Thursday, May 16, 2013

ব্যবস্থাপত্র by সম্পদ কুমার পোদ্দার

মানুষের মৌলিক কয়েকটি চাহিদার মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম। সাধারণত চিকিৎসকেরা ব্যবস্থাপত্র প্রদান করার মাধ্যমে রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকেন। এ জন্য তাঁরা উপযুক্ত সম্মানী পান। এভাবে চিকিৎসা গ্রহণের পর রোগীরা সুস্থ হয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসকদের প্রতি সবার একটা অভিযোগ আছে। রোগীদের ভিড়ের চাপে চিকিৎসকেরা অনেক সময় তাড়াহুড়া করেন। এ জন্য তাঁদের হাতে লেখা ব্যবস্থাপত্র অনেকটা অস্পষ্ট হয়ে থাকে। এটা আমি চিকিৎসকদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি। আর এই অস্পষ্ট হাতের লেখা পড়তে ওষুধের দোকানের লোকদের অনেক অসুবিধা হয়। হাতের লেখা বুঝতে অসুবিধার কারণে
অনেকে আন্দাজে ওষুধ দিয়ে থাকেন। এতে করে রোগীদের চরম মূল্য দিতে হয়। চিকিৎসক যে ওষুধ খাওয়ার জন্য পরামর্শ দেন, রোগীরা হয়তো অন্য ওষুধ পেয়ে থাকেন।
যেহেতু বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে, তাই চিকিৎসকেরা যদি কম্পিউটার কম্পোজ করে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে থাকেন, তাহলে এ ধরনের সমস্যার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। বিষয়টি বিবেচনার জন্য স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
সম্পদ কুমার পোদ্দার
কর্মকারপাড়া, শেরপুর, বগুড়া।

অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত by শাহীদুল আযম

আমাদের দেশে সরকারি যেকোনো খাত (সেবামুখী, উৎপাদনমুখী ইত্যাদি) হোক না কেন, প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, অপচয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণে জটিলতা, সীমাহীন দুর্নীতি, দলবাজি, আঞ্চলিকপ্রীতি, স্বজনপ্রীতি ইত্যাদি ধরনের হতাশাজনক চিত্র। ফলে সেবার মান হ্রাস, উৎপাদন হ্রাস, সেবামূল্য তথা উৎপাদিত সামগ্রীর ভোক্তা পর্যায়ে লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে গণ্য হওয়া, বছরের পর বছর সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল থাকা ইত্যাদি স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ আন্তরিকতা, সদিচ্ছা, নিরপেক্ষতা আর যথাযথ নিয়মকানুন ও নীতিমালা অনুসরণের মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাখা হলে সরকারি যেকোনো নিয়োগ-প্রক্রিয়াসহ সব সরকারি কাজ দ্রুত জনবান্ধব এবং প্রশংসনীয় হতে পারে, সরকারিভাবে সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়া তাঁর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে চলেছে। অতীতে বেসরকারিভাবে, দালালের মাধ্যমে মালয়েশিয়াসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে গিয়ে প্রতারিত ও নিঃস্ব হয়ে অসংখ্য হতভাগ্য বাংলাদেশি যুবক অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন—এমন অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। অথচ সব বাধাবিপত্তি ও স্বার্থান্বেষী মহলের অযৌক্তিক দাবি ও হুমকি উপেক্ষা করে সরকারিভাবে সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করে বর্তমান সরকার। সারা দেশ থেকে জনসংখ্যার ভিত্তিতে সুষ্ঠু নীতিমালা অনুসরণ করে লটারির মাধ্যমে যোগ্য প্রার্থী বাছাই, প্রশিক্ষণ দান এবং বিমানযোগে কর্মী প্রেরণের জন্য পূর্বঘোষিত মাত্র ৪০ হাজার টাকার প্যাকেজও কমিয়ে শেষ পর্যন্ত আরও সাত হাজার টাকা কমে অর্থাৎ মাত্র ৩৩ হাজার টাকায় সেখানে কর্মী পাঠানো হয়। এর মাধ্যমে শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয় একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনে সক্ষম হয়েছে সন্দেহ নেই। আশা করি, তারা শেষ পর্যন্ত একই ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হবে। সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয় তথা সরকারি প্রতিষ্ঠানে ওই দৃষ্টান্তটি অনুকরণীয় ও অনুসরণীয় হয়ে উঠুক—এটাই কামনা করি।
শাহীদুল আযম

সংবিধান ও প্রধানমন্ত্রীর অসীম ক্ষমতা

রাজনীতিবিদ ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রী গোলাম মোহাম্মদ কাদের (জি এম কাদের) দেশের সংবিধান ও শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে প্রথম আলোয় যে নিবন্ধ লিখেছেন (এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা আর নয়, ১১ মে, ২০১৩), তা খুবই সময় উপযোগী ও প্রশংসনীয়। অবশ্য তিনি যে খুব নতুন কিছু বলেছেন, তা নয়। তবে তিনি খুবই সুচিন্তিতভাবে এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা তথা প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতাগুলো চিহ্নিত করেছেন। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদটি যে রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বে এবং প্রধানমন্ত্রীর যে কার্যত কোনো জবাবদিহি নেই (কাগজে আছে, বাস্তবে নেই), তা-ও জনাব কাদের চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন। আমাদের রাজনীতির অঙ্গন ও মিডিয়া আরেকটি সংসদ নির্বাচনের বিতর্কে বর্তমানে ব্যস্ত রয়েছে। কিন্তু সেই সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে আবার একটি এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা তথা একজন প্রধানমন্ত্রীর একনায়কত্বকে যে ডেকে আনছি, তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামাচ্ছেন না। কারণ, বেশির ভাগ রাজনীতিক ও মিডিয়া এ মুহূর্তের স্বার্থ উদ্ধারে ব্যস্ত। যাঁরা কখনো প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, তাঁরা এমন একজনকে প্রধানমন্ত্রী করতে চান, যাতে তাঁর নিজের পদ, সুবিধা, ব্যবসা ও প্রভাব নিশ্চিত থাকে। প্রধানমন্ত্রী পদের ব্যক্তিটি দেশের বা গণতন্ত্রের জন্য কী করছেন বা করবেন, তা দেখা দলীয় নেতাদের কাজ নয়। বেশির ভাগ দলীয় নেতা শুধু নিজের সুবিধা ও অবস্থানটুকু দেখেন। বেশির ভাগ রাজনীতিক দলের মধ্যে বা সংসদের মধ্যে এমন কোনো ভূমিকা পালন করতে চান না, যাতে তাঁর সুবিধা ও অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যেতে পারে। বেশির ভাগ মিডিয়াও ‘বর্তমান’ নিয়ে ব্যস্ত। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ বা প্রকৃত গণতন্ত্র চর্চা নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথা নেই। ব্যতিক্রম খুব কম। এই পটভূমিতে জি এম কাদেরের প্রবন্ধটি অনেকের কাছে অরণ্যে রোদন মনে হতে পারে। হ্যাঁ, কিছুটা অরণ্যে রোদন তো বটেই। এ রকম রোদন অনেক বছর ধরে অনেকে করেছেন। এখনো করছেন। তেমন ফল পাওয়া যায় না। কারণ, সংবিধানই দেশের বড় সমস্যা। আর সেই সংবিধান পরিবর্তন করতে পারেন কেবল দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর অনুগত ও আজ্ঞাবহ বলে তাঁরা সেটি করবেন না। জি এম কাদের এই একনায়কত্বের অবসানের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব দিয়েছেন, যা বিবেচনার দাবি রাখে। তবে দেশে সত্যিকার গণতন্ত্র চালু করতে হলে এ ছাড়া আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তা কে করবেন? যাঁদের ওপর সংবিধান (আবার সংবিধানই) এই দায়িত্ব দিয়েছে, তাঁরাই তো এই অপরাজনীতির প্রতিনিধি হয়ে বসে আছেন। এই জট খোলা খুব সহজ কাজ নয়।
আমার খুব কৌতূহল, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া ও তাঁদের পারিবারিক উত্তরসূরিরা প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকলে (সে রকম দিন কি কখনো আসবে?) তখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংসদেরা সংবিধানে ‘প্রধানমন্ত্রীর’ এই একচ্ছত্র ক্ষমতার ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেবেন? অনুমান করি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির যেকোনো নেতাকে ‘প্রধানমন্ত্রীর’ এত একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করতে দিতে দুই দলই রাজি হবে না। দুই দলের পোঁ ধরা বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্টরা তখন সংবিধান সংশোধনের পক্ষে নানা যুক্তি দেখাবেন। যা এখন তাঁরা বলছেন না, পাছে ‘নেত্রী’ নারাজ হন। জনাব কাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার বলছি, আমার ধারণা, দুই বড় দল ও তাদের পরিবার যত দিন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, তত দিন এ দেশে প্রকৃত গণতন্ত্র ও সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা হবে না। অতএব, আরও বহুদিন ‘এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থাই’ গণতন্ত্রের নামে আমাদের মেনে নিতে হবে।
আমাদের নাগরিক সমাজ যদি সংবিধানের এসব ধারা সম্পর্কে সোচ্চার হতো, আন্দোলন করত, তাহলে হয়তো বড় দুই দল সংবিধান সংশোধনে বাধ্য হতো। কিন্তু নাগরিক সমাজ সংঘবদ্ধ নয়। রাজনৈতিকভাবেও সচেতন নয়। নাগরিক সমাজের একটা বড় অংশ দুই দলের কৃপাপ্রার্থী। কাজেই সরকারের প্রতি মোহহীন নাগরিক সমাজ খুবই ক্ষুদ্র ও তারা সক্রিয় নয়। ফলে এই আন্দোলন কখনো দানা বাঁধেনি। এ দেশের অধিকাংশ  মিডিয়াও নানা দলের তল্পিবাহক। আবার স্বাধীন বা দলনিরপেক্ষ মিডিয়া এসব বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেনি। অথচ মূল গোলমাল কিন্তু সংবিধানের মধ্যেই নিহিত। অতীতে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে ব্যক্তি বা দলীয় স্বার্থে, দেশের স্বার্থে বা গণতন্ত্রের স্বার্থে হয়নি। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরে পৃথিবী, দেশ, সমাজ ও বাস্তবতার ব্যাপক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের সংবিধানের ব্যাপক পরিমার্জনার যে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, তা রাজনীতিক, নাগরিক সমাজ ও মিডিয়া—কেউই তেমন গুরুত্ব দিয়ে অনুভব করছে না। আমরা দেশের নানা সমস্যা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু অনেক সমস্যার মূলে যে সংবিধান, তা অনেক সময় লক্ষ করি না। ‘এককেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা’ আমাদের সমস্যা বাড়িয়েছে, কমায়নি। সংবিধানের এই দুর্বলতাগুলো নিয়ে কি আমরা সোচ্চার হব? নাকি সবকিছু সময়ের হাতে ছেড়ে দেব?
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ওউন্নয়নকর্মী।

জেনেভায় সব ছাপিয়ে সাভার ট্র্যাজেডি by সুমনা শারমীন

চার পায়ের একটা বিশাল চেয়ার, কিন্তু একটা পা ভাঙা, সেই চেয়ারের কি আর দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা থাকে? কিন্তু আছে। জেনেভার জাতিসংঘ ভবনের সামনে এক পা খোঁড়া কাঠের বিশাল চেয়ারটি ঠায় দাঁড়িয়ে স্থলমাইনের আঘাতে পঙ্গুত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে। তবে স্থাপত্য বলেই সে দাঁড়িয়ে। নয়তো সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সাভারে রানা প্লাজা ধসের পর অসহায় দরিদ্র শ্রমিকদের মতো তার অবস্থাও হতো আহত কিংবা নিহত। যদি জানতে পারতাম এই চেয়ারের আত্মকথা, তাহলে হয়তো জানা যেত রানা প্লাজা ধসে নিহত-আহতদের জন্য তার প্রতিবাদটুকু। শুধু একটি মানুষের লাশ হয়ে যাওয়া কিংবা পঙ্গু হয়ে যাওয়াই তো নয়, তার সঙ্গে জড়িত পরিবারে আরও কতগুলো মানুষের আধপেটা খেয়ে কোনোরকমে বেঁচে থাকার চেষ্টা। গেল, সেটুকুও গেল। কিছু মানুষের লোভ, অসততা, দুর্নীতি, ক্ষমতার দাপটের কারণে এই জেনেভাতে বসেই মানবাধিকার পর্যালোচনা অধিবেশনে বাংলাদেশকে তাই প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধির কাছ থেকে শুনতে হয়েছে সাভার ট্র্যাজেডি নিয়ে কথা। হ্যাঁ, তাঁরা সমবেদনা জানিয়েছেন সত্য, কিন্তু শ্রমিকের অধিকার রক্ষা, কাজের নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টির প্রশ্ন তো এসেছেই সামনে।
২৯ এপ্রিল ছিল জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে সর্বজনীন পুনর্বীক্ষণ পদ্ধতির (ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউ বা ইপিআর) আওতায় দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনা অধিবেশন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি এই অধিবেশনে যোগ দিয়ে তাঁর সরকারের গত চার বছরের শাসনামলের মানবাধিকার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন এবং গতবারের অধিবেশনে সরকার যে অঙ্গীকারগুলো করেছিল, তা বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন, এ ছাড়া দুই দফা তিনি আলোচনায় অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের প্রশ্নের উত্তর দেন। সরকার জানত, এবারের অধিবেশনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গটি আলোচনায় আসবে, তাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে জেনেভায় গেছেন ভদন্ত সত্যপ্রিয় মহাথের, জ্ঞানেন্দ্র চাকমা, রানা দাশ গুপ্ত ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম সাইফুল ইসলাম। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যের একপর্যায়ে ভদন্ত সত্যপ্রিয় মহাথেরকে কিছু বলার সুযোগও দেন। তবে বক্তব্যের শুরুতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে মন্ত্রী তাঁর সরকারের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পর এ বিষয়ে তেমন কোনো বিব্রতকর প্রশ্নের সম্মুখীন হননি। কয়েকটি দেশ মৃত্যুদণ্ড বাতিলের কথা বলে, উত্তরে মন্ত্রী জানান এটি বাংলাদেশে ‘ইউনিক’ শাস্তির বিধান নয়, বিশ্বে অনেক দেশেই রয়েছে, বাংলাদেশে এই শাস্তি কেবল সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে দেওয়া হয়। প্রতিটি দেশের জন্য বরাদ্দ সময় সোয়া এক মিনিট, সাভার ট্র্যাজেডির জন্য চলে গেছে নির্দিষ্ট সময়, বাংলাদেশকে প্রশংসাও করেছেন অনেকে মুক্তকণ্ঠে,  তবু উঠে এসেছে অনেক প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, শ্রমিকের অবস্থার উন্নতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত সময়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছে, জাপান রামুর ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, সুইজারল্যান্ড বিচারবহির্ভূত হত্যা বা সংখ্যালঘুদের রক্ষার পাশাপাশি স্বাধীন তদন্ত কমিশনের কথা বলেছে, সুইডেন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কমানোর পাশাপাশি ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড চালুর দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, নরওয়ে সাংবাদিক হামলার বিষয়টি উত্থাপন করেছে, স্লোভাকিয়া যেমন আদিবাসী এবং প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার রক্ষার কথা বলেছে, ডেনমার্ক পাবর্ত্য চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময় বেঁধে দেওয়ার কথা বলেছে...।
সকাল নয়টায় শুরু হয়ে এ অধিবেশন চলে দুপুর ১২টা পর্যন্ত। প্রতিটি দেশ সুনির্দিষ্ট সুপারিশ উপস্থাপন করে। ইতিমধ্যেই আমরা জেনে গেছি, বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ কিছুটা সময় চেয়েছে। ইপিআর মানবাধিকার রক্ষায় এমন একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে সরকার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ছাড়াও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন বা বেসরকারি সংস্থা এই প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারে। আর এই সুযোগ বেশ গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন এ দেশের মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁরা মানবাধিকার বিষয়ে নিজস্ব প্রতিবেদন শুধু জমা দেননি, বিভিন্ন বিষয়ে লবিস্ট গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং অধিবেশনের দিন উপস্থিত থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। জেনেভায় ২৯ তারিখের অধিবেশনে লক্ষ করেছি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, অনেক বিষয়ে তাঁরা সমর্থনসূচক অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেও অনেক বিষয়ে নীরব দ্বিমত পোষণ করছিলেন। বিশেষ করে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের রক্ষা, দুর্নীতি দমন কমিশনের ভূমিকা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁরা মোটেই একমত নন।
বাংলাদেশের ১৯টি মানবাধিকার ও উন্নয়ন সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হিউম্যান রাইটস ফোরামের আহ্বায়ক এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বললেন, সরকার এবার যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে এসেছিল, এটা ইতিবাচক দিক যদিও, অনেক বক্তব্যের সঙ্গে আমরা ভিন্নমত পোষণ করি। দেশে আমরা যখন কোনো একটি ঘটনায় প্রতিবাদ করি বা ভিন্নমত পোষণ করি, সব সরকারই মনে করে, আমরা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছি, যেমন গার্মেন্টস শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আমাদের বক্তব্যগুলোকে যদি মানা হতো, তাহলে আজ সত্যি সত্যি দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হতো না। তাজরীন ফ্যাশনসের  আগুন বা রানা প্লাজা ধসে গার্মেন্টস শ্রমিকদের হতাহতের ঘটনায় সারা বিশ্বের কাছে আমরা কী বার্তা পৌঁছে দিলাম? দুর্নীতি, লোভ আর নজরদারির অভাবে আমাদের দেশের দরিদ্র পোশাকশ্রমিকেরা হয় আগুনে পুড়ে মরেন, নয়তো ভবনধসে চাপা পড়েন। এতে কি আমাদের দেশের সুনাম বাড়ল? প্রায় একই ধরনের কথা বললেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম। বললেন, সরকার এবার অনেকগুলো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন করেছে, এটা ইতিবাচক দিক। যদিও সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত নই। তবে আমরা মনে করি, সমস্যার সমাধানে কী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হলো, সেটাই দেখার বিষয়।
সরকার ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও জেনেভার এই মানবাধিকার পর্যালোচনা অধিবেশনের শুরুতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি যেমন নিজে এসে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে হাত মেলান, শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, তেমনি অধিবেশনের শেষে হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের সদস্যরা গিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে অভিনন্দন জানান। বিকেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া রিসেপশন আয়োজনে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপকালে মন্ত্রীকে বেশ আত্মবিশ্বাসী লাগছিল। এক ফাঁকে আলাপ হলো তাঁর সঙ্গে। বললেন, দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির সব সমস্যার সমাধান করতে পেরেছি তা নয়, কিন্তু আমাদের চেষ্টার ত্রুটি নেই। দেশের মানবাধিকারকর্মীদের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমাদের ভিন্নমত আছে, তবে এই ইপিআর-প্রক্রিয়ায় তাঁদের অংশগ্রহণকে আমরা স্বাগত জানিয়েছি। সেদিনই খবর এল দেশে জাতীয় সংসদের স্পিকার হলেন শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্তব্য চাইলে তিনি বলেন, এটা খুবই ইতিবাচক একটি সংবাদ, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে নারী স্পিকার, আমাদের প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থার বার্তাই পৌঁছে যাবে বিশ্বের কাছে। আর হেফাজতের ১৩ দফার দাবির বিপরীতে এটাও একটা বার্তা।
অপেক্ষাকৃত কম বয়স, কম অভিজ্ঞতায় একজন স্পিকার হলেন, এই নিয়ে দলের ভেতর কথা উঠছে কি না। বললেন, কথা তো হবেই। আমার বেলায়ও কম কথা হয়েছে? তবে আমি বিশ্বাস করি, নতুন স্পিকার তাঁর কাজ দিয়ে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করবেন। ২৯ এপ্রিল মূল অধিবেশন হয়ে যাওয়ার পর ওয়ার্ল্ড বড়ুয়া অর্গানাইজেশন এবং গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্সের উদ্যোগে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিয়ে একটি সাইড ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হয়। গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস ডিফেন্সের জেনি লান্ডসট্রম সূচনা বক্তব্য দেন, সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন সুলতানা কামাল। বক্তব্য দেন শাহীন আনাম, জাকির হোসেন, সঞ্জীব দ্রং, বিধায়ক চাকমা, সাখাওয়াত হোসেন। বারবার ঘুরেফিরে আসছিল কথাগুলো—বাংলাদেশটা সবার জন্মভূমি, তবে কেন আমরা কিছু লোকের মনের মধ্যে ‘সংখ্যালঘু’ অনুভূতি প্রবেশ করিয়ে দিই? আর তাদের বারবার ভাবতে হয়, এ দেশ ছেড়ে কেন আমরা যাব? এই অধিবেশনের শেষে বক্তব্য দেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান।
জেনেভা থেকে যেদিন ফিরে আসি, একই বিমানে ফিরলেন ভদন্ত সত্যপ্রিয় মহাথের। একা চলতে কষ্ট, সঙ্গে একজন শিষ্য। ইস্তাম্বুলে সাত ঘণ্টার যাত্রাবিরতি, এই সুযোগে তাঁর সঙ্গে কথা হলো। ৮৬ বছরের চিরকুমার মানুষটি সারা জীবন অহিংসবাদে বিশ্বাসী, পুড়েছে বিহার, পুড়েছে হূদয়, তার পরও এতটা পথ উড়ে সরকারের কথায় এসে শান্তির বাণী শোনালেন! ক্ষীণ কণ্ঠে বললেন, সরকার ছাড়া কে আমাদের রক্ষা করবে? সরকারের উচ্চপর্যায়ে আন্তরিকতা আছে, বিহার আবার তৈরি হবে। সেনাবাহিনী আমাদের পাহারা দিয়ে রাখে। যদিও আমাদের অন্তরের ক্ষত শুকাতে অনেক সময় লাগবে। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এই সেদিন আমার জন্মবার্ষিকীতে এলাকার সকল ধর্মের মানুষ হাতে হাত রেখে আনন্দ করেছে, অথচ সেই এলাকাতেই আমি, আমরা আক্রান্ত? আমরা এ দেশ ছেড়ে কেন যাব? কোথায় যাব? এটা আমার মাতৃভূমি, পিতৃভূমি, জন্মভূমি...।

বিধ্বস্ত রানা প্লাজার জমিতে বিপণিবিতান!

বিধ্বস্ত রানা প্লাজার বর্তমান পরিত্যক্ত জমিতে একটি নতুন বহুতল বিপণিবিতান নির্মাণ করে সেখানে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারকে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। প্রস্তাবটি দিয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। খবরটি ঢাকার একটি বাংলা দৈনিকের। খবরে প্রকাশ, বিজিএমইএর নতুন পরিচালনা পরিষদ রেওয়াজ অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে দেখা করতে গিয়ে এ প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ভবনধসে নিহত শ্রমিকদের পরিবারগুলোকে মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা আয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছেন। এসব পরিবারের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর এই সহমর্মিতা সর্বতোভাবে সমর্থনযোগ্য। তবে কিছু প্রশ্ন থেকে যায় বিজিএমইএর আলোচিত প্রস্তাব এবং এ-জাতীয় ঘটনায় তাদের ভূমিকা নিয়ে। কেননা, তারা রানা প্লাজার জমির কিংবা এখানে যে পোশাক কারখানাগুলো ছিল, সেগুলোর মালিক নন। এই ভবনমালিকের জমির পুরো মালিকানাও প্রশ্নবিদ্ধ বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু বেআইনি দখলকৃত জমিও এর মধ্যে রয়েছে বলে পত্রপত্রিকা থেকে জানা যায়। তবে সেটা হলেও অন্য কেউ সেই অংশের মালিক হবেন আইনি প্রক্রিয়ায়। আর তা সরকার এভাবে ব্যবহার করতে চাইলে অধিগ্রহণ করতে হবে। দিতে হবে বহু টাকা ক্ষতিপূরণ।
উল্লেখ্য, গত ২৪ এপ্রিল সাভারে রানা প্লাজা নামের একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ে। এযাবৎ পোশাকশিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে ওই ধসের ফলে। এমনকি এখনতক অন্য সব পোশাকশিল্পের দুর্ঘটনায় যত লোকের প্রাণহানি হয়েছে, তার প্রায় তিন গুণ বেশি প্রাণহানি এখানে হয়েছে। আহত ব্যক্তিদের অনেকেই জীবনের মতো পঙ্গু হয়ে যাবেন। আগের দিন ভবনটিতে ফাটল ধরলে বন্ধ করে দেওয়া হয় ওই ভবনে অবস্থিত ব্র্যাক ব্যাংকের কার্যক্রম। নিচের দোকানগুলোও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বন্ধ হয়নি পোশাক কারখানাগুলো। কোনো বিপদের ঝুঁকি নেই বলে ঘটনার দিন কারখানাগুলোর মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ডেকে এনে কাজে লাগায়। এ ঘটনার মর্মান্তিক দৃশ্যাবলি গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হওয়ায় বিস্তারিত আলোচনার অপেক্ষা রাখে না। ভবনটির মালিক সাভার যুবলীগের নেতা সোহেল রানা। তিনি অনুমোদিত নকশার বাইরে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করেছেন ভবন নির্মাণসংক্রান্ত নিয়মকানুন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। নিম্নমানের মালামালও ব্যবহূত হয়েছে ভবন নির্মাণে—এমন অভিযোগও রয়েছে। এর ওপরের তলাগুলো ভাড়া দিয়েছেন পোশাক কারখানাগুলোকে। সেখানে ছিল ভারী যন্ত্রপাতি ও বৈদ্যুতিক জেনারেটর। আর শ্রমঘন শিল্প বলে একত্রে কাজ করতে হয় বহুসংখ্যক শ্রমিককে। তদুপরি এই বহুতল ভবনের ভিতও যথাযথ মানের ছিল না বলে জানা যায়। ফলে যা হওয়ার তা-ই হয়েছে। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যম প্রকৃত চিত্র ও ঘটনা তুলে ধরেছে। ঘটনায় শঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ দেশের সাধারণ মানুষ। জানা যাচ্ছে, ততোধিক ক্ষুব্ধ রপ্তানিমুখী শিল্পটির প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর শ্রমিক ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সেখানকার আমদানিকারকেরাও চাপের মুখে। যেখানে শ্রমিকের নিরাপত্তার মান এই পর্যায়ে, সেখান থেকে তারা তৈরি পোশাক কিনতে এখন সংকোচ বোধ করছে। এ ধরনের ঘটনা অতীতেও ঘটেছে। কিন্তু কোনো দায় নির্ধারণ করে কাউকে দণ্ডিত করা হয়নি। তাই সংশ্লিষ্ট সবাই এই বিচারহীনতার সুযোগটা নিচ্ছে।

ঘটনার কয়েক দিন পর বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর এক যৌথ সাধারণ সভা হয়। সেখানে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করাসহ ক্ষেত্রমতে তাদের সদস্যপদ বাতিলের সিদ্ধান্তও হয় বলে জানা গেছে। তবে সভা শেষে তাদের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, আলোচিত ঘটনায় দায় প্রথমে ভবনমালিক ও প্রকৌশলীর। তৃতীয় পর্যায়ে সেই দায় পোশাক কারখানার মালিকদের ওপর বর্তায়। আলোচ্য ঘটনাটি অতিরঞ্জিতভাবে প্রচার করে গণমাধ্যম বিদেশে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলেও সেই মুখপাত্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। 
এরপর আসে পোশাক কারখানার মালিকদের দায়দায়িত্বের অবস্থান নিয়ে। রানা প্লাজার মালিক ও নির্মাণ প্রকৌশলী নিম্নমানের ইমারত তৈরি করে ব্যাপক প্রাণহানির কারণ ঘটিয়েছেন, এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এ ধরনের নিম্নমানের ভবনে জেনে বা না জেনে পোশাক কারখানা স্থাপন ও ঝুঁকি দেখা দেওয়ার পরও সেগুলো পরিচালনা করে এর মালিকেরা কি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একই কাতারে আসবেন না? তদুপরি শ্রম আইনে কারখানা চলাকালে শ্রমিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব মালিকের। এ ক্ষেত্রে তাঁদের কীভাবে ঘটনার জন্য কম দায়ী বলে তাঁদের সংগঠন দাবি করতে পারে? আর বিদেশে আমাদের পোশাকশিল্পের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারের খোরাক জোগান এ মালিকেরাই; গণমাধ্যম নয়। অবশ্য এসব কলকারখানার অনুমোদন ও তদারকির দায়িত্বে যেসব সরকারি সংস্থা রয়েছে, তার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরও যথেষ্ট দায় রয়েছে।
তথ্যমতে, আমাদের তৈরি পোশাক কারখানার সংখ্যা হাজার পাঁচেক। এর একটি বিরাট অংশ কমপ্লায়েন্ট বা মান প্রতিপালনকারী। কমসংখ্যক কারখানাই নন-কমপ্লায়েন্ট। আর সময়ে সময়ে তাদের অতি লোভের বলি হতে হয় দরিদ্র শ্রমিককে। কখনো আগুনে পুড়ে অঙ্গার। আর কখনো ধ্বংসস্তূপের নিচে পড়ে বিকৃত হয়ে লাশও অচিহ্নিত থাকে। দাফন হন বেওয়ারিশ হিসেবে। খয়রাতি সাহায্যের মতো কিছু ক্ষতিপূরণ পান বটে। তবে তা দরিদ্র পরিবারগুলোর দারিদ্র্য মোচনে ভূমিকাই রাখে না। আবার সেই ক্ষতিপূরণও কারও কারও ওয়ারিশদের ভাগ্যে জোটে না। এ-জাতীয় দুর্ঘটনার পর সরকারের বিভিন্ন সংস্থা উদ্ধারকাজে অংশ নেয়। সহায়তায় এগিয়ে আসেন স্বেচ্ছাসেবকেরা। রানা প্লাজার ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব ও ধ্বংসের ব্যাপকতায় উদ্ধার অভিযান সময় নিয়েছে।
এখন প্রশ্ন, হতাহত ব্যক্তিদের যৌক্তিক পরিমাণে ক্ষতিপূরণের টাকা দেবে কে? প্রধানমন্ত্রীর অনুভূতি এখানে মর্যাদার দাবি রাখে। রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে এর ব্যবস্থা করা হলেও এটা ভালো কাজে ব্যয় বলেই করদাতা জনগণ মনে করবে। তবে ভবনমালিক ও সংশ্লিষ্ট পোশাক কারখানার মালিকদের এর একটি বড় অংশের শরিকদার হওয়া উচিত। পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন ভবনমালিকের জায়গাটি দেখিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু তারা কী করবে, সে ব্যাপারে এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ লক্ষণীয় হচ্ছে না। এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হলে জমি অধিগ্রহণ এবং পরবর্তী নির্মাণকাজে প্রচুর টাকা লাগবে। হয়তো তারা ছিটেফোঁটা কিছু দিয়ে শৈবালের মতো শির উঁচু করে এক ফোঁটা শিশির দেওয়ার কথা দিঘিকে মনে রাখতে বলবে।
পোশাকশিল্পের মালিকেরা একটি সফল খাতের উদ্যোক্তা শ্রেণী হিসেবে সমাজে পরিচিত। তাঁদের প্রচেষ্টায় আজ প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক এ খাতে সরাসরি কাজ করছেন। আর তাঁদের সিংহভাগই নারী। তাই কর্মসংস্থান ও নারীর ক্ষমতায়নে উদ্যোক্তা শ্রেণীর প্রচেষ্টাকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গেই দেখি। তবে এ সাফল্যের পেছনে মূল অবদান রাখছেন শ্রমিকেরাই। তাই তাঁদের প্রতি মালিকেরা সংবেদনশীল হবেন, এটা আশা করা অন্যায্য নয়। এটাও উল্লেখ করা সমীচীন যে তৈরি পোশাকশিল্প পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোতে আমাদের পরিচিত করতে ভূমিকা রেখেছে। এই শিল্প অন্যান্য অনেক খাতে প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রেখেছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে পোশাকশিল্পের মালিকদের একটি অংশকে আমরা শ্রমিকদের প্রতি সংবেদনশীল হতে দেখি না। নন-কমপ্লায়েন্ট কারখানাগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত কমপ্লায়েন্ট করাতে না পারলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিজিএমইএ সুপারিশ করতে পারে। জানা যায়, ভোটের রাজনীতি এসব প্রতিষ্ঠানকেই প্রভাবিত করছে। তাই কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে কার্যত সংঘবদ্ধভাবে তারা পোশাকশিল্পের মালিকের পক্ষাবলম্বন করে। আজতক এ-জাতীয় ঘটনায় কারও শাস্তি ভোগ করতে হয়নি। শ্রমিকদের বেতনাদি ও স্বার্থের প্রতি তাঁরা আরেকটু সহানুভূতিশীল হতে পারেন। শ্রমিকদের ইউনিয়ন করার সুযোগ দিতে তাঁদের অনীহা সর্বজনবিদিত। অথচ আইএলও কনভেনশন সেই অধিকার শ্রমিকদের দিয়েছে। আর বাংলাদেশ সেই কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্র। কিন্তু তা করার পরিবেশই ঘটতে দেন না কারখানার মালিকেরা। দায়িত্বশীল শ্রমিক ইউনিয়ন কিন্তু প্রতিষ্ঠানের কল্যাণেই ব্যবহূত হয়। চা-শিল্পে দীর্ঘকাল শ্রমিক ইউনিয়ন সক্রিয় থাকলেও বিরল ব্যতিক্রম ছাড়া তেমন সমস্যা হয়নি। এটা ঠিক, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। নিজেদের সুযোগ-সুবিধাদি নিয়ে দর-কষাকষির চেয়ে ব্যবস্থাপনার দিকেই শ্রমিকনেতারা ঝুঁকে পড়েন। তাঁরা কাজ না করেই বেতন-ভাতাদি নেন। প্রভাব বিস্তার করেন কর্মকর্তাদের পদোন্নতি বদলি ও পদায়নে। কিন্তু একতরফাভাবে এগুলো দেখলে চলবে না। সাম্প্রতিক কালে হল-মার্কসহ ব্যাংক খাতের বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলোর একটিতেও কোনো শ্রমিকনেতা প্রভাব বিস্তার করেছিলেন—এমন অভিযোগ নেই। যেসব ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে অনুসন্ধানে দেখা যাবে ব্যবস্থাপনার মেরুদণ্ডহীন ও দুর্নীতিপরায়ণ একটি চক্র শ্রমিক ইউনিয়নকে কাজে লাগায়।
পোশাক কারখানার মালিকদের এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পর দ্রুত বড় ধরনের সহায়তা কার্যক্রম নেওয়া আবশ্যক। অন্যের জমি দেখিয়ে আর নিজেদের ভূমিকা অব্যক্ত রেখে তাঁরা সংবেদনশীলতার পরিচয় দিতে সক্ষম হননি। শ্রমিকদের পুনর্বাসনের জন্য যদি ভবনমালিকের জমি নেওয়া হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পোশাকশিল্পের মালিকদের কাছ থেকেও সমপরিমাণ জমি বা এর মূল্য আদায় করা যৌক্তিক হবে। কেননা, এখানে তাঁদের অপরাধ কিছুমাত্র কম নয়। পোশাক কারখানার মালিকদের উপলব্ধির সময় এসেছে, কিছু মালিকের অপকর্ম তাঁদের সব অর্জন ব্যর্থ করে দেওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। ক্রেতা দেশগুলোর দায়িত্বশীল মহল এসব কারখানার শ্রমিকদের ‘শ্রমদাস’ বলে আখ্যায়িত করা আমাদের কারও জন্য গৌরবের বিষয় নয়। আমরা আন্তরিকভাবে এই শিল্পের কোনো ক্ষতি চাই না, বরং চাই এর আরও বিকাশ ও সমৃদ্ধি।
আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।
majumder234@yahoo.com

নগরে অনাগরিক বাস্তবতা

দ্বিখণ্ডিত সিটি করপোরেশন অখণ্ড সিটি করপোরেশনের অদক্ষতার উত্তরাধিকারই বহন করছে। সিটি করপোরেশনের যেসব সেবা দেওয়ার কথা, নাগরিক জীবনের এ রকম হাজারো সমস্যা নিয়ে সিটি করপোরেশন অতীতে যেমন চলছিল তেমনই চলছে। বলা হয়েছিল, সিটি করপোরেশনকে উত্তর-দক্ষিণে বিভক্ত করা হলে সেবা-সুবিধা বাড়বে। কার্যত কি তা বেড়েছে? বছরের পর বছর রাজধানী ঢাকার নাগরিক-সুবিধার বেলায় কোনো অগ্রগতি নেই। রাজধানীতে একটি বেসরকারি সংস্থা পরিচালিত গবেষণা বলছে, এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জনগণ মনে করে যে নাগরিক সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না সিটি করপোরেশন। গবেষণায় দুর্নীতিকেই করপোরেশনের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। শহর যেভাবে বাড়ছে, সেই হারে সিটি করপোরেশনের প্রকল্প উদ্যোগ ও সেবা-তৎপরতা বাড়ছে না। নগরবাসীর দাবি হচ্ছে গতিশীলতা। অথচ ঢাকা প্রায় স্থবির এক নগর। প্রাপ্তির মধ্যে আছে কেবল উড়ালসড়ক। রাজধানীর যোগাযোগব্যবস্থা গতিশীল করতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি দূরদর্শী পরিকল্পনা। যোগাযোগ অবকাঠামো থেকে শুরু করে গণপরিবহনের ক্ষেত্রে ঢাকা এখনো মান্ধাতার আমলেই পড়ে আছে। অন্যদিকে উন্নয়ন-সংস্কার ইত্যাদি যা প্রধান সড়কেই বেশি হয়, অলিগলির অবস্থা তথৈবচ। বহু এলাকার রাস্তা প্রশস্ত করা দরকার, বহু এলাকার পানি ও পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি। মনোযোগ দেওয়া উচিত নিরাপদ আবাসন, যোগাযোগ ও পানিনিষ্কাশনের দিকে। বর্ষাকাল আসছে, অথচ এই সময়টাই শহরের রাস্তাজুড়ে দেখা যায় খোঁড়াখুঁড়ি। এর পেছনে দুর্নীতি ও উদাসীনতা ছাড়া আর কী কারণ আছে?
রাজধানীতে অজস্র পার্ক ও খেলার মাঠ বেদখল বা পরিত্যক্ত হয়ে আছে। নগরকর্তাদের মনে রাখা উচিত, এই শহর শিশু-কিশোরদেরও এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের উপযুক্ত পরিবেশ এখানে নেই। সিটি করপোরেশনকে অভিজাত এলাকার বাইরে তাকাতে হবে, সেখানকার পার্ক ও মাঠগুলোকে সংস্কার করে সবুজের সমারোহ আনতে হবে। পুরাতন বিমানবন্দর এলাকাকে নগর চত্বর করার প্রস্তাব নাগরিক মহলে রয়েছে। এ ব্যাপারেও তৎপর হতে হবে। একুশ শতকে নাগরিক জীবন মানে গতির স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্য। তিনটিরই বড় অভাব ঢাকা শহরে। নগরকর্তারা কি দৈনন্দিন কাজ ছাপিয়ে উঠে একুশ শতকের উপযোগী নগর নিয়ে চিন্তা করবেন?

বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ান

দেশের উপকূলজুড়ে যখন ঘূর্ণিঝড় মহাসেন আঘাত হানার জন্য এগিয়ে আসছে এবং উপকূলবাসী গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে, তখন সরকার ও বিরোধী দলের ‘যুদ্ধ প্রস্তুতি’ আমাদের বিচলিত না করে পারে না। সমাবেশ করার অনুমতি না পেয়ে প্রথমে বিরোধী দল আগামী রোববার দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করে। পরে ঘূর্ণিঝড়ের কথা বিবেচনা করে সাত ঘণ্টা পর হরতাল প্রত্যাহার করে নেয়।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্তে বিরোধী দলের সমাবেশ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, যেমন প্রশ্ন আছে সরকারি দলের সভা-সমাবেশ নিয়েও। তাই বলে বিরোধী দলকে সমাবেশ করতে না দেওয়ার কোনো যুক্তি নেই। তদুপরি গতকাল বিএনপির অন্যতম যুগ্ম মহাসচিব বরকতউল্লা বুলুকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সরকারের এসব পদক্ষেপ আলোচনার পরিবেশকেই নষ্ট করবে না, রাজনৈতিক সংঘাতও বাড়িয়ে দেবে।
সাভারে মানবসৃষ্ট দুর্যোগে সহস্রাধিক মানুষের জীবনহানির পর দক্ষিণ উপকূলে যখন ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানছে, তখন সরকার ও বিরোধী দলের পাল্টাপাল্টি অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। সব ধরনের রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে গিয়ে এ মুহূর্তে সবারই উচিত দক্ষিণাঞ্চলের বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানো। এখন জনগণের  দুর্ভোগ সৃষ্টি করে এমন রাজনৈতিক কর্মসূচি কাম্য নয়, তেমনি সরকারকেও সর্বোচ্চ ধৈর্য ও সহিষ্ণু আচরণ করতে হবে। এখন রাজনৈতিক ঝগড়াঝাঁটির সময় নয়, বিপন্ন মানুষগুলোকে উদ্ধারেই সর্বশক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন।
কী কারণে বিরোধী দলকে সমাবেশ করার অনুমতি দেওয়া হয়নি, সরকার তার ব্যাখ্যা দেয়নি। সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে,  ৫ মে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর এ ধরনের সমাবেশে নাশকতার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু নীতিনির্ধারকদের জানা থাকার কথা, বিরোধী দলকে সমাবেশ করার অনুমতি দিলেই নাশকতার আশঙ্কা কম থাকে এবং অনুমতি না দিলেই বরং সেই আশঙ্কা বেড়ে যায়। সমাবেশের অনুমতির পর অঘটন ঘটলে সংশ্লিষ্ট দল বা জোটকে দায়ী করা যায়। কিন্তু অনুমতি না দেওয়া হলে অঘটনের দায় সরকারের ওপরই বেশি পড়ে। দুই পক্ষই যখন নির্বাচনকালীন সরকারকাঠামো নিয়ে আলোচনার ব্যাপারে আশাবাদী, তখন সরকারের এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া ঠিক নয়, যাতে সেই সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়।
এই মুহূর্তে দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবর্তী মানুষগুলো যাতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারে, সে জন্য প্রশাসনসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে স্বেচ্ছাসেবকেরা বিপন্ন মানুষকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করেছেন। রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদেরও উচিত, তাঁদের এই উদ্যোগে সহায়তার হাত প্রসারিত করা।
যাঁরা জনগণের জন্য রাজনীতি করে বলে দাবি করেন, তাঁরা জনগণের এই দুর্যোগের সময় হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে পারেন না। বিরোধী দল সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদ নিশ্চয়ই করবে। কিন্তু এই মুহূর্তে তার চেয়েও জরুরি হলো উপকূলের দুর্গত মানুষগুলোকে বাঁচানো।

সংক্ষিপ্ত বিশ্বসংবাদ

শ্রমিক ধর্মঘট
দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাস্টেনবার্গে অবস্থিত লোনমিন প্লাটিনাম খনির হাজার হাজার শ্রমিক গতকাল বুধবার ধর্মঘট করেছেন। সেখানে পরস্পরবিরোধী শ্রমিক সংগঠনের মধ্যে সহিংসতার আশঙ্কা করা হচ্ছে। ১৩টি খনিতে গত মঙ্গলবার থেকে কাজ বন্ধ রয়েছে। শ্রমিক সংগঠন এএমসিইউর একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে গুলি করে হত্যার ঘটনার পর থেকে লোনমিনে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য অপর একটি শ্রমিক সংগঠন এনইউএম দায়ী বলে দাবি করছে এএমসিইউ। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ওই দুটি সংগঠনের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এএফপি।
প্রাথমিক প্রতিবেদন
ইন্দোনেশিয়ায় গত ১৩ এপ্রিলের উড়োজাহাজ (বোয়িং ৭৩৭-৮০০) দুর্ঘটনা নিয়ে দেশটির জাতীয় পরিবহন নিরাপত্তা কমিটি (এনটিএসসি) প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে ওই দুর্ঘটনার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ না করে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট লায়ন এয়ারের পাইলটরা নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। দুর্ঘটনাকবলিত বিমানটির দায়িত্বরত পাইলট ৯০০ ফুট উঁচু থেকে রানওয়ে ঠিকমতো দেখতে পাননি। বিরূপ আবহাওয়ায় আশপাশের সবকিছু আকস্মিক অদৃশ্য হয়ে পড়েছিল। বিমানটির অবতরণ থামানোর চেষ্টা করা হলেও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। পরে সেটি সাগরে অবতরণ করলেও আরোহীদের সবাই রক্ষা পেয়ে যান। রয়টার্স।
মালির জন্য সহায়তা
পশ্চিম আফ্রিকার যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ মালিকে ৫২ কোটি ইউরো সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। দেশটির পুনর্গঠনে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে ব্রাসেলসে আয়োজিত আন্তর্জাতিক দাতাদের সম্মেলনে সংস্থাটি এ প্রতিশ্রুতি দেবে বলে জানা গেছে। গতকাল বুধবার এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সম্মেলন সামনে রেখে ইউরোপীয় কমিশনের (ইসি) প্রেসিডেন্ট হোসে ম্যানুয়েল বারোসো ওই প্রতিশ্রুতির কথা জানিয়ে বলেন, এ অর্থ পশ্চিম আফ্রিকার দেশটিকে ‘স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধশালী’ হতে সহায়তা করবে। মালির উত্তরাঞ্চল থেকে আল-কায়েদার সঙ্গে যুক্ত যোদ্ধাদের উত্খাতে গত জানুয়ারিতে দেশটিতে ফ্রান্স সেনা পাঠায়। তারপর এই সম্মেলন হচ্ছে। দেশকে বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে দাতাদের কাছ থেকে ৪৩০ কোটি ইউরো সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে মালি সরকারের।

কয়েদিদের হামলায় গুরুতর আহত এক আসামি

নয়াদিল্লিতে গত ডিসেম্বরে চলন্ত বাসে মেডিকেলের ছাত্রীকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার এক ব্যক্তি কারাগারে অন্য কয়েদিদের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন বলে তাঁর আইনজীবী অভিযোগ করেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ওই ব্যক্তির নাম বিনয় শর্মা (২০)। আইনজীবী এ পি সিং গতকাল বুধবার জানান, তাঁর মক্কেল বিনয় শর্মার রক্তবমি শুরু হওয়ার পর তাঁকে গত মঙ্গলবার নয়াদিল্লির লোক নায়েক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি বলেন, ‘বিনয় রক্তবমি করছেন। তাঁর প্রচণ্ড জ্বর। তা ছাড়া বুকের ব্যথায়ও ভুগছেন তিনি। তাঁর অবস্থা সত্যিই খুব খারাপ।’ মেডিকেলের ছাত্রীকে গণধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে এক কিশোরসহ  ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এদের মধ্যে রাম সিং নামের এক আসামি গত মার্চে কারাগারে আত্মহত্যা করেন। বাকি পাঁচজনের বিচার চলছে। কিশোর বাদে চারজনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন সাজা হতে পারে। কিশোরের বিচার চলছে কিশোর আদালতে। তার লঘু শাস্তি হতে পারে। নয়াদিল্লির এ ঘটনায় তখন ভারতজুড়ে নারী নির্যাতনবিরোধী বিক্ষোভ ও আন্দোলন হয়।

ফিলিপাইন থেকে শ্রমিক নেবে না তাইওয়ান

জেলে হত্যার ঘটনার জের ধরে তাইওয়ান ফিলিপাইন থেকে শ্রমিক নেওয়া স্থগিত করেছে। একই সঙ্গে ম্যানিলা থেকে নিজেদের দূতকেও প্রত্যাহার করে নিয়েছে তারা। এর আগে ম্যানিলার দুঃখ প্রকাশের পদক্ষেপও নাকচ করা হয়। গত সপ্তাহে হুং শিহ-চেং (৬৫) নামের তাইওয়ানের ওই জেলেকে গুলি করে হত্যা করে ফিলিপাইনের কোস্টগার্ড। সে সময় তারা বলেছিল, ফিলিপাইনের জলসীমা লঙ্ঘন করায় ওই জেলেকে গুলি করা হয়। ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট বেনিগনো অ্যাকুইনো গতকাল বুধবার দুঃখ প্রকাশ করে তাইওয়ানকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট মা ইং-জিউ আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনাসহ ওই জেলের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য ম্যানিলার প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন। আর ওই ঘটনার প্রতিশোধ নিতে ফিলিপাইন থেকে শ্রমিক নেওয়া স্থগিত করেছে তাইওয়ান। সেই সঙ্গে তাইওয়ানের দাবি গতকালের মধ্যে পূরণ করার জন্য সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। অন্যথায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন প্রেসিডেন্ট মা ইং-জিউর একজন মুখপাত্র।

পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধের সুপারিশ

নিরাপত্তাজনিত কারণে জাপানের পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত একটি পরীক্ষামূলক পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধের সুপারিশ করেছে দেশটির আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (এনআরএ)। কেন্দ্রটি ভূমিকম্পের জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থিত বলে বিশেষজ্ঞরা এই অভিমত দিয়েছেন। কর্তৃপক্ষের সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে পারমাণবিক কেন্দ্রটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কর্মকর্তারা জানান, আরও পাঁচটি পারমাণবিক কেন্দ্র পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। সেগুলোতেও ত্রুটি ধরা পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমানে জাপানের ৫০টি পারমাণবিক চুল্লিই বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এ পর্যন্ত দুটি চুল্লি আবার চালু করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। জাপানের আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষকে পরামর্শদানকারী ভূকম্পবিদদের একটি প্যানেল তাদের মূল্যায়নে বলেছে, পশ্চিম উপকূলে অবস্থিত তিসুরুগা পারমাণবিক কেন্দ্রে ডি-১ নামের একটি ত্রুটি পাওয়া গেছে। এ কারণে কেন্দ্রটি চালু করা হলে তা হবে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। প্যানেলের প্রধান কুনিহিকো শিমাজাকি বলেন, ‘সৌভাগ্য যে সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা প্রাথমিক পদক্ষেপ নিচ্ছি।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংগঠন বন্ধের হুমকি রাশিয়ায়

রাশিয়ায় বড় একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন গোলোসের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে সরকার। সংগঠনটি সরকারের নির্দেশনামতো ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে নাম নিবন্ধনের নির্দেশ সম্প্রতি প্রত্যাখ্যান করেছে। রুশ বিচারমন্ত্রী আলেক্সান্দর কোনোভালোভ গতকাল বুধবার বলেন, সরকার গোলোসকে বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্যে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। রাশিয়ার সর্বশেষ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভ্লাদিমির পুতিনের জয়ে অনিয়মের অভিযোগ এনে তীব্র সমালোচনা করেছিল গোলোস।  বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত ও ‘রাজনৈতিকভাবে সক্রিয়’ বেসরকারি সংগঠনগুলোকে (এনজিও) ‘বিদেশি এজেন্ট’ হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার বিধান করে রাশিয়ায় সম্প্রতি নতুন একটি আইন হয়েছে। ওই নির্দেশ অমান্য করায় গোলোসকে গত মাসে ১৩ হাজার মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ অর্থ জরিমানা করা হয়।গোলোসের প্রধান লিলিয়া শিবানোভা বলেন, কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হলে তাঁরা নতুন একটি সংগঠন চালুর জন্য লড়াই শুরু করবেন। রাশিয়ায় পুতিনবিরোধী আন্দোলনকারীদের দমনে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তবে গোলোস বন্ধ করে দেওয়া হলে সেটিই হবে এ ব্যাপারে সবচেয়ে কঠোর পদক্ষেপ। নিবন্ধনসংক্রান্ত নতুন আইন অনুযায়ী, বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত সংস্থাগুলোকে প্রকাশ্যে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহারেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গোলোসই প্রথম ওই আইন অমান্য করেছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অস্ট্রিয়া ও তুরস্কে বৈঠক

ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গতকাল বুধবার অস্ট্রিয়া ও তুরস্কে পৃথক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে এসব আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় পর্যবেক্ষকদের প্রবেশ এবং পারমাণবিক কর্মসূচিসংক্রান্ত নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানীদের সঙ্গে পর্যবেক্ষকদের কথা বলার অনুমতি দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। এদিকে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে গতকাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান ক্যাথরিন অ্যাস্টন ও ইরানের প্রধান আলোচক সাইদ জলিলির মধ্যে আলোচনা হয়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে গত মাসে কাজাখস্তানে ছয় জাতির সঙ্গে তেহরানের ব্যর্থ আলোচনার পর অ্যাস্টন-সাইদ গতকাল আবারও আলোচনায় বসলেন।পশ্চিমা বিশ্বসহ অনেকেই ইরানকে এ কর্মসূচি ত্যাগ করার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু ইরান দাবি করছে, শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহারের জন্যই তারা এ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। কর্মসূচি বন্ধ করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই। আইএইএ অভিযোগ করেছে, ২০০৩ সাল থেকে ইরানের বিজ্ঞানীরা আণবিক বোমা তৈরির জন্য গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। এ-সংক্রান্ত ‘বিশ্বাসযোগ্য’ তথ্য-প্রমাণ তাঁদের কাছে রয়েছে। তবে ইরান বলছে, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) ও ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের মতো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার ভুল প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইএইএ তেহরানের বিরুদ্ধে আণবিক অস্ত্র তৈরির অভিযোগ করছে। ইরান আণবিক বোমা তৈরি করছে বলে আইএইএ ২০১১ সালে ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর ইরানের ওই বিতর্কিত কর্মসূচি নিয়ে নয় দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো আলোচনায় ফল বের করে আনা সম্ভব হয়নি। অস্ট্রিয়ায় আলোচনা শুরুর আগে আইএইএর প্রধান পরিদর্শক হারম্যান ন্যাকার্টস সাংবাদিকদের বলেন, ‘অনেক বিষয়ে মতের অমিল আছে। কিন্তু আমরা আলোচনার প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। এ সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’ হারম্যান ন্যাকার্টস বলেন, ‘মতের অমিল কমিয়ে আনার ব্যাপারে আমরা কঠোর পরিশ্রম করব।’ এ আলোচনায় ইরানের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আলী আজগর সুলতানি। বৈঠক শুরুর আগে তিনি এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের বিশ্লেষক মার্ক ফিটজপ্যাট্রিক বলেন, এটা স্পষ্ট যে এ আলোচনায় কোনো ফল আসবে না। ইরানের পক্ষ থেকে সমঝোতায় না এলে কোনো ফল সম্ভব নয়। আর ইরানের আসন্ন নির্বাচনের আগে তেহরান তার অবস্থান পরিবর্তন করবে বলে মনে হয় না। তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আব্বাস আরাকচি বলেন, নির্বাচন কোনো বাধা নয়। দুই বৈঠকে কিছু অগ্রগতি হবে বলে তারা আশাবাদী।

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সরাতে বেগ পাচ্ছে মিয়ানমার

ঘূর্ণিঝড় মহাসেনের হাত থেকে বাঁচাতে হাজার হাজার মানুষকে উপকূল এলাকা থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে মিয়ানমার সরকার। কিন্তু রাখাইনের রোহিঙ্গা মুসলিমদের সরাতে গিয়ে বেগ পেতে হচ্ছে তাদের। অজানা আশঙ্কায় রোহিঙ্গারা অন্যত্র যেতে রাজি হচ্ছে না। মহাসেনের কারণে শ্রীলঙ্কায় ইতিমধ্যে সাতজনের প্রাণহানি ঘটেছে এবং প্রায় চার হাজার লোক ঘরছাড়া হয়েছে। গত মঙ্গলবার দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ এই তথ্য জানায়। ঘূর্ণিঝড়টি ধীরে ধীরে বঙ্গোপসাগরের উত্তর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। কাল শুক্রবার সকালে এটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানতে পারে। মিয়ানমার সরকার ৩৮ হাজার মুসলিম রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে মঙ্গলবারের মধ্যে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু রোহিঙ্গাদের অনেকেই রাখাইন রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র যেতে রাজি হয়নি। তাদের আশঙ্কা, কর্তৃপক্ষ এই সুযোগে অন্য উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারে। তারা বলছে, ফের উদ্বাস্তু হওয়ার চেয়ে তারা বরং ঝড়ের কবলে পড়ে মরতে রাজি। গত বছর জাতিগত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পর রোহিঙ্গারা দেশটির নিম্নাঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘ বলেছে, মহাসেন ঘূর্ণিঝড়টি দুর্বল হয়ে পড়েছে। কিন্তু এরপরও বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৮২ লাখ মানুষ ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

জীবন রক্ষা করতেই সাংবাদিকের ফোন রেকর্ড জব্দ

নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থেই বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসের (এপি) সাংবাদিকদের ফোনকলের রেকর্ড জব্দ করা হয়েছিল বলে দাবি করেছে মার্কিন প্রশাসন। সম্প্রতি সাংবাদিকদের ফোন রেকর্ড জব্দ করার বিষয়টি ফাঁস হলে ব্যাপক সমালোচনা হয়। এই সমালোচনার জবাবে গত মঙ্গলবার মুখ খোলে মার্কিন প্রশাসন। অ্যাটর্নি জেনারেল এরিক হোল্ডার জানান, মার্কিন সংবাদ সংস্থা এপির সাংবাদিকদের ফোন রেকর্ড গোপনে জব্দ করা হয়েছিল। নিরাপত্তাব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ার কারণে কিছুসংখ্যক মার্কিন নাগরিকের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে কি না, তা তদন্তের জন্যই এটা করা হয়। হোল্ডার বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুতর না হলেও এটা একটা বিশাল ফাঁস হওয়ার ঘটনা। তবে এটা অতিরঞ্জিত কিছু নয়। মার্কিন জনগণের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিল। আর এজন্য কে দায়ী, সেটা বের করতে খুব আক্রমণাত্মক কিছু করাই দরকার ছিল।’ মার্কিন বিচার বিভাগের নির্দেশে দুই মাস এপির সাংবাদিকদের ফোন রেকর্ড জব্দ করা হয়। বিচার বিভাগের এমন নির্দেশের কারণে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ার পর এরিক হোল্ডার এসব কথা বললেন।

রেকর্ড দামে বিক্রি রিখটারের চিত্রকর্ম

খ্যাতিমান জার্মান চিত্রশিল্পী গেরহার্ড রিখটারের একটি তেলচিত্র গত মঙ্গলবার নিউইয়র্কে রেকর্ড দামে বিক্রি হয়েছে। নিলামকারী প্রতিষ্ঠান সাদাবি’স চিত্রকর্মটির নিলাম করে। সাদাবি’সের কর্মকর্তা টোবিয়াস মেয়ার বলেন, ডোমপ্লাজ, মেইল্যান্ড বা ‘মিলানের ক্যাথেড্রাল স্কয়ার’ নামের ১৯৬৮ সালের ওই চিত্রকর্ম দুই কোটি ৪৪ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছে। গেরহার্ড রিখটারকে (৮১) বোদ্ধাদের অনেকে বিশ্বের জীবিত শ্রেষ্ঠ শিল্পী বলে মনে করেন। সাদাবি’স ‘মিলানের ক্যাথেড্রাল স্কয়ার’ চিত্রকর্মটিকে ‘বিংশ শতকের শিল্পকলার একটি অনন্য নমুনা’ এবং গেরহার্ডের গত শতকের ষাটের দশকের ‘ফটো পেইন্টিং’ রীতির প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ছবিটিতে ঝাপসা একটি আলোকচিত্রের কায়দায় একটি নগরের দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। কোনো জীবিত শিল্পীর চিত্রকর্ম নিলামে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হওয়ার আগের রেকর্ডটিও গেরহার্ডের। ‘অ্যাবসট্রাক্টস বিল্ড’ নামে তাঁর একটি বিমূর্ত শিল্পকর্ম নিলামে দুই কোটি ১৩ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়। ১৫ বছর আগে লন্ডনের সাদাবি’সে ‘মিলানের ক্যাথেড্রাল স্কয়ার’ চিত্রকর্মটির দাম উঠেছিল ২৩ লাখ পাউন্ড, যা ছিল তখনকার রেকর্ড। সেই দামের ১০ গুণেরও বেশি দামে বিক্রি হলো চিত্রকর্মটি। ওয়াইন উত্পাদনের জন্য বিখ্যাত যুক্তরাষ্ট্রের নাপা ভ্যালির ব্রায়ান্ট ভিনইয়ার্ডের প্রতিষ্ঠাতা ডন ব্রায়ান্ট এখন চিত্রকর্মটির নতুন মালিক। সাদাবি’সের মঙ্গলবারের নিলামে প্রয়াত চিত্রশিল্পী বারনেট নিউম্যানের ১৯৫৩ সালের ‘ওয়ানমেন্ট সিক্স’ নামের একটি বিমূর্ত এক্সপ্রেশনিস্ট চিত্রকর্ম দুই কোটি ৮৭ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হয়েছে। নিউম্যানের শিল্পকর্মের জন্য এটা দামের নতুন রেকর্ড। এ ছাড়া ফ্রান্সিস বেকনের একটি চিত্রকর্ম নিলামে দুই কোটি ৬২ লাখ পাউন্ডে বিক্রি হবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে চিত্রকর্মটি এদিন ক্রেতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়।

মহাসেন নাম নিয়ে মহাবিতর্ক

বঙ্গোপসাগরের উপকূলের দিকে ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় মহাসেন নিয়ে যখন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে চলছে আতঙ্ক আর উত্কণ্ঠা, তখন ঝড়ের নাম নিয়ে শ্রীলঙ্কায় শুরু হয়েছে মহাবিতর্ক।২৭৫ থেকে ৩০১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সিংহল দ্বীপ (বর্তমান শ্রীলঙ্কা) শাসন করা বৌদ্ধ রাজা মহাসেনের নামে এই ঝড়ের নামকরণ করায় এই বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ্বিশেষ করে সিংহলি জাতীয়তাবাদী সংগঠন ও বৌদ্ধ সংগঠনগুলো সম্ভাব্য বিধ্বংসী একটি ঝড়ের নাম তাদের ‘মহান’ রাজার নামে রাখাকে অপমানজনক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।বৌদ্ধ সংগঠনগুলো অভিযোগ করেছে, রাজা মহাসেনের নামে ঝড়ের নাম রাখা একটি ‘অন্যায় ও বোকামিপূর্ণ সিদ্ধান্ত’। তারা মহাসেন রাজাকে সমৃদ্ধ শ্রীলঙ্কা গড়ার কারিগর হিসেবে উল্লেখ করেছে। বিতর্ক উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় শ্রীলঙ্কার আবহাওয়া বিভাগ এ ব্যাপারে বৌদ্ধ সংগঠনগুলোর কাছে ক্ষমা পর্যন্ত চেয়েছে। দেশটির গণমাধ্যম ও আবহাওয়া বিভাগ এখন নাম উল্লেখ না করে একে একটি মারাত্মক ঝড় হিসেবে উল্লেখ করছে। শ্রীলঙ্কার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী মহীন্দ্র আমারাওয়ারা ইতিমধ্যে মহাসেনের নামে ঝড়ের নামকরণ করার প্রস্তাব কে করেছেন সে ব্যাপারে খোঁজখবর নিচ্ছেন বলে সে দেশের গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন। মূলত বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউইউএমও) আওতায় এসকেপ নামের আবহাওয়াবিদদের একটি কমিটি বিশ্বের বড় ঝড়গুলোর নাম দিয়ে থাকে। তারা এ পর্যন্ত বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হতে পারে এমন ঝড়গুলোর আগাম নাম প্রস্তাব করে রেখেছে। ষ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অবলম্বনে ইফতেখার মাহমুদ

সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের পক্ষে বিলাওয়াল ভুট্টো

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি ‘পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখার স্বার্থে’সুষ্ঠুভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের ওপর জোর দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি ভোট কারচুপির অভিযোগ যথাযথভাবে তদন্ত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।সিন্ধু প্রদেশ থেকে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত পিপিপির নেতাদের উদ্দেশে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে দেওয়া ভাষণে বিলাওয়াল এ আহ্বান জানান। তাঁর ভাষণ শুনতে গত মঙ্গলবার রাতে করাচির বিলাওয়াল হাউসে মিলিত হন পিপিপির নেতারা।বিলাওয়াল কোথায় অবস্থান করে ভিডিও লিংকে ভাষণ দেন, তা তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। নির্বাচনের কিছু আগে থেকে বিলাওয়াল ‘আল-কায়েদার হুমকির কারণে’ জনসমক্ষে আসা বন্ধ করেন।  অনেকের ধারণা, তিনি দুবাইয়ে।বিলাওয়াল তাঁর ভিডিও ভাষণে বলেন, ভোট জালিয়াতির কারণে পিপিপি পরাজিত হয়েছে। তবে গণতন্ত্রের সুস্থ বিকাশের স্বার্থে তাঁরা নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছেন।  তাঁরা যথাযথভাবে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করবেন। প্রাদেশিক সরকারের তত্পরতা: এদিকে, ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সরকার গঠনের একটি রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামি (জেআই) ও কওমি ওয়াতান পার্টি (কিউডব্লিউ পি)। রূপরেখা অনুযায়ী এ দুটি দলের প্রত্যেকে তিনটি করে মন্ত্রণালয় পাবেন। মুখ্যমন্ত্রী ও স্পিকার পিটিআই থেকে নির্বাচিত হবেন। পিটিআইয়ের খাইবার পাখতুনখাওয়ার সাধারণ সম্পাদক শওকত ইউসুফজাই ওই রূপরেখার বিষয়ে তাঁর দল সম্মত হয়েছে বলে স্বীকার করেছেন। অন্যদিকে, পিএমএল-এন বেলুচিস্তানে সরকার গঠনের ব্যাপারে অন্যান্য দল ও স্বতন্ত্র এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ করা শুরু করেছে।

আলোচকদের তালিকা দিয়েছেন সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার

বাশার আল-আসাদ
রাশিয়ার প্রস্তাবিত শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ তাঁর পক্ষের আলোচকদের একটি তালিকা রাশিয়ার কাছে হস্তান্তর করেছেন। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এ কথা জানিয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি। হোয়াইট হাউসে গত সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের বৈঠকে রাশিয়ার প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনা নিয়ে আলোচনা হয়। এর পর প্রেসিডেন্ট বাশারের পক্ষের আলোচকদের তালিকা হস্তান্তরের খবরকে বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।Untitled-9জন কেরি আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার সুযোগ হাতছাড়া না করতে প্রেসিডেন্ট বাশারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কেরি ও লাভরভ গত মঙ্গলবার রাতে চলতি সপ্তাহে দ্বিতীয়বারের মতো এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। গত সপ্তাহে তাঁরা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোয় এক সংবাদ সম্মেলন করে সিরিয়ায় রক্তপাত বন্ধের পথ বের করতে এই শান্তি সম্মেলনেরঘোষণা দেন।এই শান্তি সম্মেলনের অনেক কিছুই এখনো ঠিক হয়নি। মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র প্যাট্রিক ভেন্ট্রেল বলেন, সম্মেলন কোথায়, কখন অনুষ্ঠিত হবে এবং কারা এতে যোগ দেবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তবে বিভিন্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, আগামী মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এই বৈঠক হতে পারে।মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি গত মঙ্গলবার সিরীয় বিদ্রোহীদের সামরিক শাখা ফ্রি সিরিয়ান আর্মির (এফএসএ) জেনারেল সেলিম ইদ্রিসের সঙ্গে কথা বলেছেন। জেনারেল সেলিম তাঁকে জানিয়েছেন, আলোচনার প্রক্রিয়ার প্রতি তাঁরা অঙ্গীকারবদ্ধ।পুতিন-নেতানিয়াহু বৈঠক: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গত মঙ্গলবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাত্ করেছেন। নেতানিয়াহু এ সময় প্রেসিডেন্ট বাশারকে অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে রাশিয়াকে সতর্ক করে দেন। দুই নেতার আলোচনার বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানা যায়নি। দুই নেতার আলোচনায় বাশারকে অস্ত্র সরবরাহের প্রসঙ্গটি ওঠার কথা নিশ্চিত করেন প্রেসিডেন্ট পুতিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ। তিনি জানান, এ সময় প্রেসিডেন্ট পুতিন অস্ত্র সরবরাহের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। দুই নেতার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশে আলোচনা হয় বলে উল্লেখ করেন পেসকভ। সিরিয়ায় সংঘাতের শুরু থেকেই প্রেসিডেন্ট বাশারকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে পুরোনো মিত্র রাশিয়া। সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চে প্রেসিডেন্ট বাশারবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা সশস্ত্র বিদ্রোহে রূপ নেয়। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৯৪ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। গত মার্চ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালিয়েছে অন্তত ১২ লাখ মানুষ।