Wednesday, June 18, 2014

পতনের আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত বাগদাদ

ইরাকের রাজধানী বাগদাদ থেকে মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে দিয়ালা প্রদেশের রাজধানী বাকুবা শহরে অবস্থান করছে সুন্নি জঙ্গিরা। জঙ্গিদের নাটকীয় সাফল্যে বাগদাদ পতনের আশঙ্কায় রাজধানীবাসীর মধ্যে ভীতি নেমে এসেছে।

>>ইরাকের সুন্নি জঙ্গিরা একের পর এক শহর দখল করে রাজধানী বাগদাদের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ছবি: এএফপি
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটির কয়েকটি অংশ ইতিমধ্যে বিদ্রোহীদের দখলে চলে গেছে। বাকুবার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বিদ্রোহীদের হাতে চলে গেলে তারা সহজেই মহাসড়ক ধরে রাজধানী বাগদাদে পৌঁছে যেতে পারবে।

বিবিসি অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাগদাদ পতনের আশঙ্কায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাদ্য ও পানি মজুত করা শুরু করেছেন রাজধানীবাসী। চাহিদা বেড়ে যাওয়া বিভিন্ন সামগ্রীর দামও হঠাত্ করে বেড়ে গেছে। খাদ্য সংগ্রহের পাশাপাশি বাগদাদের বাসিন্দারা নিজেদের মানসিকভাবেও প্রস্তুত করছেন।

বাগদাদের দিকে অগ্রসর হওয়ার পথে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে জঙ্গিদের তুমুল লড়াইয়ের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসের কর্মীদের নিরাপত্তায় ৩০০ সেনাসদস্যের একটি দল ইরাকে পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।

এদিকে জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে ব্যর্থতার অভিযোগে দেশটির চারজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করেছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকি। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় ঐক্যেরও ডাক দিয়েছেন।

সুন্নি জঙ্গিরা ইতিমধ্যে ইরাকের উত্তরাঞ্চলীয় নিনেভেহ প্রদেশের শিয়া-অধ্যুষিত শহর তাল আফারের অধিকাংশ এলাকার দখল নিয়েছে। প্রাদেশিক পরিষদের উপপ্রধান নুরিদ্দিন কাবালান গতকাল মঙ্গলবার বলেন, জঙ্গিরা তাল আফারসহ আশপাশের কিছু এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে কেবল বিমানবন্দর এলাকা।

জঙ্গিরা মসুল ও তিকরিত শহরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি বাগদাদ অভিমুখে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। বাকুবা শহরের কয়েকটি অংশ বিদ্রোহীদের দখলে চলে গেছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনী শহর নিজেদের দখলে থাকার দাবি করেছে।

বাগদাদের উত্তরাঞ্চলে সেনাবাহিনী ও জঙ্গিদের মধ্যে কয়েক দিন ধরে লড়াই চলছে। বাগদাদের পশ্চিমে আনবার প্রদেশের ফালুজা শহরের কাছে সুন্নি জঙ্গিরা গুলি করে একটি সরকারি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে। তারা দাবি করছে, সেখানে সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি ট্যাংক ধ্বংস করা হয়েছে। এ ছাড়া প্রাদেশিক রাজধানী রামাদির কাছে একটি সামরিক ঘাঁটি থেকে সেনারা পালিয়ে গেছে।

যে কারনে ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের সেক্স অনেক গভীর- যৌনতা নিয়ে মার্কিন তরুণী মনোভাব

প্রচণ্ড আবেগের সঙ্গে কাজটি না করা গেলে একদম ভালো লাগে না’, এভাবে যৌনতা নিয়ে নিজের মনোভাব প্রকাশ করলেন ২৪ বছরের এক মার্কিন তরুণী। মূলত ছেলেদের চেয়ে মেয়েদের কাছে সেক্স অনেক গভীর আবেদনের এবং আবেগময় বিষয়। এর পেছনের কারণ উদ্ভাবনের চেষ্টা করেছেন গবেষকরা।

সম্পর্কের বাঁধন

নরের সঙ্গে নারীর সম্পর্কের নানা স্তর রয়েছে। সম্পর্কের দীর্ঘসূত্রিতা নির্ভর করে তাদের মধ্যকার নানা আবেগীয় লেনদেনের ওপর। নারী তার সঙ্গীর প্রতি চরমভাবে দুর্বল হয়ে তাকে নিজের জীবনের অংশ করতে যৌনতায় লিপ্ত হয়। নিজের কামনা বাসনা এবং যাবতীয় সবকিছু নারী উজাড় করে দেয় সঙ্গীর কাছে। কিন্তু নতুন পুরুষের কাছে নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকেন নারীরা। তাই একেবারে আপন করে নিতেই নারীরা সঙ্গম করেন।

সম্পর্ক বিষয়ক সুসান কুলিয়াম বললেন, পশ্চিমে তত্ত্বীয়ভাবে যেকোনো নারী যেকোনো পুরুষের সঙ্গে সেক্স করতে পারেন। অনেকে তা করেন। কিন্তু আমরা এখনো জানিনা এই নারীদের কী দৃষ্টিভঙ্গীতে দেখা উচিত। নারীদের মধ্যে যৌন উত্তেজনা রয়েছে, তবে অতিমাত্রায় নয়। যার রয়েছে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। তবে একজন পুরুষকে ভালোবেসে তার সঙ্গে জুটি গড়ার ক্ষেত্রে যৌনতা উপভোগ্য হয়ে ওঠে নারীর কাছে।

মানসিক সুখ

নারীদের যৌনতার ব্যাপারে যদি সমাজ অনিশ্চিত থাকে, তবে নারীরা কিভাবে নিজেদের নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে নিরাপদ বোধ করবে? বহু মন্তব্য নারীদের যৌন আকাঙ্খাকে ভিন্ন দিকে পরিচালিত করে। নারীরা পুরুষদের শুধুমাত্র আপন করে নিতেই নয়, তার জৈবিক চাহিদার তৃপ্তিকর অনুভূতিও আশা করেন।

‘রিরাইটিং দ্য রুলস’ গ্রন্থের লেখক ও সম্পর্ক বিষয়ক থেরাপিস্ট মেগ বার্কার বলেন, যৌনতায় নারীরা দারুণ সুখ আশা করেন। কিন্তু বিছানায় পুরুষদের বেশি সতর্ক থাকতে হয় তৃপ্তিকর করতে। কারণ বর্তমান যুগে যৌনতায় নারীদের সুখই বেশি প্রাধান্য পায়।

যৌনতা এখন নারী কেন্দ্রিক

এক স্বাধীন যৌনকর্মী জানালেন, আমি সম্প্রতি খেয়াল করেছি, আমার কাছে যেসব পুরুষ আসেন তারা যেনো নিজেদের জন্য আসেন না, তারা আসেন আমাকে খুশী করতে। আজ থেকে বিশ বছর আগে যখন আমি আয়ারল্যান্ডে থাকতাম, তখন দেখেছি নারীরা সেক্স করতো পুরুষদের খুশি করার জন্য। কিন্তু এখন যৌনতা এখন নারীকেন্দ্রিক হয়ে গেছে।

সুসান কুলিয়ামও এ বিষয়ে একমত। তিনি বললেন, যৌনতা এখন মেয়েদের গেম হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো স্রেফ খেলা হিসেবে মনে করে না নারীরা।

বার্কার বলেন, আমরা এখনো যৌনতা নিয়ে খুব হালকাভাবে জানি। গত বছর এক জরিপে দেখা যায়, অনেক নারী তার যৌনসঙ্গীর সংখ্যা বাড়িয়েছে এবং আশঙ্কার বিষয় তারা যৌনতা নিয়ে নানা সমস্যায় রয়েছেন। আসলে মিডিয়ার কল্যাণে আমরা ভাবি সেক্স না জানি কতো মজার বিষয়। আসলে মেয়েদের কাছে সেক্স এমন এক বিষয় যেখানে মন-মানসিকতা চরম পর্যায়ে থাকে। এটা সম্পর্ক এবং সুখের গভীরতম এক প্রক্রিয়া।

যৌনতা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গী
এ বিষয়ে নারী-পুরুষের সামান্য ভুল ধারণা অনেক সমস্যা বয়ে আনতে পারে। অনেকেই সেক্স সম্পর্কে সামান্য জেনে এবং অনিশ্চয়তা নিয়ে এ কাজে জড়িয়ে পড়েন। আর এ সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনাতেও অভ্যস্ত নন অনেকে। তবুও এ কাজ করতে গেলে যদি সমস্যা মনে করে থাকলে অনেকে বন্ধুদের সঙ্গে আলাপ করেন। এ ধরনের সমস্যা নারীদের খুব বাজে মানসিক অবস্থা তৈরি করে দেয়। কিন্তু পুরুষদের কাছে তেমন সমস্যা নয়। তাদের যেনো তাগিদ থাকে নারীকে সুখী করা। কিন্তু নারীদের কাছে সম্পর্কের গভীরতা এবং দৈহিক আনন্দের চরম উৎকর্ষতা।

জয়ললিতার দুর্নীতির মামলা ফের শুরু হচ্ছে

জয়ললিতা
ভারতের তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী জয়ললিতার বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতির মামলার শুনানি বেঙ্গালুরুর একটি আদালতে আবার শুরু হতে যাচ্ছে৷ সুপ্রিম কোর্ট গতকাল মঙ্গলবার জয়ললিতার একটি আবেদন খারিজ করে দেন৷ খবর এনডিটিভির৷ মে মাসে জয়ললিতার একটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৬ জুন পর্যন্ত এই মামলার শুনানি স্থগিত করেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট৷ পরে স্থগিতের মেয়াদ বাড়িয়ে ১৬ জুন পর্যন্ত করা হয়৷ অবশেষে শুনানির জন্য গত সোমবার মামলাটি বিচারপতি বিক্রমজিৎ সেন ও শ্রীভা কীর্তি সিংয়ের অবকাশকালীন বেঞ্চে তোলা হয়৷
জয়ললিতার আইনজীবী চেয়েছিলেন, মুখ্যমন্ত্রী নিম্ন আদালতে জবাব না দেওয়া পর্যন্ত শুনানির স্থগিতাদেশ অব্যাহত রাখা হোক৷ কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট তা প্রত্যাখ্যান করেন৷ তামিলনাড়ুর তদন্তকারীরা গতকাল সুপ্রিম কোর্টে বলেন, মুখ্যমন্ত্রী অন্যায়ভাবে শুনানির তারিখ পেছানোর চেষ্টা করছেন৷ জয়ললিতা তামিলনাড়ুতে ন্যায়বিচার পাবেন না—এই আশঙ্কা থেকে তাঁর আইনজীবীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৩ সালে মামলাটি চেন্নাই থেকে বেঙ্গালুরুতে স্থানান্তর করা হয়৷

উইলিয়াম রানির চেয়েও জনপ্রিয়

প্রিন্স উইলিয়াম
প্রিন্স উইলিয়াম যুক্তরাজ্যের রাজপরিবারের সবচেয়ে জনপ্রিয় সদস্য৷ জনগণের কাছে তাঁর দাদি রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ, ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকার বাবা প্রিন্স চার্লসের চেয়ে জনপ্রিয়৷ একটি জনমত জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে৷ খবর রয়টার্সের৷ কমরেস নামের একটি প্রতিষ্ঠান ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকার জন্য যুক্তরাজ্যের দুই হাজার নাগরিকের ওপর ওই জরিপ চালায়। গত রোববার প্রকাশিত ওই জরিপের ফলে দেখা যায়, রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনসহ দেশের যেকোনো রাজনীতিকের চেয়ে রাজপরিবারের সদস্যরা বেশি জনপ্রিয়।
জরিপে ৬৮ শতাংশ মানুষ প্রিন্স উইলিয়ামকে তাঁদের পছন্দ বলে জানান৷ ৬৩ শতাংশ মানুষ রানিকে, ৪৩ শতাংশ চালর্সকে এবং ২৮ শতাংশ ক্যামেরনকে পছন্দ করেন৷ জরিপটি ১১-১৩ জুনের মধ্যে পরিচালিত হয়৷ আগের জরিপগুলোতেও রাজপরিবারে প্রিন্স উইলিয়াম সবচেয়ে জনপ্রিয় সদস্য বলে উঠে এসেছিল৷ তাঁর স্ত্রী কেট গত বছর পুত্রসন্তানের জন্ম দিলে বিশ্ব গণমাধ্যমে সাড়া পড়ে যায়। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ (৮৮) ১৯৫২ সাল থেকে যুক্তরাজ্যের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত৷ স্পেনের রাজা হুয়ান কার্লোসের মতো তিনি সিংহাসন ছেড়ে দিলে ৬৫ বছর বয়সী চার্লস হবেন ব্রিটেনের পরবর্তী রাজা। এরপর আছেন ৩১ বছর বয়সী উইলিয়াম।

অস্ত্রোপচারকালেও কণ্ঠে গান!

আলামা কঁতে
সম্মোহিত করে তাঁর গলায় অস্ত্রোপচার করা হচ্ছিল৷ এ সময় তাঁর স্বরতন্ত্রীর যাতে কোনো ক্ষতি না হয়, সে জন্য তিনি গান গেয়েছিলেন৷ আফ্রিকার ঐতিহ্যবাহী সংগীতের পেশাদার গায়িকা আলামা কঁতে গত সোমবার তাঁর গৃলার অস্ত্রোপচার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে এ কথা জানান৷ খবর রয়টার্সের৷ ফ্রান্সে গত এপ্রিলে আলামার গলায় ওই অস্ত্রোপচার হয়েছিল৷ এখন তিনি সম্পূর্ণ সেরে উঠেছেন৷ তিনি বলেন, ‘অস্ত্রোপচারের সময় গান গাওয়ার ঘটনাটি আমার এখনো মনে পড়ে৷ সারা মাথায় তখন আমার কণ্ঠস্বর ছড়িয়ে পড়ছিল৷’ আফ্রিকার দেশ গিনির শিল্পী আলামা এখন ফ্রান্সের বাসিন্দা৷
তাঁর থাইরয়েড গ্রন্থির কোষ বৃদ্ধির ফলে ক্যানসারের ঝুঁকি দেখা দিয়েছিল৷ তাই চিকিৎসকেরা সেটি অপসারণের সিদ্ধান্ত নেন৷ গলায় একটি নল স্থাপন করে এ ধরনের অস্ত্রোপচারে সাধারণত অনুভূতিনাশক ব্যবহার করা হয়৷ কিন্তু এতে স্বরতন্ত্রী বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে আলামার গান গাওয়ার ক্ষমতা চিরতরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল৷ তাই তাঁকে সজাগ রেখে সম্মোহনবিদ্যা প্রয়োগ করে অস্ত্রোপচার করার সিদ্ধান্ত নেন প্যারিসের উপকণ্ঠে অবস্থিত অঁরি-মঁদো দো ক্রেতাই হাসপাতালের চিকিৎসক গিল দনিউ৷ তিনি বলেন, সজাগ রেখে এ ধরনের অস্ত্রোপচার করা হলে রোগীকে প্রচণ্ড ব্যথা সইতে হয়৷ কেবল সম্মোহনবিদ্যা প্রয়োগ করেই সেই যন্ত্রণা কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যায়৷ আলামাকে আগেই বলা হয়েছিল, অস্ত্রোপচারের সময় তাঁকে অনেকটা প্রসববেদনার মতো যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে৷ তিনি তাই সে সময় সেই গানটি গাইলেন, ‘লড়াই করো, কখনো হাল ছেড়ে দিয়ো না৷’ আলামা বলেন, সেই মুহূর্তে খুব ব্যথা পেয়েছিলেন৷ তবে পরে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়৷ তখন মনে হয়, ব্যাপারটা যেন স্বপ্ন ছিল৷

২৪ ঘণ্টার মধ্যে মোদির বাসভবন ঘেরাও

আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির বিদ্যুৎ ও পানি সংকটের সমাধান না হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাসভবন ঘেরাও করার হুমকি দিয়েছে কংগ্রেস। মঙ্গলবার সকালে দিল্লিতে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অরবিন্দ সিং লাভলি, প্রবীণ নেতা জগদীশ টাইটলার ও মুকেশ শর্মার নেতৃত্বে বিক্ষোভ করেন কংগ্রেস কর্মীরা। পতপারগঞ্জ ও দিলশাদ গার্ডেন এলাকায় পোড়ানো হয় বিজেপি ও আম আদমি পার্টির নেতাদের কুশপুত্তলিকা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে কংগ্রেস কর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। বেশ কয়েক ঘণ্টা রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান কংগ্রেস নেতারা।
দিল্লি প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির মুখপাত্র মুকেশ শর্মা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় সরকারকে চরম হুশিয়ারি দেয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ সংকট না কাটলে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ঘেরাও করা হবে।’ কংগ্রেসের অভিযোগ, বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর সঙ্গে আঁতাত রয়েছে বিজেপি-আপের। বেসরকারি বিদ্যুৎ সংস্থাগুলোর প্রতি নরম মনোভাব পোষণ করে বিজেপি সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার নির্বাচনী বক্তব্যে আট বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার ঘোষণা দেন। অথচ ক্ষমতায় আসার পর খোদ রাজধানী দিল্লিতে ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। বিদ্যুতের ঘাটতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে মোদি সরকার। টাইমস অব ইন্ডিয়া।

কুর্মিটোলা ক্যাম্পের কয়লা

তখন বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায়। জামায়াতে ইসলামী একটি পাকিস্তানপন্থী দল। তাদের সময় বিদ্যুতের বকেয়া বিল পরিশোধ না করায় মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্পের বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তখন চৈত্র-বৈশাখ মাস। কয়েক দিন বিদ্যুৎ না থাকায় অতি গরমে ক্যাম্পের জনা দুই মানুষ মারা যান। কাগজে খবর দেখে আমি ক্যাম্পের সামনে রাস্তায় মাদুর বিছিয়ে বসে ‘সত্যাগ্রহ’ করি। আমার হাতে একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল: ক্যাম্পে বিদ্যুৎ-সংযোগ না দেওয়া পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘট চলবে। সেদিন আমার কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করতে সেখানে গিয়ে বসেছিলেন জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর (বর্তমানে সংস্কৃতিমন্ত্রী), সিপিবির নেতা রুহিন হোসেন প্রিন্স, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস, গ্রিন ভয়েসের আলমগীর কবিরসহ নাগরিক উদ্যোগ, বাপা প্রভৃতি সংগঠনের কর্মীরা। বিকেলে সরকারি লোকেরা এসে বিদ্যুৎ-সংযোগ পুনঃস্থাপন করলে কর্মসূচি শেষ করি। জেনেভা ক্যাম্পের যারা বাসিন্দা তারা কারা? তাদের প্রাথমিক পরিচয় ছিল আটকে পড়া পাকিস্তানি। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা তাদের সেই পরিচয়েই জানেন। বাঙালিরা তাদের নাম দিয়েছে বিহারি। একাত্তরের আগে আমরা সবাই ছিলাম নাগরিকত্বে পাকিস্তানি, জাতিতে কেউ ছিলাম বাঙালি, কেউ গারো, কেউ চাকমা, কেউ বিহারি প্রভৃতি। সাতচল্লিশে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সময় পূর্ব বাংলা থেকে লাখ লাখ হিন্দু তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে চলে যায়, ভারত থেকে বাঙালি ও অবাঙালি মুসলমানরা পূর্ব পাকিস্তানে আসে বা পশ্চিম পাকিস্তানে যায়। ভারত থেকে উর্দুভাষী যারা আসে, তাদের গয়রহ নাম দেওয়া হয় বিহারি। যদিও তারা সবাই বিহারি নয়, বিহারের অধিবাসীও ছিল না। বিহারি একটি জাতিসত্তা। তারা সবাই মুসলমানও নয়, উর্দুভাষীও নয়।
ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ, সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণ, লালু প্রসাদ যাদব বিহারি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যেসব বাঙালি মুসলমান পূর্ব বাংলায় আসে, তারা এখানকার বাঙালিদের সঙ্গে মিশে যায়। উর্দুভাষীরা তাদের ভাষা ও জাতিসত্তার কারণে সেভাবে মিশতে পারেনি। তাদের ডাকনাম হয়ে যায় বিহারি, যদিও তাদের অনেকে এসেছে উত্তর প্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশ থেকে। কোন রাজনীতির শিকার হয়ে বাংলাদেশের হিন্দুরা ভারতে চলে যায় এবং ভারতের মুসলমানরা মোহাজের হয়ে পাকিস্তানে আসে, সে এক দীর্ঘ ও বেদনাবিধুর ইতিহাস। এখানে এসে পাকিস্তানকেই উর্দুভাষীরা তাদের দেশ হিসেবে ভাবতে থাকে, যদিও পাকিস্তান তাদের তার নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেনি। এ কথা অনেকেই জানেন না, উর্দুভাষী ভারতীয়দের পাকিস্তান সরকার জাতীয়তায় ‘পাকিস্তানি’ বলে স্বীকৃতি না দিয়ে কাগজপত্রে তাদের লিখত Domiciled—স্থায়ীভাবে নির্বাসিত, যার অর্থ পূর্ব পাকিস্তান তাদের বাসস্থান, তবে তারা পাকিস্তানি নাগরিক নয়। চব্বিশ বছর পরে যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়, অল্প ব্যতিক্রম বাদে উর্দুভাষীরা পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে। তাদের কেউ কেউ পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকার আলবদরদের সঙ্গে গণহত্যায় সহযোগিতা করে। স্বাধীনতার পরে অনেকেই উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভয়ে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার অপশন দেয় বা ইচ্ছা প্রকাশ করে। পাকিস্তান সরকার তাদের গ্রহণে অনিচ্ছা প্রকাশ করায় তারা আটকে পড়ে। ১৯৪৭-এর পর থেকে তারা রাষ্ট্রহীন মানুষ: তাদের বাসস্থান আছে—দেশ নেই। গত শনিবার পল্লবীর কুর্মিটোলা উর্দুভাষীদের ক্যাম্পে যে ১০ জন আগুনে পুড়ে কয়লা হয়েছে, কালশী কবরস্থানে রোববার মধ্যরাতে যাদের কবরস্থ করা হয়েছে, ফেরেশতারা যখন তাদের জিজ্ঞেস করবেন—তোমাদের দেশ কী? শিশুদের কয়লাগুলো থাকবে নিরুত্তর। ৪০ বছর বয়সী বেবী আকতার বলবেন, আমাদের কোনো দেশ নেই, আমার বাবা-মারও দেশ ছিল না, পৃথিবী নামক গ্রহে আমরা বাস করতাম ৮ ফুট বাই ৮ ফুট ঘরে ১০ জন। ওই ৬৪ বর্গফুট জায়গাও আমাদের নয়—পরের জায়গা পরের জমি। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ যাঁরা মাঝে মাঝেই চুটিয়ে বাজান, তাঁরা মনোযোগ দিয়ে শোনেননি ওতে তিনি দেশবাসীর উদ্দেশে কী বলেছেন। তাঁর ওই ভাষণে একটি কথা আছে: ‘এই বাংলায়—বাঙালি, অবাঙালি যারা আছে, তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদের ওপর, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক বলে যাঁরা নিজেদের দাবি করেন, তাঁরা বদনামের পরোয়া করেন না। তাঁরা হিন্দুদের জোতজমি দখল করতে দ্বিধা করেন না, উর্দুভাষীদের বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান দখল করতে সংকোচ বোধ করেন না। তাঁদের কাছে ধর্মীয়, ভাষাগত ও জাতিগত সংখ্যালঘুরা নিরাপদ নয়। এমনকি ঘরের মধ্যে তালা লাগিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারতেও তাঁদের বুক কাঁপে না। তাঁদের জমি চাই। সে জমি নদীর তীর হতে পারে, পাহাড়ের পাদদেশ হতে পারে, বনভূমি হতে পারে, হিন্দুদের হতে পারে, বৌদ্ধদের হতে পারে, বিহারির হতে পারে,
সাঁওতাল-হাজং-চাকমাদের হতে পারে। স্বাধীনতার আগে একবার আতাউর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ ও ন্যাপ নেতার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও ত্রাণকাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ হয়েছিল। ১৯৬৯-এর শেষ দিকে মোহাম্মদপুরে বাঙালি-অবাঙালির মধ্যে গোলযোগ বাধে। সেটা থামাতে তাঁরা সেখানে যান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় কয়েকটি দিন বিরামহীন কাজ করেন। আমাদের মতো তরুণেরা তাঁদের সঙ্গে ছিল। বাহাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে একদিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তলব আসে। সেখানে গেলে একজন কর্মকর্তা পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদের কামরায় নিয়ে যান। মন্ত্রী বললেন, ‘সিবিএস-এর (কলাম্বিয়া ব্রডকাস্টিং সিস্টেম) একদল সাংবাদিক এসেছেন। তাঁরা আটকে পড়া পাকিস্তানিদের সম্পর্কে প্রতিবেদন করবেন। কী করতে কী করেন, আমাদের একজন লোকও তাঁদের সঙ্গে থাকা দরকার।’ মন্ত্রী বলেন, ‘আমার সাক্ষাৎকার নিতে এসেছিল। আমি বলেছি আমাদের একজনকে তাঁদের সঙ্গে নিতে। আপনি তাঁদের সঙ্গে গেলে ভালো হয়।’ তখন ঢাকার অদূরে মুড়াপাড়ায় ছিল আটকে পড়া উর্দুভাষীদের সবচেয়ে বড় ক্যাম্প। আমি তাঁদের সঙ্গে তিন দিন মুড়াপাড়ায় ছিলাম। সে এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা। জাতিসংঘ তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়েছিল। দুবেলা তাদের জন্য প্রতিদিন ১১০ মণ চাল বরাদ্দ করা হতো। স্থানীয় নেতা-কর্মীরা তার বারো আনাই বিক্রি করে দিতেন। প্রতিদিন হাজার হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুকে এক হাতা পরিমাণ ভাত দেওয়া হতো। সিবিএসের সাংবাদিক একজনকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘এই যে দুপুরে একবার সামান্য ভাত খান, এতে কি আপনাদের চলে।’ তার জবাব ছিল, ‘এর বেশি আমাদের দরকার হয় না, আমরা যথেষ্ট পানি খাই।’ শুনে আমার চোখে পানি আসে। মুড়াপাড়া ক্যাম্পের পরিস্থিতি ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জানালে তাঁরা সেখানকার অবস্থা দেখতে এবং দুর্নীতি বন্ধ করতে ঢাকার কমিশনারকে পাঠান। খুব যে কাজের কাজ কিছু হয়েছিল মনে হয় না। কোনো জনগোষ্ঠী সম্পর্কে ঢালাও অপবাদ দেওয়া অপরাধ। সব উর্দুভাষীই বাঙালিবিরোধী নয়। একুশে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের ওপরে একজন উর্দু কবি একটি দীর্ঘ চমৎকার কবিতা লিখেছেন। আমাদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন কবি নওশাদ নূরী। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন। বঙ্গবন্ধুকে তিনি খুব পছন্দ করতেন, বঙ্গবন্ধুও তাঁকে ভালোবাসতেন। ছয় দফা সম্পর্কে তাঁর একটি কবিতার দুটি পঙ্ক্তি মনে আছে:
হামারি নাজাত, তুম্হারি নাজাত,
ছে নোকাত, ছে নোকাত।
[আমার মুক্তি, তোমার মুক্তি,
ছয় দফা, ছয় দফা।] ১৯৮৫-তে বিশ্ববিখ্যাত জার্মান ঔপন্যাসিক গুন্টার গ্রাস এসেছিলেন ঢাকায়। কয়েক দিন ছিলেন। শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, রশীদ করীমসহ অনেক কবি-লেখকের সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা হয়। আমার সঙ্গেও জার্মান রাষ্ট্রদূত ও গ্যেটে ইনস্টিটিউটের পরিচালকের বাসভবনে তাঁর কথা হয়। তিনি উর্দুভাষীদের ক্যাম্প ঘুরে দেখেন। তিনি জানতে চান, তাদের জীবন নিয়ে বাংলা ভাষায় কোনো উপন্যাস রচিত হয়েছে কি না? তাদের দুর্দশা ঘোচাতে বাঙালি কবি-লেখকেরা কী করেছেন ১৫ বছরে। আমরা ছিলাম লা-জওয়াব। শনিবার ১০ জন কয়লা হওয়ার কথা শুনে সন্ধ্যায় আমি মেডিকেল হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে যাই। রায়হানা নামের এক নারীর ৩০ শতাংশ পুড়ে গেছে। দেখলাম তিনি অচেতন। হাসপাতালে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও গিয়েছিলেন। শুনলাম, তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ১০ জন যে মারা গেছে তা ‘নিছক দুর্ঘটনা’—শুনে বড় কষ্ট পাই। রোববার আমরা নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে কয়েকজন—পঙ্কজ ভট্টাচার্য, রোবায়েত ফেরদৌস, প্রকৌশলী সরকার আমিন, আদিবাসী নেতা দীপায়ন খীসা ও আমি উর্দুভাষীদের বস্তিগুলোতে যাই। পুলিশের সঙ্গে কথা বলি, ক্ষতিগ্রস্ত লোকজনের সঙ্গেও কথা বলি। পুলিশের গুলিতে নিহত আজাদের মায়ের সঙ্গেও দেখা করি। বেশিক্ষণ তাঁর বিলাপ শোনা সম্ভব হয়নি। বাজি পোড়ানোর জন্য ১০ জন পুড়ে মরতে পারে না। কে বা কারা ঘটনা ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে, তা যতই ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা হোক, তা অতি পরিষ্কার। আমরা এমন এক রাষ্ট্রের নাগরিক, যেখানে ক্ষমতাবান একজনের সঙ্গে আগের দিন ‘কথা-কাটাকাটি’ হলে পরদিন ১০ জন পুড়ে কয়লা হয়। কোনো জায়গা থেকে বিদ্যুৎ টেনে নেওয়া স্রেফ চুরি। কলিম ছলিম বৈদ্যনাথ অবৈধ সংযোগ নিলে দণ্ডনীয় অপরাধ। সাংসদ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গরা নিলেও তা অবশ্যই চুরি ও অপরাধ। পুলিশের বেতন-ভাতা সরকারি দল ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতারা দেন না। প্রত্যেক সাধারণ নাগরিকের ট্যাক্সের টাকা থেকে দেওয়া হয়। সেখানকার লোকেরা আমাদের বলেছেন, সব পুলিশ সদস্য খারাপ আচরণ করেন না। কিন্তু কারও কারও কথাবার্তা,
ব্যবহার অবর্ণনীয় ইতরসুলভ। ক্যাম্পের বিক্ষুব্ধ মেয়েদের কোনো কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, তুই বস্তির বিহারি মাউরািন না। টানাহেঁচড়ায় অনেক যুবতীর কামিজ ছিঁড়ে গেছে। দেড় বছরের শিশু পুড়ে কয়লা হয়েছে। nনিহত নারীর একজন ছিলেন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা, আর একজন সাত মাসের। পৃথিবীতে আসার আগেই ভ্রূণ পুড়ে মরল। যে আড়াই-তিন লাখ উর্দুভাষী বাংলাদেশে বাস করছে, তাদের অধিকাংশেরই জন্ম স্বাধীনতার পরে। ঘরে তারা উর্দু বললেও বাংলা ভাষাতেই কথা বলে। তাদের ছেলেমেয়ে বাংলা স্কুলে পড়ে। এক রিট করে তারা ভোটাধিকার পেয়েছে। অর্থনীতিতে তারা অবদান রাখছে। তারা দক্ষ কারিগর। বেনারসি শাড়ি শিল্পী, গাড়ি মেরামতসহ নানা রকম হাতের কাজে রয়েছে তাদের দক্ষতা। অতি অল্প কেউ ছাড়া এখন আর উর্দুভাষীরা পাকিস্তানে যেতে উৎসাহী নয়। ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে লাখ আড়াই মানুষের পুনর্বাসন কি এতই কঠিন? সারা দেশে প্রায় ৫০টি ক্যাম্পে উর্দুভাষীরা মানবেতরভাবে বেঁচে আছে ৪২ বছর। এখন থেকে পুড়িয়ে মারার পালা। ঢাকার ক্যাম্পগুলো থেকে তাদের তাড়াতে পারলে দশম সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ওই সব জমিতে জনপ্রতিনিধির নেতৃত্বে নিির্মত হবে আলিশান অ্যাপার্টমেন্ট অথবা সুপার মার্কেট। সেখানে ফ্ল্যাট ও দোকান পাবে ক্যাডাররা। চলবে চুটিয়ে চাঁদাবাজি। নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা মনে করেন দেশটা তাঁদের বাপের। অথবা নিজেদের তালুক। এখানে ধর্মীয়, জাতিগত, ভাষাগত সংখ্যালঘুরা তাদের খাস তালুকের নিষ্কর প্রজা। কালশীর কবরস্থানের কয়লাগুলোর প্রতিরোধ করার ক্ষমতা নেই—তারা শুধু অভিশাপ দিতে পারে। অতীতে সাধারণ মানুষের অভিশাপে বিশাল সাম্রাজ্য পর্যন্ত ধ্বংস হয়েছে—বাংলাদেশ তো ছোট দেশ।
সৈয়দ আবুল মকসুদ: গবেষক, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

‘পুলিশ থাকতে র‌্যাব কেন?’

গত ২৮ মে প্রথম আলোয় প্রকাশিত মশিউল আলমের নিবন্ধ ‘পুলিশ থাকতে র‌্যাব কেন’ অনেকাংশে জনৈক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) চৌধুরী ফজলুল বারীর বাংলাদেশের আমেরিকান দূতাবাসের কর্মকর্তাদের কাছে দেওয়া বক্তব্যকে উপজীব্য করেই লেখা হয়েছে বলে প্রতীয়মান। এ ছাড়া, মতামতে লেখকের নিজস্ব কিছু বক্তব্যও রয়েছে। ফজলুল বারী পুলিশ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কোনো ব্যক্তি নন। পুলিশ বিষয়ে তাঁর গবেষণাধর্মী কোনো প্রবন্ধ বা লেখা দেখতে পাওয়া যায় না। তবে লেখক প্রথম আলোর মতো একটি জনপ্রিয় ও মর্যাদাবান পত্রিকায় ফজলুল বারীর বক্তব্য উপস্থাপন করার কারণে এ বিষয়ে তথ্যভিত্তিক, বস্তুনিষ্ঠ ও নির্মোহ আলোচনা বিভ্রািন্ত নিরসনে সহায়ক হবে বলে অনুমিত হয়। র‌্যাব মূলত বাংলাদেশ পুলিশেরই সাংগঠনিক কাঠামোভুক্ত একটি স্বতন্ত্র ইউনিট এবং এটি গঠনের জন্য কোনো নতুন আইন না করে, বরং দি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৯ কিছুটা সংশোধন করে দি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট, ২০০৩-এর আওতায় বিদ্যমান আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের মতো আইজিপির অধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন র‌্যাব গঠন করা হয়। উল্লিখিত আইনের ধারা ৫ অনুযায়ী, এপিবিএন ও র‌্যাব সরকারের তদারকিভুক্ত এবং আইজিপি কর্তৃক পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত একটি ফোর্স। ২০০৪ সালের ২৮ জানুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত র‌্যাব গঠনসংক্রান্ত সভায় র‌্যাবের মহাপরিচালক আইজিপির সরাসরি কমান্ড ও কন্ট্রোলে দায়িত্ব পালন করবেন মর্মে সিদ্ধান্ত হয়। র‌্যাবের সৃজিত পদগুলোর বেতন স্কেল অসামরিক তথা পুলিশের পদের বেতন স্কেলের ভিত্তিতে সৃজিত হয়েছে, সামরিক বাহিনীর বেতনকাঠামোর ভিত্তিতে নয়। র‌্যাব বাংলাদেশ পুলিশের একটি বিশেষায়িত ইউনিট।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই পুলিশ বাহিনীর কার্যক্রমকে অধিকতর জোরদার ও কার্যকর করার লক্ষ্যে বিশেষ বিশেষ কাজের জন্য পুলিশের অধীনে বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। পুলিশের ব্যর্থতার কারণে র‌্যাব সৃজিত হয়েছে মর্মে যে কথা বলা হচ্ছে, তা যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। যদি আট থেকে দশ হাজার লোক দিয়ে ১৬ কোটি জনসংখ্যার বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা সম্ভব হয় তাহলে ব্যর্থ পুলিশের খাতে ছয় হাজার কোটি টাকা ব্যয় কেন? ব্যর্থ বাহিনী হিসেবে পুলিশকে নিয়ম অনুযায়ী বিলুপ্ত করে দেওয়াই উচিত ছিল। র‌্যাবে সামরিক ও অন্যান্য বাহিনী থেকে আগত প্রায় ৫৬ ভাগ সদস্য বা কর্মকর্তাদের আইনি জ্ঞান কাঙ্ক্ষিত মানের হওয়ার কথা নয়। কারণ, তাঁরা সমরসংক্রান্ত বিদ্যা শিখেছেন। পুলিশি কার্যক্রমে প্রয়োজন হয় এরূপ আইন যথা: ফৌজদাির কার্যবিধি, দণ্ডবিধি পিআরবি এবং অন্যান্য আইন সামরিক একাডেমিতে বিস্তারিতভাবে শেখানো হয়, এমন তথ্য আমরা এখনো পাইনি। সৃষ্টির পর এ পর্যন্ত র‌্যাবের অধিনায়ক পর্যায়ের (লে. কর্নেল বা সমমান) কর্মকর্তাদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে। এঁরা কেউই পুলিশ কর্মকর্তা নন। এ ছাড়া যাঁদের বিরুদ্ধে বর্তমানে অপহরণ, গুম প্রভৃতির মতো মারাত্মক অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে তাঁদের সিংহভাগই (প্রায় ৮০ ভাগ) পুলিশ কর্মকর্তা নন। অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয়, অপরাধ বা দুর্নীতি শুধু পুলিশে নয়, অন্যত্রও রয়েছে এবং সময়ে সময়ে তা মারাত্মক রূপ ধারণ করে। আর বাংলাদেশ পুলিশ যদি সরকার কর্তৃক রাজনৈতিকীকরণের শিকার হয়, সে ক্ষেত্রে সরকার কর্তৃক গঠিত র‌্যাব রাজনৈতিকীকরণের শিকার হবে না কেন? র‌্যাবকে ৭০ ভাগ ভাতা, উন্নততর যানবাহন, অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা সরকারই দিয়েছে এবং পুলিশের অন্য ইউনিটের তুলনায় দৃষ্টিকটুভাবেই বেশি দিয়েছে। হিসাবে দেখা গেছে,
পুলিশের অন্যান্য ইউনিটে কর্মরত ২ দশমিক ৫ জন সদস্যের জন্য সরকারের যে ব্যয় হয় তা ব্যয় হয় র‌্যাবে কর্মরত একজন সদস্যের জন্য। সরকার পুলিশকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করবে আর র‌্যাবকে শুধু জনস্বার্থে ব্যবহার করবে, এ রকম চিন্তা বাংলাদেশের বিদ্যমান সামাজিক ও রাজনৈতিক আবহে মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। ফজলুল বারী কর্তৃক ‘পুলিশের ঘুষ, দুর্নীতি’র বিষয়ে মার্কিন দূতাবাসে প্রদত্ত বক্তব্য, যথা: ‘দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ এবং ভয়ংকর অপরাধীদের হাত থেকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করতে র‌্যাব প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে’, ‘পুলিশের প্রশিক্ষণের অভাব’, ‘জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা নিজ নিজ কার্যালয়ে বসে থাকতেই পছন্দ করেন’ প্রভৃতি মন্তব্য অজ্ঞতাপ্রসূত, অগভীর এবং তথ্য-উপাত্ত দ্বারা সমর্থিত নয়। র‌্যাবের রাজনৈতিকীকরণের বিষয়ে ফজলুল বারীর বক্তব্য ‘সরকারের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক কারণে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিকে লক্ষ্যবস্তু করার নির্দেশ র‌্যাবকে দেওয়া হয়, তাহলে র‌্যাব সে অবৈধ নির্দেশ পালন করবে না’ বাস্তবতার নিরিখে অতি বাগাড়ম্বরপূর্ণ ও বাস্তবতাবিবর্জিত বলেই প্রতীয়মান। তদুপরি ফজলুল বারীর বক্তব্য ‘নৈতিক কারণে’ তিনি ‘রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড মেনে নিতে পারবেন না’ যথেষ্ট কৌতূহলোদ্দীপক। ফজলুল বারী র‌্যাব-১-এর অধিনায়ক থাকাকালে আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যার প্রধান সাক্ষী র‌্যাব-১-এর হেফাজতে মারা যান। এ জন্য গাজীপুরে মিছিলও হয়েছিল। পরে জানা যায়, মৃত্যুর কারণ ছিল ‘হার্ট অ্যাটাক’। ২০০৫ সালে ফজলুল বারীর পদিব ছিল কর্নেল। সরকাির চাকিররত অবস্থায় সরকারের অনুমতি ব্যতিরেকে একজন বিদেিশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে সরকারের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে আলোচনা করা নীতি-নৈতিকতা ও চাকরিবিধির পরিপন্থী ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এর দ্বারা তিনি সেনাবাহিনীতে কৃত শপথ ভঙ্গ করেছেন। এহেন ব্যক্তি বিশ্বাসযোগ্য নন। লেখক বলেছেন, ‘পুলিশি সমস্যাগুলো র‌্যাবে আরও বেশি মাত্রায় সংক্রমিত হলে র‌্যাব হয়ে উঠবে পুলিশের থেকেও বেশি বিপজ্জনক’ এবং ‘সেই সংক্রমণ থেকে র‌্যাবকে রক্ষা করার দায়িত্ব প্রধানত সরকারের, তবে র‌্যাবের নিজেরও সে ব্যাপারে আরও সজাগ হওয়া উচিত।’
উত্তম পরামর্শ বটে। প্রশ্ন হলো, ১০ হাজার জনবলসমৃদ্ধ র‌্যাবকে ‘সংক্রমণ’ থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব যদি ‘প্রধানত’ সরকারের হয়, প্রায় এক লাখ ৫৫ হাজার জনবলসমৃদ্ধ পুলিশ বাহিনী—যাদের কর্মকাণ্ডের ওপর দেশের আইনশৃঙ্খলা ও জনগণের শািন্ত ও নিরাপত্তা বহুলাংশে নির্ভর করে—তাদের ‘সংক্রমণ’ থেকে রক্ষা করার দায়িত্ব কার? যদি সরকারেরই হয় এবং তারা তা করে, তাহলে ভিন্ন পেশা, ভিন্ন পেশাগত জ্ঞান, ভিন্ন মানসিক পরিকাঠামো, ভিন্ন সার্ভিস কালচার ও পরিবেশসমৃদ্ধ চার-পাঁচিট বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত ও দুই-তিন বছরের জন্য অতিথি হিসেবে আগত কর্মকর্তা-সদস্যদের নিয়ে মুখর এ র‌্যাবের উপযোগিতা কোথায়? ‘ক্রসফায়ারে’ দুর্বৃত্ত বা সন্ত্রাসী খুন করার জন্য বড় কোনো প্রশিক্ষণ বা অস্ত্রবল ও িক্ষপ্রতার প্রয়োজন নেই। পদ্ধতিগত ও সাবস্ট্যানটিভ আইন সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা নিয়ে সাক্ষ্য আইনের যথাযথ প্রয়োগের মাধ্যমে আসামিকে গ্রেপ্তার ও আদালতে তার অপরাধ প্রমাণের জ্ঞাননির্ভর, জটিল ও সময়সাপেক্ষ পথকে পাশ কাটিয়ে ‘ক্রসফায়ার’ দ্বারা তথাকথিত সন্ত্রাসী খুন করা অনেক গুণ সহজ। যার কাজ তাকে দিয়ে না করিয়ে এবং পুলিশকে দুর্নীতিমুক্ত ও দক্ষ করে গড়ে তোলার পরিবর্তে ‘চৌকস ও িক্ষপ্র’ সামরিক বাহিনীর সদস্যকে নিত্যকার পুলিশি কাজে নিয়োজিত করার নজির বিশ্বের কোথাও দেখতে পাওয়া যায় না। উল্লেখ্য, যাদের ‘ক্রসফায়ার’ দিয়ে ‘আমজনতার আস্থা’ অর্জন করা হয়েছে তাদের সবাই বা বেশির ভাগই পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের হাতে বিভিন্ন সময়ে আটক হয়েছিল। অপহরণ, গুম, ক্রসফায়ার বা কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের (লেখকের ভাষায়) সর্বশেষ সংস্করণ হিসেবে নারায়ণগঞ্জের ঘটনাকে প্রতীকী হিসেবে ধরে নিয়ে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সমীপে এ আরজ রাখা যায় যে ‘কোথাও বোধ হয় একটু ভুল হয়েছে’। সাত খুন, মতান্তরে ১১ খুন, যদি একটি মাত্র বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়, তাহলে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পরিচালিত এলিট ফোর্সের ভালো ‘প্রশিক্ষণ’, ভালো অস্ত্র ও িক্ষপ্রতা নিয়ে আমজনতার খুিশ থাকাই বিধেয় হবে। তবে ঘটনাটি যদি হিমশৈলের ক্ষুদ্র উপরি অংশ হয়, তাহলে সাধুদের সাবধান হওয়ার সময় বোধ হয় দ্রুতই পার হয়ে যাচ্ছে৷
আবুল কাশেম: অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার

যে ইতিহাস জানাতে হতো…

যুদ্ধে যৌন সহিংসতা বন্ধ করার অভিপ্রায় নিয়ে গেল সপ্তাহে গ্লোবাল সামিট-১৪ অনুষ্ঠিত হয়েছে যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে৷ যুদ্ধের সময়ে নারীর ওপর নানা ধরনের যৌন নির্যাতন বন্ধ করার প্রস্তাব ও পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পূর্ব লন্ডনের ডকল্যান্ডের এক্সেল এক্সিবিশন সেন্টারে হয় এই সম্মেলন৷ চার দিন ধরে রকমারি কর্মসূচি দিয়ে মুড়ে থাকা এই সামিটে অংশ নেয় বিশ্বের ১১৩টি দেশ, ৪৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ১০০-এর বেশি এনজিও এবং আন্তর্জাতিক অংশীদার, ৬৩০ জনেরও বেশি সরকারি কর্মকর্তা, ৯৩০ জনের বেশি বিশেষজ্ঞ৷ যুদ্ধ, অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ কিংবা অন্য যেকোনো ধরনের হানাহানিতে নারীর ওপর নির্যাতন একটি বড় অংশজুড়ে থাকে, যার অন্যতম হলো ধর্ষণ৷ বলা হয়, ধর্ষণ হলো যুদ্ধের হাতিয়ার৷ যুদ্ধ, সহিংসতা ও এর সঙ্গে লিঙ্গীয় দেনদরবার নিয়ে একাডেমিক জগতে নানা ধরনের বাতচিত জারি থাকলেও যৌন নির্যাতন বন্ধ করা এতগুলো দেশের একত্রে বোঝাপড়ায় এই বিষয়ে নিয়ে এত বড় আয়োজন এই প্রথম৷ এর উদ্যোক্তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ এবং ইউএনএইচআরের বিশেষ দূত হলিউড অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি৷ এই সামিট অনেক কারণে গুরুত্বপূর্ণ;
যার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ আর তা হলো যুদ্ধের সময়ে যৌন সহিংসতার প্রামাণ্যকরণ আরও জোরদার করা৷ কেননা, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নির্যাতিত নারীর জবানবন্দি শোনা যায় না, কিংবা শোনা গেলেও সেটিকে সহিংসতার সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয় না; যদিও বর্তমানে এই আখ্যানগুলো খুবই জোরালোভাবে দেখা হচ্ছে, বিশেষ করে সহিংসতার ধরন ও গভীরতা মাপতে৷ আরেকটি উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধে নির্যাতিত এবং যৌন নির্যাতনের শিকার যাঁরা হয়েছেন, তাঁদের প্রতি সর্বোচ্চ সমর্থন ও সহযোগিতা প্রদান৷ বলা হয়েছে, তাঁদের প্রতি এই সমর্থন ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক কৌশলগত সমন্বয়েরও অগ্রগতি হবে৷ এই সামিটের প্রধান লক্ষ্য হলো যুদ্ধের সময়ে নারীর ওপর নানা ধরনের যৌন নির্যাতন বন্ধের জন্য পৃথিবীজুড়ে জনমত তৈরি করা, বিশেষ করে যখন ধর্ষণসহ নারীর ওপর নানা ধরনের যৌন নিপীড়নকে যুদ্ধের সময়ে হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয় এবং এটিকে যুদ্ধের মেজাজের সঙ্গে গিট্টু বেঁধে সহনীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয় ও সীমিত পরিসরে আলোচিত থাকে৷
দুই বাংলাদেশের জন্য এই সামিটটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ? গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য, বিশ্ব যে কারণে আজ এক হয়েছে, যে নির্যাতনের অভিজ্ঞতা এতগুলো দেশকে একটি পাটাতনে এনেছে, বাংলাদেশের মানুষ সেই নির্যাতনের পথেই রক্তাক্ত হয়েছে, আমরা সেই নির্যাতনেরই অংশ৷ এই সামিটের মাত্র ৪৩ বছর আগে গণহত্যা ও ভয়াবহ নির্যাতনের জমিতে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি বিশ্বকে জানাতে পারত তার সেই নারীদের নির্যাতনের ইতিহাস৷ অন্য অনেক দেশের যুদ্ধের ইতিহাসে নারীর ওপর সহিংসতার বিষয়টি মূল কেন্দ্রে থাকলেও বাদ পড়েছে বাংলাদেশে প্রসঙ্গ৷ তাই স্বভাবতই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে, কেন এই সম্মেলনে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কর্তৃক দুই লাখ নারীর ওপর নির্যাতনের বিষয়টি যুক্ত হয়নি? যদিও এতে যোগ দিয়েছে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিদলও৷ কিন্তু তারা এ বিষয়ে জোরালো অবস্থান নেয়নি৷ সুযোগ ছিল, পুরো বিশ্বের কাছে এই নির্যাতনের তথ্য জানান দিয়ে পাকিস্তানকে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার জন্য দাবি তোলা৷ কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে, এই পুরো সামিটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি৷ তবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের নারীদের ওপর সংঘটিত যৌন নির্যাতন নিয়ে একটি সেশনে কথা বলেছেন ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের রিডার নয়নিকা মুখার্জি৷
তিন
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষণ এবং নানা ধরনের যৌন নির্যাতনের শিকার নারীদের অনেকেই আত্মহত্যা করেছেন, কেউ কেউ চলে গেছেন পাকিস্তানে, কেউ লুকিয়েছেন নিজের পরিচয়৷ কেউ বা চলে গেছেন অন্য দেশে৷ আর তাঁদের মধ্য থেকেই জীবনসায়াহ্নে এসে বললেন সেই নির্যাতনের কথা, ইতিহাসের কথা৷ বীরাঙ্গনারা অনেকেই মারা গেছেন৷ তাই তাঁদের সেই নির্যাতনের ইতিহাস আলাদা কোনো ইতিহাস নয়, আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাস, মুক্তির ইতিহাস৷ আমাদের এই নির্যাতনের বিষয় আমরা বিশ্বকে জানাতে চাই৷ এই নির্যাতনের বিচার চাই৷ অার সেটি জানাতে লন্ডনেরই কিছু মানুষ সেই নির্যাতনের ছবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়েছেন, বিশ্বকে দেখানোর চেষ্টা করেছেন, স্মরণ করানোর চেষ্টা করেছেন সেই নির্যাতনের ইতিহাসকে, যেটি এই সামিটে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়নি৷ কেননা, বিশ্বকে জানতে হবে, মনে রাখতে হবে সেই নারীদের, যাঁরা নির্যাতনের ইতিহাস সঙ্গে করেই বেঁচে ছিলেন, বেঁচে আছেন৷ আর একজন বীরাঙ্গনা যখন মারা যান, তাঁর সঙ্গে চলে যায় তাঁর ইতিহাস, বাংলাদেশে নামক রাষ্ট্রটির ইতিহাসও৷
জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
zobaidanasreen@gmail.com