Tuesday, December 17, 2013

সন্ত্রাস দমন হোক আইনের সীমার মধ্যে থেকে- যৌথ বাহিনীর অভিযান

গতকাল সোমবার যৌথ বাহিনীর অভিযানে সাতক্ষীরায় পাঁচজন নিহত হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। জামায়াত অবশ্য দুজনের মৃত্যুর কথা বলেছে। লক্ষ্মীপুরে নিহত হয়েছে একজন। গত রোববারও লক্ষ্মীপুরে র‌্যাবের গুলিতে আরও একজনের নিহত হওয়ার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
অব্যাহত নাশকতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা দমন করে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা যেমন দরকার, তেমনি দরকার খেয়াল রাখা যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে যেন নতুন আতঙ্কের সৃষ্টি না হয়।

ছবিঃ ফেসবুক থেকে প্রাপ্ত।
হরতাল-অবরোধের নামে জনপরিবহনে আগুন দিয়ে হত্যা, রেলে নাশকতার হত্যা, প্রতিপক্ষকে বেছে বেছে হত্যার সঙ্গে যোগ হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে হত্যা; বিশেষ করে লক্ষ্মীপুরে যেভাবে বাড়ির ভেতর ঢুকে পর পর দুজন বিরোধী নেতাকে হত্যা করা হয়েছে, তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজের ধরন নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। যাঁরা আন্দোলনের নামে নির্বিচার হত্যা-ধ্বংসের পথ বেছে নিয়েছেন, তাঁদের অবশ্যই দমন করতে হবে। এসব দাবি আদায়ের পথ হলে খুনি-সন্ত্রাসীদেরই আন্দোলনের শিরোপা দিতে হয়। এভাবে কেবল রাজনীতি সম্পর্কেই মানুষের ঘৃণা জাগছে না, তা দেশের স্থিতিশীলতা ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকেই আঘাত করছে।

রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা, সেসব অঞ্চলের জনজীবনকে দিনের পর দিন অবরুদ্ধ রেখে প্রতিপক্ষের বাড়িঘরে আগুন ও হত্যা বন্ধে সরকারি বাহিনীর অভিযান তাই খুবই প্রত্যাশিত। কিন্তু অভিযানের নামে অভিযুক্তকে দেখামাত্র গুলি করে হত্যা কোনো আইনানুগ বাহিনীর কাজ হতে পারে না। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে এসব সন্ত্রাসীকে ধরে বিচারের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

আইন দ্বারা ক্ষমতায়িত বাহিনীর আচরণ অবশ্যই আইনের সীমা অনুযায়ীই হতে হবে। বিনা বিচারে কাউকে হত্যার রীতি সভ্য সমাজে নেই। হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনে জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা যে পদ্ধতির আশ্রয় নিয়েছে, সেই একই পদ্ধতি র‌্যাব-পুলিশ-বিজিবি নিতে পারে না। সন্ত্রাসীদের যে বিচার-বিবেচনা করতে হয় না, সেটা করতে হয় রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে।

পরিস্থিতি উদ্বেগজনক সন্দেহ নেই। জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা এবং সেই কাজে যারা বাধা দিয়ে আসছে, তাদের মোকাবিলা করা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব। সেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা এমন কিছু করতে পারে না যাতে জনগণ আরও বেশি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। আইনি সীমার মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কাজ করতে হবে। নির্বিচারে ধরপাকড়, গ্রেপ্তারের নামে বাণিজ্য, বিনা বিচারে হত্যার চর্চা তাদের এই বিশেষাধিকারের অপপ্রয়োগ বলে গণ্য হবে। তাতে জনমনে অনাস্থা বাড়বে, তার সুযোগ নেবে নাশকতাকারীরা।

আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়েছে, র‌্যাব-পুলিশের অভিযানে তারাও পাশে থাকবে। সরকারি বাহিনীর মতো বলপ্রয়োগের এখতিয়ার কি সরকারে আসীন দলের রয়েছে? পুলিশের কাজ তারা করা মানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া। আমরা সহিংসতা-নাশকতা বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ যেমন চাই, তেমনি কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নেবে, সেটা প্রত্যাশিত নয়।

নির্বাচন ২০১৪- ভোট গ্রহণের আগেই ফল নির্ধারিত? by আলী রীয়াজ

বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এ যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তার ফল আমরা এখনই জানি। ইতিমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের ফল কার্যত প্রকাশিত হয়েছে এবং বাদবাকি আসনগুলোর ফলাফলের অনুমানও আমরা সহজেই করতে পারি।

সহজিয়া কড়চা- হাতির দাঁত ও বাংলাদেশ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

হাতি যে দাঁতগুলো দিয়ে খায়, সেগুলো আমরা দেখতে পাই না। যে দাঁত দুটি আমরা দেখি, ও-দুটি তার শোভাবর্ধনকারী দাঁত। শুঁড়ে ঢাকা ভেতরের দাঁতগুলো অতি ধারালো ও তীক্ষ। তা ছাড়া হাতিরও মাহুত থাকে। সেই হস্তীচালক যেভাবে নির্দেশ দেয়, হাতি সেভাবেই চলে। কারণ, তারও পুরোপুরি স্বাধীনতা নেই যা খুশি করার।

আমাদের জাতীয় পতাকা by রবিশঙ্কর মৈত্রী

আদি বা প্রথম পতাকাটি আজকের পতাকার মতো ছিল না। আদি পতাকাটি এঁকেছিলেন স্বভাবশিল্পী ছাত্রনেতা শিবনারায়ণ দাশ। এই পতাকা তৈরির জন্য কাপড় দিয়েছিলেন ঢাকা নিউমার্কেটের অ্যাপোলো টেইলার্সের মালিক বজলুর রহমান লস্কর।
সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান কলাভবনের সামনের পশ্চিম গেটেই বাংলাদেশের পতাকা প্রথম উত্তোলিত হয়। বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন ছাত্রনেতা আ স ম আবদুর রব। আমাদের সেই আদি পতাকার মাঝখানে হলুদ বৃত্তের মধ্যে ছিল বাংলাদেশের মানচিত্র।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চে তাঁর বাসভবনে, স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন।
বিজয়ের পর ১৯৭২ সালে শিবনারায়ণ দাশের ডিজাইন করা পতাকার মাঝে মানচিত্রটি বাদ দিয়ে পতাকার মাপ, রং ও তার ব্যাখ্যা-সংবলিত একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয় পটুয়া কামরুল হাসানকে। কামরুল হাসান আমাদের জাতীয় পতাকার যে রূপ দিয়েছিলেন, সেটিই বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সবুজ আয়তক্ষেত্রের মধ্যে লাল বৃত্ত। সবুজ রং বাংলাদেশের সবুজ প্রকৃতি ও তারুণ্যের প্রতীক, বৃত্তের লাল রং উদীয়মান সূর্য, স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারীদের রক্তের প্রতীক। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকার এই রূপটি ১৯৭২ সালের ১৭ জানুয়ারি সরকারিভাবে গৃহীত হয়।
বাংলাদেশের পতাকা আয়তাকার। এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ১০:৬ এবং মাঝের লাল বর্ণের বৃত্তটির ব্যাসার্ধ দৈর্ঘ্যের পাঁচ ভাগের এক ভাগ, পতাকার দৈর্ঘ্যের ২০ ভাগের বাঁ দিকের নয় ভাগের শেষ বিন্দুর ওপর অঙ্কিত লম্ব এবং প্রস্থের দিকে মাঝখান বরাবর অঙ্কিত সরল রেখার ছেদ বিন্দু হলো বৃত্তের কেন্দ্র।
পতাকার দৈর্ঘ্য ১০ ফুট হলে প্রস্থ হবে ৬ ফুট, লাল বৃত্তের ব্যাসার্ধ হবে ২ ফুট, পতাকার দৈর্ঘ্যের সাড়ে ৪ ফুট ওপরে প্রস্থের মাঝ বরাবর অঙ্কিত আনুপাতিক রেখার ছেদ বিন্দু হবে লাল বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু।
পতাকা ব্যবহারের মাপ
ভবনে ব্যবহারের জন্য পতাকার বিভিন্ন মাপ হলো ১০ ফুট বাই ৬ ফুট, ৫ ফুট বাই ৩ ফুট এবং ২৫ ফুট বাই ১৫ ফুট। মোটরগাড়িতে ব্যবহারের জন্য পতাকার বিভিন্ন মাপ হলো ১৫ ইঞ্চি বাই ৯ ইঞ্চি এবং ১০ ইঞ্চি বাই ৬ ইঞ্চি। আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য টেবিল পতাকার মাপ হলো ১০ ইঞ্চি বাই ৬ ইঞ্চি।
পতাকার ব্যবহারবিধি
বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সরকারি ও বেসরকারি ভবন, বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশন ও কনস্যুলেটে পতাকা উত্তোলন করতে হবে। শোক দিবসে পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। পতাকা অর্ধনমিত রাখার ক্ষেত্রে প্রথমে পতাকা শীর্ষস্থান পর্যন্ত ওঠাতে হবে। তারপর অর্ধনমিত অবস্থানে রাখতে হবে। দিনের শেষে পতাকা নামানোর সময পুনরায় শীর্ষস্থান পর্যন্ত উঠিয়ে তারপর নামাতে হবে।
সরকারের অনুমতি ছাড়া জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা যাবে না। জাতীয় পতাকার ওপর কিছু লেখা অথবা মুদ্রণ করা যাবে না। এমনকি কোনো অনুষ্ঠান উপলক্ষে কিছু আঁকা যাবে না।
এখন আমরা পোশাকেও পতাকার আলো দেখি। অর্থাৎ আমাদের জাতীয় পতাকার রঙের ব্যবহার লক্ষ করি শাড়িতে পাঞ্জাবি আর কামিজেও। পতাকার চেতনা যে আমাদের মননে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে সে কথা আলাদা করে আর বলবার দরকার নেই। আমাদের জাতীয় পতাকার মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখা মানে মহান মুক্তিযোদ্ধাদেরই সম্মান করা।

৬৪০ কোটি টাকার বিয়ে

বিশ্বের ধনী পরিবারগুলোর মধ্যে অন্যতম ভারতের স্টিল ব্যবসায়ী লক্ষ্মী মিত্তাল পরিবার। এ পরিবারের বিয়ে মানেই জাঁকজমক আর বর্ণাঢ্য আয়োজনের সমাহার। লক্ষ্মী মিত্তালের ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে উপলক্ষে এ মাসের শুরুতে বার্সেলোনায় আয়োজন করা হয়েছিল জমকালো অনুষ্ঠানের।
তিনদিন ব্যাপী ওই অনুষ্ঠানের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল পাঁচ কোটি পাউন্ড। ২৬ বছর বয়সী সৃষ্টি মিত্তালের বর ব্যাংকার গুলরাজ বেহেল (৩৬) বিয়ের আসরে এসেছিলেন রাজকীয় ঘোড়ায় চড়ে। সৃষ্টি হচ্ছে লক্ষ্মী মিত্তালের ছোট ভাই প্রমোদ মিত্তালের কন্যা। প্রমোদ নিজেও স্টিল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্টিল প্রস্তুতকারক কোম্পানির আর্সেল মিত্তালের সিইও এবং চেয়ারম্যান হচ্ছে লন্ডনভিত্তিক লক্ষ্মী মিত্তাল। এছাড়া, কুইন্স পার্ক রেঞ্জার্স ফুটবল ক্লাবের ৩৪ ভাগ মালিকানাও তার। ২০০৮ সালে তার সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪২.২ মিলিয়ন পাউন্ড। মিত্তাল পরিবার বিয়ের অনুষ্ঠান কাভার করতে একটি হেলিকপ্টার ভাড়া করেছিলেন। অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রিত ৫০০ অতিথিকে খাবার আয়োজন করতে ভারত এবং থাইল্যান্ড থেকে শেফ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অনুষ্ঠানে বয়ে গিয়েছিল শ্যাম্পনের বন্যা। আর কাটা হয়েছিল ৬০ কেজি ওজনের বিয়ের কেক। স্পেন থেকে বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হয়েছে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা ছিলেন বার্সেলোনার শীর্ষ স্থানীয় হোটেলে। তারা প্রত্যেকেই ২০,০০০ পাউন্ডের বেশি মূল্যের কেনাকাটা করেছেন। ৫ থেকে ৭ই ডিসেম্বর পর্যন্ত আয়োজিত অনুষ্ঠানে হিন্দু এবং পশ্চিমা রীতি অনুসরণ করে বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনে অতিথিদেরকে শহরের ম্যাজিক ফাউন্টেইন পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে তাদের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল ওয়াটার জেট, লাইট সেট এবং অগ্নি গোলকের খেলার প্রদর্শনী। অনুষ্ঠানের শেষ দিনে বিয়ের মূল অনুষ্ঠানের জন্য কাটালান আর্ট জাতীয় জাদুঘর সর্বসাধারণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছিল। সমালোচকরা অবশ্য এ ধরনের একটি অনুষ্ঠানের অনুমতি দেয়ার জন্য বার্সেলোনা সিটি কাউন্সিলের কঠোর সমালোচনা করেছেন। এর আগে ২০০৪ সালে লক্ষ্মী মিত্তালের কন্যা ভানিশার বিয়ের সময় প্যারিসে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন কাইলি মিনোগ। ওই অনুষ্ঠানে ৪০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। লক্ষ্মী মিত্তালের ছেলে এবং উত্তরাধিকারী  আদিত্য মিত্তাল ১৯৯৮ সালে কলকাতায় বিয়ে করেছিলেন। সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথি আপ্যায়নের জন্য বলিউড তারকা শাহরুখ খান ৩০০,০০০ পাউন্ড দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে।

মুক্তিযুদ্ধে বেসরকারি প্রয়াস by আনিসুজ্জামান

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বেসরকারি প্রয়াসের ইতিহাস এখনো লেখা হয়নি। কোনো একদিন কাজটা সম্পন্ন হবে বলে আশা করি। তাতে নানাদেশের মানুষের ব্যক্তিগত ও সাংগঠনিক উদেযাগের পরিচয় লিপিবদ্ধ থাকবে।

বাড়ছে মারওয়ান বারগোতির জনপ্রিয়তা

মারওয়ান বারগোতি। ইসরাইলের কারাগারে আটক এই ফিলিস্তিনি নেতার জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে। তার এ জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনের মুক্তি সংগ্রাম নতুন মাত্রা পাবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

Profile: Marwan Barghouti

Marwan Barghouti was not well known among Palestinians until he came to prominence as a leader of the second Intifada.

বিশেষ সাক্ষাৎকার: সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী- সুস্থ অর্থনীতিকে ধ্বংস করছে অসুস্থ রাজনীতি by সোহরাব হাসান

সৈয়দ মঞ্জুর এলাহী। ব্যবসায়ী নেতা ও এপেক্স গ্রুপের চেয়ারম্যান। তাঁর জন্ম ১৯৪২ সালে, কলকাতায়। ১৯৬৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নেওয়ার পর তিনি কর্মজীবন শুরু করেন বহুজাতিক কোম্পানিতে।

‘নির্বাচন নয় সিলেকশন হচ্ছে’- ড. বদিউল আলম মজুমদার

সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার নির্বাচন বিষয়ে বলেন, এটা নির্বাচন নামের প্রহসন হচ্ছে। এটাকে আমরা বলতে পারি সিলেকশন। সিলেকশনকেই ইলেকশন বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।
গণতন্ত্র কায়েম হওয়ার জন্য প্রাথমিক পদক্ষেপ হলো নির্বাচন। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া নির্বাচন হলে গণতন্ত্রের ওই প্রাথমিক পদক্ষেপ হোঁচট খায়। মানবজমিন অনলাইনকে দেয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতার মাসেও দুই দল একটা সমাধান বের করতে পারছে না। মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন, চেতনাগুলো হলো, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সামাজিক সুবিচার, সততা, আইনের শাসন, একতা এগুলো। কিন্তু এগুলো এখন অনুপস্থিত। অনেক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসছে আমাদের দেশের। এখনও সেখানে রক্ত ঝরছে মানুষের। এটা ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে। ভূখণ্ড স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু তার সুফল ঘরে ওঠেনি। কিছু লোক আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। কিন্তু স্বপ্ন বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থার পরিবর্তন জরুরি।

রিলিফ ক্যাম্পে শিশু মৃত্যুর কথা স্বীকার

ভারতের মুজাফ্‌ফরনগরের রিলিফ ক্যাম্পে অবশেষে ১১টি শিশুর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে উত্তর প্রদেশ সরকার। দাঙ্গা পরবর্তী সময়ে অব্যবস্থাপনার কারণে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় এসব শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।
একটি অনানুষ্ঠানিক রিপোর্টে আবার দাবি করা হয়েছে ওই ক্যাম্পে ৩৬টির বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গত আগস্ট-সেপ্টেম্বরের দিকে মুজাফ্‌ফরনগরের দুটি জেলাতে বর্ণবাদী দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পর এসব রিলিফ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছিল। কর্মকর্তারা অবশ্য বলছেন আরো ছয় ব্যক্তির মৃত্যুর খবর খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই নিয়ে ওই দাঙ্গায় নিহতের সংখ্যা  ৫০ জন ছাড়িয়ে গেছে। রিলিফ ক্যাম্পের অব্যবস্থাপনার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জনস্বার্থে একটি সামাজিক সংগঠন সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ দাবি করার পর রাজ্য কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রিলিফ ক্যাম্পে মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিক ভাবে স্বীকার করা হলো। আদালতের দায়ের করা পিটিশনে সামাজিক সংগঠনটি দাবি করেছে প্রয়োজনীয় সুবিধার অভাবে কমপক্ষ আটটি নবজাত শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। রিলিফ ক্যাম্পে জন্ম সন্তান দেয়ার কারণেই এসব মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক ভাবে কর্তৃপক্ষ এবং ক্ষমতাসীন সমাজবাদী পার্টির নেতৃবৃন্দ এসব দাবি অস্বীকার করেছিল। এসব খবর প্রচার করে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্যও তারা মিডিয়াকে দায়ী করেছিল। পরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপের কারণে কর্তৃপক্ষ প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বীকার করে।  

গুজব বলেই উড়িয়ে দিলেন

ভারতের অন্যতম জনপ্রিয় ক্রিকেটার বিরাট কোহলির সঙ্গে একটি বিজ্ঞাপনে অংশ নেয়ার পর তার ভাল বন্ধু হন বলিউড অভিনেত্রী আনুশকা শর্মা। এরপর থেকে তাদের ঘনিষ্ঠতা অনেকের মনেই প্রশ্ন তুলেছিল। কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল এ দু’জনের প্রেমের খবর।

দিপীকার ‘না’

ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে বলিউডে চলতি বছরের সব চেয়ে আলোচিত ও সফল অভিনেত্রী দীপিকা পাড়ুকোন। এ অভিনেত্রী ‘রামলীলা’র পর বর্তমানে কাজ করছেন ‘কোচাধিয়া’ নামক একটি ছবির। এতে তাকে রজনীকান্তর বিপরীতে দেখা যাবে।

অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী সহিংসতা বন্ধের আহ্বান

দেশজুড়ে প্রতিবাদ আন্দোলকারীদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী সহিংসতা বন্ধে বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

এরশাদকে মুক্তি দিতে লিগ্যাল নোটিশ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে অনতিবিলম্বে মুক্তি দিতে সরকারকে লিগ্যাল নোটিশ দেয়া হয়েছে। এতে অনতিবিলম্বে সাবেক এই প্রেসিডেন্টকে মুক্তি দিতে বলা হয়েছে। অন্যথায় আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে এতে বলা হয়েছে।
আইনজীবী এবং জাতীয় পার্টি নেতা বখতিয়ার উদ্দিন খান বুধবার এ নোটিশ পাঠান। তার পক্ষে সিনিয়র এডভোকেট ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চেম্বার থেকে এ নোটিশ পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরশাদকে গত ১২ই ডিসেম্বর থেকে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) আটক রেখেছে।

নিশা কোঠারির নগ্ন ছবি প্রকাশ

দক্ষিণ ভারতে গত দুই বছর কাজ করার ফলে বলিউডে বেশ অনিয়মিত হয়ে পড়েছিলেন  নায়িকা নিশা কোঠারি। যদিও বিষয়টি নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই।
এদিকে নতুন খবর হলো, সম্প্রতি এ নায়িকা একটি নগ্ন ফটোশুটে অংশ নিয়েছেন। এখানে নামমাত্র পোশাক পরে একেবারে খোলামেলাভাবে পোজ দিয়েছেন তিনি। নিজ উদ্যোগেই তিনি এমন ব্যক্তিগত ফটোশুট করেছেন।

ZoooM
তবে এখনই ছবিগুলো প্রকাশের কোন ইচ্ছা ছিল না নিশার। তার অজান্তেই সেই শুটের দুটি ছবি ইন্টারনেটে প্রকাশ পেয়ে গেছে। সাদা দুই টুকরো কাপড় পরা এ ছবিগুলো মুছে ফেলার জন্য গুগলের কাছে আবেদনও করেছেন তিনি।

এদিকে এই ছবি থেকে একটি ছবি আবার ভারতের একটি পত্রিকাতেও ছাপা হয়ে গেছে। এ বিষয়ে নিশা কোঠারি বলেন, ছবিগুলোর এ কাজটি কে  করলো তা আমি বুঝতে পারছি না।

ZoooooM
তবে কাছের কেউই হবে। কারণ, অনেক গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলাম ছবিগুলোর ব্যাপারে। যাই হোক, এমন ছবি আমার অনুমতি ছাড়া মিডিয়ায় ছাপাও বোধহয় ঠিক না। বিষয়টি মেনে নিতে পারছি না।

হাতির অবকাশযাপনের ব্যয় দেড় কোটি রুপি!

মন্দির-মঠ-আশ্রমের নির্দিষ্ট গণ্ডিতে পোষ্য হিসেবেই দিন কাটে ওদের। বাকিরা বনে থাকলেও পুরোপুরি মুক্ত; বুনো নয়, নানা কাজে বন বিভাগের নিয়ন্ত্রণেই চলে ওদের জীবন। ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের এমন ৯৮ টি হাতিকে নেওয়া হচ্ছে এবারের বার্ষিক অবকাশে।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী জে. জয়ললিতা স্বয়ং এ বার্ষিক হস্তী-অবকাশ আয়োজনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ অবকাশে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি যৌবনদীপ্ত করে তুলতে হাতিদের দেওয়া হবে বিশেষ খাবার। এক খবরে জানিয়েছে ইন্দো-এশিয়ান নিউজ সার্ভিস।
কোয়েম্বাটুরের জঙ্গলের কাছে বন ভদ্রকালী আম্মান মন্দিরের কাছে ডিসেম্বরের ১৯ তারিখে শুরু হয়ে আগামী বছরের ৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে এ আয়োজন।
এ অবকাশে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার পাশাপাশি যৌবনদীপ্ত করে তুলতে হাতিদের দেওয়া হবে বিশেষ খাবার। পাশাপাশি চলবে মাহুতদের বিশেষ প্রশিক্ষণও।
বিভিন্ন মন্দির-মঠের ৪৩ টি এবং বন বিভাগের ৫৫টি হাতি এবার এ আয়োজনে অংশ নিচ্ছে।
রাজ্যের পোষ্য হস্তীকুলের স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে এবং তাদের তরতাজা যৌবনদীপ্ত রাখার এ প্রয়াসে এবার আনুমানিক ১ কোটি ৫৩ লাখ রুপি খরচ হবে। রাজ্য সরকার এ ব্যয় কহন করবে। 

মুহিতকে জানিয়েছেন মজীনা- নির্বাচন নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যার অপেক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র

আগামী নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের ব্যাখ্যার অপেক্ষা করছে যুক্তরাষ্ট্র। বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজীনা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে এ কথা জানিয়েছেন।

আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের পরে অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব কথা জানান।

বৈঠক সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি মজীনাকে আশ্বস্ত করে বলেছেন, বাংলাদেশে যা কিছু ঘটছে সবকিছুই সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থমন্ত্রী মজীনাকে বলেছেন, জামায়াত-শিবির বাংলাদেশে যে কর্মকাণ্ড করছে সে জন্য দলটিকে ‘টেরোরিস্ট পার্টি’ হিসেবে ‘ডিক্লেয়ার’ করা উচিত। এ ব্যাপারে মজীনা কী বলেছেন, জানতে চাইলে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন,  তিনি এতে ‘ডিসএগ্রিড’ হননি।

নির্বাচন নিয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত কী বলেছেন, জানতে চাইলে মুহিত জানান, মজীনা তাঁকে বলেছেন, ‘অর্ধেক আসনে নির্বাচন নেই। ইলেকশন মানেই তো মানুষের ভোট দেওয়া।’

বৈঠকে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস সম্পর্কেও আলোচনা হয়েছে বলে জানান অর্থমন্ত্রী। বৈঠকে অর্থমন্ত্রী মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে জানিয়েছেন,  ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ বন্ধ করে রেখেছেন। তিনি গ্রামীণ ব্যাংকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালাচ্ছেন। অথচ তিনি একজন সম্মানীয় মানুষ।

আগামী ৫ জানুয়ারির পরে আওয়ামী লীগই সরকার গঠন করছে কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘তা তো বটেই।’ এ সময় সাংবাদিকেরা মুহিতের কাছে জানতে চান, তিনিই অর্থমন্ত্রী থাকবেন কি না? উত্তরে মুহিত বলেন, ‘আমি জানি না, এটা প্রধানমন্ত্রী ঠিক করেন।’ ৫ জানুয়ারির পরের সরকারের সঙ্গে কাজ করতে যুক্তরাষ্ট্র অস্বস্তি বোধ করবে কি না, জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, তিনি তা বলতে পারবেন না।

হাতির দাঁত ও বাংলাদেশ by সৈয়দ আবুল মকসুদ

খালেদা জিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের বিশেষ
দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো
হাতি যে দাঁতগুলো দিয়ে খায়, সেগুলো আমরা দেখতে পাই না। যে দাঁত দুটি আমরা দেখি, ও-দুটি তার শোভাবর্ধনকারী দাঁত। শুঁড়ে ঢাকা ভেতরের দাঁতগুলো অতি ধারালো ও তীক্ষ। তা ছাড়া হাতিরও মাহুত থাকে। সেই হস্তীচালক যেভাবে নির্দেশ দেয়, হাতি সেভাবেই চলে। কারণ, তারও পুরোপুরি স্বাধীনতা নেই যা খুশি করার। প্রকাশ্যে কথা বলার সময় আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের মুখে যে হাসিটি দেখা যায়, সেটি তাঁর শোভা মাত্র। আন্তর্জাতিক কূটনীতিকদের অনেক কিছুই হয় অপ্রকাশ্যে। বাইরে থেকে আমরা যেটুকু দেখি তা তার অংশ মাত্র। জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূতের যে নির্বিশেষ তৎপরতা আমরা বাইরে থেকে দেখেছি মিডিয়ার মাধ্যমে, তা তাঁর কর্মসূচির অংশ মাত্র। বেশির ভাগই শুধু তিনি নিজে জানেন। তাঁর ধর্মপত্নীও নন, গার্লফ্রেন্ডও নন আর জানেন তাঁর অন্তর্যামী। পুরোটা জানেন তাঁর মাহুতরা। জাতিসংঘের মহাসচিবের পেছনে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্তারা। অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর মিশনের মূল সুর সম্পর্কে মোটামুটি জানেন বাংলাদেশের দুই বিবদমান পক্ষের দুই শীর্ষ নেতা। পল্লিবন্ধু কতটা জানেন, তা আমরা বলতে পারব না। দুই পক্ষের যে নেতাদের তিনি পিঠে হাত বুলিয়ে (তাঁদের নেত্রীদের অনুমতি নিয়ে) বৈঠকে বসিয়েছিলেন, তাঁরাও তাঁর মিশনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে কতটা জানেন, তাতে আমার ঘোর সন্দেহ রয়েছে। তাঁরা নাটকের পার্শ্বচরিত্র মাত্র।
প্রধান চরিত্র হয়ে বড় ভূমিকা পালনের সুযোগ তাঁদের দেওয়া হয় না। বরং পরলোকগত আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আব্দুল জলিলের যে নিয়তি, তাঁদের উত্তরসূরিদের নিয়তি তার চেয়ে এক পোয়া পরিমাণ কম। আমরা বরং খুশি হয়েছি এ কারণে যে বাংলাদেশের ঝগড়াটেরা তারানকোর অন্তিম ইচ্ছা পূরণ করার সুযোগটা করে দিয়েছেন। তাঁতের মাকুর মতো কয়েক দিন ছোটাছুটি করে তিনি যদি হোটেল থেকে সোজা প্লেনে গিয়ে উঠতেন, তা হতো তাঁর জীবনের বড় ব্যর্থতা শুধু নয়, অপমানও। তিনি যে দুই পক্ষকে বসানোর ব্যবস্থাটা করলেন, তাতে তাঁর কৃত্রিম সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। তাঁর মুখেও ফুটে উঠল হাসি। ওই হাসিটা ১৬ কোটি মানুষের উপভোগ করার প্রয়োজন ছিল। কী সুন্দর সাফল্য! অমন সাফল্য বাংলার মানুষের চৌদ্দপুরুষ দেখেনি। তাঁর দূতিয়ালির পক্ষগুলোর মধ্যে ছিল আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। এই চার পক্ষের কারও সঙ্গেই ভাব নেই তেমন কয়েকজন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধির কথাও তিনি শোনেন। তাঁর যাওয়ার সময় যখন ঘনিয়ে এল, তখন দুই পক্ষের হাত দুটি ধরে তিনি বললেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্র বাঁচানোর দায়িত্ব বিধাতা আমাকে দেননি, চাকরি রক্ষার্থে আমি এখানে এসেছি, আর্জেন্টিনায় অন্য চাকরি করলে আমি এখানে কস্মিনকালেও আসতাম না, তোমরা আমাকে বাঁচাও। শারীরিকভাবে নয়,
বেইজ্জতির হাত থেকে বাঁচাও। বাঁচানোর উপায়টা কী? উপায় হলো, কোনোরকমে তোমরা বসো। তোমাদের টিভির দর্শকেরা দেখুক আর আমার বস বান সাহেবও জানুন। তাঁর অনুরোধকে অসম্মান করা হয়নি। তাঁর মিশনে সফলতা এল। দুই নেতাকে হ্যান্ডশেক করাতে দুটি হাতের দরকার। হাত একটি ছিল প্রকাশ্যে আরেকটি ছিল আত্মগোপনে। আত্মগোপনের হাতটি তিনি বাইরে আনতে পারলেন। সেটা কম সফলতা নয়। কিন্তু তাঁরা মোলাকাতও করলেন, ওদিকে ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের জোর আয়োজনও চলল, রাজপথে যানবাহনে জ্বলতে থাকল আগুন, রেললাইন হলো উৎপাটিত, গাছের গুঁড়ি দিয়ে অবরোধ করা হলো মহাসড়ক, কীটপতঙ্গের মতো মরতে লাগল মানুষ। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গেও তিনি কথা বলেছেন। কিন্তু তিনি চলে যাওয়ার ১৫০ ঘণ্টার মধ্যেই ১৫১ জন (পরে আরও তিনজন) বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সাংসদ নির্বাচিত হলেন। পৃথিবীর বহু দেশের পার্লামেন্টের সদস্যসংখ্যাও ১৫১ নয়। মহাসচিবের মহাদূতের এক বিরাট সাফল্য! আমরা অনেকে ধরে নিয়েছি জাতিসংঘের দূত এসেছিলেন আমাদের স্বার্থে। আমাদের গণতন্ত্রকে বাঁচাতে। দুই পক্ষের মান-অভিমান ভাঙাতে। আসলে তা নয়। বিষয়টা দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট। জাতিসংঘ কোনো অতিজাগতিক পরাশক্তিনিরপেক্ষ বিশ্ব সংস্থা নয়। তার হেডকোয়ার্টার্সটাই আমেরিকার মাটিতে।
ম্যানহাটন দ্বীপে। একমাত্র পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার কথা যতটা সম্ভব তাকে মানতে হয়। রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদেশগুলো। তাদেরও অগ্রাহ্য করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। তারানকো ঢাকায় এসে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। চীন ও ভারতের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনারকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক স্বার্থেও প্রয়োজন রয়েছে বাংলাদেশের। তার শান্তি মিশনে আমাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশের সদস্যরা রয়েছেন। তাতে তাদেরও উপকার, আমাদেরও উপকার। আমরা বৈদেশিক মুদ্রা রোজগার করছি। পিস মিশন ছাড়া রয়েছে বাংলাদেশে জাতিসংঘের এজেন্সিগুলোর বহু প্রজেক্ট। তাতে বহু টাকা বিনিয়োগ তাদের। বাংলাদেশে গোলযোগ থাকলে সেই সব প্রকল্পের কাজ বিঘ্নিত হবে। ক্ষতি হবে ওই বিশ্ব সংস্থার। জাতিসংঘের শক্তিশালী সদস্যদেশগুলোরও ঋণ-অনুদানের অসংখ্য প্রকল্প রয়েছে বাংলাদেশে। তাদের স্বার্থও তাকে রক্ষা করতে হয়। সুতরাং বান কি মুন শান্তিশৃঙ্খলা চান বাংলাদেশের স্বার্থেও, তাঁদের স্বার্থেও। আমাদের সরকারি দলের নেতাদের কথাবার্তা শুনে মনে হয় তাঁরা রোমান সম্রাটদের মতো সর্বশক্তিমান। চেঙ্গিস খাঁর মতো তাঁরা কাউকে পরোয়া করেন না। বিদেশিরা কে কী বলল, তা তাঁরা থোড়াই কেয়ার করেন। ধমক মারেন। প্রবুদ্ধ নেতাদের বলতে চাই, এই দুনিয়ায় একা চলা যায় না।
রোমান সম্রাট ও চেঙ্গিস খাঁর জামানা নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংশ্লিষ্টতা আজকের দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্রের পক্ষেই সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করা সম্ভব নয়। তা যত বড় শক্তির অধিকারীই হোক। নেতাদের কথা শুনে মনে হয়, তাঁদের মতো বীর দুনিয়ায় আর দুখানা নেই। তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগ বাড়িয়ে আমাদের সহায়তায় এগিয়ে না এলে, পাকিস্তানের বিপক্ষে না দাঁড়ালে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিলম্বিত হতো। কতটা বিলম্বিত ও বিঘ্নিত হতো তা ৪২ বছরের কম বয়সী বীরেরা ধারণাও করতে পারবেন না। সে জন্যই মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা দেওয়া বিদেশি বন্ধুদের আমরা সম্মাননা দিচ্ছি। সুতরাং বিদেশিদের মতামত তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে উড়িয়ে দেওয়া অদূরদর্শিতা ও মূর্খতার নামান্তর। তবে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ বরদাশত না করার মধ্যে সাহসের পরিচয় রয়েছে। নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশে অচলাবস্থা, তা থেকে সাম্প্রতিক সহিংসতা ও নাশকতা, কাদের মোল্লার ফাঁসির আগে-পরে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব প্রভৃতি নিয়ে বিদেশিদের উদ্বেগ প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। তাকে উপেক্ষা করা বা উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। বর্তমানে সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচনের নামে যা হচ্ছে, স্বাধীন নির্বাচন কমিশনই তা করছে, তার দ্বিতীয় দৃষ্টান্ত বিশ্বের ইতিহাসে নেই। প্রধান দলগুলোর অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই জনগণের প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশাকে মূল্য না দিয়ে অন্য কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন দেশে ও সমাজে শান্তি আনবে না। ছোট দেশ। মানুষ বেশি।
হানাহানি লেগেই থাকবে। তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সাধারণ মানুষ। সব দলমতের মানুষ। বিশেষ করে সমাজের দুর্বলতর অংশ, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু। মহাসচিবের দূতের সফরের ব্যর্থতা ও সফলতা নিয়ে যাঁরা মাথা ঘামাচ্ছেন, তাঁদের উচিত তাঁর সফরের কেন প্রয়োজন হলো সেই কারণগুলো খতিয়ে দেখা ও বিশ্লেষণ করা। তিনি যে হাসি হেসে গেছেন, তা হাতির শোভন দুই দাঁত। যে দাঁত দিয়ে হাতি খায় সে দাঁত তীক্ষ ও ধারালো। সেই দাঁতের নিচে আমরা পড়তে চাই না। ৪২ বছরে এবারই প্রথম বিজয় দিবসে জাতীয় স্মৃতিসৌধে যাননি ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতেরা। সরকারি কর্মকর্তারা একে যতই কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন বলে উড়িয়ে দিন না কেন, আমার ভালো ঠেকেনি। অপমানিত বোধ করছি। গত পাঁচ হাজার বছরে হঠকারিতা করে পৃথিবীর কোনো দেশেই কেউ উপকৃত হয়নি। হঠকারিতা যে করে এবং যাদের বিরুদ্ধে করে, কেউই লাভবান হয় না। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণ। ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম দায়িত্বজ্ঞানহীন মানুষ নন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর, বিশেষ করে বাংলাদেশের ও পাকিস্তানের রাজনীতির নাড়িনক্ষত্র খুব ভালো জানেন। তিনি একজন বিচক্ষণ কূটনীতিক।
তিনি একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষকও। এক লেখায় কয়েক দিন আগে মাইলাম বলেছেন, ‘দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকারগ্রস্ততার কারণে, (বাংলাদেশ) এমন একটি অবস্থায় রয়েছে, যা বিরোধী দলকে বলপূর্বক দমন করে একটি একদলীয় ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। এই নির্বাচন আগে যা কিছু হয়েছে তার পরিবর্তে, উপমহাদেশে সম্পূর্ণ নতুন কিছুর ইঙ্গিত নিয়ে আসতে পারে।’ সরকার বলবে, এক দল কোথায়? তরীকত, জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাপার ভগ্নাংশ তো আমাদের সঙ্গেই আছে। একদলীয় শব্দটা ‘অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। মাইলাম কথিত ‘সম্পূর্ণ নতুন কিছুর ইঙ্গিত’ কথাটির নানা রকম অর্থ করা সম্ভব। একটি ভালো সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের ভেতরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও বাইরে কূটনৈতিক দক্ষতা প্রদর্শন করা। বিদেশিদের কোনো ধরনের উদ্বেগকে আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। আমাদের বন্ধু ও উন্নয়নের সহযোগী ভারত, চীন, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্কের ওপরই আমাদের আর্থসামাজিক উন্নতি নির্ভরশীল। তাই এই মুহূর্তে জাতীয় নেতৃত্বের কাছে জনগণ আশা করে গভীর সংযম ও দূরদৃষ্টি।

অপেক্ষমাণ বাসযাত্রীদের কথা

থমকে গেছে পুরো দেশ। লাখো মানুষ নড়তে-চড়তে পারছে না। আমিও পারছি না। আমার আম্মা রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অনেক দিন ধরে অসুস্থ। গতকাল একটি মাইল্ড হার্ট অ্যাটাকের পর তাঁর জীবন এখন ঝুঁকিপূর্ণ। আমি তাঁকে দেখতে যেতে পারছি না। রেল যোগাযোগ বন্ধ। বাস ছাড়বে না। বহু দিন পর দেশে একটি হরতাল-অবরোধবিহীন দিন এল। তবু দেশের মানুষ যে যার অবস্থানে, গ্রামে, শহরে বন্দী হয়ে পড়ল। যুদ্ধাপরাধী কাদের মোল্লার ফাঁসি হওয়ায় সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে জামায়াত-শিবির ও তাদের সমর্থকেরা। রাষ্ট্র কি জামায়াতের রাজনীতি করার এই জঙ্গি পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত নয়? বাসওয়ালারা বারবার খবর জানাচ্ছেন, চান্দাইকোনা থেকে শেরপুর—পুরো মহাসড়কের ওপর গাছ কেটে কেটে ফেলে রাখা হয়েছে। মোকামতলা থেকে পলাশবাড়ী, মিঠাপুকুর থেকে দমদমা এলোমেলোভাবে পড়ে আছে লাখো গাছের ‘মৃতদেহ’। সেগুলো সরানোর কেউ নেই। বগুড়ায় সেতু ভেঙে ফেলা হয়েছে, রংপুরে এমনকি সংবাদপত্রও পৌঁছায়নি। ডোমারে ১২টি হিন্দুবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এক এক যাত্রীর ফোনে এক এক রকম ভয়ানক খবর আসছে আর কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ডে হাজার হাজার মানুষের মুখ শুকনা হয়ে যাচ্ছে। এক যাত্রী মুঠোফোনে জেনেছেন যে মিঠাপুকুরে সড়কের ওপর নারী ও শিশুদের বসিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে সড়ক থেকে গাছ কেউ না সরাতে পারে! মহাখালী বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করছেন আমার মামা। তিনি জানালেন সেখানকার হাজার হাজার আতঙ্কগ্রস্ত,
বিষণ্ন মানুষের কথা। যারা এক দিনে কাজে ঢাকায় এসে আটকে পড়েছিলেন, তাঁদের চোখ জলে ছলছল। হোটেলে থাকতে থাকতে পকেট ফাঁকা হয়ে গেছে। খাওয়ার পয়সাও নেই। আমার মায়ের মতো কতজনের প্রিয়জনই না মৃত্যুশয্যায়। কিন্তু একটু কাছে যাওয়া যাচ্ছে না! তা হলে রাষ্ট্র কি জনগণের স্বাভাবিক জীবনযাপনের অধিকার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ! জনগণের ট্যাক্সের পয়সায় গড়ে ওঠা পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী কেউ পারেনি এভাবে বৃক্ষ হত্যা ঠেকিয়ে দিতে, মানুষের জীবনে বিপর্যয় সৃষ্টি করা প্রতিরোধ করতে। একটি অবোধ শিশুও অনুমান করছিল যে একজন যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি হলেই নিবন্ধন অবৈধ ঘোষিত হওয়া রাজনৈতিক দলটি সহিংস হয়ে উঠতে পারে। তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুতি নেয়নি কেন? নাকি এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করার সুযোগ দেওয়া হলো? সড়কের পর সড়ক কেটে দেশটিকে হাজারো বিচ্ছিন্ন অবরুদ্ধ দ্বীপে পরিণত করার সুযোগ কীভাবে পেল দুর্বৃত্তরা? কল্যাণপুরের ব্যর্থ, অবসন্ন যাত্রীরা চোখ লাল করে পরস্পরকে একটির পর একটি প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। নারীরা ভীতসন্ত্রস্ত। শিশুরা যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। ঢাকায় যাঁদের আত্মীয়স্বজন নেই, তাঁরা পড়েছেন অকূলপাথারে। অনেকেই টেলিভিশনের দিকে চোখ আটকে রেখে শিউরে শিউরে উঠছেন। সাতক্ষীরা, বগুড়া, লক্ষ্মীপুর, খুলনা, রাজশাহী, মিঠাপুকুর একেকটি বিপর্যস্ত এলাকার ছবি টেলিভিশনের পর্দায়। ১৬ ডিসেম্বর সবকিছু মোটামুটি স্বাভাবিক ছিল। সবাই দেশপ্রেমিক হয়ে উঠেছিলেন। যাত্রীভর্তি বাস পোড়ায়নি। মোড়ে মোড়ে অদৃশ্য হাতে ককটেল ছুড়ে আতঙ্ক তৈরি করেনি। দেশের মাটি, সম্পদ ও মানুষ তছনছ করে দেয়নি। আজ ১৭ ডিসেম্বর থেকে আবার শুরু হচ্ছে অবরোধ। তাহলে এক দিনের জন্য মানুষের স্বস্তি?
তাহলে মানুষ কোথায় যাবে? মানুষের প্রশ্নের যেন শেষ নেই। দেশের মানুষ রাজনীতিকদের বিদ্বেষের বিষে আক্রান্ত। একটি স্বাধীন দেশ এতটা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে কীভাবে পতিত হয়? মানুষ দায়ী করার জন্য কাউকেই খুঁজে পায় না। কদিন আগে আমাদের এক বন্ধু গুলশানের নিকেতন থেকে অফিস শেষে বাসায় না ফেরায় পরিবার গিয়েছিল গুলশান থানায় সাধারণ ডায়েরি করতে। গুলশান থানা সেটা করতে রাজি হয়নি। কারণ, ঠিক কোন স্থান থেকে ভদ্রলোক নিখোঁজ হলেন, তা উল্লেখ করতে হবে। পরে জানা গেছে যে তিনি অপহূত হয়েছেন। বন্ধুপত্নীর কাছে ফোন করে পাঁচ লাখ টাকা মুক্তিপণ চাওয়া হয়েছে। শেষে তিন লাখ টাকায় রফা হয়েছে। পুলিশ এখন রাজনৈতিক সহিংসতা সামাল দিচ্ছে। ছোটখাটো অপরাধের দিকে নজর দেওয়ার সময় এখন আর নেই। কিন্তু সহিংসতা থামানো যাচ্ছে না। মানুষ ভীতসন্ত্রস্ত। নিরাপত্তাহীনতায় আক্রান্ত। অসুস্থ বোধ করছে সবাই। কিন্তু সমাধানের সম্ভাবনাও দেখছে না সাধারণ মানুষ। কেন একটি স্বাধীন, দ্রুত প্রবৃদ্ধিপরায়ণ দেশ এভাবে থমকে গেল? কল্যাণপুরের অস্থির মানুষগুলোর চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, অতিষ্ঠ জনগণ হয়তো এখন রাস্তায় নামবে শান্তির জন্য। রাজনীতির আগুনে প্রতিটি ঘর পুড়ছে। অস্থিরতায় মানুষ অতিষ্ঠ। মানুষ মনে করে, রাজনীতির মধ্যে এমন কোনো উপাদান থাকা উচিত নয়, যা প্রত্যেক ব্যক্তিকে বিক্ষত করে দেয়। নিজের নিজের মতো করে সরব হয়ে উঠতে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। হয়তো একসঙ্গে জ্বলে উঠবে সবকিছু জ্বালিয়ে খাঁটি করতে।
শান্ত নূরুননবী: উন্নয়নকর্মী।
shantonabi@gmail.com

ভোট গ্রহণের আগেই ফল নির্ধারিত?

বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি ২০১৪-এ যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তার ফল আমরা এখনই জানি। ইতিমধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের ফল কার্যত প্রকাশিত হয়েছে এবং বাদবাকি আসনগুলোর ফলাফলের অনুমানও আমরা সহজেই করতে পারি। আওয়ামী লীগ এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনেই কেবল বিজয়ী হবে তা নয়, এককভাবে দুই-তৃতীয়াংশ আসনও পাবে। সংসদ হবে আওয়ামী লীগের শরিকদের প্রতিনিধিদের নিয়ে। একটি ভোট প্রদানের আগে, এমনকি নির্বাচনের ব্যালট ছাপারও আগে কী করে আমরা ফলাফল জানতে পারলাম, তার ব্যাখ্যা নির্বাচন কমিশন দেয়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী সেই প্রশ্নের উত্তর না চাইতেই দিয়েছেন; সে জন্য অবশ্যই আন্তরিক ধন্যবাদ তাঁর পাওনা। তিনি বলেছেন, ‘সর্বদলীয় সরকারে যাঁরা যোগ দিয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে সমঝোতা করে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছি।’ সমঝোতার সূত্র এবং অন্যান্য আসনের ফলাফলের ইঙ্গিত প্রধানমন্ত্রীর এই কথায়ই রয়েছে, ‘যেখানে যেখানে প্রার্থী আছে, সেখানে একটা পার্সেন্টেজ ধরেছি যে এখানে এত পার্সেন্ট সমঝোতা করে ছেড়ে দেব।’ শুধু তা-ই নয়, প্রধান বিরোধী দলের ব্যাপারেও তাঁর বক্তব্য স্পষ্ট, ‘যদি বিএনপি আমাদের সঙ্গে সর্বদলীয় সরকারে আসত, তাদের সঙ্গেও আমরা একই প্রক্রিয়া করতাম’ (আওয়ামী লীগের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩)। অনুমান করতে অসুবিধা হয় না যে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত এই ধরনের ‘প্রক্রিয়া’য় বিএনপিকে নিশ্চয় সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন বা দুই-তৃতীয়াংশ আসন দেওয়া হতো না।
বিতর্কের খাতিরে যদি আমরা ধরেও নিই যে প্রধানমন্ত্রী এই প্রক্রিয়ায় বিএনপিকে সব কটি আসনই দিয়ে দিতেন, তাহলে নির্বাচনের প্রয়োজন কি অবসিত হয় না? প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের মাধ্যমে বিএনপি যদি একটি আসনও লাভ করত, প্রধানমন্ত্রী যদি তাদের একটি আসনও দিয়ে দেন, সেই আসনের ভোটারদের নাগরিক অধিকারের প্রশ্নটি সেখানে কোথায় থাকছে? এ বক্তব্য থেকে এই উপসংহারে পৌঁছালে কি ভুল হবে যে ভোটাধিকারের প্রশ্নটি, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত হওয়ার প্রশ্নটি এখন আর মূল্য বহন করে না? ইতিমধ্যে জানা ফলাফলের মাধ্যমে বাংলাদেশের ভোটাররা যেহেতু জানেন, তাঁদের ভোটের মূল্য নেই, সে ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিনে ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য বিরোধী দল নয়, সরকারই আসলে ভোটারদের অনুৎসাহী করতে সক্ষম হয়েছে। তাতে করে বিরোধীদের ডাকা ‘বর্জন’ বা ‘প্রতিরোধের’ চেয়ে আরও বেশি কারণ তৈরি হয়েছে ভোটারদের ভোট না দেওয়ার। প্রথম দফায় ১৫১টি আসনের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছিল, তার ভিত্তিতে সেসব আসনের ভোটারদের সংখ্যা এবং মোট ভোটারের শতাংশের হিসাবের দিকে তাকালে যে চিত্রটি উঠে আসে, তা এই নির্বাচনকে ইতিমধ্যেই বৈধতার সংকটে ফেলে দিয়েছে। ২০০৮ সালের ভোটারসংখ্যাকে ভিত্তি ধরলে চটজলদি হিসাবে দেখা যায় যে সারা দেশের প্রায় ৫১ শতাংশ ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে না। এখন পর্যন্ত ৪৯ শতাংশ ভোটারের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কোনো কোনো বিভাগে এই হার এতটাই বেশি যে সেটা যেকোনো বিবেচনায় অগ্রহণযোগ্য। যেমন ধরা যাক রাজশাহী বিভাগের কথা। সেখানে ৬৮ শতাংশ ভোটারের ভোট দেওয়ার প্রয়োজন হবে না;
ঢাকা বিভাগের ক্ষেত্রে তা ৫৮ শতাংশের বেশি। চট্টগ্রাম বিভাগের ৫৪ শতাংশ ভোটারের পছন্দের বিষয়টি এখন ধর্তব্যের বিষয় নয়। রংপুরের ভোটাররা এই ভেবে আনন্দিত হতে পারেন যে তাঁদের প্রায় ৭৩ শতাংশের ভোটের মূল্য রয়েছে। তবে যাঁদের ভোটের মূল্য আছে, তাও যে সীমিত, সেটি আমরা আগেই দেখিয়েছি। কেননা, তাঁরা সরকার গঠনের ক্ষেত্রে কোনো রকম বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারবেন না। এই হিসাবের পরে আমরা দেখেছি, আরও কমপক্ষে তিনটি আসনকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেই হিসাবকে এর সঙ্গে যুক্ত করলে চিত্রটি আরও বেশি অগ্রহণযোগ্য হবে। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যাঁরা ভাবছেন, এসব হিসাব-নিকাশ কোনোভাবেই দেশের বাইরে বিবেচ্য বিষয় হবে না, তাঁদের জন্য দুঃসংবাদ হলো, ইতিমধ্যেই এসব অঙ্কের হিসাব শুরু হয়ে গেছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সূত্রে ওয়াশিংটন সময় ১৩ ডিসেম্বর শুক্রবার বিকেলে যখন এই খবর জানা যায় যে এক-তৃতীয়াংশ আসনে বিনা নির্বাচনেই বিজয়ী নির্ধারিত হচ্ছে, সে সময় নির্বাচনবিষয়ক গবেষণায় যুক্ত আন্তর্জাতিক একটি ফাউন্ডেশনের একজন প্রতিনিধির কাছে দেশের নাম উল্লেখ না করে আমি জানতে চেয়েছিলাম, এই ধরনের অবস্থার কোনো উদাহরণ তাঁরা জানেন কি না। তিনি পাল্টা আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতান্ত্রিক দেশের কথা বলছি কি না। হাস্যচ্ছলে তিনি এ-ও জানতে চেয়েছিলেন, এই ধরনের একটা অসম্ভব দশ্যপটের কথা আমার মাথায় কেন এল।
আমি তখন তাঁকে জানাই যে এটা কোনো কল্পনাপ্রসূত বিষয় নয়। তিনি দ্রুত খোঁজখবর নিয়ে আমাকে জানান যে আপাতদৃষ্টে তিনি এমন দ্বিতীয় উদাহরণ খুঁজে পাননি। আমাদের মনে রাখা দরকার যে বাংলাদেশে অতীতে যেসব একতরফা নির্বাচন হয়েছে, সেগুলো আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকার এতটাই স্বল্প সময় ছিল যে দেশ শাসনের প্রশ্নটি উত্থাপিত হয়নি। সে ধরনের চেষ্টা যে বাতুলতা হতো, সেটা বর্তমান বিরোধী দল, বিএনপি ভালো করেই জানে। অন্যদিকে, ১৯৮৮ সালের নির্বাচন একতরফাভাবে হলেও এই ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি। তা সত্ত্বেও সেই সরকারের বৈধতার প্রশ্ন বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহলে তখন জোরেশোরেই উঠেছিল। এই বিষয়ে ক্ষমতাসীনেরা তার শরিক জাতীয় পার্টির নেতাদের প্রশ্ন করলেই জানতে পারবেন। দেশের বিরাজমান সহিংস পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে মাত্র ১৪৬টি আসনে ‘নির্বাচনের’ ব্যবস্থা করা সহজতর হবে বলে সরকারের কোনো কোনো মহলে ধারণা থাকতেও পারে। কিন্তু এসব এলাকায় ৫০ শতাংশ মানুষকে ভোটাকেন্দ্রে হাজির করা সম্ভব হলেও তাতে যে মোট ভোটারের এক-চতুর্থাংশ ভোটারের দেওয়া রায়ের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার চেষ্টা, সেই হিসাব করতে গণিতে পারদর্শী হতে হয় না। এই যুক্তি মোটেই ধোপে টিকবে না যে অনেক দেশেই ভোটারদের ২৫ শতাংশও ভোট দেন না, তাতে সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয় না।
কেননা, সেসব ক্ষেত্রে ভোটারদের সামনে পছন্দের জন্য বিকল্প থাকে এবং তাঁরা স্বেচ্ছায় সিদ্ধান্ত নেন যে ভোট দেবেন কি না। গণতন্ত্রের একেবারে গোড়ার কথাই হচ্ছে, কোনো কিছু পছন্দ করা বা না করার অধিকার নাগরিকের আছে কি না। একজন নাগরিক সেই অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করবে, সেটা নাগরিকের বিষয়। যতক্ষণ না পর্যন্ত রাষ্ট্র আইনানুগভাবে তার প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে বিষয় নিশ্চিত করাই কেবল রাষ্ট্রের কাজ। অন্যদিকে, রাষ্ট্র যদি আইন করেও তা হরণ করে, তবে তাকে আর গণতন্ত্র বলে অভিহিত করা যাবে না। একসময় নির্বাচন কমিশনের স্লোগান হিসেবে একটা বাক্য ব্যবহূত হতো—‘আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের পর জাতীয় সংসদে গত ১৬ জুন দেওয়া ভাষণে বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘নির্বাচনী মেকানিজম তাঁরা ভালোই জানেন।’ তিনি এ-ও বলেছিলেন, ‘“আমার ভোট আমি দেব, যাকে খুশি তাকে দেব”—এটা আমারই স্লোগান ছিল। সেটা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি।’ দেশের ৫০ শতাংশের বেশি ভোটার এখন এই প্রশ্ন করতেই পারেন, ‘সমঝোতার’ ভিত্তিতে যে সংসদ তৈরি হচ্ছে, সেখানে ‘যাকে খুশি’ ভোট দেওয়ার অধিকার কীভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে? নির্বাচনী মেকানিজমের মাধ্যমে একসময় যা হরণ করা হতো বলে প্রধানমন্ত্রী যথাযথভাবেই বর্ণনা করেছিলেন, এখনকার অবস্থা তা থেকে কী অর্থে ভিন্ন?

আমার নাম শেখ মুজিবুর রহমান by কবিয়াল নুরুল হুদা

আমি মোঃ নুরুল হুদা বাঁশখালী, দক্ষিন পুইছড়ি গ্রামের সুলতানিয়া প্রাইমারী স্কুল থেকে ১৯৬৭ইং ৫ম শ্রেণী পাশ করার পর তখন আমার বয়স আনুমানিক ১৪ বছর। আমাদের গ্রামের পাশে হাই স্কুল না থাকায়, আমাকে আমার চাচার মফস্বলের শহর টেকনাফে নিয়ে যায়। চাচা জনাব বোজুরুজ মেহের ফরেষ্ট গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিলেন টেকনাফ। আমার বাবাও কক্সবাজার আদালতে মহুরীর চাকুরী করতেন। চাচা বেশি ভালবাসত বলেই সেই সুবাদে টেকনাফ রেষ্ট হাউসের পাশে ফরেষ্ট কোয়াটারে থেকে টেকনাফ হাইস্কুলে ফেব্রুয়ারীর শেষের দিকে ভর্তি করিয়ে দেন। নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু ও নতুন জায়গায় গিয়ে কিশোর মনে তখন আনন্দে ভরপুর ছিলাম। রীতিমত সপ্তাহ খানেক স্কুলে যাওয়া আসার পর হঠাৎ এক রাতে কোয়াটারের পাশে রেষ্ট হাউসের সামনে গাড়ির হরণ ও শব্দ শুনা যাচ্ছে।
চাচা বোজুরুজ মেহের এক লাফে উঠে রেষ্ট হাউসের চাবি নিয়ে গাড়ির সামনে গেলেন, আমি ও পেছনে গিয়ে দেখলাম গাড়ী থেকে দুইজন ভদ্র সাহেব বের হয়ে আসলেন এবং অস্ত্র সহ আরও দুইজন ফরেষ্ট গার্ড। চাচা সালাম দেওয়ার পর ফরেষ্ট অফিসার বললেন, আমাদের ফরেষ্টের তদন্ত কাজের জন্য একজন অতিথি এসেছেন, উনি এখানে কয়েকদিন থাকবেন। অতিথি ভদ্র লোকটি তেমন কোন কথা বললেন না। চাচা তাড়াতাড়ি রেষ্ট হাউস খোলে দিয়ে অতিথিদের জন্য হালকা চা নাস্তার ব্যবস্থা করলেন। তখন রাত আনুমানিক ১২.০০-১.০০টা পর্যন্ত হবে। স্যার বলেন অতিথির দেখাশোনা করবে ও ওনার নির্দেশ মোতাবেক যা যা লাগে সবকিছুর ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে অতিথির সাথে আর ও কিছুক্ষন সময় দিয়ে গাড়ী নিয়ে কক্সবাজার চলে গেলেন।
অতিথি রাত্রি যাপন করে পরদিন সকালের নাস্তা শেষে গোসলের জন্য গরম পানি দিতে বলেন। চা-নাস্তা, গরম পানি, পত্রিকা ও চিটিপত্র নিয়ে যাওয়া ছিল আমার কাজ। তখনো চিনতে পারিনি এই গভীর গোর গম্ভির লোকটি কে? সকালে গোসলের শেষে পরের দিনের পত্রিকা গুলো নিয়ে চোখ বোলাচ্ছেন এবং চাচাকে ডেকে বললেন এখানে বন পরিদর্শন করার মত কোন নৌকা আছে? চাচামিয়া বললেন একটা আছে স্যার তবে মেরামত করিতে হবে। স্যার বললেন তাড়াতাড়ি মেরামত করে নাও। দুইদিনের মধ্যে উপরে কাঠের ছাউনি দিয়ে খুব সুন্দর একটা নৌকা তৈরী হয়ে গেল। তারপর একরাতে বের হয়ে গেলেন অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি নিয়ে ২টি অস্ত্র দুইজন ফরেষ্ট গার্ড সহ রেরিয়ে পড়েন গহীন জঙ্গলে গভীর রাত পর্যন্ত নিঝুম প্রকৃতির সাথে কিছু সময় জোৎস্না, আর কিছু সময় অন্ধকার বনের পশু পাখিদের ডাক আর ঝিঁ ঝিঁ পোকার শব্দের সাথে মিশে নৌকার ভেতর সারারাত কাটান, আর কিছু সময় ঘুমান। সকালে আবার রেষ্ট হাউসে এসে গরম পানিতে গোসল ও নাস্তা করার পর পত্রিকার দিকে মনোযোগ দেন। প্রতিদিন অনেক গুলো পত্রিকা পাঠিয়ে দেওয়া হত কক্সবাজার থেকে, দৈনিক পত্রিকা গুলো আসতে আসতে তার পরের দিন এসে পৌছে। একদিন আমাকে অতিথি সাহেব একটি চিটি দিয়ে বলেন এই চিঠিটা ফরেষ্ট অফিসার রওশন আলী সাহেবের কাছে দিয়ে আস।
পরে আমি টেকনাফ থেকে কক্সবাজার বন কর্মকর্তার অফিসে গিয়ে উঠলাম, আমি ছোট বলে কেউ আমাকে স্যারের রুমে ঢুকার অনুমতি দেয়নি। দরজায় দেখলাম নেম প্লেটে লেখা রয়েছে রওশন আলী, তখন নিশ্চিৎ হলাম যে, এই রুমেই রওশন আলী স্যার আছেন। কিছুক্ষন ঘুরাঘুরি করার পর যখন দেখলাম কেউ নেই, তখন হঠাৎ করেই স্যারের রুমে ঢুকে গেলাম। স্যার প্রথমেই একটু বিস্ময় চোখে তাকালে এত ছোট ছেলে আমার রুমে ঢুকে পড়েছে, সালাম দিয়ে বললাম স্যার আমি টেকনাফ রেষ্ট হাউসের অতিথি স্যারের চিঠি নিয়ে আসছি। স্যার আতংকিত অবস্থায় চেয়ার থেকে উঠে এসে রুমের দরজা বন্ধ করে দিলেন এবং আমার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়া শুরু করেন। পরে দরজা খোলে কলিং বেল দিয়ে পিয়ন ডেকে আমাকে আপ্যায়ন করার কথা বলেন এবং আমার কাছ থেকে জিজ্ঞেস করেন তুমি আজ রাত কোথায় থাকবে। তখন আমি বললাম আমার বাবা কক্সবাজার আদালতে মুহুরী এখানে আমাদের বাসা আছে। স্যার বলেন তাহলে তুমি কাল সকালে আমার সাথে দেখা করার পর টেকনাফ যাবে, পরে আমাকে দুপুরের ভাত খাওয়ান। ঐ দিন বাবার সাথে থেকে পরদিন স্যারের অফিসে গিয়ে দেখা করলাম, স্যার আমাকে বেশ কিছু পত্রিকা আর মোড়ানো একটা পেকেট দিলেন। আমি টেকনাফ রেষ্ট হাউসে গিয়ে অতিথির হাতে যখন পেকেট টাকা দিলাম, উনি খোলে দেখার পর একহাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে দিলেন। পেকেটের ভেতর ছিল ক্যাপেষ্টেন সিগারেটের ছুগা এবং সেবন করার চোরট (কাল রংয়ের পাইপ)। আমি খুশি মনে বের হয়ে গেলাম, ভাবলাম এত বড় অফিসার আমাকে জড়িয়ে ধরলেন শুধু তাই নয় তিনি হিন্দু, মুসলিম, মামা যাকেই পান শুধু বুকে জড়িয়ে ধরতেন। সবার মনে ভাবনা হয় এমন অফিসারতো আর কোন দিন পাইনি। 
একদিন পত্রিকা পড়ার পর খুব বিষন্ন অবস্থায় গভীর চিন্তায় পড়ে গেলেন। তারপর চাচা বুজুরুজ মেহের (কালামিয়া) কে ডেকে বলেন এখানে বার্মার কোন লোক আছে? চাচা বললেন আছে স্যার আমাদের পরিচিত এক বার্মার হুজুর আছে উনি এখন কক্সবাজারে বাহারছড়া মসজিদের ইমামতি করেন ও আরবী পড়ান। স্যার বললেন তাড়াতাড়ি ওকে খবর দাও। তখন চাচা টেকনাফ টি এন্ড টি অফিস থেকে আমার বাবার কাছে টেলিফোন করে বলেন, ইমাম মৌলবী নুরুজ্জামান হুজুরকে অতিসত্ত্বর টেকনাফ ফরেষ্ট রেষ্ট হাউসে আসতে বলেন। তার পরদিন বাবা উমরমিয়া সহ হুজুর নুরুজ্জামান উপস্থিত। তখন বাবা চাচা হুজুর ও অতিথি সহ কিছুক্ষণ বৈঠক করেন, অতিথির বার্মার কোন গ্রাম দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে এবং নুরুজ্জামান হুজুরের বাড়ীতে থাকবেন। উক্ত বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় যে, তারপর দিন মাগরিবের আযানের পর টেকনাফ থেকে বার্মা যাওয়ার ব্যবস্থা করা হউক।
অতিথির নির্দেশ মত পরের দিন সব মালামাল খাবার দাবার  নিয়ে সবাই উপস্থিত। ঠিক মাগেিরবের নামাজের পর প্রথমে অতিথি নৌকায় উঠেন পরে আমার বাবা চাচা ও বার্মার হুজুর, মাঝি ২জন সহ পাল তোলা নৌকায় উঠে পড়েন।
তথন আমি আর কান্না থামাতে পারছিনা আমাকে ফেলে বাবা, চাচা চলে যাচ্ছে মনটা বড় খারাপ হয়ে আবেগকে ধরে রাখতে না পেরে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম। তখন বাবা নৌকা থেকে নেমে এসে আমাকে ধমক দেন আমাকে বাসায় চলে যেতে বলেন। অতিথি নৌকার ভেতর থেকে বড়গলায় বলেন ওকেও নৌকায় তুলে নাও। আমি খুশিতে আত্মহারা অতিথির বার্মা সফর সঙ্গী হিসেবে থাকতে পেরে আমার কান্না তখন বন্ধ হয়ে গেল। তারপর তাহাদের সাথে আমিও রওনা হলাম। পালতোলা নৌকা সাগরের মাঝখানে চলে গেছে প্রায়, পরে বড়খাল থেকে ছোট খালে হুজুর নুরুজ্জামানের দেখানো পথে চলতে লাগল।
সারা রাত বার্মার পুলিশের কঠিন পাহারার চোখ ফাঁকি দিয়ে সারারাত নৌকা চলছেই, ফজরের আযানের পরপরই পৌছে গেছি নুরুজ্জামার হুজুরের বাড়ী হাইদছুরাতা গ্রামে।,ভোরের পাখির ডাকে আমরা নৌকা থেকে পা নামালাম বার্মার মাটিতে, পরে নৌকা আমাদেরকে নামিয়ে দিয়ে আবার ফিরে যায় টেকনাফে। সামান্য কিছু পথ পায়ে হেটে নুরুজ্জামান হুজুরের বাড়ীতে পৌছে গরম জল দিয়ে গোসল করেন অতিথি। বিনি চালের ভাত দিয়ে সকালের নাস্তা করেন অতিথি ও আমারা সবাই। যতদিন বার্মায় ছিলাম ততদিন অতিথি ও সবার মন মানসিকতা খুব ভাল ছিল। হুজুরের বাড়ীতে আমরা চার দিন পর্যন্ত অবস্থান করি সেখানেও কিভাবে যে অতিথির জন্য বাংলা পত্রিকা পৌছে যেত কিছুই বোঝতে পারতাম না। বার্মার ঘরগুলো খুব সুন্দর মাটির তৈরী ও লোকজন প্রায় আমাদের দেশের মতো লাগে দেখতে এবং খুব অতিথি পরায়ন ও মিশুক প্রকৃতির। ভালই কেটেছে সেই দিন গুলো সবার মনে ছিল খুব আনন্দ। ৪-৫ দিন পর অতিথি আবার নৌকা আনার জন্য নির্দেশ দেন। চাচা টেকনাফ গিয়ে আবার মাঝি মাল্লা সহ সেই পালতোলা নৌকা নিয়ে হাজির। একদিন মাগরিব নামাজের পর আমরা সবাই মিলে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আসার সময় অতিথি বলেন “ইহা আমার জীবন মরন তরী”। গভীর সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের সাথে পালতোলা নৌকা সারা রাত যুদ্ধ করে ফজরের আযানের আগে বাংলাদেশে পৌছি এবং টেকনাফ ফরেষ্ট রেষ্ট হাউসে আসি। আবার গরম পানিতে গোসল শেষে রেষ্ট হাউজে জমাকৃত পত্রিকায় চোখ ভোলান।
এমনি করে আরও দুইদিন কেটে গেল। রাত নয়টার দিকে ড্রাইভার আবুল বশর ফরেষ্ট ডিপার্টমেন্টের গাড়ি নিয়ে এসে অতিথি ও আমাদের সহ ইনানী রেষ্ট হাউসে নিয়ে যায়। অতিথির জন্য সেলাই করা নতুন জামা ও নতুন লুঙ্গি পাঠিয়ে দেন জনাব রওশন আলী সাহেব। ইনানী ফরেষ্ট রেষ্ট হাউজে প্রায় ১০-১২ দিনের মত অবস্থান করে। আমিও তাহাদের সাথে থাকতে থাকতে আমার আর স্কুলে যাওয়া হচ্ছেনা। সেখানে অতিথির সেবা করা আর সাথে সাথে সব সময় কাছে থাকা হচ্ছে আমার ডিউটি, আর ছকিনা নামে এক মহিলা অতিথির জন্য রেষ্ট হাউজের রান্না-বান্না করতেন, কাপড় চোপড় ধুয়া ও অন্যান্য সব ধরনের কাজ ও অতিথির গরম জল দেওয়া আর মাঝে মাঝে চা বানানো ছিল ছকিনার প্রধান কাজ । অতিথি ডাবের পানি বেশি পছন্দ করতেন, অন্যান্য পানি কম খেতেন, বেশির ভাগ ডাবের পানিই খেতেন। অতিথি প্রতিদিন প্রায় স্থানীয় মার্মাদের সাথে তাদের ঘরে যাওয়া আসা করতেন। সালেং প্র“ ও অংছেং প্র“ নামে দুইজন মার্মা এসে অতিথিকে তাদের পাড়ায় নিয়ে যেত। সেখানে মাঝেমধ্যে তাদের বাড়ীতে দুপুরের খাবার ও খেয়ে আসতেন। তাদের সাথে এভাবে মিশে গেছিল যে ওদেরকেও বুকে জড়িয়ে ধরতেন এবং প্রায় দুই কিলোমিটার হেটে তাদের বাড়ীতে যেতেন। একদিন অতিথি চাচা বোজুরুজ মেহের কে বলেন রজু খালে একটা বড় সাম্পান আছে তার মাঝিকে খবর দাও। চাচা আমাকে ডেকে বলেন রজু খালের ভেতর যে সাম্পান দেখা যাবে সেই সাম্পানের মাঝিকে ডাক, নাম ইসলাম মাঝি এবং বন্দুক কাশেম ও শুক্কুর আলী নামে আরও দুইজন উপস্থিত ছিল। তখন অতিথি তাদের পেয়ে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং আনন্দ উৎসবের মধ্যে সবার জন্য ভাল খাবারের ব্যবস্থা করেন। আমার চাচাকেও তাহাদের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক অতিথির সাথে সাথে থাকার জন্য টেকনাফ থেকে ইনানীতে বদলি করেন। তিনি ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী এবং কুস্তি ও ক্যারাত খেলায় ছিল বাংলাদেশের সেরা। পরে চাচাকে বডি গার্ড হিসেবে সবসময় সাথে রাখতেন এবং ফরিদপুর থেকে কৃষ্ণা নামে এক হিন্দু মেয়েকে বিবাহ পড়িয়ে দেন বর্তমানে তার নাম মোস্তাফা খানম। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সময় তিনি ছিলেন গ্রামের বাড়ী ফরিদপুরে তখন হয়তো ঢাকায় থাকলে তিনিও মারা যেত। 
আমি গ্রামের বাড়ী বাঁশখালীতে চলে আসি। চাচা যখন টেকনাফ থেকে বদলি হয়ে আসে ইনানিতে তখন আমাকে গ্রামের বাড়ী বাঁশখালীতে চলে আসতে হয়েছে। ১৯৬৮/এপ্রিল মাসের দিকে টৈইটং হাই স্কুলে ভর্তি হই। সেখানেও রীতিমত স্কুলে যাওয়ার পর হঠাৎ একদিন আমি স্কুল থেকে এসে দেখি কক্সবাজার হইতে আমার বাবা ও চাচা বোজুরুজ মেহের গ্রামের বাড়ীতে এসে তড়িঘড়ি করে ভাল রান্নাবান্নার আয়োজনের ব্যস্ত আছেন। আমাদের কাচারী ঘরে দেখি, অতিথি আমাদের ঘরে এসেছেন। দেখে আমার মনে খুব আনন্দ লাগল, এমন মহান মহানুবতার স্যার যার মনে কোন হিংসা বা গৌরব কোন কিছুই পাইনি। কি জানি যদি সেই বার্মার মত আবার কোথাও বেড়াতে যেতে পারি মনে অনেক ইচ্ছে জমা হতে শুরু করেছে। উনাকে কাছ থেকে আরও ভাল করে কাছে গিয়ে দেখতে শুরু করলাম। অতিথির কথা গুলি ছিল খুব মিষ্ট ভাষায় আর অনুকরন করার মত। ইসলাম মাঝি, বন্দুক কাসেম সহ আমাদের ঘরে রাতের খাওয়া দাওয়া করে অনেক রাত পর্যন্ত আলাপ আলোচনা করে রাতে ঘুমিয়ে পড়েন। পরদিন ভোর হল গ্রামের বাড়ীতে পুকুর দেখে অতিথি পুকুরে নেমে গোসল করেন মনের আনন্দে এবং বলেন “আজ অনেক দিন পর মনের তৃপ্তি মত গোসল করলাম”। অথচ উনি গরম জল ছাড়া একদিনও গোসল করেননি। গোসল শেষে সকালের নাস্তা করার পর বাবা আমাকে বলেন, এই পত্রটা মৌলভী সৈয়দের বাড়ীতে পৌছে দিয়ে আস। আমি সোজা পত্রটা নিয়ে তাহার বাড়ীতে গিয়ে দেখি উনি নেই পরে উনার ভাইকে দিয়ে আসলাম। বাড়ীতে এসে জনাব আতাউর রহমান কাউছার সাহেবকে দেখতে পেলাম। পরে সন্ধ্যা আবার আমাদের বাড়ীতে খাওয়া দাওয়া করার পর স্থান পরিবর্তন করেন।  ঘনঘন স্থান পরিবর্তন করেন অতিথি সাহেব। পরদিন মৌলভী সৈয়দ ও আতাউর রহমান কাউছার সহ টৈটং ফরেষ্ট অফিসের সন্নিকটে আতাউর রহমান খানের বাংলোয় আসলাম। মাঝি সহ উপস্থিত থাকেন ঐ বাংলোত কিছুদিন অপেক্ষা করেন। সেখানে বুজুরুজ মেহের আমার চাচা কাসেম গার্ডকে নির্দেশ দেন আতাউর রহমান ভাই এর বাংলোতে একজন অফিসার আসিয়াছেন আপনি আপনাদের সরকারী বন্দুক নিয়ে উনার নিরাপত্তা দিবেন যেন কোন প্রকার অসুবিধা না হয়। ভাই হিসেবে এটা আমার অনুরোধ। পরে ওখানেও ৫/৬ দিন ছিলেন এবং মৌলভী সৈয়দ সাহেবের এর ব্যবস্থাপনায় সেখানে আতিতিয়তার ব্যবস্থা করা হয়। সব ষ্টাফরা অতিথির সুবিধা অসুবিধার দিক খেয়াল রাখেন এবং আঃ মজিদ নামে একজন বাংলো চৌকিদার ছিলেন সে অতিথির রান্না বান্না কাপড় চোপড় ধোয়াসহ সব ধরনের কাজ করতেন। বাংলোর পাশে একটা ছোট ঘরে থাকতেন।
পরে জানিতে পারি যে, অতিথি একদিন টৈটং থাকা অবস্থায় পত্রিকা পড়ে খুব খুশি মনে সবাইকে ডাকতে বললেন। জনাব আতাউর রহমান কাউছার সাহবে, ফরেষ্ট গার্ড বোজুরুজ মেহের, নূরুল হুদা, ওমর আলী, ইসলাম মাঝি,  বন্দুক কাসেম, শুক্কুর আলী, মৌলভী হাসান শরিফ, জহুরুল আলম সওদাগর, কেরানী ছালে আহম্মদ, মাষ্টার মৌলভী সৈয়দ সবাই খুশি মনে আনন্দ উৎসবের মাধ্যমে সেই মুহূর্তে অতিথি সবাইকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন এতদিন এত খাল নদী পাহাড় পাড়ি দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার পর অতিথি নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন- “আমার নাম শেখ মুজিবুর রহমান, আমাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আমার নামও মামলায় জড়িত করেন। তাই আমি মান  সম্মানের কারনে আতাউর রহমান খান এর সহযোগিতায় হাতিয়া তমুরুদ্দিন বাজার হইতে বড় লবনের সাম্পানে করে কুতুবদিয়া চ্যানেল হয়ে রাজাখালীর ভোলা গ্রামে আতাউর এর বাংলোয় উঠি তারপর এই জেলার বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করিয়া থাকি। বর্তমানে আমি মামলা  হইতে নির্দোষ খালাস পেয়েছি। এখন আমি মুক্ত আমার আর কোন অসুবিধা নেই। আমি আবার আমার গন্তব্য স্থান ঢাকায় চলিয়া যাইতেছি”।
এই বলিয়া সবার নিকট হইতে বিদায় নিলেন। তখন ও জানতামনা যে আমাদের মাঝে এতদিন এতবড় একজন দেশ প্রেমিক বড় নেতা ছিল এবং বিদায় নিচ্ছেন। যাবার সময় আবারও সবাইকে উদ্দেশ্য করিয়া বলেন “আমি তোমাদের সবাইকে অনেক কষ্ট দিয়েছি মনে কোন কষ্ট বা দুখঃ নিওনা ” এই বলে সবার সাথে এক এক করে হাত মিলিয়ে জনাব শেখ মুজিবুর রহমান জনাব আতাউর রহমান কাউছার সাহেব সহ সাম্পানে উঠিয়া পড়েন। ইসলাম মাঝির সাম্পানে উঠিয়া হাল ছাড়ার পর  আবারও সবার উদ্দেশ্যে সাম্পানের উপর হতে হাত নেড়ে বিদায় জানান।
এরপর দেশে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে আমি তখন ইলিশিয়া জমিলা বেগম হাই স্কুলে ৮ম শ্রেণীতে ভর্তি হলাম। কিছুদিন পর বাড়িতে এসে জানিতে পারিলাম যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমান বাংলাদেশে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমে কক্সবাজার পরিদর্শনে আসেন। জেলা প্রশাসক, কক্সবাজার কে নির্দেশ দেন আমি আত্মগোপন থাকা কালিন যারা আমার সেবা সাহায্য সহযোগিতা করেছিল তাহাদে সবাইকে কক্সবাজার রেষ্ট হাউজে উপস্থিত থাকার জন্য বলা হউক। আমরা কক্সবাজার জেলা প্রশাসকের নির্দেশ মত সবাই রেষ্ট হাউজে উপস্থিত হলাম। এবং এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হইল। আমাদের সবাইকে মাইকের মাধ্যমে নাম ডেকে মঞ্চে উঠানো  হইল।
১। আবুল কাশেম, ২। বশার ডাইভার, কক্সবাজার বন বিভাগ। ৩। রওশন আলী চৌধুরী (অনুপস্থিত) ৩। বোরুজ মেহের, বন প্রহরী (আমার চাচা) ৪। ওমর মিয়া, মুহুরী (আমার বাবা) ৫। সালেং প্র“ মার্মা ৬। অংসেং প্র“ মার্মা ৭। ছকিনা বেগম ৮। নূরুল হুদা ৯। ইসলাম মাঝি ১০। বন্দুক কাসেম ১১। মৌলভী নুরুজ্জামান (বার্মার)
আমরা সকলে এক এক করে মঞ্চে উঠলাম তারপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন তোমরা আমার কাছে মুক্তিযুদ্ধা, বীরউত্তম বীর পুরুষ এরকম উপাধি দিলেও হবেনা। তোমরা আমার কাছে তার চেয়েও বড়,  মাইকে বীর বাহাদুর ঘোষনা করে আমাদের সবাইকে। আমি আমার কঠিন সময়ে তোমাদের সহযোগিতা পেয়েছি যা আমি জীবনেও ভুলতে পারিবনা। আমাদের সবাইকে এক হাজার টাকা করে সম্মানী ভাতা দিয়ে এক এক করে সবার কাছ থেকে জিজ্ঞেষ করেন তোমাদের কারো কোন সমস্যা আছে কিনা বল আমি তা পুরন করব, বল আমি তোমাদের কি সাহায্য করিতে পারি।
আবুল বশর, ড্রাইভার দাঁড়াইয়া বলিলেন হুজুর আমার কক্সবাজারে ছেলেমেয়ে নিয়ে থাকার কোন জায়গা নেই। আমাকে দয়া করিয়া কিছু জায়গা দিলে ভাল হয়। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জেলা প্রশাসক কক্সবাজারকে নির্দেশ দিলেন, সরকারী পরিতক্ত জায়গা কোথায় আছে দেখে আমার কাছে প্রতিবেদন দাখিল কর। বার্মার মৌলভী নুরুজ্জামান দাাঁড়িয়ে বলেন হুজুর আমার সৌদি আরব যাওয়ার ইচ্ছা, তখন জেলা প্রশাসক কে নির্দেশ দিলেন মৌলভী নুরুজ্জামানকে সৌদিআরব যাওয়ার ব্যবস্থা করে আমাকে অবহিত করবে। পরে অন্যান্য সবাইকে আশ্বাস দিলেন আপনাদের কোন সমস্যা হলে আপনাদের সূখে দুঃখে আমি সব সময় পাশে থাকব। এই বলে আমন্ত্রিত অতিথি আমাদের সবার সাথে হাত মিলিয়ে উক্ত সভা ও পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠান শেষ করে আমাদের সবাইকে রেষ্ট হাউসে একসাথে খাওয়ার কথা বলে মঞ্চ ত্যাগ করেন। পরে আমরা সবাই রেষ্ট হাউসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে খাবার খাওয়ার পর সবাই বিদায় নিলাম।
কিছু দিন পর বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন করার জন্য রাঙ্গামাটি গমন করেন। খবর পেয়ে আমি ও বাবা উমর আলী সহ বেতবুনিয়া যাই। সেখানে বন বিভাগের কর্মকর্তা জনাব রওশন আলী সাহেবের বাংলোতে এক রাত থেকে পরদিন জনাব রওশন আলী স্যার সহ  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর সাথে যোগাযোগ করি এবং আমার বাবা বলেন হুজুর আমার ছেলে নুরুল হুদাকে যদি একটা সরকারী চাকুরী দেন ভাল হয়। তখন তিনি বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জনাব রওশন আলী স্যারকে নির্দেশ দেন আমাকে যেন ফরেষ্ট গার্ড হিসাবে চাকুরী দেন। তার পরদিন আমাকে রাঙ্গামাটি দুধছড়ি রেঞ্জের অধীন কচুছড়ি বিটে ফরেষ্ট গার্ড় হিসাবে চাকুরী দেন । জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মারা যাওয়ার পর আমার ম্যালেরিয়া রোগ হয়ে রাঙ্গামাটি সরকারী হাসপাতালে ভর্তি হই এবং ডাক্তারের পরামর্শে বাড়ীতে এসে বিশ্রামে থাকি পরে রাঙ্গামাটি গিয়ে দেখি আমার চাকুরী চলে যায় এবং গ্রামে ও আমি রাজনীতি প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়ি এবং গোপনে ড্রাইভারি শিখতে থাকি। পরে যখন জানিতে পারিলাম যে, বন বিভাগে ড্রাইভার পদে লোক নিয়োগ করিতেছে। অনেক খুজাখুজি করে জনাব রওসন আলী স্যারের সাথে ঢাকায় যোগাযোগ করি এবং উনার সুপারিশে চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক জনাব আব্দুল বাতেন সাহেব আমাকে চট্টগ্রাম অঞ্চলে  গাড়ী চালক পদে চাকুরী দেন। বর্তমানে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগে নিয়োজিত আছি। আমাদের সহ কর্মচারী জনাব আজিজুল হক আলম এর উৎসাহ ও সহযোগীতায় আমি আমার শৈশব লেখার আগ্রহ প্রকাশ করি।

লেখক : কবিয়াল নুরুল হুদা
সাধারণ সম্পাদক
বাংলাদেশ কবিয়াল সমিত।