Showing posts with label জিয়া চৌধুরী. Show all posts
Showing posts with label জিয়া চৌধুরী. Show all posts

Tuesday, October 22, 2019

ভয়ঙ্কর প্লাস্টিক দূষণ, বছরে ক্ষতি ৬১৫০ কোটি টাকা by জিয়া চৌধুরী

পরিবেশ ও জীবনের জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি হয়ে উঠছে প্লাস্টিক বর্জ্য। অনিয়ন্ত্রিতভাবে প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ায় দিন দিন ঘনীভূত হচ্ছে সংকট। এভাবে চলতে থাকলে প্লাস্টিক বর্জ্য দেশে বড় বিপদ ডেকে আনতে  পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকাসহ সব বড় শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের জন্য আলাদা ব্যবস্থা না থাকায় পুনর্ব্যবহার করা যাচ্ছে না এসব পণ্যের।
পাশাপাশি সিটি করপোরশেনগুলো প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য আলাদা গ্রেডিং ও ব্যবস্থাপনা না করায় গৃহস্থালির প্রাকৃতিক বা অরগানিক বর্জ্যও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। প্রাকৃতিক বর্জ্যের সাথে মিশে এসব প্লাস্টিক ছড়িয়ে পড়ছে পরিবেশে। সরাসরি দূষণের পাশাপাশি জলাশয়ে গিয়ে মিশে জলজ প্রাণির জীবনচক্রে প্রভাব ফেলছে পলিথিন ও প্লাস্টিক পণ্য। বছরের পর বছর ধরে ঠিকে থাকা এসব প্লাস্টিক পণ্য বিরূপ প্রভাব ফেলছে মানুষের খাদ্যচক্রেও।
ওয়েস্ট কনসার্ন নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হিসেবে দেখা গেছে, বছরে বাংলাদেশে অন্তত ১০ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে যার বেশিরভাগ পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা হচ্ছে না। শুধুমাত্র প্লাস্টিক ও প্লাস্টিকজাত বর্জ্যের কারণে বছরে ৬১৫০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে। পরিবেশ বিপর্যয় ঠেকাতে ও বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি রুখতে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আলাদা নীতিমালা প্রণয়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গ্রেডিং সিস্টেম ও জিরো ওয়েস্ট পদ্ধতির চালুর সুপারিশ করেছে বেশ কয়েকটি সংগঠন। এরই মধ্যে, দেশে প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পুনরায় ব্যবহারের উদ্যোগ শুরু করে দিয়েছেন অনেকে।
পুরনো ফেলে দেয়া প্লাস্টিক থেকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী পণ্য তৈরিসহ বিদেশেও রপ্তানি করা শুরু করেছেন অনেক উদ্যোক্তা। তারা বলছেন, প্লাস্টিক বর্জ্য পুনর্ব্যবহারে সরকার এখনো মনোযোগী নয়। বেসরকারিভাবে অনেকে উদ্যোগ নিলেও সরকারি প্রণোদনার অভাবে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ‘বাংলাদেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রভাব ও পুনর্ব্যবহার’ বিষয়ে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুইজন শিক্ষক ও দুইজন শিক্ষার্থী একটি গবেষণা করছেন।
অতিরিক্ত মাত্রায় প্লাস্টিকের ব্যবহারকে বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখানো হয়েছে গবেষণায়। তবে প্লাস্টিক বর্জ্য শুধুই সংকট নয় সম্ভাবনা বলেও মনে করছে ওই গবেষণা দল। শাবিপ্রবি’র রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী ও গবেষণা দলের সদস্য মো. মাহমুদুল হাসান গতকাল মানবজমিনকে বলেন, গৃহস্থালি, অফিস ও কারখানার প্লাস্টিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের একটা বড় সুযোগ রয়েছে। তবে হতাশার বিষয়, আমরা এখনো সে বিষয়ে কোন উদ্যোগ নিতে পারিনি। শাবিপ্রবি’র ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৩ সালে প্রতিদিন দেশে প্রায় ৫ হাজার ৬০ টন বর্জ্য তৈরি হতো। বছরে যার পরিমাণ ছিল প্রায় ২৬ লাখ টন। তবে, ২০২৫ সাল নাগাদ প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার টনের বেশি বর্জ্য তৈরি হবে বলে গবেষণায় আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বছরে যার পরিমান দাঁড়াবে প্রায় ৫৫ লাখ টনে। বর্জ্য অপসারণে নাগরিকদের তেমন কোন অংশগ্রহণ নেই বলেও গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। বিপুল জনসংখ্যার অধিকাংশই বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সক্রিয় না হওয়ায় এটি এক ধরনের চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। পাশাপাশি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও সেবা সংস্থাগুলোকে আরো উদ্যোগী হতে হবে বলে গবেষণায় বলা হয়েছে।
দেশের রাজধানী খোদ ঢাকাতেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার করুণ চিত্র দেখা গেছে, যেখানে মাত্র শতকরা ৩৭ ভাগ বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। গত প্রায় এক দশকে দেশে প্লাস্টিক ও প্লাস্টিক জাতীয় পণ্যের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার প্রসঙ্গে কিছুটা ইঙ্গিত করা হয়েছে ওই গবেষণায়। মিউনিসিপ্যাল সলিড ওয়েস্টে (এমএসডব্লিউ) দিন দিন প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে। দেশের নগর ও শিল্প এলাকায় খাবার ও কাগজ জাতীয় বর্জ্যের পরেই সবচেয়ে বেশি বর্জ্য তৈরি হচ্ছে প্লাস্টিক থেকে। এমনকি গ্রাম ও প্রান্তিক এলাকায়ও প্লাস্টিক শপিং ব্যাগ, প্লাস্টিক প্যাকেজিং, পিইটি বোতল ও গৃহস্থালি কাজে প্লাস্টিকের ব্যবহারের কারণে পলি বর্জ্যের পরিমাণ বাড়ছে।
২০০৫ সাল থেকে ২০১৪ সাল এই এক দশকে দেশের নগর এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ বেড়েছে শতকরা প্রায় ২.৬০ ভাগ। এই সময়ে শহর ও পৌরসভা এলাকায় প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদনের হার বেড়েছে যথাক্রমে শতকরা প্রায় ৩.৩০ ও ৩.৭৩ ভাগ। বেশ কয়েকটি সংগঠন ও সংস্থার গবেষণায় দেখা গেছে এসব প্লাস্টিক বর্জ্যের শতকরা প্রায় ৭২ ভাগ পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে না। প্লাস্টিক বর্জ্যের কারণে দেশে বছরে প্রায় ৬১৫০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে বলেও গবেষণায় জানানো হয়েছে।
এছাড়া, দেশের ভেতরে প্রায় ৫ হাজার ছোট-বড় প্লাস্টিক কারখানায় বছরে ৪ হাজার টন প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন হয়। এসব পণ্যের চার ভাগের প্রায় এক ভাগ বর্জ্য হিসেবে থেকে যাচ্ছে, যা পুনরায় ব্যবহার হচ্ছে না। উৎপাদিত বর্জ্যের শতকার মাত্র ২৮ ভাগ পুনরায় ব্যবহারের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে, এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে প্রক্রিয়াজাত করলে জ্বালানি তেলের বড় যোগান হবে বলেও শাবিপ্রবির গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। এদিকে, এনভায়রন্টমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (এসডো) আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে ঢাকাসহ দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ হু হু করে বাড়ছে।
সংগঠনটির মহাসচিব ড. শাহরিয়ার হোসেন বলেন, গৃহস্থালি কাজে বহুবার ব্যবহার করা যায় এমন প্লাস্টিক পণ্য দীর্ঘদিন থেকে ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আশঙ্কার কারণ হচ্ছে মাত্র এক বার ব্যবহার করা হয় এমন প্লাস্টিক সামগ্রী। সামাজিক অনুষ্ঠান ও খাবারের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব পণ্য। তবে সিঙ্গেল ইউজড প্লাস্টিক পণ্যের কারণে দেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমান বাড়ছে।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের ফলে দেশে ই-বর্জ্যের পরিমাণও বাড়ছে বলে জানান এসডো’র মহাসচিব। শাহরিয়ার হোসেন মানজমিনকে জানান, ই-বর্জ্যের প্রায় শতকরা ৭০ ভাগেই থাকে প্লাস্টিক। প্রচলিত বর্জ্য থেকে আলাদা করে এসব প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় সিটি করপোরেশন ও সেবা সংস্থাগুলো কোন উদ্যোগ নেয়নি। প্রচলিত গৃহস্থালির প্রাকৃতিক বর্জ্যের সঙ্গে ডাম্পিং স্টেশনগুলোতে অপসারণ করার ফলে ক্ষতির মাত্রা আরো বেশি হচ্ছে। পোড়ানোর পর, তা মাটি ও জল ও বাতাসে মিশে থাকছে। প্রভাব ফেলছে মানুষের খাদ্যচক্রেও।
শাহয়িরার হোসেন আরো বলেন, গৃহস্থালি ও বাসাবাড়ির প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ বর্জ্য অর্গানিক। তবে, প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণে কোন আলাদা পদ্ধতি না থাকায় পচনশীল বর্জ্য কোন কাজে আসছে না। সিটি করপোরেশন থেকে লাল, হলুদ ও সবুজ তিন রংয়ের আলাদা চিহ্নিত ক্যানে বর্জ্য সংগ্রহে উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন বলেও মনে করেন তিনি। পাশাপাশি, এসব বর্জ্য ডাম্পিয়ের সময় প্লাস্টিক বর্জ্যকে আলাদা চেম্বারে রেখে অর্গানিক বর্জ্য থেকে সার বা প্রয়োজনীয় কাজে লাগানো সম্ভব বলেও মত তার। তিনি আরো বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জিরো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রসেসের দিকে মনোযোগী হতে হবে। যাতে করে, বর্জ্যের পরিমাণ না বাড়ে, পুনর্ব্যবহার বাড়াতে হবে। এদিকে, প্লাস্টিক বর্জ্য পুনরায় ব্যবহার করে আবারো পণ্য উৎপাদন শুরু করেছে ইনোকা বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার মো. নিয়ামুল কবির মিঠু বলেন, প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে জ্বালানি প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্ভব। সরকারকে এমন উদ্যোগে গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি, যারা প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী পণ্য তৈরি করছে তাদেরও প্রণোদনা দিয়ে সহযোগিতা করতে হবে। তাহলে, দেশে প্লাস্টিক বর্জ্যের জিরো ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টে যাওয়া সম্ভব।

Tuesday, October 15, 2019

একজন মিজানুর রহমান by জিয়া চৌধুরী

প্রতিবাদের আরেক নাম মিজানুর রহমান। সুপেয় পানির দাবিতে ঢাকা ওয়াসা ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে তার অভিনব প্রতিবাদ নজর কেড়েছে সবার। গোটা দেশে এখন তিনি প্রতিবাদের প্রতিচ্ছবি। তবে তার এ প্রতিবাদ নতুন নয়। এক দশক ধরে জুরাইনের মানুষের সুখ-দুখে নানা অধিকার আদায়ে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন তিনি।  কখনো কখনো পরিবারসহ হাজির হয়েছেন মিছিলে-সমাবেশে।
তাই মিজানুর রহমান জুরাইনবাসীর কাছে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। শুধু জুরাইনের সুখ-দুঃখ নয়, বাংলাদেশের নানা সংকট, আন্দোলন-সংগ্রামে হাজির থাকেন মিজান। নিজে একা নন, প্রতিবাদের আওয়াজ তোলেন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে।
মিছিল, মানববন্ধন কিংবা লংমার্চের মতো নানা আয়োজনে স্ত্রী-কন্যাদের নিয়ে মানুষের কথা বলে যাচ্ছেন জুরাইনের মিজানুর রহমান। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন, কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনেও সরব ছিলেন পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই মিজান। সুন্দরবন বাঁচাতে ২০১৭ সালে এক আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে বুক পেতে দেন পুলিশের জল কামানের সামনে। সেবার পুলিশের লাঠিচার্জেরও শিকার হন তিনি। মাটিতে লুটিয়ে পড়া সেই ছবি ছড়িয়ে পড়ে দেশে-বিদেশে। ওই বছর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘মঙ্গাবে’ নামে পরিবেশবাদী সংগঠন ফলাও করে প্রচার করে মিজানুরের অদম্য কীর্তিগাঁথা।
মঙ্গাবে’র সংবাদের পর সুইডেনের বিখ্যাত ম্যাগাজিন ‘রিপাবলিক’ তাকে জলবায়ু গেরিলা যোদ্ধা উপাধি দেয়। মিজানুর রহমানের ছবি ও পরিবেশ নিয়ে তার লড়াইয়ের গল্প ছাপা হয় বিশেষ নিবন্ধ আকারে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে মিজানুর যেন জুরাইনেরই ছেলে, সেখানকার মানুষের সংকট-সম্ভাবনার সঙ্গী, আরেক ভরসার নাম। কয়েক বছর ধরে সেখানে বইমেলা আয়োজন, জলাবদ্ধতা নিরসন, রক্তদান কর্মসূচি কিংবা যে কোন বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাড়না তার। সবশেষ গত ২৩ শে এপ্রিল নিজের এলাকার পানি সমস্যা নিয়ে রাজধানীর ওয়াসা ভবনে প্রতীকী শরবত পান করানোর উদ্যোক্তাও এই মিজান। স্ত্রী শামীমা হাশেম খুকি ও তিন বছরের কন্যা মৃন্ময়ী হাসিনাকে সঙ্গে নিয়ে সেদিন ওয়াসা ভবনে যান তিনি।
সঙ্গে ছিলেন জুরাইনের আরো দুই বাসিন্দা। গতকাল সকালে জুরাইন এলাকায় কথা হয় তার সঙ্গে। সেখানকার কমিশনার রোডের মা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার নামের একটি দোকান থেকে শুরু হয় আলাপ। নিজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময়ে ফিরে যান মিজানুর। ৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার ঠিক আগে আরো নিচু ছিল জুরাইন জনপদ। মূলত বুড়িগঙ্গা তীরের ফসলের জমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় আবাসন। জুরাইনের মানুষজনের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। দেশজুড়ে বন্যা শুরু হয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ডেমরা (ডিএনডি) বাঁধ পেরিয়ে পানি ঢুকে পড়লে সব বানের জলে ভেসে যাবে।
সে সময় প্রথম বুড়িগঙ্গা সেতু বানানোর কাজ শুরু হচ্ছিল। বন্যার পানি রুখতে সেতুর জন্য রাখা বালু থেকে বস্তা ভরে বাঁধটিকে আরো উঁচু করা হয়। মিজানুর রহমানের স্বেচ্ছাসেবী কাজের শুরু ৮৮’র বন্যার সময় থেকে। ছোট-বড় অনেকের সঙ্গে এলাকায় বস্তা জোগাড় করা, বালু ভরা, বস্তাভর্তি ঠেলাগাড়ি ঠেলে বাঁধের কাছে নিয়ে যাওয়া। এটাই ছিল মিজানুর রহমানের জীবনের প্রথম স্বেচ্ছাসেবী কাজ, যে পথে এখনো হাঁটছেন। এক যুগ আগের আরেক স্মৃতিতে ফিরে যান তিনি। রাতের বেলা বাড়ির সামনের সড়কে বন্ধুদের কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ চলছিল তার। এমন সময় ‘ছিনতাইকারী, ছিনতাইকারী, ভাই বাঁচান, বাঁচান’ বলে চিৎকার শুনতে পান। পূর্ব জুরাইন এলাকার আশরাফ মাস্টারের স্কুলের গলির দিকে দৌড়াতে শুরু করেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাউকে খুঁজে পেলেন না। এরপর রাস্তায় ছোপ ছোপ রক্তের দাগ ধরে সামনে এগোন।
একটি বাসার সামনে গিয়ে দেখেন ছিনতাইয়ের শিকার একটি ছেলে কাতরাচ্ছে। ছেলেটার হাত থেকে রক্ত ঝরছে তখনো। মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা তিন হাজার টাকা খোয়া গেছে। টাকার অভাবে হাসপাতালে না গিয়ে তিনি বাসায় চলে আসেন ছেলেটিকে নিয়ে। পরে এক বন্ধুকে সঙ্গে করে আহত ছেলেটিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। ধার করে ওষুধ আর চিকিৎসার জন্য দুই হাজার টাকা পরিশোধ করেন মিজানুর রহমান। এরপর জুরাইনের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার কথা ছড়িয়ে পড়ে গোটা জুরাইনে। তাইতো জুরাইনবাসীর কাছে ‘মিজান ভাই’ যেন এক ভরসার নাম।
মহল্লায় পানি নেই, তাঁর ডাক পড়ে। পাড়ায় ময়লার ভাগাড়ের দুর্গন্ধে প্রাণ যায়, মিজান ভাইয়ের কাছে চলো। কারো আত্মীয়ের জন্য রক্ত মিলছে না? কিংবা মধ্যরাতে কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছে, হাসপাতালে নিতে হবে। ভয় কী। মিজান ভাই আছে না? এলাকায় মাদকবিরোধী আন্দোলনে মিজানুরের অবদানও কম নয়। এ কারণে হামলা-মামলারও শিকার হতে হয়েছিল তাকে। জুরাইনের পানি সমস্যা নিয়েও সোচ্চার মিজানুর রহমান ও তার পরিবার। তিনি বলেন, শুধু আমার বাড়ির পানির সমস্যার জন্য এসব করছি না। জুরাইনের প্রতিটি মানুষের সুপেয় পানি পাবার অধিকার আছে।
আমাদেরকে কেন সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হচ্ছে আমি শুধু বার বার সেই প্রশ্নটি করার চেষ্টা করেছি। আলাপের এক ফাঁকে ২০১২ সালের একটি ভিডিও ফুটেজ দেখান তিনি। পানির সমস্যা নিরসনে সেবার নিজের দুই জমজ কন্যা প্রাপ্যতা ও পূর্ণতাকে নিয়ে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে দাঁড়ান মিজানুর। ওই বছর সাড়ে তিন হাজার মানুষের গণসাক্ষর ও পানির নমুনা ওয়াসাকে দিলেও এত বছরে কোন উদ্যোগ না নেয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন। নিজের পরিবার কখনো এমন কাণ্ডে বাধা দেয় না?  হেসে ফেলেন তিনি। বলেন, আন্দোলনে-প্রতিবাদে পরিবারই আমার অনুপ্রেরণা। স্ত্রী ও তিন কন্যাকে নিয়ে মানুষের কথা বলার চেষ্টা করি। এ লড়াই আমার একার না, আমার পরিবারেরও। আমার কন্যাদেরও আমি এমন শিক্ষাই দিয়েছি।
এবার শোনা যাক এলাকাবাসীর কথা- গাজী আলমগীর কামাল নামে একজন বলেন,  ওয়াসার এমডি তাকে পাগল বলেছেন। আমিও বলছি, জুরাইনের সুখে-দুখে আমরা সব সময় এই পাগল মিজান ভাইকেই চাই। যে পাগল মানুষের অধিকারের দাবিতে সোচ্চার থাকে। তার মতো আরো অনেক পাগল দরকার আমাদের। একটি প্রকাশনা সংস্থায় কর্মরত সাগর ইসলাম বলেন, মিজান ভাইয়ের চাওয়া খুব কম। তিনি শুধু অধিকারগুলো ঠিকঠাক বুঝে নিতে চান। এখানেই যত আপত্তি। এসব করতে গিয়ে নিজের জন্য কিছু করতে পারেননি। বাবা আব্দুস সামাদের নামে থাকা বাড়ির ভাড়া থেকে সংসার চালান। স্ত্রী শামীমা হাশেম খুকি গৃহিনী।
ঘর-সংসার সামলিয়ে স্বামীর সঙ্গেও মানুষের কাতারে দাঁড়ান। সাগর ইসলাম আরো জানান, গাড়িচালক থেকে শুরু করে নানা ধরনের কাজ করেছেন মিজান ভাই। কিন্তু তার নীতির গোঁড়ামির কারণে কোথাও স্থায়ী হতে পারেননি। ২০১০ সালের দিকে মোবাইল রিচার্জের ব্যবসাও শুরু করেন। সেসময় রিচার্জ করার জন্য প্রতি অঙ্কের বিনিময়ে অতিরিক্ত এক টাকা করে নিতেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু মিজান ভাই কখনো তা নেননি। উল্টো অন্য ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়েন। মুঠোফোন কোম্পানির এক ডিলার তার দেড় লাখ টাকা নিয়ে উধাও হয়ে গেলে সে ব্যবসায়ও ইতি টানেন মিজানুর রহমান। মিজানুর রহমানের জন্ম বেড়ে ওঠা রাজধানীর পূর্ব জুরাইনে। সাত ভাই- বোনের মধ্যে তিনি পঞ্চম। উচ্চ মাধ্যমিকের পর ইচ্ছা ছিল চারুকলায় পড়বেন। কিন্তু আর্থিক অনটনে তা আর সম্ভব হয়নি। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রে চলচ্চিত্র নিয়েও কোর্স করেছিলেন।
সেটাও বেশি দূর এগোয়নি। এখন বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। চুল-দাঁড়িতে পাক ধরেছে। এই বয়সেও তরুণদের নিয়ে বইমেলা, রক্তদান কর্মসূচি, জলাবদ্ধতা নিরসনসহ নানা সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছেন। সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন পরিবেশ রক্ষার নানা আন্দোলন-সংগ্রামে। এর মধ্যে ৫০ বারের বেশি সময় রক্ত দিয়েছেন। অন্যদেরও উৎসাহিত করছেন রক্তদানে। রক্ত দিতে গিয়ে কখনো কখনো নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে রোগির ভাড়াটাও দিয়ে এসেছেন। এসবেই আনন্দ খুঁজে পান মিজানুর রহমান। জুরাইনবাসীর প্রিয় ‘মিজান ভাই’ হয়ে থাকতে চান আজীবন। আর সবার জন্য রেখে যেতে চান এক মানবিক পৃথিবী। সুন্দর পৃথিবী।

Wednesday, July 10, 2019

চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে ইয়াবা ব্যবসায় by জিয়া চৌধুরী

অভিভাবকের আশা ছিল ছেলে পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করবে, পরিবারের হাল ধরবে। ছেলেও পড়াশোনা শেষে কিছুদিন চাকরির চেষ্টা করেছে। কিছুদিনের মধ্যে কাজেও যুক্ত হয়েছে। তবে, পরিবার জানতো না কী কাজ করছে তাদের ছেলে? বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক সম্পন্ন করেন মো. জুবায়ের আহম্মেদ (২৮)। পড়াশোনা শেষ করে অন্য সবার মতো বেশিদিন চাকরি কিংবা ব্যবসার পেছনে ছোটেননি। ভিন্ন পথে হেঁটেছেন এই তরুণ। যুক্ত হন  মরণনেশা ইয়াবার বেচাকেনার কারবারে। অল্পদিনে আয় করতে থাকেন কাড়িকাড়ি টাকা।
নিজেই গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
তবে শেষ রক্ষা হয়নি জুবায়ের আহম্মেদের। সিন্ডিকেটর পাঁচ সদস্যসহ ধরা পড়েছেন র‌্যাবের জালে। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে এসেছে জুবায়েরের অন্ধকার জগতের চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। সূত্র জানায়, গাজীপুরের টঙ্গী ও আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ইয়াবা কারবারে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন জুবায়ের। জুবায়েরকে প্রশ্রয় দিতেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তি। তবে তাকে আইনের আওতায় আনতে কৌশলগত কারণে নাম প্রকাশ করতে চায় না র‌্যাব। চক্রটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে প্রতিনিয়ত নতুন কৌশলে ইয়াবা বহন করতো। কখনো যাত্রীবাহী বাসে, কখনো মৌসুমী শাক-সবজি বহনকারী ট্রাকে করে, কখনো ধান, ভুট্টা বহনকারী গাড়িতে করে, কখনো ব্যক্তিগত গাড়িতে করে ইয়াবার চালান আনতো তারা। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে ইয়াবার চালান সংগ্রহ করে গাজীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতো চক্রটি।
গ্রেপ্তার হওয়া জুবায়েরের বরাত দিয়ে র‌্যাব জানায়, মাদকের চালানগুলো অভিনব কায়দায় পায়ুপথে ও পেটের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে টেকনাফ থেকে ঢাকায় নিয়ে আসা হতো। ৫০টি ইয়াবার ছোট-ছোট প্যাকেটে নারকেল তেল মেখে পিচ্ছিল করে বিশেষ কৌশলে পায়ুপথ দিয়ে পেটের ভেতরে প্রবেশ করানো হতো। এই চক্রের কাছে টেকনাফের অন্যতম শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী জয়নাল ইয়াবা সরবরাহ করতো বলেও র‌্যাবের কাছে জানিয়েছে জুবায়ের। চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন স্পটে খুচরা বিক্রিসহ পাইকারি চালানেও দেশের বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পৌঁছে দিতো। গত ১০ জুন রাজধানীর উত্তরা পশ্চিম থানার আব্দুল্লাহপুর এলাকা থেকে জুবায়ের আহম্মেদসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১। এসময় তাদের কাছ থেকে ৪ হাজার পিস ইয়াবা ও সাতটি মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। চক্রের অন্য সদস্যরা হলেন- সাইদুল ইসলাম (২৩), মিঠু (২৮), আনোয়ার (৩২), আসাদ হোসেন (৩৫), খায়রুল ইসলাম (২৮)। এসব বিষয়ে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম মানবজমিনকে বলেন, এই ইয়াবা চক্রের অন্যদের ধরতেও অভিযান চালানো হচ্ছে। ইয়াবা কারবারে যুক্তরা যত প্রভাবশালীই হোক না কেন তাদের কাউকেই ছাড় দেয়া হবে না। র‌্যাব সূত্র জানায়, জুবায়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন।
ইয়াবার নেশার টাকা জোগাড় করতে নিজেই নেমে পড়েন ইয়াবা ব্যবসায়। এক পর্যায়ে নিজেই তৈরি করেন ইয়াবা সিন্ডিকেট। ইয়াবা বিক্রির মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বিভিন্ন গ্রুপ ও সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ করতেন।

Sunday, June 23, 2019

মানবপাচার আইন: নিষ্পত্তির হার খুবই কম, মামলা লড়তে অনীহা বাদীর by জিয়া চৌধুরী

মিশরে যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে ২০১২ সালে দালাল চক্রের কাছে সর্বস্ব হারান নওগাঁর বাবু। পাচারের শিকার হন আরো তিনজন। পরে ওই বছরের মে মাসে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দেশের ইতিহাসে প্রথম  মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা দায়ের করা হয়। ২০১২ সালের ৭ই মে নওগাঁ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলার পর সাত বছর পেরিয়ে গেলেও নিষ্পত্তি হয়নি মামলাটির। দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষা করে বিচার না পাওয়ায় এখন আর মামলার কোন খোঁজ রাখছেন না বাদী। মানবপাচার আইনের প্রথম মামলার প্রধান ও দ্বিতীয় আসামি শুরুর দিকে একবার গ্রেপ্তার হলেও এখন জামিনে রয়েছেন। মামলার নিষ্পত্তিতে তেমন কোন অগ্রগতি নেই বলে আদালত সূত্রেও জানা গেছে। মানব পাচারের শিকার হয়ে বেশিরভাগ মানুষ আর মামলার বিড়ম্বনায় যেতে চান না।
আবার মামলা করার পর বিচারের দীর্ঘসূত্রতায় অনেক ক্ষেত্রে বাদীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।  কোন কোন ক্ষেত্রে পাচারকারীদের সঙ্গে পাচারের শিকার ব্যক্তিদের আপস-মীমাংসাও হয়। ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন প্রণয়নের পর থেকে এই আইনে দায়ের হওয়া মামলার নিষ্পত্তির হার খুবই কম। বিচার না হওয়ায় গ্রেপ্তারের কিছু দিন পর জামিনে বের হয়ে আবারো পাচার কাজে জড়িয়ে পড়ে আসামিরা। দেশের বেশ কয়েকটি জেলার মানবপাচার আইনের মামলা পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মানব পাচার আইন কার্যকরের পর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত সারা দেশে ৫ হাজার ৭১৬টি মামলা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের মানব পাচার মনিটিরিং সেল সূত্রে জানা গেছে। যদিও চলতি বছরের মে মাস নাগাদ মামলার সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে, এর মধ্যে মাত্র ২৪৭টি মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। আদালত স্থানান্তর করা হয়েছে ১ হাজার ৩৭৫টি মামলার। এখনো বিচারাধানীন আছে প্রায় ৪ হাজার ৯৪টি মামলা। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচার কাজ ঝুলে আছে ১৫৫টি মামলায়। আর অন্তত সাতটি মামলায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে বিচার কাজ স্থগিত রেখেছে বিচারিক আদালত। মামলা পরিচালনার জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন না হওয়া, আসামিদের ধরতে পুলিশের অনীহা, চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে না পারা, সাক্ষীরা হাজির না হওয়াসহ নানা জটিলতায় মানবপাচার আইনের মামলার নিষ্পত্তি হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এর মধ্যে, মামলা করার পর অনেক দিন ধরে মামলা লড়তে গিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন বাদীরা। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে মামলা করা অন্তত দশ জন বাদীর সঙ্গে কথোপকথনে জানা গেছে তারা এখন আর মামলার খোঁজ-খবর রাখছেন না। শুরুর দিকে পাচারকারীদের বিচার চাইলেও আসামিরা জামিনে বের হয়ে হুমকি-ধামকি দিলে অনেকে আর আদালতপাড়ায় যাওয়ার সাহস পান না। মানব পাচার আইনে সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৬৫৩টি মামলা হয়েছে ঢাকা জেলায়। দুঃখজনকভাবে এত সব মামলার মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৫টি। ৮৪৩টি মামলায় আদালত স্থানান্তর করা হয়েছে, বিচারধীন আছে ৮০৫টি মামলা। ঢাকা জেলায় দায়ের হওয়া মানব পাচার আইনের মামলাগুলোর মধ্যে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৭৬। ঢাকা জেলার পর যশোরে মামলা দায়েরের হয়েছে সবচেয়ে বেশি। যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মোট ৬১৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ১৮টি মামলা। আদালত বদল হয়েছে ২০৭টি মামলার, বিচারাধাীন আছে ৩৭৮টি মামলা। পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে ৩৬টি মামলা। মামলার সংখ্যার দিক থেকে যশোরের পরই আছে কক্সবাজার জেলা। সমুদ্র উপকূলের এই জেলায় মামলা হয়েছে মোট ৩৯৬টি, এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে একটির। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসান মানবজমিনকে বলেন, পাচারের শিকার হওয়া অনেক ব্যক্তি মামলা করতে না চাইলে সংখ্যার হিসেবে মামলা কম নয়। মানবপাচার আইনটি চমৎকার একটি আইন। তদন্ত, শাস্তিসহ বেশ কিছু বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়া আছে। তবে আইন অনুযায়ী দেশের সাতটি বিভাগে মানব পাচারের মামলার বিচারের জন্য আলাদা সাতটি ট্রাইবুন্যাল গঠনের কথা থাকলেও সাত বছরেও কোন ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়নি। এছাড়া, মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ার বেশ কিছু দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে বের হয়ে যায় আসামিরা। পাচারের শিকার ব্যক্তিরা এমনিতে আর্থিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে হেয় হয়। উল্টো পাচারাকারীরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে পাচারের শিকার ব্যক্তিরা মামলা লড়তে চায় না, আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। শরিফুল হাসান বলেন, সাত বিভাগীয় শহরে সম্ভব না হলেও যেসব এলাকায় মামলার সংখ্যা বেশি সেখানে ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য আমরা মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে অনুরোধ করেছিলাম। এছাড়া, ন্যাশনাল প্ল্যান অব অ্যাকশন অনুযায়ী মানব পাচার বিষয়ে কার্যকরী উদ্যোগ না নেয়ায় বর্হিবিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দ্রুত মানব পাচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করার জোর দাবি জানান ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান। বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার প্রোগ্রাম অফিসার অ্যাডভোকেট সালমা সুলতানা মানবজমিনকে বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকে আদালত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। অনেক মামলায় দুই, তিন বছর পর সাক্ষীদের তলব করলে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে অনেক সময় পুলিশও মানব পাচার মামলার আসামিদের ধরতে অনীহা দেখায়। এমন প্রেক্ষাপটে পাচারের শিকার হওয়া ব্যক্তি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আবার সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতায়ও ভোগেন। এক পর্যায়ে তারা মামলা চালাতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাচারকারীদের সঙ্গে আপস করে ফেলেন। তবে, পাচারকারীদের দ্রুত বিচার না করা ও সাজা না হওয়ায় মামলায় তেমন কোন ফল আসছে না বলেও জানান এই মানবাধিকার কর্মী।

Saturday, June 22, 2019

অভিনব কায়দায় যৌন হয়রানি by জিয়া চৌধুরী

বেসরকারি এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর বাসা রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকায়। বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতে সিএনজি অটোরিকশা ব্যবহার করেন তিনি। এজন্য বাসা থেকে খিলগাঁও কমিউনিটি সেন্টার এলাকা পর্যন্ত রিকশায় আসতে হয় তাকে। সেখান থেকে সিএনজি অটোরিকশায় করে মহাখালীর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যান তিনি। মাঝে-মধ্যে সিএনজি অটোরিকশা পেতে দেরি হলে কমিউনিটি সেন্টার এলাকায় অপেক্ষা করতে হয়। গত মে মাসে অটোরিকশার জন্য অপেক্ষমাণ থাকা অবস্থায় বিব্রতকর এক ঘটনার শিকার হন তিনি। রাস্তায় যথেষ্ট জায়গা থাকা সত্তেও সাদা রংয়ের একটি প্রাইভেট কার তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষার্থী কিছুটা গাড়ির পাশ থেকে সরে গেলেও আরো চাপিয়ে দেয়া হয় প্রাইভেট কার।
গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে ওই শিক্ষার্থীকে ছোঁয়ার চেষ্টা করে গাড়িচালক। এমন সময় একটি সিএনজি অটোরিকশা পাওয়ায় দ্রুত চলে যান ওই শিক্ষার্থী। ঘটনার শেষ এখানে নয়। সাদা রংয়ের ব্যক্তিগত গাড়িটির চালক এরপরও আরো দুইদিন এমন ঘটনা ঘটান। সবশেষ গত ১৩ই মে খিলগাঁও কমিউনিটি সেন্টারের সামনের এলাকায় ময়লার ভাগাড়ের পাশে সিএনজি অটোরিকশার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সেদিনও সাদা রংয়ের প্রাইভেট কারটি তাকে ফলো করে পাশে গিয়ে থামে। রাস্তার পাশের ময়লার ট্যাংকের সাথে তরুণীকে চাপিয়ে গাড়ি দাঁড় করায় এবং ড্রাইভিং সিটে থাকা চালক তরুণীর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে যৌন হয়রানির চেষ্টা করে। এরপর ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা লোকটি গাড়ির স্টার্ট বন্ধ না করে গাড়ি থেকে নেমে তরুণীকে বিভিন্ন ধরনের অশ্লীল কথা বলে। ওই শিক্ষার্থী তখন চিৎকার শুরু করলে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে পালিয়ে যায় গাড়িচালক। তবে সেদিন কৌশলে গাড়ির নম্বরপ্লেটের ছবি তুলে রাখেন ওই শিক্ষার্থী। পরে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে যৌন পীড়ন করার অপরাধে খিলগাঁও থানায় একটি মামলা করেন মেয়েটির বাবা। মামলার এজাহারে দেয়া গাড়িটির রেজিস্ট্রেশন নম্বরের (ঢাকা মেট্রো-গ-২৫-৮২৫৫) সূত্র ধরে কাজ শুরু করে খিলগাঁও থানা পুলিশ। মামলা দায়েরের ঠিক এক মাস পর গাড়ির নম্বরের সূত্র ধরে আব্দুস সাত্তার (৪০) নামের ওই গাড়িচালককে শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, আব্দুস সাত্তার এক চিকিৎসকের ব্যক্তিগত গাড়িচালক ছিলেন। তাকে আনা-নেয়ার ফাঁকে রাইড শেয়ারিং অ্যাপেও যাত্রী তুলতো সে। এর ফাঁকে সড়কের ধারে গাড়ি পার্ক করতো। যানবাহনের অপেক্ষায় থাকা নারীদের টার্গেট করে থামানো হতো গাড়ি। সুযোগ বুঝে তাদের গায়ে হাত দেয়ার চেষ্টা করতো গাড়িচালক আব্দুস সাত্তার। তবে অবস্থা বেগতিক দেখলেই গাড়ি স্টার্ট করে দ্রুত পালিয়ে যেত। এর মধ্যে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জনকে হয়রানি করার কথা পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছে আব্দুস সাত্তার। তার গ্রামের বাড়ি ভোলার লালমোহনে। এসব বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) খিলগাঁও জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার জাহিদুল ইসলাম সোহাগ মানবজমিনকে জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ওই তরুণীর বাবার অভিযোগের প্রেক্ষিতে গাড়ির নম্বরের সূত্র ধরে আমরা বিআরটিএ-তে গাড়ির মালিকের ঠিকানা জানতে চেয়ে চিঠি পাঠাই। তাদের দেয়া তথ্যানুযায়ী গাড়ির মালিকের সাথে যোগাযোগ করে গত ১৭ই জুন গাড়ির মালিক এবং তার ড্রাইভারকে থানায় হাজির করা হয়। তাৎক্ষণিক অপরাধীকে শনাক্তকরণের জন্য ভিকটিম ঐ তরুণীকে ডাকা হয়। পরে উপস্থিত ৭/৮ জনের মধ্য থেকে ওই গাড়িচালককে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করে সে। গাড়ির চালক আব্দুস সাত্তার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে বলেও জানিয়েছেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, আমরা জানতে পারি এর আগেও আরো অনেকের সাথে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটায় সে। তবে, সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করে কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। এসব ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে অভিযোগ গেলে অপরাধ প্রবণতা আরো কমে আসবে বলেও জানান তিনি। হয়রানির শিকার তরুণীর বাবা ও মামলার বাদী জানান, আমার মেয়ে যে ঘটনার শিকার হয়েছে তা যেন আর কারো সাথে না ঘটে। এজন্য আমি দ্রুত থানায় লিখিত অভিযোগ দেই। তবে আমার মেয়ে গাড়ির নম্বরপ্লেটের ছবি তুলে রাখায় তাকে ধরা সম্ভব হয়েছে। এরকম সব মেয়েদের নিজেদের রক্ষায় এগিয়ে আসারও অনুরোধ করেন তরুণীর বাবা।

Tuesday, June 18, 2019

আদালতে মোয়াজ্জেমের ৩০ মিনিট- ‘গণপিটুনির ভয়ে পলাতক ছিলেন’ by জিয়া চৌধুরী

ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়েছেন আদালত। থানা হাজত, প্রিজন ভ্যান ও আদালতের কাঠগড়া ঘুরে তার ঠিকানা এখন ঢাকার কেরাণীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগার। মাদরাসা ছাত্রী নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্ন ও তা ভিডিও করে ছড়িয়ে দেয়ার অভিযোগে গত রবিবার গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে তাকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালতে হাজির করা হয়। আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন আবেদন করলেও প্রায় ৩০ মিনিটের দীর্ঘ শুনানি শেষে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামস জগলুল হোসেন। একই সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলায় আগামী ৩০শে জুন চার্জ গঠনের জন্য তারিখ ধার্য করেন বিচারক। ওই মামলায় গত ২৭শে মে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়ার ২০ দিন পর গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করা হয় মোয়াজ্জেমকে।
এর আগে রবিবার দুপুরে রাজধানীর হাইকোর্টের কদম ফোয়ারা চত্বর থেকে গ্রেপ্তারের পর তাকে নেয়া হয় শাহবাগ থানায়। রবিবার রাতভর থানা হাজতে থাকার পর সোমবার সকালে মোয়াজ্জেম হোসেনকে ফেনীর জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দুপুর সাড়ে বারোটার কিছু সময় পর শাহবাগ থানা থেকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।
রাখা হয় ঢাকা মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতের গারদখানায়। মোয়াজ্জেম হোসেনকে আদালতে হাজির করার আগ থেকে বাড়ানো হয় মহানগর দায়রা জজ আদালত চত্বর এলাকার নিরাপত্তা। একই সাথে বিতর্কিত ওসি মোয়াজ্জেমকে দেখতে আসা আইনজীবী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ও সামলাতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। মহানগর দায়রা জজ আদালত ভবনে স্থাপিত সাইবার ট্রাইব্যুনালকে ঘিরে বাড়তে থাকে মানুষের আনাগোনা। দুপুরের বিরতির পর ঘড়ির কাটায় দুটো বাজতেই এজলাসে উঠেন বিচারক। দুপুর দুইটা থেকে দুইটা ২০ মিনিট পর্যন্ত চলে ট্রাইব্যুনালের নিয়মিত মামলার কার্যক্রম। ঠিক দুইটা ২০ মিনিটে আদালতের বারান্দা দিয়ে কাঠগড়ায় হাজির করা হয় সোনাগাজী থানার সাবেক ওসিকে।  চোখে রোদ চশমা পরে এজলাস কক্ষে ঢুকলেও কাঠগড়ার ওঠার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা খুলে ফেলেন মোয়াজ্জেম হোসেন।
এসময় তার হাতে হাতকড়া না পরানোয় হট্টগোল শুরু হয় আইনজীবীদের মধ্যে। একজন আইনজীবী বলে ওঠেন ‘আইন সবার জন্য সমান, অসুস্থ রোগিকে হাতকড়া পরতে হলে ওসিকেও পরাতে হবে’। এমন বাকবিতণ্ডার মধ্যে বিচারক সবাইকে শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন। এর পরপরই শুরু হয় শুনানির কার্যক্রম। শুরুতে মামলার বাদী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন আদালতকে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম আইনের সেবক হয়েও আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাননি। আদালত যেদিন তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন তারপর তিনি সরাসরি আপনার আদালতে হাজির হতে পারতেন। নিজেকে নির্দোষ দাবি করতে পারতেন। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেম তা না করে পালিয়েছিলেন। সৈয়দ সায়েদুল হক আদালতের কাছে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম যে ঘটনা ঘটিয়েছেন তা পুলিশ বাহিনীর জন্য কলঙ্ক। বিশ দিন ধরে পালিয়ে থেকে তিনি আরো দুইটি অপরাধ করেছেন। ওসি মোয়াজ্জেম নিজে আদালতে হাজির হলে ব্যক্তি হিসেবে এবং পুলিশ বাহিনী একটি সংগঠন হিসেবে সংশোধনের সুযোগ পেত। আমরা ভেবেছিলাম তিনি শুরুতেই সারেন্ডার করবেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর আবেদন করেন সাইবার ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নজরুল ইসলাম শামীম।
অন্যদিকে, আসামি মোয়াজ্জেমের জামিন চান তাঁর আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ। মোয়াজ্জেমের পক্ষে আইনজীবী ফারুক আহম্মেদ আদালতকে বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তিনি পলাতক ছিলেন না, পত্রিকার মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর জানতে পেরে আইনের আশ্রয় নেয়ার জন্যই তাঁর মক্কেল হাইকোর্টে গিয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশে ছিলেন, পালিয়ে যাননি। গত রবিবার হাইকোর্ট বিভাগে ওসি মোয়াজ্জেমের আগাম জামিন শুনানি হওয়ার কথা ছিল। তবে আইনের আশ্রয় নেয়ার সুযোগ না দিয়ে পুলিশ তাঁকে হাইকোর্ট চত্বর থেকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় বলে আদালতে জানান মোয়াজ্জেম হোসেনের আইনজীবী। ফারুক আহম্মেদ আদালতের কাছে বলেন, আপনারা সবাই বলছেন তিনি পলাতক ছিলেন, আসলে ওসি মোয়াজ্জেম পলাতক ছিলেন না। এ সময় আদালত আইনজীবীকে ‘সবাই’ বলতে কি বোঝাচ্ছেন তা জানতে চান।
মোয়াজ্জেমের আইনজীবী বলেন, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের ভয়ে ওসি মোয়াজ্জেম আত্মগোপনে ছিলেন। রাস্তায় বের হলে নানান লোকজন নানা মন্তব্য করছিল। মূলত নিরাপত্তাহীনতায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। এ সময় আদালত বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য হয়ে নিরাপত্তাহীনতা! আদালত হচ্ছে আপনার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। আপনি আদালতে আসলেন না কেন? পরে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের আইনজীবী বলেন, আমার মক্কেল রিলিফ নেয়ার জন্য একটু সময় নিয়েছিলেন। জনগণ অনেক ফেরোসাস (নৃশংস) হয়ে উঠেছিল বলে উল্লেখ করে ওসি মোয়াজ্জেমের আইনজীবী বলেন, আমরা অনেক সময় দেখেছি চুরি না করেও অনেক মানুষকে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেক ছিনতাইকারীকে মেরে ফেলা হয়েছে। এমন উত্তেজিত মানুষজনের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় তিনি আত্মগোপনে ছিলেন।
এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নুসরাতের বক্তব্য ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন ছড়াননি বলেও আদালতকে জানান আইনজীবী। আদালত জিজ্ঞেস করেন, আপনি ধারণ করেছেন কি না, ইয়েস অর নো? আইনজীবী কোন উত্তর না দেয়ায় আদালত বলেন, ইউ আর টুইস্টিং। তবে এক সময় আইনজীবী বলেন, অনেক সময় বাদী এজাহারে উল্লেখ করা নিজের বক্তব্য থেকে সরে আসেন। এরকম সরে আসার প্রবণতা থেকে আগাম সতর্কতা হিসেবে বক্তব্য ধারণ করা হয়। আাদালত উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে সাবেক ওসি মোয়াজ্জেমের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এই মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আগামী ৩০শে জুন নতুন দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রিজন ভ্যানে করে কারাগারে পাঠানো হয়। আদালতের আনা-নেয়ার মাঝের সময়ে আলোকচিত্রীদের আড়াল হবার চেষ্টা করেন ওসি মোয়াজ্জেম। অনেক পুলিশ সদস্যও হাত উঁচিয়ে ছবি তোলায় বাধা হয়ে দাঁড়ান।
৬ই এপ্রিল নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। ১০ই এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান নুসরাত।  এর ১০ দিন আগে নুসরাত মাদরাসা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগ জানাতে সোনাগাজী থানায় যান নুসরাত। থানার তখনকার ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন নুসরাতকে আপত্তিকর প্রশ্ন করে বিব্রত করেন এবং তা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ওই ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হলে আদালতের নির্দেশে সেটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। পিবিআই গত ২৭শে মে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিলে ওই দিনই ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনাল।

Monday, June 3, 2019

মডেল অভিনেত্রীদের টার্গেট, ফেসবুক আইডি হ্যাক করে টাকা আদায় by জিয়া চৌধুরী

উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোলেও আর বেশিদূর পড়াশোনা করা হয়নি সামির আল মাসুদের। তথ্যপ্রযুক্তিতে আগ্রহী হয়ে যোগ দেন হ্যাকিং গ্রুপে। কাজ করতেন অ্যানোনিমাস হ্যাকিং গ্রুপের সদস্য হয়ে। জনপ্রিয় তরুণ মডেল-অভিনেত্রী ও উঠতি তারকাদের ফেসবুক আইডি নিজের দখলে নিতেন অনায়াসে। আইডি দখলে নিয়ে ঢুকে পড়তেন তারকাদের ফেসবুক ইনবক্সে, হুমকি দিতেন আপত্তিকর ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেয়ার। আইডি ফিরিয়ে দিতে দাবি করতেন মোটা অংকের টাকাও। অনেক সময় টাকা পেলেও এসব তারকাদের আইডি ফিরিয়ে দিতেন না ২৩ বছরের হ্যাকার সামির। সবশেষ তার আক্রমণের শিকার হন মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০১৮-এর প্রথম রানারআপ নিশাত নাওয়ার সালওয়া।
ফেসবুক আইডি দখলে নেয়ার পর টাকাও দাবি করেন। সামির আল মাসুদকে দশ হাজার টাকা দেয়ার পরও নিজের আইডি ফেরত পাননি মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের প্রথম রানারআপ।
পরে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের শরণাপন্ন হন নিশাত নাওয়ার সালওয়া। রমনা থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় বুধবার ঢাকার খিলক্ষেতের একটি বাসা থেকে সামির আল মাসুদকে গ্রেপ্তার করে সাইবার ক্রাইম বিভাগ। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তারকাদের ফেসবুক আইডি নিয়ন্ত্রণে নেয়ার বিষয়ে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য দিয়েছে হ্যাকার সামির আল মাসুদ। সিটিটিসি’র সাইবার ক্রাইম বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইশতিয়াক আহমেদ মানবজমিনকে জানান, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেনের সূত্র ধরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জনপ্রিয় ও উঠতি নারী মডেলদের টার্গেট করতো হ্যাকার সামির আল মাসুদ। ফেসবুকে তারকাদের বন্ধু হয়ে তাদের আইডি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিত। পরে টাকা দাবি করে হুমকি দিত। তবে, সাইবার ক্রাইম বিভাগ নিয়মিত এসব হ্যাকারদের ওপর নজর রাখছে।
অ্যানোনিমাস, ডন’স টিম ও সাইবার শট নামে কয়েকটি হ্যাকিং গ্রুপ রয়েছে। এসব গ্রুপের সদস্যরা কোন ধরনের অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়লে আমরা তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসবো। সাইবার ক্রাইম বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় অন্তত ৩০ জন অভিনেত্রী ও মডেলের ফেসবুক আইডি নিয়ন্ত্রণে নেয় সামির আল মাসুদ। এদের অনেকে টাকা দিয়ে নিজেদের আইডি ফেরত পান বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশকে জানিয়েছে এই হ্যাকার। তবে, টাকা দিলেও অনেক মডেল-অভিনেত্রী তাদের ফেসবুক আইডি ফেরত পেতেন না। সূত্র জানায়, জনপ্রিয় তরুণ চলচ্চিত্র অভিনেত্রী পূজা চেরী, টিভি অভিনেত্রী শারলিনা হোসেন, শাহতাজ মুনিরা হাশেম, উপস্থাপিকা ও মডেল মারিয়া নূর এবং এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেত্রী তমালিকা কর্মকারের ফেসবুক আইডিও নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল হ্যাকার সামির আল মাসুদ। পরে টাকা দাবি করে এসব মডেল-অভিনেত্রীদের হুমকি দেয়া হয়। টাকা পাওয়ার পর এদের অনেকের আইডি ফিরিয়ে দিতেন হ্যাকার সামির। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ৩০ হাজার টাকার বিনিময়ে আইডি ফেরত দেয়া হতো। কখনো কখনো এর বেশি টাকায়ও রফাদফা হতো। সাইবার ক্রাইম বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ফেসবুক আইডি হ্যাক করা সামির আল মাসুদ হ্যাকিং গ্রুপ অ্যানোনিমাসের সদস্য।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়লেও নিজেকে পরিচয় দেন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে। ফেসবুকে বেশি সময় বিচরণ করায় এক সময় ফেসবুক আইডি হ্যাকিংয়ের দিকে ঝুঁকে পড়েন সামির আল মাসুদ। শুরুর দিকে বেছে বেছে তরুণ নারী মডেল অভিনেত্রীদের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠান। বন্ধুত্বের আবেদনে সাড়া দেয়ার পর ‘টু ফ্যাক্টর অথোরিটি’ ও ‘ট্রাস্টেট কন্টাক্ট’র মাধ্যমে মডেল-অভিনেত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্য জেনে নিতো সামির আল মাসুদ। এরপর শুরু হতো হ্যাকার সামিরের দ্বিতীয় ধাপের কাজ। এই ধাপে, পিক্সআর্ট নামে সফটওয়্যারের মাধ্যমে মডেল-অভিনেত্রীদের আইডির নামে নকল জাতীয় পরিচয়পত্র(এনআইডি) তৈরি করা হতো। খোলা হতো জিমেইল অ্যাকাউন্টও। নকল এনআইডি তৈরির পর সাবমিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্ট গেট অপশনে গিয়ে তারকাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিজের দখলে নিয়ে নিতো। এরপর ঢুকে পড়তো ফেসবুক ইনবক্সে, ব্যক্তিগত স্পর্শকতার তথ্য ও ছবি ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখানো হতো।
ফেসবুক আইডির ফ্যান, ফলোয়ার সংখ্যা ও তারকার জনপ্রিয়তা বুঝে চাওয়া হতো অর্থ। সামির আল মাসুদ হ্যাকিংয়ের অন্য বিষয়ে পারদর্শী হলেও তার নেশা ছিল নারী তারকাদের আইডি দখলে নেয়া। কোন জনপ্রিয় অভিনেত্রীর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দখলে নিতে পারলে ‘অ্যানোনিমাস’ হ্যাকিং গ্রুপে পোস্ট দিয়ে উদযাপন করা হতো। সাইবার ক্রাইম সূত্রে জানা গেছে, তারকাদের আইডি হ্যাক করার পর জনপ্রিয়তা বুঝে গ্রুপের পক্ষ থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত রিওয়ার্ড মানি পেত হ্যাকার সামির। তারকাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়া অর্থ তো ছিলই। সাইবার ক্রাইম বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার ইশতিয়াক আহমেদ মানবজমিনকে আরো জানান, মূলত অসাবধানতাবশত ও সচেতনতার অভাবে হ্যাকিংয়ের শিকার হন অনেক মডেল-অভিনেত্রী। নিজেদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নামে ফেসবুক অ্যাকউন্ট না খোলায় এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হয় তাদের। এছাড়া, অপরিচিত যে কাউকে ফ্রেন্ডলিস্টে যুক্ত করেও বিপদে পড়তে হয় অনেককে। এসব ক্ষেত্রে তারকাদের আরো সতর্ক হওয়ার পরামর্শও দেন পুলিশের এই কর্মকর্তা।
তিনি বলেন, এনআইডি’র নামেই ফেসবুক ইউজার নেম থাকলে খুব বেশি ঝামেলায় পড়তে হয় না। এছাড়া, হুট করে কাউকে না জেনে বন্ধু তালিকায়ও নেয়াটা ঠিক হবে না। এদিকে, রমনা থানার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে হ্যাকার সামির আল মাসুদকে। সাইবার ক্রাইম বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ২রা ফেব্রুয়ারি কলাবাগান থানার আরেকটি মামলায় প্রথমে সাইবার মনিটরিং টিমের হাতে গ্রেপ্তার হয় হ্যাকার সামির। প্রায় দেড় মাস কারাগারে থাকার পর গত ২৫ মার্চ জামিনে বের হয়ে আবারো নারী মডেল-অভিনেত্রীদের টার্গেট করা শুরু করে। সবশেষ রমনা থানায় গত ২রা মে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ প্রতিযোগিতার প্রথম রানারআপ নিশাত নাওয়ার সালওয়ারের দায়ের করা আরেকটি মামলায় বুধবার তাকে গ্রেপ্তার করে সিটিটিসির সাইবার ক্রাইম বিভাগ।

শ্রীলঙ্কা থেকে ফিরতে পারেননি মশিউল, জায়ানের পরিবারে ঈদ নেই by জিয়া চৌধুরী

ক’দিন বাদে ঈদুল ফিতর। ঘরে ঘরে সবাই মাতবে ঈদের আনন্দে। কিন্তু এবার অন্যরকম এক ঈদ এসেছে শ্রীলঙ্কায় জঙ্গি হামলায় নিহত শিশু জায়ান চৌধুরীর পরিবারে। ইস্টার সানডের দিন  গত ২১শে এপ্রিল শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে ভয়াবহ বোমা হামলায় প্রাণ হারায় আট বছরের ছোট্ট জায়ান। তার বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও বোমা হামলায় গুরুতর আহত হন।
তিনি এখনও সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাতি জায়ান চৌধুরী বাবা-মা আর দেড় বছরের ছোট ভাইকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিল শ্রীলঙ্কায়। হোটেলের কক্ষে থাকায় হামলা থেকে বেঁচে যান জায়ানের মা শেখ আমেনা সুলতানা এবং জায়ানের ছোট ভাই জোহান চৌধুরী।
হামলার তিন দিন পর ২৪শে এপ্রিল জায়ানের মরদেহ বাংলাদেশে আনা হয়।
বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি মাঠে জানাজা শেষে তাকে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। ১৫ই আগস্টের শহীদদের কবরের পাশে জায়গা হয় ছোট্ট জায়ানের। শেখ ফজলুল করিম সেলিমের জামাতা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স তখন শ্রীলঙ্কায় চিকিৎসাধীন।
এমনকি জায়ানের মাও সেদিন তার ছেলেকে শেষবারের মতো বিদায় দিতে বাংলাদেশে আসতে পারেননি। এমন ট্র্যাজেডির পর কিছুতেই স্বাভাবিক হতে পারছে না জায়ানের পরিবার। গতকাল বনানীতে জায়ানের নানার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় নীরব-নিথর পরিবেশ। এই বাড়িটিতেই বেশিরভাগ সময় কাটাতো জায়ান। সুযোগ পেলেই নানার কোলে চড়তো। শেখ ফজলুল করিম সেলিমও সময় দিতেন তার প্রিয় নাতিকে। তবে ঈদ কিংবা বিশ্বকাপ আমেজ কোন কিছুই যেন এবার বাড়িটিকে ছুঁতে পারেনি। জায়ানের পছন্দের খেলা ছিল ক্রিকেট। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের খেলা থাকলে সে উন্মাদনা ছুঁয়ে যেত জায়ানকেও। তবে এবারের ক্রিকেট বিশ্বকাপ জায়ান চৌধুরীর পরিবারের কাছে বেদনার অন্য নাম।
ঘর আলো করে রাখা পুত্র জায়ান অন্য পারে আর তার বাবা এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জায়ানের পছন্দের খেলা ছিল ক্রিকেট, নানা বাড়িতে থাকলে বনানী চেয়ারম্যান বাড়ি মাঠে খেলত সে। বাড়িটির একজন নিরাপত্তাকর্মী জানান, জায়ান আসলে বাড়িটিতে অন্যরকম আনন্দ বয়ে যেত। মাঠে ক্রিকেট খেলতো, হই-হুল্লোড় লেগে যেত। ঈদেও সব আত্মীয়-স্বজনদের ভিড়ে জায়ান আলাদা জায়গা করে নিত। তবে, এবার পরিস্থিতি আসলেই ভিন্ন। জায়ান চৌধুরীর বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্স এখনো সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার একটি পা এখনো সেরে উঠেনি। তবে, মশিউল হক চৌধুরী আগের চেয়ে অনেক সুস্থ আছেন বলে মানবজমিনকে জানিয়েছেন তাদের পরিবারের একজন সদস্য। স্বামীর দেখভাল করতে দেড় বছরের সন্তান জোহান চৌধুরীকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে আছেন আমেনা সুলতানা সোনিয়া। ঈদের আগের দিন চিকিৎসাধীন জামাতাকে দেখতে সিঙ্গাপুর যাবেন শেখ ফজলুল করিম সেলিম।

বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বস্তিঘর: থাকছেন ভ্যানচালক মালি, সরকারি কর্মচারী by জিয়া চৌধুরী

জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে থাকছে ভ্যানচালক, মালি, শ্রমজীবী থেকে শুরু করে   গণপূর্ত বিভাগের কর্মচারীরা। রীতিমতো বস্তিঘর তৈরি করে দেয়া হয়েছে ভাড়া। তাই ২৯ নম্বর মিন্টো রোড এলাকায় বিশাল বাড়িটি এখন অনেকটা বস্তিতে পরিণত হয়েছে। মিন্টো রোড থেকে বিরোধী দলীয় নেতার বাসভবন দেখা গেলেও বাড়ির পেছনে অন্তত দশটি পরিবার বসবাস করছে। যেখানে জনা চল্লিশেক মানুষ বসবাস করে বলে এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন বাসিন্দাদের কয়েকজন। বিরোধী দলীয় নেতার বাসভবনের বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাসসংযোগ ব্যবহার করে দিব্যি বসবাস করছেন তারা। বাড়ির সম্পদ ব্যবহার করছেন নিজেদের মতো করে। গত প্রায় দুই দশক ধরে বাড়িটিতে বিরোধী দলীয় নেতা না থাকায় তা দখল করে নিয়েছে এসব বাসিন্দারা। এতে করে শ্রী হারাচ্ছে সরকারি বাড়িটি। এর রক্ষণাবেক্ষনের দায়িত্বে গণপূর্ত বিভাগ থেকে একজন মালী ও তত্ত্বাবধায়ক থাকলেও আদতে তারা কোন কাজ করছে না। উল্টো শ্রমজীবী কিছু মানুষকে ঘর ভাড়া দিয়ে সরকারি বাসভবনটির সৌন্দর্য্য নষ্ট করছে গণপূর্ত বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারী।
সরজমিন মিন্টো রোডের সরকারি বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে এমন চিত্র। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল পার হয়ে গোল চত্বরের ফোয়ারা শেষ হয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ে যাওয়ার সড়কটি মূলত মিন্টো রোড নামে পরিচিত। এই সড়কের শুরুর দিকে ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবন ও আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাসভবন পার হলে দক্ষিণ পাশে ২৯ নম্বর বাড়িটি। দূর থেকে শুধু লাল-সাদা রংয়ের দোতলা বাড়ি দেখা যায়। সামনে বিশাল খালি জায়গা, আছে সুরক্ষিত সীমানাপ্রাচীরও। বাড়িটির নীরব ও ভূতুড়ে পরিবেশ দেখে বোঝার উপায় নেই যে, এটি ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী, রাষ্ট্রের পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রধান ব্যক্তি জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতার বাসভবন। বাড়ির মূলফটকে কোন নামফলকও নেই, শুধু দেয়ালে হাতে লেখা ২৯ মিন্টো রোড শব্দটি রয়েছে। মূলফটক ধরে সামনে এগোতে কোন বাধার মুখে পড়তে হবে না কাউকে।  অনায়াসে খোলা থাকা গেট দিয়ে ভেতরে চলে যাওয়া সম্ভব।
ফটকের ডান পাশে নিরাপত্তীরক্ষীর চৌকিতেও কারো উপস্থিতি নেই বছর বছর ধরে। নিরাপত্তা তল্লাশি কর্মীদের কক্ষটি এখন যেন ময়লার ভাগাড়। মূল ফটক ধরে প্রায় দুইশ ফুট পিচের রাস্তা পার হলে লাল-সাদা দোতলা ছিমছাম বাড়িটিই বিরোধী দলীয় নেতার সরকারি বাসভবন। বাড়ির সামনের বিশাল খোলা জায়গায় ঘাস বড় হয়ে ঝোপের মত হয়ে গেছে। অনেকদিন এগুলো কাটা হয় না বলে জানান এখানকার একজন বাসিন্দা। বাড়িটির সামনের এলাকায় কথা হয় পঞ্চাশোর্ধ্ব পারুল আক্তার নামে এক নারীর সাথে। নিজেকে গণপূর্ত বিভাগের কর্মী পরিচয় দিলেও পরে জানা যায় তিনি রমনা পার্কের পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ২০০৭ সাল থেকে পরিবার নিয়ে এখানে থাকছেন। পারুল আক্তার মানবজমিনকে বলেন, ফখরুদ্দীন সরকারের (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আমল থেইকা আমরা এহানে থাকি। তয়, গণপূর্ত ছাড়াও এহন অনেকেই এহানে থাকে।
সরকারি বাসভবনটিতে কিভাবে থাকছেন জানতে চাইলে পারুল আক্তার জানান, গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মচারী ভবনটির পেছনের দিকে টিনশেড পাকা ভবনে দেড় দশক ধরে থাকছেন। এসব কর্মচারীদের ম্যানেজ করে তিনিও পরিবার নিয়ে প্রায় ১২ বছর ধরে মিন্টো রোডের বাড়িটিতে থাকছেন। দোতলা বাড়িটির ঠিক পেছনে লাগোয়া টিনশেড ঘর তুলে থাকছে বেশ কয়েকটি পরিবার। লাল-সাদা বাড়িটি ঘেঁষেই একেবারে পেছনের দিকে বস্তির মতো টিনের ঘরগুলো তোলা হয়েছে। কয়েক একরজুড়ে সরকারি বাসভবনটিতে এত জায়গা থাকতে ঠিক পেছনে কেন ঘর তোলা হয়েছে এমন প্রশ্নে এক বাসিন্দা বলেন, এখান থেইকা গ্যাস, পানির লাইন নেয়া সোজা। একেবারে বাড়িটির সাথেই। আবার সামনের দিকে কেউ রাস্তা দিয়া গেলেও বুঝতে পারবো না যে এখানে টিনের ঘর আছে। এরকম টিনের ঘরে পাঁচ-ছয়টি পরিবার থাকে বলেও জানান তিনি। দোতলা বাড়িটির পেছনে জামগাছের নিচে সবসময় একটি ভ্যানগাড়ি থাকে। সেলিম নামে পরিচয় দেয়া একজন জানান, টিনের ঘরগুলোতে একজন ভ্যানচালকও থাকেন। তিনি মূলত রাতে কাওরান বাজার এলাকায় মাল আনা নেয়া-করেন। এজন্য দিনের বেলা বাসায় ঘুমান, তখন ভ্যানগাড়িটি টিনশেড ঘরগুলোর সামনেই থাকে। টিনশেড ঘরগুলোতে থাকেন পঁচিশ বছর বয়সী এক যুবক।
তিনি জানান, গণপূর্ত বিভাগের কর্মচারীরা পেছনের দিকে প্রথমে থাকা শুরু করেন। পরে ধীরে ধীরে, শ্রমজীবী কিছু মানুষকে ঘর তোলার কাজে সহায়তাও করেন তারা। কয়েকজন বাসিন্দা জানান, এখানে থাকতে গণপূর্ত বিভাগের কর্মচারীদের ঘরপ্রতি কয়েক হাজার টাকা করে দিতে হয়। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. রমিজুর রহমান মানবজমিনকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন ক্লিনার, সুইপার, দারোয়ান ও মালী সবমিলিয়ে চারজন থাকার কথা। গণপূর্ত বিভাগের কয়েকজন কর্মচারীসহ মোট ১৪জন সেখানে থাকছেন বলে স্বীকার করেন এই কর্মকর্তা। তবে বলেন, কোন শ্রমজীবী ও ভ্যানচালক সেখানে থাকছেন কিনা বিষয়টি আমার জানা নেই। মাঝেমধ্যে টিনের ঘর ঝড়ে ভেঙে গেলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আবার নতুন করে ঘর মেরামত করতে হয়। সরকারি বাসভবনে যারা থাকছেন এদের বেশিরভাগ নানাজনের সুপারিশ নিয়ে অবৈধভাবে থাকছেন বলেও জানান রমিজুর রহমান। এদিকে, গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা প্রথমবারের মত বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে সরকারি বাসভবনে উঠেন। পরে ১৯৯৬ সালে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে সরকারি বাসভবনে থাকেন। ২০০১ সালের পর জাতীয় সংসদের আর কোন বিরোধী দলীয় নেতা বাড়িটিতে থাকেননি।
সবশেষ ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদের নেতা হওয়ার পর সরকারি বাসভবনে থাকতে আগ্রহ দেখিয়ে গণপূর্ত বিভাগকে চিঠি দেন রওশন এরশাদ। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতার চিঠি পাওয়ার পর বাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেয় গণপূর্ত বিভাগ। তবে, শেষমেষ রওশন এরশাদও দশম জাতীয় সংসদের মেয়াদে সরকারি বাসভবনে উঠেননি। একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর নিয়ম অনুযায়ী বাড়িটি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। তবে, এখন পর্যন্ত সরকারি বাসভবনে উঠতে তার পক্ষ থেকেও কোন আগ্রহ দেখানো হয়নি। গণপূর্ত বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বাড়িটির বেশিরভাগ আসবাবপত্র এর মধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। সংস্কার কাজ করে বাড়িটি বসবাস উপযোগী করতেও বেশ সময় লাগবে।

Saturday, June 1, 2019

ঢাকায় ঘুরে বেড়াতো ভয়ঙ্কর এই চক্র by জিয়া চৌধুরী

সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ঘুম, অতঃপর শুরু কাজের তোড়জোড়। সন্ধ্যা থেকে ভোর রাত এই সময়ে নিরীহ মানুষকে জোর করে গাড়িতে তুলে ডাকাতি ও ছিনতাই করতো ১০ থেকে ১২ জনের একটি চক্র। টাকা-পয়সা কিংবা দামি মুঠোফোন, জিনিসপত্র নিয়েও ক্ষান্ত হতো না ডাকাত দলের সদস্যরা। ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তিদের বিদায় বেলায় নিজেদের কায়দায় চুরি বা চাকু দিয়ে আঘাত করে বিদায় সম্ভাষণ জানাতো। কখনো কখনো ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তির সঙ্গে কোন নারী সদস্য থাকলে তাকেও যৌন হয়রানি করতো চক্রের সদস্যরা। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ, বছিলা ও ঢাকা উদ্যান এলাকা ছিল এই ডাকাত চক্রের নিয়ন্ত্রণে। তবে ঢাকার বাইরেও চক্রটি কয়েকটি জায়গায় ডাকাতি করেছে। গত ২৫ মে শনিবার রাতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের অর্গানাইজড ক্রাইম প্রিভেনশন টিমের অভিযানে ডাকাত দলের পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এরা হলো, মো. নাসির সরদার(২২), মো. কামাল মাদবর(২৩), মো. শহীদ বেপারী(৩৫), মো. মনিরুল হাসান(১৮) ও মো. মাহাবুব মিয়া(৩০)। ডাকাত দলের আরো অন্তত সাত সদস্য ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে। গ্রেপ্তার পাঁচ জনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩৯৯ ও ৪০২ ধারায় ডাকাতির প্রস্তুতির অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ডাকাত দলটি সংঘবদ্ধভাবে অনেক দিন ধরে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ ও ঢাকা উদ্যানের প্রধান সড়কের সামনের এলাকায় ডাকাতি ও ছিনতাই করতো। গ্রেপ্তার হওয়া ৫ জনের মধ্যে বয়সে জ্যেষ্ঠ মাহাবুব মিয়া ডাকাত দলের যানবাহন বিভাগের দায়িত্ব সামলাতেন। প্রতিদিন বিকালে গাড়ি ঠিক করে দলের বাকি সদস্যদের ফোন করে ঘুম ভাঙাতেন তিনি। পরে প্রত্যেককে গাড়িতে তুলে বেড়িবাঁধের আশেপাশের এলাকায় চলে যেতেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ডাকাত দলটির বেশিরভাগ সদস্য বয়সে তরুণ ও মাদকাসক্ত। মাদকের টাকা জোগাতে এরা ডাকাতির মতো অপরাধমূলক কাজে যোগ দেয়। তবে, রাতে ডাকাতি করার কারণে দলের সবাই সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত ঘুমাতো। বিকালের দিকে মাহাবুব গাড়ি ঠিক করে তাদের নিয়ে ঢাকা উদ্যানের প্রধান সড়কের দিকে চলে যেতো। আলো নামলেই রিকশা আরোহী থেকে শুরু করে পথচারী ও গাড়ির আরোহীদেরও টার্গেট করতো ডাকাতরা। ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পর কৌশলে চাপাতি ও চাকু দিয়ে তাদের আঘাত করে নিরাপদ দুরত্বে দিয়ে আসতো। ভোলা থেকে সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা এক তরুণ সম্প্রতি তাদের হাতে ডাকাতির শিকার হয়। আরো একজন বেসরকারি চাকরিজীবী তার স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকা উদ্যানের সড়কে যাবার সময় ডাকাত দলের হাতে পড়েন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই চাকরিজীবী জানান, তার স্ত্রীকেও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করে ডাকাতরা। ডিবি’র সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. নাজমুল হক বলেন, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান পরিচালনা করার সময় রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে ডাকাত দলের ৫ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ডাকাতির উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি। তাদের কাছ থেকে দুইটি স্টিলের চাপাতি এবং ৩ টি স্টিলের চাকু উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ডাকাতি করে বলে স্বীকার করেছে। গ্রেপ্তার ৫ জনের বিরুদ্ধে এর আগেও বিভিন্ন থানায় ডাকাতিসহ ছিনতাই ও মাদক মামলা হয়েছে।

Wednesday, May 29, 2019

মালিবাগে পুলিশ ভ্যানে বিস্ফোরণ: টাইমার দেয়া ছিল বোমায় by জিয়া চৌধুরী

রাজধানীর মালিবাগে পুলিশ ভ্যানে বিস্ফোরণের আগে এক যুবক গাড়িতে বোমা রেখে যায়। আগে থেকে রেখে যাওয়া বিস্ফোরকটি ছিল সময় ও দূর থেকে নিয়ন্ত্রিত। প্রায় এক মাসের ব্যবধানে পুলিশকে টার্গেট করে পরপর দুটি বিস্ফোরণের ঘটনায় বেশ কিছু যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা। গত রোববার রাতে মালিবাগে পুলিশ ভ্যানে বিস্ফোরণ ও গত ২৯শে এপ্রিল গুলিস্তানে ট্রাফিক পুলিশ বক্সের কাছে বিস্ফোরণের ধরন প্রায় একই।
তবে, মালিবাগের ঘটনায় তুলনামূলক শক্তিশালী বিস্ফোরক ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ব্যবহার করা হয়। দুটি বিস্ফোরণের ঘটনার তদন্তে নিয়োজিত ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কয়েকটি সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, মালিবাগ রেলগেটের কাছে থাকা পুলিশ ভ্যানটিতে এক যুবক বিস্ফোরক রেখে যায়। রাত সোয়া নয়টা নাগাদ রেলগেট মোড়ে অপেক্ষমান পুলিশের বিশেষ শাখার ওই ভ্যানটিতে বিস্ফোরক রেখে যায় ২৫ থেকে ৩০ বছর বয়সী একজন। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বিস্ফোরকটি পুলিশ ভ্যানে রেখে নেমে যায় সে। পল্টন থানা পুলিশ সূত্রে আরো জানা গেছে, বিস্ফোরকটি ছিল সময় নিয়ন্ত্রিত।
৩০ মিনিট টাইমারও ঠিক করে দেয়া ছিল বোমাটিতে। পরে, রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে আশেপাশের কোন জায়গা থেকে বোমাটির বিস্ফোরণ ঘটানো হতে পারে বলে ধারণা পুলিশের। এদিকে, ডিএমপির আরেকটি সূত্রে জানা গেছে ঘটনার আশপাশে থাকা কয়েকটি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাগুলোর মধ্যে মগবাজার-মালিবাগ ফ্লাইভারের ওপর থাকা ক্যামেরাটি রহস্যজনকভাবে ঘটনার আগের দিন থেকে নষ্ট ছিল। পুলিশ ভ্যানে বোমা রেখে যাওয়ার আগে আশপাশের ঘটনাস্থল বেশ কয়েকদিন ধরে রেকি করা হয় বলেও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার ক্লু এড়াতে আগের দিন ফ্লাইওভারের সিসিটিভির ক্যাবল কেটে রাখা হতে পারে বলেও সূত্র জানিয়েছে। এছাড়া, ঘটনাস্থলের কাছেই পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্লোজসার্কিট ক্যামেরায় ঘটনাস্থল পর্যন্ত দেখা যায় না। এসব কারণে বিস্ফোরক রেখে যাওয়া ওই যুবকের চেহারা স্পষ্ট বোঝা যায়নি। তবে, বিস্ফোরণে পুলিশ সদস্যরা মূল টার্গেট ছিল বলে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঘটনার আগে বিভিন্ন সময় ট্রাফিক পুলিশের সহকারী উপ-পরিদর্শক রাশেদা আক্তার পুলিশ ভ্যানটির আশেপাশে ছিলেন। তবে ভ্যানে ওঠার ঠিক তিন মিনিটের মধ্যেই বিস্ফোরণ ঘটানো হয়।
এছাড়া, গত ২৯শে এপ্রিল গুলিস্তানে বিস্ফোরণে পুলিশের তিন সদস্য আহত হওয়ার ঘটনায়ও একই কায়দায় বিস্ফোরক রেখে যাওয়া হয় বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। তবে, গুলিস্তানের ঘটনার তুলনায় মালিবাগে শক্তিশালী বোমা ব্যবহার করা হয়। মালিবাগে বিস্ফোরিত বোমায় স্প্রিন্টারের সংখ্যা কম থাকায় ক্ষয়ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে। তবে, আইইডি সদৃশ বোমাটি পুরোপুরি বিস্ফোরণ হওয়ায় সার্কিট ও অনান্য যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে করে বিস্ফোরকটির অবশিষ্ট অংশগুলো থেকে কোন ক্লু বের করা সম্ভব নয় বলেও তদন্ত সূত্রে জানা গেছে। পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ট্রাফিক পুলিশের এএসআই রাশেদা আক্তার মালিবাগ মোড়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এক পর্যায়ে সড়কের পাশে দঁাড়িয়ে থাকা এসবি’র গাড়িতে উঠে বসে ছিলেন। তিনি গাড়িতে ওঠার তিন মিনিট পর রেখে যাওয়া আইইডি’র বিস্ফোরণ ঘটে। গাড়িতে বিস্ফোরক রেখে যাওয়া ওই যুবককে ধরতে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের বেশ কয়েকটি টিম কাজ করছে। যুবকের অবস্থান শনাক্ত করে তাকে আইনের আওতায় আনতে কাজ করছে পুলিশ। পুলিশের ধারণা, অভিযুক্ত ওই তরুণ কোন জঙ্গি গোষ্ঠীর হয়ে ঘটনাটি ঘটিয়ে থাকতে পারে।
বোমাটি রেখে যাওয়ার সময় তার সঙ্গে আশপাশে আরও কেউ থাকতে পারে। পুরো বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। গত রোববার রাতে মালিবাগ মোড়ের পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) এসবি’র দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাড়িতে আইইডি বিস্ফোরণে আহত হন ট্রাফিক পুলিশের এএসআই রাশেদা আক্তার বাবলী (২৮) ও রিকশাচালক লাল মিয়া (৫৫)। এ ঘটনায় পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) কনেস্টবল ও হামলায় ক্ষতিগ্রস্থ গাড়ির চালক কনেস্টবল মো. শফিক চৌধুরী বাদী হয়ে পল্টন থানায় বিস্ফোরক আইনে মামলা করেন। এই হামলার ঘটনার দায় স্বীকার করে মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)। এর আগে গত ২৯শে এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে ট্রাফিক পুলিশের দুই সদস্য ও কমিউনিটি পুলিশের এক সদস্যকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার পর মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস দায় স্বীকার করে। তবে গুলিস্তানের ঘটনায় নব্য জেএমবির সদস্যরা জড়িত বলে মনে করেন ডিএমপির কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের কর্মকর্তারা। ওই ঘটনার দিনই আইএস’র একটি নতুন ভিডিও বার্তা প্রকাশ হয়। এর কিছুদিন আগে থেকে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ভারত ও বাংলাদেশে হামলার হুমকি দিয়ে আসা হচ্ছিল। গত রোববার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহতদের দেখতে গিয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়াও জানিয়েছিলেন, ধারণা করা হচ্ছে, বোমাটি গাড়িতে আগে থেকে রাখা হয়েছিল।

Sunday, May 26, 2019

নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে আইন আছে মামলা নেই by জিয়া চৌধুরী

খাদ্যে ভেজাল নিয়ে দেশজুড়ে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বিশেষ করে রমজান মাসে নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে তোড়জোড় শুরু হয়। বিভিন্ন সরকারি ও সেবা সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে একের পর এক বের হতে থাকে ভেজাল খাবার উৎপাদন কারখানার হদিস, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও করা হয় লাখ লাখ টাকা। এত কিছুর পরও থামানো যাচ্ছে না খাদ্যে ভেজাল। তবে, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে ভেজাল কারবারিদের বিরুদ্ধে নিরাপদ খাদ্য ও পেনাল কোডের নিয়মিত আইনে মামলা না হওয়া বড় বাধা বলে মনে করছেন পরিবেশ ও নিরাপদ খাদ্য আন্দোলনের কর্মীরা। তারা বলছেন, প্রচলিত আইনে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা গেলে খাদ্যে ভেজাল দেয়া অনেকটা বন্ধ করা সম্ভব।
ভেজাল খাবার উৎপাদক, বিপণনকারী এমনকি মিথ্যা তথ্য দিয়ে কোন খাবারের বিজ্ঞাপন দিয়ে গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করলে নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা করতে  পারবেন যে কোন নাগরিক। এছাড়া, খাবারের মান নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থাগুলোও অপরাধ আমলে নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শেষে মামলা করতে পারবে। তবে, দেশের অন্তত ২৫টি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওইসব জেলায় নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকরের পর থেকে উল্লেখ করার মত কোন মামলাই হয়নি। দেশের ৬৪টি জেলার কমপক্ষে ৪০টি জেলায় নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ আমলে নিয়ে কোন মামলা হয়নি। কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রামের মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অধীনে স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটদের খাদ্য আদালতে সবমিলিয়ে শ’খানেক মামলা হয়েছে। নানা জটিলতায় এই তিনটি আদালতেও চলমান মামলাগুলো সঠিক গতিতে এগোচ্ছে না।
এদিকে, নিরাপদ খাদ্য আইনে সব জেলা ও মহানগরে একটি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত গঠনের কথা থাকলেও বেশিরভাগ জেলায় এর কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। সাধারণ মানুষও মামলা দায়ের প্রক্রিয়া ও আদালত বিষয়ে অবগত নয়। মূলত নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকরের পর থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক প্রচারণার অভাবে আইনের বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা গড়ে উঠেনি বলে জানান আদালত সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের যে কোন নাগরিক চাইলে নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা করতে পারবেন সেটাও তেমনভাবে প্রচার করা হয়নি। গত এক সপ্তাহে ঢাকার বাইরের বেশ কয়েকটি জেলায় নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা দায়েরের তথ্য খোঁজা শুরু করেন এই প্রতিবেদক। রাজশাহী, যশোর, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, বরগুনা, মানিকগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ভোলা, চাঁদপুর, ফেনী, কুমিল্লা ও বান্দরবান জেলা ও দায়রা জজ আদালতে নিরাপদ খাদ্য আইনে কোন মামলা হয়নি। আদালত সূত্রে জানা যায়, সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে খাদ্য পরিদর্শকরা খাবারের মান যাচাই করে অপরাধ আমলে নিয়ে মামলা হিসেবে আদালতে অভিযোগ করার এখতিয়ার রাখেন।
যেসব এলাকায় খাদ্য পরিদর্শক নেই সেসব জেলায় স্যানিটারি পরিদর্শকরাও চাইলে নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা করতে পারবেন। এছাড়া, নগর মহানগর এলাকায় সিটি করপোরশেন ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষও চাইলে ভেজাল খাদ্য উৎপাদক ও বিপণনকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন। কিন্তু ২০১৫ সালের ১৬ই জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপণের মাধ্যমে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩’ কার্যকরের পর থেকে বেশিরভাগ জেলায় ও মহানগরে মামলা দায়েরে উদ্যোগী হননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আদালত সূত্র জানায়, তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজা দেয়াতেই আগ্রহ মামলা দায়েরকারী কর্মকর্তাদের।
তাছাড়া, সাধারণ মানুষকে নিরাপদ খাদ্য আইনের বিষয়ে সচেতন করতে না পারায় বিভিন্ন জেলায় কোন ধরনের মামলা হয়নি। খাদ্যে ভেজাল ঠেকাতে আইনের পাশাপাশি বিচারের জন্য ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ গঠন করা হয়েছে। প্রতিটি জেলার প্রথম আমলি আদালত ও মহানগরে নির্দিষ্ট একটি আদালতকে ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ হিসেবে ঠিক করে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আইন-আদালত করার তিন বছরেও রাজশাহীতে এই আদালতে একটি মামলাও দায়ের হয়নি। গত ২৭শে এপ্রিল রাজশাহীতে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’ এর প্রয়োগ ও করণীয়’ শীর্ষক এক কর্মশালায় রাজশাহীর জেলা ও দায়রা জজ মীর শফিকুল আলম বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইন কার্যকরের পর রাজশাহীতে এ আইনে একটি মামলাও দায়ের হয়নি। তার মানে আমরা নিরাপদ খাদ্য পাচ্ছি অথবা ভেজাল খাবারই খাচ্ছি-বিষয়টি এমন নয়। তিনি বলেন, এই আইনের আশ্রয় নেয়ার ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সচেতনতার অভাব রয়েছে।
মূলত ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর প্রণয়ণ করা হয় ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’। ২০১৫ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি আইনটি কার্যকর করা হয়। এরপর ওই বছরের ৩০শে জুন এক প্রজ্ঞাপনে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার বিভাগ রাজশাহীর জন্য ১ নম্বর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও মহানগর এলাকার জন্য ২ নম্বর মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতকে ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ হিসেবে নির্ধারণ করে। কিন্তু আইন কার্যকরের তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এসব আদালতে একটি মামলাও দায়ের করা হয়নি। ওই কর্মশালায় জেলার সিভিল সার্জন ডা. কাজী মিজানুর রহমান বলেন, জীবন ও স্বাস্থ্য রক্ষায় আইনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সিভিল সার্জন হিসেবে নতুন যোগ দেয়ায় নিজেই আইনটি সম্পর্কে জানতেন না।
এমনকি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত করে স্যানিটারি ইন্সপেক্টররা এ আইনের মামলার বাদী হবেন, এ বিষয়টিও তিনি জানতেন না। এমন পরিস্থিতির সূত্র ধরে অন্তত পাঁচটি জেলার স্যানেটারি ইন্সপেক্টরদের সাথে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। নিরাপদ খাদ্য আইন ও মামলা করার প্রক্রিয়া সর্ম্পকে এসব কর্মকর্তাও কিছু জানেন না বলে স্বীকার করেন। তবে কেউ কেউ জানান, প্রয়োজনীয় লোকবল ও প্রচারণার অভাবে জেলা শহরগুলো আইনের ব্যবহার করতে পারছেন না স্যানেটারি ইন্সপেক্টররা।
ঢাকার মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতের অধীনে তিনজন স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট ঢাকার তিনটি ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ পরিচালনা করছেন। গত বৃহস্পতিবার এসব আদালতে গিয়ে জানা যায়, নিরাপদ খাদ্য আইনে সবমিলিয়ে ৭২টি মামলা চলমান রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মামলার সংখ্যা ১১টি, বাকি ৬১টি মামলা চলছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের খাদ্য আদালতে। এখানকার ৩০টি মামলা আবার উচ্চ আদালতের নির্দেশে স্থগিত রয়েছে। সবশেষ ২৪শে এপ্রিল রাজধানীর বাগিচা রেস্টুরেন্টের বিরুদ্ধে নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা করে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। তবে, এখানকার একজন পাবলিক অ্যানালিস্টের পদ গত দুই বছর ধরে শূন্য থাকায় তেমন কোন মামলা হচ্ছে না বলেও আদালত সূত্রে জানা গেছে।
সিটি করপোরেশনের কর্মী মো. সেলিম বলেন, পাবলিক অ্যানালিস্ট পরীক্ষা করে ভেজাল বা বিশুদ্ধতার বিষয়ে রিপোর্ট দেন। ল্যাবের পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে পরে মামলা করা হয়। সবশেষ গোলাম সারওয়ার নামে একজন পাবলিক অ্যানালিস্ট এই পদে চাকরি থেকে অবসর নেন। তারপর ওই পদে আর কেউ যোগ দেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন কর্মকর্তা জানান, আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় এই পদে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের অধীনে পাবলিক অ্যানালিস্ট না থাকায় গত দেড়-দুই বছরে তেমন কোন মামলা হয়নি। বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত-১ এর স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী পাভেল সুইট গত বৃহস্পতিবার মানবজমিনকে জানান, সচেতনতার অভাবে অনেক মানুষ নিরাপদ খাদ্য আইনের ব্যবহার করতে পারছেন না।
এজন্য আদালতগুলোতে মামলার হারও অনেক কম। সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা গেলে মামলার সংখ্যাও বাড়বে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য আইন ছাড়াও দণ্ডবিধির ২৭২, ২৭৩, ২৭৪ ও ২৭৫ ধারাও যে কোন থানায় বা আদালতে মামলা করা যাবে। অথচ পেনাল কোডের এই ধারার বিষয়ে অনেকেই অবগত নন। আদালত সূত্রে আরো জানা গেছে, আশুলিয়ার একটি খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের পণ্য জব্দ করে সিটি করপোরেশনের বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের শরণাপন্ন হন থানা পুলিশের একজন সদস্য। তবে আশুলিয়া এলাকা ঢাকা মহানগরের অধীনে না হওয়ায় মামলা করতে বলা হয় ঢাকার মূখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে। মূলত, খাদ্য আদালতের কার্যক্রম সম্বন্ধে তেমন কোন ধারণা না থাকায় তদারকি সংস্থা ও সাধারণ মানুষ এভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এজন্য ব্যাপক প্রচারণার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে, বান্দরবান জেলা ও দায়রা জজ আদালতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানকার আদালতেও নিরাপদ খাদ্য আইনে কোন মামলা হয়নি।
তবে, নিরাপদ খাদ্য বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা ও জনসচেতনতার বিষয়টি আমলে নিয়ে বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতের কার্যক্রম এরইমধ্যে শুরু করে দিয়েছেন বলে জানান আদালত সংশ্লিষ্ট একজন। এদিকে, নিয়মিত মামলা না হওয়ায় খাবারে ভেজাল কারবারীরা সামান্য জরিমানা ও ভ্রাম্যমাণ আদালতেই পার পেয়ে যাচ্ছেন বলে মত পরিবেশবিদদের। দীর্ঘমেয়াদী বিচার ব্যবস্থায় অসাধু ব্যবসায়ীদের মামলার মুখোমুখি করা গেলে খাদ্যে ভেজাল কমে আসবে বলে জানান পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আবদুস সোবহান। তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত চলুক সে বিষয়ে কোন আপত্তি নেই। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম কমাতে নিরাপদ খাদ্য আইনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে নিয়মিত আইনে মামলা করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালতে বছরে একবার জরিমানা দিয়ে পার পেয়ে যান এসব অসাধু ব্যবসায়ী।
বিএসটিআই, ভোক্তা অধিদপ্তর, পরিবেশ অধিদপ্তর সবাইকে আরো সেচ্চার হতে হবে। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বলেন, সংস্থাগুলো মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করে কিছুটা সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছে। নিরাপদ খাদ্যের অধিকার বাস্তবায়নে এগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। সমস্যার নিরসনে একেবারে গোড়া থেকে কাজ করতে হবে। খাদ্য উৎপাদন ও বিপনন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে ভোক্তা পর্যায় অবধি মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকতে হবে। ভেজাল খাদ্য বন্ধে শুধু ভ্রাম্যমাণ আদালতে জেল-জরিমানা করার প্রক্রিয়াটি তেমন কাজে দেবে না বলে মনে করেন তিনি।
যেসব আদালতে মামলা করা যাবে
রাষ্ট্রের যে কোন নাগরিক তার জেলার মূখ্য বিচারিক হাকিম আদালতের এক নম্বর আমলী আদালতে নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা করতে পারবেন। এছাড়া মহানগর এলাকার জন্য মূখ্য মহানগর হাকিম আদালতগুলো নির্দিষ্ট ‘বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত’ গঠন করা হয়েছে। মহানগর এলাকার বাসিন্দারা এসব আদালতে মামলা করতে পারবেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপণে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মহানগর এলাকার জন্য ৪ নম্বর মহানগর হাকিম আদালত, রাজশাহীতে দুই নম্বর মহানগর হাকিম আদালত, সিলেটে তিন নম্বর মহানগর হাকিম আদালত ও বরিশালের এক নম্বর মহানগর হাকিম আদালতে নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা করা যাবে। এছাড়া, ঢাকার দুই সিটি করপোরশেন এলাকার বাসিন্দারা তিনটি বিশুদ্ধ খাদ্য আদালতে নিরাপদ খাদ্য আইনে মামলা করতে পারবেন।

Thursday, May 23, 2019

ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি: দ্বিতীয় জীবন পাওয়ার বর্ণনা ওদের মুখে by জিয়া চৌধুরী

ভয়ঙ্কর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে হবে ছোট্ট নৌকায়। একটি নৌকায় প্রায় ৫০ জন বাংলাদেশি ও সোমালিয়ান নাগরিক। এ যেন জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সাগর জয়ের চেষ্টা। সিলেটের ছায়েদুল ইসলামের বয়স সবে মাত্র ১৬। ভূমধ্যসাগরের বিশাল জলরাশি কিংবা দালাল চক্রের নির্যাতন এমন  অমানবিক গল্প ডিঙ্গিয়ে তৈরি করতে চেয়েছিল এক নতুন ইতিহাস। সিলেট থেকে ইউরোপ এমন স্বপ্নে বিভোর ছায়েদুলকে দেখতে হয়েছে ভাগ্যের নির্মমতা।
পরিবার-পরিজন, কিংবা কিশোর বয়সের উচ্ছ্বলতা সবকিছু পেছনে ফেলে যার কাছে ইউরোপ পৌঁছানোই ছিল মূখ্য। ভাগ্যের তাড়নায় অগত্যা ঘর ছাড়ে ছায়েদুল, পাড়ি জমায় এক ভয়ঙ্কর যাত্রায়। সিলেট থেকে যাত্রা শুরু হয় ইউরোপের উদ্দেশ্যে। ভারত, দুবাই, জর্ডান হয়ে স্বপ্নের ইউরোপের একেবারে কাছে, ভূমধ্যসাগর পাড়ের দেশ লিবিয়ায়। লিবিয়া থেকে ত্রিপোলি উপকূলে পৌঁছে সিলেটে থাকা পরিবারের সঙ্গে কথাও হয় ছায়েদুলের। আর মাত্র কয়েক দিন পর ইউরোপ পৌঁছে যাবার কথা জানায় মুঠোফোনে। এর মধ্যে দালাল চক্রকে বুঝিয়ে দেয়া হয় প্রায় নয় লাখ টাকাও। লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগরের ত্রিপোলি উপকূলে পৌঁছালে ছায়েদুলের ঠাঁই হয় ‘গেইম ট্র্যাপ’ নামে ঘরে। যেখানে আটকদের পরিবারের কাছ থেকে টাকা বুঝে নিতে চলে নির্যাতন। তবুও হাল ছাড়েনি ছায়েদুল, সে তখন স্বপ্ন থেকে মাত্র কয়েক হাজার কিলোমিটার সমুদ্র পথ দূরে। গেইম ঘর থেকে মুক্তির পর ত্রিপোলি উপকূল থেকে দালালদের হাত বদলে ছায়েদুলের ঠাঁই হয় নৌকায়।
জাহাজে করে ইতালির উদ্দেশ্যে যাত্রার কথা বললেও তাকে নৌকায় তুলে দেয় বাংলাদেশি দালাল চক্রের সদস্যরা। পঞ্চাশ জন করে তিনটি নৌকায় ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেবার ভয়ঙ্কর যাত্রা শুরু হয় তার। ত্রিপোলি উপকূল থেকে যাত্রা শুরু হওয়ার পর ছায়েদুল শুধু ক্ষণ গুনছিলেন কখন ইতালি পৌঁছাবেন। ত্রিপোলি থেকে ইতালি সাগরপথে প্রায় দুই হাজার ৩০০ কিলোমিটার দুরত্ব। পাড়ি দিতে সময় লাগে সময়ভেদে ত্রিশ ঘণ্টারও বেশি। সবকিছু ঠিকঠাকই চলছিল, ছায়েদুলও পৌঁছে যাচ্ছিলেন তার স্বপ্নের কাছে। তবে, তিউনিসিয়া উপকূলে পৌঁছালে হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় নৌকার ইঞ্জিন। পাশে থাকা আরেকটি নৌকাও দেখা দেয় একই গোলযোগ। ভয়ে চিৎকার করে ওঠেন অনেকে। জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ায় সাগরে ভাসতে হয় দু’দিন। তাদের সঙ্গে যাত্রা শুরু করে তিনটি নৌকার দুটিতে জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। এই দুই নৌকায় থাকা বাংলাদেশি ও সোমালিয়ান নাগরিকদের ১১ মে তিউনিসিয়ার উপকূল থেকে উদ্ধার করে দেশটির কোস্টগার্ড বাহিনী। অন্য একটি নৌকার তলা ফেটে গেলে তাদের সঙ্গে ছায়েদুলদের আর যোগাযোগ হয়নি।
গত মঙ্গলবার তিউনিসিয়ায় উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশিদের মধ্যে ১৫জনকে দেশে ফিরিয়ে আনে ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন(আইএওএম)। তিউনিসিয়া উপকূলে জ্বালানি শেষ হয়ে গেলেও ভাসতে থাকায় এরা জীবিত ফিরতে পেরেছে বলে জানা গেছে। তিউনিসিয়া থেকে বেঁচে ফিরে আসা ১৫ জন হলো: মাদারীপুরের শাহীন বিজয়(২৬), সিলেটের ইকবাল হোসেন(২৩), সেন্টু চন্দ্র সাহা(৪৭), মো. ছায়েদুল ইসলাম(১৬), মো. সোহেল আহমেদ(১৮), শাহেদ আহমেদ(৪০), মো. রুবেল আহমেদ(৩১), মাসুম খান(৩২), সুনামগঞ্জের আনোয়ার হাসান(২৬) ও মোহাম্মদ আবদুল মতিন(৪১), ভৈরবের আমির হোসেন(৩৫), কিশোরগঞ্জের এরফান চৌধুরী(২৬), ) হবিগঞ্জের রাশেদ মিয়া(২৫), সজীব মিয়া(১৯) ও মো. সোহেল রানা(২৬)। আউটপাস নিয়ে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে মঙ্গলবার দুুপরে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় এই ১৫জন। বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তাদের সঙ্গে দালাল চক্রের বিষয়ে জানতে কথা বলে ইমিগ্রেশন পুলিশ, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব), পুলিশের বিশেষ শাখা ও অনান্য গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা। কথোপকথনে লিবিয়া ও বাংলাদেশে থাকা মানপাচারের চক্রটির বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছে বলে কয়েকটি সূত্রে জানা গেছে।
পরে মঙ্গলবার রাতে তাদের যার যার বাড়িতে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করা হয়। তিউনিসিয়া থেকে বেঁচে ফিরে আসা হবিগঞ্জের সোহেল রানার সঙ্গে রেড ক্রিসেন্টের সহায়তায় কথা হয় এই প্রতিবেদকের। সোহেল রানা জানান, গত ২৮ জানুয়ারি নিজ এলাকার এক দালাল বুলবুলের সহায়তায় লিবিয়ার উদ্দেশ্যে সিলেট ছাড়েন তিনি। ভারত, জর্ডান হয়ে লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর বুলবুলকে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা দেয় তার পরিবার। পরে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার জন্য আরেক দালালকে ব্যাংকের মাধ্যমে দিতে হয় আরও সাড়ে তিন লাখ টাকা। সোহেল রানা জানান, দালালদের সঙ্গে চুক্তি ছিল, লিবিয়া থেকে জাহাজে করে ইতালি নেয়া হবে এবং চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। তবে লিবিয়ায় নিয়ে প্রায় তিন মাস একটি ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। গত ৯ মে সন্ধ্যায় লিবিয়া থেকে মোট ৫৭ জনকে একটি নৌকায় তুলে ইতালির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া হয়। নৌকাটিতে ৮ জন নারী ও তিন শিশুও ছিল। ১০ মে সারাদিন সাগরে ভাসার পর নৌকায় পানি উঠতে শুরু করে। ভাসতে ভাসতে এক সময় তিউনিসিয়া উপকূলে পৌঁছালে স্থানীয় জেলেরা তাদের উদ্ধার করে। পরে তিউনিশয়ার কোস্টগার্ডের সহায়তার তাদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সিলেটের রুবেল আহম্মেদ জানান, তারা ১১ বন্ধু সিলেট থেকে উন্নত জীবনের আশায় ইউরোপে পাড়ি জমান।
পথে পথে শারীরিক, মানসিক নির্যাতনের শিকার হন তারা। শেষমেষ ত্রিপোলি থেকে ইউরোপের উদ্দেশ্যে আলাদা নৌকায় রওনা হন ১১ বন্ধু। তবে, নিজেদের মধ্যে মাত্র ৪ জন বেঁচে ফিরতে পেরেছেন। বাকি সাত বন্ধুর খবর এখনো জানেন না তারা। নৌকা ডুবে যাওয়ায় আর বাকি বন্ধুদের হদিস পায়নি তারা। এদিকে, আইওএমের বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিউনিকেশন অফিসার চৌধুরী আসিফ মহিউদ্দিন হারুন গতকাল মানবজমিনকে বলেন, বুধবার আরো একজন তিউনিসিয়া থেকে দেশে ফিরে আসার কথা রয়েছে। এছাড়া, তিউনিসিয়ায় থাকা ১৪ বাংলাদেশিদের মধ্যে কেউ ফিরতে আগ্রহী হলে তাদেরও ফেরত আনার উদ্যোগ নেয়া হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ই মে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ৪০ বাংলাদেশী নিখোঁজ হন। একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ৪০ জনের সবাই পানিতে ডুবে মারা গেছেন।

Wednesday, May 22, 2019

থানার গাড়িচালকের রহস্যজনক মৃত্যু by জিয়া চৌধুরী

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পল্লবী থানার এক গাড়িচালকের মৃত্যুকে ঘিরে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। নিহত গাড়িচালক আমিনুল ইসলাম গত রোববার সকালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হলে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান বলে দাবি পুলিশের। তবে, আমিনুলের পরিবারের সদস্যরা পুলিশের এমন বক্তব্য মানতে নারাজ। সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে বলে মামলা করতে পুলিশ চাপ দিচ্ছে বলেও অভিযোগ পরিবারের। এদিকে, ঘটনার সূত্র ধরে পল্লবীতে পুলিশের দাবি করা দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে তেমন কোন প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রা ওইদিন সকালে একজনকে ধস্তাধস্তি করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেছেন। ঝুটপল্লী এলাকার ওই ঘটনাস্থলের কাছে থাকা একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে একটি প্রাইভেটকার থেমে থাকতে দেখলেও দুর্ঘটনার বিষয়ে স্পষ্ট কোন ছবি বা ভিডিও দেখা যায়নি। নিহত আমিনের খালাতো ভাই আজিজুল ইসলাম রনি সন্দেহ করছেন ঝুটপল্লী এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কোন্দলের জেরে মারধরের শিকার হতে পারেন তার ভাই। আজিজুলের দাবি, সেখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পূর্বশত্রুতার জেরে খুন হয়ে থাকতে পারেন আমিন। এছাড়া ঘটনার দিন ওই গাড়ি নিয়ে ডিউটিতে থাকা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক সোহেল রানার গতিবিধি যথেষ্ট সন্দেহজনক ঠেকছে নিহতের পরিবারের কাছে।
পল্লবী থানার কয়েকজন সোর্স দিয়ে নিহতের পরিবারকে অনেকটা নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। পুলিশের দাবি, আমিনুল ইসলাম রাজধানীর মিরপুরের ঝুটপল্লীর নব্য ক্যাফে নামের একটি রেস্তোরাঁর সামনের সড়কে দুর্ঘটনার শিকার হন। কিন্তু পুলিশের এমন বক্তব্যের সূত্র ধরে ঘটনাস্থলে গিয়ে তেমন কোন প্রত্যক্ষদর্শী ও তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ওদিন সকালে দুর্ঘটনা বিষয়টি কেউ দেখেছেন এমন একজনকেও খুঁজে পাননি এই প্রতিবেদক। তবে একজন লোককে ঘিরে জটলা ও পুলিশ সদস্যরা তাকে অটোরিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে জানান কয়েক দোকানি। এছাড়া নব্য ক্যাফে এবং ফাস্ট লেডি বেনারসি দোকানে ঢুকে সিসিটিভির ফুটেজে সড়কের মাঝখানে শুধু একটি প্রাইভেটকার থেমে থাকতে দেখা যায়। দুর্ঘটনার বিষয়ে স্পষ্ট কোন ভিডিও এই দুই প্রতিষ্ঠানের সিসিটিভিতে দেখা যায়নি। তবে দু-একজনকে দৌঁড়াতে দেখা গেছে। রাজধানীর বাউনিয়া বাঁধের বি ব্লকে পরিবার নিয়ে থাকতেন আমিনুল ইসলাম আমিন। স্ত্রী কল্পনা রহমান, দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ছিল সংসার। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ওই বাসায় গেলে এই প্রতিবেদকের সামনে জড়ো হন আশপাশের প্রতিবেশিরা।
এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আমিনের মৃত্যু নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। নিহত আমিনের ছোট ভাই মমিন, মামাতো ভাই আজিজুর এবং শ্বাশুড়ি হাজেরা বেগম পুলিশের বিরুদ্ধে তথ্য আড়ালের অভিযোগ করেন। তারা মানবজমিনকে জানান, ঘটনার পর থেকে পুলিশ একেক বার একেক কথা বলছে। এই নিয়ে পুলিশ তিনটি স্থানে দুর্ঘটনা হয়েছে বলে আমাদের জানায়। কিন্তু তিনটি স্থানের কোথাও এমন ঘটনার প্রমাণ পাইনি আমরা। এমনকি কেউ বলতেও পারছে না কীভাবে কি হয়েছে। এর আগে ঘটনাস্থল দেখতে কয়েকবার পুলিশকে অনুরোধ করলেও তারা নিয়ে যেতে চায়নি। বরং পুলিশ আমাদের সড়ক দুর্ঘটনার মামলা দিতে বলেছে। মামলা দেয়ার আগে পুলিশ ঘটনাস্থল দেখাবে না বলেও কয়েকবার জানায়। আমিনুল ইসলাম আমিনের স্ত্রী কল্পনা রহমান মানবজমিনকে জানান, পুলিশ আমাকে বলেছিল মিরপুরের ঝুটপল্লীর নব্য ক্যাফে নামের একটি রেস্টুরেন্টের সামনে এই সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। পরে আমি একা আশপাশের বহু দোকানে গিয়েছি। কেউ জানে না এক্সিডেন্ট হয়েছে। ১২ জন দোকানদারের কথা ভিডিও করেছি। আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। এখানে কিছু একটা আছে। মঙ্গলবার পুলিশের সঙ্গে ঝুটপল্লীতে গেলাম, অনেক দোকানে গেলাম। কিন্তু তেমন কোনো প্রমাণ তো পেলাম না। প্রমাণ না পেয়ে কার বিরুদ্ধে মামলা দেবো?
মামলা দেব না। পারলে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা করুক। আমিনের স্ত্রী আরো বলেন, রোববার আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলে এসআই সোহেল আমাকে বলেছিলেন আমিনকে আইসিইউতে রাখা হয়েছে। কিন্তু সেখানে তাকে নেয়া হয়নি। ২টার দিকে আমিনকে মর্গে দেখতে পাই। মর্গে গিয়ে দেখি আমিনের হাত-পা নাড়ছে। কান পেতে দেখি শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। তখন ডাক্তারদের জানালে তারা কাগজপত্র চান। তখন এসআই সোহেলকে ফোন দিলে তিনি ফোন ধরেননি। কাগজ না দেখানোর ফলে ডাক্তাররা তাকে পুনরায় চিকিৎসাও দিতে চায়নি। তখন আমিনকে মর্গ থেকে আমরা বের করে নিয়ে আসি। হাসপাতালের লোকজন আমাদের মার দিয়ে বের করে দিয়ে আমিনকে আবার মর্গে নিয়ে যায়। এদিকে আমিনের খালাতো ভাই আজিজুল ইসলাম রনি সন্দেহ করছেন ঝুটপল্লী এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের কোন্দলের জেরে মারধরের শিকার হতে পারেন তার ভাই। তার দাবি, সেখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে পুলিশের পূর্বশত্রুতার জেরে খুন হয়ে থাকতে পারেন আমিন। তিনি বলেন, গত রোববার ঘটনার দিন রোজা রেখেছিল আমিন ভাই। এমনকি ফজরের নামাজও পড়েছিল। সকাল আটটার সময় কাজের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। তবে, দুর্ঘটনার ঘটনার পর পুলিশ আমাদের খবর জানায়নি।
একজন রিকশাচালক নিজ থেকে এসে আমাদের খবরে দেয়। এসআই সোহেল আমিন ভাইকে মিরপুরের কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি করে বলে আমাদের জানায়, কিন্তু এমন বক্তব্যের বিপরীতে কোন কাগজপত্র দেখাতে পারেনি। এমনকি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে একজন সোর্স আমিন ভাইয়ের ফোন ধরে আমাদের জানায়। পরে, এসআই সোহেল মাঝপথে একবার জানায় যে সে মারা গেছে। এমনকি ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে তাকে অজ্ঞাত বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে রেজিস্ট্রি করে বলে আমরা জানতে পারি। আমিন ভাইকে হাসপাতালে নেয়ার পর থেকে কয়েক ঘণ্টা লাপাত্তা ছিলো এসআই সোহেল। আমিনকে মর্গ থেকে হাসপাতালে নিয়ে আসার সময় এসআই সোহেল না থাকায় কাগজপত্র দেখাতে পারেনি পরিবারের সদস্যরা। ওই সময় তাকে চিকিৎসা দেয়া গেলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হতো বলেও ধারণা। আজিজুল মানবজমিনকে বলেন, আমি লাশ দেখেছি। সড়ক দুর্ঘটনায় আঘাত পাওয়ার মতো কোন চিহ্ন তার শরীরে ছিলো না। বরং তার মুখে, হাতে ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন ছিল। শার্ট-প্যান্ট টেনে ছেঁড়ার মতো অবস্থায় দেখেছি। আমরা ধারণা করছি, তাকে ধস্তাধস্তি করে কয়েকজন মিলে মারধর করেছে। এসব ব্যাপারে জানতে চাইলে পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক এসআই সোহেল রানা মানবজমিনকে বলেন, সিসিটিভির ফুটেজের বাইরে আমার কিছু বলার নেই। এখানে লুকানোর কিছু নেই। আমিন আমাকে বলে ওয়াশরুমে গিয়েছিল। এরপর সে রোড এক্সিডেন্টে মারা যায়। তবে, প্রায় ৪০ মিনিট ধরে একজন গাড়িচালক কি করে পুলিশ ফোর্সের সাথে না থেকে আলাদা ছিলেন এমন প্রশ্নও এড়িয়ে যান এই উপ-পরিদর্শক। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম গতকাল মানবজমিনকে বলেন, আমিনের স্ত্রী তো আমার সামনেই কয়েকবার বললেন, স্যার, আমার স্বামী তো এক্সিডেন্টে মারা গেছে।
যা যা করার দ্রুত করেন। তবে আপনাদের সঙ্গে কি বলেছে তা তো আমি জানি না। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার এমন বক্তব্য নাকচ করে দেন আমিনের স্ত্রী কল্পনা আক্তার। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে ওসি সাহেবের এমন কোন কথা হয়নি। ডিএমপি মিরপুর বিভাগের পল্লবী জোনের সিনিয়র সহকারী কমিশনার শেখ মোহাম্মদ শামীম বলেন, সিসিটিভির ফুটেজ দেখে এটা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, আমিন এক্সিডেন্ট করেছে। সে যেহেতু পুলিশের ড্রাইভার ছিল সেহেতু আমি তাকে সেমি পুলিশই ভাববো। তার জন্য আমারও খারাপ লাগছে। ওই নারী আমার কাছে সগযোগিতাও চেয়েছে। দেখি কিছু করা যায় কি না। কিছু টাকাসহ একটা চাকরির ব্যবস্থা করা যায় কিনা চেষ্টা করবো।

Tuesday, May 21, 2019

ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি: ‘গেম’ সাগরে ভাসিয়ে বিদায় জানায় ‘গুডলাক ভাই’ by জিয়া চৌধুরী

তরুণ থেকে যুবক, নানা বয়সের মানুষগুলোর স্বপ্ন ইউরোপ। বিপদসংকুল পথ জেনেও ঘর ছাড়েন। তবে, ভয়ঙ্কর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে এদের বেশিরভাগের স্বপ্ন আর পূরণ হয়  না। শুধু তাই নয়, জীবন প্রদীপ নিভে যায় অকালে। মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে খোয়াতে হয় পরিবারের শেষ সম্বলটুকুও। সড়ক ও আকাশপথ ধরে বাংলাদেশ থেকে ইতালিসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে যেতে তাদের প্রথম গন্তব্য লিবিয়া। লিবিয়া পৌঁছানোর পর পাড়ি দিতে হয় ভয়ঙ্কর ভূমধ্যসাগর। সেখান থেকে ইতালি ও আশপাশের ইউরোপের দেশগুলোতে প্রবেশের চেষ্টা থাকে তাদের। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভনে এমন শত শত মানুষের স্বপ্নের সলিল সমাধি ঘটে ভূমধ্যসাগরে। অবৈধ পথে ইউরোপ যাত্রার পরতে পরতে এমন মৃত্যুফাঁদ জেনেও বাংলাদেশি একটি চক্র লিবিয়া নিয়ে যাচ্ছে তাদের।
অবৈধ পথে মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত তিনজনকে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসে ভয়াবহ তথ্য। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলিতে থাকা ‘গুডলাক ভাই’ নামে কথিত এক বাংলাদেশি ভূমধ্যসাগর হয়ে অবৈধ পথে ইউরোপে মানব পাচার চক্রটির মূলহোতা বলে জানা গেছে। লিবিয়া ও বাংলাদেশ থেকে চক্রটি তাদের কাজ চালায়। মূলত তিন ধাপে তাদের ইউরোপ পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। প্রথম দুই ধাপে সরাসরি যুক্ত থাকে বাংলাদেশি চক্রটি। তৃতীয় ও শেষ ধাপে লিবিয়ার লোকজন নৌকায় করে তাদের ভূমধ্যসাগর পার করানোর চেষ্টা করে। বাংলাদেশ ও লিবিয়া দুই দেশ মিলিয়ে অন্তত ১০০ জন এই চক্রের হয়ে কাজ করে বলেও র‌্যাব ও গোয়েন্দা সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। কোটি কোটি টাকার অবৈধ এই ব্যবসায় ঢাকা ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেকে চক্রটির এজেন্ট হিসেবে কাজ করে। তবে ইউরোপে মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকা তিনজনকে গ্রেপ্তারের পর এই চক্রের মূলহোতা ‘গুডলাক ভাই’ সম্বন্ধে জানতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই চক্রের বাকিদের ধরতে এর মধ্যে ঢাকা ও বিভিন্ন এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
মানবপাচারকারী চক্রটি বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ লোক পাঠাতে তিনটি রুট ব্যবহার করে। প্রথমে, ঢাকা থেকে ইস্তাম্বুল হয়ে লিবিয়াতে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি ইস্তাম্বুলে পাঠানো সম্ভব না হলে আকাশ বা সড়কপথে ভারতে নিয়ে পরে সেখানে পাঠায়। সবশেষ ধাপটি তুলনামূলক ব্যয়বহুল। প্রথম দুটি রুটে কাজ করা না গেলে, তৃতীয় রুটে লোক পাঠায় মানবপাচারে চক্রটি। এই রুটে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপগামীদের পাঠানো হয় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে। দুবাই থেকে আকাশ পথে যেতে হয় জর্ডান। মূলত সেখান থেকে আকাশ বা সড়কপথে ইউরোপগামীদের পাঠানো হয় লিবিয়ায়। বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ যেতে ইচ্ছুক এসব মানুষদের লিবিয়া পৌঁছানোকে প্রথম ধাপ হিসেবে কাজ করে মানব পাচার চক্র। লিবিয়ার ত্রিপোলিতে পৌঁছানোর পর তাদের দেখভাল করে কথিত বাংলাদেশি ‘গুডলাক ভাই’।
এই গুডলাক ভাইয়ের আসল নাম নাসির উদ্দিন, বাংলাদেশের নোয়াখালীতে তার গ্রামের বাড়ি বলে জানতে পেরেছে গোয়েন্দারা। নাসির উদ্দিনের ছোট দুই ভাই মনজু ও রিপন এই চক্রের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করে। নাসির উদ্দিন ওরফে গুডলাক ভাই দীর্ঘদিন ধরে লিবিয়ার ত্রিপোলিতে বসেই চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার দুই ভাই মনজু ও রিপন কখনো লিবিয়া আবার কখনো বাংলাদেশে বসে পুরো প্রক্রিয়া দেখভাল করে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, লিবিয়া পৌঁছানোর পর দ্বিতীয় ধাপের কাজ শুরু করে ‘গুডলাক ভাই’র গ্যাং। ত্রিপোলি থেকে এসব ইউরোপগামীদের নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার উপকূলীয় এলাকায়। ভূমধ্যসাগরের পাড়ের নিরাপদ এলাকা থেকে নৌযানে করে তাদের পাঠানোর চেষ্টা করা হয় ইতালি ও ইউরোপের অন্যান্য দেশে। তবে ভূমধ্যসাগর উপকূলে আরেক চক্রের হাতে এসব বাংলাদেশিদের তুলে দেয় ‘গুডলাক ভাই’। এখানে শুরু হয় তাদের কথিত ‘গেইম’ ট্র্যাপ।
চক্রটি ভয়ঙ্কর ভূমধ্যসাগরের জলপথ পাড়ি দেয়ার এই জীবন-মরণ খেলার নাম দিয়েছে ‘গেইম ট্র্যাপ’। মূলত লিবিয়ার উপকূলীয় এলাকায় ইউরোপে যেতে ইচ্ছুক মানুষদের ‘গেইম ট্র্যাপে’ বিদায় জানায় বাংলাদেশি নাসির উদ্দিন। এমন বিদায় জানানোর প্রক্রিয়া থেকে নাসির উদ্দিনের নাম হয়ে যায় ‘গুডলাক ভাই’। পাশাপাশি এই নামেই পরিচিত হয় চক্রটি। লিবিয়ার উপকূল থেকে ইউরোপ পৌঁছাতে দায়িত্ব দেয়া হয় লিবিয়ার আরেক চক্রকে। তাদের দায়িত্ব ইউরোপগামীদের ইতালি ও আশপাশের দেশে প্রবেশে সহায়তা করা। তবে, এমন ভয়ঙ্কর চেষ্টায় অনেকে সাগরেই মারা যায় বলে এই পথে যাত্রার নাম গেইম ট্র্যাপ। পুরো প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে আট থেকে দশ লাখ টাকা দিতে হয় ‘গুডলাক ভাই’ চক্রকে। তবে লিবিয়ায় বসে নিয়ন্ত্রণ করলেও দেশের নানা প্রান্তে পাচারকারীদের এজেন্ট ছড়িয়ে আছে বলে জানতে পেরেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব এজেন্ট জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের টোপ ফেলে। ইউরোপ যেতে ইচ্ছুকদের সঙ্গে পাচার চক্রের সদস্যদের সাথে দেখা করিয়ে দেয় লোকাল এজেন্টরা। ইউরোপগামীদের পাচার চক্রের হাতে তুলে দিলে এজেন্টদের পকেটে আসে অর্থ, জনপ্রতি ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা।
তবে, লিবিয়ায় বসে নিয়ন্ত্রণ করলেও গুডলাক ভাই চক্রের বাংলাদেশি সদস্যদের ধরতে এর মধ্যে র‌্যাব নজরদারি শুরু করেছে বলে জানা গেছে। মানবপাচার চক্রের বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাব-১ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম মানবজমিনকে বলেন, এই চক্রের নেটওয়ার্ক অনেক বিস্তৃত। আমরা পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে সবাইকে আইনের আওতায় আনতে কাজ করে যাচ্ছি। র‌্যাব জানায়, পৃথক আরেকটি চক্রের হোতা মিরাজ হাওলাদার। মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার বাসিন্দা মিরাজ লিবিয়ায় বসে চক্রটির মাধ্যমে ইউরোপ পাঠানোর নামে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এছাড়া সেখানে আটকে রেখে নির্যাতনের মাধ্যমে দেশে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মিরাজের চক্র। এই চক্রের বিরুদ্ধে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসে অসংখ্য ভুক্তভোগী অভিযোগ দিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব বিষয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান গতকাল রাতে মানবজমিনকে বলেন, চক্রের বাকি সদস্যদের ধরতে কার্যক্রম চলছে। সিলেটে ও শরীয়তপুরে মানবপাচার আইনে দুটি আইনে মামলা হয়েছে। যাদেরই জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া যাবে আমরা তাদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।
উল্লেখ্য গত ৯ই মে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে অন্তত ৪০ বাংলাদেশী নিখোঁজ রয়েছেন। একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে ৪০ জনের সবাই পানিতে ডুবে মারা গেছেন। দুটি নৌকায় করে ১৩০ বাংলাদেশী ইতালি যাত্রা করেছিলেন লিবিয়ার ত্রিপলী উপকূল থেকে। একটি নৌকা ইতালি উপকূলে পৌঁছতে পারলেও অন্যটি ভূমধ্যসাগরে ডুবে যায়।

শাফিন বাঁচবে কি করে? by জিয়া চৌধুরী

মুহূর্তেই এলোমেলো হয়ে গেলো মুক্তার ও সালমার জীবন। অমাবস্যার কালো ছাঁয়ায় ঢেকে গেছে তাদের স্বপ্ন। একমাত্র সন্তান শাফিন। মাত্র পাঁচ বছর বয়স তার। গ্যাসের আগুনে তার মা, বাবা এখন জন্ম মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। মৃত্যু কি শাফিন জানেনা। বুঝেনা এর অর্থ। মা বাবা ছাড়া শাফিন দুটি দিন পার করেছে। মা, বাবাকে খুঁজে ফিরছে শাফিন। তাকে বলা হয়েছে তারা বেড়াতে গেছেন। তাতেই তার মন বিষাদে ঢাকা। ক্ষণে ক্ষণে কেঁদে উঠছে। এইতো গত জানুয়ারি থেকে স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে শাফিন। ইউনিফর্ম, সাদা কেডস-মোজা পরে, কাঁধে ব্যাগ চেপে সকাল সকাল মায়ের আঙ্গুলে ধরে স্কুলে যেত। বাসার কাছেই স্কুল।  শাফিনের কচি হাত মুঠিতে শক্ত করে রোজ স্কুলে নিয়ে যেতেন সালমা। ছুটি হলে আবার স্কুল থেকে বাসায়।
গত বৃহস্পতিবারও মায়ের সঙ্গে পশ্চিম আগারগাঁও এলাকার কর্ডিয়াল ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে যায় শাফিন। ওই দিনই পশ্চিম আগারগাঁওয়ের বাসায় গ্যাস থেকে লাগা আগুনে দগ্ধ হন শাফিনের বাবা মুক্তার হোসেন (৩৮) ও মা সালমা (২৮)।  দুজনই এখন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসা চলছে তাদের। দুজনের শরীরই প্রায় ৯৫ ও ৯৭ ভাগ পুড়ে যাওয়ায় আশা ছেড়ে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। হাসপাতালের বিছানায় সালমার আকুতি, তোমরা আমরা পোলাডারে দেইখা রাইখো। পাশের বিছানায় স্বামী মুক্তার হোসেন শুয়ে থাকলেও তার মুখে কোন শব্দ নেই। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। শাফিন জানে না তার বাবা-মা কোথায়? তাকে শুধু বলা হয়েছে, তারা বেড়াতে গেছে। গত শুক্রবার দুপুরে শাফিনদের পশ্চিম আগারগাঁওয়ের বাসায় গিয়ে দেখা গেছে বাসাটি বাইরে থেকে তালা দেয়া। আগুন লাগার পর শেরেবাংলা নগর থানা পুলিশ বাসায় তালা মেরে দিয়ে চলে গেছে।
বাবা মুক্তার হোসেনের এক বন্ধুর বাসায় ঠাঁয় হয়েছে শাফিনের। তার মামা গোলাম হোসেন তাকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখছে। শাফিন শুধু আজ শনিবার মায়ের হাত ধরে স্কুলে যেতে চায়। সেখানে নাজিম, মাহির ও সামিয়ার সঙ্গে দেখা হবে তার। এরা শাফিনের বন্ধু। এদের সঙ্গে সে স্কুলের বিরতিতে সময় কাটায়। বৃহস্পতিবারও স্কুল থেকে শাফিন মায়ের সঙ্গে বাসায় গিয়েছিল। বিকালে পাশের একটি কোচিংয়ে ক্লাস করতো সে। সেদিনও মা সালমা শাফিনকে নিয়ে কোচিংয়ে দিয়ে আসেন। বাসায় ফিরে ইফতারি বানাতে গ্যাসের চুলা ধরান। এরপর তো এক বিভীষিকা। পুরো ঘরে আগুন লেগে যায়। ঘরে ঘুমিয়ে থাকা শাফিনের বাবা মুক্তারও বেশ দগ্ধ হন। স্থানীয় আহসান হাবীবসহ কয়েকজন মিলে শাফিনের বাবা-মাকে নিয়ে যান শেরেবাংলা নগরের শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। চিকিৎসকরা সেখান থেকে পাঠিয়ে দেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ণ ইউনিটে। এখন সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে হচ্ছে স্বামী-স্ত্রীকে। ঘটনা শুনে মুক্তারের শ্বশুরবাড়ির লোকজন ছুটে এসেছেন। পালা করে হাসপাতাল ও শাফিনকে সময় দিচ্ছেন।
শাফিনের বাবা-মায়ের এমন পরিণতি নিয়ে পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া।  মাইনুল ইসলাম রাসেল নামে একজন জানান, মুক্তার ছিল আমাদের এলাকার সবচেয়ে সজ্জন ব্যক্তি। তাকে পছন্দ করতো না এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। তাদের এমন অবস্থায় ছেলেটার কি হবে সেটাই এখন চিন্তার বিষয়। কিন্তু বাবা-মায়ের এমন কষ্ট এখনো শাফিনকে ছুঁতে পারেনি। পছন্দের স্মার্টফোনে সে এখনো আনমনে ভিডিও গেমস খেলে চলেছে। বড় হয়ে কি হতে চাও এমন প্রশ্নে শাফিন জানায় সে পুলিশ হতে চায়। কেন? এমন প্রশ্নে শুধুই হাসি। শাফিনের এই হাসিটা যেন কোনভাবে মিইয়ে না যায় এ প্রার্থনা স্বজন ও  প্রতিবেশির।

Wednesday, May 15, 2019

ছিনতাইকারীরা নিয়ে গেল সাত তরুণের ‘স্বপ্ন’ by জিয়া চৌধুরী

সাত তরুণের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানড্রয়েড টোটো কোম্পানি: এটিসি’। বাজারে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক যেকোনো নতুন পণ্য এলে তার ভিডিও রিভিউ বানায় আশিকুর রহমান তুষারের এই প্রতিষ্ঠান। মুঠোফোন, গ্যাজেট, ল্যাপটপ, ডিএসএলআর ক্যামেরা অথবা গেমিং সফ্‌টওয়্যারের মতো প্রযুক্তি পণ্যের ভালো-মন্দ তথ্য তুলে ধরে ইউটিউব-ফেসবুকে ছাড়েন এটিসির  সদস্যরা। এসব রিভিউ থেকে নিজের পছন্দের পণ্য বেছে নেয়া সহজ হয় গ্রাহকদের। অনেকটা শখের বসে শুরু করলেও ‘এটিসি’ এখন প্রায় ৩৫ তরুণের স্বপ্নের কারখানাও। পড়াশোনার চালিয়ে যাবার পাশাপাশি নিজেদের আগ্রহ আর অভিজ্ঞতায় কিছুটা আর্থিক লাভের মুখও দেখতে শুরু করেছে এটিসির সদস্যরা। তবে, গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুরে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে ম্লান হতে বসেছে এসব তরুণদের স্বপ্ন। কৌশলে নম্বরপ্লেট ছাড়া মোটরসাইকেল ব্যবহার করে ছিনতাই মিশনে যোগ দেয় দু’জন। প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে মিরপুর মডেল থানার পাশে এমন ছিনতাইয়ের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। তবে ঘটনাটিকে ছিনতাই মানতে নারাজ মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তার মতে এটি ছিনতাই নয় চুরির ঘটনা। এটিসি’র উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান তুষার গতকাল মানবজমিনকে জানান, বাজারে আসা নতুন একটি মুঠোফোনের ভিডিও রিভিউ বানাতে মিরপুরের একটি রেস্তোরাঁয় যাচ্ছিল তার দলের দুইজন সদস্য। এদের একজনের সঙ্গে কালোব্যাগে ছিল দুইটি ক্যামেরা, দুটি লেন্স একটি নতুন স্মার্টফোন ও কিছু তথ্যপ্রযুক্তি পণ্য। মিরপুর ৬০ ফিট সড়ক দিয়ে রিকশায় করে মিরপুর দুই নম্বর এলাকায় যাওয়ার সময় একটি মোটরসাইকেল ছোঁ মেরে ব্যাগটি নিয়ে যায়। ব্যাগে প্রায় আড়াই লাখ টাকা দামের জিনিসপত্র ছিল বলেও জানান আশিকুর রহমান তুষার। তিনি মানবজমিনকে বলেন, কয়েক বছর ধরে তিলে তিলে ছোট্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছি। আমাদের টিমের প্রত্যেক সদস্যই কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। অথচ ছিনতাইকারীদের এক মুহূর্তের ছোবলে আমাদের অন্তত ৩৫জন তরুণের স্বপ্ন ভেস্তে যেতে বসেছে। ছিনতাইয়ের ঘটনার পরে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করেছেন তারা। তবে, মিরপুর মডেল থানা পুলিশ আন্তরিক হলে ছিনতাইকারীদের ধরা সম্ভব বলেও জানান আশিকুর রহমান তুষার। ছিনতাইয়ের ঘটনার সময় রিকশায় থাকা এটিসি’র সদস্য জুলফিকার রহমান রিফাত হতাশার সুরে জানান, কি আর বলবো? হাসিখুশি সকালটা এক নিমিষেই দুঃখে পরিণত হলো। দুপুর আড়াইটার দিকে মিরপুর ৬০ ফিট থেকে রিকশায় করে পিজ্জাবার্গে একটি মুঠোফোনের ভিডিও রিভিউ বানাতে যাচ্ছিলাম আমরা দু’জন। ক্যামেরা-লেন্স, মোবাইল সব একটা ক্যালো ব্যাগে আমার কাছে ছিল। মনিপুরের একটু আগে ইফা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে হঠাৎ একটা মোটরবাইক এসে আমাদের ক্রস করে যাবার সময় হাত থেকে ছোঁ মেরে ব্যাগটা নিয়ে দ্রুত চলে যায়। ব্যাগ টান দেয়ায় আমিও রিকশা থেকে পড়ে যাই। সামনে তাকালে দেখতে পাই মোটরসাইকেলটিতে কোন নম্বরপ্লেট নেই। পরে আরেকজন মোটরসাইকেল আরোহীর সাহায্য নিয়ে ছিনতাইকারী মোটরসাইকেলটির পেছন পেছন যেতে থাকি। কিন্তু তারা দ্রুত গলির ভিতরে ঢুকে যাওয়ায় ছিনতাইকারীদের শেষ পর্যন্ত ধরতে পারিনি। রিফাত জানান, ব্যাগে সনি আলফা এ৬৩০০, সনি আলফা এ৬৫০০ মডেলের দুটি ক্যামেরা, কিট ও সিগমা লেন্স, পাওয়ার ব্যাংক, আইটেল স্কাইপি মডেলের মুঠোফোন এবং আরো কিছু প্রযুক্তিপণ্য ছিল ব্যাগটিতে। ছিনতাইকারীদের দুজনের মাথায় কালো রংয়ের হেলমেট ছিল, পেছনে থাকা ছিনতাইকারীর পরণে ছিল কালো শার্ট ও কমলা রংয়ের প্যান্ট। পরে ঘটনার আদ্যোপান্ত জানিয়ে মিরপুর মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন এটিসির’র উদ্যোক্তা আশিকুর রহমান তুষার। ছিনতাইকারীরা আগ থেকে তাদের ফলো করছিল বলেও ধারণা করছেন এটিসির সদস্যরা। তবে, ছিনতাইকারীদের মোটরসাইকেলে নেমপ্লেট না থাকায় বিপাকে পড়তে হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের। একটি সূত্রে জানা গেছে, চক্রটি বহুদিন ধরে মিরপুর এলাকায় ছিনতাই করে আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার এড়াতে নম্বরপ্লেট ছাড়া মোটরসাইকেলে করে ছিনতাই করে চক্রের সদস্যরা। একই সঙ্গে দুজনে হেলমেট পরা থাকায় তাদের চিহ্নিত করাও কঠিন হবে বলে জানিয়েছেন পুলিশের একজন সদস্য। মিরপুর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দাদন ফকির গতকাল রাতে মানবজমিনকে বলেন, আইনের ভাষায় এটা ছিনতাইয়ের মধ্যে পড়ে না। কোন ব্যক্তিকে জোর করে কোন কিছু কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে কোন কিছু নিয়ে গেলে সেটাকে আমরা ছিনতাইয়ের মধ্যে ধরবো। তবে, গতকাল মনিপুর এলকায় যেটা ঘটেছে সেটা ছিনতাই নয় চুরি। চলন্ত অবস্থায় কোন কিছ টান দিয়ে নিয়ে গেলে এটা চুরির মধ্যেই পড়ে। তারপরও আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেবো। এদিকে, ছিনতাইয়ের ঘটনার আশপাশে থাকা সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানান আশিকুর রহমান তুষার। আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি অনুরোধ করে বলেন, আমাদের ঈদটাকে মাটি করবেন না। এত বছর ধরে পরিশ্রম করে দাঁড় করানো এই ভিত্তিটাকে ভেঙে দিবেন না। দয়া করে আমাদের জিনিসগুলো ফিরে পাবার ব্যবস্থা করুন।

Saturday, May 4, 2019

উবারের বিরুদ্ধে অভিযোগের পাহাড় by জিয়া চৌধুরী ও শাহনেওয়াজ বাবলু

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চালু রয়েছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস অ্যাপ’। মোটরসাইকেল ও গাড়িতে নগরীর বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে শুরুর দিকে এসব অ্যাপ স্বস্তি দিলেও এখন মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৩শে এপ্রিল রাজধানীর শ্যামলী এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লাবণ্য নিহত হলে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানগুলোর নানা অনিয়ম ও সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ওই ঘটনায় শিক্ষার্থীকে বহনকারী ‘উবার মোটো’র চালক নিজের তথ্য গোপন করে রাইড শেয়ারিং অ্যাপে নিবন্ধন করেন বলে জানান, ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার। গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, উবার চালক সুমন হাসপাতালে যে ঠিকানা দিয়েছিলেন সে ঠিকানা ছিল ভুয়া। এমনকি যে ঠিকানা দিয়ে বিকাশ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে সেই ঠিকানায়ও তাকে পাওয়া যায়নি।
এছাড়া উবার অফিসে যে ঠিকানা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করেছিলেন সেটিও ভুয়া। তিনি বলেন, উবারের অফিসে ভুয়া ঠিকানা দিয়ে রাইডাররা নিবন্ধন করে সড়কে রাইড শেয়ারিং করার অনুমতি পায়।
রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলো কোন রকম যাচাই বাছাই ছাড়া চালকদের অনুমতি দিচ্ছে। এসব চালকদের মধ্যে অনেকেই দক্ষ চালক না। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মাদক সেবন করে। নারীদের বাইকে তুলে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে অযথা ব্রেক ধরে। আরোহীদের জন্য নিম্নমানের হেলমেট দেয়া হয়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও বলেন, চালক সুমন ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করায় তাকে খুঁজে পেতে পুলিশকে বেগ পেতে হয়েছে। তাকে আটক করতে পুলিশের অনেক সময়ও লেগেছে। উবার কর্তৃপক্ষও প্রথম দিকে কোন সহযোগিতা করেনি বলেও অভিযোগ করেন বিপ্লব কুমার সরকার। এই পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্যের সূত্র ধরে মানবজমিন গত দুই দিন ধরে রাজধানীতে রাইড শেয়ারিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান উবারের নানা অনিয়ম বিষয়ে খোঁজ নেয়া শুরু করে। অন্তত ৫০ জন চালক ও যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে।
অনুসন্ধানে দেখা যায় ‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭’র বেশিরভাগ নিয়ম মানছে না রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠান উবার ও তাদের অধীনে থাকা চালকরা। অন্যের ড্রাইভিং লাইসেন্সে নিবন্ধন, ভুল ঠিকানায় নিবন্ধন, মোটরসাইকেল ও গাড়ি চালনায় অভিজ্ঞতা না থাকা, পরীক্ষা না করেই যাকে-তাকে নিবন্ধনের সুযোগ করে দেয়া, যাত্রীদের অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা না নেয়াসহ নানা অভিযোগ পাওয়া গেছে উবারের বিরুদ্ধে। রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানটির চালকরাই মানবজমিনকে এসব অভিযোগের কথা বলেছেন। অনেকে বলছেন এখন কিছুটা কড়াকড়ি করা হলেও শুরুর দিকে যারা ভুয়া কাজগপত্র ও তথ্য দিয়ে নিবন্ধন করেছেন তারা প্রতিষ্ঠানটির সুনাম নষ্ট করছে। এছাড়া কাঙ্খিত গন্তব্যে না যেতে চাওয়া, একই দুরত্বে অন্য কোম্পানির চেয়ে দ্বিগুন ভাড়া নেয়া ও বিভিন্ন অভিযোগে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। মাগুরা থেকে ঢাকায় আসা কামরুল ইসলাম(ছদ্মনাম) মাস তিনেক হয় উবারে মোটরসাইকেল চালাচ্ছেন।
নগরীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে মানুষকে পৌঁছে দেন। তিনি গতকাল মানবজমিনকে জানান, নিজের মোটরসাইকেল ও ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলেও উবার তাকে নিবন্ধন করেছে। সেক্ষেত্রে অন্য আরেকজনের নামে নিবন্ধন নিতে হয়েছে তাকে। অনেক দিন ধরে বেকার জীবনযাপন করায়, বাধ্য হয়ে অনিয়ম করেই উবারে নিবন্ধন করতে হয়েছে বলেও দাবি করেন কামরুল। তিনি বলেন, আমি ভুল কাগজপত্র দিয়ে নিবন্ধন করলেও উবার এজন্য কোন অংশে কম দায়ী নয়। এর আগে কখনো মোটরসাইকেল চালনার অভিজ্ঞতা না থাকলেও শুধুমাত্র রাইডার বাড়ানো ও নিজেদের মুনাফার জন্য উবার এরকম শ’ শ’ তরুণদের নিবন্ধন করাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তিনি। আরেকজন চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উবারের ধানমন্ডি অফিস থেকে তিনি নিবন্ধন নিয়েছেন। ড্রাইভিং পরীক্ষার কোন ব্যবস্থা বা কাগজপত্র যাচাইয়ের কোন বালাই নেই বলেও জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন চালক।
‘রাইড শেয়ারিং সার্ভিস নীতিমালা ২০১৭’র অনুচ্ছেদ ক: রাইড শেয়ারিং সার্ভিস পরিচালনার শর্তাবলী’র ৬ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, রাইড শেয়ারিং সার্ভিসের ব্যবহৃত মোটরযানের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যেমন: রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, ফিটনেস সার্টিফিকেট, ট্যাক্স টোকেন, ইনসিওরেন্স ও এনলিস্টমেন্ট সার্টিফিকেট ইত্যাদি হালনাগাদ থাকতে হবে। তবে, বেশিরভাগ মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে এমন নিয়ম মানা হচ্ছে না। কেন নিয়ম মানা হচ্ছে না জানতে চাইলে বেশ কয়েকজন চালক বলেন, এসব বিষয়ে উবারের তেমন একটা ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা শুধু নিবন্ধন করাতে চায়, যত বেশি নিবন্ধন তত বেশি মুনাফা। এছাড়া নীতিমালার ক অনুচ্ছেদের আট ধারায় বলা আছে, নির্ধারিত স্ট্যান্ড/অনুমোদিত পার্কিং স্ট্যান্ড ব্যতীত কোন রাইড শেয়ারিং মোটরযান যাত্রী সংগ্রহের উদ্দেশ্যে রাস্তায় যেখানে-সেখানে অপেক্ষমান থাকতে পারবে না অর্থাৎ যাত্রী উঠানামা ব্যতীত এরূপ মোটরযানকে সর্বদা চলাচলরত অবস্থায় থাকতে হবে। এই নিয়মের কোন ধরনের তোয়াক্কাই করছে না উবার মোটোর চালকরা। যেখানে-সেখানে পার্কিং, মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে থেকে যানজট বাড়াচ্ছে এসব চালকরা। তাদের কারণে ট্রাফিক পুলিশের মামলার হারও আগের চেয়ে বেড়েছে।
১০ নম্বর ধারায় উল্লেখিত মোটরযান লাইসেন্স প্রাপ্তির এক বছর সময় অতিক্রান্ত না হলে রাইড শেয়ায়িং সার্ভিসে কেউ নিবন্ধন না পাওয়ার কথা থাকলেও এক্ষেত্রে নিয়ম মানা হচ্ছে না। উবার মোটোর বেশিরভাগ মোটরসাইকেলই নতুন করে কেনা এবং অনেকে ঢাকার বাইরে থেকে এসে নতুন মোটরসাইকেল কিনে কাজে নেমে পড়ছেন। নীতিমালার অনুচ্ছেদ ‘খ’র ৫ ধারায় বলা আছে, বিআরটিএ’র ওয়েবসাইট ও রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের অ্যাপসে অভিযোগ দায়ের ও নিষ্পত্তির গতিবিধি অনুসরণের সুবিধাসহ সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগে বলা হয়, বিআরটিএ ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান এসব বিষয়ে অনলাইনে অবহিত করে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ শুধু দুঃখ প্রকাশ করে দায় সারে বলে দাবি করেন অনেক অভিযোগকারী। একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক নারী জানান, একবার মোটরবাইকে সেবা নিলে আমাকে চালক নানা ধরনের কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করে।
পরে, অভিযোগ করলেও উবার থেকে তেমন কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। একবার শুধু আমার সঙ্গে মেইলে যোগাযোগ করে বলা হয়েছিল তারা এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিচ্ছে। এরপর কোন ব্যবস্থার বিষয়ে আমাকে জানানো হয়নি। এছাড়া, নীতিমালার অনুচ্ছেদ ‘ছ’-এ ধূমপান ও মাদকাসক্ত কেউ রাইড শেয়ারিংয়ে নিবন্ধন নিতে পারবে না বলেও উল্লেখ থাকলেও উবার তাদের নিবন্ধন দেয়ার ক্ষেত্রে এসব বিষয়ে কোন প্রশ্ন ও পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়নি। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট দুরত্বে অন্য অ্যাপের চেয়ে দ্বিগুনেরও বেশি ভাড়া কাটা, ক্রেডিট কার্ড সংযুক্ত করলে যাত্রা শুরুর আগেই টাকা কেটে নেয়া, রাইডাররা বার বার ট্রিপ ক্যান্সেল করে দিলেও রাইডারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন অনেক যাত্রী। এছাড়া চালকের দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন অনেকে। বেশিরভাগ ড্রাইভারের রাজধানীর পথঘাট সম্পর্কে ধারণা নেই। আর শহরের অলিগলি না চেনার পাশাপাশি গ্রাম ও শহরে রাইডের গতিবিধি না বুঝেই নিজেদের ইচ্ছেমতো রাইড দেয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন যাত্রীরা। একাধিক সূত্র জানায়, অ্যাপসভিত্তিক রাইড শেয়ারিং পাঠাও-উবারে একই দূরুত্বে সময়ের সঙ্গে ওঠানামা করছে ভাড়ার পরিমাণ। নির্দেশিত ভাড়ার তুলনায় বেশ বাড়তি ভাড়া গুণতে হচ্ছে যাত্রীদের।
উবারে পাঁচ কিলোমিটার দুরুত্বে প্রথম দিন যেখানে ১৮০ টাকা ভাড়া গুণতে হয়েছে যাত্রীদের, পরেরদিন একই দূরুত্বের পথে সেই ভাড়া ২৭৫ টাকা। কিন্তু উবার কল করার সময় সম্ভাব্য ভাড়া দেখানো হয়েছিল ১৭১ টাকা। এমন সব অভিযোগের বর্ণনা দিয়ে উবারের ফেসবুক পেজে আপত্তি জানাচ্ছেন অনেক গ্রাহক। তবে এতে উবার কর্তৃপক্ষ এবং চালকদের তোপের মুখে পড়তে হচ্ছে যাত্রীদের। মো. আশরাফুল ইসলাম নামে একজন যাত্রী মানবজমিনকে বলেন, মিরপুর সাত নম্বর থেকে নাবিস্কোতে প্রতিদিন যাতায়াত করি। সকাল আটটায় ভাড়া আসে ২৩০ টাকা আর রাতে ফেরার সময় ভাড়া লাগে ১২০ টাকা। এমন পার্থক্যের বিষয়ে উবাররে বক্তব্য সকালে ডিমান্ড বেশি থাকে। আমার কথা হলো, তাহলে সিএনজি আর উবারের মধ্যে কোন পার্থক্য আছে কিনা? আবার কোন কোন রাইডার আছেন যাদের নামে রাইড শেয়ারিংয়ের কোন ডকুমেন্ট বা লাইসেন্স নেই। দেখা গেছে গাড়ির লাইসেন্স এবং ডকুমেন্ট রয়েছে একজনের নামে আর রাইডার আরেকজন।
নামে প্রকাশে অনিচ্ছুক এমনই এক রাইডার বলেন, আমি এই পেশায় এসেছি প্রায় ছয় মাস হলো। আমার কোন মোটরবাইক নেই। এক বড় ভাইয়ের মোটরবাইক এবং তার নামে রাইড শেয়ার কোম্পানির সব কাগজপত্র রয়েছে। আমি তার নাম করে এটা ব্যবহার করছি। এমন সব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চেয়ে উবারের বাংলাদেশে থাকা একাধিক অফিসে যোগাযোগ করা হলে কর্মকর্তারা এসব বিষয়ে মন্তব্য করতে পারবেন না বলে জানান। কোন অভিযোগ থাকলে উবারের সেন্ট্রাল মেইলে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করে রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানটি। উবারের নানা অনিয়ম নিয়ে বিআরটিএ’তে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বেশ কিছু অনিয়মের বিষয়ে তারা অবগত বলে জানান। তবে নানা জটিলতায় এসব ব্যাপারে উবারকে তাগাদা দিলেও কোন সুফল মিলছে না বলেও দাবি এই কর্মকর্তার।