Monday, March 5, 2018

কাশ্মিরে সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত ৬, প্রতিবাদে বনধ ও বিক্ষোভ চলছে

ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরে সেনাবাহিনীর গুলিতে দুই গেরিলা ও চার বেসামরিক নিহত হয়েছে। এ ঘটনাকে 'অত্যন্ত দুঃখজনক ও অন্যায়' বলে অভিহিত করে আজ (সোমবার) কাশ্মির উপত্যকায় সর্বাত্মক বনধ পালন করছে যৌথ প্রতিরোধ নেতৃত্ব। 
কাশ্মিরে নিরাপত্তা বাহিনী 'নির্বিচারে গুলি চালাতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে' বলে মন্তব্য করেছেন হুররিয়াত কনফারেন্সের একাংশের প্রধান মীরওয়াইজ ওমর ফারুক।
পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ থাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ থানা এলাকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গতকাল (রোববার) দিবাগত রাত ৮টা নাগাদ সোপিয়ান জেলার পোহানে ভ্রাম্যমান চেকপোস্টে গেরিলারা গুলিবর্ষণ করলে সেনাবাহিনীর পাল্টা গুলিবর্ষণে ওই নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
সেনাবাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, গুলিতে সোপিয়ানের বাসিন্দা শাহীদ আহমেদ দার নামে এক সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে। তার কাছ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া, গাড়িতে থাকা তার তিন সহযোগীও নিহত হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, সোপিয়ান জেলার পোহানে ভ্রাম্যমান চেকপোস্টে একটি গাড়িকে থামার জন্য বলা হলেও তা থামেনি। এসময় নিরাপত্তাবাহিনীর উপরে গুলিবর্ষণ করা হয় এবং পাল্টা গুলিতে এক সন্ত্রাসী নিহত হয়।
শ্রীনগরে প্রতিরক্ষা মুখপাত্র কর্নেল রাজেশ কালিয়ার দাবি, নিহত তিন যুবক সন্ত্রাসীদের সহযোগী ছিল। যদিও স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সংঘর্ষের পরে সেনা গ্রামে ঢুকে নির্বিচারে গুলি চালায়। এতে তিনজন নিহত হয়। এছাড়া আজ উদ্ধার হয়েছে দুটি মৃতদেহ। আশিক হুসাইন ভাট নামে তাদের একজনের নাম লস্কর-ই তাইয়্যেবার সদস্য। ২০১৭ সালের ১৩ নভেম্বর থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। নিহত অন্যজনের নাম গওহর আহমদ লোন (২৪)।
এই ঘটনার পরই সোপিয়ানে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। নিহতদের পরিবারের পক্ষ থেকে একে 'ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা' বলে দাবি করা হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হওয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে রায়নাওয়াড়ি, খানইয়ার, নৌহাট্টা, এম আর গঞ্জ, সাফা কদল, ক্রালখুদ ও মৈসুমা থানা এলাকায় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কাশ্মিরে আজ ট্রেন চলাচলও স্থগিত করাসহ কাশ্মির পাবলিক সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।

অযোধ্যা ইস্যু সমাধান না হলে ভারত সিরিয়ায় পরিণত হবে: রবিশঙ্কর

ভারতে 'আধ্যাত্মিক গুরু' নামে পরিচিত শ্রী শ্রী রবিশঙ্কর বলেছেন, অযোধ্যা ইস্যু সমাধান না হলে ভারত সিরিয়ায় পরিণত হবে। আজ ‘আজতক’ হিন্দি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন।
রবিশঙ্করের দাবি, অযোধ্যা মুসলিমদের ধর্মীয়স্থল নয়। তাদের ওই ধর্মীয়স্থলের উপরে নিজেদের দাবি ছেড়ে দিয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করা উচিত।
তার মতে, অযোধ্যায় বাবরী মসজিদ-রাম মন্দির বিতর্ক আদালতের বাইরে নিষ্পত্তি হওয়া উচিত।
রবিশঙ্কর আজ গণমাধ্যমকে বলেন, 'ভারতে শান্তি থাকতে দিন। দেশ সিরিয়ার মত অবস্থায় পরিণত হওয়া উচিত নয়। এরকম হলে সব শেষ হয়ে যাবে।'
তিনি বলেন, ‘আদালত থেকে যে সিদ্ধান্তই দেয়া হোক কোনো পক্ষ মানতে রাজি হবে না। কোনো এক পক্ষ কে হার মানতে হবে। পরাজিত পক্ষ বর্তমানে বিষয়টি মেনে নিলেও কিছু কাল বাদে এ নিয়ে ফের বিতর্ক শুরু হবে যা সমাজের জন্য ভালো নয়।’
এদিকে, অযোধ্যা ইস্যুর নিষ্পত্তি না হলে ভারতের অবস্থা সিরিয়ায় পরিণত হতে পারে বলে রবিশঙ্কর যে মন্তব্য করেছেন সে সম্পর্কে দেশের প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে তার সমালোচনা করা হয়েছে। কংগ্রেস নেতা পি এল পুনিয়া রবিশঙ্করের মন্তব্যকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করেছেন।
'বিচার ব্যবস্থার প্রতি অত্যন্ত ক্ষতিকারক বিষয়'
এ নিয়ে আজ সারা বাংলা সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ কামরুজ্জামান রবিশঙ্করের মন্তব্যকে ‘অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিহিত করে রেডিও তেহরানকে বলেন, ‘আমরা অবাক হচ্ছি যে, এ ধরণের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আদালতের উপরে আস্থা হারিয়ে তারা আদালতের বাইরে ব্যক্তিগতভাবে ওই বিতর্কের সুষ্ঠু সমাধান চাচ্ছেন। যখন দেশের কোটি কোটি মুসলিম দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখছে, তখন দেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের এক নেতা যেভাবে আদালতের উপরে অনাস্থা প্রকাশ করছেন তা বিচার ব্যবস্থার প্রতি অত্যন্ত ক্ষতিকারক বিষয়।’
তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করবো দেশের মানুষ এ ধরণের ভণ্ড দেশপ্রেমীদের চিনে নেবেন এবং দেশের বিচার ব্যবস্থাকে মজবুত রাখতে সুপ্রিম কোর্টে চলা বিচারের প্রতি ১৩০ কোটি মানুষের আস্থাকে শক্তিশালী করতে সুপ্রিম কোর্ট স্বতঃপ্রণোদিতভাবে এ ধরণের বিবৃতির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা শুরু করবে, যাতে আগামীতে কেউ যাতে এ ধরণের অবমাননাকর মন্তব্য করতে দুঃসাহস না দেখায়।

তুরস্কে নিরাপত্তা হুমকিতে বন্ধ মার্কিন দূতাবাস

মার্কিন মিশনের ওয়েবসাইটে একথা জানানো হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। ২০১৩ সালে তুরস্কে মার্কিন দূতাবাসে আত্মঘাতী বোমা হামলায় এক তুর্কি নিরাপত্তা কর্মী নিহত হয়। কট্টর একটি বামপন্থী গ্রুপ এ হামলা চালানোর দাবি করে। সিরিয়ান কুর্দিশ পিপলস প্রটেকশন ইউনিটের (ওয়াইপিজে) সিরীয় কুর্দি মিলিশিয়াদের যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র দেয়াসহ একাধিক ইস্যুতে ন্যাটোর মিত্র দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরে। সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে ওয়াইপিজের শক্তিশালী ঘাঁটি আফরিনে তাদের বিরুদ্ধে গত ২০ জানুয়ারি আঙ্কারা অভিযান শুরু করে। তুরস্ক ওয়াইপিজের সঙ্গে কাজ করা বন্ধ করতে ওয়াশিংটনের প্রতি আহবান জানিয়েছে। এদিকে তুর্কি অভিযানের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

অবশেষে জার্মানিতে জোট সরকার গঠিত হচ্ছে

জার্মানির সরকার গঠন নিয়ে অবশেষে অধীর আগ্রহের অবসান ঘটল। নির্বাচনের ১৬১ দিন পর জোট সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। আগামী চার বছরের জন্য চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেলের ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাট ইউনিয়ন পার্টি, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং ব্যাভেরিয়া রাজ্যভিত্তিক ছোট দল ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন জোটবদ্ধ হয়ে এই সরকার গঠন করবে। জার্মানিতে সরকার গঠনের এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জার্মানির রাজনীতিতে বেশ অস্থিরতা বিরাজ করছিল। বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে দোদুলতা প্রকাশ পাচ্ছিল। গত ২৪ অক্টোবর জার্মানিতে ১৯তম পার্লামেন্ট নির্বাচন হয়েছিল।
এরপর প্রায় রেকর্ড সময় তিন মাস পরে পুনরায় বিগত আট বছরের জোট সরকারের আদলের দলগুলোকে নিয়ে গত ১২ জানুয়ারি জোট সরকার গঠনের প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষ হয়। তারপরও জার্মানির দ্বিতীয় বৃহত্তম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির অনেক নেতা ও তরুণ সদস্য পুনরায় জোটবদ্ধ হয়ে সরকারে যাওয়ার বিরোধিতার কারণে দলটির জোটে যাওয়ার প্রশ্নে বিশেষ সম্মেলন আয়োজনের করতে হয়েছিল। জার্মানির ১৬টি রাজ্য থেকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির ৬০০ প্রতিনিধি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ৪২ জন সদস্য বন নগরীতে জোটে যাওয়ার প্রশ্নে বিশেষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনে জোট সরকার গঠনের পক্ষে মতামত দিলেও, দেশজুড়ে দলটির সব সদস্যের রায় নেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এই দলের প্রায় ৪ লাখ ৬৪ হাজার নিবন্ধিত সদস্য গত ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ পর্যন্ত জোট সরকারে যাওয়ার পক্ষে বা বিপক্ষে ভোট দেন। গত শনিবার বার্লিনে দলটির সদর দপ্তর ভিলি ব্যান্ড হাউসে সারা রাত গণনার পর রোববার ফল ঘোষণা করা হয়। বলা হয়, সরকার গঠনের পক্ষে দলটির ৬৬ শতাংশ সদস্য ভোট দিয়েছেন। জার্মানির সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো দলটির অনেক নেতা ও তরুণ সমর্থকদের ভাষ্য, গত আট বছরের মতো পুনরায় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি জোটবদ্ধ হয়ে সরকার গঠন করলে দলটির জনপ্রিয়তা আরও কমে যাবে এবং সামাজিক, স্বাস্থ্য ও শরণার্থী খাতে দলটির উদার নীতি খর্ব হবে।

তিন নোবেল-কন্যার সফর আর কতিপয় ‘প্রশ্ন’ by গওহার নঈম ওয়ারা

তাঁরা তিনজনই শান্তিতে নোবেল বিজয়ী, তিনজনই নারী। গত সপ্তাহে তিনজন একসঙ্গে বাংলাদেশে এসেছিলেন। রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবির সরেজমিন পরিদর্শন করলেন। শান্তিতে নোবেলজয়ী এই তিন নারী: ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান, ইরানের শিরিন এবাদি এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের ম্যারেইড ম্যাগুয়ার। উখিয়া থেকে ফেরার পথে এই লেখক তাঁদের গাড়ির ধুলা আর কোটালদের চাহনি ছাড়া কিছুই দেখতে পায়নি। সন্ধ্যায় কক্সবাজারে রিলিফ কমিশনারের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনায় নোবেল-কন্যাদের প্রসঙ্গ উঠল, মনে হলো সবাই যেন অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আশার আলো দেখছেন—এবার নিশ্চয় কিছু হবে! শরণার্থীনেতারও যেন মনে হলো মনে জোর পাচ্ছেন, হাজার হোক সুকির (মতান্তরে সু চি) বন্ধুরা এসেছেন। বাংলাদেশ সফরে আসা তিন নারী নোবেলজয়ীর মতো সু চিও তো নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী। সু চি নিশ্চয় তাঁর একসময়কার সতীর্থদের খালি হাতে ফেরাবেন না! রোহিঙ্গাদের সামাজিক নেতাকে বলে মাঝি। এ রকম একজন মাঝির স্ত্রী ভেবেছিলেন, সফররত অতিথিরা কক্সবাজার-ঢাকা ঘুরে নেপিডো, সিটুইয়া হয়ে মংডু বুছিডং যাবেন। বলা বাহুল্য, এটা নিছকই তাঁর ধারণাপ্রসূত কল্পনাবিলাস। বাস্তবে তা ঘটেনি, কখনো ঘটবে কি? কী জানি? এই প্রশ্নটাই করা যেত ম্যারেইড ম্যাগুয়ারকে কিংবা তাওয়াক্কল কারমান অথবা শিরিন এবাদিকে। তাওয়াক্কল আর শিরিন দুজনেই যাঁর যাঁর দেশ থেকে নির্বাসিত—পরবাসী। চাইলেই তাঁদের নিজেদের দেশে তাঁরা ফিরতে পারবেন না। কিন্তু ম্যারেইড ম্যাগুয়ারের পরিস্থিতি ভিন্ন। তিনি তাঁর দেশেও সমাদৃত, সরকার অ-সরকার সবাই তাঁকে পাত্তা দেয় কথা শোনে। তিনি কি একবার চেষ্টা করবেন রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের পোড়া ভিটা আর গণকবর সরেজমিন দেখে আসতে? কিংবা নোবেল উইমেনস ইনিশিয়েটিভ কি একবার উড়োজাহাজটা ওদিকে ঘুরাবে? কিংবা এরপর কী ঘটবে? গত ১ ফেব্রুয়ারির প্রথম আলো পত্রিকা লিখেছে, ‘তিন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ থেকে ফিরেই তাঁরা মিয়ানমারে যাওয়ার জন্য ভিসার আবেদন করবেন। উদ্দেশ্য, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চির সঙ্গে সরাসরি কথা বলে কৈফিয়ত চাওয়া আর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া। যদিও চিঠির পর চিঠি লিখেও সু চির কোনো জবাব তাঁরা পাননি। তবু তাঁরা হাল ছাড়বেন না। চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। কী করতে হবে, সেই সুযোগ এসেছিল ঢাকায় এই তিন মহীয়সী নারীকে নিয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায়। আয়োজন করেছিল নারীদের সংগঠন নারীপক্ষ। তাদের গণদাওয়াতের লম্বা তালিকায় কীভাবে যেন ঢুকেছিল আমাদের নামও। শুধুই ঘোরাফেরা, চা, শরবত, বক্তৃতা-বিবৃতি, কান্নাকাটি, জড়িয়ে ধরা, ফোটোসেশন জমিলা-করিমা-আবেদিন-উমাদের ঘরে ফেরা নিশ্চিত করবে কি না? এসব অনেক প্রশ্ন করা যেত নোবেল বিজয়ী নারীদের। আয়োজকেরা সুযোগও দিয়েছিল। কিন্তু ওই যে রবিঠাকুরের অমোঘ বাণী: ‘রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করোনি’, তা কি কখনো মিথ্যা হতে দেবে বাঙালি? কথা ছিল প্রশ্নকর্তা ও প্রশ্নকর্ত্রীরা শুধু নিজ নিজ নামটা বলে প্রশ্ন করবেন, সংক্ষেপে শুধুই প্রশ্ন। কিন্তু হুজ্জতে বাঙালি হাতে মাইক পেলেই অমায়িক হয়ে যান, প্রশ্ন ভুলে পারলে পুরো ১০ মিনিটের ব্যাখ্যাসহ রবীন্দ্রসংগীত শুনিয়ে দেন আরকি! সঞ্চালক প্রমাদ গোনেন, লজ্জা ধুয়ে ফেলে চিৎকার করেন, প্রশ্ন করেন।
কিন্তু কে কার কথা শোনে! কে কত আগে থেকে নোবেল-নারীদের সম্পর্কে জানেন, তাঁদের ছবি টাঙিয়েছেন মনের চাতালে, ছুঁয়ে দেখেছেন কোন এয়ারপোর্টে কোন সেমিনারের পরে লম্বা লাউঞ্জে, সেসবের ফিরিস্তি আর শেষ হয় না। রোহিঙ্গাদের ঘরে ফিরে যাওয়ার আসল প্রশ্নগুলো তেমন করে আর করাই হয় না। সারা আরব বিশ্ব সম্পর্কে নিজের জ্ঞানের ভান্ডার উজাড় করে দিয়ে এক পুরুষ শ্রোতা জানতে চাইলেন, আপনি কবে ইয়েমেনের নারীদের হিজাব খুলতে বলবেন? কেউ এভাবে কথা বলে? লজ্জা লজ্জা! সীতা ওখানে থাকলে হয়তো বলতেন, ধরণি দ্বিধা হও, আমি মুখ লুকাই। ইয়েমেনের শান্তিবাদী নারী তাওয়াক্কল না চটে জানিয়ে দিলেন, পোশাক নয় ভাই, কাজ দিয়ে বিচার করুন। হিজাব চাপিয়ে দেওয়া যেমন ঠিক নয়, তেমনি কাউকে হিজাব খুলতে বাধ্য করাটাও অন্যায়। আরেক ‘ভাই’ হুজ্জতি দেখাতে গিয়ে পড়লেন মহাফাঁপরে। তাঁর বীরত্বের গাথা জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা ফাঁসি দিয়ে তবে ছেড়েছি, আন্দোলন করে সেটা হাসিল করেছি!’ ইরানের শিরিন এবাদি বললেন, ‘সরি ভাই, মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমরা ফাঁসির মতো মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি অনুমোদন করতে পারি না।’ কাজের প্রশ্ন করার সুযোগ এভাবেই বেহুদা হুজ্জতির গ্যাঁড়াকলে পড়ে আঙুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে গেল। যেমন যায় অনেক সময়; সময় নষ্ট হয়েছিল শুরুতেও। যে ভবনে আয়োজন সেই দালানের মালিকদের শখ হয়েছিল শান্তির দূতদের সঙ্গে ছবি তোলার, কীভাবে সেটা করা যায়? গুষ্টি বেঁধে ওদের হাতে ক্রেস্ট তুলে দিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে করতেই কেটে যায় অনেকটা সময়। না জানি এসব ক্রেস্ট প্রদানের ছবি তাঁরা কত জায়গায় ব্যবহার করবেন; তাতে কি রোহিঙ্গা পরিস্থিতির কোনো হিল্লা হবে? বিদেশি অতিথিদের সামনে নিজেদের যে পরিচয় আমরা কতিপয় দিলাম, তাতে আমাদের না হোক, অতিথিদের নিশ্চয়ই বোধোদয় হবে। নিশ্চয় আমরা এখনো সংশোধনের অতীত হইনি।
গওহার নঈম ওয়ারা: ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক

বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা ভিয়েতনামের

চামড়া খাতের পশ্চাৎ সংযোগ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, হার্ডওয়্যার ও বিভিন্ন ডিভাইস এবং নানা এক্সেসরিজ উৎপাদনে বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে ভিয়েতনামের উদ্যোক্তাদের। দেশটির প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফরের সময় উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের সম্মেলন ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে এসব খাতে বিনিয়োগের অনেক কিছুই চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং তিন দিনের সফরে গতকাল রোববার ঢাকায় পৌঁছেছেন। তার ১০০ সফর সঙ্গীর মধ্যে ৪৫ জন উদ্যোক্তা। প্রতিনিধি দলে লোটাস টেলিফোন, ভিটেল গ্রুপ, হ্যাসিসন গ্রুপসহ বিভিন্ন খ্যাতনামা কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তারা রয়েছেন। সফরের আগে উভয় দেশের প্রধান দুই চেম্বারের মধ্যে একাধিক বৈঠকে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন তারা। এর মধ্যে চামড়া খাতের পশ্চাৎ সংযোগ শিল্পে ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে সমঝোতা স্মারক সইয়ের বিষয়টি অনেকটাই চূড়ান্ত বলে জানা গেছে। এ ছাড়া বিটিসিএল ও ভিয়েতনামের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের বিষয়ে এমওইউ হতে পারে। এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন সমকালকে জানান, ভিয়েতনামের উদ্যোক্তারা অবকাঠামো, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, তেল ও গ্যাস এবং পর্যটনসহ আরও বেশ কয়েকটি খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে তাদের দেশের পোশাক খাতে এখানকার উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের প্রস্তাবও দেবেন তারা। সফরকালে উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের নিয়ে এফবিসিসিআই আগামীকাল মঙ্গলবার 'বাংলাদেশ-ভিয়েতনাম বিজনেস ফোরাম' আয়োজন করেছে। এতে ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার এবং ভিয়েতনামের পরিকল্পনা ও বিনিয়োগ ভাইস মিনিস্টার নুগুইয়েন ভান ট্রুনগ উপস্থিত থাকবেন। এফবিসিসিআই সভাপতি আরও জানান, সফরকালে সম্মেলনে আলোচনা ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি দেশটির উদ্যোক্তারা তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্যতাও খতিয়ে দেখবেন। আর এ সফরের আগে ভিয়েতনাম চেম্বারের সঙ্গে বৈঠককালে দেশটির উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছেন। সফরকালে এ নিয়েও অগ্রগতি হবে বলে আশা করছেন তিনি। মহিউদ্দিন জানান, বাংলাদেশ কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে পিছিয়ে রয়েছে।
অংশীদার পেলে সফরকারীরা এ খাতেও বিনিয়োগে বেশ আগ্রহী। তারা একই সঙ্গে অবকাঠামো সুবিধা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিষয়ে জোর দিয়েছেন। তিনি আশা করছেন, এ সফর শুধু কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক সফর হবে না। এটি দেশটির বড় বিনিয়োগ আনার সফর হবে। এফবিসিসিআইর প্রথম সহসভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম জানান, ভিয়েতনামের উদ্যোক্তাদের এ সফরকে ঘিরে আগের আলোচনায় একটি ওষুধ কোম্পানি সামুদ্রিক মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি বলেন, এফবিসিসিআই দেশটির প্রযুক্তি স্থানান্তরে জোর দেবে, যাতে সেখানকার কোম্পানিগুলো এ দেশে বিনিয়োগে আসে। হার্ডওয়্যারসহ নানা অ্যাক্সেসরিজ উৎপাদনে পাঁচটি কোম্পানি বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, তাদের আইটি ভিলেজ ও হাইটেক পার্কে বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য পরিস্থিতি : এক দশক আগে উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি ছিল না। যদিও বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল খুবই কম। তবে বর্তমান পরিস্থিতি পাল্টেছে অনেক। বাংলাদেশ রফতানিকারক থেকে আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ডলার রফতানির বিপরীতে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করে ৪১ কোটি ২২ লাখ ডলার। অথচ ২০০৭-০৮ অর্থবছরে প্রায় দুই কোটি ডলারের রফতানির বিপরীতে বাংলাদেশ আমদানি করে এক কোটি ডলারের সামান্য বেশি। রফতানির জন্য উল্লেখযোগ্য হলো- কৃষি, পাট ও চামড়াজাত পণ্য এবং ওষুধ। আর আমদানি হয় মূলত খনিজ দ্রব্য, বস্ত্র, যন্ত্রপাতি ও পল্গাস্টিকের উপাদান।

দিনভর ওঠানামার পর ঊর্ধ্বমুখী সূচক

অনেক দিন পর সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় শুরু হয়েছে দুই শেয়ারবাজারের লেনদেন। বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজার সূচকও বেড়েছে। তবে লেনদেনের পরিমাণ দ্বিতীয় শেয়ারবাজার সিএসইতে বাড়লেও কমেছে প্রধান শেয়ারবাজার ডিএসইতে। গত সপ্তাহের সার্বিক লেনদেন নিম্নমুখী থাকলেও শেষ তিন কার্যদিবসে ইতিবাচক ধারাতেই ছিল বাজার। বাজার সংশ্নিষ্টরা জানান, টানা পতনের পর বাজার ঘুরে দাঁড়াবে- এমন ধারণা নিয়ে অনেক বিনিয়োগকারী শেয়ার লেনদেনে অংশ নিচ্ছেন এখন। এরই প্রতিফলন দেখা গেছে বাজারে। তবে লেনদেনের শুরুতে যে ঊর্ধ্বমুখী ধারা ছিল, তা লেনদেনের শেষ পর্যন্ত বজায় থাকেনি। লেনদেনের প্রথম পৌনে এক ঘণ্টা শেষে অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বৃদ্ধির কারণে বাজারের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৫৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫৯২৩ পয়েন্ট ছাড়িয়েছিল।
এরপর কিছু শেয়ার দর হারায়। অন্য অনেক শেয়ারের দরবৃদ্ধির হার শুরুর তুলনায় কমে যায়। দুপুর ১টা ২০ মিনিটে সূচকটি ৫৮৭৬ পয়েন্টে নেমেছিল। নিম্নমুখী ধারার কারণে শেষ পর্যন্ত ঊর্ধ্বমুখী থাকে কি-না, তা নিয়ে শঙ্কাও দেখা দেয়। যদিও লেনদেন শেষে সূচকটি ১২ পয়েন্ট বেড়ে ৫৮৮৩ পয়েন্টে ক্লোজ হয়। শীর্ষ এক মার্চেন্ট ব্যাংক কর্মকর্তা বলেন, শেয়ারবাজার সংকটের প্রধান কারণ ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট। এর সমাধানে সরকারসহ সংশ্নিষ্ট সব পক্ষ কাজ করছে বলে খাবর পাওয়া গেছে। ইতিবাচক ফল মিললে ঘুরে দাঁড়াবে বাজার। যদিও রাজনীতিসহ অনেক বিষয় নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।

তিনি শাবিপ্রবির ব্র্যান্ডনেম by অধ্যাপক ফরিদউদ্দিন আহমেদ

অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবাল পড়ন্ত বিকেলে ছিলেন মুক্তমঞ্চে। বাংলাদেশের গর্বের প্রতিষ্ঠান শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবিপ্রবি) শনিবার ইলেকট্রনিক্স ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ট্রিপল-ই) বিভাগের সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনিই ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীদের তৈরি রোবটের মধ্যে চলছিল ফাইট। প্রথম রাউন্ডের প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছে কেবল। এ সময়ে সামান্য বৃষ্টি হচ্ছিল। অনুষ্ঠানে সাময়িক বিরতি। একজন শিক্ষক পরীক্ষার জন্য চলে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করছিলেন। এমন সময় অতর্কিতে সেই ভয়ঙ্কর হামলা। ছুরিকাঘাত করা হয়েছে পরপর কয়েকটি। মাথার পেছন দিকে খুব সংবেদনশীল স্থানেই ছুরি চালানো হয়। বলা যায়, ভালো প্রশিক্ষণ না থাকলে এ ধরনের আঘাত করা যায় না। ছাত্র ও শিক্ষকরা সক্রিয় হয়ে তাদের প্রিয় শিক্ষককে রক্ষার জন্য এগিয়ে যান। অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত পুলিশও তৎপর হয়। তিনি রক্তাক্ত ছিলেন; কিন্তু সবাইকে শান্ত থাকতে বলেন। এমনকি আটক দুর্বৃত্তের নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্যও অনুরোধ করেন। ছাত্র-শিক্ষকরা হামলাকারীকে আটক করেন। তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে দেওয়া হয়। কেউ কেউ বলছেন, সেখানে একাধিক হামলাকারী থাকতে পারে। এ বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানের বিষয়। বাংলাদেশের সর্বত্র জাফর ইকবাল নন্দিত। তিনি দেশের সেরা শিক্ষকদের একজন হিসেবে গণ্য হন। লেখক হিসেবে জনপ্রিয়। সব বয়সের পাঠক তার বইয়ের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। তবে বিশেষভাবে তরুণদের মধ্যে তিনি আইডল, অনুকরণীয়-অনুসরণীয়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা কাজে তিনি সর্বদা অগ্রণী। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে তার অবদান অতুলনীয়। তার স্ত্রী ড. ইয়াসমিন হকও বরেণ্য শিক্ষক। গবেষণা কাজে অধ্যাপক মুহম্মদ জাফর ইকবালের উৎসাহ অপরিসীম। অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করার কাজ তিনি করেন পরম আন্তরিকতায়। তাকে আমরা বলে থাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ব্র্যান্ডনেম'। তার পরিচয়েই অনেকে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে চেনেন। তিনি মুক্তবুদ্ধির চর্চা করেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। বিভিন্ন সময়ে তাকে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। বিরূপ সমালোচনাও করা হয়েছে। কিন্তু তিনি পিছু হটতে জানেন না। অপশক্তির কাছে হার মানতে জানেন না।
দেশের কল্যাণ ও মঙ্গল যারা চায় না, তাদের সঙ্গে আপস করতে জানেন না। লেখনীতে, আলোচনা অনুষ্ঠানে, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দেশের জন্য, দশের জন্য তার আকুলতার প্রকাশ ঘটে। তাকে হত্যার জন্যই আক্রমণ চালানো হয়েছিল- এটা সহজেই বুঝতে পারি। হামলা আকস্মিক ছিল না। মুহূর্তের উত্তেজনায় কিছু করে ফেলেনি হামলার সময় আটক দুর্বৃত্ত ফয়জুর রহমান। সে বয়সে যুবক। যতটা জানা গেছে, তার পিতা মাদ্রাসার শিক্ষক। সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নয়। উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে তার আসারও কোনো কারণ ছিল না। এটা ধরে নিতে পারি যে, পূর্বনির্ধারিত মিশনেই সে এসেছিল। সে কি নিজে থেকেই দেশের বরেণ্য একজন শিক্ষাবিদকে হত্যা করতে পরিকল্পনা এঁটেছিল, নাকি তার পেছনে রয়েছে সুসংগঠিত কোনো চক্র- সেটা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুসন্ধানে জানা যাবে। এর আগে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী আনসারউল্লাহ বাংলা টিম নামের একটি ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত। তাদের কেউ কেউ বাংলা একাডেমির বই মেলায় ড. অভিজিৎ রায়ের হত্যায় জড়িত ছিল বলে জানা যায়। সিলেটে ব্লগার অনন্ত বিজয়ের হত্যাকাণ্ডেও তাদের কারও কারও সংশ্নিষ্টতা ছিল। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় তাদের কয়েকজন গ্রেফতার হয়েছে। কেউ কেউ নিখোঁজ রয়েছে। অধ্যাপক জাফর ইকবালের ওপর হামলায় জড়িত ফয়জুর রহমানের সঙ্গে এসব সন্ত্রাসীর যোগাযোগ রয়েছে কি-না সেটা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে জানা যাবে। আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের সঙ্গে যুক্ত থাকার কারণে যারা আটক হয়েছিল, তাদের কেউ কেউ জামিনে মুক্ত হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়টি এখন অনুসন্ধানের আওতায় আসতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জঙ্গিবাদসহ যে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যেন জড়িত না হয়, সে বিষয়ে আমরা সচেতন রয়েছি। কেউ একনাগাড়ে অনেক দিন শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকলে তার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হয়। পরিবারকে প্রয়োজনে জানানো হয়। কেউ কেউ হঠাৎ করে জঙ্গি হয়ে যায় না। সাধারণত এটা একটি প্রক্রিয়ার ব্যাপার। কারও মধ্যে এ ধরনের পরিবর্তন দেখা দিলে সেটা পরিবারের সদস্যরা ধরতে পারেন, বন্ধু ও সহপাঠীদের নজরে পড়ে। ফয়জুর রহমান নামের যে দুর্বৃত্ত হামলায় জড়িত, সে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়। কিন্তু সে তো আমাদের সমাজেরই একজন। কাজেই আমাদের সচেতন থাকতে হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে। এদের কারণে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। হলি আর্টিসানে হামলায় ইতালি ও জাপানের কয়েকজন নাগরিক খুন হয়েছিলেন। এর প্রভাব পড়ার শঙ্কা ছিল আমাদের রফতানি বাণিজ্যে। বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়ার ক্ষেত্রেও সমস্যা হয়। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এ ধরনের সন্ত্রাসবাদ দমনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। এ কাজে সব মানুষের সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রিয় ক্যাম্পাসে যেন সন্ত্রাসী-জঙ্গিবাদী কেউ আশ্রয়-প্রশ্রয় না পায়, সেটা নিশ্চিত করব। এ পথ ভুল। এতে নিজের ক্ষতি হয়, পরিবার ও সমাজ বিপন্ন হয়। আমি গতকাল রোববার ঢাকার সিএমএইচে অধ্যাপক জাফর ইকবালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন। চিকিৎসকরা বলছেন, তিনি ঝুঁকিমুক্ত। তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। তিনি অচিরেই তার প্রিয় ক্যাম্পাসে ছাত্র ও সহকর্মীদের কাছে ফিরে আসবেন- এটাই কামনা। আগেই বলেছি, তাকে দিয়েই আমাদের এ বিশ্ববিদ্যালয়কে অনেকে চেনে। আমরা দেশের ভেতরে কিংবা বাইরে কোথাও গেলে অনেক সময় তার পরিচয়ের কারণেই আমাদের চেনাতে হয়। একজন শিক্ষকের চেয়ে এর চেয়ে সম্মান ও মর্যাদার আর কিছু হতে পারে না। তিনি সবার ভালোবাসায় সিক্ত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক গুণী শিক্ষক ও গবেষক আছেন। কিন্তু দেশ-বিদেশে প্রথমেই আসে জাফর ইকবালের কথা। তিনি আমাদের গর্ব। ছাত্রছাত্রীদের অনুপ্রেরণা। সবাইকে তিনি উজ্জীবিত করতে পারেন। যেখানে যান বিশেষভাবে কিশোর-তরুণরা তার সান্নিধ্য হয়। তার সঙ্গে কথা বলে আনন্দ পায়। দেশের জন্য তার যে অপরিসীম ভালোবাসা, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তার যে গর্ব, সেটা তিনি সহজেই অন্যদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের সবাই তাকে ভালোবাসেন। আমরা দ্রুত তাকে আমাদের মাঝে ফিরে পেতে চাই। আর যে হিংস্র দানবশক্তি তার ওপর হামলা চালিয়েছে, তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত সকলের চাই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি।
উপাচার্য, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

হাওরের কৃষকরা আতঙ্কে

নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের কৃষকরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাঁধ সংস্কারের নির্ধারিত সময় ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়েছে। তবে ফসল রক্ষা বেড়িবাঁধের সংস্কারের কাজ এখনও শেষ হয়নি। এ ছাড়া বাঁধ সংস্কার কাজে প্রকল্প কমিটির সভাপতি ও সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠলেও প্রশাসন এ ব্যাপারে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি। এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সুষ্ঠুভাবে বাঁধ মেরামতের দাবিতে জেলা শহর থেকে শুরু করে হাওরপাড়ের মানুষ নানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। জানা গেছে, জেলার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরী, মদনসহ বেশ কয়েকটি উপজেলা নিয়ে হাওরাঞ্চল গঠিত। বিশেষ করে ওইসব অঞ্চলে একমাত্র বোরো ফসলের ওপর এলাকার মানুষকে নির্ভর করে চলতে হয়। যথাসময়ে বাঁধ সংস্কার না করা এবং যেনতেনভাবে কাজ করায় প্রায় প্রতিবছর অকাল বন্যায় ফসলের ক্ষতি হয়। গত বছর মার্চের শেষের দিকে হাওরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে ও অকাল বন্যার ফলে জেলার খালিয়াজুরীতে শতভাগ ফসল পানিতে তলিয়ে বিনষ্ট হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাছসহ অন্যান্য প্রাণিজ সম্পদ। মদন, মোহনগঞ্জ, কলমাকান্দা, দুর্গাপুরসহ জেলার অন্য উপজেলায়ও বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এবারও বাঁধের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ না হওয়ায় ফসলহানির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা। এ ছাড়া হাওরাঞ্চলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় না করে সড়ক ও জনপথ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ হাওরের কোনো কোনো এলাকায় সড়ক নির্মাণ করেছে। সেগুলো হাওরবাসীর কোনো কাজেই আসবে না। স্থানীয় প্রশাসন কাজের তদারকী করলেও কোনো আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়নি। তবে কাজের বিল ঠিকই পরিশোধ করা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপকমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক ও জেলার মদনের মাখনা গ্রামের বাসিন্দা সাবেক ছাত্রনেতা শফি আহমেদ বলেন, হাওরে ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধের কাজ মোটামুটি হয়েছে। তবে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা প্রকল্প থেকে বাদ পড়েছে। এগুলো দেখে মেরামত করা প্রয়োজন। তা না হলে হাওরে পানি আসতে শুরু করলে ফসল তলিয়ে যাবে। গত বছরের বন্যায় ধনু নদীতে ৫ থেকে ৬ ফুট পলি জমে।
এ কারণে কয়েকদিন আগে ধনু নদীর লেপসিয়া ও নাওটায় শত শত মালবোঝাই কার্গো আটকা পড়েছিল। যতক্ষণ পর্যন্ত ধনু নদী পরিপূর্ণভাবে খনন করা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ঝুঁকিতেই থাকবে। হাওরে বেড়িবাঁধ সংস্কার একটি সাময়িক ব্যবস্থা মাত্র। পাহাড়ি ঢল এলে বেড়িবাঁধ উপচে হাওরে পানি প্রবেশ করবে। এ থেকে স্থায়ীভাবে পরিত্রাণ পেতে হলে নদী খনন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। খালিয়াজুরী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও খালিয়াজুরী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া জব্বার বলেন, সঠিক নিয়মে প্রকল্প তৈরি করা হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) বেশিরভাগ কমিটি স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের নিজস্ব লোকজনদের নিয়ে গঠন করা হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের এসওর যোগসাজশে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা বাদ দিয়ে প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। পানি আসতে শুরু করলে হাওরে পানি প্রবেশ করে ফসল তলিয়ে যাবে। নির্মিত এসব বাঁধ কোনো কাজেই আসবে না। নেত্রকোনা জেলার হাওর উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি স্বাগত সরকার শুভ বলেন, নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে গেলেও অধিকাংশ বাঁধ মেরামতের কাজ এখনও শেষ হয়নি। অধিকাংশ প্রকল্পে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত বরাদ্দ দেওয়ায় এ অনিয়ম হয়েছে। খালিয়াজুরী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার আবদুল্লাহ আল-মামুন বাবু বলেন, প্রায় সব বাঁধেই মাটি ফেলানোর কাজ শেষ হয়েছে। এরই মধ্যে সংস্কারের কাজ প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এখন চলছে বাঁধের মাটি লেবেল করার কাজ। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় এখন আর কোনো বাঁধ নেই। অকাল বন্যায় ফসলহানির সম্ভাবনা কম। নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আক্তারুজ্জামান বলেন, কাজে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়নি। আর এখন কাজের তদারকি করে স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্নিষ্ট এসও। তবে সংস্কার কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয়নি। ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ হয়েছে।

ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টকে লালগালিচা সংবর্ধনা

ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্ট ত্রান দাই কুয়াং গতকাল রোববার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে ঢাকায় পৌঁছলে তাকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের আমন্ত্রণে অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের লক্ষ্যে তিনি বাংলাদেশ সফরে এসেছেন।
ভিয়েতনামের এই নেতা ও তার পত্নী নগুয়েন থাই হিয়েন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছলে ২১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, তার পত্নী রাশিদা খানম ও কয়েকজন সিনিয়র মন্ত্রী তাদের স্বাগত জানান। তাদের বহনকারী এয়ারক্র্যাফটটি বিকেল ৪টার দিকে বিমানবন্দরে অবতরণ করে। খবর বাসসের। ভিয়েতনাম এয়ারলাইন্সের একটি বিশেষ এয়ারক্র্যাফট থেকে প্রেসিডেন্ট কুয়াং, তার পত্নী ও সফরসঙ্গীরা নেমে আসার পর দুই শিশু তাদের ফুলেল শুভেচ্ছ জানায়। ভিয়েতনামের প্রেসিডেন্টকে স্বাগত জানানোর সময় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী ও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে ছিলেন। এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ সচিব, কূটনীতিক মিশনের প্রধানগণ, তিন বাহিনীর প্রধানগণ, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), পররাষ্ট্র সচিব, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সচিবগণ এবং উচ্চপদস্থ বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সামনে ফয়জুর নেপথ্যে কারা

পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী একাধিক দফায় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) ক্যাম্পাস রেকি করেই জনপ্রিয় লেখক জাফর ইকবালকে হত্যার জন্য টার্গেট করা হয়েছিল। তাকে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকা টুকেরবাজারের শেখপাড়ার বাসিন্দা ২৪ বছরের যুবক ফয়জুর রহমান ওরফে ফয়জুর ওরফে ফয়জুল হাসান শনিবার ছুরি নিয়ে তার ওপর নৃশংস হামলা চালায়। হাতেনাতে ধরা পড়ার পর ফয়জুরকে প্রাথমিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে র‌্যাব-পুলিশের একাধিক টিম। ফয়জুর স্বীকার করেছে, হামলা চালাতে গিয়ে ধরা পড়লে নিজের প্রাণও যেতে পারে- এটা জেনেশুনেই জাফর ইকবালকে হত্যা করতে যায় সে। উগ্রপন্থায় বিশ্বাসী হলেও জঙ্গিদের কোনো সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা গতকাল পর্যন্ত স্বীকার করেনি সে। তবে হামলা করে সে মোটেও বিচলিত বা অনুতপ্ত নয়। কারণ তার ভাষায়, 'জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু। তিনি নাস্তিক।' তাই তাকে প্রাণে মেরে ফেলতে চেয়েছে ফয়জুর। পুলিশ-র‌্যাবের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল রোববার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী  শেখ  হাসিনা এ হামলাকে 'অনাকাঙ্ক্ষিত' উল্লেখ করে বলেন, হামলাকারী কারা, তা আক্রমণের ধরন থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেছে। যারা এ ঘটনাগুলো ঘটায়, তারা ধর্মান্ধ হয়ে গেছে। তারা মনে করে, একটা মানুষ খুন করলেই বুঝি তারা বেহেশতে চলে যাবে।
তারা কোনোদিন বেহেশতে যাবে না। এদিকে বিকেলে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের বিক্ষোভ সমাবেশে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, অন্যায়ের বিচার না হওয়ার ধারাবাহিকতায় হুমায়ুন আজাদ, অভিজিৎ রায়সহ ১৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। মুক্তমনা মানুষদের ওপর হামলা ও হত্যার বিচার না হওয়ায়, সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ড. জাফর ইকবালের ওপরও আক্রমণ হয়েছে। এর দায় রাষ্ট্র এড়াতে পারে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের স্ত্রী অধ্যাপক ইয়াসমিন হক বলেছেন, গত দুই বছর নয়, অনেক বছর ধরেই নানাভাবে তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কাফনের কাপড় পাঠানো হয়েছে। ২৪ ঘণ্টা তাদের সঙ্গে পুলিশ থাকে। তিনি অনুভব করেন না হামলার জন্য সঙ্গে সঙ্গে সরকারকে বা পুলিশকে ব্লেইম করা ঠিক হবে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা বলছেন, হামলাকারী ফয়জুর একজন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য, এটা মোটামুটি নিশ্চিত। তবে এ হামলার নেপথ্যে অন্য কুশীলব রয়েছে। তারাই প্রশিক্ষণ দিয়ে তাকে হামলার জন্য প্রস্তুত করে তুলতে পারে। তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। হামলাকারী ফয়জুর আনসার আল ইসলাম (সাবেক আনসারুল্লাহ বাংলা টিম-এবিটি) সদস্যও হতে পারে। শাবিপ্রবি ও আশপাশ এলাকায় এই উগ্রপন্থি সংগঠনের সদস্যদের সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। গত এক বছরে এবিটির সঙ্গে সংশ্নিষ্টতার অভিযোগে শাবিপ্রবির ১২ ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় এই সংগঠনের পক্ষ থেকে জাফর ইকবালকে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। অতীতে ড. অভিজিৎ রায়সহ অন্যান্য ব্লগার ও লেখককে এবিটির জঙ্গিরা যে কায়দায় হামলা করেছে, তার সঙ্গে জাফর ইকবালের ওপর হামলার পুরোপুরি মিল রয়েছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ইলেট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী রোববার সমকালকে বলেন, হামলার ধরন বলছে এটি জঙ্গি হামলা। সেটা না হলে কীভাবে এই পরিবেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে জাফর ইকবালের ওপর আক্রমণ করা হলো? দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ ছাড়া এটা অসম্ভব।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‌্যাব-৯-এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আলী হায়দার আজাদ সমকালকে বলেন, ফয়জুরকে ধরার পর গণধোলাই দেওয়া হয়েছিল। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হামলার ব্যাপারে সে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে। এসব যাচাই-বাছাই চলছে। র‌্যাব এ ঘটনার ছায়াতদন্ত শুরু করেছে। ফয়জুরকে পরে পুলিশের হেফাজতে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (গোপনীয়) মো. মনিরুজ্জামান সমকালকে বলেন, হামলার ধরন ও অন্যান্য তথ্য বিশ্নেষণ থেকে এটি জঙ্গিদের কাজ বলে মনে হচ্ছে। সব সন্দেহ সামনে রেখেই তদন্ত চলছে। আগে থেকেই রেকি করে হামলা :দায়িত্বশীল উচ্চ পর্যায়ের সূত্র জানায়, ফয়জুর স্বীকার করেছে, জাফর ইকবালকে টার্গেট করে হামলা করতে কিছুদিন ধরেই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস রেকি করে সে। জাফর ইকবাল কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে মিশছেন- তা জানতে অনেক দিন ক্যাম্পাসে যায় সে। এমনকি শনিবার জাফর ইকবাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের আয়োজনে 'ইইই ফেস্টিভ্যালে' উপস্থিত থাকবেন, তা আগেই জানত সে। ঘটনার দুপুর থেকেই সে ক্যাম্পাস এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে। বাসা থেকে হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসে যায় সে। ছুরিটি কোথায় পেয়েছে- এমন প্রশ্নে নিরুত্তর ছিল ফয়জুর। কেউ তাকে হামলার জন্য নির্দেশ দিয়েছে, নাকি অর্থ দিয়েছে? এমন প্রশ্নে সে জানায়, 'পত্রিকায়, টেলিভিশনে ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সে জাফর ইকবালের লেখালেখি ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রেখে আসছিল। তার মনে হয়েছে, জাফর ইকবাল ইসলামের শত্রু। সে নাস্তিকতা প্রচার করে। তাই তার প্রতি তার ঘৃণা জন্মায়।' এই ঘৃণা থেকেই জাফর ইকবালকে টার্গেট করে সে। তবে তার অন্য কোনো সহযোগী ছিল কি-না এ ব্যাপারে মুখ খুলতে রাজি হয়নি ফয়জুর। কারও কাছ থেকে অর্থ নিয়ে হামলায় অংশ নেয়নি বলে জানায়। পুলিশের ধারণা, ফয়জুরের সঙ্গে ঘটনাস্থলের আশপাশে তার অন্য সহযোগী থাকতে পারে। সাধারণত জঙ্গিদের একেকটি স্লিপার সেলে তিন থেকে সাতজন সদস্য থাকে। আবার অনেক সেলফ রেডিকালাইজড উগ্রপন্থি এককভাবে হামলা চালায়। শনিবারের হামলার পর ফয়জুরের কাছ থেকে আরও কিছু আলামত পাওয়া গেছে, সেসব পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশের কাছে হস্তান্তরের পর ফয়জুর হাসছিল। তখনও তার মাথায় ছিল ব্যান্ডেজ। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে মানসিকভাবে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে, এত বড় ঘটনার পরও তার চোখে-মুখে চিন্তা বা অপরাধের বিন্দুমাত্র ছাপ নেই। জঙ্গি হলেও তার সঙ্গে আর কারা জড়িত, একজন বহিরাগত হয়েও কার পরিকল্পনায় ক্যাম্পাসে গিয়ে একটি বিভাগের অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে গিয়ে সে ওই হামলা চালাল, সে প্রশ্নের উত্তর এখনও দেয়নি ফয়জুর। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, সামনে ফয়জুর থাকলেও এ হামলার নেপথ্যে রাঘববোয়াল থাকতে পারে। তদন্তে সেটা বের করাই এখন পুলিশের চ্যালেঞ্জ। ভিন্নভাবে নামাজ আদায় করত হামলাকারী ও তার চাচা :এলাকাবাসী জানান, ফয়জুর ও তার এক চাচা স্থানীয় মসজিদে আলাদা কায়দায় নামাজ আদায় করত। মসজিদের ইমামের পেছনে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে তারা আগ্রহী ছিল না। এ নিয়ে এলাকার অন্য বাসিন্দাদের সঙ্গে তাদের ঝগড়াও হয়েছিল। পরে ফয়জুরের ওই চাচা কুয়েত চলে যান। ধারণা করা হচ্ছে, কুয়েত প্রবাসী দুই চাচার মাধ্যমে জঙ্গিবাদে ভেড়ে ফয়জুর। সে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার গ্রামের বাড়ি সংলগ্ন ধল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করার পর আলিম শ্রেণিতে ভর্তি হয়। তবে সিলেট নগরীর উপকণ্ঠ টুকেরবাজারের শেখপাড়ায় শাবি সংলগ্ন বাসায় এসে জঙ্গি মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে হামলাকারী ফয়জুর লেখাপড়া ছেড়ে দেয়। এ সময় নগরীর জিন্দাবাজারের একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করার পাশাপাশি নামাজসহ ইসলামের বিভিন্ন রীতিনীতি ভিন্ন পন্থায় পালন শুরু করে সে। গত মাসে সে কম্পিউটারের দোকানের কাজ ছেড়ে দিয়ে 'নতুন মিশন' বাস্তবায়নের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়। আত্মসমর্পণ করেছে ফয়জুরের মা-বাবা :জাফর ইকবালের ওপর হামলাকারী ফয়জুরের বাবা-মা থানায় আত্মসমর্পণ করেছেন। রোববার রাত পৌনে ১১টার দিকে ফয়জুরের বাবা আতিকুর রহমান ও মা মিনারা বেগম সিলেট মহানগরের জালালাবাদ থানায় আত্মসমর্পণ করেন। এরপর রাতেই ফয়জুরের মা-বাবাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এর আগে রোববার বিকেলে হামলাকারী ফয়জুর রহমানকে পুলিশ হেফাজতে দেওয়া হয়েছে। এর পরই পুলিশ ফয়জুর রহমানকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। আহত অবস্থায় ফয়জুরকে গ্রহণ করে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে। এর আগে রোববার বিকেলে শেখপাড়া ও কালিয়ারকাপন গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ফয়জুরের পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। হামলার পর শনিবার রাতে সিলেট মহানগর পুলিশ ফয়জুরের মামা ফজলুর রহমানকে আটক করে। এদিকে জাফর ইকবালের ওপর হামলার পরপরই ঢাকা থেকে সিটিটিসির পাঁচ সদস্যের একটি দল আসামি ফয়জুরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সিলেটে যায়। পুলিশের দুই সদস্য প্রত্যাহার :জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় নিয়োজিত দুই পুলিশ সদস্যকে দায়িত্বে অবহেলার জন্য প্রত্যাহার করে গতকাল পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হামলার সময় নিরাপত্তায় নিয়োজিত ওই দুই পুলিশ সদস্য মুঠোফোন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (মিডিয়া) আবদুল আহাদ বলেন, 'দুইজনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। হামলার সময় তারা দায়িত্বে অবহেলা করেছেন কি-না, তা তদন্ত করে দেখা হবে।'
তথ্য জানতে চারজনকে আটক : এ হামলার ঘটনায় গতকাল সকাল পর্যন্ত র‌্যাব সন্দেহভাজন হিসেবে আরও চারজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। তাদের মধ্যে একজন হামলাকারী ফয়জুরের চাচা আবুল কাহার। গতকাল ভোরে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার জগদলের কালিয়ারকাপন গ্রামের বাড়ি থেকে চাচা আবুল কাহারকে আটক করা হয়। আসামি ফয়জুরের বাবা মাদ্রাসা শিক্ষক আতিকুর রহমানের পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে তিনজন দেশে থাকেন। এ ছাড়া নগরীর জিন্দাবাজারের রাজা ম্যানশনের মঈন কম্পিউটার অ্যান্ড প্রিন্টার্সের মালিক মঈনুল হক মঈনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য র‌্যাব হেফাজতে নিয়েছে। জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজা ম্যানশনের দ্বিতীয় তলার মঈনের কম্পিউটারের দোকানে গত জানুয়ারি মাস পর্যন্ত ফয়জুর কাজ করত বলে জানা গেছে। আটক অন্যজনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। তবে র‌্যাব রাজা ম্যানশনের তৃতীয় তলার মসজিদ সংলগ্ন একটি কম্পিউটার দোকানের একজনকে আটক করেছে বলে জানা গেছে। এই কম্পিউটারের দোকানগুলোতে ফয়জুর জামায়াতের বিভিন্ন প্রচারপত্রসহ জঙ্গি মতবাদে বিশ্বাসী বিভিন্ন প্রকাশনা কম্পোজের কাজ করত বলে জানা গেছে। এ ছাড়া গতকাল দুপুরে ফয়জুরকে প্রধান আসামি করে অজ্ঞাত আরও 'কয়েকজনের' বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সিলেট সদর উপজেলার কুমারগাঁওয়ের ফয়জুরের শেখপাড়ার বাড়ি থেকে বিভিন্ন ধরনের ইসলামী বই ও ল্যাপটপ-সিডি উদ্ধার করা হয়েছে। হামলার আলামত হিসেবে ছুরি ও একটি চাবি পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। এছাড়া ফয়জুরের ব্যাপারে তথ্য জানতে গতকাল তার মামা সুনামগঞ্জ জেলা কৃষক লীগের বহিস্কৃত নেতা ফজলুর রহমানকে আটক করে পুলিশ।
তদন্ত কমিটি : এদিকে হামলার ঘটনা তদন্তে গতকাল শাবিপ্রবি প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির সদস্যরা হলেন- সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক আবদুল গণি, রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ও কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক শহিদুর রহমান। গত শনিবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এক অনুষ্ঠানে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে অতর্কিতে জাফর ইকবালের মাথার পেছনে ছুরিকাঘাত করে এক যুবক। এর পর তাকে দ্রুত নেওয়া হয় সিলেটের ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখান থেকে শনিবার রাতেই বিমানবাহিনীর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাকে সিএমএইচে আনা হয়। এখন তিনি আশঙ্কামুক্ত। এ হামলার পর সারাদেশে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনার দাবি ওঠে।

বডিবিল্ডারদের কাছে বুকের দুধ বেচে কোটিপতি যিনি

মায়ের দুধের বিকল্প নেই- এই কথাটা নবজাতক শিশুদের জন্য যথার্থ ও প্রমাণিত। কিন্তু বডি বিল্ডারদের কাছেও নাকি মায়ের বুকের দুধ মূল্যবান। আর এ কারণে বডিবিল্ডারদের কাছে বুকের দুধ বিক্রি করে কোটিপতি হয়ে গেছেন সাইপ্রাসের এক নারী।
রাফেলা ল্যাম্পরুউ নামে ওই নারী সাত মাস আগে পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। সন্তান হওয়ার পর থেকে তিনি বুঝতে পারছিলেন ছেলেকে খাওয়ানোর পর অনেক বুকের দুধ থেকে যাচ্ছে। এরপর ২৪ বছর বয়সী রাফেলা অন্য শিশুদের জন্য বাড়তি দুধ বিক্রি করতে শুরু করেন। বুকের দুধ তৈরি হয় না- এমন মায়ের শিশু-সন্তানদের জন্য বুকের দুধ বিক্রি করছিলেন তিনি। এর এক পর্যায়ে কয়েকজন বডিবিল্ডার তার কাছে আসেন বুকের দুধ কেনার জন্য। পেশীশক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে নাকি বুকের দুধের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি। সে কারণেই তারা নানা রকম রাসায়নিক সাপ্লিমেন্টের পরিবর্তে মায়েদের বুকের দুধ কিনে খান। এভাবে বডিবিল্ডারদের বুকের দুধ বিক্রি করে ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা রোজগার করে ফেলেছেন রাফেলা। বিষয়টি প্রচারে আনতে নিজের একটি ওয়েবসাইটও তৈরি করে ফেলেছেন তিনি। এখন দুই পুত্রসন্তানের মা রাফেলা। স্বামী অ্যালেক্স ও দুই সন্তানকে নিয়ে তার সংসার সুখেই কাটছে। সূত্র: এনডিটিভি ও আজকাল।

আইনের শাসন থাকলে উচ্চ আদালতে খালেদা জিয়া খালাস পাবেন by খন্দকার মাহবুব হোসেন

বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের যেসব নেতাকর্মী এতদিন রাজনীতিতে নিশ্চুপ ছিলেন, তারা কিন্তু এখন খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশকে ঘিরে সক্রিয় হয়েছেন। আওয়ামী লীগ ভেবেছিল, খালেদা জিয়ার দণ্ড হলে বিএনপি নেতাকর্মীরা সারাদেশে বিশৃঙ্খলা করবে, ভাংচুর করবে। তখন সেটার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আরও ভাংচুর চালিয়ে বিএনপিকে কোণঠাসা করবে, অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করবে। কিন্তু খালেদা জিয়ার বিচক্ষণ নেতৃত্বে দেশের কোথাও বিশৃঙ্খলা না করে বিএনপির নেতাকর্মীরা অহিংস আন্দোলনে গিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। বরং খালেদা জিয়ার এই দণ্ডাদেশ আগামী নির্বাচনে বিএনপির জন্য ইতিবাচক হয়ে দেখা দেবে
সমকাল : দুর্নীতির মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দণ্ডিত হওয়ার বিষয়টিকে আইনজ্ঞ হিসেবে কীভাবে দেখছেন?
খন্দকার মাহবুব : দুর্নীতির মামলায় রাজনীতিবিদদের দণ্ডিত হওয়া নতুন কিছু নয়; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরও কিন্তু কয়লার পারমিট সংক্রান্ত একটি মামলায় (১৯৫৪-৫৫ সালে) দুই বছরের সাজা হয়েছিল। যদিও উচ্চ আদালতে সেটি টেকেনি। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এ ধরনের মামলা আমরা দেখি। অবশ্য খালেদা জিয়ার মামলাটি একটু ব্যতিক্রমধর্মী। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেন সরকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করতে অনেক মামলা করেছিল। গত কয়েক বছরে ক্ষমতাসীন দলের প্রধানমন্ত্রী অর্থাৎ শেখ হাসিনার সব মামলা প্রত্যাহার ও খারিজ (আদালতে) হলেও খালেদা জিয়ার মামলাগুলো এখনও চলছে। এ রকম একটি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হয়েছে। আইনের শাসন থাকলে উচ্চ আদালতে তিনি খালাস পেয়ে যাবেন।
সমকাল :খালেদা জিয়ার দণ্ডের ফলে বিএনপির রাজনীতিতে কোনো প্রভাব পড়বে কি-না?
খন্দকার মাহবুব :বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের যেসব নেতাকর্মী এতদিন রাজনীতিতে নিশ্চুপ ছিলেন, তারা কিন্তু এখন খালেদা জিয়ার দণ্ডাদেশকে ঘিরে সক্রিয় হয়েছেন। আওয়ামী লীগ ভেবেছিল, খালেদা জিয়ার দণ্ড হলে বিএনপি নেতাকর্মীরা সারাদেশে বিশৃঙ্খলা করবে, ভাংচুর করবে। তখন সেটার সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আরও ভাংচুর চালিয়ে বিএনপিকে কোণঠাসা করবে, অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করবে। কিন্তু খালেদা জিয়ার বিচক্ষণ নেতৃত্বে দেশের কোথাও বিশৃঙ্খলা না করে বিএনপির নেতাকর্মীরা অহিংস আন্দোলনে গিয়ে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালাচ্ছে। অর্থাৎ দেশকে অস্থিতিশীল করতে আওয়ামী লীগের ফাঁদে বিএনপি পা দেয়নি। বরং খালেদা জিয়ার এই দণ্ডাদেশ আগামী নির্বাচনে বিএনপির জন্য ইতিবাচক হয়ে দেখা দেবে। এ দণ্ডের কারণে বিএনপি দলগতভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। যদিও এই বৃদ্ধ বয়সে তিনি (খালেদা জিয়া) কারাগারে থেকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। তবে এতে তার প্রতি সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সহানুভূতি বেড়ে গেছে।
সমকাল :দণ্ডিত হওয়ার কারণে খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে যদি বিএনপিকে নির্বাচনে যেতে হয়, বিএনপির অবস্থান কী হবে?
খন্দকার মাহবুব :খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কোনো সুযোগ দেখি না। সরকারকে বলব, প্রতিহিংসা বাদ দিয়ে সমঝোতার ভিত্তিতে যাতে দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে, সে জন্য পদক্ষেপ নিন। তাহলে উভয় দল ও জনগণের জন্য কল্যাণকর হবে।
সমকাল :দুর্নীতির দায়ে প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ ও বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্‌হাবের পদত্যাগের ঘটনা বিচার বিভাগে কোনো ধরনের প্রভাব ফেলেছে কি?
খন্দকার মাহবুব :এ দুটি ঘটনায় বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, ষোড়শ সংশোধনী মামলার রায়কে ঘিরে এ পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধে যদি সত্যিই দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, তাহলে তারও সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত। নয়তো জনমনে বিভ্রান্তি থাকবে যে, ওই (ষোড়শ সংশোধনী) রায়ের কারণে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সমকাল :আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় বর্তমান সরকারের ভূমিকা মূল্যায়ন করুন।
খন্দকার মাহবুব : দুইজন বিচারপতির পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে। এটি অবশ্যই ন্যক্কারজনক। তা ছাড়া ৩৩ লাখ মামলাও বর্তমানে দেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন। এর মধ্যে হাইকোর্টে মামলার সংখ্যা চার লাখেরও বেশি। সরকারের উন্নয়নের ঢাকঢোল আমরা যেভাবে শুনতে পাই, সে অনুযায়ী যদি উন্নয়ন হতো তাহলে উপযুক্ত সংখ্যক বিচারক ও সহায়ক জনবল বিচার বিভাগে নিয়োগ করা হতো। সব মিলিয়ে বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বিভাগ সর্ম্পূণভাবে অবহেলিত এবং বিচার বিভাগ পৃথককরণ সংক্রান্ত মাসদার হোসেন মামলার রায় অনুসারে বিচার বিভাগের স্বাধীনতাও নিশ্চিত করা হয়নি।
সমকাল :দুর্নীতির মামলায় প্রায় ৮শ' জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা হয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কী?
খন্দকার মাহবুব :দুর্নীতির মামলায় ৮শ' লোকের সাজা হওয়ার বিষয়টি ইতিবাচক। কিন্তু যেখানে ব্যাংকের হাজার হাজার কোটি টাকা লুট হচ্ছে; সেখানে ব্যাংকের উচ্চ পর্যায়ের কারও দুর্নীতির দায়ে সাজা না হওয়াটা দুঃখজনক। তাদের বিচার নিশ্চিত না করে ৮শ' দুর্নীতিবাজের বিচার করে দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব হবে না।
সমকাল :তিন বছর ধরে উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ হয়নি; স্বাধীনতার পর থেকেই আইন প্রণয়ন ছাড়াই বিচারক নিয়োগ হচ্ছে- এ দুটি বিষয়কে কীভাবে দেখছেন?
খন্দকার মাহবুব :আমি চারবার সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি এবং দু'বার বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়্যারমান হিসেবে দায়িত্ব পালন করি। প্রতিবার উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের জন্য নীতিমালা করার জন্য সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছি; কিন্তু হয়নি। অবিলম্বে এই নীতিমালা হওয়া উচিত।
সমকাল :প্রস্তাবিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৩২ ধারা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীদের আপত্তির বিষয়ে আপনার মতামত কী? এই ধারা থাকা উচিত কি-না? এর বিকল্প কী হতে পারে?
খন্দকার মাহবুব :প্রস্তাবিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৩২ ধারা পূর্বের ৫৭ ধারার অনুরূপ। বরং ৩২ ধারা কার্যকর হলে আরও বেশি করে গণমাধ্যমকর্মীদের স্বাধীনতা হরণ করবে। যেসব অপরাধের ক্ষেত্রে ৩২ ধারা প্রয়োগের কথা বলা হয়েছে, তা প্রেস কাউন্সিল আইনে সংযোজন করে এবং ওই আইনের আওতায় নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
সমকাল :আইন অঙ্গনের দুর্নীতি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্যকে কীভাবে দেখছেন? বিচার বিভাগের দুর্নীতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?
খন্দকার মাহবুব :বিচার বিভাগকে দুর্নীতিমুক্ত করার জন্য বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেল যে বক্তব্য রেখেছেন তা প্রশংসনীয়। আমি আশা করব, প্রধান বিচারপতি এ ব্যাপারে দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। এতে বিচারপ্রার্থী অনেক হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন। তবে মনে রাখতে হবে, এই দুর্নীতির পেছনে যে মামলাজট রয়েছে, তা দূর করার জন্য দক্ষ ও যোগ্য বিচারকের পাশাপাশি সহায়ক জনবলও নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মামলাজটের সুযোগ নিয়ে দুর্নীতির আশ্রয় নিতে না পারে। পুলিশ প্রশাসন ঢালাওভাবে মামলা দায়ের করাও মামলাজট বাড়ার কারণ। এ জন্য মিথ্যা মামলা দায়েরকারীদের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করতে হবে এবং তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
সমকাল :নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিএনপিসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে। এর সমাধান কীভাবে সম্ভব?
খন্দকার মাহবুব :তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পর নির্বাচনী ব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিএনপিসহ অধিকাংশ দলই মনে করে, দলীয় সরকারের অধীনে কখনোই সুষ্ঠু সংসদ নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দল ও সরকারি দলের মধ্যে যে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব রয়েছে, সে কারণে উভয়ের মধ্যে সমঝোতা ব্যতীত দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব হবে না। নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা হিসেবে এখন (প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে নির্বাচন) যেটি সংবিধানে রয়েছে, তা বর্তমান ক্ষমতাসীন দলই প্রবর্তন করেছে। মনে রাখতে হবে, ২০১৪ সালে যেটা সম্ভব ছিল; বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের এখন যে মনোভাব, তাতে একতরফাভাবে নির্বাচন করা সম্ভব হবে না। আন্তর্জাতিকভাবেও এ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না। তাই দেশে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং গণতন্ত্রের স্বার্থে সমঝোতার ভিত্তিতেই নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতি ঠিক করতে হবে। যেহেতু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, সে জন্য তাদেরকেই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে হবে। বিএনপি অতীতের ভুলভ্রান্তি ভুলে গিয়ে নির্বাচন প্রশ্নে সরকারের সঙ্গে সমঝোতায় আসতে চায়।
সমকাল :২০১৪ সালে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় নির্বাচনকালীন সরকারের থাকার জন্য বিএনপিসহ কয়েকটি দলকে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তখন বিএনপি সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও জাতীয় পার্টিসহ কয়েকটি দল তা গ্রহণ করে নির্বাচনে অংশ নেয়। বতর্মান পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপিকে নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে অনুরূপ প্রস্তাব দেওয়া হয়, তাহলে বিএনপির সিদ্ধান্ত কী হবে?
খন্দকার মাহবুব :সরকারের কাছ থেকে আবারও প্রস্তাব চাচ্ছি। প্রস্তাব দিলে আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেব। একতরফা নির্বাচন এবার হতে দেওয়া হবে না।
সাক্ষাৎকার গ্রহণ :আবু সালেহ রনি

সাত ব্যাংকের বেপরোয়া ব্যাংকিং নির্দেশনা মানছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংকের

ঋণ আমানতের সুদের ব্যবধান (স্প্রেড) কোনোক্রমেই ৫ শতাংশের ওপরে হওয়া যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে দীর্ঘ দিন ধরেই এ নির্দেশনা দিয়ে আসছে। কিন্তু কিছু ব্যাংক বরাবরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নির্দেশনা অমান্য করে আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনাকে অবজ্ঞা করে ৭ ব্যাংক তাদের ঋণ আমানতের সুদ হারের ব্যবধান সাড়ে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে গেছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে পাঁচটিই বিদেশী। দু’টি স্থানীয় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ঋণের সুদ হার নির্ধারিত সীমার মধ্যে ধরে রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সুদের ব্যাপ্তি বেঁধে দেয়া হয়। এর দুই ধরনের ইতিবাচক দিক রয়েছে। প্রথমত কম সুদে আমানত নিয়ে বেশি সুদে বিনিয়োগ করা যায় না। অর্থাৎ ঋণের সুদ হার বেশি হলে আমানতের সুদহারও ওই হারে বাড়াতে হয়। এতে আমানতকারীরা লাভবান হন। দ্বিতীয়ত ব্যাংকগুলো আগ্রাসী ব্যাংকিং করতে পারে না। অর্থাৎ ফ্রি স্টাইলে ঋণ দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে সুদ আদায় করতে পারে না। এতে শিল্প বিনিয়োগ ব্যয় নির্ধারিত সীমার মধ্যেই থাকে। জানা গেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ঋণ আমানতের সুদ হারের ব্যবধান ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনতে বরাবরই ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হয়।
কিন্তু বরাবরই কিছু ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনা অমান্য করে থাকে। বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও যেন করার কিছু নেই। মুক্তবাজার অর্থনীতির দোহাই দিয়ে বরাবরই ওই সব ব্যাংককে ছাড় দেয়া হচ্ছে। যেমন- বিদেশী কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীদের কাছ থেকে খুব কম সুদে আমানত সগ্রহ করে। কিন্তু ঋণ দেয়া হয় বাজার হারেই। অর্থাৎ সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত যে হারে বিনিয়োগ করে এসব ব্যাংক ওই একই হারে বিনিয়োগ করে থাকে। অর্থাৎ এক দিকে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের ঠকাচ্ছে, অন্য দিকে বেশি সুদে ঋণ দিয়ে বাড়তি মুনাফা তুলে নিচ্ছে। গত ৩১ জানুয়ারির তথ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বশেষ একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। ঋণ আমানতের সুদহার নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ ওই প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক সামগ্রিকভাবে গড়ে ১ দশমিক ২৬ শতাংশ হারে আমানত সংগ্রহ করেছে। কিন্তু গ্রাহকদের কাছ থেকে ঋণ দিয়ে গড়ে সুদ আদায় করেছে প্রায় সাড়ে ৯ শতাংশ হারে। এখানে ব্যাংকটির ৩১ জানুয়ারিতে স্প্রেড ছিল ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা রয়েছে ৫ শতাংশের নিচে রাখতে হবে। ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করতে ১ টাকারও কম খরচ পড়ে সিটি ব্যাংক এনএ ও উরি ব্যাংকের। যেমন- সিটি ব্যাংক এনএর ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহ করতে গড়ে ব্যয় হয়েছে ৩৯ পয়সা, ব্যাংকটির স্প্রেড হলো ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। অন্য দিকে উরি ব্যাংকের ১০০ টাকা আমানত সংগ্রহে গড়ে ব্যয় হয়েছে ৯৮ পয়সা, যেখানে ব্যাংকটির স্প্রেড ৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ। আরেকটি বিদেশী ব্যাংক এইচএসবিসির গড় আমানত সংগ্রহের ব্যয় ১ দশমিক ৩৭ শতাংশ, অথচ ব্যাংকটির স্প্রেড ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ। অন্য দিকে স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গড় আমানত ব্যয় ২ দশমিক ৭২ শতাংশ, অথচ ব্যাংকটির স্প্রেড ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। বিদেশী পাঁচ ব্যাংকের মতো, বেপরোয়া ব্যাংকিং করছে বেসরকারি খাতের ব্র্যাক ও ডাচ্-বাংলা ব্যাংক। ব্র্যাক ব্যাংকের গড় আমানত ব্যয় ৪ দশমিক ৩১ শতাংশ, যেখানে ঋণের গড় সুদহার ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ। ফলে ব্যাংকটির স্প্রেড রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি অর্থাৎ ৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের গড় আমানত ব্যয় ২ দশমিক ২৭ শতাংশ, যেখানে ব্যাংকটির স্প্রেড ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা মানলে কমে সুদে ঋণ বিতরণ করা যেত। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বিদেশী ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের কম মুনাফা দিচ্ছে। উল্টো দিকে ঋণ দিয়ে অতিরিক্ত মুনাফা তুলে নিচ্ছে। ফলে এ মুনাফার বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। ওই সূত্র জানিয়েছে, দেশের স্বার্থেই নির্দেশনা পরিপালনে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরো কঠোর হতে হবে। তা না হলে ঋণের সুদহার কমবে না, বরং দিন দিন বাড়বে।

গ্রিন পোশাক কারখানায় শীর্ষে বাংলাদেশ

বিশ্বের যে কোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি সংখ্যক পরিবেশবান্ধব (গ্রিন ফ্যাক্টরি) পোশাক কারখানা রয়েছে৷ সংখ্যার হিসেবে, এ রকম ৬৭টি পোশাক কারখানা রয়েছে বাংলাদেশে৷ ভারতে এ ধরনের কারখানা রয়েছে মাত্র পাঁচটি৷ পরিবেশবান্ধব এ ধরনের কারখানার সনদ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি)৷ তারা লিডারশিপ ইন এনার্জি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ডিজাইন (এলইইডি) সনদ দেয়৷ ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সনদ পাওয়া বাংলাদেশি কারখানার সংখ্যা ৬৭৷ বাংলাদেশের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক ৫০টি পরিবেশবান্ধব কারখানা রয়েছে ইন্দোনেশিয়ায়৷ অন্যদিকে, ভারতে এ ধরনের কারখানা রয়েছে মাত্র পাঁচটি৷ ঢাকায় ইউএসজিবিসি-র এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোপালকৃষ্ণ পি জানান, অচিরেই বাংলাদেশের আরও ২৮০টি পোশাক কারখানা এলইইডি সনদ পেতে পারে৷ বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা পরিবেশ-বান্ধব উৎপাদনে বিনিয়োগ করেছেন বলেই এই সাফল্য এসেছে৷ বৃহস্পতিবার তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ভবনে গ্রিন প্ল্যাটিনাম রেটেড তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে সনদ প্রদানের এক অনুষ্ঠানের ফাঁকে গোপালকৃষ্ণ জানান, ‘যে কোনো বিবেচনায় বাংলাদেশে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সংখ্যক পরিবেশ-বান্ধব কারখানা রয়েছে৷' এলইইডি সনদ পাওয়া ৬৭টি বাংলাদেশি কারখানার মধ্যে ১৩টি প্রথম ক্যাটাগরি, অর্থাৎ প্ল্যাটিনাম ক্যাটাগরিতে স্থান পেয়েছে৷ বাকিগুলো স্থান পেয়েছে গোল্ড, সিলভার কিংবা সাধারণ ক্যাটাগরিতে৷ কেবল সর্বোচ্চ সংখ্যক পরিবেশ-বান্ধব কারখানাই নয়, বিশ্বের পরিবেশবান্ধব কারখানাগুলোর মধ্যে সেরাদের তালিকায়ও বাংলাদেশের অবস্থান সংহত৷ সনদপ্রাপ্ত কারখানাগুলোর শীর্ষস্থানীয় ১০টির সাতটিই বাংলাদেশে৷ সেই কারখানাগুলোকেই পরিবেশবান্ধব স্বীকৃতি দেওয়া হয় যেগুলো ২৫ থেকে ৩০ ভাগ পানি ও জ্বালানি সাশ্রয় করতে সক্ষম, যেখানে আগুন লাগার মতো দুর্ঘটনা কম হয় এবং যে কারখানা ভবনের স্থাপত্যকাঠামোর কারণে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও কম সংখ্যক মানুষ হতাহত হয়৷ গোপালকৃষ্ণ জানান, ইউএসজিবিসি-তে নিবন্ধিত বাংলাদেশের ৬৫০টি কারখানা-ভবন পরিবেশবান্ধব৷ এগুলোর মধ্যে ৩০৩টি তৈরি পোশাক কারখানার বাইরে৷ সেগুলোর কোনোটি বাণিজ্যিক ভবন, কোনোটি আবার চামড়াজাত পণ্য কিংবা জুতা-স্যান্ডেল তৈরির কারখানা৷ বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতে পরিবেশবান্ধব ভবনের সংখ্যা ৩০, যেগুলোর মধ্যে কার্যকর রয়েছে মাত্র পাঁচটি ভবন৷ ভারতকে কারখানা নির্মাণে আরও পরিবেশবান্ধব হওয়ার তাগিদ দিয়েছেন গোপালকৃষ্ণ৷ তিনি জানান, ‘বিশ্বজুড়ে ২০ মিলিয়ন বর্গফুটের ৯০,০০০ সবুজ-প্রকল্প ওয়াশিংটন ভিত্তিক ইউএসজিবিসি-র আওতাধীন৷’ প্ল্যাটিনাম সনদপ্রাপ্ত বাংলাদেশি ১৩টি কারখানা হলো – রেমি হোল্ডিং লিমিটেড, তারাসিমা অ্যাপারেলস লিমিটেড, প্লামি ফ্যাশন লিমিটেড, ভিন্টেজ ডেনিম স্টুডিও লিমিটেড, কলম্বিয়া ওয়াশিং প্ল্যান্ট লিমিটেড, ইকোটেক্স লিমিটেড, এনকিউ সেলসিয়াস ইউনিট টু লিমিটেড, কানিজ ফ্যাশন লিমিটেড, জেনেসিস ওয়াশিং লিমিটেড, জেনেসিস ফ্যাশন লিমিটেড, এসকিউ বিডি-চায়না লিমিটেড, এসকিউ কোল ব্ল্যাঙ্ক লিমিটেড এবং এনভয় টেক্সটাইল৷ প্লামি ফ্যাশন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘তৈরি পোশাক উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে সবার থেকে এগিয়ে আছে বাংলাদেশ৷
তবে আমাদের ইতিবাচক অর্জনগুলো বিশ্ব-মিডিয়ায় তেমন গুরুত্ব পায় না৷’ রেমি হোল্ডিং লিমিটেডের মিরান আলী বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে শ্রীলঙ্কার পরিবেশবান্ধব কারখানা কথা শুনে আসছি৷ তবে মাত্র কয়েক বছর আগে আমাদের উদ্যোক্তাদের একাংশ ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত আমরা সফলতা পাই৷ এখন বিশ্বে আমাদের পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি৷’ পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘প্রাথমিক পর্যায়ে ‘ব্যাক টু ব্যাক লেটার অফ ক্রেডিট'-এর সূচনা খুবই কাজের হয়েছে৷ সেই পথ ধরেই এসেছে আজকের সাফল্য৷’ বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-র সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘বিশ্বের সেরা ১০টি পোশাক কারখানার ১০টিই বাংলাদেশে৷ বাংলাদেশের আরো ২৮০টি কারখানা অচিরেই গ্রিন ফ্যাক্টরির সনদ পাবে৷ এগুলো বড় ফ্যাক্টরি৷ প্রতিটি কারখানায় আড়াই থেকে তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন৷ আমরা আমাদের ইমেজে বিল্ডআপের জন্য কাজ করে যাচ্ছি৷ কিন্তু আমাদের সমস্যা হচ্ছে আমরা যে রানা প্লাজার পর পোশাক শিল্পে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছি, তার তেমন প্রচার নেই৷ তাই বিদেশে আমাদের দূতাবাসগুলোকে এ নিয়ে কাজ করতে হবে৷ বিশ্বকে জানাতে হবে আমাদের এই পরিবর্তনের কথা৷’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘রানা প্লাজা ধ্বসের পর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ২,২০০ ফ্যাক্টরি নিয়ে কাজ করে৷ এখন আমরা বলতে পারি, এই ২,২০০ ফ্যাক্টরিই এখন ‘কমপ্লায়েন্স'৷ আর ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যানের দেড় হাজার ফ্যাক্টরির মধ্যে ৫০০-৬০০ ফ্যাক্টরির এখনো সংস্কার প্রয়োজন৷ বাকিগুলো সংস্কার এবং পুনর্নিমাণ করা হয়েছে৷ আমি বলতে পারি, বাংলাদেশে আগামী দুই বছরের মধ্যে কোনো নন-কমপ্লায়েন্স ফ্যাক্টরি থাকবে না৷’ বাংলাদেশ ন্যাশনাল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর বাংলাদেশের পোশাক কারখানার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে৷ বলতে গেলে অধিকাংশ পোশাক কারখানাই এখন কমপ্লায়েন্স৷ অর্থাৎ কারখানার ভিতরে কাজের পরিবেশ ও অন্যান্য নিরাপত্তার বিষয়ে উন্নতি হয়েছে৷ কিন্তু শ্রমিকদের জীবন-মানের কোনো উন্নয়ন হয়নি৷ খরচ বাড়লেও তাঁদের বেতন সেভাবে বাড়েনি৷ তাই শ্রমিকদের ব্যক্তিগত জীবনের কোনো উন্নয়ন হয়নি৷ শুধুমাত্র কারখানার উন্নয়ন হয়েছে৷’ তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ ২০১৩ সালে শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ করা হয়৷ তখন সর্বনিম্ন মজুরি ছিল ৫,৩০০ টাকা৷ এখনো তাই আছে৷ তবে সরকার পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জন্য আবারো মজুরি বোর্ড গঠন করেছে৷ আমরা আশা করছি এই মজুরি বোর্ড জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন মজুরি ঘোষণা করবে৷ আমরা শ্রমিক সংগঠনগুলোও প্রস্তাব তৈরি করছি৷ ১৯ এপ্রিল মজুরি বোর্ডের বৈঠক আছে৷ সেখানে আমরা আমাদের প্রস্তাব তুলে ধরব৷ আমাদের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন মজুরি ১৬ হাজার টাকার কম হবে না৷ তবে আমাদের কথা হলো, আমরা মজুরি চাই গ্রহণযোগ্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী৷’
সূত্র: ডয়চে ভেলে

পাপুয়া নিউ গিনিতে শক্তিশালী ভূমিকম্প

পাপুয়া নিউ গিনির পগেরা ১১১ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলে সোমবার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৬.০। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা একথা জানায়। খবর সিনহুয়ার।
খবরে বলা হয়, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি এ এলাকায় রিখটার স্কেলে ৭.৫ তীব্রতার একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর এ ভূমিকম্প আঘাত হানলো। এরপর সেখানে আরো কয়েকদফা ভূমিকম্প পরবর্তী কম্পন অনুভূত হয়। সর্বশেষ এ ভূমিকম্প ৬.৩০৭ ডিগ্রী দক্ষিণ অক্ষাংশ এবং ১৪২.৬২০ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমাংশে ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে আঘাত হানে। গ্রিনিচ মান সময় রোববার ১৯৫৬টায় এটি সংঘটিত। রেডক্রস জানায়, ওই এলাকায় প্রধান কোনো শহর না থাকলেও ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের এক শ’ কিলোমিটারের প্রায় ছয় লাখ ৭০ হাজারের বেশি লোকের বসবাস রয়েছে।

পূর্ব গৌতায় সরকারি বাহিনীর হামলায় আরো ৩৪ বেসামরিক লোক নিহত

সিরিয়ায় বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত ঘাঁটি পূর্ব গৌতায় রোববার সরকারি বাহিনীর বিমান হামলায় শিশুসহ ৩০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। পর্যবেক্ষণ সংস্থা একথা জানায়। মানবাধিকার বিষয়ক সিরীয় পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রধান রামি আব্দেল রহমান জানান, পূর্ব গৌতায় আসাদ বাহিনীর রকেট হামলায় ৩৪ বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে।’
তিনি আরো জানান, নিহতদের মধ্যে ১১ শিশু রয়েছে। খবর বার্তা সংস্থা এএফপি’র। রহমান জানান, হামলায় গৌতার প্রধান নগরী দৌমা ও এর পূর্বাঞ্চলীয় শহরতলীতে ২৬ জন নিহত হয়েছে। সংস্থাটি জানায়, গত ১৫ দিন ধরে গৌতায় সরকারি বাহিনীর বিমান হামলা, গোলা বর্ষণ ও রকেট হামলায় ৬৯০ জনের বেশি বেসামরিক লোক প্রাণ হারিয়েছে। রোববার সিরীয় প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বলেন, তার বাহিনী বিদ্রোহীদের কবল থেকে পূর্ব গৌতাকে অবশ্যই পুনরুদ্ধার করবে। আন্তর্জাতিক বাহিনীর পক্ষ থেকে ওই এলাকায় রক্তপাত বন্ধের আহ্বান জানানো সত্ত্বেও তিনি এমন ঘোষণা দিলেন।

যোগীর রাজ্যে হোলির জন্য পাল্টে দেয়া হলো নামাজের সময়

হোলি উৎসবকে সবারই সম্মান করা উচিত। কারণ তা বছরে হয় মাত্র একবার। সেখানে জুম্মার নামাজ পাঠ হয় বছরে ৫২ বার। হোলি ও নামাজের মধ্যে এভাবে তুলনা টেনে নয়া বিতর্কের জন্ম দিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতা যোগী আদিত্যনাথ। এবার হোলি উপলক্ষে অধিক মুসলিম জনগোষ্ঠীর উত্তর প্রদেশে জুম্মার নামাজের সময় পিছিয়ে দেয়া হয়েছে ২ ঘণ্টা।
১১ তারিখ ফুলপুর বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন। ভোটপ্রচারে গিয়ে সেই প্রসঙ্গ তুলে নামাজের সময় পিছিয়ে দেয়ার ব্যাপারে মৌলবীদের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, তাকে বলা হয়েছিল, শুক্রবারই হোলির সঙ্গে জুম্মার নামাজ পড়ছে। তাই বেলা ১১টার মধ্যে হোলির উৎসব শেষ করার চেষ্টা চলবে। কিন্তু তিনি জানিয়ে দেন, বছরে একবার হোলি হয় আর জুম্মার নামাজ পাঠ হয় বছরে ৫২ বার। অতএব কাটছাঁটের দরকার নেই, হোলি তার নির্দিষ্ট সময়মতোই চলবে। এর আগে নামাজ পাঠে যাওয়া জনতার ওপর হোলির রং ছোঁড়া উপলক্ষে দাঙ্গার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এবার সে কথা মাথায় রেখে হোলির আগে যোগী আদিত্যনাথ সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন, মসজিদের ইমামদের সঙ্গে কথা বলে শুক্রবারের নামাজের সময় পাল্টানো যায় কিনা দেখতে, যাতে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। তার আবেদনে সাড়া দিয়ে নামাজের সময় ২ ঘণ্টা পিছিয়ে দেন ইমামরা। সেই পদক্ষেপের প্রশংসা করেন মুখ্যমন্ত্রী। সূত্র: এবিপি আনন্দ।

শিল্পে গ্যাসের দাম দ্বিগুণ হবে

দেশে আরেক দফা বাড়ছে গ্যাসের দাম। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) যেদিন থেকে সরবরাহ শুরু হবে, সেদিন থেকে নতুন দরে গ্যাস কিনতে হবে শিল্পকারখানার মালিকদের। নতুন দর এখনকার চেয়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি হতে পারে। এলএনজি সরবরাহ শুরু হবে ১৫ মের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী গত বুধবার বিকেলে চট্টগ্রাম চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে এ কথা জানিয়েছেন। সরকার কাতার থেকে জাহাজে করে এলএনজি এনে কক্সবাজারের মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালের মাধ্যমে দৈনিক ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করতে চায়, যা যুক্ত হবে জাতীয় সরবরাহ ব্যবস্থায়। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বর্তমানে শিল্পকারখানায় ৭ টাকা ৭৬ পয়সা দরে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস বিক্রি করা হয়। এটা যেমন বাড়বে, তেমনি বাণিজ্যিক এবং আরও কিছু ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়তে পারে। এর আগে গত বছর ফেব্রুয়ারিতে গ্যাসের দাম গড়ে ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ বাড়ানো হয়। এলএনজি আমদানি হলে গ্যাসের সরবরাহ বাড়বে। এতে শিল্পকারখানায় সংযোগ দিতে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি ওই অঞ্চলের ২৬৫ শিল্পকারখানাকে ডিমান্ড নোট (চাহিদাপত্র) দিয়েছে বলে সংস্থাটির দায়িত্বশীল একজন প্রকৌশলী জানিয়েছেন। এ চাহিদাপত্রে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দর ধরা হয়েছে ১৪ টাকা ৯০ পয়সা। এর মধ্যে কিছু নতুন কারখানাও রয়েছে। একইভাবে কিছু পুরোনো কারখানা সম্প্রসারিত অংশে গ্যাস সংযোগের জন্য আবেদন করেছেন সংশ্লিষ্ট শিল্পোদ্যোক্তারা। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মো. ফয়েজউল্লাহ এলএনজি সরবরাহের দিন থেকে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির কথা জানিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের শিল্পকারখানাগুলোর চাহিদাপত্রে উল্লেখ করা দর থেকে গ্যাসের দাম সামান্য কম হতে পারে। আমদানি করা গ্যাস মুনাফা ছাড়া বিক্রি করা হবে। দেশের শিল্পকারখানা বিকাশের স্বার্থে পেট্রোবাংলা এ ক্ষেত্রে কোনো মুনাফা করবে না। শুধু খরচ তুলে নেবে। এক প্রশ্নের জবাবে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান বলেন, শুধু শিল্পকারখানা নয়, অন্যান্য শ্রেণির ব্যবহারকারীর গ্যাসের দর আনুপাতিক হারে বাড়বে। দর চূড়ান্ত করতে বিশ্লেষণ চলছে। পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, এখন দেশে দৈনিক গড়ে ২৬৭ কোটি থেকে ২৬৮ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হয়। এ গ্যাসের ৩০ শতাংশ ব্যবহার করা হয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের ব্যবহার মোট সরবরাহের প্রায় ১৬ শতাংশ। সার কারখানায় মোট গ্যাসের ৫ শতাংশ ব্যবহার করা হয়।
বিদ্যুতের জন্য বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম হিসেবে পেট্রোবাংলাকে দেয় ৩ টাকা ১৬ পয়সা। সবচেয়ে কম দরে গ্যাস পাচ্ছে সার কারখানাগুলো। এই শিল্পে প্রতি ঘনমিটারের দর ২ টাকা ৭১ পয়সা। এ ছাড়া ক্যাপটিভ পাওয়ার প্লান্টে (শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য নিজস্ব উদ্যোগে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র) প্রতি ঘনমিটার ৯ টাকা ৬২ পয়সা, চা-বাগানে ৭ টাকা ৪২ পয়সা, বাণিজ্যিক (রেস্তোরাঁ ও বেকারি) ১৭ টাকা ৪ পয়সা এবং আবাসিকে (গৃহস্থালি কাজ) ৯ টাকা ১০ পয়সা দরে গ্যাস দেওয়া হয়। গ্যাসের দর সবচেয়ে বেশি পরিবহন খাতে। সিএনজি ফিলিংস্টেশন প্রতি ঘনমিটার গ্যাস কেনে ৩২ টাকায়। আর ভোক্তারা ফিলিংস্টেশন থেকে গ্যাস কেনে ৪০ টাকা দরে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মাহবুবুল আলম প্রথম আলোকে জানান, গ্যাসসংকটের কারণে চট্টগ্রামের অনেক শিল্পকারখানা রুগ্ণ হয়ে যাচ্ছিল। চট্টগ্রামের শিল্পোদ্যোক্তাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক ঘোষণায় বিদেশ থেকে এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্তের কথা জানান। দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেবে। মাহবুবুল আলম আরও বলেন, চট্টগ্রামের কারখানায় দর দ্বিগুণ হলে সারা দেশে গ্যাসের একই দর নির্ধারণ করতে হবে। এতে শিল্পপণ্যের দাম বাড়বে। তবে একই দরে গ্যাস দিলে শিল্পকারখানাগুলোকে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হবে না। প্রাকৃতিক গ্যাস সাধারণ চাপ ও তাপমাত্রায় গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে। শীতলীকরণ (রেফ্রিজারেশন) প্রযুক্তির মাধ্যমে তাপমাত্রা কমিয়ে মাইনাস (-) ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামিয়ে আনলে তা তরলে পরিণত হয়। এই তরল প্রাকৃতিক গ্যাসই হচ্ছে এলএনজি। দেশে গ্যাসের মজুত কমে আসায় বিকল্প হিসেবে কাতার থেকে গ্যাস আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এলএনজি মহেশখালী থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে চট্টগ্রামের আনোয়ারা হয়ে সীতাকুণ্ডের গ্রিডে যুক্ত হবে।

কোন পরিণতির দিকে ‘বাণিজ্য যুদ্ধ’?

বাণিজ্য যুদ্ধ যেন বাধিয়েই ছাড়বেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একের পর এক শুল্ক বসানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তিনি। এর আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মতো এমন রক্ষণশীল সিদ্ধান্ত নেননি। গত বৃহস্পতিবার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়াম আমদানির ওপর যথাক্রমে ২৫ ও ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প। চলতি সপ্তাহেই এই সিদ্ধান্ত পাস হবে। এরপর আবার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে গাড়ি আমদানির ওপর শুল্ক বসানোর হুঁশিয়ারি দিলেন তিনি। গতকাল রোববার বিবিসি অনলাইনের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়। ট্রাম্পের মতে, অন্য দেশগুলো বছরের পর বছর ‘স্টুপিড’ বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা নিচ্ছে। অ্যালুমিনিয়াম ও স্টিলের ওপর ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর ইইউ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র থেকে পণ্য আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবে তারা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে ইইউ। ইইউয়ের এমন জবাবে আবার গাড়ির ওপর শুল্ক বসানোর হুমকি দিলেন ট্রাম্প। এর আগে গত শুক্রবার এক টুইটে ট্রাম্প বললেন, বাণিজ্য যুদ্ধ ‘ভালো’ এবং ‘সহজেই জেতা যায়’।
অর্থাৎ, সমালোচনায় জর্জরিত হয়ে এক যুদ্ধে সহজে জেতার বাসনা জেগেছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের মনে। ট্রাম্পের বক্তব্য হলো, যখন একটি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) প্রায় প্রতিটি দেশের সঙ্গে বাণিজ্যে অনেক বিলিয়ন ডলার হারিয়েও ব্যবসা করে, তখন বাণিজ্য যুদ্ধ ভালো এবং জয় সহজ। আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে বলে তিনি জানিয়েছেন। তবে মজার বিষয় হলো, শুরুটা চীনকে বিপাকে ফেলার জন্য হলেও এই যুদ্ধ হতাশ করছে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেরই। এটা সত্যি যে বিশ্ববাজারে প্রায় ৫০ শতাংশ স্টিলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে চীন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মোট স্টিল আমদানির ১ শতাংশ আসে চীন থাকে। বরং বড় অংশ আসে কানাডা ও ব্রাজিল থেকে। কানাডা থেকে আমদানির পরিমাণ ১৬ শতাংশ এবং ব্রাজিলের ১৩ শতাংশ। যেখানে কানাডা এবং ইইউ এককভাবে যুক্তরাষ্ট্রে ৪৫ কোটি ডলারের স্টিল রপ্তানি করে, সেখানে চীন করে মাত্র ১ কোটি ডলারের। অন্যদিকে, মোটামুটি এই পরিমাণ অর্থের সয়াবিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করে চীন। চীন যদি এখন শুল্ক বসায় লোকসান দুজনের সমানই হবে। এ রকম হুমকি অবশ্য চীন ইতিমধ্যে দিয়েছেও। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের লোহা ও অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদকদের জন্য সুখবর হলেও অন্য যেসব খাত লোহা ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর নির্ভরশীল, তারা ক্ষতির সম্মুখীন হবে। এমনকি যেই কর্মসংস্থানের জন্য ট্রাম্প এ যুদ্ধে মেতেছেন। সেই কর্মসংস্থানের হারও পড়বে ঝুঁকির মুখে। ক্ষিপ্ত কানাডাও জবাব দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে। কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড বলেন, কানাডার স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর এই বিধি আরোপ কি উচিত হয়েছে? এতে কানাডা তাদের বাণিজ্যের আগ্রহ ও শ্রমিকের সুবিধা ভেবে পাল্টা পরিকল্পনা নেবে। কানাডা মনে করছে, এসব শুল্ক সীমান্তের উভয় পাশে বাধা সৃষ্টি করবে। ইইউ বলছে, ট্রাম্প যদি ইট ছোড়ে, তারা পাটকেল ছুড়তে প্রস্তুত। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জঁ-ক্লদ ইয়ুংকার বলেছেন, ‘আমেরিকার গৃহীত ব্যবস্থার ফলে যদি আমাদের শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব না।’ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) ট্রাম্পের এসব হঠকারী সিদ্ধান্তের পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ারি করেছে। তারা বলছে, স্টিল ও অ্যালুমিনিয়ামে শুল্ক আরোপে অন্যান্য দেশের মতো ক্ষতির মুখে পড়বে যুক্তরাষ্ট্রও। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ডিরেক্টর জেনারেল রবার্তো আজেভেদো বলেছেন, বাণিজ্যে যুদ্ধে কারও আগ্রহ নেই। তাহলে কেন এই বাণিজ্য যুদ্ধে নামলেন ট্রাম্প? এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিকভাবে একটা বিশ্লেষণ দেওয়া যেতে পারে।
২০২০ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়ে এখনই আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ট্রাম্পের মনে। এমনকি নির্বাচনী প্রচারণাও অন্য যেকোনো প্রেসিডেন্টের চেয়ে তাড়াতাড়ি শুরু করেছেন তিনি। নারীঘটিত বিভিন্ন কেলেঙ্কারিতে ইমেজ সংকটে ভুগছেন ট্রাম্প। এমন অবস্থায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করে মানুষের আস্থা অর্জন করতে চাইছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রে অন্যতম স্টিল উৎপাদনকারী অঙ্গরাজ্যগুলো হলো মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, ইলিনয়, অ্যালাবামা, ওহাইও। নির্বাচনে যেসব অঙ্গরাজ্য একেকবার একেক দলের দিকে ঝোঁকে, সেগুলোকে বলা হয় সুইং স্টেট বা দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য। এসব রাজ্যে জিতলেই নির্বাচন জেতা হয়ে যায়। স্টিল উৎপাদনকারী এই অঙ্গরাজ্যগুলোর বেশির ভাগই সুইং স্টেট। গত নির্বাচনে জিততে বেশি সুইং স্টেট জিতেছিলেন ট্রাম্প। তাই এই অঙ্গরাজ্যগুলো ভোট খুবই প্রয়োজন ট্রাম্পের জন্য। তবে এই পরিণতির বিষয়ে বাণিজ্য বিশ্লেষকেরা কী বলছেন? ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য বিশ্লেষক ব্যারি আইচেনগ্রিন ও ডার্টমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডগলাস আরউইন বলেন, আগের বাণিজ্য যুদ্ধের ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এটা একেবারেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। গ্রেট ডিপ্রেশনের সময় শুল্কের প্রভাব খুব বাজেভাবে পড়েছিল। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, ১৯৩০-এর দশকে মহামন্দার মূল কারণ ছিল বাণিজ্য সুরক্ষা নীতি। অর্থনীতিবিদেরা সাধারণত কোনো বিষয়ে একমত হতে না পারলেও এ ব্যাপারে একমত যে বাণিজ্য যুদ্ধে কেউ জিততে পারে না।

চার মিনিটে মাইল পেরোনো মানবের মৃত্যু

স্যার রজার ব্যানস্টার। চার মিনিটে দৌড়ে প্রথম এক মাইল দূরত্ব অতিক্রম করে বিশ্বের দ্রুততম মানব হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন। সেই দ্রুতমানব না-ফেরার দেশে চলে গেলেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৮ বছর। বার্ধক্যজনিত সমস্যা ও পারকিনসন রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।
রজার ব্যানস্টারের পরিবারের বরাত দিয়ে রোববার বিবিসি জানিয়েছে, ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে শনিবার মারা গেছেন। ২০১১ থেকে তিনি পারকিনসন রোগে ভুগছিলেন। খবরে বলা হয়, ১৯৫৪ সালের ৬ মে অক্সফোর্ডের ইফলি রোড স্পোর্টস গ্রাউন্ডে রজার ব্যানস্টার ৩ মিনিট ৫৮ দশমিক ৪ সেকেন্ড সময়ে এক মাইল পেরিয়ে রেকর্ড গড়েন। ওই বছরই তিনি কমনওয়েলথ গেমসে একই দূরত্ব অতিক্রম করে সোনা জয় করেন। ১৯৮১ সালে ৩ মিনিট ৪৭ দশমিক ৩৩ সেকেন্ডে এক মাইল দৌড়ে নতুন রেকর্ড করেন ক্রীড়াবিদ লর্ড কো। তিনি বলেন, ‘অ্যাথলেটের সবার জন্য এবং আমাদের জাতির জন্য এই দিনটি বেদনার। আমার প্রজন্মের কোনো ক্রীড়াবিদ নেই, যিনি রজার এবং তাঁর অর্জনে অনুপ্রাণিত হননি।’ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে রজার ব্যানস্টারকে স্মরণ করে বলেন, ‘ব্রিটিশ ক্রীড়া তারকা রজারের অর্জন আমাদের সবাইকে উৎসাহিত করেছে। তাঁর কথা আমাদের মনে থাকবে।’

বাজারে আসছে ‘কৃত্রিম’ মাংস

যুক্তরাষ্ট্রের মাংস উৎপাদক প্রতিষ্ঠান জাস্ট ঘোষণা দিয়েছে, চলতি বছরের শেষ দিকে তারা ‘কৃত্রিম’ বা ‘পরিচ্ছন্ন’ মাংস বাজারে ছাড়বে। কেউ কেউ হয়তো এই লাইন পড়েই ভ্রু কোঁচকাবেন। বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উঁকি দেবে মনে। বিষয়টি খোলাসা করা যাক।
প্রাণিদেহ থেকে বায়োপসির মাধ্যমে কোষ সংগ্রহ করে গবেষণাগারে কোষ বিভাজনের মাধ্যমে বহু কোষের সৃষ্টি করা হয়। পরিবেশবিদেরা এভাবে উৎপাদিত মাংসকে ‘পরিচ্ছন্ন মাংস’ উপাধি দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, এই মাংসের ব্যবহার বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে আনবে। একটা গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের মাংস থেকে ৯৬ শতাংশ পর্যন্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কম হবে। জাস্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জোশ টেট্রিক দাবি করেছেন, চলতি বছরেই তাঁর প্রতিষ্ঠান এই মাংস বাজারে ছাড়তে পারবে। তিনি সিএনএনকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও এশিয়ার বাজারে প্রথম ছাড়া হবে এই মাংস। এটি দিয়ে চিকেন নাগেট, সসেজসহ নানা খাবার প্রস্তুত করা সম্ভব হবে। তবে এই মাংসের দাম নিয়েই রয়েছে সমস্যা। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক খাদ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মেমফিস মিটসের ৪৫০ গ্রাম গরুর মাংস তৈরি করতে খরচ পড়েছে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন ডলার। তবে উৎপাদনের পরিমাণ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ খরচ কমে আসবে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। মেমফিস মিটস ২০২১ সাল নাগাদ বাজারে ‘পরিচ্ছন্ন’ মাংস আনার পরিকল্পনা করেছে।

‘এমন ফলের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না’

ভারতের উত্তর-পূর্ব ত্রিপুরা রাজ্যের চারবারের মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার বলেছেন, নির্বাচনে পরাজয়টা একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল তাঁদের কাছে। ভারতের ইংরেজি ভাষার সংবাদভিত্তিক টিভি চ্যানেল এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন এই কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী। নির্বাচনে দলের পরাজয়ের পর এই প্রথম গণমাধ্যমের মুখোমুখি হলেন মানিক সরকার। গত শনিবার ত্রিপুরাসহ এ অঞ্চলের তিন রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয়। ত্রিপুরা বিধানসভার ৬০ আসনের মধ্যে ৪৩টিই পায় বিজেপি জোট। সিপিআইএমের নেতৃত্বাধীন বাম জোট পায় মাত্র ১৬ আসন। মানিক সরকার এই ফলাফল সম্পর্কে বলেন, ‘আমরা এই পরাজয়ের কারণ মূল্যায়ন করব। আমরা এই ফলাফলের জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।’ বিজেপির এই ত্রিপুরাজয়ের ফলে এ রাজ্য ২৫ বছরের বাম শাসনের অবসান হলো। আর এই পরাজয়ের ফলে বামপন্থীদের হাতে মাত্র এক কেরালা রাজ্যটিই রইল। এর আগে পশ্চিমবঙ্গও হাতছাড়া হয় বামেদের। দলের পরাজয়ের মধ্যেও অবশ্য নিজের আসন ধরে রেখেছেন আর্থিক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার জন্য সুপরিচিত এই বর্ষীয়ান নেতা।
এবারের নির্বাচনে ‘পরিবর্তনের’ ডাক দেয় বিজেপি। তারা স্থানীয় ত্রিপুরিদের সংগঠন ইনডিজিনাস পিপলস ফ্রন্ট অব ত্রিপুরার (আইপিএফটি) সঙ্গে জোট বাধে। বিজেপি একাই পায় ৩৫ আসন। আর মোট ভোটের ৪৩ শতাংশ পায় এ জোট। অথচ ২০১৩ সালের এ রাজ্যের সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে একটি আসনও পায়নি বিজেপি। এ রাজ্যে আসলে বিধানসভা বা লোকসভায় কখনোই কোনো আসন পায়নি দলটি। গতকাল রোববার রাজ্যপাল তথাগত রায়ের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন মানিক সরকার (৬৯)। বিজেপির নতুন মুখ্যমন্ত্রী হবেন বিপ্লব কুমার দেব (৪৮)। ফলাফল সম্পর্কে মানিক সরকার বলেন, ‘পুরো ফল গত রাতেই পেয়েছি। রাজ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি।’ মানিক সরকার বলেন, এখনই কোনো চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না। মানিক সরকার বলেছেন, ‘আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।’

চা বেচে দিনে আয় ৪০ হাজার

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একসময় চায়ের দোকানে কাজ করতেন। নীল চোখের পাকিস্তানের চাওয়ালার কথাও আমরা শুনেছি। এবার ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের নাভনাথ ইউলের চা বিক্রির গল্প শুনব। চা বিক্রি করে আর কতই বা আয় করা যায়। কিন্তু চা বিক্রেতা লাখোপতি হয়েছেন এমন নজির আছে। তবে তাই বলে চা বিক্রি করে মাসে ১২ লাখ আয়—এমন খবর কমই শোনা যায়। ২০১১ সালে চা বিক্রি শুরু করে এখন মাসে ১২ লাখ রুপি আয় করেন ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের নাভনাথ ইউল। আউটলুক ইন্ডিয়া ও টাইমস নাউয়ের খবরে বলা হয়েছে, কয়েক বছর আগে ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে চায়ের দোকান দিয়ে রোজগার শুরু করেছিলেন নাভনাথ ইউল নামের এক ব্যক্তি। শুরুতে রোজগার ছিল খুবই কম। তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন ছিল। কিন্তু হার না মেনে ধীরে ধীরে নিজের ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন ইউল। সাফল্য আসতে শুরু করে। পাশাপাশি তাঁর দোকানে ক্রেতাদের জন্য থাকে নানা ধরনের চা।
এখন পুনে শহরে তিনটি চায়ের স্টল আছে ইউলের। প্রতিটি স্টলে কাজ করেন ১২ জন করে কর্মী। আর কঠোর পরিশ্রম শেষে এখন মাসে তাঁর আয় ১০ থেকে ১২ লাখ পর্যন্ত ভারতীয় রুপি। দিনের হিসেবে সেই আয় ৪০ হাজার রুপির মতো। পুনেতে তিনটি চায়ের আউটলেটের মালিক নাভনাথ ইউলের দাবি, চায়ের দোকান করে এ পর্যায়ে ব্যবসা করা সম্ভব খুব সহজেই। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম। আগামী দিনে তিনি ভারতের বাইরেও নিজের চায়ের স্টল খুলতে চান। দূর করতে চান অনেকের বেকারত্ব। নাভনাথ ইউল বলেন, ‘২০১১ সালে ব্যবসা শুরুর পরই আমার মনে হয়েছে, নতুনভাবে কিছু করা দরকার। পুনেতে অনেক কিছুই আছে, কিন্তু কোনো ভালো ব্র্যান্ডের চায়ের দোকান নেই। অনেকে চা খেতে পছন্দ করেন, কিন্তু তাঁদের জন্য চায়ের ভালো দোকান নেই। চার বছর ধরে নানা গবেষণার পর আমি গুণগত মানের চা ক্রেতাদের সরবরাহ শুরু করি। মানের সঙ্গে আপস করিনি।’ ইউলের চায়ের একেকটি আউটলেটে প্রতিদিন তিন থেকে চার হাজার কাপ চা বিক্রি হয়। অনেক সময় লোকের লম্বা সারিও দেখা যায়।

আবার স্নায়ুযুদ্ধে ফিরছে রাশিয়া?

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন সম্প্রতি নতুন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের কথা শোনালেন। তাঁর ভাষায়, এটা শত্রুর প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিয়ে বিশ্বের যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম। ইতিমধ্যে অস্ত্রটিসহ পুরো ব্যবস্থার পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে রাশিয়া। গত বৃহস্পতিবার আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে পুতিনের দেওয়া রাষ্ট্রীয় ভাষণে উঠে আসা এই প্রসঙ্গ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলা হচ্ছে, পুতিন যে ভাষণ দিয়েছেন, তেমন ভাষণ গত এক দশকে আর কোনো বিশ্বনেতা দেননি। ওই ভাষণে তিনি মূলত প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমানতালে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য তাঁর দেশের কৌশল প্রকাশ করলেন নতুন করে। আর এর মাধ্যমে তিনি স্নায়ুযুদ্ধে অনেকখানি এগিয়ে গেলেন বলেই বিশেষজ্ঞদের মত। তবে আদৌ সেটা আলোর মুখ দেখবে কি না, তা নিয়েও সংশয় আছে। পুতিনের ভাষণের সঙ্গে সঙ্গে অ্যানিমেশন করা ভিডিও দেখানো হয়। তাতে দেখা যাচ্ছে, একটি আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাশিয়া থেকে ছোড়ার পর পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। সাগরের ওপারের অজানা দেশে আঘাত করছে। বিষয়টি অনেকটা এমন, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি অনায়াসে ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আরও স্পষ্ট করে বললে ফ্লোরিডার মতো কোনো জায়গায় এটি আঘাত হেনেছে বলে মনে হচ্ছে। আর এই অ্যানিমেশনই বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকোভ। তিনি গত শুক্রবার ব্রিফিংয়ে বলেন, অ্যানিমেশনে ব্যবহৃত ম্যাপের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো দেশের সম্পর্ক নেই। এটা ফ্লোরিডা ছিল না। শুধু তা-ই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যই ছিল না এখানে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বক্তব্যটি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি।
পুতিনের বক্তব্যে সংঘাতের আভাস ছিল না। তাঁর কথা কোনো যুদ্ধবাজের কথার মতো ছিল না। বরং এটি ছিল রাশিয়ার প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কথা জানানোর একটি আয়োজন। উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক না কেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুতিনের ঘোষণাকে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। দ্রুতই এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও জার্মানির চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল। মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগ সাংবাদিকদের বলেছে, দশকের বেশি সময় ধরে স্থিতিশীল থাকা অস্ত্রব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলার ব্যবস্থা করেছে রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বলেছেন, দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার জন্য রাশিয়ার তরফ থেকে এটি যৌক্তিক প্রতিক্রিয়া। রাশিয়া এমন কোনো অস্ত্র তৈরি করছে না, যা শত্রুর দেশের অস্ত্রকে অকার্যকর করে ফেলবে। বরং শত্রুপক্ষের এমন অনেক অস্ত্র আছে, যার কাছে রাশিয়া অসহায়। যুক্তরাজ্যের লন্ডনের রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউট অব ডিফেন্স অ্যান্ড স্ট্যাটিজিক স্টাডিজের সামরিক বিশেষজ্ঞ আইগর সুতইয়াগিন বলেন, রাশিয়ার যুক্তিগুলো বিভ্রান্তিকর। আর যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কখনোই রাশিয়ার এমন অত্যাধুনিক অস্ত্রকে অকার্যকর করে দেওয়ার মতো করে তৈরি করা হয়নি। চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক মার্ক গালেওত্তি বলেন, সব পারমাণবিক কর্মসূচিই হালনাগাদ হতে হয়। কিন্তু রাশিয়ার অস্ত্রটি ধ্বংস করার জন্য প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্ষমতাধর। তবে এটা ধীর গতিতে এগোবে। আর পুতিনের আমলে এর ব্যবহার হবে না বলেই তিনি মনে করেন। ক্রেমলিনের সাবেক উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ভ্লাদিমির ফ্রোলোভ এটাকে ‘ধাপ্পাবাজি’ বলে মন্তব্য করেছেন। এ ধরনের অস্ত্র আলোর মুখ দেখবে না বলেই মত তাঁর।

ভিয়েতনামে চার দশক পর মার্কিন রণতরি

যুদ্ধবিমানবাহী মার্কিন রণতরি কার্ল ভিনসন ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু করেছে ভিয়েতনামে। ১৯৭৫ সালে শেষ হওয়া ভয়াবহ ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন রণতরি পূর্ব এশিয়ার এই দেশের বন্দরে ভিড়বে। ভিয়েতনামের বন্দর শহর ডানাংয়ে আজ সোমবারই ভিড়বে কার্ল ভিনসন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় এ বন্দরেই মার্কিন বাহিনী প্রথম গিয়ে পৌঁছায়। তাই এবার কার্ল ভিনসনের এ যাত্রা ভিন্ন এক তাৎপর্য বহন করছে। ভিয়েতনামিদের কাছে সেই যুদ্ধ ‘আমেরিকান ওয়ার’ নামে পরিচিত। ভিয়েতনাম সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ওই যুদ্ধে কয়েক লাখ বেসামরিক নাগরিক এবং কমিউনিস্ট গেরিলা নিহত হয়। অন্যদিকে, ৫৮ হাজার মার্কিন সেনা নিহত বা নিখোঁজ হয়। যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এক তিক্ত সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছিল ভিয়েতনামের। তবে দুই দেশের মধ্যে এখন সামরিকসহ নানা খাতে যোগাযোগ বেড়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই যাত্রার মাধ্যমে চীনকে একটি বার্তা দেওয়া হচ্ছে। দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের ফলেই এই বার্তা। দক্ষিণ চীন সাগরের পুরোটাই নিজের বলে দাবি করে চীন। তবে এ সাগর নিকটবর্তী দেশগুলোর কয়েকটি এখানে নিজেদের মালিকানা দাবি করে আসছে। এর মধ্যে ভিয়েতনাম সুনির্দিষ্টভাবে প্যারাসেল ও স্পার্টলি দ্বীপকে নিজেদের বলে দাবি করে। চীন এখন এ অঞ্চলের অঘোষিত প্রধান শক্তি। আবার ভিয়েতনামের বড় বাণিজ্য সহযোগী রাষ্ট্রও এটি। তাই সার্বিক বিষয়গুলো খুব সযত্নে সামলাতে হচ্ছে ভিয়েতনামকে। বৃহৎ প্রতিবেশী চীনকে নাখোশ করতে নারাজ তারা।

এই ক্ষত মুছবে কী করে? by আনিসুল হক

মুহম্মদ জাফর ইকবাল মৃদু হাসলেন। রোববার দুপুরবেলা হাসপাতালে তাঁর বিছানার পাশে দাঁড়ালেন তাঁর স্ত্রী ইয়াসমিন হক। বললেন, ‘তোমাকে বিদেশে নিতে হবে না।’ সাদা আচ্ছাদন মাথায় পরা জাফর ইকবাল হাসছেন, বাইরে মনিটরে আমরা দেখলাম। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে বাইরের কারও প্রবেশ নিষেধ। আমরাই ইয়াসমিন হককে অনুরোধ জানালাম তাঁকে একটিবার দেখা দেওয়ার জন্য। লেখক, শিক্ষক আর শিশু-কিশোরদের প্রিয়তম এই মানুষটিকে গত শনিবার আঘাত করা হয়েছে তাঁরই প্রিয় শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনায়। তাঁর মাথার পেছনে চারটা কোপ, পিঠে একটা, হাতে একটা। ওসমানী হাসপাতালেই তাঁকে চার ব্যাগ রক্ত দেওয়া হয়েছিল। তাঁর করোটি আর মস্তিষ্ক অক্ষত আছে। সুচিকিৎসা চলছে। চিকিৎসকেরা আশা করছেন, তিনি শিগগিরই সেরে উঠে হাসপাতাল ত্যাগ করতে পারবেন। দেশবাসীর সঙ্গে আমরাও প্রার্থনা করছি, তিনি দ্রুত সেরে উঠুন। শরীর তাঁর সেরে উঠবে। দাগও হয়তো মুছে যাবে। কিন্তু তাঁর মনে যে দাগ পড়ল, তা মুছবে কী করে? দেশবাসীর মনে আতঙ্কের যে ছায়া পড়ল, তা দূর হবে কী করে? এই বিপদ অবশ্য নতুন নয়। শুধু বাংলাদেশই বিপদাপন্ন নয়। সেই ১৯৯৯ সালে কবি শামসুর রাহমানের ওপর আক্রমণের চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর হুমায়ুন আজাদ থেকে ফয়সল আরেফিন দীপনসহ আরও বহু লেখক, সংস্কৃতিসেবী, পাদ্রি ও দেশি-বিদেশী নিরীহ নাগরিক পরিকল্পিত ও বিচ্ছিন্ন আক্রমণের শিকার হলেন।
উদীচীর সম্মেলন, রমনার বটমূলে বোমা হামলা হলো, এমনকি হামলা করা হলো ঈদের জামাতেও। হো‍লি আর্টিজানের হৃদয়বিদারক ঘটনার পর সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলো। আমরা কিছুটা স্বস্তিও ফিরে পাচ্ছিলাম, বুঝি বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের বিপদকে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে। কিন্তু পৃথিবীর নানা প্রান্তে নানা জঙ্গি আক্রমণের খবর আমাদের শঙ্কিত করেই আসছে। এই বিপদ তো সহজে যাওয়ার নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা, সক্ষমতা, আধুনিকতা, অতন্দ্র প্রহরা ও আগাম পদক্ষেপ তো লাগবেই। কিন্তু এই সমস্যা রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও বৈশ্বিক। যে তরুণ হাতে ধারালো অস্ত্র তুলে নিয়েছে, আক্রমণ করতে পেরেছে অতিসজ্জন একজন লেখককে পেছন থেকে, তাকে বোঝানো দরকার, সে কেবল মানবতার ক্ষতি করেনি, ক্ষতি করেছে আমাদের ধর্মের, আমাদের জনগোষ্ঠীর এবং আমাদের দেশের। হিংসা দিয়ে কিছুই জয় করা যায় না, মানুষের হৃদয় তো নয়ই। ১ মার্চ প্রথম আলোয় বেরিয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের প্রতিবেদনের খবর। তারা বলেছে, রাজনীতিকীকরণের ফলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। একদিকে রাজনৈতিক মেরুকরণ ঐতিহাসিকভাবে বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে স্থানীয় জঙ্গিদের যোগাযোগ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার জন্য নতুন প্রকৃতির জঙ্গিবাদ হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছে তারা। এ ধরনের প্রতিবেদন আমলে নিতে হবে। জঙ্গিবাদের বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করতে হলে উদ্যোগটা নিতে হবে চতুর্মুখী। অর্থনৈতিক বৈষম্য ও সামাজিক বিভেদ কমাতে হবে। বিভেদের বীজাণুর চাষ না করে সম্প্রীতির সূত্রগুলোকে জোড়া দিয়ে বন্ধন করতে হবে জোরালো। এ দেশের মানুষ বোমা পেতে রাখবে জনসমাবেশে, আঘাত করবে বিদেশি অতিথিকে, হামলা করবে লেখকদের ওপর-এসব ছিল অচিন্তনীয়। কিন্তু এখন তা ঘোরতর বাস্তবতা। এখন দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, মধ্যমেয়াদি কর্মসূচি আর আশু পদক্ষেপ। ব্যাপারটা মিটে গেছে বলে একমুহূর্তের শৈথিল্যের সুযোগ নেই। মুহম্মদ জাফর ইকবাল আক্রান্ত হয়েও বলেছেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ রক্তাক্ত অবস্থায় বলেছেন, ‘আক্রমণকারী সুস্থ আছে তো।’ ছাত্রদের বলেছেন, ‘তোমরা শান্ত থেকো।’ বাংলাদেশকে প্রমাণ করতে হবে, আমরা সেই দেশ, যারা বলতে পারে, ‘ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাব কেহ!’ আমরা সেই দেশ, যারা ভালোবাসা দিয়ে বিশ্ব জয় করি, ঘৃণা বা হিংসা দিয়ে নয়। অন্ধকারে তরবারি ঘুরিয়ে জঙ্গিবাদ দূর করা যাবে না। জ্বালাতে হবে আলো। গণতন্ত্রের আলো, শিক্ষার আলো, সংস্কৃতির আলো, সম্প্রীতির আলো। আমরা মুহম্মদ জাফর ইকবালের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। আমরা আক্রমণকারী আর তার পরিকল্পনাকারীদের বিচার চাই, সাজা চাই, সমূলে উৎপাটন চাই। অতীতে এ ধরনের অপরাধের বিচার না হওয়া, বহু জঙ্গির জামিনে মুক্তি এবং আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবরে আমরা উদ্বিগ্ন। ভয়ের ছায়া ইগলের পাখার ছায়ার মতো আমাদের মাথার ওপরে। বুকের ওপর পাথর চেপে বসেছে। অথচ আমাদের কবি তো স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই স্বদেশের, ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,/জ্ঞান যেথা মুক্ত’। চেয়েছিলেন আমরা নিজেদের আঙিনাকে বিভেদের প্রাচীর দিয়ে যেন ক্ষুদ্র আর খণ্ড না করি। স্বাধীনতা মানে স্বাধীনতার জন্য ক্রমাগত লড়াই করে যাওয়া। ২০১৮ সালের মার্চেও আমাদের বলতে হচ্ছে, লড়াই চলছেই। কবি ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের ভাষায়, ‘এসো ছিনিয়ে নিই আমাদের স্বাধীনতা, অক্ষরের পাশে অক্ষর বসিয়ে শব্দগুলো তৈরি করবার স্বাধীনতা।’

জাফর ইকবালকে হত্যাচেষ্টা

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট লেখক মুহম্মদ জাফর ইকবালের প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনায় আমরা ক্ষুব্ধ, মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন। আমরা তীব্র ভাষায় এই হামলার নিন্দা করি, হামলাকারীকে ধিক্কার জানাই এবং ঘটনার তদন্ত, বিচার ও দায়ী ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাই। গত শনিবার বিকেলে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চে এক অনুষ্ঠান চলাকালে এই কাপুরুষোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। জাফর ইকবাল দর্শকের সারিতে বসা ছিলেন। এ সময় ফয়জুর রহমান নামে এক যুবক পেছন থেকে অতর্কিতে তাঁর ওপর উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন। এতে মাথা, পিঠ ও হাতে জখম হয়। প্রথমে তাঁকে সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করা হয়। পরে ওই রাতেই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে সেনাবাহিনীর বিশেষ বিমানে তাঁকে ঢাকায় এনে সিএমএইচে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, জাফর ইকবাল এখন আশঙ্কামুক্ত। জাফর ইকবাল শঙ্কামুক্ত এবং হামলাকারীর আটকের খবর স্বস্তির হলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর অজানা রয়ে গেছে। প্রথমত, হামলাকারী যুবকের বিস্তারিত পরিচয় কিংবা তাঁর সঙ্গে আরও কেউ ছিল কি না, তা এখনো জানা যায়নি। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সামনে ওই বহিরাগত যুবক কীভাবে ছুরি মারার সাহস পেলেন? সবচেয়ে বড় কথা জাফর ইকবালের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এর আগেও ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা এর কাছাকাছি জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও লেখকদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এসব ঘটনার পরও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্যাম্পাসের নিরাপত্তায় কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করা যায়নি এবং সে কারণেই ফের হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
জাফর ইকবাল বরাবর মুক্তচিন্তা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে সোচ্চার। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরোধী এবং ধর্মান্ধ ও জঙ্গিগোষ্ঠীর তরফে তাঁর জীবননাশের হুমকি ছিল। যে কায়দায় জাফর ইকবালের ওপর হামলা হয়েছে তাতে অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে এ ধরনের কোনো গোষ্ঠী বা তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তি বা ব্যক্তিরাই এমন ঘটনা ঘটিয়েছে। হামলাকারী প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তা স্বীকারও করেছেন। দেশে জঙ্গিবাদীদের কর্মকাণ্ড একসময় যে বিপজ্জনক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল, সাম্প্রতিক সময়ে তাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা গেছে। কিন্তু এটাই যে সব নয় এবং জঙ্গিরা যে নির্মূল হয়ে যায়নি, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তা পরিষ্কার হলো। সরকারের দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে জঙ্গিগোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে তারা দুর্বল হলেও নিষ্ক্রিয় হয়নি। ফলে বিপদের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযানে একধরনের সক্ষমতা দেখালেও জঙ্গিগোষ্ঠীর বিচারে চরম দুর্বলতা দেখিয়ে চলেছে। গত নয় বছরে জঙ্গিদের হাতে বহু লেখক-বুদ্ধিজীবী-সংস্কৃতিকর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ মারা গেলেও রাজিব হায়দার হত্যাকারীদের ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া যায়নি। এমনকি ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিজিৎ হত্যা কিংবা একই বছরের অক্টোবরে ফয়সল আরেফিন হত্যার তদন্তকাজও ঝুলে আছে। জাফর ইকবালের ক্ষেত্রে সেটি হবে না আশা করি। আটক হামলাকারীর সূত্র ধরে নেপথ্যের কুশীলবদেরও খুঁজে বের করা হোক। আশার কথা, এই হামলার প্রতিবাদে ঢাকা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হামলার বিরুদ্ধে ব্যাপক নিন্দা ও ক্ষোভ জানানো হচ্ছে। অপশক্তিকে জানিয়ে দিতে হবে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে লাখো প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশ যেকোনো মূল্যে জঙ্গিগোষ্ঠীর আক্রমণ প্রতিহত করতে প্রস্তুত।

ইসির উদ্ভট প্রস্তাব

নির্বাচন কমিশনের আইন ও বিধিমালা সংস্কার কমিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার বন্ধ করার সুপারিশ করেছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারের নামে অপপ্রচার, ঘৃণা প্রচার, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও দল সম্পর্কে অশোভন ও মানহানিকর বক্তব্য আসার আশঙ্কা থেকে তারা এই সুপারিশ করেছে বলে জানানো হয়। এটি মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার শামিল। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা দল সম্পর্কে মানহানিকর প্রচার চালালে তার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। আর এ ধরনের প্রচার তো শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হচ্ছে না। রাজনীতির মাঠে হরহামেশাই হচ্ছে। সেসব বিষয়ে নীরব থেকে নির্বাচন কমিশন ফেসবুক নিয়ে টানাটানি করলে এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জনমনে সন্দেহ জাগা স্বাভাবিক। এ ছাড়া কোনো বিধান জারি করলেই তো হবে না। সেটি বাস্তবসম্মত কি না, যাচাই করে দেখতে হবে। একজন সাবেক নির্বাচন কমিশনারও বলেছেন, এ ধরনের বিধান করলে তা কার্যকর করা অসম্ভব হবে। কারণ ফেসবুক, টুইটার এগুলো এখন জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম। বিপুলসংখ্যক মানুষ ইন্টারনেটে এসব যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করবে। এগুলো বন্ধ করলে নির্বাচনের পরিবেশ সুস্থ হবে না।
ইসিকে মনে রাখতে হবে, কঠিন বাস্তবতায় আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তাদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সেই নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা তথা সবার জন্য মাঠ সমতল করা। রাষ্ট্রীয় সুবিধা ব্যবহার করে কোনো দল নির্বাচনী প্রচার চালাবে, আর অন্যদের সভা-সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হবে, সেটি হতে পারে না। তফসিলের দোহাই দিয়ে ইসি এ ব্যাপারে নিশ্চুপ থাকতে পারে না। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে তফসিল ঘোষণার পর তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা। ইতিমধ্যে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে রদবদল শুরু হয়ে গেছে। ভবিষ্যতে আরও হবে। সেই রদবদলের প্রতিও ইসির কঠোর নজরদারি থাকতে হবে। তবে ইলেকট্রনিক ডিসপ্লে সম্পর্কে ইসির সংস্কার কমিটি যে প্রস্তাব করেছে, তা গ্রহণযোগ্য বলে ধারণা করি। সে জন্য আলাদা বিধি বা আইন করার প্রয়োজন নেই। বর্তমান আইনেই নির্বাচনী প্রচারের ওপর যে বিধিনিষেধ আছে, তার যথাযথ প্রয়োগ করলেই কোনো প্রার্থী লাখ লাখ টাকা খরচ করে এ ধরনের প্রচার চালাতে পারবেন না। নির্বাচন কমিশনের কাছে আহ্বান থাকবে, ফেসবুক বন্ধের অবাস্তব চিন্তা বাদ দিয়ে তারা যেন নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ইসিকেও শুধু কথা নয়, কাজ দিয়েই প্রমাণ করতে হবে তারা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ।

চুক্তি থেকে বের হয়ে যাবে ইরান? by মাসুমেহ্ তোরফে

পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে ছয় শক্তিধর দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ফ্রান্স, চীন ও জার্মানির ঐতিহাসিক জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) চুক্তি স্বাক্ষরের পর মনে হচ্ছে ইরান এই প্রথমবারের মতো তাদের কৌশল বদলাতে যাচ্ছে এবং হয়তো চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ভাবছে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি ইরান পরিষ্কারভাবে একটি আলটিমেটাম দিয়েছে। সেখানে তারা বলেছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করার পর পশ্চিমা বিশ্বের বড় বড় ব্যাংক, কোম্পানি ও বাণিজ্য সংস্থাগুলো তাদের সঙ্গে লেনদেন স্থগিত করে রেখেছে; এটি যদি অব্যাহত থাকে এবং জেসিপিওএ যদি তাদের জন্য আর্থিকভাবে সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা এটি থেকে বের হয়ে যাবে। ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লন্ডনে চ্যাটাম হাউসে বলেছেন, ‘যে চুক্তি আমাদের জন্য কোনো সুবিধা বয়ে আনবে না, সেই চুক্তিতে আমরা বাঁধা পড়ে থাকতে পারি না।’ আরাগচি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ লোক এবং জেসিপিওএর মূল আলোচকদের একজন। তাঁর অভিযোগ, ট্রাম্প একটি ‘লন্ডভন্ড অবস্থা’ তৈরি করে ওই চুক্তির ‘আক্ষরিক ও নৈতিক’ সীমা ভেঙে ফেলছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কয়েক মাস ধরেই হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ইরান যদি তার ‘দোষত্রুটি’ থেকে সরে না আসে, তাহলে জেসিপিওএ চুক্তি ভেঙে দেওয়া হবে। গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প তাঁর ইউরোপীয় মিত্রদের বলেছেন, ইরান যদি তার আচরণ সংযত না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র মে মাসের ১২ তারিখের আগেই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাবে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপ করা নতুন নিষেধাজ্ঞা পাস করতে পারে। ট্রাম্প এই চুক্তিতে মূলত তিনটি ত্রুটি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন। এ কারণেই তিনি চুক্তি থেকে বের হতে চাইছেন। ট্রাম্প মনে করেন, এই চুক্তিতে ইরানের দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রম সীমিত করার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি; ইরানের পরমাণুকেন্দ্রগুলো আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা যখন খুশি পরিদর্শন করতে পারবেন—এমন অনুচ্ছেদ রাখা হয়নি এবং সবশেষে ‘সানসেট’ শীর্ষক একটি অনুচ্ছেদ রাখা হয়েছে, যার আওতায় ১০ বছর পর ইরান পরমাণু কার্যক্রম শুরু করতে পারবে বলে বলা হয়েছে।
তবে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী অন্য পক্ষগুলো যখন ট্রাম্পের দাবি করা এ বিষয়গুলো চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তি প্রত্যাখ্যান করে জানাল যে বিষয়গুলো জেসিপিওএর আওতায় পড়ে না; তখন ট্রাম্প নতুন একটি সম্পূরক শর্ত চুক্তিতে জুড়ে দিতে চাইলেন। তিনি বললেন, ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা ও কার্যক্রম চালানো বন্ধ করা, আইএইএর পরিদর্শন আরও কড়া করা এবং ‘সানসেট অনুচ্ছেদ’-এর ‘ত্রুটিবিচ্যুতি’ ঠিক করা এই চুক্তির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আব্বাস আরাগচি লন্ডনে চ্যাটাম হাউসে বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরের পর ট্রাম্প এখন নতুন যে শর্তগুলো চুক্তির মধ্যে সম্পূরক হিসেবে ঢোকাতে চাইছেন, তা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। তিনি বলেছেন, এই চুক্তিতে অস্ত্র বিস্তার রোধের কথা বলা হয়েছে; দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা যাবে কি যাবে না, তা এই চুক্তির আওতার বিষয় নয়। এ ছাড়া আইএইএ পরপর নয়বার ইরানের পরমাণু কার্যক্রম বিশদভাবে পরিদর্শন করেছে। নতুন করে সেখানে তাদের পরিদর্শনের কোনো প্রয়োজন নেই। আরাগচি বলেছেন, ট্রাম্প ইরানের পরমাণু অস্ত্র তৈরি বন্ধের যে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন, সেটিও ভিত্তিহীন। কারণ, ইরান পরমাণু অস্ত্র না বানানোর ব্যাপারে স্থায়ীভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। খবর পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবের সঙ্গে কোটি কোটি ডলারের একটি পরমাণু জ্বালানি চুক্তি করতে যাচ্ছে। এর জের ধরেই ট্রাম্প ইরানের পরমাণু কার্যক্রম নিয়ে এতটা খেপে উঠেছেন। চ্যাটাম হাউসে আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে চুক্তিটিকে হত্যা করার পরিবেশ তৈরি করে ফেলেছে। গত জানুয়ারিতে সপ্তাহজুড়ে ইরানে বিক্ষোভ চলার সময় ট্রাম্প যেসব টুইট করেছেন, তা দেখে মনে হবে তিনি ইরানের প্রশাসনে পরিবর্তন করতে যাচ্ছেন। ট্রাম্পের ইরানবিরোধী কথাবার্তার কারণে বহু বিদেশি ব্যবসায়ী ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য স্থগিত করে রেখেছেন। এতে ইরানে লোকজন কাজ হারাচ্ছেন। কর্মসংস্থানের অভাব দেখা দেওয়ায় সেখানে বিক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। চুক্তিতে স্বাক্ষর করা পক্ষগুলো ইরানকে যদি প্রতিশ্রুত অর্থ না দেয়, তাহলে বিক্ষোভ আরও বাড়বে। এ অবস্থায় নিজেদের পিঠ বাঁচাতে হলেও ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাবে এবং রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াবে। এটি হলে নতুন করে এই এলাকায় উত্তেজনা ছড়াবে। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী থাকবেন ট্রাম্প।
আল-জাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত
মাসুমেহ্ তোরফে জাতিসংঘের অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন ফর আফগানিস্তানের (ইএনএএমএ) স্ট্র্যাটেজিক কমিউনিকেশন বিভাগের সাবেক পরিচালক