Showing posts with label ফারুক মঈনউদ্দীন. Show all posts
Showing posts with label ফারুক মঈনউদ্দীন. Show all posts

Sunday, November 1, 2015

ব্যাংকারদের কর্মসময় এবং মানবসম্পদ by ফারুক মঈনউদ্দীন

প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লেও
ব্যাংকারদের অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি
ব্যাংকারদের সম্পর্কে একটা কৌতুক প্রায় সবারই জানা, সেটা হচ্ছে একজন ব্যাংকারকে তাঁর সন্তানেরা কত বড় হয়েছে জিজ্ঞেস করলে তিনি দুই হাত পাশাপাশি ফাঁক করে বোঝাতে চেষ্টা করেন সন্তানের দৈর্ঘ্য। কারণ ছেলে কিংবা মেয়েকে তিনি প্রায় কখনোই দাঁড়ানো অবস্থায় দেখার সুযোগ পান না, তাঁর অফিসে যাওয়ার সময় এবং ফেরার পরও দেখতে পান ঘুমন্ত অবস্থায়। আসলেই বিষয়টা কি আদৌ কৌতুকপ্রদ? তথ্যপ্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের দিনে সত্যসম প্রসঙ্গটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে।
বর্তমান প্রজন্মের ব্যাংকাররা বিশাল লেজার বই, টোকেন বা স্ক্রল, ব্যালান্সিং, ক্যালকুলেটরবিহীন হিসাব—এসব কোনো কিছুর সঙ্গে পরিচিত নন। আমাদের দেশে ব্যাংকিংয়ের হিসাবরক্ষণে প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। এই নতুন প্রযুক্তি চালু হওয়ার আগে ব্যাংকারদের জীবন ওপরের কৌতুকের মতো না হলেও তার কাছাকাছি ছিল। লেজারে ভুল পোস্টিংয়ের জন্য ব্যালান্সিং না হলে (অর্থাৎ লেজার বইগুলোর মোট স্থিতি অক্সিলিয়ারি লেজারের সঙ্গে না মিললে) ব্যাংকারদের বহু সন্ধ্যা রাত অবধি গড়িয়ে গেছে ভুল খুঁজে বের করার জন্য। প্রতিবছর জুন এবং ডিসেম্বর মাসের ৩০ তারিখ ছিল ব্যাংকারদের জন্য কেয়ামতের দিন, অর্ধবার্ষিক এবং বার্ষিক হিসাব মেলানোর এই দুই তারিখে মধ্যরাত পর্যন্ত কাজ করতে হতো তাঁদের, তখন এমনকি ক্যালকুলেটরের ব্যবহারও ছিল সীমিত। বর্তমান সময়ে হিসাব মেলানোর জন্য কম্পিউটারের বদৌলতে জুন বা ডিসেম্বরের শেষ দিনের সঙ্গে অন্যান্য মাসের শেষ তারিখের কোনো পার্থক্য টেরই পান না ব্যাংকাররা। অথচ তথ্যপ্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করার পরও ব্যাংকারদের জীবনযাত্রায় তেমন পরিবর্তন এসেছে বলে প্রতীয়মান হয় না।
প্রযুক্তির ব্যবহার সর্বাত্মক হওয়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যাংকারদের দায়িত্ব। একসময় ব্যাংকের মূল দায়িত্ব ছিল আমানত গ্রহণ এবং ঋণ দেওয়া। তারপর বাণিজ্যিক কারণে দিনে দিনে বেড়েছে সেবার পরিধি, তার সঙ্গে বেড়েছে দায়িত্ব এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি। ব্যাংকিং নিয়মাচারকে কঠোর শৃঙ্খলায় বেঁধে মূলধন ভিত্তি শক্ত করার জন্য বাসেল ১ এবং ২-এর ধারাবাহিকতায় বাসেল ৩ প্রণীত হলে ব্যাংকারদের দায়িত্ব এবং সতর্কতা আরও বেড়ে যাবে। এর মধ্যে ২০০৩ সালে চালু হওয়া মানি লন্ডারিং আইন এবং কেওয়াইসি (নো ইয়োর কাস্টমার) বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপের ফলে ব্যাংকারদের এই দায়িত্ব কেবল ব্যাংকের ওপর থাকে না, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার ওপরও বর্তায়। তাই কোরবানির গরুর হাটে জাল নোট শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানো থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয়
মূলধন সংরক্ষণ নিশ্চিত করা, ঈদের ছুটির মধ্যে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করা থেকে কর ও শুল্ক ফাঁকি, কালোটাকা ও জঙ্গি অর্থায়নের উৎস খোঁজা কিংবা আমেরিকান নাগরিকদের কেউ দ্বৈত কর থেকে রেহাই পাচ্ছেন কি না—সবই ব্যাংকারদের দেখতে হয়।
যদিও শেষোক্ত এসব কর্মকাণ্ড রোধের জন্য রয়েছে একাধিক এবং অধিক ক্ষমতাধর সংস্থা। এর সঙ্গে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দেওয়া তো রয়েছেই। ফলে ব্যাংকের হিসাবরক্ষণের জন্য কম্পিউটার প্রবর্তন করে কর্মসময়ের সাশ্রয় ঘটালেও তার কোনো সুবিধা ব্যাংকাররা পাননি। একসময় প্রযুক্তিবিহীন ব্যবস্থায় ব্যাংকাররা যেমন কখনোই বিকেলের আলোর মুখ দেখতে পারতেন না, এখন প্রায় সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায়ও এমন অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। একসময় সনাতনী ব্যাংকিং সংস্কৃতিতে দৈনন্দিন কর্মদিবসের সময়ের অতিরিক্ত কাজ করাকে দক্ষতা এবং পরিশ্রমের মাপকাঠি বলে ধরা হতো। এমনকি এমনও শেখানো হতো যে একজন ভালো ব্যাংকার সব সময়ই খারাপ স্বামী বা পিতা। অর্থাৎ একজন ভালো ব্যাংকারকে সব সময়ই রাত করে ঘরে ফিরতে হবে। অথচ নির্ধারিত কর্মসময়ের মধ্যে কাজ শেষ করে ঘরে ফেরা যে সত্যিকার দক্ষতার পরিচায়ক, এই সরল সত্যটা সে সময় এবং বর্তমান সময়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন ধারণাতেও প্রতিষ্ঠিত করা যায়নি।
ব্যাংকারদের বহুমুখী কর্মপরিধি, ব্যবসায়িক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের চেষ্টা এবং কঠোর নিয়মাচার পরিপালনের চাপ কেবল তাঁদের সাময়িক ক্ষতিই করে না, দীর্ঘ মেয়াদে জন্ম দেয় বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যগত, মানসিক এবং সামাজিক জটিলতার। যুক্তরাজ্যের ফিন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার এক রিপোর্টে জানা যায়, ব্যাংকারদের মানসিক চাপসৃষ্ট জটিলতা নিয়ে ব্যাংকগুলো এখন উদ্বিগ্ন। মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নের জন্য ব্যাংক অব আমেরিকা, কেপিএমজি, মর্গান স্ট্যানলি, প্রাইস ওয়াটারহাউস কুপার, লয়েডস ব্যাংকিং গ্রুপ এবং গোল্ডম্যান স্যাকসসহ ডজন খানেক আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গঠিত ‘সিটি মেন্টাল হেলথ অ্যালায়েন্স’ নামের একটা সংগঠন এক জরিপে দেখিয়েছে, ব্রিটিশ চাকরিজীবীদের প্রতি ছয়জনের মধ্যে একজন উদ্বেগ এবং ডিপ্রেশনের শিকার। কর্মস্থলে ব্যয় করা সময়ের স্থায়িত্ব এবং পরিবেশের ওপর নির্ভর করে মানসিক সুস্থতা এবং কর্মদক্ষতা—এই উপসর্গটির বিষয়ে ব্যাংকের নির্বাহীরা ওয়াকিবহাল যে এর ফলে দক্ষ কর্মকর্তাদের ঘন ঘন চাকরি পরিবর্তন এবং কামাই করার প্রবণতা ব্যবসায়ের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে ‘ব্যাংক ওয়ার্কার্স চ্যারিটি’ নামের আরেকটা প্রতিষ্ঠান তাদের গবেষণা জরিপে তুলে এনেছে যে যুক্তরাজ্যে আর্থিক সমস্যা বা উদ্বেগ, গুরুদায়িত্বের চাপ এবং ভবিষ্যতের ভাবনা পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের দক্ষতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গবেষণায় কর্মক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য তিনটি সমস্যাকে চিহ্নিত করা হয়েছে: অনুপভোগ্য চাকরি, কর্মক্ষেত্র ও পরিবার বা ব্যক্তিগত জীবনের ওপর বিরূপ প্রভাবের দুশ্চিন্তা এবং চাকরির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা। প্রতিষ্ঠানটির সংগৃহীত উপাত্ত থেকে জানা যায়, ৬০ শতাংশ ব্যাংকার অনিয়মিত নিদ্রারোগে ভোগেন, ৪৭ শতাংশ থাকেন ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় আর ৪০ শতাংশ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত।
কয়েক বছর আগে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক আবিষ্কার করেছেন যে আমেরিকার নবীন ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারদের কারও কারও মধ্যে অনিদ্রা, মাদকাসক্তি, খাবারে অরুচি, বদমেজাজ ইত্যাদির প্রকোপ দেখা গেছে। এ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রথম বছর দুয়েক এসব ব্যাংকার সপ্তাহে ৮০ থেকে ১২০ ঘণ্টাও কাজ করেন। চতুর্থ বছরে গিয়ে এঁরা ভুগতে শুরু করেন নিদ্রাহীনতায়। কারও মধ্যে দেখা গেছে নানান রকম অ্যালার্জি, মাদকাসক্তি, চর্মরোগ, (সোরিয়াসিস) আর্থ্রাইটিস এবং থাইরয়েডের সমস্যা। আমাদের দেশে ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকিংয়ের তেমন বড় কোনো প্রভাব না থাকলেও এই উপসর্গের কিছুটা বাণিজ্যিক ব্যাংকারদের মধ্যেও মিলতে পারে, যদি তেমন কোনো গবেষণা চালানো যায়। জেপি মর্গান চেজ অ্যান্ড কোম্পানির এক সাবেক প্রধান নির্বাহীর বরাত দিয়ে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়, তাঁর অধীনস্থ কর্মকর্তাদের অনেকেরই চাকরির কয়েক বছরের মাথায় ৩০ থেকে ৪০ পাউন্ড ওজন বেড়ে যেতে দেখেছেন তিনি। এই সমস্ত তথ্য এবং গবেষণালব্ধ আবিষ্কার থেকে পাশ্চাত্য বিশ্বের নানান পেশা, বিশেষত ব্যাংকিংয়ে নিয়োজিত মানুষের সমস্যার কথা উঠে এসেছে।
এ রকম উপলব্ধির ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক নির্দেশনায় কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ করে মহিলাদের নির্ধারিত ব্যাংকিং সময়সূচির পর কর্মক্ষেত্রে অবস্থান করতে বাধ্য করা যাবে না মর্মে আদেশ জারি করেছে। এই নির্দেশনা যে কেবল অপ্রয়োজনীয়ভাবে ব্যাংক কর্মকর্তাদের কর্মস্থলে উপস্থিতিকে নিরুৎসাহিত করছে তা নয়, বরং এই অভূতপূর্ব সিদ্ধান্তের ফলে নিশ্চিত হতে পারে দেশের ব্যাংকিং পেশায় নিয়োজিত মানবসম্পদের পরিচর্যা এবং তাদের পরবর্তী প্রজন্মের যথাযথ নিরাপত্তা। অদূরদর্শিতার কারণে আমরা খুব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারি না, তাই উপলব্ধি করতে পারি না কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্য আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের মানবসম্পদ উন্নয়নে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ। কর্মসময়ের বাইরের এই সময়টুকু কেবল চাকরিজীবীদের সন্তানদের দেখাশোনা করা, কিংবা পরিবারের সদস্যদের আরও বেশি সময় দেওয়ার প্রয়োজনেই নয়, তাঁরা নিজেরাও যাতে বাড়তি জ্ঞানার্জনের কিছুটা সময় দিতে পারেন, কিংবা যুক্ত হতে পারেন সামাজিক বা বিনোদনমূলক কাজে। ব্যাংকারদের বছরে একবার বাধ্যতামূলক দীর্ঘ ছুটিতে যাওয়ার বিধানটাও এ জন্যই জারি করা হয়েছে, যাতে তাঁরা কিছুদিন সব মানসিক চাপমুক্ত থেকে অবসর যাপন করতে পারেন।
বর্তমান সময়ের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থায় প্রকৃত জ্ঞানার্জনের সুযোগ কম বলে কর্মসময়ের বাইরের সময়টুকু পড়াশোনায় ব্যয় করা জরুরি এবং আগ্রহীরা সে সুযোগটার সদ্ব্যবহার করতে চান। বিশ্বব্যাংকের ২০১২ সালের জ্ঞান অর্থনীতি সূচকে (নলেজ ইকোনমি ইনডেক্স) ১৪৬টা দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৭তম, অর্থাৎ তালিকার সর্বশেষ দশটি দেশের একটি। অন্য নয়টি দেশ হচ্ছে সুদান, জিবুতি, ইথিওপিয়া, গিনি, ইরিত্রিয়া, অ্যাঙ্গোলা, সিয়েরা লিওন, মিয়ানমার ও হাইতি। এই সূচক থেকে আমাদের মানবসম্পদের শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের দৈন্যদশার পরিমাপ করা যায়।
এ ছাড়া দেশের গণপরিবহনের অব্যবস্থার কারণে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ব্যাংকে কাটিয়ে নিত্য ঘরে ফেরার কঠোর সংগ্রামের পর সাধারণ কর্মজীবী কিংবা ব্যাংকারদের পক্ষে পরিবারের অন্য সদস্যদের সময় দেওয়া কিংবা জ্ঞানচর্চা কোনোটাই সম্ভব হয় না।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Wednesday, August 26, 2015

মাথাপিছু আয় বনাম মধ্যম আয়ের চক্কর by ফারুক মঈনউদ্দীন

আমরা দীর্ঘদিন ধরে, বলা যায় জন্মের পর থেকেই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। শেষ দিকে অবশ্য আমাদের বলা হতো উন্নয়নশীল দেশ। আজ বহুদিনের আগল ভেঙে আমরা স্বল্পোন্নত বা নিম্ন আয়ের দেশের তালিকায় থাকার কালিমা ঘুচিয়ে যখন মধ্যম আয় তথা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের চৌকাঠ পেরিয়েছি, এখন কাঙ্ক্ষিত এই প্রান্তিক প্রাপ্তিটিকে ধরে রেখে আরও সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টাই হবে মুখ্য করণীয়। উল্লেখ্য, মধ্যম আয়ের দেশ বলতে শ্রেণীকরণ করা হয় ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ ডলার পর্যন্ত মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোকে। এর মধ্যে ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে ৪ হাজার ১২৫ ডলার মাথাপিছু আয়ের দেশগুলোকে ধরা হয় নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং ৪ হাজার ১২৬ ডলার থেকে ১২ হাজার ৭৩৫ ডলার আয়ের দেশগুলোকে ধরা হয় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে। এর ওপরের মাথাপিছু আয়ের দেশগুলো সবই উচ্চ আয়ের দেশ। সেই হিসাবে বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের সীমানায় পা রেখেছে মাত্র। এই লেখার সঙ্গে দেওয়া সারণির আয়ের হিসাব আমাদের পরিসংখ্যান ব্যুরোর হলেও বিশ্বব্যাংক বা অন্য দাতা সংস্থাগুলো এই পরিসংখ্যানের ওপর আস্থা না রেখে তাদের নিজস্ব উপাত্তের ওপর নির্ভর করে। ফলে আয় হিসাবের তারতম্য ঘটতেই পারে।
জন্মসাল থেকে ১২৯ ডলার মাথাপিছু আয়কে ৪৩ বছরের মাথায় ১০ গুণ বাড়িয়ে তোলা দেশটি যে ভবিষ্যতে আরও বহুদূর যেতে পারে, সেটি এখন আর খুব সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন মনে হয় না। এই সারণি থেকে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর থেকে প্রথম দশকের মাথায় আমাদের মাথাপিছু আয় বেড়েছিল ৭১ শতাংশ, বৃদ্ধির এই হার বেশি হওয়ার মূলে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রথম বছরগুলোর অতি নিম্ন ভিত্তির আয় হার। তার পরের দুই দশকে এই আয় বৃদ্ধির হার ২৮ এবং ২৭ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায়-স্থবির। এ পর্যায়ে ২০০০-পরবর্তী অর্থাৎ নতুন শতাব্দীর প্রথম দশকের বৃদ্ধির হার লক্ষণীয়, ১১৪ শতাংশ এবং তার পরের মাত্র চার বছরের মাথায় গিয়ে এই বৃদ্ধি ৭০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। ২০২০ সালে গিয়ে সংখ্যাটা কোথায় দাঁড়াবে সেটি দেখার জন্য আমাদের আরও কয়েক বছর অপেক্ষা করতে হবে।
দারিদ্র্যের হার ১৯৭০ দশকের ৮০ শতাংশ থেকে কমে ২০১০ সালের হিসাবে নেমে এসেছে ২৬ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ২০০০ সালের দরিদ্র মানুষের (দৈনিক আয় ২ ডলার অথবা খাদ্য গ্রহণ ২১০০ ক্যালরির কম) সংখ্যা ৬ কোটি ৩০ লাখ থেকে কমে ২০১০-এ দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৭০ লাখে। যুক্তরাষ্ট্রের টাইম ম্যাগাজিন এই সাফল্য সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিল, দারিদ্র্য হারের এই দ্রুত পতনশীল হার বাংলাদেশকে জাতিসংঘ নির্ধারিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছে দেবে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই। একটি ক্রমবর্ধনশীল এবং ঘন জনসংখ্যার দেশে এ রকম সাফল্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ।
এই সাফল্যের পেছনের কারণ রয়েছে অনেক। বিগত দশকগুলোতে পশ্চাৎপদ কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হয়ে বাংলাদেশ ক্রমেই শিল্প এবং সেবা খাতনির্ভর উন্নয়ন কৌশলের দিকে ধাবিত হয়েছে। ফলে শতাব্দী ধরে চলা কৃষি খাতের উদ্বৃত্ত শ্রমশক্তি স্থানান্তরিত হয়েছে শিল্প এবং অন্যান্য অসংগঠিত খাতে, যা এই অদক্ষ অথচ ছদ্ম বেকার জনশক্তির আয় বৃদ্ধি করেছে। অন্যদিকে কৃষি খাতে প্রযুক্তি এবং অন্যান্য উন্নত পদ্ধতি ব্যবহারের ফলে একদিকে যেমন বেড়েছে কৃষি উৎপাদনের হার, অন্যদিকে অর্থকরী ফসলমুখী প্রবণতা কৃষি খাতকে প্রান্তিক আয়ের উৎসে আটকে রাখেনি, কৃষিব্যবস্থাকে করেছে মুনাফানির্ভর। এই উভয়মুখী প্রক্রিয়া দারিদ্র্য নিরসন এবং আয় বৃদ্ধির একটা প্রধান নিয়ামক।
কৃষি খাতের এই সাফল্য পরিমাপ করার জন্য কোনো উপাত্তের প্রয়োজন পড়ে না, ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা এবং হ্রাসকৃত কৃষিজমির বিপরীতে আমদানিনির্ভরতার অবসান থেকেই হদিস মেলে এই সাফল্যের। কৃষি খাতে এই বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পের বর্ধিত অবদান, অনাবাসী বাংলাদেশিদের ক্রমবর্ধমান হারে রেমিট্যান্স, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে তৃণমূল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান এবং আয় বৃদ্ধি, সেবা খাতের বিভিন্ন শাখার প্রবৃদ্ধি এবং সামষ্টিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার সাফল্য। বিগত কয়েক বছর ধরে পরিচালিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বিভিন্ন পদক্ষেপ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করেছে অর্থনীতির কর্মপ্রবাহের মূল স্রোতোধারায়। এটির সুফল প্রাপ্তি এখন সময়ের ব্যাপার। নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীশিক্ষা প্রসারকেও চলমান সাফল্যের একটি উল্লেখযোগ্য নিয়ামক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। অর্থনীতির এই সফলতার হার নিঃসন্দেহে আরও বেশি হতো, যদি বিগত সময়ের রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘবদ্ধ দুষ্কৃতকারী ব্যবসা-বাণিজ্যের গতিকে স্থবির করে না দিত।
নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে উঠে আসা ধারাবাহিক সাফল্যেরই স্বীকৃতি, এ কথা মেনে নিয়েও মনে রাখতে হবে আমাদের পার হতে হবে আরও বন্ধুর পথ। কারণ, নিম্ন আয় বা স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে আসার কিছু চ্যালেঞ্জও আমাদের মোকাবিলা করতে হবে। এত দিন বাংলাদেশ অনুন্নত দেশের তালিকায় থাকার কারণে দাতা সংস্থা এবং উন্নত দেশগুলো থেকে স্বল্প সুদে ঋণসহ যেসব সুবিধা ভোগ করত, কিংবা রপ্তানিতে কোটা বা জিএসপি-সুবিধার জন্য বিবেচ্য হতো, সেসব সুবিধার পথ সংকীর্ণ হয়ে যেতে পারে। উপরন্তু, মধ্যম আয়ের বিভিন্ন দেশ একটা পর্যায়ে পৌঁছার পর যে বিপাকে পড়ে, সেটির নাম মধ্যম আয়ের চক্কর। এটা এমনই একটা অবস্থা, যখন একটি দেশ মাথাপিছু আয়ের কোনো এক স্তরে পৌঁছে অন্যান্য প্রতিকূল অবস্থার কারণে এক জায়গায় গিয়ে আটকে যায় এবং সেই অবস্থা থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারে না। এর কারণ হিসেবে বলা হয় যে কৃষি খাত থেকে অকৃষি খাতে শ্রমশক্তির অবাধ সরবরাহ এবং পুঁজিঘন লাভজনক বিনিয়োগের প্রাথমিক উচ্ছ্বাস একপর্যায়ে স্তিমিত হয়ে আসে এবং প্রযুক্তি যুগোপযোগিতা হারায়।
এ পর্যায়ে অর্থনীতির চালিকাশক্তি নবায়নের জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষ জনশক্তি, উন্নততর প্রযুক্তি এবং যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক ও অবকাঠামোগত ভিত্তি। কিন্তু কেবল আয় বৃদ্ধিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করতে গিয়ে অন্যান্য দিক উপেক্ষা করার ফলে উন্নয়নের সব সহযোগী নিয়ামক নিশ্চিত করার মতো সক্ষমতা থাকে না দেশটির। এ ছাড়া উচ্চ মাথাপিছু আয়ের জোয়ারে শ্রমের মূল্য বেড়ে গেলে নিম্ন মধ্যম ও মধ্যম আয়ের দেশ হারায় রপ্তানির প্রতিযোগিতামূলক বাজার। অন্যদিকে শিল্পজাত পণ্য উৎপাদনেও উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পেরে ওঠে না এসব দেশ। ফলে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং নিম্ন প্রবৃদ্ধির কারণে মধ্য কিংবা নিম্ন মধ্যম আয়ের চক্কর থেকে বের হতে পারে না দেশগুলো। লাতিন আমেরিকার মেক্সিকো বা ব্রাজিল কিংবা আমাদের বাড়ির পাশের ইন্দোনেশিয়া বা থাইল্যান্ড এই চক্করে পড়ে আছে এখনো।
অর্থনীতিবিদেরা একসময় উপলব্ধি করেন যে উচ্চ আয়বৈষম্য থাকলে মাথাপিছু আয় দিয়ে কোনো দেশের প্রকৃত অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য নিরূপণ করা যায় না। এই আবিষ্কারের আলোকে প্রণীত হয় (১৯৯০) জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন সূচক (এইচডিআই)। কেবল মাথাপিছু আয়ের পরিবর্তে একটি দেশের সার্বিক মূল্যায়নের জন্য আরও কিছু বিষয় নিয়ে প্রণীত এই সূচক যে অধিকতর গ্রহণযোগ্য, তার যৌক্তিকতা মেলে মধ্যম আয়ের চক্করে পড়া দেশগুলোর দৃষ্টান্ত থেকে। এই সূচকের মূল চারটি বিবেচ্য বিষয়ের একটি হচ্ছে মাথাপিছু আয়। অন্যান্য তিনটি বিষয়ের মধ্যে রয়েছে জন্মকালীন সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল, স্কুলজীবনের গড় বছর এবং স্কুলজীবনে টিকে থাকার সম্ভাব্য সময়। এই সূচকের আংশিক সংশোধন করে পরবর্তী সময়ে বৈষম্য-সমন্বিত সূচক প্রবর্তন করা হয়, যাতে কেবল স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং আয়কেই বিবেচনায় নেওয়া হয় না, এসব ক্ষেত্রের প্রাপ্তির ফলাফলকে নিরূপণ করা হয় বৈষম্যের বিচারে। বৈষম্যের কারণে মানব উন্নয়নের যে ক্ষতি সাধিত হয়, সেটিই আগের সূচকের সঙ্গে এটির পার্থক্য। ২০১৩ সালের ভিত্তিতে প্রস্তুত অসাম্য-সমন্বিত সূচকের ২০১৪-এর রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশের অবস্থান ১০৩তম, যেখানে ভারত ১০০তম এবং পাকিস্তান রয়েছে ১০৮তম অবস্থানে।
একটি দেশ মাথাপিছু আয়ের বিচারে উচ্চ অবস্থানে থেকেও মানব উন্নয়ন সূচকে পড়ে থাকতে পারে অনেক নিচে। অতএব, এ কথা সহজেই বলা যায়, কেবল মাথাপিছু আয় নিয়ে সন্তুষ্ট থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ইত্যাদি বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশ আটকে পড়তে পারে নিম্ন মধ্যম আয়ের চক্করে, তখন উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে যুক্ত হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ যে মধ্যম আয়ের দেশের সর্বনিম্ন সোপানে পা রাখতে সক্ষম হয়েছে, সেই সক্ষমতা এখনো টলমল, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা কিংবা বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় টলিয়ে দিতে পারে এই অবস্থান। আমাদের জনসংখ্যাঘন বিশাল বাজারের কল্যাণে জিডিপির একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে অবস্থান প্রায় নিশ্চিত থাকলেও তার কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি নির্ভর করবে অন্যান্য নিয়ামক এবং সহায়ক শক্তির ওপর। সুতরাং সদ্যপ্রাপ্ত এই শিরোপা ধরে রাখার জন্য আমাদের পাড়ি দিতে হবে আরও দীর্ঘ পথ, নজর রাখতে হবে এই সাফল্য ধরে রেখে অগ্রসর হওয়ার দিকে। কেবল মাথাপিছু আয়ের আত্মতুষ্টিতে বিভোর থাকলে অর্জিত হবে না অর্থনীতি ও জনগণের সার্বিক মঙ্গলসূচক কোনো পরিকল্পনা।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Monday, June 1, 2015

সরকারি বেতন বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি বাড়বে কি? by ফারুক মঈনউদ্দীন

প্রায় ১৩ লাখ সরকারি চাকরিজীবীর সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন গ্রেডে প্রায় দ্বিগুণ এবং অন্যান্য গ্রেডে বিভিন্ন অনুপাতে ৮৭ থেকে ১০১ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানোর সুপারিশ-সংবলিত বেতন ও চাকরি কমিশনের রিপোর্ট গৃহীত হওয়ার পর আগামী অর্থবছরের (২০১৫–১৬) প্রথম দিন থেকে কার্যকর হতে যাচ্ছে পরিবর্তিত বেতনকাঠামো। উল্লেখ্য, নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করতে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ব্যয় বাড়বে ৬৪ শতাংশ। এই বেতন বৃদ্ধি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে যে এর ফলে অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে কি না। কারণ, সরকার ঘোষিত এই নতুন বেতনকাঠামোর উল্লম্ফনের ফলে একদিকে যেমন সরকারের ব্যয় বেড়ে বাজারে সঞ্চারিত হবে নতুন অর্থ, তেমনি বেতন বৃদ্ধির খবরে বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে নানান মহলে শুরু হবে মূল্যবৃদ্ধির তোড়জোড়।
অতীতে বিভিন্ন বেতন কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন শুরু হওয়ার পর থেকেই এ-জাতীয় প্রবণতা দেখা গেছে। হয়তো যদিও সেসব বাজার প্রতিক্রিয়া খুব ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী হয়নি। কিন্তু সরকারি ব্যয়বৃদ্ধির মাধ্যমে চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির কোনো অর্থনৈতিক বা মুদ্রানৈতিক ফলাফল নেই—সে কথাও খুব জোর দিয়ে বলা যায় না। কারণ, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের বার্ষিক ব্যয় হয় ৩৫ হাজার কোটি টাকা, আর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করার পর এই ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হবে আরও ২৬ হাজার কোটি টাকা। কেবল সরকারি খাত থেকে ২৬ হাজার কোটি টাকা এক বছরে বাজারে যুক্ত হলে তার কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া ঘটবে না, সেটি আশা করা যায় না।
আমরা সবাই জানি, মুদ্রাস্ফীতির বহুবিধ কারণের পেছনে সরকারের খরচ বৃদ্ধি, নতুন টাকা ছাপানো—এসবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বর্ণমানের বিপরীতে টাকা ইস্যু করার প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার ফলে টাকা ছেপে সরকারের ব্যয় নির্বাহ করার সুযোগটা অবারিত হয়ে যায়। কারণ, স্বর্ণমান বজায় রেখে টাকা ছাপানোর পদ্ধতি চালু থাকা অবস্থায় সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ সরবরাহ করার স্বাধীনতা থাকে না। সাধারণ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাই স্বর্ণমান মুদ্রা ব্যবস্থার অধীনে বাজারে চালু করা কাগজের মুদ্রার বিপরীতে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক সমপরিমাণ স্বর্ণ মজুত রাখার নিশ্চয়তা দিত। তখন বাজারে সঞ্চালিত মুদ্রার পরিমাণ নির্ভর করত দেশে বিদ্যমান স্বর্ণ এবং পরবর্তীকালে রৌপ্যের পরিমাণের ওপর। ফলে যথেষ্ট স্বর্ণ বা রৌপ্যের মজুত না থাকলে সরকারের পেÿক্ষ টাকা ছাপানো সম্ভব হতো না।
স্বর্ণমানের কথা উঠলই যখন, তার পেছনের কথাটাও পাঠকের জানা উচিত। প্রাচীনকালে মানুষ নিরাপত্তার জন্য তাদের স্বর্ণ এবং স্বর্ণমুদ্রা গচ্ছিত রাখত স্বর্ণকারদের কাছে। বিনিময়ে স্বর্ণকারেরা একটা নির্দিষ্ট হারে ফি আদায় করে জমাদানকারীকে একটা রসিদ দিত, যাতে জমাকারীরা প্রয়োজনমতো তাদের গচ্ছিত সম্পদ ফিরিয়ে নিতে পারে। এই রসিদের নির্ভরযোগ্যতার কারণে এটিকেই মানুষ টাকার বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে। এভাবেই শুরু হয় কাগজের মুদ্রার প্রচলন। কাগজের মুদ্রার ওপর ‘চাহিবামাত্র ইহার বাহককে ৫০, ১০০, ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকা দিতে বাধ্য থাকিবে’ লেখা অঙ্গীকারের প্রচলনও শুরু হয় এভাবে। অর্থাৎ এই রসিদটির বাহককে সমপরিমাণ স্বর্ণ দিতে বাধ্য থাকার অঙ্গীকার ছিল এটি।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপ পুনর্গঠনের ধাক্কায় এক দেশের মুদ্রাকে অন্য দেশের মুদ্রায় বিনিময় করার পদ্ধতি চালু হলে স্বর্ণমান সংরক্ষণ করার বিষয়টি আর মুখ্য থাকে না। ঠিক এ সময় মার্কিন ডলার বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে উঠে আসে। অবশেষে ১৯৭১ সালে প্রেসিডেন্ট নিক্সনের আমলে মার্কিন ডলারের বিপরীতে স্বর্ণমান সংরক্ষণ করার বাধ্যবাধকতার বিষয়টির অবসান ঘটে। অনেক অর্থনীতিবিদ মুদ্রাস্ফীতির জন্য কাগজের মুদ্রা ছাপানোর অবিমৃশ্যকারিতাকে দায়ী করলেও বিপরীতভাবে অনেকেই অভিযোগ করেন যে ১৯২৯ সালের মহামন্দার জন্য মূলত দায়ী ছিল কঠোর স্বর্ণমান বজায় রাখার পদ্ধতি। কারণ, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার জন্য সামান্য মাত্রার মুদ্রা সম্প্রসারণ নীতি অনুসরণ করা দোষের কিছু নয়। অথচ সেই মন্দাক্রান্ত অর্থনীতিতে সরকারি ঘাটতিকে পুষিয়ে নেওয়ার জন্য যখন প্রাণের স্পন্দন আনার জন্য প্রয়োজন ছিল মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ কঠোরভাবে স্বর্ণমান বজায় রাখছিল বলে অর্থনীতি মন্দা থেকে উঠে আসার জন্য সরকার কর্মসংস্থান বাড়ানোর জন্য মুদ্রা সরবরাহ বাড়াতে পারেনি। অন্যদিকে ১৯২০-এর দশকে অর্থনীতিবিদ কেইনস এই স্বর্ণমানের বিরোধিতা করলেও ব্রিটিশ সরকার তাঁর নীতি থেকে সরে আসেনি, ফলে ব্রিটিশ অর্থনীতিতেও নেমে আসে অর্থনৈতিক দুর্যোগ ও বেকারত্ব।
অতএব বোঝা যায়, কাগজের মুদ্রা ছাপানোর প্রবণতায় বাজারে অর্থ এবং ঋণের সরবরাহ বেড়ে গেলে তার বিপরীতে পণ্য ও সেবার সরবরাহ আনুপাতিক হারে না বাড়লে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। মুদ্রাস্ফীতির প্রধানতম কুফল হচ্ছে পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধি। কারণ, বাজারে অর্থের সরবরাহ বেড়ে গেলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, ফলে যে পরিমাণ পণ্য আগে যত টাকা দিয়ে কেনা যেত, সেই পরিমাণ পণ্য কিনতে এখন আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। সরকার যখন বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়, তখন ঠিক এই ব্যাপারটাই ঘটে। ফলে বাজারে সরবরাহকৃত অর্থের পরিমাণ বেড়ে গেলেও সেই বাড়তি টাকা দিয়ে আনুপাতিক হারে বাড়তি সেবা বা পণ্য কেনা সম্ভব হয় না, কারণ টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। অর্থাৎ একই পরিমাণ সেবা ও পণ্য কিনতে আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এই সেবা ও পণ্যমূল্য বৃদ্ধিই বাজারে বাড়তি অর্থ সরবরাহের সরাসরি প্রতিক্রিয়া।
সাধারণভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়। কোনো পণ্যের চাহিদা ও সরবরাহের অসামঞ্জস্যতার কারণে সেটির মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে পারে, তবে তা মুদ্রাস্ফীতি নয়। কোনো কারণে খাদ্যমূল্য কিংবা বাড়িভাড়া বৃদ্ধি পেলে সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বটে, যাকে মূল্যস্ফীতি বলা যেতে পারে, কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি নয়। শেষোক্তটি ঘটে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বৃদ্ধি এবং তার কারণে টাকার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার কারণে।
বেতন ও চাকরি কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন হলে মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে কি না, এই বিতর্কে সরকারের মন্ত্রীদের মধ্যেই দ্বিমত রয়েছে। পরিকল্পনামন্ত্রী আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতি ঘটতে পারে। সংবাদ সংস্থার খবরে জানা যায় তিনি পর্যায়ক্রমে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির পক্ষে, যাতে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি মুদ্রাস্ফীতি পরিস্থিতিতে তেমন কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে না। তিনি বলেছেন, পাঁচ বছর পরপর সরকারি বেতন বৃদ্ধি করা হয়। এবারের বেতন বৃদ্ধির সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া বিষয়ে যে গবেষণা করা হয়েছে, তার ফলাফল অতি নগণ্য। তিনি সরকারি কর্মচারীদের মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে বরং অতীত প্রবণতার দিকে নজর রাখতে বলেছেন। আমাদের অনেকেরই স্মরণ থাকার কথা যে, একসময় বাংলাদেশে অর্থ ও পরিকল্পনা নামের একটিই মন্ত্রণালয় ছিল, ফলে অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক মন্ত্রীও ছিলেন একজনই। এখন অর্থমন্ত্রী ও পরিকল্পনামন্ত্রীর বিপরীতমুখী ভাষ্য দেখে কৌতূহল জাগে এই দুটি মন্ত্রণালয় একসঙ্গে থাকলে সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া হিসেবে মন্ত্রী কী বলতেন?
উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবও কার্যকর হতে যাচ্ছে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে। এ কারণে ভারতীয় অর্থনীতিবিদেরা আগাম পূর্বাভাস করছেন এক ধাপ মুদ্রাস্ফীতির।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বেতন বৃদ্ধির ফলে কোনো মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা করছে না। সর্বশেষ মুদ্রানীতিতে (জানুয়ারি—জুন ২০১৫) আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে যে প্রস্তাবিত নতুন বেতনকাঠামোর কারণে কোনো মুদ্রাস্ফীতি ঘটবে না। দেখানো হয়েছে অতীতের বিভিন্ন পে–স্কেল বাস্তবায়নের কারণে কোনো মুদ্রাস্ফীতি ঘটেনি, যদিও পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম পে–স্কেল বাস্তবায়নের পর মুদ্রাস্ফীতি ঘটেছিল, কিন্তু তার কোনোটিই বাড়তি বেতনের জন্য নয়, বরং তা ঘটেছিল আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি, ঋণ সম্প্রসারণ, সরকারের অত্যধিক ঋণ গ্রহণ এবং টাকার অবমূল্যায়নের ফলে। অতএব অষ্টম বেতন কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের কারণে কোনো মুদ্রাস্ফীতির আশঙ্কা করছে না বাংলাদেশ ব্যাংক। এই আশাবাদ সফল হতে পারে যদি সরকার তার রাজস্ব আয় থেকে এই বাড়তি খরচের জোগান দিতে পারে। কিন্তু যদি নতুন মুদ্রা ছেপে কিংবা ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে এই খরচ মেটানো হয়, তাহলে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে অবশ্যম্ভাবী মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে।
সরকার কেবল তার ১৩ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির প্রতিক্রিয়া নিয়ে ভাবছে, কিন্তু নতুন সরকারি বেতনকাঠামো বাস্তবায়িত হলে আধা সরকারি, বেসরকারিসহ অন্য সব ক্ষেত্রে বেতন বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু হবে, ফলে বাজারে সঞ্চারিত বাড়তি অর্থের সরবরাহ সরকারি পূর্বাভাস ছাড়িয়ে যেতে পারে, এবং তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া কী হবে, সে বিষয়ে কোনো গবেষণা বা হিসাব করা হয়েছে কি না, জানা যায় না। এমনকি বিভিন্ন সেক্টরে বেতন ও মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে দানা বাঁধতে পারে আন্দোলন, যার রাজনৈতিক তাৎপর্যও অস্বীকার করা যায় না।
তাই এ বিষয়ে বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ করতে হবে, যাতে সর্বক্ষেত্রে বেতন ও মজুরি বৃদ্ধির কারণে মুদ্রাস্ফীতির লাগাম হাতছাড়া হয়ে না যায়। সরকারকে মনে রাখতে হবে, কেবল সরকারি কর্মচারীদের তুষ্টির চেয়ে বেশি প্রয়োজন বেতনবহির্ভূত জনগণের স্বস্তি, যা বিগত কয়েক বছর ধরে সাফল্যের সঙ্গে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Saturday, May 9, 2015

খেলাপি বনাম সদাচারী ঋণগ্রহীতা by ফারুক মঈনউদ্দীন

অবশেষে বাংলাদেশ ব্যাংক সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের জন্য বিশেষ প্রণোদনামূলক নীতিমালা প্রবর্তন করে তাঁদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিকতম এক সার্কুলারে সদাচারী বা ভালো ঋণগ্রহীতাদের সংজ্ঞায়িত করে তাঁদের জন্য সুদের হারে বিশেষ ছাড়ের সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে। এ কথা সত্যি, আমাদের দেশে কারণে-অকারণে খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের পুনঃতফসিলীকরণ, সুদ মওকুফসহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা ও নজির থাকলেও নিয়মিত ঋণ পরিশোধকারী গ্রহীতাদের জন্য কোনো সুবিধা বা ছাড়ের ব্যবস্থা নেই। বরং কোনো গ্রহীতা যদি দীর্ঘমেয়াদি ঋণ মেয়াদপূর্তির আগে সমন্বয় করে দিতে চান, এর জন্য উল্টো আর্লি সেটেলমেন্ট ফি নামে জরিমানা আদায় করার বিধান রয়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংজ্ঞা অনুযায়ী—চলমান, তলবি ও মেয়াদি—সব ধরনের ঋণ হিসাব বিগত তিন বছরের জন্য নিয়মিত বা স্ট্যান্ডার্ড থাকলে সেই ঋণ হিসাবধারীকে ভালো ঋণগ্রহীতা বলে বিবেচনা করা যাবে। তবে আগের তিন বছরের কোনো এক সময়ে গ্রহীতাদের কেউ বা তাঁদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যদি কোনো ব্যাংকে বিরূপ মানে শ্রেণীকৃত হয়, তাহলে তাঁরা ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে বিবেচিত হবেন না।
সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের জন্য যে প্রণোদনা দিতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট বিধিমালাও প্রণয়ন করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। চলমান ঋণ, তলবি ঋণ কিংবা মেয়াদি ঋণ—সব ক্ষেত্রেই পর পর তিন বছর ঋণ অনুমোদনের শর্ত অনুযায়ী ঋণ পরিশোধ করলে তৃতীয় বছরের আদায়কৃত মোট সুদের ওপর কমপক্ষে ১০ শতাংশ ছাড় দিতে হবে। পরবর্তী বছর শেষে ভালো ঋণগ্রহীতা হিসেবে চিহ্নিত থাকলে কিংবা মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলে পরের বছরও ছাড়ের এই বিশেষ সুবিধা বহাল থাকবে। এ ছাড়া গ্রহীতার ব্যবসায়িক প্রয়োজনে তাঁরা বর্ধিত ঋণসুবিধা পাওয়ার যোগ্য বলেও বিবেচিত হবেন।
দেশের চলমান ঋণ সংস্কৃতিতে সদাচারী গ্রহীতারা বরাবরই লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে যান, বরং খেলাপি ও বড় গ্রহীতারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ বিভিন্ন উপায়ে প্রচারণা পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশ ব্যাংক এই নতুন নীতিমালায় সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের বার্ষিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বীকৃতি বা পুরস্কার দিয়ে তাঁদের সামাজিকভাবে উচ্চাসনে তুলে ধরার জন্যও ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দিয়েছে। এই বিশেষ উদ্যোগটি পল্লি, উপজেলা ও ছোট জেলা সদরের ব্যাংক শাখার গ্রাহকদের মধ্যে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, এ রকম পাদপ্রদীপের আলোয় আসার সুযোগ তাঁদের কমই ঘটে। তবে ব্যাংকিং খাতের অনেকেই বিষয়টিকে ভালো চোখে দেখছেন না। তাঁদের বক্তব্য, ভালো ঋণগ্রহীতাদের ব্যাংক প্রথম থেকেই সুদের হারে সুবিধা দিয়ে থাকে। তার ওপর যদি আবার তিন বছর সদাচারী থাকার জন্য আদায়কৃত সুদের অংশ ফেরত দিতে হয়, সেটি ব্যাংকের আয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে।
এই প্রণোদনা প্রবর্তনের মাস দুয়েক আগে সুবৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের ঋণ হিসাবগুলোকে সহজ শর্তে পুনর্গঠিত করার নতুন যে নীতিমালা ঘোষিত হয়, সেটির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার জন্যই হয়তো সদাচারী ঋণগ্রহীতাদের পুরস্কৃত করা ও স্বীকৃতি দেওয়ার এই উদ্যোগ। কারণ, নতুন নীতিমালায় ৫০০ কোটি টাকার চেয়ে বেশি ঋণ পুনর্গঠনের জন্য যেসব শিথিল শর্ত প্রণয়ন করা হয়, সেগুলো এই অঙ্কের নিচের গ্রহীতাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। আবার ঋণের পরিমাণ এক হাজার কোটি টাকার বেশি হলে এসব শর্তের অন্তত একটি (ডাউন পেমেন্ট) আরও কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। উল্লেখ্য, ঋণ পুনর্গঠনের এই সুযোগ যে কেবল সুবৃহৎ খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে তা নয়, মেয়াদোত্তীর্ণ নয় এমন ঋণও এই নীতিমালার অধীনে সর্বোচ্চ ১২ বছরের জন্য পুনর্গঠন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব বিশাল ঋণ হিসাবের ওপর সুদের হারও নির্ধারণ করা যাবে বিশেষ ছাড়ে, তবে ব্যাংকের তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করলে যা হয় তার চেয়ে কম নয়। অবশ্য ব্যাংকের তহবিল ব্যয়ের সঙ্গে ১ শতাংশ যোগ করলেও পুনর্গঠিত ঋণের ওপর ধার্য করা এই সুদের হার ব্যাংকের জন্য কোনোভাবেই লাভজনক হবে না।
এই নীতিমালা প্রণয়নের যৌক্তিকতা হিসেবে বলা হয়েছে যে আর্থসামাজিক ও কর্মসংস্থানের নিরিখে বৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বিধায় ঋণ আদায়ের স্বার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশের মোট কর্মসংস্থানে ও জিডিপিতে ৫০০ কোটি টাকার ওপর ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট কী পরিমাণ অবদান আছে, কিংবা তাঁদের অবদান ৫০০ কোটি টাকার কম ঋণগ্রহীতাদের চেয়ে বেশি কি না, সে বিষয়ে একটা সংগত প্রশ্ন থেকেই যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোর অস্থিরতার ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়াও যদি হয় এই নতুন নীতিমালার উদ্দেশ্য, তাহলেও ৫০০ কোটি টাকার নিচের গ্রহীতারা এই সুবিধা থেকে কেন বঞ্চিত হবেন, সে প্রশ্নেরও কোনো জবাব আমরা দিতে পারছি না। যদি বহির্দেশীয় কিংবা অভ্যন্তরীণ সংকটের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সুবৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঋণ পুনর্গঠন–সুবিধা পায়, তাহলে সেসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল কিংবা নির্ভরশীল নয় এমন অপেক্ষাকৃত ছোট বা মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কেন একই কারণে এই সুবিধা পাবে না, তার কোনো সদুত্তরও ব্যাংকাররা দিতে পারছেন না।
মজার বিষয় হচ্ছে, আমরা যখন আমাদের তারকা খেলাপিসহ সুবৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের এ রকম ঢালাও ছাড় দিচ্ছি, ঠিক তখনই ভারতে খেলাপি ঋণের প্রবণতা রোধে আরেক প্রস্থ কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে। ভারতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘অসহযোগী’ (নন-কো-অপারেটিভ) ঋণগ্রহীতা নাম দিয়ে একটা নতুন শ্রেণি চিহ্নিত করার উদ্যোগ নিয়েছে। পাঁচ কোটি রুপির বেশি সব ধরনের ঋণ এই শ্রেণির আওতাভুক্ত। কয়েক বছর আগে ইচ্ছাকৃত (উইলফুল) খেলাপি নামে যে নতুন শ্রেণীকরণ করা হয়েছিল, এটি তার পরের ধাপ। ‘অসহযোগী’ ঋণগ্রহীতা বলতে তাঁদের বোঝানো হচ্ছে, যাঁরা সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পরিশোধ করেন না, বরং ব্যাংকের ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য গোপন করেন, নিজেদের আর্থিক সংগতি বা জামানত সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহে বাধা দিয়ে কিংবা সহায়ক জামানত বিক্রি করে ঋণ আদায়ের জন্য ঋণদাতা ব্যাংকের সব তৎপরতাকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করেন।
অন্যদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপির সংজ্ঞানুযায়ী, এই শ্রেণির ঋণখেলাপিরা ব্যাংকের টাকা তো ফেরত দেনই না, বরং ঋণের টাকা সরিয়ে ফেলে ভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেন কিংবা বন্ধকীকৃত অস্থাবর সম্পদ ব্যাংকের অগোচরে বিক্রি করে দেন। বস্তুত, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের তহবিল সরিয়ে ফেলার (ফান্ড ডাইভারশন) বিষয়টি প্রমাণসাপেক্ষ বলে ব্যাংকগুলোকে এই শ্রেণীকরণ করতে গিয়ে নানা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছিল। এই বাধা এড়ানোর জন্য নতুন শ্রেণীকরণের এই উদ্যোগ। কারণ, অসহযোগী ঋণগ্রহীতাদের বিষয়ে এ রকম কোনো প্রমাণের আবশ্যকতা নেই।
উল্লেখ্য, গত বছরের শেষে ভারতের কিংফিশার এয়ারলাইনসের প্রায় সাত হাজার কোটি রুপি খেলাপি ঋণ আদায়ের উদ্দেশ্যে কলকাতার একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কিংফিশার বিয়ার খ্যাত বিজয় মালিহাকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি ঘোষণা করার পর সে দেশের আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রকদের টনক নড়ে। পরবর্তী সময়ে অবশ্য কলকাতা হাইকোর্ট এই ঘোষণাকে স্থগিত করে দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দরিদ্র ও কৃষকবান্ধব ব্যাংকিং, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক সেল গঠন, গ্রিন ব্যাংকিংসহ মানবিক ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন প্রশংসনীয় ও অনন্য উদ্যোগের পাশাপাশি ৫০০ কোটি টাকা এবং তদূর্ধ্ব ঋণ পুনর্গঠনের একপেশে ছাড়ের বিধানটি আদৌ বাংলাদেশ ব্যাংক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে করেছে কি না, সে বিষয়ে ঘোরতর সন্দেহ আছে বিজ্ঞ সমাজের। কারণ, কয়েক বছর আগে সরকার যখন খোলামেলা স্বীকার করেই রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রয়োজনহীনভাবে কিছু নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স দিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেই প্রভাবকে বাধা দিতে পারেনি।
অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, আমাদের দেশের খেলাপি ঋণ সংস্কৃতিতে বড় গ্রহীতারা সব সময়ই সুদ মওকুফ, হ্রাসকৃত সুদ, দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি–সুবিধাসহ নানা ধরনের ছাড় পেয়ে আসছেন, অথচ এই তারকা খেলাপিরা ঋণ পরিশোধের জন্য তাঁদের জীবনযাপনের কোনো স্বাচ্ছন্দ্য কখনো উৎসর্গ করেছেন, এমন কোনো নজির নেই। এমনকি তাঁদের খেলাপি ঘোষণার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থায় আদালতের স্থগিতাদেশের মতো রক্ষাকবচ ব্যবহার করেও তাঁরা আরও ব্যাংকঋণ গ্রহণের পথ সুগম রাখার প্রয়াস পান। এসব সুবৃহৎ খেলাপির অনেককেই বিভিন্ন সময়ে সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বিদেশে সফরসঙ্গী হতেও দেখা যায়।
তবে ভরসার কথা, সুবৃহৎ ঋণগ্রহীতাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের এই সুযোগটি দেওয়া হয়েছে সীমিত সময়ের জন্য, চলতি বছরের ৩০ জুনের মধ্যে এ ধরনের ঋণ পুনর্গঠনের প্রস্তাব বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদনের জন্য পেশ করতে হবে। এই ব্যবস্থার পরও কোনো গ্রহীতা আবার খেলাপি হলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং শেষাবধি দেউলিয়া আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকবে ব্যাংকগুলোর। এ রকম কঠোর শর্তের পর সুযোগটি নিতে কয়টা প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কারণ, এই সুবিধা গ্রহণ করার পর খেলাপি হলে দেউলিয়া আইনের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠনের পর পরবর্তী ১২ বছরের মধ্যে আবার খেলাপি হয়ে পড়লে সুবৃহৎ এসব গ্রহীতার বিষয়ে আদৌ কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Sunday, February 15, 2015

সেই ভস্মে ঢাকা পম্পেই by ফারুক মঈনউদ্দীন

রোমের মূল রেল স্টেশনটার নাম কায়দা করে স্থানীয় উচ্চারণে বলতে হয় 'তেরমিনি,' আমাদের সহজ ইংরেজিতে যাকে বলা যায় টার্মিনাস বা টার্মিনাল। ভিয়া পালেস্ত্রো অর্থাৎ পালেস্ত্রো স্ট্রিটের কন্টিনেন্টাল হোটেল থেকে তেরমিনির দূরত্ব হাঁটাপথে পাঁচ মিনিট। হোটেলের নাম শুনে কারও ভাবা উচিত নয় এটি কোনো তারকাখচিত হোটেল। আসলে এই ভিয়া পালেস্ত্রোর প্রাচীন ভবনগুলোর বিশাল দরজার ওপাশে বিভিন্ন তলার প্রায় প্রত্যেকটিতে কয়েকটা করে ব্রেড অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট হোটেল রয়েছে। আমাদের হোটেলটি যে বিল্ডিংয়ে সেখানেও বিভিন্ন তলায় কমপক্ষে চারটি হোটেল রমরমা ব্যবসা করছে, আরও বেশিও থাকতে পারে। কন্টিনেন্টাল হোটেলে চেক ইন করার সময় কাউন্টারের মেয়েটি পাসপোর্ট রেখে দিয়েছিল ফটোকপি করার জন্য। পরে যখন পাসপোর্ট ফেরত নিতে যাই মেয়েটি বলে, আপনি প্রফেসর ইউনূসকে চেনেন?
আমি একটু চমকে যাই। বলি_ চিনি, তবে তিনি আমাকে চেনেন না। কেন বলো তো?
মেয়েটি বলে, পাসপোর্টে আপনার স্থায়ী ঠিকানা দেখলাম চিতাগং, প্রফেসর ইউনূসও চিতাগংয়ের লোক, তাই না? এবার বিষয়টা খোলাসা হয়। যাক, মেয়েটির কাছে আমাদের দামটা একটু বেড়ে গেল।
আমরা যখন রোম থেকে বারি হয়ে দক্ষিণ ইতালির মাতেরা যাই, পরিকল্পনা করেছিলাম ফেরার পথে পম্পেই ঘুরে আসব। কিন্তু আবার নেপলসে এক রাত থাকতে হবে, এসব সাত-পাঁচ ভেবে আর যাই না। তাই রোম থেকেই পম্পেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। তেরমিনি স্টেশন থেকে নেপোলির (নেপলস) টিকিট কিনতে গিয়ে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে পরীক্ষামূলকভাবে একপাশে সারি সারি বসানো সেলফ সার্ভিস টিকিট মেশিনগুলোর বুথে ঢুকে যখন টিকিট কাটার চেষ্টা করছিলাম, তখন এক তরুণ এসে বলে, কী পারছেন না? আমি হেল্প করছি। ওর নির্দেশ মোতাবেক বিভিন্ন বোতাম টেপাটেপির পর নির্দিষ্ট তারিখের টিকিটগুলো যখন মেশিনের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে, তখন বুঝতে পারি ব্যাপারটা কত সোজা। খামোখা লাইনে দাঁড়িয়ে এত সময় নষ্ট হলো। তাই ছেলেটি যখন কিছু বকশিশ দাবি করে, তাকে ৫০ ইউরো দিতে কোনো দ্বিধা হয় না।
আমরা রোমের তেরমিনি থেকে নেপোলির উদ্দেশে যখন রওনা হই, তখন সকাল প্রায় সোয়া সাতটা, প্লাটফর্মে অপেক্ষমাণ ট্রেনের পাশে দাঁড়িয়ে বিশাল ভুঁড়িওয়ালা ট্রেন ড্রাইভাররা হুশ হুশ করে সিগারেট টানছিল। তেরমিনি থেকে নেপোলির দূরত্ব সাধারণ ট্রেনে ঘণ্টা দুয়েকের। তবে দ্রুতযানও আছে, সময় লাগে ৭০ মিনিট। সকাল ৯টার ট্রেন ধরে নেপলস সেন্ট্রাল স্টেশনে পেঁৗছি ঠিক ১০টা ১০ মিনিটে। এখান থেকে ট্রেন বদল করে প্রাইভেট লাইন সারকামভিসুভিয়ানার পম্পেই_সরেন্তোর লোকাল ট্রেন ধরে নামতে হবে পম্পেই স্কাভি স্টেশনে। নেপোলি সেন্ট্রাল স্টেশনের প্লাটফর্ম থেকে একতলা নিচে নামলে লোকাল ট্রেনের প্লাটফর্ম। সেখানে গিজগিজ করছে মানুষ, সবাই যে পম্পেই যাচ্ছে তা নয়। অপেক্ষমাণ সেই সব যাত্রীর ফাঁকফোকর গলে ভিক্ষা করছিল জিন্স প্যান্ট এবং পরিষ্কার শার্ট পরা এক অপরূপ সুন্দরী ইতালীয় তরুণী, তার কোলে বছরখানেকের একটা বাচ্চা, পিঠে ঝোলানো র‌্যাকস্যাক। একটা গ্গ্নাস নিয়ে এর-ওর সামনে গিয়ে চুপচাপ দাঁড়াচ্ছিল হাত বাড়িয়ে, কিছু না দিলে পরক্ষণেই হাত সরিয়ে নিয়ে চলে যাচ্ছিল আরেকজনের সামনে, আমাদের দেশেরগুলোর মতো ঘ্যানঘেনে নাছোড়বান্দা টাইপ নয়। তাই তেমন কোনো উপার্জন হতে দেখি না মেয়েটির। এমন শরীরে শার্টের ওপরের দুটি বোতাম খোলা অবস্থায়ও সেই সুন্দরী ভিখারিণী কারও মন গলাতে পারে না দেখে মনে মনে ভাবি, ইউরোপীয় মন্দা ইতালিতে সত্যিই জেঁকে বসেছে।
নেপোলি থেকে পম্পেই স্কাভি লোকাল ট্রেনেই আধা ঘণ্টার পথ। ছোট্ট স্টেশনটি থেকে বের হয়ে অল্প কিছুদূর হাঁটলেই মৃত নগরী পম্পেইর গেট। টিকিট কাউন্টারের সামনে দর্শনার্থীর একটা মাঝারি লাইন, তার পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই ওখানকার সুপারভাইজার গোছের একজন এসে বলে, নমস্তে। আমি কিছু বলার আগে মিনা বলে ওঠে, জি-না, আমরা ইন্ডিয়ান নই, উই আর ফ্রম বাংলাদেশ। ওর দেশপ্রেম খুব প্রবল। লোকটি মোটেই বিব্রত হয় না, বলে, ওহ, দ্যাটস ফাইন। অ্যানিওয়ে, ওয়েলকাম টু পম্পেই।
জনপ্রতি ১১ ইউরোর টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর প্রথম দর্শনে পম্পেইর মৃত নগরীর যে চেহারা চোখে পড়ে সেটি হচ্ছে ধূসর, আধপোড়া মতো দেখতে এক নগরীর ভগ্নস্তূপ। আসলে আধপোড়া নয়, আগ্নেয় ভস্মের নিচে প্রায় ১৭০০ বছর চাপা পড়ে ছিল বলে অবচেতনে মনে হয় আধপোড়া কালচে ছাই। পম্পেইর ধূসরতা এবং প্রায় বৃক্ষবিবর্জিত রুক্ষ পরিবেশ হাজার বছর ধরে ভস্মস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা নগরীর ভগ্নস্তূপটিকে দিয়েছে একধরনের কাঠিন্য। পরিকল্পিত ছোট্ট শহরটির পাথর বিছানো পথ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে হয় প্রথম শতাব্দীর সমৃদ্ধ এই নগরী যেন থমকে দাঁড়িয়েছিল ৭৯ খ্রিস্টাব্দের ২৪ আগস্টের সকালে, তারপর থেকে আর সামনে এগোয়নি, কেবল ক্ষয়ে চলেছে নীরবে। অথচ নগরীটি খ্রিস্টপূর্ব সময় থেকেই ছিল সমৃদ্ধ। খ্রিস্টপূর্ব ৮৯ অব্দে এটি রোমান সম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর অবকাঠামোগতভাবে প্রভূত উন্নয়ন লাভ করে, যার বেশিরভাগই ঘটে সম্রাট অগাস্টাসের শাসনামলে। কৃষি জমির উর্বরতার কারণে জনসংখ্যার আপেক্ষিক ঘনত্ব ছিল এখানে বেশি এবং সমৃদ্ধিও আসে তার হাত ধরে। এখানে তৈরি করা হয়েছিল অ্যামফিথিয়েটার, জিমনেশিয়াম, এমনকি ইনডোর সুইমিং পুল। রাস্তার কলগুলোতে জলপ্রবাহ নিশ্চিত করতে তৈরি করা হয়েছিল যথার্থ সরবরাহ লাইন। তৈরি করা হয়েছিল চারটি গণহাম্মাম। ভূতত্ত্ববিদ ফিলিপ জেনির মতে আগ্নেয় পর্বতের বিপদের মধ্যেও একটা বৈপরীত্য রয়েছে, এসব পাহাড়ের মাটি থাকে উর্বর, তাই তার চারপাশে লোকজনের বসতিও বেশি। পম্পেইর বেলায়ও ঠিক তাই ঘটেছিল। বিসুভিয়াসের মাত্র আট কিলোমিটার দূরত্বের প্রাচীন পম্পেই নগরীর উপকণ্ঠে ছিল বহু ধনাঢ্য কৃষিজীবীর বাস। প্রাচীনকাল থেকেই এই শহরের সমৃদ্ধি এবং বহু ধরনের নাগরিক সুবিধা এবং আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য ছিল এই ধনাঢ্য শ্রেণীর লোকজন।
টিকিট কেটে ভেতরে ঢোকার পর নগরীর মূল ফটকটি ধনুকাকৃতি ছাদের নিচে, বেশ খাড়া একটা পাথুরে পথ বেয়ে উঠতে হয়। এই ফটকটির নাম 'পোর্তা মেরিনা' অর্থাৎ 'সাগরমুখী দরজা'। এখান থেকে প্রাচীন নগরীর মূল কেন্দ্র 'ফোরাম'-এ পেঁৗছে যাওয়া যায়। গেটটির ঠিক পাশেই অপেক্ষাকৃত সরু আরেকটি তোরণ, এটিতে পেঁৗছার জন্য ভাঙতে হয় বেশ কিছু সিঁড়ির ধাপ। প্রথম ফটকটি ছিল ঘোড়া এবং যান চলাচলের জন্য, আর দ্বিতীয়টি ব্যবহৃত হতো পথচারীদের জন্য। বলাবাহুল্য পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট ফটকটি খোলা নয়, দর্শনার্থীদের বড় ফটকটিই ব্যবহার করতে হয়। তবে এখান দিয়ে এখন আর গাড়িঘোড়া ঢোকে না। লাভার টালি বিছানো পথ ধরে এগিয়ে গেলে হাতের ডানে পড়বে 'ভেনাস মন্দির', তবে নামেই কেবল মন্দির, এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই, একটা থামের ভগ্নাবশেষ, আর কিছু বড় বড় পাথরের চাঁই ছাড়া একসময় নগরীর রক্ষাকর্ত্রী দেবী ভেনাসের মন্দিরটি এখন একটা খোলা জায়গা ছাড়া আর কিছু নয়। চোর ছ্যাঁচোড়ের হাত থেকে ভগ্নাবশেষগুলো রক্ষা করার জন্যই নাকি গ্রিলের দেয়াল দিয়ে জায়গাটা ঘেরা। ওসবের ভেতর দিয়ে এগিয়ে গেলে পাহাড়ের ধারে দাঁড়িয়ে বহুদূর অবধি নিচের লোকালয় দেখা যায়।
ভেনাস টেম্পল পেরিয়ে গেলে ব্যাসিলিকা। এটি ছিল পম্পেইর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গণস্থাপনা, গির্জা এবং বিচারালয়। ভবনটি পুরোপুরি না হলেও আংশিক অক্ষত আছে ছাদসহ, তবে বেশিরভাগ অংশ ধ্বংসপ্রাপ্ত, কেবল দাঁড়িয়ে রয়েছে লম্বালম্বি খাঁজকাটা গোল ইটের স্তম্ভগুলো। এটার পাশেই তৃতীয় শতাব্দীতে তৈরি দেবতা অ্যাপোলোর মন্দির, এখন কেবল কিছু ভাঙা থামের সারির মাথায় খিলান আর কিছু সিঁড়ির ধাপের মাঝে ঘাসে ঢাকা খোলা জায়গা ছাড়া আর তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই। তবে সামনে কালো গ্রানাইটে দেবতা অ্যাপোলোর মূর্তিটা রয়েছে, দুই হাতের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায় তীর-ধনুক বাগিয়ে ধরা ছিল, তবে ধনুকটি এখন আর না থাকায় মূর্তিটির দুই হাতের ভঙ্গিমাকে নাচের মুদ্রা বলে মনে হয়।
৭৯ খ্রিস্টাব্দের যে অগ্ন্যুৎপাতে পম্পেই নগরী ধ্বংস হয়েছিল, তার বেশ কিছু আগে থেকেই সেখানে মাঝে মাঝে মাঝারি মাপের ভূমিকম্প হতো। তবে ৬২ খ্রিস্টাব্দে বেশ বড় একটা ভূমিকম্পে শহরটির যথেষ্ট ক্ষতি সাধিত হয়েছিল। সেদিন ছিল সম্রাট অগাস্টাসের জাতির পিতা উপাধি প্রাপ্তির বার্ষিকী। তবে সেই উদযাপন উৎসব ভূমিকম্প-পরবর্তী বিশৃঙ্খলা, এদিক সেদিক জ্বলন্ত বাতির তেল থেকে সৃষ্ট অগি্নকাণ্ড, বিধ্বস্ত ঘরবাড়িতে চুরি ও লুটপাট এবং বেঁচে থাকা মানুষের অনাহারের ফলে ম্লান হয়ে গিয়েছিল।
পম্পেইর বহু নিদর্শন ভস্মের নিচে ১৭০০ বছর চাপা পড়ে থেকেও অবিকৃত অবস্থায় রয়ে গেছে_ এই বিস্ময়ের জবাব মেলে যখন জানা যায় চাপাপড়া অবস্থায় বাতাসের সংস্পর্শে না আসাই এর মূল কারণ। ফলে খুঁড়ে আবিষ্কার করার পর একদিকে যেমন এসব অবিকৃত নিদর্শন প্রথম শতাব্দীর পম্পেইবাসীর জীবনপ্রণালি সম্পর্কে গবেষণার খোরাক জুগিয়েছে, আবার অন্যদিকে আলো, হাওয়া, জল এবং মানবস্পর্শের কারণে এসবের ক্ষয়প্রাপ্তির সম্ভাবনাও বেড়েছে।
বিসুভিয়াস আগ্নেয় পর্বত যেদিন বিস্টেম্ফারিত হয়, সেদিন নেপলস উপসাগরে অবস্থানরত নৌবাহিনীর জাহাজের অধিনায়ক প্লিনি দ্য এলডার চরম দুঃসাহস দেখিয়ে জাহাজ নিয়ে এগিয়ে গিয়েছিলেন উদগিরণরত বিসুভিয়াসের দিকে, যাতে আরও কাছ থেকে অগ্ন্যুপাতের দৃশ্য দেখা যায় এবং সেটির কাছাকাছি উপকূল থেকে উদ্ধার করা যায় তাঁর আত্মীয়-স্বজন এবং অন্যান্য উপদ্রুত মানুষজনকে। তবে তাঁর সেই উদ্যোগ সফল হয়নি, অগ্ন্যুৎপাতের ফলে জাহাজেই মারা গিয়েছিলেন তিনি।

Sunday, February 1, 2015

কূটনীতি- ওবামার ভারত সফর ও ‘ব্যক্তিগত’ বিড়ম্বনা by ফারুক মঈনউদ্দীন

সাত্ত্বিক ঠাকুরের পঞ্জিকা পড়ার মতো আমার জোড়া পাসপোর্টের পাতার পর পাতা উল্টে যাওয়ার পর দিল্লি এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন অফিসারের প্রশ্নটা শুনে আমি তাজ্জব বনে যাই, তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপ পাকিস্তানসে আ রাহা হুঁ?’ আমার মাথায় রক্ত চড়ে গেলেও ইমিগ্রেশন অফিসারদের সঙ্গে বেশি তর্ক করা ঠিক নয় ভেবে আমি কণ্ঠে যথাসাধ্য বিনয় যুক্ত করে বলি, আরে, কী বলছেন আপনি? দুনিয়ার এত দেশ ঘুরলেও অই দেশটিতে কখনোই যাইনি আমি। সরাসরি ঢাকা থেকে এলাম আপনাদের জেট এয়ারওয়েজে। কেন আমার পাসপোর্টে পাকিস্তানের ভিসা বা মোহর দেখা যাচ্ছে? লোকটি এই কথার কোনো জবাব না দিয়ে বেশ সময় নিয়ে আমার পাসপোর্টে মোহর মারে। দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্টটা বিশাল, সব আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মতোই। আমাদের প্রতিবেশী দেশ বলে এবং ঢাকার সঙ্গে তুলনা করি বলেই ‘বিশাল’ বিশেষণটা আপনা-আপনিই চলে আসে। চলন্ত হাঁটাপথ না থাকলে অত দূর পথ হেঁটে এসে ইমিগ্রেশন কাউন্টারে পৌঁছাতে জিব বেরিয়ে যেত। ইমিগ্রেশন কাউন্টারগুলোর সামনে বহু আফগানি যাত্রীকে দেখে ভাবছিলাম, আমাদের কপালের বিড়ম্বনা আজ ঠেকায় কে। এমনিতেই ঢাকা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে দেড় ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে একেবারে শেষ সময়ে প্রায় দৌড়ে প্লেনে উঠতে হয়েছিল বলে তখনই মনে কুডাক দিচ্ছিল। ঢাকার ইমিগ্রেশন কাউন্টারে আরও চটপটে কম্পিউটার ÿঅফিসারদের বসালে এই যাত্রী ভোগান্তির কিছু অবসান ঘটতে পারে, এই কথাটা প্রতিবার বিদেশ যাত্রার সময় ইমিগ্রেশন করতে এসে মনে পড়লে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ সার্ভিসের বন্ধুদের বলতে চেয়েও বলা হয়নি। আমাদের সবুজ পাসপোর্ট দেখেও সেবার ভোরবেলায় রোম বিমানবন্দরে একটিও প্রশ্ন না করে ঘুম ঘুম চোখে অফিসারটি যখন আমাদের পাসপোর্টগুলো স্ক্যান করার পর ঝপাং করে মোহর মেরে দেন, সেদিনই উপলব্ধি করেছিলাম, আমাদের এখানে আরও কিছু ডিজিটাল সংস্কার প্রয়োজন।
দিল্লিতে আমার স্ত্রীর পাসপোর্টটা স্ক্যান করার পর অফিসারটি আচমকা উঠে গিয়ে ওটা ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য সহকর্মীর হাতে তুলে দেন এবং লোকটি পাসপোর্টের পাতার পর পাতা উল্টে যেতে থাকেন, তখন মনে হলো, তাঁরা নারী তালেবান বা আইএস জঙ্গিদের কারও সন্ধান লাভ করেছেন। ততক্ষণে পাশের কাউন্টার থেকে আমার ডাক পড়ে। আমাকে অন্য কাউন্টারে গিয়ে দাঁড়াতে দেখে পাসপোর্টের মালকিন এপাশ থেকে অসহিষ্ণু কণ্ঠে বলেন, ‘ক্যায়া কুছ গড়বড় হ্যায়?’ তখন লোকটি পাসপোর্টসমেত ফিরে এসে বলেন, ‘মেরা মেশিন খরাব হ্যায়।’ তারপর অন্য কাউন্টার দেখিয়ে ওখানে যেতে বলেন। এর মধ্যে আমার পাসপোর্টে কিংবা জাতীয়তায় পাকিস্তানি যোগাযোগ আবিষ্কার করে ফেলার কথা প্রথমেই বলেছি। দিল্লি এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশন অফিসারের পাকিস্তান থেকে আসছি কি না, প্রশ্নটা যতই সাদামাটা মনে হোক না কেন, আপাতনির্দোষ প্রশ্নটির ভেতর লুকিয়ে আছে বহু গুরুতর বিষয়। কারণ, পাসপোর্টে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সূত্রও না পাওয়া সত্ত্বেও কেবল সবুজ পাসপোর্টধারী হওয়ার কারণে এ রকম প্রশ্ন আমাদের স্বাধীন জাতীয় সত্তা ও ভাবমূর্তির জন্য অবমাননাকর। এ রকম প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত ১০ ট্রাক অস্ত্র কিংবা মুম্বাইয়ের ট্রেনে বিস্ফোরণের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো কোনো মহলের জড়িত থাকার ভারতীয় অভিযোগ। মুম্বাইয়ের ট্রেন বিস্ফোরণের অব্যবহিত পর কলকাতা বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনেও এই লেখককে ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছিল।
এবার দিল্লি পৌঁছার ঠিক দুই দিন পর ভারতের ৬৬তম প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ভারত সফরে আসেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কেবল আসা নয়, ওবামাই হচ্ছেন প্রথম মার্কিন প্রেসিডেন্ট, যিনি প্রজাতন্ত্র দিবসের আনুষ্ঠানিক কুচকাওয়াজের প্রধান অতিথি। অতএব দিল্লিজুড়ে সাজ সাজ রব হওয়াই স্বাভাবিক।
বিমানবন্দর থেকে মধ্য দিল্লিতে আসার পথে পড়ে আইটিসি মৌর্য হোটেল, এখানেই ওবামা ছিলেন। তাঁর নিরাপত্তার কারণে হোটেলটির রেস্তোরাঁতেও সব ধরনের সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন রাস্তার পাশ দিয়ে আনুষ্ঠানিক পোশাক পরা সওয়ারিসহ উটের একটা দীর্ঘ শোভাযাত্রা যাচ্ছিল, দুই দিন পরই প্রজাতন্ত্র দিবস, অতএব এসব মহড়া খুব স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু ধাক্কাটা লাগে আমাদের হোটেলে ঢোকার সময়। ঢাকার বড় হোটেলগুলোয় গাড়ি নিয়ে ঢোকার সময় গাড়ি চেক করা প্রায় গা-সহা হয়ে গেছে। কিন্তু দিল্লির চারতারা হোটেলটিতে বোর্ডার বা অতিথিদেরও শরীরে হাত দিয়ে আগাপাছতলা সার্চ করা দেখে বোঝা যায়, দিল্লি পুলিশের নির্দেশ অমান্য করার হিম্মত কিংবা ইচ্ছা এদের নেই। হোটেল থেকে বাইরে গেলে ফেরার সময় প্রতিবারই ব্যাগ তল্লাশি, শরীর তল্লাশিকে বাড়াবাড়ি রকম সতর্কতা মনে হলেও ভারতের বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটা মারাত্মক জঙ্গি হামলার কারণে পুলিশের এই বাড়তি সতর্কতাকে মেনে না নিয়ে উপায় থাকে না। তবু হোটেলের অপ্রশিক্ষিত নিরাপত্তারক্ষীদের একজন নতুন দায়িত্ব পেয়ে ক্যামেরার ব্যাগ খুলে লম্বা লেন্সটা আবিষ্কার করে সেটিকে দুরবিন মনে করে চোখে লাগিয়ে দেখতে চাইলে কণ্ঠে রাগ গোপন রেখে বলতে হয়, ভাইসাব, ইয়ে ক্যামেরা কা লেন্স হ্যায়। কনট প্লেসের একটা ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের দোকানে ঢুকতে চাইলে প্রহরী জানান, ক্যামেরা নিয়ে ঢোকা যাবে না। পরে বহু ঝামেলার পরও যখন ব্যাগের ভেতর ক্যামেরাটির প্রকৃত কাজ নিয়ে সন্দেহ করে জিনিসটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এটা-সেটা টেপাটেপি করে দেখতে গিয়ে ওটা প্রায় বিকল করে ফেলার উপক্রম করে, তখন তাকে বুঝিয়ে বলতে হয়, এটি আসলেই ক্যামেরা, কোনো দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রের কন্ট্রোল নয়। বৃদ্ধ লোকটিকে নাজেহাল করার জন্য তাঁর একটা ছবি তুলে দেখিয়ে দিতে চাইলে তিনি নিরস্ত হন। প্রজাতন্ত্র দিবস সামনে রেখে যেদিকেই যেতে চাই, ট্যাক্সিওয়ালাদের এককথা, ‘উধার বন্ধ হ্যায়।’ অথবা অনেক রাস্তা ঘুরে যেতে হবে, ‘বারাক ওবামা আ রাহা হ্যায় না?’ একজন তো রগড় করে বলেই ফেললেন, ‘ইয়ে ব্রেক ওবামা হ্যায়, সব কুছ ব্রেক কর দিয়া।’
ওবামার ভারত সফর বর্তমান ভারত সরকারের জন্য অবশ্যই বড় ঘটনা। এর আগে ১৯৯৪ সালে নরসিমা রাও যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী, তখন প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যদিও ক্লিনটন সে আমন্ত্রণ রক্ষা করতে পারেননি। সে ক্ষেত্রে নরেন্দ্র মোদি সরকারের হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি সত্ত্বেও এই সরকারের সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট যে আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সেটিকে কার্যকর করেছেন, তা ভারতের বর্তমান সরকারের জন্য একটা বিশাল বিজয় হিসেবে ধরে নিচ্ছেন দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে ২০০২ সালে গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় হাজার খানেক মুসলমান নিহত হওয়ার পর সেই দাঙ্গার উসকানিদাতা মনে করে ২০০৫ সালে তখনকার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা দেওয়া হয়নি। সেই মোদির আমন্ত্রণ পেয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তারা নাকি বিস্মিত হয়েছিলেন। কিন্তু স্বয়ং ওবামা এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করায় কারও আর বিস্ময়ের অবকাশ থাকে না। মোদি তাঁর এই আমন্ত্রণের সাফল্য দিয়ে এক ঢিলে অন্তত দুটি পাখি মেরেছেন। প্রথমত তিনি ভারতের আজন্ম শত্রু পাকিস্তানকে দেখিয়ে দিতে পেরেছেন যে উপমহাদেশীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র যত মহাশক্তিই হোক না কেন, সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং ভারতের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকছেন। দ্বিতীয় পাখিটি তিনি মেরেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র যে একজন ভারতীয় মুখ্যমন্ত্রীকে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার কারণে ভিসা দেয়নি, সেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং তাঁরই অতিথি। আরও কত পাখি যে উভয় তরফে বধ হয়েছে, সেটি রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বিষয়। যেমন ওবামা ইন্ডিয়া গেট-সংলগ্ন প্যারেড গ্রাউন্ডের উন্মুক্ত জায়গায় তিন ঘণ্টা বসে থেকে ভারতের সামরিক সরঞ্জামের যেসব প্রমাণ দেখেছেন, তার মধ্যে রাশিয়ান সমরাস্ত্রও আছে, সেটিরও রয়েছে কূটনৈতিক অর্থনীতি। অতএব মোদি যে এক ঢিলে একাধিক পাখি মেরেছেন তা যেমন ঠিক, ওবামাও বহু পাখি যে মেরেছেন, তাতে সন্দেহ নেই। তবে নরেন্দ্র মোদি তাঁর প্রধানমন্ত্রিত্বের অভিষেক অনুষ্ঠানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফকে যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন, তাতে কতটুকু আন্তরিকতা ছিল বোঝা যায়, কারণ এই আমন্ত্রণ সত্ত্বেও ভারতীয় পক্ষ থেকে পাকিস্তানের প্রতি কঠোর মনোভাবের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তা না ঘটাই উচিত পাকিস্তানের মতো একটি দেশের জন্য। ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের এই নতুন মেরুকরণ উপমহাদেশের রাজনীতিতে কতখানি প্রভাব ফেলবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না, তবে মোদি সরকারের জন্য এটা একটা বড় বিজয়, এ কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নন এমন মানুষও সহজেই বুঝতে পারবেন। আন্তর্জাতিক বা উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব উপেক্ষা করার মতো নয়, এবং সেই সম্পর্কের প্রভাব থেকে আমাদের জন্য হিতকর কিছু আহরিত হোক, এটা কামনা করা ছাড়া আমজনতার আর বেশি কিছু চাওয়ার নেই।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Monday, November 3, 2014

অর্থনীতিতে নোবেল ২০১৪- নিয়ন্ত্রণ বনাম মুক্তবাজার by ফারুক মঈনউদ্দীন

সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার সহজাত দুর্বলতা, অদক্ষতা ও গতানুগতিকতা দূর করার জন্য এগুলোকে ব্যক্তিমালিকানায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেগুলো যখন একচেটিয়া দানবে পরিণত হয়, তখন ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’র মূলমন্ত্র পরাভূত হয়—এই অজুহাতে সেটিকে ঠেকানোর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও সক্ষমতা বেশির ভাগ সরকারের থাকে না। আবার কোনো কোনো বড় প্রতিষ্ঠান একচেটিয়া বাণিজ্যিক স্বার্থে জনস্বার্থ বা ভোক্তাস্বার্থের হানি করে। এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে কীভাবে আরও উৎপাদনমুখী ও গ্রাহকবান্ধব করে তোলা যায়, সে বিষয়ে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার গবেষণাকর্মে অবদানের জন্য দেওয়া হয়েছে অর্থনীতিতে এ বছরের নোবেল স্মারক পুরস্কার (কারণ, আর পাঁচটি শাখার মতো এটি নোবেল কমিটি মনোনীত কিংবা আলফ্রেড নোবেলের উইলকৃত অর্থপুষ্ট নয়, সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরস্কারটি চালু করেছে নোবেল পুরস্কার চালু হওয়ার ৬৮ বছর পর)।

>>এবারের নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জঁ তিহল
এবারের পুরস্কার পেয়েছেন ফরাসি অর্থনীতিবিদ জঁ তিহল। উল্লেখ্য, ২০০০ সাল থেকে শুরু করে ২০১৩ সাল পর্যন্ত টানা ১৪ বছর অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার পেয়ে গেছেন মার্কিন অর্থনীতিবিদেরা, অবশ্য কোনো কোনো বছর তাঁদের সঙ্গে যৌথভাবে পেয়েছেন অন্য দেশের নাগরিকদের কেউ কেউ। ২০১৪ সালে এসে জঁ তিহল তৃতীয় ফরাসি নাগরিক হিসেবে এককভাবে এই পুরস্কার জিতে নেন।
৩০ বছর ধরে গবেষণা করে জঁ তিহল দেখিয়েছেন, কীভাবে স্বল্পসংখ্যক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভোক্তাদের ক্ষতি করে এবং নির্দেশনা দিয়েছেন সরকার কীভাবে এই প্রবণতা মোকাবিলা করতে পারে। এটি কার্যকর করতে গিয়ে একই ধরনের ও মাত্রার নিয়ন্ত্রণ যদি সব খাতের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তা কার্যকর হয় না। তাই প্রতিটি খাতের জন্য প্রযোজ্য নিয়ন্ত্রণের নীতিমালা ভিন্ন হওয়া দরকার। কারণ, এক খাতের জন্য তৈরি নিয়মাচার দিয়ে অন্য খাতকে কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না।
নোবেল কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বহু শিল্পে স্বল্পসংখ্যক বৃহৎ প্রতিষ্ঠান কিংবা একটি একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকে। অনিয়ন্ত্রিত অবস্থায় থাকার কারণে এ-জাতীয় বাজার থেকে প্রায়ই সামাজিকভাবে অবাঞ্ছিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়—যেমন: উৎপাদন ব্যয়ের চেয়ে বেশি দাম, আরও বেশি উৎপাদনশীল নতুন প্রতিষ্ঠানের বাজারে প্রবেশ ঠেকিয়ে দিয়ে কম অনুপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের টিকে থাকা ইত্যাদি।
নোবেল কমিটির মতে, জঁ তিহল এ-জাতীয় বাজার-ব্যর্থতার বিষয়ে গবেষণায় নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছেন। বলা হয়েছে, তাঁর আগে গবেষক ও নীতিনির্ধারকেরা সব শিল্পের জন্য একই সাধারণ নীতিমালা প্রয়োগ করতে চাইতেন, যেমন বিক্রয় মূল্য বেঁধে দেওয়া ইত্যাদি। জঁ তিহল তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, এ রকম নীতিমালা নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে ভালো কাজ দিতে পারে, কিন্তু অন্যদের জন্য ভালোর চেয়ে খারাপটা করে বেশি। তাই কানুন কিংবা প্রতিযোগিতার নীতিমালা প্রতিটি শিল্পের উপযোগী করে আলাদাভাবে তৈরি করা উচিত। তিহল টেলিযোগাযোগ থেকে শুরু করে ব্যাংকিং পর্যন্ত বিভিন্ন খাতের জন্য প্রযোজ্য নীতিমালা প্রণয়নের উপযোগী কাঠামো নির্দেশ করেছেন, যাতে সরকার কিংবা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বড় ও প্রভাবশালী সব প্রতিষ্ঠানকে তাদের প্রতিযোগী ও ভোক্তাদের ক্ষতি না করে আরও উৎপাদনশীল হওয়ার প্রণোদনা দিতে পারে। এবারের নোবেল স্মারক পুরস্কারের প্রধান বলেছেন, আমরা সব সময়ই বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বড় ও শক্তিমান প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সমাজের সর্বোচ্চ স্বার্থে কাজ করে, তার জন্য কী ধরনের আইন ও প্রতিযোগিতার নীতিমালা প্রণয়ন করা যায়। তবে তিহল এ কথারও জবাব দিয়েছেন তাঁর মতো করে। তিনি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এসব বিধান হতে হবে এমন, যাতে উদ্যোক্তা বা উদ্যোগ মরে না যায়। তাঁর মতে, স্বাভাবিক গতিতে বাজার যাতে চলতে পারে, তার জন্য দরকার একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা। অথচ প্রতিষ্ঠানগুলো খুব বেশি বড় ও প্রভাবশালী হয়ে উঠলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে প্রায়ই ব্যর্থ হতে হয়। এ-জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণকারী সরকারি সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়ে এবং আইনের অপব্যবহার করে তাদের প্রতিযোগীদের জন্য বাধা সৃষ্টি করে।
তিহলের এই মন্তব্য আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য কতখানি প্রযোজ্য, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ রকম উপসর্গ আরও ভয়াবহ। রাজনীতিবিদ ও প্রভাবশালীদের চাপে প্রতি পদে যেখানে আইনের লঙ্ঘন ঘটে, ব্যাহত হয় সুশাসন, সেখানে তিহলের হিতোপদেশ ও কৌশলপত্র কতখানি কার্যকর হতে পারে? পুরস্কার কমিটির এক সদস্য এই বাস্তবতা স্বীকার করে বলেছেন, রাজনীতিবিদেরা যদি তাঁর উপদেশ না ধরেন, তাহলে তাঁরা হবেন নির্বোধ। তাঁরা কখনোই কথা শোনেন না।
একচেটিয়া ব্যবসা ও বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার বিষয়ে গবেষণার পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়েও তিহলের দৃঢ় মনোভাব প্রকাশ পায়। এটি উদ্ভূত হয়েছে আমেরিকার সাব-প্রাইম সংকট থেকে শুরু হওয়া আর্থিক খাতের বিপর্যয়ের ঘটনা থেকে। ২০০৭ সালে আমেরিকার আর্থিক বাজারের এই বিপর্যয় সারা বিশ্বকে আলোড়িত করেছিল। আজ আর কারও অজানা নেই যে সেই সময়কার শিথিল নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা কিংবা অপর্যাপ্ত নজরদারিই এই সংকটের জন্য দায়ী। সেই বিপর্যয়ের ওপর তিহল আরও দুই অর্থনীতিবিদ, বেলজিয়ামের মাথিয়াস দেভাত্রিপন্ত এবং ফ্রান্সের জাঁ শার্ল রশের সঙ্গে মিলিতভাবে লেখেন ব্যালান্সিং দ্য ব্যাংকস: গ্লোবাল লেসনস ফ্রম দ্য ফিনানশিয়াল ক্রাইসিস (২০১০) শিরোনামের একটি বই। সেবারের সংকটের আবর্তে পড়ে বহু ব্যাংক ধসে পড়ার উপক্রম হলে সরকারিভাবে সেগুলো উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়। আর্থিক খাতের এই বিপর্যয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে সংকটে পড়া ব্যাংকগুলো কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, বর্তমান বিশ্বের বৃহৎ, পরস্পরযুক্ত ও জটিল ব্যাংকিং-ব্যবস্থায় আরও দক্ষতা ও স্বল্প ঝুঁকি নিশ্চিত করা যায়, সেই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বইটিতে।
গ্রন্থকারেরা মনে করেন, আর্থিক বাজারে উদ্ভাবিত ব্যাংকিং-সেবার সম্পূরক ও পরিপূরক বিভিন্ন সেবার কারণে কিছু কিছু নিয়ন্ত্রণমান শিথিল করা হয়েছে। কারণ, অন্য সব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নজরদারি ব্যাংকগুলোর তুলনায় অপেক্ষাকৃত শিথিল। তিহল ও তাঁর সহযোগীরা সমালোচনার সুরে উল্লেখ করেন, এমনকি বাসেল–২-তে মূলধন-পর্যাপ্ততার মাপকাঠিও নামানো যাবে, যদি ব্যাংকগুলো দেখাতে পারে তাদের ঝুঁকির হার সীমিত। উদাহরণ হিসেবে দেখানো যায় ঋণঝুঁকি নিরূপণে ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের ক্রেডিট রেটিং উন্নত হলে সেই ঋণের বিপরীতে মূলধন-পর্যাপ্ততার হার কমিয়ে রাখা সম্ভব। অর্থাৎ, একটা রেটিং এজেন্সির মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করবে ব্যাংকের ঋণঝুঁকির বিপরীতে সংরক্ষিত মূলধনের পরিমাণ। গ্রন্থকারেরা এর বিপদ সম্পর্কে খোলাখুলি না বললেও এ কথা অনস্বীকার্য যে মূলধন সংরক্ষণের কিছু ক্ষেত্রে রেটিং এজেন্সির ওপর পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও ঝুঁকি আছে। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন গজিয়ে ওঠা অনেক রেটিং এজেন্সির হাতে দুর্বল হিসাবরক্ষণকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের রেটিং কতখানি নির্ভরযোগ্য হবে, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।
গ্রন্থকারত্রয় আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে বাসেল–২ সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের পর ঝুঁকি মূল্যায়নের কাজটি ব্যাংকগুলো নিজেরাই করবে (ইন্টারনাল রিস্ক বেজড মডেল—আইআরবি), অর্থাৎ একপর্যায়ে স্বাধীন কোনো তৃতীয় পক্ষের করণীয় কাজটি ব্যাংক নিজেরাই সমাধা করার সুযোগ পাবে। তিহলদের আশঙ্কা, এসব ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেলের নানাবিধ জটিলতার কারণে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের পক্ষে সেসবের পূর্ণ নিরীক্ষা দুরূহ হয়ে পড়বে, যদিও সেসব মডেলের বিভিন্ন উপাদান ও নিয়ামক কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমেই নির্ধারিত হবে। লেখকত্রয়ের এই আশঙ্কার আলোকে আমাদের দেশের বাস্তবতায় ব্যাংকগুলোর হাতে নিজ নিজ ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষমতা অর্পণ করলে তার অপব্যবহার হবে কি না, সেটি ভেবে দেখতে হবে। কারণ, আমাদের দেশে এই স্বচ্ছতা ও পেশাগত সততার সংস্কৃতি এখনো গড়ে ওঠেনি। যদিও ২০১৫ সালের মধ্যে আইআরবি মডেল বাস্তবায়নের কর্মসূচি রয়েছে, কিন্তু এ ব্যাপারে আমাদের যথাযথ প্রস্তুতি ও যোগ্যতা নেই। ফলে এটি আদৌ বাস্তবায়ন করা উচিত কি না ভেবে দেখা উচিত।
তিহল ব্লুমবার্গ টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যেসব ব্যাংক সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উদ্ধার পায়, তাদের জন্য কঠোরতর আইন হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেছেন, করদাতা নাগরিকদের টাকায় ব্যাংকগুলো যাতে ফাটকাবাজি না করতে পারে, তা ঠেকানোর জন্য কড়া আইন থাকা দরকার। যদি তাদের উদ্ধার করতে হয়, তাহলে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও রাখতে হবে। আমাদের দেশের বেসিক ব্যাংককেও বিসিসিআই পতনের পর সরকারিভাবে উদ্ধার করা হয়েছিল। অথচ সেই ব্যাংকের সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারি তিহলের এই মতের পক্ষে জোরালো সাক্ষ্য দেয়, যথাযথ আইন থাকলেও এই ব্যাংকের জন্য সেসবের কিছুই যেন প্রযোজ্য ছিল না। এই মারাত্মক ব্যত্যয়ের কারণও আমরা জানি: রাজনৈতিক প্রভাব। রাষ্ট্রীয়, তথা রাজনৈতিক প্রভাবের কথাও তিহল তুলে এনেছেন, যা রোধ করার জন্য দেওয়া তাঁর কৌশলপত্রের স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি। বছর দুই আগে আমেরিকায় ‘ওয়াল স্ট্রিট দখল করো’ আন্দোলনের বিক্ষোভকারীদের দাবি ছিল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন মুদ্রা ও শেয়ার ব্যবসাসম্পর্কিত আইনগুলো বাস্তবায়ন করা। স্পষ্টতই এসব দাবির মূল প্রতিপাদ্য ছিল অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পুঁজিবাদী শোষণ, সম্পদের পুঞ্জীভবন ও সরকার এবং তার আইনের ওপর বৃহৎ করপোরেটদের অন্যায় প্রভাবের বিরুদ্ধে। এটি তিহলেরও গবেষণার বিষয়। ব্যবসায় একচেটিয়াতন্ত্র সম্পর্কে তিহলের মতবাদ আমাদের আরও একবার স্মরণ করিয়ে দেয় লেনিনের ধারণার কথা, যখন মুক্তবাজার পরিণত হতে পারে একচেটিয়া পুঁজিবাদে। এই পর্যায়ে রাষ্ট্রই একচেটিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। লেনিন দেখিয়েছেন, কীভাবে দৈত্যাকার প্রতিষ্ঠানগুলো কার্টেল ও সিন্ডিকেট গঠন করে বিভিন্ন বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করে। তিহলও এ রকম কার্টেল ও একচেটিয়াবাদের বিপদ সম্পর্কে সরকার ও নিয়ন্ত্রকদের সতর্ক করেছেন। আমরা ঠিক জানি না তিহল নিয়ন্ত্রণবাদী, নাকি নিয়ন্ত্রণবিরোধী মুক্তবাজারের সমর্থক। কিন্তু তাঁর মতবাদের মধ্যে নিয়ন্ত্রণকে সমর্থন ও একচেটিয়াতন্ত্রের বিরোধিতার মনোভাব প্রতিফলিত।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Tuesday, October 14, 2014

বিদেশি ঋণ- শঙ্কা ও সম্ভাবনা by ফারুক মঈনউদ্দীন

পুঁজির একটা প্রধান প্রবণতা হচ্ছে বেশি মুনাফা এবং স্বল্প ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রের দিকে ধাবিত হওয়া। এই নিয়মের ব্যত্যয় ঘটা হবে অস্বাভাবিকতা কিংবা ব্যতিক্রম। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণ গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে পুঁজির এই সহজাত ধর্মটি নতুনভাবে উপস্থাপিত হয় আমাদের সামনে। বাংলাদেশের বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যে আপন যোগ্যতায় বিদেশি সূত্র থেকেও ঋণ গ্রহণ করার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তার উপযোগিতা বিচার বাদ দিলেও বাংলাদেশের মতো ভাবমূর্তির দেশের জন্য এটি শ্লাঘার বিষয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গবেষণাপত্রে দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ (মার্চ) পর্যন্ত দেশের দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে মোট ৫৫৪ কোটি ডলারের ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন বিদেশি ঋণদাতাদের পক্ষ থেকে। বলা বাহুল্য, এই ঋণের একাংশ সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট বা বাকি হিসেবে দেওয়া এবং বাকি অংশ চলতি মূলধন হিসেবে দেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণ। এসব ঋণের একটা বড় অংশ দেশের বিভিন্ন ব্যাংকের নিশ্চয়তাপত্র কিংবা ঋণপত্রের বিপরীতে স্বীকৃত বিলের অধীনে বলে বিদেশি ঋণদাতা সংস্থার ঝুঁকি প্রায় অস্তিত্বহীন। তবে কিছু ঋণ আছে, যা গ্রহীতার সরাসরি দায়, সেখানে ব্যাংকের কোনো নিশ্চয়তা দেওয়া নেই, এটিই আমাদের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর কৃতিত্ব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি (জুলাই-ডিসেম্বর ২০১৪) অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ২০১৪ সালের মে পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে আগের বছরের তুলনায় ঋণপ্রবাহ বেড়েছে ১১ শতাংশ এবং বিদেশি এবং অভ্যন্তরীণ সূত্র মিলিয়ে একই সময়ে ঋণপ্রবাহ বৃদ্ধির হার ১৬ শতাংশ, অর্থাৎ বৈদেশিক সূত্র থেকে বেড়েছে ৫ শতাংশ। এখানে খুব সংগত প্রশ্ন হতে পারে, বাংলাদেশের ব্যাংকগুলো যখন অতি তারল্যের ভারে বিনিয়োগ সমস্যায় ন্যুব্জ, সে সময় দেশের করপোরেট হাউসগুলো বিদেশি ঋণমুখী হচ্ছে কেন? এর প্রধান কারণ, বিদেশি ঋণের সুদহার অভ্যন্তরীণ ঋণবাজারের সুদের চেয়ে অনেক কম। এ ছাড়া দেশীয় ব্যাংকগুলো অনেক ক্ষেত্রে তাদের মূলধন অপর্যাপ্ততার কারণে এককভাবে বড় অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করতে পারে না। অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে বিদেশি মুদ্রায় গৃহীত ঋণের স্বল্প মেয়াদও অপেক্ষাকৃত দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণবাজারের মুখাপেক্ষী হওয়ার আর একটা কারণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় কারণ সুদের হার।
সুদের এই উচ্চহার স্বাভাবিক বাজারব্যবস্থায় কমলেও আমাদের দেশের ক্ষেত্রে সেটি প্রযোজ্য হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আমাদের ঋণ মহার্ঘ হওয়ার কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে যে এই হার কমে আন্তর্জাতিক বাজারের কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। অভ্যন্তরীণ বাজারে সুদের হার না কমার কারণগুলোর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে মুদ্রাস্ফীতি। আমানতের সুদহার মুদ্রাস্ফীতির হারের নিচে নামানো সম্ভব নয় বলে ঋণের সুদের হার একটা নির্দিষ্ট হারের নিচে নামবে না। দ্বিতীয়ত, খেলাপি ঋণের উচ্চহার, যা ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, ফলে ব্যাংকগুলো সুদের হার কমাতে অপারগ। উচ্চ সুদের হারের এই অনমনীয়তার কারণেই স্বল্পব্যয়ের বিদেশি ঋণের ক্রমবর্ধমান নতুন ধারাটি উন্মুক্ত হয়েছে আমাদের দেশে। অন্যদিকে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে পুঁজি বিনিয়োগের ক্ষেত্র পূর্ণ নিষিক্ত হয়ে পড়ার ফলে পুঁজি তার সহজাত সঞ্চরণশীল প্রবণতায় ধাবিত হচ্ছে দেশের সীমানা ছাড়িয়ে। আমাদের দেশের বেসরকারি খাতে ক্রমবর্ধমান এই বিদেশি ঋণের পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন মহলে দেখা যাচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিদেশি ঋণের বিপদ যে একেবারেই নেই সে কথা হলফ করে বলা যায় না। এই বিপদাশঙ্কার মূলে রয়েছে ১৯৯৭ সালে পূর্ব এশীয় দেশগুলোর আর্থিক সংকট, যার উৎসভূমি ছিল বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের বোঝা। তবে সেখানে যা ঘটেছিল তার সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন এই প্রবণতার মৌলিক কিছু পার্থক্য আছে। সে সময় পূর্ব এশীয় দেশগুলোর নেওয়া বিদেশি ঋণ বিনিয়োগ করা হয়েছিল দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে, যার একটা বড় অংশ ছিল আবাসন খাত। ফলে স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণ দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পে আটকে যাওয়ার কারণে ঋণের মেয়াদের সঙ্গে প্রকল্পগুলোর সমাপ্তির সময়ের মধ্যে দেখা দেয় চরম সমন্বয়হীনতা, যাকে ব্যাংকিং ভাষায় বলা হয় ‘ম্যাচুরিটি মিসম্যাচ’। অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ এবং রপ্তানি আয়হীন প্রকল্পে বিনিয়োগের কারণে এই সমস্যার সঙ্গে যুক্ত হয় স্থানীয় মুদ্রার অবমূল্যায়নের ফলে সৃষ্ট বিপদ। কারণ, অবমূল্যায়নের ফলে মহার্ঘ হয়ে ওঠা বিদেশি মুদ্রার ঋণ স্থানীয় মুদ্রায় শোধ করার সময় অপ্রত্যাশিতÿ ক্ষতির মুখোমুখি হতে হয় ঋণগ্রহীতাদের। বিদেশি ঋণ গ্রহণের এই অবিমৃশ্যকারী প্রবণতার কারণেই পূর্ব এশীয় সংকট আজকাল একটা দৃষ্টান্তে পরিণত হয়েছে।
উন্নত দেশ থেকে ঋণ গ্রহণের এই প্রবণতা বিষয়ে মার্কিন অর্থনীতিবিদ রবার্ট লুকাস ১৯৯০ সালে এক প্রশ্ন তুলে বসেন যে অর্থনীতির সূত্রমাফিক পুঁজিপ্রবাহ উন্নত দেশ থেকে স্বল্পোন্নত দেশের দিকে ধাবিত হওয়ার কথা, কারণ পুঁজির অপ্রতুলতার কারণে অনাবিষ্কৃত বিনিয়োগ সম্ভাবনা থাকে বলে স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে উন্নত দেশের তুলনায় পুঁজির উৎপাদনশীলতা বেশি। ফলে সেসব দেশে পুঁজির প্রবাহ বাড়লে তাদের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত হয়। কিন্তু বাস্তবে সেটি ঘটে না। লুকাসের এই প্রশ্নের যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় আইএমএফের একটা ত্রৈমাসিক (মার্চ ২০০৭) প্রকাশনায়। এতে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামোগত সমস্যা, অপ্রশিক্ষিত বা স্বল্পশিক্ষিত মানবসম্পদ, দুর্নীতি, বৈদেশিক ঋণখেলাপের প্রবণতা ইত্যাদি কারণে বিনিয়োগের উৎপাদনশীলতা কমে যায়। এতে বলা হয়েছে, পুঁজি যদি উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যায়ও, তা যাওয়ার কথা দ্রুত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। কিন্তু বাস্তবে তাও যায় না। এটির কারণ বিশ্লেষণের জন্য আইএমএফ ৫৯টি দেশের ওপর এক সমীক্ষা চালিয়ে ১৯৭০-২০০৪ সময়ের প্রবণতা পরীক্ষা করে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক উপাত্ত ব্যবহার করে বেসরকারি পুঁজিপ্রবাহের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির জোরদার কোনো সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। এই সমীক্ষাপত্রে আরও মন্তব্য করা হয়েছে, যেসব দেশ বিদেশ থেকে বেশি ঋণ গ্রহণ করে, তাদের অভ্যন্তরীণ সঞ্চয়ের ওপর নির্ভর করতে হয় না বলে বেশি বিনিয়োগ করতে সক্ষম হয়, আর তাই তাদের প্রবৃদ্ধিও হয় দ্রুততর।
মজার বিষয়, ২০০৭-এর জানুয়ারি পর্যন্ত আইএমএফের প্রধান ইকোনমিস্ট, পরবর্তী সময়ে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংকের গভর্নর রঘুরাম রাজন তাঁর ফল্ট লাইনস গ্রন্থে ঠিক উল্টো কথা লেখেন, একটি দেশ যত বেশি তার নিজস্ব সম্পদ বা সঞ্চয় থেকে বিনিয়োগ করে, সে দেশের প্রবৃদ্ধি তত দ্রুত হয়। যে দেশ প্রয়োজনের চেয়ে কম সঞ্চয় করে বা অতিরিক্ত বিনিয়োগ করে, সে দেশের জন্য বিদেশি অর্থায়ন প্রয়োজন হতেই পারে। এটাও ঠিক যে বিনিয়োগ বেশি হলে উন্নয়নও বেশি হবে। তবে এই বিনিয়োগ যদি বিদেশি অর্থায়নে ঘটে তাহলে প্রবৃদ্ধির গতি হবে শ্লথ।
আমাদের বেসরকারি খাতের বিদেশি ঋণ নিয়ে পূর্ব এশীয় দেশগুলোর তিক্ত অভিজ্ঞতার শঙ্কার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় অঙ্কের বিদেশি ঋণ পরিশোধের ফলে সৃষ্ট সাম্প্রতিক ভারতীয় অভিজ্ঞতাও। এসব বাস্তব অভিজ্ঞতার সবটুকু আমলে না নিলেও বৈদেশিক ঋণের কিছু ঝুঁকি আছে সেগুলো বিবেচনায় রাখা উচিত। লাভজনক, উৎপাদনশীল এবং দক্ষ প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বল্প সুদের বিদেশি ঋণ বাড়তি প্রণোদনা হতে পারে, যেখানে দেশীয় বাজারে সুদের হার প্রায় তিন গুণ বেশি। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে না, সেসবের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হতে পারে টাকার অবমূল্যায়ন। যদিও টাকা কয়েক বছর ধরে স্থিতিশীল রয়েছে, কিন্তু যেকোনো কারণে যদি সে অবস্থা বজায় না থাকে, বিদেশি ঋণ গ্রহণকারীদের সেই ক্ষতি বহন করতে হবে। আমাদের দেশের যে দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান বিদেশি ঋণ গ্রহণ করছে, সেগুলোর প্রায় অর্ধেক রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প। বাকি অর্ধেকের মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, কৃষি, ওষুধ, সিমেন্ট, নৌপরিবহন, প্যাকেজিং, জুতা, ইলেকট্রনিক, ইস্পাত, বিমান পরিবহন ইত্যাদি। এমনকি বেক্সিমকোর মতো প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের কোনো সুযোগ নেই। সে কারণে এসব প্রতিষ্ঠানকে সম্ভাব্য টাকার অবমূল্যায়নের ঝুঁকি বহন করতে হবে।
স্বল্পমেয়াদি বিদেশি ঋণের বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগেরও ঝুঁকি রয়েছে, কারণ সে ক্ষেত্রে প্রকল্পের আয় শুরু হওয়ার আগেই ঋণ পরিশোধের মেয়াদ শুরু হয়ে গেলে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হবে উদ্যোক্তাদের। পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যে সংকট দেখা গিয়েছিল, তার জন্য এই সমস্যাটিও বহুলাংশে দায়ী। আমদানির ক্ষেত্রে সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটের নামে যে বৈদেশিক পরোক্ষ ঋণ পাওয়া যায়, তার থাকে দুই ধরনের সমস্যা। প্রথমত, পণ্যের মূল্য নির্ধারণে ক্রেতা-গ্রহীতার দর-কষাকষির সুযোগ থাকে সীমিত এবং দ্বিতীয়ত, দাতাদেশের পণ্য কিনতে বাধ্য হতে হয় ক্রেতাকে। বিদেশি ঋণের দরজা খুলে গেলে দেশীয় ব্যাংকগুলো যে অসম প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হবে, তা বলা নিষ্প্রয়োজন অথচ সুদের হার একটা হারের নিচে নামানোর সক্ষমতা আমাদের ব্যাংকিং খাত অর্জন করেনি।
বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি হলেও বাংলাদেশের তরফে বিদেশি ঋণখেলাপের কোনো অতীত ইতিহাস বা নজির নেই। সুতরাং দেশের এই ভাবমূর্তিটি অক্ষুণ্ন রাখতে আমাদের সচেষ্ট থাকতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এ বিষয়ে প্রথম থেকেই খুব সাবধানী বলে প্রতীয়মান। যেমন সুদের হার নির্দিষ্ট হারের নিচে রাখা কিংবা দীর্ঘমেয়াদি ঋণ এককালীন পরিশোধের পরিবর্তে একাধিক কিস্তিতে পরিশোধ ইত্যাকার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে রেখেছে। বিভিন্ন ব্যাংকের বিদেশি দায়দেনার ওপরও তীক্ষ্ণ নজর রাখছে আমাদের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ রকম নজরদারি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে বাংলাদেশের শিল্প উদ্যোক্তারা বিদেশি সস্তা ঋণের আস্বাদ গ্রহণ করে তার সুফল ভোগ করতে পারে। যদিও আমাদের নিজস্ব রিজার্ভ থেকে এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের মাধ্যমে কিছু বৈদেশিক মুদ্রা ঋণ বিতরণের ব্যবস্থা আছে, এটিকে সীমিতভাবে হলেও অন্যান্য খাতে বিস্তৃত করা যায় কি না ভেবে দেখা যেতে পারে।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Sunday, September 7, 2014

অর্থনীতি- আমাদের আবাসন খাতের বুদবুদ by ফারুক মঈনউদ্দীন

পাঠকদের স্মরণে থাকার কথা, গত দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমেরিকার গৃহায়ণ খাতের বুদ্বুদ থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক মন্দা কীভাবে বিশ্বকে নাড়া দিয়েছিল। জনগণের ঋণ গ্রহণকে উৎসাহী করার জন্য মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমাতে শুরু করলে মানুষের মধ্যে ভোগ ও বিনিয়োগের স্পৃহা বেড়ে যায়। এর প্রতিফলন ঘটে আবাসন ঋণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা থেকে। ব্যাংকগুলোও সুদের হার কমিয়ে আবাসন ঋণের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি করে, ফলে জনগণ অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ঘরবাড়ি কিনতে থাকে। কিছু ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক এসব ঋণ ডিসকাউন্টে কিনে নিয়ে মিউচুয়াল ফান্ড গঠন করে ডিবেঞ্চার ও শেয়ারবাজারে ছেড়ে দিতে থাকে। দীর্ঘমেয়াদি হোম লোনের পোর্টফোলিও নগদ বিক্রি হয়ে যাওয়ার ফলে ব্যাংকগুলোর হাতে নতুন ঋণ দেওয়ার জন্য আবার তহবিলের সংস্থান হয়ে যায় এবং তারা নিত্যনতুন কায়দায় যোগ্য-অযোগ্য সব ধরনের মানুষকেই হোম লোন বিলাতে থাকে। এর ফল ফলতে খুব বেশি দেরি হয়নি।

২০০৬ সালেই দেখা যায়, হোম লোনগুলো প্রথম কিস্তি থেকেই খেলাপি হয়ে যাচ্ছে। কারণ, এসব ঋণ অনুমোদনের সময় গ্রহীতার কোনো যোগ্যতা যাচাই করা হয়নি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সুদের ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী হার, সে কারণে মূল ঋণের মাসিক কিস্তির অঙ্ক বাড়িয়ে দিতে হয় ব্যাংকগুলোকে, অথচ দুর্বল ঋণগ্রহীতারা এই বাড়তি আকারের কিস্তির জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। এভাবে পরপর ঋণখেলাপের ঘটনা ঘটতে থাকলে ব্যাংকগুলো বন্ধকীকৃত বাড়ি বিক্রি করে খেলাপি ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে। ফলে বাড়িঘরের দরপতন ঘটতে থাকে। এর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর দেশে দেশে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোয় পড়তে থাকে শেয়ারের দাম। কারণ, ওয়াল স্ট্রিটের বড় কোম্পানিগুলো বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে এনে ঘর সামলানোর চেষ্টা করে। মার্কিন অর্থনীতিতে ‘সাব-প্রাইম মর্টগেজ’ নামের এই বালাইটার কারণে সৃষ্ট বিশ্বমন্দা কাটতে বহু সময় লেগেছিল।

সৌভাগ্যবশত বাংলাদেশে ঠিক এ রকম ঘটনা ঘটেনি। এ দেশে এ রকম চৌকস ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকার নেই এবং এ রকম কোনো আর্থিক পণ্যও নেই, যার মাধ্যমে হাউজিং লোনকে নতুন মোড়কে ছোট ছোট টুকরা করে সাধারণ মানুষের কাছে বিক্রি করা যায়। কিন্তু অন্য রকমভাবে হলেও এ দেশের রিয়েল এস্টেট খাতে এ রকমই একটা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ঠিক পুঁজিবাজারের মতোই একধরনের মূল্য বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়েছে আমাদের রিয়েল এস্টেট খাতে। এই উপসর্গের একাধিক কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথম কারণটি ভূ-সম্পত্তির প্রতি আমাদের সহজাত লোভ, মাত্র কয়েক ফুট জায়গার জন্য খুনোখুনির ঘটনাগুলোই তার প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো অগণিত আবাসন কোম্পানির উদ্ভব। কোনো ধরনের যোগ্যতাবিবর্জিত এসব ভুঁইফোড় নামসর্বস্ব কোম্পানি কেবল প্রতিষ্ঠিত ডেভেলপারদের কাছে ফ্ল্যাটের বুকিং দিয়ে পরবর্তী সময়ে চড়া দামে বিক্রি করে দিয়ে বাজারে সৃষ্টি করেছে কৃত্রিম মূল্যস্ফীতি। তৃতীয়ত, দেশের সম্ভাব্য সব জায়গায় জমি কিনে বা দখল করে আবাসন প্লট তৈরির নামে লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রলুব্ধ করার হিড়িক। কক্সবাজার বা কুয়াকাটার মতো জায়গায় বাহারি নামের আবাসন প্রকল্পের আত্মপ্রকাশ এই দৌরাত্ম্যের প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরগুলোর আশপাশের প্রতি ইঞ্চি খালি জায়গাই আজ ডেভেলপারদের দখলে। এমনকি আবাসন ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যের ফলে বিভিন্ন নগরের পরিবেশ বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিলে কখনো কখনো আদালতের হস্তক্ষেপও প্রয়োজন পড়ছে। চতুর্থত, আবাসন প্রকল্প তৈরির জন্য পর্যাপ্ত উপযুক্ত জমির অভাবের বিপরীতে অতিরিক্ত চাহিদা। এবং সবশেষে আবাসন প্রকল্প এবং জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনার জন্য ব্যাংকগুলোর দরাজ হাতে ঋণ বিতরণ।

মূলত ২০০৫-০৬ সাল থেকে ব্যাংকগুলো শেয়ারবাজার ও আবাসন খাতে বিপুল পরিমাণ ঋণ বিতরণ করতে থাকে। শেয়ারবাজারে উন্মত্ত বিনিয়োগের অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে ২০১০ সালের শেষে শেয়ারবাজারের বদ্বুদ বিস্ফোরিত হয়। শেয়ারবাজারের এমন বিপর্যয়ের আগ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর দ্বিতীয় নির্ভরশীলতা ছিল আবাসন খাতের ওপর। এ সময় (২০০৭) বাংলাদেশ ব্যাংকও নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তদের আবাসন চাহিদা মেটানোর উদ্দেশ্যে ৩০০ কোটি টাকা দিয়ে একটা পুনঃ অর্থায়ন তহবিল চালু করে, যা ২০০৯ সালে ৭০০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছিল। এই স্কিমের অধীনে একজন গ্রহীতার জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ১৫ লাখ টাকা ঋণসুবিধা। তবে এই ক্ষুদ্রাঙ্কের ঋণ প্রকল্প বুদ্বুদ তৈরিতে কোনো বড় ভূমিকা রাখেনি। আবাসন ব্যবসার রমরমা অবস্থা এবং এই খাতে ঋণের প্রাচুর্য ওপরে উল্লেখিত কারণগুলোর সঙ্গে মিলিত হয়ে সৃষ্টি করে আরেক বুদ্বুদ। অবশ্য আবাসন খাতে এই বিনিয়োগস্ফীতি লক্ষ্য করে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে এক সার্কুলার জারি করে জমিজমা কেনার জন্য সব ধরনের ব্যাংকঋণ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। ইতিমধ্যে গৃহায়ণ খাতে পুনঃ অর্থায়ন স্কিমের অধীনে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়ে গেছে। কেবল জমি কেনার জন্য সরাসরি ব্যাংকঋণ বন্ধ করলেও ধারণা করা যায়, এই খাতে ব্যাংকঋণের টাকার অঘোষিত ব্যবহার বন্ধ করা যায়নি। এ ছাড়া সাধারণ মানুষের জন্য ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ঋণ বন্ধ হয়নি, তা হওয়া উচিতও নয়। আজ যে বহু বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ব্যাংকের তারকাখেলাপি হয়ে স্ফীত করেছে ব্যাংকিং খাতে মন্দ ঋণের ঝুড়ি, তারাও বাণিজ্যিক ও শিল্পঋণের একাংশ নিয়মবহির্ভূতভাবে বিনিয়োগ করেছে স্থাবর সম্পদে।

এসব প্রবণতার কারণে আবাসন খাতের ঘোষিত ঋণের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ খেলাপি হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান সূত্রে পত্রিকার খবরে জানা যায়, ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই খাতে দেওয়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকার মধ্যে ১৩ হাজার ৪০০ কোটি, অর্থাৎ ৩৮ শতাংশ আটকে গেছে বিভিন্ন মেয়াদে। এর মধ্যে আট হাজার ১০০ কোটি টাকা মন্দ, দুই হাজার ১০০ কোটি টাকা সন্দেহজনক ও তিন হাজার ২০০ কোটি টাকা নিম্নমান হিসেবে শ্রেণীকৃত। অথচ ২০১১ সালের ডিসেম্বরে মন্দ-শ্রেণিভুক্ত ছিল চার হাজার কোটি টাকা, পরের বছর ছিল পাঁচ হাজার কোটি। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের মাথায় মন্দশ্রেণির ঋণ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

আবাসন খাতে বিতরণ করা ঋণের এই প্রবণতা ব্যাংকিং খাতে যোগ করবে সংকটের নতুন মাত্রা। কারণ, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য বন্ধকীকৃত জমি বা আবাসিক ভবন নিলামে তুললেও কাঙ্ক্ষিত ফল লাভে ব্যর্থ হবে, কারণ জমি ও নির্মাণের উচ্চমূল্য এবং ক্রেতাসাধারণের হাতে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় এসবের ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যাবে না, ঠিক যেমনটি ঘটেছিল আমেরিকার আবাসন বুদ্বুদের ক্ষেত্রে। রিহ্যাবের হিসাব অনুযায়ী, সারা দেশে প্রায় ২২ হাজার তৈরি অ্যাপার্টমেন্ট অবিক্রীত পড়ে আছে। সংগঠনটির দাবি, আশির দশকে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত এটাই অবিক্রীত অ্যাপার্টমেন্টের সর্বোচ্চ সংখ্যা।

এ দেশে কোনো একটা লাভজনক ব্যবসার ক্ষেত্র খুঁজে পাওয়া গেলে মানুষ হিসাব-নিকাশ না করে সেখানে হামলে পড়তে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সেই ব্যবসার নাভিশ্বাস ওঠে। শুধু আবাসন ব্যবসা নয়, সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার, টেলিভিশন চ্যানেল, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়—এ রকম আরও বহু উদাহরণ উপস্থিত করা যাবে, যেখানে নবাগতদের ধাক্কায় মূল ব্যবসা লাটে ওঠার উপক্রম। একই প্রবণতায় মানুষের আবাসন চাহিদার সুযোগ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত ও ভুঁইফোড় মিলিয়ে সহস্রাধিক ডেভেলপার কোম্পানি ব্যাংকঋণের সাহায্যে এই খাতে যে সংকট সৃষ্টি করেছে, তার স্বাভাবিক সহজ সমাধান হতে পারত যদি একটা ভালো বাজার, ক্রেতাদের আগ্রহ ও সক্ষমতা থাকত। সেটা অনুপস্থিত বলে দেশের প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী এই সংকট উত্তরণের জন্য সরকারের কাছেই সমাধান চাওয়া হচ্ছে। চলতি বছরের গোড়ায় রিহ্যাব নেতারা অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে, সাধারণ মানুষ যাতে তাঁদের তৈরি অ্যাপার্টমেন্টগুলো কেনার জন্য এক অঙ্কের সুদে আবাসন ঋণ পায়, তার জন্য তিন হাজার কোটি টাকার একটা তহবিল গঠন এবং আবাসন খাতের খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণের জন্য কোনো ধরনের ডাউন পেমেন্টের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করার দাবি তুলেছিলেন। বাংলাদেশ ব্যাংক গৃহায়ণ খাতকে অনুৎপাদনশীল আখ্যায়িত করে এই খাতে ঋণদান নিরুৎসাহিত করেছে বলে রিহ্যাব এই খাতকে উৎপাদনশীল খাত হিসেবে ঘোষণার দাবিও তুলেছে। দাবি আদায়ের জন্য অর্থনীতির সূত্র পাল্টে দেওয়ার এ রকম আবদার একমাত্র আমাদের দেশেই সম্ভব।

এ সমস্যার একটা সমাধান বের করার চেষ্টা করা উচিত। তা না হলে এই খাত ব্যাংকিং খাতের জন্য বয়ে আনবে বড় ধরনের সংকট। আর এই সমাধানের জন্য কোন পক্ষ কতখানি ছাড় বা সুবিধা দেবে, সেটাও নির্ধারণ করতে হবে। আবাসন ব্যবসায়ীদের ছাড় দিতে হবে বেশি, কারণ তারা নিজেরাই বেশি মুনাফার লোভে যত্রতত্র বিনিয়োগ করেছে মানুষের প্রকৃত চাহিদা যাচাই না করে। তা ছাড়া সব ব্যবসায় লাভ-লোকসান যেহেতু আছে, কখনো কখনো সেই লোকসানও মেনে নিতে হয়। ব্যাংকগুলোকেও প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কিছুটা ছাড় দিতে হবে সুদের হারে, তবে তা কখনোই আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে নয়।

ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷
fmainuddin@hotmail.com

Monday, June 30, 2014

সুইস ব্যাংকে আমাদের যত সম্পদ by ফারুক মঈনউদ্দীন

সম্প্রতি সুইস ব্যাংকে বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের যে গোপন অর্থ সঞ্চিত রয়েছে, তা নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে সুইস ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে বোমা ফাটিয়েছে সেটা নিয়ে বহু দেশে তোলপাড় হয়ে গেলেও আমাদের এখানে পত্রপত্রিকায় কিছু বিচ্ছিন্ন লেখা ছাড়া আর তেমন কোনো আলোড়ন দেখা যাচ্ছে না কোনো মহলে। সরকারি মহলের নীরবতা হয়তো কিছুটা অর্থবহ। কারণ, সবার জানা আছে সুইস ব্যাংকে কারা গোপন সঞ্চয় রাখে।

সুইস ব্যাংকগুলো যে দেশ-বিদেশের পাচার করা গোপন অর্থের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে, তার ইতিহাস বহু আগের। প্রায় ৩০০ বছর আগে থেকেই সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে গোপন অ্যাকাউন্ট খুলে টাকা জমা রাখার ব্যবস্থা চালু ছিল। ফ্রান্সের রাজাদের সঞ্চিত অর্থ গোপন রাখার প্রবণতা থেকেই এই ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৭১৩ সালে জেনেভার সিটি কাউন্সিলে যে আইন করা হয়, তাতে গ্রাহকদের অ্যাকাউন্টের হিসাব গোপন রাখার বিধান চালু করা হয়। কেবল গ্রাহক ছাড়া অন্য কারও কাছে অ্যাকাউন্ট–সম্পর্কিত তথ্য জানানো ছিল নিষিদ্ধ। মূলত তখন থেকেই বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ পাচার করে সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকে রাখার প্রবণতা শুরু হয়েছিল।

আদিতে সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তা রক্ষার আইন ফৌজদারি ছিল না বিধায় গোপনীয়তা ভঙ্গের কারণে কোনো ব্যাংক কর্মচারীকে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ ছিল না। ১৯৩৪ সালের নতুন ব্যাংকিং আইন এই গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়টিকে ফেডারেল আইনে পরিণত করে আরও কঠোর করে দেওয়া হয়। ১৯২৯ সালের মহামন্দার ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকিং আইনের এই সংশোধন প্রয়োজন ছিল। নতুন আইনে ব্যাংকিং গোপনীয়তার বিষয়টিকে ফৌজদারি দণ্ডবিধির আওতায় নিয়ে আসা হয়, ফলে গোপনীয়তা ভঙ্গকারীর শাস্তি ছিল কারাদণ্ড। জার্মানিতে হিটলারের শাসনামলে বিদেশে ধনসম্পদ জমা করার জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান চালু করা হলে সুইজারল্যা‌ন্ডে এই ব্যাংকিং গোপনীয়তা রক্ষার প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়ে যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইউরোপীয় ইহুদিরা তাদের সমুদয় সম্পদ সুইস ব্যাংকে জমা রাখা শুরু করে। যুদ্ধের ডামাডোলে বহু ইহুদি সুইস ব্যাংকের গোপন দলিলপত্র হারিয়ে ফেলে, ফলে যুদ্ধ-পরবর্তীকালে তারা আর তাদের সঞ্চিত অর্থ ফেরত পায়নি। তবে মজার বিষয় হচ্ছে, সুইস ব্যাংকে যে কেবল ইহুদিদের সম্পদ গোপন করে রাখা হতো তা নয়, নাৎ​সি বাহিনী যুদ্ধবন্দী এবং অধিকৃত দেশ থেকে যে সম্পদ লুণ্ঠন করে, সেসবও গচ্ছিত রাখা হয়েছিল সুইস ব্যাংকের গোপনীয়তায়। বিষয়টির মধ্যে কোনো আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না।

মার্কিন কূটনীতিবিদ স্টুয়ার্ট আইজেনস্ট্যাট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে অর্থনৈতিক অসংগতি এবং ব্যবসায়িক লেনদেন নিয়ে তাঁর বিখ্যাত বই ইমপারফেক্ট  জাস্টিস: লুটেড অ্যাসেটস, স্লেভস লেবার, অ্যান্ড দ্য আনফিনিশড বিজনেস অব ওয়ার্ল্ড ওয়ার টু-তে দেখিয়েছেন যে ১৯৩৯ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯৪৫-এর জুন পর্যন্ত জার্মানি তখনকার মূল্যে ৪০ কোটি ডলারের স্বর্ণ ন্যাশনাল ব্যাংক অব বার্নে পাচার করেছে। ধারণা করা যায়, যুদ্ধের খরচ চালানোর জন্য নিয়ে যাওয়া এই স্বর্ণের বেশির ভাগই ছিল হতভাগ্য ইহুদিদের কাছ থেকে লুট করা। আইজেনস্ট্যাট লিখেছেন, ‘সুইজারল্যান্ড বা অন্য নিরপেক্ষ দেশগুলো যে ভিকটিমদের স্বর্ণ জেনেশুনে গ্রহণ করেছে তার কোনো প্রমাণ নেই...তবে সুইজারল্যান্ড ও ইতালিতে পাঠানো স্বর্ণের মধ্যে অন্তত একটা ছোট অংশ ছিল, যা অধিকৃত দেশের নাগরিক এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের হতভাগ্য এবং ক্যাম্পে আনার আগেই মেরে ফেলা লোকজনের কাছ থেকে সংগ্রহ করা।’ এসব স্বর্ণালংকার অন্যান্য সোনার সঙ্গে মিশিয়ে গলিয়ে ফেলা হয়। এতে ধারণা করা যায় যে সুইজারল্যান্ড জার্মান আগ্রাসনের ভয় করছিল।

যুদ্ধ শেষে ১৯৪৬ সালে সুইস-ওয়াশিংটন চুক্তির অধীনে সুইস সরকার ত্রিপক্ষীয় গোল্ড কমিশনের কাছে প্রায় ছয় কোটি (৫.৮) ডলারের সমপরিমাণ স্বর্ণ হস্তান্তর করতে সম্মত হয়। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফরাসি সরকার জার্মানি থেকে প্রাপ্ত সব স্বর্ণের সঙ্গে সুইজারল্যান্ড এবং সুইস ন্যাশনাল ব্যাংকের সম্পৃক্ততার দাবি ছেড়ে দেয়। এর ফলে ষাটের দশক পর্যন্ত সুইস ফেডারেল আইনের কারণে সেখানকার ব্যাংক, অ্যাটর্নি অফিস, ট্রাস্টিসহ সর্বত্র জার্মান সহিংসতার শিকার এবং উদ্বাস্তুদের সুপ্ত হিসাব খঁুজে বের করার কাজ চলে। এভাবে খঁুজে পাওয়া যায় প্রায় ২৪ লাখ ডলার, (১৯৬২-এর মূল্যমানে) যা যোগ্য উত্তরাধিকারীদের কাছে ফেরত দেওয়া হয়।

এর মধ্যে ১৯৯৭ সালে একটা ঘটনা সুইস ব্যাংকের আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়টাকে আরও স্পষ্ট করে দেয়। ইউনিয়ন ব্যাংক অব সুইজারল্যান্ডের (ইউবিএস) এক প্রহরী ধ্বংস করে ফেলার ঠিক আগে ব্যাংকের কিছু পুরোনো লেজার আবিষ্কার করে, যেখানে জার্মানিতে ইহুদি নিধনের সময়কার অ্যাকাউন্টের হিসাব ছিল।  বার্লিনসহ বিভিন্ন শহরের ঠিকানাসংবলিত সেই সব হিসাব দেখে ক্রিস্টোফার মেইলি নামের সেই প্রহরী সেসব লেজার তুলে দেন একটা ইহুদি সাহায্য সংস্থার কাছে। বিষয়টি সুইস আইনে অপরাধ হলেও মেইলি এই ঐতিহাসিক দলিল ধ্বংস হতে দিতে চাননি। জার্মানিতে ইহুদি নিধনের সময়কার হিসাবপত্র দেওয়ার জন্য সুইস ব্যাংকগুলো বিভিন্নমুখী চাপের মুখে থাকলেও মেইলির এই বোমা ফাটানো ঘটনা তাদের নতুন চাপের মুখে ফেলে দেয়। শাস্তি এড়ানোর জন্য মেইলি আমেরিকায় রাজনৈতিক আশ্রয় গ্রহণ করেন। মেইলির এই উদ্‌ঘাটন অবশ্য সুইজারল্যান্ডের মানুষ এবং সংবাদমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়৷ এক পক্ষ মেইলির সাহসী বিবেচনাপ্রসূত পদ‌ক্ষেপের প্রশংসা করে, অন্য পক্ষ তাঁকে দেশপ্রেমরহিত বিশ্বাসঘাতক হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রতিক্রিয়া যা-ই হোক, পরের বছরই সুইস ব্যাংকের তরফ থেকে ইহুদি সংস্থাগুলোর সঙ্গে ১২৫ কোটি ডলারের ক্ষতিপূরণ রফা হয়।

ঘটনাটা ইউবিএস কর্তৃপক্ষকে যথেষ্ট বেকায়দায় ফেলে দেয়, কারণ এটি নতুন সুইস আইনে জার্মানি কর্তৃক ইহুদি নিধনের প্রমাণস্বরূপ যেকোনো আলামত সংরক্ষণ করার যে বিধান রয়েছে তার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। ফলে বিষয়টা যে এক দুঃখজনক ভুল, সেটা স্বীকার করতেও হয়েছে তাদের। কোনো প্রাচীন দলিল ধ্বংস করার আগে ব্যাংকের নিজস্ব একজন ইতিহাসবিদ সেসব পরীক্ষা করে দেখতেন যে সেগুলোতে ইহুদি নিধন সম্পর্কে কোনো প্রমাণ রয়েছে কি না। মেইলির আবিষ্কারের আগে আরও যেসব দলিল ধ্বংস করা হয়েছে, সেখানে তেমন কিছু পাওয়া যায়নি বলে সেই ইতিহাসবিদ সেসব ধ্বংসের অনুমতি দিয়েছিলেন বলে জানায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে ধ্বংস করা দলিলগুলোর কোনো তালিকা না রাখার কারণে সেই ইতিহাসবিদকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল।

অবশ্য মেইলি একা নন, পরবর্তী সময়ে রুডলফ এলমার নামের একজন সুইস ব্যাংক কর্মকর্তা কর ফাঁকি দেওয়া টাকার হিসাব ফাঁস করে দেওয়ার পর সুইস কর্তৃপক্ষ তার পেছনে লাগে। উইকিলিকসকে দেওয়া তার তথ্যগুলো কর ফাঁকি দেওয়া কালোটাকার অভয়ারণ্য হিসেবে সুইস ব্যাংকের ভূমিকা আর গোপন থাকে না। এরপর ব্র্যাডলি বার্কেনফেল্ড নামের আর একজনের ভূমিকার কারণে ইউবিএস আরও একবার কর ফাঁকিতে সহায়তা করার জন্য ধরা পড়ে। এর জন্য ইউবিএসকে সাত কোটি ৮০ লাখ ডলার জরিমানা দিতে হয় এবং যুক্তরাষ্ট্রকে প্রায় সাড়ে চার হাজার সন্দেহভাজন মার্কিন করখেলাপি হিসাবধারীর তালিকা সরবরাহ করতে হয়। বলা বাহুল্য, মেইলির মতো এলমার এবং বার্কেনফেল্ডকেও সুইস কর্তৃপক্ষ বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছিল।

সুতরাং বিভিন্ন দেশের নাগরিকদের সুইস ব্যাংকে গোপন সঞ্চয় নতুন কোনো ঘটনা নয়। মূল ঘটনায় আমরা উদ্বিগ্ন যে আমাদের দেশের কঠোর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনের ফাঁক গলে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে (২০১৩ সাল পর্যন্ত মোট জমা তিন হাজার ২০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ) সুইস ব্যাংকে পাড়ি দিতে পারে, তা ভেবে। কেবল সুইস ব্যাংক নয়, মালয়েশিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশি নাগরিকদের সঞ্চিত সম্পদ কোন পথে গেল, তার কোনো কার্যকর তদন্ত কখনো করার চেষ্টা কি হয়েছে কখনো? আজ পৃথিবীর প্রভাবশালী দেশগুলোর চাপে সুইস ব্যাংকগুলো তাদের গোপনীয়তা রক্ষার অঙ্গীকার থেকে কিছুটা সরে আসতে বাধ্য হয়েছে বোঝা যায়। ৩০০ বছরের ঐতিহ্য ভেঙে যদি সুইস ব্যাংকগুলো তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে গোপন হিসাবের তালিকা প্রকাশ করতে পারে, তাহলে আমাদের মতো দেশগুলোর সরকার দেশের স্বার্থে পাচারকৃত সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করতে পারছে না কেন?

ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার৷

fmainuddin@hotmail.com

Friday, May 30, 2014

প্রবাসে বসে যাঁরা দেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন by ফারুক মঈনউদ্দীন

এবারের শীতে বহু বছরের রেকর্ড ভেঙে কানাডার টরন্টোসহ পশ্চিমা বিশ্বের আরও কয়েকটি দেশে বৃষ্টি, ঝড়, বরফ ও শীত যে তাণ্ডব চালিয়েছে, তাতে সে কথা আবারও প্রমাণ করে যে প্রকৃতির শক্তির কাছে মানুষ ও তার প্রযুক্তি নিতান্তই ঠুনকো।
গত শীতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দীর্ঘায়িত শীত ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের তাণ্ডবে সেখানকার প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনভ্যস্ততার কষ্ট ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে অনেক দেশে ঘটছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়। সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস যে বঙ্গোপসাগরের দুই ভুজের শীর্ষে থাকা বাংলাদেশকে প্রায়ই প্লাবিত করে, সেটা এই উপসাগরের আকৃতি ও তার একটি বিশেষ কোণে অবস্থানের কারণেই ঘটে, এটা অনেকের জানা নেই। কিন্তু সে রকম কোনো ভৌগোলিক অবস্থানে না থেকেও বিশ্বের কোথাও কোথাও ঘটছে এ রকম বিপর্যয়। টরন্টোর বন্যাপ্লাবিত রাস্তার সঙ্গে বৃষ্টির পর ঢাকার শািন্তনগরের রাস্তার দৃশ্যের সাযুজ্য খঁুজে পেয়ে কোনো কোনো বাংলাদেশি মজাও পেয়েছেন। এবারের তুষার-ঝড়ের পর সেখানে প্রায় টানা ৩৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার দুর্লভ অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছেন অভিবাসী বাংলাদেশিরা। তবে এ কথা স্বীকার করেছেন সবাই যে যদি সে সময় গ্যাস-সংযোগ চালু না থাকত, তাহলে অনেক প্রাণহানি ঘটতে পারত কেবল ঠান্ডায়। কোনো দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে কারও তৃপ্তি পাওয়া উচিত নয়, কিন্তু এ বিষয়ে বদনামটা বাংলাদেশের এত বেশি ছিল যে বাংলাদেশিদের কেউ কেউ নিজ দেশের গ্লানির বিপরীতে সেই তৃপ্তি প্রকাশ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি।
এক বছর আগে আমার টরন্টো পেঁৗছার ঠিক পরদিন ঘটে রানা প্লাজার মর্মন্তুদ ঘটনা। লো ব্লু সুপার স্টোরের জো ফ্রেশ ব্র্যান্ডের কাপড় তৈরি হচ্ছিল রানা প্লাজার কোনো এক প্রতিষ্ঠানে৷ সেই সুবাদে কানাডায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের স্বল্প মজুরি, কাজের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা—এসব বিষয়ে সরব হয়ে উঠেছিল সে দেশের গণমাধ্যম এবং কোনো কোনো সংগঠন। রানা প্লাজা ধসের ঘটনাটি দেশের পোশাকশিল্পে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছে, তার রেশ আমাদের বহু দিন টানতে হবে।

ঘটনাক্রমে এবারও টরন্টোয় পেঁৗছার দিনই নারায়ণগঞ্জে ঘটে চাঞ্চল্যকর সাত অপহরণ ও নৃশংস খুনের ঘটনা। এ ঘটনা ঘটার প্রায় একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে গিয়েছি বলে বিভিন্নজনের কাছে এ বিষয়ে প্রায় জবাবদিহি করার মতো দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে। দূর প্রবাসে থাকলে স্বদেশে সামান্য দুর্ঘটনা ঘটলেই সেটাকে অনেক বড় দেখা যায়, উদ্বিগ্ন বোধ করে মানুষ। ঠিক এই পরিস্থিতিতে বিভ্রািন্ত বোধ করেন অভিবাসীরা, কখনো মনে হয় দেশের এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে দূরে চলে আসার সিদ্ধান্তই বুঝি ভালো ছিল। তবে দেশে থাকা আত্মীয়-পরিজনের কথা ভেবে উদ্বেগ আর দেশের পালাপার্বণে, পারিবারিক বা সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার মর্মবেদনাও হানা দেয় সংগোপনে। এমনকি যাঁরা বহু বছর আগে অভিবাসী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন দূরদেশে, তাঁদের মধ্যেও একধরনের গোপন ভালোবাসা বহমান থাকে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য।
গত বছর টরন্টোর বাংলাদেশিদের জীবন এবং নব্য অভিবাসীদের মোহভঙ্গ সম্পর্কে একটা লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর তার পক্ষে-বিপক্ষে বহু মতামত এসেছিল। বিপক্ষের কয়েকটি মন্তব্য ছিল খুবই আক্রমণাত্মক, আবার অনেকে এই লেখা পড়ার পর তাঁদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন বলেও জানিয়েছিলেন। আবার সেই লেখাটি পড়ার পরও এই নিবন্ধকারের পরিচিত অন্তত পাঁচজন গত এক বছরে তাঁদের ভাগ্যান্বেষণের চেষ্টায় দেশান্তরি হওয়ার সিদ্ধােন্ত অবিচল থেকেছেন। তাই ধারণা করা যায়, কানাডায় পাড়ি দেওয়া বাংলাদেশিদের সংখ্যা কমেনি।
গত এক বছরের মধ্যে আগে বসবাস করা পরিবারের অন্য সদস্যদের সমর্থনে টরন্টোয় গিয়ে অভিবাসনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় শামিল হয়েছেন এমন অনেককে দেখেছি, যাঁরা স্বদেশে কোনো অর্থেই অসচ্ছল ছিলেন না। আবার বছর দুয়েক আগে কানাডায় পাড়ি দিয়ে এত দিনে মোটামুটি ভদ্রস্থ একটা চাকরি পেয়ে যাওয়া কয়েকজনকে দেখলাম, যাঁদের দৃষ্টিতে এখন কানাডার সবকিছুই খারাপ৷ কারণ অবচেতনে তাঁরা দেশের অভাব বোধ করছেন, অথচ সব পেছনে ফেলে আসার পর আবার দেশে ফিরে গিয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করা কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে সেই অপছন্দের দেশেই থেকে যেতে হচ্ছে তাঁদের। তাই তাঁদের নিরুপায় পরবাসের সান্ত্বনা হয় সেখানকার উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, কঠোর আইন ও নিয়মানুবর্তিতা এবং বিভিন্ন ধরনের নাগরিক অধিকার ও সুবিধা।
এবার সে দেশে গিয়ে মনে হলো চাকরির বাজার কিছুটা ভালো হয়েছে৷ কারণ পরিচিত যে দু-একজনের কাজ ছিল না, এবার তাঁদের মুখে হাসি ফিরেছে চাকরি হয়েছে বলে। গত বছরের শীতে ভোর পাঁচটায় মাইনাস ২০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে টানা সাত-আট ঘণ্টা কাজ করার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন একজন, তিনিও মোটামুটি মাঝারি গোছের একটা কাজ পেয়েছেন সম্প্রতি। পরে অবশ্য জানা গেল যে অর্থনীতির চাকা আবার কিছুটা সচল হয়েছে দেশটির। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছে নাফটার এই সদস্যদেশটি। আইএমএফ-ও পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০১৪ সালে কানাডার অর্থনীতি গতিপ্রাপ্ত হবে।
অর্থনীতির এই গতিবৃদ্ধির কারণে চাকরির বাজার উন্নত হওয়ায় প্রবাসীদের মনেও ফিরেছে স্বস্তি। মাত্র দুই বছর আগে যাওয়া কয়েকজনকে দেখলাম ভালো কাজ পেয়ে কিছুটা উদ্দীপিত। কানাডার অর্থনীতি যে কিছুটা চাঙা হতে শুরু করেছে, সেটা তাঁরাই জানালেন। ড্যানফোর্থের এক বাংলাদেশি রেস্তোরাঁয় বসে দুধ-চা আর ডালপুরি খেতে খেতে কয়েকজন সাবেক সহকর্মীর সঙ্গে আলোচনায় তাঁদের বেশ আশাদীপ্ত মনে হলো, যদিও তাঁদের কয়েকজন এখনো নতুনভাবে ওখানকার ডিগ্রি নেওয়ার জন্য পড়াশোনা করছেন।
একসময় শিল্পসাহিত্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বনামখ্যাত অনেক বাংলাদেশি কানাডার বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে রয়েছেন অভিবাসী হিসেবে। বেশ কয়েক বছর আগে পাড়ি দিয়ে তাঁদের প্রায় সবাই প্রতিষ্ঠিত আজ। একসময় টেলিভিশনের সেলিব্রিটি সংবাদ পাঠিকা আসমা আহমেদও তাঁদের মধ্যে একজন। তাঁর ছিমছাম বাড়িতে আরও কয়েকটা বাংলাদেশি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিমন্ত্রিত হয়ে এক ছুটির দুপুরে সেই প্রতিষ্ঠিত শ্রেণির কয়েকজনের সঙ্গে ভাববিনিময়ের সুযোগ ঘটে এবার।
তবে তাঁদের কাছ থেকে সেখানকার জীবনযাত্রার বিষয়ে কিছু জানার সুযোগ ছিল সীমিত৷ কারণ বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের ক্রমাগত প্রশ্নের জবাব দিতে এবং উদ্বেগ প্রশমিত করতে গিয়ে আমার আর তেমন কিছু জানা হয়ে ওঠে না। তাঁদের উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল নারায়ণগঞ্জের সাত খুন। তাঁদের বিশ্বাস, বাংলাদেশে গুম কিংবা অপহরণের ঘটনা এমন উদ্বেগজনক যে দেশের কোনো মানুষই নিরাপদ নয়। এমনকি বুঝি, তাঁরা দেশে বেড়াতে যেতেও ভয় পান। আসমা আহমেদের সঙ্গে দেখা হওয়ার পরই তাঁর প্রশ্ন ছিল বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে। তাঁর সেই উদ্বেগ প্রশমনে বহু ধরনের যুক্তি উপস্থাপন করতে হয়েছিল আমাকে৷ দেশের মানুষ ও দেশ নিয়ে প্রবাসীদের এই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সহজাত ও চিরন্তন।
ভারতের স্বাধীনতার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিকদের উদ্দেশে নেহরু বলেছিলেন, যাতে তাঁরা সেসব দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি ধারণ করে তার সঙ্গে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই আহ্বানের পেছনের মূল কারণ ছিল অভিবাসী ভারতীয়দের পরবাসের যন্ত্রণা প্রশমিত করা। তাঁর সেই পরামর্শ ও আহ্বানের কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে পরবর্তী প্রজন্মের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মানুষেরা আজ সুপ্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশি অভিবাসীদের জন্য বিষয়টি একটা যথার্থ ইঙ্গিত হতে পারে।
ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com

Tuesday, April 8, 2014

আমাদের সিন্দুকভরা ডলার by ফারুক মঈনউদ্দীন

প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধি বোঝাতে একসময় গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ আর গোয়ালভরা গরু—এমন অবস্থাকেই বোঝানো হতো। সেই অতি সরল সমৃদ্ধির মাপকাঠিটা কিছুটা পরিবর্তিত হয়েছে, উপচে পড়া সম্পদ আগলে বসে থাকা এখন আর অর্থনৈতিক সুবিবেচনার পরিচয় বহন করে না। কয়েক বছর ধরে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সিন্দুকভরা এই ডলার নিয়ে আমরা কী করব, আমাদের কতখানি মজুত থাকা উচিত—এসব প্রশ্ন উঠে আসছে বিভিন্ন আলোচনায়। ইতিমধ্যে (ফেব্রুয়ারি ২০১৪) আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এক হাজার ৯০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে, এই প্রবণতায় জুন নাগাদ দুই হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

Friday, March 28, 2014

মানবিক ব্যাংকিং সোনার পাথরবাটি? by ফারুক মঈনউদ্দীন

অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক সেবা কিংবা ইনক্লুসিভ ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসের পাশাপাশি মানবিক ব্যাংকিং সেবার একটা ধারণা সম্প্রতি আলোচনায় চলে আসছে। পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় গতানুগতিক ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে মানবিক কথাটা হয়তো খাপছাড়া শোনাতে পারে, এ যেন সোনার পাথরবাটি। সে জন্যই বোধ হয় আমেরিকান ঔপন্যাসিক মার্ক টোয়েন কৌতুক করে মন্তব্য করেছিলেন, ব্যাংকার হচ্ছেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি আকাশে সূর্য থাকলে ছাতাটি ধার দেন, কিন্তু বৃষ্টি শুরু হওয়ামাত্র সেই ছাতা ফেরত চান।

Tuesday, February 4, 2014

রাজনীতি ও অর্থনীতি- ব্যাংকঋণ পুনর্বিন্যাসের প্রণোদনা by ফারুক মঈনউদ্দীন

বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি এবং নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) অতিসম্প্রতি দুটো সার্কুলারের মাধ্যমে মেয়াদোত্তীর্ণ এবং খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন,
পুনঃ তফসিলীকরণ এবং ডাউন পেমেন্ট আদায়ের ব্যাপারে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কিছুটা নমনীয় হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। উভয় সার্কুলারে স্বীকার করা হয়েছে দেশের অস্থিতিশীল (রাজনৈতিক) পরিস্থিতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্প খাতের উপকরণ ও পণ্যের স্বাভাবিক পরিবহন বিঘ্নিত হয়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা হারাচ্ছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প।

এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতির সব খাতের ঋণখেলাপি হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই বিবেচনায় ঋণগ্রহীতা এবং ঋণদানকারী ব্যাংক—উভয় পক্ষের নাজুক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এই দুই সার্কুলারের মাধ্যমে ডাউন পেমেন্ট আদায়, সুদের হার নির্ধারণ এবং ঋণ পুনর্গঠন কিংবা পুনঃ তফসিলীকরণের বিষয়টি যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার শর্ত সাপেক্ষে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্কের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তবে এসএমই কিংবা কৃষিঋণ ছাড়া অন্যান্য ঋণের মেয়াদকাল পুনর্গঠন করার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নিতে হবে। উল্লেখ্য, এই শিথিলতার সুযোগ গ্রহণের মেয়াদ ৩০ জুন ২০১৪ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
স্মরণে থাকার কথা, ২০০৯ এবং ২০১০ সালে ভোগ্যপণ্য, ইস্পাত—এসব খাতে বিশ্বমন্দার কবলে পড়ে বহু আমদানিকারক ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও শেয়ারবাজারের উল্লম্ফনের সময় এবং পতনের আগে পর্যন্ত ব্যাংকগুলো এই বাজার থেকে প্রচুর মুনাফা তুলে নিতে পেরেছিল। ২০১০ সালের শেষ প্রান্তে এসে শেয়ারবাজারের সেই মাতাল বুদ্বুদ বিস্ফোরিত হলে বহু অসতর্ক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী প্রায় পথে বসে যান, তার সঙ্গে আটকা পড়ে যায় বিভিন্ন ব্যাংকের বিপুল ঋণ। বিশ্বের পণ্য বাজারের পতনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের আটকে পড়া ঋণের সঙ্গে যুক্ত হয় শেয়ারবাজারে লগ্নি করা ঘোষিত এবং অঘোষিত বিপুল ঋণ। এই ঋণের মধ্যে সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ভোক্তা ঋণ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেওয়া ব্যবসায়িক ঋণ।
এমন পরিস্থিতির ধারাবাহিকতায় ব্যাংকগুলো যখন খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনায় কঠিন সময় পার করছিল, তখন ২০১২ সালের শেষে খেলাপি ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণ, মেয়াদ নির্ধারণ এবং ডাউন পেমেন্ট আদায়ের নিয়মগুলো আরও কঠোর করা হয়। সেই নতুন নীতিমালায় মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ ৯০ দিনের সীমা অতিক্রম করলেই ‘নিম্নমান’ শ্রেণীকৃত হয়ে পড়ে, যার সীমা আগে ছিল ১৮০ দিন। একইভাবে আগের ২৭০ দিনের মেয়াদোত্তীর্ণ ‘সন্দেহজনক’ ঋণের সময়সীমা কমিয়ে করা হয় ১৮০ দিন এবং ৩৬০ দিনের মেয়াদোত্তীর্ণ ‘মন্দ’ শ্রেণীর মেয়াদ কমিয়ে করা হয় ২৭০ দিন।
ঋণ শ্রেণীকরণের এই কঠোরতর নীতিমালার কারণে বহু মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ দ্রুত শ্রেণীকৃত হয়ে পড়ে এবং প্রাথমিক ধাপের শ্রেণীকৃত ঋণগুলো আচমকা পরবর্তী বিরূপ ধাপে নেমে যায়। শ্রেণীকরণের আইন পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছিল ব্যাংকগুলোর ২০১২ সালের হ্রাসকৃত মুনাফায়। অথচ সে সময় ব্যবসায়ী মহল এবং ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই ২০০৮-পরবর্তী বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য হ্রাসের ধকল সামলাতে ব্যস্ত। তবু একটি আন্তর্জাতিক মানের শ্রেণীকরণ নীতিমালা প্রবর্তনের স্বার্থে স্থিতিপত্রে বিরূপ ফলাফল সত্ত্বেও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিবর্তিত নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে তৎপর হয়েছিল। তবে তার জন্য ২০১৩ সালে নতুন মাত্রায় উন্নীত হয়েছিল ব্যাংকিং খাতের মোট শ্রেণীকৃত ঋণ।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে সমাপ্ত বছরে ব্যাংকিং খাতের নিট মুনাফা কমেছিল ১০৪ শতাংশ, যার প্রধান কারণ ছিল খেলাপি ঋণের উল্লম্ফন। মুনাফা হ্রাসের এই হার বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে ছিল ২৮ শতাংশ, অর্থাৎ সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতেই মূলত মুনাফা হ্রাস পেয়েছিল সবচেয়ে বেশি হারে। এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য যে ২০১১ এবং ২০১২ উভয় বছরেই ব্যাংকগুলোর পরিচালন মুনাফা ছিল ১৯,৭০০ কোটি টাকা, অথচ নিট মুনাফা ছিল যথাক্রমে ৯,১০০ এবং ৪,৪০০ কোটি টাকা। দুই বছরে একই পরিমাণ পরিচালন মুনাফা থাকা সত্ত্বেও নিট মুনাফার এই বিশাল পার্থক্য থেকে সহজেই বোঝা যায়, ২০১২ সালের পরিচালন মুনাফার একটা বিশাল অংশ চলে গিয়েছিল শ্রেণীকৃত ঋণের বিপরীতে সংস্থান বাবদ। কারণ, কেবল বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ বেড়ে গিয়েছিল প্রায় ৮১ শতাংশ। (সাধারণ পাঠকদের জন্য জানানো প্রয়োজন, খেলাপি বা মন্দ ঋণের বিপরীতে পরিচালন মুনাফা থেকে নির্দিষ্ট হারে কুঋণ সংস্থান রাখতে হয়, যার ফলে কমে যায় নিট মুনাফা)।
এ ছাড়া বিরূপ বিনিয়োগ পরিবেশ, তারল্যসংকট, আমানতের উচ্চ সুদ ব্যয়, আমদানি বাণিজ্যে ভাটা—এসব কারণে ২০১২ সাল ব্যাংকগুলোর জন্য খুব সুখকর বছর ছিল না। তার সঙ্গে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো যুক্ত হয় হল-মার্ক কেলেঙ্কারি, যা ব্যাংকগুলোকে আরও নাজুক পরিস্থিতিতে ঠেলে দেয়। এ রকম বিরূপ পরিস্থিতিতেও বিভিন্ন মহলের চাপ উপেক্ষা করে ঋণ শ্রেণীকরণ এবং পুনঃ তফসিলীকরণ নীতিমালা কঠোরতর করার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে বাড়তি শ্রেণীকরণের চাপ হজম করে ব্যাংকগুলো নতুন বছর শুরু করার পরপরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শুরু হয় রাজনৈতিক অস্থিরতা। এই অস্থিরতা পর্যবসিত হয় তাণ্ডবে, যার বৈশিষ্ট্য ছিল পরিকল্পিত নাশকতা। লক্ষণীয়, এই নাশকতা পরিচালিত হয়েছে অবকাঠামো—যেমন রেললাইন, সড়ক, ট্রেন ও যানবাহন, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সরকারি দপ্তর ইত্যাদির বিরুদ্ধে। সবচেয়ে অপূরণীয় ক্ষতি করা হয়েছে দেশের বৃক্ষ সম্পদের।
নজিরবিহীন এই সহিংসতা, জাতীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞ ইত্যাকার তৎপরতায় দেশের পরিস্থিতি যেমন ছিল উত্তাল, তেমনি স্থবির ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য। ফলে উদ্যোক্তারা বিনিয়োগবিমুখ হয়ে পড়েন, বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা কমে যায় উদ্বেগজনক হারে। তার বিরূপ প্রভাব পড়ে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগের ওপর। আগের বছরের বাড়তি শ্রেণীকৃত ঋণের বোঝা বাড়লেও নতুন ঋণ বিতরণ প্রায় স্থবির হয়ে পড়ে। ২০১৩ সালের নভেম্বরে ব্যাংকগুলোর বাড়তি তারল্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৬ হাজার কোটি টাকা, জানুয়ারিতে যা ছিল ৬০ হাজার কোটি টাকা, এ রকম অলস তহবিল ব্যাংক বা অর্থনীতির জন্য কোনোভাবেই মঙ্গলকর নয়।
রাজনীতি কখনোই অর্থনীতিকে বাদ দিয়ে চলতে পারে না। একসময় বাণিজ্য, উৎপাদন ও বণ্টন, জাতীয় আয় ও সম্পদ ইত্যাদির সঙ্গে সরকার ও কানুনের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করার শাস্ত্রটিরই নাম ছিল রাজনৈতিক অর্থনীতি। সুতরাং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকার তথা রাজনীতি ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও পরিচালিত হয় দেশ ও মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু ২০১৩ সালের প্রায় পুরোটাজুড়েই একযোগে ও বিচ্ছিন্নভাবে চলেছে বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড, যার কুফল জাতি ভোগ করবে আগামী বছরগুলোতে।
গত বছরের এই অস্থিরতা ও ধ্বংসলীলায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের উৎপাদন ও সুস্থির কর্মকাণ্ডের ধারায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে ঋণ পুনর্বিন্যাস ও শ্রেণীকরণের নিয়মাচারে ছাড় দেওয়ার গৃহীত উদ্যোগ থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্প ও অর্থনীতির কতখানি ক্ষতি হয়েছে। পুনঃ তফসিলীকরণ, ডাউন পেমেন্ট এবং পুনর্গঠিত মেয়াদ নির্ধারণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত শিথিল নিয়মাবলি ক্ষতিগ্রস্ত ঋণগ্রহীতাদের কিছুটা অবকাশ দিতে পারে।
এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা হবে, নির্যাতিত সংখ্যালঘুরাও বিভিন্নভাবে সহায়তা ও অনুদান পেতে পারেন। তবে ঋণগ্রহীতা নন, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত বা সর্বস্বান্ত হয়েছেন দেশজুড়ে এমন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যা নগণ্য নয়। এঁদেরও উৎপাদন ও বাণিজ্যের ধারায় নিয়ে আসার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। কারণ, অর্থনীতিতে এই অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনাহীন খাতের অদৃশ্য সমধিক গুরুত্ববহ। এ ব্যাপারে এনজিও বা মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক দায়িত্বের আওতায় স্বল্প সুদে সহায়তা প্রদান করতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এই বিষয়ে দিতে পারে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা।
বাংলাদেশ ব্যাংক খেলাপি বা মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ পুনঃ তফসিলীকরণ বিষয়ে যে শিথিলতার অবকাশ দিয়েছে, তার সুফল ঋণগ্রহীতাদের পাশাপাশি ব্যাংকগুলোও ভোগ করতে পারবে। কারণ, এতে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের হার কমে আসার ফলে মন্দ ঋণ সংস্থানের পরিমাণও হ্রাস পাবে। তবে এই সুযোগের অপব্যবহার করে স্বেচ্ছাখেলাপি এবং ২০১৩-পূর্ব খেলাপি ঋণগুলো যাতে পুনর্গঠিত না করা হয়, সেদিকেও নজর রাখতে হবে। অনেক কিছুর বিনিময়ে আমাদের ব্যাংকিং খাতে আন্তর্জাতিক মানের ঋণ শ্রেণীকরণ এবং প্রকৃত মুনাফা প্রদর্শনের যে স্বচ্ছ নিয়ম চালু হয়েছিল, তা এই শিথিলতার সুযোগে যাতে বিনষ্ট না হয়।

ফারুক মঈনউদ্দীন: লেখক ও ব্যাংকার।
fmainuddin@hotmail.com