Thursday, March 19, 2020

মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙলে কী করবেন by ডা: মিজানুর রহমান কল্লোল

মেরুদণ্ডের হাড় ভাঙলে তা রোগীর জন্য বিপদের কারণ হয়, কেননা মেরুদণ্ডের ভেতরে থাকে স্পাইনাল কর্ড- যেকোনো সময় ক্ষতবিক্ষত হতে পারে। যদি স্পাইনাল কর্ড বা স্নায়ুরজ্জু আক্রান্ত হয়, তাহলে রোগীর শরীরের নিম্নভাগ অসাড় হয়ে যায়। তাই মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীকে সর্বাধিক সতর্কতার সাথে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে হবে। রোগীর মেরুদণ্ড ভেঙেছে সন্দেহ হলে কী করবেন?
*যতদূর সম্ভব রোগীকে কম নড়াচড়া করাতে হবে। তাকে এমনভাবে তুলতে হবে যেন আহত কশেরুকা বেঁকে, মুচড়ে বা জায়গা থেকে সরে না যায়।
*শোয়ানো অবস্থাতেই পরীক্ষা করতে হবে তার হাতের আঙুল, কব্জি, হাঁটু বা পায়ের পাতা নাড়াতে পারছে কি না। যদি নাড়াতে পারে বুঝতে হবে রোগীর অবস্থা কম ঝুঁকিপূর্ণ, আর মোটেই নাড়াতে না পারলে বুঝতে হবে তার অবস্থা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
*রোগীকে শোয়ানোর সময় এমনভাবে শোয়াতে হবে যে ভঙ্গিতে শুলে রোগী আরামবোধ করে। তবে সাধারণত চিত করে শোয়ালে রোগী স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে বেশি এবং হাড় নিরাপদে থাকে।
*রোগীকে কোনোভাবেই নড়াচড়া কিংবা বসানো চলবে না। এমনকি উপুড় করাও নিষেধ।
*রোগীকে শোয়ানোর সময় একাধিক ব্যক্তির সাহায্য নিতে হবে যাতে রোগীর নিজ থেকে শারীরিক চাপ প্রয়োগ করতে না হয়।
*রোগীর ঘাড় যাতে বেঁকে না যায় সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে।
*রোগীর বুক, কোমর, মাথা এবং ঘাড়ের দুই পাশে বালিশ বা কম্বল রাখুন রাতে সে তার এসব অঙ্গ নাড়াতে পারে।
*রোগী যাতে ঠিকমতো শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারে সেদিক খেয়াল রাখুন।
*অতঃপর রোগীকে স্ট্রেচার কিংবা সমান্তরাল কাঠের তক্তায় উঠিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। এ সময় তার যাতে ঝাকি না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
*স্ট্রেচার বা কাঠের তক্তা পাওয়া না গেলে চারজন লোক ধরাধরি করে রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। একজন রোগীর মাথার নিচে, দ্বিতীয়জন রোগীর কাঁধের হাড়ের নিচে, তৃতীয়জন রোগীর নিতম্বের নিচে ও চতুর্থজন রোগীর হাঁটু ও পায়ের নিচে হাত রেখে রোগীকে সমান্তরাল রাখতে হবে যাতে রোগীর মেরুদণ্ড বেঁকে না যায়।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমা বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল। চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লি:, ২, ইংলিশ রোড, ঢাকা। ফোন: ০১৭২২৯১৬৪৭৯ (সঞ্জয়)

ঐতিহাসিক তাজহাট জমিদার বাড়ির ভেতর-বাহির by নাকিবুল আহসান নিশাদ

তাজহাট জমিদার বাড়ি
বাংলায় জমিদার প্রথা বা জমিদারিত্ব বিলীন হয়েছে অনেক আগেই। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রাচীন স্থাপত্য বাংলার বুকে ঠিকই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে উত্তরবঙ্গের তাজহাট জমিদার বাড়ি অন্যতম। রংপুর শহর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই স্থাপনা দেখতে প্রতিদিন দেশ-বিদেশের পর্যটকদের উপস্থিতি দেখা যায়।
প্রাচীন রঙ্গপুরের ইতিহাস পুস্তক থেকে জানা যায়, তাজহাট জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা রত্ন ব্যবসায়ী মান্নালাল রায়। হীরা, জহরত ও স্বর্ণ ব্যবসার জন্য রঙ্গপুরের মাহিগঞ্জে এসেছিলেন তিনি। প্রথমে বিভিন্ন ধরনের নামিদামি হীরা, মানিক, জহরতখচিত তাজ বা টুপির ব্যবসা ছিল তার। তাজ বিক্রির লক্ষ্যে এখানে হাট বসতো। তাজহাটকে কেন্দ্র করে এই জমিদার বাড়ির নামকরণ হয়। সাদা রঙের বিশাল প্রাসাদটি বেশ বড় জায়গা নিয়ে বিস্তৃত।
প্রাচীন মোগল স্থাপত্যের আদলে বানানো বাড়িটির মধ্যভাগে বিশাল একটি গম্বুজ। দু’পাশে ছড়িয়ে যাওয়া দালানগুলোর একটি মসজিদ আকৃতির। এটি প্রায় ২১০ ফুটের মতো প্রশস্ত ও চার তলার সমান উঁচু। প্রাসাদে মোট ৩১টি সিঁড়ি আছে। প্রতিটিই ইতালীয় ঘরানার মার্বেল পাথরে তৈরি।
সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেই চোখে পড়ে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ। এগুলোতে শোভা পাচ্ছে দশম ও একাদশ শতাব্দীর টেরাকোটা শিল্পকর্ম। এখানে রয়েছে সংস্কৃত ও আরবি ভাষায় লেখা বেশকিছু প্রাচীন পাণ্ডুলিপি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলের কোরআন, মহাভারত ও রামায়ণের মূল কপি। পেছনের ঘরে বেশকিছু কালো পাথর দিয়ে সাজানো হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর প্রতিকৃতি। কিন্তু জাদুঘরের ভেতরে ছবি তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

বাড়িটির চত্বরে রয়েছে বিশাল খালি মাঠ আর সারি সারি গাছ। বাড়ির দু’পাশে দুটি পুকুর। বাড়ির সামনে সুন্দর ফোয়ারার শ্বেতশুভ্র মার্বেল ও তার সবুজাভ নকশা কালের বিবর্তনে কিছুটা মলিন হলেও এখনও এর জৌলুস বোঝা যায়। কথিত আছে, রানির জন্য বিশেষভাবে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল।
রাজবাড়ির পেছনের অংশে রয়েছে গুপ্ত সিঁড়ি। জনশ্রুতি রয়েছে, এটি কোনও একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে যুক্ত যা সরাসরি ঘাঘট নদীর সঙ্গে যুক্ত। যদিও সিঁড়িটি নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তাজহাট জমিদার বাড়ি একটি ঐতিহাসিক প্রাসাদ। ১৯৮৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত রংপুর হাইকোর্ট ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি শাখা বা বেঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এই প্রাসাদ।
১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ তাজহাট জমিদার বাড়িকে একটি সংরক্ষিত স্থাপনা তথা স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করে। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনুধাবন করে ২০০৫ সালে রংপুর জাদুঘরকে সরিয়ে এই প্রাসাদের দোতলায় নিয়ে আসে। এটি এখন জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জাদুঘরে ঢুকতে লাগে নির্দিষ্ট প্রবেশমূল্য। গাড়ি নিয়ে ঢুকতে চাইলে আলাদা ফি দিতে হয়।
যেভাবে যাবেন
সড়ক পথে ঢাকা থেকে রংপুর রুটে চলাচল করে গ্রিন লাইন, টিআর ট্রাভেলস, আগমনী পরিবহন, এস আর, শ্যামলী, হানিফ, কেয়া ইত্যাদি পরিবহন। ঢাকার কল্যাণপুর ও গাবতলী থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে ছাড়ে এসব বাস।
কোথায় থাকবেন
রংপুরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের হোটেল রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোটেল শাহ আমানত, হোটেল গোল্ডেন টাওয়ার ও হোটেল দি পার্ক (জাহাজ কোম্পানির মোড়), হোটেল তিলোত্তমা (থানা রোড), হোটেল বিজয় ও আরডিআরএস (জেল রোড)।

ওষুধ ছাড়া রক্তচাপ কমানোর উপায়

উচ্চ রক্তচাপ গোটা বিশ্বেই একটি সাধারণ শারীরিক সমস্যা। যত্নশীল না হলে এই সমস্যার কারণে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। কিন্তু খুবই সাধারণ কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চললে সহজেই এই সমস্যা এড়ানো সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্রের মেয়োক্লিনিক মেডিকেল সেন্টারের ওয়েবসাইটে এমন কয়েকটি অভ্যাসের কথা তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। মানবজমিনের পাঠকের জন্য সেগুলো তুলে ধরা হলো-
ওজন কমান: মানুষের ওজন যত বাড়ে, উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও একই সঙ্গে বাড়তে থাকে। এর কারণে শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত সমস্যার পাশাপাশি ঘুমেরও ব্যাঘাত ঘটতে পারে। অথচ নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে খুব সহজেই মানুষ নিজের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকিও এড়িয়ে চলতে পারে।
নিয়মিত ব্যায়াম: নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম বা পরিশ্রমের কারণে রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকে।
প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে ১৫০ মিনিট ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের চেষ্টা করুন। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট শারীরিক পরিশ্রম উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা অনেকাংশেই কমিয়ে দেয়। 
স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ: চর্বিযুক্ত খাবার এড়িয়ে স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করুন। এমন খাবার গ্রহণ করুন, যেন  শরীর সব ধরনের পুষ্টি পরিমিতভাবে পায়।
লবণ কম খান: অধিক লবণ খাওয়া হার্টের জন্য ক্ষতিকর। দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় লবণের পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করুন। এতে আপনার হার্ট ভালো থাকবে। একই সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকলে তা কমে আসবে।
মদ্যপান কমান: অ্যালকোহল শরীরের জন্য ভালো ও খারাপ উভয়ই। পরিমিত অ্যালকোহল রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করে। কিন্তু একই অ্যালকোহল যখন অতিরিক্ত পরিমাণে গ্রহণ করা হয়, তা রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। এমনকি অনেক সময় অতিরিক্ত অ্যালকোহল শরীরের ওষুধের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
ধূমপান ত্যাগ করুন: প্রতিটি সিগারেট পরবর্তী কয়েক মিনিটের জন্য শরীরের রক্তপ্রবাহ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেয়। অধিক ধূমপান রক্তচাপকে ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। ধূমপান এড়িয়ে চলুন। এতে হার্ট ও রক্তচাপসহ সার্বিক স্বাস্থ্য স্বাভাবিক থাকে।
কফি কম খান: শরীরে কফির প্রভাব নিয়ে বিতর্ক আছে। অনিয়মিত কফি খাওয়ার ফলে রক্তচাপ অস্বাভাবিক বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু যারা নিয়মিত কফি খায়, তাদের রক্তচাপে কফি কোনো প্রভাব ফেলে না। তবে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়ার জন্য কফি কম খাওয়া ভালো।

করাচি: মৃত ভাস্কর্যের সমাজ by জাহরা নাকভি

কল্পনা করে দেখুন তো, তারুণ্যে ভরপুর রানী ভিক্টোরিয়া আপনার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন, আর তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন মুণ্ডুহীন একটি পুরুষের অবয়ব, অনুমান করা যায় যে তিনি হলেন প্রিন্স আলবার্ট? বিচারের অন্ধ দেবী হাত হারিয়ে স্থবির হয়ে গেছেন। আরেক ভদ্রলোকের মাথাটি গড়াগড়ি খাচ্ছে তার পায়ের কাছে। এমন দৃশ্য কোথায় দেখতে পাবেন? করাচিতে। কেএমসি (করাচি মেট্রোপলিটন কর্পোরেশন) গুদামঘর আপনাকে স্বাগত জানাবে মৃত ভাস্কর্যের সমাজে। করাচির পুরনো মহল্লায় আশ্চর্য এসব সামগ্রী থরে থরে সাজানো রয়েছে সবার অগোচরেই।
মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে একটি ভাস্কর্যের ভাঙ্গা মুন্ডু
এসব সামগ্রী দেশটির উপনিবেশ আমলের স্মারক। তবে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে পড়ে এগুলোর এমন অবস্থা হয়েছে। ভাস্কর্য হলো ইতিহাসের সত্যিকারের একটি অংশ। কিন্তু কুফুরি বিষয় হিসেবে আখ্যায়িত করে এগুলোকে মূল স্থান থেকে তুলে এনে এখানে রাখা হয়েছে।
দৃশ্যত আইয়ুব খানের আমলে মৌলবাদীরা এসব ভাস্কর্যের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। সৌদি বাদশাহ ফয়সালের আগমন আসন্ন হওয়ায় অনৈসলামিক এসব ভাস্কর্য নিশ্চিহ্ন হওয়ার মুখে পড়ে। পরিণতিতে এগুলোকে স্থাপনের স্থান থেকে সরিয়ে আনা হয়। এগুলোর ঠাঁই হয় লরেন্স রোডের এক গুদামঘরে। তবে ভাস্কর্যগুলোর আস্ত আসতে পারেনি, কারো হাত, কারো পা, কারো মুণ্ডু বিসর্জন দিতে হয়েছে।
নিজের চারপাশে অদ্ভুত পরিবেশ দেখছেন রানী ভিক্টোরিয়া, ছবি: আরিফ মাহমুদ
এই মূর্তিগুলোর সন্ধানেই আমার এখানে আসা। আমার উপস্থিতির সময় কেডব্লিউএসবি (করাচি ওয়াটার এন্ড স্যুয়েরেজ বোর্ড)-র কাজ করছিল পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা। এসব মূর্তির প্রতি আগ্রহ এসব লোক খুব একটা ভালো চোখে দেখেনি। যেখানে মূর্তিগুলো রাখা ছিল, সেখানে যাওয়ার পথ পাচ্ছিলাম না। তারাও বলতে পারছিল না। আমি একটি ঘরে নক করলে একজন বের হয়ে এলেন। যে লোকটি বের হয়ে এলেন, প্রথমে তাকে ইতস্তত করতে দেখা গেলেও তিনি একটি ব্যবস্থা করলেন। টেবিল আর চেয়ার পেতে উঁকি দিয়ে প্রাচীরঘেরা স্থানে রাখা ভাস্কর্যগুলো দেখার ব্যবস্থা করে দিলেন। প্রাচীরে দরজা বা অন্য কোনো ফাঁকা স্থান নেই, যেখান দিয়ে সেখানে সরাসরি যাওয়া যায়। আর এভাবেই দেখা হলো এক রোমান যোদ্ধা, একটি অ্যাঞ্জেল, এক ইংরেজ সিপাহিকে।
এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী বললেন, আমি এসব কোয়ার্টারে ১৫ বছর ধরে বাস করছি। শুরু থেকেই ভাস্কর্যগুলোকে এভাবেই দেখে আসছি।
দুর্দশাকবলিত কুমারীরা
ভাস্কর্যগুলোর প্রকৃত বয়স জানার উপায় নেই। তবে এগুলো নিয়ে টুকটাক যেসব লেখা হয়েছে, তাতে করে মনে হয়, এগুলো অন্তত ৮০ থেকে ৯০ বছরের পুরনো। ধারণা করা যেতে পারে রানী ভিক্টোরিয়া ও রোমান্টিক ইংরেজ রমনীর ভাস্কর্যটি পাশের ফ্রেয়ের হল থেকে আনা হয়েছে। এই হলটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮৭০-এর দশকে। ফলে ভাস্কর্যের বয়সও তেমন হবে অনুমান করা যেতে পারে। সম্ভবত স্থানীয় হিন্দু কারিগরেরাই এগুলো গড়েছিল। তারা এ ব্যাপারে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিল। এখন মুণ্ডুহীন অবস্থায় থাকা বিশাল অবয়বের প্রিন্স অ্যালবার্টের ভাস্কর্যটি একসময়ের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট ন্যাচারাল হিস্টরি মিউজিয়ামে ছিল।
মহাত্মা গান্ধী একসময় ছিলেন করাচি হাই কোর্ট ভবনে। তিনি এখন পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেছেন। করাচি পোলো গ্রাউন্ডে থাকা অতিকায় কালো গ্রানাইটের নেলসন মনুমেন্টের অবস্থাও একই হয়েছে। জুলফিকার আলী ভু্ট্টোর আমলে সব স্টোন ব্লকের লেখা মুছে ফেলা হয়। এটির নতুন নাম দেয়া হয় শেরপাও পার্ক।
কেএমসির সোস্যাল ওয়েলফেয়ার অ্যান্ড কালচারাল বিভাগের পরিচালক সাইফর রাহমান গ্রামি বলেন, এসব ভাস্কর্য পুনর্বাসনের একটি প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তার বিভাগের পক্ষ থেকে। প্রস্তাব অনুযায়ী, এগুলো বার্ন হল গার্ডেন্সের চারপাশে স্থাপন করা হবে। আর কেউ যদি মনে করে, এসব ভাস্কর্য ইসলামের খেলাপ হবে, তবে প্রদর্শন সীমিত করা যেতে পারে। বিদেশী পর্যটকেরা এদিকে আকৃষ্ট হতে পারে। তবে এ ধরনের আরো অনেক প্রস্তাবের মতো, এটিও লাল ফিতায় আটকে আছে।
মুণ্ডু হারিয়েও দাঁড়িয়ে আছেন প্রিন্স এলবার্ট
তবে এগুলো পুনঃস্থাপনের কাজটি সহজ হবে না। ইসলামবিরোধী বিবেচনা করার মানুষের অভাব নেই করাচিতে। তারা এগুলোকে স্থাপনের কাজটি সহজে মেনে নেবে না। আবার কর্তৃপক্ষও তাদেরকে রাজি করাতে বা ক্ষুব্ধ করার কাজটি করার প্রয়োজন বোধ করবে না। উগ্রবাদীদের আন্দোলনের মুখে পড়তে চায় কে?
আবার কোনো কোনো মহল ভাস্কর্য প্রদর্শনীর দিকে আগ্রহী হলেও তাদের চোখও এদিকে পড়ে না।
আরেকটি বিষয়ও আছে। এগুলোকে অনেকেই দেশপ্রেম-বহির্ভূত বিষয় মনে করে। ফলে এগুলো স্থাপনের বিরুদ্ধে একদিকে ধর্মীয় বাধা আছে, একইসাথে আছে দেশপ্রেম ভাবাবেগ।
অর্থাৎ প্রভাব বিস্তার করতে পারে, এমন কোনো মহলই এসব ভাস্কর্যের ব্যাপারে আগ্রহী নয়।
ফলে এখানেই হয়তো তাদের স্থান নির্ধারিত হয়ে থাকবে। এসব মহান লোক লোকচক্ষুর আড়ালেই তাদের করুণ অবস্থা লুকিয়ে রাখবে।
মার্জিত ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে দুই ক্লাসিক্যাল সুন্দরী

যারা জানে না যুদ্ধ কী: আফগানিস্তানের বিচ্ছিন্ন অংশ

‘তালেবান- ওটা আবার কী’, জিজ্ঞেস করলেন সুলতান বেগম। বেশ লাজুক ভঙ্গিতে। আফগানিস্তানের পার্বত্যময় হিমশীতল ওয়াখান করিডোরে তার বাস। জায়গাটি এতই প্রত্যন্ত যে কয়েক দশকের যুদ্ধে পুরো আফগানিস্তান লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলেও সুলতান বেগমের এলাকা তা স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারেনি।
তার পাণ্ডুর মুখে ওই এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ১২ হাজার যাযাবর মানুষের কঠিন জীবনযাত্রার ছাপ রয়ে গেছে।
ওখানে বাসকারী লোকজনের কাছে এলাকাটির নাম বাম-ই-দুনিয়া অর্থাৎ ‘পৃথিবীর ছাদ’। পাকিস্তান ও তাকিজিস্তানের সীমান্তবর্তী (চীনও যাওয়া যায় এই করিডোর দিয়ে) পার্বত্যময় ওই এলাকাটি প্রাকৃতিকভাবেই বৈরী এবং অত্যন্ত দুর্গম।
খুব কম লোকই সেখানে যাওয়ার সাহস করে। দুর্গম হওয়ার কারণেই ৪০ বছর ধরে যে যুদ্ধ আফগানিস্তানকে শেষ করে দিচ্ছে, তা সেখানে যেতে পারেনি।
ওয়াখান করিডোরের সুলতার বেগম, ছবি: এএফপি
আর তাই বেগম বলতে পারেন, ‘যুদ্ধ, যুদ্ধ কী? এখানে তো কখনো যুদ্ধ হয়নি।’ গোবরের জ্বালানি দিয়ে আগুনের ওম নিতে নিতে তিনি অবশ্য তাদের লোকজনের হাতে রুশ সৈন্যদের সিগারেট তুলে দেওয়ার কথা স্মরণ করলেন।
কয়েক দশক আগে সোভিয়েত আগ্রাসন ও মার্কিন তহবিলপুষ্ট মুজাহিদদের যুদ্ধের কথা এই এলাকার লোকজন জানে। কিন্তু এরপর তালেবানের উত্থান, তাদের সাথে মার্কিন বাহিনীর যুদ্ধ বেগমের কাছে কিংবদন্তির মতো শোনায়।
বেগমের বড় ছেলে আসকার শাহের কাছে যখন আইএসের কথা বলা হলো তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। বলেন, ‘বিদেশীরা আমাদের দেশে আক্রমণ করছে?’ আমেরিকা ও তার মিত্ররা ২০০১ সাল থেকে তালেবানের যুদ্ধে যুদ্ধ করছে শুনে অবিশ্বাসের চোখে তাকালেন।
এই এলাকাটি সৃষ্টি করা হয়েছিল ১৯ শতকে। জারতন্ত্রী রাশিয়া ও ব্রিটিশ ভারতের মধ্যে গ্রেট গেম-এ বাফার জোন হিসেবে এর উদ্ভব। তারপর থেকে স্থানটি তেমনই রয়ে গেছে, সরকার বদল হলেও সেখানে কেউ হাত দেয়নি।
ওয়াখি গোত্রের লোকজন, ছবি: এএফপি
আশপাশের দেশগুলো থেকে এই করিডোরে যাওয়া যায়। তবে তা হয় কেবল বন্ধুর পথ বেয়ে। ঘোড়া, ইয়াক বা পায়ে হেঁটে পৃথিবীর অন্যতম উঁচু পাহাড়ি এলাকা ‘পামির নট’ পাড়ি দিয়ে।
আফগানিস্তানের তারা পামিরি নামে পরিচিত। তারা মূলত কিরগিজ উপজাতীয়। আগা খানের অনুসারী উদারবাদী ইসমাইলি মুসলিম তারা। সেখানে মুসলিম নারীরা বোরকা কী জানে না।
তারা অপরাধ, সহিংসতা কী, তাও জানে না। ইয়াক আর গবাদি পশু নিয়েই তাদের জীবন কাটে। ওই এলাকায় সামান্য কয়েকজন ব্যবসায়ী যায়। তাদের কাছ থেকেই তারা প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করে।
ওই এলাকায় নেই বিদ্যুৎ, নেই ইন্টারনেট বা মোবাইল ফোন। ওয়াকি-টাকি নিয়ে ওই বিশাল এলাকা অতিক্রম করা যেতে পারে।
ওই এলাকার লোকজন মাঝে মাঝে রেডিওতে রুশ ভাষার খবর শুনতে পায়। তবে সে সুযোগও খুব বেশি নয়। অনেক ব্যবসায়ী নিয়ে আসেন। তবে ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে তা আর কাজ করে না।
ওয়াখি গোত্রের লোকজন, ছবি: এএফপি
বছরে ৩০০ দিন সেখানকার তাপমাত্রা থাকে ০ ডিগ্রির কম। চিকিৎসা সুবিধা নেই বলতে গেলে। এমনকি সামান্য ফ্লুতেও জীবন চলে যেতে পারে। জীবনের মতোই মৃত্যু একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। একটি মাত্র ড্রাগ সেখানে অবাধে পাওয়া যায়। তা হলো আফিম। আর তাতে ওই এলাকার সবাই আসক্ত।
অবশ্য পরিবর্তন আসছে। আফগান সরকার বলছে, তারা বিমান থেকে জরিপ চালাচ্ছে, সেখানে যাওয়ার সহজ কোনো পথ সৃষ্টি করা যায় কিনা তা দেখতে।
চীন ওই এলাকায় একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরিতে কাবুলকে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছে বলে আফগান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তা যদি ফলপ্রসূ হয়, তবে ওই এলাকায় আরো ব্যবসা, পর্যটন, চিকিৎসাসেবা বয়ে আনবে।
তবে যুদ্ধ থেকে তারা যে সুরক্ষা পেয়ে আসছিল, তারও অবসান ঘটবে।
পশু পালন ওয়াখিদের প্রধান জীবীকা, ছবি: এএফপি