Saturday, February 2, 2019

কারাবন্দিদের জবানিতে জেলজীবন by জিয়া চৌধুরী

ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও নানা অনিয়মে কারাগারে বন্দিদের অসহনীয় জীবন। বিভিন্ন মামলায় কারাভোগের পর মুক্তি পাওয়া অনেকের মুখে ফুটে উঠেছে অসহনীয় জীবনের কথা। কারাজীবনের কথা স্মরণ করতে গিয়ে কেঁদে ওঠেন কেউ কেউ।
ঢাকায় বিএনপি’র মহাসমাবেশের পর বিস্ফোরক ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় আড়াই মাস ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ছিলেন লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভা ছাত্রদলের এক নেতা। তিনি বলেন, পুরো কারাগার তখন রাজনৈতিক ও গায়েবি মামলায় আটক বন্দিতে ঠাসা। কাশিমপুর ও কেরানীগঞ্জের প্রতিটি ভবনে যেখানে ২০ জন থাকার কথা সেখানে প্রায় ৫০ জন করে থাকতো। কেরানীগঞ্জ কিংবা কাশিমপুর দুই কারাগারেই টাকা ছাড়া কোনো সুবিধা পাওয়া যেতনা। বলেন, শুরুর দিকে তাকে রাখা হয় কেরানীগঞ্জের কেন্দ্রীয় কারাগারে।
সেখানে প্রথমে সাধারণ বন্দি হিসেবে ওয়ার্ডে রাখা হয়।
একজন বন্দির জায়গায় সেখানে রাখা হয় অন্তত তিনজনকে। তিনি বলেন, কারাগারে এমনিতে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না, তার মধ্যে ভোটের আগে ব্যাপক গ্রেপ্তারে কারাগারে বাসের পরিবেশ ছিল না। সাধারণ ওয়ার্ডে গাদাগাদি করে থাকতে হতো। কারাগারের ভাষায় যাকে বলে, কেচকি ফাইল। গোসল, পয়ঃনিষ্কাশন সবখানেই অতিরিক্ত মানুষের চাপ। পরে অবশ্য মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে রোগী হিসেবে জায়গা হয় কেরানীগঞ্জের মেডিকেল সেলে। সেখানে থাকতে প্রতিমাসে অন্তত ১২ হাজার টাকা করে দিতে হতো বলেও জানান তিনি। বলেন, কারাগারের যেখানেই যাবেন টাকা দিতেই হবে। টাকা দিলে ন্যূনতম সুবিধা পাওয়া যেত, নইলে অমানবিক পরিবেশ। এরপর তাকে স্থানান্তর করা হয় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে। সেখানেও ছিল ভয়াবহ পরিবেশ। শুরুতে সাধারণ ওয়ার্ডে থাকলেও কাশিমপুর কারাগারের মেডিকেল জায়গা পান কয়েকদিন পরেই। সেখানেও প্রতিমাসে খরচ করতে হতো অন্তত সাত হাজার টাকা।
ইলিশ ফাইল ও কেচকি ফাইলের তুলনায় মেডিকেলে ভালো পরিবেশ পেলেও খাবার ছিল নিম্নমানের। মেডিকেলের খাবার না খেয়ে বাইরের ক্যান্টিন থেকে খাবার কিনে খেতেন তারা। বাইরের দামের তুলনায় এজন্য চারগুণ বেশি টাকা খরচ করতে হতো। মাঝে-মধ্যে পরিবারের লোকজন এলে, মুড়ি, বিস্কুট ও শুকনো খাবার পেতেন। তিনি বলেন, কারাগারের মেডিকেলে ও সাধারণ ওয়ার্ডে অবৈধভাবে মুঠোফোন ব্যবহার করা যায়। শুধু কয়েকজনকে ম্যানেজ করতে পারলেই সম্ভব হয়। টাকা দিলে ইয়াবা, গাঁজা থেকে শুরু করে সব ধরনের মাদক পাওয়া যায় বলেও জানান তিনি। মেডিকেল ও সাধারণ ওয়ার্ডের দেয়া কম্বলগুলো ছিল অপরিচ্ছন্ন। অনেকে এসব কম্বল ব্যবহার করতে পারতেন না, কষ্ট পেতেন শীতে। নিয়ম না থাকলেও  কেউ কেউ টাকা দিয়ে বাইরে থেকে কম্বল কিনে আনাতেন। এককথায় সাধারণ মানুষের থাকার মতো পরিবেশ ছিল না। যাদের পরিবার খোঁজ-খবর নিতে পারতেন না তাদের অবস্থা ছিল আরো করুণ। গত বছরের ২৬শে ডিসেম্বর থেকে চলতি ২০শে জানুয়ারি পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ কারাগারে ছিলেন এক ব্যবসায়ী। তিনিও রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার ছিলেন।
ডায়াবেটিসসহ বেশকিছু সমস্যা ছিল তার। সাধারণ বন্দি হিসেবে ওয়ার্ডে ছিলেন শুরুর দিকে। সেখানে থাকতে না পেরে টাকা দিয়ে থাকতেন মেডিকেলে। জানুয়ারির শুরুর দিকে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযান চালায় কেরানীগঞ্জের কারাগারে। এদের সবাইকে তখন মেডিকেল থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। মণিহার নামে একটি ভবনের ছয়তলায় অব্যবহৃত একটি ফ্লোরে উঠেন সবাই। ব্যবহার অনুপযোগী থাকায় কয়েকজন মিলেই পরিষ্কার করে নেন। শীতের প্রকোপ ও ডায়বেটিসের কারণে বেশ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাকে। রূপসা ভবনে একজনের জায়গায় ৫ জনকেও থাকতে দেখেছেন তিনি। খাবার হিসেবে সকালে দেয়া হতো রুটি আর গুড়, দুপুরে ডাল আর ভাত। আর রাতের খাবারে থাকতো ডাল, ভাত, মাছ। এসব খাবার ছিল পুষ্টিহীন ও অপরিচ্ছন্ন। প্রায় মাসখানেক কেরানীগঞ্জের কারাগারে থাকা আরেক বন্দি জানান, হাজারো অনিয়ম আর কষ্ট সেখানে।
যতদিন ছিলেন মানবেতর জীবন কাটাতে দেখেছেন সাধারণ ওয়ার্ডের বন্দিদের। নিজেও কয়েকদিন ছিলেন সেখানে। বলেন, রাজনৈতিক মামলায় গ্রেপ্তার বন্দিদের কষ্টের সীমা নেই কারাগারে। টাকা দিলে একটু ভালো থাকা যায় নইলে অস্বাস্থ্যকর গাদাগাদি পরিবেশে রাত কাটাতে হয়। সাধারণ ওয়ার্ডের ভেতরে আছে মেস সিস্টেম থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা। একটু ভালোভাবে থাকতে গেলে খরচ করতে হবে তিন হাজার টাকা। এরপর দুই হাজার ও দেড় হাজারেরও প্যাকেজ আছে। সাধারণ ওয়ার্ডে ইলিশ ও কেচকি ফাইলে গাদাগাদি করে থাকতে হয় এসব বন্দিকে। জাতীয় নির্বাচনের আগে বন্দি সংখ্যা বাড়ায় কষ্টও বাড়ে কয়েকগুণ। ছারপোকা, শীতের প্রকোপ আর রাতে না ঘুমানোর যন্ত্রণাও পোহাতে হয়েছে এসব বন্দিদের। যেসব বন্দিরা নিজেরাই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন তাদের ভোগান্তি সীমাহীন। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, পুষ্টিহীন খাবার আর একজনের গায়ের ওপর আরেকজন গাদাগাদি করে থাকতে হতো। টাকা-পয়সা থাকলে সেলে থাকার ব্যবস্থা আছে বলেও জানান এই বন্দি। তিনি জানান, সেলে থাকতে হলে শুরুতে দিতে হয় সাত হাজার টাকা।
আর প্রতিদিন দিতে হবে ৩০০ থেকে অন্তত এক হাজার টাকা। কিছুদিন যাওয়ার পরই আবার কেরানীগঞ্জ থেকে কাশিমপুরে স্থানান্তরের ভয় দেখানো হয়। যারা যেতে চান না তারা আটহাজার টাকা করে দিলে কেরানীগঞ্জের সেলেই থাকতে পারতেন। এসব টাকা থেকে লাইন চিফ বলে দায়িত্বরতরা পান দুই হাজার টাকা আর বাকি টাকা চলে যেত কর্তৃপক্ষের ভাগে। অপরিচ্ছন্ন, মানবেতর পরিবেশে থাকতে না চাইলে পদে পদে গুনতে হয় টাকা। তিনি বলেন, সাধারণ ওয়ার্ডে ৩৫-৪০ জন থাকার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও প্রায় একশ’ জনও থাকছেন। আর প্রতিটি সেলে তিনজন করে থাকার উপযোগী হলেও সর্বোচ্চ ৫ জন থাকছেন। কারাগারে টাকার লেনদেন ওপেন সিক্রেট।

রস রচনা: ভাড়াটের কষ্ট by আদনান মুকিত

আপনি চাইলে ঢাকা শহরের বাড়িওয়ালাদের তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করতে পারবেন।
১. কড়া বাড়িওয়ালা: যাঁরা ঠিক রাত ১১টায় বাড়ির গেট বন্ধ করে দেন।
২. মোটামুটি কড়া বাড়িওয়ালা: তাঁরা বাড়ির গেট বন্ধ করেন ঠিক রাত সাড়ে ১১টায়।
৩. হালকা কড়া বাড়িওয়ালা: এই শ্রেণির বাড়িওয়ালারা গেট বন্ধ করেন রাত ১২টায়।
এই তিন শ্রেণির বাইরেও কেউ কেউ আছেন, তবে তাঁরা বাড়িওয়ালা নন। আপনার–আমার মতোই সাধারণ মানুষ। আপনি হয়তো এই শ্রেণিবিভাগের কথা শুনে ভ্রু কুঁচকাচ্ছেন (আর যদি বাড়িওয়ালা হয়ে থাকেন, তাহলে নিশ্চয়ই এতক্ষণে ‘কী সব লেখে’ বলে পত্রিকা গুটিয়ে ফেলেছেন)। আসলে কুঁচকানো ছাড়া ভ্রু দুটির তেমন কোনো কাজ নেই। অনেকে পুরো মাথা ন্যাড়া করে ফেলে, কিন্তু রেখে দেয় ভ্রু দুটি। ভ্রু ছাড়া বিরক্তি প্রকাশ করবে কী করে?
আমরা যারা ভাড়া থাকি, সাধারণত তাদের প্রতি ভ্রু কুঁচকে তাকান দুজন। বাড়ির দারোয়ান ও স্বয়ং বাড়িওয়ালা। নিম্নলিখিত কারণে দারোয়ানের কুঁচকানো ভ্রু দেখার সৌভাগ্য অর্জন করবেন আপনি—
খুব সকালে বাড়ি থেকে বের হলে।
কোনো কারণে ভারী মেইন গেটটা খুলতে হলে (যেমন আপনি ফ্রিজ বা আলমারি কিনে এনেছেন, গেট খুলতে হবে। দারোয়ানকে খুঁজেই পাবেন না। আর পেলেও ‘চাবি লইয়া আইতাসি’ বলে কোথায় যেন হারিয়ে যাবেন তিনি)।
আপনার কোনো অতিথি এলে (এসব ক্ষেত্রে অতিথি যখন আপনার নাম বলেন, তখন না চেনার ভান করেন দারোয়ান)।
সেই অতিথি চলে যাওয়ার সময়।
এবং রাতে নির্ধারিত সময়ের পর বাড়িতে এলে।
সবগুলো বিরক্তি প্রকাশই নিশ্চয়ই যৌক্তিক। নইলে আমরা এত দিন ধরে মেনে নিচ্ছি কেন (নিচ্ছি কারণ আমরা ভাড়াটে)? বিস্ময়কর হলো, নির্ধারিত সময়ের পাঁচ মিনিট পর এলেই আপনি খেয়াল করবেন, দারোয়ান ঘুমিয়ে গেছেন। যেন গেট বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখও বন্ধ হয়ে যায় তাঁদের। শুধু আমি না, চোরও দুবার এসে আমার বারান্দা থেকে কাপড়চোপড় চুরি করে নিয়ে গেছে। কিন্তু দারোয়ানের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে যেতে পারেনি, কারণ তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন।
পরদিন সকালে ভ্রু কুঁচকে দারোয়ান বলেছিলেন, ‘কাপড়চোপড় রাইতে ঘরে ঢুকায় রাখবেন না? দিনকাল খারাপ!’
বাড়িওয়ালার ভ্রু কুঁচকানোর কথা আলাদা করে বলা কঠিন। সবকিছুতেই ভ্রু কুঁচকানোর বিস্ময়কর ক্ষমতা তাঁদের। ব্যাচেলর, বিবাহিত, তরুণ, কিশোর যা-ই হন, বাড়িওয়ালা শুধু ভ্রু কুঁচকে তাকাবেন। আপনি আমার কথাটা উড়িয়ে দিচ্ছেন তো? একটা উদাহরণ দিলে ঠিকই একমত হবেন আশা করি।
একবার গুনগুন করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলাম। বাড়িওয়ালার সঙ্গে দেখা। ভদ্রলোক ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘কোথায় যাচ্ছেন?’
‘এই একটু হাঁটাহাঁটি করে আসি।’
‘যান। হাঁটাহাঁটি করা খুব ভালো। তবে, কোনো কমপ্লেন যেন না আসে।...আপনার ভাড়াটে আমার বাসার সামনে হাঁটাহাঁটি করে—এই টাইপ আরকি।’
‘না না। কী বলেন!’
‘গুড। আর সিঁড়ি দিয়ে একটু আস্তে ওঠা–নামা করবেন। এমনভাবে হাঁটবেন, যেন শব্দ না হয়। অনেকে বিরক্ত হতে পারে, তাই না? অন্যভাবে নেবেন না, আপনি ছোট ভাইয়ের মতো, তাই বললাম।’
‘জি, ঠিক আছে।’
সিঁড়িতে নতুন টাইলস বসিয়েছেন, সে জন্য বোধ হয় এই চিন্তা। মানুষের প্রতি মায়া থাক না থাক, টাইলসের প্রতি তো আছে। সেটাইবা কজনের থাকে? সেদিন থেকে সিঁড়ি দিয়ে নিঃশব্দে ওঠা–নামার অনুশীলন শুরু করলাম। কঠিন কিছু তো না। তা ছাড়া সিঁড়িতে কারও পায়ের শব্দ শুনলে আমারও বিরক্ত লাগে। তো নিঃশব্দে সিঁড়ি দিয়ে নামছি, হঠাৎ আবার দেখা বাড়িওয়ালার সঙ্গে। দেখামাত্র ভ্রু কুঁচকে তাকালেন আমার দিকে। কিন্তু কিছুই বললেন না। পরদিন মা ডেকে বললেন, ‘কিরে, তুই নাকি পা টিপে টিপে সন্দেহজনকভাবে সিঁড়ি দিয়ে নামছিলি? ব্যাপার কী? কী করেছিস? তোদের জন্য তো সমাজে মুখ দেখানো যাবে না!’
এই হলো ব্যাপার। মাসের প্রথম সপ্তাহটা ছাড়া বাকি সব দিনই ভ্রু কুঁচকে থাকে বাড়িওয়ালাদের। কারণ, প্রথম সপ্তাহেই ভাড়াটা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে তুলে দিই আমরা।
বাড়িওয়ালারা সাধারণ মানুষ নন। ঢাকা শহরের মতো একটা জায়গায় যাঁর পাঁচ–দশতলা বাড়ি, তাঁকে সাধারণের কাতারে ফেলব—এত সাহস আমার নেই। সাধারণ মানুষ হলে গেট বন্ধ করা নিয়ে আরেকটু চিন্তাভাবনা তাঁরা করতেন নিশ্চয়ই। যে শহরে কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না মতিঝিল থেকে মোহাম্মদপুর যেতে কতক্ষণ লাগবে, সেখানে রাত ১১টায় বাড়ির দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিতে কঠোর হওয়া লাগে। শুধু তালা নয়, অনেকে তো সাইনবোর্ডও ঝুলিয়ে দেন বাড়ির দরজায়, ‘রাত ১১টার পর থেকে গেট বন্ধ—আদেশক্রমে বাড়িওয়ালা।’ ধরুন, গভীর রাতে ভূমিকম্প হলো, দ্রুত বাড়ি থেকে বের হতে হবে, তাই না? কিন্তু পারবেন না। গেট তো বন্ধ। ভূমিকম্প হলে প্রথমে যেতে হবে বাড়িওয়ালার কাছে (সাধারণত তাঁরা ভূমিকম্প টের পান না, দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন তো, ঘুম হয় গাঢ়)। চাবি খুঁজে সবাইকে নিয়ে তিনি যখন গেট খুলবেন, ততক্ষণে ভূমিকম্প শেষ, ভাগ্য খারাপ থাকলে আপনিও। আমার ধারণা, ঢাকার বাসায় ভাড়া থাকলে কবির সুমন গাইতেন, ‘কতটা কঠোর হলে তারে বাড়িওয়ালা বলা যায়...।’
শহরে এমন অসংখ্য দুর্ভাগা আছেন, যাঁরা সপ্তাহে অন্তত তিন দিন অফিস থেকে ৯টা–১০টার আগে বেরোতে পারেন না। অনেকের বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব বস থেকে কর্মচারীর দূরত্বের সমানুপাতিক। তার মধ্যে অফিস থেকে বেরিয়ে কতক্ষণ পর বাহন পাবেন, তারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই অবস্থায় প্রতিটি ভাড়াটে চাকরিজীবীর মাথায় একটা ভয়ংকর চাপ, ‘গেট লাগায় দিবে ভাই।’
কদিন আগে পাঠাও বাইকে করে বাড়ি ফিরছি। রাত পৌনে ১১টা, তবু ভয়ংকর জ্যাম। রাইডার করুণ মুখে বললেন, ‘ভাই, কিছু মনে না করলে আপনি আরেকটা বাইকে চলে যাবেন? আমাকে টাকা দেওয়া লাগবে না। বাসার গেট আটকায় দিবে সাড়ে ১১টায়। আমি পৌঁছাতে পারব না ভাই, প্লিজ।’
তাঁর কষ্টটা বুঝে ওই জ্যামের মধ্যেই নেমে গেলাম। ভদ্রলোক গেট খোলা পেয়েছিলেন কি না, জানি না, তবে আমি পাইনি। ফোন করে বাড়িওয়ালার কাঁচা ঘুম ভাঙিয়ে ভেতরে ঢুকেছিলাম। তালা খুলে ‘ওয়ার্নিং’ দিতে ভুলে যাননি তিনি। তবু আমি তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ, কারণ আমি ভাড়াটে। তিনি এসে তালা খুলে না দিলে রাস্তায় বসে ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে’ ধরনের গান গাওয়া ছাড়া কীই–বা করতাম আমি?
তবে একটা ব্যতিক্রমী ঘটনাও ঘটেছিল কদিন আগে। সে রাতেও আমি দেরি করে ফেলেছি। বাস থেকে নেমেই ছুটছিলাম বাড়ির দিকে। এলাকার মার্কেটটা পেরোতেই শুনি পাশের কলাপসিবল গেটে ধাক্কা দিচ্ছে কে যেন। গিয়ে দেখি সেই চেনা মুখ! আমাদের বাড়িওয়ালা! ব্যস্ত ভঙ্গিতে কাকে যেন ফোন দিচ্ছেন বারবার। এই মার্কেটের শেষ মাথায় কিসের যেন একটা অফিস আছে তাঁর। চিন্তিত মুখে তিনি বললেন, ‘দেখো তো, পাশের দোকানটা খোলা আছে না? ওখানে জলিল নামে একজন আছে। ওকে একটু ডাকো।’
‘কোনো সমস্যা হয়েছে?’
‘না, মানে অফিসে কাজের মধ্যে ছিলাম, ওরা ভেবেছে আমি চলে গেছি। গাধাটা গেটে তালা দিয়ে দিয়েছে।’
আরেকটি ছুটির ঘণ্টা কেস। পাশের দোকানে গিয়ে দেখি এক বৃদ্ধ শাটার নামাচ্ছেন। জলিল কোথায় জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘হ্যায় তো গেসেগা।’ দ্রুত বাড়িওয়ালাকে জানালাম সে কথা, ‘আংকেল, জলিল তো নাই।’
‘নাই মানে?’ চমকে উঠলেন বাড়িওয়ালা।
‘দোকানের বৃদ্ধ আংকেল বলল, উনি চলে গেছেন।’
বাড়িওয়ালার মুখে উদ্বেগের ছাপ, ‘ওই বুড়াকে আমার কথা বলো। বলো যে আমি মানে মকবুল সাহেব (বাড়িওয়ালার নাম) বের হবেন। চাবিটা নিয়ে আসতে।’
‘জি’ বলেই আমি আবার গেলাম সেই দোকানে। বৃদ্ধকে বললাম। বৃদ্ধ আরও বিরক্ত হয়ে বলল, ‘জলিল তো চাবি দিয়া যায় নাই।’
‘হায় হায়! এ তো “চাবি মাইরা দিসে ছাইড়া” টাইপ অবস্থা!’
আবার কলাপসিবল গেটের কাছে ছুটে গিয়ে দেখি অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারী করছেন বাড়িওয়ালা। বললাম, ‘আংকেল, জলিল ভাই তো চাবি নিয়ে চলে গেছেন।’
বাড়িওয়ালা অসহায় হয়ে বললেন, ‘হায় হায়! কী বলো! বের হব কী করে? ছাগলটা তো ফোনও ধরছে না।’ একটু পর পাশের দোকানের বৃদ্ধ এসে বললেন, ‘কলা–রুটি কিছু দিয়া যামু, স্যার? সারা রাইত না খাইয়া থাকবেন কেমনে?’
বাড়িওয়ালা ধমকে বিদায় করে দিলেন বৃদ্ধকে। আমিও চলে যাচ্ছিলাম, ভদ্রলোক বললেন, ‘ইয়ে, তুমি একটু থাকো না, মানে জলিলের বাসা তো কাছেই। ও চলে আসবে।’
‘কিন্তু আংকেল, সাড়ে ১১টা তো বেজে গেছে, গেট তো বন্ধ হয়ে যাবে।’
‘আরে না না। আমি ফোন করে দিয়েছি তো। কোনো সমস্যা হবে না। আর ইয়াংম্যান, এখনই তো রাত করে বাসায় ফেরার বয়স...ইয়ে, তুমি একটু জলিলের নম্বরে কল দেবে? আমারটা ধরছে না।’
আমি খুব চাচ্ছিলাম চলে যেতে। তালা–চাবির চক্করে পড়লে কেমন লাগে, তা বুঝুক বাড়িওয়ালা। কিন্তু তবু আমি বাড়িওয়ালাকে ছেড়ে গেলাম না। কারণ ওই যে, আমি তো ভাড়াটে।

‘মাইকেলের প্রতিটি স্পর্শ আমাকে শিহরিত করেছে’

শানা মাঙ্গাতাল। তাকে বলা হয় পপ সম্রাট প্রয়াত মাইকেল জ্যাকসনের ‘গোপন’ প্রেমিকা। সম্প্রতি মাইকেল জ্যাকসনের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে, তার যৌন আসক্তি নিয়ে যে তথ্যচিত্র নির্মাণ হয়েছে এবং তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় বইছে, তখন সেই শানা মুখ খুললেন। তিনি বললেন, নারীদের প্রতি মাইকেল জ্যাকসনের ছিল গভীর শ্রদ্ধা। তার যৌন জীবন নিয়ে যেসব গল্প বলা হচ্ছে তার সবই মিথ্যা। প্রয়াত মাইকেলের বিরুদ্ধে এমন সব অভিযোগকারীরাই আসলে মাইকেল জ্যাকসনকে ‘হত্যা’ করেছেন। ১৯৯০’র দশকে ‘থ্রিলার’ গায়ক হিসেবে জনপ্রিয়তার শীর্ষে মাইকেল জ্যাকসন। ওই সময় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িত ছিলেন শানা মাঙ্গাতাল।
তিনি বলেছেন, মাইকেল জ্যাকসন মেয়েদের ভালোবাসতেন। তাই বাচ্চাদের প্রতি তার কোনোই যৌন আসক্তি ছিল না।
তাকে যতটা শিশুদের প্রতি  যৌন আসক্ত বলা হয় বা ভাবা হয়, তিনি আসলে তা নন। তিনি চমৎকার অভিজ্ঞ এবং বিস্ময়কর একজন প্রেমিক ছিলেন। তার সঙ্গে অন্য কোনো পুরুষকে কখনোই তুলনা করা যাবে না। শানা মাঙ্গাতালের বয়স এখন ৪৮ বছর। তিনি স্মরণ করেছেন মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে সেইসব দিনগুলোকে। ওই সময় মাইকেল জ্যাকসন তার সঙ্গে প্রেমের ভান করতেন। ফোনে তাকে যৌন আসক্তিমূলক গানের কথা শুনিয়ে তার মাঝে যৌন আসক্তি সৃষ্টির চেষ্টা করতেন। কখনো কখনো তিনি যুবতীদের সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করতেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ছেলেদের যেসব অভিযোগ এসেছে তা বিশ্বাস করার মতো নয়।
মাইকেল জ্যাকসনের কোম্পানির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে কাজ করেছেন শানা মাঙ্গাতাল। তিনি বলেছেন, উল্টো অনেক পিতামাতাই তাদের বাচ্চা ছেলেদের মাইকেলের কাছে পাঠিয়ে দিতেন তার সঙ্গে থাকতে। তাদেরকে বলতেন মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে ঘুমাতে। একটি শিশু বেশি নজর পাচ্ছে এটা দেখলে অন্যরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তেন।
সম্প্রতি মাইকেল জ্যাকসনকে নিয়ে তথ্যচিত্র ‘লিভিং নেভারল্যান্ড’ প্রকাশ হয়েছে। এতে ওয়াডে রবসন এবং জেমস সেফচাক অভিযোগ করেছেন শিশু অবস্থায় তাদের সঙ্গে যৌন নির্যাতন করেছেন মাইকেল জ্যাকসন। এ নিয়ে বৃটেনের একটি ট্যাবলয়েড পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের সঙ্গে কথা বলেছেন শানা মাঙ্গাতাল। তিনি মাইকেল জ্যাকসনের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ পুরোপুরি বানচাল করে দিয়েছেন। বলেছেন, মাইকেল জ্যাকসন কখনোই শিশুদের প্রতি যৌন আসক্ত ছিলেন না। যে দুজন এ অভিযোগ এনেছেন তারা ছিলেন মাইকেল জ্যাকসনের বেস্ট ফ্রেন্ড। তাদের ভীষণ যত্ন নিতেন মাইকেল জ্যাকসন। কিন্তু মাইকেল কখনো ভাবেন নি তারাই তার বিরুদ্ধে এভাবে কথা বলতে পারে। বাস্তবে এ দুজনকে একটি পৃথিবী উপহার দিয়েছেন মাইকেল। এ ধরনের যৌন নির্যাতনের অভিযোগই মাইকেলকে হত্যা করেছে।
শানা মাঙ্গাতাল এখন লস অ্যানজেলেসের বিনোদন শিল্পের সঙ্গে কাজ করেন। ১৭ বছর বয়সে প্রথম মাইকেল জ্যাকসনের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। এক পর্যায়ে তিনি মাইকেলের অফিসের রিসিপশনিস্ট হিসেবে কাজ করা শুরু করেন। তখন তার বয়স ২০ বছর। এরই মধ্যে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে প্রেমের সম্পর্ক। বেশ কয়েক মাস ফোনে এবং অফিসে তার সঙ্গে ডেটিং দিতে থাকেন মাইকেল। এরপরই প্রথমবার তাকে চুমু খান তিনি। শানা মাঙ্গাতাল ওই চুমুর প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার সারা জীবনের স্বপ্ন যেন তখন সত্য হয়েছিল’। কিন্তু এর কয়েক সপ্তাহ পরেই একটি ম্যাগাজিনে চোখ আটকে যায় শানার। তিনি দেখতে পান এলভিস প্রিসলির মেয়ে লিসা মেরি প্রিসলির সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন মাইকেল। তা দেখে ‘হৃদয় ভেঙে যায় আমার’।
তারপরও বুকে আশা নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন শানা। আশা করেন, একদিন মাইকেলের সঙ্গে তিনি একত্রিত হবেন। অবশেষে কয়েক মাস পর লিসাকে ডিভোর্স দিলেন মাইকেল। এরপর লস অ্যানজেলেসের ইউনিভার্সেল সিটিতে ইউনিভার্সাল হিলটন হোটেলে শানাকে আমন্ত্রণ জানালেন মাইকেল জ্যাকসন। সেখানে তারা পপকর্ন খান। ছবি দেখেন। এক বোতল ওয়াইন পান করেন। তারপর এক সঙ্গে রাত যাপন করেন। ওই সময় তাদের এই সম্পর্কের কথা গোপন রেখেছিলেন শানা। চেয়েছিলেন আরো অন্তরঙ্গ হলে তবেই এ সম্পর্কের কথা প্রকাশ করবেন।
শানা বলেন, যখনই মাইকেল জ্যাকসন আমাকে স্পর্শ করতেন প্রতিবারই আমি শিহরিত হতাম। কাঁপতাম। আসলে আমি তো অনভিজ্ঞ ছিলাম। অন্য মেয়েদের যেমন থাকে আমার তেমন স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া ছিল না। তিনি আমাকে প্রস্তুত করার জন্য সবই করতেন, যা ছিল বিস্ময়কর। আমিও তো সব কিছু সেভাবেই চাইতাম। অবশ্যই মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন অভিজ্ঞ। ওই রাতে আমরা সারারাত ঘুমাই নি। মাইকেল জ্যাকসন ছিলেন ভালোবাসাময়, প্রেমময়। আমার মনে হয় আমার ইনোসেন্স তাকে আকৃষ্ট করেছিল আমার প্রতি। মনে হয়েছিল আমি যদি আগ্রাসী হই তাতে তিনি তার মতো করে আমার কাছে আসতে পারবেন না। ২০ বছর পরও তার প্রতি আমার অসীম ভালোবাসা রয়েছে।

মানুষ নাকি পিশাচ!

কাশিম খুরাম যা করেছে তা কোনো পশুও করে না। পশুর চেয়েও অনেক নিচে নেমে গেছে এই নরপিশাচ। বৃটেনে অন্ত্যোষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় এমন একটি স্থানে প্রবেশ করে সে লাশের সঙ্গে ‘সেক্স’ করেছে। এ জন্য শুক্রবার বৃটিশ আদালত তাকে ৬ বছরের জেল দিয়েছে। বার্মিংহামে তার বিরুদ্ধে এ রায় ঘোষণা করা হয়। এ সময় একজন বিচারক কাশিমের অপরাধকে সমস্ত মানবতার বিরুদ্ধে স্পর্শকাতর এক অপরাধ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বলা হয়েছে, ঘটনার সময় কাশিম ছিল মদ্যাপ। উচ্চ মাত্রায় ভাং নিয়েছিল।
এর আগের এক শুনানিতে ২৩ বছর বয়সী কাশিম তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করে। বিচারক বলেছেন, ওই ঘটনার সময় কাশিম ৩টি মৃতদেহের সঙ্গে এবং ৯টি কফিনের সঙ্গে আপত্তিকর আচরণ করে। জবাবে তার আইনজীবী জোসেফ কেটিং বলেন, ওই ঘটনার জন্য কাশিম ভীষণভাবে দুঃখিত।

চীনের বেল্ট রোড নিয়ে ঢাকাকে যা বলতে চায় দিল্লি

চীনের বহুল আলোচিত বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভ বা বিআরএই প্রকল্প থেকে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে দেখা হলে তবেই বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার বা বিসিআইএম আর্থিক করিডোরের ভবিষ্যৎ আছে বলে ভারত মনে করছে। দিল্লিতে সরকারের ঘনিষ্ঠ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, বেল্ট রোডের অন্যতম প্রধান অংশ যেহেতু বিতর্কিত কাশ্মীর ভূখণ্ডের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে তাই সেখানে ভারতের আপত্তি থাকবেই। আর বিসিআইএম যেহেতু বেল্ট রোডের চেয়ে
অনেক বেশি পুরনো প্রকল্প- তাই সেটিকে নিয়ে আলাদাভাবে এগোনো দরকার বলেই তারা যুক্তি দিচ্ছেন। পাশাপাশি বেল্ট রোড প্রকল্পের অর্থায়ন যাতে বাংলাদেশকে কোনো ঋণের জালে জড়িয়ে না ফেলে সেদিকেও ঢাকার সতর্ক থাকা দরকার বলে দিল্লির অভিমত।
এই মুহূর্তে ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম- দুই সীমান্তে চলছে চীনের বেল্ট রোড ইনিশিয়েটিভের দুটি প্রকল্পের কাজ। একদিকে চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর বা সিপেক, যা বিতর্কিত কাশ্মীরের ওপর দিয়ে যাচ্ছে বলে ভারত এই প্রকল্পের তীব্র বিরোধিতা করছে। অন্যদিকে পূর্ব সীমান্তের বিসিআইএম নিয়ে ভারতের বিশেষ আপত্তি না-থাকলেও এটাকেও যদি বেল্ট রোডের অংশ হিসেবে দেখা হয় তাহলে ওই একই কারণে দিল্লির পক্ষে তা মেনে নেয়া মুশকিল হয়ে যাচ্ছে।
এই পটভূমিতেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিকে পরামর্শ দিয়েছেন, দ্বিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় ফোরামে আলোচনার মাধ্যমে বেজিংয়ের সঙ্গে মতবিরোধ মিটিয়ে নিতে। কিন্তু ভারত কি সেই প্রস্তাব মানতে প্রস্তুত? সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক অশোক কান্থা বছর দুয়েক আগেও চীনে ভারতের রাষ্ট্রদূত ছিলেন, এখন তিনি দিল্লিতে সরকারি সাহায্যপুষ্ট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট অব চাইনিজ স্টাডিজের অধিকর্তা। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, ‘আমি কাউকে কোনো উপদেশ দিতে চাই না।
কিন্তু এটুকু অবশ্যই বলবো যে বিসিআইএম নিয়ে কথাবার্তা কিন্তু বেল্ট রোডের অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে। ফলে আমি মনে করি না অন্য কোনো প্রকল্পের সঙ্গে বিসিআইএমকে যুক্ত করে দেখার অবকাশ আছে। কারণ এটা নিয়ে সংশ্লিষ্ট চারটি দেশের আলোচনা চলছে অনেক আগে থেকে!’
কিন্তু এই মুহূর্তে চীন বিসিআইএম-কেও বেল্ট রোডের অংশ হিসেবেই দেখাতে চায় বলে একটা ধারণা সৃষ্টি হয়েছে, যদিও তারা বিষয়টা পুরো সপষ্ট করেনি। এই প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা যেমনটা চাইছেন, অর্থাৎ সিপেক নিয়ে ভারত আপত্তি শিথিল করুক, তার কি কোনো সম্ভাবনা আছে?
দিল্লিতে কানেক্টিভিটি বিশেষজ্ঞ প্রবীর দে বেল্ট রোড নিয়ে বহুদিন গবেষণা করছেন, তিনি কিন্তু খুব একটা আশাবাদী নন। ড. দে বলছিলেন, ‘দেখুন একটা দেশের অখণ্ডতা বা সার্বভৌমত্বের দাবি সবার আগে। তা ছাড়া ভারতে সামনেই নির্বাচন আসছে, ফলে এখনই বিষয়টা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হবে বা কেউ বিবৃতি দেবে বলেও মনে হয় না। তবে বিসিআইএম করিডোর যে বাংলাদেশ এবং ভারতের পূর্ব বা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য অনেক সুবিধা বয়ে আনবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সে কারণেই আমি মনে করি দিল্লিতে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাদের বিসিআইএম নিয়ে দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তা সে সিপেকে আমাদের অবস্থান যা-ই হোক না কেন। কোনো একটা মেকানিজমের মাধ্যমে এই করিডোরের কাজ এগিয়ে নিতেই হবে। বিসিআইএমের যাবতীয় স্টাডিও শেষ, এখন চার দেশের একটা বৈঠক ডেকে সেই স্টাডি অনুমোদন করাতে হবে। যে বৈঠক ডাকার দায়িত্ব মিয়ানমারের।’
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চীন-ভারত সম্পর্কের বিশেষজ্ঞ ড. শ্রীমতি চক্রবর্তীও মনে করেন বিসিআইএম নিয়ে ভারতের উৎসাহ বাংলাদেশের চেয়ে কিছু কম নয়। তবে প্রকল্পটাকে বেল্ট রোড থেকে পৃথকভাবে দেখলে তবেই সমস্যা মেটে। তার কথায়, ‘বিসিআইএমের চারটি দেশের মধ্যে সবচেয়ে আগ্রহ দেখা গেছে চীনের। মিয়ানমারের উৎসাহ একটু কম ছিল, বাংলাদেশও বলব একটু ইর‌্যাটিক ছিল। ভারতও অবশ্য কখনো কখনো মন্থরতা দেখিয়েছে। তবু আমি মনে করি বিসিআইএম নিয়ে ভারতের আপত্তির কিছুই নেই। আমাদের যাবতীয় আপত্তি সিপেক নিয়ে। আর সেটা একটা বিতর্কিত এলাকা দিয়ে যাচ্ছে বলে। এখন সেই জায়গাকে পাশ কাটানো হলে, কিংবা দুটো প্রকল্পকে আলাদা করে দেখা হলেই তো আর অসুবিধার কিছু থাকে না।’
এদিকে বিআরআই সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণের জালে জড়িয়ে দিচ্ছে, সমপ্রতি এ ধরনের সন্দেহ তৈরি হয়েছে শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ বা এমনকি পাকিস্তানেও। প্রবীর দে বলছিলেন, দিল্লিরও বিশ্বাস বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। ঢাকাকে আসলে খুবই সতর্কভাবে দেখতে হবে চীন থেকে তারা ঠিক কী নেবে। এখানে কিন্তু কোনো ‘ফ্রি লাঞ্চ’ নেই, মানে বিনি-পয়সায় কেউ কাউকে কিছু অবকাঠামো গড়ে দিচ্ছে না। চীনের ঋণে অনেক জটিল শর্তও আছে। বাংলাদেশের ডেট মার্জিন এমনিতেই অনেক বেশি, এখন বিআরআই প্রকল্পের জন্য সেটা আরো বাড়লে রাজস্ব উৎপাদনের জন্য তাদের অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে। আসলে বাংলাদেশের মতো ভারতও বিশ্বাস করে, এই অঞ্চলে বিসিআইএম করিডোরের দ্রুত বাস্তবায়ন দরকার। কিন্তু সুদূর কাশ্মীরের ছায়া পড়াতেই প্রকল্পটি ভারতের চোখে সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। আর তারা এখন বাংলাদেশকেও বার্তা দিতে চাইছে- বিষয়টিকে বেল্ট রোড থেকে আলাদা করে দেখলেই এর রূপায়ণে কোনো সমস্যা থাকে না।

কারাফটকে যে চিত্র নিত্যদিনের by মারুফ কিবরিয়া

শুক্রবার সকাল ১০টা। কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে জটলা। উদ্দেশ্য কারাগারে বন্দিদের সঙ্গে দেখা করা। কারো মা, কারো বোন, ভাই, বাবা কিংবা স্ত্রী এসেছেন দেখা করতে। ঢাকা ও আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা এই স্বজনরা সকাল থেকেই লাইন ধরেন স্লিপ নেয়ার জন্য। লম্বা সারিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর মেলে কাঙ্ক্ষিত স্লিপ। স্লিপ পেয়ে আবার যেতে হয় মূল ফটকে। সেখানে কারারক্ষীদের কাছে স্লিপ জমা দিলে কিছু সময় অপেক্ষার পর বন্দি থাকা মানুষটি আসেন স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে।
তবে এক্ষেত্রেও ফটকের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে অপেক্ষার প্রহর গুনতে হয়।
সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্রবার ভিড়টা তুলনায় বেশি থাকে। এদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। স্লিপ সংগ্রহ করার সারিটাও বেশ দীর্ঘ হয়। পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা সারির ব্যবস্থা রয়েছে নতুন কেন্দ্রীয় কারাগারে। মাঝে মাঝে এই ভিড় বেশি হয়ে গেলে তা সামাল দিতে গিয়ে খানিকটা বেগ পেতে হয় কারারক্ষীদের। অবশ্য, দীর্ঘ সারিতে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অনেক দর্শনার্থীও খুব বিব্রত হন। তাতেও যখন স্লিপ পেয়ে বন্দি থাকা স্বজনের সঙ্গে একবার দেখা করে কথা বলতে পারেন তখন প্রাণটাই ভরে যায়। প্রিয় মানুষের সঙ্গে দেখা করে অনেকেই হাসিমুখে বাড়ি ফেরেন। তবে অনেককে কান্নায় ভেঙে পড়তেও দেখা যায়।
বিশেষ করে কারাবন্দি সন্তানকে দেখতে এসে অনেক মা-ই ধৈর্যহারা হয়ে পড়েন। দেখা করার নির্দিষ্ট সময় শেষে বেরিয়ে আসার পরও কারাগার প্রাঙ্গণ ছেড়ে যেতে চান না মা। এমন চিত্রও চোখে পড়ে কেরানীগঞ্জের কারাগারে। শুক্রবার সকালে জামালপুর থেকে এসেছিলেন হেনা নামের এক নারী। কারাফটকের সামনে হাউ মাউ করে কাঁদছিলেন। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার ছেলের নাম হাবিব। দুই সন্তানের বাবা। নভেম্বর মাসে ঢাকায় বোনের বাসায় বেড়াতে আসছিল। মুড়ি কিনতে বাসা থেকে বের হলে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। এরপর আর খুঁজে পাইনি। হেনা জানান, নির্বাচনের আগে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে ঘটে যাওয়া পুলিশ-বিএনপির সংঘর্ষে গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় হাবিবকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ। কিন্তু এই ঘটনার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। হাবিব জামালপুরেই থাকেন। তার মা হেনা বলেন, আমার ছেলে কোনো রাজনীতি করে না। বাড়িতে থাকে। বোনের বাড়িতে বেড়াতে আসছিল। পুলিশ শুধু শুধু মামলা দিয়েছে। তিনি জানান, গ্রেপ্তারের পর গত তিন মাস ধরে কেরানীগঞ্জ কারাগারেই আছেন হাবিব।
কারাফটকে ছোট ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন আরো একজন। তার নাম আবিদ উল্লাহ। তিনি জানান, তার ভাইয়ের নাম আদু। সদ্য শেষ হওয়া জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছিল। আবিদ উল্লাহ বলেন. ‘আমার ভাইকে মামলা দেয়ার বয়সই হয়নি। সে এখনো অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। তাকে আটক করে মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ছোট ভাইয়ের জামিন নিয়েও প্রতিদিন এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছেন জানিয়ে তিনি বলেন. প্রতিদিন কত নেতার কাছে ঘুরি। কোনো কাজ হয় না। একটা অবুঝ ছেলে সে মামলার কি বুঝে। উকিল ধরছি, এখনো জামিন কবে পাইবো জানি না।’
সৈয়দপুর থেকে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলেন আব্দুর রশিদ। তার ছেলের নাম আজগর। নারী নির্যাতন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে গত এক মাস ধরে কারাভোগ করছেন বলে জানান আব্দুর রশিদ। সত্তরোর্ধ্ব এই পিতা বলেন, আমার সাত ছেলের মধ্যে আজগর চতুর্থ। বাড়ির পাশের একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। আজগর বিয়েও করতে চায়। কিন্তু মেয়ের বোন মাঝে একটা ঝামেলা করে আমার ছেলেকে নারী নির্যাতন মামলায় ফাঁসিয়ে দেয়। এরপর পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। এই বয়সে নির্দোষ ছেলেটা জেল খাটছে। এসব সহ্য হয় না। সেই সৈয়দপুর থেকে ঢাকায় আসছি। এখানে এত ভিড়, খুব কষ্ট হচ্ছে।  কেন্দ্রীয় কারাগার প্রাঙ্গণে গেলে প্রতিদিনই এমন অনেক বাবা, অনেক মায়ের আহাজারির চিত্র দেখা যায়।
বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে এসে অনেকেই প্রতারক চক্রের ফাঁদেও পড়েন। তবে এক্ষেত্রে কারাগারের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ভেতরের বিভিন্ন জায়গায় ফেস্টুন আকারে সতর্ক বার্তা দিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ। সেটা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। রাফসানা এসেছেন স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে। অচেনা এক ব্যক্তি এসে আসামি দ্রুত সময়ে জামিন নিয়ে দেয়ার কথাবার্তা শুরু করেন। এসময় কারারক্ষীরা আসছেন এমনটা দেখতে পেয়ে দ্রুত সটকে পড়ে ওই প্রতারক চক্রের সদস্য। রাফসানা বলেন, আমি শুরুতে বুঝি নাই। পরে দেখি তার ভাব ভালো না। পুলিশ দেখেই সে আমার সঙ্গে আর কথা বলে নাই। পরে আর ওই লোককে খুঁজে পাইনি।
কারাগারের বাইরের এই পরিবেশ নিয়ে বেশ প্রশংসার কথা শোনা গেলেও বন্দিদের সঙ্গে দেখা করতে আসা স্বজনদের অনেকেই নাখোশ কারা প্রাঙ্গণে স্থাপিত নিত্যপণ্যের দোকানগুলো নিয়ে। বাইরের সাধারণ দোকান থেকে কারাকর্তৃপক্ষের দ্বারা পরিচালিত ওই দোকানের পণ্যের দাম তুলনামূলক বেশিই বলে অভিযোগ অনেকের। আফরোজা নামের এক দর্শনার্থী বলেন, আমরা বাইরে যে জিনিসগুলো নিয়মিত দামে পাই সেখান থেকে এখানে প্রত্যেকটাই ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি। এটা আমাদের জন্য বেশিই হয়ে যায়। বাইরের দোকানের জিনিসের সঙ্গে এখানকার পণ্যের তো কোনো পার্থক্য নেই। তাহলে বেশি কেন?

গণতন্ত্রের হাল ধরতে সবকিছুই করবেন গাইডো

ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্রের হাল ধরার জন্য নিজের ক্ষমতার সবটুকু ব্যবহার করবেন বিরোধী নেতা ও স্বঘোষিত অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হুয়ান গাইডো। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয় তিনি উড়িয়ে দেন নি। আল জাজিরাকে দেয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। এতে তিনি বলেছেন, ভেনিজুয়েলা যে সঙ্কট মোকাবিলা করছে তা কাটিয়ে উঠতে পাঁচটি মূলনীতি তিনি বাস্তবায়ন ঘটাতে চান। তার মধ্যে অন্যতম হলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। আল জাজিরার সাংবাদিক লুসিয়া নিউম্যানকে দেয়া সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, ভেনিজুয়েলায় তিনি সুশাসন, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চান। বর্তমান মানবিক সঙ্কটের বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা নেয়া, নাগরিকদের কর্মসংস্থানের জন্য অর্থনীতিকে সক্রিয় করা এবং ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্রকে সামনে এগিয়ে নেয়ার জন্য হাল ধরার প্রত্যয় ঘোষণা করেন তিনি। 
উল্লেখ্য, নিজেকে তিনি অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা দেয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র, লাতিন আমেরিকার এক ডজন দেশ, কানাডা ও ইউরোপিয় ইউনিয়ন তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
মেক্সিকো ও উরুগুয়ে তাকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে সমঝোতা সংলাপের মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছিল বলে দাবি গাইডোর। তিনি বলেছেন, এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। গাইডো বলেন, এই অচলাবস্থা দুটি সমান পক্ষের মধ্যে নয়। একটি পক্ষে রয়েছে একটি ছোট্ট গ্রুপ, যারা ক্ষমতা ধরে রাখতে যেকোনো কিছু করতে চায়। অন্যপক্ষে আছে সাধারণ মানুষ। তারা মাদুরো সরকারের পরিবর্তন চায়।
তার ভাষায়, মেক্সিকো ও উরুগুয়ের সৎ উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমি বুঝতে পারি। মাদুরোকে ইউরোপিয় ইউনিয়ন যে আলটিমেটাম দিয়েছে সে বিষয়েও বুঝতে পারি আমি। উল্লেখ্য, গত শনিবার নতুন নির্বাচন দেয়ার জন্য মাদুরোকে আলটিমেটাম দিয়েছে ইউরোপিয় ইউনিয়ন। তবে ওই সময়সীমাকে অবজ্ঞা করবেন বলে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন মাদুরো।
হুয়ান গাইডো বলেন, সমঝোতার জন্য বিরোধীরা ইচ্ছা পোষণ করেছে। আমরা সব দিক থেকেই চেষ্টা করেছি। আমরা ভোট বর্জন করেছি। অনশন করেছি। প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছি। অন্যদিকে তারা আমাদেরকে হত্যা করেছে। ক্ষমতা জিম্মি করে রাখা, সরকারের হাতবদল, অবাধ নির্বাচন সব কিছুই নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আলোচনা হতে পারে।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে পদত্যাগের জন্য নতুন করে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। তিনি শুক্রবার নতুন করে তাকে এমন হুমকি দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভেনিজয়েলায় লড়াই চলছে স্বৈরাচার ও গণতন্ত্রের মধ্যে। নিকোলাস একজন স্বৈরাচার। তার ক্ষমতায় থাকার কোনো বৈধতা নেই। তাকে অবশ্যই ক্ষমতা থেকে যেতে হবে। যারা তারপরও ক্ষমতায় থাকতে চাইছে তাদের জেনে রাখা উচিত, যেকোনো ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে।

শিশুদের সঙ্গে যৌনতার দায়ে ৯ বছরের জেল

শিশুদের যৌন নির্যাতন করতেন ক্রিস্টি কিম্বার (২৬)। আর সেই দৃশ্য নিজেই ভিডিও ধারণ করতেন তিনি। বিষয়টি ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে তাকে। আদালত শুক্রবার তাকে ৯ বছরের জেল দিয়েছে। এমন শিশু নির্যাতনকারীদের ইংরেজিতে বলা হয় পায়েডোফাইল। সম্প্রতি তার মোবাইল ফোনে সমস্যা দেখা দেয়। গত বছর ২০ শে জুলাই তিনি তা মেরামত করতে দেন এক বন্ধুর কাছে। হুঁশিয়ার করে দেন তিনি যেন এর ভিতর থাকা ভিডিওগুলো না দেখেন।
কিন্তু মেরামত করার সময় তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। অনুসন্ধানে দেখা যায় তিনি ওইসব ভিডিও মোবাইলে ধারণ করে বিভিন্ন অ্যাপ ব্যবহার করে অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন। বৃটেনের কেন্ট পুলিশের একজন মুখপাত্র বলেছেন, তারা কিম্বারের মোবাইল ফোন যাচাই করে দেখেছেন। তাতে শিশুদের ওপর যৌন নির্যাতন চালাতে দেখা গেছে তাকে। এর কোনো কোনোটিতে কিম্বার নিজে যৌন কর্মকান্ডে লিপ্ত। এর পর পরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।  মেইডস্টোন ক্রাউন কোর্টে এর শুনানি হয়। তাতে বলা হয়, বেশ কিছু ভিডিও মোবাইলে ধারণ করেছেন কিম্বার। তার মধ্যে নিজেই তিনি অংশ নিয়েছেন। একটি ভিডিওতে দেখা যায় একটি শিশু একজন নারীর ওপর ‘সেক্স টয়’ ব্যবহার করছে। আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করেছেন কিম্বার। এরপর তাকে শাস্তি ঘোষণাকালে বিচারক ডেভিড গ্রিফিথ-জোনস কিউসি বলেছেন, ভিন্ন মাত্রার একটি অপরাধ করেছেন কিম্বার। তার দ্বিতীয় ফোনটিও জব্দ করে পরীক্ষা করা হয়েছে। তাতেও শিশুদের সঙ্গে রগরগে যৌন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকা ভিডিও পাওয়া গেছে।

'ইরানে দুনিয়া-কাঁপানো ইসলামী বিপ্লবের গৌরবময় ৪০ বছর’-এক

ইরানের ইসলামী বিপ্লব মানব ইতিহাসের এক নজিরবিহীন বিপ্লব। বহু বিশ্লেষকের মতে এ বিপ্লব বিগত এক হাজার বছরের সেরা আদর্শিক বিপ্লব। এ মহাবিপ্লব খ্যাতনামা বহু চিন্তাবিদ, রাষ্ট্র-বিজ্ঞানী, সমাজ-বিশেষজ্ঞ ও বিশ্বের বহু ঝানু রাজনীতিবিদকে করেছিল স্তম্ভিত, হতবাক এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ়।
কারণ, আধুনিক যুগে ধর্ম-ভিত্তিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থার পুনরুজ্জীবন ঘটতে পারে-এটা সমাজ ও রাষ্ট্র-বিজ্ঞানীদের কাছে ছিল কল্পনাতীত বিষয়। পাশ্চাত্যে ধর্ম কেবলই ব্যক্তি-জীবনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। আর মুসলিম বিশ্বেও ধর্মকে জীবনের সব ক্ষেত্রে থেকে নির্বাসন দেয়ার অপতৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল পশ্চিমা শিক্ষায় শিক্ষিত বুদ্ধিজীবি মহলের এক বড় অংশ পশ্চিমাদের অনুগত বা তাদের সেবাদাস শাসক-গোষ্ঠীর সহায়তায়। কিন্তু এমন এক প্রেক্ষাপটে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বদলে দেয় বিশ্ব-রাজনীতি ও সমাজ-ব্যবস্থার প্রচলিত সব হিসাব-নিকাশ।
১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে বিজয়ী-হওয়া ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেশটিতে অবসান ঘটায় মার্কিন কর্তৃত্বসহ তাবৎ পরাশক্তিগুলোর মোড়লিপনা। এ বিপ্লব ফিরিয়ে আনে ইরানি জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা, সম্মান ও উন্নয়নের বিরতিহীন অগ্রযাত্রার সেই হারানো গৌরবের ধারা। কিন্তু এ বিপ্লবের ফলে দিশেহারা হয়ে পড়া মার্কিন পরাশক্তি ও তার মিত্ররা গত প্রায় চার দশক ধরে একের পর এক বিছিয়ে যাচ্ছে নানা ধরনের ভয়ানক ও কুটিল ষড়যন্ত্রের জটা-জাল যাতে নির্মূল বা অন্তত লাইনচ্যুত হয়ে দুর্বল হয় এই মহাবিপ্লব। এইসব ষড়যন্ত্র অনুযায়ী  তারা কখনও পরোক্ষ যুদ্ধ, কখনও প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসন কিংবা কখনও কঠোর অর্থনৈতিক অবরোধসহ নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং এখনও করে যাচ্ছে। অবশ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ওইসব দাম্ভিক পরাশক্তির চাপিয়ে দেয়া নানা শত্রুতা সত্ত্বেও নতজানু হচ্ছে না ইসলামী ইরান, বরং খাঁটি ইসলামের অদম্য শক্তির বলে দিনকে দিন ভেতরে ও বাইরে এবং বিশ্ব-অঙ্গনে শক্তিশালী হচ্ছে ইসলামী বিপ্লবের দেশ ইরান।
ইরানের সার্বিক সমৃদ্ধি ও বিশ্বজোড়া ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে নিয়মিত হুমকি দেয়া অভ্যাস পরিণত হয়েছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী জোট। কিন্তু শত হুমকি আর বাধা সত্ত্বেও বিশ্বগ্রাসী ও লুটেরা শক্তিগুলোর ঘুম হারাম করে দিয়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লব তার গৌরবময় ৪০তম বিজয়-বার্ষিকীর প্রাক্কালেও মুক্তিকামী জাতিগুলোর জন্য আদর্শিক অনুপ্রেরণার প্রধান আলোক-সম্পাত-কেন্দ্র হিসেবে জ্বলজ্বল করছে। ইরানের ওপর হামলা চালানোর হুমকি দেয়া প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে দাম্ভিক শক্তিগুলো। বরং সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে অনন্য হয়ে-ওঠা ইসলামী ইরান এখন পশ্চিমা দাম্ভিক শক্তিগুলোকে প্রায়ই চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আগ্রাসন ও গোস্তাখির জন্য যে উচিত শিক্ষা এবং দাতভাঙ্গা জবাব অপেক্ষা করছে তা ভাবতেও শিউরে উঠছে দাম্ভিক শক্তির সমরনায়ক ও যুদ্ধবাজ নেতারা! ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে ইসলামী ইরানের প্রবল শক্তি থাকার কথা স্বীকার করছে তার শত্রুরা এবং ইরানের এই প্রবল প্রভাব ও প্রতাপ উপেক্ষা করা যে সম্ভব নয় তাও উল্লেখ করছেন পশ্চিমা বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা।
প্রখ্যাত মার্কিন চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি ইসলামী ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর প্রবল শত্রুতার কারণ তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন: 'যতদিন ইরান স্বাধীনচেতা থাকবে ও মার্কিন কর্তৃত্বকামীতার কাছে মাথা নোয়াবে না ততদিন মার্কিন  সরকারের শত্রুতা অব্যাহত থাকবে। ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান মার্কিন সরকারের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, দেশটি তার স্বাধীনতার বিষয়কে অগ্রাহ্য করে না।'
চমস্কি আরও বলেছেন: 'ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানই প্রথমবারের মত বিশ্বে সফল ইসলামী-রাজনৈতিক বিপ্লবের মডেল উপস্থাপন করেছে যাতে বিশ্বের মুসলিম ও নির্যাতিত জাতিগুলো এ বিপ্লবের সুফলগুলো থেকে লাভবান হয়।'
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাবে ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের বহু দেশে জোরদার হয়েছে ইসলামী জাগরণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে  মিশর, আফগানিস্তান, ইয়েমেন, বাহরাইন, তিউনিশিয়াসহ বিশ্বের নানা অঞ্চলে ইসলামী জাগরণের যে জোয়ার দেখা দিয়েছিল তারও বড় প্রেরণার অন্যতম প্রধান বা বড় উৎস ছিল ইরানের ইসলামী বিপ্লব।  মুসলিম জাতিগুলো বুঝতে পেরেছে যে একমাত্র খাঁটি ইসলামের দিকে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমেই এ অঞ্চলের সমস্যা ও সংকটগুলোর সুরাহা হতে পারে।
পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত ভৌগলিক অবস্থান ও আরব বিশ্বের সম্পদের প্রতি সব সময়ই লোলুপ দৃষ্টি রেখেছে সাম্রাজ্যবাদী লুটেরা শক্তিগুলো। এই শক্তিগুলোর জোটে দখলদার ইসরাইলের সঙ্গে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্ত হয়েছিল সাম্রাজ্যবাদেরই নিত্য-নতুন ষড়যন্ত্রের হাতিয়ার বা পুতুল হিসেবে ব্যবহৃত তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। কিন্তু এইসব গোষ্ঠীও চরম পরাজয়ের শিকার হয়েছে ইরাক ও সিরিয়ায়। আর তাদের এই পরাজয়ের পেছনে ছিল ইরানের আদর্শিক প্রভাব এবং দ্রুত ও মোক্ষম সামরিক সহায়তা।
ইরানের ইসলামী বিপ্লবের আগে বিশ্বকে দু'ভাগে বিভক্ত করে রেখেছিল সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো। কিন্তু ইসলামী বিপ্লবের সাফল্যের সুবাদে কর্তৃত্বকামী মেরুর মোকাবেলায় কর্তৃত্বাধীন মেরুতে জেগে ওঠে প্রতিরোধ শক্তি নামের এক নতুন মেরু।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ কোনো কোনো মার্কিন কর্মকর্তা বলেছিলেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব ৪০ বছরে উপনীত হতে পারবে না এবং তার আগের গ্রীষ্মেই ইরানে দেখা দেবে সরকার-বিরোধী গণ-অভ্যুত্থান! মার্কিন যুদ্ধবাজ নেতা জন বোল্টন বলেছিলেন, তিনি ২০১৯ সালে ইরানের ইসলামী সরকারের পতনের পর তেহরানে ক্রিসমাস উৎস করবেন সরকার বিরোধী ইরানি মোনাফিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা এমকেও'র অনুচরদের নিয়ে! কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তাদের এ জাতীয় বক্তব্য যে অসুস্থ ব্যক্তির প্রলাপের মতই অলীক তা এখন বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে।
ইরানের বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি বলেছেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লব দেখিয়ে দিয়েছে যে ইরানি জাতি তাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় সৃষ্টিশীল ভূমিকার মাধ্যমে বিশাল সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে। অন্য কথায় মহান ইমাম খোমেনী (র.) ইরানি জাতিকে বিশাল জনসমুদ্রের আকারে সংঘবদ্ধ করে এমন এক আন্দোলনে নামান যে তারা শত শত বছরের রাজতান্ত্রিক তথা বংশানুক্রমিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা এবং বিজাতীয়দের হস্তক্ষেপ ও কর্তৃত্বের অবসান ঘটিয়ে মহাপরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হন।
ইরানি জাতি মার্কিন সরকারসহ পশ্চিমা শক্তিগুলোর অর্থনৈতিক যুদ্ধসহ নানা ধরনের প্রকাশ্য ষড়যন্ত্র ও শত্রুতার মোকাবেলা অব্যাহত রাখায় ইরানের ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও দেশটির জনগণের আত্মবিশ্বাস বেড়েছে এবং তারা শত্রুদের নানা অপকৌশল মোকাবেলার পথও খুঁজে পেয়েছেন বলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

চট্টগ্রামে ৪০৫টি ইটভাটার ৩৫৫টিই অবৈধ by ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় ৪০৫টি ইটভাটার ৩৫৫টিই অবৈধ। এসব ইটভাটার জেলা প্রশাসনের কোনো লাইসেন্স নেই। পরিবেশ সংক্রান্ত লাইসেন্স আছে ৫০টির। আবার সব কটি ইটভাটায় গড়ে তোলা হয়েছে সংরক্ষিত বন এলাকায়।
পরিবেশ অধিপ্তরের হিসাবে ইটভাটার এই তথ্য পাওয়া গেলেও হিসেবে নেই এমন আরো ১১৫টি ইটভাটার তথ্য রয়েছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও বনবিভাগে। যেগুলোতে কোনো রকম বৈধতা ছাড়াই দিনের পর দিন লাখ লাখ ইট প্রস্তুত করা হচ্ছে।
প্রতি বছর এসব ইটভাটায় চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বনবিভাগ অভিযান চালালেও এ বছর মৌসুমের প্রায় শেষের দিকে এসেও অভিযানের কোনো প্রস্তুতি নেই বলে জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন।
অভিযান চালানোর সময় হয়ে উঠছে না বলে জানান চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক।
আর বনবিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া অভিযানের কোনো সুযোগ নেই তাদের। অভিযানের জন্য ম্যাজিস্ট্রেট চেয়েও পাচ্ছেন না তারা।
এ সুবাধে নির্বিঘ্নে ইট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে ইটভাটার মালিকরা। এতে ধ্বংস হচ্ছে কৃষিজমি-পাহাড়। উজাড় হচ্ছে বন। ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশ ও জলবায়ু। নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে স্থানীয় বসতির সাধারণ মানুষ। যার ক্ষতি অপূরণীয়।      
অথচ ২০১৩ সালের ৫৯নং আইনে ইট প্রস্তুত, ইটভাটা স্থাপন ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত্র আইনের ৪নং ধারায় লাইসেন্স ছাড়া ইট তৈরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বলবৎ অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, ইটভাটা যে জেলায় অবস্থিত সেই জেলার জেলা প্রশাসকের থেকে লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া, কোনো ব্যক্তি ইটভাটায় ইট প্রস্তুত করতে পারবে না।
এ আইনে বলা হয়েছে, লাইসেন্স ছাড়া ইট উৎপাদন করলে অনধিক এক বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবে; যা চট্টগ্রামের ইটভাটা মালিকদের কাছে উপেক্ষিত। অবহেলিত প্রশাসনের কাছেও।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াছ হোসেন বলেন, অবহেলিত বা উপেক্ষা নয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এরপর উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতিসহ সরকারি দপ্তরের নানা উদ্যোগ বাস্তবায়নের ব্যস্ততায় এ বছর ইটভাটার দিকে নজর দেয়া এখনো সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলায় ৫২০টির মতো ইটভাটা রয়েছে। এরমধ্যে ৪৭০টি ইটভাটার লাইসেন্স নেই। লাইসেন্স ছাড়া ইটভাটা পরিচালনায় সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। লাইসেন্স নেয়া কোনো ইটভাটা সংরক্ষিত বনেও বসাতে পারত না। কৃষি জমি, পাহাড় কেটে ইট তৈরির সুযোগও পেত না।
কারণ, পরিবেশ সম্মত জিগজ্যাগ কিলন, হাইব্রিড হফম্যান কিলন, ভার্টিক্যাল শ্যাফট ব্রিকস কিলন, টানেল কিলন বা অনুরূপ উন্নততর কোনো প্রযুক্তির ইটভাটা স্থাপন ছাড়া অন্য কোনো ইটভাটায় লাইসেন্স দেয়া হতো না।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাব মতে, চট্টগ্রামে ৪০৫ ইটভাটার মধ্যে পরিবেশ ছাড়পত্র নিয়েছিলেন ২৬২টি ইটভাটার মালিক। ১৪৩টি ভাটার মালিক ছাড়পত্র নেননি। এরমধ্যে ৮০-১২০ ফুট উচ্চতার চিমনি রয়েছে ২৮৩টি ইটভাটার। এ ধরনের চিমনিধারী ইটভাটাগুলো আধুনিক প্রযুক্তিসম্মত নয় বিধায় পরিবেশ আইনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশ আইনে অনুমোদিত আধুনিক প্রযুক্তির জিগজ্যাগ চিমনি রয়েছে ১১৯টির। উন্নতমানের অত্যাধুনিক হাইব্রিড হফম্যান কিলনধারী ভাটা রয়েছে মাত্র একটি ও অটো টানেল কিলন ভাটা রয়েছে দুটি। পরিবেশ আইনের ৪ উপধারায় এসব ইটভাটাকে আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে দেখা যায়, পরিবেশসম্মত আধুনিক প্রযুক্তির ইটভাটা রয়েছে ১২২টি। ২৮৩টি ইটভাটা পরিবেশসম্মত নয়। ২০১৪ সালের ৩০শে জুনের পর ৮০-১২০ ফুট উচ্চতার চিমনিধারী ইটভাটা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবানুযায়ী, চট্টগ্রাম জেলার রাউজানে ইটভাটা রয়েছে ৪৫টি। এরমধ্যে বৈধ মাত্র একটি। ফটিকছড়িতে ৫৬টির মধ্যে বৈধ মাত্র দুটি। সাতকানিয়ায় ৬২টির মধ্যে বৈধ ১২টি। হাটহাজারীতে ৬০টির মধ্যে বৈধ ১০টি। রাঙ্গুনিয়ায় ৭২টির মধ্যে বৈধ মাত্র একটি। চন্দনাইশে ৩০টির মধ্যে বৈধ তিনটি। লোহাগাড়ায় ২৫টির মধ্যে বৈধ কোনো ইটভাটা নেই। আনোয়ারায় চারটির মধ্যে বৈধ একটি। বাঁশখালীতে চারটির মধ্যে সবকটিই অবৈধ। সন্দ্বীপে তিনটির মধ্যে একটি বৈধ। মিরসরাইয়ে ১৪টির মধ্যে বৈধ ১০টি। সীতাকুণ্ডে চারটির সবগুলোই অবৈধ। বোয়ালখালীতে আটটির মধ্যে সাতটি অবৈধ। পটিয়ায় ৫টির মধ্যে বৈধ একটি। কর্ণফুলী উপজেলায় ১২টির মধ্যে ৭টি বৈধ।
কিন্তু বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের হিসাব মতে, রাঙ্গুনিয়ায় ৭২টি নয় ১৪২টি ইটভাটা রয়েছে। হাটহাজারীতে ৬০টি নয়, ৯৭টি, সাতকানিয়ায় ৬২টি নয়, ৮০টি ইটভাটা রয়েছে। সবমিলিয়ে ৫২০টি ইটভাটার মধ্যে ৪৭০টিই অবৈধ। আর সংরক্ষিত বন এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে সবগুলো ইটভাটা। যেখানে প্রতিদিন লাখ লাখ টন বনের কাঠ পুড়িয়ে তৈরি করা হচ্ছে ইট।

রাজধানীতে নবাগত: আশার টানে ঢাকায় আসা by জিয়া চৌধুরী

ঢাকা। চার শ’ বছরের পুরনো শহর। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিনিয়ত মানুষ ঢুকছে রাজধানীতে। বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট আর ট্রেন স্টেশন হয়ে ঢাকায় প্রবেশ করছে মানুষ। কারো জীবিকার তাগিদ, কারো চিকিৎসার প্রয়োজন, আবার কেউবা ব্যবসা-উচ্চশিক্ষার কাজে ঢাকায় আসছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ঢাকায় ঢুকছেন অন্তত দুই হাজার মানুষ। আর বিশ্বব্যাংকের সবশেষ পরিসংখ্যান বলছে ঢাকার জনসংখ্যা এখন প্রায় ২ কোটি ছুঁই ছুঁই। ২০২০ সাল নাগাদ যা গিয়ে ঠেকবে ২ কোটি ১০ লাখে।
এত মানুষ কেন ঢাকায় আসে, কী তাদের অভিলাষ? এ নিয়ে রয়েছে নানা কৌতূহল।
মো. আনোয়ার হোসেন, লক্ষ্মীপুর সদরের কুশাখালী ইউনিয়ন থেকে মাত্র দু’দিন হলো ঢাকায় এসেছেন। উদ্দেশ্য চাকরি। গত মঙ্গলবার রাত দশটার দিকে প্রথমবারের মতো ঢাকায় নামেন তিনি। লক্ষ্মীপুর থেকে সিএনজি অটোরিকশায় চাঁদপুর। সেখান থেকে লঞ্চে সদরঘাট। এই ছিল আনোয়ার হোসেনের প্রথম ঢাকা যাত্রার রুট। লক্ষ্মীপুর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করে এখন চাকরির সন্ধানে রাজধানীতে।
আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে বুধবার কথা হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি গেটে। কেন ঢাকা এলেন- এমন প্রশ্নে আনোয়ারের সহজ স্বীকারোক্তি, চাকরি-বাকরির জন্য তো ঢাকায় আসা লাগবে। একটা ভালো কোনো চাকরির জন্য ঢাকা ছাড়া গতি নেই। বাবা-মা, চার ভাই আর এক বোন রয়েছে আনোয়ারের। নিজে এখনো বিয়ে করেন নি। পরিবারের সবার চাওয়া তিনি ঢাকায় একটা ভালো চাকরি করবেন। আপাতত থাকছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হলে, সেখান থেকেই চাকরির জন্য চেষ্টা-তদবির করছেন। সিভিও বানিয়েছেন, চাকরির ভাইভা দিতে আলাদা পোশাক বানিয়ে সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। এখন শুধু একটা ফোনের অপেক্ষা। চাকরির ভাইভার ফোন! যা বদলে দেবে আনোয়ার হোসেনের জীবন। জীবিকার টানেই মূলত আনোয়ারের মতো অসংখ্য মানুষ জেলা শহরগুলো থেকে ঢাকা আসছেন।
ভাগ্য অন্বেষণে দক্ষিণের আরেকটি জেলা থেকে গত রোববার রাতে ঢাকায় এসেছেন আল-আমিন। বাসে ঢাকা আসার খরচ বেশি বলে টাকা বাঁচাতে তিনিও এসেছেন লঞ্চে। উঠেছেন ফকিরাপুল পানির টাঙ্কি এলাকায় খালার বাসায়। এসএমএস নামে একটি লেদার অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিয়েছেন। খালি হাতেই প্রক্রিয়াজাত করা চামড়া কাটতে হয় তাকে। এ ছাড়া ঢাকা ও আশেপাশের এলাকায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও চামড়াজাত পণ্য পৌঁছে দিতে হয়।
ফকিরাপুল এলাকায় আল-আমিনের সঙ্গে দেখা করতে গেলে অফিস থেকে জরুরি ফোন আসে তার। পণ্য পৌঁছে দিতে তাকে যেতে হবে গাজীপুর টঙ্গী এলাকায়। এ যাত্রায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। মুঠোফোন নম্বর চাইলাম আল-আমিনের। পরে রাতে কল দিলেও ধরেন না তিনি। কিছুক্ষণ পর একটি ক্ষুদেবার্তায় জানালেন, মুঠোফোনের স্পিকার নষ্ট। নতুন একটা হেডফোন না কেনা পর্যন্ত ফোনে কথা বলতে পারবেন না। আর্থিক সংকটে আছেন। পরে তার পরিচিত আরেক ভাইয়ের মাধ্যমে কথা হয় আল-আমিনের সঙ্গে। পাঁচজনের পরিবারে তিনিই সবার বড়। চাকরির আশায় দু’বার বিদেশে যাবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। বাবা আব্দুল হান্নান তিন মাস আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঘরে পড়ে আছেন। তাকে দেখভাল ও আর ওষুধ কেনায় খরচ হয়ে যায় অনেক টাকা। এক মাস আগে ফুটফুটে কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছেন আল-আমিনের মা। তিনিও বেশ অসুস্থ। টানাপড়েনের সংসার টিকিয়ে রাখতে আল-আমিন শেষমেশ ঢাকা আসার সিদ্ধান্ত নেন।
এসএসসির গণ্ডি পেরোনো ২২ বছরের তরুণের কাঁধেই এখন পুরো পরিবারের ভার। ঢাকায় আসার প্রথম দুইদিন অঝোরে কেঁদেছেন তিনি। ঢাকার অলিগলি কোনো কিছুই চেনেন না। ভরাট গলায় আল-আমিন বলেন, কোথাও প্রডাক্ট ডেলিভারি দিতে গেলেও লোকজনকে জিজ্ঞেস করে যেতে হয়। মাঝে মাঝে ঢাকার বাইরে লেদার পৌঁছে দিয়ে আসা লাগে। বেশ খাটুনির কাজে মাস শেষে মাত্র আট হাজার টাকা বেতন পাবার কথা। ঢাকায় কাজ করা অনেক কষ্টের, আমি গ্রামেই ভালো ছিলাম। নিরুপায় হয়েই ঢাকা আসা। পরিবারের মুখগুলোর কথা ভেসে উঠে বার বার, বিশেষ করে দুই ছোটবোনকে। এসএসসির পর আর বেশিদূর পড়াশুনা না করায় এমন দুর্গতি বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন আল-আমিন। তবে এখানেই দমে যেতে চান না। নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দেন। বলেন, যে করেই হোক ঢাকায় টিকে থাকতে হবেই। দাঁড়াতে হবে পরিবারের পাশে।
দুই সপ্তাহ হলো প্রবাস জীবন ছেড়ে ঢাকায় এসেছেন চুয়াডাঙ্গার সোহেল শেখ। পরিবারের তিন ভাই সবাই থাকতেন সৌদি আরবে। আয়-উন্নতির আশায় দুই বছর আগে তিনিও সৌদিতে পাড়ি জমান। সেখানে কনফেকশনারি দোকানে কাজ করতেন সোহেল। ব্যবসায় মন্দা যাওয়ায় সৌদি আরব থেকে দুই ভাই ফিরে আসেন বাংলাদেশে। ঢাকার পান্থপথের একটি মেস বাসায় উঠেছেন সোহেল শেখ। এখানে থেকে ব্যবসা করার চেষ্টা করবেন তিনি। জানান, সৌদিতে অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে তেমন উন্নতি নেই কারো। বরং খরচ বেড়েছে কয়েক গুণ। এর চেয়ে ঢাকায় থেকে ব্যবসার চেষ্টা করাটাকে ভালো মনে করছেন তিনি। এরমধ্যে কয়েক জায়গায় কথাও বলেছেন।
মনঃপূত হলেই ব্যবসায় পুরোদমে নেমে পড়বেন। তার ভাষায়, সৌদি আরব থেকে ঢাকাই ভালো। এক সপ্তাহ আগেই ঢাকায় আসেন টাঙ্গাইলের বাবু। নিজের জেলায় কাজের সুযোগ না মেলায় পাড়ি জমান ঢাকার উদ্দেশে। তার আগে, কথা বলে নেন ঢাকার একটি প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে। বইমেলার কারণে প্রকাশনীর কাজের চাপ বাড়ায় তাদের বাংলাবাজার অফিসে যোগ দেন বাবু। থাকছেন পুরান ঢাকায়। এর আগে কখনো ঢাকা আসেন নি তিনি। একেবারে জীবিকার তাগিদেই প্রথমবারের মতো ঢাকা আগমন তার। মাঝে মাঝে বাড়ির কথা মনে করে খারাপ লাগলেও ঢাকাতেই স্থায়ীভাবে থাকতে চান বাবু।
এত গেল জীবিকার তাগিদে ঢাকায় আসা মানুষের কথা। উচ্চ শিক্ষা আর নিজের ইচ্ছে পূরণ করতেও রাজধানীতে আসছেন অসংখ্য শিক্ষার্থী। উচ্চ মাধ্যমিক পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আসছেন বেশির ভাগ। টাঙ্গাইলের পুটিয়াজানি এলাকা থেকে দুই সপ্তাহ হলো ঢাকা এসেছেন দুই খালাতো বোন নুসরাত জাহান খান নিঝুম ও মানজুর আলম স্বর্ণা। দু’জনেই থাকছেন মোহাম্মদপুরের জাফরাবাদ পুলপাড় এলাকায়। মালয়েশিয়া প্রবাসী বাবা ও স্কুলশিক্ষক মায়ের পরিবারে একমাত্র সন্তান নিঝুম। ছোটবেলা থেকেই ইংরেজির শিক্ষক হবার স্বপ্ন। নিজের ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিতে ভর্তি হয়েছেন ধানমণিণ্ডর একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে। এর আগে, দু’একবার ঢাকা আসা হলেও থাকতেন আত্মীয়দের বাসায়। এবারই প্রথম নিজের মতো করে আবাস গড়েছেন।
শিক্ষক হওয়ার বাসনা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত থাকতে চান জাদুর শহরে। মাঝে মাঝে মায়ের জন্য মন খারাপ হয় নিঝুমের। কিন্তু শিক্ষক হতে গেলে তো কষ্ট করতে হবেই, এমন সান্ত্বনায় বুক বাঁধেন আশায়। ঢাকার যানজট খারাপ লাগে তার। চাঁপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে সপ্তাহ দুয়েক হলো ঢাকায় এসেছেন ইজমো আহমেদ ও আবুজার গিফারী। দুজনই স্নাতকে ভর্তি হয়েছেন তিতুমীর কলেজে। থাকছেন ঢাকার পান্থপথ এলাকায়। পরিবার ছেড়ে এতদূর আসার কারণও একটাই। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। পরিবারের মুখ উজ্জ্বল করা, পড়াশোনা শেষে পরিবারের দায়িত্ব নিতে চান এই দুই তরুণ। ডা. নাজমুল হাসান সবে ঢাকা এসেছেন সপ্তাহখানেক হলো।
এমবিবিএসের পাঠ চুকিয়েছেন বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ থেকে। কুমিল্লার দেবিদ্বার এলাকার ছেলে নাজমুল অবশ্য এর আগেও ঢাকা এসেছেন। তবে এবারের উদ্দেশ্যটা পুরোপুরি ভিন্ন। এমবিবিএস কোর্স শেষে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করতে থাকবেন ঢাকায়। এর মধ্যে শাহবাগ এলাকার একটি বাসায় উঠেছেন নাজমুল হাসান। ভর্তি হয়েছেন কোচিংয়েও। পরিবারের সদস্যদের বুকভরা আশা ছেলে একদিন নামকরা ডাক্তার হবে। রোগীরা ভিড় করবেন তার কাছে। এমন হাজারো স্বপ্নের ঝুলি নিয়ে ঢাকায় আসার পথগুলোতে প্রতিনিয়ত মানুষের স্রোত। বাসে, লঞ্চে কিংবা ট্রেনে চেপে মানুষের সঙ্গে আসে তাদের হাজারো বাসনা। ঢাকা যেন স্বপ্ন পূরণের এক কারখানা। কারো হয়, কারো হয় না।

বইয়ের চাহিদা কখনো শেষ হবে না -প্রধানমন্ত্রী

ভাষার মাস শুরুর দিনে অমর একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল বিকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গ্রন্থমেলার উদ্বোধন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যতই আমরা যান্ত্রিক হই না কেন, বইয়ের চাহিদা কখনো শেষ হবে না। নতুন বইয়ের মলাট, বই শেলফে সাজিয়ে রাখা, বইয়ের পাতা উল্টে পড়ার মধ্যে যে আনন্দ আছে, আমরা সবসময় তা পেতে চাই। বইয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে দেশের প্রকৃত ইতিহাস জানাতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিরাপত্তার কারণে গ্রন্থমেলায় আগের মতো আসতে না পারার কষ্টের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আগে যখন ক্ষমতায় ছিলাম না, তখন এই মেলায় অনবরত ঘুরে বেড়াতাম। আর এখন অনেকটা বন্দি জীবন, এখন ইচ্ছা থাকলেও আসা যায় না।
আর আসলেও অন্যের অসুবিধা হয়। সত্যি কথাটা কি, মনটা পড়ে থাকে বইমেলায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় কবি শঙ্খ ঘোষ, মিশরীয় লেখক-গবেষক মুহসেন আল আরিসি।
বইমেলার উদ্বোধন ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রী এবারের বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া চারজনের হাতে সম্মাননা তুলে দেন।  কবিতায় কবি কাজী রোজী, কথাসাহিত্যে মনোরোগ চিকিৎসক মোহিত কামাল, প্রবন্ধ ও গবেষণায় বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ এবং মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সাহিত্যের জন্য গবেষক-কলামনিস্ট আফসান চৌধুরী এবার এ পুরস্কার পেয়েছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে পাকিস্তানি আমলের গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সঙ্কলিত ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইনটেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অফ দা নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বইয়ের দ্বিতীয় খণ্ডের মোড়ক এ অনুষ্ঠানে উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী। মিশরীয় সাংবাদিক-গবেষক মুহসেন আল আরিসি তার লেখা ‘হাসিনা হাকাইক আসাতি’ বইটির একটি কপি এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নতুন প্রজন্মকে দেশের সঠিক ইতিহাস জানানোর ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কতটা ত্যাগ আর সংগ্রামের পথ পাড়ি দিলে একটি জাতি তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছতে পারে তা তাদের জানাতে হবে। ‘আমাদের নতুন প্রজন্মকে এসব ইতিহাস জানাতে হবে। কত ত্যাগ, তিতিক্ষা, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে একটি জাতি তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে- বাঙালির স্বাধীনতার ইতিহাস তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’ শেখ হাসিনা বলেন, এ বছরই ২০১৯ সালের ১৭ই নভেম্বর একুশের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিলাভের ২০ বছর পূর্তি হবে। ঊনসত্তরের উত্তাল গণঅভ্যুত্থান এবং বাংলার সংগ্রামী জনতার দ্বারা শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে অভিষিক্ত করারও ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছর। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সঙ্গে এসব ঘটনার ঘনিষ্ঠ যোগসূত্র রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়লাভ- এসবের মাধ্যমেই বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার বাস্তবরূপ লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী জাতির পিতার হাতে গড়া সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকায় জাতি সাড়ম্বরে আগামী ২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী উদযাপন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং জাতির পিতার জন্ম শতবার্ষিকী পালনের মধ্যদিয়ে আমাদের দেশের ইতিহাসকে আমরা আরো স্বচ্ছভাবে দেশের মানুষের কাছে এবং প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারবো বলে আমি বিশ্বাস করি।
শুধু মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নয়, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস নিয়েও অনেকে নানা বিভ্রান্তি ছড়িয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং সমপ্রতি প্রকাশিত ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ বই দুটিতে এসব বিভ্রান্তির অবসান হয়েছে বলে আমি মনে করি। তিনি বলেন, মোট ১৪টি খণ্ডে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সিক্রেট ডক্যুমেন্টস অব ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দি নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’। এসব দলিলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেক অজানা তথ্য জানা যাবে। বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যান জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ, ভারতের বিশিষ্ট বাঙালি কবি শঙ্খ ঘোষ এবং মিশরীয় বিশিষ্ট লেখক, সাহিত্যিক মহসিন আল আরিসি অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. আবু হেনা মোস্তফা কামাল এবং জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সভাপতি ফরিদ আহমেদও বক্তব্য রাখেন। বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী স্বাগত বক্তব্য দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রামেন্দু মজুমদার।
বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এ মেলার পরিসর এবার আরো বেড়েছে। বেড়েছে বইয়ের স্টল নিয়ে বসা প্রকাশনা সংস্থার সংখ্যা। এবারের গ্রন্থমেলার প্রতিপাদ্য ঠিক হয়েছে ‘বিজয়: ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ নবপর্যায়’। মেলার বাংলা একাডেমি অংশ একজন ভাষা শহীদের নামে, এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে চারজন ভাষা শহীদের নামে মোট পাঁচটি চত্বর রয়েছে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ এবং স্বাধীনতা স্তম্ভ নিয়ে বিভিন্ন তথ্য সম্বলিত প্ল্যাকার্ড বসানো হয়েছে মেলা প্রাঙ্গণে। সব মিলিয়ে ৪৯৯টি প্রতিষ্ঠানকে ৭৭০টি ইউনিট এবং বাংলা একাডেমিসহ ২৪টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানকে ২৪টি প্যাভিলিয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একাডেমি প্রাঙ্গণে ১০৪টি প্রতিষ্ঠান ১৫০টি ইউনিট নিয়ে তাদের বইয়ের পসরা সাজিয়েছে। আর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৬২০টি ইউনিট নিয়ে বসেছে ৩৯৫টি প্রতিষ্ঠানের স্টল।
এ ছাড়া বহেরা তলায় লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে ১৮০টি লিটল ম্যাগাজিনকে ১৫৫টি স্টল দিয়েছে আয়োজক কর্তৃপক্ষ। বাংলা একাডেমি ও মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করবে।
এবারো মেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে রয়েছে ‘শিশু চত্বর’। এই কর্নারকে শিশুকিশোর বিনোদন ও শিক্ষামূলক অঙ্গসজ্জায় সাজানো হয়েছে। মাসব্যাপী গ্রন্থমেলায় এবারো প্রতি শুক্র ও শনিবারে একটি সময়কে ঘোষণা করা হবে ‘শিশু প্রহর’ হিসেবে।
খুদে লেখকদের জন্য এবার শিশু চত্বরে ‘তারুণ্যের বই’ নামে একটি নতুন আয়োজন থাকছে, যেখানে খুদে লেখকরা তাদের বইয়ের প্রচারণা করতে পারবে।
এ বছর থেকেই গ্রন্থমেলায় শুরু হচ্ছে নতুন মঞ্চ ‘লেখক বলছি’। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জলাধারের পাশে এই মঞ্চে প্রতিদিন পাঁচজন লেখক যোগ দেবেন। তারা কথা বলবেন তাদের প্রকাশিত বই নিয়ে, পাঠকের প্রশ্নের জবাবও দেবেন। ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা বইমেলা সবার জন্য খোলা। এ ছাড়া শুক্র ও শনিবার বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা এবং একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত মেলা চলবে।

আসামি জানেন না মামলা কিসের by শাহনেওয়াজ বাবলু

গত পহেলা নভেম্বর সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় ১৪০ জনকে আসামি করে বিস্ফোরক আইনে একটি মামলা হয়। রোববার এই মামলার আসামিরা সবাই উচ্চ আদালতে আসেন আগাম জামিনের জন্য। জামিনও পান। কিন্তু আসামিদের অনেকেই জানতেন না মামলার বিষয়ে। এদেরই একজনের নাম মন্টু শেখ। তাঁতের কাজ করেন। বাড়ি সিরাজগঞ্জ শায়দাবাদ ইউনিয়নের শারদীয়া গ্রামে। তিনি জানেন না কেন তাকে আসামি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমি তাঁতের কাজ কইরা খাই। কখনো কারো সঙ্গে জামেলায় যাই নাই। আর আমার সঙ্গেও কারো ঝামেলা নাই। মামলা হওয়ার পর থাইক্কা আমি বাড়িতে থাকতে পারি না। তাই আগাম জামিন নিতে আইছি।
আলী মিয়া। একই উপজেলার গাদাবাড়ী গ্রামের বাসিন্দা। কৃষিকাজ করে পরিবার চালান। তিনিও এই মামলার আসামি। প্রথম বারের মতো মামলার শিকার হলেন বলে অভিযোগ করেন আলী মিয়া। তিনি বলেন, আমার জীবনে কোনো দিন থানায় যাইনি। মামলা কি জিনিস সেটাও জানি না। আমার নামেই মামলা হয়েছে। মামলার পর থেকে আমি বাড়িতে থাকতে পারি না। আমার পরিবার না খেয়ে আছে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর থানার এস আই সাইফুল ইসলাম বলেন, এটি মূলত একটি বিস্ফোরক মামলা। এর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি আমরা।
ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় গত ১১ই ডিসেম্বর ৭৫ জনকে আসামি করে হামলা ও ভাঙচুরের একটি মামলা করা হয়। তবে আসামিরা বলছে, এই ঘটনার সঙ্গে তারা জড়িত নয়। আসামিদের অনেকেই জানেন না তারা যে এই মামলার আসামি। এদের মধ্যে কেউ দর্জির কাজ করেন, কেউ খামারি আবার কেউ ব্যবসা করেন। তাদের অভিযোগ তারা কখনো কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
খোকন মিয়া। একই মামলার আসামি। তিনি হার্ডওয়ারের ব্যবসা করেন। রোববার তিনিও এসেছেন উচ্চ আদালতে আগাম জামিনের জন্য। খোকন বলেন, যে ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমাকে আসামি করা হয়েছে সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। এমনকি এমন ঘটনা আমি শুনিওনি।
একই মামলার আসামি পোল্ট্রি খামারি আবুল হাসান। তিনিও এসেছেন উচ্চ আদালতে আগাম জামিনের জন্য। আবুল হাসান বলেন, আমার নামে যে মামলা আছে সেটা আমি কয়েকদিন আগে শুনেছি। এই ঘটনা কবে ঘটেছিল তাও আমি জানি না।
মামলার বাদী রোকনউদ্দিন একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। এছাড়া স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা। রোকনউদ্দিন বলেন, আমার ভাই মুকুল হাসান গত ১০ই ডিসেম্বর মোটরসাইকেল নিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয় তারাকান্দা বাজারে কয়েকজন তার ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। সেখানকার লোকজন হামলাকারীদের চিনতে পারে। সবার সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে আমি থানায় মামলা করি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তারাকান্দা থানার এস আই সায়েদুল ইসলাম বলেন, এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নির্বাচনের আগে ৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছি। সবাই জামিনে বের হয়েছে। তদন্তের কাজ অব্যাহত রয়েছে।