Saturday, October 26, 2024

ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনায় উদ্বিগ্ন রাশিয়া, শান্ত থাকার আহ্বান

ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) রাতে দেশটির রাজধানী তেহরানসহ কয়েকটি শহরে সামরিক স্থাপনায় এ হামলা হয়। এতে ইরানের পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শনিবার (২৬ অক্টোবর) বিবৃতি দিয়েছে রাশিয়া।

রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তারা ইরানে ইসরায়েলের হামলার পর উত্তেজনার বিস্ফোরণের আশঙ্কা করছেন। জাখারোভা বলেন, আমরা জড়িত সব পক্ষকে সংযম প্রদর্শন, সহিংসতা বন্ধ এবং একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি এড়াতে আহ্বান জানাচ্ছি। আমরা মনে করি, ইরানকে প্রতিশোধমূলক কর্মকাণ্ডে উসকানি দেওয়া বন্ধ করা এবং অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনার সর্পিল পথ থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র সেন সাভেট এক বিবৃতিতে বলেছেন, নিজেদের আত্মরক্ষার জন্য ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনায় সুনির্দিষ্টভাবে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এটি গত ১ অক্টোবর ইরানের হামলার জবাব।

ইসরায়েলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর। সংবাদমাধ্যম বিবিসিকে এক মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ইরানে ইসরায়েলের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সিবিএস নিউজ জানিয়েছে, ইরানে ইসরায়েলের হামলার সবশেষ খবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেকে জানানো হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, শুক্রবার রাতে রাজধানী তেহরানের কাছে শক্তিশালী কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া যায় রাজধানীর কাছেই কারাজ শহরেও। এর পরপরই ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী জানায়, ইরানে ‘সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলা চালাচ্ছে তারা।

জানা গেছে, আগেই ইরানকে হামলার কথা জানিয়েছিল ইসরায়েল। এ কারণে আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির বাহিনী। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস নিউজের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে টাইমস অব ইসরায়েল।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তত তিনটি সূত্রের বরাতে অ্যাক্সিওস নিউজ জানিয়েছে, তৃতীয় একটি দেশের মাধ্যমে ইরানকে হামলার বিষয়ে অবগত করেছিল নেতানিয়াহু প্রশাসন। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নিয়ে রাখে তেহরান। ফলে, ইসরায়েলি হামলাগুলোকে আকাশেই ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয় খামেনির দেশ।

নেতানিয়াহু, পুতিন ও খামেনি। ছবি : সংগৃহীত

দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধে ইসরায়েলের ৪ সেনা নিহত

দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর সঙ্গে যুদ্ধে চার ইসরায়েলের সেনা নিহত হয়েছেন এবং আরও ছয়জন আহত হয়েছেন। ইসরায়েল সেনাবাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানায়।

বুধবার (২৩ অক্টোবর) দক্ষিণ লেবাননে সংঘর্ষের সময় হিজবুল্লাহর সদস্যরা একটি টানেল থেকে বের হয়ে ইসরায়েলের সেনাদের লক্ষ্য করে গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। আইডিএফের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, সেনারা পাল্টা গুলি চালালেও কতজন হিজবুল্লাহ সদস্য আহত হয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। আহত ছয় সেনার মধ্যে তিনজনের অবস্থা গুরুতর।

নিহত সেনাদের মধ্যে রয়েছেন- ওয়ারেন্ট অফিসার মোরডেকাই হাইম আমোইয়াল (৪২), সার্জেন্ট মেজর শমুয়েল হারারি (৩৫), মাস্টার সার্জেন্ট শ্লোমো আবিয়াদ নাইমান (৩১) এবং সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস শুয়াভেল বেন-নাতান (২২)।

এদিকে হিজবুল্লাহর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা দক্ষিণ লেবাননের আইতা আল সাব এলাকায় ইসরায়েলি একটি ট্যাঙ্ক ধ্বংস করেছে। এতে একজন ক্রু নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও একজন। গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে ট্যাঙ্কটি ধ্বংস করা হয় এবং এতে আগুন ধরে যায়। বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে, যেখানে ভারী অস্ত্র ও গ্রেনেড ব্যবহার করা হচ্ছে।

এছাড়া, পৃথক ঘটনায় আইডিএফ জানায়, ৭ম অর্কড ব্রিগেডের ৭৫তম ব্যাটালিয়নের একজন অফিসার অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইলের হামলায় গুরুতর আহত হয়েছেন। ৫৫তম প্যারাট্রুপার্স ব্রিগেডের ৭১৫৫তম ব্যাটালিয়নের একজন রিজার্ভ সৈন্যও হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, ২২৬তম প্যারাট্রুপার্স ব্রিগেডের ৬২২৬তম ব্যাটালিয়নের একজন অফিসার গুরুতর আহত হয়েছেন।

উল্লেখ্য, হিজবুল্লাহ দাবি করেছে, তাদের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরায়েলের ৭০ সেনা নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। বুধবার হিজবুল্লাহর অপারেশন রুম জানায়, যুদ্ধে ইসরায়েলি বাহিনীর ৭০ জনেরও বেশি সেনা নিহত হয়েছে, যদিও পূর্বের বিবৃতিতে তারা ৫৫ সেনার মৃত্যুর কথা বলেছিল। অপরদিকে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, লেবাননে স্থল অভিযান শুরুর পর তারা প্রায় ২০ সেনা হারিয়েছে এবং উত্তর ইসরায়েলে হিজবুল্লাহর হামলায় আরও ৩০ সেনা নিহত হয়েছে।

দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধের সময় ৪ সেনা নিহত হয়। ছবি : সংগৃহীত
দক্ষিণ লেবাননে যুদ্ধের সময় ৪ সেনা নিহত হয়। ছবি : সংগৃহীত



গাজায় সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৮৯০ ইসরায়েলি নিহত

গাজায় গত বছরের ৭ অক্টোবর থেকে হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। দেশটির এ হামলায় উপত্যাকা এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তবে এ হামলা চালানোর কড়া মূল্য দিতে হয়েছে দেশটিকে। উপত্যকায় ইসরায়েলের সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তাসহ ৮৯০ ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন।

শুক্রবার (২৫ অক্টোবর) মেহের নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদেনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ৮৯০ ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে সেনা, কর্মকর্তা, পুলিশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামীদের সংগঠন হামাসের আল আকসা স্টর্ম অপারেশন শুরুর পর তারা নিহত হয়েছেন।

ইসরায়েলের যুদ্ধ মন্ত্রণালয় শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। গত এক বছরে চলা সংঘর্ষে তারা নিহত হয়েছেন।

গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাস ও ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন আল আকসা স্টর্ম অপারেশন শুরু করে। এতে ইসরায়েলের এক হাজার ২০০ জন নিহত হন। এরপর থেকে গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েল।

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় এক বছর ধরে অব্যাহত ইসরায়েলি হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করতে অন্তত ১৫ বছর সময় লাগবে। এজন্য প্রতিদিন ১০০টি লরি ব্যবহার করতে হবে। জাতিসংঘের হিসাবমতে, গাজায় ভবন ধসে এ পর্যন্ত ৪২ মিলিয়ন টনেরও বেশি ধ্বংসস্তূপ জমা হয়েছে। এ ধ্বংসস্তূপগুলো যদি একসঙ্গে এক জায়গায় রাখা যায়, তাহলে তা মিশরের ১১টি গ্রেট পিরামিডের সমান হবে। এ ধ্বংসস্তূপ সরাতে ব্যয় হবে ৫০০ থেকে ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার বেশি)।

ইউএন এনভায়রনমেন্ট প্রোগ্রামের হিসাব অনুসারে, গাজায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ২৯৭টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা অঞ্চলটির মোট ভবনের অর্ধেকের বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের মধ্যে এক-চতুর্থাংশ পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এ ছাড়া এক-দশমাংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং এক-তৃতীয়াংশ বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে ফেলার জন্য ২৫০ থেকে ৫০০ হেক্টর জমির প্রয়োজন পড়বে।

গাজাভিত্তিক জাতিসংঘের একজন কর্মকর্তা গত সপ্তাহে গার্ডিয়ানকে বলেন, ‘অবকাঠামোর যে পরিমাণ ক্ষতি করা হয়েছে, তা পাগলামির পর্যায়ে পড়ে... দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসে একটি ভবনও নেই যেখানে ইসরায়েল হামলা চালায়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকৃত অর্থেই এ অঞ্চলের ভৌগোলিক চিত্র পরিবর্তিত হয়ে গেছে। যেখানে আগে পাহাড় ছিল না, এখন সেখানে পাহাড় হয়ে গেছে। দুই হাজার পাউন্ডের বোমাগুলো আক্ষরিক অর্থেই এ অঞ্চলের মানচিত্র বদলে দিয়েছে।’ 

ইসরায়েলি বাহিনীর ট্যাংক। ছবি : সংগৃহীত

লাদাখ থেকে সেনা সরানো শুরু ভারত-চীনের

পূর্ব লাদাখ থেকে সেনা সরানো শুরু করে দিয়েছে ভারত ও চীন। রাশিয়ার কাজানে ব্রিকস সম্মেলন শুরুর ঠিক আগে প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলএসি) বরাবর উত্তেজনা প্রশমনে দুই দেশের চুক্তি বা বোঝাপড়া অনুযায়ী এই উদ্যোগ।

দুই দেশের সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার থেকেই মুখোমুখি অবস্থানে থাকা সেনাদের সরানো শুরু হয়েছে। আপাতত দুটি অঞ্চলে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হলো ডেপস্যাং ও ডেমচক।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়াং শুক্রবার জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সমাধান সূত্র মেনে দুই দেশের সেনাবাহিনী প্রাসঙ্গিক কাজ বাস্তবায়ন শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত সেই কাজ সুষ্ঠুভাবেই চলছে।

দিল্লিতে এক সরকারি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, ডেপস্যাং ও ডেমচকেই দুই দেশের সেনাবাহিনী এখনো একেবারে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। সেই বাহিনী প্রত্যাহারের কাজ শুরু হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি বলেও রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে।

গত সোমবার ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি প্রথম জানান, পূর্ব লাদাখের বিতর্কিত এলাকার উত্তেজনা প্রশমনে ভারত ও চীনের মধ্যে বোঝাপড়া হয়েছে। সেই বোঝাপড়া অনুযায়ী দুই দেশ এলএসিতে টহলদারি করবে ও নজরদারি রাখাবে। ওই বোঝাপড়া মেনেই পরবর্তী সময়ে সেনা অপসারণের কাজ শুরু হবে এবং ২০২০ সালে এপ্রিল মাসে এলএসিতে সেনানীদের যে অবস্থান ছিল, সেখানে দুই দেশের সেনাবাহিনী ফিরে যাবে।

ওই ঘোষণার পরদিন চীনের পক্ষ থেকেও ওই সমঝোতা–সংক্রান্ত বিবৃতি দেওয়া হয়। তারপরই ভারত জানায়, কাজানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন।

পাঁচ বছর পর সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যদিও সেই বৈঠকের পর কোনো যৌথ বিবৃতি প্রচার করা হয়নি। দুই দেশের বিবৃতিতে যথেষ্ট ফারাকও দেখা যায়। ভারতের বিবৃতিতে যাকে ‘চুক্তি’ বলা হয়েছে, চীনের বিবৃতিতে তা ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’।

সেই ‘চুক্তি’ অথবা ‘গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি’ কোন কোন ক্ষেত্রে, তার চরিত্রই–বা কী, দুই দেশের কেউই শুক্রবার পর্যন্ত তা স্পষ্ট করেনি। ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস যদিও সেই চুক্তিতে কী কী রয়েছে, জানতে চেয়েছে। ভারত সরকার এখনো নীরব।

পাঁচ বছর আগে পূর্ব লাদাখের গলওয়ানে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের পর স্বাভাবিক বাণিজ্য সম্পর্কে ভারত বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল। শতাধিক চীনা অ্যাপ নিষিদ্ধ করা হয়। টেলিকম ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামে ব্যবহৃত প্রযুক্তি রপ্তানিতে নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও অনেক কড়াকড়ি করা হয়। সেই সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার দাবি চীন অনেক দিন ধরেই জানিয়ে আসছে।

চীনের দাবি, সীমান্ত বিবাদের মীমাংসার বিষয় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হওয়া উচিত নয়। বিবাদের এক ইতিহাস রয়েছে। সময় নিয়ে তার মীমাংসায় সচেষ্ট হওয়া দরকার। এর পাল্টা ভারতের বক্তব্য, সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে, স্থিতাবস্থা না ফিরলে বাণিজ্যিক বা অন্য সম্পর্কও সাবলীল হতে পারে না।

সীমান্ত বিতর্ক ঘিরে দুই দেশ নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকলেও আলাপ–আলোচনার দরজা কখনো বন্ধ হয়নি। এ ক্ষেত্রে ভারতের ‘পাকিস্তান নীতি’ ও ‘চীন নীতি’ পৃথক। সীমান্ত সমস্যার সমাধানে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে গত পাঁচ বছরে বিশটির বেশি বৈঠক হয়েছে। কূটনৈতিক স্তরেও আলোচনা অব্যাহত থেকেছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যও চলেছে নানা বিধিনিষেধ ও নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও। আড়ষ্টতা সত্ত্বেও চীন–ভারত বাণিজ্যিক সম্পর্ক সবচেয়ে বেশি। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের বহরে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাপিয়ে গেছে চীন। ২০২৩–২৪ অর্থবর্ষে ভারত–চীন মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১১৮ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার। যদিও চীনে ভারতের রপ্তানি ছিল মাত্র ১৬ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার। চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্যঘাটতি এই মুহূর্তে ৮৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

চীনের চাহিদামতো বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ ভারত তুলে নিলে বাণিজ্যঘাটতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাবে। টেলিকমসহ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো উন্মুক্ত হবে। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে ভারতীয় শিল্প মহলেরও চাপ রয়েছে সরকারের ওপর। বিশেষজ্ঞ মহল যদিও এই বিষয়ে ভারতকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়টি গভীর বিবেচনায় রাখতে বলেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক। ছবি: এএনআই

উজবেকিস্তানে প্রাচীন দুই শহরের সন্ধান

পূর্ব উজবেকিস্তানের ঘাসভরা পাহাড়ে দুটি মধ্যযুগীয় শহরের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন উজবেকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্নতাত্ত্বিকেরা। এ আবিষ্কার উপকথায় থাকা প্রাচীন সিল্ক রোড সম্পর্কে আমাদের জানাশোনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। পূর্ব ও পশ্চিমের সঙ্গে পণ্য আনা-নেওয়ার জনপ্রিয় বাণিজ্যপথ হিসেবে এই সিল্ক রোড পরিচিত।

ধারণা করা হয়, এই বাণিজ্যপথ নিম্নভূমির শহরগুলোকে সংযুক্ত করেছিল। কিন্তু গবেষকেরা রিমোট সেন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন, কমপক্ষে দুটি উঁচু ভূমির শহরের সঙ্গেও ওই পথ যুক্ত হয়েছিল।

এ শহরগুলোর মধ্যে একটি ছিল টুগুনবুলাক। ১২০ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত শহরটি মূলত মেট্রোপলিটন শহর হিসেবে গড়ে উঠেছিল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এটি ২ হাজার মিটার উঁচুতে অবস্থিত শহরটি এখনো অনেকের কাছে দুর্গম বলে মনে হয়।

গবেষক দলে যুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক ফারহোদ মাকসুদভ বলেন, এ আবিষ্কারের ফলে মধ্য এশিয়ার ইতিহাস বদলে যাবে। গবেষক দলটির ধারণা, টুগুনবুলাক ও আরেকটি ছোট শহর তাসবুলাক অষ্টম ও নবম শতকে গড়ে উঠেছিল। মধ্যযুগে অঞ্চলটি শক্তিশালী তুর্কি রাজবংশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল।

পূর্ব উজবেকিস্তানের পাহাড়ে হারানো দুই শহর পাওয়া গেছে
পূর্ব উজবেকিস্তানের পাহাড়ে হারানো দুই শহর পাওয়া গেছে। ছবি : রয়টার্স

গাজায় আর যুদ্ধে যাবেন না ইসরায়েলি ১৩০ সেনা

ইসরায়েলে গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাস চালানোর পরও অনিয়মিত সেনা (রিজার্ভিস্ট) ইয়োতাম ভিল্ককে সামরিক বাহিনীতে কাজের জন্য ডাকা হয়নি। তবে তিনি স্বেচ্ছায় ইসরায়েলের হয়ে যুদ্ধ করতে যান। এরপর তিনি গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে ২৩০ দিন কাটিয়েছেন। এ যুদ্ধ তাঁর জীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু এখন আর তিনি যুদ্ধে যেতে চান না।

এ বছরের গ্রীষ্মে গাজায় ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে দ্বিতীয় দফায় কাজ করার পর ইয়োতাম সেখানে যেতে অস্বীকার করছেন। তিনি বলেছেন, সরকার যদি আবার ডাকে তিনি আর যাবেন না। তিনি মনে করেন, কিছু ক্ষেত্রে গাজায় সামরিক পদক্ষেপ জরুরি ছিল। কিন্তু এটা হওয়া উচিত ছিল শান্তি প্রচেষ্টায় সহায়ক হতে পারে, এমন কূটনৈতিক সমাধানের একটি উপায় হিসেবে। তিনি এখন বিশ্বাস করেন, গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ফিলিস্তিনিদের জীবনকে আরও কঠিন করে তোলার পাশাপাশি জিম্মি মুক্তি কঠিন করে তোলা হয়েছে। নেতানিয়াহু সরকার সেখানে শান্তি অর্জন করতে চায় না।

৯ অক্টোবর ইয়োতামসহ ইসরায়েলি ১৩০ অনিয়মিত সেনা প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের কাছে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে তাঁরা বলেছেন, গাজা যুদ্ধ শেষ করতে ও হামাসের হাতে জিম্মি ১০১ জনকে মুক্ত করতে চুক্তি সই না করলে তাঁরা সরকারের হয়ে আর কোনো কাজ করবেন না।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ‘আমাদের অনেকের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে সীমারেখা পার হয়ে গেছে। আবার অনেকে সীমারেখার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। আমরা ভাঙা মন নিয়ে এই সেবা থেকে সরে দাঁড়াতে এ চিঠি লিখছি।’

ইয়োতামের সীমারেখা আগেই ছাড়িয়ে গেছে। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর জন্য সহজ ছিল না।

এই অনিয়মিত ইসরায়েলি সেনার মনে হয়েছে, যুদ্ধে সহযোগিতা করা থেকে সরে না দাঁড়ালে গাজায় আরেকটি দখলদারির যুদ্ধের অংশ হবেন তিনি। নেতানিয়াহু যতই বলুন না কেন, গাজায় নেতানিয়াহুর ইচ্ছা নিয়ে তাঁর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভা ও ডানপন্থী মন্ত্রীরা গাজায় ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কথা বলছেন।

ইয়োতাম ভিল্ক বলেন, ‘তাঁরা আমাকে এক বীভৎস পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। আমি আমার নিজের সরকারের কাছ থেকে প্রতারিত বোধ করছি।’

ইয়োতাম শুধু একা নন, মার্ক ক্রেসও তাঁর মতো লেবানন সীমান্তে ৬৬ দিন দায়িত্ব পালন করেছেন। এখন তিনি মনে করছেন, যথেষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, বাড়ি ফেরার পর থেকে তাঁর মানিয়ে নিতে সমস্যা হচ্ছে। বিষণ্নতায় ভুগছেন তিনি।

গাজায় ইসরায়েলের বোমা হামলা
গাজায় ইসরায়েলের বোমা হামলা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

গণ-অভ্যুত্থান কি বেহাত হওয়ার পথে? by ডাঃ ওয়াজেদ খান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টি ও অন্তর্বতীকালীন সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। পতিত স্বৈরাচারের সুবিধাভোগীরা ষড়যন্ত্র করছে ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের। অপরদিকে গণঅভ্যুত্থানের ফসল দ্রুত ঘরে তুলতে চায় কোনো কোনো রাজনৈতিক দল। সবশেষ রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অপসারণ জটিলতা কি তাহলে গণঅভ্যুত্থান বেহাত হওয়ার পথ সুগম করছে? এমন প্রশ্ন এখন জনমনে। বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের তিন মাস গত হয়নি এখনো। এরই মাঝে ডালপালা মেলছে নানাবিধ গুজব। এসব নিয়ে সরব সোশ্যাল মিডিয়া। এছাড়া পাল্টা অভ্যুত্থান, সামরিক শাসন জারির বিষয়টিও আছে আলোচনায়। ভারতে পলাতক হাসিনা ও তার অনুগতরা প্রবাসী সরকার গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছে, এমন খবরও চাউর আছে।

বিপ্লবের পর প্রতিবিপ্লবের একটি সম্ভাবনা থেকেই যায়। বিশ্ব ইতিহাসে প্রতিবিপ্লবের নজির রয়েছে অনেক। ফরাসি বিপ্লব থেকে বাংলাদেশের ‘৭৫ এর নভেম্বরের বিপ্লবের পরও ঘটে প্রতিবিপ্লবের ঘটনা। প্রতিবিপ্লব বরাবরই অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় মূল বিপ্লবের স্থায়ীত্ব ও পরিপূর্ণতার পথে। পরাজিত শক্তিকে সুযোগ করে দেয় পূর্বাস্থানে আসীন হতে। বিপ্লবকারীদের নতুন সমাজ বা রাষ্ট্র গঠন প্রচেষ্টা রুখে দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত শ্রেণি ও তাদের আর্শীবাদপুষ্টরা মরণপণ কামড় দেয় পূর্বাবস্থায় ফিরে আসার জন্য। যার মধ্য দিয়ে পুনরুথানের চেষ্টা চালায় বিপ্লবের বিরুদ্ধচারী পতিত শক্তি। জুলাই-আগস্টের পরিবর্তনের ঘটনায় আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনকে বিপ্লব না বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে গণঅভ্যুত্থান হিসেবে। সেদিক থেকে প্রতিবিপ্লবের বিষয়টি আমলে নেয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। পতিত স্বৈরাচার ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে চ্যালেঞ্জ করে পাল্টা অভ্যুত্থান করবে সে ধরনের শক্তি, সাহস ও নৈতিক মনোবল নেই তাদের। অন্তর্বতী সরকারের সাময়িক দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সামরিক বাহিনী দেশের গণমানুষের বিপক্ষে দাঁড়াবে সে ধরনের সম্ভাবনাও অত্যন্ত ক্ষীণ।

তবে উড়িয়ে দেয়া যাবে না গণঅভ্যুত্থান বেহাত হওয়ার সম্ভাবনা। গণ অভ্যুত্থান বেহাত হওয়া মানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বতীকালীন সরকারের ক্ষমতা হারানো। ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো মুখিয়ে আছে ক্ষমতা হাতিয়ে নিতে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ফ্যাসিবাদ মুক্ত, বৈষম্যবিহীন একটি নতুন বাংলাদেশ। যেখানে থাকবে গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায় বিচার ও মানবিক মর্যাদার নিশ্চয়তা। আর এসব নিশ্চিত করতেই তারা উত্থাপন করেছে রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি। এই দাবির মূলে রয়েছে একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত। এজন্য অন্তর্বতীকালীন সরকারকে একটি যৌক্তিক সময় দেয়ার পক্ষে মত দিয়েছে দেশের মানুষ। জনগণ মনে করে রাষ্ট্র সংস্কার আগে, নির্বাচন পরে। তবে এসময়কালে সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে। নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রীর মূল্য ও সহজ প্রাপ্যতা। বলা যায়, এক্ষেত্রে অন্তর্বতী সরকারের তেমন কোনো সাফল্য নেই। এসব নিয়ে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে সমাজ ও রাষ্ট্রে। আর এই সুযোগটি গ্রহণের অপেক্ষায় রয়েছে কিছু রাজনৈতিক দল। অতি দ্রুত নির্বাচনের দাবিতে মাঠ গরম করতে চাচ্ছে দলগুলো। সংস্কারকাজ অসম্পূর্ণ রেখে যেকোনো মূল্যে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার হাত বদল হলে গণঅভ্যুত্থান বেহাত হবে। গণঅভ্যুত্থান বেহাত হওয়ার সকল পথ ও সম্ভাবনা রুখে দিতে হবে ছাত্র-জনতাকে। সবধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নজিরবিহিন ঘটনা পাঁচ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান। যার মধ্যদিয়ে পতন ঘটেছে ফ্যাসিবাদের। দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন পতিত স্বৈরাচার হাসিনা। তার আগে জুলাইয়ের ৩৬দিনে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে হাসিনা। কেড়ে নিয়েছেন দেড় সহস্রাধিক প্রাণ। এখনো হাসপাতালে বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত হাজার হাজার মানুষ। এরই মাঝে ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সফলতা ও বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে বিভিন্ন মহল। চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে তারা প্রতিটি  কাজের। বিগত পনের বছর যারা ছিলো আশাহীন, ভাষাহীন তারা বিভিন্ন দাবি দাওয়ার তাৎক্ষণিক সুরাহা চাচ্ছে। মিছিল সমাবেশ করে রাজপথে ভোগান্তি বাড়াচ্ছে সাধারণ মানুষের। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ অন্তর্বর্তী সংশ্লিষ্ট সকলেরই তীব্র সমালোচনায় মত্ত। তারা একবারো ভাবছেন না- তাদের এসব সমালোচনা কারো প্রতি ব্যক্তিগত আক্রমণ ফ্যাসিবাদের দোসরদেরকেই উৎসাহিত করছে।

বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান বেহাত হওয়ার নজির বাংলাদেশেও রয়েছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো দেশের গণমানুষ । কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা বেহাত হয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের একক মালিকানা চলে যায় এক ব্যক্তি ও একটি দলের কব্জায়। এ নিয়ে বাংলাদেশের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী আহমদ ছফা’র লেখা ড. সলিমুল্লাহ খানের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘বেহাত বিপ্লব-১৯৭১।’ গণঅভ্যুত্থান বেহাত হওয়ার সকল পথ ও সম্ভাবনা রুখে দিতে হবে। সবধরনের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারকে।

লেখক:ডাঃ ওয়াজেদ খান। সম্পাদক, সাপ্তাহিক বাংলাদেশ, নিউ ইয়র্ক।

(লেখকের একান্ত নিজস্ব মতামত)

mzamin

চাই ইস্পাতকঠিন জাতীয় ঐক্য by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

আজ ক’দিন থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে মারাত্মক তোলপাড় চলছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আগাগোড়াই একজন বিতর্কিত মানুষ। কখনো তিনি নামিদামি ছিলেন না, কখনো নিষ্কলুষ ছিলেন না। পাবনায় কলেজে পড়ার সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তখনো শাস্তি ভোগ করেছেন। তার মূল নেতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের প্রবাদপুরুষ নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, অন্যদিকে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। তাই তার অতীত খুব একটা সমুজ্জ্বল নয়। ইদানীং তিনি যা করছেন- যা বলছেন- তা সম্পূর্ণই সংবিধান লঙ্ঘন, নীতি-নৈতিকতাবিরোধী মিথ্যাচার। ৫ই আগস্টের পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে তার বেতার ভাষণে স্পষ্ট করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তিনি সে পদত্যাগ গ্রহণ করেছেন। তারপর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। যথারীতি অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা পরিষদের তিনি শপথ পড়িয়েছেন। রাষ্ট্র কাঠামো চলছে।

তার মধ্যে তিনি কেন, কি উদ্দেশ্যে নানা অগ্রহণযোগ্য অপ্রীতিকর কথা বলে চলেছেন। হ্যাঁ এটা ঠিক, যারা বিগত সরকারকে উৎখাত করেছে তাদের পক্ষে যেমন জনমত আছে, ঠিক তেমনি তাদের বিপক্ষে অনেক শক্তিধররা রয়েছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার সফল আন্দোলনকে ব্যর্থ করার। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা করবেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব এবং আসমানসমান মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা করবেন- এসব একেবারে অতি সাধারণ ব্যাপার। ক’দিন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চাচ্ছে। হয়ে যাবে। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সবার আগে গেছেন প্রাক্তন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, তার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই যাবেন। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। কারও হায়াত মওত তো বলা যায় না। তাকে হত্যা করা না হোক- আল্লাহ যদি আজরাইল পাঠিয়ে দেন- তাহলে কে ফেরাবে? তখন কী হবে? সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যদি পরপারে চলে যান তার জন্য কি দেশ বসে থাকবে? কখনো না। মাননীয় স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। মাননীয় স্পিকারের পদত্যাগের কোনো সুযোগই নেই। পরবর্তী সংসদ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তিনি স্পিকার। কিন্তু পণ্ডিতি করে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তাতে কী হবে? সংসদীয় ধারাবাহিকতা রাখতে গেলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য দিয়ে শপথ পড়িয়ে নিলেই সমস্ত লেঠা চুকে যাবে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মরে গেছেন ধরে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিলে কী তেমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে? কে এলো, কে গেল- এটা তেমন বড় কথা নয়। বড় কথা সত্যিই রাষ্ট্র ভালোভাবে চলছে কিনা, মানুষ স্বস্তিতে-শান্তিতে আছে কিনা। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন আছে এবং এটা ধ্রুব সত্য, এক চোখে তেল, আরেক চোখে নুন বেচাকেনা করলে চলবে না। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই দুর্যোগের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। তার জন্য জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

জন্মেছিলাম ’৪৭-এর ১৪ই জুন একেবারে এক পশ্চাৎপদ পল্লী কালিহাতীর ছাতিহাটিতে। তারপর পদ্মা মেঘনা যমুনার পানি বহু গড়িয়েছে। একটা সময় ছিল- কিছুই বুঝতাম না। লাল বিল্লাওয়ালার হাওয়ালদার গ্রামে গেলে গোলাঘরের মাচার উপর সরিষা, কালাই, ধান রাখা ঢোলের মধ্যে পালাতাম। সেই মানুষ আজও বেঁচে আছি। রাজনীতিতে এসেছিলাম বড় ভাই লতিফ সিদ্দিকীকে অবলম্বন করে বা তাকে দেখে দেখে। যে সময় পুলিশ দেখে কাঁপতাম তখন লতিফ ভাই আইয়ুব-মোনায়েমের বিরুদ্ধে তারস্বরে বক্তৃতা করতেন। নিজে কাঁপতেন, শ্রোতাদেরও উতালা করে তুলতেন। আর দুনিয়ার ভীরু কাপুরুষ আমি ভাবতাম একই বাবার ঔরসজাত একই মায়ের সন্তান, একজনের অত সাহস, আরেকজন আমি এত ভীতু কেন? এভাবেই এক সময় ’৬২-র শিক্ষা কমিশন বাতিলের আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। সেই হয়তো প্রথম টাঙ্গাইলের ছাত্র-জনতার মিছিল। তখন পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কুমুদিনী মহিলা কলেজ এবং টাঙ্গাইল বিন্দুবাসিনী গার্লস স্কুলের মেয়েরা রাস্তায় বেরিয়ে ছিল। পুরনো বাসস্ট্যান্ড থেকে কুমুদিনী কলেজ এবং আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে আগ্নেয়গিরির মতো গর্জন করে ছাত্র-জনতার মিছিল সিএন্ডবি’র মোড় হয়ে বটতলা, সেখান থেকে টাঙ্গাইল পার্কের পাশে আনসার ক্যাম্পের সামনে আমতলে এক অভাবনীয় সভা হয়েছিল। সেখানে অনেকেই বক্তৃতা করেছিলেন। কিন্তু আজও আমার কানে বাজে কুমুদিনী কলেজের এক নেত্রীর গলা। নাম মনে নেই। গত ৫-১০ বছর অনেককেই জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু কেউ তার নাম বলতে পারেননি। যারা দু’একজন বলেছেন- আমার কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তখন টাঙ্গাইলে জাতীয় নেতা হুজুর মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মুসলিম লীগের বেশ কিছু নেতা ছিলেন। টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহের বাইরে তাদের তেমন বিচরণ ও পরিচিতি ছিল না। আওয়ামী লীগের কয়েকজন ছিলেন। তাদের মধ্যে সর্বজনাব আব্দুল মান্নান, শামসুর রহমান খান শাজাহান, বদিউজ্জামান, হাতেম আলী তালুকদার, ছাত্রনেতাদের মধ্যে ফজলুল করীম মিঠু, আল মুজাহিদী, ফজলুর রহমান খান ফারুক, শওকত আলী তালুকদার, লতিফ সিদ্দিকী, আতিকুর রহমান সালু, বুলবুল খান মাহবুব, এম এ রেজা, আনোয়ার বক্‌শ, দাউদ খান, আলমগীর খান মেনু আরও অনেকেই। সেই যে ’৬২তে রাজপথে পা মিলিয়ে ছিলাম আজও চলছি তো চলছি। জীবনে কতো উত্থাল-পাথাল দেখলাম। মোনায়েম খানের সৃষ্ট এনএসএফ, তার দাপটে রাস্তায় চলা যেতো না, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কথা বলা যেতো না। তারাও এক সময় ’৬৯-এর আগে আগে একেবারে সুতার মতো সোজা হয়ে গিয়েছিল। তাই গত জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে এক অখ্যাত প্রাক্তন বিচারপতি যখন বলেছিলেন, আন্দোলন দমাতে ছাত্র-যুবলীগই যথেষ্ট। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সে কি হামবড়া ভাব! শেখ হাসিনাও খুব একটা কম যান না। কীসব অকথ্য ভাষা ব্যবহার করেছেন যা সুস্থ মস্তিষ্কে ভাবাই দুষ্কর। তবু করেছেন। তার ফলও ভোগ করেছেন। যতকাল রাষ্ট্র থাকবে, রাষ্ট্র ব্যবস্থা থাকবে- ততকাল সরকারে যাওয়া-আসা থাকবে। সরকারে গিয়েই কেউ যদি ভাবে তিনি কিয়ামত পর্যন্ত থাকবেন তাহলে সেটা যে ভ্রান্ত তার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। এক সময়ের ইরাকের বাদশাহ নুর-ই সাঈদ। তাকে জনগণ উৎখাত করেছিল। কর্নেল গাদ্দাফি, কি তেজই না ছিল তার। জনপ্রিয়তাও ছিল হিংসা করার মতো। হোসনি মোবারক, কতো দেশ কতো নেতা এক সময় ইরানের বাদশাহ রেজা শাহ পাহলভী, খোমেনির হাতে পরাজিত হয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। এরকমই হয়। ’৬০-’৬২ তে মনে হতো আইয়ুবের বুঝি শেষ নেই, অজেয় অমর হয়ে এসেছেন। কিন্তু তা সত্য নয়। লৌহমানব আইয়ুব খানকে আমরাই তামা-কাঁসা করেছিলাম। একটা সময় শেখ হাসিনা এবং তার চাটুকাররা ভেবেছিলেন, শত বছর ক্ষমতায় থাকবেন। শেখ হাসিনার পর উত্তরাধিকার কে- সে নিয়েও চিন্তা করছিলেন। মানুষ ভাবে এক, আল্লাহ করেন আরেক। এক গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতা ছেড়েছিলেন, জেলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পালাননি, তাকে পালাতে হয়নি। কিন্তু নিদারুণভাবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে ছেড়ে বিপদের মুখে ফেলে পালিয়েছেন। শুধু পালিয়েই ক্ষান্ত হননি, ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর আমিও দেড় যুগের বেশি ভারতে নির্বাসনে ছিলাম। বারবার সরকার পরিবর্তন হলেও তারা আমাকে যথেষ্ট গুরুত্ব ও মর্যাদা দিয়েছে। এখনকার অনেক নেতাদেরই চিনি না, জানি না। কিন্তু ভারতকে জানি, চিনি এবং বুঝি। মহান ভারত খুব একটা কোনো ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছায় চলে না। চলে জাতীয় স্বার্থনির্ভর করে চাণক্য নীতিতে। তাই ভারত তার স্বার্থে শেখ হাসিনাকে যেভাবে রাখা দরকার সেভাবেই রাখবে- তার বেশি নয়, কমও নয়। ভারতে তার যে সুবিধা-অসুবিধা হওয়ার পুরোটাই হবে। তবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মুখ সামলাতে না পারলে সামনে তার প্রচুর বিপদ আছে।

আমাদের দেশে অনেক বছর থেকেই সর্বক্ষেত্রেই পণ্ডিতের ছড়াছড়ি। যে পরিমাণ জ্ঞানী পণ্ডিত বাস করে সারা পৃথিবীর সব পণ্ডিত জ্ঞানী-গুণী বিদ্বান একত্র করলেও বিশ্ব জোড়া বিদ্বান পণ্ডিতের সংখ্যা কম হবে। আজ কিছুদিন থেকেই বৈধ-অবৈধ সংবিধান-অসংবিধান এসব নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ক’দিন থেকেই শুনছি, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। কি শূন্যতা হবে? আমরা বুঝতে পারছি না, দেশের মানুষ বুঝতে পারছে না। যে অধ্যাপক ইউনূসকে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী চোখের কাঁটা ভাবছিলেন গণেশ উল্টে যাওয়ায় তিনিই প্রধান নিয়ামক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা। এটা কোন সংবিধানে, কোন পাতায় লেখা ছিল? কিন্তু আন্দোলনের রায়ে যে সময় তিনি প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন তার মতো বৈধ শাসক অতীত সরকারে কেউ ছিলেন না। হ্যাঁ এটা ঠিক, অনভিজ্ঞ লোকজনদের নিয়ে তেমন খুব ভালো একটা কিছু করতে পারছেন না। কিন্তু হাসিনার দুঃশাসনের চাইতে খুব খারাপ অবস্থায় আমরা নেই। দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি- এটা খুবই স্বাভাবিক। এমন দুর্যোগের মধ্যদিয়ে দেশ বা জাতি যখন যায় তখন এমন অনেক কিছুই ঘটে যা অল্প আগেও কল্পনা করা যায় না। তেমনটাই হচ্ছে। কম বেশি আরও হবে। এক্ষেত্রে আমাদের সবার দেশপ্রেমিক হওয়া দরকার, দেশের প্রতি যত্নবান হওয়া দরকার। ব্যক্তি স্বার্থ ত্যাগ করে সমষ্টির স্বার্থের প্রতি নজর দেয়া উচিত।

আজ ক’দিন থেকে মহামান্য রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে মারাত্মক তোলপাড় চলছে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি আগাগোড়াই একজন বিতর্কিত মানুষ। কখনো তিনি নামিদামি ছিলেন না, কখনো নিষ্কলুষ ছিলেন না। পাবনায় কলেজে পড়ার সময় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তখনো শাস্তি ভোগ করেছেন। তার মূল নেতা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক সময়ের প্রবাদপুরুষ নুরুল ইসলাম ঠাণ্ডু, অন্যদিকে প্রাক্তন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু। তাই তার অতীত খুব একটা সমুজ্জ্বল নয়। ইদানীং তিনি যা করছেন- যা বলছেন- তা সম্পূর্ণই সংবিধান লঙ্ঘন, নীতি-নৈতিকতাবিরোধী মিথ্যাচার। ৫ই আগস্টের পর মহামান্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে জাতির উদ্দেশ্যে তার বেতার ভাষণে স্পষ্ট করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। তিনি সে পদত্যাগ গ্রহণ করেছেন। তারপর নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। যথারীতি অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা পরিষদের তিনি শপথ পড়িয়েছেন। রাষ্ট্র কাঠামো চলছে। তার মধ্যে তিনি কেন, কি উদ্দেশ্যে নানা অগ্রহণযোগ্য অপ্রীতিকর কথা বলে চলেছেন। হ্যাঁ এটা ঠিক, যারা বিগত সরকারকে উৎখাত করেছে তাদের পক্ষে যেমন জনমত আছে, ঠিক তেমনি তাদের বিপক্ষে অনেক শক্তিধররা রয়েছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা করবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার সফল আন্দোলনকে ব্যর্থ করার। সেজন্য আইনশৃঙ্খলা নষ্ট করার চেষ্টা করবেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব এবং আসমানসমান মূল্যবৃদ্ধির চেষ্টা করবেন- এসব একেবারে অতি সাধারণ ব্যাপার। ক’দিন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ চাচ্ছে। হয়ে যাবে। সাবেক প্রধান বিচারপতিকে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। সবার আগে গেছেন প্রাক্তন সরকার প্রধান শেখ হাসিনা, তার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই যাবেন। রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে শূন্যতার সৃষ্টি হবে। কারও হায়াত মওত তো বলা যায় না। তাকে হত্যা করা না হোক- আল্লাহ যদি আজরাইল পাঠিয়ে দেন- তাহলে কে ফেরাবে? তখন কী হবে? সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যদি পরপারে চলে যান তার জন্য কি দেশ বসে থাকবে? কখনো না। মাননীয় স্পিকার পদত্যাগ করেছেন। মাননীয় স্পিকারের পদত্যাগের কোনো সুযোগই নেই। পরবর্তী সংসদ পর্যন্ত বেঁচে থাকলে তিনি স্পিকার। কিন্তু পণ্ডিতি করে তিনি পদত্যাগ করেছেন। তাতে কী হবে? সংসদীয় ধারাবাহিকতা রাখতে গেলে একজন বয়োজ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য দিয়ে শপথ পড়িয়ে নিলেই সমস্ত লেঠা চুকে যাবে। বর্তমান মহামান্য রাষ্ট্রপতি মরে গেছেন ধরে নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিলে কী তেমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে? কে এলো, কে গেল- এটা তেমন বড় কথা নয়। বড় কথা সত্যিই রাষ্ট্র ভালোভাবে চলছে কিনা, মানুষ স্বস্তিতে-শান্তিতে আছে কিনা। এসব ক্ষেত্রে অবশ্যই অনেকের মধ্যে প্রশ্ন আছে এবং এটা ধ্রুব সত্য, এক চোখে তেল, আরেক চোখে নুন বেচাকেনা করলে চলবে না। সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে এই দুর্যোগের হাত থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। তার জন্য জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

mzamin
বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, বীরউত্তম

ট্রাম্পকে নিয়ে উদ্বিগ্ন ডেমোক্রেট নেতারা

দুই সপ্তাহেরও কম সময় পর যুক্তরাষ্ট্র পেতে যাচ্ছে তাদের নতুন প্রেসিডেন্ট। এবারের নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উভয় প্রার্থীই খুব ভালো অবস্থানে রয়েছে। তাই কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন তার আগাম পূর্বাভাস দেয়া কঠিন। ধারণা করা হচ্ছে গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে এবছর। এখন শুধুই অপেক্ষা কে হচ্ছেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট।  ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী কমালা হ্যারিস নাকি রিপাবলিকান নেতা ডনাল্ড ট্রাম্প। দুজনের জনপ্রিয়তাই এখন তুঙ্গে।

বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে  ডেমোক্রেট দলের মনোনয়ন পাওয়ার দুই মাস অতিক্রম করেছে কমালা হ্যারিস। শিকাগোতে একটি আনন্দময় জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতা করার জন্য কমালাকে দলীয় মনোনয়নের মুকুট দিয়েছিল ডেমোক্রেটরা।

সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ৮১ বছরের নড়বড়ে জো বাইডেন যেন মানানসই হচ্ছিল না। সে বিষয়টি অবশ্য প্রথম প্রেসিডেন্সিয়াল বিতর্কেই স্পষ্ট হয়ে যায়। ওই বিতর্কে নড়বড়ে পারফরমেন্সের জন্য খোদ দলের ভেতরেই বাইডেনের প্রার্থিতা নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়। প্রথমে গোঁ-ধরলেও এক পর্যায়ে বাইডেন নিজেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতা থেকে সরিয়ে নেন। এরপরই দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমালা হ্যারিস ওই পদের হাল ধরেন। কিন্তু ট্রাম্পকে নিয়ে ডেমোক্রেটদের উদ্বেগ যেন এখনো কাটেনি।

কেননা, ডেমোক্রেট দলের জয় নিয়ে অতিরিক্ত যে আত্মবিশ্বাস প্রচার করা হচ্ছে তা নিয়ে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দলটির সিনিয়র নেতারা। তারা বলছেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে উদ্বেগ ততই বাড়ছে। তাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে তাদের উদ্বেগ এখন আরও প্রকট হচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাইডেনের তুলনায় কমালা হ্যারিস নিজের দলকে বেশ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত সামান্য হলেও ট্রাম্পকে পেছনে রেখেছেন কমালা। এটা নিশ্চিত যে, ডেমোক্রেট দলের নির্দিষ্ট যে ভোটার রয়েছেন তারা কমালাকেই ভোট দেবেন। কিন্তু এর বাইরে যে ভোটার রয়েছেন তাদের নিজ শিবিরে ভেড়ানোই কমালার জন্য বেশ চ্যালেঞ্জের বিষয় এখন।  
এই উদ্বেগ কাটাতে কমালার দিকেই এখন নজর রাখছেন দলের সিনিয়র নেতারা। তারা মনে করেন, বিজয়ের জন্য হ্যারিসকে ডেমোক্রেট শিবিরের বাইরের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে হবে, পাশাপাশি ভঙ্গুর জোটকে ধরে রাখতে হবে যা বাইডেনকে ২০২০ সালে জিততে সাহায্য করেছিল।

সাম্প্রতিক ভোটগুলোতে যে চিত্র ফুটে উঠেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, কমালা ও ট্রাম্প প্রায় সমান্তরাল গতিতেই চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তবে যেসব রাজ্যে নিজেদের আধিপত্য রয়েছে সেখানে ট্রাম্পের জায়গা পাওয়া  ডেমোক্রেটদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে মিশিগান, উইসকনসিন এবং পেনসিলভানিয়ায় ট্রাম্পকে নিয়ে বেশ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ডেমোক্রেটদের সিনিয়র নেতারা। যদিও ডেমোক্রেটদের মূল স্টেটগুলোতে প্রতিযোগিতাটি বেশ হাড্ডাহাড্ডি হতে পারে।

যদিও কমালার দাবি তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকদিন যাবৎ বেশ অনুজ্জ্বল পরিস্থিতির মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচনী প্রচারণায় ট্রাম্পকে নিয়ে বেশ হাসাহাসি করছেন তিনি। কমালা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে একজন ‘প্রতারক বা অবিশ্বাসী’ মানুষ বলে অভিহিত করেছেন। সম্প্রতি এক বক্তৃতায় ট্রাম্পকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলে তীর্যক মন্তব্যও করেছেন ডেমোক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী। এই হাসাহাসি ডেমোক্রেটদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায় কিনা তা নিয়েও রয়েছে জল্পনা-কল্পনা। জরিপ বলছে এখনো কমালা হ্যারিসের জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে; তবে তা যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। কেননা ইলেক্টোরাল কলেজে জিততে তাকে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোতে জয় নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে ডেমোক্রেট দলের যেসব রাজ্যে অবস্থান শক্তিশালী সেখানে কোনোভাবেই তাকে হেরে গেলে চলবে না।

mzamin


আন্দোলনে আহত: এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছেন তারা by সুদীপ অধিকারী

জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার বিক্ষোভের পর হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। কিন্তু সেই আন্দোলনে আহত হয়ে এখনো রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কাতরাচ্ছেন শতাধিক মানুষ। এদের কারোর পায়ে গুলি লেগেছে, কারোর হাতে। কারোর আবার গুলি কোমর দিয়ে ঢুকে পেট ছিদ্র হয়ে বের হয়ে গেছে। অনেকেই সারা জীবনের মতো পা  হারিয়েছেন। চোখে গুলিবিদ্ধ হয়ে দৃষ্টি হারানো অনেকে এখনো চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ৪ তলার বেডে শুয়ে জীবনের হিসাব মিলাচ্ছেন। দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এসব তরুণ, যুবক, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় দিন পার করছেন।

শেরেবাংলা নগরের জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতালের) পরিচালক অধ্যাপক ডা. কাজী শামীম উজ্জামান বলেছেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দালনে আহত হয়ে এ পর্যন্ত এ হাসপাতালে ৮ শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ২১ জনের অঙ্গহানি হয়েছে। বেশির ভাগ রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাড়িতে ফিরে গেলেও এখনো হাসপাতালের ‘বি’-ওয়ার্ডে ৫৯ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেন, আন্দোলনে আহতদের মধ্যে বেশির ভাগেরই মাল্টিপল ইঞ্জুরি রয়েছে। হাড় ভাঙার সঙ্গে তাদের শরীরের মাংসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমরা আমাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। সম্পূর্ণ বিনা খরচে তাদের চিকিৎসা চলছে। আন্দোলনের প্রথম দিকে ক্যাজুয়ালিটি-১, ক্যাজুয়ালিটি-২ সহ বিভিন্ন ওয়ার্ডে চিকিৎসাসেবা দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে আন্দোলনে আহতদের জন্য হাসপাতালের তিন তলা ও চার তলায় বিশেষায়িত ইউনিট খোলা হয়েছে। সেখানেই এই ৫৯ জনের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

ওই তালিকায় নাম রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার্থী সাদ আব্দুল্লাহর। পঙ্গু হাসপাতালের ৩ তলার ‘বি’-ওয়ার্ডে চিকিৎসা নেয়াদের মধ্যে তিনিও একজন। গত ৭ই আগস্ট থেকে তিনি হাসপাতালটিতে ভর্তি। ১৯ বছরের এই শিক্ষার্থী বলেন, সরকার পরিবর্তনের আগের দিন গত ৪ঠা আগস্টের আন্দোলনে তার ডান পায়ে গুলি লাগে। একাধিক অস্ত্রোপচার করে গুলি বের করার পর পায়ে স্টিলের রডের খাঁচা লাগিয়ে দিয়েছে। ডাক্তার বলেছেন, ক্ষত-বিক্ষত হাড় জোড়া লাগানোর জন্য অন্তত ৯ মাস এভাবেই পায়ে খাঁচা লাগানো থাকবে। এর পর আবারো পায়ে অস্ত্রোপচার করে এই খাঁচা বের করা হবে। তবে পা আগের মতো স্বাভাবিক হবে না। আমি আর কোনোদিনও আগের মতো পা ভাঁজ করতে পারবো না। গুলি লাগার বিষয়ে সাদ বলেন, গত ৫ই আগস্ট দুপুরে হাসিনা সরকারের পতনের খবরে সকলে যখন আনন্দ করছিল, সে সময় আমিও মিরপুর এলাকায় মিছিল দেখতে গিয়েছিলাম। মিছিলটি মিরপুর-১ থেকে ২ নম্বরের দিকে এগুতেই হঠাৎ পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া শুরু করে। তখন ভয়ে আমি ওভার ব্রিজের উপর ওঠে পড়ি। পুলিশ তখন ওই ব্রিজের উপর উঠে আমার পায়ে গুলি করে। গুলিতে আমার বাম পায়ের হাঁটুর হাড় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে কয়েকজন মিলে আমাকে পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখান থেকে আমার পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে। দুইদিন থাকার পর সেখানকার চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পেরে এই হাসপাতালে চলে আসি। তখন থেকে এখানেই চিকিৎসা নিচ্ছি। হাঁটতেও পারি না, চলতেও পারি না। বিছানায় খাওয়া, বিছানাতেই সব। কবে আমি এ যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবো তার ঠিক নেই। সাদের মতো গত ৫ই আগস্ট ডানপায়ে গুলিবিদ্ধ হয় দশম শ্রেণির ছাত্র আলী হাসান। তাকে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। হাসান বলেন, অনেক চেষ্টার পরও গত ১৪ই আগস্ট আমার ডান পা হাঁটুর নিচে থেকে কেটে ফেলতে বাধ্য হয় ডাক্তাররা। ১৬ দিন চিকিৎসা নেয়ার পর ৩০শে আগস্ট আমি সাতক্ষীরা ফিরে যাই। কিন্তু বাড়ি ফিরে স্ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটতে গিয়ে পড়ে গিয়ে আমার পায়ে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। এরপর আবারো পঙ্গু হাসপাতালে নিয়ে আসে আমার পরিবার। অশ্রুশিক্ত হয়ে হাসান বলেন, সারা জীবনের মতো আমার পা-টা হারালাম। এখন আমার বাবা-মাকে কে দেখবে!

এদিকে জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে চোখে গুলিবিদ্ধ ও আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে সাড়ে ৭শ’ জন চিকিৎসা নিয়েছেন শেরে বাংলা নগর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল থেকে। তাদের কেউ এক চোখ, আবার সারাজীবনের মতো নিজের দুই চোখেরই দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। এসব রোগীদের দেখভালের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ডা. জাকিয়া সুলতানা বলেন, আন্দোলনে আহত হয়ে এ পর্যন্ত আমাদের এখানে সাড়ে ৭০০ মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন। এ ছাড়াও ৫৫০ জন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনো হাসপাতালের ৪ তলার স্পেশালাইজড ডেডিকেটেড ইউনিটে ৪০ জন ভর্তি রয়েছেন। তিনি বলেন, মূলত আমাদের এখানে চিকিৎসা নেয়া প্রায় সকলের চোখেই একাধিবার অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে। কারও একবার। কারোর দুইবার। অনেকে আবার আসছেন চেকআপ করাতে। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। এমনকি চীন, নেপালের মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশের চিকিৎসক দল আমাদের হাসপাতালে এসে এসব রোগীদের চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। আমরা এসব রোগীদের জন্য স্পেশাল কেয়ার ইউনিট চালু করেছি। বিশেষায়িত চিকিৎসকদের বোর্ড বসিয়ে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়ে থাকে। চোখে গুলি লাগার বিষয়ে তিনি বলেন, অনেক রোগীকে আমরা দেখেছি ছররা গুলি চোখের মণি ভেদ করে চলে গেছে। তাদের এসব গুলি বের করতে গিয়ে আরও রক্তক্ষরণ হতে পারে, মণি ছোট হয়ে যেতে পারে, চোখের শেপ নষ্ট হতে পারে তাই অধিক ক্ষতির ভয়ে সারা জীবন তাদের চোখে বুলেট নিয়েই বাঁচতে হবে। এমনই একজন সিলেটের সুজন আহমেদ (২২)। তিনি বলেন, প্রথম থেকেই সিলেটের আন্দোলনে যুক্ত ছিলাম। গত ২৪শে জুলাই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলন চলাকালে পুলিশের গুলি এসে লাগে আমার ডান চোখে। এরপর আমার সঙ্গীরা উদ্ধার করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে বলা হয়- আমার চোখের মধ্যে গুলি ঢুকে গেছে। ঢাকা ছাড়া চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয়। এরপর আমি ঢাকায় চলে আসি। এখানে আসার পর ডাক্তাররা আমাকে জানান, আমার চোখরে মধ্য থেকে গুলি আর কোনোদিন বের করা যাবে না। যদিও যায় তার পরও কোনোদিন আর আমি ডান চোখে দেখতে পারবো না। ১৯শে জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর রায়েরবাগ এলাকায় বাম চোখে গুলিবিদ্ধ হন রিপন আহমেদ। ১০ মাসের সন্তান ও স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে তিনিও দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চার তলায়। রিপন বলেন, আন্দোলন যখন তুঙ্গে সকলে ঘর থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে, তখন আমিও আর বসে থাকতে পারিনি। আমিও তাদের সঙ্গে যোগ দেই। সেদিন পুলিশের গুলিতে একের পর এক নিহতের খবর আসছিল। পুলিশ নির্বিচারে গুলি করছিল। আমরাও রাস্তা ছাড়িনি। এরইমধ্যে হঠাৎ একটি গুলি এসে লাগে আমার চোখে। চোখ দিয়ে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়ছিল তখন। আমি রাস্তায় লুটিয়ে পড়ি। একপর্যায়ে আমার জ্ঞান হারিয়ে যায়। যখন জ্ঞান ফেরে আমি তখন হাসপাতালে। এরপর সেখান থেকে আমাকে এই চক্ষু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। সেদিন প্রাণে বাঁচলেও চোখের দৃষ্টি হারিয়ে গেছে সারাজীনের মতো। আমার ১০ মাসের বাচ্চা ও স্ত্রী ছাড়া কেউ নেই। আমার পারিশ্রমেই তাদের মুখে অন্ন জুটতো। এখন তো কাজও করতে পারবো না। অন্ধ লোককে কেউ কাজেও নিবে না। আমার বাচ্চাটাকে কীভাবে বড় করে তুলবো, কীভাবে সংসারের খরচ মেটাবো কিছুই বুঝতে পারছি না। একইদিনে রাজধানীর বাড্ডার গোদারাঘাট এলাকায় চোখে গুলিবিদ্ধ হন মো. সাজ্জাদ হোসেন। সাজ্জাদ বলেন, সেদিন জুমার নামাজের পর অন্যদের সঙ্গে আমিও বাড্ডার আন্দোলনে যোগ দিই। পুলিশ আমাদের লক্ষ্য করে একের পর এক গুলি ছুড়ছিল। সেই গুলির একটি এসে লাগে আমার ডান চোখে। তারপর থেকে আমি আর এই চোখটা দিয়ে কিছুই দেখতে পারছি না।

অপরদিকে গত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আহত হয়ে প্রায় ৫ শতাধিক মানুষ চিকিৎসা নিয়েছেন শেরেবাংলা নগরের শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও এসব রোগীদের চিকিৎসার জন্য তিনটি বিশেষায়িত ওয়ার্ড খোলা হয়। বেশির ভাগ রোগী চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাড়িতে ফিরলেও এখনো হাসপাতালটির ৪ তলার ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে ৬ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদেরও কারোর পায়ে গুলি লেগেছে, কারও হাতে, কারও পেটে। সোহ্‌রাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. শফিউর রহমান বলেন, আন্দোলনে আহত হয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে  আমাদের হাসপাতালে ৫ শতাধিক মানুষ ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এদের বেশির ভাগই ছাড়পত্র নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। তবে এখনো ৬ জন ভর্তি রয়েছেন। আমরা তাদের বিষয়ে বিশেষ নজর রাখছি। আন্দোলনে আহত হয়ে অন্তত ২৭শ’ জন চিকিৎসা নিয়েছেন ঢাকা মেডিকের কলেজ হাসপাতালে। হাসপাতালটির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, আন্দোলন চলাকালীন অনেকেই  হাসপাতালের ইমার্জেন্সি থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন। কাউকে অন্য হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে। আর গুরুতর ৮৯০ জন বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। এখনো বেশ কয়েকজন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের জন্য আলাদা ডেডিকেটেড ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তাদের জন্য সার্বক্ষণিক ডিউটি ডাক্তার ও নার্স রয়েছেন।

mzamin

সরজমিন মৌচাক: লিলি প্লাজা মার্কেট দখলের অভিযোগ

রাজধানীর মৌচাকের ‘লিলি প্লাজা’ মার্কেটটি অবৈধভাবে দখল করে নেয়ার অভিযোগ করেছে এর মালিকপক্ষ। ভবনটির উন্নয়নে একটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল মালিকপক্ষ। কিন্তু ওই প্রতিষ্ঠান চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে রাজনৈতিক ও ক্যাডার শক্তি দিয়ে দখলে নিয়ে এর উন্নয়ন কাজ শুরু করেছে। আগের সরকারের সময়ে ছাত্রলীগ-যুবলীগের লোকজনকে নিয়ে ডেভেলপার কোম্পানি দখল চেষ্টা চালালেও তা পারেনি। সরকার পরিবর্তনের পর অন্য একটি রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সহায়তায় এবার মার্কেট দখলে নিয়ে তা ভাঙার কাজ শুরু করেছে। আদালতের নির্দেশনা অমান্য করে তারা এই কাজ করে যাচ্ছে। সরজমিন এলাকা ঘুরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে মার্কেটটি দখলের সত্যতা মিলেছে।

ড. মির্জা মাসুদ হোসেন এই মার্কেটের স্বত্বাধিকারী ছিলেন। তিনি ২০২১ সালে মারা যান। মার্কেটটিতে ছিল কয়েকশ’ দোকান। মির্জা মাসুদ মারা যাওয়ার পর তার স্ত্রী মোসলেমা আক্তার মার্কেটটি উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেন। তাদের একমাত্র আয়ের উৎস ছিল এই মার্কেটটি। ২০২২ সালে ভিভো বিল্ডার্স নামে একটি ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে বহুতল ভবন নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ হন। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ভিভো বিল্ডার্সের চেয়ারম্যান আব্বাস উদ্দীন আহম্মেদ ও এমডি জুয়েল মুন্সী প্রতারণার আশ্রয় নেন বলে অভিযোগ করেন মোসলেমা আক্তার।

বর্তমানে ভিভো বিল্ডার্স মার্কেটটি দখলে নিয়ে ‘লিলি প্লাজা’ নাম পরিবর্তন করে ‘মৌমাছি টাওয়ার’ নামে সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়েছেন। বহুতল ভবন নির্মাণে ভবনটি ভাঙার কাজ চলমান রয়েছে। চুক্তি ভঙ্গ করায় ভিভো ডেভেলপারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলাও করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারটি।

ভিভো ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী সাইনিং মানির ৬ কোটি টাকা তিন কিস্তিতে পরিশোধ করার কথা ছিল। প্রথম কিস্তির ২ কোটি টাকা আম-মোক্তারনামা দলিল হওয়ার পর দেয়ার কথা থাকলেও মাত্র ১৩ লাখ টাকা এবং দুইটি দোকানের অগ্রীম গ্রহণ পরিশোধ বাবদ ২০ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা প্রদান করে ওই কোম্পানি। অবশিষ্ট টাকার বিপরীতে আইএফআইসি ব্যাংকের ৪টি চেক প্রদান করলেও সবকটি চেক ডিজঅনার হয়। ভিভো ডেভেলপার কোম্পানি থেকে লিলি প্লাজার মালিকপক্ষ শুধুমাত্র ১৩ লাখ টাকা ছাড়া আর কোনো টাকা পায়নি। ডেভেলপার কোম্পানি শর্তানুযায়ী কোনো টাকা না দিয়ে রাতের বেলায় এলাকার কিছু ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী বাহিনীকে নিয়ে লিলি প্লাজায় একটি সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয় এবং এই সন্ত্রাসী বাহিনী লিলি প্লাজার দোকান ও অফিসের লোকজনদের ভয়ভীতি দেখিয়ে দোকান অফিস ছেড়ে চলে যেতে বলে।

আদালতে মামলা ও জিডি সূত্রে জানা যায়, লিলি প্লাজা মার্কেট ৯৩ নিউ সার্কুলার রোড, মালিবাগ, রমনা ঢাক-১২১৭ এর ওয়ারিশসূত্রে মালিক মোসলেমা আক্তার মির্জা, তার ছেলে মির্জা মুন্নাফ বেগ ও মেয়ে নাহরিন মির্জা। মার্কেটটি ভেঙে বহুতল ভবন নির্মাণ করার জন্য ২০২২ সালে ৪ঠা এপ্রিল ভিভো বিল্ডার্স কোম্পানির সঙ্গে ১৮/সি ৪র্থ তলা র‌্যাকিং স্ট্রিট ওয়ারী, ঢাকা-১২০৩ এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক মোসলেমা ও তার ছেলে ভিভো ডেভেলপার কোম্পানির এমডি মো. জুয়েল মুন্সীকে দলিল নং-১৮৩৮ মূলে রেজিস্ট্রি পাওয়ার করে দেয় এবং মেয়ে নাহরিন মির্জা ২০২২ সালের ২৬শে জুন রেজিস্ট্রি পাওয়ার নামা দলিল নং-৩৩৮৮ মূলে রেজিস্ট্রি পাওয়ার করে দেন কিন্তু ভিভো বিল্ডার্স চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে তাদের সঙ্গে প্রতারণা করার কারণে ২০২২ সালের ১লা ডিসেম্বর পাওয়ার অব অ্যাটার্নি আইনে ২০২২ এর ৩ উপধারা মোতাবেক পাওয়ার নামা দলিল দুইটি বাতিলের জন্য লিগ্যাল নোটিশ প্রদান করে এবং ২০২৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা জেলার ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে উপরোক্ত দুইটি রেজিস্ট্রি পাওয়ার নামা বাতিলের জন্য দেওয়ানি মোকাদ্দমা নং-১৫৩/২০২৩ দায়ের করেছেন মোসলেমা আক্তার মির্জা।

সূত্র জানায়, লিলি প্লাজা ও জমির মালিক মির্জা মোসলেমা আক্তার জমিতে মার্কেট করার উদ্দেশ্যে ভিবো ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তিপত্র দলিল সম্পাদন করেছিলেন। বিনিময়ে ভিভো ডেভেলপার মোসলেমাকে নগদ কিছু অর্থসহ দেড় কোটি টাকার কয়েকটি চেক প্রদান করেছিল। কিন্তু সবগুলো চেক ক্যাশ না হওয়ায় বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। বিরোধ মীমাংসার জন্য মার্কেট কমিটি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা করে দিয়ে এই মর্মে জানিয়েছিল যে, দ্রুত সময়ের মধ্যে চেকগুলো ক্যাশ করে ভিভো বিল্ডার্স এবং এরপরে ভবন নির্মাণে প্লান পাস করাবে। কিন্তু সমঝোতার পরেও ভিভো ডেভেলপার পাওনা টাকা দিতে ব্যর্থ হলে লিলি প্লাজার মালিক মির্জা মোসলেমা বাধ্য হয়ে ভিভো ডেভেলপারের দেয়া সবগুলো চেক ডিজঅনার করে আদালতে মামলা করেন যার মিস মোকাদ্দমা মামলা নং-১৫৩/২০২৩ইং। এরপরেও ভিভো ডেভেলপার আইনের তোয়াক্কা না করে জোরপূর্বক লিলি প্লাজা মার্কেটটি দখলে নিতে বিগত আওয়ামী সরকারের সময়ে ছাত্রলীগ, যুবলীগসহ কিছু অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নিয়ে দখলে নেয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

ভিভো বিল্ডার্সের মালিকরা আওয়ামী লীগ সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাতারাতি ভোল পাল্টিয়ে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে লিলি প্লাজায় অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। এই হামলায় মদত দিয়ে সরাসরি অংশ নিয়েছেন লিলি প্লাজার ভাড়াটিয়া জাহাঙ্গীর আলম ওরফে বোমা জাহাঙ্গীর ও ম্যানেজার নজরুল ইসলাম বাবলু এবং যুবদল নেতা মোস্তফা। এ সকল ব্যক্তিদের নিয়ে ভিভো বিল্ডার্স কর্তৃপক্ষ অস্ত্রের মুখে মার্কেটটি দখল করে নিয়েছে বলেও জানান তারা।

সূত্র মতে, প্রস্তাবিত মার্কেটের জায়গার পরিমাণ কম-বেশি ৭ কাঠা। প্রতি কাঠা সাইনিং বাবদ ডেভেলপার জমির মালিককে ১ কোটি টাকা করে দেয়ার কথা। নির্মাণাধীন বিল্ডিং’র আনুপাতিক হার হবে ৫০ শতাংশ জমির মালিক ও ৫০ শতাংশ ডেভেলপার।
মোসলেমা আক্তার জানান, উপায় না পেয়ে সন্তানদের সম্পদ রক্ষার জন্য ঢাকা ১ম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে ভিভো বিল্ডার্স’র বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি চুক্তিপত্র বাতিলের জন্য মামলা করি। মামলা নম্বর-১৫৩/২০২৩। এরপর তারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে লিলি প্লাজার মালিকপক্ষ জীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে রমনা থানায় ভিভো বিল্ডার্সের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি একটি জিডি করে। জিডি নম্বর-১০৫৯।

গতকাল সরজমিন দেখা যায়, ভিভো বিল্ডার্স কর্তৃক লিলি প্লাজা মার্কেটটি ভাঙার কাজ করছে। ভবনটির সামনে ‘মৌমাছি টাওয়ার’ নামে একটি সাইনবোর্ড টানানো। ভবনের সামনে পাহারারত অবস্থায় দেখা যায় কয়েকজন ব্যক্তিকে। ৩৪ বছর ধরে ওই ভবনটিতে নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করেন পাটোয়ারী নামে এক ব্যক্তি। তিনি বলেন, এই ভবনটি ভাঙার কাজ চলছে। এখানে ১৫-১৬ তলা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এটা বহু পুরনো মার্কেট। আগে লিলি প্লাজা নামে ছিল।

আশপাশে থাকা বেশ কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মী ও ব্যবসায়ীরা বলেন, বেশ কয়েক বছর ধরে এই লিলি প্লাজায় দু’পক্ষের বিরোধ চলছে। হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটেছে। এখানে অনেক ব্যবসায়ীর রুটি-রুজির জায়গা ছিল। বেশির ভাগ ব্যবসায়ী পাঞ্জাবির আইটেমগুলো বিক্রি করতেন। ভবনটিকে ঘিরে একের পর এক ঘটনা ঘটে চলছে। এখন আবার দেখা যাচ্ছে ভবনের সামনে লিলি প্লাজার পরিবর্তে নতুন সাইনবোর্ড মৌমাছি টাওয়ার। অনেক ব্যবসায়ী দোকানে থাকা তাদের মালামাল ঠিকমতো নিতে পারেননি। বিল্ডিং ভাঙার কারণে যে যেদিকে পারছে চলে গেছে।

মোসলেমা আক্তার মির্জা মানবজমিনকে বলেন, বহুতল ভবন নির্মাণে আমি ভিভো বিল্ডার্স ডেভেলপার কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হই। কিন্তু তারা চুক্তি ভঙ্গ করায় আমি তাদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছি।   

ভুক্তভোগী এই নারী বলেন, বিষয়টি নিয়ে থানা  ও সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কারা সম্প্রতি মার্কেট দখলে সহায়তা করেছে, হামলা করেছে তাদের সবার নাম পরিচয় আছে। কেউ কেউ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত। পুলিশ বা প্রশাসন তাদের নাম জানতে চাইলে সরবরাহ করা হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিভো বিল্ডার্স ডেভেলপার কোম্পানির চেয়ারম্যান আব্বাস উদ্দীন আহম্মেদ মানবজমিনকে বলেন, অভিযোগগুলো সঠিক নয়। আমার কাছে সকল প্রকার কাগজপত্র রয়েছে।

ভিভো বিল্ডার্স ডেভেলপার কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এমডি) মো. জুয়েল মুন্সী মানবজমিনকে বলেন, দেশে বর্তমানে যে আইন তাতে যে কেউ চাইলে অন্য জনের বাড়ি দখল করতে পারে না। তিনি বলেন, আমরা এখন কোনো ডেভেলপার না, জমির মূল মালিক। মোসলেমার সঙ্গে ডিল হয়েছে ১৪তলা ভবন নির্মাণের। তার ননদের অংশটা আমরা সরসরি ক্রয় করেছি। পুরাতন ভবন ভেঙে আমরা ১৪তলা বিল্ডিং করবো মোসলেমা পাবেন ৫০ শতাংশ আর আমরা পাবো ৫০ শতাংশ।

লিলি প্লাজা মার্কেটের ম্যানেজার নজরুল ইসলাম বাবলু তার বিরুদ্ধে উঠা অভিযোগের বিষয়ে বলেন, আমি লিলি প্লাজা মার্কেটের ম্যানেজার আমি কেন দখলে সহযোগিতা করবো। 

mzamin

গণহত্যার জন্য আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব আল্লামা মুহাম্মদ মামুনুল হক বলেছেন, সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিষিদ্ধে প্রমাণ করে শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। তাই সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে দেশে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার নেই। দেশে গণহত্যা ও সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। এটাই এখন মানুষের দাবি। গতকাল দুুপুরে শহরের এন. আহাম্মদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে খেলাফত মজলিসের গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মামুনুল হক বলেন, বিএনপি-জামায়াতসহ সকল রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এখনো ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। ষড়যন্ত্র চলছে। তাই সামনের দিনগুলোতে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। নয় তো যে স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে, সেটা ছিনতাই হতে পারে। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মহান বিজয় কয়েকমাসের মধ্যে ছিনতাই করে নিয়েছে ভিনদেশি একটি রাষ্ট্র। বাংলাদেশের হাজার বছরের ঐতিহ্য এবং এই দেশের ৭ কোটি মানুষের ইচ্ছা এবং অভিপ্রায়ের বিরুদ্ধে ভিনদেশি আরেকটি রাষ্ট্রের সংবিধানের মূলনীতিগুলো কলমের খোঁচায় একটি প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে স্থাপন করা হয়েছে। আর এর মাধ্যমে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের একটি নতুন চেতনা তৈরি করা হয়েছে। এর চেয়ে দুঃখের বিষয় হলো ১৯৭২ সালের চেতনাকে সবসময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে ৭১ সালের চেতনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এইভাবে ৭২ সালের চেতনার মাধ্যমে ৭১ সালের চেতনাকে ছিনতাই করা হয়েছে। গত ৫০ বছর ধরে খুনি হাসিনা নিজ দলের নেতাকর্মী ও দেশের মানুষের ওপর প্রতিশোধ নিচ্ছে।

খেলাফত মজলিসের মহাসচিব বলেন, ছাত্র-জনতার ওপর গণহারে যেভাবে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে, এটা কোনো সভ্য দেশে হতে পারে না। শুধুমাত্র ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে বছরের পর বছর হত্যা, গুম ও খুন নির্যাতন চালিয়েছে স্বৈরাচার হাসিনা। কিন্তু ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। এদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ভারতে। ভারত কীভাবে হাজার হাজার মানুষ খুনের আসামি শেখ হাসিনাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে- এটাই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ ভারতের প্রশ্রয়ে শেখ হাসিনা সেখানে বসে দেশের বিরুদ্ধে, জনগণের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ বানাতে পাঁয়তারা করছে। কিন্তু দেশের মানুষ কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না। অনতিবিলম্বে ইন্টারপোলের মাধ্যমে খুনি শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের দেশে এনে বিচার করতে হবেই হবে।

খেলাফত মজলিসের জেলা শাখার সভাপতি মাওলানা লোকমান হোসেনের সভাপতিত্বে এ সময় যুগ্ম-মহাসচিব মাওলানা জালাল উদ্দিন আহমদে, তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, আতাউল্যাহ আমিন, সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুর রহমান হেলাল, মো. ফয়সালসহ কেন্দ্রীয় ও জেলা-উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।

mzamin

ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ, কার্যক্রম চালালে হতে পারে যে সাজা by রাশিম মোল্লা

বিগত আওয়ামী লীগ সরকার গত ১লা আগস্ট নিষিদ্ধ করেছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অঙ্গসংগঠন। প্রায় তিন মাসের ব্যবধানে বুধবার রাতে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। আইনজীবীদের দেয়া তথ্যমতে, যে আইনে জামায়াত-শিবিরকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল সেই একই আইনে ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে সিনিয়র সচিব ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেন স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, সরকার ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯’ এর ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এর প্রদত্ত ক্ষমতাবলে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ‘বাংলাদেশ ছাত্রলীগ’কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো এবং উক্ত আইনের তফসিল-২ এ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ নামের ছাত্র সংগঠনকে নিষিদ্ধ সত্তা হিসেবে তালিকাভুক্ত করলো।

২০০৯-এর ধারা ১৮তে  নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তালিকাভুক্তকরণ সম্পর্কে বলা হয়েছে। এই ধারার ১৮ (১) উপধারায় বলা হয়েছে- এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, সরকার, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কার্যের সঙ্গে জড়িত রয়েছে মর্মে যুক্তিসঙ্গত কারণের ভিত্তিতে, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, উক্ত ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারিবে। ১৮(২)-এ বলা হয়েছে, সরকার, সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা, যে কোনো ব্যক্তি বা সত্তাকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে বা তফসিল হতে বাদ দিতে পারিবে অথবা অন্য কোনোভাবে তফসিল সংশোধন করিতে পারিবে।
ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী মো. মহসিন রশিদ। তিনি বলেন, ছাত্রলীগ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। এই সংগঠনের নেতা-কর্মীরা বহু মানুষকে নির্বিচারে খুন করেছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের লাশ দাফন ও গোসলেও বাধা দেয়ার সংবাদ মিডিয়ায় দেখেছি। তিনি বলেন, ছাত্রলীগে এক সময় মেধার মূল্যায়ন ছিল। মেধার ভিত্তিতে সবকিছু হতো। কিন্তু ছাত্রলীগ এখন হেন কোনো কাজ নেই যা তারা করে নাই। ছাত্রলীগ ধর্ষণের সেঞ্চুুরি উৎসবও পালন করেছে। গত ১৫/২০ বছর ধরে টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল ও মাদকের মতো ঘৃণিত কর্মকাণ্ডে অতিমাত্রায় জড়িয়ে পড়েছে। শুধু তাই নয়, ছাত্রলীগের নারী কর্মীরাও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ছাত্রলীগের নারী কর্মীরা চরিত্রহীন ও সন্ত্রাসী কর্মাকাণ্ডেও জড়িয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, আইনে বলা আছে কি কি করলে একটি সংগঠনকে নিষিদ্ধ করা যায়। আর ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হতে যা যা করা লাগে তার সব কিছুই করেছে। আমি মনে করি আরও আগেই ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা দরকার ছিল। অনেক কোমলমতী ছাত্র এই সংগঠনে যুক্ত হয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। মূল সংগঠন আওয়ামী লীগও  ছাত্রলীগকে নিবৃত করতে পারেনি। তিনি নিষিদ্ধ এই সংগঠনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা রুজু ও বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানান। একইসঙ্গে এই সংগঠনের কোনো সম্পদ থাকলে তা রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত ও ব্যাংক একাউন্ট থাকলে ফ্রিজ করার আহ্বান জানান।  

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মামুন মাহবুব মানবজমিনকে বলেন, জুলাই-আগস্টে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দমন করতে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে। তাদের হামলা থেকে নারী শিক্ষার্থীরা পর্যন্ত রেহাই পায়নি। গত ১৫/২০ বছর ধরে ছাত্রলীগ হত্যা, ধর্ষণ, চাঁদাবাজির মাত্রা চরম পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ছাত্রলীগের নারী কর্মীরাও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়েছিল। তাদের নিষিদ্ধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তবে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করার চাইতে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতাদের বিচারেরর মুখোমুখি করে বিচারিক প্রক্রিয়ায় ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলে আরও ভালো হতো। বিষয়টি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারতো না।        
এ বিষয়ে সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. শাহজাহান সাজু মানবজমিনকে বলেন, গত ১লা আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৮(১) ধারা অনুযায়ী জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির ও তাদের অন্যান্য অঙ্গসংগঠনকে নিষিদ্ধ করে। ওই একই আইনের একই ধারায় বুধবার রাতে অন্তর্বর্তী সরকার ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। একইভাবে অন্য কোনো ছাত্রসংগঠনকে নিষিদ্ধ করতে পারে। তিনি বলেন, এখন থেকে ছাত্রলীগ তার কোনো কর্মসূচি পালন করতে পরবে না। কর্মসূচি পালন করলে তা আইনত অপরাধ। তাদেরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তার করতে পারবে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট বার সংবিধান সংরক্ষণ কমিটির সভাপতি শাহ আহমেদ বাদল বলেন, আগের ছাত্রলীগ আর এখনকার ছাত্রলীগ এক নয়। ছাত্রলীগ এখন ভোগবাদী, সন্ত্রাসী ও নারী ধর্ষণকারী হিসেবে পরিচিত। এই সংগঠনটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট হতে সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করছে। তারা আওয়ামী লীগের গণতন্ত্র ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নে লাঠিয়াল বাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে। গত জুলাই-আগস্টে ছাত্রদের ন্যায়সঙ্গত দাবিতে করা আন্দোলনকে ব্যাহত করতে নির্বিচারে হামলা করেছে। ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের এক নেতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে গুলি ছোড়ার ছবি পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করা সময়ের দাবি ছিল।

নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার শাস্তি:
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি সন্ত্রাসী কাজ করলে, সন্ত্রাসী কাজে অংশ নিলে, সন্ত্রাসী কাজের জন্য প্রস্তুতি নিলে বা সন্ত্রাসী কাজ সংঘটনে সাহায্য বা উৎসাহ দিলে, সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত কাউকে সমর্থন বা সহায়তা দিলে সেই ব্যক্তি, সত্তা বা সংগঠন সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত বলে বিবেচিত হবে। সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ ড. আবুল হোসেন খন্দকার মানবজমিনকে বলেন, সন্ত্রাস দমন আইনের ধারা অনুযায়ী সত্তা বলতে কোনো আইনি প্রতিষ্ঠান, সংবিধিবদ্ধ সংস্থা, বাণিজ্যক বা অবাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, গোষ্ঠী, অংশীদারী কারবার, সমবায় সমিতিসহ এক বা একাধিক ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত যে কোনো সংগঠনকে বোঝানো হয়েছে। সংগঠন নিষিদ্ধ করা মানে হচ্ছে- এ সংগঠন কোনো কার্যক্রম চালাতে পারবে না। নিষিদ্ধ কোনো সংগঠন যদি কার্যক্রম কোনোভাবে চালু রাখে, তাহলে এর বিরুদ্ধে সরকার যে কোনো রকম স্টেপ নিতে পারে।

এই আইনের ৮ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ১৮ এর অধীন কোনো নিষিদ্ধ সত্তার সদস্য হন বা সদস্য বলিয়া দাবি করেন, তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন এবং উক্তরূপ অপরাধ সংঘটনের জন্য তিনি অনধিক ছয় মাস পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ড, অথবা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন। ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি ধারা ১৮ এর অধীন কোনো নিষিদ্ধ সত্তাকে সমর্থন করিবার উদ্দেশ্যে কাউকে অনুরোধ বা আহ্বান করেন, অথবা নিষিদ্ধ সত্তাকে সমর্থন বা উহার কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও উৎসাহিত করার উদ্দেশ্যে কোনো সভা আয়োজন, পরিচালনা বা পরিচালনায় সহায়তা করেন, অথবা বক্তৃতা প্রদান করেন, তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন। ৯(২) ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নিষিদ্ধ সত্তার জন্য সমর্থন  চেয়ে অথবা উহার কর্মকাণ্ডকে সক্রিয় করার উদ্দেশ্যে কোনো সভায় বক্তৃতা করেন অথবা রেডিও, টেলিভিশন অথবা কোনো মুদ্রণ বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে কোনো তথ্য সমপ্রচার করেন, তাহলে তিনি অপরাধ সংঘটন করিবেন। ৯(৩) ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) অথবা (২) এর অধীন কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তাহলে তিনি অনধিক সাত বৎসর ও অন্যূন দুই বৎসর পর্যন্ত যে কোনো মেয়াদের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ড ও আরোপ করা যাবে। ১০ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন অপরাধ সংঘটনের ষড়যন্ত্র করেন, তাহলে তিনি অপরাধ করেছেন বলে গণ্য হবেন এবং তিনি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির দুই তৃতীয়াংশ মেয়াদের যে কোনো কারাদণ্ডে, অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন এবং যদি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে অপরাধের শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব চৌদ্দ বৎসরের কারাদণ্ড হইবে, কিন্তু উহা ৪ (চার) বৎসরের কম হবে না।

১১ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি বা সত্তা এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনের প্রচেষ্টা করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি বা সত্তা অপরাধ সংঘটন করিয়াছেন বলে গণ্য হবে এবং উক্ত ব্যক্তি বা উক্ত সত্তার প্রধান, তিনি চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী বা অন্য যে কোনো নামে অভিহিত হউক না কেন, উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির দুই-তৃতীয়াংশ মেয়াদের যে কোনো কারাদণ্ডে অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং যদি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে উক্ত অপরাধের শাস্তি হবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর ও অন্যূন ৪ (চার) বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড, এবং উহার অতিরিক্ত সংশ্লিষ্ট সত্তার বিরুদ্ধে ধারা ১৮ অনুসারে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।

১২ ধারায় বলা হয়েছে- যদি কোনো ব্যক্তি বা সত্তা এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে- (ক) সাহায্য বা সহায়তা করে; বা (খ) সহায়তাকারী হিসেবে অংশগ্রহণ করে; বা (গ) অন্যদেরকে সংগঠিত বা পরিচালনা করে; বা (ঘ) অবদান রাখে; তাহলে উক্ত ব্যক্তি বা সত্তা অপরাধ সংঘটন করিয়াছেন বলে গণ্য হবে এবং উক্ত ব্যক্তি বা উক্ত সত্তার প্রধান, তিনি চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রধান নির্বাহী বা অন্য যে কোনো নামে অভিহিত হউক না কেন, উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত সর্বোচ্চ শাস্তির দুই-তৃতীয়াংশ মেয়াদের যে কোনো কারাদণ্ডে, অথবা অর্থদণ্ডে, অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং যদি উক্ত অপরাধের জন্য নির্ধারিত শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাহলে উক্ত অপরাধের শাস্তি হইবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব ১৪ (চৌদ্দ) বৎসর ও অন্যূন ৪ (চার) বৎসরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা যাবে।

সন্ত্রাস দমন আইনে কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যুন ৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনজীবীরা বলেন, দোষী প্রমাণিত হলে অপরাধের গুরুত্ব অনুসারে এই আইনের আলোকে শাস্তি দেয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

mzamin

মৌসুমের শেষ প্রান্তেও ডেঙ্গুর প্রকোপ

অক্টোবরের শেষে এসেও ডেঙ্গুর প্রকোপ কমছে না। চলতি বছর সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যু দেখা যাচ্ছে এই মাসেই। চলতি মাসেই মারা গেছেন ১০৬ জন। এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বর এখন আর শুধু বর্ষা মৌসুমের রোগ নয়। ধরন বদলে সারা বছর জুড়ে দাপট দেখাচ্ছে। এমনকি শীতেও ছড়াচ্ছে প্রকোপ। আগে রাজধানী ঢাকায় বেশি দেখা দিলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিভাগীয় শহরগুলোতেও। জানুয়ারি থেকে প্রতি মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে কমবেশি মৃত্যু হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১লা জানুয়ারি থেকে ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত ডেঙ্গু সংক্রমণে মারা গেছেন ২৬৯ জন। এখন পর্যন্ত একক বছরে মৃত্যুর সংখ্যা বিচারে এটা তৃতীয় সর্বোচ্চ। চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৫৪ হাজার ৭০২ জন। অক্টোবরে আক্রান্ত হয়েছেন ২৩ হাজার ৭৬৪ জন।

চলতি বছর সর্বোচ্চ আক্রান্ত ও মৃত্যু দেখা যাচ্ছে অক্টোবরে। অক্টোবরের প্রথম ২৫ দিনেই মারা গেছেন ১০৬ জন। এর আগের মাস সেপ্টেম্বরে ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া আগস্টে ২৭ জন, জুলাইয়ে ১২ জন, জুনে ৮ জন, মে মাসে ১২ জন, এপ্রিলে ২ জন, মার্চে ৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন, জানুয়ারিতে ১৪ জন মারা যান।

কীটতত্ত্ববিদরা আগে থেকেই অক্টোবরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বর থেকেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় উড়ন্ত মশা মারার দিকে নজর দেয়ার পরামর্শও দেয়া হয়। তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রমের দেখা মেলেনি।

কীটতত্ত্ববিদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, আমি আগেও বলেছিলাম সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়বে। এ সংখ্যাটি হঠাৎ করে বাড়েনি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় প্রশাসন এখনো কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এ অবস্থায় অক্টোবরে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা আরও বাড়তে পারে।

পুরুষরা ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হলেও বেশি মারা যাচ্ছেন নারীরা। চলতি বছর এখন পর্যন্ত মোট আক্রান্তের ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ পুরুষ ও ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ নারী। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৩ দশমিক ৫ শতাংশ নারী ও ৪৬ দশমিক ৫ শতাংশ পুরুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুতে মারা যাওয়া নারীদের বয়সভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী নারীর মৃত্যু হয়েছে বেশি। ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত মোট নারীর মৃত্যু ১৪৩ জন। যার মধ্যে ২১ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ৪৯ জন। এ ছাড়া ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সী নারী ২০ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এ পর্যন্ত সর্বোচ্চ সংক্রমণ হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে। অন্যদিকে, মৃত্যু বেশি হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। উত্তর ও দক্ষিণে আক্রান্তের সংখ্যা অনেকটা কাছাকাছি। উত্তর সিটি করপোরেশনে ১১ হাজার ৪৪৯ জন এবং দক্ষিণে ১১ হাজার ৯০ জন। দক্ষিণে মৃত্যু ১৩৩ জন। উত্তরে মৃত্যু হয়েছে ৪৭ জনের। এর পরের অবস্থানে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগ, সেখানে আক্রান্ত ৯ হাজার ৮৬৫ জন, মৃত্যু ২৬ জনের।

১লা জানুয়ারি থেকে ২৫শে অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা বিভাগে মোট আক্রান্ত ৮ হাজার ৮২৭ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ১০ জনের। চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত ৯ হাজার ৮৬৫ জন, মৃত্যু ২৬ জনের। বরিশাল বিভাগে আক্রান্ত ৪ হাজার ৭২৯ জন, মৃত্যু ৩২ জনের। খুলনা বিভাগে আক্রান্ত ৪ হাজার ৬৮৬ জন, যার মধ্যে মারা গেছেন ১৬ জন। ময়মনসিংহ বিভাগে ১ হাজার ৪৮৪ জন আক্রান্ত হলেও মৃত্যু হয়েছে ৩ জনের। এ ছাড়া রাজশাহী বিভাগে ১৫২৬ জন আক্রান্ত এবং মারা গেছেন ১ জন, রংপুরে ৮৬৩ জন ও সিলেট বিভাগে ১৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এই দুই বিভাগে কেউ মারা যাননি।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ডেঙ্গুতে সর্বোচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যু হয় ২০২৩ সালে। ওই বছর ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। গত বছরের সেপ্টেম্বরে এক মাসে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি ৩৯৬ জনের মৃত্যু হয়। ওই সময় ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন ৭৯ হাজার ৫৯৮ জন। সেপ্টেম্বরে মারা যান ৮০ জন।

mzamin

কেমন ছিল সালাউদ্দিনের ‘১৬ বছর’

অনেকের মতেই কাজী সালাউদ্দিন বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ফুটবল তারকা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি হিসেবে খেলোয়াড়ি জীবনের সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি তিনি। বিরাট তারকা খ্যাতি নিয়ে সভাপতি পদে ২০০৮ সাল থেকে টানা ১৬ বছর দায়িত্ব পালন করছেন। তার দীর্ঘ দায়িত্ব কালে দেশের ফুটবল তলানিতে গিয়ে পৌঁছায়। তার সময়ে ফিফা কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছেন বাফুফে সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ।  ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে অবনমন ঘটেছে জাতীয় ফুটবল দলের। তার ১৬ বছরে শুধু মেয়েদের সাফে চ্যাম্পিয়ন হওয়া ছাড়া বলার মতো কোনো ঘটনাই খুঁজে পাওয়া যাবে না বাংলাদেশের ফুটবলে।

র‌্যাঙ্কিংয়ে শুধুই অবনমন
২০০৮ সালের মে মাসের ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৭৫। বর্তমানে বাংলাদেশের ফিফা র‌্যাঙ্কিং ১৮৫। এক সময় বাংলাদেশের ফিফা র‌্যাঙ্কিং ২০০ ছুঁইয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ২০১৭ সালে ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ ছিল ১৯৭তম স্থানে, যা কিনা বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সর্বনিম্ন র‌্যাঙ্কিং।

জাতীয় দলের ব্যর্থতা
তার সময়ে জাতীয় দল সবচেয়ে ব্যর্থ। সাত সাফের ছয়টিতে গ্রুপ থেকে বাদ পড়েছে। তারপরও ২০১৯-এ বলেছিলেন তার দৃষ্টিতে ৫০ বছরের সেরা জাতীয় দল এটিই।  এ পর্যন্ত হওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ১৪টি আসরের মধ্যে ৯ বার চ্যাম্পিয়ন প্রতিবেশী দেশ ভারত। ভারত নিয়মিত খেলে এশিয়ান কাপে। অথচ বাংলাদেশ সাফেই চ্যাম্পিয়ন হতে পারে না ১৯ বছর। এমনকি সালাউদ্দিনের ১৬ বছরে একটি বার ফাইনাল খেলতে পারেনি বাংলাদেশ। সাফে সর্বশেষ চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ ২০০৩ সালে। কাজী সালাউদ্দিন সভাপতির দায়িত্ব নেয়ার ১৬ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ সাফল্য দুবার সেমিফাইনালে ওঠা। ২০১৬-তে থিম্পুতে এশিয়ান কাপ প্রাক-বাছাইয়ে ভুটানের কাছে হার বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় লজ্জা। সেটিও টপকে গেছে ক’দিন আগে অপেশাদার দল সিশেলসের কাছে হারে।  

সোহাগের নিষেধাজ্ঞা ও সালাম মুর্শেদীর জরিমানা
বাফুফে সভাপতি হিসেবে কাজী সালাউদ্দিন মাঠের ফুটবলে যতটা না আলোচনায় ছিলেন, এর চেয়েও বেশি আলোচনায় ছিলেন মাঠের বাইরের ঘটনায়। বাফুফের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর ফিফা তদন্ত করছিল, সেটাই কখনও স্বীকার করেননি কাজী সালাউদ্দিন। বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগ তার পক্ষে সাফাই দিতে জুরিখে ফিফা সদর দপ্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন তিন সহকর্মীকে নিয়ে। সেটাও নাকি জানতেন না বাফুফে সভাপতি! পরে বাফুফের বিভিন্ন খরচে অনিয়ম, জালিয়াতি ও মিথ্যাচারের অভিযোগে ফিফা ২০২৩ সালের ১৪ই এপ্রিল নিষিদ্ধ করে সোহাগকে। বাফুফের অর্থ কমিটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ে বাফুফের দ্বিতীয় ব্যক্তি সিনিয়র সহসভাপতি সালাম মুর্শেদীকে ফিফা ১৩ লাখ টাকা জরিমানা করে। বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে যা নজিরবিহীন।

কোচ পরিবর্তন
সালাউদ্দিনের ১৬ বছরে জাতীয় দলের কোচ পরিবর্তন হয়েছে ২৩ বার। কখনো দেশি, কখনো বিদেশি। কখনো স্থায়ী, কখনো অন্তর্বর্তী কোচের ওপর আস্থা রেখে, আবার আস্থা হারিয়েছেন।

ফিফার অনুদান বন্ধ অস্বীকার
তার শেষ মেয়াদে আর্থিক অনিয়ম আর অসংগতির কথা বারবার সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে অসংখ্য রিপোর্ট প্রকাশ হয়েছে। কিন্তু বারবারই যাকে ভুল আখ্যা দিয়েছেন সভাপতি।

সাংবাদিকদের নিয়ে বাজে মন্তব্য ও ক্ষমা চাওয়া
২০২৩ সালে এক আলোচনা সভার শুরুতে সাংবাদিকদের তাচ্ছিল্য করেন। এ সময় তাকে বলতে শোনা যায়, ‘জার্নালিস্টরা এখানে ঢুকতে গেলে তাদের আমার এখানে ফটো দিতে হবে তাদের মা-বাবার। আরেকটা কন্ডিশন হলো তারা বাপের ফটো পাঠাবে, জুতা পরা। ঠিক আছে (হাসি)? এটা হতে হবে মেন্ডেটরি। বাপের জুতা পরা ছবি থাকতে হবে।’ যদিও পরে তোপের মুখে পড়ে ক্ষমা চান তিনি।

নারী দলকে অলিম্পিক বাছাই খেলতে না পাঠানো
গত বছর এপ্রিলে সাফজয়ী নারী ফুটবল দলকে মিয়ানমারে অলিম্পিক বাছাইয়ে খেলতে না পাঠিয়ে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে পড়েন কাজী সালাউদ্দিন। এজন্য তারা ৯২ লাখ টাকা চেয়েছিল ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কাছে। মিয়ানমার যাওয়ার জন্য এত টাকা শুনে অনেকে ভ্রু কুঁচকাবেন। এরপরও মন্ত্রণালয়ের জবাবের অপেক্ষা না করে টাকা চাওয়ার মাত্র একদিন পরই বাফুফে সংবাদ সম্মেলন করে জানিয়ে দেয়, অর্থাভাবে দল পাঠাতে পারছে না। ফুটবল অঙ্গনে গুঞ্জন, সাবিনা খাতুনরা নিজেদের বেতনসহ সুযোগ সুবিধার দাবি জানিয়ে অনুশীলন বয়কট করেছিলেন। সেই শাস্তিই নাকি দিয়েছিলেন কাজী সালাউদ্দিন এভাবে দলকে অলিম্পিকে না পাঠিয়ে।

জেলার ফুটবলকে পাঠিয়েছেন হিমাগারে
তার ১৬ বছরের সময়কালে জেলা লীগ আয়োজনে দু-তিনবার জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে অর্থ দিয়েছেন সালাউদ্দিন। কিন্তু ওই পর্যন্তই। জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো সক্রিয় করতে পারেননি। লীগ না করলে শাস্তি দিতে পারতেন সংশ্লিষ্ট জেলাকে। অনেকের মতে, সেটা করেননি নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই। ফলে জেলার কর্মকর্তারা গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়েছেন। তাদের অনেকেই বাফুফের নির্বাচনের সময় ঢাকায় এসে ‘উপঢৌকন’ নিয়ে বাড়ি ফেরেন বলে গুঞ্জন আছে।

mzamin

কুলাউড়ায় অসহায়-দুস্থদের পাশে সুইজারল্যান্ড প্রবাসী

কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বপ্ন গড়ি প্রবাসী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সুইজারল্যান্ড প্রবাসী দানবীর বাবু এআর রবি দাসের পক্ষ থেকে অসহায়, দুস্থ মানুষের মধ্যে হুইলচেয়ার, শাড়ি, লুঙ্গিসহ প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকার নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। মাসব্যাপী বিতরণ কার্যক্রমে শতাধিক ব্যক্তির হাতে শাড়ি, লুঙ্গি ও চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। গতকাল আর্থিকভাবে অক্ষম ৪ জনকে হুইলচেয়ার দেয়া হয়। এ বিষয়ে সুইজারল্যান্ড বিএমএফ’র টেকনিক্যাল ম্যানেজার বাবু রবি দাস বলেন, একযুগ থেকে প্রবাসের আয়ের একটা অংশ গরিব-দুঃখীদের জন্য রেখে দেই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে থাকবেও। বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- সাগর কুর্মী, কানাই লাল দাস, রাজু দাস, পলাশ চক্রবর্তী, সজল বড়কুর্মী, জসিম উদ্দিন, মাসুক মিয়া, স্বপন মল্লিক, বাবুল দাস প্রমুখ।
mzamin

সিলেট সেটেলমেন্ট: বসে বসে বেতন নিচ্ছেন অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী by ওয়েছ খছরু

সিলেট সেটেলমেন্টের ভূমি জরিপ কাজ প্রায় ৮ বছর আগেই শেষ হয়েছে। গেজেট হয়ে প্রিন্ট পর্চাও এসে গেছে। বলতে গেলে সিলেট সেটেলমেন্টে রুটিন কাজ ছাড়া তেমন কোনো কাজও নেই। জরিপের সময় চালু করা অস্থায়ী উপজেলা অফিসও প্রায় সব বন্ধ। এই অবস্থায় বসে বসে বেতন নিচ্ছেন সিলেট সেটেলমেন্টের অর্ধশত কর্মকর্তা-কর্মচারী। তবে সেটেলমেন্টে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অনেকেরই অবসরের সময় এসে গেছে। এ কারণে তাদের কর্মস্থলে রাখা হয়েছে। যাদের অবসরের সময় এখনো বাকি তাদের অনেককেই ইতিমধ্যে বদলি করা হয়েছে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের অধীনে সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের জরিপ কার্যক্রম ১৯৮৮ সালের দিকে বিভাগের ৩৯ উপজেলায় শুরু হয়। এর মধ্যে প্রথমে মাঠ জরিপের কার্যক্রম চালানো হয়। সর্বশেষ ২০১৫ সালের দিকে এসে জরিপের চূড়ান্ত প্রকাশনা পর্যন্ত সব কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। বর্তমানে কয়েকটি মৌজার বাঁধাইয়ের কাজ চলছে। জরিপের শুরুতে কাজ সহজতর করার জন্য সিলেট সেটেলমেন্ট কার্যালয় থেকে জোনের ৩৯ উপজেলায় সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার নিয়োগ করে অস্থায়ী অফিসও খোলা হয়েছিল। কিন্তু এখন কাজ না থাকায় ওই অফিসগুলোরও দৃশ্যমান অস্তিত্ব এখন আর নেই। উপজেলা পর্যায়ের অনেক অফিসের কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। কিছু কিছু অফিসে বছরের পর বছর ধরে তালা ঝুলছে।

কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব অফিসে না গিয়ে বাড়িতে বসে থাকছেন। শুধুমাত্র তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করার জন্য বার বার ধরনা দিলেও অনেক অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেখা মিলছে না। অনেকেই আবার বাড়িতে বসে সিল ব্যবহার করে তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করছেন বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। কর্মচারীরা জানিয়েছেন, জরিপ কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে ২য় শ্রেণির কর্মকর্তা ১৫ জন, ৩য় শ্রেণির কর্মচারী ৩৯ জন ও ৪র্থ শ্রেণির কর্মচারী ৫২ জন কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যেই অর্ধেকের বেশি হচ্ছেন পুরাতন কর্মকর্তা-কর্মচারী। আর অর্ধেক হচ্ছেন বিভিন্ন সময় নিয়োগপ্রাপ্ত কিংবা বদলি হয়ে আসা কর্মকর্তা-কর্মচারী। এদিকে- ২০২৩ সালের ১লা নভেম্বর ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারিকৃত নির্দেশনা উল্লেখ করে পরিচালক (ভূমি রেকর্ড) মো. মোমিনুর রশীদ স্বাক্ষরিত আদেশে সিলেট জোনে কর্মহীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামের তালিকা প্রেরণ করার জন্য জোনাল অফিসারকে নির্দেশ প্রদান করেন। ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, খুলনা ও বরিশাল জোনে জনবল স্বল্পতার কারণে অনেক কাজ এগিয়ে নেয়া যাচ্ছে না। সে কারণে কর্মহীন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করতে এই তালিকা চাওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। চিঠি প্রাপ্তির পর সিলেট জোনাল সেটেলমেন্ট কার্যালয় থেকে ৩৯ উপজেলা অফিসে উপ-সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসার, সার্ভেয়ার, সিটকিপার, কম্পিউটার, পেশকার, রেকর্ডকিপার, খারিজ সহকারী, কপিস্ট-কাম-বেঞ্চ সহকারী, যাচ মোহরার, প্রসেস সার্ভার, অফিস সহায়ক ও চেইনম্যান পদে সর্বমোট ১০৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর তালিকা পাঠানো হয়।

তালিকা মোতাবেক অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ২৪ জনকে বিভিন্ন জোনে বদলি ও পদায়ন করেন। তবে ৩য় শ্রেণির ১৪ জন দুর্নীতিবাজ কর্মচারীর বদলির আদেশ পুনরায় বাতিল করা হয়েছে। বদলির বাতিল কিংবা তালিকা থেকে বাদ পড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া-১০ জনের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারী বদলি হওয়া কর্মস্থলে না গিয়ে নিজ নিজ এলাকায় বদলি হয়ে চলে গেছেন। ওই সময় সেটেলমেন্টের আব্দুল মান্নান ও সাধন চাকমাকেও বদলি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে তারা তাদের বদলি ঠেকিয়ে নিজ কর্মস্থলেই থেকে যান। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করে মাসের পর মাস কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেছেন। আবার মাস শেষে ঠিকই বেতন-ভাতা উত্তোলন করছেন। বিষয়টি অধিদপ্তরের কর্তা ব্যক্তিদের দৃষ্টিগোচর হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, কর্মচারীদের মধ্যে অধিদপ্তর থেকে বদলির গুজব ছড়িয়ে তাদের মধ্যে ‘বদলি আতঙ্ক’ সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে বদলি ঠেকানো কিংবা বদলি বাতিলের নামে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। এ ব্যাপারে সিলেটের জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসার এমরান হোসেন মানবজমিনকে জানিয়েছেন, সিলেট সেটেলমেন্ট থেকে অর্ধেকের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। তারা বদলিকৃত জোনে কাজও করছেন। কিছুসংখ্যক রয়েছেন যাদের অবসরের সময় চলে এসেছে। এ কারণে তাদের বদলি করা হয়নি। আগামী বছর অনেকেই অবসরে চলে যাবেন। এ কারণে তাদের এখানে রাখা হয়েছে বলে জানান তিনি।  

অভিজ্ঞতা আছে তবুও বিদেশ ভ্রমণ by মো. আল-আমিন

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ করে আসছে দেশের অন্যতম বৃহৎ এই প্রকৌশল সংস্থাটি। তবে অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা থাকার পরও পরামর্শক নিয়োগ ও বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে এখনো কোটি কোটি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে এলজিইডি’র। সম্প্রতি দেশের ৬টি সিটি করপোরেশন ও ৮১টি পৌরসভার অবকাঠামোর উন্নয়নে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। এ প্রকল্পের অধীনে এসব সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় নাগরিক সুবিধা বাড়ানোর পাশাপাশি পার্ক, লাইব্রেরি নির্মাণ ও জলাধার তৈরি করা হবে। এই প্রকল্পের বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অভাবনীয় ব্যয় প্রস্তাবের কারণে প্রকল্পটির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ব্যয়ের এসব অসঙ্গতির বিষয়ে আপত্তিও জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। যদিও গত ৭ই অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের দ্বিতীয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’ (আরইউটিডিপি) শীর্ষক এই প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, নিজেদের দক্ষতা থাকার পরও ঋণের টাকায় দেশি-বিদেশি পরামর্শক এবং বিদেশ ভ্রমণের পেছনে এতবড় অঙ্কের টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা অযৌক্তিক।

পিইসি সভায় অতিরিক্ত ব্যয় ও অপ্রয়োজনীয় খাত নিয়ে প্রশ্ন: উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ হাজার ৯০১ কোটি ২২ লাখ টাকা। যার মধ্যে ৪ হাজার ২৫৯ কোটি ৬০ লাখ দেবে বিশ্বব্যাংক। বাকি ১ হাজার ৬৪১ কোটি ৬২ লাখ দেবে সরকার। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন। তবে আলোচ্য প্রকল্পের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত ব্যয় প্রস্তাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পিইসি সভার কার্যপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, প্রকল্পটিতে পরামর্শক খাতে ৩১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা ব্যয় প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে কার্যপত্রে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর সাধারণত পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের সড়ক, ব্রিজ-কালভার্ট, ফুটপাথ, ড্রেন নির্মাণ, স্ট্রিট লাইট স্থাপন কার্যক্রমগুলো করে থাকে। সে অভিজ্ঞতার আলোকে প্রস্তাবিত প্রকল্পের কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন করা সম্ভব। তারপরও এত সংখ্যক বিদেশি ও দেশি পরামর্শক প্রস্তাবের যৌক্তিকতা নেই। কার্যপত্রে অতি প্রয়োজন ছাড়া পরামর্শক খাতে যথাযথভাবে ব্যয় কমানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। এদিকে বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়ার বিষয়েও একই অভিমত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। বলছে, প্রকল্পের আওতায় যেসব কাজ করা হবে, সেগুলো এলজিইডি’র নিয়মিত কাজ। এই কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য বৈদেশিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই। তাই প্রকল্প থেকে বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বাদ দেয়ার পরামর্শ দিয়েছে কমিশন। অন্যদিকে প্রকল্পটিতে অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ বাবদ প্রায় ২০ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রশিক্ষণ কাদের দেয়া হবে এবং প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা, সেটিও জানতে চেয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ খাতে ৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। যেটিকে অত্যধিক উল্লেখ করে প্রশ্ন তোলা হয়।
ওদিকে কমিশন সূত্র বলছে, প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৬১৩টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এত সংখ্যক গাড়ি কেনার প্রস্তাবের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে পরিকল্পনা কমিশনের। গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে অর্থ বিভাগের সুপারিশ ডিপিপিতে অন্তর্ভুক্ত না থাকলেও এত গাড়ি কেনার যৌক্তিকতা নিয়েও আপত্তি তোলে পরিকল্পনা কমিশন।  প্রকল্পের আওতায় অফিস সরঞ্জাম হিসেবে ৪০০ সেট কম্পিউটার বাবদ ৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ৭০টি ল্যাপটপ বাবদ ১ কোটি ৭ লাখ, ১০০ ফটোকপিয়ার বাবদ ২ কোটি এবং ১২টি প্রজেক্টর বাবদ ৯ লাখ ৬০ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া এলজিইডি’র দক্ষতা উন্নয়নের জন্য ৩৯০ সেট কম্পিউটার বাবদ ৭ কোটি ৪০ লাখ, একটি মাল্টি ফাংশন প্রিন্টার বাবদ ১ লাখ, একটি ফটোকপিয়ার বাবদ লাখ টাকা, ফার্নিচার বাবদ ৮০ লাখ টাকার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব যন্ত্রপাতি এবং ফার্নিচার কেনার প্রস্তাবেও আপত্তি ছিল পরিকল্পনা কমিশনের। এত আপত্তি সত্ত্বেও প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার।

প্রকল্প সম্পর্কে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর ডিপিপিতে বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ, বিশেষ করে দরিদ্র ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী নগরসমূহে স্থানান্তরিত হচ্ছে। দেশের পৌরসভাগুলোতে অবকাঠামো, সুপেয় পানি ও পয়ঃনিষ্কাশনসহ পরিবেশ দূষণের সমস্যা রয়েছে। এ সকল সমস্যা নিরসনে বিভিন্ন সময় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সর্বশেষ বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এমজিএসপি প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের ৪টি সিটি করপোরেশন ও ২৪টি পৌরসভার অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। উক্ত প্রকল্পের ফলো-আপ প্রকল্প হিসেবে রিজিলিয়েন্ট আরবান অ্যান্ড টেরিটোরিয়াল ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (আরইউটিডিপি) প্রকল্পটি প্রস্তাব করা হয়। সেক্ষেত্রে একই ধরনের প্রকল্প আগে করা হলেও নতুন করে পরামর্শক ও বিদেশে প্রশিক্ষণ খাত থাকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশেষজ্ঞরা।  

এ বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত প্রতিটি প্রকল্প খতিয়ে দেখা। কোনোভাবেই টাকা অপচয় করা যাবে না। অবকাঠামোগত উন্নয়নমূলক কাজে দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও এখনো পরামর্শক ও বিদেশে প্রশিক্ষণ খাতে প্রচুর পরিমাণে অর্থ খরচ করা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব পালন করা গোপাল কৃষ্ণ দেবনাথের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। তখন তার মোবাইল নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে খুদেবার্তা পাঠিয়েও কোনো উত্তর মেলেনি।