Showing posts with label কবিতা. Show all posts
Showing posts with label কবিতা. Show all posts
Friday, August 15, 2025
বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে সেই আগস্টেই লেখা কবিতা
![]() |
| মীর গুল খান নাসির |
বেলুচিস্তানের
প্রথম সারির কবি মীর গুল খান নাসির (১৯১৪—১৯৮৩)। ন্যাপের রাজনীতির সঙ্গে
যুক্ত ছিলেন। নিজ জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতার পক্ষে সোচ্চার থাকায় পাকিস্তানি
শাসকদের নির্যাতনের শিকার হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর মর্মন্তুদ
হত্যাকাণ্ডের সময় মীর গুল খান ছিলেন কারাগারে বন্দী। বঙ্গবন্ধু হত্যার ১৪
দিন পর ১৯৭৫ সালের ২৯ আগস্ট কারাগারে বসেই তিনি এই কবিতা লেখেন।
মীর গুল খান নাসির
ভোর কোথায়?
চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মধ্যে
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।
ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে,
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই
রক্তের ধারা বইছে প্রবল।
হে নির্বোধের দল, কোথায় উজ্জ্বল প্রভাত?
এখানে এখনো ক্রুদ্ধ রাত
এজিদরূপী সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো চূর্ণ করছে
সাহসী দেশপ্রেমিকের হাড়,
জনবহুল, চিত্রময় বাংলাদেশে আবারও রক্তের ঝড়।
সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা আবারও জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রাম-নগর,
মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।
হে সাহসী কমরেডগণ, এজিদ থেকে সতর্ক হও,
তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হও, পরাস্ত হবে তারা
তাদের মুখ তাদেরই কিন্তু জবান সাম্রাজ্যবাদীদের।
সেবাদাসেরা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের পকেট স্ফীতকায়
এবং সাহসী দেশপ্রেমিকদের খতম করে দিতে
সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে জোগান আসতেই থাকবে
তারা পাঠাবে ভাড়াটে লোক ও অস্ত্র
এই কাপুরুষদের কোনো দয়া-মায়া নেই,
এদের কারণেই বিশ্বে এখন ঘোর অন্ধকার।
মুক্তির শিখা কোথাও জ্বলে উঠলে এরা তা নিভিয়ে দেয় দ্রুত
বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।
সাম্রাজ্যবাদীরা আবারও ফিরে গেছে তাদের সেই পুরোনো
চক্রান্তে, বিশ্বাসঘাতকতায়
আবারও দ্বন্দ্বের ফয়সালা হচ্ছে বন্দুকের নলে
আবারও সোনার জমিনে জ্বলছে আগুন
হে বন্ধুরা, এভাবেই সময়ের মুখোমুখি আমরা
আমার মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও জ্বলছে এখন
ভয় পেয়ো না হে সাহসী যোদ্ধারা, থেমে যেয়ো না,
কণ্টকিত দুর্গম পথ এখনো অনেক বাকি।
মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না,
দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা।
বেশিক্ষণ নয়, কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও
এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে
হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়
বিজয়-পতাকা উড়ছে।
>>>অনুবাদ: রিজওয়ান উল আলম
মীর গুল খান নাসির
ভোর কোথায়?
চিৎকার, ক্রন্দন আর শশব্যস্ত আহ্বানের মধ্যে
উল্লাস করছে অন্ধ জনতা।
ওরা বলে, ‘এখন ভোর’, কিন্তু জীবনপানে তাকিয়ে
আমি দেখি রাত্রি, ঘোর অমানিশা।
বিদ্যুৎ চমকানো আর বজ্রপাতে মনে হয় দূরে বৃষ্টি হচ্ছে,
কিন্তু বাতাসে বৃষ্টির নামগন্ধ নেই
রক্তের ধারা বইছে প্রবল।
হে নির্বোধের দল, কোথায় উজ্জ্বল প্রভাত?
এখানে এখনো ক্রুদ্ধ রাত
এজিদরূপী সাম্রাজ্যবাদীরা এখনো চূর্ণ করছে
সাহসী দেশপ্রেমিকের হাড়,
জনবহুল, চিত্রময় বাংলাদেশে আবারও রক্তের ঝড়।
সাম্রাজ্যবাদের দালালেরা আবারও জ্বালিয়ে দিচ্ছে গ্রাম-নগর,
মহান দেশপ্রেমিক মুজিব নিজ রক্তের সাগরে শায়িত
সাম্রাজ্যবাদের অভিশপ্ত সেবাদাসেরা তাঁকে
রক্তের জামা পরিয়ে দিয়েছে এবং বিদ্ধ করেছে বুলেটে
এজিদের বিরুদ্ধে হোসেনের কাহিনির পুনরাবৃত্তি।
হে সাহসী কমরেডগণ, এজিদ থেকে সতর্ক হও,
তোমরা যদি ঐক্যবদ্ধ হও, পরাস্ত হবে তারা
তাদের মুখ তাদেরই কিন্তু জবান সাম্রাজ্যবাদীদের।
সেবাদাসেরা ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের পকেট স্ফীতকায়
এবং সাহসী দেশপ্রেমিকদের খতম করে দিতে
সাম্রাজ্যবাদীদের কাছ থেকে জোগান আসতেই থাকবে
তারা পাঠাবে ভাড়াটে লোক ও অস্ত্র
এই কাপুরুষদের কোনো দয়া-মায়া নেই,
এদের কারণেই বিশ্বে এখন ঘোর অন্ধকার।
মুক্তির শিখা কোথাও জ্বলে উঠলে এরা তা নিভিয়ে দেয় দ্রুত
বঙ্গবন্ধু মুজিব সপরিবারে নিহত ওদের হাতে
আবারও স্বাধীনতার পতাকা অর্ধনমিত।
সাম্রাজ্যবাদীরা আবারও ফিরে গেছে তাদের সেই পুরোনো
চক্রান্তে, বিশ্বাসঘাতকতায়
আবারও দ্বন্দ্বের ফয়সালা হচ্ছে বন্দুকের নলে
আবারও সোনার জমিনে জ্বলছে আগুন
হে বন্ধুরা, এভাবেই সময়ের মুখোমুখি আমরা
আমার মাতৃভূমি বেলুচিস্তানও জ্বলছে এখন
ভয় পেয়ো না হে সাহসী যোদ্ধারা, থেমে যেয়ো না,
কণ্টকিত দুর্গম পথ এখনো অনেক বাকি।
মুজিবের রক্ত কখনোই বৃথা যাবে না,
দেশপ্রেমিকের জন্য এ এক অগ্নিপরীক্ষা।
বেশিক্ষণ নয়, কুয়াশা ও আঁধার সত্ত্বেও
এই ভয়াল রাত্রি দ্রুত কেটে যাবে
হৃদয় দিয়ে নাসির স্পষ্ট দেখতে পায়
বিজয়-পতাকা উড়ছে।
>>>অনুবাদ: রিজওয়ান উল আলম
Tuesday, February 16, 2021
এলারি একারস্-এর কবিতা: ভাষান্তর by মঈনুস সুলতান

কবি,
শিশুসাহিত্যিক, শিল্পী ও নিসর্গবিদ এলারি একারস্-এর জন্ম ১৯৪৬ সালে। তিনি
হার্বার্ড ও সানফ্রানসিসকো স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। তার
কাব্যগ্রন্থ দুটি। ২০১৫ সালে ‘প্র্যাকটিসিং দ্যা ট্রুথ’ কাব্যগ্রন্থের জন্য
তিনি অটাম হাউস পোয়েট্রি প্রাইজ পান। ১৯৮৮ সালে প্রকাশিত তার ‘নকিং অন দি
আথর্’ কাব্যগ্রন্থ ওয়েসলিয়ান নিউ পোয়েট সিরিজের জন্য নির্বাচিত হয়। এছাড়াও
তিনি শিশুদের জন্য ‘সারাজ্ ওয়াটার ফল : অ্যা হিলিং স্টোরি আবাউট সেক্সুয়াল
এবিউস (২০০৯)’ শিরোনামে একটি উপন্যাসও রচনা করেছেন। কবি উত্তর
ক্যালিফোর্নিয়ার সমুদ্র তীরবর্তী অঞ্চলে বসবাস করেন।
প্রায় চল্লিশ বছর ধরে পাখি পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি নিসর্গ নিবিড় পরিবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ফার বৃক্ষের বনানীতে পাখি পরিসংখ্যান
খুব ভালোভাবেই জানি—একর জুড়ে থাকা বনানীর কোথায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। যখন এক ফোঁটা বৃষ্টি গড়িয়ে পড়ে হাকোলবেরির পাতা থেকে, কোথায় তা ঝরে পড়লো আমি তা অনুভব করি।ঘুরে ফিরে জানা হয়ে গেছে প্রতিটি পাখির নীড়ের নির্দিষ্ট অবস্থান। পরিচয় হয়েছে প্রতিটি আলাদা আলাদা কাকলীর গীতল ব্যঞ্জনার সঙ্গে, কোন বার্ডকল, কত প্রকারের কুজনে কথা বলছে কে কার সাথে, কোন খেচরটি শাসন করছে ছানাদের, ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে কোন পাখিটি। আমি সচেতন যে—কখন কমলাবউ পাখিটি ভুল করে ঢুকে পড়বে ভিন্ন এক খেচরের গণ্ডিতে, আর তাড়া খাবে তৎক্ষণাত।
আমার পরিবারে বাউন্ডারি বা নিজস্ব গণ্ডির বিষয়টি মানা হয় না তেমন। আমার জননী, যখন মদ্যপানে বেহেড, মাঝরাতে আমার কামরায় ডোর ঠেলে এসে হুড়মুড়িয়ে শুয়ে পড়েন আমার বিছানায়।
বসন্ত ঋতুর পুরোটা জুড়ে আমি বসবাস করেছি বনানীতে, আর তৈরি করেছি নানা রকমের গণ্ডিরেখা নির্ধারিত পরিসরের চার্ট। একটি চড়ুই যখন মাতে সংগীতময় কাকলিতে, সে হেলিয়ে দেয় তার ছোট্ট মাথাটি আর ফুলে ফেঁপে ওঠে তার গলার পালক। প্রতিক্রিয়ায় গান করে ওঠে আরেকটি চড়ুই, সে কাকলি দিয়ে তৈরি করে তার গণ্ডিবদ্ধ পরিসরের সীমান্তে দেয়াল। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে আমিও সে অনুযায়ী রেখা টানি চার্টের মানচিত্রে।
---হাঁস---
যখন আমি পত্রিকার সংবাদ পাঠে ক্লান্ত, একজন পুরুষ বাতাস ভরা পুতুল-মানবীর সঙ্গে সঙ্গমের সময় মৃত্যুবরণ করছে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে; ফুলের মতো শোভন নামের একটি শহর ফলুজা, চলছে ওখানে খণ্ডযুদ্ধ; চাবুক ও হাতকড়ার সমবায়ে নতুন পদ্ধতিতে টর্চারের উদ্ভব...আমি পত্রিকাটি বন্ধ করে চলে আসি পুকুর পাড়ে। দেখি, হাঁসগুলো ডুবসাঁতারে মেতেছে, কখনো-বা কথা বলছে কোয়াক কোয়াক ধ্বনিতে। জলে ডোবা ম্যালার্ড হাঁসটির কমলালেবু রঙের দু-পা বাতাস কাটছে শূন্যে। তারা পাড়ের প্রান্ত ঘেঁষে আদার খুঁটছে, পুচ্ছ দুলিয়ে গিলে ফেলে ছুড়ে দেয়া রুটির টুকরা-টাকরা; জলজগুল্ম ঠোঁটে টেনে চলাচলে তৈরি হয় বাঁকানো বৃত্তাকার ট্রেইল; আর তাদের কণ্ঠনালীর সবুজ পালক রোদে ঝলকায়।
---মেফ্লাই---
মেফ্লাই নামের জলপতঙ্গটি কাদামাখা পানিতে যুঝে যাচ্ছে। আমি প্রকৃতির নিজস্ব বিষয়-আশয়ে জড়িয়ে না পড়ার জন্য নিজেকে সতর্ক করি, কিন্তু পতঙ্গটি যে ভাবে ডানা কাঁপিয়ে যুঝছে, আর দারুণভাবে ক্লান্ত হয়ে ভাসছে, তারপর ফের ডানা থেকে ঝরাতে চাচ্ছে কর্দমাক্ত জল—তা স্রেফ নির্লিপ্তভাবে দেখে যাওয়া বড় কঠিন। এবার মেফ্লাইটি ভেসে থাকার যুদ্ধে ক্লান্ত হতে হতে আমার দিকে আসতে চাচ্ছে। আমি একটি ডাল বাড়িয়ে দিলে সে তা আঁকড়ে ধরে। আমি নিজের আচরণে না হেসে পারি না। এ পতঙ্গটির সারা জীবনের মেয়াদ কেবলমাত্র এক দিনের। তো কাদাজল থেকে উদ্ধার করে আমি তার জীবনকে কতোটা দীর্ঘায়িত করতে পারলাম? সম্ভবত আমার সহায়তায় জলপোকাটি বেঁচে থাকবে আরো এক কিংবা দুই ঘণ্টা, তারপর অবধারিত মৃত্যুতে ঢলে পড়বে সে। কিন্তু যে ভাবে মেফ্লাইটি পরিষ্কার করছে তার পা, এবং রোদে মেলে শুকানোর চেষ্টা করছে তার ডানা, তা পর্যবেক্ষণ করে আমার মন ভরে ওঠে ভালো লাগার অনুভূতিতে।
---প্যাঁচা---
প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়াতে ভারী বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলো আমার মন। তখন আমি বনানীর কুয়াশা কেটে হাঁটতে বেরোই । চাঁদ যেন ব্যান্ডেজ বাঁধার গজ কাপড়ে জড়ানো, গাছ বৃক্ষকেও দেখাচ্ছে আবছা। আমি শুয়ে পড়ি টিলার ঢালে। টারউইড গাছ থেকে নিসৃত গন্ধ এসে লাগছিলো নাকে, আর মাঝে মাঝে সমুদ্র থেকেও ভেসে আসছিলো নোনা গন্ধ। আমি করোটিতে ফারের মতো দেখতে ব্যারেট পরে ছিলাম, এবং হাত দুটো ভাঁজ করে রেখেছিলাম মাথার ওপর। ধারালো ও শীতল কিছু আমার আঙুল ছুঁয়ে উড়ে যায়। বুঝতে পারি—একটি প্যাঁচা, সম্ভবত নিশচর খেচরটি আমার ফার সদৃশ্য ব্যারেটটিকে ভেবেছে ছোট্ট কোন প্রাণী। সে ধারালো নখর দিয়ে ছোবল মেরে উড়ে যায় সামনে।
---অবশিষ্ট আছে যা---
শেষ বার যেদিন আমি আমার দিদিমাকে টেলিফোন করেছিলাম, মনে হয়েছিলো কোনো কিছু নিয়ে তিনি ব্যস্ত আছেন, যেন কিছু একটা একাকি তিনি নিমগ্ন হয়ে শুনছেন। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রায় সব কিছুই আমি ভুলে গেছি, তবে শুধু একটি জিনিস এখনো মনে দাগ কেটে আছে...তার কফিনের উপর রাখা ফুলের তোড়ায় মৌমাছিগুলো মেতেছিলো পরাগায়ণে, তারা গর্ভকেশরগুলোতে হুল বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে ওড়াউড়ি করছিলো।
প্রায় চল্লিশ বছর ধরে পাখি পর্যবেক্ষক হিসেবে তিনি নিসর্গ নিবিড় পরিবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
ফার বৃক্ষের বনানীতে পাখি পরিসংখ্যান
খুব ভালোভাবেই জানি—একর জুড়ে থাকা বনানীর কোথায় আমি দাঁড়িয়ে আছি। যখন এক ফোঁটা বৃষ্টি গড়িয়ে পড়ে হাকোলবেরির পাতা থেকে, কোথায় তা ঝরে পড়লো আমি তা অনুভব করি।ঘুরে ফিরে জানা হয়ে গেছে প্রতিটি পাখির নীড়ের নির্দিষ্ট অবস্থান। পরিচয় হয়েছে প্রতিটি আলাদা আলাদা কাকলীর গীতল ব্যঞ্জনার সঙ্গে, কোন বার্ডকল, কত প্রকারের কুজনে কথা বলছে কে কার সাথে, কোন খেচরটি শাসন করছে ছানাদের, ডাল থেকে ডালে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে কোন পাখিটি। আমি সচেতন যে—কখন কমলাবউ পাখিটি ভুল করে ঢুকে পড়বে ভিন্ন এক খেচরের গণ্ডিতে, আর তাড়া খাবে তৎক্ষণাত।
আমার পরিবারে বাউন্ডারি বা নিজস্ব গণ্ডির বিষয়টি মানা হয় না তেমন। আমার জননী, যখন মদ্যপানে বেহেড, মাঝরাতে আমার কামরায় ডোর ঠেলে এসে হুড়মুড়িয়ে শুয়ে পড়েন আমার বিছানায়।
বসন্ত ঋতুর পুরোটা জুড়ে আমি বসবাস করেছি বনানীতে, আর তৈরি করেছি নানা রকমের গণ্ডিরেখা নির্ধারিত পরিসরের চার্ট। একটি চড়ুই যখন মাতে সংগীতময় কাকলিতে, সে হেলিয়ে দেয় তার ছোট্ট মাথাটি আর ফুলে ফেঁপে ওঠে তার গলার পালক। প্রতিক্রিয়ায় গান করে ওঠে আরেকটি চড়ুই, সে কাকলি দিয়ে তৈরি করে তার গণ্ডিবদ্ধ পরিসরের সীমান্তে দেয়াল। বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে আমিও সে অনুযায়ী রেখা টানি চার্টের মানচিত্রে।
---হাঁস---
যখন আমি পত্রিকার সংবাদ পাঠে ক্লান্ত, একজন পুরুষ বাতাস ভরা পুতুল-মানবীর সঙ্গে সঙ্গমের সময় মৃত্যুবরণ করছে হৃৎপিণ্ডের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে; ফুলের মতো শোভন নামের একটি শহর ফলুজা, চলছে ওখানে খণ্ডযুদ্ধ; চাবুক ও হাতকড়ার সমবায়ে নতুন পদ্ধতিতে টর্চারের উদ্ভব...আমি পত্রিকাটি বন্ধ করে চলে আসি পুকুর পাড়ে। দেখি, হাঁসগুলো ডুবসাঁতারে মেতেছে, কখনো-বা কথা বলছে কোয়াক কোয়াক ধ্বনিতে। জলে ডোবা ম্যালার্ড হাঁসটির কমলালেবু রঙের দু-পা বাতাস কাটছে শূন্যে। তারা পাড়ের প্রান্ত ঘেঁষে আদার খুঁটছে, পুচ্ছ দুলিয়ে গিলে ফেলে ছুড়ে দেয়া রুটির টুকরা-টাকরা; জলজগুল্ম ঠোঁটে টেনে চলাচলে তৈরি হয় বাঁকানো বৃত্তাকার ট্রেইল; আর তাদের কণ্ঠনালীর সবুজ পালক রোদে ঝলকায়।
---মেফ্লাই---
মেফ্লাই নামের জলপতঙ্গটি কাদামাখা পানিতে যুঝে যাচ্ছে। আমি প্রকৃতির নিজস্ব বিষয়-আশয়ে জড়িয়ে না পড়ার জন্য নিজেকে সতর্ক করি, কিন্তু পতঙ্গটি যে ভাবে ডানা কাঁপিয়ে যুঝছে, আর দারুণভাবে ক্লান্ত হয়ে ভাসছে, তারপর ফের ডানা থেকে ঝরাতে চাচ্ছে কর্দমাক্ত জল—তা স্রেফ নির্লিপ্তভাবে দেখে যাওয়া বড় কঠিন। এবার মেফ্লাইটি ভেসে থাকার যুদ্ধে ক্লান্ত হতে হতে আমার দিকে আসতে চাচ্ছে। আমি একটি ডাল বাড়িয়ে দিলে সে তা আঁকড়ে ধরে। আমি নিজের আচরণে না হেসে পারি না। এ পতঙ্গটির সারা জীবনের মেয়াদ কেবলমাত্র এক দিনের। তো কাদাজল থেকে উদ্ধার করে আমি তার জীবনকে কতোটা দীর্ঘায়িত করতে পারলাম? সম্ভবত আমার সহায়তায় জলপোকাটি বেঁচে থাকবে আরো এক কিংবা দুই ঘণ্টা, তারপর অবধারিত মৃত্যুতে ঢলে পড়বে সে। কিন্তু যে ভাবে মেফ্লাইটি পরিষ্কার করছে তার পা, এবং রোদে মেলে শুকানোর চেষ্টা করছে তার ডানা, তা পর্যবেক্ষণ করে আমার মন ভরে ওঠে ভালো লাগার অনুভূতিতে।
---প্যাঁচা---
প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কটি ভেঙে যাওয়াতে ভারী বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলো আমার মন। তখন আমি বনানীর কুয়াশা কেটে হাঁটতে বেরোই । চাঁদ যেন ব্যান্ডেজ বাঁধার গজ কাপড়ে জড়ানো, গাছ বৃক্ষকেও দেখাচ্ছে আবছা। আমি শুয়ে পড়ি টিলার ঢালে। টারউইড গাছ থেকে নিসৃত গন্ধ এসে লাগছিলো নাকে, আর মাঝে মাঝে সমুদ্র থেকেও ভেসে আসছিলো নোনা গন্ধ। আমি করোটিতে ফারের মতো দেখতে ব্যারেট পরে ছিলাম, এবং হাত দুটো ভাঁজ করে রেখেছিলাম মাথার ওপর। ধারালো ও শীতল কিছু আমার আঙুল ছুঁয়ে উড়ে যায়। বুঝতে পারি—একটি প্যাঁচা, সম্ভবত নিশচর খেচরটি আমার ফার সদৃশ্য ব্যারেটটিকে ভেবেছে ছোট্ট কোন প্রাণী। সে ধারালো নখর দিয়ে ছোবল মেরে উড়ে যায় সামনে।
---অবশিষ্ট আছে যা---
শেষ বার যেদিন আমি আমার দিদিমাকে টেলিফোন করেছিলাম, মনে হয়েছিলো কোনো কিছু নিয়ে তিনি ব্যস্ত আছেন, যেন কিছু একটা একাকি তিনি নিমগ্ন হয়ে শুনছেন। তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রায় সব কিছুই আমি ভুলে গেছি, তবে শুধু একটি জিনিস এখনো মনে দাগ কেটে আছে...তার কফিনের উপর রাখা ফুলের তোড়ায় মৌমাছিগুলো মেতেছিলো পরাগায়ণে, তারা গর্ভকেশরগুলোতে হুল বিঁধিয়ে বিঁধিয়ে ওড়াউড়ি করছিলো।
![]() |
| এলারি একারস্ |
Tuesday, July 21, 2020
কথা এনেছ, দাও by কচি রেজা

---১---
আমার পৃথক আকাশ, আমি শেষ রাতের নক্ষত্র
সৌর ঝড়ে নিভে গিয়ে
অথবা ছিলাম বালুর নিচে
শাদা হয়ে গিয়েছে হাড়
ফুটে উঠব হয়ত কোনো আয়নায়
কেউ তার মতো, আমি কারো মতো
ভিন্ন ভিন্ন গাছের নামে
একরাশ পাতার মধ্যে অহংকারী আমি
কোনো এক সুস্বাদু ফলের আশ্চর্য প্রতিভার কাছে
চুপ করে বসে থাকি।
----২----
একমাত্র নিখুঁত অভিনয় জানে অন্ধরা
যারা বধির উপনিষদ শোনে তারা
বাদামী গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে বিপুল হর্ন দিয়ে,
আধেক কুঁকড়ে বরফের ছবি তুলছে ঘুলঘুলি
দূরের স্টেশন থেকে উঠছে পোড়া গন্ধ
একচাঙড় শাদা বরফ পিষছে শীতপ্রধান দেশের কেউ
জুতোর সাথে যাবার ইচ্ছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না,
নাভীর দোষ নেই
আত্মহত্যার চামচে আটকে গেছে পার্পল দাঁত।
----৩----
আমাকে চঞ্চল করে আমার নাম! ভিতরে স্নাত করে এই উচ্চারণ! দাবদাহে যার জন্ম তার নাম নীরজা কেন রেখেছ, বাবা!
মাছের কাঁটার মত জীবন বিঁধে আছে গলায়! এখন ঢোক গিলতে গেলে যে যন্ত্রণা, সে আমি
তোমার জামার আস্তিন দিয়ে, তোমার
পকেটে হাত ঢুকিয়ে মুছে ফেলি!
----৪----
শেষ পর্যন্ত সস্তা নেশাটাই বেছে নিই
হাঁটতে থাকি যেসব পথে হাঁটিনি এযাবত
সূর্যাস্ত পর্যন্ত বরাদ্দ ছিল
ফুল
তুমি
না হেঁটে ভেসেই গেলাম
ভাসতে ইচ্ছে হল আমার
----৫----
তোমার দাঁড়িয়ে থাকা ভাবাচ্ছে না
যেভাবে গঠন নিয়ে
সামান্য দূর থেকেও এই হেলান দেওয়ার গাছটুকু
তার অভিনয়টুকু ঝরে পড়া এবং তারপর যা কিছু তোমার আমার
বোঝার ভুলে আমরা যা করেছি বহুবার...
কথোপকথনের দোলাচলে হিম হয়ে
আঁকড়ে ধরেছি নিজেই নিজেকে
কম্পন দেখোনি
রক্ত ঝরে পড়া এবং হৃদয় মুছতে মুছতে
পাথর ভুল করেনি
লক্ষ্যভেদ নিয়ে।
আমার পৃথক আকাশ, আমি শেষ রাতের নক্ষত্র
সৌর ঝড়ে নিভে গিয়ে
অথবা ছিলাম বালুর নিচে
শাদা হয়ে গিয়েছে হাড়
ফুটে উঠব হয়ত কোনো আয়নায়
কেউ তার মতো, আমি কারো মতো
ভিন্ন ভিন্ন গাছের নামে
একরাশ পাতার মধ্যে অহংকারী আমি
কোনো এক সুস্বাদু ফলের আশ্চর্য প্রতিভার কাছে
চুপ করে বসে থাকি।
----২----
একমাত্র নিখুঁত অভিনয় জানে অন্ধরা
যারা বধির উপনিষদ শোনে তারা
বাদামী গাড়ি স্টার্ট নিচ্ছে বিপুল হর্ন দিয়ে,
আধেক কুঁকড়ে বরফের ছবি তুলছে ঘুলঘুলি
দূরের স্টেশন থেকে উঠছে পোড়া গন্ধ
একচাঙড় শাদা বরফ পিষছে শীতপ্রধান দেশের কেউ
জুতোর সাথে যাবার ইচ্ছে কিন্তু খুঁজে পাচ্ছি না,
নাভীর দোষ নেই
আত্মহত্যার চামচে আটকে গেছে পার্পল দাঁত।
----৩----
আমাকে চঞ্চল করে আমার নাম! ভিতরে স্নাত করে এই উচ্চারণ! দাবদাহে যার জন্ম তার নাম নীরজা কেন রেখেছ, বাবা!
মাছের কাঁটার মত জীবন বিঁধে আছে গলায়! এখন ঢোক গিলতে গেলে যে যন্ত্রণা, সে আমি
তোমার জামার আস্তিন দিয়ে, তোমার
পকেটে হাত ঢুকিয়ে মুছে ফেলি!
----৪----
শেষ পর্যন্ত সস্তা নেশাটাই বেছে নিই
হাঁটতে থাকি যেসব পথে হাঁটিনি এযাবত
সূর্যাস্ত পর্যন্ত বরাদ্দ ছিল
ফুল
তুমি
না হেঁটে ভেসেই গেলাম
ভাসতে ইচ্ছে হল আমার
----৫----
তোমার দাঁড়িয়ে থাকা ভাবাচ্ছে না
যেভাবে গঠন নিয়ে
সামান্য দূর থেকেও এই হেলান দেওয়ার গাছটুকু
তার অভিনয়টুকু ঝরে পড়া এবং তারপর যা কিছু তোমার আমার
বোঝার ভুলে আমরা যা করেছি বহুবার...
কথোপকথনের দোলাচলে হিম হয়ে
আঁকড়ে ধরেছি নিজেই নিজেকে
কম্পন দেখোনি
রক্ত ঝরে পড়া এবং হৃদয় মুছতে মুছতে
পাথর ভুল করেনি
লক্ষ্যভেদ নিয়ে।
Wednesday, February 19, 2020
কবিতা- প্রকৃতির আহাজারি, মানুষের বিলাপ by আশরাফ আহমেদ
‘হারানোর মিছিলে প্রকৃতি’ নামে একটি কবিতাটি
ছাপার পর পড়ে মনে হলো অনেক কথা বলা হয়নি এতে;
অবশ্য, এ বিষয়ে কবিতা, কাহিনি, প্রবন্ধ, গবেষণা-চলতেই থাকবে-এসব শেষ হওয়ার মত নয়;
যদ্দিন বিশ্বে ধনতন্ত্র, মুনাফার ব্যাপার থাকবে
বায়ুদূষণ সঙ্গে চলবে অবিরত দুরন্ত অপ্রতিরোধ্য গতিতে
কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য, নির্গত ধোঁয়া কার্বন হয়ে বইবে নিরবধি আকাশে, বাতাসে, সমুদ্র ,পাহাড় পর্বতে
বিশ্ব চরাচরে ,পাতালে, অন্তরিক্ষে-সর্বত্র অব্যাহতভাবে।
কবিতায় বলেছিলাম ছোট এক দারকিনি প্রজাতির মাছের কথা আর সঙ্গে টক-মিষ্ট এক ফলের কথা;
কেমন করে, কখন, কোথায় উধাও হয়ে গেল সৃষ্টিগুলো?
বলেছিলাম মানুষের সীমাহীন লোভ, অবিবেচনার কথা;
আর ও বলেছি:
উফসী ধান আর মাছ চাষের কারণে
কেমিক্যাল সার, কীটনাশক ওষুধ
ফলন বাড়ানোর এই সব মহৌষধ প্রয়োগের কারণে
স্বাদে অতুলনীয় দেশজ মাছ ইদানীং প্রায় বিলীন
আমাদের বিশ্ব থেকে, অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের
পরিবেশ দূষণের অমোঘ নিয়মে!
বলেছিলাম প্রায় বৃক্ষশূন্য রঘুনন্দন পাহাড়ের কথা
শাল, সেগুন সুরভিত পাহাড়টিতে গজারি, সোনারু, নানা জাতের বাঁশ, ছন, উলু, কাঠসহ হাজারো নির্মাণ সামগ্রী যে পাহাড়টিতে অনায়াসে পাওয়া যেত।
লোভাতুর মহালদাররা হাতি দিয়ে টেনে আনত
মুনাফার আশে নির্বিচারে ছোট-বড় বাছ বিচার না করে।
ছোট বেলা দেখেছি রকমারি হরিণ, বাঘ, বনমোরগ,
বানর, হনুমান, নানা জাতের পাখি, বনকুকুর, মতুরা
কত সব বন্য প্রাণী হামেশাই এদের দেখা মিলত।
রঘুনন্দন আজ বিরান, সম্পদ লুণ্ঠনে আর নিধনের বলিকাষ্ঠে নিস্তর আর খোলা মাঠসম সমতল প্রান্তর।
পাহাড়ি জিভধর ছড়ার ঝিরঝির পানি, সোনালি বালি,
দু–চারটে ছোট মাছ, ঢলে ভাটি থেকে আসা
উজানি কই, মাগুর সন্ধ্যে হতেই বাঁশের কুপির আলোতে ঝুপড়ি পলো দিয়ে মাছ ধরা-সে সব আজ আর নেই ।
ঢল হয়, মাছ আসে না, নেই ভাটিতে মাছ, হাঁস কিছুই
উজানে প্রাণ কোম্পানি আরও কত কারখানা বর্জ্য দিয়ে
বিনাশ করেছে ভাটি অঞ্চলের এসব সম্পদ।
ইটের ভাটা, দালান কোঠা, যত্রতত্র কল-কারখানা,
দোকান-পাট দখল করেছে বিভিন্ন কায়দায় সব জায়গা
ধানি আর পতিত জমি, সবজি ফল-ফলাদি চাষের ভূমি
কিছুই বাদ পড়েনি-এমনকি শ্মশান স্থান, খেলার মাঠ
গো-চারণ ভূমি, খাল-বিল, নদী-নালা গিলেছে গোগ্রাসে নিতান্ত নির্দয়ে, অবহেলা, আর নির্মম নির্লজ্জে।
মানুষের নির্দয়তা, লোভ-লালসা, ক্ষমতার অপব্যবহার
কালো টাকা, মস্তানের দুর্দান্ত দাপটে সহায় সম্বলহীন আদম সন্তান, কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে আছে ধুঁকেধুঁকে মৃতপ্রায়!
ছাপার পর পড়ে মনে হলো অনেক কথা বলা হয়নি এতে;
অবশ্য, এ বিষয়ে কবিতা, কাহিনি, প্রবন্ধ, গবেষণা-চলতেই থাকবে-এসব শেষ হওয়ার মত নয়;
যদ্দিন বিশ্বে ধনতন্ত্র, মুনাফার ব্যাপার থাকবে
বায়ুদূষণ সঙ্গে চলবে অবিরত দুরন্ত অপ্রতিরোধ্য গতিতে
কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য, নির্গত ধোঁয়া কার্বন হয়ে বইবে নিরবধি আকাশে, বাতাসে, সমুদ্র ,পাহাড় পর্বতে
বিশ্ব চরাচরে ,পাতালে, অন্তরিক্ষে-সর্বত্র অব্যাহতভাবে।
কবিতায় বলেছিলাম ছোট এক দারকিনি প্রজাতির মাছের কথা আর সঙ্গে টক-মিষ্ট এক ফলের কথা;
কেমন করে, কখন, কোথায় উধাও হয়ে গেল সৃষ্টিগুলো?
বলেছিলাম মানুষের সীমাহীন লোভ, অবিবেচনার কথা;
আর ও বলেছি:
উফসী ধান আর মাছ চাষের কারণে
কেমিক্যাল সার, কীটনাশক ওষুধ
ফলন বাড়ানোর এই সব মহৌষধ প্রয়োগের কারণে
স্বাদে অতুলনীয় দেশজ মাছ ইদানীং প্রায় বিলীন
আমাদের বিশ্ব থেকে, অপরিণামদর্শী কর্মকাণ্ডের
পরিবেশ দূষণের অমোঘ নিয়মে!
বলেছিলাম প্রায় বৃক্ষশূন্য রঘুনন্দন পাহাড়ের কথা
শাল, সেগুন সুরভিত পাহাড়টিতে গজারি, সোনারু, নানা জাতের বাঁশ, ছন, উলু, কাঠসহ হাজারো নির্মাণ সামগ্রী যে পাহাড়টিতে অনায়াসে পাওয়া যেত।
লোভাতুর মহালদাররা হাতি দিয়ে টেনে আনত
মুনাফার আশে নির্বিচারে ছোট-বড় বাছ বিচার না করে।
ছোট বেলা দেখেছি রকমারি হরিণ, বাঘ, বনমোরগ,
বানর, হনুমান, নানা জাতের পাখি, বনকুকুর, মতুরা
কত সব বন্য প্রাণী হামেশাই এদের দেখা মিলত।
রঘুনন্দন আজ বিরান, সম্পদ লুণ্ঠনে আর নিধনের বলিকাষ্ঠে নিস্তর আর খোলা মাঠসম সমতল প্রান্তর।
পাহাড়ি জিভধর ছড়ার ঝিরঝির পানি, সোনালি বালি,
দু–চারটে ছোট মাছ, ঢলে ভাটি থেকে আসা
উজানি কই, মাগুর সন্ধ্যে হতেই বাঁশের কুপির আলোতে ঝুপড়ি পলো দিয়ে মাছ ধরা-সে সব আজ আর নেই ।
ঢল হয়, মাছ আসে না, নেই ভাটিতে মাছ, হাঁস কিছুই
উজানে প্রাণ কোম্পানি আরও কত কারখানা বর্জ্য দিয়ে
বিনাশ করেছে ভাটি অঞ্চলের এসব সম্পদ।
ইটের ভাটা, দালান কোঠা, যত্রতত্র কল-কারখানা,
দোকান-পাট দখল করেছে বিভিন্ন কায়দায় সব জায়গা
ধানি আর পতিত জমি, সবজি ফল-ফলাদি চাষের ভূমি
কিছুই বাদ পড়েনি-এমনকি শ্মশান স্থান, খেলার মাঠ
গো-চারণ ভূমি, খাল-বিল, নদী-নালা গিলেছে গোগ্রাসে নিতান্ত নির্দয়ে, অবহেলা, আর নির্মম নির্লজ্জে।
মানুষের নির্দয়তা, লোভ-লালসা, ক্ষমতার অপব্যবহার
কালো টাকা, মস্তানের দুর্দান্ত দাপটে সহায় সম্বলহীন আদম সন্তান, কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে আছে ধুঁকেধুঁকে মৃতপ্রায়!

Saturday, February 8, 2020
অতৃপ্তির গান by আসাদ মান্নান

অতৃপ্তি আমাকে নিয়ে
উড়ে যাচ্ছে
শূন্যতার
বাহুলগ্না
হাওয়ার ডানায়;
দূরে নদী ভালোবাসা
বিষণ্ন জলের
বিরহের তীরভাঙা
সময়ের গান
গাইতে গাইতে
একা বহে যায় :
আকাশ দুঃখের ভারে
দিগন্তের বাঁকে
ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড
যে চাঁদের মুখ
কখনও বা
অসহায় ধর্ষিতার মতো
তুমুল কান্নায়
মেঘের আড়ালে
চলে যায়
অন্ধকারে
প্রকৃতির অন্দরতলায়
অন্য এক বেদনার
নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেঙে
হাঁটে নিরালয়;
আমি তাকে নিয়ে
দূরগামী ট্রেনের আশায়
জরাজীর্ণ
ঘড়ির হাতল ধরে
আর কতকাল
এ ভুল স্টেশনে বসে থাকবো!
উড়ে যাচ্ছে
শূন্যতার
বাহুলগ্না
হাওয়ার ডানায়;
দূরে নদী ভালোবাসা
বিষণ্ন জলের
বিরহের তীরভাঙা
সময়ের গান
গাইতে গাইতে
একা বহে যায় :
আকাশ দুঃখের ভারে
দিগন্তের বাঁকে
ঘূর্ণিঝড়ে লণ্ডভণ্ড
যে চাঁদের মুখ
কখনও বা
অসহায় ধর্ষিতার মতো
তুমুল কান্নায়
মেঘের আড়ালে
চলে যায়
অন্ধকারে
প্রকৃতির অন্দরতলায়
অন্য এক বেদনার
নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেঙে
হাঁটে নিরালয়;
আমি তাকে নিয়ে
দূরগামী ট্রেনের আশায়
জরাজীর্ণ
ঘড়ির হাতল ধরে
আর কতকাল
এ ভুল স্টেশনে বসে থাকবো!
Thursday, August 8, 2019
বই: বাংলাদেশের আকাশ; কবিতায় প্রিয় বঙ্গবন্ধু by শিউল মনজুর

শোকাচ্ছন্ন
আগস্ট মাস। ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসের ১৫ তারিখ বাংলাদেশের জাতীয় জীবনের একটি
রক্তাক্ত দিন। বাংলাদেশের মহানায়ক শতাব্দীর শ্রেষ্ট বাঙালী শেখ মুজিবুর
রহমানকে সপরিবারে হাজারো বুলেটের আঘাতে একদল খুনী হত্যা করে। যদিও
ভাগ্যগুণে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ওই সময় বিদেশ থাকায় বেঁচে যান। এই
মহানায়কের নিকট বাংলাদেশের মানুষ আজীবন ঋণী। তাঁর আহ্বানেই ১৯৭১ সালে
স্বাধীনতা অর্জনের জন্য সমগ্র বাঙালী জাতি সশস্ত্র পাকবাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে
পড়ে এবং নয় মাসের অক্লান্ত সংগ্রামের পর পাক বাহিনী পরাজয় স্বীকার করে নেয়।
অতঃপর বাঙালী জাতির সবচেয়ে প্রিয় স্বাধীন দেশের পতাকা বিশ্বদরবারে উড্ডীন
হয়। বিশ্বমানচিত্রে জন্মলাভ করে নতুন দেশ বাংলাদেশ। মুক্ত স্বাধীনতার দেশ
বাংলাদেশ। আর এই স্বাধীন দেশের রূপকারই হচ্ছেন আমাদের সকলের মহানায়ক প্রিয়
নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। যে কারণে এই মহানায়ককে বাঙালী জাতি নানাভাবে স্মরণ
করে। বিশেষ করে কবিতায় গানে চিত্রকলায় এই মহানায়ককে আমরা স্মরণ করি।
হৃদয়ের অফুরন্ত ভালবাসায় তাঁকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চেষ্টা করি। এ দেশের নবীন
প্রবীণ কবি সাহিত্যিকরাও এই মহানব্যক্তিত্বকে তাদের কবিতার ভেতরে দিয়ে তার
মুখচ্ছবিকে তাঁর অমূল্য কর্মকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। বাংলাদেশের স্থপতি
মুজিবকে স্মরণ করে বা তাঁকে কেন্দ্র করে বহু রচনা বা সাহিত্য লেখকরা উপহার
দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে বেরিয়েছে প্রবন্ধের বই, গল্প ও উপন্যাসের বই। তবে
বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি বেরিয়েছে সম্পাদিত কবিতার বই। আর কোন
রাজনৈতিক নেতাকে কেন্দ্র করে এত কবিতা আমার মনে হয় লেখা হয়নি। এসব সম্পাদিত
বইগুলোতে শামসুর রহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণসহ
দেশের খ্যাতিমান কবিরা তাঁকে নিয়ে স্মরণীয় পঙ্্ক্তি রচনা করেছেন। এসব
পঙ্্ক্তি আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পাঠককে আবেগাপ্লুত করে। মনে হয় যেন জাতির
জনক শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের মাঝে আজও উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জেগে আছেন।
এই মহানব্যক্তিত্বকে নিয়ে প্রবাস থেকেও বই বেরিয়েছে। এর মধ্যে একটি
উল্লেখযোগ্য কবিতার সঙ্কলন কবি কাজল রশীদ সম্পাদিত বাংলাদেশের আকাশ। এই
গ্রন্থে দেশে ও প্রবাসে অবস্থানরত অসংখ্য কবিরা জাতির জনককে শ্রদ্ধায়
ভালবাসায় কবিতার মধ্য দিয়ে স্মরণ করেছেন। লন্ডনের প্রবাস প্রকাশনীর এই
সঙ্কলনে অন্তর্ভুক্ত বেশকিছু কবিতা মনে রাখার মতো। গ্রন্থটির ছাপা বাঁধাই
অত্যন্ত উন্নতমানের। বইটি থেকে দেশের সুপরিচিত কয়েকজন কবির কবিতার অংশ
বিশেষ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো :
----এক.-----
এ মাটির সোঁদা গন্ধে
বাতাসের উদ্দাম বেগে
নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে
আপনি তো কোন পৃথক সত্তা নন; আমাদের সকলের
প্রাণের গভীরে অবিরাম ধ্বনিত একটি নাম- শেখ মুজিব।
(দশ বছর পর- সোহরাব হাসান, পৃষ্ঠা-১২৩)
----দুই.-----
পিতা নয়; পুত্র হিসেবে তোমাকে চাই-
যেন পুত্র হিসেবে পাই।
আমাদের বিসন্ন ব্যর্থতাগুলো, ঘৃণিত গ্লানিগুলো
শোকার্ত শূন্যতাগুলো মুছে দিয়ে-
অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো
আলোকিত করবে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।
(স্থলাভিষিক্ত-সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, পৃষ্ঠা-১১৩)
----তিন.-----
প্রতিবার ঝড়ের শেষে ভাঙ্গনের পর একটি সূর্য ওঠে
রক্তের সাগর উথাল পাতাল, দাঁড়ায় একটি সূর্য
আঁধার আচ্ছন্ন কাল থেকে নিশিলাগা কাল থেকে
একটি সূর্য দাঁড়ায় এসে আমাদের শিয়রের পাশে
বত্রিশের সিঁড়িতে এক সাগর রক্তের মাঝে ফুটে ওঠে এক সূর্য
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, আলো দিয়ে যায় সে সূর্য।
(একটি সূর্যের গল্প-রবীন্দ্র গোপ, পৃষ্ঠা-৯৬)
-----চার.----
যেহেতু তিনি হিমালয়ের চেয়েও উঁচু ছিলেন
তাই দুর্বৃত্তরা কিছুতেই তার নাগাল না পেয়ে
তারা পিঁপড়ের ঢিবির চেয়েও অতি খাটো রয়ে গেল।
(যেহেতু তিনি খুব বড় ধরনের মানুষ ছিলেন- রবিউল হুসাইন, পৃষ্ঠা-৯৫)
-----পাঁচ.-----
হঠাৎ জানতে চাইলেম
‘খোকা’
লোকটির বসবাস
এখন কোথায়!
প্রথম জন
দ্বিতীয় জন
শেষ জন
এক বাক্যে উচ্চারণ করলেন,
লোকটির বসবাস
বাঙালীর হৃদপুরে।
(হৃদপুরে-মাকিদ হায়দার, পৃষ্ঠা-৭৫)
এই সব কবিতার ভেতর দিয়ে মনে হয় যেন আমাদের প্রিয়নেতা বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান যেন জীবন্ত, আমাদের সম্মুখে দ-ায়মান। কবিরা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী পঙ্্ক্তির ছোঁয়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনালি মুখ অঙ্কন করেছেন, এক একটি কবিতা যেন এক একজন বঙ্গবন্ধু। তাই ঘাতকরা তাঁর প্রাণ কেড়ে নিলেও তিনি বাংলার ঘরে ঘরে তুমুল সজীবতা নিয়েই আমাদের মাঝে জেগে আছেন। কবি কাজল রশীদ সম্পাদিত বাংলাদেশের আকাশ শিরোনামের এই মূল্যবান গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর মুখকে সোনালি অক্ষরে চিত্রিত করেছেন আরও অসংখ্য কবি। তাদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চোধুরী, নাসির আহমেদ, মাহমুদ কামাল, কামাল চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, অসীম সাহা, আনোয়ারা সৈয়দ হক, আসলাম সানী, তপন বাগচী, তিতাশ চৌধুরী, ইকবাল আজিজ, ইকবাল হাসান, আতাউর রহমান মিলাদ, হালিম আজাদ, শিহাব শাহরিয়ার, শামীম রেজা, আনজীর লিটন, শিউল মনজুর, মুজিব মেহদী, মাহবুব বারী, গোলাম কিবরিয়া পিনু প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থের চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিহাব শাহরিয়ার। এক কথায় বাংলাদেশের আকাশ ও প্রিয় বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে এক হয়ে আছেন। বইটি হৃদয়ে হৃদয়ে পৌঁছে দেবে জাতির জনকের অমূল্য স্মৃতি। ধন্যবাদ প্রবাস প্রকাশনীকে।
----এক.-----
এ মাটির সোঁদা গন্ধে
বাতাসের উদ্দাম বেগে
নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে
আপনি তো কোন পৃথক সত্তা নন; আমাদের সকলের
প্রাণের গভীরে অবিরাম ধ্বনিত একটি নাম- শেখ মুজিব।
(দশ বছর পর- সোহরাব হাসান, পৃষ্ঠা-১২৩)
----দুই.-----
পিতা নয়; পুত্র হিসেবে তোমাকে চাই-
যেন পুত্র হিসেবে পাই।
আমাদের বিসন্ন ব্যর্থতাগুলো, ঘৃণিত গ্লানিগুলো
শোকার্ত শূন্যতাগুলো মুছে দিয়ে-
অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো
আলোকিত করবে ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল।
(স্থলাভিষিক্ত-সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, পৃষ্ঠা-১১৩)
----তিন.-----
প্রতিবার ঝড়ের শেষে ভাঙ্গনের পর একটি সূর্য ওঠে
রক্তের সাগর উথাল পাতাল, দাঁড়ায় একটি সূর্য
আঁধার আচ্ছন্ন কাল থেকে নিশিলাগা কাল থেকে
একটি সূর্য দাঁড়ায় এসে আমাদের শিয়রের পাশে
বত্রিশের সিঁড়িতে এক সাগর রক্তের মাঝে ফুটে ওঠে এক সূর্য
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, আলো দিয়ে যায় সে সূর্য।
(একটি সূর্যের গল্প-রবীন্দ্র গোপ, পৃষ্ঠা-৯৬)
-----চার.----
যেহেতু তিনি হিমালয়ের চেয়েও উঁচু ছিলেন
তাই দুর্বৃত্তরা কিছুতেই তার নাগাল না পেয়ে
তারা পিঁপড়ের ঢিবির চেয়েও অতি খাটো রয়ে গেল।
(যেহেতু তিনি খুব বড় ধরনের মানুষ ছিলেন- রবিউল হুসাইন, পৃষ্ঠা-৯৫)
-----পাঁচ.-----
হঠাৎ জানতে চাইলেম
‘খোকা’
লোকটির বসবাস
এখন কোথায়!
প্রথম জন
দ্বিতীয় জন
শেষ জন
এক বাক্যে উচ্চারণ করলেন,
লোকটির বসবাস
বাঙালীর হৃদপুরে।
(হৃদপুরে-মাকিদ হায়দার, পৃষ্ঠা-৭৫)
এই সব কবিতার ভেতর দিয়ে মনে হয় যেন আমাদের প্রিয়নেতা বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান যেন জীবন্ত, আমাদের সম্মুখে দ-ায়মান। কবিরা অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী পঙ্্ক্তির ছোঁয়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সোনালি মুখ অঙ্কন করেছেন, এক একটি কবিতা যেন এক একজন বঙ্গবন্ধু। তাই ঘাতকরা তাঁর প্রাণ কেড়ে নিলেও তিনি বাংলার ঘরে ঘরে তুমুল সজীবতা নিয়েই আমাদের মাঝে জেগে আছেন। কবি কাজল রশীদ সম্পাদিত বাংলাদেশের আকাশ শিরোনামের এই মূল্যবান গ্রন্থে বঙ্গবন্ধুর মুখকে সোনালি অক্ষরে চিত্রিত করেছেন আরও অসংখ্য কবি। তাদের মধ্যে সৈয়দ শামসুল হক, বেলাল চোধুরী, নাসির আহমেদ, মাহমুদ কামাল, কামাল চৌধুরী, মুহম্মদ নূরুল হুদা, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, অসীম সাহা, আনোয়ারা সৈয়দ হক, আসলাম সানী, তপন বাগচী, তিতাশ চৌধুরী, ইকবাল আজিজ, ইকবাল হাসান, আতাউর রহমান মিলাদ, হালিম আজাদ, শিহাব শাহরিয়ার, শামীম রেজা, আনজীর লিটন, শিউল মনজুর, মুজিব মেহদী, মাহবুব বারী, গোলাম কিবরিয়া পিনু প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। গ্রন্থের চমৎকার প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিহাব শাহরিয়ার। এক কথায় বাংলাদেশের আকাশ ও প্রিয় বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে এক হয়ে আছেন। বইটি হৃদয়ে হৃদয়ে পৌঁছে দেবে জাতির জনকের অমূল্য স্মৃতি। ধন্যবাদ প্রবাস প্রকাশনীকে।
Friday, July 26, 2019
মায়ের শরীরের একাংশ আমি by মামুন অপু
আমার অস্তিত্বের অঙ্কুরোদগম হয়েছিল
এক মায়াবী নারীর গূঢ় কর্ষিত জঠরে
বাবার রক্ত থেকে মায়ের রক্তে মিশে
তৈরি হলো আমার শাঁস
দশ মাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফল আমার জন্ম।
বটবৃক্ষের রক্ত শাদা, মায়ের দুধও...
এমন সাদা ও সুস্বাদু রক্তের তৃষ্ণায়
আমার কণ্ঠনালি ও বুক শুকালে
মা অনায়াসে পরম মমতায় মুখে ধরে বুক থেকে নিসৃত সাদা রক্ত।
হাঁটা ও উড়তে শিখলেই
সন্তানরা হয়ে যায় দ্রুতগামী রেলগাড়ি
যত দূরেই যাই ফিরে আসি ভালোবাসার স্টেশনে
তখন বারবার মনে হয় মায়ের শরীরের একাংশ আমি।
এক মায়াবী নারীর গূঢ় কর্ষিত জঠরে
বাবার রক্ত থেকে মায়ের রক্তে মিশে
তৈরি হলো আমার শাঁস
দশ মাসের দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ফল আমার জন্ম।
বটবৃক্ষের রক্ত শাদা, মায়ের দুধও...
এমন সাদা ও সুস্বাদু রক্তের তৃষ্ণায়
আমার কণ্ঠনালি ও বুক শুকালে
মা অনায়াসে পরম মমতায় মুখে ধরে বুক থেকে নিসৃত সাদা রক্ত।
হাঁটা ও উড়তে শিখলেই
সন্তানরা হয়ে যায় দ্রুতগামী রেলগাড়ি
যত দূরেই যাই ফিরে আসি ভালোবাসার স্টেশনে
তখন বারবার মনে হয় মায়ের শরীরের একাংশ আমি।

Friday, February 8, 2019
কালি ও কলমে প্রকাশিত শহীদ কাদরীর কবিতা
>>কালি ও কলমে প্রকাশিত শহীদ কাদরীর কবিতা<<
একে ব’লতে পারো একুশের কবিতা
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়,
কিন্তু যদি তুমি অপলক তাকিয়ে থাকো এই শব্দমালার দিকে,
তুমি দেখতে পাবে এই কবিতার ভেতর ফল্গুধারার মত বয়ে
চলেছে
শ্রাবণের রাঙা জল – একে তুমি একুশের কবিতা বলতে পারো।
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়,
কিন্তু যারা প্রেমিক তাদের চোখে ঠিক ধরা পড়বে –
এই কবিতার উপর আষাঢ়ের ঘনমেঘের এবং শাড়ি পরা বাংলার
মায়েদের
দীর্ঘ ছায়া পড়ে আছে;
এই কবিতার গভীরে এখনও ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’,
এখনও বিরতিহীনভাবে বয়ে চলেছে বাংলার বর্ষণমুখর রাত্রির
কালো হাওয়া
এ কবিতা একুশেরই কবিতা।
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়।
কিন্তু বৈশাখের খররৌদ্রে সোনালি খড়বাহী গাড়ির মতো
মন্থরভাবে এগিয়ে চলেছে এই কবিতা, এখন আমি জানি
একুশই হচ্ছে এই পঙ্ক্তিগুলোর জরায়ু – একে আমি একুশের
কবিতাই বলতে চাই!
আমার মনে আছে ১৯৫২-র শেস্নøvগান চঞ্চল একুশের অপরাহ্ণে
আমি দেখেছি পাখির পালকের মতো হালকা এক
ভিখিরি বালকের মৃত্যু এক অমোঘ থ্রি-নট-থ্রির গুলিতে।
তার কথা একুশের ইতিহাসে লেখাজোখা নেই;
এই কবিতাটিকে আমি সেই নিহত বালকের
শ্বেত কফিন ও স্মৃতির মিনার বলতে চাই,
এবং সেই অর্থেও একে আমি একুশের কবিতাই বলবো।
সেই এক সময় ছিল যখন বাংলা ভাষা থেকে নির্বাসনে পাঠানো
হয়েছিল
বাংলা ভাষাকেই। সরকারি উর্দিপরা বিদেশি সৈনিকের মতো ভারি
বুট পরে
সদর্পে কুচকাওয়াজ করে বেড়িয়েছে আমাদের অচেনা শব্দগুলো
অথচ আমার এ শব্দমালা বাংলা ছাড়া অন্য কিছু নয়,
আর সে অর্থেও একে আমি একুশের কবিতা বলতে চাই।
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়।
কিন্তু যদি বরকত, রফিক, সালাম, জববারের অফুরান রক্তের
লালে
আমার স্বদেশ ডুবে না যেতো – এই কবিতাটি লেখা হতো না
কোনোদিন
অতএব এই কবিতাটিকে আমি একুশের কবিতাই বলতে চাই
দোহাই তোমাদের, তোমরা আপত্তি করো না।
পথে হলো দেরি
পথে পথে আর পান্থশালায়
হয়ে গেল বড় দেরি
কাঁধে নিয়ে সব মৃত হরিণের
দুয়ারে দুয়ারে স্বপ্ন করেছি ফেরি।
তোমার বাগানে মালাকার নেই
বাগানে ঝরছে চেরি
দরোজা জানালা বন্ধ সকলই
হয়েছে কি খুব দেরি?
তবু আজকে লণ্ঠন জ্বেলে
লিখব তোমার কথা
সে-সব কথা কি নিমেষে মেলাবে?
আমার বেলায় হবে নাকি অন্যথা?
শীতের পাহাড়ি তীব্র হিম বাতাস
ছিঁড়েছে আমার তাঁবু;
‘আপনি বড্ড দেরি করেছেন’
হেঁকে বলেস্নøন ইস্টিশনের বাবু।
পথে পথে আর পান্থশালায়
হয়ে গেল বড় দেরি,
কাঁধে নিয়ে আমি মৃত হরিণের শব
একা একা হাঁটি। তোমার বাগানে
সারা দিনরাত অঝোরে ঝরবে চেরি।
আপনারা জানেন
Philosophers have only interpreted the world in various ways; the point however is to change it – Marxs, Thesis on Feurbach
আপনারা জানেন
মহামতি পেস্নøটো কী বলেছেন…
দার্শনিক কান্ট কী বলেছেন…
হেগেল কী বলেছেন…
মহামতি বুদ্ধ কী বলেছেন…
দেকার্তে কিংবা
বের্গসঁ কী বলেছেন…
বার্ট্রান্ড রাসেল কী বলেছেন…
হোয়াইটহেড কী বলেছেন…
জীবনানন্দ দাশ কী বলেছেন…
বুদ্ধদেব বসু কিংবা বিষ্ণু দে কী বলেছেন…
কী বলেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ!
কী বলেছেন কবিকুলচূড়মণি মাইকেল!
আপনারা জানেন
ঈশ্বরের পুত্র যিশু কী বলেছেন…
ইউরিপিডিস কিংবা সফোক্লিস কী বলেছেন…
মিশেল ফুকো কী বলেছেন,
দেরিদ্দা কী বলেছেন
কী বলেছেন পিকাসো
কিংবা পল এলুয়ার!
এই গ্রহের মহাপুরুষরা কে কী বলেছেন
আপনারা সবই জানেন। এখানে বক্তৃতা আমার উদ্দেশ্য
নয়। আমি এক নগণ্য মানুষ, আমি
শুধু বলি : জলে প’ড়ে যাওয়া ঐ পিঁপড়েটাকে ডাঙায় তুলে দিন
বিপস্নøব
মনজুর এলাহীর বাগানে,
ছায়াচ্ছন্ন সন্ধ্যায়, বসেছিলাম আমরা
কয়েকজন। কথা হ’লো, অনেক ধরনের
কথা হ’লো। কেউ বললেন বঙ্গবন্ধুর কথা,
সেই প্রসঙ্গে নিহত এ্যালেন্দে এবং
চিলিতে সামরিক উত্থানের ইতিহাসও
উলেস্নøখ করলেন কেউ কেউ। বলা বাহুল্য
ইরাক ইরানের কথাও উঠলো। ক্যাস্ট্রোর পর
কিউবার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ,
বিশ্বব্যাপী অসৎ বণিকদের দাপট,
এবং বাংলার বিপন্ন মানুষ
নিরন্ন আজীবন – এইসব কথা বলাবলি
করলাম আমরা কাজু বাদাম আর
কফি খেতে খেতে। ক্রমশ রাত্রি নেমে এলো
কালো বেড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে।
টেবিল চেয়ারগুলো ঘিরে জোনাকিরা
জ্বলতে লাগলো – যেন চিরটাকাল এরকম
জ্বলতে থাকবে তারা। আমরা উঠে গেলাম
ডিনার টেবিলে।
মনজুর এলাহী আবার বললেন : বন্দুকের নলই
শক্তির উৎস! রক্তপাত ছাড়া শ্রেণিসাম্য প্রতিষ্ঠা
অসম্ভব, অনায়াসে কেউ শ্রেণিস্বার্থ ছেড়ে দেয় না।
আমি জানালা থেকে দেখলাম
মনজুর এলাহীর গোটা বাগান
জোনাকিরা দখল করে নিয়েছে –
বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে।
হমত্মারকদের প্রতি
বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়,
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়
না, কোনো উপমায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না
তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম
বুট, সৈনিকের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিলো,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো
দেখতে, এবং ওরা মানুষই
ওরা বাংলা মানুষ
এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনোদিন।
বিব্রত সংলাপ
তুমি বারবার নতুন কিছু শুনতে চাইলে
বোল্লে : ‘আমাকে নতুন কিছু শোনাও’
আমি বোলস্নাম : ‘অমাবস্যার পুঞ্জপুঞ্জ অন্ধকার
একদল কালো মুখোশ-পরা
ডাকাতের মতো
শিকার করতে চাইছে শাদা খরগোশের মতো কম্পমান
চাঁদটাকে’
তুমি বোলেস্ন : ‘এর কোনো অর্থ নেই!’
আমি আবার বোলস্নাম : ‘তুমি কী শোনোনি
তিনটে মাছের আক্রমণে নিহত মাছরাঙা প’ড়ে আছে নদীর
ওপারে’
তোমার চোখের তারা
অবিশ্বাসে বারবার নেচে উঠলো : ‘এটা একটা
প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ঘটনা, হতেই পারে না’
আমি এবার একটু উঁচু গলায় : ‘বিশ্বাস করো অরণ্যের অব্যাহত
আক্রমণে দারুণ সংকুচিত হয়ে পড়ছে
আমাদের শহরগুলো।’
মস্নান হেসে তুমি বোলেস্ন : ‘ব্যাপারটা বরং উলটো
মানুষের হমত্মারক হাতের কল্যাণে এ-দেশে
পুষ্পল ঋতু আর দেখাই যায় না’
আমি এবার রেগে উঠলাম : ‘তুমি জানো
সমুদ্র প্রত্যাখ্যান করেছে আমাদের নদীগুলোকে,
তারা ফিরে আসছে তাতার দস্যুর তরঙ্গের মতো
আমাদের গ্রাম ও শহরের দিকে।’
হেলায়-ফেলায় তুমি বোলেস্ন : ‘অমন অলক্ষুণে কথা
শুনতেও নেই।’
আমি আবার বোলস্নাম : ‘ঐ দ্যাখো হরিণশাবকের তাড়া খেয়ে
দিশেহারা ডোরাকাটা বাঘগুলো
দিগ্বিদিক
পালাচ্ছে ছুটে।’
তুমি মস্নান হেসে বোলেস্ন : ‘এমন সুদিন কখনো কি আসবে?’
বস্টন ১৯৯০
সেই সময়
শ্রাবণ তোমার
শরীরে লিখেছে গল্প
– তার স্বাদ ভুলি নাই
শত্রম্নসেনার সতর্ক চোখ এড়িয়ে
তুমি এসেছিলে
তিনটে রাসত্মা পেরিয়ে
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে
– ভুলি নাই
সময়টা ছিল যুদ্ধের
কারফিউ চতুর্দিকে
বোকা, হাবা ও অবুঝদের
দলে মিশে গিয়ে আমরা
জ্ঞানী বুদ্ধের
বাণীর বদলে বন্দুক
নিয়েছি নির্দ্বিধায়
– ভুলি নাই
ক্রন্দন আর কলেস্নাল-ভরা
এলো স্বাধীনতা, শামিত্ম
এলো যুদ্ধশেষের ক্লামিত্ম
তখন তোমাকে
বলিনি কি ‘‘অপ্সরা
‘‘সম্বল শুধু
‘‘তোমার মুখের কামিত্ম
কিন্তু তবুও দাওনি ত তুমি ধরা
– ভুলি নাই
যদি মুখ খুলি
আমি মুখ খুললে কী বলবো বলুন,
যদি আমাকে কিছু বলতেই হয়,
তাহলে কী ব’লবো – ঐ দেখুন
রুপালি অলংকার পরা নিগ্রো রমণীর মতো
রাত্রির শরীর জ্বলছে
কিংবা যদি বলি : কিন্নরকণ্ঠ নদীগুলো
আজো গান গাইছে – কেউ শুনবে না
এইসব কাব্যিক কথা।
যদি মুখ খুলতেই হয়
আমি ব’লবো : আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা
ক্রমশ কমে যাচ্ছে, উত্তর বাংলায়
শীতের পোশাক যাওয়া দরকার;
আমেরিকা না বেজিং – সাহায্যের হাত
প্রসারিত হবে কার দিকে? এ ব্যাপারে
সুশীল সমাজ আজ কী মনে করেন?
কার কণ্ঠে তুলে দেবো
কবিতার এই মণিহার?
আমি জানি গুপ্তঘাতকেরা
ছড়িয়ে রয়েছে আমার শহরে।
তাদের নিধন চেয়ে
কবিতাকে অস্ত্রের মতো
ব্যবহার করতে চেয়েছি আমি বহুবার।
কিন্তু কবিতা কেবল
ঘুরে বেড়ায় যেখানে রাঙা বল নিয়ে
বিকেলে খেলার মাঠে ছেলেরা জটলা পাকায়
অথবা মুখ গুঁজে পড়ে থাকে
মহিলাদের চুলের অন্ধকারে।
অপেক্ষা করছি
সেই সাত-সকালে তুমি বেরিয়েছো,
এখনও ফেরার নাম নেই।
টেলিফোন করছি এমনভাবে
যাতে বৃষ্টিধারার মতো নম্বরগুলো বেজে ওঠে,
যাতে তোমার মনে হয়
কে যেন গাইছে গীতবিতানের গানগুলো,
কিন্তু তবুও তোমার কোনো উত্তর নেই।
তিনটে এসএমএস করলাম,
দয়া করে উত্তর দাও।
তুমি যখন বাইরে যাও
ভয়ে আমি (কবির ভাষায়) কাঁপতে থাকি,
আর যখন ফিরে আসো
মনে হয় আমি সেই লোক যে-একদা
চন্দ্রপৃষ্ঠে হেঁটেছিল।
দ্যাখো, ভয় আমি পাই
কেননা ইতিহাসের অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে
আজ আমি জ্বরাগ্রস্ত –
বন্দি একটি বিদেশি বারান্দায়।
হ্যাঁ, বিচ্ছেদ তা যতো ক্ষণকালীনই হোক
তাকে আমি ভয় পাই।
সব বিচ্ছেদের মধ্যেই রয়েছে মৃত্যুর স্বাদ।
শামত্ম বিকেলে
দেবতার মতো দেবদারু গাছ
আজ আর কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করে না;
সোনালি সূর্যাস্তকে
আহবান জানায় না কোনো ঊর্ধ্বযানী সন্ধ্যার আজান;
সংহারের কালী-মূর্তির মতো রাত্রি নামে
পৃথিবীব্যাপী।
সকাল সাতটায় তুমি বেরিয়ে গেছো,
এখন বিকেল পাঁচটা। তবে কি আমাদের আর
দেখা হবে না কোনোদিন?
ইরাক জ্বলছে। আফগানিসত্মানের পাহাড়ে-পাহাড়ে
হমত্মারকদের সাব-মেশিনগান
গর্জন করছে বারবার। আত্মহত্যাকামী
ব্রেনওয়াশ্ড্ বালকেরা ঊরুতে গ্রেনেড বেঁধে
ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের শহরে।
ঘন ঘন সাইরেন বাজিয়ে ছুটছে
পুলিশের হলুদ গাড়ি।
টুইন টাওয়ারে যেদিন বিমান আক্রমণ হ’লো
সেদিন তুমি নিউইয়র্কে।
আর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর সময়
আমি কলকাতায়। প্রায় আজীবন
বিচ্ছেদ ভাবাতুর আমি।
বেরিয়েছো সেই সাত-সকালে
এখনও ফেরার নাম নেই।
মৃত্যুর আগে প্রত্যেকেরই প্রাপ্য
একটি শেষ চুম্বন – আমি কী তাও পাবো না!
মানুষ, নতুন শতকে
আজ আবার উদ্যত ছুরি মানুষের হাতে,
ওর পায়ের নিচে
পিষ্ট হচ্ছে নারী,
শিশুরা নিহত হচ্ছে চতুর্দিকে!
কবি, তোমার বর্মগুলো বের করে নাও।
তোমার কবিতাই শ্রেষ্ঠ বর্ম আজ!
মধ্যযুগের অন্ধকার ছিঁড়ে
আবার উদ্যত ছুরি
মানুষের হাতে।
আমাদের চেনা নগরগুলো থেকে
উঠছে ক্রন্দনধ্বনি
কবি, ওকে প্রতিহত করো।
কবি তুমি জানো আমাদের প্রিয় কবিতার
অমর পঙ্ক্তিগুলো
হত্যার বিরুদ্ধে চিরকাল – চিরকাল…
কবি, ওকে প্রতিহত করো \
এখন সেই সময়
যাকে অসময় বলতে পারো, দুঃসময় বলতে পারো
দোয়েলের গান কেউ পছন্দ ক’রছে না
কোয়েলের গান কেউ পছন্দ ক’রছে না
পৃথিবীব্যাপী এখন শুধু
পাতা ঝরার শীতার্ত গান ছাড়া
অন্য কোনো ধ্বনি নেই
ওক গাছ কিংবা পাইন গাছ
শিমুল অথবা কৃষ্ণচূড়া
শীতের আক্রমণ থেকে নিসত্মার নেই কারুর
শুধু আর্তনাদ ঝরা-পাতার
আমাদের লাল, নীল, সবুজ পাতাগুলো,
আমাদের প্রিয় পাতাগুলো ঝ’রে পড়ছে,
স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিকদের মতো ঝ’রে পড়ছে,
শুধু পাতা ঝ’রার আর্তনাদ
শুধু পাতা ঝরার শোকার্ত চিৎকার চতুর্দিকে।
অথচ সমস্ত পৃথিবীর ঝরা-পাতাদের চিৎকারকে ছাপিয়ে
ভূকম্পনে বিধ্বস্ত গ্রামের মন্দিরে
ঘণ্টাধ্বনির মতো,
জলোচ্ছ্বাসের পরের প্রথম ভোরের
আজানের মতো,
কবি তার উত্থানের গানটি গাইবে
অসময় বলো, দুঃসময় বলো,
গান থামবে না।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গল্প
সেদিন দুপুরবেলা
অন্যমনে ছিলাম ব’সে মন্দির-চত্বরে
আমার কৈশোরের এক
ছায়াচ্ছন্ন দিনে।
এয়ারগানের ছর্রাবেঁধা নিহত কাকের কলকাতাকে
স্মৃতির একটি গুচ্ছে
মিলিয়ে নিয়ে,
সংহত ক’রে,
বসেছিলাম আমরা তিনজন (আমি,
জাহাঙ্গীর আর সুকুমার)।
আবাল্য অবাধ্য কথক আমি নতুন
বন্ধুদের শোনাচ্ছিলাম কলকাতার ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে
ঘুরে ঘুরে আমার (জন্মদিনে পাওয়া)
এয়ারগান কত-না চড়ুই আর কাকাতুয়া নির্দ্বিধায়
শিকার করেছে।
আর সূর্যটাকে সেদিন
মনে হয়েছিল একটা লাল বিশাল ললিপপ্ (নিউ-
মার্কেট থেকে কেনা) – আমার মুখে এই
উক্তিটা শুনে জাহাঙ্গীর উঠলো ব’লে ‘আর
গুল-তাপ্পি মারিস না-তো’ আর আমি যেই বলতে গেছি
‘ঠিক্ বলেছিস্!’ অমনি চোখজোড়াটা
আটকে গ্যালো বটগাছের নিচে,
দেখি, একটা মরা শালিক
টেলিভিশনের অ্যান্টেনার মতো
শূন্যে দু’পা তুলে
নিশ্চিন্তে রয়েছে প’ড়ে।
আর লাইন দিয়ে সারিসারি লাল পিঁপড়ে
শালিকটার চোখের মণি খুঁটেখুঁটে খাচ্ছে!
কোথাও কোনো বেদনার চিহ্ন নেই,
না-নৃত্যরত গাছের পাতায়, না-গগনম-লের অসীম
নীলিমায়
এ-ভাবেই আমার বিশ্বাসগুলো
পাখির চোখের মতো খুঁটেখুঁটে
খেয়ে ফেলেছে দুপুর-বেলার সেই লাল পিঁপড়েগুলো।
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর –
ব্যক্তিগত গ্রাম থেকে অনাত্মীয় শহরে
পুকুরের যৌথ স্নান থেকে নিঃসঙ্গ বাথরুমে
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয়
কাম্য নয়
কাম্য নয় আর –
জুঁই, চামেলি, চন্দ্রমলিস্নøকা কিংবা কাঠগোলাপ থেকে
টিউলিপ ম্যাগনোলিয়া অথবা ক্রিসেনথিমাম
নিজস্ব শহর থেকে অচেনা ফুটপাতে
এশিয়ার আকাশে ময়ূর নীল থেকে
কুয়াশাচ্ছন্ন প্রতীচ্য
না, কোনো নির্বাসনই
কাম্য নয়
আর।
কাম্য নয় আপন ভদ্রাসন থেকে ভাড়াটে ফ্লাটে
এই শব্দহীন শোল মাছের ঝোল থেকে
স্বাদমুক্ত চিকেন স্যুপ
আর ডিনার রোলে এ নির্বাসন
না, কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর।
পোকা-মাকড়ের গুঞ্জনে ভরা
তলোয়ারের মতন দীপ্তিমান বৈশাখ থেকে
শিকারি কুকুরের মতো শীত হাওয়ার চিৎকারে
এই যে নির্বাসন – কাম্য নয় তা।
নিজস্ব মহিলার আলিঙ্গন থেকে
হননমত্ত জনতার ব্যুহে
এই যে নির্বাসন – কাম্য নয় আর।
প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্যে
অন্য এক উল্লাস-মত্ত পতাকার নিচে
এই যে নতজানু নির্বাসন – কাম্য নয় আর
প্রেম থেকে অপ্রেমে,
ধর্ম থেকে ধর্মান্ধতায়
প্রগতি থেকে প্রতিক্রিয়ার মধ্যযুগীয় আবর্তে,
চুম্বন থেকে চুম্বনহীনতায়
জীবনের ওপারে কোনো অমত্মহীন কফিনে
এই যে নির্বাসন
আমার কাম্য নয় আর
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর।
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়,
কিন্তু যদি তুমি অপলক তাকিয়ে থাকো এই শব্দমালার দিকে,
তুমি দেখতে পাবে এই কবিতার ভেতর ফল্গুধারার মত বয়ে
চলেছে
শ্রাবণের রাঙা জল – একে তুমি একুশের কবিতা বলতে পারো।
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়,
কিন্তু যারা প্রেমিক তাদের চোখে ঠিক ধরা পড়বে –
এই কবিতার উপর আষাঢ়ের ঘনমেঘের এবং শাড়ি পরা বাংলার
মায়েদের
দীর্ঘ ছায়া পড়ে আছে;
এই কবিতার গভীরে এখনও ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’,
এখনও বিরতিহীনভাবে বয়ে চলেছে বাংলার বর্ষণমুখর রাত্রির
কালো হাওয়া
এ কবিতা একুশেরই কবিতা।
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়।
কিন্তু বৈশাখের খররৌদ্রে সোনালি খড়বাহী গাড়ির মতো
মন্থরভাবে এগিয়ে চলেছে এই কবিতা, এখন আমি জানি
একুশই হচ্ছে এই পঙ্ক্তিগুলোর জরায়ু – একে আমি একুশের
কবিতাই বলতে চাই!
আমার মনে আছে ১৯৫২-র শেস্নøvগান চঞ্চল একুশের অপরাহ্ণে
আমি দেখেছি পাখির পালকের মতো হালকা এক
ভিখিরি বালকের মৃত্যু এক অমোঘ থ্রি-নট-থ্রির গুলিতে।
তার কথা একুশের ইতিহাসে লেখাজোখা নেই;
এই কবিতাটিকে আমি সেই নিহত বালকের
শ্বেত কফিন ও স্মৃতির মিনার বলতে চাই,
এবং সেই অর্থেও একে আমি একুশের কবিতাই বলবো।
সেই এক সময় ছিল যখন বাংলা ভাষা থেকে নির্বাসনে পাঠানো
হয়েছিল
বাংলা ভাষাকেই। সরকারি উর্দিপরা বিদেশি সৈনিকের মতো ভারি
বুট পরে
সদর্পে কুচকাওয়াজ করে বেড়িয়েছে আমাদের অচেনা শব্দগুলো
অথচ আমার এ শব্দমালা বাংলা ছাড়া অন্য কিছু নয়,
আর সে অর্থেও একে আমি একুশের কবিতা বলতে চাই।
এই কবিতাটি সরাসরি একুশের কবিতা নয়।
কিন্তু যদি বরকত, রফিক, সালাম, জববারের অফুরান রক্তের
লালে
আমার স্বদেশ ডুবে না যেতো – এই কবিতাটি লেখা হতো না
কোনোদিন
অতএব এই কবিতাটিকে আমি একুশের কবিতাই বলতে চাই
দোহাই তোমাদের, তোমরা আপত্তি করো না।
পথে হলো দেরি
পথে পথে আর পান্থশালায়
হয়ে গেল বড় দেরি
কাঁধে নিয়ে সব মৃত হরিণের
দুয়ারে দুয়ারে স্বপ্ন করেছি ফেরি।
তোমার বাগানে মালাকার নেই
বাগানে ঝরছে চেরি
দরোজা জানালা বন্ধ সকলই
হয়েছে কি খুব দেরি?
তবু আজকে লণ্ঠন জ্বেলে
লিখব তোমার কথা
সে-সব কথা কি নিমেষে মেলাবে?
আমার বেলায় হবে নাকি অন্যথা?
শীতের পাহাড়ি তীব্র হিম বাতাস
ছিঁড়েছে আমার তাঁবু;
‘আপনি বড্ড দেরি করেছেন’
হেঁকে বলেস্নøন ইস্টিশনের বাবু।
পথে পথে আর পান্থশালায়
হয়ে গেল বড় দেরি,
কাঁধে নিয়ে আমি মৃত হরিণের শব
একা একা হাঁটি। তোমার বাগানে
সারা দিনরাত অঝোরে ঝরবে চেরি।
আপনারা জানেন
Philosophers have only interpreted the world in various ways; the point however is to change it – Marxs, Thesis on Feurbach
আপনারা জানেন
মহামতি পেস্নøটো কী বলেছেন…
দার্শনিক কান্ট কী বলেছেন…
হেগেল কী বলেছেন…
মহামতি বুদ্ধ কী বলেছেন…
দেকার্তে কিংবা
বের্গসঁ কী বলেছেন…
বার্ট্রান্ড রাসেল কী বলেছেন…
হোয়াইটহেড কী বলেছেন…
জীবনানন্দ দাশ কী বলেছেন…
বুদ্ধদেব বসু কিংবা বিষ্ণু দে কী বলেছেন…
কী বলেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ!
কী বলেছেন কবিকুলচূড়মণি মাইকেল!
আপনারা জানেন
ঈশ্বরের পুত্র যিশু কী বলেছেন…
ইউরিপিডিস কিংবা সফোক্লিস কী বলেছেন…
মিশেল ফুকো কী বলেছেন,
দেরিদ্দা কী বলেছেন
কী বলেছেন পিকাসো
কিংবা পল এলুয়ার!
এই গ্রহের মহাপুরুষরা কে কী বলেছেন
আপনারা সবই জানেন। এখানে বক্তৃতা আমার উদ্দেশ্য
নয়। আমি এক নগণ্য মানুষ, আমি
শুধু বলি : জলে প’ড়ে যাওয়া ঐ পিঁপড়েটাকে ডাঙায় তুলে দিন
বিপস্নøব
মনজুর এলাহীর বাগানে,
ছায়াচ্ছন্ন সন্ধ্যায়, বসেছিলাম আমরা
কয়েকজন। কথা হ’লো, অনেক ধরনের
কথা হ’লো। কেউ বললেন বঙ্গবন্ধুর কথা,
সেই প্রসঙ্গে নিহত এ্যালেন্দে এবং
চিলিতে সামরিক উত্থানের ইতিহাসও
উলেস্নøখ করলেন কেউ কেউ। বলা বাহুল্য
ইরাক ইরানের কথাও উঠলো। ক্যাস্ট্রোর পর
কিউবার অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ,
বিশ্বব্যাপী অসৎ বণিকদের দাপট,
এবং বাংলার বিপন্ন মানুষ
নিরন্ন আজীবন – এইসব কথা বলাবলি
করলাম আমরা কাজু বাদাম আর
কফি খেতে খেতে। ক্রমশ রাত্রি নেমে এলো
কালো বেড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে।
টেবিল চেয়ারগুলো ঘিরে জোনাকিরা
জ্বলতে লাগলো – যেন চিরটাকাল এরকম
জ্বলতে থাকবে তারা। আমরা উঠে গেলাম
ডিনার টেবিলে।
মনজুর এলাহী আবার বললেন : বন্দুকের নলই
শক্তির উৎস! রক্তপাত ছাড়া শ্রেণিসাম্য প্রতিষ্ঠা
অসম্ভব, অনায়াসে কেউ শ্রেণিস্বার্থ ছেড়ে দেয় না।
আমি জানালা থেকে দেখলাম
মনজুর এলাহীর গোটা বাগান
জোনাকিরা দখল করে নিয়েছে –
বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে।
হমত্মারকদের প্রতি
বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়,
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়
না, কোনো উপমায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না
তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম
বুট, সৈনিকের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিলো,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা মানুষের মতো
দেখতে, এবং ওরা মানুষই
ওরা বাংলা মানুষ
এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনোদিন।
বিব্রত সংলাপ
তুমি বারবার নতুন কিছু শুনতে চাইলে
বোল্লে : ‘আমাকে নতুন কিছু শোনাও’
আমি বোলস্নাম : ‘অমাবস্যার পুঞ্জপুঞ্জ অন্ধকার
একদল কালো মুখোশ-পরা
ডাকাতের মতো
শিকার করতে চাইছে শাদা খরগোশের মতো কম্পমান
চাঁদটাকে’
তুমি বোলেস্ন : ‘এর কোনো অর্থ নেই!’
আমি আবার বোলস্নাম : ‘তুমি কী শোনোনি
তিনটে মাছের আক্রমণে নিহত মাছরাঙা প’ড়ে আছে নদীর
ওপারে’
তোমার চোখের তারা
অবিশ্বাসে বারবার নেচে উঠলো : ‘এটা একটা
প্রকৃতি-বিরুদ্ধ ঘটনা, হতেই পারে না’
আমি এবার একটু উঁচু গলায় : ‘বিশ্বাস করো অরণ্যের অব্যাহত
আক্রমণে দারুণ সংকুচিত হয়ে পড়ছে
আমাদের শহরগুলো।’
মস্নান হেসে তুমি বোলেস্ন : ‘ব্যাপারটা বরং উলটো
মানুষের হমত্মারক হাতের কল্যাণে এ-দেশে
পুষ্পল ঋতু আর দেখাই যায় না’
আমি এবার রেগে উঠলাম : ‘তুমি জানো
সমুদ্র প্রত্যাখ্যান করেছে আমাদের নদীগুলোকে,
তারা ফিরে আসছে তাতার দস্যুর তরঙ্গের মতো
আমাদের গ্রাম ও শহরের দিকে।’
হেলায়-ফেলায় তুমি বোলেস্ন : ‘অমন অলক্ষুণে কথা
শুনতেও নেই।’
আমি আবার বোলস্নাম : ‘ঐ দ্যাখো হরিণশাবকের তাড়া খেয়ে
দিশেহারা ডোরাকাটা বাঘগুলো
দিগ্বিদিক
পালাচ্ছে ছুটে।’
তুমি মস্নান হেসে বোলেস্ন : ‘এমন সুদিন কখনো কি আসবে?’
বস্টন ১৯৯০
সেই সময়
শ্রাবণ তোমার
শরীরে লিখেছে গল্প
– তার স্বাদ ভুলি নাই
শত্রম্নসেনার সতর্ক চোখ এড়িয়ে
তুমি এসেছিলে
তিনটে রাসত্মা পেরিয়ে
বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে
– ভুলি নাই
সময়টা ছিল যুদ্ধের
কারফিউ চতুর্দিকে
বোকা, হাবা ও অবুঝদের
দলে মিশে গিয়ে আমরা
জ্ঞানী বুদ্ধের
বাণীর বদলে বন্দুক
নিয়েছি নির্দ্বিধায়
– ভুলি নাই
ক্রন্দন আর কলেস্নাল-ভরা
এলো স্বাধীনতা, শামিত্ম
এলো যুদ্ধশেষের ক্লামিত্ম
তখন তোমাকে
বলিনি কি ‘‘অপ্সরা
‘‘সম্বল শুধু
‘‘তোমার মুখের কামিত্ম
কিন্তু তবুও দাওনি ত তুমি ধরা
– ভুলি নাই
যদি মুখ খুলি
আমি মুখ খুললে কী বলবো বলুন,
যদি আমাকে কিছু বলতেই হয়,
তাহলে কী ব’লবো – ঐ দেখুন
রুপালি অলংকার পরা নিগ্রো রমণীর মতো
রাত্রির শরীর জ্বলছে
কিংবা যদি বলি : কিন্নরকণ্ঠ নদীগুলো
আজো গান গাইছে – কেউ শুনবে না
এইসব কাব্যিক কথা।
যদি মুখ খুলতেই হয়
আমি ব’লবো : আমাদের নদীগুলোর নাব্যতা
ক্রমশ কমে যাচ্ছে, উত্তর বাংলায়
শীতের পোশাক যাওয়া দরকার;
আমেরিকা না বেজিং – সাহায্যের হাত
প্রসারিত হবে কার দিকে? এ ব্যাপারে
সুশীল সমাজ আজ কী মনে করেন?
কার কণ্ঠে তুলে দেবো
কবিতার এই মণিহার?
আমি জানি গুপ্তঘাতকেরা
ছড়িয়ে রয়েছে আমার শহরে।
তাদের নিধন চেয়ে
কবিতাকে অস্ত্রের মতো
ব্যবহার করতে চেয়েছি আমি বহুবার।
কিন্তু কবিতা কেবল
ঘুরে বেড়ায় যেখানে রাঙা বল নিয়ে
বিকেলে খেলার মাঠে ছেলেরা জটলা পাকায়
অথবা মুখ গুঁজে পড়ে থাকে
মহিলাদের চুলের অন্ধকারে।
অপেক্ষা করছি
সেই সাত-সকালে তুমি বেরিয়েছো,
এখনও ফেরার নাম নেই।
টেলিফোন করছি এমনভাবে
যাতে বৃষ্টিধারার মতো নম্বরগুলো বেজে ওঠে,
যাতে তোমার মনে হয়
কে যেন গাইছে গীতবিতানের গানগুলো,
কিন্তু তবুও তোমার কোনো উত্তর নেই।
তিনটে এসএমএস করলাম,
দয়া করে উত্তর দাও।
তুমি যখন বাইরে যাও
ভয়ে আমি (কবির ভাষায়) কাঁপতে থাকি,
আর যখন ফিরে আসো
মনে হয় আমি সেই লোক যে-একদা
চন্দ্রপৃষ্ঠে হেঁটেছিল।
দ্যাখো, ভয় আমি পাই
কেননা ইতিহাসের অন্ধকারে হাঁটতে হাঁটতে
আজ আমি জ্বরাগ্রস্ত –
বন্দি একটি বিদেশি বারান্দায়।
হ্যাঁ, বিচ্ছেদ তা যতো ক্ষণকালীনই হোক
তাকে আমি ভয় পাই।
সব বিচ্ছেদের মধ্যেই রয়েছে মৃত্যুর স্বাদ।
শামত্ম বিকেলে
দেবতার মতো দেবদারু গাছ
আজ আর কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করে না;
সোনালি সূর্যাস্তকে
আহবান জানায় না কোনো ঊর্ধ্বযানী সন্ধ্যার আজান;
সংহারের কালী-মূর্তির মতো রাত্রি নামে
পৃথিবীব্যাপী।
সকাল সাতটায় তুমি বেরিয়ে গেছো,
এখন বিকেল পাঁচটা। তবে কি আমাদের আর
দেখা হবে না কোনোদিন?
ইরাক জ্বলছে। আফগানিসত্মানের পাহাড়ে-পাহাড়ে
হমত্মারকদের সাব-মেশিনগান
গর্জন করছে বারবার। আত্মহত্যাকামী
ব্রেনওয়াশ্ড্ বালকেরা ঊরুতে গ্রেনেড বেঁধে
ঘুরে বেড়াচ্ছে আমাদের শহরে।
ঘন ঘন সাইরেন বাজিয়ে ছুটছে
পুলিশের হলুদ গাড়ি।
টুইন টাওয়ারে যেদিন বিমান আক্রমণ হ’লো
সেদিন তুমি নিউইয়র্কে।
আর গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর সময়
আমি কলকাতায়। প্রায় আজীবন
বিচ্ছেদ ভাবাতুর আমি।
বেরিয়েছো সেই সাত-সকালে
এখনও ফেরার নাম নেই।
মৃত্যুর আগে প্রত্যেকেরই প্রাপ্য
একটি শেষ চুম্বন – আমি কী তাও পাবো না!
মানুষ, নতুন শতকে
আজ আবার উদ্যত ছুরি মানুষের হাতে,
ওর পায়ের নিচে
পিষ্ট হচ্ছে নারী,
শিশুরা নিহত হচ্ছে চতুর্দিকে!
কবি, তোমার বর্মগুলো বের করে নাও।
তোমার কবিতাই শ্রেষ্ঠ বর্ম আজ!
মধ্যযুগের অন্ধকার ছিঁড়ে
আবার উদ্যত ছুরি
মানুষের হাতে।
আমাদের চেনা নগরগুলো থেকে
উঠছে ক্রন্দনধ্বনি
কবি, ওকে প্রতিহত করো।
কবি তুমি জানো আমাদের প্রিয় কবিতার
অমর পঙ্ক্তিগুলো
হত্যার বিরুদ্ধে চিরকাল – চিরকাল…
কবি, ওকে প্রতিহত করো \
এখন সেই সময়
যাকে অসময় বলতে পারো, দুঃসময় বলতে পারো
দোয়েলের গান কেউ পছন্দ ক’রছে না
কোয়েলের গান কেউ পছন্দ ক’রছে না
পৃথিবীব্যাপী এখন শুধু
পাতা ঝরার শীতার্ত গান ছাড়া
অন্য কোনো ধ্বনি নেই
ওক গাছ কিংবা পাইন গাছ
শিমুল অথবা কৃষ্ণচূড়া
শীতের আক্রমণ থেকে নিসত্মার নেই কারুর
শুধু আর্তনাদ ঝরা-পাতার
আমাদের লাল, নীল, সবুজ পাতাগুলো,
আমাদের প্রিয় পাতাগুলো ঝ’রে পড়ছে,
স্বাধীনতা যুদ্ধের সৈনিকদের মতো ঝ’রে পড়ছে,
শুধু পাতা ঝ’রার আর্তনাদ
শুধু পাতা ঝরার শোকার্ত চিৎকার চতুর্দিকে।
অথচ সমস্ত পৃথিবীর ঝরা-পাতাদের চিৎকারকে ছাপিয়ে
ভূকম্পনে বিধ্বস্ত গ্রামের মন্দিরে
ঘণ্টাধ্বনির মতো,
জলোচ্ছ্বাসের পরের প্রথম ভোরের
আজানের মতো,
কবি তার উত্থানের গানটি গাইবে
অসময় বলো, দুঃসময় বলো,
গান থামবে না।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের গল্প
সেদিন দুপুরবেলা
অন্যমনে ছিলাম ব’সে মন্দির-চত্বরে
আমার কৈশোরের এক
ছায়াচ্ছন্ন দিনে।
এয়ারগানের ছর্রাবেঁধা নিহত কাকের কলকাতাকে
স্মৃতির একটি গুচ্ছে
মিলিয়ে নিয়ে,
সংহত ক’রে,
বসেছিলাম আমরা তিনজন (আমি,
জাহাঙ্গীর আর সুকুমার)।
আবাল্য অবাধ্য কথক আমি নতুন
বন্ধুদের শোনাচ্ছিলাম কলকাতার ফুটপাথ থেকে ফুটপাথে
ঘুরে ঘুরে আমার (জন্মদিনে পাওয়া)
এয়ারগান কত-না চড়ুই আর কাকাতুয়া নির্দ্বিধায়
শিকার করেছে।
আর সূর্যটাকে সেদিন
মনে হয়েছিল একটা লাল বিশাল ললিপপ্ (নিউ-
মার্কেট থেকে কেনা) – আমার মুখে এই
উক্তিটা শুনে জাহাঙ্গীর উঠলো ব’লে ‘আর
গুল-তাপ্পি মারিস না-তো’ আর আমি যেই বলতে গেছি
‘ঠিক্ বলেছিস্!’ অমনি চোখজোড়াটা
আটকে গ্যালো বটগাছের নিচে,
দেখি, একটা মরা শালিক
টেলিভিশনের অ্যান্টেনার মতো
শূন্যে দু’পা তুলে
নিশ্চিন্তে রয়েছে প’ড়ে।
আর লাইন দিয়ে সারিসারি লাল পিঁপড়ে
শালিকটার চোখের মণি খুঁটেখুঁটে খাচ্ছে!
কোথাও কোনো বেদনার চিহ্ন নেই,
না-নৃত্যরত গাছের পাতায়, না-গগনম-লের অসীম
নীলিমায়
এ-ভাবেই আমার বিশ্বাসগুলো
পাখির চোখের মতো খুঁটেখুঁটে
খেয়ে ফেলেছে দুপুর-বেলার সেই লাল পিঁপড়েগুলো।
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর –
ব্যক্তিগত গ্রাম থেকে অনাত্মীয় শহরে
পুকুরের যৌথ স্নান থেকে নিঃসঙ্গ বাথরুমে
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয়
কাম্য নয়
কাম্য নয় আর –
জুঁই, চামেলি, চন্দ্রমলিস্নøকা কিংবা কাঠগোলাপ থেকে
টিউলিপ ম্যাগনোলিয়া অথবা ক্রিসেনথিমাম
নিজস্ব শহর থেকে অচেনা ফুটপাতে
এশিয়ার আকাশে ময়ূর নীল থেকে
কুয়াশাচ্ছন্ন প্রতীচ্য
না, কোনো নির্বাসনই
কাম্য নয়
আর।
কাম্য নয় আপন ভদ্রাসন থেকে ভাড়াটে ফ্লাটে
এই শব্দহীন শোল মাছের ঝোল থেকে
স্বাদমুক্ত চিকেন স্যুপ
আর ডিনার রোলে এ নির্বাসন
না, কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর।
পোকা-মাকড়ের গুঞ্জনে ভরা
তলোয়ারের মতন দীপ্তিমান বৈশাখ থেকে
শিকারি কুকুরের মতো শীত হাওয়ার চিৎকারে
এই যে নির্বাসন – কাম্য নয় তা।
নিজস্ব মহিলার আলিঙ্গন থেকে
হননমত্ত জনতার ব্যুহে
এই যে নির্বাসন – কাম্য নয় আর।
প্রাচ্য থেকে প্রতীচ্যে
অন্য এক উল্লাস-মত্ত পতাকার নিচে
এই যে নতজানু নির্বাসন – কাম্য নয় আর
প্রেম থেকে অপ্রেমে,
ধর্ম থেকে ধর্মান্ধতায়
প্রগতি থেকে প্রতিক্রিয়ার মধ্যযুগীয় আবর্তে,
চুম্বন থেকে চুম্বনহীনতায়
জীবনের ওপারে কোনো অমত্মহীন কফিনে
এই যে নির্বাসন
আমার কাম্য নয় আর
কোনো নির্বাসনই কাম্য নয় আর।
Saturday, March 3, 2018
রক্তে স্নাত সিরিয়া by হামিদ সরকার

রক্তে ভেজা সিরিয়ার মাটি
বাতাসে বারুদের গন্ধ,
কোথায় আজ বিশ্বমোড়ল
সত্যিই তারা অন্ধ।
মুসলিম নামের মূখোশধারী
প্রকাশিত জালিম রূপ,
আরাকানের পরেই এখন
সিরিয়া আজ মৃত্যুকূপ।
নারী-পুরুষ, অবুঝ শিশুর
রক্তে স্নাত সিরিয়া,
ওআইসি আর জাতিসংঘ
দিচ্ছে মদদ রাশিয়া।
বারুদের মতো উঠবে জ্বলে
এমন তরুনের খুব অভাব,
ক্ষমতা দিয়ে দাবিয়ে রাখাই
জালিম শাসকের নিত্য স্বভাব।
সিরিয়ার ওই নারী-শিশু
করছে শুধু ফরিয়াদ,
তোমার রহম চাইছি খোদা
ধ্বংস কর শাসকহাত।
বাতাসে বারুদের গন্ধ,
কোথায় আজ বিশ্বমোড়ল
সত্যিই তারা অন্ধ।
মুসলিম নামের মূখোশধারী
প্রকাশিত জালিম রূপ,
আরাকানের পরেই এখন
সিরিয়া আজ মৃত্যুকূপ।
নারী-পুরুষ, অবুঝ শিশুর
রক্তে স্নাত সিরিয়া,
ওআইসি আর জাতিসংঘ
দিচ্ছে মদদ রাশিয়া।
বারুদের মতো উঠবে জ্বলে
এমন তরুনের খুব অভাব,
ক্ষমতা দিয়ে দাবিয়ে রাখাই
জালিম শাসকের নিত্য স্বভাব।
সিরিয়ার ওই নারী-শিশু
করছে শুধু ফরিয়াদ,
তোমার রহম চাইছি খোদা
ধ্বংস কর শাসকহাত।
Thursday, February 12, 2015
মায়া-হরিণ by নির্মলেন্দু গুণ
![]() |
| নির্মলেন্দু গুণ |
কাল তো প্রায় তোমার প্রেমে
পড়েই গিয়েছিলাম।
অজানা এক নেশায় পাগল
রাত ছিল কাল রাতে।
পড়েই গিয়েছিলাম বলি কেন?
পড়ে গিয়েছিলাম বলাই শ্রেয়।
তোমার প্রেমে পড়েছিলাম যে,
বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই তাতে।
সদ্যকাটা চাকের মধুর মতো
কাল সেই মদিরঘন রাত,
শ্যালা নদীর তীরবর্তী বনে
কেঁপেছিল বাঘিনী-গর্জনে।
বৃদ্ধ হলেও বাঘ তো আমি বটে,
বাস্তবে না হলেও তোমার ডাকে
মনে-মনে দিয়েছিলাম সাড়া।
মায়া-হরিণ জড়াতে যাবো যেই,
দেখি তোমার আমার মাঝখানে
বন বাওয়ালী যমের মত খাড়া।
------------------------
অজানা এক নেশায় পাগল
রাত ছিল কাল রাতে।
পড়েই গিয়েছিলাম বলি কেন?
পড়ে গিয়েছিলাম বলাই শ্রেয়।
তোমার প্রেমে পড়েছিলাম যে,
বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই তাতে।
সদ্যকাটা চাকের মধুর মতো
কাল সেই মদিরঘন রাত,
শ্যালা নদীর তীরবর্তী বনে
কেঁপেছিল বাঘিনী-গর্জনে।
বৃদ্ধ হলেও বাঘ তো আমি বটে,
বাস্তবে না হলেও তোমার ডাকে
মনে-মনে দিয়েছিলাম সাড়া।
মায়া-হরিণ জড়াতে যাবো যেই,
দেখি তোমার আমার মাঝখানে
বন বাওয়ালী যমের মত খাড়া।
------------------------
নির্মলেন্দু গুণ
০৫.০১.২০১৫
০৫.০১.২০১৫
=====================================
প্রেমে পড়ার খবর -নয়া দিগন্ত
কিশোরীকে বিয়ের দাবীতে বৃদ্ধের অনশন
বালিয়াকান্দি (রাজবাড়ী) সংবাদদাতা
প্রবাদ
আছে প্রেম মানে না, জাতি,বর্ণ, ধর্ম ও বয়স। বিয়ের দাবীতে প্রেমিকারা
প্রেমিকের বাড়ীতে অনশনের ঘটনা ঘটলেও এবার তার উল্টো ঘটনা ঘটেছে। এবার ৬০
বছর বয়সী এক বৃদ্ধ ১৩ বছর বয়সী প্রেমিকার বাড়ীতে বিয়ের দাবীতে দুইদিন ধরে
অনশন করছে। ঘটনাটি ঘটেছে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার নবাবপুর ইউনিয়নের
বনগ্রামে। ওই বৃদ্ধের নাম আলাউদ্দিন শেখ (৬০)। তার ৪ মেয়ে ১ ছেলে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বনগ্রামের ওই বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, আলাউদ্দিন শেখ তার ১৩বছর বয়সী প্রেমিকার বাড়ীতে বিয়ের দাবীতে অবস্থান করছে। খবর শুনে আশপাশের এলাকার লোকজন ভীড় জমিয়েছে। এলাকায় নানা ধরনের গুঞ্জন ও রম্য কথা বার্তা শোনা যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, অনশনের খবর শুনে আমরা দেখতে এসেছি। তবে এনিয়ে কেউ গ্রাম্য শালিসের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এতে এলাকার পরিবেশ ও সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।
ওই বাড়ীর মালিক জানান, তার কন্যার বয়স ১৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে পাশের বাড়ীর আলাউদ্দিন শেখ নানা ভাবে উত্যক্ত করে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বুধবার থেকে বিয়ের দাবী নিয়ে আলাউদ্দিন শেখ বাড়ীতে উঠেছে।
১৩ বছর বয়সী ওই তরুনী জানায়, তার সাথে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক চলে আসছে। সে তাকেই বিয়ে করতে কোন আপত্তি নেই।
আলাউদ্দিন শেখ জানান, আমি তাকে ভালোবাসি, তাকেই বিয়ে করব। কেউ বাধা দিয়ে ঠেকাতে পারবে না। কারন আমরা দু’জনই বিয়েতে রাজি আছি।
আলাউদ্দিনের স্ত্রী জানান, বাধা দিয়েও ঠেকাতে পারছি না, দুইদিন ধরে ওই বাড়ীতে উঠেছে। এনিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে বনগ্রামের ওই বাড়ীতে গিয়ে দেখা যায়, আলাউদ্দিন শেখ তার ১৩বছর বয়সী প্রেমিকার বাড়ীতে বিয়ের দাবীতে অবস্থান করছে। খবর শুনে আশপাশের এলাকার লোকজন ভীড় জমিয়েছে। এলাকায় নানা ধরনের গুঞ্জন ও রম্য কথা বার্তা শোনা যাচ্ছে।
এলাকাবাসী জানান, অনশনের খবর শুনে আমরা দেখতে এসেছি। তবে এনিয়ে কেউ গ্রাম্য শালিসের উদ্যোগ নিচ্ছে না। এতে এলাকার পরিবেশ ও সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।
ওই বাড়ীর মালিক জানান, তার কন্যার বয়স ১৩ বছর। দীর্ঘদিন ধরে পাশের বাড়ীর আলাউদ্দিন শেখ নানা ভাবে উত্যক্ত করে আসছিল। বিষয়টি নিয়ে রাজবাড়ী আদালতে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বুধবার থেকে বিয়ের দাবী নিয়ে আলাউদ্দিন শেখ বাড়ীতে উঠেছে।
১৩ বছর বয়সী ওই তরুনী জানায়, তার সাথে দীর্ঘদিন ধরে সম্পর্ক চলে আসছে। সে তাকেই বিয়ে করতে কোন আপত্তি নেই।
আলাউদ্দিন শেখ জানান, আমি তাকে ভালোবাসি, তাকেই বিয়ে করব। কেউ বাধা দিয়ে ঠেকাতে পারবে না। কারন আমরা দু’জনই বিয়েতে রাজি আছি।
আলাউদ্দিনের স্ত্রী জানান, বাধা দিয়েও ঠেকাতে পারছি না, দুইদিন ধরে ওই বাড়ীতে উঠেছে। এনিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
![]() |
| আলাউদ্দিন শেখ (৬০) |
Friday, January 23, 2015
নির্জনতার মডার্নিটি
কবিতা ভাষা নির্মাণে নিজেকে নগ্ন করে, লাল
হলুদ সবুজবাতি জ্বালিয়ে অনেক ভেতরে, অনেক দূরপথে যাত্রা করে সে
সৃজন-উল্লাসে। তারিক সুজাতের কবিতায় এ হল স্বাভাবিক উৎরাইয়ের দূরযাত্রা।
চেতনের পথ ধরে অজানায় বয়ে যাওয়া, তবে পথের দুধারে চেনা-সব মুখ আর উপাদান,
চেনা প্রকৃতি ও বাস্তবতা। কখনও জাগতিক চৈতন্যের অনুপুঙ্খ যাপনের প্রাত্যহিক
ঘটনাই তার প্রধান উপজীব্য। সমকালীন রাজনৈতিক উপাদান কিংবা ভিন্ন চোখে
সময়কে দেখার মাধ্যমে কবিতার শরীর ও মন-নির্মাণে তার যে ভাষাদর্শন, তাও
ব্যক্তি তারিক সুজাতের নিজস্ব। ফলে সাবজেক্টিভ ও অবজেক্টিভের মধ্যে দিয়ে যে
কাব্য-সুরধারা, তা সরল বাক্যগঠন, শব্দচয়নের এক যুক্তিক্রম-পথের নির্দেশ
দেয়- যা তারিক সুজাতের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। কবিতার শৈলী,
দৃশ্যগত ও বোধগত আমাদের প্রায়শ আলোচ্য হয়, তার চেয়ে বেশি অন্তর্গত চেতনের
ইঙ্গিত কত দূর পাঠককে টেনে নিয়ে যায়।
এই প্রচল মূল্যায়নের বাইরে গিয়ে কাঠামোবাদি দৃষ্টির নিরিখে নয় কেবল, ডাইলেক উপস্থাপনের নিরিখেও তারিক সুজাত অ্যান্টিডাইলেক কিংবা পলিটিকেল হেজিমনি-অ্যান্টিহেজিমনির সমন্বয় সাধন করতে পেরেছেন। ক্ষয়িষ্ণু নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যাপনের টানাপোড়েন চমৎকারভাবে উপস্থিত তার কবিতায়।
আশির দশকের অগ্রজ কবি তারিক সুজাতের কাব্যপ্রতিমা পড়ুয়া-মনোবিদের পঠনে-মননে এমনই এক আশ্চর্য নবনির্মিতি তৈরি করে দেয়; অক্ষরের রেখায় রেখায় মডার্ন ফর্ম ও এক্সেপ্রেশনে ক্ল্যাসিকাল মানুষের আভিযাত্রিক সাহসকে উসকে দিয়ে, তার পর অব্যর্থ অন্বয়ে গড়া বৈশ্বিক-বিস্তারকে সুসহ-সুষমায় কিংবা চারু-নন্দময়তায় ভরিয়ে তোলে। প্রান্তরের সহজিয়া অভিপ্রায় সব নিস্পৃহ নিরক্তিম সাধুতায়, কখনও বা দৃপ্তবিপ্লবী রক্তিমতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। তিনি প্রজানীতি কিংবা রাষ্ট্রনীতির যথা সুন্দরের সিম্পনিটি মগ্নগহন কবিতাকলার আলতো ছোঁয়ায় এমন এক অনিন্দ্যসুরের তানপুরায় গেয়ে তোলেন যে, মৃদুকণ্ঠ নমনীয়তার আশ্লেষে সিদ্ধ সবচেয়ে বজ -উচ্চারণটিও তখন তার তুলিতে স্বতঃই মানিয়ে যায়। তার ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি এক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল উপমাই শুধু নয়, বিরলপ্রয়োগ সৌন্দর্যে এক মহা-উচ্চারী ইতিহাস হতে পারে।
পথের চোখেও আজ পথচলার ক্লান্তি/পথের পা স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না কোথাও/পথ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পথিকের পায়ে।/পথের মোড়ে রক্তচোখে সিগন্যালগুলো/রাগী গলায় বলছে : এদিকে এসো না/পথের পাশের যাত্রীছাউনিটিও/ সূর্যের দিকে মুখ তুলে ভাবছে :/ কোথাও শান্তির মতো শীতল ছায়া নেই।/একটি বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো/জেব্রাক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে তের কোটি মানুষ।/পথের মাঝখানে গোল আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে/ট্রাফিকের ভূমিকায় একঘেয়ে অভিনয় করে যাচ্ছে/প্রতিদ্বন্দ্বী ছায়া।/মত ও পথের পার্থক্য নিয়েও যে/যাত্রা হয়-/সেই কথাটি কেউ বলছে না/পথ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পথিকের পায়ে।
স্বপ্ন এবং সত্য। মত ও পথ। প্রকৃতি ও মানুষ। গতি ও গান। দুঃখ ও ক্লান্তি। নিন্দা ও ঘৃণা, স্মৃতি ও বিষাদ- এসব উপাচার ব্রহ্মারে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। কবি কিন্তু এগুলোকে বাজাতে চান জরাহীন এক ভাষাভঙ্গিমায়। নির্জন লাবণ্যে জ্বালাতে চান অন্তর্লোকের প্রদীপ শিখা। কবিতা তখন আর স্বয়ং কবির নাগালে থাকে না, ঐন্দ্রজালিক স্পর্শসত্যে কিংবা পাঠসত্যে সে অনায়াসে পৌঁছে যায় পড়–য়ার মর্মমূলে। তখন বাদ-বিবাদ কিংবা প্রতিবাদ ডিঙিয়ে সে কবিতা পেয়ে যায় এক অবিসংবাদিতের রূপ।
‘কবিতা’ কবিতাটি একবার পড়া যাক :
মৌন, হে ব্যবধান/নির্লিপ্ত দহনে তবু কী করে পোড়াও!/আলোতে উত্তীর্ণ মুখ, আলোকিত অমা;/ ঐ আলোর দিকে, ঐ উত্থিত অলৌকিক/ সিঁড়িটির দিকে হেঁটে যায়, কে সে?/কতটা পথের শেষ দিগন্তকে ছোঁয়/ কত ধাপ নামা হলে পতনের শুরু/পথিক জানে না তবু দ্বিধাহীন যায়!/ যে যায় সে যায়। পথ-সিঁড়ি চিনে/যাওয়াটাই মৌলিক;/ না হলে পরাস্ত হতে হয়, বিনাশে ফুরায় নীড়/অযথা ক্লান্তিতে পরিণামহীন হেঁটে/জীবন জয়ের নামে যৌবন খরচ।/মৌন, হে প্রজ্ঞাপারমিতা,/হে সুন্দর সর্বনাশ!/তুমুল তোমার দিকে মন্দ্র আলোড়ন/অনন্তের ঘরে অমরতা নিলয় নিখিল/মৌন, হে ব্যবধান!
বাঙালি জাতির অস্তিত্বের গৌরব ‘একাত্তর বা স্বাধীনতা’ যে মহান প্রাতিস্বিক-মানবের হাত দিয়ে এসেছে, আলোকস্তম্ভ তথা উচ্চমান মিনারের মতো যিনি এ জাতিকে অনন্তকাল ধরে আশা, সাহস ও প্রেরণা জুগিয়ে যাবেন, সেই চিরভাস্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা কি তিনি বিস্মৃত হতে পারেন? না, তিনি কখনোই জাতির এ মহান নায়ককে বিস্মৃত হতে পারেন না। স্মরণ-মাধুর্যে তাই তিনি প্রভাতের প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো অকপটে গেয়ে ওঠেন :
মুখর মিনার/যেন সে ভোরের পাখি/অমল আঘাতে/দ্রুত ছিঁড়ে গেলে ঘুম/পার হয়ে রাত/আঁধার অতনু তিথি/প্রিয়তম রোদ/প্রতীক আলোতে দেখা/ সে তো বাঙালির পিতা মুজিবেরই মুখ।
এভাবে মহামানব বঙ্গবন্ধু কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ী একাত্তরের চেতনাসঞ্জাত উচ্চারণ তার কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। যেমন ফিরে ফিরে আসে যাযাবরী শৈশবের সাহসিকতা কিংবা যুদ্ধপথের দগ্ধস্মৃতি। আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারি প্রেতাত্মারা বারবার ছোবল মেরে বিকৃত করার স্পর্ধা দেখায়, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তাক্ত স্মৃতিকে যারা নিমিষেই মুছে ফেলতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের এই দেশে এও কি সম্ভব? ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বারবার বেপথু হওয়াকে কবি তাই কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। তার মানবিক সত্তা প্রতিবাদের বহুবিধ প্রতীকে ফুঁসে ওঠে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করে :
আমার সময়কে আমি/উল্টো পায়ে হেঁটে যেতে দেখেছি!/ ভূতগ্রস্ত সময়ের পদচ্ছাপ অনুসরণ করে/জরাগ্রস্ত জাতি কখন পৌঁছে গেছে/গভীর খাদের কিনারায়/ জানলে না, তুমি জানলে না।/হে আমার তিরিশ-বয়সী যুবা/রক্তাক্ত স্বদেশ/ তোমাকে টেনেহিঁচড়ে মর্গের দিকে/নিয়ে যাচ্ছে কারা?...
...প্রিয় নেতৃবৃন্দ!/ ইতিহাসের কালো কফিনে / শেষ পেরেকটি ঠোকার আগে/ মুক্তবাতাসে আমাদের একটু / নিঃশ্বাস নিতে দিন
নিজেরই ভেঙে যাওয়ার শব্দে/ জেগে ওঠো বাংলাদেশ/ জাগো শেষবার
আততায়ী হন্তারক সময়ের প্রতিধ্বনি তুলে/আসে দুঃস্বপ্নের রাত/ বারবার...
কবিতা তো মানুষের আশ্রয়-নিদান। বিপুল এই মহাবিশ্বে মানুষ খুঁজে-ফেরে তার স্বস্তিকা-পুরাণ। মাটি ফুঁড়ে আকাশছোঁয়া বৃক্ষপাখালির মতো কবিতাও তাই পল্লবিত হয় কবির কল্পচেতনার রঙ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। এই রঙ কখনও গাঢ়, কখনও আর্দ্র, কখনও কোমল, কখনও রুদ্র, কখনও রুক্ষ, কখনও নিরস, কখনও বা তীক্ষè, সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত। স্বপ্নে-জাগরণে অতিচেতন মানুষের মন এভাবে উড়ে উড়ে যায়, দিগন্ত থেকে দিগন্তরেখায়... নীল আকাশের তারায় তারায়। কবি তারিক সুজাতের বর্ণিল কাব্যচ্ছটা এভাবে পাঠককে মুহূর্তেই পৌঁছে দেয় আবিলতাহীন এক স্বপ্নাদ্য জগতের চির-সবুজের প্রান্তরে। মাসুদ পথিক
এই প্রচল মূল্যায়নের বাইরে গিয়ে কাঠামোবাদি দৃষ্টির নিরিখে নয় কেবল, ডাইলেক উপস্থাপনের নিরিখেও তারিক সুজাত অ্যান্টিডাইলেক কিংবা পলিটিকেল হেজিমনি-অ্যান্টিহেজিমনির সমন্বয় সাধন করতে পেরেছেন। ক্ষয়িষ্ণু নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যাপনের টানাপোড়েন চমৎকারভাবে উপস্থিত তার কবিতায়।
আশির দশকের অগ্রজ কবি তারিক সুজাতের কাব্যপ্রতিমা পড়ুয়া-মনোবিদের পঠনে-মননে এমনই এক আশ্চর্য নবনির্মিতি তৈরি করে দেয়; অক্ষরের রেখায় রেখায় মডার্ন ফর্ম ও এক্সেপ্রেশনে ক্ল্যাসিকাল মানুষের আভিযাত্রিক সাহসকে উসকে দিয়ে, তার পর অব্যর্থ অন্বয়ে গড়া বৈশ্বিক-বিস্তারকে সুসহ-সুষমায় কিংবা চারু-নন্দময়তায় ভরিয়ে তোলে। প্রান্তরের সহজিয়া অভিপ্রায় সব নিস্পৃহ নিরক্তিম সাধুতায়, কখনও বা দৃপ্তবিপ্লবী রক্তিমতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। তিনি প্রজানীতি কিংবা রাষ্ট্রনীতির যথা সুন্দরের সিম্পনিটি মগ্নগহন কবিতাকলার আলতো ছোঁয়ায় এমন এক অনিন্দ্যসুরের তানপুরায় গেয়ে তোলেন যে, মৃদুকণ্ঠ নমনীয়তার আশ্লেষে সিদ্ধ সবচেয়ে বজ -উচ্চারণটিও তখন তার তুলিতে স্বতঃই মানিয়ে যায়। তার ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি এক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল উপমাই শুধু নয়, বিরলপ্রয়োগ সৌন্দর্যে এক মহা-উচ্চারী ইতিহাস হতে পারে।
পথের চোখেও আজ পথচলার ক্লান্তি/পথের পা স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না কোথাও/পথ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পথিকের পায়ে।/পথের মোড়ে রক্তচোখে সিগন্যালগুলো/রাগী গলায় বলছে : এদিকে এসো না/পথের পাশের যাত্রীছাউনিটিও/ সূর্যের দিকে মুখ তুলে ভাবছে :/ কোথাও শান্তির মতো শীতল ছায়া নেই।/একটি বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো/জেব্রাক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে তের কোটি মানুষ।/পথের মাঝখানে গোল আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে/ট্রাফিকের ভূমিকায় একঘেয়ে অভিনয় করে যাচ্ছে/প্রতিদ্বন্দ্বী ছায়া।/মত ও পথের পার্থক্য নিয়েও যে/যাত্রা হয়-/সেই কথাটি কেউ বলছে না/পথ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পথিকের পায়ে।
স্বপ্ন এবং সত্য। মত ও পথ। প্রকৃতি ও মানুষ। গতি ও গান। দুঃখ ও ক্লান্তি। নিন্দা ও ঘৃণা, স্মৃতি ও বিষাদ- এসব উপাচার ব্রহ্মারে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। কবি কিন্তু এগুলোকে বাজাতে চান জরাহীন এক ভাষাভঙ্গিমায়। নির্জন লাবণ্যে জ্বালাতে চান অন্তর্লোকের প্রদীপ শিখা। কবিতা তখন আর স্বয়ং কবির নাগালে থাকে না, ঐন্দ্রজালিক স্পর্শসত্যে কিংবা পাঠসত্যে সে অনায়াসে পৌঁছে যায় পড়–য়ার মর্মমূলে। তখন বাদ-বিবাদ কিংবা প্রতিবাদ ডিঙিয়ে সে কবিতা পেয়ে যায় এক অবিসংবাদিতের রূপ।
‘কবিতা’ কবিতাটি একবার পড়া যাক :
মৌন, হে ব্যবধান/নির্লিপ্ত দহনে তবু কী করে পোড়াও!/আলোতে উত্তীর্ণ মুখ, আলোকিত অমা;/ ঐ আলোর দিকে, ঐ উত্থিত অলৌকিক/ সিঁড়িটির দিকে হেঁটে যায়, কে সে?/কতটা পথের শেষ দিগন্তকে ছোঁয়/ কত ধাপ নামা হলে পতনের শুরু/পথিক জানে না তবু দ্বিধাহীন যায়!/ যে যায় সে যায়। পথ-সিঁড়ি চিনে/যাওয়াটাই মৌলিক;/ না হলে পরাস্ত হতে হয়, বিনাশে ফুরায় নীড়/অযথা ক্লান্তিতে পরিণামহীন হেঁটে/জীবন জয়ের নামে যৌবন খরচ।/মৌন, হে প্রজ্ঞাপারমিতা,/হে সুন্দর সর্বনাশ!/তুমুল তোমার দিকে মন্দ্র আলোড়ন/অনন্তের ঘরে অমরতা নিলয় নিখিল/মৌন, হে ব্যবধান!
বাঙালি জাতির অস্তিত্বের গৌরব ‘একাত্তর বা স্বাধীনতা’ যে মহান প্রাতিস্বিক-মানবের হাত দিয়ে এসেছে, আলোকস্তম্ভ তথা উচ্চমান মিনারের মতো যিনি এ জাতিকে অনন্তকাল ধরে আশা, সাহস ও প্রেরণা জুগিয়ে যাবেন, সেই চিরভাস্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা কি তিনি বিস্মৃত হতে পারেন? না, তিনি কখনোই জাতির এ মহান নায়ককে বিস্মৃত হতে পারেন না। স্মরণ-মাধুর্যে তাই তিনি প্রভাতের প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো অকপটে গেয়ে ওঠেন :
মুখর মিনার/যেন সে ভোরের পাখি/অমল আঘাতে/দ্রুত ছিঁড়ে গেলে ঘুম/পার হয়ে রাত/আঁধার অতনু তিথি/প্রিয়তম রোদ/প্রতীক আলোতে দেখা/ সে তো বাঙালির পিতা মুজিবেরই মুখ।
এভাবে মহামানব বঙ্গবন্ধু কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ী একাত্তরের চেতনাসঞ্জাত উচ্চারণ তার কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। যেমন ফিরে ফিরে আসে যাযাবরী শৈশবের সাহসিকতা কিংবা যুদ্ধপথের দগ্ধস্মৃতি। আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারি প্রেতাত্মারা বারবার ছোবল মেরে বিকৃত করার স্পর্ধা দেখায়, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তাক্ত স্মৃতিকে যারা নিমিষেই মুছে ফেলতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের এই দেশে এও কি সম্ভব? ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বারবার বেপথু হওয়াকে কবি তাই কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। তার মানবিক সত্তা প্রতিবাদের বহুবিধ প্রতীকে ফুঁসে ওঠে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করে :
আমার সময়কে আমি/উল্টো পায়ে হেঁটে যেতে দেখেছি!/ ভূতগ্রস্ত সময়ের পদচ্ছাপ অনুসরণ করে/জরাগ্রস্ত জাতি কখন পৌঁছে গেছে/গভীর খাদের কিনারায়/ জানলে না, তুমি জানলে না।/হে আমার তিরিশ-বয়সী যুবা/রক্তাক্ত স্বদেশ/ তোমাকে টেনেহিঁচড়ে মর্গের দিকে/নিয়ে যাচ্ছে কারা?...
...প্রিয় নেতৃবৃন্দ!/ ইতিহাসের কালো কফিনে / শেষ পেরেকটি ঠোকার আগে/ মুক্তবাতাসে আমাদের একটু / নিঃশ্বাস নিতে দিন
নিজেরই ভেঙে যাওয়ার শব্দে/ জেগে ওঠো বাংলাদেশ/ জাগো শেষবার
আততায়ী হন্তারক সময়ের প্রতিধ্বনি তুলে/আসে দুঃস্বপ্নের রাত/ বারবার...
কবিতা তো মানুষের আশ্রয়-নিদান। বিপুল এই মহাবিশ্বে মানুষ খুঁজে-ফেরে তার স্বস্তিকা-পুরাণ। মাটি ফুঁড়ে আকাশছোঁয়া বৃক্ষপাখালির মতো কবিতাও তাই পল্লবিত হয় কবির কল্পচেতনার রঙ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। এই রঙ কখনও গাঢ়, কখনও আর্দ্র, কখনও কোমল, কখনও রুদ্র, কখনও রুক্ষ, কখনও নিরস, কখনও বা তীক্ষè, সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত। স্বপ্নে-জাগরণে অতিচেতন মানুষের মন এভাবে উড়ে উড়ে যায়, দিগন্ত থেকে দিগন্তরেখায়... নীল আকাশের তারায় তারায়। কবি তারিক সুজাতের বর্ণিল কাব্যচ্ছটা এভাবে পাঠককে মুহূর্তেই পৌঁছে দেয় আবিলতাহীন এক স্বপ্নাদ্য জগতের চির-সবুজের প্রান্তরে। মাসুদ পথিক
Friday, January 16, 2015
ডালিম যেভাবে ফোটে : সেইসব মূর্খ ও মূকের জীবনী
‘কবিতাকেও,
জগতের সেইসব কথিত শেষ সঙ্গতির সাথে অনিবার্য যুদ্ধে জয়ী হতে হয়; এই যেমন
ধরুন স্বাতীর দেয়া হাতঘড়িটির কথা; তার তিনটি কাঁটাই থেমে পড়েছে এখন, তবু
সময় চলছে...’
কবিতাকে জগতের সেইসব কথিত শেষ সঙ্গতির সাথে অনিবার্য যুদ্ধে জয়ী হতে হয়। এটি কবি সজল সমুদ্র’র স্বীকারোক্তি। তার স্বীকারোক্তির রেশ টেনেই বলছি, বস্তুত এই যুদ্ধটা করতে হয় কবিকে। কবিতা তার তলোয়ার; ঢাল, বর্ম, অশ্বক্সসবকিছু। সেই শেষ অনিবার্য যুদ্ধের সমস্ত সরঞ্জাম কবিতা এবং এই যুদ্ধের ময়দানে জয়ী হতে হয় এসব যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে আসা পদাতিক, কবিকে।
‘এত প্রান্ত বদল করি, এত ভঙ্গি ভাঙি রাতজুড়েক্স/ তবু হয় না নদীর মতো শুয়ে পড়া।’ এই প্রান্ত বদল আর রাতজুড়ে ভঙ্গি ভাঙার যুদ্ধ করতে করতেই কেটে যায় কবির এক জীবনক্সযে জীবনে মানুষ জড়িয়ে পড়ে পারস্পরিক ঝগড়ায়, কালো পিঁপড়েদের মতো।
সজল সমুদ্র খুব ছোট দৈর্ঘ্যরে কবিতা লেখেন। অন্তত ‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ বইয়ের সবগুলো কবিতার দিকে তাকালে তেমনই দেখা যায়। কোনো একটি দীর্ঘ কবিতাও নেই এ বইয়ে। তবে এই সীমিত দৈর্ঘ্যরে কবিতাতেই তিনি ধরতে চেয়েছেন সমূহ ব্যাপ্তিকে। পেরেছেনও। সামগ্রিক অর্থে কবিতাকে এটাই পারতে হয়। ক্ষুদ্রের মধ্য দিয়ে সমগ্রকে ধরা।
‘বলো উটপাখি, কবে, কোথায় হারিয়েছো ডানা; তবুক্স/অজস ধূলিঝড়, এতটা নিরুত্তর কীভাবে পার হয়ে এলে!’ সজল সমুদ্র তার ‘মূক’ কবিতার সেই উটপাখি, যে অজস ধূলিঝড় পার হয়ে আজ এখানে এসেছে; তবে মূক নয়, নিরুত্তরও নয়।
‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ বইটি হাতে নিলেই একটি প্রশ্ন আসে, ডালিম আবার কীভাবে ফোটে? নাম কবিতাটির দিকে তাকাইক্স
‘তুমি দিচ্ছ হাততালি, ডালিম যেভাবে ফেটে লিখে রাখে রক্তবর্ণনা...’
এখানেও তো ডালিম ফোটার কোনো অস্তিত্ব নেই। তখনই অনুভব করি, ডালিম কোনো ফল হয়ে আর নেই এখানে; হয়তো কোনো নারী কিংবা সমগ্র জীবন। কোনো এক মুহূর্তে এসে আমরা প্রত্যেকেই তাদের সশব্দে ফুটে ওঠার শব্দ শুনতে পাই।
‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ কবির দ্বিতীয় বই। প্রথম বই ‘পত্রে রচিত ভোর’। একটি কবিতাকে অনেক কিছু অতিক্রম করতে হয়ক্সরাস্তা, রাত, মরুভূমি, গম্বুজ, একটি জীবনক্সসামগ্রিক অর্থে মহাকাল। স্বভাবতই কবিকেই এসব কিছু অতিক্রম করতে হয়। তবে যে কোনো কবির জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রতিনিয়ত নিজেকে অতিক্রম করা। সজল সমুদ্র আক্ষরিক অর্থেই সেটা পেরেছেন। পত্রে রচিত ভোর এবং ডালিম যেভাবে ফোটে পাশাপাশি রাখলেই সেটা প্রমাণিত হবে।
সজল সমুদ্র ঠিক কীভাবে কবিতা লেখেন? দেখা যাকক্স
‘এত ঘন কুয়াশার ভেতরে, ময়ূরের পেখমে তাকিয়ে এখন কি দাঁড়িয়ে থাকা যায়!’ সজল সমুদ্র দাঁড়িয়ে থাকেনঙ্ঘনঘোর কুয়াশার ভেতরে, গম্বুজের মতো তুমুল ধৈর্যে। সেখান থেকে একসময় তার কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করে দৃশ্যপট; ব্যথা-বেদনা, স্বাতীর দেয়া হাতঘড়ির তিনটি কাঁটা, যারা এই মুহূর্তে থেমে আছে, হরিণ, ফড়িং, হলঘরক্সকাচবান্ধব হিরার পৃথিবী। সবার গোচরে কিংবা অগোচরে মুঠোভর্তি করে তিনি সেসব তুলে আনেন কবিতায়। কখনও আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিয়ে যান সুড়ঙ্গের ওপারেক্সযেখানে তার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দেখতে পাই কীটের হাততালি, গভীর গর্ত থেকে উড়ে আসা আপাত বিলুপ্ত মার্বল্ড বিড়াল। তার হাত শুশ্রূষায় পারদর্শী; আবার সেই হাতেই ছুরি চালিয়ে হাসতে হাসতে বের করে আনেন দীর্ঘশ্বাস, ঈর্ষা এবং দূরদিশাহীন গোপন হাসিক্সপুঞ্জীভূত আদিম আবেগ। আর এটাই সজল সমুদ্রের বৈশিষ্ট্য।
শব্দব্যবহারে যথেষ্ট সচেতনতা দেখিয়েছেন সজল। যে কোনো কবিতার যে কোনো পঙ্ক্তির যে কোনো শব্দই এই চিহ্ন বহন করে যাচ্ছে। যদিও ‘ধান-ভাবনা’, ‘ভাষাপ্রান্তর’, কিংবা ‘যেটুকু মানান আজ সই’ক্সএমন দুয়েকটি উপাদান ঠিক অসংলগ্ন নয়, তবে মানানসই মনে হয়নি। পারদর্শিতার প্রমাণ সজল তার প্রথম বইয়েই দিয়েছেন। কিন্তু কবিতায় তার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণক্সদৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর জীবনবোধক্সতার উপস্থিতি সজল সমুদ্রের কবিতায় যত্রতত্র। ‘কাটা আপেলের টুকরো, প্রতিদিন তারই শ্বাস ফেলে চলি’; ‘বুঝিনি, আধপোড়া মোম গন্ধই ছড়ায় বেশি আলো ও উজ্জ্বলতার চেয়ে’; ‘বিউগল হাতে যাকে মৃত ভেবে যাও, লোকে তারই ডাকে আজও যুদ্ধে যায়, জাহাজ ভাসায়’; ‘দংশনে ভীত লোক, জেগে উঠবো জাদুকর পেলে’; ‘গ্রহণের যোগ্য চাঁদ প্রতিদিন আকাশে ওঠে না’ক্সএমন অজস্র পঙ্ক্তি ছড়িয়ে আছে বইয়ে। সজল সমুদ্র সেসব পঙ্ক্তিকে কুড়িয়ে এনে গেঁথেছেন গুল্মে, সুচারু হাতে।
সম্পূর্ণ সরিষার ক্ষেতে একা যে বাদাম গাছ, তার অনর্থ সমস্ত গল্পের জীবনী সজল সমুদ্র উদ্ধৃত করেছেন সযত্নে। ‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ সেইসব মূর্খ ও মূকের জীবনী পাঠের আনন্দ দেবে, আনন্দ দেবে অস্পৃশ্য বোধকে স্পর্শের। হ রাসেল আহমেদ
বই
ডালিম যেভাবে ফোটে
সজল সমুদ্র
কবিতাকে জগতের সেইসব কথিত শেষ সঙ্গতির সাথে অনিবার্য যুদ্ধে জয়ী হতে হয়। এটি কবি সজল সমুদ্র’র স্বীকারোক্তি। তার স্বীকারোক্তির রেশ টেনেই বলছি, বস্তুত এই যুদ্ধটা করতে হয় কবিকে। কবিতা তার তলোয়ার; ঢাল, বর্ম, অশ্বক্সসবকিছু। সেই শেষ অনিবার্য যুদ্ধের সমস্ত সরঞ্জাম কবিতা এবং এই যুদ্ধের ময়দানে জয়ী হতে হয় এসব যুদ্ধ সরঞ্জাম নিয়ে ছুটে আসা পদাতিক, কবিকে।
‘এত প্রান্ত বদল করি, এত ভঙ্গি ভাঙি রাতজুড়েক্স/ তবু হয় না নদীর মতো শুয়ে পড়া।’ এই প্রান্ত বদল আর রাতজুড়ে ভঙ্গি ভাঙার যুদ্ধ করতে করতেই কেটে যায় কবির এক জীবনক্সযে জীবনে মানুষ জড়িয়ে পড়ে পারস্পরিক ঝগড়ায়, কালো পিঁপড়েদের মতো।
সজল সমুদ্র খুব ছোট দৈর্ঘ্যরে কবিতা লেখেন। অন্তত ‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ বইয়ের সবগুলো কবিতার দিকে তাকালে তেমনই দেখা যায়। কোনো একটি দীর্ঘ কবিতাও নেই এ বইয়ে। তবে এই সীমিত দৈর্ঘ্যরে কবিতাতেই তিনি ধরতে চেয়েছেন সমূহ ব্যাপ্তিকে। পেরেছেনও। সামগ্রিক অর্থে কবিতাকে এটাই পারতে হয়। ক্ষুদ্রের মধ্য দিয়ে সমগ্রকে ধরা।
‘বলো উটপাখি, কবে, কোথায় হারিয়েছো ডানা; তবুক্স/অজস ধূলিঝড়, এতটা নিরুত্তর কীভাবে পার হয়ে এলে!’ সজল সমুদ্র তার ‘মূক’ কবিতার সেই উটপাখি, যে অজস ধূলিঝড় পার হয়ে আজ এখানে এসেছে; তবে মূক নয়, নিরুত্তরও নয়।
‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ বইটি হাতে নিলেই একটি প্রশ্ন আসে, ডালিম আবার কীভাবে ফোটে? নাম কবিতাটির দিকে তাকাইক্স
‘তুমি দিচ্ছ হাততালি, ডালিম যেভাবে ফেটে লিখে রাখে রক্তবর্ণনা...’
এখানেও তো ডালিম ফোটার কোনো অস্তিত্ব নেই। তখনই অনুভব করি, ডালিম কোনো ফল হয়ে আর নেই এখানে; হয়তো কোনো নারী কিংবা সমগ্র জীবন। কোনো এক মুহূর্তে এসে আমরা প্রত্যেকেই তাদের সশব্দে ফুটে ওঠার শব্দ শুনতে পাই।
‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ কবির দ্বিতীয় বই। প্রথম বই ‘পত্রে রচিত ভোর’। একটি কবিতাকে অনেক কিছু অতিক্রম করতে হয়ক্সরাস্তা, রাত, মরুভূমি, গম্বুজ, একটি জীবনক্সসামগ্রিক অর্থে মহাকাল। স্বভাবতই কবিকেই এসব কিছু অতিক্রম করতে হয়। তবে যে কোনো কবির জন্য সবচেয়ে জরুরি প্রতিনিয়ত নিজেকে অতিক্রম করা। সজল সমুদ্র আক্ষরিক অর্থেই সেটা পেরেছেন। পত্রে রচিত ভোর এবং ডালিম যেভাবে ফোটে পাশাপাশি রাখলেই সেটা প্রমাণিত হবে।
সজল সমুদ্র ঠিক কীভাবে কবিতা লেখেন? দেখা যাকক্স
‘এত ঘন কুয়াশার ভেতরে, ময়ূরের পেখমে তাকিয়ে এখন কি দাঁড়িয়ে থাকা যায়!’ সজল সমুদ্র দাঁড়িয়ে থাকেনঙ্ঘনঘোর কুয়াশার ভেতরে, গম্বুজের মতো তুমুল ধৈর্যে। সেখান থেকে একসময় তার কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করে দৃশ্যপট; ব্যথা-বেদনা, স্বাতীর দেয়া হাতঘড়ির তিনটি কাঁটা, যারা এই মুহূর্তে থেমে আছে, হরিণ, ফড়িং, হলঘরক্সকাচবান্ধব হিরার পৃথিবী। সবার গোচরে কিংবা অগোচরে মুঠোভর্তি করে তিনি সেসব তুলে আনেন কবিতায়। কখনও আমাদের আঙুল ধরে হাঁটতে হাঁটতে নিয়ে যান সুড়ঙ্গের ওপারেক্সযেখানে তার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দেখতে পাই কীটের হাততালি, গভীর গর্ত থেকে উড়ে আসা আপাত বিলুপ্ত মার্বল্ড বিড়াল। তার হাত শুশ্রূষায় পারদর্শী; আবার সেই হাতেই ছুরি চালিয়ে হাসতে হাসতে বের করে আনেন দীর্ঘশ্বাস, ঈর্ষা এবং দূরদিশাহীন গোপন হাসিক্সপুঞ্জীভূত আদিম আবেগ। আর এটাই সজল সমুদ্রের বৈশিষ্ট্য।
শব্দব্যবহারে যথেষ্ট সচেতনতা দেখিয়েছেন সজল। যে কোনো কবিতার যে কোনো পঙ্ক্তির যে কোনো শব্দই এই চিহ্ন বহন করে যাচ্ছে। যদিও ‘ধান-ভাবনা’, ‘ভাষাপ্রান্তর’, কিংবা ‘যেটুকু মানান আজ সই’ক্সএমন দুয়েকটি উপাদান ঠিক অসংলগ্ন নয়, তবে মানানসই মনে হয়নি। পারদর্শিতার প্রমাণ সজল তার প্রথম বইয়েই দিয়েছেন। কিন্তু কবিতায় তার চেয়েও যেটা গুরুত্বপূর্ণক্সদৃষ্টিভঙ্গি এবং গভীর জীবনবোধক্সতার উপস্থিতি সজল সমুদ্রের কবিতায় যত্রতত্র। ‘কাটা আপেলের টুকরো, প্রতিদিন তারই শ্বাস ফেলে চলি’; ‘বুঝিনি, আধপোড়া মোম গন্ধই ছড়ায় বেশি আলো ও উজ্জ্বলতার চেয়ে’; ‘বিউগল হাতে যাকে মৃত ভেবে যাও, লোকে তারই ডাকে আজও যুদ্ধে যায়, জাহাজ ভাসায়’; ‘দংশনে ভীত লোক, জেগে উঠবো জাদুকর পেলে’; ‘গ্রহণের যোগ্য চাঁদ প্রতিদিন আকাশে ওঠে না’ক্সএমন অজস্র পঙ্ক্তি ছড়িয়ে আছে বইয়ে। সজল সমুদ্র সেসব পঙ্ক্তিকে কুড়িয়ে এনে গেঁথেছেন গুল্মে, সুচারু হাতে।
সম্পূর্ণ সরিষার ক্ষেতে একা যে বাদাম গাছ, তার অনর্থ সমস্ত গল্পের জীবনী সজল সমুদ্র উদ্ধৃত করেছেন সযত্নে। ‘ডালিম যেভাবে ফোটে’ সেইসব মূর্খ ও মূকের জীবনী পাঠের আনন্দ দেবে, আনন্দ দেবে অস্পৃশ্য বোধকে স্পর্শের। হ রাসেল আহমেদ
বই
ডালিম যেভাবে ফোটে
সজল সমুদ্র
Friday, December 26, 2014
কাশবনে স্মৃতি লেখে নগরের বাউল কবি by বিমল গুহ
মানুষ
জন্মগতভাবে সৌন্দর্যপিপাসু। যখন মানুষের বুদ্ধি হয়েছে, বিবেক জাগ্রত
হয়েছে, তখন থেকেই সে তার কথা জানাতে চেয়েছে। গুহাবাসী মানুষের জীবনাচরণ
আমাদের সেই ধারণা দেয়। দেয়ালের গায়ে তাদের নানা আঁকিবুঁকির মধ্য থেকে তা
অনুমেয়। এতদিন মনের ফ্রেমে যে দৃশ্যাবলি ধারণ করত, ক্যামেরা আবিষ্কারের পর
মানুষ ছবি তোলার জন্য আরও ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ক্যামেরায় তোলা ছবি পূর্ণাঙ্গ
ছবি হয় না। সে ছবিতে ফুটে ওঠে একটা রূপ, একটা দিক। কিন্তু মানুষের চোখ তার
চেয়ে অনেক বেশি দেখে। এই ছবি আঁকার জন্য কেউ হাতে নেয় তুলি, কেউ হাতে তুলে
নেয় কলম। কবি কলম দিয়ে জীবনের যে-ছবি লেখেন তা চিন্তাজাত বলেই এর ব্যাপ্তি
বেশি। প্রকৃত কবি সমাজ সভ্যতারই রূপকার। তেমন একজন কবি অরুণাভ সরকার,
সম্প্রতি লোকান্তরিত হয়েছেন। যে-কবি বাউলের বেশে ঢাকা শহরের বাসিন্দা
হয়েছিলেন, চলেও গেলেন সেই বাউলের বেশেই।
বাউলেরা সৃষ্টির মাহাত্ম্যে মুগ্ধ থেকে জীবনের রূপ-রসের সন্ধান করেন, বাউল-কবি তার থেকে বড় ব্যতিক্রমী ছিলেন কি! জীবনযাপনে এক ধরনের উদাসীনতা সব সময় ছিল এই কবির। কবিতা বা লেখালেখির ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারী ছিলেন বটে, উদাসীনতার আঁচ থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি কখনও। তার কাছে পাঠকের প্রত্যাশা ছিল অনেক, কিন্তু পাঠককে দিখেছেন কম। কবিতার বই মাত্র তিনটি- ১) নগরে বাউল, ২) কেউ কিছু জানে না ও ৩) নারীরা ফেরে না। মানুষের জীবন-আচরণের সব বিষয় তার কবিতার বিষয়। দৈনন্দিন জীবনযাপনের যাবতীয় দিক কবিতার ছত্রে ছত্রে নিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন কবি। ভালোবাসা তার অনুভবে ও বর্ণনায় সর্বগ্রাসী ছায়া বিস্তার করে আছে সর্বত্র। তার শিশুতোষ গ্রন্থ ‘খোকনের অভিযান’ও উল্লেখযোগ্য রচনা। রয়েছে পেশাগত সম্পাদনার বইও। তবে মূলত কবিই ছিলেন তিনি।
কবিতার প্রতি তীব্র আসক্তি কবিকে বাউল করেছে- এ কথা তো বলাই যায়! যে কারণে অন্য কোনো বিষয়ে স্থিরতা হয়নি কোনো দিন। চাকরির ক্ষেত্রে বাউল প্রকৃতি তাকে স্থানচ্যুত করেছে বার বার। সাংবাদিতাই ছিল পেশা। কবিতার নেশার কারণে একটি সাহিত্যপত্রিকা দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন। পত্রিকার নাম- ঈষিকা। দেখা হলেই ‘ঈষিকা’র জন্য কবিতা চাই। আমাকে বেশি স্নেহই করে ফেলেছিলেন কবি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে নানা অভিযোগ। ফোন করিনি কেন! কবিতা পাঠাইনি কেন- এসব। ‘ঈষিকা’ ক্ষীণাঙ্গি হলেও মানসম্পন্ন কবিতা পত্রিকা। নামটা আমারও বেশ পছন্দের ছিল। এত পছন্দ যে, আমরা ১৯৮৩ সালে জন্মগ্রহণকারী আমাদের বড় মেয়ের নামই রেখেছি- ‘ঈষিকা’। কবিতা পত্রিকা ‘ঈষিকা’র আয়ুস্কাল ছিল ১৯৮৫ পর্যন্ত। আমার ঈষিকা এখন বড় হয়েছে। শুরুতে নিয়মিত শিশুতোষ সাহিত্যচর্চ্চা করত, এখন কম। আমার ঈষিকার ছড়ার বইও আছে একটা- ‘ছড়ার নাচন হাওয়ার নাচন’। অরুণদা তাতেই খুশি ছিলেন। বলতেন- অন্তত আপনার ঈষিকা বড় হচ্ছে। অরুণদা বরাবর আমাকে ‘আপনি’ই সম্বোধন করতেন! তবুও অগ্রজের স্নেহ থেকে কখনও বঞ্চিত হয়নি। দাদা যখন বেশ অসুস্থ, বৌদিকে নাকি বলতেন- বিমলকে ফোন ধরে দাও। এই অসুস্থতার মধ্যেও কথা হয়েছে। এভাবে হঠাৎ চলে যাবেন- তা কি করে ভাবি! ফোনে বলেছিলেন বার বার- ‘বিমল একবার আসবেন আপনার সঙ্গে কথা আছে’! যাব যাব করেই কেটে গেল দুই সপ্তাহ। যাওয়া হল না, কী কথা তাও জানতে পারলাম না আর। মাফ করে দেবেন- অরুণদা!
কবি অরুণাভ সরকারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে। আমি তখন মতিঝিলে একটি বেসরকারি দফতরে চাকরি করতাম। ছিলাম মাত্র ছয় মাস। দেখি- এক দুপুরে আমার খোঁজে এসেছেন একজন কেউ। লম্বা গোছের মানুষ- অতি বিনয়ী। দেখেই পরিচয় দিলেন- ‘আমি অরুণ। মুখের দিকে তাকাতেই আবার বললেন- অরুণাভ সরকার’। আমি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাকে অভ্যর্থনা জানালাম। কবির লেখার সঙ্গে আমার আগেই পরিচয় ছিল। বললাম- আপনি আমার প্রিয় কবি। আমার ঠিকানা...? বললেন- কবি আহসান হাবীবের কাছে জেনেছি। এর আগের সপ্তাহে দৈনিক বাংলা’র সাহিত্য পৃষ্ঠায় আমার কবিতা পড়ে সেদিন আমাকে স্নেহের পরশে জড়িয়ে নিয়েছেন অরুণদা। তিনি নাকি কবি আহসান হাবীবের কাছে জানতে চেয়েছেন- কে এই তরুণ? হাবীব ভাই বলেছিলেন না কি- চট্টগ্রাম থেকে আসা এই ছেলে নিয়মিত লিখছে, সম্প্রতি চাকরিতে যোগদান করেছে ‘পদ্মা প্রিন্টার্সে’, মতিঝিলে অফিস। সেই মহৎ হৃদয়ের অরুণ’দা- এক অর্বাচীনকে খুঁজতে এসেছেন মতিঝিলে! আমি তো আপ্লুুত! সেই থেকে আমি পেয়েছি একজন আপন আত্মীয়কে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসেছি আগের বছর। এক আত্মীয়ের সুবাদে এই অস্থায়ী কাজে যোগদান। ঢাকা এসে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলাম কবি আহসান হাবীবকে। হাবীব ভাইয়ের কাছে নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। প্রকৃত অভিভাবকই বটে। গেলে প্রথমেই খোঁজ নিতেন আমার কিছু হল কি না! তাই চাকরিতে যোগদানের খবর হাবীব ভাইকেই দিয়েছি সবার আগে। সেখানে আমার পরিচয় কবি নাসির আহমেদের সঙ্গে, পরে বন্ধুত্ব। হাবীব ভাইয়ের কাছে কবিতার পরীক্ষাও দিতে হয়েছে বহুবার। এমনও হয়েছে- কবিতা হাতে দিলেই নাসির আহমেদকে দিয়ে বলতেন- পড়। নিজের উপস্থিতিতে এই পরীক্ষা বড় কঠিনই ছিল! পরে অরুণদার সঙ্গে দু’একবার হাবীব ভাইয়ের দফতরেও দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। সাহিত্যের কথাই হতো। পরিমাণে কম লিখলেও সাহিত্যপ্রাণ মানুষ বলতে যা বোঝায়- অরুণদা তা-ই ছিলেন। কবিতা শুদ্ধতাই বিশ্বাস করতেন বলে কখনও আমার লেখা তার পছন্দ হলে বা পছন্দ না হলে ফোন করে খুশির প্রকাশ করতেন অথবা অভিযোগ করতেন। বলা যায়- প্রিয় অগ্রজের এক ধরনের শাসন! আমাকে ফোনে না পেলে আমার বন্ধু- যাকে অরুণদা সমান ভালোবাসতেন বা বেশি ভালোবাসতেন- কবি ফারুক মাহমুদ, তাকে বলতেন ও যেন আমাকে জানায়- অরুণদাকে শিগগিরই ফোন করতে। স্নেহের এই ভালোবাসার মানুষটিকে আর কখনও পাব না- তা ভাবলে মনটা হুহু করে ওঠে! অরুণদা, আপনি নেই, আপনার কবিতা আমাদের সাথী হয়ে থাকল!
বাউলেরা সৃষ্টির মাহাত্ম্যে মুগ্ধ থেকে জীবনের রূপ-রসের সন্ধান করেন, বাউল-কবি তার থেকে বড় ব্যতিক্রমী ছিলেন কি! জীবনযাপনে এক ধরনের উদাসীনতা সব সময় ছিল এই কবির। কবিতা বা লেখালেখির ক্ষেত্রে শুদ্ধাচারী ছিলেন বটে, উদাসীনতার আঁচ থেকে বের হয়ে আসতে পারেননি কখনও। তার কাছে পাঠকের প্রত্যাশা ছিল অনেক, কিন্তু পাঠককে দিখেছেন কম। কবিতার বই মাত্র তিনটি- ১) নগরে বাউল, ২) কেউ কিছু জানে না ও ৩) নারীরা ফেরে না। মানুষের জীবন-আচরণের সব বিষয় তার কবিতার বিষয়। দৈনন্দিন জীবনযাপনের যাবতীয় দিক কবিতার ছত্রে ছত্রে নিপুণভাবে অঙ্কন করেছেন কবি। ভালোবাসা তার অনুভবে ও বর্ণনায় সর্বগ্রাসী ছায়া বিস্তার করে আছে সর্বত্র। তার শিশুতোষ গ্রন্থ ‘খোকনের অভিযান’ও উল্লেখযোগ্য রচনা। রয়েছে পেশাগত সম্পাদনার বইও। তবে মূলত কবিই ছিলেন তিনি।
কবিতার প্রতি তীব্র আসক্তি কবিকে বাউল করেছে- এ কথা তো বলাই যায়! যে কারণে অন্য কোনো বিষয়ে স্থিরতা হয়নি কোনো দিন। চাকরির ক্ষেত্রে বাউল প্রকৃতি তাকে স্থানচ্যুত করেছে বার বার। সাংবাদিতাই ছিল পেশা। কবিতার নেশার কারণে একটি সাহিত্যপত্রিকা দীর্ঘদিন সম্পাদনা করেছেন। পত্রিকার নাম- ঈষিকা। দেখা হলেই ‘ঈষিকা’র জন্য কবিতা চাই। আমাকে বেশি স্নেহই করে ফেলেছিলেন কবি। দেখার সঙ্গে সঙ্গে নানা অভিযোগ। ফোন করিনি কেন! কবিতা পাঠাইনি কেন- এসব। ‘ঈষিকা’ ক্ষীণাঙ্গি হলেও মানসম্পন্ন কবিতা পত্রিকা। নামটা আমারও বেশ পছন্দের ছিল। এত পছন্দ যে, আমরা ১৯৮৩ সালে জন্মগ্রহণকারী আমাদের বড় মেয়ের নামই রেখেছি- ‘ঈষিকা’। কবিতা পত্রিকা ‘ঈষিকা’র আয়ুস্কাল ছিল ১৯৮৫ পর্যন্ত। আমার ঈষিকা এখন বড় হয়েছে। শুরুতে নিয়মিত শিশুতোষ সাহিত্যচর্চ্চা করত, এখন কম। আমার ঈষিকার ছড়ার বইও আছে একটা- ‘ছড়ার নাচন হাওয়ার নাচন’। অরুণদা তাতেই খুশি ছিলেন। বলতেন- অন্তত আপনার ঈষিকা বড় হচ্ছে। অরুণদা বরাবর আমাকে ‘আপনি’ই সম্বোধন করতেন! তবুও অগ্রজের স্নেহ থেকে কখনও বঞ্চিত হয়নি। দাদা যখন বেশ অসুস্থ, বৌদিকে নাকি বলতেন- বিমলকে ফোন ধরে দাও। এই অসুস্থতার মধ্যেও কথা হয়েছে। এভাবে হঠাৎ চলে যাবেন- তা কি করে ভাবি! ফোনে বলেছিলেন বার বার- ‘বিমল একবার আসবেন আপনার সঙ্গে কথা আছে’! যাব যাব করেই কেটে গেল দুই সপ্তাহ। যাওয়া হল না, কী কথা তাও জানতে পারলাম না আর। মাফ করে দেবেন- অরুণদা!
কবি অরুণাভ সরকারের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৭৯ সালের প্রথম দিকে। আমি তখন মতিঝিলে একটি বেসরকারি দফতরে চাকরি করতাম। ছিলাম মাত্র ছয় মাস। দেখি- এক দুপুরে আমার খোঁজে এসেছেন একজন কেউ। লম্বা গোছের মানুষ- অতি বিনয়ী। দেখেই পরিচয় দিলেন- ‘আমি অরুণ। মুখের দিকে তাকাতেই আবার বললেন- অরুণাভ সরকার’। আমি শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাকে অভ্যর্থনা জানালাম। কবির লেখার সঙ্গে আমার আগেই পরিচয় ছিল। বললাম- আপনি আমার প্রিয় কবি। আমার ঠিকানা...? বললেন- কবি আহসান হাবীবের কাছে জেনেছি। এর আগের সপ্তাহে দৈনিক বাংলা’র সাহিত্য পৃষ্ঠায় আমার কবিতা পড়ে সেদিন আমাকে স্নেহের পরশে জড়িয়ে নিয়েছেন অরুণদা। তিনি নাকি কবি আহসান হাবীবের কাছে জানতে চেয়েছেন- কে এই তরুণ? হাবীব ভাই বলেছিলেন না কি- চট্টগ্রাম থেকে আসা এই ছেলে নিয়মিত লিখছে, সম্প্রতি চাকরিতে যোগদান করেছে ‘পদ্মা প্রিন্টার্সে’, মতিঝিলে অফিস। সেই মহৎ হৃদয়ের অরুণ’দা- এক অর্বাচীনকে খুঁজতে এসেছেন মতিঝিলে! আমি তো আপ্লুুত! সেই থেকে আমি পেয়েছি একজন আপন আত্মীয়কে।
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা এসেছি আগের বছর। এক আত্মীয়ের সুবাদে এই অস্থায়ী কাজে যোগদান। ঢাকা এসে অভিভাবক হিসেবে পেয়েছিলাম কবি আহসান হাবীবকে। হাবীব ভাইয়ের কাছে নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। প্রকৃত অভিভাবকই বটে। গেলে প্রথমেই খোঁজ নিতেন আমার কিছু হল কি না! তাই চাকরিতে যোগদানের খবর হাবীব ভাইকেই দিয়েছি সবার আগে। সেখানে আমার পরিচয় কবি নাসির আহমেদের সঙ্গে, পরে বন্ধুত্ব। হাবীব ভাইয়ের কাছে কবিতার পরীক্ষাও দিতে হয়েছে বহুবার। এমনও হয়েছে- কবিতা হাতে দিলেই নাসির আহমেদকে দিয়ে বলতেন- পড়। নিজের উপস্থিতিতে এই পরীক্ষা বড় কঠিনই ছিল! পরে অরুণদার সঙ্গে দু’একবার হাবীব ভাইয়ের দফতরেও দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে। সাহিত্যের কথাই হতো। পরিমাণে কম লিখলেও সাহিত্যপ্রাণ মানুষ বলতে যা বোঝায়- অরুণদা তা-ই ছিলেন। কবিতা শুদ্ধতাই বিশ্বাস করতেন বলে কখনও আমার লেখা তার পছন্দ হলে বা পছন্দ না হলে ফোন করে খুশির প্রকাশ করতেন অথবা অভিযোগ করতেন। বলা যায়- প্রিয় অগ্রজের এক ধরনের শাসন! আমাকে ফোনে না পেলে আমার বন্ধু- যাকে অরুণদা সমান ভালোবাসতেন বা বেশি ভালোবাসতেন- কবি ফারুক মাহমুদ, তাকে বলতেন ও যেন আমাকে জানায়- অরুণদাকে শিগগিরই ফোন করতে। স্নেহের এই ভালোবাসার মানুষটিকে আর কখনও পাব না- তা ভাবলে মনটা হুহু করে ওঠে! অরুণদা, আপনি নেই, আপনার কবিতা আমাদের সাথী হয়ে থাকল!
Friday, November 7, 2014
আধুনিক কবিতার ভবিষ্যৎ : ক্যারোল অ্যান ডাফির ভাবনা by আহমেদ বাসার
ব্রিটেনের
প্রথম নারী পোয়েট লরিয়েট ক্যারোল অ্যান ডাফি ঘোষণা করেছেন, খুদে বার্তার
ভাষাই কবিতার সর্বোত্তম বাহন হতে পারে। তিনি দাবি করেন, এ ভাষা নতুন
প্রজন্মের তরুণ চারণ কবিদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।
৫৫ বছর বয়সী এ কবি বলেন- কবিতা হচ্ছে খুদে বার্তার একটি বিশেষ আঙ্গিক। এটাই প্রকৃত ‘টেক্সট’। এটা অনুভবের একটি শুদ্ধতম রূপ, যা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর মধ্য দিয়ে কম কথায় অনেক বেশি কিছু বলা যায়।
পোয়েট লরিয়েট মনে করেন- খুদে বার্তার সংক্ষিপ্ত ভাষার ওপরই আধুনিক কবিতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তিনি বলেন- আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, ফেসবুক প্রজন্মই আমাদের ভবিষ্যৎ এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কবিতাই তাদের জন্য উপযুক্ত মাধ্যম। এটা এক ধরনের সময় ক্যাপসুল- যা অনুভব ও ধারণাকে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বহুদূর ভ্রমণে উৎসাহিত করে। তিনি আরও যোগ করেন, কবিতা একুশ শতকের অন্যতম সাহিত্য আঙ্গিক।
মিস ডাফি ইংল্যান্ডের ৩৪১ বছরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মনোনীত কোনো নারী পোয়েট লরিয়েট। যিনি ১০ বছরের জন্য অ্যান্ড্র– মোশানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ২০০৯ সালে। প্রতি বছর তিনি পাঁচ হাজার পাউন্ড করে সম্মানী পাবেন।
ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনির্ভাসিটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার মন্তব্যগুলো নিয়ে মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে যা তাদের নিজস্ব কাব্যসংকলনের জন্য সহায়ক হবে।
ডাফি- যিনি ২০০৯ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্রিটেনের প্রথম নারী পোয়েট লরিয়েট- বলেন, তিনি স্কুলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবিতা লেখা শেখানোর ব্যাপারে খুবই উৎসাহী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কবিতাই একুশ শতকের অনিবার্য সাহিত্য মাধ্যম। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে তরুণদের ভাষার সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট করা সম্ভব। যে ভাষা খেলার মতোই আকর্ষণীয়।
ডাফি এরই মধ্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, আলফ্রেড লর্ড টেনিসন, জন বেজামেন ও টেড হিউজের মতো বিশাল নামগুলোর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন।
পোয়েট লরিয়েট সরকারের পরামর্শে ব্রিটেনের রানী কর্তৃক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কবি। টনি ব্লেয়ার ১৯৯৯ সালে ১০ বছরের জন্য এর সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন।
পোয়েট লরিয়েটের দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান অনুষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কবিতা রচনা করা।
ডাফি বহু আগ থেকেই রাজবংশীয় ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে কবিতা রচনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে তাকে যখন এ পদের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছিল তখন প্রিন্স এডওয়ার্ড ও সোফির বিয়ের আয়োজন চলছিল। তখন তিনি বলেছিলেন- আমি এডওয়ার্ড ও সোফির জন্য কোনো কবিতা রচনা করব না। কোনো আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কবিরই তা করা উচিত নয়।
এছাড়া এরকম অভিযোগও প্রচলিত যে, টনি ব্লেয়ার একজন সমকামিকে পোয়েট লরিয়েট হিসেবে নিয়োগ দানের ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিগ্ধ ছিলেন। ২০১১ সালে ডাফি একটি কাব্যসংকলনের মোড়ক উন্মোচিত করেছিলেন, যা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়েছিল। তিনি প্রত্যেককে তাদের নিজস্ব কাব্যসংকলনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন- তারা যে কোনো ভাবে এটি করতে পারে। এটি হতে পারে দলবদ্ধভাবে, হতে পারে শ্রেণী কিংবা স্কুলের একটি কবিতার দল অথবা সাধারণভাবে একজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে হলেও সমস্যা নেই। কাব্যসংকলনটি তারা যেভাবে চায় সেভাবে সংকলিত হতে পারে। এটা হতে পারে ভাবার্থকেন্দ্রিক কিংবা হতে পারে ইস্যুভিত্তিক। অথবা অন্য কিছু নিয়ে যা তারা পছন্দ করে। তাদের জন্য একটি বাজেট বরাদ্দ করা হবে এবং তাদেরই ভাবতে হবে তারা কীভাবে খরচ করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- তাদের মাথায় রাখতে হবে কবিতা সৃষ্টির জন্য তাদের ফি দিতে হবে। সুতরাং তারাও তাদের ভাবনার অন্তর্ভুক্ত হতে হবে যে সেই ফিটা কত হতে পারে। ডাফির নিজস্ব সৃষ্টিকর্ম বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে একটি কবিতা সহিংসতাকে উৎসাহিত করার অভিযোগে বাদ দেয়া হয়েছে। ‘এডুকেশন ফর লেইজার’ নামক সহিংসতাবিষয়ক কবিতাটি অ্যা কিউ অ্যা পরীক্ষা বোর্ড ও জিসিএসই কাব্যসংকলন থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এ অভিযোগে যে, এটিতে ছুরিকাঘাতে সৃষ্ট অপরাধ ও একটি গোল্ড ফিশের টয়লেটে পড়ে যাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। ডাফি সর্বদা এটি মনে করেন, কবিতা, যা শুরু হয় এমন শব্দগুচ্ছ দিয়ে- আমি আজ কোনো কিছুকে হত্যা করতে যাচ্ছি- এটাই সহিংসতার বিরোধী।
৫৫ বছর বয়সী এ কবি বলেন- কবিতা হচ্ছে খুদে বার্তার একটি বিশেষ আঙ্গিক। এটাই প্রকৃত ‘টেক্সট’। এটা অনুভবের একটি শুদ্ধতম রূপ, যা ভাষার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এর মধ্য দিয়ে কম কথায় অনেক বেশি কিছু বলা যায়।
পোয়েট লরিয়েট মনে করেন- খুদে বার্তার সংক্ষিপ্ত ভাষার ওপরই আধুনিক কবিতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। তিনি বলেন- আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, ফেসবুক প্রজন্মই আমাদের ভবিষ্যৎ এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, কবিতাই তাদের জন্য উপযুক্ত মাধ্যম। এটা এক ধরনের সময় ক্যাপসুল- যা অনুভব ও ধারণাকে সংক্ষিপ্ত পরিসরে বহুদূর ভ্রমণে উৎসাহিত করে। তিনি আরও যোগ করেন, কবিতা একুশ শতকের অন্যতম সাহিত্য আঙ্গিক।
মিস ডাফি ইংল্যান্ডের ৩৪১ বছরের ইতিহাসে সর্বপ্রথম মনোনীত কোনো নারী পোয়েট লরিয়েট। যিনি ১০ বছরের জন্য অ্যান্ড্র– মোশানের স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন ২০০৯ সালে। প্রতি বছর তিনি পাঁচ হাজার পাউন্ড করে সম্মানী পাবেন।
ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন ইউনির্ভাসিটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তার মন্তব্যগুলো নিয়ে মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছে যা তাদের নিজস্ব কাব্যসংকলনের জন্য সহায়ক হবে।
ডাফি- যিনি ২০০৯ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্রিটেনের প্রথম নারী পোয়েট লরিয়েট- বলেন, তিনি স্কুলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কবিতা লেখা শেখানোর ব্যাপারে খুবই উৎসাহী। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কবিতাই একুশ শতকের অনিবার্য সাহিত্য মাধ্যম। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে তরুণদের ভাষার সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট করা সম্ভব। যে ভাষা খেলার মতোই আকর্ষণীয়।
ডাফি এরই মধ্যে উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, আলফ্রেড লর্ড টেনিসন, জন বেজামেন ও টেড হিউজের মতো বিশাল নামগুলোর কাতারে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছেন।
পোয়েট লরিয়েট সরকারের পরামর্শে ব্রিটেনের রানী কর্তৃক প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একজন কবি। টনি ব্লেয়ার ১৯৯৯ সালে ১০ বছরের জন্য এর সময়সীমা নির্ধারণ করেছেন।
পোয়েট লরিয়েটের দায়িত্বের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাজপরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রধান প্রধান অনুষ্ঠান ও কর্মকাণ্ডকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য কবিতা রচনা করা।
ডাফি বহু আগ থেকেই রাজবংশীয় ব্যক্তিবর্গ সম্পর্কে কবিতা রচনার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ১৯৯৯ সালে তাকে যখন এ পদের জন্য বিবেচনা করা হচ্ছিল তখন প্রিন্স এডওয়ার্ড ও সোফির বিয়ের আয়োজন চলছিল। তখন তিনি বলেছিলেন- আমি এডওয়ার্ড ও সোফির জন্য কোনো কবিতা রচনা করব না। কোনো আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন কবিরই তা করা উচিত নয়।
এছাড়া এরকম অভিযোগও প্রচলিত যে, টনি ব্লেয়ার একজন সমকামিকে পোয়েট লরিয়েট হিসেবে নিয়োগ দানের ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দিগ্ধ ছিলেন। ২০১১ সালে ডাফি একটি কাব্যসংকলনের মোড়ক উন্মোচিত করেছিলেন, যা মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত করা হয়েছিল। তিনি প্রত্যেককে তাদের নিজস্ব কাব্যসংকলনের জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন- তারা যে কোনো ভাবে এটি করতে পারে। এটি হতে পারে দলবদ্ধভাবে, হতে পারে শ্রেণী কিংবা স্কুলের একটি কবিতার দল অথবা সাধারণভাবে একজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে হলেও সমস্যা নেই। কাব্যসংকলনটি তারা যেভাবে চায় সেভাবে সংকলিত হতে পারে। এটা হতে পারে ভাবার্থকেন্দ্রিক কিংবা হতে পারে ইস্যুভিত্তিক। অথবা অন্য কিছু নিয়ে যা তারা পছন্দ করে। তাদের জন্য একটি বাজেট বরাদ্দ করা হবে এবং তাদেরই ভাবতে হবে তারা কীভাবে খরচ করবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- তাদের মাথায় রাখতে হবে কবিতা সৃষ্টির জন্য তাদের ফি দিতে হবে। সুতরাং তারাও তাদের ভাবনার অন্তর্ভুক্ত হতে হবে যে সেই ফিটা কত হতে পারে। ডাফির নিজস্ব সৃষ্টিকর্ম বিদ্যালয়ের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে একটি কবিতা সহিংসতাকে উৎসাহিত করার অভিযোগে বাদ দেয়া হয়েছে। ‘এডুকেশন ফর লেইজার’ নামক সহিংসতাবিষয়ক কবিতাটি অ্যা কিউ অ্যা পরীক্ষা বোর্ড ও জিসিএসই কাব্যসংকলন থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছে এ অভিযোগে যে, এটিতে ছুরিকাঘাতে সৃষ্ট অপরাধ ও একটি গোল্ড ফিশের টয়লেটে পড়ে যাওয়ার উল্লেখ রয়েছে। ডাফি সর্বদা এটি মনে করেন, কবিতা, যা শুরু হয় এমন শব্দগুচ্ছ দিয়ে- আমি আজ কোনো কিছুকে হত্যা করতে যাচ্ছি- এটাই সহিংসতার বিরোধী।
Friday, October 31, 2014
কবিতার ভাষা : সাম্প্রতিক অন্বেষা by হামিদ রায়হান
আদি-বয়নের
মাধ্যমে একদিকে ঘটে যে উচ্চারণের কৌণিক বিন্যাস আর অন্যদিকে বহুস্বর
সঙ্গতির প্রয়াস আত্মস্থ করে নেয় বিভিন্ন তাৎপর্যের দ্বন্দ্বকে; আর এভাবে
বহুস্বরসঙ্গতিময় প্রতিবেদনে পৌঁছানোর তাগিদে কবি নির্মাণ করেন তার কবিতার
ভাষা। এতে কবিতার আপাত-সমাপ্তি ঘোষিত হলেও কবির বিশিষ্ট নির্বাচিত উচ্চারণে
যে দ্বিবাচনিক অন্বয় গড়ে ওঠে, এর নিবিড় অন্বেষণই আমাদের জায়মান পাঠকৃতির
উৎস যে কোনো শিল্প একটি নির্দিষ্ট দেশকালের কাঠামোতেই নির্মিত হয়। সে
সমন্বিত করে চারপাশের চেনাজানা সবকিছুকে। বহুমাত্রিক পরিপার্শ্বের
ক্রিয়া-বিক্রিয়া যৌগিক প্রকৃতিকে পাঠলব্ধ বোধ ও ব্যঞ্জনায় বিমূর্ত করে
তোলে। দু’ভাবে সে তা তুলে ধরে। প্রথমত, ভঙ্গি ও আচরণের মাধ্যমে; দ্বিতীয়ত,
ধ্বনি বা শব্দ গঠনের মাধ্যমে। ধ্বনি বা শব্দসমবায়ের সাহায্যে যত বেশি
পরিমাণ মনোভাব সৃষ্টি করা যায়, ভঙ্গি ও আচরণের সাহায্যে ততটা পারা যায় না।
ভঙ্গি ও আচরণের সাহায্যে মাত্র গুটিকয়েক আঙ্গিক মুদ্রা সৃষ্টি করা যায়; তবে
বেশিদূর এগোনো যায় না; কিন্তু ধ্বনির সহায়তায় মনের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাব
প্রকাশ করা সম্ভব। তাই এ ধ্বনিই হচ্ছে ভাব প্রকাশ করার মাধ্যম। ধ্বনিই হয়
এক ধরনের ভাষাচিহ্ন। মানুষ এ চিহ্নকে তার পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে, প্রকৃতি
থেকে তুলে এনে ধ্বনি-সমবায়ে কিংবা শব্দের মধ্য দিয়ে শৃংখলাবদ্ধ করে, ফলে
শব্দ বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় এর দ্যোতক ও দ্যোতিতের ক্রিয়া-বিক্রিয়ায়
ব্যাপকতা স্পষ্ট করে তোলে; সঙ্গে এ শব্দ নানা বিষয়, নানা উপকরণের
Synecdoche (সিনেকডকি) বা অখণ্ডতা নির্দেশ করে এবং তার অন্তর্গত রয়েছে
স্থান, কাল, পাত্র, ইতিহাস, বোধ, চেতনা প্রভৃতি। এসব উপাদান বিজারিত হয়ে
ঐতিহ্যিক টেক্সটকে জাগিয়ে তোলে- কাব্য শিল্পের অনুসন্ধিৎসার বিমোচনে; এবং
এনে দেয় এক ভিন্ন মাত্রিক মেটাফর। এ মেটাফর, বস্তু-চেতনা-সময়, এ সবের
ক্রান্তি দর্শনে, সত্যকে ভেঙে রূপকের মাধ্যমে এক ভাষাচিত্র নির্মাণ করে;
সঙ্গে নির্মাণ করে নিজকে ভাঙার, চিত্রিত করার শৈল্পিক ভঙ্গি এবং এর
জটপাকানো সময়, ইতিহাসবোধ। এ বোধের কাছেই উপলব্ধি চিহ্নায়নের গোপন চাবি
থাকে, যা অনুশীলিত চেতনার উত্তরণে বিশেষ সহায়ক শক্তির ভূমিকায় আবির্ভূত হয়
এবং এনে দেয় এক নৈর্ব্যক্তিকতার বোধ; সে সঙ্গে বহুস্বর সঙ্গতির আয়তনকে
ক্রমশ জোরালো করে তোলে। ফলে শব্দ হয়ে ওঠে চিন্তার ও সংস্কৃতির একরৈখিক আবরণ
ভেঙে বহুস্বরা সংস্কৃতির অন্বেষণ ও আর্কিটাইপ; এবং কবিতার ভাষা, এর অখণ্ড ও
অনন্তের দ্যোতনা।
যেহেতু কবিতার ভাষা এবং পদান্বয় কিংবা উপলব্ধির চিহ্নায়ন, বাচনিক অভিব্যক্তি ও শাব্দিক উপকরণের প্রয়োগ : সব ক্ষেত্রে কেবল নিয়ম ও অভ্যাস-অতিযায়ী সংকেত ব্যাস্ত হওয়ার উদ্ভাসক নয় কেবল, পরাবাস্তবতারও চিহ্নায়ক; এসব সমান্তরালভাবে বহমান সম্ভাব্যতার এক পরাজগৎ নির্মাণ করে, ভিন্নার্থে যা আমাদের ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক অস্তিত্বেও চেনা আদল, কবিতার পরাভাষায় নির্মিত অন্যতর আর্শিতে তাকে সামগ্রিক অবয়বে মূর্ত করে তোলার প্রয়াস লক্ষণীয়। আর এ-প্রয়াস সচেতন ও অবচেতন, দু’ভাবে হয়ে থাকে। এ-প্রসঙ্গে নর্মান ফ্লেয়ারক্লাত্ত’র মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : There is struggle over the structuring of texts and orders of discourse. এ-প্রসঙ্গে তার সুচিন্তিত মন্তব্য আমাদের বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারে: ‘Discourse may be stylistically heterogeneous due to contradictions and pressures in the speech situation’.
আমি’র জানালা খুলে বিচিত্র চিত্র দেখার জন্যই সৃষ্টি হয় ফ্রয়েডিয় মনঃসমীক্ষণ পদ্ধতির, আর লাকাঁর মানবিক চৈতন্যের অস্তিত্ববাদী সমস্যা ও চরিত্রকে উন্মোচন করার প্রয়াস লক্ষযোগ্য; আর সামগ্রিক উপলব্ধির চিত্র ধারণ করে তার মূল ভাষা। কবিতার পরিসরের মধ্যে প্রচ্ছন্ন অন্তর্নাট্যের একাধিক স্তরে স্ব-ভূমিকায় প্রকাশ পেতে থাকে। এ আত্মবিভাজিত সত্তার দর্পণে যুযুধান জগৎ ও জীবনের ফেনিল ও তীব্র অপরতার যে-স্তর উন্মোচিত হয়, তা আসলে কবিতার ভাষার পটভূমি। এ যে আসল গভীরতর উদ্ভাসনের সূচনাবিন্দু মাত্র, এইটে বুঝতে অসুবিধে হয় না। কারণ, কবি যতটুকু জানান, তার সঙ্গে সমান্তরাল এক বৃহত্তর না-জানার পরাজগৎ উন্মুখ হয়ে থাকে। ভিন্নার্থে বলা যায়, শব্দ ও নৈঃশব্দের দ্বিবাচনিকতার, এর ক্রমোন্মোচনের পথ কীভাবে তৈরি হয়, তার কূটাভাস কবির আদি-বয়নে অন্তর্হিত থেকে যায়। এ সম্পর্কে Stanley Burnashaw এর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : 'All verses are composed of sounds and silence' যা শাব্দিক ও পারিভাষিক, উভয় অর্থেই আমাদের ভাবনাকে সমর্থন করে। যে ভাবনা অভিজ্ঞতার অন্তর্গত করে তোলার জন্য ন্যূনতম নিভৃতি চায়, তখনই এর সঙ্গে আরও একটা বিশিষ্ট শব্দের সংঘাত আমাদের মস্তিষ্কে. হাতুড়ির আঘাত হানে। কারণ কবির বাচনে যে উহ্যতা, তাতে তৃপ্ত না হয়ে তিনি শূন্যায়নকে বাক্সময় করে তুলতেও প্রয়াসী। এ প্রসঙ্গে পিয়ের মাশেরের সুচিন্তিত প্রবাদপ্রতিম মন্তব্য লক্ষ্য করা যায়: 'By speech, silence becomes the centre and principle of expression, its vanishing point. Speech eventually has nothing more to tell us; we investigate the silence, for it is the silence that is doing the speaking' এ প্রসঙ্গে সন্জিদা খাতুনের মন্তব্যও বিবেচনার প্রাসঙ্গিকতা স্বীকার করা যায়। তিনি বলেছেন : ‘কবিতার শ্রাব্য ধ্বনি-সমাবেশে শ্রুত আর অশ্র“ত ধ্বনির পরস্পর লীলা বড় ভূমিকা পালন করে। ধ্বনি স্রোত ক্ষণে ক্ষণে আপন বেগ সংবরণ করে আপনার চতুর্দিকে নিঃশব্দের ঘের রচনা করেই ফুটিয়ে তোলে আপন বৈশিষ্ট্য। কবিতার মূলস্বা ধ্বনিত করার কাজে এ অবকাশের যথোচিত মূল্য বুঝে নিতে হবে। ... এই অশ্রুত ধ্বনি হৃদয়গহনে বাজে ...।’
দুই.
কবিতার ভাষিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থান-কালিক এক সীমাবদ্ধতার সূচনা। সীমাবদ্ধতা আছে বলেই অতিক্রমণ। এ সীমার বাস্তবতাকে অস্বীকার নিভৃতে, অন্তর্লীনতার প্রক্ষেপণে; নতুন মাত্রার বিস্তার ও ব্যাপ্তিতে। মূলত এ মাত্রা এক প্রতিরূপ নির্মাণের। এ নির্মাণ চেতন-অবচেতন, অদৃষ্ট-অননুভূত বাস্তবতার দেশ-কালিক পঠন এবং তার অন্তঃ ও বহিঃসত্তার ভাব ব্যাকরণও। কিন্তু কবিতার ভাষিক প্রতিরূপ-নির্মাণ প্রক্রিয়া এক বিশৃংখল ভাষিক উপলব্ধির সক্রিয়তাকে রূপ দেয়, যাতে এক মায়াবি জগতের বিপুল রহস্যেও স্বতঃস্ফূর্ত আসা-যাওয়া যা কবির বিষয়ী-সত্তার সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে ঘটে, যা কবির অনিবার্য ফোকাস। কবিতার দেহ বা ফরমেট সৃষ্টিতে কবি যা জানেন না তাই তার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়; কারণ জানাকে তার পক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এ অজ্ঞতা অনিবার্য অবচেতন ফোকাসের দ্যোতক হিসেবে নির্মাণকে পূর্ণতা দেয়। কেননা নির্বাচন শিল্পের প্রেরণ কোণের বিপ্রতীপে অবস্থান করে সর্বদা। যা হোক, কাব্য নির্মাণের এ অনিবার্য অবচেতন ফোকাস-এ মধ্যেই যেহেতু ব্যাপ্ত ও সংগুপ্ত প্রকৃতির মহত্তম নিচতম শৈল্পিক, সেহেতু এর রয়েছে এক ব্যবহারিক সমস্যা। তবে এ সমস্যার কোনো সৃজনশীল কবির, পাঠকের নয়। এ সমস্যা মূল কাব্যাজ্ঞানের কোনো অতলান্ত রহস্য, কিংবা সার্বিক মানবিক-মাননিক কাব্য উপলব্ধির অনগ্রসরতা, কিংবা হয়তো কাব্যেও কোনো অনির্ধারিত সত্য রয়েছে যা বাস্তবের গতানুগতিকতার অনধিগম্য। কারণ কাব্য সত্য ও বাস্তব সত্য কোনো পূর্ব নির্ধারিত রৈখিকতায় আবদ্ধ নেই আর। শুধু নির্মিতির চাতুর্য, শব্দ-সমবায়ে আবশ্যিকতা কিংবা প্রতিবেদনের দার্শনিকতা দিয়ে কবিতার ভাষা ও তার সত্যের সাম্প্রতিক দিগন্ত বিস্তারকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না; যাবেও না। ব্যবহারিক জগতে দৃশ্যমান অনুষঙ্গগুলো ইদানীং এত দ্রুত বাঁক নিচ্ছে যে তথাকথিত ‘বানস্তবতা’ এক অর্থে কাকতাড়ুয়ার মতো অলীক ও উদ্ভট প্রতিপন্ন হচ্ছে। কারণ পরিক্রমার কোনো নির্দিষ্ট কক্ষপথ নেই, কোনো কেন্দ্র বা লক্ষ্যবিন্দুও নেই; তাই কবিতার মধ্যে নির্মীয়মাণ সন্দর্ভ প্রতিনিয়ত সম্ভাব্য এক প্রতিসন্দর্ভের সঙ্গে সংঘর্ষাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে বিলীন বা চুরমার হয়ে যাচ্ছে আত্মগত ভাস্কর্য, যত্নে-গড়া প্রতীকায়িত চিত্রকল্পগুলো এবং উপলব্ধির পরিক্রমা। এ শূন্যায়তনকে উপলব্ধির পরা-যুক্তিতে অর্থাৎ বয়নের নিজস্ব পরাভাষায় ভরাট করে নিয়ে কবিকে বুঝে নিতে হয় কীভাবে বাস্তবের অনুপুঙ্খগুলো মূর্ত হয়ে উঠছে কিংবা রূপকের পরাভাষা দ্বিবাচনিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বাস্তবতার আয়তনের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে সমান্তরালভাবে প্রবহমান এক দ্বিবাচনিক অপর সত্তার পরা-ভাষাশ্রয়ী প্রতিবেদন নির্মিত হয়। এ প্রতিবেদন পরস্পর অবিচ্ছেদ্য যেসব স্তরের ন্যাসে-প্রতিন্যাসে গড়ে ওঠে, তার প্রতিটি শব্দের সঙ্গে সঙ্গে শব্দবিভাজনও গুরুত্বপূর্ণ, বহমানতার সঙ্গে ছেদের অন্বয় বা অনন্বয়, সংবেদনশীলতা দিয়ে উচ্চারণের বহুরৈখিকতা ও কবির আদি-বয়ন থেকে আহূত হয়েও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করে। এ আদি-বয়নের মাধ্যমে একদিকে ঘটে যে উচ্চারণের কৌণিক বিন্যাস আর অন্যদিকে বহুস্বর সঙ্গতির প্রয়াস আত্মস্থ করে নেয় বিভিন্ন তাৎপর্যের দ্বন্দ্বকে; আর এভাবে বহুস্বরসঙ্গতিময় প্রতিবেদনে পৌঁছানোর তাগিদে কবি নির্মাণ করেন তার কবিতার ভাষা। এতে কবিতার আপাত-সমাপ্তি ঘোষিত হলেও কবির বিশিষ্ট নির্বাচিত উচ্চারণে যে দ্বিবাচনিক অন্বয় গড়ে ওঠে, এর নিবিড় অন্বেষণই আমাদের জায়মান পাঠকৃতির উৎস, যা অপরতার দর্পণে প্রতিফলিত বহুবিভাজিত সত্তার সত্য ও সত্যভ্রম উপলব্ধিতে সহায়তা করবে; অর্থাৎ বাখতিনের মৌল অনুভব, ‘Nothing is anything in itself’-এর প্রাসঙ্গিকতাকে বিশিষ্টতা দান করে।
তিন.
কবিতার ভাষা কৃতি-অতিরিক্ত গ্রন্থন (extra-textual structure)-এর যে জটিলতা তা সম্পূর্ণভাবে আধুনিক ও অতি আধুনিকতাবাদীরই সৃষ্টি। এ জীর্ণ ও ক্লিশে আধুনিকতাবাদী বৃত্তাবদ্ধ কবিতার ভাষা শৈলীর এক রৈখিকতা ভেঙে, তৈরি হচ্ছে আজকের কবিতার বাক এবং তা হয়ে উঠেছে ক্রমশ সংস্কৃতিমুখী বহুস্বরের সাঙ্গীতিক ভাষা। সমাজ ও ঐতিহ্য এবং জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কশূন্যতার প্রেক্ষাপটে কবিতার ভাষায় মাত্রারিক্ত ব্যক্তিক উচ্চারণের একমুখো, আপাতসরল দুর্বোধ্য গ্রন্থনা ও কৃত্রিম অন্তঃসারশূন্য উলম্বচারী জীবনচেতনার ক্ষুদ্রগণ্ডির অভিঘাতে কবিতার ভাষায় একটি প্রান্তিক অবয়ব লক্ষ্যগোচর হয়ে ওঠে। সমাজ-সম্পর্কশূন্য অথচ জটিল ও দুর্বোধ্য অভিজ্ঞতার বৃত্তাবর্তে পড়ে তা উচ্চারিত ও মুখর হতে থাকে অস্বাভাবিক ও বিপর্যয়ের বাক্যবন্ধরূপে; এবং ভাষা সংস্থাপনের ভঙ্গি হয়ে ওঠে একটি বিমূর্ত, অলভ্য ও অন্তঃসারহীন চাকচিক্যময় কাব্যভাষার শব্দ গঠন। এ সময়ের কবিতার ভাষা লক্ষ করলে দেখা যায় তা অধিকাংশ (ব্যতিক্রম আছে, তবে তা খুব ক্ষীণ) আধুনিকতাবাদী কবিরই উগ্র প্রবণতায় পর্যবসিত। প্রত্যেক কবির সাজানো কিন্তু অস্বতঃস্ফূর্ত আর্তি, নিঃসঙ্গতাবোধ, হতাশা এবং ক্লেদাক্ত উপলব্ধি- ভাষাকথনের প্রকাশ একই মাত্রায়, একই বিন্যাসে সাজানো ও গোছানো। সামগ্রিক সামাজিকতার অভাব, সঙ্গে দার্শনিক প্রত্যয়ের পৌরুষেরত্বের অভাবের ফলেই কবিতার ভাষা পরিবর্তনশীল, এর বিপরীতে আধুনিকতাবাদীদের উচ্চারণ একটি স্রোতহীন ভাষাচক্রে সমর্পিত। এ বিপত্তির উৎস অন্তর্নিহিত জীবনবোধে এবং মহৎ উত্তরণের আকাক্সক্ষাহীন অস্থিহীন ব্যক্তিস্বরের উন্মত্ততা ও ভ্রান্তির ভেতর।
যে ভাষার ভিত্তি বিভ্রান্তির মধ্যে ভিন্নার্থে ঔপনিবেশিক শিল্প-সংস্কৃতির মধ্যে শেকড়ায়িত, যা তিরিশের কালচক্রে য়ুরোপের যে অধরাবাহিক ফসল তাকে পাশ কাটিয়েই আজকের কবিতার এ বাক্ পরিবর্তন; সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বহুস্বরা সংস্কৃতির ভাষা, যার স্বরচেতন মায়াবি বিন্যাসে সব মিলিয়ে জীবনের জগতের সব এবং কবিতা হয়ে উঠছে কৃতি। স্বনিম তত্ত্বের (phonemic theory) ধারাবাহিকতায় অর্থিম তত্ত্বে (sememe theory) থেকে যে আকরণমূলক বাগর্থের (structural semantics) সূত্রপাত; এ seme-এর মাধ্যমে সব ধরনের বাগর্থ (verbal meaning)-এ গ্রন্থিত বাক্যগুলো কৃতির (Text) অর্থদ্যোতনার সামগ্রিকতা, যাকে গ্রিমাস Totalite de signification বলে চিহ্নিত করেছেন, তা ব্যাখ্যা করা যায়। গ্রিমাস যে বৈপরীত্যের কথা বলেছেন তা হল Immanence & manipulation-এর বৈপরীত্যের কথা। প্রথমটি হল আমাদের অভিজ্ঞতার পৃথিবীর সব বৈশিষ্ট্যের একটা মানসিক অবধারণ চিহ্ন (conceptual map); দ্বিতীয়টির দ্বারা ভাষা বিশেষে এ অবধারণ চিত্রের semes বা তাদের বৈশিষ্ট্যের কোনগুলো কোন পরিবেশে বা পরিস্থিতিতে কেমন বিন্যাসে ব্যবহৃত হয় সে-বিষয়ে ইঙ্গিত করে। শব্দ যেহেতু বাক্য বিশেষে অর্থ বদলায়, তাই গ্রিমাসের মতে একটি শব্দের একটি অপরিবর্তনীয় মূল (invariant core) থাকে, যাতে এক বা একাধিক seme-এ পরিবেশ নির্ভর seme-এর একটি (series of contextual semes) পর্যায়ক্রম বিদ্যমান থাকে। শব্দের অর্থবোধের বেলায় এগুলোর মধ্য থেকে কোনটিকে বা কোনগুলোকে নেয়া হবে তা নির্ভর করে বাক্যে ব্যবহৃত অন্যান্য seme গুলোর পুনরাবৃত্তি। বাক্যে পুনরাবৃত্ত seme গুলোকে গ্রিমাস বলেছেন classemes, এই classemes যখন বাক্যেও ঊর্ধ্বতন স্তরে (যেমন- কবিতায়, অনুচ্ছেদে) পুনরাবৃত্ত হয় তখনই পাঠ একটি সন্তুলন (coherence) খুঁজে পায়; আর এ ভারসাম্য বা সন্তুলনই হল Isotopy.
কবিতার ভাষা যে সম্পূর্ণ কৃতি একটি সমজনিত অর্থবিজ্ঞানের স্তরে অবস্থিত; কবি চাইলেই এই সন্তুলন ও সমজনিত (homogeneity) ভেঙে ছত্রখান হয়ে যেতে পারে। তাই কবিতার বিশ্লেষণে Isotopy ভেঙে কিংবা এর বিপরীতে অবস্থান করে কীভাবে এর ভাষার জাল বোনা হয় ভাবের সমান্তরালে তাই দেখতে হবে আমাদের। যে কোনো কবিতা যা এই সন্তুলন ও সমজনিত ভেঙে হয় এর ভাষা নৈরাশ্য না এর বিপরীত, তা সামগ্রিক অর্থে নির্ভর করে এর চরিত্রের ওপর। কারণ ভাষার নৈরাশ্য-অনৈরাশ্য বলতে কিছু নেই।
কবিতার ভাষা ক্রমবিকাশমান; স্তর থেকে স্তরান্তরে প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কবিতার ভাষায় কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। কবিতার ভাষা মানুষের জিহ্বার মতো সক্রিয়। মূলত চেতনা ও উপলব্ধির ভিন্নতর বিস্তৃতিই কবিতার ভাষার উৎসাগার; আর আদিকাল থেকে ভাষার বৃত্তায়ন ঘটেছে তার পটভূমির বিবর্তনে। ভাষা মানুষের চেতনাগত এ বিবিধ রূপান্তরের ইতিবৃত্ত।
ভাষা স্বয়ম্ভরা। এ স্বয়ম্ভরা বলেই এর যেমন একটা নিজস্ব বস্তু-সংসার আছে, তেমনি সৃজনেরও একটা অর্থ-সংসার আছে ব্যাকরণ নিয়ে। তাই একথা বললে একটুও দ্বিরুক্তি হবে না যে ভাষা ও ব্যাকরণের মধ্যেকার সম্বন্ধ সমান্তর রেখা, যা ব্যাকরণ দর্পণে তাকে আর ধারার উপায় নেই। এ প্রসঙ্গে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর সুচিন্তিত মন্তব্য বিশেষ অর্থে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘আমি যে ব্যাকরণের কথা বলিতেছি, তাহার উদ্দেশ্য নিয়ম রচনা নহে; নিয়ম প্রণয়ন নহে; নিয়ম আবিষ্কার। ভাষার মধ্যে অজ্ঞাত অপরিচিত নিয়ম বর্তমান আছে, সেই নিয়ম খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। নিয়ম সকল ভাষাতেই আছে। ... কেননা অনিয়ম, শৃঙ্খলারহিত ভাষা চিন্তার অগোচর। ... নিয়ম সাহিত্যের ভাষাতে আছে, লৌকিক ভাষাতেও আছে। কথাবার্তার ভাষা অনেকটা বন্ধনশূন্য বলিয়া বোধ হয়, কিন্তু বস্তুতই কি তাহা শৃঙ্খলাবর্জিত? অসম্ভব। ... কিন্তু ভূতাত্ত্বিকরা বর্তমান কালের নিয়ম আবিষ্কার করেন বলিয়া ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের রোধ হয় না। ভাষার পক্ষেও সেই এক কথা। পাণিনি ব্যাকরণ রচনা করিয়া সংস্কৃত ভাষার পরিবর্তন রোধ করিতে পারেন নাই।’
ভাষা যেহেতু সংস্কৃতির বয়ন সে-কারণে কবিতা ও ভাষাতত্ত্বের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; ফলে কবিতার ভাষার কৃতির আড়ালে যুক্ত থাকে গোষ্ঠী, জাতি, ধর্ম ও শ্রেণীচেতনা। মিথ, বিশ্বাস, লৌকিক-অলৌকিক, বস্তু ও ভাবনার বিভিন্ন আর্কিটাইপ থাকে পরিবেশ পরিস্থিতি। স্থানকালের ভঙ্গি ও বয়ন। এতসব কিছুর মিথষ্ক্রিয়ার ফলে নির্মিতি পায় কবিতার অবয়ব। আর তাকে প্রকাশের মাধ্যম হল শব্দ। কবিতার ভাষা এ শব্দকে জারন প্রক্রিয়ায় বের করে আনে তার ভেতরকার অফুরন্ত কথকতা। শব্দ একটি যতি চিহ্ন; তাই চিহ্ন ও চিহ্নিতের মধ্যেকার যে সম্প্রেষণ (communication) কবিতার ভাষার, ভাষা সেই সম্প্রেষণের আধেয়; ফলে তা অবরোহি বা আরোহী সাধারণীকরণ অতিক্রম করে হয়ে ওঠে মানবভাষা, যা কবিতার ভাষার আধেয়। আর আধেয়ই নির্মাণ করছে আজকের কবিতার ভাষাশৈলী, যা একই সঙ্গে হয়ে উঠছে ত্রিকালের ভাষা; সেই সঙ্গে চিন্তার ও সংস্কৃতির একরৈখিক আবরণ ভেঙে বহুস্বরা সংস্কৃতির অন্বেষণ।
যেহেতু কবিতার ভাষা এবং পদান্বয় কিংবা উপলব্ধির চিহ্নায়ন, বাচনিক অভিব্যক্তি ও শাব্দিক উপকরণের প্রয়োগ : সব ক্ষেত্রে কেবল নিয়ম ও অভ্যাস-অতিযায়ী সংকেত ব্যাস্ত হওয়ার উদ্ভাসক নয় কেবল, পরাবাস্তবতারও চিহ্নায়ক; এসব সমান্তরালভাবে বহমান সম্ভাব্যতার এক পরাজগৎ নির্মাণ করে, ভিন্নার্থে যা আমাদের ব্যক্তিসত্তা ও সামাজিক অস্তিত্বেও চেনা আদল, কবিতার পরাভাষায় নির্মিত অন্যতর আর্শিতে তাকে সামগ্রিক অবয়বে মূর্ত করে তোলার প্রয়াস লক্ষণীয়। আর এ-প্রয়াস সচেতন ও অবচেতন, দু’ভাবে হয়ে থাকে। এ-প্রসঙ্গে নর্মান ফ্লেয়ারক্লাত্ত’র মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : There is struggle over the structuring of texts and orders of discourse. এ-প্রসঙ্গে তার সুচিন্তিত মন্তব্য আমাদের বিশেষভাবে সাহায্য করতে পারে: ‘Discourse may be stylistically heterogeneous due to contradictions and pressures in the speech situation’.
আমি’র জানালা খুলে বিচিত্র চিত্র দেখার জন্যই সৃষ্টি হয় ফ্রয়েডিয় মনঃসমীক্ষণ পদ্ধতির, আর লাকাঁর মানবিক চৈতন্যের অস্তিত্ববাদী সমস্যা ও চরিত্রকে উন্মোচন করার প্রয়াস লক্ষযোগ্য; আর সামগ্রিক উপলব্ধির চিত্র ধারণ করে তার মূল ভাষা। কবিতার পরিসরের মধ্যে প্রচ্ছন্ন অন্তর্নাট্যের একাধিক স্তরে স্ব-ভূমিকায় প্রকাশ পেতে থাকে। এ আত্মবিভাজিত সত্তার দর্পণে যুযুধান জগৎ ও জীবনের ফেনিল ও তীব্র অপরতার যে-স্তর উন্মোচিত হয়, তা আসলে কবিতার ভাষার পটভূমি। এ যে আসল গভীরতর উদ্ভাসনের সূচনাবিন্দু মাত্র, এইটে বুঝতে অসুবিধে হয় না। কারণ, কবি যতটুকু জানান, তার সঙ্গে সমান্তরাল এক বৃহত্তর না-জানার পরাজগৎ উন্মুখ হয়ে থাকে। ভিন্নার্থে বলা যায়, শব্দ ও নৈঃশব্দের দ্বিবাচনিকতার, এর ক্রমোন্মোচনের পথ কীভাবে তৈরি হয়, তার কূটাভাস কবির আদি-বয়নে অন্তর্হিত থেকে যায়। এ সম্পর্কে Stanley Burnashaw এর মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন : 'All verses are composed of sounds and silence' যা শাব্দিক ও পারিভাষিক, উভয় অর্থেই আমাদের ভাবনাকে সমর্থন করে। যে ভাবনা অভিজ্ঞতার অন্তর্গত করে তোলার জন্য ন্যূনতম নিভৃতি চায়, তখনই এর সঙ্গে আরও একটা বিশিষ্ট শব্দের সংঘাত আমাদের মস্তিষ্কে. হাতুড়ির আঘাত হানে। কারণ কবির বাচনে যে উহ্যতা, তাতে তৃপ্ত না হয়ে তিনি শূন্যায়নকে বাক্সময় করে তুলতেও প্রয়াসী। এ প্রসঙ্গে পিয়ের মাশেরের সুচিন্তিত প্রবাদপ্রতিম মন্তব্য লক্ষ্য করা যায়: 'By speech, silence becomes the centre and principle of expression, its vanishing point. Speech eventually has nothing more to tell us; we investigate the silence, for it is the silence that is doing the speaking' এ প্রসঙ্গে সন্জিদা খাতুনের মন্তব্যও বিবেচনার প্রাসঙ্গিকতা স্বীকার করা যায়। তিনি বলেছেন : ‘কবিতার শ্রাব্য ধ্বনি-সমাবেশে শ্রুত আর অশ্র“ত ধ্বনির পরস্পর লীলা বড় ভূমিকা পালন করে। ধ্বনি স্রোত ক্ষণে ক্ষণে আপন বেগ সংবরণ করে আপনার চতুর্দিকে নিঃশব্দের ঘের রচনা করেই ফুটিয়ে তোলে আপন বৈশিষ্ট্য। কবিতার মূলস্বা ধ্বনিত করার কাজে এ অবকাশের যথোচিত মূল্য বুঝে নিতে হবে। ... এই অশ্রুত ধ্বনি হৃদয়গহনে বাজে ...।’
দুই.
কবিতার ভাষিক পরিপ্রেক্ষিতে স্থান-কালিক এক সীমাবদ্ধতার সূচনা। সীমাবদ্ধতা আছে বলেই অতিক্রমণ। এ সীমার বাস্তবতাকে অস্বীকার নিভৃতে, অন্তর্লীনতার প্রক্ষেপণে; নতুন মাত্রার বিস্তার ও ব্যাপ্তিতে। মূলত এ মাত্রা এক প্রতিরূপ নির্মাণের। এ নির্মাণ চেতন-অবচেতন, অদৃষ্ট-অননুভূত বাস্তবতার দেশ-কালিক পঠন এবং তার অন্তঃ ও বহিঃসত্তার ভাব ব্যাকরণও। কিন্তু কবিতার ভাষিক প্রতিরূপ-নির্মাণ প্রক্রিয়া এক বিশৃংখল ভাষিক উপলব্ধির সক্রিয়তাকে রূপ দেয়, যাতে এক মায়াবি জগতের বিপুল রহস্যেও স্বতঃস্ফূর্ত আসা-যাওয়া যা কবির বিষয়ী-সত্তার সংমিশ্রণের মধ্য দিয়ে ঘটে, যা কবির অনিবার্য ফোকাস। কবিতার দেহ বা ফরমেট সৃষ্টিতে কবি যা জানেন না তাই তার মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়; কারণ জানাকে তার পক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এ অজ্ঞতা অনিবার্য অবচেতন ফোকাসের দ্যোতক হিসেবে নির্মাণকে পূর্ণতা দেয়। কেননা নির্বাচন শিল্পের প্রেরণ কোণের বিপ্রতীপে অবস্থান করে সর্বদা। যা হোক, কাব্য নির্মাণের এ অনিবার্য অবচেতন ফোকাস-এ মধ্যেই যেহেতু ব্যাপ্ত ও সংগুপ্ত প্রকৃতির মহত্তম নিচতম শৈল্পিক, সেহেতু এর রয়েছে এক ব্যবহারিক সমস্যা। তবে এ সমস্যার কোনো সৃজনশীল কবির, পাঠকের নয়। এ সমস্যা মূল কাব্যাজ্ঞানের কোনো অতলান্ত রহস্য, কিংবা সার্বিক মানবিক-মাননিক কাব্য উপলব্ধির অনগ্রসরতা, কিংবা হয়তো কাব্যেও কোনো অনির্ধারিত সত্য রয়েছে যা বাস্তবের গতানুগতিকতার অনধিগম্য। কারণ কাব্য সত্য ও বাস্তব সত্য কোনো পূর্ব নির্ধারিত রৈখিকতায় আবদ্ধ নেই আর। শুধু নির্মিতির চাতুর্য, শব্দ-সমবায়ে আবশ্যিকতা কিংবা প্রতিবেদনের দার্শনিকতা দিয়ে কবিতার ভাষা ও তার সত্যের সাম্প্রতিক দিগন্ত বিস্তারকে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না; যাবেও না। ব্যবহারিক জগতে দৃশ্যমান অনুষঙ্গগুলো ইদানীং এত দ্রুত বাঁক নিচ্ছে যে তথাকথিত ‘বানস্তবতা’ এক অর্থে কাকতাড়ুয়ার মতো অলীক ও উদ্ভট প্রতিপন্ন হচ্ছে। কারণ পরিক্রমার কোনো নির্দিষ্ট কক্ষপথ নেই, কোনো কেন্দ্র বা লক্ষ্যবিন্দুও নেই; তাই কবিতার মধ্যে নির্মীয়মাণ সন্দর্ভ প্রতিনিয়ত সম্ভাব্য এক প্রতিসন্দর্ভের সঙ্গে সংঘর্ষাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে বিলীন বা চুরমার হয়ে যাচ্ছে আত্মগত ভাস্কর্য, যত্নে-গড়া প্রতীকায়িত চিত্রকল্পগুলো এবং উপলব্ধির পরিক্রমা। এ শূন্যায়তনকে উপলব্ধির পরা-যুক্তিতে অর্থাৎ বয়নের নিজস্ব পরাভাষায় ভরাট করে নিয়ে কবিকে বুঝে নিতে হয় কীভাবে বাস্তবের অনুপুঙ্খগুলো মূর্ত হয়ে উঠছে কিংবা রূপকের পরাভাষা দ্বিবাচনিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে বাস্তবতার আয়তনের ব্যাপ্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যাতে সমান্তরালভাবে প্রবহমান এক দ্বিবাচনিক অপর সত্তার পরা-ভাষাশ্রয়ী প্রতিবেদন নির্মিত হয়। এ প্রতিবেদন পরস্পর অবিচ্ছেদ্য যেসব স্তরের ন্যাসে-প্রতিন্যাসে গড়ে ওঠে, তার প্রতিটি শব্দের সঙ্গে সঙ্গে শব্দবিভাজনও গুরুত্বপূর্ণ, বহমানতার সঙ্গে ছেদের অন্বয় বা অনন্বয়, সংবেদনশীলতা দিয়ে উচ্চারণের বহুরৈখিকতা ও কবির আদি-বয়ন থেকে আহূত হয়েও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে চিহ্নিত করে। এ আদি-বয়নের মাধ্যমে একদিকে ঘটে যে উচ্চারণের কৌণিক বিন্যাস আর অন্যদিকে বহুস্বর সঙ্গতির প্রয়াস আত্মস্থ করে নেয় বিভিন্ন তাৎপর্যের দ্বন্দ্বকে; আর এভাবে বহুস্বরসঙ্গতিময় প্রতিবেদনে পৌঁছানোর তাগিদে কবি নির্মাণ করেন তার কবিতার ভাষা। এতে কবিতার আপাত-সমাপ্তি ঘোষিত হলেও কবির বিশিষ্ট নির্বাচিত উচ্চারণে যে দ্বিবাচনিক অন্বয় গড়ে ওঠে, এর নিবিড় অন্বেষণই আমাদের জায়মান পাঠকৃতির উৎস, যা অপরতার দর্পণে প্রতিফলিত বহুবিভাজিত সত্তার সত্য ও সত্যভ্রম উপলব্ধিতে সহায়তা করবে; অর্থাৎ বাখতিনের মৌল অনুভব, ‘Nothing is anything in itself’-এর প্রাসঙ্গিকতাকে বিশিষ্টতা দান করে।
তিন.
কবিতার ভাষা কৃতি-অতিরিক্ত গ্রন্থন (extra-textual structure)-এর যে জটিলতা তা সম্পূর্ণভাবে আধুনিক ও অতি আধুনিকতাবাদীরই সৃষ্টি। এ জীর্ণ ও ক্লিশে আধুনিকতাবাদী বৃত্তাবদ্ধ কবিতার ভাষা শৈলীর এক রৈখিকতা ভেঙে, তৈরি হচ্ছে আজকের কবিতার বাক এবং তা হয়ে উঠেছে ক্রমশ সংস্কৃতিমুখী বহুস্বরের সাঙ্গীতিক ভাষা। সমাজ ও ঐতিহ্য এবং জনজীবনের সঙ্গে সম্পর্কশূন্যতার প্রেক্ষাপটে কবিতার ভাষায় মাত্রারিক্ত ব্যক্তিক উচ্চারণের একমুখো, আপাতসরল দুর্বোধ্য গ্রন্থনা ও কৃত্রিম অন্তঃসারশূন্য উলম্বচারী জীবনচেতনার ক্ষুদ্রগণ্ডির অভিঘাতে কবিতার ভাষায় একটি প্রান্তিক অবয়ব লক্ষ্যগোচর হয়ে ওঠে। সমাজ-সম্পর্কশূন্য অথচ জটিল ও দুর্বোধ্য অভিজ্ঞতার বৃত্তাবর্তে পড়ে তা উচ্চারিত ও মুখর হতে থাকে অস্বাভাবিক ও বিপর্যয়ের বাক্যবন্ধরূপে; এবং ভাষা সংস্থাপনের ভঙ্গি হয়ে ওঠে একটি বিমূর্ত, অলভ্য ও অন্তঃসারহীন চাকচিক্যময় কাব্যভাষার শব্দ গঠন। এ সময়ের কবিতার ভাষা লক্ষ করলে দেখা যায় তা অধিকাংশ (ব্যতিক্রম আছে, তবে তা খুব ক্ষীণ) আধুনিকতাবাদী কবিরই উগ্র প্রবণতায় পর্যবসিত। প্রত্যেক কবির সাজানো কিন্তু অস্বতঃস্ফূর্ত আর্তি, নিঃসঙ্গতাবোধ, হতাশা এবং ক্লেদাক্ত উপলব্ধি- ভাষাকথনের প্রকাশ একই মাত্রায়, একই বিন্যাসে সাজানো ও গোছানো। সামগ্রিক সামাজিকতার অভাব, সঙ্গে দার্শনিক প্রত্যয়ের পৌরুষেরত্বের অভাবের ফলেই কবিতার ভাষা পরিবর্তনশীল, এর বিপরীতে আধুনিকতাবাদীদের উচ্চারণ একটি স্রোতহীন ভাষাচক্রে সমর্পিত। এ বিপত্তির উৎস অন্তর্নিহিত জীবনবোধে এবং মহৎ উত্তরণের আকাক্সক্ষাহীন অস্থিহীন ব্যক্তিস্বরের উন্মত্ততা ও ভ্রান্তির ভেতর।
যে ভাষার ভিত্তি বিভ্রান্তির মধ্যে ভিন্নার্থে ঔপনিবেশিক শিল্প-সংস্কৃতির মধ্যে শেকড়ায়িত, যা তিরিশের কালচক্রে য়ুরোপের যে অধরাবাহিক ফসল তাকে পাশ কাটিয়েই আজকের কবিতার এ বাক্ পরিবর্তন; সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বহুস্বরা সংস্কৃতির ভাষা, যার স্বরচেতন মায়াবি বিন্যাসে সব মিলিয়ে জীবনের জগতের সব এবং কবিতা হয়ে উঠছে কৃতি। স্বনিম তত্ত্বের (phonemic theory) ধারাবাহিকতায় অর্থিম তত্ত্বে (sememe theory) থেকে যে আকরণমূলক বাগর্থের (structural semantics) সূত্রপাত; এ seme-এর মাধ্যমে সব ধরনের বাগর্থ (verbal meaning)-এ গ্রন্থিত বাক্যগুলো কৃতির (Text) অর্থদ্যোতনার সামগ্রিকতা, যাকে গ্রিমাস Totalite de signification বলে চিহ্নিত করেছেন, তা ব্যাখ্যা করা যায়। গ্রিমাস যে বৈপরীত্যের কথা বলেছেন তা হল Immanence & manipulation-এর বৈপরীত্যের কথা। প্রথমটি হল আমাদের অভিজ্ঞতার পৃথিবীর সব বৈশিষ্ট্যের একটা মানসিক অবধারণ চিহ্ন (conceptual map); দ্বিতীয়টির দ্বারা ভাষা বিশেষে এ অবধারণ চিত্রের semes বা তাদের বৈশিষ্ট্যের কোনগুলো কোন পরিবেশে বা পরিস্থিতিতে কেমন বিন্যাসে ব্যবহৃত হয় সে-বিষয়ে ইঙ্গিত করে। শব্দ যেহেতু বাক্য বিশেষে অর্থ বদলায়, তাই গ্রিমাসের মতে একটি শব্দের একটি অপরিবর্তনীয় মূল (invariant core) থাকে, যাতে এক বা একাধিক seme-এ পরিবেশ নির্ভর seme-এর একটি (series of contextual semes) পর্যায়ক্রম বিদ্যমান থাকে। শব্দের অর্থবোধের বেলায় এগুলোর মধ্য থেকে কোনটিকে বা কোনগুলোকে নেয়া হবে তা নির্ভর করে বাক্যে ব্যবহৃত অন্যান্য seme গুলোর পুনরাবৃত্তি। বাক্যে পুনরাবৃত্ত seme গুলোকে গ্রিমাস বলেছেন classemes, এই classemes যখন বাক্যেও ঊর্ধ্বতন স্তরে (যেমন- কবিতায়, অনুচ্ছেদে) পুনরাবৃত্ত হয় তখনই পাঠ একটি সন্তুলন (coherence) খুঁজে পায়; আর এ ভারসাম্য বা সন্তুলনই হল Isotopy.
কবিতার ভাষা যে সম্পূর্ণ কৃতি একটি সমজনিত অর্থবিজ্ঞানের স্তরে অবস্থিত; কবি চাইলেই এই সন্তুলন ও সমজনিত (homogeneity) ভেঙে ছত্রখান হয়ে যেতে পারে। তাই কবিতার বিশ্লেষণে Isotopy ভেঙে কিংবা এর বিপরীতে অবস্থান করে কীভাবে এর ভাষার জাল বোনা হয় ভাবের সমান্তরালে তাই দেখতে হবে আমাদের। যে কোনো কবিতা যা এই সন্তুলন ও সমজনিত ভেঙে হয় এর ভাষা নৈরাশ্য না এর বিপরীত, তা সামগ্রিক অর্থে নির্ভর করে এর চরিত্রের ওপর। কারণ ভাষার নৈরাশ্য-অনৈরাশ্য বলতে কিছু নেই।
কবিতার ভাষা ক্রমবিকাশমান; স্তর থেকে স্তরান্তরে প্রোজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অর্থাৎ কবিতার ভাষায় কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। কবিতার ভাষা মানুষের জিহ্বার মতো সক্রিয়। মূলত চেতনা ও উপলব্ধির ভিন্নতর বিস্তৃতিই কবিতার ভাষার উৎসাগার; আর আদিকাল থেকে ভাষার বৃত্তায়ন ঘটেছে তার পটভূমির বিবর্তনে। ভাষা মানুষের চেতনাগত এ বিবিধ রূপান্তরের ইতিবৃত্ত।
ভাষা স্বয়ম্ভরা। এ স্বয়ম্ভরা বলেই এর যেমন একটা নিজস্ব বস্তু-সংসার আছে, তেমনি সৃজনেরও একটা অর্থ-সংসার আছে ব্যাকরণ নিয়ে। তাই একথা বললে একটুও দ্বিরুক্তি হবে না যে ভাষা ও ব্যাকরণের মধ্যেকার সম্বন্ধ সমান্তর রেখা, যা ব্যাকরণ দর্পণে তাকে আর ধারার উপায় নেই। এ প্রসঙ্গে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর সুচিন্তিত মন্তব্য বিশেষ অর্থে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেছেন, ‘আমি যে ব্যাকরণের কথা বলিতেছি, তাহার উদ্দেশ্য নিয়ম রচনা নহে; নিয়ম প্রণয়ন নহে; নিয়ম আবিষ্কার। ভাষার মধ্যে অজ্ঞাত অপরিচিত নিয়ম বর্তমান আছে, সেই নিয়ম খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। নিয়ম সকল ভাষাতেই আছে। ... কেননা অনিয়ম, শৃঙ্খলারহিত ভাষা চিন্তার অগোচর। ... নিয়ম সাহিত্যের ভাষাতে আছে, লৌকিক ভাষাতেও আছে। কথাবার্তার ভাষা অনেকটা বন্ধনশূন্য বলিয়া বোধ হয়, কিন্তু বস্তুতই কি তাহা শৃঙ্খলাবর্জিত? অসম্ভব। ... কিন্তু ভূতাত্ত্বিকরা বর্তমান কালের নিয়ম আবিষ্কার করেন বলিয়া ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের রোধ হয় না। ভাষার পক্ষেও সেই এক কথা। পাণিনি ব্যাকরণ রচনা করিয়া সংস্কৃত ভাষার পরিবর্তন রোধ করিতে পারেন নাই।’
ভাষা যেহেতু সংস্কৃতির বয়ন সে-কারণে কবিতা ও ভাষাতত্ত্বের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; ফলে কবিতার ভাষার কৃতির আড়ালে যুক্ত থাকে গোষ্ঠী, জাতি, ধর্ম ও শ্রেণীচেতনা। মিথ, বিশ্বাস, লৌকিক-অলৌকিক, বস্তু ও ভাবনার বিভিন্ন আর্কিটাইপ থাকে পরিবেশ পরিস্থিতি। স্থানকালের ভঙ্গি ও বয়ন। এতসব কিছুর মিথষ্ক্রিয়ার ফলে নির্মিতি পায় কবিতার অবয়ব। আর তাকে প্রকাশের মাধ্যম হল শব্দ। কবিতার ভাষা এ শব্দকে জারন প্রক্রিয়ায় বের করে আনে তার ভেতরকার অফুরন্ত কথকতা। শব্দ একটি যতি চিহ্ন; তাই চিহ্ন ও চিহ্নিতের মধ্যেকার যে সম্প্রেষণ (communication) কবিতার ভাষার, ভাষা সেই সম্প্রেষণের আধেয়; ফলে তা অবরোহি বা আরোহী সাধারণীকরণ অতিক্রম করে হয়ে ওঠে মানবভাষা, যা কবিতার ভাষার আধেয়। আর আধেয়ই নির্মাণ করছে আজকের কবিতার ভাষাশৈলী, যা একই সঙ্গে হয়ে উঠছে ত্রিকালের ভাষা; সেই সঙ্গে চিন্তার ও সংস্কৃতির একরৈখিক আবরণ ভেঙে বহুস্বরা সংস্কৃতির অন্বেষণ।
Friday, September 5, 2014
কবিতা ও ইলিশ গবেষণা by অমিতাভ অপু
কবিতা
ছাড়া পৃথিবীতে আর কিছুই নির্ভরযোগ্য নয়। কবিতাতেই মেলবে সারা বিশ্ব। এ
যুগে এমন বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে চলে গেছেন দু’বাংলার কবিতার স্বপ্নে বিভোর
কবি-গবেষক উত্তম দাশ। এক শতাব্দীর কবিতার গবেষণায় নতুন মাত্রা যোগ করে হয়ে
ওঠেন সিদ্ধপুরুষ। গত বছর বিশ্ব বাংলা কবিতার প্রকাশনা ছিল আরও এক অনন্য
সংযোজন। বাংলা কবিতার অন্তঃপ্রকৃতির সঙ্গে আধুনিকতার মিল খুঁজে ফেরা এ কবির
এভাবে সাড়ে চুয়াত্তর বছর বয়সে চলে যাওয়া কাম্য ছিল না। সুস্থ্য জীবনযাপন
করলেও গত ১২ জুন রাতে কয়েক মিনিটের বুক ব্যথা-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে পশ্চিম
বাংলার পদ্ম-পুকুরে নিজ বাড়িতেই ইহলোক ত্যাগ করেন তিনি। কিশোর বয়স থেকে
আমৃত্যু ভারতের বিভিন্ন রাজ্যসহ বিশ্বের বহু দেশ ঘুরে বেড়ালেও শৈশবের
জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি তার অন্তর্টান ছিল বরাবর। গত ১০ বছরে একাধিকবার
সস্ত্রীক ছুটে এসেছিলেন এ দেশে। প্রকৃতি আর শৈশবকে খুঁজে ফিরেছেন।
উত্তম দাশ এ দেশে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চর-সেন্দর গ্রামে দাদু (নানা) শচিন্দ লাল রায়ের মোক্তার বাড়িতে ১৯৩৯ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। নিজেদের বাড়িও ছিল ওই গ্রামেই। পিতা কুমুদবন্ধু দাশের সরকারি চাকরির সুবাদে যুক্ত ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। মূলত ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় মাত্র ৮ বছর বয়সে উত্তম দাশ মা ছবি দাশের সঙ্গে এ দেশ ত্যাগ করে বাবার কর্মস্থল ভারতে চলে যান। পশ্চিম বাংলার বারইপুরে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাসাহিত্যে এমএ ও ১৯৭১ সালে বাংলাসাহিত্যে সনেট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। কলেজে অধ্যাপনা করার পাশাপাশি কবিতা লেখা ও সাহিত্য গবেষণা ছিল তার নেশা ও পেশা। তার সম্পাদিত সাহিত্যপত্র মহাদিগন্তে বহু বাঙালি কবির প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮টি কবিতার বই’র মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রুনুকে, ভারতবর্ষের একজন, নির্মাণে এসেছে, রাত্রির স্থাপত্য, ভ্রমণের দাগ, কাব্য নাট্য ও কবিতা, ভারতীয় কবির ডাইরী, প্রবন্ধের মধ্যে বাংলাসাহিত্যে সনেট, কবিতার সেতুবন্ধ, হাংরি শ্র“তি, শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, বাংলা ছন্দের কূটস্থান, বাংলা ছন্দের অন্তঃপ্রকৃতি, ক্ষুধিত প্রজন্ম, শতবর্ষের আলোকে জীবনানন্দ দাশ ২০০০, শতবর্ষের আলোকে বুদ্ধদেব বসু ২০০৮। সম্পাদিত কবিতার বই ‘শতাব্দীর বাংলা কবিতা’, বিশ্ব বাংলা কবিতা এতে ৩শ’ কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা ও জীবনবৃত্তান্ত প্রকাশ পায়। বইটি আলোড়িত হয়ে ছিল ব্যাপক। শেষ বয়সে শৈশবের টানে উত্তম দাশ এ দেশে যতবার ছুটে আসেন তাকে সঙ্গ দেন বড় মামা লক্ষ্মীপুর জেলার ক্রীড়া সংগঠক, যোগব্যায়াম গবেষক, প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার আলো বিকাশ রায়। এই বড় মামাই ছিলেন তার ছাত্র জীবনে আদর্শ বন্ধু, আর বহু স্মৃতির নস্টালিজায় আবদ্ধ। তার লেখার বহু স্থানে বিকাশ মামার কথা উল্লেখ রয়েছে। উত্তম দাশের মৃত্যু সংবাদ ওই বড় মামাকে জানান হয় ৮ দিন পর। ৮৩ বছর বয়সী মামা আলো বিকাশ ভাগ্নের মৃত্যু সংবাদে স্বাভাবিক থাকতে পারেননি। লক্ষ্মীপুর অফিসার্স ক্লাবে আড্ডা দেয়ার সময় কলকাতা থেকে ছোট মামা শম্ভু ফোন করে উত্তম দাশের শ্রাদ্ধাদি বিষয় জানান। এতেই ভেঙে পড়েন বিকাশ মামা। লক্ষ্মীপুর জেলার সন্তান হিসেবে উত্তম দাশকে দু’বার সংবর্ধনা জানান স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকরা।
উত্তম দাশের মা ছবি দাশ, ৯৩ বছর বছর বয়সে এখনও জীবিত। বারইপুরের বাড়িতে মেঝ ছেলে তন্ময় ও বাভি দাশের সঙ্গে থাকেন। পুত্রের (উত্তম) মৃত্যু সংবাদ তাকে জানান হয়নি। এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যাবে না। দীর্ঘ জীবনের জন্য উত্তম দাশ নিয়মিত যোগব্যায়াম, করতেন। তার পরও মৃত্যু চিরন্তন। স্ত্রী মালবিকা দাশ, পুত্র কবি ময়ুখ দাশ, কন্যা মালিনী (মৌসুমী) দাশ, ছেলের বউ, নাতি, নাতনিসহ অসংখ্য স্বজন রেখে গেছেন।
উত্তম দাশ শুধু কবিতা বা বাংলাসাহিত্য নিয়েই গবেষণা করেননি। তিনি বাংলাদেশের ইলিশ মাছ নিয়েও গবেষণা করেছেন। ২০০২ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার সদর আলেকজান্ডারের মেঘনা পড়ে গিয়ে নদীর গতিপথ দেখেন। ওই সময় তাকে জেলেদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। ইলিশের প্রজনন, ইলিশের বেড়ে ওঠা, কোন পানিতে ইলিশের স্বাদ কেমন- এ সব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। ইলিশের স্বাদের সঙ্গে সাহিত্যের মিল খোঁজেন। সাগরের নোনা পানির ইলিশ, ডিম ছাড়ে মিঠা পানিতে। এ কারণে ইলিশকে মিঠা পানির মাছ বলা হয়। একজন কবি-সাহিত্যিককে কত বিষয় জানতে হয় তারও উদাহরণ উত্তম দাশ ।
উত্তম দাশ এ দেশে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার চর-সেন্দর গ্রামে দাদু (নানা) শচিন্দ লাল রায়ের মোক্তার বাড়িতে ১৯৩৯ সালের ১১ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। নিজেদের বাড়িও ছিল ওই গ্রামেই। পিতা কুমুদবন্ধু দাশের সরকারি চাকরির সুবাদে যুক্ত ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। মূলত ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় মাত্র ৮ বছর বয়সে উত্তম দাশ মা ছবি দাশের সঙ্গে এ দেশ ত্যাগ করে বাবার কর্মস্থল ভারতে চলে যান। পশ্চিম বাংলার বারইপুরে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। ১৯৬৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাসাহিত্যে এমএ ও ১৯৭১ সালে বাংলাসাহিত্যে সনেট বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। কলেজে অধ্যাপনা করার পাশাপাশি কবিতা লেখা ও সাহিত্য গবেষণা ছিল তার নেশা ও পেশা। তার সম্পাদিত সাহিত্যপত্র মহাদিগন্তে বহু বাঙালি কবির প্রতিভার বিকাশ ঘটে। ১৮টি কবিতার বই’র মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল রুনুকে, ভারতবর্ষের একজন, নির্মাণে এসেছে, রাত্রির স্থাপত্য, ভ্রমণের দাগ, কাব্য নাট্য ও কবিতা, ভারতীয় কবির ডাইরী, প্রবন্ধের মধ্যে বাংলাসাহিত্যে সনেট, কবিতার সেতুবন্ধ, হাংরি শ্র“তি, শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, বাংলা ছন্দের কূটস্থান, বাংলা ছন্দের অন্তঃপ্রকৃতি, ক্ষুধিত প্রজন্ম, শতবর্ষের আলোকে জীবনানন্দ দাশ ২০০০, শতবর্ষের আলোকে বুদ্ধদেব বসু ২০০৮। সম্পাদিত কবিতার বই ‘শতাব্দীর বাংলা কবিতা’, বিশ্ব বাংলা কবিতা এতে ৩শ’ কবির শ্রেষ্ঠ কবিতা ও জীবনবৃত্তান্ত প্রকাশ পায়। বইটি আলোড়িত হয়ে ছিল ব্যাপক। শেষ বয়সে শৈশবের টানে উত্তম দাশ এ দেশে যতবার ছুটে আসেন তাকে সঙ্গ দেন বড় মামা লক্ষ্মীপুর জেলার ক্রীড়া সংগঠক, যোগব্যায়াম গবেষক, প্রথম শ্রেণীর ঠিকাদার আলো বিকাশ রায়। এই বড় মামাই ছিলেন তার ছাত্র জীবনে আদর্শ বন্ধু, আর বহু স্মৃতির নস্টালিজায় আবদ্ধ। তার লেখার বহু স্থানে বিকাশ মামার কথা উল্লেখ রয়েছে। উত্তম দাশের মৃত্যু সংবাদ ওই বড় মামাকে জানান হয় ৮ দিন পর। ৮৩ বছর বয়সী মামা আলো বিকাশ ভাগ্নের মৃত্যু সংবাদে স্বাভাবিক থাকতে পারেননি। লক্ষ্মীপুর অফিসার্স ক্লাবে আড্ডা দেয়ার সময় কলকাতা থেকে ছোট মামা শম্ভু ফোন করে উত্তম দাশের শ্রাদ্ধাদি বিষয় জানান। এতেই ভেঙে পড়েন বিকাশ মামা। লক্ষ্মীপুর জেলার সন্তান হিসেবে উত্তম দাশকে দু’বার সংবর্ধনা জানান স্থানীয় কবি-সাহিত্যিকরা।
উত্তম দাশের মা ছবি দাশ, ৯৩ বছর বছর বয়সে এখনও জীবিত। বারইপুরের বাড়িতে মেঝ ছেলে তন্ময় ও বাভি দাশের সঙ্গে থাকেন। পুত্রের (উত্তম) মৃত্যু সংবাদ তাকে জানান হয়নি। এমন মৃত্যু মেনে নেয়া যাবে না। দীর্ঘ জীবনের জন্য উত্তম দাশ নিয়মিত যোগব্যায়াম, করতেন। তার পরও মৃত্যু চিরন্তন। স্ত্রী মালবিকা দাশ, পুত্র কবি ময়ুখ দাশ, কন্যা মালিনী (মৌসুমী) দাশ, ছেলের বউ, নাতি, নাতনিসহ অসংখ্য স্বজন রেখে গেছেন।
উত্তম দাশ শুধু কবিতা বা বাংলাসাহিত্য নিয়েই গবেষণা করেননি। তিনি বাংলাদেশের ইলিশ মাছ নিয়েও গবেষণা করেছেন। ২০০২ সালে লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি উপজেলার সদর আলেকজান্ডারের মেঘনা পড়ে গিয়ে নদীর গতিপথ দেখেন। ওই সময় তাকে জেলেদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। ইলিশের প্রজনন, ইলিশের বেড়ে ওঠা, কোন পানিতে ইলিশের স্বাদ কেমন- এ সব বিষয় নিয়ে কথা বলেন। ইলিশের স্বাদের সঙ্গে সাহিত্যের মিল খোঁজেন। সাগরের নোনা পানির ইলিশ, ডিম ছাড়ে মিঠা পানিতে। এ কারণে ইলিশকে মিঠা পানির মাছ বলা হয়। একজন কবি-সাহিত্যিককে কত বিষয় জানতে হয় তারও উদাহরণ উত্তম দাশ ।
Friday, August 15, 2014
কবি শামসুর রাহমান by বিমল গুহ
কোন
শিল্পই জোর করে সৃষ্টি করা যায় না। শিল্প তার স্বকীয় আদল নিয়ে স্রষ্টার
মনে আপনা থেকেই সৃষ্টির পথ করে নেয়। একজন কবিও কবিতাকে অবলম্বন করে জীবনের
নির্যাস ছেকে নিয়ে পাঠককে তার অংশী করে নেন। এই শিল্পের পথ স্বত:সিদ্ধ,
স্বত:স্ফূর্ত। তা হয়ে ওঠার বিষয়। বিষয়টা সহজ করে বললে বলতে হয়- একজন কবি
যখন লিখেন তখন তিনি নিমগ্নতার চূড়ান্ত স্থানে অবস্থান করেন। তাঁর মনের
স্থিরতা যখন একটা বিন্দুতে গিয়ে পৌঁছে; তখন কবির কলমে একটি কবিতা লেখা হয়ে
ওঠে। এটা সাধনা। এই সাধনার স্তর, আর আধ্যাত্মিক সাধনার স্তর সমান
নিমগ্নতার, সমান শুদ্ধতার। এই স্তরে যতক্ষণ তিনি থাকেন, ততক্ষণই তিনি কবি।
কেউ কেউ সার্বক্ষণিক কবি, কেউ আবার খণ্ড-সময়ের। বাংলাদেশের সামাজিক
প্রেক্ষাপটে সার্বক্ষণিক লেখক/কবি হওয়া দূরূহ ব্যাপার। হাতে গোনা কেউ কেউ
আছেনও বটে। শামসুর রাহমান চাকুরি করলেও সাহিত্যসাধনার পথে ছিলেন
সার্বক্ষণিক। আমাদের সাহিত্যাঙ্গনে বিরল সৌভাগ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি।
বিপুল তাঁর কাব্যসম্ভার, বিশাল তাঁর কবিতার ক্যানভাস। লেখার সময়, জীবনকালও
পেয়েছেন দীর্ঘ। তাঁর লেখার গতি কখনো শ্লথ হয়নি। এ এক অবাক ব্যাপার যে,
জীবনের কোন বাধাই তাঁর কাছে বাধাস্বরূপ হয়ে আসেনি। তাঁর লেখার বিস্তার দেখে
কেউ কেউ ভিন্ন মন্তব্যও করেছেন কখনো কখনো। তাঁর কাছে তা পরিগণ্য বিষয় ছিলো
না কখনো। নদীর গতির মতোই বেগবান তাঁর চেতনার স্রোত। আনন্দে বিগলিত হয়েছেন,
বেদনায় কাতর হয়েছেন, মানুষের বিপদে ব্যথিত হয়েছেন, জন-অধিকারের প্রশ্নে
সোচ্চার হয়েছেন, অন্যায়ের প্রতিবাদে সামিল হয়েছেন- এই কবি। এইসব বিষয়কে
চৈতন্যে জারিত করে লিখেছেন অমর পংক্তিমালা। একজন বড় মাপের মানুষও ছিলেন
তিনি।
কবির মানস গঠন হয়েছে কিশোর বয়সেই। তাঁর কথায়-‘আমি কিভাবে কবিতার পথে এসেছি, সেটা বলা মুশকিল। কেননা আমি কোনো প্ল্যান করে- মানে কোমর বেঁধে কবিতা লিখতে বসিনি, এটা অনেকটা হঠাৎ পেয়ে যাওয়া ধনের মতো। ...আমাদের মহল্লাতে একটি খ্রিস্টান পরিবার ছিল- তাদের একটা লাইব্রেরি ছিল। সেই লাইব্রেরিতে মহল্লার কেউ যেত না- আমিই বোধ হয় সেই লাইব্রেরিতে প্রথম বহিরাগত। সেখানে আমি পুরানো বাঁধানো ‘প্রবাসী’ দেখতে পাই এবং আরো কিছু কিছু বই পাই। আমার ক্ষুধা সে-লাইব্রেরি মেটাতে পারেনি। তখন পাটুয়াটুলির কাছে ব্রাহ্মসমাজের একটা লাইব্রেরি ছিল। সেটা হল- ‘রামমোহন লাইব্রেরি’। আমি সেই লাইব্রেরির সদস্য হয়ে গেলাম। সেখানেই আমার প্রকৃত পাঠ শুরু হল। সেখানেই আমি রবীন্দ নাথ, বঙ্কিমচন্দ , শরৎচন্দ এবং আরো দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনা পড়ার সুযোগ পাই। এভাবেই আমার কিছু মানস গঠন হয়েছে। তারপর হঠাৎ একদিন ১৯৪৮ সালে, আমার কি মনে হল- আমি লিখে ফেললাম কিছু আর কি- একটি কবিতা’! কবিতাটি ছাপা হয়- ‘সোনার বাংলা’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায়। সেই শুরু কবির যাত্রা, বাংলা ভাষার অন্যতম শীর্ষকবি শামসুর রাহমানের। করেছেন- বাঙালি জাতির স্বপ্নচৈতন্য, উত্থান ও জীবনপ্রবাহের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক রূপায়ন। নদীর গতি যেমন প্রকৃতি অনুসারী, সাহিত্যের গতিও তেমনি সমাজ-প্রকৃতি অনুগামী। স্বাভাবিক এর পথচলা, নিরন্তর এর যাত্রা সামনের দিকে। এই পথচলায় বাংলা কবিতার বিপুল আয়তনে খরস্রোতা নদীর মতোই বিশাল রেখা টেনে এগিয়ে গেছেন কবি শামসুর রাহমান।
সাতচল্লিশের ভারত-বিভক্তির পূর্বে ঊনিশ শতকের শুরু থেকে যে-বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকাশ লাভ করেছিলো, তাতে স্বভাবতই নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্টিতে উল্লসিত বোধ করেছে অনেকে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে-পরে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবন ও সাহিত্যশিল্পে শুরু হয় নতুন উদ্দীপনা। সেই সময়ে ও তৎপরবর্তীকালে এই অঞ্চলে, তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবিতায় দ্বিমুখী ধারার আর্বিভাব ঘটে। একটি ধারা ইসলামী মূল্যবোধকে লালন করে এগোতে থাকে: এঁরা পাকিস্তানি আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলা সাহিত্য ইসলামী চেতনা প্রবর্তনের জন্য উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। বিভাগপূর্ব কালের ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’-এর আদর্শকে এঁরা বহন করেছিলেন। একই সময়কালে কারো কারো কবিতায় অসাম্প্রদায়িক ও তিরিশোত্তর নতুন কবিতার লক্ষণ প্রত্যক্ষযোগ্য হয়ে ওঠে। এভাবে দিন দিন প্রগতিশীল ধারাটি বিকশিত হতে থাকে, আর প্রগতিবিরোধী ধারাটি একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এর পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে এ বাংলার কাব্যস্রোত আরো বেগবান হতে থাকে। কবি শামসুর রাহমান এই সময়ের কবিদের মধ্যে অগ্রসারিতে ছিলেন।
কাল-পরিক্রমণের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা সাহিত্যের এই গতিতে কখনো শতক-দশকওয়ারী বিভাজন করলেও, তা কোন প্রকৃত কবির কাব্যযাত্রায় তেমন প্রভাব ফেলে না। দশওয়ারী বিভাজন সচেতন পাঠকের কাব্যবিচারের সুবিধার্থেই কেবল করা হয়ে থাকে। প্রকৃত কবিতার পাঠকের কাছে তার কোন আলাদা অর্থ নেই। ভালো কবি সবসময়ই ভালো কবি। সেই খণ্ডিত পরিমণ্ডল অতিক্রম করে শামসুর রাহমান উঠে এসেছেন সমগ্র বাংলা কবিতার শীর্ষ সারিতে। শামসুর রাহমানের কবিতা মানে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি জীবনাচরণের ধারাবাহিক ইতিহাস। তিনি তাঁর কবিতায় রূপায়ন করেছেন বাঙালি সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস। আমাদের জাতীয় জীবনে রবীন্দ -নজরুল যেভাবে প্রতিদিনকার জীবনযাপনের সাথে স¤পৃক্ত, শামসুর রাহমানের কবিতাও তাই। আমাদের জাতীয় জীবনের সকল আয়োজনে শামসুর রাহমানের কবিতার উজ্জ্বল উপস্থিতি থেকে তা সহজে অনুমান করা যায়। সচল কবি হিসেবেই পরিণত বয়সে জীবন অতিক্রান্ত করেছেন তিনি। লিখে গেছেন আমৃত্যুকাল্, তাঁর প্রত্যয়ও তা-ই ছিলো। জীবৎকালে,যোগ্য মর্যাদাও পেয়েছেন, নিজের অবস্থানও দেখে যেতে পেরেছেন। কম কবির এই সৌভাগ্য হয়! শামসুর রাহমান তাঁর ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন এই বলে যে, ‘যদি বাঁচি চার দশকের বেশি/ লিখবো।/ ...যদি বেঁচে যাই একদিন আরো/ লিখবো’। হ্যাঁ তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে, তিনি আমাদের জন্য কবিতার জগৎই শুধু সম্প্রসারণ করে যাননি, সম্প্রসারণ করেছেন সাধারণের কাছে কবিতার গ্রহণযোগ্যতা এবং কবিদের সামাজিক মর্যাদা। নিজের মর্যাদার প্রতিও তিনি ছিলেন- টান টান। তিনি সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন এবং আমাদের দেখিয়ে গেছেন।
কবি স্বভাবে ছিলেন অতি বিনয়ী। কোন গরিমা দেখেনি কেউ- এই মাপের একজন কবির মধ্যে। ছোটবড় সবার বন্ধু। একজন অতি তরুণ কবিকেও কাছে টেনে নিতেন, উৎসাহিত করতেন লেখার ব্যাপারে। তাঁর কাছে যেতে কোন তরুণ কবির সাহস সঞ্চয় করার প্রয়োজন হয়নি। তবুও বলতে হয়- বিশাল কাব্যপরিমণ্ডল গড়ে তোলার এই কৃতি-মানুষের কাব্যবিচার করবে সময়। তবে এটুকু বলা যায় যে, শামসুর রাহমানের উচ্চারণ ছিলো হৃদয়-সংবেদী, সমাজলগ্ন ও কালজয়ী। শিল্পের সঙ্গে সাধনাকে যুক্ত করতে চেয়েছেন তিনি, যে-সাধনা অনিবার্যভাবে সৃজনশীল ও কালের প্রতিভূ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাল-পরিক্রমায়।
কবির মানস গঠন হয়েছে কিশোর বয়সেই। তাঁর কথায়-‘আমি কিভাবে কবিতার পথে এসেছি, সেটা বলা মুশকিল। কেননা আমি কোনো প্ল্যান করে- মানে কোমর বেঁধে কবিতা লিখতে বসিনি, এটা অনেকটা হঠাৎ পেয়ে যাওয়া ধনের মতো। ...আমাদের মহল্লাতে একটি খ্রিস্টান পরিবার ছিল- তাদের একটা লাইব্রেরি ছিল। সেই লাইব্রেরিতে মহল্লার কেউ যেত না- আমিই বোধ হয় সেই লাইব্রেরিতে প্রথম বহিরাগত। সেখানে আমি পুরানো বাঁধানো ‘প্রবাসী’ দেখতে পাই এবং আরো কিছু কিছু বই পাই। আমার ক্ষুধা সে-লাইব্রেরি মেটাতে পারেনি। তখন পাটুয়াটুলির কাছে ব্রাহ্মসমাজের একটা লাইব্রেরি ছিল। সেটা হল- ‘রামমোহন লাইব্রেরি’। আমি সেই লাইব্রেরির সদস্য হয়ে গেলাম। সেখানেই আমার প্রকৃত পাঠ শুরু হল। সেখানেই আমি রবীন্দ নাথ, বঙ্কিমচন্দ , শরৎচন্দ এবং আরো দেশি-বিদেশি লেখকদের রচনা পড়ার সুযোগ পাই। এভাবেই আমার কিছু মানস গঠন হয়েছে। তারপর হঠাৎ একদিন ১৯৪৮ সালে, আমার কি মনে হল- আমি লিখে ফেললাম কিছু আর কি- একটি কবিতা’! কবিতাটি ছাপা হয়- ‘সোনার বাংলা’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকায়। সেই শুরু কবির যাত্রা, বাংলা ভাষার অন্যতম শীর্ষকবি শামসুর রাহমানের। করেছেন- বাঙালি জাতির স্বপ্নচৈতন্য, উত্থান ও জীবনপ্রবাহের ধারাবাহিক ঐতিহাসিক রূপায়ন। নদীর গতি যেমন প্রকৃতি অনুসারী, সাহিত্যের গতিও তেমনি সমাজ-প্রকৃতি অনুগামী। স্বাভাবিক এর পথচলা, নিরন্তর এর যাত্রা সামনের দিকে। এই পথচলায় বাংলা কবিতার বিপুল আয়তনে খরস্রোতা নদীর মতোই বিশাল রেখা টেনে এগিয়ে গেছেন কবি শামসুর রাহমান।
সাতচল্লিশের ভারত-বিভক্তির পূর্বে ঊনিশ শতকের শুরু থেকে যে-বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত শ্রেণী বিকাশ লাভ করেছিলো, তাতে স্বভাবতই নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানের সৃষ্টিতে উল্লসিত বোধ করেছে অনেকে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে-পরে এই মধ্যবিত্ত শ্রেণীর জীবন ও সাহিত্যশিল্পে শুরু হয় নতুন উদ্দীপনা। সেই সময়ে ও তৎপরবর্তীকালে এই অঞ্চলে, তৎকালীন পূর্ব বাংলার কবিতায় দ্বিমুখী ধারার আর্বিভাব ঘটে। একটি ধারা ইসলামী মূল্যবোধকে লালন করে এগোতে থাকে: এঁরা পাকিস্তানি আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বাংলা সাহিত্য ইসলামী চেতনা প্রবর্তনের জন্য উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। বিভাগপূর্ব কালের ‘পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটি’ ও ‘পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সংসদ’-এর আদর্শকে এঁরা বহন করেছিলেন। একই সময়কালে কারো কারো কবিতায় অসাম্প্রদায়িক ও তিরিশোত্তর নতুন কবিতার লক্ষণ প্রত্যক্ষযোগ্য হয়ে ওঠে। এভাবে দিন দিন প্রগতিশীল ধারাটি বিকশিত হতে থাকে, আর প্রগতিবিরোধী ধারাটি একসময় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এর পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ পঞ্চাশের দশকে এ বাংলার কাব্যস্রোত আরো বেগবান হতে থাকে। কবি শামসুর রাহমান এই সময়ের কবিদের মধ্যে অগ্রসারিতে ছিলেন।
কাল-পরিক্রমণের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা সাহিত্যের এই গতিতে কখনো শতক-দশকওয়ারী বিভাজন করলেও, তা কোন প্রকৃত কবির কাব্যযাত্রায় তেমন প্রভাব ফেলে না। দশওয়ারী বিভাজন সচেতন পাঠকের কাব্যবিচারের সুবিধার্থেই কেবল করা হয়ে থাকে। প্রকৃত কবিতার পাঠকের কাছে তার কোন আলাদা অর্থ নেই। ভালো কবি সবসময়ই ভালো কবি। সেই খণ্ডিত পরিমণ্ডল অতিক্রম করে শামসুর রাহমান উঠে এসেছেন সমগ্র বাংলা কবিতার শীর্ষ সারিতে। শামসুর রাহমানের কবিতা মানে বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালি জীবনাচরণের ধারাবাহিক ইতিহাস। তিনি তাঁর কবিতায় রূপায়ন করেছেন বাঙালি সমাজ ও সভ্যতার ইতিহাস। আমাদের জাতীয় জীবনে রবীন্দ -নজরুল যেভাবে প্রতিদিনকার জীবনযাপনের সাথে স¤পৃক্ত, শামসুর রাহমানের কবিতাও তাই। আমাদের জাতীয় জীবনের সকল আয়োজনে শামসুর রাহমানের কবিতার উজ্জ্বল উপস্থিতি থেকে তা সহজে অনুমান করা যায়। সচল কবি হিসেবেই পরিণত বয়সে জীবন অতিক্রান্ত করেছেন তিনি। লিখে গেছেন আমৃত্যুকাল্, তাঁর প্রত্যয়ও তা-ই ছিলো। জীবৎকালে,যোগ্য মর্যাদাও পেয়েছেন, নিজের অবস্থানও দেখে যেতে পেরেছেন। কম কবির এই সৌভাগ্য হয়! শামসুর রাহমান তাঁর ‘নিজ বাসভূমে’ কাব্যগ্রন্থে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন এই বলে যে, ‘যদি বাঁচি চার দশকের বেশি/ লিখবো।/ ...যদি বেঁচে যাই একদিন আরো/ লিখবো’। হ্যাঁ তাঁর ইচ্ছা পূরণ হয়েছে, তিনি আমাদের জন্য কবিতার জগৎই শুধু সম্প্রসারণ করে যাননি, সম্প্রসারণ করেছেন সাধারণের কাছে কবিতার গ্রহণযোগ্যতা এবং কবিদের সামাজিক মর্যাদা। নিজের মর্যাদার প্রতিও তিনি ছিলেন- টান টান। তিনি সেই মর্যাদা অর্জন করেছেন এবং আমাদের দেখিয়ে গেছেন।
কবি স্বভাবে ছিলেন অতি বিনয়ী। কোন গরিমা দেখেনি কেউ- এই মাপের একজন কবির মধ্যে। ছোটবড় সবার বন্ধু। একজন অতি তরুণ কবিকেও কাছে টেনে নিতেন, উৎসাহিত করতেন লেখার ব্যাপারে। তাঁর কাছে যেতে কোন তরুণ কবির সাহস সঞ্চয় করার প্রয়োজন হয়নি। তবুও বলতে হয়- বিশাল কাব্যপরিমণ্ডল গড়ে তোলার এই কৃতি-মানুষের কাব্যবিচার করবে সময়। তবে এটুকু বলা যায় যে, শামসুর রাহমানের উচ্চারণ ছিলো হৃদয়-সংবেদী, সমাজলগ্ন ও কালজয়ী। শিল্পের সঙ্গে সাধনাকে যুক্ত করতে চেয়েছেন তিনি, যে-সাধনা অনিবার্যভাবে সৃজনশীল ও কালের প্রতিভূ হয়ে দাঁড়িয়েছে কাল-পরিক্রমায়।
Friday, August 8, 2014
জাপানে রবীন্দ্রচিহ্নের খোঁজে by প্রবীর বিকাশ সরকার
১৯৬১
সাল। শতবর্ষ রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী। ভারত ছাড়াও বিশ্বের একাধিক দেশে উদযাপন
করা হবে বিশ্বকবির এই দিবসটি। তাই নানা ধরনের আয়োজন। জাপানও এর ব্যতিক্রম
নয়। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর আহ্বানে জাপানি ভক্তরা সাড়া দিয়েছেন।
রবীন্দ্রভবনের অধ্যক্ষ ক্ষিতীশ রায় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বান চিঠিতে লিখে
পাঠালেন জাপানে। অবশ্য এর আগে ১৯৫৭ সালেই কতিপয় প্রবীণ জাপানি ভক্ত
রবীন্দ্রনাথের জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে একটি সভা আহ্বান করলেন তাদের
মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন জাপানের মর্যাদাসম্পন্ন প্রকাশনা সংস্থা
হেইবোনশা পাবলিশারের কর্ণধার এবং শিক্ষাবিদ শিমোনাকা ইয়াসাবুরোও। এই সভায়
সৌভাগ্যক্রমে ইন্দিরা গান্ধী উপস্থিত ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি বিশ্বভারতীর
ছাত্রী ছিলেন একদা। ১৯৫৭ সালের সেই সময়ে তিনি পিতা প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল
নেহরুর সঙ্গে জাপান সফর করছিলেন।
পরের বছর ১৮৫৮ সালে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হল জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে, এর চেয়ারম্যান হলেন বিশিষ্ট কাগজ ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি গবেষক এবং রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের বন্ধু ড. ওওকুরা কুনিহিকো। ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ শেষবার জাপানে এলে তার বাড়িতে প্রায় তিন সপ্তাহ আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। কুনিহিকো বিশাল পরিকল্পনা করলেন এবং সাড়ে তিন বছর লাগিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ১৯৬১ সালে প্রধান অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করলেন ড. কুনিহিকো, ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে। এ উপলক্ষে বিস্তর প্রকাশনা এবং পত্রপত্রিকা-সাময়িকীর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল শুধু টোকিওতেই নয়, ওসাকা, নাগাসাকি, কোবে প্রভৃতি শহরেও। সংরক্ষণের অভাবে কত যে প্রকাশনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার হিসাব নেই। তারপরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
০১. আপোরোন
তেমনি একটি সাড়া জাগানো ঋতুভিত্তিক ম্যাগাজিন ছিল ‘আপোরোন’ নামে। আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি ও সাহিত্যভিত্তিক এ ম্যাগাজিনটির সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন কাতোও শোওজিরোও। ‘আপোরোন শা’ প্রকাশনা সংস্থা গঠন করে এ ম্যাগাজিনটি প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগও নেন। তিনি নিজেই রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে ম্যাগাজিনটির উদ্বোধনী সংখ্যা প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রসংখ্যা হিসেবে। তাতে জাপানখ্যাত সাহিত্যিক, কবি ও অধ্যাপক-গবেষক রবীন্দ্রভক্ত যেমন কাতায়ামা তোশিহিকো / রবীন্দ্রনাথ টেগোর, নাকামুরা হাজিমে / টেগোর এবং রাধাকৃষ্ণান, ওওতা সাবুরোও / জাপানে টেগোরের গ্রন্থসমূহ, তাছাড়া রোমান রোলান / টেগোর সম্পর্কে, উইরিয়াম বাটলার ইয়েটস / গীতাঞ্জলির ভূমিকা, আঁন্দ্রে জিইদ / গীতাঞ্জলির যৌক্তিক ব্যাখ্যা, জাঁন এরবের / প্রেমের ভবিষ্যবক্তা, বি.জি. রাই / রবীন্দ্রদর্শনের সামাজিক তাৎপর্য প্রমুখের রচনাও জাপানিতে অনুবাদ করা হয়েছে। গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা অনুবাদ করেছেন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক ও অনুবাদক ইয়ামামুরো শিজুকা।
‘আপোরন’ ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথকে বিস্তৃতাকারে তুলে ধরেছে। রবীন্দ্রনাথের লেখাও অনুবাদ করা হয়েছে ইংরেজি থেকে জাপানিতে। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মোৎসবে ৮ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলির জাপানি অনুবাদ প্রকাশ করে মাইলফলকের কাজ করেছে, সে সময় পর্যন্ত এ রকম প্রকাশনা বিদেশের অন্য কোনো দেশে হয়েছে বলে জানা নেই। সুতরাং রবীন্দ্রভক্ত কাতোও শোওজিরোওই প্রথম কৃতীত্বের অধিকারী।
০২. টেগোর সেন্টেনারি ফেস্টিভেল
১৯৬১ সালের জন্মজয়ন্তীর প্রধান অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় মে মাসের ৬ তারিখে সদ্য নির্মিত বুনকিয়োও কোওকাইদোও মিলনায়তনে প্রভাবশালী দৈনিক সংবাদপত্র আসাহিশিম্বুনের সহযোগিতায়। এ উপলক্ষে একটি চমৎকার বৃহদাকারে অনুষ্ঠান সূচিপত্র প্রকাশ করা হয়। মোটা আর্ট পেপারে সিলভার কালারের ওপর গাঢ়ো নীল রঙে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি এবং শিরোনাম। ভেতরে অনুষ্ঠান সূচি রয়েছে দুই পর্বে। প্রথম পর্বে প্রথমেই ভারতের জাতীয়সঙ্গীত ‘জনগণমন; ও পরে জাপানের জাতীয়সঙ্গীত ‘কিমিগায়ো’ তামাগাওয়া গাকুয়েন কয়ারের শিল্পীরা গেয়েছেন। এরপর চেয়ারম্যান ওওকুরা কুনিহিকোর শুভেচ্ছা বক্তৃতা। বাণী পড়ে শোনানো হয় জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেনতারোও কোসাকা, বৌদ্ধপণ্ডিত রেভারেন্ড রোজেন তাকাহিসা, প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও সমালোচক নিয়োজেন হাসেগাওয়া’র। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত লালজি মেহরোত্রা। রেকর্ডকৃত রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বর বাজিয়ে শোনানো হয়। স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতা দেন খ্যাতিমান কবি কুসানো শিনপেই। তামাগাওয়া গাকুয়েন কোয়ার ‘গ্লোরিয়া’ নামে সমস্বরে একটি গান পরিবেশ করে।
দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ সঙ্গীতের জাপানি ভাষায় কোরাস। এতে কণ্ঠ দেন ৎসুকুজি বৌদ্ধ কোয়ারের শিল্পীরা। অকেস্ট্রা পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রভক্ত সাদাও ইতোও। এরপর অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’র একাংশ, নৃত্যাভিনয়ে অংশ নেন সাকাকিবারা নৃত্য দল, পরিচালনা করেন সাকাকিবারা কিইৎসু। সাকাকিবারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি শান্তিনিকেতনে ভারতীয় ধ্র“পদী নৃত্যের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সূচিপত্রের প্রথমেই মুদ্রিত আছে ‘জনগণমন’-এর স্বরলিপি এবং নিচে গানটির জাপানি অনুবাদ, অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক ওওরুই জুন। অন্যান্য পৃষ্ঠাগুলোতে আছে : ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাহিনীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, অভিনয়শিল্পীদের নাম। অধ্যাপক ও সমালোচক সাকামোতো তোকুমাৎসুর জন্মোৎসব উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। অধ্যাপক কাতায়ামা তোশিহিকো কর্তৃক মাকে নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের ‘মনেপড়া’ কবিতাটির জাপানি অনুবাদ। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণের সময়কার একটি ছবি, সংবাদপত্রে সংবাদের টুকরো, ১৯২৪ সালে জাপানে অবস্থানকালে স্বহস্তে লিখিত একটি বাণী ‘এনেছিনু সাথে লয়ে আশা / চলে গেনু রেখে ভালোবাসা’র আলোকচিত্র এবং জাপানি অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরযুক্ত একটি আলোকচিত্র। রবীন্দ্র জীবনের বর্ষপঞ্জি। ‘ভারততীর্থ’ সঙ্গীতের সংক্ষিপ্ত পটভূমি মূল বাংলা থেকে জাপানিতে ভাষান্তর করেছেন স্বনামধন্য বহুভাষাবিদ টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারততত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ওয়াতানাবে শোওকো এবং জাপানি ভাষায় গীত সঙ্গীতটির সুর করেছেন সাদাও ইতোও। শেষদিকে রয়েছে ইয়ামামুরো শিজুকার অনূদিত একটি কবিতা যেটা অনুবাদক বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে কানাডার নাগরিকদের উদ্দেশে আবেদনকৃত এবং ১৯৩৮ সালের মে মাসে অটোয়া বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত কিন্তু কোন কবিতা বাংলা নাকি ইংরেজি তার হদিস খুঁজে পেলাম না। শেষ প্রচ্ছদে রবীন্দ্রনাথের অংকিত একটি চিত্র মুদ্রিত আছে।
০৩. টেগোর
টোকিওর মতো জাপানের দক্ষিণ অঞ্চলের বাণিজ্য মহানগর ওসাকা প্রিফেকচারেও রবীন্দ্র জন্মোৎসব উদযাপনের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে গঠিত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ব্যবসায়ী ও ওসাকা চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান মিচিসুকে সুগি। কবে কমিটিটি গঠিত হয়েছে এবং অনুষ্ঠানাদি কি কি হয়েছে তার তথ্য আপাতত মিলছে না। ওসাকাতে জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান হয়েছিল নিশিতেননোওজি কাইকান মিলনায়তনে অক্টোবর মাসের ৭ তারিখে। এ উপলক্ষে সুশোভন একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছে ‘টেগোর’ নামে। তাতে দেখা যায় সভাপতির নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রয়েছে, তিনি রবীন্দ্রনাথকে জানতেন। অনুষ্ঠান সূচিতে ছিল : দু’দেশের জাতীয়সঙ্গীত পরিবেশন। স্লাইডে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি প্রদর্শন ও কণ্ঠস্বরের রেকর্ড বাজিয়ে শোনানো। কমিটির সভাপতির শুভেচ্ছা বক্তব্য, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত লালজি মেহরোত্রার শুভেচ্ছা বক্তব্য, জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লিয়াজন অফিস প্রধান তাৎসুউচি কোওনো এবং দৈনিক আসাহিশিম্বুন পত্রিকার মালিক নাগাতাকা মুরায়ামা’র বাণী। উল্লেখ্য, নাগাতাকা মুরায়ামার পিতা আসাহিশিম্বুন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা রিউহেই মুরায়ামার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল ১৯১৬ সালে জাপানে। মুরায়ামা রবীন্দ্রনাথের সম্মানার্থে একটি জাঁকজমকপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী চা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক মোরিমোতো তাৎসুও এবং অধ্যাপক মিয়ামোতো মাসাকিয়ো।
এ অনুষ্ঠানের দুটি বড় আকর্ষণ ছিল ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ তথ্যচলচ্চিত্র এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তোকু গোতা রচিত ও পরিচালিত ভগবান বুদ্ধের জীবনীভিত্তিক নাটক ‘বসন্তের প্রাণ’। রবীন্দ্রনাথের একটি দুর্লভ ছবি মুদ্রিত হয়েছে তার স্বাক্ষরসহ সুজুকি নামক একজন রবীন্দ্রভক্তের সংগ্রহ থেকে। এরপর রবীন্দ্র জীবনের বর্ষপঞ্জি। নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন ওসাকা শিরিৎসু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসাও মিয়ামোতো ‘রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে’। রবীন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ডে গভীর আধ্যাত্মিকতা কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন। কৃষি নিয়ে যে কাজ তিনি করেছেন সেটা সেই সময়কার জন্য এক বিপ্লব এবং অগ্রণী এক উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছেন। এ রচনার পাশেই মুদ্রিত হয়েছে ইংরেজিতে লেখক, সমালোচক, সাহিত্য বিশেষজ্ঞ দার্শনিক এবং ভারতীয় লেখক সমিতির কর্মসচিব মুলক রাজ আনন্দের একটি বাণী। আরও একটি প্রবন্ধ লিখেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবিহারা তোকুও ‘এখনো প্রাণবন্ত চিন্তা’ নামে। লেখক এক স্থানে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের চিন্তাদর্শন কোনোভাবেই পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট স্থানের পুরনো ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ব্যাপকভাবে সমগ্র মানব জাতির স্বাভাবিক অনুরাগ হিসেবে যথার্থ আধুনিকত্বে নির্ভর করা যায়, আবার রবীন্দ্রনাথের চারিত্রিক স্বাতন্ত্র্য যুগের ভিন্ন চিন্তা নয়, বরং আধুনিক মানব হিসেবে বিপুল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয়কেই নির্দেশ করে। এর পাশে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার অনুবাদ, করেছেন মিয়ামোতো মাসাকিয়ো। তারপর রবীন্দ্রনাথের তথ্যচলচ্চিত্রটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা লিখেছেন অধ্যাপক ওওরুই জুন। আছে ‘বসন্তের প্রাণ’ নাটকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। টোকিওতে রবীন্দ্র জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে বিগত সাড়ে তিন বছরের সব কর্মকাণ্ডের দলিলপত্রের প্রদর্শনীর বিবরণ। রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ, করেছেন অধ্যাপক মিয়ামোতো মাসাকিয়ো। আপোরোন শা প্রকাশনা সংস্থার রবীন্দ্রনাথবিষয়ক বিজ্ঞাপন। শেষে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কবিতাটির জাপানি অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক কাতায়ামা তোশিহিকো। রবীন্দ্রনাথের দুটি চিত্রকর্মও মুদ্রিত আছে।
০৪. কুরিয়ে
ঋতু এবং কর্মজীবনভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘কুরিয়ে’ ১৯৫৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ম্যাগাজিনটি ১৯৬১ সালের আগস্ট সংখ্যায় খ্যাতিমান ভারত গবেষক, ভারতীয় ধ্র“পদী সাহিত্য বিশ্লেষক তানাকা ওতোয়া একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন ‘টেগোর এবং জাপান’ শিরোনামে। তিনি প্রবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে লিখেছেন, সুপুরুষ, সুকণ্ঠের অধিকারী রবীন্দ্রনাথকে তার তরুণকালে গান্ধী প্লেবয় বলে প্রশংসা করেছিলেন এমন কথা শুনেছি। সেটা সত্যি না মিথ্যে জানা নেই, কিন্তু ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ ছিলেন। মানব রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরও গবেষণা করা আবশ্যক বলে মনে হয়। লেখাটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছবি ও চিত্রকর্ম মুদ্রণ করেছে।
পরের বছর ১৮৫৮ সালে টেগোর মেমোরিয়াল অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হল জন্মজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষে, এর চেয়ারম্যান হলেন বিশিষ্ট কাগজ ব্যবসায়ী, শিক্ষাবিদ, আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি গবেষক এবং রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনের বন্ধু ড. ওওকুরা কুনিহিকো। ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ শেষবার জাপানে এলে তার বাড়িতে প্রায় তিন সপ্তাহ আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। কুনিহিকো বিশাল পরিকল্পনা করলেন এবং সাড়ে তিন বছর লাগিয়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ১৯৬১ সালে প্রধান অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করলেন ড. কুনিহিকো, ভারতের রাষ্ট্রদূত এবং বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিতে। এ উপলক্ষে বিস্তর প্রকাশনা এবং পত্রপত্রিকা-সাময়িকীর বিশেষ সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল শুধু টোকিওতেই নয়, ওসাকা, নাগাসাকি, কোবে প্রভৃতি শহরেও। সংরক্ষণের অভাবে কত যে প্রকাশনা বিলুপ্ত হয়ে গেছে তার হিসাব নেই। তারপরও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে।
০১. আপোরোন
তেমনি একটি সাড়া জাগানো ঋতুভিত্তিক ম্যাগাজিন ছিল ‘আপোরোন’ নামে। আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি ও সাহিত্যভিত্তিক এ ম্যাগাজিনটির সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন কাতোও শোওজিরোও। ‘আপোরোন শা’ প্রকাশনা সংস্থা গঠন করে এ ম্যাগাজিনটি প্রকাশ করেন। পরবর্তীকালে গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগও নেন। তিনি নিজেই রবীন্দ্রভক্ত ছিলেন। ১৯৫৮ সালে ম্যাগাজিনটির উদ্বোধনী সংখ্যা প্রকাশিত হয় রবীন্দ্রসংখ্যা হিসেবে। তাতে জাপানখ্যাত সাহিত্যিক, কবি ও অধ্যাপক-গবেষক রবীন্দ্রভক্ত যেমন কাতায়ামা তোশিহিকো / রবীন্দ্রনাথ টেগোর, নাকামুরা হাজিমে / টেগোর এবং রাধাকৃষ্ণান, ওওতা সাবুরোও / জাপানে টেগোরের গ্রন্থসমূহ, তাছাড়া রোমান রোলান / টেগোর সম্পর্কে, উইরিয়াম বাটলার ইয়েটস / গীতাঞ্জলির ভূমিকা, আঁন্দ্রে জিইদ / গীতাঞ্জলির যৌক্তিক ব্যাখ্যা, জাঁন এরবের / প্রেমের ভবিষ্যবক্তা, বি.জি. রাই / রবীন্দ্রদর্শনের সামাজিক তাৎপর্য প্রমুখের রচনাও জাপানিতে অনুবাদ করা হয়েছে। গীতাঞ্জলি থেকে কবিতা অনুবাদ করেছেন খ্যাতিমান শিশুসাহিত্যিক ও অনুবাদক ইয়ামামুরো শিজুকা।
‘আপোরন’ ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথকে বিস্তৃতাকারে তুলে ধরেছে। রবীন্দ্রনাথের লেখাও অনুবাদ করা হয়েছে ইংরেজি থেকে জাপানিতে। উল্লেখ্য, ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র জন্মোৎসবে ৮ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলির জাপানি অনুবাদ প্রকাশ করে মাইলফলকের কাজ করেছে, সে সময় পর্যন্ত এ রকম প্রকাশনা বিদেশের অন্য কোনো দেশে হয়েছে বলে জানা নেই। সুতরাং রবীন্দ্রভক্ত কাতোও শোওজিরোওই প্রথম কৃতীত্বের অধিকারী।
০২. টেগোর সেন্টেনারি ফেস্টিভেল
১৯৬১ সালের জন্মজয়ন্তীর প্রধান অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয় মে মাসের ৬ তারিখে সদ্য নির্মিত বুনকিয়োও কোওকাইদোও মিলনায়তনে প্রভাবশালী দৈনিক সংবাদপত্র আসাহিশিম্বুনের সহযোগিতায়। এ উপলক্ষে একটি চমৎকার বৃহদাকারে অনুষ্ঠান সূচিপত্র প্রকাশ করা হয়। মোটা আর্ট পেপারে সিলভার কালারের ওপর গাঢ়ো নীল রঙে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি এবং শিরোনাম। ভেতরে অনুষ্ঠান সূচি রয়েছে দুই পর্বে। প্রথম পর্বে প্রথমেই ভারতের জাতীয়সঙ্গীত ‘জনগণমন; ও পরে জাপানের জাতীয়সঙ্গীত ‘কিমিগায়ো’ তামাগাওয়া গাকুয়েন কয়ারের শিল্পীরা গেয়েছেন। এরপর চেয়ারম্যান ওওকুরা কুনিহিকোর শুভেচ্ছা বক্তৃতা। বাণী পড়ে শোনানো হয় জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেনতারোও কোসাকা, বৌদ্ধপণ্ডিত রেভারেন্ড রোজেন তাকাহিসা, প্রখ্যাত লেখক, সাংবাদিক ও সমালোচক নিয়োজেন হাসেগাওয়া’র। শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন ভারতীয় রাষ্ট্রদূত লালজি মেহরোত্রা। রেকর্ডকৃত রবীন্দ্রনাথের কণ্ঠস্বর বাজিয়ে শোনানো হয়। স্মৃতিচারণমূলক বক্তৃতা দেন খ্যাতিমান কবি কুসানো শিনপেই। তামাগাওয়া গাকুয়েন কোয়ার ‘গ্লোরিয়া’ নামে সমস্বরে একটি গান পরিবেশ করে।
দ্বিতীয় পর্বে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘ভারততীর্থ’ সঙ্গীতের জাপানি ভাষায় কোরাস। এতে কণ্ঠ দেন ৎসুকুজি বৌদ্ধ কোয়ারের শিল্পীরা। অকেস্ট্রা পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ রবীন্দ্রভক্ত সাদাও ইতোও। এরপর অনুষ্ঠিত হয় রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’র একাংশ, নৃত্যাভিনয়ে অংশ নেন সাকাকিবারা নৃত্য দল, পরিচালনা করেন সাকাকিবারা কিইৎসু। সাকাকিবারা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি শান্তিনিকেতনে ভারতীয় ধ্র“পদী নৃত্যের প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। সূচিপত্রের প্রথমেই মুদ্রিত আছে ‘জনগণমন’-এর স্বরলিপি এবং নিচে গানটির জাপানি অনুবাদ, অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক ওওরুই জুন। অন্যান্য পৃষ্ঠাগুলোতে আছে : ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাহিনীর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি, অভিনয়শিল্পীদের নাম। অধ্যাপক ও সমালোচক সাকামোতো তোকুমাৎসুর জন্মোৎসব উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। অধ্যাপক কাতায়ামা তোশিহিকো কর্তৃক মাকে নিয়ে রচিত রবীন্দ্রনাথের ‘মনেপড়া’ কবিতাটির জাপানি অনুবাদ। ১৯১৬ সালে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জাপান ভ্রমণের সময়কার একটি ছবি, সংবাদপত্রে সংবাদের টুকরো, ১৯২৪ সালে জাপানে অবস্থানকালে স্বহস্তে লিখিত একটি বাণী ‘এনেছিনু সাথে লয়ে আশা / চলে গেনু রেখে ভালোবাসা’র আলোকচিত্র এবং জাপানি অনুবাদ। রবীন্দ্রনাথের স্বাক্ষরযুক্ত একটি আলোকচিত্র। রবীন্দ্র জীবনের বর্ষপঞ্জি। ‘ভারততীর্থ’ সঙ্গীতের সংক্ষিপ্ত পটভূমি মূল বাংলা থেকে জাপানিতে ভাষান্তর করেছেন স্বনামধন্য বহুভাষাবিদ টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারততত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ওয়াতানাবে শোওকো এবং জাপানি ভাষায় গীত সঙ্গীতটির সুর করেছেন সাদাও ইতোও। শেষদিকে রয়েছে ইয়ামামুরো শিজুকার অনূদিত একটি কবিতা যেটা অনুবাদক বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে কানাডার নাগরিকদের উদ্দেশে আবেদনকৃত এবং ১৯৩৮ সালের মে মাসে অটোয়া বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত কিন্তু কোন কবিতা বাংলা নাকি ইংরেজি তার হদিস খুঁজে পেলাম না। শেষ প্রচ্ছদে রবীন্দ্রনাথের অংকিত একটি চিত্র মুদ্রিত আছে।
০৩. টেগোর
টোকিওর মতো জাপানের দক্ষিণ অঞ্চলের বাণিজ্য মহানগর ওসাকা প্রিফেকচারেও রবীন্দ্র জন্মোৎসব উদযাপনের জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে গঠিত কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন ব্যবসায়ী ও ওসাকা চেম্বার অব কমার্সের চেয়ারম্যান মিচিসুকে সুগি। কবে কমিটিটি গঠিত হয়েছে এবং অনুষ্ঠানাদি কি কি হয়েছে তার তথ্য আপাতত মিলছে না। ওসাকাতে জন্মোৎসবের অনুষ্ঠান হয়েছিল নিশিতেননোওজি কাইকান মিলনায়তনে অক্টোবর মাসের ৭ তারিখে। এ উপলক্ষে সুশোভন একটি স্মরণিকা প্রকাশিত হয়েছে ‘টেগোর’ নামে। তাতে দেখা যায় সভাপতির নাতিদীর্ঘ বক্তব্য রয়েছে, তিনি রবীন্দ্রনাথকে জানতেন। অনুষ্ঠান সূচিতে ছিল : দু’দেশের জাতীয়সঙ্গীত পরিবেশন। স্লাইডে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতি প্রদর্শন ও কণ্ঠস্বরের রেকর্ড বাজিয়ে শোনানো। কমিটির সভাপতির শুভেচ্ছা বক্তব্য, ভারতীয় রাষ্ট্রদূত লালজি মেহরোত্রার শুভেচ্ছা বক্তব্য, জাপান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের লিয়াজন অফিস প্রধান তাৎসুউচি কোওনো এবং দৈনিক আসাহিশিম্বুন পত্রিকার মালিক নাগাতাকা মুরায়ামা’র বাণী। উল্লেখ্য, নাগাতাকা মুরায়ামার পিতা আসাহিশিম্বুন পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা রিউহেই মুরায়ামার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল ১৯১৬ সালে জাপানে। মুরায়ামা রবীন্দ্রনাথের সম্মানার্থে একটি জাঁকজমকপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী চা-অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক মোরিমোতো তাৎসুও এবং অধ্যাপক মিয়ামোতো মাসাকিয়ো।
এ অনুষ্ঠানের দুটি বড় আকর্ষণ ছিল ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায়ের নির্মিত ‘রবীন্দ্রনাথ টেগোর’ তথ্যচলচ্চিত্র এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব তোকু গোতা রচিত ও পরিচালিত ভগবান বুদ্ধের জীবনীভিত্তিক নাটক ‘বসন্তের প্রাণ’। রবীন্দ্রনাথের একটি দুর্লভ ছবি মুদ্রিত হয়েছে তার স্বাক্ষরসহ সুজুকি নামক একজন রবীন্দ্রভক্তের সংগ্রহ থেকে। এরপর রবীন্দ্র জীবনের বর্ষপঞ্জি। নাতিদীর্ঘ নিবন্ধ লিখেছেন ওসাকা শিরিৎসু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাসাও মিয়ামোতো ‘রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিকতা সম্পর্কে’। রবীন্দ্রনাথের কর্মকাণ্ডে গভীর আধ্যাত্মিকতা কাজ করেছে বলে তিনি মনে করেন। কৃষি নিয়ে যে কাজ তিনি করেছেন সেটা সেই সময়কার জন্য এক বিপ্লব এবং অগ্রণী এক উদ্যোগ বলে অভিহিত করেছেন। এ রচনার পাশেই মুদ্রিত হয়েছে ইংরেজিতে লেখক, সমালোচক, সাহিত্য বিশেষজ্ঞ দার্শনিক এবং ভারতীয় লেখক সমিতির কর্মসচিব মুলক রাজ আনন্দের একটি বাণী। আরও একটি প্রবন্ধ লিখেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবিহারা তোকুও ‘এখনো প্রাণবন্ত চিন্তা’ নামে। লেখক এক স্থানে বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের চিন্তাদর্শন কোনোভাবেই পৃথিবীর একটি নির্দিষ্ট স্থানের পুরনো ঐতিহ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, ব্যাপকভাবে সমগ্র মানব জাতির স্বাভাবিক অনুরাগ হিসেবে যথার্থ আধুনিকত্বে নির্ভর করা যায়, আবার রবীন্দ্রনাথের চারিত্রিক স্বাতন্ত্র্য যুগের ভিন্ন চিন্তা নয়, বরং আধুনিক মানব হিসেবে বিপুল বৈশিষ্ট্যপূর্ণ বিষয়কেই নির্দেশ করে। এর পাশে রয়েছে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার অনুবাদ, করেছেন মিয়ামোতো মাসাকিয়ো। তারপর রবীন্দ্রনাথের তথ্যচলচ্চিত্রটি সম্পর্কে ব্যাখ্যা লিখেছেন অধ্যাপক ওওরুই জুন। আছে ‘বসন্তের প্রাণ’ নাটকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ। টোকিওতে রবীন্দ্র জন্মোৎসবকে কেন্দ্র করে বিগত সাড়ে তিন বছরের সব কর্মকাণ্ডের দলিলপত্রের প্রদর্শনীর বিবরণ। রবীন্দ্রনাথের কবিতার অনুবাদ, করেছেন অধ্যাপক মিয়ামোতো মাসাকিয়ো। আপোরোন শা প্রকাশনা সংস্থার রবীন্দ্রনাথবিষয়ক বিজ্ঞাপন। শেষে ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ কবিতাটির জাপানি অনুবাদ করেছেন রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক কাতায়ামা তোশিহিকো। রবীন্দ্রনাথের দুটি চিত্রকর্মও মুদ্রিত আছে।
০৪. কুরিয়ে
ঋতু এবং কর্মজীবনভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘কুরিয়ে’ ১৯৫৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে ম্যাগাজিনটি ১৯৬১ সালের আগস্ট সংখ্যায় খ্যাতিমান ভারত গবেষক, ভারতীয় ধ্র“পদী সাহিত্য বিশ্লেষক তানাকা ওতোয়া একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেন ‘টেগোর এবং জাপান’ শিরোনামে। তিনি প্রবন্ধের শেষ অনুচ্ছেদে লিখেছেন, সুপুরুষ, সুকণ্ঠের অধিকারী রবীন্দ্রনাথকে তার তরুণকালে গান্ধী প্লেবয় বলে প্রশংসা করেছিলেন এমন কথা শুনেছি। সেটা সত্যি না মিথ্যে জানা নেই, কিন্তু ঋষিকবি রবীন্দ্রনাথ একজন মানুষ ছিলেন। মানব রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে আরও গবেষণা করা আবশ্যক বলে মনে হয়। লেখাটির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছবি ও চিত্রকর্ম মুদ্রণ করেছে।
Subscribe to:
Posts (Atom)
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2002)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
Recent Comments
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
Cox's Bazar Us Categories
প্রথম আলো
আন্তর্জাতিক
মানবজমিন
আলোচনা
কালের কণ্ঠ
উপ-সম্পাদকীয়
যুগান্তর
প্রথম পাতা
মতামত
জাতীয়
সমকাল
নয়া দিগন্ত
রাজনীতি
জনকণ্ঠ
সুশীল কথন
ভারত
অর্থনীতি
বিনোদন
শেষের পাতা
ক্রিকেট খেলা
যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্য
দেশে দেশে
স্পেশাল প্রতিবেদন
নির্বাচন
প্রথম আলো
খেলা
খোলা কলম
আইন আদালত ও বিচার
আমার দেশ
ইসরায়েল
ফুটবল খেলা
বাংলানিউজ
মুক্তধারা
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা
ফিলিস্তিন
Lead
রাজধানী
অপরাধ
আন্দোলন
এক্সক্লুসিভ
আইন ও মানবাধিকার
নারী
ইরান
শিক্ষা
বিএনপি
সারা বিশ্ব
ক্রিকেট
সাহিত্য
পাকিস্তান
মুক্তমঞ্চ
আওয়ামী লীগ
বাংলা ট্রিবিউন
শিশু
দুর্নীতি
সারা দেশ
কালবেলা
চট্টগ্রাম
বিশাল বাংলা
ব্রেকিং নিউজ
সাউথ এশিয়ান মনিটর
সিলেট
ক্রীড়া
পার্সটুডে
অর্থ
খালেদা জিয়া
অর্থ ও বাণিজ্য
শিল্প বাণিজ্য
চীন
বিবিসি বাংলা
কাশ্মীর
চতুরঙ্গ
খবরাখবর
প্রধানমন্ত্রী
বিশ্ব
নতুন বার্তা
হত্যা
ধর্ম
স্মরণ
গল্প
মুসলিম
যুক্তরাজ্য
শিক্ষাঙ্গন
শেখ হাসিনা
ফুটবল
বার্তা২৪ ডটনেট
রস+আলো
জাতিসংঘ
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি
সাক্ষাৎকার
রাশিয়া
মুক্তিযুদ্ধ
মিডিয়া
হরতাল-অবরোধ
ইউরোপ
খেলা ধুলা
সৌদি আরব
ছাত্রলীগ
ইতিহাস
প্রতিবেদন
জামায়াতে ইসলামী
সোহরাব হাসান
অমানবিক
পশ্চিমবঙ্গ
আলোকিত চট্টগ্রাম
আইন
চাষাবাদ- কৃষি ও কৃষক
ফিচার
ভ্রমণ
মিজানুর রহমান খান
ওয়েছ খছরু
খোলা চোখে
বাংলাদেশ-ভারত
ইসলাম ও সমাজ
সিরিয়া
যৌন নির্যাতন
নারায়ণগঞ্জ
জাতীয় সংসদ
নারী ধর্ষণ
আনন্দ
খেলাধুলা
বিজ্ঞান ও গবেষণা
ব্যাংকিং ও বিনিয়োগ
আফ্রিকা
মাদক
সন্ত্রাস
আনিসুল হক
যৌন আবেদনময়ী
সংখ্যালঘু
প্রবাস
ছুটির দিনে
মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সৈয়দ আবুল মকসুদ
তুরস্ক
নকশা
বিজ্ঞান প্রজন্ম ও কম্পিউটার
আফগানিস্তান
গোল্লাছুট
বইপত্র
অন্য আলো
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
প্রতারণা
ছবি
টাইমস্ আই বেঙ্গলী
প্রকৃতি
ব্যবসা বাণিজ্য
ইউক্রেন
দুর্ঘটনা
অপহরণ
সাহিত্যালোচনা
গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিক
জাতীয় পার্টি
রাজশাহী
স্টেডিয়াম
দীন ইসলাম
মানবাধিকার
তরুণ প্রজন্ম
স্বাস্থ্য
ফূটবল খেলা
হিন্দু
রোহিঙ্গা
মিজানুর রহমান
মশিউল আলম
আইন ও বিচার
আলী যাকের
রুদ্র মিজান
মানবকণ্ঠ
খুলনা
হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ
আব্দুল কাইয়ুম
নেপাল
মালয়েশিয়া
তারেক শামসুর রেহমান
আসিফ নজরুল
আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
সাজেদুল হক
ফারুক ওয়াসিফ
কাফি কামাল
মৌলভীবাজার
হাসান ফেরদৌস
আনন্দ কণ্ঠ
তৃতীয় পাতা
যাপিত জীবন
জ্যোতির্বিজ্ঞান
সড়ক দুর্ঘটনা
আলী রীয়াজ
ক্রিখেট খেলা
ফুটবল খলা
বদরুদ্দীন উমর
মরিয়ম চম্পা
রংপুর
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া
শিল্প ও সাহিত্য
নতুনের জানালা
বৃষ্টি ও বন্যা
মোস্তফা কামাল
কক্সবাজার
এ এম এম শওকত আলী
বন্ধুসভা
সংবিধান ও রাষ্ট্র
Exclusive
ঢাকা
বগুড়া
মিয়ানমার
ঈদ বিশেষ সংখ্যা
গবেষণা
বাংলাদেশ
মিসর
অবৈধ-অনিয়ম-কারচুপি
এ কে এম জাকারিয়া
নির্বাচনী কূটনীতি
বদিউল আলম মজুমদার
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
শোক
এম আবদুল হাফিজ
পরিবেশ
সংস্কৃতি
ইয়েমেন
খবর
বাংলাদেশে
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
শুভ্র দেব
অজয় দাশগুপ্ত
প্রজন্ম ডট কম
আবুল কাশেম
আমদানি ও রপ্তানি
জীবনযাপন
ফ্রান্স
কিশোরগঞ্জ
লেবানন
আবদুল মান্নান
জাপান
রঙের মেলা
ঐতিহ্য
কুমিল্লা
শিল্প
মুক্তমত
মাহমুদুর রহমান
রাজনৈতিক আলোচনা
শরিফুল হাসান
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল
পার্বত্য চট্টগ্রাম
ময়মনসিংহ
সংবাদ২৪.নেট
সীমান্ত সন্ত্রাস
আহমদ রফিক
ইফতেখার মাহমুদ
কাজের খবর
ইরাক
স্বপ্ন নিয়ে
টাঙ্গাইল
যশোর
HotTopic
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর
অমর সাহা
আনোয়ার হোসেন
আলী ইমাম মজুমদার
গাজীপুর
চিকিৎসা
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন
আবুল মোমেন
থাইল্যান্ড
মুফতি এনায়েতুল্লাহ
শ্রীলঙ্কা
সৌম্য বন্দ্যোপাধ্যায়
কলকাতা
মেহেদী হাসান
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য
রসালোচনা
কামরুজ্জামান মিলু
তথ্য প্রযুক্তি
বরগুনা
আনু মুহাম্মদ
কাজী সোহাগ
স্মৃতিচারণ
কুলদীপ নায়ার
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
সারাবেলা
ব্রাজিল
অস্ট্রেলিয়া
মারুফ কিবরিয়া
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
অন্য দিগন্ত
মহিউদ্দীন জুয়েল
মানসুরা হোসাইন
মুনতাসীর মামুন
শিরোনাম
শেখ রোকন
আবু সাঈদ খান
জেল থেকে জেলে
ফেসবুক
মহিউদ্দিন আহমদ
সংবাদ
কবিতা
বিশ্বজিৎ চৌধুরী
আলী হাবিব
প্রকৃতি ও পরিবেশ
শিল্প ও বাণিজ্য
শেষ পাতা
আবু আহমেদ
এম সাখাওয়াত হোসেন
নুরুজ্জামান লাবু
নূর মোহাম্মদ
মসজিদ
সুভাষ সাহা
আতাউস সামাদ
আলোচনা মতামত
অর্থনীতি ও বানিজ্য
এবিএম মূসা
আতাউর রহমান
কামাল আহমেদ
পিয়াস সরকার
আসাম
রংবেরং
রাহীদ এজাজ
রোকনুজ্জামান পিয়াস
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আশরাফুল ইসলাম
ফেনী
বরিশাল
রণজিৎ বিশ্বাস
অরুণ কর্মকার
প্রকৃতি ও বিজ্ঞান
মোস্তফা হোসেইন
উত্তর কোরিয়া
একরামুল হক
জলবায়ু ও পরিবেশ
আশীষ-উর-রহমান
একরামুল হক শামীম
তুহিন ওয়াদুদ
কালি ও কলম
ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ
অপরাজিতা
ইন্দোনেশিয়া
জাগোনিউজ২৪.কম
মইনুল ইসলাম
মানিকগঞ্জ
মুহম্মদ জাফর ইকবাল
মোশতাক আহমেদ
আশরাফুল হক রাজীব
ফরহাদ মাহমুদ
প্রণব বল
শংকর কুমার দে
সেলিম জাহিদ
আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ
কামরুল হাসান
পার্থ প্রতীম ভট্টাচার্য্য
রাজীব আহমেদ
শিল্পী
সাময়িকী ফ্যাশন
দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু
বিদ্যুৎ
মোরসালিন মিজান
রবার্ট ফিস্ক
কুষ্টিয়া
অভিজিৎ ভট্টাচার্য্য
ঈদ
কাজী সুমন
জনস্বাস্থ্য
জাতীয় নাগরিক পার্টি
ঝিলিমিলি
নিবন্ধ
মুস্তাফা জামান আব্বাসী
মনজুরুল হক
মহসীন হাবিব
মাহবুব মোর্শেদ
রফিকুল ইসলাম
শিলালিপি
শুভ রহমান
চৌধুরী মুমতাজ আহমদ
ছিটমহল
jugantor
নোবেল পুরস্কার
পাঠকের মতামত
পাবনা
মোশাররফ বাবলু
উচ্চশিক্ষা
তানভীর সোহেল
মামুন রশীদ
আনন্দ প্রতিদিন
উৎপল রায়
এনামুল হক
কাজল ঘোষ
নদী দূষণ
নাটোর
নিত্যপণ্য
ফাহিমা আক্তার সুমি
বাংলা নববর্ষ
চারু শিল্প
ভেনেজুয়েলা
শওকত হোসেন
নজরুল ইসলাম
নিউজিল্যান্ড
বিজ্ঞান
পার্থ সারথি দাস
প্রযুক্তি
মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান
গোলাম মর্তুজা
ফরহাদ মজহার
শারমিন নাহার
principalsanaullah
আদিবাসী
কাতার
কালের খেয়া
দিল্লি
ফখরুল ইসলাম
বাংলাদেশ প্রতিদিন
মুখোমুখি প্রতিদিন
মোহীত উল আলম
রাহাত খান
অমিতোষ পাল
গল্পালোচনা
পানি আগ্রাসন
বিশ্বজিৎ পাল বাবু
মাহবুব তালুকদার
আব্দুল কুদ্দুস
কানাডা
বিদেশ
WikiOpinion
তোফায়েল আহমেদ
তৌহিদা শিরোপা
আলোকিত বাংলাদেশ
কাদের সিদ্দিকী
ড. আবু এন এম ওয়াহিদ
ফারুক মঈনউদ্দীন
মোছাব্বের হোসেন
উৎপল শুভ্র
দিনাজপুর
নোমান মোহাম্মদ
সুদীপ অধিকারী
অরূপ দত্ত
ঝড় ও দুর্যোগ
পাভেল পার্থ
ফরিদপুর
ফিরোজ মান্না
মাসুদ পারভেজ
রোজিনা ইসলাম
শরিফুজ্জামান
শিশির মোড়ল
হামিদ-উজ-জামান মামুন
আকমল হোসেন
আজিজুর রহমান
আলম শাইন
তারেক মাহমুদ
দীপংকর চন্দ
পাভেল হায়দার চৌধুরী
ফখরে আলম
মাসুদ রানা
শহিদুল ইসলাম
হুমায়ূন আহমেদ
আবুল হাসনাত
আল আমিন
আসিফ আহমেদ
ইশতিয়াক পারভেজ
জিয়া চৌধুরী
হারুন হাবীব
অমিত বসু
ওমর ফারুক
ফজলুল বারী
ফারুক চৌধুরী
মাসুদ মিলাদ
শর্মিলা সিনড্রেলা
শাহাদুজ্জামান
হায়দার আকবর খান রনো
জাবেদ রহিম বিজন
জার্মানি
জাহাঙ্গীর আলম
ট্রানজিট
নন্দন
যতীন সরকার
যুবলীগ
লাতিন আমেরিকা
আরিফুজ্জামান তুহিন
কাজী আনিছ
খাবার
গাজীউল হাসান খান
তারেক রহমান
বাংলার দিগন্ত
মোহাম্মদ কায়কোবাদ
শেখ হাফিজুর রহমান
শৈলী
সাতকানিয়া
সুদান
কাজী হাফিজ
জোবাইদা নাসরীন
নিয়ামত হোসেন
মাহফুজুর রহমান মানিক
লুৎফর রহমান রনো
ইমরান আলী
এস এম আজাদ
জাহাঙ্গীর শাহ
মাহমুদুর রহমান মান্না
মুশফিকুর রহমান
সাতক্ষীরা
ইকতেদার আহমেদ
উৎসব
ঝিনাইদহ
মাসুদা ভাট্টি
মোকারম হোসেন
শেখ সাবিহা আলম
সিরাজগঞ্জ
সৈয়দ মাহবুবুর রশিদ
হারুন আল রশীদ
WikiEducation
আরব আমিরাত বা দুবাই
উজ্জ্বল মেহেদী
কনকচাঁপা
ড. মাহফুজ পারভেজ
পরিতোষ পাল
ব্যবসা
মিঠুন চৌধুরী
শাহদীন মালিক
হায়দার আলী
আহমেদ জামাল
ইমদাদুল হক মিলন
নওগাঁ
পোশাকশিল্প
বাতায়ন
আবু সালেহ আকন
এমাজউদ্দীন আহমদ
টিপু সুলতান
ড. মাহবুব উল্লাহ্
ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী
শোকাবহ ১৫ ও ২১ আগস্ট
WikiInternational
এবনে গোলাম সামাদ
দক্ষিণ কোরিয়া
পারভেজ খান
ফজলুল আলম
ফরিদা আখতার
বিভাষ বাড়ৈ
মাহমুদুজ্জামান বাবু
মুনির হাসান
মোশতাক আহমদ
সুনামগঞ্জ
আপেল মাহমুদ
জহির উদ্দিন বাবর
নোয়াখালী
রিপন আনসারী
লিবিয়া
শরীফুল ইসলাম
সুব্রত আচার্য্য
ইসলাম
উপন্যাস
কাল স্রোত
ক্রীড়া দিগন্ত
খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ
গাজীউল হক
জাহীদ রেজা নূর
শাহনেওয়াজ বিপ্লব
সাইদুজ্জামান
সাময়িকী
অধ্যাপক শুভাগত চৌধুরী
অনন্যা আশরাফ
অনিকা ফারজানা
আদিত্য আরাফাত
ইফতেখার আহমেদ টিপু
কামাল লোহানী
ড. সা'দত হুসাইন
তামান্না ইসলাম অলি
ফারজানা লাবনী
ফারুক যোশী
মনজুর আহমেদ
রিয়েল-টাইম নিউজ
আসজাদুল কিবরিয়া
কাক ছোট গল্প
ছিনতাই
জলবায়ু
বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য বাপন
মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী
রশিদ মামুন
লক্ষ্মীপুর
সম্পাদকীয়
সাইফুদ্দীন চৌধুরী
সুমন বর্মণ
BBC
ইমরান রহমান
ইলিরা দেওয়ান
এম শাহজাহান
নওশাদ জামিল
নুরুন্নবী চৌধুরী
প্রতীক ওমর
বার্তাটোয়েন্টিফোর.কম
বিকাশ দত্ত
মনিরুজ্জামান
মহিউদ্দিন আহমেদ
উইঘুর মুসলিম
দৈনিক ইত্তেফাক
পিটার কাস্টার্স
পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
প্রিয় চট্রগ্রাম
বাজেট
বাণিজ্য
মোবাশ্বির আলম মজুমদার
সঞ্জয় সাহা পিয়াল
হবিগঞ্জ
Hot Topic
খুন
টাকা আনা পাই
মাহবুবুর রহমান
শুভজ্যোতি ঘোষ
হাছান কুতুবী
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
অমর একুশে বিশেষ সংখ্যা ২০১২
Fantastic
আবিষ্কার
ড. কামাল
দৈনিক ইনকিলাব
ফিলিপাইন
ভুটান
মহাকাশচারী
জোহরান মামদানি
নিয়ন আলোয়
সাভার
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ
ইতালি
শফিক রহমান
শামীমুল হক
শেয়ারবাজার
আইন আদালত
গ্রিনল্যান্ড
নারী নির্যাতন
পটুয়াখালী
ফরিদ উদ্দিন আহমেদ
মণিপুর
মাগুরা
মেক্সিকো
অনিম আরাফাত
কিরণ শেখ
জাভেদ ইকবাল
দুদক
রাঙ্গামাটি
Art Mag
আরিফুল ইসলাম
প্রতিবাদ
প্রবাসী বাঙালি
বান্দরবান
মালদ্বীপ
শফিকুল ইসলাম
শিক্ষানীতি
সংবিধান
ডিডাব্লিউ
নরসিংদী
শরিফ রুবেল
কূটনীতি
গাইবান্ধা
জলবায়ু পরিবর্তন
ঝালকাঠি
নাইজেরিয়া
বায়ুদূষণ
যৌন অপরাধ
শাহনাজ পারভীন
স্বাধীনতা
WikiCity
WikiPolitics
কিশোর আলো
বৌদ্ধ
মতিউর রহমান চৌধুরী
WikiInterview
আকবর হোসেন
ইসলামী ছাত্রশিবির
ইহুদি
দৈনিক সংগ্রাম
Exclusive Articles
WikiEconomy
WikiLaw
ঘূর্ণিঝড়-হারিকেন
চুয়াডাঙ্গা
বাগেরহাট
ভূমিকম্প
রাজনৈতিক
সমিতির খবর
সানজানা চৌধুরী
সায়েদুল ইসলাম
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল
আমাদের সময় ডট কম
কুতুবদিয়া স্পেশাল
খাগড়াছড়ি
ধর্মঘট
স্পেন
আইন ও আদালত
কাদির কল্লোল
তাইওয়ান
দুর্গোৎসব ও পূজা
দৈনিক আমার সংবাদ
নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা 2013.
নূরে আলম সিদ্দিকী
প্রতিক্রিয়া
বিডিআর বিদ্রোহ
ব্যাংক
মুন্সীগঞ্জ
শিশুসাহিত্য
খ্রিষ্টধর্ম
গণমাধ্যম
গদ্যকার্টুন
পিরোজপুর
প্রতিদিনের সংবাদ
ভোরের কাগজ
রুমিন ফারহানা
Hit
আর্জেন্টিনা
বন্যা
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
সরল গরল
Asia
ডেনমার্ক
পরামর্শ
প্রকৃত্
ভাষা
ভোলা
MERIT
Soikot
WikiWoman
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
উন্নয়ন
জর্ডান
জ্বালানি
পিলখানা হত্যাকাণ্ড
ফ্যাশন
রঞ্জন বসু
সাংসদ
হরতাল
WikiCrime
উইকিলিকস
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
ক্রিকেট ও রাজনীতি
গণতন্ত্র
গোপালগঞ্জ
চাঁদপুর
চিত্রকর্ম
ছাত্ররাজনীতি
জঙ্গিবাদ
জন্মদিন
তেল-গ্যাস
দক্ষিণ ধুরুং
দূর পরবাস
নাকিবুল আহসান নিশাদ
নারী অধিকার
নোবেল শান্তি পুরস্কার
পঞ্চগড়
পরীক্ষা
প্রবাসী শ্রমিক
বিজয় দিবস
মেঘালয়
রাঙামাটি
সুশাসনের জন্য নাগরিক
সোমালিয়া
হামলা
আন্দালিব রাশদী
ঈদুল আজহা
এনটিভি
কক্সবাজার নিউজ ডটকম
কলম্বিয়া
কুতুবদিয়া নিউজ
চট্টগ্রাম বন্দর
চিঠিপত্র
ছাত্র রাজনীতি
ঠাকুরগাঁও
ডিজিটাল বাংলাদেশ
তথ্য অধিকার
তিউনিসিয়া
দুর্যোগ
দ্বিজেন শর্মা
নির্যাতন
নড়াইল
বেলজিয়াম
ভারতের প্রধানমন্ত্রী
মৃত্যু
শারদীয় দুর্গোত্সব
শিশুমৃত্যু
শিশুহত্যা
সালমান রাফি শেখ
সুবীর ভৌমিক
সুশাসন
স্মৃতি
হংকং
Africa
My Art
অধিকার
আন্তর্জাতিক নারী দিবস
একুশে টেলিভিশন
কুয়েত
চাঁপাইনবাবগঞ্জ
চুক্তি
নির্বাচন ও রাজনীতি
নেত্রকোণা
পরিবহন
পর্যটন কেন্দ্র
প্রশাসন
ফ্রান্সিস বুলাতসিঙ্ঘালা
বিশ্বকাপ ফুটবল
বড়ঘোপ
ভি এস নাইপল
ভৈরব
মরক্কো
মাওবাদী
মামলা
যানজট
লেমশীখালী
সংসদ
সমাজ
সামাজ
সুজন সুপান্থ
সুন্দরবন
সৈয়দ দিদার বখত
Middle East
Principal Sanaullah
Special Day
অগ্নিসংযোগ
অমৃতবাজার পত্রিকা
অরবিন্দ কেজরিওয়াল
আইন ও অধিকার
আগুন ও মৃত্যু
আজকের কাগজ
আল মাহমুদ
আহসান কবির
এম.এ মান্নান
এল সালভাদোর
ওমান
কমল জোহা খান
কিউবা
খাদ্যসমস্যা
জঙ্গি
জর্দান
তথ্য অধিকার আইন
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা
পানামা
পূর্বপশ্চিম
প্রাণি ও উদ্ভিদ
বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার
বন্য প্রাণী
বেলুচিস্তান
ভিয়েতনাম
ভোরের ঈদ ১৯
ভয়েস অফ আমেরিকা
যায়যায়দিন
লালমনিরহাট
শিক্ষা অধিকার
শিক্ষা ও সমাজব্যবস্থা
শিশুশিক্ষা
শেরপুর
শ্রমিক
সন্ত্রাসবাদ
সিঙ্গাপুর
সুইডেন
NEWS
Palestine
fd
অরণ্যে রোদন
অরুণাচল
অর্থনৈতিক
অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক
আহমেদ মুনির
ইকরাম সেহগাল
উত্তর ধুরুং
উমর মনজুর শাহ
একুশে ফেব্রুয়ারি
ঐতিহাসিক
কিশোরকণ্ঠ
কুড়িগ্রাম
কোরবান
ঘূর্ণিঝড়
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন
জাইমা রহমান
জাদুঘর
জামালপুর
জীবন
জেসমিন আখতার
জ্বালানি তেল
টেলিভিশন
তথ্যপ্র্রযুক্তি
তুষার আবদুল্লাহ
দেশপ্রেম
দৈনিক কক্সবাজার
নাগরিক সংবাদ
নারীঅধিকার
নিরাপত্তা
নির্বাচিত
নেদারল্যান্ডস
পাহাড়
পয়লা বৈশাখ
বঙ্গবন্ধু
বন্দর
বিশ্ব অর্থনীতি
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা
মহান বিজয় দিবস
মা
মাদারীপুর
মানবতা
মানববন্ধন
মিজোরাম
মিডিয়া ভাবনা
মে দিবস
রাজবাড়ী
শরীয়তপুর
শিক্ষা দিবস
শিক্ষা-প্রশাসন
শুভ বড়দিন
সজীব ওয়াজেদ জয়
সময়চিত্র
সরেজমিন প্রতিবেদন
সাতকানিয়া পৌরসভা
সুইজ়ারল্যান্ড
সুশান্ত মজুমদার
স্মরণ সভা
স্মর্রণ
হাসান আজিজুল হক
America
Burma
Child
China
Hot Video
Huw Cordey
Latin America
Marwan Barghouti
Tom Geoghegan
Tom Heap
Washington
kolkata24x7
অমানবিকতা
অ্যান্টার্কটিকা
আহমদ ছফা
উখিয়া
উত্সব
উদ্যোগ
এসিড-সন্ত্রাস
ওয়াসি আহমেদ
কর্মসূচি
কেনিয়া
ঘড়ি
চট্টগ্রাম বন্দর
চাকরি
চারদিক
চীন ও জাপান
জনসংখ্যা
জাকির তালুকদার
জাহাজ
জাহিদ হোসাইন খান
জায়গা
জায়মা জারনাজ রহমান
জীবনী
জেলহত্যা দিবস
জ্বালানী সম্পদ
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন
ড. সাজিদ হক
ডিজিটাল
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন
তিব্বত
ত্রিপুরা
নগরজীবন
নরওয়ে
নিবন্ধন
নীলফামারী
পবিত্র আশুরা
পবিত্র ঈদুল ফিতর
পরিকল্পনা
পানিসম্পদ
পুলিশ
পেরু
পোল্যান্ড
প্যারিস
প্রান্তকথা
প্রিয়.কম
প্রেক্ষিত
বর্নাঢ্য র্যালী
বলিভিয়া
বাংলাভিশন
বাজারসুবিধা
বাস্তবসম্মত
বিচার
বিশ্ব খাদ্য দিবস
বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস
বিশ্ব নদী দিবস
বিশ্ব প্রতিবন্ধী দিবস
বিশ্ব শিক্ষক দিবস
বিশ্ববিদ্যালয়
ব্যবস্থাপনা
ব্যাংক ব্যবস্থা
ব্রিটিশ
ভাষাসৈনিক
মাহমুদ আহমাদ
মুস্তাফিজ মামুন
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
যুদ্ধ ও শান্তি
যুদ্ধাপরাধ
যুদ্ধাপরাধের বিচার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
লবন চাষ
লামিনে ইয়ামাল
শহীদের স্মৃতি
শান্তি
শিল্প ও পরিবেশ
শিশুশ্রম
সন্ত্রাস ও রাজনীতি
সহজিয়া কড়চা
সিগন্যাল
সেলিনা হোসেন
স্বাধীন
স্বাস্থ্যনীতি
স্মরণ মুক্তিযুদ্ধ
স্মৃতিঘর
হাসপাতাল
Afghanistan
Bangladesh
Brazil
CNN
California
Comments
Croatia
Delhi
Denise Winterman
Dome of the Rock
God Mag
Google
Hugh Schofield
India
Indonesia
Jane O'Brien
Japan
Jeremy Bowen
Jerusalem
Jon Kelly
Kareem Khadder
Kate Dailey
Kim Ghattas
Lead News
Libya
Mahfuz Anam
Michal Zippori
New York
Nigeria
Pakistan
Paris
Paul Colsey
Qamrul Islam
Rosie Goldsmith
Rupert Wingfield-Hayes
Sanjoy Majumder
Source
South Sudan
The Daily Star
The Telegraph
Thomas Fessy
Tours
Vietventures
Wall Street
World's Last Chance
Young
a excellent photo in Kutubdia Island
bdnews24
google search
image
অদিতি ফাল্গুনী
অযোগ্যদে
অসারপনা
আইনকানুন
আজারবাইজান
আদিবাসী দিবস
আনোয়ারা সৈয়দ হক
আন্তর্জাতিক প্রতিবন্ধী দিবস
আফসার আমেদ
আবদুল লতিফ মাসুম
আবু আজাদ
আলজেরিয়া
আশান উজ জামান
আহমদ ফাহমি
ইথিওপিয়া
ইভ টিজিং
ইমরান খান
ইমাম খাইর
ইসলাম ও জীবন
ঈদের খুশি ও আনন্দ
ঈদের বেতন
উজবেকিস্তান
উপনির্বাচ
উপনির্বাচন
উর্দুভাষী
এ পি জে আবদুল কালাম
একুশে ফেব্রুয়ারি:
ঐতিহাস
ওবামা
কক্সবাজার নিউজ
কমিল্লা
কম্বোডিয়া
কলকাতার চিঠি
কাকন রেজা
কাজাখস্তান
কাটরা
কানাই কুণ্ডূ
কালের পুরাণ
কুতুবদিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
কৈয়ারবিল
ক্রসফায়ার
ক্ষত
ক্ষমাপ্রার্থনা
ক্ষুদ্রঋণ
কয়লানীতি
খায়ের মাহমুদ
খোন্দকার শওকত হোসেন
গাম্বিয়া
গোধূলি
গোড়ার
গৌড়
গ্রামীণ অর্থনীতি
গ্রিস
গ্রেপ্তার
ঘূর্ণিঝড় সম্পাদকীয়
ঘোড়া
চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচন
চরমোনাই পীর
চলতি পথে
চাঁদ
চাদ
চিনি
চিরকুট
চিলি
চেয়ারম্যান
ছাত্র-রাজনীতি
ছাড়পত্র
ছুটিদন
জজ হত্যা দিবস
জনদুর্ভোগ
জনস্বাস্থ্যের
জবাবদিহি
জম্মদিন
জলদস্যু
জাতিগত সহিংসতা
জারদারি
জি. মুনীর
জীবনযুদ্ধ
জীবিকা
জুমকন্যার
জ্বালানি রাজনীতি
জ্বালানি সম্পদ
জ্বালানিসম্পদ
জয়পুরহাট
ঝুঁকি
ঝুঁকি হ্রাস দিবস
টিপাইমুখ
টিপাইমুখ বাঁধ
টিপাইমুখে বাঁধ
টিভি চ্যানেল
টোঙ্গা
ঢাকা টাইমস
তানজির আহমেদ রাসেল
তুর্কমেনিস্তান
তেঁতুল
তেলকূপ দুর্ঘটনা
তেলিরকাটা
দক্ষিণ মগডেইল
দারিদ্র্য বিমোচন
দায়গুলো
দায়িত্ব
দুই দু’গুণে পাঁচ
দুর্গ
দূর পরবাসে
দেবনারায়ণ চক্রবর্তী
দৈনিক আজাদী
নগরদর্পণ
নদীকৃত্য দিবস
নববধূ
নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন
নারীর ক্ষমতায়ন
নাসরীন জাহান
নাসিমা আনিস
নাসির উদ্দিনের স্বাভাবিক মৃত্যু
নিকারাগুয়া
নিজাম কুতুবী
নিপীড়ন
নিরাপতা
নির্বাসনে
নিষেধাজ্ঞা’
নীহারুল ইসলাম
নূরে আলম জিকু
নেতা ইমরান খান
নেতৃত্বে
নোযাখালী
পণ্যবাজার
পদক
পবিত্র হজ
পররাষ্ট্রনীতি
পরিস্থিতি
পর্তুগাল
পাঠকের মন্তব্
পাপুয়া নিউগিনি
পাপড়ি রহমান
পাসপোর্ট
পাহাড়ধস
পিলখানা হত্যা
পোশাক
প্রশ্নবিদ্ধ
প্রস্তাবিত
প্রাণীজী
প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ
প্রয়াণ
ফাঁসি
ফিনল্যান্ড
ফেরি ও পন্টুন
বঙ্গবন্ধু হত্যা
বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তন
বঞ্চনা
বনসম্পদ
বরিশাল ছাত্রলীগ
বর্ণবৈষম্যবিলোপ দিবস
বাঁকখালী
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
বাংলাদেশের পতাকা
বার্লিন দেয়াল
বাল্যবিয়ে
বাস্তবা
বাস্তবায়
বিচার বিভাগ
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
বিজ্ঞানচিন্তা
বিজ্ঞাপন
বিজয়
বিদ্যুত
বিদ্যুৎ-সংকট
বিদ্যুৎকেন্দ্রে
বিপ্রদাশ বড়ুয়া
বিলবোর্ড দুর্ঘটনা
বিলেতের স্ন্যাপশট
বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস
বিশ্ব পরিবেশ দিবস
বিসিবি
বুলবন ওসমান
বুড়িগঙ্গা
বৃক্ষরোপণ
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন
বৈষম্য
বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর
ব্যারিস্টার নাজির আহমদ
ব্রুনাই
বড়পুকুরিয়া
ভাজিরালংকর্ন
ভালোবাসা
ভাষণ
ভেজাল
ভোজ্যতেল
মংলা থেকে
মঈনুল হাসান
মঙ্গোলিয়া
মঞ্জু সরকার
মনযূরুল হক
মনি হায়দার
মন্ত্রিসভা
মাওবাদী সহিংসতা
মাতৃভাষা ও পরভাষা
মানচিত্র নিউজ
মানসিক স্বাস্থ্য দিব্স
মানসিকতা
মালি
মাল্টা
মাহবুব রেজা
মাহামুদা খাতুন
মিথিলেশ ভট্টাচার্য
মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম
মুরগি জমা
মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন
মূল্যস্ফীতি
মৃত্যু ও কিছু ভাবনা
মোহাম্মদ কামরুজ্জামান
মোহাম্মদ মোশাররফ হুসাইন
ম্যাডোনা
ম্যান্ডেলা দিবস
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল
যুদ্ধাপরাধ-বিচার
রকিব হাসান
রক্ত
রদ্ধাঞ্জলি
রবাণিজ্যে
রাগবি
রাজনৈতিক সংস্কৃতি
রাজপথ
রাষ্ট্রীয়
রাস্তার
রিয়াল মাদ্রিদ
রুবেল হোসেনের
রেলওয়ের
রোমাঞ্চিত
রোমানিয়া
র্বিজ্ঞান
শক্তিশালী
শঙ্কা
শরীরের
শশী থারুর
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস
শাকিরা
শাহ্নাজ মুন্নী
শায়খ আহমাদুল্লাহ
শিক্ষক খুন
শিক্ষক-রাজনীতি
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস
শিক্ষাচিত্রে
শিক্ষাবিদের
শিবের গীত
শুঁটকি উৎপাদন
শেরাটনীয়
শোনা
শ্রদ্ধাঞ্জল
শ্রমবাজার
শ্রমশক্তি
ষড়যন্ত্র
সংকট
সংঘাত
সংশোধন
সঙ্গী
সততা
সন্দেশ
সমন্বয়সাধন
সমাজ ও নারী
সমুদ্রস্নান
সময়
সময় নিউজ টিভি
সময়ের প্রতিবিম্ব
সরকার
সাংবাদ
সাইক্লোন শেল্টার
সাইপ্রাস
সাজিদ গ্রেফতার
সাদাসিধে কথা
সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম
সামন্ততন্ত্র
সামরিক শাসন
সামাজি
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম
সাহসী
সিডনি
সিয়াম
সুপ্রভাত
সূর্যে
সেচসুবিধা
সোনার বাংলা
স্কাইপি
স্বকৃত নোমান
স্বচ্ছতা
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
স্বাধীনত
স্বাধীনতাযুদ্ধ
স্বামী
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স
স্বীকৃতি
স্মৃত-নিদর্শন
স্মৃতিসৌধ
স্মৃতিসৌধে
স্লোভাকিয়া
হত্যা ও হরতাল
হাইতি
হামিদ মীর
হুগজিল্ট











