Monday, December 23, 2013

সরল গরল- দশম সংসদের বৈধতা ও একাদশের ভাবনা by মিজানুর রহমান খান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘সমঝোতা হলে দশম সংসদ ভেঙে নির্বাচনের’ যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয় বলেই প্রতীয়মান হয়।

নেতা-কর্মী হত্যার রাজনীতি বন্ধ করুন- আন্দোলন না আক্রোশ?

একতরফা নির্বাচন বন্ধের জন্য বিরোধী দল যে আন্দোলন করছে, তা দেখা যাচ্ছে ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতিহিংসায় রূপ নিয়েছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রথম আলোর প্রতিনিধিদের পাঠানো প্রতিবেদনে এর ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। গত কয়েক সপ্তাহে শিবগঞ্জ উপজেলার টিকরি গ্রামের ২৫টি বাড়ি ও ৩০-৩৫টি দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রতিপক্ষ দল আওয়ামী লীগ করে বা তাদের ভোট দেয়, এই অপরাধে বেছে বেছে তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালানো হচ্ছে। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার আওয়ামী লীগের এক নেতা পারিবারিক কবরে লুকিয়ে থেকেও রেহাই পাননি, তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

বিভিন্ন এলাকায় সংখ্যালঘু পরিবারের সদস্যদের ওপরও চলছে হামলা। তাদের ঘরবাড়ি-সহায়সম্পদ পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপরও চলছে নির্বিচার হামলা। ২০ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল সদর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি ও দাইন্যা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম ফারুককে দুর্বৃত্তরা গুলি করে হত্যা করেছে। লক্ষ্মীপুরে বিএনপি-সমর্থকদের বিরুদ্ধে চালানো হয়েছে ভয়াবহ আক্রমণ। এ রকম হত্যা-আক্রমণ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ঘটছে।
গত শনিবার শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটের সামনে গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও ছাত্র মৈত্রীর সভাপতিকে লক্ষ্য করে ককটেল ছুড়ে মারা হয়। তিনিসহ মোট তিনজন গুরুতর আহত হয়েছেন। উগ্রপন্থীরা এই হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গণ-অংশগ্রহণ ছাড়া গণ-আন্দোলন হয় না। এই গুরুত্বপূর্ণ দিকটির প্রতি নেতৃত্বকে সব সময় সতর্ক থাকতে হয়। আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে প্রতিপক্ষ দলের ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে আক্রোশ চরিতার্থ করার জন্য যেন হামলা চালানো না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্দোলন আক্রোশে পরিণত হলে তার পাল্টাপাল্টি জের চলতে থাকে। আজ কোথাও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা হলে, কাল হয়তো বিএনপির নেতা-কর্মীদের ওপরও নেমে আসবে পাল্টা হামলা। কারণ, পরিস্থিতি সব সময় একই রকম থাকে না। আজ যেখানে এক দলের আধিপত্য, কাল সেখানে শক্তির ভারসাম্য একেবারে উল্টে যাওয়া বিচিত্র নয়।
রাজনীতিতে নৈরাজ্যের কোনো স্থান নেই। গণতন্ত্রের জন্য এ দেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে। সেখানে ব্যক্তি-হত্যার বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রোশ মেটানোর জন্য হামলা চালানোর অপকৌশল শেষ পর্যন্ত পরিত্যক্ত হয়েছে। কারণ, ওই পথে আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জন করা যায় না। বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে অতীতের আন্দোলনের অভিজ্ঞতার আলোকে সুস্থ ধারার আন্দোলনের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে; হত্যা বা আগুন দিয়ে নয়।
আন্দোলনকে রাজনীতির প্রথাগত পথ থেকে বিচ্যুত হতে দেওয়া যাবে না। এ বিষয়ে দুই পক্ষের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিতে হবে। কোনো দলের নেতা বা ব্যক্তিকে হত্যা, তাদের ওপর হামলা বা বাসায়-দোকানে আগুন দেওয়ার মতো হিংসাত্মক তৎপরতা বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হোক।

নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা- উপসর্গ নয়, রোগের চিকিৎসা জরুরি by বদিউল আলম মজুমদার

২৫ নভেম্বর দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর থেকে গত সপ্তাহ তিনেক চলমান সহিংসতায় শতাধিক ব্যক্তির প্রাণহানি ঘটেছে।

খালেদার আন্দোলন এবং নানা প্রসঙ্গ! by আলী রাবাত তারেক

অন্তহীন সমালোচনা খালেদা জিয়ার। ঘরে বাইরে এই সমালোচনা। যারা সমালোচনা করছেন তাদের যুক্তি হচ্ছে খালেদার আন্দোলন হঠকারী। দেশ বিরোধী। জনস্বার্থ বিরোধী।
দেশের কল্যাণে এ ধরনের আন্দোলন কোন ভূমিকা রাখবে না। বরং দেশটার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। অনেকে বলছেন, কি হলো আন্দোলন করে। সরকার তো টলেনি। ঠিক মতোই আছে। নির্বাচন হচ্ছে। মাঝখান দিয়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হলো। ক্ষতি হলো রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিগত সম্পদের। দেশের ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত হলো। এই যুক্তির সঙ্গে অনেকেই একমত নন। তারা বলছেন, আন্দোলন যদি ব্যর্থই হবে তাহলে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলেন কেন? এরশাদ কেন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন।  কেনইবা তাকে আটকে রাখা হচ্ছে। প্রার্থীরা এলাকায় যাচ্ছেন না কেন? ব্যবসায়ীরা কেন বলছেন আন্দোলন দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। দুই নেত্রীকে আলোচনার কথা বলছেন কেন? বিদেশি পর্যবেক্ষকরা কেন আসছেন না। কেন অর্থমন্ত্রী বলছেন এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন কেন বলছে এই নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর কোন সুযোগ নেই। কমনওয়েলথ কেন না করে দিলো। যুক্তরাষ্ট্র কেন এই নির্বাচনের ব্যাপারে কড়া অবস্থান নিলো। আন্দোলন যদি সফলই না হবে তাহলে নির্ধারিত সময়ের আগে কেন সেনা মোতায়েন করা হলো। যৌথবাহিনী কেন গ্রামে গ্রামে বিশেষ অভিযানের নামে জনপ্রত্যাশার বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। সর্বোপরি ভোটারবিহীন এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার কি অর্জন করবে। নির্বাচন যে তামাশা ও কৌতুকে পরিণত হয়েছে সেটা তো প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের মধ্যেই স্পষ্ট। খালি মাঠে গোল দেয়ার কথা তিনি নিজেই বলছেন। এই দুটি মত এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। হারজিত নিয়ে দুই মতের মানুষেরা ব্যস্ত। কিন্তু দেশের আমজনতার দিকে কে তাকায়। তাদের কথা কে ভাবছে। দেশ জ্বলছে। পুড়ে মরছে মানুষ। খেটে খাওয়া মানুষগুলো কেন বলছে আমরা বাঁচতে চাই। আমরা এই ধ্বংসাত্মক রাজনীতি চাই না। গ্রামগঞ্জে এই আওয়াজ পৌঁছে গেছে। শাসক দলের সমর্থকরা মানুন আর না মানুন এই নির্বাচন দেশটাকে নৈরাজ্যের পথে ঠেলে দিয়েছে। নির্বাচনের ইতিহাস পাল্টে দিয়ে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। দেশটাকে বিভক্ত করেছে। জোর করে ক্ষমতায় থাকার পথকে উৎসাহিত করেছে। আমরা সবাই জানি নৈরাজ্য থেকে যে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয় তা থেকেই একনায়কতন্ত্রের জন্ম হয়। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন একনায়কতন্ত্রের জন্ম দেবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। মানুষ কি বলবে। তাদের কি বলার আছে। তাদের তো একটাই অস্ত্র ছিল ভোট। সেটা থেকেও তারা বঞ্চিত। ভোট তো দূরে কথা তারা এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে। তারা আঁতকে উঠে যৌথবাহিনীর আগমনে। জান যাচ্ছে যাক। কিন্তু সহায় সম্পদ? তাও যাচ্ছে। বুলডোজার কেড়ে নিচ্ছে তাদের ভবিষ্যতের স্বপ্ন। মাথা গোঁজার ঠাঁই। পরিবার পরিজনের জন্য কিছুই রেখে যেতে পারছে না। আমরা এমন এক সমাজে বাস করি যেখানে এক বাড়িতে জামায়াত যেমন আছে, তেমনি আছে আওয়ামী লীগ-বিএনপিও। একজনের অপরাধে যখন গোটা বাড়িটি গুঁড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তখন অন্যদের স্বপ্নও ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে।
এই রাজনীতির অবসান কবে হবে? মানুষ তো এই রাজনীতি চায় না। তারা তো পরিবর্তন চায়। এই পরিবর্তন কবে কখন আসবে? যে ধারায় রাজনীতিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তাতে দেশের অস্তিত্বই হুমকির সম্মুখীন হবে। তাই কেউ কেউ বলছেন, দল নয় দেশের স্বার্থ বড় এটা ভাবতে হবে। বাংলাদেশের বিদেশি বন্ধুরা হতাশ এবং ক্ষুব্ধ। তারা এর পরিবর্তন চান। তারা যেভাবেই পারেন চাপ দেয়ার চেষ্টা করছেন। এতে আমাদের রাজনীতিকদের হুশ হবে না। কারণ, তাদের কাছে দেশ নয়, ক্ষমতা বড়। এই যখন অবস্থা তখন জনবিচ্ছিন্ন এক সরকারকে কেউ কেউ দূর থেকে আশকারা দিয়ে চলেছেন। তারা এ থেকে হয়তো কিছু অর্জন করতে পারবেন। কিন্তু আমরা কি কিছু পাবো? ইতিহাস বলে শূন্য হাতেই আমাদের ফিরতে হবে। তাই সময় থাকতে ভাবুন। সময় এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

বিদেশি ঋণ ও উন্নয়ন

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশি সাহায্যের ভূমিকা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। বলা হয়েছে, বিদেশি সাহায্য সেসব দেশেই কার্যকর, যেখানে ভালো আর্থিক, মুদ্রা ও বাণিজ্য নীতিমালা রয়েছে। অন্য পক্ষের বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে বিদেশি সাহায্য কার্যকর হওয়ার সঙ্গে গ্রহীতা দেশের অর্থনৈতিক নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই। এ কথা অবশ্য ঠিক যে দরিদ্র দেশগুলোর প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নীতিমালা প্রণয়নের সক্ষমতা কম থাকার কারণে তারা বিদেশি সাহায্যের ব্যাপারে দাতাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা, এর ব্যবস্থাপনা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে দুর্বল থাকে। কিন্তু সাহায্যের কার্যকারিতার সঙ্গে গ্রহীতা দেশের নীতিমালার দক্ষতাকে সম্পর্কিত করলে সাহায্য-ব্যবস্থার অন্য দুর্বলতাগুলো ঢাকা পড়ে যায় এবং সব ব্যর্থতার দায় গিয়ে পড়ে সাহায্য গ্রহীতা দেশের ওপর। যার ফলে সাহায্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে দাতাদের অগ্রাধিকার, সাহায্যপ্রবাহ এবং গ্রহীতা দেশের প্রয়োজনের মধ্যে ফারাক, সাহায্যপ্রবাহে অনিশ্চয়তা, দাতা ও গ্রহীতার একই পর্যায়ের জবাবদিহি না থাকা, বিশ্ব সাহায্য-ব্যবস্থার গতি-প্রকৃতি ইত্যাদি বিষয় দৃষ্টির আড়ালে রয়ে যায়।
সাহায্য গ্রহণকারী দেশের নীতিমালার কারণে নয়, বরং দাতারা যেভাবে সাহায্যের প্রয়োজন নির্ধারণ করে ও অর্থ ছাড় করে, মূলত সেই প্রক্রিয়াই অকার্যকর সাহায্যের জন্য দায়ী। এটি ২০০৫ সালে প্যারিস ঘোষণায় প্রথমবারের মতো স্বীকার করা হয়েছে। তবে এর আগেও বিভিন্ন ফোরামে বিদেশি সাহায্যের কার্যকারিতা বাড়ানোর ব্যাপারে মতৈক্য সৃষ্টির প্রচেষ্টা শুরু হয়। প্যারিস ঘোষণা হচ্ছে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের একটি প্রতিশ্রুতি, যেটি বিদেশি সাহায্যের ক্ষেত্রে সংস্কারবিষয়ক মূলনীতি হিসেবে বিবেচিত হয়। প্যারিস ঘোষণায় সাহায্য দাতা ও গ্রহীতা উভয় পক্ষই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়, যাতে বিদেশি সাহায্যের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন সুষ্ঠু, বর্ধিত ও অধিকতর ফলপ্রসূ হয় এবং তা নির্ণয়ে তদারকির ব্যবস্থাও থাকে। বিদেশি সাহায্যের কার্যকারিতা-সংক্রান্ত এই ঘোষণার মূল্যায়ন ও অগ্রগতি সাধনে পরবর্তী সময়ে আরও কয়েকটি মাইলফলক অর্জিত হয় ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে ঘানার আক্রায় এবং ২০১১ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার বুসানে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনে। এই দুটি বৈঠকে বিদেশি সাহায্য দেওয়া-নেওয়ার ক্ষেত্রে প্যারিস ঘোষণার আলোকে বৃহত্তর মতৈক্যের ওপর জোর দেওয়া হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন বিদেশি সাহায্য কার্যকরী হয় না। এর পেছনে প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে সাহায্য প্রদান ও ব্যবহার উভয় ক্ষেত্রেই সক্ষমতার অভাব এবং চিরায়ত দাতা-গ্রহীতা সম্পর্ক।
গতানুগতিকভাবেই দাতা-গ্রহীতা সম্পর্ক অসম হয়, যেখানে এক পক্ষ শক্তিশালী ও অন্য পক্ষ বেশ দুর্বল থাকে। যে কারণে সাহায্য গ্রহীতা দেশের সামনে পছন্দের স্বাধীনতা খুবই কম থাকে। উপরন্তু বিভিন্ন সময়ে বিদেশি সাহায্য ব্যবস্থায় নানা ধরনের সংস্কার হচ্ছে। কিন্তু ওসব সংস্কারে সাহায্য গ্রহণকারী দেশের মতামত খুব কমই প্রতিফলিত হয়েছে। যে কারণে গ্রহীতা দেশে বিদেশি সাহায্যের কার্যকারিতাও জোরদার হতে পারছে না। সাহায্য-ব্যবস্থায় দাতাদের দিক থেকে সাহায্য গ্রহণকারী দেশগুলোর সম্পৃক্ততাকে তেমন একটা উৎসাহিত না করাটাও এ জন্য আংশিকভাবে দায়ী। তবে এটিও সত্য যে আন্তর্জাতিক সাহায্য-ব্যবস্থায় গ্রহীতা দেশগুলো অংশগ্রহণের সুযোগ পেলেও নিজেদের মতামত তেমনভাবে তুলে ধরতে পারছে না। সাহায্যের কার্যকর ব্যবহারের প্রশ্নে তাদের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। দাতাদের মধ্যেও প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে সক্ষমতার দুর্বলতা আছে, সাহায্য দেওয়ার সময়ে অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে না। বাংলাদেশে বিদেশি সাহায্যপ্রবাহের ধারা ক্রমেই পরিবর্তিত হচ্ছে। পরিবর্তনটা শুধু সাহায্যের উৎস ও পরিমাণেই ঘটছে না, খাতভিত্তিক বরাদ্দ এবং ব্যবহারের দিক থেকেও তা হচ্ছে। বিগত প্রায় দুই যুগে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির সম্পৃক্ততা জোরদার হয়েছে। আমদানি, রপ্তানি, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রবাসী-আয়ের বর্ধিত অংশ সেটিই ইঙ্গিত করে। যার ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিদেশি সাহায্যের আনুপাতিক অংশ অনেক কমে গেছে।
১৯৮১ সালে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) বিদেশি সাহায্যের অংশ ছিল শতকরা ৫ দশমিক ৮ ভাগ, ২০১৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ২ শতাংশ। বিদেশি সাহায্যের অংশ অর্থনীতিতে কমে এলেও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এর অংশ দেশীয় উৎস থেকে অর্থায়নের প্রায় সমান। মোট সাহায্যের সিংহভাগই আসে প্রকল্প সাহায্য বাবদ। বাংলাদেশে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জন এবং সামাজিক খাতের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বিদেশি সাহায্যের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বিদেশি সাহায্যের ভূমিকা ও কার্যকারিতা নিয়ে বাংলাদেশেও বিতর্ক এবং দ্বিধা রয়েছে। কখনো কখনো সাহায্যদাতাদের উপস্থিতি অর্থনৈতিক নীতিমালার সঙ্গে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশের সুশাসন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি উন্নয়নে দাতাদের বক্তব্য এখন নিয়মিত ব্যাপার। একদিকে শর্তের বেড়াজাল, অন্যদিকে সাহায্যপ্রবাহ সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণার অভাব, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি কারণে সাহায্যের কার্যকারিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। অন্যদিকে সাহায্য বরাদ্দের ক্ষেত্রে দারিদ্র্য ও উন্নয়ন প্রাথমিক মাপকাঠি নয়। বরং রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং উন্নয়নের উদ্দেশ্য বিবেচনা করেই সাহায্য দেওয়া হয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে অর্থায়নের উৎস হিসেবে অন্যান্য খাত যেমন অভ্যন্তরীণ সম্পদ সঞ্চালন, রেমিট্যান্স, বিদেশি বিনিয়োগ ইত্যাদির তুলনায় বিদেশি সাহায্যের পরিমাণ ইতিমধ্যেই কমে এসেছে। অপর দিকে যুদ্ধ-সংঘাতে জর্জরিত দেশগুলোর আর্থিক চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিদেশি সাহায্যের প্রবাহ যেমন বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে সংকুচিত হয়ে আসবে, তেমনি সাহায্য ব্যবহারের ওপর নজরদারি ও কর্তৃত্ব বাড়বে। এ অবস্থায় বাংলাদেশকে বিদেশি সাহায্যের বাইরে অন্যান্য আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ সঞ্চালন করার প্রয়াস জোরদার করতে হবে।

কূটনীতি : দুনিয়ার দ্বিতীয় প্রাচীনতম পেশা by মহিউদ্দিন আহমদ

১৯৬৭ সালের খুব সম্ভব অক্টোবর মাসের কোনো একদিন লাহোর সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে আমাদের প্রবেশনারি জীবনের শুরু। এই লাহোর সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে সেই জমানায় সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান (সিএসপি) এবং পিএফএস পাকিস্তান ফরেন সার্ভিসের নবীন কর্মকর্তাদের এক বছরের কাগজ-কলমের প্রশিক্ষণ নিতে হতো। থাকা-খাওয়া, প্রতিদিন সকাল-বিকাল ঘোড়ায় চড়া, টেনিস খেলা এবং লেখাপড়ার সব ব্যবস্থাই এই সিভিল সার্ভিস একাডেমি কমপ্লেক্সে ছিল। আমাদের সেই ১৯৬৭-৬৮ ব্যাচে ২০ জন সিএসপি এবং ১৫ জন পিএফএম প্রশিক্ষণার্থী- সাবেক পূর্ব পাকিস্তান এবং পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। তবে এ বছর আমাদের বাঙালিদের সংখ্যাধিক্য ছিল। সর্বপাকিস্তান প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার ভিত্তিতে তখন এই নিয়োগগুলো হতো। আমাদের বছর ২০% মেরিট কোটার ৪ জনের ৩ জনই বাঙালি ছিলেন। প্রথমজন শাহেদ সাদউল্লাহ কয়েক বছরের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়। এখন লন্ডনে উর্দু ‘দৈনিক জং’ পত্রিকার সম্পাদক। দ্বিতীয়জন ড. মিজানুর রহমান শেলী, চাকরি জীবনের সাত-আট বছরের মধ্যে তিনিও চাকরি ছেড়ে দেন। (‘নেম ড্রপিং’ করছি না, আসলেই তিনি আমাদের ব্যাচমেট ছিলেন; যেমন ছিলেন ড. আকবর আলি খান।) এখন ঢাকার একটি ‘থিঙ্কট্যাঙ্ক’-এর প্রধান এবং তৃতীয়জন আবদুশ শাকুর কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। তো প্রবেশনারি জীবনের শুরুতে ক্লাসে এক অতিথি বক্তা খুব সম্ভব পশ্চিম পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের এক সচিব রিজভী সাহেব আমাদের ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তাদের উদ্দেশ করে ডিপ্লোম্যাসি সম্পর্কে বলতে গিয়ে এ পেশাটিকে দুনিয়ার দ্বিতীয় প্রাচীনতম পেশা হিসেবে বর্ণনা করলেন। সঙ্গে সঙ্গে আমার মনে প্রশ্ন জাগল, তাহলে দুনিয়ার প্রথম প্রাচীনতম পেশাটি কী? পাশে উপবিষ্ট ছিল ফরিদ; ড. শাহ মোহাম্মদ ফরিদ, ২০০১ সালে, তখনকার নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি। ফরিদ ঢাকা ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকস ডিপার্টমেন্টেও তিন বছরের অনার্স ক্লাসগুলোতে ক্লাসমেট সুতরাং একটু বেশি ঘনিষ্ঠ। ফরিদ একজন মেধাবী ছাত্র, অনার্স এমএতে ফার্স্ট ক্লাস, দুটোর একটিতে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্টও। সুতরাং তার জ্ঞানগরিমা প্রত্যাশিতভাবেই বেশি।
ফরিদ কয়েক সেকেন্ড আমার প্রশ্নটি এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করল। কিন্তু আমি ছাড়লাম না তাকে। এক রকমের বাধ্য হয়েই ফরিদ বলল, ‘প্রস্টিটিউশন’ দুনিয়ার প্রাচীনতম পেশা।
একটি ধাক্কা খেলাম। ডিপ্লোমেসি হল ‘গ্ল্যামারস’ একটি ‘প্রফেশন’, তাই শুনে এসেছি। করাচি ইউনিভার্সিটিতে এমএ পড়ার সময় করাচিতে কিছু রাষ্ট্রদূত এবং কূটনীতিবিদদের দেখে তা-ই মনে হয়েছে। আর এই ‘ডিপ্লোমেসি’, প্রস্টিটিউশনের পরের প্রফেশন!
পরে দেখেছি, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান, পলিটিকসকেই দ্বিতীয় প্রাচীনতম পেশা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি পলিটিকস প্রফেশনকে দুনিয়ার প্রথম প্রফেশনের সঙ্গেও তুলনা করেছেন। ইন্টারনেটে খোঁজাখুঁজি করে এ প্রসঙ্গে তার উদ্ধৃতিটি এমন পেয়েছি : 'It has been said that politics is the second oldest profession. I have learned that it bears a striking resemblance to the first.' (রাজনীতিকে দ্বিতীয় প্রাচীনতম পেশা হিসেবে বর্ণনা করা হয়ে থাকে। আমি আরও শুনেছি, দুনিয়ার প্রাচীনতম পেশাটির সঙ্গে এই রাজনীতি পেশার দারুণ মিল রয়েছে।)
দুই.
দেবযানী খোবরাগাড়ে নামের এক ভারতীয় মহিলা কূটনীতিবিদকে নিউইয়র্কে গ্রেফতারের প্রতিবাদে ভারতে দারুণ তোলপাড় চলছে এখন। বাংলাদেশের পত্র-পত্রিকা ও টিভিতেও এ খবর গুরুত্ব পাচ্ছে। নিউইয়র্কে এই কূটনীতিবিদ ডেপুটি কনসাল জেনারেল ছিলেন। দেবযানী খোবরাগাড়ে ভারত থেতে সঙ্গীতা রিচার্ডস নামের যে কাজের মেয়েকে নিউইয়র্কে নিয়ে গিয়েছিলেন তাকে আমেরিকান আইন অনুযায়ী প্রযোজ্য নিুতম মজুরি প্রতি ঘণ্টায় ৯ ডলার দিচ্ছিলেন না বলে কাজের মহিলাটি মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করে। এই ভারতীয় কূটনীতিবিদ ১২ ডিসেম্বর সকালে তার বাচ্চাদের স্কুলে নামাতে গেলে নিউইয়র্ক পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে, হাতকড়া পরায়, বিবস্ত্র করে তার শরীর সার্চ করে, ড্রাগ আসক্ত ক্রিমিন্যালদের সঙ্গে একই সেলে রাখে। ছয়-সাত ঘণ্টার মধ্যে অবশ্য দেবযানী খোবরাগাড়ে বেরিয়ে আসেন ব্যক্তিগত জামিনে। কিন্তু ভারতীয়দের জন্য ক্ষতি যা হওয়ার তা ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে। একজন কূটনীতিবিদ, তাও মহিলা। তেমন গুরুতর কোনো অপরাধ নয়, তারপরও তার সঙ্গে এমন আচরণ? ভারত সরকার এবং দেশটির আপামর জনসাধারণ যথার্থই মনে করল, এমন আচরণ ভিয়েনা কনভেনশনের গুরুতর লংঘন। সুতরাং তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভারত সরকার নতুন দিল্লি এবং ভারতের অন্যান্য শহরে কর্মরত মার্কিন কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে আট-দশ রকমের ব্যবস্থা গ্রহণ করল। ভারতের ফরেন সেক্রেটারি সুজাতা সিং জরুরি ভিত্তিতে দিল্লিতে অ্যামেরিকান রাষ্ট্রদূত ন্যান্সি পাওয়েলকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ জানান। ভারতে কর্মরত মার্কিন কূটনীতিবিদরা তাদের বাসাবাড়িতে কর্মরত কাজের লোকদের কী বেতন-ভাতা দিয়ে থাকেন তা জানাতে হবে, মার্কিন কনস্যুলেটে কর্মরত মার্কিন কূটনীতিকরা ভারত সরকার কর্তৃক ইস্যু করা পরিচয়পত্র ফেরত দেবে, কূটনীতিবিদ হিসেবে তারা বিদেশ থেকে শুল্কমুক্ত জিনিসপত্র- যেমন- খাবার-দাবার, মদ, গাড়িঘোড়া ইত্যাদির আমদানি বন্ধ থাকবে। সর্বোপরি দিল্লিতে মার্কিন দূতাবাসের নিরাপত্তার ব্যবস্থায় দিল্লি পুলিশ দূতাবাসের চারপাশে বিভিন্ন ধরনের যেসব ব্যারিকেড স্থাপন করেছিল তা তুলে নিয়েছে।
খুব ইন্টারেস্টিং একটি দাবি তুলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর এক পররাষ্ট্রমন্ত্রী যশোবন্ত সিনহা। তিনি বলেছেন, ভারতে কর্মরত কিছু মার্কিন কূটনীতিবিদ সমকামী। এসব সমকামী কূটনীতিবিদদের পুরুষ সঙ্গীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে ভারত সরকার যেসব ভিসা দিয়েছে, সমকামী কূটনীতিবিদদেরও ভারতে থাকার অনুমতি দিয়েছে, তা প্রত্যাহার করে এদের গ্রেফতার করতে হবে। কারণ ভারতে এটি একটি অপরাধ। নিউইয়র্কে দেবযানী খোবরাগাড়ে প্রযোজ্য ন্যূনতম বেতন না দিয়ে যদি অপরাধ করে থাকেন, তো এসব সমকামী মার্কিন কূটনীতিবিদরা তো আরও বড় জঘন্য অপরাধ করে চলেছেন ভারতের প্রযোজ্য আইন লংঘন করে!
কয়েক দিন আগে একটি মার্কিন কংগ্রেস প্রতিনিধি দল দিল্লি সফরে ছিল। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদ, কংগ্রেস ভাইস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধী, ভারতীয় জনতা পার্টির সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, লোকসভার স্পিকার মীরা কুমারী, ভারত সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা শিবশংকর মেনন, তারা এই মার্কিন কংগ্রেস প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রতিবাদে নির্ধারিত সব অ্যাপায়নমেন্ট বাতিল করেছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংও কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন। লোকসভা-রাজ্যসভায় প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন সব রাজনৈতিক দল।
এনডিটিভি- নিউ দিল্লি টেলিভিশনে কয়েকদিন ধরেই দেখছি এই ভারতীয় মহিলা কূটনীতিবিদের প্রতি অগ্রহণযোগ্য আচরণ এবং এ প্রসঙ্গে বিভিন্ন ভারতীয়র মন্তব্য, মতামত গুরুত্বের সঙ্গেই প্রচার হচ্ছে প্রতিটি বুলেটিনে।
গত মঙ্গল বা রোববার রাতে দেখি একটি আলোচনা অনুষ্ঠানে ভারতের দুই সাবেক পররাষ্ট্র সচিব- ললিত মান সিং এবং কানওয়াল সিবালের সঙ্গে আর এক অভিজ্ঞ কূটনীতিবিদ রনেন সেন। আরও কয়েকজনসহ তারা কথা বলছেন। ললিত মান সিং এবং রনেন সেন দু’জনই ওয়াশিংটনে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। কথা বললেন, আলাদাভাবে ভারতের এক প্রতিমন্ত্রী শশি থারুর। তিনিও একজন পেশাজীবী কূটনীতিবিদ এবং জাতিসংঘে আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ছিলেন।
শশি থারুর বললেন, আমেরিকান আইন অনুযায়ী যদি কাজের লোকদের ন্যূনতম বেতন দিতে হয়, দেখা যাবে ওই বেতন তা ওই ‘হাউজমেড’-এর নিয়োগদাতা কূটনীতিবিদদের চেয়ে বেশি। কারণ কূটনীতিবিদদের তো বিদেশে ভারতীয় স্কেলে বেতন-ভাতা দেয়া হয়ে থাকে। ‘আমেরিকান স্ট্যান্ডার্ডে’ তা অনেক কম। আমেরিকার প্রযোজ্য হারে বেতন দিতে হলে ‘হাউজমেড’ সঙ্গীতা রিচার্ডকে মাসে বেতন দিতে হয় প্রায় দেড় হাজার ডলার, প্রতি সপ্তাহে ৩৫ ঘণ্টা হিসাবে। ভারতীয় স্কেলে দেবযানী খোবরাগাড়ে হয়তো নিজে এত বেতন পান না। তবে বিদেশের দূতাবাসে বেতনের এই ঘাটতিটা পূরণ করা হয়ে থাকে ফরেন অ্যালাউন্স দিয়ে। তারপর তারা সরকার থেকে বাড়ি ভাড়াও পেয়ে থাকেন।
ইতিমধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, কিন্তু ভারতীয়রা চাইছে মার্কিন সরকারকে মাফ চাইতে হবে। কংগ্রেস, বিজেপি- দলমত এবং পেশা নির্বিশেষে সব ভারতীয় তাদের একজন কূটনীতিবিদের পক্ষে, তাদের জাতীয় স্বার্থের পক্ষে যেমন ঐক্য দেখাচ্ছে আমি অভিভূত। আমাদের কি কখনও এমনটি হবে?
ইতিমধ্যে ভারত সরকার আরেকটি কাজ করেছে- দেবযানী খোবরাগাড়েকে এক কূটনৈতিক চালে নিউইয়র্কের ডেপুটি কনসাল জেনারেল পদ থেকে নিউইয়র্কে ভারতের স্থায়ী মিশনে বদলি করেছে।
তিন.
এখানে একটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ের একটু ব্যাখ্যা দরকার। আন্তঃরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক পরিচালনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কূটনীতিবিদদের কিছু বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়ে থাকে, যেমন- তাদের ‘হোস্ট’ সরকার তাদের কর্মস্থল এবং বাসাবাড়ি এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অতি গুরুতর কারণ ছাড়া তাদের গ্রেফতার করা যাবে না, তাদের মানইজ্জত, সম্মান সমুন্নত রাখতে হবে। এই কথাগুলো বর্ণিত আছে ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন ডিপ্লোমেটিক রিলেশনস-১৯৬১’তে। যারা কনস্যুলেটে কাজ করেন তারা কূটনীতিবিদ ঠিকই, কিন্তু তারা কূটনৈতিক মিশনে কর্মরত কূটনীতিবিদদের মতো এত সুযোগ-সুবিধা পান না। ডেপুটি কনসাল জেনারেল হিসেবে দেবযানী খোবরাগাড়ে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী ছিলেন না বলে ভারত সরকার তাকে তাদের নিউইয়র্কের স্থায়ী মিশনে বদলি করে কূটনীতিবিদ হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকারী করে তুলেছে।
ভাইস কনসাল, কনসাল, কনসাল-জেনারেল- এরা সাধারণত বিদেশে দেশের নাগরিকদের দেখাশুনার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার করাও তাদের অন্যতম দায়িত্বপ্রাপ্ত। কিন্তু একটু আগেই যেমন বলেছি, তারা দূতাবাসে কর্মরত কূটনীতিকদের মতো দায়মুক্তি, মামলা-মোকদ্দমা থেকে অব্যাহতি এসব সুযোগ-সুবিধা পুরোপুরি পান না। এই শ্রেণীর কূটনীতিকদের অধিকার, সুযোগ-সুুবিধা বর্ণনা করা হয়েছে ‘ভিয়েনা কনভেনশন অন্ কনস্যুলার রিলেশন-১৯৬৩’ তে। সুতরাং মনে রাখতে হবে, কূটনীতিবিদদের জন্য ভিয়েনা কনভেনশন দুটি প্রণীত হয়েছে।
আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিঃপ্রচার অনুবিভাগের ডাইরেক্টর জেনারেল মো. শামীম আহসান ‘কূটনীতিকোষ’ ঊহপুপষড়ঢ়বফরধ ড়ভ উরঢ়ষড়সধপু নামের ৮৬৫ পৃষ্ঠার একটি মোটা বই লিখেছেন (প্রকাশক : এ এইচ ডেভেলপমেন্ট পাবলিসিং হাউস)। যশোর বোর্ডে ১৯৮৪ সালে মানবিক বিভাগে প্রথম, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অনার্স এমএতে ফাস্ট ক্লাস ফার্স্ট তুখোড় ছাত্র, এখন এক মেধাবী দক্ষ ফরেন সার্ভিস কর্মকর্তা এই শামীম আহসান এই ভিয়েনা কনভেনশন দুটো সম্পর্কে সংক্ষেপে কী লিখেছেন তা হুবহু নিচে তুলে দিলাম :
Diplomatic Relations 1961, Vienna Convention on (কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপরে ভিয়েনা কনভেনশন, ১৯৬১) ১৯৬১ সালের ১৮ এপ্রিল ভিয়েনাতে স্বাক্ষরিত চুক্তি। ৮১টি দেশের অংশগ্রহণে স্বাক্ষরিত চুক্তিটির উদ্দেশ্য ছিল : কূটনৈতিক এজেন্ট এবং মিশনগুলোর প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা ও অব্যাহতি (diplomatic privileges & immunities)-এর উপরে বিদ্যমান প্রথাসিদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের সংকলন ও স্পষ্টীকরণ। উক্ত কনভেনশন ১৯৬৪ সালে কার্যকর হয় এবং বস্তুত প্রত্যেকটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রই উহার সদস্য (state parties)। এখানে উল্লেখ্য যে, উক্ত সুযোগ-সুবিধা কূটনীতিকদের ব্যক্তিগত লাভালাভের জন্য প্রদান করা হয় না। International Law Commission-এর বক্তব্য এখানে সুস্পষ্ট The purpose of such privileges and immunities is not to benefit individuals but to ensure the efficient performance of the functions of diplomatic mission as representing states. কোনো রাষ্ট্র কর্তৃক উক্ত আইন স্বাক্ষর এটা নিশ্চিত করে না যে বা খুব কম ক্ষেত্রেই নির্দেশ করে যে, চুক্তির ধারাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে উহার মিউনিসিপ্যাল আইনের আওতায় কার্যকরী হবে। কেননা এক্ষেত্রে স্বাক্ষরিত চুক্তি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে জাতীয় আইন প্রণয়নের (national legislation) প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশ চুক্তিটি ১৯৭২ সালে স্বাক্ষর (accede) করেছে। কনভেনশনটি সংযুক্তি ২৮ এ দেখা যেতে পারে।
Consular Relations Vienna Conventions on (1963) (কনসু্যুলার সম্পর্কের ওপরে ভিয়েনা কনভেনশন, ১৯৬৩) ১৯৬৩ সালের ২৪ এপ্রিল ভিয়েনাতে অনুষ্ঠিত আলোচনার ফলে গৃহীত হয়। উক্ত কনভেনশনের লক্ষ্য ছিল কনসু্যুলার বিষয়ে বিরাজমান প্রথাসিদ্ধ আন্তর্জাতিক আইন, বিশেষ করে কনস্যুলার অফিস ও কর্মকর্তাদের সুবিধাদি, অব্যাহতি ইত্যাদি সংকলন ও স্পষ্টীকরণ করা। উক্ত কনভেনশন ১৯৬৭ সালে বলবৎ হয় এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশই উহা স্বাক্ষর করেছে। উক্ত কনভেনশনের আওতায় প্রদত্ত কূটনৈতিক সুবিধাদি প্রদানের উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন লাভবান হন তা নিশ্চিত করা নয় বরঞ্চ প্রেরণকারী দেশের মিশনসমূহ যেন দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারে তার নিশ্চয়তা বিধান। উক্ত কনভেনশনকে আরও স্পষ্ট করার জন্য এবং উক্ত কনভেনশনে উল্লিখিত সুবিধাদি ও অব্যাহতি (privileges & immunities) প্রদানের জন্য, অনেক দেশ উহার উপর ভিত্তি করে দ্বিপাক্ষিক চুক্তিও সম্পাদন করেছে। বাংলাদেশ ১৯৭২ সালে কনভেনশনটি স্বাক্ষর (accede) করেছে। কনভেনশনটি সংযুক্তি ৯ এ দেখা যেতে পারে। (Consular Privileges & Immunities) দেখুন।
প্রথম কনভেনশনটিতে ৫৩টি ধারা, এখন পর্যন্ত ১৮৯টি দেশ এই কনভেনশনে স্বাক্ষর করেছে। দ্বিতীয়টির ধারা সংখ্যা ৭৯, ১৭৬টি দেশ সই করেছে।
চার.
আমাদের রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক কর্মী, সাহিত্যিক, সম্পাদক, সাংবাদিক, কূটনীতি বিষয়ে যারা লেখালেখি করেন, মধ্যরাতের টকশোগুলোতে যারা এই রাষ্ট্র, ওই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গর্জন করেন, জিহাদ ঘোষণা করেন, শীতের রাতকে গরম করে তোলেন- তাদের জন্য ফরজ এই কনভেনশন দুটির অন্তত প্রথমটি মনোযোগ দিয়ে পড়া, পারলে গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো মুখস্থ রাখা। শামীমের বইটি হাতের কাছে রাখলে এই ‘পণ্ডিত’ বিশ্লেষকদের কথাগুলো বাস্তবসম্মত হবে। আর কনভেনশন দুটি অতি সহজে ইন্টারনেট থেকেও নেয়া যায়।
যারা ঢাকাস্থ ভারত, পাকিস্তান, মার্কিন দূতাবাস এবং দূতাবাসগুলোতে কর্মরত কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে হরহামেশা হুঙ্কার-হুমকি দিতে থাকেন, মিছিল-মিটিং সমাবেশ করেন, পারলে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেন, তাদের ভিয়েনা কনভেনশন অব ডিপ্লোমেটিক রিলেশনস-১৯৬১ এর ২২ নম্বর ধারাটি মনে রাখতে বলি। এই ধারাটি এমন ‘Host country must protect the mission from intrusion or damage.’ (হোস্ট দেশ অবশ্য অবশ্যই দূতাবাসগুলোকে অনুপ্রবেশ বা ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা করবে।)
মিছিলকারী এবং গর্জনকারীদের বলি, এখানে আমাদের সরকারটির একটি আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা আছে। বাংলাদেশে কর্মরত প্রতিটি দূতাবাস ও প্রত্যেক কূটনীতিবিদকে সব রকমের নিরাপত্তা দেয়ার বাধ্যবাধকতা আমাদের সরকারের আছে। শেখ হাসিনার সরকারটি এমনিতেই নিজসৃষ্ট কতগুলো সমস্যার কারণে প্রত্যাশিত এবং অপ্রত্যাশিত, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক চাপে আছে। শেখ হাসিনার এই সরকারটির ওপর অতিরিক্ত আর কোনো চাপ সৃষ্টি করবেন না, প্লিজ।
সবশেষে বাংলাদেশে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম হানাকে বলি, তিনি বলেছেন, বিজয় দিবসের জাতীয় অনুষ্ঠানে স্মৃতিসৌধে তারা যাননি, কিন্তু বিকালে বঙ্গভবনে মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুষ্ঠানে তো তারা গিয়েছেন। কূটনৈতিক শিষ্টাচার, আচার-আচরণ সম্পর্কে এই লোকের সামান্যতম জ্ঞান থাকলে তার জানার কথা, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানগুলোর কোনোটাই একটি আরেকটির বিকল্প নয়। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের প্রতিটিতে উপস্থিত থাকার মধ্যে রাষ্ট্রদূতদের এক রকমের বাধ্যবাধকতা আছে।

রাজনীতির পরাজয় হতে পারে না by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

রাজনৈতিক প্রতিহিংসার আগুনে পুড়ছে বাংলাদেশ। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে, বুঝে না বুঝে আমরা সবাই দেশটাকে জিম্মি করছি। অসহনশীল ও অপরিণামদর্শী রাজনীতির কারণে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, উৎপাদন ও আমদানি-রফতানি এবং অর্থনীতির চাকা আজ থমকে গেছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশে বিপর্যয় নেমে আসবে, এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। দেশ বিপর্যস্ত হোক তা সাধারণ মানুষ চায় না। বস্তুত ১৬ কোটি মানুষই চায় শান্তি আর শান্তি নির্ভর করে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের ওপর, বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের ওপর। এ মুহূর্তে বড় দুই দলের মধ্যে ঐক্য অপরিহার্য। যুদ্ধাপরাধের বিচার ও নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের ইস্যু সমান তালে চলছে। আর এটাই অশান্তির মূল কারণ। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি মেনে নিয়ে ক্ষমতাসীন দল প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তুলতে পারে।
কিন্তু ক্ষমতাসীন দল হাঁটছে উল্টো পথে, ভোটবিহীন এক তামাশার নির্বাচন তারা করতে যাচ্ছে, যা দেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে সৃষ্টি করবে এক কলংকজনক অধ্যায়। এর মাধ্যমে মানুষ তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, বিশেষ করে যারা নতুন ভোটার হয়েছেন তারাও। এ প্রহসন ও তামাশার নির্বাচন একদিকে গণতন্ত্রের বারোটা বাজাবে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তিকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে যাবে। এরই মধ্যে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ভোটবিহীন নির্বাচনের ব্যাপারে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিতীয় দফায় শুনানি হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। এতে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ নিয়ে আলোচনা হতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স’ (জিএসপি) সুবিধা বহাল রাখা নিয়ে আশংকা দেখা দিয়েছে। এর আগে আমেরিকা জিএসপি সুবিধা বাতিল করেছে। জাতিসংঘও বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। হুমকি আসতে পারে শান্তিরক্ষা মিশনে নিয়োগ পাওয়া বাংলাদেশের সদস্যদের ওপর। এসব জটিল ব্যাপার ঘুরপাক খাচ্ছে মানুষের মনে। দৃশ্যত প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হলে এবং চলমান রাজনৈতিক সংকটের গ্রহণযোগ্য সমাধান না হলে বাংলাদেশ আর এক চুলও সামনে অগ্রসর হতে পারবে বলে মনে হয় না; বরং যেটুকু উন্নতি বাংলাদেশের হয়েছে, তা গভীর খাদে পড়ে যেতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
দেশ আজ সর্বগ্রাসী সংকটে নিপতিত। সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা কারও কাছেই স্পষ্ট নয়। রাস্তায় রাস্তায় মানুষকে কুপিয়ে মেরে ফেলার আলামত দেখা যাচ্ছে, দেশের স্থানে স্থানে সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেছে; আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনগণ পরস্পরের শত্র“তে পরিণত হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে মানুষের সব স্বপ্ন, ধ্বংস হচ্ছে সম্ভাবনা। সবাইকে এই অপরিণামদর্শী রাজনীতি ত্যাগ করে সহনশীল রাজনীতির আবহ তৈরি করতে হবে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বেশকিছু মৌলিক বিষয়ে বিতর্ক ছিল। এ বিতর্ক পেছনে ফেলে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বর্তমান সময়ে বড় দুটি ইস্যু সহিংসতার কারণ হচ্ছে। একটি যুদ্ধাপরাধের বিচার, অন্যটি নির্বাচনকালীন সরকার। এ দুই ইস্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন টালমাটাল। এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি দেশে বিরাজ করছে। সব ক্ষেত্রে সৃষ্টি হচ্ছে অনিশ্চয়তা। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে নিয়ে চলছে বিপজ্জনক খেলা! পরাশক্তি ও আঞ্চলিক শক্তির তৎপরতা দেখে প্রতীয়মান হয়, কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কুক্ষিগত করার চেষ্টায় আছে। এমনটি হলে দেশের ভাগ্যে বিপর্যয় ঘটার সমূহ আশংকা আছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। কাজেই যে কোনো মূল্যে চলমান বিতর্কের অবসান ঘটাতে হবে, জাতিকে বের করে আনতে হবে অন্ধকার গহ্বর থেকে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যের মাধ্যমেই সেটা সম্ভব।
দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার বিষয়টি এখন নির্ভর করছে ক্ষমতাসীন দলের ওপর। ভোটবিহীন নির্বাচন বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে পক্ষপাতহীন নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হলে জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশও এক অনিবার্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি রাজনৈতিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। দেশে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের ভাবমর্যাদা সমুন্নত থাকবে।
ক্ষমতার রাজনীতি দেশের মানুষকে দুই ভাগে বিভক্ত করছে। এ থেকে আরও অসংখ্য বিভক্তি তৈরি হচ্ছে সমাজে। এমনটি অব্যাহত থাকলে এখানে বাইরের হস্তক্ষেপ অনিবার্য হয়ে উঠবে। বিদেশী সেনা মোতায়েনের একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হবে। সোনার বাংলা শ্মশানে পরিণত হবে। তখন রাজনীতি বলতে কিছু থাকবে না, যেমন নেই ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, আইভরিকোস্ট, সুদান, সোমালিয়াসহ এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশে। তারা আজ অন্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্য দেশের আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে তাদের শান্তি-শৃংখলা বজায় রাখতে হচ্ছে।
কোনো রাজনৈতিক দলকে নিশ্চিহ্ন করার মনোবৃত্তি নিয়ে রাজনীতি হয় না এবং দেশও সঠিকভাবে চালানো যায় না। আওয়ামী লীগের কোনো ভুল বা অদূরদর্শী রাজনীতির কারণে দেশে যদি কোনো বিপর্যয় সৃষ্টি হয়, তাতে আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। রাজনীতিতে দিনবদলের স্লে­াগান ছিল আওয়ামী লীগের। এটা তাদের নির্বাচনী ওয়াদাও ছিল। তারা জাতির কাছে ওয়াদা করেছিল রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনার। কিন্তু গত পাঁচ বছরে এমন একটি উদ্যোগও সরকার নেয়নি যাতে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে। উল্টো শাসকদের অসহিষ্ণু আচরণে রাজনীতি ফিরে যাচ্ছে সেই অন্ধকার যুগে। গ্রাম্য রাজনীতি এবং চর দখলের মতো সরকারের কর্তাব্যক্তিদের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে অরাজনীতিসুলভ সব বাক্য, যা কোনোভাবেই জাতীয় রাজনীতির ভাষা হতে পারে না। এতে অপরাজনীতি উৎসাহিত হচ্ছে, রাজনীতি চলে যাচ্ছে বিপজ্জনক পর্যায়ে। বিরোধী দলের অনেক শীর্ষ নেতা মিথ্যা মামলায় জেলে। তাদের প্রধান কার্যালয় অবরুদ্ধ। তারা মিছিল করতে পারে না, সভা করতে পারে না, এমনকি করতে পারে না শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনও! এটা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা। এ পরিস্থিতিতে কিভাবে রাজনৈতিক ঐক্য ও সমঝোতা হতে পারে? কাজেই রাজনীতিতে সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে, মুক্তি দিতে হবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের। সংবিধানের দোহাই দিয়ে ভোটবিহীন নির্বাচন রাজনৈতিক দলের জন্য মানানসই নয়। কেননা সংবিধান মানুষের জন্য, সংবিধানের জন্য মানুষ নয়। ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে দেশ ও দেশের মানুষকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়া নেতৃত্বের জন্য অশোভনীয়। ভোটবিহীন নির্বাচনের কারণে দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। আর যারা নতুন ভোটার হয়েছেন, তাদের দুঃখের শেষ নেই। তাদের মধ্যে রীতিমত ক্ষোভ বিরাজ করছে। বস্তুত এ ভোটবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক দলের রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছে। তারা কোনো দলকেই এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাতে সমর্থ হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো প্রার্থীও তারা খুঁজে পায়নি। এটি বিরোধী দলের জন্য এক বিরাট সাফল্য। তাদের এখানে নৈতিক বিজয় হয়েছে, কিন্তু সার্বিক অর্থে রাজনীতির পরাজয় হয়েছে। পরাজিত হচ্ছেন রাজনীতিকরাও। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘে গিয়ে বলেছেন, ‘দেশের জন্য যে কোনো ত্যাগ আমি স্বীকার করব।’ এর কিছুদিন পর ইমামদের এক সম্মেলনে বলেছেন, ‘আমি দেশে শান্তি চাই, মানুষের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না, প্রধানমন্ত্রীর পদ আমার দরকার নেই’ ইত্যাদি। প্রধানমন্ত্রীর কথাগুলো চলমান সময়ে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। তার সুন্দর সুন্দর এসব কথা বাস্তবে পরিণত হলে দেশে অশান্তি থাকার কথা নয়। ভোটবিহীন নির্বাচন বাতিল করে এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, মুক্তি দিতে পারেন মানুষকে কষ্ট থেকে। আশা করি, প্রধানমন্ত্রীর কথা শুধু কথাই থাকবে না, তা বাস্তবে রূপ পাবে। রাজনীতির জয় হবে। ব্যর্থ নয়, সফল হবেন রাজনীতিকরা।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

প্রমাণিত হল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আসলে পাকিস্তানের by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আমার এক বন্ধুপুত্র মনসুর আহমদ ব্রাসেলসে একটি বড় ইউরোপিয়ান কোম্পানিতে চাকরি নিয়ে বসবাস করেন। অর্থনীতি এবং রাজনীতি দুটি বিষয়েই তার পড়াশোনা প্রচুর। মাঝে মাঝে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়েও তার সঙ্গে টেলিফোনে আমার আলাপ-আলোচনা হয়। এই সেদিন একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি নিয়ে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব পাস হতেই মনসুর আমাকে টেলিফোনে জানালেন- ‘আঙ্কেল, আমরা একাত্তরে ফিরে গেছি।’ কথাটির ব্যাখ্যা তার কাছে জানতে চাইলাম। মনসুর বলল, এতদিন বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তান জামায়াত ও বিএনপির মাধ্যমে ‘প্রক্সি ওয়ার’ চালাচ্ছিল। তাতে সফল না হওয়ায় এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি শুরু হতেই তারা স্বমূর্তি ধারণ করে বাইরে বেরিয়ে এসেছে। যদি একাত্তরের অবস্থানে তারা থাকত, তাহলে বাংলাদেশে আবার তারা সৈন্য পাঠাত। সেই সুযোগ না থাকায় পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাসের মাধ্যমে তাদের এই জিঘাংসার প্রকাশ। মনসুর আমাকে বলল, আপনি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করুন। পাকিস্তান পার্লামেন্টে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পাস হওয়ার আগেই পাকিস্তানের জামায়াত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার জন্য তাদের সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণার সুযোগ ও অবস্থান এখন পাকিস্তানের নেই। তাই পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস দ্বারা এই পরোক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা। প্রত্যক্ষ যুদ্ধটি তো বাংলাদেশের মাটিতেই হচ্ছে। হরতাল ও অবরোধের নামে যে ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যাকাণ্ড চলছে, তা তো এক ধরনের যুদ্ধই। এই যুদ্ধের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ভার পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই’র হাতে। হাসিনা সরকারের দৃঢ়তায় এই প্রক্সি ওয়ার সফল হচ্ছে না বলেই পাকিস্তানকে এখন নিজের মুখোশ খুলে এই যুদ্ধে সমর্থন দিতে এগিয়ে আসতে হয়েছে। আমরা আবার একাত্তরে ফিরে গেছি। জাতীয় পর্যায়ে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। আমেরিকা ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ভূমিকা দেখে আমাদের বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
আমি মনসুর আহমদের এই বিশ্লেষণের সঙ্গে সহমত পোষণ করি। যদি কেউ নিরাসক্ত ও নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়ে বাংলাদেশের গত ৪০ বছরের ইতিহাস খতিয়ে দেখেন, তিনি দেখবেন, ’৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তান পরাজিত হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ বন্ধ করেনি। বাংলাদেশের ভেতরে ক্রমাগত তার স্বাধীন অস্তিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চলেছে ইসলামাবাদের অর্থ ও অস্ত্রপুষ্ট অনুসারীদের দ্বারা। এই অনুসারীদের মধ্যে জামায়াতের নাম সর্বাগ্রে উচ্চারণ করা যায়। জামায়াত ধীরে ধীরে বিএনপিকে গ্রাস করে।
বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতাকে হত্যা থেকে শুরু করে বাংলাদেশে জঙ্গি অভ্যুত্থান, বাংলা ভাইদের আবির্ভাব, বারবার শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা এবং সর্বশেষে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু হতেই দেশব্যাপী এই সন্ত্রাস সৃষ্টির প্যাটার্নের দিকে লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, এর পেছনে আইএসআই’র ষড়যন্ত্রের কালো হাতটির খেলা রয়েছে। আজ সারা দেশে যে সন্ত্রাসের তাণ্ডব, তা তো আজকের ব্যাপার নয়। বিএনপি যতবার ক্ষমতায় এসেছে, ততবারই এই সরকারের প্রশ্রয়ে থেকে জামায়াত তার অস্ত্রভাণ্ডার তৈরি করেছে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য। দশ ট্রাক অস্ত্র চালান ঘটনার সব রহস্য তো এখনও উন্মোচিত হয়নি। বলা হচ্ছে, পূর্ব ভারতের উলফা বা এই জাতীয় গেরিলাদের হাতে পৌঁছানোর জন্য এ অস্ত্র বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পাঠানো হচ্ছিল। আসলে এ অস্ত্র আসছিল বাংলাদেশের মৌলবাদী জঙ্গিদের জন্য। এ ধরনের অস্ত্রের একটি চালানমাত্র ধরা পড়েছে। তার আগে ও পরে আরও কত অস্ত্রের চালান এসেছে এবং ট্রেনিংপ্রাপ্ত জঙ্গিদের হাতে পৌঁছেছে তার হিসাব কে দেবে? এখন এটা স্পষ্ট ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তিদান বানচাল করার জন্য জামায়াত এই যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েছিল। অসংখ্য মসজিদ-মাদ্রাসাকে তাদের ঘাঁটি করেছিল।
এই সন্ত্রাস ও যুদ্ধকেই বিএনপি একটি রাজনৈতিক কভার দিয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন, হরতাল ও অবরোধের খোলস পরিয়ে। একটি নির্বাচন পদ্ধতির প্রশ্নে এ ধরনের ধ্বংসাÍক অভিযানে নামা যে একটি অজুহাত এটা আজ দেশবাসীর সামনে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আসল উদ্দেশ্য, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা বাতিল করা। ’৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যেসব স্বদেশদ্রোহী গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল এবং পাকিস্তান, আমেরিকা প্রভৃতি যেসব দেশ তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা দিয়েছিল, ২০১৩ সালে দেখা যাচ্ছে সেসব দেশই এই মানবতার শত্র“দের দণ্ডদানের বিরুদ্ধে সরব ও সক্রিয় হয়েছে।
এই যুদ্ধে আরেকটা ব্যাপার স্পষ্ট হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ বিএনপির গণতান্ত্রিক চরিত্র প্রত্যাশা করে এবং বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে এলে তাকে ভোট দেয়। সিটি কর্পোরেশনের পাঁচটি নির্বাচনে তা প্রমাণিত হয়েছে। হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত বহুদলীয় সরকারের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন মেনে নিয়ে বিএনপি নির্বাচনে এলে অনেকেরই ধারণা, বিএনপি শুধু ভালো করত না, হয়তো জয়ী হতেও পারত।
কিন্তু বিএনপি ভোটের রাজনীতিতে না থেকে জামায়াতের সঙ্গে মিলে সন্ত্রাসের রাজনীতিতে যেতেই দেখা যাচ্ছে, এই সন্ত্রাসকে যতই আন্দোলনের খোলস পরানো হোক তাতে জনসমর্থন মিলছে না। সন্ত্রাস ও রক্তপাত দ্বারা জনগণকে ভীত করে কখনও কখনও ঘরে অবস্থানে বাধ্য করা যাচ্ছে, কিন্তু জনসমর্থন পাওয়া যাচ্ছে না। বিএনপির এখন অবস্থা দাঁড়িয়েছে, মুখরক্ষার জন্য এখন হরতাল-অবরোধ তারা ডাকছেন। না ডাকলে তাদের পরাজয় স্বীকার করতে হয়। এ অবরোধ ডাকা ক্রমশই প্রহসনে পরিণত হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে অর্থহীন করে ফেলা এবং একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি ভণ্ডুল করার জন্য শুধু অস্ত্র নয়, সন্ত্রাসী আমদানিও চলছে বহুদিন ধরে। আমার সহৃদয় পাঠকদের অনেকেরই হয়তো স্মরণ আছে, আমেরিকা কর্তৃক আফগানিস্তানে তালেবান শাসন উৎখাতের পর দলে দলে সন্ত্রাসী তালেবান পাকিস্তানে আশ্রয় নেয়। আইএসআই তাদের আশ্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে। এ সময় খালেদা-নিজামী সরকার ছিল বাংলাদেশে ক্ষমতায়।
এ পলাতক জঙ্গিদের নিরাপদ আশ্রয়দান এবং প্রয়োজনের সময়ে বাংলাদেশে কাজে লাগানোর জন্য করাচি থেকে সমুদ্রগামী জাহাজে সাধারণ যাত্রীবেশে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরে পাঠানো হতে থাকে। এই খবর ইউরোপ-আমেরিকার প্রধান সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয়। ‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’, ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ এবং ফ্রান্স ও জার্মানির দুটি প্রধান কাগজে তা ফলাও করে প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারকে সতর্ক করা হয়। শেখ হাসিনা তখন বিরোধী দলের নেত্রী। তিনি দেশে জঙ্গি মৌলবাদীদের উত্থান হতে চলেছে বলে এবং এখনই এ ব্যাপারে কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার বলে সরকারকে হুশিয়ার করেন। আর যায় কোথা? সরকারপ্রধান হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া তখনই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বললেন, ‘দেশে মৌলবাদী জঙ্গিরা আস্তানা গাড়ছে এই প্রচার চালিয়ে হাসিনা দেশের ভাবমূর্তি ধ্বংস করছেন।’ খালেদা জিয়ার সঙ্গে সুর মিলিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একই অভিযোগ তোলে ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ পত্রিকা। একই দিনে পত্রিকা দুটি প্রধান সম্পাদকীয় নিবন্ধে শেখ হাসিনা দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন এ মন্তব্যসহ ঘোষণা করে, ‘বাংলাদেশে জঙ্গি মৌলবাদীদের আস্তানা নেই।’
বাংলাদেশে যখন জঙ্গি মৌলবাদীরা অর্থ, অস্ত্র ও সাংগঠনিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তদানীন্তন বিএনপি-জামায়াত সরকারের প্রশ্রয়ে সন্ত্রাসী অভ্যুত্থানের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন সেই সাবেক সরকার এবং তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে দুটি প্রধান জাতীয় পত্রিকা বলেছে, দেশে জঙ্গিবাদী নেই। তৎকালীন সরকারের অন্যতম মন্ত্রী, বর্তমানে যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত ও গ্রেফতারকৃত মতিউর রহমান নিজামী আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘বাংলাদেশে বাংলা ভাই বলে কারও অস্তিত্ব নেই। এটা মিডিয়ার আবিষ্কার।’ পরে এই বাংলা ভাইদেরই ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছিল। আর গত আফগান যুদ্ধের শেষে আফগানিস্তান থেকে বহু জঙ্গি যে পালিয়ে পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিল, তার সত্যতা প্রমাণ করছে বাংলাদেশের আজকের সন্ত্রাস। এরা সবাই আকাশ থেকে উড়ে এসে বাংলাদেশে জুড়ে বসেনি। পলাতক তালেবানদের হাতেই এদের অনেকে ট্রেনিংপ্রাপ্ত।
বাংলাদেশের বর্তমান যুদ্ধ যে কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যাপার নয়, বরং একাত্তরে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের হামলারই পুনরাবৃত্তি, এটা কাদের মোল্লার ফাঁসি একেবারে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে দিয়েছে। এত দিন বলা হয়েছে, এই কাদের মোল্লা বা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী একাত্তরের মোল্লা ও সাঈদী নন। তাদের বদলে অন্য লোক এবং নির্দোষ লোক ধরে আনা হয়েছে। কাদের মোল্লা যে যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লা নন, সেটা প্রমাণ করার জন্য তার লেখা একটা চিঠিও বাজারে ছড়ানো হয়েছে এবং একশ্রেণীর মিডিয়া তা লুফে নিয়েছে।
এখন পাকিস্তানের পার্লামেন্টের প্রস্তাবে নিশ্চিতভাবে জানা গেল, এই কাদের মোল্লাই একাত্তরের পাকিস্তানি হানাদারদের সহযোগী ঘাতক কাদের মোল্লা। বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্র“ এই যুদ্ধাপরাধী দীর্ঘকাল ধরে এখন দণ্ডিত হওয়ায় এবং অন্যান্য অপরাধীরও দণ্ড নিশ্চিত হওয়ায় পাকিস্তান আর ঘোমটার আড়ালে থেকে বা তাদের পোষা অনুসারীদের সাহায্যে বাংলাদেশবিরোধী তৎপরতা ও নাশকতামূলক কাজ চালিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি; একেবারে রণংদেহি মূর্তি ধারণ করে বাংলাদেশে যুদ্ধাভিযান চালানোরও হুমকি দিয়েছে। শক্তি, সুযোগ ও অনুকূল পরিবেশ থাকলে তারা যে ’৭১ সালের মতো হানাদার সৈন্য বাংলাদেশে পাঠাত তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু বাংলাদেশ এখন একটি স্বাধীন রাষ্ট্র এবং পাকিস্তানও বহুদূরবর্তী এবং অন্তদ্বন্দ্বে জর্জরিত একটি পতনোন্মুখখ দেশ। হুমকি দেখানো এবং আস্ফালন করা ছাড়া তাদের আর কিছু করার নেই।
বাংলাদেশ নিয়ে ’৭১ সালে আমেরিকাসহ অনেক পশ্চিমাশক্তি যে অবস্থান গ্রহণ করেছিল, বর্তমানেও দেশটিকে ঘিরে তারা একই অবস্থান গ্রহণ করেছে। এ অবস্থানটি হল একাত্তর সালে বাংলাদেশে গণহত্যা চালানো সত্ত্বেও তারা পাকিস্তানকে সমর্থন জুগিয়েছে এবং এক্ষণে ২০১৩ সালে সারা দেশে বিএনপি ও জামায়াত রাজনৈতিক আন্দোলনের কভারে যে মিনি গণহত্যা শুরু করেছে, তাকে পরোক্ষভাবে সমর্থন জুগিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টিকারীদের অবৈধ দাবি মেনে নেয়ার জন্য সরকারের ওপর জোটবদ্ধ হয়ে চাপ সৃষ্টি করছে।
একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেরও বিরোধী এই বহিঃশক্তি। একজন যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি হওয়ায় জাতিসংঘ প্রধান পর্যন্ত দুঃখিত। কিন্তু মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়ায় শত শত নিরীহ নির্দোষ সিভিলিয়ান হত্যা অব্যাহতভাবে চলতে থাকা সত্ত্বেও তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ দূরে থাক, জাতিসংঘ প্রধান টুঁ শব্দটি উচ্চারণ করতে পারেননি। বাংলাদেশে এই যুদ্ধাপরাধীদের সহযোগীরাই এখন রাজনৈতিক আন্দোলনের কভারে সন্ত্রাস চালাচ্ছে, নিরীহ মানুষ, এমনকি বালক-বৃদ্ধ পুড়িয়ে মারছে। ওয়ার অন টেরোরিজমের স্বঘোষিত নেতা আমেরিকা বাংলাদেশের এই সন্ত্রাসীদের পরম বান্ধব। এই সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আপস করার জন্য হাসিনা সরকারের ওপর ‘সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের’ নামে চাপের পর চাপ প্রয়োগ করছে।
১৯৭০ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ ব্যর্থ করার জন্য আমেরিকা ভারত মহাসাগরে তাদের সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করেছিল। এবার পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে তা করতে না পেরে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে জোটবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ভিত্তি রক্ষায় যুদ্ধরত হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ’৭১ সালে ভারত মহাসাগরে আমেরিকার সপ্তম নৌবহর প্রেরণ এবং ২০১৩ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থান গ্রহণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য একই। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধীদের উৎসাহ ও সমর্থন জোগানো।
এবার বাংলাদেশের মিত্রদের অনেকে আশঙ্কা করেছিল, পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতে ভারত-আমেরিকা নব্য মিতালির সুবাদে ভারত হয়তো দেশটির স্বাধীনতার পক্ষের শিবির ও সরকারের পক্ষে ’৭১-এর মতো শক্ত অবস্থান নিতে চাইবে না অথবা পারবে না। এই আশংকা অসত্য প্রমাণিত হয়েছে। বাংলাদেশ এবং বর্তমান হাসিনা সরকারের পক্ষে দিল্লি শক্ত অবস্থান নিয়েছে। বলদর্পী আমেরিকা দিল্লিকে কিছুটা শিক্ষা দেয়ার উদ্দেশ্যে দেশে নিযুক্ত ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানী খোবরাগাড়েকে একটি তুচ্ছ মামলায় কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূতভাবে গ্রেফতার করে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগেই তাকে অশ্লীল নির্যাতনের (নগ্নদেহ তল্লাশিসহ) শিকার করেছে। ওয়াশিংটন ভেবেছিল, তাদের চেয়ে দুর্বল ভারত তার কোনো জবাব দিতে পারবে না। ভারত শক্ত জবাব দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করতে হয়েছে। দিল্লি তাতে সন্তুষ্ট হয়নি। ওয়াশিংটনকে কড়া ভাষায় বলেছে, ‘আমেরিকার জানা উচিত, বিশ্ব আর আগের অবস্থায় নেই।’ অর্থাৎ বিশ্বে আমেরিকার মোড়লিপনার দিন শেষ এবং তাদের সামরিক শক্তিও আর অপরাজেয় নয়।
’৭১ সালেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সমর্থন জানানোর দরুন দেশটির সঙ্গে অশিষ্ট আচরণ করেছিল আমেরিকা। স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন ‘দ্যাট উইমেন’ (ঃযধঃ ড়িসবহ) বলে অভিহিত করে অবজ্ঞা প্রকাশ করেছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীও তার জবাব দিয়েছিলেন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে মৈত্রী চুক্তি করে ভারত মহাসাগর থেকে মার্কিন নৌবহরকে লজ্জাকর পশ্চাদপসারণে বাধ্য করে। এবারও লন্ডনের কোনো কোনো কাগজের খবর, পুতিনের রাশিয়া অত্যন্ত সতর্কভাবে বাংলাদেশ তথা ভারত মহাসাগর পরিস্থিতির দিকে নজর রেখেছে। আমেরিকা বেশি বাড়াবাড়ি করতে চাইলে সিরিয়ায় নিশ্চিত মার্কিন ও পশ্চিমা হামলা রোখার মতো বাংলাদেশ সম্পর্কেও রাশিয়া এ অবস্থান গ্রহণ করবে। আর এবার চীনকে দিয়ে ভারতবিরোধী কার্ডটি খেলাতেও আমেরিকা ব্যর্থ হয়েছে। আমার বিশ্বাস, একাত্তরের মতো বাংলাদেশবিরোধী এবারের যুদ্ধেও পাকিস্তান পরাজিত হবে। জামায়াতসহ যেসব জঙ্গি দল পাকিস্তানের হয়ে বাংলাদেশে প্রক্সি ওয়ার চালাচ্ছে বারবার পরাজয়ের ফলে তারা এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। এদের সন্ত্রাসে জনগণ যদি ভীত না হয় এবং সরকার যদি আরও দৃঢ়তা ও কঠোরতার সঙ্গে এদের মোকাবিলা করে, তাহলে দেশী-বিদেশী অনেক চক্রান্ত এবং সন্ত্রাস থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করা সম্ভব হবে। তবে সেজন্য একাত্তরের মতোই দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

গ্রেফতার এড়াতে দেবযানীকে জাতিসংঘ প্রতিনিধি করল ভারত

গ্রেফতার এড়াতে নিউইয়র্কে অভিযুক্ত ভারতীয় কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়েকে জাতিসংঘে স্থানান্তর করা হয়েছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা জানান, তারা যুক্তরাষ্ট্রে অভিযোগের মুখোমুখি হওয়া কূটনীতিক দেবযানী খোবরাগাড়েকে শনিবার জাতিসংঘে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে স্থানান্তর করেছেন। জাতিসংঘে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত অশোক মুখার্জি জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের কাছে লেখা এক চিঠিতে দেবযানী খোবরাগাড়েকে স্থানান্তর করার কথা জানান। জাতিসংঘে তার এ পদের কারণে দেবযানী একজন পরিচারিকাকে কম বেতন দেয়ার অভিযোগে গ্রেফতারী পরোয়ানা থেকে রেহাই পেতে পারেন। নিউইয়র্কের ডেপুটি কনসাল জেনারেল দেবযানী খোবরাগাড়ে (৩৯) যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যকার কূটনৈতিক কোন্দোলের কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। এদিকে, দেবযানী খোবরাগাড়ে ইস্যুতে সুর নরম করল নয়াদিল্লি। প্রথমে ক্ষমা চাওয়ার দাবি তুললেও এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখায় গুরুত্ব দিতে চায় ভারত।
এদিকে বিতর্ক উস্কে দেবযানীর পরিবারের অভিযোগ, পরিচারিকা সঙ্গীতা রিচার্ড সম্ভবত সিআইএ এজেন্ট। দেবযানী খোবরাগাড়েকে ভারতের স্থায়ী মিশনে অন্তর্ভুক্ত করার কাজ শুরু করল রাষ্ট্রসংঘ। ভারতীয় কূটনীতিককে হেনস্থার অভিযোগ। প্রতিবাদের ঝড় দেশজুড়ে কড়া অবস্থান নেয় কেন্দ্রও। ওয়াশিংটনের সঙ্গে কার্যত সংঘাতের পথেই হাঁটতে শুরু করে নয়াদিল্লি। দুঃখপ্রকাশ করেও পাল্টা চাপ দেয় মার্কিন প্রশাসনও। সম্ভবত তার জেরেই শনিবার কিছুটা নরম সুর শোনা গেল কেন্দ্রের গলায়। একাধিক ক্ষেত্রে আমেরিকার সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বেশ নিবিড় ভারতের। সেখানে দাঁড়িয়ে দেবযানী খোবারাগাড়ে ইস্যুকে সামনে রেখে সম্পর্কের অবনতি কিছুটা হলেও কি চিন্তা বাড়িয়েছে নয়াদিল্লির? উঠতে শুরু করেছে প্রশ্ন। নিউইয়র্ক টাইমস, টাইমস অব ইন্ডিয়া।

২০১১ সালে জেল পালানোর দায়ে মুরসির বিচার হবে

মিসরের সাবেক একনায়ক হোসনি মোবারকের বিরুদ্ধে ২০১১ সালে অভ্যুত্থানের সময় ওয়াদি এল নাতরুণ কারাগার ভেঙে পালানোর দায়ে দেশটির ক্ষমতাচ্যুত কট্টরপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির বিচার হবে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস ও অন্য একটি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে সন্ত্রাসী জোট তৈরি করায় তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আনা হয়েছে। শনিবার প্রসিকিউশন সূত্র এ কথা জানায়। খবর এএফপির। রাষ্ট্রীয় মালিকাধীন আল-আহরাম সংবাদপত্র তাদের ওয়েবসাইটের খবরে জানায়, ফিলিস্তিনের জঙ্গি গ্র“প হামাসের সদস্যসহ শতাধিক বন্দির সঙ্গে মুরসির বিচার হবে। মুরসি ছাড়াও মুসলিম ব্রাদারহুডের আরও ১৩২ নেতাকর্মীকে একই দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। গত জুলাই মাসে সেনা অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত মুরসির বিরুদ্ধে এর আগে হত্যা ও সহিংসতার অভিযোগ আনে সামরিক জান্তার সমর্থনপুষ্ট আইনজীবীরা।
সন্ত্রাসবাদের যে নতুন অভিযোগ তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। সরকারি আইনজীবীরা বলছেন, এটি মিসরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ। তবে এ মামলায় মুরসি ন্যায়বিচার পাবেন কিনা সে ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সাবেক এই প্রেসিডেন্টের সমর্থক ব্রাদরহুড কর্মীরা অভিযোগ করছেন, তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করছে। গত জুলাই মাসের গোড়ার দিকে মোহাম্মদ মুরসি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মুসলিম ব্রাদারহুড কয়েক হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। এছাড়া বিক্ষোভরত জনতার ওপর সেনা বাহিনীর নির্বিচার গুলিবর্ষণে নিহত হয় দুই হাজারেরও বেশি মানুষ। ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ও মুসলিম ব্রাদারহুডের সর্বোচ্চ নেতা মুহাম্মাদ বাদীসহ দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বুধবার আনীত এ অভিযোগে বলা হয়েছিল, কিছু বিদেশী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে এসব নেতা রাষ্ট্রের গোপন তথ্য তুলে দিয়েছেন।

দেবযানীর শাস্তি দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রে বিক্ষোভ

দেবযানী খোবরাগাড়ের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর কর্মীরা। তারা ২০ ডিসেম্বর নিউইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো এবং ওয়াশিংটনে ভারতীয় কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ করে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বিচার বিভাগকে ধন্যবাদ জানান। ‘ন্যাশনাল ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স এলায়েন্স’ আয়োজিত এ বিক্ষোভ কর্মসূচির সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করে হংকং এবং ভারতেও মানববন্ধন করেছেন গৃহকর্মীরা।
নিউইয়র্কের বিক্ষোভে স্লোগান ছিল ‘ডিপ্লম্যাট ইম্যুনিটি-উই স্যা একাউন্টেবিলিটি, ‘ওয়ার্কার্স আর আন্ডার এটাক-স্ট্যান্ড আপ ফাইট ব্যাক, ‘দ্য পিপল ইউনাইটেড-উইল নেভার বি ডিফিটেড, ‘ডিগনিটি ইয়েস-স্লেভারি নো, ‘ফ্রি ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স-অ্যান্ড দ্য স্লেভারি, ‘হুয়াট ডু উই ওয়ান্ট-জাস্টিস জাস্টিস, ‘ওয়ার্কার্স রাইটস আর হিউম্যান রাইটস, ‘জাস্টিস ফর ডমেস্টিক ওয়ার্কার্স, ‘ডাজ ইম্যুনিটি প্রটেক্ট হিউম্যান রাইটস ভায়োলেটর, ‘নো টু লেবার ট্রাফিকিং-নো টু মডার্ন স্লেভারি’, ইত্যাদি। নিউইয়র্ক সিটির সেন্ট্রাল পার্ক সংলগ্ন ভারতীয় কন্স্যুলেটের সামনের এ বিক্ষোভে ৬০ জনের মতো মহিলা অংশ নিলেও সে সংবাদ কভার করতে জড়ো হয়েছিলেন শতাধিক টিভি ও সংবাদপত্রের সাংবাদিক ও ক্যামেরা ম্যান। বাংলাদেশ, নেপাল, ভারত, ফিলিপাইন, পাকিস্তান এবং মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশের গৃহকর্মী এবং মানবাধিকার নিয়ে কর্মরতরা এতে অংশ নেন। এ সময় ভারতীয় কন্স্যুলেটের উপ-প্রধান দেবযানী খোবরাগাড়ের মিথ্যাচারের সমালোচনা করা হয়। অভিযোগ করা হয় যে, দেবযানীর বাসায় কাজের চুক্তির সময় গৃহকর্মী সঙ্গীতা রিচার্ডকে ঘণ্টায় পৌনে ১০ ডলার করে বেতন দেয়ার অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তবে দেয়া হয় ৩.৩১ ডলার করে। এভাবে সঙ্গীতাকে ঠকানো হয়েছে দিনের পর দিন।
তার পাসপোর্ট আটক রাখা হয় এবং মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। বক্তারা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত সংস্থা এবং নিউইয়র্কের ইউএস অ্যাটর্নি প্রিত ভ্যারারার প্রশংসা করে বলেন, তারা ন্যায়-নিষ্ঠভাবে সঙ্গীতার অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়েছেন। অভিযোগের সত্যতা পেয়েই তারা দেবযানীকে গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারের পর প্রচলিত রীতি অনুযায়ী কারাগারে প্রবেশের সময় তার দেহ তল্লাশি করা হয়। বক্তারা বলেন, কূটনৈতিক সুবিধায় কি উল্লেখ রয়েছে যে, কারও সঙ্গে প্রতারণা এবং দুর্ব্যবহার করলেও তা বিচারের আওতায় আসবে না? বক্তারা অভিযোগ করেন যে, সঙ্গীতার আÍীয়স্বজনকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হচ্ছে মামলা তুলে নেয়ার জন্য। ইন্টারপোলের মাধ্যমে সঙ্গীতাকেও ভারতে ফিরিয়ে নেয়ার তৎপরতা চলছে। কিন্তু মামলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সঙ্গীতাকে যেন নিউইয়র্কের বাইরে নেয়া না হয় সে দাবি জানান বক্তারা। এ অবস্থায় সঙ্গীতাকে ভারতে পাঠিয়ে দিলে তার জীবন বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে বলেও মন্তব্য করেন বক্তারা। মানববন্ধনের সঞ্চালক ইয়োমারা ভেলেজ জানান, গৃহকর্মী সঙ্গীতার সমর্থনে ক্যালিফোর্নিয়া এবং ওয়াশিংটন ডিসি ছাড়াও ভারত ও হংকং-এ মানববন্ধন হয়েছে সঙ্গীতার সঙ্গে প্রতারণা ও দুর্ব্যবহারের বিচার দাবিতে। রয়টার্স, টাইমস অব ইন্ডিয়া।

উড়ন্ত হোটেল

পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চেপে মেঘ রাজ্যে উড়ে বেড়ানোর স্বাদ এতদিন কেবল গল্পকথার রাজপুত্তুররাই পেত- বাস্তবে তা ছিল অলিক-অধরা! সময় বদলেছে, রূপকথার সে গল্প আজ প্রযুক্তির জাদুতে বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে। এখন অনায়াসেই মেঘের দেশে ভেসে বেড়ানো যাবে। মানুষকে মেঘের দেশে নিয়ে ভাসমান আনন্দ দেয়ার জন্য সম্প্রতি হোটেল ম্যানড ক্লাউড নামে একটি সেভেন স্টার হোটেল তৈরি করেছেন ফরাসি প্রযুক্তিবিদরা। এমনিতেও ফ্রান্সের ম্যানড ক্লাউড বিশ্বের অন্যতম সেরা হোটেলগুলোর একটি। বিচিত্রতার দিক দিয়েও সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে এটি। মাটি থেকে দেখলে মনে হবে, আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে কোনো নভোযান।
দোল খেলছে ভাসমান মেঘের সঙ্গে। চমকে যাওয়ার মতো সবকিছুতেই ঠাসা এই উড়ন্ত হোটেল। মেরি মাসউড সর্বপ্রথম এই হোটেলের নকশা নিয়ে ভাবেন এবং তিনিই মূল পরিকল্পনাকারীদের একজন। সাধারণ মানুষকে অবাক করে দেয়ার মতো নকশা বানাতে গিয়েই এই হোটেলের ভাবনা আসে তার মাথায়। তিনি ভাবতেন কেমন হবে একটি পুরো হোটেল যদি উড়ে বেড়ায় খোলা বাতাসে? হয়েছেও তাই। ম্যানড ক্লাউড ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটার বেগে উড়ে আকাশে। একটি পুরো হোটেল আকাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখতেই অবাক হয়ে যান অনেকেই। প্রায় ৪০ জন যাত্রী নিয়ে আকাশে বিচরণকারী এই হোটেলে আছে একটি প্রকাণ্ড জিমনেসিয়াম, সুপরিসর লাইব্রেরি, বড় ডাইনিং রুম, মিনি বারান্দা এবং একটি স্পা সেন্টার। ডি জিন।