Friday, January 10, 2014

খোলা চোখে- সংখ্যালঘু রাজনীতির ‘সফট টার্গেট’ by হাসান ফেরদৌস

যাদের দিকে ঢিল ছুড়লে পাটকেল খাওয়ার ভয় নেই, যাদের বাড়িতে আগুন দিলে পাল্টা আগুন লাগার উদ্বেগ নেই, যাদের দু-চারজন খুন বা ধর্ষণ হলে ফিরতি খুন বা ধর্ষণের আশঙ্কা নেই—এমন মানুষজনই হলো ‘সফট টার্গেট’।

সেদিন বাইশে ফেব্রুয়ারি by রফিকুর রশীদ

অফিসে বের হওয়ার সময় হাতের কাছে সবকিছু ঠিকঠাক না পেলে কার মেজাজ খারাপ না হয়! আলনায় জামা-পায়জামা ঠিকই সাজানো আছে, কিন্তু গেঞ্জিটা কোথায়? দেয়ালঘড়িতে ১০টার ঘণ্টা বাজে ঢং ঢং। শফিউর রহমানের কপালের দুপাশের শিরা দাপায় দপ্দপ্ করে। দ্রুত হাতে পায়জামার ফিতে বাঁধতে গজগজ করে ওঠেন- উহ্, আজও সেই ১০টা! কোথায় একটু আগে বের হব কিনা...
সহসা ঘরে ঢোকেন শফিউরের মা। ছেলের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলেন, আজ আর অফিসে ন গেলে হয় না খোকা?
এই খোকা ডাকটুকু শুধু মায়ের। বাবা মাহবুবুর রহমান পূর্ণ নামেই ডাকেন ছেলেদের। প্রায়ই তিনি স্ত্রীকে স্মরণ করিয়ে দেন- খোকা শব্দটির গায়ে কেমন যেন হিঁদুয়ানী গন্ধ আছে। মুসলমানের ছেলেমেয়েকে ডাকতে হয় ইসলামী নামে। এ পরামর্শ মনে থাকে না শফিউরের মায়ের। উল্টো তিনিই মনে করিয়ে দেন, আমরা তো ছিলাম হিন্দুস্তানেরই মানুষ; খোকা বলার অভ্যেস যে!
মায়ের কথা কানে ঢুকুক আর না-ই ঢুকুক, মাকে সামনে পেয়ে শফিউর রহমান জিজ্ঞেস করেন- গেঞ্জিটা কোথায় গেল, বল তো মা!
গেঞ্জির হদিস মা কেমন করে দেবেন! কাপড়-চোপড় নিপাট ভাঁজ করে তার বউমা কোনোটা ন্যাপথালিন দিয়ে তুলে রাখে বাক্সে, কোনোটা সাজিয়ে রাখে আলনায়। থরে থরে সাজানো সেই আলনার কাপড় ছেলেকে এলোমেলো করতে দেখে তিনি ডেকে ওঠেন বউমাকে,
অ বউমা! খোকার গেঞ্জিটা...
রান্নাঘর থেকে সাড়া দেয় আকিলা খাতুন,
এই যে মা, আসছি।
শাড়ির আঁচলে চোখ-মুখ মুছতে মুছতে স্ত্রীকে আসতে দেখেই শফিউর রহমানের মেজাজ চড়ে যায় সপ্তমে। মায়ের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে স্ত্রীর ওপর রোষ ঝাড়েন,
কটা বাজে সে হুঁশ আছে!
আকিলা খাতুন আলনার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বলে,
কতদিন বলেছি তোমার ওই ঘড়ি ঠিক চলে না।
এ্যাঁ, ১০টা বাজেনি তাহলে!
রঘুনাথ লেনের পুরনো বাড়ির স্যাঁতসেঁতে দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির ভুলটুকু আর নতুন করে ধরিয়ে না দিয়ে আকিলা খাতুন এক টানে আলনা থেকে গেঞ্জি এনে স্বামীর সামনে বাড়িয়ে ধরে- এই নাও তোমার গেঞ্জি।
আলনাতেই ছিল! শফিউর রহমান বিস্মিত হন। স্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে এক চিলতে হেসেও ওঠেন। আকিলা খাতুন কপট কটাক্ষ করে,
হ্যাঙ্গারে কোট ঝুলছে, চোখে পড়েছে তো!
শফিউর রহমান নরম স্বরে বলেন,
আমার চোখে না পড়লেও তুমি তো আছ!
পুত্র এবং পুত্রবধূর এ মধুর খুনসুটির মধ্যেও শফিউরের মা আকুল কণ্ঠে ডেকে ওঠেন,
অ খোকা! আমি বলছিলাম কী- আজ আর অফিসে না গেলে...
না মা, হয় না।
গেঞ্জির ওপর শার্ট চাপিয়ে শফিউর রহমান বোতাম লাগাতে লাগাতে ব্যাখ্যা দেন, হাইকোর্টের চাকরি খোদ সরকারি চাকরি। দেশের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। এ সময় একবার অফিসে না গেলে চলে!
এ ব্যাখ্যা শুনে অন্তর ভরে না মায়ের। তিনি ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, গতকাল যে তুই বললি- এ দেশ আর চলবে না, এ সরকার টিকবে না; তাহলে আর...
এই ফাঁকে আকিলা খাতুন স্বামীর বিরুদ্ধে অনুযোগ জানায়, তবু উনাকে যেতে হবে মা। হাইকোর্টের কেরানি। উনি না গেলে আইন আদালত সব বন্ধ হয়ে যাবে না।
মুখে অনুযোগ, তবু আকিলা খাতুন কোটের বুক আলগা করে স্বামীর পিঠের কাছে বাড়িয়ে ধরে। শফিউর রহমান কোটের হাতার মধ্যে দুহাত গলিয়ে কাঁধে ঝাঁকুনি দিয়ে বলেন, অফিস-আদালত তো গতকাল থেকেই বন্ধ হয়ে গেছে। তবু একবার যেতে হবে।
সামান্য কেরানি যে!
শফিউরের মা দুপা এগিয়ে এসে ছেলের কাঁধে হাত রেখে ডুকরে ওঠেন,
ভয় করে বাবা, শহরে আজও যদি গোলাগুলি হয়!
গুলি করে আর কত মানুষ মারবে মা, গতকাল তো নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হত্যা করেছে মানুষ। মাতৃভাষার জন্য এ দেশের ছাত্রজনতা এখন মরতে প্রস্তুত।
স্বামীর কথার ধরন শুনে চমকে ওঠে আকিলা খাতুন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে প্রশ্ন করে, তুমি যে প্রাইভেটে বিএ পরীক্ষা দেবে সেটা আমরা জানি, তাই বলে কি ছাত্ররাজনীতি শুরু করেছ নাকি?
কী মুশকিল! তোমার মেয়ে তোমাকে মা বলে ডাকবে না? আমার মাকে আমি মা বলে ডাকব না? এর মধ্যে আবার রাজনীতি-ফাজনীতি কী বল দেখি!
আকিলা খাতুনের বুকচিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে, অস্ফুট কণ্ঠে বলে,
কী জানি!
স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাস শফিউর রহমানের কানের দুয়ারে পৌঁছনোর আগেই ঘরের দরজায় দৃৃষ্টি চলে যায়। তিন বছরের কন্যা শাহনাজ টলোমলো পায়ে ঠিক সময়মতো হাজির। বাবা অফিস যাওয়ার আগে তার গালে চুমু এঁকে দেবে, এ তার নিত্যদিনের রুটিন। আজ দেরি হচ্ছে দেখে বুঝি সে নিজেই এগিয়ে আসে, দুহাত বাড়িয়ে ডাকে,
বাবা, আমি...
শফিউর রহমান হঠাৎ অন্য মানুষ হয়ে যান। মেয়েকে বুকের মধ্যে জাপটে ধরে আদর করেন। এ-গাল ও-গাল চুমু খেয়ে ভিজিয়ে দেন। মুখে শুধু উচ্চারণ করেন, এই যে আমার বুড়ি-মা। এই যে আমার বুড়ি-মা।
শফিউরের মা বহুবার ছেলের ভুল সংশোধন করে দিয়েছেন নিজেকে দেখিয়ে, বলেছেন- ওই ছুড়ি আবার বুড়ি-মা হল কী করে বাবা? বুড়ি-মা তো হলাম আমি। ছেলে সেটা মানতে নারাজ। তার যুক্তি খুবই সরল- তুমি তো আমার মা। বুড়ি হচ্ছে এইটা। এই যে আমার বুড়ি। শফিউরের মা এবার নতুন পথে পা বাড়ান, ছেলেকে জব্দ করার জন্য বলেন,
আমরা তাহলে কবে বুড়ো হব বাবা!
ঝটপট জবাব শফিউরের,
বুড়ি তো আছেই মা, তোমরা কেন বুড়ো হবে!
আকিলা খাতুন কথাবর্তার মোড় ঘুরিয়ে দেয়, হাত বাড়িয়ে মেয়েকে আহ্বান জানায়, খুব হয়েছে শানু, নেমে আয়। বাবা অফিস যাবে।
গাছ বেয়ে নামার মতো করে বাবার কোল থেকে সুড়–ৎ করে নেমে পড়ে শাহনাজ।
এতক্ষণে শফিউর রহমান জানতে চান,
বাবাকে দেখছি না কেন মা?
শফিউরের মা ছেলের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে শাড়ির আঁচল মুখে চেপে ফ্যাচ করে ফুঁপিয়ে ওঠেন। শফিউর হতভম্ব। অফিসে যাওয়ার ব্যাপারে বাবার নিয়মনিষ্ঠার কথা তার খুব জানা আছে। পোস্টাল ডিপার্টমেন্টের চাকরি। সময়ের নড়চড় কাকে বলে সে কথা তার অভিধানে লেখা নেই। তাই বলে গোলোযোগপূর্ণ এই বেসামাল দিনেও কি এত সকালে বের হতে হবে! শফিউর রহমান জিজ্ঞেস করেন, কী হল মা, কাঁদছ কেন?
মায়ের মুখে কথা নেই। বরং এবার তার চাপা কান্না রীতিমতো স্ফুট হয়ে ওঠে। শফিউর মোটেই বুঝতে পারে না- তার মায়ের এ কান্নার কী ব্যাখ্যা হতে পারে! হয়তো তিনি বাবাকেও বারণ করেছেন অফিসে যেতে, কিন্তু নিবৃত করতে পারেননি। মাত্র আর বছরখানেক চাকরি আছে তার, এ সময় স্ত্রীর কথায় কান দিয়ে অফিস কামাই করার পাত্র তিনি! মাথা খারাপ! শফিউর রহমান নিঃসংশয় হওয়ার জন্য মাকে শুধান,
বাবা তাহলে অফিসে চলে গেছে মা?
এতক্ষণে মুখ খোলেন শফিউরের মা। তিনি বলেন,
অফিস কোথায়! তিনি তো বেরিয়েছেন সেই সাত সকালে!
কী বলছ মা! সাত সকালে...
হ্যাঁ। সারা রাত ছটফট করে সকালে উঠে বেরিয়ে গেল।
শফিউর রহমান এবার ভীষণ উদ্বেগ বোধ করেন। ভেতরে ভেতরে খানিকটা অপরাধীও মনে হয় নিজেকে। গত রাতে বাড়ি ফেরার পর কথায় কথায় পিতা-পুত্র জড়িয়ে পড়ে তুমুল তর্কে। মাহবুবুর রহমান মেজাজি মানুষ। তিনি সাফ জানিয়ে দেন- সামান্য ভাষার জন্য আমরা লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান করিনি। বাবার সঙ্গে শফিউরের মতান্তরের জায়গাটা এখানে, এ ভাষার প্রশ্নে। শফিউর রহমান ভাষার প্রশ্নটিকে সামান্য বলে মানতে পারেন না। কথার পিঠে কথা বাড়ে। রফিউদ্দীনের কথা ওঠে। আবুল বরকতের কথা ওঠে। উত্তেজিত শফিউরের মুখ থেকে মন্তব্য বেরিয়ে পড়ে- কোনো সভ্য দেশে এরকম সরাসরি গুলি চালায় বাবা? এ দেশটা আর চলবে না দেখ।
সহসা এসব কথা মনে পড়তেই শফিউর রহমানের গায়ে কাঁটা দেয়। নিজেই ক্ষতবিক্ষত হন- সারা রাত ঘুমাতে পারেননি বাবা! আবার সকালে উঠেই হাওয়া! এ সবের মানে কী! এবার মাকে চেপে ধরেন,
এসব আগে বলনি কেন মা? বাবা তাহলে অফিসে যায়নি!
শফিউরের মা চিরকেলে বাঙালি নারী। আঁচলে চোখ মুছে বলেন, চা-নাস্তা নেই, নাওয়া খাওয়া নেই, কিসের অফিস!
শফিউর রহমান আর মোটেই বিলম্ব করেন না। আচ্ছা আমি দেখছি বলে সবাইকে আশস্ত করে উঠানে নেমে আসেন। প্রতিদিনের সঙ্গী র‌্যালি সাইকেল নিয়ে সদর দরজা ঠেলে বের হতেই হঠাৎ বাবার সঙ্গে দেখা। চোখ দুটো রক্তজবা। মাথার চুল উসকোখুসকো। নিজের ছেলেকে চিনতেও যেন খানিক সময় লাগে তার। চিনতে যখন পারেন, তখন সাইকেলের হ্যান্ডেলে হাত রেখে তিনি বলেন,
তুমি যাচ্ছ কোথায় শফিউর রহমান? হসপিটালের মর্গ থেকে লাশ সরিয়ে ফেলেছে আর্মি। মরা মানুষকেও এত ভয় ওদের!
শফিউর রহমান আপন জন্মদাতার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন অবাক বিস্ময়ে। এ কি ঝড়ের তাণ্ডবে ভেঙে যাওয়া কলাগাছ, ছিন্নভিন্ন প্রত্ররাজি! শফিউর ধীরে ধীরে সাইকেলের হ্যান্ডেল থেকে বাবার হাতটা নামিয়ে দেন। আর তখনই নিজের শরীরের রক্ত চনমন করে ওঠে। সাইকেলটা স্ট্যান্ডে চড়িয়ে বাবার পা ছুয়ে কদমবুসি করেন, তারপর বলেন,
বাইরে অনেক কাজ বাবা, আমি আসি।
শফিউর রহমান সত্যিই সাইকেল ঠেলে বেরিয়ে যান। বাবা মাহবুবুর রহমান কী যেন বলতে যান, কিন্তু গলার স্বর স্ফুট হয় না। এমনকি ছেলের নাম ধরেও ডাকা হয় না আর।
দুই .
সেদিন শুক্রবার।
মাহবুবুর রহমান কলকাতায় বসে অনেকক্ষণ ধরে ওজু-গোসল সেরে মাথায় টুপি চাপিয়ে মসজিদের উদ্দেশে বেরিয়ে যান। না, অন্যান্য দিনের মতো জিন্যহ টুপি সেদিন পরেননি। লালবাগের অবাঙালি দর্জির তৈরি হালকা নকশাদার টুপি পরে তিনি জুমার নামাজে বেরিয়ে যাওয়ার পরপরই বাড়িতে দুঃসংবাদটি এসে পৌঁছে। প্রকৃত সংবাদটি আড়াল করার জন্য বলা হয় পুলিশের গুলি লেগেছে শফিউর রহমানের হাতে, যেনবা ব্যাপারটা খুব সামান্যই।
ছোটভাই তৈয়বুর এক দৌড়ে ছুটে গিয়ে ঘটনার আদ্যপান্ত শুনে আসে। তখন এক বিরাট মিছিল যাচ্ছিল নবাবপুর রোড দিয়ে সাংঘাতিক তেজি আর সাহসী মিছিল। রাষ্ট্রভাষার স্লোগান তো আছেই, মিছিল থেকে আগের দিনের ছাত্র হত্যারও বিচার চাইছে। শফিউর রহমানের সাইকেল রথখোলায় মরণ চাঁদের দোকান পর্যন্ত আসতেই পেছন থেকে গুলি এসে লাগে তার পিঠে। কেঁপে ওঠে সারা শরীর। মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। শফিউর রহমানের সাইকেল আরও একটু এগিয়ে খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে এসে মুখ থুবড়ে পড়ে যায়। তারপরই অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকা মেডিকেল।
তৈয়বুরের মুখের এ বিস্তারিত বিবরণ শেষ হতে না হতেই আকিলা খাতুন জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে বিছানায়। ছোট্ট শাহনাজ এত কিছু না বুঝেই মা বলে আর্তনাদ করে ওঠে। শফিউরের মা দ্রুত হাতে বউমার চোখে মুখে পানির ছিটা দেন, বউমার কপালে হাত দিয়ে বুকভাঙা বিলাপ শুরু করেন-আমার এ কী সর্বনাশ হলরে মা। এখন আমি কী করি, কোথায় যাই...। আবেগ সংবরণ করে তৈয়বুর চোখ মুছে শক্ত হয়, শাহনাজকে দুহাতে টেনে বুকে তুলে নেয়, শাসনের স্বরে মাকে বলে, কান্না থামাও তো মা! চলো মেডিকেলে যাই।
এ প্রস্তাবে মা খুব রাজি। কিন্তু তার দুশ্চিন্তা বউমাকে। সে কথা তিনি বলেই ফেলেন,
বউমার শরীর খারাপ। এ অবস্থায় ওকে রেখে...
সহসা আকিলা খাতুন চোখ মেলে তাকায় এবং জোর দাবি জানায়, না না, আমি মেডিকেলে যাব মা। আমি যাব।
এক গ্লাস পানি সামনে বাড়িয়ে ধরে শাশুড়ি বলেন,
পানিটুকু খাও মা।
না মা, আমি যাব মেডিকেলে।
কান্নার হৃদে নেমে আসে আকিলা খাতুনের কণ্ঠ। অবুঝ শিশুর মতো বায়না ধরে। শাশুড়ি বুঝাতে চেষ্টা করেন- তোমার পেটের মধ্যে যে আরেকজন আসছে মা, তার কথা তো ভাবতে হবে! বউমার মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে প্রস্তাব রাখেন- আমরা ঘুরে আসি মা, তুমি না হয় পরে যেও।
না, আকিলা খাতুন কোনো কথা শুনবে না, কোনো যুক্তি মানবে না, গুলিবিদ্ধ স্বামীর শয্যাপাশে সে যাবেই। পেটে যে আসছে তার এ দিকে সাত মাস হয়ে আসছে, তারই কথা ভেবে মৃত্যুপথযাত্রী স্বামীর মুখ দেখবে না সে! তার খুব মন বলছে- শফিউরের চোখ এতক্ষণ তাকেই খুঁজছে। উ™£ান্তের মতো সে চিৎকার করে ওঠে, আমি ওর কাছে যাব।
অবশেষে আকিলা খাতুনের শক্ত দাবির কাছে পরাস্ত হয় সবাই। বেলা দ্বিপ্রহরে তারা ছুটে আসে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে তুমুল উত্তেজনা। আহত অসুস্থ মানুষের আহাজারি তো আছেই সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসংখ্য প্রতিবাদী মানুষের আবেগ আর উৎকণ্ঠা- মেডিকেলের মর্গ থেকে লাশ উধাও! এ কি মগের মুল্লুক! যা খুশি তা-ই করবে? অবশ্য এরই মাঝে বিক্ষুব্ধ ছাত্রজনতা শহীদদের মরদেহ ছাড়াই গায়েবি জানাজা সম্পন্ন করেছে। একুশের মতা বাইশ তারিখেও তারা রাজপথে বেপরোয়া গুলি চালিয়েছে, মানুষ মেরেছে নির্বিচারে। আর কত সহ্য হয় মানুষের। তাই তারা টগবগ করে ফুটছে।
শফিউর রহমানের চোখে মুখে ভয়ানক ক্লান্তির ছাপ। অধিক রক্তক্ষরণে নিস্তেজ হয়ে পড়েছে শরীর। তবু এ মুমূর্ষু অবস্থায় আপনজনদের কাছে পেয়ে কে যেন ভেতর থেকে জাগিয়ে তোলে তাকে। সে হাত বাড়িয়ে জাপটে ধরে মাকে। রক্ত মেখে যায় মায়ের শাড়িতে। শফিউরের কপাল থেকে নুয়ে-থাকা চুলের গুচ্ছ সরিয়ে মা সেখানে চুম্বন একে দেন পরম মমতায়। তখন ছেলের দুচোখের কোনা বেয়ে তপ্ত অশ্র“ গড়িয়ে পড়ে। মানুষের ভিড় ঠেলে শফিউরের মাথার কাছে চলে আসে ছোটভাই তৈয়বুর। খুব নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে সে খবর নিয়ে এসেছে- তার ভাইয়ের গুলিবিদ্ধ শরীর অপারেশন করবেন ডা. এলিনসন। বিদেশি সার্জন। হাত খুব ভালো। মায়ের কাঁধে হাত রেখে সে সান্ত্বনা দেয়,
কাঁদছ কেন মা! অপারেশন হলেই ভাইয়া ভালো হয়ে যাবে তো!
শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে মা ফুঁপিয়ে ওঠেন।
শফিউর রহমান হাত বাড়াতেই সে হাত আঁকড়ে ধরে ছোটভাই তৈয়বুর। ছোটভাইয়ের হাতের মুঠোয় বড়ভাইয়ের হাত। মাথাটা একপাশে হেলানো। হাত ধরেই শফিউর বলেন, শাহনাজকে দেখিস ভাই। এই যে আমার বুড়ি। দেখিস ওকে।
এইবার তৈয়বুরের চোখ ভিজে আসে, গলা ধরে আসে; সামনে থেকে সরে যায়। এতক্ষণে সামনে এগিয়ে আসে আকিলা খাতুন। তার কণ্ঠে বুকফাটা হাহাকার। স্বামীর গায়ের রক্তেভেজা গেঞ্জিটা খামচে ধরতে গিয়ে তার দৃষ্টি আটকে যায় বুলেটবিদ্ধ ক্ষতস্থানে। আর তখনই তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে। মুখে কোনো কথা সরে না। শফিউর রহমান হাত বাড়িয়ে দেন স্ত্রীর দিকে। আকিলা খাুন তখন কী করে! তার খুব ইচ্ছা করে ওই দুটি হাতের বন্ধনে নিজেকে সমর্পণ করতে। ইচ্ছা করে ওই রক্তে ভেজা গেঞ্জি থেকে সবটুকু রক্ত নিজের বুকে শুষে নিতে। ইচ্ছা করে ওই ঘোলাটে চোখ দুটো মমতার চুম্বনে মুছিয়ে দিতে। কিন্তু এ জনারণ্যে কিইবা করতে পারে সে!
এরই মাঝে সার্জন এলিনসনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়। হাসপাতালের সিস্টার-ব্রাদার ব্যস্ত পায়ে দৌড়াদৌড়ি শুরু করে দেয়। স্ট্রেচারে রোগী তুলে অপারেশন থিয়েটারের দিকে নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। আকিলা খাতুন তখন প্রাণপণে আঁকড়ে ধরে স্বামীর হাত, আর্তকণ্ঠে চিৎকার করে ওঠে- না।
এ জটিল সংকটাপন্ন মুহূর্তে এভাবে না বলার মানে কী! আকিলা খাতুন কি স্বামীর শরীরের গুলিবিদ্ধ স্থানের এ অপরেশন চায় না। সার্জন এলিনসন অনেক বড় ডাক্তার, অনেক খ্যাতি তার; তবুও না? আকিলা খাতুন কী করে বুঝাবে- মুমূর্ষু ওই মানুষটিকে এক পলকের জন্যও চোখের আড়াল করতে ইচ্ছা করছে না। তাই তো সে স্ট্রেচারের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়, স্বামীর রক্তাক্ত বুকে হাত রাখে। ডুকরে ওঠা তার কান্নার ভাঁজে আবারও গুমরে ওঠে- না।
মানুষ বাঁচানোর মহান ব্রত নিয়ে যে চিকিৎসক কর্তব্যকর্মে আÍনিয়োগ করেছেন, রোগীর স্বজনদের আর্তবিলাপে কান দিতে গেলে তার চলে! মানুষের বাঁচার আকুতিই তার কানের দুয়ারে দম ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, তাই অন্য কোনো মানসিক আহাজারি কানের ভেতর দিয়ে তার মর্মমূল পর্যন্ত পৌঁছতে পারে না। শুধু ডাক্তার বলে তো কথা নয়, মহৎ এ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। কাজেই শফিউর রহমানের স্ট্রেচার সামনে এগিয়ে চলে। অচেনা শূন্যতার গহ্বরে প্রবেশেন ঠিক পূর্বমুহূর্তে স্ত্রীর হাত ধরে শফিউর বলেন,
আমি যাই আকিলা। এবার আমাদের পুত্রসন্তান হলে তার নাম রেখ শফিক। মানে শফিকুর রহমান। তার মধ্যেই আমি বেঁচে থাকব। এপারে আকিলা খাতুনকে রেখে শফিউর রহমানের স্ট্রেচার চলে যায় ওপারে। প্রিয় পাঠক, সত্যিই আর এপারে আসা হয়নি শফিউর রহমানের। বিখ্যাত সার্জন ডা. এলিনসনের অপারেশন সেদিন সাফল্যের নাগাল পায়নি। যখন সন্ধ্যায় সব পাখি ঘরে ফেরে, শফিউরের জীবনবাতি তখন নিভে যায়। পুলিশ কিংবা আর্মি যে কোনো সময় ছোঁ মেরে লাশ গুম করে ফেলতে পারে এ আশংকায় কজন ছাত্র যুক্তি করে শফিউরের লাশ লুকিয়ে রাখে ঢাকা মেডিকেলের স্টেরিলাইজ বিভাগে। টানা তিনদিন পর কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতিতে সে লাশ আনা হয় আজিমপুর কবরস্থানে। অতঃপর মধ্যরাত পেরিয়ে গেলে আকিলা খাতুনের জমানো টাকায় কেনা মাটিতে দাফন করা হয় লাশ। এ পর্যন্ত সর্বজনবিদিত ইতিহাস, গল্প নয়। কেবল আকিলা খাতুনের বিমূঢ় হাতের মুঠোয় ধরে থাকা শফিউরের রক্তমাখা গেঞ্জিটাই আগামীদিনের কল্পগল্পের অনিঃশেষ উপাদান হয়ে যায়।

কাঠকয়লায় লেখা আমীরুলের ছড়া

আয়রে পাখি লেজ ঝোলা/ তোরে দেবো দুধ কলা/ খাবিদাবি কলকলাবি/ খোকাকে তুই ঘুমপাড়াবি ছেলে বেলায় এই সব ছড়া ছিল আনন্দদায়ী। একটা লেজ ঝোলা পাখি কল্পনা করতাম এবং নিজেই খোকা হয়ে যেতাম ঘুমাবার ছলে। আরেকটা ছড়া- ছেলে ঘুমালো/পাড়া জুড়ালো/বর্গী এলো দেশে/বুলবুলিতে ধান খেয়েছে/খাজনা দেবো কিসে? ভাবতাম বর্গীরা নিশ্চয় ডাকাত, তারা গ্রামে ঢুকে লুটপাট করে- আলীবাবা চল্লিশ চোরের মতো। এসব চিন্তার সঙ্গে আরেকটা চিন্তার ঐক্য তৈরি হতো সেই কৈশোরে। তারো পরে জসীমউদ্দীনের যে পদ্যটি আমাকে ভীষণ নাড়া দিত সেটি হচ্ছে- আয় ছেলেরা আয় মেয়েরা/ ফুল তুলিতে যাই/ ফুলের মালা গলায় দিয়ে/ মামার বাড়ি যাই/ মামার বাড়ি পদ্মপুকুর/ গলায় গলায় জল/ এপার হতে ওপার গিয়ে/ নাচে টেউয়ের দল। মামার বাড়িতে যাওয়ার আগে-পরে এই ছড়া মনে কত আনন্দ বিস্ময়ের কত চিন্তারই না জন্ম দিত। বন্দে আলী মিয়ার- আম গাছ জাম গাছ/ বাঁশ ঝাড় যেন/মিলে মিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন/ পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই/ এক সাথে খেলি আর পাঠশালা যাই। অপূর্ব দ্যোতনা তৈরি করত কবি খান মোহাম্মদ মঈনুদ্দীনের আরও একটা ছড়া- ও বগা তুই খাস কি/ পান্তাভাত চাস কি/ একটু যদি পাই হাপুস হুপুস খাই। কিংবা রোকনুজ্জামান খানের- বাকবাকুম পায়রা/ মাথায় দিয়ে টায়রা/ বৌ আসবে কালকি/ চড়বে সোনার পালকি। এই সব অসম্ভব কৌতূহলকর ছড়া পড়ে কৈশোর পার করেছি। এসএসসি পড়ার সময় হাতে এলো আবু সালেহ-এর পল্টনের ছড়া- ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না/ বলা যাবে না কথা/ রক্ত দিয়ে পেলাম শালার/ এমন স্বাধীনতা। ছড়ার যে আরও একটা রূপ আছে সমাজের অন্যায় অসঙ্গতির বিরুদ্ধে ছড়া একটা অস্ত্র তা আমাকে দারুণভাবে স্পর্শ করে। যশোরে বসেই শিশুতোষ লেখা লিখতাম- পত্রপত্রিকায় ছাপা হলে খুব আনন্দ পেতাম- হাতে নিয়ে ঘুরে ঘুরে বন্ধুদের দেখতাম। ওই সময় কিশোরদের পত্রিকা বেরুল- কিশোর বাংলা। ওখানে আমার লেখা ছাপা হতো- আর যাদের লেখা পড়তাম- লুৎফর রহমান রিটন, আমীরুল ইসলাম আরও অনেক। খুব রঙিন ছবি এঁকে ইলাস্ট্রেশন করে ছাপা হতো কিশোর বাংলায়। আমীরুল রিটনের লেখার সঙ্গে দেখা হতো সেখানে। তখন দেখা হতো পত্রিকার পাতায়। ঢাকায় এসে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে দেখা হল সরাসরি- আমীরুল ও রিটনের সঙ্গে। ভাব হলো দুজনের সঙ্গেই। আমীরুলের মনমাতানো হাসি। দারুণ আড্ডাবাজ বন্ধুবৎসল সে। কথা দিয়ে মানুষ ভজানোর কারিগর আমীরুল। গদ্যে পদ্যে সব্যসাচী। সম্পাদনা ও সংগঠকের ভূমিকাতেও দীপ্র। আমীরুলের পরোপকারিতা এখন সর্বজনবিদিত। ওর কাছ থেকে কোনো কোনো কাজ এক কথায় পাওয়া যায় আর কোনো কাজ এক বছরেও নয়। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ছেড়ে আমীরুল এখন চ্যানেল আইতে। ওকে একটা কবিতার বই উৎসর্গ করেছিলাম। উৎসর্গ পত্রে লিখেছিলাম যে জীবনের দুই পিঠ দেখে। আমীরুল অনেক কোলাহলের মধ্য থেকেও নির্জন। পুরনো ঢাকার অধিবাসী হিসেবে একটা পুরনো ঢাকাইয়া মিশ্রিত বচন তৈরি করে নিয়েছে। ছেলেবেলার বন্ধুদেরও ভোলেনি সে। ওর লেখার মধ্যে এসব অনুসঙ্গ নানাভাবে এসেছে। এত কিছুর মধ্যেও সম্পাদনা-প্রযোজনা উপন্যাস ছোটগল্প ও ছড়া রচনা। রাতে ওর ছড়াগুলো পরছিলাম। নানা বিষয় অনুষঙ্গ আর নিরীক্ষা দিয়ে আমীরুলের মনোজগৎ ভরা। আশির দশকে গণমুখী ছড়ার যে নিরীক্ষা সেখানেও আমীরুলের স্পর্শ উজ্জ্বল- নূর হোসেনকে নিয়েও আমীরুলের ছড়া আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে। অন্তঃমিল ছড়াকে প্রাণদায়ী করে কিন্তু মিল ছাড়াও যে ছড়া অভিনব হতে পারে আমীরুল তা প্রমাণ করেছেন। আমীরুলের গদ্যের যে এলিগরি ছড়ায় তা সম্পূর্ণ উল্টো ইমেজ। একটা সুতার মধ্যে আমীরুল তার শব্দগুলো ঝুলিয়ে দেননি। বরং অসংখ্য সুতার মধ্যে আমীরুলের ঝোলানো শব্দগুলো বেছে নিয়ে পাঠককেই তৈরি করতে হয় একটা বক্তব্য। এটা পাঠকের সামনে ছুড়ে দেয়া গেম। পাঠকের মনে হতে পারে সাদামাঠা এ লেখাটা না হলেও চলতো কিন্তু আমীরুলের ছড়ার শেষে কোথাও একটা চিন্তার গিঁঠ থাকে, যা খোলাটা পাঠকের জন্য জরুরি। এক নিরুত্তর ধাঁধার জগৎ প্রয়োজনীয় এবং অনিবার্য। আমীরুল তার ঐতিহ্য কিংবা উত্তরাধিকার ত্যাগ করেননি। তিনি ঐতিহ্যের মধ্য থেকেই ভেঙেছেন কিন্তু সে ভাঙন একরৈখিক নয় , সে ভাঙন ঈশানে অগ্নিতে। দুএকটা উদাহরণ দিলে পাঠক বুঝবেন। আমীরুল জানেন তার পূর্বসূরি সুকান্ত ভট্টাচার্য অন্তঃমিল ছাড়া কিশোর কবিতা লিখেছিলেন- হে সূর্য শীতের সূর্য তুমি উত্তাপ আর আলো দিয়ো ঐ রাস্তার ধারের উলঙ্গ ছেলেটাকে। আমীরুল অনেক তুচ্ছ আটপৌঢ়ে কিন্তু জীবনযাপনের দরকারি বিষয়ে আলো ফেলেছেন। বাংলা ছড়ার বিড়াল পাখি বাঘ সিংহ কত প্রাণীরই না ছোটাছুটি ওর ছড়ার দ্বীপে। কখনও বিড়াল বাঘ হয়ে যাচ্ছে ইঁদুর অজগর, সিংহই হয়তো ইঁদুরে রূপ নিচ্ছে- কিংবা কখনও অবুঝ শিশু হয়ে উঠছে মল্লবীর ছুটে যাচ্ছে পৃথিবীর নানা দেশে। এই যে রূপান্তরের আশ্চর্য অভিবাষণ- তা পরাস্বপ্নের মতো কিন্তু পরাস্বপ্ন নয়- তবে কি তা বাঙালি জাতির মননের অভিব্যক্তির রহস্যময়তা। আমীরুল শেকড় থেকে টেনে তুলেছেন উবজীব্য যেমন একটা ছড়া শিরোনাম- প্রকৃতি
প্রকৃতির সন্তান আমি/ ধরিত্রীর পুত্র, মানব-বন্ধনে আজ/ ছিন্ন ধরি সূত্র।/ প্রকৃতি ও মানুষের/ চলেছে সংগ্রাম।/ বৃক্ষশূন্য প্রকৃতির/ জানি না পরিণাম।
নিজেকে প্রকৃতির পুত্র বলার মধ্যে যে শক্তি ও মরুত প্রয়োজন তা আমীরুলের আছে। বৃক্ষশূন্যতা যে স্বদেশকে শ্মশানতুল্য করে তুলবে তার ভবিষ্যৎদ্বাণী শুনতে পায় এই লেখাটিতে। পাঠক সাম্প্রতিককালের বৃক্ষনিধন ও নানা ঘটনা এই লেখাটির প্রাসঙ্গিকতা তৈরি করে। শব্দের জ্যামিতি আমীরুল বোঝেন। ছড়া লিখছে শিরোনামের আরেকটি লেখা- চাঁদ উঠছে-উঠুক না/ ফুল ফুটছে-ফুটুক না/ পাখি ডাকছে ডাকুক না-ছড়া লিখছে-লিখুক না। একটা সাবলিলতা। মনে হয় ছোটবেলায় মনের আনন্দে কাঠকয়লা দিতে দেয়ালে লিখছি মনের যত আনন্দময় কথা। তার কি অর্থ? সত্যের আনন্দের যা অর্থ তাইতো। সেই খাঁটি সত্যযা বলতে মানা কিন্তু আমীরুল বলবেনই এমন এক পণ তার- মাছ শিরোনামের ছড়া-
আয়রে আয় ছেলের দল মাছ ধরতে যাই,/ যে পুকুরে ছিপ ফেলেছি মাছ কোথাও নাই।/ মাছ মারতে সবাই মিলে দোলায় চেপে যাবো,/ শূন্য বিল মরা পুকুর মাছ কোথায় পাবো?
এক মরুতুল্য শূন্যতায় আমাদের প্রতিবেশ ধ্বংসোন্মুখ জলশূন্য জলাধার, পুকুর। কোথাও মৎস্য কিংবা মানব প্রয়োজনের উপপাদ্য নেই। আছে সীমাহীন হাহাকার। ধরিত্রী নিজেই বলছে কোথায় পাব তোমাদের পোষণের পণ্য? অসচেতনতাবোধ জাতিকে গ্রাস করছে- তার সাবধান বাণী করেছেন আমীরুল। এই দায়বোধ একজন প্রকৃত লেখকের আত্মা থেকে উৎসারিত- কেউ তাকে শিখিয়ে দেয়নি। এবং আরেক প্রশ্ন নতুন ধাঁধার তৈরি করে- পাকা আপেল না পড়ে তাই/ কাঁঠাল যদি পড়তো জ্ঞানী নিউটন হয়তো তখন/অন্য চিন্তা করতো। কাঁঠাল আপেল সবই মাধ্যকর্ষণ শক্তির টানে পড়ে। নিউটন কাঁঠাল পড়লে এ কথা ভাবতেন কিনা এই বঙ্গে। এই বঙ্গের একজন লেখকের এই ভাবনা কি অমূলোক কোনো কিছুই অমূলোক নয়। ছড়া শুধুই সৌখিন মজদুরী নয়, তার রয়েছে এক বিশাল দায়বোধ। হাজার বছরের ছড়ার আঙ্গিক বদলেছে কিন্তু ইতিহাস তার ধারাক্রম রক্ষা করে চলেছে। নদীর মতো তার গতি পথ- নদী নদী নদীরে/ বইছে নিরবধিরে/ কোথা থেকে নদীর জন্ম/ কোথায় নদীর শেষ/ নদীর সাঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে হলাম নিরুদ্দেশ। প্রকৃত বাঙালি মননের এক দীপ্র উদাহরণ। তরতাজা আর টাটকা বলতে যা বোঝায় সেরকমই। পাঠক ভাববেন এত সহজ ছড়া কিন্তু তাকে এও ভাবতে হবে সহজ কথা বলা সত্যিই তো কঠিন, আমীরুল কি তবে রবীন্দ্রনাথের সেই অসাধ্য সাধনের চেষ্টা করছেন?
রেজাউদ্দিন স্টালিন

আগামীর পৃথিবীরা, এ বছরের সাই-ফাই by রফিকুর রশীদ

সাই-ফাই লেখক ডেমিয়েন জি ওয়াল্টারের ব্লগ অবলম্বনে মোহাম্মদ আরজু আমাদের জীবনের কেন্দ থেকে টিভিকে সরিয়ে ইন্টারনেট সেই জায়গা নিচ্ছে, একই সঙ্গে আমাদের নয়া পপ কালচার হয়ে উঠেছে সায়েন্স ফিকশন। ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে যারা অপেক্ষাকৃত তরুণ এবং নাওয়া-খাওয়া ভুলে জ্ঞানার্জনে আগ্রহী, তাদের যাপিত পৃথিবী খুবই আজব ও জটিল। সাই-ফাইগুলোতে আমরা এমন সব রূপক খুঁজে পাই, যা এই ইন্টারনেটনিবাসীদের সম্পর্কে কথা বলতে ভাষা খুঁজে পেতে আমাদের সাহায্য করে। তরুণরা নির্বোধ নয়, দি হাঙ্গার গেমস : ক্যাচিং ফায়ারের মতো সাই-ফাই অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র আজ সিনেমা হলগুলোকে মেরে খাচ্ছে। টিনেজারদের সুড়সুড়িই এর সম্বল নয়। এই সাফল্যের কারণ হচ্ছে, এমন কাহিনীর মধ্যেই একটা প্রজন্ম আজ বড় হয়ে উঠছে, পুঁজিবাদের চূড়ান্ত পর্বে এমন কাহিনীর মধ্যে একটা প্রজন্ম আজ নিজেদের অভিজ্ঞতা উচ্চারণ করছে।
সাই-ফাই কাহিনীগুলো খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে, মৌলিকভাবেই বদলে যাচ্ছে। তবে সাই-ফাইর সাবেকি লেখক ও সমালোচকদের জায়গা থেকে এটা বোঝা যাবে না। কারণ, তারা নিজেরা এই বদল টের করতে পারেননি। পারেননি যে তার সর্বশেষ নজির হচ্ছে, ২০১৩ সালের আর্থার সি ক্লার্ক পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকা। ওই তালিকায় থাকা লেখকদের সবাই-ই ছিলেন বৃদ্ধ, শ্বেতাঙ্গ এবং পুরুষ। অতীতাচারী সব কাহিনীর বই। পুরস্কার কর্তৃপক্ষের পছন্দ দেখে মনে হয়, সায়েন্স ফিকশন এককালে কি বস্তু ছিল- সেই সংজ্ঞা দিতে চান তারা, কিন্তু সায়েন্স ফিকশন এখন কি হয়ে উঠছে- সেই ব্যাপারে তারা অন্ধ। তবে এই অন্ধত্ব টের করেছেন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ লেখকদের একজন। অ্যাডাম রবার্টস। তার লেখালেখি নিয়ে একটি বিদ্যায়াতনিক সম্মেলনে তাকে প্রশ্ন করা হয়, তার কাজগুলো কিভাবে ভবিষ্যতের অংশ হয়ে উঠছে বলে তিনি মনে করে। রবার্টসের জবাব; ক্রমবর্ধমানভাবে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার পথে রয়েছে, শ্বেতাঙ্গ-পুরুষসুলভ অভিজ্ঞতার বাইরে দুনিয়ার আরও ভিন্ন-বিচিত্র অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য দেশের কণ্ঠস্বরের সামনে হারিয়ে যাচ্ছে।
এই ভিন্ন-বিচিত্র কণ্ঠস্বরের দু-একটা আজ হাজির করছি, যেগুলোর কথা এই ২০১৪ সালজুড়ে আপনি শুনবেন। জনপ্রিয় হবে এই সাই-ফাইগুলো, বেশ আলোচিত হবে। এমন লেখকদের একজন হচ্ছে ইজরাইলে জন্ম নেয়া লাভি তিশার। খুবই সাম্প্রদায়িক পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন তিনি। তবে এরপর বাস করেছেন বর্ণবাদমুক্ত দক্ষিণ আফ্রিকায় এবং পৃথিবীর অস্থিরতা ছেড়ে এশিয়ার শান্ত দেশ লাওসে। আধুনিক জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে কুণ্ঠিত না হওয়া লেখক হিসেবে বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। তার যুগসৃষ্টিকারী সায়েন্স ফিকশন ওসামা গত ২০১২ সালে ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি অ্যাওয়ার্ড পায়। সাই-ফাই ওসামার জনপ্রিয়তা ও এই পুরস্কারের কারণ তার ব্যতিক্রমী বিশ্লেষণ। বিতর্কিত বটে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমরা যেভাবে সন্ত্রাসবাদকে মিথ্যে পরিণত করি, তার বিশ্লেষণ তিনি উপন্যাসে করেছেন, নিজস্ব উপায়ে। যেখানে দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বা এর পরে কোনো এক সময়ে এক ভিন্ন পৃথিবীর জন্ম, যে পৃথিবী আমাদের মতো নয়। যেখানে পশ্চিম আর প্রাচ্যের মুসলিমের মধ্যে সমস্যা নেই। যেখানে ওসামা এই ওসামা নন, বরং এক এন্টিহিরো। তার অপর বই দি ভায়োলেন্ট সেঞ্চুরি তিশারের কটুভাষী ও বিদ্রুপাত্মক সায়েন্স-ফিকশনের উদাহরণ, যা ব্রিটেনের সুপারহিরোদের ইতিহাস ঘিরে লেখা হয়েছে। বিকল্প ইতিহাস। তিশারের আর সব কাজের মতোই এই বইটির কাহিনীও দুই সে াতে বয়ে চলেছে, একদিকে গ্রিক সংস্কৃতির প্রতি লেখকের নিজস্ব মুগ্ধতা অন্যদিকে গুরুভার মূল সুর। এই শৈলী খুব উপযোগী সেই সব ইন্টারনেটনিবাসী পাঠকের জন্য, যাদের নিজস্ব আগ্রহের জায়গাগুলোও নানা সে াত বয়।
লেখিকা হেলেন ওয়েকারের দি গোলেম অ্যান্ড দি জিন্নি গত বছরজুড়ে আস্তে আস্তে পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছে, তুষের আগুনের মতো, আমি নিশ্চিত এটা এ বছর বোমার বিস্ফোরিত হবে পাঠক সমাজে। নিউইয়র্কে অভিবাসী অভিজ্ঞতার কাহিনী। আমাদের সময়ের নীতিগর্ভ রূপক কাহিনী। একটা শব্দও অপচয় করেননি লেখিকা, বেদরকারি বলে মনে হবে এমন একটাও অনুচ্ছেদ নেই, নতুন কোনো মুগ্ধতা তৈরি করে না- এমন একটাও পরিচ্ছেদ নেই। ইয়াহুদী রূপকথার অলৌকিক নারী- গোলেম আর এক জাদুবন্দি জিনের কাহিনী। উনিশ শতকের নিউইয়র্কের পটভূমিতে লেখা সাই-ফাই।
অপর লেখিকা অ্যান লেকি। তার সাই-ফাই অ্যানসিলিয়ারি জাস্টিস এ বছর বেশ সাড়া জাগাবে। একদিকে এর লেখার শৈলী হচ্ছে মঞ্চায়নযোগ্য বিরাট উপন্যাসের মতো, অন্যদিকে এটি পূর্ণতা পেয়েছে ধীরলয়ের গদ্যভাষায়। উপন্যাসের কেন্দ ীয় চরিত্র- অ্যালিয়েন এক প্রাণীর চেতনা ও বিবেকের জগতে অনুসন্ধান চালাবার চেষ্টা করেছেন অ্যান। প্রথমে একটি নভোযানের আত্মা হিসেবে থাকে ব্রেক নামের অ্যালিয়েন। পরে তার ভূমিকা কমে এক ধরনের ব্যক্তিসত্তায় নেমে আসে।
আমেরিকান লেখকদের মধ্যে গত একদশক জুড়ে আজব সব সায়েন্স ফিকশন নিয়ে জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছেন জেফ ভ্যান্ডারমার। এ বছরও তার বইগুলো জনপ্রিয় থাকবে। এ বছর আসছে নতুন একটি উপন্যাসও। ভেনিস আন্ডারগ্রাউন্ড ও শ্রেকের চমতকার বিচিত্র উপন্যাস রয়েছে তার। দুই বছর আগে জেফ জানিয়েছিলেন, নতুন উপন্যাসের প্রকল্প নিয়ে কাজ করছেন তিনি- যা তার নিজের কল্পনারও দূরতম সীমা ছাড়িয়ে গেছে। ফেব্র“য়ারিতে বইটি বাজারে আসছে। নাম অ্যানিহিলেশন : দি ফার্স্ট অফ দি সাউদার্ন রিচ ট্রিলজি।

একজন বিশ্বভাবুকের প্রতিকৃতি by মাসুদুজ্জামান

ইতালীয় মার্কসবাদী অ্যান্তোনিও গ্রামসি একবার তার জেলখানার নোটবুকে উল্লেখ করেছিলেন, নির্বস্তুক গণতন্ত্রের কোনো পটভূমিকায় নয়, বরং বাস্তব প্রথানুগ বিভিন্ন ঐতিহাসিক পারম্পর্যের মধ্য দিয়ে বুদ্ধিজীবীদের আবির্ভাব ঘটে। কবি, লেখক, ভাবুক বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের আবির্ভাব ঘটেছিল ঠিক এ রকমই একটা পটভূমিতে, গত শতকের পঞ্চাশ দশকের বাংলাদেশে। ব্যক্তিপরিচয়ের সূত্রে তার লেখালেখি ও ভাবনার সঙ্গে কিছুটা হলেও পরিচিতি ঘটেছে আমার। সেইসব প্রসঙ্গ নিয়েই এই লেখা। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। সময়টা গত শতকের সত্তর দশকের শেষ দিক। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বেশ কয়েকটা বছর কেটে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকলেই যা হয়, নানা দিকে দৃষ্টি প্রসারিত হয়ে যায়। অনেক কিছু জানবার ও করবার স্পৃহা জেগে ওঠে। প্রথমেই মনে হয় সেইসব ব্যক্তিত্বের কথা, যারা আমাদের কালে কিংবদন্তি হয়ে আছেন। রাজনীতি সচেতন হলেও রাজনীতিবিদদের প্রতি আকৃষ্ট হইনি। আগ্রহটা জেগেছে শিল্পসাহিত্যের প্রতি। ফলে, যারা সাহিত্যচর্চা করেন- তা সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর থেকেই হোক কিংবা বাইরে থেকে- তাঁদের সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলাম। আমাদের কালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন বেশ কয়েকজন শিক্ষক ছিলেন যাঁরা লেখালেখি আর প্রাগ্রসর চিন্তার সূত্রে দেশ জুড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। মাঝে মাঝেই দেখতাম, ত্রস্ত পায়ে অলস মন্থর কোনো বিকেলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে শহীদ মিনারের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন। তিনি তখন থাকতেন শহীদ মিনারের পাশেই বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকায়। কলাভবনের পশ্চিম পাশের লনে সান্ধ্যভ্রমণে উপস্থিত হতেন আহমদ শরীফ। প্রখ্যাত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সন্জীদা খাতুন ছিলেন আমার সরাসরি শিক্ষক। হুমায়ুন আজাদ তখন এডিনবরা থেকে সদ্য দেশে ফিরেছেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যোগ দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবু হেনা মোস্তফা কামালও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে চলে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আগে থেকেই বাংলা বিভাগে কাজ করছিলেন রফিকুল ইসলাম আর সৈয়দ আকরাম হোসেনের মতোন খ্যাতিমান শিক্ষকেরা। এরই মাঝে কিছুটা দলছুট কিন্তু প্রাজ্ঞ, সৃষ্টিশীল একজন মানুষের সন্ধান আমরা পেয়েছিলাম, তিনি হচ্ছেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। দলছুট বললাম এই কারণে যে তিনি পড়াতেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে, বসতেন কলাভবনের নিচতলার উত্তর-পূর্ব কোণের প্রায়ান্ধকার সর্বশেষ ঘরটিতে। মিতকথন আর পরিমার্জিত ব্যবহারের কারণে প্রথম সাক্ষাতেই মুগ্ধ হয়েছিলাম আমি। পরিচয়ের সূত্রটাও ছিল আকর্ষক, অন্তত আমার কাছে।
কবিতাচর্চার পাশাপাশি আমার তখন আগ্রহ জন্মেছে সমকালীন বিশ্বভাবুকদের প্রতি। যখন যে বই পাচ্ছি সেই সূত্রে গোগ্রাসে বিশ্বসাহিত্য পড়ছি, পড়ছি নানা ভাবুকের লেখা। পরিচয় ঘটছে ফুকো, দেরিদা, হাবেরমাস, সাঈদ এদের সঙ্গে। এরকমই একটা দিনে অনুমতি নিয়েই প্রবেশাধিকার পেয়েছিলাম বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের সেই রুমে, যেটা ছিল একাধারে তাঁর বিভাগীয় বসবার কক্ষ আর তাঁরই প্রতিষ্ঠিত সমাজ নিরীক্ষণ কেন্দে র কার্যালয়। প্রথম পরিচয়ের দ্বিধা নিয়ে কিছুটা কুণ্ঠিত হয়ে বসে আছি। তিনি নিজেই নাম-ধাম জেনে সহজ করে নিলেন। চা খাওয়ার সৌজন্যের মাঝেই চোখে পড়ল টেবিলের ওপর রাখা আমার পরম প্রার্থিত একটা বইয়ের প্রতি - অরিয়েন্টালিজম। ইতিমধ্যে বইটার নাম জেনেছি কিন্তু তখনও পড়া হয়নি, ফলে লুব্ধকের দৃষ্টিতে বইটা দেখছি। তবে এর এই মুহূর্তের পাঠক যিনি, তাঁর কাছ থেকে বইটা তো প্রথম পরিচয়ের দিনই চেয়ে নিয়ে পড়ব বলা যায় না। তবে বইটা পড়ার যে দারুণ ইচ্ছে, সে কথা জানাতে ভুলিনি তাঁকে। ফলে কয়েক দিন পরে দ্বিতীয় সাক্ষাতেই বইটা হাতে পেয়ে গেলাম। সুখ্যাত কোনো বইপাঠের সে এক দারুণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি। ফলে আরেক দিন বইটার বিষয়আশয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে জমে উঠল ছোটখাটো আলোচনা। আমার ইচ্ছেটা ছিল এরকম- যতটা না বলব তার চেয়ে অনেক বেশি শুনে নিয়ে বুঝে নেব বইটার মর্মবস্তু। আমার এই অভিলাষ পূর্ণ হয়েছিল আর সেই সূত্রে সেদিন আমি বুঝে নিয়েছিলাম তাঁর পঠনপাঠন আর বোধের সীমা কতটা বিস্মৃত, কতটা গভীর। সাহিত্য থেকে রাজনীতি, সমাজতত্ত্ব থেকে নৃতত্ত্ব, সংস্কৃতিতত্ত্ব থেকে দর্শন, অনেক কিছুই তাঁর অধিগত। একজন পরিপূর্ণ আধুনিক মানুষ তিনি- কী জীবনাচরণে, কী পঠনপাঠনে, কী ভাবনায়। আমাদের ওই সময়ে একমাত্র তাঁকেই দেখেছি পশ্চিমা বিশ্বের সাম্প্রতিক কালের সদ্য প্রকাশিত শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি বা দর্শনের বইগুলো পড়তে। তাঁরই সাহচর্যে আমার কাছে খুলে গিয়েছিল পশ্চিমের জানালা। এরও আগে তিনি যে সৃষ্টিশীল একজন লেখক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত, উন্মোচিত হয়ে গিয়েছিল সেই পরিচয়।
২.
শুরু গত শতকের সেই পঞ্চাশের দশকে। পঞ্চাশের সূচনাবর্ষেই নতুন রাজধানী ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল একটি কবিতা সংকলন- নতুন কবিতা। এই সংকলনটিই ছিল বাংলাদেশের নতুন কবিদের প্রথম কবিতা সংকলন। আশরাফ সিদ্দিকী এবং আবদুর রশীদের সম্পাদনায় প্রকাশিত এই সংকলনে স্থান পেয়েছিল সমকালের তেরোজন তরুণ কবির কবিতা। শামসুর রাহমান যদিও লক্ষ্য করেছেন, প্রকৃত অর্থে নতুন কোনো কবিতাই ছিল না সংকলনটিতে, তবু তাঁর ভাষ্য অনুসারে এই সংকলনেই কয়েকজন কবির অস্পষ্ট বিশিষ্টতা প্রথম থেকেই চিহ্নিত হয়ে গিয়েছিল। অস্পষ্ট বিশিষ্টতায় চিহ্নিত এই কবিসংকলনের অন্যতম কবি ছিলেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। সেই থেকে আজও একজন তরুণ কবির ভাষায় আর আÍঅনুভবের গভীরতা দিয়ে কবিতা রচনা করে চলেছেন তিনি। মানবিক দিক থেকে তাঁর কবিতা সংরক্ত, মিতকথনের ঔজ্জ্বল্যে দ্যুতিময়। একটা কবিতা থেকে কয়েক পঙ্ক্তি তুলে দিই : আমি এক ফতুর মানুষের মতো/বিশ্বাসগুলো খুঁজি, /ভালোবেসে ফতুর হওয়ার ভিতর/কোথাও মিল আছে, আমি মিলগুলোর কথা ভাবি। এই যে নিহিলবাদিতা থেকে অস্তিতে ফেরার আকুতি, কবিতার মধ্য দিয়ে ইতিবাচক মানবিকতায় স্থির হওয়ার অভিলাষ, তাঁর মতো প্রাজ্ঞ কবির পক্ষেই তা ভাবা সম্ভব।
অনেকটা গল্পের মতো করে নিজের কথাগুলো বলেন তিনি, ছোট ছোট বাক্য, বাক্যের মধ্যে কখনও কখনও কিছু উপমা- এভাবেই গল্পকবিতার কুশলী নির্মাতা বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। আরেকটি কবিতার কথা বলি : তুমি চা রেখে বাইরে গেছ। / পাহাড়টা ছাড়িয়ে নদীটা পেরিয়ে / রোদটা যখন পায়ের কাছে আসবে তখন আমি উঠবো। এখানে রোদের যে মানবিকীকরণ করলেন, খুবই সরল সেই বর্ণনা, কিন্তু নিঃসন্দেহে মর্মস্পর্শী। কষ্টকল্পনা দিয়ে তিনি কবিতাকে পাঠকের কাছে অনধিগম্য করে তোলেন না।
আমিত্বের কথাই আধুনিক কবিতা, বলেছিলেন ব্রাত্য-ইতিহাসের প্রখ্যাত ভারতীয় ভাবুক রণজিৎ গুহ তাঁর তিন আমির কথা শীর্ষক গ্রন্থে। বোরহানউদ্দিনের কবিতা এই আমিত্বের বয়ানে পূর্বাপর বিস্মৃত। তবে কার্তেসীয় অর্থে নয়, আমিত্বের ভেতর দিয়ে বিশ্বজনীন হয়ে উঠবার দিকেই তাঁর কবিতার ঝোঁক সুস্পষ্ট : সরকার পতনের চিৎকার শোনা যায় / কিন্তু যে রাষ্ট্রটা মানুষের খুলির মধ্যে প্রতিষ্ঠিত/সে-খুলির কাছ / দায়বদ্ধতা কারো নেই।/ হে অমানুষ মানুষ/তোমার দায়বদ্ধতা কার কাছে/আমার এক চোখে পানি, আর এক চোখে আগুন/আমি দুচোখ মেলে চেয়ে থাকি / সকল বধ্যভূমির দিকে। ব্যক্তিক প্রেম, এমনকি শারীরিক প্রেমও তাঁর কবিতায় এভাবে সর্বমানবিক বা রাজনৈতিক হয়ে ওঠে : জানেন কি / শরীরে অনুভূতির প্রবেশই / রাজনৈতিক / গাছের মধ্যে পাখিদের প্রবেশ / করার মতো / জানেন কি / তখন শরীর আগের মতো নয় / তখন গাছগুলি বিপ্লবের মতো বিস্ফোরিত।
কবিতার পাশাপাশি গল্পও লিখেছেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর। নাগরিক নির্বেদ আর নৈঃসঙ্গ্যের মধ্যে ব্যক্তিক আত্মোপলব্ধিই হচ্ছে তাঁর গল্পের বিষয়আশয়।
তবে তাঁর সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হচ্ছে, আমার মতে, তাঁর প্রবন্ধগুলো। সমকালীন রাজনীতির চমৎকার বৌদ্ধিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন তিনি, যা আর কারও লেখায় খুঁজে পাই না। দৈশিক ও বৈশ্বিক রাজনীতি নিয়ে এমন সব অন্তর্ভেদী গভীর বিশ্লেষণাত্মক প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন, যার তুলনা পাওয়া ভার। সেই সঙ্গে তিনি লিখেছেন শিল্পসংস্কৃতি বিষয়ক নানা গ্রন্থ। আমাদের লোকশিল্প এবং চিত্রশিল্পের তিনিই প্রথম আধুনিক ব্যাখ্যাতা। শুধু প্রচারবিমুখ বলে কিংবা আত্মপ্রচারে আগ্রহী নন বলে তাঁর প্রবন্ধ নিয়ে তেমন আলোচনা হতে দেখা যায় না। অনেকেই আবার তাঁর পঠনপাঠন ও বোধের সমীপবর্তী হতে পারেন না বলে প্রবন্ধগুলোকে দুর্বোধ্য বলে মনে করেন। বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীরের প্রবন্ধের বিষয়আশয় এতটাই আধুনিক যে, পাঠকের যদি বিশ্বভাবুকতার পূর্বপাঠজনিত অভিজ্ঞতা না থাকে, অর্থাৎ তিনি যদি এই সময়ের যেসব ভাবুক বিশ্বজুড়ে তাঁদের চিন্তাসূত্রে খ্যাতিমান হয়ে উঠেছেন, তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো না পড়ে থাকেন, তাহলে তাঁর প্রবন্ধ বোঝা সহজ হবে না। তাঁর রচিত কয়েকটি গ্রন্থের নামোল্লেখ করলেই বোঝা যাবে কী ধরনের আধুনিক কিন্তু অনিবার্য বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন তিনি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- বাংলাদেশের গ্রাম, বাংলাদেশে ধনতন্ত্রের উদ্ভব ও বিকাশ, জয়নুল আবেদিনের জিজ্ঞাসা, নিস্তব্ধতার সংস্কৃতি, চিত্রশিল্প বাংলাদেশে, বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ এবং মৌলবাদ, আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার অভিজ্ঞতা শীর্ষক বইগুলোর কথা।
আমার ছোট্ট এই লেখাটিতে তাঁর প্রবন্ধের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ হাজির করা একেবারেই অসম্ভব, কিন্তু তাঁর চিন্তার গভীরতা যে কতখানি, দু-একটি উদাহরণ দিয়ে তা ব্যক্ত করা যেতে পারে। তিনিই প্রথম দেখিয়েছেন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে আর ব্যক্তির পরিসর গেছে সংকুচিত হয়ে। রাজনৈতিক এই কর্তৃত্ববাদের কারণে জনসাধারণ একটি স্থায়ী নির্ভরশীলতার আবর্তে নিমজ্জিত, অন্যপক্ষে এই প্রক্রিয়ায় নিুবর্গের স্বার্থ দমিত এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের একটি সুষম, উন্নয়নমুখী নীতি অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষুণ্ন হয়েছে। এভাবেই বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর রাজনীতি ও রাষ্ট্রের সঙ্গে এর অন্তর্গত জনমানুষ, বিভিন্ন বিশ্ব উন্নয়ন সংস্থা, মৌলবাদ, পুরসমাজ, জাতীয়তাবাদ, আধুনিকতার বোধ, উত্তর-আধুনিকতার তর্ক, নান্দনিকতার রাজনৈতিক তাৎপর্য ইত্যাদি বিষয় সম্পর্কে চমৎকার মৌলিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। কামরুল হাসান, জয়নুল আবেদিনের শিল্পকর্মকেও তিনি আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার নিরিখে বিনির্মাণ করে নিয়েছেন। বাংলাদেশের কোনো ভাবুক তাঁর মতো দেশজ বোধে শিকড়িত থেকে আধুনিকতা ও উত্তর-আধুনিকতার বিশ্ববোধ দিয়ে আমাদের চিত্রশিল্প, শিল্পসাহিত্য, লোকসাহিত্য বা রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। শিল্পসাহিত্য আর রাজনীতির সমীকরণ প্রসঙ্গে তাই তিনি লিখতে পেরেছেন, সোনার বাংলা হচ্ছে আমাদের অস্তিত্ব, সোনার বাংলা হচ্ছে আমাদের রাজনীতির এবং শিল্পের প্রকাশবহ উপাদান।... এই প্রকাশবহতা হচ্ছে আমাদের গ্লানি, আমাদের মুক্তি, মোক্ষ, পুনরুজ্জীবন এবং চিরন্তনতা। জয়নুল আবেদীন এই অবস্থান থেকে শিল্পের ক্ষেত্রে এবং শেখ মুজিব এই অবস্থান থেকে রাজনীতির ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করেছেন আমাদের মুক্তি, মোক্ষ, পুনরুজ্জীবন এবং চিরন্তনতা তৈরি করার জন্য।
৩.
সংক্ষেপে বিবৃত করলে, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক ডিসকোর্স হাজির করেছেন তাঁর বিচিত্র ধরনের লেখায়-কবিতা, গল্প, প্রবন্ধে- তা নিঃসন্দেহে মৌলিক এবং গভীরতর ভাবনায় সমৃদ্ধ। প্রকৃত অর্থেই একজন সব্যসাচী লেখক তিনি। রাষ্ট্রচিন্তা, সমাজচিন্তা, নৃতাত্ত্বিক ভাবনা, নান্দনিক বোধ সবকিছু এমনভাবে তাঁর রচনায় মিলেমিশে গিয়েছে যে, দৈশিক পটভূমিতে বিবৃত হলেও বিশ্বভাবুকের মর্যাদায় তাঁকে অভিষিক্ত বলে মনে হয়। এই স্বল্পপরিসরে সেই ভাবনার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় উপস্থাপন করা গেল না, তবু এই সামান্য কথনের মধ্য দিয়ে ৭৮তম জন্মদিনে তাঁর প্রতি জ্ঞাপন করছি গভীর শ্রদ্ধা।

খোলা চোখে- সংখ্যালঘু রাজনীতির ‘সফট টার্গেট’ by হাসান ফেরদৌস

যাদের দিকে ঢিল ছুড়লে পাটকেল খাওয়ার ভয় নেই, যাদের বাড়িতে আগুন দিলে পাল্টা আগুন লাগার উদ্বেগ নেই, যাদের দু-চারজন খুন বা ধর্ষণ হলে ফিরতি খুন বা ধর্ষণের আশঙ্কা নেই—এমন মানুষজনই হলো ‘সফট টার্গেট’।
বাংলাদেশের জন্মের গোড়া থেকেই সংখ্যালঘু হিন্দুরা সে রকম ‘সফট টার্গেট’ হয়ে থেকেছে। একাত্তরে পাকিস্তানিরা বেছে বেছে হিন্দুদের ওপর হামলা করেছে। লক্ষ্য, হিন্দু জনগোষ্ঠীকে উৎখাতের মাধ্যমে ‘ফাইনাল সলিউশন’ অর্জন। পাকিস্তানিরা আর নেই, কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর চার দশকে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত আক্রমণ থামেনি। তার সর্বশেষ প্রমাণ মিলল ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর দেশজুড়ে সংখ্যালঘু উৎখাতের নতুন তাণ্ডবে।

স্বাধীন বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু গ্রাম আক্রান্ত হয়। লক্ষ্য, এসব গ্রামের লোকজন যাতে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার দুঃসাহস না করেন। নির্বাচন শেষে আবারও তাঁরা আক্রান্ত হন, হুমকি ও শাসানি সত্ত্বেও কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে গেছেন এবং তাঁদের পছন্দের দলের বাক্সে ভোট দিয়েছেন, তার শাস্তি হিসেবে। এবারের সংখ্যালঘু আক্রমণের কারণও খুব ভিন্ন কিছু নয়। বাংলাদেশের হিন্দুরা বরাবরই আওয়ামী লীগকে নিজেদের রক্ষাকর্তা ভেবে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন, তা তারা সত্যি সত্যি রক্ষাকর্তা হোক বা না-ই হোক। প্রতিপক্ষ বিএনপি ও জামায়াত, যারা যেকোনো মূল্যে নির্বাচন ঠেকাতে বদ্ধপরিকর ছিল, বড় কর্তার গায়ে কুটোটি ছোঁয়াতে না পারলেও ঝাঁপিয়ে পড়েছে কুটোটি তুলে ধরার সাধ্য নেই যাদের, এমন সব অসহায় মানুষের ওপর। আক্রান্ত হয়েছে যশোরের মালোপাড়ার মৎস্যজীবী পরিবার, ঠাকুরগাঁওয়ের হিন্দুবাজার, দিনাজপুরের নিম্নবিত্ত হিন্দু গ্রাম। যারা আক্রান্ত হয়েছে, তাদের অধিকাংশ এমনিতেই সমাজের প্রান্তবর্তী মানুষ, তার ওপর ধর্মীয় সংখ্যালঘু। নিজেরা দুর্বৃত্তদের পরিকল্পিত হামলার প্রতিরোধ করবে, সে ক্ষমতা তাদের নেই। সে কথা জেনেই এসব গ্রাম বা মহল্লা বেছে বেছে নেওয়া হয়েছে।
আক্রমণ হবে, এ কথা পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের যেমন জানার কথা, তেমনি জানার কথা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কর্তাব্যক্তিদেরও। এঁদের কারও পক্ষ থেকেই কোনো আগাম পাহারাদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে নিজের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার দায়ভার এঁরা কেউই এড়াতে পারেন না। পুলিশ বা প্রশাসন ‘ওপরওয়ালার নির্দেশ নেই’ বলে পাশ কাটাতে পারে, কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা দায়িত্ব এড়াবেন কী বলে? হিন্দুদের তাঁরা চিরকালই নিজেদের ‘ভোটব্যাংক’ বিবেচনা করে এসেছেন। কিন্তু যাদের ওপর সংখ্যালঘু হিন্দুদের এত আশা, তারা কেউ কথা রাখে না। আগেও না, এবারেও না। চোর পালালে যেমন পুলিশ আসে, তেমনি ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই হওয়ার পর এসব গ্রামে নিরাপত্তা টহল বসেছে। নাগরিক কমিটি গঠিত হয়েছে। সরকারের নেতারাও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির হুমকি দিয়েছেন। এ সবই বাতাসে তলোয়ার ঘোরানো ছাড়া আর কিছু নয়। যারা সব খোয়াল, এই কথার ফুলঝুরিতে তাদের কোনো লাভ হবে না।
এখন চোখের জল ফেলা ও কপাল চাপড়ানো ছাড়া মালোপাড়ার চন্দনা বিশ্বাস বা দেয়াপাড়ার কালীদাসী সরকারের অন্য আর করার কী আছে?
বাংলাদেশে একদল মানুষ আছে, যারা বরাবর হিন্দুদের ওপর নির্যাতন বা তাদের প্রতি বৈষম্যকে ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বানানো গপ্প বা ‘মিথ’ বলে চালানোর চেষ্টা করে থাকে। ২০০১ সালে নির্বাচনের পর হিন্দুদের ওপর যে অভাবনীয় নির্যাতন হয়, দেশের পত্রপত্রিকা তার সচিত্র বিবরণ ছেপেছিল। ছাপলে কী হবে, ক্ষমতায় অধিষ্ঠ হয়েই বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে সেসব বাজে কথা বলে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়া হয়। পার্লামেন্টে একজন হাফ মন্ত্রী এমন কথাও বললেন, কোথাও কোনো ধর্ষণের ঘটনা ঘটেনি। ঘটার সুযোগ থাকলে তিনি নিজেও তাতে অংশ নিতেন। তাঁর কথা শুনে সংসদের হলভর্তি মানুষ হেসে কুটি কুটি হয়েছিলেন।
আশার কথা, এবার বিএনপির নেত্রী মুখ ফুটে সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। নিজের দলের বা ঘনিষ্ঠ দোসর জামায়াতের অংশগ্রহণের কথা তিনি স্বীকার করেননি, তবে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতন বন্ধের ব্যাপারে সোচ্চার থাকার জন্য নিজ দলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্দেশ পাঠিয়েছেন। সেটাও একধরনের স্বীকারোক্তি। নিদেনপক্ষে, এ যাত্রায় তাঁর দলের কোনো নেতা যে ‘নির্যাতন হলে আমরাও হাত লাগাতাম’ জাতীয় কথা আগ বাড়িয়ে বলেননি, তাকে একধরনের ‘প্রগ্রেস’ বলা যায় বৈকি!

মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন, একটা দেশ ও তার মানুষ কতটা সভ্য, তা বোঝার একটা উপায় সে দেশের মানুষ নিজেদের দরিদ্র ও প্রান্তবর্তী মানুষ, বিশেষ করে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের অধিকার কীভাবে রক্ষা করে, তা থেকে। গান্ধী নিজে সে অধিকার রক্ষায় নিজের জীবন পর্যন্ত খুইয়েছিলেন। সভ্যতার এই মানদণ্ডে আমরা বাংলাদেশের মানুষ খুব যে এগিয়েছি, তা বলা যাবে না। হিন্দু পেটানো আমাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর যে হারে হিন্দু দেশত্যাগ করেছে, তা থেকেই ব্যাপারটা টের পাওয়া যায়। একসময় বাংলাদেশে হিন্দুর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ ছিল। এখন তা কমতে কমতে ৮ দশমিক ৫ শতাংশে এসে ঠেকেছে। নিজের ভিটামাটি ছেড়ে এরা কেউ শখ করে দেশ ছাড়ে না, বিদেশে এদের অভ্যর্থনার জন্য কোনো তোরণও নির্মিত হয়নি। অথচ দেশের মন্ত্রী থেকে পাতিবুদ্ধিজীবী—সবাই একবাক্যে বলবেন, সব দোষ হিন্দুদের। ওদের এক পা এ দেশে, এক পা ও দেশে।
কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর সদস্যদের বেছে বেছে নির্যাতন বস্তুত মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। রাজনৈতিক গোলযোগের সূত্র ধরেও যদি তেমন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে তাদের বিচারের সুযোগ রয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সহিংসতার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন, এসব ঘটনার জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে বিচারের সুযোগ রয়েছে। একই অপরাধে কেনিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহকারীকে বিচারে হাজিরা দেওয়ার জন্য হেগে তলব করা হয়েছে।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব একা সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের নয়। দেশের মানুষেরও। যারা আক্রান্ত হচ্ছে, তারা আমাদের প্রতিবেশী, আমাদের ভাই ও বন্ধু। চোখের সামনে নির্যাতনের যেসব ঘটনা ঘটছে, তার প্রতিটি যথাযথ নথিবদ্ধ করা ও তদন্তের সব আলামত সযত্নে রক্ষা, যারা এসব ঘটনার সাক্ষী, তাদের আশু দায়িত্ব। অপরাধ করেও শুধু প্রামাণিক নথিপত্রের অভাবে যেন কেউ রেহাই না পায়, তা নিশ্চিত করার এখনই সময়।
নিউইয়র্ক

হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

বিশ্বায়নের কাল- হতাশ হয়েছে বিশ্ব by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশ আর কখনো এভাবে প্রায় পুরো বিশ্বকে হতাশ করেছে বলে শুনিনি। ব্যতিক্রম অবশ্য আছে। সেটা নিকটতম প্রতিবেশী, যার সহায়তা ও অঙ্গীকারগুলো সময়মতো পূরণ হলে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দলের জনসমর্থন হয়তো এতটা কমে যেত না।
ফলে, বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সমর্থন সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নির্বাচনে প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী সরকারকে বাস্তবে কোনো সাহায্য করবে কি না বলা মুশকিল; বরং ভারতবিরোধিতার রাজনীতির প্রচারণা উসকে দেওয়ায় তা সহায়ক হওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করা এখন সহজ নয়।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে হতাশা জানানোর পালা শুরু হয় লন্ডন থেকে। তারপর ওয়াশিংটন, টরন্টো, জাতিসংঘ মহাসচিবের দপ্তর হয়ে ক্যানবেরা ও টোকিও—সব জায়গা থেকে প্রায় অভিন্ন প্রতিক্রিয়া। তাদের হতাশার কারণ অনেক। প্রথমত, অর্ধেকের বেশি নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের ভোটদানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়া এবং অবশিষ্ট এলাকাগুলোয় ভোটারদের অংশগ্রহণ কম হওয়ার বিষয়। দ্বিতীয়ত, বেআইনি সহিংসতায় বেসামরিক লোকজনের প্রাণহানি, নাগরিকদের ভীতি প্রদর্শন এবং স্কুল-কলেজসহ সরকারি ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা। তৃতীয়ত, শান্তিপূর্ণ ও সব দলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য না হওয়া। কমনওয়েলথ দেশগুলোর জোট কমনওয়েলথের মহাসচিবের বিবৃতিতেও কোনো ব্যতিক্রম ছিল না।
নির্বাচনের সপ্তাহ দুয়েক আগেই ইঙ্গিত মিলতে শুরু করে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই নির্বাচন কীভাবে মূল্যায়ন করতে যাচ্ছে। কমনওয়েলথ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে পর্যবেক্ষক না পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেও এই নির্বাচন যে কমনওয়েলথের গৃহীত সনদের নীতিমালা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, সে কথা তারা তখন স্পষ্ট করেনি সম্ভবত কূটনৈতিক শালীনতার কারণে। তবে নির্বাচনোত্তর বিবৃতিতে সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকদের জন্য ব্যাখ্যা দিয়ে তারা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে কেন তারা পর্যবেক্ষক পাঠাতে পারেনি। সেখানে তারা বলেছে, কমনওয়েলথ সনদের নীতিমালা, বিশেষ করে অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচনের সঙ্গে পরিস্থিতি সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় কমনওয়েলথের পর্যবেক্ষকেরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাননি। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সমতুল্য কর্মকর্তা ক্যাথরিন অ্যাশটন অবশ্য খোলাসা করেই জানিয়ে দেন যে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ না হওয়ায় তাঁরা এটি পর্যবেক্ষণের কোনো প্রয়োজন দেখছেন না। গত ২০ ডিসেম্বর তাঁর মুখপাত্র পর্যবেক্ষণ মিশন পাঠানো স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘স্বচ্ছ, অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরিতে দেশটির প্রধান রাজনৈতিক শক্তিগুলো ব্যর্থ হওয়ায়’ তাঁরা এ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের অন্যতম মুখপাত্র জেন সাকি ২২ ডিসেম্বরেই তাঁদের হতাশার কথা জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশের মানুষের চোখে বিশ্বাসযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের সুযোগ থাকলেও প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল কোনো সমঝোতায় পৌঁছতে না পারায় তেমন নির্বাচন সম্ভব হচ্ছে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অর্ধেকের বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে যাওয়ায় এই নির্বাচনে যুক্তরাজ্য কোনো পর্যবেক্ষক পাঠাবে না।
বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে হতাশার পর ভবিষ্যৎ সম্পর্কের বিষয়েও ইঙ্গিতটা এসব বিবৃতিতে স্পষ্ট। কূটনীতির একটি প্রধান উপাদান হচ্ছে কঠিন কথা মিষ্টি ভাষায় বলতে পারা। বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উন্নয়ন এবং বাণিজ্য-সহযোগী এসব দেশের বিবৃতিতে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে যে তারা চায় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও সংস্কৃতিতে দ্রুততম সময়ে প্রত্যাবর্তন। সে কারণেই অস্ট্রেলিয়া ও জাপান স্পষ্ট করে আরেকটি নির্বাচন আয়োজনের কথা বলেছে। আর অন্যরা কিছুটা ঘুরিয়ে বলেছে। যেমন ব্রিটিশ সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাকে জরুরি অগ্রাধিকার দিয়ে ভয় ও প্রতিশোধের আশঙ্কামুক্ত অংশগ্রহণমূলক ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য একযোগে কাজ করা বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও জনগণের প্রত্যাশার প্রতি সাড়া দিয়ে শিগগিরই অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও অর্থবহ সংলাপের কথা বলেছেন। ‘অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া’ যে আরেকটি নির্বাচন, সে কথা নিশ্চয়ই আমাদের রাজনীতিকদের বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের প্রশ্নে ভারতের সঙ্গে পাশ্চাত্যের এসব দেশ ও আন্তর্জাতিক জোট বা সংস্থার কিছুটা ভিন্নতা থাকলেও সহিংসতা, বিশেষ করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত হামলাগুলোর নিন্দার ক্ষেত্রে বাইরের দুনিয়ায় কোনো ধরনের মতভিন্নতা নেই। ভারত এ ক্ষেত্রে বেশি উদ্বিগ্ন। তার কারণ, নির্যাতনের শিকার মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিতে বাধ্য হলে ভিটেছাড়া উদ্বাস্তুদের তাদেরই আশ্রয় দিতে হবে। তবে অন্যদের উদ্বেগও কম নয়। কেননা, বাংলাদেশে নির্বাচন হলেই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা গত কয়েক দশকে নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সেগুলোর কোনোটিরই বিচার হয়নি। মানবাধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নতুন উপলব্ধি ও দায়িত্ববোধের পরিচায়ক কিছু উদ্যোগ বা পদক্ষেপ তাই মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়। তবে এ ক্ষেত্রে প্রাথমিক দায়িত্ব বর্তাবে সরকারের ওপর। শুধু বিরোধী দল বা জামায়াত-শিবিরকে দায়ী করলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না।
২০১২ সালের ডিসেম্বরের কথা। লন্ডনে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি কমিটিকক্ষে ব্রিটিশ রাজনীতিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠকেরা বাংলাদেশের প্রধান দুই দলের প্রতিনিধিদের কাছে নির্বাচনোত্তর সংখ্যালঘু নিপীড়নের আশঙ্কার কথা প্রকাশ করেছিলেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান, প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন বলে কথিত অত্যন্ত প্রভাবশালী সাবেক আমলা এইচ টি ইমাম সরকারের পক্ষে অঙ্গীকার করে গিয়েছিলেন যে এ ধরনের হামলা প্রতিকারে সব ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হবে। বিরোধী দল বিএনপির এম কে আনোয়ারও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে তাঁর দল এ ক্ষেত্রে সহযোগিতা করবে। বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গণহারে গ্রেপ্তারের পর তাঁদের ঘাড়ে দায়িত্ব চাপালে তা কতটা ধোপে টিকবে, বলা মুশকিল। তবে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে না পারার বিষয়ে সরকারের ব্যাখ্যা কতটা হালে পানি পাবে, বলা দুষ্কর। বিবিসিতে যশোরের পুলিশ সুপারের যে উদ্ধৃতি দেখলাম, তাতে এটা স্পষ্ট যে সরকারের কাছে জেদ-জবরদস্তির ভোটরক্ষা যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, নাগরিকের জীবনরক্ষা বা নিরাপত্তার বিষয়টির অগ্রাধিকার ততটা ছিল না। এ কারণে সব জায়গাতেই পুলিশ, প্রশাসন ও ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা গেছেন হামলা হওয়ার পর। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর বেশি দিন চুপ থাকবে বলে মনে হয় না। হাইকমিশনার নাভি পিল্লাই এ বিষয়ে তো আগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন।
বিরোধী দলকে মতপ্রকাশের সুযোগ না দেওয়া, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক হয়রানির প্রসঙ্গেও এসব বিবৃতিতে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। স্পষ্টতই তাঁদের উদ্বেগের প্রধান বিষয় হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ একটি কর্তৃত্ববাদী বা স্বৈরাচারী শাসনের পথে ধাবিত হয় কি না। নির্বাচন শেষ হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পেরোনোর আগেই নতুন করে বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে সরকার বহির্বিশ্বে যে বার্তা পাঠাল, তা কতটা বিবেচনাপ্রসূত হলো, তা তারাই ভালো বলতে পারবে। বিরোধী দল দমন এবং শক্তি প্রয়োগে মতপ্রকাশের সুযোগ খর্ব করা অব্যাহত থাকলে অচিরেই মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো যে নতুন ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে, তাতে সন্দেহ নেই। আর সে রকম ক্ষেত্রে উন্নয়ন-সহায়তা ও বাণিজ্য-সুবিধার ওপর যে প্রতিকূল প্রভাব পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, তা আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না।
নির্বাচন-পূর্ব বিবৃতিগুলো এবং নির্বাচনোত্তর প্রতিক্রিয়াগুলোয় পাশ্চাত্যের দেশগুলোর ব্যবহূত ভাষায় যে ধরনের মিল, তা স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখার বিষয়ে তারা অভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও তাদের কর্মকৌশলে সেই অভিন্নতা বজায় থাকার সম্ভাবনা প্রবল।
প্রতিটি বিবৃতিতেই বাংলাদেশে স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জন্য দেশটির জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখার কথা রয়েছে। এটাকে অনেকেই নতুন সরকারের প্রতি সমর্থনের অঙ্গীকার বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, যা শঠতাপূর্ণ। যাঁরা কূটনৈতিক শালীনতা বজায় রেখেও গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন, তাঁরা সেই প্রহসনজাত নেতৃত্বের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতা বজায় রাখবেন—এমনটি কল্পনা করে কেউ আত্মহারা হতে চাইলে অন্যদের আর কী করার আছে?
এবার অন্য একটি দেশের কথা বলি। ২০০৮ সালের ২৯ মার্চ। ব্যাপক সহিংসতার পর অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্ট নির্বাচনে একযোগে ভোট অনুষ্ঠিত হলেও ভোট গ্রহণের ৩৬ ঘণ্টা পরও নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় অস্বীকৃতি জানাল নির্বাচন কমিশন। কারণ হিসাবে তারা বলল, ২১০টি আসনের পার্লামেন্টে ২৩টি আসনের ভোট পুনর্গণনা প্রয়োজন। এই কটি আসনের ফলাফল উল্টে দিতে পারলেই নির্বাচনে শাসক দলকে বিজয়ী ঘোষণা করা যায়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আবেদন-নিবেদন সবই উপেক্ষিত হলো। সরকারের প্রভাবাধীন হাইকোর্টও ফলাফল পরিবর্তনের চেষ্টা বন্ধে হস্তক্ষেপের জন্য বিরোধী দলের আবেদন প্রত্যাখান করলেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও বিরোধী দল জয়ী হওয়ার দাবি জানাল, কিন্তু কমিশন সেই ফলাফলও স্থগিত রাখল। প্রায় এক মাস পর তারা বিতর্কিত ভোটগুলো পুনর্গণনার উদ্যোগ নিল এবং যথারীতি আশঙ্কা অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিজয়ী ঘোষিত হলো।
পশ্চিমা বিশ্বে রীতিমতো হইচই। এমনকি যে দেশটিতে এসব নির্বাচনী প্রহসন মঞ্চস্থ হলো, সেই দেশটির প্রতিবেশীদেরও অনেকে প্রকাশ্যেই এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের কথা বলল। তবে তাদের এক বৃহৎ প্রতিবেশী তাদের সমর্থনে অনড় থাকল। এ কারণে আঞ্চলিক জোটের দেশটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হলো না। তবে নির্বাচনের প্রায় চার মাস পর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেশটির বিরুদ্ধে নানা রকমের নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো। এরপর আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যস্থতায় আপস-রফার মাধ্যমে দেশটির দুই আপসহীন প্রতিদ্বন্দ্বী ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তি করতে বাধ্য হলো।
যে দেশটির কথা বলছিলাম, সেটির ক্ষমতাসীন দল ও তার নেতার কৃতিত্ব হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত করে নিজেদের স্বাধীন করা। আর সেই ক্ষমতাসীন দলটি ছিল ওই দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের নেতৃত্বদানকারী দল এবং তার স্বাধীনতাসংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা। কিন্তু দলটিও যেমন দিনে দিনে গণবিচ্ছিন্ন কোটারির রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়েছিল, তেমনি সেই নেতাও অপশাসন তথা দুঃশাসনের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন।
দেশটির নাম জিম্বাবুয়ে। আর দলটির নাম জানু পি এফ এবং স্বাধীন দেশটির জনক হলেন রবার্ট মুগাবে। প্রতিবেশী হলো দক্ষিণ আফ্রিকা। দেশের ভেতরে বিরোধীদের কোণঠাসা করে মুগাবে গত বছর আবারও পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। কিন্তু দেশটি এখনো খুঁড়িয়ে চলছে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে মুগাবে এখনো একঘরে।

কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন।

সরল গরল- ‘সংবিধান রক্ষায়’ সংবিধানবিচ্যুত শপথ by মিজানুর রহমান খান

ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই দেশ শাসন করেছিলেন ১৬৪৩ থেকে ৭২ বছরের বেশি। ‘আমিই রাষ্ট্র’ কথাটি তাঁর জবানিতেই পরিচিত। অপ্রয়োজনে সংবিধান থেকে সরে আজই শপথ এবং ১২ জানুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রশ্নবিদ্ধ উদ্যোগ দেখে লুইয়ের কয়েকটি উদ্ধৃতি স্মরণে আসছে।
লুই বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি নিজেকে জয় করতে পারে, তার সামনে আর সামান্যই কিছু টিকতে পারে।’ অবশ্য তিনি তাঁর অন্তিম শয়ানে বলেছিলেন, ‘আমি চলে যাচ্ছি কিন্তু রাষ্ট্র সর্বদাই টিকে থাকবে।’

রকিব উদ্দীন কমিশন গতকাল গেজেট করে যা করল, তাতে মনে হয় তাঁরা লুইয়ের সপ্তদশ শতাব্দীর রাজকর্মচারী। তাঁরা লুইয়ের মনোবাঞ্ছা পূরণ করছেন। লুই বলতেন, ‘এটা আইনসম্মত, কারণ এটাই আমার অভিপ্রায়।’ এখন সরকার সংসদ ভাঙছে না অথচ ইসিকে দিয়ে সংবিধান ভাঙাচ্ছে। সরকারি মন্ত্রণাদাতারা ও তাদের তথাকথিত শুভানুধ্যায়ীরা উদ্ভট ও অসাংবিধানিক মন্ত্রণা দিচ্ছেন। তাঁরা নাকি বলছেন, নবম সংসদ ভাঙতে হবে না। শপথ নিলে এবং দশম সংসদ ডাকলেই নবম সংসদ বিলুপ্ত হবে। অথচ সংবিধান বলেছে, শুধু দুভাবে সংসদ লুপ্ত হবে। প্রথমত প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শে রাষ্ট্রপতির আদেশে। দ্বিতীয়ত প্রথম বৈঠক থেকে পাঁচ বছরের মেয়াদ পুরা হলে। এটা পুরা হবে ২৪ জানুয়ারি। এই তারিখ এলেই তবে সংসদ আপনাআপনি ভাঙবে। কাউকে ভাঙতে হবে না। এখন নাকি সিদ্ধান্ত হয়েছে, সংসদ ভাঙতে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শ দেওয়া হবে না। ২৪ জানুয়ারির জন্য অপেক্ষাও করা হবে না। তালি বাজিয়ে নবম সংসদ উধাও করে দেওয়া হবে।
রাষ্ট্রপতি, স্পিকার ও প্রত্যেক নির্বাচন কমিশনার শপথ নিয়েছিলেন, আমি সংবিধানের রক্ষণ ও সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করব। আইন অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে আমার পদের কর্তব্য পালন করব এবং আমার সরকারি কার্য ও সরকারি সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত স্বার্থের দ্বারা প্রভাবিত হতে দেব না।
গতকাল নতুন নির্বাচনের ফলাফল সরকারি বিজ্ঞপ্তি দ্বারা প্রকাশ করে ইসি সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদের তিন দফার শর্ত নির্দিষ্টভাবে লঙ্ঘন করল। স্পিকার শপথ পড়ানোর দায়িত্ব নিয়ে তাঁর শপথও লঙ্ঘন করলেন। এরপর বাকি থাকবেন রাষ্ট্রপতি।
১২৩ অনুচ্ছেদের বিধান নিম্নরূপ: ‘(৩) সংসদ-সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে (ক) মেয়াদ-অবসানের কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী নব্বই দিনের মধ্যে: এবং (খ) মেয়াদ-অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে ভাঙ্গিয়া যাইবার পরবর্তী নব্বই দিনের মধ্যে: তবে শর্ত থাকে যে, এই দফার (ক) উপ-দফা অনুযায়ী অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত ব্যক্তিগণ, উক্ত উপ-দফায় উল্লিখিত মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করিবেন না।’ দশম সংসদ নির্বাচন ওই (ক) উপদফা মতে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং সংবিধান বলেছে, ‘নির্বাচিত ব্যক্তিগণ’ আগামী ২৪ জানুয়ারি অর্থাৎ ‘মেয়াদ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সংসদ-সদস্যরূপে কার্যভার গ্রহণ করবেন না।’ কিন্তু শপথ নিয়ে আজই তাঁরা কার্যভার গ্রহণ করছেন।
সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদের ২(ক) দফায় শপথের বিধান আছে। তাই ১২৩ ও ১৪৮ অনুচ্ছেদ মিলিয়ে পড়তে হবে। ১৪৮(২ক) বলেছে, ‘১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার অধীন অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপিত হওয়ার তারিখ হতে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে’ শপথ পড়াতে হবে। এই অনুচ্ছেদেরই ৩ উপদফা বলেছে, শপথ মাত্রই কার্যভার গ্রহণ।
ইসি যদি ২৩ জানুয়ারিতেও গেজেট প্রকাশ করত, তাহলে ২৫ জানুয়ারিতেই শপথ পড়ানো সম্ভব ছিল। বহুল উচ্চারিত ‘সংবিধান রক্ষার’ জন্য তারা ১৫ দিন সময় অপেক্ষা করতে পারেনি।
এর আগে ২৪ জানুয়ারির পর নতুন সরকারের শপথ গ্রহণের চিন্তাভাবনা ছিল। এখন ‘সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাসহ বিদ্যমান পরিস্থিতির’ কথা বিবেচনা করে দ্রুততম সময়ে শপথ গ্রহণ করা হচ্ছে। পত্রিকায় এসেছে, গত সোমবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে শপথের সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটা বিশ্বাস করা কঠিন যে, রাষ্ট্রপতি সংবিধান ভঙ্গ করার সভায় পৌরোহিত্য করেছেন।
শাসকগণ প্রমাণ দিচ্ছেন, মাত্র ১৫ দিন বিলম্বের চেয়ে সংবিধান ভাঙা অনেক সহজ। অথচ এঁরাই সংবিধানের কোনো বিচ্যুতি ঘটালেও বিরাট শাস্তির বিধান করেছেন।
শাসকেরা চাইলেই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংবিধান সংশোধন করে ১২৩ অনুচ্ছেদের ওই শর্তাংশ মুছে ফেলতে পারতেন। কিন্তু তাতে বদনাম হবে। লোকে ধরে ফেলবে। সংবিধানে সংশোধনী আনা বদনামের। কিন্তু তাকে দলিতকরণ দোষণীয় বা দণ্ডনীয় নয়। লোকে ধরতে পারবে না। আমরা তথাকথিত সাংবিধানিক শাসনে কতটা আছি, এটা তার আরেকটি প্রমাণ।
রকিব কমিশন সংবিধান ভাঙল। শপথ পড়ালে স্পিকারও তার ভাগীদার হবেন। এখন দেখতে হবে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী হতে শেখ হাসিনাকে কবে কখন আমন্ত্রণ জানান। রাষ্ট্রপতি এটা করলে তাঁর তরফে একটি নির্দিষ্ট সাংবিধানিক বিচ্যুতি ঘটানো হবে। তিনি যদি সরকার করার আমন্ত্রণ জানাতে আরও ১৫ দিন সময় নেন, তাহলে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ বেঁচে যাবে। আমরা বুঝতে অপারগ থাকব, নবম সংসদের সত্তা মাঘের কুয়াশায় মিলিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত কী করে তিনি দশম সংসদ ডাকবেন।
২৪ জানুয়ারির আগে রাষ্ট্রপতি দশম সংসদের কোনো সদস্যকে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বৈধভাবে নিয়োগ দিতে পারেন না। কারণ সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘যে সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন বলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রতীয়মান হবেন, রাষ্ট্রপতি তাকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করবেন।’ কিন্তু সংবিধানমতে আমি তো ২৪ জানুয়ারির আগে কার্যভার গ্রহণ-উপযোগী কোনো ‘সংসদ সদস্য’ দেখি না। সংবিধানবহির্ভূত শপথ আইনের চোখে বৈধ শপথ হবে না। তাই রাষ্ট্রপতি তাঁদেরকে সরকার গড়তে আহ্বান জানাতে বাধ্য নন। শুনেছি, রাষ্ট্রপতি সঠিক পরামর্শ দিয়ে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।
এখন রাষ্ট্রপতি যদি ২৪ জানুয়ারির আগে দশম সংসদের কোনো সদস্যকে প্রধানমন্ত্রী হতে আমন্ত্রণ জানান, তাহলে তিনি সংবিধানের ১২৩ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত হবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।
যেকোনো ধরনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি সংবিধান কল্পনা করেছিল। তাই ৫৭(৩) অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকতে কোনো কিছুই অযোগ্য করবে না।’
আসলে ভয় পেয়েছে আওয়ামী লীগ। নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ দলটি এখন তাদের লব্ধ ‘বিজয়’ হাতছাড়া হওয়ার ভয়ে শঙ্কিত। তাই সংবিধানের এমন শক্তিশালী রক্ষাকবচ সত্ত্বেও কখন কী হয় এ প্রশ্ন তাদের তাড়া করে ফিরছে।
বস্তুত তাঁরা রাজার ইচ্ছা পূরণ করছেন। সংবিধানবিচ্যুত হয়ে সংবিধান রক্ষণের শপথ আজ। এই রাষ্ট্রে কার কাছে এর প্রতিকার চাইব?

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।

সরল গরল- ‘সংবিধান রক্ষায়’ সংবিধানবিচ্যুত শপথ by মিজানুর রহমান খান

ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই দেশ শাসন করেছিলেন ১৬৪৩ থেকে ৭২ বছরের বেশি। ‘আমিই রাষ্ট্র’ কথাটি তাঁর জবানিতেই পরিচিত। অপ্রয়োজনে সংবিধান থেকে সরে আজই শপথ এবং ১২ জানুয়ারির মধ্যে নতুন সরকার গঠনের প্রশ্নবিদ্ধ উদ্যোগ দেখে লুইয়ের কয়েকটি উদ্ধৃতি স্মরণে আসছে।

পাকিস্তান- নওয়াজ শরিফের কঠিন সময় by নাজাম শেঠি

প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ যদি ২০১৪ সালের দিকে তাকান, তাহলে পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র দেখতে পাবেন, যেদিকে তাঁর সরকারকে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। যথা: পররাষ্ট্রনীতি, সন্ত্রাসবাদ, অর্থনীতি, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যকার সম্পর্ক এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক।
এসব ক্ষেত্রে তাঁর জন্য কী অপেক্ষা করছে, তা দেখতে পেয়ে তিনি আস্থা বোধ করতে পারেন। কারণ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই অভিজ্ঞ ও তাঁর বিশ্বস্ত লোকজন দায়িত্বরত আছেন। পররাষ্ট্রনীতির দায়িত্বে আছেন পররাষ্ট্র বিভাগের দুই বর্ষীয়ান কর্মকর্তা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সারতাজ আজিজ ও সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক ফাতেমি। অর্থ মন্ত্রণালয় দেখছেন সাবেক অর্থমন্ত্রী ইসহাক দার। কার্যত উপপ্রধানমন্ত্রী চৌধুরী নিসার আলি খান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থেকে জাতীয় নিরাপত্তা/সন্ত্রাসবাদ/আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে নীতিকৌশল ঠিক করছেন। সাবেক আইনমন্ত্রী জাহিদ হামিদ আর আইনজীবীদের আন্দোলনের সাবেক নেতা অ্যাটর্নি জেনারেল মুনির মালিক দেখছেন আইন। আর শরিফ ভ্রাতৃদ্বয়ের উভয়েই ব্যক্তিগতভাবে সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। গত দুই দশকে দুবারের অ্যাডভেঞ্চারিজমের অনেক তিক্ত ফলের স্বাদও তাঁরা পেয়েছেন। কিন্তু এই পাঁচটি বিষয়ের প্রতিটিই একটি করে বিস্ফোরণোন্মুখ বোমার মতো, দ্রুত নিষ্ক্রিয় করা না হলে সেগুলো বিস্ফোরিত হবে।

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত পাকিস্তানের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল ভারতের দিক থেকে। এবারই প্রথম সেই জায়গায় এসেছে আফগানিস্তান। আমেরিকান সেনাদের চলে যাওয়া শুরু হলে তালেবানের পুনরুত্থানও শুরু হবে। আফগানিস্তানের জাতীয় সামরিক বাহিনী বেশি সময় তালেবানকে সামলে রাখতে পারবে না। বিশেষত, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যদি কারচুপি হয় এবং তালেবানবিরোধী জোটের ভেতরে কোন্দল বাড়ে, তাহলে তালেবানের প্রত্যাবর্তন দ্রুততর হতে পারে। আর আফগানিস্তানে যদি আবার গৃহযুদ্ধ বেধে যায়, তবে পাকিস্তানে তার নেতিবাচক প্রভাব হবে বিরাট। আফগানিস্তান থেকে দলে দলে শরণার্থীরা এসে ঢুকতে থাকবে পাকিস্তানে, বিশেষ করে আফগান সীমান্তের দুটি প্রদেশে। এটা হবে ওই দুটি প্রদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা। অন্যদিকে পাকিস্তানি তালেবানও আফগানিস্তানের ভেতরে দীর্ঘ মেয়াদে ঘাঁটি গড়ে তুলতে পারবে আল-কায়েদা ও আফগান তালেবানের সহযোগিতায়। ফলে সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা করার কাজটি প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠবে।
কতকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং সেগুলো বাস্তবায়নে সাফল্য দৃশ্যমান করে তুলতে হবে। তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সংলাপ ও আফগান-পাকিস্তান-তালেবানের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় মীমাংসা প্রচেষ্টার মাধ্যমে তালেবানকে নিরস্ত্র করে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এতে সফল না হলে, এসব প্রক্রিয়ার সুবাদে তালেবান নিজেদের শক্তি বাড়ানোর সময় ও সুযোগ পাবে এবং ক্রমান্বয়ে উভয় দেশেই আধিপত্য বিস্তার করবে। তখন পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও আমেরিকা একজোট হয়েও তালেবানকে পরাস্ত করতে হিমশিম খেতে থাকবে।
অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো হলো মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুতের সংকট আর বেকারত্ব। কিন্তু এই তিনটি ক্ষেত্রেই সরকারি উদ্যোগগুলো দুর্বল ও স্বল্পমেয়াদি। রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো খাতে ব্যয়ের জন্য কিংবা জ্বালানি তেলের বকেয়া পাওয়া পরিশোধের জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যাংক ও বিদেশি দাতাদের কাছ থেকে অর্থঋণ নেওয়া হলে তো মূল্যস্ফীতি বাড়তেই থাকবে। ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে রূপান্তরের কাজ দীর্ঘায়িত হলে, কিংবা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ও সরবরাহে বিলম্ব হলে আগামী গ্রীষ্মে বিদ্যুতের সংকট মারাত্মক রূপ ধারণ করবে। আর বেকার যুবকদের ঋণ দেওয়ার প্রকল্পটিও ক্রমবর্ধমান বেকারত্বজনিত ক্ষোভ-বিক্ষোভের প্রশমন ঘটাতে ব্যর্থ হবে, যদি শিল্প ও সেবা খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি না পায়। কিন্তু বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কোনো নীতি কিংবা সুপারিশও এ মুহূর্তে সরকারের তরফে প্রকাশ করা হয়নি। সবকিছু মিলিয়ে অর্থনীতিতে যে বহুমুখী সংকট তীব্রতর হয়ে উঠছে, তা দেশকে কী সংঘাতময় পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে, তা কল্পনা করাও কঠিন।
বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীর ব্যাপারে সরকারের আচরণ কী হবে, সেটাও বিরাট পরীক্ষার বিষয়। সাবেক প্রধান বিচারপতি ইফতিখার মোহাম্মদ চৌধুরীর বিদায়ের মধ্য দিয়ে নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করার প্রতি বিচারকদের ঝোঁক বিলুপ্ত হয়নি। নির্বাহী বিভাগ বিচার বিভাগের ওপর ছড়ি ঘোরাতে চাইলে বিচার বিভাগের দিক থেকে যে প্রতিরোধ আসবে, তা অবশ্যই একটা সংকটের সৃষ্টি করবে। এ রকম সংকট এড়ানোর ব্যাপারে পার্লামেন্টের ভেতরে-বাইরে কোথাও সরকারের কোনো নীতিগত উদ্যোগের আভাস নেই।
সাবেক সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদোহ মামলাটি বিতর্কিত। এটি পুনরায় সচল করে তাঁর বিচার করার যে উদ্যোগ শুরু করা হয়েছে, সেটি পাকিস্তানের সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। একজন রাজনীতিপ্রবণ সেনাপ্রধানের কাছ থেকে একজন অরাজনৈতিক সেনাপ্রধানের হাতে দায়িত্ব হস্তান্তর মোটামুটি সাবলীলভাবে ঘটার পর একজন সাবেক সেনাশাসককে নতুন করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রতিক্রিয়া ভীষণ নেতিবাচক হতে পারে। এর ফলে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ পথভ্রষ্ট হতে পারে এবং এমনকি শেষ পর্যন্ত সরকারের আয়ু কমে যেতে পারে। এটা খুবই স্পষ্ট যে একজন সাবেক সেনাপ্রধানের বিচারের ব্যাপারে সেনাবাহিনী স্পর্শকাতর, কেননা এই বিচারের ধারায় সেনাবাহিনীর আরও অনেক অবসরপ্রাপ্ত ও চাকরিরত কর্মকর্তা চলে আসতে পারেন। জনগণও জেনারেল মোশাররফের বিচারের দাবিতে চিৎকার করছে না, বরং তাঁর শাসনামলে যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, প্রবৃদ্ধি ও জীবনযাত্রার তুলনামূলক ভালো মান ছিল, জনমনে তার স্মৃতি রয়ে গেছে। মোশাররফের বিচার-প্রক্রিয়া এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সমর্থকগোষ্ঠীগুলোও সংগঠিত হতে পারে। তা ছাড়া এই মামলার কিছু ফাঁকফোকরও রয়েছে। এ মামলার বিচারকদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আছে, প্রশ্ন আছে এ মামলায় সংবিধানের ৬ অনুচ্ছেদের ব্যবহার নিয়েও। যেসব বিচারপতি, জেনারেল ও রাজনীতিক ১৯৯৯ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত সংবিধানের ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষেত্রে জেনারেল মোশাররফকে সহযোগিতা করেছিলেন, তাঁদের নিষ্কৃতি দিয়ে শুধু মোশাররফের বিরুদ্ধে ৬ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করা নিয়ে বিতর্ক প্রবল।
শরিফ ভ্রাতৃদ্বয়ের জানা উচিত, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারকে অস্থিতিশীল এমনকি উৎখাত করার লক্ষ্যে দেশের ভেতরে ঝড় তুলতে পারে, পারে পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঘোর সংকট সৃষ্টি করতে। তাঁদের উপলব্ধি করা উচিত যে সংবিধানের আশ্রয় নিয়ে বা অন্য কোনোভাবে অন্যদের দোষারোপ করার সময় এটা নয়। কাউকে শাস্তি দেওয়ার থেকে অনেক অনেক জরুরি কাজ এ সরকারের সামনে রয়েছে। কারণ, রাষ্ট্র ও সমাজ এ মুহূর্তে নানা রকম সমস্যা-সংকটের মুখোমুখি। ভবিষ্যতের আশা জাগিয়ে রাখার জন্য সেগুলো সমাধান করার প্রয়াসের ক্ষেত্রে আমরা সুসংবাদের অপেক্ষায় আছি।

পাকিস্তানের ইংরেজি সাপ্তাহিক ফ্রাইডে টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
নাজাম শেঠি: সম্পাদক, ফ্রাইডে টাইমস।

পাকিস্তান- নওয়াজ শরিফের কঠিন সময় by নাজাম শেঠি

প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ যদি ২০১৪ সালের দিকে তাকান, তাহলে পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্র দেখতে পাবেন, যেদিকে তাঁর সরকারকে মনোযোগ নিবদ্ধ করতে হবে। যথা: পররাষ্ট্রনীতি, সন্ত্রাসবাদ, অর্থনীতি, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগের মধ্যকার সম্পর্ক এবং সামরিক-বেসামরিক সম্পর্ক।

অরণ্যে রোদন- কী ব্যবস্থা নিলেন? by আনিসুল হক

আমার এক বন্ধু আমাকে বার্তা পাঠিয়েছেন: ‘সারা দেশে যা হচ্ছে, তা দেখে আমি, আমার পরিবার, আমার সম্প্রদায়—আমরা কেউ এতটুকু আশ্চর্য নই। এটাই ইতিহাস, আমরা জানি এ রকম হয়, হয়েছে বহু।

ভয়েস অব আমেরিকাকে খালেদা- ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট কৌশলগত’: বেগম খালেদা জিয়া

বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনা পরের বিষয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট বা ঐক্যর বিষয়টি শুধুই কৌশলগত ব্যাপার বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

ভয়েস অব আমেরিকাকে খালেদা- ‘জামায়াতের সঙ্গে জোট কৌশলগত’: বেগম খালেদা জিয়া

বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। সুতরাং একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনা পরের বিষয়। জামায়াতের সঙ্গে জোট বা ঐক্যর বিষয়টি শুধুই কৌশলগত ব্যাপার বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
শন্তি, উন্নয়ন, দারিদ্র বিমোচন চায় বলেই তরুণরা এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে বলেও তিনি দাবি করেন। গতকাল ভয়েস অব আমেরিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন খালেদা জিয়া। ভয়েস অব আমেরিকার ওয়াশিংটন স্টুডিও থেকে তাঁর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন সরকার কবীরূদ্দীন। এ সাক্ষাৎকারে বিএনপির দলীয় অবস্থান ও আঠারো দলের পরবর্তী ভাবনা তুলে ধরেছেন খালেদা জিয়া। নির্বাচন হয়ে গেল। এখন কি কর্মসূচি নিয়ে এগোবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রথম কথা আমি বলব যে, দেশে কোন নির্বাচন হয়নি। যেটা হয়েছে তা কারও কাছেই গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের মানুষ সরকারকে সম্পূর্ণভাবে রিজেক্ট করেছে। আপনি নিজেই দেখেন যেখানে ১৫৩টা সিটে কেউ পার্টিসিপেট করেনি। কন্টেস্ট করেনি। কেউ আগ্রহীই নয় নির্বাচন করতে। সেখানে শুধু একদলীয় নির্বাচন ১৫৩টা সিটে হয়েছে। কোন প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। দ্বিতীয়ত যে ১৪৭টা সিটে ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনের কথা ছিল। সেখানেও দেশের ও বিদেশের মিডিয়া কর্মীরা দেখেছে, ভোটিং সেন্টারে মানুষই নেই। প্রিজাইডিং অফিসার কোনো কোনো যায়গায় ঘুমাচ্ছে। কোনো কোনো যায়গায় নিজেরাই ভোট দিচ্ছেন। ৪৭/৪৮টা ভোট কেন্দ্রে কোন ভোটার ভোট দেয়নি। তারপরে অনেক কেন্দ্র বন্ধ। তারপরও যেটা হল তাতে ৫%ও হবে না। তো এতে কি হল। মানুষের এটাইকি রায়? জনগণের মতামতের কোনও প্রতিফলন এখানে হয়নি। কাজেই এটাকে কোনও ইলেকশন আমি বলব না। এটা ভাগাভাগির নির্বাচন বলতে পারেন। তারা নিজেরা সিট ভাগাভাগি এবং ক্ষমতার ভাগাভাগি হয়েছে। বাংলাদেশের জনগণ সত্যিকারের একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখতে চায়। যেখানে সকল দলের অংশগ্রহণ থাকবে। সেরকম একটি নির্বাচন দেখতে চায়। সেই নির্বাচনটা হতে হবে একটা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। মানুষ এখন আরও পরিষ্কার ৫ই জানুয়ারির পরে যে আওয়ামী লীগের অধীনে কোনও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারে না। এবং নির্বাচন কমিশন যে একটা মেরুদণ্ডহীন বা দলীয় সরকারের মতো কাজ করেছে, এটা একদম পরিস্কার। যেখানে ৫%ও ভোট পড়েনি। সেখানে কেমন করে ৪০%ভোট বলে? এটা একটা নির্লজ্জ মিথ্যা কথা বলছে। এবং এজন্য তার দু’দিন সময় লেগেছে। সব ঠিকঠাক করে, গুছিয়ে কিভাবে বলবে তা ঠিক ঠাক করে। কাজেই এটা পরিস্কার। এবং জাতী এটাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনার আহ্বান প্রশ্নে তিনি বলেন, দশম নির্বাচনই তো মানুষ রিজেক্ট করেছে। একাদশের কথা পরে হবে। আমরা গণিতান্ত্রিক দল। আমি অনেক আগে থেকেই গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করছি। আমরা সত্যিকারই গণতন্ত্র চাই। জনগণের ভোটের অধিকার, ভাতের অধিকার, মানবাধিকার রক্ষার জন্য চাই। শন্তি চাই, উন্নয়ন চাই, দারিদ্র বিমোচন চাই, লেখাপাড়া চাই। তরুণরা এই সরকারকে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জামায়াতের সঙ্গে যোগাযোগ, জোট বা ঐক্য বা আঁতাত কৌশলগত কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আতাত বলেন, জোট বলেন বা ঐক্য বলেন তা আওয়ামী লীগই আগে করেছে। এরশাদের আমলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম কেউ নির্বচানে যাব না। তারপর মাঝ রাতে এরশাদের সঙ্গে আতাত করে নির্বাচনে গেল আওয়ামী লীগ। জামায়াতের সঙ্গে কথা বলে তাদেরকে নিয়ে গেল। নিরপেক্ষ সরকারের দাবিটা আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতের। সে জন্য তখন আওয়ামী লীগ অনেক নাশকতা করেছে। আওয়ামী লীগ এখনও জামায়াতের সঙ্গে সেই যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের এই জোট সমূর্ণভাবে কৌশলগত। বিদেশীদের হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে খালেদা জিয়া বলেন, আমরা স্বাীধন দেশ। এদেশের মানুষই সিদ্ধান্ত নেবে। বিদেশীরা আমাদের ডেভেলপমেন্ট পার্টনার হিসাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। তারা বিভিন্ন বিষয়ে কথাবার্তা বলতে পারেন। কিন্তু তারা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর হস্তক্ষেপ করলে মানুষ তা সহ্য করবে না। সাম্প্রতিক সময়ে অচলাবস্থা, হত্যা, নাশকতা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ সবকিছুর দায় বর্তায় গভর্নমেন্টের উপর। তাদের একগুয়েমি, জেদের উপর। এজন্য সরকার দায়ী। দলীয় লোকজনই এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। সংখ্যালঘুদের বাড়ি ঘর তারা পোড়াচ্ছে। অতীতেও তারা হিন্দুদের বাড়িঘর, ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান দখল করেছে। সংখ্যালঘুদের সবসময় তারা খারাপ আরচণ করছে। পুলিশের চোখের সামনে এগুলো ঘটলেও তারা কিছু বলছে না। কারন তাদেরকে নির্দেশনা দেয়া আছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিষয়ে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার, মানবাধিকার, স্বাধীন দেশের আভ্যন্তরীন ব্যাপারে কারও হস্তক্ষেপ নয় এটাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। এগুলো আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপি চেয়াপারসন অভিযোগ করেন, দেশের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত খারাপ। অত্যন্ত ভয়াবহ। সারাজীবন ক্ষমতায় থাকার জন্য হত্যা, গুম করছে আওয়ামী লীগ। যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের বিরুদ্ধেই নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আজ জেলখানাগুলো বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

‘বাংলাদেশের সংকট সমাধানে মার্কিন সিনেটে প্রস্তাব গৃহীত’

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপ ও রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ ‘সিনেট’। গত ৭ই জানুয়ারি ১১৩তম কংগ্রেসের প্রথম সেশনে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
গতকাল এর বিস্তারিক রেজুলেশন প্রকাশ করা হয়। দেশটির পাঁচ সিনেটর রিচার্ড ডারবিন, জন বুজম্যান, বারবারা বক্সার, মাইকেল বি এঞ্জি ও সিনেটর ক্রিস্টফার এস মার্ফি গত ১১ই ডিসেম্বর প্রস্তাবটি পররাষ্ট্র বিষয়ক সিনেট কমিটিতে তোলার এক সপ্তাহ পর সেটি নিয়ে কমিটিতে আলোচনা হয়। মঙ্গলবার ওই প্রস্তাবটি প্রায় অপরিবর্তিতভাবেই গ্রহণ করে। এ প্রস্তাবে বাংলাদেশের ৫ই জানুয়ারি ভোটের আগের পরিস্থিতিই সেখানে উঠে এসেছে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের বিরোধকে দায়ী করে ওই প্রস্তাবে ছয়টি সুনির্দিষ্ট বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এগুলো হল, ১. বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংঘাতের নিন্দা জ্ঞাপন এবং রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদেকে সরাসরি এবং সত্যিকার অর্থেই অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংলাপে বসার আহ্বান। ২. লাগাতার রাজনৈতিক অচলাবস্থায় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ। ৩. অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধের উদ্যোগ নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের পথ গ্রহণের আহ্বান। ৪. নির্বাচনে পর্যবেক্ষকদের নিরাপত্তা এবং অবাধ গতিবিধির নিশ্চয়তা দিতে রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আহবান, ৫. বাংলাদেশের রাজনৈতিক মতবিরোধ দূর করতে জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব ফারনান্দেজ-তারানকো যে আলোচনার প্রক্রিয়া শুরু করে দিয়ে গেছেন, তা এগিয়ে নেয়া। এবং ৬. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতে, মানবাধিকার কর্মীদের হেনস্তা বন্ধে এবং গ্রামীণ ব্যাংকের ‘স্বাধীনতা’ ফিরিয়ে দিতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

‘বাংলাদেশের সংকট সমাধানে মার্কিন সিনেটে প্রস্তাব গৃহীত’

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে সংলাপ ও রাজনৈতিক সংস্কারের আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ ‘সিনেট’। গত ৭ই জানুয়ারি ১১৩তম কংগ্রেসের প্রথম সেশনে এ সংক্রান্ত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

‘অনেক হয়েছে এবার ক্ষান্ত দেন’- কীভাবে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হয় জানা আছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেছেন, হরতাল, অবরোধ দিয়ে মানুষের জীবন ধ্বংস করা, খুন করা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ না করলে কীভাবে করতে হয় তা আওয়ামী লীগের জানা আছে। শক্ত হাতে সন্ত্রাসী কাজ বন্ধ করা হবে।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নির্বাচন বানচাল করতে ব্যর্থ হয়েছেন বলে মন্তব্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক হয়েছে এবার ক্ষান্ত দেন।’ তিনি বলেন, ‘নির্বাচনে আসেননি, ভুল করেছেন। ভুলের খেসারত আপনাকেই দিতে হবে।’ তিনি বলেন, মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে  যত কঠোর হওয়া দরকার, সরকার তত কঠোর হবে।

আজ শুক্রবার রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে আয়োজিত জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। বক্তব্যের শুরুতে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সময়কার বিভিন্ন কথা তিনি তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলব। সোনার বাংলা করাই আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার।’ তবে তাঁর বক্তব্যের বেশির ভাগ অংশ জুড়েই ছিল বিরোধী দলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনা। হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতা বন্ধের জন্য খালেদা জিয়ার প্রতি বারবার আহ্বান জানান তিনি।

নির্বাচনে না আসার জন্য ধন্যবাদ

শেখ হাসিনা বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ তিনি নির্বাচনে আসেননি। তিনি নির্বাচনে আসেননি, কারণ যুদ্ধাপরাধের দল জামায়াত আসতে পারেনি। ভালোই হলো, বাংলাদেশের মানুষকে যুদ্ধাপরাধীদের দলকে ভোট দিতে হয়নি। বিএনপি নেত্রীকে অনুরোধ করব, লাদেনের মতো ভিডিও দিয়ে, কর্মসূচি ঘোষণা করে দেশের মানুষকে যেন আর কষ্ট না দেন।’

ভোটারদের ধন্যবাদ

নির্বাচনে ৪০ শতাংশ ভোট পড়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবাইকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, বিরোধী দল নির্বাচনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সফল হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমি কৃতজ্ঞতা জানাই আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনকে।’ একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করায় তিনি নির্বাচন কমিশনকেও ধন্যবাদ জানান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ, র্যাব, আনসার-ভিডিপি, সেনাবাহিনী বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখায় তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

১২ তারিখ সরকার গঠন

শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতির কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে পরামর্শ দিয়েছেন সরকার গঠন করার জন্য। এজন্য আগামী ১২ জানুয়ারি সরকার গঠনের জন্য শপথ গ্রহণ করব।’

শক্ত হাতে সন্ত্রাসী কাজ বন্ধ করব

বিএনপির নেতা খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেক হয়েছে, এবার ক্ষান্ত দেন। বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতি না করার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। উন্নতি অবশ্যই হবে। সঙ্গে রাজাকার আর যুদ্ধাপরাধী নিয়ে বিএনপির ক্ষমতা নেই যে সেটা বন্ধ করবে।’ তিনি বলেন,  মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যত কঠোর হওয়া দরকার, সরকার তত কঠোর হবে। শক্ত হাতে সন্ত্রাসী কাজ বন্ধ করা হবে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘লাদেনের মতো ভিডিওবার্তা দিয়ে আন্দোলনে নেমে দেশের মানুষকে কষ্ট যেন তিনি না দেন, সেটাই তাঁর কাছে অনুরোধ। কেউ যদি স্বাভাবিক জীবনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার চেষ্টা করে, তাহলে আমরা তা প্রতিহত করব। শক্ত হাতে সন্ত্রাসী কাজ বন্ধ করা হবে।’

জবাব দিতে হবে সংখ্যালঘুদের কেন হত্যা করা হচ্ছে

খালেদা জিয়ার প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষ আর কত ধ্বংসযজ্ঞ সহ্য করবে?  তিনি বলেন, ‘জবাব দিতে হবে, কেন সংখ্যালঘুদের হত্যা করা হচ্ছে?’ ২০০১ সালের নির্বাচনের পরও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছে, উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, সে সময় আমরা বিরোধী দলে ছিলাম। কিন্তু এখন জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আছি। শক্ত হাতে এসব বন্ধ করা হবে। দায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।’

কষ্টের দিন থাকবে না

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে ছেলে-মেয়েরা স্কুল যেতে পারছে না। হরতাল-অবরোধের কারণে দিনের পর দিন স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়েছে। এ কষ্টের দিন আর বেশি দিন থাকবে না। আবার মানুষ স্কুলে যেতে পারবে। নিয়মিত কাজকর্ম করতে পারবে। কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারবে না। কেউ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করলে শক্ত হাতে প্রতিহত করব। বাংলার জনগণের জীবন নিয়ে কেউ ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। এজন্য আমি বাংলাদেশের মানুষের কাছে সহযোগিতা চাই।’

অশান্তি বেগমের আক্রমণের শিকার থেকে কেউ রেহাই পায়নি

বিএনপির নেতার উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মনে শান্তি এলেও একজনের মনে কোনো শান্তি ছিল না। আমাদের বিএনপির নেত্রীর মনে শান্তি ছিল না। বাংলাদেশের মানুষ যখন শান্তিতে থাকেন, উনি তখন অশান্তিতে ভোগেন। আর উনার সেই অশান্তির আগুন ছড়িয়ে দেন সারা বাংলাদেশে। আবার শুরু করেন তিনি আন্দোলনের নামে খুন খারাবি, জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড। উনার আন্দোলন মানে কী? উনি জনগণকে ডাক দেন। উনার ডাকে কেউ সাড়া দেয় না।’ তিনি বলেন, ‘বোমা হামলা করে বাস আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা শুরু করেন। সিএনজিতে ড্রাইভার যাত্রীসহ পুড়িয়ে মারেন। নিরীহ গরু। ট্রাকে গরু যাচ্ছে। সেই গরুগুলো ওই অশান্তি বেগমের আক্রমণের শিকার থেকে রেহাই পায়নি।’ তিনি বলেন, ‘রিকশাওয়ালা, গাড়িচালক কেউ রেহাই পায়নি। বারবার আলোচনার ডাক দেওয়া হলেও তিনি সাড়া দেননি। আলটিমেটাম দিয়েছেন।’

তিনি যা গালি দেবেন তাই আশীর্বাদ হয়ে আসবে

শেখ হাসিনা বলেন, ‘২০০৬ সালে বিএনপির নেত্রী বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ ১০০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। এমনকি বিরোধী দলও হতে পারবে না। উনি যখন যা বলেন সেটা আওয়ামী লীগের বেলায় প্রযোজ্য না হলেও, ফলে যায় ওনার বেলায়।’ ‘তিনি যা গালি দেবেন, তা-ই আশীর্বাদ হয়ে আসবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যের শুরুতে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসের ভাষণের কথা উল্লেখ করে বলেন, একটি দেশ কীভাবে চলবে সেটা ১০ জানুয়ারি এই ময়দানে বঙ্গবন্ধু বলে গিয়েছেন। একটি দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি কীভাবে চলবে, সেটাও তিনি ওই ভাষণে বলেছেন। তাই এ দিনটি আজ গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের অবস্থা তুলে ধরেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ১৯৯৬-২০০১ বাংলাদেশের জন্য স্বর্ণযুগ। ওই সময় বিশ্বসভায় বাংলাদেশ সম্মান পায়। ২০০১-২০০৬ আবার চলে অত্যাচার নির্যাতন। বাংলাদেশে ৭১-এর মতো নির্যাতন করা হয়। ছোট্ট ৬ বছরের শিশু ফাহিমা, পূর্ণিমা ধর্ষণের শিকার হয়। কারণ তাদের বাবা-মা নৌকায় ভোট দিয়েছিল। এরপর ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসে বাংলাদেশকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের হাত থেকে মুক্ত করে আওয়ামী লীগ। সফলতা অর্জন করে। বাংলার মানুষের মনে তখন শান্তি ছিল। কিন্তু একজনের মনে শান্তি ছিল না। তিনি জনতার কাছে জানতে চান, ‘কার মনে শান্তি ছিল না?’ সমস্বরে সবাই জবাব দেয়, ‘খালেদা জিয়া’।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুল লতিফ সিদ্দিক, মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ প্রমুখ।

‘অনেক হয়েছে এবার ক্ষান্ত দেন’- কীভাবে সন্ত্রাস বন্ধ করতে হয় জানা আছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেছেন, হরতাল, অবরোধ দিয়ে মানুষের জীবন ধ্বংস করা, খুন করা বন্ধ করতে হবে। বন্ধ না করলে কীভাবে করতে হয় তা আওয়ামী লীগের জানা আছে। শক্ত হাতে সন্ত্রাসী কাজ বন্ধ করা হবে।

মিস ওয়ার্ল্ড হতে চায় লিঙ্গান্তরকারী বাংলাদেশী

“আমি সুন্দরী নারী এবং এজন্য মানুষের উচিত আমাকে সম্মান করা। মিস ওয়ার্ল্ড হওয়া আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি। বড় হওয়ার সময়েই আমার সবসময় মনে হতো আমি ভুল শরীরের ফাঁদে পড়েছি, তাই লিঙ্গান্তর করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
সৃষ্টিকর্তা ও নিজের ওপর আমার বিশ্বাস আছে। আমার মন যা চায় আমি তাই করতে পারি।”- সম্প্রতি দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন লিঙ্গান্তর করা ২৩ বছর বয়সী গ্ল্যামার মডেল অ্যামেলিয়া মালতেপে।

বাংলাদেশের এক রক্ষণশীল মুসলমান পরিবারে জন্ম অ্যামেলিয়া মালতেপের। তার আগের নাম আদেশ। ২০০৯ সালে পড়াশুনার জন্য কানাডার টরেন্টোতে যান অ্যামেলিয়া। মডেলিংয়ের পাশাপাশি বর্তমানে বিজনেস অ্যাকাউন্টিং নিয়ে পড়ছেন। 

ছোটবেলা থেকেই সুন্দর চোখের অধিকারী অ্যামেলিয়া। তিনি জানান, তার চোখই তার সামনে লিঙ্গান্তরিত হওয়ার সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়।  লিঙ্গান্তর করার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে অ্যামেলিয়া বলেন, “এটা ছিল আমার জন্য অসাধারণ একটা মুহূর্ত। আমার মনে হয়েছে আমি যা ছিলাম শেষ পর্যন্ত তাই হতে সক্ষম হয়েছি।”

অ্যামেলিয়া মেয়েদের মতো চুল পাওয়ার জন্য ২০০০ পাউন্ড ব্যয় করেছেন। হরমোন পরিবর্তন করে লিঙ্গান্তর করার দুই মাস পর অ্যামেলিয়ার শরীরে স্তন প্রতিস্থাপন করা হয়। এতে অ্যামেলিয়ার ব্যয় হয়েছে ৬০০০ পাউন্ড। 

ভবিষ্যতে মডেলিংয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চান অ্যামেলিয়া। এরইমধ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের হয়ে মডেলিংও করেছেন তিনি। লিঙ্গান্তর করা কানাডিয়ান মডেল জেনা টালাকোভাকে নিজের অনুপ্রেরণা মনে করেন অ্যামেলিয়া। লিঙ্গান্তর করে সাধারণত সুন্দরী প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া যায় না।

এ নিয়মের বিরুদ্ধে গত কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করছিলেন জেনা। বর্তমানে কানাডায় লিঙ্গান্তরকারীদের মিস ওয়ার্ল্ডে প্রতিযোগিতা করার অনুমতি দেয়া হয়েছে। কানাডার স্থানীয় পত্রিকা টরেন্টো সান এ অ্যামেলিয়ার মডেলিংয়ের ছবি প্রকাশ হওয়ার পর তাকে নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। এজন্য তার বিরুদ্ধে মামলা করারও প্রস্তুতি নিয়েছিলেন কয়েকজন রাগান্বিত পাঠক।  

বর্তমানে প্রেমিক চার্লস ডোবাকের সঙ্গে বসবাস করছেন অ্যামেলিয়া। ২৭ বছর বয়সী চার্লস অ্যামেলিয়ার ব্যক্তিগত প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। সূত্র: হাফিংটন পোস্ট।

মিস ওয়ার্ল্ড হতে চায় লিঙ্গান্তরকারী বাংলাদেশী

“আমি সুন্দরী নারী এবং এজন্য মানুষের উচিত আমাকে সম্মান করা। মিস ওয়ার্ল্ড হওয়া আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্নগুলোর একটি। বড় হওয়ার সময়েই আমার সবসময় মনে হতো আমি ভুল শরীরের ফাঁদে পড়েছি, তাই লিঙ্গান্তর করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

'আজীবন বার্সাতেই থাকতে চাই'

৫৯ দিন পর বার্সার জার্সি গায়ে মাঠে ফিরেই জোড়া গোল করলেন মেসি
গোল ডটকম শিরোনামই করেছে, 'মেসির হলিউডি কামব্যাক'। কোচ জেরার্ডো মার্টিনোর মুখের কথা কেড়ে নিলেও গোল ডটকমের কথাটা খুবই যুক্তিযুক্ত। প্রায় দু'মাস পর মাঠে ফিরেই মাত্র ২৬ মিনিটের ঝড়ে শুধু গেটাফের জালে দু'বার বলই জড়ালেন না, কেড়ে নিলেন সবার হৃদয়ও। ৬৪ মিনিটে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার পরিবর্তে মাঠে নামার পর মেসি যা দেখালেন, এরপর শুধু তার মুখেই মানায়_ 'বার্সাতেই কাটিয়ে দিতে চাই পুরো ক্যারিয়ার।' সতীর্থ কার্লোস পুয়োল আরেকটু এগিয়ে। বললেন, 'কীভাবে খেলতে হয়, সেটা মেসি কখনোই ভুলে যান না।' শুধু ক্লাবই নয়, জাতীয় দলেও যিনি সতীর্থ, সেই হ্যাভিয়ের মাচেরানো স্যালুটই দিয়ে বসলেন মেসিকে। বার্সার আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডকে ছাড়া যেন ন্যু ক্যাম্প পুরোটাই অনুজ্জ্বল। গত দু'মাসে সেটাই প্রমাণ হয়েছে। অথচ, তাকেই কেনার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (পিএসজি)। মেসির বাই আউট ক্লজের (২৫০ মিলিয়ন ইউরো) পুরোটাই দিতে প্রস্তুত আরবীয় পেট্রো ডলারে ফুলে-ফেঁপে ওঠা ক্লাবটি। পিএসজির প্রস্তাব নিয়ে আবার আলোচনাও হচ্ছে নানা পর্যায়ে। এমনকি নিউইয়র্কভিত্তিক একটি অনলাইন খবর প্রকাশ করেছে, 'বার্সাও চিন্তাভাবনা করছে এ প্রস্তাব নিয়ে।' শুধু তাই নয়, পারিশ্রমিক বাড়ানো ও চুক্তি নবায়ন নিয়ে বার্সার সহ-সভাপতি হ্যাভিয়ের ফাউসের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার পর অনেকেই মনে করছেন, মেসিকে বিক্রির ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে থাকতে পারে বার্সা। এতসব গুঞ্জন যখন ডালপালা মেলছিল আকাশে, ঠিক তখনই মেসি জানিয়ে দিলেন, 'অন্য কোথাও নয়, আমি আজীবনই থাকতে চাই বার্সেলোনায়।' স্প্যানিশ দৈনিক এএসকে তিনি বলেন, 'এখানেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং এখানে থেকেই ক্যারিয়ার শেষ করতে চাই আমি।' হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে ৫৯ দিন পর মাঠে ফিরেছেন আর্জেন্টাইন এ তারকা। মেসি বলেন, 'আমি সব সময়ই মুখিয়ে ছিলাম দলে ফেরার জন্য। দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলাম। ইনজুরি থেকে ফিরে অনুশীলনে নিজেকে ফিট মনে হওয়াতেই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজেকে সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। মাঠের বাইরে থাকলে অনেক কিছুই বদলে যেতে চায়। তবে শারীরিকভাবে আমি সুস্থ, হ্যামস্ট্রিংয়েও কোনো ব্যথা অনুভব করছি না। শারীরিকভাবেই এখন আমি পরিশ্রম করতে পারি এবং সেটা বেশ উপভোগও করছি।' অ্যাথলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে খেলা নিয়ে মেসি বলেন, 'অ্যাথলেটিকোর বিপক্ষে খেলার ইচ্ছা আছে। তবে এ নিয়ে কোচ ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলব। সবকিছুর ওপর ইনজুরি। আমি খেলতে চাই এবং তা যাতে বন্ধ হয়ে না যায় সে বিষয়টাই চিন্তা করছি।' একই সঙ্গে চারবারের ফিফা বর্ষসেরা এই ফুটবলারের ইচ্ছা, ইনজুরিমুক্ত থেকে ২০১৪ সালটা শেষ করা এবং আগামী জুনে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে নিজেকে পুরোপুরি মেলে ধরা। জুরিখে ফিফা ব্যালন ডি'অর অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন বলেও জানিয়েছেন মেসি। তিনি বলেন, 'আমি অবশ্যই ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকব। ব্যালন ডি'অরের তিনজনের মধ্যে থাকতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে হচ্ছে।'

আদালতে হাজিরা দিলেন জারদারি

অর্থ পাচার ও দুর্নীতি মামলায় পাকিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারি গতকাল আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। ১৯৯০ সালে দায়ের করা ওই মামলায় তার বিরুদ্ধে অর্থপাচার ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে রাষ্ট্রীয় খরচে একটি পোলো খেলার মাঠ তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট থাকাকালে জারদারি মামলা থেকে ক্ষমা পেয়েছিলেন; কিন্তু প্রেসিডেন্ট হিসেবে পাঁচ বছরের দায়িত্ব শেষে অব্যাহতি পাওয়ার পর তার বিরুদ্ধে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত করা হয়েছে। গতকাল সংক্ষিপ্ত শুনানি শেষে ১৮ জানুয়ারি পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়। জারদারির আইনজীবী আমজাদ ইকবাল কোরেশি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্টের বিপক্ষে যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা অস্পষ্ট। তিনি যে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনের সামনে পোলো মাঠ তৈরি করেছিলেন, তার কোনো প্রমাণ নেই। অন্যান্য মামলার মতো সাবেক প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে দায়ের করা এ মামলাটিও শেষ পর্যন্ত খারিজ হয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে আদালতে হাজির হলে তার দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির কিছু সমর্থক জারদারির পক্ষে স্লোগান দিতে থাকেন। তারা প্ল্যাকার্ড নাড়িয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। পাকিস্তানে এখন দুই সাবেক প্রেসিডেন্টের বিচার চলছে। আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের বিচার অবশ্য তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ব্যাপারে আপাতত মুলতবি রয়েছে। তবে জারদারির আইনজীবীরা দুটি বিচারকে একই মাপের বলে মনে করছেন না। জারদারির মুখপাত্র ফারহাত উল্লাহ বাবর বলেছেন, 'দুটির মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। জারদারি একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ছিলেন।'
তার বিচারের সঙ্গে একজন সাবেক একনায়কের বিরুদ্ধে তোলা দেশদ্রোহিতার অভিযোগকে একই সারিতে ফেলা উচিত হবে না।'

ইরানের প্রতি মার্কিন বিদ্বেষ স্পষ্ট :খামেনি

পরমাণু আলোচনায় ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্বেষের বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। গতকাল বৃহস্পতিবার জেনেভায় পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরানের সঙ্গে ছয় পরাশক্তির বৈঠক শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে এ মন্তব্য করেন তিনি। এদিকে, গতকালই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন পরমাণু আলোচনা ও সিরিয়া ইস্যুতে ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে কথা বলেছেন। খবর :এএফপি ও রয়টার্স। তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে গত বছরের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো একটি চুক্তিতে উপনীত হয় ইরান ও ছয় পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি। ছয় মাসের অন্তর্বর্তী ওই চুক্তি অনুযায়ী তেহরান তার পরমাণু কর্মসূচির আংশিক স্থগিত করবে। বিনিময়ে দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব। এ সময়ের মধ্যে চুক্তিটি পূর্ণাঙ্গ করার কাজ সম্পন্ন করারও কথা রয়েছে। গতকাল সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় ওই চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য নতুন করে আলোচনা শুরু করে উভয়পক্ষ। গত ২৪ নভেম্বর দু'পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি বাস্তবায়নের পথে অবশিষ্ট বিষয়গুলোর নিষ্পত্তিই এ বৈঠকের প্রধান উদ্দেশ্য। আলোচনায় ইতিবাচক ফল আসবে বলে আশাবাদী ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধান আলোচক জাভেদ জারিফ। ইরানের মেহের বার্তা সংস্থা জানায়, জারিফ গতকাল নিজের ফেসবুক পাতায় একটি লেখায় জেনেভায় নতুন দফার আলোচনা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এদিকে, জেনেভায় উভয়পক্ষের বৈঠকটি শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লা আলি খামেনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী হিসেবে অভিহিত করেন। ইরানে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, 'পরমাণু আলোচনায় ইরান, ইরানি জনগণ, ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের শত্রুতা ও বিদ্বেষ প্রকাশ হয়ে পড়েছে।'

গণজাগরণ মঞ্চের মালোপাড়া লংমার্চ শুরু আজ

সাম্প্রদায়িক হামলায় জড়িতদের শাস্তি ও আক্রান্তদের ক্ষতিপূরণসহ তিন দফা দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের দুই দিনের রোডমার্চ শুরু হচ্ছে আজ। সকাল সাড়ে ৭টায় শাহবাগ থেকে যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়ার উদ্দেশে এই রোডমার্চে রওনা হবেন মঞ্চের সংগঠক ও নেতাকর্মীরা। রোডমার্চের সময় চলতি পথে ছয়টি পথসভা, সমাবেশ ও জনসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল বিকেলে শাহবাগে এক সংবাদ সম্মেলনে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে আজ সকাল ৭টায় শাহবাগ প্রজন্ম চত্বরে জমায়েত, সাড়ে ৭টায় রোডমার্চ শুরু, ১০টায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেইরি গেটে পথসভা, সকাল ১১টায় মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে পথসভা, দুপুর ১টায় ফেরিঘাটে জুমার নামাজের বিরতি, বিকেল ৩টায় ফরিদপুর শহরের জনতা ব্যাংক মোড়ে সমাবেশ, বিকেল ৪টায় মধুখালীতে মধুবন মার্কেটের সামনে পথসভা, বিকেল ৫টায় মাগুরার খানপাড়া বটতলায় পথসভা এবং সন্ধ্যা ৭টায় যশোর শহরে পেঁৗছে প্রথম দিনের রোডমার্চের মুলতবি ও রাত্রিযাপন।
পরদিন সকাল ৮টায় যশোর শহর থেকে অভয়নগর উপজেলার মালোপাড়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু হবে। সেখানে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মালোপাড়ার আক্রান্ত এলাকা পরিদর্শন, আক্রান্ত মানুষদের সঙ্গে মতবিনিময় ও সহমর্মিতা জ্ঞাপন, সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস রোধে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে স্থানীয় জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধকরণ, দুর্গত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ। বিকেল ৩টায় যশোরের চিত্রা মোড়ে অনুষ্ঠিত হবে জনসমাবেশ। গণজাগরণ মঞ্চের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে_ ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন রোধে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে আলাদা আইন প্রণয়ন; সাম্প্রতিক প্রতিটি নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার এবং সারাদেশে আক্রান্ত পরিবারগুলোর ক্ষতি নিরূপণ করে তা পূরণের ব্যবস্থা করা। সংবাদ সম্মেলনে ইমরান এইচ সরকার বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস ও হুমকিতে দেশের হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বাস করছেন। এ অবস্থায় আমরা আবারও সাম্প্র্রদায়িক সন্ত্রাস প্রতিরোধে সরকারের দৃষ্টিগ্রাহ্য শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছি।

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশকে চাপ দিন

নিউইয়র্কভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'হিউম্যান রাইটস ওয়াচ' (এইচআরডবি্লউ) বাংলাদেশে নির্বিচারে 'গণগ্রেফতার' বন্ধ এবং বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে চাপ সৃষ্টির জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। বুধবার সংস্থাটির এক বিবৃতিতে এ আহ্বান জানানো হয়। সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, 'চলমান রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে বাংলাদেশের সব পক্ষকে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। পাশাপাশি দেশটিকে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপ প্রয়োগ করতে হবে'।
বিবৃতিতে 'গণগ্রেফতার' বন্ধ করে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ, সভা-সমাবেশ-সেমিনার এবং মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ব্যাপারেও বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষকে চাপ দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। বিবৃতিতে ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, 'ক্ষমতাসীন দল বলে আসছে, তারা বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনাকে স্বাগত জানায়; কিন্তু নির্বিচারে গ্রেফতার অভিযান চলা অবস্থায় তাদের এ বক্তব্য গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে।' ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক দেশ ও সংস্থা পর্যবেক্ষক পাঠায়নি উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন শত শত নেতাকর্মী ও সদস্যকে নির্বাচনের আগেই গ্রেফতার করা হয়। বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কার্যত গৃহবন্দি করে রাখা হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে চলে যান।
ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, 'এই নির্বিচার গ্রেফতার সমালোচকদের দুর্বল, সীমিত মতপ্রকাশ এবং ক্ষমতাসীন দলের শক্তি পাকাপোক্ত করার পরিকল্পনার অংশ। যদিও কিছু ক্ষেত্রে সরকার যৌক্তিকভাবেই বিরোধীদের সহিংসতা বন্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে।'
বিবৃতিতে বলা হয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোত বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় কমপক্ষে ১৫০ জন প্রাণ হারিয়েছেন, যার অধিকাংশের জন্যই দায়ী বিরোধীরা। এতে বলা হয়, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীরা সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে অভিযোগ করা হয়। হিন্দুরা ঐতিহ্যগতভাবে আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে থাকে।

মানবিক প্রেমবোধ ও সহমর্মিতা

মানুষের মধ্যে পূর্ণমাত্রায় জ্ঞান, বুদ্ধি-বিবেক ও চেতনা দেওয়া হয়েছে, যাতে মহান স্রষ্টাকে চিনতে পারে, ন্যায়ের পথে চলতে পারে এবং জগতে দুষ্কর্মের পরিণতি ও ফলাফল উপলব্ধি করতে পারে। সব ধরনের অনিষ্ট, অকল্যাণ, মন্দ কাজ ও মিথ্যাচার থেকে দূরে থাকে, আর সত্য-সুন্দর ও জনকল্যাণকর কাজকে গ্রহণ করতে পারে। এ জন্যই মানুষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের মানসিকতা ও মানবিক প্রেমবোধ দেওয়া হয়েছে। যাতে মানুষ সবার সঙ্গে মিলেমিশে প্রেমের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপন করতে পারে। মানুষ যদি তার জ্ঞান-বুদ্ধি ও মানবতাবাদী দর্শন সহমর্মিতাকে কাজে না লাগায়, তবে সে চতুষ্পদ জন্তুর চেয়েও অধম, মানুষ নামের কলঙ্ক! পক্ষান্তরে, মানুষ বিভিন্ন জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র এবং বিশ্বাসে যতই বিভক্ত থাকুক না কেন, আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন, ‘আমি তো আদম সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি,
স্থলে ও সমুদ্রে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি, তাদের উত্তম রিজিক দিয়েছি এবং আমি যাদের সৃষ্টি করেছি, তাদের অনেকের ওপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।’ (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ৭০) মানবজাতিকে সম্মানিত করে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। যে বা যারা বিপথগামী রয়েছে, তাদের ভ্রান্তনীতি, আদর্শ, শিক্ষা অনুসরণ বা অনুকরণ নয়, বরং তাদের শান্তির ধর্ম ইসলামের পথে চলার আহ্বান জানিয়ে কাউকে ঘৃণা, অবহেলা ও অবজ্ঞা করা চলবে না। সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে সম্মান ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে, সে যে পথের বা দলমতের হোক না কেন? এ জন্য যে, দুনিয়ার সব মানুষই পরস্পর ভাই ভাই। তাদের কাজ করতে হবে দেশের শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য, অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়। ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড দেশের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না। তাই মানুষে মানুষে হূদ্যতা ও সৌহার্দ্য স্থাপনের মাধ্যমে একটি শান্তি ও সমৃদ্ধির পৃথিবী গড়ার তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।’ (সূরা আল-কাসাস, আয়াত: ৭৭) প্রেমহীন সমাজে শান্তি অশান্তিতে, ন্যায় অন্যায়ে, নীতি দুর্নীতিতে রূপ নেয়। বিভিন্ন সংগঠন ও দলমতের পারস্পরিক স্বার্থপরতা-শত্রুতা, সন্দেহ-অবিশ্বাস, হিংসা-বিদ্বেষ, যুদ্ধবিগ্রহ, কলহ-বিবাদ, সন্ত্রাস-সহিংসতা, অস্থিরতা-হানাহানি, ঘুষ-দুর্নীতি—এসব মানবপ্রেমের উল্টো ধারার ফল। মানুষ নিজের কায়েমি স্বার্থসিদ্ধির জন্য কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করেছে নানা বৈষম্যের।
এক ব্যক্তি অন্য ব্যক্তিকে, এক জাতি অন্য জাতিকে, এক ধর্মাবলম্বী ভিন্ন ধর্মের অনুসারীকে পরাভূত করতে এবং দাবিয়ে রাখতে চালু করেছে বর্ণ, গোত্র ও শ্রেণীবৈষম্যের। যে যখনই সুযোগ পেয়েছে, তখনই অন্য দলমতকে দমানোর জন্য অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে। কীভাবে তাকে নিচু করা যায়, তার বিভিন্ন কৌশল বের করেছে। এভাবেই সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে মানুষের মধ্যে চলে আসছে বৈষম্যমূলক আচরণ। বিশেষ করে বর্ণবৈষম্য যুগ যুগ ধরে মানুষে মানুষে সৃষ্টি করেছে সুস্পষ্ট বিভেদ, ফলে জন্ম নিয়েছে অনেক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের। অথচ পবিত্র কোরআনে মানুষকে সাবধান করা হয়েছে, ‘নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হয়ে যাবে।’ (সূরা আল-আনফাল, আয়াত: ৪৬) বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে কালে কালে যুগে যুগে বিরোধ, সংঘাত-সংঘর্ষ, এমনকি যুদ্ধবিগ্রহে নিরপরাধ মানুষের জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়েছে। এভাবে ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের মহাসংকটে ভুগছে পৃথিবী। দয়া-মায়া নেই জনমনে, মানবপ্রেম নেই মনুষ্যসমাজে! জনগণের প্রতি নির্দয় হওয়া, কষ্ট দেওয়া, অবহেলা করা, নিরীহ মানুষকে জুলুম-নির্যাতন ও হত্যা করার নাম সেবা নয়। মানবকুলের সঙ্গে মনুষ্যরূপী পশুরা জ্বালাও-পোড়াও, যাত্রীবাহী যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, পেট্রলবোমা হামলা এবং নাশকতা চালানোর মাধ্যমে অমানবিক ও পাশবিক আচরণ করেই চলেছে। অথচ আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন সৎ কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমে মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য; ব্যক্তিস্বার্থে মজে পশুর মতো স্বার্থপর জীবনযাপনের জন্য নয়। যেমনিভাবে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটেছে।’ (সূরা আল ইমরান, আয়াত: ১১০)
মানুষের ধন-সম্পদ, বিদ্যা-বুদ্ধি, ক্ষমতা, বংশ, রূপলাবণ্য আল্লাহ দেখেন না, দেখেন কোন মানবপ্রেমী বান্দা তার সাধ্যানুযায়ী জনসেবা ও মানবের কল্যাণে কাজ করছে। তাই হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান—প্রত্যেক মানুষেরই পারস্পরিক মানবতাবোধ ও উদার নৈতিক মানসিকতা থাকা অপরিহার্য। মানুষের মধ্যে যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রতি প্রেম-ভালোবাসা, মায়া-মহব্বত না থাকে, তাহলে কেয়ামতের কঠিন দিবসে আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার সুশীতল ছায়া থেকে তারা বঞ্চিত হবে। এ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা মানুষের ওপর দয়া করে না, আল্লাহ তাদের ওপর দয়া করেন না।’ (বুখারি ও মুসলিম) সুতরাং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সারা বিশ্বের মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, প্রেম-প্রীতি সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা উচিত। তাই আসুন, আমরা সচেষ্ট হই, যেন আল্লাহর বান্দা হিসেবে দলমতের ঊর্ধ্বে সব মানুষকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে পারি, শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে পারি! বিপদে-আপদে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিই এবং পৃথিবীর কোনো মানুষকে অবহেলা বা অবজ্ঞা না করি! কোনো ধর্ম, জাত, কুল, বংশ নয়; মানুষ নামের ব্যক্তিটিকে যেন হূদয় নিংড়ানো ভালোবাসা দিয়ে সাহায্য-সহযোগিতা, জনসেবা ও সহানুভূতিতে এগিয়ে আসতে সমর্থ হই!
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক, গবেষক ও কলাম লেখক।
dr.munimkhan@yahoo.com