Wednesday, May 4, 2011

হোঁচট খেল শেয়ারবাজার

পুঁজিবাজারবিষয়ক তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের পর গতকাল সোমবার প্রথম লেনদেন দিবসেই হোঁচট খেল দেশের দুই শেয়ারবাজার।
প্রতিবেদন প্রকাশ এবং এ সম্পর্কে সরকারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া গেলে বাজার স্থিতিশীল হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু দিনের শুরুতে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও দিন শেষে উভয় স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্যসূচক বেশ খানিকটা কমেছে। কমেছে লেনদেনের পরিমাণও।
বাজার-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ করায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হলেও অনেক বড় বড় বিনিয়োগকারী এখনো বাজার থেকে দূরে রয়েছেন। কিছু কিছু বিষয়ে সরকার অধিকতর তদন্তের ঘোষণা দেওয়ায় বড় বিনিয়োগকারীদের অনেকেই সক্রিয় হচ্ছেন না। বাজারের নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে এটিও একটি কারণ বলে মনে করেন তাঁরা।
এর বাইরে মুদ্রাবাজারের তারল্য-সংকটকেও দায়ী করছেন কেউ কেউ। তাঁদের মতে, কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংক বেশ তারল্য-সংকটে রয়েছে। এসব ব্যাংকের অনেকগুলোই আবার নিয়মের বাইরে গিয়ে পুঁজিবাজারে বেশি অর্থ বিনিয়োগ করেছিল। এর বড় অংশ গ্রাহকদের ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ বাজারে ধস নামায় যেগুলো সমন্বয় করা সম্ভব হয়নি।
আবার সম্প্রতি নিজেদের তহবিলে টান পড়ায় কয়েকটি ব্যাংক মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউস গ্রাহকদের শেয়ার চাপ দিয়ে (ফোর্সড সেল) বিক্রি করেছে।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ নিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহসানুল ইসলাম তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, শেয়ারবাজার কারসাজির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় একটি বিতর্কের অবসান ঘটল। গোটা তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশের ইতিহাস অনেক কম, যা রীতিমতো একটি সাহসী পদক্ষেপও।
আহসানুল ইসলাম প্রতিবেদনের সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেন। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী আরও অধিকতর তদন্তেরও দাবি জানান তিনি।
বিও হিসাবধারীদের করদাতা শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) বাধ্যতামূলক করা প্রসঙ্গে আহসানুল ইসলাম বলেন, ব্যাংক হিসাবের মতো বিও হিসাবও একই ধরনের হওয়া উচিত।
বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, গতকাল ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্য দিয়ে দিনের লেনদেন শুরু হয়। শুরুতে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ২৩ পয়েন্ট বেড়ে যায়। কিন্তু এর কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার তা ৪০ পয়েন্টের মতো কমে। এরপর সারা দিনে সূচক একাধিকবার ওঠানামা করে। তবে দিনের লেনদেন শেষে ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ৫৯ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ৯৯১ পয়েন্টে নেমে আসে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ২২৮ পয়েন্ট কমে ১৬ হাজার ৭১৩ পয়েন্টে দাঁড়ায়। স্টক এক্সচেঞ্জটিতে এদিন ১৮৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ৩৯টির, কমেছে ১৪৩টির ও অপরিবর্তিত ছিল সাতটি প্রতিষ্ঠানের দাম। সিএসইতে গতকাল ৭১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা আগের দিনের চেয়ে দুই কোটি টাকা কম।

এসইসির নির্দেশ উপেক্ষা করল ডিএসই

এমআই সিমেন্ট ফ্যাক্টরি লিমিটেডকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)। বরং প্রাথমিক গণপ্রস্তাবে মাধ্যমে যেসব বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি। অথচ ডিএসইর সভাপতি শাকিল রিজভীর উপস্থিতিতে এক বৈঠকে কোম্পানিটিকে বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার শর্তে তালিকাভুক্তির নির্দেশ দিয়েছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি।
জানা গেছে, ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদ গতকাল এসইসির সেই নির্দেশকে উপেক্ষা করে কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্তি না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়।
ডিএসইর জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আহসানুল ইসলাম বলেন, বাজারের বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে তাঁদের টাকা দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে এসইসির কাছে আবেদন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোম্পানিটিকে যে শর্তে তালিকাভুক্তি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তার নজির বিশ্বের কোথাও আছে কি না, জানা নেই। এ ছাড়া বিনিয়োগকারীদের ক্ষতিপূরণ বাবদ যে শেয়ার ডিএসইর কাছে জামানত রাখার কথা বলা হয়েছে, প্রয়োজনের সময় তা বিক্রি করতে সমস্যায় পড়তে হবে। এসব সমস্যার কথা বিবেচনা করে কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্ত না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএসই।
তবে এসইসি সূত্রে জানা গেছে, এসইসির নির্দেশ উপেক্ষা করে কোম্পানিটির তালিকাভুক্তি আটকানোর কোনো এখতিয়ার স্টক এক্সচেঞ্জের নেই। তা ছাড়া ডিএসইর সভাপতির উপস্থিতিতেই কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
এদিকে বাজার সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, এমআই সিমেন্টর কোনো প্লেসমেন্টর শেয়ার ছিল না। তাই ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের অনেকেই এ কোম্পানির তালিকাভুক্তির ব্যাপারে শুরু থেকেই নাখোশ ছিলেন।
তাঁদের মতে, প্লেসমেন্ট না পেয়েই তারা এখন কোম্পানিটিকে তালিকাভুক্তি দিচ্ছে না।
গত ২০ জানুয়ারি কোম্পানিটির শেয়ার অতিমূল্যায়িত উল্লেখ করে সরকার তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া স্থগিত করে। পরে সরকারের নির্দেশে শর্তসাপেক্ষে তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেয় এসইসি।
এদিকে সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে কোম্পানির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের কোম্পানির শেয়ারের দাম কোনোভাবেই অতিমূল্যায়িত নয়। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী কোম্পানির শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাত ১৬-এর নিচে, সিমেন্ট খাতের খাতের তালিকাভুক্ত যেকোনো কোম্পানির চেয়ে কম।

আজ বেশির ভাগ শেয়ারের দাম কমেছে

দেশের পুঁজিবাজারে আজ দরপতন হয়েছে। আজ দুই স্টক এক্সচেঞ্জেই তালিকাভুক্ত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানের দাম কমেছে। এর ফলে কমেছে সাধারণ সূচক। একই সঙ্গে আর্থিক লেনদেনও কমেছে। এ নিয়ে গত তিন কর্মদিবসে নিম্নমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেল দুই স্টক এক্সচেঞ্জে।
ডিএসই সূত্রে জানা যায়, নিম্নমুখী প্রবণতার মধ্য দিয়ে আজ ডিএসইতে লেনদেন শুরু হয়। শুরুতেই ডিএসইর সাধারণ মূল্য সূচক ১৮ পয়েন্ট নেমে যায়। তবে বেলা সোয়া ১১টার দিকে সূচক ১৪ পয়েন্ট বাড়লেও এর পর থেকে সূচক নিম্নমুখী হতে থাকে। দিন শেষে দেখা যায়, ডিএসইর সাধারণ মূল্যসূচক ১২৫.৬৭ পয়েন্ট কমে ৫৮৬৫.৭০ পয়েন্টে দাঁড়ায়। আজ ডিএসইতে লেনদেন হওয়া ২৪৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেড়েছে ৩০টির, কমেছে ২০৭টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১১টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম। স্টক এক্সচেঞ্জটিতে আজ ৪৫৩ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা গতকালের চেয়ে ৫৬ কোটি টাকা কম।
এদিকে খাত অনুযায়ী বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আজ প্রায় সব খাতেরই দরপতন হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের ৩০টির মধ্যে ২৭টি প্রতিষ্ঠানের দাম কমেছে। এ ছাড়া সিমেন্ট খাতের পাঁচটির মধ্যে চারটির, সিরামিক খাতের পাঁচটির মধ্যে চারটির, প্রকৌশল খাতের ২৩টির মধ্যে ২০টির, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের ২১টির মধ্যে ১৯টির, খাদ্য ও সেবা খাতের ১৫টির মধ্যে ১২টির, বিমা খাতের ৪৪টির মধ্যে ৩৭টির, বিবিধ খাতের নয়টির মধ্যে ছয়টির, ওষুধ খাতের ২১টির মধ্যে ১৭টির, টেলিযোগাযোগ খাতের একমাত্র প্রতিষ্ঠান জিপির ও বস্ত্র খাতের ২৫টির মধ্যে ২০টির দরপতন হয়।
ডিএসইতে আজ লেনদেনে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে বেক্সটেক্স, ইউসিবিএল, বেক্সিমকো, বিএসআরএম স্টিল, আফতাব অটো, আরএন স্পিনিং, মালেক স্পিনিং, এনবিএল, তিতাস গ্যাস ও ইউনাইটেড এয়ার।
অন্যদিকে, আজ চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক ৩১০.৩০ পয়েন্ট কমে ১৬৪০২.৯০ পয়েন্টে দাঁড়ায়। সিএসইতে লেনদেন হওয়া ১৮২টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেড়েছে ১৩টির, কমেছে ১৬৩টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ছয়টি প্রতিষ্ঠানের দাম। আজ স্টক এক্সচেঞ্জটিতে ৫৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে, যা গতকালের চেয়ে আগের দিনের চেয়ে ১৭ কোটি টাকা কম।
সিএসইতে আজ লেনদেনে শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে ইউসিবিএল, বেক্সটেক্স, ইউনাইটেড এয়ার, এনবিএল, আফতাব অটো, আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক, বেক্সিমকো, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক ও এবি ব্যাংক।

আজ চতুর্থ দফার ভোট গ্রহণ

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে আজ মঙ্গলবার চতুর্থ দফায় ভোট নেওয়া হবে। চার জেলার ৬৩টি আসনে এ ভোট নেওয়া হবে। জেলা চারটি হলো হাওড়া, হুগলি, পূর্ব মেদিনীপুর ও বর্ধমান। বর্ধমানের ২৪টি আসনের মধ্যে আজ ভোট নেওয়া হবে ১২টিতে। মোট ২৯৪টি আসনের এ নির্বাচনে ছয় দফায় ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত ১৮ এপ্রিল ভোট গ্রহণ শুরু হয়। এরই মধ্যে তিন দফা নির্বাচনে ১৭৯টি আসনের ভোট গ্রহণ শেষ হয়েছে। ৭ মে বাকি ৫২টি আসনে ভোট নেওয়া হবে।
আজকের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন ৩৬৬ জন প্রার্থী। তাঁদের মধ্যে নারী প্রার্থী ৩৯ জন। বামফ্রন্ট, কংগ্রেস-তৃণমূল জোট ও বিজেপি সব কটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। এ আসনগুলোর মোট ভোটার এক কোটি ২৬ লাখ ১১ হাজার ১৭৩ জন।
আজ ভাগ্য নির্ধারিত হবে রাজ্যের সাতজন মন্ত্রীর। তাঁরা হলেন শিল্পমন্ত্রী নিরুপম সেন, উচ্চশিক্ষামন্ত্রী সুদর্শন রায় চৌধুরী, কৃষিমন্ত্রী নরেন দে, অগ্নিনির্বাপণমন্ত্রী প্রতীম চট্টোপাধ্যায়, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণমন্ত্রী মোহান্ত চট্টোপাধ্যায়, কারিগরি শিক্ষামন্ত্রী চক্রধর মাইকাপ এবং তথ্য ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী সৌমেন্দ্রনাথ বেরা।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ-পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনাই বড় চ্যালেঞ্জ

দেরিতে হলেও পুঁজিবাজারসংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদন সরকার প্রকাশ করেছে এবং তদন্ত কমিটির অনেক সুপারিশ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়ন, কিছু বিষয়ে অধিকতর তদন্ত ও এসইসি পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুরুতে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা নিয়ে সরকারের দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সময়ক্ষেপণ ও কাটছাঁট করে প্রতিবেদন প্রকাশ করার ঘোষণা জনমনে অসন্তোষের জন্ম দিয়েছিল। সরকার আগের অবস্থান থেকে সরে এসে হুবহু তদন্ত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে সুবিবেচনার পরিচয় দিয়েছে। তবে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
শেয়ারবাজারে ধস নামা ও বিপর্যয়ের জন্য তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের দায়ী করা হয়েছে, সেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সরকার যদি সত্যিই দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে, তবে বিনিয়োগকারীরা অন্তত এই স্বস্তি পাবেন যে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের অপকর্ম করে পার পাবেন না। তদন্ত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে হোক অথবা অধিকতর তদন্তের মাধ্যমেই হোক, সরকারকে কাজটি করতে হবে।
তবে পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজটি হচ্ছে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার (এসইসি) পুনর্গঠন। তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করে অর্থমন্ত্রী গত শনিবার এসইসি পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা মনে করি, চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পরিবর্তনের পাশাপাশি সামগ্রিকভাবেই এসইসিকে পুনর্গঠন করা উচিত। প্রথমত, এসইসির চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগে যাতে কোনো ধরনের দলীয় বিবেচনা কাজ না করে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। যোগ্যতা ও দক্ষতাই হতে হবে এর মাপকাঠি।
দ্বিতীয়ত, এসইসির সামগ্রিক পুনর্গঠনের জন্য ঊর্ধ্বতন নির্বাহীদের পরিবর্তন ও রদবদলের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঊর্ধ্বতন কয়েকজন নির্বাহীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠে এসেছে। এর বাইরেও কয়েকজনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ বিভিন্নভাবে প্রকাশিত হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের সরিয়ে ঊর্ধ্বতন নির্বাহী পদে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, এসইসিকে একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিণত করতে হলে এর লোকবল বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই এবং সেই লোকবল হতে হবে যোগ্য ও দক্ষ। এসইসির কাজকর্মের ওপর বাইরে থেকে হস্তক্ষেপের পথ বন্ধ করতে হবে। এই উদ্যোগগুলো নেওয়া গেলে পুঁজিবাজারে আস্থা ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে।
এ ছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা ও ব্যবসা পরিচালনার বিষয়টি পৃথক করা, পুঁজিবাজারের কর্মকাণ্ডে সামগ্রিকভাবে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বর্তমান আইনকানুনগুলো পর্যালোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে সরকার পুঁজিবাজার বিষয়ে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নিতে পারে। এ ধরনের একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা গেলে পুঁজিবাজার বিষয়ে সরকারের অবস্থানটি পরিষ্কার থাকবে। আমরা আশা করব, সরকার যেসব উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, তা আন্তরিকতার সঙ্গে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।

গ্রাউন্ড জিরোতে উল্লাস

সেদিনও ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের চারপাশে সমবেত হয়েছিল হাজারও মানুষ। তাদের চোখে ছিল কান্না, চাহনিতে ছিল আতঙ্ক। রাজ্যের ভীতি যেন চেপে ধরেছিল গোটা আমেরিকাকে। ১০ বছর পর আজ আবারও সেখানে হাজারও মানুষের সমাগম। জায়গাটির নাম বদলে হয়েছে গ্রাউন্ড জিরো। জনতার আচরণেও এসেছে পরিবর্তন। আজ তারা হাসছে, উল্লাসে মেতেছে। মহানন্দে আলিঙ্গন করছে একে-অপরকে।
উপলক্ষ আর কিছুই নয়। ২০০১ সালে যে কারণে মার্কিনরা কেঁদেছিল, আজ তার ঠিক বিপরীত কারণেই তারা বিজয়ানন্দে মেতেছে। সেদিন আল-কায়েদার সন্ত্রাসী হামলায় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল নিউইয়র্ক। আজ সেই আল-কায়েদারই প্রধান নেতা ওসামা বিন লাদেন ধরাশায়ী। মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে মৃত্যু হলো তাঁর।
রোববার সন্ধ্যা থেকেই নানা সূত্রে লাদেন নিহত হওয়ার খবরটি আসতে থাকে। বিষয়টি অনেকে বিশ্বাস করলেও কেউ কেউ তখনো ছিল সংশয়ে। তবে মধ্যরাতের আগে আগে হোয়াইট হাউস থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দেওয়া ভাষণের পরই লাদেনের নিহত হওয়ার খবরটি সবার কাছে হয়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্য।
ওবামার ভাষণের পরই উল্লাসে মেতে ওঠে মার্কিনরা। রাস্তায় ঢল নামে মানুষের। নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন—সর্বত্র ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে মার্কিনরা। জাতির প্রধান শত্রুর মৃত্যুতে বাঁধভাঙা উল্লাসে মেতে ওঠে তারা। চারিদিকে স্লোগান ওঠে, ‘জয় হোক আমেরিকা’, ‘জয় হোক ওবামা’। অনেকে এই বলে স্লোগান দিচ্ছিল, ‘ওসামাকে খুঁজে পেলেন ওবামা’।
কেবল স্লোগানই নয়, জাতীয় সংগীত গেয়েও লাদেনের মৃত্যু উদ্যাপন করে মার্কিনরা। অনেকে সারা রাত রাস্তায় গাড়ির হর্ন বাজিয়ে লাদেনের মৃত্যু উদ্যাপন করে।
তবে লাদেনের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি উল্লাস হয়েছে গ্রাউন্ড জিরোতে। পতাকা হাতে হাজারও মানুষের সমাগম ঘটে সেখানে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা রাজনীতিবিদ পর্যন্ত শামিল হন এই বিজয়োল্লাসে। সেখানে উপস্থিত নিউইয়র্ক পুলিশের প্রধান রেমন্ড কেলি তাঁর প্রতিক্রিয়ায় লাদেনের মৃত্যুকে ‘অভিনন্দনের মাইলফলক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।

লাদেনের মৃত্যুতে বাড়তে পারে সহিংসতা

ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুতে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হবে বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। বরং প্রতিশোধমূলক হামলার কারণে সহিংসতা আরও বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
উপজাতীয়-বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রহিমউল্লাহ ইউসুফজাই বলেন, লাদেন নিহত হওয়ার ঘটনায় আল-কায়েদার সহযোগী সংগঠনের সদস্যদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এই ক্ষতি তারা কিছু না বলে ছেড়ে দেবে বলে মনে হয় না। বরং আত্মঘাতী হামলার মতো ঘটনা ঘটিয়ে তারা তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে।
২০০১ সালের ৯/১১ হামলার ঘটনার পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ডাক দেন। এতে মিত্র হিসেবে পাকিস্তান সরকার সহযোগিতা করে আসছে। ২০০৭ সালের জুলাই থেকে দেশটিতে চার হাজার ২৪০ জনেরও বেশি লোক বোমা হামলায় নিহত হয়েছে। এসব হামলায় আল-কায়েদা ও তাদের দোসররা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। ২০০৪ সাল থেকে জঙ্গিদের হামলায় দুই হাজার ৭৯৫ জনেরও বেশি পাকিস্তানি সেনা নিহত হন। আহত হন আট হাজার ৬৭১ জন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্বজুড়ে জিহাদি আন্দোলনে বিন লাদেন পথপ্রদর্শকের ভূমিকা পালন করতেন। আল-কায়েদার দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা আয়মান আল-জাওয়াহিরি সংগঠনটির বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মকাণ্ডের মূল নেতা। মার্কিন পর্যবেক্ষক দল ইন্টেল সেন্টারের বেন ভেঞ্জকি হুঁশিয়ার করেছেন, এ ঘটনায় কেবল আগামী কয়েক দিন নয়, কয়েক মাস বা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিশোধমূলক হামলা চলতে পারে। বিশেষ করে, ছোটখাটো সন্ত্রাসী দলগুলো এ ধরনের হামলা বেশি চালাতে পারে।
ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুতে গতকাল সোমবার থেকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদসহ স্পর্শকাতর স্থানগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

প্রমাণিত হলো পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি: পি চিদাম্বরম

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পি চিদাম্বরম বলেছেন, ইসলামাবাদের কাছে আল-কায়েদার প্রধান ওসামা বিন লাদেনের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আবার প্রমাণিত হলো, পাকিস্তান সন্ত্রাসীদের ‘ঘাঁটি’।
গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে চিদাম্বরম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, যেখানে অভিযান চালিয়ে লাদেনকে হত্যা করা হয়েছে, অ্যাবেটোবাদ নামের সেই স্থানটি ইসলামাবাদের অদূরে অবস্থিত। আমরা ওবামার বক্তব্যের এই দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি।’
চিদাম্বরম বলেন, এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন সংগঠনে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানে তাঁদের গোপন আস্তানা তৈরি করেছে।
চিদাম্বরম বলেন, ‘আমাদের ধারণা, ২০০৮ সালে মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলার হোতা পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গিদের পাকিস্তানই আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে।’ ওই ঘটনায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে শনাক্ত করা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে তিনি ইসলামাবাদের প্রতি আহ্বান জানান।

লাদেনের উত্তরসূরি হচ্ছেন জাওয়াহিরি?

আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন নিহত হওয়ার পর তাঁর উত্তরসূরি হতে পারেন সংগঠনটির দ্বিতীয় শীর্ষস্থানীয় নেতা আইমান আল-জাওয়াহিরি। তবে আল-কায়েদা এখনো এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জাওয়াহিরি বিন লাদেনের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন। আবার অনেক বিশ্লেষক তাঁকে আল-কায়েদার মস্তিষ্ক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। এ ছাড়া তাঁকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
টুইন টাওয়ারে ওই হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে অভিযান শুরুর পর থেকে লাদেন পলাতক ছিলেন। এরপর সংগঠনের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধের আহ্বান জানিয়ে জওয়াহিরি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করে আসছেন। ফলে তিনি সংগঠনের পরিচিত মুখ হিসেবে আবির্ভূত হন।
২০০৮ সালে জওয়াহিরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গৃহপালিত নিগ্রো’ বলে অভিহিত করেন। ওবামাকে শেতাঙ্গদের অনুগত কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস হিসেবে বোঝানোর জন্য তিনি ওই অবমাননাকর শব্দ ব্যবহার করেন। এ ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
জাওয়াহিরি ১৯৫১ সালে মিসরের কায়রোতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একজন চিকিৎসক ও শল্যবিদ। ১৯৭৪ সালে মিসরের সবচেয়ে স্বনামধন্য মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিৎসায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন জাওয়াহিরি। শল্যচিকিৎসায় তাঁর স্নাতক ডিগ্রিও রয়েছে। অধ্যয়ন শেষ হওয়ার পর তিনি মুসলিম ব্রাদারহুডের রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৮১ সালে মিসরের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত হত্যায় অংশ নেওয়া এক জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে তিনি ঘনিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা করেন। ওই সময় তিনি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন। এরপর অবৈধ অস্ত্র রাখার দায়ে তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগার থেকে বের হয়ে তিনি সৌদি আরব চলে আসেন। পরে তিনি পাকিস্তান ও আফগান সীমান্তে মিসরের ইসলামিক জিহাদ গ্রুপের একটি অংশ প্রতিষ্ঠা করেন।
আশির দশকের মাঝামাঝিতে জাওয়াহিরি ও বিন লাদেন আফগানিস্তানে সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধের সমর্থনে পাকিস্তানের পেশওয়ারে মিলিত হন। ১৯৯৩ সালে জাওয়াহিরি মিসরের উগ্র ইসলামপন্থী সংগঠন জিহাদের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসীর তালিকার দুই নম্বরে জাওয়াহিরির নাম রয়েছে। এতে বিন লাদেনের নাম ছিল এক নম্বরে। জওয়াহিরি আফগান-পাকিস্তান সীমান্তের দুর্গম এলাকায় আত্মগোপন করে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ন্যাটোর হামলায় গাদ্দাফির ছেলে ও তিন নাতি-নাতনি নিহত

লিবিয়ায় ন্যাটোর বিমান হামলায় দেশটির নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির এক ছেলে ও তিন নাতি-নাতনি নিহত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, গাদ্দাফিকে হত্যা করার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে ওই হামলা চালানো হয়। তবে তিনি অক্ষত আছেন।
ন্যাটোর হামলায় গাদ্দাফির ছেলে নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর বিক্ষোভকারীরা লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে ইতালির দূতাবাস এবং ইতালি ও ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে আগুন ধরিয়ে দেয়। তবে হামলার সময় ভবনগুলোতে কেউ ছিল না।
লিবিয়া সরকারের মুখপাত্র মুসা ইব্রাহিম গত রোববার বলেন, পূর্ণ শক্তি নিয়ে গাদ্দাফির বাড়িতে হামলা চালিয়েছে ন্যাটো। তিনি বলেন, হামলায় সাইফ আল-আরব (২৯) ও গাদ্দাফির তিন নাতি-নাতনি নিহত হয়েছে।
ইব্রাহিম বলেন, হামলার সময় গাদ্দাফি ও তাঁর স্ত্রী ওই ভবনে ছিলেন। তবে তাঁরা অক্ষত রয়েছেন। তিনি বলেন, ওই হামলা ছিল দেশের নেতাকে হত্যার জন্য একটি সরাসরি অভিযান। লিবিয়া সরকারের এই মুখপাত্র জানান, নিহত শিশুদের মধ্যে দুটি মেয়ে ও একটি ছেলেশিশু রয়েছে। একটি মেয়েশিশুর বয়স দুই ও অন্যটির চার মাস। ছেলেশিশুটির বয়স দুই বছর।
ইব্রাহিম বলেন, গাদ্দাফি ভালো আছেন; তিনি কোনো আঘাত পাননি। তাঁর স্ত্রীও ভালো আছেন; তিনিও কোনো আঘাত পাননি। তবে অন্য লোকজন আহত হয়েছে।
সরকারের এই মুখপাত্র বলেন, তাঁদের কাছে মনে হচ্ছে গাদ্দাফির অবস্থান-সম্পর্কিত তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘তারা জানত, গাদ্দাফি এখানে আছেন অথবা তারা কোনো কারণে গাদ্দাফিকে সেখানে আশা করেছিল।’
উল্লেখ্য, ১৯৮৬ সালে মার্কিন বিমান হামলায় গাদ্দাফির পালিত মেয়ে প্রাণ হারিয়েছিলেন।
এদিকে ত্রিপোলিতে নিজ নিজ মিশনে হামলার খবর নিশ্চিত করেছে রোম ও লন্ডন। হামলার জবাবে ব্রিটেনে লিবিয়ার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ বলেন, ‘আমি ত্রিপোলিতে ব্রিটিশ দূতাবাসসহ অন্যান্য দেশের কূটনৈতিক মিশনে হামলার নিন্দা করছি।’
হেগ আরও বলেন, ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী গাদ্দাফির সরকারকে ত্রিপোলিতে কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। তা করতে ব্যর্থ হয়ে গাদ্দাফির সরকার আবারও নিজেদের আন্তর্জাতিক দায়দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে।
ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী দূতাবাসে হামলার নিন্দা করেছেন।
ফেব্রুয়ারিতে সংঘাত শুরু হওয়ার সময় ব্রিটেনের দূতকে দেশে ডেকে পাঠানো হয়। আর মার্চে ত্রিপোলিতে দূতাবাস বন্ধ করে দেয় ইতালি।
জাতিসংঘ কার্যালয়ে হামলার পর ত্রিপোলি থেকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক সব কর্মীকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ন্যাটোর বিমান হামলায় গাদ্দাফির ছেলে নিহত হওয়ার পর বিক্ষোভকারীরা জাতিসংঘের ভবন ও কয়েকটি বিদেশি দূতাবাসে হামলা চালায়।
জাতিসংঘ বলেছে, তাদের সব বিদেশি কর্মী তিউনিসিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেছে।
গত রোববার গাদ্দাফি বাহিনী মিসরাতা বন্দরে ভারী গোলা বর্ষণ করেছে। লিবিয়ার সরকারি টেলিভিশনে বলা হয়, বিদ্রোহীদের জন্য অস্ত্র খালাস বন্ধ করতে ওই হামলা চালানো হয়েছে। তবে বিদ্রোহীরা বলেছে, হামলার সময় বন্দরে একটি জাহাজ থেকে ত্রাণসামগ্রী খালাস করা হচ্ছিল। এএফপি ও বিবিসি।
গাদ্দাফিকেও বরণ করতে হবে লাদেনের ভাগ্য: মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেনের যেভাবে মৃত্যু হয়েছে, লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকেও সেই ভাগ্য বরণ করতে হবে। গতকাল সোমবার লিবিয়ার বিদ্রোহীদের মুখপাত্র কর্নেল আহমেদ বানি এ কথা বলেন।
লাদেনের মৃত্যুর ঘটনায় মুখপাত্র বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত খুশি। এখন আমরা পরবর্তী ধাপের জন্য অপেক্ষা করছি। আমরা চাই, মার্কিনরা গাদ্দাফিরও একই দশা করুক।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা জানি, লাদেন আমাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। তিনি আমাদেরও শত্রু।’ আল-কায়েদার সমর্থকেরা লিবিয়ার বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়ছিল—তাদের কাছে প্রমাণ আছে বলে দাবি করেন মুখপাত্র।

‘আমি যদি না-ও থাকি তবু জিহাদ চলবেই’

২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর পর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ওসামা বিন লাদেনের নাম। লাদেনের তৎপরতা রোধে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এতে মোটেও দমে যাননি লাদেন। বরং বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংবাদভিত্তিক আরবি টিভি চ্যানেলে অডিও ও ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে বারবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন তিনি।
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে হামলা চালানোর পর একই বছরের ৭ অক্টোবর লাদেনের যে বার্তা প্রচার করা হয়, তা হচ্ছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে অরক্ষিত জায়গায় আঘাত হেনেছেন আল্লাহ। ধ্বংস করে দিয়েছেন ভবন। এ জন্য আল্লাহকে ধন্যবাদ। এটি ছিল তাদের সবচেয়ে সম্মানজনক ভবন।’
একই মাসের শেষ দিকে একটি পাকিস্তানি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে লাদেন বলেন, ‘আমি যদি না-ও থাকি, তবু জিহাদ চলবেই।’
এর আগে ১৯৯৮ সালের ডিসেম্বরে টাইম সাময়িকীতে প্রকাশিত লাদেনের সাক্ষাৎকারে তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তাঁর কাছে রাসায়নিক বা পারমাণবিক অস্ত্র আছে কি না। জবাবে লাদেন বলেন, ‘মুসলমানদের রক্ষায় অস্ত্র জোগাড় করা তো ধর্মীয় কর্তব্য। আমি যদি অস্ত্র জোগাড়ের চেষ্টা করি, তাহলে তা হবে ধর্মীয় কর্তব্য পালন।’
২০০২ সালের মে মাসে কয়েকটি বার্তা সংস্থা থেকে প্রচার করা ভিডিও বার্তায় লাদেন বলেন, ‘ইহুদি ও আমাদের মধ্যে এই যুদ্ধ। কোনো দেশ ইহুদির পরিখায় নামলে এ জন্য তারাই দায়ী থাকবে।’
২০০৪ সালের অক্টোবরে আরবি টিভি চ্যানেল আল-জাজিরা থেকে প্রচারিত ভিডিও বার্তায় তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে উদ্দেশ করে লাদেন বলেন, ‘স্বাধীন মানুষ তাদের নিরাপত্তা জলাঞ্জলি দেয় না। বুশ দাবি করে থাকেন, স্বাধীনতাকে আমরা ঘৃণা করি। আমরা যদি তা-ই করে থাকি, তাহলে সুইডেনে কেন হামলা চালাচ্ছি না। আমাদের কাছে এর কারণ ব্যাখ্যা করুন, বুশ।’
২০০১ সালের নভেম্বরে আল-জাজিরা থেকে প্রচারিত ভিডিও বার্তায় লাদেন বলেন, ‘আমাদের বিষয়টির সমাধান যারা জাতিসংঘে করতে চায়, তারা ভণ্ড। আর যেসব দেশ জাতিসংঘের সদস্য, তারা কাফের।’
২০০৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে আল-জাজিরা থেকে প্রচারিত অডিও বার্তায় লাদেন বলেন, ‘শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ে শহীদ হওয়ার হামলার ওপর আমরা গুরুত্ব দিচ্ছি। এসব হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এমন ভয় পেয়েছে, যা আগে কখনো পায়নি।’

পাকিস্তান চাপের মুখে পড়বে

ওসামা বিন লাদেনের নিহত হওয়ার ঘটনাকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদের জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বর্ণনা করেছে পাকিস্তান। তবে আল-কায়েদার এই শীর্ষ নেতা কীভাবে দেশটির একটি সামরিক স্থাপনার কাছাকাছি লুকিয়ে থাকতে সক্ষম হয়েছেন, তা ব্যাখ্যা করার জন্য পাকিস্তানকে নিশ্চিতভাবেই চাপের মুখে পড়তে হবে।
প্রথমত, ওসামা বিন লাদেন সীমান্তবর্তী কোনো পাহাড়ি এলাকায় লুকিয়ে ছিলেন না। তিনি লুকিয়ে ছিলেন পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ থেকে সড়কপথে দুই ঘণ্টার দূরত্বে সামরিক একাডেমির কাছাকাছি একটি ভবনে। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে পাকিস্তানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন, এই বিষয়টি তাঁদের বক্তব্যকে আরও জোরালো করে তুলবে।
মাত্র ১০ দিন আগে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আশফাক পারভেজ কায়ানি সেনা ক্যাডেটদের উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে বলেছেন, আল-কায়েদা ও তালেবানের সঙ্গে সম্পৃক্ত জঙ্গিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছে সামরিক বাহিনী।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন অভিযোগ করেছিলেন, কিছু সরকারি কর্মকর্তা ওসামা বিন লাদেন ও মোল্লা ওমরকে লুকিয়ে রেখেছেন। এদিকে পাকিস্তানে মার্কিন পাইলটবিহীন বিমানের হামলা ও পাকিস্তানে সিআইএর কর্মকাণ্ড নিয়ে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কে তিক্ততা দেখা দেয়।
আল-কায়েদার অগ্রদূত হাক্কানি নেটওয়ার্কের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের যোগাযোগ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
লাদেনকে আশ্রয় ও সুরক্ষা দেওয়ার জন্য সন্দেহের আঙুল উঠছে আইএসআইয়ের দিকে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ঘটনার পরম্পরা এই ইঙ্গিত দিচ্ছে, আইএসআইয়ের সেইফ হাউসে প্রাণ হারিয়েছেন ওসামা বিন লাদেন।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা বিশ্লেষক ইমতিয়াজ গুল বলেন, ‘কিছু দিন ধরে ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের মধ্যে প্রচণ্ড উত্তেজনা বিরাজ করছিল। কারণ, বিন লাদেন ইসলামাবাদের কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে আছেন বলে মনে করা হচ্ছিল।’
ইমতিয়াজ গুল বলেন, ‘আইএসআই যদি বিষয়টি জেনে থাকে, তাহলে তাদের ভেতরের কেউ তথ্যটি ফাঁস করে দিয়েছিল।’ এই বিশ্লেষক আরও বলেন, পাকিস্তানের যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে অনেক কিছু করতে হবে। কারণ, মার্কিনরা বলে আসছিল ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানে রয়েছেন। তিনি বলেন, বিষয়টি পাকিস্তানের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর দারুণ আঘাত।

ওসামা বিন লাদেনের উত্থান

ওসামা বিন লাদেনের জন্ম ১৯৫৭ সালে, সৌদি আরবের রিয়াদে। তাঁর বাবা মুহাম্মদ বিন লাদেন ছিলেন ধনবান ব্যক্তি। আবাসন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। তাঁর ৫৪ সন্তানের মধ্যে ওসামা বিন লাদেন ছিলেন ১৭তম। ১৯৬৯ সালে এক বিমান দুর্ঘটনায় ওসামার বাবার মৃত্যু হয়। এ সময় ওসামার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ওই বয়সেই আট কোটি ডলার মূল্যের
পৈতৃক সম্পত্তি পান তিনি। পরে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করতে জেদ্দায় পাড়ি জমান ওসামা। ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যরা শিক্ষকতা করতেন।
ওসামা তাঁর ১৭ বছর বয়সে দূরসম্পর্কের এক সিরীয় বোনকে প্রথম বিয়ে করেন। এরপর আরও অন্তত চার নারীকে বিয়ে করেন। ওসামার ২৩ জন সন্তান রয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
ওসামা বিন লাদেন ১৯৮০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়ে অংশ নেন। ওই সময়ই তিনি ‘আল-কায়েদা’ গঠন করেন।
পরে যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে তাঁর অবস্থান পাল্টান। ওসামা বিশ্বাস করতে থাকেন, সারা বিশ্বের মুসলমানেরা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সন্ত্রাসবাদের শিকার হচ্ছেন। অভিযোগ আছে, নব্বইয়ের দশকে আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন মার্কিন স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা ওসামার করা। এরপর তাঁকে পরিবার থেকে ত্যাজ্য করা হয়, বাতিল করা হয় সৌদি নাগরিকত্বও।
নব্বইয়ের দশকেই আবার আফগানিস্তানে প্রত্যাবর্তন করেন ওসামা। তালেবান শাসনের ছত্রচ্ছায়ায় সেখানে তিনি বিভিন্ন শিবিরে সারা বিশ্ব থেকে আসা জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ দিতেন।
১৯৯৮ সালে পূর্ব আফ্রিকায় মার্কিন দূতাবাসে বোমা হামলার পর আফগানিস্তানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবিরে মার্কিন বাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। কিন্তু ওসামা প্রাণে বেঁচে যান।
২০০১ সালে আফগানিস্তানের তোরাবোরা পাহাড়ে জঙ্গি আস্তানায় মার্কিন বাহিনীর ক্রমাগত বোমা হামলার মুখেও অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি।
অভিযোগ রয়েছে, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ও পেন্টাগনে সন্ত্রাসী হামলার অনুমোদন দেন ওসামা। ওই হামলায় অন্তত তিন হাজার মানুষ নিহত হন। পরে অজ্ঞাত স্থান থেকে ওসামা এক বক্তব্যে বলেন, ওই হামলায় ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা তাঁর প্রত্যাশা ছাড়িয়ে গেছে।
৯/১১ হামলার পর বিশ্বের মোস্ট ওয়ান্টেড সন্ত্রাসী হিসেবে ওসামার মাথার দাম আড়াই কোটি ডলার ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে তাঁর প্রতিষ্ঠা করা সংগঠন আল-কায়েদাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রায় এক দশক ধরে বড় ধরনের অভিযান চলে। কিন্তু বাঘা বাঘা গোয়েন্দাদের চোখে ধুলো দিতে সক্ষম হন তিনি।
২০০৯ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস বলেন, ‘ওসামা কোথায় আছেন তা আমাদের জানা নেই। আগের কয়েক বছর ধরে ওসামার কর্মকাণ্ড ও অবস্থান সম্পর্কেও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে কোনো তথ্য নেই।’
তবে শেষ রক্ষা হয়নি আল-কায়েদাপ্রধানের। গত রোববার ভোরে পাকিস্তানে মার্কিন বাহিনীর হামলায় নিহত হয়েছেন তিনি।

আবার শীর্ষে মুম্বাই

লাসিথ মালিঙ্গার ৪ ওভারে ১৯ রান, মুনাফ প্যাটেলের ৪ ওভারে ১৮ আর হরভজন সিংয়ের ৪ ওভারে ২৫। দুটি করে উইকেট তিনজনেরই। পাঞ্জাবের লক্ষ্য ১৬০। ওই তিন বোলার ১২ ওভারে ৬ উইকেট নিয়েছেন মাত্র ৬২ রান দিয়ে, পাঞ্জাব তাই যেতে পারেনি কাছাকাছিও। ২৩ রানে জিতে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে ফিরেছে শচীন টেন্ডুলকারের মুম্বাই। দিনের অন্য ম্যাচে দিল্লির ১৪০ রান ৩০ বল হাতে রেখেই টপকে ৭ উইকেটে জিতেছে কোচি (১৪১/৩)।

মগা-ঝড়ে উড়ে গেল ব্রাদার্স

ম্যাচ শেষে ডাগ-আউটে ফেরার সময় সতীর্থরা করতালির বৃষ্টিতে তাঁকে অভিনন্দন জানালেন। কে একজন পাশ থেকে বললেন, ‘ব্ল্যাক মেসি’। শুনে মুচকি হাসলেন মুক্তিযোদ্ধার সুদানি স্ট্রাইকার জেমস মগা। বার্সেলোনার আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের সঙ্গে নিজের তুলনায় লজ্জিত, বিব্রতও। কিন্তু কাল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে মুক্তিযোদ্ধার কাছে ‘মেসি’ হয়ে উঠেছিলেন মগা। একাই ৪ গোল করে উড়িয়ে দিলেন ব্রাদার্সকে, মুক্তিযোদ্ধা জয়ী ৪-১ গোলে।
দ্বিতীয় পর্বে জয় দিয়ে শুরু করা মুক্তিযোদ্ধা পয়েন্ট তালিকার শীর্ষেই রইল। ১২ ম্যাচে ১০ জয় ও ১ ড্রয়ে ৩১ পয়েন্ট তাদের। সমান ম্যাচে মাত্র ৩ জয়ে ১৩ পয়েন্ট নিয়ে অষ্টম স্থানে ব্রাদার্স।
বাংলাদেশ লিগ মগা-ঝলক দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। এই গোল-মেশিন একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধাকে। আগেই একটি হ্যাটট্রিক করেছেন রহমতগঞ্জের বিপক্ষে। কাল পেলেন দ্বিতীয় হ্যাটট্রিক। ১৬ ও ৪২ মিনিটে দুই গোল করা মগা হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ৮১ মিনিটে। ৮৮ মিনিটে পান চতুর্থ গোল। মাঝখানে একটি সহজ সুযোগ নষ্ট না করলে গোল পেতেন আরও। এ নিয়ে ৬ ম্যাচে তাঁর গোলসংখ্যা ১২। ৬০ মিনিটে ব্রাদার্সের ড্যানিলো একটি গোল শোধ করেন।
জলবসন্তে আক্রান্ত হওয়ায় দলে নেই দল ও লিগের শীর্ষ গোলদাতা (১২টি) মিঠুন। মগা ছুঁয়ে ফেললেন তাঁকে। মিঠুন সুস্থ হয়ে ফিরতে ফিরতে হয়তো তাঁকে টপকেই যাবেন। মিঠুন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘মিঠুন খুবই ভালো খেলোয়াড়। ওর পায়ের কাজ খুব ভালো, আমার সুবিধা আমি লম্বা।’ দ্রগবা-ভক্ত ৬ ফুট আধা ইঞ্চি উচ্চতার মগা এমন পারফরম্যান্সের পরও পেশাদার থাকলেন, ‘খুবই ভালো লাগছে। বেশি ভালো লাগছে দল জিতেছে বলে। আমরা আবাহনীর চেয়ে ৫ পয়েন্ট এগিয়ে, শেখ জামালের চেয়ে ৪ পয়েন্টে। দারুণ ব্যাপার।’

বাজ্জোকে ছাড়িয়ে

রোমার হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ—এসব রেকর্ডই তাঁর। পরশু রাতে নিজেকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেলেন ফ্রান্সেসকো টট্টি। দুই গোল করে বারির বিপক্ষে রোমাকে জিতিয়েছেন ৩-২ ব্যবধানে। এই দুই গোল কিংবদন্তি রবার্তো বাজ্জোকে ছাড়িয়ে তাঁকে নিয়ে গেল সিরি ‘আ’র সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা তালিকার পঞ্চম স্থানে।
খেলার ৩০ মিনিটে ফ্রি-কিক থেকে গোল করে দলকে সমতায় ফেরানোর পাশাপাশি সিরি ‘আ’তে বাজ্জোর ২০৫ গোলের কীর্তি স্পর্শ করেন টট্টি। ২৭ মিনিট পর পেনাল্টি থেকে সিরি ‘আ’তে করেন নিজের ২০৬তম গোল, বাজ্জোকে পেছনে ফেলে ফ্রান্সেসকো টট্টির নাম ওঠে যায় পাঁচে। তাঁর ওপরে কেবল ইতালিয়ান কিংবদন্তি সিলভিও পিওলা (২৭৪ গোল), সুইডেনের গানার নর্দালহল (২২৫ গোল), ইতালির জিউসেপ্পে মিয়াৎজা (২১৬টি) ও ইতালো-ব্রাজিলিয়ান হোসে আলতাফিনি (২১৬টি)।
সেই ১৯৯৩ সালের ২৮ মার্চ ব্রেসিয়ার বিপক্ষে রোমার জার্সি পরে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক। প্রথম গোলের দেখা পান ১৯৯৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর, ফগিয়ার বিপক্ষে। সেই থেকে একই ক্লাবে খেলে রোমার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছেন। টট্টিও মনে করেন তিনিই রোমের ‘রাজা’। কিংবদন্তি বাজ্জোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার দিনে টট্টি এই আভাসও দিলেন, এখনই বুট জোড়া তুলে রাখার কথা ভাবছেন না, ‘রোমের রাজা এখনো মরেনি। সে কখনো মরবেও না। আমি জানি আমি কী দিতে পারি। আমি খুশি, আরেকটি রেকর্ড গড়লাম এবং বাজ্জোর মতো মহান খেলোয়াড়ের মতো আরেক ধাপ এগোলাম। আমি এভাবেই খেলে যেতে চাই।’
আনন্দের দিনে একটা হতাশাও আছে টট্টির। সুযোগ পেয়েও হ্যাটট্রিক হাতছাড়া করেছেন। ৭৯ মিনিটে আরেকটি পেনাল্টি কিক নিতে গিয়ে বল পোস্টে লাগান তিনি। তাঁর এই হতাশা আরও বড় হতো যদি ইনজুরি সময়ে জয়সূচক গোলটি না করতেন আলিয়েন্দ্রো রোসি।

অবসর নিতে বলা হয়েছিল চন্দরপলকে

একসময় মাঝেমধ্যে হাত ঘোরাতেন শিবনারায়ণ চন্দরপল। ডানহাতি লেগ স্পিন। সেই চন্দরপল এমন সব বাউন্সার ছুড়তে পারেন, কে জানত! ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেট বোর্ডের (ডব্লুআইসিবি) প্রধান নির্বাহী আর্নেস্ট হিলাইরেকে দুই দিনের মধ্যে যে বাউন্সারগুলো ছুড়লেন, এই চন্দরপলকে খুব কম লোকেই চিনত। ‘লাইন অ্যান্ড লেংথ নেটওয়ার্কে’ হিলাইরের বক্তব্যের ব্যাখ্যা দাবি করে হিলাইরেকে চিঠি দিয়েছিলেন সাবেক উইন্ডিজ অধিনায়ক। হিলাইরে জবাব দিয়েছিলেনও, যে চিঠিটাকে বলা যায় বাউন্সারে ‘ডাক’ করা বা দেখেশুনে ছেড়ে দেওয়া। জবাবে আরেকটি বাউন্সার ছুড়েছেন চন্দরপল, বিশ্বকাপের পর নাকি তাঁকে অবসর নিতে বলেছিলেন নির্বাচকেরা!
পুরো ঘটনা বুঝতে হলে ফিরতে হবে একটু পেছনে। পাকিস্তান সিরিজের দল থেকে বাদ পড়া তিন সিনিয়রের একজন ক্রিস গেইলের আইপিএলে যোগ দেওয়া নিয়ে কিছুদিন ধরেই বিতর্ক চলছিল। এসব নিয়েই গত ২৫ এপ্রিল ‘লাইন অ্যান্ড লেংথ নেটওয়ার্কে’ এক সাক্ষাৎকার দেন হিলাইরে। বাদ পড়ার পর চুপ থাকলেও সাক্ষাৎকারে ক্রিকেটারদের নিয়ে হিলাইরের কিছু মন্তব্য জাগিয়ে তোলে চন্দরপলকে। হিলাইরের কাছে এক চিঠিতে এর ব্যাখ্যা দাবি করেন ২৭ এপ্রিল। ২৯ এপ্রিল এক বিবৃতিতে জবাব দেন হিলাইরে। তাঁর ব্যাখ্যা, ক্রিকেটারদের নিয়ে বক্তব্যগুলো নির্দিষ্ট কোনো ক্রিকেটারকে নিয়ে নয় এবং এটির ভিত্তি সাবেক কোচদের বক্তব্য আর প্রতিবেদন। ‘ডব্লুআইসিবি চন্দরপলকে জানিয়েছে, তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের গুরুত্বপূর্ণ একজন সদস্য ছিলেন, এখনো আছেন এবং ভবিষ্যতেও তাঁকে পাওয়ার আশা করছে’—বিবৃতিতে এটা জানিয়ে হিলাইরে অভিযোগ করেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্লেয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন (ডব্লুআইপিএ) নানাভাবে ক্রিকেটারদের কুপরামর্শ দিচ্ছে।
ওই দিনই আরেকটি চিঠিতে কড়া জবাব দেন চন্দরপল। ‘ডব্লুআইপিএ কুপরামর্শ দিচ্ছে’ হিলাইরের এই বক্তব্যে চন্দরপলের জবাব, ‘হয়তো আমি ডক্টর চন্দরপল নই, কিন্তু আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের শীর্ষ একজন ব্যাটসম্যান এবং চাপের মধ্যে ও কঠিন পরিস্থিতিতে গভীরভাবে চিন্তা করার সামর্থ্য আমার আছে। ডব্লুআইপিএ কুপরামর্শ দিচ্ছে বলে যেভাবে আপনি ডব্লুআইপিএকে জড়ানোর চেষ্টা করেছেন, সেটা খুব দুঃখজনক। আপনি হয়তো জানেন না, ক্যারিয়ারজুড়ে বিশ্বের সেরা সব বোলারকে আমি খেলেছি এবং আমি জানি, কীভাবে পাল্টা আক্রমণ করতে হয়। তবে আমি কিছুটা অন্তর্মুখী মানুষ, আশা করব, আপনি এটাকে শ্রদ্ধা করবেন!’
এখানেই শেষ নয়, এরপর একের পর এক বাউন্সার ছুড়ে গেছেন চন্দরপল—
—গত অস্ট্রেলিয়া সফরে ডাইভ দিয়ে চোট পাওয়ার পর ক্রিকেট বোর্ডের ফিজিও আমার যে চিকিৎসা করেছিলেন, সেটা ছিল অকার্যকর। দেশে ফিরে আমাকেই আমার দায়িত্ব নিতে হয়েছে, চিকিৎসার খরচ তো দিতে হয়েছেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ফিজিও বলেছিল, বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসকেরা চোটের অবস্থা দেখে...করাতে বলেছেন।
—নির্বাচকেরা আমাকে অবসর নিতে বলেছিলেন এবং আমি রাজি না হওয়ায় তাঁরা দারুণ হতাশ হয়েছিলেন;
—একজন নির্বাচক তো এটাও বলেছিলেন যে আমাকে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলতে হবে এবং সেখানে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখালেই কেবল আমাকে ভবিষ্যতে বিবেচনা করা হবে। অথচ সদ্য সমাপ্ত বিশ্বকাপেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের পক্ষে তৃতীয় সর্বোচ্চ ব্যাটিং-গড় ছিল আমার;
—কোচ আমাকে বলেছেন, গত ১২ মাসে আমি দলের জন্য কিছুই করতে পারিনি বলে আমাকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
দেখা যাক, এবার হিলাইরে ‘ডাক’ করেন নাকি হুক করেন!

চেলসিকে আর্সেনালের দান

আনন্দ-বেদনার যুগলবন্দী আর্সেন ওয়েঙ্গারের মনে। আনন্দ—ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে ১-০ গোলে হারিয়েছে আর্সেনাল। বেদনা—এর পরও শিরোপা জয়ের আশা নেই তাঁর দলের।
অ্যারন র‌্যামসের গোলে পাওয়া আর্সেনালের জয় অবশ্য নতুন আশা জাগিয়েছে চেলসি শিবিরে। ম্যাড়মেড়ে সমাপ্তির সম্ভাবনা জাগানো ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে হঠাৎই রোমাঞ্চ। তিন রাউন্ড বাকি থাকতে ৭৩ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে ম্যানইউ। শনিবার টটেনহামকে ২-১ গোলে হারানো চেলসির পয়েন্ট ৭০। এরপর আর্সেনাল (৬৭)।
ম্যানইউর তিন ম্যাচের একটি আবার চেলসিরই বিপক্ষে। ম্যানইউ ৩ পয়েন্ট এগিয়ে থাকলেও দুই দলের গোল ব্যবধান সমান। ম্যানইউর মাঠ ওল্ড ট্রাফোর্ডে আগামী রোববারের দ্বৈরথে চেলসি জিতে গেলে ট্রফিতে একটা হাত তাদেরও থাকবে।
এই সমীকরণের কথা ভেবেই চেলসি অধিনায়ক জন টেরি এই ম্যাচে হয়ে গিয়েছিলেন আর্সেনাল সমর্থক, ‘আমি পুরো ৯০ মিনিটই আর্সেনালকে সমর্থন করেছি এবং শিরোপা জয়ের সুযোগও আমরা পেয়ে গেছি।’
আর্সেনাল দারুণ খেলে জিতলেও ম্যানইউ কোচ অ্যালেক্স ফার্গুসনের কাঠগড়ায় অবশ্য রেফারি। র‌্যামসের দেওয়া গোল পরিশোধের সুযোগ পেয়েছিল ম্যানইউ। মাইকেল ওয়েনকে আটকাতে বক্সের মধ্যে ফেলে দেন আর্সেনালের গায়েল ক্লিশি। রেফারি ক্রিস ফয় ম্যানইউর পেনাল্টির আবেদন নাকচ করে দেন। ম্যাচ শেষে ফার্গুসন তাই সমালোচনা করেছেন রেফারির।
ওয়েঙ্গার কিন্তু নিজের দলের খেলোয়াড়দের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, ‘দারুণ খেলেছি আমরা। গোল পাওয়ার আগ পর্যন্তও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল আমাদেরই হাতে। সব দিক দিয়েই এগিয়ে ছিলাম আমরা। আমাদের স্বভাবসুলভ পাসিং আর সুশৃঙ্খল ফুটবল, সবকিছুই ছিল।’ জয়ের আনন্দের পাশাপাশি একটু হতাশাও ছুঁয়ে গেছে ওয়েঙ্গারকে, ‘আমার বিশ্বাস ছিল, এবার আমরা চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে পারব। আসলে সর্বশেষ তিনটা সপ্তাহে আরেকটু ভাগ্যের ছোঁয়া যদি পেতাম!’
সিরি ‘আ’তে এসি মিলানের শিরোপা জয় একরকম নিশ্চিতই হয়ে গেছে। পরশু ফ্লামিনির গোলে বোলোনিয়াকে ১-০-তে হারানোর পর শিরোপার সুবাস এসে লাগছে তাদের নাকে। বাকি ৩ ম্যাচ থেকে ১ পয়েন্ট পেলেই সাত বছর পর ‘স্কুডেট্টো’ জিতবে ইতালিয়ান পরাশক্তি। এবার মিলানের এই সাফল্যের পেছনে ক্লাবের পরিচালক আদ্রিয়ানো গ্যালিয়ানি সভাপতি সিলভিও বেরলুসকোনিরই বড় অবদান দেখেন। এবার খেলোয়াড় কেনার পেছনে বেরলুসকোনি প্রচুর খরচ করেছেন বলেই না এই সাফল্য!