Monday, October 25, 2021

দক্ষিণ এশিয়া কি অন্ধকার পথে এগুবে?

যদি কিছু ভারতীয় (সবাই না) ভারতের মুসলমানদের তামাশা, নির্যাতন, ক্ষতি, আঘাত, সন্ত্রাস বা হত্যা করে, তাহলে অন্য দেশে বসবাসকারী হিন্দু এবং শিখরাও কি তামাশা, নির্যাতন, ক্ষতি, আঘাত, সন্ত্রাস বা হত্যাকান্ডের শিকার হবে না? সহজেই জ্বলে উঠা উপমহাদেশে, 'ক্রিয়া' এবং 'প্রতিক্রিয়া' কখনোই ভালোভাবে আলাদা করা যায় না।


ভারতের প্রখ্যাত ইংরেজি দৈনিক দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে লেখা এক কলামে কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা এবং দেশটির সাবেক কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এমন মন্তব্য করেছেন।

'সীমানা মানুষকে ধরে রাখতে পারে না' উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, সীমানার মাধ্যমে দেশসমূহ নির্ধারিত হলেও পৃথিবীর ইতিহাসে প্রচুর সংখ্যক মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে চলে যাওয়ার ভুরি ভুরি উদাহরণ রয়েছে। বিশ শতক এবং বর্তমান একুশ শতক- অভিবাসনের জন্য উল্লেখযোগ্য।

জাতিসংঘের অধীনে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অফ মাইগ্রেশন (এইওএম) নামে একটি সংস্থা রয়েছে। ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত সংস্থাটি অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের সাথে সাথে চলাফেরার স্বাধীনতার অধিকারের মধ্যে যোগসূত্রকে স্বীকৃতি দেয়। অভ্যন্তরীণ এবং বহিরাগত- অভিবাসন বন্ধ করা যাবে না। (ভারতে সাড়ে ৬ কোটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় অভিবাসী রয়েছে) আমরা ‘অভিবাসনের সুশৃঙ্খল ও মানবিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে সাহায্য করতে’ আইওএম এর মতো কাজ করতে পারি।

পি চিদাম্বরম মনে করেন মানুষের দেশান্তরী হওয়ার কারণ হলো দেশভাগ এবং যুদ্ধ। ভারতের ক্ষেত্রে উক্ত দুটোই ঘটেছে মন্তব্য করে তিনি লিখেছেন, ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনকে মানব ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ 'জোরপূর্বক' অভিবাসনের কারণ বলে মনে করা হয়।
সংখ্যাটি আনুমানিক ১ কোটি ৮০ লাখ। বাংলাদেশের জন্ম দেয়া মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে ৮০-৯০ লাখ শরণার্থী ভারতে আসে। তাদের অধিকাংশই পশ্চিমবঙ্গে বসতি স্থাপন করেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অংশ আসামে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান ছিল। একই সময়ে লাখ লাখ মুসলমান ভারতে থেকে যায়, হাজার হাজার হিন্দু ও শিখ পাকিস্তানে ফিরে যায় এবং বিপুল সংখ্যক হিন্দু বাংলাদেশে ফিরে যায়। এই তিনটি দেশের মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশ স্বঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ প্রজাতন্ত্র, দুটোই কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

বছরের পর বছর ধরে, হিন্দু, মুসলিম এবং শিখ সহ লাখ লাখ ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। আমরা গর্বের সাথে তাদের প্রবাসী ভারতীয় বলি। তবে, তারা ধর্মনিরপেক্ষ হলেও মূলত খ্রিস্টান একটি দেশে সংখ্যালঘু। একইরকমভাবে ভারতীয় অভিবাসীরা অনেক ইউরোপীয় দেশ সহ কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং নিউজিল্যান্ডে বসতি স্থাপন করেছে। তাদের মধ্যে কেউ জাতিগত বা ধর্মীয় কুসংস্কারের শিকার হলে ভারত সরকার স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন হয়।

২১ কোটি ৩০ লাখ মুসলমানদের ভারতে নিজেদের বাড়ি রয়েছে যেখানে তাদের পূর্বপুরুষরা বসবাস করতেন। একইভাবে, বাংলাদেশের দেড় কোটি হিন্দু (১৬ কোটি জনসংখ্যার মধ্যে) সেইসব পরিবারের বংশধর যারা দেশভাগ বা মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে চলে আসেনি।

ভারতীয় নাগরিকদের বংশধর এবং অভিবাসী - দুই ধরনের মুসলমানরাই ভারতে বসবাস করে। তারা বিভিন্ন সময়ে ধর্মীয় কুসংস্কারের শিকার হচ্ছে। তবুও, মোদি সরকার তাদের নিরাপত্তা দিতে বা তাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার নিন্দা জানাতে অস্বীকার করে। যদি কোন দেশ প্রশ্ন উত্থাপন করে, মোদি সরকার তাদের 'ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের' বিরুদ্ধে সতর্ক করে। বাংলাদেশে হিন্দু ও হিন্দুদের উপাসনালয়ে হামলার সময় ভারতের উদ্বেগ প্রকাশ করার সাথে বিষয়টি সাংঘর্ষিক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্পষ্ট বক্তব্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি তার দৃঢ় নির্দেশাবলীও বিবেচনা করুন।

আরএসএস (রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ) এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পিতা এম এস গোলওয়ালকর তার বই 'উই অর আওয়ার নেশনহুড ডিফাইন্ড' এ যা লিখেছিলেন তা স্মরণ করিয়ে দিই: "মুসলমানরা অবশ্যই হিন্দু জাতি ও সংস্কৃতির প্রসিদ্ধি ভিন্ন অন্য কোন ধারণা (সমূহ) নিয়ে ভাবতে পারবে না। দেশটিতে সম্পূর্ণরূপে হিন্দু জাতির অধীনস্থ থাকতে হবে, কিছুই দাবি না করে... এমনকি নাগরিক অধিকারও নয়।" আরএসএস/বিজেপির বর্তমান নেতারা কি সেই দর্শন থেকে নিজেদের দূরে রেখেছেন? ধরে নিলাম দূরে রেখেছেন। তাদের কাজ ও কথা কিন্তু সেই ধারণাকেই বিশ্বাস করে। প্রকৃতপক্ষে, মুসলমানদের উপর বাড়াবাড়িতে তাদের নীরবতা আমাদের আরও কিছু জানান দেয়।

- কোনো ধর্মনিরপেক্ষ জাতি কি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) -এর মতো একটি বৈষম্যমূলক আইনকে সমর্থন করবে যা মুসলমানদের বাদ দিয়ে সকল ধর্মের মানুষকে গ্রহণ করে? কেউ কি বলতে পারেন যে সিএএ এবং হাজার হাজার কথিত 'বিদেশি' আটকের হুমকি বাংলাদেশে এবং অন্য কোথাও প্রভাব ফেলবে না?

- কোনো সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের জাতি কি পেহলু খানকে হত্যা করবে, যিনি রাজস্থানে তার ছোট দুগ্ধ খামারে গরু পরিবহন করছিলেন, অথবা আখলাককে এই সন্দেহে যে তিনি ইউপি (ভারতের উত্তর প্রদেশে) তে তার বাড়িতে গরুর মাংস রেখেছিলেন?

- কোনো বহু-ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর দেশ কি ভিন্ন ধর্মের দুটি মানুষ প্রেমে পড়লে বা বিয়ে করতে চাইলে তাকে লাভ জিহাদের মতো বাজে তত্ত্বে ফেলায় সহ্য করবে?

- কোনো আধুনিক জাতি কি জনপ্রিয় ব্র্যান্ড 'তানিষ্ক'কে এমন বিজ্ঞাপন সরানোর জন্য চাপ দেবে যাতে বলা হয়েছিল দুই ভিন্ন বিশ্বাসের দম্পতি স্বামীর পরিবারে সুখে বসবাস করছে?

- কোনো বহু ভাষিক দেশ কি উর্দু নামকে অপরাধগণ্য করবে যেটি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ফ্যাবিন্ডিয়া কর্তৃক জামাকাপড়ের লাইন চালু করার জন্য দেওয়া হয়েছিল? এই অভিযোগে যে তা দুই সপ্তাহ পর হওয়া একটি হিন্দু উৎসবকে ইসলামিক রঙ দিয়েছে?

- মুজাফফরনগর এবং উত্তর-পূর্ব দিল্লির সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অভিযুক্তদের তদন্ত ও বিচারে যে ফল এসেছে সেই আইনকে সমর্থন করতে কি বাধ্য কোনো পক্ষপাতহীন রাষ্ট্র?

বহুত্ববাদকে বাস্তবতা বলে মনে করেন চিদাম্বরম। তিনি লিখেছেনঃ যদি কিছু ভারতীয় (সবাই না) ভারতের মুসলমানদের তামাশা, নির্যাতন, ক্ষতি, আঘাত, সন্ত্রাস বা হত্যা করে, তাহলে অন্য দেশে বসবাসকারী হিন্দু এবং শিখরাও কি তামাশা, নির্যাতন, ক্ষতি, আঘাত, সন্ত্রাস বা হত্যাকান্ডের শিকার হবে না? সহজেই জ্বলে উঠা উপমহাদেশে, 'ক্রিয়া' এবং 'প্রতিক্রিয়া' কখনোই ভালোভাবে আলাদা করা যায় না।

বহুত্ববাদ একটি বাস্তবতা। প্রতিটি দেশকে অবশ্যই বিভিন্ন সংস্কৃতির, বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী, বিভিন্ন ভাষা ও ধারা অনুসরণকারী লোকদের সাথে বসবাস করতে শিখতে হবে। যা একটি জাতিকে গ্রহণযোগ্যতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার সাথে আবদ্ধ করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে।

মনে হচ্ছে সহিষ্ণুতার জায়গা দখল করেছে সহিংসতা। এটি যে কোনখানে, যে কোনও সময়ই ঘৃণ্য। সহিংসতা সহিংসতারই জন্ম দেবে। চোখের বদলে চোখ নেয়া পৃথিবীকে অন্ধ করে দেবে। নিজেকে জিজ্ঞাসা করুন, কে এটা বলেছিল?


Wednesday, October 20, 2021

পণ্ডিত নেহরুকে লেখা পণ্ডিত মান্টোর ঐতিহাসিক পত্রের ব্যবচ্ছেদ by কে এইচ রুধির

সাদাত হাসান মান্টো, জীবনের শেষ দিকে ‘বেগায়রে ওনওয়ানকে(নামহীন)’ নামে একটি উপন্যাস লিখে গেছেন। ১৯৫৪ সালের অগাস্টের দিকে প্রকাশিত এই উপন্যাসের ভূমিকা ছিল একটি পত্র। তবে যেই সেই পত্র নয়, তখনকার ভারতের প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে লেখা রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও সাহিত্য মানসম্পন্ন একটি পত্র। বইটি মান্টো নেহরুকে উৎসর্গ করেছিলেন। পত্রটি ঐতিহাসিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ ।
পত্রের শুরুতেই মান্টো নেহরুকে ‘পণ্ডিতজি’ সম্বোধন করে কৌতুক ছলে আমেরিকানদের নেহরু প্রীতির কথা তুলে ধরে লিখছেন-

“পণ্ডিতজি, আসসালাম আলায়কুম-
*এটা আমার প্রথম পত্র, যেটা আপনার দরবারে প্রেরণ করছি। আপনি মাসাল্লাহ আমেরিকানদের কাছে খুব সুপুরুষ বলে পরিগণিত। কিন্তু আমি মনে করি, আমার গঠনাকৃতিও খুব একটা মন্দ না। যদি আমেরিকা যাই, তাহলে হয়তো আমাকেও সেই সৌন্দর্যের মর্যাদা প্রদান করা হবে।”
তারপরই মান্টো, নেহরুর সাথে কী কী মিল এবং অমিল আছে সেইটার বয়ান দিয়ে লিখছেন-

*“কিন্তু আপনি হচ্ছেন বিশাল হিন্দুস্থানের প্রধানমন্ত্রী, আর আমি পাকিস্তানের একজন শ্রেষ্ঠ গল্পকার। দু’টোর মধ্যে অনেক ব্যবধান। অবশ্য একটা ব্যাপারে আমাদের দু’জনের মধ্যে মিল আছে, আপনিও কাশ্মিরী, আমিও কাশ্মিরী। আপনি নেহরু, আমি মান্টো। কাশ্মিরী হবার আরেক মানে সৌন্দর্য এবং সৌন্দর্য মানে… যা আমি এখনো দেখিনি।”

মান্টো আফসোস করে বলছেন নিজে কাশ্মিরী হয়েও তাঁর কাশ্মীরের সৌন্দর্য প্রাণ ভরে উপভোগ করার কিংবা অনুভব করার সৌভাগ্য হয়নি কারণ তাঁর “স্রেফ বাঁহাল পর্যন্ত যাবার সৌভাগ্য হয়েছে”। কাশ্মিরী হবার কারণে তাঁর নেহরুর সাথে দেখা করবার অনেক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কখনো নেহরুর সাথে দেখা হয়নি। যদিও উনি বলছেন তার দরকার নেই, জীবন চলার পথে “কোন না কোন রাস্তায়, কিম্বা কোন চৌমাথায় এক কাশ্মিরীর সাথে অপর কাশ্মিরীর দেখা হয়েই যায়” কিন্তু নেহরুর সাথে উনার কখনো দেখা হয়নি। মান্টো সচেতনভাবেই এইখানে ভৌগলিকভাবে দ্বিখণ্ডিত কাশ্মীরের দিকে ইঙ্গিত করছেন, যার কারণে এক কাশ্মিরীর সাথে আরেক কাশ্মিরীর সাক্ষাৎও দুরূহ হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী হবার দরুণ কাশ্মিরী হয়েও নেহরু যে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কাঠামোর কারণে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে গেছেন সেইটারও একটি সূক্ষ্ম ইঙ্গিত আছে মান্টোর লেখায়। মান্টো লিখছেন ‘নহর’ এর পাশে জন্ম বলে নাম রাখা হয়েছে ‘নেহরু’ কিন্তু মান্টোর নাম কেন মান্টো হলো? তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা যারা কাশ্মিরী ভাষা জানেন তাদের বরাত দিয়ে উনি বলছেন “মান্টো অর্থ ‘মানুট’, অর্থাৎ দেড়-সেরী পাথর”। মান্টো নেহরু কে তাঁর নামকরণের সার্থকতা জানাতে অনুরোধ করে লিখেছেন-

*“আমি যদি সত্যি দেড় সের হই তাহলে আপনার সাথে আমার কোন তুলনাই হয় না। আপনি পুরো নহর আর আমি স্রেফ দেড়-সেরী। আপনার সাথে আমার কি সংঘর্ষ হতে পারে?”

তারপর উনি ঠাট্টা ছলে পণ্ডিত নেহরুকে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন সে এবং নেহরু উভয়ই এমন এক জোড়া বন্দুক যা কাশ্মিরীদের সম্পর্কে প্রচলিত প্রবাদ মতে ‘অন্ধকারে নিশানা লাগায়’! মান্টোর ভাষ্যমতে এই প্রবাদ শুনে তাঁর গা জ্বলে কারণ কাশ্মিরীরা আজ পর্যন্ত কোন ময়দানে পরাজয় বরণ করেনি, না কুস্তিতে না কাব্যচর্চায়। নেহরুর রাজনৈতিক অসততার সমালোচনা করে মান্টো লিখেছেন-

*“রাজনীতিতে আপনার নাম বড় গর্বের সাথে নিতে পারি। কারণ আপনি কথা বলে সঙ্গে সঙ্গে বড়খেলাপ করতে বড় পটু।”

ভারত থেকে কাশ্মির হয়ে পাকিস্তানে প্রবাহিত নদীগুলোর গতিপথ বন্ধ করে দেয়ার অবিবেচনাপ্রসূত ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে মান্টো লিখছেন-

*“তা পণ্ডিতজি, আপনি তো স্রেফ নেহেরু। দূর্ভাগ্য যে, আমিও স্রেফ দেড়-সেরী পাথর। যদি ত্রিশ-চল্লিশ-মণী পাথর হতাম, তাহলে নিজেকে সেই নদীতে শুইয়ে দিতাম। যাতে পাথর সরাবার জন্য আপনাকে অন্ততঃ কিছুক্ষণ সময়ের জন্য হলেও ইঞ্জিনীয়ারদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হতো।”

উপরোক্ত বাক্যগুলোতে মান্টোর প্রতিবাদী মননের নিদর্শন পাওয়া যায়। মান্টো আসলে বুঝাতে চাইছেন উনি নেহরুর মতো রাজনৈতিকভাবে এত ওজনদার ও প্রভাবশালী ব্যক্তি নন। অন্যথায় তিনি নেহরুর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেন এবং তাঁকে এই অবিচেনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আরো গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করতেন যৌক্তিক সমাধানের জন্য। মান্টোর এই পত্র ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক পানি বন্টন চুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। মান্টো এমন সময় এই পত্রটি লিখছেন যখন দুই দেশের মধ্যে প্রবাহিত নদীগুলোর পানির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুদ্ধংদেহী অবস্থা। মান্টো রাজনীতিবিদ না হওয়া সত্ত্বেও সেই সময় তাঁর দেশের ন্যায্য হিৎসা চাইতে কলম ধরেছেন। নিজ দেশ ও জনগণের প্রতি বুদ্ধিজীবীদের যে দায়িত্ব মান্টো সেই দায়িত্ব থেকে সরে যাননি।

মান্টোর মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পর, টানা আট বছর দর কষাকষির পর ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বর ১৯ তারিখে সিন্ধু পানি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মান্টো আরো সমালোচনা করে লিখেন যে পণ্ডিত নেহরু যতই বিখ্যাত ব্যক্তি হোক না কেন উনি এক পরিচয়ের মোড়কে আবদ্ধ-‘হিন্দুস্থানের প্রধানমন্ত্রী’। এই হিন্দুস্থানের সাথে মান্টোরও সম্পর্ক আছে কিন্তু এখন তাতে পণ্ডিত নেহরুর রাজত্ব, তিনিই সর্বেসর্বা, তিনিই নিয়ন্ত্রক। পত্রের শেষের দিকে মান্টো অভিযোগ তুলেছেন যে নেহরুর রাজত্বে বসবাস করে দিল্লী, লক্ষ্ণৌ ও জুলান্ধরের প্রকাশকরা বিনা অনুমতিতে তাঁর বই ছেপে বেআইনিভাবে ব্যবসা করে চলছে কিন্তু নীতিবাদী পণ্ডিতজি সেইদিকে দৃষ্টিপাতও করছেন না-

*“আপনি আমাদের নদীর পানি বন্ধ করে দিচ্ছেন। আর আপনার দেখাদেখি আপনার রাজধানীর প্রকাশকরা অনুমতি ছাড়াই আমার বইগুলো চটপটে ছেপে বের করে ফেলছে। এটা কোন ধরনের ভদ্রতা! আমিতো ভেবেছিলাম, আপনার মন্ত্রিত্বে এ ধরনের হীন কাজ হতেই পারে না।”

ভারতে মান্টোর বই শুধু বেআইনিভাবেই ছাপা হচ্ছিল না এমনকি প্রকাশকরা ইচ্ছেমতো নাম দিয়ে মান্টোর গল্প সংকলন বের করে ফেলছিল। অশ্লীলতার অভিযোগে মান্টোকে মোট ছয়বার অভিযুক্ত হয়েছেন। অবিভক্ত ভারতে তিনবার (ধোঁয়া, বু, কালি শালোয়ার) এবং দেশভাগের পর পাকিস্তানে আরো তিনবার(খোল দো, ঠান্ডা গোশত, উপর নিচে দারমিয়া)। অশ্লীলতার অভিযোগের প্রেক্ষিতে মান্টোর উত্তর ছিল ‘আমি একজন গল্প লেখক, কোন পর্ণগ্রাফার নই’। একদিকে মামলা-মোকাদ্দমা চলছে আর সেই সময়েই দিল্লীতে এক প্রকাশক ‘মান্টোর অশ্লীল গল্প’ নাম দিয়ে গল্প সংকলন বের করে চুটিয়ে ব্যবসা করছিল। এমনকি তাঁর ‘গঞ্জে ফেরেশতে’ নামের বইটিও ভারতের এক প্রকাশক ছাপিয়ে দিল ‘পর্দে কে পিছে’ নামে! সেই সব অভিযোগ শেষে মান্টো পণ্ডিত নেহরুকে এক প্রকার সূক্ষ্ম হুমকি দিয়েই জানাচ্ছেন-

*“আমি এই নতুন বইটি লিখলাম। এই পত্রই তার ভূমিকা যেটি আপনার কাছে লিখছি। এই বইটাও আপনাদের ওখানে কেউ বেআইনীভাবে প্রকাশ করে বসে, তাহলে খোদার কসম, আমি যে কোন দিন দিল্লী এসে আপনার কলার চেপে ধরবো, আর ছাড়বো না আপনাকে-এমনভাবে আপনার ওপর চেপে বসব যে, আজীবন মনে থাকবে, প্রতিদিন ভোরে উঠে বলবো নিমকা-চা খাওয়ান। সাথে একটা তাফতানাও। শালগমের শবদেগ তো প্রতি সপ্তাহ অন্তে থাকবেই।”

কাশ্মীরিদের আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার উদাহরণ দিতে গিয়ে মান্টো তাঁর পিতা মরহুম গোলাম হাসান মান্টো’র কথা লিখেছেন। তাঁর পিতা কোন ‘হাতুর’ এর দেখা পেলেই ডেকে নিয়ে বাড়ী আসতেন। দেউড়িতে বসিয়ে নিমকা-চা ও কুলচা খাওয়াতেন এবং গর্বভরে বলতেন ‘আমিও কাশর’। এই যে এক কাশ্মিরীর অপর কাশ্মিরীর সাথে অবিচ্ছেদ্য আত্মিক বন্ধন, সেইটাই মান্টোর কাছে স্বাভাবিক মনে হয়। এমনকি এই টানটি প্রত্যেক কাশ্মিরী যে জীবনে এক বারও কাশ্মীরের সৌন্দর্য চোখ মেলে দেখেনি তার ভেতরেও থাকা উচিত বলে মনে করেন। মান্টো এই কথা দিয়ে কাশ্মীরের সৌন্দর্য পুরোপুরি না দেখা সত্ত্বেও তাঁর ভেতর কাশ্মীরের প্রতি যে অবিচ্ছেদ্য আত্মিক টান অনুভব করেন সেইটার দিকেই ইঙ্গিত করছেন। মান্টো শুধু কাশ্মীরের সৌন্দর্য দেখেননি, দেখেছেন ক্ষুধা-দারিদ্র্য আক্রান্ত কাশ্মিরীদেরও। তাদের দুঃখ-দুর্দশা, অভাব-অনটন মান্টোকে ভাবিয়েছে। পত্রের এক পর্যায়ে মান্টো নেহরুকে আহ্বান জানাচ্ছেন যদি তিনি কাশ্মিরীদের ক্ষুধা দারিদ্র্য দূর করতে পারেন তাহলে কাশ্মীরকে তাঁর কাছেই রেখে দিতে। কিন্তু মান্টো জানেন নেহরু তখন যতটা না কাশ্মিরী তার চেয়ে বেশি ‘হিন্দুস্থানের প্রধানমন্ত্রী’, তাই তিনি লিখছেন-

*“তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আপনি স্বয়ং কাশ্মিরী হওয়া সত্ত্বেও তা দূর করতে পারবেন না, কারণ আপনার সে অবকাশই নেই।”

মান্টো লিখেছেন তিনি রাজনীতিবিদ নন কিন্তু এমন না যে রাজনীতির কিছুই বুঝেন না। তাই তিনি নেহরুর কাছে প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন তাঁকে কাশ্মীর দেখা-শোনার দায়িত্ব সমঝে দেওয়ার জন্য। বখশী গোলাম মোহাম্মদ(জম্মু-কাশ্মীর রাজ্য প্রধান, ১৯৫৩-৬৪) এর মতো প্রথম শ্রেণির জুচ্চোর ও বাটপারদের হাতে কাশ্মীরের দেখা শোনার ভার নেয়ার জন্য কেন খামোখা বখশিশ দিয়ে রাখছেন সেইটা নিয়েও প্রশ্ন করেছেন।

রেডক্লিফ লাইনের ভিত্তিতে ৪৭ এর দেশভাগ মান্টোর হৃদয়েও দাগ কেটেছিল। সেই ক্ষত নিয়েই বাকি জীবন পার করেছেন, কখনো সেই ক্ষত সেরে উঠেনি। বানরের রুটি ভাগ করার মত এই দেশভাগের কারণে মানুষে মানুষে যে সংঘাত হলো, হানাহানি হলো, রক্তগঙ্গা বয়ে গেল দুই দেশেই, সেই ইতিহাস, সেই ভয়ংকর অমানবিক দৃশ্যগুলো মান্টোকে তাড়িয়েছে আমৃত্যু। মান্টোর লেখাপত্র জুড়েই সেইসবের উপাদান পাওয়া যায়। বৃটিশরাজ খুব সচেতনে দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে জাতিবিদ্বেষের বীজ বপন করে গেছে সেইটা উপড়ে ফেলা সম্ভব হয়ে উঠেনি, বরঞ্চ সময়ে-অসময়ে ডালপালা মেলেছে। দেশভাগ পরবর্তী যে রক্তগঙ্গা বয়ে গেল তার দায়ভার থেকে নেহরু ও জিন্নাহ কেউই মুক্ত নন। দেশভাগ পরবর্তী ভারত সরকার কর্তৃক জুনাগড় রাজ্য দখলের কথা মান্টো তাঁর পত্রে উল্লেখ করেছেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর জুনাগড় পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয় কিন্তু ৯ নভেম্বরে আবার ভারত জুনাগড় দখল করর নেয় এবং পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি কার্যকরভাবে ভারত রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়। নেহরুর এমন ভূমিকার সমালোচনা করে মান্টো লিখেছেন-

*“যেটা কোন কাশ্মিরী একমাত্র কোন মারাঠার প্রভাবেই করতে পারে; আমার ইঙ্গিত প্যাটেলের প্রতি।”

ভারত ভাগের পর পর নেহরুর দেওয়া ভাষণকে কটাক্ষ করে মান্টো লিখেছেন “আমার বোধগম্য হলো না আপনি এমন ভাষণ পাঠ করার জন্য রাজী হলেন কি করে…!” মান্টোর মতে নেহরু যেন প্রতি বাক্যের উপর বমি করছিল। মান্টো রাজনীতিবিদ নন কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায় নিম্নোক্ত বক্তব্যে-

*“এটা তখনকার কথা, যখন ‘রেড কলফ’ ভারতকে ডবল রুটির দু’টো টুকরো করে রেখে দিয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, এখনো সেঁকা হয়নি। ওদিকে আপনি সেঁকছেন এদিকে আমরা। কিন্তু আমাদের উভয়ের উনুনের আগুন আসছে বিদেশ থেকে।”

বৃটিশ বানরের কাছে ভৌগোলিক রুটি সমানভাগে ভাগ করাতে গিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে বিদ্বেষের বিষবাষ্পের উদ্ভব হলো সেটির সমাপ্তি কোথায়? যে স্বাধীন সার্বভৌমত্বের জন্য এত রক্তপাত সেটাও তো এক প্রকার ছলনাই! বৃটিশরাজের ‘ভাঙো এবং শাসন করো’ নীতিই অনুকরণ করে চলছি আমরা। মান্টো তাই পত্রের শেষে নিজেকে পরিচয় দিচ্ছেন ‘একজন ঝলসানো হৃদয়ের মানুষ’ হিসেব যাঁর শরীর থেকে ‘পোড়া মাংশের গন্ধ আসছে’।

টীকাঃ

‘প্রেম আমার প্রেম’ বইটির ভূমিকায় বাংলায় অনূদিত যে পত্রটি আছে তাতে দেশভাগের পর ভারত সরকার কর্তৃক হায়দ্রাবাদ দখলের কথাও উল্লেখ আছে। কিন্তু ইংরেজি অনুবাদটিতে হায়দ্রাবাদ দখল সংক্রান্ত কোন বাক্যই নেই। ‘প্রেম আমার প্রেম’ বইটিতে উল্লেখিত অংশটি নিম্নরূপঃ
“হায়দ্রাবাদের প্রতিও আপনি প্রতিবেশী সুলভ আক্রমণ চালালেন। হাজার হাজার মুসলমানের রক্তের গঙ্গা বইয়ে দিলেন এবং অবশেষে হায়দ্রাবাদ দখল করে নিলেন। এটি কি আপনার জন্য বাড়াবাড়ি নয়?”

তথ্যসূত্রঃ

১। পত্রটির বাংলা অনুবাদ সাদাত হাসান মান্টোর ‘বেগায়রে ওনওয়ানকে(নামহীন)’ উপন্যাসের বাংলা অনুবাদ ‘প্রেম আমার প্রেম’ গ্রন্থের ভূমিকা থেকে নেওয়া হয়েছে। অনুবাদ করেছেন আখতার-উন-নবী। প্রকাশকালঃ মে ১৯৮০। প্রকাশনায়ঃ বাংলাবাজার, ঢাকা।

২। ২। পত্রটির ইংরেজি অনুবাদ পাওয়া যাবে সাদাত হাসান মান্টোর গল্প সংকলন ‘Black Margines: Stories’ বইয়ে। পৃষ্ঠাঃ ২৭১-২৭৫। পত্রটির ইংরেজি অনুবাদ করেছেন M Asaduddin। পত্রটির ইংরেজি অনুবাদ পড়তে পারবেন এই লিংক থেকেওঃ >>>Manto’s Letter to Nehru

Tuesday, October 19, 2021

মানুষ কি করে অন্য প্রাণীর দুধ খেতে শিখলো?

বিবর্তনের প্রথম দিকে মানুষের অন্য প্রাণীর দুধ হজম করতে পারতো না। কিন্তু এখন অনেক জনগোষ্ঠীই গরু, উট, বা ছাগলের দুধ খায়।
কিভাবে মানুষের শরীরে অন্য প্রাণীর দুধ হজম করার ক্ষমতা তৈরি হলো?
ইদানীং বাজারে প্রাণীর দুধের নানা 'প্রতিযোগী' এসে গেছে। যেমন সয়া দুধ, আমন্ড বাদামের দুধ - এগুলো বেশ জনপ্রিয়ও হয়ে উঠছে।
যারা 'ভেগান' - তাদের জন্য, অথবা যাদের দুধে এ্যালার্জি আছে - তাদের জন্য এই বিকল্পগুলো বেশ সুবিধাজনক।
কিন্তু এগুলো এখনো জনপ্রিয়তার দিক থেকে প্রাণীজ দুধের কাছাকাছি আসতে পারে নি।
বিবিসির মাইকেল মার্শাল এক রিপোর্টে লিখছেন, প্রাণীজ দুধের সাথে মানুষের সম্পর্ক হাজার হাজার বছরের পুরোনো। এর ইতিহাসও অতি বিচিত্র উত্থান-পতনে ভরা।
মানুষ হয়ে অন্য প্রাণীর দুধ খাওয়াটা কি একটা 'আজব' ব্যাপার?
দুধ খাওয়াটা মানুষের কাছে এতই স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে যে কেউ যদি বলে - এটা একটা আজব কাজ - তাহলে এ কথা যে বলবে তাকেই বরং আপনার একটা উদ্ভট লোক বলে বনে হবে।
কারণ আমরা কখনো এভাবে চিন্তা করি না।
একটি গরু বা অন্য কোন প্রাণীর দেহে দুধ তৈরি হয় - তার বাচ্চাদের খাওয়ানোর জন্য। কিন্তু মানুষ কি করছে? তারা গরুটার বাঁট টিপে টিপে সেই দুধ বের করে নিয়ে নিজেরা খাচ্ছে। এটা কি একটা আজব ব্যাপার নয়?
কিন্তু এমন সংস্কৃতিও আছে, যেখানে প্রাণীর দুধ খাবার কথা অনেকেরই প্রায় অজানা।
এই সেদিন, ২০০০ সালে চীনে একটা প্রচারাভিযান শুরু হয়েছিল যাতে লোকে স্বাস্থ্যগত কারণেই আরো বেশি করে দুধ এবং দুধজাত খাবার খায়।
এই প্রচারাভিযানটিকে চীনের বয়স্ক লোকদের দিক থেকে গভীর সন্দেহের মোকাবিলা করতে হয়েছিল। দুধ থেকে যে পনির তৈরি হয় তা এখনও চীনের অনেক মানুষকে অসুস্থ করে ফেলতে পারে।
বলা হয়, মানব প্রজাতির ইতিহাস মোটামুটি তিন লক্ষ বছরের। সে তুলনায় দুধ খাবার ইতিহাসকে প্রায় 'নতুন' বলা যায়।
মোটামুটি ১০ হাজার বছর আগেও মানুষ দুধ প্রায় খেতোই না।
খেলেও তা ছিল খুবই বিরল। প্রথম যে মানুষেরা দুধ খেতে শুরু করে তারা ছিল পশ্চিম ইউরোপের কৃষক ও পশুচারণকারী জনগোষ্ঠীর লোক । এরাই ছিল প্রথম মানুষ যারা গরু বা অন্য পশুদের পোষ মানিয়ে গৃহপালিত প্রাণীতে পরিণত করেছিল।
বর্তমানে উত্তর ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং অন্য আরো অনেক জায়গায় দুধ পান করাটা সাধারণ ব্যাপার হয়ে গেছে।
মানুষের জন্য অন্য প্রাণীর দুধ খাওয়াটা যে 'অস্বাভাবিক' তার একটা বৈজ্ঞানিক যুক্তিও আছে।
'বৈজ্ঞানিক যুক্তি'
দুধের মধ্যে আছে এক বিশেষ ধরণের শর্করা - যাকে বলে ল্যাকটোজ। ফল বা অন্যান্য মিষ্টি খাবারে যে শর্করা থাকে তার চেয়ে এটা অনেক আলাদা। আমরা যখন শিশু ছিলাম, আমাদের শরীর এক বিশেষ ধরণের এনজাইম তৈরি করতো যাকে বলে ল্যাকটেজ - যার কাজ ছিল আমাদের মায়ের দুধ হজম করতে সহায়তা করা। কিন্তু শিশু যখন মায়ের দুধ খাওয়া ছেড়ে দেয় - তখন অনেকের দেহেই সেই ল্যাকটেজ তৈরি বন্ধ হয়ে যায়।
এই ল্যাকটেজ ছাড়া দুধ ঠিকমত হজম হয় না। তাই একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষ যদি বেশি দুধ খায় তাহলে তার পেটে গ্যাস হওয়া, পেটে ব্যথা, খিঁচুনি অথবা ডায়রিয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
মানুষ ছাড়া অন্য স্তন্যপায়ী প্রাণী যেমন গরু, কুকুর বা বিড়ালের মধ্যেও দেখা যায় যে তারা পূর্ণবয়স্ক হলে তাদের দেহে ল্যাকটেজ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অনেকেই দুধ খেয়ে হজম করতে পারেন, কারণ তাদের দেহে ল্যাকটেজ তৈরি বন্ধ হয় না। মানুষের ক্ষেত্রে এটা কিভাবে ঘটলো?
দুধ হজম করার 'ল্যাকটেজ' এনজাইম কারো দেহে সারাজীবন থাকে, কারো থাকে না
প্রথম যে প্রাপ্তবয়স্ক ইউরোপিয়ানরা দুধ খেয়েছিল - তাদের হয়তো প্রচুর গ্যাস হতো।
কিন্তু কিছুকালের মধ্যেই তাদের মধ্যে একটা বিবর্তন ঘটেছিল। তারা মায়ের দুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলেও তাদের দেহে ল্যাকটেজ উৎপাদন অব্যাহত রয়ে গেল, দেখা গেল তারা দুধ খেলেও কোন বিরূপ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে না।
এর কারণ হিসেবে ডিএনএ'র একটি অংশকে চিহ্নিত করা হয়েছে - যা ল্যাকটেজ জিনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এই প্রবণতাকে বলে ল্যাকটেজ পার্সিস্টেন্স এবং এর বিবর্তন নিয়ে একটি গবেষণা প্রবন্ধ লিখেছেন প্যারিসের 'মিউজিয়াম অব হিউম্যানকাইন্ড'-এর অধ্যাপক লোরে সেগুরেল। তিনি বলছেন, "ইউরোপের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের মধ্যে প্রথম ল্যাকটেজ পার্সিস্টেন্স দেখা যায় এখন থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে। আর মধ্য ইউরোপে এটা প্রথম দেখা যায় ৩ হাজার বছর আগে।"
বর্তমানে অনেক জনগোষ্ঠীর মধ্যেই এ প্রবণতা অর্থাৎ 'দুধ হজম করার ক্ষমতা' খুবই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। উত্তর ইউরোপে এখন ৯০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই দেহে ল্যাকটেজ এনজাইম তৈরি হচ্ছে।
আফ্রিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কিছু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও এ কথা সত্য।
কিন্তু এমন অনেক জনগোষ্ঠী আছে যাদের দেহে ল্যাকটেজের অব্যাহত উপস্থিতি অনেক বিরল। আফ্রিকানদের অনেকের মধ্যেই এটা নেই। এশিয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকাতেও এটা সাধারণত দেখা যায় না।
কেন এমন হয়, তা এখনো এক ধাঁধাঁ
বৈজ্ঞানিকরা বলছেন: কোন কোন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে কি কারণে দুধ খাবার অভ্যাস গড়ে উঠেছে এবং তাদের প্রাপ্তবয়স্কদের দেহে ল্যাকটেজ এনজাইম তৈরি হচ্ছে - এটার কোন সূত্র বের করা খুবই কঠিন।
মি. সেগুরেল বলছেন, "দুধ খাওয়াটা 'উপকারী' হয়ে উঠেছে কেন, বা অন্য অনেক রকম খাদ্যের উৎস থাকলেও একেবারে অন্য রকম একটি খাদ্য এই দুধই কেন এতটা 'গুরুত্বপূর্ণ' হয়ে উঠেছে - এটা বলা কঠিন।"
কেউ হয়তো বলতে পারেন, দুধ পান করার ফলে মানুষ নতুন একটি পুষ্টিদায়ক খাবারের সন্ধান পেয়েছে, তাদের অনাহারে থাকার ঝুঁকি কমেছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে এ যুক্তি খুব বেশি খাটে না।
যেসব লোক দুধ খেয়ে হজম করতে পারে না, তারাও অল্প পরিমাণ দুধজাতীয় খাবার কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই খেতে পারে। তা ছাড়া দুধ থেকে যে মাখন, দই, ক্রিম এবং পনির তৈরি হয় - এর সবগুলোতেই ল্যাকটোজের পরিমাণ অনেক কমে যায়। চেডার এবং পারমিজিয়ানো নামে যে বিশেষ ধরণের পনির আছে তাতে মাত্র ১০ শতাংশ বা তারও কম ল্যাকটোজ থাকে।
"ঘন ক্রিম এবং মাখনে ল্যাকটোজের পরিমাণ সবচেয়ে কম" - বলছেন সেগুরেল।  জানা যায়, চিজ বা পনির তৈরির কৌশল মানুষ বেশ দ্রুতই উদ্ভাবন করেছিল।
গত বছর সেপ্টেম্বরে বর্তমান ক্রোয়েশিয়ায় পড়ে এমন একটি এলাকায় পুরাতত্ববিদরা কিছু মৃৎপাত্রের অংশ খুঁজে পান - যাতে ফ্যাটি এসিডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। এতে মনে হয় ওই পাত্র দই বা ছানা জাতীয় কিছু তৈরির কাজে ব্যবহৃত হতো - যা পনির উৎপাদনের একটি ধাপ। এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে বলতে হবে দক্ষিণ ইউরোপের লোকেরা ৭,২০০ বছর আগেই পনির তৈরি করতো। ইউরোপের অন্যত্র আরো হাজারখানেক বছর পরের পনির উৎপাদনের তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। মনে রাখতে হবে তখনও ইউরোপের প্রাপ্তবয়স্ক লোকদের দেহে ল্যাকটেজ পার্সিস্টেন্স অর্থাৎ দুধ হজম করার এনজাইমের স্থায়ী উপস্থিতি তৈরি হয় নি।
তবে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের জেনেটিক্সের অধ্যাপক ডালাস সোয়ালো বলছেন, কোন ধরণের লোকের দেহে পরিণত বয়সে উচ্চ মাত্রায় ল্যাকটেজ থাকে এবং কাদের থাকে না - তার একটা স্পষ্ট প্যাটার্ন আছে।
তিনি বলছেন, যারা পশুচারণ করতো, গরু-ছাগল-ভেড়া পালতো - তাদের দেহে উচ্চ মাত্রায় ল্যাকটেজ পাওয়া যায়। কিন্তু যারা শিকারী এবং কোন প্রাণী পুষতো না - তাদের মধ্যে জিনের ওই পরিবর্তনটি ঘটেনি। যেসব জনগোষ্ঠী শুধু চাষাবাদ করতো কিন্তু কোন পশুপালন করতো না - তাদের দেহেও 'ল্যাকটেজ পার্সিস্টেন্স' নেই।
তার মানে হচ্ছে - যাদের জীবনধারার কারণে প্রাণীর দুধ সংগ্রহ করা সম্ভব ছিল না, তাদের দেহকে দুধ পানের উপযোগী করে তোলার জন্য বিবর্তিত হবার কোন চাপ ছিল না।
তাহলে প্রশ্ন হলো, কিছু কিছু পশুচারণকারী জনগোষ্ঠীর দেহে এই বৈশিষ্ট্য তৈরি হলেও অন্যদের ক্ষেত্রে তা হলো না কেন?সেগুরেল বলছেন, মঙ্গোলিয়ার মতো পূর্ব এশিয়ায় যেসব পশুচারণকারী জনগোষ্ঠী আছে তাদের দেহে ল্যাকটেজের উপস্থিতি অত্যন্ত কম - যদিও তারা খাদ্য হিসেবে তাদের পালিত পশুর দুধের ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল।
অথচ নিকটবর্তী পশ্চিম এশিয়া বা ইউরোপের জনগোষ্ঠীগুলোর জিনে এ পরিবর্তন হয়েছে, কাজেই পূর্ব এশিয়ার গ্রুপগুলোতেও এ পরিবর্তন ছড়াবে এটা তো স্বাভাবিক। কিন্তু তা হয় নি, এবং এটা একটা ধাঁধাঁ হিসেবে রয়ে গেছে, বলছেন সেগুরেল।
দুধ খাবার কি কোন উপকারিতা আছে?
সেগুরেল বলছেন, পুষ্টিগুণ ছাড়াও দুধ পানের হযতো আরো কিছু উপকারিতা আছে।
তিনি বলছেন, গবাদিপশুর যেসব রোগ হয় - তাদের পালনকারী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও সেসব রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। এটা হতেই পারে যে গরুর দুধ পান করলে মানবদেহে এমন কিছু এন্টিবডি তৈরি হয়, যাতে এ্যানথ্রাক্স ক্রিপটোস্পোরিডিওসিসের মতো রোগ সংক্রমণ ঠেকাতে পারে। বাচ্চাদের মায়ের দুধ খাওয়ানোর একটি উপকারিতাও তাই - শিশুর দেহকে সংক্রমণ থেকে রক্ষা।
তবে কোন কোন জনগোষ্ঠীর দেহে যে ল্যাকটেজের উপস্থিতি থাকে না - এটা হয়তো নিতান্তই দৈবক্রমে ঘটেছে - এমনটাও হতে পারে। অধ্যাপক সোয়ালো বলছেন, "আপনি যদি পশুচারণকারী হন তাহলে আপনার দেহে দুধ হজম করার স্থায়ী ক্ষমতা তৈরি হবে - এটাই হচ্ছে সবচেয়ে আমাদের ছবিটার সবচেয়ে যৌক্তিক অংশ।কিন্তু দুধ হজম করতে হলে আপনার জিনের সেই বিশেষ মিউটেশনটা হতেই হবে - প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রশ্নটা আসবে তার পরে।"
অধ্যাপক সোয়ালো বলছেন, মঙ্গোলিয়ান গো-চারণকারী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দেখা যায় যে তারা সাধারণত গাঁজানো দুধ খায় - যাতে ল্যাকটোজের পরিমাণ কমে যায়।
অধ্যাপক সোয়ালোর ছাত্রী ক্যাথরিন ওয়াকার বলছেন, "মানুষ দুধকে গাঁজিয়ে ল্যাকটোজ কমিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে এত উন্নতি করেছে, কিন্তু তার পরও তার দেহে দুধ হজমের এনজাইম রয়ে যাচ্ছে কেন সেটাও একটা প্রশ্ন - যার উত্তর পাওয়া কঠিন।"
হয়তো মানবদেহে ল্যাকটেজ পার্সিস্টেন্স তৈরি হবার একটি নয় বরং অনেক কারণ রয়েছে।
অধ্যাপক সোয়ালো বলছেন, "দুধে প্রচুর চর্বি, প্রোটিন, শর্করা বা সুগার, এবং ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন-ডির মতো অন্যান্য পুষ্টিগুণ রয়েছে - এবং এটাই হয়তো মানবদেহে দুধ হজম করার এনজাইমের স্থায়ী উপস্থিতির আসল কারণ। তা ছাড়া এটা পরিষ্কার পানিরও একটা উৎস। এটাও হয়তো কোন কোন জনগোষ্ঠীর বিবর্তনের কারণ হতে পারে।"
মানবদেহে এই পরিবর্তনটা এখনো ঘটছে কিনা তা অবশ্য স্পষ্ট নয়। অধ্যাপক সোয়ালো ২০১৮ সালে একটা জরিপ চালিয়েছিলেন চিলির কোকুইম্বো এলাকায় পশুচারণকারী একটি জনগোষ্ঠীর ওপর। প্রায় ৫০০ বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকায় নতুন আসা ইউরোপিয়ানদের সাথে এই জনগোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের যৌনমিলন ও সন্তান উৎপাদন হয়। এখন এই গোষ্ঠীটির মধ্যে দুধ হজম করার ক্ষমতা ছড়িয়ে পড়ছে। ঠিক যেমনটা ৫ হাজার বছর আগে উত্তর ইউরোপে ঘটেছিল।
তবে কোকুইম্বো জনগোষ্ঠী দুধের ওপর নির্ভরশীল, তাই তাদের অবস্থাটা পৃথিবীর অন্য জায়গার মতো নয়।
দুধ খাবার অভ্যাস কি কমছে?
গত কয়েক বছর যাবৎ যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হতে পারে, লোকজন বোধহয় দুধ খাওয়া ছেড়ে দিচ্ছে। ২০১৮ সালের নভেম্বর মাসে ব্রিটেনের দৈনিক গার্ডিয়ান একটি রিপোর্ট করে।
এতে বলা হয়, ব্রিটিশ জনগণের মধ্যে গরুর দুধের প্রতি আকর্ষণ কমে যাচ্ছে, বরং ওট এবং বাদামের দুধ উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর ব্যবসা ক্রমাগত বাড়ছে। এতে মনে হয় ঐতিহ্যগত দুধের জন্য একটা লড়াই আসন্ন।
কিন্তু পরিসংখ্যান দেখলে দেখবেন ব্যাপারটা উল্টো। আইএফসিএন নামের ডেইরি রিসার্চ নেটওয়ার্ক তাদে ২০১৮ সালের রিপোর্টে বলছে, ১৯৯৮ সাল থেকে বৈশ্বিক দুধের উৎপাদন প্রতি বছরই বেড়েছে। ২০১৭ সালে বিশ্বে দুধ উৎপাদন হয়েছে ৮৬ কোটি ৪০ লাখ টন। আইএফসিএন বলছে, ২০৩০ সাল নাগাদ দুধ উৎপাদন আরো ৩৫ শতাংশ বাড়বে।
মানুষ কি খাচ্ছে তার পর ২০১০ সালের এক রিপোর্টে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে দুধ খাওয়ার পরিমাণ গত দু দশেকে কমেছে, এর জায়গায় কোমল পানীয় পান বেড়েছে। অন্যদিকে এশিয়ায় দুধ খাওয়া বেড়েছে। ২০১৫ সালে ১৮৭টি দেশে চালানো আরেক জরিপে দেখা যায়, বয়স্কদের মধ্যে দুধ খাওয়া বাড়ছে, এর অর্থ হতে পারে তরুণদের মধ্যে দুধ অতোটা জনপ্রিয় নয়। কাজেই বিশ্বে দুধের প্রতি আকর্ষণ যেভাবে বাড়ছে - তাতে 'বিকল্প দুধ' যে তার জায়গা দখল করে নেবে, বা বাজারে আঘাত হানবে - এমন মনে হয় না।
তা ছাড়া সয়া, ওট বা আমন্ডের মতো বিকল্প দুধে দুধের মতো পুষ্টিগুণও নেই। এটা শুথু ভেগান বা দুধে এ্যালার্জি আছে এমন লোকদের জন্যই সুবিধাজনক।
এশিয়াতে দুধের চাহিদা যেভাবে বাড়ছে সেটা বেশ বিস্ময়কর।
কারণ এশিয়াতে বেশির ভাগ লোকের ক্ষেত্রেই বড় হবার পর তাদের দেহে দুধ হজম করার ল্যাকটেজ এনজাইম উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।
তুলনামূলকভাবে দুধের উপকারিতার চেয়ে অধিকাংশ এশিয়ানের ক্ষেত্রে এটা হজম করতে গিয়ে যে সমস্যা হয় - তার পরিমাণ বেশি।
উন্নয়নশীল কিছু দেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মানুষের মধ্যে লামার মতো অন্য প্রাণীর দুধ প্রচলিত করার চেষ্টা করেছে, কারণ এটা হয়তো গরুর দুধের চেয়ে সহজপ্রাপ্য বা সস্তা হবে।
এ বছরই জানুয়ারি মাসে একটা গুরুত্বপূর্ণ জরিপে এমন কিছু বৈশ্বিক স্বাস্থ্যকর খাবারের কথা বলা হয়েছে - যাতে স্বাস্থ্যও ভালো থাকবে, আবার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়াও কম হবে।
এতে রেড মিট অর্থাৎ গরু-ছাগল-ভেড়ার মাংস ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ বা তার সমমানের কিছু খাবার কথা ঠিকই বলা হয়েছে।
সুতরাং মানুষের খাদ্য হিসেবে দুধ এখনো ভালোভাবেই টিকে আছে, এবং এখনো তার প্রসার হচ্ছে।
যদিও আমাদের দেহে এই দুধ হজম করার ক্ষমতার বিবর্তন থেমে গেছে।
সূত্রঃ বিবিসি

Thursday, October 14, 2021

যেভাবে ডাইনোসরের সমাধি খুঁজে পেলো এক মেষপালক

এই গল্পটি এক মেষপালকের। তবে এতে আরও আছেন একজন ভূগোল শিক্ষক এবং পেনশনের টাকায় নিজের খরচা চালানো আরেকজন প্রৌঢ়।
মেষ পালকের নাম ডুমাঙ্গে তৈয়বেকা। মূলত তিনিই সন্ধান দিয়েছেন ২০০ মিলিয়ন বা দুই হাজার বছরের পুরনো সেই ডাইনোসরের কঙ্কালের।
দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের ক্ষেমেগা গ্রামে ঘটেছে এই ঘটনা।
ডাইনোসরের সমাধি আবিষ্কারের পর থেকে নিজের লোকালয়ে রীতিমতো 'নায়ক' বনে গেছেন ৫৪ বছর বয়সী তৈয়বেকা।
তার মুখেই শোনা যাক সেই সমাধি খুঁজে পাবার ঘটনাটা।
"আমার বংশের পূর্ব পুরুষ অর্থাৎ আমার দাদা'র বাবা ও মায়ের কবর ছিল এখানটায়। আর আমার উপরে ছিল সেগুলো দেখ-ভাল করার ভার।"
একদিন কবর রক্ষণা-বেক্ষণের কাজ করার সময় হঠাৎ নজরে এলো বিরাটকার একটা হাড়। "এরকম হাড় আমি জীবনের দেখিনি।"

আমাদের গ্রাম নিয়ে একদিন বই লেখা হবে

"শৈশবে আমরা ডাইনোসরের গল্প শুনেছি। কিন্তু তখন আমরা জানতাম যে, ডাইনোসরের গল্প হচ্ছে এক ধরনের রূপকথা," বলছিলেন জেমস রেলেন।
"তবে, ১৯৮২ সালে কিছু বই পড়ার পর আমার মনে হল, ডাইনোসর আসলে কল্পকাহিনী নয়, এটি বাস্তব। সেই থেকেই ডাইনোসরের অস্তিত্বের সন্ধান করেছি আমি," জানাচ্ছিলেন জেমস রেলেন।
মি. রেলেন হলেন ডাইনোসরের সমাধি আবিষ্কার গল্পের দ্বিতীয় চরিত্র এবং পেনশনের টাকার উপরেই যার জীবিকা নির্ভরশীল।
রেলেন বলছিলেন যে, "এই আবিষ্কারের অংশ হতে পেরে আমার যে কী আনন্দ হয়েছে তা আর বলে বোঝানো যাবে না।"
"এই ক্ষুদ্র গ্রাম নিয়ে একদিন বই লেখা হবে। আর সারা দুনিয়া তখন জানবে আমাদের।"
এমনকি এখানকার স্থানীয় উন্নয়নেও এটি বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করেন জেমস রেলেন।
ডাইনোসরের ফসিল বা জীবাশ্ম খুঁজে বের করা এই তিনজনের আরেকজন হলেন থেম্বা জিকাজিকা। তিনি পেশায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূগোল শিক্ষক।
জিকাজিকা বলছিলেন, "কঙ্কালটা পেয়ে তারা সেটি আমার কাছে নিয়ে আসে। তখন সেটিকে আমি জানাই যে, এটি একটি ফসিল।"

সবখানে ছড়ানো ছিল ডাইনোসর

২০১৮ এর শুরুর দিকে এই গ্রামে এক দল প্রত্ম-জীবাশ্মবিদ কয়েক সপ্তাহ ধরে ডাইনোসরের সমাধিতে খনন কাজে অংশ নিয়েছে। 
ইস্টার্ন কেইপ প্রদেশে এই ফসিলগুলোর সন্ধান মেলে।
এই দলটিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধ্যাপক জোনাহ কোইনিয়ের।
তিনি বলছিলেন, "আমরা যখন প্রথম ওই জায়গাটা দেখতে যাই, সেটি ছিল দারুণ ব্যাপার। মনে হচ্ছিলো সবখানেই ছড়ানো ছিল ডাইনোসর।"
সামনের বছর আবার তারা এই গ্রামে আসবেন এবং এই কঙ্কাল ও হাড়গুলোকে জোহানসবার্গে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবেন বলেও জানান তিনি।

বারো জাতের উদ্ভিদ-খেকো প্রজাতি

যেখানে এই কঙ্কাল মিলেছে সেই জায়গাটি একেবারে পতিত ভূমি। কোনও গাছপালা কিছুই নেই সেখানকার প্রায় ১২ মাইলের মধ্যে।
ধারণা করা হচ্ছে যে, শতশত প্রত্ন-জীবাশ্ম সেখানে রয়েছে। আর এগুলো এসেছে অন্তত ১২ জাতের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ-খেকো সরোপোডোমর্ফ ডাইনোসর থেকে।
যে হাড়টা পাওয়া গেছে তা দেখে অনুমান করা হচ্ছে যে, প্রাণীটি অন্তত ২৬ ফিট লম্বা আর এক টন ওজন ছিল।
আজ থেকে প্রায় ১,৪৫০ বছর থেকে ২,০০০ বছর আগে জুরাসিক যুগে লম্বা গলার, দীর্ঘ শরীরের এই ডাইনোসরগুলো পাওয়া যেতো।
গবেষণায় এই জায়গা থেকে আরও দারুণ তথ্য আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, গবেষণা সম্পন্ন করতে হয়তো সময় লাগতে পারে বছরের পর বছর।
কিন্তু ইতোমধ্যেই এই প্রজেক্টে কাজ করতে গিয়ে খুব উচ্ছ্বসিত নবীন গবেষক চেবিসা ম্ডেকাজি।

পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু

নদীর শুকনো রেখা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনজন স্থানীয় পুরুষ বলছিল, এই জায়গাটিকে ঘিরে তাদের বিরাট স্বপ্নের কথা।
তারা চায়, এই স্থানটিকে ইউনেস্কো ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হোক। যদি তা করা হয় তাহলে গবেষক ও পর্যটকেরা এখানে আসবে।
এর ফলে চাঙ্গা হয়ে উঠবে এখানকার স্থানীয় অর্থনীতি।
আর মেষপালক মিস্টার তৈয়বেকা মনে করেন, এই স্থান এখানকার তরুণ প্রজন্মের জীবনটাই পাল্টে দিতে পারে।
তিনি বলছিলেন, "আমার কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই। কিন্তু এই ডাইনোসরগুলো পাওয়ায় আমাদের সন্তানেরা বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ায় আগ্রহী হবে।"
ডাইনোসরের ফসিলের সন্ধানে খোড়াখুড়ি চলছে।

Tuesday, October 12, 2021

গর্ভবতী মায়ের দৈনিক খাবার রুটিন

একজন গর্ভবতী মাকে নিজের স্বাস্থ্য ও তার গর্ভস্থ ভ্রূণের সঠিক বিকাশ নিশ্চিত করতে হয় বলে গর্ভবতী মাদের একটি আদর্শ খাবার রুটিন অনুযায়ী খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের ৭-১১ কেজি ওজন বৃদ্ধি পায়। এছাড়াও গর্ভকালীন সময়ে মায়ের শরীরে যেন পর্যাপ্ত শক্তি থাকে ও হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও যেন ঠিক থাকে এজন্য প্রথম থেকেই একটা আদর্শ খাবার রুটিন মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। একটি আদর্শ খাবার তালিকা কেমন হবে তা বোঝার আগে জানা উচিত এই সময়ে মায়েদের কী কী খাওয়া উচিত এবং কী খাওয়া উচিত নয়।
১. ক্যালসিয়াম
ক্যালসিয়াম শিশুর হাড়ের গঠনের জন্য অতি প্রয়োজনীয় উপাদান। মা যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ ক্যালসিয়াম না খান তবে শিশুর হাড় শক্ত হবে না। এমনকি ক্যালসিয়ামের অভাবে গর্ভাবস্থায় মায়ের কোমর ও পায়ের গোড়ালিতে ব্যাথা অনুভূত হতে পারে। দুগ্ধজাত খাদ্য যেমন দুধ, দই, পনির ইত্যাদিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম থাকে। তবে এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে, মায়ের যদি হাই প্রেশার থাকে তবে দুধ না খেয়ে তাকে দই খেতে হবে। এছাড়াও প্রতিদিন ভাতের সাথে একটি কাঁচা মরিচ অনেকটা ক্যালসিয়ামের যোগান দিয়ে থাকে। মাছ ও মাছের কাটায় থাকে প্রচুর ক্যালসিয়াম। মটরশুঁটি, বিভিন্ন ধরণের বাদাম, ছোলা ও শাকসবজি এবং ফলমূলেও থাকে ক্যালসিয়াম। এরপরও ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী গর্ভবতী মাকে ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেতে দেওয়া হয়।
২. আয়রন
আয়রনের ঘাটতি হলে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হয়। অনেক শিশুর জন্মের পর থেকেই হিমোগ্লোবিনের অভাব বা রক্তস্বল্পতা দেখা দেয় আয়রনের ঘাটতির কারণে। তাই গর্ভাবস্থায় মাকে প্রচুর আয়রন সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। কচু শাক, লাল শাক, পালং শাক, কাঁচা কলা, ডালিম, বিটস, বাদাম, ছোলা, খেজুর, কলিজা, শিং মাছ, মাগুর মাছ ইত্যাদিতে থাকে প্রচুর পরিমাণে আয়রন।
আয়রন সমৃদ্ধ খাবার; সূত্র: LifeMartini.com
৩. ফলিক এসিড
ফলিক এসিড বা ফোলেট এক ধরণের ভিটামিন বি কমপ্লেক্স জাতীয় উপাদান। গর্ভের সন্তানের হৃদপিণ্ড, মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে ও অঙ্গহানি রোধ করতে ফলিক অ্যাসিড একটি প্রয়োজনীয় উপাদান। বিভিন্ন ফলমূল যেমন আম, জাম, লিচু, কমলা, আঙ্গুর, স্ট্রবেরি ইত্যাদিতে থাকে ফলিক এসিড। এছাড়া সবুজ পাতা সমৃদ্ধ খাবার যেমন- পুঁইশাক, পাটশাক, মূলাশাক, সরিষা শাক, পেঁপে, লেবু, ব্রকলি, মটরশুঁটি, শিম, বরবটি, বাঁধাকপি, গাজর ইত্যাদি ও বিভিন্ন ধরনের ডাল যেমন- মসুর, মুগ, মাষকালাই, বুটের ডাল ইত্যাদিতে ফলিক এসিড প্রচুর পরিমাণে বিদ্যমান থাকে।
এছাড়াও সরিষা, তিল, তিসি, সূর্যমুখীর বীজ, লাল চাল, লাল আট ইত্যাদি ফোলেট সমৃদ্ধ খাবার। তবে মায়ের শরীরে পর্যাপ্ত ফলিক এসিডের পরিমাণ নিশ্চিত করতে গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই ডাক্তাররা ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ ট্যাবলেট খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।
ফলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার; সূত্র: Fit Pregnancy
৪. জিংক
গর্ভাবস্থায় জিঙ্কের পরিমাণ কম হলে কম ওজনের শিশু জন্ম দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া দেহের বৃদ্ধি রোধ বা বামনত্ব হতে পারে। এছাড়াও জিংকের অভাবে পরবর্তীতে শিশুর ডায়রিয়া বা নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও কনজাংকটিভার প্রদাহ, পায়ে বা জিহ্বায় ক্ষত, মুখের চারপাশে ক্ষত, আচরণগত অস্বাভাবিকতা, অমনোযোগিতা, বিষন্নতা, সিজোফ্রেনিয়া, ক্ষুধা মন্দা দেখা দেয়। ভেড়া ও গরুর মাংস,ফুলকপি,সবুজ শিম, টমেটো ইত্যাদিতে জিংক রয়েছে। সামুদ্রিক মাছ, গরু-খাসির কলিজা, আটা-ময়দার রুটি, দুগ্ধজাত খাদ্য, শিমজাতীয় উদ্ভিদ, মসুর ডাল, চীনাবাদাম, মাশরুম, সয়াবিন ও ঝিনুকে জিংক পাওয়া যায়।
৫. আয়োডিন
আয়োডিন শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ ও শারীরবৃত্তীয় কাজ সুষ্ঠভাবে সম্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান। এর অভাবে শিশুর প্রতিবন্ধী হতে পারে। তাই গর্ভাবস্থায় আয়োডিন যুক্ত লবণ খাওয়া জরুরি। এছাড়াও সামুদ্রিক মাছ, দুধ, দই, পনির, ডিম্, কলা ও কলার মোচা ইত্যাদিতে থাকে প্রচুর আয়োডিন।
৬. ভিটামিন এ
ভিটামিন এ এর অভাবে শিশুর দৃষ্টিশক্তি হীনতা হতে পারে। ভিটামিন এ চোখের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। এছাড়া ভিটামিন এ দেহের বৃদ্ধি ও চর্ম, দাঁত ও অস্থির গঠন এবং নানা রকম সংক্রামক রোগ হতে শরীরকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয়। সকল প্রকার রঙিন ফলমূল ও শাকসবজি তে আছে ভিটামিন এ। এছাড়া মলা ও ঢেলা মাছ, ডিমের কুসুমেও এটি বিদ্যমান।
৭. ভিটামিন ডি
ভিটামিন ডি দেহের অন্ত্র থেকে ক্যালসিয়ামকে শোষণ করে। ভিটামিন ডি র অভাবে শিশুদের হাড় ঠিকমতো বৃদ্ধি পায় না এবং হাড় বাঁকা হয়ে যায়। দুধ, দই, পনির, ডিম্, সামুদ্রিক মাছ, গরুর কলিজা, মাছের তেল, মাশরুম ইত্যাদিতে আছে ভিটামিন ডি।
গর্ভবতী মায়ের জন্য একটি আদর্শ খাবার রুটিন
গর্ভবতী মায়ের আদর্শ খাবার রুটিন; সূত্র: MomJunction
উপরোক্ত উপাদানগুলো গর্ভবতী মায়ের নিত্যদিনের খাবার তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত। কিন্তু একই সাথে গর্ভাবস্থায় মায়ের নানারকম শারীরিক সমস্যা থাকতে পারে। সাধারণ সমস্যাগুলোর মধ্যে কিছু হলো সকালে ঘুম থেকে উঠার পর বমি ভাব যাকে বলে মর্নিং সিকনেস, ক্ষুধামন্দা, অরুচি, কোষ্ঠকাঠিন্য। এগুলো বিবেচনা করে নিচে গর্ভবতী মায়ের জন্য একটি আদর্শ খাবার রুটিন দেয়া হলো:
সকাল
মর্নিং সিকনেসের জন্য সকালে ভারী খাবার না খাওয়াই ভালো। উঠেই সামান্য বিস্কুট বা মুড়ি এ জাতীয় শুকনা খাবার ও পানি খেয়ে কিছুক্ষন হাঁটাচলা করে নেওয়া ভালো। এরপর ১-২টি রুটি সাথে ১ বাটি সবজি/ডাল/ তরকারি এবং একটি ডিম খাওয়া যেতে পারে।
সকাল ১১ টার দিকে ১ গ্লাস দুধ বা ফলমূল খেতে পারেন। গম ও ভুট্টার তৈরী ছাতুতে প্রচুর ফাইবার, কার্বোহাইড্রেট, ভিটামিন ও মিনারেলস আছে। হালকা নাস্তা হিসেবে এটা খেতে এপ্রেন।
দুপুর
দেড় থেকে ২ কাপ ভাত বা ৩-৪ তা রুটি খাওয়া উচিত ভারী খাবার হিসেবে। এর সাথে সবজি/ ডাল/ তরকারি এবং অবশ্যই ৫০-৭০ গ্রাম মাছ/ মাংস খাওয়া উচিত। সাথে সালাদ খেতে পারেন। তবে একটি কাঁচা মরিচ খেতে ভুলবেননা। খাওয়ার পরে দই খেলে তা হজমে সাহায্য করবে।
বিকেল
বিকেলে খেতে পারেন স্যুপ, কাস্টার্ড বা বাড়িতে তৈরী যেকোনো নাস্তা। বাহিরের খাবার কিংবা চা-কফি খাওয়া মোটেই উচিত নয়।
রাত
রাতের খাবার দুপুরের খাবারের অনুরূপ। তবে শাক জাতীয় খাবার রাতে খেলে হজমে সমস্যা হতে পারে। তাই রাতে শাক না খাওয়াই উত্তম।
>>>parentingtips.co

ডাচ নৌবাহিনী থেকে পালাতে বিমান চুরি করেছিলেন যিনি

নববিবাহিত স্ত্রীর সাথে দেখা করতে ১৯৬৯ সালে ব্রিটিশ বিমানঘাঁটি থেকে বিমান চুরি করে পালাতে গিয়ে নিখোঁজ হন মার্কিন অফিসার সার্জেন্ট পল মেয়ের। তার উপরে গত দু'বছর অনুসন্ধান করছেন বিবিসি'র সাংবাদিক এমা জেন কিরবি।
প্রায় একই রকম কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন ডাচ নৌবাহিনীর তরুণ থিও ফন এইজ্ক। তবে, মি. মেয়েরের সাথে এইজ্কের ফারাক হচ্ছে, নিজের কাহিনী নিজ মুখে বলার জন্য তিনি এখনো বেঁচে রয়েছেন।
থিও ফন এইজ্কের ছোট্ট বাড়িটি যেন একটা আশ্চর্য খনি। ঝাড়ুর ওপর বসে থাকা খেলনার ডাইনি থেকে শুরু করে ওপরের তাকে রাখা চীনামাটির বিড়াল পরিবার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। পাশেই কয়েকটা খুলি দাঁত কেলিয়ে আছে।— কী নেই সেখানে!
তবে, এইজ্কের বাসার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বস্তু ওই কফি টেবিলটা— যেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে সযত্নে রাখা পুরনো পত্রিকার কিছু ক্লিপিং।
নিজের নব-তারুণ্যের দিনগুলোতে থিও ফন এইজ্ক সবসময় উড়ার স্বপ্ন দেখতেন
১৯৬৪ সালের সেসব পত্রিকার শিরোনামে লেখা রয়েছে এক তরুণ নাবিকের কথা — যে কিনা উড়োজাহাজ চুরি করে মাল্টা থেকে লিবিয়ার বেনগাজীতে পালিয়ে এসেছিল।
বয়সের ভারে সব চুল সাদা হয়ে যাওয়া ফন এইজ্ক পত্রিকার সেই সব ছবির দিকে তাকিয়ে হাস্যজ্জ্বলভাবে বলেন, "এটা আমি! ছবির ওই আমিটার বয়স তখন মোটে ২১"!
তার স্ত্রীও পাশে থেকে এসব কথা-বার্তা শুনছিলেন আর মাঝে-মাঝে কৌতুক ভরে অংশও নিচ্ছিলেন আলাপে।
তার দিকে ইঙ্গিত করে বলছেন, "কি বেয়াড়া রে বাবা! ভালো যে তোমার সাথে তখন পরিচয় হয়নি আমার।"
নিজের নব-তারুণ্যের দিনগুলোতে থিও ফন এইজ্ক সবসময় উড়ার স্বপ্ন দেখতেন। সত্যি বলতে সেই সাত বছর বয়স থেকেই তার ছিল উড়বার সাধ।
কিন্তু বিমান বাহিনীতে যোগ দিয়ে পাইলট হবার মতন ভালো রেজাল্ট তার ছিল না।
তখন হঠাৎ একদিন সে জানতে পেলো, ডাচ নৌবাহিনীতে নবিশ হিসেবে ইলেক্ট্রিশিয়ান পদে লোক নিচ্ছে। প্রশিক্ষণার্থীরা এখানে ভালো করতে পারলে তারা বৈমানিকের প্রশিক্ষণ পাবে।
থিও ফন এইজ্কের সাম্প্রতিক ছবি
ব্যাস! বৈমানিকের প্রশিক্ষণ পাবার সুযোগ আছে জেনেই নৌবাহিনীর ইলেকট্রিক-মিস্ত্রির তালিকায় নাম লিখিয়ে নিলেন ১৯ বছর বয়সী এইজ্ক। চুক্তি ছিল পরবর্তী ৮ বছর সে নৌবাহিনীতেই থাকবে।
তিনি প্রশিক্ষণে ভালো করেন। বৈমানিকের ট্রেনিং পাবার জন্যও মনোনীত হন। সেসময় ১৯৬৪ সালের শুরুর দিকেই, তার লগবুকে যোগ হয়েছে ৪০ ঘণ্টা উড়ার খতিয়ান।
এমন সময় একদিন এক পার্টিতে তার কমান্ডিং অফিসার বিমানের প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের অনুভূতি ও মতামত জানাতে বলেন।
এইজ্ক তখন রাখঢাক না রেখে বলেছিলেন যে, প্রশিক্ষণের জন্য ছোটো-ছোট বিমান না দিয়ে সাবমেরিন বিধ্বংস গ্রুমান ট্র্যাকার বিমানে করে প্রশিক্ষণ দিলে আরও ভালো হয়।
কিন্তু ঠিক এর পরদিনই এইজ্কের বিপত্তির শুরু। হঠাৎ করেই তার রেজাল্ট কার্ডে কমলা রঙের দাগ দেয়া হল। এর অর্থ হচ্ছে, তার রেজাল্ট এতই খারাপ যে, ফেল করার আশঙ্কা রয়েছে।
এটা দেখে সে ক্ষেপে গেলো। শিক্ষক আসার আগেই ক্লাসের ব্ল্যাকবোর্ডে ট্রেনিং নিয়ে কড়া মন্তব্য লিখে রাখল।
এর শাস্তি হিসেবে তাকে সপ্তাহান্তের জন্য নিজস্ব জেলে পুরে দিলো নৌবাহিনী। কিন্তু সুযোগ বুঝে সে জেল থেকে পালাল।
বেনগাজিতে এইজ্কের একক ভ্রমনের তথ্য রয়েছে লগ বুকে
পালানোর পর তাকে বৈমানিকের প্রশিক্ষণ থেকে বহিষ্কার করা হল।
কিন্তু এইজ্ক দমে গেলেন না। তাকে যেন বৈমানিকের প্রশিক্ষণে আবারো ফিরিয়ে নেয়া হয় সেই লক্ষ্যে আবেদন-নিবেদন করতে লাগলেন।
এই নিয়ে অফিসে আবেদন করতে গেলে অসাবধানে তাকে ভুল কাগজ ধরিয়ে দিয়ে ছিল।
কয়েকমাস পর অফিস থেকে বলা হল, ভুল পদ্ধতিতে আবেদন করায় তার অনুরোধ বিবেচনা হয়নি। ততদিনে অনেক সময় চলে গেছে। তাই, পুনরায় আবেদনের সুযোগও নেই।
অথচ চুক্তি মোতাবেক নৌবাহিনীতে তখনো তার আরও ছয় বছর বাকি। এই পুরোটা সময় তাকে ইলেকট্রিক মিস্ত্রী হয়েই কাটাতে হবে।
কিন্তু এভাবে এইজ্ক চাকরিতে থাকবেন না। তাই, চাকরি থেকে অব্যাহতি চাইলেন। কিন্তু বিধি বাম! তাকে অব্যাহতি দেয়া হল না। বারংবার অব্যাহতির আবেদন করলেও প্রতিবারই তিনি প্রত্যাখ্যাত হলেন।
তার সাথে যা করা হয়েছে সেটি মোটেও ন্যায়সঙ্গত হয়নি বলেই মনে করতেন এইজ্ক। তাই, এই নিয়ে এইজ্ক ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং নৌবাহিনী থেকে পালাবার ফন্দি আঁটতে শুরু করেন।
বিমান চুরি করে পালাতে গিয়ে নিখোঁজ হন মার্কিন অফিসার সার্জেন্ট পল মেয়ের
পালানোর একমাত্র রাস্তা হিসেবে এইজ্ক দেখলেন, গ্রুমান ট্র্যাকার প্লেন। কিন্তু সেটাতে তিনি তখনো কোনোদিন চড়েননি। তবে, এইজ্ক দমে যাবার পাত্র নন।
গ্রুমান ট্র্যাকার প্লেনের হ্যান্ডবুক নিয়ে সকাল-বিকাল পড়তে লাগলেন। তার অন্য সহকর্মীরা যখন পার্টিতে যায় অথবা বিশ্রাম নেয় এইজ্ক তখন পড়েন। পড়ে পড়ে বোঝার চেষ্টা করেন গ্রুমান ট্র্যাকার প্লেনের নাড়ী-নক্ষত্র।
একদিকে, এইজ্ক হ্যান্ডবুক পড়েন। অন্যদিকে, গ্রুমান ট্রেকার প্লেনের অভিজ্ঞ পাইলটদের সাথে আলাপের ছলে জেনে নেন, কিভাবে ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়া হয়, কিভাবে বিমান অবতরণ করা হয় সেইসব বৃত্তান্ত।
কিন্তু এইজ্কের মনে একটা সন্দেহ ছিল। সেটি হচ্ছে, সে যেখানে আছে সেখান থেকে উড়ে গন্তব্যে পৌঁছানো মুস্কিল।
একটু হলেই হয়তো গিয়ে ঠেকতে হবে রাজনৈতিক বিবাদে ভরা তৎকালীন পূর্ব জার্মানিতে।
এমন সময়, একদিন, থিও ফন এইজ্কের সামনে যেন সৌভাগ্যের দুয়ার খুলে গেলো। হঠাৎ তখন ব্রিটিশ আর্মির সাথে মাল্টায় দুই মাসের একটা অনুশীলনের সুযোগ এলো।
গ্রুমান ট্র্যাকার
সুযোগ বুঝে, স্বেচ্ছাসেবীদের দলে ঢুকে গেলেন এইজ্ক। কেননা, তিনি ভেবে দেখলেন, মাল্টা থেকে বিমান নিয়ে পালানো সহজ।
মাল্টায় অনুশীলনে গিয়েও তিনি নিয়মিত পড়তে থাকলেন বিমানের হ্যান্ডবুক। পড়তে পড়তে প্রায় আত্মস্থ করে নিলেন খুঁটি-নাটি। পাশাপাশি, বিমানের মেকানিক্স বা মিস্ত্রীদের কাজ-কর্ম খুব চৌকসভাবে লক্ষ্য করতে থাকলেন।
অবশেষে, অনুশীলন শেষ হল। যে যার ঘাঁটিতে ফিরে যাবার আগে এক সন্ধ্যায় হল বিদায়ী অনুষ্ঠান। সেখানে সবাই প্রচুর পানাহার করলেও এইজ্ক রইলেন শান্ত। কেননা ঠিক পরদিন ভোরেই তিনি পালাবেন।
পরদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠে ধার করে একটা সাইকেল নিয়ে এইজ্ক রানওয়েতে এলেন। এইজ্ক বলছিলেন, "পালাতে যাবার সময় সার্জেন্ট মেয়ের গার্ডকে নিজের নাম বলেছিলেন ক্যাপ্টেন এপস্টেইন। আর আমি প্রহরীকে বললাম, আমার নাম জানসেন। আমার সম্পর্কে প্রহরীর কোনও ধারণাই ছিল না। সে আমাকে বিমানের হ্যাঙ্গারের দরজা খুলতে সাহায্য করলো।"
ডয়েচ সংবাদপত্রে থিও ফন এইজ্কের এই কাণ্ড নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছিল
অতি নিখুঁতভাবে চুরির পরিকল্পনা এঁটেছিলেন এইজ্ক। প্রহরীর পিস্তল ও সাইকেল তালা মেরে রেখেছিলেন। তার অফিসের টেলিফোনের সাথে যে মাইক্রোফোন ছিল, সেটিকেও সরিয়ে রেখেছিলেন।
সেই রোমাঞ্চকর দিনের স্মৃতি রোমন্থন করে এইজ্ক বলছিলেন, "তো আমি ইঞ্জিন চালু করলাম। রেডিও অন করলাম। আমার নাম কী? আমি কী করছি— ইত্যাদি কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে জানতে চাইছিল। কিন্তু আমি কোনও উত্তরই দিইনি। আমি উড়াল দিলাম।"
ডাচ নৌবাহিনীর সেই গ্রুমান ট্র্যাকার সাবমেরিন বিধ্বংসী বিমানে তখন দুইটি টর্পেডো ছিল। টর্পেডোগুলো নিয়ে তিনি মোটেই ভাবছিলেন না। কারণ তিনি শুধু ভাবছিলেন, "নৌবাহিনীতে আমি আর কিছুতেই ফিরে যাবো না"।
এইজ্ক বলছিলেন, "ভূমধ্যসাগরের বুক ৫ হাজার ফিট উপর দিয়ে আমি উড়ছিলাম। আমি বুঝতে পারি, কেমন ছিল সার্জেন্ট মেয়েরের অনুভূতি!"
পালানোর সময়ে ককপিটে সার্জেন্ট মেয়ের তার নব বিবাহিতা স্ত্রীকে ফোন করেছিলেন। তিনি নিজের মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করছিলেন।
অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমানোর আগে এইজ্ক ককপিট থেকে কাউকে ফোন করেননি। কিন্তু তার বেশ কিছুদিন আগেই তিনি তার মাকে রূপোর একটা ক্রস উপহার পাঠিয়েছিলেন।
নেদারল্যান্ডসে ফেরার পর থিও ফন এইজ্ক।
এইজ্ক বলছিলেন, "এটা দেখে মা নিশ্চয়ই অনুমান করেছিলেন যে, আমি কিছু একটা করতে যাচ্ছি।"
সেদিন সাড়ে ৫ ঘণ্টা উড়লেন ২১ বছর বয়সী থিও ফন এইজ্ক। অবতরণ করলেন বেনগাজিতে। মিলিটারি বিমান দেখে যে ব্যক্তিটি প্রথম এগিয়ে এসেছিলেন সৌভাগ্যক্রমে সে ছিল ডাচ প্রবাসী। তার কাছে নিজের পুরো কাহিনী বললেন এইজ্ক।
ইউরোপে ফিরে গেলে নিশ্চিত জেল। তাই স্বদেশী সেই ডাচ ব্যক্তির পরামর্শে লিবিয়ার পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন এইজ্ক। স্বদেশী সেই ডাচ ব্যক্তির পরামর্শে লিবিয়ার পুলিশের কাছে এইজ্ক এটাও বললেন যে, সে ইউরোপের উদার যৌন আচরণ ও সমকামিতার বিরোধী। ফলে, এইজ্ক রাজনৈতিক আশ্রয় ও সুরক্ষা পেলো।
অবশেষে, ডাচ রাষ্ট্রদূতের সাথে অনেক আলাপ-আলোচনা ও দেন-দরবারের পর এই সিদ্ধান্ত হল যে, নেদারল্যান্ডেই ফিরে যাবেন এইজ্ক। তবে ছল করে পালিয়ে আসার কারণে তাকে সেদেশে মাত্র ১২ মাস জেল খাটতে হবে। এর বিনিময়ে নৌবাহিনী থেকে সে পাবে সম্মানজনক প্রস্থান।
থিও ফন এইজ্ক বলছিলেন, "আমি যা চেয়েছিলাম তা পেয়েছি। আমি নৌবাহিনী থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম, পেয়েছি। এবং যা করেছি তার জন্য আমার কোনও অনুতাপ নেই।"

Saturday, October 9, 2021

ধারণার চেয়েও দ্বিগুণ বাড়বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা: আশঙ্কা বিজ্ঞানীদের by ব্রজেশ উপাধ্যায়

২১০০ সাল নাগাদ ধারণার চেয়েও দ্বিগুণ বাড়বে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। এমনটাই আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীদের একটি আন্তর্জাতিক দল। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত নতুন এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল 'প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস' নামের জার্নালে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বর্তমান মাত্রায় তাপ নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা প্রায় দুই মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। 
এতোদিন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২১০০ সাল নাগাদ এক মিটারের চেয়ে কিছুটা কম বাড়তে পারে। তবে নতুন গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। এতে আগের ধারণার চেয়ে দ্বিগুণেরও কিছু বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছে। আর সেটা সত্য হলে আশ্রয়হীন হয়ে পড়তে পারে লাখ লাখ মানুষ। সবচেয়ে অরক্ষিত দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। এছাড়া হুমকির মুখে পড়বে লন্ডন, নিউইয়র্ক ও সাংহাইয়ের মতো বড় বড় শহরগুলোও। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জলবায়ু উদ্বাস্তু হিসেবে ইউরোপে পাড়ি দিতে পারে ১০ লাখ শরণার্থী।
নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে কার্বন নির্গমন এখন যেভাবে চলছে তা কমানো না গেলে ৮০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ সাগরের পানির নিচে চলে যেতে পারে।
বস্তুত দুনিয়াজুড়ে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্কটিকায় বেড়েছে বরফ গলার পরিমাণ। ফলে ধারণার চেয়েও বেশি মাত্রায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর ফলে ৮০ লাখ বর্গ কিলোমিটার পরিমাণ ভূমি সাগরের পানিতে তলিয়ে যাবে। এর মধ্যে বাংলাদেশের একটি বড় অংশও তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের অনেক এলাকা তখন এমন হয়ে যাবে যে, সেখানে লোকজনের বসবাস খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।
যে ৮০ লাখ বর্গ কিলোমিটার পরিমাণ ভূখণ্ড সাগরের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের একটি বড় অংশ এবং মিসরের নীল নদ উপত্যকা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা। এর ফলে কোটি কোটি মানুষকে বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হবে।
২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ এলাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা সাত শতাংশের কিছুটা কম বাড়তে পারে। এতে দেশের ১৭ শতাংশ ভূখণ্ড সাগরের পানিতে তলিয়ে যেতে পারে। আর সেটা হলে বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়বেন লাখ লাখ মানুষ। যে জায়গাগুলো পানির নিচে চলে যাবে তার অনেকগুলোই গুরুত্বপূর্ণ ফসল উৎপাদন অঞ্চল। যেমন মিসরের নীল নদের বদ্বীপ। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এমন পরিণতি এড়ানোর জন্য এখনও সময় আছে, যদি আগামী কয়েক দশকে কার্বন নির্গমন বড় আকারে কমানো যায়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কার্বন নির্গমন বিদ্যমান হারে চলতে থাকলে ভবিষ্যতের পৃথিবী হতে এখনকার চাইতে পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতর হবে। এতে করে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ৬২ সেন্টিমিটার থেকে ২৩৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত। এর আগে ২০১৩ সালের রিপোর্টে বলা হয়েছিল সমুদ্রস্তরের উচ্চতা ৫২ থেকে ৯৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। কেননা, গ্রিনল্যান্ড ও এ্যান্টার্কটিকায় বরফ গলার প্রক্রিয়ার অনেক দিকই তাতে অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
গবেষণা দলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ব্রিস্টল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক জোনাথন বামবার। তার আশঙ্কা, বিশ্বের ১৭ লাখ বর্গকিলোমিটার ভূমি সাগরের পানিতে হারিয়ে যেতে পারে, যা আয়তনে বাংলাদেশের ১০ গুণেরও বেশি।

Friday, October 8, 2021

নারী যদি পুরুষকে যৌনমিলনে বাধ্য করে - তাকে কি ধর্ষণ বলা যায়?

কোন কোন পাঠকের কাছে এই রিপোর্টটির কিছু অংশ অস্বস্তিকর লাগতে পারে...
একজন পুরুষ যদি একজন নারীর সাথে জোর করে যৌনমিলন করে তাকে ধর্ষণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু যদি একজন নারী একজন পুরুষকে জোর করে তার সাথে যৌন মিলন করতে বাধ্য করে - তাহলে সেটাও কি ধর্ষণের পর্যায়ে পড়বে?
ইংল্যান্ড এবং ওয়েলসের আইনে একে ধর্ষণ বলা হয় না। কিন্তু এ নিয়ে এক নতুন সমীক্ষা চালানোর পর একজন গবেষক বলছেন, হয়তো এখানে পরিবর্তন আনার সময় হয়েছে।
জরিপে একজন বলেছেন, "আমরা এ নিয়ে কথা বলতে ভয় পাই। আর যদিও বা কথা বলি, আমাদের কেউ বিশ্বাস করে না।"
পুরুষদের কি 'ধর্ষণ' করা যায়? তাকে কি জোর করে উত্তেজিত করা সম্ভব - যাতে যৌন মিলন ঘটতে পারে? কিন্তু এখন গবেষকরা বলছেন: এটা অসম্ভব নয়, বরং অসম্ভব মনে করাটাই একটা 'মিথ' বা 'কাল্পনিক উপকথা'।
ব্রিটেনের ল্যাংকাস্টার ইউনিভার্সিটি ল' স্কুলের ড. সিওভান উইয়ার ২০১৬-১৭ সালে যুক্তরাজ্যে 'একজন পুরুষকে জোরপূর্বক যৌনমিলনে বাধ্য করার' ওপর প্রথম গবেষণা পরিচালনা করেন।
ড. উইয়ার বলছেন, পুরুষকে জোর করে যৌন মিলনে বাধ্য করাকে ইংরেজিতে বলে ফোর্সড-টু-পেনিট্রেট বা এফটিপি - এবং পুরুষের মনের ওপর এর প্রতিক্রিয়া হতে পারে খুবই মারাত্মক।
অনলাইন জরিপের মাধ্যমে ২০০ জন পুরুষের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করেন তিনি। এ বছর তিনি এ বিষয়ে আরো বিস্তারিত একটি জরিপ করেছেন - যা এ সপ্তাহেই প্রকাশিত হয়েছে।
এতে ড. উইয়ার দেখতে চেয়েছেন, কী প্রেক্ষাপটে একজন পুরুষকে যৌনমিলন করতে বাধ্য করা হয়, এর পরিণাম কী হয়, এবং আইনের দৃষ্টিতেই বা এ ব্যাপারটিকে কীভাবে দেখা হয়?

জন নামে একজনের কথা (আসল নাম নয়)

"আমি প্রথম যখন খেয়াল করলাম যে আমার সঙ্গিনী নিজেকে নিজে নির্যাতন করছে - তখনই আমি বুঝলাম যে কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। তার এ জন্য কিছু চিকিৎসাও করা হয়।"
"ছয় মাস পরে যেটা ঘটলো, সে নিজেকে নিজে নির্যাতন করার পরিবর্তে এ জন্য আমাকে বেছে নিল।"
"হয়তো আমি বসার ঘরে বসে আছি, সে হঠাৎ রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে আমার নাকে খুব জোরে একটা ঘুষি মারলো, তারপর খিলখিল করে হাসতে হাসতে দৌড়ে পালিয়ে গেল।"
"আরেক দিন হয়তো সে কাজ থেকে ফিরে এসেই দাবি করলো, তার সাথে যৌনমিলন করতে হবে। এ জন্য সে হিংস্র হয়ে উঠতো। ব্যাপারটা এমন স্তরে চলে গেল যে তার কাজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় হলে আমি ভয়ে থাকতাম।"
আরেকদিন জন রাতে ঘুম থেকে জেগে উঠে আবিষ্কার করলেন তার সঙ্গিনী তার হাতে হাতকড়া লাগিয়ে তাকে খাটের ফ্রেমের সাথে বেঁধে রেখেছেন। তার পর একটা লাউডস্পিকার দিয়ে জনের মাথায় আঘাত করতে শুরু করলেন তিনি।
জনের অন্য হাতটাও তিনি দড়ি দিয়ে খাটের সাথে বেঁধে ফেললেন, এবং তার পর তার সাথে জোর করে যৌনমিলন করার চেষ্টা করতে লাগলেন
আতংক এবং যন্ত্রণার কারণে জন তার সঙ্গিনীর ইচ্ছে পূরণ করতে পারলেন না।
তখন সঙ্গিনী তাকে আবার মারধর করতে লাগলেন, এবং বাঁধা অবস্থায় আধঘন্টা ফেলে রাখলেন। তার পর তাকে মুক্ত করে দিলেও তার সাথে এ ব্যাপারে কোন কথাই বলতে চাইতেন না তিনি।
এর মধ্যে জনের সঙ্গিনী গর্ভবতী হলেন, কয়েক মাসের জন্য তার হিংস্র আচরণ কমে গেল। কিন্তু তার সন্তান জন্মের কিছু কাল পরই জন এক রাতে আবিষ্কার করলেন - তাকে আবার বিছানার সাথে হাতকড়া দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।
জনকে এবার জোর করে ভায়াগ্রা খাইয়ে দিয়ে তার মুখ বেঁধে রাখলেন সঙ্গিনী। সেদিন বাথরুমে গিয়ে অনেকক্ষণ একা বসে ছিলেন জন।
জন বলছেন, পরে এসব ঘটনা নিয়ে তিনি অন্যদের সাথে কথা বলতে গেলে কেউ বিশ্বাসই করে নি।
"অনেকে প্রশ্ন করেছে যে কেন আমি তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি না, বা কেন তাকে পাল্টা মার দিচ্ছি না। এর অনেক কারণ আছে, যেমন আমাদের সন্তান, অথর্নৈতিক বিষয় - এরকম অনেক কিছু।"

পুরুষের 'ধর্ষিত হবার' গল্প অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না

ড. উইয়ার বলছেন, তিনি দেখেছেন - পুরুষের 'ধর্ষিত হবার' গল্প অনেকে বিশ্বাস করতে চায় না।
ড. উইয়ার বলছেন, ফোর্সড-টু-পেনিট্রেট বা এফটিপি সম্পর্কে কিছু ধারণা তার গবেষণায় ভুল প্রমাণিত হয়েছে।
এরকম একটি ধারণা হচ্ছে: এটা অসম্ভব, কারণ পুরুষরা শারীরিকভাবে মেয়েদের চেয়ে বেশি শক্তিশালী।
আরেকটি ভুল ধারণা: পুরুষরা যৌন মিলনের যে কোন 'সুযোগ'কেই ইতিবাচকভাবে নিয়ে থাকে।
তৃতীয় আরেকটি ভুল ধারণা: পুরুষের যৌনাঙ্গ উত্থিত বা 'ইরেকশন' হয়েছে মানেই হলো যে সে যৌন মিলন চাইছে। আসলে তা নয়। পুরুষরা ভয় পেলে বা ক্রুদ্ধ হলেও ইরেকশন ঘটতে পারে এবং তা কিছু সময় স্থায়ীও হতে পারে।
ড. উইয়ার বলছেন, "গবেষণায় আরো দেখা গেছে যে ধর্ষণের সময় নারীদের পক্ষেও যৌন সাড়া দেয়া সম্ভব, কারণ তাদের দেহ এ ক্ষেত্রে শারীরবৃত্তীয়ভাবে সাড়া দিতে পারে। ধর্ষণের শিকার হওয়া পুরুষ ও নারী - উভয়ের ক্ষেত্রেই এর স্পষ্ট প্রমাণ আছে কিন্তু এ ব্যাপারটা নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা হয় না।"
ড. উইয়ার আরো বলছেন, তিনি এমন কিছু এফটিপির শিকার পুরুষের অভিজ্ঞতা শুনেছেন - যারা অতিমাত্রায় মদ্যপান বা অন্য কোন নেশা করার পর নারীর হাতে জোরপূর্বক যৌনমিলনের শিকার হয়েছেন - কিন্তু তা ঠেকাতে পারেন নি।
একটি ঘটনায় একজন নারী একটি সমকামী পুরুষকে যৌন মিলনে বাধ্য করেন - এবং তাকে হুমকি দেন - এতে রাজি না হলে পুরুষটি যে সমকামী তা সবার কাছে ফাঁস করে দেবেন তিনি।
জরিপে অংশ নেয়া একজন বলেছেন, "আমাকে পুলিশ বলেছে 'তুমি নিশ্চয়ই ব্যাপারটা উপভোগ করেছো - না হলে তুমি নিশ্চয়ই আগেই আমাদের জানাতে।"
আরেকজন বলেছেন, "যেহেতু আমরা পুরুষ তাই আমরা এটা নিয়ে কথা বলতে ভয় এবং লজ্জা বোধ করি।"
"বললেও কেউ বিশ্বাস করে না। তারা বলে, তুমি তো পুরুষ, একজন পুরুষকে কিভাবে যৌন নিপীড়ন করা যেতে পারে?"