Showing posts with label প্রবাসী বাঙালি. Show all posts
Showing posts with label প্রবাসী বাঙালি. Show all posts

Saturday, February 7, 2026

বৃটেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোট নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে?

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে চা-কফির আড্ডা থেকে শুরু করে মসজিদের বাইরে- সবখানেই চলছে আলোচনা। দীর্ঘদিন পর প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ভোট দেয়ার সুযোগ পাওয়ায় আগ্রহ বাড়লেও তাদের মধ্যে সংশয় ও অনিশ্চয়তাও রয়েছে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচন শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর প্রথম জাতীয় ভোট এবং প্রায় দুই দশকের মধ্যে প্রথম নির্বাচন। যেখানে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে আয়োজিত এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারছে না।

প্রথমবারের মতো বিদেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিরা প্রবাসে থেকে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলেও বাস্তবে অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম। নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারের সংখ্যা ৭০ লাখের বেশি। যা মোট ভোটারের প্রায় ৫ শতাংশ।

তবে যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিপুল বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর তুলনায় নিবন্ধিত ভোটার সংখ্যা খুবই কম। মাত্র ৩২ হাজার বা তার কিছু বেশি। অথচ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে বাংলাদেশি বা বৃটিশ বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় সাড়ে ছয় লাখ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকত্ব, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকা, জটিল ডিজিটাল নিবন্ধন প্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক অনাস্থাই এর প্রধান কারণ।

বয়স্ক ও সদ্য প্রবাসে আসা বাংলাদেশিরা ভোট নিয়ে বেশি আগ্রহী হলেও, যুক্তরাজ্যে জন্ম নেয়া বা বেড়ে ওঠা তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদাসীনতা লক্ষণীয়। অনেক তরুণ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতি তাদের দৈনন্দিন জীবনে তেমন প্রভাব ফেলে না, বরং যুক্তরাজ্যের রাজনীতিই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে, যারা মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন ও বিতর্কিত নির্বাচন দেখেছেন, তাদের কাছে এই নির্বাচন স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িত।

ভোট দিতে জাতীয় পরিচয়পত্র, বায়োমেট্রিক নিবন্ধন এবং মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন- এই দীর্ঘ প্রক্রিয়া অনেককে নিরুৎসাহিত করেছে। কেউ কেউ শেষ মুহূর্তে আবেদন করে সময়মতো কাগজপত্র না পাওয়ায় ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

এ ছাড়া কেউ কেউ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভোট বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর প্রভাব বৃটেনেও স্পষ্ট। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘদিনের লন্ডনবাস এবং আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বৃটিশ এমপি টিউলিপ সিদ্দিককে ঘিরে বিতর্ক প্রবাসী সমাজে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

এ ছাড়া যুক্তরাজ্যের স্থানীয় রাজনীতিবিদদের বাংলাদেশি নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে দ্বৈত নাগরিকত্ব ও দায়বদ্ধতা নিয়ে।

অনেকের কাছে এই নির্বাচন দীর্ঘ অপেক্ষার পর একটি আশার আলো। আবার কারও কাছে এটি এখনো অনিশ্চিত ভবিষ্যতের প্রতিচ্ছবি। এক প্রবাসীর কথায়, এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশ আমাদের শিকড়। কিন্তু সত্যিকারের পরিবর্তন হবে কি না- সেটাই বড় প্রশ্ন।

সব মিলিয়ে, বৃটেনে বসবাসরত বাংলাদেশিরা সরাসরি সংখ্যায় খুব বড় প্রভাব না ফেললেও, কাছাকাছি লড়াইয়ের আসনে তাদের ভোট ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে তার চেয়েও বড় বিষয়- এই ভোট প্রবাসীদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্বীকৃতির দাবি পূরণের একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ।

(মূল ইংরেজি প্রতিবেদন থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

mzamin

Thursday, January 29, 2026

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বড় অংশ অতিদরিদ্র

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির একটি বড় অংশ বর্তমানে অতি দারিদ্র্য বলে জানিয়েছে দেশটির প্রভাবশালী গবেষণা সংস্থা জোসেফ রাউনট্রি ফাউন্ডেশন (জেআরএফ)। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যের দারিদ্রতা আগের তুলনায় আরও গভীর হয়েছে। বর্তমানে দেশটিতে ৬৮ লাখ মানুষ অতিদরিদ্রতার মধ্যে বসবাস করছেন। যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

এতে বলা হয়, জেআরএফ-এর তথ্যানুযায়ী যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মধ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা দারিদ্র্যের সবচেয়ে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। কম আয়ের চাকরি, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে তাদের বড় অংশ ‘অতিদরিদ্র’ অবস্থায় বসবাস করছে।

সংস্থাটি বলছে, ‘অতি দারিদ্র্য’ বলতে আবাসন ব্যয় বাদ দেয়ার পর যেসব পরিবারের আয় যুক্তরাজ্যের মধ্যম আয়ের ৪০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তাদের বোঝানো হয়। বর্তমানে বৃটেনে প্রায় ৬৮ লাখ মানুষ এই ক্যাটাগরিতে রয়েছেন। যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সংস্থাটি বলেছে, দারিদ্রতার সবচেয়ে বড় শিকার শিশুরা। এরপর রয়েছেন শারীরিক প্রতিবন্ধীরা। অপরদিকে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের মধ্যে দারিদ্রতার হার খুবই বেশি।

এছাড়া শিশু দারিদ্রতার হারও বেড়েছে। বর্তমানে প্রায় ৪৫ লাখ শিশু দারিদ্রতার মধ্যে বড় হচ্ছে। গত তিন বছর টানা দরিদ্র শিশুর সংখ্যা বেড়েছে। ২০১৭ সালে বৃটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল নিম্নআয়ের যেসব পরিবার দুই সন্তানের বেশি সন্তান নেবে তারা সরকারি সামাজিক সুরক্ষা সহায়তা পাবে না। তবে গত এপ্রিলে এই নিয়ম বাতিল করেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী রাখায়েল রিভিস।

mzamin

Monday, January 19, 2026

পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক যেসব ঝুঁকি তৈরি করছে by মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার

প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের জন্য একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি। তবে সম্প্রতি একটি ভাইরাল ভিডিও নতুন এই ব্যবস্থাকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। প্রথম আলো (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) জানায়, বাহরাইনের ঠিকানাসংবলিত বহু পোস্টাল ব্যালট এক বাসায় গণনা করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে ফেসবুকে না ছড়ানোর অনুরোধও শোনা যায়।

এরপর লন্ডনভিত্তিক আল–জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে আরও দুটি ভিডিও পোস্ট করেন। সেখানে দেখা যায়, সৌদি আরব ও কুয়েতেও একই ধরনের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে; কিছু ব্যালট অন্যের কাছে পাওয়া নিয়ে প্রবাসী শ্রমিকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, এসব ভিডিওও ফেক বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নয়।

ঘটনাটি নির্বাচন কমিশনের নজরে এসেছে এবং তদন্ত চলছে। তবে বাস্তবতা হলো, ভোট শুধু গণনার প্রক্রিয়া নয়; ভোট একই সঙ্গে জন–আস্থার প্রতীক। তাই বাহরাইনের ঘটনাটি একক ভিডিও হয়ে শুরু হলেও দ্রুতই এটি প্রবাসী ভোটব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।

প্রবাসী ভোটিং আসলে কীভাবে হচ্ছে?

অনেকেই মনে করেন, প্রবাসীরা দূতাবাসে গিয়ে ভোট দেন এবং দূতাবাস তা দেশে পাঠায়। বাস্তবে বাংলাদেশে প্রবাসী ভোটদান বর্তমানে দূতাবাসভিত্তিক শারীরিক ভোট নয়; এটি ডাকযোগে ভোটদান পদ্ধতি।

নির্বাচন কমিশনের অফিশিয়াল ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপটি মূলত নিবন্ধন ও ব্যালট ট্র্যাকিংয়ের জন্য। অর্থাৎ প্রক্রিয়াটি মূলত এমন: প্রবাসী ভোটার অ্যাপে নিবন্ধন/এনরোলমেন্ট করলে ডাকযোগে ব্যালট ভোটারের বিদেশি ঠিকানায় যায়। ভোটার ব্যালটে ভোট দিয়ে সেটি আবার ডাকযোগে বাংলাদেশে ফেরত পাঠান।

এই প্রক্রিয়ায় দূতাবাস বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতাকারী—এমন নির্দেশনা কমিশনের নথিতে নেই; বরং পুরো ব্যবস্থার নির্ভরতা ডাকব্যবস্থা ও ঠিকানার নির্ভুলতার ওপর।

ঠিকানার বাস্তবতা

ভাইরাল হওয়া ভিডিওগুলোকে আমাদের সংবেদনশীলভাবে বিচার করতে হবে। শ্রমঘন দেশগুলোয় বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে, অনেক শ্রমিক একই বাসা, ফ্ল্যাট বা ক্যাম্পে বসবাস করেন। ফলে একই ঠিকানা একাধিক মানুষের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

আবার মালয়েশিয়ার মতো দেশে অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক অনিয়মিত অবস্থায় থাকায় স্থায়ী ঠিকানা, বৈধ ভাড়া চুক্তি বা নিয়মিত পোস্টাল–সুবিধা অনেক সময়ই তাঁদের থাকে না। সে কারণে কারও সহকর্মী বা পরিচিত ব্যক্তির ঠিকানা ‘কমন অ্যাড্রেস’ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার ঘটনাও দেখা যায়।

নির্বাচন কমিশন অ্যাপে ঠিকানা পূরণের ক্ষেত্রে সতর্ক করেছে; বর্তমানে অবস্থানরত ঠিকানা দিতে হবে, রাস্তা-বিল্ডিং-ব্লক/এলাকা স্পষ্টভাবে লিখতে হবে এবং পোস্টাল/জিপ কোড নির্ভুল রাখতে হবে।

কিন্তু বাস্তবে অনেক অভিবাসী শ্রমিক স্বল্পশিক্ষিত হওয়ায় ইংরেজিতে ঠিকানা লেখা, পোস্টাল কোড বোঝা কিংবা কোন ঠিকানাটি ব্যবহার করা উচিত—এসব বিষয়ে বিভ্রান্ত হন। এই সীমাবদ্ধতার সুযোগে দেশে কিছু অনানুষ্ঠানিক ‘সেন্টার’ বা ‘তৃতীয় পক্ষ’ গড়ে ওঠে, যারা শ্রমিকদের হয়ে অনলাইনে আবেদন বা অ্যাপ ফিলআপ (পূরণ) করে দেয়।

এতে কিছু সুবিধা মিললেও বড় ঝুঁকি তৈরি হয়; ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা এবং ভোটসংক্রান্ত পুরো প্রক্রিয়া অল্প কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়তে পারে। তখন প্রশ্ন ওঠে, এই ব্যবস্থায় যে অনৈতিক প্রভাব পড়বে না, তার নিশ্চয়তা কে দেবে?

এই পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব, কুয়েত ও বাহরাইনের ঘটনায় প্রথমেই খতিয়ে দেখতে হবে; একটি বাসায় অনেক পোস্টাল ব্যালট পাওয়ার পেছনে ঠিকানা-সংক্রান্ত বাস্তবতা কাজ করেছে, নাকি অন্য কোনো অনিয়ম রয়েছে?

তবে ঠিকানার যুক্তি দেখিয়ে বিষয়টি পাশ কাটানোও ঠিক হবে না। কারণ, একই জায়গায় ব্যালট পাঠানো স্বাভাবিক হলেও একটি ব্যক্তিগত বাসায় এতগুলো ব্যালট একসঙ্গে জমা হওয়া বা গণনা হওয়া অস্বাভাবিক।

এখানেই তদন্তের মূল বিষয় এবং এখান থেকেই আস্থার সংকট তৈরি হয়। একই সঙ্গে ভোট ডাকযোগে দেশে পৌঁছানোর পর স্থানীয় পোস্ট অফিসসহ মধ্যবর্তী পর্যায়ে অনিয়ম হবে না—এই নিশ্চয়তাও জনমনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ভোট নিয়ে আমাদের সমাজ-মনস্তত্ত্ব

বাংলাদেশি সমাজ ভোটের প্রশ্নে অত্যন্ত সংবেদনশীল। ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, ভোটের অধিকার এখানে মানুষ কেবল রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, ব্যক্তিগত সম্মান হিসেবেও দেখে। তাই ভোটসংক্রান্ত সন্দেহ মানুষের মধ্যে খুব দ্রুত ছড়ায়। এই সন্দেহপ্রবণতা কোনো ব্যক্তিগত দোষ নয়; এটি বহু রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থেকে গড়ে ওঠা একটি জাতীয় মনস্তত্ত্ব।

এখানে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কথাও মনে রাখতে হবে। সেই আন্দোলনের পেছনে অন্যতম বড় বাস্তবতা ছিল, জনগণের ভোটাধিকার দীর্ঘদিন কার্যকরভাবে সীমিত হয়ে পড়া এবং নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা বদলের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়া। ফলে ভোট নিয়ে মানুষের আবেগ আরও তীব্র হয়েছে এবং ভোট–সম্পর্কিত যেকোনো ঘটনা এখন সহজেই বড় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার ইকোনমি অ্যান্ড সোসাইটি বইতে বলেছেন, রাষ্ট্র টিকে থাকে বৈধতার ওপর; বৈধতা দুর্বল হলে শাসন ও প্রতিষ্ঠান প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অতএব, ভোটপ্রক্রিয়ায় সন্দেহ তৈরি হলে সেই বৈধতাই ক্ষতিগ্রস্ত হবে—এ কারণেই একটি ভিডিও এত বড় রাজনৈতিক আলোড়ন তৈরি করতে পারে।

অন্যান্য দেশের ব্যবস্থা

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়—প্রবাসী ভোটিং কেবল প্রযুক্তির বিষয় নয়; সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ভোটের গোপনীয়তা ও ‘চেইন অব কাস্টডি’ (ভোট কাগজটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কার কার হাতে গেল) কীভাবে সুরক্ষিত করা হচ্ছে।

ফিলিপাইন

ফিলিপাইনের অভিজ্ঞতা দেখায়—প্রবাসীদের ভোট কেবল একটি নির্বাচনপ্রক্রিয়া নয়; এটি প্রবাসীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তির একটি শক্ত কাঠামো। এ উদ্দেশ্যে ফিলিপাইন ২০০৩ সালে ‘বিদেশে অবস্থানরত ভোটার আইন’ বা রিপাবলিক অ্যাক্ট ৯১৮৯ প্রণয়ন করে, যার মাধ্যমে বিদেশে থাকা নাগরিকদের ভোটদানের একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি হয়।

পরবর্তী সময়ে এই কাঠামো আরও দৃঢ় হয়, কারণ রিপাবলিক অ্যাক্ট ৯১৮৯ সংশোধন করে ২০১৩ সালে রিপাবলিক অ্যাক্ট ১০৫৯০ প্রণয়ন করা হয়, যা ওভারসিস ভোটিং ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করে। (সূত্র: সিনেট ইলেকটোরাল ট্রাইব্যুনাল ও জুডিশিয়ারি ই-লাইব্রেরি, ফিলিপাইনস)

এই আইনের অধীনে বিদেশে থাকা ফিলিপাইন নাগরিকেরা নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রবাসী ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করতে পারেন এবং সাধারণভাবে ভোট প্রদান হয় সংশ্লিষ্ট দূতাবাস/কনস্যুলেট পরিচালিত ওভারসিস ভোটিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। (সূত্র: ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্স, ফিলিপাইনস)

ফিলিপাইনের প্রবাসী ভোটব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো ভোটার উপস্থিতি (টার্নআউট) কম। সাম্প্রতিক সময়ে ডিজিটাল/ইন্টারনেটভিত্তিক ভোটের দিকে অগ্রসর হওয়ায় প্রবাসী ভোটিং আরও সহজ হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ভোট জালিয়াতি’ জাতীয় অভিযোগ ও সন্দেহও বেড়েছে। (সূত্র: এএফপি ফ্যাক্টচেক, ৪ মে ২০২৫)

ফিলিপাইন নির্বাচন কমিশন (কমেলেক) বিভিন্ন সময় ‘অনলাইন ভোটে কারচুপি’ জাতীয় অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করলেও বাস্তবতা হলো ডিজিটাল ভোটিং নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হওয়ামাত্রই নির্বাচন প্রক্রিয়ার বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়ে (সূত্র: ফিলিপাইন ডেইলি ইনকোয়ারার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৫)

মেক্সিকো

মেক্সিকোতে প্রবাসী ভোটিংকে জাতীয় বৈধতা ও নাগরিকত্বের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখা হয়; রাষ্ট্র তার নাগরিকদের শুধু ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ করে রাখতে চায় না। মেক্সিকোর উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তারা প্রবাসী ভোটকে একক পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ না রেখে ধাপে ধাপে বহু মাধ্যমভিত্তিক (ডাকযোগে, দূরবর্তী পদ্ধতি এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে দূতাবাস/কনস্যুলেট) ভোটিং ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হয়েছে।

বিদেশে থাকা মেক্সিকানদের ভোটার নিবন্ধন ও ব্যবস্থাপনা করে দেশটির ন্যাশনাল ইলেকটোরাল ইনস্টিটিউট (আইএনই) এবং নির্দিষ্ট নির্বাচনে প্রবাসীরা বিভিন্ন মাধ্যমে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। (সূত্র: সেক্রেতারিয়া দে রেলাসিওনেস এক্সতেরিওরেস, মেক্সিকো)

তবে এসিই ইলেকটোরাল নলেজ নেটওয়ার্ক/প্রজেক্ট ২০২৫ রিপোর্ট এবং ইউএনএএম-এর নর্থ আমেরিকা গবেষণা কেন্দ্রের (সিসান) ২০২৫ বিশ্লেষণ ইঙ্গিত দেয়, মেক্সিকোর প্রবাসী ভোট চালুর প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন বিতর্কের মধ্য দিয়ে গেছে এবং শুরুতে ডাকযোগে ভোটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ছিল।

ডাকযোগে ব্যালট পৌঁছানো–ফেরত পাঠানো, ঠিকানা ও ডেলিভারি জটিলতা এবং কিছু কড়াকড়ি শর্ত প্রবাসীদের অংশগ্রহণকে সীমিত করেছে। ফলে ভোটাধিকার থাকলেও বাস্তবে ভোটার উপস্থিতি প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি।

শ্রীলঙ্কা

শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতাও শিক্ষণীয়। দেশটি এখনো প্রবাসী ভোটাধিকার নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, তারা শুধু প্রযুক্তিগত বা আইনগত দিক নয়, এই সিদ্ধান্ত সমাজে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে, রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াবে কি না এবং নির্বাচনপ্রক্রিয়ার ওপর জন–আস্থা কীভাবে প্রভাবিত হবে—এসব বিষয়ও গভীরভাবে বিবেচনা করছে। ফলে প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেও শ্রীলঙ্কা তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নিয়েছে এবং প্রবাসী ভোটিং চালুর ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত নিতে সময় নিচ্ছে।

শেষ কথা

ফিলিপাইন, মেক্সিকো বা শ্রীলঙ্কা অভিজ্ঞতা বলে, প্রবাসী ভোটব্যবস্থা প্রযুক্তি দিয়ে নয়, আস্থা দিয়ে টিকে থাকে। বাংলাদেশে এটি নতুন উদ্যোগ। কিন্তু ভোট নিয়ে আমাদের সমাজ অত্যন্ত সংবেদনশীল; শুরুতেই যদি প্রবাসী ভোট কারচুপির সন্দেহে আক্রান্ত হয়, তবে এ ব্যবস্থাটি প্রশ্নের মুখে পড়বে।

এটি শুধু রাজনৈতিক ইস্যু নয়, এর বড় অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি আছে। রেমিট্যান্স ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি দুর্বল হবে। ভোট নিয়ে সন্দেহে বিদেশে শ্রমিকদের পারস্পরিক বন্ধন ভেঙে গেলে সংঘাত বাড়বে আর নিয়োগদাতা দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে লোক নেওয়া নিয়েও নতুন করে ভাবতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং প্রবাসী নেতৃত্ব—সবার দায়িত্ব হলো এই ব্যবস্থাকে কারচুপি-অনিয়ম থেকে রক্ষা করা।

* মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার, শিক্ষক ও গবেষক, রাষ্ট্র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়

পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্ক যেসব ঝুঁকি তৈরি করছে

Friday, February 21, 2025

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত, শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা by আরিফ মাহফুজ

কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই লন্ডনে পালিত হয়েছে ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।  বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন থাকার কারণে লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে অবস্থিত কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এবার বড় ধরনের কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

২১শে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে টাওয়ার হ্যামলেটস্ কাউন্সিলের নির্বাহী মেয়র ও বাংলাদেশের হাইকমিশনার আবিদা ইসলাম পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর ক্রমান্বয়ে শ্রদ্ধা জানান যুক্তরাজ্য বিএনপি এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ সহ সকল রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও সাংবাদিকদের সংগঠন। সাধারণ মানুষও একক ভাবে শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসেন, তবে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি, মন্ত্রী কেউ শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসেননি। শুধু মাত্র সিলেটের সাবেক মেয়র ও যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ নেতা আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী শহীদ মিনারে এসেছিলেন তবে আওয়ামীলীগের ব্যানারে নয়।  

যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ যখন পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তখন আনোয়ারুজ্জামানকে দেখা যায়নি। একই সময় একটি সামাজিক সংগঠনের ভিড়ে তাকে এক ঝলক দেখা যায়, পরবর্তীতে শহীদ মিনারের সামনে কয়েকজন সঙ্গীসহ তাকে দেখা যায়, তার হাতে ছিল তার নাম সম্বলিত একটি পুষ্পস্তবক। আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে গেলে, বিএনপি কর্মীরা ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে শুরু করেন। এসময়  তিনি গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে গেলে, নিরাপত্তা কর্মীরা তাকে বাধা দেন। দ্রুত তাকে শহীদ মিনার ছাড়তে দেখা যায়। এসময় আওয়ামী লীগ কর্মীরাও উত্তেজনার সৃষ্টি করে।  পরে নিরাপত্তা কর্মীদের সহযোগিতায় তারা এলাকা ত্যাগ করেন।

পূর্ব লন্ডনের আলতাব আলী পার্কে অবস্থিত শহীদ মিনারে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের অন্তত পাঁচ শতাধিক কর্মী জড়ো হন। বিএনপি, আওয়ামী লীগ ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।

৫ আগস্টের পরে দেশত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে আশ্রয় নেয়া নেতারা হলেন, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য, সদ্য বিলুপ্ত সংসদ ও মন্ত্রিসভার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ও ফরিদপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান, সাবেক বৈদেশিক কল্যাণ ও শ্রম প্রতিমন্ত্রী ও সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান, সুনামগঞ্জ ১ আসনের সাবেক সাংসদ রণজিৎ সরকার, সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা বিধান চন্দ্র দাস, সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার সহ আরো অনেকে।  তারা কেউই ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে শহীদ মিনারে আসেননি।

mzamin

Saturday, January 18, 2025

ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইয়ের নেতৃত্বে প্রবাসীরা by এম এম মাসুদ

ঋণে জর্জরিত দেশ। ব্যাংকগুলো ফাঁকা। রিজার্ভ তলানিতে। মূল্যস্ফীতি হু হু করে বাড়ছে। অর্থনৈতিক এমন দৈন্যদশায় কুলহারা সংশ্লিষ্টরা। একের পর এক সিদ্ধান্ত নিয়েও অর্থনীতিকে তার গতিপথে ফিরিয়ে আনা যাচ্ছিল না। বলতে গেলে বাংলাদেশ ফোকলা করে পালিয়ে যান পতিত শেখ হাসিনার সরকার। দেশের এমন দুরবস্থার মধ্যেই দেশের হাল ধরেন ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু পতিত আওয়ামী লীগের আমলের পাহাড়সম দুর্নীতি, ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট-পাচার, আর্থিক খাতে ঋণ কেলেঙ্কারি সহ বিভিন্ন কারণে খাদের কিনারে চলে যাওয়া অর্থনীতিকে টেনে ধরবে কীভাবে? অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে কি এমন জাদুর কাঠি আছে যে, দ্রুত তার সমাধান এনে দেবে? তবে হ্যাঁ, এ সময় এগিয়ে আসে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা। ধীরে ধীরে রেমিট্যান্স যোদ্ধারা দুই হাত মেলে ধরায় অর্থনীতি চাঙ্গা না হলেও ধস থমকে দাঁড়ায়। অর্থনীতির গতি ফেরাতে শক্ত হাতে হাল ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। চালু করেন সুশাসন। বন্ধ হয়ে যায় অর্থ পাচার। আর এতে চালিকা শক্তি হিসেবে কাজ করেছে অর্থনীতির অন্যতম সূচক রেমিট্যান্স। এ ছাড়া আরেক সূচক রপ্তানি খাতও সঙ্গ দেয় এতে।

বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে: পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে রপ্তানি ও আমদানির মধ্যে ব্যবধান বা বাণিজ্য ঘাটতি গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। রপ্তানি আয়ের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ও আমদানি প্রবৃদ্ধি কমায় বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর শেষে বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৭.৮৮ বিলিয়ন ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৯.৮৬ বিলিয়ন ডলার। পাঁচ মাসে দেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০.১ শতাংশ, আর আমদানি কমেছে ১.২ শতাংশ। আমদানি প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার কমে যাওয়া এবং রপ্তানি আয় প্রায় ১.৬৬ বিলিয়ন বেড়ে যাওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি কমেছে।

রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রপ্তানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি থাকায় চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে দেশের বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্য হিসেবে পরিচিত ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি ৪৯.৫ শতাংশ কমে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ব্যালান্স অব পেমেন্টের সার্বিক ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২.৪৭ বিলিয়ন ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২.৪৩ বিলিয়ন ডলার কম।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘাটতি হ্রাস হওয়া দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। এই অর্জনে রপ্তানি ও রেমিট্যান্স মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কারণ, বৈদেশিক ঋণ বা অনুদানের মতো উপাদানগুলোতে আমরা তেমন প্রবৃদ্ধি দেখিনি। তাছাড়া এই ঘাটতি কমেছে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার আয় থেকে। এটা ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়াবে না।
আর্থিক হিসাবে ঘাটতি কমেছে: ওভারডিউ রপ্তানি আয় দেশে আসায় এবং স্বল্পমেয়াদি লোনের বহিঃপ্রবাহ কমার কারণে চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের আরেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান আর্থিক হিসাবে ঘাটতিও কমেছে। এ সময়ে আর্থিক হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৮১ মিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮১১ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ চলতি অর্থবছরে এই ঘাটতি প্রায় ২৩০ মিলিয়ন ডলার কমেছে।
ঊর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্স: এদিকে ঊর্ধ্বমুখী রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর ভর করে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে দেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের অন্যতম উপাদান চলতি হিসাবে ঘাটতি আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯৪ শতাংশ কমেছে। নভেম্বর শেষে দেশের চলতি হিসাবে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২২৬ মিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩.৯৪ বিলিয়ন ডলার। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছে ১১.১৪ বিলিয়ন ডলার। গত বছরের এই পাঁচ মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ৮.৮১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২.৩৩ বিলিয়ন ডলার বা ২৬ শতাংশ। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, মূলত রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হওয়ার কারণে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমে এসেছে। গত কয়েক বছর ধরে চলতি হিসাবের ঘাটতি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছিল। এই ঘাটতিটা কমিয়ে আনা পুরো অর্থনীতির জন্য খুব ভালো দিক।
রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে: অর্থনীতির আলোচিত সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের ঘরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি বিপিএম-৬ (ব্যালেন্স অব পেমেন্ট অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন) হিসাবে ৮ই জানুয়ারি বাংলাদেশের রিজার্ভ ছিল ২১.৬৭ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ২৬.৫৭ বিলিয়ন ডলার। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) ১.৬৭ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ নেমেছে ২০ বিলিয়ন ডলারে। গ্রস হিসাবে দাঁড়িয়েছে ২৪.৯ বিলিয়ন ডলারে। নভেম্বরের শেষদিকে দেশের নিট রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ১৮ কোটি ডলার ও গ্রস রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ৪৯৭ কোটি ডলার। ফলে এক মাসের ব্যবধানে অর্থাৎ ডিসেম্বরে দেশের নিট রিজার্ভ বেড়েছে ২৬২ কোটি ডলার ও গ্রস রিজার্ভ বেড়েছে ১৭৪ কোটি ডলার। গত ৫ই আগস্ট সরকার পরিবর্তনের সময় ঋণ ছিল ৩৭০ কোটি ডলারের উপরে। এর মধ্যে গত ৫ মাসে ৩৩০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। এই ঋণ পরিশোধের পরও রিজার্ভ বেড়েছে। রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাড়ায় সূচক বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক হুসনে আরা শিখা বলেন, প্রতি বারই আক’ুর বিল শোধের পর রিজার্ভ কমে আসে। তবে উদ্বেগের কিছু নেই। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গতি বেশ ভালো। রপ্তানি আয়ও বাড়ছে। রিজার্ভ আবার বাড়বে।
রপ্তানি আয়: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলেছে, এই ছয় মাসে পণ্য রপ্তানি থেকে মোট আয় হয়েছে ২৪.৫৩ বিলিয়ন ডলার। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি।
মূল্যস্ফীতি চ্যালেঞ্জ: বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে বড় চ্যালেঞ্জের একটি মূল্যস্ফীতি। দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চমূল্যে স্থির নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম। এক বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে দেশের মানুষ। কিন্তু মানুষের আয় সেভাবে বাড়েনি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ ২০২৪ সালে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০.৩৪ শতাংশ। ডিসেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ১০.৮৯ শতাংশ। আর খাদ্যে হয়েছে ১১.৯২ শতাংশ। গত জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪.১০ শতাংশে উঠেছিল, যা ছিল সাড়ে ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অন্যদিকে ২০২৪ সালের ১২ মাসের মধ্যে প্রথম আট মাস মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৭ শতাংশের ঘরে। শেষ চার মাস ৮ শতাংশের উপরে ছিল এই হার।

mzamin

Monday, December 9, 2024

লন্ডনে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সমাবেশে সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-সংসদ সদস্যরা by সাইদুল ইসলাম

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সমাবেশের দর্শকসারিতে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্যকে দেখা গেছে। সেখানে সাবেক এক মন্ত্রিপরিষদ সচিবকেও দেখা গেছে।

সমাবেশের দর্শকসারিতে যাঁদের বসে থাকতে দেখা গেছে, তাঁদের মধ্যে আছেন সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুর রহমান, সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব এবং সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব কবির বিন আনোয়ার।

গতকাল পূর্ব লন্ডনের ইম্প্রেসন ভেন্যু হলে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের আয়োজনে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সমাবেশ হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর লন্ডনের এই সমাবেশে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দেখা গেল আব্দুর রহমান, শফিকুর রহমান চৌধুরী, হাবিবুর রহমান হাবিব ও কবির বিন আনোয়ারকে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান ফরিদপুর ১ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন। শফিকুর রহমান চৌধুরী সিলেট ২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য। হাবিবুর রহমান হাবিব সিলেট ৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য।

জনপ্রশাসনের প্রভাবশালী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত ছিলেন কবির বিন আনোয়ার। গত বছরের জানুয়ারিতে তিনি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের পদ থেকে অবসরে যান। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। তিনি ভারতে অবস্থান করছেন।

সরকার পতনের পর আওয়ামী লীগের বেশির ভাগ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, নেতা-কর্মী আত্মগোপনে চলে যান। অনেকে দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে গতকাল লন্ডনে উল্লিখিত চারজনকে দেখা গেল। দেশে তাঁদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১ অক্টোবর কবির বিন আনোয়ার ও তাঁর স্ত্রী তৌফিকা আহমেদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সমাবেশের দর্শকসারিতে সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুর রহমান (সারির সামনে)।
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে শেখ হাসিনার ভার্চ্যুয়াল সমাবেশের দর্শকসারিতে সাবেক মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আব্দুর রহমান (সারির সামনে)। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাজ্যের লন্ডনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সমাবেশের দর্শকসারিতে সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী (সারির সামনে)
যুক্তরাজ্যের লন্ডনে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল সমাবেশের দর্শকসারিতে সাবেক প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী (সারির সামনে) ছবি: সংগৃহীত

Thursday, December 5, 2024

বৃটেন নিয়ে অস্বস্তি, লন্ডনে বক্তৃতা করবেন হাসিনা: দূতকে ডাকলেন উপদেষ্টা by মিজানুর রহমান

ভারতের সঙ্গে টানাপড়েনের মধ্যে নতুন করে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে বৃটেনকে নিয়ে। বৃটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে দেশটির অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপ। যদিও পার্লামেন্টে দেয়া বক্তব্যে অনেক অসত্য তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে প্রতিবাদ করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা বাংলাদেশ সরকার। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, বৃটেনকে নিয়ে অস্বস্তির দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে দেশটিতে অবস্থান করা আওয়ামী সমর্থকদের তৎপরতা। তারা লন্ডনে একটি বড়সড় সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে। আগামী ৮ই ডিসেম্বর সেই সমাবেশ হবে। যেখানে হাজারো নেতাকর্মীর উপস্থিতির চেষ্টা চলছে। অনুষ্ঠানের আয়োজক যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনাকে ‘প্রধানমন্ত্রী’ দাবি করে তারা ওই আয়োজনের একটি পোস্টার করেছে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে হাসিনা বক্তব্য রাখবেন বলে প্রচার চালাচ্ছে। যদিও ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন শেখ হাসিনা। খোদ আশ্রয়দাতা ভারতই তাকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ট্রিট করছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, ওই সমাবেশে শেখ হাসিনাকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত করার চেষ্টা করছেন আয়োজকরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সমাবেশটি হবে কিনা? বা তিনি আদৌ বক্তৃতা করবেন কিনা? তা নিয়ে এখনো যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। ওই আয়োজনের ভেন্যু হিসেবে আপাতত ইস্ট লন্ডনের ইম্প্রেশন হল ঠিক হয়েছে। সেই সমাবেশ থেকে প্রবাসী সরকার গঠনেরও চেষ্টা করা হতে পারে বলেও আয়োজকরা বলছেন। সেগুনবাগিচা দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, উপরোল্লিখিত বিষয়াদি বিবেচনায় নিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুককে বুধবার ডেকে ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা। সাধারণত যে কোনো বিষয়ে অসন্তোষ জানাতে রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারকে অতিরিক্ত সচিব বা মহাপরিচালক পর্যায়ে ডাকা হয়। কিন্তু বৃটেন যেহেতু শুরু থেকে অন্তর্বর্তী সরকারকে প্রকাশ্যে সাপোর্ট দিয়ে আসছে তাই স্পর্শকাতর বিষয়গুলো নিয়ে উপদেষ্টা নিজেই রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কথা বলেছেন। তাছাড়া বৃটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টিও বিবেচনায় ছিল। তাই দূতকে তলব নয় বরং উপদেষ্টা কথা বলার আগ্রহ ব্যক্ত করেছেন মর্মে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। হাইকমিশনার সারাহ কুকের সঙ্গে বিদায়ের পর উপদেষ্টা মিস্টার হোসেন গণমাধ্যমকে ব্রিফ করেন। সেখানে তিনি কোনো প্রশ্ন নিবেন না বলে আগেই ঘোষণা দেন। বলেন আমি কেবলই স্টেটম্যান্ট করবো। ফলে বৃটেনে আওয়ামী লীগের সমাবেশ নিয়ে হাইকমিশনারের সঙ্গে কী কথা হয়েছে বা আদৌ তিনি বিষয়টি তুলেছিলেন কিনা তা জানা সম্ভব হয়নি।

বৃটেন বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যা বললেন: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বুধবারের সংবাদ ব্রিফিংয়ে কথা শুরু করেন এভাবে- ‘বৃটিশ হাইকমিশনারকে আমি ডেকেছিলাম দুটো কারণে, ছোটো ছোটো দুটো ঘটনা ঘটেছে। একটা হচ্ছে, ২ তারিখে বৃটিশ পার্লামেন্টে কয়েকজন এমপি বক্তব্য দিয়েছেন, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু পরিস্থিতির ওপরে এবং সেখানে কিছু মিসইনফরমেশন আছে, এটা আমি হাইকমিশনারকে জানিয়েছি এবং বলেছি যে, চারিদিকে যে তথ্যের প্রবাহ চলছে, সেটা থেকে মনে হয় যেন তারা তা নিয়েছেন। আর দুয়েকটা সংগঠন যারা কথাবার্তা বলেছেন, সেগুলো মোটামুটি বৃটেন-বেইজড। এখানে যেটা পরিস্থিতি সেটার প্রতিফলন বৃটিশ পার্লামেন্টে ঘটেনি।’ উপদেষ্টা বলেন, আমি যেটা বলেছি, পার্লামেন্ট মেম্বাররা তো যা ইচ্ছা তা বলবেন। এটাতে কারও-ই কিছু করার নাই, আমাদেরও কিছু করার নেই। কিন্তু আমাদের অবস্থানটা তারা যেন তাদের চ্যানেলে তুলে ধরেন। উনিও (বৃটিশ হাইকমিশনার) বলেছেন, আপনারা আপনাদের মিশনের মাধ্যমে জানান, আমরাও জানাবো। অল পার্টি পার্লামেন্টারি গ্রুপের একটা বিবৃতি এসেছে বেশ বড়সড়। সেখানে খুব দুঃখজনকভাবে যেটা এসেছে, আমি বলেছিও তাকে যে আমরা খুবই কষ্ট পেয়েছি। সেখানে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, ৫ই আগস্টের পরে বেশি মৃত্যু হয়েছে। এ জিনিসটি পুরোপুরি মিথ্যা। ৫ই আগস্টের আগে নিহতের সংখ্যা দেখানো হয়েছে মোট ২৮০ জন! আমি বলেছি বিষয়টা মোটেও তা না। ৫ই অগাস্ট বা তার আগে অন্তত দেড় হাজার ছেলেমেয়ে মারা গেছেন। তার মধ্যে ৭৮০ জনের তো আমরা একেবারে বাই নেইম পরিচয় জানি। বাকি অনেকের পরিচিয় নিশ্চিত করা যায়নি। তবে ডেডবডি পাওয়া গেছে এবং তারা নিহত এতে কোনো সন্দেহ নেই। উপদেষ্টা বলেন, ৫ই আগস্টের পর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু রিপোর্টটা যেভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে সেটা একেবারেই সঠিক নয়; বরং দুঃখজনক যে, এখানে জুলাই-আগস্ট জুড়ে এখানে এত বড় বড় ঘটনা ঘটেছে, সেটার কোনো উল্লেখ নেই তাদের রিপোর্টে। এটাও উল্লেখ নেই যে এখানে বিপুলসংখ্যক ছাত্রকে রাস্তাঘাটে গুলি করে মারা হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, আমি বলেছি, তারা তাদের কথা বলছেন কিন্তু আমাদের তো সত্যটা এবং বাস্তবতাটা জানাতে হবে। আমাদের অবস্থানটা ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকতে হবে। বৃটিশ দূতকে বলেছি আপনি একটু ব্যাখ্যা করুন আপনার সরকারের কাছে এবং আপনার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে। এটাই।’

লন্ডন সমাবেশের আয়োজক আওয়ামী লীগের নেতা যা বললেন: লন্ডন সমাবেশের বিষয়ে জানতে চাইলে আয়োজক যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক বলেন, আমরা আশা করছি শেখ হাসিনা ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হবেন এবং প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করবেন। তার সঙ্গে তাদের সরাসরি কথা হয়েছে কিনা? অর্থাৎ কীভাবে আমন্ত্রণ জানানো হলো? এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, বিভিন্ন মারফতে যোগাযোগ হয়েছে। ওই সমাবেশের জন্য বৃটিশ গভর্মেন্টের অনুমতি নিয়েছেন কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, হলরুমে অনুষ্ঠানের অনুমতি লাগে না। কেবলমাত্র ১০ ডাউনিং স্ট্রিট এবং পার্লামেন্টের সামনে অনুষ্ঠান করতে অনুমতি লাগে। বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে শেখ হাসিনাকে তারা এখানো কীভাবে ‘প্রধানমন্ত্রী’ বলে যে প্রচার চালাচ্ছেন? সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে তো অন্তর্বর্তী সরকার বলে কিছু নেই। পরবর্তী নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেয়া পর্যন্ত তারা এমনটাই বলতে চান বলে জানান ওই নেতা।


Saturday, November 9, 2024

লন্ডনে গোলটেবিল বৈঠক: উপদেষ্টা পরিষদে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবাসী বাংলাদেশি নেয়ার দাবি by আরিফ মাহফুজ

লন্ডনে ‘দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি: জাতি গঠনে তারা কীভাবে ভূমিকা পালন করতে পারেন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যায় লন্ডন স্কুল অব কমার্স অ্যান্ড আইটি মিলনায়তনে বৃটিশ-বাংলাদেশি পেশাজীবীদের উদ্যোগে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবাসী বাংলাদেশি নেয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

বৈঠকে বক্তারা বলেন, বৈষম্য ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে প্রবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। বিভিন্ন দেশে প্রবাসীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দূতাবাস ও হাইকমিশন ঘেরাও করেছেন, সভা-সমাবেশ করেছেন নিয়মিতভাবে দিনের পর দিন। মধ্যপ্রাচ্যে বিক্ষোভ করতে গিয়ে অর্ধশত প্রবাসী জেল খেটেছেন। সর্বশেষে প্রবাসীরা ৫ আগস্টের আগে মাসব্যাপী রেমিটেন্স পাঠানো বন্ধ করে সরকারের টনক নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সংশ্লিষ্ট উপদেষ্টা ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি জানিয়েছেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর প্রবাসীদের রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ার ফলে বৈদেশিক রিজার্ভে হাত না দিয়েই বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা হয়েছে। সুতরাং দেড় কোটির উপর প্রবাসীকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। তাই দেশ পরিচালনায় উপদেষ্টা পরিষদে অন্তত ১০ শতাংশ প্রবাসী বাংলাদেশি নেয়া অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন আছে উল্লেখ করে বক্তারা আরও বলেন, ‘যেকোনো উপায়ে এই সরকারকে সফল হতেই হবে। সরকার ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে। সফল গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫৩ বছর পর দেশ গড়ার এক সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। এই সুযোগ থেকে মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশ বাংলাদেশি যারা প্রবাসে থাকেন তাদের বঞ্চিত করলে বরং দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পৃথিবীর প্রায় ১৫টি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ আছে যাদের একেকটির মোট জনসংখ্যা দেড় কোটি হবে না। সুতরাং এত বিপুল সংখ্যক প্রবাসীদের অবহেলা করে রাষ্ট্রের টেকসই সংস্কার বা মেরামত করা সম্ভব নয়। দেড় কোটি প্রবাসীদের সন্তুষ্ট করুন ও তাদের ন্যায্য এবং যৌক্তিক দাবিসমূহ মানুন, তার বিনিময়ে দেখবেন প্রবাসীরা কোটি কোটি ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা করে দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবেন।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সিনেটর নাসরুল্লাহ খান জুনায়েদের সভাপতিত্বে প্রতিথযশা আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার নাজির আহমদের সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমান।

এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. হাসানাত হোসেন এবং বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আব্দুল কাদের সালেহ।

আলোচনায় অংশ নেন আইনজীবী ব্যারিস্টার ওমর ফারুক, ব্যারিস্টার ইকবাল হোসেন, ব্যারিস্টার হামিদুল হক আফিন্দী লিটন, সাবেক সেনা কর্মকর্তা আমিন চৌধুরী, ব্যারিস্টার আলিমুল হক লিটন, ব্যারিস্টার এম ফয়ছল, ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম এমাদ, ব্যারিস্টার আলী ইমাম, যুবনেতা নাসির উদ্দিন, গবেষক শরীফুল ইসলাম, মানবাধিকার কর্মী তানভীর হাসান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে বিলেতের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ আহমদ, কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট সাজেদুর রহমান, সমাজকর্মী আমিনুল ইসলাম প্রমুখ। দুই ঘণ্টাব্যাপী আলোচনা ও মতবিনিময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা উঠে আসে।

বৈঠক নিম্নোক্ত প্রস্তাবনা ও দাবি সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয়-

১। প্রবাসীদের ন্যায়সঙ্গত বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ও অভিযোগ আছে। এসব ন্যায়সঙ্গত দাবি-দাওয়া ও অভিযোগ অতীতে সরকারের কাছে পাঠালেও যথাযথ বা সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি। অথচ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স হচ্ছে দেশের অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত। এই খাতকে মোটেই অবহেলা করা ঠিক নয়। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১০টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। অনুরূপভাবে প্রবাসীদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার, বিভিন্ন দাবি-দাওয়া, সেবার মান ও অভিযোগ-এসব বিষয়ে সংস্কারের জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সংস্কার কমিশন গঠনের দাবি জানাচ্ছি।

২। দেড় কোটির উপরে প্রবাসী অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০% বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করছেন। তারা বাংলাদেশের নাগরিক। চার লাখ চাকমাদের জন্য প্রতিটি সরকারে তাদের প্রতিনিধিত্ব থাকে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারেও আছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, দেড় কোটি প্রবাসীদের জন্য কোনো সরকারেই প্রবাসী প্রতিনিধি রাখা হয়নি। তাই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেড় কোটি উপরে প্রবাসীদের মধ্য থেকে অন্তত: দুইজন উপদেষ্টা রাখার দাবি জানাচ্ছি।

৩। বৃটেন, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন অনেক বাংলাদেশি দ্বৈত-নাগরিক। অনেকে বাস্তব ও প্রায়োগিক সুবিধার্থে দ্বৈত-নাগরিকত্ব নিলেও তারা জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক এবং সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী জন্মসূত্রে প্রাপ্ত নাগরিকত্ব কেউ কেড়ে নিতে পারে না। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকরা সংসদ সদস্য হতে পারবেন না। দ্বৈত নাগরিকরা বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি, এমনকি প্রধান বিচারপতি হতে পারলেও এমপি হওয়ার পথে সাংবিধানিক বাধা ও বৈষম্য রাখার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। উল্লেখ্য, গণতন্ত্রের সূতিকাগার বৃটেনে দ্বৈত নাগরিকরা বৃটিশ পার্লামেন্টের মেম্বার হতে পারেন। শুধু তাই নয়, বৃটেনে এমপি হওয়ার জন্য বৃটিশ নাগরিক হওয়ারও বাধ্যবাধকতা নেই। বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ও বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়েও বৃটেনে সেটেল্ড যে কেউ বৃটিশ এমপি হতে পারবেন। সুতরাং জন্মসূত্রে বাংলাদেশি নাগরিক যারা দ্বৈত-নাগরিকত্ব নিয়েছেন তাদের জন্য সংবিধানের বৈষম্যমূলক ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ বিলুপ্ত করার দাবি জানাচ্ছি।

৪। প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করছেন। সবাইকে একভাবে দেখা উচিৎ নয়। বৃটেনে বৃটিশ-বাংলাদেশিরা সুপ্রতিষ্ঠিত। এখানে শত শত দক্ষ প্রফেশনাল আছেন, যারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখে চলছেন। হাজার হাজার অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও লন্ডন গ্র্যাজুয়েট আছেন যারা বাংলাদেশ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। আধুনিক মালয়েশিয়া নির্মাণে মালয়েশিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মুহাম্মদ বৃটেনে এসে বৃটিশ-মালয়েশিয়ানদের মধ্যে ট্যালেন্ট হান্ট করতেন। এমনটি করা জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি। সুপ্রতিষ্ঠিত বৃটিশ বাংলাদেশিদের বাংলাদেশকে দেয়ার মতো অনেক কিছু আছে।

৫। বৃটেন থেকে পাওয়ার অব  অ্যাটর্নি দিতে ভ্যালিড বাংলাদেশি পাসপোর্ট থাকা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে গত ২-৩ বছর আগে। পাওয়ার অব অ্যাটর্নির সঙ্গে ভ্যালিড বাংলাদেশি পাসপোর্টের সম্পর্ক কী তা বোধগম্য নয়। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে এমন আজগুবি নিয়ম নেই। এই নিয়ম চালু করার কারণে বৃটেনে লাখ লাখ বসবাসকারী প্রবাসীরা মারাত্মক ঝামেলায় পড়েছেন। অন্য দেশের প্রবাসীরাও বিড়ম্বনায় পড়েছেন। এমতাবস্থায়, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি সম্পাদনে আইডি হিসেবে বাংলাদেশি পাসপোর্ট অথবা বৃটিশ পাসপোর্ট অথবা এনআইডি কার্ড গ্রহণযোগ্য বলে অতি দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির জোর দাবি জানাচ্ছি।

৬। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হোন। অথচ, যাদের ভোটে এমপি নির্বাচিত হোন তাদের সঙ্গে সুযোগ-সুবিধায় বিরাট বৈষম্য রয়েছে। যেমন, এমপি হলেই ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ঢাকায় সরকারি জমি বরাদ্দসহ নানা উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয়। রাষ্ট্রের মালিক তথা ভোটারদের বাসস্থান ও অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত না হলেও এমপিদের জন্য বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হয়। এটা রাষ্ট্রের নাগরিকদের সঙ্গে বিরাট বৈষম্য তৈরি করে। অথচ সংবিধানে বলা আছে, আইনের চোখে সকলেই সমান। অবিলম্বে এসব বৈষম্যমূলক সুযোগ-সুবিধা ও বরাদ্দ বাতিল করতে হবে। পৃথিবীর উন্নত  গণতান্ত্রিক দেশে এমপিদের এ ধরনের বৈষম্যমূলক সুযোগ-সুবিধা ও বরাদ্দ দেয়া হয় না । সেখানে স্থানীয় উন্নয়ন বরাদ্দ দেয়া হয় গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের মাধ্যমে।
mzamin

Tuesday, November 5, 2024

এক দেশপ্রেমিকের অকথিত কাহিনী : দূর থেকে একটি নতুন বাংলাদেশ গড়ার লড়াই

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, বাংলাদেশের যুবসমাজকে অতিমাত্রায় সক্রিয় হতে দেখা গেছে। তারা দুর্নীতি ও অবিচারে নিমজ্জিত একটি শাসন ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে গোটা দেশ এমন এক কর্তৃত্ববাদী শাসকের  অধীনে ছিল যিনি ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দুর্নীতি, অন্যায়কে প্রাধান্য দিয়ে গেছেন। সেই সরকারের প্রতি মানুষের মোহভঙ্গ হয়েছে। যার প্রেক্ষিতে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা আন্দোলন সফলতার মুখ দেখে।  

অগণিত ব্যক্তির আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ এই নতুন স্বাধীনতার স্বাদ পেয়েছে। বিশেষ করে ছাত্ররা, হাসিনার শাসনামলে চরম দুর্ভোগের  শিকার। দুর্নীতি ও অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য  অনেক সাহসী কণ্ঠকে নীরব করা হয়েছে- কাউকে হত্যা করা হয়েছে ,  কেউ আবার আহত হয়েছেন। বাংলাদেশে অনেকেই নিপীড়নের শিকার হয়েছেন সে সময়। যারা চ্যালেঞ্জ করার সাহস দেখিয়েছেন  তারা নৃশংস প্রতিশোধের সম্মুখীন হয়েছে।  বাংলাদেশে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে ভিন্নমতকে দমিয়ে রাখা হয়েছে। এমন ভয়াল পরিস্থিতি থেকে দেশকে বাঁচাতে অনেকেই কাজ করেছেন। তাদের একজন ড.  মনজুর মোর্শেদ। যিনি নিউয়র্কের একজন কার্ডিওলজিস্ট।  জন্মভূমির প্রতি গভীর দায়িত্ববোধের কারণে, ড. মোর্শেদ সর্বদা বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির চেষ্টা করেছেন।তিনি সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে তাদেরকে হাসিনা সরকারের অন্যায়, অবিচারের বিরুদ্ধে কথা বলার অনুরোধ করেছেন। এমনকি এবিসি বাংলা চ্যানেলের মতো প্ল্যাটফর্মে নিজের কণ্ঠস্বর তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ড. মোর্শেদ।  সেখানে  তিনি প্রাক্তন কূটনীতিক সাকিব আলী, অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম যিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চীফ প্রসিকিউটর, এবিসি বাংলা চ্যানেলের লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ, আলাউর খন্দকার, ড. তাজ হাসমি এবং অন্যান্য ব্যক্তিত্বদের সামনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি টাইম টিভিতে সাংবাদিক আবু তাহের, সালাউদ্দিন, হেলাল উদ্দিন রানা এবং অন্যান্যদের সাথে এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি "ফেস দ্য পিপল" অনুষ্ঠানেও  কথোপকথনে  উপস্থিত হয়েছেন। ন্যায়বিচারের পক্ষে সওয়াল করার জন্য ড. মোর্শেদের অটল প্রতিশ্রুতি তুলে ধরে যে, রাজনৈতিক বৃত্তে না থেকেও বাংলাদেশের একটি উন্নত ভবিষ্যত গড়ার লক্ষ্যে তিনি অবিচল ।
বাংলাদেশে ন্যায়বিচারের পক্ষে ওকালতি করার লক্ষ্যে ড. মনজুর মোর্শেদ গণমাধ্যম ছাড়িয়েও একাধিক পদক্ষেপ নিয়েছেন। তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করেছেন। নিউইয়র্কে কার্ডিওলজিস্ট হিসাবে তার ব্যস্ত কর্মসূচির মধ্যেও তিনি হোয়াইট হাউস, পররাষ্ট্র সচিব এবং বিভিন্ন সিনেটরকে চিঠি লিখে নিজের কথা জানিয়েছেন। কংগ্রেসম্যানরা অনেকেই তার উদ্বেগের কথা স্বীকার করে সেই চিঠির উত্তর দিয়েছেন। এমনকি জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের কাছেও তিনি তার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। উপরন্তু, তিনি নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং ওয়াশিংটন পোস্টের মতো প্রকাশনাগুলোতে অনেক নিবন্ধ পাঠিয়েছেন, যা পাঠকদের কাছে তার বার্তাকে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছে।  

দূরে থেকেও দেশকে যে গভীর ভালোবাসা যায় তারই আদর্শ উদাহরণ হলেন ড. মোর্শেদ  তিনি বাংলাদেশী সরকারের ফ্যাসিবাদী প্রবণতার বিরুদ্ধে সরব  ছিলেন। সাহসের সাথে তার দেশের নাগরিকদের সাথে  হওয়া অন্যায়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তার কথা বলার দৃঢ়তা,  অন্যায়কে চ্যালেঞ্জ করার এবং পরিবর্তনের পক্ষে সওয়াল করার মানসিকতা একজন ব্যক্তির দৃঢ় সংকল্পকে তুলে ধরে।
বাধার মুখোমুখি হয়েও, হাসিনার শাসনামলে অন্যায়ের বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে ড. মোর্শেদের  দৃঢ় সংকল্প সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তার অঙ্গীকারকে তুলে ধরে। গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে, তিনি ক্ষতিগ্রস্তদের কণ্ঠস্বরকে প্রসারিত করতে এবং জবাবদিহিতা ও সংস্কারের পক্ষে লড়ে যান। দেশের সংগ্রামের গল্পগুলিকে  বিস্তৃত শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিতে একটি সেতুর মতো কাজ করে চলেছেন ড. মোর্শেদ, যারা পরিবর্তন চাচ্ছেন তাদের মধ্যে যাতে সংহতির অনুভূতি জেগে ওঠে।

এ মুহূর্তে, দেশ একটি নতুন বাংলাদেশের স্বাধীনতা উদযাপন করছে। অগণিত ব্যক্তির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে, বিশেষ করে যাদের গল্প প্রায়শই শোনা যায় না। যারা দেশের অগ্রগতিতে অবদান রেখেছেন, নিপীড়ন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন তাদের আজীবন মনে রাখবে জাতি।  অপরদিকে যারা ফ্যাসিস্টকে সমর্থন করে গণতন্ত্রকে দুর্বল করেছে তাদের বিরুদ্ধে  লড়াইয়ে সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। আমাদের অবশ্যই এমন একটি  ভবিষ্যত গড়তে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে হবে যেখানে অতীতের মতো কোনো স্বৈরাচার মসনদে ফিরে আসতে না পারে। 

mzamin

Monday, November 4, 2024

প্রবাসী মুন্না কার কর্মী?

সিলেটের সোনারপাড়ার বাসিন্দা ও ফিনল্যান্ড প্রবাসী সাজ্জাদুর রহমান মুন্না কার কর্মী? বিএনপি? না আওয়ামী লীগের-  এ নিয়ে ধুম্রজালের সৃষ্টি হয়েছে। তবে নগরের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি নেতারা মুন্নাকে ‘যুবলীগকর্মী’ হিসেবে দাবি করেছেন। তারা বলেছেন; গ্রেপ্তারের পর এখন তাকে বিএনপি’র কর্মী হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। ফিনল্যান্ড প্রবাসী মুন্না সিলেট নগরে আলোচিত ব্যক্তি। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে এর আগে তিনি একাধিকবার আলোচিত হয়েছেন। এমনকি গত বছরের প্রথম দিকে তিনি এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনও করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন  সোনারপাড়ার এসপি টাওয়ার-২ এর স্বত্বাধিকারী কুলাউড়ার ইউপি চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বুধবার মধ্যরাতে কোতোয়ালি থানার বিস্ফোরক মামলায় সিলেট নগরীর শিবগঞ্জ থেকে সাজ্জাদুর রহমান মুন্নাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অর্থপাচারসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর জানা গেছে ফিনল্যান্ড যুবলীগের সহ-সভাপতি হচ্ছে মুন্না। সে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. আব্দুল মোমেনের অবৈধ আয়ের অর্থ ফিনল্যান্ড পাচার করার মূলহোতা বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এ ছাড়া; তার সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর ফিনল্যান্ড বিএনপি’র তরফ থেকে দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে বিবৃতি পাঠানো হয়। ওই বিবৃতিতে দলের নেতারা মুন্নাকে ফিনল্যান্ড বিএনপি’র কর্মী হিসেবে দাবি করেন। বৃহস্পতিবার পাঠানো বিবৃতিতে ফিনল্যান্ড বিএনপি’র সভাপতি কামরুল হাসান জনি ও সাধারণ সম্পাদক জামান সরকার জানিয়েছেন, মুন্নাকে ষড়যন্ত্র ও মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করায় ফিনল্যান্ড বিএনপি’র নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হতাশ হয়েছেন। এ জন্য মুক্তির ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণে সহযোগিতা চাওয়া হয়। এদিকে, ফিনল্যান্ড বিএনপি’র এই বিবৃতিতে হতাশ সিলেট মহানগরের ২১নং ওয়ার্ডের বিএনপি’র নেতারা। শনিবার ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি মো. খায়রুল ইসলাম খায়ের ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালিক সেবুর সই করা এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে যুবলীগ নেতাকে বিএনপিকর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়ার নিন্দা জানানো হয়। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে- ফিনল্যান্ডপ্রবাসী যুবলীগ নেতা ও আওয়ামী লীগ নেতাদের অর্থদাতা সাজ্জাদুর রহমান মুন্নাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মামলাও আছে। কিন্তু  গ্রেপ্তারের পর বিভিন্ন গণমাধ্যমে মুন্নাকে বিএনপিকর্মী বানানোর অপচেষ্টা করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমরা ২১ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি নেতারা তা ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করছি। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে ওয়ার্ড বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের হয়রানি করে আসছিল সাজ্জাদুর রহমান মুন্না। সেইসঙ্গে গ্রেপ্তারের তথ্য ও টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছিল। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর খোলস পাল্টে বিএনপিকর্মী সাজার নাটক শুরু করে দিয়েছে মুন্না। তার এই নাটক মামলা থেকে বাঁচার জন্য। অথচ ফ্যাসিবাদী হাসিনার আমলে আওয়ামী এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে দলীয় কর্মসূচিতে দেখা গেছে তাকে। দিনরাত তাদের পেছনে সময় ও টাকা দিয়ে সহযোগিতা করেছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার হওয়া মুন্নার মূলবাড়ি মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। সিলেট নগরের সোনারপাড়া নবারুন আবাসিক এলাকায় তার বাসা রয়েছে। বিগত কয়েক বছর মুন্না যখনই ফিনল্যান্ড থেকে সিলেটে এসেছে তখন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল। তিনি কখনোই নিজেকে বিএনপি’র কর্মী হিসেবে পরিচয় তুলে ধরেননি। তার পারিবারিক মালিকানাধীন বাসার রাস্তা নিয়ে কুলাউড়া উপজেলার ভাটের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে তার দ্বন্দ্ব রয়েছে। এই দ্বন্দ্বের জের ধরে ২০২৩ সালে প্রথমে নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন গ্রেপ্তার হওয়া সাজ্জাদুর রহমান মুন্না। পরে এসপি টাওয়ার-২ এর স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলামও পাল্টা সংবাদ সম্মেলন করে মুন্নার বিরুদ্ধে বিষোদাগার করেছিলেন। সিলেট থেকে এই বিরোধের রেশ গিয়ে পড়েছিল এলাকায়ও। তখন উভয়পক্ষের মধ্যে মামলা, পাল্টা মামলাও ছিল। ঘটনাটি গড়েছিল কুলাউড়ার সাবেক এমপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম নাদেল পর্যন্ত। তবে তাদের মধ্যে বিবদমান বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি।
mzamin

Tuesday, October 29, 2024

স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন যেসব প্রবাসী

চলতি বছরের গত ৫ই আগস্ট স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার পতন ঘটে। এর পেছনে দেশের ছাত্র-জনতা যেমন ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি একঝাঁক প্রবাসী বাংলাদেশি সাংবাদিক ও কন্টেন্ট ক্রিয়েটররাও অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

শেখ হাসিনা সরকারের দুর্নীতি, দুঃশাসন, খুন, গুম ও লুটপাটের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন তারাও।  ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অনলাইন ও গণমাধ্যমে টকশোতে অংশ নিয়ে সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখেন তারা।  পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব থেকেছেন এসব প্রবাসী।

এদের মধ্যে লন্ডনের সাংবাদিক রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী সুয়েব, যুক্তরাষ্ট্রের এম রহমান মাসুম, আলাউর খন্দকার, কানাডার ড. তাজ হাশমী, ফ্রান্সের সাইফুর সাগর ও অস্ট্রেলিয়ার মুন্নী চৌধুরী মেধাসহ আরো অনেকেই রয়েছেন। যারা ছিলেন নিয়মিত সরব।

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের কারণে এসব সাংবাদিকদের অনেকেই এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশে আসতে পারেননি। তবে স্বৈরাচার সরকারের হুমকি-ধমকি, রোষানল তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। তারা প্রতিবাদ চালিয়ে গিয়েছেন প্রতিনিয়ত।

টেলিভিশন কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র গঠনমূলক সমালোচনায় দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে প্রভাব ফেলেছেন।

এমনকি সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের পরামর্শে দেশের একটি জাতীয় দৈনিকেও তাদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ২০২১ সালের ৬ অক্টোবর ফয়সল চৌধুরী, পিনাকী ভট্টাচার্য ও তাজ হাশমীকে নিয়ে ‘দেশবিরোধী ভয়ানক তিন সাইবার দুর্বৃত্ত’ শিরোনামে ওই জাতীয় দৈনিকে প্রধান সংবাদ প্রকাশিত হয়।

ওই প্রতিবেদনে ফয়সল চৌধুরীকে দেশবিরোধী দিগভ্রান্ত আখ্যায়িত করে বলা হয়, তিনি বিদেশে বসে মিথ্যাচার, উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে দেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।

তাকে যুদ্ধাপরাধী অপশক্তি এবং জঙ্গিবাদের পক্ষে জামায়াতে ইসলামী ও পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার পেইড এজেন্ট বলেও  বর্ণনা করা হয়।

এতে আরও বলা হয়, সরকার, প্রধানমন্ত্রী, শিল্পপতি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে বিষোদগার ও গুজব ছড়ানোই কথিত সাংবাদিক ফয়সল চৌধুরী সুয়েবের মূল কাজ। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের বিরুদ্ধে তিনি মিথ্যাচার করে চলেছেন। এছাড়া অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান, জুনাইদ আহমেদ পলক, আইজিপি ড. বেনজীর আহমেদ, এস আলম গ্রুপ, এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার ও পদ্মা ব্যাংকের চেয়ারম্যান চৌধুরী নাফিস শরাফতসহ বিভিন্ন জনের বিরুদ্ধে ইচ্ছামাফিক বিষোদগার করে যাচ্ছেন এই স্বঘোষিত পণ্ডিত।

লন্ডনে বসবাস করেন রেজা আহমদ ফয়সল চৌধুরী। ঢাকার স্যাটেলাইট টিভি ‘চ্যানেল আই’র ইউরোপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন তিনি।

বহির্বিশ্বে ফয়সল চৌধুরীই প্রথম টিভি চ্যানেলটির মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের অন্যায়-অত্যাচার, গুম-খুনের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেন।

তার সঞ্চালনায় চ্যানেল আই-ইউকেতে ‘স্ট্রেইট ডায়ালগ’ শিরোনামে টকশো সম্প্রচারিত হয়।  ২০১৩ থেকে টানা ২০১৮ সাল পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়া ‘স্ট্রেইট ডায়ালগে’র কারণে আওয়ামী লীগ সরকার তার ওপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়। এক পর্যায়ে টকশোটি বন্ধ করতে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ হাইকমিশন নানা তৎপরতা চালিয়ে ব্যর্থ হয়। সর্বশেষ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাসিনা সরকারের চাপে ঢাকার চ্যানেল আই কর্তৃপক্ষ লন্ডনে চ্যানেল আই এর সম্প্রচার এক দিনের নোটিশে বন্ধ করে দেয়। অভিযোগ করা হয়, লন্ডন স্টুডিওতে কেক কেটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্মদিন উদযাপন করা হয়েছে।

তব এসব করেও স্বৈরাচার সরকারের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থেমে থাকেনি। ‘চ্যানেল ইউরোপ ফেসবুক পেজ’, ‘স্ট্রেইট ডায়ালগ ইউটিউব চ্যানেল’ ও ‘আইপিটিভি চ্যানেল ইউরোপ; দিয়ে প্রতিবাদ অব্যাহত রাখেন তিনি।

এছাড়া গত বছরে ডিসেম্বরে সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের কাছে বাংলাদেশ সরকারের দুঃশাসনের কিছু চিত্র তুলে ধরেন ফয়সল চৌধুরী।

‘ফিফটি ইয়ার্স অব বাংলাদেশ’ বইয়ের লেখক ডক্টর তাজ হাশমী বসবাস করেন কানাডায়। সেখানে বসে শেখ হাসিনা সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে আলোচিত হন তিনি।

এদের মধ্যে অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এম রহমান মাসুমও বাংলাদেশে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের কঠোর সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রে বসে ২০১২ সাল থেকে ইউটিউব-ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইংরেজি ভাষায় আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে অনুষ্ঠান শুরু করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর, কংগ্রেসম্যান, ইউরোপিয়ান মেম্বার অব পার্লামেন্ট, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মীদের তার অনুষ্ঠানে যুক্ত করে আওয়ামী লীগ সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরেন। সে সময় তার অনুষ্ঠান থেকে দেশের প্রকৃত অবস্থা জানতে পারত  মানুষ।

মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদের দুর্দশা ও তাদের অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন এম রহমান মাসুম। যিনি সরজমিন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করে তাদের অবস্থা দেখেন এবং একটি প্ল্যাটফর্মে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য ‘রেমিট্যান্স ফাইটার্স অব বাংলাদেশ’ নামে একটি সংগঠন গঠন করেন। এটি বেশ  জনপ্রিয়তা লাভ করে।

এছাড়া কানাডা থেকে ‘ফেস দ্য পিপল’ নামে টকশো করে শেখ হাসিনা সরকারের কাছে বিতর্কিত হন সাইফুর সাগর, ফ্রান্স থেকে সুসময় শরীফ ও সিডনি থেকে বনী আমীন। টকশোতে অতিথি হয়ে মালয়েশিয়া থেকে ডা. ফয়জুল হক, সাকিব আলী, ব্যারিস্টার সরওয়ার হোসেনসহ অনেকে হাসিনা সরকারের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। লন্ডন থেকে আরিফ আল মাহফুজ শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে অনলাইনে জনমত গঠনেও ভূমিকা রাখেন।

এদিকে লন্ডন থেকে সাংবাদিক আব্দুর রব ভুট্টোও স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তিনিও সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। যুক্তরাষ্ট্রের আরেক অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নায়েব আলী। তিনি হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।

২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনে ভুল তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন নূরে আলম হামিদী। তিনি বর্তমানে লন্ডন প্রবাসী। পাকিস্তানি নাগরিক ও লস্কর-ই-তৈইয়্যবার স্কোয়াড লিডার হিসেবে পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন এমনকি জাতীয় সংসদে নূরে আলম হামিদীকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

আমেরিকায় বসবাস করেন আলাউর খন্দকার। আমেরিকা বাংলা চ্যানেল (এবিসি) নামে একটি টিভিতে টকশো করে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখেন তিনি।

ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মোখলেসুর রহমান চৌধুরী দীর্ঘদিন থেকে লন্ডনে বসবাস করছেন। তিনি পতিত হাসিনা সরকারের নানা অপকর্ম, দুঃশাসন ও নৈরাজ্যের  বিরুদ্ধে সে সময় সরব ছিলেন। লন্ডন-আমেরিকার বেশ কয়েটি চ্যানেলের টকশোতে নিয়মিত অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে জোরালো ভূমিকাও পালন করেন মোখলেসুর রহমান।

mzamin

Saturday, October 26, 2024

কুলাউড়ায় অসহায়-দুস্থদের পাশে সুইজারল্যান্ড প্রবাসী

কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বপ্ন গড়ি প্রবাসী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সুইজারল্যান্ড প্রবাসী দানবীর বাবু এআর রবি দাসের পক্ষ থেকে অসহায়, দুস্থ মানুষের মধ্যে হুইলচেয়ার, শাড়ি, লুঙ্গিসহ প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকার নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। মাসব্যাপী বিতরণ কার্যক্রমে শতাধিক ব্যক্তির হাতে শাড়ি, লুঙ্গি ও চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। গতকাল আর্থিকভাবে অক্ষম ৪ জনকে হুইলচেয়ার দেয়া হয়। এ বিষয়ে সুইজারল্যান্ড বিএমএফ’র টেকনিক্যাল ম্যানেজার বাবু রবি দাস বলেন, একযুগ থেকে প্রবাসের আয়ের একটা অংশ গরিব-দুঃখীদের জন্য রেখে দেই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে থাকবেও। বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- সাগর কুর্মী, কানাই লাল দাস, রাজু দাস, পলাশ চক্রবর্তী, সজল বড়কুর্মী, জসিম উদ্দিন, মাসুক মিয়া, স্বপন মল্লিক, বাবুল দাস প্রমুখ।
mzamin

Wednesday, October 23, 2024

মালয়েশিয়ার ন্যানো স্যাটেলাইট আবিষ্কার ও গবেষণায় বাংলাদেশি ড. তারিকুল ইসলাম by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়ায় গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণ প্রদর্শনী ২০২৪ এর অন্যতম সেরা আকর্ষণ ছিলো বাংলাদেশি প্রবাসী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের গবেষণা প্রকল্প 'ন্যানো স্যাটেলাইট কমপ্যাক্ট সি-ব্যান্ড প্যাচ অ্যান্টেনা'। যা মালয়েশিয়ার ন্যানো স্যাটেলাইট পরিচালনায় এই প্রথম কোনো বাংলাদেশির মাইলফলক অর্জন।

মালয়শিয়ার খ্যাতনামা উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি কেবাংসান মালয়েশিয়া (ইউকেএম) সম্প্রতি এ গবেষণা, উদ্ভাবন ও বাণিজ্যিকীকরণ প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ইউকেএমের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (পরিকল্পনা ও কর্পোরেট উন্নয়ন), অধ্যাপক দাতো ড. রোসলি বিন রাজিকান এর সভাপতিত্বে টেকনোপলিস সাইবার একাডেমি (এএসটি) এর অডিটোরিয়াম হলে এ প্রদর্শনীর পর্দা উন্মোচিত হয়।

এ বছরের আলোচ্য বিষয় ছিলো 'টেকনোলজির কমার্শিয়ালাইজেশন এবং উদ্ভাবন টেকসই গবেষণা।' এ প্রোগ্রামে তিনি ইউকেএম এর ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টির সেরা ১০টি বাণিজ্যিক পণ্য উদ্বোধন করেন। প্রদর্শনীতে অন্যান্য কার্যক্রমের পাশাপাশি, ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের সেরা গবেষণা প্রজেক্ট গুলোর বাণিজ্যিকীকরণ, ইন্ডাস্ট্রি কোলাবোরেশান এবং গবেষণা পত্র শীর্ষক সেমিনার আয়োজিত হয়। প্রদর্শনীর সেরা ১০ বাণিজ্যিক প্রজেক্টে স্থান পাওয়া অন্যতম আকর্ষণীয় গবেষণা প্রজেক্ট হলো ন্যানো স্যাটেলাইটের জন্য তৈরি করা কমপ্যাক্ট প্যাচ অ্যান্টেনা যা সি-ব্যান্ডে পরিচালিত হয়।

এই প্যাচ অ্যান্টেনাটি জাপানের কিউশু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি কর্তৃক তৈরি করা একটি কিউবস্যাটেলাইটে (ন্যানো স্যাটেলাইট) ইনস্টল করা হয়েছে, যা গত ২৪ মার্চ ২০২২ তারিখে রাত ৯:১০ (জেএসটি) এ আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশন (আইএসএস) থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। স্যাটেলাইট মিশনে সি-ব্যান্ড কমিউনিকেশন বোর্ড ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ২০ এমবিপিএস উচ্চ গতির ক্ষমতা সম্পন্ন ডেটা ডাউনলিংক পাওয়া যায়। উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন এই সি-ব্যান্ড এন্টেনা, মোবাইল গ্রাউন্ড মিশনে ওয়ান (১) এমবিপিএস পর্যন্ত ডাউনলিংক স্পিড প্রদর্শন করে যা মূল গ্রাউন্ড স্টেশনে একই ফ্রিকোয়েন্সিতে ব্যবহার করা হয়।

প্রস্তাবিত উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন মাইক্রোস্ট্রিপ অ্যান্টেনা সিস্টেমে কোএক্সিয়াল ফিড টেকনিক ব্যবহার করা হয়। এর গঠনগত আকৃতিতে একটি অপ্রতিসম বর্গাকার প্যাচ এবং একটি প্যাসিভ আয়তকার স্ট্রিপ রয়েছে। এটি সহজেই কিউবস্যাটেলাইটের যে কোনো আকারের ধাতব বা অধাতব পৃষ্ঠে সংযুক্ত করা সম্ভব। এটিই বিশ্বের প্রথম সি-ব্যান্ড, উচ্চ গেইন, কমপ্যাক্ট, রাইটহ্যান্ড সার্কুলার পোলারাইজড ক্ষমতাসম্পন্ন অ্যান্টেনা যা সরাসরি ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি  থেকে কমার্শিয়াল স্যাটেলাইট পরিচালনায় ব্যবহার করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার গবেষণা এবং আবিষ্কারের দিক থেকে অন্যতম সেরা মাইলফলক অর্জন করেছে এই কমপ্যাক্ট সি-ব্যান্ড প্যাচ অ্যান্টেনা ।

সেরা এই প্রজেক্টটির পরিচালনায় ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয়শিয়ার অন্যতম শীর্ষ গবেষক এবং অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম যিনি বর্তমানে ইউকেএম-এর ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক এবং সিস্টেমস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। একই সাথে তিনি জাপানের কিউশু ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও কর্মরত আছেন। সম্প্রতি স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত র‌্যাঙ্কিং অনুযায়ী, তিনি নেটওয়ার্কিং এবং টেলিকমিউনিকেশন’ শাখায় বিশ্বের শীর্ষ ২% বিজ্ঞানীদের একজন।

এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২০ সাল থেকে এই ধরনের বিজ্ঞানীদের ক্যারিয়ার লং এবং সিংগেল ইয়ারের ক্যাটাগরিতে তালিকা প্রকাশ করে থাক। ২টি ক্যাটাগরিতেই ড. ইসলামের নাম একাধারে ২০২০ সাল থেকে বর্তমান অবধি নথিভুক্ত হয়ে আসছে। প্রতি বছর আগের বছরের অর্জনের ভিত্তিতে র‌্যাংক আপডেট করা হয়। এই র‌্যাংকিংটি সাইটেশন মেট্রিক্স যেমন: এইচ-ইনডেক্স, কো অথর সংশোধিত এইচএম-ইনডেক্স, সাইটেশন এবং সি -স্কোরের উপর ভিত্তি করে করা হয়ে থাকে যা স্কোপাস ডেটাবেস থেকে সংগৃহীত হয়ে থাকে।

অধ্যাপক তারিকুল ইসলামের অর্জনের ঝুলিতে আরো রয়েছে প্রায় ৬০০টি গবেষণা প্রবন্ধ, ২৫০ কনফারেন্স আর্টিকেল, গবেষণামূলক বই, যাতে অ্যান্টেনা, মেটাম্যাটেরিয়াল এবং মাইক্রোওয়েভ ইমেজিং-এর মতো বিষয় গুলো  নিয়ে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ড. ইসলামের গবেষণা প্রোটোটাইপ দিয়ে ২৫টি পেটেন্টের আবেদন দাখিল করা আছে এবং ইতোমধ্যে ৫টি পেটেন্ট এর আবেদন গৃহীত হয়েছে।

বর্তমানে তিনি একটি গবেষণা দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা তার তত্ত্বাবধানে গবেষণা করছে যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি গবেষকও রয়েছেন। ইতিমধ্যে তার তত্ত্বাবধানে ৩৫ জন ছাত্র পিএইচডি ডিগ্রী এবং ২৫ জন ছাত্র এমএসসি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। এছাড়াও, ১০ জনেরও বেশি পোস্টডক্টরাল এবং ভিজিটিং গবেষকগণ তার তত্ত্বাবধানে গবেষণা সম্পন্ন করেছেন।

শুধু তাই নয়, ড. ইসলাম একজন চার্টার্ড প্রফেশনাল ইঞ্জিনিয়ার (সিইঞ্জ), আইইইই এর সিনিয়র সদস্য, যুক্তরাজ্যের আইইটি-এর ফেলো, এবং জাপানের আইএইআইসিএই-এর সিনিয়র সদস্য। তার গুগল স্কলার সাইটেশন সংখ্যা  প্রায় ২৭,০০০ এবং তার এইচ-ইনডেক্স ৬৯।

এছাড়াও ড. ইসলামের তত্ত্বাবধানে একটি উন্নত প্রযুক্তি সম্পন্ন আধুনিক মানের অ্যান্টেনা ল্যাবরেটরি (স্টেট অফ দ্যা আর্ট) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যা ৪০ গিগাহার্টজ ফ্রিকোয়েন্সি পর্যন্ত অ্যান্টেনা ডিজাইন এবং টেস্টিং সুবিধা প্রদান করে থাকে। ইতিপূর্বে তিনি আইইটি ইলেকট্রনিক্স লেটারের সহযোগী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও, বর্তমানে তিনি সেন্সরস এবং ন্যানোম্যাটেরিয়ালস জার্নাল এর গেস্ট সম্পাদক, আইইইই এক্সেস-এর সহযোগী সম্পাদক, এবং স্প্রিঙ্গার নেচার এর 'সাইন্টিফিক রিপোর্টস' জার্নালের সম্পাদকীয় বোর্ডের সদস্য হিসেবে কর্মরত আছেন।
mzamin

Sunday, October 20, 2024

আনোয়ার ইব্রাহিমের বাংলাদেশ সফরের প্রতিফলন: বাংলাদেশি কর্মীদের ইপিএফ বাধ্যতামূলক করছে মালয়েশিয়া by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশ সহ সমস্ত বিদেশি কর্মীদের জন্য এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করছে।

প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিমের বরাতে দেশটির সরকারি নিউজ এজেন্সি বারনামা সহ দেশটির প্রায় সকল মিডিয়া জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মান অনুসারে, জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য ছাড়াই সকল কর্মীকে ন্যায্য অধিকার প্রদানের জন্য মালয়েশিয়া সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

গত শুত্রুবার দেশটির সংসদ 'দেওয়ান রাকয়াতে' ২০২৫ সালের বাজেট পেশ করার সময় এই প্রস্তাব ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করার এমন ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

অবসরকালীন সঞ্চয়কে উৎসাহিত করতে এবং অনানুষ্ঠানিক কর্মী ও অনিয়মিত আয়ের ব্যক্তিদের জন্য, আনোয়ার ইব্রাহিম, যিনি দেশটির অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এ ঘোষণা করেছেন যে, এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) এর আওতায় রিটায়ারমেন্ট সেভিংস আই-সারাণ ম্যাচিং প্রণোদনা ১৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২০ শতাংশ করা হয়েছে, যা বার্ষিক সীমা হিসেবে সর্বোচ্চ ৫০০ রিঙ্গিত থেকে সারাজীবনে সর্বোচ্চ ৫০০০ রিঙ্গিত পর্যন্ত থাকবে।

এছাড়া জনবান্ধব এ প্রধানমন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, 'আই-সুরি' প্রোগ্রামটি অর্থাৎ, গৃহিণী, বিধবা, একক মা এবং একক মহিলাসহ জাতীয় দারিদ্র্য ডেটা ব্যাংক 'ইকাছিহ'তে নিবন্ধিত মহিলাদের জন্য স্বেচ্ছাসেবী এ সাবস্ক্রিপশন প্রোগ্রামটি সরকারি এবং সক্রিয় অংশগ্রহণকারীদের অবদানের ভিত্তিতে ম্যাচিং প্রণোদনার সাথে চালিয়ে যাওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক সুরক্ষা এজেন্ডা আরও জোরদার করা হবে যাতে বেশি সংখ্যক মানুষের অবসরকালীন সঞ্চয় এবং দুর্যোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায়। আত্ম-কর্মসংস্থান সামাজিক সুরক্ষা স্কিমটি কর্মচারীদের অবদানের ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কভার করবে, যার জন্য ১০০ মিলিয়ন রিঙ্গিত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

তাছাড়া মালয়েশিয়া একটি বয়স্ক জাতির দিকে ধাবিত হওয়ায় উদ্বেগ জানিয়ে আনোয়ার বলেন, এমপ্লয়ীজ প্রভিডেন্ট ফান্ড (ইপিএফ) তাদের স্কিমগুলিকে পর্যালোচনা করছে যাতে সকল জেনারেশনের মধ্যে শক্তভাবে তা বণ্টন করা যায় এবং ইপিএফ সদস্যদের সঞ্চয়ের একটি অংশ সরাসরি তার পরিবারের সদস্যদের ইপিএফ অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করার সুযোগ তৈরি করে দেবে।

উল্লেখ্য যে, গত ৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, ‘আমরা পুরো ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা অত্যন্ত স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমাদের শ্রমিক দরকার, তাদের আধুনিক দাস হিসেবে গণ্য করা যাবে না। তারা বাংলাদেশ বা অন্য যেখান থেকেই আসুক না কেন, আমি এখানকার মতো আগেও প্রকাশ্যে এ কথা বলেছি।’

mzamin

Tuesday, October 15, 2024

প্রবাসীরা ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়েছেন by এম এস সেকিল চৌধুরী

এগারো কোটির বেশি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য বিভিন্ন দেশ ও প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যাওয়ার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বিভিন্ন দেশে কর্মরত দেড় কোটির বেশি প্রবাসী, যাদের রেমিট্যান্স, বিনিয়োগ ও সামাজিক-পারিবারিক অবদান আমাদের দেশটাকে আর্থ-সামাজিকভাবে সবল করে রেখেছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রেস ব্রিফিং ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত খবর অনুযায়ী দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর ব্যক্তিগত তথ্য অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে উন্মুক্ত হয়ে গেছে কতিপয় অসাধু প্রভাবশালী মানুষের ব্যক্তিগত অর্থ লালসার কারণে। এ ঘটনা জাতিকে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে কর্মরত ও বসবাসকারী বাংলাদেশি নাগরিক যাদের এনআইডি কার্ড রয়েছে তারা ভীষণ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন। অনেকের এনআইডি কার্ডে ছোটখাটো বানান বিভ্রাট ও তথ্যের ভ্রান্তি থাকার অবকাশ আছে। এ কারণে প্রবাসীদের পাসপোর্ট ও ট্র্যাভেল ডকুমেন্ট এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থান সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রবাসীদের তথ্যভাণ্ডারের সম্ভাব্য অসঙ্গতির প্রধান কারণ হচ্ছে এ বিষয়ে আমরা ‘প্রথম জেনারেশন’ এবং সম্যকভাবে অবহিত ছিলাম না সুতরাং ভ্রান্তিগুলো নির্মূল করে আদর্শ অবস্থানে আসতে আমরা এখনো সক্ষম হইনি। দ্বিতীয়ত: অনেকদিন আগে থেকে যারা বিদেশে থাকেন তাদের বিদেশের তথ্যাবলী ও দেশের তথ্যভাণ্ডারে থাকা তথ্যের সমন্বয়ে কিছু ঘাটতি আছে। এমতাবস্থায় দেশে থাকা তথ্য ভাণ্ডারের তথ্য বিদেশি নিয়োগকর্তা ও কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছালে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

দেশের অপরাপর জনগোষ্ঠীর তথ্যও অন্যদের কাছে থাকা নিরাপদ নয়। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।  বিশ্ব সম্প্রদায় যখন নিজেদের নাগরিকদের তথ্য ভাণ্ডার সুরক্ষিত ও নিরাপদ রাখার জন্য নানা কর্মকৌশল গ্রহণ করছে, প্রতিনিয়ত নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করছে এবং নিরাপত্তা বেষ্টনী নিশ্চিত করার জন্য নিয়ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে তখন আমাদের দেশের কতিপয় লোক নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থে দেশ জাতির নিরাপত্তা বিক্রি করে দিচ্ছে এবং এ কাজে রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল সহায়তা পাচ্ছে। কি বিভৎস্য ও ভয়ঙ্কর এই ঘটনা!

বিশ্বায়নের যুগে আন্তর্জাতিক নানা উপলক্ষে বাংলাদেশের বহু নাগরিকের বিভিন্ন পারিবারিক, সামাজিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ আছে বহির্বিশ্বের সঙ্গে। এই তথ্যপাচার এসব মানুষকে বিপদগ্রস্ত করতে পারে। আর্থিক ও বৈষয়িক নানা ক্ষেত্রে এই তথ্য সংশ্লিষ্ট থাকায় মানুষ বিপদে থাকবেন।

এমনিতেই আমাদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার নষ্ট করার জন্য প্রতিযোগী কতিপয় দেশ আমাদের নামে দেশে-বিদেশে নানা অপপ্রচার চালায়। আমরাও নানা রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার জন্য নিজ দেশকে জঙ্গিবাদের ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির উত্থানের কথা বলে বেড়িয়েছি নিজেদের দলীয় রাজনীতির সুবিধা আদায়ের জন্য। এ সবই আমাদেরকে জাতি হিসেবে ঝুঁকির মধ্যে রেখেছে।

উপরন্তু কতিপয় মানুষের অতি লোভ ও অসাধুতায় গোটা জাতির নিরাপত্তা আজ ঝুঁকিপূর্ণ, এ অবস্থায় দেশে ও বিদেশে অবস্থানকারী সকল নাগরিকদের ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় কী ব্যবস্থা নেয়া যায় এ ব্যাপারে খাত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করে তড়িৎ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এ ব্যাপারে সরকারকে অতি দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানাই। এ ক্ষেত্রে যেকোনো বিলম্ব নানা বিপদ ডেকে আনতে পারে।

mzamin

Sunday, October 13, 2024

৫ সিকার ছাগল চিনতে না পারলে রক্ত দেয়া থামবে না: পিনাকী ভট্টাচার্য by আব্দুল মোমিত

কথায় আছে হাজার টাকার বাগান খায় ৫ সিকার ছাগলে। এই ৫ সিকার ছাগল চিনতে না পারলে বারবার বাংলাদেশের মানুষকে রক্ত দিতে হবে। এই ৫ সিকার ছাগল হচ্ছে আওয়ামী লীগ এবং ভারত। এই দুই শক্তিকে মোকাবিলা করতে না পারলে বাংলাদেশে শান্তি আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য।

শনিবার প্যারিসের একটি হোটেলের বলরুমে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ফরোয়ার্ড’র (এইচআরএফ) উদ্যোগে ‘গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ: প্রবাসীদের ভাবনা’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে প্রধান অতিথি পিনাকী ভট্টাচার্য আরও বলেন, বারবার প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষে থেকে দাবি জানানো হয়। কিন্তু হওয়ার কথা ছিল তারা বলবে এবং সেটি সরকার মেনে নেবে। আমাদেরকে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে। আমি একটি উদ্যোগ নিয়েছি পুরো বিশ্ব থেকে প্রবাসীরা পাঁচ বিলিয়ন ডলার রাষ্ট্রকে দেবে। এটি হলে সরাসরি প্রবাসীরা রাষ্ট্র নির্মাণের কাজে চলে আসবেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এইচআরএফ সভাপতি মোহাম্মদ ফয়সাল আহমেদ। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ফরাসি গণমাধ্যম ফ্রান্স টুয়েন্টিফোরের সাংবাদিক মোহাম্মদ আরিফ উল্লাহ। বাংলা টেলিগ্রাম সম্পাদক সাংবাদিক শাহ সুহেল আহমদের সঞ্চালনায় শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সাংবাদিক অনুক্ত কামরু। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থেকে আগত রাজনীতিবিদ নুরুল ইসলাম ভুঁইয়া (ছোটন), ফ্রান্স বিএনপির প্রধান উপদেষ্টা এহসানুল হক বুলু,  সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের, সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম মিয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমেদ, কমিউনিটি নেতা টি এম রেজা।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধের উপর প্যানেল আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন সিনিয়র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ফ্রান্স (বিসিএফ)-এর প্রেসিডেন্ট এম ডি নূর, অ্যাক্টিভিস্ট ও রাজনীতিবিদ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী, আইনজীবী ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট মনোয়ার হোসাইন, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফরাসি আইনজীবী আকাশ হেলাল, বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন ফ্রান্স (বিসিএফ)-এর প্রেসিডেন্ট এম ডি নূর।

এছাড়া সেমিনারে অতিথি আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শামীমা আক্তার রুবি, বিকশিত নারী সংঘের সভানেত্রী তৌফিকা শাহেদ, সাবেক সেনা কর্মকর্তা মীর জাহান, লিটল ম্যাগ স্রোতের সম্পাদক কবি বদরুজ্জামান, মানবাধিকার সংগঠন এফডিএইচআর ফ্রান্স- এর সভাপতি মোহাম্মদ আল আমিন, সিনিয়র সাংবাদিক কামরুজ্জামান কাজল।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ থেকে প্রবাসীদের পক্ষ থেকে চার দফা দাবি জানানো হয়। সেগুলো হলো, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোর তত্ত্বাবধানে জাতীয় নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা, দ্বিতীয়ত ফ্রান্সসহ সবগুলো দূতাবাসে দ্রুত ই-পাসপোর্ট এবং জাতীয় পরিচয় পত্র তৈরির ব্যবস্থা করা, তৃতীয়ত দাবি হচ্ছে জাতীয় সংসদে প্রবাসীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা, চতুর্থত অনিয়মিত অভিবাসীদের লাশ সরকারি খরচে দেশে প্রেরণের ব্যবস্থা করা।

এছাড়া বক্তারা বলেন, এই প্রথমবারের মতো অভিবাসী বাংলাদেশিরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে স্টেক হোল্ডারের ভূমিকায় এসেছেন। চার দফা দাবি আদায়ে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে জোরদার ভূমিকা পালন করতে হবে। এছাড়াও ৫ই আগস্টের বিপ্লবকে সার্থক করার জন্য প্রবাসে সকল বাংলাদেশিকে সজাগ থাকার আহ্বান জানানো হয়।

mzamin

Friday, October 11, 2024

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার by আরিফুল ইসলাম

মালয়েশিয়ার পেরাক রাজ্যের ইপোহ'র তেলুক ইন্তানের তামান লেজেন্ডার ফেজ থ্রি'র শেয়ার্ড হাউসের পেছনের জঙ্গল থেকে বাংলাদেশি এক নির্মাণ শ্রমিকের গলা কাটা লাশ উদ্ধার করেছে দেশটির স্থানীয় থানা (বালাই) পুলিশ।

বৃহস্পতিবার (১০ অক্টোবর) এ ঘটনায় সন্দেহভাজন তিনজন বাংলাদেশি শ্রমিককে আটক করে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। তদন্তের স্বার্থে নিহত ঐ বাংলাদেশি এবং হত্যার এ ঘটনায় আটক তিনজনের নাম ঠিকানা প্রকাশ করেনি দেশটির পুলিশ প্রশাসন।

এ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে পেরাক পুলিশের প্রধান দাতুক আজিজি মাত আরিস দেশটির সরকারি নিউজ এজেন্সি বারনামা ও স্থানীয় নিউজ পোর্টাল দি ষ্টারকে বলেছেন, বৃহস্পতিবার ভোর-সকাল সাড়ে ৫টার সময় ২৭ বছর বয়সী বাংলাদেশী এক নির্মাণ শ্রমিকের লাশের খবর পায়। পরে লোকালদের পক্ষ থেকে একটি ফোন কল পেলে লাশটি উদ্ধার করে তারা।

প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে দেশটির পুলিশ গত রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভিকটিমের তিন জন সঙ্গী নিখোঁজ থাকার খবরও দিয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে তারা আরো জানিয়েছে, নিহত ব্যক্তি তার সহকর্মী বন্ধুদের সাথে গত রাত সাড়ে ৮টার সময় রাতের খাবার খেতে ও একসময় জামাতে নামাজ পড়তে দেখা গেছে তাদের। বৃহস্পতিবার পেরাক পুলিশ কন্টিনজেন্ট (আইপিকে) তাদের সদর দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছে, পরিদর্শনে দেখা গেছে এই এলাকায় প্রায় ৩৪ জন বিদেশী পৃথক পৃথক ছোট ছোট রুমে বাস করতো।

তদন্তের স্বার্থে গ্রেফতারকৃত (৩২-৩৯) বছর বয়সী তিন বাংলাদেশির তথ্য প্রকাশ করেনি মালয়েশিয়া পুলিশ এবং ঘটনার উদ্দেশ্য শনাক্ত করতে তারা তিনটি মোবাইল ফোন জব্দ ও সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করেছে বলে জানিয়েছে তারা।

এদিকে, তেলুক ইন্তান ম্যাজিস্ট্রেট নাইদাতুল আথিরাহ আজমানের আদালত তিন বাংলাদেশিকে তাদের স্বদেশীকে হত্যার তদন্তে সহায়তা করার জন্য সাত দিনের (১৬ অক্টোবর পর্যন্ত) রিমান্ডে রাখার অনুমতি দিয়েছে।

mzamin


Tuesday, January 29, 2019

ওমানে বাংলাদেশী অভিবাসীদের মহানুভবতা

ওমানের মাসকটে শয্যাশায়ী বাংলাদেশী শ্রমিক মোহাম্মদ লিটন (৩২)। শুধু যে শয্যাশায়ী তা নয়, তার শরীরের বেশির ভাগ অংশ বিকল বা প্যারালাইজড। কাঁধের নিচ থেকে শরীরের নিচের অংশের এই অবস্থা। চিকিৎসকরা পরামর্শ দিয়েছেন তাকে বাংলাদেশে এনে চিকিৎসা করাতে। কিন্তু লিটনকে দেশে আনা সহজ কথা নয়। বিশেষ ব্যবস্থায় তাকে আনতে হবে ঢাকায়। এ জন্য পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলভিত্তিক একটি বিমান সংস্থা চেয়েছে ১৫০০ ওমানি রিয়াল। এত টাকা তার পক্ষে যোগাড় করা অসম্ভব।
এ খবর ছড়িয়ে পড়লো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। অমনি এগিয়ে এলেন বাংলাদেশী অভিবাসীরা। তারা স্বদেশী ভাইয়ের জন্য মন উজার করে সংগ্রহ করলেন তহবিল। তাতে ওই ১৫০০ ওমানি রিয়াল সংগ্রহ হয়ে গেছে। ফলে লিটন এখন দেশে ফিরে মা-বাবা, স্বজনের মুখ দেখার স্বপ্ন দেখছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন মাসকট ডেইলি।
লিটন একটি ফার্মে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। কিন্তু প্রায় আড়াই মাস আগে তার শরীরের নিচের অংশে অস্বাভাবিক এক সমস্যা দেখা দেয়। তিনি শরীর নাড়াতে পারেন না। এ অবস্থায় মাসকটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়। কিন্তু অবস্থার আরো অবনতি ঘটে। প্যারালাইজড হয়ে যায় তার শরীরের নিচের অংশ। তারপর থেকে গত দেড় মাসের মতো বিছানায় পড়ে আছেন লিটন। ওই হাসপাতালের চিকিৎসকরা তাকে দেশে ফিরে আরো চিকিৎসা নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। যোগাযোগ করা হয় বিমান সংস্থার সঙ্গে। তারা লিটনকে ঢাকা পর্যন্ত বিশেষ ব্যবস্থায় পৌঁছে দেয়ার জন্য চেয়ে বসে ১৫০০ ওমানি রিয়াল। এ অবস্থায় তার শারীরিক অবস্থা এবং আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে পড়ে। আর মানবতার স্বার্থে এগিয়ে আসেন বাংলাদেশী অভিবাসীদের একটি দল। তারা লিটনকে দেশে ফেরত পাঠানোর টিকেট কিনতে সংগ্রহ করতে থাকেন তহবিল।
টাওয়েল অটো সেন্টারের মাসকট সেলসের প্রধান সুদীপ ব্যানার্জী বলেন, লিটন হলেন তাদের একজন সাপোর্ট স্টাফের ভাই। তার ভাষায়, আমরা জানতে পারি লিটন অসুস্থ। তার শরীরের নিচের অংশ প্যারালাইজড। এখন এ অবস্থার বিস্তার লাভ করেছে। শরীরের উপরের অংশও প্যারালাইজড। কাঁধের নিচ পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে তা। লিটনের এমন অবস্থার কথা শুনতে পেয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম তাকে দেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ব্যবস্থা আমাদেরকে নিতেই হবে। এ সময়ে দিনরাত ২৪ ঘন্টা লিটনের পাশে একজন কারো থাকা উচিত, তার দেখাশোনার জন্য। তা ছাড়া এই বেসরকারি হাসপাতালে অবস্থান করাও ব্যয়বহুল। এ জন্য তার আত্মীয়-স্বজনরা বেশ কিছু বিমান সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে দেশে ফিরিয়ে নেয়ার বিষয়ে।
বাংলাদেশের একটি বিমান সংস্থা তাদেরকে জানায়, এমন রোগিকে পরিবহন করতে যে সরঞ্জাম প্রয়োজন তা তাদের কাছে নেই। অন্যরা বিমান ভাড়া এতটা হাঁকালো যে তা তার বা তার পরিবারের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। লিটনকে দেশে পাঠাতে হলে কমপক্ষে ১৫০০ রিয়াল প্রয়োজন।
সুদীপ ব্যানার্জী বলেন, এ নিয়ে আমি সহকর্মী ও অন্যান্য কোম্পানিতে নিয়োজিত শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করি। সবার কাছে সহায়তার হাত বাড়ানোর আহ্বান জানাই, যাতে আমরা লিটনকে তার মায়ের কাছে ফেরত পাঠাতে পারি। অবশেষে সবার মনখোলা সহযোগিতায় লিটনকে দেশে পাঠানোর মতো অর্থ সংগ্রহ হয়েছে। এখন তাকে দেশে পাঠানোর জন্য সঙ্গে যাওয়া একদল ডাক্তারও ঠিক করা হয়েছে। সব ডকুমেন্ট প্রস্তুত। লিটন অপেক্ষা করছে দেশের উদ্দেশে যাত্রার জন্য।

Friday, September 18, 2009

জন্মভূমির সঙ্গে রয়েছে মানুষের এক রহস্যময় যোগসূত্র -প্রবাসী বাঙালি by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

‘প্রবাসী বাঙালি’ শব্দটার সূচনা এ কালে নয়, ব্রিটিশ আমলে। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকেই বাঙালি ‘বাবু’রা সারা ভারতে বিদ্বান হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। ফলে ভালো চাকরিবাকরি নিয়ে তারা বাংলার বাইরে পাড়ি জমাতে শুরু করে। তবে ব্রিটিশ যুগে বাঙালির প্রবাসের দৌড় এই উপমহাদেশের বাইরে খুব একটা পৌঁছায়নি। ভারতবর্ষের নানা জায়গা, বিশেষ করে উত্তর ভারতের ছোট-বড় শহর ও অন্যান্য এলাকায় এরা বেশ ভালোভাবেই জেঁকে বসে। আগেই বলেছি, এদের অধিকাংশই ছিল উচ্চ শিক্ষিত মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দু। বিদ্যার জন্য ভারতবর্ষের সবখানে এদের কদর ছিল। সঞ্জীব চন্দ্রের ‘পালামৌ’, রবীন্দ্রনাথ, শরত্চন্দ্রের বেশ কিছু লেখায়, বিভূতিভূষণের আরণ্যক-এর মতো অন্যান্য লেখকের অনেক লেখায় বাঙালির এই বহির্মুখী যাত্রার ছবি রয়েছে। বিশ শতকের শুরুতেই এলাহাবাদে প্রবাসী বাঙালিদের যে বড়সড় একটা গোষ্ঠী গড়ে উঠেছিল তা বোঝা যায় সেখানে অতুল প্রসাদের নেতৃত্বে আয়োজিত বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের ঘনঘটা দেখেই।
প্রবাসী বাঙালি আজ শুধু এই উপমহাদেশের চৌহদ্দীতে সীমাবদ্ধ নয়, পৃথিবীর সব দেশের সব শহরে এরা ছড়িয়ে পড়েছে। দারিদ্র্যের দুঃসহ চাবুক থেকে বাঁচার জন্য বা সচ্ছল জীবনের স্বর্ণমৃগের পেছনে ছুটে বাঙালি আজ বসত গাড়েনি এমন জায়গা পৃথিবীতে কম। আমার ধারণা, আল্পসের উচ্চতম শৃঙ্গের ওপর পৌঁছাতে পারলেও সেখানে দোকান খুলে বসে থাকা অন্তত একজন বাঙালির দেখা মিলবে। গত ৪০ বছর বাংলাদেশের বাঙালিদের জীবনে বল্গাহীন গোল্ডরাশের যুগ। সৌভাগ্যের সোনার হরিণের পেছনে ছুটে লাখ লাখ বাঙালি এ সময় সারা পৃথিবীতে ছড়িয়েছে। বাংলাদেশ বা পশ্চিম বাংলার বাইরের এই বিশ্ববাংলাকে তারা বলে ‘তৃতীয় বাংলা’। তাদের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ থেকে গেছে মূলত শিক্ষিত পেশাজীবী বাঙালিরা। কিন্তু বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এখানকার মানুষের সামনে আচমকা সুযোগের কোটি কোটি রুদ্ধ দরজা খুলে যাওয়ার ফলে এখান থেকে শিক্ষিত মানুষের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী বাঙালি বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। তাদের সংখ্যা আজ মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো। লন্ডন শহরের ৮০ লাখ অধিবাসীর মধ্যে সাড়ে তিন লাখই আজ বাঙালি। নিউইয়র্কে বাঙলির সংখ্যা এক লাখের বেশি, লস অ্যাঞ্জেলেস, টরন্টো বা রোমে কম, সে কম ৫০ হাজার করে। পৃথিবীতে ছোট-বড় এমন শহর কমই আছে, যেখানে বাঙালির একটা ছোটখাটো ডেরা নেই। আজ বাংলাদেশের মানুষের জন্য কোনো দেশই যেন আর বিদেশ নয়। যে দেশে যে শহরেই যান মুহূর্তের মধ্যে সেখানে কিছু ‘বাঙালি ভাই’ পেয়ে যাবেন এবং প্রাণভরে বাংলায় কথা বলতে পারবেন। ‘প্রবাসে বাঙালিমাত্রেই সজ্জন’। কাজেই বেশ কিছু দেশায়ালি ভাইয়ের বাড়িতে ভাত-মাছের নিমন্ত্রণ পেয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়। সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-পড়া প্রবাসী বাঙালির সংখ্যা আজ ৫০ লাখের ওপর। প্রবাসী বাঙালি শ্রমিকদের পাঠানো টাকা আজ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের বৃহত্তম উত্স।

২.
একজন মানুষের শৈশব-কৈশোরের সুন্দর দিনগুলো যে দেশে কাটে, জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সেটিই তার দেশ। সেটিই তার চিরকালের জন্মভূমি। যত দূরে বা যে দেশেই সে যাক, শৈশবের স্নিগ্ধ রঙিন অনুভূতিভরা দিনগুলোয় যে দেশের গাছপালা, নদী, আকাশকে সে তার রক্তকণিকায় আহরণ করেছে, সেই জন্মভূমির জন্যই তার আমৃত্যু কান্না। এর কারণ খুঁজে পাওয়া কঠিন নয়। আমাদের জীবনের প্রিয়তম, রঙিনতম জিনিসগুলো আমরা তো আহরণ করি আমাদের শৈশব-কৈশোরেই। এ সময় চারপাশ থেকে আমরা যা কিছুই গ্রহণ করি, তা এমনভাবে আমাদের রক্তের কণায় কণায় মিশে যায় যে তা-ই হয়ে যায় আমাদের আজন্মের পরিচয়। মৃত্যু পর্যন্ত ওই মানুষটাই আমরা থাকি। প্রবাসজীবনের সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো ওই স্বপ্ন আর ভালোবাসার দেশটাকে তাদের আচমকা হারিয়ে ফেলতে হয়। তাই দেশত্যাগী স্মৃতিভারাতুর এই মানুষগুলো পৃথিবীর নানা বিচ্ছিন্ন প্রান্তে গিয়েও এই দেশটির চারপাশেই সারা জীবন জেগে থাকে। কেবল তারাই নয়, তাদের সন্তানসন্ততি এমনকি অনেক পরের প্রজন্মের মানুষেরা—যারা নানা দেশের বাসিন্দা হয়ে পুরো ভিন্ন মানুষ হয়ে গেছে, যাদের সংস্কৃতি আলাদা, ভাষা আলাদা, পোশাক-আশাক, আচার-আচরণ আলাদা, তারাও তাদের পিতৃপিতামহের ফেলে আসা সেই অতীত দেশটির জন্য—নিজেদের আদি শেকড়ের জন্য—একটা ব্যাখ্যাহীন আকুলতা অনুভব করে। যে দেশে যত দিন ধরেই তারা থাকুক, ঐতিহ্য, ধর্ম বা বর্ণগত পার্থক্যের কারণে সেখানকার মানুষের সঙ্গে তারা কখনোই পুরোপুরি এক হতে পারে না—তাদের জীবনের ভেতর কিছু পরিমাণ ফাঁকা জায়গা থেকেই যায়। উেসর সঙ্গে একাত্ম হয়ে এ জন্যই তারা হয়তো তাদের সেই শূন্য স্থান পূরণের চেষ্টা করে।
প্রবাসী জীবনের একটা খুব বড় ধরনের দুঃখের দিক আছে, সেটা হলো, যত সুখ আর সম্ভোগের মধ্যেই তারা থাকুক, শেষ হিসেবে তারা যাযাবর, উদ্বাস্তু। ঘরবাড়ি, আত্মীয়, বন্ধু-শৈশব-কৈশোর, জন্মভূমি জননী পিছে ফেলে অপরিচিত দূরদেশে, অচেনা পরিবেশে পরিচয়হীনভাবে মৃত্যু পর্যন্ত তাদের ঘুরে বেড়াতে হবে, যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ, প্রকৃতি কোনো কিছুর সঙ্গেই তাদের আত্মার সত্যিকার যোগ নেই। তাদের ভবিষ্যত্ প্রজন্মের সন্তানসন্ততিরা মিশে যাবে ওসব দেশের জল-হাওয়া বা ভাষা-সংস্কৃতির সঙ্গে, ওইসব সংস্কৃতির বৈভব আর উত্তেজনার ভেতর মর্যাদাবান (কিংবা হয়তো তাদের মতোই মর্যাদাহীন) জীবন কাটাবে; কিন্তু তাদের সেখানে বেঁচে থাকতে হবে বহিরাগতের মতো, প্রায় অবাঞ্ছিত হিসেবে। তারা সেখানকার সবকিছুই দেখবে, উপভোগ করবে—সেসব থেকে আনন্দও হয়তো পাবে। কিন্তু কোনো কিছুকেই নিজের বলে ভাবতে পারবে না। যেন এসব তাদের নয়, অন্য কারও। যেন নাগরিক হয়েও তারা নাগরিক নয়, যেন তারা এক ধরনের চির পর্যটক। প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে উদ্বাস্তুজীবনের এই গভীর দুঃখ আমি সব জায়গায় অনুভব করেছি। লক্ষ করেছি বাংলার গাছপালা-ঢাকা সবুজ গ্রাম, মেঘ-ওড়া নীল আকাশ, নদীর কলকণ্ঠ—সবকিছুর পাশে কীভাবে তাদের হূদয় মরে পড়ে আছে। ছেলেবেলার বন্ধু, শৈশব-কৈশোরের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠিনী, বাংলার মাটি, বাংলার জল—সবকিছুর জন্য তাদের কী আকুতি, কী ব্যাকুলতা।
সন্দেহ নেই আমরা যারা বাংলাদেশে থাকি তাদের চেয়ে বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভেতর অনেক বেশি। এটা অকারণে নয়। আমরা যারা বাংলাদেশে বাস করছি, প্রতিদিন এর প্রিয়-অপ্রিয়, তিক্ত বা বিরক্তিকর সান্নিধ্য বা উপস্থিতি সহ্য করতে বাধ্য হচ্ছি, তাদের কাছে দেশ যতখানি স্বপ্নের জিনিস, তার চেয়ে অনেক বেশি বাস্তব আর কাঠখোট্টা। এ সম্পর্ক একেবারেই দাম্পত্য সম্পর্ক বা তেল-নুন-লাকড়ির মতো হিসাব করার ব্যাপার। অতি পাওয়ায় এ একঘেয়ে, বিরক্তিকর। কিন্তু বাংলাদেশের সঙ্গে প্রবাসীদের সম্পর্ক দাম্পত্যের মতো বিস্বাদ, কটু বা একঘেয়ে নয়, এ সম্পর্ক প্রেমিক-প্রেমিকার সম্পর্ক। বিচ্ছেদের কষ্টে এ দীর্ণ; তাই এ এমন হাহাকার-ভরা। জেলখানার কয়েদির কাছে প্রাচীরের বাইরের তুচ্ছ একটা পাখির গান বা দূরের কোনো মানুষের কণ্ঠের ছোট্ট একটু সজীব আওয়াজ যেমন মুক্ত আর চিরযৌবনের বার্তা নিয়ে হাজির হয়, তাদের কাছে মাতৃভূমিও তা-ই। দেশ হয়ে ওঠে স্বর্গাদপি গরীয়সী।
এই স্বপ্নের জন্য পৃথিবীজোড়া দেশ-বিদেশের অসংখ্য শহরে আজ লাখ লাখ বাঙালি বিষণ্ন দীর্ঘশ্বাসে দিন কাটায়। অনেক উপস্থিত বাস্তব দুঃখ তাদের এই বিষণ্নতা আর অসহায়তাকে বাড়িয়ে দেয়। চোখের সামনে তারা দেখে, বিদেশে জন্ম নিয়ে বা বেড়ে উঠে তাদের ছেলেমেয়েরা ভিন্ন সংস্কৃতির ভেতর বিচ্ছিন্ন হতে হতে একসময় অচেনা হয়ে যাচ্ছে, তাদের বিজাতীয় ও অশালীন চালচলন মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। নিজেদের দুর্ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে কখনো দেশে ফিরে যাওয়ার কথাও তারা হয়তো ভাবে। কিন্তু তত দিনে নিজেদের তৈরি বিধিলিপিই তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে গেছে। আজ দেশে ফিরলেও সন্তানসন্ততির সঙ্গে চিরবিচ্ছিন্নতা, না ফেরা মানেও তাদের হারানো। তারা টের পায় নির্মম অর্থকষ্টের চাবকানি বা বেশি রকম লাভের মোহে দেশ ছাড়ার পর সত্যি সত্যি বড় বেশি দেরি করে ফেলেছে তারা। সে দেশের মাটিতে তাদের শেকড় ছড়িয়ে গেছে। তাদের ছেলেমেয়েদের অস্তিত্ব বা ভবিষ্যত্ও আজ সে দেশের মাটির সঙ্গে নিয়তির মতো বাঁধা।
তাদের এ কথা ভাবতে কষ্ট লাগে যে তাদের সন্তানেরা তাদের মতো বাংলাদেশি নয়। ওই সন্তানদের শৈশব-কৈশোর কেটেছে ওই দেশে। তাদের দেশ আমেরিকা বা এমনই কোনো দেশ। তাদের বাবাদের যেমন আমেরিকা বা ইংল্যান্ডের সঙ্গে কোনো আত্মিক যোগ নেই, তাদেরও তেমনি নেই বাংলাদেশের সঙ্গে। সন্তানদের এভাবে অপরিচিত হয়ে ওঠার কষ্ট বাবা-মায়ের বুকে পেরেকের মতো বেঁধে। মানুষ ভাবতে ভালোবাসে তাদের জৈবিক অস্তিত্বের মতো তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও সন্তানদের মধ্য দিয়ে বহমান থাকুক। কিন্তু যখন তারা দেখে, তাদের ছেলেমেয়েরা আলাদা দেশের অপরিচিত মানুষ হয়ে যাচ্ছে, নিজস্ব সংস্কৃতির গৌরবময় পরিচয়কে পর্যন্ত সম্মান করছে না, তখন তারা এক নিদারুণ একাকিত্বে ভোগে। এ দেশে আসার সময় এই পরিস্থিতির জন্য তারা প্রস্তুত ছিল না। যে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য একদিন তারা প্রিয় জন্মভূমি, বন্ধু, ভাই, আত্মীয়স্বজন ছেড়ে অনিশ্চিত বিদেশের পথে পা বাড়িয়েছিল, তাদের উপেক্ষা-তাচ্ছিল্য তাদের ভেতরে ভেতরে কাঁদায়, ভেঙে দেয়।
পৃথিবীর সব দেশেই বাঙালিদের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য যে উত্কণ্ঠা, আগ্রহ বা ব্যাকুলতা দেখি, তা দেখে উগ্র জাতীয়তাবাদী না হয়েও আমার মনে হয়েছে মানুষ আর তার জন্মভূমির মধ্যে রয়েছে এক রহস্যময় যোগসূত্র।

৩.
দেশের জন্য এই ব্যাকুলতা প্রবাসীদের মধ্যে যে কতখানি প্রবল, একটা গল্প শুনিয়ে তা বোঝানোর চেষ্টা করি। আগেই বলেছি, বিদেশে বাস করা সম্পন্ন বা সচ্ছল বাঙালিদের মধ্যে এই ব্যাকুলতা যতখানি তার চেয়ে এ অনেক বেশি পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা শ্রমিক শ্রেণীর গরিব-অসহায় মানুষের মধ্যে। সচ্ছল মানুষদের মনকে জন্মভূমির রক্তিম হাতছানি যে কখনো কখনো উতলা করে না তা নয়। কিন্তু গাড়ি-বাড়ি, বিলাস-বৈভবে, ঝলমল করা তাদের জীবনে সে পিছুটান খুব বড় কিছু নয়। তা ছাড়া ইচ্ছা করলেই তো তারা মাঝেমধ্যে দেশে এসে ঘুরে যেতে পারে। তারা তা যায়ও। তাই বিদেশে থাকলেও দেশের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কষ্ট তাদের অত প্রবল নয়। কিন্তু গরিব প্রবাসীদের ব্যাপারে ঘটনাটা আলাদা। আদম বেপারিদের খপ্পরে পড়ে জমি-বাড়ি বিক্রি বা বন্ধক দিয়ে নামমাত্র রোজগারের আশায় অচেনা দূর বিদেশের পথে পাড়ি জমায় তারা। দূরদেশের নির্মম আবহাওয়া বা ঝলসানো রোদের ভেতর শরীর আয়ু ক্ষয় করে অমানুষিক শ্রমে তাদের জন্য দূর প্রবাস থেকে এরা বছরের পর বছর টাকা পাঠায়। সেই টাকা দিয়ে তার ভাইয়েরা বাজার থেকে চড়াদামে মাছ-মাংস কিনে নবাবী হালে দিন কাটায়, চায়ের দোকানে আড্ডা দিয়ে ফূর্তিতে সময় গুজরান করে। ভাইয়ের পাঠানো টাকায় তার জন্য জমি কেনার বদলে অনেক সময় গোপনে তা নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়। তবু এই মানুষগুলো তাদের মুখ স্মরণ করেই হাজারো শৌখিন জিনিসে বড় বড় ব্যাগ-বস্তা ভর্তি করে বাড়ি ফেরে।
এমনই একদল দুঃখী মানুষের সঙ্গে বছর তিনেক আগে দেখা হয়েছিল, দুবাই এয়ারপোর্টে। সেবারও আমেরিকা থেকে ফিরছিলাম। দুবাইয়ে প্লেন পাল্টে ঢাকার প্লেনে উঠছি। বের্ডিং কাউন্টারে গিয়ে দেখি ফ্লাইটে বিদেশি নেই বললেই চলে। কাউন্টারজুড়ে গিজগিজ করছে মধ্যপ্রাচ্যের নানা জায়গা থেকে জড়ো হওয়া ঘরমুখো বাঙালি শ্রমিকের দল। বুঝলাম, এদের নিয়মিত আনা-নেওয়ার জন্যই এমিরেটস, ইতিহাদ, কাতার বা কুয়েত এয়ারলাইনসের এত ঢাকামুখো ফ্লাইট। এদের কেউ তিন বছর কেউ চার বছর কেউ এমনকি পাঁচ বছর পর দেশে ফিরছে, সবার সঙ্গে বিরাট বিরাট বাক্স-পেঁটরার ভেতর কেনাকাটা করা সাধ্যমতো জিনিসপত্র। প্রিয়জনের জন্য কেনা এই জিনিসগুলো তাদের হাতে তুলে দেওয়ার স্বপ্নে তাদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। দেশের জন্য কী ব্যাকুলতা আর স্বপ্ন সবার চোখে। বাঁধভাঙা বন্যার মতো উদ্বেল হূদয় নিয়ে ফ্লাইটের পাঁচ ঘণ্টার দীর্ঘ সময়টুকু সহ্য করার শক্তিও যেন তারা হারিয়ে ফেলেছে। যেন পারলে দুবাইয়ে প্লেনে উঠেই সরাসরি ঢাকা বিমানবন্দরে নেমে যায়। কথা বলে বোঝা গেল এদের অধিকাংশই লিখতে-পড়তে পর্যন্ত জানে না। আমার পাশেই বসেছিলেন রীতিমতো স্যুটটাইপরা ডাকসাইটে এক ভদ্রলোক। কিছুক্ষণ আলাপের পরে একগাল বিগলিত হাসির সঙ্গে হাতের ইমিগ্রেশন আর কাস্টমসের কাগজ দুটো আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ভাবলাম, আমার ওগুলো দরকার ভেবেই হয়তো ওগুলো আমাকে দিচ্ছেন। বললাম, আমার আছে, লাগবে না।
‘একটু ফিলাপ কইরা দিবেন স্যার?’ মুখে দাঁত বের করা বিগলিত হাসি। কী আশ্চর্য! এ রকম একজন স্যুটপরা পুরোদস্তুর ডাঁটপাটওয়ালা ভদ্রলোক লিখতে পর্যন্ত জানেন না? কিন্তু না, এমন বাঙালি একজন-দুজন না, হাজারে হাজারে পাবেন মধ্যপ্রাচ্যের মতো পৃথিবীর নানা দেশের খেটে-খাওয়া মানুষের ভিড়ে।
কথায় কথায় জানলাম, তিনিও একজন শ্রমিক। বাড়ি সিলেটে। রিয়াদে কাঠমিস্ত্রির কাজ করেন। প্রথম এসেছিলেন বসরায়, ইরাকে। সেখানে যুদ্ধের তাড়া খেয়ে আরবে পাড়ি জমিয়েছেন।
তার ফরম ফিলাপ শেষ হতেই আরেকটা হাত এগিয়ে এল সামনের দিক থেকে। তারটা শেষ হতেই দেখি চারপাশ থেকে ডজনখানেক হাত আমার দিকে এগিয়ে আছে। সব হাতে একই ফরম। সবাই যে ভদ্রভাবে অনুরোধ করছে তা-ও না। অনুরোধ করার ভাষাও অনেকে জানে না। এ ধরনের দেহাতী মানুষের পক্ষে কী করেই বা তা সম্ভব?
‘এই যে, দেন তো, আমারডা ফিলাপ কইরা দেন।’
মনে হয় হুকুম করছে।
দুঃখী এই লোকগুলোর জন্য মমতায় মনটা ভরে উঠল। প্লেনযাত্রার পুরো সময়টা এদের ফরম ফিলাপ করে চললাম। এদিকে বাংলাদেশ এগিয়ে আসছে। প্লেন ভর্তি লোকগুলোর মধ্যে টানটান উত্তেজনা। কখন আসবে বাংলাদেশ। কেন আসছে না। লোকগুলোর চেহারায় আগ্নেয় উগ্রতা। সবার কথাবার্তার বিষয় একটাই: বাংলাদেশ। ঘরে ফেরার আগ্রহে, আনন্দে, উত্তেজনায় যেন ফেটে পড়ছে সবাই।
সামনের টিভির পর্দায় প্লেনের ছুটে চলার ছবি চোখে পড়ছে। আরব সাগরের ধার দিয়ে করাচির পাশ কাটিয়ে দিল্লি-কানপুর পেরিয়ে প্লেন এখন বিহারের ওপর। এখনো অন্তত ঘণ্টাখানেক বাকি। যাত্রীরা অস্থির, বেসামাল। উত্তেজনায় যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। কোথায় বাংলাদেশ, কোথায় তুমি? মাতৃভূমি, তুমি কত দূর! অধিকাংশ লোকই মানচিত্র চেনে না। বুঝতে পারছে না ঠিক কোনখানে আছে। হঠাত্ জানালার পাশ থেকে কে একজন চিত্কার করে উঠল: ওই যে! ওই যে।
তার ব্যগ্র চিত্কার সারা প্লেনে যেন কেঁপে কেঁপে বেড়াতে লাগল। সবাই যেন মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিল। হঠাত্ প্লেনের ভেতর ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। প্লেন ভর্তি প্রায় সব লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে হুড়মুড় করে জানালার দিকে ঝুঁকে কী যেন আঁতিপাতি করে খুঁজছে। গলায় শুধু একটাই চিত্কার—কই? কই? (কোথায় আমার দেশ—ভাই, সন্তান, জীবনসঙ্গী, বাপ, মা, কোথায় তোমরা?) প্লেন ভর্তি এত লোক পাগলের মতো উঁকিঝুঁকি দিয়ে শুধু বাংলাদেশ দেখার চেষ্টা করছে।
হঠাত্ গোটা প্লেন ভর্তি লোক একসঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলে যে বিমানের বিপদ হতে পারে সে জ্ঞান নেই এই লোকগুলোর। বিমানবালা আর পুরুষ ক্রুরা ধমক দিয়ে, চিত্কার করে পাগলের মতো দুই হাতে টেনেহিঁচড়ে ঘাড় চেপে তাদের বসানোর চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু জানালা থেকে তাদের ফেরানো সোজা নয়। প্রবাসীদের কাছে বাংলাদেশ এমনই এক জ্বলন্ত রূপসী। আমাদের কাছে এর কতটুকু?
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: লেখক, প্রাবন্ধিক। প্রতিষ্ঠাতা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র।