Wednesday, April 17, 2019

বাংলাদেশই প্রধান বিষয় আসামের ভোটে by তরুণ চক্রবর্তী

নাগরিকত্ব সংশোধনী (ক্যাব) বা নাগরিক নিবন্ধনকরণের (এনআরসি) হাত ধরে ‘বাংলাদেশ’ই ভারতের আসাম রাজ্যের ভোটে এবারও প্রধান বিষয়। রাজনৈতিক দলের নেতাদের পাশাপাশি সুশীল সমাজও একমত, আসাম এখনো ভোট প্রচারে ‘বাংলাদেশ’ থেকে বার হতে পারেনি।কারণ আসামের ভোটে নির্ণায়ক শক্তিই হচ্ছেন বাঙালিরা। আর বিজেপির হাত ধরে এবার বাঙালি ভোটকে দু-ভাগে ভাগ করার প্রবল চেষ্টা প্রকট।
কংগ্রেসের চা বাগান সংগঠনের নেতা ভগীরথ করণ। তাঁর সঙ্গে সম্প্রতি কথা হচ্ছিল আসামের রাজধানী গুয়াহাটির কংগ্রেস ভবনে। ভগীরথের আক্ষেপ,‘রাজ্যে সমস্যার অন্ত নেই। অথচ, বাংলাদেশের বাইরে বার হতে পারলাম না।’ বাস্তবেই আসামে বেকারত্ব, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, দুর্নীতির মতো ভোট রাজনীতির মুখরোচক বিষয় বা স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো গুরুতর বিষয় সরকার বা বিরোধী পক্ষের ভোটের বিষয়ই নয়। এমনকি, ফি বছর বন্যায় মানুষের পাশাপাশি বন্য পশুরাও প্রাণ হারাচ্ছেন আসামে। বন্যা প্রতিরোধ নিয়েও ভোট প্রচারে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে না কোনো পক্ষ। তাঁদের মূল বিষয়ই বাংলাদেশ।
এক সময়ে আসামে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছেন বহু যুবক। স্বপ্ন দেখেছিলেন স্বাধীন আসামের। গড়ে উঠেছিল সন্ত্রাসবাদী সংগঠন উলফা। সেই উলফার চেয়ারম্যান অরবিন্দ রাজখোয়ার মতে, আসামের ভিটেমাটি বেদখল হয়ে যাওয়াতেই তাঁরা অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন। অভিযোগের তীর তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশের দিকে। উলফা ছাড়াও ‘বঙাল খেদার’ নামে বহু মানুষকে হত্যা করেছে বিভিন্ন খিলঞ্জিয়া (ভূমিপুত্র) সংগঠন। দশকের পর দশক ধরে কখনো সরবে, কখনো বা নীরবে চলছেই বাঙালি নির্যাতন।
শিলচরে বিশিষ্ট আইনজীবী সাধন পুরকায়স্থ বলছিলেন, ‘ক্যাব বা এনআরসি আসলে তো সেই বাংলাদেশি সন্দেহে ভারতীয়দের হয়রানির জাঁতাকল। বললেন । বাঙালি ভূমিপুত্রদের গায়েও চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশি তকমা। পোড়া হচ্ছে বন্দিশালায়। ভোটারদের নামের পাশে সন্দেহ চিহ্ন এঁকে দিয়ে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে নাগরিকত্ব।;
খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এসে ভোটে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন ক্যাব বাস্তবায়নের। ক্যাব তো আসলে বাংলাদেশি হিন্দুদেরই নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি। কংগ্রেসও পাল্টা হিসেবে ক্যাব না দেওয়াকেই হাতিয়ার করেছে। রাহুল গান্ধীর সভাতেও তাই গুরুত্ব পায় অনুপ্রবেশ। নেতাদের দেখানো পথেই ভোটপ্রার্থীর লোকজন চারদিকে শুধু ক্যাব আর এনআরসি নিয়েই প্রচারে ব্যস্ত। আবার আক্ষেপও করছেন নেতারা। বিজেপিও বলছে, উন্নয়নই সবচেয়ে জরুরি। কিন্তু একান্তে তাঁদের মুখেও শোনা যাচ্ছে আসামে বাংলাদেশটাই বেশি চলে।
আগামী বৃহস্পতিবার আসামের বাংলাভাষী এলাকা বরাক উপত্যকায় ভোট। প্রচার তুঙ্গে। আজ সোমবার ছিল বাংলা নববর্ষ ভারতে। আজও প্রচারে কিন্তু বারবার উঠে এল সেই বাংলাদেশ। বরাক উপত্যকা বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির নেতা তৈমুর রাজা চৌধুরী পয়লা বৈশাখ পালনেও টানলেন বাংলাদেশের উদাহরণ। প্রথম আলোকে তৈমুর বলেন, ‘বাংলাদেশের মতো নববর্ষের অনুষ্ঠান জরুরি বরাকে। তাহলেই এক হবে সব বাঙালি।’
এবারের ভোটে বাঙালি জাতিকেই দুই টুকরো করার চেষ্টা চলছে বলে মনে করেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, ‘এনআরসির কারণে বাঙালির দেওয়া পিঠ ঠেকে গিয়েছে। বাংলাদেশি-বাংলাদেশি বলে বাঙালি জাতিটাকেই শেষ করার চক্রান্ত চলছে। এখন প্রয়োজন বাঙালির একতা। না হলে ভারতের বাঙালিদের সর্বনাশ হয়ে যাবে।’
কিন্তু তবু বিভাজনের রাজনীতি বেশ সক্রিয়। ভোট রাজনীতির স্বার্থে ভারতীয় বাঙালির বিশেষ বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের ভারতীয়, আর অন্যদের বাংলাদেশি বলার প্রয়াস দিন দিন বাড়ছে। এবারের ভোটে আরও প্রকট বাংলাদেশ। তাই সন্দেহের বশে ভোটাধিকার হারিয়েছেন ১ লাখ ২০ হাজার নাগরিক। বন্দিদশায় রয়েছেন হাজার খানেক। আরও ৭০ হাজারের সন্ধান চলছে। ৪০ লাখ আসাম বাসীর নাগরিকত্বও বাংলাদেশি সন্দেহের তালিকায়। এঁদের সিংহ ভাগই বাঙালি। বংশানুক্রমে আসামে বাস করেও তাঁরা নিজেদের ‘নাগরিক’ করে তুলতে পারলেন না। তাই এবারও, ভোটে সেই বাংলাদেশ আর বাংলাদেশিতেই আটকে আছে আসামে।

গণধর্ষণের মামলা করে জীবন শঙ্কায় বাদী by জিয়া চৌধুরী

সুবর্ণচরের চরজব্বর ইউনিয়নের উত্তর বাগ্যা এলাকায় গণধর্ষণের শিকার নারীর পরিবার এখন জীবন শঙ্কায় সময় পার করছে। ধর্ষণ মামলার বাদী নির্যাতিতার স্বামী ও তার মেয়েকে ক্রমাগত হুমকি দিচ্ছে আসামি পক্ষ। এমনকি তার মেয়েকে এসিডে ঝলসে দেয়ার কথাও বলছে আসামি পক্ষের লোকেরা। এ অবস্থায় নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত পরিবারটি। গত ৩১শে মার্চ ওই গৃহবধূ গণধর্ষণের শিকার হন। এ ঘটনায় করা মামলায় অভিযুক্ত প্রধান আসামি আবুল কালাম বেচু  ওরফে বেচু মাঝি পার পেয়ে যেতে পারেন বলে শঙ্কা রয়েছে নির্যাতিত পরিবারের। ধর্ষণের ঘটনার সময় তার ব্যবহৃত মুঠোফোনের অবস্থান ঘিরে এমন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও জেলা পুলিশের কয়েকটি সূত্রে এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এজন্য তথ্য প্রযুক্তিতে দক্ষ কাউকে দিয়ে মামলাটির তদন্ত করারও দাবি উঠেছে।
এদিকে, সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করায় নির্বাচনের ঠিক দুই দিন পরে সংঘবদ্ধ ও পরিকল্পিতভাবে ওই নারীকে ধর্ষণ করা হয় বলে দাবি করেছেন তার স্বামী ও মামলার বাদী মো. শাহাজাহান। ঘটনার পরদিন মামলা দায়েরের পর থেকে বাদী, তার পরিবারের সদস্য ও মামলার সাক্ষীদের সাক্ষ্য না দিতে ও মামলা তুলে নিতে ক্রমাগত হুমকি ও চাপ দিয়ে যাচ্ছে। এমনকি ধর্ষণের শিকার নারীর কন্যাকেও ঘটনার পর নানা ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। এসিডে ঝলসে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়েছে। মামলার কয়েকজন স্বাক্ষী, ঘটনার শিকার নারীর স্বজন ও স্থানীয় প্রশাসনের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। জীবনের নিরাপত্তায় ধর্ষণের শিকার নারীর স্বামী মো. শাহাজাহান বাদী হয়ে চর জব্বর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছেন।
মামলার আসামিদের স্বজন ও পরিবারের সদস্য ছালা উদ্দিন, আলা উদ্দিন, আবদুল খালেক, আবদুল মতলব, কামাল উদ্দিন, নেছার উদ্দিন, আরিফ, ইলিয়াছ, মিরাজ, মেহরাজ, রেখা বেগম, রোজিনা বেগম ও জামাল উদ্দিনসহ আরো বেশ কয়েকজন মামলা তুলে নিতে বাদীর পরিবারকে ও সাক্ষীদের চাপ দিচ্ছেন। এসব বিষয়ে স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবদুল ওয়াদুদ ঘটনাস্থলে গিয়ে সাক্ষী ও বাদীর পরিবারের সাথে কথা বলেন। মামলা তুলে নেয়ার হুমকির বিষয়ে সত্যতা পেয়ে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানান। মো. আবদুল ওয়াদুদ গতকাল মঙ্গলবার রাতে মানবজমিনকে বলেন, সাক্ষীসহ কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি। তারা সবসময় বাড়িতে থাকেন। বাদীর পরিবারে মেয়েও রয়েছে। নিরাপত্তার বিষয়ে আমি থানাকে বলেছি। এদিকে, চর জব্বর থানার পুলিশ মামলার এজাহারে উল্লেখ করা আট আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের থেকে কোন ধরনের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় না করায় ক্ষোভ জানিয়েছেন বাদী।
একই সঙ্গে গণধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ১৩ জনের মধ্যে আট জন আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও বাকি অজ্ঞাত পাঁচজনকে গ্রেপ্তারে পুলিশ কোন তৎপরতা দেখাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি মানবজমিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মামলার দুই ও চার নম্বর আসামি যথাক্রমে আবুল বাশার ও ইউছুপ মাঝি এই ধর্ষণের ঘটনার আগেও অন্তত আটটি ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও অপহরণের ঘটনা ঘটিয়েছে। এসব ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে, যেগুলোর বিচার চলমান রয়েছে। নোয়াখালী জেলা ও দায়রা জজ আদালত সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গত কয়েক বছর ধরে তাদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে চর জব্বর ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ। আগের মামলাগুলোর এখনো কোন সুরাহা না হওয়ায় আতঙ্কে আছেন ওইসব মামলার বাদী ও সাক্ষীরাও।
সবশেষ চতুর্থ ধাপে গত ৩১শে মার্চ সুবর্ণচর উপজেলা নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার জেরে মো. শাহাজাহানের স্ত্রীকে পরিকল্পিতভাবে বাগ্যা এলাকায় ধর্ষণের ঘটনা ঘটায়। তবে ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত আসামি আবুল কালাম বেচু ওরফে বেচু মাঝির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও তার মোবাইল ফোনের লোকেশন নিয়ে ধাঁধায় পড়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ধর্ষণের শিকার নারী, তার স্বামী ও মামলার বাদী এবং ভিকটিমের পরিবার বেচু মাঝির যে মুঠোফোন নম্বর দিয়েছেন ঘটনার সময় সেই মুঠোফোন নম্বরের লোকেশন ঘটনাস্থলে ছিলো না। এমনকি আসামি বেচু মাঝির নামে নিবন্ধন করা সিমটির অবস্থান ধর্ষণের সময় চর জব্বর ইউনিয়নের বাগ্যা এলাকার ঘটনাস্থলে ছিল না বলে মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছে পুলিশের একাধিক সূত্র। তবে ধর্ষণের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত বেচু মাঝির সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলেও এ বিষয়ে পুলিশকে প্রমাণ করতে কাঠখড় পোহাতে হবে বলে সূত্রে জানা গেছে।
জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, ধর্ষণের এক ঘণ্টা আগেও বাগ্যা এলাকায় রুহুল আমিনের প্রজেক্টের আশেপাশে বেচু মাঝির ফোনের লোকেশন ট্র্যাক করা গেছে। কিন্তু ধর্ষণের সময় ও তারপর বেচু মাঝির মুঠোফোনের লোকেশন পাওয়া যায় পাশের জেলা লক্ষ্মীপুরের রামগতি উপজেলায়। ওই কর্মকর্তা জানান, ধর্ষণের পরে নিজেকে ঘটনায় নির্দোষ প্রমাণ করতে এমন ফাঁদ পাতা হয়ে থাকতে পারে। টেলিভিশনের ক্রাইম পেট্রোল ও অপরাধবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো থেকে প্রধান অভিযুক্ত এমন পরিকল্পনা করতে পারে। তিনি জানান, ঘটনার আগে একটি মোটরসাইকেলে করে ধর্ষণের শিকার নারীকে ফলো করতে থাকে কয়েকজন আসামি। এ সময় বেচু মাঝির মুঠোফোন মোটরসাইকেলে করে লক্ষ্মীপুরের রামগতিতে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। নইলে ধর্ষণের আগে বেচু মাঝির মুঠোফোন থেকে তার নামে নিবন্ধিত সিম অন্য সিম লাগিয়ে আসল নম্বরটি লক্ষ্মীপুর এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। মামলার বিচার থেকে নিরাপদে থাকতে বেচু মাঝি এমন কৌশল করতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। তার এমন কৌশল মামলার বিচারে প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা জানিয়েছে কয়েকজন। তবে আদালত সূত্র ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা বলছে, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বেচু মিয়ার সংশ্লিষ্টা থাকলেই তাকে সাজা দিতে সমস্যা হবার কথা নয়। তবে, মামলার আরো দুই আসামি আবুল বাশার ও ইউছুপ মাঝির বিরুদ্ধে আরো অন্তত আটটি নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ও অপহরণের মামলার খোঁজ মিলেছে মানবজমিনের অনুসন্ধানে। ২০১৩ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৬০৩ নম্বর মামলা, ৬৮৭ নম্বর মামলা, ২০১৪ সালে জিআর ২৪১ নম্বর মামলা, ২০১৫ সালের ৬৫ নম্বর, ২০১৮ সালে ১৮৭ নম্বর মামলাসহ আরো কয়েকটি মামলায় অন্যতম আসামি করা হয় এই দুইজনকে। একই সঙ্গে ২০১৭ সালে নারী ও শিশু নির্যাতনের একটি মামলায় সুবিচার চেয়ে পুলিশ সদর দফতরের ক্রাইম বিভাগের ডিআইজি ও নোয়াখালীর পুলিশ সুপার বরাবরও আবেদন করেন ভিকটিম একটি পরিবার। তবে এসবের কোন কিছুই শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। তার আগে ২০১৫ সালে জেলা শিশু ও মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা একটি প্রতিবেদনে আসামিদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ তুলে ধরেন। যেটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকের কাছেও পাঠান ওই কর্মকর্তা। এদিকে মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা ইন্সপেক্টর মো. ইব্রাহিম খলিল গতকাল রাতে মানবজমিনকে জানান, বাদীর পরিবারের নিরাপত্তা চেয়ে জিডির বিষয়টি আমি নিজেই তদন্ত করছি। তবে এখনো কোন সুস্পষ্ট প্রমাণ পাইনি। তবে বাদীর অভিযোগকে আমি পুরোপুরি ভিত্তিহীনও বলছি না। আমরা সচেষ্ট আছি। সব সময় টহল পুলিশ বাদীর পরিবারের নিরাপত্তায় কাজ করছে। আসামিদের এখনো জবানবন্দি নেয়া হয়নি কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা রিমান্ডে নিয়ে তাদের থেকে তথ্য নেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তারা কোন তথ্য দিচ্ছে না। আর অজ্ঞাত আরো ৫ আসামিকে এখনো পুলিশ শনাক্ত করতে পারেনি বলেও মানবজমনিকে জানান তদন্তকারী কর্মকর্তা।

নটর ডেম ক্যাথেড্রাল: ২০০ বছরে তৈরি কয়েক ঘণ্টায় ব্যাপক ক্ষতি

ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্র নটর ডেম ক্যাথেড্রাল তৈরি করতে সময় লেগেছিল ২০০ বছর। আর ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে কয়েক ঘণ্টায় তার ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক। আগুনের কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যায়নি। কর্মকর্তারা বলছেন, গির্জার সংস্কারের কাজ চলাকালে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ছবিতে দেখা গেছে, আগুনের লেলিহান শিখা ৮৫০ বছরের পুরনো আইকনিক এই ভবন ছেয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন ঘটনাস্থলে পৌঁছে সকল ক্যাথলিক এবং ফরাসি নাগরিকের জন্য তার সমবেদনার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের এই অংশটি পুড়তে  দেখে আমার দেশের আর সবার মতো আমিও অত্যন্ত ব্যথিত’। এ খবর দিয়েছে বিবিসি।
খবরে বলা হয়, গত বছর এই ক্যাথলিক গির্জার পরিচালনা কর্তৃপক্ষ গির্জাটি রক্ষা করতে জরুরি তহবিলের জন্য আবেদন জানিয়েছিল।
তখন প্রাচীন এই গির্জা ভেঙে পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। সোমবার স্থানীয় সময় বিকালে শুরু হওয়া আগুন নেভাতে প্রচুর উদ্ধারকর্মী কাজ করছিলেন। ভবনের চারপাশের এলাকা থেকে লোকজনকে সরিয়ে নেয়া হয়। এদিকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেয়ার কথা থাকলেও, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রন অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তা বাতিল করেন। প্রেসিডেন্টের কার্যালয় এলিজি প্রাসাদের কর্মকর্তারা এ কথা জানান।
প্যারিসের মেয়র আনে হিদালগো একে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড আখ্যা দিয়েছেন। তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের বেঁধে দেয়া সীমানা অতিক্রম না করার আহ্বান জানান। তবে অগ্নিকাণ্ডের পর মূল কাঠামো এবং দু’টো বেল টাওয়ার রক্ষা করা  গেছে বলে জানান কর্মকর্তারা। প্রাচীন গোথিক ভবনটিকে রক্ষার জন্য দমকল কর্মীরা ব্যাপক চেষ্টা চালালেও এর উঁচু মিনার এবং ছাদ ধসে পড়ে।
যেভাবে আগুন ছড়িয়ে পড়ে: স্থানীয় সময় সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টার দিকে আগুন লাগে এবং দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। ক্যাথেড্রালের ছাদে যখন আগুন জ্বলতে থাকে এবং ভবনের জানালা ধ্বংস করে দেয় তখন প্রকাণ্ড জোরে শব্দ শোনা যায়। উঁচু মিনার খসে পড়ার আগে তা কাঠের তৈরি কাঠামো ধ্বংস করে। একটি বেল টাওয়ার ধসের হাত থেকে রক্ষার জন্য ৫০০ জন ফায়ার ফাইটার কাজ করে।
চার ঘণ্টা পরে অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর প্রধান জ্যঁ-ক্লদে গ্যালেট বলেন, প্রধান কাঠামোটি পুরোপুরি ধ্বংসের কবল থেকে রক্ষা করা গেছে এবং সংরক্ষিত আছে। ক্যাথেড্রালের শিল্পকর্ম সংরক্ষণ এবং এর উত্তরাংশে টাওয়ার রক্ষার জন্য রাতভর সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হয়। এ সময় অনেককে প্রকাশ্যে কাঁদতে দেখা যায়। একই সময় অন্যরা দুঃখ করছিলেন, কেউবা প্রার্থনা করছিলেন। রাজধানীর অনেক গির্জায় বেল বাজাতে শোনা যায়।
প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রন বলেন, ‘আমরা একত্রে পুনরায়  তৈরি করবো নটর ডেম’। তিনি ফায়ার ফাইটারদের চূড়ান্ত সাহসিকতা এবং পেশাদারিত্বের প্রশংসা করেন।
ইতিহাসবিদ কামিলি পাস্কাল ফরাসি গণমাধ্যম বিএফএম টিভিকে বলেন, আগুন ধ্বংস করে দিচ্ছে ‘অমূল্য ঐতিহ্য’। ৮০০ বছর ধরে এই ক্যাথেড্রাল প্যারিসে দাঁড়িয়ে ছিল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে খুশির এবং দুর্ভাগ্যজনক ঘটনায় নটর ডেমের ঘণ্টাধ্বনি তাকে স্মরণীয় করে রেখেছে।
একটি দেশের প্রতীক: বিবিসি ওয়ার্ল্ড অনলাইনের হেনরি আস্টয়ের-এর বিশ্লেষণ অনুসারে, নটর ডেমের মতো অন্য কোনো নিদর্শন বা জায়গা ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না। জাতীয় প্রতীক হিসেবে এর কাছাকাছি প্রতিদ্বন্দ্বী আইফেল টাওয়ার। ১২০০ শতক থেকে প্যারিসে দাঁড়িয়ে ছিল নটর ডেম।  ভিক্টর হুগোর ‘দ্য হাঞ্চব্যাক অব নটর ডেম’ ফরাসিদের কাছে নটর ডেম ডি প্যারিস হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছিল। এই ক্যাথেড্রালটি সর্বশেষ বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়েছিল ফরাসি বিপ্লবের সময়।

ফেরদৌসের ভিসা বাতিল, ভারত ছাড়ার নির্দেশ by পরিতোষ পাল

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ায় বাংলাদেশের অভিনেতা ফেরদৌসকে নিয়ে প্রবল রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ভিসা বাতিল করে তাকে দেশে ফেরার নির্দেশ দিয়েছে ভারত। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফেরদৌসকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ফেরদৌস আহমেদের ভিসা সংক্রান্ত আচরণ লঙ্গনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ভিসা বাতিল করেছে। তাকে দেশ ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পর বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনের পক্ষ থেকে ফেরদৌসকে সোমবার রাতেই ঢাকায় ফিরে যাওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার তৌফিক হাসান নিজে ফেরদৌসকে ফোন করে দেশে ফিরে যেতে বলেছেন বলে উপ-হাইকমিশন সূত্রে জানা গেছে। ফেরদৌস হাইকমিশনকে বলেছেন, তিনি সেখানে একটি ছবির শুটিং করতে গিয়েছিলেন।
পরে সেখানকার প্রার্থীর অনুরোধে রোড শোতে উপস্থিত ছিলেন। বাংলাদেশের অভিনেত্রী জয়া আহসানকেও দেশে থাকতে বলা হয়েছে। অভিনেতা ফেরদৌসের অন্য দেশের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণের প্রতিবাদে মঙ্গলবার বিজেপির পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে নালিশ জানানো হয়। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী অফিসারের সঙ্গে দেখা করার পর বিজেপি নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা জানি যে, ভারতের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কোনো বিদেশি নাগরিক অংশ নিতে পারে না। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস বাংলাদেশি নাগরিককে (ফেরদৌসকে) নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করে আইন ভঙ্গ করেছে। সেই সঙ্গে বিজেপি নেতা ভিসা নীতি ভঙ্গ করার অভিযোগে ফেরদৌসকে গ্রেপ্তারের দাবিও জানিয়েছেন।  
গত রোববার ও সোমবার তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থীদের সমর্থনে আয়োজিত রোড শোতে রায়গঞ্জ, হেমতাবাদ ও করণদিঘীতে ফেরদৌস টালিগঞ্জের আরো কয়েকজন সহ-অভিনেতার সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়েছিলেন। এই খবর প্রকাশে আসতেই ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে কলকাতায় ফরেন রেজিস্ট্রেশন অফিসে ফেরদৌসের ভিসা সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে পাঠানো হয়। জানতে চাওয়া হয়েছে, তার ভিসা সংক্রান্ত সব তথ্য। ভারতে সফরে এসে স্থানীয় ফরেন রেজিস্ট্রেশন অফিসে তা জানানো বাধ্যতামূলক। সূত্রের খবর, ফেরদৌস বিজনেস ভিসা নিয়েই কলকাতায় এসেছিলেন। তিনি নিয়মিতই কলকাতায় আসা যাওয়া করেন। তবে, নির্বাচনী প্রচারের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি কোনো অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন নি।
বাংলাদেশের পাশাপাশি টালিগঞ্জের অনেক ছবিতে ফেরদৌস নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন। বাংলাদেশের মতো এপার বাংলাতেও তিনি সমান জনপ্রিয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রায়গঞ্জ কেন্দ্রের ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোটের দিকে তাকিয়েই ফেরদৌসের জনপ্রিয়তাকে প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছে। গত রোববারই বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছিলেন, ভারতের একটি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিভাবে বিদেশি নাগরিককে দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে রোড শো করাচ্ছে? আমি এরকম আগে শুনিনি। আগামীকাল হয়তো আমাদের মমতা ব্যানার্জি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে তৃণমূলের হয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেয়ার জন্য ডাকতে পারেন। আমরা এই ঘটনার নিন্দা জানাই। এদিকে জনপ্রিয় ধারাবাহিক করুণাময়ী রাণী রাসমনির অভিনেতা বাংলাদেশের নূরকে নিয়েও অনুরূপ বিতর্ক তৈরি হয়েছে। নূরও কয়েকদিন আগে দমদম লোকসভা কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্র্থী সৌগত রায়ের সমর্থনে প্রচারে অংশ নিয়েছিলেন।

সব বিভাগে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হবে -স্বাস্থ্যসেবা ও পুষ্টি সপ্তাহের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের চিরায়ত চিকিৎসা পদ্ধতির ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রাচীনকাল থেকে চলে আসা চিরায়ত স্বাস্থ্য সেবা পদ্ধতিকে মূলধারার ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত জাতীয় স্বাস্থ্য সেবা ও পুষ্টি সপ্তাহ-২০১৯ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এই আহবান জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ভেষজ, আয়ুর্বেদিক, ইউনানী এবং হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা উপেক্ষা করতে পারি না এবং মানুষের চিকিৎসা সুবিধার জন্য এগুলোর উন্নয়নের জন্য আরো গুরুত্ব দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ বর্তমানে মান সম্পন্ন ওষুধ উৎপাদনে ব্যাপক সফল্য অর্জন করেছে এবং বিদেশে এর চাহিদা তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি চিরায়ত ওষুধেরও ব্যাপক গুরুত্ব রয়েছে।
বিশ্বব্যাপী ভেষজ (হার্বাল) চিকিৎসার চাহিদা ব্যাপক উল্লেখ করে তিনি চিরায়ত চিকিৎসার উন্নয়নে নিবিড় গবেষণার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী তৃণমূল পর্যায়ে জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সহজতর করতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারি অর্থে কেনা অ্যাম্বুলেন্স ও জিপ বিতরণ করেন। তিনি জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে তার সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।  সকল মানুষকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে দেশব্যাপী কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমান প্রায় ১৪ হাজার ক্লিনিক মা ও শিশুদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে এবং এখান থেকে ৩০টি মারাত্মক রোগের ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রসবকালীন সময়ের জন্য দক্ষ প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। সরকার আইসিটি ব্যবহার করে ‘স্বাস্থ্য বার্তা’ নামে কল সেন্টারের মাধ্যমে টেলি মেডিসিন সেবা চালু করেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব উদ্যোগ হচ্ছে মূলত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রবর্তিত স্বাস্থ্যসেবারই অংশ।
এ প্রসঙ্গে তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারের আমলে স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন বঙ্গবন্ধু সংবিধানে স্বাস্থ্যকে ৫টি মৌলিক চাহিদার একটি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। তিনি বলেন, এই সাংবিধানিক নীতির অনুসরণে আওয়ামী লীগ সরকার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জনগণের মান সম্পন্ন চিকিৎসা সুবিধা প্রদান এবং চিকিৎসক ও নার্সদের মতো দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার ঢাকায় প্রথম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে। তিনি বলেন, তার পরবর্তীতে সরকার দেশের ৮টি বিভাগের প্রতিটি মেডিকেল কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীতে তিনটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। শেখ হাসিনা শুধু সায়েন্স ব্যাক গ্রাউন্ডের বদলে সব একাডেমিক ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে নার্স-নিয়োগে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধি সংশোধনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি অপারেশন পরবর্তী রোগীদের পরিচর্চার জন্য নার্সদের বিশেষ প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নের কারণে দেশের গড় আয়ু ৬৬ দশমিক ৮ বছর থেকে বেড়ে ৭২ বছর ছাড়িয়েছে এবং মাতৃমৃত্যুর হার ৩ দশমিক ৪৮ থেকে কমে ১ দশমিক ৭২ (প্রতি হাজারে) এবং শিশু মৃত্যুর হার প্রতি ১০০০ এ ৪১ থেকে কমে ২৪-এ দাঁড়িয়েছে । আওয়ামী লীগ সরকার সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তার সরকার বর্তমানে প্রতিবন্ধীদের জন্য আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। আগামী বাজেট থেকে অটিস্টিকসহ সব ধরণের প্রতিবন্ধীকে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে।
শেখ হাসিনা এ সময় অটিস্টিকদের কল্যাণে তার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ হোসেনের অবদানের কথা স্মরণ করেন। প্রধানমন্ত্রী হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যানসার, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগের ব্যাপক বিস্তার ঘটায় এইসব রোগ সম্পর্কে সতর্ক থাকার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই রোগগুলো প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণই উত্তম। তিনি এ সময় এইসব রোগের ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এগুলো প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি সেরা সমাধানগুলোর একটি। তিনি পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, রোগ নিরাময়ের চেয়ে প্রতিরোধ করা ভালো। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. মুরাদ হাসান, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

মাদরাসা ছাত্রী আটক

সোনাগাজীর মাদরাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যা মামলার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গতকাল দুপুরে জান্নাতুল আফরোজ মনি নামে এক আলিম পরীক্ষার্থীকে আটক করেছে পিবিআই। সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে পরীক্ষা শেষে দুপুর দেড়টায় তাকে আটক করা হয়।
তবে জান্নাতুল আফরোজ মনিকে আটকের বিষয়টি পিবিআই’র কোনো কর্মকর্তা স্বীকার না করলেও সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার কেন্দ্র সচিব নুরুল আফসার ফারুকী নিশ্চিত করেছেন। এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই এর পরিদর্শক মো. শাহ আলাম জানান, তাদের কোনো টিম মনি নামে কাউকে আটক করেনি। তবে অন্য কোনো বাহিনী আটক করেছে কিনা তা তিনি নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি।
এদিকে এ মামলায় এজহারভুক্ত ৮ জনের মধ্যে ৭ জন ও সন্দেহভাজন হিসেবে আরো ৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
অপরদিকে নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় অপরাধী আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফেনী ও সোনাগাজীতে মানববন্ধন করেছে একাধিক সংগঠন। মঙ্গলবার সকালে শহরের জিরো পয়েন্ট সংলগ্ন শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন করে ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির ব্যবসায়ীরা, বিকালে একাদশ শ্রেণির প্রথম বর্ষের পরীক্ষা শেষে শহরের শহীদ শহীদুল্যাহ কায়সার সড়কে মানববন্ধন করে সরকারি জিয়া মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীবৃন্দ।
এদিকে সকালে সোনাগাজী বাজারের জিরো পয়েন্টে মানববন্ধন করে ‘সোনাগাজী মহিলা পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।
এছাড়া ফেনী ও সোনাগাজীতে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সংগঠন মানববন্ধন করেছে। এ সময় ওইসব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।
ফেনী শহর ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোশারফ হোসেন মানববন্ধনে তার বক্তব্যে বলেন, দুই আসামির জবানবন্দিতে নুসরাত হত্যার সঙ্গে জড়িত সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রুহুল আমিনের নাম উঠে এসেছে। অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
তিনি ছাড়াও অন্য বক্তারা নুসরাত হত্যার ঘটনায় সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ সব অপরাধীদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন। কোনোভাবে যেন মামলা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত না হয় সে জন্য সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করেন।
গত ৬ই এপ্রিল সকালে নুসরাত আলিমের আরবি পরীক্ষা প্রথমপত্র দিতে গেলে মাদরাসায় দুর্বৃত্তরা তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এ ঘটনায় দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৫ দিন পর বুধবার রাতে মারা যায়। বৃহস্পতিবার বিকালে তার জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে প্রধান আসামি করে ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৪-৫ জনকে আসামি করে নুসরাতের ভাই নোমান মামলা দায়ের করেন।

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফার ভোট: তিন কেন্দ্রেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই by পরিতোষ পাল

পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় দফায় ১৮ই এপ্রিল বৃহস্পতিবার উত্তরবঙ্গের তিনটি লোকসভা আসনে ভোট হবে। এই তিনটি আসন হলো রায়গঞ্জ, জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং। প্রথম দফায় ভোট হয়েছে কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে। দ্বিতীয় দফার ভোটে তিনটি আসনে লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি। চতুর্মুখী এই লড়াইয়ে সবাই জয়ের আশা করছেন। উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ আসন থেকে গতবার জয়ী হয়েছিলেন সিপিআইএমের মো. সেলিম।
এবারও তিনি নিজের আসন দখলে রাখার লড়াইয়ে অবতীর্ণ। তার বিরুদ্ধে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী করা হয়েছে কিছুদিন আগে কংগ্রেস থেকে আসা কানাইয়ালাল আগরওয়ালকে।
কংগ্রেস অবশ্য দীপা দাশ মুনশির জেদের কাছে হার মেনে এই কেন্দ্রে দীপাকেই মনোনয়ন দিতে বাধ্য হয়েছে। দীপা আগে দু’বার এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হলেও গতবার পরাজিত হয়েছিলেন। সাবেক সাংসদ দীপার জেদের কারণেই রাজ্যে বাম ও কংগ্রেসের সমঝোতা ভেঙে গেছে। দীপা পুরনো জমি খুঁজে পেতে লড়াই করছেন বিজেপির পাশাপাশি সিপিআইএম ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। বিজেপি এই কেন্দ্রে প্রার্থী করেছে রাজ্য বিজেপির সাধারণ সম্পাদিকা দেবশ্রী চৌধুরীকে। বহিরাগত বলে বিজেপি প্রার্থী নিয়ে প্রথমে মতান্তর তৈরি হলেও প্রচার যত এগিয়েছে ততই তা কেটে গেছে। সকলেই এখন একাট্টা হয়ে জয়ের লক্ষ্যে প্রচারে ব্যস্ত। রায়গঞ্জে গতবছর একটি স্কুলের সামনে বিক্ষোভ দেখাতে গিয়ে দুই ছাত্রের গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনাটিই নির্বাচনে কাঁটা হয়ে উঠেছে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের কাছে। নিহত দুই ছাত্রের পরিবার সিবিআই তদন্ত চেয়ে এখনো মৃতদেহের সৎকার করেননি। দিদি মমতা একবারও সেখানে যাননি বলে ক্ষোভও রয়েছে। সেখানেই বিজেপির অ্যাডভানটেজ।
বিজেপির স্থানীয় নেতাদের মতে, ছাত্র মৃত্যুর ঘটনার প্রভাব পড়বে গোটা জেলার ভোটে। এ ছাড়া রায়গঞ্জে বিজেপি গত কয়েক বছরে নিজেদের ভিত্তি বেশ শক্তপোক্ত করেছে। সিপিআইএমের  মো. সেলিম একাই জোরদার প্রচার করছেন। ডিজিটাল প্রচারেও সেলিম সকলকে টেক্কা দিয়েছেন। কিন্তু দলের সাংগঠনিক অবস্থা এখনো বেশ দুর্বল। ফলে গতবারের ভোট ধরে রাখা তার কাছে এক কঠিন লড়াই। অবশ্য সেলিম জানিয়েছেন, বিজেপি বিরোধী ভোট কাটার জন্যই কংগ্রেস এই কেন্দ্রে প্রার্থী দিয়েছে। গতবার এক লাখ ভোটের ব্যবধানে হেরে গেলেও কংগ্রেস প্রার্থী দীপা দাশ মুনসি পুরনো কংগ্রেস ভোটের ওপর ভরসা করছেন। প্রয়াত প্রিয়রঞ্জনের একটা প্রভাব এখনো রায়গঞ্জে রয়েছে বলে কংগ্রেসীরা মনে করেন। আর এর ওপর ভরসা করেই প্রিয়রঞ্জন জায়া দীপা জয়ের আশা করছেন। অবশ্য রায়গঞ্জে প্রায় ৩৬ শতাংশের বেশি সংখ্যালঘু ভোট রয়েছে। সেই ভোটের দিকে নজর বিজেপি বিরোধী তিন দলেরই। ফলে মেরুকরণের রাজনীতিও রায়গঞ্জে বেশ তীব্র হয়েছে। অবশ্য রায়গঞ্জের মানুষ ভাবছেন, ভোট কতটা অবাধ ও শান্তিপূর্ণ হবে তা নিয়ে। মানুষ ভোট অবাধে দিতে পারলে কাটাকাটির অঙ্কে অনেক অঘটন ঘটতে পারে।
রায়গঞ্জের মতো অ্যাডভানটেজ অবস্থা না থাকলেও জলপাইগুড়ি কেন্দ্রে বিজেপির উপস্থিতিই অন্য দলের প্রার্থীদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছে। গতবার এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিল তৃণমূল কংগ্রেস। এই কেন্দ্রের অন্তর্ভুক্ত  বিধানসভা কেন্দ্রগুলোতেও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রভাব বেশ। আসলে চা বাগান সমৃদ্ধ এই আসনে এক সময়ে বাম আধিপত্য ছিল প্রবল। কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার পর থেকে বামদের প্রভাব অনেকটা কমে গেছে। তবুও গতবার এই কেন্দ্রে বাম প্রার্থী ৩৩ শতাংশ আসন পেয়ে দ্বিতীয় স্থানে ছিল। তবে এবারের প্রার্থী ভগীরথ রায় এলাকায় শিক্ষক হিসেবে পরিচিত হলেও দলের সংগঠন এখনো চাঙ্গা হয়ে উঠতে পারেনি। বরং বামদের প্রভাবের বলয়ে ঢুকে পড়েছে বিজেপি।
বিজেপি গত এক বছরে জেলায়  দলের প্রভাব অনেকটাই বাড়াতে পেরেছে বলে বিরোধীরাও মেনে নিয়েছেন। ফলে সর্বত্রই লড়াই হচ্ছে বিজেপির সঙ্গে রাজ্যের শাসক দলের।  অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেস এবারও প্রার্থী করেছে গতবারের বিজয়ী বিজয়চন্দ্র বর্মনকে। তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে, বিজেপির প্রভাব নেই এমন জায়গগুীর থেকে যথেষ্ট লিড নিতে পারলে জয়ের পথে কোনো বাধা থাকবে না। কংগ্রেসে মণিকুমার ডার্নাল প্রার্থী হয়েছেন দলের হয়ে লড়াইটা টিকিয়ে রাখতে। চা বাগান শ্রমিকদের নেতা মণিকুমার তাকিয়ে রয়েছেন চা বাগানের শ্রমিকদের ভোটের দিকেই। বিজেপি প্রার্থী জয়ন্ত রায় এলাকার জনপ্রিয় চিকিৎসক। তিনি মনে করছেন, মানুষ এবার ভোট দেবে তৃণমূল কংগ্রেসের দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে। তার অভিমত, মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে বিজেপিকেই ভোট দেবেন। ফলে আপাত নিস্তরঙ্গ জলপাইগুড়িতে এবার লড়াইটা বিজেপির সঙ্গে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের।
রায়গঞ্জ ও জলপাইগুড়ির পাশাপাশি দার্জিলিং কেন্দ্রেও বিজেপিই প্রধান শক্তি হিসেবে লড়াই করছে। অবশ্য গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থনে বিজেপির এসএস আলুয়ালিয়া এই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন। তবে কেন্দ্রে যখন সংকট চলছিল তখল আলুয়ালিয়া দূরে সরেই ছিলেন। তাই তার বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছিল পাহাড়ের মানুষের। ফলে এবার আলুয়ালিয়ার পরিবর্তে বিজেপি প্রার্থী করেছে তরুণ ব্যবসায়ী রাজু সিং বিস্তকে। বিস্তকে প্রার্থী করা নিয়ে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ থাকলেও বিস্তের পেছনে সমর্থন দিয়েছে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরুং গোষ্ঠী এবং সুবাস ঘিসিংয়ের গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট। এই দুই দলের সমর্থন পেয়ে বিজেপি বেশ চাঙা হয়ে উঠেছে। অবশ্য দার্জিলিং কেন্দ্রে কংগ্রেস, সিপিআইএম, তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি ছাড়াও প্রার্থী রয়েছে জন আন্দোলন পার্টির নেতা হরকা বাহাদুর ছেত্রীও। দুই দশকে এবারই প্রথম দাজিংলিংয়ের নির্বাচনের আলাদা গোর্খাল্যান্ডের দাবি কোনো দলই ইস্যু করেনি।
এবারের নির্বাচনে জাতিসত্তার ইস্যুটি চাপা পড়ে গেছে। কংগ্রেসের শঙ্কর মালাকার এই এলাকার একটি বিধানসভা কেন্দ্রে জয়ী বিধায়ক হলেও দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে কংগ্রেসের তেমন কোনো অস্তিত্ব নেই। এই কেন্দ্রের সমতল এক অংশের ভোটই কংগ্রেস প্রার্থী পাবেন বলে সকলে মনে করছেন। সিপিআইএম প্রার্থী দার্জিলিংয়ের সাবেক সাংসদ আনন্দ পাঠকের পুত্র সমন পাঠক চা বাগানে শ্রমিক ভোটে ভাগ বসাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। তাছাড়া সমতলে সিপিআইএমের সংগঠনের জোরেও বেশ ভালো ভোট পাবেন সমন পাঠক। তাই দার্জিলিংয়ে লড়াইটা হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী অমর সিং রাইয়ের সঙ্গে বিজেপির রাজু সিং বিস্তের। অমর সিং রাই আসলে গোর্খা মুক্তি মোর্চার বিধায়ক ছিলেন। তাকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের দলের প্রতীকে প্রার্থী করেছেন। ফলে এ নিয়ে গোর্খাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিনয় তামাং গোষ্ঠী অমর সিং রাইকে সমর্থন দিয়েছে। আসলে দিদি কৌশলে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার মধ্যে ভাঙন ধরিয়ে একটি অংশকে নিজের অনুগত হিসেবে পরিচিত করেছেন। কিন্তু গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বিমল গুরুং গোষ্ঠী বিজেপির পাশে দাঁড়ানোয় গোর্খা ভোট আড়াআড়ি ভাগ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত রোববারও গোপন ডেরা থেকে পাঠানো এক ভিডিও বার্তায় তার অনুগতদের বিমল গুরুং চুপচাপ বিজেপিতে ছাপ দেবার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি জিএনএল এফ দলেরও প্রভাব রয়েছে পাহাড়ে। তাদেরও সমর্থনের ফলে গোর্খাদের একটা বড় অংশের ভোট বিজেপির দিকে আসার সম্ভবাবনাই বেশি। এই সব বিরুদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে লড়াই করতে হচ্ছে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী অমর সিং রাইকে। সার্বিকভাবে দ্বিতীয় দফায় যে তিনটি আসনে নির্বাচন হচ্ছে তাতে বিজেপিই অ্যাডভানটেজে রয়েছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। তবে অনেকের মতে, ভোট কাটাকুটির অঙ্কে অনেক হিসাব পাল্টে যেতে পারে।

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ

ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস আজ।  ১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযু্‌দ্ধ চলাকালে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলা গ্রামের আম্রকাননে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। পরে এই বৈদ্যনাথতলাকেই ঐতিহাসিক মুজিবনগর হিসেবে নামকরণ করা হয়। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে আজ দিবসটি পালিত হবে। ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানোর পর একই বছরের ১০ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয়। এ দিন ঘোষিত ঘোষণাপত্রে ২৬শে মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন করা হয়।
ঘোষণাপত্রে সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি ও সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করা হয়। এ ছাড়াও তাজউদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলী অর্থমন্ত্রী এবং এ এইচ এম কামারুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী নিযুক্ত হন। অপরদিকে জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী অস্থায়ী সরকারের মুক্তিবাহিনীর প্রধান কমান্ডার এবং মেজর জেনারেল আবদুর রব চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন।
১১ই এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদ দেশবাসীর উদ্দেশে বেতার ভাষণ দেন, যা আকাশবাণী  থেকে একাধিকবার প্রচারিত হয়।
তাজউদ্দিনের ভাষণের মধ্যদিয়েই দেশ-বিদেশের মানুষ জানতে পারে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার লক্ষ্যে একটি আইনানুগ সরকার গঠিত হয়েছে। এরই পথ পরিক্রমায় ১৭ই এপ্রিল সকালে মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথগ্রহণের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরের মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিকেন্দ্রে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। পরে শ্রদ্ধা নিবেদন ও কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান হবে। সকাল পৌনে ১১টায় মুজিবনগর শেখ হাসিনা মঞ্চে মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। বিকালে হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।