Wednesday, October 15, 2025
যুদ্ধ ও আগ্রাসন: যুগপৎ মানবসভ্যতা ও বিবেকের মৃত্যুঘণ্টা by আবুল মোমেন
আক্রমণকারী শক্তি ইসরায়েল নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ না হওয়া পর্যন্ত রণাঙ্গন ছাড়বে বলে মনে হয় না। অতীতে দেখা যেত, সংঘাতের বাইরের দর্শক বাকি বিশ্বের নেতাদের চাপে এমন নিষ্ঠুরতা থামাতে হতো। হামাসের ৭ অক্টোবরের (২০২৩) হামলার প্রতিশোধ নেওয়া শুরু করেছিল ইসরায়েল নভেম্বর থেকে। তার মিত্রদের যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত পশ্চিম ইউরোপের পরামর্শে তারা ১৯ জানুয়ারি ২০২৫ একবার যুদ্ধবিরতি মেনে ছিল; কিন্তু তারপর মার্চ থেকে আবারও পূর্ণোদ্যমে গাজার নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণের ওপর যে নৃশংস হামলা শুরু করেছে, তা আর বন্ধ করছে না।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুদ্ধবিরতির সব প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়ে ইসরায়েলের অবিরাম নিষ্ঠুরতার পক্ষে কাজ করে চলেছে, শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ বন্ধ করে নিজেরাও সাম্প্রতিককালের এই গণহত্যার অংশীজন হয়ে গেল। মোটকথা তারা শান্তি আলোচনার সুযোগ রুদ্ধ করে রেখেছে। প্রায় ২১ মাসের একতরফা হামলার মধ্যে ইসরায়েল তার লক্ষ্য কয়েক দফায় বিস্তৃত করেছে। এটা তারা করেছে মুরব্বি যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপীয় মিত্রদের নব্য ঔপনিবেশিক নীলনকশার পুরোভাগের বাহিনী হিসেবে।
পুরো বিশ্বের ওপর পশ্চিম ইউরোপীয় সাতটি দেশের আধিপত্যের শুরু মহাসাগরীয় অভিযাত্রার কালে (পঞ্চদশ–অষ্টাদশ শতাব্দী) দুই আমেরিকা ও সর্বশেষ অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় ভূমিসন্তানদের নির্মম-নিষ্ঠুরতায় সম্পূর্ণ, কোথাও আংশিক বিনাশ করে ইউরোপীয় বসতি স্থাপনের মাধ্যমে। দীর্ঘ লাগাতার চক্রান্ত, মিথ্যা আশ্বাস এবং চরম নিষ্ঠুরতার পরও যারা বেঁচে গিয়েছিল, তাদের নিজস্ব ভাষা-কৃষ্টির ওপর ঔপনিবেশিক ইউরোপীয় ভাষা-সংস্কৃতির বাধ্যতা চাপানো হয়েছিল, যেমনটা ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের উত্তরাধিকারের দায় আমাদেরও বইতে হয়েছে, হচ্ছে।
যে দুটি মহাদেশ পূর্ণাঙ্গ দখলের বাইরে ছিল, সেই এশিয়া ও আফ্রিকায় তারা উপনিবেশ স্থাপন করে অবিরাম লুণ্ঠন ও নিষ্পেষণ চালিয়ে গেছে। এভাবে শিল্পবিপ্লব-পরবর্তী ঊনবিংশ শতক নাগাদ বিশ্বের ভূমি এবং সম্পদ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাতেই পুঞ্জীভূত হয়ে যায়।
বিশ্বের ভূমি ও সম্পদের ওপর দখল কায়েমের প্রকল্প ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনায় হয়েছিল। ১৮৮১ সালে প্রাশিয়ার জেনারেল অটো ফন বিসমার্ক বার্লিনে নিজেদের মধ্যে আফ্রিকার ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়ে সম্মেলন ডেকেছিলেন, ইতিহাসে এটি ‘স্ক্র্যাম্বল ফর আফ্রিকা’ বা আফ্রিকার জন্য কাড়াকাড়ি নামে আখ্যায়িত হয়েছে। পশ্চিম ইউরোপের সাতটি দেশ—যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল নিজেদের মধ্যে মহাদেশটি ভাগাভাগি করে নিয়েছে। পরে তাতে ইতালি ও যুক্তরাষ্ট্র যোগ দিয়েছিল। বাদ ছিল শুধু দুটি দেশ—ইথিওপিয়া ও লাইবেরিয়া।
প্রথম মহাযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে তারা মুসলিম অধ্যুষিত মধ্যপ্রাচ্য, মিসর প্রভৃতি অঞ্চল পুনর্গঠনের মাধ্যমে তাদের আধিপত্য আরও বিস্তৃত ও দৃঢ় করার চেষ্টা চালিয়েছিল। ১৯২৯-৩০ সালের মহামন্দা ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ধকলে ইউরোপীয় শক্তি হ্রাস পাওয়ায় উপনিবেশগুলো ছেড়ে দেওয়ার বাস্তবতা তৈরি হয়। এর পেছনে স্থানীয় কারণ হলো দেশগুলোতে স্বদেশ ও স্বাধীনতা চেতনার বিকাশ এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের তীব্রতা। এখন সময়ের ব্যবধানে বিচার করলে মনে হয়, যেসব দেশে প্রত্যক্ষ ঔপনিবেশিক শাসন চলেছে, সেখানে ঔপনিবেশিক শক্তি শাসনকাজে স্থানীয় সহায়ক শ্রেণি তৈরি করতে গিয়ে স্বদেশ ও স্বাধীনতা চেতনায় উজ্জীবিত কিছু মানুষের জন্ম দেয়।
এমন মানুষদের নেতৃত্বে উপনিবেশায়িত দেশে দেশে তীব্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে গত শতকের মধ্যভাগ থেকে এশিয়া-আফ্রিকায় নতুন স্বাধীন দেশের আবির্ভাব হতে থাকে। এই বাস্তবতা এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থানের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সূচিত হয় স্নায়ুযুদ্ধ। যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউরোপ পুনর্গঠনের দায় এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নেতৃত্ব চলে আসে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। শিল্পবিপ্লব যেমন সবার জন্য সুযোগ তৈরি করলেও এর আঁতুড় যুক্তরাজ্য ও আঙিনা পশ্চিম ইউরোপের ফসলের উত্তমর্ণ হিসেবে নিয়ন্তার ভূমিকায় ছিল, তেমনি আজকের নতুন প্রযুক্তির প্রভাব ও বিশ্বায়নের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। এতে শরিক হতে হচ্ছে সব দেশ ও জাতিকে এবং এর লভ্যাংশে সবার সুযোগ থাকলেও উত্তমর্ণের নিয়ন্তা-ভূমিকা পাল্টায়নি। মঞ্চ তাদের জন্যই সাজানো আছে।
বিশ্ব নিয়ন্ত্রণে তাদের সমকক্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকলেও পুরোনো পারমাণবিক শক্তির দেশ রাশিয়াকে গণ্য করতে হয় এবং রাশিয়া-চীন জোট বাঁধলে তা মাথাব্যথার কারণ হয়। ইউক্রেন আক্রমণের জন্য রাশিয়াকে দায়ী করেও এ যুদ্ধ প্রলম্বিত করার গূঢ়ার্থ খেয়াল করতে হবে। ন্যাটোর প্রসারণের হুমকি বজায় রেখে তারা এ যুদ্ধকে মদদ দিয়ে যাচ্ছে মূলত দীর্ঘ মেয়াদে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি খর্ব করার লক্ষ্য নিয়ে।
বিস্তৃত কথা বাদ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, তারা যেকোনো মূল্যে ইসরায়েলের স্বার্থ সুরক্ষা করতে তো চায়ই, সেই সঙ্গে এ অঞ্চলে এবং উত্তর আফ্রিকায় হুমকিস্বরূপ কোনো স্বাধীনচেতা শাসকের উত্থান যেন না ঘটে, তা–ও নিশ্চিত করতে চায়। সে কারণেই দুই স্বাধীনচেতা শাসক ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে হত্যা ও উৎখাত করা হলো। যে অজুহাতে ও যে প্রতিশ্রুতিতে এই দুই দেশে সামরিক অভিযান হয়েছিল, তা সত্য ছিল না, হয়নি। কিন্তু এ দুজনের অনুপস্থিতিতে এ অঞ্চল থেকে তাদের জন্য হুমকি হয়ে ওঠার মতো কেউ যেমন থাকল না, তেমনি দেশ দুটি বহুকালের জন্য ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে গেল।
নতুনভাবে ইরান এখন পশ্চিমের মাথাব্যথার কারণ। তারা ইসরায়েলের নিরাপত্তার অজুহাতকে বরাবর প্রয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে এবং এর জন্য অন্যদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করতে এবং সেই অন্যদের প্রতি চরম অমানবিক হতে বিন্দুমাত্র ভাবেনি। একটি কথা অবশ্য মনে রাখতে হবে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য এবং উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গোত্র-বিভক্ত অনেক দেশে জাতি গঠনের যে দুর্বলতা, তারও সুযোগ নেওয়ার ইতিহাস রয়েছে।
বাস্তবতা হলো বিশ্বটা দাবার ছক হয়ে থাকলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব একতরফা খেলে যাচ্ছে—বিশেষত সমাজতান্ত্রিক দ্বিতীয় বিশ্বের পতন ও বিশ্বায়নের সুবাদে। আপাতত তারা খেলছে যুগপৎ রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সমর ও অর্থশক্তির বিরুদ্ধে। একদিকে ইউক্রেন, অন্যদিকে ইসরায়েল রণাঙ্গনে লড়ছে, তবে সত্যিকার অর্থে ইসরায়েলের বাস্তব প্রতিপক্ষ আর নেই। মাঠে হামলা চালিয়ে যাওয়ার অজুহাত নেই।
মনে হচ্ছে, তবু পশ্চিমা শক্তি ইসরায়েলকে দিয়ে অন্যায় যুদ্ধ চালিয়ে যাবেই। হামাস বা হিজবুল্লাহ প্রতিরোধ না করলেও যুদ্ধবিরতি চুক্তির জন্য বারবার সম্মতি জানানো সত্ত্বেও ইসরায়েল হামলা বন্ধ করতে চায় না। বরং ইরানকে নতুন প্রতিপক্ষ খাড়া করেছে। পশ্চিম ইউরোপ চুপচাপ। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ—অবশ্যই ইসরায়েলের অনুকূলে। প্রতিদিন তারা মানুষ মারছে—এমন একতরফা নৃশংসতা এত দীর্ঘদিন চলতে আগে দেখেনি বিশ্ব। কিন্তু তা চলছে, চলতে পারছে, সম্ভবত নৃশংসতা নেওয়ার সামর্থ্য আর মানব–বিবেকের নেই। অসাড় হয়ে যাওয়া বিশ্ববিবেকের সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল এবং তার পৃষ্ঠপোষক পশ্চিমা দুনিয়া মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে নতুন পরিকল্পনায় মত্ত হয়ে আছে।
আমরা নিজেদের এবং নিজেদের দেশ নিয়ে ব্যতিব্যস্ত আছি। পশ্চিমা পরিমণ্ডলের বাইরের বিশ্বের ছোট–বড়, ধনী-দরিদ্র সব দেশেই অভ্যন্তরীণ সংকট বাড়ছে, কোথাও দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক সংঘাত চলমান। অথচ এই ফাঁকে বিশ্ব-বিবেকের টুঁটি চেপে ধরা হয়েছে। প্রশ্ন হলো এটাই কি মানবজাতির ভবিতব্য? নাকি কোথাও থেকে প্রশ্ন উঠবে, প্রতিরোধের ডাক আসবে? অন্তত অতীতের জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মতো একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ মঞ্চ তৈরি হবে আবার—এমন প্রত্যাশা এবং উদ্যোগ ছাড়া দিনযাপনের গ্লানি তো আর টানা যাবে না। বিশ্বশান্তি, সভ্যতার নিরাময় এবং বিবেক রক্ষার একটা কোনো উদ্যোগ তো নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।
* আবুল মোমেন, সাংবাদিক ও লেখক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
Saturday, March 26, 2016
চাই সবার জন্য স্বাধীনতা by আবুল মোমেন
বাঙালির পক্ষে এর মধ্যে বিকশিত হওয়া সম্ভব ছিল না, যেমন পাকিস্তানের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পক্ষেও সম্ভব হচ্ছে না। বাঙালির ভাষাভিত্তিক সংস্কৃতি শক্তিশালী। ব্রিটিশ আমল থেকে এ ভাষা শিক্ষার মাধ্যম হওয়ায় এর ভিত্তি ছিল দৃঢ়, বিস্তার ঘটেছে ব্যাপক। তার ওপর বাংলা ভাষায় দ্রুত অত্যন্ত উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হওয়ায় এবং সেই সাহিত্য মাতৃভূমির বন্দনায়, স্বাধীনতার উদ্দীপনায় বরাবর অত্যন্ত মানসম্পন্ন ও কার্যকর রসদ জুগিয়ে গেছে, যার আবেদন আজও সমানভাবে বজায় রয়েছে। ফলে বাঙালির ওপর পাকিস্তানের উর্দু ভাষা কিংবা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতা চাপিয়ে দেওয়া এবং একতরফা অগণতান্ত্রিক স্বৈরশাসন মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। আর তারই ফলে মুক্তিযুদ্ধ যেমন, তেমনি স্বাধীনতাও হয়ে পড়েছিল অনিবার্য।
২.
পাকিস্তানে পাঞ্জাবি মুসলমানদের একাধিপত্য বজায় ছিল। আজ স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে মূল্যায়ন করতে বসে মনে হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে যেন তারই অনুকরণে বাঙালি মুসলমানের একাধিপত্য তৈরি হয়েছে। এখানে আমাদের পাকিস্তানকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আদর্শে পরাভব ঘটে। ১৯৪৭-এ যখন দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, তখন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ ছিল হিন্দু। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সময় তা ছিল ২২ শতাংশের মতো। আর বাংলাদেশের বিগত ৪৫ বছরের ইতিহাসে দেশের হিন্দু জনসংখ্যা কমে মাত্র ৯ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। কেন হিন্দুরা দেশ ছাড়ছে, তা নিয়ে প্রতিবেশী মুসলমান যথেষ্ট সচেতন নয়, বরং অধিকাংশের ধারণা বিভ্রান্তিকর। এদের অনেকেই এর মধ্যে একধরনের ভারতপ্রীতির হিন্দু মানসিকতাকেই কেবল দেখতে পায়। তার অস্তিত্ব হয়তো আছে, কিন্তু পারিপার্শ্বিকতাই এই মনোভাব তৈরিতে ও তা জিইয়ে রাখতে সাহায্য করে। ১৯৬৫ সালের শত্রুসম্পত্তি আইনের অভিশাপ কেন স্বাধীন দেশেও বয়ে বেড়াতে হবে, এর জবাব স্বাধীন বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি দেয়নি। আমরা সংখ্যালঘুর সম্পত্তির জবরদখলের নানা চিত্র উত্তরোত্তর বাড়তে দেখছি। সংখ্যালঘু এ দেশে স্বস্তিতে বসবাস করতে পারছে কি না, সেটা যতক্ষণ না সংখ্যাগুরুর বিবেচ্য বিষয় হবে, ততক্ষণ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। আর তা ঘটেনি বলে বাংলাদেশের মুসলমানদের জন্য একাত্তরের স্বাধীনতা যে সুফল এনেছে, তা দেশের সব ধরনের সংখ্যালঘুর জন্য সেই মানে আনেনি। এটি আমাদের ব্যর্থতা, যা দ্রুত শোধরানো দরকার।
দেশে যেসব আদিবাসী সংখ্যালঘু আছেন—প্রায় ৪৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, তাদের পক্ষে ভাষা-সংস্কৃতি রক্ষা তো কঠিন বটেই; ভিটেমাটি, জমি ও স্থাবর সম্পত্তি রক্ষা করাও দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তাদের এমন মনে হওয়ার উপলক্ষ বারবার তৈরি হয়েছে যে তারা জাতি পরিচয়ের কারণে এ দেশে বৈষম্য ও নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় নিত্যদিন খবর বেরোচ্ছে।
আমরা বিশ্বাস করি উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আরও উন্নতি হবে, আয় ও আয়ু বাড়বে, শিক্ষিতের হার বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কী হবে?
এই বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করতে পারব না। একই সঙ্গে আমরা অস্বীকার করব না, সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিভিন্ন খাতে উন্নয়ন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, দারিদ্র্যবিমোচন ইত্যাদিতে উন্নয়ন বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি বাড়িয়েছে। বর্তমান সরকারের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী ভূমিকাও প্রশংসনীয়। কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতগুলো, বিশেষত অভিবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাক খাতের আয় টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। কেবল কৃষির ভিত্তিটা মজবুত হয়েছে। তৈরি পোশাক ও অভিবাসী এই খাতের শ্রমিকদের অধিকাংশের জীবন এখনো আয় ও অধিকারের দিক থেকে মানবেতরই রয়ে গেছে। তাদের দক্ষতা, আয় বৃদ্ধি ও জীবনমান বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ আমরা নিতে পারিনি।
৩.
জাতিসংঘ আগামী ২০৩০ সালে অর্জনের জন্য যে ১৭টি খাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করেছে, তা অর্জন আমাদের জন্য সত্যিই কঠিন হবে। কেননা, এটি আর পরিমাণগত উন্নয়নের বিষয় থাকছে না। এবার গুণগত পরিবর্তনের ওপর জোর দিতে হবে। গুণ ও মান সাধারণত সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। অবস্থার, কাজের ও ফলাফলের বিচারে তা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়, বোঝা যায়।
আমরা সব সময় দ্রুত সাফল্য চেয়েছি। জাতিগতভাবে আমরা লম্বা দৌড়ের জন্য মানসিক-শারীরিক কোনোভাবেই তৈরি নই। বাস্তবতা বলে, মুক্তিযুদ্ধ নয় মাসের বেশি স্থায়ী হলে, ধরা যাক যদি তা কয়েক বছর গড়াত, তাহলে স্বাধীনতার প্রশ্নে জাতির ঐক্য ধরে রাখা যেত না। কেননা, আমাদের সেই প্রস্তুতি ছিল না। স্বাধীনতা কীভাবে কখন হতো, বলা মুশকিল।
গণতন্ত্র সব নাগরিকের জন্য মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর নির্ভর করে। আর তা বাস্তবায়ন করতে হলে চাই দুটি ক্ষেত্রে গুণগত পরিবর্তন—সর্বস্তরে যথার্থ মানসম্পন্ন শিক্ষায় উন্নত নাগরিক এবং দক্ষ দুর্নীতিমুক্ত প্রতিষ্ঠান। তৃতীয় যে বিষয়টি প্রয়োজন, তা সরকারের জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতার ব্যবস্থা করা। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃতপক্ষে আমরা কোনো কাজই শুরু করিনি। আমজনতার এতে কোনো আপত্তি নেই, বস্তুত এ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা নেই। তবে এর ফলাফল পেলে এতে তাদের নিশ্চয় আগ্রহ থাকবে। কিন্তু যাঁরা ক্ষমতাসীন এবং যাঁরা ক্ষমতাকে ঘিরে শাসকশ্রেণির অংশে পরিণত হয়েছেন, তাঁরা এমন ব্যবস্থা সম্পর্কে আন্তরিক নন। বড় দুই দলে এ বিষয়ে মতভিন্নতা আছে বলে মনে হয় না।
দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, এই ব্যবস্থার দিকে যাওয়ার জন্য স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরেও নাগরিক সমাজ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করার মতো যথেষ্ট শক্তি অর্জন করেনি। তাদের নৈতিক দুর্বলতাই এ ক্ষেত্রে বড় বাধা হচ্ছে। তার ওপর আরেক দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের উপযোগী দল হয়ে উঠতে পারছে না বিএনপি। তারা যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াতকে ছাড়বে কি না, তা অস্পষ্ট। খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শনও ধোঁয়াশাপূর্ণ। তাঁদের আওয়ামী লীগবিরোধিতা যদি বাংলাদেশের স্বাধীনতার এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার মূলধারার বিপরীতে অবস্থান নেয়, উল্টো বহুলাংশে পাকিস্তানের সঙ্গেই মেলে, তাহলে সাধারণ মানুষ, বিশেষত তরুণ সমাজ তো বিভ্রান্ত হবেই। আর এর ফলে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় গিয়ে একধরনের একচ্ছত্র ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। আখেরে ক্ষতি হচ্ছে গণতন্ত্রের। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন তো অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ—সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন কঠিন হবে।
আমাদের শেষ ভরসা মানুষ। কারণ মানুষ স্বভাবগতভাবে সামনেই এগোতে চায়, তরুণ সমাজ সব বাধা ঠেলে এগিয়েই যাবে। আমরা বিশ্বাস করি উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে আরও উন্নতি হবে, আয় ও আয়ু বাড়বে, শিক্ষিতের হার বাড়বে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের কী হবে? ধর্ম-বর্ণবৈষম্যহীন আইনের শাসনের? গণতন্ত্রের? এসবও যে ধোঁয়াশাচ্ছন্ন থেকে যাচ্ছে? এটাই আমাদের আজ বড় দুর্বলতা, দুর্ভাবনার বিষয়।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Thursday, February 18, 2016
ভুল স্বীকার করে মাহ্ফুজ আনাম কি ভুল করলেন? by আবুল মোমেন
ভুল স্বীকার অন্যায় নয়, অপরাধ তো নয়ই; ভুল স্বীকার মানুষের একটি প্রশংসনীয় গুণ বলেই বিবেচিত হয়। বিবেচ্য বিষয় হলো, কেউ একই ভুল বারবার করছে কি না, ভুলটি ইচ্ছাকৃত ছিল কি না। কিন্তু সেই বিচার বাদ দিয়ে বিষয়টিকে নিয়ে ব্যক্তিগত মানহানি বা রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ঠুকে দেওয়ার মধ্যে বরং ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে হয়রানি করা বা শাস্তি দেওয়ার মনোভাবের প্রকাশ ঘটে। তবু এ ক্ষেত্রে একই ভুল বারবার হয়েছে কি না বা ভুল ইচ্ছাকৃত ছিল কি না, সে আলোচনা আমরা করব। তার আগে ভুল ও ভুল স্বীকার নিয়ে আরও কয়েকটি কথা বলা দরকার।
আমাকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করে থাকেন, তোমার মা-বাবার প্রতি কোন কারণে তুমি সবচেয়ে বেশি কৃতজ্ঞ, আমি সব সময় নির্দ্বিধায় বলেছি, ভুল করার অধিকারসহ স্বাধীনতা দেওয়ার জন্য। বলা হয়ে থাকে, ভুলত্রুটির মধ্য দিয়েই মানুষ শেখে। একজন সম্পাদক কখনোই ভুল করেন না, করবেন না বা ভুল করতে পারেন না—এমন ভাবনা অন্যায্য। মানবসমাজে এ ধরনের যুক্তি অচল। এই অপূর্ণতা নিয়েই মানুষ। ধর্মগ্রন্থে বারবার ভুল ও ভুল স্বীকার, ক্ষমা ও দয়ার প্রসঙ্গ এসেছে।
আমাদের সমাজ যে দিনে দিনে নির্দয় হয়ে উঠেছে, তার প্রমাণ প্রায় প্রতিদিন শিশু নির্যাতন আর ভয়ংকর মাত্রায় শিশু হত্যার ঘটনা থেকে পাওয়া যায়। যে শিশু, সে তো অন্যায়-অপরাধের আওতার বাইরে, বরং তার জীবন ভুলভ্রান্তিরই আওতায় থাকে। তা থাকে বলেই সে শেখে, বাড়ে, বড় হয়। কিন্তু এই সমাজ যে ভুল ও অন্যায়ের মধ্যে গুলিয়ে বসে আছে, তাই এটি শিশুর প্রতিও নির্দয়। এরই সূত্র ধরে চলে আসে অসহিষ্ণুতা, ক্ষমতার দাপট, ধৈর্যহীনতাসহ নানান মানবিক অক্ষমতা। যে সমাজ ভুলকে ধারণ করতে পারে না, সেই সমাজ অমানবিক হয়ে ওঠে। হয়ে পড়ে অবক্ষয়গ্রস্ত। তার মূল্যবোধের ভারসাম্য নষ্ট হয়। আমরা প্রতিনিয়ত লক্ষ করছি, অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জানছি সমাজে কতভাবে দুর্নীতি অর্থাৎ অন্যায় হচ্ছে, কত অবিচার, বঞ্চনা ও নিষ্ঠুরতার কাহিনি জমছে। এসবের প্রতিকার আমরা করি না। সৎ ও ন্যায়বান মানুষ বারবার নিষ্ঠুর অন্যায়ের শিকার হয় এখানে। তাই রবীন্দ্রনাথকে দেখি এই বাস্তবতায় তিক্ত হয়ে শেষে ঈশ্বরের কাছে নালিশ জানাতে: ‘প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।’ আমরা অন্যায়কে কবির ভাষায়, তৃণসম দহন করতে পারি না, কিন্তু ভুল ঘটলে—তাও ভুল স্বীকারের পরে বুঝে—ব্যক্তির ওপর হামলে পড়ছি। এ হলো অক্ষমের বীরত্ব!
মানুষের উত্তরণ ও বিকাশ কীভাবে ঘটে? নিজের ভুলগুলো বুঝতে পারলে তবে। এভাবেই শিখতে শিখতে মানুষ অভিজ্ঞ হয়। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী পড়লে আমরা দেখব কীভাবে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন মাঠের কর্মী, শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো মার্কিনপন্থী গণতন্ত্রীর শিষ্য ক্রমে ধর্মনিরপেক্ষ সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মহানায়কের ভূমিকায় পৌঁছে যান। ভুলগুলো শুধরে শুধরে তিনি এগিয়েছেন। ভুল স্বীকার না করলে শোধরাতেন কী করে? অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘আমার যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনো দিন কষ্ট হয় নাই, ভুল হলে তা সংশোধন করে নেব, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে।’ (পৃ: ৮০)
বঙ্গবন্ধু বাঙালি চরিত্রের একটি বৈশিষ্ট্য নিয়ে চরম ক্ষুব্ধ ছিলেন। আত্মজীবনীতে এ বিষয়ে লিখতে গিয়ে তাঁর ভাষায় তিক্ত অভিজ্ঞতার রেশ স্পষ্ট ধরা পড়ে। সেটি হলো বাঙালির পরশ্রীকাতরতা। তিনি লিখেছেন, ‘বোধ হয় দুনিয়ার কোনো ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, “পরশ্রীকাতরতা”।...এই জন্যই বাঙালি জাতির সকল রকম গুণ থাকা সত্ত্বেও জীবনভর অন্যের অত্যাচার সহ্য করতে হয়েছে। সুজলা সুফলা বাংলাদেশ সম্পদে ভর্তি। এমন উর্বর জমি দুনিয়ায় খুব অল্প দেশেই আছে। তবুও এরা গরিব। কারণ, যুগ যুগ ধরে এরা শোষিত হয়েছে নিজের দোষে।’ (পৃ: ৪৮) বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ কেবল বৈষয়িক ও স্থাপনাগত উন্নয়নে বাস্তবায়িত হবে না, তা আসবে প্রধানত উন্নত মানুষ সৃষ্টির মাধ্যমে। কিন্তু তারা যদি আজও ভুল ও অন্যায়ের মধ্যে পার্থক্য করতে না শেখে, তাহলে বঙ্গবন্ধু-কন্যার সকল প্রয়াস সত্ত্বেও এ উন্নয়নের ভিত থেকে যাবে দুর্বল।
আচ্ছা, এ ভুল কি ডেইলি স্টার সম্পাদক একাই করেছিলেন? না, বরং একজন সম্পাদক ব্যতীত বাকি সব সম্পাদকই করেছিলেন। তাহলে একজনকে কেন শাস্তি দেওয়ার চেষ্টা? এর নৈতিক ভিত্তি কী? মনে হবে না এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত? আচ্ছা, মাহ্ফুজ আনাম কি ইচ্ছাকৃতভাবে এ ভুল করেছেন? যদি তা-ই হতো, তবে তাঁর মতো বিখ্যাত বিতার্কিক বাকপটু মানুষের পক্ষে সেদিন তরুণ সাংবাদিক মুন্নী সাহাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া কোনো কঠিন কাজ ছিল না। কিন্তু সেটি হতো কপটাচার। যারা ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে (অর্থাৎ অন্যায় করে) কেবল তারাই কপটতার আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষা করে থাকে। এ সমাজ কি বলতে চাইছে সততার অহংকার গুঁড়িয়ে দেব, সবার মতো কপট হওয়াই বাঞ্ছনীয়? আচ্ছা, এই প্রবীণ সাংবাদিক ও সম্পাদক কি এই একই ধরনের ভুল বারবার করেছেন? যদি আমরা আলোচ্য ২০০৮-০৯-এর সময়ের এবং সামগ্রিকভাবে ডেইলি স্টার-এর মোদ্দা ভূমিকা বিচার করি, তাহলে দেখব আদর্শের দিক থেকে এই পত্রিকা অসাম্প্রদায়িকতা, গণতন্ত্র, বাক্স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতাসহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, নাগরিক অধিকার, নারীর অধিকার ও ক্ষমতায়ন, শিশু অধিকার ও সুরক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ। মনে করুন ২০০১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতনের সময় ডেইলি স্টার-এর মূল কাগজ ও শুক্রবারের সাময়িকীর সচিত্র প্রতিবেদনগুলোর কথা। মনে করুন আমেরিকার ইরাক আক্রমণের পরে লাল ব্যানার শিরোনামগুলোর কথা, এক–এগারোর পরে শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার হলে মাহ্ফুজ আনামের স্বনামে লেখা কলামের কথা। মনে করুন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্ষে এই পত্রিকার ভূমিকা। মনে করুন এই পত্রিকার শিশু, নারী, সংখ্যালঘু, বনবনানী, নদী-খাল-বিল, মুক্তচিন্তা, মুক্তিযুদ্ধের অনুকূল অসংখ্য খবর ফিচারের কথা। গণমাধ্যম হিসেবে বাংলাদেশকে বিদেশিদের কাছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, ভালোভাবে পরিচয় করাচ্ছে ডেইলি স্টার, সেটি প্রধানত ইতিবাচক ভাবমূর্তিই তো।
তা ছাড়া মাহ্ফুজ আনাম বিশ্বাস করেছিলেন সরকারের একটি অংশ সামরিক বাহিনীর একটি অঙ্গের ওপর। দেশের সামরিক বাহিনীর ওপর আস্থা রাখা কি দেশদ্রোহ? আমরা জানি, বিশেষ পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর কেউ কেউ ক্ষমতার পক্ষে বা জন্য নানা ভূমিকা নেয়, যা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, সুশাসনের মানদণ্ডে মানা যায় না। এর বিরুদ্ধে কথা বলা, সংগ্রাম করার ঐতিহ্য আমাদের আছে। আর তাই মাহ্ফুজ আনাম সেই দিন ডিজিএফআইকে বিশ্বাস করে খবর ছাপানোকে তাঁর সম্পাদক-জীবনের একটি ব্যর্থতা ও ভুল বলে স্বীকার করেছেন। একে দেশদ্রোহ আখ্যায়িত করলে ডিজিএফআইসহ অনেককেই টানতে হবে।
এখানে এ কথা টেনে আনা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে বহু নিন্দিত ফখরুদ্দীন-মইনুদ্দীনের দুই বছরেই প্রথম আওয়ামী লীগের বাইরের কোনো সরকার পঁচাত্তরের পরে বঙ্গবন্ধুকে ভালোভাবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছিল। তাঁর জন্মদিন পালন করেছে, মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁর কবরে গেছেন সরকারপ্রধান। এই সরকার পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের নেতিকরণ এমনভাবে করেছিল যে তাতে ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বাড়তি সুবিধা পেয়েছিল। এই সরকার তারেক রহমানের দুর্নীতি প্রকাশ করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে, অন্তত বহুকালের জন্য তাঁকে মাইনাস করার পটভূমি তৈরি করে দিয়েছে। এ কথাও মানতে হবে, ফখরুদ্দীন আহমদের নির্দলীয় সরকার দুই বড় দলের তীব্র সংঘাতময় ক্ষমতা-দ্বন্দ্বের পরে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের পরিবেশ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। হ্যাঁ, তা বলে এই সরকারের ভুল কি ছিল না? ছিল। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে বাড়াবাড়ি হয়েছে, মাইনাস টু তত্ত্ব ভুল ছিল। তবে তারা চেয়েছিল রাজনীতিতে অচলায়তন ভাঙতে, সংঘাতের বাস্তবতা দূর করতে। লক্ষ্য ঠিকই ছিল, পথ হয়তো ঠিক ছিল না।
আমার পর্যবেক্ষণে বুঝতে পারি, শেখ হাসিনা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মতোই চিন্তায় সৃজনশীলতাকে স্থান দেন, উত্তরণ ও এগিয়ে যাওয়ার জন্য ভুল থেকে শিখে পথ নির্ধারণ করতে জানেন। আশা করি, এই অসুস্থ অপরিণত ব্যক্তি-নিধনের হুজুগ বন্ধ করতে তাঁর কাছ থেকে সময়োচিত পরামর্শ আসবে।
ব্যক্তিগতভাবে বলব, কোনো কোনো সময় বা ক্ষেত্রে ডেইলি স্টার এমন অনেক নীতি বা অবস্থান নিয়েছে, যার সঙ্গে আমি একমত হইনি। কিছু বিষয়ে আমার দ্বিমত বা ভিন্নমত রয়েছে। কিন্তু মাহ্ফুজ আনাম যে একজন সৎ, বিজ্ঞ সাংবাদিক, সফল সম্পাদক, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। সম্প্রতি ভুল স্বীকার করে তাঁর এই সততার গৌরব আরও বৃদ্ধি করেছেন তিনি।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Sunday, February 14, 2016
শিশুহত্যার বিচার হয়তো হবে, শৈশব হত্যার? by আবুল মোমেন
![]() |
| সিলেটে খুঁটির সঙ্গে বেঁধে শিশু সামিউল আলম রাজন হত্যা |
তাহলে সমস্যা দাঁড়ায় দুটি—শিশুহত্যা এবং মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ তৈরিতে বা মনুষ্যত্বে ঘাটতি। এবার নজর দিতে হবে সমাজের দিকে এবং মানুষ তৈরির ক্ষেত্রগুলোর দিকে। না, এ সমাজ শিশুবান্ধব নয়। আজ বাংলাদেশে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে সব শিশুই সুবিধাবঞ্চিত। শহরের ধনী থেকে নিম্ন মধ্যবিত্ত সব স্তরের শিশুকেই খাঁচাবন্দী জীবন কাটাতে হয়; সেটা বাসায় যেমন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তেমনই। বস্তির শিশুরা হয়তো তুলনামূলকভাবে মুক্তজীবন কাটায় কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পারিবারিক সাহচর্য-পরিচর্যা—এসবের অভাবে তার কাটে বঞ্চিত জীবন। একদল মুক্তিবঞ্চিত তো অন্য দল সুবিধাবঞ্চিত। শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য মুক্তি বা মুক্ত পরিবেশ আবশ্যিক প্রয়োজন। গ্রামে শহরের প্রভাব পড়ছে, তা ছাড়া মধ্যবিত্ত পর্যন্ত কেউ আর গ্রামে পরিবার নিয়ে বাসও করেন না। এখানে অবশিষ্ট লোকজনের জন্য মুক্তি কিছুটা থাকলেও তার সব চাহিদা পূরণ করে বড় হওয়ার সুযোগ-সুবিধার বঞ্চনা প্রকট। এর ওপর শিশুশিক্ষায় রাষ্ট্র নিজেই বৈষম্যকে এতই প্রশ্রয় দেয় যে শিশুর বিকাশে সমতা প্রতিষ্ঠা একেবারেই অসম্ভব।

আর সমাজ যে শিশুবান্ধব নয়, তার কী হবে? যেসব প্রাণীর জীবনে মূল কাজ কেবল খাদ্যান্বেষণ করে বেঁচে থাকা, তাদের জীবনযাপনের জন্য বসত ও বিচরণের বড় এলাকার প্রয়োজন হবে, এটা সহজ বুদ্ধিতে বোঝা যায়। শুনেছি শিকারি প্রাণী একটি বাঘের প্রয়োজন পড়ে পাঁচ বর্গমাইল বিচরণ এলাকা, দলবদ্ধভাবে থাকা তৃণভোজী হরিণের হয়তো কম লাগে। আবার অনেকে পরিযায়ীও হয়। পাখি তো হাজার মাইল পাড়ি দিয়েও নতুন সাময়িক বসতি খুঁজে নেয়। মানুষ খাদ্যশৃঙ্খলসহ আরও প্রাকৃতিক সীমা ভেঙে এক অর্থে স্বাধীন, আবার সেই মানুষ ক্রমে নিজেই নিজেকে ÿক্ষুদ্র বসতির ঘেরে বন্দী করে ফেলছে। উন্নত বিশ্বে আবাসস্থল ছোট হলেও উন্মুক্ত স্থানে পার্ক ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার মাধ্যমে ব্যক্তির মুক্ত বিচরণের চৌহদ্দি অনেক বেড়ে যায়। শিশুদের জন্য আরও প্রশস্ত ব্যবস্থা তারা রেখেছে। একজন শিশুর স্বাভাবিক বিচরণের ব্যাপ্তি কতটা হওয়া দরকার এর কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আমি জানি না, কিন্তু এটুকু বুঝি যে তার অকারণ দৌড়ঝাঁপ, খেলাধুলা, মাটি ও প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভের যে ক্ষুধা ও চাহিদা, তা মেটানো জরুরি। আমরা গরিব দেশের মানুষ, শিশুর কাছ থেকে মাঠ, আকাশ, মুক্ত বায়ু, সূর্যালোক-জ্যোৎস্নালোক, সকাল-দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যা, সমবয়সী বন্ধুজন-খেলাধুলা সব কেড়ে নিয়ে তাকে বড়জোর ধরিয়ে দিচ্ছি পাঠ্যবই, ঢুকিয়ে দিচ্ছি কোচিং ক্লাসে, বসিয়ে দিচ্ছি প্রাত্যহিক পরীক্ষায়। কেমন মন নিয়ে বড় হচ্ছে এই শিশু?
একদিকে বঞ্চনা আর জিপিএ-৫ পাওয়ার চাপ আর অন্যদিকে তার স্বাভাবিক চাহিদা পূরণের অভাব। চাপ আর ক্ষোভ তাকে স্বাভাবিকভাবে বাড়তে দেবে? জিপিএ-৫-এর সাফল্যের জন্য তার শৈশব জিম্মি করে ফেলছি না? এ ব্যবস্থায় শিশুদের সঙ্গে বড়দের সম্পর্ক চলে সাধারণত ধমক আর ঘুষের ওপর (পরীক্ষায় ভালো করলে বেড়াতে নেব, বাসায় চুপচাপ থাকলে চায়নিজ খাওয়াব ইত্যাদি)।
যারা শিশুহত্যা করে শেষ পর্যন্ত তাদের পরিচয় হয়তো জানা যায়, কারও কারও শাস্তিও হয়। কিন্তু যারা প্রতিনিয়ত শৈশব হত্যা করছে? দুটিই তো ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিত অপরাধ। তবু আমরা এ দুইয়ের মধ্যে একটা পার্থক্য টানতে চাইব। শৈশব হত্যার ক্ষেত্রে হয়তো অসচেতনতা একটি বড় কারণ। আমরা তাড়াহুড়ো করে উন্নয়ন ঘটাতে চাইছি, যার অর্থ সড়ক-সেতু, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা বানিয়ে যাওয়া। মুক্তস্থান, মাঠ, পার্ক ও প্রকৃতিকে দখল করে জলাঞ্জলি দিয়েই তা করা হচ্ছে। আমি এর জন্য এককভাবে সরকারকে দায়ী করব না। সমাজ এসব চাহিদা নিয়ে দাবি তো তুলছেই না, বরং ব্যক্তি নিজের জায়গাজুড়ে বাড়ি আর দোকানপাটই তো বানাচ্ছেন। খালি জায়গায় অর্থনৈতিক ক্ষতি, স্থাপনা তৈরি হলে লাভ মেলে। ফলে সমাজ ও সরকার যৌথভাবেই একযোগে এ কাজ করছে। সুবিধা হলো শৈশব হত্যা করলে হাতে রক্তের দাগ লাগে না, কাউকেই নির্দিষ্টভাবে অপরাধী বলা যায় না।
কিন্তু এবার একটা কথা বলতে চাই। শৈশব হত্যা থেকে শিশুহত্যা তো খুব দূরে নয়। আপনারা সিলেটের রাজন হত্যার ভিডিওর কথা চিন্তা করুন। তামাশা হিসেবে শিশুহত্যা ‘উপভোগ’ করছিলেন অনেকে। কেউ এগিয়ে এলেন না। যে একজন এগিয়ে এলেন, তাঁর উদ্দেশ্য মোবাইলে জ্বলজ্যান্ত হরর ফিল্ম ধারণ এবং সেটা সর্বসাধারণে ছড়িয়ে দিয়ে তৃপ্তি লাভ! আর কিছু পরিবারে নিষ্ঠুর পিতা বা মাতা কিংবা অন্য অভিভাবক বা সমাজ তো অহরহ খেলার আসর থেকে উঠিয়ে শিশুকন্যাকে বিয়ের পিঁড়িতে বসাচ্ছেন। ঘরে ঘরে কত ছেলে, কত মেয়ের সুরের, রঙের, কাব্যের, নৃত্যের, অভিনয়ের ক্ষুধা ও প্রতিভাকে দুমড়ে-মুচড়ে দেওয়া হয় একমাত্র মোহ জিপিএ-৫-এর পেছনে ছুটিয়ে? শিক্ষা ও কলা, পরীক্ষা ও খেলা, জ্ঞানচর্চা ও সৃজনশীলতার যে সহাবস্থান করার কথা তা যে আমরা মনেই রাখি না। তাই শিশু এবং শৈশবের ওপর স্টিম রোলার চলছেই।

সাধারণভাবেই শিশুর বেশির ভাগ ইচ্ছার ওপর আমরা নিষেধের কপাট টেনে দিই। শিশু যদি বলে লাফ দিই, অভিভাবক বলেন কাজ নেই, হাত-পা ভাঙবে। শিশু যদি বলে প্রজাপতি ধরব, মা বলবেন, রোদে ঘুরলে অসুখ করবে। শিশু যদি বলে গাছে চড়ব, পেয়ারা পাড়ব, বাবা বলবেন কাজ নেই, পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবে। শিশু যদি জ্যোৎস্নায় বাইরে যেতে চায়, মা বলবেন, কী সর্বনাশ! ঠান্ডা লাগবে। এমনই দৃষ্টান্ত অজস্র দেওয়া যায়। শিশুর প্রতি আমাদের এই মজ্জাগত না-কে হ্যাঁ-তে পরিণত করতে হবে। শিশু ব্যথা পাবে, হাত ভাঙতেও পারে, মাথা কাটতে পারে (মাথা ফেটে যায় না), চোট-ব্যথা একটু লাগতেই পারে। কিন্তু এসবই জীবনের অংশ। সাবধানতা ভালো, কিন্তু শিশুকে ফার্মের মুরগি বানিয়ে ফেললে সর্বনাশ। ফার্মের মুরগির মুরগিত্বে ঘাটতি থাকে। সে ওড়ে না, ডাকে না, এমনকি বিশেষ নড়াচড়াও করে না; কেবল খায়, মলত্যাগ করে, ডিম পাড়ে, ঘুমায়। যে শিশু খেলে না, দৌড়ঝাঁপ করে না, একটু গায় না, নাচে না, আঁকে না, তার মানসিক প্রতিবন্ধিতা তৈরি হয়, মানুষ হিসেবে ঘাটতি নিয়ে সে বড় হয়। তারাই সদলে এ সমাজকে উনমানুষের সমাজে পরিণত করবে। পরিণতিতে দেখা দেয় মনুষ্যত্বের সংকট। কবে কবি বলেছেন ‘মানুষের গভীর গভীর অসুখ এখন’।
সত্যিই শিশুরা আমাদের বিবেচনার মধ্যে বিশেষ থাকে না। বাড়ির শিশুটির জন্য স্কুল, কোচিং আর জিপিএ-৫-এর ব্যবস্থা হলেই অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন সুচারুভাবে দায়িত্ব পালন শেষ হলো। তার আরাম বা বিচরণক্ষেত্র ছোট হয়ে গেল, সেটা আমরা লক্ষই করি না। মনে রাখি না যেসব শিশু হারিয়ে যায় তাদের। কত শিশু প্রাণ হারিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে সে হিসাব কি আমরা রাখি? জীবন শুরুই হয়নি বলে তাদের তো কোনো জীবনী লেখা হয়নি। তাদের নামধামও কেউ মনে রাখেনি, এমনকি সংখ্যাও নয়। তাই অবলীলায় আমরা মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলি। এদের কি বাদ দেওয়া যাবে সে হিসাব থেকে?
১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে ইউনিসেফের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, শুধু পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তসংলগ্ন শরণার্থী শিবিরগুলোতে জুলাই পর্যন্ত ছয় লাখ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। আর ১২ সেপ্টেম্বর মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি শরণার্থী শিবির ঘুরে জানিয়েছিলেন, এ পর্যন্ত আট থেকে দশ লাখ শিশু এই যুদ্ধের বলি হয়েছে। তারা মূলত ডায়রিয়া ও ডায়রিয়া–জাতীয় রোগেই প্রাণ হারিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধই তো তাদের মৃত্যুর কারণ। ইউনিসেফ থেকে বলা হয়েছিল বর্ষা দীর্ঘায়িত হলে শিশুমৃত্যুর হার আরও বাড়বে। প্রবীণদের স্মরণ থাকবে, ১৯৭১ সালে বর্ষা দীর্ঘায়িত হয়েছিল। এডওয়ার্ড কেনেডি আরও বলেছিলেন, শরণার্থীদের ৪০ শতাংশ শিশু ও বৃদ্ধ, যাদের জীবন ছিল হুমকির মুখে।
শিশুহত্যা বন্ধ করতে হলে শৈশব হত্যা বন্ধ করতে হবে, শিশুহত্যাকারীদের শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি নিজেদের দিকে তাকাতে হবে। সব উন্নয়ন পরিকল্পনায় শিশু এবং মানুষ এবং তাদের মুক্ত প্রাকৃতিক বিচরণক্ষেত্র এবং সেই সূত্রে দেশের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে সবার আগে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Friday, January 15, 2016
বিএনপির জন্য ভাবনা by আবুল মোমেন
বিএনপির প্রধান শক্তি বিপুল জনসমর্থন, যাতে তারা প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের কাছাকাছি। তাদের প্রধান দুর্বলতা সংগঠন। এর কারণ বিএনপির জন্মের মধ্যেই নিহিত আছে। এটি একজন সামরিক শাসক মূলত আওয়ামী লীগ-বিরোধী লোকজন নিয়ে ক্ষমতায় বসে গঠন করেছিলেন। তখন তাঁর অগ্রাধিকার ছিল বৈধতা অর্জন ও ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা। তাই নিজের রাজনৈতিক দলের প্রয়োজন পড়েছিল। দলটি গঠনতান্ত্রিকভাবেই অগণতান্ত্রিক—সামরিক কর্তা তাঁর একক নেতৃত্ব কোনোভাবেই ভাগ করতে সাহস পাননি। ফলে দলের শাখা সংগঠন ও নানান অঙ্গসংগঠন তৈরি হলেও নেতৃত্বের কেন্দ্রিকতার ধরন পাল্টায়নি। তাতে দল সাংগঠনিকভাবে মজবুত হয়নি। এখানে এ আলোচনায় আওয়ামী লীগকেও একটু টানতে হবে। ক্ষমতাসীন এই দলের ইতিহাসের প্রায় সবটাজুড়েই গণতন্ত্রের সংগ্রামই মুখ্য হলেও কালে কালে আওয়ামী লীগও আজ এক নেত্রীকেন্দ্রিক দলে পরিণত হয়েছে এবং আমরা অবাক হয়ে লক্ষ করছি সামাজিকভাবে বরাবর সক্রিয় সজীব একটি সংগঠন কীভাবে ক্ষমতার প্রশ্রয়ে থেকে নির্জীব ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। হয়তো এই সংগঠনের শিকড় অনেক গভীরে বলে এ অবস্থায়ও প্রয়োজনে আন্দোলন দাঁড় করাতে পারে এবং এখনো দেশের আনাচকানাচে দলের আদর্শে নিবেদিত অনেক কর্মী-সমর্থকও রয়েছেন, যাঁদের সত্তার গভীরে রাজনৈতিক বীজ প্রবাহিত হয়।
বিএনপির দ্বিতীয় দুর্বলতা হলো তাদের রাজনৈতিক আদর্শ। দেশে সিংহভাগ মানুষের চেতনার কথা বিচার করলে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দলের জায়গা বেশ বিস্তৃত। কিন্তু ধর্ম নিয়ে রাজনীতির নানামুখী বিপদ আছে এবং বিএনপিও এ থেকে বিপদে পড়েছে বলেই মনে হয়। মোটের ওপর দলটিকে রাজনীতি সাজাতে হয়েছে প্রধান প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগের রাজনীতির প্রধান অস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধ এমন এক ভাবাবেগ, যা ঘাঁটাঘাঁটি করা সহজ নয়। কিন্তু সমর্থক ভোটারদের মান বিচার করলে দেশের রাজনীতিতে ভাবাবেগের প্রয়োজন পড়ে। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিরুত্তাপ থেকে ভাবাবেগের অস্ত্র হিসেবে নিয়েছে ইসলামকে। এই দুই ভাবাবেগ যদি দুটি ভরকেন্দ্র হয়ে থাকে, তাহলে তাদের ঘিরে আরও সমমনা সমধর্মী দল, গোষ্ঠী, জনগণ জুটে যাবে—এটাই স্বাভাবিক। ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ভেতর দিয়ে একসময় দেশ বড় দুটি দলকে ঘিরে মোটামুটি দুটি মতাদর্শে বিভক্ত হয়ে গেল।
এই পরিবর্তনের সময় রাজনৈতিক দিক থেকে আওয়ামী লীগ কিছু বাড়তি সুবিধা পেয়েছে এবং একটি প্রধান ক্ষেত্রে প্রায় প্রজ্ঞাপূর্ণ বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। সম্ভবত এটিই তাদের এগিয়ে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ প্রতিপক্ষের শক্তির প্রধান উৎস ভাবাবেগের ভান্ডারে ভাগ বসাতে সক্ষম হলো। তারা প্রমাণ করতে পারল যে মুক্তিযুদ্ধ ও ইসলাম পরস্পরবিরোধী কোনো ভাবাদর্শ নয় এবং ভাবাবেগের দুটি পৃথক ভরকেন্দ্রও নয়। আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতিক এবং নেতা-কর্মীদের ব্যক্তিগত সংস্কৃতিতে ইসলাম একটি বড় জায়গা জুড়ে আছে। এটা আরোপিতও নয়, বানানোও নয়, অতীতে ধর্মপ্রাণ মানুষ হয়েও অনেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনার পক্ষপাতী ছিলেন না। এখানে আমরা বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগে পার্থক্য দেখতে পাই।
বিরোধিতা ও প্রতিপক্ষতার চর্চা যত তীব্র, ব্যাপক ও দীর্ঘায়িত হয়েছে, বিএনপি ততই কট্টর ইসলামি দলগুলোর কাছাকাছি চলে এসেছে, দলের অভ্যন্তরে জামায়াতপন্থী অনেক নেতাই শক্ত অবস্থানে চলে এসেছেন। ফলে দেশের তরুণসমাজ যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে ভাবাবেগে জেগে উঠছে, তখনো বিএনপি তাদের প্রতি পক্ষপাত প্রকাশ করতে কুণ্ঠিত হচ্ছে না। আর এর চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটল স্বয়ং বেগম জিয়ার মুখে, তিনি যখন মুক্তিযুদ্ধের শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর কথা ও মনোভাবই দলের বক্তব্য ও ভাবনা হিসেবে মানুষের কাছে প্রকাশ পায়। তাঁর এ বক্তব্য রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটা মারাত্মক ভুল বলেই প্রমাণিত হচ্ছে।
কোনো সচেতন মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদের মাথা গোনা সংখ্যা নিয়ে মাথা ঘামায় না। যেমন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে ছয় কোটি মানুষের মৃত্যু বা লেনিনগ্রাদ (প্রাক্তন ও বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) রক্ষায় ২০০ রুশবাসীর শাহাদাত বরণ কিংবা নাৎসিদের হাতে ৬০ লাখ ইহুদি নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান নিয়ে কেউ প্রশ্ন করে না। সবাই জানেন যে নিহত ও শহীদের সংখ্যা ছিল বেশুমার। প্রশ্নটা হচ্ছে, একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসররা গণহত্যা চালিয়েছিল কি না, নারী নির্যাতন করেছিল কি না, জানমালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছিল কি না। এরই ফাঁকে বেগম জিয়ার জ্ঞাতার্থে জানাই, একাত্তরের সেপ্টেম্বর নাগাদ শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে আসা মার্কিন সিনেটর প্রয়াত এডওয়ার্ড কেনেডি একটি সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন যে শরণার্থী শিবিরগুলোতেই তখন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ শিশু প্রাণ হারিয়েছে। এরা সবাই মুক্তিযুদ্ধের বলি। তাদের সে সম্মান দিতে হবে।
যা হোক, আমরা আগের কথায় ফিরে আসি। দল পুনর্গঠন বা সাংগঠনিকভাবে দলকে গুছিয়ে নেওয়ার আগে তাদের ভাবতে হবে মানুষকে উজ্জীবিত করার হাতিয়ার কী হবে? তারা কি এর জন্য মুসলিম জাতীয়তাবাদের আদর্শকেই ধারণ করে এগোবে? এই মনোভাবের মানুষের সংখ্যা দেশে অনেক এবং বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির কারণে নতুনভাবে তরুণসমাজের মধ্যে মুসলিম পরিচয় তুলে ধরা ও প্রমাণ করার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ দুটি কারণে বিএনপি তাদের সনাতন আদর্শেই অবিচল থাকতে পারে। এখানে তাদের জন্য বিপদ দেখতে পাই দুদিক থেকে। একদিকে হলো নতুন পরিস্থিতির কারণে মুসলিম জাতীয়তাবাদের রাজনীতির, অন্তত কিছুকালের জন্য, চরমপন্থা ও জঙ্গিবাদের দিকে ঝুঁকে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপির গায়ে জেএমবি-জামায়াত পৃষ্ঠপোষকতার দাগ রয়েছে, ফলে আবারও নতুন কোনো সম্পর্ক তাদের সমস্যায় ফেলতে পারে। বিপদের দ্বিতীয় দিকটি হলো, ইসলামে শান্তিপূর্ণ পথে মানুষের মন জয় ও প্রতিকূলতা অতিক্রম করার শিক্ষা ও আদর্শ রয়েছে। বর্তমান বাস্তবতায় বৈশ্বিক পটভূমিতে আমরা মুসলিম আলেম-মনীষীদের মধ্যে ইসলামের এই ভাষ্য তুলে ধরা এবং তার ভিত্তিতে একটি সমঝোতা ও শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টির প্রয়াস লক্ষ করছি। তা ছাড়া বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ধর্মভীরু মুসলিম হলেও সাংস্কৃতিক-সামাজিকভাবে তাদের মজ্জাগত প্রবণতা উদার মানবিক দিকে। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এবং মুসলিম লীগের অবাঙালি নেতারা বিষয়টি ধরতে পারেননি। সে কারণেই শেষ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ও বর্তমান বাংলাদেশে মুসলিম লীগ অস্তিত্বহীন হয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো বিএনপি নেতাদের মাথায় রেখে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
আজকের বাস্তবতায় বিএনপির পক্ষে প্রমাণ করা শক্ত যে তারা ইসলামচর্চায় আওয়ামী লীগের চেয়ে গুণগতভাবে বেশি আন্তরিক ও শ্রেয়তর। ইতিমধ্যে ছিটমহল বিনিময়, বিদ্যুৎ সরবরাহে উন্নতি ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারতবিরোধিতার কার্ড রাজনীতিতে কোনো বাড়তি সুবিধা দেবে না।
বলা যায়, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ভাবাদর্শিক ভ্রান্ত মোহে কেটেছে বিএনপির। দলের এই মোহ দীর্ঘায়িত হওয়ায় নানা রকম ভুলভ্রান্তি ঘটে চলেছে এবং বিপরীতে আওয়ামী লীগ একতরফা সুবিধা পেয়ে যাচ্ছে। উপরন্তু, সরকারে থাকায় সবটা জায়গাজুড়েই দলটি খেলছে। বিএনপি মাঠে নামার জায়গা পাচ্ছে না।
তবে স্থানীয় নির্বাচনগুলো তাদের জন্য সুযোগ নিয়ে আসছে এবং আশার কথা, বিএনপির নেতৃত্ব সেটা গ্রহণ করছেন। এর বাইরে তাদের জন্য আরেকটা বড় কাজ আছে বলে মনে হয়। তা হলো মানসিকতার পরিবর্তন। কাজটা সহজ নয়। কিন্তু বাংলাদেশে যেমন ধর্মকে একদম বাদ রেখে রাজনীতির কথা ভাবা যায় না, তেমনি অমোঘ আরেক বিষয় হলো মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বা চেতনা বলতে একটা বিষয় আছে, তা হলো প্রকৃত গণতন্ত্র; যা অসাম্প্রদায়িক মানবতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার ইত্যাদি বিষয়কে নিশ্চিত করে। স্থানীয় সরকারের স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন, বিচার বিভাগের যথার্থ স্বাধীনতা, সরকার ও প্রশাসনের জবাবদিহিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও প্রকৃত গণতন্ত্রেই নিষ্পত্তি হবে। আর এখানেই বিএনপির জন্য রাজনীতির আদর্শ, ভাবাবেগ তৈরির খনি রয়েছে। কারণ ক্ষমতা সংহত করা বা পাকাপোক্ত করার দৌড়ে নেমে বর্তমান সরকার অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠেছে এবং গণতান্ত্রিক অধিকারে অনেকটাই ঘাটতি তৈরি করছে। দুর্নীতি, বিচারহীনতা, বিচারবহির্ভূত হত্যা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বেপরোয়া ক্ষমতা, গণমাধ্যমের ওপর হস্তক্ষেপ ইত্যাদি অনেকভাবেই গণতন্ত্র খর্ব হচ্ছে। কোনো কার্যকর বিরোধী দল না থাকলে সাধারণত ক্ষমতাসীনদের এভাবে ক্ষমতামদমত্ত হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়তে থাকে। তার কিছু আলামত সমাজে রয়েছে। ফলে বিএনপির জন্য রাজনীতির সুযোগ কম, এ কথা ঠিক নয়। কেবল তাদের পুরোনো ধাঁচের চিন্তার বাইরে এসে নতুনভাবে ভাবতে হবে।
তাদের জন্য শেষ এবং শক্ত ফাঁড়া হলো দলের ভাবাদর্শিক নেতা জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর বিকল্প একজন ভাবার অভ্যাস পরিবর্তন। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা, জেএমবি সম্পৃক্ততা ইত্যাদি যেমন খালেদা জিয়ার আমলে বিএনপির গায়ে বড় আঁচড়, তেমনি জিয়াউর রহমানের উত্থানের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও চার নেতার খুনিদের পৃষ্ঠপোষকতার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই এ দেশে স্বাধীনতাসংগ্রাম হয়েছে, তাঁর নামে স্লোগান দিয়েই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর অনুপস্থিতিতে তাজউদ্দীন আহমদসহ চার নেতাই সরকার চালিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ফলে জাতি এঁদের হত্যাকাণ্ডের কেবল বিচার নয়, সব রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাইবে। এটা তাদের কর্তব্য ও অধিকার। ফলে এ নিয়ে বিরোধপূর্ণ মনোভাবের অবসান টানতে হবে।
তবে, এই বিপদ কীভাবে কাটাবেন, সেটা বেগম জিয়া ও তাঁর সহকর্মীদেরই আজ ভাবতে হবে। সে ভাবনার দায় কলামিস্টের নয়, তাঁদেরই।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Friday, January 8, 2016
উন্নয়ন হলেও সুখ অধরা থাকছে by আবুল মোমেন
এরপরে কি আর কথা থাকবে না? ইংরেজ বাঘা বুদ্ধিজীবী বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘বাহ্যরূপ ও বাস্তবতা’—এপিয়ারেন্স অ্যান্ড রিয়ালিটি-যুক্তিজালের গোলকধাঁধায় না ঢুকেও বলা যায়—বোধ হয় থাকবে। ছোট্ট দেশ, সার্কের সদস্যরাষ্ট্র ভুটানের রাজা তাবড় অর্থনীতিবিদ ও দুঁদে উন্নয়নবিশারদদের সূচকগুলোতেই কিন্তু সন্তুষ্ট থাকেননি। তিনি নতুন ভাবনার জোগান দিয়েছেন। দেশের উন্নয়নের হদিস নেওয়ার প্রচলিত মাপকাঠি জিডিপি, জিএনপি—অর্থাৎ মোট দেশীয় উৎপাদন, মোট জাতীয় উৎপাদন ইত্যাদিতে উন্নয়নের সম্পূর্ণ চিত্র উঠে আসে বলে মনে করেন না তিনি। রাজা ওয়াংচুক মনে করেন প্রথমত, মানুষের উন্নয়নের চাহিদা কেবল বস্তুগত বিষয়ে সীমিত থাকতে পারে না। দ্বিতীয়ত, উন্নয়নের চাহিদার রূপ ও মান দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন হওয়াই স্বাভাবিক। তবে তাঁর মতে, সব মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য—সুখ। তাই তিনি বলেছেন, কোনো দেশের উন্নয়ন বোঝার মাপকাঠি হবে জিএনএইচ—গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস, মোট জাতীয় সুখের পরিমাপ।
ভুটানের স্বাস্থ্যোজ্জ্বল হাসিখুশি লোকদের অল্প দেখার অভিজ্ঞতায় বেশ সুখী আর সমাজটাকেও শান্তিপূর্ণই মনে হয়েছে। ওদের বিষয়ে বেশি বলার অধিকার আমার নেই। তবে আমরা সবাই জানি গ্রামবাংলার সাধারণ মানুষ ঐতিহ্যগতভাবেই অল্পে তুষ্ট, আশুতোষ। পশ্চিমা একটি জরিপেও দেখা গেছে, সুখের মাপকাঠিতে বাংলাদেশের অবস্থান বেশ ওপরেই আছে। এর অর্থ এ দেশের জনগণ বা সাধারণ মানুষ মোটামুটি সুখেই আছে।
এই জরিপের ফল কি সত্য? বাস্তব চিত্র কি এতে উঠে এসেছে? আবারও আমরা রাসেলের গূঢ় তর্কের মুখোমুখি হই—বাহ্যরূপ আর বাস্তবতায় কি ফারাক আছে? জানি, জরিপ আর পরিসংখ্যান অনেক সময় বোকা বানায় আমাদের, ডাহা মিথ্যাও বলতে পারে। তা ছাড়া সুখ বা শান্তির মতো বিমূর্ত এবং নিতান্ত মনোজগতের বিষয়ে পরিমাণগত ধারণা দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তবে উন্নয়নের প্রচলিত অধিকাংশ সূচকেই বাংলাদেশের চমকপ্রদ সাফল্য অর্জিত হলেও সেসব অর্জনকে একটুও খাটো না করে বাস্তবতার আলোকেই বলা যায়, বাংলাদেশের বহু মানুষ সুখেও নেই, শান্তিতেও নেই।
দেশে অনেক ধরনের বৈষম্য বিরাজ করছে এবং তাতে এক পক্ষ অন্য পক্ষের আধিপত্যের কারণে বঞ্চিত বা বঞ্চিত-শোষিত উভয়ই হচ্ছে। অনেক উন্নয়ন হলেও বাংলাদেশের সমাজকাঠামো সামন্তধাঁচের, ধর্মসংস্কারশাসিত এবং মোটা দাগে রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক। এমন সমাজে নারী সর্বস্তরের—কর্মক্ষেত্র থেকে সংসার, শৈশব থেকে বার্ধক্য, সধবা থেকে বিধবা ইত্যাদি—বৈষম্যের শিকার, স্বভাবতই অনেকেই নিগ্রহ ও লাঞ্ছনার শিকার এবং প্রায় ঢালাওভাবে পুরুষতন্ত্রের যৌন পীড়নের আতঙ্কে কাটাতে বাধ্য হয়। তার সুখ বড় ঠুনকো, ভাসা-ভাসা, অনেক সময় মেকি এবং ছেলেভোলানো ছলনার বেশি নয়।
বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা বহুকাল ধরেই—সেই পাকিস্তান আমল থেকেই বৈষম্যের শিকার। কখনো রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক উভয় প্রকার বৈষম্যের শিকার তারা। দীর্ঘকাল ধরে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায় কেবল বৈষম্যের কারণেই নয়, বঞ্চনা-লাঞ্ছনা-নিপীড়নের ফলে ভয়ার্ত জীবন কাটাচ্ছে। তারা যে অসুখী, তার কিছু স্পষ্ট পরিসংখ্যানগত হিসাবও হাজির করা যায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তৎকালীন পূর্ববঙ্গের হিন্দু জনসংখ্যা ছিল এ দেশের মোট জনসংখ্যার ৩৩ শতাংশ। পাকিস্তানে ছিল রাষ্ট্রীয় সাম্প্রদায়িকতা, ১৯৬৫-এর পরে যার গভীরতা ও ব্যাপ্তি কেবল বেড়েছে। ১৯৭১-এ স্বাধীনতার পরে এই সংখ্যা নেমে যায় ২২-২৩ শতাংশে। দ্বিজাতি তত্ত্বকে অগ্রাহ্য করে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান–ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মিলে মুক্তিযুদ্ধ করে যে স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হলো, তাতেও সংখ্যালঘুর বিড়ম্বনা থেমে থাকেনি। অনেকেরই সম্পত্তি হাতছাড়া হয়েছে, জনসংখ্যা ক্রমাগতই কমে বর্তমানে ১০ শতাংশের নিচে। সুখে থাকলে কেউ দেশ ছেড়ে যায়?
আমাদের পাহাড়ের প্রতিবেশী ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাস্তবতা কী? ১৯৪৭ সালে গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালির সংখ্যা ছিল ২ শতাংশ। বর্তমানে সেখানে সমতলের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ। নিজ দেশে পরবাসী ওরা। তারপরে তাদের দিক থেকে স্বায়ত্তশাসন, বিচ্ছিন্নতার আন্দোলন-সংগ্রাম এবং সরকারের দিক থেকে সামরিক অভিযানসহ জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ১৯৯৭ সালে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির দুই দশক পূর্ণ হলেও কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে পাহাড়িদের মনে সুখ আসেনি। বস্তুত কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ থেকেই তাদের জীবনে সুখ কমতে শুরু করেছে, বাংলাদেশ আমলে তা হ্রাসের হারই বেড়েছে। পার্বত্য অঞ্চলে জিয়াউর রহমানের বাঙালি অভিবাসন নীতির ফলে তা চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে, যা শান্তিচুক্তিও ঠেকাতে পারেনি।
ইদানীং সংবাদপত্রে প্রায়ই পড়ি সমতলের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর চরম ভোগান্তির নানা খবর। গত ২৪ ডিসেম্বর ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এ পড়লাম সিলেটের উরাং জাতির রাজাসহ সবার দুরবস্থার কথা। তাদের জমিজমা ভূমিদস্যুদের হাতে গ্রাস হতে হতে এখন ২০ শতাংশও নেই। স্বয়ং রাজা ও তাঁর পরিবার দারিদ্র্যের প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছেছেন। একই অবস্থা সাঁওতাল-গারোসহ সমতলের ৪৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর। তারা ভিটেহারা, জমিহারা হয়ে যাচ্ছে। তার ওপর নারীরা অহরহ যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে এবং কোনো বিচারই পাচ্ছে না। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, দেশের ÿক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর লোকজন কেউ সুখে নেই।
খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধরা এত দিন এমন করে ভাবেনি, কিন্তু রামুর ঘটনা এবং যাজক ও গির্জার ওপর হামলার পর তাদেরও মনে শান্তি ও সুখে টান পড়তে শুরু করেছে।
দেশের ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মধ্যে অতি ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আহমদিয়া সম্প্রদায় বেশ কয়েক বছর ধরে কট্টর সুন্নিদের হুমকি ও হামলার সম্মুখীন হচ্ছে। তাদের একটি মসজিদে বোমা হামলা হয়েছে। একইভাবে দেশের আরেক ক্ষুদ্র মুসলিম সম্প্রদায় শিয়াদের একটি মসজিদেও হামলা হয়েছে, মুয়াজ্জিন নিহত হয়েছেন এবং বেশ কয়েকজন মুসলিম আহত হয়েছেন। আমরা কি কেউ খবর নিয়েছি দেশে আরও যেসব মুসলিম ক্ষুদ্র গোষ্ঠী আছে, যেমন: বাহাই, বোরা, ইসমাইলিয়া, এরা কেমন আছে? বাস্তবের আলামত বলে, তাদের মনে সুখ থাকার কথা নয়।
যদি আমরা শিশু রাজন, রাকিব, রবিউলদের কথা মনে করি, তবে শিউরে উঠে কবুল করতে হবে, এ সমাজ শিশুবান্ধব নয়। তা ছাড়া শিক্ষাজীবন যেভাবে পরীক্ষা ও জিপিএ-৫-এর দাপটে কোচিং, মুখস্থ ও পরীক্ষার শৃঙ্খলে পরিণত হয়েছে, তা শিশুর দৈনন্দিন জীবনের সুখ নষ্ট করেছে। আর অপহরণ-মুক্তিপণ-নেশা-সাইবার অপরাধ-যানজটের মিলিত ফল হলো শিশুদের জীবনে নেই অবকাশ, নেই স্বাধীনতা। খেয়াল করলে দেখা যাবে ধনী-দরিদ্রনির্বিশেষে এ দেশের শিশুরা শৈশবহারা, অসুখী। কিশোর-কিশোরীরাও একই বাস্তবের শৃঙ্খলে ও চাপে সুখী কৈশোর থেকে বঞ্চিত।
হয়তো বাস্তববাদীরা ভাবছেন, সুখ-শান্তি মানসিক ব্যাপার, তা ব্যক্তিগত সাধনায় অর্জন করতে হয়। না, আমরা জানি এ বাস্তব নয়, বাস্তবের বাহ্যরূপমাত্র। কথাটা আমরা তুলেছি তুচ্ছ মানুষের নগণ্য জীবনের সামান্য চাহিদার আলোকেই। এ সমাজে যাঁরা জীবনে ভোগের কিছুই না চেয়ে আপন আনন্দে সাধনমার্গে বিচরণ করতে চান, সেই বাউল-ফকির–পীর-মুর্শিদ সহজিয়া সাধকেরাও কি সুখে আছেন? তাঁদের দাড়ি-চুল কেটে লাঞ্ছিত করা হয়নি? হুমকির মুখে রাখা হয়নি?
মুক্তচিন্তার মানুষ জানেন, তাঁদের পথটি দুর্গম। তবু কেউ কি ভাবতে পারেন, এই একবিংশ শতাব্দীতে, স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশতক পরও তাঁদের চিন্তা নয়, জীবনই আশঙ্কার মধ্যে থাকবে!
তদুপরি দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী, দুবারের প্রধানমন্ত্রী ও ভবিষ্যতের সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীই যদি দেশের জন্মযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করেন, জাতির জনককে হেয় করেন, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের অবমাননা করেন, তখন সচেতন দেশপ্রেমিক মানুষের মনে সুখ থাকে কীভাবে?
দুটি সামান্য নগণ্য কথা বলে শেষ করতে চাই।
প্রথমত, বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেশের যে চমকপ্রদ অগ্রগতি হয়েছে, তাকে অস্বীকার করি না, বর্তমান সরকার যে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে উন্নয়নের পথে, তাও অস্বীকার করার কারণ নেই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তি কার্যকরের কৃতিত্ব ভোলার নয় এবং এই কর্মযজ্ঞে প্রধানমন্ত্রী যে যোগ্য নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাও মানতে দ্বিধা নেই। এসব সাফল্যে অনেকের মতো আমিও স্বস্তি পাই, আনন্দিত হই। এ দেশের মানুষের, বিশেষত তরুণদের, প্রাণশক্তির ওপরও আমি ভীষণভাবে ভরসা করি। সঠিক দিকনির্দেশনা পেলে তাঁদেরই পক্ষে যে দেশের অর্থাৎ সমাজ ও সমাজমানসের প্রকৃত রূপান্তর ঘটানো সম্ভব, সে বিশ্বাস আমার আছে। ফলে আমি নিরাশাবাদী নই, এখনো আশাবাদী, তবে উদ্বিগ্ন আশাবাদী। আমাদের বুঝতে হবে সুখ-শান্তি সরকার একা এনে দিতে পারবে না।
দ্বিতীয়ত, সমাজকে প্রাচীন সংস্কারে বন্দী রেখে, নারীকে পুরুষতন্ত্রের দাপটে রেখে, শিক্ষাকে পরীক্ষার শৃঙ্খলে বেঁধে, গণতন্ত্রকে ক্ষমতার দুর্গে আটকে, চিন্তার গতিপথে অন্ধবিশ্বাসের অর্গল এঁটে সমাজমানসের রূপান্তর করা যায় না। মনের গহিনে আলো প্রবেশ না করলে অন্ধকার কাটবে কীভাবে? এমনটা চলতে থাকলে সে সমাজে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়। আশঙ্কার কথা, এ দেশে মুক্তচিন্তার মানুষ তৈরিতে ভাটা চলছে, বিপরীত স্রোত বরং বেশ জোরদার বলেই মনে হয়। সমাজের আলোকন (এনলাইটেনমেন্ট) ছাড়া অগ্রগতি সম্ভব নয়। এ কাজ সরকারের নয়, সমাজের অগ্রসর মুক্তচিন্তার মানুষের। তবে এই আলোকনের সঙ্গে সঙ্গে তাকে টেকসই ও তার অগ্রগতি নিশ্চিত করতে যে কাঠামোগত সংস্কার, পরিবর্তন, নবায়ন প্রয়োজন, তা সরকারের দায়িত্ব। সে কাজ অনেকটা হচ্ছে বটে, কিন্তু আলোকন ব্যতীত কেবল কাঠামোগত উন্নয়নে মানবিক সমাজ নির্মাণ হবে না। এসব কাজ আরব্ধ রেখে উন্নয়নের বাহ্যরূপে চমকপ্রদ পরিবর্তন ঘটলেও প্রকৃত সুখ অধরাই থেকে যাবে। সে রকম আলামত এ সমাজে প্রকট হয়ে উঠছে—সেটাই ভয়ের বিষয়।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Tuesday, December 8, 2015
যুদ্ধের ধকল ও উত্তরাধিকারের মনস্তত্ত্ব by আবুল মোমেন
আমরা ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলাম স্বাধীনতার স্বপ্ন বুকে নিয়ে, দেশপ্রেমও ছিল গভীর, এসব নিয়ে অঙ্গীকার ছিল দৃঢ়। সেদিন রূপান্তরিত বাঙালি যেমন অকুতোভয় বীরত্বে যুদ্ধ করেছে, তেমনি নিঃস্বার্থভাবে সর্বোচ্চ ত্যাগেও পিছিয়ে থাকেনি। তবু আমরা জানি যুদ্ধে আক্রমণ, হানাহানি, আঘাত, হত্যা, ধ্বংস, রক্তপাতের মতো অস্বাভাবিকতাও স্বাভাবিক। এর উপজাত হয়ে ব্যক্তি ও সমষ্টির মনস্তত্ত্বে ঘৃণা, আক্রোশ, হিংসা, জিঘাংসার মতো তীব্র নেতিবাচক প্রবণতাও প্রবলভাবে সক্রিয় থাকে। এদিকে যুদ্ধের অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতাগুলো উভয় বা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের ব্যক্তি ও সমষ্টির জন্য তীব্র মানসিক ধকলের (trauma) অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। পেছনে যদি ঘৃণা-আক্রোশ ইত্যাদির মনস্তাত্ত্বিক ইন্ধন কার্যকর থাকে, তাহলে মানসিক ধকল থেকে বেরিয়ে আসা হয়ে পড়ে কঠিন।
স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় প্রত্যাঘাতের শিকার হই আমরা। তারপর টানা ২০ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ও লক্ষ্য, আদর্শকে সরিয়ে দেশকে পাকিস্তানি ধারায় চালানো হয়েছিল। সেই ২০ বছরে এ ধারার রাজনীতি এবং ধর্মান্ধ রাজনীতি, সংগঠন, সংস্কৃতি সমাজে শিকড় বিস্তার করেছে। এটি ঘটেছে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায়। বিএনপি মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দলের ভূমিকা পালন করতে চাইলেও তার আওয়ামী লীগ-বিরোধী রাজনীতি কেবল ধর্মীয় জাতীয়তার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধেও দাঁড়িয়ে গেছে। বাংলাদেশে এই রাজনীতি দাঁড় করাতে গিয়ে দলটি ধর্মীয় চরমপন্থী রাজনীতির আশ্রয়দাতা বটবৃক্ষের ভূমিকাও নিয়েছে।
গণতন্ত্রে বহু দল ও বহু মত থাকবে, এটাই স্বাভাবিক এবং কাম্য। কিন্তু সব দলের জন্য ন্যূনতম আদর্শিক চেতনায় ঐকমত্য থাকা জরুরি। সব উন্নত দেশেই এটি আছে, স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য জাতিকে এটি অর্জন করে নিতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপের উন্নত দেশগুলো এই জাতীয় ঐকমত্যে পৌঁছাতে দীর্ঘদিন বিস্তর যুদ্ধবিগ্রহ করেছে ও রক্তপাত ঘটিয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধকালীন যে ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তাতেই বুঝি বাংলাদেশের আদর্শিক সহমতের পক্ষে সবার অবস্থানের রায় ঘোষিত হয়ে গেল। আমরা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তা, ধর্মীয় গোঁড়ামির চেতনা সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদের ঐতিহ্যকে অঙ্গীকার করেছিলাম। কিন্তু মানুষের অন্তরের বহুমুখী পক্ষপাত, আগ্রহ, অঙ্গীকার কি যুদ্ধের দামামার মধ্যে আদৌ বিবেচনায় এসেছিল? আমরা তো সমাজে, যেসব বিষয়ে দ্বন্দ্ব এবং বিভ্রান্ত ও বিতর্ক চলমান ছিল, যেমন ইসলাম ও বাঙালি সংস্কৃতি, ইসলাম ও বিজ্ঞানচর্চা, ধর্মীয় চেতনা ও যুক্তিবাদ, এসব নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করিনি। এমনকি আমাদের উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও তো এসব নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হয় না। সাধারণত আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে সমাজে যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে পড়ে, তাতে জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর অংশ মোটামুটি গণতন্ত্রচর্চার জন্য মৌলিক বিষয়ে মোটা দাগে ঐকমত্যে পৌঁছে যায়। সমাজ স্থিতিশীল হয়ে ওঠে। আমরা সে জায়গায় পৌঁছাতে পারিনি।
আমাদের বিতর্কটি যুগপৎ ক্ষমতাকেন্দ্রিক এবং আদর্শভিত্তিক। যেহেতু আলোচনা ও বিতর্কচর্চার মাধ্যমে যুক্তির পথে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারা তৈরি হয়নি, অন্ধ আবেগই বহুলাংশে ঘটনার নিয়ন্তা, তাই বিতর্ক ও দ্বন্দ্ব নিষ্পত্তিহীনভাবে চলমান। আর বিতর্ক এভাবে অমীমাংসিত চলতে থাকলে উভয় পক্ষের তৎপরতার ফলে দ্বন্দ্বের আদিম এক আঁচ ও পরিধি বাড়তে থাকে, ক্ষেত্রবিশেষে বিরোধিতা আদিম রূপেই ফিরে যেতে চাইবে। উদ্বেগের বিষয় হলো, তার কিছু লক্ষণ আমরা সমাজে দেখতে পাচ্ছি।
তথ্যপ্রযুক্তির রথে চেপে যে কালান্তর এসে দুয়ারে কড়া নাড়ছে, তার বারতা যদি আমাদের বুদ্ধিজীবীসমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে না পারেন বা বুঝতে দেরি করেন, তাহলে তাঁরাই তামাদি আর অকেজো হয়ে পড়বেন জাতি যুদ্ধের পরে যুদ্ধসংক্রান্ত মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারের (Legacy) বোঝা নামানোর ফুরসত পায়নি কিংবা এ বিষয়ে নেতৃত্ব তেমন সজাগ ছিল না। বরং দ্রুত প্রত্যাঘাত আমাদের পুনরায় প্রতিরোধ ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঠেলে দিয়েছে। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কারণে ক্রমেই বাস্তবতা এ রকম হয়ে উঠেছিল যে বাংলাদেশ যেন বায়ান্ন থেকে একাত্তরের চেতনাগত সব অর্জনকে অস্বীকার করে পাকিস্তানকেই অনুকরণ করতে চলেছে। যাঁরা এসব অর্জনের সঙ্গে সম্পৃক্ত আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন, যাঁরা পরবর্তীকালে এই চেতনায় বিশ্বাস করেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন এবং যাঁরা রণাঙ্গনের যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছেন, তাঁদের জন্য এ ছিল সম্পূর্ণ উল্টোযাত্রা। তদুপরি ২০ বছর ধরে তা চলমান থাকবে তেমন বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছিল কঠিন। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন তাঁদের জন্য পবিত্র দায়িত্ব হয়ে ওঠে। বিরোধ যখন মৌলিক এবং চরম রূপে দেখা দেয়, তখন উভয় দিকেই সম্ভাব্য শক্ত চরম অবস্থান নেওয়ার ঝোঁক বাড়ে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ যেমন, তেমনি এর মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারের বোঝা বহনও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অপর পক্ষে ইসলামের যেসব জঙ্গিরূপ বিশ্বের নানা মুসলিম দেশে তৈরি হচ্ছে, তা আমদানি ও প্রয়োগের ঝোঁকও বেড়েছে। এর অনুকূলে আরও অনেক কার্যকারণ কাজ করেছে। যেমন মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম দেশের প্রতি পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের আচরণ ও ভূমিকা।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে এ দেশে কোনো সময়ই, কি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, কি বুদ্ধিজীবী সমাজ, কেউই এমন কোনো পথ দেখাতে পারেননি বা এমনভাবে পরিকল্পনা করে কাজ করেননি, যাতে নিরস্ত্র গণতান্ত্রিক আন্দোলন হিংসা-ঘৃণার বৃত্ত থেকে বাইরে থাকে। বরং বিভক্তি ক্রমেই চরম রূপ নিয়েছে এবং যেন দুর্ভাগ্যজনকভাবে জাতি ক্রমেই ঘৃণা-হিংসার ক্ষুদ্র বৃত্তে আটকে পড়ছে। মনে হয় এখন এ বিষয়ে ভাবা জরুরি হয়ে পড়েছে।
ইতিহাসের দায় পালনের পাশাপাশি আইনের দায় মেটানোও জরুরি। এবং সমান জরুরি হিংসা-ঘৃণা ইত্যাদি মনস্তাত্ত্বিক উত্তরাধিকারের বোঝা থেকে জাতিকে মুক্ত করা। এ তিনটি কাজ কীভাবে একসঙ্গে করা সম্ভব, সে প্রজ্ঞাই আজ পথ দেখাতে পারে আমাদের। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির রায়ের আগে গণমাধ্যমে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ফাঁস লাগানো ছবি প্রকাশ বা রায়ের পর আনন্দ মিছিল বা মিষ্টি খাওয়া নিশ্চয় পরিণত বুদ্ধি বা প্রজ্ঞাপূর্ণ কাজ নয়। প্রতিটি প্রাণই প্রাণ, প্রতিটি মৃত্যুই মৃত্যু। তাকে ন্যায়বিচারের অমোঘ বিধান হিসেবেই দেখতে হবে, এর বেশি কিছু নয়।
কিন্তু আক্রোশ ও উল্লাসের মনস্তত্ত্বটা আমি বুঝি। যুদ্ধাপরাধীরা জীবৎকালে কখনো তাঁদের ভুল স্বীকার করেননি, মুক্তিযুদ্ধকে মেনে নেননি, উল্টো এ মনোভাব নিয়েই ক্ষমতায় বসেছেন, জাতীয় পতাকা উড়িয়ে গাড়িতে চলেছেন এবং সুযোগ পেলে আত্মপক্ষে যে দম্ভোক্তি করেছেন ও অপর পক্ষের প্রতি যেসব বক্রোক্তি করতে ছাড়েননি, তার মধ্যকার প্রতিশোধ চরিতার্থ করার আনন্দ ঢাকা থাকে না। এর মধ্যে অবশ্যই অন্যায় ও উসকানি আছে। এও বুঝি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেই ভাবা স্বাভাবিক যে কোনো কারণে ক্ষমতার রদবদল হলে যুদ্ধাপরাধীরা ছাড়া পেয়ে পুনরায় ক্ষমতাবান হয়ে ফিরে আসবেন। তাঁরা বা তাঁদের দলবল হয়তো প্রতিহিংসার পথে চলবে, এমন আশঙ্কাও কাজ করে। কিন্তু আমরা তো মানুষ এবং যাঁরা জানেন যে তাঁরাই মূলধারা, তাঁরাই এ দেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবেন, তাঁদের তো চলমান বর্তমানের পাশাপাশি, বরং তার চেয়েও বেশি গুরুত্বের সঙ্গে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের অর্জনই যেন ভবিষ্যতের মূলধারা হিসেবে টিকে থাকে সে জন্য কাজ করতে হবে। তাতে ঘাটতি থেকে গেলে অতীতের মহৎ অর্জনকে ডিঙিয়ে এই এক অনভিপ্রেত বর্তমান আমাদের পিছু ছাড়বে না।
আমরা সবাই লক্ষ করছি একবিংশ শতাব্দীতে একটা কালান্তর চলছে। মানুষের বিকাশ ও উন্নতির নানা নতুন পথ ও বিকল্প তৈরি হয়েছে। দেশের সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষ মাঠপর্যায় থেকে চমকপ্রদ সব অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাফল্যের অর্জনে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছেন। শিক্ষার বিষয়ে সরকার ও জনগণ সচেতন হয়েছে, এমনকি শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের পথেও সচেতনতা লক্ষ করা যাচ্ছে। মাদকের সর্বনাশা ছোবল বা জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটতে দেখেও বলতে চাই, মানুষের মধ্যে শুভবোধ জাগানোর মতো
আবহ বিরাজ করছে, যা যেকোনো গঠনমূলক ও ভবিষ্যৎমুখী শুভ কার্যক্রমকে বিবেচনায় নিতে সক্ষম। অর্থাৎ নতুন কিছু কথা বলার, নতুনভাবে ভাবার এটাই বোধ হয় সময়।
আমরা জানি, কালান্তরের হাওয়া বইতে শুরু করলে তাকে ঠেকানো যায় না। ইংরেজের সংস্পর্শে আসার পরে ঊনবিংশ শতাব্দীজুড়ে ও বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় যে কালান্তর ঘটেছে বাংলায় ও ভারতে, তাতে মুসলিম ও হিন্দু গোঁড়া সমাজ রক্ষণশীলতার কারণে অংশ নিতে চায়নি, বিলম্বের কারণে তারাও কিন্তু পিছিয়ে পড়েছিল। আমাদের অনেকের অপছন্দ সত্ত্বেও আজকে বিশ্বায়ন ও বাজার অর্থনীতি ব্যাপক পরিবর্তনের চাপ তৈরি করেছে। তার পিছু পিছু তথ্যপ্রযুক্তির রথে চেপে যে কালান্তর এসে দুয়ারে কড়া নাড়ছে, তার বারতা যদি আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব বুঝতে না পারেন বা বুঝতে দেরি করেন, তাহলে তাঁরাই তামাদি আর অকেজো হয়ে পড়বেন। কেননা, সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের সে বারতা পেয়েছে। তারা জেগেও উঠেছে, এগিয়ে চলেছে, নিজেদের সঙ্গে সঙ্গে এরা দেশকেও এগিয়ে নিচ্ছে, এগিয়ে নেবে। কিন্তু তারপরেও রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিজীবী সমাজ এগিয়ে না এলে এ অগ্রগতি অসম্পূর্ণ হবে, কাঠামোগতভাবে দুর্বল থাকবে এবং যখন-তখন সমাজ নৈরাজ্যে ডুবে গিয়ে খেটে-খাওয়া মানুষের, যাদের অধিকাংশই তরুণ উদ্যোক্তা-স্বপ্নযাত্রার ভরাডুবি ঘটাবে। এই বিপর্যয়ের জন্য কে হবেন দায়ী?
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Thursday, November 5, 2015
শুভবুদ্ধির জাগরণ চাই by আবুল মোমেন
একজন শোকার্ত বাবার ব্যক্তিগত শোকের মুহূর্তে উচ্চারিত বক্তব্যের গভীরতা বোঝার ক্ষমতা ক্ষমতায় থাকা মানুষের না-ও থাকতে পারে। কেননা, এই অবস্থায় অনেকেই কেবল ক্ষমতার বিচারেই পক্ষ-প্রতিপক্ষ হিসেবে পৃথিবীকে দেখতে জানেন। দৃষ্টি ও বিবেচনাশক্তিকে আরও একটু প্রসারিত করে এর নিকট ও সুদূরপ্রসারী কুশীলবদের দেখার মতো ক্ষমতা তাঁরা হারিয়ে ফেলেন। বলতে দ্বিধা নেই, তাঁর বক্তব্য যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের মনে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। এর ধাক্কা লাগবে আওয়ামী লীগের গায়ে। এসব গায়ে না মাখলে আখেরে দলের ও দেশেরও ক্ষতি। তাই শোকের পাশাপাশি সচেতন মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠাও বেড়ে যায়।
যারা দীপনের মতো মুক্তমনা মানুষদের হত্যাযজ্ঞে নেমেছে, তারা কেবল বাংলাদেশে তৎপর তা নয়, ধর্মান্ধ মানুষের তৎপরতা ভারত-পাকিস্তানে যেমন আছে, আছে মধ্যপ্রাচ্যে-আফ্রিকায়, এমনকি ইউরোপ-আমেরিকাতেও তাদের তৎপরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ধরনের চরমপন্থী মতাদর্শের উত্থানের সময় এবং তৎপরতার ক্ষেত্রগুলো বিচার করলে এর পেছনের উদ্দেশ্য আমরা বুঝতে পারব। সেই সূত্রে স্মরণ করিয়ে দেব মধ্যপ্রাচ্যে কৃত্রিমভাবে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠা এবং সৌদি আরবের বর্তমান রাজবংশকে ক্ষমতায় বসানোর পেছনে তৎকালীন ইঙ্গ-যুক্তরাষ্ট্র সাম্রাজ্যবাদের ভূমিকার কথা।
এমনকি এই সেদিন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব ভাঙার সূচনাকর্মটির ক্ষেত্র হিসেবে পোল্যান্ডকে বাছাই করা, সে দেশের একজন বন্দরশ্রমিক ওয়ালেসাকে নায়ক বানানো (আজ তিনি বিস্মৃত) এবং এই সময়ে পোলিশ বংশোদ্ভূত একজনকে পোপ বানিয়ে দূতিয়ালির কাজে লাগানোর গভীর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার কথাও স্মরণ করা যায়। এসবই যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা শক্তির চাল। তারা যেকোনো মূল্যে সারা বিশ্বের অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিপতি থাকতে চায়।
আফগানিস্তানে সোভিয়েত হস্তক্ষেপ বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন কাজ হয়নি। ইরান ও ভারতের মধ্যবর্তী ও চীনের নিকট প্রতিবেশী এই পাহাড়ি দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশলগত গুরুত্ব অনস্বীকার্য। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের নিয়ে কী করল? জঙ্গি ইসলামি তালেবানদের সমর্থন দিল, তাদের অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে শক্তিশালী করে তুলল। পরবর্তীকালে মুসলিম-অধ্যুষিত বিরাট অঞ্চলজুড়ে নিজেদের শক্তি বাড়ানোর জন্য তারা আল-কায়েদা সৃষ্টি করল। একসময় আফগানিস্তানে সোভিয়েত দখলদারির অবসান হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তাঁবেদারির কাল শুরু হলো। গোত্রভিত্তিক সমাজটিতে অস্থিরতা দেখা দিল এবং গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে লিপ্ত সে দেশে এখনো শান্তি আসেনি, মুসলমানরা ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে ব্যস্ত রয়েছে।
জজিরাতুল আরবে সৌদি বংশকে ক্ষমতায় বসিয়ে সাম্রাজ্যবাদ মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের দখল নিয়েছে। কে না জানে এসব রাজা-বাদশাহ ইসলামসম্মত জীবনাদর্শের পরিপন্থী ভোগবিলাসের জীবনেই অভ্যস্ত। তদুপরি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার তাঁবেদার আরও রাষ্ট্র সৃষ্টির ব্যাপারে তারা প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করে থাকে। আরব-ইসরায়েল কোনো যুদ্ধেই সৌদি আরব অংশ নেয়নি। কিন্তু আরব বিশ্বের দুই স্বাধীনচেতা শাসক ইরাকের সাদ্দাম হোসেন ও লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও তার আগ্রাসী বাহিনীকে সব রকম সহযোগিতা দিয়েছে সৌদি সরকার। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র সিরিয়া ছাড়া সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র বলয়ের বাইরে আর কোনো দেশ নেই। তাই ঠিক ইরাকের মতোই এখানেও শাসক পরিবর্তনের ধুয়া তুলেছে তারা। ঠিক আগের মতোই সৌদি আরব রয়েছে তাদের পাশে। ইরাক থেকে সিরিয়ায় অস্থিরতা নৃশংসতায় লিপ্ত জঙ্গি ইসলামি দল আইএস বা আইসিস সবই একসুতোয় গাঁথা।
ইসলামের নামে জঙ্গিবাদের আদি উদ্গাতা কারা? বহুকাল ধরে আমাদের দেশের আলেম-মাওলানারা ওয়াহাবি পন্থা ও মওদুদিবাদীদের ধর্মীয় ব্যাখ্যার বিরোধিতা করে এসেছেন। কারণ, এঁরা ইসলামের ভ্রান্ত ব্যাখ্যা হাজির করে দেশে অনেককাল ধরেই অস্থিরতা সৃষ্টির কাজ করেছেন। গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানে কাদিয়ানিদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার কারণে বিচারে মওদুদির ফাঁসির রায় হয়েছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্রের চাপে সে আদেশ মওকুফ হয়েছিল। একইভাবে তারা এ দেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের বিরোধিতা করে ক্ষান্ত হয়নি, পাকিস্তান সরকারের দোসর হিসেবে পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় দেশের চিন্তাবিদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। সেই সময়ও দখলদার পাকিস্তান সরকারকে মদদ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এখনো পরাজিত এই শক্তি বাঙালি মুসলমানদের চিরায়ত মানবিক ধর্মসাধনার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনের পথে অশান্তি ও অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
আমাদের দেশে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে আখেরে কার লাভ? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এতে বিএনপি লাভবান হবে। কিন্তু কার্যত আওয়ামী লীগ-বিরোধিতার সূত্রে তখন সব ধারার ধর্মান্ধ গোষ্ঠী তৎপর হয়ে এক হবে এবং তারা ক্ষমতার অংশীদার হবে এবং কিছুকালের মধ্যেই ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবে। যেহেতু ধর্মভিত্তিক বিভিন্ন দলের মধ্যে মতপার্থক্য তীব্র এবং তারা যেহেতু গণতান্ত্রিক কোনো মূল্যবোধেই বিশ্বাস করে না, তাই তাদের মধ্যে পরস্পর ব্যাপক সংঘাত অনিবার্য, যা ইরাক, আফগানিস্তানসহ মুসলিম দেশে দেশে চলছে। বিএনপি এই দ্বন্দ্ব ও বিশৃঙ্খলা সামাল দিতে ব্যর্থ হবে এবং দেশ চরম অস্থিরতা ও নৈরাজ্যে আবর্তিত হবে। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের পরিণতি কী হয়—একনায়ক, নয় তো নৈরাজ্য?
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ আকারে ছোট হলেও এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সামরিক, কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দেশটির ভূমিকা হতে পারে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাই আমরা দেখি, এ দেশের গভীর সমুদ্রবন্দর নিয়ে চীন-জাপানে প্রতিযোগিতা, ভারতের আগ্রহ, সহায়তার প্রতিযোগিতায় বিশ্বব্যাংকও এগিয়ে আসছে, যার অর্থ পশ্চিমও তাদের স্বার্থ দেখতে পাচ্ছে এখানে। যুক্তরাষ্ট্র অনেক রকম চুক্তিতে আমাদের আবদ্ধ রাখতে চায়, নানা সামরিক মহড়ায় অংশ নিচ্ছে আমাদের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে।
বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের সম্পর্কে আমরা তো জড়িয়ে আছিই। ফলে অস্থিরতার সুযোগ নেওয়ার পক্ষ রয়েছে অনেক। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মুসলিম দেশে ইসলামের জঙ্গি ব্যাখ্যা হাজির করে দেশকে অস্থিতিশীল করার অপশক্তির অভাব কখনো হয় না। মনে হয় এরা ধর্মগ্রন্থ ও ধর্মীয় সাহিত্যের মর্ম উপলব্ধি করে পাঠ করে না। ফলে শক্তিশালী চতুর স্বার্থান্বেষীর দল এদের ব্যবহার করে নিজেদের সুদূরপ্রসারী স্বার্থ হাসিল করে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে অতীতে এরা পারেনি। আমাদের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক অবক্ষয় এবং ক্রমাগত অসহিষ্ণু দ্বন্দ্বের কারণে সমাজের অভ্যন্তরে নীরব প্রচারণা চালিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এরা ব্যাপক বিভ্রান্তি তৈরি করতে পেরেছে। তাতে রাজনৈতিক সংকট গভীর হয়েছে। এরা এই সংকটের সদ্ব্যবহার করে তলেতলে শক্তি সঞ্চয় করে এখন আঘাত করে চলেছে। এ সময়ে অতীতের মতোই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক জাগরণ দরকার এবং সেই সঙ্গে প্রকৃত আলেম-ওলামাদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন।
গুপ্তহত্যার ঘটনা ইসলামকে নিচে নামাচ্ছে। কারণ, ইসলাম নিশ্চয় এমন ধর্ম নয়, যা যুক্তির যুদ্ধে বিজয়ী হতে অক্ষম, যে ধর্মে অসির চেয়ে মসি এবং শহীদের রক্তের চেয়ে জ্ঞানীর কলমের কালি শক্তিশালী ও পবিত্র বলা হয়েছে, সে ধর্ম কি জ্ঞান ও লেখনীর লড়াইয়ে অসমর্থ? মুসলিম সমাজ কি কাপুরুষের আচরণ চিনতে অপারগ? আর যা-ই হোক, ইসলাম কাপুরুষদের ধর্ম নয়, এসব ঘটনা এ ধর্মকে কলুষিত করছে। এই সূত্রে রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মমোহ’ কবিতার কথা মনে পড়ছে—
‘ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
....
বিধর্ম বলি মারে পরধর্মেরে,
নিজ ধর্মের অপমান করি ফেরে,’
ধর্মের মোহজালে জড়িয়ে এরা নিজে মরে, অন্যকে মারে এবং বারংবার নিজের ধর্মকেই অপমান করে যায়। শেষ দুই পঙ্ক্তিতে কবি বলেছেন:
‘ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,
এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।’
কীভাবে জ্ঞানের আলোক আনব? ক্ষমতায় বসে কেবল বিএনপির ছায়া দেখে আঁতকে উঠলে হবে? আর শোকার্ত মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর বাক্য উচ্চারণ করলে চলবে? আমি মনে করি, সুস্থ সাংস্কৃতিক চেতনায় সম্পন্ন সামাজিক জাগরণ আজ অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। রাজনীতিকে সেটারই সহযোগী হয়ে পরিশুদ্ধ হতে হবে। তবেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের অভীষ্ট এমন এক মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ কায়েম করতে সক্ষম হব, যেখানে ইসলাম ও অন্য সব ধর্ম ও মত মর্যাদার সঙ্গে বিকশিত হতে সক্ষম হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Friday, October 30, 2015
শিক্ষামন্ত্রীর অসহায়ত্ব ও হতাশা by আবুল মোমেন
যে তরুণেরা ফাঁস হওয়া প্রশ্নের ভিত্তিতে গৃহীত পরীক্ষা বাতিলের দাবি তুলেছে, তাদের দাবির নৈতিক ন্যায্যতা অনস্বীকার্য। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা থেকে আমরা বুঝতে পারি, এখানে আদতে কচি-মাথার নীতিবোধ আর পাকা-মাথার বাস্তব বুদ্ধির টানাপোড়েন চলছে। সরকার হয়তো ভাবছে, এ পর্যায়ে ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হলে কৃতকার্য হয়ে ভর্তি হওয়া ছাত্ররা না পাল্টা আন্দোলনে নামে। রীতিমতো সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়ে যাবে সরকার। এই সম্ভাব্য বিপদ তারা ডেকে আনতে চাইছে না।
নাগরিক সমাজ নিশ্চয় ফাঁস বা দুর্নীতিমুক্ত পরীক্ষা এবং নৈতিক ন্যায্যতার পক্ষেই থাকবে। কিন্তু এটি একটি ইস্যুভিত্তিক আন্দোলন বলে ক্ষতিগ্রস্ত অকৃতকার্য ছাত্রদের পক্ষে ব্যাপক ছাত্র-তরুণ ও নাগরিক সমাজের সক্রিয় ভূমিকা ঘটবে কি না সন্দেহ। নৈতিকভাবে দুর্বল সমাজ অনবরত ছোট-বড় নৈতিক ত্রুটিকে উপেক্ষা করে এবং আপস করেই চলতে অভ্যস্ত। শিক্ষামন্ত্রী তাঁর সততার ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রেখেছেন, যা আজকের দিনে রাজনীতিবিদদের মধ্যে দুর্লভ। তাঁর সরল উক্তির মধ্যে এ সমাজে সৎ মানুষের অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। এখানে নাগরিক সমাজের দায়িত্ব রয়েছে। কেননা, সমাজে সততা অসহায় এতিম থাকবে, বিশেষত শিক্ষার ক্ষেত্রে, এটা কি মেনে নেওয়া যায়?
অন্যান্য ক্ষেত্রের কায়েমি স্বার্থের তুলনায় পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের দুর্নীতির ফলাফলে পার্থক্য রয়েছে। এর সঙ্গে একদিকে ছাত্র-তরুণদের বৈষয়িক ও নৈতিক স্বার্থ জড়িত আর অন্যদিকে শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটির প্রশ্ন যুক্ত। আমরা অনেক কাল ধরে বলে আসছি, শিক্ষার একমাত্র লক্ষ্য যদি হয়ে ওঠে পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া, তাহলে শিক্ষা নিয়ে দুর্নীতির চক্র সহজে ভাঙা যাবে না। কিন্তু পাকেচক্রে আমরা সেই চক্রের জালেই আটকেছি। আজকে গোটা শিক্ষাব্যবস্থা—প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর পর্যন্ত—মূলত সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে পরীক্ষার সম্পর্ক যে অঙ্গাঙ্গি, তা সবাই মানবেন। বিভিন্ন পর্বান্ত বা চূড়ান্ত পর্বের শেষে সনদ ও ডিগ্রি শিক্ষার ফসল বৈকি। কিন্তু তার মূল্য কি ব্যক্তিনিরপেক্ষ, অর্থাৎ মানুষটির চেয়েও বেশি?

শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমাদের ধারণা এবং অনুসৃত নীতির কারণে গোটা শিক্ষাব্যবস্থাই আজ পরীক্ষাকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। এ কারণে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক সবারই একমাত্র ধ্যানজ্ঞান হয়ে পড়েছে পরীক্ষার ফলাফল। ফলাফল-নিবেদিত ব্যবস্থায় পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য উল্লিখিত ত্রিপক্ষ সব সময় মরিয়া হয়ে থাকে। সবাই যেন রেসের ঘোড়া—প্রথম হওয়ার জন্য টগবগ করে ছুটছে। জয়ের লক্ষ্যে সবার সম্মিলিত উদগ্র চাহিদার ফলে পরীক্ষাকে ঘিরে জুয়াড়িদের আবির্ভাব হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। সফল হওয়ার সহজ ও কার্যকর পন্থার সন্ধান করতে করতে স্কুলকেও পাশ কাটিয়ে পরীক্ষায় সিদ্ধিলাভের দক্ষ মোক্ষম পদ্ধতি ও ক্ষেত্র তৈরি করে নিয়েছে এই আক্কেলমন্দরা—তার নৈতিক ভিত্তি না থাকুক। গড়ে উঠেছে নোট বই ব্যবসা কোচিং সেন্টার এবং মডেল টেস্ট পদ্ধতি। মানতেই হবে, বাজার অর্থনীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ব্যবস্থা। এখন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রদের ফরজ কাজ—নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শ্রেণিকে পাঠগ্রহণ নয়—কোচিং সেন্টারে উপস্থিত থাকা ও অবিরত মডেল টেস্ট দিয়ে পরীক্ষার্থী হিসেবে দক্ষ ও পোক্ত হয়ে ওঠা। নকল বন্ধের জন্য নোট বই বন্ধ করার জিহাদে নেমেছিলেন মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী, কিন্তু ব্যবস্থার কারণে পরীক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা ও চাহিদা মেটাতে শিক্ষা-জুয়াড়িদের নোট বইসহ সব ব্যবসা বেশ জাঁকিয়েই চলছে।
এভাবে আমরা একেবারে নিচের শ্রেণি থেকে ছাত্রদের শিক্ষার্থী সত্তার অকালমৃত্যু ঘটিয়ে তাদের পরীক্ষার্থী সত্তার বিকাশ ঘটাচ্ছি—সেটা শেষ পর্যন্ত উগ্র রূপই ধারণ করে এবং পরিণতিতে মানবিক মূল্যবোধ, সামান্য নীতিবোধেরও আকাল দেখা দেয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, একে অন্যের দেখাদেখি ভীত-বিভ্রান্ত অভিভাবকেরা কোনো ঝুঁকিতে যেতে চান না। একেবারে প্রথম শ্রেণি থেকেই সন্তানকে কোচিং সেন্টারের বা বাড়তি গৃহশিক্ষক জিম্মায় দিয়ে হাঁফ ছাড়েন। পুরো স্কুলজীবনে পিএসসি-জেএসসি-এসএসসি শিশুর অবসর, বিনোদন, খেলাধুলা, বেড়ানো, সৃজনশীল কাজ, সাহিত্যপাঠ, এমনকি বাবা-মা-স্বজনদের সঙ্গে নির্মল সময় কাটানো—সবকিছুই শিকেয় ওঠে। এভাবে কেবল ছাত্রের মানুষ হওয়া কঠিন হচ্ছে তা নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এবং এই তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে সৃষ্ট ভাগ্যান্বেষণের সুযোগ নিতে তৎপর ‘বুদ্ধিমানদের’ মনুষ্যত্ব বোধ ক্রমেই বিলুপ্ত হবে। ফলে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা দুর্নীতি পিছু ছাড়বে না।
এভাবে বেড়ে উঠে অধিকাংশ শিশু প্রায়ই কৃতিত্বের সঙ্গে বিভিন্ন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উচ্চ ডিগ্রিধারী ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-আমলা হলেও সমাজচিত্র কী বলছে? ভালো মানুষের আকাল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না? এভাবে চললে সব প্রতিষ্ঠান, সব ব্যবস্থা ঘুণে ধরবে। চক-মিলানো রাস্তা, ভবন বাড়বে, চকচকে-ঝকঝকে মানুষ হয়তো বাড়বে, তবে দখলদারি, জঙ্গিবাদ, দুর্নীতি, নেশা, প্রশ্নপত্র ফাঁস ইত্যাদি থামবে না।
প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকানো যাবে না?—বালাই ষাট, এমন কথা মানতে নেই! বাঙালি এতটা অক্ষম জাতিতে পরিণত হয়নি। কেননা, এ ফাঁস কার গলায় শক্তভাবে লাগছে? অবশ্যই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গলায় এবং পরিণামে দেশের। আমাদের ধারণা, শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ধারণা সঠিক হলে এবং সে অনুযায়ী মানুষ, অবশ্যই কর্মদক্ষ মানুষ, তৈরিতে যথার্থ পদ্ধতির আশ্রয় নিলে দুর্নীতির ফাঁসে শিক্ষাকে ফাঁসি দিতে হয় না। শিক্ষার প্রতিটি স্তরের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। বিষয়টি বুঝে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত আমাদের সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিষয়টা সরকার বা শিক্ষামন্ত্রী যে বোঝেন না, তা নয়। বোঝেন বলেই ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালেই শিক্ষা কমিশন গঠন করেন, তিন মাসের মধ্যে কমিটি খসড়া রিপোর্ট দেয় এবং আনন্দের বিষয় ছিল অতীতের ধারা ভেঙে এ প্রতিবেদনটি সর্বমহল গ্রহণ করেছে। এটি নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণের কথা থাকলেও মোটের ওপর এটি ধরে এগিয়ে গেলে শিক্ষার ব্যাধি—মুখস্থ, নোট বই, পরীক্ষা ও ফল-কেন্দ্রিকতা কাটিয়ে ওঠা যেত।
প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় পরীক্ষা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু থাকবে আরও অনেক কিছুর সঙ্গে অনুশীলনের অংশ হিসেবে। ঘন ঘন পরীক্ষার ফলে জ্ঞানানুশীলনের ধারাবাহিকতায় বাধা বা ছেদ পড়তে থাকলে শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট সবাই অভ্যস্ত হয়ে যায় প্রশ্নের উত্তর-আকারে জ্ঞানের বিষয়টিকে দেখতে। জ্ঞানের বা বিষয়ের অখণ্ডতা ও ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তাদের ধারণা তৈরি হয় না। এ রকম ব্যবস্থায় অভ্যস্ত মানুষের পক্ষে, বড় হয়েও, কোনো পূর্ণাঙ্গ বই পড়া, জটিল ব্যাখ্যা বা দুরূহ বিষয় ধৈর্য ধরে পড়া, শোনা বা বোঝার অভ্যাস তৈরি হয় না। এতে মানুষটার সর্বনাশ হয়ে যায়। কারণ, এতে শিক্ষার যে চূড়ান্ত লক্ষ্য একজন মানুষকে মানুষ হিসেবে স্বাবলম্বী হতে সহায়তা করা এবং তাই প্রকৃত স্বাধীন এবং তাই আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাশীল ব্যক্তির যোগ্যতা দেওয়া, তা সম্পূর্ণ বিফলে যাবে। কেবল একজন আত্মবিশ্বাসী মানুষের বিবেচনা ও দায়িত্ব বোধ তৈরি হয় এবং তাই নিজের নিজের মর্যাদার পরোয়া করেন। অর্থাৎ মানুষ হিসেবে তাঁর চরিত্র গঠিত হয়। তেমনি মানুষ প্রশ্ন ফাঁস করাকে হীন কাজ বলে বুঝতে পারেন এবং বড় কথা হলো, এর সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে তাঁর রুচি ও নৈতিকতায় বাধবে। ভালো মানুষ ও মানবিক সমাজ নির্মাণে উপযুক্ত শিক্ষাকে অগ্রাধিকার না দিলে পুলিশ-র্যাব-ডিবি, সিসি ক্যামেরা-টহলদারি-নজরদারি, জঙ্গিবাদ-নেশাগ্রস্ততা-অপরাধ, রাজনীতির দেউলিয়াপনা-সংস্কৃতির সংকট-সমাজের অবক্ষয়, কর্তৃত্ববাদী শাসন ইত্যাদি কেবল বাড়তে থাকবে। তখন হয় মনে হবে প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো গুরুতর বিষয় নয় অথবা তা জেনেও এ উৎপাত মেনে নিতে হবে।
এটা আদতে গুরুতর বিষয়। কেননা, এতে সমাজে শিক্ষার সংকট লেগেই থাকবে, তেমনি থাকবে জাতির চরিত্র গঠনের সমস্যা। প্রশ্ন হলো যে কথাটা আমরা জানি এবং মানি, যে কারণে ক্ষমতায় এসে সরকার শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিল, তিন মাসে প্রতিবেদন প্রণয়ন এবং সে বছর থেকেই তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিল, তাকে কেন উপেক্ষা করা হচ্ছে? আমরা জানি না অর্থের অভাবে না অন্য কোনো কারণে সরকার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে হাত দিচ্ছে না। তবে এটা স্পষ্টভাবে বলা যায়, বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৩ শতাংশের নিচে বরাদ্দ রেখে সংখ্যাগত উন্নতি সম্ভব হলেও গুণগত মান অর্জন সম্ভব নয়। তার জন্য অন্তত আন্তর্জাতিক মান ৬ শতাংশ বিনিয়োগ প্রয়োজন। বর্তমান পরীক্ষার ফলের পেছনে ছুটে সংখ্যাগত সাফল্য আসবে, কিন্তু গুণগত মান অর্জন ঠেকে থাকবে। এ বাস্তবতায় যে একদিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীদের ঠেকানো যাবে না এবং অন্যদিকে সমস্যার
জবাব দিয়ে গুণগত মান অর্জনের অভীষ্ট পথে চলা সম্ভব নয়, তা বুঝে শিক্ষামন্ত্রীকে বারবার হয় অসহায়ত্ব নয়তো হতাশা প্রকাশ করতে হবে। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Sunday, August 2, 2015
দুই প্রজন্মের আওয়ামী লীগ by আবুল মোমেন
![]() |
| অলংকরণ: মাসুক হেলাল |
আমরা জানি, ঐতিহাসিক কাল থেকেই বাংলার নিম্নবর্গের মানুষ বারবার বিদ্রোহ করেছে, রাজা ও রাজন্যদের বিরুদ্ধে রীতিমতো যুদ্ধ করেছে। পাকিস্তান সৃষ্টির দুই বছরের মাথায় গঠিত দল আওয়ামী লীগকে বলা যায় সর্বসাধারণের রাজনৈতিক মঞ্চ। মাওলানা ভাসানী এ দলের সভাপতি হিসেবে যথার্থই ছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগের ত্যাগী অভিজাত ব্যক্তিদের নিয়ে দল প্রায়ই সমস্যায় পড়েছে। দলে সাধারণদের মুখপাত্র ছিলেন তরুণ সংগঠক মুজিব। পাল যুগে কৈবর্ত বিদ্রোহে যেমন বিদ্রোহী জেলেদের নেতা ছিলেন দিব্যক, ব্রিটিশ যুগে বিদ্রোহী চাষিদের নেতা ছিলেন নূর আল দীন বা তিতুমীর, তেমনি এই সময়ে মুজিব যেন বাংলার বঞ্চিত-নিপীড়িত-সাধারণের নেতা হয়ে ওঠার দীর্ঘ পথে যাত্রা শুরু করলেন। সাধারণের এই নেতা একপর্যায়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়েছেন দলের অভিজাত নেতাদের নিয়ে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেÿ ক্ষুব্ধ নেতা লিখেছেন, ‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনো দিন এক সাথে হয়ে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ (পৃ.২৭৩)
২...
দুটি কারণে আওয়ামী লীগ এ দেশের উদীয়মান শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়। ভাষা-সংস্কৃতির প্রশ্নে এই শ্রেণি পাকিস্তানের শাসকদের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হয়ে উপযুক্ত রাজনৈতিক শক্তির সমর্থন প্রত্যাশা করছিল এবং সব শ্রেণির অন্তর্ভুক্তিমূলক বঞ্চনামুক্ত সমাজের স্বপ্ন তাদের অধিকাংশকে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের আদর্শে উজ্জীবিত করেছিল। এই সচেতন দেশপ্রেমিক মধ্যবিত্ত শ্রেণি একটি জাতীয়তাবাদী জাগরণের জন্য উন্মুখ ছিল। তত দিনে পরিণত দূরদর্শী শেখ মুজিব এ দেশে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মূল প্রবক্তা এবং প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছেন। জননায়ক শেখ মুজিবকে ঘিরে গণজোয়ার এমন প্রবল হয়ে উঠেছিল যে একসময় বামপন্থী দলগুলোর জন্য হয় তাঁর সহযাত্রী হওয়া, নয়তো বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য উপায় থাকল না।
সেদিনের পরিস্থিতিই গণতান্ত্রিক দলে ও গণতন্ত্রপ্রত্যাশী সমাজে একক নেতৃত্ব সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তারই অনুষঙ্গ হয়ে আরও একটি ঘটনা ঘটেছে। চুয়ান্নর নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকে এখানে মুসলিম লীগের সংগঠন ভেঙে পড়েছিল, তাকে কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষমতার প্রসাদ দিয়ে টিকিয়ে রাখছিল মাত্র। ফলে বিরোধী দল হলেও তখন থেকেই আওয়ামী লীগ এ দেশের রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চের সবটা জুড়েই তৎপর ছিল। এটা রাষ্ট্রীয় না হলেও দলের সামাজিক ক্ষমতা ও প্রভাব ব্যাপকভাবে বাড়িয়েছে। আর পূর্ববঙ্গে ষাটের দশকজুড়ে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সংকুচিত ও সমাজের ক্ষমতা প্রসারিত হয়েছে। ফলে আওয়ামী লীগ তখন থেকেই এ দেশের বড় দল, ক্ষমতাধর দল। দীর্ঘদিন এই অবস্থানে অভ্যস্ত দলের নেতা-কর্মীরা স্বভাবতই ক্ষমতাধরের মনস্তত্ত্বে আক্রান্ত হয়েছে। যার যার পরিসরে কর্তৃত্ব, মুরব্বিয়ানা এবং সেই সূত্রে নিজস্ব কায়েমি স্বার্থের ক্ষমতাবলয় তৈরির প্রবণতা দেখা দেওয়া বিচিত্র নয়। এ প্রবণতাকে ঠেকানোর অস্ত্র যে রাজনৈতিক আদর্শ, রাজনৈতিক শিক্ষা এবং গণতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামো, তাকে অকার্যকর করে রাখার বিষয়ে এ ধরনের নেতাদের মধ্যে যোগসাজশ ঘটবেই। এর বিষময় ফল আওয়ামী লীগ স্বাধীনতার পর থেকেই ভোগ করছে। হয়তো এখন তা আরও বেড়ে গেছে। আমরা সরাসরি দলের বর্তমান নেতৃত্বকে উদ্দেশ করে হয়তো বলতে পারি, দেশকে এই অগণতান্ত্রিকতার বৃত্ত থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব আপনাদেরই নিতে হবে।
৩...
গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকারের জন্য যারা প্রাণপাত করছি, তারা কেন এই ক্ষমতাধর দলের বিকল্পের—যদি শূন্যতা না–ও বলি—সংকট নিয়ে কথা বলছি না? ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি থেকে, অর্থাৎ পাকিস্তান সৃষ্টির পাঁচ মাসের মাথায় রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে যে নতুন জাতির ভ্রূণ তৈরি হয়ে ধীরে ধীরে আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার কাঙ্ক্ষিত পরিণতি কি বিএনপি নিশ্চিত করতে পারে? বিএনপি আন্দোলনের প্রশ্নে জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে গেছে। কিন্তু কেবল যুদ্ধাপরাধ নয়, এ দল তো আদতে গণতন্ত্রেই বিশ্বাস করে না, ধর্ম ও লিঙ্গসমতাও তো মানে না, যা গণতন্ত্রের আবশ্যিক শর্ত? সেই দলকে সঙ্গে রেখে কী করে বায়ান্ন থেকে একাত্তরের লাখো শহীদের স্বপ্ন পূরণ হবে? যদি বিএনপির শক্তিশালী সক্রিয় সংগঠন থাকত, তাহলে জামায়াতকে ক্ষমতার অংশীদার করা নিয়ে ততটা আশঙ্কা থাকত না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বিপুল সমর্থক আছে বিএনপির, আর সংগঠন রয়েছে জামায়াতের। ফলে ক্ষমতার ফায়দা তারাই অনেক বেশি উশুল করবে। আর আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের নামে যেসব জঙ্গিগোষ্ঠী আজ মানবতাবিরোধী মারাত্মক সন্ত্রাস চালাচ্ছে, তার শাখা-প্রশাখা এই মুসলিমপ্রধান দেশেও তো ছড়াচ্ছে। জামায়াত-বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে তারা প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী হবে, কারণ জোটের অগ্রাধিকার পাবে আওয়ামী লীগ ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিকে দুর্বল করার পাল্টা প্রতিশোধ।
দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিকশিত করতে আওয়ামী লীগের বিকল্প দল চাই। সেই দল আওয়ামী লীগের চেয়েও এগিয়ে রাজনীতি করতে পারে, যদি তারা একদিকে রাজনীতিতে সমাজের নিম্নবর্গের বিপুল জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করে এবং অন্যদিকে ইরাক-আফগানিস্তান-লিবিয়ার বিপর্যয়কে মাথায় রেখে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী জাতীয়তার আদর্শকে ধারণ করে। বলে রাখা দরকার, বিগত ৬৬ বছরের ইতিহাসে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে যে দলটি অত্যন্ত সজীব এবং বাস্তবতা অনুধাবনে দক্ষ, এমনকি প্রয়োজনে সৃজনশীল হতেও সক্ষম। এভাবে দলটি ষাটের দশকেই বামপন্থীদের প্রায় অকেজো করে ফেলেছিল, এখন ইসলামপন্থী রাজনীতির ঘরে হানা দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে বঙ্গবন্ধুর এই দল শেখ হাসিনার নেতৃত্বেও বাঙালি জাতীয়তাবাদের মর্যাদার বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন। আওয়ামী লীগ তার চেয়ে অগ্রসর রাজনৈতিক দলের জায়গা প্রায় পুরোপুরি দখল করে এখন তার চেয়ে পশ্চাৎপদ দলের জায়গায়ও দখল বাড়াচ্ছে। তা তাকে করতেই হচ্ছে, কারণ সেদিকে সমর্থক-ভোটারের সংখ্যা বেশি বৈ কম নয়। পাশাপাশি মুক্তবাজার অর্থনীতি আর জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদ দমনে কঠোরতার মাধ্যমে ভারত ও পশ্চিমা বিশ্বের সমর্থনও ধরে রেখেছে। এটাই সুশাসন ও গণতান্ত্রিক মানদণ্ডে অকৃতকার্য হয়েও আওয়ামী লীগের ক্ষমতা নিশ্চিত থাকার কারণ।
ফল হলো এই, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রশ্রয়ে-আনুকূল্যে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ক্ষমতা ভোগ করে যাওয়ার লাইসেন্স পেয়ে গেছে। ফলে আপাতত পাল্টা প্রশ্ন হলো, একা হাসিনা কি দলে ভিড়ে থাকা উচ্চাভিলাষী, ভাগ্যান্বেষী তরুণ বা পাতিনেতাদের সামলাতে পারবেন? মনে হয় না এটা সম্ভব। এদের হাতে দিনে দিনে মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে এবং তাতে তিনি তো ভুগবেনই, ডুববে দেশ। এতে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নেত্রী ক্ষমতা, অধিকতর ক্ষমতার নিশ্ছিদ্র সুরক্ষায় বন্দী হয়ে যাবেন, তার প্রতিক্রিয়ায় অন্যদের স্বাধীনতাও হ্রাস পাবে, গণতন্ত্র আরও সংকুচিত হবে। তা ছাড়া তলে তলে রাজনৈতিক সংকট গভীরতর হতে থাকবে।
তাহলে বাংলাদেশ কি আপাতত আওয়ামী লীগপন্থী ও আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতিতে বিভক্ত হয়েই থাকবে? মনে হয় নাগরিক সমাজ এ ক্ষেত্রে কিছু করতে পারে। এক. আওয়ামী লীগের ওপর আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি ও দল পরিচালনার প্রক্রিয়া প্রবর্তনের জন্য চাপ তৈরি করতে পারে। দুই. রাজনীতিকে আর্থিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অস্ত্র ও কালোটাকা থেকে মুক্ত রাখার জন্যও চাপ তৈরি করা যায়। তিন. ইসলামের মানবিক সহনশীল রূপটি তুলে ধরে মুসলিম সমাজেও যে বহুমতের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে যুগপৎ ইসলাম ও সুশাসন ভালোভাবেই বিকশিত হতে পারে, তার পক্ষে জনমত তৈরি করতে পারে। চার. পুরোনো সমাজব্যবস্থা ও ধ্যানধারণার অচলায়তন ভেঙে সমাজের নবায়ন ঘটিয়ে সত্যিকারের মানবিক বিকাশমান সমাজ কায়েমে কাজ করতে পারে। ইতিহাসের আলোকে গণতান্ত্রিক সমাজের বিকাশের ধারা এবং ধর্মান্ধ রক্ষণশীল সমাজের সংকটের প্রেক্ষাপটে এই বিষয়গুলো বিচার-বিবেচনা করে দেখা উচিত।
কোনো সমাজ যথার্থভাবে গণতন্ত্রের উপযোগী হয়ে উঠলেই কেবল কর্তৃত্ববাদী শাসনের হাত থেকে মুক্তি পেতে পারে। এমনকি সে কাজ শেখ হাসিনাও করতে পারেন, যদি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বেড়াজাল তিনি ভাঙতে চান।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
Saturday, July 4, 2015
ভ্রান্ত ভাবনা, ভুল পথ, সর্বনাশা পরিণতি by আবুল মোমেন
একসময় বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা ভাষায় অমুসলিম লেখকদের প্রাধান্যের কারণে ইসলামি চেতনার অগ্রাধিকারের দোহাই দিয়ে এসব সম্পর্কে বিরূপ প্রচারণা চলেছে। ভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তী দুই দশকের বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এ দেশের সাধারণ মানুষ গ্রহণ করায় ইসলামি রক্ষণশীলদের ভাষাসংক্রান্ত সাংস্কৃতিক কট্টরপন্থা কালে কালে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
কিন্তু এ নিয়ে কখনো তাত্ত্বিক আলোচনা হয়নি। ভাষাসংস্কৃতির অগ্রগামিতা সহজ ও নিশ্চিত হয়েছে মূলত পাকিস্তানি শাসকদের বাঙালির প্রতি (যার সিংহভাগ ধর্মে মুসলমান) সুস্পষ্ট বৈষম্য ও লাগাতার নিপীড়ন-বঞ্চনার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও ক্রমবর্ধমান সংগ্রামের কারণে। এই সংগ্রামে বিজয়ের মাধ্যমে রাজনৈতিক অধিকার অর্জনের অনুষঙ্গ হিসেবেই বাঙালি সংস্কৃতির বিজয়ও ছিল স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু এতে কট্টরপন্থীদের মনের খুঁতখুঁতানি কাটেনি। বাঙালি হতে বা বাঙালি মুসলমান পরিচয়ে তাদের কুণ্ঠা থেকে যায়।
বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে আমমানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরির একটি সহজ কারণ হলো এর সঙ্গে সংস্কৃত (ও প্রাকৃত) ভাষার যোগ, যে ভাষায় হিন্দুধর্মীয় শাস্ত্রগুলো রচিত; এ ভাষার প্রথম ও প্রধান শিল্পীরা প্রায় সবাই ধর্মত হিন্দু, যা মূলত ঐতিহাসিক কারণে ঘটেছে, ধর্মীয় কারণে নয়। আমরা লক্ষ করব, বাংলার মধ্যযুগ (এবং ভারতবর্ষেরও) ইউরোপের মতো অন্ধকার নয়। এ সময় মুসলিম সুলতানেরাই বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে আনুকূল্য জুগিয়েছেন।
প্রথম যুগের মুসলিম আরব যোদ্ধারা বিজিত দেশে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের ভাষা হিসেবে আরবি প্রচলন করতে চেয়েছেন। দেখা গেছে, ধর্মান্তরকরণ যত সহজ, ভাষান্তরিত করা তত সহজ নয়। ফারসি ভাষা আরব যোদ্ধাদের সব জবরদস্তি উপেক্ষা করে টিকে গেছে। এর কারণ, এ ভাষায় উন্নত জনপ্রিয় সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছিল, যা ব্যাপক মানুষের নৈমিত্তিক চর্চার অংশ হয়ে পড়েছিল। আজও দেখা যাবে, বৃহত্তর পারসিক সাংস্কৃতিক ভূমিতে—সে বাকু থেকে কাবুল, বোখারা থেকে ইস্তাম্বুল, ইস্পাহান থেকে ফ্রুঞ্জে সর্বত্র—অভিজাত-নিম্নবর্ণ পণ্ডিত-মূর্খ সবাই শ্রেষ্ঠ কবিদের দু-চার পঙ্ক্তি আওড়াতে পারেন। সেই সব সাহিত্য সব সময় তৌহিদি পন্থার শর্ত শতভাগ হয়তো পূরণ করে না।
বাংলা ভাষায় প্রচুর ভাবের গান, আধ্যাত্মিক গান রয়েছে, যা মাঠপর্যায়ের খেটে খাওয়া মানুষকে যুগ যুগ ধরে ভাবুকতার খোরাক দিয়ে এসেছে। আবার পরবর্তীকালে দেশবন্দনার কাব্য ও গানও রচিত হয়েছে দেদার। ফলে বহুকালে বাঙালির এমন এক ভাবুক আধ্যাত্মিক শাশ্বত মন তৈরি হয়েছে, যা তাকে সহজাতভাবে ভাব আর সুরের রসিক করে তুলেছে। কাব্য ও গানের সূত্রে বাঙালির ভাবের ঘরে একান্ত দেশজ আদল বেশ শক্ত স্থায়ী আসন করে নিয়েছে। এখানেও নিতান্ত ঐতিহাসিক কারণেই এই ভাব-সুরসম্ভারে হিন্দুদের অবদানই প্রথম এসেছে, হয়তো আজও বেশিই আছে। কিন্তু কালের নিয়মে কি সাহিত্য কি সংগীত, সবতাতেই ইসলামের প্রভাব পড়েছে, আরবি-ফারসি ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটেছে, আর মুসলমান কবি ও সুরশিল্পীর আবির্ভাবও ঘটেছে স্বাভাবিকভাবে। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য বা বাঙালি সংস্কৃতিকে আর কোনোভাবেই নিরঙ্কুশভাবে হিন্দুর বলে ভাবা যাবে না, এটা হিন্দু-মুসলিমের যৌথ সৃষ্টি।
ভাষা ও সাহিত্যের বিষয়ে কিছুটা হাল ছাড়লেও সংগীতের ব্যাপারে কিছু কট্টরপন্থী বলতে চান, ইসলামে সংগীত বেদাত। সংগীতের মূল ভিত্তি হলো সুর। আর যখন সুললিত কণ্ঠে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত বা আজানের ধ্বনি ভেসে আসে, তখন ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে কান খাড়া করে তা শুনতে হয়। কারণ, সুরের আবেদন সর্বজনীন। পবিত্র কোরআন বা আজানের বক্তব্য কেবল মুসলমানের কাছেই গ্রাহ্য হলেও সুর এমন এক বিমূর্ত ভাষা, যা সব মানুষের, এমনকি প্রাণীদেরও প্রভাবিত করতে সক্ষম।
মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, সব সৃষ্টির মালিক আল্লাহ। তাহলে মানবজীবনে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী, মানবমনকে শান্ত, সুস্থ, সমাহিত করার গুণসম্পন্ন এমন সৃষ্টিকে কেন তাঁরা উপেক্ষা করবেন? হ্যাঁ, বান্দার জন্য পরীক্ষা হলো, এই মহৎ সৃষ্টিকে তার সুমহান রূপেই সে ব্যবহার করবে, নাকি এর অপব্যবহার, অপচয় করবে। এটা ব্যক্তির এবং সেই সঙ্গে সমাজের রুচি, দক্ষতা ও ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে কে কীভাবে সম্পদকে ব্যবহার করবে। এ ধরনের হীনতাকে অপসংস্কৃতি আখ্যা দিয়ে সুস্থ সংস্কৃতি বিকাশে কাজ করাই হলো সঠিক পথ।
তাই মুসলমানদের বিপরীতমুখী অবস্থানে দাঁড় করানোর প্রয়াসগুলো বস্তুত যুক্তিযুক্ত নয়। আরেকটা কথাও মনে রাখা ভালো, আরব ভূমি মূলত শুষ্ক মরু অঞ্চল, প্রচণ্ড উত্তাপ ও ভয়াবহ লু হাওয়া আর ধূলিঝড় বয়ে যায়। তাপ, লু, ধূলি আর বাতাসের শুষ্কতা থেকে আত্মরক্ষার জন্য সে দেশে নারী-পুরুষ সবাইকে জোব্বাজাতীয় পোশাক পরতে দেখা যায়। সেখানকার মুসলমান যেমন, তেমনি খ্রিষ্টান, ইহুদি সবাই এই পোশাকই পরে। (বর্তমান উন্নতির যুগে ব্যাপক ধনাগমেনর ফলে সর্বত্র ব্যাপকভাবে এসি এসেছে এবং পোশাকেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।) আমাদের এই উষ্ণমণ্ডলীয় দেশের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি এবং বৃষ্টির প্রাচুর্যও বেশ। আর সর্বত্র নদীনালা ছড়ানো। এ ধরনের ভ্াপসা গরমে গায়ে বাতাস পেলে আরাম হয়। তাই আমাদের দেশে নিজস্ব যে পোশাকগুলো উদ্ভাবিত প্রচলিত হয়েছে, যেমন: লুঙ্গি, ধুতি, শাড়ি, চাদর, গামছা—সবগুলোই খোলামেলা, যাতে গায়ে বাতাস খেলতে পারে। কোনোটাই আঁটসাঁট নয়, নদীনালা জলা-কাদা ভেঙে পথ চলতে ওঠানো-নামানোর জন্য বেশ উপযোগী।
সংসারে মানুষকে একদিকে যেমন ঔচিত্যবোধ থেকে কাজ করতে হয়, তেমনি অন্যদিকে উপযোগিতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হয়। কী উচিত, তার সঙ্গে কী উপযোগী, তাকেও মেলাতে হয়।
স্বর্গচ্যুত মানুষের বসত মর্ত্যে, যেখানে বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ু, প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভাষাসংস্কৃতির বৈচিত্র্যও ব্যাপক। জলবায়ু ও প্রকৃতির ওপর বস্তুত মানুষের হাত নেই। দেখা যাচ্ছে, এদের ওপর বেশি খোদকারি করলে আখেরে বিপর্যয় হয়, যা ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে সামলানো কঠিন। পৃথিবীকে জলবায়ু ও প্রকৃতির দিক থেকে একাকার করা যাবে না—এটা বান্দার কর্ম নয়। এটাও বোঝা গেছে, মানবজাতির ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও ঘুচবে না। মানুষের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো এই বিবিধ বৈচিত্র্য নিয়ে পরস্পর শান্তিতে সহাবস্থান করা।
যুদ্ধবিগ্রহ চালিয়ে অপরকে পদানত করে চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের দিন বহুকাল আগে শেষ হয়ে গেছে। এখন কোনো যুদ্ধই নিষ্পত্তি হয় না, চলমান থাকে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ সমাপ্ত হলে বিজ্ঞানী আইনস্টাইন বলেছিলেন, যুদ্ধকে জয় করা গেছে, শান্তিকে নয়।
সংঘাত ও যুদ্ধের কারণগুলো জিইয়ে রাখলে কখনো শান্তি আসবে না, সমৃদ্ধিও নয়। সেটাই ধর্মসম্মত কাজ, যা বিদ্বেষ ও আক্রোশের চর্চাকে নিরুৎসাহিত করবে, বরং বোঝাপড়া ও স্থিতিশীলতার অনুকূল পরিবেশ তৈরি হবে।
অষ্টাদশ শতাব্দীতে বাংলায় ইংরেজ শাসন শুরু হওয়ার পর ঊনবিংশ শতকে এখানে একটি কালান্তরের সূচনা হয়েছিল। মুসলমান নেতৃত্ব সেদিন তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব ধরতে পারেনি, তাদের ব্যর্থতার চড়া খেসারত গুনতে হয়েছে এ দেশের সাধারণ মুসলমানকে। এর জের আজও শেষ হয়নি। আজ পৃথিবী ও মানবসমাজ আরেক কালান্তরের সামনে। এবার ভূমণ্ডল ও মানবসমাজ ব্যাপক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। অর্থনীতি খোলামেলাভাবে আগ্রাসী হয়ে পড়েছে। প্রযুক্তি ব্যক্তির দৈনন্দিন জীবনের ধরন পাল্টে দিচ্ছে, ভূরাজনীতিতে নতুন শক্তিকেন্দ্র ও ভিন্ন টানাপোড়েন তৈরি হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ এবং ভূমি ও পানির লড়াইকে আড়াল করতে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের বুলি ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পুরোনো চিন্তা ও রাজনীতির খোলস ভাঙতে না পেরে আরব ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোয় একদিকে শাসকেরা সাম্রাজ্যবাদের বশংবদ হয়ে এজেন্টের কাজ করছে, আর নানান কট্টর দল ওদেরই পাতা ফাঁদে পা দিয়ে আত্মঘাতী হানাহানিতে নেমেছে। এই হলো নির্বোধের ক্রোধকে পুঁজি করে তার ওপর প্রভুত্ব দীর্ঘায়িত করার পুঁজিবাদী কৌশল।
দ্রুত পরিস্থিতি অনুধাবন করা দরকার। পরিবর্তনগুলো এবং এদের প্রভাব কত গভীর ও ব্যাপ্ত হতে পারে, তা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। বিরোধ ও বিবাদের চর্চায় লিপ্ত না হয়ে সংহতি ও সম্প্রীতির সুযোগগুলো এখনই কাজে লাগাতে হবে। বাঙালি ও মুসলমানে বিরোধ হওয়ার কারণ নেই। আরবি শুধু সুন্নি মুসলমানের ভাষা নয়, আরবিভাষী শিয়াদের বাস আছে বাহরাইন, ইরাক, সিরিয়া এবং সব আরব দেশে। নানা মত-পথের খ্রিষ্টানও আছে আরবিভাষী, ইহুদিও রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, চীন, শ্রীলঙ্কা, বসনিয়াসহ কত দেশেই অনারব মুসলমান রয়েছে, যাদের মাতৃভাষা ভিন্ন ভিন্ন।
ইসলামের নবীর কাছে আল্লাহর কাছ থেকে প্রথম যে বাণীটি আসে, তা একটিমাত্র শব্দ—ইকরা (পড়ো)। পঠন হলো জ্ঞানের চাবি। জ্ঞানের নির্যাস বলা হয় পবিত্র কোরআনকে। তার গভীরতা ও ব্যাপ্তির সঠিক এবং কালোপযোগী ব্যাখ্যার সামর্থ্য যদি কোনো জনগোষ্ঠী হারিয়ে ফেলে একে কেবল একটি মুখস্থ করে আওড়ানোর গ্রন্থ মনে করে, তবে এ গ্রন্থ থেকে সমকালীন জীবনকে চালিত ও সমৃদ্ধ করার রসদ তারা খুঁজে পাবে না। তাদের জ্ঞানরাজ্য হবে মৃত এবং তারা হয়ে পড়বে তামাদি। তারা পিছিয়ে যেতে থাকবে। এ পরিস্থিতিতে স্বভাবতই পরাজিতের মনের ক্রোধ ও প্রতিহিংসায় নিজেরা জ্বলতে থাকবে এবং শত্রু তৈরি করে ঝাল ঝাড়বে। এভাবে সাম্রাজ্যবাদের তেমন ক্ষতি তারা করতে পারবে না, ভ্রাতৃঘাতী হানাহানিই সার হবে। এটা সত্যি দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি।
আমরা কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য এ রকম পরিণতি কামনা করি না।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2218)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...









