Friday, May 16, 2014

বাবা তখন চট্টগ্রামে by বুলবন ওসমান

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাবা শওকত ওসমান কলকাতা সরকারি কমার্স কলেজ থেকে অপশান দিয়ে যোগ দেন চট্টগ্রাম সরকারি কমার্স কলেজে। তখন তার বয়স ৩০। পাতলা গড়ন, ঝাঁকড়া চুল, দেখতে যুবকই মনে হতো। ১৯৫০ সালে দুই বাংলায় আবার বড় ধরনের দাঙ্গা বাধে, তাই মা ও আমরা পাঁচ ভাইবোন নানাবাড়ি হাওড়া জেলার ঝামটিয়া গ্রাম থেকে চলে আসি চট্টগ্রামে। বাসা নেয়া হয় চন্দনপুরায়। দারোগাবাড়ির কাছে। দোতলা বাড়ি, নাম রাধিকা ভবন, ঠিকানা ৩৪বি চন্দনপুরা। এটা সিরাজউদ্দৌলা রোডের কিছুটা ভেতরে। বাড়ির সামনে শান-বাঁধান পুকুর। ঘাটের দুপাশে দুটি লিচুগাছ। বাঁপাশের গাছটার নাম বোম্বাইয়া লিচু- এটি উঁচু জাতের। আঁটি ছোট, শাঁস বেশি, কাঁচা অবস্থায় কিছুটা মিষ্টি, পাকলে অপূর্ব। অনেকটা স্ট্রবেরির মতো দেখতে। তবে গাঢ় লাল হতো না, কিছুটা হালকা লাল। পরে আমরা দিনে কাক তাড়ান ছাড়াও রাত জেগে এ লিচু পাহারা দিতাম, বাদুড় তাড়াতে। লিচুর মৌসুমে চট্টগ্রাম শহরে সব জায়গায় দিন-রাত শোনা যেত গাছে বাঁধা টিন টানার শব্দ অথবা ফাটা বাঁশ বেঁধে ফটাস ফটাস করে শব্দ তুলে কাক ও বাদুড় তাড়ান। বাদুড় তাড়ানোর জন্য রাতে গাছে হারিকেনও বাঁধা হতো। চট্টগ্রাম শহর খুব লিচুগাছ সমৃদ্ধ।
১৯৫১ সালে চট্টগ্রামে দুই বাংলার সংস্কৃতি সম্মেলন হয়। এ সময় বাবা ছিলেন অন্যতম আহ্বায়ক। চট্টগ্রামে সংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি তখন অন্যতম প্রাণপুরুষ। এ সম্মেলন নিয়ে দিন-রাত খাটা-খাটনি করেন। কলকাতা থেকে সলিল চৌধুরীর দল আসেন সঙ্গীত পরিবেশন করার জন্য। নাটকের দলও আসে।
বাবার কাছে চট্টগ্রামের বুদ্ধিজীবীদের অনেকে আসতেন। তাদের মধ্যে ছিলেন আবুল ফজল চাচা। তিনি কখনও কখনও মেয়ে মমতাজকে সঙ্গে নিয়ে আসতেন। আরও যারা নিয়মিত আসতেন তাদের মধ্যে ছিলেন সাহিত্যিক শ্রীমোপাল বিশ্বাস কাকা। ছিলেন অধ্যাপক ইদ্রিস আলী, আবু সুফিয়ান, আহমদ হোসেন, জালাল উদ্দীন প্রমুখ। ইদ্রিস চাচা বাড়িতে ঢুকেই বলতেন, ভেউ... অর্থাৎ ভাইকে আদর করে এভাবে ডাকতেন।
চন্দনপুরায় একজন দুর্ধর্ষ গুণ্ডা-প্রকৃতির যুবক ছিল। ডাকনাম দুদু, ভালো নাম গোলাম নবী। মধ্যম উচ্চতার এ যুবককে বাবা একসময় ডেকে ভালোভাবে বোঝায় এ-জীবনধারা ছেড়ে দিতে। শুধু উপদেশ নয়, বাবা তাকে ন্যাশনাল ব্যাংকে পিয়নের চাকরিও নিয়ে দেন। এরপর থেকে দুদুভাই সব খারাপ কাজ ছেড়ে দেন এবং তিনি বাবাকে আব্বা সম্বোধন করতেন। বয়সে মাত্র আট-১০ বছরের পার্থক্য দুজনের। দুদুভাই এক সময় সস্ত্রীক আমাদের চন্দনপুরার বাড়িতেও কিছুদিন ছিলেন। দুদুভাই ছিলেন আমাদের বড় ভাইয়ের মতো।
১৯৫০ সালে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে কাগমারি সংস্কৃতি সম্মেলন হয়। তখন আমাদের বাসার নিচতলায় একেবারে সামনের বসার ঘরে মহড়া হতো। বাবার নেতৃত্বে সাংস্কৃতিক দল ঢাকা যাবে। দুতিন ঘণ্টা করে মহড়া হতো, বিকাল থেকে সন্ধ্যা রাত পর্যন্ত। আসতেন শিল্পী চিরঞ্জীব শর্মা, তার ভাইঝি দীপ্তি, মালেকা আজিম, কামেলা শরাফী, সুচরিতদা, অচিন্ত বাবু, ননী গোপাল বাবু, নৃত্যশিল্পী নিতাই ও শঙ্কর বাবু। এক মাস ধরে চলে মহড়া। চট্টগ্রামের দল খুব সুনাম কেনে সম্মেলনে। মালকা বানুর দেশে রে... চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গীতিকাব্যের এই সুর এখনও কানে লেগে আছে। চট্টগ্রামে থাকাকালীন সন্ধ্যার পর বাবা এশরাজ বাজাতেন। তার একটা খাতা ছিল- যাতে নানা রাগের গৎ-এর স্বরলিপি লেখা ছিল। এটা দেখে দেখে গৎগুলো তুলতেন। আমাকেও বাজনা শেখান। স্বরলিপি দেখে রবীন্দ্রসঙ্গীত তুলতেন। বাবার এ খাতাটা ৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় হারিয়ে যায়। এটা তার সঙ্গীতচর্চার একটা দলিল হিসেবে ছিল। আজ খুব আফসোস হয় খাতাটা হারিয়ে যাওয়ায়।
চট্টগ্রামে আমার ছোটভাই জাঁনেসার ওসমান জন্মলাভ করে। আন্দরকিল্লায় চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের পেছনের হাসপাতালে ওর জন্ম। আমরা সবাই দেখতে গেছি- বাবা জাঁনেসারের হাত তুলে নিয়ে বললেন, দেখেছ, হাতের আঙুলগুলো কি আর্টিস্টিক। সেই জাঁনেসার আজ জীবনের ছটি দশক পার করে বাবার স্মৃতি রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাকি ভাই-বোনদের ওপর বয়স ভর করেছে তাই এখন দায়িত্বটা ওর।
এলো ১৯৫৮ সাল। দেশে আইউব খান মার্শাল ল জারি করলেন। সব বামপন্থী কর্মীরা গা ঢাকা দিতে বাধ্য হলেন। অনেকে হলেন অন্তরীণ। দেশ ছাড়তেও বাধ্য হলেন কেউ কেউ। যেমন গোপাল বিশ্বাস কাকা নীরবে দেশ ছেড়ে গেলেন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলির শ্রীরামপুরে তিনি স্থিত হন। কাকি অর্চনা বিশ্বাস বিদ্যালয়ের চাকরিতে যোগ দিয়ে সংসারের হাল ধরেন। সম্প্রতি গোপাল কাকা দেহত্যাগ করেছেন। মনে পড়ে আমাদের চন্দনপুরায় এলে বাবা না থাকলে বাজাতেন বাবার এশরাজটা নিয়ে। বসে বসে গৎ বাজাতেন। আমরা শুনতাম। আমাদের গানও শেখাতেন...
মার্শাল ল জারির কয়েক দিন পরই বাবার ডাক পড়ল চট্টগ্রামের কমিশনারের কাছ থেকে। বাবার একটা স্যুট ছিল, ওটা পরে বেরিয়ে গেলেন। বাবা বেরিয়ে যাওয়ার পর দেখি দোতলায় বাবার কামরায় বসে মা কাঁদছেন। বাবা কেন সকালে স্যুট পরে বেরিয়ে গেলেন তখনও জানি না। আমি তখন চট্টগ্রাম কলেজের সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। মা আমাকে খবরটা দিলেন। আমিও খুব চিন্তিত হয়ে পড়ি। পরিবারে কি ভয়াবহ এক বিপর্যয় নেমে আসতে যাচ্ছে? খুব উৎকণ্ঠায় থাকি। অন্যরা জানে না।
দুঘণ্টা পর বাবা ফিরলেন। তাকে খুব স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল। পরে মার কাছ থেকে জানতে পারি চট্টগ্রামের কমিশনার ভদ্রলোক ইন্ডিয়ার হায়দ্রাবাদের লোক। তিনি বাবাকে খুব সম্মান দিয়ে কথা বলেছেন। বাবাকে এও বলেছেন, দেশ ছেড়ে এসেছেন, নিজ পরিবার নিয়ে থাকেন, এখানে অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনও নেই... তাই যেন সতর্ক থাকেন। এর বেশি কিছু বলেননি। হ্যাঁ, বাবা সতর্ক ছিলেন এবং পরে এর ফল হিসেবে প্রকাশিত হয় তার নাট্যরূপী উপন্যাস ক্রীতদাসের হাসি। আর আমরা চট্টগ্রামে তার সঙ্গে যোগ দেয়ার আগে তিনি যে সময়টুকু একা ছিলেন সে সময় শহর ও শহরতলীর আনাচে-কানাচে প্রতিদিন ঘুরে বেড়িয়েছেন, তার ফলে বেরোয় স্কচধর্মী সব গল্প যা নেত্রপথ নামক গল্পগ্রন্থে সংকলিত।
সীমান্ত পত্রিকা বের করতেন মাহবুবুল আলম চৌধুরী চাচা। তিনি ছিলেন বামপন্থী সক্রিয়কর্মী, মার্শাল ল জারি হওয়ার পর তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। বাবা একদিন বললেন, মাহবুবের সঙ্গে দেখা হল, দাড়ি রেখেছে। চট করে চেনা যায় না। তারপর আরও বললেন, মাহবুব জানাল, পুলিশ তাকে বলেছে, আমরা জানি আপনি দাড়ি রেখেছেন... আসলে মাহবুব চাচা এতো জনপ্রিয় ছিলেন যে ওকে কেউ অ্যারেস্ট করতে চাইত না।
ঢাকায় দীর্ঘজীবন কাটানোর পরও বাবা বলতেন, চিটাগাং আমার সেকেন্ড হোম। চট্টগ্রাম ছিল তার অতি প্রিয় জায়গা। ৩৪বি চন্দনপুরার বাড়িটি যদি শওকত ওসমান স্মৃতি হিসেবে রাখা যেত, অতি চমৎকার একটি ঘটনা ঘটত! এক যুগ তিনি চট্টগ্রামের সংস্কৃতি মণ্ডলে অনেক কিছু দিয়েছেন, আবার চট্টগ্রামও তাকে অনেক দিয়েছে। মনে পড়ে ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্র“য়ারি ঢাকায় গুলি চললে তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী সব বিহারিদের পর্যন্ত ডেকে ডেকে শোনাতেন দেখো, ঢাকা যে পুলিশ গুলি চালায়া, বহুত স্টুডেন্ট মারা গিয়া আওর ঘায়েল হুয়া। তাকে অস্থির হয়ে পাঁয়চারি করতে দেখেছি। এর প্রতিবাদে পরদিন চট্টগ্রাম কলেজের নেতৃত্বে আমরা এম.ই. স্কুল ও কাজেম আলী স্কুলের ছাত্ররা বিরাট মিছিল করে সারা শহর ঘুরেছি। কোনো বাধা সে দিন ছাত্ররা মানেনি। সব ছাত্র তখন আগুনের মতো জ্বলছে।
চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লায় ছিল ডাক্তার হাশেম চাচা আর ইউসুফ চাচার চেম্বার। তারা ছিলেন আমাদের গৃহচিকিৎসকের মতো। কিছু হলেই আমরা এ দুই চাচার চেম্বারে হাজির হতাম। কোনোদিন ফি দিতে হয়নি।
সব সময় ওষুধ কিনতাম লালদীঘির পাশে অবস্থিত পপুলার ফার্মেসি থেকে। ওখানে প্রতুল কাকা সব ওষুধ ঠিকঠাক করে হাতে দিতেন। চট্টগ্রামে বাবা গল্প ও নাটকের বই নিজের খরচে ছাপেন : জুনু আপা ও অন্যান্য গল্প এবং বাগদাদের কবি। ঠিক মনে পড়ছে না সম্ভবত কোহিনুর ইলেকট্রিক প্রেসে ছাপা হয়েছিল। ইঞ্জিনিয়ার খালেক চাচা ছিলেন এ ছাপাখানার স্বত্বাধিকারী। সোনালি বিমের চশমা পরতেন। মধ্যম উচ্চতার ফর্সা চেহারা... এখনও চোখের সামনে ভাসে। তার ছেলে আবদুল মালেক ছিল আমার সহপাঠী।
এম.ই. স্কুল আর গুরু ট্রেনিং স্কুলের (তখন নাম ছিল নর্মাল স্কুল) সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন বগুড়ার জসীমউদ্দীন চাচা। ছুটির দিনে তার বাড়িতে আমরা তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে হই-হুল্লোড় করে অনেক বছর কাটিয়েছি। সকালে ওবাসায় গেলে গরুর পায়ার স্যুপ ছিল বরাদ্দ। সত্যি বলতে কি বাবার কারণে চট্টগ্রাম আমাদের সব ভাই-বোনেরও সেকেন্ড হোম হয়ে গেছে। পঞ্চাশের দশকের চট্টগ্রাম তখন ছিল স্বপ্নের দেশ। গণি সওদাগরের বেকারির দুআনার পেস্ট্রি ছিল অমৃততুল্য। এ বেকারির বেলা বিস্কুট ছিল আমাদের আর এক আকর্ষণের খাবার। বোষ ব্রাদার্সের লবঙ্গ লতিফা ছিল অন্যতম সেরা মিষ্টি। দুআনা দামের মঙ্গোলিয়া ও প্যারাডাইস আইসক্রিম ছিল সবচেয়ে লোভনীয়। বাবার কারণে চট্টগ্রামের সব বড় বড় লোকের স্নেহ পেয়েছি আমরা। এদের মধ্যে ছিলেন ভাষাবিদ ড. এনামুল হক, ইন্স্যুরেন্সের সামাদ চাচা, অধ্যাপক ওমদাতুল চাচা, ন্যাপ নেতা হারুন চৌধুরী প্রমুখ। চন্দনপুরায় ছিলেন কবিরাজ ননী গোপালবাবু। তিনি বেহালা বাজাতেন। বাবার সঙ্গে ছিল খুব হৃদ্যতা। তার কাছে মাঝে মাঝে যেতাম গান শিখতে। তিনি একটি রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখিয়েছিলেন, খরবায়ু বয় বেগে, চারদিক ছায় মেঘে... চট্টগ্রামের অন্যতম স্বনামধন্য সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মাহবুবুল আলমের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আমার পরিচয় হয়নি, কিন্তু তার সহোদর কবি ওহিদুল আলমের সঙ্গে ভালো ঘনিষ্ঠতা ছিল। এমনকি স্বাধীনতার পর ঢাকায় আমার সঙ্গে তিনি দেখা করেছিলেন, একটি কিশোর উপন্যাস ছাপার ব্যাপারে।
সাহিত্যিক মাহবুবুল আলমের সঙ্গে সরাসরি পরিচয় না থাকলেও তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সবিহ্উল আলমের নাম শুনেছি ছোট চাচা শিল্পী জিলানির মাধ্যমে। আবুল ফজল সাহেবের ছেলে আবুল মনজুর আমার সহপাঠী। সবিহ্উল, মনজুর আর আমি তিনজনই সমবয়সী। সবিহ্উলের সঙ্গে পরে ঢাকায় আলাপ। ওদের দেখলেও আমাদের চট্টগ্রামের জীবনের কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বাবার কথা। তার কারণেই সবার সঙ্গলাভ। মনজুরের ছোট ভাই আবুল মনসুর চারুকলায় আমার প্রত্যক্ষ ছাত্র।
চন্দনপুরার বাসার পেছনে ছিল চাকতাই খাল। অনেক বাঁশ বেয়ে নিয়ে যেত বাঁশ ব্যবসায়ীরা। জোয়ারের সময় এ বাঁশ চকবাজারের অভিমুখে যাত্রা করত। ভাটার সময় বাঁশ সব নদীতে চলে যেত। দরকার হলে আমরা মাঝে মাঝে দুএকটা বাঁশ চুরি করতাম। অবশ্য বাবাকে না জানিয়ে।
বাসা আর খালের মাঝখানে একটা ছোট মাঠ ছিল। আমরা শীতকালে এখানে ব্যাডমিন্টন খেলতাম। বাবা মাঝে মাঝে যোগ দিতেন এবং ভূমিকা নিতেন কোচের। ভালো ব্যাডমিন্টন খেলতেন। খেলার প্রতি তার ছিল সমান আকর্ষণ ও পারদর্শিতা। খুব ভালো খেলতেন ক্যারামবোড। তাস ও দাবাতেও ছিলেন দক্ষ। মোটামুটি সব রকম ইনডোর গেমে তার উৎসাহ ছিল প্রবল। ছেলেবেলায় জাবলসিংহপুরে খেলতেন চিকে বা দাঁড়িয়াবান্ধা। আর সারা গ্রামে একটি ছিল ক্যারামবোড আর সেটি ছিল বাবার।
১৯৫৮ সালে বাবা ঢাকা কলেজে বদলি হয়ে এলেন। তার একবছর পর আমি আইএ পাস করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়ার জন্য আমাকেও আসতে হল ঢাকায়। এবার আমাদের জীবনের চট্টগ্রাম পর্বের সমাপ্তির সময় এসে গেল। ১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে পুরো পরিবার ঢাকায় সোমেনবাগে আগে কেনা জায়গায় অর্ধসমাপ্ত ঘরেই শুরু হল বসবাস। ছোটদের স্কুল-কলেজের ভর্তির ব্যাপার আছে তাই আর চট্টগ্রামে থাকা গেল না। বাবার একযুগের চট্টগ্রাম বাসের এখানেই সমাপ্তি। বাকি আমাদেরও তাই।
অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠায় রাজধানী ঢাকা আজ প্রায় অচল মহানগর। একইভাবে আমাদের দেখা সেই পঞ্চাশের দশকের স্বপ্নের শহর চট্টগ্রাম আজ টিলা কাটার ফলে শরীরে কুষ্ঠরোগ সৃষ্টি করেছে। দুই টিলার মাঝে ঝরনা ধারা তির তির করে বয়ে চলে অবিরাম, আজ এসবই হুমকির মুখে। বাবা ইহলোক ছেড়ে গেছেন পনের-ষোল বছর, তার কথা মনে পড়লে যেমন কষ্ট হয়, তেমনি কষ্ট হয় আমাদের স্বপ্নের শহর চট্টগ্রামের শ্রীহীন পরিবেশ দেখে।

পরিবর্তনশীল সমাজের খণ্ডচিত্র হেঁটে চলেছি বন জোছনায়

দিলরুবা আহমেদ আমেরিকা প্রবাসী বাঙালি কথাসাহিত্যিক। দীর্ঘ প্রবাস জীবনে থেকেও তিনি বাংলাদেশের পরিবর্তনশীল সমাজ ব্যবস্থার ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখেন, আর তারই প্রতিফলন ঘটে তার লেখায়। হেঁটে চলেছি বন জোছনায় হাতে পাওয়া তার সর্বশেষ উপন্যাস।
সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, পাওয়া-না পাওয়া, ভালোবাসা ও অবহেলা এসব কিছু নিয়েই মানুষের জীবন। মানুষের জীবন থেমে থাকে না। এটা সৃষ্টিকর্তার অবধারিত নিয়ম উপন্যাসটিতে লেখিকা যে চরিত্রগুলোর অবতারণা করেছেন তারা প্রত্যেকেই ওই একই ফ্রেমে বাঁধা। জীবনের বাস্তবতা থেকে কেউই দূরে নয়। পাঠক পড়লেই বুঝতে পারবেন কোনো কল্পকাহিনী স্থান পায়নি উপন্যাসটিতে। এটা লেখিকার একান্তই সৃষ্টিশীলতা। এখানেই তিনি সার্থক। উপন্যাসটিকে তিনি তার কল্পনা ও সৃষ্টিশীলতা দিয়ে বাস্তবতার চাদরে মুড়ে দিয়েছেন।
জীবন মানে যদি শুধুই সুখ হতো তাহলে সৃষ্টি হতো না এত-গল্প, উপন্যাস ও কবিতা। সাহিত্যের ভাণ্ডারে অধিকাংশ জায়গা তখন হয়তো শূন্যতাই দখল করত। রুচিশীলতার নিপুণ হাতে লেখিকা দেখিয়েছেন ভালোবাসার রকমফের আর ছুটে চলা। কন্যার মনে পিতার প্রতি ভালোবাসার যে শাশ্বত উপস্থিতি তার খণ্ড চিত্র উপন্যাসটিকে আরও আবেদনময় করেছে। মমতাজের জীবনের গতিময় ট্রাজেডি, হামিদ সাহেবের প্রগাঢ় ভালোবাসার বলয়ে আবদ্ধ থেকেও মমতাজের কষ্ট যেন আমাদের সমাজেরই একটি বাস্তবচিত্র যা শহর-বন্দর, গ্রাম-গঞ্জের কোথাও না কোথাও এখনও ঘটে। দাদন, আমের, পারুল, বকুল, নেহা, মালবিকা, দুজামাই, রশীদ স্যার সবাই পরিবর্তনশীল সমাজের একটি জীবন্ত চিত্র। তারা সবাই ছুটে চলেছেন জীবনের পরিসমাপ্তির দিকে যেখানে শুধুই সুখ নেই আবার শুধুই দুঃখও নেই। এরা জীবন নামক জোছনায় ফেরারি। সে জোছনায় হেঁটে চলেছে কথাসাহিত্যিক দিলরুবা আহমেদের চরিত্রগুলো। সেদিক থেকে হেঁটে চলেছি বন-জোছনায় নামকরণটি যথার্থ এবং গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হয়েছে।
উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে বারবারই কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও কবি শামসুর রাহমানের কথা মনে পড়েছে। চরিত্রগুলো রূপায়নে লেখিকা বাংলার যে অবয়বকে বেছে নিয়েছেন তা পড়লে মনে করার উপায় নেই যে দীর্ঘদিন ধরে এ লেখিকা প্রবাসী। সুদূর আমেরিকায় অবস্থান করেও তিনি গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন বাংলার পরিবর্তনশীল সমাজব্যবস্থা। ঢাকা শহরে হাতিরঝিলের সৌন্দর্যও তার উপন্যাস থেকে বাদ পড়েনি।
বাইশ বছরের যৌবন যেন কালবৈশাখী ঝড়ের মতো। একদিকে আমেরের দুর্নিবার আকর্ষণ অন্যদিকে নীলাঞ্জনা নামক মায়াবী কণ্ঠের আকর্ষণীয় স্বপ্নের রানীর ফোনালাপ থেকে সৃষ্ট ভালোবাসার মধ্যে এক অদ্ভুত সমীকরণ লক্ষণীয়। মুঠোফোনের জগতে ল্যান্ডফোনের ফোনালাপে সৃষ্ট প্রেম দ্বারা লেখিকা আমেরকে সমাজে কিছুটা বোকা টাইপের ছেলে হিসেবেই উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু নীলাঞ্জনার প্রতি আমেরের অন্তরের আকুতিটুকু শুধু বুঝতে পারবে ভুক্তভোগী শ্রেণির তরুণরা। অন্যদিকে নীলাঞ্জনা খালার কথামতো যে কাজটি অবিরত করে যাচ্ছিল তা যে তার জীবনে বেঁচে থাকার অনেকটাই অবলম্বন হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা না বুঝেছে আমের না বুঝেছে তার খালা। কারণ রশীদ স্যারদের মতো মানুষদের সঙ্গে সমাজের যে মেয়েরা কেবল মাত্র বিবাহযোগ্য হয়ে উঠেছে এবং যারা অপরূপ সুন্দরী সামাজিক পারিপার্শিকতা তাদের বাধ্য করে রশীদ স্যারদের মতো মানুষদের বিয়ে করতে। তাদের বেঁচে থাকার অবলম্বন কী হবে তা নিয়ে কেউ ভাবে না। শেষ পর্যন্ত লেখিকা নীলাঞ্জনা নামক মালবিকার জীবনকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন যাতে আমেরের জীবনে বিশাল এক ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে।
উপন্যাসের মূল দুটি চরিত্র মমতাজ ও হামিদ সাহেব। একটি প্রেম থেকে একটি সংসার। এখানে প্রেমের জয় দিয়েই শুরু যাদের জীবন অনেকেই ভাববেন তাদের আবার কিসের কষ্ট। যমুনার এপারে দাঁড়িয়ে আজও যদি কেউ ভাবেন, সম্রাট শাহজাহান কী আসলে মমতাজকে ভালোবাসতেন নাকি ঘৃণা করতেন? মমতাজের মনের গহীনে যে কষ্ট লুকিয়ে আছে তা তার পিতার জন্য এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু জীবনের প্রথম বিয়ে, প্রথম স্বামী, প্রথম বাসর সবই কী ঘৃণায় পরিপূর্ণ? হামিদ সাহেব তার জীবনে সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে মমতাজকে জয় করেছেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। বড় মেয়ের মুখের দিকে যখন মমতাজ বেগম তাকান তখন কী তিনি সাবেক স্বামীর প্রতি শুধুই ঘৃণা প্রকাশ করেন, নাকি এমন লক্ষ্মী একটি মেয়ে দেয়ার জন্য তার প্রতি কৃতজ্ঞতাও পোষণ করেন তা কিন্তু লেখিকা উপন্যাসে ব্যক্ত করেননি। তিনি শুধু দেখিয়েছেন আগের স্বামীর প্রতি ঘৃণা।
একজন পুলিশ অফিসারের ঢাকা শহরে বাড়ি, গাড়ি, ধন-সম্পদের অভাব নেই আজ এমন বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর এক শ্রেণীর সদস্যের বাস্তব চরিত্র উন্মোচন করেছেন অতি সাবধানে। একজন সৎ পুলিশ অফিসার তার বেতনের টাকা দিয়ে ঢাকা শহরে গাড়ি, বাড়ির মালিক হতে পারবে এটা অকল্পনীয়। হামিদ সাহেব তাই-ই হয়েছেন। যদিও তার চরিত্র উপন্যাসে শুধুই সাফল্যের পরিচয়বাহী।
দাদনের স্ত্রী নেহা নামক বউ একটি অসাধারণ সৃষ্টি লেখিকার। পুরো উপন্যাসটি অলংকৃত করেছে নেহা নামক চরিত্রটি। এ চরিত্রটি রূপায়ন করতে গিয়ে লেখিকা যেসব ঘটনার অবতারণা করেছেন তাতে হুমায়ূন আহমেদের কথা মনে পড়ে যায়। কীভাবে সত্য বলার মাধ্যমে নেহা চরিত্রটি শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করতে পেরেছে তা উপন্যাসটি না পড়লে বোঝা যাবে না। আকলিমার মা চরিত্রটি যেমন উপভোগ্য, তেমনি জামাই চরিত্র রচনায় তিনি অনেক হাসির খোরাক যুগিয়েছেন উপন্যাসে।
পিতার প্রতি কন্যাদের যে ভালোবাসা, দুর্নিবার আকর্ষণ উপন্যাসটিতে তা জোছনার মতো পরিব্যপ্ত। প্রবাসী মেয়েরা কাছে এলে হামিদ সাহেবের ঘর জোছনায় ভরে যায়। এ যেন শাশ্বত বাংলার চিরন্তন রূপ। এখানে হামিদ সাহেবকে সম্রাট শাহজাহান ভাবলেও ক্ষতি নেই। কেন না তার বিরুদ্ধে তার স্ত্রী, কন্যাদের কোনো অভিযোগ নেই। হামিদ সাহেবের শেষ পরিণতি উপন্যাসটিকে আরও মর্মান্তিক করে তুলেছে।
দিলরুবা আহমেদের ৯৬ পৃষ্ঠার উপন্যাসটির প্রচ্ছদ দৃষ্টিগ্রাহ্য। উন্নতমানের কাগজে ছাপা। প্রকাশক : আয়েশা হক শিমু, শৈলী প্রকাশন, ৫ সিডিএ বা/এ, মোমিন রোড, চট্টগ্রাম।
মোঃ রাশেদুল কবির আজাদ

পুরাবৃত্ত by নাজিব ওয়াদুদ

দূরে একটা ধুলোর ঘূর্ণি। পাক খেয়ে খেয়ে বিশাল অজগর যেন আসছে ধেয়ে। এই তাতানো গরমকালে সেটা নৈমিত্তিক ঘটনা। বিশেষ এ দুপুরের পর, বিকালের শুরুতে। এ সূর্যপীড়িত গ্রামে মাটি পুড়ে পুড়ে কয়লাটে। ধুলো মিহি, কিন্তু মুড়িভাজা বালুর মতো মরচে-রঙা। সামনে দিগন্তজোড়া ধু-ধু প্রান্তর। খালি। শস্যহীন। মরুভূমির মতো জল ও জীবনহীন। একটি-দুটি ন্যাড়া গাছ দাঁড়িয়ে এখানে সেখানে, কখনও যে এ মাটি ফলবতী ছিল তার সাক্ষ্য দিতে যেন আদালতের বারান্দায় সারা দিন ধরে অপেক্ষমাণ।
এসব তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল যে মেয়েটি সে প্রকৃতপক্ষে দেখছিল না, ভাসমান দীপ্তিহীন চোখ মেলে তাকিয়ে ছিল মাত্র। তার বয়স অনুমান করা অসম্ভব। ন্যাড়া গাছগুলোর চেয়েও হালকা, সরু, পুষ্টিহীন তার দেহ। ক্ষুধায় অকালে বলিরেখা-পড়া সাবালকপ্রাপ্ত মুখ। প্রথমে সে ঘূর্ণিটাকে পাত্তা দেয়নি। এসব দেখে দেখে অভ্যস্ত সে। কিন্তু ঘূর্ণিটা কবিরাজের গাছামু শেকড় দেখে বশমানা সাপের মতো ক্রমশ ফণা সংকুচিত করে। নেতিয়ে পড়ে তার দেহ। এখন তার আকাশের চেয়ে মাটির প্রতি অধিক আগ্রহ। ক্রমে সে খেয়াজালের মতো ঝপাত করে মাটির ওপর আছড়ে পড়ে। তখন মনে হয় তার মধ্যে থেকে একটা প্রাণী মাথা তুলে দাঁড়ায়। হাঁটতে থাকে। ক্রমে ক্রমে, নিছক প্রাণী নয় কোনও, তাকে একেবারে দু-পেয়ে জন্তুর মতো দেখায়। যেন বা ধুলোরই মানুষ একটা। এ অকালে এই অভাবী খরাপীড়িত বিরান গ্রামে কোনো পরিব্রাজকের আগমন বিস্ময়ের ব্যাপার। হয়তো বা অসম্ভবও। তবু সে তো পরিব্রাজক না হয়ে যায় না। কেন না এ গ্রাম থেকে লোক শুধু যাচ্ছেই। সত্যিকার কথা, পালাচ্ছে। যেতে যেতে গ্রামখানি শূন্য এখন। এতদিন একটি লোকও ফেরেনি এ গ্রামে। শুধুই গেছে। ফেরার কোনো কারণও ঘটেনি। তাহলে কে সে মানুষটি ফিরে আসছে আজ? সেটা সম্ভব নয়। তাহলে সে পরিব্রাজক না হয়ে যায় না। কেন যেন এক অলিক সম্ভাবনায় মেয়েটির শুকনো পচা মাটির মতো কালচে চোখ-মুখ উজ্জ্বল হওয়ার চেষ্টা করে।
সে বসে আছে আমগাছের নিচে। আসলে হেলান দিয়ে রয়েছে গাছের গোড়ায়। কারণ স্বাভাবিকভাবে বসে থাকার মতো শক্তি তার দেহে নেই। গাছটাকেও ঠিক আর গাছ বলা চলে না। তার পত্র-পল্লবগুলো যেন খুবলে খুবলে ছিঁড়ে নিয়ে গেছে হিংস্র দৈত্যের দল। এ জ্যৈষ্ঠ মাসে তার শুকনো প্রশাখায় এখনও কয়েকটা ফলের ভ্রুণ কালো কয়লার মতো সেঁটে রয়েছে। মেয়েটি ঝরে পড়া সে রকমই একটা ভ্রুণ চিবিয়ে রস সিঞ্চনের প্রয়াস করছে। আমের কড়ালি শুকিয়ে খড়মড়ে। মাসহীন। রসহীন। তেতো। কয়লার মতোই বিস্বাদ। বা স্বাদহীন। লোকটিকে দেখে মেয়েটি সে কথাও ভুলে যায়।
সে পালাতে পারেনি। কারণ সে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। জ্বর এতটাই তীব্র ছিল যে তার কোনো হুশ ছিল না। অনাহারী শরীর তার জ্বালা সইতে পারছিল না। তার বুড়ো বাপ, কিংবা সৎ-মা, কিংবা ভাইবোনরাও অনাহারে বিধ্বস্ত ও জর্জরিত। মৃত্যু-আতংক সবাইকে গ্রাস করেছিল। কেউ কারও ভার নিতে সমর্থ ছিল না। কেয়ামতের ময়দানে নাকি এরকম হবে। স্বামী স্ত্রীকে চিনবে না। বাপ-মা সন্তানকে দেখে পালিয়ে যাবে। সেদিনের ভয়াবহতা হবে এমনি প্রটণ্ড ও অমানবিক। নিজেকে বাঁচানোর চিন্তায় দিশাহারা হয়ে থাকবে সবাই। তাদেরও এমন অবস্থাই হয়েছিল। কেউ কারও দায়িত্ব নেয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। তাদের মনে মৃত্যুভয় বাসা বেঁধেছিল।
সেটাই স্বাভাবিক। কেন না, এ অবস্থা শুধু এ গ্রামেরই নয়। অন্যসব গ্রাম থেকেও একই রকম খবর আসছিল। তিন বছর আগে যে এত বড় যুদ্ধ হয়ে গেল, আর ঘন-ঘোর বর্ষা ও প্লাবন, তখনও এমন অবস্থা হয়নি। গ্রামগুলো যেন দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত। দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে উত্তপ্ত সূর্যের তাপে। হতাশ মানুষগুলো সব কদুর লতার মতো নেতিয়ে পড়তে লাগল মাটির ওপর। গ্রামের ক্ষেতে ফসল নেই, পুকুরে-খালে পানি নেই, যেন সবার এখন শান্তভাবে মরে যাওয়ার সময়। যেমন মানুষের দুরবস্থা, তেমনই জীবজন্তু, গাছপালারও।
লোকটি এখন অনেকখানি কাছে। মেয়েটিকে লক্ষ্য করে সে এবং কৃশকায়া এ বালিকার মুখোমুখি হবে বলে রাস্তা থেকে নেমে আসে। মেয়েটি শান্ত হয়ে বসে আছে। আসলে তার অশান্ত হওয়ার মতো শক্তিই নেই। যে কোনো একটা ইঁদুর এসেও তাকে কুরে-কুরে খেয়ে ফেলতে পারে।
লোকটি নীরবে তার সামনে এসে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ তাকে নিরীক্ষণ করে। তারপর দ্রুত তার কাছে গিয়ে রসাল ফলের
একটা টুকরো এগিয়ে ধরে। মেয়েটি একই সঙ্গে হাঁ করে এবং হাত বাড়ায়। লোকটি ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত হলেও ফলের টুকরোটি সরাসরি তার মুখেই তুলে দেয়। মেয়েটি ধীরে ধীরে সেটি চিবোতে শুরু করে। তার খাওয়া দেখে মনে হয় না সে ক্ষুধার্ত বা অনাহারী। কিন্তু তা তো হতেই পারে না। আসলে ক্ষুধায়-পিপাসায় তার সব বোধই হয়তো বা অবশ হয়ে গেছে। টুকরোটুকু খেতে গিয়ে অপরিসীম পরিশ্রমে সে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়ে। আরও এলিয়ে পড়ে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সে তার চোখ উন্মিলন করে। তাকায় লোকটির দিকে। হাত বাড়ায়। লোকটি তার মুখে আর এক টুকরো ফল তুলে দেয়। মেয়েটি এবার একটু নড়ে-চড়ে, মেরুদণ্ড সোজা করে বসে। তার মাড়ি দুটো দ্রুত কাজ করে। তার বোধ ফিরে আসছে। সে খাবারের স্বাদ পাচ্ছে। শরীরে রস পাচ্ছে। এবার গোটা একটা বিস্কুট এগিয়ে দেয় লোকটি। সেটাকে প্রায় গোগ্রাসে চিবিয়ে গিলে ফেলে মেয়েটি। তারপর বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি। আরও চায়। কিন্তু এবার কঠোর হয় লোকটি। - অ্যাখুন আর না। পরে।
মেয়েটি কষ্ট পায়, কিন্তু ক্ষুব্ধ হয় না। সেরকম মনের জোর তার নেই। শরীরও অচল-প্রায়। সে আবার গাছের গুঁড়ির সঙ্গে হেলান দেয়। খাওয়ার পরিশ্রমে সে ক্লান্ত।
চারপাশে তাকায় লোকটি। বাড়ি-ঘরগুলো কুটিরের মতো। কিন্তু কোনো মানুষের সাড়া-শব্দ নেই। এমনকি কোনো গৃহপালিত জন্তু-জানোয়ারও নেই। গাছপালা পাতাশূন্য, মরা ডালপালা বিকালের রোদে পুড়ছে। ফসলের চারাগুলো শুকিয়ে পোড়া আবর্জনার মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে কঠিন মাটির ওপর, যেন অনাহারী গ্রামের প্রতিটি মানুষের মৃত্যুর সংকেত দিচ্ছে। আগন্তুকের মুখ গম্ভীর হয়ে ওঠে। তারপর, আশ্চর্যজনক উদাসীনতার সঙ্গে পায়ের নিচে কাত হয়ে পড়ে থাকা একটি চারা আমগাছের পাতা ভেঙে নেয়। কোমরে মুছে মুখে পুরে দেয়। চিবুতে থাকে। এতটুকু রসও যদি থাকে! একটুখানি চিবিয়ে থুক করে ফেলে দেয় সে।
যেন একটা আগুনের ঝড় বয়ে গেছে এ গ্রামের ওপর দিয়ে। লোকটি মনে মনে একটু ভয় পায়। গত কয়েক মাস থেকে সে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ঘুরছে। সদ্য-স্বাধীন যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের সব গ্রামই অভাবী। কিন্তু এ গ্রামের মতো আর দেখেনি সে। দুর্ভিক্ষ ও খরা একসঙ্গে তার গলা টিপে ধরেছে।
এদিক-ওদিক তাকিয়ে সে বলে, কেউ নাই? একই সঙ্গে বিস্মিত, বিভ্রান্ত ও উৎফুল্ল তার কণ্ঠ।
মেয়েটি তার মাথাটা একটু এপাশ-ওপাশ করে। অর্থাৎ নেই।
বিকালের রোদ পড়ে আসছে।
আজকের রাতটা এখানেই কাটাবে, ভাবে আগন্তুক।
মেয়েটি এখন রসবতী হয়ে উঠছে। দেখা যাচ্ছে সে পূর্ণ যুবতি। বয়স ঊনিশ-কুড়ির কম হবে না। উজ্জ্বল শ্যামলা রং, কলাপাতার মতো হলদেটে সবুজ। এ কয়দিনের খাওয়া-বিশ্রামেই তার দেহবর্ণের খোলতাই ফেটে বেরুতে লেগেছে। নিষ্পাপ মায়াময় মুখ। চোখ দুটো যেন সব সময় টলটল করে। কৃতজ্ঞতার পানি যখন-তখন ছলছলিয়ে ওঠে।
লোকটি তাকে এ বাড়িতে এনে তুলেছে। আর কেউ নেই এখানে। সে সকালে বেরিয়ে যায়, ফেরে দুপুরের পর। বিকালে বেরিয়ে আবার ফেরে সেই গভীর রাতে। খাবার আসে বাইরে থেকে।
প্রথম দিনই লোকটি বলেছে, এটা হল শহর এলাকা। খুব খারাপ জায়গা। কাউকে বিশ্বাস নাই। বাইরে যাবে না, উঁকি-ঝুঁকি দেবে না। কারও সঙ্গে কথা বলবে না।
তার সাবধানবাণী শুনে একটা ওয়াজের কথা মনে পড়ে মেয়েটির। সেই ওয়াজ মাহফিলে মৌলভি সাহেব বলেছিলেন, পৃথিবীতে সবচেয়ে ভালো জায়গা হচ্ছে মসজিদ, আর সবচেয়ে খারাপ জায়গা বাজার। মিলে যায় লোকটির কথা মৌলভি সাহেবের ওয়াজের সঙ্গে। এটা তো বাজারই। সুতরাং খারাপ জায়গা। লোকটার কথা সত্যি বলে মেনে নিয়েছে সে। এ বাড়িতে তার মাসখানিক হয়ে গেল। একটি দিনের জন্য, একবারও, সে বাড়ির বাহির হয়নি। হবেই বা কেমন করে। এখানকার কিছুই চেনে না সে। কোনো মানুষজনও পরিচিত নয়। আর তাকে থাকতে হয় তালাবদ্ধ ঘরে। বেরিয়ে যাওয়ার সময় বাইরে থেকে ঘরে তালা মেরে যায় লোকটি। অভাব নেই খাবারের, পরনের কাপড়ের, এমনকি নিরাপত্তারও।
মেয়েটি কথা বলতে ভয় পায়। যখন ভয় কাটিয়ে ওঠে তখন কেবল একটা কথাই সে বলতে পারে- আমি বাড়িত যাব।
লোকটি কোনো উত্তর করে না।
লোকটি প্রতিদিন অনেক রাতে বাড়ি ফেরে। প্রায় দিনই খেয়ে আসে বাইরে থেকে। একটা-দুটো কথা বলে-কি-বলে-না, ঘুমিয়ে পড়ে। আবার সকালে বেরিয়ে যায়।
একদিন দুপুরের পর তাকে বেরোতে বলে লোকটা। -রেডি হও।
কিছু প্রসাধনসামগ্রী এগিয়ে দেয় তার দিকে। -এইগুলা সুন্দর করে মাখো।
কোনো প্রশ্ন না করে দ্রুত তৈরি হয় সে। কেবল একবার অনুচ্চস্বরে বলে- আমি বাড়িত যাব।
একটা রিকশায় ওঠে ওরা। পাশাপাশি বসতে হয়। আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকে মেয়েটি। কোনো কথা বলে না। লোকটিও কথা বলে খুব কম। কিন্তু আজ মাঝে-মাঝে মুখ খোলে। শহরের এটা-ওটা দেখিয়ে দেয়। যেন ওকে শহর চেনাচ্ছে। মেয়েটি অবাক হয়ে দেখে বটে। কিন্তু তার মন বসে না।
লোকটার যেন কী হয়েছে। কোথায় চলেছে কে জানে! রিকশায় শুধু ঘুরছে। -কুন ঠায়ে যাব ছার? রিকশাওয়ালার প্রশ্নে একেকবার একেক জায়গার কথা বলে। এই ছোট্ট শহরটার অনেকখানিই ঘোরা হয়ে যায় তাদের। রিকশাওয়ালা শেষ পর্যন্ত ভাবে, হাওয়া খেতে বেরিয়েছে ওরা। কিন্তু সে ক্লান্ত হয়ে পড়ে একনাগাড়ে রিকশা টেনে। -ছার, একাট্টুক চা-পানি খাবেন না? আমার খুব তিস্সি লাইগিছে। লোকটার যেন হুশ ফেরে। এবার একটা হোটেল দেখে দাঁড়াতে বলে। সিঙ্গাড়া, মিষ্টি, শেষে চা খায়। লোকটা ভাবে, এইটুকুর প্রয়োজন ছিল। এখন কেমন তরতাজা লাগছে। অবশেষে সন্ধ্যের আগে ঘরে ফেরে ওরা।
সেদিন আর বের হয় না সে। নিজের ঘরে শুয়ে শুয়ে ভাবে কেবল। -এই কাজ আমাকে দিয়ে হবে না। কী করে এ কাজ করব আমি, বলো? একটা বোকা-সোকা, সরল-সোজা, অসহায় নিষ্পাপ মেয়েকে নিয়ে এ কাজ করা আমার উচিত হবে? ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়ে লোকটা।
বেশ রাত হয়। তখন তাকে খেতে ডাকে মেয়েটি।
-ঘুমাওনি তুমি?
-আপনের খাওয়া হয়নি যে।
-তুমি খেয়েছ?
-না।
অবাক হয় সে। কিন্তু কিছু বলে না। নিশ্চুপ খেয়ে ওঠে।
অনেক রাতে তার ভাবনা শেষ হয়। তখন পাশের ঘরে গিয়ে মেয়েটিকে ডাকে। নিশ্চিন্তে গভীর ঘুমে নেতিয়ে ছিল মেয়েটি। ধড়ফড় করে উঠে কাঁপতে থাকে। সেদিকে খেয়াল নেই লোকটির। সে বলে, কাল ভোর-ভোর রেডি থাকবে। তোমাকে তোমার বাড়ি নিয়ে যাব।
কী কালঘুমে যে ধরেছিল তাকে, ধুম-ধাড়াক্কায় যখন ঘুম ভাঙে তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। দরোজা খুলতেই হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে আগন্তুক তিন যুবক।
-তোরা?
তার গলায় একটা ছুরি চেপে ধরে একজন। -শালা! মাল কই? ট্যাকা হজম কিন্তু মালের খবর নাই, আঁ?
-টাকা দিয়ে দেব।
-এইরেশ্শালা, ট্যাকা লিয়ে কী কইরব আমরা, আঁ? আমরা মাল চাই। কাইল্ তোর মাল লিয়ে যাওয়ার কথা না? যাইস্নি ক্যান?
কাল বেরিয়েছিল নিয়ে যাবে বলে কিন্তু পারেনি। সেকথা বলার ফুরসত পায় না সে। তাকে বাঁধার চেষ্টা করে ওরা। হইচই শুনে মেয়েটি ততক্ষণে হাজির।
-এই, এডিই সেই মাল নাকি?
ধর শালিকে! তাকে ধরতে যায় একজন।
দ্রুত পেছন ফিরে হেঁশেলে ঢোকে মেয়েটি। হাতে নেয় ইয়া বড় বটিটা। পাল্টা তাড়া করে। ছুরিওয়ালা লোকটা ছুটে আসে। তার পাঁজরে এক ঘা বসিয়ে দেয় মেয়েটি। সে একটা বিস্মিত হাঁ দেখিয়ে নেতিয়ে পড়ে। অন্য দুজন ছুটে আসে। কিন্তু মেয়েটির রণমূর্তি দেখে পিছটান দেয়।
মাথার ওপর তাতানো রোদ, মাঠময় শীতল ভেজা বাতাসের ঝুলঝাপ্পি। মাসখানিক আগে যে ধুলোর ঘূর্ণিময় রোদ-পোড়া মরচেময় মাটি রেখে গিয়েছিল, সেখানে এখন সোঁদাল গন্ধ। নাড়া গাছগুলো সবুজ পাতার মেলা। মাঠময় সবুজ ঘাসের জাজিম। তার মধ্যে চরে বেড়াচ্ছে গরু-ছাগল। হাল-বলদ নিয়ে কাজে ব্যস্ত কৃষকের দল। একটা আমগাছের নিচে দাঁড়ায় ওরা। তার পাতাগুলো এখন কী সবুজ!
যুবকটির হাত দুটি টেনে নেয় যুবতি। তার চোখে চোখ রেখে হাসে। যুবক অপলক তাকিয়ে থাকে তার দিকে। আবার হাসে মেয়েটি। অপার রহস্য তার চোখে-মুখে। ছেলেটি বলে, কী! মেয়েটি হাতের ইশারায় দূরে তার গ্রাম দেখায়।
ছেলেটি একবার পেছনে তাকায়, তারপর দিগন্তের দিকে, দেখে- দূরে, বহু দূরে, মাঠের পারে আকাশ মিলেছে মাটির সঙ্গে।
মেয়েটি দ্রুত পা চালায়, যেন হাঁটে না- নাচতে নাচতে উড়ে চলে। তাই দেখে না হেসে পারে না ছেলেটি।

অধিকৃত নগর, প্রতিরোধের সাহিত্য

ঢাকা যে একটি অবরুদ্ধ নগরী, যেখানে ঘরে-বাইরে প্রতিপদে আতংক আর মৃত্যুভয় এবং শহরটি পাক হানাদার বাহিনী কর্তৃক অধিকৃত - নগরবাসী এ নির্মম সত্যটি বুঝতে শুরু করে ১৯৭১-এর এপ্রিল-মে থেকে। পঁচিশে মার্চের নির্বিচার গণহত্যার দুঃস্বপ্ন তখনও মানুষকে তাড়া করে ফিরছে - ওই ভয়াল স্মৃতি ভোলার মতো নয়, কিন্তু ঢাকার নগরজীবনকে পৃথিবীর মানুষের কাছে স্বাভাবিক দেখানোর জন্য সামরিক জান্তা তখন মরিয়া হয়ে উঠেছিল।
শহরের দোকানপাট খুলে গেছে, বাজারে মোটামুটি ভিড়, হাতেগোনা হলেও স্কুল-কলেজে যাচ্ছিল ছাত্রছাত্রীরা। সিনেমা হলও খুলতে শুরু করেছে। কিন্তু পঁচিশে মার্চের কালরাত্রি বাঙালির মনে যে-গভীর ক্ষত তৈরি করে গেছে, তা শুকোচ্ছিল না।
ঢাকার বাহ্যিক জীবন তখন যে কোনো বড় নগরীর মতো, তবে ওতে স্বতঃস্ফূর্ত প্রাণচাঞ্চল্য ছিল না। রাস্তায় যানবাহন ও লোক চলাচল নেমে গিয়েছিল অর্ধেকেরও নিচে, শহরের মোড়ে মোড়ে আর্মি চেকপোস্ট, বড় সড়কে সেনাবাহিনীর টহল, মানুষ হাঁটে প্রায় নিঃশব্দে এবং দ্রুত। অবরুদ্ধ ঢাকার তথাকথিত স্বাভাবিকতায় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল হিম-শীতল আতংক, যাকে বলা যেতে পারে এক ধরনের সাদা ভয়। সব ছাপিয়ে ছিল মৃত্যুভয়।
জুনের মধ্যে ঢাকার অর্ধেকেরও বেশি মানুষ চলে গেছে পল্লী এলাকায় বা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। ওসব এলাকা তখনও মুক্ত এবং ঢাকার চেয়ে নিরাপদ। অন্যদিকে বহু আক্রান্ত মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে শরণার্থী শিবিরে। বাস্তুভিটাচ্যুত বাঙালির দুর্ভোগ তখন আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের প্রধান খবর।
অধিকৃত ঢাকা আক্ষরিক অর্থে আতংকের নগরী হয়ে ওঠে ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হওয়ার পর। এর পরপরই ভারতের বিভিন্ন ট্রেনিং ক্যাম্পে পুরোমাত্রায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়ে যায়। মুক্তিবাহিনীর তরুণ যোদ্ধারা অল্পদিনের মধ্যে তাদের অপারেশন শুরু করে দেশের গ্রামাঞ্চলে, শহরতলীতে, ঢাকার উপকণ্ঠে। এক সময় মুক্তিবাহিনীর উপস্থিতি টের পাওয়া যেতে থাকে খোদ মহানগরীতেও। বেশিদিন লাগেনি, পাকবাহিনীর অবস্থানের ওপর মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগুপ্তা হামলা এক সময় হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ব্যাপার। আগস্ট-সেপ্টেম্বরের পর ঢাকা এবং তার পার্শ্ববর্তী এলাকার মানুষ দেখতে থাকে পাকবাহিনীর সঙ্গে, রাজাকার এবং আলবদর-আল শামস বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি লড়াই। এ সময় পাকবাহিনী হিংস্র হয়ে ওঠে। বেড়ে যায় তাদের নির্যাতন, এবং পাড়ায়-মহল্লায় ধরপাকড় ও তুলে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলার মত ঘটনা।
১৯৭১-এর অবরুদ্ধ ঢাকা বিভিন্ন যুদ্ধে-মহাযুদ্ধে শত্র“ কর্তৃক অধিকৃত পৃথিবীর অন্যান্য নগরী থেকে পৃথক ছিল না কোনোভাবেই। ওইসব শহরে বন্দি বা প্রতিরোধ-লড়াইয়ে অংশ নেয়া লেখকদের রচনায় অবরুদ্ধ সময়ের যে-চিত্র পাই আমরা, বাংলাদেশের কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিকদের লেখাতেও আমরা একই আর্তি-বেদনা, দেশপ্রেম এবং মাতৃভূমিকে মুক্ত করার অঙ্গীকার লক্ষ্য করি। অধিকৃত শহরের শিল্পী-লেখকদের প্রসঙ্গ এলে প্রথমেই আমাদের মনে পড়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন নাৎসি বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ প্যারিসের রেজিস্ট্যান্ট মুভমেন্ট এবং এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত কবি, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রশিল্পীদের কথা। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য, কবি পল এলুয়ার এবং রেনে শার। আতংকের এই নগরীতে জার্মান দখলদার বাহিনী যখন তাদের নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছিল, প্যারিসের আন্ডারগ্রাউন্ড, অর্থাৎ গুপ্ত পত্রপত্রিকার মুদ্রণের ভেতর দিয়ে প্রতিরোধ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিলেন সেখানকার লেখক সমাজ। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আলবের কামু।
প্যারিসের মতো দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ব্রিটেনের লন্ডনও নাৎসি বিমানবাহিনীর উপর্যুপরি আক্রমণের ফলে এক বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত হয়। যুদ্ধের এক পর্যায়ে পূর্ব লন্ডন হয়ে দাঁড়ায় ধ্বংসস্তূপ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালে প্রতিরোধ এবং শান্তির স্বপক্ষের কবিতা নিয়ে ইংরেজিভাষী এবং অন্যান্য দেশের পাঠকদের উজ্জীবিত করেছিলেন ব্রিটিশ ওয়ার পোয়েট্রি আন্দোলনের কবিরা। মূলত পঁচিশ সদস্যের এই কবিগোষ্ঠীর প্রধান ছিলেন উইলফ্রেড ওয়েন। ইংরেজি কবিতায় এ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা এবং বিপর্যয়ের পটভূমিতে আন্তর্জাতিক কবিতায় আবির্ভূত হলেন অডেন, স্টিফেন স্পেন্ডার, ডে-লুইস প্রমুখ ব্রিটিশ কবিরা। এদের সঙ্গে কণ্ঠ মেলালেন আমেরিকার কবিরাও। এ প্রসঙ্গে প্রথমেই মনে আসে জেমস ডিকি এবং এলিজাবেথ বিশপের নাম।
১৯৩৬-১৯৩৯-এর স্পেনের গৃহযুদ্ধ থেকে উঠে আসেন গার্সিয়া লোরকা,আন্তোনিও মাচাদো, রাফায়েল আলবের্তি প্রমুখ কবিরা। স্বৈরাচারী শাসক ফ্রাঙ্কোর মাদ্রিদ দখলের ফলে এদের প্রায় সবাইকে রাজধানী ছাড়তে হয়। স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের বর্বরতা ও বিভীষিকা এবং মানবজাতির শান্তির আকাক্সক্ষাকে অমর করে রেখেছেন দেশটির অমর শিল্পী পাবলো পিকাসো তার চিত্রকর্ম গুয়ের্নিকায়।
বিশ শতকে যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং আতংকগ্রস্ত নগরীর তালিকায় আরও শহরের নাম এসে যায়। কে অস্বীকার করবে, আধুনিক ইতিহাসের কলংক হয়ে আছে হিটলারের বার্লিন এবং এর ইহুদি নিধনযজ্ঞ, দখলকৃত পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারস এবং এর ওপর নাৎসি বাহিনীর নির্যাতন? নাৎসি বাহিনীর বর্বরতা এবং হিটলার অধিকৃত জার্মানি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনেক কালজয়ী সাহিত্যকর্ম। আধুনিক চলচ্চিত্রের এক প্রধান বিষয়বস্তু জার্মানি এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ। ডেভিড লীন এবং, সাম্প্রতিককালে, স্টিফেন স্পিলবার্গের নাম এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতেই হয়। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে নির্মিত হয়েছে অনবদ্য কিছু চলচ্চিত্র।
এ মুহূর্তে মনে আসছে নাৎসি বাহিনী কর্তৃক লেনিনগ্রাড দখল নিয়ে ওই সময়ের সোভিয়েত কবি আনা আখমাতোভার স্মৃতিচারণমূলক রচনাটির কথা। একই সঙ্গে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, রচিত হয়েছে রক্তাক্ত বৈরুতের কবি মাহমুদ দারবিশের অসংখ্য কবিতা। ডাচ কিশোরী অ্যান ফ্রাংকের মর্মস্পর্শী ডায়েরি এখন সাহিত্যকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়।
যুদ্ধকালীন ডায়েরির প্রসঙ্গে আমরা বাঙালিরা অনিবার্যভাবে উল্লেখ করি একটি রচনার কথা : জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি। মুক্তিযুদ্ধকালীন অবরুদ্ধ ঢাকার অবস্থার ওপর এ এক অমূল্য দলিল। ওই সময়ের ঢাকার প্রায় প্রতিদিনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা আছে এ বইয়ে।
নমাসব্যাপী অবরুদ্ধ ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যকর্মের ভেতর বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় শামসুর রাহমানের কবিতা। ওই বৈরী এবং বীরত্বদীপ্ত সময় নিয়ে বেশ কিছু কবিতা রচনা করেছেন কবি, যেগুলোর অনেকগুলো পড়ি আমরা তার বন্দি শিবির থেকে কাব্যগ্রন্থে। একটি কবিতায় কবি লেখেন, ”কবুরে স্তব্ধতা নিয়ে বসে আছি। নড়ি না চড়ি না/ একটুকু, এমনকি দেয়ালবিহারী টিকটিকি/ চকিতে উঠলে ডেকে, তাকেও থামিয়ে দিতে চাই... সমস্ত শহরে/ সৈন্যরা টহল দিচ্ছে, যথেচ্ছ করছে গুলি, দাগছে কামান/ এবং চালাচ্ছে ট্যাংক যত্রতত্র। মরছে মানুষ/ পথে-ঘাটে-ঘরে, যেন প্লেগবিদ্ধ রক্তাক্ত ইঁদুর।” [পথের কুকুর]
সিকদার আমিনুল হকের একটি কবিতায় মোটামুটি একই চিত্র পাই আমরা। তিনি লেখেন : পেছনের বারান্দায় একা, চুপচাপ বসে থাকি।/ এখন বন্ধুরা নেই, আড্ডা নেই, নিউমার্কেটের/ গুলতানি, ভালো বই নিয়ে তর্ক, সব চুকেবুকে গেছে;/... গ্রেনেডে জানানি দেয়, যেই রাত্রি নামে, মনে মনে/ বলি দীর্ঘজীবী হও! তখনই ইতর শব্দ করে/ মিলিটারি জিপ যায়... [প্রাণী ও মানুষ]
একাত্তরের অবরুদ্ধ ঢাকার ওপর গল্প, উপন্যাসও রচিত হয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক। ওই ভয়ানক সময়ে শেষ-সকালে বাড়ির সামনের রাস্তায় এক অচেনা তরুণের লাশ পড়ে থাকতে দেখার পর মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের মানসিক অবস্থা ও আচরণের বাস্তবানুগ বর্ণনা দিয়েছেন মাহমুদুল হক। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের কোনো কোনো লেখায় সময়টি উঠে এসেছে। শওকত আলী, মঞ্জু সরকার, রাবেয়া খাতুন, তাপস মজুমদার প্রমুখ অধিকৃত নগরীর শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থাকে ধরেছেন তাদের গদ্যরচনায়। অন্যদিকে, নাসির উদ্দিন ইউসুফের চলচ্চিত্র গেরিলা দেখতে দেখতে মনে হয়, আমি ফিরে গেছি একাত্তরের ঢাকায়। কী জীবন্ত এর ভাষা! তবে একাত্তরের ঢাকার সবচেয়ে বিশদ চিত্র পাই আমরা হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ও গল্পে। অবরুদ্ধ নগরী এবং এর অসহায় অধিবাসীদের এমন আন্তরিক বর্ণনা বাংলা সাহিত্যে বিরল। যে কথাটি না বললেই নয়, নগরী বা জনপদ অধিকৃত হতেই থাকবে মানুষের মূঢ়তার কারণে, এবং থেমে থাকবে না ওসব জায়গার লেখক-শিল্পীদের প্রতিবাদী সৃজনশীলতাও। হ (পুনশ্চ: কিছু সময় ছাড়া এই রচনার লেখক অধিকৃত ঢাকায় ছিলেন।)

অবাধ যৌনাচার যেখানে রীতি

সে এক ভালবাসার মুক্ত দুনিয়া। অবাধ প্রেম সেখানে। ইচ্ছা হলেই নারী বা পুরুষ তার সঙ্গী বদল করতে পারে। বেছে নিতে পারে পছন্দের সঙ্গী। অবাধে বিবাহ বহির্ভূত যৌন সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে তারা। এমন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য প্রতিটি গ্রামে বিশেষ আকৃতির কুঁড়েঘর আছে। একে বলা হয় লাভ হাট বা ভালবাসা ঘর। সেই ঘরকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় বুকুমাতুলা। এমন ভালবাসায় কোন বাধা নেই। কারও কোন অনুযোগ নেই। কারণ, সবার জন্যই এ অধিকার সমান। তাই বলে তারা তাদের সম্প্রদায়ের বাইরের কারও সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে না। এমন সংস্কৃতি এখনও বহাল আছে পাপুয়া নিউ গিনির ট্রোবিয়ান্ড দ্বীপপুঞ্জে। সেখানে বসবাসকারী নারীদের বেশির ভাগই থাকে খোলামেলা। তাদের শরীরের উপরের অংশে কোন পোশাক থাকে না। কোমরের কাছে জড়ানো থাকে এক টুকরো কাপড়। সেই অবস্থায় তারা খোলা আকাশের নিচে ক্রিকেট খেলায় মেতে ওঠে। ইচ্ছা হলেই পছন্দের কোন সঙ্গীকে নিয়ে তারা বুকুমাতুলায় গিয়ে উদ্দাম আদিমতায় মেতে ওঠে। এটা নারী-পুরুষ সবার জন্যই প্রযোজ্য।

মোদি-ডকট্রিন ও প্রধানমন্ত্রীর ভুল সংকেত

মোদি-ডকট্রিন ও প্রধানমন্ত্রীর ভুল সংকেত
ভারতে পালাবদল মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি দোষারোপ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্তব্যকে সময়োপযোগী বা সমীচীন বলা যাবে না৷ এতে কোনো কূলই রক্ষা পাবে না৷ একজন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে ‘ভয়ানক ভুল’ বলেছেন৷ প্রধানমন্ত্রী প্রকারান্তরে ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন৷ অনেেকর মতে তিস্তা চুক্তি না হওয়ার ব্যাপারে মমতাকে দায়ী করা আসলে দিল্লির অপারগতা কিংবা অজুহাত৷ মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফর থেকেই মমতা আলোচনায়৷ শেখ হাসিনা নীরবতা ভাঙলেন এমন একটি সময়ে, যখন অবৈধ বাংলাদেশি ইস্যুতে মোদির অন্যায্য মন্তব্যের (‘১৬ মের পরে অবৈধ বাংলাদেিশদের বহিষ্কার করা হবে’) বিরুদ্ধে মমতাই সবচেয়ে বেশি জোরালো অবস্থান নিয়েছেন৷ যদিও ২০০৫ সালে আমরা এই মমতাকেই একই মনোভাব নিয়ে লোকসভায় স্পিকারের মুখের ওপর ফাইল ছুড়তে দেখেছি৷ অনেকেই মনে করেন, দিল্লির ঢাকানীতি বদলাবে না৷ দরকষাকষি আরও জটিল হতে পারে৷
জি নিউজ গতকাল খবর দিল, লোকসভায় বিরোধীদলীয় নেতা সুষমা স্বরাজ যিনি মোদির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থিতার বিরোধী, তিনি বিদেশমন্ত্রী হতে পারেন৷ মনমোহনের ঢাকা সফরে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন৷ সিঙ্গাপুরে তিনি বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর ঢাকা সফর খুব ভালো, মমতাকে সঙ্গে রাখতে পারলে বেশ হতো৷ পিটিআইয়ের খবর (১৪ সেপ্টেম্বর ২০১১) পড়ে মনে হেলা, সুষমা তিস্তা চুক্তিবিরোধী নন৷ কংগ্রেস নেতারা মমতাকে বোঝাতে পারেননি৷ তাঁর কথায়, ‘ওঁর সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি ছিল৷ অগত্যা প্রধানমন্ত্রী তিস্তা চুক্তি পাশে সরিয়ে রেখেছেন৷ তবে এটাই শেষ নয়৷’ আমরাও অনুমান করি, মমতার সঙ্গে রাজনৈতিক যোগাযোগের হয়তো ঘাটতি ছিল৷ পিশ্চমবঙ্গের বাজেটসহ নানা বিষয়ে মমতার সঙ্গে দিল্লির টানাপোড়েন গোপনীয় কিছু নয়৷ মমতা এবারের নির্বাচনী বক্তৃতায় ইঙ্গিত দেন, রাজ্যের স্বার্থ বাঁচিয়ে তিস্তা চুক্তি করতে তাঁর আপত্তি নেই৷ কিন্তু কংগ্রেস যা পারেনি, তা বিজেপি বা নতুন সরকারকে দিয়ে করাতে বাংলাদেশকে উপযুক্ত কর্মপন্থা উদ্ভাবন করতে হবে৷ এ জন্য সরকার, প্রধান দলগুলোর গবেষণামূলক প্রস্তুতি চাই৷ গুজরাল-ডকট্রিন ছিল, ভারত প্রতিবেশীকে ন্যায্যতার সঙ্গে দেবে৷ বিনিময় আশা করবে না৷ বাংলাদেশের মানুষ

পাপের ৬৬ বছর!

১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের দেশান্তরের শুরু
ফিলিস্তিনিদের ‘নাকবা’র ৬৬ বছর পূর্ণ হলো৷ আরবি শব্দ নাকবার অর্থ মহাবিপর্যয়৷ বলপূর্বক ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরায়েলের আনুষ্ঠানিক পত্তন ও স্বাধীনতা ঘোষণা৷ ৬৬ বছর আগে ১৯৪৮ সালের ১৪ মে তেলআবিবে জায়নবাদী নেতা বেন গুরিয়ান এই ঘোষণা দেন৷ তার পরদিন ১৫ মে আরব দেশগুলো একযোগে ইসরায়েল আক্রমণ করলেও শোচনীয়ভাবে পরাজয় বরণ করে আমেরিকা-ব্রিটেনের অস্ত্র-সমর্থনপুষ্ট ইসরায়েলের কাছে৷ ১০ লাখের মধ্যে সাড়ে সাত লাখ ফিলিস্তিনি নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বিভিন্ন আরব দেশে আশ্রয় নেয়৷ সেই শরণার্থী জীবন চলছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে৷ আর ইসরায়েল দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনিদের ভূমি ও সম্পদ দখল করে নিচ্ছে, নিত্যনতুন ইহুদি বসতি স্থাপন করছে, ধ্বংস করে দিচ্ছে ফিলিস্তিনি আরবদের শত শত বছরের পুরোনো জনপদগুলো৷ ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাসেলে প্রথম জায়নবাদী কংগ্রেসে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে এই রাষ্ট্র স্থাপনের প্রস্তাব করে৷ তখন ফিলিস্তিন ছিল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীন৷ অটোমান সুলতান আবদুল হামিদ এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন৷ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৭ সালে ফিলিস্তিন ও ট্রান্স জর্ডান ব্রিটিশদের দখলে যায়৷
ওই বছর ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেলফোর ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় ব্রিটেনের সহযোগিতা প্রদানের অঙ্গীকার ঘোষণা করেন৷ ইউরোপ থেকে ক্রমেই ইহুদিরা গিয়ে আবাস গড়তে থাকে ফিলিস্তিনে৷ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের নেতৃত্বে ইউরোপজুড়ে ইহুদিনিধন শুরু হলে ফিলিস্তিনে ইহুদিদের গমন বেড়ে যায়৷ ১৯৪৭ সালে নবগঠিত জাতিসংঘ ফিলিস্তিনকে ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে দুই ভাগ করে দুটি রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা করে৷ ১৯৪৮ সালের ১৪ মে ব্রিটেন আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটায়, জায়নবাদীরা ঘোষণা দেয় স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্রের৷ ১৫ মে তাই নাকবা৷ এর পরের সাড়ে ছয় দশকের ইতিহাস একদিকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের শক্তিশালী, আগ্রাসী ও সম্প্রসারণশীল হওয়ার, অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের নিগ্রহের, ভূমি হারানোর ও হত্যা-নিপীড়নের শিকার হওয়ার৷ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সর্বাত্মক সমর্থন-সহায়তায় ইসরায়েল ক্রমশ পরিণত হয়েছে এক দুর্ধর্ষ রাষ্ট্রে৷ অবশ্য অনেক উদারপন্থী ইহুদি ইসরায়েলের দখলদাির ও আগ্রাসনকে সমর্থন দেয় না, এমনকি কোনো কোনো গোঁড়া ইহুদি ইসরায়েল রাষ্ট্রকে ইহুদিদের রাষ্ট্র হিসেবে মানে না৷ তবে তাদের কণ্ঠস্বর ঠাঁই পায় না পাশ্চাত্যের মূলধারার।

‘খেয়েদেয়ে’ কাজটি হচ্ছে পদত্যাগ

হাতির খাদে পড়ার সঙ্গে চামচিকার লাথি মারার সম্পর্কটি আমাদের সমাজে অনেক পুরোনো৷ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী তাঁর বর্তমান দশা সম্পর্কে সাংবাদিকদের কাছে এই আক্ষেপই জানিয়েছেন৷ ‘হাতি খাদে পড়লে চামচিকাও লাথি মারে’৷ ফলে, এমন একটি পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের উচিত ‘হাতিকে’ সহযোগিতা করা৷ এখানে হাতির চরিত্রটি যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী নিজে, তা স্পষ্ট৷ কিন্তু চামচিকার চরিত্রগুলো যে কারা, তা ধোঁয়াশাই রয়ে গেল৷ এরা কি তাঁর দল বা সরকারের কেউ কেউ, নাকি ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী কোনো শক্তি’? আরও একটি বিষয় বোঝা যাচ্ছে না, সাংবাদিকেরা কীভাবে ‘হাতির’ প্রতি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন! হাতির মতো বড়সড় একটি প্রাণীর খাদে পড়ে যাওয়াটা চরম বিপদেরই বটে! এর সঙ্গে যদি চামচিকাদের উৎপাত যোগ হয়, তবে মাথা ঠিক রাখা সত্যিই কঠিন৷ আনুষ্ঠানিক কারণ জ্বর হলেও সম্ভবত সেসব এড়াতেই তিনি গত সোমবার মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে যাননি৷ কারণ, ‘জ্বর’ নিয়েই তো তিনি মন্ত্রণালয়ে গেলেন, বিকেলে দলের অফিসে৷ কিন্তু উৎপাত থেকে মুক্ত থাকতে পারলেন কি! মন্ত্রিসভার ‘বৈঠক শেষে গুঞ্জন ওঠে যে ত্রাণমন্ত্রী আর মন্ত্রিসভায় থাকছেন না’৷ চামচিকারা তো অনেক কিছু বলবে, কিন্তু হাতি তাকে পাত্তা দেবেন কেন? হাতির িক ‘খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই’! মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করবেন িক না, এমন প্রশ্নকে তিনি উড়িয়ে দিয়েছেন এভাবেই৷ তবে সাংবাদিকেরাই বা এমন প্রশ্ন করতে গেলেন কেন? আমাদের দেশে কে কবে স্বেচ্ছায় পদ ছেড়ে দিয়েছে! হাতি কীভাবে ও কেন খাদে পড়লেন, সেটা সবারই জানা হয়ে গেছে৷
নারায়ণগঞ্জে সাতটি খুন হয়েছে এবং তা বড়ই নৃশংস কায়দায়৷ গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে, র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা টাকা নিয়ে এই কাজ করেছেন৷ এই অভিযোগ এখনো প্রমাণিত না হলেও এর যে ভিত্তি রয়েছে, তা বোঝা গেছে সরকারের কিছু উদ্যোগে৷ প্রথমে র৵াবের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করে তাঁদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে৷ এরপর তাঁদের অবসরে পাঠানো হয়েছে৷ এই ঘটনার মূল যে অভিযুক্ত র‌্যাব কর্মকর্তা, কর্নেল (ঘটনার পর তাঁকে সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে নিয়ে অবসর দেওয়া হয়েছে) তারেক সাঈদ মোহাম্মাদ, তিনি ঘটনাচক্রে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রীর জামাতা৷ জামাতা যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, এর দায় শ্বশুর নেবেন কেন? ফলে, হাতির খাদে পড়ার কোনো কারণ ছিল না৷ কিন্তু হাতি যে নিজেই খাদে গিয়ে পড়েছেন! নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত হিসেবে যখন তারেক সাঈদের নাম পত্রপত্রিকা ও গণমাধ্যমে আলোচিত হচ্ছিল, তখন মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী একটি বিবৃতি দিয়ে বসলেন, তা-ও আবার মন্ত্রণালয়ের প্যাডে৷ তিনি দাবি করলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের কোনো যুক্ততা নেই৷ ‘আমি দ্ব্যর্থহীনভাবে এটুকুও জানিয়ে রাখতে চাই, এ হত্যাকাণ্ড-সম্পর্কিত মামলায় অভিযুক্তদের সঙ্গে আমার পরিবারের কোনো সদস্যের কখনোই কোনো রকম যোগাযোগ বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল না৷’ এমন একটি বিবৃতি দিয়ে তিনি যে কাজটি আসলে করলেন, তা হচ্ছে অভিযুক্ত তারেক সাঈদকে নির্দোষ প্রমাণ বা তাঁকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন৷ মন্ত্রী পদে থেকে

পশ্চিমবঙ্গে ৩২০০ বুথে ফের ভোট চায় বিরোধীরা

শাড়িতেও বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী নরেন্দ্র মোদি৷ মুম্বাইয়ে
একটি দোকানে বিক্রয়কর্মী মোদির ছবিসংবলিত শাড়ি
দেখাচ্ছেন ক্রেতাদের৷ গতকাল তোলা ছবি। রয়টার্স
পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনের ভোটপর্ব শেষ হওয়ার দুদিন পরও বামফ্রন্ট, কংগ্রেস ও বিজেপি শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে হাজার হাজার বুথ দখল ও ভোট ডাকাতির অভিযোগে সোচ্চার৷ তাদের আরও ক্ষোভ নির্বাচন কমিশনের ওপর৷ তারা সব দেখেও নাদেখার ভান করেছে৷ ইতিমধ্যে বিরোধী দলগুলো নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে প্রায় তিন হাজার ২০০ বুথে আবার ভোট গ্রহণের দাবি জানিয়েছে৷ পাশাপাশি বিরোধী দলগুলো রাজ্যে ও রাজ্যের বাইরে পশ্চিমবঙ্গে ‘ভোট প্রহসন’-এর অভিযোগে প্রচারে সোচ্চার হয়েছে৷ রাজধানী দিল্লির যন্তরমন্তরে বামপন্থীরা গতকাল বুধবার এক সমাবেশে পশ্চিমবঙ্গে ভোটে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ তোলে৷ সমাবেশে সিপিএমের সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত বলেন, রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতায় শাসক তৃণমূল কংগ্রেস তিন হাজারের বেশি বুথ দখল করে ছাপ্পা ভোট দিয়েছে, অথচ নির্বাচন কমিশন সব দেখেও নীরব৷ কলকাতায় প্রদেশ কংগ্রেস নেতা প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, কমিশনের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য ও সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে বলা হয়েছিল, ভোটে ব্যাপক কারচুপি হয়েছে৷ নিয়মানুযায়ী সব তথ্যপ্রমাণ খুঁটিয়ে দেখার কথা স্ক্রুটিনি কমিটির৷
সেই কমিটির সুপারিশও নির্বাচন কমিশন অগ্রাহ্য করেছে৷ বিজেপির রাজ্য সভাপতি দলীয় প্রার্থী রাহুল সিংহ বলেন, সব অভিযোগ কমিশনকে জানানোর পরেও সাড়া মেলেনি৷ এদিন নির্বাচন কমিশন জয়নগর, বসিরহাট ও বারাসতে দুটি করে মোট ছয়টি বুথে আবার ভোট গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে৷ অথচ গত সোমবার শেষ পর্বের ভোটে পশ্চিমবঙ্গের যে ১৭টি লোকসভা কেন্দ্রে ভোট হয়েছে, তার বেশির ভাগ জায়গাতেই ব্যাপক সন্ত্রাস, হিংসাত্মক কার্যকলাপ ও বুথ দখলের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে৷ একাধিক টিভি চ্যালেনেই ধরা পড়েছে, বুথের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের লোক ঢুকে ভোটদাতারা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে কোন দলের প্রতীকের পাশে বোতাম টিপছেন, সেদিকে নজর রাখছেন৷ অনেক ক্ষেত্রে এমনও দেখা গিয়েছে যে তৃণমূলের কর্মীরা বুথে ভোটদাতাদের নির্দিষ্ট বোতাম টিপতে নির্দেশ দিচ্ছেন৷ গোটা ব্যাপারটাই চলছে নির্বাচন কমিশন নিযুক্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তার উপস্থিতিতেই৷ যে ছয়টি বুথে আগের ভোট বাতিল করে আবার ভোট গ্রহণের জন্য কমিশন নির্দেশ দিয়েছে, সেসব বুথেও এই কাণ্ড ঘটেছিল৷ কিন্তু দলগুলো প্রশ্ন তুলছে, যেখানে তিন হাজারের বেশি বুথে একই কাণ্ড ঘটানো হয়েছে, সে ক্ষেত্রে মাত্র ছয়টি বুথের ভোট বাতিলের নির্দেশ কেন? প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী, সিপিএম নেতা ও যাদবপুরের দলীয় প্রার্থী সুজন চক্রবর্তী প্রমুখ অনেকেই নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন৷ ভোটপর্বের শুরুতে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ পর্যবেক্ষক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এসে সুধীর কুমার রাকেশ দাবি করেছিলেন, ভোট নিয়ে কারচুপি ও বুথ দখল ঠেকাতে তাঁর বিশেষ দাওয়াই জানা আছে এবং তা তিনি প্রয়োগ করবেন৷ কিন্তু ভোটপর্ব মিটে যাওয়ার পরদিন মঙ্গলবার তিনি স্বীকার করেন, পশ্চিমবঙ্গের অবস্থা তিনি আগে বুঝতে পারেননি৷

তুরস্কে ২৪৫ শ্রমিকের মৃত্যু

তুরস্কের মানিসা প্রদেশে কয়লা খনিতে স্বজনের মৃত্যুর
খবর শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন এই নারী। এএফপি
তুরস্কের পশ্চিমাঞ্চলীয় মানিসা প্রদেশের সোমা এলাকার একটি কয়লাখনিতে গত মঙ্গলবারের ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় কমপক্ষে ২৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে৷ এখনো আটকা আছেন কয়েক শ কর্মী৷ তাঁদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা চলছে৷ এ ঘটনার পর তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে৷ এদিকে, প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গতকাল বুধবার ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে ক্ষুব্ধ লোকজন তাঁর গাড়ি আটকে রেখে বিক্ষোভ করে৷
এ ছাড়া আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে বিক্ষুব্ধ লোকজনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় পুলিশের৷ তুরস্কের জ্বালানিমন্ত্রী তানের ইলদিজ বলেন, ‘আমাদের আশঙ্কা, ভয়াবহ খনি দুর্ঘটনায় প্রাণহানি আরও বাড়তে পারে৷ এটা এমন একটা দুর্ঘটনার দিকে মোড় নিতে চলেছে, যেখানে তুরস্ককে তার ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে হতে পারে৷’ মন্ত্রী তানের ইলদিজ গতকাল জানান, মানিসা প্রদেশের সোমা এলাকার সোমা কোমুর নামের বেসরকারি কয়লা খনিটিতে মঙ্গলবারের ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর থেকে এ পর্যন্ত ২৪৫ জন শ্রমিককে মৃত উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে৷ তবে ঠিক কতজন এখনো ওই খনির ভেতরে আটকা আছেন, তা নিশ্চিত করে বলতে অস্বীকৃতি জানান তিনি৷ তবে এর আগে বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছিল, খনির ভেতরে ৭৮৭ জন কর্মী ছিলেন৷ তুরস্কের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এএফএডি জানিয়েছে, শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৯৩ জনকে ওই খনি থেকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে, যাঁদের মধ্যে ৮৫ জনই আহত৷ তুরস্কে খনি দুর্ঘটনা বিরল নয়, বিশেষ করে বেসরকারি খনিগুলোতে মাঝেমধ্যেই এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে৷ এর আগে তুরস্কে সবচেয়ে বড় শিল্প দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৯৯২ সালে৷
তখন জঙ্গুলডাক প্রদেশের একটি খনিতে গ্যাস বিস্ফোরণের ঘটনায় ২৬৩ জন কর্মীর প্রাণহানি ঘটেছিল৷ মঙ্গলবার বিস্ফোরণটি ঘটে গ্রিনিচ মান সময় দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে৷ ত্রুটিপূর্ণ একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার থেকে এই বিস্ফোরণের সূত্রপাত হয়৷ একটি নিরাপত্তা সূত্র জানায়, খনিটিতে অন্তত দুটি পকেট ছিল৷ এর মধ্যে একটি উন্মুক্ত থাকায় উদ্ধারকর্মীরা আটকে পড়া কর্মীদের কাছে যেতে সক্ষম হন৷ দ্বিতীয়টি বন্ধ থাকায় সেদিকে যাওয়া যায়নি৷ উদ্ধার তৎপরতায় ৪০০ জনের বেশি কর্মী যোগ দিয়েছেন৷ তবে আগুন ও বিষাক্ত কার্বন মনো-অক্সাইড গ্যাসের কারণে উদ্ধার তৎপরতা ব্যাহত হচ্ছে৷ জীবিত উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের বেশির ভাগই কাশি ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন৷ নিঃশ্বাসের সঙ্গে ধুলাবালু শরীরে ঢুকে পড়ায় তাঁদের এ অবস্থা হয়েছে৷ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার ও প্রবেশপথ থেকে প্রায় চার কিলোমিটার নিচে এখনো যাঁরা আটকা আছেন, তাঁদের বাঁচিয়ে রাখতে উদ্ধারকর্মীরা পাম্পের সাহায্যে পরিষ্কার বাতাস পেঁৗছে দেওয়ার চেষ্টা করছেন৷ কর্মীদের কাছে গ্যাস মাস্ক রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে৷ তবে এগুলোর সাহায্যে তাঁরা কতক্ষণ টিকতে পারবেন, তা স্পষ্ট নয়৷ ইস্তাম্বুলে কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে৷ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এ বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়৷ খনি দুর্ঘটনার পর তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আলবেনিয়া সফর ও প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুল চীন সফর বাতিল করেছেন৷ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে এক বিবৃতিতে তিনদিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করা হয়৷ এএফপি ও রয়টার্স৷

রাহুলকে দেখা গেছে, কথা শোনা যায়নি

রাহুল গান্ধী
ভারতের লোকসভা নির্বাচন শেষে বুথ-ফেরত জরিপে বলা হচ্ছে, ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় গণতান্ত্রিক মোর্চা (এনডিএ) জয়ী হতে চলেছে৷ কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোট সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা (ইউপিএ) এনডিএর চেয়ে বেশ পিছিয়ে থাকবে৷ কাল শুক্রবার চূড়ান্ত ফল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন৷ এবারের নির্বাচনে এনডিএর প্রচারণার নেতৃত্ব দিয়েছেন বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী ও গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ আর কংগ্রেসের প্রচারণার নেতৃত্ব দেন দলটির সহসভাপিত রাহুল গান্ধী৷ বুথ-ফেরত জরিপে এনডিএর জয়ের আভাস মেলার পর প্রচারণায় নেতৃত্ব দেওয়া এই দুই নেতার মধ্যে নতুন করে তুলনা চলছে৷ তাতে বলা হচ্ছে, এবারের নির্বাচনী প্রচারণায় রাহুলকে শুধু দেখা গেছে, কিন্তু তাঁর কথা শোনা যায়নি৷
কিংবা তিনি ভোটার তথা জনগণকে কথার মাধ্যমে আকৃষ্ট করতে পারেননি৷ আবার এটাও বলা হচ্ছে, রাহুলের বক্তব্য প্রচারে গণমাধ্যমের মধ্যে উপেক্ষার প্রবণতাও দেখা গেছে৷ বিপরীতে এই জায়গায় অনেক দূর এগিয়ে গেছেন মোদি৷ মোদিকে দেখাও গেছে, তাঁর কথাও শোনা গেছে৷ নির্বাচনের রাজনীতিতে ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারার অক্ষমতার মতো মহাদুর্যোগ আর কিছু নেই৷ এর কারণে রাজনীতিবিদ ও ভোটারদের যোগাযোগের যে ঘাটতি হয়, তাতে জোটের ভাঙন আর কোনো কিছু দিয়েই ঠেকানো সম্ভব হয় না৷ এ কারণেই নির্বাচনে কংগ্রেস তথা ইউপিএ জোটের এই পরিণতি৷ রাহুলের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আবারও ভারতের ভোটার তথা জনগণের মন জয় করা৷ কথা দিয়ে, কথা বলে জনগণকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করা৷ দলকে শুধু টিকিয়ে রাখতেই নয়, দলের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই কাজটাই তাঁর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক৷ এ কাজটা তাঁর জন্য কঠিন হবে৷ কারণ, এবারের নির্বাচনে টেলিভিশন ক্যামেরাগুলো রাহুলকে উপেক্ষা করেছে৷ শুধু তাই নয়, রাহুলের অনেক সমাবেশেও মাঝামাঝি সময় লোকজন চলে গেছে৷ সব মিলিয়ে কংগ্রেস ও ইউপিএর বর্তমান পরিস্থিতির জন্য দায় নিতে হবে রাহুলকেই৷ ঘুরে দাঁড়ানোর কাজটা করতে হবে তাঁকেই৷ বাগ্মিতায় পটু হতে হবে৷ এ জন্য রাহুলকে অপেক্ষা করতে হবে৷ হিন্দুস্তান টাইমস৷

কলম্বাসের জাহাজ উদ্ধার!

কলম্বাসের সান্তা মারিয়া নৌকার রেপ্লিকা
হাইতি উপকূলের কাছাকাছি এলাকা থেকে জাহাজের ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে৷ এ ধ্বংসাবশেষ সম্ভবত ক্রিস্টোফার কলম্বাসের প্রথম আমেরিকা অভিযাত্রায় ব্যবহৃত নৌযান সান্তা মারিয়ার৷ সংবাদমাধ্যমে গত মঙ্গলবার প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে এমন তথ্য জানানো হয়েছে৷ ৫০০ বছর আগে কলম্বাসের নৌযানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল৷ এ ব্যাপারে তদন্ত শুরু করেছিলেন সাগরতলের অভিযাত্রী ব্যারি ক্লিফোর্ড৷
তিনি দাবি করছেন, ওই ধ্বংসাবশেষ আসলেই আমেরিকার আবিষ্কারকারক নাবিকের জাহাজের৷ ১১ বছরের প্রচেষ্টায় তিনি এ ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন৷ এ নৌযান মানবেতিহাসের গতিধারা বদলে দিয়েছিল৷ তিনি আগামী মাসে হাইতিতে গিয়ে স্থানীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ করণীয় ঠিক করবেন৷ সান্তা মারিয়া যে জায়গায় তলিয়ে গিয়েছিল বলে কলম্বাস জানিয়েছিলেন, সেখান থেকেই ওই ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়৷ ক্লিফোর্ড ও তাঁর সহযোগীরা ২০০৩ সালে এটি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন৷ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ চার্লস বিকার বলেন, তথ্য-প্রমাণ অত্যন্ত জোরালো৷ ক্লিফোর্ড হয়তো ১৪৯২ সালের সেই সান্তা মারিয়াকেই আবিষ্কার করেছেন৷ এএফপি৷