Showing posts with label উৎপল রায়. Show all posts
Showing posts with label উৎপল রায়. Show all posts

Friday, November 23, 2018

হাইকোর্টে জামিনপ্রার্থীদের ভিড়: ‘আদালতের বারান্দা এখন আমাদের ঘরবাড়ি’ by উৎপল রায়

শামসুল হক (৫৫)। ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের নন্দোয়ার ইউনিয়নের ভণ্ডগ্রামের বাসিন্দা। রাণীশংকৈল থানায় দায়ের করা নাশকতার একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে আসেন তিনি। গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট অ্যানেক্স (বর্ধিত) ভবনের দোতলায় সংশ্লিষ্ট আদালতের বারান্দায় তিনিও লাইনে ছিলেন অন্যদের সঙ্গে। ভগ্ন শরীরের শ্মশ্রুমণ্ডিত শামসুল হকের চোখে মুখে ছিল দিশাহারা ভাব। দুশ্চিন্তার ছাপও স্পষ্ট। পাশেরজনকে কেবলই জিজ্ঞাসা করছেন ‘জামিন হইবো তো? তার পাশে থাকা তারই এলাকার কয়েকজন জানান, সহজ সরল শামসুল হক অন্যের জমিতে কৃষিকাজ করেন। শারীরিকভাবেও অতটা সবল নন তিনি।
পড়াশুনা যেমন নেই, তেমনি তার উচ্চারণেও রয়েছে সমস্যা।
বিএনপির কোনো পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গেই তিনি নেই। তার সাতটি মেয়ে। ইতিমধ্যে দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। আরো ৫ মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তা ও পরিশ্রমে তার শরীর আরো ভেঙে পড়েছে। তিনি এই মামলার বিষয়ে কিছুই জানেন না। অসুস্থ শরীর নিয়েই তিনি ঢাকায় এসেছেন নাশকতার মামলায় আগাম জামিন নিতে। এমনকি ঢাকায় আসা যাওয়ার ভাড়াও নেই তার কাছে। দেয়ালে ঠেস দিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন শামসুল হক। তার পাশে থাকা কয়েকজন তাকে সান্ত্বনা দেন। শামসুল হক বলেন, কাজকাম কইরা কূল পাই না।
রাজনীতি করমো কহন। ঘরে ৫টা মাইয়া। কয়ডা দিন পালাইয়া ছিলাম। মেয়েগুলার চিন্তায় কিছুই করতে পারি না। এলাকার লোকজন কইলো হাইকোর্টে আইতে, তাই আইলাম। যদি জামিন না পাই তাইলে আমার সংসারডা কেডায় দেখবো? রানীশংকৈলের নন্দোয়ার ইউনিয়ন বিএনপি নেতা শামসুল ইসলাম বলেন, সহজ সরল শামসুল ইসলাম রাজনীতির কিছুই বোঝেন না। আমরা বিএনপির সরাসরি রাজনীতি করলেও তিনি বিএনপির সমর্থক। কিন্তু এরকম একজন অসহায় মানুষের নামেও মামলা দেয়া হবে এটি আমরা ভাবিনি। পরে জানা যায়, দুপুর ২টার পর সংশ্লিষ্ট আদালত থেকে ৮ সপ্তাহের আগাম জামিন পান শামসুল হকসহ অন্যরা। আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টরা জানান, পুলিশের ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক আইনসহ বিভিন্ন মামলায় বেশকিছুদিন ধরেই আগাম জামিনের জন্য সারা দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা আসছেন সুপ্রিম কোর্টে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এত বেশি মামলায় আগাম জামিনের আবেদন হাইকোর্টে জমা পড়েনি।
এত বেশি মানুষও হাইকোর্টে আগাম জামিনের জন্য হাজির হননি। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, ‘সরকার পরিকল্পিতভাবে আগামী নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার আতঙ্কে রেখে মাঠ খালি করে একতরফাভাবে নির্বাচন করতে চায়। এ জন্যই সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের নামে এসব ভিত্তিহীন গায়েবি ও কাল্পনিক মামলা দেয়া হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সারা দেশ থেকে প্রতিটি কর্মদিবসেই বিএনপির শত শত লোক আগাম জামিন নিতে আসছেন। আর সুপ্রিম কোর্টের ইতিহাসে এত বেশি লোকের আগাম জামিন নিতে আসার নজির অতীতে যেমন নেই তেমনি এত বেশি গায়েবি মামলাও অতীতে হয়নি। এত বেশি লোক জামিন নিতে আদালতে আসেন নি।’ তিনি বলেন, আশার কথা এই যে হাইকোর্ট অনেক উদার হয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন আগাম জামিন দিচ্ছেন। তবে, দুর্ভাগ্য যে, হাইকোর্ট চার সপ্তাহ কিংবা আট সপ্তাহ আগাম জামিন দিলেও জামিন শেষে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিম্ন আদালতে হাজির হলে অনেককেই কারাগারে পাঠানো হচ্ছে। এতেই বোঝা যায় সরকার নিম্ন আদালতে হস্তক্ষেপ করছে।’ খন্দকার মাহবুব আরো বলেন, ‘যারা আগাম জামিন নিতে আসছেন তাদেরকে আমরা সর্বতোভাবে আইনি সহায়তা দিচ্ছি। কিন্তু এমনও আছেন যাদের ঢাকায় আসা যাওয়ার মতো ভাড়া নেই, খাওয়ার টাকা নেই। ওই সব লোকের নামেও মামলা দেয়া হচ্ছে।
দুপুর ১টা। সুপ্রিম কোর্ট অ্যানেক্স (বর্ধিত) ভবনের সামনে দীর্ঘ লাইন। পাশে দাঁড়িয়ে একজন সিরিয়াল নম্বর ও এলাকার নাম বলছেন। সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে ‘আছি’ বলে জানান দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। কিছুক্ষণ পরই সারিবদ্ধভাবে সবাই গিয়ে হাজির হন ওই ভবনের দোতলার একটি আদালতে। কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা সবাই ঠাকুরগাঁও জেলা, থানা, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপির নেতাকর্মী। নাশকতা, বিশেষ ক্ষমতা আইনসহ বিভিন্ন মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে এসেছেন সর্বমোট ২৪০ জন। তাদের সবাই হাজির কি-না এবং জামিন যাতে হাতছাড়া না হয় তা নিশ্চিত হতেই এ বিশেষ লাইনের ব্যবস্থা।
ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ও একই উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জিয়াউল ইসলাম জিয়া আলাপকালে জানান, গত ১লা সেপ্টেম্বর ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের একটি কমিউনিটি সেন্টারে সকাল ১১টার দিকে মিলাদের আয়োজন করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় তিনি জানতে পারেন নাশকতার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তিনিসহ ৩৫ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। এতদিন অনেকটাই আত্মগোপেনে ছিলেন। আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে বৃহস্পতিবার আগাম জামিন নিতে এসেছেন তারা। তিনি আরো জানান, বিগত কয়েক মাসের মধ্যে ১৭টি মামলায় ওই জেলার বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ৬শ’ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল বৃহস্পতিবার ২৪০ জন আগাম জামিন নিতে এসেছেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, নেতাকর্মীদের আগাম জামিনের জন্য বেশকয়েকদিন ধরে হাইকোর্টে আসতে হচ্ছে। এর আগেও ধাপে ধাপে ২শ’ জনের বেশি নেতাকর্মীর আগাম জামিন হয়েছে। পুলিশের দায়ের করা মামলায় গতকাল হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে এসেছিলেন রানীশংকৈলের ৮ নম্বর নন্দোয়ার ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ওয়াদুদ বিন নূর আলিফ। তিনি বলেন, গত ১লা সেপ্টেম্বর স্থানীয় থানায় আমার বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা হয়। সেই থেকে গ্রেপ্তারের ভয়ে এলাকায় নিয়মিত যেতে পারছি না। শুধু আমি নই ওই থানার বিএনপির সকলপর্যায়ের নেতাকর্মীদের একই অবস্থা। অনেকেই এলাকাছাড়া। আবার অনেকেই আগাম জামিন নিতে হাইকোর্টে আসছেন।
সোহেল মৃধা (৩৩)। চাদপুর মতলব (উত্তর) ফরাজীকান্দি ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। নাশকতার একটি মামলায় গতকাল হাইকোর্টে আগাম জামিন নিতে এসেছেন তিনি। সোহেল মৃধা বলেন, বিগত এক বছরের মধ্যে আমার নামে ৫টি মামলা হয়েছে। সবগুলোতেই জামিনে আছি। আজকে (গতকাল) একটি মামলায় ৮ সপ্তাহের জামিন হয়েছে। তিনি জানান, নারায়নগঞ্জের পঞ্চবটী এলাকায় কফেকশনারীর ব্যবসা রয়েছে তার। পুলিশি ঝামেলার ভয়ে অনেকদিন ধরেই পরিবার থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন তিনি। মতলবের (উত্তর) গ্রামের বাড়িতে না থেকে নারায়ণগঞ্জের পঞ্চবটী এলাকায় থাকেন। সোহেল মৃধা বলেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গ্রামের বাড়ি গিয়েছিলাম। সেখান থেকে একটি মামলায় পুলিশ আমাকে গ্রেপ্তার করে। এরপর কারাগার। ১৮ দিন কারাবাস শেষে চাঁদপুরের একটি আদালত থেকে জামিন পাই। এরপর থেকে ভয়ে গ্রামের বাড়িতে নিয়মিত যাই না। তিনি বলেন, ২৫শে নভেম্বর আমার সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া মেয়ে সৌশি আক্তারের বার্ষিক পরীক্ষা। মেয়েটার ইচ্ছে ছিল পরীক্ষার সময় আমি তার কাছে থাকবো। কিন্তু মনে হয় তা সম্ভব হবে না। আতঙ্কে থাকি কখন না আবার মামলা হয়, গ্রেপ্তার হয়ে যাই। সোহেল মৃধা আরো বলেন, মামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। প্রতিনিয়ত আদালতে দৌড়ঝাঁপ করতে হচ্ছে। পারিবারিক, সামাজিক ও আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। একমাত্র অবলম্বন ব্যবসাটাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
মতলব (উত্তর) উপজেলা যুবদলের সভাপতি রাশেদ হাসান টিপু (৪৩) বলেন, আমার নামে বিশেষ ক্ষমতা ও বিস্ফারক আইনের দুটি মামলা রয়েছে। দুটিতেই জামিনে আছি। গত ফেব্রুয়ারিতে একটি মামলায় কারাগারে নেয়া হয় আমাকে। ২৫ দিন কারাগারে থেকে পরে মুক্তি পাই। তিনি বলেন, আজ (গতকাল) এই উপজেলার বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যারা জামিন নিতে এসেছেন তাদের অনেকেই মামলায় বিপর্যস্ত। কেউবা অসহায়। অনেকের ঢাকায় আসা ও যাওয়ার মতো ভাড়াও নেই। আমরা যারা নেতৃত্বস্থানীয় তারাই তাদের জামিনের জন্য চেষ্টা করছি। তিনি আরো বলেন, আমরা মামলায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি। এলাকায় যেতে পারি না। যদি যেতেও হয় সকালে গিয়ে ওই দিনই ফিরে আসি। সবশেষ গত ২০শে অক্টোবর গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। রাতে থাকতে পারিনি। ওই দিনই চলে আসি। তিনি বলেন, স্থানীয় এলাকায় বালু পাথরের ব্যবসা রয়েছে আমার। কিন্তু সেই ব্যবসাও অনেকটাই স্লথ। গ্রেপ্তার হয়রানির ভয়ে বেশির ভাগ সময় ঢাকাতেই থাকি।
নাশকতার মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে এসেছেন মতলবের (উত্তর) ১০ নম্বর পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. সজীব আল ফালাক (২৬)। তিনি জানান, এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে তার নামে বিশেষ ক্ষমতা ও বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা হয়। ওই মামলায় তিনি জামিনে আছেন। ওয়েস্ট কোস্ট ম্যানেজমেন্ট টেকনোলজিতে মেকানিক্যাল বিভাগে এমএসসি করছেন তিনি। পাশাপাশি ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সজীব আল ফালাক বলেন, রাজনীতি যে এত কঠিন সেটি আগে বুঝিনি। গ্রেপ্তার হয়রানির আতঙ্কে থাকি প্রতিনিয়ত। পড়াশুনাও বিঘ্নিত হচ্ছে। গ্রামের বাড়িতে নিয়মিত যেতে পারি না। এখন থাকি পুরান ঢাকার ফরিদাবাদ এলাকায় এক আত্মীয়র বাসায়। বলা চলে দুঃসহ জীবন পার করছি। আগাম জামিন নিতে আসা চাঁদপুর বিএনপির একজন নেতা বলেন, এভাবে আদালতে দৌড়ঝাঁপ করতে গিয়ে আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবন ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই পরিবারের কাছ থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন।
হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে আসা ময়মনসিংহের গৌরিপুরের মইলাকান্দা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রিয়াদুজ্জামান (৩৬) বলেন, গত ৭/৮ বছরে আমার নামে ৫২টি মামলা হয়েছে। এর সবগুলোতে জামিনে আছি। একটি মামলায় গত ১৩ই অক্টোবর কারাগারে যাই। প্রায় একমাস পর কারামুক্তি পাই। আজও (গতকাল) তিনটি মামলায় ১০৪ জনের আগাম জামিন হয়েছে। এর মধ্যে আমিও আছি। তিনি বলেন, গত কয়েকবছরে আদালতের বারান্দায় হয়ে গেছে আমাদের বাড়িঘর। আজ এই মামলা তো কাল সেই মামলা। শুধু আমি নই এলাকার আমাদের প্রায় সব নেতকর্মীরই একই অবস্থা। মামলায় হাজিরা দিতে দিতে আমাদের এখন গা-সওয়া হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এটাই বোধহয় আমাদের নিয়তি। গৌরিপুরের ডৌহাখলার মজিবুর রহমান জানান, এলাকায় তিনি কৃষিকাজ করেন। বিএনপির কোনো পর্যায়ের রাজনীতির সঙ্গেই তিনি জড়িত নন। তবে, ওই রাজনৈতিক দলের সমর্থক হওয়ার কারণেই তাকেও মামলার আসামি করা হয়েছে বলে জানান তিনি। মজিবুর রহমান বলেন, কয়েকদিন ধইরা পালাইয়াছিলাম। আইজ জামিন পাইছি।
চট্টগ্রাম মহানগর যুবদলের যুগ্ম সম্পাদক তৌহিদুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় সুপ্রিম কোর্ট এলাকায়। আলাপকালে জানান বিশেষ ক্ষমতা আইনের একটি মামলায় হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে এসেছেন তিনি। তিনি বলেন, আমিসহ আরো অনেকের নামে গত জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ৬টি মামলা দিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে ৫টি মামলায় ঘুরেফিরে ৪২ জনকে আসামি করা হয়েছে। হাইকোর্টে এসেছিলাম আগাম জামিন নিতে। তিনি বেলন, আদালত আমাদের ৮ সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছেন। কিন্তু ভয় আর আতঙ্ক আমাদের কাটে না। এই বুঝি নতুন কোনো মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়, সেই দুশ্চিন্তায় থাকি। তিনি বলেন, আমাদের নামে যে হারে মামলা করা হচ্ছে এবং যেভাবে আমরা আদালতের বারান্দায় দৌড়াচ্ছি তাতে এটি আমাদের জন্য নতুন এক অভিজ্ঞতা। পরিবার পরিজন, কাজকর্ম বাদ দিয়ে আমরা এখন কেবলই মামলা নিয়ে দৌড়াচ্ছি।

Saturday, September 15, 2018

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে হুমকির মুখে পড়বে স্বাধীন সাংবাদিকতা by উৎপল রায়

মঙ্গলবার বহুল আলোচিত ডিজিটাল নিরাপত্তা বিলের ওপর প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেছে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই বিলের ওপর সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন পেশ করা হতে পারে বলে জানা গেছে। এদিকে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল’ চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অংশীজনদের মতামতকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এটিকে দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক উল্লেখ করে এ নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি প্রস্তাবিত এই বিলটি জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার আগে সংশোধনীর তাগিদ দিয়েছেন সম্পাদক পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা। তারা বলছেন, প্রস্তাবিত এই আইন বাস্তবায়িত হলে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে।
এ বিষয়ে ‘ডেইলি স্টার’ সম্পাদক মাহ্‌্‌ফুজ আনাম মানবজমিনকে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটি, আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আমাদের ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছিল। দুই দফা আলোচনায় আমরা যে আভাস-ইঙ্গিত পেয়েছিলাম বিশেষ করে আইনমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম এবং পরবর্তীকালে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, এই প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটি আমাদের সঙ্গে বসবে। কিন্তু পত্রিকায় দেখলাম প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়ে গেছে। কিন্তু সেখানে আমাদের যে মূল দাবিগুলো ছিল সেগুলো বিকৃত হয়েছে বলে আমি মনে করি। এখানে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা, সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন মিডিয়ার স্বাধীনতা একেবারেই সুরক্ষিত হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি যে এভাবে একটি ব্যুরোক্রেসি স্ট্রাকচারের মধ্যে গণমাধ্যমের পুরো স্বাধীনতা শৃঙ্খলিত হচ্ছে। এই আইনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কম্পিউটার তল্লাশি করা, সিজ করা, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বন্ধ করা এবং প্রয়োজনবোধে গ্রেপ্তারের অধিকার দেয়া হয়েছে। এটি খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর প্রস্তাব আমরা দিয়েছিলাম। প্রেস কাউন্সিল একটি প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান। তার আইনি কাঠামো আছে। যা কিছু হবে ওখানে শুনানি হবে। প্রেস কাউন্সিল থেকে যদি অনুমতি দেয়া হয় যে নিয়মের লঙ্ঘন হয়েছে তাহলে পদক্ষেপের ব্যাপার হতে পারে। আরেকটি প্রস্তাব করেছিলাম যে, দেশে যে তথ্য অধিকার আইন আছে, সেই আইনে গণমাধ্যমের জন্য যে ধরনের স্বার্থরক্ষা হয়েছে সেগুলো যেন সমুন্নত থাকে। একই সঙ্গে তথ্য অধিকার আইন এবং এই আইনে কোথাও যদি সাংঘর্ষিক হয় তাহলে তথ্য অধিকার আইন প্রাধ্যান্য পাবে। কিন্তু এগুলোর কোনো কিছুই রক্ষিত হয়নি বলে আমাদের ধারণা। আমি মনে করি এভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে।’
‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ সম্পাদক নঈম নিজাম বলেন, ‘এ বিষয়ে সম্পাদক পরিষদ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং অন্যান্য সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল তার একটিও গ্রহণ না করা খুবই দুঃখজনক। সেই সময় আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অসঙ্গতিপূর্ণ ধারাগুলো বাদ দেয়া হবে। কিন্তু এর একটিও বাদ না দিয়ে শুধু শব্দগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেটি সাংবাদিকদের অধিকারের জায়গাটুকু হরণ করার মতো, সেগুলো বহাল রেখে এই আইন পাস করার যে প্রক্রিয়া তৈরি করা হচ্ছে এবং সংসদীয় কমিটির যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে আমি এটিকে দুর্ভাগ্যজনক বলে মনে করছি। তিনি বলেন, ‘আমরা অতীতেও দেখেছি, এধরনের কালাকানুন পাস হয়েছে। যার পরিণতি শুভকর হয়নি।’ নঈম নিজাম বলেন, সামাজিক গণমাধ্যমের জন্য সরকার আলাদা আইন করতে পারতো এবং ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারতো। কিন্তু সেটি না করে মূলধারার গণমাধ্যমকে আরো কঠিনভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এই আইন পাস করা হচ্ছে। আমি আশা করবো, এখনো সময় আছে আইনটি সংসদে পাস হওয়ার আগে সংশোধনী এনে এ জায়গাগুলো সরকার পরিবর্তনের ব্যবস্থা করবে। এর অন্যথা হলে বাংলাদেশের আগামী দিনের গণমাধ্যম হুমকির মুখে পড়বে।’
ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটি চূড়ান্ত করায় হতাশা প্রকাশ করেছেন টিআইবি’র (ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল সংবিধানের মূলনীতির পরিপন্থি। অংশীজনদের মতামত অগ্রাহ্য করে গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা হরণের ঝুঁকিপূর্ণ ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা বিল’-এর বিতর্কিত ধারাসমূহ অপরিবর্তিত রেখে সংসদীয় কমিটি কর্তৃক প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক। এই আইন প্রণয়নে সরকারকে আরো দূরদর্শী হওয়ার আহবান জানান ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, একদিকে প্রস্তাবিত বিলের ৮, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারাগুলোর ব্যাপারে গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্বেগ ও মতামতকে উপেক্ষা করা হয়েছে, যা তাদের স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঝুঁকি সৃষ্টি করবে। অন্যদিকে বিতর্কিত ৩২ ধারার ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, ১৯২৩ অনুসরণের সুপারিশ করার দৃষ্টান্ত অত্যন্ত হতাশা ও দুঃখজনক।
তিনি বলেন, সরকারের ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে দুর্নীতি প্রতিরোধ সুশাসন নিশ্চিত হওয়ার যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে প্রস্তাবিত আইনটি সেক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ৩২ ধারার অপপ্রয়োগের ফলে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী দুর্নীতি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন সংক্রান্ত তথ্য জানার আইনি অধিকার ব্যাপকভাবে রুদ্ধ হবে। এছাড়া এই ধারাটি অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং যেকোনো ধরনের গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে কাজ করবে, যা সংবিধানের মূল চেতনা, বিশেষ করে মুক্তচিন্তা বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীন বিকাশের পথ ব্যাপকভাবে রুদ্ধ করবে।

Monday, August 13, 2018

জোট রাজনীতিতে নয়া সমীকরণ by সাজেদুল হক ও উৎপল রায়

রাজনীতি এমনই। খালি চোখে সবসময় সবকিছু দেখা যায় না। পর্দার আড়ালে থাকে ঘটনার ঘনঘটা। অভাবনীয় কিশোর আন্দোলন। সরকারে খানিকটা অস্বস্তি। বিরোধী শিবিরে কিছুটা আশাবাদ। তবে অস্বস্তি কাটিয়ে ফের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাসীনদের হাতেই। গত এক দশকে একেবারে চেনাদৃশ্য। যদিও আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে গ্রেপ্তার নিয়ে একধরনের গ্লোবাল নিন্দা তৈরি হয়েছে। এই যখন অবস্থা তখন সরকারের মন্ত্রীরা গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের  সমালোচনায় মুখর।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে একাধিক মন্ত্রী যোগ দিয়েছেন এই সমালোচনায়। সবচেয়ে কঠোর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ড. কামালের বিরুদ্ধে। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রকে সঙ্গে নিয়ে তিনি এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। এর আগে এস কে সিনহাকে নিয়ে জুডিশিয়াল ক্যুর ষড়যন্ত্র করেছিলেন। কেন হঠাৎ ড. কামাল হোসেনের এত সমালোচনা?
উদ্যোগ আর তৎপরতা চলছে অনেকদিন ধরেই। নানা জটিলতা। তবে সম্ভবত এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে সামনে আসতে যাচ্ছে জোট রাজনীতির নয়া সমীকরণটি। সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে এ ব্যাপারে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে। আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর ঐক্য প্রক্রিয়ার উদ্যোগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি সমাবেশের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ওই সমাবেশে ড. কামাল হোসেন ছাড়াও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাবেক প্রেসিডেন্ট বি. চৌধুরী, আ স ম আব্দুর রব, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মনসুরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা যোগ দিতে পারেন।
দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলকেই এই সমাবেশে যোগ দেয়ার আমন্ত্রণ জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। যদিও শেষ পর্যন্ত সমাবেশের অনুমতি পাওয়া যায় কি-না তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এক্ষেত্রে বিকল্প উপায়ে নতুন জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটতে পারে। এর আগে গত মাসেও জোট রাজনীতি ঘিরে বেশ কিছু চাপান-উতোর হয়েছে। রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে বাম রাজনৈতিক দলগুলোর জোট। আর এ জোটের আত্মপ্রকাশের পরপরই সিপিবি কার্যালয়ে যান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। সিপিবির পক্ষ থেকে অবশ্য একে বর্ণনা করা হয়েছে নিছক সৌজন্য সাক্ষাৎ হিসেবে। কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গেও সেসময় বৈঠক করেন ওবায়দুল কাদের।
কিশোর আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে জোট রাজনীতির আলোচনা অনেটাই মিইয়ে যায়। তবে এখন আবার নতুন করে সে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ প্রসঙ্গে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। জনসভায় অংশ নেয়ার জন্য বিএনপি, বিকল্প ধারা বাংলাদেশ, সিপিবিসহ বিভিন্ন দলকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ না জানালেও জনসভায় তাদের অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, আমরা যেটি জাতীয় ঐক্য হিসেবে মনে করছি তাতে জামায়াত ছাড়া তাদের  সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করছি। ২২শে সেপ্টেম্বরই সরকারবিরোধী বৃহৎ জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটবে কি না- এমন প্রশ্নে সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘তার আগেও তো হতে পারে। প্রক্রিয়া তো চলছে। একটি নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ- এসব মৌলিক ইস্যুতে আলাপ আলোচনা অনেকদিন ধরেই চলছে। এখন একটি সমাধান হয়তো আসবে।’
তিনি বলেন, ‘সকলেই যার যার অবস্থান থেকে বক্তব্য দিচ্ছে। বাম ফ্রন্ট দিচ্ছে, আমরা দিচ্ছি, বিএনপিও দিচ্ছে। এখন শুধু সরকারকে বলা যে, একটি গ্রহণযোগ্য নিরপেক্ষ নির্বাচন, জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর- এগুলো নতুন কথা না। এগুলো আপনারাও (সরকার) অতীতে বলেছেন। এক সঙ্গে আন্দোলনও করেছেন। এখন কেন এগুলো নষ্ট করবেন?’ সুব্রত চৌধুরী বলেন, ‘জোটের ব্যাপারে আমরা সহমত হয়েই আছি। এখন সরকারের কাছ থেকে কিভাবে দাবিগুলো আদায় করবো সেটাই হলো কথা।’
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিন বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে জনসভার জন্য ডিএমপি ও গণপূর্ত অধিদপ্তরে অনুমতি চাওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, ‘একটি গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচনসহ আমাদের সাংবিধানিক অধিকারগুলো বাস্তবায়নের জন্যই এই ঐক্য প্রক্রিয়া।
এই প্রক্রিয়ায় আমরা সকল রাজনৈতিক দলকেই আমন্ত্রণ জানাবো। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এ ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। তিনি বলেন, সেপ্টেম্বরেই বিএনপি, গণফোরাম, বিকল্পধারা, জে এস ডি, নাগরিক ঐক্যসহ বেশকিছু রাজনৈতিক দল নিয়ে সরকারবিরোধী বৃহত্তর জোট গঠন হতে পারে। জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, একটি সুষ্ঠু ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হতে হবে। এখন সরকার যদি পুলিশ আর আমলা দিয়ে নির্বাচন করে তাহলে তো আর সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। সুষ্ঠু নির্বাচন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হলে বিরোধী দলগুলোর ঐক্য নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নতুন রাজনৈতিক জোটের এই প্রচেষ্টা অনেকদিন ধরেই চলছে এবং বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের এ ব্যাপারে সায় রয়েছে। যদিও জোট গঠন নিয়ে বেশ কিছু জটিলতাও রয়েছে। সম্ভাব্য জোটের নেতাদের ওপর এ নিয়ে চাপ ও প্রলোভন দুটিই আসতে পারে। শুরুতে আসন ভাগাভাগি নিয়েও এক ধরনের জটিলতা  তৈরি হয়েছে। সম্ভাব্য জোটের নেতা কে হবেন তা নিয়েও ধোঁয়াশা রয়েছে। যদিও বৃহত্তর জোট প্রশ্নে বিএনপি বড় ধরনের ছাড় দিতে রাজি। মালয়েশিয়া মডেল নিয়েও আলোচনা চলছে। শেষ পর্যন্ত জোট রাজনীতি কোন দিকে গড়ায় তা শিগগিরই পরিষ্কার হয়ে যাবে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন।

Thursday, August 9, 2018

একজন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক by উৎপল রায়

৪৭/১ পুরানা পল্টন। ‘সুবর্ণা’-ছায়াঘেরা, শীতল, ছিমছাম একটি বাড়ি। এ বাড়ির সঙ্গে রাজধানীর খুব বেশি বাড়িকে মেলানো যাবে না। যেমন মেলানো যাবে না এখানে বাস করা মানুষটাকেও। এ বাড়িতেই বাস করেন খ্যাতিমান আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। প্রখ্যাত এ আইনজীবী এক সময় প্রতিনিয়ত সরব ছিলেন আদালত আর মিডিয়ায়। এখন অনেকটাই নীরব। কেমন আছেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, বার্ধক্য তাকে কাবু করেছে। অনেকদিন ধরে শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। দিন কাটাচ্ছেন অনেকটা নীরবে, নিভৃতে। বই, পত্রিকা পড়ে, টিভি দেখে সময় কাটে তার। পারতপক্ষে বাসা থেকে বের হন না। বের হলেও হুইলচেয়ারই ভরসা। প্রিয়প্রাঙ্গণ সুপ্রিম কোর্টেও এখন নিয়মিত পা পড়ে না তার। যান কালেভদ্রে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন-পুরনো প্রায় সব মামলাই পরিচালনা করেন তার ছেলে ব্যারিস্টার ফাহিমুল হক ও জুনিয়র আইনজীবীরা। তিনি পরামর্শ দেন। পুরানা পল্টনের ওই বাসার নিচতলায় তার চেম্বার বেশিরভাগ সময়ই নীরব থাকে। চেম্বারে দায়িত্বরত একজন বলেন, ‘স্যার বেশিরভাগ সময়ই বাসার দোতলার কক্ষে থাকেন। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া সেখান থেকে নিচে নামেন না। কথা বলেন কম। চেম্বারেও বসেন না খুব একটা। মাঝে মধ্যে যখন নিচে নামেন, কোথাও যান তখনই তাকে দেখি। তার জুনিয়র আইনজীবীরা মাঝেমধ্যে চেম্বারে আসেন। আগে গাজীপুরের চন্দ্রায় তার প্রতিষ্ঠিত হাসপাতাল ও বাগানবাড়িতে যেতেন প্রায় প্রতি সপ্তাহে। এখনও যান তবে, অনিয়মিত।’ সম্প্রতি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক’র পুরানা পল্টনের ‘সুবর্ণা’য় কথা হয় তার সঙ্গে। কেমন আছেন? তিনি বলেন, ‘ভালো নেই। বয়স হয়েছে।’ বর্তমান রাজনীতি ও সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কী ভাবছেন- রফিক-উল হক বলেন, ‘আমার এখন মরার বয়স হয়েছে। ওসব নিয়ে এখন আর চিন্তা করি না। ভাবিও না। আগে ভাবতাম। কথা বলতাম। এখন আর বলি না। বলতে চাইও না।’
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর বেসরকারি একটি হাসপাতালে তার বাম পায়ে অস্ত্রোপচার হয়। এরপর থেকে তার স্বাভাবিক হাঁটাচলা ব্যাহত হচ্ছে। মাঝেমধ্যে পায়ে ব্যথা হয়। যে কারণে হুইল চেয়ারে যাওয়া-আসা করতে হয়। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, ২০১১ সালে প্রিয়তমা স্ত্রী ডা. ফরিদা হকের মৃত্যুর পর থেকেই নিঃসঙ্গতা অনুভব করতেন তিনি। আর এখন বার্ধক্য যোগ হয়ে সেই নিঃসঙ্গতা আরো বেড়েছে। পুরানা পল্টনের ওই বাসার দোতলায় তাকে দেখাশোনা করেন একাধিক গৃহভৃত্য। তারা জানান, বয়সের কারণে রফিক-উল হকের জীবনযাপনেও অনেকটা পরিবর্তন এসেছে। ঘুম থেকে উঠেন একটু দেরিতে। পরিমিত আহার করেন। খাবারের তালিকায় থাকে কাচা ছোলা, চা, ভাত, আম, দুধ, চিড়া।
রফিক-উল হকের জুনিয়র এক আইনজীবী বলেন, ‘স্যার লোকসমাগম ও গণমাধ্যম এড়িয়ে চলেন। কারো সঙ্গে বেশি সময় নিয়ে কথা বলেন না। সংবিধান, আইন, আদালত, দেশের রাজনীতির প্রতি এখন আর আগের মতো আগ্রহ নেই। আগে যেভাবে এসব নিয়ে সরব ছিলেন এখন তা একেবারেই নেই। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া আদালতেও আসেন না খুব একটা। আদালত সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়েও এখন তার আগের মতো উৎসাহ নেই। স্যারের মামলাগুলো এখন আমরাই পরিচালনা করি। তিনি আমাদের পরামর্শ দেন। আর পুরানা পল্টনের ছায়াশীতল, নিরিবিলি  এই বাড়িটি তার এত প্রিয় যে এখান থেকে কোথাও যেতে চান না তিনি।’
ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের জন্ম ১৯৩৫ সালের ২রা নভেম্বর কলকাতার সুবর্ণপুর গ্রামে। ১৯৫৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, ১৯৫৭ সালে দর্শন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। ১৯৫৮ সালে  এলএলবি পাস করেন।  ১৯৬২ সালে যুক্তরাজ্য থেকে বার এট ল’ সম্পন্ন করেন  তিনি। ১৯৬৫ সালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হিসেবে এবং ১৯৭৩ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে আইন পেশা শুরু করেন তিনি। বর্ণাঢ্য  জীবনে আইন পেশায় দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর পার করেছেন। ব্যারিস্টার  রফিক-উল হক বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে কাজ করেছেন। বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জমানায় দুই নেত্রী যখন কারাগারে তখন তাদের জন্য অকুতোভয়ে আইনি লড়াই করেন তিনি। একই সঙ্গে দুই নেত্রীর সমালোচনা করতেও পিছপা হননি তিনি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভাবমূর্তি রক্ষায় বরাবরই সোচ্চার রফিক-উল হক। দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও আইনি বিষয় নিয়ে সরকারকে সহযোগিতা করেছেন বর্ষীয়ান এই আইনজীবী। ১৯৯০ সালের ৭ই এপ্রিল থেকে ১৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন রফিক-উল হক। কিন্তু কোনো সম্মানী নেননি। পেশাগত জীবনে তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক দল করেননি। তবে, নানা সময়ে রাজনীতিবিদরা সবসময় তাঁকে পাশে পেয়েছেন। রাজনীতিবিদদের সম্মান সবসময়ই অর্জন করেছেন তিনি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তাঁর জীবনের উপার্জিত অর্থের প্রায় সবই ব্যয় করেছেন মানুষের কল্যাণ ও সমাজসেবায়।  আর তার এই উদ্যোগকে বিরল বলে অ্যাখ্যায়িত করেছেন আইন অঙ্গনে তার সমসাময়িকরা।
সাবেক প্রধান বিচারপতি মো. ফজলুল করিম মানবজমিনকে বলেন, ‘ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে আমার পরিচয় আমার ওকালতি জীবনের শুরু থেকে। সেই ১৯৬৯ সালে। তবে, এর আগে থেকেই তিনি ওকালতি শুরু করছিলেন। আইনজীবী হিসেবে রফিক-উল হক সততা, নিষ্ঠা ও সমতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি একাগ্র চিত্তের মানুষ। দায়িত্বশীলও। কখনো তিনি জাতি, ধর্ম, বর্ণ, দল বিবেচনায় নেননি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পক্ষেও তিনি ওকালতি করেছেন। দুজনকেই তিনি সমভাবে ও সমদৃষ্টিতে দেখেছেন। আগ্রহ নিয়ে দুজনের মামলা পরিচালনা করেছেন। বিচারপতি ফজলুল করিম বলেন, আইনের ব্যাপারে তার যেমন অগাদ জ্ঞান, তেমনি আইনকে তিনি আইনের দৃষ্টিতে দেখেছেন সবসময়। কোন দল দেখেননি। বিনে পয়সায়ও তিনি অনেকের মামলা পরিচালনা করেছেন। আদালতে তাকে খুব সামনে থেকে দেখেছি ও শুনেছি। তার যুক্তিতর্ক খুবই স্পষ্ট ও সাবলীল। ব্যারিস্টার রফিক-উল হক যখন অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন তখনো তিনি কোনো পক্ষপাতিত্ব করেননি।’ প্রাক্তন এই প্রধান বিচারপতি বলেন, ২০১০ সালে আমি অবসরে যাই। এরপর থেকে ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের সঙ্গে আর ওইভাবে যোগাযোগ নেই। মাঝে মধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখা-সাক্ষাৎ হতো। এখন আমি নিজেও অসুস্থ। শুনেছি তিনিও অসুস্থ। আমি উনার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি। তিনি যেন দীর্ঘায়ু হন। কারণ তার কাছে নতুনদের অনেক কিছু শেখার আছে।
ব্যারিস্টার রফিক-উল সম্পর্কে বলতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, তিনি সমসাময়িককালের একজন অত্যন্ত উঁচুমানের আইনজীবী যাকে বিচারক, আইনজীবীসহ এই পেশার সর্বস্তরের ব্যক্তিগণ শ্রদ্ধা সম্মানের চোখে দেখেন। তিনি এই দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা কোনো না কোনোভাবে পরিচালনা করেছেন। ওই সব মামলায় বিভিন্ন আইনের ইন্টারপ্রিটেশন (বিশদ ব্যাখ্যা) দেয়া হয়েছে এবং আইনের ভূমিকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই  দেশে ডেভেলপমেন্ট অব ল’তে আইনজীবী হিসেবে এক বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ব্যক্তি হিসেবেও তিনি অত্যন্ত সদয় ও স্নেহপরায়ণ। রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, তিনি জীবনে অনেক টাকা উপার্জন করেছেন। আবার সেই অর্থ অনেক জনহিতকর ও মানুষের কল্যাণে ব্যয় করেছেন। তার কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠান আছে। দাতব্য প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে তিনি যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তা অত্যন্ত বিরল। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে তার সম্পর্ক খুবই অন্তরঙ্গ এবং তিনি আমার শ্রদ্ধাভাজন। শুনেছি তিনি এখন অনেকটাই নিভৃত জীবনযাপন করছেন। তবে, সুপ্রিম কোর্টে মাঝে মধ্যে তার সঙ্গে দেখা হয়, কথা হয়। আমি উনাকে উৎসাহ দিয়ে বলি, উনি যেন সুপ্রিম কোর্টে নিয়মিত আসেন। কারণ, উনাকে দেখলে নতুন আইনজীবীরা উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত হবেন।
রোকন উদ্দিন মাহমুদ বলেন, বিগত ওয়ান ইলেভেনের সময় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আইনজীবী হিসেবে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছিলেন। ওয়ান ইলেভেন সরকারের বিভিন্ন আদেশ নির্দেশ চ্যালেঞ্জ করে বিভিন্ন মামলা পরিচালনা করেছিলেন। একজন স্পষ্টভাষী ও সাহসী মানুষ হিসেবেও তার সুনাম রয়েছে। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল থাকাকালে বেশকিছু বিরল দৃষ্টান্ত রেখেছিলেন। যে দৃষ্টান্তগুলো উনার আগে বা পরে কেউ দেখাতে পারেনি। উদাহরণ হিসেবে বলতে পারি- তখনকার সময়ে অনেককেই স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টে ডিটেনশন দিয়ে কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা হতো। এর বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে হেভিয়াস কর্পাস রিট দায়ের হতো। সেসব ফাইল দেখে যদি তিনি বুঝতে পারতেন যে ডিটেনশন বৈধ হয়নি, রাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল হওয়া সত্ত্বেও স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কার্যতালিকার ওইসব মামলাগুলোর বিষয়ে আদালতকে অপেক্ষায় না রেখে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আটকাদেশ বৈধ হয়নি উল্লেখ করে তাদের ছেড়ে দেয়ার কথা বলতেন। এরকম স্বচ্ছতা অন্য কোনো অ্যাটর্নি জেনারেল দেখাতে পারেননি। শুধু তাই নয়, অন্যান্য রিট পিটিশনের ক্ষেত্রেও তিনি যদি দেখতেন যে সরকারি আদেশ বেআইনি সেখানেও তিনি আদালতে কোনোরূপ ভনিতা না করে তা স্বীকার করে নিতেন। আমি শুনেছি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তার যে প্রাপ্য বেতন ছিল, তাও গ্রহণ করেননি। এটিও বিরল দৃষ্টান্ত।    
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হককে আইনজীবী হিসেবে আমি প্রথম দেখি ১৯৬২ সালে। আমার বাবার (ব্যারিস্টার আসরালুল হোসেন) ফরাসগঞ্জের চেম্বারে। বাবার জুনিয়র আইনজীবী হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। শুরু থেকেই তাকে একজন মেধাবী মানুষ মনে হয়েছে। একপর্যায়ে আমার বাবা তাকে বেশ কিছু মামলা পরিচালনার দায়িত্ব দেন এবং তিনি তা যথেষ্ট দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করেন। ১৯৬৬ সালে বাবা মামলার প্রয়োজনে লম্বা সময়ের জন্য জেনেভাতে যান। ওই সময় চেম্বারের সব মামলার দায়িত্ব বর্তায় তার (ব্যারিস্টার রফিক-উল হক) ওপর। সেই থেকে তিনি একজন ভালো আইনজীবী হিসেবে সুনাম অর্জন শুরু করেন। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও আমি সুপ্রিম কোর্টের একই চেম্বারে দীর্ঘদিন বসেছি। তবে, এখন অসুস্থতা ও বার্ধক্যের জন্য তিনি আদালতে নিয়মিত আসতে পারেন না। তিনি একজন মেধাবী ও পরিশ্রমী আইনজীবী। মামলার প্রয়োজনে প্রচুর পড়াশোনা করেন। মক্কেলদের প্রচুর সময় দেন। মামলা পরিচালনাও করেন খুব নিখুঁতভাবে। আদালতে যখন মামলার শুনানিতে আসেন, পুরোদমে প্রস্তুতি নিয়েই আসেন এবং সময়মতো আসেন, যা এখনকার আইনজীবীদের অনেকের ক্ষেত্রেই খুব একটা দেখা যায় না। আর কাজ এবং দায়িত্বের ব্যাপারে কখনোই তাকে অধৈর্য হতে দেখিনি। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। এ কারণে যে তার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এখনো শিখছি। আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, এ পর্যন্ত প্রায় একশ গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তিনি অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া যখনই আদালতের বিচারকরা প্রয়োজন মনে করেছেন তখনই তাকে ডাকেন। এমনকি এ-ও দেখেছি যে আদালতে অন্য মামলার শুনানিকালে বিচারকরা তার কাছ থেকে নানা সময়ে সাংবিধানিক ও আইনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা শুনতে চেয়েছেন। তিনি বলেন, একজন সাহসী ও স্পষ্টভাষী মানুষ হিসেবেও তিনি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। স্পষ্ট এবং সত্য কথা বলতে কখনো তিনি কাউকে পরোয়া করেননি।

Tuesday, July 17, 2018

সরজমিন আদালতপাড়া: কমলার অপেক্ষার প্রহর ১৬ বছরেও শেষ হয়নি by উৎপল রায়

বুধবার ১১ই জুলাই। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলার বারান্দার মেঝের এক কোনায় বসে আছেন বৃদ্ধা কমলা খাতুন। সকাল থেকে অপেক্ষা। তার আইনজীবী আসবেন। মামলা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তুলবেন। এরই মধ্যে দুপুরও গড়িয়ে যায়। কিন্তুআইনজীবী আর আসেন না। তিনি জানান, মাদক মামলার আসামি তিনি। গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে তিনি প্রতিনিয়ত আদালতে আসছেন। হাজিরা দেন। রাজধানীর উত্তর বাড্ডার বাসিন্দা কমলা খাতুন জানান, প্রায় ১৬ বছর আগে তার নামে মাদকের মামলা হয়। তার দাবি জায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে প্রতিপক্ষ তার ঘরে হেরোইন রেখে তাকে ফাঁসিয়ে দেয়। কিছুদিন কারাগারেও ছিলেন। এরপর নিয়মিতই আদালতে আসা যাওয়া। তার মামলা বর্তমানে কি পর্যায়ে আছে তা জানেন না স্বল্প শিক্ষিত কমলা খাতুন। শুধু বলেন, সাক্ষী আসে না, উকিল সব জানে। কিন্তু সকাল থেকে অপেক্ষা করেও আইনজীবীর দেখা পাননি। সঙ্গে মোবাইল ফোন এমনকি কোনো স্বজনও নেই। তার অপেক্ষার প্রহর যেন আর ফুরোয় না। তিনি বলেন, সাক্ষী আহে না, বাদীও আহে না। কিন্তু আমি নিয়মিত আহি। তিনি জানান, তার স্বামী নেই। মেয়ের স্বামীদের সহায়তায় কোনোমতে দিন চলে তার। এই দীর্ঘ সময়ে মামলা চালাতে গিয়ে তিনি নিঃস্ব হয়ে গেছেন। এই বয়সে আদালতে হাজিরা দিতে দিতে শরীর স্বাস্থ্যও ভেঙে পড়েছে। কিন্তু কমলা খাতুনের বিচারকাজ আর শেষ হয় না। কবে শেষ হবে তাও তিনি জানেন না। বলেন, ‘আমার যদি কোনো দোষ থাইক্যা থাকে বিচার হোক। সাজা হোক। কিন্তু এই যন্ত্রণা আর সহ্য  হইতেছে না। ১৬ বছর ধইরা আদালতে আসতে আসতে আমার সব শেষ। এহন শান্তিতে মরবার চাই।’
একই ভবনের পঞ্চম তলার বারান্দার মেঝের এক কোনায় জবুথবু হয়ে বসে আছেন আব্দুল ওয়াদুদ (৬৪)। পাশেই তার স্ত্রী ছামুদা বেগম (৫৫)। ওয়াদুদের শরীর ভেঙে পড়েছে। ঘোলাটে চোখ। বগুড়ার সোনাতলা পাঁচপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল ওয়াদুদ জানান, তিনি গ্যাস চালিত অটোরিকশা চালাতেন। প্রায় একযুগ আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিনতাইয়ের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন তিনি। প্রায় ছয় মাস ছিলেন কারাগারে। এরপর এই দীর্ঘ সময়ে মামলা এক আদালত থেকে অন্য আদালতে বদলি হয়েছে। কিন্তু মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। আবদুল ওয়াদুদ জানান, মেরুদণ্ডের হাড় ক্ষয়ে যাচ্ছে তার। প্রায় সারাক্ষণ বসে থাকতে হয়। তার স্ত্রী ছামুদা বেগম চিকিৎসা সংক্রান্ত বিভিন্ন রিপোর্ট দেখিয়ে বলেন, আব্দুল ওয়াদুদ এখন আর কোনো কাজ করতে পারেন না। তিনি অন্যের বাসাবাড়িতে ঝিয়ের কাজ করেন। এক ছেলে রিকশা চালায়। কোনোমতে সংসার টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু মামলার কারণে আব্দুল ওয়াদুদের জীবন একপ্রকার থমকে আছে। দীর্ঘ সময়েও মামলা শেষ না হওয়ায় এই অসুস্থ শরীরেও প্রতিটি ধার্য তারিখে আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে। 
ঢাকা জেলা জজ আদালত ভবনের (পুরাতন) তৃতীয় তলায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৪ এর সামনে জটলা। বিচারপ্রার্থী, আসামি ও তাদের স্বজনদের অপেক্ষা। আইনজীবীদের সঙ্গে বিচারপ্রার্থীদের বাদানুবাদ। তর্ক-বিতর্ক। হকারদের অবাধ আনাগোনা। একই চিত্র যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতের সামনেও। ভেতরে বিচারকাজ চলছে। কিন্তু বাইরে কোলাহল, চিৎকার চেঁচামেচি। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত পুলিশও নির্বিকার। আইনজীবী পলাশ কান্তি দাস বলেন, যেহেতু এগুলো বিচারিক আদালত তাই এখানে বাদী, আসামি, সাক্ষী সবাই আসে। সেজন্য কোলাহল একটু বেশি। তবে, আমরা চাই কোলাহলমুক্ত পরিবেশ। আদালতের পরিবেশ যেন আদালতের মতোই থাকে। আইনজীবী অনিরুদ্ধ বলেন, মামলার অনুপাতে বিচারক খুবই অপ্রতুল। একেকটি আদালতে অসংখ্য মামলা। বাদী, আসামিদের দিনের পর দিন আদালতে আসতে হয়। সকাল থেকে দিনভর তাদের অপেক্ষায়  থাকতে হয়। যে কারণে আদালতের পরিবেশও থাকে কোলাহলপূর্ণ। বিচারপ্রার্থী মানুষের দুর্দশা দেখে আমাদেরও কষ্ট হয়। কিন্তু সিষ্টেম এমনভাবে তৈরি হয়েছে যে দিনের পর দিন এভাবেই চলছে। বিচারের আশায় থাকা মানুষের দুর্দশা কিভাবে কমবে সে বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। 
বুধবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রিতা আক্তার (৪২) হন্যে হয়ে ঘুরছেন ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত ভবন এলাকায়। যাচ্ছেন এর ওর কাছে। কখনো আইনজীবী কখনো গণমাধ্যমকর্মী। বিলাপ করে বলছেন, ‘আমার রাকিবরে মাইরা ফালাইছে, আমি আল্লাহর কাছে বিচার চাই।’ রিতা আক্তার জানান, গত ৪ঠা এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার ছেলে দুটি সিনেমায় অভিনয় করা শিশুশিল্পী রাকিব হাওলাদার (১৫) বাসা থেকে বের হয়ে কাপ্তান বাজার পোলট্রি মোড় যায়। সেখান থেকে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই আটক করে ওয়ারী থানায় নিয়ে যাওয়া হয় রাকিবকে। তিনি খবর পেয়ে থানায় গিয়ে ছেলের চিৎকার শুনতে পান। দেখতে পান তার ছেলেকে মধ্যযুগীয় কায়দার পেটানো হচ্ছে। এভাবে দুদিন পার হওয়ার পর ৬ই এপ্রিল তাদের জানানো হয় রাকিব ক্রসফায়ারে মারা গেছে। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে গিয়ে ছেলের লাশ দেখতে পান। তিনি জানান, রাকিবকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ওয়ারী থানার ওসি রফিকুল ইসলাম, ওসি (তদন্ত) মো. সেলিমসহ চারজনের বিরুদ্ধে গত ১১ই এপ্রিল মামলা করেন রিতা আক্তার। তিনি জানান, মামলা করার পর থেকেই নানা হুমকির মধ্যে ছিলেন তিনি। ইতিমধ্যে তাকে জোর করে  মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নেয়া হয়েছে। অভিযোগ থেকেও তাদের অব্যাহতি দিয়েছেন আদালত। বুধবার ঢাকা মহানগর দায়রা আদালত প্রাঙ্গণে আলাপকালে তিনি জানান, ঘটনার পর তার কাছ থেকে অন্তত ১০টি কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে পুলিশ ও সাদা পোশাকের লোকজন। তাকে এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করতেও নিষেধ করা হয়েছে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিতা আক্তার বলেন, ‘আমার ছেলেরে যারা মারছে তাদের বিচার আল্লায় করবো।’
ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন আদালত ভবনের পাশে হাজতখানার সামনে বিভিন্ন বয়সী নারী পুরুষের ভিড়। একেকটি পুলিশ ভ্যান আসার সঙ্গে সঙ্গে তারা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন। খুঁজছেন স্বজনদের। কারো হাতে কলা, পাউরুটি। এই আদালতের কয়েকজন আইনজীবী ও তাদের সহকারীরা জানান, আসামিদের গ্রেপ্তারের পর প্রথমে এখানেই নিয়ে আসা হয়। এরপর তাদের সংশ্লিষ্ট আদালতে তোলা হয়। শুনানির পর আদালতের আদেশ অনুযায়ী যাদের কারাগারে পাঠানো হয় তাদের আবারো ওই হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। শ্যামপুর থেকে আসা ষাটোর্ধ্ব জুলেখা বেগম জানান মঙ্গলবার শ্যামপুর এলাকায় দুই গ্রুপের মারামারির একটি মামলায় তার ভাইয়ের ছেলে জালালকে ধরে নিয়ে আসে পুলিশ। বুধবার আদালতে তাকে তোলা হবে। তাকে একনজর দেখার জন্য সকাল থেকে অপেক্ষায় আছেন তিনি।

Thursday, May 24, 2018

কেন হতাশ তরুণ সমাজ? by উৎপল রায়

মেহেরপুর থেকে উচ্চ শিক্ষার উদ্দেশ্যে রুবেল ঢাকায় আসেন ২০১২ সালে। সংসারে তিনিই বড় সন্তান। রুবেলের বাবা ছিলেন মেহেরপুর জেলা জজ আদালতের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। মারা গেছেন কয়েক বছর আগে। বাবার সামান্য পেনশনের টাকা ও অল্প জমির আয়ে তিন ভাইবোন ও মাকে নিয়ে কোনোমতে চলছে সংসার। দুই বছর আগে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিবিএ সম্পন্ন করেন। বড় ছেলে হওয়ায় সঙ্গত কারণেই তার ওপর সংসারের দায়িত্ব বর্তায়। তিনি এখন থাকেন মিরপুরের একটি মেসে। এই কয়েক বছরে পড়াশুনার পাশাপাশি কিছু রোজগারের আশায় নানা চেষ্টা করেছেন তিনি। পড়ার খরছ যোগাতে পরিচয় গোপন করে মিরপুর ১০ নম্বর গোলচত্বরের ফুটপাথে  কাপড়ও বিক্রি করেছেন। বিবিএ পাস করার পর সরকারি, বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ইন্টারভ্যু দিয়েছেন। কিন্তু চাকরি নামক ‘সোনার হরিণ’ অধরা তার কাছে। হতাশ সজল বলেন, উচ্চশিক্ষিত হয়েও আমি বেকার। নিজেকে সবসময় ছোট মনে হয়। পুরো পরিবার আমার ওপর নির্ভর করছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে আমি হতাশ। এ হতাশা বোঝানো যাবে না।  
মো. ওয়ালীউল্লাহ ওলি (২৯)। ২০১৪ সালে বরিশাল বিএম কলেজ থেকে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। এরপর পেরিয়ে গেছে ৪ বছর। কিন্তু চাকরি এখনো অধরা ওলির কাছে। মাদারীপুরের ছেলে ওলি থাকেন মিরপুরের কাজীপাড়ার একটি মেসে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে না পারছি নিচে নামতে না পারছি উপরে ওঠতে। চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমাও প্রায় শেষের পথে। শুধু আমি নই, আমার বন্ধুদের অনেকেরই একই অবস্থা। ওলি জানান, ঘুষ, তদবির আর রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়া এখন আর চাকরি হয় না। আর চাকরি না পাওয়ায় পরিবার, স্বজনদের চাপ রয়েছে। সামাজিকভাবেও হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছি। এলাকায় গেলেই সবাই জানতে চায় কেন চাকরি হচ্ছে না? নিজেকে সবসময় ছোট মনে হয়। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে আমি হতাশ।
কেবল বেকারত্বের জন্য নয়, চারদিকে খুন, ধর্ষণ, সড়কে মৃত্যুর মিছিলসহ নানা নেতিবাচক ঘটনা ঘটছে। এতে করে আমাদের মতো তরুণদের হতাশা আরো বাড়ছে। কিশোরগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী প্রিতী বলেন, যখন কলেজে পড়া শুরু করি তখন থেকেই ইচ্ছে ছিল চাকরি করবো, নিজের পায়ে দাঁড়াবো। কারো মুখাপেক্ষী হবো না। গৃহিণী হয়ে থাকবো না। কিন্তু চাকরির বাজারের যে অবস্থা তাতে পড়াশুনা শেষ করে একটি মানসম্মত চাকরি পাবো কি না এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি। 
শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে তরুণদের হতাশার একটি বড় কারণ কর্মসংস্থানের অভাব বা বেকারত্ব। শিক্ষিত বেকারদের মধ্যে এ হতাশা আরো বেশি বলে মনে করেন তারা।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, শুধু শিক্ষিত বেকার নয়, গ্রামাঞ্চলে তরুণ যুব সমাজ ব্যাপকহারে বেকার রয়েছে। আর ব্যাপকহারে বেকারত্বের কারণেই কিন্তু বেকারদের একটি অংশ মাদকে আসক্ত হচ্ছে।  এসব হতাশা, নিরাশা থেকেই হয়। তরুণদের এই হতাশা নিরাশা দূর করাও কিন্তু একটি জাতীয় দায়িত্ব। তিনি বলেন, জঙ্গিবাদ, মাদকের বড় কারণই হচ্ছে হতাশা ও নিরাশা। এটি চাকরি পেয়েও হতে পারে আবার চাকরি না পেয়েও হতে পারে। একজন যদি এম এ পাস করে ৩ হাজার ৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করে তাহলে তার এই চাকরি পাওয়া এবং বেকার থাকার মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। আবার  কোনোক্ষেত্রে যদি বেতন কমও হয় কিন্তু আশা থাকে যে ২/৩ বছর পার করলে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা আছে, তাহলেও হয়তো চালিয়ে নেয়া যায়। মূল কথা হলো কাজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বছর আগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন আল মাসুদ সজীব। বর্তমানে টিউশনির টাকায় নিজের খরছ চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, চাকরির জন্য বিশেষ করে সরকারি চাকরির জন্য গত দু’বছর ধরে চেষ্টা করছি। কিন্তু হচ্ছে না। তরুণ সমাজের বেশির ভাগই প্রত্যাশা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছে না। শিক্ষিত তরুণদের জন্য চাকরির বাজারটা ক্রমেই যেন সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এতে করে অনেকেই চাপে পড়ে হতাশায় নিমজ্জিত হচ্ছে। আর হতাশা থেকে অনেকেরই সামাজিক অবক্ষয় ঘটছে। তিনি বলেন, কর্মসংস্থানের অভাব যেমন দেখতে পাচ্ছি তেমনি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী ও ঢেলে সাজানোরও প্রয়োজন রয়েছে।
আজহার করিম শাহেদ। খুলনার পাইকগাছা থেকে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছিলেন। উচ্চশিক্ষিত হয়েছেনও। কিন্তু মূল যে উদ্দেশ্য ছিল চাকরি সেটি এখনো অধরা তার কাছে। তিনি এখনো বেকার। তিনি বলেন, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পেরিয়ে যাচ্ছে। পরিবারকে কিছুই দিতে পারছি না। বেকার বলে বিয়েও করতে পারছি না। যাকে বিয়ে করবো আমার বেকারত্বের জন্য সেই প্রেমিকাও হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি চাকরি পেতে গেলে ঘুষ দিতে হয়। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকতে হয়। কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থীদের সে উপায়ও নেই। বেসরকারি চাকরিতেও আমার সনদের মূল্যায়ন হয় না। এ অবস্থায় দুঃসহ জীবন পার করছি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও অর্থনীতিবিদ ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, বেকারত্ব থাকলে যা হয়, এটির একটি হলো সামাজিক প্রভাব অন্যটি অর্থনৈতিক এই দু্‌’দিক দিয়েই ক্ষতি হচ্ছে। সামাজিক দিক হলো বেকারদের তো সিকিউরিটি অব লাইফ অর্থাৎ যেটি আয়কে বোঝায়, সেটা তাদের নেই। তাদের প্রতিনিয়ত পরিবারের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। আর হাত পাতলে সবসময় পাওয়াও যায় না। একজন শিক্ষিত যুবক যখন পরিবারের কাছে টাকা চায় তখন সব পরিবারই সবসময় তা দিতে পারে না। এতে বেকারদের মনে হতাশাজনক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং এ থেকে তারা সামাজিক অপরাধ, অস্থিরতা ও বেআইনি কাজে লিপ্ত হয়। তিনি বলেন, এটি কিন্তু আমাদের জন্য বিরাট সমস্যা। এ অবস্থা যদি বাড়তে থাকে তাহলে এটি দেশকে ভীষণ অস্থিতিশীল ও অস্থির করে তুলবে। তাই এ নিয়ে জরুরিভিত্তিতে চিন্তা করা উচিত। 
অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, শিক্ষিত তরুণ সমাজের হতাশার দুটো কারণ রয়েছে। একটি হচ্ছে কর্মসংস্থানের পরিমাণের সংকট। অন্যটি স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার জায়গায় একটি সংকট আছে। তিনি বলেন, হতাশা থেকে বেকারদের একটি অংশ অপরাধজনক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হচ্ছে। আর বেকারদের  বৃহৎ একটি অংশ জীবনবাজি রেখে ঝুঁকি নিয়ে বিদেশের বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার চেষ্টা করছে-এটিও হতাশা থেকেই। দেশের প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, আমাদের আরো বেশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী প্রয়োজন। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, রাষ্ট্র তরুণদের জন্য প্রয়োজনীয় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে না। কাজ না পাওয়াতে তরুণরা হতাশায় ভুগছে। আর এ হতাশা থেকে তরুণদের একটি অংশ নানা সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, একজন শিক্ষার্থী পাস করে কর্মজীবনে প্রবেশ করবে- এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু বাবা মায়েরা অনেক কষ্ট করে সন্তানকে পড়াশুনা করান, স্বপ্ন দেখে। কিন্তু পাস করে চাকরি ক্ষেত্রে সেই সন্তান কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাবা মা স্বজনদের স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে না।
স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে। আর এ থেকেই কোনো কোনো তরুণ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। কেউ কেউ দুঃস্বপ্ন ভুলে থাকার জন্য মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ে। একদিকে তারা হতাশা ভুলে থাকার জন্য মাদক গ্রহণ করছে অন্যদিকে মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তৌহিদুল হক বলেন, একদিকে আমরা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না করে তরুণদের একটি অংশকে অপরাধের দিকে ঠেলে দিচ্ছি অন্যদিকে সেই অপরাধের জন্য তাদের বিচার হচ্ছে। এটি স্ববিরোধী। তিনি বলেন, তরুণ সমাজ নিয়ে আমাদের আরো বেশি ভাবতে হবে। আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে বেকারত্ব  বাড়ছে। একই সঙ্গে তরুণদের হতাশাও বাড়ছে। শুধু পাসের সংখ্যা বাড়িয়ে কোনো লাভ হবে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এমন পর্যায়ে নিতে হবে যেন তরুণদের বেকারত্বের হতাশায় ভুগতে না হয়।

Thursday, May 10, 2018

তারুণ্যের সংকট: কেন মিলছে না চাকরি? by উৎপল রায়

অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষকরা বলছেন- সরকারি চাকরিতে পদের বিপরীতে তীব্র প্রতিযোগিতা, কোটার প্রতিবন্ধকতা, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ বছর বহাল রাখা, নিয়মিত শূন্য পদ পূরণ না হওয়া, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ঘুষ ও তদবির বাণিজ্যসহ রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ, নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিত বেকারদের কাছে সরকারি চাকরি সবসময়ই ‘সোনার হরিণ’। অন্যদিকে বেসরকারিখাতে কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষার্থীর চাহিদা বেশি। কিন্তু সে অনুপাতে শিক্ষার্থী স্বল্প। যে কারণে বেসরকারিখাতে চাকরি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে সাধারণ ও প্রচলিত শিক্ষার্থীদের জন্য। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সরকারি চাকরির বাইরে বড় ভরসা বেসরকারিখাত। বর্তমানে বিকাশমান অর্থনীতি ও শিল্পখাতে কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন লোকের চাহিদা বেশি। এক্ষেত্রে সাধারণ ও প্রচলিত শিক্ষায় শিক্ষিতদের চাহিদা কম থাকায় তাদের বিশাল একটি অংশ বেসরকারিখাতে চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে, বেকারত্বের সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিগত কয়েক বছরে দেশের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। কৃষি, শিল্পে লেগেছে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া। গার্মেন্ট, ওষুধ শিল্পসহ বেসরকারি নানা ক্ষেত্রে লোকবলের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু বেসরকারি খাতে যে পরিমাণ কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন লোকবল প্রয়োজন সেই অনুপাতের শিক্ষার্থী দেশে নেই। সঙ্গত কারণেই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের দিয়ে সে অভাব পূরণ করা যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেশের বাইরে থেকে লোক এনে সেই অভাব পূরণ করতে হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষাকে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।
অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, যেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ কম সেখানে বেকার সমস্যা থাকবেই। বেকারত্বের জন্য কর্মসংস্থান যেমন একটি সমস্যা, তেমনি মানসম্মত কর্মস্থানের অভাবও আরেকটি সমস্যা। তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধির কৌশলে যেভাবে আমরা এগুচ্ছি, সেখানে কর্মসংস্থান কম তৈরি হচ্ছে। আর বেকাররা যে ধরনের কর্মসংস্থান পেতে চায়, সে ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। তিনি বলেন, সরকারি চাকরি এক ধরনের নিশ্চয়তার বিষয় বলে এর প্রতি আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে। যদি ব্যক্তি ও বেসরকারিখাতে অনেক কর্মসংস্থান থাকতো তাহলে সরকারি চাকরির প্রতি এত নজর থাকতো না। আর সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতার জায়গায় দুর্বলতা আছে। দুর্নীতি ইত্যাদি বিষয়ও আছে। আবার সরকারি প্রতিষ্ঠানে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা শুনি জনবল সংকট। দেখা যাচ্ছে জেলায় জেলায় আড়াইশ বেডের হাসপাতাল হচ্ছে, কিন্তু জনবল আছে ৫০ বেডের। সরকারি চাকরিতে অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এগুলো সচল হচ্ছে না। হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, চাকরি না পাওয়ার মূল কারণ হলো কর্মসংস্থানের সংকট। এই যে কোটা সংস্কার আন্দোলন, চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর আন্দোলন- এগুলো চাকরির সংকটের কারণেই। তিনি বলেন, একটা চমকপ্রদ তথ্য হলো, বাংলাদেশে আশপাশের দেশ থেকে কিছু সংখ্যক লোক এখানকার কর্মসংস্থানের সুযোগ নিচ্ছে। তার মানে আমাদের তরুণ তরুণীদের যে শিক্ষা আমরা দিচ্ছি এই প্রতিযোগিতার বাজারে সেটা নেয়া হচ্ছে না। আর অন্যরা আশপাশ থেকে এসে যে ধরনের সুযোগ সুবিধা নিয়ে নিচ্ছে, সে ব্যাপারেও আমরা সচেতন না। 
কেন শিক্ষিত বেকার বাড়ছে এমন প্রশ্নে শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত নয়। রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতি ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থাও ভালো নয়। এ কারণেই বেকার ও উচ্চশিক্ষিত বেকার বাড়ছে। তিনি বলেন, নৈতিক আস্থাহীনতা ও জাতীয় লক্ষ্যহীনতা- এগুলো যুক্ত হয়ে এ ধরনের সমস্যা হচ্ছে। অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, বেকারত্বের সমস্যা প্রত্যেক জাতির মধ্যেই আছে। সরকার সেটা নিয়ে পরিকল্পনা করে চিন্তা করে যতটুকু পারা যায় সমাধান করে। বেকার সমস্যার সমাধানের নানা উপায়ও আছে। তবে, এ নিয়ে আমাদের দেশের রাজনীতিবিদ ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে কোনো চিন্তা নেই। কিন্তু এই সমস্যার সমাধান করতেই হবে।  আমাদের আরো বেশি কর্মমুখী, কারিগরি ও পেশামুখী শিক্ষা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের শিক্ষিতরা যে ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত এটি সবসময় আমাদের বর্তমান বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। সেজন্যই কেউ কেউ চাকরি পায় না। তবে, এখানে চাকরিদাতারাও সমস্যা সৃষ্টি করে। তারা অভিজ্ঞ, দক্ষ লোক চায়। কিন্তু দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক তো সবসময় পাওয়া যাবে না। এটিতো চাকরি ও ট্রেনিংয়ের মাধ্যমেই হবে। এটি পৃথিবীর সব দেশেই হয়ে থাকে। তিনি বলেন, আমাদের যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিশেষ করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও ম্যানুফেকচারিং এগুলো শ্রম নিবির নয়। এগুলো শ্রম নিবির থাকা দরকার। ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, বেকারত্ব সমস্যা নিরসনে আমাদের দেশে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের প্রতি আরো বেশি নজর দেয়া উচিত।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার মোয়াজ্জেম হোসেন মানবজমিনকে বলেন, এতদিন পর্যন্ত যে খাতগুলোতে মূল কর্মসংস্থানের চালিকাশক্তি বলা হতো সেই খাতগুলো ধীরে ধীরে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য আরো বেশি মেকানাইজড ও মেশিনকেন্দ্রিক হচ্ছে। সে কারণে যে মাত্রায় আগে কর্মসংস্থান তৈরি হতো, সেই মাত্রায় এখন কর্মসংস্থান কম। তিনি বলেন, দেশে জেনারেল ডিগ্রিধারী পেশাদারদের চাহিদা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। যেহেতু শিল্পখাতের উন্নয়ন হচ্ছে আগামীতে নতুন নতুন শিল্পখাত আসবে। তাই আগামীতে জেনারেল ডিগ্রিধারী গ্র্যাজুয়েটদের কাজ পাওয়ার সম্ভাবনাও কমে আসবে। সেক্ষেত্রে আরো বেশি টেকনিক্যাল জ্ঞানসম্পন্ন পেশাদার লোক দরকার। খন্দকার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, শিক্ষিত বেকারের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে দুটো বিপরীতমুখী চিত্র রয়েছে। একদিকে প্রতিবছর সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে প্রচুর সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হচ্ছে, তারা চাকরির জন্য আবেদনও করছে। অন্যদিকে দেখা যায় বাংলাদেশে বিদেশ থেকে এসে প্রচুর পেশাদার লোক বেসরকারি বিভিন্ন খাতে কাজ করছে এবং দেশ থেকে তারা প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে। এখন যেটি বলার বিষয় সেটি হচ্ছে- দেশে যারা গ্র্যাজুয়েট হচ্ছে এবং তারা যে শিক্ষা পাচ্ছে তাতে তারা যথেষ্ট দক্ষতা সম্পন্ন নন। তাদের সেই দক্ষতার ঘাটতির জন্যই প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি এবং পেশাদারদের নিয়োজন করতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষা কাঠামোতে পরিবর্তন দরকার। আরো বেশি কর্মমুখী ও কারিগরি শিক্ষা দরকার। আমাদের ভোকেশনাল ও কারিগরি শিক্ষাকে আরো উন্নত করতে হবে।
গিভেন্সি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক খতিব আবদুল জাহিদ মুকুল মানবজমিনকে বলেন, বাবা মায়েরা কত কষ্ট করে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করিয়েছে। কিন্তু তারা চাকরি পাচ্ছে না। বেকার থাকছে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতসহ অন্যান্য দেশ থেকে কর্মীরা এসে আমাদের দেশে কাজ করে আমাদের দেশের টাকা তারা বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, চাকরি না পাওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে। সরকারি চাকরিতে কম পদের বিপরীতে প্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। আর বেসরকারি ও শিল্পখাতে যে পরিমাণ কারিগরি ও মেধাসম্পন্ন প্রার্থীর প্রয়োজন হয়, সেই মানের প্রার্থী খুঁজে পাওয়া যায় না। কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা আরো প্রসারের পাশাপাশি দেশের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক ও যুগপোযোগী করতে হবে এমন উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের শিক্ষার্থীরা অনার্স, মাস্টার্স পাস করছে। কিন্তু চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি অনেকেরই মৌলিক, প্রযুক্তিগত ও কারিগরি জ্ঞান খুবই সীমিত। অনেকেই ভালো ইংরেজি জানে না। মনে হয় যেনতেনভাবে একটা ডিগ্রি নিয়ে একটা চাকরি খোঁজাই তাদের পড়াশোনার উদ্দেশ্য। কিন্তু এতে করে চাকরির বাজারে তারা পিছিয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারাকাত বলেন, অনেক ক্ষেত্রে পদ খালি আছে।   ব্যাংক ও কর্পোরেট সেক্টরে খালিপদগুলো পূরণ করা হচ্ছে না। সরকারি চাকরিতেও বহু পদ খালি রয়েছে। কিন্তু পূরণ হচ্ছে না। এই পদগুলো পূরণ করলেও কিছু সমাধান হয়। আর সর্বোপরি দেশে ব্যাপকহারে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ দরকার। না হলে বেকারত্বের এই সমস্যার সমাধান হবে না। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিই শুধু চাকরি নয়। দেশে উন্নয়নের একটি নির্দিষ্ট ধারা তৈরি হচ্ছে। এখন অনেক উন্নয়ন হচ্ছে। এখানে কারিগরি শিক্ষাসহ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ শিক্ষায় শিক্ষিতদের প্রয়োজন। এখন আমাদের চিন্তা করতে হবে আমরা কি ধরনের শিক্ষা চাই, সামনের ১০/২০ বছরে কি ধরনের শিক্ষিত মানুষ আমাদের দরকার। এজন্য একটি কমিশন গঠন করা উচিত। প্রচলিত যে  শিক্ষা ব্যবস্থা এর সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কতটুকু অসামঞ্জস্যতা আছে তা খুঁজে বের করতে হবে। ড. আবুল বারাকাত বলেন, ভবিষ্যতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড়মাপের পরিবর্তন আনতে হবে। তবে, সেই পরিবর্তনটা কি হবে সেটি এককথায় বলে দেয়া সম্ভব নয়। নির্দিষ্ট একটি পরিকল্পনা সামনে রেখে এটি করা দরকার। এজন্য একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা দরকার।

Tuesday, May 8, 2018

তারুণ্যের সংকট: যত শিক্ষা তত বেকারত্ব by উৎপল রায়

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। ফলাফল প্রকাশের প্রায় সাত বছর পার হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েও তিনি এখনো বেকার। এই কয়েক বছরে সরকারি বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অসংখ্যবার লিখিত, মৌখিক পরীক্ষা দিয়েও নিজেকে উৎরাতে পারেননি তিনি। ইচ্ছা ছিল মেধা ও যোগ্যতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা হবেন। পরিবারে হাসি ফোটানোর পাশাপাশি দেশ সেবায় নিয়োজিত করবেন নিজেকে। কিন্তু এখন তিনি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।
গ্রামের বাড়ি লালমনিরহাট থেকে কিছুদিন পর পর ইন্টারভিউ দিতে ঢাকায় আসেন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গেছে। আর সরকারি চাকরির আশায় অন্য চাকরির প্রতি এতটা ঝোঁক ছিল না। তবে, এই কয়েকবছরে দু’ একটি বেসরকারি প্রতিষ্টানে চাকরি পেলেও সম্মানী খুবই কম হওয়ায় তা তার জীবনযাত্রার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিলনা। ফলে, সেই সব চাকরি ছাড়তে হয়েছে তাকে। কিছুদিন আগে সরকারি একটি প্রতিষ্টানে অডিটর পদে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন। বর্তমানে চরম হতাশ আলী আজম বলেন, সরকারি চাকরিতে এটাই আমার শেষ সুযোগ। এই কয়েক বছরে অনেক চেষ্টা করেছি। উচ্চশিক্ষিত হয়েও বেকার। আর বেকার বলে নানাজনের নানা কথা শুনতে হয়। চাকরি হয়েছে কি না, কেন হচ্ছেনা, কবে হবে- সবাই জানতে চায়। মাঝে মাঝে পরিবার স্বজনদের কাছ থেকে প্রচন্ড চাপ আসে। নিজেকে সবসময় ছোট মনে হয়। এ হতাশা বোঝানো যাবেনা। শুধু আলী আজমই নন।
উচ্চশিক্ষার সনদ রয়েছে। কিন্তু চাকরি নেই। প্রতিবছর সরকারি, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে সনদ নিয়ে বেকারত্বের বোঝা বয়ে ঘুরছেন দেশের লাখ লাখ উচ্চ শিক্ষিত তরুণ-তরুণী। যাদের বেশির ভাগেরই অভিভাবক সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালিয়েছেন বহু কষ্টে। সন্তানের পড়াশোনার জন্য অনেকেই যেমন জমানো অর্থ খরচ করেছেন, তেমনি অনেকেই ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে পারেননি। আবার কেউ সুদে টাকা ধার করে, জমিজমা বিক্রি করার পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনের ভোগ বিলাসিতা বিসর্জন দিয়েও সন্তানের পড়ার খরচ চালিয়েছেন। কিন্তু সন্তান উচ্চ শিক্ষিত হলেও বেকার হয়ে ঘুরছে দিনের পর দিন। কেউ কেউ হয়ে পড়ছেন পরিবারের বোঝা। এতে করে শিক্ষিত বেকারদের হতাশা ও মানসিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনি পরিবারের সঙ্গে তাদের দূরত্ব বেড়ে পারিবারিক বন্ধনও কমে আসছে। মেধা, যোগ্যতা থাকার পরও চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে কেউ কেউ হয়ে পড়ছে মাদকাসক্ত, জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদ, ছিনতাইসহ বিভিন্ন সামাজিক অপরাধে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) পরিচালিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপ (২০১৬-২০১৭) প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী দেশে বর্তমানে বেকারের সংখ্যা ২৬ লাখ ৭৭ হাজার। এর মধ্যে উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার বেশি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ। জরিপে দেখা গেছে, জাতীয় বেকারত্বের গড় হার ৪ দশমিক ২ ভাগ। আর মোট বেকারত্বের ১১ দশমিক ২ ভাগই শিক্ষিত। এরমধ্যে উচ্চশিক্ষিত বেকার রয়েছেন ১৫ দশমিক ১ ভাগ। বিবিএসের কর্মকর্তারা জানান, প্রবৃদ্ধি হলেও সেই তুলনায় দেশে কর্মসংস্থান বাড়ছে না। ফলে, বেকারের সংখ্যাও বাড়ছে। বিবিএসের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সিপিডি (সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ) বলছে, বাংলাদেশে গ্র্যাজুয়েটধারী শিক্ষিতদের ৩৪ দশমিক ৩ ভাগই (এক-তৃতীয়াংশ) বেকার। আর যুব বেকার রয়েছে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ। এইচএসসি পাস বেকার রয়েছে ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৬ সালের ৩৬টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন পরীক্ষায় পাস করেছেন ৫ লাখ ৮ হাজার ৯৪৬ জন। এর মধ্যে স্নাতক পাস পর্যায়ে ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫৫১ জন, স্নাতক (সম্মান) পর্যায়ে ১ লাখ ২৯ হাজার ৯৩৬ জন, কারিগরি স্নাতক পর্যায়ে ১৪ হাজার ৬৪ জন, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২ লাখ ২ হাজার ১৯০ জন, কারিগরি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২ হাজার ৩০২ জন, বিভিন্ন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট, ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্সে ১ হাজার ৫৩৬ জন এবং এমফিল, পিএইচডি সমমান পর্যায়ে ১ হাজার ৩৬৭ জন শিক্ষার্থী পাস করেছে। আর দেশের ৯৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিষয়ে ইউজিসি পরিচালিত বার্ষিক প্রতিবেদনে (২০১৬ সাল) দেখা যায়, একাডেমিক কার্যক্রম চলছে এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০১৬ সালে ডিগ্রি লাভ করেছেন ৬৫ হাজার ১৯২ জন শিক্ষার্থী যা ২০১৫ সালের তুলনায় ৩ হাজার ৭১০ জন বেশি। ২০১৬ সালে উত্তীর্ণ ৬৫ হাজার ১৯২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে স্নাতক, কারিগরি ও প্রযুক্তিতে ১৭ হাজার ৬৪৬ জন এবং মাস্টার্স কারিগরি ও প্রযুক্তিতে ৫৬২ জন শিক্ষার্থী ডিগ্রি লাভ করেছেন।
অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, গবেষকরা বলছেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ কর্মক্ষম মানুষ কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে ৫ লাখের বেশি উচ্চ শিক্ষিত। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই চাকরি পাচ্ছেন না। অর্থনীতিবিদ ও গবেষকদের মতে সরকারি চাকরিতে শূন্য পদের বিপরীতে চাকরিপ্রার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। তাই শিক্ষিতদের বেশ বড় একটি অংশ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। একই সঙ্গে সরকারি শূন্যপদগুলোও নিয়মিতভাবে পূরণ হয় না। আর বেসরকারি খাতে বর্তমানে বিশেষজ্ঞ, কারিগরি ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষিতদের চাহিদা বেশি। যে কারণে প্রচলিত ও সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিতদের বেসরকারি খাতে চাকরি পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে শিক্ষিত বেকাররা চাকরি না পাওয়ায় অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে বিরূপ প্রভাব পড়ছে। একদিকে চাকরি না পাওয়ায় এসব শিক্ষিত জনবলকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে যুক্ত করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে বেকারদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়ছে নানা সামাজিক অপরাধে। আর চাকরি না পাওয়ার আশঙ্কা ও হতাশা থেকে উচ্চ শিক্ষিত মেধাবীদের একটি অংশ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। ফলে, তাদের মেধা ও সেবা দেশের কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষিত গ্র্যাজুয়েটদের মধ্যে ৩৪ দশমিক ৩ শতাংশই বেকার। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা গড়পড়তা বেকারের তুলনায় অনেক বেশি। আর যুব বেকার ও গ্র্যাজুয়েট বেকারের সংখ্য আরো বেশি। সার্বিকভাবে বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। তিনি বলেন, দেখা যাচ্ছে যারা স্বল্পশিক্ষিত তাদের মধ্যে বেকারত্বের সংখ্যা কম। কিন্তু যখন উচ্চ শিক্ষিতের হার বাড়ে তখন বেকারত্বের হারও বাড়ে। তিনি আরো বলেন, শিক্ষিত বেকারত্বের স্বাভাবিক কারণ হচ্ছে, যে পরিমান জনগোষ্ঠী প্রতিবছর কর্মবাজারে প্রবেশ করছে, সেই পরিমাণ কর্মসৃজন হচ্ছে না। আর শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত পেশাদারিত্বের যে চাকরি, সেই চাকরি সৃষ্টির সংখ্যা কম। ফলে, বেকারত্বের সংখ্যাটা আরো বড়ভাবে আমরা দেখতে পাচ্ছি।
শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক মানবজমিনকে বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের সমস্যা রয়েছে। তবে, এ বিষয়ে খুব নির্ভরযোগ্য কোনো গবেষণা এখন পর্যন্ত হয়নি। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে এবং নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে যা দেখছি তাতে বেকারত্বের সমস্যা আছে এবং তা ভালোভাবেই আছে। তবে, এখন শিক্ষিতদের অনেকেই বিভিন্ন কাজে যুক্ত হচ্ছে। এমনকি অনেকে মাছ চাষও করছেন। ফলে বেকার সমস্যা কিছুটা কমে আসছে বলে আমার মনে হয়। আর বেকারত্ব নিয়ে নতুন করে যদি গবেষণা হয় তাহলে সঠিক তথ্য জানা যাবে। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বলেন, আমাদের রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতি ও শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কোনো জাতীয় পরিকল্পনা নেই। সরকারের উন্নয়নের কথা বলা হলেও বেকার সমস্যা নিরসনের কথা কেউ তেমনভাবে বলছে না।
অনলাইনে চাকরির বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠান ‘বিডিজবস’র জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক মো. শামীম হাসান মানবজমিনকে বলেন, চাকরি প্রার্থীরা প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ জীবনবৃত্তান্ত আমাদের প্রতিষ্ঠানে রেজিস্ট্রেশন করে। গত এক মাসে ৬ থেকে ৭ হাজার সিভি জমা পড়েছে। তিনি বলেন, একটি চাকরির বিজ্ঞাপন দিলেই প্রতিদিন অন্তত ৩ হাজার সিভি জমা পড়ে। যাদের বেশির ভাগই উচ্চশিক্ষিত। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাহিদা ব্যাংকের চাকরিতে। দেখা গেছে, একটি ব্যাংকের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে অন্তত ১ লাখ ৫০ হাজার সিভি আসে।
বাংলাদেশ বাংকের সাবেক গভর্ণর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নতুন করে আরো যোগ হচ্ছে। বেকারত্বের এই সমস্যাটি মারাত্মক। এটি মোটেও আমাদের জন্য ভালো ব্যাপার নয়। সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও এটি বিরাট ব্যাপার। তিনি বলেন, তরুণরা লেখাপড়া শিখে যদি চাকরি না পায়, তাহলে তারা পরিবারকে সাপোর্ট দিতে পারে না। এতে করে তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করে। আর হতাশা থেকে তারা বিভিন্ন সামাজিক অপরাধ ও বেআইনি কাজে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, আমাদের অনেক তরুণ রয়েছে। তারা উৎসাহী। তাদের প্রডাকটিভিটি আছে। তাদের দিয়ে কাজ করানো যায়। কিন্তু তারা শিক্ষিত হলেও তাদের মেধা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অনেক তরুণ বিদেশে চলে যাচ্ছে। ফলে, এই সুযোগটি আমাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এটি আমাদের অর্থনীতির জন্য বিরাট ক্ষতি। এ নিয়ে এখন থেকেই গুরুত্ব দিতে হবে। তবে, আমাদের যে শিক্ষা ব্যবস্থা এটা যেন প্রায়োগিক ক্ষেত্রে আরো কার্যকরি হয়। কারিগরি শিক্ষার প্রতি আমাদের আরো গুরুত্ব দিতে হবে। কারিগরি শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বেকারত্ব নিরসনে ক্ষুদ্র ও মাঝরি শিল্পের প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আবুল বারাকাত বলেন, উচ্চ শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের যে পরিসংখ্যান বলা হচ্ছে তা আমার কাছে সঠিক বলে মনে হয়। প্রতিবছর যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে পাশ করে বেরুচ্ছে তাদের বড় অংশই বেকার। পাশ করার পর অনেকের পাঁচ বছরেও চাকরি হয় না। পদ যদি থাকে ২০টি, আবেদন জমা পড়ে ২০ হাজার। এরপর চাকরি ক্ষেত্রে থাকে নানা শর্ত। চাকরি না পেয়ে অনেকের বয়সও পেরিয়ে যায়। তিনি বলেন, যে পরিমাণ চাকরির সৃষ্টি হওয়া দরকার সেই হারে যদি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি না হয় তাহলে তো বেকারের সংখ্যা বাড়বেই। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিএ, এমএ পাস করাবে। কিন্তু যেকোনো কাজ তো তারা করতে পারবে না। ভবিষ্যতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার মতো দেশের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় মাপের পরিবর্তন আনতে হবে বলে মত দেন ড. আবুল বারাকাত। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে আমাদের কী ধরনের চাকরির চাহিদা তৈরি হবে এবং কী ধরনের শিক্ষিত মানুষ প্রয়োজন সে বিষয়ে পরিকল্পিতভাবে এগুতে হবে। প্রয়োজনে একটি কমিশন গঠন করতে হবে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’র (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, দেখা যাচ্ছে আমাদের গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থায় ছেলে মেয়েরা যত বেশি লেখাপড়া শিখছে তত বেশি বেকার বেড়ে যাচ্ছে। তাই, শিক্ষার যে মান সেটা কিন্তু আমাদের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি দিতে পারছেনা। বাবা মায়েরা ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার পিছনে লাখ লাখ টাকা খরছ করছেন। কিন্তু তাদের বুঝতে হবে শুধু সরকারি চাকরির আশায় এম এ, বিএ পাশ করলে তো হবেনা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মান বাড়াতে হবে। কারিগরি ও প্রযুক্তি শিক্ষার ওপর আরো গুরুত্ব দিতে হবে। বেকারত্ব নিরসনে কর্মসংস্থানের প্রয়োজন এবং কর্মসংস্থানের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে বলে উল্লেখ করেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে চাকরি ক্ষেত্রে বিশেষ করে বেসরকারিখাতে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তণ যেভাবে হচ্ছে, তাতে আমাদের বর্তমান শিক্ষা পদ্ধতি যদি আরো ভাল না হয় তাহলে আমরা আরো পিছিয়ে যাবো। আর কারিগরি শিক্ষার মান ও সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে হবে।

Monday, April 23, 2018

গ্রেপ্তার: উপেক্ষিত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা by উৎপল রায়

ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তারের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের নির্দেশনা উপেক্ষিত হচ্ছে। গ্রেপ্তার বিষয়ে সাম্প্রতিক বেশকিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের নির্দেশনা না মানার অভিযোগ উঠেছে। সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার কর্মী, পুলিশের সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, সর্বোচ্চ আদালতের আদেশ বা নির্দেশনা অবজ্ঞা করা আদালত অবমাননার শামিল। আর যারা আদালতের নির্দেশনা পালন করছেন না তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও ১৬৭ ধারায় রিমান্ড বিষয়ে ২০০৩ সালের এপ্রিলে হাইকোর্টের দেয়া রায় ২০১৬ সালের ২৪শে মে বহাল রাখে আপিল বিভাগ। পরে ওই বছরের ১০ই নভেম্বর এর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে ৫৪ ও ১৬৭ ধারা সংশোধনের জন্য সাত দফা সুপারিশ করা হয়। একই সঙ্গে আদালত বেশকিছু নির্দেশনা দিয়ে রায়ে উল্লেখ করেন, আইন সংশোধনের আগে এইসব  নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। নির্দেশনার মধ্যে ছিল, আটকাদেশ (ডিটেনশন) দেয়ার জন্য পুলিশ কাউকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করতে পারবে না, কাউকে গ্রেপ্তার করার সময় পুলিশ বাধ্যতামূলকভাবে তার পরিচয়পত্র দেখাবে। এছাড়া গ্রেপ্তারের তিন ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কারণ জানাতে হবে। বাসা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য স্থান থেকে গ্রেপ্তার ব্যক্তির নিকট আত্মীয়কে এক ঘণ্টার মধ্যে বিষয়টি জানাতে হবে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে তার পছন্দ অনুযায়ী আইনজীবী ও আত্মীয়দের সঙ্গে পরামর্শ করার সুযোগ দিতে হবে। অনুসন্ধান ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা বার বারই অবজ্ঞা করা হচ্ছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী তিন নেতাকে সোমবার (১৬ই এপ্রিল)  ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের ফটক থেকে তুলে নিয়ে যায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জিজ্ঞাসাবাদ করে কিছুক্ষণ পর তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। পরে ওই তিন নেতা সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন তাদেরকে চোখ বেঁধে গাড়িতে তুলে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। যদিও ডিবি পুলিশ দাবি করে, ওই তিনজনকে চোখ বেঁধে তুলে নেয়া হয়নি। এটা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে।  জানা গেছে, এ ঘটনার পর কোটা সংস্কার আন্দোলকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক মানবজমিনকে বলেন, এসব ঘটনা এবং অন্যান্য অনেক ঘটনায় এটি স্পষ্ট যে, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বা নির্দেশনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমলে নেয় না বললেই চলে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন নেতাকে ডিবি পুলিশ যেভাবে ধরে নিয়ে গিয়েছিল এটাতো আইনের শাসন এবং সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো হয়েছে।
গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। রায় ঘোষণার আগে ও পরে রাজধানীসহ সারা দেশে বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তারের করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযোগ ওঠে গ্রেপ্তারের অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চ আদালতের নির্দেশনা পালন করা হয়নি। খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে কর্মসূচি পালনের সময় বিভিন্ন সময়ে বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এসএম মিজানুর রহমান ও সহ-সভাপতি জাকির হোসেন মিলনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর মধ্যে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সহ-সভাপতি ও তেজগাঁও ছাত্রদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জাকির হোসেন মিলনকে গত ৬ই মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধন কর্মসূচি থেকে সাদা পোশাকের পুলিশ গ্রেপ্তার করে। পরে তিনদিনের  রিমান্ড শেষে ১১ই মার্চ আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরদিন (১২ই মার্চ) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান জাকির হোসেন মিলন। পরে এই চার নেতার গ্রেপ্তারের বিষয়টি উচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। তাদের গ্রেপ্তারের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২৯শে মার্চ হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে ২রা এপ্রিল রুল জারি করেন বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এবং বিচারপতি আশরাফুল কামালের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ওই চার নেতাকে জবরদস্তিমূলকভাবে গ্রেপ্তার করা কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে চাওয়া হয় রুলে। একই সঙ্গে ওই চার নেতাকে গ্রেপ্তারে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে না- রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়। রাজধানীর কাপ্তানবাজারে কিশোর রাকিব হাওলাদার (১৫)কে  ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে- এমন অভিযোগে ওয়ারী থানার ওসিসহ চারজনের বিরুদ্ধে গত ১১ই এপ্রিল ঢাকা মহানগর দায়রা জজ মো. কামরুল হোসেন মোল্লার আদালতে মামলা দায়ের করেন রাকিবের মা রীতা আক্তার। নির্যাতন এবং হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা এই মামলায় আদালত বাদীর জবানবন্দি গ্রহণ করে এ বিষয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেন। এ মামলার আসামিরা হলেন, ওয়ারী থানার ওসি মো. রফিকুল ইসলাম, ওসি (তদন্ত) মো. সেলিম, এসআই জ্যোতি ও সোর্স মোশারফ। বাদী রীতা আক্তারের অভিযোগ গত ৪ঠা এপ্রিল রাত সাড়ে ১০টার দিকে তার ছেলে রাকিব হাওলাদারকে (১৫) কাপ্তানবাজার এলাকা থেকে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই আটক করে ওয়ারী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। গ্রেপ্তারের পর রাকিবের সঙ্গে তাকে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরে ৬ই এপ্রিল সকাল ১১টায় বাদীর পিতাকে (রাকিবের নানা) থানা থেকে ফোন করে জানানো হয় তার নাতি (রাকিব) ক্রসফায়ারে মারা গেছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে। পরে রীতা আক্তার ঢামেকের মর্গে গিয়ে ছেলের লাশে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান বলে আর্জিতে অভিযোগ করেন।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক মানবজমিনকে বলেন, গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের যে নির্দেশনা রয়েছে তা মানা উচিত। সুপ্রিম কোর্টের আদেশ পালন তো করতে হবে। যদি পালন করা না হয় সেটি তো অপরাধ হলো। যারা তা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে তাদের ডিপার্টমেন্ট ব্যবস্থা নেবে। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন মানবজমিনকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়তই পিছিয়ে যাচ্ছি। যেসব বিষয়ে সর্বোচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা পাওয়া গেছে সেই সব নির্দেশনা বার বার উপেক্ষিত হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে কিছু ঘটনার বর্ণনায় তা আমরা পাচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যখন নিজেদেরকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ভাবে তখনই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। এই ঘটনাগুলো শুধু উদ্বেজনকই নয়, দুঃখজনক এবং ভয়াবহ। তিনি বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী তিন নেতার বিরুদ্ধে কোনো মামলা ছিল না। কিন্তু আদালতের নির্দেশনার ব্যত্যয় ঘটিয়ে এটি করা হয়েছে। এ বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খোঁজ নেয়া এবং দোষীদের চিহ্নিত করে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়া উচিত। এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নূর খান লিটন বলেন, দুর্ভাগ্যজনক হলো সুশাসন, স্বচ্ছতা এগুলোকে অবজ্ঞা করে আমরা শুধু উন্নয়নের ঢেঁকুর তুলছি। আইনের শাসনকে যদি সমুন্নত রাখা না যায় তাহলে তা কারো জন্যই ভালো হবে না।
পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মো. নুরুল হুদা মানবজমিনকে বলেন, যেহেতু এসব বিষয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে, তাই এসব নির্দেশনা মানতে হবে। এক্ষেত্রে যদি আদালত অবমাননা হয় তাহলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ক্ষেত্র বিশেষে বিভাগীয় ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেয়া যায়। এ ধরনের উদ্যোগের অভাব কি না- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, উদ্যোগ থাকা উচিত। মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে। আর যেখানে ক্ষমতা আছে, সেখানে ক্ষমতার অপব্যবহারও থাকে। অপপ্রয়োগ যাতে না হয় সেজন্য এ সমস্ত (বিভাগীয় ও ফৌজদারি  ব্যবস্থা) প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই এটি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে।

Tuesday, April 17, 2018

ভিডিও কনফারেন্সে বিচারকাজের নজির নেই by উৎপল রায়

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় নতুন একটি বিষয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাগারে থাকা খালেদা জিয়া যেহেতু অসুস্থ এবং আদালতে হাজির করা যাচ্ছে না- তাই বিচারকাজ ভিডিও করফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালনার জন্য আদালতে আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল। তবে, খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা এমন প্রস্তাবের বিরোধিতা করে বলছেন, দেশে প্রচলিত আইনে এ  ধরনের কোনো সুযোগ নেই। এমনটা করতে হলে ফৌজদারি ও অপরাধ আইন সংশোধন করতে হবে। ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রচলিত আইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচার পরিচালনার কোনো সুযোগ নেই। দেশে এখন পর্যন্ত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কোনো ফৌজদারি মামলার বিচারকাজের নজির নেই। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবীরা বলছেন, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার জন্য সুপ্রিম কোর্টের কিছু পরামর্শ ও নির্দেশনা রয়েছে। তবে তা আনুষ্ঠানিক কিংবা বাধ্যতামূলক নয়।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ রাজধানীর বকশিবাজারের কারা অধিদপ্তরের প্যারেড গ্রাউন্ডে স্থাপিত অস্থায়ী বিশেষ আদালতে চলছে। বর্তমানে মামলাটি যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের পর্যায়ে রয়েছে। গত বৃহস্পতিবার এক আদেশে এ মামলার অসমাপ্ত যুক্তি-তর্ক উপস্থাপনের জন্য আগামী ২২শে এপ্রিল দিন ধার্য করেন ঢাকার পঞ্চম বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান। একই সঙ্গে ওই দিন পর্যন্ত এ মামলার আসামি খালেদা জিয়ার জামিন বর্ধিতকরণের আদেশ দেয়া হয়। অসুস্থতার কারণে এই মামলায় একাধিক ধার্য তারিখে খালেদা জিয়াকে আদালতে হাজির করা যায়নি বলে কারা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে দুদকের আইনজীবীরা জানান। গত ৮ই ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায়ে খালেদা জিয়াকে ৫ বছর ও অন্য আসমিদের ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেন একই আদালত। রায়ের পর থেকে খালেদা জিয়াকে রাখা হয়েছে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে। ৫ই এপ্রিল জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার শুনানিতে দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতের উদ্দেশ্যে বলেন, খালেদা জিয়া আর্থ্রাইটিসে ভুগছেন। অসুস্থতার কারণে তাকে আদালতে আনা হচ্ছে না। তিনি যেহেতু অসুস্থ তাই জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার পরবর্তী বিচারকার্যক্রম ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালনা করা যায় কি না- এ বিষয়ে তারা আদালতে আবেদন করবেন। প্রচলিত সাক্ষ্য আইন অনুযায়ী এ সুযোগ রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। এ সময় তিনি ভারতের লালু প্রসাদ যাদবের (বিহার রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী) মামলার বিচারকাজ ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। দুদক আইনজীবীর বক্তব্যের বিরোধিতা করে খালেদা জিয়ার আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান বলেন, এ ধরনের বক্তব্যের কোনো যৌক্তিকতা নেই এবং তা বাড়াবাড়ি ও অবান্তর। তিনি বলেন, সংসদীয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের আইন-আদালত চলছে। তাই আদালতের কার্যক্রম যেভাবে চলছে, সেভাবেই চলবে। বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের বিধানে এ ধরনের কোনো সুযোগ নেই বলেও জানান খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা। 
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন মানবজমিনকে বলেন, দুদকের আইনজীবী হয়তো নতুন কোনো চমক সৃষ্টি করার জন্য অনলাইন ভিডিওর মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার কথা বলেছেন। এটি নিতান্তই বেসামাল ও রাজনৈতিক বক্তব্য। তিনি বলেন, যেখানে কথায় কথায় আদালতে সমস্যা সৃষ্টি হয় সেখানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনা করা নেহায়েতই ছেলেমানুষি বক্তব্য। আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো বিধান নেই আর তা সম্ভবও না। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, যদি এ পদ্ধতিতে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হয় তাহলে প্রচলিত আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আরো অনেক কিছুই পরিবর্তন করতে হবে। যেটি আমাদের দেশে সম্ভব নয়। 
সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, আমাদের দেশে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজের কোনো উদাহরণ এখন পর্যন্ত নেই। দেশের প্রচলিত আইনেও এ ধরনের কিছু বলা নেই। আর এ পদ্ধতিতে বিচারকাজের জন্য সুপ্রিম কোর্টের কিছু নির্দেশনা থাকলেও এটি আনুষ্ঠানিক কোনো নির্দেশনা নয় যে, এভাবেই বিচারকাজ পরিচালনা করতে হবে। তবে উভয়পক্ষের আইনজীবীরা সম্মত হলেই ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালিত হতে পারে। তার পরও নানা প্রশ্ন আছে। তিনি বলেন, দুদকের আইনজীবী হয়তো একটি প্রস্তাব করেছেন। এ পদ্ধতিতে বিচারকাজ পরিচালনা করতে হলে আগে বিচারিক আদালতে আবেদন করতে হবে। প্রশ্ন হলো বিচারিক আদালত আবেদন গ্রহণ করবে কি না? অনুমতি দেবেন কি না? ঢাকা শহরে বসে ভিডিও কনফারেন্সের প্রয়োজনীয়তা আছে কি না? এমন তো না যে দূর অন্ত। তাই সবকিছুই নির্ভর করছে বিচারিক আদালতের ওপর। কাজেই বিষয়টি এত সহজ না যে বললেই হয়ে গেল। সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, আমার জানামতে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার নজির বা উদাহরণ আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত নেই। দেশের প্রচলিত আইনেও এ বিষয়ে কিছু বলা নেই। তাই এর বেশি কিছু এ বিষয়ে বলতে পারবো না।
খালেদা জিয়ার আইনজীবী আব্দুর রেজাক খান বলেন, আদালতের বাইরে তো আদালত বসতে পারে না। ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বিচারকাজ পরিচালনার বিষয়ে দুদক আইনজীবী কথার কথা বলেছেন। আমাদের দেশে এটি করা যায় না। এ ধরনের কোনো নজিরও এখন পর্যন্ত নেই। তিনি বলেন, সরকার আদালত সেটআপ করতে পারে কিন্তু তা করতে হবে সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ ও আলোচনা করে। আব্দুর রেজাক খান বলেন, ভারতে (বিহারের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী লালু প্রসাদ যাদবের মামলা) কীভাবে করেছে না করেছে সেটা তারা জানে। সেখানে কনসেন্ট থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো নজির নেই।

Thursday, March 22, 2018

সাজা ভোগের ২ যুগের বেশি সময় পর নির্দোষ ঘোষণা by উৎপল রায়

গরু চোরাচালানের মামলায় যশোরের শার্শা উপজেলার আবদুল কাদের ও মফিজুর রহমানকে ১৯৮৭ সালের মার্চ মাসে ৫ বছরের কারাদণ্ডের রায় দিয়েছিল যশোরের একটি বিচারিক আদালত। এর আগে ১৯৮৬ সালের আগস্টে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন দুজন। রায় অনুযায়ী সাজাও ভোগ করেন তারা। রায়ের বিরুদ্ধে নিয়মমতো দুজন আপিলও করেছিলেন। ওই দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিল করার ৩১ বছর পর এবং সাজা ভোগের দুই যুগেরও বেশি সময় পর গতকাল হাইকোর্টে আপিলের রায়ে আবদুল কাদের ও মফিজুর রহমান নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পেলেন। হাইকোর্টের রায়ে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও ইতিমধ্যে মফিজুর রহমান মারা যাওয়ায় তিনি তা জেনে যেতে পারেননি। এ সংক্রান্ত আপিলের শুনানি নিয়ে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হকের একক বেঞ্চ গতকাল এ রায় ঘোষণা করেন। আদালত দুজনের আপিল গ্রহণ করে রায়ে উল্লেখ করেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়নি। আদালতে দুজনের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড’র প্যানেল আইনজীবী কুমার দেবুল দে।
গতকাল রায়ের পর কুমার দেবুল দে এই মামলার নথির বরাত দিয়ে মানবজমিনকে জানান, যশোর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ৬টি গরু আমদানির অভিযোগে ১৯৮৬ সালের ২৭শে আগস্ট তৎকালীন বিডিআরের (বর্তমান বিজিবি) একজন ল্যান্স নায়েক যশোর জেলার শার্শা থানায় আবদুল কাদের ও মফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ১৯৮৭ সালের ৩০শে মার্চ যশোরের একটি বিচারিক আদালত রায় ঘোষণা করেন। রায়ে ওই দুজনকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। পাশাপাশি তাদের ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা করেন আদালত। পরে ওই বছরই তারা সাজার বিরুদ্ধে যশোরে তৎকালীন বিভাগীয় হাইকোর্ট বেঞ্চে আপিল করেন। কিন্তু পরবর্তীতে যশোর হাইকোর্ট বেঞ্চ অবলুপ্ত হলে আপিলটি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে আসে। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে আইনি জটিলতায় এর শুনানি শেষ হয়নি। মামলাটিও চলে যায় হিমাগারে। এরই মধ্যে ১৯৮৯ সালে সাজার মেয়াদ শেষ হলে আবদুল কাদের ও মফিজুর রহমান কারাগার থেকে মুক্তি পান। মফিজুর রহমান ইতিমধ্যে মারা যান। কুমার দেবুল দে জানান, আসামিদের তৎপরতা না থাকা, আইনিসহ বিভিন্ন জটিলতায় এই মামলার আপিলের শুনানি ও নিষ্পত্তি তখন হয়নি। তিনি আরো জানান, সুপ্রিম কোর্টের পুরনো মামলা নিষ্পত্তির উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের শুরুতে এই মামলাটি হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে পাঠানো হয়। ওই বেঞ্চ মামলার নথি পর্যালোচনা করে জানতে পারেন যে, আসামিপক্ষের আইনজীবী ইতিমধ্যে মারা গেছেন। তখন আইনজীবী নিয়োগের জন্য আসামিপক্ষকে নোটিশ পাঠানো হয়। নোটিশ পাঠানোর পর আবদুল কাদের সুপ্রিম কোর্ট লিগ্যাল এইড অফিসে যোগাযোগ করেন। এরপরই মামলার শুনানির উদ্যোগ নেয়া হয়। কুমার দেবুল দে বলেন, মঙ্গলবার শুনানি শেষে আজ (গতকাল) রায় ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। আপিল গ্রহণ করে দুজনকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন আদালত। আদালত বলেছেন, রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। কুমার দেবুল দে বলেন, আপিল করার ৩১ বছর পর হাইকোর্টের রায়ে দুজনই বেকসুর খালাস পেলেন। এত দীর্ঘ সময়ে এই মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনিসহ বিভিন্ন জটিলতা তো ছিলই, আসামিরাও আপিল নিষ্পত্তির ব্যাপারে তৎপর ও উদ্যোগী ছিলেন না। যে কারণে বিচারে এই বিলম্ব হয়েছে। আবদুল কাদেরের বয়স বর্তমানে ৬৫ বছর। থাকেন যশোরের শার্শা উপজেলার হরিশচন্দ্রপুর গ্রামে। সেখানে কৃষিকাজ করেন তিনি। গতকাল তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মানবজমিনকে তিনি বলেন, ‘আইজ দুপুরে শুনছি খালাস পাইছি। খুব ভালো লাগতাছে। আমার জীবনে, কপালে যা লেখা আছিলো সেইটিই হইছে। আমি আর কারে দুষবো। আমি বইল্লে তো হবে না, আমি কিছু করতেও পারবো না। কোর্ট যেইটা ভালো মনে করে করবে। তিনি জানান, মামলার অপর আসামী তিন বছর আগেই মারা গেছেন।

Tuesday, July 4, 2017

ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ: সুপ্রিম কোর্টের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে নয় by উৎপল রায়

ঐতিহাসিক। যুগান্তকারী রায়। সুপ্রিম  কোর্টের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ন্যস্ত করা সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিয়েছিল হাইকোর্ট। সেই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের করা আপিল গতকাল সর্বসম্মতিক্রমে খারিজ করে দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। একই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের পর্যবেক্ষণে কিছু শব্দচয়ন বাদ দেয়ার (এক্সপাঞ্জ) কথা বলা হয় রায়ে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের সাত বিচারকের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ গতকাল এ রায় দেন। বেঞ্চের অন্য বিচারকগণ হলেন- বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্‌হাব মিঞা, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। সর্বোচ্চ আদালতের এ রায়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ হিসেবেই বহাল রইলো। একই সঙ্গে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে রইলো না। এখন থেকে এ ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল প্রয়োগ করতে পারবে। গতকাল আপিল বিভাগের ঘোষিত এ রায়কে যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন আইনজীবীরা। অন্যদিকে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানান, পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হবে। তবে, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আপিল বিভাগের এই রায়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এর আগে গত ১লা জুন আপিলের শুনানি শেষে রায় যে কোনদিন ঘোষণা করা হবে মর্মে তা অপেক্ষমাণ (সিএভি) রেখেছিল আপিল বিভাগ।
‘সরকার বনাম অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান সিদ্দিকী ও অন্যান্য’ শীর্ষক  আলোচিত এই মামলার রায়ের জন্য সোমবার (গতকাল) এটি আপিল বিভাগের  কার্যতালিকায় ১ নম্বর ক্রমিকে ছিল। এমনিতে সকাল ৯টায় আদালতের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও বিচারকরা এজলাসে বসেন সোয়া ১ ঘণ্টার কিছু বেশি সময় পর। এর আগেই আপিল বিভাগের ১ নম্বর এজলাস কক্ষ কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। সকাল ১০টা ২৫ মিনিট। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের সাত বিচারক এজলাসে তাদের নিজ নিজ আসন গ্রহণ করেন। আদালত তখন জনাকীর্ণ। পিনপতন নীরবতা। আলোচিত এই রায় শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন সংশ্লিষ্ট মামলায় শুনানিতে অংশ নেয়া রাষ্ট্র ও রিটকারীদের পক্ষের আইনজীবী, অ্যামিকাস কিউরিগন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও গণমাধ্যম কর্মীরা। সকাল ১০টা ২৭ মিনিটে সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। মাত্র ১ মিনিটের পঠিত রায়ে হাইকোর্টের রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ (শব্দচয়ণ) এক্সপাঞ্জ (বাদ দিয়ে) করে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ‘সর্বসম্মতভাবে’ খারিজ করার রায় ঘোষণা করেন প্রধান বিচারপতি।
৭২-এর ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন কীভাবে সংবিধান পরিপন্থি হয়- প্রশ্ন আইনমন্ত্রীর
১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ পুনঃস্থাপন কীভাবে সংবিধান পরিপন্থি হয়- এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। একই সঙ্গে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা সংক্রান্ত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় পড়ে এ বিষয়ে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে বলে জানান তিনি। গতকাল আপিল বিভাগের রায় ঘোষণার পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আইনমন্ত্রী। সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে জাতীয় সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হলো কিনা- এমন প্রশ্নের  জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, রায়ে বিচারকগণ শুধু আপিল খারিজ করে দিয়েছেন। পূর্ণাঙ্গ রায় না পড়া পর্যন্ত এই কথার জবাব দেয়া যাবে না। তবে, আমার কাছে সব সময় প্রশ্ন থাকবে যে, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে যেটা ছিল, সেটা সামরিক সরকার সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল আনার পর তা আবার সংসদ পুনঃস্থাপন করে। এখন সেটা কীভাবে সংবিধানের পরিপন্থি হয়- আমি সেটা বুঝতে পারছি না। আইনমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদে যে কথাগুলো বলা আছে, সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক ও উন্নত দেশগুলোতে সে বিষয়গুলো আছে। তিনি বলেন, আমি পূর্ণাঙ্গ রায়ের জন্য অপেক্ষা করবো। পূর্ণাঙ্গ রায়ের পর আমরা কী করব, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব। এদিকে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আপিল বিভাগের রায়ে বাতিল হয়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় সরকারি দল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি পাওয়ার পরই আমরা প্রতিক্রিয়া জানাব। প্রয়াত সঙ্গীতজ্ঞ করুণাময় গোস্বামীর মরদেহে শ্রদ্ধা জ্ঞাপণ শেষে গতকাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা  জানান। 
এই রায় ঐতিহাসিক: মনজিল মোরসেদ
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল চেয়ে করা রিটকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ গতকাল আপিল বিভাগের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। এই রায়ের মাধ্যমে স্বাধীনতার চার দশক পর বিচার বিভাগের জন্য আরেকটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। মানুষ মনে করে সংসদের মাধ্যমে যদি বিচারকদের অপসারণ করা হতো  তাহলে বিচারকরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারতো না। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতো। তিনি বলেন, আইনটি করে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেয়া হয়েছিল, এখন আপিল বিভাগের রায়ের ফলে সেটি বেআইনি, অকার্যকর ও বাতিল হয়ে গেল। এই রায়ের ফলে আইন বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের সঙ্গে বিচার বিভাগের কোন বিরোধ হবেনা উল্লেখ করে মনজিল মোরসেদ বলেন, এটি একদমই হবে না। কারণ, আমাদের সংবিধানে বলা আছে উচ্চ আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটিই চূড়ান্ত। তাই এখানে সংসদ, সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের বিরোধের কোন সুযোগ নেই। সংবিধানেই বলা আছে যে আপিল বিভাগ কোন রায় দিলে সেটি মানতে হবে। 
ষোড়শ সংশোধনী বাতিল জরুরি ছিল: ড. শাহদীন মালিক
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের দেয়া রায় প্রত্যাশিত ছিল বলে মন্তব্য করেছেন আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক। একই সঙ্গে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করা জরুরি ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গতকাল রায়ের পর এক প্রতিক্রিয়ায় ড. শাহদীন মালিক সাংবাদিকদের বলেন, ১০ জন অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে নয়জনই মতামত দিয়েছিলেন যে, হাইকোর্টের রায় সঠিক ছিল। এ কারণে আমার প্রত্যাশা ছিল হাইকোর্টের রায়ই বহাল থাকবে। তিনি বলেন, ক্ষমতার পৃথককরণের যে নীতি সংবিধান ধারণ করে, অর্থাৎ  রাষ্ট্রের তিনটি অঙ্গ নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগের কেউ কারও ওপর সরাসরি কর্তৃত্ব করবে না। ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই নীতি লঙ্ঘিত হচ্ছিল। তাই, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও পৃথককরণের স্বার্থে এই সংশোধনী বাতিল করা জরুরি ছিল। সংসদের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংক্রান্ত সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করা হবে বলে জানান এই মামলায় ইন্টারভেনার হিসেবে শুনানিতে অংশ নেয়া সংসদ সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। গতকাল সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আদালতের রায় সবার জন্য শিরোধার্য। সর্বোচ্চ আদালতের রায় সবাইকে মানতে হবে। তবে আপিল বিভাগের এই রায়ের বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদন করবে। তিনি আরো বলেন, পৃথিবীর অনেক দেশে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে রয়েছে।
মামলার পূর্বাপর
১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণ ক্ষমতা সংসদের হাতে ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে ন্যস্ত করা হয়। পঁচাত্তরের  ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পট পরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় গিয়ে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করেন। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী উচ্চ আদালত কর্তৃক অবৈধ ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী  আনলেও তাতে সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের বিধানের কোনো পরিবর্তন করেনি। সুপ্রিম কোর্টের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংসদে পাস করে সরকার। পরে ২২শে সেপ্টেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। সংবিধানের এই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একই বছরের ৫ই নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের নয়জন আইনজীবী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। শুনানি শেষে ওই বছরের ৯ই নভেম্বর রুল জারি করে হাইকোর্ট। রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে গত বছরের ৫ই মে তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বিশেষ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে বিচারকদের অপসারণ ‘ইতিহাসের দুর্ঘটনা’। হাইকোর্টের এই রায় নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন উত্তাপ ছড়ায়। এমনকি সংসদে ওয়াক আউটের ঘটনাও ঘটে। হাইকোর্টের এই রায়কে ‘সংবিধান পরিপন্থি’ বলে উল্লেখ করেছিলেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। হাইকোর্টের এই রায় আপিলে টিকবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ওই বছরের ১১ই আগস্ট হাইকোর্টের ১৬৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। পরে রাষ্ট্রপক্ষ হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যা ও মতামত দেয়ার জন্য গত ৮ই ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের ১২ জন সিনিয়র আইনজীবীর (অ্যামিকাস কিউরি) নাম ঘোষণা করা হয়। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে যাদের নাম ঘোষণা করা হয় তারা হলেন, টিএইচ খান, এম আমীর-উল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, রফিক-উল হক, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, এএফ হাসান আরিফ, আজমালুল হোসেন কিউসি, শফিক আহমেদ, আবদুল ওয়াদুদ ভূইয়া, এমআই ফারুকী, এজে মোহাম্মদ আলী, ফিদা এম কামাল। গত ৮ই মে আপিলের শুনানি শুরু হলে আপিলের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে এর শুনানি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির বাকবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটে। গত ৮ই মে এ বিষয়ে আপিলের শুনানি শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা। রিটকারিদের পক্ষে আইনজীবী মনজিল মোরসেদ তার মতামত ও যুক্তি উপস্থাপন করেন। আর এ মামলায় ইন্টারভেনার হিসেবে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরু। গত ২৪শে মে থেকে ৩০শে মে পর্যন্ত ১০ জন সিনিয়র আইনজীবী অ্যামিকাস কিউরি  হিসেবে এ বিষয়ে তাদের মতামত আদালতে উপস্থাপন করেন। সিনিয়র আইনজীবী রফিক-উল হক ও শফিক আহমেদ শুনানিতে অংশ নেননি। শুনানিতে অংশ নেয়া ১০ অ্যামিকাস কিউরির মধ্যে ৯জনই ষোড়শ সংশোধনীর বিষয়ে হাইকোর্টের রায়ের যৌক্তিকতা তুলে তা বাতিলের পক্ষে মত দেন। শুধু আজমালুল হোসেন কিউসি ষোড়শ সংশোধনীর পক্ষে তার মতামত তুলে ধরেন। মোট ১১ কার্যদিবসে শুনানি শেষ হয়।

Monday, April 24, 2017

বিচার হয়নি ৪ বছরেও by উৎপল রায়



সাভারের ‘রানা প্লাজা’ ট্র্যাজেডির পর পেরিয়ে গেছে চার বছর। কিন্তু দেশ-বিদেশে আলোচিত ও মর্মন্তুদ ওই ঘটনার দোষীদের বিচার হয়নি আজও। ঘটনার পর হত্যা ও ইমারত আইনের দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া দুর্নীতির মাধ্যমে রানা প্লাজায় নয় তলা ভবন নির্মাণের অভিযোগে আরো একটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সঙ্গে ভবন মালিক সোহেল রানার বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র রাখার অভিযোগে অস্ত্র আইনে এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে আরো একটি মামলা দায়ের করা হয়। খোঁজ নিয়ে এবং মামলা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হত্যা ও ইমারত আইনে অভিযোগ গঠন করা হলেও এখনো সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়নি। আর দুর্নীতির মামলাটির অভিযোগ গঠনের শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।
২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল সকাল পৌনে নটায় হঠাৎ ধসে পড়ে সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন নয় তলা রানা প্লাজা ভবন। এ ঘটনায় নিহত হন এক হাজার ১৩৬ জন। প্রায় হাজারখানেক শ্রমিক প্রাণে বেঁচে গেলেও তাদের  অনেকেই পঙ্গুত্ব বরণ করেন। বিশ্ব বিবেক ও মানবতাকে নাড়া দেয়া ওই ঘটনার দিনই সাভার থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। ঘটনার পর পালিয়ে যান ভবন মালিক ও সাভার থানা যুবলীগ নেতা সোহেল রানা। চার দিন পর ২৮শে এপ্রিল যশোরের বেনাপোল থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা  হয়। ভয়াবহ ওই ঘটনায় দায়ের করা প্রথম মামলাটিতে হতাহতের ঘটনা উল্লেখ করে ভবন মালিক রানা, তার বাবা-মা, ভবনের কারখানা মালিক এবং ভবন অনুমোদন ও নির্মাণ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আর অন্য মামলাটিতে ধসে পড়া ওই ভবনটির অবকাঠামো নির্মাণে ত্রুটি ও নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয় আসামিদের বিরুদ্ধে। হত্যা ও ইমারত নির্মাণ আইনের দুই মামলায় ২০১৫ সালের ১লা জুন পুলিশের অপরাধ তদন্ত  বিভাগের (সিআইডি) সহকারী সুপার বিজয়কৃষ্ণ কর ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে সোহেল রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, স্থানীয় কাউন্সিলর মোহাম্মাদ আলী খান, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, ধসে পড়া ওই ভবনের তিনটি গার্মেন্ট কারখানার মালিক, সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. সারোয়ার কামালসহ ৪১ জনকে আসামি করা হয়। আসামিদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যু ঘটানোসহ দণ্ডবিধির ৩০২, ৩২৬, ৩২৫, ৩৩৭, ৩৩৮, ৪২৭, ৪৬৫, ৪৭১, ২১২, ১১৪, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে ৫৯৪ জনকে। অন্যদিকে ইমারত নির্মাণ আইনের মামলায় বিধি না মেনে রানা প্লাজা ভবন নির্মাণের অভিযোগে ১৮ আসামির বিরুদ্ধে ১৯৫২ সালের ইমারত নির্মাণ আইনের ১২ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। এই মামলায় ১৩৫ জনকে সাক্ষী করা হয়েছে। রানা, তার বাবা আব্দুল খালেক ওরফে কুলু খালেক, মা মর্জিনা বেগম, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, উপ-সহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, রানা প্লাজার নিউওয়েব বাটন লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইথার টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামান, সাইট ইঞ্জিনিয়ার মো. সারোয়ার কামালসহ হত্যা মামলার ১৭ জনকে এই মামলায়ও আসামি করা হয়েছে। মাহবুবুল আলম নামক একজন গার্মেন্টস ব্যবসায়ীকে ইমারত নির্মাণ মামলায় আসামি করা হলেও হত্যা মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি। ফলে, দুই মামলা মিলিয়ে মোট আসামি ৪২ জন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ইতিমধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৩১ আসামি আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জানান, হত্যা মামলায় মাত্র তিনজন আসামি কারাগারে রয়েছেন। তারা হলেন- প্রধান আসামি সোহেল রানা, প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও সাইট ইঞ্জিনিয়ার সারোয়ার কামাল (এই তিনজন ইমারত আইনের মামলারও আসামি)। আসামিদের মধ্যে সাতজন এখনো পলাতক। আর ১ জন ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। দুই মামলার মধ্যে হত্যা মামলাটি বর্তমানে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। এই মামলায় গত বছরের ১৮ই জুলাই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ১৮ই সেপ্টেম্বর সাক্ষ্যগ্রহণের আদেশ দেন ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ এসএম কুদ্দুস জামান। এই মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী ঢাকা জেলা ও দায়রা আদালতের পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) খোন্দকার আবদুল মান্নান মানবজমিনকে জানান, উচ্চ আদালতে এই মামলায় সাতজন আসামির করা একটি আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি এক আদেশে তাদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলার কার্যক্রমে ৬ মাসের স্থগিতাদেশ দেয় হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। ফলে, আইনি জটিলতায় এই মামলায় নির্ধারিত তারিখে বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ সম্ভব হয়নি। খোন্দকার আবদুল মান্নান বলেন, আগামী ৭ই মে এ মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালত থেকে পরবর্তী আদেশের অপেক্ষায় আছি আমরা।  তবে, ওই দিন (৭ই মে) থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করতে পারবো বলে আমরা আশাবাদী। ঘটনার চার বছর পার হয়েছে, আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এই দীর্ঘ সময়ে কেন সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যায়নি-এমন প্রশ্নের জবাবে খোন্দকার আবদুল মান্নান বলেন, বিচারকাজে একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুতে হয়। এছাড়া আসামিদেরও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। উচ্চ আদালতে যাওয়াও তাদের আইনগত অধিকার। তবে, আমরা আশা করি দ্রুত বিচার শুরু করে দ্রুতই তা শেষ করা যাবে।
এদিকে হত্যা মামলায় ৫৯৪ জনকে সাক্ষী করায় দ্রুত বিচার নিষ্পন্ন হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগী নিহতদের স্বজন ও বিচারপ্রার্থীরা। তাদের যুক্তি-এমনিতেই এ মামলার বিচারকাজ অনেক পিছিয়ে আছে। এখন এত সংখ্যক সাক্ষীর সাক্ষ্য নিতে গেলে বছরের পর বছর সময় পার হয়ে যাবে। এতে করে বিচার বিলম্বিত হবে। তবে, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, ৫৯৪ জনের তালিকা হলেও সবার সাক্ষ্য তারা নেবেন না। বেছে বেছে গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনা সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদেরই তারা আদালতে উপস্থাপন করবেন। এ বিষয়ে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি খোন্দকার আবদুল মান্নান বলেন,  তালিকার সবার সাক্ষ্য নেয়া হয়তো সম্ভব হবে না। মামলায় অভিযোগ প্রমাণে ঠিক যতজন সাক্ষীর প্রয়োজন হবে ততজন সাক্ষীকেই ডাকা হবে।
এদিকে এ ঘটনায় ইমারত নির্মাণের আইনের মামলাটি চলছিল ঢাকার  অতিরিক্ত মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে। মামলায় গত বছরের ১৪ই জুন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে ২৩শে আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণের দিন ধার্য করেন ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম মো. মোস্তাফিজুর রহমান। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অতিরিক্ত পিপি (পাবলিক প্রসিকিউটর) আনোয়ারুল কবীর বাবুল মানবজমিনকে জানান, ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাটি বর্তমানে স্থগিত অবস্থায় আছে। এ মামলায় মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রানা প্লাজা ভবনের নিউওয়েব বটম লিমিটেডের চেয়ারম্যান বজলুস সামাদ আদনান, নিউওয়েব স্টাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদুর রহমান তাপস, ইথার  টেক্সটাইলের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান ওরফে আনিসুজ্জামানের করা একটি আবেদন জেলা ও দায়রা আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। যে কারণে সাক্ষ্যগ্রহণ মুলতবি করা হয়। তিনি জানান, ইতিমধ্যে বজলুল সামাদ আদনানের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত। আরো দুটি আবেদন শুনানি ও নিষ্পত্তি হলে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু করা যাবে। আগামী ১৭ই মে এ বিষয়ে শুনানির জন্য দিন ধার্য আছে বলে জানান রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী। তিনি বলেন, আসামিপক্ষের এ ধরনের আবেদন মামলার বিচারে কালক্ষেপণ করার একটি প্রয়াস। আনোয়ারুল কবীর বাবুল আরো জানান, ইমারত আইনের মামলায় সাভার পৌরসভার মেয়র মো. রেফাতউল্লাহ তার মামলার ক্ষেত্রে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। পরে হাইকোর্টের এক আদেশে শুধু তার ক্ষেত্রে বিচার কার্যক্রম এক বছরের জন্য স্থগিত রয়েছে।
এদিকে রানা প্লাজা ভবন ধসের পর অনুসন্ধানে নামে দুদক। অনুসন্ধান শেষে ছয় তলা ভবনের অনুমোদন থাকলেও দুর্নীতির মাধ্যমে রানা প্লাজায় দশ তলা ভবন নির্মাণের অনুমোদন নিয়ে নয়তলা পর্যন্ত নির্মাণ করার অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ই জুন সাভার থানায় রানার বাবা, মাসহ ১৭ জনকে আসামি করে দুর্নীতির মামলা দায়ের করে দুদক। মামলা দায়েরের সময় ভবন মালিক সোহেল রানাকে আসামি করা হয়নি। ২০১৫ সালের ১৬ই জুলাই আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হয়। পরে মামলাটি বিচার ও নিষ্পত্তির জন্য ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে ঢাকার বিশেষ জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়। এই আদালতে গত বছরের ৬ই মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের বিষয়ে শুনানি হয়। আদালত রাষ্ট্র ও আসামি পক্ষের আইনজীবীদের বক্তব্য শেষে মামলাটি পুনঃতদন্তের নির্দেশ দেন। পরে পুনঃতদন্ত শেষে সোহেল রানাকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে আদালতে ১৮ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এ মামলায় দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (২) ধারা ও দণ্ডবিধি ১০৯ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে আসামিদের বিরুদ্ধে। আদালত সূত্র জানায়, গত ১৯শে এপ্রিল এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ শুনানি শেষে এক আদেশে ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আদেশের জন্য আগামী ৮ই মে নির্ধারণ করেছেন ঢাকা বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতের বিচারক এম আতোয়ার রহমান। আইনজীবীরা জানান, আদালত যদি ওই দিন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) গ্রহণ করে সাক্ষ্যগ্রহণের আদেশ দেন তাহলে এ মামলায় আসামিদের বিচার শুরু হবে।

Sunday, January 31, 2016

ক্ষমতার ছায়ায় ‘রাজনীতির দোকান’ by উৎপল রায়

নিবন্ধন, গঠনতন্ত্র ও কার্যালয় কিছুই নেই। কেন্দ্রীয়ভাবেও নেই কোনো স্বীকৃতি। সংগঠনের নেতাকর্মীও হাতেগোনা। দাবি, তারা আওয়ামী লীগের অঙ্গ বা ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন। দলের জন্য তারা কাজ করেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের দাবি, তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এবং সরকারের উন্নয়নের সহযোগী। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, এসব সংগঠনের নামে সুবিধা আদায়ই তাদের প্রধান লক্ষ্য। ‘শিশু লীগ’, ‘আওয়ামী বাস্তুহারা পরিষদ’, ‘দর্জি লীগ’, ‘বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ’ এমন সব নামের ভুঁইফোড় সংগঠনের সংখ্যা দিনে দিনে বেড়েই চলছে।
২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে সরকার গঠনের পর থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের দুই মেয়াদে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে নামে বেনামে অসংখ্য সংগঠন গড়ে উঠেছে। দলের কেন্দ্রীয় ও দায়িত্বশীল এ সংখ্যা পঞ্চাশ ছাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, দল যেহেতু ক্ষমতায়, তাই এসব সংগঠন রাজনীতির দোকান খুলে বসেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ সন্তান শেখ রাসেলের নাম ভাঙিয়ে চলছে এসব সংগঠন। দাপটের সঙ্গে তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়, জাতীয় প্রেস ক্লাব, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠা নামসর্বস্ব এসব সংগঠনের কার্যালয় দূরের কথা, এদের কোনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি পর্যন্ত নেই। অনেক সংগঠন তাদের ঠিকানা ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দাবি করলেও সেখানে তাদের কোনো অফিস বা দপ্তরও নেই। আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল ও রাজনীতি সচেতন কয়েকজন কেন্দ্রীয়  নেতা মনে করেন, এসব ভুঁইফোড় ও নামসর্বস্ব সংগঠন দলের নাম ভাঙিয়ে ‘আগাছা’ ‘পরগাছা’ হয়ে ‘স্বার্থ হাসিলের দোকান’ খুলে বসেছে। সূত্র জানিয়েছে, প্যাডসর্বস্ব এসব সংগঠনের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, তদবিরসহ বিভিন্ন অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। এছাড়া সংগঠনের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব নিয়েও নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও সংঘাতে জড়াচ্ছেন তারা।
অতি পরিচিত একটি সংগঠন বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট। এই সংগঠনটিতে পরিচিত মুখ অনেকে সময়ে সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন। সম্প্রতি এ সংগঠনের সভাপতি টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম মামলা করেছেন তার সই জাল করে প্রতারণার। অভিযোগ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অরুণ সরকার রানার বিরুদ্ধে। রানা যদিও অভিযোগ করেছেন, তার স্বাক্ষরও জাল করা হয়েছে একই প্যাডে। সই জাল করে সংগঠনের নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করে তারানা হালিমের পক্ষে মামলাটি দায়ের করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের বেশ কজন প্রভাবশালী নেতা, সাবেক ও বর্তমান মন্ত্রী নামসর্বস্ব এসব সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এমনকি সংগঠনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারা নিয়মিত অংশ নেন।
আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যুবলীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, কৃষক লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, তাঁতী লীগ ও যুব মহিলা লীগ দলের সহযোগী সংগঠন। এছাড়া ছাত্রলীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদকে ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটসহ আরও কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনও আওয়ামী লীগের নামে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, ১৫ই আগস্ট শাহাদাৎবার্ষিকী, শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস, বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের জন্মদিবসসহ জাতীয় নানা দিবসের কর্মসূচি পালন করে। এসব সংগঠনের পাশাপাশি নতুন গজিয়ে ওঠা সংগঠনও দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালনে সক্রিয় থাকে। নতুন করে উদ্ভব হয়েছে ‘শিশু লীগ’, ‘আওয়ামী দর্জি লীগ’, ‘আওয়ামী চালক লীগ’ ‘আওয়ামী সমবায় লীগ’সহ আরও কিছু সংগঠন। এছাড়া নামে বেনামে চলছে নৌকা সমর্থক গোষ্ঠী, জননেত্রী পরিষদ, আওয়ামী ওলামা লীগ, আওয়ামী বাস্তুহারা লীগ, আওয়ামী মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ, আওয়ামী পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা লীগ, ডিজিটাল বাংলাদেশ ফোরাম, আওয়ামী পরিবহন শ্রমিক লীগ, আওয়ামী যুব সাংস্কৃতিক জোট, জনতার মঞ্চ, জনতার প্রত্যাশা, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনা গবেষণা পরিষদ, আওয়ামী প্রচার লীগ, আওয়ামী তরুণ লীগ, আওয়ামী মৎস্যজীবী লীগ, আওয়ামী রিকশাচালক মালিক-শ্রমিক ঐক্য লীগ, আওয়ামী যুব হকার্স লীগ, বঙ্গবন্ধু লেখক লীগ, মুক্তিযোদ্ধা জনতা লীগ, বঙ্গবন্ধু যুব পরিষদ, বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ, বঙ্গবন্ধু একাডেমি, বঙ্গবন্ধু বাস্তুহারা লীগ, বঙ্গবন্ধুর চিন্তাধারা বাস্তবায়ন পরিষদ, আমরা মুজিব সেনা, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, জয়বাংলা সাংস্কৃতিক পরিষদ, মুক্তিযোদ্ধা লীগ, মুক্তিযোদ্ধা জনতা লীগ, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব পরিষদ, জননেত্রী পরিষদ, হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক পরিষদ, স্বাধীনতা পল্লী চিকিৎসক পরিষদসহ অসংখ্য নামসর্বস্ব সংগঠন। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে এছাড়া ওলামা লীগ, বঙ্গবন্ধু মঞ্চ, বাংলাদেশ হকার্স লীগসহ ২২টি সংগঠনের একটি জোট (সম্মিলিত আওয়ামী সমর্থক জোট) ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ আহূত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নগর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক আবদুল হক সবুজ এই জোটের চেয়ারম্যান হয়ে জোটের নেতাকর্মী ও সংগঠনের দেখ-ভাল করতেন। কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার মুখে তিনি সম্মিলিত আওয়ামী সমর্থক জোটের চেয়ারম্যান পদ থেকে সরে দাঁড়ান। বর্তমানে নিয়াজ মোহাম্মদ খান নামে আওয়ামী লীগের একজন নেতা এই নামসর্বস্ব জোটের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নূহ-উল-আলম লেনিন মানবজমিনকে বলেন, দল ক্ষমতায় থাকলে যা হয় সংগঠনের নামে তা-ই হচ্ছে। এরা রাজনীতির নামে রাজনীতির দোকান খুলে বসেছে। কেন্দ্রীয় ও মহানগর আওয়ামী লীগের কিছু নেতাও এসব সংগঠনের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা বিবৃতি দেয়। মনগড়া নানা কথা বলে। আমরা এসব পাত্তা দিই না। আমার ধারণা, বিএনপি-জামায়াতের লোকজনও এসব সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, নামসর্বস্ব সংগঠনের অনেকেই কর্মসূচির নামে চাঁদাবাজি করে এরকমও শুনেছি। কিন্তু এসব তৃতীয় ও চচুর্থ শ্রেণির সংগঠনের বিষয়ে আমরা ভাবি না। আওয়ামী লীগের একজন সাংগঠনিক সম্পাদক আলাপকালে বলেন, কেন্দ্রীয় ও মহানগর আওয়ামী লীগের কিছু নেতা এবং বর্তমান ও  সাবেক কিছু মন্ত্রী মিডিয়া কভারেজ পাওয়ার জন্য ভুঁইফোড় বিভিন্ন সংগঠনের অনুষ্ঠানে যান। তারা তাদের মতো করেই সেখানে বক্তব্য বিবৃতি দেন। তবে, এসব সংগঠনের কোনো রাজনৈতিক স্বীকৃতি ও সাংগঠনিক ভিত্তি নেই। তারা আওয়ামী লীগেরও কেউ নয়। ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা ক্ষোভের সঙ্গে মানবজমিনকে বলেন, এসব সংগঠনের কোনো দোষ নেই। কেন্দ্রীয়  ও মহানগরের শীর্ষ নেতারাই এদের পৃষ্ঠপোষকতা করছেন। এদের বিভিন্ন কর্মসূচিতেও নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, বিএনপি-জামায়াতের বিপক্ষে ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কথা বললে যে কোনোভাবেই বলা যায়। এসব নামসর্বস্ব সংগঠনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে কথা বলার কোনো যুক্তি দেখি না।
মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগ নামের একটি সংগঠনের সভাপতি ফাতেমা জলিল সাথী বলেন, আরও চারজন মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের ব্যানারে কর্মসূচি পালন করলেও তার পরিচালিত সংগঠনটিই আসল। আলাপকালে তিনি জানান, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা তার পরিচালিত মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম লীগের পৃষ্ঠপোষকতা করেন। আর একই নামে অন্য চারটি সংগঠনকে পৃষ্ঠপোষকতা করছেন সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। গত কয়েক বছর ধরে আওয়ামী শিশু লীগের ব্যানারে একটি সংগঠনের কিছু শিশু কিশোরকে বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সভা, সমাবেশ ও মানববন্ধনে অংশ নিতে দেখা গেছে। এছাড়া একই সংগঠনের নামে মাঝে মাঝে ব্যানার ও প্যানাফ্লেক্সও শোভা পায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেলের ছবি। ব্যানারে লেখা থাকে ‘আজকের শিশু আগামী দিনের ভবিষ্যত’। খোঁজ নিয়ে  জানা গেছে, ২০১২ সালে ‘শিশু লীগ’ নামে এ সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটে। বেশ কিছুদিন সক্রিয় থাকলেও বিগত কয়েক মাস ধরে শিশু লীগের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা রাজধানীর ডেমরা থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ মুন্সী। মানবজমিনকে তিনি বলেন, আমি একটি ভালো উদ্দেশ্য নিয়ে স্কুলের শিক্ষার্থীদের একত্র করে এ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল শিশুদের পড়ালেখাসহ তাদের যাবতীয় বিষয় দেখভাল করার। কিন্তু অনেকেই বিষয়টি নেতিবাচক হিসেবে নিয়েছে। তাই কয়েক মাস ধরে শিশু লীগের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ভবিষ্যতে তা আবার চালু হবে কিনা তা বলতে পারছি না। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ব্যানার ফেস্টুন ও দলীয় কর্মসূচিতে শিশুদের নিয়ে অংশগ্রহণের বিষয়টি অস্বীকার করেন তিনি।