Wednesday, November 20, 2019

তথ্যপ্রযুক্তির যুদ্ধে কার লাভ, কার ক্ষতি

তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়ায় যুদ্ধের দামামা বেশ জোরেসোরেই বেজে উঠেছে। অনেক আগে থেকেই এক ধরনের স্নায়ুযুদ্ধ চলছিল যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে, যার অংশ ছিল প্রায় গোটা দুনিয়া। কিন্তু চীনা প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষায়িত নিষেধাজ্ঞা জারি এবং একই সময়ে হুয়াওয়ের সঙ্গে গুগলের চুক্তি বাতিলের প্রেক্ষাপটে যুদ্ধটা এখন আর শুধু স্নায়ুর টানাপোড়েনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বিশ্ব বাণিজ্যের ময়দানে পূর্ণাঙ্গ অবয়বে প্রতিভাত হতে শুরু করেছে। কিন্তু এই যুদ্ধে কার লাভ, কার ক্ষতি? এই যুদ্ধের ভেতরে ভবিষ্যতের জন্য কোনো সম্ভাবনা কি আছে?

আধুনিক যুগের কম্পিউটার প্রযুক্তির জনক হিসেবে খ্যাত চার্লস ব্যাবেজের মেকানিক্যাল কম্পিউটার থেকে শুরু করে আজকের স্মার্ট কম্পিউটিং ডিভাইস পর্যন্ত বিশ্বে কম্পিউটিং সিস্টেমের উপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রেখেছে যুক্তরাষ্ট্র। তথ্য ভাণ্ডারের বিবেচনায় আধুনিক কম্পিউটার থেকে সুপার কম্পিউটারই হোক, আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে সর্বাধুনিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা, টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক কিংবা ডিভাইসই হোক– সবকিছুতেই যুক্তরাষ্ট্র একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রেখেছে।

আপনি কম্পিউটার বা ল্যাপটপ কিনতে গেলে সাধারণত কোন কোন ব্র্যান্ডের কথা আগে ভাবেন? নিশ্চয়ই ডেল, এইচপি, আসুস কিংবা লেনোভোর কথা। এই চারটি প্রধান ব্র্যান্ডের মধ্যে ডেল, এইচপি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি। আর আসুস তাইওয়ানের কোম্পানি হলেও এর ওপর নিয়ন্ত্রণ চীনের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রেরই বেশি। লেনোভো চীনের কোম্পানি, ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর এটি প্রথম বিশ্বে নাড়া দেয় ২০০৮ সালে, যখন এর মার্কেট শেয়ার শীর্ষ পাঁচটি ব্র্যান্ডের মধ্যে চলে আসে। আর একটি কোম্পানি কমপ্যাক বেশ ভালোভাবে বাজারে এসেছিল, কিন্তু এটা অধিগ্রহণ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের এইচপি।

স্ট্যাটিসটার তথ্য অনুযায়ী, ডেস্কটপ ও ল্যাপটপ কম্পিউটার অপারেটিং সিস্টেমের (ওএস) ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত ৭৬ শতাংশ একক মার্কেট শেয়ার যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রোসফটের। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপলে'র আইওএসে'র মার্কেট শেয়ার ১২ দশমিক ৩ শতাংশ। আর লিনাক্সের ১ দশমিক ৬ শতাংশ। অন্যদিকে স্মার্টফোনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান গুগলের অ্যান্ড্রয়েড ওএসের মার্কেট শেয়ার ৭৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আইওএসে'র ২২ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আবার ধরুন, এন্টারপ্রাইজ নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি সিসকো এক নম্বরে, ব্রডব্যান্ড ইন্টারন্টে বা ফাইবার অপটিক ট্রান্সমিশন যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি সিয়েনা এক নম্বরে। আপনি ডিভাইস তৈরির জন্য চিপসেট, মাইক্রোচিপ যেটার কথাই বলুন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কোয়ালকম, ইনটেল, ডেল সিংহভাগ বাজার দখল করে আছে। শুধুমাত্র টেলিযোগাযোগে রেডিও যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে চীনের হুয়াওয়ে ২০১৮ সালে ২৯ শতাংশ শেয়ার নিয়ে বিশ্ব বাজারে এক নম্বরে ছিল, যা এ বছর ৩২ শতাংশে বিস্তৃতি হওয়ার আভাস রয়েছে।

স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার স্যামসাং ২০১৯ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ২৩ শতাংশ একক মার্কেট শেয়ার নিয়ে শীর্ষে আছে। তার ঠিক নিচে থাকা চীনের হুয়াওয়ের মার্কেট মেয়ার ১৯ শতাংশ। আর যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপলের আইফোনের মার্কেট শেয়ার ১১ শতাংশ। এর বাইরে বিভিন্ন দেশের স্থানীয় কোম্পানিগুলোর ক্ষুত্র ক্ষুদ্র মার্কেট শেয়ার রয়েছে। এসব ছাড়াও অনলাইনে বিশ্বে জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, যেমন: ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব, ইয়াহু, হোয়াটস অ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম– সবকিছুই যুক্তরাষ্ট্রের মালিকানাধীন।

উপরের পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে কম্পিউটার, স্মার্টফোন, নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতির মূল উপাদান চিপসেট, মাইক্রোচিপ থেকে শুরু করে নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি এবং কম্পিউটিং সিস্টেমের সব কিছুর বাজার মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোরই নিয়ন্ত্রণে। এখানেই প্রশ্ন ওঠে– তাহলে এ তথ্যপ্রযুক্তির যুদ্ধে চীনের সত্যিই কোনো অবস্থান আছে কি? খোলা চোখে দেখলে তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে চীনের অবস্থানও এখনও খুবই দুর্বল কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মত নয়। কিন্তু খোলা চোখে এই যুদ্ধটাকে দেখলে ভুল হবে।

এখানে যুদ্ধের দু'টি দিক আছে। প্রথম দিকটি হচ্ছে, চীনের নিজস্ব বাজার। একশ' কোটির বেশি মানুষের দেশ চীন নিঃসন্দেহে বিশ্বের বৃহত্তম বাজার। এই বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো ক্রমাগত বাজার হারিয়েছে। কারণ চীনা কোম্পানিগুলো যতটা না বিশ্ব বাজারের দিকে নজর দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি নজর দিয়েছে নিজের বাজারের দিকে। কারণ চীনের বাজারে ১০ থেকে ১২ শতাংশ মার্কেট শেয়ার পেলেই একটা কোম্পানি লাভের হিসেব করতে পারে চোখ বন্ধ করে। চীনে যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় নেটওয়ার্কিং সাইট ফেসবুক, গুগল, ইয়াহু, হোয়াটস অ্যাপ, ইউটিউব, জিমেইল সবকিছুই বন্ধ। এর পরিবর্তে চীনারা ব্যবহার করে উইচ্যাট আর ইউবো। এ দু'টি নেটওয়ার্কিং সাইটের কথা চীনের বাইরে অনেকেই জানেন না। কিন্তু চীনে এ দু'টি সাইটের মার্কেট শেয়ার ৯৫ শতাংশের বেশি। চীনের বাজারে আইফোনের মার্কেট শেয়ার ১০ শতাংশ, স্যাংমসাংয়ের ১ শতাংশের নিচে। যেখানে চীনের হুয়াওয়ের ৬০ শতাংশ, শাওমি, ভিভো, অপোর বাকি প্রায় ৩০ শতাংশ। চীনা কর্তৃপক্ষের যুক্তি হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেটওয়ার্কিং সাইটগুলো সারা বিশ্বের মানুষের তথ্যের মালিক হয়ে যাচ্ছে, যে তথ্য তারা যে কোনো সময় অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করতে পারে। যে কারণে চীনের মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের নেটওয়ার্কিং সাইট ব্যবহার করতে পারবে না। অথচ অদ্ভুত হচ্ছে, চীনা কোম্পানিগুলো নেটওয়ার্কিং ডিভাইস থেকে শুরু করে স্মার্টফোন– সবকিছুতেই মার্কিন কোম্পানির তৈরি মাইক্রোচিপ ও চিপসেট এবং মাইক্রোপ্রসেসর ব্যবহার করছে! হুয়াওয়ে, অপো, ভিভো, ওয়ান প্লাস– সবাই নিজেরা গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করছে, অথচ চীনে গুগলের ব্যবহার নিষিদ্ধ!

উল্টোদিকে চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ে, জেডটিই'র নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তথ্য চুরি ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইউরোপীয় দেশগুলো বার বার কোম্পানি দু'টিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাপলসহ বেশিরভাগ কোম্পানিরই সবচেয়ে বড় কারখানা চীনে অবস্থিত এবং 'রেয়ার আর্থ' (মাইক্রোচিপসহ ডিভাইস তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতব মৌল খনিজ উপাদান ল্যান্থানাইড গ্রুপের ১৫টি এবং স্কায়ন্ডিয়াম ও ইট্রিয়াম) মৌল কিনছে চীনের কাছ থেকেই! প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য উৎপাদনে অপরিহার্য রেয়ার আর্থ মৌলের ব্যবসায় যেহেতু চীনের একক আধিপত্য, সে কারণে চীন এটাকেও পুঁজি করে যুক্তরাষ্ট্রকে বেকায়দায় ফেলতে পারে। কিন্তু জাপানসহ বিভিন্ন দেশের ভূতত্ত্ববিদরা প্রমাণ করেছেন, নাম 'রেয়ার আর্থ' হলেও প্রকৃতপক্ষে এই খনিজ মৌল উপাদান বিশ্বে 'রেয়ার' নয়। বাজারের বাস্তবতায় এতদিন পর্যন্ত চীনের বাইরে অনেক দেশ বিপুল সম্ভার থাকা সত্ত্বেও রেয়ার আর্থের বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায়নি, কিন্তু চীন এটাকে পুঁজি করলে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের অনেক দেশের 'রেয়ার আর্থ' মৌলের বাণিজ্যিক উৎপাদনে যেতে বেশি সময় লাগবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোতে প্রতিকূল পরিস্থিতি থাকা সত্ত্বেও চীনা কোম্পানি হুয়াওয়ের উত্থান তথ্যপ্রযুক্তির বাজারে সত্যিই একটি বিস্ময়। হুয়াওয়ে চীনের একমাত্র কোম্পানি যারা তথ্যপ্রযুক্তির বিশ্ববাজারে নিজেদের শীর্ষ পর্যায়ভুক্ত করেছে এবং এত কম সময়ে বিশ্বজুড়ে হুয়াওয়ে এত বেশি বিস্তৃত হয়েছে যেটা যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বড় অস্বস্তির জন্ম দিয়েছে। চীনের বাজার তো নেইই, এখন বিশ্ববাজারে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ভীত কাঁপিয়ে দিয়েছে হুয়াওয়ে।

হুয়াওয়ে বিশ্ববাজারে নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তির ব্যাপক বাজারজাতকরণ শুরু করে ২০০০ সাল থেকে। ২০১০ সালের মধ্যেই হুয়াওয়ে এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সিসকো, সিয়েনা, সিমেন্স, অ্যালকাটেল, ইউরোপের এরিকসন, নোকিয়ার বাজারে ধস নামিয়ে প্রবল আধিপত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। এশিয়া ও আফ্রিকায় হুয়াওয়ের মার্কেট শেয়ার ৬০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ২০১৫ সালের মধ্যে হুয়াওয়ে ইউরোপের বাজারের ২০ শতাংশের বেশি মার্কেট শেয়ার দখলে নেয়। আবার স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে হুয়াওয়ের ২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করে ২০১৮ সালের মধ্যেই বিশ্ববাজারে দ্বিতীয় স্থানে চলে আসাটাও বড় বিস্ময়ের। এমনকি হুয়াওয়ে চীনের একমাত্র কোম্পানি যারা সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা নিয়ে নিজেদের অপবাদ ঘুচিয়ে ২০১৮ সালেই 'নিরাপদ প্রযুক্তি'র জন্য আর্ন্তজাতিক স্বীকৃতিও পেয়েছে।

অতএব চীনের একটি কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের এতগুলো কোম্পানিকে এভাবে বিশ্ববাজারে পর্যুদস্ত করে ফেলছে যেটা নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষকে বেশ চিন্তিত করেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। কিন্তু এবারে কট্টর রক্ষণশীল চিন্তার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন তাকে হুয়াওয়ের অগ্রযাত্রায় বড় বাধা হিসেবে দেখছেন অনেক প্রযুক্তবিদ। এই নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কোম্পানিকে হুয়াওয়ের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হলে বিশেষভাবে অনুমতি নিতে হবে। প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি কেয়ালকম ও ইনটেল মাইক্রোচিপ ও চিপসেট সরবরাহ না করলে হুয়াওয়েকে বিকল্প উৎপাদনের কথা ভাবতে হবে। এই বিকল্প পথে যাওয়ার সক্ষমতা হয়তো হুয়াওয়ের আছে, কিন্তু সে পথে যেতে যে সময়টা লাগবে তার প্রবল নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বিশ্ববাজারের মার্কেট শেয়ারে। আবার হুয়াওয়ের স্মার্টফোনে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহার করা সম্ভব না হলে এক্ষেত্রেও হুয়াওয়েকে নতুন করে ভাবতে হবে। ভাবতে হবে বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয় জিমেইল, গুগল ম্যাপ কিংবা ইউটিউবের বিকল্পও। এসব ক্ষেত্রে বিকল্প তৈরি হুয়াওয়ের মত বিশাল কোম্পানির জন্য অসম্ভব নয়। কিন্তু বিকল্প অপারেটিং সিস্টেম এবং নেটওয়ার্কিং সাইটের বাজার তৈরি করা সত্যিই কঠিন, যা সামনের দিনগুলোতে হুয়াওয়েকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।

এক্ষেত্রে আপাতত সংকট হলেও হুয়াওয়ের হাত ধরে বিশ্ব তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন মেরুকরণের একটা সম্ভাবনাও বিপুলভাবে তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের আগের উদারপন্থী প্রেসিডেন্টরা বিশ্ববাজারের যুক্তির আলোয় নানা বিচার-বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের কৌশল অবলম্বন করতেন। যে কারণে তারা চীনের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে নানাভাবে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরশীল করে রাখার কৌশল নিয়েছিলেন। রক্ষণশীল নীতির হলেও চীনা কর্তৃপক্ষ সহজে এবং কম সময়ে বাজার দখলের ব্যাকুলতা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে এতদিন খুব বেশি বিচলিত বোধ করেনি। কিন্তু অতি রক্ষণশীল ট্রাম্প যুক্তিকে পেছনে ঠেলে রক্ষণশীল নীতির চোখ দিয়ে বিশ্ববাজারকে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলেছেন। তিনি চারদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর একচ্ছত্র মার্কেট শেয়ারে অভিভূত হয়ে নিয়ন্ত্রণে কৌশলের খোলসটাকে দুর্বল করে দিয়েছেন একটা নিষেধাজ্ঞা জারি করেই। আর এটাই তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনাকে প্রবল করে তুলেছে। কারণ ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা পরবর্তী পরিস্থিতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে প্রযুক্তিগতভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করবে। দুই-তিন বছর বিশ্ববাজারে হুয়াওয়েকে হয়ত খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতে হবে, উজানে নৌকা ঠেলতে হবে। কিন্তু চীনা কর্তৃপক্ষ এবং চীনের কোম্পানিগুলো এখন স্রোতের গতিমুখই বদলে দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা নেবে। সেটায় তারা সফল হলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই একক আধিপত্য ধরে রাখা যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে বিশ্ববাজারে অস্তিত্ব ধরে রাখতে কঠোর পরীক্ষার মুখে পড়তে হবে। কারণ চীন শুধু তথ্যপ্রযুক্তিতে নয়, এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন অ্যামেরিকা ও ইউরোপের একটি অংশে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আধিপত্যটাও স্পষ্ট করেছে। ফলে তথ্যপ্রযুক্তি দুনিয়ার আজকের যুদ্ধ অদূর ভবিষ্যতে বড় বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক যুদ্ধেরও ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সবশেষ একটা আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য। তথ্যপ্রযুক্তির দুনিয়ায় হুয়াওয়ের উত্থান সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য নেটওয়ার্কিং প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি থেকে ডিভাইস– সবকিছুই সুলভ মূল্যে পাওয়া সহজ করে দিয়েছিল। কিন্তু আজকের 'যুদ্ধাবস্থার' কারণে প্রযুক্তি পণ্যের দাম বেড়ে গেলেও যেতে পারে।

কবুতর কাহিনি by রিম সাবরিনা জাহান সরকার

ক্লাস টু-তে পড়ি। শীতকাল। ফুলার রোডের টিচার্স কোয়ার্টারের মাঠে কোর্ট কেটে ব্যাডমিন্টন খেলা চলছে। কার সঙ্গে খেলে যেন গো-হারা হারছি। কোর্টের বাইরে নিরাপদ দূরত্বে দুইটা বাদামি কবুতর অস্থির পায়চারিতে ব্যস্ত। নাম বাবিন আর বাবলি। উড়তে তাদের বেশি ভালো লাগে না। ভালো লাগে পিছু পিছু হাঁটতে কিংবা ডিমে তা দেওয়ার ভঙ্গিতে কাঁধে বসে থাকতে। খেলা শেষে হাঁপাতে হাঁপাতে তাদের ইশারায় ডাকলাম। টায়রা দুলিয়ে দুজন হাঁসের মতো হেলেদুলে দৌড়ে এল। একজন টপ করে কাঁধে চড়ে বসল, আরেকজন সমান গতিতে পা মিলিয়ে হাঁটছে।
পোষা পাখির এত দূর পোষ মেনে যাওয়ায় পাখির মালকিন আমি আহ্লাদে আটখানা। তার ওপর বাবা-মা বাসায় নেই। তারা নানির জিম্মায় ছেলেমেয়ে রেখে সপ্তাহখানেকের জন্য বন্য প্রাণীর ওপর এক কনফারেন্সে ভারতের দেরাদুনে গেছেন। সেই সুযোগে আমরা দুই ভাইবোন নিজেরাই বন্য প্রাণী হয়ে উঠছি। একজন কাঁধে কবুতর নিয়ে পাড়াময় ঘুরে বেড়াই। আর ক্লাস নাইনে পড়া বড়জনেরও বেশ পাখাটাখা গজিয়ে গেছে। সন্ধ্যার আগে তার টিকির দেখা মেলে না।
এহেন অবস্থায় বেশির ভাগ সময়ে নানি আসিয়া খাতুনকে খাস বরিশালের ভাষায় উচ্চকিত কণ্ঠে অদৃশ্য কাউকে শাপশাপান্ত করতে দেখা যায়। ‘পিঠ পাচাইয়া কেনু (বাংলা মাইর) একখান দেলে বোজবাআনে মনু। কইতর কান্ধে ঘোরে। কইতর না য্যান একেকডা মুরহা’। মৃদু প্রতিবাদ করি, ‘নানি, কেনু দিলে কিন্তু আম্মুকে বলে দেব। আর প্লিজ আমার কবুতরকে মুরগি বলবেন না।’ লাভ হয় না সচরাচর। উত্তরে উল্টো শুনতে হয়, ‘ওয়া মোর আল্লাহ তাআলা, মুরহা-কইতর লইয়া কোম্মে যে মুই যাই...হালার পা’লা (হালার পো হালা) পোলাপান মোরে বোগদা পাইসে...।’ সেই সঙ্গে পোলাপান কর্তৃক এত অত্যাচারের পরও তার কপালে কেন ‘ঠাডা’ পড়ছে না তাই নিয়ে মিহি সুরে বিলাপ চলতে থাকে।
নানির হাতে চব্বিশ ঘণ্টা গরম খুন্তি থাকে। তাই তাঁকে বেশি ঘাঁটাই না। তবে কথাগুলো প্রায় মুখস্থ হয়ে এসেছে। বিশেষ করে হালার পা’লা। সব মিলিয়ে আঠারোটা কবুতরকে লাইনে রাখতে গালিটা ভালো কাজে দিচ্ছে। নানির মেজাজ বাই পোলার ধাঁচের। এই ঠান্ডা তো এই গরম। মেজাজ ঠান্ডা হলে নানি দু-একটা ‘কইতর’কে বাটার জুতার বাক্সে বসিয়ে নিয়ে আসেন। আমিও আস্তে করে বাক্সটা মাথার কাছে রেখে ঘুমিয়ে যাই। শীতের মাঝরাতে কবুতর বাক্স ডিঙিয়ে বিড়ালের মতো লেপের ওমে হানা দেয়। বাসার বিশাল একটা বারান্দা আমার পাখিদের জন্য বরাদ্দ। রেডিও, টেলিভিশনের কার্ডবোর্ডের বাক্স বেঁধে তাদের ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। লাই পেয়ে পেয়ে কবুতরের সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে এখন দেড় ডজন। সকালের আলো ফুটতেই বাকবাকুম রবে পুরো ব্যাটালিয়নটা তাদের ব্যারাকে, মানে বারান্দায় এক দফা লেফট-রাইট ঠুকে নেয়।
আজকে আমিও তাদের দলে আছি। তবে ভিন্ন কারণে। ছড়া আওড়াচ্ছি। পাড়ায় বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেখানে কাজী নজরুলের ‘প্যাঁচা’ শুনিয়ে আসতে হবে। মা যাওয়ার আগে পাখি পড়া করে শিখিয়ে–পড়িয়ে দিয়ে গেছেন। ছড়াটা নাকি নজরুল সাহিত্যের সেরা সৃষ্টি। প্যাঁচার ওপর বিস্তর গবেষণা করা প্রাণীবিদ মায়ের তাই ধারণা। যদিও আমার কিঞ্চিৎ দ্বিমত আছে। তো ছড়ার ফাঁক–ফোকরে বুদ্ধি করে ইম্প্রোভাইজেশন হিসেবে হালকা অভিনয় জুড়ে দিয়েছি। সেটারই ঝালাই চলছে।
‘ঠ্যাং চ্যাগাইয়া প্যাঁচা যায়/ যাইতে যাইতে খ্যাঁচখ্যাচায়’
‘প্যাঁচায় গিয়া উঠল গাছ/ কাওয়ারা সব লইল পাছ’

এখানে সামান্য অভিনয়। একটু উদ্বাহু হাউমাউ মানে প্যাঁচা গাছে উঠে গেছে। তারপর ডানা জাপটে ধেয়ে আসা মানে কাক পিছু নিয়েছে। নিজেই প্যাঁচা, নিজেই কাক। দ্বৈত চরিত্র। প্রতিভা দেখানোর সুযোগ প্রতিদিন আসে না।
‘প্যাঁচার ভাইস্তা কোলা ব্যাঙ/ কইল চাচা দাও মোর ঠ্যাং’-টেংরি ভাঙা লুলা ভাইস্তা হিসেবে পাড়ার কোনো ছেলেকে ভুজুং দিয়ে পটাব নাকি ভাবছি।
যা হোক, ছড়া ঠোটস্থ হয়ে গেছে। শুধু সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না, আবৃত্তির সময় লুকিয়ে একটা দুইটা কবুতর নিয়ে যাব কিনা। এরা সঙ্গে থাকলে ভরসা লাগে। কিন্তু মঞ্চে আচমকা উড়ে গিয়ে কারও গায়ে পড়লে ঝামেলা বাঁধতে পারে। সুতরাং, এই চিন্তা বাদ দিতে হলো। সন্ধ্যায় কবুতর ছাড়াই ঢিপঢিপ বুকে মঞ্চে উঠলাম। ভালোই চলছিল। কিন্তু গোল বাঁধল শেষের কয়েক লাইনে। ‘প্যাঁচায় কয় বাপ, বাড়িতে যাও/ পাছ লইছে সব হাপের ছাও’। হাপের ছাওয়ের পরের লাইন বেমালুম ভুলে গেলাম। ইঁদুর জবাই কইরা খায়/ বোঁচা নাকে ফ্যাচফ্যাচায়’—এই অতি কাব্যিক পঙ্‌ক্তিটা আর মনে পড়ছে না। ঘেমে নেয়ে বার কতক অ্যাঁ অ্যাঁ করে শেষমেশ নিজেই একটা হাপের ছাও হয়ে মঞ্চের পেছনের পর্দায় ঝুলে পানির ফোঁটার মতো চুইয়ে নেমে যাওয়ার তাল করছি। শেষ মুহূর্তে হঠাৎ আরেকটা র‍্যান্ডম ছড়ার দুই লাইন মনে পড়ে গেল। ‘শেয়ালের ল্যাজ, গোটা দুই প্যাঁচ’ আর কী সব গাঁজাখুরি আওড়ে ইজ্জতের দফারফা হওয়ার আগেই দিলাম এক চম্পট।
তারপর থেকে কিরা কাটলাম, কবুতর ছাড়া কোথাও যাওয়া যাবে না। এরা আমার আত্মবিশ্বাসের চাবিকাঠি। কিন্তু লোকে ভাবে এক, হয় আরেক। একদিন মায়ের সঙ্গে স্কুল থেকে ফিরে দেখি ঘরটা বেশি বড়সড় আর ছিমছাম লাগছে। যেন কেউ জঞ্জাল সরিয়ে সব গুছিয়ে রেখেছে। মনটা বেশ ফুরফুরে লাগল। কিন্তু মা বললেন, বাসায় চুরি হয়েছে। ফ্রান্স থেকে সাধ করে নিয়ে আসা টাইপরাইটার থেকে শুরু করে হাল মডেলের ক্যামেরা, সব লোপাট। ছুটা বুয়া নুরবানু ও তার দল কাজটা খুব দ্রুততার সঙ্গে সুচারুভাবে করেছে। মালসামাল সরিয়ে নুরবানু শেষবারের মতো মায়া করে বোধ হয় ঘর ঝাড়ু দিয়ে মুছেও গেছে। পুলিশে নালিশ করলে মাসখানেক বাদে এটুকু তথ্য ছাড়া আর কিছু জানা গেল না। এই ঘটনার পর তড়িঘড়ি করে বাসা বদলের তোড়জোড় শুরু হলো।
একই পাড়ায় আরও বড় বাসা পাওয়া গেল। সেটা এত বড় যে অনায়াসে ক্রিকেট খেলা যাবে। তবে সমস্যা আছে। কবুতর নেওয়া যাবে না। এরা খালি বাসায় কয়েক দিন বসে থেকে এদিক-ওদিক উড়ে চলে যাবে। কোনো ব্যাপার না। এই সিদ্ধান্তে নানি বেজায় খুশি। তিনি এই সুযোগে সালুনের হুররা (তরকারির ঝোল) রাঁধার জন্য গোটা কয়েক কবুতর চেয়ে বসলেন। চালের রুটির সঙ্গে দারুণ জমবে। সব দেখেশুনে অধিক শোকে পাথর হয়ে পাখির মায়া ত্যাগ করতে রাজি হলাম। শুধু শর্ত হলো, কবুতর খাওয়া যাবে না। কালী, রাজা, পাফিন, ফ্যাশফ্যাশ, কুটনি ওরা সবাই আমার বন্ধু। বন্ধুকে মেরে খাওয়া অবান্তর চিন্তা।
কবুতরগুলোর কেউ নানির সালুনের হুররা হয়েছিল কিনা সেটা বলতে ইচ্ছা করছে না। আসলে ছোট মানুষকে কেউ পাত্তা দেয় না। দুঃখজনক সত্য। নতুন বাসায় আমি মন খারাপ করে ঘুরি। স্কুলের পর ফিরে অজান্তেই চোখ চলে যায় দূরের দালানের কার্নিশে। সেখানে চলে বদখত দাঁড় কাক নয় তো বাচাল শালিকের আড্ডা। কিন্তু এক দুপুরে ঘটল আজব ঘটনা। দূর কার্নিশে দুধ সাদা কুটনি আর দাবার ছকের মতো সাদাকালো ফ্যাশফ্যাশকে দেখতে পেলাম যেন। ভালো করে চোখ কচলে আবার তাকালাম। তারপর চেঁচিয়ে, লাফিয়ে, হাত নেড়ে, গামছা-তোয়ালে উড়িয়ে যেভাবে পারি ডাকতে থাকলাম। বাড়ির সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে কবুতরের জোড়াটা উড়ে এসে টান বারান্দার গ্রিলে বসল।
পুরোনো বন্ধু ফিরে পেয়ে কত কী যে সেদিন তাদের বলেছিলাম, আজকে সেসব আর মনে নেই। শুধু মনে হয়েছিল, তাদের ঠিকমতো বিদায় বলে আসা হয়নি। বরং চোরের মতো লুকিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু পশুপাখির সৌজন্যবোধ প্রখর। তারা তাই একবার ভালো করে বিদায় নিতে এসেছে। কিন্তু ওই এক দিনই। এরপর আর মেলে না নোটন নোটন পায়রাগুলোর দেখা। কার্নিশজুড়ে আবার সেই গম্ভীর কাক-শালিকের ভিড়। তবুও শেষ বিকেলের ঘোর লাগা আলোয় ছোট্ট মনের কল্পনায় এক আধটা সফেদ পালক উড়ে ঘুরে দূরে হারিয়ে যায়। সে খবর কেউ জানল না।
>>>ড. রিম সাবরিনা জাহান সরকার: গবেষক, ইনস্টিটিউট অব প্যাথলজি, স্কুল অব মেডিসিন, টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি মিউনিখ, জার্মানি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি পেতে যাচ্ছে ৯ বছর বয়সী জিনিয়াস!

বেলজিয়ামের ৯ বছর বয়সী এক শিশুকে স্নাতক ডিগ্রি দিতে যাচ্ছে দেশটির একটি বিশ্ববিদ্যালয়। লরেন্ট সাইমন্স নামের এই জিনিয়াস পড়াশুনা করছিলেন আইনধোভেন ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে। এই কোর্স গড়পড়তা সাধারণ বয়সী শিক্ষার্থীদের জন্যও অনেক কঠিন বলে বিবেচিত হয়। আর সেখানে মাত্র ৯ বছর বয়সেই ডিগ্রি লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছে ওই শিশু। ডিসেম্বরে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ডিগ্রি প্রদান করা হবে। এ খবর দিয়েছে সিএনএন।

খবরে বলা হয়, স্নাতক লাভের পর তড়িৎ প্রকৌশল নিয়ে পিএইচডি করার ইচ্ছা রয়েছে সাইমন্সের। তার পিতা বলেছেন, তার ইচ্ছা রয়েছে মেডিসিন ডিগ্রি লাভেরও! তার মা ও বাবা, লিডিয়া ও আলেক্সান্ডার বলেন, অনেক আগে লরেন্টের দাদী তার অনেক প্রশংসা করছিলেন। কিন্তু তারা ভেবেছিলেন দাদী হয়তো একটু বাড়িয়ে বলছিলেন।
কিন্তু শেষে শিক্ষকরাও তাদেরকে জানান যে, তাদের সন্তান বিশেষ মেধা নিয়ে পৃথিবীতে এসেছে। লিডিয়া বলেন, শিক্ষকরা তার মধ্যে খুবই আশ্চর্যজনক কিছু গুণ দেখতে পান।
লরেন্টের পরিবারে অবশ্য ডাক্তারের সংখ্যা বেশি। কিন্তু তারাও আজ অবদি ঠাওর করতে পারছেন না যে, লরেন্ট কীভাবে এত দ্রুত সব শিখতে পারে। অবশ্য লিডিয়া মজা করে বললেন, গর্ভাবস্থায় অনেক মাছ খেয়েছিলাম। সেটা একটা কারণ হতে পারে!
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা অন্যান্য শিক্ষার্থীদের চেয়েও লরেন্টকে তাড়াতাড়ি এই স্নাতক কোর্স শেষ করতে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা পরিচালক জোয়ের্ড হালশফ বলেন, এটি অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ শিক্ষার্থীরা যাদের দ্রুত কোর্স শেষ করার যৌক্তিক কারণ রয়েছে তারা বিশেষ সময়সীমা পেতে পারেন। ক্রীড়াক্ষেত্রে খুব ভালো করেন এমন শিক্ষার্থীদের বেলায়ও এই বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়।

হালশফ বলেন, লরেন্ট স্রেফ অসাধারণ! আমরা এ পর্যন্ত যত শিক্ষার্থী পেয়েছি, লরেন্ট তাদের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত সব শিখে ফেলেছে। সে শুধু অত্যন্ত মেধাবীই নয়, খুব অনুুুভূতিপ্রবণও। লরেন্ট সিএনএনকে বলেছে যে, তার প্রিয় বিষয় হলো তড়িৎ প্রকৌশল। এছাড়া মেডিসিন নিয়েও পড়াশুনা করার ইচ্ছে আছে তার।

লরেন্টের এই অনন্যসাধারণ কীর্তির কথা এখন ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বের সবচেয়ে নামীদামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইতিমধ্যে তাকে ভর্তি করানোর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এখনই লরেন্টের পরিবার বলতে চায় না যে, সে কোথায় পিএইচডি করার কথা ভাবছে। তার পিতা বলেন, তথ্য নিজের ভেতরে নেওয়াটা লরেন্টের জন্য সমস্যা নয়। এখন তার ফোকাস হওয়া উচিত গবেষণা ও নিজের লব্ধ জ্ঞান প্রয়োগ করে নতুন কিছু আবিষ্কারের প্রতি।

লরেন্ট হয়তো বেশিরভাগ মানুষের চেয়ে দ্রুতগতিতে সব শিখতে পারে। কিন্তু তার পিতামাতা চান তার শৈশব যেন নষ্ট না হয়। আলেক্সান্ডার বলছিলেন, আমরা চাই না সে খুব সিরিয়াস হয়ে যাক। সে যা করতে পছন্দ হয় তা-ই করে। একজন শিশু ও তার প্রতিভার মধ্যে ভারসাম্য থাকা চাই। লরেন্ট অবশ্য তার পোষা কুকুর স্যামির সঙ্গে সময় কাটাতে পছন্দ করে। এছাড়া ফোনে গেম খেলে অন্য শিশুদের মতোই। তবে বেশিরভাগ ৯ বছর বয়সী শিশু যেটা পারেনি, লরেন্ট সেটা ইতিমধ্যে করে ফেলেছে। সে নিজের জীবনের লক্ষ্য ঠিক করে ফেলেছে! তার ইচ্ছা কৃত্রিম অঙ্গপ্রত্যঙ্গ তৈরি করা।
তবে সবকিছুর আগে জাপানে ছুটি কাটাতে যেতে চায় লরেন্ট।

ধনীদের পছন্দের দামি ১০ পণ্য

ঢাকার রাস্তায় ২০০ টাকায়ও হাতঘড়ি পাওয়া যায়। সেই ঘড়িতেও সময় দেখা যায়। কিন্তু অতিধনীদের ঘড়ি শুধু সময় দেখার জন্য নয়, সেটা আভিজাত্যেরও প্রতীক। সে কারণে তাঁরা ঘড়ি কিনতে কোটি টাকা ব্যয় করেন। ২০১৮ সালে একটি ঘড়ি বিক্রি হয়েছে ৫৯ লাখ মার্কিন ডলারে, বাংলাদেশি মুদ্রায় যার দাম পড়েছে ৫০ কোটি টাকা।
ধনীরা কী কেনেন, কোথায় বিনিয়োগ করেন, তাঁদের কাঙ্ক্ষিত বস্তু কী কী—এসব বিষয় উঠে এসেছে নাইট ফ্রাঙ্ক নামের যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি
প্রতিষ্ঠানের সম্পদ প্রতিবেদন বা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৯-এ। এতে ২০১৮ সালে ধনীরা সবচেয়ে বেশি দাম দিয়ে কী কী বস্তু কিনেছেন, তার একটা তালিকাও তুলে ধরা হয়।
তালিকায় দেখা যায়, চিত্রকর্মের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম উঠেছে ইংরেজ চিত্রশিল্পী ডেভিন হকনির ‘পোট্রেট অব অ্যান আর্টিস্ট’ নামের একটি চিত্রকর্মের। সাড়ে ৯ কোটি ডলার বা ৯৬৫ কোটি টাকায় নিলামে বিক্রি হয়েছে চিত্রকর্মটি। কে কিনেছেন, তা নেই নাইট ফ্রাঙ্কের প্রতিবেদনে।
ধনীরা সাধারণত দুষ্প্রাপ্য হুইস্কি সংগ্রহে রাখতে পছন্দ করেন। ২০১৮ সালে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে দামি হুইস্কির মূল্য ১৫ লাখ ডলার বা ১ কোটি ২০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। ম্যাকালান-১৯২৬ নামের ওই হুইস্কির উৎপাদক যুক্তরাজ্যের দ্য ম্যাকালান ডিস্টিলারি। যে বোতলে ওই হুইস্কি বিক্রি হয়েছে, সেটার গায়ে আবার চিত্রশিল্পী মাইকেল ডিলনের নিজ হাঁতে আকা চিত্রকর্ম রয়েছে।
ফ্রান্সের রানি মারি অ্যান্তনয়েত্তির একটি গলার হার নিলামে বিক্রি হয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারে (৩০৬ কোটি টাকা)। যেটি অলংকারের মধ্যে সবচেয়ে দামি। সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হওয়া ঘড়িটি রোলেক্সের তৈরি। ‘১৯৭০ রোলেক্স ডেটোনা’ নামের ঘড়িটি নিলামে ৫০ কোটি টাকায় বিক্রি করে ফিলিপস নামের একটি নিলামকারী প্রতিষ্ঠান।
ইতালির অভিজাত গাড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ফেরারি ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ‘ফেরারি ২৫০ জিটিও’ মডেলের কিছু গাড়ি তৈরি করেছিল, যার একটি গত বছর ৪ কোটি ৮৪ লাখ ডলারে (৪১১ কোটি টাকা) নিলামে বিক্রি হয়। এটাই ছিল নিলামে বিক্রি হওয়া সবচেয়ে দামি গাড়ি।
ফ্রান্সের একটি ওয়াইন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের ৭৪ বছর পুরোনো এক বোতল ওয়াইন বিক্রি হয় ৫ লাখ ৫৮ হাজার ডলারে, যা ২০১৮ সালের সবচেয়ে
দামি ওয়াইনের তকমা পায়। এটিও নিলামেই বিক্রি হয়েছে।
ধনীরা পুরোনো স্ট্যাম্প, রঙিন হীরা, পুরোনো মুদ্রা বা কয়েন ও আসবাবও সংগ্রহে রাখতে পছন্দ করেন। যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর ১৯১৮ সালের একটি স্ট্যাম্প বিক্রি হয়েছে ১৬ লাখ ডলারে (সাড়ে ১৩ কোটি টাকা)। পোল্যান্ডের ১৬২১ সালের একটি স্বর্ণমুদ্রা বিক্রি হয় ২২ লাখ ডলারে (১৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা)। ১৯ ক্যারেটের একটি গোলাপি হীরা বিক্রি হয় ৫ কোটি ডলার বা ৪২৫ কোটি টাকায়।
আসবাবের মধ্যে সবচেয়ে দামি পণ্যটি ছিল একটি হাতির দাঁতখচিত দেরাজওয়ালা আলমারি। ব্রিটিশ শিল্পপতি ও রাজনীতিবিদ স্যার রোনাল্ড উইনের (১৭৩৯-৮৫) বাসভবনে ব্যবহৃত ওই আলমারি ১৯৯১ সালে নিলামে এক দফা ৯ লাখ ৩৫ হাজার ডলারে (প্রায় ৮ কোটি টাকা) বিক্রি হয়েছিল। এবার দাম চাওয়া হয় ৫০ লাখ ডলার, যা বিক্রি হয়নি। অবশ্য আইনি ঝামেলা এড়াতে নিলামে ওঠানোর আগে আলমারিটি থেকে হাতির দাঁতের নকশা তুলে নেওয়া হয়।

আহমদ শাহ মাসউদঃ মৃত্যুঞ্জয়ী এক মুজাহিদের গল্প by নাঈমুর রাহমান নবীন

৯ সেপ্টেম্বর ২০০১… কাল্পনিক দুই ব্যক্তির কথোপথনঃ
(গভীর রাত পেন্টাগনের নিজ অফিসের করিডোর এর সামনে পায়চারি করছেন এক সিআইএ কর্মকর্তা, তার হাতে চুরুট, ধোঁয়া মিশে যায় অন্ধকারে আর তার সময় কাটে উৎকণ্ঠায়… একটি ফোনের অপেক্ষায় প্রতি মুহর্ত যেন অসহ্য মনে হচ্ছে)
পাশের ঘর থেকে সহযোগী…
– স্যার কফি দিব?
– (ইতস্তত হয়ে) না… হুইস্কি পাঠাও।
– জি স্যার
– এই পাকিস্তানি বলদগুলো কোন কাজ যদি ঠিক মত করত, (পেগ শেষ করতে করতে নিজে নিজে বলতে লাগলেন)।

হঠাৎ করে তার ব্যক্তিগত ফোন বেজে উঠল,ফোন ধরতে ওপাশ থেকে ভারী কর্কশ গলায়…
অজ্ঞাতঃ কাজ হয়ে গেছে।
কর্মকর্তাঃ বডি কনফার্মড?
অজ্ঞাতঃ হুম।
৪০ বছর পূর্বে…
পাঞ্জশির উপত্যকার পাহাড়ে দাঁড়িয়ে একটি ৮ বছর বয়সী আফগান বালক। সন্ধ্যায় দিগন্তে পাহাড়ের আড়ালে কিভাবে সূর্য হারিয়ে যায় তা দেখতে তার বড় ভাল লাগে। বাবা দোস্ত মোহাম্মদ রয়েল আর্মির কর্নেল, শখ করে ছেলের নাম রাখেন “আহম্মাদ শাহ্”। বড় হয়ে তার নামের সাথে যুক্ত হয় “মাসউদ”। “আহম্মাদ শাহ্ মাসউদ” নামটি কারো জন্য আতঙ্ক, আবার কারো জন্য দেশপ্রেমিক এক নায়কের প্রতিমূর্তি। বাবা-মা’র ইচ্ছা সে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ুক, কিন্তু তার ইচ্ছা সে বাবার মত যোদ্ধা হবে। স্কুলের অধ্যয়ন শেষে নিজের অমত সত্ত্বেও কাবুল ইউনিভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ভর্তি হন, ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া আবস্থায় ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতিক দল জামাতি-ই-ইসলাম(১৯৭৯) এর সাথে জড়িয়ে পড়েন। যা মূলত ছিল মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড (Muslim Brotherhood) সমর্থিত আফগান এন্টি কমিউনিস্ট পার্টি।

“লায়ন অফ পাঞ্জশির”
১৯৭৮ সালে আফগান নবাবকে হত্যার মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে সোভিয়েত মদদপুষ্ট পাপেট কমিউনিস্ট সরকার। যা সাধারণ আফগানরা কখনো মেনে নিতে পারেনি। তারা বিদ্রোহ করে সরকার পতনের জন্য। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে রাশিয়ানরা আফগানিস্তান আক্রমণ করে (১৯৭৯)। পবিত্র ভূমিতে “নাস্তিক”দের পদার্পণ সাধারণ ধর্মপ্রাণ আফগানদের মনে বর্শার মত বিঁধে। শুরু হয় একটি অসম যুদ্ধের, বস্তুর সাথে অবস্তুর সংঘাত। রুশ লাল ফৌজদের নির্বিচারে হত্যা হতে বাদ যায়নি, শিশু,তরুণ, বৃদ্ধ এমনকি গর্ভবর্তী মহিলা পর্যন্ত। গ্রামের পর গ্রাম তারা পুড়িয়ে ফেলছে, ধর্ষণ, গনহত্যা, নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা মাত্র।
দেশের এই দুর্দিনে তরুণ মাসউদ পারলেন না ভোগবিলাসে জীবন কাটাতে। যার রক্তই যোদ্ধার, সে কি পারে যুদ্ধের ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকতে? ছুটে গেলেন নিজ মাতৃভূমি পাঞ্জশিরে প্রতিরোধ গড়ে  তুলতে। পাঞ্জশিরকে বলা হয় আফগানিস্তানের হৃদয়। রুশ সেনারা সমগ্র আফগান দখল করে শুধু উত্তর প্রদেশ বাদে। রুশ সেনাদের একটি যুদ্ধে জেতার জন্য যা যা দরকার সবই ছিল, আধুনিক অস্ত্র, প্রযুক্তি, দক্ষ সেনা, গোয়েন্দা। কিন্তু সাধারণ কৃষক, পশুপালক আফগানদের ছিল তীব্র দেশপ্রেম আর ধর্মের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
অপ্রতিরুদ্ধ রুশ সেনারা এগিয়ে যাচ্ছিল পাঞ্জশির আকাশ ছোঁয়া পাহাড়ের মাঝ দিয়ে, সংখ্যায় তারা হাজার বা তার বেশি। আচমকা মাসউদ গেরিলা আক্রমণ করেন, দুই পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা নিরীহ কৃষক ঝাঁপিয়ে পড়ে রুশ সেনাদের উপর ক্ষুধার্ত বাঘের মত। রুশদের দম্ভ চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়, জয় হয় সত্যের। নয় বছর স্থায়ী আফগান যুদ্ধে একটিবারের জন্যেও তারা উত্তর প্রদেশ জয় করতে পারেনি।
অপরদিকে কোল্ড ওয়ার (COLD WAR) চলাকালীন সময় এরকম ব্যায়বহুল যুদ্ধ রাশিয়ার অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। রুশরা বাধ্য হল আফগানিস্তান ত্যাগ করতে (১৯৮৯)। এটা ছিল মাসউদ যে অপ্রতিরুদ্ধ সোভিয়েত কমিউনিস্ট সরকারের বুকে শেষ ছুরি মারেন। “The wall street” জার্নালে তাকে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল “The Afgan who won the cold war”।
১৯৯২ সালে তিনি কাবুল (আফগানিস্তানের রাজধানী) দখল করেন, আফগানিস্তানকে শত্রু মুক্ত ঘোষণা করেন। তাকে উত্তর প্রদেশের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হতে অনুরোধ করা হয়, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। পরবর্তীতে তিনি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ঘরের শত্রু বিভীষণ
আফগানিস্তান একটি বহুজাতিক দেশ যেখানে বরাবরই Pastun/পশতুন বা পাঠানরা প্রতাপশালী ছিল। কিন্তু বুরাহানউদ্দিন রব্বানী, যিনি আফগান যুদ্ধের পর রাষ্টপতি হন, তিনি ও মাসউদ দুইজনই ছিলেন (Tajks) তাজাক্স জাতি। প্রভাব প্রতিপত্তিতে তাজাক্সরা পাঠানদের চেয়ে এগিয়ে গেল যা পাঠানদের কাছে ঈর্ষনীয়।একই সময় আফগান কম্যুনিস্ট অনুসারীরা স্বাধীন আফগান সরকারের বিরুদ্ধে নানা চক্রান্ত করে, যা অনেকটা জ্বলন্ত অগ্নিশিখায় ঘি ঢালার মত। এতদিন যারা সোভিয়েতদের বিরুদ্ধে পরস্পরের কাঁধে কাঁধ রেখে নিজ মাতৃভূমির জন্য লড়াই করেছে তারাই আজ একে অপরের দিকে বন্দুক তাক করছে শুধু মাত্র নিজেদের জাতিগত স্বার্থের জন্য।
অপর দিকে আফগান যুদ্ধে অংশ নেয়া বিদেশি যোদ্ধা আল-কায়দার প্রধান ওসামা বিন লাদেন মাসউদকে অনুরোধ করেন তার সংগঠনের জন্য পাঞ্জশিরে একটি বেস ক্যাম্প স্থাপনের। কিন্তু মাসউদ আল-কায়দার উদ্দেশ্য বুঝতে পারেন এবং তাদের হটিয়ে দেন। এমন অবস্থায় আল-কায়দার এমন একজনকে প্রয়োজন পড়ে যে আল-কায়দার হয়ে আফগানিস্তানে তাদের নিরাপত্তা দেবে।
ধর্ম যখন অস্ত্র
১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফগান-পাক সীমান্তে জড়ো হয় একদল মানুষ। এদের বেশি ভাগই পাকিস্তানে আফগান রিফিউজি, সোজা ভাবে বলতে গেলে পাক-গোয়েন্দা মদদপুষ্ট আফগান। তারা একটি সংগঠন তৈরি করল যার নাম দিল ‘তালেবান’। এক বছরের মধ্যে তারা গোটা আফগানিস্তানে ছড়িয়ে পড়ল দাবানলের মত। শুধু মাত্র মাসউদের অধীনস্থ উত্তর প্রদেশ বাদে সমগ্র আফগান তাদের মুখ গহ্বরে। তালেবান একটি অত্যাধুনিক সশস্ত্র সংগঠন যার জন্ম হয়েছে কিছু দেশত্যাগী তরুণদের হাত ধরে, যাদের ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার ক্ষেত্রে রয়েছে অজ্ঞতা এবং যারা পরোক্ষভাবে সহযোগিতা পেয়েছে সৌদি আরব, এমনকি আমেরিকান পেট্রোলিয়াম কোম্পানির।
অর্থনীতির ভাষায় বলা চলে, তালেবান হল একটি ইন্ডাস্ট্রি যেখানে বিনিয়োগকারীদের সর্বোচ্চ মুনাফালাভের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরানো একান্তই জরুরী। তাই মাসউদের মৃত্যুটা অনেকটা অনিবার্য ছিল।
২০০১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর, ৯/১১ হামলার দুইদিন আগে। দুইজন বিদেশি সাংবাদিকের ছদ্মবেশে আল-কায়দার দুইজনের আত্মঘাতী হামলাকারীর শিকার হন মাসউদ। আজও ৯ই সেপ্টেম্বর মাসউদ স্মরণে আফগানিস্তা শহীদ দিবস হিসেবে পালিত হয়।
মাসউদের সবচেয়ে বড় অপরাধ ছিল তিনি ছিলেন সুন্নি হানাফি মুসলিম। তিনি স্বপ্ন দেখতেন এমন একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন দেশের, যেখানে গণতন্ত্র হবে ইসলামের আদলে। তিনি সেই গণতন্ত্রকে চাইতেন না,যেখানে প্রগতিশীলতার নামে ইসলামকে জাদুঘরে বন্দী করে রাখা হয়।
আহম্মাদ শাহ্ এর মাসউদ হয়ে ওঠা ছিল ‘শীতল যুদ্ধের অবসান’, আর তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সূচনা হল সন্ত্রাসবাদ নির্মূল নামে নতুন সাম্রাজ্যবাদের উথান। ৯/১১-এর গল্পটা ছিল আহম্মাদ শাহ্ মাসউদের গল্প।

>>নিয়ন আলোয়
তথ্যসূত্রঃ
– নিউ ইয়র্ক টাইমস ১
– নিউ ইয়র্ক টাইমস ২
– দি ফেমাস পিপল
– আল জাজিরা

এশিয়ার ভয়ংকর সড়কগুলোর গল্প by আদনান আরেফিন

কী নেই এই রাস্তাগুলোয়? উঁচু–নিচু পাহাড়, ভয়ংকর খরস্রোতা নদী, মরুভূমি, যেকোনো সময় তুষার বা পাথর ও ভূমিধসের ভয়, বন্দুকধারী খুনি। আছে বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাওয়া ব্যাপক স্বপ্নবাজ মানুষের পাথুরে পাহাড় কেটে মসৃণ রাস্তা বানানোর সত্যি গল্প! তারপরও রাস্তাগুলো ভয়ংকর। পদে পদে মৃত্যু সেখানে ওত পেতে থাকে। অথচ কোনোমতে পার হতে পারলেই আপনি পাবেন জীবনের সেরা মুহূর্তের স্বাদ। চলুন শুরু করা যাক সেই রোমাঞ্চকর গল্প।
খারদুং লা রোড, ভারত। ছবি: সজল জাহিদখারদুং লা রোড, ভারত। ছবি: সজল জাহিদ
১. খারদুং লা রোড, (ভারত)
হিমালয়ের পশ্চিম অংশের দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত এই রাস্তা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত। এ কারণে ভারতের খারদুং লা রোডটি বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মোটরগাড়ি চলাচলকারী রাস্তা হিসেবে বিবেচিত।
উচ্চতা, গভীর গিরিখাদ, যেকোনো সময় তুষারপাত, ভূমিধসের আশঙ্কা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে ‘ন্যাশনাল জিওগ্রাফি’ চ্যানেল এবং ‘গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে’ অনেকবারই বিপজ্জনক রাস্তার তালিকায় এসেছে ভারতের খারদুং লা রোডের কথা। প্রায় ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তা ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের লাদাখ অঞ্চলের একটি পর্বত পাস। এর স্থানীয় উচ্চারণ ‘খারডং লা’ বা ‘খার্ডজং লা’। এ ছাড়া খারদুং লা রোডটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি মধ্য এশিয়ায় লেহ থেকে কাশগার পর্যন্ত প্রধান কারওয়ান রুটে অবস্থিত। এ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও এই রুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। রোডটির নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৬ সালে এবং ১৯৮৮ থেকে এখানে গাড়ি চলাচল শুরু হয়। এটি ভারতের সর্বোচ্চ পর্বত রাস্তাগুলোর মধ্যে একটি হওয়ায় সবার ভ্রমণের জন্য নয়। তাই খুবই অভিজ্ঞ ড্রাইভার ছাড়া এই রাস্তায় কাউকে গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হয় না। তবে ভারী বৃষ্টিপাত ও তুষারপাতের কারণে খারদুং লা পাস জুলাই থেকে আগস্ট এবং নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এই সড়কে চলাচলের সবচেয়ে ভালো সময় মে থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত।
জোজি লা রোড, ভারত। ছবি: সজল জাহিদজোজি লা রোড, ভারত। ছবি: সজল জাহিদ
২. জোজি লা রোড, (ভারত)
আপনি যদি জানেন, যে রাস্তায় আপনি গাড়ি চালাচ্ছেন, সে রাস্তা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১ হাজার ৫৭৫ ফুট বা ৩ হাজার ৫২৮ মিটার উঁচুতে অবস্থান করছে এবং আপনার চোখের সামনে রয়েছে কয়েক শ বা কয়েক হাজার ফুটের গভীর পাহাড়ি খাদ, পাহাড়ের ওপরের তুষার যেকোনো সময় আপনার গাড়ির ওপরে ধসে পড়বে, আপনি কী করবেন? ভারতের জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী শ্রীনগর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে এবং কাশ্মীরের শোনমার্গ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে লাদাখ ও কাশ্মীরের সংযোগ স্থাপনকারী জোজি লা রোড বা যাকে ‘জোজিলা পাস’ নামে চেনে সবাই, সেটি এ রকমই একটি ভয়ংকর রাস্তা। আর এ কারণেই রাস্তাটি বিশ্বের ভয়ংকরতম রাস্তাগুলোর মধ্যে ১ নম্বরে রয়েছে।
জোজি লা রোড জম্মু ও কাশ্মীরের একটি উঁচু পর্বত পাসও বটে। লাদাখ ও কাশ্মীরকে সংযুক্ত করা প্রায় পাঁচ মাইল বা নয় কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাহাড়ি রাস্তা ভীষণ সরু। শীতকালে তীব্র বাতাস এবং ভারী তুষারপাতের কারণে রাস্তাটি অত্যন্ত দুর্গম হয়ে ওঠে। এ জন্য শীতের আগে এই রাস্তায় সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া রাস্তাটিতে প্রায়ই ধস নামে। ভারী বৃষ্টিপাত হলে এই রাস্তায় কাদা জমে যায়। এ কারণে গাড়ির চাকা কাদায় আটকে যায় এবং বড় ধরনের দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে থাকে। তাই ওই সময় এই সরু রাস্তাটিতে গাড়ি চালানো অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। এ রাস্তায় একবার প্রবেশ করলে পেছনের দিকে ফেরা প্রায় অসম্ভব। এ কারণে জোজি লা রোডে চলার সময় যদি একবার ভেড়ার পালের সামনে পড়ে যায় কোনো যানবাহন, তাহলে যতক্ষণ না ভেড়ার পাল সরছে ততক্ষণ সেখানে আটকে থাকতে হবে। এই রাস্তায় চলাফেরায় সাধারণ মানুষের অসুবিধার কথা চিন্তা করে ভারত সরকার ‘জোজি লা টানেল’ প্রকল্পটি অনুমোদন করে। এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।
করাকরাম হাইওয়ে, পাকিস্তান ও চীন। ছবি: ইউকিমিডিয়া কমনসকরাকরাম হাইওয়ে, পাকিস্তান ও চীন। ছবি: ইউকিমিডিয়া কমনস
৩. কারাকোরাম হাইওয়ে, (পাকিস্তান ও চীন)
প্রায় ১৬ হাজার ফুট উঁচুতে যদি কোনো রাস্তা হয়, সেই রাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে আপনি মজা পাবেন হয়তো, কিন্তু কখন যে স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছে যাবেন, তার কোনো হিসাব আপনার কাছে নাও থাকতে পারে। তার ওপর রাস্তাটা যদি হয় ভূরাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেখানকার আইনশৃঙ্খলা যদি সব সময় যথাযথ কর্তৃপক্ষের হাতে না থাকে, তাহলে আপনার মতো সাধারণ মানুষের জন্য সেটা নরক ছাড়া আর কিছুই নয়। হ্যাঁ, তেমনই একটি ভয়ংকরতম রাস্তা কারাকোরাম হাইওয়ে, যেটিকে কেকেএইচ বা ন্যাশনাল হাইওয়ে ৩৫ নামেও চেনে পৃথিবীর মানুষ। খতরনাক এই রাস্তা পাকিস্তান ও চীনের মধ্যে অবস্থিত। এটি প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ, যার মধ্যে পাকিস্তানে ৮৮৭ কিলোমিটার এবং চীনে ৪১৩ কিলোমিটার রাস্তা রয়েছে।
কারাকোরাম পর্বতমালার মধ্য দিয়ে যাওয়া এই রাস্তা চলে গেছে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়, নদী, হ্রদ ও হিমবাহর পাশ দিয়ে। যেকোনো সময় যেকোনো জায়গায় এসব থেকে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। রাস্তাটির পাকিস্তান অংশে পড়েছে গিলগিট বালতিস্তানের নাঙ্গা পাহাড়, রাকাপশি পাহাড়, দিরান ইত্যাদি কারাকোরাম পর্বতশ্রণির বিভিন্ন পাহাড়, সিন্ধু, হুনজা, গিলগিট ইত্যাদি পাহাড়ি নদী, প্রচুর হিমবাহ ও হ্রদ। এবার ভাবুন, এই রাস্তা কতটা ভয়ংকর হতে পারে?
কারাকোরাম হাইওয়ে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের হাসান আবদেলে শুরু হয়ে শেষ হয়েছে চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল শিনজ্যাং বা জিনজিয়াং উইঘুরে। পাকিস্তানের মধ্যে এটি খাইবার পাখতুনখাওয়া এবং গিলগিট-বালতিস্তানের মতো ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর দিয়ে গিয়ে চীনের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে। এটি প্রাচীন সিল্করুটের অনেকগুলো পথের একটি। এই হাইওয়েটি নির্মাণের সময় প্রায় ৮১০ জন পাকিস্তানি এবং ২০০ জন চীনা শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছিলেন। এই প্রাণহানির বেশির ভাগই ঘটেছিল মারাত্মক ভূমিধসের ফলে। এই হাইওয়েটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৫৯ সালে এবং ২৭ বছরের কর্ড ড্রিলিংয়ের পরে ১৯৮৬ সালে এর নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
তিয়েনমেন মাউন্টেন রোড, চীন। ছবি: ডাঞ্জারাস রোড ডট অর্গতিয়েনমেন মাউন্টেন রোড, চীন। ছবি: ডাঞ্জারাস রোড ডট অর্গ
৪. তিয়েনমেন মাউন্টেন রোড, (চীন)
তিয়েনমেন শব্দটির বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘স্বর্গের দরজা’। অসাধারণ প্রাকৃতিক শোভাময় পাহাড় বলে এর এমন নাম হয়েছে। এই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার জন্য যে রাস্তা, সেটিই তিয়েনমেন মাউন্টেন রোড নামে পরিচিত। কিন্তু একবার ভাবুন যে আপনাকে সেই রাস্তা পাড়ি দিতে হবে ৯৯টি বিপজ্জনক বাঁক! সঠিক সময় বাঁকটা নিতে না পারলে আপনি গাড়িসহ উড়ে গিয়ে পড়তে পারেন কয়েক শ ফুট নিচের গিরিখাদে। উচ্চতা যত বাড়বে, পতনের রাস্তা তত লম্বা হতে থাকবে।
চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশের তিয়ানমেন মাউন্টেন ন্যাশনাল পার্কের মধ্যে অবস্থিত এই রাস্তা ‘তিয়েনমেন শান বিগ গেট রোড’ নামেও পরিচিত। এই রাস্তাটি সমুদ্রপৃষ্ঠের ২০০ মিটার ওপর থেকে ১ হাজার ৩০০ মিটার পর্যন্ত ওপরে উঠে গেছে। এই রাস্তাটি ভীষণ বিপজ্জনক হওয়ার মূল কারণ, এতে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি কোণের মোট ৯৯টি বাঁক বা মোড় আছে এবং এই মোড়গুলোর বেশির ভাগই তিয়েনমেন গুহার ভেতর দিয়ে চলে গেছে। রাস্তাটির একদিকে গভীর খাদ আর অন্যদিকে বিশাল বাঁক। তাই এই রাস্তায় বছরের সব সময়ই দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা থাকে। এপ্রিল থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই রাস্তায় চলাচলের জন্য আদর্শ সময় ধরা হয়।
গোলিয়াং টানেল, চীন। ছবি: ডাঞ্জারাস রোড ডট অর্গগোলিয়াং টানেল, চীন। ছবি: ডাঞ্জারাস রোড ডট অর্গ
৫. গোলিয়াং টানেল, (চীন)
নওয়াজ উদ্দিন সিদ্দিকি অভিনীত হিন্দি সিনেমা ‘মাঝি: দ্য মাউনটেনম্যান’ যাঁরা দেখেছেন, তাঁরা জানেন, একজন মানুষ নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর পর পাহাড় কেটে রাস্তা বানিয়ে কীভাবে নিজ গ্রামের শত শত মানুষের মৃত্যু রুখে দিয়েছিলেন। চীনের গোলিয়াং টানেলের গল্পটাও একই রকম। মাত্র ৩০০ জন গ্রামবাসীর ব্যবহারের জন্য রাস্তা বানাতে মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ খরচ করতে অনীহা প্রকাশ করে চীন সরকার। কিন্তু দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য উতলা হয়ে থাকা চীনের প্রত্যন্ত এলাকার গোলিয়াং নামের গ্রামটির ১৩ জন অধিবাসী সরকারের সে সিদ্ধান্তের থোড়াই কেয়ার করেন। তাঁরা সরকারের সহায়তা এবং কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাহাড়ের ভেতর দিয়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণের বিপজ্জনক কাজ শুরু করেন। খাড়া পাহাড়ের ওপর বিস্ফোরক নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মারাত্মক দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছিলেন কয়েকজন শ্রমিক। কিন্তু দমে না গিয়ে অন্যরা পাথুরে পাহাড়ের পেটে খোঁড়াখুঁড়ি চালিয়ে যান। অবশেষে ১৯৭৭ সালে অনেক রক্ত আর তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এই টানেল সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
গোলিয়াং টানেল প্রায় ১ দশমিক ২ কিলোমিটার লম্বা একটি সুড়ঙ্গপথ। এই সুড়ঙ্গপথ চীনের হিনান প্রদেশের জিনসিয়াংয়ের হুইসিয়ানে অবস্থিত তাইহং পর্বতমালার অন্য প্রান্তের সঙ্গে গোলিয়াং গ্রামকে যুক্ত করে দিয়েছে। পাথুরে পাহাড়ের পেটে প্রায় ১৩ ফুট প্রশস্ত এই সুড়ঙ্গটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭২ সালে। এই রাস্তাটি বিপজ্জনক হওয়ার কারণ, এর এক দিকে পাহাড় আর অন্যদিক সম্পূর্ণ ফাঁকা। এই সুড়ঙ্গের কয়েক শ মিটার নিচে রয়েছে মাটি। এ ছাড়া এটি একটি সুড়ঙ্গ হওয়ায় বেশির ভাগ সময় অন্ধকার থাকে। এই টানেলটি সারা বছর খোলা থাকে।
তারোকো গর্জেড রোড, তাইওয়ান। ছবি: ডাঞ্জারাস রোড ডট অর্গতারোকো গর্জেড রোড, তাইওয়ান। ছবি: ডাঞ্জারাস রোড ডট অর্গ
৬. তারোকো গর্জেড রোড, (তাইওয়ান)
বিপজ্জনক রাস্তার মধ্যে এরপর বলতে হবে তাইওয়ানের ৮ নম্বর হাইওয়ে তারোকো গুর্জ রোডের কথা। এই রাস্তাটিও গোলিয়াং টানেলর মতো পাথর কেটে তৈরি করা হয়েছে। এটিকে ‘সেনট্রাল ক্রস-আইল্যান্ড হাইওয়ে’ বলা হলেও আসলে এটি একটি সরু রাস্তা। এটি এতই সরু রাস্তা যে এই রাস্তায় পাশাপাশি দুটি বড় গাড়ি চলাচল করা প্রায় অসম্ভব।
তাইওয়ান জাপানের অধীনে থাকার সময় এটি একটি পায়ে চলা পথ বা ট্রেইল ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চীন তাইওয়ানের দখল নিয়ে পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যাওয়া পুরোনো ট্রেইলটিতেই পাকা রাস্তা তৈরি করে তাইওয়ানের পূর্ব ও পশ্চিম উপকূলকে যোগ করে দেয়। চীনের ন্যাশনালিস্ট আর্মির সদস্যরা ১৯৫৬-১৯৬০ সালের মধ্যে রাস্তাটি তৈরি করেন। রাস্তাটি পাশাপাশি থাকা দুটি পাহাড়ের মধ্যকার চিকন পাথুরে জমি কেটে বানানো হয়েছে। ফলে ভৌগোলিক কারণে এই রাস্তায় রয়েছে অনেকগুলো বিপজ্জনক বাঁক বা ব্লাইন্ড কর্নার। এই বাঁকগুলোর কারণে সামনের কিছু দেখার সুযোগ থাকে না। ফলে যেকোনো সময় যানবাহনের মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকে। এ ছাড়া ভারী বৃষ্টিপাতের ফলে এই রাস্তার ওপর ভূমিধস এবং পাথরধস হতে পারে যেকোনো সময়। মূলত, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে এই রাস্তাটি পৃথিবীর বিপজ্জনক রাস্তাগুলোর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃত।

সিগারেট ছেড়ে ই-সিগারেট: ধূমপায়ীদের হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়ায় ব্যাপক উন্নতি

সাধারণ তামাক পাতার সিগারেট ছেড়ে ই-সিগারেট ব্যবহার করেন এমন দীর্ঘদিনের ধূমপায়ীদের ওপর একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেখা যায়, মাত্র এক মাসের মধ্যেই ওই ধূমপায়ীর হৃৎযন্ত্রের পারফরম্যান্সে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। বৃটিশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, তামাক পাতার সিগারেট ছেড়ে যারা নিকোটিন-সমৃদ্ধ ই-সিগারেট ব্যবহার করছেন, তাদের হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়ায় উন্নতি দেখা গেছে। অর্থাৎ, এই পরিবর্তনের কারণে তাদের হৃৎরোগের ঝুঁকি ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃটিশ বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার ফলাফল অবশ্য বিশ্বব্যাপী বহু স্বাস্থ্য গবেষক খুবই গভীরভাবে পরীক্ষা নীরিক্ষা করবেন।

তবে বৃটেনের ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্ডিওভাসকুলার মেডিসিন ও থেরাপিউটিকস বিভাগের অধ্যাপক জ্যাকব জর্জ বলেন, ‘সিগারেট ছেড়ে যারা ই-সিগারেট ধরেছেন, তাদেরকে পরীক্ষা করে দেখা গেছে যে, তাদের হৃৎযন্ত্রের কার্যক্রমে মাত্র এক মাসেই গড়ে ১.৫% উন্নতি হয়েছে। একে যদি প্রেক্ষিতের মধ্যে দাঁড় করাই, তাহলে বলতে হয় যে, সংবহনতান্ত্রির ক্রিয়ায় যদি ১ শতাংশও উন্নতি হয়, তাহলে হার্ট অ্যাটাকের মতো হৃৎযন্ত্র সংক্রান্ত দুর্ঘটনার হার ১৩ শতাংশ হ্রাস পায়।’

জ্যাকব অবশ্য একটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, এই গবেষণায় বিশেষভাবে ই-সিগারেট গ্রহণ বা ভেপিং-কে তামাক পাতার সিগারেটের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। তামাক পাতার সিগারেট গ্রহণে ফুসফুস ও অন্যান্য ক্যান্সার হয়ে থাকে।
এছাড়া প্রাণঘাতি স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাক ও হৃৎযন্ত্রের অন্যান্য জটিল রোগ হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

তবে জ্যাকব বলেন, ‘এ বিষয়ের ওপর জোর দিয়ে বলা গুরুত্বপূর্ণ যে, ই-সিগারেট মোটেই নিরাপদ নয়। সংবহনতন্ত্রের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তামাক পাতার সিগারেটের চেয়ে ই-সিগারেট কিছুটা কম ক্ষতিকর। ই-সিগারেটকে মোটেই ক্ষতিহীন যন্ত্র হিসেবে দেখা উচিৎ নয়। ফলে যারা ধুমপান করেন না বা তরুণ, তারা একে ক্ষতিহীন কিছু ভেবে গ্রহণ করবেন না।’
জ্যাকব ও তার দলের এই গবেষণা ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে জার্নাল অব দ্য আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলোজিতে। খবরে বলা হয়, এই গবেষণার কারণে ই-সিগারেটের সম্ভাব্য ঝুঁকি ও সুবিধা নিয়ে আন্তর্জাতিক বিতর্ক আরও বাড়বে। সাম্প্রতিক বছরে শুধু ই-সিগারেট সংক্রান্ত ২,০০০ ফুসফুস রোগ ধরা পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। এছাড়া ৪০ জনের মৃত্যুর জন্য ই-সিগারেট গ্রহণকে দায়ী করেছেন চিকিৎসকরা।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ বিভাগের বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, তাদের গবেষণা থেকে ইঙ্গিত মিলছে যে, ই-সিগারেটে টিএইচসি থাকে। এই টিএইচি হলো গাজার একটি উপাদান যা গ্রহণকারীকে মাতাল করে। এছাড়া থাকে জারিত ভিটামিন ই। এই দুইটি উপাদানের কারণেই ওই রোগ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

বৃটেনের নেশা ও বিষবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা গত মাসে অবশ্য বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে ভেপিং সংক্রান্ত যে অসুস্থতার খবর পাওয়া গেছে, তা সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক সমস্যা। এ ধরণের কোনো সমস্যা বৃটেনে বা অন্য কোনো দেশে দেখা যায়নি।
ডান্ডি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই পরীক্ষামূলক গবেষণা চলেছে দুই বছর ধরে। এতে অর্থায়ন করেছে বৃটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন নামে একটি দাতব্য সংস্থা। এতে দীর্ঘদিন ধরে ধূমপান করে আসছেন এমন ১১৪ জন ব্যক্তির ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। এই ব্যক্তিরা গত দুই বছরে দিনে কমপক্ষে ১৫টি সিগারেট গ্রহণ করতেন। তাদেরকে এক মাসের জন্য তিনটি দলে ভাগ করা হয়। এক মাস আগে ও পরে তাদের সংবহনতন্ত্রের পরীক্ষা নেওয়া হয়। তিন দলের মধ্যে একটি দল আগের মতোই তামাক পাতার সিগারেট গ্রহণ করে। দ্বিতীয় দল নিকোটিনের ই-সিগারেট গ্রহণ করতে শুরু করে। তৃতীয় দল নিকোটিন বিহীন ই-সিগারেট নিতে থাকেন। পরে ফলাফল থেকে দেখা গেছে, ই-সিগারেট গ্রহণকারী দু’টি দলের শরীরে রক্ত প্রবাহের ক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

স্মৃতি-বিস্মৃতির মঞ্চকাব্য : আমরা তিনজন by সাজেদুল আউয়াল

খুব করে ভালো না লাগলে, কি চলচ্চিত্র কি নাটক-নাট্য – কোনোটা নিয়েই লিখতে মন চায় না। তাছাড়া অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি মন না মজলে, মন থেকে না লিখলে লেখাটাও কেমন যেন মনমরা হয়ে যায়, পানসে লাগে। গত ৩০ এপ্রিল ২০১৯ সালে লোকনাট্যদল-প্রযোজিত আমরা তিনজন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালায় দেখে মন যেন কেমন করে উঠল। মন খারাপ করা প্রযোজনাটি আবার ভালোও লাগল! নাট্যযজ্ঞটি ঢাকার সন্তান বুদ্ধদেব বসু-রচিত গল্প ‘আমরা তিনজন’ অবলম্বনে নির্মিত। এর নাটকায়ন, মঞ্চ ও সংগীত-পরিকল্পনা এবং নির্দেশনা তথা নাট্যায়নের কাজটি করেছেন শিল্পজন লিয়াকত আলী লাকী।

গল্পের লেখক কবি, গল্পটির বাক্য-বর্ণনায় কাব্যলক্ষণ স্পষ্ট। গল্পের মঞ্চায়নও কাব্যধর্মী। সেজন্য প্রযোজনাটিও ‘মঞ্চকাব্য’ হয়ে উঠেছে। বুদ্ধদেব বসু ঢাকার পুরানা পল্টনের বাসিন্দা ছিলেন। পরে কলকাতা চলে যান; কিন্তু ভুলতে পারেননি পুরানা পল্টনের সেই সুখময় অল্পবয়সের স্মৃতি। সদ্য কৈশোর পেরোনো যুবক বুদ্ধদেব গল্পের ভেতর দিয়ে ফেলে আসা দিনগুলোর কথা স্মরণ করেছেন : সেই ১৯২৭-২৮ সালের পুরানা পল্টনের প্রাকৃতিক পরিবেশ, তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানোর ঘটনা, পাড়ার মেয়ে অন্তরার জন্য তিন বন্ধুর আকুতি এবং আরো কিছু প্রসঙ্গ প্রকাশ পেয়েছে গল্পে। বর্তমান রচনায় দুটি দিক থেকে প্রযোজনাটি অনুধাবন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে : এক. এর ড্রামাটিক টেক্সটটি তথা গল্পের নাটকায়নের ধরনটি কেমন এবং দুই. এর পারফরম্যান্স টেক্সট তথা নাট্যায়ন প্রচেষ্টাটি কিরূপ।

ড্রামাটিক টেক্সট/ নাটকায়ন

বলা দরকার যে, লিয়াকত আলী লাকী বুদ্ধদেব বসুর গল্পের নাটকরূপ দেননি, শুধু নাটকায়ন করেছেন – তাঁর ভাষায় ‘অবলম্বন’ করেছেন। গল্পের সবটাই গ্রহণ করেছেন, কোনো কিছুই বর্জন করা হয়নি। গল্পে যার যার চরিত্রে যে যে সংলাপ ছিল তার সবই বহাল রেখেছেন ড্রামাটিক টেক্সটে; চরিত্রগুলোর গল্পস্থ বর্ণনাগুলোও দিয়েছেন। বর্ণনাগুলো দর্শকগণের উদ্দেশে প্রযুক্ত, আর সংলাপগুলো চরিত্রবর্গ তাদের নিজেদের মধ্যে চালাচালি করে। সংলাপ – কাব্যাক্রান্ত। কবিতার চরণের মতো একেকটি সংলাপ। ছন্দময়-কাব্যালংকার সমৃদ্ধ।

সংযোজন করা হয়েছে শুধু কিছু রবীন্দ্রসংগীত, চরিত্রের মনের অবস্থার প্রকাশ ও ঘটনাকে মাত্রা দেওয়ার জন্য, গল্পের মেজাজ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আবহ তৈরির জন্য। প্রেম-বিরহ প্রভৃতি পর্যায়ের গান দিয়েই আবহ তৈরি করা হয়েছে। শ্রাবণ-রাতের আবহ তৈরিতেও বর্ষাবিষয়ক গান ব্যবহৃত হয়েছে। বোঝা যায় অনেক ভেবে গানগুলো ব্যবহৃত হয়েছে। গানগুলো নির্বাচন করেছেন লিয়াকত আলী লাকী নিজেই। পুরো গান নয়, অংশবিশেষ। কিছু গান মঞ্চে গাওয়া হয়েছে, কিছু বেজেছে সাউন্ডট্র্যাকে। গল্পটি বাংলা সাহিত্যের একটি মেজর কাজ – তাই গল্পের মূল ভাব-বক্তব্যের প্রতি বিশ্বস্ত থাকাটা জরুরি ছিল। লিয়াকত আলী লাকীও তা-ই থেকেছেন। গল্পটি  স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত। এই স্মৃতিকাতরতাকে নাটকায়নে যথাযথভাবেই পরিবাহিত করেছেন তিনি।

গল্পটি এরকম : ১৯২৭ সালের ঢাকার পুরানা পল্টন। বিকাশ, অসিত এবং হিতাংশু তিন বন্ধু। দিনের বেশিরভাগ সময় তিন বন্ধু একসঙ্গে থাকে। তিন বন্ধু একে অপরের প্রেমে পড়ে আবার তিনজনই একসঙ্গে অন্য একজনের প্রেমে পড়ে, নাম তার অন্তরা, বাড়ির সবাই যাকে তরু বলে ডাকে, তবে তিন বন্ধুর কাছে মেয়েটির নাম হয়ে যায় ‘মোনালিসা’। একদিন কাকতালীয়ভাবে রাস্তায় তাদের সঙ্গে দেখা হয় তরু ও তার বাবা-মার। তরুর বাবা দে সাহেব তাদের বাসায় আমন্ত্রণ জানায়। বৃষ্টিমুখর একদিনে তারা তরুর বাড়ি যায়; কিন্তু তার সঙ্গে তেমন কোনো কথা হয় না। এর মধ্যেই সে টাইফয়েডে আক্রান্ত হয়। তিন বন্ধুর ভীষণ মন খারাপ হয়। তরুর বাবা-মা তাদের সহায়তা চাইলে প্রায় এক মাস দিন-রাত পরিশ্রম করে তারা তরুকে সুস্থ করে তোলে। তার সঙ্গে তাদের একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়।

তারপর একদিন তরু ভালো হলে শরীর উদ্ধারে চলে যায় রাঁচি। ঠিকানা রাখেনি বলে তিন বন্ধুর খুবই মন খারাপ। তবে যেদিন ওরা ফিরল, সেদিন স্টেশনে কচি কলাপাতা রঙের শাড়ি আর লালচে মুখাবয়বের মোনালিসাকে দেখে তিন বন্ধু মুগ্ধ হয়। ট্রেনের মধ্যে তরুর সে কি গল্প, দেখতে দেখতে তিন বন্ধু চারজন হয়ে উঠল। একদিন তরুর মা তাদের ডেকে জানায় তরুর বিয়ের সংবাদ। খবরটি শুনে তিন বন্ধু হতভম্ব হয়ে যায়। বিয়ের পর তরু চলে যায় কলকাতা। কিছুদিন পর হঠাৎ জানা যায়, সে ঢাকায় আসছে এবং অমত্মঃসত্ত্বা। পোয়াতি তরুকে তিন বন্ধু ঘিরে থাকে সবসময়। ও যাতে ভালো থাকে, কখনো মন খারাপ না করে, সে চেষ্টাতেই দিন কাটে তাদের।

এক অমাবস্যার রাতে প্রসব-বেদনায় ছটফট করতে থাকে তরু। তার চাপাকান্না তিন বন্ধুর বুক বিদীর্ণ করে। শীতের রাতে মাঠের মধ্যে না-খেয়ে, না-ঘুমিয়ে তিন বন্ধু রুদ্ধশ্বাসে প্রতীক্ষা করতে থাকে। ভোরের প্রথম ছাইরঙা আলোয় ওরা দেখতে পায় দে সাহেবের বেদনার্ত নির্বাক মুখ। অতঃপর রাশি রাশি ফুল আরো কত কিছু দিয়ে সাজানো হলো তরুর শবদেহ। জীবিত তরুর তিন বন্ধু তার অস্তিমযাত্রায় তার শ্মশানবন্ধু হয়ে তারই শবদেহ বয়ে নিয়ে চলে। এভাবেই শেষ হয় স্মৃতিকাতরতায় ভরা ড্রামাটিক টেক্সটটি।

গল্পটি মনে হয় দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পরই রচিত এবং তখনো দেশভাগ হয়নি। বিষয়টি বয়সী বিকাশ একেবারে শেষে হিতাংশু সম্পর্কে যা বলে তা থেকে বোঝা যায়। বিকাশ বলে : ‘হিতাংশু এমএসসি পাস ক’রে জার্মানিতে গেলো পড়তে আর ফিরল না, সেখানকারই একটা মেয়েকে বিয়ে ক’রে সংসার পাতল, এখন এই যুদ্ধের পরে কেমন আছে, কোথায় আছে কে জানে।’ যে-যুদ্ধের কথা বিকাশ বলছে তা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধই হবে। সম্ভবত ১৯৪৬ সালেই গল্পটি লিখিত হয়েছে। কারণ দেশভাগ হয়েছে ১৯৪৭ সালে – ওই সালে বা পরে লিখলে দেশভাগ প্রসঙ্গটি গল্পে আসার কথা।

গল্পের তিন বন্ধুর একজন বুদ্ধদেব নিজে, যার নাম বিকাশ। সবাই সমবয়সী। বয়সটাই তাদের বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলে। আর তখন জনমানুষের সংখ্যাও এ-শহরে কমই ছিল। মেয়েদের সংখ্যাও অল্প, তদুপরি মেয়েরা ঘরের বাইরে বেরোতো কম। ১৯২৭-২৮ সালের পুরানা পল্টনের তিন বন্ধু একসঙ্গেই সময় কাটাত, আড্ডা দিত, সাইকেল চালিয়ে রমনা-রেসকোর্সের মাঠ চষে বেড়াত। শহরের একমাত্র সিনেমা হলে ছবি দেখত।

রিফ্রেইন বা গানের ধুয়ার মতো বারবার কিছু সংলাপ ড্রামাটিক টেক্সটে ফিরে ফিরে আসে, যেগুলো পুরো নাটকায়নটিকে সংগীতের মোড়কে ঢেকে দিয়েছে। শুরুতে, মাঝে ও শেষে সংলাপগুলো বুদ্ধদেব গুঁজে দিয়ে কাব্যভাব সৃষ্টি করেছেন গল্পটিতে। এই ভাবটিরই সম্প্রসারণ ঘটানো হয়েছে নাটকায়নের ক্ষেত্রে। যেমন শুরুতেই বয়সী বিকাশ মঞ্চে প্রবেশ করে দর্শকদের উদ্দেশে বলছে : ‘আমরা তিনজন একসঙ্গে তার প্রেমে পড়েছিলাম : আমি, অসিত আর হিতাংশু; ঢাকায় পুরানা পল্টনে, উনিশ-শো সাতাশে। সেই ঢাকা, সেই পুরানা পল্টন, সেই মেঘে-ঢাকা সকাল!’ এরপরই নাট্যযজ্ঞ ফ্ল্যাশব্যাকে চলে যায়। যুবক বিকাশ গল্প উন্মোচন করে এই বলে যে : ‘আমরা এসেছিলাম কিছু পরে, অসিতদের বাড়ির তখন ছাদ পিটোচ্ছে। একটা সময় ছিল, যখন ঐ তিনখানাই বাড়ি ছিল পুরানা পল্টনে; বাকিটা ছিল এবড়োখেবড়ো জমি, ধুলো আর কাদা, বর্ষায় গোড়ালি-জলে গা-ডোবানো হলদে-হলদে-সবুজ রঙের ব্যাঙ আর নধর সবুজ ভিজে-ভিজে ঘাস। সেই বর্ষা, সেই পুরানা পল্টন, সেই মেঘ-ঢাকা দুপুর! আমরা তিনজন একসঙ্গে থাকতাম সব সময় – যতটা এবং যতক্ষণ থাকা সম্ভব।’

যুবক বিকাশ আরো বলে : ‘আমরা তিনজন তিনজনের প্রেমে পড়েছিলাম, আবার তিনজন একসঙ্গে অন্য একজনের প্রেমে পড়লাম, সেই ঢাকায়, পুরানা পল্টনে উনিশ-শো সাতাশ সনে।’ গল্পের মাঝামাঝি এসে তরু অসুস্থ হয় এবং স্বাস্থ্যোদ্ধারে রাঁচিতে যায়। তখন যুবক বিকাশ বলে : ‘মোনালিসা, কোনোদিন জানলে না তুমি, কোনোদিন জানবে না, কী ভালো আমাদের লেগেছিলো, কী সুখী আমরা হয়েছিলাম, সেই সাতাশ সনের বর্ষায়, পুরানা পল্টনে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সেই জ্বরে-ঝড়ে, বৃষ্টিতে থমথমে অন্ধকারে, ছমছমে ছায়ায়। দেড় মাস তুমি শুয়ে ছিলে, দেড় মাস তুমি আমাদের ছিলে।’

তারপর তরুর বিয়ে হয়। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে তরুর মৃত্যু হলে নাট্যযজ্ঞের একেবারে শেষে বয়সী বিকাশ হুইলচেয়ারে করে এসে সমাপ্তিসূচক সংলাপ হিসেবে বলে : ‘অসিত আর হিতাংশুই সব করলো, রাশি রাশি ফুল নিয়ে এলো কোথা থেকে, আরো কত কিছু, বেলা দুটো পর্যন্ত শুধু সাজাল শুধু সাজাল, তারপর নিয়ে যাবার সময় সকলের আগে রইল ওরা দু’জন। আরো অনেকে এলো কাঁধ দিতে, শুধু আমি বেঁটে ব’লে বাদ পড়লাম, পিছনে পিছনে হেঁটে চললাম একা-একা। ঠিক একা-একাও নয়, কারণ ততক্ষণ হীরেনবাবু এসে পৌঁছেছেন, বাড়ির কাপড়ে জুতো-ছাড়া পায়ে তিনিও চললেন আমার পাশে পাশে। হীরেনবাবু পরের বছর আবার বিয়ে করলেন, দে-সাহেব চলে গেলেন বদলি হ’য়ে। কিছুদিন পর্যন্ত লোকেরা বলাবলি করলো ওঁদের কথা, তারপর তারা-কুটিরের একতলায় অন্য ভাড়াটে এলো, পুরানা পল্টনে আরও অনেক বাড়ি উঠলো,  ইলেকট্রিক আলো জ্বললো। অসিত স্কুল থেকে বেরিয়ে চাকরি নিলো তিনসুকিয়ায়, ছ-মাসের মধ্যে কী একটা অসুখ ক’রে হঠাৎ মরে গেলো। … আর আমি – আমি এখনো আছি, ঢাকায় নয়, পুরানা পল্টনে নয়, উনিশ-শো সাতাশে কি আটাশে নয়, সে-সব আজ মনে হয় স্বপ্নের মতো, কাজের ফাঁকে ফাঁকে একটু স্বপ্ন, ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে একটু হাওয়া – সেই মেঘে-ঢাকা সকাল, মেঘ-ডাকা দুপুর, সেই বৃষ্টি, সেই রাত্রি, সেই – তুমি! মোনালিসা, আমি ছাড়া আর কে তোমাকে মনে রেখেছে!’

এই কাব্যময় রিফ্রেইন তথা ধুয়া বা কাব্যময় বাক্যগুলো (সেই ঢাকা, সেই পুরানা পল্টন, সেই মেঘে-ঢাকা সকাল!/ সেই বর্ষা, সেই পুরানা পল্টন, সেই মেঘ-ঢাকা দুপুর!/ সেই সাতাশ সনের বর্ষায়, পুরানা পল্টনে, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, সেই জ্বরে ঝড়ে, বৃষ্টিতে থমথমে অন্ধকারে, ছমছমে ছায়ায়।/ সেই মেঘে-ঢাকা সকাল, মেঘ-ডাকা দুপুর, সেই বৃষ্টি, সেই রাত্রি, সেই – তুমি!) বারবার ড্রামাটিক টেক্সটে আসার ফলে মঞ্চমাঝে একটা কাব্যভাবের জন্ম হয়েছে। এজন্যই প্রযোজনাটিকে ‘মঞ্চকাব্য’ বলা হয়েছে। এছাড়াও কিছু সংলাপ কাব্যভাবম–ত। যেমন তরুর বিয়ের পর তার বাড়ি ঘুরে এসে অসিত যে বলে – ‘হঠাৎ যেমন নতুন লাগল তাকে, একটু অন্যরকম, সিঁথিতে জ্বলজ্বলে সিঁদুর, পরনে কড়কড়ে শাড়ি, কানে হাতে গলায় চিকচিকে গয়না, আর কেমন একটা গন্ধ দিচ্ছে গা থেকে – হীরেনবাবুর সেন্টের গন্ধ না, নতুন ফার্নিচারের মদ-মদ গন্ধ না, চুলের তেল কি মুখের পাউডারেরও না – আমার মনে হ’লো এই সমস্ত মিলিত গন্ধের যেটা নির্যাস, সেটাই ভর করেছে মোনালিসার শরীরে।’ – তাতেও কাব্যগন্ধ উপস্থিত। তরুর আসন্ন মৃত্যু আঁচ করতে পেরে অসিত বলে – ‘দুপুরের আগেই বিকেল হ’য়ে গেলো সেদিন, বিকেলের আগেই অন্ধকার।’ আবার তরুর মৃত্যুর সময়কার বর্ণনা দিতে গিয়ে বিকাশ বলে – ‘ভোরের প্রথম ছাইরঙা আলোয় দেখলাম তাঁর ঠোঁট নড়ে উঠলো, এমন স্থির হ’য়ে আমরা তাকিয়েছিলাম আর এমন স্তব্ধ চারদিক যে তাঁর কথাটা আমরা কানে না-শুনে যেন চোখ দিয়ে দেখলাম।’ – এ-সংলাপগুলোও কাব্যরসম–ত।

পারফরম্যান্স টেক্সট/ নাট্যায়ন

নাট্যায়নের শুরুতেই বিলম্বিত লয়ে সেতারের ধ্বনি শোনা যায়। সাইক্লোরামায় স্থির মেঘ। সন্ধ্যার আবহ তৈরি করা হয় পুরনো দিনের পাঁচটি বাতিগাছে আলো জ্বালিয়ে। তিনজন বয়স্ক নওকর বাতিগুলো জ্বালিয়ে যায়। বাতি জ্বালানো আর নেভানোর মধ্য দিয়েই মঞ্চে সন্ধ্যা-সকালের আবহ তৈরি করা হয়, দৃশ্যান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। মঞ্চের দুদিকে চারটি বাইসাইকেলকেও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ছোট ছোট অনেক বক্সও রাখা – ওগুলোর তিনটির ওপর তিনজন অভিনয়শিল্পী বসে আছে। বক্সগুলো দিয়েই অন্তরাদের বাড়ি, রেলের কামরা, ঘোড়ার গাড়ি, তরুণ বিকাশের লেখার টেবিল, দিগন্ত-বিসত্মৃত মাঠ, অসুস্থ অন্তরার শোবার বিছানা, তরুর শবাধার ইত্যাদি বানানো হয়। এ-কাজে কখনো নওকরগণ, কখনো অভিনয়শিল্পীরা অংশ নেয়। নরম-কোমল পেইল ইয়েলো আলো মঞ্চমাঝে। এসবের মধ্যে ‘ওগো তৃষ্ণা আমার বক্ষজুড়ে …’ গানটি গাইতে গাইতে হুইলচেয়ারে করে বয়সী বিকাশ মঞ্চে আসে – বিকাশই ১৯২৭-২৮ সালের পুরানা পল্টনের সেইসব দিনরাত্রির স্মৃতি, ‘সেই পুরানা পল্টন, সেই মেঘে-ঢাকা সকাল!’, তার নিজের, বন্ধু অসিত, হিতাংশুর গল্প বলে যায়। তিন বন্ধু একসঙ্গে যার প্রেমে পড়েছিল, সেই রহস্যময়ী অন্তরা ওরফে তরু ওরফে মোনালিসার গল্প বলে যায়।

বয়সী বিকাশই এই গল্পের কথক। বস্ত্তত তার কথনের এক পর্যায়েই গল্পটি পেছনে চলে যায়, ফ্ল্যাশব্যাকে
স্মৃতি-বিস্মৃতির দোঁহা মঞ্চমাঝে পরিবেশিত হয় – সেই ১৯২৭-২৮ সালের ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে – কখনো সংলাপে, কখনো বর্ণনায়, কখনো গানে, কখনো নীরবতায়। বয়সী বিকাশ প্রস্থানের সময় গাইতে থাকে ‘নিবেছে মোর বাতি …।’ পুরো নাট্যযজ্ঞে কিছু গান অভিনয়শিল্পীদের কণ্ঠনিঃসৃত, কিছু রেকর্ডকৃত। নাট্যায়নের শেষ দৃশ্যেও এই বয়সী বিকাশই কষ্টভরা মন নিয়ে হুইলচেয়ারে বসে মঞ্চে আসে। তার হাতে তরুর সাদা-কালো ছবি। মঞ্চে আসতে আসতে সে গান ধরে ‘নয়ন ছেড়ে গেলে চলে …।’ এই রবীন্দ্রসংগীতটি গল্পের শেষাংশের সঙ্গে গেছে, আবেগ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি পরা তরু এই সময় বিকাশের পিছনে এসে দাঁড়ায়। তখন বিকাশ আবার গেয়ে ওঠে – ‘তোমায় নতুন করে পাবো বলে …’। মঞ্চে তখন গল্পের যে-পরিবেশ ছিল তার সঙ্গে গানটি যায়নি। তখন তরুকে শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে – তিন বন্ধু আর তরুর গল্পটিও অবশিষ্টহীনভাবে শেষ – তখন বিকাশ সমাপ্তিসূচক সংলাপ হিসেবে যা বলে তা ড্রামাটিক টেক্সটবিষয়ক আলোচনার শেষের দিকে উদ্ধৃত হয়েছে। দীর্ঘ অথচ মন খারাপ করা সমাপ্তিসূচক সেই সংলাপটি যেভাবে কাতর করেছে, গানটি তা করতে পারেনি। ভালো হতো যদি ভরাট কণ্ঠে গানটি রেকর্ড করে শোনানো হতো। তাতে মঞ্চমাঝে স্মৃতিমেদুর আবহ তৈরিতে অধিক সহায়ক হতো।

অনেক করে মন খারাপ না হলে কোনো শিল্পকর্মেরই জন্ম হয় না। বুদ্ধদেব বসুর গল্পটি পড়ে লিয়াকত আলী লাকীর মন নিশ্চয় খারাপ করেছিল। আর মঞ্চে প্রযোজনাটি দেখে আমার-আমাদের মন খারাপ হয়েছে। এই মন খারাপ হওয়ার বিষয়টি মঞ্চে নাট্যায়ন প্রত্যক্ষ করার সময়ই সংঘটিত হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রযোজনাটির নির্দেশনার ধরন, অভিনয়শৈলী প্রধান ভূমিকা রেখেছে। সঙ্গে আলো-মঞ্চসজ্জা-আবহসংগীত-পোশাক পরিকল্পনা সহযোগী উপাদান হিসেবে সক্রিয় থেকেছে – সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে পারফরম্যান্স টেক্সটটি। পারফরম্যান্সের ভেতর দিয়েই মঞ্চে স্মৃতিমথিত কষ্ট নির্মিত হয়েছে। দেড় ঘণ্টার মতো নাট্যযজ্ঞটির সময়সীমা। এর মধ্যেই গল্পটির মধ্যে স্থিত স্মৃতিকাতরতাকে নাট্যায়নের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

নাট্যায়নের ধরনটি অর্গানিক ইউনিটির কথাই মনে করিয়ে দেয়। নাট্যায়নের মূল ইউনিট বা উপকরণগুলো হচ্ছে সেট-প্রপস্, অভিনয়শিল্পীদের পোশাক-পরিচ্ছদ, মেকআপ, মঞ্চ-আওতায় অভিনয়শিল্পীদের চলাফেরা, তাদের অভিনয়, আলোর সংগত, আবহসংগীত ইত্যাদি। এগুলোর সুষম সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্গানিক ইউনিটিটি গঠন করেছেন নির্দেশক। আর এ-কাজে বাস্তবধর্মী উপস্থাপনারীতিই অনুসৃত হয়েছে, কারণ বহুদূরে ফেলে আসা এক সুখময় অথচ কষ্টদায়ক স্মৃতিই নির্দেশক মঞ্চে উপস্থাপন করতে চেয়েছেন। কোনো রকমের গিমিক বা অ্যাবস্ট্রাকশনের আশ্রয় নেওয়া হয়নি। তাতে করে কিন্তু বর্তমানে থেকেও অতীতে ফিরে যেতে অসুবিধা হয়নি দর্শকের। নাট্যায়নকর্মটি দর্শকের মনে ধরার এটাও অন্যতম একটি কারণ। বাস্তববাদ যে শিল্পকলার জগৎ থেকে কখনো লুপ্ত হবে না তা প্রযোজনাটি প্রত্যক্ষ করে আবার অনুভব করলাম। 

সুচারু নাট্যায়নের কাজই হচ্ছে অর্গানিক ইউনিটি তৈরি করে দর্শক-মনে নানা রসের সঞ্চার করা, নানা ভাবের বিস্তার ঘটানো। সুখ-দুঃখবহ স্মৃতিময় করুণরসের সঞ্চার-বিস্তার ঘটানোর এই কাজটি নির্দেশক সুচারুভাবেই সম্পন্ন করেছেন। সেজন্য গল্পের সুখ-দুঃখবহ মেজাজটি অক্ষুণ্ণ থেকেছে মঞ্চে। মঞ্চে যেন আমরা একই সময়ে গল্পটি পাঠ করি, আবার এর নাট্যায়নটি প্রত্যক্ষও করি! বুদ্ধদেব বসু যেন অনুপস্থিত থেকেও উপস্থিত! লিয়াকত আলী লাকী ও তাঁর দল মঞ্চে উপস্থিত থেকে বুদ্ধদেব বসুর অনুপস্থিতিকে বুঝতে দেয়নি। আমার মতে, এখানেই এই প্রযোজনাটির সর্বোচ্চ সাফল্য।

প্রযোজনাটির সেট, আলো ও আবহসংগীত সাজেস্টিভ। আর বাকি সব ইউনিটই বাস্তবধর্মী। আলোচ্য প্রযোজনার সেট-পরিকল্পনার দায়িত্বে ছিলেন সুজন মাহাবুব – তিনি গল্প-উপযোগী সেটই নির্মাণ করেছেন। সেটের প্রধান উপকরণগুলোর কথা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। সব উপকরণই পুরনো দিনের আবহ তৈরিতে সহায়ক হয়েছে। এছাড়া তরুদের বাড়ির অবস্থান বোঝাতে একটি তুলসীগাছ মঞ্চের এক কোণে একসময় রাখা হয়, তরুর মা ‘দুর্গা দুর্গা’ বলে তাতে জলও দেয় – এতেও পুরনো দিনের স্মৃতি নির্মিত হয়। পেছনের পর্দায় প্রায় সারাক্ষণ ব্যাক প্রজেকশনের মাধ্যমে আকাশে স্থির মেঘ দেখানো হয়েছে। এ-উপকরণটিও গল্পে বলা ‘সেই মেঘে-ঢাকা সকাল, মেঘ-ডাকা দুপুর, সেই বৃষ্টি’ কথাগুলোকে মঞ্চে প্রতিস্থাপন করে। তবে মেঘগুলো মাঝে মাঝে উড়ে চললে মঞ্চে গতির সঞ্চার হতো।

বয়সী বিকাশের চরিত্রে লিয়াকত আলী লাকী নিজেই অভিনয় করেছেন। নিজ চরিত্রের মধ্যে লীন হয়ে গেছেন বলেই মনে হলো। তাঁর সহজাত অভিনয় প্রতিভার গুণেই চরিত্রটি বিশ্বাস্য হয়ে উঠেছে, করুণরসের সঞ্চার করেছে। তরুণ বয়সের বিকাশের চরিত্রে মাসউদ সুমন দারুণ অভিনয়শৈলী দেখিয়েছেন। তিনি একাই নাট্যযজ্ঞটিকে অনেকদূর টেনে নিয়ে গেছেন। চরিত্রটিকে সেই ১৯২৭-২৮ সালের পুরানা পল্টনে স্থাপন করেছেন। তবে তাঁর স্বারিক তথা বাচিক অভিনয়ে বাঙাল টান থাকলে চরিত্রটি স্থানিক ভিত্তি পেত। তাছাড়া দুই বিকাশের মধ্যে বয়সের কারণে শারীরিক আকারগত পার্থক্যটি গ্রহণযোগ্য হলেও এদের গায়ের বর্ণগত তফাতটি চোখে লাগে, দুজন যে একই ব্যক্তি তা ব্যক্ত করে না। বয়সী বিকাশ শ্যামলা আর তরুণ বিকাশ ধবধবে সাদা-ফর্সা। মানুষের বয়স বাড়লে দেহগত আকারের পরিবর্তন হলেও গাত্রবর্ণগত পরিবর্তন হয় না বললেই চলে। এখন যেটা করা যায় সেটা হলো, তরুণ বিকাশের মুখম-ল ও গায়ের প্রকাশিত অংশ রূপসজ্জার মাধ্যমে কিছুটা শ্যামলাবরণ করে দেওয়া। তাছাড়া বয়সী বিকাশের পোশাকেও পরিবর্তন আনা দরকার বলে মনে করি – তিনি কোট-প্যান্ট না পরে পাজামা-পাঞ্জাবি পরলে যথাযথ হতো, কারণ বুদ্ধদেব সম্ভবত ১৯৪৬-৪৭ সালের দিকেই গল্পটি লিখেছেন – ওই সময় তিনি কলকাতায় পড়ান এবং প্রায়শই পাজামা-পাঞ্জাবি পরতেন। কোট-প্যান্ট পরতেন বিদেশে অধ্যাপনাকালে। পাজামা-পাঞ্জাবি পরলে যুবক বয়সী বিকাশের সঙ্গে বয়সী বিকাশের একধরনের সাযুজ্যও তৈরি হবে। তাতে করে উভয় বিকাশকে একই ব্যক্তি বলে ধরে নিতে দর্শকগণের বেগ পেতে হবে না।

হিতাংশু চরিত্রে আজিজুর রহমান সুজন এবং অসিত চরিত্রে ফজলুল হক চোস্ত অভিনয় করেছেন। তাঁরা সিজন্ড অভিনয়শিল্পীর মতোই দাপটের সঙ্গে তাঁদের স্ব-স্ব চরিত্রকে মঞ্চে জীবন্ত রেখেছেন। তরুও ভীষণ ভালো কাজ করেছেন। তরুর মুখে সংলাপ কম। কিন্তু মঞ্চে তাঁর অবস্থান ছিল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এই অবস্থান ধরে রেখে তিনি যে সারাক্ষণ তরু হয়ে থেকেছেন এবং শুধু আঙ্গিক-বাচিক অভিনয় দিয়ে তাঁর প্রতি আমাদের আকর্ষণ তৈরি করেছেন, এটাও গল্পটি জমতে সাহায্য করেছে। দে সাহেবের চরিত্রে স্বদেশ রঞ্জন দাসগুপ্ত, হীরেনবাবুর চরিত্রে জিয়া উদ্দিন শিপন ও দে সাহেবের স্ত্রী সুমির চরিত্রে সোনিয়া আক্তারও গল্পের চরিত্রের সঙ্গে মিশে গেছেন বলে তাঁরাও গল্পেরই একজন হয়ে গেছেন, বিচ্ছিন্ন কেউ বলে মনে হয়নি। কিন্তু স্বদেশ রঞ্জন দাসগুপ্তর অ্যাক্টিং ওভার্টলি থিয়েট্রিক্যাল, কিছুটা উচ্চৈঃস্বরিক, যা অন্যদের সফট টোন ও অ্যাক্টিং স্কিমের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ নয়। তাঁর টোন কিছুটা ডাউন করা দরকার বলে মনে করি। পুরনো ভৃত্যদের চরিত্রে শিশির কুমার রায়, আলী আজম বাচিক অভিনয়ে যুক্ত না থেকেও তাঁদের অঙ্গভঙ্গি-চলাফেরার মধ্য দিয়ে সেই আমলের ভৃত্যদের কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তাঁদের বেশ-ভূষণও পুরনো দিনের কথাই মনে পড়িয়ে দেয়। পোশাক, রূপ, সজ্জা সেই ১৯২৭-২৮ সালসম্মত।

সবার বেশ-ভূষণ পরিকল্পনার কাজটি মেহেজাবীন মুমু গল্পের সময়-কালানুযায়ীই নিষ্পন্ন করেছেন। তরুর বিয়ের পর লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরানো হয় তাকে, হাতে শাঁখা, পায়ে আলতাও দেওয়া হয় – তাতে বিবাহিত তরু বিশ্বাস্য হয়ে ওঠে। আরো পরে তাকে ইজিচেয়ারে গাঢ় সবুজ শাড়ি পরা অবস্থায় দেখা যায় – বোঝা যায় সে আর কুমারী নেই। অসুখের সময় কালো চাদর গায়ে শোয়া অবস্থায়ও তাকে দেখা যায়। বলা যায়, শাড়ি-কাপড় নির্বাচনের ক্ষেত্রে মেহেজাবীন মুমু সৃজনশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। তবে বয়সী বিকাশের জন্য কালানুযায়ী পোশাক-পরিচ্ছদ তিনি নির্বাচন করেননি বলেই মনে হয়েছে।

মঞ্চে আলোকসৃজনের দায়িত্বে ছিলেন স্বনামখ্যাত আলোকশিল্পী নাসিরুল হক। দৃশ্যখ– হলুদ-নরম আলোর সংগত পুরনো দিনের আবহ সৃষ্টি করেছে মঞ্চপরিসরে। এক্ষেত্রে স্পটলাইটের সাহায্য নেওয়া হয়েছে বেশি করে, ফলে আলো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যায়নি। তাতে করে দর্শকের চোখ কেবল ঘটনাখণ্ডের দিকেই নিবদ্ধ ছিল। তখন ঢাকা শহরে বিদ্যুৎ ছিল না। তাই বাতিগাছ তথা লণ্ঠনের আলো ব্যবহৃত হয়েছে। সংলাপসূত্রে জানা যায় যে, তরুদের বাড়িতে তখন পেট্রোম্যাক্স জ্বলতো। পেট্রোম্যাক্স প্রসঙ্গটি পুরনো দিনের আমেজ তৈরি করে। তরুর বিয়েতে তাদের বাড়িতে আলোসজ্জার ব্যবস্থা করা হয় – মঞ্চে আলোর ঝলকানি তৈরি করে আলোকসজ্জার ইফেক্ট নির্মিত হয়, নাসিরুল হক এক্ষেত্রে সফল। তরুর শিয়রে মোমবাতির ক্ষীণ আলোর ব্যবহারও তার অসুস্থতার আবহ তৈরিতে  সহায়ক হয়েছে। বস্ত্তত উজ্জ্বল আলো পরিহার করে মঞ্চে নাসিরুল হক নস্টালজিক একটা আবহ তৈরি করেছেন। এটা তাঁর আলো তৈরির ক্ষেত্রে নান্দনিক বোধের প্রকাশ – সেই ১৯৮৩-৮৫ সালের দিকে কলকাতায় আলোকশিল্পী তাপস সেনের কিছু আলোর কাজের কথা মনে পড়েছে নাসিরুল হকের কাজ দেখে।

আবহসংগীত করেছেন ইমামুর রশীদ। আবহসংগীত – গল্পের মেজাজ অনুযায়ী দাঁড় করানো হয়েছে। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে – বিশেষ করে সেতার, পিয়ানো, সরোদ, সানাই, ভায়োলিন ও কিবোর্ডে যে-সুরখ- বাজানো হয়েছে তা গল্পটির নানা ঘটনাখ- মঞ্চ-পরিসরে ঘনবদ্ধ হতে সহায়ক হয়েছে। হারমোনিয়াম, তবলাও প্রয়োজনীয় মেজাজ তৈরি করেছে ঘটনাখণ্ডের। তরুর বিয়ের সময় সানাই-উলুধ্বনি-বিয়ে পড়ানোর মন্ত্র শোনা যায়। বিয়ের আবহ তৈরিতে এসব শব্দ সাহায্য করেছে। সংলাপে তরুর অসুখের কথাবার্তার সময় সরোদ-সেতার বাজে, বেহালাও বাজে করুণ সুরে। সরোদের টোকায় কষ্ট উৎপাদিত হয় মঞ্চমাঝে। নারীকণ্ঠে দীর্ঘ লয়ে রাগসংগীতও বাজে তখন, এতে বিষণ্ণতার আবহ সৃষ্টি হয় মঞ্চে। শব্দ নিয়ে একটি নিরীক্ষা দারুণ লেগেছে – সেটি হচ্ছে তরুর মৃত্যু-চিৎকার থামার সঙ্গে সঙ্গেই সাউন্ডট্র্যাকে বাজতে থাকা সংগীতখ-টি হঠাৎ থেমে যাওয়া। মৃত্যুর মেটাফোর বলা যায় একে – যেন হঠাৎ মরণ এসে ছিঁড়ে নিয়ে গেল তরুর জীবন। শব্দের এরকম মাত্রিক ব্যবহার সৃষ্টিশীলতার পরিচায়ক। কিছুক্ষণ নীরবতার পর ধীরলয়ে বেজে ওঠে তানপুরা – শোকের আবহ তৈরি হয় মঞ্চ আওতায়।

সংলাপে শিয়ালের কথা এসেছে বারকয়েক। পারিপার্শ্বিক শব্দ হিসেবে শিয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শোনার অপেক্ষা করেছি বারবার। পাইনি। পেলে পরিবেশটা সশরীরে পেতাম। সংলাপসূত্রে ঘোড়ার গাড়ি চলার শব্দও শুনতে পেয়েছি, যা পুরনো দিনের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। একবার শুধু পাখির ডাক সংলাপের সঙ্গে শোনানো হয়েছে। আরো কিছু পাখির ডাক শোনার জন্যও কান উদগ্রীব ছিল – ধারণা করি তখন গাছভরা পাখি ছিল, পাখির কলরব-কিচিরমিচির ছিল সকাল-সন্ধ্যায়। পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর ডাক পরিবেশ তৈরিতে অবদান রাখত। সংলাপসূত্রে বৃষ্টির শব্দও পাওয়া যায় একবার, তবে তা আরো কয়েকবার এলে বর্ষার আমেজ মঞ্চে সশরীরে উপস্থিত হতো। তারপরও লিয়াকত আলী লাকী মঞ্চসজ্জা, সংগীত ও নির্দেশনার ইউনিটগুলো দিয়ে মঞ্চমাঝে দেড় ঘণ্টার যে ঘোর তৈরি করেন তা-ই দর্শককে আটকে ফেলে এবং স্মৃতিকাতর করে রাখে। এই কৃতিত্ব তাঁকে দিতেই হবে। তবে নাট্যযজ্ঞ যেহেতু সামষ্টিক কর্ম তাই এই যজ্ঞে জড়িত সবাই সেই কৃতিত্বের অংশীদার।

আসলে নাট্যযজ্ঞের প্রতিটি ইউনিট একই লয়-তালে ক্রিয়া করে মঞ্চে গল্পের গতি সৃষ্টি করতে না পারলে দর্শককে ভাবে ডোবানো সম্ভব হয় না। এ-কাজটি লিয়াকত আলী লাকী তাঁর নাট্যক্ষেত্রে দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আশ্রয়ে নিপুণভাবেই সম্পন্ন করেছেন। তার জন্য তাঁকে অর্গানিক ইউনিটির ওপরই জোর দিতে হয়েছে। সকল শুদ্ধ শিল্পকর্মই এই ইউনিটি দাবি করে। সম্ভবত নির্দেশকের সংগীতের ওপর দখল থাকার কারণেই এই ইউনিটি বজায় থেকেছে। পুরো প্রযোজনাটিকেই তিনি সংগীতের সমতুল্য করে গড়ে তুলেছেন। সে-কারণেই দেড় ঘণ্টা যে কোনদিক দিয়ে মঞ্চে অতিবাহিত হলো তা টের পাইনি, যে-ঘোরের মধ্যে মন ডুবল তাও সংগীতের ধুয়ার মতোই মনে অনুরণিত হতে থাকল, নাট্যযজ্ঞ শেষ হওয়ার পরও। সবকিছুরই শেষ থাকে, ভালো লাগারও শেষ থাকে, কিন্তু নাট্যযজ্ঞটি দেখার পর যে ভালো লাগার জন্ম হয় তা যেন শেষ হতেই চায়নি!

তরু থেকে তিথি

গল্পটিতে বুদ্ধদেব বসুর স্মৃতিমথিত বেদনা প্রকাশিত হয়েছে মন কেমন করা কাব্যাক্রান্ত ভাষায়। সেই ‘মন কেমন করা’ বিষয়টি মঞ্চে পরিবাহিত করেছেন লিয়াকত আলী লাকী তাঁর সৃষ্টিশীল নাট্যপ্রজ্ঞার সহায়তায়। সেই নাট্যপ্রয়াস প্রত্যক্ষ করে দর্শক হিসেবে আমারও মন কেমন করে ওঠে। আমারও মনে পড়ে যায় নিজ স্মৃতির কথা! আমি নিশ্চিত, আমার মতো অনেকেরই এমনটি হয়েছে – নারী-পুরুষ উভয় প্রকার দর্শক নির্বিশেষে। নাট্যযজ্ঞটি ভালো লাগা ও মন খারাপ হওয়ার কারণও তাই স্মৃতিবিজড়িত। হয়তো নাট্যায়নটি প্রত্যক্ষ না করলে সেই স্মৃতি-বিস্মৃতির মধ্যেই থেকে যেত। এখানেই নাট্যযজ্ঞের প্রাসঙ্গিকতার প্রশ্নটি আসে। আর আমার কাছে ‘তরু থেকে তিথি’ প্রসঙ্গটিও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে।

নাট্যযজ্ঞটি দেখে রমনা পার্কের ভেতর দিয়ে বাড়ি ফিরছি – তরু নয় তখন কেন জানি হঠাৎ তিথির কথাই মনে পড়ে! পার্ক এমনিতেই মানুষের মনকে নৈঃসঙ্গ্যচেতনায়-স্মৃতিকাতরতায় আচ্ছন্ন করে। ফিরে যাই সেই ১৯৭৩-৭৪ সালের নয়াপল্টনে। সেই শঙ্খবরণ ভোর! সেই কারো এলানো চুলের মতো কালোরঙের রাত্রি! তখন বুদ্ধদেবের সময়ের মতো শিয়ালের ডাক শোনা যেত না। কিন্তু ব্যাঙের ডাক শুনেছি আর বানরও দেখেছি অনেক। ১৯২৭-২৮-এর মতো তখন তেমন ‘লম্বা-লম্বা চোর-কাঁটা ছাওয়া মাঠ’ ছিল না। বুদ্ধদেবের মতো ‘লণ্ঠন জ্বেলে কেরোসিনের গন্ধে আর মশার কামড়ে’র মধ্যে আমাদের পড়তে হতো না। তবে গল্পের তিন বন্ধুর মতো আমরাও তিন বন্ধু ছিলাম – আমি (শামীম), ফারুক ও শাহীন। কৈশোর পেরোনো যুবক, সবার প্রেমভরা মন। একসঙ্গে নয়াপল্টন চষে বেড়াই। আর গল্পের তিনজনের মতো আমরাও তিথিদের বাড়ির পাশ দিয়ে হাঁটি! শুধু তাকে একবার দেখার জন্য। তবে তিনজন একসঙ্গে নয়, যার যার সময়মতো। বিষয়টা সবাই জানতাম; কিন্তু এ নিয়ে কথা হতো না। কে জানে, তিথিও হয়তো বুঝত তাকে দেখার জন্য অনেকে খামোখাই তার বাসার পাশ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করে।

বিকাশ, অসিত এবং হিতাংশুদের তো তবু তরুর সঙ্গে কথা হয়েছে, আমার কোনোদিনই কথা হয়নি, দেখা ছাড়া। ফারুক, শাহীনের কথা বলতে পারব না। এক সময় বাসাবদলের কারণে তিথির সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কবছর আগে অফিসার্স ক্লাবে এক বিয়েতে তাকে দেখি – আমাদের বিয়েটি দ্বিতীয় তলায় আর তিথিরটি নিচ তলায়। ওপরে উঠতে গিয়ে হঠাৎ তাকে দেখে থমকে দাঁড়াই। আমি তাকে চিনলেও সে চিনতে পারেনি। তার হাতে কালো বড় ভ্যানিটি ব্যাগ, বেশ ব্যস্ত। শাড়ি পরা অবস্থায় তিথিকে এই প্রথম দেখলাম। বারবার করে দেখলাম – সেই চোখ, সেই ফর্সা মুখ, তবে শরীর ভারী হয়ে গেছে। একজনের সঙ্গে কথা বলে বুঝলাম আজ তিথির ছেলের বউভাত। পার্কে হাঁটতে হাঁটতে ভাবলাম – বুদ্ধদেবের তরু সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে জীবন হারায় আর আমাদের তিথি ছেলের বৌভাত করেছে। আসলে নাট্যযজ্ঞটিই আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে পেছনে, মনে পড়িয়ে দিয়েছে তিথির কথা। বাসায় ফিরেও তিথির কথাই মনে পড়েছে বারবার। কিন্তু কেউই তা বুঝতে পারেনি! যৌবনের প্রারম্ভের সেই দিনগুলোর একটি অকথিত প্রসঙ্গকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য এরকম একটি প্রযোজনার কাছে ঋণী থেকে গেলাম, যা ছিল গোপন তা হঠাৎ আজ তরুর সূত্রে প্রকাশ পেল। ফারুক বা শাহীন কি মনে রেখেছে তিথিকে? তিথিরও কি কখনো মনে আসে আমাদের কারো কথা? শুধু কি আমিই জীবনের সবচেয়ে সুখের অথচ মন খারাপ করা স্মৃতি ধরে রেখেছি? ফারুক কোথায় জানি না। শাহীন ডাক্তার হয়েছিল কিন্তু অসিতের মতো সেও বিশ-বাইশ বছর পূর্বে সড়ক দুর্ঘটনায় মরে গেল! আর আমি? বাবা চেয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার হই, হয়েছি লেখক। হয়তো সামান্য লেখক বলে, বুদ্ধদেব যেমন তরুকে, আমিও তেমনি তিথিকে ভুলিনি। মনে হয়, গল্পের থিমটি তথা এই তরু-তিথিবিষয়ক কথকতা সবসময়ই প্রাসঙ্গিক থাকবে, সব যুগে।

বাংলাদেশ থেকে যে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যেতে চান, তাদের যেসব তথ্য জেনে রাখা ভালো

সৈয়দা সায়মা চৌধুরী যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করার জন্য গিয়েছেন ২০১৬ সালে। বাজারজাতকরণ নিয়ে তিনি একটি লন্ডনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, ''যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করতে হলে আগে থেকে পরিকল্পনা করা জরুরি। অন্তত এক বছর আগে থেকেই সেই পরিকল্পনা শুরু করতে হবে। সেই সঙ্গে নিজের আর্থিক সামর্থ্য বুঝে শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই করতে হবে।''
বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে কিছুদিন আগে। এখন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পছন্দের তালিকায় যেমন বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তেমনি অনেকে বিদেশে পড়তে যাবার কথাও ভাবছেন।
বিদেশের স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনার তথ্য নিয়েই এই প্রতিবেদন।

প্রথমেই দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় বাছাই

সায়মা চৌধুরী বলছেন, ''প্রথমেই একজন শিক্ষার্থীকে ঠিক করতে হবে তিনি কোন দেশে পড়তে যেতে চান। কারণ একেকটি দেশের পড়াশোনা, খরচ, ভর্তি চাহিদায় পার্থক্য আছে। দেশ বাছাইয়ের পরে ঠিক করতে হবে যে, আমার সাবজেক্ট ও আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে মিলিয়ে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যেতে পারে। এক্ষেত্রেও একেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম বা চাহিদা, টিউশন ফির সঙ্গে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্থক্য থাকে।''
ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিলের আঞ্চলিক সমন্বয়ক তাওসিফ মান্নান খান বলছেন, ''যুক্তরাজ্যসহ অনেক দেশে সেপ্টেম্বরে ভর্তি সেশন শুরু হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে অন্তত এক বছর আগে থেকে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করা উচিত। বিশেষ করে ইংরেজির ভর্তি চাহিদা যেমন, আইইএলটিএস বা অন্যান্য চাহিদা প্রস্তুতি করা, বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগাযোগ, আবেদন ইত্যাদি অন্তত একবছর আগে থেকে শুরু করতে হবে।''
তিনি বলছেন, যে বিষয়ে পড়তে চান, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে হবে। সেই সঙ্গে দেখতে হবে আপনার আর্থিক সামর্থ্য এবং পছন্দের সঙ্গে মিলছে কিনা।

যেসব প্রস্তুতি দরকার হবে

বাংলাদেশে এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর এখন শিক্ষার্থীদের ভর্তি পছন্দের তালিকায় যেমন বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, তেমনি অনেকে বিদেশে পড়তে যাবার কথাও ভাবছেন।

ভাষা দক্ষতার প্রমাণ:

যেমন আইইএলটিএস, টোফেল, স্যাট অথবা জিআরই। একেকটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে এসব চাহিদার পার্থক্য থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় দেশগুলোর বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইইএলটিএসে ব্যান্ড স্কোর অন্তত ৬ থাকা দরকার। তবে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এর চেয়ে বেশিও চাইতে পারে। তবে আমেরিকাসহ আরো দেশের কোন কোন সাবজেক্টে টোফেল, স্যাট বা জিআরই দরকার হতে পারে।
জার্মানি, ফ্রান্স, সুইডেন, নরওয়ের মতো ইউরোপীয় দেশে পড়তে গেলে যেমন ইংরেজিতে পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে, আবার অনেক ক্ষেত্রে সেই দেশের ভাষার দক্ষতা দরকার হতে পারে। বিশেষ করে জার্মানির মতো দেশে বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ নিতে হলে জার্মান ভাষা জানতে হবে।

পড়াশোনার ফলাফল

বাংলাদেশে পড়াশোনার ফলাফলের ওপর ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ের বা বিষয়ে ভর্তির ব্যাপারটিও অনেক সময় নির্ভর করে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে ইমেইল করেও পরামর্শ চাওয়া যেতে পারে। অনেক সময় ইংরেজি দক্ষতার ব্যান্ডস্কোরও ভর্তি বা বিষয় পাওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে।

ভর্তির প্রক্রিয়া

বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয় বাছাই করার পরে অনলাইনের মাধ্যমে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করতে হবে।
নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন ইত্যাদি দেশের কেন্দ্রীয় ভর্তি ব্যবস্থাপনার ওয়েবসাইট আছে। সেখানে আবেদন করলে আপনার যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বেছে দেয়া হয়।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদন করতে হয়।
সেখানে পড়াশোনার সকল সনদ কাগজপত্র স্ক্যান করে তুলে দিতে হতে পারে। পাশাপাশি এসব সেগুলোর ফটোকপি কুরিয়ার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানায় পাঠাতে হতে পারে।
শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে যুক্তরাজ্যের স্ট্যাফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান
সাধারণত কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবেদন গ্রহণ বা বাতিলের সিদ্ধান্ত ইমেইলের মাধ্যমে জানানো হয়।
আবেদনপত্র গ্রহণ করা হলে ভিসা আবেদনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।

আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণপত্র

ভিসা আবেদনের সময় আর্থিক সচ্ছলতার প্রমাণ দেখাতে হবে। প্রায় সব দেশেই শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে দূতাবাস কর্মকর্তারা দেখতে চাইবেন যে, শিক্ষার্থীর পড়াশোনা ও থাকাখাওয়ার খরচ সে বহন করতে সক্ষম।
দেশ ভেদে টিউশন ফি হিসাবে অন্তত বছরে অন্তত ১০/১২ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ২০/২২ লাখ টাকা খরচের সামর্থ্য থাকতে হবে। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীর থাকা-খাওয়া, যাতায়াত, পোশাক, হাতখরচ, চিকিৎসা যোগ করতে হবে। লন্ডনের ক্ষেত্রে যেমন এক্ষেত্রে বছরে আরো অন্তত ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখতে হবে। এই খরচের টাকা ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি সেমিস্টারের ফি অগ্রিম পরিশোধ করতে হয়।
অনেক দেশে স্বাস্থ্য বীমা থাকা বাধ্যতামূলক। সেটি অবশ্য বাংলাদেশের বিভিন্ন বীমা এজেন্সি করে থাকে, যেসব এজেন্সির নাম দূতাবাসের ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে।

আবাসন

সব বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসন ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের পূর্বেই জানাতে হবে যে, তারা সেই আবাসন সুবিধা নিতে চান কিনা। অথবা শিক্ষার্থীরা চাইলে নিজেরা আলাদাভাবে বাসা ভাড়া করেও থাকতে পারেন। এসব ক্ষেত্রে সাধারণত নিজেদের রান্না করে খাওয়ার ব্যবস্থা থাকে।

বৃত্তির জন্য আবেদন

আবেদনের সময় উল্লেখ করতে হবে যে বৃত্তি নিতে চান কিনা। একই সময় বৃত্তির জন্যই প্রস্তুতি নিতে হবে।
ভারত, তুরস্ক, জার্মানি, জাপান, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারিভাবেই নানা ধরণের বৃত্তি রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে একটি র‍্যাংকিংয়ে সেরা হয়েছে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়
এরকম বিখ্যাত কয়েকটি বৃত্তি হলো জাপানের মনবুশো বৃত্তি ও মনবুকাগাকুশো বৃত্তি, , এমএইচটিটি স্কলারশিপ প্রোগ্রাম, জার্মানির ডিএএডি, অস্ট্রেলিয়ার ডেভেলপমেন্ট স্কলারশিপ, যুক্তরাজ্যের কমনওয়েলথ স্কলারশিপ, শেভেনিং স্কলারশিপ, যুক্তরাষ্ট্রের ফুলব্রাইট ফরেন স্টুডেন্টস প্রোগ্রাম, কানাডার হাম্বার ইন্টারন্যাশনাল এন্ট্রান্স স্কলারশিপ ইত্যাদি। এছাড়া প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিক্ষার্থীদের পূর্ণ বা আংশিক বৃত্তির সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ওয়েবসাইটের বিভিন্ন দেশের দূতাবাস বা সরকারি বৃত্তির নোটিশ পাওয়া যাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনলাইনেই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে বৃত্তির আবেদন করা যেতে পারে।

ভিসা

ভিসা আবেদনের সময় আবেদন পত্রের কাগজপত্রের মধ্যে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির অফার লেটার থাকতে হবে। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীর আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণ, অর্থাৎ ব্যাংক হিসাবে নিজের নামে বা গ্যারান্টারের নামে পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
শিক্ষার্থী ভিসার ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত থাকতে পারে।
শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করার জন্য যেসব দেশে যেতে চান, তার কয়েকটি দেশের ভর্তির পদ্ধতি এখানে বর্ণনা করা হলো।

যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা

ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিলের আঞ্চলিক সমন্বয়ক তাওসিফ মান্নান খান বলছেন, ''যুক্তরাজ্যে যারা স্নাতক বা আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে পড়তে যেতে চান, তারা UCAS ওয়েবসাইটের গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি সংক্রান্ত সকল কাজ করতে পারেন। কারণ এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যুক্তরাজ্যের সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি তথ্য, আবেদনের প্রক্রিয়াসহ সব তথ্য পাওয়া যাবে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়েও সেখানকার ভর্তি তথ্য, খরচ, আবেদনের প্রক্রিয়া ও অনলাইনে আবেদন করা যায়।''
তিনি বলছেন, একেকটি শহর ও বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে পড়াশোনার খরচ ভিন্ন হয়ে থাকে। যেমন লন্ডনে পড়তে গেলে যে খরচ লাগবে, অন্য শহরে হয়তো খরচ কম হবে।
তিনি বলছেন, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে বা UCAS সরাসরি আবেদন করা যায়। আবেদনের সময় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান করে আপলোড করতে হবে। পরবর্তীতে কুরিয়ারের মাধ্যমে হার্ড কপি পাঠাতে হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে বাছাই করলে ই-মেইলের মাধ্যমে জানিয়ে দেবে এবং ভর্তির চিঠিও পাঠাবে। সেই চিঠি নিয়ে আর্থিক সক্ষমতার প্রমাণসহ ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।
যুক্তরাজ্যে আন্ডার গ্রাজুয়েট কোর্সগুলো তিন বছরের হয়ে থাকে। পড়াশোনার সময় শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খন্ডকালীন কাজ করতে পারবেন।
ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে জার্মান বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে
পড়াশোনা শেষ করে শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশে ফেরত আসতে হবে। তবে সেখানে মাস্টার্স বা অন্য কোন কোর্সে ভর্তি হলে পুনরায় ভিসার আবেদন করে বাড়িয়ে নেয়া বা পরিবর্তন করে নেয়া যেতে পারে।
ঢাকায় ব্রিটিশ কাউন্সিলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আরো এ সংক্রান্ত পরামর্শ নেয়া যেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শিক্ষা

আমেরিকার বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। ঢাকায় আমেরিকান সেন্টারে গিয়ে এ ব্যাপারে পরামর্শ ও তথ্য সহায়তা নেয়া যেতে পারে।
শিক্ষা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ওয়েবসাইট 'এডুকেশনইউএসএ' দেশটিতে ভর্তি, বিশ্ববিদ্যালয়, ডেডলাইন, প্রক্রিয়া সম্পর্কে সকল তথ্য পাওয়া যাবে।
আমেরিকান সেন্টারের ওয়েবসাইটে পড়াশোনার ব্যাপারে পাঁচটি গাইডলাইন দেয়া রয়েছে। এগুলো দেখে পুরো আবেদনের প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা যেতে পারে।
প্রথমেই গবেষণা। কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চান, আপনার পছন্দের বিষয় সেখানে আছে কিনা, টিউশন ফি কতো, ইংরেজির জন্য আইইএলটিএস,নাকি টোফেল অথবা আর কি প্রমাণ চাইছে ইত্যাদি দেখে বাছাই করতে হবে। এরপর পড়াশোনার খরচ বা বৃত্তির বিষয়টি ঠিক করে নিতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় ঠিক হওয়ার পরে অনলাইনেই আবেদন করতে হবে এবং প্রয়োজনে সেমিস্টার ফি পাঠাতে হবে। এরপরে ভর্তির সুযোগ পেলে ভিসার আবেদন করতে হবে।
আমেরিকায় একেকটি স্টেট ভেদে বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের অনেক তারতম্য হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়া

বিদেশে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় সহায়তা করে, এমন একটি প্রতিষ্ঠান স্টুডেন্ট ওয়ার্ল্ডের কর্মকর্তা আমরিন কবির বলছেন, ''অস্ট্রেলিয়ার জন্য আইইএলটিএস ও এইচএসসির পরীক্ষার জিপিএ খুব গুরুত্বপূর্ণ দুইটা বিষয়। এর ওপরে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া নির্ভর করবে। এটা যত ভালো হবে, সে তত ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাবেন।''
তিনি বলছেন, ''যদিও প্রকাশ্যে বলা হয় না, তবে ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে ভালো আইইএলটিএসের স্কোরটি অনেকটা ভূমিকা রাখে।''
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবেদন থেকে সবমিলিয়ে এক্ষেত্রে দুই মাসের মতো সময় লাগবে পারে।
তিনি বলছেন, ''জিপিএ কম থাকলে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাচেলর কোর্সে ভর্তির চেষ্টা না করে বরং অস্ট্রেলিয়ায় কোন ডিপ্লোমা কোর্সে যেতে পারেন। সেটা সম্পন্ন করে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাঙ্ক্ষিত কোর্সে ভর্তিতে সুবিধা পেতে পারেন।''
সায়েন্স, প্রকৌশলের মতো বিষয় আইইএলটিএসের সাত স্কোর থাকা দরকার হবে।
''এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ার বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক স্কলারশিপ রয়েছে। একটু ভালো পারফর্মেন্স দেখাতে পারলে সেগুলো পাওয়া সম্ভব।'' তিনি বলছেন।
শিক্ষার্থীদের পছন্দের তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো অনেক প্রতিষ্ঠান
আমরিন কবির বলছেন, ''অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা চলার সময় শিক্ষার্থীরা পার্টটাইম আর ছুটির সময় ফুলটাইম কাজ করতে পারেন। আবার পড়াশোনা শেষ করে সেখানে নিয়ম মেনে চাকরি ও পরবর্তীতে স্থায়ী হওয়ারও সুযোগ হতে পারে।

কানাডা

কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে আইইএলটিএস অবশ্যই থাকতে হবে।
এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ওয়েবসাইট ব্যবহার করে শিক্ষার্থীরা সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় ওয়েবসাইটে ভর্তি তথ্য, আবেদনের প্রক্রিয়াসহ সকল তথ্য বিস্তারিতভাবে থাকে। সকল কাগজপত্রের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সেমিস্টার ফি অগ্রিম পাঠাতে হবে।
তারা শিক্ষার্থীরা ভর্তির সুযোগ পেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অফার লেটার পাঠানো হয়। এরপর ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।
সেখানেও পড়াশোনা করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী হিসাবে চাকরি ও স্থায়ী বসবাসের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

ভারত

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারতেও অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সুযোগ। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার খরচ অনেকটা বাংলাদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচের মতোই।
বাংলাদেশসহ বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভারত সরকারের নানা স্কলারশিপ রয়েছে। ঢাকার ভারতীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে যোগাযোগ করে বিস্তারিত জানা যেতে পারে।

চীন

গত কয়েক বছর ধরে অনেক বাংলাদেশি চীনে পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন। ঢাকার বেশ কিছু শিক্ষার্থী সহায়ক প্রতিষ্ঠান এক্ষেত্রে সহায়তা করে থাকে। তবে চীনে পড়তে গেলে আগে চীনা ভাষা শিখতে হবে। ঢাকায় এখন এরকম বেশ কিছু ভাষা শেখানোর প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
চীনে পড়াশোনা করে এসে এখন ঢাকার একটি চীনা মোবাইল ফোন কোম্পানিতে কাজ করছেন মোঃ. মুরাদ খান। তিনি বলছেন, '' আমি ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চীনা ভাষা শেখার পরে চীনের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেছিলাম। তার একটিতে বৃত্তির সুযোগ পাওয়ায় চীনে গিয়ে চার বছর পড়াশোনা করেছি।''
ফ্রান্সের ইউনিভার্সিটি অফ ডিডের্ট প্যারিস
তিনি জানান, বিদেশি শিক্ষার্থী হিসাবে সেখানে খাবারে খাপ খাওয়াতে খানিকটা সমস্যা হলেও পড়াশোনার সুযোগ, মান এবং থাকার ব্যবস্থা খুবই ভালো।

জার্মানি

জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও জার্মান ভাষায় পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন টিউশন ফি দিতে হবে, আবার জার্মান ভাষার অনেক প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে এখনো জার্মানিতে বিনা বেতনে পড়াশোনা করার সুযোগ রয়েছে। তবে সেজন্য জার্মান ভাষার দক্ষতা প্রমাণ করতে হবে।
জার্মানিতেও পড়াশোনার পাশাপাশি কাজের সুযোগ রয়েছে। পড়াশোনা শেষে অস্থায়ীভাবে থাকার অনুমতিও পাওয়া যেতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে ভর্তি, প্রোগ্রাম তথ্যসহ সকল তথ্য পাওয়া যাবে এবং আবেদন করা যাবে।
ঢাকার গ্যেটে ইন্সটিটিউটে জার্মান ভাষা শেখা যেতে পারে।

মালয়েশিয়া

বাংলাদেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী বর্তমানে মালয়েশিয়াতে পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে সেখানে।

বিনা বেতনে পড়াশোনা

নরওয়ে এবং ফিনল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। সেই সঙ্গে থাকা-খাওয়ার খরচ মেটাতে স্কলারশিপও পাওয়া যেতে পারে।
সুইডেনে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে ভর্তি করা হয়। সেখানে আবেদন করার পর যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় চূড়ান্ত হবে।

ইউরোপের অন্যান্য দেশে পড়াশোনা

বাংলাদেশ থেকে ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ডেনমার্ক, নেদারল্যান্ডস, শ্লোভাকিয়াসহ অনেক দেশে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করতে যাচ্ছেন।
এক্ষেত্রে যারা ইংরেজি ভাষায় পড়তে চান, তাদের আগেই দেখে নিতে হবে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষায় কোন কোর্সগুলো রয়েছে।

জিন পরীক্ষা: আসছে শুধু আপনার জন্য তৈরি ওষুধ by এমা উলাকট

দেহকোষে জিনের গঠন বিন্যাস পরীক্ষা বা জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর ব্যয় যত কমে আসছে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স দিয়ে নতুন উপাত্ত বিশ্লেষণ যত সহজ হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে শুধুমাত্র আপনার জন্য বিশেষভাবে তৈরি ওষুধ তৈরির দিনটিও এখন আর খুব একটা দূরে নয়।
আইসল্যান্ডের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষের জিনের গঠন বিন্যাস এবং বিশ্লেষণ সম্পন্ন হয়েছে।
ডিকোড জেনেটিক্স-এর মত বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে প্রায় ৬০০ মার্কিন ডলার ব্যয় করে হাজার হাজার মানুষ তাদের জিন গঠন বিন্যাস জেনে নিচ্ছেন। জেনে নিচ্ছেন তারা ভবিষ্যতে কো‌ন্‌ কোন্‌ রোগের শিকার হতে পারেন।
"এমআরআই স্ক্যানের তুলনায় এই খরচ খুব একটা বেশি না," বলছেন ডিকোড জেনেটিক্স-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কারি স্টেফানসন।
সাধারণ মানুষের অসুখ-বিসুখ সম্পর্কে আগাম জানাই শুধু এ ধরনের প্রকল্পের উদ্দেশ্য নয়। পাশাপাশি কোন ব্যক্তির নির্দিষ্ট জিন গঠনের ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে শুধুমাত্র ঐ ব্যক্তির জন্য কীভাবে ওষুধ তৈরি করা যায়, তাও জানা সম্ভব হবে।
যেমন, কোন কোন মানুষের হজমশক্তি অন্যদের চেয়ে বেশি। ফলে তাদের জন্য সেই ধরনের ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে বা তাদেরকে সেই ধরনের চিকিৎসা দেয়াও সম্ভব হবে। কারও বিশেষ কোন রোগের ঝুঁকি থাকলে তাদের জীবনযাত্রার পদ্ধতি পরিবর্তন করে কীভাবে সেই ঝুঁকি কমানো যায়, জিনোম সিকোয়েন্সিং করে সেটাও জানা যাবে।
"এই বিষয়ে যে বিপুল তথ্য আমাদের হাতে আসছে তা বিশ্লেষণ করার জন্য আমরা আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করছি," বলছেন মি. স্টেফানসন, "আর এসব উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আমরা জানতে পারছি মানুষে-মানুষে দেহগত তফাৎগুলো কোথায়, নানা ধরনের অসুখের প্রকারভেদগুলো কী এবং কীভাবে ভিন্ন ভিন্নভাবে মানুষের চিকিৎসা দেয়া যায়।"
কারি স্টোফানসেন বলছেন, জিন পর্যালোচনা করে ওষুধের কার্যকারিতা সম্পর্কে আগাম জানা সম্ভব হবে।
মানব দেহের প্রথম জিনোম সিকোয়েন্সিং করতে সময় লেগেছিল ১৩ বছর এবং ব্যয় হয়েছিল ২৭০ কোটি ডলার। কিন্তু এখন প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার সাথে সাথে ডিএনএ বিশ্লেষণের খরচ অনেক কমে গেছে। মানুষের জিন বিন্যাসের তথ্য মজুদ রাখার জন্য সারা বিশ্বজুড়ে এখন গড়ে তোলা হচ্ছে 'বায়োব্যাংক'।
যেমন ধরুন, উত্তর ইয়োরোপের ছোট্ট একটি দেশ এস্তোনিয়া। সেখানকার নাগরিকদের স্বেচ্ছায় তাদের ডিএনএ নমুনা জমা দেয়ার জন্য উৎসাহ দেয়া হচ্ছে। সেখানে এসএনপি অ্যারে নামে পরিচিত স্বল্পমূল্যের এক পরীক্ষার মাধ্যমে সেই তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে বলে জানালেন টারটু বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্সটিটিউট অফ জেনোমিক্স-এর বায়োব্যাংক প্রধান অধ্যাপক আন্ড্রেয়াস মেটস্পালু। মাথাপিছু এই পরীক্ষার ব্যয় মাত্র ৫০ ইউরো।
নানা ধরনের রোগের কারণ যে সাত লক্ষ জিন মিউটেশন, তার সাথে এসব লোকের দেহকোষ থেকে পাওয়া তথ্য যাচাই করা হয়। এবং ঐ পরীক্ষায় যারা অংশগ্রহণ করেছেন, এই প্রথমবারের মতো তাদেরকে পরীক্ষার ফলাফল জানানো হচ্ছে।
"সব ধরনের জেনেটিক মিল-অমিল যাচাই করার সময় সেখান থেকে এত নতুন তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে আমাদের মনে হয়েছে এসব তথ্য কোন মানুষ চাইলে তার চিকিৎসার জন্যও ব্যবহার করতে পারেন," বলছেন ঐ ইন্সটিটিউটের ফার্মাকোজেনোমিক্স বিভাগের দলনেতা ও উপপরিচালক অধ্যাপক লিলি মিলানি।
"যেমন ধরুন,কোন্ জিনের কাঠামো পরিবর্তনের ফলে রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে সেটা এই পরীক্ষা থেকে জানা যায়। আবার স্তনের ক্যান্সারের জন্য যে বিশেষ জিন মিউটেশন দায়ী, এটা থেকে সে সম্পর্কেও আগাম ধারণা পাওয়া সম্ভব।"
লিলি মিলানি বলছেন, রোগীদের জিনগত তথ্য দেয়ার সময় খুবই সতর্কতার সাথে করতে হবে।
উদাহরণ দিয়ে অধ্যাপক মিলানি ব্যাখ্যা করলেন, ভবিষ্যতে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কম না বেশি, কিংবা কারও টাইপ-টু ডায়াবেটিস হবে কি না, তা নির্ভর করে ঐ ব্যক্তির জিনের গঠন বিন্যাস, রোগ প্রবণতা এবং খাবার ও শরীরচর্চা ইত্যাদিসহ ঐ লোকের সার্বিক জীবনযাত্রার মানের ওপর।
তাই এই ধরনের তথ্য জানানোর জন্য যথেষ্ট সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। ভবিষ্যতে খুবই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হতে যাচ্ছেন, এই আগাম খবরে যে কেউই খুবই বিচলিত হয়ে পড়বেন।
এস্তোনিয়ায় যখন কাউকে তার ভবিষ্যৎ রোগের সম্ভাবনার কথা জানানো হয় তখন তাকে একটি নতুন ফর্মে সই করে সম্মতি দিতে হয় যে এই ফলাফল সম্পর্কে তিনি অবহিত। এরপর তার রক্তের দ্বিতীয় একটি নমুনা সংগ্রহ করে দ্বিতীয়বারের মতো পরীক্ষা চালানো হয়। উদ্দেশ্য দুটি ফলাফল যাচাই করে দেখা। এরপর বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের সাথে অ্যাপয়েন্টমেন্ট, কাউন্সেলিং ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি, এই দু:সংবাদ জানানোর জন্য পরিবারের সদস্যদের প্রতিও চিঠি লেখা হয়।
বানরের ভেতর মানব মস্তিষ্কের জিন স্থাপন করলেন চীনা বিজ্ঞানীরা
"এস্তোনিয়ায় যেটা একেবারেই অনন্য তা হলো এসব ফলাফল আমরা রোগীদের জানানো শুরু করেছি। যাদের স্তনে ক্যান্সার হবে কিংবা পরিবার সূত্রে যাদের রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা ভবিষ্যতে বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, এই ধরনের ফলাফল আমরা ক্লিনিকগুলোর সহায়তায় রোগীদের জানিয়ে দিচ্ছি," বলছেন অধ্যাপক মিলানি।
"তবে এই ব্যাপারে আমরা খুবই সতর্ক এবং তথ্য প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা খুবই রক্ষণশীল।"
কিন্তু সারা বিশ্বে জিন বিন্যাস পরীক্ষা যতই বাড়ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ একটি সমস্যা সামনে চলে আসছে।
বেশিরভাগ পরীক্ষাই এখন চলছে এমন সব মানুষের ওপর যাদের জন্ম ইয়োরোপীয় পরিবারে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণা প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল হিউম্যান জিনোম রিসার্চ-এর একজন পরিচালক ড. লুসিয়া হিনডর্ফ বলছেন, "আমরা যদি একই ধরনের জনগোষ্ঠীর ওপর বেশি নজর দেই, কিংবা যাদের সম্পর্কে তথ্য আগেই জোগাড় করা হয়েছে তাদের দিকেই বেশি মনোযোগ দেই, তাহলে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত যেসব উপাত্ত রয়েছে তার মধ্য থেকে তারতম্যগুলো খুঁজে বের করা কঠিন হয়ে পড়বে।"
"আমরা এমন সব প্রমাণ পেয়েছি যাতে দেখা যাচ্ছে আপনি যদি তথ্য ভাণ্ডারে ৫০ হাজার অ-ইয়োরোপীয় লোকের বদলে ৫০ হাজার ইয়োরোপীয় লোকের উপাত্ত যোগ করেন তাহলে তাহলে উপাত্তের মান বদলে যায়। কিন্তু আপনি যদি ৫০ হাজার অ-ইয়োরোপীয় লোকের তথ্য যোগ করেন তাহলে অনেক বেশি তারতম্য খুঁজে পাওয়া যায়।" অর্থাৎ বেশি সংখ্যায় রোগ সনাক্ত করা যায়।
এক দশক আগের তুলনায় জিনোম সিকোয়েন্সিং-এর খরচ এখন খুবই কম।
জিনোমিক্স এবং রোগতত্ত্বকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক গবেষণা প্রকল্প চালু হয়েছে। এর আওতায় ড. হিনডর্ফ এবং তার সহযোগীরা প্রায় ৫০,০০০ আমেরিকান-আফ্রিকান, লাতিনো, এশীয় এবং নেটিভ হাওয়াইয়ান ও নেটিভ আমেরিকানের ডিএনএ তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
এ থেকে তারা রক্তচাপ, টাইপ-টু ডায়াবেটিস, ধূমপান এবং জটিল কিডনি রোগের সাথে সম্পর্কিত ২৭টি নতুন ধরনের জিনগত সমস্যা আবিষ্কার করেছেন। হাওয়াই দ্বীপের আদি বাসিন্দাদের কাছ থেকে ডিএনএ উপাত্ত বিশ্লেষণ করে তারা দেখেছেন প্রতিদিন যে ক'টা সিগারেট খাওয়া হচ্ছে তার সঙ্গে জিনোম ভ্যারিয়েশনের একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। অন্য কোন জনগোষ্ঠীতে এই ব্যাপারটা লক্ষ্য করা যায়নি।
একইভাবে এই গবেষণা দলটি দেখেছে, আফ্রিকান-আমেরিকানদের রক্তের হিমোগ্লোবিনে যে গ্লুকোজ থাকে তার সাথে হিমোগ্লোবিন জিনের একটা তফাৎ রয়েছে। সিকেল সেল অ্যানিমিয়ার জন্য এই জিন দায়ী।
এসব গবেষণার ফলে ব্যক্তি-বিশেষের প্রয়োজনকে সামনে রেখে কারও জন্য বিশেষভাবে ওষুধ তৈরির কাজটা ভবিষ্যতে সহজ হয়ে যাবে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
এমন একটা সময় আসবে যখন শিশুদের জন্মের সময় তাদের জিনোম সিকোয়েন্স করা হবে। এস্তোনিয়ার অধ্যাপক লিলি মিলানি বলছেন, এস্তোনিয়ার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এরই মধ্যে এই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন।
"আমার বিশ্বাস, জিনের গঠন বিন্যাসের ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে (শিশুর) জন্মের সময়ই এই বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। ফলে তার ভবিষ্যৎ রোগ-বালাই প্রতিরোধের চিকিৎসা প্রদানও সহজ হবে," তিনি বলছেন, "আমরা যদি পারি, তাহলে সেটা করবো নাই বা কেন?"
জিন সমস্যার সাথে রোগের সম্পর্ক খুঁজে বের করতে এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।