Saturday, September 19, 2026

‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ ও চব্বিশের বিপ্লবীরা by মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

১৯২২ সালের নভেম্বরে কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার হয়ে যে তরুণ কবিটিকে কলকাতার জেলে এনে তোলা হয়েছিল, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাকে চিনেছিল কেবল একটি মামলার নম্বর হিসেবে—রাজবন্দি। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যে জবানবন্দিটি লিখে দিলেন, সেটি আসামির আত্মপক্ষ সমর্থন ছিল না; সেটি ছিল বিচারকের আসনটিকেই উল্টে দেওয়ার দলিল। ‘ধূমকেতু’তে ছাপা ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটিকে রাষ্ট্রদ্রোহের প্রমাণ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কাজী নজরুল ইসলাম জবাবে শুরু করলেন এইভাবে—‘আমার উপর অভিযোগ, আমি রাজবিদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দি এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত।’ বাক্যটি নালিশ নয়, ঘোষণা। যে ভাষায় মানুষ ক্ষমা চায়, সে ভাষা এখানে নেই; আছে সেই ভাষা, যে ভাষায় মানুষ রায় শোনায়।

এরপর তিনি যা বললেন, সেটিই এই লেখার কেন্দ্রীয় বাক্য—‘একধারে রাজশক্তি, একধারে সত্য। একজন রাজা, হাতে রাজদণ্ড; আর একজন সত্য, হাতে ন্যায়দণ্ড।’ এক বাক্যে গোটা ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থার মুখোশটা খুলে গেল। রাষ্ট্র বলতে চায়, আইন আর ন্যায় এক জিনিস; আদালত বলতে চায়, রায় আর সত্য এক জিনিস। নজরুল দেখিয়ে দিলেন—না, ওরা দুই জিনিস এবং প্রায়ই ওরা পরস্পরের শত্রু। রাজদণ্ডের হাতে থাকে পুলিশ, দণ্ডবিধি, কারাগার আর ফাঁসিকাঠ। ন্যায়দণ্ডের হাতে থাকে কেবল একটি কণ্ঠস্বর। কিন্তু ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, দ্বিতীয়টিকে ভয় পায় প্রথমটি; উল্টোটা নয়।

নজরুল নিজের অবস্থানকে গুলিয়ে ফেলতে দেননি এক মুহূর্তের জন্যও। তিনি রাজদ্রোহী নন—তিনি অন্যায়ের বিদ্রোহী। এই পার্থক্যটুকু তার জবানবন্দির প্রাণ। রাষ্ট্র চেয়েছিল তাকে একটি অপরাধীর খোপে ঢুকিয়ে দিতে, যাতে তার কথার কোনো নৈতিক ওজন না থাকে। তিনি সেই খোপ ভেঙে বেরিয়ে এসে বললেন, তার বিদ্রোহ কোনো ব্যক্তি বা সিংহাসনের বিরুদ্ধে নয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে। ‘আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদান করার জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত।’ এই আত্মপরিচয়ের ঠিকানাটিই ঔপনিবেশিক আদালতের কাছে সবচেয়ে বিপজ্জনক ছিল। কারণ যে মানুষ নিজের বৈধতা রাষ্ট্রের কাছ থেকে নেয় না, তাকে রাষ্ট্র অবৈধ ঘোষণা করে কোনো লাভ নেই।

একশ বছর পর, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, বাংলাদেশের রাস্তায় ঠিক এই দৃশ্যটাই আবার মঞ্চস্থ হলো। একদিকে রাজদণ্ড—রাষ্ট্রীয় বাহিনী, দলীয় ক্যাডার, কারফিউ, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, গণগ্রেপ্তার, ‘ব্লক রেইড’। অন্যদিকে ন্যায়দণ্ড—হাতে কেবল একটা প্ল্যাকার্ড আর গলায় একটা স্লোগান নিয়ে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী। রংপুরে আবু সাঈদ যখন দুই হাত দুদিকে ছড়িয়ে পুলিশের বন্দুকের সামনে বুক পেতে দাঁড়ালেন, তখন তিনি আসলে একটি বাক্যকেই শরীরে অনুবাদ করছিলেন। রাজদণ্ডের হাতে ছিল রাইফেল, তার হাতে ছিল একটি লাঠি আর একটি সত্য। গুলিটা তার বুকে লাগল, কিন্তু ভিডিওটা লাগল গোটা দেশের বুকে।

রাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে তাদের গায়ে নাম সেঁটে দিতে চাইল—জঙ্গি, রাজাকার, দেশের শত্রু, বিদেশি ষড়যন্ত্রের দালাল। ঠিক যেভাবে একশ বছর আগে নজরুলের গায়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছিল ‘রাজবিদ্রোহী’ তকমাটি। এই নামকরণের রাজনীতিটা বোঝা জরুরি—শাসক আগে প্রতিবাদকারীর পরিচয় নির্ধারণ করে নেয়, তারপর সেই পরিচয়ের উপযুক্ত শাস্তিটা প্রয়োগ করে। নজরুল সেই ফাঁদে পা দেননি; তিনি রাষ্ট্রের দেওয়া নামটা ছুড়ে ফেলে নিজের নামটা নিজে ঘোষণা করেছিলেন। চব্বিশের শিক্ষার্থীরাও তাই করলেন—‘রাজাকার’ গালিটাকে তারা স্লোগানে রূপান্তরিত করে ফিরিয়ে দিলেন। অপমানকে অস্ত্র বানিয়ে ফেরত পাঠানোর এই কৌশলটা আসলে আত্মপরিচয়ের ওপর নিজের দখল ফিরিয়ে নেওয়া।

কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্র কখনোই নতুন কৌশল আবিষ্কার করে না, সে কেবল ঔপনিবেশিক পুরোনো ম্যানুয়ালটাই আবার খুলে বসে। ব্রিটিশ যে ১২৪-ক ধারা দিয়ে নজরুলকে ধরেছিল, ফ্যাসিবাদী সরকার সেই একই যুক্তি দিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বানিয়েছিল। ব্রিটিশ যেভাবে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা’র নামে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করত, চব্বিশে সেভাবেই হল বন্ধ করে, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে, শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা হলো। রিমান্ডের নামে নির্যাতন, গুম হয়ে যাওয়া তরুণ, আয়নাঘরের গল্প—এসবের কোনোটিই বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়। এগুলো ঔপনিবেশিক আমলের উত্তরাধিকার, যা স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রযন্ত্র পরম যত্নে সংরক্ষণ করেছিল, শুধু বন্দুকের নলটা ঘুরিয়ে দিয়েছিল নিজের নাগরিকদের দিকে।

নজরুল জানতেন, কারাগার আসলে ভয় উৎপাদনের কারখানা। শাসক একজনকে বন্দি করে দশ হাজারকে চুপ করানোর জন্য। তাই তার জবানবন্দির সবচেয়ে বড় আঘাতটা ছিল ভয়ের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, সত্য স্বয়ং-প্রকাশ; তাকে কারারুদ্ধ করা যায় না। কবিকে জেলে পোরা যায়, কিন্তু কবির বাণীকে নয়। এই কথাটির সত্যতা চব্বিশে আমরা চোখের সামনে দেখেছি। সরকার শত শত শিক্ষার্থীকে তুলে নিয়ে গেছে, ডিবি অফিসে বসিয়ে জোর করে আন্দোলন প্রত্যাহারের বিবৃতি পড়িয়েছে ক্যামেরার সামনে। ফল কী হলো? পরদিন সেই ভিডিওটাই হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় প্ররোচনা। জোর করে আদায় করা স্বীকারোক্তি রাষ্ট্রকে বাঁচায় না, ফাঁস করে দেয়।

‘কারার ওই লৌহকপাট, ভেঙে ফেল কররে লোপাট’—নজরুলের এই লাইনটা এতদিন আমাদের কাছে ছিল অনুষ্ঠানের গান। চব্বিশে এটা আবার কাজের নির্দেশনা হয়ে উঠল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে যেদিন শিক্ষার্থীরা দখলদার ছাত্রসংগঠনকে বের করে দিলেন, যেদিন গেটের তালা ভেঙে মিছিল রাস্তায় নামল, সেদিন গানটার প্রতিটি শব্দ আক্ষরিক অর্থ ফিরে পেল। রাষ্ট্র ভেবেছিল হলগুলোই তার সবচেয়ে বড় দুর্গ, কারণ ওখানে সিট মানেই আনুগত্য। অথচ সেই দুর্গই প্রথম ভাঙল। ভয় জিনিসটা এমন—যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ পাথরের মতো শক্ত, আর ভাঙলে বালির মতো গুঁড়ো।

জবানবন্দিতে নজরুল নিজেকে বলেছিলেন বাঁশি—যন্ত্র, যন্ত্রী নন। বাণীটা তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তিনি কেবল বাহক। এই বিনয়ের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সবচেয়ে কঠিন রাজনৈতিক সত্য—যে কথার মালিক কোনো একক ব্যক্তি নয়, সেই কথা মেরে ফেলা যায় না। ব্রিটিশ নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছিল, ভেবেছিল ‘ধূমকেতু’র আগুন নিভে যাবে। নেভেনি। চব্বিশের আন্দোলনেরও কোনো একক নেতা ছিল না, কোনো একক দপ্তর ছিল না, যেটা দখল করলেই সব শেষ। সমন্বয়কদের ধরে নিয়ে গিয়েও রাষ্ট্র দেখল, পরদিন রাস্তায় মানুষ আরো বেশি। দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি, ফেসবুকের প্রোফাইল লাল—বাণীর কোনো একটা ঠিকানা ছিল না বলেই সেটা তল্লাশি করে পাওয়া গেল না।

তবে নজরুলের জবানবন্দিকে কেবল সাহসের দলিল বলে পড়লে তার অর্ধেকটা হারিয়ে যায়। ওটা একই সঙ্গে একটা নৈতিক দর্শনের দলিল। তিনি কোথাও প্রতিশোধের কথা বলেননি, ঘৃণার চাষ করেননি। তার বিদ্রোহ ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অন্যায়কারীর ব্যক্তিসত্তার বিরুদ্ধে নয়। এই জায়গাটায় চব্বিশের তরুণদের সঙ্গে তার মিলটা সবচেয়ে গভীর। যখন আন্দোলনকারীরা নিহত পুলিশ সদস্যের জানাজায় দাঁড়িয়েছেন, যখন মন্দির পাহারা দিতে সারারাত জেগে থেকেছেন, তখন তারা আসলে সেই একই নীতিতেই দাঁড়িয়েছিলেন—অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই আর প্রতিহিংসা এক জিনিস নয়। এই পার্থক্যটুকু হারিয়ে ফেললে বিদ্রোহ নিজেই নতুন রাজদণ্ড হয়ে ওঠে।

আরেকটি প্রশ্ন এই লেখাটি লেখকদের দিকে ছুড়ে দেয়। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, কবির দায়িত্ব সত্যকে প্রকাশ করা—সরকারের স্তুতি করা নয়, নিরপেক্ষতার ভান করে চুপ থাকাও নয়। অথচ চব্বিশের জুলাইয়ে যখন ছেলেমেয়েগুলো রাস্তায় মরছিল, তখন দেশের বহু প্রতিষ্ঠিত কবি, অধ্যাপক ও সাংবাদিক নীরবতাকেই ভদ্রতা বলে চালিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ কেউ আরো এগিয়ে গিয়ে হত্যাকাণ্ডের যৌক্তিকতা খুঁজেছিলেন। ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাদের জন্য কোনো ছাড় রাখে না। যে কলম রাজদণ্ডের ছায়ায় আরাম খোঁজে, নজরুলের সংজ্ঞায় সে কলম আর কবির থাকে না, কেরানির হয়ে যায়।

এখানেই ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ আমাদের সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটা করে। নজরুল রাজশক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, কোনো নির্দিষ্ট রাজার বিরুদ্ধে নয়। রাজদণ্ড হাতবদল হতে পারে, কিন্তু রাজদণ্ড রাজদণ্ডই থাকে। যে গুম-খুন-নির্যাতনের বিরুদ্ধে চব্বিশের ছাত্ররা রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই একই যন্ত্র কাল অন্য কারো হাতে গেলে সে কি আপনাআপনি ন্যায়দণ্ড হয়ে যাবে? নজরুলের উত্তর পরিষ্কার—না। যে কণ্ঠ শুধু নিজের প্রতিপক্ষ ক্ষমতায় থাকলে সোচ্চার হয় আর নিজের লোক ক্ষমতায় এলে চুপ করে যায়, সে কণ্ঠ ন্যায়দণ্ড ধরেনি, সে শুধু রাজদণ্ডের পালা বদলের জন্য অপেক্ষা করছিল।

এই কারণেই জবানবন্দিটি এখনো ব্যবহারযোগ্য, জাদুঘরের জিনিস নয়। একটা রাষ্ট্র যখন প্রশ্নকে অপরাধ বানায়, তখন সে যে নামেই ডাকা হোক—ঔপনিবেশিক, জাতীয়তাবাদী, উন্নয়নবাদী, বিপ্লবী—চরিত্রে সে একই। নজরুল আদালতে দাঁড়িয়ে যে মৌলিক প্রশ্নটা তুলেছিলেন, সেটা হলো—সত্য বলার অধিকারের বৈধতা কে দেয়? রাষ্ট্র? তাহলে রাষ্ট্র যা শুনতে চায় না, তা কখনোই বলা যাবে না এবং কথার স্বাধীনতা কথাটার আর কোনো মানে থাকে না। তিনি সেই বৈধতার উৎসকে রাষ্ট্রের বাইরে নিয়ে গিয়েছিলেন—বিবেক ও সত্যের কাছে। এই স্থানান্তরটাই তার সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ, কবিতার চেয়েও বড়।

চব্বিশের জুলাইয়ে যে ছেলেটি টিয়ারশেলের ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে দৌড়ে গিয়ে সহপাঠীর রক্তাক্ত শরীরটা কাঁধে তুলে নিয়েছিল, সে হয়তো ‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ পড়েনি। কিন্তু সে ঠিক ওই কাজটাই করছিল, যেটা নজরুল কাগজে করেছিলেন—রাষ্ট্রের ভয়কে অস্বীকার করা। বইয়ের সঙ্গে রাস্তার সম্পর্কটা এভাবেই তৈরি হয়। কোনো প্রবন্ধ কোনো মিছিল তৈরি করে না, কিন্তু মিছিলটা যখন তৈরি হয়ে যায়, তখন সে নিজের ভাষা খুঁজতে গিয়ে পুরোনো কণ্ঠস্বরগুলোকে আবিষ্কার করে। শহীদ মিনারের দেয়ালে যেদিন কেউ নজরুলের লাইন লিখে দিল, সেদিন একশ বছর আগের একটা আদালতকক্ষ আর ২০২৪ সালের একটা রাস্তা এক হয়ে গেল।

নজরুল সেই মামলায় এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পেয়েছিলেন। জেলে গিয়ে অমানবিক আচরণের প্রতিবাদে চল্লিশ দিন অনশন করেছিলেন। রাষ্ট্র শাস্তি দিতে পেরেছিল, কিন্তু বশ করতে পারেনি। শাস্তি আর বশীকরণের এই ব্যবধানটাই সব স্বৈরশাসনের চূড়ান্ত ব্যর্থতা। চব্বিশেও তাই হলো—রাষ্ট্র মারতে পেরেছিল, আটকাতে পারেনি; ইন্টারনেট বন্ধ করতে পেরেছিল, খবর আটকাতে পারেনি; কারফিউ দিতে পেরেছিল, রাস্তা খালি রাখতে পারেনি। যেদিন একটা রাষ্ট্র বুঝতে পারে যে তার নাগরিক আর ভয় পাচ্ছে না, সেদিন তার হাতে আর কোনো হাতিয়ার অবশিষ্ট থাকে না। বন্দুক তখন কেবল শব্দ করে, শাসন করে না।

‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ তাই কোনো একটি সালের দলিল নয়, একটি অবস্থানের নাম। যতদিন কোথাও কোনো তরুণকে সত্য বলার অপরাধে তুলে নিয়ে যাওয়া হবে, যতদিন কোনো আদালত ন্যায়ের বদলে ক্ষমতার সেবা করবে, ততদিন এই লেখাটা কাউকে না কাউকে খুঁজে নেবে। চব্বিশ আমাদের শিখিয়েছে, ন্যায়দণ্ড কোনো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জিনিস নয়; প্রতিটি প্রজন্মকে সেটা নিজের হাতে তুলে নিতে হয় এবং প্রতিটি প্রজন্মকেই আবার প্রমাণ দিতে হয়, সে সেটা রাজদণ্ড বানিয়ে ফেলেনি। নজরুল কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটা রেখে গিয়েছিলেন, সেটা এখনো আমাদের ঘাড়ের ওপর ঝুলে আছে—আপনার হাতে কোনটা?

‘রাজবন্দির জবানবন্দি’ ও চব্বিশের বিপ্লবীরা

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বর্তমান বাস্তবতা by মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)

পার্বত্য চট্টগ্রাম—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—বাংলাদেশের অন্যতম কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল অঞ্চল। দেশের মোট আয়তনের প্রায় এক-দশমাংশজুড়ে বিস্তৃত এই এলাকা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত ভাগ করে নিয়েছে। দুর্গম ভূপ্রকৃতি, জাতিগত বৈচিত্র্য, অমীমাংসিত ভূমিবিরোধ, একাধিক সশস্ত্র সংগঠন, আন্তঃসীমান্ত চোরাচালান এবং সংঘাতপূর্ণ মিয়ানমারের নৈকট্য—সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি কোনো আঞ্চলিক প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এ সমস্যার শিকড় ইতিহাসের গভীরে প্রোথিত। ষাটের দশকের গোড়ায় কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের ফলে প্রায় ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি পানির নিচে চলে যায় এবং প্রায় এক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হন, যাদের অধিকাংশ ছিলেন চাকমা জনগোষ্ঠীর। অনেকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ পাননি এবং হাজার হাজার মানুষ ভারতে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও ভূমির অধিকার নিয়ে মতবিরোধের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি এবং এর সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনীর উত্থান ঘটে। প্রায় দুই দশকের সশস্ত্র সংঘাতে বহু মানুষের মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠী, বাঙালি অধিবাসী ও রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।

১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি প্রধান সশস্ত্র বিদ্রোহের অবসান ঘটিয়ে অস্ত্রধারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগ সৃষ্টি করে। চুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি অথবা শক্তিশালী করা হয়। এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক অর্জন, কারণ এর মাধ্যমে সশস্ত্র সংঘাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক আলোচনার পথ উন্মুক্ত হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ও শান্তির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এখনো নিশ্চিত হয়নি। ভূমির মালিকানা, স্থানীয় পরিষদের ক্ষমতা ও নির্বাচন, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং কেন্দ্র ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে প্রশাসনিক ক্ষমতা বণ্টন নিয়ে বিরোধ রয়ে গেছে। অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন ও রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠন গড়ে উঠেছে। জনসংহতি সমিতির ভাঙনের পাশাপাশি ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট—ইউপিডিএফ এবং এর বিভিন্ন অংশ নিজেদের রাজনৈতিক ও সশস্ত্র কাঠামো তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বান্দরবানের কিছু এলাকায় কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টÑকেএনএফ এবং এর সশস্ত্র শাখার উত্থান নতুন নিরাপত্তা-চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে। ২০২৪ সালে ব্যাংক ডাকাতি, অপহরণ, অস্ত্র লুট ও নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় কেএনএফের কথিত সংশ্লিষ্টতা দেখিয়েছে যে সীমিত ভৌগোলিক এলাকায় সক্রিয় একটি সংগঠনও জাতীয় পর্যায়ে নিরাপত্তা-সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

চাঁদাবাজি, অপহরণ, গোষ্ঠীগত হত্যাকাণ্ড এবং অবৈধ কর আদায়ের কারণে ব্যবসায়ী, পরিবহনশ্রমিক, ঠিকাদার ও সাধারণ গ্রামবাসী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিভিন্ন সংগঠন বিশেষ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করলেও তাদের সশস্ত্র নিয়ন্ত্রণ সেই জনগোষ্ঠীর মানুষেরই স্বাধীন রাজনৈতিক মতপ্রকাশ, জীবিকা ও নিরাপত্তাকে সংকুচিত করে। অস্ত্রধারী গোষ্ঠীর উপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে মতামত দিতে বা গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। মিয়ানমারের সংঘাত এ পরিস্থিতিতে আরো বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে। রাখাইন ও চীন রাজ্যে যুদ্ধ, আরাকান আর্মির ক্রমবর্ধমান শক্তি, জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং অবাধ অস্ত্রপ্রবাহ বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তকে একটি অস্থিতিশীল রণসীমায় পরিণত করছে। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দুর্গম বনাঞ্চল, পাহাড়ি পথ এবং বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারে বিস্তৃত জাতিগত এবং পারিবারিক যোগাযোগকে কাজে লাগাতে পারে। মাদক—বিশেষ করে ইয়াবা ও মেথামফেটামিনÑছোট অস্ত্র, চোরাই পণ্য এবং মানব পাচারের পথগুলোও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। ফলে একটি স্থানীয় ঘটনা খুব দ্রুত আন্তঃসীমান্ত নিরাপত্তা-সংকটে রূপ নিতে পারে।

কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই অঞ্চলের অস্থিতিশীলতাকে বিদেশি শক্তি বা স্বার্থান্বেষী মহল কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, মিয়ানমারের সংঘাতপূর্ণ এলাকা, বঙ্গোপসাগর এবং দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সম্ভাব্য যোগাযোগ করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত। আন্তর্জাতিক অধিকার সংগঠন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গোয়েন্দা সংস্থা, আন্তঃসীমান্ত জাতিগত নেটওয়ার্ক ও ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী—সব পক্ষেরই এ অঞ্চলের ঘটনাবলির প্রতি আগ্রহ থাকতে পারে। এর কিছু মানবিক সহায়তা বা মানবাধিকারের বৈধ উদ্বেগ থেকে পরিচালিত হতে পারে; আবার কিছু তৎপরতার উদ্দেশ্য হতে পারে স্থানীয় সংগঠনকে প্রভাবিত করা, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাকে কাজে লাগানো অথবা ঢাকাকে কূটনৈতিক চাপে রাখা। তবে সরকারকে প্রমাণিত বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অনুমাননির্ভর অভিযোগের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে। বিদেশি অর্থায়ন, অস্ত্র সরবরাহ, প্রশিক্ষণ কিংবা নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ গোয়েন্দা তথ্য, আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড এবং কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। প্রমাণ ছাড়া কোনো অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। পাহাড়ি জনগণের প্রতিটি দাবি বা অভিযোগকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে চিহ্নিত করলে নাগরিকদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা বাড়বে এবং প্রকৃত বিদেশি হস্তক্ষেপের সুযোগ আরো প্রসারিত হবে। আবার সব নিরাপত্তা-আশঙ্কাকে প্রচারণা বলে উড়িয়ে দেওয়াও বিপজ্জনক। প্রয়োজন পেশাদার প্রতিগোয়েন্দা তৎপরতা, রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্বচ্ছ তদন্ত।

অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ অমীমাংসিত থাকলেই বিদেশি পক্ষগুলো তা কাজে লাগানোর সুযোগ পায়। ভূমিবিরোধ, দুর্নীতি, দুর্বল স্থানীয় শাসন, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বৈষম্য এবং সংস্কৃতি অবজ্ঞার ধারণা সশস্ত্র সংগঠনগুলোর সদস্য সংগ্রহের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা কিংবা নির্যাতনের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত না হলে সেসব ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে। তাই বিদেশি প্রভাব মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় শুধু গোপনীয়তা বা শক্তি প্রদর্শন নয়; বরং এমন একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, যা প্রত্যেক নাগরিককে সমানভাবে সুরক্ষা দেয়। সশস্ত্র গোষ্ঠী যখন সড়ক নিয়ন্ত্রণ, চাঁদা আদায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয় দেখায়, তখন সাধারণ মানুষ স্বাধীনভাবে আলোচনায় অংশ নিতে পারে না।

এ কারণে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি ও কার্যকর ভূমিকা অপরিহার্য। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাকে সীমান্ত নজরদারি, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, অস্ত্র ও মাদকের পথ বন্ধ এবং সশস্ত্র ঘাঁটি নির্মাণ প্রতিরোধ করতে হবে। অভিযান হতে হবে গোয়েন্দা তথ্যনির্ভর, লক্ষ্যভিত্তিক ও আইনের সীমার মধ্যে। সামষ্টিক শাস্তি, নির্বিচার আটক কিংবা কোনো সম্প্রদায়কে হয়রানি করা অন্যায় এবং কৌশলগতভাবেও ক্ষতিকর। নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের পাশাপাশি সেখানে নিয়োজিত সদস্যদের স্থানীয় ভাষা, সংস্কৃতি, মানবাধিকার ও সংঘাত-সংবেদনশীলতা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সরকারকে একটি স্থায়ী জাতীয় সমন্বয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, স্থানীয় পরিষদ এবং সব সম্প্রদায়ের গ্রহণযোগ্য প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকবেন। এই কাঠামো সশস্ত্র সংগঠন, সীমান্তপথ, চাঁদাবাজি, অবৈধ অর্থায়ন, ভূমিবিরোধ এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা সম্পর্কে সমন্বিত মূল্যায়ন করবে। সীমান্ত নজরদারিতে আধুনিক প্রযুক্তি, ড্রোন, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও দ্রুত চলাচলের সক্ষমতা দরকার; তবে প্রযুক্তি কখনো মানব গোয়েন্দা তথ্য এবং জনগণের আস্থার বিকল্প হতে পারে না। শান্তিচুক্তির প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করে সরকারকে প্রকাশ করতে হবেÑকোনগুলো বাস্তবায়িত হয়েছে, কোনগুলো অসম্পূর্ণ এবং কোনগুলোতে আইনগত ব্যাখ্যা বা সংশোধন প্রয়োজন। এরপর একটি সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন-রোডম্যাপ প্রণয়ন করা উচিত। গ্রহণযোগ্য ভোটার তালিকার ভিত্তিতে স্থানীয় ও আঞ্চলিক পরিষদের নির্বাচন প্রতিনিধিত্বশীল শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। ভূমি কমিশনকে পর্যাপ্ত জনবল, অর্থ, কার্যকর বিধিমালা, আধুনিক জরিপ, ডিজিটাল রেকর্ড এবং ভুয়া দাবি প্রতিরোধের ক্ষমতা দিতে হবে। ভূমিবিরোধের সমাধান জাতিগত উত্তেজনা বা শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়; আইন, দলিল, ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও আলোচনার মাধ্যমে করতে হবে।

সরকার, শান্তিচুক্তির স্বাক্ষরকারী পক্ষ, চুক্তিবহির্ভূত রাজনৈতিক সংগঠন, নারী, যুবক, প্রথাগত নেতা, বাঙালি অধিবাসী এবং তুলনামূলক ছোট পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে নিয়ে নতুন সংলাপ শুরু করা প্রয়োজন। তবে সংলাপের অর্থ সহিংসতাকে বৈধতা দেওয়া নয়। যেসব সশস্ত্র সংগঠন সহিংসতা ত্যাগ, অবৈধ অস্ত্র সমর্পণ এবং সংবিধান মেনে শান্তিপূর্ণ রাজনীতিতে অংশ নিতে রাজি হবে, তাদের জন্য যাচাইযোগ্য পুনর্বাসনের পথ রাখা যেতে পারে। যারা হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালিয়ে যাবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কিন্তু আইনসম্মত ব্যবস্থা নিতে হবে। উন্নয়নকে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। শুধু সড়ক ও পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণ করলেই শান্তি আসবে না, যদি স্থানীয়রা বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কায় থাকে কিংবা উন্নয়নের সুফল না পায়। বাংলা, ইংরেজি ও উপযুক্ত মাতৃভাষায় শিক্ষা, দুর্গম এলাকায় আবাসিক বিদ্যালয়, বৃত্তি, কারিগরি প্রশিক্ষণ, টেলিমেডিসিন, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল যোগাযোগ এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। পাহাড় কাটা, বন উজাড় ও অপরিকল্পিত পর্যটন জীবিকা ধ্বংস এবং ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার এবং মিয়ানমার সীমান্তের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ বজায় রাখা জরুরি, যাতে কোনো সশস্ত্র সংগঠন প্রতিবেশী ভূখণ্ডকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে। সহযোগিতার ক্ষেত্র হবে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অস্ত্র পাচার এবং অপরাধীদের প্রত্যর্পণ। তবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে কোনো বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সহায়তা নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের নীতিনির্ধারিত হবে ঢাকায় এবং ওই অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে পরামর্শের ভিত্তিতে।

সরকারকে দুটি বিপজ্জনক ধারণা পরিহার করতে হবে—একটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা; অন্যটি হলো, নিরাপত্তাব্যবস্থার কোনো প্রয়োজন নেই এবং শুধু ছাড় দিয়েই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। টেকসই শান্তির জন্য রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও ন্যায়বিচার—উভয়ই দরকার। বাংলাদেশকে দৃঢ়ভাবে সীমান্ত ও ভূখণ্ড রক্ষা, সশস্ত্র গোষ্ঠী নিরস্ত্রীকরণ এবং বিদেশি হস্তক্ষেপ প্রতিহত করতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ অভিযোগের সমাধান, সমান নাগরিক মর্যাদা, বাস্তবসম্মত অঙ্গীকার পূরণ এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে কখনো আঞ্চলিক শক্তির প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র বা সরকারের ওপর স্থায়ী চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হতে দেওয়া যাবে না। পাহাড়ের মানুষ বাংলাদেশেরই নাগরিক; তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সমৃদ্ধি দেশের সার্বভৌমত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে রাষ্ট্র সন্ত্রাস ও বিচ্ছিন্নতাবাদ দমনে শক্তিশালী, আইন মানতে সংযত এবং মানুষের অভিযোগ সমাধানে আত্মবিশ্বাসীÑসেই রাষ্ট্রই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি ঝুঁকিপূর্ণ সীমান্ত থেকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে শান্তি, যোগাযোগ ও সমৃদ্ধির সেতুতে রূপান্তর করতে পারবে।

hrmrokan@hotmail.com

পার্বত্য চট্টগ্রাম ও বর্তমান বাস্তবতা

ভারতে দারিদ্র্য ঢেকে রাখার পর্দা সংস্কৃতি by এলাহী নেওয়াজ খান

সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনকালে পর্দা টানিয়ে দারিদ্র্য ঢেকে রাখার ঘটনা বিশ্বে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বস্তির জরাজীর্ণ বাড়িঘর ও নোংরা পোশাক পরিহিত মানুষকে পর্দা দিয়ে আড়াল করা হয়েছে, যাতে বিশ্বনেতারা ভারতের আসল চেহারা দেখতে না পান। কিন্তু তাতে কি সত্য গোপন রাখা গেছে? বরং সবাই বুঝে গেলেন, পর্দার ওপারে কী নির্মম সত্যটা লুকিয়ে আছে। বলা যায়, বিজেপি সরকারের এই উদ্যোগের ফলটা উল্টো হয়েছে। কারণ বিরোধী দল, বিশেষ করে আম আদমি পার্টির নেতারা এই কৃত্রিমতাকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করায় বিষয়টি বিশ্ববাসীর কাছে আরো নগ্নভাবে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। তবে এটাই ভারতের সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তব চিত্র।

মূলত, ব্রিকস সম্মেলন কেন্দ্রে যাওয়ার পথে নয়াদিল্লির প্রধান সড়কের পাশে বসন্তবিহার কুলি নামক বস্তিকে ঢেকে রাখতে এই পর্দা টানানো হয়। ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনেও ওই বস্তি ঢাকতে একইভাবে পর্দা টানানো হয়েছিল। তবে এবারের ঘটনা ইতালির প্রখ্যাত সাংবাদিক ওরিয়ানা ফ্যালাসির সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারের বর্ণনার কথাটি মনে করিয়ে দিয়েছে। সেটি ছিল ফ্যালাসির নেওয়া ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাক্ষাৎকার। সে সাক্ষাৎকারের ভূমিকা অংশে নয়াদিল্লির চরম দারিদ্র্য ও বস্তির এক মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল।

সেই ঘটনার ৫৫ বছর পর সেই দিল্লিতেই ২০২৬ সালে সেই দরিদ্রতার পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে আগের তুলনায় রাস্তায় সেই পবিত্র পশুর বিচরণ অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ফ্যালাসি তার বর্ণনায় উল্লেখ করেছিলেন। এটি ছিল ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ওরিয়ানা ফ্যালাসির সেই সাক্ষাৎকারের ভূমিকা অংশের বর্ণনাটি ছিলÑযেমন একদিকে রয়েছে নয়াদিল্লির চওড়া রাস্তা, রাজকীয় ও জাঁকজমকপূর্ণ সরকারি প্রাসাদ এবং লন, আর এর উল্টো পাড়ে নির্মম দারিদ্র্যের দৃশ্য।

ফ্যালাসির বর্ণনাটা ছিল এ রকম—‘ফুটপাতের ওপর জীর্ণ নোংরা কাপড়ের স্তূপের উপর এক বৃদ্ধ ভিখারি অঘোরে ঘুমাচ্ছিলেন, ঠিক তার পাশেই একটি গরু মলত্যাগ করছিল। যার ফলে সেই মল ছিটকে এসে ঘুমন্ত বৃদ্ধ লোকটির শরীর ও কাপড় নোংরা করে দিচ্ছিল।’

এই দৃশ্যটি দেখে নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে তিনি মৃদুস্বরে ফিসফিস করে বলে উঠেছিলেন, ‘ভারতে সবকিছু বোধ হয় একটু বেশি ধীরগতিতে চলে।’ এই মন্তব্যটি ইন্দিরা গান্ধীর ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিয়েছিল। ফ্যালাসি লিখেছেন, ‘তার কথাটি শেষ হতে না হতেই ইন্দিরা গান্ধী লোহার মতো শক্ত পাঁচটি আঙুল দিয়ে তার হাত চেপে ধরেছিলেন এবং অত্যন্ত শীতল ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে তিনি তার বিখ্যাত অব দ্য রেকর্ড মন্তব্যটি করেছিলেন।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একদল বোকা দ্বারা পরিবেষ্টিত।’

সে যাই হোক, ওই পটভূমিতে বর্তমানে ভারতের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির স্বরূপটা আমাদের জানা দরকার। প্রকৃতপক্ষে বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ভারতে জীবনযাত্রার প্রকৃত মান বোঝার জন্য দৈনিক ৪ দশমিক ২০ ডলারের একটি উচ্চতর দরিদ্রসীমা ব্যবহার করা হয়েছে। আর এই উচ্চতার মানদণ্ড অনুযায়ী ভারতের প্রায় ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষÑঅর্থাৎ ৩৪ কোটি ২০ লাখ মানুষ এখনো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। অর্থাৎ মানুষ এখন না খেয়ে মারা যাচ্ছে না ঠিকই, তবে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও মানসম্মত জীবনযাত্রার দিক থেকে বড় একটি অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

এছাড়া ভারতের সিংহভাগ মানুষ গ্রামে বাস করে এবং কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কাজের সন্ধানে গ্রাম থেকে এসে শহরে অভিবাসনের ফলে বস্তি অঞ্চলে দরিদ্রের একটি নতুন রূপ তৈরি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। অন্যদিকে ভারতে অর্থনৈতিক বৈষম্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। অক্সফাম ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের সিংহভাগ সম্পদ মাত্র ১ শতাংশ ধনকুবেরের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উত্তরণ ধীরগতির হয়ে পড়েছে।

এদিকে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপিএইচআই যৌথভাবে যে প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে, তা শুধু আয়ের ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং জীবনযাত্রার মান—এই তিনটি বিষয়ের বারোটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। এই আন্তর্জাতিক সূচক অনুযায়ী, ভারতে তীব্র দারিদ্র্য অনেক কমেছে বটে, তবে এখনো দেশটির হেডকাউন্ট রেশিও ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ ১৬ শতাংশের অধিক মানুষ এখনো প্রতিদিনের জীবনে পুষ্টি, মানসম্মত বাসস্থান, পরিচ্ছন্ন জ্বালানি কিংবা শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকারের কোনো না কোনোটি থেকে বঞ্চিত।

যদিও বাগাড়ম্বরপূর্ণ প্রচারণার কারণে ভারতের অর্থনীতির সত্যিকারের চেহারা জানা সম্ভব হয় না। তবে ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উপদেষ্টা জয়ন্ত ভান্ডারী বিভিন্ন সময়ে ভারতের দারিদ্র্য ও অর্থনীতি সম্পর্কে যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, তা থেকে প্রকৃত সত্যটা পাওয়া যায়। তিনি ভারতকে মেরুদণ্ডহীন জেলিফিশের সঙ্গে তুলনা করে মতাদর্শহীন রাষ্ট্র বলে অভিহিত করেছেন। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে ভারতের দারিদ্র্য ও অর্থনীতি সম্পর্কে বিস্ফোরক সব মন্তব্য করেছেন।

ভান্ডারীর মতে, ভারত বিশ্বশক্তি হয়ে উঠছে—এই প্রচারণামূলক আখ্যানটি একটি মরীচিকা। মহাকাশ অভিযান, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন, ট্রিলিয়ন ডলারের মোট জিডিপির আড়ালে সাধারণ নাগরিকদের প্রকৃত অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আড়াল করা হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন যে, মোট জনসংখ্যার অনুপাতে মাথাপিছু আয় অত্যন্ত কম। তার মতে, প্রকৃত অর্থে ভারত এখনো বিশ্বের দরিদ্রতম দেশগুলোর একটি। যেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ তীব্র অর্থনৈতিক অসমতা, কর্মসংস্থানের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করছে।

ভান্ডারী মনে করেন, ভারতের অর্থনৈতিক অনগ্রসরতার মূল কারণ শুধু ভুল নীতি নয়, বরং সাংস্কৃতিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়। তিনি বলেন, ভারতে সর্বস্তরের শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। সমাজে যুক্তি ও সৃজনশীলতার অভাব, লোকদেখানো জাতীয়তাবাদ ও অন্ধবিশ্বাস যোগ্যতার স্থান দখল করে নিয়েছে।

তিনি স্পষ্টভাবে বিশ্বাস করেন, ভারতের পক্ষে পরবর্তী চীন হওয়া অসম্ভব। চীন যেভাবে তাদের শাসনতান্ত্রিক সক্ষমতা ও উৎপাদনযোগ্যতার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষকে দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছে, সে ক্ষেত্রে ভারতের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং অদক্ষতার কারণে সেই স্তরের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়।

জয়ন্ত ভান্ডারী আরো বলেছেন, ভারতের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কারণেই দেশের শিক্ষিত তরুণ ও দক্ষ পেশাজীবীরা সুযোগ পেলেই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার মতে, দেশের ভেতরে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থানের কোনো সুনির্দিষ্ট ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ না থাকায় এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

ভারতে দারিদ্র্য ঢেকে রাখার পর্দা সংস্কৃতি

বিশ্ববাণিজ্যের দুটি দুঃস্বপ্ন: রুদ্ধ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবে by প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম

বিশ্ববাণিজ্যের ইতিহাসে কিছু জলপথ আছে, যেগুলোর আয়তন ছোট হলেও গুরুত্ব মহাদেশের চেয়েও বড়। হরমুজ প্রণালি এবং বাব আল-মান্দেব তেমনই দুটি সামুদ্রিক ‘চোকপয়েন্ট’। একটি পারস্য উপসাগরের তেল-গ্যাসের প্রধান দরজা, অন্যটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের মাধ্যমে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ।

ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে নিয়ে জিবুতি ও ইয়েমেনকে যুক্ত করেছে। বাব আল-মান্দেব ফারসি শব্দ। এর অর্থ মৃত্যু দরজা। অতীতে নাবিকরা দিকনির্দেশনা ভুল করে এই পথে দিশাহারা হয়ে পড়তেন বলেই এমন নামকরণ করা হয়েছিল। ভৌগোলিকভাবে এটি সরু; কিন্তু বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব অসীম।

একটির অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে কাঁপিয়ে দেয়; অন্যটির সংকট জাহাজকে আফ্রিকা ঘুরিয়ে দেয়। কিন্তু দুটিই যদি একই সময়ে কার্যত বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সংকট আর মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়বে বিশ্ববাণিজ্য, জ্বালানি, খাদ্য, শিল্প, মূল্যস্ফীতি ও কোটি কোটি মানুষের জীবনে।

২০২৬ সালের মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকে আর শুধু কল্পনায় থাকতে দিচ্ছে না। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাবে ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২০ দশমিক ৯ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবাহিত হয়েছে, যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। একই সময়ে প্রতিদিন ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এ পথ দিয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্যের ২০ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ হরমুজ কেবল একটি জলপথ এবং বিশ্ব জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ধমনি।

আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, হরমুজ দিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ৮৯ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া। চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ছিল প্রধান ক্রেতা। তাই হরমুজের সংকটের প্রথম ধাক্কা পড়বে এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতিতে; কিন্তু দ্বিতীয় ধাক্কা পড়বে পুরো বিশ্বে। কারণ তেলের বাজার বৈশ্বিক বাজার।

ইতোমধ্যেই এর নমুনা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি যুদ্ধ-পূর্ব মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে এবং ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

তেলের দাম বাড়লে শুধু পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ে না। বাড়ে ট্রাকের ভাড়া, জাহাজের ভাড়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়, কারখানার উৎপাদন খরচ, কৃষির সেচ ও পরিবহন ব্যয়। অর্থাৎ তেলের দাম হলো অর্থনীতির এমন একটি সুইচ, যেটি চাপ দিলে একসঙ্গে বহু খাতের ব্যয় বেড়ে যায়।

অন্যদিকে বাব আল-মান্দেব বিশ্ববাণিজ্যের আরেক দরজা স্বরূপ। হরমুজের সংকট মূলত জ্বালানি সরবরাহের সংকট। বাব আল-মান্দেবের সংকটের চরিত্র কিছুটা ভিন্ন। এটি বিশ্ববাণিজ্যের সময় ও দূরত্বের সংকট।

ইয়েমেন ও আফ্রিকার জিবুতি-ইরিত্রিয়ার মাঝখানে অবস্থিত বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এর উত্তরে রয়েছে সুয়েজ খাল। ফলে এশিয়া থেকে ইউরোপে যাওয়া জাহাজের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার।

বর্তমান মধ্যপ্রাচ্য সংকট সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। হরমুজে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার পাশাপাশি ইয়েমেনের হুথিদের তৎপরতায় বাব আল-মান্দেবও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাব আল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনায় বড় বড় জাহাজ কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ বেছে নিচ্ছে। সম্প্রতি ব্রেন্ট তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠেছে।

দুটির সংকট একসঙ্গে হলে এখানেই শুরু হবে আসল দুঃস্বপ্ন। হরমুজ বন্ধ হলে উপসাগরীয় তেল ও এলএনজির প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। বাব আল-মান্দেব বন্ধ হলে এশিয়া-ইউরোপের সমুদ্রপথে সুয়েজের কার্যকারিতা আরো কমে যাবে। অর্থাৎ একটি পথ বন্ধ করবে জ্বালানির সরবরাহ, আর অন্যটি বাড়াবে বাণিজ্যের দূরত্ব ও পরিবহন ব্যয়। একসঙ্গে ঘটলে বিশ্ব অর্থনীতি দুই দিক থেকে চাপে পড়বে। বিশ্বের ৮০ শতাংশের বেশি বাণিজ্য সমুদ্রপথে পরিচালিত হয়।

বাব আল-মান্দেবের গুরুত্ব বোঝার জন্য সুয়েজ খালের কথা মনে রাখতে হবে। এশিয়া থেকে ইউরোপে জাহাজ যদি বাব আল-মান্দেব দিয়ে লোহিত সাগরে ঢুকতে না পারে, তাহলে সুয়েজ খাল ব্যবহার করেও লাভ নেই। তাকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরতে হবে।

এ কারণেই লোহিত সাগরের সংকট শুরু হওয়ার পর বড় বড় শিপিং কোম্পানি আফ্রিকা ঘুরে যেতে শুরু করেছিল। এখন যদি একই সময়ে হরমুজও অচল থাকে, তাহলে জ্বালানি পরিবহন ও কনটেইনার বাণিজ্য দুই ক্ষেত্রেই বিকল্প পথের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে।

২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বাব আল-মান্দেব দিয়ে তেল পরিবহন ৮ দশমিক ১ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন পর্যন্ত উঠেছিল বলে ইআইএর তথ্য দেখায়। একই সময়ে সুয়েজ খাল ও সুমেড (SUMED) পাইপলাইন দিয়ে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত তরল পরিবহনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, এই জলপথগুলো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর উন্নয়নশীল দেশের জন্য এ সংকটের অভিঘাত আরো তীব্র হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটা নতুন বিপদের ঘণ্টা।

হরমুজে তেল ও এলএনজি সরবরাহ কমলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়বে। বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজের সংকটে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বাড়বে। এই দুই ব্যয় একসঙ্গে বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয়ও বাড়বে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি।

একজন বাংলাদেশি নাগরিক হরমুজ বা বাব আল-মান্দেবের মানচিত্র হয়তো কখনো দেখেননি। কিন্তু ওই দুই জলপথের সংকট তার বাজারের ব্যাগে, বাসের ভাড়ায় কিংবা বিদ্যুতের বিলে এসে পৌঁছাতে পারে।

কৃষির জন্য ডিজেল দরকার। সেচে বিদ্যুৎ দরকার। সার আমদানি করতে বৈদেশিক মুদ্রা দরকার। কৃষিপণ্য পরিবহনে জ্বালানি দরকার। বন্দরে পণ্য খালাস ও দেশের অভ্যন্তরে পরিবহনে জ্বালানি দরকার।

আধুনিক বিশ্ববাণিজ্য দীর্ঘদিন ধরে ‘জাস্ট ইন টাইম’ মডেলের ওপর দাঁড়িয়েছে। কারখানায় কাঁচামাল বেশি দিন পড়ে থাকবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী আসবে। কিন্তু সমুদ্রপথে অনিশ্চয়তা বাড়লে এই মডেল ভেঙে পড়ে। একটি কনটেইনার যদি নির্ধারিত সময়ের বদলে দুই-তিন সপ্তাহ দেরিতে আসে, তাহলে পুরো উৎপাদন পরিকল্পনা বদলে যেতে পারে।

এ কারণেই হরমুজ ও বাব আল-মান্দেবকে আলাদা দুটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এগুলো বিশ্ব অর্থনীতির দুটি স্পর্শকাতর স্নায়ু। আজ হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় তলানিতে এবং বাব আল-মান্দেবেও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি বন্ধ থাকাই যদি বিশ্ববাণিজ্যের জন্য দুঃস্বপ্ন হয়, তাহলে দুটি একসঙ্গে বন্ধ হওয়া হবে সেই দুঃস্বপ্নের দ্বিতীয় অধ্যায়।

একটি জাহাজকে কয়েক হাজার অতিরিক্ত নটিক্যাল মাইল যেতে হয়। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ে, জাহাজের সময় বাড়ে, ক্রু ও বীমা ব্যয় বাড়ে এবং একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনের জন্য বেশি খরচ হয়।

কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুধু জাহাজ ও বন্দরের ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে বীমা, ব্যাংকিং, ক্রেডিট, জ্বালানি, কনটেইনার, বন্দর, সরবরাহচুক্তি এবং আন্তর্জাতিক আইন।

হরমুজ এবং বাব আল-মান্দেব, দুটি প্রণালি ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে। কিন্তু বিশ্ব অর্থনীতির শিরা-উপশিরায় তারা একই স্রোতের অংশ। একটি তেল ও গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে; অন্যটি এশিয়া-ইউরোপের বাণিজ্যপথকে সুয়েজের সঙ্গে যুক্ত করে। তাই একটির সংকট অন্যটির বিকল্প নয়; বরং দুটির সম্মিলিত সংকট বিশ্ব অর্থনীতির সরবরাহ, জ্বালানি ও পরিবহন—তিন স্তম্ভেই আঘাত করতে পারে।

সৌদি আরব কিছু তেল হরমুজ এড়িয়ে বিকল্প রুটে পাঠাতে পারে। মিসরের সুমেড পাইপলাইনও গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। কিন্তু এগুলোর সক্ষমতা সীমিত এবং দীর্ঘ সমুদ্রপথের তুলনায় ব্যয় বেশি। EIA-ও উল্লেখ করেছে, বিকল্প রুটগুলো দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও সীমিত সক্ষমতার। অর্থাৎ সংকটের সময় বিশ্ব বুঝতে পারে দক্ষতার জন্য তৈরি বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা সবসময় স্থিতিস্থাপকতার জন্য তৈরি নয়। কারণ হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব যদি একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যায়, তখন বিশ্ববাজারে শুধু জাহাজের পথ বন্ধ হবে না, একইসঙ্গে বিশ্বায়নের স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসই সংকুচিত হয়ে আসবে।

* প্রফেসর ড. মো. ফখরুল ইসলাম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডিন
- fakrul@ru.ac.bd

বিশ্ববাণিজ্যের দুটি দুঃস্বপ্ন

অখণ্ড ভারত: এক অসম্ভব স্বপ্ন by শাহীদ কামরুল

গ্রিক পুরাণের ইকারাসের কাহিনিতেও উচ্চাকাঙ্ক্ষার এমন সীমালঙ্ঘনের পরিণতি দেখা যায়। ইকারাস ও তার পিতা ডেডালাস মোম এবং পালক দিয়ে তৈরি ডানা ব্যবহার করে বন্দিদশা থেকে পালিয়ে আকাশে উড়েছিল। ডেডালাস তাকে সতর্ক করেছিলেন, যেন সে খুব বেশি ওপরে না ওঠে, কারণ সূর্যের তাপে মোম গলে যাবে। কিন্তু ওড়ার উন্মাদনায় ইকারাস সতর্কতা ভুলে সূর্যের খুব কাছে চলে যায়; মোম গলে তার ডানা ভেঙে পড়ে এবং সে সমুদ্রে পতিত হয়। কাহিনিটির প্রতীকী শিক্ষা স্পষ্ট : বাস্তবতার সীমা অতিক্রম করা উচ্চাকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত শক্তির প্রমাণ নয়, পতনের কারণ হতে পারে। ‘অখণ্ড ভারত’-এর রাজনৈতিক কল্পনাও যদি বর্তমান রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব ও জনগণের সম্মতিকে অতিক্রম করতে চায়, তবে তা ইতিহাসের বাস্তবতার সঙ্গে সংঘর্ষে পড়বে। অতীতের স্মৃতি যতই গভীর হোক, বর্তমানের মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার ওপর তার কোনো অধিকার নেই।

‘অখণ্ড ভারত’ হয়তো একটি রাজনৈতিক কল্পনা, কোনো হারানো ভূগোলকে পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা, কিংবা নির্বাচিত ইতিহাসের স্মৃতিকে বর্তমানের মানচিত্রে আবার এঁকে দেওয়ার স্বপ্ন। কিন্তু ইতিহাসের মাটিতে কল্পনার বীজ বপন করলেই তার ডালে ফুল ফোটে না। ইতিহাসের নিজস্ব ঋতু আছে, ভূগোলের নিজস্ব স্মৃতি আছে, আর মানুষের আত্মপরিচয়ের গভীরে এমন কিছু শিকড় প্রোথিত থাকে, যেগুলো কোনো সাম্রাজ্যিক মানচিত্রের রেখা দিয়ে উপড়ে ফেলা যায় না। মানচিত্রে একটি রেখা টেনে দেওয়া সহজ; কিন্তু একটি জাতির সার্বভৌম ইচ্ছার সীমারেখা আঁকা হয় রক্ত, অশ্রু, স্মৃতি, আত্মত্যাগ এবং সম্মতির কালিতে। কাগজের ওপর আঁকা সীমান্ত মুছে ফেলা যায় এক টানে; কিন্তু মানুষের চেতনায় খোদাই হয়ে থাকা স্বাধীনতার রেখা কোনো কলমে মুছে ফেলা যায় না।

যে রাষ্ট্র তার প্রতিবেশীর কাছ থেকে বন্ধুত্বের পরিবর্তে ভীতি, সমতার পরিবর্তে আনুগত্য এবং সহযোগিতার পরিবর্তে নতজানুতা দাবি করে, সে অজান্তেই নিজের চারপাশে একটি অদৃশ্য প্রাচীর তুলে দেয়। বাইরে থেকে তার প্রাসাদ যতই উঁচু হোক, তার জানালায় যতই বিজয়ের পতাকা উড়ুক, ভেতরে যদি আস্থার বাতাস প্রবেশ না করে, তবে একদিন সেই প্রাসাদ নিজেরই প্রতিধ্বনির মধ্যে বন্দি হয়ে পড়ে। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপর্যয় কখনো কখনো পরাজয় নয়; বরং এমন এক নিঃসঙ্গতা, যেখানে চারপাশে সবাই উপস্থিত থেকেও কেউ আর হৃদয়ের দরজা খুলতে চায় না।

ভারতের সফট পাওয়ারের (Soft Power) শক্তি অস্বীকার করার কোনো কারণ নেই। বলিউডের রঙিন পর্দা, ভারতীয় সাহিত্য ও দর্শনের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ভারতীয় প্রবাসীদের উপস্থিতি এবং ইংরেজি ভাষায় ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের সক্রিয়তা ভারতকে বিশ্বপরিসরে একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচিতি দিয়েছে। জওহরলাল নেহরুর জোটনিরপেক্ষতার নীতি, উচ্চশিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ এবং বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের প্রাথমিক কল্পনা বহু দশক ধরে ভারতের একটি আকর্ষণীয় মুখ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছিল। আমেরিকান রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোসেফ নাইয়ের চিন্তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, রাষ্ট্র শুধু সামরিক শক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রলোভনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে না; আকর্ষণ, সংস্কৃতি এবং মূল্যবোধও মানুষের মন জয় করার শক্তিশালী মাধ্যম।

কিন্তু এখানেই লুকিয়ে থাকে সূক্ষ্ম বিপদের রেখা। আকর্ষণ যখন প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, আর প্রভাব যখন নিয়ন্ত্রণের আকাঙ্ক্ষায় রূপ নেয়, তখন সংস্কৃতির যে সেতু একদিন দুই তীরকে কাছে এনেছিল, সেটিই ধীরে ধীরে আধিপত্যের সিঁড়িতে পরিণত হতে পারে। ফুল দিয়ে যদি পথ দেখানো হয়, তাকে সৌন্দর্য বলা যায়; কিন্তু সেই ফুলের আড়ালে যদি পথের দিক নির্ধারণের চেষ্টা থাকে, তখন সৌন্দর্য আর নিছক সৌন্দর্য থাকে না।

ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তক আন্তোনিও গ্রামসির হেজিমনি (Hegemony) ধারণা এই জায়গাটিকে বুঝতে বিশেষভাবে সহায়ক। গ্রামসি দেখিয়েছিলেন, আধিপত্য সবসময় বন্দুকের নল দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় না। অনেক সময় তা মানুষের চিন্তা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, সংবাদমাধ্যম এবং দৈনন্দিন বোধের মধ্যে এমনভাবে প্রবেশ করে যে মানুষ আধিপত্যকে আর আধিপত্য হিসেবে চিনতেই পারে না। শিকল তখন আর লোহার তৈরি থাকে না; শিকল হয়ে ওঠে ধারণা। কারাগারের দেয়াল তখন ইট-পাথরে নয়, মানুষের চিন্তার ভেতরে নির্মিত হয়।

একটি সমাজ যখন ভাবতে শুরু করে, ‘আমাদের নিরাপত্তার জন্য ওদের দরকার’, ‘আমাদের স্থিতিশীলতার জন্য ওদের অনুমোদন প্রয়োজন’, কিংবা ‘ওদের অসন্তুষ্ট করা বিপজ্জনক’, তখন আধিপত্য আর সীমান্তের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকে না; সে মানুষের মনের ভেতরে ঘর বানিয়ে ফেলে। তখন শাসককে প্রতিটি দরজায় প্রহরী বসাতে হয় না, কারণ মানুষের ভয়ই প্রহরীর কাজ করতে শুরু করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিজয় তাই শুধু ভূখণ্ড দখল নয়; বরং অন্যের কল্পনাশক্তির ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ভারতীয় উপমহাদেশে শুধু সেনাবাহিনীর শক্তিতে শাসন করেনি। আইন, শিক্ষা, আমলাতন্ত্র, জনশুমারি, মানচিত্র, ইতিহাসচর্চা এবং জ্ঞান উৎপাদনের মধ্য দিয়েও তারা একটি ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলা নির্মাণ করেছিল। মানচিত্র তখন শুধু ভূখণ্ডের ছবি ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল ক্ষমতার একটি ভাষা। ইতিহাস তখন শুধু অতীতের বিবরণ ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল বর্তমানকে নিয়ন্ত্রণ করার একটি উপায়।

বিখ্যাত ফিলিস্তিনি-আমেরিকান সাহিত্যতাত্ত্বিক অ্যাডওয়ার্ড সাঈদ তার ওরিয়েন্টালিজম (Orientalism) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও ক্ষমতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। কে কাকে কীভাবে বর্ণনা করবে, কে সভ্য, কে পশ্চাৎপদ, কে নিরাপদ, কে বিপজ্জনক, কে মধ্যপন্থি এবং কে উগ্র, এই শব্দভান্ডারও ক্ষমতার রাজনীতির অংশ হতে পারে। কোনো জনগোষ্ঠীকে একটি নির্দিষ্ট নামে ডেকে দীর্ঘদিন ধরে তার পরিচয় ব্যাখ্যা করতে থাকলে একসময় সেই ব্যাখ্যাই যেন তার ওপর আরোপিত আয়নায় পরিণত হয়।

আসলে, ক্ষমতা শুধু আদেশ দেয় না; ক্ষমতা শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করে, পরিচয়ের নাম দেয়, ‘স্বাভাবিক’ ও ‘অস্বাভাবিক’-এর সীমা নির্ধারণ করে এবং কোন সত্য দৃশ্যমান হবে আর কোন সত্য অন্ধকারে ঢাকা থাকবে, তার কাঠামো নির্মাণ করে। ফলে কোনো জনগোষ্ঠীর পরিচয়, কোনো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কিংবা কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষাকে যে ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয়, সেই ভাষাও ক্ষমতার একটি ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের প্রশ্নটি তাই ভারতপ্রীতি বনাম ভারতবিদ্বেষের সরল দ্বন্দ্ব নয়; এর কেন্দ্রে রয়েছে স্বাধীনতা (Sovereignty) । প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সুসম্পর্ক একটি প্রয়োজনীয় বাস্তবতা, কিন্তু বন্ধুত্ব কখনো অভিভাবকত্বের সমার্থক হতে পারে না। বড় রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মমর্যাদা এবং স্ট্র্যাটেজিক অটোনমি (Strategic Autonomy) । ছোট ভূখণ্ড মানেই ছোট আত্মা নয়; সামরিক শক্তিতে দুর্বল হওয়া মানেই রাজনৈতিক ইচ্ছায় দুর্বল হওয়া নয়।

বাংলাদেশের প্রয়োজন তাই নতজানু আনুগত্য কিংবা অন্ধ বৈরিতার কোনো একটি প্রান্ত বেছে নেওয়া নয়; প্রয়োজন বিচক্ষণ কূটনীতি, জাতীয় স্বার্থ এবং সমমর্যাদার সম্পর্ক। বন্ধুত্ব থাকবে, বাণিজ্য থাকবে, সীমান্ত সহযোগিতা থাকবে, নিরাপত্তা সহযোগিতা থাকবে; কিন্তু জাতীয় সিদ্ধান্তের চাবিকাঠি থাকবে ঢাকার হাতেই। প্রতিবেশীর সঙ্গে হাত মেলানো যায়, কিন্তু নিজের হাতের মুঠোয় থাকা কলমটি অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না।

তাছাড়া, সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা (Sovereignty) শুধু পতাকা বা সীমান্তে নয়; তা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, স্মৃতি ও মানুষের আত্মপরিচয়ে বাস করে। যে জাতি নিজের ইতিহাসকে অন্যের আয়নায় দেখতে অভ্যস্ত হয়, একসময় সেই আয়নাকেই নিজের মুখ বলে ভুল করতে পারে। তবে আত্মপরিচয় কোনো দুর্গ নয়; গভীর শিকড়ের বৃক্ষের মতোই সে বহির্বিশ্বের বাতাস গ্রহণ করতে পারে।

বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের কল্পিত সম্প্রদায় (Imagined Communities) ধারণা দেখায়, জাতি শুধু ভূখণ্ড নয়; অভিন্ন স্মৃতি ও কল্পনায় নির্মিত একটি কমিউনিটি (Community)। বাংলাদেশের পরিচয়ও ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, বৈচিত্র্য, নদী, সাহিত্য ও রাজনৈতিক সংগ্রামের বহুস্তরীয় অভিজ্ঞতায় গড়ে উঠেছে। তাই এই বহুত্বই তার শক্তি, কোনো দুর্বলতা নয়।

আদতে, ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণাটিকেও তাই ইতিহাসের আদালতে নতুন করে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। উপমহাদেশের ইতিহাস একদিকে সাংস্কৃতিক সংযোগের, অন্যদিকে রাজনৈতিক বিচ্ছেদেরও ইতিহাস। ভাষা, খাদ্য, সাহিত্য, ধর্ম, সংগীত এবং পারিবারিক স্মৃতির সীমান্ত আধুনিক রাষ্ট্রের সীমান্তের চেয়ে অনেক পুরোনো। কিন্তু সাংস্কৃতিক সংযুক্তি থেকে রাজনৈতিক পুনরেকত্রীকরণের দাবি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জন্ম নেয় না। একই নদীর দুই তীরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ একই জলের স্মৃতি বহন করতে পারে; একই ভাষার শব্দ উচ্চারণ করতে পারে; একই গানের সুরে আবেগ খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু তাই বলে দুই তীরকে একটি ঘর বানানো বাধ্যতামূলক নয়। ইতিহাসের আত্মীয়তা আর রাষ্ট্রের একীভবন এক জিনিস নয়। সাংস্কৃতিক নৈকট্য সীমান্তকে নরম করতে পারে, কিন্তু সার্বভৌম রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে অকার্যকর করে না। ইউরোপের ইতিহাসেও বহু জাতি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির বন্ধনে যুক্ত থেকেও পৃথক সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে। তাই ভারতীয় সভ্যতার বিস্তৃত ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে সম্মান করা এবং একটি অখণ্ড রাজনৈতিক ভূখণ্ডের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা এক বিষয় নয়। অতীতের একটি অভিন্ন স্মৃতি ভবিষ্যতের একটি অভিন্ন রাষ্ট্রের বাধ্যতামূলক নকশা নয়।

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন শিক্ষা হলো, কোনো সাম্রাজ্য তার মানচিত্রের আয়তন দিয়ে চিরস্থায়ী হয় না। তার স্থায়িত্ব নির্ভর করে প্রতিবেশীদের আস্থা, নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি এবং অন্যের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মানের ওপর। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি ক্ষমতার বাস্তবতা বুঝেছিলেন; কিন্তু আধুনিক আন্তর্জাতিক রাজনীতি আরো একটি শিক্ষা দিয়েছে : জবরদস্তি দিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু বৈধতা আদায় করা যায় না।

ভারত যদি সত্যিকারের আঞ্চলিক নেতৃত্ব চায়, তার পথ আধিপত্য নয়, আস্থা ও সমমর্যাদার অংশীদারত্ব। ভয় দিয়ে প্রতিবেশীকে নীরব করা যায়, হৃদয়ে জায়গা করা যায় না। বাংলাদেশের পথও তাই নতজানু আনুগত্য বা অন্ধ বৈরিতা নয়; জাতীয় স্বার্থ, সাংবিধানিকতা ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহির ভিত্তিতে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ। দিল্লি, ওয়াশিংটন, বেইজিং বা মস্কো নয়, বাংলাদেশের দিকনির্দেশ নির্ধারিত হবে বাংলাদেশেই।

তাই ‘অখণ্ড ভারত’-এর রাজনৈতিক ফুল ফুটবে কি না, তার উত্তর কোনো স্লোগান, প্রচারণা কিংবা টেলিভিশন স্টুডিও দিতে পারবে না। উত্তর দেবে ইতিহাস, ভূগোল এবং জনগণের সম্মিলিত ইচ্ছা। ফুলের ছবি হাজারবার আঁকা যায়, তার নামে অসংখ্য কবিতা লেখা যায়, কাগজে তার জন্য নতুন মানচিত্রও তৈরি করা যায়; কিন্তু শিকড় যদি মাটির গভীরে না থাকে, তবে সেই ফুল কাগজের ফুল হয়েই থেকে যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ কোনো একক রাজধানীর স্বপ্নে নয়; বরং সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক মর্যাদা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে ভারত সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী, তাকে বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত ভয় পেতে হবে না। আর যে বাংলাদেশ সত্যিকার অর্থে সার্বভৌম, তাকে নিজের সার্বভৌমত্ব প্রমাণ করার জন্য ভারতের প্রতি ঘৃণা ছড়াতে হবে না।

আধিপত্যের বীজ বারবার বোনা যেতে পারে। নতুন নতুন বয়ান বাজারে আসতে পারে। ভূরাজনীতির মঞ্চ বারবার নতুন সাজে সজ্জিত হতে পারে। কিন্তু জনগণের ইতিহাসের মাটি যদি জেগে থাকে, তবে প্রতিটি সাম্রাজ্যিক কল্পনার সামনে এক অদৃশ্য প্রাচীর দাঁড়িয়ে থাকবে। সেই প্রাচীরের নাম সার্বভৌমত্ব; তার ভিত্তির নাম আত্মমর্যাদা; আর তার প্রাণ হলো জনগণের নিজের ভবিষ্যৎ নিজে নির্ধারণ করার অধিকার।

তাই ‘অখণ্ড ভারত’ যদি রাজনৈতিক আধিপত্যের স্বপ্ন হয়, তবে তার সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন কোনো বাহ্যিক শক্তি নয়; প্রশ্নটি ইতিহাসের নিজস্ব বিধানের : জনগণের সম্মতি ছাড়া কোনো মানচিত্রই চিরস্থায়ী নয়। কারণ মানচিত্র কালি দিয়ে আঁকা যায়, সাম্রাজ্য শক্তি দিয়ে বিস্তৃত করা যায়, সীমান্ত ক্ষমতা দিয়ে সরানোর চেষ্টা করা যায়; কিন্তু একটি জাতির ভবিষ্যৎ আঁকা যায় শুধু তার নিজের ইচ্ছার ক্যানভাসে।

আর সেই ক্যানভাসে অন্যের রঙ যতই গাঢ় হোক, ইতিহাসের শেষ তুলির আঁচড়টি নিজের হাতেই রাখে একটি জাতি। সার্বভৌমত্বের রঙ তাই সহজে মুছে যায় না। যে জাতি নিজের ভবিষ্যৎ নিজে লিখতে শেখে, তার ভাগ্যের পৃষ্ঠা অন্য কেউ দীর্ঘদিনের জন্য নিজের নামে লিখে রাখতে পারে না।

* শাহীদ কামরুল, সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি
- sahidkamrul25@gmail.com

অখণ্ড ভারত: এক অসম্ভব স্বপ্ন

হুথিদের দখলে বাব আল-মান্দেব, সৌদির অনুরোধ সত্ত্বেও দূরে যুক্তরাষ্ট্র

ইরানের মিত্র হুথিদের হাতে ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ কয়েক হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা চলে গেছে। কৌশলগত দ্বীপ ও লোহিত সাগরের দীর্ঘ উপকূলের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মান্দাবেও নিয়ন্ত্রণ শক্ত করেছে গোষ্ঠীটি। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে গত সপ্তাহান্তে মাসকাটে মার্কিন দূতাবাসে হুথি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। বৈঠকে হুথিরা আশ্বস্ত করেছে, লোহিত সাগরে তারা মার্কিন জাহাজে হামলা করবে না। তবে সৌদি আরবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকবে।

হুথিদের এমন আশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন আছে। অতীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে গোষ্ঠীটি। তাদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থানও রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকদের কেউ কেউ বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হুথিদের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া ছাড়া ওয়াশিংটনের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই।

সৌদি আরবের চাপ

হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। গত সপ্তাহে তিনি ট্রাম্পকে দুবার ফোন করে হামলার অনুরোধ করেন বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস। ট্রাম্প তা প্রত্যাখ্যান করেন।

এরপর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার জরুরি সমন্বয়ের জন্য রিয়াদ যান। এতে বোঝা যায়, সৌদিকে সমর্থন করলেও সরাসরি ইয়েমেন যুদ্ধে জড়াতে চাইছে না যুক্তরাষ্ট্র।

ইসরাইলও সৌদির হয়ে ইয়েমেনে হস্তক্ষেপের প্রস্তাব দিয়েছে বলে খবর এসেছে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ইসরাইল সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর সম্ভাবনা কম। গাজা, লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর ও ইরান নিয়ে একসঙ্গে চাপ সামলাতে হচ্ছে দেশটিকে। এর মধ্যে ইয়েমেন নতুন আরেকটি যুদ্ধক্ষেত্র হতে পারে।

ওয়াশিংটনের ওপর সৌদির আস্থা কমছে

ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহ সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। গত কয়েক বছর ধরেই রিয়াদ বিকল্প নিরাপত্তা অংশীদার খুঁজছে।

২০১৮ ও ২০১৯ সালে সৌদির তেল স্থাপনায় হামলার পর সম্পর্ক বহুমুখী করার উদ্যোগ নেয় দেশটি। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি করে সৌদি। পরে পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গে মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিও বাড়ানো হয়।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইমন মাবন বলেন, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয় নয়। বরং নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব আরো বহুমুখী করার চেষ্টা।

ইরান যুদ্ধেই চাপে যুক্তরাষ্ট্র

ইয়েমেনে সরাসরি না জড়ানোর বড় কারণ যুক্তরাষ্ট্রের চলমান ইরান যুদ্ধ। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা স্পষ্ট নয়। এরই মধ্যে তেল ও যুদ্ধের খরচ বেড়েছে।

পেন্টাগনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম চার মাসেই খরচ হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ২২ বিলিয়ন ডলার গেছে গোলাবারুদে। অসংখ্য মার্কিন বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্রভান্ডারে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ার খবরও এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসন অবশ্য বলছে, তাদের হাতে এখনো বিপুল অস্ত্র রয়েছে।

এর মধ্যে ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধ শুরু হলে সামরিক চাপ আরো বাড়বে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। ট্রাম্প নিজেই দীর্ঘস্থায়ী ‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ’ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

বাব আল-মান্দাবে চাপে কারা?

হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মান্দাব—দুটি নৌপথই এখন ঝুঁকিতে। হরমুজ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল তেল ও গ্যাস বিশ্ববাজারে যায়। আর বাব আল-মান্দাব এশিয়া ও চীনের বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

কিছু বিশ্লেষকের মতে, বাব আল-মান্দাব দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে চীনের ওপর চাপ বেশি পড়তে পারে। তবে এতে যুক্তরাষ্ট্রও রেহাই পাবে না। সৌদি অবকাঠামো ও জাহাজে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাড়বে পরিবহন ও জ্বালানির খরচ, যার প্রভাব পড়বে মার্কিন ভোক্তাদের ওপরও।

অধ্যাপক মাবনের মতে, হুথিদের বাব আল-মান্দাব নিয়ন্ত্রণে থাকতে দেওয়া চীনকে দুর্বল করা বা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা নয়। ইরান যুদ্ধেই চাপে থাকা যুক্তরাষ্ট্র এখন ইয়েমেনে নতুন যুদ্ধের সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

হুথিদের দখলে বাব আল-মান্দেব, সৌদির অনুরোধ সত্ত্বেও দূরে যুক্তরাষ্ট্র

ডায়াবেটিক রোগীর পায়ের যত্নে যা করতে হবে by ডা. অনন্ত কুমার কুন্ডু

ডায়াবেটিস থাকলে পায়ের বিশেষ যত্ন নিতে হবে, অন্যথায় পায়ে আঘাত লেগে পচনশীল ঘা দেখা দিতে পারে। এমনটা হলে তার চিকিৎসা করা খুব কঠিন হয়ে যায়। এমনকি পা কেটে ফেলতেও হতে পারে।

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন মানুষের ক্ষেত্রে পায়ের যত্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ডায়াবেটিস থাকলে পায়ে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি স্নায়ুজনিত সমস্যা ও অনুভূতি হ্রাস পায়। ডায়াবেটিক রোগীর পা সব সময় সংক্রমণের ঝুঁকিতে থাকে।
পায়ের যত্নে যা করবেন

● খালি পায়ে কখনোই হাঁটা যাবে না। খোলা স্যান্ডেল পরাও ঠিক নয়। পা যথেষ্ট সুরক্ষা পায় এমন ঢাকা জুতা বা কেডস পরবেন।

● সব সময় নরম ও আরামদায়ক জুতা পরতে হবে। জুতার সামনের দিকটা প্রশস্ত হতে হবে, যাতে আঙুলগুলো যথেষ্ট স্পেস বা স্থান পায়।

● মোজা ছাড়া জুতা পরবেন না। তবে ভেজা মোজা পরা নিষেধ। মোজা প্রতিদিন পরিবর্তন করতে হবে।

● পায়ের নখ কাটতে নেইল কাটার ব্যবহার করবেন। তবে সাবধান থাকতে হবে যেন আঙুলে আঘাত না লাগে। খুব গভীর করে কখনো নখ কাটবেন না।

● পায়ের কড়া নিজে কাটবেন না বা ঘষবেন না।

● প্রতিদিন কুসুম গরম পানি ও সাবান দিয়ে ভালোভাবে পা ধুতে হবে এবং শুকনা কাপড় দিয়ে পা ও দুই আঙুলের মাঝের জায়গা ভালোভাবে মুছে ফেলতে হবে।

● প্রতিরাতে নিজের পা দুটি ভালোভাবে পরীক্ষা করে দেখুন। পায়ের তলা দেখতে কারও সাহায্য নিন বা আয়না ব্যবহার করুন। পায়ে লালচে বা কালো রং, পা ফোলা, ফোঁড়া বা ফুসকুড়ি, কড়া বা সংক্রমণ দেখলে সচেতন হোন। দ্রুত চিকিৎসককে বিষয়টি জানান।

● কখনোই গরম পানিতে আগে পা চোবাবেন না বা গরম সেঁক নেবেন না। এটা করার আগে হাত দিয়ে বা অন্য কাউকে দিয়ে পানি কতটা গরম ও সেই তাপ সহনীয় কি না, সেটা পরীক্ষা করে নিন।

●স্বাভাবিক রক্ত চলাচলের জন্য প্রতিদিন পায়ের ব্যায়াম করতে হবে।

* ডা. অনন্ত কুমার কুন্ডু, ডায়াবেটিস ও হরমোন রোগবিশেষজ্ঞ, বারডেম জেনারেল হাসপাতাল

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন মানুষের ক্ষেত্রে পায়ের যত্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ
ডায়াবেটিসে আক্রান্ত একজন মানুষের ক্ষেত্রে পায়ের যত্ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ছবি: পেক্সেলস

নারীদের ম্যামোগ্রাম টেস্ট কেন জরুরি, কোথায় করবেন, খরচ ও প্রস্তুতি কেমন by ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন

আমাদের সমাজে নারী হিসেবে অনেকেই পরিবার, কাজ, সন্তান, অফিস—সবকিছু সামলাতে এতটাই ব্যস্ত থাকেন যে নিজের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দেওয়ার সময়ই পান না। কিন্তু নিজের যত্ন নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি দায়িত্ব। নারীদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে ও রোগ প্রতিরোধে দুটি নিয়মিত পরীক্ষা খুবই জরুরি। সেগুলো হলো ম্যামোগ্রাম ও প্যাপ টেস্ট। অনেক নারীই লজ্জা, ব্যস্ততা বা অযথা ভয়ের কারণে গুরুত্বপূর্ণ স্ক্রিনিং টেস্টগুলো এড়িয়ে যান। কিন্তু মনে রাখবেন, ম্যামোগ্রাম ও প্যাপ টেস্ট জীবন বাঁচাতে পারে।

কারা ম্যামোগ্রাম করবেন

যদি আপনার বয়স ৪০ বা তার বেশি হয়, তাহলে আজই ম্যামোগ্রাম করার পরিকল্পনা করুন। বয়স ৩৫ পার হওয়ার পর পরিবারে কারও স্তন ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে আরও আগেই শুরু করা উচিত।

বোন, মা, খালা বা ঘনিষ্ঠ কোনো আত্মীয়ের ব্রেস্ট ক্যানসারের ইতিহাস থাকলে আরও সতর্ক হতে হবে। কেবল নিজে নয়, মা, খালা, বোন, ভাবি, বন্ধু—সবাইকে উৎসাহিত করুন এই পরীক্ষা করতে। সঠিক সেন্টার ও বিশেষজ্ঞ বেছে নিন।

কোথায় করবেন

ম্যামোগ্রাম করার আগে খোঁজখবর নিন যেখানে পরীক্ষাটি করবেন সেখানে থ্রি–ডি টমোসিনথেসিস ম্যামোগ্রাম সুবিধা আছে কি না। সেখানকার প্রযুক্তিবিদ ও রেডিওলজিস্ট অভিজ্ঞ কি না। তাঁরা নিয়মিত ব্রেস্ট আলট্রাসাউন্ড, কোর বায়োপসি—এসব করেন কি না। বায়োপসির ক্ষেত্রে মেটালিক ক্লিপ ব্যবহার করা হয় কি না ইত্যাদি।

সঠিক প্যাথলজি ল্যাব নির্বাচন করতে হবে। বায়োপসির পর নমুনা এমন পরীক্ষাগারে পাঠানো উচিত যেখানে ইআর, পিআর, হার টু, কেওয়াই ৬৭ ইমিউনোহিস্টোকেমিস্ট্রি টেস্টগুলো নির্ভুলভাবে হয়। কারণ, নির্ভুল রিপোর্টই সঠিক চিকিৎসার প্রথম ধাপ। চিকিৎসার ক্ষেত্রে টিম অ্যাপ্রোচে গুরুত্ব দিন। যদি ম্যামোগ্রামে কোনো স্বাভাবিকতা ধরা পড়ে, তাহলে ভয় পাবেন না। আজকাল চিকিৎসা উন্নত, কার্যকর ও অত্যন্ত সফল।

খরচ ও প্রস্তুতি

বাংলাদেশে ম্যামোগ্রাম তুলনামূলক সস্তা। সরকারি হাসপাতালে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং বেসরকারি হাসপাতালে ২ থেকে ৩ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। ম্যামোগ্রাম একটি বিশেষ ধরনের এক্স–রে, তাই তেমন প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই।

শরীরে ধাতব অলংকার যেমন চেইন বা হার খুলে রাখতে হবে। হালকা ও সহজে খোলা যায় এমন পোশাক পরুন। ডিওডোরেন্ট, লোশন, অ্যান্টিপারসপিরেন্ট ইত্যাদি না ব্যবহার করা ভালো। স্বাভাবিক খাবার খেতে পারবেন।

* ডা. মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, নিউব্রুনস্উইক, কানাডা

ম্যামোগ্রাম ও প্যাপ টেস্ট নারীর জীবন বাঁচাতে পারে
ম্যামোগ্রাম ও প্যাপ টেস্ট নারীর জীবন বাঁচাতে পারে। ছবি: ফ্রিপিক