Sunday, November 8, 2015

মিয়ানমারের নির্বাচনে জিতবে কে—গণতন্ত্র না জবরদস্তি? by সোহরাব হাসান

সামরিক শাসনে রেকর্ড সৃষ্টিকারী মিয়ানমারে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। দেশটির তিন কোটি ভোটার ৪৪০ আসনের নিম্ন পরিষদে ৩৩০ আসনের জন্য ভোট দিলেও বাকি আসনগুলো পূরণ করবেন সেনাবাহিনীর প্রধান সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে। ২২৪ সদস্যের উচ্চকক্ষের ১৬৮টি আসনেও একই দিনে ভোট হতে যাচ্ছে। সেখানেও বাকি আসনগুলো পূরণ করবেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এই নির্বাচনে ৯১টি তালিকাভুক্ত রাজনৈতিক দলের ছয় শতাধিক প্রার্থী অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) মধ্যে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ধারণা, নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলে এনএলডি জয়ী হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে কি না। কিংবা নির্বাচনে সু চির দল জয়ী হলেও প্রকৃত ক্ষমতা তাঁর হাতে দেওয়া হবে কি না। ১৯৯০ সালেও মিয়ানমারের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জনগণ এনএলডির পক্ষে রায় দিলেও সেনাবাহিনী সেই নির্বাচনী ফল নাকচ করে দেয় এবং জনগণের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে। তবে পর্যবেক্ষকেরা এ-ও মনে করেন যে সেই সময়ে যত সহজে নির্বাচনী ফলাফল নস্যাৎ করা গেছে, এখন সেটি তত সহজ হবে না। সেনাবাহিনীকে ইচ্ছায় হোক কিংবা বাইরের চাপেই হোক, বিরোধী দলের সঙ্গে কিছুটা আপসরফায় আসতে হয়েছে। ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধানে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব বহাল রাখতে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানে সেনাবাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত করা হয়, যাঁদের সেনাপ্রধানই মনোনীত করে থাকেন। সেই সংবিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১০ সালের নির্বাচন বর্জন করে এনএলডি; যদিও দলের কিছু লোককে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করেছিল সেনা-নিয়ন্ত্রিত সরকার। কিন্তু সেই নির্বাচনে মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ইতরবিশেষ পরিবর্তন হয়নি। আগের সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেইন সেইনই নতুন প্রেসিডেন্ট পদে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। বেসামরিক প্রশাসনের মতো সামরিক প্রশাসনেও কিছু কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে ৩০ সদস্য নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো সেনাসদস্যদের হাতেই রয়েছে।
রোহিঙ্গাদের একাত্মতায় ভোট দেবে না স্বীকৃত মুসলিমরাও
৭ নভেম্বর, ২০১৫: পরিবর্তন ডটকম
রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মুসলিমদের মিয়ানমারে নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া না হলেও দেশটির নাগরিক হিসেবে পূর্ণ অধিকার পেয়েছেন কামান মুসলিমরা। কিন্তু তাও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে মিয়ানমারের নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন কামানরা।
মিয়ানমারে রোববারের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ঘোষণা দিয়েছেন কামান মুসলিমরা। রোহিঙ্গাদের মতই কামানরাও আরাকানের বাসিন্দা এবং সেখানকার আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে তারাও কম নির্যাতিত হননি। রোহিঙ্গাদের মতই ২০১২ সালে কামানরাও একই ধরনের বর্বর নির্যাতনের শিকার হয়েছিল, হত্যা করা হয়েছিল কয়েকশ’ কামান মুসলিমকে।
বার্মা টাইমস জানিয়েছে, তখন থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মতই শরণার্থী শিবিরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছে কিছু কামান মুসলিমকে। রোহিঙ্গাদের মতই তাদের ওপরেও রয়েছে নানা নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু কামান মুসলিমদের ভোট দেয়ার অধিকার রয়েছে এবং তাহলেও বুদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের গণআন্দোলনের কারণে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভোট দেয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার প্রতিবাদ হিসেবে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অধিকাংশ কামান মুসলিম। মিয়ানমারের নির্বাচনে দেশটি জুড়ে মুসলিম প্রার্থীদের প্রতি বৈষম্যে হতাশাও প্রকাশ করেছেন কামানরা।
এদিকে, বৃহস্পতিবার থেকেই রোহিঙ্গা গ্রামগুলোকে অবরুদ্ধ করতে শুরু করেছে সশস্ত্র রাখাইনরা। ২০১২ সালের মতই গণহত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। মুসলিম ও তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর ঘোষণাও দেয়া হচ্ছে। হুমকির কারণে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন সেনাবাহিনীর সাহায্যপ্রার্থী রোহিঙ্গারা। প্রায় সবদিক থেকে অবরোধের কারণে গ্রাম থেকে পালাতেও পারছেন না তারা। রোহিঙ্গাদের সাহায্যে সেনাবাহিনীর টহল তো নেইই, এমনকি অনেক গ্রামেই খোদ পুলিশেরই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন সাধারণ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে লুটপাট চালিয়ে পুলিশ ও বিজিপি স্মার্টফোন ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে যাচ্ছে এবং অসংখ্য নারী-পুরুষকে ধরে ধরে পেটাচ্ছে। মুসলিম বিশ্বে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে স্মার্টফোন ব্যবহার করা হচ্ছে, এই অভিযোগে স্মার্টফোন নিয়ে যাচ্ছে সৈনিকরা।
এদিকে, শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কর্মীদের কারাদণ্ড, বাকস্বাধীনতা হরণ, সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য ও রাজনৈতিক দণ্ডাজ্ঞা- অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন- সবমিলিয়ে বার্মায় নির্বাচনের সপ্তাহটিতে পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। রোববার ভোটদান সামনে রেখে এক বিবৃতিতে একথা জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাটির ব্রিটেন শাখা।
এদিকে, নির্বাচনে জয়প্রত্যাশী শান্তিকামী নেতা অং সান সু কি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চলমান নির্যাতনের বিষয়টি অত্যুক্তি বলে মন্তব্য করেছেন। রোহিঙ্গাদের সংকটের বিষয়টি নিয়ে অতি মাতামাতি না করার জন্যও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, মার্কিন পত্রিকা হাফিংটন পোস্টের এক খবরে বলা হয়েছে, খুব বেশি দেরি হওয়ার আগেই রোহিঙ্গাদের সংকট দূর করতে না পারলে জাতিটি নির্মূল হয়ে গেলেও অবাক হওয়ার তেমন কিছু থাকবে না।
জেনারেল থেইন সেইন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিরোধী দল এনএলডির সঙ্গে সমঝোতায় আসার উদ্যোগ নেন; যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে অং সান সু চির ১৫ বছরের অন্তরীণ অবস্থার অবসান হয় এবং পরের বছর ৪৫টি আসনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে এনএলডির ৪৩ জন সদস্য জয়ী হয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেন। অং সান সু চি হন বিরোধী দলের নেত্রী।
এখানে উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে মিয়ানমারে তৎকালীন নেউইন সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রবল ছাত্র গণ-আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, অসুস্থ মাকে দেখতে এসে অং সান সু চি তাতে জড়িয়ে পড়েন এবং একসময় তাঁর হাতেই নেতৃত্বের ভার পড়ে। এরপর তিনি বাবা মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের সহযোদ্ধা ও তরুণ নেতাদের সমন্বয়ে এনএলডি গড়ে তোলেন। এই দলটি ১৯৯০ সালে নির্বাচনে ৮৫ শতাংশ আসনে জয়ী হলেও সামরিক শাসকেরা সেই ফল মেনে নেননি। অং সান সু চিকে কখনো অন্তরীণ, কখনো নির্জন কারাবাসে কাটাতে হয়। তাঁর অধিকাংশ রাজনৈতিক সহযোদ্ধার ঠিকানাও হয় জেলখানা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকেও মিয়ানমার প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দ্রুত নাজুক হতে থাকে।
গত তিন বছরে অং সান সু চি ও তাঁর দল একাধিকবার সংবিধানে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হন। কেননা, তিন-চতুর্থাংশের সমর্থন ছাড়া সংবিধান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধানের ৫৯ (এফ) ধারা অনুযায়ী কেউ বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করলে কিংবা তাঁর সন্তান অন্য দেশের নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এই আইনটি করা হয়েছিল সু চিকে লক্ষ্য রেখেই। এ ছাড়া সংবিধানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সেনাবাহিনীর জন্য যে ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত আছে, সেটি পরিবর্তন করতে না পারলে মূল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই থেকে যাবে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
গণতন্ত্রের নেত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে নন্দিত অং সান সু চি এবারের নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী। ইয়াঙ্গুনের বিখ্যাত শোয়েডন প্যাগোডার সামনে আয়োজিত জনসভায় তিনি বলেছেন, নির্বাচনে তাঁর দলই জয়ী হবে। যারা বলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সময় এটি নয়, তারা আসলে এনএলডির হাতে ক্ষমতা দিতে ভয় পায়। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদেরও ধারণা, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে অং সান সু চিরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি। আর সু চির জয়ের অর্থ হবে সেনা নেতৃত্বের পরাজয়।
প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন এই বলে ভোটারদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে বিরোধী দল জয়ী হলে মিয়ানমারে আরব বসন্ত দেখা দেবে, যা দেশকে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবে। তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেছেন। নির্বাচিনী প্রচারের শুরু থেকে সু চির দল যাতে জয়ী হতে না পারে, সে জন্য সেনাবাহিনী ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো নানা অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে।
এখানে কৌতূহলোদ্দীপক হলো, আশির দশকের শেষার্ধে এবং নব্বইয়ের দশকজুড়ে যে বৌদ্ধ মংরা সেনাশাসনের বিরুদ্ধে চালিত আন্দোলনে সু চিকে সমর্থন করেছেন, তাঁেদর অধিকাংশ এখন তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। শান্তির প্রতীক গৈরিক বসনধারীরা এখন ধর্মকে উগ্রপন্থার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁরা প্রচার চালাচ্ছেন যে সু চি জয়ী হলে ভবিষ্যতে দেশটিতে মুসলমানেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে এবং বৌদ্ধরা সাগরে নিক্ষিপ্ত হবে। যদিও এ ধরনের প্রচারের কোনো ভিত্তি নেই। বরং দেশটির জনসংখ্যার পাঁচ ভাগ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নিয়ত তারা ভয়ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। গত কয়েক বছরে রাখাইন প্রদেশের বাইরেও একাধিকবার মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা হয়েছে। আর মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের তো নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিই দেয়নি, তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। অনেকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। সম্প্রতি রাখাইনে নির্বাচনী জনসভায় অং সান সু চি বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাসহ সব সমস্যার সমাধান হবে।
মুসলিমবিরোধী রাজনীতি সেখানে এতটাই তুঙ্গে যে ক্ষমতাসীন ইউএসডিপি ও বিরোধী এনএলডি কোনো মুসলমানকে প্রার্থী করেনি। যদিও বর্তমান সেনা প্রভাবিত সংসদেও বেশ কয়েকজন মুসলমান সদস্য আছেন। গত জানুয়ারিতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যখন মিয়ানমারে যাই, তখনই সু চি-বিরোধী ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করি। সেখানে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি বন্ধু আমাকে একটি ওয়েবসাইট দেখালেন, যাতে হিজাব পরিহিত অবস্থায় সু চিকে একজন মুসলমান নেতার সঙ্গে আলোচনা করতে দেখা যায়। ছবিটি ছিল ইমপোজ করা। সু চিকে রোহিঙ্গা তোষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের ভয়ে তিনি রোহিঙ্গা ও মুসলিমদের ওপর অব্যাহত হামলার বিষয়েও একপ্রকার নীরবতা অবলম্বন করে চলেছেন। এ কারণে বহির্বিশ্বে সু চিকে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি ২০০৭ সালে সরকার-সমর্থকেরা সু চির গাড়িবহরে হামলা চালালে অন্যান্যের মধ্যে এনএলডির একজন মুসলিম নেত্রীও গুরুতর আহত হন, যিনি ছিলেন নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সু চি তাঁকে মনোনয়ন দিতে সাহস পাননি।
অং সান সু চি সর্বশেষ নির্বাচনী সভায় দেওয়া ভাষণে বলেছেন, জনগণের রায়ে তাঁর দলই জয়ী হবে এবং সে ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান প্রেসিডেন্টের ওপরে হবে। এখানেই আশঙ্কা যে সেই জয়কে ক্ষমতাসীনেরা মেনে নেবে কি না। যদি মেনে না নেয়, তাহলে কি ১৯৯০ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে? আর যদি মেনে নেয়, তাহলে কি সামরিক জান্তা সংবিধান সংশোধন করে সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ উন্মুক্ত করবে?
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় নব্বইয়ের পুনরাবৃত্তি হওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নতি ও আন্তর্জাতিক জনমত। সেই সময়ে মিয়ানমার নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখার ঝুঁকি নিলেও এখন নিতে সাহস পাবে না। এই মুহূর্তে বিদেশি বিনিয়োগ ও সাহায্যের সুফল কেবল সাধারণ মানুষই পাচ্ছে না, তার সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন সেনা শাসকেরাও। অন্যান্য উন্নয়নকামী দেশের মতো মিয়ানমারের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঠিকাদারির বড় অংশীদার বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। ফলে খুলে দেওয়া অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দরজা ফের বন্ধ করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হবে।
সে ক্ষেত্রে সু চির দল জয়ী হলে সেনা কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে একটি আপসরফা বা ক্ষমতা ভাগাভাগিতে আসতে পারে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা মনে করেন। সু চিও এ ব্যাপারে নমনীয় বলে ধারণা করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনি বলে দিয়েছেন, এনএলডি জয়ী হলে ‘সমঝোতার সরকার’ গঠনে প্রস্তুত আছে। সমঝোতার অর্থ ক্ষমতা ভাগাভাগি।
এখন প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে এককভাবে ক্ষমতা ভোগকারী সেনাবাহিনী সেই ভাগাভাগিতে রাজি হবে কি না। তাই নির্বাচনের চেয়েও পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি এখন নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

শিক্ষকের ভগ্ন কাঁধ এবং এসডিজির গুরুভার by গোলাম ফারুক

এই নিবন্ধের মূল আলোচ্য বিষয় দুটি: শিক্ষক ও এসডিজি। প্রথমেই শিক্ষক প্রসঙ্গটি নাট্যকার বার্নার্ড শয়ের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করা যাক। তিনি তাঁর ম্যান অ্যান্ড সুপারম্যান নাটকে লিখেছিলেন, ‘যিনি পারেন তিনি করেন, আর যিনি পারেন না তিনি শেখান।’ ছাত্রাবস্থায় এই বাক্যটি যখন পড়েছিলাম, মনে হয়েছিল এটা শয়ের স্বভাবসুলভ রসিকতামাত্র। অনেক দিন পর আমি নিজে যখন শিক্ষক, ছোট্ট একটা ঘটনায় টের পেলাম, এটা নিতান্ত ঠাট্টা নয়। ঘটনাটা এ রকম: কাপড় কিনতে গেছি। দর-কষাকষি করতে যাওয়ায় দোকানি বিরক্ত হয়ে বললেন, আগের দিন এক বিশেষ কর্মকর্তা হাসিমুখে অনেক বেশি দাম দিয়ে একই কাপড় কিনে নিয়ে গেছেন। আমি বলতে চাইলাম, ওনার তো...। দোকানদার কী বুঝলেন জানি না, আমাকে থামিয়ে মুখ বাঁকিয়ে শব্দগুলোকে অবজ্ঞার সঙ্গে চিবিয়ে ফেলে দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘ওরা পারে, পায়; আপনারা পারেন না, তাই মাস্টারি করেন।’
পরে লক্ষ করলাম, ওই দোকানির মতো যাঁরা ‘বুদ্ধিমান’, তাঁরা এমনটাই ভাবেন। তাঁদের ধারণা, শিক্ষকেরা শিক্ষকতা করেন বাধ্য হয়ে—ক্ষমতা ও অর্থের বিচারে এর চেয়ে ভালো চাকরি পাননি বলে। নিজে শিক্ষক বলে কিনা জানি না, এটা মানতে আমার কষ্ট হয় এবং আমার ধারণা, যেকোনো সংবেদনশীল মানুষের পক্ষে এটা মানা কঠিন। যা হোক, অপমান করলেও তথ্য-উপাত্ত ছাড়াই ওই দিন ওই দোকানি আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছেন, বাংলাদেশের ‘বুদ্ধিমান’ মানুষদের কাছে শিক্ষকদের মান-মর্যাদা কেমন।
এবার আসা যাক এসডিজি (সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল) প্রসঙ্গে। এই গেল সেপ্টেম্বরে আমরা এসডিজি পূরণ করব বলে স্বাক্ষর করেছি। অর্থাৎ আমরা প্রতিজ্ঞা করেছি, এমডিজির ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ আগামী ১৫ বছরে অর্জন করার জন্য এসডিজির যে ১৭টি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, আমরা তা পূরণে সচেষ্ট থাকব। এই ১৭টি লক্ষ্যের মধ্যে চার নম্বরটিতে শিক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা আছে। শিক্ষা-সম্পর্কিত এই লক্ষ্যে পৌঁছানো দুষ্কর হলেও এত চমৎকার যে তা যদি অর্জন করা যায়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যেই অন্য কিছুতে না হোক, অন্তত শিক্ষায় আমরা উন্নত দেশগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে যাব। অনেকের কাছে বিষয়টা উচ্চাভিলাষী কিংবা অলীক মনে হতে পারে, কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এটা উচ্চাভিলাষী বটে, তবে অলীক নয়। পরিকল্পনা মাফিক এগোলে বাংলাদেশ অবশ্যই এই লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে। সেই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, যদি না পারে, এই প্রতিযোগিতাময় বিশ্বে সে এমন পিছিয়ে পড়বে যে ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন শেষ পর্যন্ত স্বপ্নই থেকে যাবে।
খুব সংক্ষেপে এসডিজির শিক্ষা-সম্পর্কিত লক্ষ্য হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা করা। এখন দেখা যাক মানসম্পন্ন শিক্ষা বলতে আসলে কী বোঝায়। ইউনেসকো তাদের একটি রিপোর্টে মানসম্পন্ন শিক্ষার সংজ্ঞা দিয়েছে এভাবে: মানসম্পন্ন শিক্ষার অর্থ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তার উন্নয়ন; তাদের ব্যক্তিত্ব, মেধা, মানসিক ও শারীরিক সামর্থ্যের পরিপূর্ণ বিকাশ সাধন; ওরা জ্ঞান লাভ করবে, মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ হবে, দক্ষতা অর্জন করবে, সৃজনশীল হবে, সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণে ব্রতী হবে, সর্বোপরি বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠবে। উপরন্তু, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই যেন শেষ কথা না হয়, এ কারণে ছাত্রদের এমনভাবে গড়ে তোলা হবে, যেন তাদের ভেতর জীবনব্যাপী নিরন্তর শেখার একটা আগ্রহ তৈরি হয়।
এই মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য ইউনেসকো কিছু পূর্বশর্ত পূরণের কথা বলেছে। ইউনেসকোর মতে, মানসম্পন্ন শিক্ষা মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: ১. শিক্ষক, ২. শিক্ষাক্রম এবং ৩. শিক্ষার পরিবেশ। এর মধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে দুর্বল জায়গা বা তার একিলিসের গোড়ালি হচ্ছে প্রথমটি: ‘শিক্ষক’। তাই অন্য দুটি বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করার পর এ বিষয়ে ফিরে আসব।
স্বাভাবিক নিয়মে যেকোনো শিক্ষাক্রমকে যুগোপযোগী হতে হয়। তবে ইউনেসকো সুনির্দিষ্টভাবে বলেছে যে তাকে হতে হবে বাস্তবসম্মত ও বোধগম্য, যা শিক্ষার্থীকে সাম্য, মৈত্রী, সহনশীলতা, মানবাধিকার, লিঙ্গসমতা, সবুজ অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজ, স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিষয়ে সচেতন ও সক্রিয় করে তুলবে। আমাদের পাঠ্যবইগুলোয় হয়তো সবকিছু খুব নিখুঁতভাবে উপস্থাপিত হয়নি, তবে চেষ্টা করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষানীতি–২০১০–এর ভিত্তিতে ২০১২ সালে যে শিক্ষাক্রম সংস্কার হয়, তার সঙ্গে ইউনেসকো প্রস্তাবের যথেষ্ট মিল আছে। শুধু তা-ই নয়, এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে রচিত হয়েছে শতাধিক নতুন পাঠ্যবই। বোঝাই যাচ্ছে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সাফল্য প্রায় সুনিশ্চিত।
মানসম্পন্ন শিক্ষার আরেকটি শর্ত হচ্ছে শিক্ষার পরিবেশ। ইউনেসকো বলছে, লেখাপড়ার জন্য ছেলেমেয়েদের যেকোনো একটি কক্ষে ঢুকিয়ে দিলেই হবে না, কক্ষটিকে হতে হবে সত্যিকারের শ্রেণিকক্ষ। বাংলাদেশে কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই কক্ষকে শ্রেণিকক্ষে রূপান্তরের গতি প্রশংসার যোগ্য। যেমন ২০১১ সালে যেখানে বাংলাদেশের কোনো মাধ্যমিক স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ছিল না, সেখানে ২০১৫ সালের মধ্যে ৮০ শতাংশ স্কুল মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করতে পারবে এবং একই সংখ্যক স্কুল বিদ্যুতের সংযোগ পাবে। এ ছাড়া ১০ শতাংশ স্কুলে থাকবে সৌরবিদ্যুৎ, ৮৫ দশমিক ০৫ শতাংশ স্কুল পাবে কম্পিউটার ব্যবহার করার সুবিধা, ৩৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ স্কুল ইন্টারনেট-সংযোগ পাবে, ৯১ শতাংশ স্কুলে থাকবে নিরাপদ পানীয় জল এবং ৯৯ শতাংশ স্কুলে মেয়েদের জন্য আলাদা টয়লেটের ব্যবস্থা হবে। যদিও শিক্ষক-ছাত্র অনুপাত এখনো একটু বেশি, তবু শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে সরকার যে সচেষ্ট, এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় এবং এই গতিতে চললে ২০৩০ সালের মধ্যে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
এ ছাড়া আরও কিছু বিষয় আছে, যা এসডিজির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। সেই সব জায়গায় বাংলাদেশ ইতিমধ্যে অনেক এগিয়ে আছে। যেমন প্রায় সব স্কুলে প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা চালু, প্রায় সব ছেলেমেয়েকে প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি করা (৯৭ দশমিক ৭ শতাংশ) এবং ছাত্রছাত্রীর সংখ্যায় সমতা আনা। যেমন প্রাথমিক পর্যায়ে এখন ছাত্রীর সংখ্যা ৫০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে তা আরও বেশি—৫৩ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ ছাত্রের চেয়ে এখন ছাত্রীসংখ্যা বেশি।
তার মানে, এসডিজির যাত্রারম্ভে উপর্যুক্ত বিষয়াদিতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি বেশ ভালো। তবে শিক্ষাবিদেরা মনে করেন, এসব প্রস্তুতি শেষ পর্যন্ত সুকুমার রায়ের ‘বিদ্যেবোঝাই বাবুমশাইয়ের’ জীবনের মতো ‘ষোলোআনাই মিছে’ হয়ে যাবে, যদি ‘শিক্ষক’ মানসম্পন্ন না হন। একটি জাতি যত চেষ্টাই করুক, সে তার শিক্ষাব্যবস্থার মান কখনোই শিক্ষকের মানের চেয়ে উন্নত করতে পারে না। ২০১৪ সালে আইএলও, ইউনেসকো, ইউএনডিপি, ইউনিসেফ ও ‘এডুকেশন ইন্টারন্যাশনাল’-এর কর্তাব্যক্তিরা এক যুক্ত বিবৃতিতে আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ‘একটি দেশের শিক্ষকেরা যেমন, তার শিক্ষাব্যবস্থাও ঠিক তেমনই। সবার জন্য বিশ্বজনীন ও মানসম্পন্ন শিক্ষা বাস্তবায়নে শিক্ষকের ভূমিকাই প্রধান; নতুন নতুন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ ও সুযোগকে মোকাবিলা বা সদ্ব্যবহার করার জন্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মন ও মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁরাই মূল ভূমিকা পালন করতে পারেন...।’ এই উদ্ধৃতির যে জায়গায় বলা হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থার মান কার্যত সমান, সেখান থেকে আরেকটা অনুসিদ্ধান্ত টানা যায়: আর কিছু থাক বা না থাক, কেবল ভালো শিক্ষক থাকলেই মোটামুটি মানসম্পন্ন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সম্পর্কটা তো বোঝা গেল। অর্থনীতিবিদেরা যেহেতু বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আবার অর্থনীতির গাঁটছড়া বাঁধা, তাই সাধারণ বুদ্ধিতে অর্থনীতিতে শিক্ষকের মান-মর্যাদার ভূমিকা কী হতে পারে, তা আন্দাজ করা যায়। কিছু কিছু দেশে তার সাক্ষাৎ প্রমাণও মেলে। যেমন চীন। চীনের অর্থনীতি সবাই জানি, কিন্তু চীনা শিক্ষকদের বেতন ও মান-মর্যাদা অনেকের কাছেই অজানা।
২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গ্লোবাল ইনডেক্সে দেখা যায়, পৃথিবীতে চীনা শিক্ষকদের মর্যাদাই সবচেয়ে বেশি। সেখানে চিকিৎসক আর শিক্ষকেরা সমান মর্যাদা ভোগ করেন; ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ মনে করেন, ছাত্ররা শিক্ষকদের সত্যিকার অর্থে সম্মান করে; ৫০ শতাংশ মানুষ চান যে তাঁর সন্তান শিক্ষক হোন এবং শিক্ষকদের গড় বেতন হচ্ছে ১৭ হাজার ৭৩০ ডলার। উল্লেখ্য, অনেক দেশ আছে, যেখানে শিক্ষকেরা এর চেয়েও অনেক বেশি বেতন পান, কিন্তু যেকোনো কারণেই হোক, এত মর্যাদা পান না। অর্থাৎ চীন জানে শুধু বেতন নয়, আরও অনেকভাবে শিক্ষকদের মর্যাদা বাড়ানো যায়। আমার ধারণা, মহিরুহরূপে যে চীনকে আমরা এখন দেখি, তার বীজটা এখানেই প্রোথিত।
এসব কারণেই বাংলাদেশ যদি এসডিজি পূরণ করতে চায়, যেমন সফলভাবে সে এমডিজি পূরণ করেছে, তাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে শিক্ষায়, অর্থাৎ শিক্ষকের ওপর। এমডিজির ক্ষেত্রে শিক্ষক এত গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন না, কারণ সেখানে শিক্ষার প্রসার নিয়ে যতটা ভাবা হয়েছিল, মান নিয়ে ততটা নয়। মনে রাখতে হবে, এবারের লক্ষ্য হচ্ছে মানসম্পন্ন শিক্ষা, যার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষক অপরিহার্য। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার তা উপলব্ধি করা শুরু করেছে। যেমন শিক্ষক প্রশিক্ষণের সংখ্যা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার ইতিমধ্যে প্রশংসনীয় কিছু উদ্যোগ নিয়েছে।
সচেতন নাগরিকেরা আশা করেন, সরকার আরও উদ্যোগ নেবে, বেসরকারি খাত এগিয়ে আসবে, জনগণ এই পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবে, শিক্ষকেরা নিজেরাও আত্মোন্নয়নে ব্রতী হবেন; যাতে জগদ্বিখ্যাত বার্নার্ড শ কিংবা বিষয়বুদ্ধিতে পাকা সেই দোকানির ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। সবচেয়ে মেধাবী মানুষ যেন শিক্ষকতা পেশায় আসেন এবং এখনকার শিক্ষকেরা যেন আরও অনেক যোগ্য হয়ে ওঠেন। না হলে মানসম্পন্ন শিক্ষাদানের যে গুরুভার ন্যুব্জদেহ শিক্ষকদের ভগ্ন কাঁধে তুলে দেওয়া হয়েছে, তার ভারে তাঁরা হুমড়ি খেয়ে পড়বেন, সেই সঙ্গে আছড়ে পড়বে গোটা জাতির ভবিষ্যৎ।
গোলাম ফারুক: ফলিত ভাষাতত্ত্ববিদ, গবেষক, অধ্যাপক।
faruk.golam@yahoo.com
তথ্যসূত্র:
১। Pocket Book on Bangladesh Education Statistics-2014 (2015)
২। The Right to Education and the Teaching Profession (2015)
৩। 2013 Global Teacher Status Index (2013)
৪। Making Education for all a Reality: Beyond 2015 (2013)

অপেক্ষায় আইরিন

র‌্যাম্প মডেলিং থেকে টিভি পর্দায় এসে একাধিক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দর্শকের নজর কাড়েন আইরিন। এরপর চলচ্চিত্রে পাড়ি জমিয়ে টানা কাজ করছেন তিনি। বর্তমানে দুটি ছবির মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছেন এ অভিনেত্রী। এর মধ্যে রয়েছে ‘এই তুমি সেই তুমি’, ‘টার্গেট’ ছবিগুলো। আইরিন অভিনীত ও মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো হল ‘ভালোবাসা জিন্দাবাদ’, ‘ইউটার্ন’, ‘টাইম মেশিন’ ও ‘ছেলেটি আবোল-তাবোল মেয়েটি পাগল পাগল’।
আইরিনের মুক্তিপ্রাপ্ত ছবিগুলো থেকে এখনও সাড়া জাগাতে না পারলেও অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন আইরিন। নিজেকে চলচ্চিত্র জগতে শক্ত অবস্থানে দেখতে চাওয়ার লক্ষ্যে মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবিগুলোতে সেভাবেই প্রস্তুত হয়ে আসছেন তিনি। আইরিন বলেন, ‘আমি সবসময় চেষ্টা করি ভালো কাজ দিয়ে দর্শকের হৃদয়ে অবস্থান করার। সেটা অব্যাহত থাকবে। মুক্তির অপেক্ষায় যে ছবিগুলো রয়েছে সেগুলো নিয়ে আমি বেশ আশাবাদী। এদিকে কিছুদিন আগে আইরিন জনপ্রিয় চিত্রনায়ক ফেরদৌসের সঙ্গে একটি বিজ্ঞাপনের মডেল হয়েছেন। এটি একটি সেভিং ফোমের বিজ্ঞাপন ছিল বলে জানান তিনি।

সত্য যেন খুন হয়ে না যায় by সোহরাব হাসান

সিজার তাবেলা হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা চার আসামি
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আছে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনো স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষত আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাইবে না, যাহাতে কোনো ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’
ইংরেজি ইনভেস্টিগেশন শব্দের অর্থ তদন্ত, অনুসন্ধান, অন্বেষণ, সংবীক্ষণ। এর উদ্দেশ্য সত্য উদ্ঘাটন। যে সত্য লোকচক্ষুর আড়ালে থাকে, সেটি জনগণের সামনে নিয়ে আসাই হলো তদন্তকারী সংস্থা বা কর্মীদের দায়িত্ব। এটি হতে হবে সম্পূর্ণ রাজনীতি–নিরপেক্ষ। তদন্তকারীদের দেখার বিষয় ঘটনাটি কীভাবে ঘটল, কারা ঘটাল, কেন ঘটাল? সাধারণ মানুষের পক্ষে এ ধরনের কাজ সম্ভব নয় বলেই রাষ্ট্র তদন্তকাজে প্রশিক্ষিত, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীদের সমন্বয়ে একাধিক সংস্থা বা কর্মী বাহিনী তৈরি করে।
আধুনিক রাষ্ট্রে অপরাধ দমনের প্রথম ও প্রধান উপায় হলো, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আগে অপরাধীদের প্রস্তুতি, ষড়যন্ত্র বা নীলনকশা ভন্ডুল করে দেওয়া। সে ক্ষেত্রে অপরাধীরা যাঁকে বা যাঁদের টার্গেট করে, তাঁরা রক্ষা পান। আর সেটি সম্ভব না হলে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীদের পাকড়াও করে আইনানুযায়ী শাস্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
যে রাষ্ট্র এই কাজটি যত দক্ষতার সঙ্গে করে, সেই রাষ্ট্রে অপরাধ প্রবণতা তত কমে যায়। আর যে রাষ্ট্রে অপরাধীরা ছাড় কিংবা পার পেয়ে যায়, সেই রাষ্ট্রে অপরাধ আরও জেঁকে বসে, আইনের শাসন ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। এই বিবেচনায় কেবল ধর্মীয় জঙ্গি নয়, সব ধরনের অপরাধীদের প্রতি রাষ্ট্র তথা সরকারের জিরো টলারেন্স থাকা প্রয়োজন। আমরা সেদিনই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হব, যেদিন অপরাধীদের আওয়ামী লীগার বা বিএনপিওয়ালা হিসেবে দেখা হবে না। দেখা হবে অপরাধী হিসেবেই।
সাম্প্রতিক কালে সিলেটে শিশু রাজন ও খুলনায় কিশোর রাকিব হত্যার আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের ব্যাপারে সরকার যে কঠোর মনোভাব দেখিয়েছে, সব ক্ষেত্রে তা অনুসৃত হলে বাংলাদেশে অপরাধ সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা সম্ভব হতো। কিন্তু সব ক্ষেত্রে আইন নিজস্ব গতিতে চলে না বলেই দেশজুড়ে অপরাধীদের আস্ফালন ও দৌরাত্ম্য বেড়ে চলেছে।
সম্প্রতি মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে আততায়ীদের হাতে খুন হন ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা ও জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি। ঘটনার পর থেকেই এ নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও প্রধান বিরোধী দল বিএনপির নেতারা বাহাসে লিপ্ত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এর পেছনে বিএনপি-জামায়াতের ‘হাত’ আছে। বিএনপি বলছে, আসল অপরাধীদের আড়াল করতেই সরকার বিএনপির ওপর দায় চাপাচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা যদি অপরাধের ‘হাত’ না খুঁজে পুরো শরীরটি খুঁজত, তাহলে রহস্য উদ্ঘাটন সহজ হতো বলে আমরা মনে করি।
সিজার তাবেলা হত্যার প্রায় এক মাসের মাথায় ঢাকার পুলিশ কমিশনার সংবাদ সম্মেলন করে সন্দেহভাজন ঘাতক হিসেবে যাঁদের চিহ্নিত করলেন, তাঁরা কেউ মাদক ব্যবসায়ী, কেউ অস্ত্রের জোগানদাতা, কেউ পাড়ার বখাটে। এঁদের মধ্যে তামজিদ আহমেদ রুবেল নামের একজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তবে তাঁর পরিবার বলছে, নির্যাতনের মুখে এই স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছে। অপর তিন আসামিকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ২৬ অক্টোবর আসামিদের আদালতে হাজির করা হলেও অনেক আগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তাঁদের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
তাহলে এত দিন আসামিরা কোথায় ছিলেন? আইন অনুযায়ী কাউকে গ্রেপ্তার করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেটি মেনে চলেছে কি? পুলিশের দাবি, অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি তারা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটিও উদ্ধার করেছে। এর আগে সিসিটিভির ফুটেজে দুই আরোহীসহ একটি মোটরসাইকেল ও টেলিফোনে আলাপরত এক যুবককে দেখা গিয়েছিল। সিসি টিভিতে ধরা পড়া যুবকদেরই কি পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে, না অন্য কাউকে?
পুলিশের হাতে আটক চারজনের চেয়ে আলোচনায় এসেছে তাঁদের কথিত বড় ভাই, যাঁর বা যাঁদের নির্দেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে পুলিশ দাবি করেছে। সেদিন সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার কোনো বড় ভাইয়ের নাম না বললেও পরদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল জানিয়ে দিলেন, ‘বড় ভাই’ বিএনপির মহানগর শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক কমিশনার এম এ কাইয়ুম। তিনি বিদেশে পলাতক, কেউ বলছেন মালয়েশিয়ায়, কেউ বলছেন লন্ডনে। পরদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বললেন, কাইয়ুমকে তিনি ‘বড় ভাই’ বলেননি। কাইয়ুম সন্দেহের তালিকায় আছেন। তাহলে কি সরকার ‘বড় ভাই’ সম্পর্কে এখনো নিশ্চিত হতে পারছে না, না বড় ভাইয়ের ওপরের কোনো বড় ভাইকে তারা খুঁজছে?
পুরো বিষয়টির মধ্যে একটি রহস্যের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। দুই বিদেশি নাগরিক খুন হলেন বাংলাদেশে। সন্দেহভাজন খুনিরাও এখানে ধরা পড়লেন। কিন্তু তাঁদের মদদদাতারা কেউ মালয়েশিয়ায়, কেউ লন্ডনে। আবার টাকাও আসছে নাকি লন্ডন থেকে। কে কীভাবে টাকা পাঠাল, সেটিও খুঁজে বের করা দরকার। আগে খুনিদের খুঁজে বের করতে পারলে তাঁদের সঙ্গে থাকা বড় ভাইকে পাওয়া কঠিন হবে না। কিন্তু আগে বড় ভাইকে খুঁজে পরে খুনিদের বের করা দুরূহ হবে।
আমাদের গোয়েন্দা বিভাগ এখন পর্যন্ত দুই বিদেশি নাগরিক হত্যা, খ্রিষ্টান ধর্মযাজক লুক সরকার হত্যাচেষ্টা ও তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় গ্রেনেড হামলা—এই চার ঘটনার যোগসূত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। অর্থাৎ হত্যাকাণ্ডগুলো যে একই গোষ্ঠী ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত নয়। অনেকটা অন্ধকারে ঢিল ছুড়ছে। হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ও কুশীলব ভিন্ন হলে যোগসূত্র পাওয়া যাবে না। বিএনপি-জামায়াত আমলে কিংবা তার আগে আওয়ামী লীগ আমলে যতগুলো বোমা-গ্রেনেড হামলা হয়েছে, সেসবের লক্ষ্যবস্তু ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী, সংস্কৃতিসেবী, সংগীতশিল্পী, বাংলা নববর্ষ, ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা তাদের উপাসনালয়। আর কুশীলব ছিল হরকাতুল জিহাদ বাংলাদেশ বা হুজির নেতা-কর্মী।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় পদে ছিলেন এবং বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিত, এমন একজন ব্যক্তি আলাপ প্রসঙ্গে বলেছেন, স্পর্শকাতর ঘটনার তদন্ত করতে হয় অত্যন্ত গোপনীয়তা বজায় রেখে। রাজনৈতিক বাগ্বিতণ্ডা তদন্তকে সহায়তা করে না; বরং বুমেরাং হওয়ার আশঙ্কা থাকে। জঙ্গিগোষ্ঠীর ব্যাপারে সরকারের জিরো টলারেন্সের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের আন্তরিকতায় ঘাটতি না থাকলেও সামর্থ্যে ঘাটতি আছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি মিরপুরে তল্লাশির সময় দুর্বৃত্তদের হাতে এএসআই ইব্রাহিম মোল্লার নিহত হওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, এ ধরনের টহল কখনোই এককভাবে দেওয়া উচিত নয়। যিনি তল্লাশি করবেন, তাঁর সঙ্গী কর্মকর্তাকে অবশ্যই সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে প্রস্তুত থাকতে হবে। মিরপুরের ঘটনায় সেটি থাকলে এভাবে ছুরিকাঘাতে এএসআইকে মরতে হতো না।
তাঁর মতে, হোসেনি দালানের ঘটনায়ও পুলিশের কর্তব্য ছিল বিষয়টি রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া। ঘটনাস্থলে যথেষ্টসংখ্যক পুলিশ সদস্য থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তল্লাশি করে সবাইকে ভেতরে ঢোকানোর প্রয়োজন বোধ করেননি। স্বাভাবিক অবস্থায় সেটি ঠিক থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে নয়। কয়েক শ লোককে তল্লাশি করে ভেতরে ঢোকানো কঠিন ছিল না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যুক্তি দেখাতে পারেন যে সেখানে যেহেতু অতীতে অঘটন ঘটেনি, তাই তাঁদের মাথায় সেটি ছিল না। এখানেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেশাদারির বিষয়টি সামনে চলে আসে। কোথাও সন্ত্রাসী ঘটনা না ঘটলে সেটি নিরাপত্তাবলয়ের বাইরে থাকতে পারে না। সন্ত্রাসীরা তাদের দুষ্কর্ম সম্পাদন করতে একই জায়গা বা একই পদ্ধতি ব্যবহার করে না। তাই পেশাদারি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কেবল রুটিন কাজ করলে হবে না। তাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে সৃজনশীলতার সঙ্গে।
তবে এ কথাও স্বীকার করতে হবে যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখার পরও অনেক সময় অঘটন এড়ানো যায় না। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতেও মারাত্মক অঘটন ঘটে থাকে। কিন্তু সেখানে এসব নিয়ে রাজনৈতিক বাহাস হয় না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে কেউ জজ মিয়া কাহিনি ফাঁদেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেশাদারি মনোভাব নিয়ে ঘটনার তদন্ত করতে পারবে, সেই অভয় দেওয়া হয় সব পক্ষ থেকেই।
মনে রাখতে হবে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে যেন আমরা অপরাধীকে আড়াল না করি। রাজনৈতিক বাহাসে যেন সত্য খুন না হয়ে যায়। সন্ত্রাসীদের হাতে মানুষ খুন হলে তার বিচার পাওয়া যায়। অপরাধীকে ধরে কঠিন শাস্তি দেওয়া যায়। অপরাধের শিকার ব্যক্তি বা তার পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও বিধান আছে। কিন্তু সত্য খুন হলে তার প্রতিকার পাওয়া যায় না। ঘাতক চিহ্নিত না হলে, বা তার শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি হয়; যা একটি আধুনিক রাষ্ট্রে কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

কামরুলসহ চারজনের ফাঁসি

সিলেটে শিশু শেখ সামিউল আলম রাজন (১৪) হত্যা মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলামসহ চারজনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন সিলেট মহানগরের দায়রা জজ আদালত।
ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য তিন আসামি হলেন চৌকিদার ময়না মিয়া ওরফে বড় ময়না, তাজউদ্দিন আহমদ ওরফে বাদল ও জাকির হোসেন ওরফে পাবেল ওরফে রাজু।
এ ছাড়া মামলার অভিযুক্ত সাত আসামিকে সাত বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড ও বাকি দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়েছে।
আজ রোববার ১৪ কার্যদিবসে বিচার-প্রক্রিয়া শেষ করে আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন বিচারক আকবর হোসেন মৃধা।
গত ৮ জুলাই চুরির অপবাদে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের কুমারগাঁও বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন শেখপাড়ায় নির্যাতন করে হত্যা করা হয় সিলেটের জালালাবাদ থানা এলাকার বাদেয়ালি গ্রামের সবজি বিক্রেতা রাজনকে। লাশ গুম করার সময় ধরা পড়েন একজন। পরে পুলিশ বাদী হয়ে জালালাবাদ থানায় মামলা করে। ফেসবুকে প্রচারের উদ্দেশে নির্যাতনের ভিডিও চিত্র ধারণ করেন নির্যাতনকারীরা। ১২ জুলাই এই ভিডিও চিত্র নিয়ে প্রথম আলোয় ‘নির্মম পৈশাচিক!’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।
ঘটনার পরপরই পালিয়ে সৌদি আরব চলে গিয়েছিলেন মামলার প্রধান আসামি কামরুল ইসলাম। ইন্টারপোলের মাধ্যমে গত ১৫ অক্টোবর তাঁকে ফিরিয়ে আনা হয়। তাঁর উপস্থিতিতে মামলার গুরুত্বপূর্ণ ১১ সাক্ষীর পুনরায় সাক্ষ্য গ্রহণের পর একটানা তিন দিন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত রায়ের তারিখ ধার্য করেন।

শিশু রাকিব হত্যায় দুজনের ফাঁসি

খুলনায় শিশু রাকিব (১২) হত্যা মামলায় দুজনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন মহানগর দায়রা জজ আদালত। আজ রোববার ১০ কার্যদিবসে বিচার-প্রক্রিয়া শেষ করে আলোচিত এই মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামিরা হলেন শরীফ মোটরসের মালিক মো. শরীফ ও তাঁর সহযোগী মিন্টু।
এ মামলায় অভিযুক্ত অপর আসামি শরীফের মা বিউটি বেগমকে খালাস দিয়েছেন আদালত।
খুলনার শিশু রাকিব হত্যা মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে গত ১ নভেম্বর দুপুরে খুলনা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ভারপ্রাপ্ত বিচারক দিলরুবা সুলতানা রায় ঘোষণার তারিখ ধার্য করেন।
আদালতের মোট ১০ কার্যদিবসে বিচার-প্রক্রিয়া শেষ হয়। মামলা হওয়ার ৯৬ দিন পর এই রায় ঘোষণা করা হলো।
গত ৩ আগস্ট বিকেলে খুলনার টুটপাড়ায় শরীফ মোটরস নামের এক মোটরসাইকেলের গ্যারেজে নির্যাতন করে রাকিবকে হত্যা করা হয়।

সড়কে মৃত্যু: নয়া মহামারি by রোবায়েত ফেরদৌস

সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মহামারির রূপ নিয়েছে, এটি যেমন সত্য; বিপরীতে চেষ্টা থাকলে সড়ক দুর্ঘটনাকে যে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, তা–ও সমান সত্য। গবেষণা বলছে (হোসেন জিল্লুর, ২০১৫), বিশ্বের ৮৮টি দেশ দুর্ঘটনার হার কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং ৮৭টি দেশে তা বেড়েছে। সড়ক পরিবহন বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও দ্রুত বিকাশমান খাত। কিন্তু সড়ক পরিবহন খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য যে সময়োপযোগী ও কার্যকর বিধিবিধান ও উদ্যোগ গ্রহণ করার দরকার ছিল, বাংলাদেশে সেই সমতায় বিরাট ঘাটতি রয়েছে এবং এই সামর্থ্যের অভাবই এ খাতের উন্নয়নের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।
আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয়, সড়ক পরিবহন নিয়ে নতুন পলিসি, আইন, বিধিবিধান প্রণীত হয় ঠিকই, কিন্তু প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় যাত্রীদের মতামত দেওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না, যাত্রীদের সেবার মানোন্নয়নের বিষয়টি এবং তাদের কণ্ঠস্বর সব সময়ই উপেক্ষিত রয়ে যায়। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটি (বিআরটিএ) অ্যাক্ট ২০১৫ এবং রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যাক্ট (আরটিএ), ২০১৫ নামে সরকার পৃথক দুটি আইন প্রণয়ন করতে যাচ্ছে; সেখানেও যাত্রীদের কথা শোনা হচ্ছে না।
সড়ক দুর্ঘটনার ঝোঁক ও প্রবণতা: গবেষণা প্রতিবেদনে (হোসেন জিল্লুর, ২০১৫) দুর্ঘটনার শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ‘হিট-অ্যান্ড-রান’ ধরনের, অর্থাৎ কোনো যানবাহন দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বা কাউকে মেরে দিয়ে পালিয়ে যায়, এর হার মোট দুর্ঘটনার ৪২ শতাংশ; এর পরের ধরনগুলো এ রকম: ‘মুখোমুখি সংঘর্ষ’ (১৯%), ‘গাড়ি উল্টে যাওয়া’ (১৩%), ‘পেছন থেকে মেরে দেওয়া’ (৯%), ‘পাশ থেকে ধাক্কা দেওয়া’ (৬%)। সড়ক দুর্ঘটনার যারা শিকার হয়, তাদের সিংহভাগই পথচারী, মোট ভিকটিমের ৪১%; এরপরে রয়েছে বাস/কারের যাত্রী (১৯%), দুই/তিন চাকার যানের চালক ও যাত্রী (১৬%), ট্রাক/বাসের চালক ও যাত্রী (১৪%), সাইকেল আরোহী (৩%)। যারা দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাস (৩৮%), এরপর রয়েছে ট্রাক (৩১%), মোটরসাইকেল (১২%), কার/জিপ (১১%) ও তিন চাকার মোটরযান (৮%)।
চালকের বৈশিষ্ট্য: চালকের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৯৭ শতাংশ চালকের কাছে লাইসেন্স আছে, তা সেটা বৈধ বা অবৈধ লাইসেন্স হোক। এর মধ্যে ২০ শতাংশ চালক কোনো পরীক্ষা না দিয়েই লাইসেন্স পেয়েছেন; ৯২ শতাংশ চালককে ঘুষ দিয়ে লাইসেন্স জোগাড় করতে হয়েছে আর ৫৪ শতাংশ চালককে লাইসেন্স পেতে দীর্ঘসূত্রতার শিকার হতে হয়েছে।
তবে চালকেরা প্রায় সবাই সংঘবদ্ধ (৮০%), অর্থাৎ কোনো না কোনো চালক/শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত। তাঁদের বেশির ভাগেরই কোনো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই, ‘ওস্তাদ-শাগরেদ’-এর মতো সনাতনী পদ্ধতিতে তাঁরা গাড়ি চালানো শিখেছেন। মাত্র ৯ শতাংশ চালকের মাসিক বেতন আছে, অন্যরা ট্রিপ ভিত্তিতে রোজগার করেন। ফলে তাঁদের ওপর মালিকদের পক্ষ থেকে প্রবল চাপ থাকে ট্রিপের সংখ্যা বাড়ানোর। গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে যে ২০ শতাংশ চালকের কাজের চাপ (ওয়ার্ক-লোড) ভীষণ রকম বেশি, সপ্তাহে ছয়-সাত দিন এবং দিনে ১৩ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হয় তাঁদের। আর দুর্ঘটনা ঘটলে ৪২ শতাংশ চালকেরই কোনো শাস্তি হয় না; বিচারহীনতার এই সংস্কৃতির কারণেই চালকেরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন।
কেন দুর্ঘটনা ঘটে?: দুর্ঘটনার কারণকে তিন ভাগে দেখানো যেতে পারে। এক. বিধিবিধান ও পরিচালনার দুর্বলতা: এর মধ্যে আছে ট্রাফিক আইনের যথার্থ প্রয়োগ না হওয়া, দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্নীতির কারণে অযোগ্য গাড়ি ও অদক্ষ চালকের লাইসেন্সপ্রাপ্তি, সড়কে বিভিন্ন গতির গাড়ি/বাহন যুগপৎ চলাচল, দুর্ঘটনা বা অনিয়মের ক্ষেত্রে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, যুগোপযোগী আইন না থাকা, বিদ্যমান আইনে প্রতিকার-প্রতিবিধান-ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা না থাকা, স্থানীয় অর্থনীতি বিকাশের সঙ্গে নিরাপদ সড়কের চাহিদাকে সমন্বয় করতে না পারা ইত্যাদি। দুই. কারিগরি ত্রুটি: এর ভেতরে রয়েছে সড়ক পরিকল্পনা ও নির্মাণে সমস্যা, সড়কে দুর্ঘটনাপ্রবণ স্পট বা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক থাকা, রোড সিগন্যাল-ডিভাইডার-স্পিডব্রেকার-অ্যাকসেস রোডের সমস্যা। তিন. মানবীয় দুর্বলতা: বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকের ওপর শারীরিক-মানসিক-আর্থিক চাপ, নিরাপদ সড়ক সম্পর্কে সচেতনতার অভাব, পথচারীদের ঝুঁকিপূর্ণ চলাচল ও আচরণ, সড়কের পাশে দোকান-বাজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ড চালানো ইত্যাদি।
দুর্ঘটনা রোধে করণীয় কী: সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে যেসব পদক্ষেপ দ্রুত নেওয়া দরকার, তা হলো সড়ক দুর্ঘটনা রোধে কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান রাখা। কারণ, দোষী চালকদের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির উদাহরণ থাকলে চালকেরা সাবধানে গাড়ি চালাতে বাধ্য। সড়ক দুর্ঘটনায় কেউ মারা গেলে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে মামলা দায়েরের বিধান রাখতে হবে; তা না হলে চালকেরা সচেতন হবেন না এবং দুর্ঘটনার সংখ্যা বাড়তে থাকবে। বিআরটিএর একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী টাকার বিনিময়ে অবৈধ লাইসেন্স দেন, এটি বন্ধ করতে হবে।
১৯৮৩ সালের পুরোনো মোটরযান আইনকে আধুনিক, কার্যকর ও জনবান্ধব করতে হবে। দোষী চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও শ্রমিকনেতাদের প্রত্যক্ষ মদদে তাঁদের ছাড়িয়ে আনতে পরিবহন সেক্টর একরকমের জিম্মি করে রাখা হয়। এই জিম্মিদশা থেকে পরিবহন খাতকে মুক্ত করতে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং বিআরটিএর প্রতিরোধ সেলগুলো কার্যকর করতে হবে। সারা দেশের ১৪৪টি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক বা কেন্দ্র মেরামতের কাজ দ্রুত শুরু করে তা শেষ করতে হবে। সড়ক-মহাসড়কে নকশা-সংক্রান্ত ত্রুটি দ্রুত সারাতে হবে। সারা দেশে গাড়ির চালকদের ব্যবহারিক, তাত্ত্বিক ও মনস্তাত্ত্বিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন সড়কে একেবারে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং কেউ এটি চালালে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তি দিতে হবে।
সড়কের পাশে কিংবা সড়কের মধ্যে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বাজার, দোকানপাট, প্রভাবশালী রাজনৈতিক সংগঠন ও সহযোগী সংগঠনের সাইনবোর্ড–সর্বস্ব অফিস তুলে দিতে হবে। পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ পারাপার রোধে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন ধরনের মিডিয়া ক্যাম্পেইনের ব্যবস্থা করতে হবে। মহাসড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও নছিমন-করিমনের মতো বিপজ্জনক যানবাহন বন্ধ করা খুব জরুরি। বিআরটিএর জনবল বাড়াতে হবে, প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক, যুগোপযোগী ও কার্যকর করতে হবে। পুরোনো, লক্কড়ঝক্কড় মার্কা ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তা থেকে তুলে নিতে হবে। ব্যক্তিগত গাড়ির চাপ কমাতে সড়কে প্রয়োজনমতো ‘পাবলিক ট্রান্সপোর্ট’ বা ‘গণপরিবহন’ নামাতে হবে, প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, প্রয়োজনে প্রাইভেট কারে গ্যাস-সুবিধা বাতিল করতে হবে। সারা দেশে সড়ক-মহাসড়কগুলোতে অত্যন্ত ধীরগতিতে ‘চার লেনের’ কাজ চলছে, এতে বাড়ছে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনা; তাই দ্রুতগতিতে চার লেনের কাজ শেষ করতে হবে।
[তথ্যসূত্র: এক. হোসেন জিল্লুর রহমান, ‘সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে আইনগত উদ্যোগ’, পিপিআরসি, ঢাকা; দুই. সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ২৫ অক্টোবর, ২০১৫ ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত বিভিন্ন পর্যায়ের অংশীজনদের মতামত]
রোবায়েত ফেরদৌস: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
robaet.ferdous@gmail.com
ভালুকায় যাত্রীবাহী বাস খাদে, নিহত ৭ @মানবজমিন
৭ নভেম্বর ২০১৫, শনিবার
গতকাল সারা দেশে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় নয়জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ময়মনসিংহের ভালুকায় নিহত হয়েছেন সাতজন। এ ছাড়া টঙ্গী ও লক্ষ্মীপুরে দুজন নিহত হয়েছেন। ভোরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভালুকা উপজেলার মেহেরাবাড়ী নামকস্থানে বাস খাদে পড়ে মহিলাসহ ৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৫ জন। আহতদের ভালুকা স্বাস্থ্যকমপ্লেঙ ও ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নেত্রকোনা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী এফএম পরিবহনের একটি বাস (ঢাকা মেট্রো ব-১১-৩৬৬৬) ভালুকার মেহেরাবাড়ী নামক স্থানে পৌঁছলে চালক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি বালুবোঝাই ট্রাকে ধাক্কা দেয়। পরে বাস ও ট্রাকটি উলটে রাস্তার পূর্বপাশে খাদে পড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ভালুকা পৌরসভার ভাণ্ডাব গ্রামের ফুরকান আলীর ছেলে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য ফজলুল হক (৪৫) ও আসমাউল হোসনা নামে এক নারী নিহত হন। এতে আরও ১৫ যাত্রী আহত হন। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন আহতদের উদ্ধার করে ভালুকা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেঙে ভর্তি করেন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় আহতদের ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে ত্রিশালের আবদুল মোতালেব (৪২) ও নিলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার নওশেদ (৩৫), খাইরুল ইসলাম (৪০), কাজল (৪৫) ও কুদ্দুস পাঠান মারা যান। ভালুকা মডেল থানার ওসি মামুনুর রশিদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। লক্ষ্মীপুর-মজুচৌধুরীরহাট সড়কের কাদিরাগোঁজ এলাকায় গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে মোটরসাইকেল আরোহী রাফি হোসেন নিহত হয়েছে। নিহত রাফি সদর উপজেলার শাকচর গ্রামের মো. খোকন হোসেনের ছেলে। গত শুকবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। টঙ্গীতে বালুবাহী ট্রলির চাপায় অর্পিতা (৪) নামের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল সকালে টঙ্গীর পূর্ব আরিচপুরের সরকার বাড়ি রোডে এ দুর্ঘটনা ঘটে। পুলিশ ট্রলিসহ চালক সাত্তারকে আটক করেছে। জানা যায়, স্বপন চন্দ্র দে সপরিবারে পূর্ব আরিচপুর এলাকার সরকার বাড়ি রোডের নূরুল ইসলামের বাড়িতে ভাড়া থাকে। বাড়ির পাশে রাস্তায় খেলা করার সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে অর্পিতাকে ইঞ্জিনচালিত বালুবাহী একটি ট্রলি চাপা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই সে মারা যায়। নিহত অর্পিতা নেত্রকোনার সাধুপাড়া গ্রামের স্বপন চন্দ্র দের মেয়ে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে।

মিয়ানমারের নির্বাচনে জিতবে কে—গণতন্ত্র না জবরদস্তি? by সোহরাব হাসান

সামরিক শাসনে রেকর্ড সৃষ্টিকারী মিয়ানমারে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সাধারণ নির্বাচন। দেশটির তিন কোটি ভোটার ৪৪০ আসনের নিম্ন পরিষদে ৩৩০ আসনের জন্য ভোট দিলেও বাকি আসনগুলো পূরণ করবেন সেনাবাহিনীর প্রধান সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে। ২২৪ সদস্যের উচ্চকক্ষের ১৬৮টি আসনেও একই দিনে ভোট হতে যাচ্ছে। সেখানেও বাকি আসনগুলো পূরণ করবেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এই নির্বাচনে ৯১টি তালিকাভুক্ত রাজনৈতিক দলের ছয় শতাধিক প্রার্থী অংশ নিলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে ক্ষমতাসীন ইউনাইটেড সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) ও শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) মধ্যে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদের ধারণা, নির্বাচন মোটামুটি সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হলে এনএলডি জয়ী হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, নির্বাচনটি সুষ্ঠু হবে কি না। কিংবা নির্বাচনে সু চির দল জয়ী হলেও প্রকৃত ক্ষমতা তাঁর হাতে দেওয়া হবে কি না। ১৯৯০ সালেও মিয়ানমারের ইতিহাসে প্রথম সাধারণ নির্বাচনে জনগণ এনএলডির পক্ষে রায় দিলেও সেনাবাহিনী সেই নির্বাচনী ফল নাকচ করে দেয় এবং জনগণের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখে। তবে পর্যবেক্ষকেরা এ-ও মনে করেন যে সেই সময়ে যত সহজে নির্বাচনী ফলাফল নস্যাৎ করা গেছে, এখন সেটি তত সহজ হবে না। সেনাবাহিনীকে ইচ্ছায় হোক কিংবা বাইরের চাপেই হোক, বিরোধী দলের সঙ্গে কিছুটা আপসরফায় আসতে হয়েছে। ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধানে সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব বহাল রাখতে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সব প্রতিষ্ঠানে সেনাবাহিনীর জন্য ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত করা হয়, যাঁদের সেনাপ্রধানই মনোনীত করে থাকেন। সেই সংবিধানের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১০ সালের নির্বাচন বর্জন করে এনএলডি; যদিও দলের কিছু লোককে ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য করেছিল সেনা-নিয়ন্ত্রিত সরকার। কিন্তু সেই নির্বাচনে মিয়ানমারে রাজনৈতিক পরিস্থিতির ইতরবিশেষ পরিবর্তন হয়নি। আগের সরকারের প্রধানমন্ত্রী থেইন সেইনই নতুন প্রেসিডেন্ট পদে পাঁচ বছরের জন্য নির্বাচিত হন। বেসামরিক প্রশাসনের মতো সামরিক প্রশাসনেও কিছু কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে ৩০ সদস্য নিয়ে গঠিত মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো সেনাসদস্যদের হাতেই রয়েছে।
জেনারেল থেইন সেইন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার পর বিরোধী দল এনএলডির সঙ্গে সমঝোতায় আসার উদ্যোগ নেন; যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে অং সান সু চির ১৫ বছরের অন্তরীণ অবস্থার অবসান হয় এবং পরের বছর ৪৫টি আসনে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে অংশ নিয়ে এনএলডির ৪৩ জন সদস্য জয়ী হয়ে বিরোধী দলের আসনে বসেন। অং সান সু চি হন বিরোধী দলের নেত্রী।
এখানে উল্লেখ্য, ১৯৮৮ সালে মিয়ানমারে তৎকালীন নেউইন সরকারের বিরুদ্ধে যে প্রবল ছাত্র গণ-আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, অসুস্থ মাকে দেখতে এসে অং সান সু চি তাতে জড়িয়ে পড়েন এবং একসময় তাঁর হাতেই নেতৃত্বের ভার পড়ে। এরপর তিনি বাবা মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানের সহযোদ্ধা ও তরুণ নেতাদের সমন্বয়ে এনএলডি গড়ে তোলেন। এই দলটি ১৯৯০ সালে নির্বাচনে ৮৫ শতাংশ আসনে জয়ী হলেও সামরিক শাসকেরা সেই ফল মেনে নেননি। অং সান সু চিকে কখনো অন্তরীণ, কখনো নির্জন কারাবাসে কাটাতে হয়। তাঁর অধিকাংশ রাজনৈতিক সহযোদ্ধার ঠিকানাও হয় জেলখানা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকেও মিয়ানমার প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা দ্রুত নাজুক হতে থাকে।
গত তিন বছরে অং সান সু চি ও তাঁর দল একাধিকবার সংবিধানে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হন। কেননা, তিন-চতুর্থাংশের সমর্থন ছাড়া সংবিধান পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। ২০০৮ সালে প্রণীত সংবিধানের ৫৯ (এফ) ধারা অনুযায়ী কেউ বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করলে কিংবা তাঁর সন্তান অন্য দেশের নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। এই আইনটি করা হয়েছিল সু চিকে লক্ষ্য রেখেই। এ ছাড়া সংবিধানে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে সেনাবাহিনীর জন্য যে ২৫ শতাংশ আসন সংরক্ষিত আছে, সেটি পরিবর্তন করতে না পারলে মূল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতেই থেকে যাবে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
গণতন্ত্রের নেত্রী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে নন্দিত অং সান সু চি এবারের নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে দারুণ আশাবাদী। ইয়াঙ্গুনের বিখ্যাত শোয়েডন প্যাগোডার সামনে আয়োজিত জনসভায় তিনি বলেছেন, নির্বাচনে তাঁর দলই জয়ী হবে। যারা বলে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সময় এটি নয়, তারা আসলে এনএলডির হাতে ক্ষমতা দিতে ভয় পায়। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষকদেরও ধারণা, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হলে অং সান সু চিরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি। আর সু চির জয়ের অর্থ হবে সেনা নেতৃত্বের পরাজয়।
প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন এই বলে ভোটারদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন যে বিরোধী দল জয়ী হলে মিয়ানমারে আরব বসন্ত দেখা দেবে, যা দেশকে বিশৃঙ্খলা ও নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেবে। তিনি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার প্রয়োজন নেই বলেও মন্তব্য করেছেন। নির্বাচিনী প্রচারের শুরু থেকে সু চির দল যাতে জয়ী হতে না পারে, সে জন্য সেনাবাহিনী ও তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো নানা অপপ্রচারে লিপ্ত রয়েছে।
এখানে কৌতূহলোদ্দীপক হলো, আশির দশকের শেষার্ধে এবং নব্বইয়ের দশকজুড়ে যে বৌদ্ধ মংরা সেনাশাসনের বিরুদ্ধে চালিত আন্দোলনে সু চিকে সমর্থন করেছেন, তাঁেদর অধিকাংশ এখন তাঁর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। শান্তির প্রতীক গৈরিক বসনধারীরা এখন ধর্মকে উগ্রপন্থার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন। তাঁরা প্রচার চালাচ্ছেন যে সু চি জয়ী হলে ভবিষ্যতে দেশটিতে মুসলমানেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে এবং বৌদ্ধরা সাগরে নিক্ষিপ্ত হবে। যদিও এ ধরনের প্রচারের কোনো ভিত্তি নেই। বরং দেশটির জনসংখ্যার পাঁচ ভাগ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও নিয়ত তারা ভয়ভীতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। গত কয়েক বছরে রাখাইন প্রদেশের বাইরেও একাধিকবার মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা হয়েছে। আর মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের তো নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতিই দেয়নি, তাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছে। অনেকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। সম্প্রতি রাখাইনে নির্বাচনী জনসভায় অং সান সু চি বলেছেন, দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলে আইন অনুযায়ী রোহিঙ্গাসহ সব সমস্যার সমাধান হবে।
মুসলিমবিরোধী রাজনীতি সেখানে এতটাই তুঙ্গে যে ক্ষমতাসীন ইউএসডিপি ও বিরোধী এনএলডি কোনো মুসলমানকে প্রার্থী করেনি। যদিও বর্তমান সেনা প্রভাবিত সংসদেও বেশ কয়েকজন মুসলমান সদস্য আছেন।
গত জানুয়ারিতে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যখন মিয়ানমারে যাই, তখনই সু চি-বিরোধী ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ করি। সেখানে বসবাসরত একজন বাংলাদেশি বন্ধু আমাকে একটি ওয়েবসাইট দেখালেন, যাতে হিজাব পরিহিত অবস্থায় সু চিকে একজন মুসলমান নেতার সঙ্গে আলোচনা করতে দেখা যায়। ছবিটি ছিল ইমপোজ করা। সু চিকে রোহিঙ্গা তোষণকারী হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, উগ্রপন্থী বৌদ্ধদের ভয়ে তিনি রোহিঙ্গা ও মুসলিমদের ওপর অব্যাহত হামলার বিষয়েও একপ্রকার নীরবতা অবলম্বন করে চলেছেন। এ কারণে বহির্বিশ্বে সু চিকে ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমনকি ২০০৭ সালে সরকার-সমর্থকেরা সু চির গাড়িবহরে হামলা চালালে অন্যান্যের মধ্যে এনএলডির একজন মুসলিম নেত্রীও গুরুতর আহত হন, যিনি ছিলেন নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সু চি তাঁকে মনোনয়ন দিতে সাহস পাননি।
অং সান সু চি সর্বশেষ নির্বাচনী সভায় দেওয়া ভাষণে বলেছেন, জনগণের রায়ে তাঁর দলই জয়ী হবে এবং সে ক্ষেত্রে তাঁর অবস্থান প্রেসিডেন্টের ওপরে হবে। এখানেই আশঙ্কা যে সেই জয়কে ক্ষমতাসীনেরা মেনে নেবে কি না। যদি মেনে না নেয়, তাহলে কি ১৯৯০ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে? আর যদি মেনে নেয়, তাহলে কি সামরিক জান্তা সংবিধান সংশোধন করে সু চির প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথ উন্মুক্ত করবে?
তবে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, বর্তমান বাস্তবতায় নব্বইয়ের পুনরাবৃত্তি হওয়ার পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়াবে দেশটির অর্থনৈতিক উন্নতি ও আন্তর্জাতিক জনমত। সেই সময়ে মিয়ানমার নিজেকে বিচ্ছিন্ন রাখার ঝুঁকি নিলেও এখন নিতে সাহস পাবে না। এই মুহূর্তে বিদেশি বিনিয়োগ ও সাহায্যের সুফল কেবল সাধারণ মানুষই পাচ্ছে না, তার সুবিধা আদায় করে নিচ্ছেন সেনা শাসকেরাও। অন্যান্য উন্নয়নকামী দেশের মতো মিয়ানমারের ব্যবসা-বাণিজ্য ও ঠিকাদারির বড় অংশীদার বর্তমান ও সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। ফলে খুলে দেওয়া অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের দরজা ফের বন্ধ করা তাঁদের পক্ষে কঠিন হবে।
সে ক্ষেত্রে সু চির দল জয়ী হলে সেনা কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে একটি আপসরফা বা ক্ষমতা ভাগাভাগিতে আসতে পারে বলে পশ্চিমা বিশ্লেষকেরা মনে করেন। সু চিও এ ব্যাপারে নমনীয় বলে ধারণা করা যাচ্ছে। ইতিমধ্যে তিনি বলে দিয়েছেন, এনএলডি জয়ী হলে ‘সমঝোতার সরকার’ গঠনে প্রস্তুত আছে। সমঝোতার অর্থ ক্ষমতা ভাগাভাগি।
এখন প্রশ্ন হলো, দীর্ঘদিন ধরে এককভাবে ক্ষমতা ভোগকারী সেনাবাহিনী সেই ভাগাভাগিতে রাজি হবে কি না। তাই নির্বাচনের চেয়েও পর্যবেক্ষকের দৃষ্টি এখন নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতির দিকে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

২৫ বছর পর ভোট দিচ্ছে মিয়ানমারের জনগণ

২৫ বছরের মধ্যে প্রথম সব দলের অংশগ্রহণে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে মিয়ানমারে। ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে সকাল থেকে। আর এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটিতে পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে চলা সামরিক শাসনের অবসান হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট থিয়েন শিয়েন অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং ফলাফল যাই হোক না কেন তাকে সম্মান জানানো হবে বলেও আশ্বাস দিয়েছেন। তবে মুসলিম সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই নির্বাচনকে ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে।
মিয়ানমারে এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রায় তিন কোটি বার্মিজ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। নব্বইটির বেশি দলের ছয় হাজার প্রার্থী ৬৬৪টি আসনের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিচ্ছেন। সেনা-সমর্থিত ক্ষমতাসীন ইউনিয়ন সলিডারিটি ডেভেলপমেন্ট পার্টিও নির্বাচনের অন্যতম প্রভাবশালী প্রতিদ্বন্দ্বী দল।
তবে বিরোধী নেত্রী অং সাং সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে পার্লামেন্টে জয়ী হতে যাচ্ছে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু সরকার গঠন করতে হলে তাদের অবশ্যই দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পেতে হবে। কিন্তু দেশটির সংবিধান অনুসারে নির্বাচনে সংসদীয় আসনের ২৫ শতাংশ সামরিক বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত থাকছে।
এ দিকে মাইলফলক হিসেবে আখ্যা পাওয়া এই নির্বাচনকে মৌলিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে অভিহিত করেছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। সেইসাথে ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকা এবং দেশটির লাখ লাখ মুসলিম সম্প্রদায় এবং রোহিঙ্গা নাগরিকদেরকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করায় মানবাধিকার কর্মীদের সমালোচনার মুখে পড়েছে এই নির্বাচন প্রক্রিয়া।
ইয়াঙ্গুন থেকে সাংবাদিক জোনাহ ফিশার জানান, দেশটিতে নির্ভরযোগ্য কোনও জনমত জরিপ না থাকায় ভোটের ফলাফল কোন দিকে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আগে থেকে কোনও ধারনা করা যাচ্ছে না।
নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে এবং চল্লিশ হাজার পুলিশ সদস্যকে ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে।

হিমালয়ের চ্যালেঞ্জ by দেব মুখার্জি

নেপাল–ভারত ​সীমান্তে আটকে পড়া খাদ্য ও জ্বালানিবাহী ট্রাক
২০১৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম বরণ যাদব নেপালের নতুন সংবিধান ঘোষণা করেছেন। এর আগে ২০০৭ সালে দেশটির সংসদে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান পাস হয়েছিল, এই সংবিধান সেই সংবিধানকে প্রতিস্থাপিত করল। দেশটির জনগণের সংবিধান প্রাপ্তির যে চেষ্টা ছিল, এর মধ্য দিয়ে তা পূর্ণতা পেল।
১৯৪৮ সাল থেকে নেপালে ছয়টি সংবিধান প্রণীত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম চারটি প্রণয়ন করেছে রানারা বা রাজদরবার। রানাদের গোষ্ঠীতান্ত্রিক শাসন শেষ হওয়ার পর নেপালের রাজনীতিতে সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল। কিন্তু রাজা মহেন্দ্র সেই বাতাস চলাচলে বাধা সৃষ্টি করেন, তিনি সরকার ভেঙে দিয়ে ১৯৬২ সালে এক সংবিধান চাপিয়ে দেন। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে নিজের একক কর্তৃত্বে ‘পঞ্চায়েত রাজ’ গঠন করেন। তারপর ১৯৯০ সালের সংবিধান পেতে নেপালি কংগ্রেসকে প্রায় ৩০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে গণ–আন্দোলন করতে হয়েছে। সেই সংবিধান আসলে রাজদরবার ও রাজনৈতিক দলের আপসরফার মাধ্যমে প্রণীত হয়েছিল। ওই সংবিধান নেপালকে পঞ্চায়েত-রাজের হাত থেকে মুক্তি দিলেও রাজা জ্ঞানেন্দ্র ২০০৫ সালের প্রাসাদ অভ্যুত্থানের মাধ্যমে চূড়ান্ত ক্ষমতাধর রাজতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঘটানোর চেষ্টা করেন। ২০০৬ সালের এপ্রিলে যে দ্বিতীয় গণ–আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার মধ্য দিয়ে রাজতন্ত্রের পতন হয়। রাজনৈতিক নির্বাসন থেকে সংসদকে ফিরিয়ে আনা হয়, শাসনব্যবস্থার কাঠামো প্রণয়ন করতে তারা ২০০৭ সালে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান পাস করে।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানটি আকর্ষণীয় ও প্রগতিশীল ছিল। এতে ওই সময়ের চেতনা প্রতিফলিত হয়েছিল। একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণপ্রজাতন্ত্রের কথা বলা হয়েছিল। শাসনব্যবস্থায় জনগণকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ছিল, যে জনগণ ১৮ শতকের মাঝামাঝি সময়ে রাষ্ট্রটি গঠিত হওয়ার পর থেকেই শাসনব্যবস্থার বাইরে ছিল। ২০০৮ সালে যে সংবিধান সভা নির্বাচিত হয়, কথা ছিল, তারা দুই বছরের মধ্যে দেশটির জন্য একটি স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করবে। তারা চার বছরের মধ্যেও তা করতে পারেনি। এর মধ্যে সরকার পরিবর্তন হয়েছে কয়েকবার, আর রাজনৈতিক নেতারা ঐকমত্যও গড়ে তুলতে পারেননি। সম্ভবত মূল ধারার রাজনৈতিক দলগুলো, যেমন নেপালি কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউনাইটেড মার্ক্সিস্ট–লেনিনিস্ট) নির্বাচনে জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় মাওবাদীদের ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে। তাই তারা সামনে এগোতে ভয় পাচ্ছিল। আবার মাওবাদীরাও সময়-সময় যে ‘জনগণতন্ত্র’ গঠনের কথা বলেছে, সে ব্যাপারে জনগণের মধ্যে আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলতে পারেনি। ইয়ুথ কমিউনিস্ট লিগের কার্যক্রমে শান্তি বিঘ্নিত হয়েছে।
মাঝখানে এক দফা তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকলেও ২০১৩ সালে একটি নতুন সংবিধান সভা ও সংসদ নির্বাচিত হয়। আর দেশটির সিংহভাগ মানুষই এখন মাওবাদী ও মদেশিদের ছেড়ে প্রথাগত দলগুলোর দিকে ঝুঁকছে। এ বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর এই প্রচেষ্টার ফল পাওয়া যায়। ১৯৫১ সালে যখন রাজা ত্রিভুবন ভারত থেকে ফিরে রানাদের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ করেন, তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল, ‘এখন থেকে সংবিধান সভা কর্তৃক প্রণীত সংবিধানের আলোকে আমাদের দেশের জনগণ শাসিত হবে, জনগণই তাদের নির্বাচিত করবে।’ হ্যাঁ, শেষমেশ ছয় দশকেরও বেশি সময় পরে কষ্টকর সংগ্রামের পর তাঁর সেই কথা বাস্তবায়িত হলো।
এই সংবিধান করতে গিয়ে এর প্রণেতাদের অনেক প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিতে হয়েছে। তাঁদের শুধু এর নীতি ও লক্ষ্য নিয়েই মাথা ঘামাতে হয়নি, কম সুবিধাপ্রাপ্ত ও বৈষম্যের শিকার মানুষদের প্রবল ক্রোধও আমলে নিতে হয়েছে। ইতিমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানে সেটা স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। নেপালে একই সঙ্গে একাধিক বিপ্লব হচ্ছে। রাজার ওপর দেবত্ব আরোপ করা হলেও শেষমেশ রাজতন্ত্রের পতন হয়েছে। বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি জাতিকে জাতিসত্তার নতুন সুলুক সন্ধান করতে হচ্ছে। রাজপ্রাসাদ থেকে যে দুই শতক ধরে সামন্তীয় ব্যবস্থা পরিচালিত হয়েছে, সেটার অবসান ঘটেছে। জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ ঘটেছে।
এ ছাড়া নেপালের একটি পক্ষ দেশটিকে ‘হিন্দু’ রাষ্ট্রে ফিরিয়ে নেওয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এ ব্যাপারটা হয়তো অনেকেই খেয়াল করেননি যে দেশটি মূলত ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের দেশ হলেও ১৯৬২ সালে রাজা মহেন্দ্রর সংবিধানের আগে দেশটি হিন্দু রাষ্ট্র ছিল না। নিশ্চিতভাবেই তাঁর লক্ষ্য ছিল গণতান্ত্রিক হাওয়ার মধ্যে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। না, সেটা শুধু জাতির প্রতীক ছিল না, ছিল বিশ্বাসের রক্ষাকবচ।
কিন্তু নেপালে আমলে নেওয়ার মতো বিষয় এখনো অনেক আছে। অনেকেই মনে করেন, রাজতন্ত্র উচ্ছেদের সঙ্গে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় প্রেসিডেনশিয়াল ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত। আবার এই সংবিধানের অনেক দিকই সাদরে গ্রহণ করার মতো। এই সংবিধান একটি গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। সরকার হবে সংসদীয় পদ্ধতির, যার সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও আনুপাতিক নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত হবে। আর ব্যাপক বিরোধিতা সত্ত্বেও অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
এমন একটি সংবিধানকে সবাই স্বাগত জানাবে, সেটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ব্যাপারটা মোটেও তেমন নয়। অনেক প্রশংসনীয় গুণাবলি থাকা সত্ত্বেও এই সংবিধান দেশটির বড় একটি জনগোষ্ঠীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ করতে পারেনি। আবার ক্ষমতা প্রয়োগের বেলায় সংবিধান স্ট্যাটাসকো বা বিদ্যমান অবস্থা বজায় রেখেছে। ধারণা, কখনো কখনো বাস্তবতার চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বহু মানুষ মনে করছে, সুবিধাভোগী জাতিগোষ্ঠী যেমন বহুন ও ছত্রিরা নিজেদের আধিপত্য চিরস্থায়ী করতে চাচ্ছে।
ওদিকে মদেশিরা তো আছেই। এরা হিন্দিভাষী; ভারতের বিহার ও উত্তর প্রদেশ থেকে আসা এই মানুষদের নেপালের পাহাড়ি অভিজাতরা কখনোই নিজেদের সমকক্ষ মনে করেনি। ফলে নানা সময়েই তাদের নিপীড়ন করা হয়েছে, রাজধানীতে যেতে হলে তাদের একসময় গলায় পরিচয়পত্র ঝোলাতে হতো। তাদের মনে সেই স্মৃতি এখনো জ্বলজ্বল করছে। মদেশিরা নেপালের জনসংখ্যার ৩০ শতাংশ, দেশটির রাজস্ব আয়েরও বেশির ভাগই আসে তাদের কাছ থেকে। কিন্তু সরকারি চাকরিতে ও সেনাবাহিনীর চাকরিতে তারা বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তাদের অঞ্চলে বিনিয়োগও হয় কম। নতুন সংবিধানে বলা হয়েছে, মদেশের ১২ থেকে ২০টি জেলা পাহাড়ি জেলাগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হবে। আরও উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হচ্ছে, প্রত্যক্ষ নির্বাচনে সংসদীয় আসনের ভাগাভাগিতে মদেশিদের প্রতিনিধিত্ব ৮৩ থেকে ৬৩টিতে নেমে যাবে। ফলে বিপুলসংখ্যক মদেশি মানুষ ভোটাধিকার হারাবে। ২০০৮ সালে জি পি কৈরালার সরকার তাদের যে লিখিত নিশ্চয়তা দিয়েছিল, এটা স্পষ্টতই তার লঙ্ঘন। ফলে মদেশ ফুঁসে উঠেছে।
এদিকে ভারত চায় নেপালের সংবিধান নিয়ে যেসব দ্বন্দ্ব ও ভিন্নমত সৃষ্টি হয়েছে, তার যেন শান্তিপূর্ণ সমাধান হয়। তবে ভারতে একটি প্রশ্ন ওঠে, ভারত কেন অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাবে? সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নেপালের বিষয়ে কয়েকবার বলেছেন, ভারত এক সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল নেপাল দেখতে চায়, যেখানে সব সম্প্রদায় সংবিধানকে নিজেদের মনে করবে। কিন্তু ভারত কেন এর ফলাফল নিয়ে এত উদ্বিগ্ন? সেটা নেপালের জনগণের ব্যাপার, ভারতের নয়। আবার ভারতের সঙ্গে নেপাল যেভাবে জড়িয়ে আছে, তাতে তার পক্ষে নেপালের ব্যাপারে নির্মোহ থাকাও সম্ভব নয়। উন্মুক্ত সীমান্ত ও চলাচল, ঘনিষ্ঠ পারিবারিক যোগাযোগ, পারস্পরিক রূপান্তরযোগ্য মুদ্রা, নেপালিদের ভারতে কাজ করার লক্ষ্যে প্রণীত চুক্তি, গোর্খাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীতে কাজ করা প্রভৃতি কারণে ভারত হয়তো নেপালের ব্যাপারে চোখ বুজে থাকতে পারে না।
আবার নেপালেও ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙা হয়েছে। সেখানকার জনগণ ভারতীয় পতাকা পোড়াচ্ছে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করছে। কিন্তু এসব করে কি লাভ হবে? ইতিহাস বলে, যোগাযোগের বিভিন্ন পথ খুলে দিলে ভুল-বোঝাবুঝি দূর হয়।
ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; ভারতের পাক্ষিক ফ্রন্টলাইন থেকে নেওয়া
দেব মুখার্জি: বাংলাদেশ ও নেপালে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত।

নিরাপত্তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন, সিসি ক্যামেরার বিক্রি দ্বিগুণ by মোছাব্বের হোসেন

একটি আবাসন প্রতিষ্ঠানের মালিক মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা মাজেদুল হক বায়তুল মোকাররম মসজিদ মার্কেটে গত বৃহস্পতিবার সিসি ক্যামেরা কিনতে এসেছিলেন। মোহাম্মদপুরের জাকির হোসেন রোডে থাকেন। সেখানে ফ্ল্যাটের অন্যান্য মালিক মিলে সিসি ক্যামেরা বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিপদ তো আর বলে আসবে না। তাই আগে থেকেই এই ক্যামেরা লাগিয়ে সতর্ক থাকছি।’ চুরি-ডাকাতি বা অন্য যেকোনো খারাপ ঘটনার পরবর্তী ব্যবস্থা নিতে এখন সিসি ক্যামেরা জরুরি হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে সহিংস ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা অনেকে ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা বা সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার দিকে জোর দিচ্ছেন। এতে রাজধানীসহ সারা দেশে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করার চাহিদা বেড়েছে। বিক্রেতারা বলছেন, গত এক বছরে এই বিক্রির হার দ্বিগুণ হয়েছে। তবে গত দুই সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।
রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও স্টেডিয়াম মার্কেটে দেশের সবচেয়ে বড় সিসি ক্যামেরার বাজার। এর বাইরে ধানমন্ডি, বনানী, কম্পিউটার সিটিসহ বড় বড় কয়েকটি শপিং সেন্টারে সিসি ক্যামেরার মার্কেট আছে।
গত বৃহস্পতিবার বায়তুল মোকাররম মসজিদ ও স্টেডিয়াম মার্কেটের সিসি ক্যামেরার বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, এখন অনেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পর্যায়েও সিসি ক্যামেরা কিনছেন।
রাজধানীর সিসি ক্যামেরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ক্যামেরা মিউজিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ গাফফার মোল্লা প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিরাপত্তার জন্য সিসি ক্যামেরাকে এখন খুবই দরকারি মনে করা হচ্ছে। কোনো ঘটনা ঘটলে এর সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় সিসি ক্যামেরার ফুটেজ থেকে। আমাদের বিক্রি এখন দ্বিগুণ বেড়েছে।’ তিনি বলেন, সারা দেশে বিশেষ করে বড় বড় শহরে সিসি ক্যামেরার চাহিদা বেড়েছে। তিনি বলেন, আগে বড় বড় শপিং মলে সিসি ক্যামেরার চাহিদা ছিল কিন্তু এখন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তো বটেই, ব্যক্তিগত বাসাবাড়িতে অনেকে সিসি ক্যামেরা লাগাচ্ছেন। এই সিসি ক্যামেরাগুলোর বেশির ভাগই চীন ও তাইওয়ান থেকে আসছে বলে তিনি জানান।
বায়তুল মোকাররম মার্কেটে ক্যামেরা ফিউচার নামের একটি সিসি ক্যামেরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠানের মালিক তানভীর হাসান বলেন, আগে বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকে সিসি ক্যামেরা লাগানোর অর্ডার পেতেন। কিন্তু গত দুই সপ্তাহে তিনি চারটি বাড়িতে সিসি ক্যামেরা লাগানোর অর্ডার পেয়েছেন। তিনিও জানালেন, এই ক্যামেরার বিক্রি দ্বিগুণ বেড়েছে।
নারায়ণগঞ্জের একটি পোশাকশিল্প প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আয়নাল কবির এসেছিলেন বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে। তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠানের জন্য আটটি ক্যামেরা কিনেছেন। তিনি বললেন, ‘এমনিতেই আমাদের ক্যামেরা লাগানোর চিন্তা ছিল না। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে বাড়তি নিরাপত্তার কথা ভেবে ক্যামেরা লাগাচ্ছি।’
হাতিরপুল এলাকায় এক সপ্তাহ আগে একটি ব্যক্তিগত বহুতল ভবনের মালিক সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছেন। সেখানকার বাসিন্দাদের একজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দেশের পরিস্থিতি তাঁদের ভাবিয়ে তুলেছে। দিনের আলোতে যেভাবে খুনখারাবি চলছে, তাতে সিসি ক্যামেরা না লাগিয়ে উপায় ছিল না। এটি না হলে ঘটনা ঘটার পর তা ধরার জন্য আর কোনো সূত্রই থাকে না। তিনি জানান, এটি হয়তো কিছুটা ব্যয়বহুল, কিন্তু প্রয়োজনের কথা চিন্তা করলে এটির বিকল্প হয় না।
বাজার ঘুরে দেখা গেল, ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকা দামের সিসি ক্যামেরা আছে। এ ছাড়া এই ক্যামেরার তথ্য সংরক্ষণ করতে নানান যন্ত্রপাতি কিনতে হয়। ক্যামেরা মিউজিয়ামের বাবুল খান বলেন, একটি মনিটরে চারটি সিসি ক্যামেরার কার্যক্রম দেখা যায়। ২ হাজার ৫০০ টাকার একটি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করতে সব যন্ত্রপাতিসহ ৩০ হাজার টাকা খরচ পড়ে।
সিসি ক্যামেরার চাহিদাই শুধু বাড়েনি, বেড়েছে এই কাজের সঙ্গে জড়িত মেকানিকদেরও চাহিদা। বসুন্ধরা সিটিতে কথা হয় এমনই একজন মেকানিক মো. জুয়েলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজের চাপ এখন বেশি। কাজ করে কূল পাচ্ছি না। আগে তিনি সপ্তাহে এক থেকে দুটি স্থানে সিসি ক্যামেরা লাগানোর কাজ করতেন, এখন রোজই কাজের অর্ডার পাচ্ছেন।’
আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা অভিজাত এলাকায় যেসব বাড়ি নির্মাণ করছে, তার বেশির ভাগগুলোতেই সিসি ক্যামেরা লাগাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহকেরাই উদ্যোগী হচ্ছেন। এ বিষয়ে আমিন মোহাম্মদ গ্রুপের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা তানভীরুল ইসলাম বলেন, ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখন প্রায় সবাই সিসি ক্যামেরা লাগানোর বিষয়ে আমাদের বলছেন। এ ছাড়া ভিডিও ডোর কলের মাধ্যমে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি বাসায় যাবে কি না, তা দেখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। সাধারণত আমরা ছাদের রেলিং, পার্কিং ও বাসার প্রবেশমুখে বেশি করে সিসি ক্যামেরা লাগানোর অর্ডার পাচ্ছি।’ দিনে দিনে এভাবে ক্যামেরার ব্যবহার বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।
সিসি ক্যামেরা লাগানোর বিষয়ে পুলিশের কোনো উদ্যোগ আছে কি না, জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মুনতাসিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের অপরাধ শাখার কর্মকর্তারা বিভিন্ন আবাসিক এলাকার ভবন মালিক, বড় বড় শপিং সেন্টারের মালিক, ব্যাংক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ গুরুত্বপূর্ণ ভবনের মালিকদের সিসি ক্যামেরা লাগানোর বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করছেন। কোনো এলাকায় সিসি ক্যামেরা লাগালে যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধী শনাক্ত করা সহজ হয়, এটি তাদের বোঝানো হচ্ছে।’ মুনতাসিরুল বলেন, কোনো ভবনে সিসি ক্যামেরা থাকলে এমনিতেই অপরাধীরা সচেতন থাকে। এতে ওই এলাকায় অপরাধ কমে আসে বা কোনো ঘটনা ঘটলেও পুলিশ ওই সিসি ক্যামেরার বিশ্লেষণ করে ঘটনার সূত্র খুঁজতে সুবিধা হয়। এ জন্য যত বেশি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে, অপরাধের মাত্রা তত কমতে থাকবে বলে মনে করেন তিনি।
নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে নিজের কর্মস্থলে ক্লোজড সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা বসাতে চান মাহবুব আলম নামের এই ব্যক্তি। গতকাল বিকেলে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মার্কেটে এই ক্যামেরা কিনতে যান তিনি l ছবি: প্রথম আলো

ছোট প্রকল্পগুলো কেন অগ্রাধিকার পায় না? by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

অতি নিন্দুকও স্বীকার করবে যে বাংলাদেশে এখন উন্নয়নযজ্ঞ চলছে। পদ্মা সেতু, ঢাকায় কয়েকটি বড় আকারের ফ্লাইওভার, বিভিন্ন জেলায় প্রাইভেট সেক্টরে বিদ্যুৎকেন্দ্র, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রাথমিক কাজকর্ম, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, কয়েকটি সেনানিবাস, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের রাস্তা, ডবলমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল, ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের রাস্তা, বাংলাদেশ-ভারত-নেপাল-ভুটান ট্রানজিটের জন্য ছোট-বড় নানা অবকাঠামো নির্মাণ, এমনই ছোট-বড় আরও বহু প্রকল্প এখন বাংলাদেশে বাস্তবায়ন হতে চলেছে। এগুলোকে ‘উন্নয়ন’ না বললে কাকে উন্নয়ন বলব?
নানা রকম উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য আমরা বর্তমান সরকারকে সাধুবাদ জানাই। বর্তমান সরকারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ ‘মধ্য আয়ের দেশ’ হতে চলেছে। বাংলাদেশের মতো পিছিয়ে পড়া দেশের জন্য এটা যে কত বড় সুখবর, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ একটি দৃষ্টান্ত বলে বিশ্বনেতারা বাংলাদেশের প্রশংসা করছে, তা সরকার প্রায়ই দাবি করে। জাতিসংঘের এমডিজির অনেকগুলো লক্ষ্য বাংলাদেশ পূরণ করে ফেলেছে। যদিও সিপিডির গবেষণায় দাবি করা হয়েছে: ‘কয়েকটি লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।’ এমডিজির এসব লক্ষ্য অর্জন শুধু সরকারের কর্মসূচিতে হচ্ছে না, অসংখ্য এনজিও এসব কর্মসূচি নিয়ে বহু বছর যাবৎ কাজ করছে। সরকারের কোনো মন্ত্রীর বক্তৃতায় এনজিওগুলোর এই অবদানের কথা স্বীকার করা হয় না। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ জানে কারা কোন ইস্যু নিয়ে কত বছর যাবৎ কাজ করছে।
সরকারের হয়তো ধারণা, ঢাকার সব ফ্লাইওভার নির্মিত হলে যানজট স্বাভাবিক নিয়মেই কমে আসবে। কিন্তু নগর ও যানবাহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফ্লাইওভার যানজটকে তেমনভাবে কমাতে পারবে না একদিকে আমরা দেখছি, বাংলাদেশ মধ্য আয়ের দেশ হতে চলেছে। অপরদিকে দেখছি, বাংলাদেশে কতগুলো সাধারণ কাজ সরকার বাস্তবায়ন করতে পারছে না। অথচ একই সরকার অনেক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ছোট ছোট কাজ করার ব্যাপারে সরকারের দুর্বলতা কোথায়, তা আমাদের চিন্তায় আসেনি। সরকারের কোনো প্রতিনিধি বিষয়টা খোলাসা করবেন কি?
একটি আধুনিক দেশ বা শহরের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ব্যবস্থা থাকা দরকার। শুধু মধ্য আয়ের দেশ নয়, গরিব দেশেও এসব ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। বর্তমান সরকার কী কী ছোট বিষয়ে (মেগা প্রকল্পের তুলনায়) মনোযোগ দেয়নি বা সফল হয়নি, তা এই কলামে তুলে ধরতে চাই।
১. সরকার ঢাকা বা চট্টগ্রাম শহরে একটি আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। যাতে মানুষ স্বল্প খরচে ও সহজে যাতায়াত করতে পারে। যেকোনো বড় শহরের এটা প্রধান শর্ত। সরকার নিজে যদি গণপরিবহন ব্যবসা করতে না চায় (না করাই উচিত), তাহলে উপযুক্ত নীতি, পরিকল্পনা ও প্রণোদনা দিয়ে প্রাইভেট সেক্টরকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতে পারত। সরকার তা করেনি। আমাদের যোগাযোগমন্ত্রী পদ্মা সেতু, চার লেনের রাস্তা, কর্ণফুলী টানেল ইত্যাদি নিয়ে যত কথা বলেন, গণপরিবহন নিয়ে তার ১ শতাংশ কথাও বলেন না। এর রহস্য কী? ঢাকা ও চট্টগ্রামে আধুনিক গণপরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে না পারা সরকারের একটা বড় ব্যর্থতা। ঢাকায় একটা মডেল প্রতিষ্ঠিত হলে অন্যান্য শহরেও পরে তা বাস্তবায়ন করা যায়।
২. রেল সার্ভিসও একটি নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন হতে পারত। বড়, মাঝারি ও ছোট দূরত্বে রেল আরও বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস দিতে পারত। এখন দু-একটা নতুন সার্ভিস হয়েছে। তবে তা আরও বেশি পরিমাণে হতে পারত। পুরোনো রেল সার্ভিসের তেমন আধুনিকায়ন হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে। গরিব ও মধ্যবিত্তের জন্য রেল একটি নির্ভরযোগ্য যানবাহন। অথচ সরকার রেলের ব্যাপারে তেমন মনোযোগ দেয়নি। রেলের রাস্তা বাড়েনি, বগি বাড়েনি, অন্তত দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায়। অথচ প্রাইভেট সেক্টরে আন্তজেলা আধুনিক বাস সার্ভিস বিকশিত হয়েছে। এতে সরকারের কোনো কৃতিত্ব নেই। অভিযোগ আছে, সেই বাস সার্ভিসকে জনপ্রিয় করতেই রেলের কর্মকর্তারা ইচ্ছে করে রেলকে দুর্বল করে রেখেছেন। রেলের ‘কালোবিড়াল তত্ত্ব’ তো এক রেলমন্ত্রীই ফাঁস করে গেছেন। সেই কালোবিড়াল কিন্তু এখনো ধরা হয়নি।
৩. ফুটপাত প্রধানত পথচারীদের জন্য। কিন্তু ঢাকা ও অন্যান্য শহরের অন্তত ৫০ শতাংশ ফুটপাত হকারদের দখলে। কোনো মেয়র, জেলা প্রশাসন বা মন্ত্রণালয় ফুটপাত হকারমুক্ত করতে পারেনি। হকারদের বিকল্প জায়গার ব্যবস্থা করতেও পারেনি। সব হকারকে বিকল্প জায়গা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব হতে পারে না। সরকার কয়েকটা হকার মার্কেটের জায়গা দিতে পারে। যেখানে নিয়মকানুনের ভিত্তিতে হকাররা ব্যবসা করতে পারে। এ ছাড়া নাইট মার্কেট, সান্ধ্য বাজার, উইকেন্ড মার্কেট ইত্যাদি নামে নানা কিছু হতে পারে। কিন্তু ফুটপাত হকারের জায়গা নয়, এটা পথচারীর জন্য। যারা শহরে এতগুলো ফ্লাইওভার বানাতে পারে, তারা ফুটপাত হকারমুক্ত করতে পারে না? অনেকে বলেন, এর জন্য আমাদের রুগ্ণ রাজনীতি, পুলিশের দুর্নীতি ও সরকারি নানা স্তরের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিই বড় বাধা। ফুটপাত যদি পথচারীরা ভালোভাবে ব্যবহার করতে পারত, তাহলে বহু মানুষ স্বল্প দূরত্বে রিকশা, ট্যাক্সি বা বাসে চড়ত না, হেঁটেই যেত। ফুটপাতের হকারদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করা কঠিন কিছু নয়।
৪. নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত নাগরিকদের জন্য কোনো ব্যাপক আবাসন পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করতে পারেনি। রাজউক বেশি মনোযোগ দিয়েছে উচ্চমধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের জমির জন্য, যা সরকারের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত হয়নি। প্রতিটি বড় শহরে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে ছোট, মাঝারি ও বড় মাপের আবাসন প্রকল্প নেওয়ার সুযোগ ছিল।
৫. ঢাকার যানজট এখন দেশের প্রধান সমস্যা হয়ে উঠেছে। সরকার সেদিকে তেমন মনোযোগ দিচ্ছে না। সরকারের হয়তো ধারণা, ঢাকার সব ফ্লাইওভার নির্মিত হলে যানজট স্বাভাবিক নিয়মেই কমে আসবে। কিন্তু নগর ও যানবাহন বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ফ্লাইওভার যানজটকে তেমনভাবে কমাতে পারবে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে, কার্যকরভাবে যানজট কমাতে ও ঢাকা শহরে স্বাভাবিক চলাচলের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্য সরকার কোনো পরিকল্পনা এখনো করছে না। যানজট এ অবস্থায় থাকলে আর পাঁচ বছরের মধ্যে ঢাকায় চলাচলের জন্য ‘হেলিকপ্টার সার্ভিস’ গড়ে তুলতে হবে।
আমরা সবাই চাই, বাংলাদেশ যত দ্রুত সম্ভব মধ্য আয়ের দেশ হয়ে উঠুক। সরকার যেসব মেগা প্রকল্প গ্রহণ করেছে, তাও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হোক। সরকার আরও কিছু মেগা প্রকল্প গ্রহণ করুক। কিন্তু যেসব প্রকল্পে সাধারণ মানুষ বেশি উপকৃত হবে, সরকার সেসব প্রকল্প কেন অগ্রাধিকার পাবে না?
আমরা চাই, এই নিবন্ধে উল্লিখিত কয়েকটি ছোট কাজে (মেগা প্রকল্পের তুলনায়) যেন সরকার মনোযোগ দেয়। এর ফলে জনগণ উপকৃত হবে, সরকারও জনপ্রিয় হবে।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: মিডিয়া ও উন্নয়নকর্মী।

তারা কেন দেশান্তরি হয়? by হাসান ফেরদৌস

এল পাসোর বন্দিশিবিরে এক দল বাংলাদেশি যুবক।
তাঁরা অনশনের পর গত সপ্তাহে মুক্তি পান
নিজের পরিচিত আবাস, স্বজন, নিকট বন্ধুবান্ধব—সব ছেড়ে মানুষ কেন অজানার উদ্দেশে দেশ ছাড়ে? কোন কুহকী আশার নেশা তাকে অজ্ঞাতবাসে নিয়ে যায়?
দেশান্তরি নামের একটি তথ্যচিত্রে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন মৃদুল চৌধুরী। সেটা ২০০৭ সালের কথা, তখন তিনি হার্ভার্ডের ছাত্র। আনিসুল হকের উপন্যাস দুঃস্বপ্নের যাত্রী পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সেই তথ্যচিত্র নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন। গল্পের কেন্দ্রে ছিল একদল বাংলাদেশি যুবক, যারা সাহারা মরুভূমি পেরিয়ে স্পেনে পৌঁছানোর এক অভাবিত যুদ্ধে নেমেছিল। কিছুটা হেঁটে, কিছুটা জিপে চেপে তারা ঠিকই সাহারা জয় করে। তারপর আসে ভূমধ্যসাগর। সামান্য এক রাবারের ডিঙি নৌকায় চেপে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তারা। কিছুদূর যাওয়ার পর সেই নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। খাবার নেই, এক ফোঁটা পানি নেই, উদ্ধারের আশা নেই। চোখের সামনে তাদের দেখতে হয় একের পর এক অভুক্ত-অসুস্থ বন্ধুর মৃত্যু। সেই মৃত বন্ধুদের কাঁচা মাংস, কখনো কখনো নিজেদের প্রস্রাব খেয়ে জীবন বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছিল তারা। দশ দিন পর আলজেরীয় এক নৌযান তাদের দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে। যে যাত্রা শুরু হয়েছিল ৪২ জন বন্ধু নিয়ে, তা শেষ হয় ১৭ জনের মৃত্যু দিয়ে। যে ২৫ জন বেঁচে থাকে, তাদের কারোরই স্পেন যাওয়া হয় না, ফিরে আসতে হয় দেশে।
একদল প্রবাসীর সঙ্গে আমি সেই ছবি দেখেছিলাম নিউইয়র্কে। তখনই এই প্রশ্ন উঠেছিল, ঠিক কতটা বেপরোয়া হলে এমন নিশ্চিত মৃত্যুর পথ পাড়ি দিতে নামে কেউ? সহজ উত্তর মেলেনি, তবে এ ব্যাপারে আমরা একমত হয়েছিলাম, খুব সানন্দে, শুধু অ্যাডভেঞ্চারের আশায় কেউ এমন দুর্লঙ্ঘ্য যাত্রায় নামে না। একই কথা বলা যায় হাজার হাজার সিরীয় উদ্বাস্তুকে নিয়ে, যারা মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইউরোপে পাড়ি দিতে চেষ্টা করছে। অব্যাহত গৃহযুদ্ধের ফলে তাদের নিজ বাসভূমি এখন সম্পূর্ণ অরক্ষিত, জীবন-মৃত্যুর এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দেওয়ার দুঃসাহসী লড়াইেয় তারা নামে, কারণ অন্য কোনো বিকল্প তাদের জানা নেই। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে মানুষ কেন পালাবে? তারা কি এতটা অসহায়, এতটা আশাহীন?
এই প্রশ্নটি নতুন করে জাগল টেক্সাসের এল পাসোতে ৮২ জন আটক বাংলাদেশির কথা জানতে পেরে। দেশান্তরির যুবকদের অভিজ্ঞতার তুলনায় এদের অভিজ্ঞতা যে খুব ভিন্ন তা নয়, তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ তফাত হলো সমুদ্রে তাদের না খেয়ে মরতে হয়নি। বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে তারা ঠিকই আমেরিকায়, তাদের গন্তব্যে পৌঁছেছিল। সে প্রায় ছয় মাসে আগের কথা। মেক্সিকো ও আমেরিকার সীমান্তপথে অবৈধ উপায়ে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তারা আটক হয় মার্কিন সীমান্ত পুলিশের হাতে। মাত্র কয়েক দিন আগে তারা শর্ত সাপেক্ষে ছাড়া পেয়েছে, কিন্তু আমেরিকায় যে তারা আশ্রয় পাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
এই ৮২ জনের যাত্রা শুরু হয়েছিল ঢাকায়। একদল মানব পাচারকারীর মাধ্যমে তারা প্রথম পৌঁছায় ব্রাজিল। সেখান থেকে পেরু ও ইকুয়েডর ঘুরে হাজির হয় মেক্সিকোয়। আসতে না আসতেই মেক্সিকো পুলিশ তাদের আটক করে। এই পর্যন্ত যা যা ঘটেছে, সবই পূর্বপরিকল্পিত, এমনকি আটকের ব্যাপারটি পর্যন্ত। দিন সাতেক জেল খাটার পর তাদের সবাইকে ছেড়ে দেওয়া হয় এই শর্তে যে এক সপ্তাহের ভেতর তাদের দেশ ছাড়তে হবে। এবার আরেক দল মানব পাচারকারী তাদের বাসে, ট্রেনে, হাঁটা পথে নিয়ে আসে মেক্সিকো-যুক্তরাষ্ট্র সীমান্তে। ঘন অরণ্যের ভেতর দিয়ে রাতের অন্ধকারে তারা সীমান্ত পার হয়ে হাজির হয় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের এল পাসোতে। আসতে না আসতেই ধরা পড়ে পুলিশের হাতে।
অনুমান করি, বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন এখন ধনী-দরিদ্র সবার চোখে। তারা দেশ ছেড়ে পালাতে চায়। যারা সবচেয়ে সচ্ছল, তারা একই সঙ্গে বিদেশে টাকা আর নিজেদের ছেলেমেয়েদের পাচার করে। যারা দরিদ্র, ঘটিবাটি বেচে তারা ছোটে মধ্যপ্রাচ্যে এদের কথা হয়তো আমরা কখনোই জানতাম না। এমন অসংখ্য অবৈধ অভিবাসী এই এল পাসোর জেলখানায় দীর্ঘদিন থেকে পচে মরছে। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার পর উপায়ান্তর না দেখে এসব বাংলাদেশি আমরণ অনশনের পথ বেছে নেয়। ব্যাপারটায় পুলিশ কর্তৃপক্ষ ভড়কে গেলে তারা যোগাযোগ করে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে। কনস্যুলার বিষয়ে সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামসুল আলম চৌধুরী ছুটে যান এল পাসোতে। তাঁরই মধ্যস্থতায় বাংলাদেশি যুবকেরা অনশন ভাঙতে রাজি হয়, তবে তার আগে কর্তৃপক্ষকে কথা দিতে হবে তাদের এখান থেকে মুক্তি দেওয়া হবে। এক মাসের মধ্যে তারা আমেরিকা ছেড়ে যাবে, এই শর্তে অবশেষে তাদের মুক্তি দিতে সম্মত হয় মার্কিন কর্তৃপক্ষ। আপাতত তারা মুক্ত, যে সামান্য সময় হাতে আছে, তার মধ্যে কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয়ের চেষ্টা করবে। তাতে ব্যর্থ হলে তাদের ফিরতে হবে বাংলাদেশে।
আটক বাংলাদেশিদের নিয়ে শামসুল আলম চৌধুরীর সঙ্গে কথা হলো। তাঁর কাছ থেকেই জানলাম, মাথাপিছু ২৫ থেকে ৩০ হাজার ডলার দিয়ে এসব যুবক দেশ ছেড়েছে এই বিশ্বাসে যে আমেরিকায় পৌঁছানোমাত্রই স্বর্গের দরজা তাদের জন্য খুলে যাবে। এদের অধিকাংশই খুব সামান্য ইংরেজি জানে, বিশেষ কোনো কারিগরি দক্ষতাও নেই। অধিকাংশেরই কোনো আত্মীয়স্বজন নেই, যেখানে সাময়িকভাবে আশ্রয় মিলবে।
সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা অস্ট্রেলিয়া বা অন্য কোথাও আশ্রয় মিলবে—এই আশায় ডিঙি নৌকায় চেপে সাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। টহলদার নৌসেনাদের সহায়তায় তাদের অনেককে তীরে টেনে তোলা হয়েছে, অন্যরা সাগরেই তলিয়ে গেছে। এই রোহিঙ্গাদের মধ্যে বাংলাদেশ থেকেও কেউ কেউ পালানোর চেষ্টা করেছে। রোহিঙ্গারা নিজের দেশে পরদেশি, তাদের ন্যূনতম মানবাধিকারটুকুও বর্মি সরকার মানতে রাজি নয়। তারা পালাবে, আমরা তা বুঝি, কিন্তু বাংলাদেশ থেকে পালাবে কেন?
সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল রিসার্চ ট্রাস্ট এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার লক্ষ্যে এক গবেষণা পরিচালনা করে। প্রধানত কক্সবাজার ও টেকনাফে পরিচালিত এই গবেষণায় দুটো জিনিস বেরিয়ে এসেছে। এক, বাংলাদেশে অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য উন্নতি সত্ত্বেও দেশটির সব মানুষ সেই উন্নয়ন থেকে সমানভাবে লাভবান হয়নি। অন্যদিকে, বৈশ্বিক উষ্ণতার প্রভাবে উপকূলবর্তী মানুষ ক্রমেই তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে দেশের ভেতরেই উদ্বাস্তু হয়ে পড়ছে। দেশ ছেড়ে যারা পালাচ্ছে, তাদের অনেকেই এই শ্রেণিভুক্ত মানুষ। এল পাসোতে যারা আটকে ছিল, তাদের অধিকাংশ ঠিক এই সব ছিন্নমূল মানুষ নয়। অধিকাংশই অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা গুনে গুনে দালালের হাতে তুলে দেওয়ার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তারা কেন দেশ ছাড়বে?
এক কারণ, অনুমান করি, বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন এখন ধনী-দরিদ্র সবার চোখে। তারা দেশ ছেড়ে পালাতে চায়। যারা সবচেয়ে সচ্ছল, তারা একই সঙ্গে বিদেশে টাকা আর নিজেদের ছেলেমেয়েদের পাচার করে। যারা দরিদ্র, ঘটিবাটি বেচে তারা ছোটে মধ্যপ্রাচ্যে। সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি মানুষ এখন দেশের বাইরে। এদের অধিকাংশই বৈধ পথে বিদেশে এসেছে। যারা বৈধ পথে বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়, তারা বেছে নেয় অবৈধ পথ। তাদের এ কাজে মদদ দিতে সদা প্রস্তুত একদল অসাধু মানব পাচারকারী।
চাইলেই বিদেশে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো যাবে না। কিন্তু নিদেনপক্ষে যে কাজটা আমরা করতে পারি, তা হলো অসাধু মানব পাচারকারীদের কার্যকলাপ ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। সরকার নানা আইনকানুন করেছে, কিন্তু সরষের ভেতরেই যে ভূত ঘাপটি মেরে থাকে, সে কথাও আমাদের জানা। এ বছর যে কয়েক হাজার হজযাত্রী যথারীতি টাকাপয়সা জমা দিয়েও হজে যেতে পারেননি, তা ওই সব সরষের ভেতরের ভূতের জন্য। এই ভূত খেদানোর কাজটা একা সরকারকে দিয়ে হবে না, দেশের মানুষকেও পথে নামতে হবে, তাদের প্রতিবাদের আওয়াজটা উঁচু করতে হবে।
অন্য যা দরকার, তা হলো অভিবাসনের সঠিক চিত্রটি তুলে ধরা। যারা অবৈধ পথে বিদেশে যেতে চায়, তাদের খুব ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া, যে কঠিন পথে তারা নামার কথা ভাবছে, কী অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ তাদের জন্য অপেক্ষা করছে! এই কাজ সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারে দেশের তথ্যমাধ্যম। এখন দেশে রেডিও-টিভির অভাব নেই। তারা যদি চোখে আঙুল দিয়ে সত্যটা তুলে ধরে, তাতে কেউ কেউ হয়তো ডিঙি নৌকায় ভারত মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার আগে দ্বিতীয়বার চিন্তা করবে। এতে যদি একটি জীবনও বাঁচে, তাহলে বলতে পারবে একটি জীবন বাঁচানো গেছে।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।