Monday, March 26, 2018

ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে চুপ ছিলেন কেন পর্নো তারকা?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া যৌন সম্পর্ক নিয়ে এতদিন চুপ থাকার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন পর্নো তারকা স্টর্মি ড্যানিয়েলস। তিনি বলেছেন, নিজের ও নিজের ছোট মেয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন তিনি। সেই শঙ্কা থেকেই ২০১৬ সালের শেষের দিকে এ ব্যাপারে চুপ থাকার বিনিময়ে ১ লাখ ৩০ হাজার ডলারের একটি চুক্তির প্রস্তাব এলে রাজি হতে দ্বিধা করেন নি। সিবিএস চ্যানেলের ফ্ল্যাগশিপ প্রোগ্রাম ‘৬০ মিনিটস’-এ প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে তিনি এসব বলেন। স্টর্মি ড্যানিয়েলস আরও বলেন, ২০১১ সালের দিকে বাউয়ার পাবলিশিং-এর কাছে ১৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে এই যৌন সম্পর্কের বিষয়টি স্বীকার করে সাক্ষাৎকার দেন তিনি। এর পরই এক ব্যক্তি তাকে প্রচ্ছন্ন কিন্তু স্পষ্ট হুমকি দিয়ে যায়। উল্লেখ্য, এ বছরের শুরুর দিকে ইন টাচ ম্যাগাজিন সেই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে। এতদিন ধরে প্রকাশ না করার কারণ হিসেবে ম্যাগাজিনটি জানায়, ট্রাম্পের ব্যক্তিগত আইনজীবী মাইকেল কোহেন তখন মামলা দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এ কারণেই আইনি জটিলতায় পড়ার ভয়ে তখন সাক্ষাৎকারটি ছাপানো হয়নি। কিন্তু সম্প্রতি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রকাশ করে, ট্রাম্পের আইনজীবী স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে ১,৩০,০০০ ডলার পরিশোধ করেছেন চুপ থাকার জন্য। এ খবর প্রকাশের পরই ইন টাচ ম্যাগাজিন ওই সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে দেয়। হুমকি পাওয়ার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে ড্যানিয়েলস বলেন, ‘আমি পার্কিং লটে ছিলাম। আমার দুধের শিশু মেয়েটাকে নিয়ে ফিটনেস ক্লাসে যাচ্ছিলাম। তখনই এক ব্যক্তি আমার দিকে এগিয়ে আসে এবং আমাকে বলে, ‘ট্রাম্পকে একা থাকতে দাও। ওই স্টোরির কথা ভুলে যাও।’ এরপরই ওই লোক আমার মেয়ের দিকে আগায়। তারপর বলে, ‘ফুটফুটে ছোট্ট একটা মেয়ে! মেয়েটার মার যদি কিছু হয়, ব্যাপারটা লজ্জার হবে।’
এই হুমকি পাওয়ার পর ড্যানিয়েলস পুলিশের কাছে যান নি। কিন্তু কয়েক বছর পর এক আইনজীবী তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তখন ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারাভিযান একেবারে শেষের দিকে। এ সময়ই ট্রাম্পের আইনজীবী কোহেন একটি প্রস্তাব দেন। স্টর্মি ড্যানিয়েলস বলেন, আমি ওই প্রস্তাব লুফে নিই। কারণ আমি আমার পরিবার ও আমার নিজের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলাম।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ‘৬০ মিনিটস’-এর এই পর্বে স্টর্মি ড্যানিয়েলসের সাক্ষাৎকার প্রকাশের কথা থাকায়, এটি ছিল সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠানটির সবচেয়ে প্রতিক্ষীত একটি পর্ব। এ যেন একটি জাতীয় অনুষ্ঠান। দেশজুড়ে বহু মানুষ এটি দেখেছেন। এমনকি কিছু বারে এই অনুষ্ঠান চলাকালে ‘ডার্ক অ্যান্ড স্টর্মি’ ককটেল পার্টি আয়োজন করা হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তার ব্যক্তিগত আইনজীবী মাইকেল কোহেনের জন্য এই সাক্ষাৎকারের সম্ভাব্য আইনি তাৎপর্যও রয়েছে। রোববারে প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারের আগে স্টর্মি ড্যানিয়েলস দেশজুড়ে বিভিন্ন ‘স্ট্রিপ’ ক্লাবে উপস্থিত হয়েছেন। একে তিনি নাম দিয়েছেন ‘মেইক আমেরিকা হর্নি অ্যাগেইন’ ট্যুর। কিন্তু সিএনএন’র উপস্থাপক ও সিবিএস’-এর ‘৬০ মিনিটস’-এর অন্যতম প্রতিনিধি অ্যান্ডারসন কুপার্সকে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারে ড্যানিয়েলসের পোশাকে ছিল পেশাদারিত্বের ছাপ। বোঝাই যায়, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছেন তিনি।
ড্যানিয়েলস ছাড়াও আরেকজন নারী সম্প্রতি ট্রাম্পের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া শারীরিক সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু না বলতে উভয় নারীর সঙ্গেই চুক্তি করেছেন তার আইনজীবী। কিন্তু ওই নারীরা এখন সেই চুক্তির বাইরে এসে ওই সম্পর্ক নিয়ে কথা বলতে চান। তারা বলছেন, ওই সম্পর্কের ব্যাপারে কথা বলার অধিকার তাদের রয়েছে। অন্য নারী হলেন প্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাগাজিন প্লেবয়ের সাবেক মডেল ক্যারেন ম্যাকডগাল।
ড্যানিয়েলসের মতো ম্যাকডগালও তার কাহিনী ন্যাশনাল এসকয়ার নামে এক ম্যাগাজিনের কাছে বিক্রি করেছিলেন। কিন্তু ন্যাশনাল এসকয়ার শেষ অবদি ওই কাহিনী ছাপেনি। বৃহস্পতিবার সিএনএন-এ অ্যান্ডারসন কুপারকে ম্যাকডগালও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
এই নারীদের দাবি অস্বীকার করেছেন ট্রাম্পের মুখপাত্ররা। কিন্তু উভয় মামলাই ট্রাম্পের জন্য আইনি চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন ও আইন মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে যে, দুই নারীকে ট্রাম্প যেই অর্থ দিয়েছেন তা অবৈধভাবে নির্বাচনী অর্থ ব্যায়ের শামিল। সেই অভিযোগেরই যেন ভিত্তি প্রস্তুত করছে দুই নারীর বক্তব্য।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ৬০ মিনিটসের মতো বড় টিভি অনুষ্ঠানে স্টর্মি ড্যানিয়েলসের উপস্থিত হওয়া থেকে বোঝা যায়, জনসম্মুখে কথা বলা থেকে তাকে বিরত রাখার চেষ্টা নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ট্রাম্পের আইনজীবী কোহেন সম্প্রতি বলেছেন, চুক্তি ভঙ্গ করে এ নিয়ে কথা বলায় কয়েক লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করবেন তিনি। কিন্তু তা-ও ড্যানিয়েলসকে দমায়নি। আমেরিকায় টিভি নিউজে প্রায়ই সবচেয়ে বেশি দেখা অনুষ্ঠানগুলোর তালিকায় শীর্ষে থাকে ৬০ মিনিটস অনুষ্ঠানটি।
অনুষ্ঠান সম্প্রচারের কিছুক্ষণ পর মাইকেল কোহেনের আইনজীবী ব্রান্ট এইচ. ব্লাকি একটি চিঠি পাঠান ড্যানিয়েলসের নতুন আইনজীবী মাইকেল আভেনাতির কাছে। ওই চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, যে হুমকির কথা ড্যানিয়েলস উল্লেখ করেছেন, তার মাধ্যমে তিনি মাইকেল কোহেনের মানহানি করেছেন। চিঠিতে স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বলা হয়।
সাক্ষাৎকারে অ্যান্ডারসন কুপার স্টর্মি ড্যানিয়েলসকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন তিনি আইনগত ঝুঁকির কথা মাথায় নিয়েও ট্রাম্পের সঙ্গে হওয়া সম্পর্কের বিষয়ে এখন সরব হচ্ছেন? ‘তিনি বলেন, আমি যতদিন চুপ ছিলাম, আমার কোনো সমস্যাই ছিল না। কিন্তু যখনই আমাকে মিথ্যাবাদী হিসেবে উপস্থাপন করা হলো, তখন আমি তা মানতে পারিনি।’

চীনাদের বিশ্বাস করতেন না জওয়াহেরলাল নেহরু -অশোক পার্থসারথীর বইয়ে তথ্য

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন জওয়াহেরলাল নেহরু। চীনের প্রতি তিনি নমনীয় ছিলেন না। এমন কি চীনকে বিশ্বাসও করতেন না। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধের অনেক আগে থেকেই বিশ্বস্ত সহযোগীদের মাধ্যমে চীনের বিষয়টি মোকাবিলা করতেন। তবে ওই সহযোগীকে গোপনীয়তা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ হতে হতো বা তাকে শপথ করে নিতে হতো। ওই সহযোগী এই গোপনীয় বিষয় শুধু জওয়াহেরলাল নেহরুর সঙ্গেই শেয়ার করতে পারতেন। ফলে ভিতরে ভিতরে কি ঘটছে তার পুরোটা জানতে পারতেন না নেহরুর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভি কে কৃষ্ণা মেনন। ভারতের তুখোড় কূটনীতিক গোপাল পার্থসারথীর (যিনি জিপি নামেও পরিচিত) ওপর লেখা একটি বইয়ে এ সব কথা বলা হয়েছে। গোপাল পার্থসারথী ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নীতিনির্ধারণীবিষয়ক উপদেষ্টা ও বহুমুখী কূটনীতিক। তিনি জওয়াহেরলাল নেহরু ও রাজীব গান্ধীর অধীনেও কাজ করেছেন। বইটির নাম ‘জিপি: ১৯১৫-১৯৯৫’। লিখেছেন গোপাল পার্থসারথীর ছেলে অশোক পার্থসারথী। তিনিও ভারত সরকারের সাবেক একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সরকারের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। ওই বইটি গোপাল পার্থসারথীর রেখে যাওয়া নোটের ওপর ভিত্তি করে লিখেছেন তার ছেলে অশোক। এতে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তখনকার পশ্চিম পাকিস্তান দখল করে নিতে চেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। এ জন্য সকল প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন ভারতের তখনকার সেনাপ্রধান স্যাম মানেকশ। এসবই বলা হয়েছে ওই বইয়ে। তবে চীন বিষয়ে এতে বলা হয়েছে, গোপাল পার্থসারথীকে ১৯৫৮ সালে চীনের রাষ্ট্রদূত করে সেখানে পাঠিয়ে দেন তাকে। এ বইয়েই আরেকটি অংশে বলা হয়েছে, চীনের দেং সিয়াওপিং ও ইন্দিরা গান্ধী চীন ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত নিয়ে আলোচনা শুরু করেছিলেন। কিন্তু তাতে স্যাবোটাজ করেন একজন সিনিয়র কূটনীতিক। অশোক পার্থসারথীর পিতা গোপাল পার্থসারথীর রেখে যাওয়া নোটকে উদ্ধৃত করেছেন এক জায়গা। বেইজিং যাওয়ার আগের দিন ১৮ই মার্চ তার পিতা সাক্ষাৎ করেন নেহরুর সঙ্গে। এ নিয়ে গোপাল পার্থ সারথী যে নোট রেখে গেছেন তাতে তাদের মধ্যকার কথোপকথন রয়েছে। গোপাল পার্থসারথীর কাছে নেহরু জানতে চান-
‘সুতরাং জিপি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তোমাকে কি বলেছে? হিন্দু-চায়না ভাই ভাই? তুমি কি এটা বিশ্বাস করো না। আমি কিন্তু চীনাদের সামান্যও বিশ্বাস করি না’। এভাবেই তারা ওইদিনের বৈঠক শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘তারা হলো অহংকারী, অবিশ্বস্ত, ভ্রান্তিময় ও প্রচুর উগ্র। তোমার কাজ হবে শাশ্বত নজরদারি। একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা হলো, তুমি শুধু আমাকেই টেলিগ্রাম পাঠাবে। তোমাকে এটা নিশ্চিত করতে হবে, তোমাকে এই নির্দেশনা আমি দিয়েছে তা যেন কৃষ্ণা (মেনন) জানতে না পারেন। এটা এ জন্য যে, যদিও কৃষ্ণা, আপনি ও আমি আমাদের সবার একটি অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে- বাম ও জোটনিরপেক্ষ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও অন্যান্য সমাজতান্ত্রিক দেশের সঙ্গে। কৃষ্ণা বিশ্বাস করেন যে, কোনো সমাজতান্ত্রিক দেশ (চায়না) একটি জোট নিরপেক্ষ দেশের (ভারত) ওপর হামলা চালাতে পারে না।
এই কথোপকথনের নোট এখন অশোক পার্থসারথীর কাছে রক্ষিত আছে। এর ওপর ভিত্তি করেই তিনি লিখেছেন ‘জিপি: ১৯১৫-১৯৯৫’। বইটি প্রকাশ হওয়ার কথা রয়েছে এ মাসের শেষের দিকে। এতে ভূমিকা লিখেছেন ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জী।
১৯৬২ সাল। তখন চীনের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ আসন্ন। চারদিকে যুদ্ধের রণপ্রস্তুতি। এ সময় গোপাল পার্থসারথীকে ডেকে পাঠানো হলো নয়া দিল্লিতে। তিনি ফিরে এলেন। যুদ্ধের পর ভারত ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক হিম শীতল হয়েগেল। তবে ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে সম্পর্ক চালু হলো। গোপাল পার্থসারথীর পরামর্শে এ কাজটি করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, যদিও তখনও দু’দেশের মধ্যে শত্রুতামুলক সম্পর্ক অব্যাহত ছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার ২০ বছর পরে ১৯৮২ সালে শত্রুতামুলক সম্পর্কের যবনিকা ঘটান সেই গোপাল পার্থসারথী। এর ফলে ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে রাজীব গান্ধীর ঐতিহাসিক চীন সফরের পর্থ তৈরি হয়।
১৯৮২ চীনের ‘প্যারামাউন্ট লিডার’ হিসেবে পরিচিত দেং সিয়াওপিংয়ের সঙ্গে ১০৫ মিনিট বৈঠক হয় গোপাল পার্থসারথীর। সেই বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছিল তাদের মধ্যে তা এ যাবত পরিষ্কার জানা যায় নি। তা ছাড়া তা নিয়ে বিতর্কও ছিল। কিন্তু সেই বিষয়টি এবার তার ছেলে অশোক পার্থসারথী তার লেখা বইয়ে প্রকাশ করে দিয়েছেন। ওই বৈঠকে দেং ছিলেন একটি ‘প্যাকেজ ডিল’-এর মুডে। তিনি চাইছিলেন সীমান্ত বিরোধ মিটিয়ে ফেলতে। ১৯৬২ সালের যুদ্ধে চীনের কাছে হেরে যায় ভারত। তাই ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় লাদাখ অংশে৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা ১৫ বছরে দখল করে নেয় চীনারা। তবে অরুণাচল প্রদেশের পুরোটাই ছিল ভারতের। অশোক পার্থসারথীর লেখা অনুযায়, দেং সিয়াওপিংয়ের সঙ্গে একমত হয়েছিলেন গোপাল পার্থসারথী। তিনি বলেছিলেন, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দেংকে প্যাকেজ প্রস্তাব করবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরাজি।

বাড়ছে যক্ষ্মা রোগী by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

দেশে বাড়ছে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে নতুন ১৯ হাজারের বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বলে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যান্য যক্ষ্মা রোগীসহ শিশু যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যাও বেড়েছে। যক্ষ্মা শনাক্তকরণের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে এই সংখ্যা বেশি চিহ্নিত হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। দেশে যক্ষ্মা চিকিৎসার ক্ষেত্রে সরকারের সাফল্য আশাব্যঞ্জক হলেও ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা বা মাল্টি ড্রাগ রেজিসটেন্ট টিউবারকিউলোসিস (এমডিআর) নিয়ন্ত্রণ এখনও বড় একটি চ্যালেঞ্জ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর পেছনে কারণ হলো ডায়াগনসিস সংক্রান্ত জটিলতা। এখনও এ ধরনের রোগীদের আনুমানিক ৮০ শতাংশই শনাক্তের বাইরে থাকছে। আর সব ধরনের যক্ষ্মা চিকিৎসার আওতা-বহির্ভূত থাকছে ৩৩ শতাংশ রোগী। তবে, শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেও জীবাণুযুক্ত ফুসফুসে যক্ষ্মার চিকিৎসায় সাফল্যের হার (৯৫ শতাংশ) সন্তোষজনক।
২০১৫ সালে যেখানে শিশু যক্ষ্মা রোগী ছিল ৭ হাজার ৯৮৪ জন, সেখানে ২০১৭ সালে তা বেড়ে নতুন দাঁড়ায় ১০ হাজার ৬২ জন। শতকরা হিসেবে দুই বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২৬ শতাংশের ওপরে। শিশুসহ ২০১৬ সালে দেশে শনাক্তকৃত মোট যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা ছিল ২ লাখ ২২ হাজার ২৯০ জন। আর ২০১৭ সালে তা দাঁড়ায় ২ লাখ ৪২ হাজার ৯৬৮ জন। ২২শে মার্চ জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়েছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, ব্র্যাক ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থাসমূহ যৌথভাবে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। বিশেষজ্ঞরা জানান, এমডিআর রোগী শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হচ্ছে যে সংখ্যক জিন এক্সপার্ট মেশিন থাকার কথা, তা নেই। তাছাড়া সচেতনতার অভাব ও চিকিৎসাব্যয় বেশি বলে অনেকের পক্ষে নিয়মিত ওষুধ খাওয়া সম্ভব হয় না। ফলে এর সফলতা তুলনামূলক কম।
ব্র্যাকের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সিনিয়র সেক্টর স্পেশালিস্ট ডা. মো. আবুল খায়ের বাশার এক প্রবন্ধে ২০১৭ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল টিবি রিপোর্ট উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রতি লাখে যক্ষ্মার কারণে মৃত্যু হয় ৪০ জনের। প্রতি বছর প্রতি লাখে নতুন যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ২২১ জন। কফে জীবাণুযুক্ত ফুসফুসের যক্ষ্মা চিকিৎসার সাফল্যের হার ৯৫ শতাংশ। ওষুধ প্রতিরোধী যক্ষ্মা চিকিৎসার সাফল্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরো অগ্রগামী। এক্ষেত্রে বিশ্বে যেখানে সাফল্যের হার ৫৪ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে সাফল্যের হার ৭৭ শতাংশ। এই রোগ নির্মূল করতে ২০১৫ সালের তুলনায় ২০৩৫ সালে যক্ষ্মায় মৃত্যুর হার ৯৫ শতাংশ ও প্রকোপের হার ৯০ শতাংশ কমিয়ে আনতে চায় সরকার। এলক্ষ্যে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সঙ্গে ব্র্যাকসহ ২৭টি বেসরকারি সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রতি বছর আরও এক লাখের বেশি যক্ষ্মা রোগী শনাক্তের বাইরে থাকে। এই হিসাব মিলে এই সংখ্যা ১৫ থেকে ১৭ লাখ ওপরে হবে। আক্রান্তদের মধ্যে প্রতিজনের দুই বছর মেয়াদি চিকিৎসায় সরকারের খরচ হয় ৩ লাখ টাকা। টিবি বিশেষজ্ঞরা বলেন, যক্ষ্মা একটি বায়ুবাহিত রোগ। মানুষের হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এ রোগ ছড়ায়। যক্ষ্মা দুই রকম। ফুসফুসের যক্ষ্মা এবং ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষ্মা। যক্ষ্মা রোগের প্রাথমিক লক্ষণ কাশি ও জ্বর। ক্ষুধামন্দা দেখা দেয়ায় খাওয়ার রুচি থাকে না। শরীরের যেকোনো স্থানে যক্ষ্মা রোগ হতে পারে। তবে শতকরা ৮০ থেকে ৮৫ ভাগ যক্ষ্মা রোগ ছড়ায় ফুসফুসে। নিয়মিত ওষুধ সেবন ও চিকিৎসকের পরামর্শে এ রোগ ভালো হয়। তিন সপ্তাহ বা তার অধিক সময় ধরে কাশি হলে পরীক্ষার জন্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উপস্থিত হওয়া একান্ত জরুরি। তারা বলেন, কফে জীবাণুযুক্ত রোগীদের আরোগ্য লাভ করার সংখ্যাই বেশি। এটি ইতিবাচক বলে তারা মন্তব্য করেন। আর বাকি ৬ শতাংশ, যারা অনিয়মিত, লস টু ফলো আপ এবং মৃত্যুবরণ করেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনটিপি) পরিসংখ্যান মতে, ২০১৫ সালে ২ লাখ ৬ হাজার ৯১৫ জন, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৯৬ হাজার ৭৯৭ জন, ২০১৩ সালে ১ লাখ ৯০ হাজার ৮৯৩ জন, ২০১২ সালে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৭ জন এবং ২০১১ সালে এই সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৭ জন। জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাবেক এক অধ্যাপক বলেন, টিবি রোগীর একটি সংখ্যা শনাক্ত না হওয়ার বিষয়টি সঠিক। এজন্য টিবি রোগীর সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। তিনি বলেন, এটা প্রি-ডায়াগনসিস ও পোস্ট ডায়াগনসিস হওয়ার কারণে হয়ে থাকে। যক্ষ্মা রোগীর যে সংখ্যাটা শনাক্তের বাইরে থাকছে- এটা অবশ্যই দুশ্চিন্তার বিষয়। এতে সমাজের ক্ষতি হবে। রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতাও। সংশ্লিষ্টদের এদিকে নজর দিতে হবে বলে তিনি পরামর্শ দেন। এই পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচির মধ্যদিয়ে দেশে আগামীকাল বিশ্ব যক্ষ্মা দিবস পালন করা হচ্ছে। এবারের যক্ষ্মা দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- নেতৃত্ব চাই যক্ষ্মা নির্মূলে, ইতিহাস গড়ি সবাই মিলে।’

যক্ষ্মার ঝুঁকিতে চা শ্রমিকরা

যক্ষ্মায় অধিক ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে চা শিল্প শ্রমিকরা। দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখের অধিক মানুষ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়। এ রোগের কারণে প্রতি বছর বাংলদেশে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ হাজার লোকের মৃত্যু হয় বলে দাবি করছে যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ চিকিৎসা নিয়ে কর্মরত সংস্থা হিড বাংলাদেশ।
চিকিৎসকদের মতে, বস্তির তুলনায় সরকারি চিকিৎসা সুবিধা বঞ্চিত চা শ্রমিকদের নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে বন্দি থেকে ঘনবসতি ও নোংরা পরিবেশে বসবাস, দারিদ্র্য, পুষ্টিহীনতা এবং অসচেতনতার কারণে তুলনামূলক অধিক পরিমাণে যক্ষ্মাসহ নানাবিধ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, চা বাগান বেষ্টিত বাংলাদেশে অন্যান্য বিভাগের তুলনায় সিলেট বিভাগ যক্ষ্মা রোগের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। চা বাগানগুলোতে যক্ষ্মা রোগী শনাক্তকরণের হারও অনেক বেশি। গত বছরে সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারে চার হাজার ৬৮৮ জন, হবিগঞ্জে চার হাজার ৭৭৬ জন এবং সিলেট জেলায় ৫২৩৯ জনসহ তিন জেলায় যক্ষ্মারোগী ১৪ হাজার ৭০৩ জন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চা বাগানে বসবাসরত দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অনেকে অসচেতন যারা উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। চা বাগানের নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতর থেকে এখনো অনেকেই বাইরে বের হতে পারছে না। ঘনবসতি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস, মাদকাসক্ত, পরিমিত খাবারের সমস্যা সবমিলিয়ে বস্তির তুলনায় চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষ্মা রোগের প্রবণতা অনেক বেশি।
চ্যালেঞ্জ টিবি বাংলাদেশ (সিটিবি) প্রজেক্ট সূত্র জানায়, বিশ্বের যে ২২টি দেশের মধ্যে যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা সর্বাধিক তার মধ্যে বাংলাদেশ ৬ষ্ঠ। প্রতি বছর দেশে প্রায় তিন লাখ ২১ হাজার মানুষ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হন এবং এর মধ্যে প্রায় ৬৪ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মতে, সারা দেশে প্রতি লাখে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত ২২৫ জন রোগী পাওয়া গেলেও শুধুমাত্র সিলেটে এই হার ৩০০ বেশি। চ্যালেঞ্জ টিবি বাংলাদেশ (সিটিবি) প্রজেক্টের মৌলভীবাজার জেলা প্রকল্প কর্মকর্তা তাপস বাড়ৈ বলেন, গত বছর এপ্রিল, মে ও জুন এই তিন মাসে সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের ১৬টি উপজেলায় ৫৯৪ জন যক্ষ্মা রোগী পাওয়া যায়। এই সময়ে ৪১টি চা বাগান, সাতটি পুঞ্জি এবং ১৩টি রাবার বাগানের ৩৫ হাজার ১৩৭টি পরিবারের এক লাখ ৬৬ হাজার ৫৩ জন রোগী চ্যালেঞ্জ টিবি কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকার পেয়েছেন। তিনি আরো বলেন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে চা বাগানের কম্পাউন্ডার, ড্রেসার, মা, ম্যানেজমেন্ট, গ্রাম্য চিকিৎসকদের নিয়ে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।
হিড বাংলাদেশের যক্ষ্মা, কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের কুষ্ঠ প্রকল্প ইনচার্জ পরেশ চন্দ্র দেবনাথ বলেন, বাড়ি ঘরের অবস্থা ও অসচেতনতা, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের অভাব, নোংরা পরিবেশ ও কলোনিতে ঘনবসতি বেশি থাকায় চা বাগানগুলোতে যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ রোগের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক বেশি। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল থাকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চা বাগানগুলো এসব রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা রয়েছে এবং সরকারি হাসপাতালে এসে রোগীরা চিকিৎসা গ্রহণ করছে। হিড বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, গত এক বছরে এই উপজেলায় চার হাজার ৯৫৩ জন রোগীর কফ পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে যক্ষ্মার জীবাণুযুক্ত রোগীর সংখ্যা ৩৮৬ জন, জীবাণুমুক্ত ২৩০ জন, অন্যান্য ৯৫ জন, পূর্ণ আক্রান্ত ৪০ জন, ফেইলিউর পাঁচজন ও এমআরডি আক্রান্ত ছয়জন রোগী পাওয়া গেছে। এর মধ্যে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছে ৩০ জন।
হিড বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গল উপজেলার টিবি সেন্টারের অ্যাসিসটেন্ট পঞ্চম কৈরী বলেন, শ্রীমঙ্গলে বছর বছর যক্ষ্মা রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তিন মাসের মধ্যে এ উপজেলায় ১০০৭ জনের কফ পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৮৫ জনের মধ্যে যক্ষ্মার জীবাণু পাওয়া গেছে। ক্রমেই তা বৃদ্ধি পেয়ে এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত ১২৭৪ জনের মধ্যে ৯৮ জন, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৩৪২ জনের মধ্যে ১০৩ জন ও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৩৩০ জনের মধ্যে ১০০ জন রোগীর কফে যক্ষ্মার জীবাণু পাওয়া গেছে।
জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আওতায় হিড বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ টিবি প্রকল্পের পরিচালক মনোরো জ্যাকব বলেন, যক্ষ্মা নির্মূলের লক্ষ্যে প্রকল্পটি সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার চা বাগান, রাবার বাগান, খাসিয়া পুঞ্জিসহ বিভিন্ন গ্রামাঞ্চল ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মাধ্যমে মানুষের স্বাস্থ্য (কফ ও অন্যান্য) পরীক্ষা করে আসছে। এ প্রকল্পের শুরু থেকে এ পর্যন্ত শ্রীমঙ্গলে ১০ হাজার ১৮৬ জন যক্ষ্মা রোগী আরোগ্য পেয়েছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কর্মকর্তা ডা. জয়নাল আবেদীন টিটো বলেন, যক্ষ্মা (টিউবারকিউলোসিস বা টিবি) একটি সংক্রামক রোগ। যার কারণ মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস নামের জীবাণু। এটি যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তির কফ, হাঁচি, কাশির মাধ্যমে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এমনকি হাসি, কথা বলার মাধ্যমেও এ জীবাণু বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এ জীবাণু শ্বাসের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির ফুসফুসে প্রবেশ করে।
তবে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক থাকলে এতে কোনো সমস্যা হয় না। এ ব্যাপারে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় চা বাগানের শ্রমিকদের মধ্যে যক্ষ্মা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. সত্যকাম চক্রবর্তী বলেন, এইচআইভিআইর পর যক্ষ্মা হচ্ছে দ্বিতীয় সংক্রামক ব্যাধি যে রোগে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায়। ‘যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা আছে এবং তা প্রতিরোধ করা যায়’ এ তথ্যের ওপর নির্ভর করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডঐঙ) তাদের নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এতে সঠিক নেতৃত্বের মধ্য দিয়ে এই পরিকল্পনার অধীনে আগামী ২০৩৫ সালের মধ্যে যক্ষ্মা রোগ ৯০ শতাংশ এবং যক্ষ্মা রোগের কারণে মৃত্যুর হার ৯৫ শতাংশ হ্রাস করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

যে কারণে টপলেস হলেন রেহানা

কেরালার নারী অধিকারকর্মী রেহানা ফাতিমা। কখনো তিনি টপলেস। কখনো যৌনতার অভিনয় করেন। কখনো তরমুজ হাতে নিয়ে নগ্ন হয়ে পোজ দেন। অথচ রেহানা ফাতিমার জন্ম একটি মুসলিম পরিবারে। পড়াশোনা করেছেন মাদ্রাসায়। তিনি নিজেই বলেন, আমি হিজাব পরি। প্রার্থনা করি পাঁচবার। সম্প্রতি কেরালায় একটি কলেঝের একজন শিক্ষক মেয়েদের স্তনকে তরমুজের সঙ্গে তুলনা করে মন্তব্য করেছেন। এর প্রতিবাদ করেছেন রেহানা। ওই মন্তব্যের বিরুদ্ধে অনলাইনে যে পিটিশন করা হয়েছে, তাতে দ্রুততার সঙ্গে যোগ দেন রেহানা। তিনি উন্মুক্ত বক্ষে তরমুজ সহ পোজ দিয়েছেন। তাতে চারদিকে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। কেউ কেউ তাকে সমর্থন করেছেন। তার ওই পোস্ট শেয়ার হয়েছে। রেহানা দুই সন্তানের মা। মডেল। নারী অধিকার কর্মী। তিনি বলেন, নারীদের দেহ নিয়ে মানুষের কেন এত হইচই। একজন নারী তার দেহ দেখাতে পারবে না। এই যে প্রতিবন্ধকতা আমি তা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। নারী ও পুরুষ তো আলাদা স্ট্যান্ডার্ড। রেহানা যে এবারই নগ্ন হয়ে পোজ দিয়েছেন এমন নয়। তিনি ত্রিসুর পুলিকালিতে ওনাম নামের টাইগার ড্যান্সে অংশ নিয়েছেন। ওই অনুষ্ঠানটি শুধু পুরুষদের জন্য। সেখানে যোগ দেয়া একমাত্র নারী এই রেহানা। তিনি অংশ নিয়েছেন ‘কিস অব লাভ’ প্রচারণায়। রেহানার জন্ম মুসলিম পরিবারে হলেও ১২ বছর বয়সে তার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। তখন তাদের পরিবারে সদস্য মাত্র তিনজন। তাও নারী। একজন হলেন রেহানা। অন্য দু’জনের একজন তার মা ও বোন। এক পর্যায়ে তার পিতা মারা যান। এরপরই শুরু হয় অন্যজীবন তার। বিভিন্ন লোক তাদের বাড়িতে যাতায়াত বাড়িয়ে দেয়। তারা মদ্যপ হয়ে আসতো। অন্ধকারে আসতো। ডাকাডাকি করতো। এ নিয়ে তখন অনেক শোর চিৎকার করেছেন রেহানা। কিন্তু সহায়তায় কেউ এগিয়ে আসে নি। এসব পরিস্থিতি রেহানাকে পাল্টে দিয়েছে বলে জানান তিনি। একবার তিনি পরিবারের সবার সঙ্গে পিকনিকে গিয়েছিলেন। তারই একটি ছবি পোস্ট করেছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। কিন্তু তাতে রেহানার পোশাক নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করা হয়। তাতে তিনি পরেছিলেন শর্টস, স্লিভলেস টি-শার্ট। সঙ্গে সঙ্গে তার চরিত্র নিয়েও কথা বলাবলি হলো। রেহানা বলেন, ওই পিকনিকে আমার পার্টনার ও সন্তানরাও ছিল। আমার ওই পার্টনার ছিল খালি গায়ে। এসব নিয়ে ইস্যু করার কিছু ছিল না। কিন্তু আমাদেরকে হুমকি দেয়া হলো। ফলে আমাকে চিন্তায় ফেলে দিল বিষয়টি। এর জবাবে তিনি নিজের বিকিনি পরা একটি ছবি পোস্ট করলেন। বলেন, শরীর আমার। কি পরবো সেটা একান্তই আমার বিষয়। এমন কি কিছু আদৌও পরবো কিনা তাও আমার অধিকার। রেহানা প্রথম ‘একা’ নামের একটি ছবিতে অভিনয় করেছেন। সেখানে একজন ব্যক্তির সঙ্গে তাকে শারীরিক সম্পকৃ গড়তে দেয়া যায়। এতে ব্যবহৃত নগ্ন দৃশ্য নিয়ে অনেক কথা বলাবলি হয়েছে।

কতটা বিপজ্জনক ট্রাম্পের নতুন নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন? -নিউ ইয়র্ক টাইমসের সম্পাদকীয়

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নতুন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের ভালো দিক হলো, তিনি যা মনে করেন, ঠিক সেটাই মুখ দিয়ে বলেন। আর খারাপটা হলো তিনি যা মনে করেন। যুক্তরাষ্ট্রে বোল্টনের মতো খুব কম লোকই আছেন, যারা দেশকে যুদ্ধের দিকে ধাবিত করতে এত বেশি আগ্রহী। তাকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে বেছে নেওয়াটা ট্রাম্পের অন্যান্য সিদ্ধান্তের মতো উদ্বেগজনক। বোল্টন ছাড়াও, আরেক কট্টরপন্থি সিআইএ পরিচালক মাইক পম্পের্কে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে মনোনীত করেছেন ট্রাম্প। এ থেকে বোঝা যায় ট্রাম্প নিজের জাতীয়তাবাদী চিন্তাভাবনা দ্বারা কতটা আলোড়িত হচ্ছেন।
বিশেষ করে, বোল্টন বিশ্বাস করেন যে, আন্তর্জাতিক আইন, সনদ ও পূর্বেকার প্রশাসনের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের তোয়াক্কা না করে যুক্তরাষ্ট্র চাইলে যা খুশি তা-ই করতে পারে। তিনি উত্তর কোরিয়ায় হামলা করে দেশটির পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি অসাড় করে দেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন। অথচ, এ ধরনের যেকোনো হামলা এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে পারে যার দরুন মারা যেতে পারে হাজার হাজার মানুষ।
একই সঙ্গে তিনি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে খাটো করেছেন। আগামী মে মাসের শেষের দিকে ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের মধ্যে যে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে, সেটিরও বিরোধী তিনি। এ ছাড়া যে ছয় দলীয় ইরান পারমাণবিক চুক্তির ফলে ২০১৫ সাল থেকে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প উল্লেখযোগ্য হারে সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে, বোল্টন সেই চুক্তি শুধু বাতিলই করতে চান না; তিনি ইরানে বোমা হামলা চালানোর আহ্বান পর্যন্ত জানিয়েছেন। জাতিসংঘ ও অন্যান্য বহুদেশীয় সনদের প্রতি ট্রাম্পের মতো তার বিদ্বেষও সুবিদিত। তিনি একতরফা সমাধানে বিশ্বাসী।
৩০ বছরের ক্যারিয়ার জুড়ে বোল্টন তিনজন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের অধীনে কাজ করেছেন। ছিলেন জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ অস্ত্রনিরোধ কর্মকর্তা। এমন গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতিক পদে কাজ করলেও, বোল্টন মূলত কূটনীতি ও অস্ত্র-নিরোধ নীতিকেই অবজ্ঞা করে এসেছেন। তিনি সবসময়ই ছিলেন সামরিক সমাধানের পক্ষপাতী। ১৯৯৪ সালে উত্তর কোরিয়ার প্লুটোনিয়াম প্রকল্প স্থগিত করার বদলে জ্বালানি তেল ও অন্যান্য সহযোগিতা প্রদানের আন্তর্জাতিক চুক্তি বাতিল করতে বোল্টনের মতো কেউই এত সোচ্চার ছিলেন না। ওই চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার কারণেই উত্তর কোরিয়া নিয়ে বর্তমান সংকটের মুখে বিশ্ব।
নির্বাচনী প্রচারাভিযান চলাকালে ডনাল্ড ট্রাম্প ইরাক যুদ্ধের সমালোচনা করেছিলেন। তখন অনেকের মনে হয়েছিল যে, তিনি হয়তো পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম আক্রমণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করবেন। বোল্টনের মতো ওই ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের কট্টর সমর্থক কেউ ছিলেন না। তার তখনকার যুদ্ধংদেহী অবস্থান তিনি কখনই পরিত্যাগ করেননি। ওই সময়ে বোল্টন বলেছিলেন যে, ইরাকি জনগণ মার্কিন সৈন্যদের স্বাগত জানাবে। তিনি আরো বলেছিলেন যে, আমেরিকার সামরিক ভূমিকার অবসান হবে শিগগিরই, কারণ সাদ্দাম হোসেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে ইরাকিরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। ঠিক এ ধরনের সরলীকৃত ও একগুঁয়ে অবস্থানই বোল্টন বেশির ভাগ সময় নিয়ে থাকেন।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে বোল্টন স্থলাভিষিক্ত হবেন তিন তারকা জেনারেল এইচ আর ম্যাকমাস্টারের। সম্ভাব্য পরিণতির কথা মাথায় না রেখে ইরান পারমাণবিক চুক্তি ভেস্তে দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন ম্যাকমাস্টার। এ ছাড়াও ট্রাম্পের সঙ্গে অন্যান্য নীতিগত বিষয়ে মতপার্থক্য ছিল তার। ট্রাম্পের ১৪ মাসের বিশৃঙ্খল শাসনামলে বোল্টন হলেন তৃতীয় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। হোয়াইট হাউজের ম্যাকমাস্টারের সময়কাল কখনই মসৃণ ছিল না। অথচ, বোল্টনের সঙ্গে ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের এক ধরনের বোঝাপড়া সৃষ্টি হয়েছে। এই পদে আসার আগেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কয়েকবার সাক্ষাৎ হয়েছে তার। এ ছাড়া তিনি ফক্স নিউজ চ্যানেলে প্রায়ই বিশেষজ্ঞ হিসেবে মন্তব্য দেন। প্রেসিডেন্ট এই চ্যানেলটির নিয়মিত একজন দর্শক।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ পেতে বোল্টন ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন। এমনকি ট্রাম্প আগে এই পদ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে তাকে প্রত্যাখ্যান করার পরও দমে যাননি বোল্টন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য আগে তাকে বাদ দিয়েছেন তার বিপজ্জনক অবস্থানের কারণে নয়; বরং তার গোঁফ পছন্দ হয়নি বলে।
আমেরিকায় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাজ হলো এটি নিশ্চিত করা যে প্রেসিডেন্ট যাতে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সহ দেশের সব জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার দৃষ্টিভঙ্গি জানতে পারেন। কিন্তু বোল্টন তার এই দায়িত্ব পালনে সৎ থাকবেন, তা বিশ্বাস করা কঠিন। তিনি যে প্রতিষ্ঠানেই কাজ করেছেন, সেখানেই আমলাতান্ত্রিক দ্বৈরথে জয় পেতে ও তার বিরুদ্ধাচরণকারীদের অপসারণে নিষ্ঠুর পন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি এত বেশি কট্টর যে, ২০০৫ সালে জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসেবে তার মনোনয়ন নিশ্চিত করেনি সিনেট। বাধ্য হয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ তাকে বিশেষ কায়দায় নিয়োগ দেন। তিনি ওই পদে এক বছরের মতো টিকতে পেরেছিলেন। তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে সিনেট মেনে নেবে, এমন সম্ভাবনা কম। এ কারণেই হয়তো ট্রাম্প তাকে জাতীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার পদে নিয়োগ দিয়েছেন, কারণ এই পদে সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন হয় না।
উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে এখনকার সংবেদনশীল সময়ে বোল্টনকে নিয়োগ দেয়াটা খুবই বাজে একটি সিদ্ধান্ত। ট্রাম্প নিজে যদিও প্রায়ই উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়েছেন, তবুও অন্তত তিনি কিম জং উনের সাক্ষাতের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট, যিনি পারমাণবিক সংকটের কূটনৈতিক সমাধান পেতে আগ্রহী, তিনিই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
এ মাসের শুরুতে বোল্টন ফক্স নিউজকে বলেছেন যে, কিম জং উনের সঙ্গে আলোচনা হবে মূল্যহীন। দক্ষিণ কোরিয়ার নেতারা কূটনৈতিক পন্থা বেঁছে নেয়ায় তিনি তাদেরকে অবজ্ঞা পর্যন্ত করেছেন। ২৮শে ফেব্রুয়ারি ওয়ালস্ট্রিট জার্নালে লেখা এক কলামে তিনি লিখেছেন যে, উত্তর কোরিয়ার হাতে পারমাণবিক অস্ত্র থাকায় এখন যে ‘প্রয়োজনীয়তা’ সৃষ্টি হয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে দেশটিতে স্বতঃপ্রণোদিত আক্রমণ করাটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য পুরোপুরি যথার্থ একটি পন্থা। এর আগেও তিনি লিখেছেন যে, বলপ্রয়োগের আগে অবশ্যই দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের ঐকমত্য চাওয়া উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। কিন্তু কিম জং উনের পারমাণবিক অস্ত্রের হুমকি থেকে নাগরিকদের রক্ষা করার জন্য আমেরিকার পদক্ষেপে কোনো বিদেশি সরকারের ভেটো প্রদানের অধিকার নেই, এমনকি তারা ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও।
ইরানের ক্ষেত্রে বোল্টন ও প্রেসিডেন্ট একমত। তারা উভয়েই বলেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে যাওয়া। ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমসে লেখা এক নিবন্ধে বোল্টন লিখেছেন, ইসরাইল যেমন ১৯৮১ সালে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের ওসিরাক পারমাণবিক চুল্লি ও ২০০৭ সালে সিরিয়ার চুল্লি ধ্বংস করেছিল, তেমন কিছু একটাই প্রয়োজন।
সিরিয়া ও ইরান ইস্যুতে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার ফলে অযথা রক্তই শুধু ঝরবে না, এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্র দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জন্য ধ্বংসাত্মক হতে পারে। ইরান চুক্তির কারণে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি অনেকখানি সীমিত হয়েছে। এই চুক্তি বহাল থাকা উচিত। উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতার পথও একবার পরীক্ষা করে দেখা উচিত।
অবশ্য রাশিয়া ইস্যুতে বোল্টনের অবস্থান ট্রাম্পের চেয়ে কিছুটা ভালো। বোল্টন মনে করেন, বৃটেনে রাশিয়ার সাবেক পক্ষত্যাগী গুপ্তচরদের যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে, সেই প্রেক্ষিতে ন্যাটোর উচিত কড়া প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করা। কিন্তু বোল্টন যেমনটা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং মুসলিম-বিদ্বেষী অ্যাক্টিভিস্ট পাম গেলারের বইয়ের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন, তা যেকোনো শীর্ষ আমেরিকান কর্মকর্তার বেলায় অগ্রহণযোগ্য।
এটি নিশ্চিত যে বোল্টন মিত্র দেশ ও বাকি বিশ্ব থেকে আমেরিকার বিচ্ছিন্নতাকে ত্বরান্বিত করবেন। কংগ্রেস হয়তো তার নিয়োগ থামাতে পারবে না। কিন্তু কংগ্রেসের উচিত এই নিয়োগের বিরুদ্ধে কথা বলা। পাশাপাশি, কখন যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে যাবে, সেই সিদ্ধান্ত নেয়ার সাংবিধানিক এখতিয়ার কংগ্রেসের। তাই এই বিষয়টিও কংগ্রেসের উচিত পুনর্ব্যক্ত করা।

মাদক নিরাময় কেন্দ্রে মাদকসেবীর দিনরাত by আল-আমিন

‘আঠারো বছরের তরুণ রুবন। বনানীর একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের ও’লেভেলের ছাত্র। সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার ইয়াবা সেবনের পাশাপাশি ধূমপানের নেশা ছিল। কিন্তু, এখন ঘুম থেকে উঠেই রুবন এক গ্লাস শরবত পান করেন। যাতে থাকে পুষ্টিকর ফলের রস। বাবা ও মায়ের একমাত্র সন্তান সুঠাম দেহের এই তরুণ বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার ছলে নেশায় আসক্ত পড়ে। ছন্নছাড়া জীবন হয়ে যায় তার। বাবা ও মা কঠিন এক দুশ্চিন্তার সাগরে নিপতিত হয়। অনেক শাসন ও নিষেধের পরও তাকে এই সর্বগ্রাসী নেশা থেকে বিরত রাখা যায়নি। একপর্যায়ে রুবনের চিকিৎসার জন্য ঢাকার গুলশানের ‘মুক্তি’ মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ভর্তি করা হয়। সেখানে ২৪ ঘণ্টা তাকে চিকিৎসক ও কর্মচারীরা পর্যবেক্ষণে রাখছেন। বলা যায় তার এখন একপ্রকারের বন্দি জীবন। চিকিৎসকের ওষুধের থেরাপি ছাড়াও তাকে মানসিকভাবে শক্তি দেয়ার জন্য নিয়মিত ‘কাউন্সিলিং’ করা হয়। এই অবস্থায় রুবনের ভবিষ্যত চিন্তায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত তার বাবা- মা। মাদকাশক্তি নিরাময় কেন্দ্র চিকিৎসা শেষে সেই পুরনো রুবন তাদের বুকে ফিরে আসবে এই আশায় বুক বেঁধে বসে আছেন তারা।
এ বিষয়ে মানসিক অ্যান্ড মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের (মুক্তি) জিএম আবদুর রশীদ মানবজমিনকে বলেন, মুক্তি ঢাকার নামকরা মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র। এই প্রতিষ্ঠানে ৪৬ জন রোগী ভর্তি আছেন। তার মধ্যে ৪ জন নারী। তিনি জানান, ভর্তিরত রোগীর মধ্যে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী। বাকিরা অন্য পেশায় নিয়জিত। একজন মাদকাসক্ত রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে কাজ করে যাচ্ছে মুক্তি। মাদকাসক্ত রোগীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য ওষুধ সেবন করানোর পাশাপাশি প্রত্যেকের জন্য আলাদা ও গ্রুপ কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা আছে। তাদের এমবিবিএস চিকিৎসকসহ একটি কাউন্সিলিং বোর্ড রয়েছে। গতকাল সকালে ওই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, জেনারেল ম্যানেজারের কক্ষে ভর্তিরত স্বজনদের ভিড়। ম্যানেজারের কাছে তাদের রোগীদের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। তাকে যেন পূর্ণ সুস্থ করা যায় এজন্য কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়ছেন। কেউ খাবার বা বিভিন্ন পণ্য কেনার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিচ্ছেন। মিরপুর থেকে আসা সুমাইয়া আক্তার নামে এক গৃহিণী জানান, তার মেয়ে ঢাকার একটি নামকরা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কয়েকমাস আগে ইয়াবায় আসক্ত হড়ে পড়ে। নেশার অতিরিক্ত টাকার চাহিদার কারণে আমরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠি। একপর্যায়ে তার বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। তাকে চিকিৎসা দেয়ার জন্য মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। নিরাময় কেন্দ্র মুক্তি, সেখানে ভর্তিরত রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ভর্তিরত একজন রোগীকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। প্রতিদিন সকাল ৭ টার দিকে তাদের ঘুম থেকে উঠানো হয়। ঘুম থেকে উঠেই তাদের এক ফলের শরবত দেয়া হয়। সেখানে নিয়োজিত নার্স ও কর্মচারীরা সর্বক্ষণ তাদের অনুসরণ করেন। এরপর তাদের সকাল ৮টায় সময় নাস্তা দেয়া হয়। নাস্তা শেষে রোগীদের পাঠানো হয় স্টাডি রুমে। তারা সেখানে ডেইলি পত্রিকাসহ বিভিন্ন বই পড়েন। কেউ আবার টেলিভিশন দেখেন। বেলা ১১টায় তারা আবার চলে যান নিজ নিজ বেডে। সেখানে চিকিৎসকরা প্রত্যেকটি বেডে রাউন্ড দেন। সময় ধরে মাদকাসক্ত রোগীর সর্বশেষ অবস্থা জানতে চান। চিকিৎসক রোগীর ওষুধ সেবনের বিষয়টি জানতে চান।
সূত্র জানায়, দুপুর ১২ টার পর তারা বিশ্রাম নেন। দুপুর ১ টার দিকে তারা গোসল করেন। গোসলের পর তারা নিজ নিজ ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করেন। প্রার্থনা শেষে তাদের দুপুরের খাবার দেয়া হয়। খাবারে তিন বেলায় পুষ্টিকর সবজি রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। দুপুরের খাবারের পর তারা আবার বিশ্রামে চলে যান। বিকাল ৪ টার দিকে তাদের জন্য একক বা গ্রুপ কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করা হয়। কাউন্সিলিং এর পাশাপাশি কাউকে যোগ ব্যায়াম করানো হয়। কাউন্সিলিংয়ে জীবনের মূল্য, নৈতিকতা, শিষ্টাচার ও জীবনের শেষ গন্তব্যের পথ দেখানো হয়। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, সমাজ ও দেশের প্রতি দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে অবগত করা হয়। সন্ধ্যার পর ২০ মিনিট তাদের ধর্মীয় বয়ান দেয়া হয়। এরপার আবার তারা নিজ নিজ বেডে চলে যান। তখন তাদের হালকা নাশতা দেয়া হয়। ঠিক রাত ৮ বাজলেই আবার চিকিৎসক প্রত্যেকটি বেডে রাউন্ড দেন।
রাত পৌঁনে ৯ টার দিকে তাদের রাতের খাবার দেয়া হয়। খাবারের পর তারা ওষুধ সেবন করেন। রাত ১০ থেকে ১১ টা পর্যন্ত তাদের বিনোদনের জন্য টেলিভিশন দেখতে দেয়া হয়। টেলিভিশন দেখার জন্য একটি আলাদা কক্ষই আছে। তবে মাদকসেবীরা নিজেরা পছন্দ অনুযায়ী চ্যানেল দেখতে পারেন না। কর্তৃপক্ষ তাদের শিক্ষামূলক চ্যানেল দেখতে দেন। যাতে তাদের জীবনাবোধের শক্তি বাড়ে। রাত ১১ টা হলে তারা আবার নিজ বেডে ঘুমানোর জন্য চলে যান। এ সময় ঘুমানোর জন্য নিরাময় কেন্দ্রের বাতি বন্ধ করে দেয়া হয়। একজন রোগীর ৪ মাস এভাবেই তার জীবন রুটিনে বন্দি থাকে। তাদের স্বজনরা আশায় বসে থাকেন, আবার হয়তো সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে তিনি ফিরে আসবেন। নিরাময় কেন্দ্রে দিনের কার্যসূচিতে যাতে কোনরকম হেরফের না হয় এজন্য কর্মচারীরা তৎপর থাকেন। কোন রোগী দিনের নিয়মিত কাজে অলসতা করলে তাকে অনেক বুঝিয়ে ও ভালোবাসা দিয়ে রুটিন অনুযায়ী চলার পরামর্শ দেন।
জানা গেছে, নিরাময় কেন্দ্রে একটি বড় সমস্যা মোকাবিলা করতে হয় কর্তৃপক্ষকে। তা হচ্ছে- ভর্তিরত অনেক মাদকসেবী পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু, নার্স ও সেখানে কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা তাদের সর্বক্ষণ নজরদারির কারণে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যেতে পারেন না। মূল গেটে ২৪ ঘণ্টা একজন নিরাপত্তারক্ষী দায়িত্ব পালন করেন। তার হাতে একটি চাবি থাকে। ঢোকা ও বের হওয়ার ক্ষেত্রে তার জবাবদিহিতার মধ্যে পড়তে হয়। এর আগে মুক্তি নিরাময় কেন্দ্র থেকে কয়েকজন রোগী বাইরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে গেটে তাদের আটকে দেয়া হয়। পরে তাদের স্বজনদের খবর দেয়া হয়। তবে যেসব রোগীর পালিয়ে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় তাদের বেশি করে কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা করা হয়। মুক্তিতে ভর্তিরত একজন রোগী জানান, আমি একা একা অনেক চেষ্টা করেছি মাদক ছেড়ে দেয়ার জন্য। কিন্তু পারিনি। পরিবারের সঙ্গে পরামর্শ করে নিজেই এই মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র ভর্তি হয়েছি। আমি আশা করি মরণ নেশা মাদক থেকে মুক্তি পাবো।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মানসিক রোগ বিভাগের চিকিৎসক ডা. রশিদুল হক জানান, নিরাময় কেন্দ্র একজন মাদকাসক্ত রোগীকে মাদক সেবন থেকে বিরত রাখতে ভালো ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে যে কাউন্সিলিং করা হয় তাতে রোগী জীবনের ছন্দ খুঁজে পায়।

ঢাকায় সমন্বয়ককে তুলে নিয়ে ‘জিজ্ঞাসাবাদ’ ছাত্রলীগের: কোটার বিরুদ্ধে অন্যরকম প্রতিবাদ

সরকারি চাকরিতে বিদ্যমান ৫৬ শতাংশ কোটা কমিয়ে ১০ শতাংশে নিয়ে আসাসহ পাঁচ দফা দাবিতে সরা দেশে গলায় শিক্ষা সনদ ঝুলিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করেছেন আন্দোলনকারী চাকরি প্রত্যাশী ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা। গতকাল পূর্ব ঘোষিত এ কর্মসূচি পালন করতে গেলে ঢাকায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়কারী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী বনী ইয়ামিনকে কর্মসূচি থেকে তুলে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে ছাত্রলীগ। এদিকে আন্দোলনকারীরা পূর্ব ঘোষিত ২৯শে মার্চের নাগরিক সমাবেশ পরিবর্তন করে ৩১শে মার্চে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত ১৪ই ফেব্রুয়ারি থেকে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের ব্যানারে কোটা সংস্কারের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা বলেন, আমরা কোটা বাতিল চাচ্ছি না, আমরা চাই যৌক্তিক সংস্কার। যা ১০ শতাংশের বেশি হওয়া কোনো ভাবেই দেশের জন্য সুখকর নয়। আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী আমাদের দাবির যৌক্তিকতা বুঝে তা মেনে নিবেন। সেজন্য আমরা অহিংস সব কর্মসূচি বেছে নিয়েছি।
কেন্দ্রীয়ভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান কর্মসূচি পালনের লক্ষ্যে সকাল সাড়ে ৯টা থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে জড়ো হন। একপর্যায়ে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার মুহাম্মদ নিজামুল ইসলাম ও সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম এহতেশাম আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক বনী ইয়ামিনকে কর্মসূচি থেকে মধুর ক্যান্টিনে ডেকে নিয়ে যান। এ সময় ঘটনাস্থলে অবস্থান নিয়েছিলেন ছাত্রলীগের কর্মসূচি ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক রাকিব হোসেনসহ বেশ কিছু নেতাকর্মী। মধুর ক্যান্টিনের গোল ঘরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ, সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন, আইন বিষয়ক সম্পাদক আল নাহিয়ান খান জয় ওই শিক্ষার্থীকে প্রায় ১ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ বিষয়ে আন্দোলনকারী এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘একজনকে কর্মসূচি থেকে তুলে আনার সময় আমরা অনেকে পিছনে পিছনে মধুুর ক্যান্টিনে এসেছিলাম। কিন্তু আমাদের সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। এ সময় কর্মসূচিও দ্রুত শেষ করতে নির্দেশনা দেয় ছাত্রলীগ।’ তবে বনী ইয়ামিনকে তুলে নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে ছাত্রলীগ। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি মো. সাইফুর রহমান সোহাগ বলেন, ‘কাউকে তুলে আনা হয়নি। ওরা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছে।’ এদিকে একজনকে তুলে নেয়া ও হুমকির পরও কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে আন্দোলনকারীরা। তবে এ দিনের কর্মসূচি সংক্ষেপ করা হয়েছে। আন্দোলনকারীরা গলায় শিক্ষা সনদ ঝুলিয়ে ঝাড়ু হাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসহ ক্যাম্পাসের বিভিন্ন পয়েন্ট ও রাস্তাসমূহ পরিষ্কার করেন।
এদিকে আমাদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কোটা সংস্কারের দাবি শিক্ষা সনদ গলায় ঝুলিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা।
উল্লেখ্য, আন্দোলনকারীদের পাঁচ দফা দাবি হলো- কোটাব্যবস্থা সংস্কার করে ৫৬ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে নিয়ে আসা, কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেয়া, কোটায় কোনো ধরনের বিশেষ পরীক্ষা না নেয়া, সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়সসীমা এবং চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় কোটাসুবিধা একাধিকবার ব্যবহার না করা।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে প্রেসিডেন্টের ১৬ দফা নির্দেশনা by নূর মোহাম্মদ

উচ্চশিক্ষায় শৃঙ্খলা আনতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে ১৬ ধরনের নির্দেশনা দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য ও প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ। সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক ও ভিসিদের প্রতি তিনি এ নির্দেশনা দিয়েছেন।
এ ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, প্রেসিডেন্টের সুপারিশগুলো ইউজিসিকে বাস্তবায়ন করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করতে বলেছি। বাস্তবায়নের অগ্রগতি প্রতিবেদন পেলে প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠানো হবে।
প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে পাঠানো পত্রে ১৬ ধরনের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সমাবর্তন বা অন্যান্য অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্টের ছবি ব্যবহার করছে। এমনকি ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে এ ছবি ব্যবহার করছে, যা অনভিপ্রেত। এধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে নিয়মিত অডিট হওয়ার প্রয়োজন। এজন্য অডিট রিপোর্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কাছে নিয়মিত জমা দেয়ার পাশাপাশি এখন থেকে চ্যান্সেলরের কাছে অডিট রিপোর্টের একটি অনুলিপি পাঠাতে হবে। স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক নিজস্ব জমি বন্ধক দেয়ার বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে মান নিশ্চিত করতে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করতে সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনুসরণীয় সমন্বিত একটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি ক্রিয়া, বির্তক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা- জোরদার করতে হবে। শিক্ষার্থীরা উগ্রবাদ ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে জড়িয়ে পড়ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক একটি তদারকি কমিটি গঠন করতে হবে এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে সরকারকে নিয়মিত অবহিত করতে হবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় যাতে সার্টিফিকেট বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য ও অতিরিক্ত ভর্তি ফি আদায় করতে না পারে, সে ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভিসি, প্রো-ভিসি ও কোষাধ্যক্ষ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম কীভাবে চলছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় নতুন বিভাগ খোলার ব্যাপারে চাহিদা ও যুগোপযোগিতার বিবেচনায় নতুন বিভাগ খোলার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসিকে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয় প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে। প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতির পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দেয়ার পরামর্শ দিয়ে প্রেসিডেন্ট বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় উচ্চ শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ যথাযথ অনুসরণ করার নির্দেশন দেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় তদারকি করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম কাজ হলো গবেষণা। গবেষণা কাজকে উৎসাহিত করার ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি বিধি মোতাবেক প্রণোদনামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। যোগ্য নাগরিক গঠনের বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষার পাশাপাশি উন্নত নৈতিক চরিত্র গঠনের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে আরও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার মানোন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র ভর্তির বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করতে হবে। শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করতে হবে। অ্যাক্সিডেটেশন কাউন্সিল দ্রুত গঠর করে এর কার্যক্রম শুরুর পদক্ষেপ নেয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণ করে সেখানে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত স্থানান্তরের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মঞ্জুরি কমিশনকে নির্দেশনা দিয়েছেন। আর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রতি বছর ন্যূনতম একবার এধরনের বৈঠক হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

দেশের অগ্রযাত্রা যেন থেমে না যায় -স্বাধীনতা পদক প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি হিসেবে বাংলাদেশ কারও কাছে হাত পেতে নয় বরং বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে এবং নিজস্ব সম্পদ দিয়েই আত্মনির্ভরশীল হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ একদিন জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবেই গড়ে উঠবে এবং বিশ্বে মাথা উঁচু করে চলবে। কারও কাছে হাত পেতে নয়, আমাদের যতটুকু সম্পদ, তাই দিয়েই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যাবো। এ দেশকে আমরা আরো সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যাবো। গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে স্বাধীনতা পদক-২০১৮ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি চাই, আমাদের স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রেরণা নিয়ে এই বাংলাদেশ যে এগিয়ে যাচ্ছে, সে যাত্রা যেন থেমে না যায়। এই যাত্রা যেন অব্যাহত থাকে। ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে আমরা মধ্যম আয়ের দেশ আর ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজনৈতিক স্বাধীনতা এলেও জাতির পিতার অবর্তমানে অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি। তাকে ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট নির্মমভাবে হত্যার পর সমগ্র বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়। অথচ জাতির পিতা মাত্র সাড়ে তিন বছরের শাসনে যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশকে গড়ে তুলে তাকে স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায়ে রেখে যান। আজকে সেখান থেকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হয়েছে। তবে, যদি জাতির পিতা বেঁচে থাকতেন তাহলে আজকে ’৭৫ এর পর ৪৩ বছর লাগতো না। আরো অনেক আগেই বাংলাদেশ উন্নত দেশের পর্যায়ে চলে যেতে পারতো। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা  থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় আসা বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে এরই মধ্যে সম্মানজনক অবস্থানে এসেছে। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘উন্নয়নশীল দেশ হতে হলে জাতিসংঘের তিনটি শর্তের মধ্যে দুটো শর্ত পূরণ করা হলেই স্বীকৃতি পাওয়া যায়। আমরা তিনটি শর্ত বড় ব্যবধানে পূরণ করতে পেরেছি। জাতিসংঘের মানদণ্ড অনুযায়ী একটি দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় (জিএনআই) হবে ১,২৩০ ডলার অথবা আরো বেশি। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬১০ ডলার। একটি দেশের মানবসম্পদ সূচক, হিউম্যান অ্যাসেটস ইনডেস্ক (এইচএআই) অবশ্যই ৬৬ অথবা বেশি এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, ইকোনমিক ভালনারেবিলিটি ইনডেস্ক (ইভিআই) ৩২ অথবা নিচে থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সূচক যথাক্রমে ৭২ দশমিক ৯ এবং ২৪ দশমিক ৮। প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত বছর ইউনেস্কো জাতির পিতার ৭ই মার্চের ভাষণকে বিশ্ব ঐতিহ্য দলিলের অমূল্য অংশ হিসেবে তাদের মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড রেজিস্ট্রারে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ৭ই মার্চের ভাষণ তাই এখন শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নয়, এটি বিশ্বের সম্পদ। একাত্তরের ২৫শে মার্চের কাল রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অতর্কিত হত্যাযজ্ঞ শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। যে ঘোষণা তৎকালীন ইপিআর-এর (বর্তমান বিজিবি) ওয়্যারলেসের মাধ্যমে সমগ্র দেশে ছড়িয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী বিএনপি-জামায়াত (২০০৫-০৬) সরকারের সর্বশেষ বছর থেকে বর্তমানে তার সরকারের শাসনে দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে মাথাপিছু আয় ছিল ৫৪৩ মার্কিন ডলার যা বর্তমানে ১,৬১০ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ যা বর্তমানে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। জিডিপি ছিল ৫ দশমিক ৪০ শতাংশ বর্তমানে যা ৭ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার বর্তমানে যা ৩৪ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। জিডিপির আকার ছিল ৪ লাখ ৮২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা যা বর্তমানে হয়েছে ১৯ লাখ ৭৫ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। মুদ্রাস্ফীতি ডাবল ডিজিট থেকে নেমে বছরের এ সময় নাগাদ ৫ দশমিক ৭ ভাগ হয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ বেড়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। আমাদের বাজেট অতীতের থেকে চারগুণের বেশি বেড়ে বর্তমানে ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা হয়েছে। এডিপি ১৯ হাজার কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩২শ মেগাওয়াট থেকে বেড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াটের উপরে হয়েছে।  তিনি বলেন, যদিও তার সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতা ত্যাগের সময় দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩শ মেগাওয়াট। বিএনপি পরবর্তী ৫ বছরে ১ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন না বাড়িয়ে উল্টো প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট কমিয়ে ফেলে। বর্তমানে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুতের সুবিধা পাচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দিতে তার সরকার কাজ করে যাচ্ছে এবং দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বহুমুখী করেছে বলেও উল্লেখ করেন।
স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত ১৮ জন
এ বছর সংস্কৃতিমন্ত্রী এবং বিশিষ্ট অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূরসহ ১৮ জনকে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা এই স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। মুক্তিযুদ্ধ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, উন্নয়নসহ জাতীয় জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য এই পদক প্রদান করা হয়। এ বছর যারা স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হয়েছেন, তারা হচ্ছেন- কাজী জাকির হাসান (মরণোত্তর), শহীদ বুদ্ধিজীবী এসএমএ রাশীদুল হাসান (মরণোত্তর), শংকর গোবিন্দ চৌধুরী (মরণোত্তর), এয়ার ভাইস মার্শাল সুলতান মাহমুদ বীরউত্তম-এসিএসসি (অব.), এম আবদুর রহিম (মরণোত্তর), ভূপতি ভূষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী (মরণোত্তর), শহীদ লে. মো. আনোয়ারুল আজিম (মরণোত্তর), হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী (মরণোত্তর), শহীদ আমানুল্লাহ্‌ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান (মরণোত্তর), শহীদ মতিউর রহমান মল্লিক (মরণোত্তর), শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক (মরণোত্তর), আমজাদুল হক, সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, কৃষি সাংবাদিকতায় চ্যানেল আইয়ের পরিচালক (বার্তা) শাইখ সিরাজ, চিকিৎসাবিদ্যায় অধ্যাপক ডা. এ কে এম ডি আহসান আলী, সমাজসেবায় অধ্যাপক এ কে আজাদ খান, সাহিত্যে সেলিনা হোসেন ও খাদ্যনিরাপত্তায় ড. মো. আবদুল মজিদ। পদকপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মধ্যে যারা বেঁচে আছেন তারা নিজে এবং মরণোত্তর পদক বিজয়ীদের পক্ষে তাদের স্ত্রী, পুত্র, কন্যা এবং পরিবারের সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পদক গ্রহণ করেন। অধ্যাপক ড. মো. আবদুল মজিদ পুরস্কার বিজয়ীদের পক্ষে নিজস্ব অনুভূতি ব্যক্ত করে অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হবে এবং দেশ ও জাতির প্রতি তাদের কর্তব্যবোধ আরো জাগ্রত হবে। তারা এই দেশকে ভবিষ্যতে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম স্বাধীনতা পদক প্রদান অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন এবং স্বাধীনতা পদক বিজয়ীদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরেন। এ পর্যন্ত ২৪৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে। পুরস্কার হিসেবে ৩ লাখ টাকার চেক, ১৮ ক্যারেট সোনার একটি পদক ও সনদ দেয়া হয়।

টিউশনির সাত-সতেরো by পিয়াস সরকার

আনি নগদ টাকা, মাসের শেষে হাত ফাঁকা। শিক্ষা জীবনে শিক্ষার্থীদের এ যেন নিয়মিত চিত্র। পরিবার থেকে হাত খরচের টাকা যতই আনুক না কেন মাসের শেষে হাত ফাঁকা থাকবেই। এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ খুঁজে নেন টিউশনি। পার্টটাইম চাকরির চেষ্টাও করেন অনেকে। ভাগ্যের জোরে চাকরি পেলেও যোগ হয় সমস্যা। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির সময় ভারসাম্য রাখা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এমনই কঠিন বাস্তবতায় শিক্ষা জীবন চালিয়ে নিচ্ছেন লাখো শিক্ষার্থী। আবার অনেক চাকরিজীবী বাড়তি আয়ের জন্য চাকরির পাশাপাশি যুক্ত হচ্ছেন টিউশনিতে। গৃহিণীরাও পিছিয়ে নেই। তারাও  অনেকেই আয়ের জন্য বেছে নিচ্ছেন টিউশনি।
লালমাটিয়া মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী তানিয়া রহমান বলেন, চাইলেই আমি চাকরি খুঁজে পাচ্ছি না। আর চাকরি পেলেও পড়ালেখার পাশাপাশি সময় মেলানো কষ্টকর হয়ে যায়। হাত খরচের টাকা জোগানোর পাশাপাশি অনেক শিক্ষার্থীর টিউশনির উপর ভর করে পার করে দিচ্ছেন শিক্ষা জীবন। শিক্ষা জীবনের পর বেকার সময়ে মাথা উঁচু করে চলার প্রধান হাতিয়ার টিউশনি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ বিভাগ থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করেছেন সেলিম আহমেদ। এখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিসিএস এবং সরকারি চাকরির। প্রস্তুতির পাশাপাশি ছয়টি টিউশনি করান তিনি। মাসে আয় করেন ১৬ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ইংলিশে পড়বার কারণে টিউশনি পেতে খুব একটা সমস্যা হয় না। লেখাপড়া শেষ চাকরি মিলছে না। আবার বাড়ি থেকে টাকাও নিতে পারছি না। ভালোই আছি টিউশনি করিয়ে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মাসুম খন্দকার। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান, পরিবার থেকে লেখাপড়ার খরচ চালানো সক্ষমতা নেই। টিউশনি একমাত্র সম্বল তার। তিনি বলেন, টিউশনি আমার লেখাপড়া টিকিয়ে রেখেছে। আমি নিজের খরচ চালানোর পাশাপাশি বাড়িতেও কিছু টাকা পাঠাই। বলতে পারেন আমার টাকায় ছোট ভাইয়ের লেখাপড়া চলছে। টিউশনিতে রয়েছে অনেক সুবিধা। দিনে মাত্র এক থেকে দেড় ঘণ্টা সময় দিলেই হয়। তাই একের অধিক শিক্ষার্থীকেও পড়ানো সম্ভব খুব সহজে। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সীমান্ত চৌধুরী এভাবেই জানান তার প্রতিক্রিয়া।
শিক্ষার্থীরা টিউশনি করিয়ে যেমন পান সম্মান আবার হাত খরচের টাকার জন্য সর্বোত্তম মাধ্যম। অভিভাবকদের তাদের সন্তানদের জন্য টিউশনিতে গুনতে হয় সর্বনিম্ন এক হাজার টাকা থেকে আট-দশ হাজার টাকা পর্যন্ত। মোহাম্মদপুর প্রিপারেটরি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রিফা তাবাচ্ছুম নিমগ্নর জন্য তার বাবা-মা গুনেন দুই হাজার টাকা মাসে। আবার মেডিকেলে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছেন ধানমন্ডি বয়েজের শিক্ষার্থী আশরাফুল আলম তোরণ। ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান তাকে পড়াতে আসেন বাড়িতে সপ্তাহে চারদিন। এর জন্য তিনি মাসে পান সাত হাজার টাকা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অমিত রহমান বলেন, এক বাড়িতে পড়াতে যেতাম আজিমপুরে। প্রথম সাত মাস ঠিকমতো বেতন দিলেও তারপরের মাসে জানান এ মাসের বেতনটা দিতে পারবে না পরের মাসে একসঙ্গে দুই মাসের টাকা দিবেন। এভাবে তিন মাসের টাকা বাকি হবার পরে বুঝতে পারি তারা টাকা দিবেন না। তাই টিউশনি ছেড়ে দিতে বাধ্য হই। সাউথ ইস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী আবিব রহমান বলেন, টিউশনি করানোর কারণে চাইলেও যখন তখন বাড়িতে যেতে পারি না। সেমিস্টার ব্রেক বা ঈদের আগে বন্ধুরা সব বাড়িতে গেলেও টিউশনির কারণে তাকে থাকতে হয় ঢাকায়। সেই সঙ্গে বাড়িতে গেলেও ফিরতে হয় খুব তাড়াতাড়ি। সব থেকে খারাপ লাগে যখন বন্ধুরা আড্ডা বা ঘুরতে যাবার পরিকল্পনা করে। আড্ডায় থাকা কিংবা ঘুরতে যাওয়াও সম্ভব হয় না টিউশনির কারণে। আবার ডিসেম্বর মাসে শিক্ষার্থীদের ছুটি থাকে। তাই এই মাসে বেতন ছাড়া থাকতে হয়। ঢাকার কত শতাংশ শিক্ষার্থী বা পেশার মানুষ টিউশনির সঙ্গে জড়িত এমন পরিসংখ্যান না মিললেও ঢাকার ৫টি বিশ্ববিদ্যালয় ও ২টি কলেজের ৭০ জন শিক্ষার্থীকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সরাসরি প্রশ্ন করে দেখা যায় এর মধ্যে ১৬ জন অর্থাৎ ২৩ শতাংশ শিক্ষার্থী টিউশনির সঙ্গে জড়িত। ছেলে শিক্ষার্থী ৯ জন এবং মেয়ে শিক্ষার্থী ৭ জন। আবার ১৬ জনের মাঝে ১৫ জনই একের অধিক টিউশনি করেন। এই ১৬ জনের মধ্যে ৩ জন বাড়ি থেকে টাকা নেন না। টিউশনি তাদের একমাত্র অবলম্বন। ৭০ জনের ৫৪ জনেরই অভিজ্ঞতা রয়েছে টিউশনি করানোর। আবার ১৮টি পরিবারের টিউশনির শিক্ষকদের তথ্যে দেখা যায়, ১০ জন শিক্ষক এবং ৮ জন শিক্ষিকা। ১৫ জন এখনো অধ্যয়নরত আছেন।  তার মধ্যে ১৫ জনই একের অধিক টিউশনি করান। আবার তাদের মধ্যে ১১ জনের শিক্ষা জীবন চলছে। ৩ জনের শিক্ষা জীবন শেষ। ১ জন চাকরির পাশাপাশি টিউশনি করান।
অনেকে ইচ্ছা থাকলেও মিলাতে পারছেন না টিউশনি। এর জন্য ভরসা করতে হয় পরিচিত জনদের ওপর। তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে টিউশন খুঁজে দেয়াকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে নানান ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। যেমন টিউটর দিচ্ছি নিচ্ছি, টিউশন বিডি, ঢাকা টিউশন মিডিয়া, টিউশন মিডিয়া লিমিটেড, ঢাকা টিউটর ইত্যাদি। এসব অনলাইন কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন অনেক শিক্ষার্থী। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মোনালিসা প্রামাণিক টিউশনি খুঁজে পেয়েছেন ঢাকা টিউশনের মাধ্যমে। তিনি বলেন, আমি আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম, বিভাগ, পরিচয় ইত্যাদি তথ্য দেই ঢাকা টিউশনকে। তারা আমাকে টিউশনি খুঁজে দেন। এর জন্য প্রথম মাসের বেতনের অর্ধেক টাকা দিতে হয়।
ঢাকা টিউশন মিডিয়ার স্বত্বাধিকারী মারুফুল ইসলাম বলেন, আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলাম। শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশনি খুঁজে পাওয়া কতটুকু গুরত্বপূর্ণ তা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি। এছাড়াও অভিভাবকদের জন্য যোগ্য শিক্ষক পাওয়াটাও কষ্টকর। এসব কথা চিন্তা করে এই উদ্যোগ হাতে নেই। প্রথম মাসের বেতনের অর্ধেক টাকা রাখছি। এতে যেমন লাভবান হচ্ছি সঙ্গে উপকৃত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। অভিভাবকরাও খুঁজে পাচ্ছেন মনমতো শিক্ষক।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে টিউশনি পাবার পর প্রথম সপ্তাহে দিতে হয় টাকা। গৃহিণী রেহানা বলেন, সারাদিন বাড়িতে বসে থাকি। সময় কাটে না তাই চিন্তা করি টিউশনি করাব। ৫০০ টাকা দিয়ে ফর্ম পূরণ করি একটি টিউশন মিডিয়া হাউজের। প্রায় দুই সপ্তাহ পর আমাকে টিউশনি ঠিক করে দেয় তারা। তাদের চুক্তি অনুযায়ী বেতনের অর্ধেক দেড় হাজার টাকা পরিশোধ করি। এক তারিখ পড়ানো শুরু করে নয় তারিখে জানিয়ে দেয়া হয় তাকে দিয়ে আর বাচ্চা পড়াবেন না। মিডিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলে বলেন, চুক্তি অনুযায়ী টিউশনি দিয়েছি, আপনিও টাকা পরিশোধ করেছেন। এখন বাচ্চা আপনার কাছে না পড়লে সে দায়ভারতো আমরা নিব না। তিনি আরো বলেন, আমি যে বাড়িতে সাব-লেট থাকি এখন তাদের মেয়েকে পড়াই। আমাদের ঘর ভাড়া ৭ হাজার টাকা ঠিক হলেও এখন তারা আমাদের কাছে রাখেন ৪ হাজার টাকা। বাকি টাকা আমার বেতন হিসাবে গণ্য করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইউসুফ ইসলাম রিফাদ বলেন, অভিভাবকদের চাওয়া এবং অভিযোগের কোনো শেষ নেই। সন্তান কেন রেজাল্ট খারাপ করলো? কী পড়ান আপনি। যাবার পর কিছুই বলতে পারে না? গণিত করান বেশি করে। ইংলিশে এত দুর্বল কেন? পড়া নেবেন প্রতিদিন, বেশিচাপ হয়ে যাচ্ছে। দেরি হলো কেন আসতে ইত্যাদি প্রশ্নে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় প্রায়ই।
বায়িং হাউজে কর্মরত বাবা ইমদাদুল ইসলাম ও মা রাহেলা ফারজানা কর্মরত একটি কল সেন্টারে। তাদের কন্যা জায়ান পড়েন ধানমন্ডি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। তাদের মেয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়ে শিক্ষার্থী খুঁজছেন। কিন্তু শিক্ষিকা কেন? বাবা ইমদাদুল হক বলেন, আমরা সারা দিন বাড়িতে থাকি না। মেয়ে তার দাদির কাছে থাকে তাই নিরাপত্তা যেমন একটা বড় ব্যাপার আবার শিক্ষিকা হলে মেয়ে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এসব অনলাইন মাধ্যমে অভিভাবকদের চাহিদাগুলোতে দেখা যায় প্রায় ৮০ শতাংশ ছাত্রীর জন্য শিক্ষিকা চান অভিভাবকরা। আবার ছাত্রের জন্যও শিক্ষিকার আবেদন দেখা যায়। সঙ্গে শুধু শিক্ষক চেয়ে আবেদন নেই বললেও চলে। 
বাবা-মা শিক্ষিকা খোঁজার পাশাপাশি শিক্ষিকারা টিউশনি নেবার আগে চেষ্টা করেন দেখে শুনে বুঝে নেয়ার। আদিবা রাকা অধ্যয়নরত ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসে। তিনি বলেন, টিউশনি নেবার আগে দেখে নেই বাড়িতে কে কে থাকে। পড়াবার সময় মহিলা সদস্যরা বাড়িতে থাকেন কী না? ইত্যাদি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাদিরা জাহান বলেন, আমি টিউশনিতে ঢোকার সময় আমার এক বন্ধুকে ফোন দিয়ে ঢুকি। আবার ঘণ্টাখানিক পর টিউশনি শেষে তাকে জানিয়ে দেই। এক ঘণ্টার বেশি হলে সে খোঁজ নেয় কোনো সমস্যা হয়েছে কী না?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, ২০১৭ সালে পড়াতাম একটি মেয়েকে। আমার ছাত্রীর বড় ভাই প্রায়ই চেষ্টা করতেন আমার সঙ্গে কথা বলার। মোবাইল ফোনে প্রেমের প্রস্তাব দেয়ার পাশাপাশি বিরক্ত করতেন প্রায়ই। একদিন বাড়িতে কেউ ছিল না। শুধু তার বড় ভাই ছিল। আমি পড়াতে গেলে বড় ভাই বলেন, এখনই চলে আসবে সবাই। তার কথায় অসঙ্গতি এবং বিপদের আশঙ্কা মাথায় নিয়ে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়ি বাড়ি থেকে। আর যাইনি পড়াতে- সেই বাড়িতে।
মোহাম্মদপুর নিবাসী গৃহিণী রিতা রায় বলেন, আশা ইউনিভার্সিটির এক মেয়ে পড়াতে আসত আমার ছেলেকে। খুবই মিষ্টি মেয়ে, ভালো ব্যবহার, বুদ্ধিমতী। আমাদের পরিবারের সদস্য ভাবতাম তাকে। প্রায় দুই বছর আমার ছেলেকে পড়িয়েছিল। কিন্তু এক মাসে সে বলে টাকার কারণে ভার্সিটির রেজিস্ট্রেশন করতে পারছে না। তার বেতন মাসিক তিন হাজার টাকা, ধার হিসেবে তাকে দেই দশ হাজার টাকা। সেই টাকা নেয়ার পর আর আমাদের বাড়িতে আসেনি সে। মোবাইল নম্বরটাও বন্ধ। খোঁজ নিয়ে জানতে পারি তার ভার্সিটি শেষ হয়ে গেছে মেস ছেড়ে দিয়েছে, কোথায় গেছে তা বলতে পারেনি তার মেসের সদস্যরা। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী সজল মাহমুদ তিন বছর আগে পড়াতেন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জয়কে। তিনি এখন সম্পর্কে তার শ্যালক। ছাত্রের বড়বোন নিশি পড়তেন ইডেন কলেজে। সেই সময় প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লে এক বছর পর পারিবারিক সম্মতিতে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তারা।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন মত প্রকাশের স্বাধীনতার পরিপন্থি- আইনমন্ত্রীকে কূটনীতিকরা

ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনের ৪টি ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ ১০টি দেশের রাষ্ট্রদূত। গতকাল সচিবালয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তার কার্যালয়ে বৈঠক করে তারা এ উদ্বেগের কথা জানান। প্রায় দুই ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।  রাষ্ট্রদূতদের প্রতিনিধি দলটির নেতৃত্ব দেন জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. থমাস প্রিন্স। প্রতিনিধি দলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), সুইডেন, যুক্তরাষ্ট্র,  ডেনমার্ক, ফ্রান্স, কানাডা, ইউকে, স্পেন, নরওয়ে এবং সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে জার্মান রাষ্ট্রদূত ড. থমাস প্রিন্স সাংবাদিকদের জানান, আইনমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তারা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর ২১, ২৫, ২৮ এবং ৩৫ ধারা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট-এর এই ধারাগুলো জনগণের মুক্ত বাক-স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে। এই আইনের শাস্তি, জামিন অযোগ্য ধারা এবং এই আইনের অপব্যবহার- এই তিনটি বিষয় নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের বলেন, উনারা বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সময় চেয়েছিলেন। সে কারণে   আজকে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমাদের আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে। এখন আমরা নিজেরা বসে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবো।
খালেদা জিয়ার বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ নিয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, উনি তো আইনজীবী নিয়োগ করতেই পারেন। এক্ষেত্রে তো সরকারের কিছু করার নেই। তবে আমি শুনেছি, যে আইনজীবীকে নিয়োগ করা হয়েছে, সেই লর্ড কার্লাইল নাকি যুদ্ধাপরাধীদের মামলায় তাদের পক্ষ নিয়েছিলেন। যে দল যুদ্ধাপরাধীদের জন্য  দোয়া করতে পারে সেই দল এই কার্লাইলের মতো আইনজীবী নিয়োগ দেবে- এটাই তো স্বাভাবিক। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। তবে বিষয়টি দুঃখজনক।
সম্প্রতি একটি জার্মান প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশকে স্বৈরতান্ত্রিক দেশের তালিকায় রেখে প্রকাশ করা প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিষয় ছাড়া অন্য কোনো বিষয়ে আলোচনা হয়নি। বৈঠকে আইন সচিব আবু সালেহ মোহাম্মদ জহিরুল হক উপস্থিত ছিলেন।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবেন গাদ্দাফিপুত্র সাইফ!

লিবিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করার পরিকল্পনা নিচ্ছেন প্রয়াত নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফির ছেলে সাইফ আল ইসলাম গাদ্দাফি। সাত বছর আগে তার পিতা গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। তারপর তাকে হত্যা করা হয়। একপর্যায়ে ধরা পড়েন সাইফ আল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে হত্যা থেকে শুরু হরে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। এজন্য তার অনুপস্থিতিতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। ঘোষণা দেয়া হয় ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে মারার। তবে এখনও বেঁচে আছেন সাইফ। এ খবর দিয়েছে লন্ডনের অনলাইন দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট। সাইফ আল গাদ্দাফির মুখপাত্র বলেছেন, এখন তিনি লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছেন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে গঠিত হয়েছে নতুন দল পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব লিবিয়া। এই দল থেকেই তিনি নির্বাচন করতে চান। তার উদ্দেশ্য, দেশকে সন্ত্রাসী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করা। এ বিষয়ে তিউনিসিয়াতে এক সংবাদ সম্মেলন করেছেন সাইফ আল গাদ্দাফির মুখপাত্র আয়মান বোরাস। তিনি বলেছেন, মুয়াম্মার গাদ্দাফির দ্বিতীয় ছেলে সাইফ আল গাদ্দাফি লিবিয়াকে পুনর্গঠন করবেন। এই দেশটাকে সবার উপযোগী করে গড়ে তুলবেন। বাইরের দুনিয়ার সবাই বিষয়টিকে অসম্ভব হিসেবে দেখতে পারেন। কারণ, সাইফের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। কিন্তু আল আরাবি আল জাদিদ নামের মিডিয়াকে মানবাধিকারকর্মী খালেদ গুয়েল বলেছেন, দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি হয়েছে। দেশ ভবিষ্যতে কোনপথে এগিয়ে যাবে তা পরিষ্কার নয়। তাই অনেক বেশি লিবিয়ান বিশ্বাস করেন, দেশকে বাঁচানো যাবে শুধু সাইফের মাধ্যমে।
তাই তার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো আইনগত বাধা থাকার কথা নয়। কারণ, মুয়াম্মার গাদ্দাফির কর্মকর্তাদেরকে ২০১৩ সালের একটি আইনের অধীনে সরকারি পদে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু সেই আইনটি বাতিল করা হয়েছে ২০১৫ সালে। তিনি নির্বাচিত হলে লিবিয়াকে কোন পথে পরিচালনা করবেন তা নিশ্চিত নয়।

অর্থনীতিতে অগ্রগতি সাম্য মেলেনি

মহান স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকী পালন করছে দেশ। ১৯৭১ সালের এই দিনে স্বাধীনতার ঘোষণার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিল স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শোষণ-বঞ্চনার নাগপাশ ছিন্ন করে সদ্য ভূমিষ্ঠ রাষ্ট্রটি নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজ প্রস্ফুটিত আলোর মধ্যগগনে। ৪৭ বছরের এই পথচলায় বহু অর্জনে সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলাদেশ। অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করে বিশ্বের বুকে দেশের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করেছে এদেশের কর্মপাগল মানুষ। স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকীর ঠিক আগে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার যোগ্যতার স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। নানা সূচকে এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের সামনে এখনো অর্থনৈতিক সমতা, সুশাসন ও কার্যকর গণতন্ত্রের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পাশাপাশি বৈষম্য বেড়ে চলেছে সমানতালে যা স্বাধীনতার মূল চেতনার পরিপন্থি। একইসঙ্গে সুশাসন ও জবাবদিহিতা পুরো নিশ্চিত না হলে মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠা করাটাও কঠিন। কার্যকর গণতন্ত্র আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও সামনে নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়নের জন্য জরুরি বলে মনে করেন তারা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম মনে করেন স্বাধীনতার এতো বছরে আমাদের অর্জন ও সম্ভাবনা অনেক। তবে স্বাধীনতার পর থেকে যে ধারাবাহিকতায় অর্থনীতি এগিয়ে যাচ্ছিল তা এক সময় ধীর হয়ে যায়। বাংলাদেশের   গত ৪৭ বছরের ইতিহাসে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বহুদূর এগিয়েছে দেশ। মাথাপিছু আয় বেড়েছে। এগুলো বড় প্রাপ্তি। তবে সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তিনি বলেন, সব থেকে বড় দুচিন্তার বিষয় হলো রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা জিইয়ে আছে। দেশের বড় দলগুলো আলোচনায় বসছে না। আর আলোচনায় বসবে- এমন সম্ভাবনাও খুব বেশি নেই। ফলে আগামীর দিনগুলো সুখকর নাও হতে পারে। অর্থনীতির উন্নয়নের ধারাবাহিকতা কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, একটি দেশের উন্নয়নের জন্য প্রথমে দরকার রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। যা আমাদের দেশে নেই বললেই চলে। অন্য চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে আছি। এখন দরকার দারিদ্র্যবিমোচনে বেশি মনোযোগ দেয়া। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ গত কয়েক বছর ধরে একই জায়গায় স্থির রয়েছে। এই ধারা থেকে বের হতে হবে। এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে সরকারকে। তিনি বলেন, আমাদের সুশাসনের অভাব রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করে সুশাসন প্রতিষ্ঠার ব্যবস্থা করতে হবে। সহজেই ব্যবসা করা যায় এমন তালিকায় বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান ১৭৭ নম্বরে। এতে বোঝাই যাচ্ছে দেশের ব্যবসার পরিবেশ কোথায়? এই জায়গা থেকে উত্তরণে আমাদের কাজ করতে হবে। এসব বিষয় আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশকে বলা হতো তলাবিহীন ঝুড়ি। ৪৭ বছর পর সেই বাংলাদেশ এখন আর তলাবিহীন ঝুড়ি নেই। অনেকে এগিয়েছে। ইতিমধ্যেই উন্নয়নশীল দেশের কাতারে যাওয়ার স্বীকৃতি পেয়েছে। এগুলো ভালো অর্জন। এটাকে ধরে রাখতে হবে। টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, এখন দরকার সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও আইনের শাসন। প্রয়োজন সমতাভিত্তিক উন্নয়ন। যেন সবাই সমান সুযোগ পায়। তিনি বলেন, দিন দিন বৈষম্য বাড়ছে। প্রতিষ্ঠানগুলোতে দক্ষ লোকের অভাব। এগুলোকে দক্ষ করতে হবে। শিক্ষার মান বাড়াতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। প্রশাসনকে রাজনীতি মুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, ক্ষমতার কাছাকাছি যারা আছে তারাই বেশি সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছে। এ কারণে টেকসই উন্নয়নের জন্য দরকার সমতাভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, স্বাধীনতার এতো বছর পর আমাদের অর্জন অনেক। দেশের রপ্তানি খাত বিশ্ব বাজারে এখন একটি উজ্জ্বল নাম। এছাড়া দেশের অর্থনীতিকে আরো অগ্রসর করতে সামনে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বিশেষ করে অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে দেশের ব্যবসায়ীরা অনেক পরিকল্পনা করছেন, যা দেশের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাবে। এখন মানুষ আত্মনির্ভরশীল হচ্ছে। সরকারের নীতিগত সহায়তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পেলে দেশ আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি শুরু হয়েছিল ঋণাত্মক দিয়ে। সর্বশেষ ২০১৫ থেকে ১৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাবে জিডিপি প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৭.১১ শতাংশে। মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬০২ ডলার। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ১২৯ ডলার। ১৯৭৩ সালে দেশের রিজার্ভ ছিল ১৭৩ মিলিয়ন ডলার বা ১৭ কোটি ৩ লাখ ডলার। গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে রিজার্ভ।
১৯৭২-৭৩ থেকে ২০১৬-১৭ দেশে জাতীয় বাজেটের আকার বেড়েছে ৪৩২ গুণ। স্বাধীনতার পর ১৯৭৬ সালে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় ছিল ১৬.৩৫ মিলিয়ন বা এক কোটি ৬০ লাখ ডলার। গত সাড়ে চার দশকে তা বেড়েছে কয়েক’শ গুণ।
স্বাধীনতার পর রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ২৪২ কোটি টাকা। আর এখন রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা। সর্বশেষ করদাতার সংখ্যা ২৫ লাখ ছাড়িয়েছে।
স্বাধীনতার পর প্রথম অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ছিল ২৬০ কোটি টাকা। সর্বশেষ ইপিবি রপ্তানি আয়ের এই হালনাগাদ পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় হয়েছে ৩ হাজার ৪২৪ কোটি ১৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে ব্যাপক। সেইসঙ্গে বেড়েছে বেসরকারি বিনিয়োগও। গত এক দশকে বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৪ থেকে ৫ গুণ।
নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ এখন বিশ্বের কাছে এক সম্ভাবনার নাম। স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকীর দিনে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে বাণী দিয়েছেন। বাণীতে দেশবাসীকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি তারা সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ারও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের তাগিদ দিয়ে প্রেসিডেন্ট তার বাণীতে বলেন, গণতন্ত্রের বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য সংযম ও পরমতসহিষ্ণুতা খুবই জরুরি। এ জন্য জাতীয় জীবনে সকলের আরো ধৈর্য্য, সংযম ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। জাতীয় সংসদ হবে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দু। এ জন্য সরকারি দলের পাশাপাশি বিরোধী দলকেও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে ২০৪১ সালের মধ্যে দেশকে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে উন্নীত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে ‘রোল মডেল’। সারাবিশ্ব আমাদের আর্থসামাজিক উন্নয়নের ভূয়সী প্রশংসা করছে। ২০২১ সালের আগেই আমরা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করব।

শ্রীলঙ্কায় মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় জড়িত পুলিশ রাজনীতিক!

শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডিতে মুসলিম বিরোধী দাঙ্গায় জড়িত ছিল স্থানীয় পুলিশ ও রাজনীতিকরা। প্রত্যক্ষদর্শী, কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং ওই ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ দেখে এটা নিশ্চিত হয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। পুলিশের ভূমিকা ও স্থানীয় কিছু বৌদ্ধ রাজনীতিকের কর্মকাণ্ডে এটা স্পষ্ট যে, ওই সময় নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের ওপর শ্রীলঙ্কার সরকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল। সহিংসতায় উসকানি দিয়েছিলেন ওইসব বৌদ্ধ উগ্রপন্থি। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিয়েছিল। অভিযোগ আছে, এরা শ্রীলঙ্কার সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসের অনুসারী। এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রাজাপাকসে। তিনি বলেছেন, তিনি বা তার দলের কেউই এতে জড়িত নন। তবে পুলিশ বলেছে, তারা এমন অভিযোগে তাদের কর্মকর্তা ও রাজনীতিকদের জড়িত থাকার বিষয় অনুসন্ধান করছে। ওদিকে রয়টার্স যে সিসিটিভি দেখেছে তাতে দেখা যায়, অভিজাত আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যরা, স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের সদস্যরা মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের অবমাননা করছেন। এ বিষয়ে স্থানীয় স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের কমান্ডাররা কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। একটি মসজিদে ইমামতি করেন এ এইচ রামিস। তিনি বলেন, আমাদেরকে যাদের নিরাপত্তা দেয়ার কথা তারাই হামলা চালাতে এসেছিল। তারা চিৎকার করছিল। অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করছিল। তাদের আচরণ ছিল সন্ত্রাসীদের মতো। স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের মুখপাত্র রুওয়ান গানসেকারা বলেছেন, তারা এসব অভিযোগের তদন্ত করছেন। দ্বিতীয় আরেকটি ইউনিট রাজনৈতিক নেতাদের জড়িত থাকার বিষয়টি তদন্ত করছে। উল্লেখ্য, সম্প্রতি ক্যান্ডি এলাকায় মুসলিমদের ওপর সহিংস আক্রমণ করে বৌদ্ধরা। এ সময় তারা মুসলিমদের মসজিদ, ঘরবাড়ি, দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়। ভাঙচুর করে। ফলে সরকার বাধ্য হয়ে ১০ দিনের জরুরি অবস্থা জারি করে।

ভালুকায় মধ্যরাতে ভবনে বিস্ফোরণ, নিহত ১

ভালুকায় একটি ছয়তলা ভবনের তৃতীয়তলায় রহস্যজনক বিস্ফোরণে তৌহিদুল ইসলাম নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র নিহত হয়েছেন। এসময় গুরুতর আহত হয়েছেন তার অপর তিন সহপাঠী। আহতদের দুজনকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও একজনকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার রাত দেড়টার দিকে জামিরদিয়া মাস্টারবাড়ী আইডিয়াল মোড় এলাকার জুট ব্যবসায়ী আব্দুর রাজ্জাক ঢালীর মালিকানাধীন আরএস ভবনে। হতাহতরা সবাই খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সূত্র জানায়, খুলনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুয়েট) চার শিক্ষার্থী সিরাজগঞ্জের শাহাজাদপুর উপজেলার মনিরুল ইসলামের ছেলে তৌহিদুল ইসলাম (২৫) একই উপজেলার নুরুল ইসলাম আকন্দের ছেলে শাহীন আকন্দ (২৪), নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার মান্দাইলপুর গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে হাবিবুর রহমান (২৫) ও মাগুরা শালিখা উপজেলার দীঘল গ্রামের বিমল সরকারের ছেলে দীপ্ত সরকার (২৫) ভালুকা মাস্টারবাড়ীস্থ স্কয়ার ইন্ডাস্ট্রিজে ইন্টার্ন করতে ১০ দিন আগে ওই ছয়তলা ভবনের তৃতীয় তলা ভাড়া নেন। শনিবার রাত দেড়টার দিকে হঠাৎ ভবনের তৃতীয়তলায় বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। বিস্ফোরণে তৃতীয়তলার দেয়াল ও কাঁচের দরজা-জানালা ভেঙে প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত দূরত্বে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় তৌহিদুল ইসলাম নামে এক যুবক নিহত ও অন্যদের শরীর ঝলসে গুরুতর আহত হন। আহতদের মাঝে হাফিজ, দীপ্ত সরকারকে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও নাজমুল ওরফে শাহীনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পর বোমা সন্দেহে পুলিশ বাড়িটি ঘিরে রাখে। খবর পেয়ে রাতেই ময়মনসিংহ পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলামসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে যান।
রোববার সকালে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার জিএম সালেহ উদ্দিন, ময়মনসিংহ রেঞ্জের ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা ও নির্বাহী অফিসার মাসুদ কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। দুপুরে ঢাকা থেকে মেজর মাহমুদের নেতৃত্বে ৮ সদস্যের বোমা ডিস্পোজাল টিম ঘটনাস্থলে পরিদর্শন করেন।
স্থানীয়রা জানান, ১০ দিন আগে খুলনা ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির (খুয়েট) চার ছাত্র এই ছয়তলা ভবনের তিনতলায় একটি রুম ভাড়া নেন। বিস্ফোরণের পর বিকট শব্দে ভবনটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে পড়লে আশপাশের লোকজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। ভবনের নিচতলায় ওয়ালটনের শো-রুম রয়েছে এবং ভবনের অপরাপর তলাগুলো আবাসিক ভাড়া দেয়া আছে।
ভালুকা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার রাকিবুল হাসান জানান, অবৈধ গ্যাস সংযোগে ত্রুটিজনিত কারণে বা ওই রুমে গ্যাস সিলিন্ডর বিস্ফোরণের কারণে ওই ঘটনা ঘটতে পারে।
এ ঘটনায় ময়মনসিংহের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাইরুজ্জামানকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেয়ার জন্য নিদের্শ দেয়া হয়েছে। গফরগাঁও সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রায়হানুল ইসলাম জানান, বোমা ডিস্পোজাল টিম ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বোমার বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়নি। গ্যাসলাইনের বিস্ফোরণ থেকে এ ঘটনাটি ঘটতে পারে। ভালুকা মডেল থানার ওসি মামুন অর রশিদ জানান, এ ব্যাপারে বাড়ির মালিককে আসামি করে হত্যা মামলার প্রস্তুতি চলছে। তবে এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়নি। ঘটনার পর থেকে বাড়ির মালিক আব্দুর রাজ্জাক ঢালী পলাতক রয়েছেন।

‘ওই শিক্ষক থাকলে আমরা স্কুলে যাবো না’ by আকতারুজ্জামান

প্রধান শিক্ষকের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়ে স্কুল ছেড়েছে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির তিন ছাত্রী। ইতিমধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছেড়ে তারা বেসরকারি স্কুলে ভর্তি হয়েছে। মেহেরপুর গাংনী উপজেলার নওপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ঘটনা  ঘটে। তবে, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা স্কুলে না গেলেও হাজিরা খাতায় উপস্থিত লিখে রেখেছে শিক্ষকরা। ছাত্রীরা এক সপ্তাহ ধরে স্কুলে না গেলেও কি কারণে তাদের হাজিরা খাতায় উপস্থিত দেখানো হয়েছে তার লিখিত কারণ দর্শানোর তাগিদ দিয়েছেন প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। তবে, সহকারী শিক্ষক আব্দুল হালিম বলেন, অনুপস্থিত থাকলে উপবৃত্তি উত্তোলনে ঝামেলা হবে, সে কারণে তারা স্কুলে না আসলেও উপস্থিত দেখায়। শিক্ষার্থীদের অভিযোগের একটি অডিও বার্তা উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর পৌঁছেছে। অডিও বার্তা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে একটি তদন্ত টিম গঠন করে তদন্তভার দেয়া হয়েছে। তদন্তে শিক্ষার্থীরা যৌন নিপীড়নের কথা শিকার করেছে। কিন্তু এক সপ্তাহ পার হলেও তদন্ত রিপোর্ট উপজেলা নির্বাহী অফিসারের বরাবর পৌঁছায়নি। অভিযুক্ত শিক্ষক স্কুলে থাকলে স্কুলে যেতে চাইছে না ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা। ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গাংনী নওপাড়া মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান বকুল ছাত্রীদের শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে অশালীন আচরণ করতো। প্রধান শিক্ষকের আচরণে বিরক্ত হয়ে ছাত্রীরা শিক্ষিকাদের শরণাপন্ন হয়। শিক্ষিকারা বিষয়টি ধামাচাপা দিলে তারা তাদের অভিভাবকদের জানায়। অভিভাবকরা মানসম্মানের ভয়ে তাদের মেয়েদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বিভিন্ন স্কুলে ভর্তি করেছে। অভিভাবকদের মধ্যে এবং এলাকায় জানাজানি হলে প্রধান শিক্ষক বিষয়টি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করেন। পরে বিষয়টি কাথুলী ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান রানা সোমবার সন্ধ্যায় ছাত্রীদের বাড়িতে যায়। ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলতেই বেরিয়ে আসে প্রকৃত ঘটনা। বিষয়টি স্কুলের ম্যাডামদের জানিয়েও লাভ হয়নি। ফলে বেশ কয়েক ছাত্রী স্কুল ছেড়েছে। ছাত্রীরা বলেছে, ‘ওই শিক্ষক থাকলে আমরা আর স্কুলে যাব না।
স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি আব্দুল সাত্তার বলেন, আমরা ৫/৬ দিন ধরে এলাকায় গুঞ্জন শুনছি। প্রধান শিক্ষক ছুটিতে থাকায় কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক উদ্দিন জানান, আমি বিষয়টি ইউএনও সাহেবের কাছ থেকে শুনেছি। তবে, অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা নেয়া হবে।
প্রধান শিক্ষক হাফিজুর রহমান বকুল জানায়, আমি ষড়যন্ত্রের মধ্যে পড়েছি। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে একটি মহল। আমি ২৯/০১/২০১৫ ইং তারিখে এ স্কুলে যোগদান করে শিক্ষার মান উন্নয়ন হয়েছে এবং স্কুলের সার্বিক উন্নয়ন হয়েছে। ঈর্ষান্বিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করা হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার বিষ্ণুপদ পাল জানান, বিষয়টি আমি মৌখিকভাবে শুনেছি এবং ঘটনার বর্ণনা পেয়ে একটি অডিও বার্তা পেয়েছি। বিষয়টি এখনো যাচাই বাছাই চলছে।
সহকারী শিক্ষা অফিসার ফায়সাল বিন হাসান, সহকারী শিক্ষা অফিসার তাজমিরা খাতুনকে তদন্তভার দেয়া হয়েছে, তদন্ত করে দুই দিনের মধ্যে লিখিত প্রতিবেদন প্রেরণ করতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধের যত চলচ্চিত্র by কামরুজ্জামান মিলু

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, প্রেক্ষাপট ও না জানা অনেক গল্প বাংলা চলচ্চিত্রে এসেছে। তবে অনেকের মতে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বড় পর্দায় পুরোপুরি তুলে আনা সম্ভব হয়নি। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ একটি দেশের যেমন জন্ম দিয়েছে, তেমনি স্বাধীন মানচিত্রের জন্য কেড়ে নিয়েছে লাখো মানুষের প্রাণ। মুক্তিযুদ্ধ এত ঘটনাবহুল যে শতাব্দীর পর শতাব্দী এ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যেতে পারে। কারণ বাংলাদেশের সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ  নিয়ে এত বেশিসংখ্যক চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়েছে, দেশের বাইরেও তা প্রশংসা কুড়িয়েছে। এ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসংখ্য প্রামাণ্য, স্বল্প এবং পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে আমাদের দেশে। মুক্তিযুদ্ধের আগেই প্রখ্যাত নির্মাতা জহির রায়হান নির্মাণ করেন ‘জীবন থেকে নেয়া’। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এই চলচ্চিত্রে সংসারের একগোছা চাবির মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসন ক্ষমতা বোঝানো হয়। অন্যদিকে প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর প্রযোজক চলচ্চিত্রকার মাসুদ পারভেজ ওরফে সোহেল রানা বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিশাল বড় একটি ক্যানভাস। ‘ওরা ১১ জন’ চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধের খণ্ডচিত্র তুলে ধরা হয়েছে মাত্র। ১৯৭২ সালে মুক্তি পেয়েছিল সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’ চলচ্চিত্রটি। একই বছর মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাস উঠে এসেছে মমতাজ আলীর ‘রক্তাক্ত বাংলা’ ও আনন্দের ‘বাঘা বাঙ্গালী’ চলচ্চিত্রে। ১৯৭৬ সালে হারুন-অর রশিদ নির্মাণ করেন ‘মেঘের অনেক রং’। সাংবাদিক ও চলচ্চিত্রকার শহীদুল হক খান সরকারি অনুদানে ১৯৮১ সালে নির্মাণ করেন ‘কলমিলতা’। ১৯৯৪ সালে নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ নিজের লেখা গল্পে নির্মাণ করলেন ‘আগুনের পরশমনি’। ৪৬ বছর ধরে বাংলাদেশে নির্মিত হয়েছে বেশকিছু মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র। অন্যতম এই চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ওরা ১১ জন’, ‘হাঙ্গর নদী গ্রেনেড’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘রক্তাক্ত বাংলা’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘ধীরে বহে মেঘনা’, আমার জন্মভূমি, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘আলোর মিছিল’, ‘মেঘের অনেক রঙ’, ‘কলমিলতা’, ‘নদীর নাম মধুমতি’, ‘আগামী’, ‘এখনো অনেক রাত’, ‘মুক্তির গান’, ‘মাটির ময়না’, ‘জয়যাত্রা’, ‘খেলাঘর’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘আমার বন্ধু রাশেদ’, ‘গেরিলা’, ‘জীবনঢুলী’, ‘৭১-এর সংগ্রাম’, ‘মেঘমল্লার’, ‘৭১-এর মা জননী’, ‘অনুক্রোশ’, ‘হৃদয়ে ৭১’, ‘অনিল বাগচীর একদিন’, ‘এইতো প্রেম’, ‘শোভানের স্বাধীনতা’, ‘ভুবন মাঝি’ ইত্যাদি। এ ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্যচিত্র বলতে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘স্টপ  জেনোসাইড’, ‘লিবারেশন ফাইটার্স’, ‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডম’, ‘ইনোসেন্ট মিলিয়নস’ ‘প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’, ‘আগামী’, ‘প্রত্যাবর্তন’ ‘সূচনা’, ‘দুরন্ত’, ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা’ ও ‘ধূসর যাত্রা’, ‘৭১-এর যিশু’, ‘স্মৃতি ৭১’, ‘সেই রাতের কথা বলতে এসেছি’ প্রভৃতি। তবে বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনী নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের সংখ্যাটা অনেকটাই কমেছে। তাই অনেক নির্মাতার মতে, চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকার যে অনুদান দেয় তাতে একটি মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব হয় না। এর ফলে দেশাত্মবোধক চলচ্চিত্র নির্মাণে নির্মাতাদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। নতুন অনেক মেধাবী নির্মাতার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণের ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও বাজেটের কারণে বারবারই পিছিয়ে যাচ্ছেন। তাই সরকারি এই অনুদানের অঙ্কটা বাড়ানোর বিষয়েও কর্তৃপক্ষকে বিশেষ নজর দেয়ার অনুরোধ জানান এই প্রজন্মের বেশ কিছু নির্মাতা।

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আজ

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস আজ। স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকী। স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল সূচনার দিন। স্বাধীনতার বাঁধনহারা আনন্দে, উৎসবে উদ্বেলিত হওয়ার দিন। যাদের ত্যাগ আর রক্তে অর্জিত  এই স্বাধীন ভূখণ্ড সেই বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর দিন। মুক্তির আনন্দে সমৃদ্ধির শপথে মুষ্টিবদ্ধ হওয়ার দিন। ১৯৭১ সালের এ দিনে স্বাধীনতার ঘোষণায় উদ্দীপ্ত হয়ে মুক্তির লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল মুক্তিকামী জনতা। ঘোষণা হয়েছিল বাংলার স্বাধীনতা। নানা আয়োজনে এবার পালিত হচ্ছে স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস। পুরো জাতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করবে মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের। উৎসবের আনন্দে পালিত হবে স্বাধীনতার বার্ষিকী। শ্রদ্ধার সঙ্গে জাতি স্মরণ করবে স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। আজ সরকারি ছুটির দিন। দিবসটি উপলক্ষে সরকারি ও বেসরকারিভাবে পালিত হবে নানা কর্মসূচি। দিবসটি উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে জাতীয় দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। এরপর উপস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, বাংলাদেশে অবস্থিত বিদেশি কূটনীতিক, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন। সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনাসমূহ আলোক সজ্জিত করা হয়েছে। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপসমূহ জাতীয় পতাকা ও রঙিন পতাকায় সজ্জিত করা হয়েছে। স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বাণী দিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে সংবাদপত্রসমূহ প্রকাশ করেছে বিশেষ ক্রোড়পত্র।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সারা দেশের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্র, হাসপাতাল, কারাগার, এতিমখানা, সরকারি মাতৃ ও শিশুসদনসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানসমূহে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। স্বাধীনতা দিবসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিস্তারিত কর্মসূচি পালন করবে। কর্মসূচির মধ্যে আছে স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও পুরস্কার বিতরণী।
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সকল সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকল জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মহান স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করবে।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে দু’দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে- সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ভবন, কেন্দ্রীয় ও দেশব্যাপী দলীয় সকল কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন এবং সকাল ৬টায় জাতীয় স্মৃতিসৌধে ও সকাল ৭টায় বঙ্গবন্ধু ভবনের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন।
সকাল ১১টায় গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন।
দিবসটি উপলক্ষে মঙ্গলবার বিকাল সাড়ে তিনটায় রাজধানীর ফার্মগেটের খামারবাড়ির কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আওয়ামী লীগ সভাপতি এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও দেশের বরেণ্য বুদ্ধিজীবীরা বক্তব্য রাখবেন।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ২৬শে মার্চ মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে আওয়ামী লীগ গৃহীত কর্মসূচি দেশবাসীর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করার জন্য দলের শাখাসহ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনসমূহের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ীসহ সর্বস্তরের জনগণ ও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে আগামীকাল রাজধানীতে শোভযাত্রা বের করবে বিএনপি। জাতীয় পার্টি, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, গণফোরাম, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিসহ বিভিন্ন দল ও সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে ওয়ান্ডারল্যান্ড শিশু পার্কে বিনা টিকিটে প্রবেশ উন্মুক্ত রেখেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। রাজধানীর শ্যামলীতে অবস্থিত এই পার্কে ডিএনসিসির পক্ষ থেকে সকাল-সন্ধ্যা কেবলমাত্র শিশুদের জন্য বিনা টিকিটে প্রবেশ ও অন্যান্য সুবিধা উপভোগ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ইতিমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে।

২৫শে মার্চের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য দরকার জোর প্রচেষ্টা by কাজী রুনা

মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র যুধিষ্ঠিরের মতো সত্যবাদীরও চারিত্রিক স্খলন ঘটেছিল। কেবলমাত্র যুদ্ধে জয়লাভ করার জন্যই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়েছিল যুধিষ্ঠিরকে। আর এ কারণে তাকে নরক দর্শন পর্যন্ত করতে হয়েছিল। মহাভারত অনুযায়ী কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় দ্রোনাচার্য যখন ছিল দোর্দণ্ড প্রতাপে তখন পঞ্চপাণ্ডীয়রা দ্রোনকে বধ করতে ছলনার আশ্রয় নেয়। এরই অংশ হিসেবে অশ্বথামা নামে একটি হাতি মারা গেলে কৃষ্ণের প্ররোচনায় দ্রোনকে তার পুত্র অশ্বথামার মৃত্যু সংবাদ শোনানো হয়। দ্রোন বলেছিলেন একমাত্র সত্যবাদী যুধিষ্ঠির বললেই তিনি বিশ্বাস করবেন পুত্রের মৃত্যু সংবাদ। যুধিষ্ঠির তখন ছলনার আশ্রয় নিয়ে বলেছিলেন ‘অশ্বথামা হত’। যদিও মৃদু স্বরে বলেছিলেন ‘ইতি গজ’।
মানব সভ্যতার বর্বরোচিত অধ্যায় যুদ্ধ, যা আদিম যুগ থেকে এখনো পর্যন্ত সংঘটিত হচ্ছে নিষ্ঠুর থেকে নিষ্ঠুরতম পর্যায়ে। একগোষ্ঠীর মানুষ ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষকে হত্যার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করে। এখান থেকে জেনোসাইড পদবাচ্যটি আলোচনায় আসে। পোলিশ ইহুদি আইনজীবী রাফায়েল লেমকিন ১৯৪৪ সালে প্রথম এই শব্দটি ব্যবহার করেন। একে বাংলায় বলা হয় গণহত্যা। আন্তর্জাতিক আইনে গণহত্যা শব্দটিকে একটি নির্দিষ্ট মাপকাঠিতে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের গণহত্যা কনভেনশন অনুযায়ী গণহত্যা শুধুমাত্র ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে খুন নয়, বরং কোনো একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করার জন্য শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধনও এর অন্তর্ভুক্ত হবে। কনভেনশন অনুযায়ী এটি সংঘটিত হবে আরেক জনগোষ্ঠীর ওপর যারা জাতীয়ভাবে (হধঃরড়হধষষু), গোষ্ঠীগতভাবে (বঃযহরপধষষু), ধর্মীয়ভাবে (ৎবষরমরড়ঁংষু) বা বর্ণগতভাবে (ৎধপরধষষু) ভিন্ন। এই কনভেনশন গৃহীত হওয়ার পর স্বীকৃত নিষ্ঠুরতম গণহত্যাগুলো হলো আর্মেনীয় ও রুয়ান্ডার গণহত্যা।
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ নিরস্ত্র বাঙালির ওপর পাকহানাদার বাহিনী যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড চালায় তা অবশ্যই ইতিহাসের বর্বরোচিত একটি গণহত্যা। বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে ধ্বংস করে দেয়ার জন্য ২৫শে মার্চের রাতে অপারেশন সার্চলাইট নামে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। সে রাতেই পাকবাহিনী একযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, ইকবাল (সার্জেন্ট জহুরুল হক) হল, রোকেয়া হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন ও পিলখানা ইপিআর সদর দপ্তরে হত্যাযজ্ঞ চালায়। সিডনি ট্রিবিউনের ভাষ্যানুযায়ী, শুধুমাত্র ২৫শে মার্চ রাতে কমবেশি এক লাখ লোককে হত্যা করা হয়। মূলত ২৫শে মার্চের রাতে বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিল এক মৃত্যুপুরী। এরপর টানা নয় মাস ধরে পাকহানাদার বাহিনী যে হত্যাযজ্ঞ পুরো বাংলাদেশ জুড়ে চালায় তা পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন। শুধু হত্যা বা ধর্ষণই নয়, পুরো বাঙালি জাতিসত্তাকে ধ্বংস করার জন্য সব পদক্ষেপই নিয়েছিল পাকিস্তানি জান্তা। কিন্তু ইতিহাসের এই জঘন্যতম গণহত্যা এখনো পর্যন্ত আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃতি পায়নি। যদিও এখানে জেনোসাইড বা গণহত্যার সবগুলো উপাদান বা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।
পাকহানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে লোমহর্ষক অত্যাচার চালিয়েছিল। এখানে পাক বাহিনীর গণহারে খুন, ধর্ষণ অবশ্যই গণহত্যার সংজ্ঞায় পড়বে। এছাড়া হিন্দু জনগোষ্ঠী খুন ও ভারতে চলে যাওয়া এক কোটি উদ্বাস্তু- এসব সুনির্দিষ্টভাবে গণহত্যার সংজ্ঞার আওতাভুক্ত।
এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণটিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্ট্রারে’ অন্তর্ভুক্ত করেছে ইউনেস্কো। এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলনকে উদ্বুদ্ধ করার এই ঐতিহাসিক ভাষণটি ‘ওয়ার্ল্ডস ডকুমেন্টরি হেরিটেজ’র অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলো। এখন একাত্তরের গণহত্যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য সঠিক পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। এজন্য একদিকে বিশ্বের দরবারে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করা যেমন জরুরি তেমনি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক লবিং। কেননা, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ। যদিও যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ শুরু থেকেই পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে আমাদের মুক্তি সংগ্রামের বিরোধিতা করেছিল। তবে মুক্তিযুদ্ধের সহায়ক শক্তি ভারত ও রাশিয়া সহ বেশ কয়েকটি দেশ অবশ্যই এতে সমর্থন করবে। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক লবিং। এমন লোমহর্ষক, বর্বরোচিত গণহত্যা যখন আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃতি পাবে তখন আমরা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চাইতে পারবো।
জাতিসংঘ ১৯৮৫ সালে আর্মেনীয় গণহত্যাকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এছাড়া ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় হুতু ও তুতসিদের মধ্যে যে রক্তক্ষয়ী গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে সেটিকেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। এজন্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা (আইসিটিআর) গঠন করে বেশ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। সবশেষ ২০০২ সালে বিশ্বের যেকোনো দেশে সংঘটিত গণহত্যার বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত আইসিসি গঠন করা হয়। আমরা আশা করবো অচিরেই এই আদালতে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে পাকিস্তানকে।