Sunday, December 27, 2015

আত্মহনন থেকে ফিরিয়ে আনলেন প্রেসিডেন্ট

তুরস্কে সেতু থেকে লাফিয়ে আত্মহত্যা করতে যাচ্ছিলেন এক যুবক। ঠিক সে সময়ই সেখান দিয়ে যাচ্ছিল প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের গাড়িবহর। কর্মকর্তারা দ্রুত যুবকের কাছে ছুটে গিয়ে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট গাড়ি দাঁড় করিয়েছেন; আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান।’ যুবকটি ফিরে এসে দেখেন সত্যিই দেশের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান গাড়িতে বসে আছেন। প্রেসিডেন্ট তাঁর সঙ্গে হাত মেলান। এতেই বেঁচে যায় যুবকটির প্রাণ। খবর বিবিসির।
তুরস্কের ইস্তাম্বুলে গতকাল শনিবার এ ঘটনা ঘটেছে। বসফরাস প্রণালীর ওপর ইউরোপ ও এশিয়ার প্রধান সংযোগ সেতুর রেলিং বেয়ে একেবারে প্রান্তে গিয়ে লাফ দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন ওই যুবক।
ভিডিও চিত্রে দেখা গেছে, এরদোয়ানের গাড়িবহরের সঙ্গে থাকা নিরাপত্তা কর্মকর্তারা তাঁকে প্রেসিডেন্টের গাড়ি দেখিয়ে সেখান থেকে চলে আসতে বলছিলেন। কিছুক্ষণ পর ওই যুবক রেলিং ডিঙিয়ে চলে আসেন এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মিনিট খানেক কথা বলেন।
বার্তা সংস্থা এপি বলেছে, ওই যুবক পারিবারিক সমস্যার কারণে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করছিলেন। নিরাপত্তা কর্মীরা জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যুবকটিকে সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছেন।

আশি বছরে রাবেয়া খাতুন

১৯৪৭-এর আগে ঢাকায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা ছিল খুবই কম। ঢাকা তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব অংশের রাজধানী হলে ধীরে ধীরে ঢাকা নগরের আয়তন বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে জনসংখ্যা। গড়ে উঠতে থাকে নতুন মধ্যবিত্ত সমাজ। দু-একজন করে লেখকেরও দেখা মিলতে থাকে। কলকাতায় যাঁদের শুরু, তেমন কয়েকজন ঢাকায় এলেন। ঢাকায়ও শুরু করলেন কেউ কেউ! স্বল্পসংখ্যক নতুনে তো পাঠকের তৃপ্তি হওয়ার কথা নয়! তাই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত লেখকেরাই ছিলেন তাঁদের কান্ডারি। ধীরে ধীরে অবস্থা বদলায়। সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজধানী শহরে গড়ে উঠতে থাকা মধ্যবিত্ত সমাজের ভেতর থেকে জেগে ওঠেন নতুন সাহিত্যস্রষ্টারা। রাবেয়া খাতুন তাঁদেরই একজন। ৮০ বছর পূর্তির লগ্নে তাঁর অবদানের মূল্যায়ন করতে হলে এই পটভূমির কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। ১৯৪৭-এর আগের বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র কলকাতায়। কিন্তু সেখানে মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। নারীদের অবস্থা আরও পশ্চাৎপদ। সেই সমাজে আত্মবিকাশের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ নারীদের দু-একজনকে তখন সবেমাত্র দেখা যেতে শুরু করেছে! ঢাকায় সাহিত্যের যাত্রার শুরুতে নারীদেরও মাত্রই দু-একজনের সূচনা। রাবেয়া খাতুন সেই সূচনাকারীদের অন্যতম। তখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছেন এমন নারীর সংখ্যাও কম। তাঁদের লেখাপড়ার দৌড়ও মাধ্যমিক স্কুলের দোরগোড়া অবধি। আবার এই সীমিত লেখাপড়ার সুযোগের পেছনেও উদ্দেশ্য সংকীর্ণ—আধুনিক পুরুষতান্ত্রিকতার সহায়ক ও উপযোগী হিসেবে নারীদের গড়ে তোলা। কারণ, ওই সময়ে প্রধানত নারীদের জীবন ছিল ঘরের ভেতরের সংসার-সীমানাতেই সীমিত। সুতরাং দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে নারীর উচ্চশিক্ষায় ফায়দা এর চেয়ে বেশি আর কী!
পুরুষের মতো মুক্তভাবে নিজের জীবন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বলতে গেলে ছিলই না। হয় বাবার, না হয় স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার জন্য তাঁকে সব সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। সমাজের সাধারণ আধুনিক শ্রেয়োবোধই এ রকম যে নারীর বাইরে যাওয়ার দরকার হবে নিতান্তই সংসারের প্রয়োজনের খাতিরে। সে জন্যই তাঁদের শিক্ষার অধিকারও ততটুকুই, যতটুকু ঘরের ভেতরে প্রয়োজন। বিবাহযোগ্য হিসেবে এটুকু শিক্ষা তার মূল্য কিছুটা বাড়িয়েছিল বইকি। রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক উন্মেষের কালে বাংলাদেশের উদার মধ্যবিত্ত সমাজ এর চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পারেনি। তাঁর সমসাময়িক কালের মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ প্রতিনিধিদের স্মৃতিকথাগুলো থেকে এমন মনোভঙ্গিরই পরিচয় পাওয়া যায়। কিশোর বয়স থেকেই তিনি বিদ্রোহী সত্তার অধিকারী। তাঁর স্মৃতিকথায় সে পরিচয় পাওয়া যায়। নিতান্ত কিশোর বয়সে বিদ্রোহে যাঁর সূচনা, তিনি যে অদম্য হবেন, সে তো জানা কথাই! ওই বয়সে পত্রিকায় লেখা পাঠানোয় পরিবারে দেখা দেয় তীব্র অসন্তোষ। বয়োজ্যেষ্ঠদের ধারণা, একটি মেয়ের হাতের লেখা সংসারের বাইরের পুরুষদের দেখতে মানা। নারী হিসেবে কী রকম অবরুদ্ধ সমাজের বাসিন্দা ছিলেন তিনি, এই ঘটনা তার সাক্ষ্য। এ রকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্বপ্ন দেখেছেন ঔপন্যাসিক হওয়ার, মুক্তি ঘটাতে চেয়েছেন লেখক সত্তার। নারী বলে তাঁকে বেশি সংগ্রামশীল হতে হয়েছে। নিজের সৃষ্ট সাহিত্যকর্মকে নারী হিসেবে বাড়তি অনুকম্পার চোখে দেখা হোক, এমন প্রত্যাশা কখনো করেননি! জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি-অর্থনীতির প্রভাবে আমাদের সমাজও বিবর্তমান। সেটাকে তাঁর পর্যবেক্ষণ অগ্নিদৃষ্টির মাধ্যমে। বিচিত্র কথাসাহিত্যকর্মে তথা গল্প-উপন্যাসে ও ভ্রমণ সাহিত্যে এমনকি শিশুসাহিত্যের অভিযাত্রায় তাঁর নিদর্শন ছড়িয়ে আছে! নারী-পুরুষনির্বিশেষে তাঁর সমকালের উল্লেখযোগ্য লেখকদের খুব কম সংখ্যকের মধ্যেই এতটা দীর্ঘকালব্যাপী ধারাবাহিক সক্রিয় ও নিমগ্নতা পাওয়া যাবে। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে সক্রিয়। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো।
পঞ্চাশেরও বেশি উপন্যাসের রচয়িতা। তাই ঔপন্যাসিক হিসেবেই হয়তো বেশি পরিচিতি। এ পর্যন্ত চার খণ্ডে প্রকাশিত চার শ ছোটগল্পের রচয়িতা হিসেবে দেখলে তাঁকে প্রধানত গল্পকার হিসেবেই চেনা যাবে। ভ্রমণ–সাহিত্যের লেখক হিসেবেও তিনি অবিরল। বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে সৃষ্টিশীল অনুপ্রেরণায় রচিত তাঁর ভ্রমণ–সাহিত্য প্রাচুর্য ও স্বাতন্ত্র্য উভয় কারণে আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। এদিকে তিনি সামনের সারিতেই থাকেন শিশুসাহিত্যের স্রষ্টা হিসেবেও। তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতিকথামূলক রচনাও পরিমাণে কম নয়। সব মিলিয়ে রাবেয়া খাতুন তাঁর সৃষ্টিশীল বিচিত্র সংরূপের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ মানসের অন্তর্গত স্রোতকেই পাঠকদের অনুভবের সীমানায় এনে দেন। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব জীবনোপলব্ধি ও কল্পনা প্রতিভার সমন্বয়। তাঁর ভাষা ঋজু, সংহত, ব্যঞ্জনাময় ও নির্মোহ। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার বিবেচনায় রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক অবদানকে এ কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হবে। তিনি যখন ভ্রমণ–সাহিত্যে মনোযোগী হন, তখন আমাদের পত্রপত্রিকাগুলো এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। একের পর এক ভ্রমণ–সাহিত্য রচনা করে এই মাধ্যমটির দিকে সাহিত্য সমাজকে আগ্রহী করে তুলেছেন। বৃহদায়তন উপন্যাস লেখেননি। লিখেছেন নভেলার। এতে একদিকে তিনি ধারণ করেছেন ক্ষয়িষ্ণু গ্রামীণ জীবনবোধকে, অন্যদিকে ধরা পড়েছে ঘটমান নগরজীবন। ছোটগল্পের নাতিদীর্ঘ পরিসরেও এই জটিলতাকে তিনি তাঁর বিশিষ্ট গদ্যরীতির সামর্থ্যে পেরেছেন সম্পন্নভাবে ধারণ করতে। নিজে সংবেদনশীল নারী বলে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনে নারী-মনস্তত্ত্বের স্বাতন্ত্র্যকে পেরেছেন উপলব্ধি করতে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনপ্রবাহকে একেবারে সন্ধিস্থল থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি। আজ তাঁর ৮০ বছর পূর্ণ হবে। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চর্চিত তাঁর সাহিত্যকে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান ও অভিনিবেশের সঙ্গে বিচার করে দেখা জরুরি। আমরা তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন কামনা করি।
আহমাদ মাযহার: সাহিত্যিক।

সকল ধর্মীয় উপধারার নিরাপত্তা চাই

গত শুক্রবার রাজশাহীর বাগমারায় একটি আহমদিয়া মসজিদে জুমার নামাজ চলাকালে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা স্পষ্টতই বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। কয়েক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপাসনালয়ে সন্ত্রাসী হামলার যেসব ঘটনা ঘটেছে, এটি তারই ধারাবাহিকতা বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর জোরালো তৎপরতা সত্ত্বেও এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ হচ্ছে না। বাগমারার আহমদিয়া মসজিদে বোমা বিস্ফোরণে যে একমাত্র ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে, বোমাটি তিনিই বহন করছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন। ওই তরুণের পরিচয় এখনো অজ্ঞাত রয়ে গেছে। প্রত্যন্ত একটি অঞ্চলে, যেখানে মসজিদগামী মুসল্লিদের সবাই পরস্পরের পরিচিত, সেখানে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক তরুণ নিজের পোশাকের ভেতরে বোমা নিয়ে নামাজে শামিল হয়েছিলেন—এটা নিঃসন্দেহে রহস্যজনক। তবে তিনি যে নিরীহ মুসল্লিদের প্রাণহানি ঘটানোর উদ্দেশ্যেই সেখানে ঢুকেছিলেন, এটা সন্দেহাতীত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব তাঁর পরিচয় বের করা এবং সেই সূত্রে তাঁর নেপথ্যের শক্তিকে চিহ্নিত করা। এই দেশে হিন্দুদের মন্দির, খ্রিষ্টানদের গির্জা আক্রান্ত হয়েছে।
খুন বা জখম করা হয়েছে খ্রিষ্টান যাজকদের। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোর ওপর এ ধরনের দুঃখজনক আক্রমণ বেশ কিছুদিন ধরেই কমবেশি ঘটে চলেছে। তবে খ্রিষ্টান যাজকদের হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণ করা সম্প্রতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তদুপরি ইসলামেরই আরেকটি ধারা শিয়া মুসলমানদের তাজিয়া মিছিলে কিংবা শিয়া মসজিদে হামলার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেশবাসীকে বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। শিয়া সম্প্রদায়ের পর বাগমারায় আহমদিয়া মসজিদের এই বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল, একই ধর্মের অন্যান্য ধারা–উপধারার মানুষও এখন আর নিরাপদে নেই। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা ইসলামি জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর আচরণের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্য ও পাকিস্তান- আফগানিস্তানে এ ধরনের ঘটনার খবর আমরা পাই। বাংলাদেশ যেন তেমন ইসলামি জঙ্গিবাদের শিকারে পরিণত না হয়, সে জন্য সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এবং জনগণকে মিলিতভাবে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

প্যারিস থেকে রূপপুর রামপাল by আনু মুহাম্মদ

গত ৩০ নভেম্বর প্যারিসে জলবায়ু সম্মেলন শুরুর প্রাক্কালে নিউইয়র্ক টাইমস বলেছিল, ‘আগের দুটো সম্মেলনের মতো প্যারিসেও যদি আলোচনা ব্যর্থ হয় তাহলে সব দেশ সেই পথে যাত্রা অব্যাহত রাখবে, বিজ্ঞানীরা যার সম্পর্কে বারবার সতর্ক করছেন—সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি, আরও ঘন ঘন বন্যা, খরা পরিস্থিতির অবনতি, খাদ্য ও পানির ঘাটতি, ধ্বংসাত্মক ঘূর্ণিঝড়সহ ভয়ংকর প্রাকৃতিক দুর্যোগ।’ একই দিন ইকোনমিস্ট ভবিষ্যদ্বাণী দিয়েছিল, ‘প্যারিসে আসলে কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষী বৈশ্বিক চুক্তিই স্বাক্ষর হবে না। তবে সম্মেলনে যা কিছু দলিলপত্র তৈরি হবে সেগুলোই উল্লেখযোগ্য অর্জন বলে প্রশংসা পেতে থাকবে।’
সংশয় ছিল সবারই। এর কারণও সবাই জানেন। ক্ষমতাবানেরাই যখন অপরাধী তখন তাদের নেতৃত্বে কতটুকু আর অগ্রসর হওয়া যায়? চাপ দিয়ে যতটুকু পারা যায়। চাপ বা জন-আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অবশ্য কিছু কাজ হয়েছে, উত্তর আমেরিকা ইউরোপে ‘উন্নয়ন’ নামের পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতা চালানো এখন সহজ নয়। এসব দেশ ছাড়াও জাতিসংঘের আওতায় বহু ধারা যুক্ত হয়েছে, নানা উদ্যোগ জন্ম নিয়েছে। তবে যেসব বহুজাতিক কোম্পানি এসব দেশের ক্ষমতা নিয়ে দীর্ঘদিন পরিবেশবিধ্বংসী তৎপরতায় লিপ্ত তাদের জন্য এখন দুনিয়া খুলে দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ যখন বলে আমরা তো বেশি কার্বন-নিঃসরণমুখী উন্নয়ন করিনি, এখন আমাদের সেই সুযোগ দিতে হবে, তখন প্রসন্ন হয় সেই একই ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। চীন নিজ দেশে এখন উন্নয়নের ধরনে কয়লাকেন্দ্রিকতা কমাচ্ছে, কিন্তু বাড়াচ্ছে আফ্রিকায়। ভারত যে বাংলাদেশে ও আফ্রিকায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বেশি উৎসাহী তার অন্যতম কারণ নিজ দেশে কার্বন-নিঃসরণের মাত্রা বিশ্বকে কম দেখানো। কিন্তু বিশ্ব, সমুদ্র, নদী, বায়ুমণ্ডল সব তো অভিন্ন, যেখানেই ক্ষতি হোক না কেন তা সবার কাছেই গিয়ে পৌঁছায়।
প্যারিস চুক্তির মধ্যে সবাইকে বিশেষত ক্ষমতাধর অপরাধীদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে বহু রকম ফাঁকফোকর রাখা হয়েছে। কার্বন নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা এই সম্মেলনের ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হলেও তার জন্য কোনো আইনগত বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। নিজ নিজ দেশে কে কতটা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করবেন, তা ২২ এপ্রিল ২০১৬ থেকে ২১ এপ্রিল ২০১৭ পর্যন্ত সময়ে জানা যাবে। তবে সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ যে মাত্রা ঘোষণা করেছে, তা অব্যাহত থাকলে উষ্ণতা সম্মেলন নির্ধারিত ২ ডিগ্রি থেকে বেশি প্রায় ৩ ডিগ্রি হবে। কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই, উপরন্তু তার সুযোগ আছে চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার। উপরন্তু ক্ষতির জন্য দায় নির্ধারণ কিংবা ক্ষতিপূরণ আদায়েরও কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।
বিশ্ব উষ্ণায়ন বিপদ এক দিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে তেল, কয়লাসহ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের উচ্চমাত্রা শুধু নয়, মুনাফাকেন্দ্রিক উৎপাদন ও ভোগের নির্বিচার বৃদ্ধিও যুক্ত। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি উপাদান হলো সমরাস্ত্র খাতের ভয়ংকর বিকাশ। মানুষ ও পরিবেশকে ভয়াবহভাবে খুন করার যাবতীয় আয়োজন হয় এই খাতের প্রয়োজনে, নিত্যনতুন গবেষণা, বিনিয়োগ এবং উত্তেজনা-সংঘাত সৃষ্টির মাধ্যমে। এই খাত কখনোই এসব সম্মেলনে আলোচনায় আসে না। প্যারিস ঘোষণায় জলবায়ু বিপর্যস্ত দেশগুলোকে ১০ হাজার কোটি ডলার অর্থ জোগান দেওয়ার একটা ফাঁকা অনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি আছে। বলা বাহুল্য, এই অর্থের বেশির ভাগ অংশ জোগানদাতা দেশের আমলা, ব্যবসায়ী, কনসালট্যান্ট, গ্রহীতা দেশের সাব কন্ট্রাক্টররাই পাবে, কথিত কাজে যাবে সামান্যই। এই সঙ্গে এই অঙ্কটাও মাথায় রাখা দরকার যে বিশ্বে প্রতিবছর সমরাস্ত্র খাতে খরচ হয় এর ১০ গুণ বা ১০ লাখ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ। যার প্রতিটি টাকা মানুষ ও পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর সুবিধাভোগী কেবল অস্ত্র ব্যবসায়ী, দখলদার দস্যু আর সন্ত্রাসী রাষ্ট্র ও গোষ্ঠীগুলো।
ফ্যাসিস্ট খুনিদের হাতে নিহত জার্মানির পণ্ডিত বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গ ১০০ বছর আগে বিশ্বব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, পঁুজিবাদের অন্তর্গত প্রবণতাই হলো ক্রমাগত নতুন নতুন মুনাফার ক্ষেত্র বের করতে গিয়ে দখল ও ধ্বংসের পথ গ্রহণ করা। এ কারণে অব্যাহত সামরিকীকরণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার জন্য অনিবার্য। এর ৬০ বছর পর ইউরোপের আরেকজন পণ্ডিত আর্নেস্ট ম্যান্ডেল বিশ্লেষণ করে বলেছেন পঁুজিবাদী বিশ্বব্যবস্থা এখন চিরস্থায়ী সমরাস্ত্র অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। আর সম্প্রতি কানাডার নাওমি ক্লেইন বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার নাম দিয়েছেন ‘ডিজাস্টার ক্যাপিটালিজম’। এই ব্যবস্থার যারা সুবিধাভোগী তাদের দাপট অব্যাহত থাকতে পারলে পরিস্থিতির পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব? তারপরও যতটুকু প্রতিশ্রুতি এবং স্বীকারোক্তি আমরা ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’ (এসডিজি) সম্মেলন ও জলবায়ু সম্মেলন থেকে পাই, তা বিশ্বে মানুষের জীবনযাপনের সঙিন অবস্থা, ভীতিকর পরিবেশ অবনতি এবং মানুষ-পরিবেশের পক্ষে তাত্ত্বিক কাজ ও আন্দোলনের চাপেই হয়েছে। এর ফলেই নবায়নযোগ্য খাত এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এসব সম্মেলনে উন্নয়ন প্রশ্ন নিয়ে আলোচিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নয়, জলবায়ু তহবিল পাওয়া নিয়েই বাংলাদেশ সরকারের মনোযোগ বেশি। অন্যদিকে, দেশে তহবিলের অভাবে নয় বরং নিত্যনতুন ঋণ নিয়ে ও বাজেট সরিয়ে তৈরি হচ্ছে এমন সব প্রকল্প, যা জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য ক্ষতির চেয়েও বেশি ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে। জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে বহু প্রকল্প দেখছি আমরা। এই দুর্যোগের হাত থেকে উপকূলীয় এলাকার মানুষকে বাঁচানোর কথা বলেও বহু প্রকল্প তৈরি হচ্ছে। কিন্তু একই সময়ে নিজেরা ঋণগ্রস্ত হয়ে সুন্দরবনবিনাশী রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র করা হচ্ছে। এই সুন্দরবনই সব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কয়েক কোটি মানুষকে রক্ষা করার প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা, যা লাখো কোটি টাকা দিয়েও নির্মাণ করা সম্ভব নয়। এই সুন্দরবন রক্ষার জন্য তহবিলের দরকার নেই, বরং এর ওপর বিনিয়োগ বা অর্থব্যয়ের প্রবণতা কমালেই সুন্দরবন বাঁচে।
বিশাল ঋণ নিয়ে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর প্রকল্প নিয়ে সরকার গর্বিত। এ রকম অদক্ষ এবং অরক্ষিত অবস্থায় আর কোনো দেশ কখনো পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানোর প্রকল্প নিয়েছে বলে জানা নেই। ষাটের দশকে ছোট্ট একটি পারমাণবিক কেন্দ্র বানানোর জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল, সরকার তার ওপর ভর করেই অগ্রসর হচ্ছে। কিন্তু দুই হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে এর যে নিরাপত্তাবলয় তৈরি করতে হবে, বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, তাতে চারপাশের দেড় কোটি মানুষকে হয় সরাতে হবে নয়তো তারা প্রাত্যহিক নানাবিধ বিপদের ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করবে। দুর্ঘটনার কথা চিন্তা করতেও ভয় হয়, পারমাণবিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়েও সরকারের যে কথাবার্তা তাতে ভরসা পাওয়ার উপায় দেখি না। রাশিয়ান ঋণ, প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ ও ব্যবস্থাপনায় নির্মিতব্য এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিয়ে যখন রুশ রাষ্ট্রদূত বলেন, এটি এতই নিরাপদ যে এর ওপর বোমা মারলেও এর কোনো ক্ষতি হবে না, এবং যখন সেই কথা মুখস্থ বলতে থাকেন বাংলাদেশের কর্তাব্যক্তিরা, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না আমরা কী রকম বিপদের মধ্যে যাচ্ছি।
দেশে কৃষিজমি, বন উজাড় করে, নদী দখল করে নানা রকম নির্মাণকাজ হচ্ছে। এসব কাজে সরকারই অগ্রণী। সেই পথেই দস্যুদের সদম্ভ দখল তৎপরতা। সরকার দেশে অনেকগুলো ইপিজেড করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর জন্য জমি বাছাই ও জমি অধিগ্রহণ-প্রক্রিয়া যে খুবই ত্রুটিপূর্ণ, তা এই মুহূর্তে হবিগঞ্জে চা-শ্রমিকদের প্রতিবাদ থেকেই বোঝা যাচ্ছে। পরিষ্কার দুই ফসলি জমিকে অনাবাদি দেখিয়ে এই প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। যেমন সুন্দরবনকে দেখানো হয়েছিল গ্রামবসতি। মিথ্যা, অস্বচ্ছতা ও প্রতারণার ওপর তো কোনো টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না।
বাংলাদেশের ‘উন্নয়ন’ ধরন আসলে মূলধনের আদিম সংবর্ধনের একটি মডেল। আমি আগেও বহুবার বলেছি উন্নয়নের এই ধরন মানুষ ও প্রকৃতিবিদ্বেষী। বন, পাহাড়, নদী, পানি, আবাদি জমি, জীববৈচিত্র্য বিনাশ করে জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে আর কিছু লোকের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করতে এই ধরন উন্মাদনা তৈরি করা হয়েছে। মুনাফামুখী, দখল, লুণ্ঠন ও দুর্নীতি আশ্রয়ী এই ‘উন্নয়ন’ জিডিপি বাড়াতে পারে, স্বল্প মেয়াদে চকচকে দেখাতে পারে কিন্তু এই ধরন, যাকে রাউল প্রেবিশ বলেছিলেন উন্নয়নের ইমিটেশন, তা দীর্ঘ মেয়াদে বিবর্ণ এবং বিপজ্জনক হতে বাধ্য। সে জন্যই একদিকে যখন দেখি প্রতিবছর দেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে ৬ শতাংশের বেশি, তখন মানব উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ রয়েছে একদম পেছনের কাতারে, জাতিসংঘের (ইউএনডিপি) মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০১৫ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৮৮টি দেশের মধ্যে ১৪২তম।
উন্নয়নের ধরনের কারণেই ক্রমবর্ধমান হারে চোরাই টাকার কেন্দ্রীভবন হচ্ছে এবং তা অর্থ পাচার অনিবার্য করে তুলছে। সর্বশেষ আন্তর্জাতিক সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ অর্থের সমপরিমাণ বিদেশে পাচার হচ্ছে। ২০১৩ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৭ হাজার কোটি টাকা, পরের বছরগুলোতে আরও বাড়ছে। সব তথ্য বিবেচনায় নিলে এর হার আরও বেশি হবে। অনেক বিজ্ঞজন বলেন, দেশে ‘সুশাসনের অভাব’ বলে এই অর্থ দেশে বিনিয়োজিত হতে পারছে না, তাই বাইরে চলে যাচ্ছে! আসলে তথাকথিত ‘সুশাসনের অভাব’ থাকার কারণেই কিছু লোকের হাতে দেশের এই পরিমাণ সম্পদ গিয়ে জমেছে। তাঁরা ক্ষমতাবান, যেখানে তাঁদের ভবিষ্যৎ সেখানে তাঁরা এই চোরাই টাকা পাঠিয়ে দিচ্ছেন। এই দেশ তাঁদের টাকা বানানোর জায়গা, জীবনযাপন বা ভবিষ্যৎ অন্যত্র।
ব্যাংক লুট (ঋণখেলাপি, জালিয়াতি) করে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ, শেয়ারবাজারে প্রতারণা ও প্রভাব বিস্তার, জমি-পাহাড়-নদী-জলাশয় দখল, রাষ্ট্রীয় বৃহৎ প্রকল্পে ২০০ বা ৩০০ শতাংশ বেশি ব্যয়, বিদেশি ঋণে ভোগবিলাসিতা, কমিশনের বিনিময়ে দেশের জন্য সর্বনাশা চুক্তি স্বাক্ষর এগুলো সবই বর্তমান উন্নয়ন মডেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাঁরা শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত, ঋণ নিয়ে যাঁরা বড় বড় খেলাপি, যাঁরা বৃহৎ প্রকল্প থেকে হাজার কোটি টাকা সরাতে পারেন, তাঁরাই তো প্রভাবশালী, ক্ষমতার খঁুটি। তাঁদের স্বার্থ আর বিশ্ব উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী অপরাধীদের স্বার্থ অভিন্ন। বাংলাদেশের বিপদ সেখানেই।
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
anu@juniv.edu/anujuniv@gmail.com

বিত্ত, দুর্নীতি ও রাজনীতি by হায়দার আকবর খান রনো

প্রথম আলোর ১৭ ডিসেম্বর সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় এবারের পৌরসভা নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা পর্যালোচনা করে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। তাতে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের ৩৩ জন প্রার্থীর নগদ টাকা আছে কোটি টাকার অনেক বেশি। প্রতিবেদন বলছে, ‘এর বাইরে কিছু প্রার্থী আছেন, যাঁদের সম্পদ, আয় ও ব্যাংকঋণের মধ্যে সামঞ্জস্য নেই।’ অন্যদিকে বিএনপি প্রায় এক দশক ক্ষমতার বাইরে থাকলেও তাদের ৫৬ জন প্রার্থী কোটিপতি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে কোটিপতিদের মধ্যে।
এমন সংবাদ উদ্বেগ খানিকটা বৃদ্ধি করলেও খুব বিস্মিত হইনি। কারণ, রাজনীতি এখন চলে গেছে টাকাওয়ালাদের দখলে। অনেকের জন্য রাজনীতি এখন ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। নির্বাচন এবং এ রকম কিছু ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করলে লাভ উঠে আসে অনেক বেশি পরিমাণে। উপরিউক্ত হলফনামা বিশ্লেষণ থেকে আরও জানা যায় যে আওয়ামী লীগের ১৪০ জন প্রার্থী এবং বিএনপির ১২৬ জন প্রার্থী সরাসরি ব্যবসায়ী।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এই দুটি প্রধান দলে ব্যবসায়ীদের ছড়াছড়ি এবং চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তাঁরাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণ করেন। ব্যবসায়ীরা হয়েছেন রাজনীতিবিদ আর রাজনীতিবিদেরা হয়েছেন ব্যবসায়ী। সঠিক পরিসংখ্যান আমার এই মুহূর্তে জানা না থাকলেও এটা নিশ্চিতভাবেই জানি যে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা হচ্ছেন ব্যবসায়ী এবং কোটিপতি, কেউ কেউ অতিকায় ধনী। শুধু এবারের সংসদই নয়, বিগত কয়েকটি সংসদেই একই চিত্র ছিল। অথচ স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে তা কিন্তু ছিল না। পেশাগতভাবে রাজনীতিবিদ যাঁরা, তাঁরাই নির্বাচন করতেন এবং নির্বাচিত হতেন।
বিএনপি কখনোই আদর্শভিত্তিক দল ছিল না। তবু জিয়ার আমলে বেশ কিছু বামপন্থী ও ন্যাপের জেলা পর্যায়ের নেতারা এই দলে যোগদান করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের আদর্শ ধরে রাখতে পারেননি। উপরন্তু দলের মধ্যেও তাঁরা ছিলেন বেশ কোণঠাসা। তবু এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ধুলামাটিতে মাখামাখি করে দলটিকে নতুনভাবে পুনর্গঠিত করেন। কিন্তু তারেক রহমান নেতৃত্বে আসার পর দলটি তেমন ক্রমাগত দক্ষিণে সরে গিয়ে পাকিস্তান আমলের মুসলিম লীগের কাছাকাছি জায়গায় অবস্থান নিয়েছে, তেমনি দলের মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছেন অতিকায় ধনীরা। যাঁরা দেশ, জনগণ, কর্মসূচি, আদর্শ ইত্যাদি নিয়ে সামান্যতম মাথা ঘামান না।
অন্যদিকে ষাটের দশকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তরুণ কর্মীদের মধ্যে একধরনের জাতীয়তাবাদী আদর্শ কাজ করত। তাঁরা জেল-জুলুম খেটেছেন। তাঁরা ছিলেন পেশাগতভাবে রাজনীতিবিদ। তাঁদের সবাই যে দুর্নীতিমুক্ত ছিলেন, এমন দাবি করা যাবে না। নানা ধরনের সুবিধাবাদও ছিল। তবু একটা ন্যূনতম পর্যায়ে রাজনৈতিক আদর্শবোধ কাজ করত। সেই প্রজন্ম এখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে। এখন এই দলে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য, যাঁদের মুখে ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ’ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ ইত্যাদি বুলি শোনা গেলেও বাস্তবে তাঁরাও রাজনীতিকে নিয়েছেন ব্যবসা হিসেবে। বড় চমৎকার ব্যবসা। প্রায় বিনা পুঁজিতে বা অতি কম পুঁজিতে বিরাট লাভ। মুনাফার হার খুব বেশি। উৎপাদনের ঝামেলা নেই। ব্যবসায় ঝুঁকিও নেই।
কী ধরনের ধনী ব্যক্তিরা আজ শাসক দলের সাংসদ ও স্থানীয় পর্যায়ে নেতা হয়েছেন, তার অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। একেবারে সাম্প্রতিক একটা ঘটনার কথা উল্লেখ করা যাক। গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সাংসদ মন্জুরুল ইসলাম লিটন, যিনি কিছুদিন আগে ১২ বছরের বালক সৌরভের পায়ে গুলি করে মিডিয়ায় এসেছিলেন। তিনি গত বিজয় দিবসে সুন্দরগঞ্জে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের অনুষ্ঠানে ঢাকা থেকে হেলিকপ্টারযোগে এসেছিলেন এবং তা-ও আড়াই ঘণ্টা পর। জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানকেও সেই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। অর্থ ও ক্ষমতা প্রদর্শনের কী অদ্ভুত মানসিকতা!
গত অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, ‘আজকে রাজনীতির বেশির ভাগ চলে গেছে ব্যবসায়ীদের পকেটে। এটা আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় কলঙ্ক।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেউ যদি অবৈধভাবে টাকাপয়সার মালিক হতে চান, তাহলে আরও অনেক ব্যবসা আছে। এমন লোকের রাজনীতিতে না আসাই ভালো।’
কিন্তু দুর্ভাগ্য! রাষ্ট্রপতির সদিচ্ছা কার্যকরী হয় না। এমন লোকেরাই রাজনীতি জমিয়ে বসে আছেন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ছিলেন ষাটের দশকের আওয়ামী লীগের রাজনীতির মানুষ। এই প্রজন্মের আওয়ামী লীগের মধ্যে সেই যুগের বৈশিষ্ট্য খুঁজতে যাওয়া বৃথা।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের ক্ষোভ অবৈধ ব্যবসার ব্যাপারে। উপরন্তু রাজনীতির পদ, পরিচয় ও ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে টাকা উপার্জনের যে পদ্ধতি ও কৌশল, তা অবশ্যই অবৈধ। তা হচ্ছে বড় রকমের দুর্নীতি। এ রকম দুর্নীতি অন্যরা করলে একরকম, যদিও তা খারাপ। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতাধরেরা সেটি করলে দেশের জন্য তা হয় মারাত্মকভাবে ক্ষতিকর। ভয়াবহ। তা অর্থনীতিকে করে ভঙ্গুর, সমাজকে করে কলুষিত, রাজনীতিকে করে বিকৃত।
আমাদের দেশে করপোরেট হাউসের অধিকাংশ মালিক নিজেরাই সাংসদ বা মন্ত্রী হতে চান। এতে সিস্টেম হিসেবে অর্থব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নড়বড়ে হয়ে ওঠে এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি হয় সব পুঁজিবাদী দেশেই দুর্নীতি কম-বেশি আছে। ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদেরা দুর্নীতির সঙ্গে কমবেশি জড়িত থাকেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনীতিবিদেরা কী রকম দুর্নীতি করেন, তা বিখ্যাত সাহিত্যিক মার্ক টোয়াইন এক উপন্যাসে (দ্য গোল্ডেন এজ) এক চরিত্রের সংলাপের মধ্য দিয়ে এভাবে প্রকাশ করেছেন। ‘এ কংগ্রেশনাল অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কস্টস মানি। জাস্ট রিফ্লেক্ট ফর ইন্সট্যান্স। এ মেজোরিটি অব দ্য হাউস কমিটি, সে ১০,০০০ ডলার এ পিস—৪০,০০০ ডলার; এ মেজোরিটি অব দ্য সিনেট কমিটি, দ্য সেম ইজ—সে ৪০,০০০ ডলার; এ লিটল এক্সট্রা টু ওয়ান অর টু চেয়ারম্যান অব ওয়ান অর টু সাচ কমিটিস, সে ১০,০০০ ডলার ইজ—২০,০০০ অ্যান্ড দেয়ার ইজ ১,০০,০০০ ডলার অব দ্য মানি গন, টু বিগিন উইথ...’
তাহলে উন্নত পুঁজিবাদী দেশেও রাজনীতিবিদেরা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকেন। তবে বাংলাদেশের সঙ্গে পার্থক্যটি এখানে লক্ষ করা যেতে পারে। প্রথমত, উন্নত পুঁজিবাদী দেশে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হন না। রাজনীতিবিদদের তাঁরা অর্থনৈতিক সহায়তা দান করেন। কিন্তু নিজেরা রাজনৈতিক পদ গ্রহণ করেন না। তাতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সিস্টেম অধিক কার্যকর থাকে। রাজনীতিতে বুর্জোয়ার নিয়ন্ত্রণ হয় অপ্রত্যক্ষ, কিন্তু কার্যকর। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই ফ্লেডারিখ অ্যাঙ্গেলস বিষয়টি লক্ষ করে বলেছিলেন, (পরিবার ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি গ্রন্থে), পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় ‘সম্পদ জোর খাটায় পরোক্ষভাবে, কিন্তু আরও নিশ্চিতভাবে, একদিকে সরকারি কর্মচারীদের সরাসরি হাত করে, যার বিশুদ্ধ দৃষ্টান্ত হচ্ছে আমেরিকা, অপরদিকে সরকার ও ফাটকাবাজদের সঙ্গে সহযোগিতা করে...।’
আমাদের দেশে করপোরেট হাউসের অধিকাংশ মালিক নিজেরাই সাংসদ বা মন্ত্রী হতে চান। এতে সিস্টেম হিসেবে অর্থব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নড়বড়ে হয়ে ওঠে এবং নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। টেন্ডারবাজি ইত্যাদি তারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন অথবা ভারতের সঙ্গে আমাদের দেশের এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। এ রকম হওয়ার পেছনে কিছু ঐতিহাসিক কারণও আছে। এখানে যে ধনিক শ্রেণি বিকাশ লাভ করেছে, তার চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য অধ্যাপক রেহমান সোবহান বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছেন। ‘বাংলাদেশে বুর্জোয়া শ্রেণির বিকাশ ও অভ্যন্তরীণ অসংগতি’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘বাঙালি বুর্জোয়াদের এই স্তরটির তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নিজেদের উদ্ভব ও বিকাশের জন্য রাষ্ট্রীয় কৃপার ওপর নির্ভরতা।...(তাদের) উন্নতির পেছনে তাদের নিজস্ব যোগ্যতা বা সামাজিক স্তরগত অবস্থানের সুবিধা—কোনোটাই কাজ করেনি। তাদের উন্নতির কারণ হিসেবে যা প্রতিভাত হয়, তা হলো নেহাত “সৌভাগ্য” অথবা বড়জোর অনুগ্রহ আদায়ের কৌশলে সিদ্ধহস্ততা।’
এই কারণে ব্যবসায়ীরা নিজেরাই রাজনৈতিক পদ দখল করাকে সুবিধাজনক মনে করেন। অথবা ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা নিজেরাই ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন। এবং সেই ক্ষেত্রে দুর্নীতির পরিমাণ হয় দেশের অর্থনীতির পরিপ্রেক্ষিতে অনেক বড় এবং বেপরোয়া লুটপাট রাজনীতির সংস্কৃতির অংশে পরিণত হয়। উল্টোদিকে এত বিরাট ধনসম্পদের মালিক না হলে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।
ক্ষমতাসীনদের সম্পদের স্ফীতি কী হারে হতে পারে তার উদাহরণও আমাদের হাতের কাছে আছে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের জন্য সরকারদলীয় যেসব মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, ডেপুটি স্পিকার ও সাংসদেরা (আগের টার্মের অর্থাৎ ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল এই সময়কালে) নির্বাচন কমিশনের কাছে হলফনামা করে সম্পত্তি ও আয়ের যে বিবরণ দিয়েছিলেন, ‘সুজন’ সেই বিবরণ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে, আগের পাঁচ বছরে তাঁদের সম্পত্তি ও আয় কী হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ৪৮ প্রার্থীর আয় বেড়েছিল ৫৮২ শতাংশ। মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের আয় বেড়েছিল যথাক্রমে ২৪৩ ও ৪৬৪ শতাংশ। এটি অবিশ্বাস্য হলেও সত্য। তাহলে পৌরসভা নির্বাচনে ৮৯ কোটিপতি প্রার্থীর খবরে বিস্মিত হওয়ার তেমন কিছু নেই। কিন্তু উদ্বিগ্ন না হয়েও পারছি না। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে রাজনীতি যে দুষ্টচক্রের মধ্যে আবর্তিত হবে, তার থেকে বেরিয়ে আসার পথ সহজ হবে না। সেটা শুধু রাজনীতি নয়, অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক নয়। আর তার সামাজিক প্রতিক্রিয়া আরও বিষময় হতে বাধ্য।
হায়দার আকবর খান রনো: রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি।

আইএসকে ঠেকাব কীভাবে? by হাসান ফেরদৌস

যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান পার্টির যে এক ডজন নেতা-নেত্রী তাঁদের দলের পক্ষে ২০১৬ সালের নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট পদে লড়তে চান, তাঁরা কে কার চেয়ে বেশি লড়াকু, তা প্রমাণে একেবারে গলদঘর্ম হয়ে পড়েছেন। গত সপ্তাহে লাস ভেগাসে তাঁরা জড়ো হয়েছিলেন তাঁদের দলের পাঁচ নম্বর ‘ডিবেটে’। সেখানে সবার এক কথা, ইসলামিক স্টেটকে (আইএস) ঠেকাতে হেন কাজ নেই, যা করা যাবে না। তা করতে গিয়ে যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধে, তাতেও কুছ পরোয়া নেই।
অনুমান করি, এর অধিকাংশই বাত-কি-বাত, প্রাক্-নির্বাচনী প্রচারণায় নিজ নিজ সমর্থকদের গা গরম করার চেষ্টা। আমেরিকার নির্বাচনী ব্যবস্থার এ এক অদ্ভুত ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত কে দলের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নির্ণয়ের জন্য ভোটাভুটির দেড়-দুই বছর আগে থেকে নিজেদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলে দলের সমর্থকদের নিজের পক্ষে টানতে। এর নাম ‘প্রাইমারি’। সমস্যা হলো, এই প্রাইমারির দৌড় পেরোতে রিপাবলিকানরা ঠিক সেই কাজটাই করছে, যা আইএস মনে-প্রাণে চাইছে। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে চলতি যুদ্ধটাকে তারা মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে ধর্মযুদ্ধ বলে প্রমাণে ব্যস্ত। অন্য সবকিছুর চেয়ে বেশি যা তারা চায়, তা হলো সিরিয়ায় ও ইরাকে, যেখানে আইএস তথাকথিত ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠা করেছে, সেখানে তাদের ঠেকাতে মার্কিন সৈন্য পাঠানো হোক। তাহলে খেলাটা জমে ভালো।
ডোনাল্ড ট্রাম্প থেকে জেব বুশ, সবাই ঠিক তা-ই চাইছেন। শুধু বোমা মেরে আইএসকে হটানো যাবে না। ওবামা প্রশাসনের সেই চেষ্টা, সিনেটর টেড ক্রুজের ভাষায়, বড়জোর ‘ছবি তোলার সুযোগ’। এখনই সৈন্য পাঠাও, ইরাক ও সিরিয়ার তেল দখল করো, সেখানে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করো।
মার্কিন সৈন্য না পাঠালে শুধু বিমানযুদ্ধে আইএসকে যে ঘায়েল করা যাবে না, অধিকাংশ আকেলমান্দ লোক তাতে একমত। ইরাকে সাদ্দাম হোসেনকে সরানো সম্ভব হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে এক সর্বাত্মক যুদ্ধের পর, প্রায় দেড় লাখ পদাতিক সৈন্য সরাসরি সে যুদ্ধে অংশ নেয়। ইরাকে সাদ্দাম সরকারের পতন এবং সেখানে বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতির প্রতিক্রিয়াতেই জন্ম নেয় সুন্নি বিদ্রোহ। আর মার্কিন সৈন্য সরে যেতে না-যেতেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে আইসিস বা আইএস। সেই আইএসকে তাড়াতে না–হয় আবারও দেড় লাখ সৈন্য পাঠানো গেল। কিন্তু কত দিন তাদের সেখানে আসন গেড়ে বসে থাকতে হবে জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে?
এ কথায় এখন সবাই একমত, বিশ্বজুড়ে যে ইসলামি জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটেছে, তার প্রধান কারণই হলো আমেরিকার ইরাক অভিযান। ‘শুদ্ধ ইসলামি রাষ্ট্র’ গঠনের স্বপ্ন থেকে একধরনের মৌলবাদী তৎপরতা মিসর থেকে পাকিস্তান, সারা ইসলামি বিশ্বে বরাবরই ছিল। কিন্তু আরবের মাটিতে বিদেশি সৈন্যের উপস্থিতি তাতে যেন ঘৃতাহুতি দিল। সেই আগুনের বহ্ন্যুৎসব এখন ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর সর্বত্র।
ইসলামি জঙ্গিবাদ ঠেকানোর উপায় হিসেবে আমেরিকা ও পশ্চিম ইউরোপ মোটের ওপর যে ব্যবস্থা নিয়েছে তা হলো: যেখানে জঙ্গি দেখবে সেখানেই বোমা ফেলো। সিরিয়া, ইয়েমেন, পাকিস্তান ও মালি—সবখানে একই দৃশ্য। সম্প্রতি সাপ্তাহিক নেশন পত্রিকায় ভাষ্যকার ইউসুফ মুনাওয়ার আমেরিকার এই নীতিকে চুলায় পানি গরম করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। গনগনে চুলায় পানি গরম করতে গেলে তাতে একসময় বুদ্বুদ দেখা দেবে। জঙ্গিবাদ হলো ওই বুদ্বুদের মতো। হাঁড়িতে যখন বুদ্বুদ ফোটে, আমেরিকা অমনি খুন্তি হাতে নিয়ে সেই বুদ্বুদ ফুটো করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। এক বুদ্বুদ থামে তো আরেক বুদ্বুদ ফোটে। কত বুদ্বুদ তারা থামাবে? অথচ ভিন্ন ভিন্ন বুদ্বুদ থামানোর বদলে যদি সে বুদ্বুদের কারণ—ওই জ্বলন্ত চুলা—নেভানোর ব্যবস্থা করত, তাহলে ফল পাওয়া যেত অনেক দ্রুত ও সহজে।
আমার নিজের ধারণা, প্রেসিডেন্ট ওবামা এই সহজ সত্যটা বুঝতে পেরেছেন। চারদিক থেকে চাপ সত্ত্বেও তিনি যে এখনো আইএসের বিরুদ্ধে মার্কিন পদাতিক সৈন্য পাঠাননি, তার কারণ তিনি জানেন এর ফলে আইএসকে নতুন জীবন দান করা হবে। শুধু সামরিক ব্যাপার হলে আইএসকে ঠেকানো আমেরিকার পক্ষে কঠিন হতো না। তিনি জানেন, সে বিজয় ধরে রাখতে হলে দেড় লাখ না হোক, তার অর্ধেক সৈন্য স্থায়ীভাবে ওই এলাকায় রেখে দিতে হবে। ঠিক এই ভুলটি করেই জর্জ বুশ আইএসের জন্ম দিয়েছিলেন।
আইএসের নিয়মিত সৈন্যসংখ্যা ৩০-৩৫ হাজারের বেশি হবে না। আমেরিকার মতো সর্বাধুনিক সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে টিকে থাকার ক্ষমতা আইএসের নেই। অথচ তারপরও তারা তো দিব্যি চরিয়ে খাচ্ছে, সিরিয়া ও ইরাক মিলিয়ে রীতিমতো বিরাট একটা অঞ্চল তারা নিজেদের দখলে নিয়েছে। তার কারণ, আইএস তার জীবনীশক্তি আহরণ করে বিদেশি আগ্রাসন ও রাজনৈতিক অধিকারহীনতার ব্যাপারে ওই অঞ্চলের সুন্নিদের ক্ষোভ থেকে।
তাহলে সমাধান কোথায়? এ প্রশ্নের একটা উত্তর মিলেছে জাতিসংঘ থেকে। গত শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে সিরিয়ার অব্যাহত গৃহযুদ্ধ থামাতে একটি শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সুযোগ নিয়েই আইএস সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। ফলে প্রথম কাজই হলো সেই গৃহযুদ্ধ থামানো। ওয়াশিংটন, মস্কোসহ সব পক্ষই একমত হয়েছে যে আপাতত সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে রেখেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। বিশ্বের এ দুই পরাশক্তি সেখানে ইতিমধ্যে এক নতুন সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িয়ে পড়েছে। উভয়েই বলেছে, আইএস তাদের শত্রু, কিন্তু সেই শত্রু ঘায়েলের জন্য কোনো অভিন্ন রণকৌশল অবলম্বনের বদলে তারা যে যার নিজস্ব রাজনৈতিক লক্ষ্য হাসিলে ব্যস্ত। জাতিসংঘে গৃহীত নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তির মাধ্যমে এই অবস্থা বদলানোর একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যদি মস্কো ও ওয়াশিংটন তাদের দেওয়া কথার খেলাপ না করে, তাহলে উভয়ের সামরিক চাপের একমাত্র লক্ষ্য হবে আইএসের পতন।
আইএসের সামরিক পতন নিশ্চিত হলেও তার আদর্শগত পতন অর্জিত হবে না। কারণ, আইএস কেবল একটি সামরিক আন্দোলন নয়, তার আসল জোর আদর্শগত বা ‘আইডিওলজিক্যাল’। পাল্টা ‘আইডিওলজি’ রাতারাতি গজানো সম্ভব নয়, কিন্তু যা সম্ভব তা হলো, ইউসুফ মুনাওয়ার যে জ্বলন্ত চুলার কথা বলেছেন, তার আগুন নেভানোর ব্যবস্থা করা।
এ কথার অর্থ, ঠিক যেসব কারণে আইএস আসন গেড়ে নিতে পেরেছে, নজর দিতে হবে সেসবের দিকে। সর্বাগ্রে প্রয়োজন হবে ওই অঞ্চলের সব জাতি-গোষ্ঠীর ন্যায্য রাজনৈতিক স্বাধিকারের নিশ্চয়তা। ইরাকে শিয়া নেতৃত্ব সে দেশের সুন্নি জনগোষ্ঠীর অধিকার মানতে অস্বীকার করেছে। সিরিয়ায়ও আসাদ ব্যস্ত থেকেছেন সব ক্ষমতা নিজের আলাভি-শিয়াদের হাতে জমা রাখতে। অন্যদিকে, ইরাকের উত্তরে কুর্দিরা দীর্ঘদিন থেকে নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার দাবি করে আসছে। তুরস্ক নাখোশ হবে ভেবে কৃর্দিদের সেই দাবি পরাশক্তিগুলো গ্রাহ্য করেনি।
সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ থামার পর একটি জরুরি কাজ হবে ওই অঞ্চলের সব জাতি-গোষ্ঠীর ন্যায্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের স্বীকৃতি জানিয়ে এক ব্যাপক, বহুজাতিক ‘সামাজিক-রাজনৈতিক চুক্তি’। এই চুক্তি বাস্তবায়নের চেহারা কী হবে, এই মুহূর্তে তা বলা কঠিন। তবে ইরাক ও সিরিয়া উভয় দেশেই যদি জাতিভিত্তিক বিভক্তি মেনে একটি ফেডারেল ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, তাতে সমাধানের একটি পথ উন্মুক্ত হবে, এ কথা অনেক নিরপেক্ষ বিশ্লেষকই বলা শুরু করেছেন।
আমেরিকা বা রাশিয়াকে যদি এই ‘গ্র্যান্ড বারগেইনের’ নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাতে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠবে। এ দুই শক্তির ব্যাপারেই ঐতিহাসিক কারণে ওই অঞ্চলের লোকদের গভীর অবিশ্বাস রয়েছে। কিন্তু ওয়াশিংটন ও মস্কো যদি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে এমন একটি ‘গ্র্যান্ড বারগেইনের’ পেছনে দাঁড়ায়, তাহলে এই কঠিন কাজটির বাস্তবায়ন অনেক সহজ হয়ে আসে।
শুধু এ দুই পরাশক্তি নয়, আঞ্চলিক শক্তিসমূহ—যেমন ইরান, সৌদি আরব ও উপসাগরীয় দেশসমূহ—তাদেরও এই চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে আইএস ছাড়াও এক বড় আপদ হলো ইরান ও সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। অন্যকে রুখতে এরা নিজেদের ধ্বংস করতে প্রস্তুত, সেই প্রমাণ তারা ইতিমধ্যে রেখেছে। গোড়া থেকেই যদি এ দুই নাটের গুরুকে প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তাহলে স্বল্পমেয়াদি হিসাবে স্থিতিশীলতা অর্জন অসম্ভব নয়।
সৌদি আরব ইরানকে ঠেকানোর লক্ষ্যে এরই মধ্যে এক ৩৪-জাতি সামরিক জোট গঠনের কথা ঘোষণা করেছে। এর ফলে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে প্রতিযোগিতা যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে ওই অঞ্চলের শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব কাটানোর একমাত্র উপায় এ দুই দেশের ‘অভিভাবকদের’ তাদের ক্লায়েন্ট দেশের মাধ্যমে নিজেদের ‘প্রক্সি’ যুদ্ধ চালানোর পুরোনো অভ্যাসটা বদলানো।
আইএস যে একা আমেরিকার সমস্যা নয়, সে রাশিয়ার জন্যও মস্ত মাথাব্যথা, সে কথা এ দুই দেশই স্বীকার করে নিয়েছে। জাতিসংঘে সিরিয়ায় যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গ্রহণকালে তাদের বক্তব্যে সে কথার স্বীকৃতি মিলেছে। বাস্তবতা মেনে নিয়েই যে তারা অভিন্ন ভাষায় কথা বলছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এখন সৌদি আরব ও ইরানের সামনে সেই একই সত্যটা তুলে ধরার দায়িত্ব যদি যথাক্রমে ওয়াশিংটন ও মস্কো গ্রহণ করে, অনুমান করি, তাহলে তাদের একে অপরের বিরুদ্ধে ঘোড়দৌড় সাময়িকভাবে হলেও থামানো যাবে।
আইএসকে মোকাবিলায় মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যদি সত্যি সত্যি ঐকমত্য অর্জিত হয়, তাহলে শুধু জঙ্গিবাদের উত্থানই ঠেকানো সম্ভব হবে না, শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে অনেক প্রশ্নেরই সমাধান অর্জন সম্ভব। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এক মস্ত বিপদ সামনে রেখে তারা এক হয়েছিল। আজকের সংকট তার চেয়ে বিন্দুমাত্র কম নয়।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

নেপালের শিক্ষা! by কামাল আহমেদ

অবরোধ প্রতাহারে নেপালকে শেষ পর্যন্ত
ভারতের দাবি মেনে নিতে হয়েছে
ভারতে নরেন্দ্র মোদি তাঁর ভূমিধস বিজয়ের পর শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কথিত ‘প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার’ দেওয়ার পররাষ্ট্রনীতির সূচনা করেছিলেন। দেশের ভেতরে ‘সবকা সাথ সমৃদ্ধি’র যে আওয়াজ তুলে তিনি নির্বাচিত হয়েছিলেন, সেই সমৃদ্ধির ধারায় প্রতিবেশীদেরও সম্পৃক্ত করার অঙ্গীকার করেছিলেন তিনি। তবে বছর না ঘুরতেই তাঁর সেই আশ্বাস অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। নেপাল তার এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ। প্রায় চার মাস এক অঘোষিত অবরোধের শিকার নেপাল শেষ পর্যন্ত ২০ ডিসেম্বর রাতে ভারতের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। প্রায় সাত বছর ধরে দর-কষাকষি ও রাজনৈতিক লেনদেনের নানা সমীকরণের মধ্য দিয়ে গৃহীত সংবিধান বৃহৎ প্রতিবেশীর চাপে আবারও সংশোধনে সম্মত হয়েছে নেপাল সরকার।
নেপালের তেরাই সমতল অঞ্চলের মধেশিদের দাবি অনুযায়ী সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব এবং প্রাদেশিক সীমানা পুনর্নির্ধারণের বিষয় বিবেচনায় রাজি হয়েছে মন্ত্রিসভা। তেরাই অঞ্চলের এই মধেশিরা মূলত ভারতীয় বংশোদ্ভূত এবং ভারতের বিহার রাজ্যের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার বন্ধন অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। নেপালের নতুন সংবিধানের যেসব বিষয়কে ঘিরে দেশটিতে বিরোধ ও অস্থিরতা দেখা দেয়, তার মধ্যে সাতটি প্রদেশ সৃষ্টি এবং তার সীমানা চিহ্নিত করা অন্যতম। এ ছাড়া রাজতন্ত্রের অবসানের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হওয়া হিন্দুরাষ্ট্র পরিচয় পুনরুজ্জীবনের দাবিও উঠেছিল।
গত আগস্ট মাসে দেশটিতে নতুন সংবিধান গৃহীত হওয়ার পর দেশের ভেতরে মধেশিরা প্রতিবাদ জানানো শুরু করলে ভারতও প্রকাশ্যে নেপালের সমালোচনা শুরু করে। এমনকি ভারত ওই সংবিধান সংশোধনের কথাও বলে। প্রায় একই সময়ে মধেশিদের আন্দোলনের কারণে নিরাপত্তাহীনতার দোহাই দিয়ে ভারতের সীমান্তচৌকিগুলোতে সব ধরনের পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়, যাকে অঘোষিত অবরোধ হিসেবেই সবাই অভিহিত করতে থাকেন। ভারতে সরকারিভাবে অবরোধের কথা অস্বীকার করা হলেও দেশটির বিরোধী রাজনীতিক এবং সংবাদমাধ্যমেও একে অবরোধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
গত রোববার রাতে (২০ ডিসেম্বর) মধেশি আন্দোলনকারীদের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে একটি কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত হয়, যে কমিশন এই বিরোধ নিষ্পত্তি ও সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে সুপারিশ পেশ করবে। সমঝোতার পর নেপালের শিল্পমন্ত্রী সোম প্রসাদ পান্ডে সাংবাদিকদের বলেন যে কমিশন গঠিত হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তার সুপারিশমালা পেশ করবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সেদিন এক বিবৃতিতে চলমান অচলাবস্থা নিরসনের ভিত্তি তৈরি করতে এই সমঝোতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশাবাদ প্রকাশ করে।
নেপালের ওপর ভারতের এই অঘোষিত অবরোধের অবসান যে সবার জন্য সুসংবাদ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। জাতিসংঘ থেকে শুরু করে আমরা সবাই এখন আপাতত স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়তে পারি। কেননা, এই অবরোধের সময় প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে নানা সময়ের সংঘাতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৫০ জনের। অবরোধজনিত খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতির কারণে কোনো মৃত্যু ঘটেছে কি না, তার কোনো হিসাব অবশ্য কেউ প্রকাশ করেনি। তবে ৩০ নভেম্বর ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক অ্যান্থনি লেক এক বিবৃতি দিয়ে বলেছিলেন যে অচিরেই এই অবরোধের অবসান না হলে শীত মৌসুমে শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যাবে। তার আগে ১১ নভেম্বর জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে সব পক্ষের প্রতি এই অবরোধ অবসানের আহ্বান জানিয়েছিলেন (টাইমস অব ইন্ডিয়া, ১১ নভেম্বর, ২০১৫)। মি. মুন তাঁর বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন যে অবরোধের কারণে ভয়াবহ ভূমিকম্প–পীড়িত দেশটির প্রত্যন্ত এলাকায় জরুরি মানবিক সাহায্যসামগ্রীর সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব তাঁর বিবৃতিতে অবরোধের জন্য দায়ী কে, তা উল্লেখ না করলেও বলেছিলেন যে একটি ভূমিবেষ্টিত (ল্যান্ডলক্ড) দেশ হিসেবে নেপালের ট্রানজিট পাওয়ার অধিকার আছে। উপরন্তু মানবিক সহায়তা পাওয়ার প্রশ্ন তো রয়েছেই। তারও দুই মাস আগে সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের র্শীষ বৈঠকের সময় নেপাল আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের কাছে ভারতের এই অবরোধের বিষয়ে অভিযোগ জানিয়েছিল। তবে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে জাতিসংঘের সীমাবদ্ধতা যে কতটা প্রকট, সে প্রসঙ্গ এখানে আলোচনা না করলেও চলে। অবশ্য তাদের এসব উদ্বেগের প্রসঙ্গ উত্থাপন এ কারণে জরুরি যে সংকটটি একটি প্রাণঘাতী রূপ নিলেও নিতে পারত। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একটি বড় ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেল। সম্ভবত বাংলাদেশও একই ধরনের বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা পেল। কেননা, জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি ও খাদ্যসামগ্রী সরবরাহে বাংলাদেশের কাছেও নেপাল সহায়তা চেয়েছিল। ভারতের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কে উত্তরোত্তর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সেটা কতটা সম্ভব হতো, তা বলা মুশকিল।
এই অর্থনৈতিক অবরোধটির কারণে নেপাল এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো দুর্যোগের কবলে পড়ে। প্রথমটি ঘটেছিল ২৫ এপ্রিলের ভয়াবহ ভূমিকম্পের কারণে। ওই ভূমিকম্পে দেশটিতে জাতিসংঘের হিসাবে কমপক্ষে ৯ হাজার লোকের মৃত্যু হয় এবং ২৩ হাজারের বেশি লোক আহত হয়। হাজার হাজার লোক আশ্রয়হারা হয় এবং অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়ে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নানা ধরনের সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এলেও দেশটিতে পুনর্গঠনের কাজ এখনো পুরোদমে শুরু হতে পারেনি।
নেপালের সঙ্গে ভারতের এই বিরোধ বা সংকটের অন্য আরেকটি দিক তুলে ধরেছেন ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসেরই এক প্রবীণ নেতা মনি শংকর আয়ার। ৭ ডিসেম্বর তিনি এনডিটিভির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিশেষ নিবন্ধে কিছু চমকপ্রদ তথ্য দিয়েছেন, যাতে দেখা যাচ্ছে নেপালের এই দুর্ভোগের পেছনে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও অনেকাংশে দায়ী। ‘এ মোদি-মেড ডিজাস্টার হিটস নেপাল হার্ড’ শিরোনামের নিবন্ধে তিনি লিখেছেন, নেপালকে হিন্দু রাষ্ট্র হতে না দেওয়ার প্রতিশোধ নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী মোদি। তিনি আরও লিখেছেন, ২০১৫ সালে বিহারে যে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন হয়ে গেল, সেই ভোট সামনে রেখে এক বছর আগে নেপালের জানকিপুরে মি. মোদি একটি জনসভা করতে চেয়েছিলেন। সেখানে তিনি মধেশি মেয়েদের মধ্যে ১০ হাজার বাইসাইকেল বিতরণ করতে চেয়েছিলেন। ওই সব সাইকেল পেলে মধেশি বালিকারা বিহারে বসবাসরত তাঁদের আত্মীয়স্বজনকে বিজেপির পক্ষে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করবেন বলে তাঁর আশা ছিল। নেপাল সরকার তাঁকে সেই সুযোগ দেয়নি।
মনি শংকর আয়ার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন তাঁর লেখায়। নেপালের যে সংসদে নতুন সংবিধানটি অনুমোদিত হয়েছে, সেই সংসদে তরাই অঞ্চল থেকে জনপ্রতিনিধি আছেন ১১৬ জন এবং তাঁদের মধ্যে ১০৫ জনই সংবিধানটির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। মাত্র ১১ জন সাংসদের বিরোধিতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে ভারত যে নেপালি সংবিধান আবারও সংশোধনের চাপ দিয়েছে, তিনি তার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি তাঁর পাঠকদের উদ্দেশে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন যে ভারতের সংবিধানসভা যে সংবিধানটি অনুমোদন করেছিল, নেপাল যদি তা সংশোধনের দাবি জানাত, তাহলে ভারতে তার প্রতিক্রিয়া কী হতো? এই অঘোষিত অবরোধের পরিণতিতে নেপালে ভারতবিরোধী মনোভাব জোরদার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রকে উদ্ধৃত করে কংগ্রেসের এই নেতা আশাবাদ প্রকাশ করে লিখেছেন যে নেপালিরা হয়তো বুঝতে পারবেন, নেপালের ওপর যে অবরোধজনিত দুর্যোগ নেমে এসেছে, তার দায় পুরো ভারতের নয়, শুধু বর্তমান সরকারের। মি. আয়ারের এই লেখা হয়তো রাজনৈতিক কারণেই এতটা কঠোর। কিন্তু ভারতের সংবাদমাধ্যমও বিষয়টিতে কম সোচ্চার নয়। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস গত মাসেই এক সম্পাদকীয়তে মি. মোদির প্রতিবেশী নীতির কড়া সমালোচনা করে লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রতিবেশীকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতি বাস্তবায়ন করতে পারেননি (আনইজি নেবারস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ৩ নভেম্বর, ২০১৫)।
বিশ্বায়নের কালে জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ধারণায় রূপান্তর ঘটছে—এ কথা আমরা সবাই জানি। ইউরোপে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অভিন্ন মুদ্রাব্যবস্থার কারণে এক দেশের বাজেটের বিষয়ে অন্য দেশের মতামতের আলাদা গুরুত্ব ইতিমধ্যে স্বীকৃত। এমনকি বৃহত্তর ইউনিয়নকে সন্তুষ্ট করতে গ্রিসকে একাধিকবার নির্বাচনও করতে হয়েছে। বিশ্বের কোনো দেশেই আর সবকিছুই ওই দেশের একার নয়, এতে প্রতিবেশী এবং তার বাইরে পুরো বিশ্ববাসীর স্বার্থ অথবা ভাগ্যের অনেক কিছুই জড়িত আছে। কিন্তু অন্যের নাক গলানোরও তো একটা সীমা আছে। নাকি তা শুধু ছোট দেশগুলোর জন্য সত্য—বড় বাজার অথবা উদীয়মান বিশ্বশক্তির জন্য নয়?
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

আশি বছরে রাবেয়া খাতুন by আহমাদ মাযহার

১৯৪৭-এর আগে ঢাকায় বাংলা সাহিত্যের চর্চা ছিল খুবই কম। ঢাকা তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব অংশের রাজধানী হলে ধীরে ধীরে ঢাকা নগরের আয়তন বাড়তে থাকে, বাড়তে থাকে জনসংখ্যা। গড়ে উঠতে থাকে নতুন মধ্যবিত্ত সমাজ। দু-একজন করে লেখকেরও দেখা মিলতে থাকে। কলকাতায় যাঁদের শুরু, তেমন কয়েকজন ঢাকায় এলেন। ঢাকায়ও শুরু করলেন কেউ কেউ!
স্বল্পসংখ্যক নতুনে তো পাঠকের তৃপ্তি হওয়ার কথা নয়! তাই কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত লেখকেরাই ছিলেন তাঁদের কান্ডারি। ধীরে ধীরে অবস্থা বদলায়। সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজধানী শহরে গড়ে উঠতে থাকা মধ্যবিত্ত সমাজের ভেতর থেকে জেগে ওঠেন নতুন সাহিত্যস্রষ্টারা। রাবেয়া খাতুন তাঁদেরই একজন। ৮০ বছর পূর্তির লগ্নে তাঁর অবদানের মূল্যায়ন করতে হলে এই পটভূমির কথা আমাদের মনে রাখতে হবে।
১৯৪৭-এর আগের বাংলা সাহিত্যের কেন্দ্র কলকাতায়। কিন্তু সেখানে মুসলিম সমাজের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। নারীদের অবস্থা আরও পশ্চাৎপদ। সেই সমাজে আত্মবিকাশের আকাঙ্ক্ষায় উন্মুখ নারীদের দু-একজনকে তখন সবেমাত্র দেখা যেতে শুরু করেছে! ঢাকায় সাহিত্যের যাত্রার শুরুতে নারীদেরও মাত্রই দু-একজনের সূচনা। রাবেয়া খাতুন সেই সূচনাকারীদের অন্যতম। তখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে লেখাপড়ার সুযোগ পেয়েছেন এমন নারীর সংখ্যাও কম। তাঁদের লেখাপড়ার দৌড়ও মাধ্যমিক স্কুলের দোরগোড়া অবধি। আবার এই সীমিত লেখাপড়ার সুযোগের পেছনেও উদ্দেশ্য সংকীর্ণ—আধুনিক পুরুষতান্ত্রিকতার সহায়ক ও উপযোগী হিসেবে নারীদের গড়ে তোলা। কারণ, ওই সময়ে প্রধানত নারীদের জীবন ছিল ঘরের ভেতরের সংসার-সীমানাতেই সীমিত।
সুতরাং দৃষ্টিভঙ্গি এমন যে নারীর উচ্চশিক্ষায় ফায়দা এর চেয়ে বেশি আর কী! পুরুষের মতো মুক্তভাবে নিজের জীবন পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার বলতে গেলে ছিলই না। হয় বাবার, না হয় স্বামীর কাছ থেকে অনুমতি পাওয়ার জন্য তাঁকে সব সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে। সমাজের সাধারণ আধুনিক শ্রেয়োবোধই এ রকম যে নারীর বাইরে যাওয়ার দরকার হবে নিতান্তই সংসারের প্রয়োজনের খাতিরে। সে জন্যই তাঁদের শিক্ষার অধিকারও ততটুকুই, যতটুকু ঘরের ভেতরে প্রয়োজন। বিবাহযোগ্য হিসেবে এটুকু শিক্ষা তার মূল্য কিছুটা বাড়িয়েছিল বইকি। রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক উন্মেষের কালে বাংলাদেশের উদার মধ্যবিত্ত সমাজ এর চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে পারেনি। তাঁর সমসাময়িক কালের মুসলিম মধ্যবিত্ত সমাজ প্রতিনিধিদের স্মৃতিকথাগুলো থেকে এমন মনোভঙ্গিরই পরিচয় পাওয়া যায়।
কিশোর বয়স থেকেই তিনি বিদ্রোহী সত্তার অধিকারী। তাঁর স্মৃতিকথায় সে পরিচয় পাওয়া যায়। নিতান্ত কিশোর বয়সে বিদ্রোহে যাঁর সূচনা, তিনি যে অদম্য হবেন, সে তো জানা কথাই! ওই বয়সে পত্রিকায় লেখা পাঠানোয় পরিবারে দেখা দেয় তীব্র অসন্তোষ। বয়োজ্যেষ্ঠদের ধারণা, একটি মেয়ের হাতের লেখা সংসারের বাইরের পুরুষদের দেখতে মানা। নারী হিসেবে কী রকম অবরুদ্ধ সমাজের বাসিন্দা ছিলেন তিনি, এই ঘটনা তার সাক্ষ্য। এ রকম একটা পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্বপ্ন দেখেছেন ঔপন্যাসিক হওয়ার, মুক্তি ঘটাতে চেয়েছেন লেখক সত্তার।
নারী বলে তাঁকে বেশি সংগ্রামশীল হতে হয়েছে। নিজের সৃষ্ট সাহিত্যকর্মকে নারী হিসেবে বাড়তি অনুকম্পার চোখে দেখা হোক, এমন প্রত্যাশা কখনো করেননি! জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি-অর্থনীতির প্রভাবে আমাদের সমাজও বিবর্তমান। সেটাকে তাঁর পর্যবেক্ষণ অগ্নিদৃষ্টির মাধ্যমে। বিচিত্র কথাসাহিত্যকর্মে তথা গল্প-উপন্যাসে ও ভ্রমণ সাহিত্যে এমনকি শিশুসাহিত্যের অভিযাত্রায় তাঁর নিদর্শন ছড়িয়ে আছে! নারী-পুরুষনির্বিশেষে তাঁর সমকালের উল্লেখযোগ্য লেখকদের খুব কম সংখ্যকের মধ্যেই এতটা দীর্ঘকালব্যাপী ধারাবাহিক সক্রিয় ও নিমগ্নতা পাওয়া যাবে।
৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে সক্রিয়। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যাও উল্লেখ করার মতো। পঞ্চাশেরও বেশি উপন্যাসের রচয়িতা। তাই ঔপন্যাসিক হিসেবেই হয়তো বেশি পরিচিতি। এ পর্যন্ত চার খণ্ডে প্রকাশিত চার শ ছোটগল্পের রচয়িতা হিসেবে দেখলে তাঁকে প্রধানত গল্পকার হিসেবেই চেনা যাবে। ভ্রমণ–সাহিত্যের লেখক হিসেবেও তিনি অবিরল। বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে সৃষ্টিশীল অনুপ্রেরণায় রচিত তাঁর ভ্রমণ–সাহিত্য প্রাচুর্য ও স্বাতন্ত্র্য উভয় কারণে আলাদাভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।
এদিকে তিনি সামনের সারিতেই থাকেন শিশুসাহিত্যের স্রষ্টা হিসেবেও। তাৎপর্যপূর্ণ স্মৃতিকথামূলক রচনাও পরিমাণে কম নয়। সব মিলিয়ে রাবেয়া খাতুন তাঁর সৃষ্টিশীল বিচিত্র সংরূপের মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ মানসের অন্তর্গত স্রোতকেই পাঠকদের অনুভবের সীমানায় এনে দেন। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব জীবনোপলব্ধি ও কল্পনা প্রতিভার সমন্বয়। তাঁর ভাষা ঋজু, সংহত, ব্যঞ্জনাময় ও নির্মোহ। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রার বিবেচনায় রাবেয়া খাতুনের সাহিত্যিক অবদানকে এ কারণেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হবে। তিনি যখন ভ্রমণ–সাহিত্যে মনোযোগী হন, তখন আমাদের পত্রপত্রিকাগুলো এর জন্য প্রস্তুত ছিল না। একের পর এক ভ্রমণ–সাহিত্য রচনা করে এই মাধ্যমটির দিকে সাহিত্য সমাজকে আগ্রহী করে তুলেছেন। বৃহদায়তন উপন্যাস লেখেননি। লিখেছেন নভেলার। এতে একদিকে তিনি ধারণ করেছেন ক্ষয়িষ্ণু গ্রামীণ জীবনবোধকে, অন্যদিকে ধরা পড়েছে ঘটমান নগরজীবন। ছোটগল্পের নাতিদীর্ঘ পরিসরেও এই জটিলতাকে তিনি তাঁর বিশিষ্ট গদ্যরীতির সামর্থ্যে পেরেছেন সম্পন্নভাবে ধারণ করতে। নিজে সংবেদনশীল নারী বলে গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনে নারী-মনস্তত্ত্বের স্বাতন্ত্র্যকে পেরেছেন উপলব্ধি করতে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনপ্রবাহকে একেবারে সন্ধিস্থল থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন তিনি।
আজ তাঁর ৮০ বছর পূর্ণ হবে। ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চর্চিত তাঁর সাহিত্যকে আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান ও অভিনিবেশের সঙ্গে বিচার করে দেখা জরুরি। আমরা তাঁর দীর্ঘ কর্মময় জীবন কামনা করি।
আহমাদ মাযহার: সাহিত্যিক।

মোদি হতাশ, বিশ বাঁও জলে জিএসটি by সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়

ন্যাশনাল হেরাল্ড–এর মামলায় আদালতে
হাজির হয়েছিলেন সোনিয়া ও রাহুল
শেষ পর্যন্ত কী হবে বলতে পারি না, তবে আপাতত সব ঘোলাটে হয়ে গেছে। এবং এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অসহায় যাঁকে মনে হচ্ছে, তিনি এই বহু বিভাজিত বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশের প্রধানমন্ত্রী। নরেন্দ্র মোদি।
সবকিছু আচমকা ঘোলাটে হয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধান কারণ সেটাই, ২৮ বছর আগে যাঁকে হাতিয়ার করে উত্তর প্রদেশের মান্ডা নামক এক অখ্যাত জনপদের সাবেক রাজা বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং দিল্লিতে গান্ধী পরিবারের মসনদ টলিয়ে দিয়েছিলেন। ইন্দিরা হত্যার প্রবল আবেগ ও জনসমর্থনে ভর দিয়ে রাজীব গান্ধী ক্ষমতায় বসলেও তিন বছরের মধ্যেই টলমল করে উঠেছিল তাঁর গদি। দুই বছর পর ১৯৮৯ সালের নির্বাচনে অপদস্থ রাজীবকে ‘চোর’ অপবাদ মাথায় নিয়ে সরে যেতে হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং। রাজীব-বধে সেদিন তাঁর হাতিয়ার ছিল বোফর্স।
ভারতের রাজনীতিতে দুর্নীতি সেই যে একটা মোক্ষম ‘ইস্যু’ হয়ে দেখা দিল, আজও তা বড় অনুঘটক হয়ে রয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতি আজ হঠাৎই যে এমন ঘোলাটে হয়ে গেল, তার কারণও এই দুর্নীতি। সংসদ সচল হয়েও অচল হয়ে রইল, অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ থমকে গেছে, জরুরি বিলগুলো মুখ থুবড়ে পড়েছে, ফলে গড়গড় করে চলতে থাকা নরেন্দ্র মোদির রথের গতি শ্লথ হয়ে গেল।
দুর্নীতির অভিযোগ প্রথম ওঠে কিন্তু মোদির দলের বিরুদ্ধেই। আর সেই অভিযোগের কেন্দ্রে ছিলেন যিনি, তিনিও অন্য এক মোদি। আইপিএলের বিগ বস ললিত মোদি, দেশে এলে গ্রেপ্তার হতে হবে বলে যিনি বিলেতে বসে বেশ কিছুদিন ধরেই এ দেশের রাজা-উজির মারছেন। সংক্ষেপে বলতে গেলে সে সময় অভিযোগটা ছিল প্রধানত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের বিরুদ্ধে। তিনি ও তাঁর পরিবার ললিতের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত, তাঁর স্বামী ও কন্যা ললিতের হয়ে প্রকাশ্যে ওকালতি করেন এবং ললিতকে তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য বিশেষ ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট পাইয়ে দিতে তিনি ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করেছিলেন। একজন ফেরার, যাঁর বিরুদ্ধে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নয়–ছয়ের অভিযোগ রয়েছে, যাঁকে দেশে ফেরাতে ভারত সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে (অবশ্য সেইভাবে তেড়েফুঁড়ে চেষ্টা হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক আছে), তাঁকে কিনা সাহায্য করছেন সুষমা স্বরাজ? কংগ্রেস রীতিমতো হইচই ফেলে দেয় এ নিয়ে। রাজনীতিও হয়ে ওঠে চনমনে।
সুষমার পাশাপাশিই বিতর্কে ঢুকে পড়েন বিজেপির আরও দুই কৃতী মুখ্যমন্ত্রী। রাজস্থানের বসুন্ধরা রাজে ও মধ্যপ্রদেশের শিবরাজ সিং চৌহান। বসুন্ধরা ও ললিতের বহুদিনের বন্ধু। দুজনেই রাজস্থানের বাসিন্দা। তা ছাড়া বসুন্ধরার সাংসদ-পুত্র দুষ্মন্ত সিংয়ের ব্যবসায় ললিত বিস্তর টাকা ঢেলেছেন। অতএব, সুষমার মতো তিনিও সমান অপরাধী। কারণ, তাঁরা অপরাধী ললিতকে আগলে রেখেছেন! তাঁকে রক্ষা করছেন!
কংগ্রেসের হাতে ঠিক এই সময়েই আরও একটি অস্ত্র উঠে আসে মধ্যপ্রদেশ থেকে। ব্যাপক দুর্নীতি। রাজ্যে শিক্ষা ও সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে বহমান এই দুর্নীতি এবং তাকে ঘিরে পরতে পরতে রহস্যের জাল বিষয়টিকে আকর্ষণীয় করে তোলে। রহস্যটা আবার ভয়াবহ। এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ যাঁদের বিরুদ্ধে, যাঁরা এর তদন্তে সাহায্য করছেন, তাঁদের অনেকেরই একে একে রহস্যজনক মৃত্যু হচ্ছে। অথচ রাজ্য সরকার নির্বিকার। অভিযোগ, দুর্নীতির সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের যোগসাজশই নাকি এর কারণ।
মোদি সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই এ দুই দুর্নীতি কংগ্রেসের হাতে আচমকাই একটা বড় অস্ত্র তুলে দেয়। দুই মুখ্যমন্ত্রী ও এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর অপসারণের দাবিতে কংগ্রেস সংসদ অচল করে রাখে দিনের পর দিন। গোঁ ধরে থাকেন প্রধানমন্ত্রীও। সরকার, দল ও সংঘ পরিবার এককাট্টা হয়ে যায়। দল ও সরকারের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়, তিনজনের একজনকেও বরখাস্ত করা হবে না। ৩১ বছর পর লোকসভার ভোটে নিরঙ্কুশ গরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গড়ার প্রধান কারিগর নরেন্দ্র মোদি দলকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে কংগ্রেস এভাবে বেশি দিন টানতে পারবে না। কিছুদিনের মধ্যেই তারা দম হারাবে।
হলোও ঠিক তাই। কিন্তু আমরা দেখলাম, বিতর্ক শুরু হতেই সুষমা কালো চশমা পরতে শুরু করলেন। সংবাদমাধ্যমকে ধারে-কাছে ঘেঁষতে দিলেন না। প্রথম প্রথম নিজের সমর্থনে খান কয়েক টুইট করা ছাড়া প্রকাশ্যে একটা মন্তব্যও কোথাও করলেন না। একই রকম আচরণ করতে লাগলেন বসুন্ধরা রাজে ও শিবরাজ সিং চৌহান। কংগ্রেসের ফানুসের হাওয়াও ধীরে ধীরে কমতে শুরু করল। সংসদের অধিবেশন শেষ হওয়ার পর কাউকে আর তেমন ফোঁস-ফাঁস করতে শোনা গেল না।
লোকসভায় চিন্তা না থাকলেও মোদির বরাবরের দুশ্চিন্তা রাজ্যসভাকে নিয়ে। সেখানে কংগ্রেস অমিত শক্তিধর। তার সঙ্গে হাত মেলানো অন্য দলগুলো অর্থনৈতিক সংস্কারের জরুরি বিলগুলো আটকে দিচ্ছে। জমি অধিগ্রহণ বিল পাসের আশা মোদি সরকার ছেড়ে দেয়। রিয়েল এস্টেট বিলের আশাও। এমনকি কিশোর অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দেওয়ার বিলটি নিয়েও সরকার নিরাশ হয়ে পড়ে। মাছের চোখের মতো মোদির দৃষ্টিতে ঘুরতে থাকে শুধু অভিন্ন পণ্য ও পরিষেবা (জিএসটি) বিল। কংগ্রেস আমলে যে বিলের জন্ম, অনেক পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে, অনেক রাস্তা হেঁটে যে বিল এখন আইন হওয়ার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে, যে বিল চালু হলে দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ২ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যাবে এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে বিদেশি পুঁজির কাছে ভারত আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে, যার ছোঁয়ায় মোদির ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ স্লোগান কার্যকর হবে, সেই বিলটি পাস করাতে কংগ্রেসের সঙ্গে সন্ধির সাদা পতাকা নেড়ে দিলেন নরেন্দ্র মোদি। চায়ের আমন্ত্রণ জানালেন সোনিয়া গান্ধী ও মনমোহন সিংকে।
ঐতিহাসিক সেই চা-চক্রের পর বরফ গলার লক্ষণও দেখা যাচ্ছিল। সংসদ দিন কয়েক নিস্তরঙ্গ দিঘির মতো স্থির হয়ে রইল। যেন শান্তি স্বস্ত্যয়ন হয়ে গেছে। কিন্তু একেবারে আচমকাই সেই বহু পঠিত গোয়েন্দাকাহিনির অতি বিখ্যাত ‘কোথা হতে কী হইল, দস্যু মোহন পলাইয়া গেল’ বাক্যটির মতোই সবকিছু কী অদ্ভুতভাবে ভণ্ডুল হয়ে গেল! রে রে করে উঠল কংগ্রেস ও তার সহযোগীরা। বিজেপি-কংগ্রেস মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেল যে যার অস্ত্রে শাণ দিয়ে। ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল রাজনীতির সন্ধি-কৌশল। সৌজন্যে সেই দুর্নীতি।
ন্যাশনাল হেরাল্ড মামলাটা যে ঠিক কী, প্রথম আলোর পাঠকেরা এত দিনে মোটামুটি তার একটা আঁচ পেয়েছেন। খুবই সংক্ষেপে বলতে গেলে, এটা হলো প্রাচীন কংগ্রেসের একটা সম্পত্তি নবীন কংগ্রেসের হাতে রেখে দেওয়ার গল্প। ১৯৩৮ সালে জওহরলাল নেহরুসহ কংগ্রেসের ৭৬১ জন সদস্য এজেএল নামে এক কোম্পানি সৃষ্টি করেন ন্যাশনাল হেরাল্ড ও কৌমি আজাদ নামে ইংরেজি ও উর্দু ভাষায় দুটি খবরের কাগজ বের করার জন্য। উদ্দেশ্য, পরাধীন ভারতে কংগ্রেসের আদর্শ ও ভাবধারার প্রচার। সেই কাগজ খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে তার অফিস গড়ে ওঠে। স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিও বৃদ্ধি পায়। তবে কালের নিয়মে ক্রমে ক্রমে কাগজ দুটির ধার ও ভার কমতে থাকে। সংস্থাকে বাঁচাতে কংগ্রেস তার তহবিল থেকে ৯০ কোটির কিছু বেশি টাকা বিনা সুদে ধার দেয়। তাতেও কাজ না হওয়ায় ২০০৮ সালে প্রকাশনা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ইতিমধ্যে কংগ্রেস ওয়াইআইএল নামে আর একটি কোম্পানি খোলে এজেএল অধিগ্রহণের জন্য। এই নতুন কোম্পানির ৭৬ শতাংশ শেয়ারের মালিক সোনিয়া ও রাহুল গান্ধী। বাকিটা কংগ্রেসের অন্য নেতাদের। এই অধিগ্রহণ আইনসম্মত নয় বলে মামলা ঠোকেন সুব্রহ্মণ্যম স্বামী। তাঁর অভিযোগ, সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ন্যাশনাল হেরাল্ড–এর প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি হাতিয়ে নেওয়ার এটা একটা চক্রান্ত। নিম্ন আদালত সোনিয়া-রাহুলদের ব্যক্তিগত হাজিরার জন্য সমন জারি করেন। সোনিয়ারা হাইকোর্টের শরণাপন্ন হন। হাইকোর্ট আবেদন নাকচ করে দিলে ১৯ ডিসেম্বর নাটকীয়ভাবে কংগ্রেস নেতারা পাটিয়ালা হাউসে মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে হাজিরা দিয়ে জামিন পান।
ন্যাশনাল হেরাল্ড–এর সম্পত্তি হাতানোর অপরাধে সোনিয়া-রাহুল অপরাধী কি না, তা আদালত ঠিক করবেন। কিন্তু কংগ্রেস এই আইনি সক্রিয়তার জন্য সরাসরি দায়ী করেছে নরেন্দ্র মোদিকে। তাদের কথায়—স্বামী আসলে মুখোশ, মুখ্য মোদিই। জামিনের আবেদন হাইকোর্ট খারিজ করে দেওয়ার পর যে একটা সপ্তাহ সংসদ চলল, প্রতিদিনই কংগ্রেস ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতার’ অভিযোগ তুলে তা বানচাল করে দিয়েছে। আইনের এই লড়াইকে তারা রাজনীতির আঙিনায় নিয়ে এসে ম্রিয়মাণ দলকে চাঙা করতে চাইছে। কংগ্রেস-বিজেপির এই সংঘাতে বাড়তি হাওয়া দিয়েছেন দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তাঁর সরকারের প্রধান সচিবের অফিসে দুর্নীতির অভিযোগে সিবিআইয়ের হানা দেওয়াকে তিনি বিজেপির ‘রাজনৈতিক চক্রান্ত’ বলে অভিযোগ এনেছেন। কংগ্রেস বলছে, ন্যাশনাল হেরাল্ড হলো তাদের বিরুদ্ধে বিজেপির রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার অপচেষ্টা। কেজরিওয়াল বলছেন, তাঁর সরকারকে কাজ করতে না দিতে কেন্দ্রীয় সরকার সিবিআইকে কাজে লাগাচ্ছে।
কেজরিওয়াল এক কদম এগিয়ে লড়াইয়ে আবার কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলিকে শামিল করেছেন। বলেছেন, সিবিআইয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে দিল্লি ডিস্ট্রিক্ট ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের (ডিডিসিএ) সাবেক সভাপতি অরুণ জেটলির আমলের দুর্নীতির তদন্তে সরকারের ফাইল হাতিয়ে নেওয়া। এ নিয়ে এখন ধুন্ধুমার চলছে। কংগ্রেস ও আম আদমি পার্টির সাঁড়াশি আক্রমণের মোকাবিলায় বিজেপি এখন ব্যস্ত। জামিন পাওয়ার পর সোনিয়া-রাহুল যেভাবে মোদি ও তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন (রাহুল তো আবার সরাসরি মোদির নাম করে), তাতে স্পষ্ট, সহযোগিতা দূর অস্ত, সরকারের সঙ্গে চরম সংঘাতের পথেই আপাতত তাঁরা হাঁটতে চলেছেন।
এই ঘোলাটে পরিস্থিতিতে কী করে স্বস্তিতে থাকতে পারেন নরেন্দ্র মোদি? বড় আশা ছিল তাঁর, এই অধিবেশনে জিএসটি বিল পাস করিয়ে আগামী অর্থবছর (১ এপ্রিল) থেকে সারা দেশে চালু করে দেবেন। সুব্রহ্মণ্যম স্বামী নামের এক ‘ওয়ানম্যান ডেমোলিশন স্কোয়াড’ তাঁর সেই আশা ও স্বপ্নকে খান খান করে দিতে চলেছে। শুধু কি তাই? কংগ্রেস এই ধারণাটা গোটা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে যে স্বামী নন, আসল খলনায়ক ও নাটের গুরু নরেন্দ্র মোদিই। স্বামী যখন বুক বাজিয়ে বলেন, আসছে বছরেই সোনিয়া-রাহুলকে তিনি জেলে ঢোকাবেন; কংগ্রেস তখন বলে, ঠোঁট নড়ছে স্বামীর, আওয়াজটা আদতে মোদির।
ভারতীয় রাজনীতির ‘আনগাইডেড মিসাইল’ সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে সোনিয়া-রাহুল ঘায়েল হবেন কি না পরের কথা, আপাতত চরম হতোদ্যম নরেন্দ্র মোদি। আজ তিনি বড়ই অসহায়। জিএসটি নিয়ে তিনি বড় আশার জাল বুনেছিলেন।
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়: প্রথম আলোর নয়াদিল্লি প্রতিনিধি।

বাজারের কোনো অদৃশ্য হাত নেই by কৌশিক বসু

বহুদিন ধরে মূলধারার অর্থনীতির অন্তর্নিহিত পূর্বানুমান হচ্ছে, অর্থনীতিতে এক অদৃশ্য হাত খুব মসৃণভাবে তার জাদু দেখিয়ে যাচ্ছে। সরবরাহের চেয়ে চাহিদা বেশি হলে পণ্যের দাম বেড়ে যায়, আবার উল্টোটা হলে দাম কমে যায়। আর এর মধ্য দিয়ে বাজার স্থিতিশীল হয়।
নিশ্চিতভাবে অনেক পর্যবেক্ষকই বুঝতে পেরেছেন, সত্যটা ঠিক এর বিপরীত। মানে হলো, পণ্যের মূল্য, মজুরি ও বিশেষ করে সুদের হার কখনো কখনো খুব ধীরগতিতে পরিবর্তিত হয়, যেটা কখনো কখনো বাজারকে পরিষ্কার হতে দেয় না। শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে এর মাজেজা হলো, বেকার শ্রমিকদের দীর্ঘদিন কাজ খুঁজতে হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রের অন্যদের কথা হচ্ছে, তাঁদের সহকর্মীরা যেটাকে ‘বেকারত্ব’ বলছেন তার আসলে অস্তিত্বই নেই। এই ব্যাপারটা স্বতঃপ্রণোদিত, কারণ কিছু কিছু একগুঁয়ে প্রকৃতির শ্রমিক বিদ্যমান মজুরিতে কাজ করতে রাজি হয় না।
যে মানুষেরা ব্যক্তি ইচ্ছা-নিরপেক্ষ বেকারত্বের ধরন বোঝেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন জন ম্যানিয়ার্ড কেইনস ও আর্থার লুইস। এঁরা এই বিষয়টিকে দ্বৈত অর্থনীতির মডেলের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যেখানে শহরে শ্রমিকের সংখ্যাধিক্য থাকলেও তাঁদের মজুরির তারতম্য হয় না, আর শহুরে শ্রমিকদের মজুরি গ্রামের শ্রমিকদের চেয়ে বেশি থাকে। কেইনস ও লুইস উভয়ই তাঁদের কাজে এই মূল্যের পরিবর্তনবিমুখতা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু তাঁদের কাছেও এই ধারণাটা স্রেফ পূর্বানুমান ছিল, তাঁরা কখনো এটা বোঝাতে পারেননি, মজুরি ও সুদের হার কেন প্রায়ই চাহিদা ও সরবরাহের চাপকে প্রতিহত করে।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোসেফ স্টিগলিৎস এই ধাঁধার সমাধান দিয়েছেন, তিনি এ বছর শিক্ষকতার ৫০ বছর উদ্যাপন করেছেন। তিনি প্রমাণ করেছেন, কেন কিছু কিছু ক্ষেত্রে মূল্যের পরিবর্তন হয় না, যে কারণে বাজারের কার্যকারিতা কমে যায়, আর পরিণামে অদৃশ্য হাতের কার্যক্রম ব্যাহত হয়। স্টিগলিৎস এ প্রসঙ্গে বলেছেন, অদৃশ্য হাত ‘এই অর্থে কিঞ্চিৎ অদৃশ্য যে সেটা আসলে নেই’।
স্টিগলিৎস এক উল্লেখযোগ্য ১০ বছর কালের পরিপ্রেক্ষিতে নিজের যুক্তিমালা সাজিয়েছেন। ১৯৭৪ সালে স্টিগলিৎস শ্রমিকদের ঝরে পড়ার ওপর একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন, সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, কেন মজুরির হার অপরিবর্তিত থাকে। উন্নয়ন অর্থনীতির জন্য তাঁর এই গবেষণার বেশ গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য রয়েছে, আমি ওটা প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি। এরপর তিনি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন, যার মধ্যে ক্রেডিট রেশনিংয়ের ওপর একটি নিবন্ধ, সুদের হারে অপরিবর্তনশীলতা ও এফিসিয়েন্সি ওয়েজের ওপর আরেকটি নিবন্ধও ছিল। তারপর ১৯৮৪ সালে তিনি কার্ল শাপিরোর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ কারণে সৃষ্ট বেকারত্বের ওপর এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেন।
সুদের হার কখন বাড়াতে হবে আর কখন কমাতে হবে, তার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, তার জন্য আমাদের সৃজনশীল ও বিশ্লেষণী চিন্তা করতে হবে অন্যান্য অর্থনীতিবিদের কাজও এই মূল্যের অপরিবর্তনশীলতার ওপর গবেষণার ভিত্তি রচনা করেছে। কিন্তু ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে স্টিগলিৎস যেসব কাজ করেছেন, তা বাজার-সংক্রান্ত সামষ্টিক অর্থনীতির চিন্তাকাঠামো বদলে দেয়। অপরিবর্তনশীল মূল্য-সংক্রান্ত স্টিগলিৎস যেসব যুক্তি দিয়েছেন তার অন্তর্জ্ঞান কিন্তু খুবই সাধারণ। কাজে ফাঁকি দেওয়ার কোনো শাস্তি যদি না থাকে, তাহলে লোকে হরহামেশাই কাজে ফাঁকি দেয়। আর কর্মস্থলে কাজে ফাঁকি দেওয়ার সবচেয়ে অভিন্ন শাস্তি হচ্ছে চাকরি হারানোর ঝুঁকির মধ্যে থাকা। কিন্তু কর্মীরা যদি চাকরি চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি কাজ খুঁজে পায়, তাহলে তাদের চাকরি খাওয়ার হুমকি দিয়ে কোনো কাজ হয় না।
কাজে ফাঁকি না দেওয়ার প্রণোদনা হিসেবে যদি কর্মীকে বাজারের চেয়ে বেশি বেতন দেওয়া হলে চাকরি হারানোর মূল্য আরও বেড়ে যায়। এটা অবশ্যই সত্য যে এই সূত্র যদি একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করে তাহলে সেটা অন্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও কাজ করবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মজুরি বেড়ে যাবে, আর পরিণামে শ্রমিকের সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেড়ে যাবে। অন্যকথায় বললে, বেকারত্বের হার বাড়বে। তারপর যদি সব প্রতিষ্ঠান সমান বেতন দেয়, তাহলে কর্মীদের ছাঁটাই করার হুমকি বেশ কার্যকর হবে, কারণ এতে যে কর্মী কাজ হারাবে, তাঁর বেকার হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ফলে বাজারে এক সাম্যাবস্থা সৃষ্টি হবে, যেখানে বেকারত্ব থাকবেই, কিন্তু মজুরির হার কমবে না। সংক্ষেপে বললে, এটা হলো শাপিরো-স্টিগলিৎস সাম্যাবস্থা।
জ্যানেট ইয়েলেন ১৯৮৪ সালে এই তত্ত্বের ওপর এক চমৎকার সমীক্ষা চালিয়েছিলেন, যার শিরোনাম ছিল ‘এফিসিয়েন্সি ওয়েজ মডেলস অব আন-এমপ্লয়মেন্ট’। হ্যাঁ, স্টিগলিৎসের গবেষণা এখনো প্রভাবশালী হলেও এই ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ করা সম্ভব। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেভাবে মুদ্রানীতি করা হয়, তা আমাকে হতাশ করেছে। সেসব দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রায়ই শিল্পায়িত দেশের সূত্র নকল করে, তারা এ কথা চিন্তা করে না ওই নীতির কার্যকারিতা সংশ্লিষ্ট দেশের পরিপ্রেক্ষিতের ওপর নির্ভর করে।
স্টিগলিৎসের কাজ আমাদের এ কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে সুদের হার মসৃণভাবে ওঠা-নামা করে—এই ধারণার ভিত্তিতে নীতি প্রণয়নের ঝুঁকিটা কোথায়। সুদের হার কখন বাড়াতে হবে আর কখন কমাতে হব, তার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই, তার জন্য আমাদের সৃজনশীল ও বিশ্লেষণী চিন্তা করতে হবে। বিশেষ করে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতে তথ্য সংগ্রহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাতে হবে, যাতে আরও বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে নীতি প্রণয়ন করা যায়।
১৯৯০ সালের শেষের দিকে আমি বিশ্বব্যাংকে জোসেফ স্টিগলিৎসের সঙ্গে কাজ করেছি, তখন তিনি সেখানে প্রধান অর্থনীতিবিদ হিসেবে কাজ করতেন। সে সময় তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে খুবই উত্তপ্ত বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন, বিষয় ছিল পূর্ব এশিয়ায় সংস্থাটির হস্তক্ষেপ। আমি সুস্পষ্টভাবেই বলতে পারি, ওই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি আইএমএফকে বদলে দিয়েছিলেন। আমরা আশা করি, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি ভবিষ্যতেও তেমন প্রভাব ফেলবে, কারণ সেটা আমাদের সব পর্যায়ে আরও বিশ্লেষণী নীতি প্রণয়ন করতে উৎসাহিত করে।
(জোসেফ স্টিগলিৎসের শিক্ষকতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ নিবন্ধ)
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ।

নিয়ন্ত্রিত দূষণের পথেই উন্নয়ন by মুশফিকুর রহমান

দুই সপ্তাহজুড়ে টান টান উত্তেজনার স্বস্তিকর অবসান হলো প্যারিসের সফল জলবায়ু সম্মেলনে। অংশগ্রহণকারী ১৯৫টি দেশের প্রতিনিধিরা সবাই মিলে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের (২০১৫) ঘোষণা সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করতে সক্ষম হয়েছেন নির্ধারিত সময়ের ১৬ ঘণ্টা পর। সংগতভাবেই বিশ্বজুড়ে দীর্ঘ সময়জুড়ে প্যারিস সম্মেলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে আরও দীর্ঘ আলোচনা, বিশ্লেষণ চলবে।
উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত বিশ্বের প্রায় ২০০ দেশের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং সামর্থ্যের বিভিন্নতা রয়েছে। দেশগুলোর ভৌগোলিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটও বিভিন্ন। পরিবেশের বিপন্নতা সবুজ এই পৃথিবীর সব দেশের জন্য বিপন্নতার কারণ; তবে তার মাত্রাগুলো ভিন্ন ভিন্ন। তার ওপরে রয়েছে দেশে দেশে জীবনযাত্রার ধরন এবং মাথাপিছু ভোগ্যপণ্য ও সার্ভিস ব্যবহারের অভ্যাস, আকাঙ্ক্ষা ও সামর্থ্যের বিভিন্নতা। এত কিছুর পরও ১৯৫ দেশের সরকারকে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনের অভিন্ন চুক্তিতে একমত করা সম্ভব হয়েছে সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ও ভারসাম্যপূর্ণ একটি সমঝোতা দলিল তৈরি করার মধ্য দিয়ে। বলা হচ্ছে, সবাইকে খুশি করার মতো একটি চুক্তি করা গেছে। সবাই যে দলিলে সম্মত হয়, তাতে নমনীয়তা ও সমঝোতার বাক্যমালা বেশি হবে, সেটিই তো স্বাভাবিক। তবে প্যারিস জলবায়ু সম্মেলন ২০১৫ তো শেষ কথা নয়; বরং প্যারিস ২০১৫ জলবায়ু চুক্তিতে বর্তমান শতাব্দীর মধ্যে বিশ্বের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের নিচে সীমিত (প্রাক্-শিল্প বিপ্লব সময়ের বিদ্যমান মাত্রার তুলনায়) রাখার সম্মিলিত বৈশ্বিক অঙ্গীকার খুব কম প্রাপ্তি নয়। ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের কার্বন-দূষণ সর্বোচ্চ মাত্রায় ওঠার আশঙ্কা যখন তীব্র হয়ে উঠেছে, তখন বিশ্বের বড়-মাঝারি-ছোট দূষণকারী সব দেশের মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ ও তা বাস্তবায়নের আংশিক আইনি দায়বদ্ধতার চুক্তিতে পৌঁছানো অবশ্যই বড় অর্জন।
পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উষ্ণতা বৃদ্ধির জন্য দূষণের দায়ভার বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন। কিন্তু প্যারিস সম্মেলনে সবাই নিজ নিজ দেশের দূষণ হ্রাস করার দায়িত্ব মেনে নিয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর পর বিশ্ব সম্মেলনে সমবেত হয়ে বিশ্বনেতারা দূষণ হ্রাসে তাঁদের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা কতটা অর্জিত হলো এবং পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করার প্রতিশ্রুতিও নির্ধারণ করেছেন। সেই সঙ্গে এই সম্মেলন উন্নয়নশীল দেশগুলোকে দূষণ হ্রাস ও জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাব মোকাবিলার জন্য সক্ষম হতে সহায়তার লক্ষ্যে বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের তহবিল গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মূলত ধনী দেশগুলো এই তহবিলে অর্থের জোগান দেবে। সম্মেলনে গৃহীত চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২০ সাল থেকে।
আশার কথা, কার্বন-দূষণ হ্রাস করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে বড় বড় ব্যবসার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোও ইতিবাচকভাবে নিয়েছে এ সম্মেলনের অর্জন নিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনীতি ও দ্বিতীয় বৃহত্তম দূষণকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেছেন, ‘প্যারিস সম্মেলন পৃথিবীর সবাইকে কার্বন-দূষণ হ্রাস করার লক্ষ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রশ্নে শক্তিশালী বার্তা জানিয়ে দিয়েছে।’ পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি ও বৃহত্তম দূষণকারী দেশ চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জি জিন হুয়া প্যারিস চুক্তিকে ‘নিখুঁত না হলেও’ ঐতিহাসিক এই অর্জনকে সামনে এগিয়ে নিতে কোনো বাধা মনে করেন না। তিনি বরং চুক্তিকে ‘পক্ষপাতহীন, ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ ও সমন্বিত চুক্তি’ বলে চিহ্নিত করেছেন। বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতি ও বড় দূষণকারী দেশ ভারতের পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভেদকার প্যারিস চুক্তিকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ ও পৃথিবীর সামনে এগিয়ে যাওয়ার দলিল’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। অপরদিকে পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশগুলোর সম্মিলিত জোটের চেয়ারম্যান গিজা গ্যাসপার মার্টিনস এই চুক্তিকে বলছেন, ‘স্বল্পোন্নত দেশগুলো এবং পৃথিবীবাসী—সবার জন্য প্রত্যাশার সম্ভাব্য উত্তম অর্জন।’
এই চুক্তি বাস্তবায়নে আগামী কয়েক দশক ধরে কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করার নানামুখী জটিল কিন্তু বাস্তবায়নযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। এর অনেকগুলো অপ্রিয় এবং জনতুষ্টির বিপরীত কাজ। বিশেষভাবে হ্রাস করতে হবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার। উৎপাদন-প্রক্রিয়া সচল রাখার সব আয়োজনকে আরও দক্ষ এবং উৎসে দূষণ হ্রাস করার উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য বড় বিনিয়োগ, যৌক্তিক ভোগ এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনা-কাঠামো গড়তে হবে। উন্নয়নশীল দেশগুলো প্রত্যাশিত আর্থিক সহায়তার সিংহভাগ ঋণ বা অনুগ্রহ নয়, প্রাপ্য হিসেবে পেতে চায়। সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলো ব্যবসার বিষয়টি ভুলছে না; বরং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বিস্তৃত করার প্রযুক্তি তাদের জন্য বড় ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো সমৃদ্ধ অর্থনীতির দেশগুলোর কাছে কার্বন-দূষণ হ্রাস করতে যে প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ চায়, তা দেওয়ার ক্ষেত্রে সামর্থ্যবান দেশগুলো নিশ্চিত হতে চায় যে তাদের বিনিয়োগ ঘোষিত লক্ষ্য বাস্তবায়নে জবাবদিহির সঙ্গে ব্যবহৃত হবে। এর সঙ্গে সামগ্রিক সুশাসনের ইস্যু জড়িত। বিষয়গুলো দুই পক্ষের বিবেচনার মাপকাঠিতে সব ক্ষেত্রে সমার্থক নয়।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার হ্রাস করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক ব্যবহারের মধ্য দিয়ে কার্বন-দূষণ হ্রাস করার ঘোষণা দেওয়া যত সহজ, কার্যত দেশের অর্থনীতি ও উৎপাদন-প্রক্রিয়ার গতিমুখ ঘোরানো তত সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সময়, টেকসই প্রযুক্তির পর্যাপ্ত সমাবেশ এবং তাদের দক্ষ পরিচালন অবকাঠামো গড়ে তোলা দরকার। সে জন্য মানবসম্পদ গড়ে তোলার বড় চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে।
তবে আশার কথা, কার্বন-দূষণ হ্রাস করার বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে বড় বড় ব্যবসার নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানগুলোও ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। তারা এ ক্ষেত্রে নতুন বিনিয়োগ, গবেষণা ও দীর্ঘ মেয়াদে লাভজনক ব্যবসার সম্ভাবনা খুঁজে পেয়েছে। সুতরাং বাজারের নিয়মে দূষণ হ্রাসের প্রযুক্তি উন্নয়নে পুঁজির প্রবাহ বাড়বে, নতুন নতুন বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হবে। ভোক্তা ও বিশ্বের নাগরিক হিসেবে প্রান্তিক অবস্থানে থাকলেও আমরা সেই অর্জনগুলোর চুইয়ে পড়া সুবিধা পাব। এর সঙ্গে আমরা নিজেদের মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে বিপন্ন পৃথিবীতে ভালোভাবে টিকে থাকার টেকসই কৌশল যত বেশি প্রয়োগ করতে পারব (বাংলাদেশের এ ক্ষেত্রে ইতিমধ্যে অর্জন ফেলনা নয়) তত অন্যের দয়ার ওপর নির্ভরতা কমবে।
ড. মুশফিকুর রহমান: খনি প্রকৌশলী, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক।

একমাত্র প্যাপিরাসগাছের মৃত্যু by মোকারম হোসেন

ঢাকায় বলধা গার্ডেনের বিরল সংগ্রহ একমাত্র প্যাপিরাসগাছটি এখন আর নেই। দুর্লভ এই গাছটি দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেনের সাইকিতে সংরক্ষিত ছিল। এ বছরের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে কনকসুধার ছবি তুলতে গিয়ে জানতে পারি প্যাপিরাসগাছটি নেই। সাইকিতে ঢোকার পর ডান দিকে রোজক্যাকটাসের পাশে টবের ভেতরেই ছিল গাছটি। জানামতে, দেশে আর কোনো প্যাপিরাসগাছ নেই। আমাদের অবহেলায় একটি উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্ত হলো। কারণ জানতে চাইলে বাগানের কর্মীরা জানান, এ বছর অতিবৃষ্টিতে বাগানের ভেতর জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বৃষ্টির পানির সঙ্গে পয়োনিষ্কাশন নালার ময়লা গাছের গোড়ায় জমে থাকায় গাছটির মৃত্যু হয়েছে। ধারণা করা হয়, বাগান তৈরির সূচনা পর্বেই বৃক্ষপ্রেমিক জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ রায় প্যাপিরাসগাছটি এখানে নিয়ে আসেন।
দেশের প্রকৃতিপ্রেমিক লেখক ও বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন দীর্ঘদিন ধরে বলধা গার্ডেন সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে আসছিল। গুরুত্বপূর্ণ এই বাগানের চারপাশে অনেক সুউচ্চ স্থাপনা তৈরি হওয়ায় সেখানকার উদ্ভিদবৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে। পাশাপাশি বর্ষায় নিয়মিত জলাবদ্ধতার কারণেও প্রতিবছর অনেক গাছপালার মৃত্যু হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে এখানকার বিলুপ্ত গাছের তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই বাগান ধ্বংস হবে। দেশের উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও নিসর্গীদের মতে, মূল গাছগুলো অক্ষত রেখে চারা–কলমের মাধ্যমে বাগানের গাছগুলো অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে বলধা গার্ডেনের আদলে আরেকটি বাগান তৈরি করা উচিত। তাহলে বাগানটি নিশ্চিত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে। হারিয়ে যাবে না প্যাপিরাসের মতো দুষ্প্রাপ্য গাছগুলো। শুধু উল্লিখিত গাছটিই নয়, বাগানে এমন আরও অনেক গাছ রয়েছে, যার দ্বিতীয়টি কোথাও সংরক্ষিত নেই। এ ধরনের কোনো একটি গাছ বাগান থেকে হারিয়ে যাওয়া মানে সারা দেশ থেকেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়া।
এখানকার বিলুপ্ত গাছের তালিকা প্রতিনিয়তই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অচিরেই এই বাগান ধ্বংস হবে প্যাপিরাস (Cyperus papyrus) মূলত প্রাচীন লেখার উপকরণ। প্যাপিরাসের বাকলে লেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ দলিল এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রাচীন জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। তবে প্রাচীন লেখার আরেক উপকরণ ভূর্জপত্রের গাছটি এখনো বাগানের সাইকি অংশে বেঁচে আছে। প্রাচীন মিসরীয়রা প্যাপিরাসের কাণ্ড থেকে একধরনের কাগজ তৈরি করত। একাধিক গাছের সংগৃহীত বিভিন্ন অংশ জোড়া দিয়ে একটি পরিপূর্ণ লেখার উপকরণ বানানো হতো। প্যাপিরাসগাছ এক থেকে চার মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কাণ্ড খুব নরম এবং গোড়ার দিকে মানুষের হাতের কবজির মতো মোটা। মোথা বেশ শক্ত। মোথা থেকে গজানো নতুন চারা লালচে বাদামি রঙের আবরণে ঢাকা থাকে। মাথার দিকে পাতার ভারে কাণ্ড অনেকটা নুয়ে পড়ে। গাছের পাতা দেখতে কোঁকড়ানো খসখসে চুলের মতো। পাতা ছোট, মূল শক্ত। মিসরীয়রা প্যাপিরাসগাছের সরু লম্বা ডাঁটি দিয়ে মাদুর ও নৌকার পাল তৈরি করত। কাণ্ডের ভেতরের মজ্জা শুকিয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করত। ইথিওপিয়া ও নীল নদের উজানে এখনো প্যাপিরাসগাছ দেখা যায়। সাধারণত ২০ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় এ গাছ ভালো থাকে। গ্রীষ্মের শেষ ভাগে ফুল ফোটে। জলার ধার অথবা অল্প পানির জলাভূমি পছন্দ। বীজ ও মোথাকন্দ থেকে বংশবৃদ্ধি।
বলধা গার্ডেনের হতশ্রী রূপ দেখে খুব সহজেই অনুমান করা যায় যে বাগানটি লোকবল ও অর্থ–সংকটে ভুগছে। বাগানের সর্বত্র অযত্নের ছাপ। সংরক্ষিত সাইকি অংশের পরিস্থিতিও বেশ নাজুক। স্বল্পসংখ্যক মালি নিয়ে শুধু গাছগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। চারপাশের উঁচু দালানে প্রায় ঢাকা পড়েছে বাগানটি। দিনের আলোয়ও পেছনের দিকটা বেশ অন্ধকার। সিবিলি অংশে সারা দিনই দর্শনার্থীদের ভিড়। এই দর্শনার্থীরা মূলত অন্য মতলবে এখানে আসেন। প্রশ্ন হলো, বলধা গার্ডেনের মতো এমন স্পর্শকাতর একটি স্থাপনা কেন টিকিটের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হলো! তবু যাঁরা এখানে বেড়াতে আসেন, তাঁরা যদি সত্যিকার অর্থে বৃক্ষের সমঝদার হতেন, তাহলে কোনো প্রশ্ন ছিল না। উপরন্তু, নিত্যদিনের এই অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত উদ্যানের বিপন্ন গাছগুলোর মৃত্যুকেই শুধু ত্বরান্বিত করছে। এই বাগানের অর্জিত অর্থ ছাড়া কি বন বিভাগের চলছিল না? আবার এখানকার অর্জিত অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হলেও বাগান রক্ষণাবেক্ষণে তার সিকি ভাগও ব্যয় হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, অচিরেই এসব আত্মঘাতী কাজের সমাপ্তি ঘটবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বাগানটি বাঁচিয়ে রাখতে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
মোকারম হোসেন: প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক। সাধারণ সম্পাদক: তরুপল্লব
tarupallab@gmail. com

ভারতে বিচারপতি বাছাইয়ে পর্দা উন্মোচন by মিজানুর রহমান খান

স্বচ্ছতা ও জনগণের জানার অধিকারের জয় হয়েছে। ৬৬ বছর ধরে অনুসৃত গোপনীয়তার প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসেছেন ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট। গত ১৬ অক্টোবর বিচারক নিয়োগ কমিশন গঠনসংক্রান্ত ভারতের সংবিধান সংশোধনী বিল বাতিল করেছিলেন তাঁরা। সেই রায়ের ৬০ দিনের মাথায় ১৬ ডিসেম্বর বিচারক নিয়োগ ও বাছাইয়ে নতুন ফর্মুলা দিয়েছেন আদালত। তবে এই বিতর্ক সহজে থামছে না। কারণ, বিচারক বাছাই ও নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের কাছেই ন্যস্ত রাখতে সরকার ও আইনসভা রাজি থাকে কি না, সেটা দেখার বিষয়। আবার আদালত বলেছেন, প্রধান বিচারপতি ও অপর চার জ্যেষ্ঠ বিচারকের সর্বসম্মতিতে নিয়োগ পাকা হবে। কিন্তু সব সময় সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। তা ছাড়া বিচারক বাদে অন্য কাউকেই কলিজিয়ামে ঢুকতে দেওয়া যাবে না, সেই যুক্তি সবাই না–ও মানতে পারেন।
তবে বিচারপতি বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বলতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কী বোঝেন, সেটা এখন থেকে জনগণও বুঝতে পারবে। কী কী বিবেচনায় বিচারকের মতো এতটা বিশাল মাপের গুরুত্বপূর্ণ পদে যোগ্য লোককে বাছাই করা হয়, সেটা এতকাল শুধু প্রধান বিচারপতি ও পাঁচ জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে নিয়ে গঠিত কলিজিয়ামের অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল। সত্যি একটা কালো পর্দাঘেরা ব্যাপার ছিল। এখন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রথমবারের মতো স্বীকার করলেন যে বিচারপতি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে সরাসরি জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। এমনকি কোনো বিচারক প্রার্থীর ব্যাপারে জনগণ অভিযোগ করতে পারবেন এবং কলিজিয়াম ও সরকারকে তা বিবেচনায় নিতে হবে।
আসলে বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কিংবা নির্বাহী বিভাগ, কেউ এটা স্বতঃপ্রণোদিতভাবে মানবেন। কিন্তু তা-ই সত্য হলো। সরকার নয়, ভারতের সুপ্রিম কোর্টই এগিয়ে এলেন। তাঁরাই জাতির সামনে, বিশ্বসভ্যতার সামনে দ্বিধাহীন চিত্তে স্বীকার করলেন যে বিচারপতি বাছাই করার প্রক্রিয়াটায় আমজনতার ন্যায্য হিস্যা আছে। বিচারক বাছাইয়ে মানুষের জানার অধিকারের বিষয়টি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ, এটা পরিপন্থী নয়।
অথচ এতকাল রাষ্ট্রপতি প্রজ্ঞাপন জারি করার আগমুহূর্ত পর্যন্ত সরকারি তরফে বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে কিছু জানানোটা রীতিমতো নিষিদ্ধ ব্যাপার ছিল। বিচারকের শপথ নেওয়ার তারিখটা দ্রুততার সঙ্গে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো। আর তখন নবনিযুক্ত বিচারকের বিষয়ে উচ্চবাচ্য করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত।
আর এখন বিচারক পদে কারও চূড়ান্ত নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপন ঘাড়ের ওপর চেপে বসার অনেক আগেই মানুষ জানবে যে কাদের ভেতর থেকে বিচারক বাছাই করা হচ্ছে। কিসের ভিত্তিতে প্রাথমিক তালিকাটা তৈরি হলো। কারণ, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের একটি সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ বুধবার বলেছেন, ‘বাছাই ও নিয়োগের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই নিয়োগের কার্যপ্রণালিতে তার প্রতিফলন থাকতে হবে এবং নিয়োগ সম্পর্কিত প্রতিটি স্তরের বিষয় আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের (ক্ষেত্রমতে হাইকোর্টের) ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে।’ এ ছাড়া বিচারক বাছাই-সংক্রান্ত পুরো আলোচনা ও পরামর্শ প্রক্রিয়ার লিখিত রেকর্ড থাকতে হবে, এমনকি কারও ভিন্নমতও লিখে রাখতে হবে বলে সুপ্রিম কোর্ট নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। যেসব রাষ্ট্র বিচারক বাছাইয়ে কঠিন পর্দাপ্রথা চালু রেখেছে, তাদের তা থেকে বেরিয়ে আসতে উৎসাহিত করতে হবে।
অতীতে আমরা দেখেছি, বিচারক নিয়োগের কোনো মামলায় আদালত তলব করেও সরকার বা আদালত প্রশাসনের কাছ থেকে উপযুক্ত রেকর্ডের হদিস পাননি। প্রধান বিচারপতি এককভাবে কাউকে বিচারক নিয়োগে সুপারিশ করেছিলেন, কেবল এতটুকু অনুমান বা কল্পনার ভিত্তিতে পাকাপাকি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এটা এখন বলা যায়, সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন বিশ্বের অন্যান্য উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মতো ভারতীয় উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রগুলোও উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা ও শুনানিনির্ভর বাছাইয়ের প্রক্রিয়া মেনে নেবে। ভারতে এখন যদি সম্ভাব্য বিচারক প্রার্থীর বিষয় আগেভাগে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়, তাহলে সেখানে একধরনের প্রকাশ্য আলাপ-আলোচনার একটা অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হবে। পরোক্ষভাবে গণশুনানি চালু হয়ে যাবে।
এ প্রসঙ্গে দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করতে হয় যে কোনো কোনো দেশের আদালত ‘স্বচ্ছতা’ শব্দটি ব্যবহারিক কার্যক্রম থেকে দূরে সরিয়ে কেবল কাগজে-কলমেই আটকে রেখেছেন। বাস্তবে কোনো ‘স্বচ্ছতা’র নীতি অনুসরণ করা হয় বলে আদৌ প্রতীয়মান হয় না। অবশ্য জোর গলায় সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের কাউকে এ বিষয়ে দাবিও করতে দেখা যায় না। উপরন্তু এ বিষয়ে একধরনের আশ্চর্য দায়মুক্তি দেখা যায়। বিচারক পদপ্রার্থী বাছাইয়ের পরে আসে নিয়োগের প্রশ্ন। কিন্তু কী করে বাছাই করা হয়, এমনকি কারা, কীভাবে, কোন বিবেচনায়, কী কারণে বিচারকের শূন্য পদে প্রার্থী কিংবা বিশিষ্ট আইনবিদ হিসেবে বিচারালয়ের পবিত্র আসনে বসার জন্য আমন্ত্রিত হন, তা বাছাই প্রক্রিয়ার অন্তর্গত। অথচ এ বিষয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বা হাইকোর্ট বা আইন ও বিচার মন্ত্রণালয় থেকে কোনো তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাই ছিল না।
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায় এই অচলায়তন ভেঙে দেবে, সেই আশায় আমরা দিন গুনব। ভাবতে ভালো লাগছে যে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কিংবা আইন ও বিচার মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হিসেবে সচিব অথবা মন্ত্রীকে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন করবেন। তাঁরা শুধাবেন, মাননীয় মন্ত্রী, এখন কতগুলো শূন্য পদ আছে? প্রাথমিক তালিকায় যেসব নাম আপনারা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছেন, সেটা কিসের ভিত্তিতে, কীভাবে তৈরি হলো? মি. অমুকের বিষয়ে আমাদের কাছে এই তথ্য-প্রমাণ আছে। তাহলে তাঁর নাম কী করে এল? এভাবে কলিজিয়াম তার জবাবদিহি মেনে নিয়েছে।
১৯৪৯ সাল থেকে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ও তাদের সরকারগুলো দাবি করে আসছে, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা বজায় রেখে তবেই তারা বিচারক নিয়োগে রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ দিয়ে চলে। কিন্তু সেটা জনগণের জানা-বোঝার একেবারে বাইরে ছিল। জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ তাতে ছিল না। এমনকি সেই অধিকার যে আছে, সেটাই কেউ স্বীকার করতেন না। ভরতের সরকার যে কমিশন করেছিল, তাতেও জনতার জানার অধিকার এভাবে স্বীকৃত হয়নি।
বিচারক পদে কাউকে নিয়োগের সরকারি প্রজ্ঞাপনের আগে গোটা প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমজনতা কিছুই জানতে পারত না। ১৯৯৩ সালে পাঁচ বিচারকের সমন্বয়ে কলিজিয়াম প্রথা যখন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট চালু করলেন, তখন সরকার ও সংসদ এর বিরোধিতা করেনি, বরং দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তা মেনে নিয়েছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে তা নিয়ে কথা উঠল। আকার-ইঙ্গিতে অভিযোগ উঠল যে ভারত তার সর্বোচ্চ আদালতে সব থেকে যোগ্য ব্যক্তিদের বসাতে পারছে না। নানা ধরনের কোটারি ও সংকীর্ণ স্বার্থ ভর করেছে। দীর্ঘ তর্ক–বিতর্কের পরে কংগ্রেস ও বিজেপি অবশেষে এক বিরল সমঝোতায় পৌঁছাল। তারা বিচারপতি নিয়োগের বিধানসংবলিত সংবিধানের ৯৯তম সংশোধনী পাস করল। আর সেটা বাতিল হলে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকা মোদি সরকারের জন্য পরাজয় হিসেবে দেখা হতো। বিজেপির অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ‘অনির্বাচিতদের স্বৈরশাসন’ বলে আদালতের যে সমালোচনা করেছিলেন, এখন তার ধার কমে যাবে। কারণ, সুপ্রিম কোর্ট সরকারের নিবেদন কিছুটা কবুল করেছেন। সরকার বলেছে, বিচারক নিয়োগে একটি এমওপি লাগবেই। এমওপি মানে মেমোরেন্ডাম অব প্রসিডিউর। আর এটা নির্বাহী বিভাগের কাজ, আদালতের এতে হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। আদালত বলেছেন, আমরা তা মেনে নিলাম। তবে এমওপির লক্ষ্য হবে কলিজিয়াম-ব্যবস্থাকে উন্নত করা। এমওপিতে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকবে। এসব বিষয়ে প্রধান বিচারপতির পরামর্শ নিতে হবে।
আসলে ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের অক্টোবর ও ডিসেম্বরের দুটি রায়ের আলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ কমিশন গঠন করাই স্থায়ী সমাধান। প্রস্তাবিত এমওপিকে কমিশনে ঢোকাতে হবে। ভারতকে আরেকটি সংবিধান সংশোধনীতে যেতে হবে। কারণ, আদালত তৈরি আইন সংবিধানের বিকল্প হতে পারে না। ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট যখন কমিশন-সংক্রান্ত পুরো আইনটিই বাতিল করলেন, তখন তা ছিল খুবই হতাশার। গত অক্টোবরে এই কলামে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্তের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছিলাম। কিন্তু এখন দেখছি ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট তাঁর আগের অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। আদালত বলেছেন, সরকারকে বিচারক নিয়োগের ন্যূনতম বয়স নির্ধারণ এবং সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টে নিয়োগ সচিবালয় গঠন করতে হবে।
ভারতের মিডিয়া ও সুপ্রিম কোর্ট পর্যবেক্ষণকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ১৬ ডিসেম্বর তাই একটি শুভ দিন। বাংলাদেশের বিজয় দিবসে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট ভারতীয় জনগণের জানার অধিকারের বিজয় ঘোষণা করেছেন। কারণ, এ দিনটিতে বাক্স্বাধীনতার নতুন ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। ভারতের মিডিয়া বিচারক বাছাইয়ের প্রক্রিয়ার গোড়া থেকেই এখন সংগত ও গঠনমূলক প্রশ্ন তুলতে পারবেন। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই নবতর উপলব্ধিকে সাধুবাদ জানাই। এটা বিশ্বাস করতে ভালো লাগছে যে জগদ্দল পাথরকে টলানো সম্ভব।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

নগরকেন্দ্রিক স্থাপনার রূপরেখা by সজল চৌধুরী

একটি অনুমান করা যাক, যদি শুধু স্থাপনা-অবকাঠামো শিল্প ২০৫০ সালের মধ্যে ৩ গিগাটন বিষাক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন রোধ করতে পারে, তাহলে সেটি হবে এক বছরে রাস্তা থেকে ৬৩ কোটি গাড়ি তুলে নেওয়ার সমতুল্য। বিষয়টি মোটেও তুচ্ছ নয়। এখন পৃথিবীর শহরের জনসংখ্যা ৩৫০ কোটি। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ২৫০ কোটি নাগরিক নতুন করে যুক্ত হলে শহরের পরিবেশ, রাস্তাঘাট, যানবাহন, স্বাস্থ্যরক্ষাসহ জলবায়ুর ওপর কী ধরনের ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে, তা সহজেই অনুমেয়।
এসব নিয়েই প্যারিসে অনুষ্ঠিত হলো বিশ্বের জলবায়ু–বিষয়ক সম্মেলন কপ-২১। যেখানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের সঙ্গে পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য ও স্থাপনাশিল্পের বিষয়টি বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু স্থাপনা কিংবা ভবন খাত থেকেই প্রতিবছর নিঃসরিত সর্বমোট গ্রিনহাউস গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ নির্গত হয়। শক্তির যথেচ্ছ ব্যবহার ও অনিয়ন্ত্রিত পরিচালনাই হচ্ছে এই নির্গমনের কারণ। সেই সঙ্গে ধারণা করা হচ্ছে, ২০৫০ সালের মধ্যে এই নির্গমনের পরিমাণ দ্বিগুণ বা তিন গুণ হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দ্রুত নগরায়ণকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আমাদের মতো দেশগুলোর অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ বা অন্যকথায় শোচনীয়। কারণ, আমাদের দেশের শহরগুলোর বিশেষ করে শুধু ঢাকার জনসংখ্যা গত ১০ বছরে প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে, আগামী ২০২৫ সালের মধ্যে তার সংখ্যা হবে প্রায় ২ কোটির কাছাকাছি। ফলে প্রতিবছরই ঢাকায় বিপুল পরিমাণ স্থাপনা অনিয়ন্ত্রিতভাবে নির্মিত হচ্ছে, যার সঠিক পরিসংখ্যান সত্যিই আমাদের ভাবিয়ে তোলে। এর মাশুল হিসেবে নাগরিকদের অধিক মাত্রায় বৈদ্যুতিক বিলসহ অন্যান্য ব্যয়ভার মেটাতে হচ্ছে। একদিকে যেমন শক্তির অপচয় বাড়ছে, তেমনি অন্যদিকে বাড়ছে দূষণের মাত্রা ও কার্বন নিঃসরণের হার।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও বিষয়টি সত্য যে ইতিপূর্বে বিশ্বের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করলেও স্থাপনাশিল্পে শক্তির ব্যবহার এবং অপচয় রোধকল্পে সঠিক করণীয় নির্ধারণ করতে পারেননি। তবে এবারের কপ-২১ সম্মেলনে এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আগে বিষয়টিকে একপ্রকার পাশ কাটিয়ে যাওয়া হলেও বর্তমানে ‘টেকসই উন্নয়ন রূপরেখায়’ এটা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ৪৫টির মতো দেশ তাদের জাতীয় উন্নয়নে ইতিমধ্যে পরিবেশবান্ধব স্থাপনাশিল্পের বিষয়টি আমলে নিয়েছে, বিষয়টি ইঙ্গিতপূর্ণ। অন্যদিকে ‘বিল্ডিং এফিসিয়েন্সি ইন কান্ট্রিস ন্যাশনাল ক্লাইমেট প্ল্যান’-এর তথ্যমতে, বিশ্বের শুধু ৫০টির মতো দেশ তাদের স্থাপনাশিল্পে শক্তির অপচয় রোধ করার জন্য বিশেষভাবে করণীয়র তালিকা প্রণয়ন করেছে। অন্যরা এখনো ওই বিষয়ে সেভাবে পদক্ষেপ নিতে পারেনি, যা আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অতীব জরুরি।
অন্যদিকে, জাতিসংঘের পরিবেশ-বিষয়ক কর্মসূচি ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট বর্তমানে স্থাপনাশিল্পকে পরিবেশবান্ধব করতে এবং উন্নয়নশীল দেশের শহরগুলোতে পরিবেশ খাতে অর্থায়ন বাড়াতে মত দিয়েছে। তারা এ ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোড পুনর্নির্ধারণ, স্থাপনাশিল্পে শক্তির ব্যবহার পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনাতে অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে বিশেষভাবে আগ্রহী। এখন আমাদের দেখতে হবে, এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করতে আমাদের দেশের শহরকেন্দ্রিক পদক্ষেপ হিসেবে প্রথমে কী করা যেতে পারে: স্থানীয় ও নগরকেন্দ্রিক নীতিমালা প্রণয়ন ও আঞ্চলিক সমন্বয়।
তা ছাড়া, আমাদের দেশে বর্তমানে যে বিল্ডিং কোড আছে, সেটিকে অঞ্চলভেদে পরিবেশ ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যার ভিত্তি হবে সুনির্দিষ্ট বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা। এ ক্ষেত্রে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়সহ কেন্দ্রীয় হাউস বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। শুধু প্রয়োজন আন্তরিকতা ও সঠিক পৃষ্ঠপোষকতার।
অন্যদিকে দেশের স্থপতি-প্রকৌশলী ইনস্টিটিউট তাদের অভ্যন্তরীণ গবেষণা কার্যক্রমের মাধ্যমে নগরকেন্দ্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে, তাদের সে সক্ষমতা আছে। এ ক্ষেত্রে ডেনিশ ক্লাইমেট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড যেভাবে বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা করছে, আমরা তা অনুসরণ করতে পারি। সেই সঙ্গে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মতো আমাদের দেশেও প্রস্তাবিত ‘বিল্ডিং ডে’ পালনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের পরিবেশবান্ধব স্থাপনাশিল্পের বিষয়ে সচেতন করতে পারে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রকল্পের জ্বালানি ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
ঢাকার মেয়রদের পক্ষ থেকে শহরকে সবুজ করার যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে বাড়ির ছাদে গাছ লাগানোর যে উদ্যোগ নিয়েছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয় ও বিজ্ঞানসম্মত। কারণ, গবেষণায় দেখা গেছে, ছাদে সবুজের সমারোহ থাকলে বাড়ির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ৩-৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমানো সম্ভব, এতে শক্তির সাশ্রয় হবে। এ ক্ষেত্রে স্থপতিরা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে নগরের পরিবেশ বিপর্যয় রোধ করে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে পারেন। আর এ কাজ শুরু করতে হবে নিজ আঙিনা থেকেই। আজ যা স্থানীয়, কাল তা সমগ্র বিশ্বের।
সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে জাপানে গবেষণারত।

বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়েছিল কে? by মশিউল আলম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
পাকিস্তানের সুপরিচিত সমাজসেবী ও কলাম লেখক আরদেশির কাওয়াসজি মারা যাওয়ার ১৩ বছর আগে এক সকালে টেলিফোনে শুনতে পেলেন পাকিস্তানের প্রয়াত সামরিক শাসক আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের পুত্র আলী ইয়াহিয়া খানের কণ্ঠস্বর।
‘আপনি তো মরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন। আমার বাবাকে নিয়ে বই লিখবেন বলে যে কথা দিয়েছিলেন, কবে লিখবেন সেটা? আপনি যেসব কাগজপত্র চেয়েছিলেন, সবই তো আপনার কাছে পাঠানো হয়েছে। হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদন নিয়ে তো আবার লেখালেখি হচ্ছে, বাবাকে নিয়ে বইটা লেখার এটাই উপযুক্ত সময়।’
‘ধৈর্য ধরুন। তাড়াহুড়া করে ইতিহাস লেখা যায় না। আরেকটা কথা, আমাদের বিখ্যাত ও কুখ্যাত জেনারেলদের পুত্রদের অনেকেই এখন প্রকাশ্যে বলা শুরু করেছেন, তাঁদের কঠোর পরিশ্রমী পিতারা তাঁদের জন্য কত কোটি কোটি টাকা রেখে গেছেন। আপনি কি প্রকাশ করতে প্রস্তুত, বাবার কাছ থেকে আপনি কত পেয়েছেন?’
টেলিফোনের তারের মধ্য দিয়ে রাওয়ালপিন্ডি থেকে ভেসে এল ছাপার অযোগ্য শব্দ।
ইয়াহিয়াকে নিয়ে কোনো বই কাওয়াসজি লেখেননি শেষ পর্যন্ত। ২০১২ সালে ৮৬ বছর বয়সে তিনি মারা গেছেন। ইয়াহিয়াপুত্র আলী তাঁকে যেসব কাগজপত্র পাঠিয়েছিলেন, তার মধ্যে ইয়াহিয়ার নিজের হাতে লেখা কিছু দিনপঞ্জির ফটোকপি ছিল। কাওয়াসজি করাচির ইংরেজি দৈনিক ডন-এ সেগুলোর কিছু কিছু অংশ তুলে ধরেছিলেন।
১৯৭৬ সালের ২৫ মে ইয়াহিয়া লিখেছেন: ‘হিটলারের প্রচারণামন্ত্রী ড. জোসেফ গোয়েবলস বলেছিলেন, এত বেশি পরিমাণে মিথ্যা কথা এত বেশিবার বলো, যেন লোকজন মিথ্যাগুলোকেই সত্য বলে বিশ্বাস করে। ড. গোয়েবলসের শিষ্যদের মধ্যে শোরার চেয়ে বেশি অনুগত কেউ ছিল না।’
শোরা ফারসি শব্দ। এর অর্থ, উটের মতো নিচের ঠোঁট ঝুলে পড়া মানুষ। ইয়াহিয়া ভুট্টোকে এই নাম দিয়েছিলেন। বলা হয়ে থাকে, ভুট্টোর প্ররোচণাতেই তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে বাংলাদেশে গণহত্যা শুরু করেন। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীসহ অনেকেই মনে করে পাকিস্তান ভাঙার মূল দায় ইয়াহিয়ার নয়, ভুট্টোর। পরে এ দুজনের মধ্যে ঘৃণার সম্পর্ক চরমে উঠেছিল, এ কথা এখন সুবিদিত। ইয়াহিয়া ১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন। ভুট্টো তাঁকে বন্দী করে রেখেছিলেন বান্নির জঙ্গলের এক বাংলোতে। বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে। তারপর তাঁকে নিজের বাড়িতে ফিরতে দিয়েছিলেন বটে, তবে সেখানেও ইয়াহিয়া ছিলেন গৃহবন্দী।
ইয়াহিয়ার সঙ্গে কাওয়াসজির শেষ দেখা হয়েছিল ১৯৭৬ সালের এক সকালে। রাওয়ালপিন্ডির হারলে স্ট্রিটে নিজের বাড়িতে ইয়াহিয়া তখনো গৃহবন্দী। রাস্তায় কাওয়াসজিকে দেখে তিনি হাত নেড়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘এই কাওয়াসজি, আপনি আমাকে ভুট্টোর জেলখানা থেকে বের করেছিলেন। এখন এখান থেকে বের করেন।’
‘কঠিন,’ কাওয়াসজি বলেছিলেন, ‘কিন্তু হাল ছেড়ে দেবেন না। ধৈর্য ধরেন, তাঁর পড়ে যেতে আর বেশি দেরি নেই।’
ভুট্টো সম্পর্কে ইয়াহিয়া তাঁর দিনপঞ্জিতে লিখেছেন, ‘আমার বাঙালি মন্ত্রী ড. জি এইচ চৌধুরী তাঁর বইতে লিখেছেন, “পাকিস্তান আর পাওয়ার—এ দুই ‘পি’-এর মধ্য থেকে তাঁকে (ভুট্টো) বেছে নিতে হয়েছে একটা। তিনি বেছে নিয়েছেন শেষেরটা। আমার অর্থমন্ত্রী নওয়াব মুজাফ্ফর খিজিলবাশ একবার আমাকে বলেছিলেন, তাঁর এক বিদেশি বন্ধু, যিনি নামকরা মনোবিশারদ, তিনি তাঁকে বলেছিলেন যে এই লোকটা (ভুট্টো) যদি এক বছরের মধ্যে ক্ষমতায় যেতে না পারে, তাহলে সে পাগল হয়ে যাবে। আমি দোয়া করি, নিজের ক্ষমতার ক্ষুধা মেটানোর জন্য পাকিস্তান ভাঙার চেয়ে সে যেন পাগলই হয়ে যায়।’”
ইয়াহিয়া তাঁর দিনপঞ্জিতে বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে ভুট্টো সম্পর্কে লিখেছেন, ‘শোরা মুজিবুর রহমানকে এমন মাত্রায় ঘৃণা করতেন যে ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে আমি যখন ইরানি রাজতন্ত্রের রজতজয়ন্তী উৎসবে যোগ দিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম, তখন তিনি আমাকে সামরিক আদালতে মুজিবের মামলার কার্যক্রম শেষ করে তাঁকে শেষ করে দিতে বলেন। আমি তাঁকে বলি, আদালতে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। তখন তিনি আমাকে বলেন, ইরানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানেরা মুজিবকে মুক্তি দেওয়ার জন্য আমার ওপর সব ধরনের চাপ প্রয়োগ করবেন। তাই আমার উচিত তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া এবং মুজিবকে ঝুলিয়ে দেওয়া। আমাদের দেশের তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা, যিনি নিজেকে গণতন্ত্রী বলে দাবি করেন, দাবি করেন যে তিনি জনগণের নেতা, তাঁর মুখে এ ধরনের কথা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাই।
‘১৯৭১ সালের ২০ ডিসেম্বর আমি যখন তাঁর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করছিলাম, তখন তাঁকে বলি যে সামরিক আদালতের (মুজিবের মামলার) রায় ও আনুষঙ্গিক নথিপত্র পাওয়া গেছে এবং সেগুলো আইন মন্ত্রণালয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে তো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। অথচ তিনি (ভুট্টো) জাতির সামনে কীভাবেই না বললেন যে আমি মুজিবের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছি, আর তিনি এসে তাঁকে বাঁচিয়েছেন! মিথ্যা! মিথ্যা! মিথ্যা! অবশ্য এ রকম একজন ঘাগু মিথ্যুকের কাছ থেকে অন্য আর কী প্রত্যাশা করার ছিল? সামরিক আদালতের দেওয়া ওই মামলার নথিপত্রগুলো নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কাজ চলছে, সেগুলো খতিয়ে দেখলেই সত্যটা বেরিয়ে আসবে, কোন তারিখে কোন সময়ে কী করা হয়েছে।
‘মজার ব্যাপার হলো, তিনি (ভুট্টো) যখন মুজিবকে বলেন যে ইয়াহিয়া তাঁকে ফাঁসিতে ঝোলাতে চেয়েছেন, আর ভুট্টো তাঁকে বাঁচিয়েছেন, ভালোমানুষ মুজিব ভুট্টোর এই কথা বিশ্বাস করেছেন।
‘অথচ তিনি (ভুট্টো) জাতির সামনে কীভাবেই না বললেন যে আমি মুজিবের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছি, আর তিনি এসে তাঁকে বাঁচিয়েছেন! মিথ্যা! মিথ্যা! মিথ্যা! অবশ্য এ রকম একজন ঘাগু মিথ্যুকের কাছ থেকে অন্য আর কী প্রত্যাশা করার ছিল?’
‘ঘটনাক্রমে মুজিবকে শেষ করে দিতে চেয়েছিলেন শুধু এক ভুট্টো নন। আরও আগের দিকে, (মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে) ল্যাংড়া নুরুল আমিন ও মাহমুদ আলীর সঙ্গে এক বৈঠকে এ দুজনই আমাকে বলেছিলেন, আমি মুজিবকে শেষ না করা পর্যন্ত তাঁরা পাকিস্তান-পসন্দ
ও ইসলাম-পসন্দ বাঙালিদের সামলাতে পারছেন না। উত্তরে আমি তাঁদের বলেছিলাম, পাকিস্তানের রাজনীতিকদের চিন্তাধারা যদি এ রকমই হয়ে থাকে, যদি তারা পরস্পরকে শেষ করে দিতে চায়, তাহলে আল্লাহ যেন এ ধরনের রাজনীতিকদের হাত থেকে পাকিস্তানকে রক্ষা করেন।’
১৪ ডিসেম্বর প্রথম আলোয় প্রকাশিত সহকর্মী মিজানুর রহমান খানের ‘কোর্ট মার্শালে বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ভুট্টো’ শিরোনামের নিবন্ধে লেখা হয়েছে, মুম্বাইয়ের ইংরেজি ট্যাবলয়েড সাপ্তাহিক ব্লিৎ্জ-এর সম্পাদক রুস্তম করনজিয়া ‘বিশ্বাস করতেন’ যে ভুট্টো শেখ মুজিবকে অন্তত একবার প্রাণে বাঁচিয়েছিলেন ‘ইয়াহিয়ার জল্লাদখানা’ থেকে। আসলে এটা যে ভুট্টো নিজেই দাবি করেছিলেন, তা আমরা ইয়াহিয়ার নিজের লেখা দিনপিঞ্জ থেকেই জেনেছি।
কিন্তু ড. গোয়েবলসের শিষ্য হিসেবে ভুট্টো ও ইয়াহিয়া কেউ কারও চেয়ে কম ছিলেন না। এই দুজনের কে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করতে চেয়েছিলেন আর কে তাঁকে রক্ষা করেছেন—এই প্রশ্নের সুরাহা এঁদের বক্তব্যের মধ্যে সম্ভবত নেই। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে, বঙ্গবন্ধু যখন পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে রুদ্ধ, সামরিক আদালতে তাঁর বিচার কার্যক্রম শুরুর সপ্তাহ দুই পরে টাইম সাময়িকীর ২৩ আগস্ট সংখ্যায় ‘পাকিস্তান: মুজিবস সিক্রেট ট্রায়াল’ শিরোনামের এক নিবন্ধের শেষে ডেভিড গ্রিনওয়ে লেখেন, ইয়াহিয়া সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারী এক ব্যক্তিকে বলেছেন, ‘আমার জেনারেলরা (মুজিবের) বিচার ও মৃত্যুদণ্ড চান।’ কিন্তু তারপরও এ রকম একটা সাধারণ অনুভূতি আছে যে অখণ্ড পাকিস্তানের আশায় পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট মুজিবের জীবনরক্ষা করতেও পারেন। মুজিবকে জীবিত রাখার মধ্যেই পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের মধ্যকার বিচ্ছেদ এড়ানোর লক্ষ্যে আলোচনার শেষতম সুযোগটা খোলা থাকবে।
পাকিস্তানিদের হাতে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু ঠেকানোর কৃতিত্ব আমেরিকান কূটনীতিকেরাও দাবি করেন। পাকিস্তানে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন জোসেফ ফারল্যান্ড। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন তিনি, প্রায় প্রতিদিনই তাঁদের দেখা হতো এবং তাঁরা একসঙ্গে মদ খেতেন বলে জানিয়েছেন আমেরিকান অনুসন্ধানী সাংবাদিক জ্যাক এন্ডারসন। এন্ডারসন পেপারস-এর ২২২ পৃষ্ঠা থেকে জানা যাচ্ছে, ‘ফারল্যান্ড একবার ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, “যখন ইতিহাসের বইপত্র লেখা হবে, তখন দেখানো হবে যে যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি ও পাকিস্তানে আমাদের স্থানীয় প্রচেষ্টার ফলেই মুজিব বেঁচে আছেন।” তিনি বলেন, ‘মুজিব গ্রেপ্তার হওয়ার পর আমি ইয়াহিয়ার সঙ্গে ঘন ঘন কথা বলতাম এবং প্রায়ই মুজিবের প্রসঙ্গ তুলতাম। আমি ইয়াহিয়াকে বলি, আমরা মনে করি, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের উভয় অংশের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতার জন্য মুজিব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যক্তিকে হত্যা না করার পরামর্শ আমি ইয়াহিয়াকে দিই। এবং অবশেষে গ্রীষ্মের শুরুর দিকে এক রাতে ইয়াহিয়া আমাকে বললেন, “আপনি আমাকে কনভিন্স করেছেন। তাঁকে (মুজিব) প্রাণদণ্ড দেওয়া হবে না।”’
প্রকৃতপক্ষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রক্ষা করেছিল বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। স্নায়ুযুদ্ধের দুই প্রতিপক্ষ শিবির বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যেভাবে জড়িয়ে পড়েছিল, এবং সেখানে মুক্তিকামী বাঙালির জাতির নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের যে গুরুত্ব সব ক্রীড়নক মহলে অনুভূত হয়েছিল, তাতে তাঁকে বিচারের নামে হত্যা করা পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। অতটা অবিমৃশ্যকারী তারা হতে পারেনি।
মশিউল আলম: সাংবাদিক৷
mashiul.alam@gmail.com