Friday, August 29, 2025

পুতিনকে আলোচনার টেবিলে আসতেই হবে: ইইউ প্রধান

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে অবশ্যই ইউক্রেন নিয়ে শান্তি আলোচনায় বসতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে ফোনালাপের পর  বৃহস্পতিবার এ কথা বলেছেন তিনি।

ট্রাম্পের প্রস্তাবে পুতিন-জেলেনস্কির আলোচনা আয়োজনে ক্রেমলিনের গড়িমসি দেখে এ আহ্বান জানালেন ভন ডার লেন।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ভন ডার লেন এক বার্তায় বলেন, ‘কিয়েভে ভয়াবহ হামলার পর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ও পরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বললাম। আমাদের ইইউর কার্যালয়ও এ হামলার শিকার হয়েছে। পুতিনকে আলোচনায় আসতেই হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইউক্রেনে ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ীভাবে শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। এতে শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মাধ্যমে দেশটি নিরাপদ  হয়ে উঠতে পারে।’

এদিকে ইউক্রেনে সংঘাত শুরুর পর থেকে গতরাতে অন্যতম বড় বোমা হামলা চালিয়েছে মস্কো। এ হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক মিশন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলে কিভাবে ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে তা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো আলোচনা করছে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপীয় শান্তি পরিকল্পনার সমর্থনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ইউক্রেনে আমেরিকান সৈন্য মোতায়েন করবে না।

ভন ডার লেন লিখেছেন, ‘ইউরোপ সম্পূর্ণভাবে তার দায়িত্ব পালন করবে।’ তিনি এ সময় ইউক্রেনের অস্ত্র তহবিলে সহায়তা করার উদ্দেশ্যে ইইউর নতুন বড় একটি কর্মসূচির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

উরসুলা ভন ডার লেন
উরসুলা ভন ডার লেন। ছবি: রয়টার্স

দয়া করে আপনারা নিজেদের ভূমিকা স্পষ্ট করুন: ইউরোপীয় নেতাদের জেলেনস্কি

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি গতকাল বৃহস্পতিবার ইউরোপের কয়েকজন নেতাকে বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তাঁর দেশের জন্য নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কী হবে, তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা এখন খুব জরুরি। কারণ, যুদ্ধ টানা সাড়ে তিন বছর ধরে চলছে।

পোল্যান্ডে ইউরোপীয় নেতাদের একটি ভার্চ্যুয়াল বৈঠকে জেলেনস্কি এ আহ্বান জানান। এতে অংশ নেন পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট কারোল নাভ্রোৎসকি এবং এস্তোনিয়া, লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া ও ডেনমার্কের নেতারা। বৈঠকের ঠিক আগে বুধবার রাতে রাশিয়ার এক হামলায় ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে অন্তত ২২ জন নিহত হন বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

জেলেনস্কি বলেন, বৈঠকে অংশ নেওয়া নেতারা রাশিয়ার ওপর আরও চাপ তৈরির বিষয়ে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছেছেন। ইউক্রেন–রাশিয়া সংঘাত নিয়ে আসছে কূটনৈতিক আলোচনার আগে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়। প্রসঙ্গত, ইউক্রেনে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু করে রাশিয়া।

বৈঠকে জেলেনস্কির করা মন্তব্যগুলো তাঁর প্রেসিডেনশিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। জেলেনস্কি বলেন, ইউক্রেন মনে করে, ক্রেমলিনের নেতা ভ্লাদিমির পুতিন এখনো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহী নন।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেন, নিরাপত্তার নিশ্চয়তার একটি দৃঢ় ভিত্তি ইউক্রেনের দরকার। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একমত হয়েছেন এবং এক সপ্তাহ ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে পুতিনের ওপর আরও চাপ তৈরি করা প্রয়োজন—এ ব্যাপারেও ইউক্রেন ও ইউরোপীয় নেতাদের অভিন্ন মত রয়েছে।

জেলেনস্কির কথায়, ‘যখন আমরা নিরাপত্তার নিশ্চয়তার কথা বলি, তখন দরকার পরিষ্কার জবাব—রাশিয়া আবার আক্রমণ করলে স্থলে, আকাশে আর সাগরে আমাদের প্রতিরক্ষায় কারা এগিয়ে আসবে, কীভাবে অংশ নেবে? দয়া করে আপনারা নিজেদের ভূমিকা স্পষ্ট করুন।’

‘এখন গুরুত্বপূর্ণ হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যেন দেখেন, আমরা ইউরোপীয়রা যুদ্ধ শেষ করতে একসঙ্গে কাজ করছি’, বলেন জেলেনস্কি।

ট্রাম্প চেষ্টা করছেন পুতিন ও জেলেনস্কির মধ্যে বৈঠকের ব্যবস্থা করতে। তিনি বলেছেন, সংঘাত নিরসনে অগ্রগতি না হলে মস্কোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হতে পারে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, কিয়েভে রাশিয়ার সাম্প্রতিক হামলায় প্রেসিডেন্ট ‘সন্তুষ্ট নন’।

জেলেনস্কি বরাবরই ট্রাম্পের প্রস্তাবিত বৈঠকের (জেলেনস্কি–পুতিন) পক্ষে ছিলেন এবং ইউরোপীয় নেতাদের যুদ্ধবিরতির আহ্বানও সমর্থন করেছেন, যাতে রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা শুরু করা যায়।

আজ শুক্রবার নিউইয়র্কে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইউক্রেনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বৈঠক করার কথা রয়েছে।

ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের এক মুহূর্তে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। হোয়াইট হাউস, যুক্তরাষ্ট্র, ১৮ আগস্ট ২০২৫
ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ বন্ধ করা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের এক মুহূর্তে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। হোয়াইট হাউস, যুক্তরাষ্ট্র, ১৮ আগস্ট ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

ফোনালাপ ফাঁস, পদচ্যুত হতে পারেন থাইল্যান্ডের বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা

থাইল্যান্ডের সাময়িকভাবে বরখাস্ত প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রাকে পদচ্যুত করার বিষয়ে আজ শুক্রবার সিদ্ধান্ত নেবেন দেশটির সাংবিধানিক আদালত। কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনায় তাঁকে বরখাস্ত করা হয়েছিল।

আদালতের রায়ে পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা পদচ্যুত হলে সেটি হবে সিনাওয়াত্রা পরিবারের জন্য বড় ধাক্কা। এ রায় থাইল্যান্ডকে নতুন রাজনৈতিক অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আদালতের রায় পেতংতার্নের বিরুদ্ধে গেলে ২০০৮ সালের পর তিনি হবেন আদালতের রায়ে পদচ্যুত হওয়া থাইল্যান্ডের পঞ্চম প্রধানমন্ত্রী। সমালোচকেরা বলছেন, দেশটির বিচারকেরা মূলত রাজতন্ত্র-সামরিক গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন।

এ রায়ের মধ্য দিয়ে থাইল্যান্ডে আগাম নির্বাচনের পথ খুলে যেতে পারে।

আদালতে পেতংতার্ন ও তাঁর বাবা সাবেক থাই প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার বিরুদ্ধে চলা গুরুত্বপূর্ণ তিনটির মামলার দ্বিতীয়টির রায় হবে আজ।

৭৬ বছর বয়সী থাকসিন সিনাওয়াত্রা ছিলেন থাইল্যান্ডের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নায়ক। ২০০৬ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। গত সপ্তাহে রাজতন্ত্র অবমাননার অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। তবে ১৬ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে ২০২৩ সালে দেশে ফেরার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আরেকটি মামলায় আবার তাঁকে কারাগারে পাঠানো হতে পারে।

পেতংতার্ন শেষ পর্যন্ত পদচ্যুত না হলেও খুব বেশি লাভ হবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কারণ, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের ধাক্কা এবং তাঁর ফেউ থাই পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অর্থনৈতিক প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা—সব মিলিয়ে সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি বড় সংকটের মুখে আছে।

আইএসইএএস-ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের থাইল্যান্ড স্টাডিজ প্রোগ্রামের ভিজিটিং ফেলো ও ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়ক নাপন জাতুস্রিপিতাক বলেন, ‘আমার মনে হয়, সিনাওয়াত্রা পরিবারের রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা একেবারেই শেষ হয়ে গেছে।’

গত মে মাসে থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্তে সেনা বিরোধকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রার একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে পেতংতার্নকে কম্বোডিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সঙ্গে খুব আনুগত্যের সুরে কথা বলতে শোনা যায়। ওই সময় হুন সেনকে আঙ্কেল বলে সম্বোধন করেন পেতংতার্ন। তিনি একপর্যায়ে এক জ্যেষ্ঠ থাই সেনা কর্মকর্তার সমালোচনা করে তাঁকে নিজের ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বলে উল্লেখ করেন।

এই ফোনালাপ থাইল্যান্ডে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। কেউ কেউ পেতংতার্নের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ করেন। তিনি ওই মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চাইলেও সাংবিধানিক আদালত নৈতিক অপরাধের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা পিটিশন আমলে নেন এবং তাঁকে সাময়িকভাবে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে বরখাস্ত করেন।

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী পেতংতার্ন সিনাওয়াত্রা। ফাইল ছবি: রয়টার্স

হারেৎজের মতামত কলাম: ইসরাইলকে কি ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন নেতানিয়াহু?

হারেৎজের মতামত কলামঃ ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজা নীতিকে ‘ফরমালডিহাইড ফর্মুলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। যা উপত্যাকাটিতে শান্তি নয় বরং মৃতের সংখ্যা বাড়াতে পারে। নেতানিয়াহুর এমন নীতির সমালোচনা করে একটি মতামত কলাম প্রকাশ করেছে হারেৎজ। সেখানে বলা হয়েছে, নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে যে কৌশল নিয়েছেন, তা ইসরাইলের সমাজকে আরও আগ্রাসী ও অহংকারী করে তুলছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশটির জন্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করছে।

নেতানিয়াহু ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাতকে ‘বর্বরতা বনাম সভ্যতার সংঘাত’ হিসেবে তুলে ধরেন। কিন্তু বাস্তবে এই বিভাজন ভেঙে পড়ছে। ইসরাইল কি সত্যিকার অর্থেই ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে চায় তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নেতানিয়াহু কি ফিলিস্তিনিদের ‘ফিন’ জাতির মতো শান্ত ও সভ্য করতে চান? নাকি তাদের ‘অ-ফিন’ হিসেবে থাকাটাই ইসরাইলের জন্য সুবিধাজনক বলে মনে করেন, যাতে কোনো সমাধান না করার অজুহাত পাওয়া যায়?

নেতানিয়াহু মনে করেন সময় ইসরাইলের পক্ষে আছে। কিন্তু এই ধারণা একটি বিপজ্জনক ভ্রম ছাড়া আর কিছুই নয়। গাজায় ইসরাইলের প্রতিটি কঠোর আঘাত ফিলিস্তিনিদের জয়ী করছে। কারণ, দুর্বলদের আত্মত্যাগই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যত বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হচ্ছে, গাজায় ক্ষুধা ও দুর্ভোগ বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে ইসরাইল ততই দুর্বল ও আগ্রাসী শক্তি হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ইসরাইলের সময় ফুরিয়ে আসছে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার সমালোচনা করেছেন কলামিস্ট ক্যারোলিনা ল্যান্ডসম্যান। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্ম ইসরাইলের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। শুধু ডেমোক্রেট নয়, রিপাবলিকানদের মধ্যেও এই পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

নেতানিয়াহুর এই নীতি ইসরাইলি সমাজের জন্য বিপদ ডেকে আনছে। ইহুদি আধিপত্য বাড়ছে এবং ফিলিস্তিনিদের পরিচয় কেবল ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই নীতি কেবল সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে, কিন্তু কোনো সমাধান দেবে না। ফরমালডিহাইড যেমন কেবল মৃতদেহ সংরক্ষণ করে, নেতানিয়াহুর কৌশলও তেমনি কেবল ‘মৃতের সংখ্যা বৃদ্ধি’ করছে। ল্যান্ডসম্যান সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইসরাইলের এই আত্মঘাতী যাত্রার কাউন্টডাউন বা ক্ষণগণনা ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।

গাজায় ইসরাইলের ব্যাপক বোমা হামলা, নিহত আরও ৬১
গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর সামরিক অভিযান তীব্র হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া হামলায় অন্তত ৬১ জন নিহত হয়েছেন বলে মেডিকেল সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন ত্রাণপ্রার্থীও রয়েছেন। গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলীয় এলাকাগুলোতে ব্যাপক বোমা হামলার খবর পাওয়া গেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

এতে বলা হয়, জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ইসরাইলের এই অভিযানের সমালোচনা করে বলেছেন, এটি যুদ্ধের একটি নতুন এবং বিপজ্জনক ধাপের ইঙ্গিত। তিনি বলেন, গাজা সিটিতে সামরিক অভিযানের ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনবে। কারণ এখানে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনি আবারও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হবেন।

এদিকে, গাজা সিটির শুজাইয়া, জেইতুন এবং সাবরা এলাকাগুলোতে ইসরাইলি বাহিনীর বোমা হামলার কারণে বাসিন্দারা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে উপকূলের দিকে পালাচ্ছেন। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার মতে, জেইতুন এলাকার দক্ষিণাংশে ইসরাইলি স্থল অভিযানে ১৫০০-এর বেশি বাড়িঘর ধ্বংস হয়েছে। ইসরাইলি কর্মকর্তারা গাজা সিটিকে হামাসের শেষ দুর্গ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা গাজায় জোরপূর্বক গুমের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা জানান, রাফাহতে ত্রাণ নিতে যাওয়া ক্ষুধার্ত ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক গুম করে ফেলা হচ্ছে। এক যৌথ বিবৃতিতে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খাদ্যের জন্য ক্ষুধার্ত বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে জোরপূর্বক গুম করা শুধু মর্মান্তিক নয়, এটি এক ধরনের নির্যাতন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় মানবিক সংকট চরমে পৌঁছেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার অনাহারে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। যার মধ্যে দুইজন শিশু। ফলে এই যুদ্ধে অনাহারে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩১৭ জনে, যার মধ্যে ১২১ জনই শিশু।

আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জৌম দেইর আল-বালাহ থেকে জানান, সেখানকার পরিস্থিতি হৃদয়বিদারক। মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে খাবারের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে, কিন্তু প্রায়শই খালি হাতে ফিরতে বাধ্য হচ্ছে। ইসরাইলের সামরিক হামলায় এখন পর্যন্ত ৬২,৯০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।

গাজার জেইতুনের সকল ভবন ধ্বংস করেছে ইসরাইল

গাজা শহরের জেইতুন এলকার সকল ভবন ধ্বংস করেছে ইসরাইল। সেখানে আর কোনো ভবন অক্ষত নেই। এ মাসের শুরুতে গাজায় স্থল অভিযান শুরু করে ইসরাইল। এতে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ বাড়ি ধ্বংস করা হয়েছে। এদিকে রাতভর হামলায় কমপক্ষে ১১ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে এক নারী ও শিশু আছে। তারা বুরেজি শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা ছিলেন। এ খবর দিয়ে অনলাইন আল জাজিরা জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাদে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্য আইপিসি’র ঘোষণাকে সমর্থন করেছে। এতে বলা হয়েছে, গাজার দুর্ভিক্ষ মানুষ সৃষ্ট সংকট। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প গাজায় ইসরাইলের যুদ্ধ ও যুদ্ধ পরবর্তী পরিকল্পনা নিয়ে একটি নীতিগত বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন।

শিক্ষাবিদ লোরেনজো কামেল বলেছেন, ওই বৈঠকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক সমস্যার কোনো সামরিক সমাধান হতে পারে না। তবে তিনি বলেন, অস্ত্র, নিষেধাজ্ঞা আরোপ ইত্যাদির শর্তাবলীর বিষয়ে সামান্য পরিবর্তন হয়েছে। কামেল আরও বলেন, লেবাননের একটি বৃহৎ অংশ গাজার মতো পরিণতি ভোগ করতে যাচ্ছে। এর আগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প হিজবুল্লাহকে ধ্বংসের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই কথা বলেন তিনি। জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থার (ইউএনআরডব্লিউএ) তরফে বলা হয়েছে, ২২ মাসের যুদ্ধে তাদের একজন কর্মীকে গাজা থেকে ১৯ বার বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে। এক্সে এক পোস্ট দিয়ে সংস্থাটি জানিয়েছে, চলমান বোমা হামলায় অধিকাংশ মানুষ বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন। আরও বলা হয়েছে, মানুষ ক্ষুধার্ত এবং ক্লান্ত। এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/177512_Lima-1.webp

নেতানিয়াহু যেভাবে ইসরায়েলকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন by এরান ইয়াশিভ ও দানিয়েল সিদ্দন

ইতালির বর্তমান সরকার দেশটির ইতিহাসে অন্যতম ইসরায়েলপন্থী সরকার। তাই ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইডো ক্রোসেত্তোর সাম্প্রতিক বক্তব্য ইসরায়েলিদের, বিশেষ করে ইসরায়েল সরকারের ভেতরের মানুষদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে ধরা উচিত।

লা স্টাম্পা পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ক্রোসেত্তো সরাসরি ইসরায়েলের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই নিরীহ মানুষ মারার অজুহাত আর হতে পারে না। তিনি আরও যোগ করেন, ‘আমাদের এমন পদক্ষেপ নিতে হবে, যা নেতানিয়াহুকে সংঘাত থামাতে বাধ্য করবে।’ তাঁর মতে, ‘সে পদক্ষেপগুলো ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নয়; বরং নিজেদের জনগণকে এমন এক সরকার থেকে রক্ষা করার উপায়, যে সরকার ভালোমন্দ বিবেচনার বোধ ও মানবিকতা হারিয়ে ফেলেছে।’

ক্রোসেত্তোর এ বক্তব্য একদম সঠিক। গাজার যুদ্ধ শুধু ফিলিস্তিনিদের ওপর নয়; বরং ইসরায়েলের অর্থনীতি, গণতন্ত্র ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের ওপরও ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। যদি এখনই দিক পরিবর্তন না করা হয়, তাহলে নেতানিয়াহুর নীতি ইসরায়েলকে কয়েক দশকের জন্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একঘরে করে দিতে পারে।

জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তর গাজায় অনেক মানুষ (কমপক্ষে পাঁচ লাখ) এখন তীব্র খাবারের সংকটে ভুগছেন, যা একেবারে দুর্ভিক্ষের মতো পরিস্থিতি। ইসরায়েল জুলাই মাসে যে ‘মানবিক শহর’ বানানোর কথা বলেছিল, সেটা আসলে গাজাবাসীদের জোর করে সীমাবদ্ধ জায়গায় আটকে রাখার পরিকল্পনা। এরপর আগস্টে তারা গাজা সিটি দখল করে আরও মানুষকে জোর করে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এসব দেখে বোঝা যাচ্ছে, গাজার মানুষের অবস্থা আরও খারাপ হতে চলেছে।

নেতানিয়াহুর সরকার এ ধ্বংসাত্মক পথে এগিয়ে চলেছে। কারণ, তাঁর নিজের রাজনৈতিক মঞ্চে টিকে থাকা এ যুদ্ধের ওপর নির্ভর করছে। দুর্নীতির মামলাগুলোতে দুর্বল হয়ে পড়া নেতানিয়াহু ক্ষমতায় টিকে থাকতে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার পথ বেছে নিয়েছেন। এ মনোভাব তাঁর জোট সরকারের সবচেয়ে চরমপন্থী সদস্যদের প্রভাব বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ খোলাখুলি বলছেন, গাজা ও পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের বড় আকারে উচ্ছেদ করতে হবে। তাঁদের কাছে দুর্ভিক্ষ ও বাস্তুচ্যুতি অনিচ্ছাকৃত পরিণতি নয়; বরং এটি তাঁদের লক্ষ্য।

চলমান ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া শুধু নৈতিক বিপর্যয় নয়, এর গভীরতর প্রভাবও আছে। সম্প্রতি ২৪ জন শীর্ষস্থানীয় অর্থনীতিবিদ (যাঁদের মধ্যে ১১ জন নোবেলজয়ী) নেতানিয়াহুকে এক খোলাচিঠিতে বলেছেন, ইসরায়েল নিজের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি ডেকে আনছে।

গাজার মানুষদের বাঁচাতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দেশের অভ্যন্তরে প্রবল চাপের মুখে পড়া ইউরোপ চুপ থাকবে না। ইসরায়েলের ওপর ‘টার্গেটেড’ নিষেধাজ্ঞা আরোপের সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। এতে ইসরায়েলের সঙ্গে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ইসরায়েলের সমৃদ্ধিশালী প্রযুক্তি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা তহবিল বিপদের মুখে পড়বে।

এখনই ঋণমান হ্রাস শুরু হয়েছে, ঋণের সুদের হার বেড়ে যাচ্ছে এবং দক্ষ ইসরায়েলিরা বড় সংখ্যায় দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত কারণে এ খরচের কিছুটা বহন করতে চাইতে পারে, তবু এটা পরিষ্কার যে নেতানিয়াহুর নীতির কারণে ইসরায়েলের অর্থনীতি দীর্ঘ বছর ধরে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়ে পারবে না।

১৯৮২ সালে ইসরায়েল-লেবানন যুদ্ধের পরিণতির মতোই, গাজার ভয়াবহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করলে যুক্তরাষ্ট্রকে সম্ভবত অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার খরচ বহন করতে হবে।

প্রথমত, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজার মানুষের বেঁচে থাকার জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও চিকিৎসাসহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু গাজায় খাবারের পরিমাণ পাঠানো নয়; বরং মানুষের হাতে পৌঁছাচ্ছে কি না এবং কার্যকরভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না, সেটিই হবে এর মাপকাঠি।

দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলকে অবশ্যই গাজাবাসীর শিবিরে জোর করে স্থানান্তরের পরিকল্পনা বাদ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সশস্ত্র সংঘর্ষের সময়ও মৌলিক মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকার কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে হবে। সবশেষে ইসরায়েলকে একটি সত্যিকারের যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ নিতে হবে, যা জিম্মিদের মুক্তি এবং যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাবে।

পশ্চিমা দেশগুলোর উচিত এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়নের জন্য ইসরায়েলের ওপর কূটনীতি, অর্থনৈতিক পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা।

* এরান ইয়াশিভ তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক
* দানিয়েল সিদ্দন তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

ভারতকে মোকাবিলায় পাকিস্তান কেন নতুন রকেট কমান্ড গড়ল, এর বৈশিষ্ট্য কী

পাকিস্তানের ৭৮তম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ নতুন এক সামরিক কাঠামো ঘোষণা করলেন। তিনি বললেন, সেনাবাহিনীতে গড়ে তোলা হয়েছে আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড (এআরএফসি)। এটি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘সব দিক থেকে শত্রুকে আঘাত হানতে সক্ষম’।

১৩ আগস্ট ইসলামাবাদে এক অনুষ্ঠানে শরিফ বলেন, এ উদ্যোগ পাকিস্তানের প্রচলিত যুদ্ধক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

পাকিস্তানে ‘শত্রু’ বলতে মূলত বোঝানো হয় দেশটির প্রতিবেশী ও প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে। দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী। ওই ঘোষণার মাত্র এক সপ্তাহ পর ভারত বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ওডিশা থেকে ‘অগ্নি-৫’ মধ্যমপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এর পাল্লা ৫ হাজার কিলোমিটার (৩ হাজার ১০০ মাইল)।

যদিও বিশ্লেষকেরা বলছেন, পাকিস্তানের এআরএফসি গঠনের সঙ্গে ভারতের ওই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সরাসরি সম্পর্ক নেই।

তবে এআরএফসি গঠনের সিদ্ধান্ত এসেছে চলতি বছরের মে মাসে হওয়া পাকিস্তান-ভারতের টানা চার দিনের সংঘাতের পর। ওই সংঘাতে দুই দেশ একে অপরের সামরিক স্থাপনায় বিমান ও ড্রোন হামলা চালায় এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ লড়াই পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাকৌশলের কিছু দুর্বলতা প্রকাশ করেছে। প্রায় তিন দশক ধরে দেশটি মূলত পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর ভরসা করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। কিন্তু বাস্তবে কখন সেই অস্ত্রের ব্যবহার করবে, তা নিয়ে ছিল অস্পষ্ট অবস্থানে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, শুধু পাকিস্তানই নয়, বর্তমানকালের আধুনিক যুদ্ধ বা লড়াইয়ে বিশ্বব্যাপী ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের গুরুত্ব বাড়ছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ কিংবা ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে ইসরায়েলের সংঘাত এর বড় প্রমাণ।

এআরএফসি আসলে কী

প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ নতুন রকেট কমান্ড নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, এআরএফসি হচ্ছে সেনাবাহিনীর নতুন এক শাখা। এর মাধ্যমে প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রীভূত করা হবে। অর্থাৎ প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন, ব্যবহার, সংরক্ষণ—সব দায়িত্ব ছড়ানো–ছিটানো কমান্ডের পরিবর্তে একসঙ্গে একটি নতুন কমান্ডের হাতে আসবে।

পাকিস্তানের সামরিক কাঠামোয় পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ থাকে স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানস ডিভিশনের (এসপিডি) হাতে। আর কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে থাকে দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র নীতিনির্ধারণী সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি (এনসিএ)’।

এসপিডির সাবেক সেনাকর্মকর্তা নাঈম সালিকের মতে, এআরএফসি পারমাণবিক সক্ষমতার অস্ত্রব্যবস্থার পরিবর্তে মূলত প্রচলিত গাইডেড রকেটব্যবস্থা নিয়েই কাজ করবে।

‘প্রচলিত কামানের পাল্লা যেখানে মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ কিলোমিটার (১৯ থেকে ২২ মাইল), এআরএফসি সেখানে এমন গাইডেড রকেটের ওপর জোর দিচ্ছে, যেগুলো পুরোপুরি প্রচলিত ব্যবস্থা ও পারমাণবিক সক্ষমতাহীন’, বলেন নাঈম সালিক। বর্তমানে তিনি ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান স্ট্র্যাটেজিক ভিশন ইনস্টিটিউটের (এসভিআই) নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

নাঈম জানান, পারমাণবিক সক্ষমতাসম্পন্ন ব্যালিস্টিক এবং ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এখনো এসপিডি ও এনসিএর নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে। আর এআরএফসির তত্ত্বাবধান করবে সেনাবাহিনীর জেনারেল হেডকোয়ার্টার্স (জিএইচকিউ)।

অন্যদিকে, সাবেক ব্রিগেডিয়ার এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও পারমাণবিক নীতি–বিশেষজ্ঞ তুঘরাল ইয়ামিন বলেন, এআরএফসি গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তুতি ও কার্যকারিতা বাড়ানো—হোক সেটা প্রতিরোধ কৌশলের অংশ হিসেবে কিংবা সীমিত সংঘাতকালে ব্যবহারের লক্ষ্যে।

‘রকেট ফোর্স কমান্ডকে অবশ্যই আঞ্চলিক হুমকির পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। এটা কোনো আকস্মিক প্রতিক্রিয়া নয় যে শুধু একটি পরীক্ষা বা সীমিত সংঘর্ষের জবাবে গড়ে তোলা হয়েছে’, বলেন ইয়ামিন।

বর্তমানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নয়টি কোর রয়েছে। এর বাইরে রয়েছে তিনটি বিশেষায়িত কমান্ড—আকাশ প্রতিরক্ষা, সাইবার ও স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড (যা পারমাণবিক অস্ত্র পরিবহনের দায়িত্বে)।

এআরএফসির নেতৃত্ব দেবেন সেনাবাহিনীর একজন তিন তারকা জেনারেল, যা এর গুরুত্বকেই তুলে ধরছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে তিন তারকা জেনারেলদের হাতে সাধারণত কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোর ও দপ্তরের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়।

এআরএফসির প্রয়োজন কেন হলো

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এ নতুন সামরিক কাঠামো ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা বা মে মাসের সংঘাতের সরাসরি প্রতিক্রিয়া নয়; বরং বহুদিনের চিন্তাভাবনার ফল।

তুঘরাল ইয়ামিন মনে করেন, ভারতের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অবশ্যই পাকিস্তানকে সতর্ক করেছে। তবে রকেট কমান্ড আসলে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনারই অংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের আলবানি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ক্রিস্টোফার ক্ল্যারি বলেন, পাকিস্তান আগেই স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের দিকে ঝুঁকেছিল। তাঁর মতে, পারমাণবিক মিশন সামলাবে স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড, আর প্রচলিত হামলার দায়িত্ব হবে রকেট ফোর্সের।

ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (এএনইউ) শিক্ষক মনসুর আহমেদ বলেন, সব পারমাণবিক শক্তিধর দেশই যুদ্ধের প্রচলিত কৌশলগত বিকল্প তৈরি করেছে। তাই ভারতের বাড়তে থাকা পাল্টা আক্রমণক্ষমতার মুখে পাকিস্তানের এআরএফসি আসলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি পূরণ করছে।

মনসুর আহমেদ বলেন, পাকিস্তান বহু বছর ধরেই প্রচলিত পাল্টা আক্রমণক্ষমতা বাড়াচ্ছে। ভারতের ‘প্রথম হামলার কৌশল’ ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি পাকিস্তানকে জরুরিভিত্তিতে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। মে মাসের সংঘাতে ভারতের প্রচলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা পাকিস্তানের জন্য বড় শিক্ষা হয়ে গেছে।

‘মের সংঘাত শুধু প্রমাণ করেছে, ভারতের প্রচলিত ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মুখে পাকিস্তানের উদীয়মান কৌশলগত প্রচলিত শক্তিকে দ্রুত কার্যকর করার তীব্র প্রয়োজন রয়েছে’, বলেন আহমেদ।

এআরএফসির অধীন কোন ক্ষেপণাস্ত্র আসবে

পাকিস্তানের হাতে আছে নানা ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র। এগুলো স্থল থেকে স্থল, আকাশ থেকে স্থল ও স্থল থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআরএফসি মূলত স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র নিয়ন্ত্রণ করবে।

নাঈম সালিকের মতে, এআরএফসির হাতে বর্তমানে ফাতেহ-১ (পাল্লা সর্বোচ্চ ১৪০ কিমি) ও ফাতেহ-২ (২৫০–৪০০ কিমি) রকেট রয়েছে। মে মাসের সংঘাতে এগুলো ব্যবহারও করা হয়েছিল। এর পাশাপাশি হাতফ-১ ও আবদালি ক্ষেপণাস্ত্রও আছে। এগুলোর পাল্লা ৫০০ কিলোমিটারের কম।

মনসুর আহমেদ বলেন, নতুন কমান্ড পাকিস্তানকে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তুতে গভীরভাবে হামলা চালানোর সুযোগ দেবে, আবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারও করতে হবে না।

মনসুর আহমেদ আরও বলেন, ‘এআরএফসির মূল লক্ষ্য, বহু ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপব্যবস্থা ও নির্ভুল প্রচলিত আঘাতক্ষমতা গড়ে তোলা। এতে পাকিস্তানের ‘কুইড প্রো কো প্লাস’ কৌশল কার্যকর হবে; যা ভারতের প্রতিরোধ কৌশলের জবাব।’

পাকিস্তানের ‘কুইড প্রো কো প্লাস’ নীতি অনুযায়ী, ভারতের হামলার জবাব সমানুপাতে না দিয়ে আরও বড় বা অপ্রত্যাশিতভাবে দেওয়া হতে পারে। তবে সেটি এমনভাবে, যা সংঘাত জোরালো করার আশঙ্কা তৈরি করলেও পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি না করে।

মে মাসের সংঘাত থেকে পাওয়া শিক্ষা

ভারতের তরফে শুরু করা সংঘাতের প্রথম দিনই পাকিস্তান বলে, তারা ভারতের কয়েকটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ভারত প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে ক্ষয়ক্ষতির কথা মেনে নেয়, যদিও সংখ্যা জানায়নি।

ভারত পাল্টা হামলায় পাকিস্তানের গভীরে প্রবেশ করে বিমানঘাঁটি ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে। সিন্ধু প্রদেশের ভোলারি বিমানঘাঁটিতে তারা নিক্ষেপ করে রাশিয়ার সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি ব্রহ্মোস সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র।

চার দিন লড়াই চলার পর ১০ মে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান তাঁরা ‘শুধু সাময়িক বিরতি দিয়েছেন’। তিনি বলেন, ‘ভারত পারমাণবিক ব্ল্যাকমেল সহ্য করবে না। ভারত ‘‘সন্ত্রাসবাদে’’ সমর্থন দেয় এমন সরকার ও ‘‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’’র মধ্যে কোনো পার্থক্য করবে না।’

মনসুর আহমেদ বলেন, এআরএফসি গঠনের একটি উদ্দেশ্য হলো, ভারতের এ নতুন ধরনের প্রতিরোধকৌশল মোকাবিলা করা।

পারমাণবিক কৌশল আর রকেট ফোর্সের বাস্তবতা

দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষাকৌশলের মূল ভরসা ছিল কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র। এগুলো স্বল্পপাল্লার, কম ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক বোমা। আর বানানো হয়েছিল মূলত ভারতের বড় ধরনের সামরিক আগ্রাসন ঠেকানোর জন্য।

কিন্তু ২০২৫ সালের সংঘাত ছয় বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো দুই দেশকে পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যায়। এর আগেও ২০১৯ সালে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন ভারত দাবি করেছিল, সন্ত্রাসী শিবিরে হামলা চালাতে তাদের যুদ্ধবিমান পাকিস্তানের ভেতরে বোমা ফেলেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সাবেক পাকিস্তানি প্রতিরক্ষাবিশ্লেষক বলেন, ‘রকেট ফোর্স গঠনের মূল উদ্দেশ্য হলো, মে মাসের সংঘাতের সময় প্রকাশিত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠা।’

ওই সংঘাতে ভারতের ব্রহ্মোস ব্যবহার করার পরও পাকিস্তান বাবর ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে পাল্টা আঘাত করতে পারেনি। কারণ, বাবর শুধু পারমাণবিক মিশনের জন্য সংরক্ষিত এবং তা নিয়ন্ত্রণ করে এ মিশনের দায়িত্বে থাকা এসপিডি ও স্ট্র্যাটেজিক ফোর্সেস কমান্ড।

হাতফ-৭ নামেও পরিচিত বাবর স্থল থেকে ছোড়া একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এর পাল্লা ৭০০ কিলোমিটার (৪৩৫ মাইল) এবং এটি ২০১০ সাল থেকে সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। তবে এটি এখনো পাকিস্তানের পারমাণবিক নীতির সঙ্গে সংযুক্ত।

ওই বিশ্লেষক বলেন, ‘নতুন রকেট ফোর্স গঠন আসলে দেখিয়ে দিল, পাকিস্তানের শুধু পারমাণবিক অস্ত্রনির্ভর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। ২০১৯ আর ২০২৫ সালের সংঘাত প্রমাণ করেছে, ভারত নানা উপায়ে পাকিস্তানের এ প্রতিরোধব্যবস্থা এড়িয়ে গেছে। তাই এখন প্রচলিত আগ্নেয়াস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রই জরুরি।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-27%2F10be0b62%2FShaheen1.avif?rect=1%2C0%2C504%2C336&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
‘পাকিস্তান দিবস’–এর সামরিক শোভাযাত্রায় ইসলামাবাদে একটি শাহীন-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন কয়েকজন সেনাসদস্য। ফাইল ছবি: রয়টার্স