Sunday, January 26, 2014

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ইতিহাসের বন্দি by সঞ্জয় কুমার

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ইতিহাসের বন্দি। ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে যে নির্বাচন হলো তা ছিল আওয়ামী লীগের, আওয়ামী লীগের দ্বারা এবং আওয়ামী লীগের জন্য। বাংলাদেশে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে এভাবেই বর্ণনা করা যায়।
জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের অর্ধেকেরও বেশি আসনে প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়েছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। বাকি অর্ধেকে বন্ধুপ্রতিম দলগুলোর সঙ্গে নামমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। এভাবে জাতীয় সংসদে তিন-চতুর্থাংশ  সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ বিজয় ছিল অপ্রত্যাশিত। এটা এমন একটি সংসদ হলো যেখানে দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিরই কোন প্রতিনিধি নেই। এতে আরও বলা হয়, যে সংসদে প্রধান বিরোধীদলীয় জোট নেই তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই- এটাই স্বাভাবিক। এ প্রশ্নটি যেমন বাংলাদেশের ভিতরে উঠছে তেমনি প্রতিধ্বনি তুলছে বাইরেও। দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটির গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন অনেকেই। এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশে একদলীয় নির্বাচন এটাই প্রথম নয়। ১৯৯০ দশকের মধ্যভাগে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তারাও তখন একই রকম নির্বাচন করে বিজয়ী হয়। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তারা সংসদের সবগুলো আসনে বিজয়ী হয়। কিন্তু নিজের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভারে সেই সরকার ভেঙে পড়ে এবং অল্প সময়ের মধ্যে আরেকটি নির্বাচন করে। সেই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরে আওয়ামী লীগ। সঞ্জয় কুমার লিখেছেন, বাংলাভাষী এ দেশটিতে যা ঘটছে তার একটি বিশাল ও জটিল ইতিহাস আছে। উদীয়মান এ জাতির কাছে বার বার ফিরে আসছে সেই ইতিহাস। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে এটি একটি যুদ্ধক্ষেত্র। এখানে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল হলো আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। এ দু’টি দলের মধ্যে পিছনের গভীর অবিশ্বাস ও শত্রুতা সৃষ্টি করেছে সেই রাজনৈতিক লড়াই। আলোচনার প্রথম বিষয় হলো: কেন ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণমূলক হয় নি এবং এতে কেন প্রধান রাজনৈতিক দল অংশ নেয় নি? বিএনপি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন চায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল এমন একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের প্রস্তাব করে যেখানে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি থাকবেন। বিরোধী দল এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে নির্বাচনের আগে পদত্যাগ দাবি করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা সংবিধান থেকে বাতিল করে আওয়ামী লীগ। ২০১১ সালে এ সংক্রান্ত বিধান সংবিধান থেকে বাতিল করে। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে এ রকম সরকারের অধীনেই বাংলাদেশের নির্বাচন হয়েছে। সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করার উদ্যোগে অংশ নেয় নি বিরোধী দল। তারা বুঝতে পেরেছিল এর মাধ্যমে দেশকে কোনদিকে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। তাদের সেই ধারণা সত্য হয়ে বেরিয়ে এসেছে এবারের নির্বাচনে। বাস্তবতা হলো এর আগে সব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। ২০০৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আওয়ামী লীগ একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ওই সময়ের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল সেনাবাহিনী। ওই সরকার তাৎক্ষণিক নির্বাচন দেয়ার পরিবর্তে তাদের মেয়াদ বাড়াতে চেষ্টা করে এবং চেষ্টা করে বাংলাদেশের প্রথিতযশা দু’টি বড় রাজনৈতিক দলকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে। শেখ হাসিনা তখন কারাবরণ করেন। বিএনপিও তখন একই পরিণতি ভোগ করে। কিন্তু ওই সময়ের ঘটনা থেকে কোন দলই কোন শিক্ষা নেয় নি। তাদের মধ্যে অনেক বার সংলাপ হয়েছে। তার কোনটিতে সমঝোতা চেষ্টায় ভূমিকা রাখেন আন্তর্জাতিক মহল। কিন্তু পরস্পরবিরোধী দল দু’টির মধ্যে কোন সমঝোতাই হয় নি। কোন চুক্তিতে একমত হয় নি তারা। ফল হিসেবে, আওয়ামী লীগ নির্বাচন করে। বিএনপি ও তার মিত্র, বিশেষ করে ডানপন্থি জামায়াতে ইসলামী সেই নির্বাচনে বাধা দেয়ার চেষ্টা করে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ৫ শতাধিক মানুষ প্রাণ হারান তিন মাসে। শুধু তা-ই নয়। বিরোধীরা হরতাল, অবরোধ আহ্বান করে। অব্যাহত এসব কর্মসূচিতে অচল হয়ে পড়ে পুরো জাতি। বিভিন্ন রিপোর্টে বলা হচ্ছে যে, জামায়াতে ইসলামীর কট্টরপন্থিরা হিন্দু সমপ্রদায়ের বিরুদ্ধে হামলা করেছে। এই ইতিহাসের কারাগারে বন্দি এখন বাংলাদেশের আধুনিক গণতন্ত্র- এ কথা বলা ভুল হবে না।  তবে যে কেউ প্রশ্ন  করতে পারেন, দেশের বর্তমান অচলাবস্থা কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে? সঞ্জয় কুমার লিখেছেন, এই একই প্রশ্ন নির্বাচনের একদিন পরে সংবাদ সম্মেলনে আমি করেছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। জবাবে তিনি বলেন, এর পুরোটাই নির্ভর করে বিরোধীদের মনোভাবের ওপর। যদি তারা সংলাপ চায় তাহলে কোন পথ বের করা যেতে পারে।
এক্ষেত্রে একমাত্র পথ হচ্ছে নতুন নির্বাচন এবং এমন নির্বাচন অনিবার্য, তা ছয় মাসে হোক বা এক বছরে। বর্তমানে যে সরকার ক্ষমতায় আছে তারা বৈধতার সমস্যায় ভুগছে। সহিংসতা ও অব্যাহতভাবে স্বাভাবিক জীবনতযাত্রা ব্যাহত হওয়ায় নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে মানুষ হতাশ হয়ে উঠেছে। রাস্তায় আপনি যদি একজন সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেন তাহলে তাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো- তারা চান শান্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক। কে হারলো এবং কে জিতলো তাতে তাদের কোন তোয়াক্কা নেই। এমন হতাশা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে না। এতে শুধু সামরিক হস্তক্ষেপের সুযোগই সৃষ্টি হয়। ১৬ কোটি মানুষের এ দেশটি তা থেকে একেবারে নিরাপদ নয়। গণতন্ত্র হলো জনগণ দ্বারা, জনগণ কর্তৃক ও জনগণের জন্য। কিন্তু এ ধারণাটি তখনই সত্যিকার অর্থে ব্যবহার করা যায় যখন সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ থাকে।
সংক্ষেপে বলতে হয়, ২০১৪ সালের এ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক এই চেতনার ঘাটতি রয়েছে।

সঞ্জয় কুমার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক নয়া দিল্লি ভিত্তিক সাংবাদিক। তিনি এশিয়া প্রশান্ত অঞ্চলভিত্তিক ম্যাগাজিন ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর একজন প্রতিবেদক।
(২৪শে জানুয়ারি দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ইলেকশনস ২০১৪:  হোয়ার ডেমোক্রেসি ইজ এ প্রিজনার অব হিস্ট্রি’ শীর্ষক লেখার অনুবাদ)

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ইতিহাসের বন্দি by সঞ্জয় কুমার

বাংলাদেশের গণতন্ত্র ইতিহাসের বন্দি। ৫ই জানুয়ারি বাংলাদেশে যে নির্বাচন হলো তা ছিল আওয়ামী লীগের, আওয়ামী লীগের দ্বারা এবং আওয়ামী লীগের জন্য। বাংলাদেশে সমপ্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে এভাবেই বর্ণনা করা যায়।

আওয়ামী লীগের টার্গেট ইমেজ উদ্ধার by লুৎফর রহমান

ইমেজ উদ্ধারের টার্গেট নিয়ে সামনে যেতে চায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। আপাতত সরকারের মেয়াদ নিয়েও ভাবছে না ক্ষমতাসীন দল।

আওয়ামী লীগের টার্গেট ইমেজ উদ্ধার by লুৎফর রহমান

ইমেজ উদ্ধারের টার্গেট নিয়ে সামনে যেতে চায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। আপাতত সরকারের মেয়াদ নিয়েও ভাবছে না ক্ষমতাসীন দল।
বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় মধ্যবর্তী নির্বাচন দেয়াকে সুবিধাজনক মনে হলে নির্বাচন আয়োজনেও আপত্তি থাকবে না তাদের। তবে এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং সংলাপ ইস্যুতে বিরোধী জোটকে ব্যস্ত রেখে দল এবং সরকারের ইমেজ উদ্ধারের চেষ্টা করবে আওয়ামী লীগ। এ লক্ষ্যে দলীয় এবং সরকারের আলাদা পরিকল্পনাও নেয়া হয়েছে। দলীয় পরিকল্পনার মধ্যে আছে বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন নেতাদের বাদ দিয়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠন। এছাড়া বিগত সরকারের নেয়া অসমাপ্ত মেগা প্রকল্পগুলো দ্রুত সময়ে সম্পন্ন করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে দৃশ্যমান করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক রেখে সামনে এগোবার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। একই সঙ্গে বিগত সরকারের যেসব মন্ত্রী-এমপিদের প্রতি দলের নেতাকর্মী ও ভোটারদের ক্ষোভ ছিল কৌশলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে রাখা হয়েছে। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদ, সংসদের গুরুত্বপূর্ণ পদে সমালোচিত নেতাদের রাখা হয়নি। আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের নেতারা মনে করছেন, সরকার কত দিন চলবে এটি নির্ভর করবে পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। যত দিন নিরাপদে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারে নতুন সরকার, ততদিন দায়িত্ব পালন করে যাবে। এক্ষেত্রে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে মানুষের ভাল ইমেজ গড়ার চেষ্টা করা হবে। এটি করা সম্ভব হলে যখনই নির্বাচন হোক না কেন এতে ফল আওয়ামী লীগের ঘরেই আসবে। দলের একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সরকারের মন্ত্রী বলেন, সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে। সাংবিধানিকভাবে পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার অধিকার আছে। তবে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনে যে কথা বলা হচ্ছে তা নির্ভর করবে পরিবেশ পরিস্থিতির ওপর। বিরোধী জোট যদি সহিংস কর্মসূচি বাদ দিয়ে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করে তাহলে সংলাপ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের কোন আপত্তি নেই। সরকার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে চলার চেষ্টা করবে বলে জানান তিনি। সরকারের এ মন্ত্রী জানান, দলের মন্ত্রী-এমপিদের অনেকের প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা ছিল। নতুন সরকারে তাদের সেভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র জানিয়েছে, বিগত পাঁচ বছরে সাংগঠনিক যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল তা দ্রুতই কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হবে। বিতর্কিত ও জনবিচ্ছিন্ন নেতাদের সরিয়ে নতুন নেতৃত্বকে সামনে আনা হবে। এক্ষেত্রে চলতি বছরে বিশেষ কাউন্সিলও আহ্বান করা হতে পারে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচিত পদে তরুণ ও ত্যাগী নেতাদের নির্বাচিত করারও চেষ্টা করা হবে দলীয়ভাবে। এজন্য উপজেলা নির্বাচনে দলের একক প্রার্থী রাখার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে কেন্দ্র থেকে। দলের নির্দেশনার বাইরে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে। সূত্র বলছে, উপজেলা নির্বাচন শেষ হলে জেলা পরিষদের নির্বাচনের উদ্যোগ নেয়া হবে। দীর্ঘ দিন থেকে প্রশাসক দিয়ে চলা জেলা পরিষদের দলের নেতাদের নির্বাচিত করে আনার পরিকল্পনা রয়েছে আওয়ামী লীগের। এদিকে সরকারের কর্মপরিকল্পনার রয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের নির্বাচন দাবিকে অন্যান্য ইস্যু দিয়ে চাপা দিয়ে রাখা, নির্বাচন ও নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে সংগঠিত সহিংস গঠনার বিচার ও দায়ীদের আইনের আওতায় আনা। পদ্মা সেতুর কাজ শুরু করা, কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়। সূত্রমতে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সার্বিক দিক প্রধানমন্ত্রী নিজেই তদারক করছেন। এজন্য শুরু দিকে এ মন্ত্রণালয়ে শুধু প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীই দেবেন। সরকারের শুরুতে কূটনৈতিক চাপ এড়ানোর অংশ হিসেবে এ মন্ত্রণালয়ে পূর্ণ মন্ত্রী নিয়োগ দেয়া হয়নি। এ মন্ত্রণালয়ের সার্বিক কার্যক্রমও প্রধানমন্ত্রী সরাসরি তদারিক করছেন। এক্ষেত্রে তার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী সহায়তা করছেন। আপাতত প্রতিমন্ত্রীকে এ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব দেয়া হলেও নির্বাচনকালীন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে কিছুদিনের মধ্যেই এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব দেয়া হতে পারে। বিগত সরকারের বিতর্কিত মন্ত্রীদের অনেকে বাদ পড়েছেন দলীয় পরিকল্পনার আলোকে। অপেক্ষাকৃত অনভিজ্ঞদের মন্ত্রণালয়ে আনাও একই লক্ষ্য থেকে। জাতীয় সংসদে চিফ হুইপ পরিবর্তন করা হয়েছে। হুইপদেরও সরিয়ে নতুনদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দশম সংসদের সংসদীয় কমিটিগুলোর চেয়ারম্যান নিয়োগের সময় স্বচ্ছ এবং ভাল ইমেজের এমপিদের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কোন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত কাউকে ওই মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগ করা হবে না। সরকারি সূত্র বলছে, দু্রততম সময়ের মধ্যেই সরকার দৃশ্যমান উন্নয়নকাজ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শুরুকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বলে তৎপরতা শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। রাজধানীতে নির্মাণাধীন ফ্লাইওভারগুলোর কাজও দ্রুত শেষ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।  ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চার লেন কাজ দ্রুত শেষ করার পরিকল্পনা নিয়েছে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়। এদিকে কম ভোটার উপস্থিতি ও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রেকর্ডসংখ্যক প্রার্থী এমপি হওয়ায় নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে বিতর্ক এবং গ্রহণযোগ্যতার সঙ্কট রয়েছে তা কাটিয়ে উঠতে কূটনৈতিক তৎপরতাও জোরদার করা হয়েছে। সরকারের নীতি নির্ধারকদের মতে, ইতিমধ্যে অনেক দেশ নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত থাকলে যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশের মনোভাবও পরিবর্তন হবে বলে মনে করছেন সরকারের নীতি নির্ধারকরা। আর এ লক্ষ্য দিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও শুরু হয়েছে। এছাড়া বিগত সময়ে কিছু দাতা সংস্থার সঙ্গে সরকারের টানাপড়েন থাকলেও সামনে তাদের পরামর্শকে ইতিবাচক হিসেবে ধরে এগোতে চায় নতুন সরকার। এ জন্য দাতাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রকল্প প্রণয়ন ও অর্থায়নে গুরুত্ব দেয়ার কথাও ভাবা হচ্ছে। এদিকে দাতা ও বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর চাপেই বিরোধী দলের সভা-সমাবেশে বাধা দেয়া থেকে সরে আসছে সরকার। একই সঙ্গে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা থেকে নেতাদের জামিন ও মুক্তির ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে না। সূত্র বলছে, সার্বিক ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক আবহ তৈরি হলে তা সরকারি দলের জন্য পরবর্তী নির্বাচন বৈতরণী পার হওয়া সহজ হবে। এমন একটি পরিবেশ তৈরিই এখন সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য।

ঘুরে দাঁড়াতে বিএনপির কৌশল by কাফি কামাল

রাজনীতি ও আন্দোলনে ঘুরে দাঁড়াতে তিন লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। সারা দেশে সাংগঠনিক ভিত্তি সুসংহত, স্থানীয় নির্বাচন ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে জনমত জোরদার করতে চায় দলটি।

ঘুরে দাঁড়াতে বিএনপির কৌশল by কাফি কামাল

রাজনীতি ও আন্দোলনে ঘুরে দাঁড়াতে তিন লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে বিএনপি। সারা দেশে সাংগঠনিক ভিত্তি সুসংহত, স্থানীয় নির্বাচন ও জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে জনমত জোরদার করতে চায় দলটি।
৫ই জানুয়ারি একতরফা নির্বাচনের পর নতুন উদ্যমে পথ চলতেই এ প্রস্তুতি চলছে বিএনপিতে। স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল ও কাউন্সিলে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামতের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি। ফলে এ মুহূর্তে সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে কাউন্সিল ও স্থানীয় নির্বাচন। বিরোধী জোটের নেতারা মনে করেন, একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বর্তমান সরকার এক বছরের বেশি সময় স্থায়ী হতে পারবে না। ২৩শে জানুয়ারি চিকিৎসক প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকে খোদ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া এমন মন্তব্য করেছেন। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আমলে নানা ইস্যুতে আন্দোলন করেছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮দল। এক পর্যায়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের একক দাবিতে পরিচালিত হয় তাদের চূড়ান্ত আন্দোলন। এ দাবিকে সফল করতে সারা দেশে রোড মার্চসহ অন্তত দুইবার সফর করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। চারদলীয় জোটের পরিধি বেড়ে ১৮দলীয় হয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে পেয়েছে সাফল্য। সরকারের কঠোর অবস্থানের মুখে শেষ সময়ে আন্দোলনের মাঠে দাঁড়াতেই পারেনি বিরোধী নেতাকর্মীরা। বিএনপি নেতারা জানান, বিরোধী দলের অবস্থান থেকে দেশে ইতিবাচক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার একটি প্রচেষ্টা ছিল বিএনপির। কিন্তু সরকার বিরোধী দলসহ দেশের বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, পেশাজীবীসহ সাধারণ মানুষের মতামতের তোয়াক্কা করেনি। এমনকি বন্ধু রাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উদ্যোগেও ইতিবাচক সাড়া দেয়নি সরকার। বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার, হত্যা ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করে এখন তারা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। বিএনপি নেতারা বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর বিএনপির নেতৃত্বে ১৮দলের আন্দোলনের সাফল্য-ব্যর্থতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে পর্যালোচনা চলছে। ইতিমধ্যে পেশাজীবী নেতাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠকে সে সব ত্রুটি-বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলেছেন খালেদা জিয়া। ২০১৩ সালের শেষদিকে সারা দেশের মানুষের জনসমর্থনের জোয়ার, আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়ের উদ্যোগ ও আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ছিল পুরোটাই সরকারের বিপক্ষে। কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য আসেনি বিরোধী জোটের। কেন এমনটি হলো তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি তা থেকে উত্তরণের নানা কৌশল প্রণয়ন করছে বিএনপির নীতিনির্ধারক মহল। বিএনপির নীতি-নির্ধারক মহল নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন জনসমর্থন জোরালো থাকলেও পাশাপাশি দুর্বলতা ছিল সাংগঠনিকভাবে। মামলা-হামলা নিয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপে একপর্যায়ে আত্মগোপনে যান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীরসহ দলের স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান ও যুগ্ম মহাসচিবদের বড় অংশটিই। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের এমন আত্মরক্ষামূলক অবস্থানের সুযোগকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়েছে সরকার। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় অংশটিই গা বাঁচিয়ে চলেছে পুরো সময়। অন্যদিকে ঢাকা মহানগরসহ দেশের অনেক জেলা ও উপজেলা কমিটি এখনও অপূর্ণাঙ্গ। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারেনি। মূল্যায়ন বঞ্চিত নেতাকর্মীদের একাংশও ছিল নিষ্ক্রিয়। এছাড়া অব্যাহতভাবে দমন-পীড়নের শিকার তৃণমূল নেতৃত্ব হয়ে পড়ে বিপর্যস্ত। বিএনপির নীতিনির্ধারক নেতারা জানান, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে দলের ৬ষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। সে কাউন্সিলে কাউন্সিলরদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নেতৃত্বের প্রতিটি ধাপে উল্লেখযোগ্য একটি পরিবর্তন আনতে চান শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। নিষ্ক্রিয়দের সরিয়ে ত্যাগী ও নির্যাতিতদের মূল্যায়নের মাধ্যমে তৃণমূলকে চাঙ্গা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রতি আস্থার সৃষ্টি করা হবে। এছাড়া আন্দোলনে ব্যর্থতার বড় একটি কারণ ছিল জোটের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। জোটের শরিক দল জামায়াতের প্রতি সরকারের চূড়ান্ত আক্রোশের শিকার হয়েছে বিএনপি। নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার দায় চাপানো হয়েছে বিএনপির ঘাড়ে। জামায়াতের সঙ্গে দূরত্ব রক্ষার মাধ্যমে জোটগত রাজনীতি করার কৌশল নিতে চায় বিএনপি। সেক্ষেত্রে আন্দোলনের মাঠ দখলে রাখার জন্য সাংগঠনিক পুনর্গঠনের বিকল্প দেখছেন না শীর্ষ নেতৃত্ব। এছাড়া সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে শিগগিরই বিভিন্ন জেলা সফর করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। কয়েকজন সিনিয়র নেতা জেলা সফর শুরু করেছেন। বিএনপি নেতারা জানান, সার্বিক দিক বিবেচনা করলে ১৮দলের নির্দলীয় সরকার আন্দোলন ব্যর্থ হয়নি। স্বাধীনতার পর আর কোন ইস্যুতে এত বেশি জনসমর্থন সৃষ্টি হয়নি। কোন আন্দোলনে সারা দেশের মানুষ এভাবে সমর্থন দেয়নি। কোন আন্দোলনই সারা দেশে এভাবে ছড়িয়ে পড়েনি। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে- বিরোধী দলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে দেশের ৯০ ভাগ মানুষ ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। বিএনপি নেতারা বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে দুইটি বড় ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে। এতদিন ছিল বাকশাল আর এবার ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন। দীর্ঘ মেয়াদি রাজনীতিতে এটি বিএনপির পক্ষেই গেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় কৌশল ঠিক না করলে দূরবর্তী সে সাফল্য হাতছাড়া হতে পারে। কারণ জনমত ধরে রাখা অনেক কঠিন বিষয়। তাই বর্তমান সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে দ্রুত সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে জনসমর্থন আরও জোরালো করার কোন বিকল্প নেই। আর জনসমর্থনের পালে নতুন করে হাওয়া বইয়ে দিতেই স্থানীয় নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছে বিএনপি। একক প্রার্থী সমর্থন দিতে দলের সিনিয়র নেতাদের সংশ্লিষ্ট জেলাগুলোতে দায়িত্ব দিয়েছেন খালেদা জিয়া। ইতিমধ্যে দলীয় সমর্থন নিয়ে প্রার্থীর আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী কার্যক্রম শুরু করেছেন। স্থানীয় নির্বাচনের ফলাফল অনুকূলে এনে সরকারকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চায় জনসমর্থন বিএনপির পক্ষেই। বিএনপি নেতারা জানান, জনসমর্থন জোরালো করার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনা তদন্তের পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উচ্চ পর্যায়ের চারটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আর আগামী জুনে সরকারের নতুন বাজেটকে কেন্দ্র করেই শুরু হবে মূল আন্দোলন। বিরোধী নেতা মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজেট প্রণয়ন ও সেটা বাস্তবায়নের জন্য পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান করতে পারবে না সরকার। বাজেটের ঘাটতি, কর বৃদ্ধি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির মতো জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে শুরু হবে সে আন্দোলন। তবে কর্মসূচি প্রণয়নে তৃণমূলের মতামতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হবে। বিশেষ করে আঞ্চলিক ইস্যুগুলোতে জোর দেয়া হবে। তারই প্রস্তুতি হিসাবে শিগগিরই সারা দেশে ধারাবাহিক জেলা সফর শুরু করবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

দলের অস্তিত্ব নিয়েই চিন্তিত ক্ষমতাহীন এরশাদ

চরম বেকায়দায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নির্বাচনে উভয়কুল রক্ষার কৌশল নিয়ে এখন তিনি তার দলের অস্তিত্ব নিয়েই চিন্তিত।
নির্বাচনের আগেই একদফা ভাঙনের পর তিনি যে কৌশল নিয়েছিলেন নির্বাচনের পর তা তার জন্য বড় বিপদ ডেকে এনেছে। এখন তিনি নিজ দলেও ক্ষমতাহীন। স্ত্রী রওশন এরশাদ বিরোধী দলের নেতা হওয়ার পর দলীয় মন্ত্রী ও এমপিরা এখন রওশনের পাশে। দলের সংসদীয় দলের বৈঠক হচ্ছে রওশনের নেতৃত্বে। রওশনের নেতৃত্বে স্মৃতিসৌধে ফুল দেয়া হয়েছে এরশাদকে ছাড়াই। এদিকে নির্বাচনের আগে এরশাদের বর্জনের ঘোষণা দেয়ার পর যেসব প্রার্থী সরে দাঁড়িয়ে ছিলেন তারাও ক্ষোভ আর অভিমান নিয়ে এরশাদ থেকে দূরে। এ নেতারাও এখন এরশাদকে বিশ্বাস করতে পারছেন না। দলের মধ্যে এমন অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যেই এরশাদের সামনে হাজির হয়েছে আরেক পরীক্ষা। মঞ্জুর হত্যা মামলার খড়্‌গ তার মাথার ওপর। মামলার রায়ের তারিখ নির্ধারণ করার পরের দিন এরশাদ বিবৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং তার সহযোগী হওয়ার ঘোষণা দেন। তার এ বিবৃতি দেয়ার পর অনুগত নেতাকর্মীরাই বলছেন, এরশাদ চরম এক অস্বস্তিকর সময় পার করছেন। দলে যেমন তার নিয়ন্ত্রণ নেই, তেমনি রাজনৈতিক অঙ্গনেও তিনি আস্থাহীন। সর্বশেষ সংরক্ষিত আসনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে নিজের ক্ষমতা নিয়ে দলেই প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। এ বিষয়ে কর্তৃত্ব চেয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দেন সংসদের বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ। যদিও মনোনয়নপত্র বিক্রি ও প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এরশাদ। এরপর নিজের পছন্দের প্রার্থীদের একটি তালিকাও করেছিলেন। এরশাদের বোন, ভাই জিএম কাদেরের স্ত্রীসহ এরশাদের পছন্দের ৬ প্রার্থীর নাম কোন কোন গণমাধ্যমে ছাপাও হয়েছে। কিন্তু এ তালিকা প্রকাশের পর রওশন এরশাদ ও দলীয় এমপিরা আপত্তি তোলেন। তারা এরশাদ ঘনিষ্ঠ প্রার্থীদের এমপি করার বিপক্ষে মত দেন। এ নিয়ে রওশন এরশাদের বিরোধিতার মুখে চূড়ান্তভাবে প্রার্থীদের নাম প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন এরশাদ। দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার সাংবাদিকদের জানান, এরশাদ ও রওশন এরশাদ পরামর্শক্রমে প্রার্থী ঠিক করবেন। দলে কোন দ্বন্দ্ব নেই এবং সংসদ অধিবেশন শুরু হলে জাতীয় পার্টি নিয়ে সব ধরনের বিভ্রান্তি কেটে যাবে। এদিকে মহাসচিব এমন দাবি করলেও নির্বাচনকে ঘিরে জাতীয় পার্টিতে চলছে চরম অস্থিরতা। নির্বাচনের আগেই এরশাদকে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদ এরশাদের নেতৃত্ব ত্যাগের ঘোষণা দেন। প্রেসিডিয়াম সদস্য গোলাম মসিহকে মহাসচিব করে তিনি জাতীয় পার্টির কমিটি ঘোষণা করেন। গতকাল রাতে কাজী জাফর আহমদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে যোগ দিয়েছে। কাজী জাফরের জাতীয় পার্টিতে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির বেশ কয়েকজন প্রেসিডিয়াম সদস্য যুক্ত হয়েছেন। এ ছাড়া এরশাদের নির্দেশে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো আরও কয়েকজন নেতা কাজী জাফরের জাতীয় পার্টিতে যোগ দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। অন্যদিকে নির্বাচনের পরে এরশাদের নেতৃত্বে থাকা জাতীয় পার্টিতেও চরম বিভক্তি দেখা দিয়েছে। সরকারি সুবিধা নেয়া নিয়ে সংসদ সদস্যরা রওশন এরশাদকে ঘিরে ক্ষমতার বলয় তৈরি করেন। এ ক্ষেত্রে দূরে রাখা হয় এরশাদকে। এরশাদকে ক্ষমতাহীন করার কৌশলের অংশ হিসেবে দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য জিএম কাদেরকে এমপি হিসেবে সংসদে নেয়া হয়নি। দলের নেতাদের মধ্যে যে প্রক্রিয়ায় এরশাদকে বিজয়ী করা হয়েছে একই প্রক্রিয়ায় জিএম কাদেরকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। এরশাদের আদেশ-নির্দেশমতো কাজ করায় জিএম কাদের এখন রওশনপন্থি নেতাদের অপছন্দ। এদিকে এরশাদ ও তার অনুগত নেতারা কোণঠাসা হয়ে পড়ায় তৃণমূলের কর্মীরাও হতাশ। দিকভ্রান্ত অবস্থানে আছেন তারা। এ অবস্থার মধ্যেই উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন এরশাদ। একই সঙ্গে বলা হয় নির্বাচনে একক প্রার্থী মনোনয়ন দেয়া হবে। কিন্তু এই একক প্রার্থী কারা ঠিক করবে এ সম্পর্কে এ পর্যন্ত স্পষ্ট কোন নির্দেশনা পাননি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতারা। রওশন এরশাদ দলীয় এমপিরা চাইছেন তাদের অনুগত নেতাদের উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী করতে। অন্যদিকে এরশাদের অনুগত নেতারা চাইছেন পার্টির চেয়ারম্যানের সমর্থন নিয়ে নির্বাচন করতে। এমন টানাপড়েনের মধ্যে জাতীয় পার্টির সমর্থিত প্রার্থীরা নিজেদের মতো করে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। দলের নেতাকর্মীদের মতে, দলের এমন অগোছালো অবস্থায় উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিলে তেমন সুবিধা করতে পারবেন দল সমর্থিত প্রার্থীরা। একই সঙ্গে সুবিধাজনক উপজেলায় একাধিক প্রার্থী থাকায় তাদের জয়ের সম্ভাবনাও কমে যাবে।

দলের অস্তিত্ব নিয়েই চিন্তিত ক্ষমতাহীন এরশাদ

চরম বেকায়দায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। নির্বাচনে উভয়কুল রক্ষার কৌশল নিয়ে এখন তিনি তার দলের অস্তিত্ব নিয়েই চিন্তিত।

সিপিডির পর্যালোচনা- অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে

একটি সুষ্ঠু, আস্থাভাজন, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।
তার মতে, সঙ্কট দূর করতে হলে রাজনৈতিক বিরোধীদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আর গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হলে বিনিয়োগেও আস্থার সঙ্কট কাটবে না। গতকাল রাজধানীর ধানমন্ডিতে সিপিডি কার্যালয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০১৩-১৪ দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্যালোচনা বিষয়ক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এতে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা হক ও খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম হোসেন। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, অস্থিরতা না কাটলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের দ্বিধা থেকে যাবে। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠান না হলে আস্থার সঙ্কট কাটবে না। আর এটা যদি না হয় তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হবে না। তিনি আরও বলেন, জনসমর্থনের অভাব ও আস্থার অভাব থাকলে দীর্ঘমেয়াদে সুফল পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, আপাতত শান্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অনেক বন্ধ ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান সচল হচ্ছে। কিন্তু এতে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে বলে মনে হয় না। বিনিয়োগ বাড়াতে হলে নীতি সঙ্কট দূর করতে হবে, অচলাবস্থার নিরসন করতে হবে। তিনি বলেন, জনপ্রত্যাশার কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমঝোতার মাধ্যমে একটি নির্বাচনের প্রত্যাশা সিপিডি’র। ড. দেবপ্রিয় বলেন, গত ছয় মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে গ্রামীণ অর্থনীতি ও দেশীয় শিল্পখাত ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ জন্য শুধু রপ্তানিমুখী শিল্পকে নয় বরং সব ধরনের শিল্পকে সমান গুরুত্ব দিয়ে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। দেশের সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রামীণ অর্থনীতি। এর মধ্যে পোল্ট্রি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিশেষ প্রণোদনার আওতায় নিয়ে এসে কৃষি ঋণ বৃদ্ধি ও ভাতার ব্যবস্থা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। এক প্রশ্নের জবাবে অর্থবছরের প্রথমার্ধে ৪ খাতের আর্থিক ক্ষতির হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, রেল ও সড়ক যোগাযোগ খাতে ১৬ হাজার ৬৮৯ কোটি, কৃষি ও কৃষিজাত শিল্পখাতে ১৫ হাজার ৮২৯ কোটি, রপ্তানিমুখী বস্ত্রশিল্পে ১৩ হাজার ৭৫০ কোটি ও পর্যটন খাতে ২ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। সিপিডি’র পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ক্ষতির এই আর্থিক মূল্যায়ন তৈরি করা হয়েছে। মোস্তাফিজুর রহমান গবেষণাপত্র উপস্থাপনের শুরুতেই বলেন, জনপ্রত্যাশা ও অর্থনীতির শক্তির ভিত্তিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির যে সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল, সেটি হারিয়ে গেছে। উচ্চ প্রবৃদ্ধির সেই সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতিকে মাশুল দিতে হচ্ছে। বর্তমানে অর্থনীতির গতি একেবারে শ্লথ হয়ে পড়েছে। ঘোষিত বাজেটের আয় ও ব্যয় উভয় অনেক কমে গেছে। নানা সঙ্কটের কারণে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের সহজলভ্য থাকলেও বাংলাদেশের খাদ্য মজুত কমেছে। অপরদিকে খাদ্য মূল্যস্ফীতি অনেক বেড়ে গেছে। এছাড়া, নানা অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে ব্যাংকিং খাত নাজুক অবস্থা পার করছে। এদিকে অস্থিরতার কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়েও বড় ধরনের ধসের মধ্যে পড়েছে।
গবেষণাপত্রে বলা হয়, অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে সরকারের রাজস্ব আদায়, বিদেশী বিনিয়োগ, বৈদেশিক অনুদানসহ বিভিন্ন খাতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় আয় অনেক কম হলেও ব্যয়ের মাত্রা কম থাকায় ঘাটতি নেই। এটি দেশের সার্বিক উন্নয়নের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই আয় এবং ব্যয়ের কাঠামোকে পুনর্গঠন করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাজেটবহির্ভূত ব্যয় বাড়ানো দরকার।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশে বর্তমানে খাদ্য মজুত সাড়ে ৯ লাখ টন, যা গত বছরের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম। কৃষি ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি হলেও তা শুধু ধান উৎপাদনে। বাকি শস্যের ক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি অনেক কমেছে। শাকসবজির ক্ষেত্রে উৎপাদনকারীরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আবার ভোক্তা বাজার থেকে বেশি মূল্যে তা কিনেছে। পোল্ট্রি ও দুগ্ধ খামারিরা ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
সিপিডি’র দাবি, বিশ্বব্যাপী চালের দাম অনেক কম হলেও বাংলাদেশে তা বেশি। এ জন্য মজুত কমেছে। যাতে ভবিষ্যতে খাদ্য ঘাটতি না হয়, সেজন্য কম দামে বিদেশে বাজার থেকে চাল আমদানির ওপর গুরুত্ব দেয় সিপিডি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অর্থনীতির গতি শ্লথ হয়ে পড়ায় রাজস্ব আহরণে ঘাটতি হয়েছে। সার্বিকভাবে রাজস্ব খাতে প্রবৃদ্ধি ২৫.৩ শতাংশ ধরা হলেও গত ৫ মাসে এখাতে মাত্র ১৪.৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
এনবিআরের হিসাব মতে, ৫ মাসে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে ৮৫০০ কোটি টাকা। ব্যক্তি করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করা, বিভিন্ন খাতকে করসুবিধা ও করহার হ্রাসের কারণে ঘাটতি বেড়েছে। সার্বিকভাবে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলেও রাজস্ব আদায়ে ৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। যেটি খুবই দুরুহ কাজ। বছর শেষে রাজস্ব আদায়ে ১৮ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হবে বলে মনে করছে সিপিডি।
ব্যাংকিং খাতের বিষয়ে সিপিডি বলছে, বেশ কিছু সমস্যার মধ্য দিয়ে চলছে ব্যাংকিং খাত। উচ্চ মাত্রার ঋণ নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণ জালিয়াতির পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। নতুন ব্যাংক এলেও চাহিদা অনুযায়ী প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়নি। সার্বিকভাবে অর্থনৈতিক স্থবিরতা থাকায় ঋণের চাহিদা বাড়েনি। কেউ বিনিয়োগ করছে না। ফলে ঋণ নেয়ার মতো কেউ নেই। এ কারণে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বাড়ছে, যা ব্যাংকিং খাতকে বেকায়দায়, এমনকি লোকসানের মুখে ফেলতে পারে। গত ৬ মাসে ব্যাংকগুলোতে তারল্য বেড়েছে ৭৩.৮ শতাংশ। এছাড়া, ১৬ শতাংশের বেশি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও ব্যাংকগুলো মাত্র ১১ শতাংশ বিতরণে সক্ষম হয়েছে।
এদিকে অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে বিদেশী এবং স্থানীয় উভয় বিনিয়োগই অনেক কমে গেছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-অক্টোবর প্রান্তিকে এফডিআই হয়েছে ৫৩৮ মিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের তুলনায় মাত্র ১.৩ শতাংশ বেশি। কিন্তু বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত হওয়ার হার হ্রাস পেয়েছে। স্থানীয় কোম্পানির বিনিয়োগ ২৭ শতাংশ এবং বিদেশী মালিকানা কোম্পানির বিনিয়োগ ১০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি বেড়েছে উল্লেখ করে বলা হয়, অর্থবছরের প্রথম ৬ মাসে রপ্তানি আয়ে প্রবৃদ্ধি ১৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও তা শুধু তৈরী পোশাক শিল্পেই বেশি। তৈরী পোশাক শিল্প ছাড়া বাকি সবখাতে মাত্র ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। মার্কিন ও ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের তুলনায় ভারত, ভিয়েতনাম ও কম্ব্বোডিয়া তাদের পণ্যের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি তিন গুণ বৃদ্ধি করেছে। আর বাংলাদেশ প্রবৃদ্ধি কিছুটা বৃদ্ধি করতে সক্ষম হলেও লভ্যাংশ পাওয়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে।
পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে বলা হয়, এ সময় পুঁজিবাজারে আইপিও’র সংখ্যা বাড়লেও নতুন উদ্যোক্তা কমেছে ১০ শতাংশ। এছাড়া, গবেষণাপত্রে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিবহন, কৃষি, তৈরী পোশাক ও পর্যটন খাতে ৪৯ হাজার ১৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। যা মোট দেশজ উৎপাদনের ৪.৭ শতাংশ। এর মধ্যে পরিবহনে ১৬ হাজার ৬৮৮ কোটি ৬৫ লাখ, কৃষিতে ১৫ হাজার ৮২৯ কোটি, পোশাক খাতে ১৩ হাজার ৭৫০ কোটি এবং পর্যটন খাতে ২৭৫০ কোটি টাকার লোকসান হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। অর্থনৈতিক বর্তমান অগ্রগতি অব্যাহত থাকলে বছরে শেষে ৫.৮ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে বলে মনে করছে সিপিডি।

সিপিডির পর্যালোচনা- অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে

একটি সুষ্ঠু, আস্থাভাজন, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে বলে মন্তব্য করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

ডেটলাইন ২৯শে ডিসেম্বর- যেভাবে নেমে আসে অন্ধকার by মনির হায়দার

কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহ ছিল একেবারে তুঙ্গে। ছিল সব রকম প্রস্তুতিও। গণজোয়ার সৃষ্টি হবে ঢাকার রাজপথে। সেই জোয়ারের তোড়ে ভেসে যাবে একতরফা নির্বাচনের সব আয়োজন। সরকার বাধ্য হবে সমঝোতা করতে।

ডেটলাইন ২৯শে ডিসেম্বর- যেভাবে নেমে আসে অন্ধকার by মনির হায়দার

কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহ ছিল একেবারে তুঙ্গে। ছিল সব রকম প্রস্তুতিও। গণজোয়ার সৃষ্টি হবে ঢাকার রাজপথে। সেই জোয়ারের তোড়ে ভেসে যাবে একতরফা নির্বাচনের সব আয়োজন। সরকার বাধ্য হবে সমঝোতা করতে।
সকলের অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি হবে। অবসান ঘটবে অনিশ্চয়তার। দূর হবে সব রকম শঙ্কা আর আতঙ্ক। বন্ধ হবে খুনোখুনি আর পেট্রল বোমার সন্ত্রাস। নিরাপদ ও স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসবে দেশজুড়ে। এমন স্বপ্ন বুকে নিয়ে অপেক্ষায় ছিলেন বিরোধীরা। ভয়-বিপত্তি তুচ্ছ করে নানা কৌশলে মফস্বল থেকে ঢাকায় পৌঁছে যান বহু মানুষ। কিন্তু নেতাদের গা বাঁচানো কৌশল আর চালাকিতে ধুলিসাৎ হয়ে যায় সব পরিকল্পনা।

একদিকে ঘটনার দু’দিন আগেই বিরোধী দলের পুরো পরিকল্পনা পৌঁছে যায় সরকারের হাতে। অন্যদিকে মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের ভয় দেখানো হয়, রাস্তায় নামলেই সরাসরি গুলি করা হবে। চুল পরিমাণ ছাড়ও দেয়া হবে না। আর তাতেই আঁতকে ওঠেন নেতারা। শীর্ষমহলকে কিছু না জানিয়েই যে যার মতো পালিয়ে বাঁচার কৌশল নেন। এমনকি মোবাইল ফোন বন্ধ করে দিয়ে চলে যান যোগাযোগের একেবারে বাইরে। এ কারণে ঘটনার দিন কাউকেই আর খুঁজে পাওয়া যায়নি কোথাও। কর্মসূচি সফল করার দায়িত্বে থাকা নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি একবারের জন্যও। এছাড়া সরকারের পক্ষে কিছু নেতার ‘ম্যানেজ’ হয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অপরদিকে জামায়াতের শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ ছিল, বিএনপি রাস্তায় না নামলে জামায়াত-শিবিরও নামবে না। শেষ পর্যন্ত তা-ই হলো। বিএনপিকে রাস্তায় দেখা যায়নি। সে কারণে নামেনি জামায়াত-শিবির। স্বাভাবিকভাবেই নামেনি নগরবাসীও। আর এসব কারণেই কার্যত ব্যর্থ হয় ব্যাপক উত্তাপ ছড়ানো ২৯শে ডিসেম্বরের ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি।
নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন চলে আসছিল প্রায় তিন বছর ধরে। এ ব্যবস্থা সংবিধান থেকে মুছে দেয়া হয় ২০১১ সালের ৩০শে জুন। এরপর থেকেই ব্যবস্থাটি সংবিধানে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে বিরোধী দল। দাবি আদায়ে দফায় দফায় প্রায় ৭৫ দিন হরতাল পালন করা হয়। হরতালের পর শুরু হয় অবরোধ। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে শুরুর পর নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত একাধিক দফায় প্রায় ৩৫ দিনের অবরোধ কর্মসূচি পালন করে বিরোধী দল। এতে অচল হয়ে পড়ে গোটা দেশ। স্থবির হয়ে যায় জনজীবন। পুরোপুরি ভেঙে পড়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ব্যাপক নাশকতার কারণে প্রথমবারের মতো মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে ট্রেন চলাচল। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যায় শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য। অভিজ্ঞজনেরা বলেছেন, স্বাধীন বাংলাদেশে এতটা কড়া আন্দোলন আর কখনও দেখা যায়নি। কিন্তু তাতেও কাজ হলো না। সরকার পাত্তা দেয়নি কোন কিছুকে। নিজেরা যা ভেবেছে, তা করে গেছে নিঃসংকোচে। মহাজোটের সরকারই খুশিমতো প্রথমে সর্বদলীয় সরকার ঘোষণা করেছে। পরক্ষণেই আবার বলেছে, না এটি সর্বদলীয় নয়, নির্বাচনকালীন সরকার। সরকারের ইচ্ছার সঙ্গে তালমিলিয়ে চলে নির্বাচন কমিশনও। বিরোধী দলগুলোর দাবি-দাওয়ার প্রতি ফিরেও তাকায়নি কাজী রকিবউদ্দিনের কমিশন।
এমন পরিস্থিতিতে হরতাল-অবরোধের বাইরে ভিন্নতর আন্দোলনের পথে হাঁটেন খালেদা জিয়া। ২৪ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা দেন নতুন কর্মসূচি ‘রোড ফর ডেমোক্রেসি’। একতরফা নির্বাচন প্রতিহত করতে ২৯শে ডিসেম্বর দলে দলে ঢাকার রাজপথে নেমে আসার আহবান জানান দেশবাসীর প্রতি। এই কর্মসূচিকে ঘিরে উত্তাপ-উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। ঢাকাসহ সারাদেশে বিরোধী দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা ব্যাপক প্রস্তুতি নেন। অন্যদেকি কর্মসূচি ঠেকাতে সরকারও হয়ে ওঠে মরিয়া। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলে বসলেন, একটি পিঁপড়াও যেন ঢাকায় ঢুকতে না পারে। পুলিশ, বিজিবি ও র‌্যাবসহ প্রশাসনের সর্বশক্তি লাগানো হয় কাজে। রাজধানীতে জড়ো করা হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪০ হাজারেরও বেশি সদস্যকে। বিরোধী দলের অবরোধ ভাঙার চেষ্টা বাদ দিয়ে সরকার নিজেই অবতীর্ণ হয় অবরোধকারীর ভূমিকায়। সব ধরনের পরিবহন-যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় ২৭শে ডিসেম্বর থেকে। শুরু হয় অঘোষিত সরকারি অবরোধ। কাউকে সন্দেহ হওয়া মাত্রই গ্রেফতার। রাজধানীতে বিভিন্ন থানা ও গোয়েন্দা পুলিশের হাজতখানায় তিল ধরণের ঠাঁই ছিল না। নিদারুণ মানবেতর পরিস্থিতি তৈরি হয় প্রতিটি হাজতে। সর্বত্র দেখা দেয় সীমাহীন আতঙ্ক।
অন্যদিকে বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার গুলশানের বাড়ির সামনে চলে আরেক নাটকীয়তা। শ’ শ’ পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলা হয় বাড়িটি। সেই সঙ্গে বাড়ির প্রবেশমুখে ফেলে রাখা হয় বালুভর্তি দু’টি ট্রাক। অদ্ভুত এই কাণ্ড নিয়ে ভীতি-আতঙ্কের মধ্যেও সর্বত্র সৃষ্টি হয় হাস্যরস। এই ঘটনায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানান বিশিষ্টজনরাও। কিন্তু কোন কিছুই বিচলিত কিংবা বিব্রত করেনি সরকারকে।
এমন উত্তাপ-আতঙ্কের মধ্যেই চলে আসে ২৯শে ডিসেম্বর। সর্বত্র টান টান উত্তেজনা। সকাল গড়িয়ে দুপুর। এরপর দুপুর গড়িয়ে বিকেল। দিনের শেষে এক সময় নেমে আসে রাতের আঁধার। কিন্তু সুপ্রিমকোর্ট আঙিনায় বিএনপি-জামায়াত সমর্থক আইনজীবী, জাতীয় প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নেতৃবৃন্দের বিক্ষোভ ছাড়া রাজধানীর আর কোথাও উল্লেখ করার মতো কোন জনস্রোতের খবর পাওয়া যায়নি। অবশ্য মালিবাগ বাজার এলাকায় জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল বের হওয়া মাত্রই পুলিশ গুলি শুরু করে। তাতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় এক শিবির কর্মী। তারপর আর কেউ রাস্তায় নামার সাহস পায়নি।
ওয়াকিবহাল সূত্রগুলো জানিয়েছে, ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ সফল করার লক্ষ্যে বিরোধী পক্ষ যে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করেছিল, সেটি সরকারের হাতে পৌঁছে যায় ২৭ তারিখেই। নগর বিএনপির নেতাদের মধ্যে কে কোন এলাকায় নেতৃত্ব দেবেন, কোন্‌ দিক থেকে মিছিল আসবে, পল্টনে যেতে না দেয়া হলে বিকল্প জমায়েত কোথায় হবে - সবকিছুই জেনে যায় সরকার। সেভাবেই নেয়া হয় মোকাবেলার সব রকম ব্যবস্থা। কর্মসূচি সফল করার দায়িত্বে থাকা নেতাদেরকে পরিষ্কার জানিয়ে দেয়া হয়, ২৯ তারিখে রাস্তায় নামলেই সরাসরি গুলি করা হবে। এক চুলও ছাড় দেয়া হবে না। আর তাতেই ভয় পেয়ে যান বিএনপির এসব নেতা। শীর্ষ নেতৃত্বকে কিছু না জানিয়ে আগের রাতেই যে যার মতো সটকে পড়েন। বন্ধ করে দেন মোবাইল ফোন। এ কারণে কর্মসূচির দিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তাদের কারও সঙ্গেই আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। এছাড়া কোন কোন নেতাকে বিশেষ ব্যবস্থায় ‘ম্যানেজ’ করার খবরও রয়েছে।
নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানায়, ২৯ তারিখে বেগম খালেদা জিয়াকে যে বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হবে না-  তা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন তিনি। এ কারণে আগের দিনের ভিডিও বার্তায় তিনি সেটার ইঙ্গিতও দেন। কিন্তু তাঁর অনুপস্থিতিতে ময়দানে কর্মসূচি সফল করার মূল নেতৃত্ব কে দেবেন তা ঠিক করা ছিল না। এছাড়া গোটা কর্মসূচির কার্যকর কোন সমন্বয়ও ছিল না। এ কারণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বহু মানুষ মিছিল নিয়ে বের হওয়ার জন্য নির্দ্দিষ্ট স্থানে জড়ো হলেও তাদের দিক-নির্দেশনা দেবার কেউ ছিল না। একই ভাবে মফস্বলের যে হাজার হাজার মানুষ ২-৩ দিন আগেই রাজধানীতে চলে আসেন, তারা রাস্তায় ঘুরেছেন এতিমের মতো। এলোমেলো ঘুরতে থাকায় সন্দেহবশত তাদের অনেককে পুলিশ গ্রেফতার করে হাজতে নিয়ে যায়। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় তাদের পূর্বনির্ধারিত স্থানগুলোতে জড়ো হন। কিন্তু তাদের অপেক্ষা করাই সার। বিএনপি নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত তারা রাস্তায় নামেননি। কেবলমাত্র মালিবাগ বাজার এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে জামায়াত-শিবিরের একটি মিছিল হঠাৎ রাস্তায় নেমে আসে। সঙ্গে সঙ্গেই গুলি শুরু করে দেয় পুলিশ। তাতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায় এক শিবির কর্মী। আহত হয় অনেকে। এই খবর চাউর হওয়ার পর অন্য কোথাও আর রাস্তায় নামেনি জামায়াত-শিবির। সূত্র জানিয়েছে, জামায়াতের কেন্দ্র থেকে নির্দেশ ছিল, বিএনপি যদি আগে রাস্তায় না নামে, তাহলে জামায়াত-শিবিরও নামবে না। এমন পরিস্থিতিতে বিকল্প কোন কর্মকৌশল বা পরিকল্পনা ছাড়াই বেগম খালেদা জিয়া ঘোষণা দেন, ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ চলবে পরদিনও। কিন্তু দেখা গেল একই দৃশ্যপট। অন্ধকারে মুখ থুবড়ে পড়ে গণতন্ত্রের আন্দোলন, সংগ্রাম।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে

মোহাম্মদ রাফি
ড. মোহাম্মদ রাফির জন্ম ১৯৫৬ সালে। রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষাজীবন শেষ করেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইমোরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৩ সাল থেকে ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগ এবং সামাজিক উন্নয়ন ইউনিটের সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি হিসেবে শিক্ষকতা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল নামক প্রতিষ্ঠানে গবেষক হিসেবে এবং মেইকেন বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষকতা করেছেন। এখন কাজ করছেন বাংলাদেশের গ্রামীণ ক্ষমতাকাঠামো নিয়ে। এ ছাড়া ব্র্যাকের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের প্রভাব নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে চলেছেন তিনি।
 সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ইফতেখার মাহমুদ ও ফারুক ওয়াসিফ

প্রথম আলো  হিন্দু সমাজের ওপর চলমান সহিংসতাকে কেউ বলছেন সাম্প্রদায়িকতা, কেউ বলছেন রাজনৈতিক সহিংসতা। আপনি কী মনে করেন?
মোহাম্মদ রাফি  হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নির্বাচনের আগে ও পরে যে হামলাগুলো হয়ে গেল, একে রাজনৈতিক সহিংসতা বলা যায়। তবে এর মধ্যে ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বিষয় আছে। সব ঘটনা যে কোনো একটি কারণে ঘটেছে, তা বলা যাবে না। একেক সময় একেকটি বিষয় প্রাধান্যে চলে আসে। সাম্প্রতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে হয়তো নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে অন্য কারণগুলো যে ছিল না, তা বলা যাবে না। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে হিন্দুরা না থাকলে অনেকে লাভবান হয়।
প্রথম আলো  সেটা কেমন? একটু ব্যাখ্যা করেন।
মোহাম্মদ রাফি  যেমন, বাংলাদেশের হিন্দুরা তো একটি রাজনৈতিক দলের ভোটব্যাংক হিসেবে কাজ করে। সবাই জানে, তারা আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়। ফলে যারা তাদের ভোট পায় না, তারা চায় হিন্দুরা এ দেশ থেকে চলে যাক। ২০০১ সালে আমরা এমনটি দেখেছি। আবার যারা তাদের পক্ষশক্তি, তারা হিন্দুদের পক্ষে আছে, তা দেখাতে চায়। এই দুই পক্ষের রাজনৈতিক লড়াইয়ের বলি হতে পারে হিন্দুরা।
প্রথম আলো  অপ্রধান ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর ওপর সাম্প্রদায়িক আচরণ ও চাপ তো সারা বছরই থাকে। কিন্তু নির্বাচনের সময় তা এত তীব্র হয়ে ওঠে কেন?
মোহাম্মদ রাফি  যেকোনো রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে সব সময় আরেকটি রাজনৈতিক শক্তি সক্রিয় থাকে। যেমন, যারা হিন্দুদের ওপর হামলা করতে চায়, তারা সক্রিয় হওয়ার পর অপর পক্ষ তো মাঠে থাকে। তারা তা প্রতিরোধ করে থাকে। নির্বাচনের সময় এই পাল্টা সক্রিয়তা কমে গিয়ে শূন্যতা তৈরি হয়। এই সুযোগটি সহিংসতাকারীরা নেয়। সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক শক্তিগুলো যদি সক্রিয় থাকত, তাহলে এ ধরনের দুঃখজনক ঘটনা ঘটত না।
প্রথম আলো  ২০০১ সালের পর তো বিএনপি ক্ষমতায় ছিল, তাদের কাছে সংখ্যালঘুদের সংখ্যা কমানো বা প্রতিহিংসার বিষয় ছিল। কিন্তু এখন তো সংখ্যালঘুদের পক্ষের শক্তি বলে দাবিদার সরকার ক্ষমতায়। তাহলে এ ঘটনাগুলো কেন ঘটতে পারল?
মোহাম্মদ রাফি  সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতার সময় দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলছিল। আওয়ামী লীগ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনটি করে ফেলতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনেকেই নিশ্চিত ছিল না। নতুন সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন কী দাঁড়ায়, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা ছিল। ফলে যারা এগুলো ঘটিয়েছে, তারা হয়তো এই অনিশ্চয়তার সুযোগ নিয়েছে। যখন নির্বাচন শেষ হয়ে গেল, আন্তর্জাতিক সমর্থন অনুকূলে আসতে শুরু করল, তখন সমান্তরালভাবে সহিংসতা কমে যেতে দেখা গেছে।
প্রথম আলো  ২০০১ সালের সাম্প্রদায়িক তাণ্ডবের ওপর আপনি গবেষণা জরিপ পরিচালনা করেছেন। সে সময়ের সঙ্গে তুলনা করে যদি বলতেন। এখন সরকার ভিন্ন, কিন্তু প্রশাসন কেন একই আচরণ করল?
মোহাম্মদ রাফি  নির্বাচনের সময় সরকারের পক্ষে সব কেন্দ্রে একই রকম নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয় না। যারা ঘটনাগুলো ঘটিয়েছে, তাদের পদ্ধতিটা হয়তো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বুঝতে পারেনি। তবে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান না করে কোনো কিছু বলা যাবে না।
প্রথম আলো  দেখা যাচ্ছে, পুলিশের তরফে কোনো প্রতিরোধ হয়নি। যদি হতো, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সহিংসতাকারীদের সংঘর্ষ হতো। যেমন, অভয়নগরের সাংসদ, পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তার পরও তাঁরা সহিংসতা বন্ধে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেননি।
মোহাম্মদ রাফি  যাঁরা প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন, তাঁরা তো নিয়ম ও নির্দেশে পরিচালিত হন। ফলে বিষয়টিকে এভাবে দেখার সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো বিষয় কাজ করেছে কি না, তা আমার জানা নেই।
প্রথম আলো  আপনার বইয়ে বলেছিলেন, অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ সংখ্যাগুরুর মধ্যে ঐক্য তৈরি করতে পারে। ব্যাখ্যা করবেন?
মোহাম্মদ রাফি  যেমন, একটি পাড়ার হিন্দুদের উৎখাত করতে পারলে তা সেখানকার মুসলমান ক্ষমতাবানেরা দখল করতে পারে। এ ক্ষেত্রে মুসলমানের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন বা মতাদর্শিক পার্থক্য কাজ না করে বরং ঐক্য তৈরি হতে পারে। যেমন, একটি গ্রামে ২৫ ঘর মুসলমান এবং পাঁচ ঘর হিন্দু থাকলে হিন্দুদের জমি দখল করার জন্য ২৫ ঘর মুসলমানের মধ্যে ঐক্য তৈরি হতে পারে।
প্রথম আলো  হিন্দুদের সম্পত্তি দখলে প্রায় সর্বদলীয় ঐক্য দেখা যায়। আবুল বারকাত ও আপনার গবেষণায় দেখা গেছে, যাঁরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় বেশি থাকেন, হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের হিস্যাও তাঁদের বেশি।
মোহাম্মদ রাফি  হ্যাঁ, ক্ষমতার বিন্যাসের সঙ্গে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখলের সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৪৭-এর পর থেকে ধরলে মুসলিম লীগ, আওয়ামী লীগ, বিএনপি—এই তিনটি দল পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় থেকেছে। আওয়ামী লীগ থেকেছে সবচেয়ে কম সময়। ফলে তারা সবচেয়ে কম সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও মুসলিম লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় সমান পরিমাণ অর্থাৎ প্রায় ৪৪ শতাংশ হিন্দু সম্পত্তি দখল করেছে। অন্যদিকে যারা বিরোধীপক্ষ, তারা কম হলেও সম্পত্তি দখল করেছে। এ ব্যাপারে সব দলকেই দেখা গেলেও একটি বিষয় কিন্তু আমাদের ভাবতে হবে। আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং জামায়াত কি তাহলে রাজনৈতিকভাবে এক হয়ে গেল? তাদের কি কোনো স্বতন্ত্র পরিচিতি
নেই? সেটা অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ যদি চিন্তা করে কোনটি আমার জন্য লাভজনক, সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি দখল করা, নাকি তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান, ঐতিহাসিক দায় ইত্যাদি রক্ষা করা। এই দুটি বিষয়কে যদি আমরা দুই পাল্লায় রাখি, তাহলে কিন্তু তাদের সংখ্যালঘু নির্যাতন ও সম্পত্তি দখল করার কথা নয়।
প্রথম আলো  সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ক্ষেত্রে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, স্থানীয় সম্পর্কের সংঘাত ও নির্বাচনী রাজনীতি কাজ করে এবং দায়ীরা যে দলেরই হোক, কেউ তাদের শাস্তি দিতে চায় না। এখন পর্যন্ত কি কোনো সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচার হয়েছে?
মোহাম্মদ রাফি  না, বিচার হয়নি। ২০০১-এর ঘটনায় যে তদন্ত কমিটি হয়েছিল, তারা আমার কাছে দুবার এসেছিল। কিন্তু ওই প্রতিবেদন আমরা কেউ দেখিনি। ওই ঘটনার বিচারও হতে শুনিনি। অবশ্যই বিচারহীনতা যেকোনো অপরাধকে বাড়ায়।
প্রথম আলো  উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক হিংসার সূত্রপাতের মুহূর্ত হিসেবে দেশভাগকে অনেকে দায়ী করেন। কিন্তু বর্তমান সাম্প্রদায়িকতার ধরনটা কি বদলায়নি?
মোহাম্মদ রাফি  দেশভাগের অনেক আগে থেকে এখানে সাম্প্রদায়িকতা যে ছিল, তার বহু প্রমাণ ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে রয়েছে। যেমন, চর্যাপদে দেখি বৌদ্ধদের ব্যাপারে হিন্দুদের ঘৃণা। এ দেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের সময় ব্রাহ্মণেরা কুকুর লেলিয়ে দিয়ে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার অনেক ঘটনা আছে। এরপর এই অঞ্চলে মুসলমান শাসকদের আমলে ধর্মান্তরকরণের ইতিহাস সব সময় শান্তিপূর্ণভাবে হয়েছে, তা তো নয়। অনেকে বলে, এখানে তরবারির জোরে ধর্মান্তর হয়েছে। এ কথা পুরোপুরি যেমন ঠিক না, তেমনি একদম ভুলও নয়।
প্রথম আলো  দেখা যাচ্ছে, উপকূলীয় ও সীমান্তবর্তী গ্রামে যেখানে হিন্দুদের বসতি বেশি এবং সেখানেই সাম্প্রদায়িক হামলাগুলো বেশি হচ্ছে। অন্যদিকে ভারতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাগুলোর উৎপত্তি বেশির ভাগই শহরে। দুই দেশের সাম্প্রদায়িকতার গড়নে কি কোনো পার্থক্য দেখেন?
মোহাম্মদ রাফি: ১৯৪৭-এর দেশভাগের দিকে তাকালে দেখব, বাংলাদেশ থেকে হিন্দুরা গিয়ে ভারতের সীমান্ত এলাকায় বসতি গড়েছে। আর ভারত থেকে আসা অবস্থাপন্ন মুসলমানেরা ঢাকাসহ বড় শহরে বসতি গেড়েছে। ভারতের উচ্ছেদ হওয়া মুসলমানেরা শ্রমিক হিসেবে শহরাঞ্চলে জড়ো হয়েছে। এখানে পার্থক্য হচ্ছে, শহরাঞ্চলে বসবাস এবং শ্রমিক হওয়ার কারণে ভারতীয় মুসলমানেরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং লড়াই করতে পারছে। বাংলাদেশের হিন্দুদের ক্ষেত্রে তেমনটা আমরা দেখছি না।
প্রথম আলো  সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের চোখ দিয়ে দেখলে কে তাদের শত্রু, কে মিত্র?
মোহাম্মদ রাফি  আমার মনে হয় না একজন বুদ্ধিমান সংখ্যালঘু বিষয়টিকে এভাবে দেখে। তারা দেখে কে আমার জন্য কম ক্ষতিকারক। সেই হিসাব থেকেই তারা কোনো একটি রাজনৈতিক দল বা শক্তির প্রতি সমর্থন জানায়। কেননা, সব রাজনৈতিক দলই তাদের কমবেশি ক্ষতি করেছে।
প্রথম আলো  আপনার আগের গবেষণায় সুপারিশ করেছিলেন, সহিংসতার বিরুদ্ধে সংখ্যালঘুদের একটি যৌথ শক্তিতে পরিণত হতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব?
মোহাম্মদ রাফি  হ্যাঁ, এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, হিন্দুরা নিজেরা যদি সংগঠিত হয়, তাহলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অথচ তারা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়লে, সহিংসতার শিকার হলে ভারতে চলে যায়। কিন্তু ভারতের মুসলমানেরা তো সহিংসতার কবলে পড়লে পাকিস্তানে চলে যায় না। তারা লড়াই করে টিকে থাকে। এভাবে অনেক ক্ষেত্রে সফলও হয়েছে তারা। নীরব থেকে আরও বিপন্ন হলে তারা কী করবে, সেটা বিবেচনার বিষয় হয়। কিন্তু তাদের নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। ‘করতে হবে’, ‘দিতে হবে’-জাতীয় কথা তাদের কাছ থেকে কম শুনি। উপকূল বা সীমান্ত এলাকার হিন্দুরা না হয় বড় ধরনের প্রতিবাদী কর্মসূচি নিতে পারেনি। কিন্তু ঢাকা শহরের দেড় কোটি অধিবাসীর মধ্যে যদি কমপক্ষে ১০ লাখও হিন্দু ধর্মাবলম্বী থাকে, তাদের মধ্যে দুই লাখ মানুষও যদি সারা দেশের সাম্প্রদায়িক হামলা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে নামত, তাহলে পুরো ঘটনাই অন্য রকম হয়ে যেত।
প্রথম আলো  হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ রয়েছে, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী মঞ্চ রয়েছে। তারা তো দীর্ঘদিন ধরে সাম্প্রদায়িক নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে।
মোহাম্মদ রাফি  তাদের আন্দোলন অনেক দুর্বল। এটা দিলে ভালো হয়, এটা করা উচিত না—এমন কণ্ঠে তারা আন্দোলন করছে। সম্মিলিতভাবে জোরালো প্রতিবাদ হলে হামলাকারী পক্ষ বা রাষ্ট্র সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে রাজনীতি করার বিষয়টিকে অন্যভাবে ভাবত। ফলে অবশ্যই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তাদের পক্ষে যারা আসবে, তাদের সঙ্গে নিতে হবে। কিন্তু তারা নিজেদের যাতে ওই আন্দোলনে প্রাধান্যে থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে। সব মুসলমান তো খারাপ নয়। সংখ্যালঘুরা যদি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে মাঠে নামে, তাহলে তাদের পক্ষে অনেক মুসলমানকেও পাওয়া যাবে। তাই এই আন্দোলনে সবার আসার সুযোগও রাখতে হবে, একে নিছক সম্প্রদায়নির্ভর জোট করে রাখলে চলবে না।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ রাফি  ধন্যবাদ।

কংগ্রেসের হাতে ভারতের অবক্ষয়

মনমোহন সিং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন ২০০৪ সাল থেকে। তাঁর চলতি দ্বিতীয় মেয়াদ যখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, তখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো একটি সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেছেন সম্প্রতি। সেখানে সমবেত সাংবাদিকদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন, তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা যেভাবে তাঁর শাসনামলের মূল্যায়ন করেন, ইতিহাস তার থেকে বেশি সদয়ভাবে সেটা করবে বলে তিনি আশা করেন। কিন্তু সে রকম সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না। বরং মনমোহন সিংয়ের দল, একসময়ের মহান কংগ্রেস দল এখন এক রাজনৈতিক কানাগলিতে ঘুরপাক খাচ্ছে। দলটি তার ধ্বংসাত্মক পরিবারতান্ত্রিক নেতৃত্ব থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেই কেবল এই কানাগলি থেকে বেরোবার পথ খুঁজে পেতে পারে। একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে ভারত ইতিমধ্যে অর্ধশতকের বেশি সময় পেরিয়ে এসেছে। এই সময়ের অধিকাংশটাই সরকারের দায়িত্বে ছিল কংগ্রেস দল। এখন মনে হচ্ছে, কংগ্রেসের এই আধিপত্যের যুগ শেষ হতে চলেছে। দলটির অবক্ষয়ের সবচেয়ে পরিষ্কার লক্ষণটি ফুটে উঠেছে গত ডিসেম্বরে, যখন ভারতের চারটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের ভরাডুবি ঘটেছে। রাজস্থানে কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ২১টি আসন, আর ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জিতেছে ১৬২টি আসন। অথচ ২০০৮ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস সেখানে পেয়েছিল ৯৬টি আর বিজেপি পেয়েছিল ৭৮টি আসন। একইভাবে দিল্লিতে টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর কংগ্রেস এবার ৭০টি আসনের মধ্যে পেয়েছে মাত্র আটটি; এমনকি দলটির যে নেত্রী সবচেয়ে লম্বা সময় ধরে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন, সেই শিলা দীক্ষিতও আসন হারিয়েছেন এমন এক ব্যক্তির কাছে, যিনি রাজনীতিতে নবাগত।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ছোট্ট রাজ্য মিজোরামেই শুধু কংগ্রেস তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে পেরেছে। এটা কংগ্রেসের জন্য এক নজিরবিহীন ভরাডুবি। আগামী জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে দলটির জন্য ভালো কিছুর পূর্বাভাস এতে নেই। কেন এ রকম হলো এবং কংগ্রেস নিজের ক্ষয় ঠেকাতে পারবে কি না, এসব বুঝতে হলে বিজেপির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ডেমেক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) হাত থেকে ২০০৪ সালে কংগ্রেস জাতীয় নেতৃত্ব ফিরে পাওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কী ঘটেছে, তা বুঝতে হবে। ভারতের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে কংগ্রেস ২০০৪ সালে নবনির্বাচিত ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্সের (ইউপিএ) কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়। কিন্তু অবাক ব্যাপার হলো, দলটির প্রধান নেতা সোনিয়া গান্ধী প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে সম্মত হলেন না, তিনি এই পদের জন্য ইউপিএর প্রার্থী হিসেবে প্রস্তাব করলেন মনমোহন সিংয়ের নাম। মনমোহন সিং একজন অধ্যাপক ও আমলা, যাঁর কোনো নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রায় ৪০ দিন নানা নাটকীয়তার পর মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, যদিও কোনো নির্বাচনী এলাকায় তাঁর প্রতি কোনো প্রত্যক্ষ ভোটার-সমর্থন ছিল না। এই অস্বাভাবিক বন্দোবস্ত তাৎক্ষণিকভাবে নানা রকমের তিক্ত মন্তব্য-সমালোচনার কারণ ঘটায়। একজন পর্যবেক্ষক বিচক্ষণতার সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন, ‘যেখানে কর্তৃত্ব আছে, সেখানে যোগ্যতা নেই; কিন্তু যেখানে কিছুটা যোগ্যতা আছে, সেখানে কোনো কর্তৃত্ব নেই।’ মনমোহন সিংয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও ভারতের শীর্ষ রাজনৈতিক পদে তাঁর কর্তৃত্বের সম্ভাবনা ছিল অত্যন্ত সীমিত। যতই দিন গড়িয়েছে, ততই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে যে, মনমোহন সিংয়ের সরকার একেবারেই অকার্যকর। তাঁর ব্যর্থতাই ছিল অবধারিত, কারণ মনমোহন সিংয়ের যা কিছু শক্তি-সামর্থ্য ছিল, তা একজন অনুগত ও সামর্থ্যবান অধস্তন কর্মকর্তা হিসেবে; কার্যসূচি নির্ধারণ করে দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করার মতো নেতৃত্বের গুণ তাঁর ছিল না। ১৯৯০-এর দশকে মনমোহন সিং যখন ভারতের অর্থমন্ত্রী ছিলেন,
তখন দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তরের ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর ভূমিকার কথা বিবেচনা করে দেখা যাক। অর্থনৈতিক রূপান্তরের উদ্যোগকে তাঁর সমর্থকেরা তাঁর দূরদৃষ্টি ও যোগ্যতা-সক্ষমতার দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রায়ই উল্লেখ করতেন। গত বছর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নটবর সিং হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিয়েছেন যে, ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কার ও পুনর্গঠনের উদ্যোগটি আসলে ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নরসীমা রাওয়ের, যিনি ছিলেন কংগ্রেসের একজন চতুর ও বর্ষীয়ান নেতা। প্রয়োজনীয় কাজ করার ক্ষেত্রে মনমোহন সিংয়ের অনাগ্রহ ছিল; নরসীমা রাও ক্ষেত্র প্রস্তুত করে না দিলে এবং সংস্কারের পক্ষে প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমর্থন সংগঠিত না করলে মনমোহন তেমন কিছুই অর্জন করতে পারতেন না। সরকারের এজেন্ডা অনুসারে কাজ করতেও মনমোহনের অনীহা ছিল। আগে এমন বলাবলি হতো যে, রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তাঁর যোগ্যতাকে খাটো করে দেখা যেমন উচিত নয়, তেমনি অর্থনীতির ব্যবস্থাপক হিসেবে তাঁর দক্ষতার অতিমূল্যায়ন করাও ঠিক হবে না। কিন্তু নরসীমা রাওয়ের ভূমিকা উন্মোচিত হওয়ার আগেই একজন নেতা হিসেবে মনমোহন সিংয়ের অযোগ্যতা-অদক্ষতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি শুধু যে স্থবির হয়ে গেছে তা-ই নয়, তিনি সোনিয়া গান্ধীর সব কথা মান্য করে গেছেন, সেগুলো বৈধ হোক বা না হোক। ফলে শাসনব্যবস্থা ও অর্থনীতির অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়েছে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) সমন্বয়ে গঠিত একটি সংবিধানবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ভারত; সেই সংস্থার নাম ন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কাউন্সিল (এনএসি), সোনিয়া গান্ধী যার সভানেত্রী। মন্ত্রিসভা হয়ে পড়েছে অর্থহীন, ইউরোপীয় কল্যাণরাষ্ট্রের অপুষ্ট ধারণার দ্বারা অনুপ্রাণিত এনএসির ফরমানগুলোই হয়ে উঠেছে সরকারি নীতি। ফলে মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্বে অর্থনীতির অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়েছে, জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, বিশেষত খাদ্যদ্রব্যের দাম। এ ছাড়া ২০০৪ সাল থেকে কংগ্রেসের শাসনামলে রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি ও অর্থসংক্রান্ত কেলেঙ্কারি বেড়েছে, বিস্তার ঘটেছে নানা রকমের অপরাধবৃত্তি। ইউপিএ শাসকগোষ্ঠী দক্ষতার সঙ্গে লুটপাট চালিয়েছে; ব্যাপক দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাবে এই জোটের প্রধান শরিক দল কংগ্রেসের গ্রহণযোগ্যতা নিঃশেষিত হয়েছে। এসব কিছু ঘটেছে অর্থনীতিতে আপাত-শিক্ষিত মনমোহন সিংয়ের নীরব দর্শকের ভূমিকায়; তিনি শুধু দায়িত্বশীলতা দেখাতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছেন আর রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরের অবস্থান থেকে তুচ্ছ মন্তব্য ছুড়ে দিয়েছেন। মনমোহন সিং কংগ্রেস দলের যে ক্ষতির কারণ ঘটিয়েছেন, সেটা পূরণ করার কাজ দলটিরই। আর তাঁর নির্লিপ্ততার কারণে প্রধানমন্ত্রী নামের প্রতিষ্ঠানটির যে ক্ষতি হয়েছে, সেটা ভারতের সব মানুষের সমস্যা। মনমোহন সিংয়ের বিপর্যয়কর নেতৃত্বের এক দশকের বৈশিষ্ট্য হলো দুর্বলতা ও ক্ষয়। এর পরিণামে সামনের অনেক বছর ধরে ভারতকে ভুগতে হবে। তাঁর কাজের ন্যায্যতা প্রতিপাদন দূরে থাক, ইতিহাসবিদেরা জানবেন, নিশ্চিতভাবে কাকে দায়ী করতে হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
 যশবন্ত সিং: ভারতের অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন। জিন্না: ইন্ডিয়া-পার্টিশন—ইনডিপেনডেন্স গ্রন্থের লেখক।

নারী নির্যাতন

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রথমবারের মতো ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন (ভিএডব্লিউ) সার্ভে ২০১১ শিরোনামে যে জরিপটি করেছে, তাতে দেশে নারী নির্যাতনের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। সাধারণভাবে ধারণা করা হয় যে নারীরা ঘরে নিরাপদ এবং বাইরেই বেশি নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু বিবিএসের জরিপটি সেই ধারণাকে উল্টে দিয়েছে। জরিপে দেখা যাচ্ছে, ঘরে আরও নির্দিষ্ট করে বললে স্বামীর দ্বারা কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হন ৮৭.৬ শতাংশ নারী। এর মধ্যে ৮১.২ শতাংশ মানসিক, ৫৩.২ শতাংশ অর্থনৈতিক, ৩৬.৫ শতাংশ যৌন এবং ৬৪.৬ শতাংশ শারীরিক নির্যাতন ভোগ করে থাকেন। এ ছাড়া ৮৫ শতাংশ নারীর উপার্জনের অধিকার না থাকা কিংবা ১৯.১ শতাংশের নিজের ইচ্ছায় ভোট দিতে না পারাও আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে নারীর করুণ চিত্রই তুলে ধরে। প্রথমেই বিবিএসকে ধন্যবাদ দিতে হয় লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা এ রকম একটি নির্মম সত্য সামনে নিয়ে আসার জন্য। বিভিন্ন মহল থেকে যখন নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়নের গালভরা বুলি আওড়ানো হয়, তখন এই জরিপ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে সেই বুলি ও বাস্তবতার মধ্যে দুস্তর ফারাক আছে। আবার এ কথাও সত্য, নারী নির্যাতন রোধ কিংবা নারীর উন্নয়নের দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, সমাজেরও। আমাদের সমাজমানস নানা সংস্কার ও বিধিনিষেধের জালে এমনভাবে তৈরি, যেখানে যুক্তি, জ্ঞান ও সভ্যতার আলো সহজে প্রবেশ করতে পারে না।
এ ক্ষেত্রে আমাদের সেকেলে শিক্ষাব্যবস্থা ও বৈষম্যমূলক পারিবারিক আইনের পাশাপাশি পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাও কম দায়ী নয়। নারীর প্রতি সংঘটিত সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে দেশে একাধিক আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। প্রথমত, আইনি প্রতিকার চাওয়ার জন্য যে অভয় পরিবেশ থাকা দরকার, সেই পরিবেশটি প্রায় অনুপস্থিত। দ্বিতীয়ত, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফরিয়াদি কেবল ন্যায়বিচার থেকেই বঞ্চিত হন না, সামাজিক ও পারিবারিকভাবে লাঞ্ছনা-নিগ্রহের শিকার হন। ঘরে ও ঘরের বাইরে এই নারীর ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে চলেছে, এর প্রতিকার পেতে হলে এটিকে নিছক ব্যক্তিগত, পারিবারিক ঘটনা বলে পাশ কাটানো যাবে না। একই সঙ্গে এটি যে ঘৃণ্য অপরাধ, সেটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে স্বীকার করে নিয়ে প্রতিকারের উদ্যোগ নিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে সালিসের নামে অপরাধকে ধামাচাপা ও অপরাধীকে রক্ষার অপচেষ্টা চালানো হয়। এসব আইনের শাসনেরই পরিপন্থী নয়, মানবাধিকারেরও চরম লঙ্ঘন। নারী নির্যাতনের এই ভয়াল চিত্র নারীর জন্য যেমন অবমাননাকর, তার চেয়েও বেশি লজ্জাজনক পুরুষের জন্য। তাই, এই ভয়াল সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে নারী-পুরুষ সবাইকে এককাট্টা হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি নারীর সামাজিক ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে না পারলে আমরা এই সমাজটিকে সভ্য বলে দাবি করতে পারব না।

ইউক্রেনে সংঘর্ষ চলছেই

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে গতকাল শনিবারও সরকারবিরোধী
বিক্ষোভ চলে। তার আগের রাতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চলার সময়
একজন বিক্ষোভকারী অগ্নিকুণ্ডে টায়ার ছুড়ে দেন। ছবি: রয়টার্স
ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে পুলিশ ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ গতকাল শনিবারও অব্যাহত ছিল। এর আগে সাময়িক বিরতি এবং কিছু ছাড়ের ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচের প্রস্তাব সত্ত্বেও রাতভর বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষ হয়েছে। ১৯৯১ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সংকট চলছে ইউক্রেনে।
দুই মাস ধরে বিক্ষোভ চললেও গতকালের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল। তবে শত শত বিক্ষোভকারী অবস্থান কর্মসূচি অব্যাহত রাখে। দক্ষিণ কিয়েভে একজন পুলিশ সদস্যের লাশ উদ্ধারের পর অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য কর্তৃপক্ষ ও বিরোধীরা পরস্পরকে দায়ী করছে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বিক্ষোভকারীদের বেশ কয়েকজনকে দুই মাসের সাজা দিয়েছেন একটি আদালত। কিয়েভের গ্রাশেভস্কি স্ট্রিটে বিক্ষোভকারীরা শুক্রবার রাতে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা জবাব দেয়। এএফপি।

এবার এএপি-মিডিয়া মুখোমুখি?

বিতর্ক আম আদমি পার্টির (এএপি) পিছু ছাড়তে চাইছে না। নতুন বিতর্কে জড়াচ্ছেন আইনমন্ত্রী সোমনাথ ভারতীও। কিন্তু তা সত্ত্বেও সোমনাথের বিরুদ্ধে এখনই কোনো ব্যবস্থা নেবেন না এএপি-মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। বরং বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনার জবাবে এএপি আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। অরবিন্দ কেজরিওয়াল জানিয়ে দিয়েছেন, খিড়কি গ্রামের ঘটনা নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষ হওয়ার আগে সোমনাথ ভারতীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। সোমনাথকে অবশ্য বেফাঁস কথাবার্তা বলতে বারণ করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের খবর। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি গতকাল শনিবার সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সরাসরি জিজ্ঞাসা করেন, এএপির বিরুদ্ধাচরণের জন্য নরেন্দ্র মোদি তাঁদের কত টাকা দিয়েছেন। সোমনাথের এ মন্তব্যে নিশ্চিত উসকানি ছিল দলীয় এক বিবৃতির। সেই বিবৃতিতে মিডিয়াকে কটাক্ষ করে বলা হয়েছিল, সাধারণত মিডিয়া কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত থাকে। তারাই এএপির বিরুদ্ধে নেতিবাচক খবর প্রকাশ করছে। সরাসরি মোদির নাম করে ফেলাটা ভুল হয়েছে বোঝার পরে সোমনাথ অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান। তবে তাঁর দলের পক্ষ থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাদের আক্রমণাত্মক মনোভাবের আওতা থেকে মিডিয়াকে বাদ দেওয়া হবে না। কেজরিওয়াল বুঝতে পারছেন,
ধরনার পর থেকেই তাঁদের বিরুদ্ধে নানা মহলের সমালোচনার ঢেউ বেড়ে গেছে। এর একটা কারণ, বিজেপির কিছুটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়া, অন্য কারণ রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের প্রাসঙ্গিক থাকার চেষ্টা। এই যৌথ কারণের জন্যই মিডিয়া এএপির বিরুদ্ধাচরণ করছে বলে তাঁদের ধারণা। গতকাল কেজরিওয়াল বলেন, ‘কোনো মুখ্যমন্ত্রী ধরনায় বসতে পারবেন না এমন কোনো বিধান ভারতীয় সংবিধানে লিখে দেওয়া হয়নি।’ পাশাপাশি তিনি জানান, অতি দ্রুত তাঁরা জন লোকপাল বিল পাস করাবেন। এ জন্য দিল্লি বিধানসভার বিশেষ অধিবেশন ডাকা হবে। এ বিশেষ অধিবেশন ডাকা নিয়ে আরও একবার দিল্লি সরকারের সঙ্গে দিল্লি পুলিশের সংঘাত লাগতে পারে। কারণ, কেজরিওয়াল চাইছেন ওই বিশেষ অধিবেশন রামলীলা ময়দানে করতে। অনুমতির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লি পুলিশকে চিঠিও লেখা হয়। দিল্লি পুলিশ প্রধানত নিরাপত্তাজনিত কারণে সেই অনুমতি দেবে না বলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সিন্ধের সঙ্গে সংঘাতের ফলে কেজরিওয়াল তাঁর পছন্দসই আমলাও পাচ্ছেন না। কেজরিওয়াল জানেন, লোকসভা ভোটের আগে কাজের কাজ করে দেখাতে হলে পছন্দসই আমলার সাহচর্য খুবই দরকার। সংঘাতের ফলে সেটাও হচ্ছে না।

সেতু কেলেঙ্কারির পাঁকে নিউজার্সির গভর্নর

রাজনৈতিক কারণে ইচ্ছাকৃত যানজট সৃষ্টি করে কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্রিস ক্রিস্টি। এ কেলেঙ্কারির নাম হয়েছে ‘ব্রিজগেট’। ফলে আগামী নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য এ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজ দলের ভেতরেই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, সাধারণ জনমতও ক্রিস্টির প্রতিকূলে। ক্রিস ক্রিস্টির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি গত নির্বাচনের আগে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। নিজ অঙ্গরাজ্যের সব মেয়রের সমর্থন আদায়ে নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করেন। নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপনকারী ওয়াশিংটন সেতুসংলগ্ন শহর ফোর্ট লির মেয়র মার্ক সোকোলিচকেও চাপ দেওয়া হয়। তবে ডেমোক্রেটিক দলের সমর্থক সোকোলিচ রিপাবলিকান গভর্নর ক্রিস্টিকে সমর্থন দেননি। ফলে তাঁকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গভর্নর অফিস থেকে প্রভাব খাটিয়ে নির্মাণকাজের অজুহাতে ব্যস্ত কর্মদিবসে ওয়াশিংটন সেতুর কয়েকটি লেন বন্ধ রাখা হয়। ফলে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয় সেখানে। ভোগান্তিতে পড়ে জরুরি বিভাগের গাড়িগুলোও। গভর্নর ক্রিস্টির দপ্তরের কিছু ই-মেইল বার্তা গত মাসে প্রকাশ হয়ে পড়ে, যাতে লেন বন্ধ রাখার ব্যাপারে গভর্নরের দপ্তর থেকে কলকাঠি নাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।
তবে গভর্নর দাবি করেছেন, বিষয়টি তাঁর অজ্ঞাতসারে ঘটেছে। সংবাদ সম্মেলন করে তিনি রাজ্যের বাসিন্দাদের কাছে ক্ষমাও চেয়েছেন। চাকরিচ্যুত করা হয়েছে গভর্নরের বিশেষ সহকারীকে। সেতুর লেন বন্ধ রাখার সরাসরি নির্দেশ যে ক্রিস্টিই দিয়েছিলেন, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে বিষয়টি তিনি আদৌ জানতেন না তাও বিশ্বাস করছেন না কেউ। ব্রিজগেট নামে পরিচিতি পাওয়া এ কেলেঙ্কারি নিয়ে বিস্তারিত তদন্ত শুরু হয়েছে। তদন্তে হাজির হতে গভর্নর ক্রিস্টির নির্বাচনী প্রচারণা কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তদন্তের পরই ক্রিস্টির ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সুনিশ্চিত হওয়া যাবে। গভর্নর সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তদন্তে তিনি সহযোগিতা করে যাবেন। এ ঘটনা নিয়ে অস্বস্তিতে রয়েছে রিপাবলিকান দল। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে মোকাবিলায় গভর্নর ক্রিস্টির জনপ্রিয়তাকে বড় করে দেখা হচ্ছিল। তবে কেলেঙ্কারিতে জড়ানো ক্রিস্টির জনপ্রিয়তা এখন নিম্নমুখী। সাধারণ জনমতে তাঁর জনপ্রিয়তা ৬৮ শতাংশ থেকে এক মাসে ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে। উদারনৈতিক রিপাবলিকান হিসেবে ক্রিস্টি এই কেলেঙ্কারি সামাল দিতে না পারলে ২০১৬ সালেও হোয়াইট হাউস রিপাবলিকানদের নাগালের বাইরে থেকে যাবে বলে খোদ দলের মধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে।