Showing posts with label মৌলভীবাজার. Show all posts
Showing posts with label মৌলভীবাজার. Show all posts

Thursday, July 16, 2026

শতবর্ষী করচের জলাবনে যেতে যেতে কত কী চোখে পড়ে

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাদিপুর গ্রামে সকালটা অন্য রকমভাবে আসে। এটি কাউয়াদিঘি হাওরপারের একটি গ্রাম। ওই গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে গেলে সামনে পড়ে অন্তেহরি, এটি রাজনগর উপজেলার আরেকটি গ্রাম। অন্তেহরিও কাউয়াদিঘি হাওরের কোল ঘেঁষে শত বছর ধরে প্রাণ-প্রকৃতির অংশ হয়ে গেছে। বর্ষায় হাওরের উত্তাল ঢেউ সামলে এই গ্রামে মানুষের বাস। যত দূর চোখ যায় অবারিত রুপালি জলের ভাঁজ করা শীতলপাটি।

শীতে আরেক প্রকৃতি। দিগন্তজুড়ে শুধু বিস্তীর্ণ সবুজ। উড়ে যায় পরিযায়ী পাখির ঝাঁক। এই অন্তেহরি গ্রামকে ছুঁয়ে শত বছরের পুরোনো করচগাছে নীরবে-নিভৃতে তৈরি হয়েছে এক টুকরা ‘জলাবন’। ওখানে জলে শরীর ডুবিয়ে পুরো বর্ষাটাই পার করে এই গাছেরা।

মৌলভীবাজার শহরতলির মৌলভীবাজার-কুলাউড়া সড়কের চাঁদনীঘাট থেকে উত্তর দিকে একাটুনা-জগৎপুর হয়ে অন্তেহরির দিকে গেছে একটি পাকা সড়ক। অন্তেহরির ওই জলাবনের দিকে ‘যেতে যেতে পথে’ কাদিপুরে তখন মৌসুমি মাছের হাট জমে গেছে। এখানে হাটের মানুষ, ঘাটের মানুষ খুব বেশি না হলেও একরকমের প্রাণ আছে। কেউ রাতে কাউয়াদিঘি হাওর থেকে ধরা মাছ নিয়ে এখানে এসেছেন। কেউ এসেছেন পাইকারি দরে মাছ কিনে শহরে নিয়ে যেতে, কেউ গ্রামে গ্রামে ফেরি দিয়ে ওই মাছ বিক্রি করবেন। কিছু ক্রেতাও আছেন, যাঁরা হাওরের টাটকা মাছ কিনতে এখানে ছুটে এসেছেন।

একটা স্বল্পস্থায়ী হাট জমে কাদিপুরের ওই স্থানে। কারও ডোলায় চিংড়ি মাছ, কারও ডোলায় পুঁটি–টেংরাসহ বারো জাতের মাছ। কারও ডোলায় শিং-মাগুর, চ্যাং, কৈ, ভেদা, নানা রকম গুঁড়া মাছ।

কাদিপুর থেকেই অন্তেহরি গ্রামের শত বছর বয়সী করচগাছগুলোকে চোখে পড়ে। সেই কবে গাছগুলো এখানে মাথা তুলতে শুরু করেছিল, তা বলার মতো কেউ আর বেঁচে নেই। স্থানীয় মানুষেরা জানেন, তাঁদের বাপ-দাদারাও যেমন এই গাছগুলো দেখে গেছেন, এখন তাঁরাও দেখছেন। স্থানীয় লোকজনের ধারণা, এই গাছ কেউ রোপণ করেনি। হাওরপারে প্রকৃতির আপন নিয়মে জলাভূমির অন্য সব গাছের মতো এরাও এখানে কোনো এক সময় শিকড় পুঁতেছে। তারপর ধীরে ধীরে বাতাসের বুকে ডালপালা মেলেছে। সেই যে সংসার পেতেছে তারা, এখনো আছে। আগে অনেক গাছ ছিল। নানা দুর্যোগ-দুর্বিপাকে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তারপরও সব কটা একেবারে বাস্তুহারা হয়ে পড়েনি।

এখনো বর্ষা এলে এই করচগাছগুলো এক টুকরা জলাবন হয়ে ওঠে। বৈশাখের সময় থেকে কাউয়াদিঘি হাওরে পানি বাড়তে থাকে, তখন হাওর ভরা অবাধ জলের থইথই। তখন করচের গাছগুলো পানির তলায় ডুবতে থাকে। পানি যত বেশি, তাদের শরীরও ততই ডুবে। অনেকেই একপশলা শান্তির সন্ধানে ওই জলাবনের কাছে কখনো দুপুর, কখনো বিকেলের সময়টিকে পার করতে ছুটে আসেন।

স্থানীয় লোকজন জানালেন, এবার এই আষাঢ়েও কাউয়াদিঘি হাওরে খুব বেশি পানি হয়নি। অন্য বছর এই সময়ে যতটা পানি হতো, এবার তার চেয়ে অনেক কম পানি হয়েছে। কিছু কিছু করচগাছের গোড়া অনেকটা শুকনা মাটিতে ভেসে আছে। অন্য বছর এই সময়ে গাছগুলো সারা শরীর ডুবিয়ে থাকে, এবার এখনো সে রকম পানি হয়নি। তবে নৌকা নিয়ে জলাবনে ভেসে বেড়াতে কোনো সমস্যা নেই। ওখানে জলের সঙ্গে জলের খেলা চলছে। ‘কালের যাত্রার ধ্বনি’ কেউ শুনছে কি শুনছে না, ওখানে হাওর-জলের ইতিহাস সঙ্গে করে ‘জলাবন’ স্থির হয়ে থাকে।

এক টুকরা জলাবনে এখনো মানুষকে কাছে টানবার আকর্ষণ করচের আছে। মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরপারের অন্তেহরিতে
এক টুকরা জলাবনে এখনো মানুষকে কাছে টানবার আকর্ষণ করচের আছে। মৌলভীবাজারের কাউয়াদিঘি হাওরপারের অন্তেহরিতে। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, June 13, 2026

কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে বাংলাদেশি তরুণ নিহত

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে মুজিব আলী (২০) নামের বাংলাদেশি এক তরুণ নিহত হয়েছেন। আজ শুক্রবার সন্ধ্যায় উপজেলার শরীফপুর ইউনিয়নের দত্তগ্রাম সীমান্তে ভারতের অভ্যন্তরে এ ঘটনা ঘটে।

দত্তগ্রাম সীমান্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৪৬ ব্যাটালিয়নের আওতায় পড়েছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ওই ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ শুক্রবার রাত সাড়ে নয়টার দিকে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, বিএসএফ নিহত মুজিবের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় হাসপাতালের মর্গে নিয়ে গেছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্নের পর তারা লাশ হস্তান্তর করবে বলে জানিয়েছে।

নিহত মুজিব আলী একই এলাকার বাসিন্দা মৃত অজিব উল্লাহর ছেলে। শরীফপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) স্থানীয় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য জয়নুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, নিহত মুজিব চোরাকারবারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ঘটনার সময় তাঁর সঙ্গে আরও কয়েকজন ছিলেন বলে জানা গেছে।

বিজিবি ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দত্তগ্রাম সীমান্তে মনু নদ দেশের সীমানা ভাগ করে দিয়েছে। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে দত্তগ্রামের বাসিন্দা মুজিবসহ ছয়-ছয়জন বাংলাদেশি মনু নদ পার হয়ে সীমান্তের ১৮৫২ ও ১৮৫৩ নম্বর মূল সীমান্তখুঁটির মাঝখান দিয়ে ভারতে ঢুকে পড়েন। সেখানে বিএসএফের টহলদল তাঁদের দেখে বাধা দেয়। একপর্যায়ে টহলদলের সদস্যরা গুলি চালালে মুজিব ঘটনাস্থলেই মারা যান। তাঁর সহযোগীরা দ্রুত সটকে পড়েন। এ দিকে গুলির শব্দ পেয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের সংশ্লিষ্ট এলাকার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা বিস্তারিত জানান।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত। ফাইল ছবি

Wednesday, June 10, 2026

হাওরের তাজা মাছের দুই বেলার হাট by আকমল হোসেন

তখন বেলা পড়ে এসেছে। কালো রঙের চীনা হাঁসের মতো চিপচিপে গলা বাড়িয়ে তরতর করে জলের নালা পেরিয়ে আসছে একেকটি নৌকা। তাতে দু–একজন করে লোক। কেউ নৌকা বাইছেন, কেউ বসে আছেন। সব কটি নৌকাতেই কমবেশি মাছ। তাঁরা মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওর থেকে মাছ ধরে দিনের শেষে একটি অস্থায়ী ঘাটে ফিরছেন। সেখানে অপেক্ষায় মাছের পাইকার আর ক্রেতা।

মৌলভীবাজার সদর উপজেলার একাটুনা ও আখাইলকুরা ইউনিয়নের সংযোগস্থল কাউয়াদীঘি হাওরপারের কালাইপুরা এলাকার একটি কালভার্টের ওপর এই হাট বসেছে। সকালে ও বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরে মাছ ধরে মৎস্যজীবীরা এ ঘাটে মাছ বিক্রি করতে আসেন। খুচরা মৎস্য ব্যবসায়ীরা ওখান থেকে পাইকারি দরে মাছ কিনে ছড়িয়ে পড়েন ছোট-বড় গ্রামীণ হাটের দিকে, শহরের দিকে। শ্রাবণ থেকে কার্তিক মাস—এ সময়ে এই অস্থায়ী হাট বসে। এখানে শুধু কাউয়াদীঘি হাওরের তাজা মাছই ওঠে।

কাউয়াদীঘি হাওরপারের গ্রাম কালাইপুরা। ওখানে গিয়েই দেখা মেলে এই হাটের। হাট বলতে সাধারণত যে চেহারাটা ধরে নেওয়া হয়, এ হাটে সে রকম কিছু নেই। এখানে শুধু ছোট ছোট বাঁশ–বেতের পাত্রে সাজিয়ে রাখা আছে মাছ। নৌকা থেকে মাছ নামানোর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় টানাটানি, দামাদামি। এবার পানি কম, মাছও কম। হাওরের মাছের চাহিদা বেশি থাকে, তাই দামটাও অনেক চড়া।

মাছ নিয়ে আসা কালাইপুরার মাসুম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সকাল বেলা ৫০০ টাকার মাছ বিক্রি করেছেন। বিকেলে যে মাছ পেয়েছেন, তা হয়তো ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ১০ থেকে ১৫ বছর ধরে করমউল্লাপুর কালভার্টে এই অস্থায়ী হাট বসছে। আগে এখানে কোনো হাট ছিল না। যাঁরা মাছ ধরতেন, তাঁরা নিজেরাই কাছের হাটবাজারে, নয়তো মৌলভীবাজার শহরে গিয়ে মাছ বিক্রি করতেন। অস্থায়ী হাট হওয়ায় এখানেই বেচে দেন।

এখানে যাঁরা মাছ নিয়ে আসেন, তাঁদের বেশির ভাগই কালাইপুরা গ্রামের। এটি মৎস্যজীবী–অধ্যুষিত একটি গ্রাম। দুই বেলাতেই এখানে এখন হাট বসে। রাতে যাঁরা হাওরে মাছ ধরেন, তাঁরা সকাল সাড়ে ছয়টা থেকে সাতটার মধ্যে এই ঘাটে মাছ নিয়ে আসেন। সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে বেচাকেনা শেষ, হাটও শেষ। দুপুরের পরে যাঁরা হাওরের দিকে মাছ ধরতে যান, তাঁরা বিকেল পাঁচটার দিকে হাটে আসেন। সন্ধ্যাতেই হাট শেষ। হাটে ছোট মাছই বেশি ওঠে। একদম তাজা মাছ, হাটে নিয়ে আসার পরও অনেক মাছ নড়াচড়া করে। পুঁটি, টেংরা, মলা, ভেদা, চান্দা–জাতীয় মাছই বেশি। মাঝেমধ্যে রুই–জাতীয় ছোট আকারের কিছু মাছ পাওয়া যায়। প্রতিদিন শুধু কালাইপুরা গ্রাম থেকেই অর্ধশতাধিক মানুষ হাওরে মাছ ধরতে যান। প্রতিদিন এই অস্থায়ী ঘাটে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকার মাছ বেচাকেনা হয়।

মো. আমির নামের এক ক্রেতা বলেন, তিনি প্রায়ই এখানে মাছের জন্য আসেন। এক হাজার টাকার ছোট মাছ কিনে বললেন, ‘হাওরের তাজা মাছের স্বাদই আলাদা।’

কালাইপুরা গ্রামের আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘১০ থেকে ১৫ বছর ধরে এখানে হাট বসছে। আগে এখানে এ রকম বেচাবিক্রি হতো না। প্রতিদিন ৫০ থেকে ১০০ জন হাওরে মাছ ধরতে যান। তাঁরাই ঘাটে মাছ এনে বিক্রি করেন। সকাল ও বিকেলে হাট বসে। শ্রাবণ মাস থেকে হাট শুরু হয়েছে, কার্তিক মাস পর্যন্ত যত দিন হাওরে পানি থাকবে, তত দিন চলবে।’

সাজিয়ে রাখা হয়েছে হাওরের তাজা মাছ। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের করমউল্লাপুর কালভার্ট ঘাটে
সাজিয়ে রাখা হয়েছে হাওরের তাজা মাছ। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপারের করমউল্লাপুর কালভার্ট ঘাটে। ছবি: প্রথম আলো

Friday, June 5, 2026

খামারের মাছ-মাংস আর ফল-ফসলে স্বপ্নের মতো জীবন হান্নানের by আকমল হোসেন

গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছের স্বপ্ন কতজনই না দেখেন! তবে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার বাহারমর্দ্দান গ্রামের মো. আবদুল হান্নানের মতো কয়জন সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন। অবসরপ্রাপ্ত এই ব্যাংক কর্মকর্তা নিজের জমিতে প্রয়োজনীয় প্রায় সব খাদ্যপণ্য উৎপাদন করেন। লবণ-চিনি ছাড়া বাজার থেকে তেমন কিছু কিনতে হয় না তাঁর। শাকসবজি, ফলমূল, মাছ, ডিম ও মাংস—সবই আসে নিজের খেত, খামার, বাগান ও পুকুর থেকে।

আবদুল হান্নান ছিলেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মাটির প্রতি টান ছিল শৈশব থেকেই। পড়াশোনার সময় ধান চাষে হাতেখড়ি। পরে ন্যাশনাল ক্রেডিট অ্যান্ড কমার্স (এনসিসি) ব্যাংকের সিলেট অঞ্চলের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ২০১৮ সালে অবসর নেন। অবসরজীবনে তিনি মাটির টানেই ফিরে গেছেন চাষাবাদে। শুরু করেন শাকসবজি, মসলা, দেশি-বিদেশি ফল, মাছ এবং দেশি জাতের মোরগ পালন। তাঁর বাগানে শোভা পাচ্ছে সৌদির খেজুর থেকে শুরু করে অ্যাভাকাডো, জলপাই, আতাসহ দেশি-বিদেশি নানা ফল।

সম্প্রতি এক দুপুরে বাহারমর্দ্দানে আবদুল হান্নানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, একজন শ্রমিক নিয়ে তিনি নিজেই গাছের পরিচর্যা করছেন। বাগানে দেশি-বিদেশি অনেক জাতের গাছ লাগানো। কোনোটাতে ফল এসেছে। কোনোটা নতুন লাগানো। বাগানের চৌহদ্দির মধ্যে পুকুর। পুকুরেই চাষ হচ্ছে রুই-কাতলা, মৃগেল, কার্ফু, পাঙাশসহ বিভিন্ন জাতের মাছ। প্রয়োজন হলেই পুকুরে বড়শি ফেলেন তিনি।

এই সৌখিন খামারি বলেন, চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর চাষাবাদের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে নেন। প্রায় ৬০ শতাংশ জমিতে শাকসবজি ও মসলার চাষ শুরু করেন। ধান চাষ আগে থেকেই করতেন। পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, শর্ষে, দারুচিনি, মরিচ, ধনিয়া, তেজপাতা—সবই নিজে উৎপাদন করেন। শর্ষে থেকে পরিবারের ভোজ্যতেলের চাহিদা পূরণ হচ্ছে। এবার মাছের খাবারের চাহিদা মেটাতে ভুট্টা চাষও শুরু করবেন। ৬০ শতাংশ জমিতে দেশি-বিদেশি ফলের চাষ করেছেন। সৌদি খেজুরের একটি গাছে এবার এক থোকা খেজুর এসেছে। অনেক খেজুরগাছ নিজেই চারা তৈরি করে লাগিয়েছেন। বাড়ির আশপাশের ৬০ শতাংশ জমিতেও আছে নানা প্রজাতির গাছ। ১০০ থেকে ১৫০টি দেশি জাতের মোরগ–মুরগি পালেন। সেখান থেকেই ডিম ও মাংসের চাহিদা পূরণ হয়।

স্থানীয় বাসিন্দা জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রথম আলোকে বলেন, যখন যে মৌসুম, তখন সেই রকম সবজি চাষ করেন আবদুল হান্নান। ফসল, ফল আর মাছে ভরা সংসার তাঁর। তেমন কিছু তাঁকে কিনে খেতে হয় না।

আবদুল হান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুরুর সময় তেমন কিছু জানতাম না। ধীরে ধীরে শিখেছি, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। এখন অনেকে আমার কাছ থেকে চাষাবাদের পরামর্শ নিতে আসেন। আমি নিজের মতো করে মাছের খাবার বানাই, ওষুধ দিই, জৈব সার উৎপাদন করি। বাগান ও খামারের সব কাজ নিজেই তদারক করি।’

পরিবারের প্রয়োজন মিটিয়ে উদ্বৃত্ত ফল ও পণ্য বাজারেও বিক্রি করেন আবদুল হান্নান। জানালেন, এখন পর্যন্ত পাঁচ থেকে ছয় লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এখন শুধু পরিচর্যার খরচ। বেশ তৃপ্তি নিয়ে তিনি বলেন, ‘লবণ-চিনি ছাড়া আর কিছু কিনি না। মাছ-মাংস, ফল-ফসল—সব নিজেরই উৎপাদন। চেষ্টাটাই আসল। খুব বেশি টাকা খরচ না করেও অনেক কিছু সম্ভব।’

আবদুল হান্নানের বাগানে আছে নানা জাতের দেশ–বিদেশি ফল
আবদুল হান্নানের বাগানে আছে নানা জাতের দেশ–বিদেশি ফল। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, February 21, 2026

হাওরপারে গোঁসাই বাড়ির পলাশগাছের গল্প

বসন্ত এসে গেছে। ধান কাটা শেষ হয়েছে অনেক দিন। পথের পাশে খড়ের মাঠে ছেলেরা দল বেঁধে ফুটবল খেলছে। খাইঞ্জার হাওরে বোরোখেতে কাজ করছেন কেউ কেউ। মাঠের ওপর কিছু চিল একা, কিছু দল বেঁধে উড়ছে।

খাইঞ্জার হাওর থেকে হঠাৎ চোখে পড়ে হাওরপারের গ্রামের একটি বাড়ির গাছপালার মাথায় যেন স্তূপ হয়ে আছে একগুচ্ছ আগুনের শিখা। হাওয়ায় সেই আগুনের শিখা দুলছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার মোস্তফাপুর ইউনিয়নের ভুজবল গ্রামের এই বাড়ি ‘গোঁসাই বাড়ি’ নামে পরিচিত। বাড়ির পুকুরপাড়ের গাছেই এমন আগুনের শিখার মতো পলাশ ফুল ফুটেছে। ফুল দেখে ‘পিন্দারে পলাশের বন পালাব পালাব মন...’ গানের কথা মনে পড়ে যায়।

বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে খাইঞ্জার হাওর এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় দেখা গেছে, রাস্তার পাশে কেউ খেত থেকে বোরো ধানের চারা তুলছেন, কেউ চারা রোপণ করছেন, কেউ খেতে পানি দেওয়ার ব্যবস্থা করছেন। স্থানীয় লোকদের কেউ কেউ পতিত মাঠ দেখিয়ে জানালেন, পানির ব্যবস্থা না থাকায় এই খেতে বোরো চাষ সম্ভব হয়নি। খেতের পাশ দিয়েই গেছে কোদালীছড়া। পাড়ে বুনো কিছু গাছের মধ্যে অনেক চিল বসে আছে।

গোঁসাই বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পলাশ ফুলের একটি গাছ নয়, ছোট-বড় অনেক গাছ ছড়িয়ে আছে বাড়ির এখানে-সেখানে। বাড়ির পুকুরপাড়ে, রাস্তার পাশে, ঝোপঝাড়ের ভেতর ছড়ানো-ছিটানো অনেক গাছ। ছোট-বড় পাঁচ-ছয়টি গাছে পলাশ ফুল ফুটেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু গাছ ২০-৩০ বছর বা তার চেয়ে বেশি পুরোনো। পুকুরপাড়ের দুটি গাছে বেশি ফুল ফুটেছে। গাছগুলোর মাথায় আগুন রঙের ঢেউ খেলছে। ফুল ঝরে পড়ছে গাছের নিচে। গাছতলা অনেকটা নকশা তোলা রঙিন চাদরের মতো হয়ে আছে। ফুলের কাছে শালিক ও কাঠশালিক পাখিই বেশি দেখা গেছে। তারা এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে গিয়ে বসছে। বাড়ির লোকজনের ধারণা, গাছগুলো প্রাকৃতিকভাবেই গজিয়েছে। বাড়ির উত্তরাধিকারীদের কেউই বলতে পারছেন না, পলাশ গাছগুলো কে লাগিয়েছেন। ফুল ফোটা একটি পলাশগাছের পাশে দুটি উদালগাছের ডালে ডালে ঝাঁক বেঁধে সোনালি রঙের ফুল ফুটেছে।

বাড়ির অংশীদারদের একজন নারায়ণ গোস্বামী জানালেন, কীভাবে এখানে পলাশ ফুলের গাছগুলো হয়েছে, তাঁর ধারণা নেই। প্রতিবছর এই সময়ে ফুল ফোটে। আলাদা করে গাছগুলোর পরিচর্যার কোনো প্রয়োজন পড়ে না।

অপর অংশীদার ফণী বাগচি বললেন, প্রায় ২০ বছর আগে একটি গাছ কেটে তিনি ঘরের কাজে লাগিয়েছিলেন। সেই গাছের গোড়া থেকে ডালপালা গজিয়ে এখন ওই গাছটিই অনেক বড় হয়ে গেছে। তিনিও বলতে পারেননি, তাঁদের বাড়িতে এত পলাশগাছ থাকার কারণ।

গাছগুলো কেটে ফেলা না হলে হয়তো ভবিষ্যতে এই বাড়িটি ‘পলাশ বাড়ি’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠতে পারে। বসন্তে রঙের আগুন লাগবে তখন বাড়িটিতে। এসব ভাবতে ভাবতেই পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবছে। গোধূলির রঙে তখন প্রকৃতি স্তব্ধ, নির্জন হয়ে গেছে। সেই রঙের সঙ্গে মিশে গেছে পলাশ ফুল। ধীরে সন্ধ্যা এসে পলাশ বাড়িটিকে রাতের আঁধার জড়িয়ে ধরতে শুরু করেছে।

গাছের মাথায় পলাশ ফুল। ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ভুজবল গ্রামে
গাছের মাথায় পলাশ ফুল। ৪ ফেব্রুয়ারি বিকেলে মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ভুজবল গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, February 7, 2026

‘ভোটের আগে কত নেতা আসে, ভোট শেষ হইলে আর কেউ খোঁজ নেয় না’

প্রতিবার ভোট এলে প্রচারণার কারণে সরগরম হয়ে ওঠে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার চা–বাগানগুলো। বাগানের কাঁচা-পাকা রাস্তার দুপাশে শোভা পায় নানা প্রার্থীর পোস্টার, অলিগলিতে ভেসে আসে নির্বাচনী গান আর মাইকিংয়ের শব্দ। তবে প্রচারণার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বিধিনিষেধের কারণে এবারের চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন।

পোস্টার লাগানো নিষিদ্ধ থাকায় চা-বাগানগুলোয় নেই চেনা নির্বাচনী আমেজ। মাইকিংও আগের মতো নেই। ফলে ভোট আসছে—এ খবরই যেন ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না শ্রমিকদের কাছে। অথচ এই চা-বাগানগুলোর শ্রমিকেরাই এই আসনের নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের বড় নিয়ামক।

দীর্ঘদিন ধরে ‘নৌকার ভোটার’ হিসেবে পরিচিত এই চা-শ্রমিকেরা টানা সাতবার সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস শহীদকে বিজয়ী করেছিলেন। এবার নৌকা না থাকায় অন্য দলের প্রার্থীরা তাঁদের সমর্থন পেতে শুরু করেছেন নতুন করে দৌড়ঝাঁপ।

শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার-৪ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৮৩ হাজার ৫৮ জন। এর মধ্যে লক্ষাধিক ভোটার চা-শ্রমিক। এই বিপুল ভোটই বদলে দিতে পারে নির্বাচনের ফলাফল।

গতকাল সোমবার শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভাড়াউড়া, ভুড়ভুড়িয়া, খাইছড়া ও ফুলছড়া চা-বাগানসহ কয়েকটি বাগান ঘুরে দেখা গেছে, হাতে গোনা দু–একজন প্রার্থীর ব্যানার ঝুলছে। তবে সেগুলো চোখে পড়ার মতো নয়। কোথাও নেই আগের মতো উৎসাহ বা উত্তেজনা।

ভুড়ভুড়িয়া চা-বাগানের বাসিন্দা নারায়ণ পাশী আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘এবার পোস্টার না থাকায় বোঝাই যায় না ভোট আইছে। দুই-একটা ব্যানার ছাড়া কিছুই নাই। মাইকিংও খুব কম। কোনো আমেজ নাই। তবে ভোটের দিন সবাই ভোট দিতে যাব।’

একই বাগানের নারী শ্রমিক মিনা পাশীর কণ্ঠে উঠে আসে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার গল্প। তিনি বলেন, ‘ভোটের আগে কত নেতা আসে, কত কথা বলে। কত স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু ভোট শেষ হইলে আর কেউ খোঁজ নেয় না। সবার জীবনে ভালো দিন এলেও আমাদের জীবনে সুদিন আসে না। আমরা প্রতিবার ভোট দিই, আমাদের ভোটেই সবাই নেতা হয়, কিন্তু আমাদের দিকে কেউ তাকায় না। এবার আমরা এমন মানুষকেই ভোট দিতে চাই, যে সংসদে গিয়ে আমাদের কথা বলবে, আমাদের কষ্টের কথা তুলবে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চা-শ্রমিক নেতা বলেন, ‘আমরা সারা জীবন নৌকায় ভোট দিয়েছি। কিন্তু এতবার জিতিয়েও আমাদের জীবন বদলায়নি। এখনো মানবেতর জীবন যাপন করতে হয়। এবার অনেক প্রার্থী এসেছে। আমরা আর শুধু মার্কা দেখে ভোট দেব না। দেখে, শুনে, বুঝে যোগ্য মানুষকেই ভোট দেব।’

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুজিবুর রহমান চৌধুরী (হাজী মুজিব), জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী প্রীতম দাশ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী নূরে আলম হামিদী, জাতীয় পার্টির প্রার্থী জরিফ হোসেন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ)প্রার্থী আবুল হাসান এবং স্বতন্ত্র (বিএনপি বিদ্রোহী) প্রার্থী মহসিন মিয়া ওরফে মধু মিয়া।

শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান
শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া চা বাগান। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Friday, October 17, 2025

মৌলভীবাজারের যে বাড়ি পাখিদের ‘আপন ঠিকানা’ by আকমল হোসেন

সকালটা রোদে ঝলমল করছে। গ্রামীণ পাকা সড়কের দুই পাশে আমনের রোপণ করা চারার ফাঁকে জলের মধ্যে পড়ছে রোদ। ঢেউ খেলছে হালকা-গাঢ় সবুজ পাতা। খেতের কোথাও ১০-২০টি, কোথাও ১-২টি করে সাদা বক দাঁড়িয়ে থেকে শিকার খুঁজছে।

মৌলভীবাজারের মোকামবাজার-অফিসের বাজার সড়ক ধরে যাওয়ার পথে তখন এ রকমই সকালের পরিবেশ। একঝলকে খানিকটা দূরে ধানখেতের এক প্রান্তে চোখে পড়ে, একটি বাড়ির গাছে গাছে যেন সাদা কাঠগোলাপের মতো থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। হাওয়ায় সেই ফুলের পাপড়ি দুলছে।

এরপরই কাছে যাওয়া, এসব ফুলের সঙ্গে পরিচয়। তবে ওই বাড়ির গাছে গাছে সাদা কোনো ফুল ফোটেনি, ফুল হয়ে ফুটে আছে সাদা বক। এখানে বক পাখি সংসার পেতেছে। সঙ্গে আছে কালো পানকৌড়ির দল, শালিকসহ নানা রকমের পাখিও।

সকালবেলা মাত্র ঘুম থেকে উঠছেন বাড়ির লোকজন। পাখিরা সমবেত ডাকে সরগরম করে রেখেছে সারা বাড়ি। বাড়ির লোকজন অনেকটা বছর ধরে এসব পাখির সঙ্গে আছেন, পাখিরা তাঁদের সঙ্গে আছে। ওই ডাককে তাঁরা আর আলাদা করতে পারেন না। পাখি, পাখির ডাক—সবকিছুই এখন তাঁদের বাড়ির অংশ হয়ে গেছে, সংসারযাপনের অংশ হয়ে গেছে।

এটি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু গ্রামের একটি বাড়ি। বাড়ির তিন দিকেই ফসলের খোলা মাঠ। পূর্ব দিকে মাঠ শেষে আছে খাইঞ্জার হাওর।

বাড়ির কর্তা মো. এরশাদ মিয়া বলেন, ‘অনেক বছর ধরি পাখিরে রাখছি। পাখিরে পাহারা দিই। রাইতে ডাক শুনলে জানের দিকে চাই না, ঘর থাকি বাইর অই যাই। অনেকে শিকার করতো চায়। দিনের বেলায়ও কেউ কেউ আয়। কেউরে পাখি মারতে দিই না। আরও তো বাগান আছে। তারা যায় না। এখানে আশ্রয় পাইছে বলে আইছে। তারারে যত্ন করি রাখি।’

সম্প্রতি সকালে দূর থেকে যে রকমটা দেখা গেছে, গাছে গাছে সাদা সাদা ফুল হয়ে আছে পাখি। কাছে গেলে তার পরিমাণ যেন আরও বেড়ে যায়। এরশাদ মিয়ার বাড়ির পশ্চিম দিকের একটি পুকুরের পাড় ঘেঁষে আম, তেঁতুল, সুপারিসহ বিভিন্ন ধরনের গাছ আছে। প্রায় সব কটি গাছেই বসে আছে ছোট-বড় অসংখ্য বক।

কাছেপিঠে আছে পানকৌড়ি। সাদার ফাঁকে ফাঁকে সবুজের সঙ্গে মিশে থাকা কালো রঙের পাখি। পানকৌড়ি নড়লে-চড়লেই ভালো করে চোখে পড়ে। মানুষ, বক ও পানকৌড়ি ওই বাড়িতে ‘মিলেমিশে আত্মীয় যেন’।

প্রায় গাছেই আছে পাখির বাসা। কোনোটিতে এখনো পাখির ছানা বসে আছে। কাছেই মা-বাবার মধ্যে কোনো না কোনোটি পাহারায়। দূর থেকে মা অথবা বাবা আধার নিয়ে আসছে, ছানার হাঁ করা মুখের ভেতর খাবার ঠেলে দিচ্ছে। সন্তান বাৎসল্যে ভরপুর বাড়ির সব কটি গাছ। বাড়ির পশ্চিম দিকটাতে চলার উপায় নেই। পাখির বিষ্ঠায় সাদা সাদা হয়ে আছে গাছতলা।

ওই গ্রামেরই মাদ্রাসাছাত্র মো. তারেক জানিয়েছে, সে প্রায়ই পাখি দেখতে ওই বাড়িতে যায়। বাড়ির লোকজন যেমন, প্রতিবেশীরাও তেমন পাখির প্রতি নজর রাখেন। প্রতিবেশীরা মনে করেন, এই পাখি তাঁদের সবার। কেউ পাখিকে বিরক্ত করেন না।

বাড়ির লোকজন ও স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ৮ থেকে ১০ বছর ধরে ওই বাড়িতে পাখি আশ্রয় নিয়েছে। কমবেশি সারা বছরই বাড়িতে পাখি থাকে। তবে কার্তিক মাসে পাখির সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। তখন অসংখ্য পাখিতে সব কটি গাছ সাদা হয়ে ওঠে। ভোরের দিকে পাখিরা জেগে যায়, তারপর ডাকতে শুরু করে। ডাকতে ডাকতে বাসা ছেড়ে মাঠের দিকে, কিংবা হাওরের দিকে উড়াল দেয়। সারা দিন বাইরে থাকে। বিকেল হলে আবার বাড়িতে ফিরতে শুরু করে।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-08-27%2Fddwvosze%2FMoulavibazarDH053720250816bok-shalik-4moulvibazar.JPG?rect=0%2C0%2C2000%2C1333&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
ঝাঁক বেঁধে পাখি নীড়ে ফিরছে। মৌলভীবাজার সদর উপজেলার আজমেরু গ্রামের একটি বাড়িতে। ছবি: প্রথম আলো

Friday, June 6, 2025

চায়ের রাজ্য আর রূপ মাধুর্যের ‘বৃষ্টি বন’

চায়ের রাজ্যে সবুজ বন আর অনন্য প্রকৃতি। জেলার ৯২টি চা-বাগান, ঘন বন, পাহাড়ি টিলা আর হাওর নদী। চা বাগানের আশপাশ রাবার, লেবু আর আনারসের বাগান। মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড ও হামহাম জলপ্রপাত। সেইসঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি আর পাখি ও মাছের অভয়ারণ্য বাইক্কা বিল। চা রাজ্যের পথে পথে এমনি একের পর এক বর্ণনাতীত সৌন্দর্যের আধার। আর বৃষ্টি বন লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য এ যেন মনোমুগ্ধতার এক অনন্য আবেশ। দু’চোখ জুড়ে সবুজ বন আর নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। গহীন বনে বন্যপ্রাণির হাঁকডাক আর অবাধ বিচরণ। প্রবেশদ্বার থেকেই স্বাগত জানায় সারি সারি রকমারি গাছ। আর ওই গাছের মগডালে বানরের লাফঝাঁপ, ভাল্লুক, কাঠবিড়ালি আর কতো কী প্রাণী। দূর থেকে কানে বাজে ওদের নিজেদের মধ্যে হট্টগোলের উচ্চ আওয়াজ। দেখা মিলে তাদের দৌড়ঝাঁপ আর খাবার-দাবার নিয়ে ঝগড়া-ঝাটির। জীববৈচিত্র্যের সমারোহের এমন নজরকাড়া অপরূপ প্রকৃতির আধার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার জাতীয় উদ্যান। বর্ষা আর শুষ্ক দু’ মৌসুমে তার ভিন্ন রূপ সৌন্দর্য। এই বৃষ্টি বন বা রেইন ফরেস্টটির নাম ‘লাউয়াছড়া’। যুগ যুগ থেকে আপন রূপ মাধুর্যে দৃষ্টি কাড়ছে প্রকৃতিপ্রেমীদের। জাতীয় উদ্যান হিসেবে খ্যাতি অর্জনের পর আপন বৈশিষ্ট্যে হয়ে উঠেছে অনন্য। দেশের অন্যতম ও জেলার একমাত্র এই জাতীয় উদ্যানটি দেশি-বিদেশি প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। নানা সমস্যা ও সংকটে থেকেও এখনো ঐতিহ্য আর সম্ভাবনা ধরে রাখার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা। ওখানকার প্রকৃতির সঙ্গে মানবের দানবীয় আচরণ। তারপরও লড়াই করে কোনো রকম টিকে আছে উদার প্রকৃতির এই রাজ্য। উদ্যানের প্রবেশ পথে সারিবদ্ধ গাছ আর আঁকাবাঁকা রেলপথ আকৃষ্ট করে যে কাউকে। কী নেই ওখানে। সবুজ গাছগাছালি, বনজ-জঙ্গল আর লতাগুল্মের মধ্যেই নানা জাতের বন্যপ্রাণির আপন নিবাস। সূর্যোদয় কিংবা গোধূলীলগ্নে ওখানকার বাসিন্দারা জানান দেয় এটাই তাদের আপন ভুবন। তাদের হাঁকডাক আর  হৈ-হুল্লুড়ে টের মিলে, ওখানেই বাসস্থান গড়েছে বন্যপ্রাণিরা। নানা রঙ আর আকার আকৃতির পোকা-মাকড়ের ঝিঁঝিঁ শব্দ, বিচিত্র সব পশুপাখির কিচিরমিচির, দলবদ্ধ বানরের ভেংচি আর লাফঝাঁপ। সাপ, হরিণ, বানর, শিয়াল আর নানা জাতের বন্যপ্রাণির অবাধ বিচরণ। এমন দৃশ্য লাউয়াছড়ায় হরদম দেখা মেলে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশে অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। সবুজ প্রকৃতির হাতছানিতে ভরপুর ‘ট্রপিক্যাল রেইন ফরেস্ট’ হিসেবে খ্যাত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। এই উপভোগ্য নৈসর্গিক সুন্দর্যের টানে বর্ষা আর শুষ্ক মৌসুমে প্রতিনিয়তই পর্যটকরা ওখানে আসেন। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই উদ্যানটি পাখি, সরীসৃপ প্রাণী ও উল্লুকসহ নানা জাতের বন্যপ্রাণি দেখার জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান হিসেবে ব্যাপক পরিচিত। চায়ের দেশ হিসেবে খ্যাত সিলেট বিভাগের যতগুলো দর্শনীয় স্থান আছে তার মধ্যে লাউয়াছড়া রেইন ফরেস্ট অন্যতম। উদ্যানটি এখন শুধু পর্যটকদের বিনোদনেরই স্থান নয়। জীবন্ত জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক গবেষণাগারও বটে। ওখানে দেশি-বিদেশি পশুপাখি ও বন্যপ্রাণি গবেষকরা গবেষণার জন্য স্থানটিতে আসছেন। শিক্ষা, গবেষণা, ইকো-ট্যুরিজমসহ ভ্রমণবিলাসীদের কাছে চিত্তবিনোদনের অন্যতম আকর্ষণীয় স্পট হয়ে উঠেছে এ উদ্যান। জানা যায় ১৯২৫ খিস্টাব্দে বৃটিশ সরকারের উদ্যোগে লাগানো নানা জাতের গাছগাছালি বেড়ে আজকে তা ঐতিহ্যবাহী বনে পরিণত হয়েছে। মৌলভীবাজার ফরেস্ট রেঞ্জের আওতাধীন ২,৭৪০ হেক্টর আয়তনের পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন ছিল এলাকাটি, সেই সুবাদে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পূর্ববতী নাম পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বন। বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি প্রকৃতি ভ্রমণ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১,২৫০ হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণি (সংরক্ষণ ও সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ খিস্টাব্দে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। লাউয়াছড়া আসার পথে রাস্তার দু’পাশে চোখে পড়বে চা-বাগান। উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলায় চা-বাগান দেখে মনে হবে যেন সবুজ সমুদ্র ঢেউ খেলছে। আর ওখানে এসে ঘন সবুজের গহীনে দেখতে পাবেন বিচিত্র সব পশু-পাখি। মিশ্র চিরহরিৎ এই উদ্যানে রয়েছে ৪৬০ প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। জানা যায়, বিশ্বখ্যাত ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টি ডেজ’ ছবির একটি অংশের শুটিং হয়েছিল এই লাউয়াছড়া বনে। ১৩টি দেশের ১১৪টি লোকেশনে চিত্রায়িত হয় ছবিটি।
mzamin

Friday, April 11, 2025

৫ কিলারের লোমহর্ষক বর্ণনা: মিস কিলিংয়ের শিকার আইনজীবী সুজন

মিস কিলিংয়ের শিকার হন তরুণ আইনজীবী সুজন মিয়া। ভুল টার্গেটে কিলিং মিশন সম্পন্ন করে কিলাররা। মুঠোফোনে পাঠানো ছবির সঙ্গে মিল ভেবে ভাড়াটে ঘাতকরা দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করে কিলিং মিশন। ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ডকে মারতে গিয়ে তারা ভুলক্রমে খুন করে আইনজীবী সুজনকে। মৌলভীবাজার শহরে পৌরসভা এলাকায় ঘাতকদের ছুরিকাঘাতে আইনজীবী সুজন মিয়া চাঞ্চল্যকর খুনের ঘটনার ৫ দিনের মাথায় প্রেস বিফিংয়ে ৫ জনকে গ্রেপ্তার ও হত্যার নেপথ্যের রহস্য গণমাধ্যমকর্মীদের জানান পুলিশ সুপার। গতকাল দুপুরে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের কনফারেন্স হলে প্রেসবিফিংয়ে পুলিশ সুপার এম কে এইচ জাহাঙ্গীর হোসেন ঘাতকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান এ পর্যন্ত আইনজীবী সুজন মিয়া হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারীসহ ৫ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার রাত প্রায় ১১টার দিকে মৌলভীবাজার সদর মডেল থানাধীন মৌলভীবাজার পৌরসভার পশ্চিম পাশে মেম্বার রোডের ৪৪নং শাকির ভবনসংলগ্ন তালাবাহ হুমায়ুন হক ফ্রুট স্টোর দোকানের পাশে ফুটপাথের উপর আইনজীবী সুজন মিয়াকে অজ্ঞাতনামা কতিপয় ব্যক্তি ধারালো চাকু দিয়ে আঘাত করে হত্যা করে। ওই ঘটনায় সুজনের ভাই এনামুল হক সুমনের এজাহারের প্রেক্ষিতে মঙ্গলবার মৌলভীবাজার সদর মডেল থানায় মামলা হয়।

একটি বিশেষ টিম গঠন করে জেলার বিভিন্ন স্পর্শকাতর স্থান, পার্শ্ববর্তী জেলাসহ তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় বিভিন্ন জায়গায় অভিযান চালানো হয়। অভিযান পরিচালনা করে বুধবার ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী নজির মিয়া মুজিব (২৫), পিতা-সামছুল হক, গ্রাম: বাসুদেবশ্রী (কালিশপুর), থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার। ঘটনার সঙ্গে জড়িত মো. আরিফ মিয়া (২৭), পিতা-মৃত সিজিল মিয়া, রঘুনন্ধনপুর, বাসা নং-৫২, থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার সদর। হোসাইন আহমদ সোহান (১৯), পিতা-আনসার মিয়া, গ্রাম: দিশালোক, ইটা সিংকাপন, থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার। লক্ষণ নাইডু (২৩), পিতা-মনা নাইডু, মাথিউরা চা বাগান, থানা-রাজনগর, জেলা-মৌলভীবাজার। আব্দুর রহিম (১৯), পিতা-মো. রফিকুল ইসলাম, গ্রাম: কাশিপুর পূর্বপাড়া, থানা-কেন্দুয়া, জেলা-নেত্রকোনা, বর্তমান ঠিকানা: মল্লিকসরাই (জসিম মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া), থানা ও জেলা-মৌলভীবাজার। এদের আটক করা হয়। আসামি নজির মিয়া মুজিবের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করে জব্দ করা হয়। নজির মিয়া মুজিবকে আটক করার পর মামলার মূল রহস্য উদ্ঘাটন হয়।

সূত্রমতে, নজির মিয়া মুজিব তার পাশের বাড়ির অগ্রণী ব্যাংকের সিকিউরিটি গার্ড মিসবাহের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতা ছিল। মুজিব চেয়েছিল মিসবাহকে একটা কঠিন জবাব দিতে। দুই বছর পূর্বে নজির মিয়া মুজিব শহরের চাঁদনীঘাট এলাকায় হোটেলে কাজ করাকালীন সময়ে দুধ ব্যবসায়ী লক্ষণের সঙ্গে পরিচয় হয়। লক্ষণের মাধ্যমে মিসবাহকে মারার জন্য টাকার বিনিময়ে কিলার ভাড়া করে মুজিব। মুজিব ভাড়াটিয়া ঘাতক লক্ষণসহ অন্যান্যের মোবাইলের মাধ্যমে মিছবাহের ছবি পাঠায়। ঘটনার দিন শহরের কাশিনাথ আলাউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের খেলার মাঠে চলা বাণিজ্যমেলায় ভাড়াটিয়া কিলাররা আইনজীবী সুজনকে দেখে মিসবাহ ভেবে মুজিবকে ফোন দেয়। তারা তাকে জানায়, যে লোকের ছবি পাঠিয়েছ সেই লোককে আমরা পেয়েছি। মুজিব ভাড়াটিয়া  কিলারদের ভিডিওকলের মাধ্যমে টার্গেট দেখিয়ে নিশ্চিত করতে বলে। খুনের শিকার সুজনকে কিলার আব্দুর রহিম ইমুতে ভিডিওকল দিয়ে মুজিবকে টার্গেট দেখায়। মিল থাকাতে তখন মুজিব তাদের মারতে বলে। তখন তারা সুজনের ওপর আঘাত চালায়। প্রেস বিফিংয়ে জানানো হয়, এই ৫ জন ছাড়াও ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যদের গ্রেপ্তার করতে তৎপর রয়েছে পুলিশ। এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) নোবেল চাকমা, ডিআইও মো. আবু হোসাইন, মৌলভীবাজার মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গাজী মো. মাহবুবুর রহমান, ডিবি’র ওসি আবু জাফর মোহাম্মদ মাহফুজুল কবিরসহ জেলা পুলিশের কর্মকর্তারা।

mzamin

Sunday, March 30, 2025

চায়ের দেশের মনকাড়া জীববৈচিত্র্য by ইমাদ উদ দীন

দু’চোখ জুড়ে কেবল দৃষ্টি নন্দন নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। নানা জীববৈচিত্র্যের সমারোহ। পাহাড়ি টিলা, নদী হাওর আর চায়ের দেশ। বলা চলে সবুজের স্বর্গরাজ্য খ্যাতি এ জেলার। প্রবাসী ও পর্যটন অধ্যুষিত মৌলভীবাজারের প্রকৃতির অপরূপ রূপ মাধুর্যের কী নেই ওখানে। চোখের প্রতিটি পলকেই প্রশান্তির পরশ। এখানকার উজাড় করা ভূপ্রকৃতির অপরূপ লীলা নিকেতন এ যেন এক ব্যতিক্রমী মায়াবী দৃশ্য। ৯২টি চা বাগান, লেবু, আনারস, আগর-আতর ও রাবার বাগান, মাধবপুর লেক, মাধবকুণ্ড ও হামহাম জলপ্রপাত আর কতো কি। আর দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি ও তার জীববৈচিত্র্য। এ জেলার সৌন্দর্যবর্ধনের অন্যতম প্রাকৃতিক উপকরণ। সবুজ বন জীববৈচিত্র্য আর অনন্য প্রকৃতি। মনোমুগ্ধতার এক অন্যরকম আবেশ। 

মনকাড়া চায়ের রাজ্য: বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির ফোঁটায় সজীব সতেজ দু’টি পাতা একটি কুঁড়ি। আর শুষ্ক মৌসুমে আধমরা চা গাছগুলো থাকে নির্জীব। বৃষ্টি এলেই পত্রপল্লবে জীবনচক্র ফিরে। তখন কী যে অপরূপ প্রাণবন্ত  প্রাণচঞ্চলতা। পাহাড়ি টিলার পরতে পরতে যেন সবুজের ঢেউ খেলা। আঁকাবাঁকা মেঠো পথে সকাল থেকেই চা কন্যারা কাজে ব্যস্ত। তাদের রপ্তকরা নিজস্ব কায়দা কৌশলে চা-পাতা চয়ন ব্যতিক্রমী শৈল্পিকতা। নানা হাড়খাটুনি কঠিন পরিশ্রমী এ মানুষগুলোর জীবন যুদ্ধের গল্প একটু ভিন্ন রকম। তাদের মানবেতর জীবনযাপনের মাঝেও আছে সমৃদ্ধ নিজস্ব সংস্কৃতি। তাদের মনোমুগ্ধকর চা নৃত্য বা কাঠি নৃত্য সমৃদ্ধ করেছে সংস্কৃতিকে। দেশে ১৬৭ চা বাগানের মধ্যে  মৌলভীবাজার জেলার ৭টি উপজেলায় রয়েছে ৯২টি।  

জলপ্রপাত: মাধবকুণ্ড আর হামহাম জলপ্রপাত আকৃষ্ট করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। দেশের অন্যতম জলপ্রপাত দু’টির অবস্থান যেমন জেলার দু’টি উপজেলায়। তেমনি ব্যতিক্রমী গুণে মুগ্ধ করছে পর্যটকদের। মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত জেলার বড়লেখা উপজেলার কঠিন পাথরের পাহাড় পাথারিয়া পাহাড়ের উপর বহমান গঙ্গামারা ছড়া মাধবকুণ্ড  জলপ্রপাত হয়ে নিচে পড়ে, ১৬২ ফুট  উপর থেকে পড়ে তা মাধবছড়া দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপর থেকে পানি নিচে পড়ে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট কণ্ড। আর ডান পাশে সৃষ্টি হয়েছে পাথরের গুহা। ওই দৃশ্যগুলোই মাধবকুণ্ডের আর্কষণ। এডভেঞ্চারপ্রিয় পর্যটকদের কাছে হামহাম জলপ্রপাতের গুরুত্ব অন্যরকম। গহীন অরণ্যের ১৩৫/১৪৭ ফুট উচ্চতার এই অনিন্দ্য সুন্দর এই জলপ্রপাতটি জেলা কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি কুরমা বনবিটে অনেকটা   গোপনীয়তায় তার রূপ মাধুর্য জানান দিচ্ছে।  

হাকালুকি হাওর: দেশের সবচেয়ে বড় ও এশিয়ার অন্যতম হাওর হাকালুকি। মৌলভীবাজার ও সিলেট জেলার ৫টি উপজেলার ১৮,১১৫ হেক্টর আয়তনের অর্ধশতাধিক বিলের এই বিশাল হাওর বিপন্ন ও বিলুপ্ত প্রজাতির জলজ জীববৈচিত্র্যের নিবাস। মিঠাপানির মাছ, দেশীয় ও পরিযায়ী পাখির অন্যতম আধার হাওরটি বর্ষা ও শুষ্ক মৌসুমে মনকাড়া রূপ সৌন্দর্যে আপন করে কাছে টানে প্রকৃতিপ্রেমীদের।

বৃষ্টিবন লাউছড়া: গহীন বনে বন্যপ্রাণীর হাঁকডাক আর অবাধ বিচরণ। জীববৈচিত্র্যের সমারোহের এমন নজরকাড়া অপরূপ প্রকৃতির আধার মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার জাতীয় উদ্যান। বৃষ্টি বন বা রেইন ফরেস্ট ‘লাউয়াছড়া’। দেশের অন্যতম ও  জেলার একমাত্র এই জাতীয় উদ্যানটি দেশি-বিদেশি প্রকৃতিপ্রেমীদের হৃদয়ে ঠাঁই পেয়েছে। উদ্যানের প্রবেশ পথে সারিবদ্ধ গাছ আর আঁকাবাঁকা রেলপথ আকৃষ্ট করে যে কাউকে। কি নেই ওখানে। সবুজ গাছগাছালি, বনজজঙ্গল আর লতাগুল্মের মধ্যেই নানা জাতের বন্যপ্রাণীর আপন নিবাস। সূর্যোদয় কিংবা গোধূলীলগ্নে ওখানকার বাসিন্দারা জানান দেয় এটাই তাদের আপন ভুবন। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান বাংলাদেশে অবশিষ্ট চিরহরিৎ বনের একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা। বাংলাদেশের ৭টি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য ও ১০টি জাতীয় উদ্যানের মধ্যে লাউয়াছড়া অন্যতম। সৌন্দর্যের দিক দিয়ে সুন্দরবনের পরেই লাউয়াছড়া বনের অবস্থান। বিলুপ্ত প্রজাতির প্রাণী, ফলজ, বনজ ও ওষুধি গাছগাছালি আর লতাগুল্ম। নানা জাতের পাখি আর সবুজ প্রকৃতিতে ভরপুর ‘ট্রপিক্যাল  রেইন ফরেস্ট’ হিসেবে খ্যাত লাউয়াছড়া। এ জেলার  চা বাগান, অর্ধশতাধিক রাবার ও আগর বাগান, কমলা, লেবু ও আনারস বাগান, হাওর, মাধকণ্ড জলপ্রপাত, হামহাম জলপ্রপাত, মাধপুর লেক, আলী আমজদের নবাববাড়ি, খাসিয়াপুঞ্জি ও পান চাষ, বাইক্কাবিলসহ নানা আর্কষণীয় দর্শনীয় স্থান দেখার পরও পর্যটকরা ছুটেন লাউছড়ায়। জানা যায় ১৯২৫ খিষ্টাব্দে বৃটিশ সরকারের উদ্যোগে ওখানে লাগানো হয় নানা জাতের গাছগাছালি। বনের অস্তিত্ব ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পশ্চিম ভানুগাছ বনের ১,২৫০  হেক্টর এলাকাকে ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও সংশোধন) আইন অনুযায়ী ১৯৯৬ খিস্টাব্দে জাতীয় উদ্যান হিসাবে ঘোষণা করা হয়। জানা যায় বিশ্বখ্যাত ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইট্টিডেজ’ ছবির একটি অংশের শুটিং হয়েছিল লাউয়াছড়ায়। এ ছাড়াও মাধবপুর লেকসহ জেলা জুড়ে রয়েছে অর্ধশতাধিক ছোট বড় দৃৃষ্টিনন্দন পর্যটন স্পট। এবার ঈদে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। রয়েছে তাদের সে রকম প্রস্তুতি। পাঁচতারকা মানের দুসাই রিসোর্ট ও গ্র্যান্ড সুলতানসহ শতাধিক হোটেলমোটেল ও রিসোর্ট পর্যটক বরণে প্রস্তুত। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ সূত্র জানায়, পর্যটক বরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টরা এজেলায় আগত পর্যটকদের নির্বিঘ্ন সেবা দিতে প্রস্তুত।
mzamin

Monday, March 17, 2025

কাউয়াদীঘি হাওরে ‘শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা আসে’

তখন অনেক দূরে দিগন্ত পেরিয়ে কোনো এক গ্রামের ওপারে ঢলে পড়ছে সূর্য। দিনটা শেষ হতে চলেছে। পলাশ ফুলের রঙে তখন থালার মতো ঝুলে আছে সূর্যটা। খুব বেশি সময় নেই। চলে যেতে হবে অন্য কোথাও, অন্য কোনো দেশে। ওখানে অন্ধকার ঘোচানোর দায় ওই একই সূর্যের। বিদায়মুহূর্তের সেই রঙিন আলো ছড়িয়ে পড়েছে প্রান্তরের বুকে।

দেখতে দেখতে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরের পশ্চিম আকাশে সূর্য আরও লাল হয়ে উঠেছে। ‘ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল’ বাড়ি ফিরছে। রাখালের দল মেঠো পথে ধুলা উড়িয়ে হাওর থেকে গরু নিয়ে ছুটছে নিজেদের গ্রামের দিকে। কেউ ফিরছেন গবাদিপশুর জন্য ঘাস নিয়ে। সাদা বকের ঝাঁক রাত কাটাতে হাওরপারের কোনো বাড়ির আশ্রয়ের দিকে উড়ে চলছে। আর নির্জনতায় ডুবে আছে সবুজ ধানের দেশ, হাওরের দিলখোলা সবুজ হৃদয়।

মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলা নিয়ে ছড়ানো কাউয়াদীঘি হাওরের বুক। সম্প্রতি বসন্তের এক বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরের দিকে যাওয়ার পথে অন্য রকম ভালো লাগা তৈরি হতে থাকে। সদর উপজেলার একাটুনা এলাকা পার হতেই দেখা মেলে ধানখেতের পাশে ঘাস, কচুরিপানা ভরা এক টুকরো পতিত জমিনে একঝাঁক শামুকখোল পাখির সঙ্গে। গ্রামের ভেতরেই পাখিগুলো ওখানে রাজকীয় পা ফেলছে, শরীর দুলিয়ে হাঁটছে, উড়ছে, খাদ্য খুঁটে খাচ্ছে। এতটাই নিশ্চিত তাদের উপস্থিতি, কোনো ভয়ভীতি নেই। পাশেই মানুষের ঘরবাড়ি। তবু কেউই তাদের বিরক্ত করছে না। শামুকখোলের দল আপনমনে ওখানে সময় পার করছে।

ওখান থেকে কিছুটা দূরে বিরাইমাবাদ এলাকায় অপেক্ষায় তখন শহর-নগরজীবনের বাইরে অন্য এক জগৎ। হয়তো ওই এলাকার মানুষের কাছে এ রকম প্রকৃতি নতুন কিছু নয়, দিনের শেষে ও রকম সময় প্রতিদিনই একবার ফিরে আসে তাদের কাছে। তারা দেখে, তারা একসময় ভুলেও যায়। ওই গ্রাম এলাকা হাওরপারের। গ্রামের শেষ প্রান্ত থেকে কাউয়াদীঘি হাওরের শুরু। হাওরের সবুজ হৃদয়ে তখন মৃদু নীরবতায় গোধূলি ধোঁয়া, ধীরে সন্ধ্যা নামছে। যত দূর চোখ যায়, তত দূর বিস্তৃত শুধু ধানের সবুজ, ঘাসের সবুজ। ওখানে তখন ‘সন্ধ্যা হয়ে আসে—সন্ধ্যা হয়ে আসে/ একা একা মাঠের বাতাসে/...।’

সন্ধ্যা যে হয়ে এসেছে, তা সূর্যই মনে করিয়ে দেয়। সূর্যের দিনের কড়া, চোখ রাঙানো মেজাজ তখন আর নেই। সূর্য তখন গোল থালার মতো পলাশ ফুলের রং মেখেছে সারা দেহে। পশ্চিমের আকাশে সূর্যটা তখন একটু একটু করে ঢলে পড়েছে, হালকা কুয়াশার মতো পর্দার আড়ালে ডুবতে বসেছে। আরও কিছু সময় শেষে তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই রঙের ছোপ পড়েছে হাওরের প্রতিটি ঘাসে।

হাওর উচ্চারণমাত্রই মনে হতে পারে, ওখানে আর কিছু নেই। এ এক অথই জলের দেশ। শুধু জলের সাদা বুক, আঁচড়ে পড়া ঢেউ। ছোট-বড় নৌকা ভাসছে জলের বুকে। হাওরপারের গ্রামগুলোকে মনে হতে পারে গা ডুবিয়ে সাঁতার কাটছে জলে। এখন তার ঠিক উল্টো প্রকৃতি। এখন দু-একটি বিল ছাড়া আর কোথাও জলের দেখা মেলে না। চোখের সামনে শুধু সবুজের খোলা বুক, দিগন্তজোড়া সবুজের উন্মুক্ত হৃদয়, সৌন্দর্যের অন্য হাওর প্রকৃতি।

এদিকে সূর্য ডুবছে আর অন্যদিকে হাওরের কাজ শেষে ঘরে ফিরছেন মানুষ। পথে পথে দেখা হতে থাকে রাখালদের সঙ্গে। একটু পরপরই ১০-২০টি কিংবা তারও বেশি গরু নিয়ে ফিরছিলেন রাখালেরা। তাঁরা সেই সকালবেলা হাওরপারের গ্রাম থেকে পাঁচ-সাত কিলোমিটার দূরে গরু নিয়ে হাওরে গিয়েছিলেন। ওখানে সারা দিন গরু চরিয়েছেন। কয়েকজন গৃহপালিত গবাদিপশুর জন্য হাওর থেকে ঘাস সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরছিলেন। তাঁরাও দিনের কোনো একটা সময় ঘাস সংগ্রহ করতে হাওরে এসেছিলেন।

শুধু কি মানুষই এমন সন্ধ্যায় নিজের গ্রামে, নিজের বাড়িতে ফিরে যায়? পাখিদেরও বাড়ি আছে, বাড়ি ফেরার তাড়া আছে। পাখিরাও রাত কাটাতে একা, নয়তো ঝাঁকে ঝাঁকে হাওর থেকে হাওরপারের কোনো গ্রামে তাদের নিরাপদ ঠিকানা, কোনো আশ্রয়ের দিকে ফিরছে। এই দলে আছে সাদা বকপাখি, পানকৌড়ি, শালিক-ঘুঘুর দল। তারা উড়তে উড়তে কোনো না কোনো গ্রামের দিকে হারিয়ে যেতে থাকে। কোনো ঝাঁক হাওরপারের বাড়ির গাছে দলে দলে বসে থাকে। ওই গাছেই রাত কাটবে তাদের। সকাল হলেই এসব আশ্রয় ছেড়ে তারা ছড়িয়ে পড়ে হাওরের বিভিন্ন দিকে। সারা দিন এখানে-ওখানে ওড়ে, ঘুরে তারা খাবার খুঁজে খায়।

ততক্ষণে সূর্য ডুবে গেছে। সূর্যের আর দেখা পাওয়া যায় না। শুধু আলোর কিছু রেশ আকাশের দিগন্তে ফুটে আছে, কিছু আলো মেঘের দেহে লেগে আছে। কিছু সময়ের মধ্যে তা–ও মুছে যায়। একটা সময় সন্ধ্যার অন্ধকারে ডুবে যায় হাওর, হাওরপারের গ্রাম। যে যেভাবেই দেখছে, এখানে এই হাওরের বুকে প্রকৃতই ‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো সন্ধ্যা আসে’...। গোধূলি ম্লান হতে হতে সন্ধ্যাটা এখানে এমনই, নিজেকে রাঙিয়ে তবে ছুটি নেয়।

গোধূলিবেলায় হাওর থেকে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন রাখাল
গোধূলিবেলায় হাওর থেকে গরু নিয়ে বাড়ি ফিরছেন রাখাল। ছবি: প্রথম আলো

Monday, December 9, 2024

১৮ বছর পর সন্তান হলেও বাবা ডাক শোনা হলো না মিছরাফের by আব্দুর রহমান সোহেল

দীর্ঘ ১৮ বছর আগে বিয়ে করেছিলেন রাজনগর উপজেলার মুন্সিবাজার ইউনিয়নের সুনাটিকি গ্রামের মিছরাফ খাঁ (৪৫)। বিয়ে করলেও গত ১৮ বছরে কোনো সন্তান জন্ম নেয়নি তার। অনেক ডাক্তার দেখিয়েও বিফল হয়ে ছিলেন। অবশেষ দেড় বছর আগে স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে ২য় বিবাহ করেছিলেন। বিয়ের পরেই স্ত্রীর কোল জুড়ে আসে ছেলে সন্তান। নাম রাখেন মাহের খাঁ। তার বয়স এখন ১ বছর। ১৮ বছর পর সন্তান পেয়েছিলেন তাই খুশিতে ছিলেন আত্মহারা। একদিন বাবা ডাক শুনবেন। কিন্তু সেই ছেলের মুখে বাবা ডাক শোনার আগেই নির্মমভাবে খুন হলেন মিছরাফ খাঁ।

সরজমিন মিছরাফ খাঁ’র বাড়িতে গিয়ে দেখ যায় করুণ দৃশ্য। বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মিছরাফ খাঁর মা ও স্ত্রী জেসমিন বেগম। কথা বলতে না পারা ছেলেটা লোকজনের ভিড় দেখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছে চারিদিকে। হয়তো মানুষের ভিড়ে খুঁজছে তার বাবা মিছরাফ খাঁ’কে। অবুঝ শিশুটি কীভাবে বুঝবে তার বাবা আর নেই। ঘাতকের এক আঘাতেই চলে গেছেন না ফেরা দেশে। গ্রামের খাঁ ও সৈয়দ গোষ্ঠীর বিরোধে নিভে গেল মিছরাফ খাঁ’র জীবন প্রদীপ।
স্থানীয়রা জানান, বেশ কিছুদিন থেকে জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলছিল সুনাটিকি গ্রামের খাঁ ও সৈয়দ গোষ্ঠীর মাঝে। গত বৃহস্পতিবার এনিয়ে সালিশ বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও মধ্যস্থতাকারীর অনুপস্থিতিতে তা হয়নি। গত ৬ই ডিসেম্বর জুমার নামাজের পর বিরোধপূর্ণ জমির ডোবায় মাছ ধরতে যান সৈয়দ জুয়েল আলী ও তার লোকজন। সালিশ বৈঠকে যেহেতু সমাধান হবে তাই মাছ না ধরার জন্য আপত্তি জানান খাঁ গোষ্ঠীর নূরুল আমিন খাঁ। কিন্তু সৈয়দ গোষ্ঠীর লোকজন আপত্তি আমলে না নিয়ে মাছ ধরতে থাকে। এতে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে দুই গোষ্ঠীর লোকজন সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। উভয় পক্ষে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই সৈয়দ মহরম খাঁ’র ছেলে মিছরাফ খাঁ (৪৫) প্রতিপক্ষের দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন। সন্ধ্যার দিকে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। এ সময় অন্তত ২০ জন আহত হন। আহতদের মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়। নিহত মিছরাফ খাঁ’র লাশ মৌলভীবাজার সদর হাসপাতালে ময়নাতদন্ত পরবর্তী গত শনিবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। দাফন শেষে ওইদিন রাতেই   ইউপি সদস্য নূরুল আমিন বাদী হয়ে ৪৫ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরও ৫০/৬ কে আসামি করে মামলা করেন। এই মামলায় আটককৃতরা হলো- সৈয়দ জাহাঙ্গীর আলী, সৈয়দ মনসুর আলী, সৈয়দ লিয়াকত আলী, সৈয়দ আবদার আলী।
রাজনগর থানার অফিসার্স ইনচার্জ (ওসি) শাহ মোবাশ্বীর হোসেন বলেন, সৈয়দ গোষ্ঠী ও খাঁ গোষ্ঠী একে অপরের আত্মীয়। বিরোধপূর্ণ ডোবাতে মাছ ধরতে গিয়ে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এতে ঘটনার স্থলে মিছরাফ খাঁ নিহত হয়েছেন। মামলা হয়েছে, পুলিশ ৪ জনকে আকট করেছে।

mzamin

Saturday, November 2, 2024

আব্দুস শহীদ উপাখ্যান: মৌলভীবাজারে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও কোন্দল সৃষ্টির ‘মাস্টার মাইন্ড’

একাধিক হত্যা মামলায় ঢাকা থেকে গ্রেপ্তার ও বাসায় পাওয়া নগদ দেশি ও বিদেশি কয়েক কোটি টাকা ও স্বর্ণালংকার উদ্ধারের খবরে সবার চোখ ছানাবড়া। তবে কি তাকে নিয়ে আগে থেকেই বয়ে চলা নানা মন্তব্য সঠিক। এখন জেলা জুড়ে অবৈধপন্থায় হঠাৎ ধনকুবের বনে যাওয়া পতিত সরকারের কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদকে নিয়ে চলছে এমন আলোচনা। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও দলীয় কোন্দল সৃষ্টির ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবেই নিজ জেলার রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কাছে তার পরিচিতি। বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মামলা-হামলায় দমন নিপীড়নে তার ভূমিকা সবসময়ই সক্রিয়। তিনি উপাধ্যক্ষ, মুক্তিযোদ্ধা, ড. মো. আব্দুস শহীদ। মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল) আসনের ৭ বারের এমপি। ছিলেন হুইপ, প্যানেল স্পিকার ও সর্বশেষ ৭ মাসের কৃষিমন্ত্রী। জেলা আওয়ামী লীগের এক মেয়াদে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে থাকা সভাপতিও। নামের আগে উপাধ্যক্ষ ও সর্বশেষ যুক্ত ডক্টরেট এবং মুক্তিযোদ্ধা উপাধী নিয়ে জেলা জুড়ে রয়েছে নানা আলোচনা। তকমা আছে নিজ জেলার উন্নয়ন বিদ্বেষী হিসেবেও। দীর্ঘ মেয়াদে এমপি ও মন্ত্রী থাকার পরও নিজ এলাকায় নেই দৃশ্যমান উন্নয়ন। মেডিকেল কলেজ, চা নিলাম কেন্দ্র, শমসেরনগর বিমান বন্দরসহ বড় প্রকল্পের উন্নয়ন বাস্তবায়নে নেপথ্যে বাধার কারণ তিনি। এমন অভিযোগ খোদ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মুখে মুখে। এর অন্যতম কারণ নিজের আধিপত্য ধরে রাখা ও দলীয় কোন্দল জিইয়ে রাখা। ক্ষমতার দাপটে অবৈধপন্থায় নীরবে সরব ছিল তার টাকা উপার্জনের নানা ফন্দি ফিকির। দেশ ও বিদেশে বানিয়েছেন সম্পদের পাহাড়। তার ও তার পরিবারের সদস্যদের ইশারা ছাড়া বাস্তবায়িত হতোনা সরকারি কোনো প্রকল্প।

অভিযোগ রয়েছে বালু মহাল, জলমহাল, সরকারি, বেসরকারি নানা প্রকল্প। এমনকি শ্রীমঙ্গলের ভুনবির, মির্জাপুরসহ অন্যান্য ইউনিয়নের অবৈধ বালু উত্তোলন থেকে কমলগঞ্জের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল্যবান গাছ কেটে বিক্রি পর্যন্ত। বৈধ ও অবৈধ ছোট-বড় সব কাজ ও আয় রোজগারের একটি বড় অংশের টাকার ভাগ আসতো তার হাতে। এর ব্যত্যয় হলেই নানা হয়রানি। এভাবেই তিনি হাতিয়ে নিতেন কোটি কোটি টাকা। তার নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী করতে ৩ ভাই ও বড় মেয়েকে দলীয় পদ-পদবী দিয়ে নিয়ে আসেন জন সম্মুখে। প্রভাব খাটিয়ে তার ছোট ভাই ইমতিয়াজ আহমদ বুলবুলকে কমলগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান, ইফতেখার আহমদ বদরুলকে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও মোসাদ্দেক আহমদ মানিককে বানান মুক্তিযোদ্ধা ও কমলগঞ্জ আওয়ামী লীগের সভাপতি। আর বড় মেয়ে উম্মে ফারজানা ডায়নাকে পদ দেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদকের। উদ্দেশ্যে ছিল আগামীতে সংসদ নির্বাচনে সদস্য বানানো। এজন্য রাজনীতির মাঠে তার সঙ্গেই রাখতেন মেয়েকে। এ নিয়ে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অসন্তোষ ও ক্ষোভকে তিনি পাত্তাই দিতেন না। বলা চলে সংসদ থেকে ইউনিয়ন পরিষদ, শহীদ পরিবারের ছিল একক আধিপত্য।

সূত্রমতে, মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল) সংসদীয় আসনে ১৯৯১ সাল থেকে নানা কৌশলে পতিত স্বৈরাচারী সরকারের শেষ সময় পর্যন্ত টিকিয়ে রাখেন তার এমপিত্ব। জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বে থাকাকালে জেলা জুড়ে দলীয় অভ্যন্তরীণ গ্রুপিং দ্বন্দ্ব ছিল চরমে। প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মহসীন আলীর সঙ্গে দলীয় দ্বন্দ্ব ছিল প্রকাশ্যে। ওই সময় দলের একটি বড় অংশকে কোনঠাসা করে রাখতে তিনি তটস্ত ছিলেন। নানা কূট কৌশলে দীর্ঘদিন জেলার শীর্ষ দলীয় পদ ধরে রাখেন। আর ওই ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্পদের পাহাড় গড়েন। এমন অভিযোগ দলীয় নেতাকর্মীসহ জেলাবাসীর। এ ছাড়া লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের পাশে ‘সাবারী টি প্ল্যান্টেশন’ নামে চা-বাগান গড়ে তুলে উদ্যানের ৭-৮ একর পাহাড়ি জমি দখলে নেন। সরকারি খরচে ওই বাগানে বিদ্যুৎ সংযোগসহ স্থাপন করেন ১৫-২০টি ডিপটিউবওয়েল। কাঁঠালকান্দিতে ১০-১৫ একর পাহাড়ি এলাকায় বাগান বাড়ি। সেখানে সরকারি খরচে ডিপটিউবওয়েল ও সৌর প্ল্যান্ট নির্মাণ। হাইল হাওরে বাইক্কা বিলের পাশে প্রায় ১৫-২০ একর জমির বিশাল মৎস্য খামার।

অভিযোগ রয়েছে প্রভাব খাটিয়ে অবৈধভাবে পাখি ও মাছের নিরাপদ অভায়াশ্রম বাইক্কা বিলের কান্দি থেকে এক্সেভেটর মেশিন দিয়ে মাটি কেটে পাড় তৈরি করেন ওই খামারের। কমলগঞ্জ মাঝেরছড়ায় কয়েকশ’ বিঘা টিলায় লেবু বাগান। রাজধানীর উত্তরা ১০নং সেক্টর, ২নং রোড ৩৫নং বাসা, ঢাকা-সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের জগদীশপুর পেট্রোল পাম্প, ঢাকার ফার্মগেইট এলাকায় ঘরসহ জমি ও দোকান। শ্রীমঙ্গল সদর ইউনিয়নের দিলবরনগরে প্রায় ১০ একর জমিতে লেবু বাগান। শ্রীমঙ্গল শহরের কলেজ রোডে পাঁচতলা ভবন। মৌলভীবাজার রোডে হাউজিং এস্টেটে বাসার জায়গা। কমলগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন বাসা। গ্রামের বাড়িতে সরকারি খরচে প্রায় ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে সোলার লাইট স্থাপন ও পুকুর খনন। এ ছাড়া লোক মুখে প্রচলিত আছে তার নামে-বেনামে কানাডা, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে বাড়ি রয়েছে। ২০১২ সালে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি তার চাহিদানুযায়ী বিধি লঙ্ঘন করে গ্রামের বাড়িতে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গ্যাস লাইন দেয়। ২৯শে অক্টোবর তার গ্রেপ্তারের খবরে নিজ নির্বাচনী এলাকার নির্যাতিত মানুষসহ জেলা জুড়ে আনন্দ মিছিল করে জনতা। এ সময় তারা তার অবৈধভাবে উপার্জিত সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফিরিয়ে আনাসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।

mzamin

Saturday, October 26, 2024

কুলাউড়ায় অসহায়-দুস্থদের পাশে সুইজারল্যান্ড প্রবাসী

কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় স্বপ্ন গড়ি প্রবাসী ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সুইজারল্যান্ড প্রবাসী দানবীর বাবু এআর রবি দাসের পক্ষ থেকে অসহায়, দুস্থ মানুষের মধ্যে হুইলচেয়ার, শাড়ি, লুঙ্গিসহ প্রায় ৫ লক্ষাধিক টাকার নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। মাসব্যাপী বিতরণ কার্যক্রমে শতাধিক ব্যক্তির হাতে শাড়ি, লুঙ্গি ও চিকিৎসার জন্য নগদ অর্থ প্রদান করা হয়। গতকাল আর্থিকভাবে অক্ষম ৪ জনকে হুইলচেয়ার দেয়া হয়। এ বিষয়ে সুইজারল্যান্ড বিএমএফ’র টেকনিক্যাল ম্যানেজার বাবু রবি দাস বলেন, একযুগ থেকে প্রবাসের আয়ের একটা অংশ গরিব-দুঃখীদের জন্য রেখে দেই। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে আমার এই প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে থাকবেও। বিতরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন- সাগর কুর্মী, কানাই লাল দাস, রাজু দাস, পলাশ চক্রবর্তী, সজল বড়কুর্মী, জসিম উদ্দিন, মাসুক মিয়া, স্বপন মল্লিক, বাবুল দাস প্রমুখ।
mzamin

Monday, October 7, 2024

সীমান্তে বিএসএফ’র টার্গেট বাংলাদেশের মানুষ- রিজভী

মৌলভীবাজারে বিএসএফ’র গুলিতে নিহত স্বর্ণা দাসের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরবর্তী পথসভায় বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সীমান্তে হত্যার সময় ভারত দেখেনি তারা হিন্দু না মুসলমান। তাদের টার্গেট হচ্ছে বাংলাদেশি, তাদের টার্গেট হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ। শুধুমাত্র শেখ হাসিনা ছাড়া যারাই যখন ক্ষমতায় এসেছে তারা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তকে নিরাপদ সীমান্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। ভারত তা শুনেনি, তারা সীমান্তকে পৃথিবীর সবচেয়ে রক্তাক্ত সীমান্ত, সহিংস সীমান্ত এবং মৃত্যু ও লাশের মিছিলে পরিণত সীমান্ত করেছে।

রোববার (৬ই অক্টোবর) জুড়ী উপজেলার পশ্চিমজুড়ী ইউনিয়নের খাকটেখা কালনীগড় বাজারে বিএসএফ’র গুলিতে নিহত স্বর্ণা দাসের পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আসেন রুহুল কবির রিজভী। এ সময় ‘আমরা বিএনপি পরিবার’-এর পক্ষ থেকে স্বর্ণা দাসের পরিবারের হাতে আর্থিক অনুদান তুলে দেন তিনি।

সেখানে পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন রুহুল কবির রিজভী। তিনি আরও বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সীমান্তে লাশের সংখ্যা বেড়েই চলছে। ভারতের হাতে বানানো তাদের গোলাম শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে তাই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী আরও আক্রমণাত্মক। ৫ই আগস্ট জনগণের যে বিপ্লব হয়েছে তার ধারাবাহিকতায় জনগণের আস্থা নিয়ে ড. ইউনূস সরকারে আসে। আমাদেরও এই সরকারের প্রতি আস্থা আছে। তবে গণতন্ত্রের চর্চাকে সামনে রেখে দ্রুত নির্বাচন দেয়া উচিত। নির্বাচন দিতে কেন বিলম্ব করছেন? অতি দ্রুত গণতন্ত্র রক্ষায় নির্বাচন দিন।

রিজভী বলেন, বর্তমানে যিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব তিনি কাতারের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তখন যারা বিএনপি করতো তিনি তাদের পাসপোর্ট রিনিউ করতেন না। এ বিতর্কিত রাষ্ট্রদূতের কারণেই অনেক বাংলাদেশিকে দেশে ফিরতে হয়েছে। সে তো স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার এজেন্ট। সে কীভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব হলো? এরা কখনোই চাইবে না আপনি সফল হোন। এদের মতো স্বৈরাচারী সরকারের এজেন্টরা আপনাকে প্রতিনিয়ত বিতর্কিত করবে। কাতার বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টা শরিফুল হক সাজুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন আমরা বিএনপি পরিবারের উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল, আলমগীর কবীর, আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমন, মৌলভীবাজার জেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি নাসির উদ্দিন আহমেদ মিঠু।

mzamin


Friday, September 20, 2024

তিন মাস ধরে ১৪০০ চা শ্রমিকের মজুরি বন্ধ

মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার ফুলতলা চা বাগানে প্রায় তিন মাস ধরে ১৪শ চা শ্রমিকের মজুরি ও রেশন বন্ধ রয়েছে। এ কারণে তাদের দুর্ভোগের শেষ নেই। শ্রমিকদের অভিযোগ, দ্য নিউ সিলেট টি এস্টেটস লিমিটেডের মালিকানাধীন ওই বাগান কর্তৃপক্ষ নিয়মিত মজুরি না দিয়ে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। মজুরির দাবিতে শ্রমিকরা কর্মবিরতি-মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে আসছিলেন। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধির আশ্বাসে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাগান মালিক নানা অজুহাত দেখিয়ে শ্রমিকদের মজুরি বন্ধ রেখেছেন। শোনা যায়, তিনি দেশের বাইরে চলে গেছেন। এরপর থেকে বাগানে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুমে শ্রমিকরা কাজ না করলে উৎপাদনে বড় ক্ষতির শঙ্কা দেখা দিতে পারে, যে কারণে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।

বাগানের শ্রমিক পরিবারের রাম ভোজন কালবেলাকে বলেন, জেলার সীমান্তবর্তী ফুলতলা চা বাগান ভালো মানের বাগান। হঠাৎ মালিকপক্ষের অসহযোগিতায় প্রায় তিন মাস ধরে শ্রমিকদের রেশন ও মজুরি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়েন দিনমজুর শ্রমিকরা। শ্রমিকরা দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষের কোনো কর্ণপাত নেই।

বাগান পঞ্চায়েতের সাধারণ সম্পাদক দিপচান গোয়ালা কালবেলাকে বলেন, আমাদের বাগানে ১৪শ শ্রমিক রয়েছেন। মালিকপক্ষ দেশের বর্তমান পরিস্থিতি ও বন্যার অজুহাত দেখিয়ে ১১ সপ্তাহ ধরে রেশন ও মজুরি বন্ধ করে রেখেছেন। এ নিয়ে আমরা বারবার যোগাযোগ করলেও কোনো সুরাহা হয়নি। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের জানানো হলে তারা উদ্যোগ নিয়েও সমাধান করতে পারেননি। তাদের প্রচেষ্টায় মাত্র এক সপ্তাহের মজুরি প্রতি জনে ১ হাজার ২০ টাকা পেয়েছেন।

কিন্তু রেশন দেওয়া হয়নি। এ টাকা দিয়ে শ্রমিকরা ঋণ পরিশোধ করবেন, না সংসারের খরচ চালাবেন। এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন শ্রমিকরা। ধারাবাহিকভাবে মজুরি প্রদান না করলে শ্রমিকরা অনাহারে-অর্ধাহারে থাকবেন। শ্রমিকরা বাগান রক্ষার স্বার্থে এবং চা পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুম থাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

জুড়ী উপজেলার ফুলতলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল আলীম শেলু কালবেলাকে বলেন, বাগানের অবস্থা ভালো নয়। বিষয়টি স্থানীয় ও ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। বাগান চালু রাখার জন্য এক সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাগান ম্যানেজারকে পাওয়া যায়নি। তার মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে। জুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাবলু সুত্রধর কালবেলাকে বলেন, এখানে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ এসে পরিদর্শন করেছেন। শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হয়েছে। মজুরি প্রদান অব্যাহত থাকবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করব।

শ্রমিকরা বাগান রক্ষার স্বার্থে এবং চা পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুম থাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ছবি : কালবেলা
শ্রমিকরা বাগান রক্ষার স্বার্থে এবং চা পাতা উত্তোলনের ভরা মৌসুম থাকায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। ছবি : কালবেলা



Monday, September 9, 2024

মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়: নিয়োগে দুর্নীতি কোটি টাকার বাণিজ্য, তোলপাড় by ইমাদ উদ দীন

একটি নিয়োগ পরীক্ষার রেজাল্ট শিট। নয়ছয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব। এটা পুকুর চুরি নয়, অনেকটা সাগর চুরি। এমনটি মন্তব্য সুশীল সমাজ ও ক্ষতিগ্রস্তদের। অভিযোগ উঠেছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ৭টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট করে কয়েক কোটি টাকা বাণিজ্য করেছে একটি চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা স্যোশাল মিডিয়ায় চাউর হলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জেলাবাসীর। নিয়োগ বঞ্চিত ও সচেতন মহল নিয়োগকৃতদের চাকরি বাতিলের জোর দাবি জানাচ্ছেন। ওই নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নিয়োগ কমিটির সদস্য, পরীক্ষক ছাড়াও ২ জন এমপি ও ১ জন মন্ত্রীসহ সিভিল সার্জন অফিসের ৪ জন কর্মচারী ও ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি রেজাল্ট শিটে দেখা যায় পরিসংখ্যানবিদ, স্টোরকিপার, গাড়িচালক, ক্লোড চেইন টেকনিশিয়ান, ল্যাবরেটরি এটেনডেন্ট ও অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক ৬টি পদে ১২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। ১২ জনই সনাতন ধর্মাবলম্বী। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় সিভিল সার্জন অফিসের যারা নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা ৫ জনই সনাতন ধর্মাবলম্বী। ওই সময়ের স্রোত ও আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপ সহজ হবে বলে ওদেরকে নিয়োগ পাইয়ে দেন। ফলাফলের দিক থেকে ১ম হয়ে কমলগঞ্জের রুবেল আহমেদ নিয়োগ বঞ্চিত হলেও ৩য় হওয়ার পরও শুধু টাকা ও সনাতন ধর্মের লোক বলে গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ পান শুভচন্দ্র পাল। এ ছাড়া স্বাস্থ্য সহকারী পদে ৭১টি পদের মধ্যে (৯টি স্থগিত/বাতিল) নিয়োগ পেয়েছেন ৫৫ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী। ৭৪টি পদের মধ্যে ৬৭ জনই সনাতন ধর্মাবলম্বী অধিক গুরুত্বে নিয়োগ পান। আর ৪টি কোটায় নিয়োগ পান ২০ জন। অভিযোগ রয়েছে ভুয়া তথ্য দিয়েও অনেকেই টাকার জোরে নিয়োগ পান। জানা যায় ৭টি ক্যাটাগরিতে ২০১৮ ও ২০২৩ সালে দু’টি পৃথক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এতে ৯৫টি পদের জন্য ২০ হাজার ৮শ’ ৬৯ জন আবেদন করেন। এরমধ্যে  লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৮ হাজার ১৫৪ জন। উত্তীর্ণ হন ৫৯৭ জন। মৌখিক পরীক্ষা শেষে চলতি বছরের ১৬ই জুলাই ৯৩ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয় (আইনগত জটিলতায় স্বাস্থ্য সহকারী ৩টি পদ স্থগিত থাকে)। নিয়োগ প্রক্রিয়া, পরীক্ষাসহ সকল আনুষ্ঠানিকতা ঠিকটাক দেখালেও যারা চাহিদামতো বড় অংকের টাকার যোগান দিয়েছেন কেবল তারাই নয় ছয়ের মাধ্যমে যোগ্য বলে নিয়োগ পান। এমন অভিযোগ চাকরি বঞ্চিতদের। ভালো পরীক্ষা দেয়ার পরও অকৃতকার্য হওয়ায় প্রার্থী ও তাদের স্বজনদের সন্দেহ হয়। তখনই নিয়োগে অনিয়ম দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ তোলেন। চাকরি বঞ্চিতরা বলছেন যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের ওই প্রশ্নে আবারো পরীক্ষা নিলে নির্ঘাত অকৃতকার্য হবেন। অভিযোগ উঠেছে সরাসরি এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী অসিত চক্রবর্তী, হেড এসিস্টেণ্ট কাম ক্যাশিয়ার রঞ্জনা দেবী, পরিসংখ্যানবিদ অহিজিৎ দাস রিংকু, স্টোরকিপার অলকচন্দ্র পাল ও ২৫০ শয্যা সদর জেনারেল হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিতাংশ আচার্য্যসহ অন্যরা। এরা দীর্ঘদিন থেকে একই অফিসে কর্মস্থল হওয়ায় দাপটের সঙ্গে দুর্নীতি, ঘুষ ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ সকল অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তাদের দাপটের কারণে সিভিল সার্জন অফিসের কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পান না। ওই ঘটনার নেপথ্যে আর্থিক বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সাবেক এমপি শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, মৌলভীবাজার-৩ (সদর ও রাজনগর) সাবেক এমপি ও অলিলা গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল) সাবেক এমপি ও কৃষিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. আব্দুস শহীদ, বিএম এর মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি ডা. সাব্বির আহমদ খান। ওই নিয়োগ কমিটিতে আহ্বায়ক ছিলেন বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) সিলেট, ডা. মো. আনিসুর রহমান, সদস্য ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ) উপ-সচিব মনিরা পারভীন, পিএসসির  উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আব্দুস সালাম, সদস্য সচিব ছিলেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ। অভিযোগ উঠেছে ওই নিয়োগ বাণিজ্যের যাবতীয় কলকাঠি নেড়েছেন সিভিল সার্জন অফিসের ৪ জন, সদর জেনারেল ২৫০ শয্যা হাসপাতালের-১ জন, বিএমএ’র ১ জন ও নিয়োগ বোর্ডের ৩ জন। আর তাদেরকে প্রশ্রয় দিয়ে প্রভাবিত করেন স্থানীয় ২ জন এমপি, ১জন মন্ত্রী ও বিএমএ’র নেতারা। এ ক্ষেত্রে তারা দালালের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। তারা নিয়োগ কমিটিসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ম্যানেজ করে চাকরি দেয়ার শর্তে অন্তত ৫০-৬০ জন প্রার্থীর কাছ থেকে ৫-৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। নিয়োগের পরও আরেক দফা পোস্টিং বাণিজ্য করেন সিভিল সার্জন অফিসের সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ২০২৩ সালেও আউট সোর্সিং নিয়োগেও অনুরূপ দুর্নীতি হয়েছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ওই নিয়োগেও জড়িত ছিলেন সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বিএমএর নেতারা। এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির সদস্য উপ-সচিব (স্বাস্থ্য-৬ শাখা) স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় মনিরা পারভীন ও সদস্য সচিব মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন ডা. জালাল উদ্দিন মুর্শেদ মুঠোফোনে মানবজমিনকে জানান নিয়োগ পরীক্ষায় কোনো দুর্নীতি হয়নি। সরকারের সকল নিয়ম কানুন মেনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

Friday, September 6, 2024

বিএসএফকে শিশু স্বর্ণা বলেছিল- ‘আমাদের মেরো না আইনের আশ্রয়ে নিয়ে নাও’ by আলাউদ্দিন কবির

কুলাউড়ার লালারচক সীমান্তের পাশে জলাশয়ে পৌঁছামাত্র হঠাৎ বিএসএফকে দেখে স্বর্ণা আতঙ্কিত হয়ে বলে ‘আমাদের মেরো না আইনের আশ্রয়ে নিয়ে নাও’। বাংলায় বলা কথাগুলোর প্রতি উত্তরের বদলে বিএসএফের বুলেটে বুক ঝাঁজরা হয়। বিএসএফের বন্দুক তাক করানো দেখে স্বর্ণা ঘুরে যায়। পেছন দিকের গুলিটা বুকের ডানপাশ দিয়ে ওপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। তখনই স্বর্ণা বলে, ‘মা হাতটা ছেড়ে দাও, আমি আর বাঁচবো না’। তোমার প্রাণ রক্ষা করো। স্বর্ণার ভাই পিন্টু দাস কান্নাজড়িত কণ্ঠে মানবজমিনকে এসব কথা জানায়। মায়ের জ্ঞান ফেরার পর তার কাছ থেকে এ হৃদয়বিদারক ঘটনার বর্ণনা শুনেছে পিন্টু। জুড়ী উপজেলার কালনীগড় গ্রাম এখন শোকস্তব্ধ। শান্ত এই জনপদ শোকে কাতর।

এই গ্রামেরই কিশোরী স্বর্ণা দাস চলে গেছে পরপারে। সীমান্ত পাড়ি দিতে গিয়ে বিএসএফের বুলেটের আঘাতে প্রাণ গেছে স্বর্ণার। ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী বিএসএফের নির্মমতার বলি স্বর্ণার পরিবারে থামছে না কান্না। বাবা পরেন্দ্র দাস ও মা সঞ্জিতা রানী দাস বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন। ৩ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে স্বর্ণা ছিল ছোট। পড়ালেখায় ছিল মেধাবী। পুরো স্কুল মাতিয়ে রাখতো। সহপাঠীরা অকালে স্বর্ণাকে  হারানোর শোকে মুহ্যমান। নিরোদ বিহারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৮ম শ্রেণির ছাত্রী স্বর্ণা মায়ের সঙ্গে গত ১লা সেপ্টেম্বর রোববার রাতে কুলাউড়ার শরিফপুর ইউনিয়নের লালারচক সীমান্ত দিয়ে ভারত যেতে চেয়েছিল। ত্রিপুরা রাজ্যের শনিচড়া গ্রামে তার মামার বাড়ি। স্বর্ণার এক ভাই মামা কার্তিক দাসের পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘদিন থেকে আছে। ভাইকে দেখা ও মামার বাড়ি বেড়ানো অধরাই রয়ে গেল স্বর্ণার। স্বর্ণা দাসের বাবা পরেন্দ্র দাস বলেন, রোববার সকালে মা ও মেয়ে ভারতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন। সোমবার সকালে স্বর্ণার মামার বাড়িতে যোগাযোগ করে জানতে পারি তারা যায়নি। পরে অনেক খোঁজাখুঁজির পর এক সেনা কর্মকর্তার সহযোগিতায় শমশেরনগর থেকে স্বর্ণার মাকে উদ্ধার করি। পরদিন সোমবার বিকালে বিজিবি’র মাধ্যমে আমার মেয়ের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হই। স্বর্ণার মা সঞ্জিতা রানী দাস বলেন, সীমান্ত এলাকায় আমি ও আমার মেয়ে দালালদের খপ্পরে পড়ে যাই। তারা চট্টগ্রামের আরও একটি পরিবারের সঙ্গে আমাদেরকেও ভারতে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে। সীমান্তের কাছে গেলেই হঠাৎ গুলির আওয়াজ শুনে মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। নির্দয় বিএসএফের গুলিতে আমার মেয়ের শরীর ঝাঁজরা হয়ে গেছে। এ কথা বলেই সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেন সঞ্জিতা রানী দাস।

স্থানীয় পশ্চিম জুড়ী ইউপি’র ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য মদন মোহন দাস বলেন, মেয়েটি বড় নম্র ভদ্র ছিল। পুরো গ্রামেই তার সুনাম ছিল। পশ্চিম জুড়ী ইউপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বলেন, গুলি করে মারার অধিকার কে দিলো। আমরা সীমান্তে গুলি করে মারাকে সমর্থন করি না। আর কতো ফেলানির মতো লাশ সীমান্তে পড়বে। ভারত যদি আমাদের বন্ধু ভাবে তাহলে এসব বন্ধ করতে হবে। স্বর্ণার সহপাঠী সুস্মিতা, পূর্বা, বন্যা ও সিপা জানায়, পড়ালেখায় সে ভালো ছিল। খেলাধুলাও করতো। পুরো ক্লাস মাতিয়ে রাখতো। বন্ধু রাষ্ট্রের এই বাহিনী এত নির্মম কেন? গুলি করতে তাদের বুক একবারও কাঁপলো না। ৪৫ ঘণ্টা পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চাতলাপুর  চেকপোস্ট দিয়ে স্বর্ণার লাশ হস্তান্তর করে বিএসএফ। বুধবার তার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

Sunday, September 1, 2024

মৌলভীবাজারে বন্যা: কমছে পানি, বাড়ছে দুশ্চিন্তা by ইমাদ উদ দীন

ভয়ার্ত রূপ দেখানো বন্যার আগ্রাসন থেমেছে এখন। ভেসে উঠছে ক্ষতচিহ্ন। দীর্ঘ প্রায় ১২ দিন পর বানের পানির দুর্ভোগ কাটিয়ে উঠলেও এখন মহাদুর্ভোগে ঘরবাড়ি হারানোদের পুর্নবাসন নিয়ে। জেলার নদী তীরের চরম দুর্ভোগগ্রস্ত বানভাসিদের সঙ্গে আলাপকালে এমনটিই জানালেন তারা। জেলার ৭টি উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত মনু, ধলাই, ফানাই, জুড়ী, কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদীর তীরের ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই। নদী ও হাওর এলাকার বন্যার পানি দ্রুত নামছে। তবে এরই সঙ্গে দেখা দিচ্ছে নতুন দুর্ভোগ। বিশুদ্ধ পানি, খাবার, শিশুখাদ্য, স্যানিটেশন ও গো-খাদ্যের চরম সংকটের পাশাপাশি দেখা দিয়েছে পানিবাহিত নানা রোগবালাই। আকস্মিক বন্যায় ছেড়ে যাওয়া বাসাবাড়িতে ফিরছেন বন্যার্তরা। বসতঘর মেরামত ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পর পুনরায় অনেকটা নতুন করেই যাত্রা শুরু করছেন বসবাসের জন্য। তবে উজানের ঢল আর ভারী বৃষ্টি হলে বন্যায় আবারো প্লাবিত হতে পারে। এমন আশঙ্কা স্থানীয় বাসিন্দাদের। কারণ নদী ভেঙে যাওয়া বাঁধ এখনো মেরামত হয়নি। গেল কয়দিন থেকে নদী তীরবর্তী গ্রাম ও শহর এলাকা থেকে বানের পানি নেমে যাওয়ায় ভেসে উঠছে ডুবন্ত রাস্তাঘাট আর বসত ভিটা। পানি নামাতে ক্ষতিগ্রস্তরা কিছুটা দুশ্চিন্তা মুক্ত হলেও এখন দেখা দিচ্ছে নানা নতুন দুর্ভোগ। পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হচ্ছে ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন। আর এরই সঙ্গে বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যানও। ঘরবাড়ি আর ক্ষেতকৃষি হারানো দৃশ্যে অসহায়ত্তও ভাড়ছে বন্যায় চরম ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের। সরকারি তরফে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নিরূপণ হয়নি। বিভিন্ন বিভাগের উদ্যোগে বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নির্ণয়ের কাজ চলছে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে সবমিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করতে আরও দু/একদিন সময় লাগবে। জেলা প্রশাসনের তথ্য মতে বন্যায় ২ লাখ ৫৭ হাজার ৯৩৩ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন চলমান ৩য় দফা বন্যায় জেলার ৭টি উপজেলার নদী ও হাওর এলাকায় প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষাধিক মানুষ বন্যা আক্রান্ত হয়েছেন। এরমধ্যে জেলার রাজনগর, কমলগঞ্জ ও কুলাউড়া কয়েক শতাধিক ঘরবাড়ি আংশিক এবং পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। রাজনগর উপজেলার কামারচাক, মনসুরনগর, টেংরা ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামে দেখা যায় বন্যার পানির তোড়ে বেশ কিছু ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ নষ্ট হয়েছে। ভিটের মাটি সরে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। রাস্তাঘাট ভেঙে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই ভয়াল দৃশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই বন্যার আগে এখানে কোনো বসতভিটা ছিল। একই অবস্থা কুলাউড়া উপজেলার মনু নদী তীরবর্তী শরীফপুর, হাজীপুর, টিলাগাঁও ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামে। কমলগঞ্জের ইসলামপুর, আদমপুর, পতনঊষার, মুন্সিবাজার ইউনিয়নের একাধিক গ্রামেই একই অবস্থা। স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তরা জানান, বন্যায় তাদের ঘরবাড়ির অস্তিত্ব নেই। বসত ভিটা আর উঠান এখন অনেকটাই পুকুর হয়ে গেছে। এমনকি পাকা ল্যাট্রিনের ট্যাংকির নিচ পর্যন্ত পানির স্রোতের তোড়ে উঠে গেছে। বিশুদ্ধ পানির উৎস টিউবওয়েলগুলোও নষ্ট হয়েছে। নদী তীরবর্তী গ্রামের ঘরবাড়ি ঘুরে দেখা যায় সবার অবস্থা একই। কারও সীমানা প্রাচীর কিংবা ঘরের দেয়াল বানের পানির স্রোতে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এ বছর আকস্মিক বন্যায় জেলায় মনু, ধলাই, জুড়ী, ফানাই ও কুশিয়ারা নদীর প্রায় ২৫টি স্থানে ভাঙন ও বাঁধ উপচে তীরবর্তী এলাকা প্লাবিত করে। বাঁধ ভাঙা এলাকার আশপাশে যাদের বসত ভিটা ছিল তাদের এখনো অবর্ণনীয় দুর্ভোগ আর ক্ষয়ক্ষতি। আকস্মিক বন্যায় বেহাল দশা জেলার  যোগাযোগ ব্যবস্থারও। ২য় দফা বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে উঠার আগেই আবারো ৩য় দফা বন্যা হওয়ায় চরম ক্ষতি হয়েছে রাস্তাঘাটেরও। ক্ষেতকৃষি, সবজি ও ফলজ বাগান নষ্ট হয়েছে। ফসলের ক্ষতিতে প্রান্তিক চাষিরা এখন দিশাহারা। হঠাৎ এমন ক্ষয়ক্ষতিতে সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন কৃষকরা। ক্ষতিগ্রস্ত মৎস্য খামারিরা। বিপর্যয় নেমে এসেছে পোল্ট্রি খাতেও।

এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আব্দুস সালাম চৌধুরী মানবজমিনকে জানান জেলার প্রতিটি দপ্তর থেকে ক্ষয়ক্ষতির নিরূপণ করা হচ্ছে। ডি ফরমে সব বিভাগের বন্যায় ক্ষয়ক্ষতির তথ্য জানাবেন। আমরা এ সকল পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ে পাঠাবো। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে এ বিষয়ে তথ্য চেয়েছেন। প্রত্যাশা হয়তো পুনর্বাসনের পরিকল্পনাও থাকতে পারে।

Tuesday, August 27, 2024

মৌলভীবাজারে অসহায় মানুষ -তৃতীয় দফায় বন্যা by ইমাদ উদ দীন

ধীরগতিতে কমছে বানের পানি। জেলার নদীগুলোর পানি এখন বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আর কমতে শুরু করেছে নদীর বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়া গ্রামগুলোর উজান এলাকায় বানের পানি। তবে নদী ও হাওরের ভাটি এলাকায় এখনো ঘরবাড়িতে হাঁটু ও কোমর পানি। সময় যত যাচ্ছে আশ্রয়কেন্দ্র, অন্যত্র আশ্রয় নেয়া ও নিজ বসতভিটায় ঝুঁকি নিয়ে থাকা বন্যার্তরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটসহ স্যানিটেশন আর পানিবাহিত নানা রোগবালাইয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন। জেলার ৭টি উপজেলার নদী ও হাওর তীরের প্রায় সাড়ে ৪ লক্ষাধিক মানুষ বন্যাকবলিত। এর আগে কখনো এমন আগ্রাসী ও রাক্ষুসে বন্যা দেখেননি কেউ। মাত্র ঘণ্টা দুয়েক এর ব্যবধানে কিছু সামাল দেয়ার আগেই আকস্মিক এ বন্যায় চোখের নিমিশে সবই শেষ। কোনো রকম প্রাণ রক্ষা করতে পারলেও সব হারিয়ে এখন তারা নিঃস্ব।

বানভাসিরা বন্যার প্রথমদিনের ভয়াবহতার ভয় আর দুঃসহ স্মৃতি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। স্বপ্নের রোপা আমন ধান ও সবজি ক্ষেত বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা এখন দ্বিগুণ হচ্ছে। এমনটি জানালেন জেলার মনু, ধলাই, ফানাই, জুড়ী ও কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকার বন্যায় দূর্ভোগগ্রস্তরা। জানা যায়, জেলা জুড়ে এখন ৩য় দফা বন্যা চলমান। এখন বৃষ্টি থামলেও ধীরগতিতে নামছে পানি। জেলার নদী তীরের বাসিন্দারা নতুন করে প্রথমবারের মতো বন্যা আক্রান্ত হলেও হাওর তীরের বাসিন্দারা এনিয়ে ৩য় দফায় বন্যা আক্রান্ত হলেন। আগের দু’দফা বন্যার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারো বন্যা আক্রান্ত হলেন। জেলার নদী ও হাওর তীরের গ্রামগুলোর বন্যাকবলিত অনেক মানুষই তাদের গবাদিপশুসহ আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নিয়েছেন। অনেকেই নানা কষ্টে ঘরে মাচাং বেঁধে চরম ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।

তারা জানান, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা পেলেও গ্রাম এলাকায় ত্রাণ সহায়তা মিলছে কম। এমন দুর্দিনে তারা এখনো সরকারি ত্রাণ সহায়তা ও জরুরি চিকিৎসাসেবা পাননি। ব্যক্তি, সামাজিক ও পেশাজীবী সংগঠনসহ বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ হলেও তা শৃঙ্খলিত না হওয়ায় বিড়ম্বনায় পড়েছেন দুর্ভোগগ্রস্তরা। আশ্রয়কেন্দ্র বা যোগাযোগ ব্যবস্থা যে এলাকায় ভালো সেখানে ত্রাণ যাচ্ছে বেশি। বন্যাকবলিত অনেক গ্রামেই দীর্ঘ অপেক্ষার পরও অসহায় বন্যার্তরা পাচ্ছেন না ত্রাণ সহায়তা। তারা জানান, এই সময়ে ক্ষেত কৃষি না থাকায় নেই আয় রোজগারও। বন্যায় সর্বস্বান্ত কৃষক, মৎস্যজীবী, শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের হতদরিদ্র মানুষ পড়েছেন মহাবিপাকে। তারা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশন সমস্যায় ভুগছেন। তারা অভিযোগ করে বলছেন, অপরিকল্পিতভাবে হাওর ও নদী তীরের অধিকাংশ বিদ্যালয় কাম বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নিচতলায় শৌচাগার ও বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা থাকায় তা বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

অনুরূপ বাড়িতে, সড়কে বা উঁচু স্থানে অন্যত্র আশ্রয় নেয়া বন্যাকবলিত লোকজনও এই সমস্যায় ভুগছেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, জেলার ৭টি উপজেলার ৫১টি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় বন্যাকবলিত মানুষের জন্য ৬৫টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এতে প্রায় ১১ হাজার বন্যার্ত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের স্বাস্থ্যসেবার জন্য ৬৮টি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে ৮২৬ মেট্রিক টন চাল ও নগদ ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। জেলার অসহায় হতদরিদ্র বানভাসি দুর্ভোগগ্রস্ত মানুষ সরকার, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও রাজনৈতিক সংগঠন, বিভিন্ন সংস্থা, পেশাজীবী সংগঠনসহ দেশ ও প্রবাসের বিত্তবানদের কাছে অতীতের মতো তাদের চলমান এই কঠিন দুর্যোগে সার্বিক সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর আকুল আবেদন জানাচ্ছেন।