Wednesday, November 5, 2025

মামদানির জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি যেভাবে বদলে দিতে পারে by সালেহ উদ্দিন আহমদ

নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচন নিয়ে বাংলাদেশেও ছিল বিপুল কৌতূহল ও উৎসাহ। কারণ, মুসলমান প্রার্থী জোহরান মামদানি, যাঁকে বলা হয়েছে নিউইয়র্কের ‘বাঙালি আন্টিদের’ প্রার্থী—তিনিই ছিলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনীত প্রার্থী। নিউইয়র্ক সিটি ‘বাঙালি আন্টিদের’ নিরাশ করেনি। জোহরান মামদানি ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হলেন এবং ইতিহাস গড়লেন।

নিউইয়র্ক সিটি ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সিটি মিনিয়াপোলিসে মেয়র নির্বাচন হলো, সেখানেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আছেন একজন মুসলমান প্রার্থী—ওমর ফাতেহ।

৪ নভেম্বর, মেয়র নির্বাচন ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচন হলো নিউজার্সি ও ভার্জিনিয়ার দুটি স্টেটে গভর্নর পদে। দুটিতেই ট্রাম্পের মনোনীত প্রার্থীদের হারিয়ে ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হয়েছেন। এ নির্বাচনে সবচেয়ে বড় হার হয়েছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। শুধু নিউইয়র্ক, নিউজার্সি ও ভার্জিনিয়ায় নয়, যেসব স্টেটে ভোট হয়েছে, তার এক্সিট পুলে দেখা গেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বড় আকারে মার্কিন জনগণের আস্থা হারিয়েছেন।

নিউইয়র্ক সিটিতে মামদানির জয়জয়কার

নিউইয়র্ক সিটির মেয়র এখন একজন অভিবাসী মুসলমান! তাঁর গুরুত্ব ও পরিচিতি থাকবে সারা বিশ্বে। জোহরান মামদানি নির্বাচিত হওয়ায় সারা বিশ্বের মুসলমানরা অবশ্যই আনন্দিত, তবে মামদানিকে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য নিউইয়র্কের জনগণ নির্বাচিত করেননি। তাহলে মাত্র ৯ শতাংশ মুসলমান ভোট নিয়ে তিনি প্রাইমারি থেকেই বিদায় নিতেন। তাঁর পরিচিতি ও দিগন্ত আরও বিশাল। তাই তো নিউইয়র্কের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী তাঁকে মেয়র হিসেবে বেছে নিয়েছে।

নিউয়র্ককে বলা হয় ‘ইহুদিদের শহর’। পৃথিবীর যত নামীদামি ধনি ইহুদি আছেন, তাঁদের বেশির ভাগ বাস করেন নিউইয়র্ক শহরে। সেই শহরে ভারত-উগান্ডার একজন মুসলমান অভিবাসীর ছেলে নিউইয়র্ক শহর জয় করে নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রভাবশালী রাজনৈতিক ও সম্পদশালী ব্যক্তিত্ব সর্বতোভাবে মামদানির বিরোধিতা করেছিলেন।

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি নির্বাচনে মামদানি সাবেক গভর্নরের অ্যান্ড্রু কুমো ও বর্তমান মেয়র এরিখ আদামসকে হারিয়ে দলের মনোনয়ন পান। অন্য যেকোনো প্রার্থীর জন্য ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন পাওয়ার পর নির্বাচিত হওয়া খুব সহজ হতে পারত। কারণ, নিউইয়র্ক সিটিতে ৭০ শতাংশ ভোটার ডেমোক্রেটিক পার্টির রেজিস্টার্ড ভোটার। কিন্তু মামদানির জন্য কাজটা অত সহজ ছিল না।

সবচেয়ে বড় বাধা আসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প থেকে। তিনি মামদানিকে হারানোর জন্য সর্বতোভাবে চেষ্টা করেছিলেন। অ্যান্ড্রু কুমোকে ট্রাম্প পরিচিত করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মামদানির বিরুদ্ধে আবার সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে। টাকাপয়সার সংস্থানও তিনি করলেন বড় ইহুদি ব্যবসায়ীদের চাঁদা নিয়ে। তিনি চাপ দিয়ে বর্তমান মেয়র এরিখ আদামসকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে দিলেন, যাতে তাঁর ভোটগুলো অ্যান্ড্রু কুমো পান। এরিখকে বলা হলো তাঁকে সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত করা হবে।

সিনেটে ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতা চাক সুমারসহ ডেমোক্র্যাট অনেক নেতা মামদানিকে সমর্থন করতে অস্বীকার করলেন। সুমার নিজেও একজন ইহুদি ও ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক। কিন্তু বিরোধীদের এত চেষ্টা সত্ত্বেও মামদানির জনপ্রিয়তা একটুও কমেনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাচনের আগের দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে অ্যান্ড্রু কুমোর প্রতি সরাসরি সমর্থন জানিয়েছেন, যদিও তাঁর এ সমর্থন অনেক আগের থেকেই সবার জানা ছিল।

নিউইয়র্ক সিটির জনগণ দৃঢ়ভাবে মামদানিকে সমর্থন দিয়েছেন। কারণ, তিনি নিউইয়র্কের সাধারণ সমস্যাগুলো আত্মস্থ করতে পেরেছিলেন এবং সেগুলো সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বাড়ি ভাড়া স্থিতিশীল করা, বিনা মূল্যে বাস পরিবহনসেবা ও শিশুযত্ন পরিষেবা সম্প্রসারণ তাঁর প্রস্তাবগুলো বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

সাধারণ জনগণের এসব সমস্যা নিয়ে আগে কখনো কেউ ভাবেননি। মামদানি তাঁর পরিকল্পনাগুলো সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন।

ইসরায়েলের প্রতি তাঁর অকপট সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনি অধিকারের আদায়ের একজন অবিচল সমর্থক—জোহরান মামদানি বিশ্বের বৃহত্তম ইহুদি জনসংখ্যার একটি শহরে ইহুদি ভোটারদের কাছ থেকে সমর্থন অর্জনের জন্য একজন অসম্ভব প্রার্থী বলে মনে হতে পারে। কিন্তু নিউইয়র্কবাসী ইহুদিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, বিশেষ করে তরুণ, প্রগতিশীল ও সংস্কারবাদী ইহুদিরাও তাঁর তারুণ্য, সামাজিক ন্যায়বিচার ও অন্যায়ের বিরুদ্ধাচরণে আকৃষ্ট হয়ে মেয়র নির্বাচনে তাঁকে সমর্থন দিয়েছেন।

নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে অ্যান্ড্রু কুমো মামদানির আচরণকে উপহাস করে একটি বিশ্রী বিজ্ঞাপন ছেড়েছিলেন, যেখানে তিনি নিজের হাতে ভাত খান এবং ফিলিস্তিনি অধিকার নিয়ে কথা বলেন এবং কেফিয়া ও ফিলিস্তিনি পতাকাসহ ‘অপরাধীদের’ সঙ্গে ছবি তুলেছেন। কিন্তু এ বিজ্ঞাপন নিউইয়র্কবাসীর অনেককেই বরং মামদানিকে তাঁদের নিজেদের লোক ভাবতে সহায়তা করেছেন। কারণ, নিউইয়র্কে অনেক অভিবাসীই হাত দিয়ে ভাত খান এবং এখন যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশের বেশি লোক ফিলিস্তিনিদের সমর্থক।

কোনোভাবেই বাহিনীকে দমানো গেল না। জোহরান মামদানি এখন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর নিউইয়র্ক সিটির মেয়র। মামদানি তাঁর বিজয় বক্তৃতায় বলেছেন, ‘আমার একমাত্র আফসোস, আজকের এ নতুন দিনটা আসতে এত সময় লেগেছে।’

মামদানির সামনে কঠিন পথ

নির্বাচিত হতে মামদানিকে যে কঠিন পথ পার হতে হয়েছে, সেটি এখন ইতিহাস হয়ে যাবে। সামনে মেয়র হিসেবে সফলকাম হতে তাঁকে আরও কঠিন বাস্তবতার মোকাবিলা করতে হবে। তাঁর প্রথম কাজ হবে, তিনি যে কোয়ালিশন তৈরি করেছেন, সেটিকে অক্ষুণ্ন রাখা। তাঁকে তাঁর কট্টর ফিলিস্তিনি সমর্থন ও শহরের ইহুদিদের আস্থা অর্জন—দুটোর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

নিউইয়র্কবাসীকে দেওয়া তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো পরিপূর্ণ করা খুব সহজ হবে না। এগুলোর অর্থায়নের জন্য নিউইয়র্কের ব্যবসায়ী ও করপোরেট নেতাদের তাঁর কাছে টানতে হবে।

তাঁর সবচেয়ে বিপদ আসবে ‘মাগা’ কমান্ডার থেকে। ট্রাম্প ওয়াশিংটন ও শিকাগোর মতো বড় শহরে শান্তি রাখার নাম করে এরই মধ্যে ফেডারেল রিজার্ভ সেনাবাহিনী পাঠাচ্ছেন। তাঁর আসল উদ্দেশ্য শহরের প্রশাসনকে কবজায় রাখা। মামদানি শপথ গ্রহণের পরপরই যে সিটিতে ফেডারেল সেনা পাঠাবার চেষ্টা হবে, তা অনেকটা নিশ্চিত।

এরই মধ্যে ফ্লোরিডার দুজন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান দাবি করেছেন, বিচার বিভাগ যেন পুরোনো ফাইলপত্র ঘেঁটে দেখে মামদানি কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন? তাঁদের ধারণা কোথাও কিছু গরমিল পেলে ট্রাম্প মামদানির নাগরিকত্ব বাতিল করে দিতে পারবেন।

তবে এটিও ঠিক, এই নির্বাচনে যাঁরা মামদানিকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁরা বলবেন, জোহরান মামদানিকে ভয় দেখিয়ে বা ‘হেলা-ঠেলা’ দিয়ে কখনো কুপোকাত করা যাবে না। প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেই তিনি মেয়র হয়েছেন এবং মেয়র হিসেবে সফলতার জন্য তিনি সব প্রতিকূলতা চতুরভাবে মোকাবিলা করবেন।

আর একটি বিষয় লক্ষ্য করার, যাঁরা ট্রাম্পকে কঠোরভাবে মোকাবিলা করেছেন, ট্রাম্প পরবর্তী সময়ে তাঁদের সম্মান দেখিয়ে মেনে নিয়েছেন। যেমন চীন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও পুতিন। মামদানির ক্ষেত্রেও তা–ই হতে পারে, দুজনেই সম্মানজনক সহ–অবস্থান বেছে নেবেন।

এখন সবাই জানেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে মামদানির প্রভাব দিন দিন বাড়তেই থাকবে এবং অন্য শহরগুলোতেও অনেক মামদানি বের হয়ে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রচলিত রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করতে। ডেমোক্র্যাটরা আশা করে আছেন, মামদানি তাঁর প্রগতিশীল নেতৃত্ব দিয়ে ডেমোক্র্যাট নেতৃত্বের নতুন মুখ হয়ে উঠতে পারেন।

যাঁরা আশাবাদী তাঁরা বলবেন, মামদানির জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন আলো ছড়াবে। আবার ট্রাম্পের মতো ‘না-বাদীর’ সংখ্যাও কম নয়। তাঁরা বলবেন, সর্বনাশ হয়ে গেছে, মামদানির বামপন্থী রাজনীতি নিউইয়র্ককে অন্ধকারে ডোবাবেন। আপনি কোন দলে?

মিনিয়াপেলিসে কি ওমর ফতেহ মেয়র হতে পারবেন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু যদি কোনো স্টেটকে বলতে হয়, সেটি হবে মিনেসোটা। ষাট ও সত্তর দশকে মিনেসোটার সিনেটর হুবার্ট হামফ্রে ও এককালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ওয়াল্টার মন্ডেল ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে প্রগতি ও মানবতাবাদী রাজনীতির পতাকাবাহী। পরবর্তী সময়ে সোমালিয়ান বংশোদ্ভূত কংগ্রেস ওম্যান ইলিয়ান ওমর ২০১৯ সাল থেকেই মিনেসোটা থেকে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের নির্বাচিত হয়ে আসছেন এবং প্রগতিবাদী ককাসে নাম লেখিয়েছেন। মিনেসোটার বড় শহর মিনিয়াপেলিস সিটির মেয়র নির্বাচনও হয়ে ৪ নভেম্বর।

মিনিয়াপোলিস সিটির মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির (যা মিনেসোটাতে ডেমোক্রেটিক ফার্মার ও লেবার পার্টি নামেও পরিচিত) প্রাইমারিতে প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন দুই মূল প্রার্থী—বর্তমান মেয়র জ্যাকব ফ্রে, যিনি একজন ইহুদি এবং কট্টর ইসরায়েলি সমর্থক। স্টেট সিনেটর ৩৫ বছর বয়সী ওমর ফাতেহ, যাঁকে বলা হয় মিনিয়াপোলিসের মামদানি। ফতেহ একজন গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক ও সোমালি বংশোদ্ভূত মুসলমান। এ যেন নিউইয়র্কে সিটির ডুপ্লিকেট। কারণ, ওমর ফাতেহও বর্তমান মেয়রকে হারিয়ে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন লাভ করেন।

স্টেট ডেমোক্রেটিক পার্টি ফাতেহকে নিজেদের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে অনুমোদন করেছিল। কিন্তু এ অনুমোদন ছিল অল্প কয়েক দিনের জন্য। পরবর্তী সময়ে মেয়র ফ্রের আপত্তিতে স্টেট ডেমোক্রেটিক পার্টি এ অনুমোদন বাতিল করে দেয় এই অজুহাতে যে নির্বাচনের সম্মেলনকক্ষে মাইক্রোফোন, ইলেকট্রনিক ভোটিং সিস্টেমে ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ভালোভাবে কাজ করছিল না, তাই ভোটাররা সুশৃঙ্খলভাবে ভোট দিতে পারেননি। আসলে এটি ছিল ফাতেহর বিরুদ্ধে একটি চক্রান্ত।

৪ নভেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আবার ফাতেহর ও ফ্রের মধ্যেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়। ডেমোক্রেটিক পার্টি ফাতেহর অনুমোদন বাতিল করার পর ফাতেহর নির্বাচনী প্রচারণা দারুণভাবে হোঁচট খায়।

মিনিপোলিস মেয়র নির্বাচনে হয়েছে ‘রাঙ্কেড’ ভোট। প্রত্যেক ভোটার তাঁদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দ বাছাই করে তিনটা ভোট দেন। প্রথম পছন্দ গণনায় ফ্রে ও ফাতেহ প্রথম ও দ্বিতীয় হয়েছেন, কিন্তু দুজনের কেউই ৫০ শতাংশ ভোট পাননি। তাই প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়নি। ভোটারদের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পছন্দের প্রার্থীদের বিবেচনায় ব্যালট গণনা অব্যাহত রয়েছে। দু–এক দিনের মধ্যেই জানা যাবে, কে হবেন নতুন মেয়র।

যুক্তরাষ্ট্রে যে মুসলমান রাজনীতিকেরা ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, এর আরেকটি প্রমাণ ভার্জিনিয়া স্টেটসের লেফটেন্যান্ট গভর্নর পদে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন গাজালা ফেরদৌস হাশমি। তিনি চার বছর বয়েসে ভারত থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। এখন যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রভাবশালী স্টেটের দ্বিতীয় ব্যক্তি।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-11-05%2Fwduo0kjx%2FMamdani-5.jpg?rect=0%2C0%2C5000%2C3333&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নিউইয়র্ক নগরের মেয়র নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি ২০২৫ সালের নির্বাচনে জয়ের পর তাঁর সমর্থকদের হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছেন। ৪ নভেম্বর ২০২৫, ব্রুকলিন। ছবি: রয়টার্স

সুদানে কারা গণহত্যা চালাচ্ছে, আরব আমিরাতের ভূমিকা কী by নাতাশা বুতি ও ফারুক চোথিয়া

২০২৩ সালের এপ্রিল মাসে সুদান এক ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে পড়ে। ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিতে দেশটির সামরিক বাহিনী এবং শক্তিশালী আধা সামরিক গোষ্ঠী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে শুরু হওয়া তীব্র লড়াই থেকে এই গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে পশ্চিম দারফুর অঞ্চলে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি হয় এবং সেখানে গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার অভিযোগও ওঠে।

সম্প্রতি আরএসএফ এল-ফাশের শহরটি দখল করার পর এর বাসিন্দাদের নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত সারা দেশে দেড় লাখের বেশি মানুষ মারা গেছেন এবং প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। জাতিসংঘ এটিকে বিশ্বের বৃহত্তম মানবিক সংকট বলে অভিহিত করেছে।

পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থান ও সংঘাতের শুরু

১৯৮৯ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ২০১৯ সালে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকেই দফায় দফায় যে উত্তেজনা চলছিল, তার সর্বশেষ পরিস্থিতি হচ্ছে বর্তমান গৃহযুদ্ধ।

বশিরের প্রায় তিন দশকের শাসনের অবসানের দাবিতে বিশাল জনবিক্ষোভ হয়েছিল। তারই প্রেক্ষিতে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয় সেনাবাহিনী। কিন্তু দেশটির মানুষ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন চালিয়ে যায়। যার পরিপ্রেক্ষিতে একটি যৌথ সামরিক-বেসামরিক সরকার গঠিত হয়। কিন্তু ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে আরও একটি সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সরকারটিকে উৎখাত করা হয়। এই অভ্যুত্থানের কেন্দ্রে ছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও দেশটির কার্যত প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং তাঁর ডেপুটি ও আরএসএফ নেতা জেনারেল মোহাম্মদ হামদান দাগালো।

এই দুই জেনারেল দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ ও বেসামরিক শাসনে ফিরে যাওয়া নিয়ে প্রস্তাবিত পদক্ষেপে একমত হতে পারেননি। তাঁদের মধ্যে মূল বিরোধের বিষয় ছিল প্রায় এক লাখ সদস্যের আরএসএফ-কে সেনাবাহিনীর সঙ্গে একীভূত করার পরিকল্পনা এবং নতুন এই যৌথ বাহিনীর নেতৃত্ব নিয়ে। ধারণা করা হয়, দুজন জেনারেলই তাঁদের ক্ষমতা, সম্পদ ও প্রভাব ধরে রাখতে চেয়েছিলেন।

আরএসএফ সদস্যদের দেশের বিভিন্ন স্থানে মোতায়েন করা হলে সেনাবাহিনী বিষয়টিকে নিজেদের জন্য হুমকি হিসেবে দেখে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়। সেই লড়াই দ্রুত তীব্র আকার ধারণ করে এবং আরএসএফ খার্তুমের বেশির ভাগ অংশ দখল করে নেয়। যদিও প্রায় দুই বছর পর সেনাবাহিনী খার্তুমের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায়।

আরএসএফ, গণহত্যার অভিযোগ ও আরব আমিরাতের ভূমিকা

আরএসএফ গঠিত হয় ২০১৩ সালে। যে কুখ্যাত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে দারফুরে নৃশংস গণহত্যা ও জাতিগত নির্মূল অভিযানের অভিযোগ রয়েছে, তার মধ্য থেকে আরএসএফ বাহিনী গড়ে ওঠে।

জেনারেল দাগালো আরএসএফকে একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলেন। এ বাহিনীর মাধ্যমে তিনি সুদানের কিছু সোনার খনিরও নিয়ন্ত্রণ করেন। অভিযোগ রয়েছে যে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে এ সোনা পাচার করেন।

সুদানের সেনাবাহিনী আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে আরএসএফকে সমর্থন দেওয়া ও ড্রোন হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে। যদিও উপসাগরীয় দেশটি তা অস্বীকার করেছে।

আরএসএফ এখন প্রায় পুরো দারফুর এবং পাশের কর্দোফান প্রদেশের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। সেখানে আরএসএফ একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সরকার গঠন করায়, সুদান সম্ভবত দ্বিতীয়বারের মতো বিভক্ত হতে চলেছে। ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদান বিচ্ছিন্ন হয়ে আলাদা রাষ্ট্র গঠন করে।

দারফুরের অনেক বাসিন্দা মনে করেন, আরএসএফ ও সহযোগী মিলিশিয়ারা জাতিগতভাবে মিশ্র জনগোষ্ঠীর অঞ্চলটিকে আরব-শাসিত অঞ্চলে পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে যুদ্ধ চালাচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলেছে, আরএসএফ মাসালিত ও অন্যান্য অ-আরব সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালাচ্ছে। তারা এটিকে ‘জাতিগত নির্মূল অভিযান’ বলে আখ্যা দিয়েছে।

সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও সমর্থন

সামরিক বাহিনী দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বেশির ভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হলো মিসর, যার সঙ্গে সুদানের অভিন্ন সীমান্ত ও নীল নদের পানি ভাগাভাগির সম্পর্ক রয়েছে।

জেনারেল বুরহান লোহিত সাগরের তীরে অবস্থিত পোর্ট সুদানকে তাঁর সদর দপ্তর এবং জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকারের কেন্দ্র বানিয়েছেন। আরএসএফ সেখানে ড্রোন হামলা চালিয়েছিল। আরএসএফ চলে যাওয়ার সময় রাজধানী খার্তুম ছিল এক ধ্বংসস্তূপ। সেখানে হাসপাতাল, ক্লিনিক, সরকারি ভবনগুলো বিমান হামলা ও কামানের গোলায় ধ্বংস হয়েছিল।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য ছিল আরএসএফ ও সহযোগী মিলিশিয়ারা গণহত্যা করেছে। তখনকার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছিলেন, আরএসএফ জাতিগত সহিংসতার ভিত্তিতে পুরুষ, বালক ও শিশুদের পদ্ধতিগতভাবে হত্যা করেছে এবং নারীদের ওপর জঘন্য যৌন সহিংসতা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে জেনারেল দাগালো এবং পরে জেনারেল বুরহানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। জাতিসংঘের তদন্তকারীরা যদিও সেখানে গণহত্যা ঘটেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাননি; তবে তঁারা নিশ্চিত করেন যে আরএসএফ ও সেনাবাহিনী উভয়ই যুদ্ধাপরাধ করেছে।

শান্তি প্রচেষ্টা

সৌদি আরব ও বাহরাইনে বেশ কয়েক দফা শান্তি আলোচনা হলেও তা ব্যর্থ হয়েছে। উভয় পক্ষ, বিশেষ করে সেনাবাহিনী যুদ্ধবিরতিতে অনিচ্ছা দেখিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস আক্ষেপ করে বলেছেন যে বিশ্বের অন্যান্য সংকটের তুলনায় সুদানের এই সংঘাতের প্রতি বৈশ্বিক আগ্রহ কম। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে সুদান নিয়ে বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া একেবারেই কম। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি জানিয়েছে, সুদানের ২ কোটি ৪০ লাখের বেশি মানুষ চরম খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন। এসব কারণে সুদানের সংঘাত আজ বিশ্বের ‘বিস্মৃত যুদ্ধ’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

* নাতাশা বুতি ও ফারুক চোথিয়া, বিবিসির সাংবাদিক
- বিবিসি থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ

গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে সুদানের রাজধানী খার্তুম।
গৃহযুদ্ধের আগুনে জ্বলছে সুদানের রাজধানী খার্তুম। ফাইল ছবি: রয়টার্স

জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক জয়ের রহস্য কী

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী জোহরান মামদানি গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নিউইয়র্ক সিটির ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সাবেক গভর্নর ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন তিনি। এ জয়ের মধ্য দিয়ে জোহরান হলেন শহরটির প্রথম মুসলিম মেয়রও।

নিউইয়র্ক সিটির বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামসও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য লড়াই করছিলেন। তবে গত সেপ্টেম্বরে নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান তিনি।

৩৪ বছর বয়সী ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট ও কুইন্স থেকে নির্বাচিত অঙ্গরাজ্য পরিষদ সদস্য জোহরান ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন। ৬৭ বছর বয়সী কুমো পান ৪০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট, আর স্লিওয়া ৭ শতাংশের কিছু বেশি।

যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের একের পর এক সাফল্যের মধ্যে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক এ জয় এসেছে। ভার্জিনিয়ায় কংগ্রেস সদস্য অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার অঙ্গরাজ্যের প্রথম নারী গভর্নর হচ্ছেন, নিউজার্সিতে গভর্নর পদে মিকি শেরিল ট্রাম্প-সমর্থিত প্রতিদ্বন্দ্বীকে পরাজিত করছেন। ক্যালিফোর্নিয়ায় গভর্নর গ্যাভিন নিউসমের নতুন আসনবিন্যাস পরিকল্পনায় ডেমোক্র্যাটদের জন্য পাঁচটি নতুন কংগ্রেস আসন যোগ হতে যাচ্ছে।

ব্রুকলিনের ব্রুকলিন প্যারামাউন্ট হলে জোহরানের বিজয় ঘোষণার পর উল্লাসে ফেটে পড়েন সমর্থকেরা। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস তাঁর পক্ষে ফল ঘোষণা করতেই উপস্থিত জনতা চিৎকার, করতালি, আলিঙ্গনে মেতে ওঠেন।

নিউইয়র্ক সিটির প্রথম মুসলিম মেয়র হওয়ার পাশাপাশি জোহরান শহরের ইতিহাসে প্রথম দক্ষিণ এশীয় ও গত এক শতকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র।

গত শরতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরুর সময় জোহরান ছিলেন তুলনামূলক অচেনা রাজনীতিক। কিন্তু শহরের বসবাসযোগ্যতা নিয়ে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ও প্রাণবন্ত প্রচার দ্রুতই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তাঁর ঘোষিত কর্মসূচিতে ছিল বাড়িভাড়া স্থির রাখা, সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, ন্যূনতম মজুরি ঘণ্টায় ৩০ ডলার করা, বাস পরিবহনসেবা ফ্রি করা, ধনীদের ওপর কর বাড়ানোসহ নানা উদ্যোগ।

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুদান, হাজারো স্বেচ্ছাসেবী, সামাজিক যোগাযোগে বুদ্ধিদীপ্ত প্রচার ও পরিবর্তনের বার্তা—সব মিলিয়ে জোহরানের তৃণমূল প্রচার বসন্ত নাগাদ গতি পায়। এ গতি চূড়ান্ত রূপ পায় গত জুন মাসে ডেমোক্র্যাট প্রাইমারিতে। প্রাথমিক বাছাই ভোটে তিনি কুমোকে প্রায় ১৩ পয়েন্টে হারিয়ে নিউইয়র্কের রাজনৈতিক অভিজাত ব্যক্তিদের হতবাক করে দেন। তরুণ ও প্রথমবার ভোট দেওয়া নানা শ্রেণির ভোটারকেও একত্র করতে সক্ষম হন তিনি।

প্রাইমারিতে হারার পরও কুমো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থেকে যান। এক ডজনের বেশি নারীর কাছ থেকে যৌন হয়রানির অভিযোগ ওঠার পর ২০২১ সালে গভর্নর পদ ছাড়েন কুমো। রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের আশা নিয়ে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচনে নামেন তিনি। তবে গ্রীষ্ম ও শরৎজুড়ে সব জরিপে জোহরান কুমো ও স্লিওয়ার চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। ইতিমধ্যে যৌন হয়রানির অভিযোগ নাকচ করেছেন কুমো।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জোহরান ও কুমোর মধ্যে প্রায়ই তর্কবিতর্ক চলে নিজেদের কাজের রেকর্ড, যোগ্যতা, শহরের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁদের ভাবনাসহ নানা ইস্যু ঘিরে। জোহরান অভিযোগ করেন, কুমো ধনী অনুদান দাতা ও করপোরেট স্বার্থে কাজ করেন। আর কুমো বলেন, জোহরান শহর পরিচালনায় অদক্ষ ও অভিজ্ঞতাহীন।

অক্টোবর মাসে মেয়র পদপ্রার্থীদের বিতর্কে জোহরান, কুমো ও স্লিওয়া শহরের অপরাধ, পুলিশিং, ইসরায়েল, আবাসন, পরিবহন, জীবনযাত্রার ব্যয়সহ নানা স্থানীয়, জাতীয় ও বৈশ্বিক বিষয়ে মুখোমুখি হন। তাঁরা ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও মতবিনিময় করেন।

জোহরান মামদানির প্রচার জাতীয় পর্যায়ে প্রগতিশীল নেতাদের সমর্থন পায়। সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স ও নিউইয়র্কের কংগ্রেস সদস্য আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ প্রকাশ্যে তাঁর পক্ষে প্রচারে অংশ নেন।

নিউইয়র্কের প্রভাবশালী আরও কয়েকজন নেতা, যেমন জেরি ন্যাডলার ও রাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল লেটিশিয়া জেমসও জোহরানকে সমর্থন করেন। সেপ্টেম্বরে গভর্নর ক্যাথি হোকুল নীতিগত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও জোহরানের প্রতি তাঁর সমর্থনের ঘোষণা দেন। অতি সম্প্রতি, নির্বাচনের দুই সপ্তাহের কম সময় আগে প্রতিনিধি পরিষদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফ্রিজ তাঁকে সমর্থন করার ঘোষণা দেন।

তবে নিউইয়র্কের সব ডেমোক্র্যাটই জোহরানের পাশে ছিলেন না। অঙ্গরাজ্যের দুই সিনেটর চাক শুমার ও কারস্টেন গিলিব্র্যান্ড তাঁকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেননি।

নির্বাচনী প্রচারের সময় জোহরানকে সমালোচনা ও আক্রমণের মুখে পড়তে হয় বয়স, অভিজ্ঞতা ও প্রগতিশীল নীতির কারণে। ইসরায়েল সরকারের নীতি ও গাজায় দেশটির আগ্রাসন নিয়ে সমালোচনা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন তাঁর সঙ্গে কিছু ইহুদি গোষ্ঠীর সম্পর্ক জটিল করে তোলে।

জোহরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক মহলে ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণেরও শিকার হন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ ও নিউইয়র্কের রিপাবলিকান প্রতিনিধি এলিস স্টেফানিক তাঁকে ‘মেয়র পদে জিহাদপন্থী প্রার্থী’ বলে আখ্যা দেন।

অক্টোবর মাসে জোহরান কুমোর তীব্র সমালোচনা করেন। কারণ, কুমো এক রক্ষণশীল রেডিও উপস্থাপকের সঙ্গে হাসাহাসি করছিলেন, যখন তিনি (উপস্থাপক) বলছিলেন, ‘আরেকটি ৯/১১ ঘটলে মামদানি নিশ্চয় উল্লাস করবেন।’ মামদানি এ ঘটনাকে ‘বীভৎস’ ও ‘বর্ণবাদী’ বলে আখ্যা দেন।

এর আগে কুমোকে সমর্থনকারী রাজনৈতিক সংস্থা ‘সুপার প্যাক’-এর বিরুদ্ধে জোহরান অভিযোগ তোলেন, তারা ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়েছে। একটি প্রস্তাবিত পোস্টারে তাঁর দাড়িকে বেশি কালো, লম্বা ও ঘন করে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

এ নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক মনোযোগ কেড়েছে। এ নিয়ে রাজনীতিক ও বিশ্লেষকেরা নানা মত দিয়েছেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও হস্তক্ষেপ করেছেন। মামদানিকে ‘চরমপন্থী’ ও ‘কমিউনিস্ট’ বলে আখ্যা দিয়ে কুমোকে সমর্থন জানিয়েছেন।

এমনকি ভোটের আগের দিন গত সোমবার সন্ধ্যায় ট্রাম্প বলেছেন, জোহরান জিতলে নিউইয়র্ক প্রায় কোনো ফেডারেল তহবিল পাবে না। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লেখেন, ‘অ্যান্ড্রু কুমোকে আপনি ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ না–ও করতে পারেন, কিন্তু তাঁকে ভোট দেওয়ার বিকল্প নেই। আপনাকে অবশ্যই তাঁকে ভোট দিতে হবে। আশা করি, তিনি ভালো করবেন। তিনি সক্ষম, মামদানি নন।’

ট্রাম্পের এককালের ঘনিষ্ঠ মিত্র ধনকুবের ইলন মাস্কও সোমবার নিউইয়র্কবাসীকে কুমোকে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।

উগান্ডায় ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরিবারে জন্ম নেওয়া জোহরান সাত বছর বয়সে পরিবারসহ নিউইয়র্কে আসেন। তিনি ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব পান। জুলাইয়ে ট্রাম্প তাঁর নাগরিকত্ব বাতিল করার ইঙ্গিত দেন। জবাবে তিনি বলেন, ‘এটি শুধু আমাদের গণতন্ত্রের ওপর আঘাত নয়; বরং যাঁরা ভয় না পেয়ে সত্য কথা বলেন বা সাহস দেখান, সেই প্রত্যেক নিউইয়র্কবাসীর প্রতি এ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা যে যদি আপনি কথা বলেন, তাঁরা আপনার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেবেন।’

সব আক্রমণ উপেক্ষা করেও জোহরানের প্রচার দেশজুড়ে প্রভাব ফেলেছে। আগস্টে দ্য গার্ডিয়ান জানায়, তাঁর প্রচার অন্তত ১০ হাজারের বেশি তরুণ প্রগতিশীলকে রাজনীতিতে আসার কথা ভাবতে অনুপ্রাণিত করেছে।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে স্থানীয় সময় গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত (বাংলাদেশ সময় আজ বুধবার ভোর পাঁচটা) আনুমানিক ১৭ লাখ মানুষ ভোট দিয়েছেন বলে জানায় শহরের নির্বাচন বোর্ড। গত ৩০ বছরের মধ্যে এটি ছিল সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতি।

১৯৯৩ সালের নির্বাচনে প্রায় ১৯ লাখ ভোটার ভোট দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী রুডি জুলিয়ানি ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেভিড ডিনকিনসকে পরাজিত করে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।

এবারের নির্বাচনে প্রায় ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৩১৭ জন আগাম ভোট দিয়েছেন, যা প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ছাড়া অন্য কোনো নির্বাচনে নিউইয়র্ক শহরে এটিই সর্বোচ্চ আগাম ভোট পড়ার ঘটনা।

গতকাল নিউইয়র্ক শহরের অ্যাস্টোরিয়া এলাকায় একটি কেন্দ্রে ভোট দেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি। নির্বাচনে অন্যান্য প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোরও অঙ্গীকার করেন তিনি। স্বাভাবিকভাবেই তরুণসহ সব বয়সী ভোটারের মধ্যে বেশ সাড়া পেয়েছেন, যার প্রতিফলন দেখা গেছে গতকালের ভোটকেন্দ্রে।

ব্রুকলিনে বিজয় ভাষণ দিচ্ছেন জোহরান মামদানি। এ সময় ট্রাম্পকে এক হাত নেন তিনি
ব্রুকলিনে বিজয় ভাষণ দিচ্ছেন জোহরান মামদানি। এ সময় ট্রাম্পকে এক হাত নেন তিনি। ছবি: রয়টার্স

ভার্জিনিয়ার নতুন লেফটেন্যান্ট গভর্নর মুসলিম ডেমোক্র্যাট গাজালা হাশমি

ভারতীয় বংশোদ্ভূত ডেমোক্র্যাট প্রার্থী গাজালা হাশমি ভার্জিনিয়ার লেফটেন্যান্ট গভর্নর নির্বাচনে রিপাবলিকান জন রিডকে পরাজিত করে জয়লাভ করেছেন। হাশমি ভার্জিনিয়া সিনেটে প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় আমেরিকান সিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।  তার সাম্প্রতিক এই জয়ের অর্থ, এখন তার সিনেট আসনটি পূরণের জন্য বিশেষ নির্বাচন করতে হবে। হাশমি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ২০১৯ সালে এবং বিস্ময়করভাবে এক রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত রাজ্য সিনেটের আসন উল্টে দিয়ে ভার্জিনিয়ার জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হন। পাঁচ বছর পর, ২০২৪ সালে, তিনি সিনেটের শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কমিটির চেয়ার হিসেবে নিযুক্ত হন- যা ডেমোক্রেট পার্টির দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার- প্রজনন স্বাধীনতা ও জনশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বের পদ।

হাশমির ওয়েবসাইটে উল্লেখ রয়েছে, তিনি অন্যদের জীবনমান উন্নত করতে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন। বিশেষ করে আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশগত ন্যায়বিচারের বৈষম্য দূরীকরণে মনোনিবেশ করে কাজ করে যাচ্ছেন। গাজালা হাশমি ১৯৬৪ সালে ভারতের হায়দরাবাদে জিয়া হাশমি ও তানভীর হাশমির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব কেটেছে মালাকপেটে তার নানাবাড়িতে। তিনি মাত্র চার বছর বয়সে মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে ভারত থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। সেখানে তারা তার বাবার সঙ্গে জর্জিয়ায় যোগ দেন। গাজালার পিতা অধ্যাপক জিয়া হাশমি, আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র। সেখান থেকে তিনি এম.এ. ও এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন এবং খুব শিগগিরই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেখানকার পরিচালক হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন।

গাজালার মা তানভীর হাশমি, বিএ এবং বি.এড ডিগ্রিধারী। তিনি ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন্স কলেজ, কোঠি থেকে পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। গাজালা তার স্কুল জীবনে শ্রেষ্ঠ ছাত্রী (ভ্যালেডিক্টোরিয়ান) হিসেবে স্নাতক হন এবং একাধিক পূর্ণ স্কলারশিপ ও ফেলোশিপ অর্জন করেন। তিনি জর্জিয়া সাউদার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে অনার্সসহ বিএ এবং আটলান্টার এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমেরিকান সাহিত্য বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। ১৯৯১ সালে গাজালা তার স্বামী আজহার রফিককে নিয়ে রিচমন্ড এলাকায় চলে যান। তাদের দুই প্রাপ্তবয়স্ক কন্যা রয়েছে। তারা হলেন ইয়াসমিন ও নূর। দু’জনেই চেস্টারফিল্ড কাউন্টি পাবলিক স্কুল এবং ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক। গাজালা হাশমি প্রায় ৩০ বছর ধরে অধ্যাপনা করেছেন। প্রথমে ইউনিভার্সিটি অব রিচমন্ডে এবং পরে রেনল্ডস কমিউনিটি কলেজে। রেনল্ডস কলেজে তিনি সেন্টার ফর এক্সিলেন্স ইন টিচিং অ্যান্ড লার্নিং প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/188082_Abul3.webp

বিজয়ী ভাষণে মামদানি: মুসলিম হওয়ার জন্য আমি ক্ষমা চাইতে রাজি নই, নিউইয়র্ক হবে আলোকিত, ট্রাম্পকে চার শব্দ

ইতিহাস রচনা করে নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচিত জোহরান মামদানি সমর্থকদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন। জয়ের পর তিনি বলেছেন, নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মকে ধন্যবাদ। আমরা তোমাদের জন্য লড়াই করব, কারণ আমরা তোমরাই। ভবিষ্যত আমাদের হাতে। বন্ধুরা, আমরা একটি রাজনৈতিক ‘ডাইনেস্টি’কে পতন ঘটিয়েছি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন এনডিটিভি। ৩০ মিনিটের কম সময়ের বক্তব্যে মামদানি সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘ডনাল্ড ট্রাম্প, যেহেতু আমি জানি আপনি দেখছেন, আপনার জন্য আমার চারটি শব্দ আছে- ‘টার্ন দ্য ভলিউম আপ’। অর্থাৎ কণ্ঠস্বর বাড়াও। আমাদের কেউকে আঘাত করতে চাইলে আপনাকে আমাদের সবার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যদি কেউ একটি জাতিকে দেখাতে পারে যে ট্রাম্প দ্বারা কীভাবে প্রতারিত হওয়া যায় এবং তাকে পরাজিত করা যায়, তবে তা হলো সেই শহর যা তাকে গড়ে তুলেছে। আমি সেই দুর্নীতির সংস্কৃতির অবসান ঘটাবো যা বিলিয়নেয়ারদের, যেমন ট্রাম্পকে, কর ফাঁকি দিতে এবং কর সুবিধা কাজে লাগাতে সক্ষম করেছে।’

মামদানি তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানড্রু কুমোকে ব্যক্তিগত জীবনে ‘সেরা শুভকামনা’ জানান। বলেন, ‘এ রাতটি হোক শেষবার আমি তার নাম উচ্চারণ করেছি। কারণ আমরা এমন একটি রাজনীতি ত্যাগ করছি যা কয়েকজনের জন্য কাজ করে’।

নিউইয়র্কবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, তারা একটি পরিবর্তনের ম্যান্ডেট, একটি নতুন ধরনের রাজনীতির ম্যান্ডেট এবং একটি শহরের ম্যান্ডেট দিয়েছেন, যা আমরা বাঁচাতে পারি। জয়ী ঘোষণার সময় তিনি বলেন, ১লা জানুয়ারি, আমি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে শপথ নেব। নিউইয়র্ক থাকবে অভিবাসীদের শহর। অভিবাসীরা এই শহরকে গড়েছে, অভিবাসীরা এটিকে শক্তি যুগিয়েছে এবং এ রাত থেকে এটিকে নেতৃত্ব দেবে একজন অভিবাসী। আমরা সবাইকে ভালোবাসব, আপনি অভিবাসী হোন বা না হোন।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক জওহরলাল নেহরু’র ‘ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি’ ভাষণ উদ্ধৃত করে বলেন, ইতিহাসে বিরল মুহূর্ত আসে যখন আমরা পুরনো থেকে নতুনের দিকে পা রাখি, যখন একটি যুগ শেষ হয় এবং যখন দীর্ঘ সময় ধরে দমনকৃত জাতির আত্মা প্রকাশ পায়। তিনি আরও বলেন, তার নির্বাচনী জয় সমস্ত নিউইয়র্কবাসীর জন্য, ট্যাক্সি চালক থেকে শুরু করে লাইন কুক পর্যন্ত। তিনি একটি গল্প শেয়ার করেন যেখানে তিনি সিটি হলে ১৫ দিন অনশন করেছিলেন ট্যাক্সি চালক রিচার্ডের সাথে। তিনি বলেন, আমার ভাই, এখন আমরা সিটি হলে আছি।

মামদানি আরও জানান, বিভিন্ন শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে তার কথোপকথন, দোকান মালিক থেকে নার্স পর্যন্ত, তার প্রচারণার মূল লক্ষ্য ছিল সাধারণ মানুষকে প্রতিনিধিত্ব দেয়া। তিনি বলেন, ‘এই শহর তোমাদের শহর এবং এই গণতন্ত্র তোমাদেরও। তিনি পুনরায় তার সর্বজনীন শিশু যত্ন এবং বাড়ি ভাড়া কমানো প্রতিশ্রুতিগুলো উল্লেখ করেন।’ সমর্থকদের বলেন, ‘এই অন্ধকার মুহূর্তে নিউইয়র্ক হবে আলো।’ তিনি প্রতিশ্রুতি দেন সব নিউইয়র্কবাসীর পাশে থাকবেন, এমনকি যারা তাকে ভোট দেয়নি তারাও।

বক্তব্যে তিনি তার মুসলিম পরিচয়কে গর্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন এবং পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। বলেন, ‘আমার মা ও বাবার প্রতি, আমি তোমাদের ছেলে হতে পেরে গর্বিত। আমি তরুণ এবং মুসলিম। মুসলিম হওয়ার জন্য আমি ক্ষমা চাইতে রাজি নই।’

শাহরুখ খান: গণহত্যার সময় বিলিয়নিয়ার হওয়ার অর্থ কী by আজাদ ইসা

এ বছর শাহরুখ খানের জন্মদিনটা ভিন্নভাবে উদ্‌যাপিত হয়েছে এটা বলা যায়। রোববার যখন এই মেগাস্টার ৬০ বছরে পা দিলেন, তখন তিনি শুধু বলিউডের অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘বাদশা’ হিসেবেই নয়, বরং একজন বিলিয়নিয়ার হিসেবে সর্বকালের সবচেয়ে ধনী ভারতীয় অভিনেতা হিসেবেও পরিচিত হবেন।

হুরুন ইন্ডিয়া রিচ লিস্ট অনুযায়ী, খান গত অক্টোবরেই বিলিয়নিয়ার স্তরে পৌঁছান, যা তাঁকে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.০০০০৪ শতাংশের অন্তর্ভুক্ত এক অভিজাত শ্রেণিতে নিয়ে যায়। ভারতের ৩৫৮ জন বিলিয়নিয়ারের মধ্যে তিনি একজন, যা ভারতের মোট জনসংখ্যার ০.০০০০২ শতাংশ। তাঁকে নিয়ে মানুষের দেবতার মতো আচরণ করার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।

সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয়, ভারতের মূলধারার মিডিয়া তাঁর এই অর্জনকে উদ্‌যাপন করেছে—তার নিরলস পরিশ্রম, অনন্য প্রতিভা, ক্যারিশমা এবং ব্যবসায়িক দক্ষতার প্রশংসায়, যা তাঁকে রিয়েল এস্টেট, স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্টে বিস্তৃত বহুবিধ পোর্টফোলিও গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে।

‘এই অর্জন…বহু বছরের অবিরাম পরিশ্রমকে মুকুট পরিয়েছে…তাঁর ব্র্যান্ডকে পরিণত করেছে একটি শক্তিশালী সম্পদ-ইঞ্জিনে’, লিখেছে ইন্ডিয়া টুডে। হিন্দুস্তান টাইমস যুক্তি দিয়েছে: ‘শাহরুখ খানের বিলিয়নিয়ার ক্লাবে প্রবেশ—মাথা এবং হৃদয়—উভয়ের কাছেই সম্পূর্ণ অর্থবহ।’

একইভাবে ইকোনমিক টাইমস মন্তব্য করেছে: ‘তাঁর যাত্রা প্রমাণ করে, প্রতিভা, পরিশ্রম এবং স্মার্ট বিনিয়োগ পর্দার ভেতরে এবং বাইরে—উভয় জায়গায়—স্থায়ী উত্তরাধিকার তৈরি করতে পারে।’

কিন্তু খুব কম লোকই ভেবেছে—২০২৫ সালে বিলিয়নিয়ার হওয়ার অর্থ কী?

গত বছর গবেষকেরা সতর্ক করেছিলেন একটি ভারতে বৈষম্য ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের চেয়েও খারাপ অবস্থায় রয়েছে; যেখানে মধ্যবিত্তের সুযোগ-সুবিধা ভেঙে পড়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে এবং যেখানে তাঁর (শাহরুখ খান) মতো মুসলমান পরিচয়ের মানুষেরা ১৯৪৭ সালে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির মুখোমুখি।

আরেকটি প্রশ্ন এর ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকে: ভারত, গাজা বা কাশ্মীরে সামাজিক-রাজনৈতিক উথালপাতালের মুখে শাহরুখের নীরবতা—তাঁর সম্পদ বৃদ্ধিতে কি ভূমিকা রেখেছে? আসলেই, এমন সময়ে বিলিয়নিয়ার হওয়া শাহরুখ খান সম্পর্কে কী বলে?

শাহরুখের সম্পদের গল্প

খানের উত্থান বুঝতে হলে, শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী ভারতের ইতিহাস দেখতে হবে। বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সমাজে হিন্দু জাতীয়তাবাদ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়, আর হিন্দি জনপ্রিয় সিনেমা বিনা সংকোচে বহুজাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একটি আকাঙ্ক্ষিত ভারতের স্বপ্ন তৈরি করে।
শাহরুখ খান হয়ে ওঠেন এক সেতু—সংরক্ষণশীল অতীত থেকে মুক্ত বাজারের ভবিষ্যতের দিকে। সবকিছুই দেখতে নির্দোষ মনে হতে পারে। স্বজনপ্রীতির ওপর দাঁড়ানো একটি ইন্ডাস্ট্রিতে বহিরাগত হিসেবে তাঁর সাফল্য অনেকের জন্য আশার গল্প হয়ে ওঠে।

যেখানে ট্রিকল-ডাউন (চুইয়ে পড়া) অর্থনীতি ছিল এক প্রতারণা, সেখানে বোম্বেতে শাহরুখ খানের উত্থান মানুষকে ব্যবস্থার ওপর বিশ্বাস রাখতে এবং ‘ইন্ডিয়া’ ধারণাকে বিশ্বাস করতে সাহায্য করেছিল।

হিন্দু জাতীয়তাবাদ যখন ভারতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন রাজ, রাহুল এবং পরবর্তী সময়ে বীর—তাঁর জনপ্রিয় চলচ্চিত্র চরিত্রগুলো—দক্ষতার সঙ্গে বর্ণ-ধর্মীয় বিভাজনকে আড়াল করেছিল এবং অসমতাকে রাজনৈতিক প্রশ্ন নয়, বরং ব্যক্তিগত সামর্থ্যের প্রশ্নে রূপ দিয়েছিল।

তিনি ছিলেন সাধারণ মানুষের সাফল্যের প্রতীক। এটি সাধারণ মানুষকে নিশ্চিত করেছিল—তারা চাইলে সাফল্য পেতে পারে, আধুনিক হতে পারে এবং ভারতীয় হতে পারে।

একজন বিনোদন সাংবাদিক ২০২৩ সালে ডয়চে ভেলেকে বলেছিলেন, ‘তাঁর (শাহরুখ) ব্যক্তিগত জীবন “ইন্ডিয়া”র ধারণার প্রতিচ্ছবি। তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু দেশে একজন মুসলমান, হিন্দু নারীকে বিয়ে করেছেন এবং তাঁর সন্তানেরা তাঁদের ইচ্ছামতো ধর্ম গ্রহণ করে বড় হচ্ছেন।’

কিন্তু আসলে তিনি যা ছিলেন—এটি তার চলচ্চিত্রেও দেখা যায়—তিনি ছিলেন মুসলমানের একটি নিরাপদ রূপ, এমন এক চরিত্র, যা হিন্দু রাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করে যে ভারতের ভূখণ্ডে মুসলমান হওয়ার একটি গ্রহণযোগ্য উপায় আছে: ভদ্র, রাষ্ট্র-অনুগত, ভোক্তাবান্ধব দেশপ্রেমিক।

ডানপন্থীরা তাঁকে ঘৃণা করলেও তাঁর বিনয়ী আনুগত্য এবং ‘মুসলিম সোশ্যাল’ চরিত্রে অভিনয়ের প্রবণতা—যেখানে মুসলমানিত্ব সীমাবদ্ধ থাকে পোশাক, রুচি এবং ভদ্রতায়—ভারতের উদার লিবারেলদের সুযোগ দেয় নিজেদের সহনশীল ও প্রগতিশীল ভাবতে। তাঁরা দেখতে চান না—মুসলমানদের প্রতি তাঁদের নিজেদের বিশ্বস্ততার দাবি। যখন নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে হিন্দুত্ব রাষ্ট্রশক্তিতে রূপ নেয়, বৃহৎ করপোরেশনদের সঙ্গে একাকার হয়ে—তখন শাহরুখ খান তাঁর অসাধারণ সাফল্যের ফাঁদে আটকা পড়ে গেছেন।

নীরবতা, সহায়তা আর খলনায়কত্ব

২০১৫ সালে, মোদি ক্ষমতায় আসার এক বছর পর এবং ঘৃণা যখন প্রকাশ্যে দেখা দিতে শুরু করেছে, তখন শাহরুখ খান দেশে ‘অসহিষ্ণুতা বাড়ছে’ বলে সামান্য মন্তব্য করেছিলেন। সেই মানুষ, যার সম্পর্কে বলা হয়েছিল যে তিনি শ্রেণি, ধর্ম, জাত, ভাষা ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে উঠেছেন, তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়া হলো—আসলে তিনি শুধু একজন ভারতীয় মুসলমান।

বেশি সময় লাগেনি বাস্তবতা স্পষ্ট হতে—তাঁর সম্পদ নির্ভর করছে এই সক্ষমতার ওপর যে তিনি মনোযোগী, নতজানু, বাধ্য মুসলিম শিল্পী হয়ে থাকতে পারেন কি না। এটি ছিল একটি ফাউস্টিয়ান চুক্তি, যা শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য খুবই লাভজনক হয়ে ওঠে।

শাহরুখের প্রযোজনা সংস্থা রেড চিলিজ এন্টারটেইনমেন্ট ক্রমাগত বড় হতে থাকে। তাঁর ক্রিকেট দল কলকাতা নাইট রাইডার্সের সহ-স্বত্বাধিকারী জুহি চাওলা, যিনি মোদির মুসলমানবিরোধী নীতির কিছু বিষয়ে সমর্থন দিয়েছেন। তাঁদের দল আইপিএলের সবচেয়ে আইকনিক এবং সবচেয়ে লাভজনক দলগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

২০১৫ সালের পর কয়েক বছর খান কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি—যে সময়টিকে ‘কঠিন সময়’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। তারপরও তিনি ভারতের ভোক্তা জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেকে স্থাপন করার নতুন পথ খুঁজে পান। ব্র্যান্ড এন্ডোর্সমেন্টের ক্ষেত্রে শাহরুখ খান এখনো সবচেয়ে চাহিদাসম্পন্ন মুখ। খান পরিবারের উপস্থিতি দেখা যায় কো-ওয়ার্কিং স্পেস থেকে শুরু করে আর্থিক সেবাতেও।

তিনি তিন ডজনের বেশি পণ্যের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর—যার অনেকগুলোই ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কিত অথবা ফিলিস্তিন দখলে ভূমিকা রাখার কারণে বয়কট তালিকায় আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভারতীয় কনগ্লোমারেট টাটা এবং রিলায়েন্স—যাদের ইসরায়েলের সামরিক-শিল্প কমপ্লেক্সের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হুন্দাই, যার যন্ত্রপাতি ব্যবহৃত হয় ফিলিস্তিনি ঘরবাড়ি ভাঙতে।
খান ক্যাস্ট্রল অয়েলেরও ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর। এই অটোমোটিভ অয়েল ও লুব্রিকেন্ট কোম্পানির মালিক ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি), যাকে গত মার্চে ইসরায়েল ভূমধ্যসাগরে প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধানের লাইসেন্স দিয়েছে।

এ কথা বাড়িয়ে বলা হবে না যে খান অনেক আগেই শুধু অভিনেতা নন। তিনি কেবল একটি ব্র্যান্ডও নন। তিনি একটি সাম্রাজ্য। আর অন্য বিলিয়নিয়ারের মতো, তিনি তাঁর ভাবমূর্তি ধোয়ার জন্য দান-খয়রাতকে ব্যবহার করেন—অ্যাসিড-অ্যাটাক বেঁচে যাওয়া নারীদের সহায়তা, শিশুদের সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং শিশুস্বাস্থ্যসেবাকে সমর্থন করে।

ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস আগস্টে লিখেছিল, ‘তাঁকে ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের ওয়ারেন বাফেট বলা সম্পূর্ণ ভুল হবে না।’ কিন্তু ভক্তরা যখন এখনো তাঁকে তাঁর চরিত্রগুলোর মূল্যবোধ—সাধারণ মানুষ, পরিবার, আনুগত্য, ভালোবাসা—এর সঙ্গে যুক্ত করে, তিনি নিঃশব্দে তাঁদের সরল বিশ্বাসকে কাজে লাগিয়ে ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে শোষণকারী শ্রেণির অংশে পরিণত হয়েছেন।

গণহত্যার সময় বিলিয়নিয়ার

আজ ভারতের মুসলমানরা দেশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় বাস করছে। মোদির শাসনে ভারতীয় মুসলমানরা সামান্য সন্দেহেই লিঞ্চিংয়ের শিকার হচ্ছেন; তাঁদের নাগরিকত্ব হুমকির মুখে; বিচারব্যবস্থা, পুলিশ, মিডিয়া—সব প্রতিষ্ঠানেই তাঁদের অবমূল্যায়ন ছড়িয়ে পড়েছে—এতটাই যে অনেকে এটিকে বর্ণবৈষম্যের এক রূপ বলে বর্ণনা করছেন।

ভারত-অধিকৃত কাশ্মীরে, ইসরায়েলি কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে—ভাগ করা, নিয়ন্ত্রণ এবং দমন করার জন্য এবং নতুন নীতিতে উপত্যকার জনসংখ্যাগত গঠন পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে। যখন ভারত মুসলমানদের জন্য নরকে পরিণত হয়েছে, শাহরুখের নীরবতা আরও গভীর হয়েছে।

শাহরুখ-ভক্তরা অথবা ভারতীয় উদারপন্থীরা হয়তো তাঁর ছেলে আরিয়ান খানের হয়রানির গল্প বলবেন, অথবা দাবি করবেন তাঁর সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র পাঠান এবং জওয়ান-এ তিনি ‘নীরব বিদ্রোহ’ করেছেন। কিন্তু তাঁর নীরবতার পক্ষে এই যুক্তিগুলো প্রমাণ করে—তাঁর সাফল্য নির্ভর করে আনুগত্যের ওপর।

খান জওয়ান চলচ্চিত্রের জন্য জাতীয় পুরস্কারও জিতেছেন। এটি পরিষ্কার করে দেয়—চলচ্চিত্রটি আসলে কতটা ‘বিদ্রোহী’ ছিল। আর যখন গাজায় গণহত্যা শুরু হলো, নীরবতা আরও ঘনীভূত হলো।

ইসরায়েল যখন ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুলে বোমা ফেলে পুরো পরিবার নিশ্চিহ্ন করছিল এবং ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে গুলি করছিল—ঠিক তখন ভারতের মুসলমান এবং অন্য কর্মীরা ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়ানোর অপরাধে পেটানো হয়েছে, আটক হয়েছে, শহরের বাইরে ফেলে আসা হয়েছে।

অন্যরা গ্রেপ্তার ও বিদ্রূপের ঝুঁকি নিয়েছিল। তাঁরা বিভিন্ন শহরে ম্যাকডোনাল্ডস ও অন্যান্য মার্কিন ফাস্ট ফুড চেইনের সামনে দাঁড়িয়ে জনগণের বিবেককে আহ্বান জানিয়েছিল যেন গাজায় হত্যাযজ্ঞে জড়িত পণ্যগুলো বয়কট করা হয়। কিন্তু খান কোথাও ছিলেন না। বরং তিনি যেন নতুন নতুন উপায়ে দেখাতে লাগলেন যে এসব বিষয়ে তাঁর কিছু যায় আসে না।

এ বছরের মে মাসে, যখন পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ তুঙ্গে পৌঁছায়—শিল্পী এবং শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন জাদুঘর ও আর্ট গ্যালারি) অবস্থান নেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছিল—তখন খান বেছে নিলেন অন্য পথ: নিউইয়র্কের মেট গালায় তাঁর প্রথম উপস্থিতি।
যেখানে বাইরে প্রতিবাদ হচ্ছিল, সেখানে খান লালগালিচায় উপস্থিত হলেন—ফ্যাকাশে ও শীর্ণদেহ, কিন্তু পুরোপুরি সাজানো-গোছানো: সব্যসাচীর ডিজাইন করা কালো উলের কোটে মোড়া এবং গলায় স্তরে স্তরে গয়না। ভারতীয় গণমাধ্যম আবারও পরিপ্রেক্ষিত উপেক্ষা করে তাঁর পোশাক আঁকড়ে ধরল এবং তাঁর উপস্থিতিকে বলল ‘ঐতিহাসিক’।

এরপর সেপ্টেম্বর মাসে মোদির জন্মদিনে, অনুগত খান এক্স-এ পোস্ট করলেন—‘আজ প্রধানমন্ত্রী মোদির ৭৫তম জন্মদিন উপলক্ষে আমি আমার শুভেচ্ছা জানাই। একটি ছোট শহর থেকে বৈশ্বিক মঞ্চে উঠে আসা আপনার যাত্রা খুবই অনুপ্রেরণাদায়ক। দেশের প্রতি আপনার শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম এবং নিষ্ঠা এই যাত্রায় স্পষ্ট দেখা যায়। ৭৫ বছর বয়সেও আপনার উদ্যম আমাদের মতো যুবকদের হার মানায়। আমি প্রার্থনা করি, আপনি সব সময় সুস্থ ও সুখী থাকুন।’

শাহরুখ ছিলেন বলিউডের অনেক তারকার মধ্যে একজন, যাঁরা প্রধানমন্ত্রীকে প্রশংসায় ভাসালেন।

অক্টোবর নাগাদ, যখন তথাকথিত ‘যুদ্ধবিরতি’ ঘোষণা হওয়ার পর বিশ্ব পরিস্থিতি বুঝে নিতে ব্যস্ত, তখন বলিউডের তিন খান—আমির, সালমান ও শাহরুখ—সৌদি আরবে জয় ফেস্টিভ্যালে উপস্থিত হলেন।

সৌদি রাজতন্ত্রের এই বার্ষিক অনুষ্ঠান—নিজেদের অপরাধ আড়াল করার জন্য তৈরি—এ তিনজন একে অপরকে প্রশংসায় ভরিয়ে দিলেন এবং অতীত স্মৃতিচারণা করলেন। তাঁরা যৌথভাবে সেখানকার ধনী সৌদি রাজপরিবার এবং এলিট দর্শকদের চ্যালেঞ্জ করলেন এমন কিছু করতে, যা এত দিন কেউ করতে পারেনি (বা সামর্থ্য হয়নি): তাদের তিনজনকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণে অর্থায়ন করা।

এটি ছিল তাঁদের অগ্রাধিকার এবং সবকিছু বিক্রি করে দেওয়ার মানসিকতার আরেকটি প্রকাশ। অস্থিরতা ও বিচ্ছিন্নতার এ সময়—মৃত্যু আর ধ্বংসের ঋতুতে—শাহরুখের সম্পদ বৃদ্ধি মোটেই বিস্ময়কর নয়।

* আজাদ ইসা, মিডল ইস্ট আইয়ের নিউইয়র্ক মেট্রোপলিটন এলাকাভিত্তিক একজন সিনিয়র রিপোর্টার। তিনি এর আগে ২০১০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আল–জাজিরা ইংলিশ-এ কাজ করেছেন।
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া
- অনুবাদ ও সংক্ষিপ্তকরণ: মনজুরুল ইসলাম

২ নভেম্বর ৬০ বছরে পা দিলেন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান
২ নভেম্বর ৬০ বছরে পা দিলেন বলিউড বাদশাহ শাহরুখ খান। ছবি: রয়টার্স

মারা গেছেন ইরাকে হামলার নেপথ্য কারিগর সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি

ইরাকে হামলার নেপথ্য কারিগর যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টন ডিক চেনি মারা গেছেন। মঙ্গলবার ৮৪ বছর বয়সে মারা যান তিনি। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চেনি নিউমোনিয়া ও হৃদরোগজনিত জটিলতায় ভুগছিলেন। ২০০৩ সালে ইরাকে হামলার অন্যতম মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এই রাজনীতিবিদ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, চেনি মার্কিন ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভাইস প্রেসিডেন্টদের একজন। ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ-এর অধীনে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। তার নেতৃত্বে ভাইস প্রেসিডেন্টের কার্যালয় প্রথমবারের মতো মার্কিন প্রশাসনের ক্ষমতার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

চেনি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সবচেয়ে দৃঢ় সমর্থক ছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, সাদ্দাম হোসেনের সরকার বিপুল পরিমাণে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্র’ মজুত রেখেছে এবং আল-কায়েদার সঙ্গে তাদের যোগসূত্র রয়েছে। পরবর্তীতে ৯/১১ কমিশন এই দাবি ভিত্তিহীন বলে ঘোষণা করে এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি।

তবুও চেনি বারবার বলেন, সেই সময়কার গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী ইরাক আক্রমণ সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। ইরাক আক্রমণের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, মার্কিন সৈন্যদের স্বাধীনতাকামী হিসেবে স্বাগত জানানো হবে এবং যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হবে। যদিও সেটি শেষ হতে এক দশক লেগে যায়।

১৯৪১ সালের ৩০ জানুয়ারি নেব্রাস্কার লিংকনে জন্মগ্রহণ করেন রিচার্ড ব্রুস চেনি। কৈশোরে পরিবার নিয়ে ওয়াইওমিংয়ে চলে যান। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পড়া শেষ করতে পারেননি। পরে ইউনিভার্সিটি অব ওয়াইওমিং থেকে রাজনৈতিক বিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে তার সূচনা হয় ১৯৬৯ সালে। নিক্সন প্রশাসনের ইন্টার্ন হিসেবে। পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড সরকারের চিফ অব স্টাফ হন। ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত তিনি প্রেসিডেন্ট জর্জ এইচ ডব্লিউ বুশ-এর প্রশাসনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন।

চেনি বুশ প্রশাসনে জাতীয় নিরাপত্তা নীতিতে ব্যাপক প্রভাব রাখেন। ৯/১১ হামলার পর সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় তিনি তথাকথিত ‘এনহান্সড ইন্টাররোগেশন টেকনিক’ বা বাড়তি জিজ্ঞাসাবাদের পক্ষে ছিলেন। যেখানে ওয়াটারবোর্ডিং ও ঘুম বঞ্চনার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘ এসব পদ্ধতিকে নির্যাতন বলে আখ্যা দেয়। চেনিকে তার কঠোর নীতির জন্য প্রায়ই ‘স্টার ওয়ার্স’ চলচ্চিত্রের খলনায়ক ডার্থ ভেডার-এর সঙ্গে তুলনা করা হতো। একবার এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, এই তুলনাটা খারাপ নয়। এমনকি তিনি একবার ডার্থ ভেডারের পোশাক পরে অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিলেন।

ডিক চেনির স্ত্রী লিন চেনি দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাদের দুই মেয়ে- লিজ চেনি ও মেরি চেনি। বড় মেয়ে লিজ চেনি মার্কিন কংগ্রেসের প্রভাবশালী রিপাবলিকান সদস্য ছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেওয়ার পর নিজের আসন হারান। ডিক চেনি ২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি ডেমোক্রেট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে ভোট দেবেন। কারণ আমেরিকান প্রজাতন্ত্রের ইতিহাসের জন্য ডনাল্ড ট্রাম্পকে বড় হুমকি মনে করেন তিনি।

২০০৬ সালে টেক্সাসে এক শিকার অভিযানে ভুলবশত তিনি নিজের বন্ধুকে গুলিবিদ্ধ করেন। যা তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ২০১৮ সালে তার জীবনের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র ভাইস-এ অভিনেতা ক্রিশ্চিয়ান বেল তাকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন। বেল গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার গ্রহণকালে মজা করে বলেন, এই চরিত্রে অনুপ্রেরণার জন্য শয়তানকে ধন্যবাদ। ডিক চেনি তার মৃত্যু পর্যন্ত মার্কিন রক্ষণশীল রাজনীতির এক বিতর্কিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মৃত্যুর সময় তার পাশে ছিলেন স্ত্রী লিন, কন্যা লিজ ও মেরি।

mzamin

নিউইয়র্কের মেয়র নির্বাচন আজ: সর্বশেষ জরিপেও কুমোর চেয়ে ১৪.৩ পয়েন্ট এগিয়ে জোহরান

নিউইয়র্ক নগরের মেয়র নির্বাচনে আজ ভোট গ্রহণ শুরু হয়েছে। প্রায় ৫০ লাখ নিবন্ধিত ভোটার আজ ৪ নভেম্বর নগরের পরবর্তী মেয়র নির্বাচনের লক্ষ্যে ভোট দেবেন।

নিউইয়র্ক সিটি বোর্ড অব ইলেকশনের তথ্য অনুযায়ী, ৯ দিনে আগাম ভোট পড়েছে ৭ লাখ ৩৪ হাজার ৩১৭টি। এই হার ২০২১ সালের মেয়র নির্বাচনের তুলনায় প্রায় চার গুণ বেশি।

সর্বশেষ রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকস জরিপে দেখা যাচ্ছে, ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানির প্রতি ৪৬ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার সমর্থন জানিয়েছেন। অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমোর প্রতি সমর্থন রয়েছে ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটারের। এই জরিপ অনুযায়ী কুমোর চেয়ে ১৪ দশমিক ৩ পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছেন জোহরান। রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ার প্রতি সমর্থন রয়েছেন ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ।

তবে গতকাল সোমবার রাতে স্বতন্ত্র প্রার্থী কুমোর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন রিপাবলিকান দলীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক। এই দুই প্রভাবশালীর শেষ মুহূর্তের সমর্থন ভোটারদের মন পরিবর্তন করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকার (ডিএসএ) সদস্য জোহরান মামদানি তাঁর ঘোষিত নীতির মাধ্যমে তরুণ ও উদার ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। যেমন সবার জন্য বিনা মূল্যে শিশুযত্ন, বিনা মূল্যে বাস–সেবা এবং বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে সচেষ্ট থাকা।

নিউইয়র্ক নগরে প্রতি চার বছর পর মেয়র নির্বাচন হয় এবং কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে মেয়র থাকতে পারেন। বর্তমান মেয়র এরিক অ্যাডামস (ডেমোক্র্যাট) ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে দায়িত্বে আছেন। তবে তিনি এবার দলের মনোনয়ন পাননি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও পরে তিনি নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।

এরিক অ্যাডামসের বিরুদ্ধে গত বছর ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। অবশ্য পরে গত এপ্রিলে আদালত তাঁর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ খারিজ করে দেন।

এবারের নির্বাচনের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে—তিনটি শিবিরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এবার যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নগরে উদারপন্থী, মূলধারা এবং রক্ষণশীল রাজনীতিকেরা মুখোমুখি লড়াইয়ে নেমেছেন।

জরিপ কতটা নির্ভরযোগ্য

রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকস-এর তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জরিপে কুমোর সঙ্গে জোহরান মামদানির ব্যবধান ৩ থেকে ২৫ পয়েন্ট পর্যন্ত।

তবে প্রতিটি জরিপেরই কিছু মার্জিন অব এরর (ভুলের পরিমাণ) থাকে। জরিপকারীরা জনমতের প্রতিনিধিত্বমূলক নমুনা তুলে আনার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রকৃত সমর্থনের হার ঘোষিত সংখ্যার চেয়ে কয়েক পয়েন্ট এদিক-ওদিক হতে পারে।

এ ছাড়া বিভিন্ন জরিপে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের হিসাব করার পদ্ধতি ভিন্ন হওয়ায় ফলেও পার্থক্য দেখা যায়।

তবে বিভিন্ন জরিপের ফল একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে সেই মার্জিন অব এরর কিছুটা কমে যেতে পারে।

বছরের শুরুর দিকে ডেমোক্রেটিক দলের প্রাথমিক বাছাইয়ে অধিকাংশ জরিপ ভুল ছিল। সেগুলোতে কুমোর জয় সহজ হবে বলে ধারণা দেওয়া হয়েছিল। বাস্তবে জোহরান মামদানি বিপুল ব্যবধানে জয় পান।

জরিপ কীভাবে করা হয়

এমারসন কলেজ, ম্যারিস্ট কলেজ ও কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির মতো প্রতিষ্ঠান নিয়মিত জনমত জরিপ চালায়, যাতে ভোটাররা কাকে সমর্থন করছেন এবং কোন কোন বিষয় তাঁদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায়।

এই জরিপে র‌্যানডম স্যাম্পলিং (দ্বৈবচয়ন) পদ্ধতিতে ফোন, মেসেজ বা অনলাইনে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তাঁদের কাছে জানতে চাওয়া হয়—কোন প্রার্থীকে তাঁরা ভোট দেবেন, কোন ইস্যুগুলো তাঁদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে, বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের সমর্থন কেমন ইত্যাদি।

প্রতিটি জরিপে নমুনার আকার (স্যাম্পল) এবং ভুলের সীমা উল্লেখ থাকে, যার ফলাফল কতটা নির্ভুল, তা বুঝতে সাহায্য করে।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিউইয়র্ক নগরে ৫১ লাখ ভোটার নিবন্ধিত ছিলেন। এর মধ্যে ৬৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট, ১১ শতাংশ রিপাবলিকান। এ ছাড়া প্রায় ১১ লাখ ভোটার কোনো দলের পক্ষে নিবন্ধিত নন।

স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমো ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি
স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমো ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানি। ছবি: রয়টার্স

"পশ্চিম এশিয়ায় নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ইসরায়েলকে কবরস্থ করবে"

পার্স টুডে- মিডল ইস্ট মনিটর সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে পশ্চিম এশিয়ায় ইসরায়েলি বর্বরতা ও সন্ত্রাসী তৎপরতা সম্পর্কে বিশ্লেষণ করেছে।

মিডল ইস্ট মনিটর সম্প্রতি একটি প্রবন্ধে লিখেছে: ইতিহাসে এমন অনেক লোক আছে যারা অংহকারের শিকার হয়ে ভাগ্যহারা হয়।  তারা তাদের তৈরি ধ্বংসযজ্ঞের উপরে দাঁড়িয়ে আছে, এখনও মাথা উঁচু করে আছে, এখনও বিশ্বাস করে যে তারা আরেকটি নৃশংসতার মাধ্যমে নিজেদেরকে মুক্ত করতে পারবে। নেতানিয়াহু তার নামকে এমনই এক তালিকায় যুক্ত করেছেন।

কাতারের দোহায় হামাস নেতাদের হত্যার ব্যর্থ প্রচেষ্টা কেবল একটি সাধারণ কৌশলগত ভুল ছিল না। এটি ছিল যুক্তি, মানবতার বিরুদ্ধে এবং এখনও অবশিষ্ট সামান্য কূটনীতির বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধের ডাক। কাতারে আক্রমণ করার অর্থ ছিল আরব বিশ্বের দিক থেকে ইসরায়েলের দিকে প্রসারিত একমাত্র হাতকেই কামড়ানো।

নেতানিয়াহু যা করেছেন তা কেবল দায়িত্বজ্ঞানহীনই নয়, এটি ছিল রাজনৈতিক আত্মহত্যা। এই আক্রমণের পরিণতি হবে ভয়াবহ এবং ইসরাইলকে আরও বিচ্ছিন্ন করে তুলবে। নেতানিয়াহুর আর কোনও সতর্কবার্তা কোনও কাজে আসবে না। তিনি হতাশার জগতে আটকা পড়েছেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী লেবানন, তুরস্ক বা কাতারে, যেখানেই হামাস নেতারা থাকবেন, সেখানেই আবারও হামলা চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

কিন্তু এটা অবশ্যই বলা উচিত যে নেতানিয়াহু যে অতল গহ্বর খুলে দিয়েছেন তা কেবল গাজাতেই নয় যেখানে তিনি পতিত হচ্ছেন। ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সারা বিশ্বের মানুষের রাস্তায় ইহুদিবাদ-বিরোধী মিছিল দেখতে পাচ্ছেন। একসময় ইউরোপের রাজধানীগুলোতে পতাকার জন্য খ্যাত ইসরায়েল এখন সেখানে একজন বিতাড়িতের মতো ঘুরে বেড়াচ্ছে। ইহুদিবাদী  সৈন্যরা অভিশাপ পাচ্ছে। লন্ডন, বার্লিন, প্যারিস এবং নিউ ইয়র্কে প্রতি সপ্তাহে এই স্লোগান শোনা যায়। আমেরিকায়, যেখানে ইহুদিবাদীরা মনে করত এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ সেখানেও পরিস্থিতি বদলে গেছে। ছাত্ররা সমস্বরে তাদের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়। আমেরিকান ইহুদিরা কাঁদতে কাঁদতে বলে: "আমরা তোমাদের (ইসরায়েল) নামের সাথে একমত নই।"

নেতানিয়াহুর ক্লান্ত ও অকার্যকর লাঠি আর ভিন্নমতকে থামাতে পারবে না। জনগণ গাজার ধ্বংসাবশেষ যথেষ্ট দেখে ফেলেছে। ইহুদিবাদী রেজিমের মুখ থেকে মুখোশ খুলে গেছে। নেতানিয়াহুর দাবি যে তিনি পশ্চিম এশিয়াকে নতুন করে সাজিয়ে তুলবেন, তা কেবল একটি কল্পনা। আপনারা যে পরিকল্পনাগুলো করেছেন তা হল ধ্বংসের পরিকল্পনা; গাজা ধ্বংস হয়ে গেছে, পশ্চিম তীরের আরও অনেক অংশ গ্রাস করা হয়েছে এবং সিরিয়া ও লেবাননের ভূমিতে বোমা হামলা করা হয়েছে। এই  হঠকারি কল্পনাগুলো আশ্চর্যজনক।

নেতানিয়াহু পশ্চিম এশীয় অঞ্চলের জন্য যা ডিজাইন করেছেন তা হল ইসরায়েলের সমাধিফলক। একসময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কৃত্রিম পোশাকে ঢাকা ইসরাইল এখন বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থা, দুর্বৃত্ত শাসনব্যবস্থা এবং লজ্জাজনক দখলদার সেনাবাহিনী হিসেবে কু্খ্যাত। নেতানিয়াহু, তুমি রুবিকন পেরিয়ে গেছো, আর ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। সেতুগুলো পুড়ে গেছে। তুমি সদিচ্ছার শেষ চিহ্নও হারিয়ে ফেলেছো। ইতিহাস তোমাকে ক্ষমা করবে না।

নেতানিয়াহু, তুমি পশ্চিম এশিয়ার চিত্র নতুন করে আঁকতে পারবে না। তুমি শুধু ইসরায়েলের মৃত্যুর বাণী লিখছ। ইতিহাস তোমাকে মনে রাখবে না, একজন মহান রাজনীতিবিদ হিসেবে নয়, ইসরায়েলের রক্ষক হিসেবে নয়, বরং এমন একজন হিসেবে তোমার নাম লেখা থাকবে যে ইসরায়েলকে ধংসের দিকে ঠেলে দিয়েছিল।

পশ্চিম এশিয়ায় নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ইসরায়েলকে কবরস্থ করবে
পশ্চিম এশিয়ায় নেতানিয়াহুর পরিকল্পনা ইসরায়েলকে কবরস্থ করবে

নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচন: জোহরান মামদানির কতটা বিরোধী, কুমোকে সমর্থন দিয়ে সেটি বুঝিয়ে দিলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী অ্যান্ড্রু কুমোকে সমর্থন দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জোহরান মামদানিকে ‘বামপন্থী’ উল্লেখ করে তাঁকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ট্রাম্প বলেছেন, মেয়র পদে কুমো যোগ্য, জোহরান মামদানি নন।

গতকাল সোমবার নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে নিজের সমর্থনের কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। যদিও অনেক আগে থেকেই জোহরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। তবে এই প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে কুমোকে সমর্থন দিলেন তিনি।

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আপনারা অ্যান্ড্রু কুমোকে ব্যক্তিগতভাবে পছন্দ করেন বা না করেন, সত্যি বলতে গেলে আপনাদের কাছে বিকল্প কোনো পথ নেই। আপনাদের তাঁকে ভোট দিতে হবে এবং আশা করতে হবে যে তিনি অসাধারণ কাজ করবেন। তিনিই (মেয়র) পদের যোগ্য, মামদানি (জোহরান) নন!’

এর আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, মেয়র নির্বাচনে জোহরান জয়ী হলে নিউইয়র্ককে ‘খুব সামান্য’র বেশি কেন্দ্রীয় তহবিল দিতে আগ্রহ দেখাবেন না তিনি। এরপর গত রোববার একটি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জোহরানকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে আখ্যা দেন ট্রাম্প। যদিও এমন তকমা প্রত্যাখ্যান করেছেন জোহরান।

অ্যান্ডু কুমো একসময় নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ছিলেন। মেয়র পদে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী বাছাই পর্বে বাদ পড়ে স্বতন্ত্র হিসেবে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন তিনি। ট্রাম্পের সমর্থনের বিষয়ে তিনি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁকে সমর্থন দিচ্ছেন না। বরং তিনি জোহরানের বিরোধিতা করছেন।

নির্বাচিত হলে জোহরান মামদানি হবেন নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র। এখন পর্যন্ত করা বিভিন্ন জরিপে কুমো ও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়ার চেয়ে জনসমর্থনে বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন তিনি। যদিও ট্রাম্প নিজ দলের প্রার্থী স্লিওয়াকে সমর্থন জানাননি। ট্রুথ সোশ্যালে তিনি লিখেছেন, ‘স্লিওয়ার জন্য একটি ভোট আসলে হবে জোহরানের পক্ষে একটি ভোট।’

কুমোর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের জবাবে জোহরান বলেছেন, এই সমর্থনের মাধ্যমে ট্রাম্প বুঝিয়েছেন যে কুমো তাঁর জন্য সেরা মেয়র হবেন। তাঁর প্রশাসনের জন্য সেরা মেয়র হবেন। তবে নিউইয়র্ক শহরের জন্য সেরা মেয়র হবেন না বা নিউইয়র্কবাসীর জন্য সেরা মেয়র হবেন না।

অ্যান্ড্রু কুমো
অ্যান্ড্রু কুমো। ফাইল ছবি: রয়টার্স

নিউইয়র্কে মেয়র নির্বাচন আজ: মামদানির তীব্র বিরোধিতা, কুমোকে সমর্থন ট্রাম্পের

আজ ৪ঠা মঙ্গলবার নিউইয়র্কে বহুল আলোচিত মেয়র নির্বাচন। বিশেষ করে মুসলিম প্রার্থী জোহরান মামদানিকে কেন্দ্র করে এই নির্বাচন বেশি উত্তাপ ছড়িয়েছে। আগে থেকেই তাকে আক্রমণ করে কথা বলেছেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে নির্বাচনের আগেরদিন সোমবার তিনি ডেমোক্রেট প্রার্থী জোহরান মামদানিকে কার্যত একরকম হুমকি দিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, জোহরান মামদানি মেয়র নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি নিউইয়র্ক সিটির জন্য ফেডারেল তহবিল সীমিত করবেন। মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ আখ্যা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, তার নেতৃত্বে শহরটি সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়বে। অন্যদিকে তিনি নির্বাচনে সমর্থন দিয়েছেন অ্যানড্রু কুমোকে। ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ‘বামপন্থী শীর্ষ প্রার্থী’ জোহরান মামদানিকে নির্বাচিত না করতে। সোমবার রাতে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লিখেছেন, ব্যক্তিগতভাবে অ্যানড্রু কুমোকে পছন্দ করুন বা না করুন, আপনার সত্যিই কোনো বিকল্প নেই। আপনাকে তাকে ভোট দিতেই হবে এবং আশা করতে হবে যে তিনি দারুণ কাজ করবেন। তিনি তা করতে সক্ষম, মামদানি নন! এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

ট্রাম্প আরও লিখেছেন, যদি কমিউনিস্ট প্রার্থী জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জিতে যান, তাহলে আমি আইনে যতটা বাধ্য, তার ন্যূনতম সীমা ছাড়া আর কোনো ফেডারেল তহবিল দেব না। একজন কমিউনিস্টের হাতে এই একসময়ের মহান শহরের সফলতা বা টিকে থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আমি ভালো অর্থ খারাপ স্থানে নষ্ট করতে চাই না।

উল্লেখ্য, কুইন্সে জন্ম নেওয়া ট্রাম্প প্রায়ই নিউইয়র্ককে নিজের ‘প্রথম বাড়ি’ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জাতিকে পরিচালনা করার দায়িত্বে আছেন তিনি এবং মামদানির জয় মানে শহরটির ‘সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ধ্বংস’ হবে। প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, তিনি এমনকি সফলতার রেকর্ড থাকা একজন ডেমোক্রেটকেও মামদানির চেয়ে বেশি পছন্দ করবেন এবং নিউইয়র্কবাসীদের সাবেক গভর্নর অ্যানড্রু কুমোকে সমর্থন দেয়ার আহ্বান জানান। তাকে তিনি ‘সক্ষম নেতা’ বলে উল্লেখ করেন। এছাড়াও রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়াকেও খোঁচা দেন ট্রাম্প। বলেন, স্লিওয়াকে ভোট দেয়া মানে মামদানিকেই ভোট দেয়া। ঠাট্টা করে তিনি আরও বলেন, বেরেট ছাড়া স্লিওয়াকে অনেক ভালো দেখায়।

নিউইয়র্কের সাবেক গভর্নর কুমোর প্রতি ট্রাম্পের এই সমর্থন এসেছে বহুল আলোচিত নির্বাচনের আগের সন্ধ্যায়। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা, সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন প্রেসিডেন্ট হয়ে এভাবে মেয়র নির্বাচনে তার সমর্থন এবং একজন প্রার্থীর সরাসরি বিরোধিতা তিনি করতে পারেন কিনা তা নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।

ওদিকে জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, কুমোর থেকে এগিয়ে আছেন ডেমোক্রেট প্রার্থী মামদানি। কুমো ডেমোক্রেট প্রাইমারিতে মামদানির কাছে পরাজিত হয়ে এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া তাদের দু’জনের অনেক পিছনে রয়েছেন। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার পোস্টে স্লিওয়াকে সমর্থন দিতে অস্বীকৃতি জানান। বরং তিনি লিখেছেন, কার্টিস স্লিওয়াকে ভোট দেয়া মানে মামদানিকেই ভোট দেয়া। ট্রাম্প প্রশাসন অতীতে বারবার ডেমোক্রেট নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোর জন্য ফেডারেল অনুদান ও প্রকল্প তহবিল কমানোর চেষ্টা করেছে। এ অর্থবছরে নিউইয়র্ক সিটি ৭.৪ বিলিয়ন ডলার (৫.৭ বিলিয়ন পাউন্ড) ফেডারেল তহবিল পেয়েছে।

mzamin