Monday, June 15, 2026

খলিফা আবু বকরের যুগে পারস্য অভিযান: ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয় by মাহমুদ আহমাদ

ইরাকের উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় খালিদ ইবনে ওয়ালিদের প্রতি খলিফা আবু বকরের স্পষ্ট নির্দেশনা ছিল—আপার ইরাক দিয়ে অভিযান শুরু করে প্রধান লক্ষ্য হীরার দিকে এগিয়ে যেতে থাকবে। হীরা অধিকার সম্পন্ন হলে এই স্থানকে কেন্দ্র করে পরবর্তী অভিযানের পরিকল্পনা সাজাবে। জুতসই লোকেশন ও কৌশলগত গুরুত্বের কারণে খলিফা হীরাকে কেন্দ্র করে ইরাক অভিযানের পরিকল্পনা করেছিলেন। তাই হীরাই ছিল মুসলিম সেনাবাহিনীর প্রাথমিক টার্গেট। হীরা বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিম সেনাবাহিনী প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন করে নেয়।

খলিফা আবু বকর ইরাক অভিযানে দুজন সেনাপতিকে পাঠিয়েছিলেন। আপার ইরাক দিয়ে অভিযান শুরু করেছিলেন প্রধান সেনাপতি খালিদ ইবনে ওয়ালিদ। আর ইয়াজ ইবনে গানাম ইরাকে প্রবেশ করেছিলেন দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল দিয়ে। একদিকে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ হীরা জয় করে ফেললেও ইয়াজ ইবনে গানাম পারসিকদের বিরুদ্ধে সুবিধা করতে পারছিলেন না। দাউমাতুল জানদালে কোনো রকমে শত্রুর মোকাবিলায় টিকে ছিলেন। সেনাপতি খালিদ সিদ্ধান্ত নিলেন—ইয়াজের সাহায্যে তিনি এগিয়ে যাবেন।

আনবার (জাতুল উয়ুন)

আনবার ছিল দজলা নদীর পূর্বতীরে, বর্তমান সাকলাওয়িয়া অঞ্চলের অন্তর্গত এলাকায় অবস্থিত ইরাকের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক একটি নগর। প্রাচীনকাল থেকেই এটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সামরিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। পারসিক যুগে আনবার অন্যতম প্রধান প্রশাসনিক ও সামরিক ঘাঁটি ছিল।

দুমাতুল জান্দালের উদ্দেশে রওনা হয়ে সেনাপতি খালেদ আনবারের প্রতিপক্ষের বাধার মুখোমুখি হলেন। তিনি চাইলে তাদের উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতে পারতেন; কিন্তু তাতে বাহিনীর পেছন দিকটা অনিরাপদ রয়ে যেত। এই ঝুঁকি তিনি নিতে চাইলেন না।

মুসলিম বাহিনীর অভিযানের জন্য আনবারবাসী আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। তারা দুর্গের চারপাশে পরিখা খনন করে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সুরক্ষিত করল। এরপর দুর্গের ভেতরে ঢুকে বসে থাকল। মুসলিম বাহিনী আনবার দুর্গের চারপাশে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করলেন। মুসলিমরা সঙ্গে থাকা দুর্বল উটগুলো জবাই করে পরিখার সরু অংশ ভরাট করে ফেলল। এরপর দুর্গ নিজেদের দখলে নিয়ে নিলেন। সেনাপতি খালেদ এই দুর্গের দায়িত্বে জাবরকান ইবনে বদরকে নিযুক্ত করলেন।

আইনে তামর

আনবার বিজয়ের খালেদ ইবনে ওয়ালিদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র আইনে তামর। মুসলিম বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে আরব ও পারস্যের সম্মিলিত শক্তি সেখানে আগে থেকেই প্রস্তুত হয়েছিল। তাদের নেতা ছিল উক্কাহ ইবনে আবি উক্কাহ। অন্যদের মতো তারাও খালেদের সামরিক দক্ষতাকে অবমূল্যায়ন করল। উক্কাহ অহংকারভরে ঘোষণা করেছিলে, আরবদের মোকাবিলায় আরবরাই যথেষ্ট; পারস্য বাহিনীর সহায়তার প্রয়োজন তাদের নেই।

দুই বাহিনী মুখোমুখি হলে খালেদ একটি সাহসী ও ঝুঁকিপূর্ণ কৌশল গ্রহণ করেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঠিক আগে, যখন উক্কাহ নিজের সৈন্যদের সারিবদ্ধ করতে ব্যস্ত, তখন খালেদ অল্পসংখ্যক অশ্বারোহী নিয়ে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে তাকে বন্দি করে নিয়ে আসেন। নেতা বন্দি হওয়ায় আরব খ্রিষ্টান বাহিনীর মনোবল ভেঙে পড়ে এবং তারা আত্মসমর্পণ করে। এরপর খালেদ আইন তামরের দুর্গ অবরোধ করেন। দুর্গে আশ্রয় নেওয়া লোকদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেন। এভাবে আইনে তামরে সম্পূর্ণভাবে মুসলিমদের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। আইন তামরের প্রশাসক হিসেবে উয়াইমির ইবনে কাহিল আসলামীর নিযুক্ত করেন।

দুমাতুল জানদাল

আইনে তামর জয় করে খালেদ ইবনে ওয়ালিদ দুমাতুল জানদালের দিকে এগিয়ে গেলেন। এখানে মুসলিম সেনাপতি ইয়াজ ইবনে গানাম অবরুদ্ধ হয়ে ছিলেন। খালেদের অগ্রযাত্রার সংবাদ পৌঁছাতেই দাউমাতুল-জানদালের শাসকরা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল এবং বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যদের সমবেত করল।

এদিকে দাউমাতুল-জানদালে পৌঁছে খালেদ দেখতে পেলেন, শত্রুবাহিনী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদল তার মোকাবিলার জন্য এবং অন্যদল ইয়াজ ইবনে গানামের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আক্রমণ শুরু হলে উভয় বাহিনী মুসলিমদের হাতে পরাজিত হয়। পরাজিত সৈন্যরা দুর্গে আশ্রয় নিতে ছুটে গেলেও ভিড়ের কারণে ভেতরে যেতে পারে না। ফলে তারা মুসলিম বাহিনীর আক্রমণের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এরপর খালেদ দুর্গের প্রবেশদ্বার ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং দুমাতুল জানদালের পূর্ণ নিজের হাতে তুলে নেন।

এই বিজয় শুধু সামরিক সাফল্য নয়; কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকেও এর অনেক গুরুত্ব ছিল। দুমাতুল জানদাল ছিল আরব উপদ্বীপ, ইরাক এবং শামের সংযোগস্থলে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে শহরটির অধিকার মুসলিমদের জন্য উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্তকে নিরাপদ করে এবং ইরাক ও শামের মধ্যকার যোগাযোগপথকে সুরক্ষিত করে।

হুসাইদ বিজয়

দুমাতুল জানদাল বিজয়ের পরও ইরাকে মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থেমে যায়নি। খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ অন্য অভিযানে ব্যস্ত থাকায় বহু অমুসলিম আরব ও পারসিক গোষ্ঠী মুসলিম শাসনকে দুর্বল মনে করে আবার সংগঠিত হতে শুরু করে। বিশেষ করে, আইনুত তামরে নিহত উক্কাহর প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে জোট করে এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে একটি বৃহৎ সম্মিলিত বাহিনী প্রস্তুত করে।

এই উদ্দেশ্যে পারসিক সেনানায়করা তাদের বাহিনী নিয়ে বাগদাদ অঞ্চল থেকে হুসাইদ ও খানাফিতে অবস্থানরত আরব মিত্রদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার চেষ্টা শুরু করে। তাদের তৎপরতা মুসলিম গোয়েন্দাদের নজরে পড়ে যায়। হীরার শাসক কা’কা ইবনে আমর তাদের ওপর নজরদারির ব্যবস্থা করেন।

খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ জানতে পারেন, হুসাইদে বিভিন্ন গোত্রের সৈন্যরা পারসিক সেনাপতি রাওজাবার বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিচ্ছে। শত্রুকে আরো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ না দিয়ে তিনি কাকা ইবনে আমরের নেতৃত্বে একটি বাহিনী সেখানে পাঠান এবং হীরার দায়িত্ব ইয়াজ ইবনে গনমের হাতে অর্পণ করেন। এদিকে জারমাহারের সহায়তায় রাওজাবাও পারসিক ও আরব বাহিনীকে একত্র করেন। হুসাইদের যুদ্ধে কাকার নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী শত্রুপক্ষকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে। যুদ্ধে অনেক শত্রুসৈন্য নিহত হয়। এ বিজয়ের ফলে মুসলিমরা ইরাকে তাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা নতুন জোট ও সম্ভাব্য বিদ্রোহের প্রচেষ্টা নস্যাৎ করে দেয়।

মুসাইয়াখ বিজয়


হুসাইদে বিজয়ের পর খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ উপলব্ধি করেন, ইরাকের উত্তরাঞ্চলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আরব ও পারসিক গোষ্ঠীগুলো দ্রুত দমন না করা গেলে তারা আবার একত্র হয়ে মুসলিমদের জন্য বড় হুমকিতে পরিণত হতে পারে। তাই তিনি তার অধীনস্থ সব কমান্ডারকে মুসাইয়্যাখ নামক স্থানে সমবেত হওয়ার নির্দেশ দেন। হাওরাতের নিকটবর্তী এ অঞ্চলে নির্ধারিত সময়ে মুসলিম বাহিনীর বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন একত্র হলে খালেদ তাদের সমন্বিত আক্রমণের পরিকল্পনা দেন। এরপর তিন দিক থেকে একযোগে অভিযান চালিয়ে তারা স্থানীয় প্রতিরোধশক্তিকে ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং শত্রুদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।

ফিরাজের লড়াই

ইরাকে ধারাবাহিক বিজয়ের মাধ্যমে মুসলিমরা যখন অধিকাংশ প্রতিরোধশক্তিকে দমন করতে সক্ষম হয়, তখন সেনাপতি খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ ফিরাজ অঞ্চলে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন। শাম, ইরাক ও আরব উপদ্বীপের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ফিরাজ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সীমান্তাঞ্চল। কৌশলগতভাবে এর নিয়ন্ত্রণ মুসলিমদের জন্য অপরিহার্য ছিল।

ফিরাজে মুসলিম বাহিনীর উপস্থিতি রোমানদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। মুসলিমদের দ্রুত অগ্রযাত্রা থামানোর উদ্দেশ্যে তারা পারসিকদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং উভয় পক্ষ তাদের অভিন্ন প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে একযোগে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে প্রথমবারের মতো মুসলিম বাহিনী একই যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরব—এই তিন শক্তির সম্মিলিত বাহিনীর মুখোমুখি হয়।

উভয় বাহিনী ফোরাত নদীর তীরে মুখোমুখি অবস্থান নেয়। শত্রুপক্ষ মুসলিমদের নদী পার হয়ে আসার আহ্বান জানালে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদ নিজ অবস্থানে অটল থেকে তাদেরই নদী পার হতে দেন। যুদ্ধে রোমান, পারসিক ও আরবদের যৌথ বাহিনীর বিরুদ্ধে মুসলিমরা অসাধারণ সাহস ও শৃঙ্খলার পরিচয় দেয়। তীব্র যুদ্ধের পর শত্রুজোট সম্পূর্ণভাবে পরাজিত হয় এবং বিপুলসংখ্যক সৈন্য নিহত হয়। বিজয়ের পর খালেদ কয়েক দিন ফিরাজে অবস্থান করে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করেন।

হিজরি ১২ সালের জিলকদ মাসে সংঘটিত এই যুদ্ধ মুসলিমদের বিরুদ্ধে গঠিত বৃহত্তম জোটকে ভেঙে দেয় এবং ইরাকে মুসলিম কর্তৃত্বকে আরো সুদৃঢ় করে। ইতিহাসে এটি ইরাক অভিযানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজয়। এটি ছিল ইরাকে খালেদ ইবনুল ওয়ালিদের নেতৃত্বে পরিচালিত শেষ উল্লেখযোগ্য যুদ্ধ।
ইরাক অঞ্চলে অন্যান্য বিজয়

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময় by ইলিয়াস মশহুদ

বর্তমানে ‘মাদরাসা’ শব্দটি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ব্যবহৃত হয়। মুসলিম সভ্যতার স্বর্ণযুগে মাদরাসার ধারণা ছিল অনেক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। সে সময়ের মাদরাসাগুলো শুধু ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র ছিল না, সেগুলো আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে গড়ে ওঠা পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে কাজ করত। সেখানে ধর্মীয় বিদ্যার পাশাপাশি ভাষা ও সাহিত্য, ইতিহাস, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং প্রশাসনিক বিদ্যারও চর্চা হতো। এসব প্রতিষ্ঠান ছিল জ্ঞান-বিজ্ঞানের বৈশ্বিক বিকাশের প্রধানকেন্দ্র। মুসলিম বিশ্বের শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আইয়ুবি শাসকদের (৫৬৯-৬৪৮ হি./ ১১৭১-১২৫০ খ্রি.) অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মিসর ও শামজুড়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য মাদরাসা, দারুল হাদিস ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার। এসব প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বহুমুখী জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি লাভ করে। আইয়ুবি যুগে প্রতিষ্ঠিত কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মাদরাসা নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস মশহুদ

৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি বৃহত্তর সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চলে নিজের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তিনি যখন মিসরে ফিরে আসেন, তখন সেখানে শিক্ষার বিস্তার ও সুন্নি ভাবধারার প্রচারের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের বিশেষ উদ্যোগ নেন।

আইয়ুবি শাসনামলে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি এবং তার উত্তরসূরিদের তত্ত্বাবধানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা ও শিক্ষাকাঠামো প্রণয়নে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ফাতেমি আমলের শিয়া মতাদর্শের প্রভাব কাটিয়ে বৃহত্তর সুন্নি মতাদর্শ পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের ক্ষেত্রে এ সময়টি গুরুত্বপূর্ণ।

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষাবিপ্লবের প্রধান কেন্দ্র ছিল কায়রো, দামেস্ক এবং আলেকজান্দ্রিয়া। ফাতেমিদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব মুছে সুন্নি মতবাদ রাষ্ট্রীয়ভাবে শক্তিশালী করা ছিল এই শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য। এসব মাদরাসা থেকে বিজ্ঞ আলেম, দক্ষ বিচারক, প্রশাসক এবং আমলা তৈরি হতেন। তারা রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতেন। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বহুমুখী জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছিল। কোরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ, আরবি ব্যাকরণ (নাহু-সরফ), সাহিত্য এবং অলংকার শাস্ত্র (বালাগাত); যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন, চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ গণিতশাস্ত্রের চর্চাও অব্যাহত ছিল।

সালেহিয়া মাদরাসা

মিসরের কায়রো শহরে ইমাম শাফেয়ির মাকবারার কাছে ৫৭২ হিজরিতে (১১৭৬ খ্রি.) এই মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয়। এই মাদরাসার শিক্ষাধারা শাফেয়ি মাজহাব অনুযায়ী পরিচালিত হতো। ইমাম সুয়ুতি বলেন, ‘এই মাদরাসা হচ্ছে সব মাদরাসার তাজ। খ্যাতিমান আলেম নাজমুদ্দিন খুবুশানির তত্ত্বাবধানে এখানে শিক্ষাদান শুরু হয়।’

৫৭৮ হিজরিতে (১১৮৩ খ্রি.) জিলহজের শেষদিকে, যখন এর উন্নয়নকাজ চলছিল, তখন প্রখ্যাত পরিব্রাজক ইবনে জুবায়ের এই মাদরাসা পরিদর্শন করেন। তিনি উল্লেখ করেন, ‘এ অঞ্চলে সালেহিয়া মাদরাসার মতো অন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মিত হয়নি। মাঠের বিশালতা এবং নির্মাণশৈলীর অনন্যতার দিক দিয়ে এটি অতুলনীয়। দর্শকের মনে হবে, এ যেন স্বাধীন একটি রাজ্য। এটি নির্মাণে অনেক অর্থ ব্যয় করা হয়। শায়খ খুবুশানি নিজেই এ মাদরাসার পরিচালক ছিলেন। সুলতান সালাহুদ্দিন তাকে এর দায়িত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘এর সৌন্দর্যবৃদ্ধিতে আপনি ইচ্ছামতো ব্যয় করুন, খরচ বহনের দায়িত্ব আমাদের।’

ইবনে জুবায়েরের এই বক্তব্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, সুলতান সালাহুদ্দিন এসব মাদরাসার জন্য সৎ, যোগ্য, বিজ্ঞ এবং প্রসিদ্ধ আলেমদের শিক্ষক নির্বাচন করতেন।

হুসাইনি মাদরাসা

সুলতান সালাহুদ্দিন কায়রোতে (তথাকথিত) মাশহাদে হুসাইনি তথা হুসাইনের সমাধির পাশে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং এই মাদরাসার জন্য বিপুল সম্পদ ওয়াকফ করেন। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘সুলতান আন-নাসির (সালাহুদ্দিন) ক্ষমতালাভের পর সেখানে দরস-তাদরিস এবং ফকিহদের অবস্থানের ব্যবস্থা করেন। তিনি বিখ্যাত ফকিহ বাহাউদ্দিন দিমাশকির হাতে এর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করেন। তিনি যে মিম্বরে বসতেন, এর পেছনেই ছিল (তথাকথিত) হুসাইন (রা.)-এর সমাধি।’

সুলতান আল-মালিকুল কামিলের শাসনামলে মুইনুদ্দিন হাসান ইবনে শায়খুশ শুয়ুখ উজিরের দায়িত্ব লাভ করলে তিনি এই মাদরাসার জন্য ওয়াকফ জমা করেন। এর দ্বারা বিশাল শিক্ষাভবন এবং ফকিহদের জন্য (আবাসিক) উঁচু বাড়িগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল।

ফাতেমি যুগে বিস্তার ঘটা শিয়া মতবাদের ইতি টানা এবং সুন্নি মতাদর্শের বিস্তারের লক্ষ্যে সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একাধিক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই মাশহাদে হুসাইনিতে মাদরাসা নির্মাণের বিশেষ তাৎপর্য ছিল।

ফাজিলিয়া মাদরাসা

এ সময়ে নির্মিত অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল ফাজিলিয়া মাদরাসা। ৫৮০ হিজরিতে (১১৮৪ খ্রি.) কাজি আল-ফাজিল এই মাদরাসা নির্মাণ করেন এবং শাফেয়ি ও মালেকি মাজহাব পাঠদানের জন্য ওয়াকফ করেন। এই মাদরাসার জন্য অসংখ্য গ্রন্থও ওয়াকফ করা হয়েছিল। এর পরিমাণ প্রায় ১ লাখে পৌঁছে গিয়েছিল। পাশাপাশি এতিমদের শিক্ষার জন্যও জায়গা বরাদ্দ করা হয়েছিল। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘এই ফাজিলিয়া ছিল কায়রোর সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।’

কামিলিয়া মাদরাসা

আল-মালিকুল কামিল ইবনে আদিল হাদিস শাস্ত্রের প্রতি খুব আগ্রহী ছিলেন। কায়রোতে তিনিই কামিলিয়া মাদরাসা নামে সর্বপ্রথম হাদিসের জন্য বিশেষায়িত মাদরাসা নির্মাণ করেন। ৬২২ হিজরিতে (১২২৫ খ্রি.) এই মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথমে হাদিস শাস্ত্রে অভিজ্ঞ আলেমদের কাছে, পরে শাফেয়ি মাজহাবের ফকিহদের কাছে এর দায়িত্ব হস্তান্তর করা হয়। বিখ্যাত হাদিসবিশারদ হাফিজ ওমর ইবনে হাসান আন্দালুসিকে এই মাদরাসার পরিচালক নিযুক্ত করা হয়।

সমন্বয়ধর্মী মাদরাসা

বাগদাদের মুসতানসরিয়া মাদরাসার আদলে আস-সালেহ নাজমুদ্দিন আইয়ুব ইবনে কামিল ফাতেমিদের পূর্ব-প্রাসাদের কাছে ৬৩৯ হিজরিতে (১২৪১ খ্রি.) একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করেন। তিনি প্রতিষ্ঠানে সমন্বিতভাবে চার মাজহাবের পাঠদান করা হতো। ইমাম মাকরিজি বলেন, ‘তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি বৃহত্তর মিসরে স্থানে এক ছাদের নিচে চার মাজহাবের শিক্ষা চালু করেছিলেন।’

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা

আইয়ুবি শাসনামলে শিক্ষা ছিল সম্পূর্ণ অবৈতনিক এবং রাষ্ট্রীয় বা ওয়াকফ করা সম্পদ দ্বারা পরিচালিত। শিক্ষার্থীদের জন্য থাকা-খাওয়া এবং মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা ছিল। শ্রেষ্ঠ আলেম ও বিজ্ঞদের এসব মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতো। তাদের সামাজিক মর্যাদা ও বেতন ছিল অত্যন্ত সম্মানজনক। সালেহিয়া মাদরাসার অধ্যাপক নাজমুদ্দিন আল খুবুশানিকে মাসিক ভাতা হিসেবে ৪০ দিনার, মাদরাসার ওয়াকফ সম্পদ দেখাশোনার জন্য ১০ দিনার, প্রতিদিন ৬০ রিতিল রুটি এবং দুই মশক নীলনদের পানি বরাদ্দ ছিল। প্রতিটি বড় মাদরাসায় গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য সমৃদ্ধ লাইব্রেরি ছিল।

আইয়ুবি রাজবংশের নারীরাও শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সালাহুদ্দিনের বোন জুমুররুদ খাতুন এবং পরিবারের অন্য নারীরা দামেশকে বহু মাদরাসা ও খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

আইয়ুবি শাসকদের এই শিক্ষাবিপ্লবের ফলে আড়াই শতাব্দী পর মিসর আবার বাগদাদ ও কর্ডোভার মতো ইসলামি সভ্যতার প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

শিক্ষার বিস্তার ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সোনালি অধ্যায়

আইয়ুবি শাসকদের মাদরাসা নির্মাণের প্রচেষ্টা শুধু কায়রোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মিসরের অন্যান্য শহরেও তা বিস্তৃত হয়েছে। ফাইয়ুম শহরে দুটি মাদরাসা নির্মাণ করা হয়। ৫৭৭ হিজরিতে (১১৮১ খ্রি.) আলেকজান্দ্রিয়াতে সালাহুদ্দিন আইয়ুবি একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। ওয়াকফ সম্পদের মাধ্যমে এসব মাদরাসার শিক্ষকদের জীবিকার ব্যবস্থা হতো।

ইবনে জুবায়ের বলেন, ‘এ অঞ্চলের (আলেকজান্দ্রিয়া) গর্ব এবং এ অঞ্চলের সুলতানের কৃতিত্বের অনন্য নিদর্শন হচ্ছে, এখানকার মাদরাসাগুলো এবং শিক্ষার্থী ও ইবাদতগুজার ব্যক্তিদের জন্য নির্মিত সরাইখানা।’

তারা দূরদূরান্ত থেকে এখানে আসতেন। তাদের প্রত্যেকেই আশ্রয়ের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা ছিল। বিষয়ভিত্তির শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষকের উপস্থিতি ছিল। একজন কর্মকর্তা সবসময় তদারকি করতেন।

ইবনে জুবায়ের বলেছেন, ‘আলেকজান্দ্রিয়ায় অধিকাংশ মসজিদ ছিল যৌথ (অর্থাৎ, মসজিদ ও মাদরাসার সমন্বয়ে গঠিত)। তার প্রত্যেকটিতেই সুলতানের পক্ষ থেকে ইমাম নিয়োজিত ছিল। তাদের কারো মাসিক বেতন ছিল পাঁচ মিসরি দিনার, আবার কারো এর চেয়ে বেশি বা কম। এ ছিল সুলতানের অন্যতম মহৎ কর্ম।’

সুলতান সালাহুদ্দিন বাইতুল মাকদিসে শাফেয়ি মাজহাবের এবং দামেশকে মালেকি মাজহাবের অনুসারীদের জন্য মাদরাসা নির্মাণ করেছিলেন। তাকিউদ্দিন ওমর এডেসায় একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন। আল-আজিজ ওসমান ইবনে সালাহুদ্দিন দামেশকে ভাই আল-আফজালের মাধ্যমে আজিজিয়া মাদরাসা; মুয়াজ্জম ঈসা মুয়াজ্জামিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। একইভাবে সালাহুদ্দিনের ভাই সাইফুল ইসলাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ শহরেই আল আশরাফ মুসা ইবনে আদিল দারুল হাদিস আশরাফিয়া নির্মাণ করেন।

জামে বনু উমাইয়ার কাছে কাজি আল-ফাজিল দারুল হাদিস ফাজিলিয়া নির্মাণ করেন। সালাহুদ্দিনের বোন সিত্তুশ শাম দামেশকে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এমনিভাবে তার আরেক বোন রাবেয়া খাতুনও দামেশকে একটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

আলেপ্পো শহরও আইয়ুবিদের প্রচেষ্টায় অনেক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা হয়। আল-মালিকুজ জাহির হানাফি এবং শাফেয়িদের জন্য একটি যৌথ মাদরাসা নির্মাণ করেন। শুধু শাফেয়ি মাজহাবের জন্য ইবনু শাদ্দাদ সালেহিয়া নামে আরেকটি মাদরাসা নির্মাণ করেন।

এভাবে আইয়ুবি আমলে সাম্রাজ্যের নানা প্রান্তে অসংখ্য মাদরাসা নির্মিত হয়েছে। এমনকি ইজ্জুদ্দিন ইবনে শাদ্দাদ শুধু দামেশকেই চার মাজহাবের ৯২টি মাদরাসা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন।

মধ্যযুগ : বহুমুখী জ্ঞানচর্চার স্বর্ণসময়
১২৩৬ সালে নির্মিত আলেপ্পোর ফেরদৌস মাদরাসা

মহাকাশে ঝড় : ১০০ কোটি টনের প্লাজমা মেঘ by আশিকুর রহমান তালহা

মহাকাশের বিশালতার মধ্যে প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে নানা রকম বিস্ময়কর ঘটনা। সম্প্রতি বিজ্ঞানীদের নজরে এসেছে সূর্যের পৃষ্ঠ থেকে নির্গত এক বিশাল প্লাজমা মেঘ, যার ভর প্রায় ১০০ কোটি টন। খবরটি প্রকাশের পর অনেকের মনে উদ্বেগ দেখা দিলেও জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তবে সূর্যের এই ভিন্ন বিস্ময়কর রূপ দেখে রীতিমতো অবাক হয়েছে পুরো বিশ্ব। সূর্যের বুকে ঘটে যাওয়া এক শক্তিশালী বিস্ফোরণের কারণে প্রায় ১০০ কোটি (১ বিলিয়ন) টন ওজনের আয়নিত কণা বা চৌম্বকীয় প্লাজমার একটি বিশাল মেঘ ধেয়ে এসেছে পৃথিবীর দিকে। গত ৮ জুন এই মহাজাগতিক মেঘটি আঘাত হেনেছে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্রে। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১ হাজার ৪০০ কিলোমিটারেরও বেশি তীব্র গতিতে ছুটে আসা এই প্লাজমা মেঘকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘করোনাল মাস ইজেকশন’ (CME)। আমেরিকার স্পেস ওয়েদার প্রেডিকশন সেন্টারের (NOAA) বিজ্ঞানীরা এটিকে একটি শক্তিশালী ‘ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়’ (Geomagnetic Storm) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই আধুনিক যুগে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এর প্রভাব ঠিক কতটা, সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজব। প্লাজমা হলো পদার্থের চতুর্থ অবস্থা। এটি অত্যন্ত উত্তপ্ত ও আয়নিত গ্যাস, যা বিদ্যুৎ পরিবাহিত করতে সক্ষম। সূর্য থেকে নির্গত এই প্লাজমা মেঘ যখন পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে, তখন তা পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে ভূচৌম্বকীয় ঝড়ের সৃষ্টি করে।

প্রযুক্তিতে প্রভাব

সাধারণ মানুষের শরীরের ওপর সরাসরি কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না থাকলেও, বিজ্ঞানীদের তৈরি আধুনিক প্রযুক্তি-কাঠামোর ওপর এটি বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। যেমনÑ

স্যাটেলাইট ও জিপিএস বিপর্যয়

মহাকাশে থাকা কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটগুলো এই প্লাজমা মেঘের তীব্র চার্জযুক্ত কণার সরাসরি আক্রমণের শিকার হয়। এর ফলে সাময়িকভাবে জিপিএস (GPS) এবং নেভিগেশন সিস্টেমে ত্রুটি দেখা দিতে পারে, যা বিমান ও সমুদ্রগামী জাহাজের পথ চলায় বিঘ্ন ঘটায়।

ব্ল্যাকআউটের শঙ্কা

প্লাজমা মেঘের শক্তিশালী চৌম্বকীয় তরঙ্গ যখন পৃথিবীর মাটিতে আঘাত করে, তখন বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনে অতিরিক্ত বিদ্যুৎপ্রবাহ বা ‘জিওম্যাগনেটিক্যালি ইন্ডিউসড কারেন্ট’ তৈরি হয়। এর ফলে বড় বড় ট্রান্সফরমার বিকল হয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিপর্যয় ঘটতে পারে।

রেডিও ব্ল্যাকআউট

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের আয়নোস্ফিয়ার স্তরটি ওলটপালট হয়ে যাওয়ার কারণে উচ্চ-কম্পাঙ্কের (HF) রেডিও যোগাযোগ সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে।

মহাকাশচারীদের ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (ISS) থাকা মহাকাশচারীরা এ সময় তীব্র মহাজাগতিক বিকিরণ বা রেডিয়েশনের ঝুঁকিতে পড়েন। এই প্লাজমা মেঘ শুধু ক্ষতিই করে না, এর রয়েছে চোখ জুড়ানো কিছু বৈশিষ্ট্য ও সুবিধা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলোÑ

আকাশে আলোর নৃত্য

এই ঝড়ের সবচেয়ে সুন্দর উপহার হলো মেরুজ্যোতি বা অরোরা (Aurora)। সূর্যের চার্জিত কণাগুলো যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের গ্যাসের সঙ্গে ধাক্কা খায়, তখন মেরু অঞ্চলের আকাশে সবুজ, বেগুনি ও লাল আলোর এক অপূর্ব ক্যানভাস তৈরি হয়। এবার এই ঝড় এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, সাধারণত যেসব অঞ্চলে অরোরা দেখা যায় না (যেমন : হিমালয় অঞ্চল), সেখানেও আকাশের উত্তর দিগন্তে হালকা রঙিন আভা দেখা গেছে।

মহাকাশের আবর্জনা পরিষ্কার

এই ঝড়ের কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগ কিছুটা প্রসারিত হয়। এর ফলে নিম্ন কক্ষপথে জমে থাকা মানবসৃষ্ট বিভিন্ন পুরোনো স্যাটেলাইটের ধ্বংসাবশেষ বা ‘স্পেস জাঙ্ক’ বাতাসের ঘর্ষণে পুড়ে ছাই হয়ে নিচে নেমে আসে।

এ ধরনের ঘটনা বিজ্ঞানীদের মহাকাশের আবহাওয়া বুঝতে এবং ভবিষ্যতের আরো শক্তিশালী সৌরঝড় থেকে আমাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পাওয়ার গ্রিডকে সুরক্ষিত রাখার প্রযুক্তি উন্নত করতে সাহায্য করে। সূর্যের এই কোটি কোটি টনের মারাত্মক রেডিয়েশনকে পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র একটি অদৃশ্য জালের মতো আটকে দিয়ে আমাদের রক্ষা করছে। প্রযুক্তির সাময়িক কিছু ত্রুটি বাদ দিলে, প্রকৃতি যেমন ধ্বংসাত্মক হতে পারে, তেমনি অরোরার মতো অদ্ভুত সুন্দর কোনো সৃষ্টিও এ ঘটনায় পাওয়া যায়।

মহাকাশে ঝড় : ১০০ কোটি টনের প্লাজমা মেঘ

হরমুজ প্রণালি খোলা, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারসহ যা যা থাকছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিতে

যুদ্ধ বন্ধে একটি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। এই চুক্তিতে যে ১৪ বিষয় থাকছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। তবে বিষয়গুলো সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আজ সোমবার ভোররাতে দুই দেশের চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দেন। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা জানান।

এরপর ইরানের আধা সরকারি রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা মেহর নিউজ সমঝোতা স্মারকে থাকা ১৪টি বিষয় প্রকাশ করে। সেগুলো হলো:

# লেবাননসহ সব ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি।

# ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না বলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিশ্রুতি।

# ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার।

# ইরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী প্রত্যাহার।

# ইরানের ব্যবস্থাপনায় ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া।

# যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের পুনর্গঠন পরিকল্পনা দেবে, যাতে ব্যয় হবে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার।

# ইরানের তেল ও জ্বালানি পণ্যের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞার অবসান।

# পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে ইরানের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত।

# ওই অঞ্চলে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করা এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি যুক্তরাষ্ট্রের।

বার্তা সংস্থা মেহরের খবরে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় জব্দ করা ইরানের তহবিলের অর্ধেক না ছাড়া, ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত চূড়ান্ত সমঝোতার আলোচনা শুরু হবে না।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চূড়ান্ত যে চুক্তি হবে, সেটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবের মধ্য দিয়ে অনুমোদিত হবে।

হরমুজ দিয়ে তেল পরিবহন শুরু হবে

ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর কথা নিশ্চিত করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমি হরমুজ প্রণালিকে সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করার অনুমতি দিচ্ছি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর আরোপিত অবরোধও অবিলম্বে তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিচ্ছি।’

বিশ্বের জাহাজগুলোকে ইঞ্জিন চালু করার আহ্বান জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, তেল পরিবহন চলবে।

পরে আরেকটি পোস্টে ট্রাম্প বিষয়টি কিছুটা স্পষ্ট করেছেন। তিনি লিখেছেন, অন্যরা যেখানে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে তিনি সফল হয়েছেন।

‘এই মহান চুক্তি ওই পুরো অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে আসবে,’ ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন ট্রাম্প। তিনি লিখেছেন, ‘অনেক প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন এবং আমার আগে সবাই ব্যর্থ হয়েছেন। ওই অঞ্চলের নেতারা এই প্রথম একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি প্রকৃত শান্তি অর্জনে তাদের সহায়তা করতে পারেন।’

শুক্রবার চুক্তিতে সই হওয়া এবং হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণের পর এই প্রণালির উভয় পাশ দিয়ে ওই অঞ্চল ও পুরো বিশ্বের জন্য তেল পরিবহন স্বাভাবিক হবে বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প।

চুক্তিকে ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে দেখছেন ইসরায়েলি ডানপন্থীরা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তির ঘোষণা ইসরায়েল মোটেও সহজভাবে নেবে না। এরই মধ্যে ইসরায়েলি ডানপন্থী সংবাদমাধ্যমগুলোয় ট্রাম্পের কড়া সমালোচনা শুরু হয়েছে বলে আল–জাজিরার খবরে বলা হয়েছে।

এতে বলা হয়, এসব সংবাদমাধ্যম ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অনুগত হিসেবে পরিচিত। হঠাৎ মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমগুলোর এ অবস্থান বেশ অস্বাভাবিক একটি ঘটনা। অল্প কিছুদিন আগেও জনমত জরিপে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা বেশি দেখা গিয়েছিল।

এখন আসল ঘটনা হচ্ছে, ইরান ইস্যুতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আর আগের মতো একই জায়গায় নেই। ট্রাম্পের এ চুক্তির ঘোষণার ফলে ইসরায়েল এখন লেবাননে বোমাবর্ষণ বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। এমনকি ইসরায়েল লেবানন থেকে তাদের সেনা সরিয়ে নিতে পারে অথবা তাদের আগ্রাসন স্থগিত করতে পারে।

বিষয়টিই ইসরায়েলের কট্টরপন্থীদের ক্ষোভের মূল কারণ দাঁড়িয়েছে। তাঁরা একে ইসরায়েলের জন্য একটি রাজনৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন, এ চুক্তিকে তেহরানে বিজয় হিসেবে দেখা হবে। আর ইরানের সেই বিজয় আসলে ইসরায়েলের জন্য একটি ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবেই গণ্য হবে।

তেহরানের সড়কের পাশে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ও দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ম্যুরাল। ১৪ জুন ২০২৬, তেহরান
তেহরানের সড়কের পাশে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ও দেশটির প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ম্যুরাল। ১৪ জুন ২০২৬, তেহরান। ছবি: রয়টার্স

ইরান দলের সংবাদ সম্মেলনে ফুটবল নিয়ে প্রশ্নই হলো না

২০২৬ বিশ্বকাপে সম্ভবত সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সংবাদ সম্মেলন ছিল এটি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ, ভিসা পাওয়া নিয়ে জটিলতা, বেস ক্যাম্প সরিয়ে নেওয়াসহ বিভিন্ন কারণে ইরানের ফুটবল দল এবারের বিশ্বকাপের আলোচিত দলগুলোর একটি। নিউজিল্যান্ড ম্যাচ সামনে রেখে এক দিন আগে মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে পা রেখেছে ইরানের ফুটবল দল।

সেই দলের প্রথম সংবাদ সম্মেলনে রাজনীতির প্রসঙ্গ আসারই কথা। আর তা এতটাই বেশি যে ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি বলতে বাধ্য হয়েছেন—কেউ তো ফুটবল নিয়ে প্রশ্ন করলেন না!

ইরান বিশ্বকাপে তাদের প্রথম ম্যাচ খেলবে বাংলাদেশ সময় আগামীকাল সকালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। এই ম্যাচ নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা একের পর এক প্রশ্ন করেছেন দলটির বিশ্বকাপ প্রস্তুতি রাজনৈতিক প্রভাব ও তাতে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরকারের ভূমিকা নিয়ে।

সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই এ সব প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে ফুটবল খেলতে এসেছি। ইরানের ভেতরের এবং বাইরে থাকা সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করা আমাদের কাজ। আমরা রাজনীতির মানুষ নই।’

লস অ্যাঞ্জেলেসে ইরানের ম্যাচের ভেন্যু সোফি স্টেডিয়ামের বাইরে প্রবাসী ইরানিরা বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর বিরোধিতায় বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছেন খবর প্রকাশ হয়েছে। এ নিয়ে ইরানের কোচ বলেন, ‘ইরানি জাতি হিসেবে আমরা প্রতিটি ইরানিকে সম্মান করি।’

ট্রেনিং ক্যাম্প স্থানান্তরসহ প্রস্তুতির সময় দল যেসব প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন করার জন্য গালেনোই সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান। ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি কোচের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘আমরা এখানে ফুটবল খেলতে এসেছি, আর ফুটবল সব সময় সব পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে।’

ইরানের হয়ে ১০০টির বেশি ম্যাচ খেলা এবং বর্তমানে গ্রিক ক্লাব অলিম্পিয়াকোসে খেলা এই ফুটবলার আরও বলেন, ‘বহু বছর ধরে ইরান একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি, যারা একটি সভ্যতার অংশ। আমরা সেই ঐক্যটাই দেখাতে চাই। আমরা বিশ্বকাপে এসেছি বিশ্বের যেখানেই ইরানিরা থাকুক, তাদের মনে আনন্দ দিতে। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব মতামত থাকতে পারে এবং আমরা তাকে সম্মান করি। তবে আমরা এখানে ফুটবলার হিসেবে এসেছি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আমরা রাজনীতিতে জড়াতে চাই না।’

তারেমি সাংবাদিকদের খোঁচা মারেন সংবাদ সম্মেলনে একেবারে শেষদিকে। তিনি বলেন, ‘কেউই ফুটবল নিয়ে কোনো প্রশ্ন করলেন না। আমরা নিউজিল্যান্ডের মতো দারুণ একটি দলের বিপক্ষে খেলছি। আমি আশা করি এটি একটি ভালো ম্যাচ হবে। রাজনীতির খবরের জন্য আপনাদের অন্য শহরের রাজনৈতিক সংবাদ সম্মেলনে যাওয়া উচিত।’

সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই ও ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি
সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ আমির গালেনোই ও ফরোয়ার্ড মেহেদি তারেমি। এএফপি

কেনিয়ায় কারা এই ‘ম্যাডাম’, কীভাবে শিশুদের বিপদগামী করেন তাঁরা

আফ্রিকার দেশ কেনিয়ায় শিশুদের যৌনবৃত্তিতে জড়াচ্ছেন কিছু নারী। সেখানে এসব নারীকে ‘ম্যাডাম’ নামে ডাকা হয়ে থাকে। তাঁরা মাত্র ১৩ বছর বয়সী শিশুদের পর্যন্ত যৌনকর্মে জড়াতে বাধ্য করছেন। বিবিসি আফ্রিকা আই–এর এক অনুসন্ধানে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউতে দিনরাত ট্রাক ও লরি চলাচল করে। পণ্য ও মানুষ নিয়ে এসব যানবাহন দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, এমনকি উগান্ডা, রুয়ান্ডা, দক্ষিণ সুদান ও কঙ্গো গণপ্রজাতন্ত্রের মতো অন্য দেশ পর্যন্ত যায়।

শহরটির অবস্থান নাইরোবি থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার (৩১ মাইল) দূরে। এই গুরুত্বপূর্ণ শহরটি আগে থেকেই যৌন ব্যবসার জায়গা হিসেবে পরিচিত ছিল। কিন্তু এখন এটি শিশুদের যৌন নিপীড়নের জায়গাও হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরের শুরুতে বিবিসি আফ্রিকা আইয়ের দুজন নারী অনুসন্ধানী প্রতিবেদক যৌনকর্মী সেজে ওই শহরের যৌন ব্যবসা চক্রের ভেতরে ঢুকে পড়েন। ওই দুই অনুসন্ধানী সাংবাদিক এমন ভাব করছিলেন, যেন কীভাবে ‘ম্যাডাম’ হওয়া যায়, তা তাঁরা শিখতে চান।

ওই দুই সাংবাদিক গোপনে কিছু ভিডিও ধারণ করেছেন। ভিডিওতে অন্য দুজন নারীকে কথা বলতে শোনা যায়। তাঁরা বলছিলেন, এটা যে বেআইনি কাজ, তা তাঁরা জানেন। এরপর ওই দুই নারী বিবিসির সাংবাদিকদের সঙ্গে যৌন পেশায় জড়িত কয়েকজন অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের পরিচয় করিয়ে দেন।

বিবিসি ওই ভিডিও এবং তাদের পাওয়া সব তথ্য গত মার্চে কেনিয়ার পুলিশকে দেয়। বিবিসির ধারণা, এরপর ‘ম্যাডামরা’ তাঁদের জায়গা বদলে ফেলেছেন। পুলিশ বলেছে, যেসব নারী ও মেয়েদের ভিডিওতে দেখা গেছে, তাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

কেনিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা খুবই বিরল। মামলায় জিততে হলে পুলিশের ও সংশ্লিষ্ট শিশুর সাক্ষ্য দরকার হয়। কিন্তু বেশির ভাগ সময় শিশুরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে ভয় পায়।

বিবিসির রাতের আঁধারে গোপনে ধারণ করা ঝাপসা ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক নারী নিজেকে ‘নিয়ামবুরা’ নামে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি হেসে হেসে বলছেন, ‘তারা তো এখনো বাচ্চা। তাই একটু মিষ্টি দিলেই সহজে কাবু করে ফেলা যায়।’

নিয়ামবুরা নামের ওই নারী বলেন, ‘মাই মাহিউতে যৌনবৃত্তি যেন নগদ ফসলের মতো। ট্রাকচালকেরাই এর মূল চালিকাশক্তি। আমরা সেখান থেকেই মুনাফা করি। মাই মাহিউতে এটা এখন একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে।’

নিয়ামবুরা বলেন, তাঁর কাছে মাত্র ১৩ বছর বয়সী একটি মেয়ে আসে। সে ছয় মাস ধরে যৌন পেশায় কাজ করছে।

নিয়ামবুরা আরও বলেন, ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের নিয়ে কাজ করাটা খুব ঝুঁকিপূর্ণ। আপনি তাদের শহরে খোলাখুলি আনতে পারেন না। আমি শুধু গভীর রাতে, চুপিসারে তাদের বাইরে নিয়ে আসি।’

কেনিয়ার জাতীয় আইনে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের নিজেদের সম্মতিতে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। তবে অনেক পৌরসভায় স্থানীয় আইন অনুযায়ী এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মাই মাহিউ শহরটি নাকুরু কাউন্টির অন্তর্ভুক্ত। সেখানে এটা নিষিদ্ধ নয়।

তবে কেনিয়ার দণ্ডবিধি অনুযায়ী, যৌনবৃত্তি থেকে উপার্জিত অর্থ দিয়ে জীবন যাপন করাটা বেআইনি। হোক তিনি যৌনকর্মী নিজে বা কোনো দালাল। ১৮ বছরের কমবয়সী কোনো শিশুকে যৌন বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে বিক্রি বা পাচার করার অপরাধে ১০ বছর থেকে শুরু করে আমৃত্যু কারাদণ্ড হতে পারে।

আরেকটি সাক্ষাতে নিয়ামবুরা গোপনে অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে একটি বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে তিনজন কিশোরী একটি সোফায় বসে ছিল। আরেকজন বসে ছিল একটি কাঠের চেয়ারে। এরপর নিয়ামবুরা ঘর থেকে বের হয়ে যান। আর এতে অনুসন্ধানকারী একা একা মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান।

মেয়েরা জানায়, তাদের দিনে একাধিকবার যৌন নিপীড়নের শিকার হতে হয়।

একজন মেয়ে বলে,‘ অনেক সময় এক দিনেই অনেক লোকের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে হয়। খদ্দেররা এমন সব কাজ করতে বাধ্য করেন, যা কল্পনাও করা যায় না।’

কেনিয়ায় কতজন শিশুকে জোর করে যৌন ব্যবসায় যুক্ত করা হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো হালনাগাদ পরিসংখ্যান নেই। তবে ২০১২ সালে কেনিয়ার মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক প্রতিবেদন বলা হয়েছিল, প্রায় ৩০ হাজার শিশু তখন যৌনকাজে জড়িত ছিল।

কেনিয়ার তৎকালীন সরকার এবং বর্তমানে বিলুপ্ত বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ইরাডিকেট চাইল্ড প্রস্টিটিউশন ইন কেনিয়া’র দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি করা হয়েছিল।
২০২২ সালে গ্লোবাল ফান্ড টু অ্যান্ড মডার্ন স্লেভারি নামের এনজিও প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কিলিফি ও কোয়ালে কাউন্টিতে প্রায় ২ হাজার ৫০০ শিশুকে জোর করে যৌনকর্মে যুক্ত করা হয়েছে।

বিবিসির আরেক অনুসন্ধানী সাংবাদিক যৌনপল্লির অন্য এক নারীর সঙ্গে একাধিকবার সাক্ষাৎ করেন। ওই নারী নিজের নাম চেপ্টু বলে উল্লেখ করেন।

বিবিসির সাংবাদিককে চেপ্টু বলেন, তিনি কমবয়সী মেয়েদের বিক্রি করে জীবিকা উপার্জন করেন এবং আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারেন। বেআইনি হওয়ায় এ ধরনের ব্যবসা খুব গোপনে করতে হয়।

চেপ্টু আরও বলেন, ‘যদি কেউ ছোট মেয়ের চাহিদা জানান, আমি তাঁদের কাছে অর্থ চাই। আমাদের নিয়মিত কিছু খদ্দেরও আছেন, যাঁরা বারবার তাদের জন্য ফিরে আসেন।’

চেপ্টু গোপন অনুসন্ধানী সাংবাদিককে একটি ক্লাবে নিয়ে যান। সেখানে তাঁর অধীন কাজ করা চারজন মেয়ে ছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটটির বয়স ১৩ বছর। বাকিরা বলেছে, তাদের বয়স ১৫।

কমবয়সী মেয়েদের থেকে কত আয় হয়, সে বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলেন চেপ্টু। তিনি বলেন, মেয়েরা প্রতি ৩ হাজার কেনিয়ান শিলিং (প্রায় ২৩ ডলার বা ১৭ পাউন্ড) আয় করলে, তাতে তার নিজের ভাগের পরিমাণ হয় ২ হাজার ৫০০ শিলিং (প্রায় ১৯ ডলার বা ১৪ পাউন্ড)।

আরেক সাক্ষাতে মাই মাহিউ শহরের একটি বাড়িতে চেপ্টু অনুসন্ধানকারী সাংবাদিককে দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সঙ্গে একা রেখে চলে যান। ওই মেয়েদের একজন বলে, সে গড়ে প্রতিদিন পাঁচজন পুরুষের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক করতে বাধ্য হয়।

কেনিয়ার যৌনবৃত্তি এক জটিল ও অন্ধকার জগৎ। সেখানে প্রাপ্তবয়স্ক নারী-পুরুষ উভয়ই শিশুদের যৌনবৃত্তিতে নিয়ে আসার সঙ্গে জড়িত।

মাই মাহিউ শহরে ঠিক কতজন শিশুকে জোর করে এই কাজে ব্যবহার করা হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের এই ছোট্ট শহরে তাদের খুঁজে পাওয়া খুব সহজ।

‘বেবি গার্ল’ নামে পরিচিত এক সাবেক যৌনকর্মী এখন মাই মাহিউ শহরে যৌন নির্যাতন থেকে পালিয়ে আসা মেয়েদের আশ্রয় ও সহায়তা দেন। বর্তমানে ৬১ বছর বয়সী এ নারী ৪০ বছর যৌনকাজে জড়িত ছিলেন। তাঁর বয়স যখন ২০-এর কোটায়, তখন তিনি পারিবারিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে স্বামীর ঘর থেকে পালিয়ে এসে পথে বসেন। তাঁর সঙ্গে তিন সন্তান ছিল এবং তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পরে তিনি যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন।

বাড়ির সামনের অংশে একটি আলো ঝলমলে ঘরে কাঠের টেবিলে বসে এই নারী বিবিসির সাংবাদিককে চারজন তরুণীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এই চারজনকে শৈশবে মাই মাহিউ শহরের কিছু ‘ম্যাডাম’ জোর করে যৌনবৃত্তির পথে ঠেলে দিয়েছিলেন।

প্রত্যেক তরুণীই বলেছেন, হয় তাঁদের মা-বাবার বিচ্ছেদ হয়ে গিয়েছিল অথবা মা-বাবা বেঁচে ছিলেন না, নয়তো বাড়িতে তাঁদের নির্যাতনের শিকার হতে হতো। তাঁরা নিজেদের বাড়ি থেকে পালিয়ে নিরাপত্তা পাওয়ার আশায় মাই মাহিউতে এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে আবারও নিপীড়নের শিকার হন তাঁরা।

মিশেল নামের এক তরুণী বলেন, ১২ বছর বয়সে তিনি মা–বাবাকে এইচআইভির কারণে হারিয়েছিলেন। তারপর বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। রাস্তায় এক লোকের সঙ্গে দেখা হয়। ওই লোক তাঁকে থাকার জায়গা দেন। কিন্তু তাঁর ওপর যৌন নিপীড়ন শুরু করেন।

দুই বছর পর মাই মাহিউর এক ‘ম্যাডাম’ তাঁর কাছে এসে তাঁকে যৌনকর্মে যুক্ত হতে বাধ্য করেন।

লিলিয়ান নামের ১৯ বছর বয়সী আরেক তরুণী বলেন, ছোটবেলাতেই তিনি মা–বাবাকে হারিয়েছেন। তিনি তাঁর চাচার কাছে ছিলেন। ওই চাচা তাঁকে গোসলের সময় গোপনে ভিডিও করেন এবং সেই ভিডিও বন্ধুদের কাছে বিক্রি করেন। এভাবে পরে তিনি ধর্ষণের শিকার হন।

ঘটনার সময় লিলিয়ানের বয়স ১২ বছর ছিল। তিনি তখন পালিয়ে যান। এরপর আবার এক ট্রাকচালকের হাতে ধর্ষণের শিকার হন। ওই ট্রাকচালকই তাঁকে মাই মাহিউতে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে এক নারী তাঁকে সেখানে যৌনকর্মের সঙ্গে যুক্ত করেন।

এই তরুণীরা এখন ‘বেবি গার্ল’-এর আশ্রয়ে আছেন। তাঁদের দুজন এখন ফটোগ্রাফি স্টুডিওতে আর দুজন সৌন্দর্য চর্চাকেন্দ্রে কাজ করছেন।

তাঁরা সমাজে সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ‘বেবি গার্লকে’ সহযোগিতা করেন।

লিলিয়ান ফটোগ্রাফি শেখা এবং অতীতের নির্যাতনের ক্ষত থেকে সেরে ওঠার ওপর মনোনিবেশ করেছেন।

লিলিয়ান বলেন, ‘আমি আর ভয় পাই না। কারণ, “বেবি গার্ল” আমার পাশে আছেন। তিনি আমাদের অতীতকে ভুলে যেতে সাহায্য করছেন।’

কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউ যৌন ব্যবসার এলাকা হিসেবে পরিচিত
কেনিয়ার রিফট ভ্যালির ট্রানজিট শহর মাই মাহিউ যৌন ব্যবসার এলাকা হিসেবে পরিচিত। ছবি: বিবিসির এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে

গল্প- ফুলি

ফজলুর শুধু মনে আছে বাসটা চলছিল একটা বাঁশঝাড়ের গা ঘেঁষে, ঝিরঝির বৃষ্টির মধ্য দিয়ে। বাঁশঝাড়ে ভূত থাকে বলে দাদি ভয় দেখাতেন, ভয়টা সে পেতও, তবে সন্ধ্যার আঁধার নামলে। কিন্তু সেদিন বাসটা চলছিল ভরদুপুরে, তাছাড়া সে বসেছিল মার হাত ধরে। মা অনেক হাসতেন, তার হাসি ফজলুর সব ভয় দূর করে দিত। ভয় ছিল না বলে ফজলু বাঁশঝাড়ের দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। একসময় নিশ্চয় ঘুমিয়ে পড়েছিল, যেমন ঘুমিয়ে পড়েছিল বাসের ড্রাইভার, অথবা সেরকমই আমাদের ধারণা। একটা শব্দে তার ঘুমটা ভেঙেও গেল। শব্দটা ছিল তার ছয় বছরের জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার।

পাহাড় ভাঙার জন্য দাদি বজলুকে, অর্থাৎ  ফজলুর বাবাকে দোষ দিতেন। কেন সে ভরা বর্ষায় বন্ধুর বিয়ে খেতে ছেলে-বউসহ একটা ভাঙা বাসে চড়ে নিয়ামতপুর রওনা হবে? সেই বন্ধুকে দাদি কখনো চোখে দেখেননি, এমনি দূরে দূরে থাকত লোকটা। অনেকদিন ধরে সৌদিতেও ছিল লোকটা। দশদিনের ছুটিতে এসে কেন বজলুকেই ডাকতে হবে বিয়েতে যেতে?

দাদি বলেন, ফজলুর বাবা-মার লাশ লোকটাই অবশ্য বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল; ফজলুকেও – অথবা যেটুকু ফজলু তখনো জাগা ছিল। দাদির ধারণা, ফজলু যে কোনোদিন মানুষ হয়নি, সেটি ওই বর্ষাদিনে তার জীবনের ওপর একটা পাহাড় ভেঙে পড়ার জন্য।

তোরে আমি অনেক চেষ্টা করছি ফজলু, মানুষ করতে। পারলাম না, দাদি ফজলুকে বললেন। আমাদের হিসাবে হাজার তিনশোবারের  মতো।

ফজলু পুকুর থেকে বালতি ভরে পানি তুলে একটা কাটা ড্রামে রাখছে। ড্রামের পাশে দাদির প্রিয় গরুটা ঝিম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। তাকে গোসল দিতে হবে। গরুটা একটা গাভী, দাদি যার একটা নাম দিয়েছেন, ফুলি। তার কড়া বাদামি চামড়ায় সাদা কিছু দাগ, দেখলে মনে হয় কোনো বুনো ফুল। গাভীটা বিষণ্ণ, তার বাছুরটা মারা গেছে। ফজলু সকাল সকাল গাভীটার দুধ দুইয়েছে। সেই দুধ কিছু গরম করে সে খেয়েওছে। এখন তাকে গোসল দিলে তার বিষণ্ণতা কমবে। দাদি তাকে বলেছেন।

পাড়ার লোক ফজলুকে ভয় পায়। ছেলেটা একটা গুন্ডা, তার মধ্যে একটা বেপরোয়া ভাব, কাউকে সে পরোয়া করে না, এমন কথা প্রতিবেশী ইন্তাজ আলি সবাইকে বলেন, বিশেষ করে ফজলুদের বাড়ির তিনটি মরাগাছ তিনি লোক লাগিয়ে লাকড়ির জন্য কেটে নেওয়ার পর সে যেভাবে তার বাড়িতে গিয়ে তা-ব চালিয়েছিল, তারপর। পাড়ার লোক অবশ্য এখন খুশি, ফজলু নারায়ণগঞ্জ থাকে। মাঝেমধ্যে আসে, কিন্তু বাড়ি ছেড়ে খুব একটা বেরোয় না। আগে যখন গ্রামে ছিল, মানুষ তার সামনে পড়তে চাইত না। ফজলুর এক মামা, যিনি পুলিশে চাকরি করতেন, এবং চাকরি চলে গেলে বাড়িতেই থাকেন, তাকে গুন্ডা থেকে ‘মানুষ’ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এই মামাই তাদের দেখাশোনা করেছেন, তাদের বাড়িটা যে দখল হয়ে যায়নি, সেটিও তার জন্য। ফজলু সেজন্য মামার সামনে বেয়াদবি করে না; কিন্তু তার কোনো কথা শোনার দায় তার আছে, তা বিশ্বাস করে না।

একটা মানুষের সামনেই শুধু ফজলু কখনো মেজাজ দেখায় না এবং তিনি হচ্ছেন তার দাদি। তার জীবনের ওপর পাহাড় ধসে পড়ার পর তাকে টেনেটুনে তুলেছেন দাদি। তাকে আগলে রেখেছেন। তাকে সঙ্গ দিয়েছেন। সেবা দিয়েছেন। তার দিকে তাকিয়ে দাদি বললেন, বাপের মতো অত চওড়া-লম্বা হইতে গেলি কেনরে ফজলু? চওড়া লম্বা ছিল বইলা তো জানালায় আটকায়া গেল, বাইর হইতে পারল না।

গরুটার গা ডলতে ডলতে ফজলুর মন কিছুটা খারাপ হলো। বাছুরটা মুখে ফেনা তুলে আচমকা মরে গেল। ফজলু নারায়ণগঞ্জ ছিল। খবর পেয়ে বাড়ি আসতেই দাদি বললেন, ফুলির বাচ্চাটা মইরা গেছেরে ফজলু, এই দুঃখে ফুলিও যদি এখন যায়?

ফুলি কি বাসে করে বাচ্চাটাকে নিয়ে নিয়ামতপুর যাচ্ছিল?

তবে ফজলু জানে, কারো মারা যাওয়ার দুঃখে যদি কেউ মারা যেত, তবে সে-ই তো অনেক আগে যেত। অনেক বছর মার মুখটা তার যখন-তখন মনে ভেসে উঠত, তার হাসিটা কানে বাজত। তখন সে ঠিক থাকতে পারত না। চোখ বন্ধ করে ঝিম মেরে থাকত – ফুলি এখন যেমন থাকে, চোখে পানি নিয়ে – না হয় বাইরে গিয়ে পুকুরের কোনার বাঁশঝাড়টাতে একটার পর একটা রাগী ঢিল মারত।

একসময় ঝিম মারা থেকে বেরিয়ে সে রাগের ঝাপটায় পড়ল। রাগটা কার ওপর, সে জানে না। হয়তো বাঁশঝাড়গুলির ওপর, অথবা বাঁশঝাড়ে দিনের বেলা লুকিয়ে থাকা ভূতগুলির ওপর। একসময় তার বিশ্বাস হলো নিয়ামতপুর যাওয়ার পথের বাঁশঝাড়ের ভূতগুলিই তার ওপর ভেঙেপড়া পাহাড়টা কেটেছিল, এজন্য এক সন্ধ্যায় সে সাইকেল চালিয়ে ওই বাঁশঝাড়ে গিয়ে তা-ব করেছে। ঢিল ছুড়েছে। বাঁশ কেটেছে। কচি বাঁশে আগুন লাগানোর চেষ্টা করেছে। তাতে আগুন না জ্বললেও ধোঁয়া হয়েছে বেশ। রাতঘুমে থাকা পাখিগুলি জেগে উঠে হইচই করেছে।

ঘণ্টাদুয়েক বাঁশঝাড়ে তুফান তুলে সে ফিরেছে। সাইকেলটা বন্ধু মনুকে ফেরত দিয়ে বাড়িতে এসে দা-টা রান্নাঘরের দেয়ালে গুঁজে পুকুরে নেমে গোসল করেছে। গোসল করতে করতে তার চোখে ভেসেছে একটা ডোবা। ফজলুর ওপর নেমে আসা পাহাড়টা ওই ঝিরঝির বৃষ্টিদিনের বাসটাকে এক ধাক্কায় বাঁশঝাড়ের উল্টোদিকের ডোবায় ফেলে দিয়েছিল। গত তিন-চার বছরে তাকে কয়েকবার নিয়ামতপুর যেতে হয়েছে। তার বাবার বন্ধু তাকে টাকা-পয়সা দিয়েছেন, জামা-জুতা দিয়েছেন, একবার দাদির জন্য শাড়ি দিয়েছেন। ফজলু নিয়েছে, কিন্তু দাদি ছুঁয়েও দেখেননি সেই শাড়ি। সেটি গেছে রইসুন বুয়ার ভাগে। রইসুন বুয়া আরেক মানুষ, যিনি ফজলুর রাগটা তেমন দেখেননি। নিয়ামতপুরে যাওয়া-আসার পথে ফজলু শুধু বাঁশঝাড়ের দিকেই তাকিয়ে থেকেছে। কোনো ডোবার দিকে তার চোখ যায়নি।

ফুলির গা ডলতে ডলতে ফজলু খেয়াল করল, গাইটা চোখ বুজেছে, এবং চোখের কোনা বেয়ে পানি পড়ছে। ফজলু বুঝল, গাইটা এখন তার মতোই স্মৃতির ঝাপটা থেকে নিজেকে বাঁচাতে চোখ বোজার রাস্তা নিয়েছে।

গরুর কি কোনো স্মৃতি থাকে? থাকলে কি তার মতো টুকরো টুকরো, এলোমেলো?

দাদি বসে ডাঁটাশাক বাছছেন। ডাঁটাশাক ফজলুর প্রিয় খাবার। আর ট্যাংরা মাছ। রইসুন বুয়ার হাঁটতে কষ্ট হয়, তারপরও ট্যাংরা মাছ এনে দিয়ে গেছেন, সাত সকালে। দাদি জিজ্ঞেস করলেন, তুই যেহানে থাহিস, জায়গাটার নাম কী?

বন্দর। অনেকবার কইছি দাদি।

হ। তা বন্দরে কোনো সুন্দর মাইয়া নাই? চোহে পড়ে না? এই প্রশ্নটা দাদি তাকে গত কয়েকমাসে অন্তত ত্রিশবার জিজ্ঞেস করেছেন। ফজলু হাসল, বলল, চোহে পড়লে তোমারে জানাইমু, দাদি।

হ। এই গেরামের, আশপাশের কুনু গেরামের, কুনু মাইয়া তো তোরে বিয়া করব না।

বিষয়টা ফজলুর জন্য স্বস্তির। সে কথা বাড়ায় না।

পকেটে রাখা মোবাইল ফোন বাজে। ফজলু ধরে, এবং ফুলিকে চোখ বুজে স্মৃতির ঝাপটা সামলাতে দিয়ে একটু দূরে হেঁটে যায়। ফোন করেছে তার বন্দরের বন্ধু, নাম খাদেম। সে বলল, ওরে ফজলু, ভালো খবর। ম্যানেজ করা গেছে। অহন সব মোটামুটি কিলিয়ার। তুই আইতে পারিস।

ঠিকাসে, ফজলু বলল।

শুন, শুন, কথা আছে, খাদেম বলল, মনুরে ছুটাইবার রাস্তা পাওয়া গেছে। অবশ্য তাতে খরচ দেড় লাখ। বস আধা দিবেন, বাকিটা আমাগো ম্যানেজ করতে হইব। তোর ভাগে পড়ছে দশ। টেহাটা কাইল লাগব। একটা নম্বর এসেমেস কইরা দিতাছি। ওই নম্বরে বিকাশ কইরা দিস। দুইবারে করিস, সকালে একবার, বিকালে আরেকবার।

খাদেমরে, আমার টাকা নাই। একশ টাকাও নাই। দশ হাজার কইত্থে দেই? কাতর কণ্ঠে বলল ফজলু।

না দিলে বস রাগবো। বস রাগলে মনুও ফৌত। তুইও। তোরে কিলিয়ার করতে বসের কত লাগছে জানিস তো। আইচ্ছা রাখি।

খাদেম ফোন রেখে দিলে ফজলু চিন্তায় পড়ল। গ্রামে তার একটাই বন্ধু, মনু। ফজলুকে স্কুল থেকে বের করে দেওয়ার পর মনুই তাকে সঙ্গ দিয়েছে। সিনেমা দেখতে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেছে। মনু মাঝে মাঝে বাড়ি থেকে পালায়। তার মা আছে, আবার সৎমাও আছে। সৎমা এক খতরনাক মহিলা, তার বাবাকে পোষ মানিয়ে একটা ফাউল মানুষ করে ফেলেছে। মনু এসব কথা যখন ফজলুকে বলেছে, তার গলায় অবশ্য রাগ ছিল না। কারণ তার মা আছেন। কিন্তু রাগের বদলা মনুর গলায় একটা দুঃখ বেজেছে। এখন সেটা নেই। দুই বছর ধরে বন্দরে থাকতে থাকতে, ফজলুর সঙ্গে মেসের একটা ঘর ভাগ করতে করতে, তার মনে রাগ এসেছে। একদিন বাড়ি এসে সৎমাকে বলেছে, আমার মারে আর একটা খারাপ কথা কইলে আফনারে আর আফনার পোলাডারে আমি ডোবায় ফালাইয়া চুবাইমু। চুবাইয়া চুবাইয়া দম আটকাইয়া মারমু, বুঝলেন?

ফাউল মানুষ বাবা ঘরের দাওয়ায় বসে মনুর রাগী গলা শুনেছেন। এই রাগ তিনি কোনোদিন দেখেননি। একে তাৎক্ষণিক সামাল দেওয়াটাও তার জ্ঞানের ভেতর নেই। তিনি চুপ করে থাকলেন।

মনু তার মাকে একটা মোবাইল ফোন দিয়েছিল। সে মাকে বলল, একদিনও যদি তোমারে একটা বদ কথা কয়, আমারে জানাইও মা। চললাম।

সেই থেকে মনুর মা স্বস্তিতে আছেন। ফাউল মানুষটাও মাঝেমধ্যে তার বিছানায় আসেন; কিন্তু মা স্বস্তিতে গেলেও মনুর রাগটা থাকল। এটি সে ফজলু থেকে সারা জীবনের মতো কর্জ নিয়েছে।

বন্দরের তারা মিয়ার ক্যাডার বাহিনীতে মনুই প্রথম নাম লিখিয়েছে, নারায়ণগঞ্জে সিনেমা দেখতে এসে খাদেমের সঙ্গে তার পরিচয়ের সুবাদে। তারা মিয়ার ক্যাডার হলেও তাদের বস আরেকজন, যিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জে এবং বন্দরে আসেন মাঝে মধ্যে, শীতলক্ষ্যা পাড়ি দিয়ে। তার স্পিডবোট আছে। গাড়িও আছে। তাকে কেউ ডাকে ডন সাহেব, কেউ জিয়া সাহেব। তারা মিয়া তাকে সমীহ করেন। লোকটার নিশ্চয় অনেক টাকা, কারণ মনুদের চার-পাঁচজনকে তিনি ভালোই পয়সা দেন। তারা মিয়া লোকটা কিপ্টা। হাড্ডি কিপ্টা, কিন্তু বস হাতখোলা হওয়ায় তারা মিয়াকে মনুরা ছেড়ে যায়নি। বসের কেন তারা মিয়াকে দরকার, যেখানে তাকে পুলিশও দেখলে সালাম দেয়, হেসে হেসে কথা বলে, থানায় ডেকে চা খাওয়ায়, এ-প্রশ্নটি মনু একদিন করেছে খাদেমকে। উত্তরে খাদেম বলেছে, বড় দালানের খুঁটি লাগে না মনু? বন্দুক সগিরের পিস্তল লাগে না?

ফজলু জানে, বসের সাম্রাজ্য শীতলক্ষ্যা পার হয়ে নারায়ণগঞ্জকে পেছনে ফেলে ঢাকা পর্যন্ত ছড়ানো। তবে বন্দর তার কাছে পয়া। এখানে অনেক জমি এখন তার দখলে, যার বেশিরভাগ তারা মিয়ার ক্যাডারেরা ব্যবস্থা করে দিয়েছে। বসের সঙ্গে তারা মিয়ার পার্থক্যটা ফজলু বুঝেছে এভাবে : বসের যেখানে বন্দরে একটা গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি আছে, তারা মিয়ার আছে কিনা ঝুট ব্যবসা, যে-কাজে তার নির্ভরতা আবার ক্যাডারদের ওপর। খাদেম বলে, এখন অবশ্য তারা মিয়ার ইয়াবা ব্যবসা ঝুট ব্যবসা থেকেও বেশি পয়মন্ত।

বস এবং তারা মিয়া সম্বন্ধে মনুর উৎসাহটা বেশি। ফজলুর আবার কোনো মানুষকে নিয়ে উৎসাহটা কম। কারো সম্পর্কে কথা উঠলে সে শোনে, মনে মনে নোট করে নেয়, ব্যস। তাছাড়া, এখন ভাবাভাবির সময়টা কম। কারণ একটু সমস্যা যাচ্ছে তারা মিয়ার ক্যাডারদের। থানার ওসি পাল্টালে কিছুদিন তাদের দৌড়ের ওপর থাকতে হয়। এই তিনমাস যেমন। থানায় নতুন ওসি এসেছেন, একদিন বস থানায় গিয়ে ওসির সাক্ষাৎ না পেয়ে তারা মিয়ার গদিতে বসে গজর গজর করেছেন। তারা মিয়ার সিমেন্ট ব্যবসা, খুবই নিরীহ ধরনের, তাও একদিন ওসি এসে দেখে গেছেন। তাকে বলেছেন সাবধান হয়ে যেতে। তিনি তারা মিয়াকে চোখে চোখে রাখবেন। যেদিন একটা পা বিপথে ফেলবেন তারা মিয়া, তাকে আইনের দড়ি দিয়ে বাঁধবেন।

তারা মিয়া বিগলিত হেসেছেন। এই হাসিটা অভিনয়ের, কিন্তু অভিনয়টা এমনই নিপুণ, ওসিও বুঝলেন না। তিনি কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন। ওসি চলে গেলে তারা মিয়া যা বললেন তা ওসির কানে গেলে কী হতো কে জানে। তিনি চোখ সরু করে বললেন, আমার পথ তো একটাই ওসি সাহেব। দেখি এই পথ আপনি কতদিন আগলে রাখতে পারেন।

ঝুট ব্যবসায় মারামারি, এমনকি খুনাখুনিও হয়। কিন্তু তারা মিয়া এই ব্যবসা করেন শান্তিতে। কারণ তার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। নতুন ওসি আসার পর প্রতিদ্বন্দ্বী এলো, একদিন মারধরও হলো। তাতে মাথা ফেটে একজন হাসপাতালে গেল, পেটে গুলি লেগে আরেকজন গেল ঢাকা মেডিক্যালে। গুলিটা খাদেমের পিস্তলের। পিস্তলটা তাকে ভাড়ায় দিয়েছে বন্দুক সগির, যাকে প্রটেকশন দেন বন্দরের এক সরকারি দলের নেতা।

পুলিশ এসে হানা দিলো। খাদেম পালাল। মনু ধরা পড়ল। ফজলুকে নারায়ণগঞ্জ একটা কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা মিয়া, সে বেঁচে গেল। বন্দর না ফিরে সে সোজা বাড়ি গেল।

খাদেম তাকে ফোনে জানাল, বাড়িতেই যেন থাকে, আর অকারণে বাইরে না যায়। ওসির প্রমোশন হয়েছে, বন্দর ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে পারেন। গেলে একটা কিছু হবে, না হলে রূপগঞ্জ না হয় আড়াইহাজারে বস তাদের একটা ব্যবস্থা করে দেবেন।

বছরখানেক আগে একটা জমি দখল করতে গিয়েছিল তারা মিয়ার ক্যাডারদল। তাদের সঙ্গে ছিল বন্দুক সগির। লোকটা ছোটখাটো, কিন্তু বিরাট তার তেজ। জমিটা ছিল সোনার, এর জন্য বস অনেকদিন চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু এরকম জমি সহজে দখলে আসে না। দখলের ব্যবস্থাটা সেজন্য বস পাকাপোক্ত করে রেখেছিলেন, শুধু একটা ফাঁক থেকে গিয়েছিল। আরেকটা পার্টি নেমেছিল মাঠে, যাদের হাতটা ছিল অনেক লম্বা। পুলিশ শুধু না, প্রশাসনেও সেই হাত পৌঁছেছিল।

জমিতে পৌঁছানোর আগেই খাদেম ব্যাপারটা টের পেয়েছিল। সে বন্দুক সগিরকে বলেছিল, ভাইজান, আইজকা থাক। আইজ প্যাঁচটা বড়।

সগির শোনেনি।

পুলিশ সগিরকে ধরেছিল, ফজলুকেও। আরো দু-একজনকে। খাদেম পালানোতে ওস্তাদ। সে পালিয়েছিল। বসকে বেশ ঝামেলা পোহাতে হয়েছিল সবাইকে ছাড়িয়ে নিতে। জীবনে প্রথম জেলের ভাত খেয়েছে ফজলু। দাদি অবশ্য কিছুই টের পাননি। প্রতিদিন দাদিকে ফোন করে সে। সূর্য ওঠা-ডোবার মতোই নিয়মে। জেলে বসেও প্রতিদিন তার কথা হয়েছে দাদির সঙ্গে। ব্যবস্থাটা তারা মিয়া করে দিয়েছেন।

তারপরও অন্তত আধামণ চালের জেলের ভাত তাকে খেতে হয়েছে।

অবাক কা-, ফজলু বেরিয়ে দেখল, জমিটাতে বিরাট সাইনবোর্ড, যাতে বড় করে কোম্পানির নাম লেখা। কোম্পানির নাম ডন ভ্যালি। খাদেম বলে, এটা রিয়াল ইস্টেট।

হেলাফেলা, মোড়ামুড়ি বস পছন্দ করেন না, ফজলু জানে। জেল থেকে মনু তাকে ফোনে বলেছে, জেলে এবার বিপদ। গেল বছর কিছু লোককে মেরে তক্তা করেছিল তারা মিয়ার ক্যাডাররা। তাদের দুজন এখন একই জেলে। তারা মনুকে বলেছে বাড়িতে মিলাদ পড়াতে। তার জান এবার শেষ।

যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বের হতে হবে, মনু বলেছে, যা পারো তোমরা করো।

আর আজ সকালে খাদেমের ফোন। এখন সে কী করে? হাতে আছে একটা দিন। সে কি পিয়ারু মামার কাছে যাবে? পিয়ারু-পুলিশ মামার কাছে? নাকি বাবার বন্ধুর বাড়ি যাবে নিয়ামতপুর? দাদির হাতে টাকা নেই। তাকে যত টাকা সে দিয়েছে, তার কিছু তিনি খরচ করেছেন, বাকিটা জমিয়েছেন। কিন্তু কোথায় রেখেছেন, ফজলু জানে না। তারপরও দাদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ফজলু শ-পাঁচেক টাকা চাইলে নিশ্চয় দাদি দিতেন, কিন্তু একসঙ্গে দশ হাজার সে কী করে চায়।

দুপুরে তার জন্য দাদি ভাত বেড়ে দিলে সে অবশ্য কথাটা তুলেছে। জরুরি দরকার, সে দাদিকে বলেছে।

টাকা দিলে তুই কই যেন কুনখানে থাহিস সেইখানে চইলা যাবি?

হ। ফজলু আসেত্ম করে বলেছে।

দাদিকে দেখলে মনে হতে পারে ভুলাভালা মানুষ, কেউ ঠকালেও বোঝেন না, লোকের চালাকি ধরতে পারেন না; কিন্তু আমরা জানি দাদি সহজ মানুষ নন। তিনি বোঝেন। ফজলু কোনো কারণে একটা বিপদে আছে, তিনি সেটা টের পেয়েছেন। দাদির মন। মাস দুই নাতিটা আছে তার সঙ্গে, তার মনটা ভরে আছে। টাকা দিলে সে চলে যাবে। তিনি উদাসীনভাবে বললেন, হাতে টাকা নাইরে ফজলু। যা ছিল আছিয়ারে কিছু দিছি। কিছু জমা আছে সুফিয়া বইনের কাছে।

আছিয়া ফজলুর চাচাত বোন। পিয়ারু চাচার বড়ভাই আজমত মুন্সির মাদ্রাসা পাশ মেয়ে। বিধবা। জীবনটা কাটে কষ্টে। ফজলু তাকে দেখেছে কদাচিৎ।

দাদির ওপর ফজলুর কখনো রাগ হয় না, আজো হলো না, তবে তার রাগ গিয়ে পড়ল আছিয়ার ওপর। আছিয়া বুবুকে দাদি বলেছিলেন তার কাছে চলে আসতে। দুই ছেলেমেয়েসুদ্ধ। কিন্তু আছিয়া পড়ে থাকল শ্বশুরবাড়ি, আধাপেটা খেয়ে, শ্বশুর-শাশুড়ির অত্যাচার সয়ে। ফজলুর ইচ্ছা হয় একদিন বুবুর শ্বশুরবাড়ি গিয়ে ওই দুই বুড়া-বুড়িকে সাইজ করে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।

দাদি বললেন, ফুলিটা গোসল কইরা আরাম পাইল ফজলু। কিন্তু তারপর ঘাস-বিচালি কিছুই খায় নাই। উপোস করতেছে। ফুলিটার বুকে দুধ, ছাওয়ালটা নাই। সকালে দুধ দুইলে ওর পরানটা কান্দে। শূন্য হয়। ফুলি বাঁচবে না।

খাওয়া শেষ করে উঠানে নামল ফজলু। বদনার পানি ঢেলে হাত ধুলো। ফুলিকে চোখে পড়ল। সজনেগাছের নিচে বসে আছে ঝিম মেরে। স্মৃতির ঝাপটা কি একটা গাইকেও এমন উদাসী করে দেয় যে কিছু খেতে তার ইচ্ছা হয় না?

ফজলু যেমন মিষ্টি খায় না। খেতে না পেরে মরে গেলেও, এবং আধাসের ম-া অথবা রসগোল্লা পৃথিবীর শেষ খাদ্য হলেও, না, সেদিন থেকে, যেদিন তাকে দাদি বলেছিলেন, তোর মা মিষ্টির পোকা ছিলরে ফজলু, মিষ্টি পাইলে আর কিছু না খাইলেও তার চলত।

ফুলির বোজা চোখের দিকে তাকাতে তাকাতে একটা চিন্তা তার মাথায় এলো। মনে মনে একটা হিসাব করল। দাদি ঘণ্টাখানেকের জন্য ঘুমাতে যাবেন, তিনটার দিকে। তার আগেই তার চিন্তাটা পাকা করতে হবে। আজ হাটবার। প্রতি মাসের শেষ মঙ্গলবার হাটটা খুব জমে। আজ শেষ মঙ্গলবার।

-----দুই-----

হাটের যেখানটায় গরুর বেচাকেনা হয়, সেখান পর্যন্ত ফুলিকে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে একবারও কোনো সমস্যা হলো না ফজলুর। দাদি ঘুমিয়ে গেলে ফুলিকে যখন সে জাগিয়ে তুলল, এবং ফুলি উঠে দাঁড়াল, সে যেন বুঝল তাকে নিয়ে ফজলুর কোনো মতলব আছে। ফজলু ভেবে দেখেছে, না খেয়ে ফুলি যখন মরেই যাবে, তাকে হাটে নিয়ে বিক্রি করে দিলেই তো হলো। এমনিতে ফুলি তরতাজা, একটা তিন-সাড়ে তিন বছরের গাই যেমন হয়। গরুর দাম এখন ভালো, কম করে হলেও পঞ্চাশ-ষাট হাজার তো পাওয়া যাবেই। দশ হাজার বিকাশ করে বাকিটা রেখে দিলেই হবে। ফুলিকে দাদি ভুলে গেলে তার হাতে টাকাটা একসময় সে তুলে দেবে।

ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর খদ্দের পাওয়া গেল। খদ্দের ইমামগঞ্জের। ফজলু স্বস্তি পেল। সে তাকে চেনে না, ফজলুও তাকে চেনে না। খাদেমের দেওয়া নম্বরে সে আজ পাঁচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেবে। বাকিটা কাল সকালে। তারপর সে বাসে উঠবে বন্দরের পথে।

যতক্ষণ ফুলিকে ধরে ফজলু দাঁড়িয়ে ছিল, ফুলি ঝিম মেরেই ছিল। কিন্তু খদ্দেরের হাতে তাকে তুলে দিলে ফুলির মধ্যে একটা চাঞ্চল্য দেখা দিলো। সে বুঝতে পারছিল না, তার চেনা পৃথিবীর বাইরের একজন মানুষ কেন তাকে ধরেছে। ফজলুই বা কেন এটি করতে দিচ্ছে। খদ্দেরটা একটা দড়ি লাগিয়েছে ফুলির গলায়, এবং দড়িটা যেন তাকে বাস্তবে জাগিয়ে দিলো। একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি মেলল সে ফজলুর দিকে। তারপর তার চাঞ্চল্য চলে গেল। একটা অবসাদ যেন নামল তার শরীরে। চোখ দুটি বন্ধ করে দিলো। ফজলু কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল। কেন জানি তার ধারণা হলো ফুলির সঙ্গে তার আর চোখাচোখি হবে না। হলোও না। ফজলু দাঁড়িয়ে থাকলেও খদ্দেরের তাড়া ছিল, সে চলে গেল।

ফুলি চোখ খুলল না। অথবা খুলল এমন চিকন করে, মাটির দিকে, যেন ফজলুর ছায়াটাও তার চোখে না লাগে।

বাড়ি ফিরে ফজলু দেখল, দাদি দাওয়ায় বসে আছেন। তার প্রিয় বেতের মোড়ায়। তার সামনে যেতে যেতে সে তার বিলাপ শুনল।

বিলাপের সুরে দাদি বললেন, তুই কই ছিলিরে ফজলু? আমার ফুলিটা চইলা গেছে।

চইলা গেছে? কোথায়? অবাক হওয়ার ভান করল ফজলু।

জানি না। দাদি বললেন, তারপর চোখ বুজলেন।

ফজলুর কেন জানি খুব রাগ হলো। না দাদির ওপর না, নিজের ওপরও না। কিসের ওপর তাও সে জানে না। কিন্তু তার রাগ হলো, সবাই কেন তাকে দেখে চোখ বুজবে? দাদি কি সব বুঝেছেন? তিনি কি জানেন ফুলি যায়নি, তাকে ফজলুই নিয়ে গেছে?

অবাক, সে কোথায় ছিল এতক্ষণ, একবারও দাদি জিজ্ঞেস করলেন না। তাকে শুধু বললেন, ফুলিটা চইলা গেল। তুইও কি যাবি?

এ-কথা কেন জিজ্ঞেস করলেন তার ভুলাভালা দাদি?

আমি একটু খুইজ্জ্যা দেহি, দাদি? সে বলল।

দাদি বন্ধ চোখেই একটুখানি হাসলেন। বললেন, ফুলি চইলা গেছে। এখন তুইও চইলা যাবি। তয় যা।

-----তিন-----

সকালে ঘুম থেকে উঠে সে বলল, যদি না যাই দাদি, ক্যামনে কী হইব? খামু কী?

খাওনের অভাব হইবে নারে ফজলু, দাদি বললেন। তোর তাগড়া শরীর। বাপদাদার ভিটা আছে। একটুখানি জমি আছে, একটা পুকুর আছে।

ফুলি যেখানে বসে বসে ঝিমাচ্ছিল গতকাল, দাদি ঠিক ওই জায়গায় বসেছেন মোড়া পেতে।

তৈরি হয়ে তার রংওঠা ব্যাগটা কাঁধে ফেলে দাদির সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি বললেন, কেউ যাইতে চাইলে তারে আটকানো যায় নারে ফজলু। তোর বাপেরে পারি নাই। তোরেও পারমু না। যা।

ফজলু হাঁটা দিলো।

কিছুদূর গিয়ে সে তার কাঁধ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রাখল। তারপর একটা গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকল। এবার রাগটা তার নিজের ওপর।

কপাল দিয়ে রক্ত বেরুলো। রক্ত মিশল চোখের পানির সঙ্গে।

-----চার-----

বন্দরে মেসঘরে পৌঁছল সে বেলা বারোটায়। বেশ ক্ষুধা লেগেছে, কিন্তু ফুলির মতো সে একটা সিদ্ধান্ত নিল, আজ কিছুই খাবে না।

খাদেম তাকে জিজ্ঞেস করল, কপাল ফাটল ক্যামনে?

ফজলু উত্তর দিলো না। খাদেমও দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করল না। জিজ্ঞেস করে নষ্ট করার মতো সময় তার নেই। গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজে বেরুতে হবে আজ রাতে। বস পইপই করে বলে দিয়েছেন, কাজটা ঠিকঠাক করতে হবে।

কী কাজ?

পরে বলব। এখন খা। খাইয়া ঘুমা। তিনটায় উঠিস। তিনটায় মিটিং, খাদেম বলল, তারপর চলে গেল।

ফজলু খেলও না, ঘুমালও না। শুধু বিছানায় চুপচাপ শুয়ে থাকল।

তিনটায় মনু এলো। জেলে থেকে সে শুকিয়ে গেছে। রংটাও কালো হয়ে গেছে। মনুর পেছন পেছন উত্তম এলো – উত্তম বসের খাস মানুষ। ওর সঙ্গে পিস্তল থাকে। ফজলু বুঝল আজকের কাজটা সহজ নয়। উত্তম যেখানে যায়, খবর তৈরি করে দিয়ে আসে।

থানার ওসি চলে গেছেন। এখনো নতুন ওসি আসেন নাই। বস এই সময়টা বেছে নিয়েছেন তার কাজের জন্য। খাদেম জানালো বসের সোনার মতো দামি জমিটা সাত কোটি টাকায় রফা করেছিলেন এক পেপার মিলের সঙ্গে। কিন্তু সেটা কাল হঠাৎ দখলে নিয়েছে গোদনাইলের হাজি এহসান। লোকটা ঘাঘু। বন্দুক সগিরকে সে কৌশলে নারায়ণগঞ্জ নিয়ে সেখানে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। এখন উত্তম ভরসা।

উত্তমের কথা শুনে মনে হলো, লাশ পড়বে। মনু শিউরে উঠল। ফজলু অবশ্য উত্তমের কথা শুনেছে আবার শোনেওনি। তার মন পড়ে আছে দাদি আর ফুলির বোজা চোখে। সে ঠিক জেনেছে, দাদি সব বুঝেছেন। সব বুঝে দাদি রেগে বাড়ি মাথায় তুললে সে খুশি হতো, তাকে চেলা কাঠ দিয়ে পেটালে সে আরাম পেত, তিনি দাওয়ায় গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদলে তার স্বস্তি হতো। কিন্তু দাদি এসব কিছু না করে শুধু চোখ বুজেছেন।

কেন?

সন্ধ্যার মধ্যেই খবর এলো, সর্বনাশ! ওসি ফিরেছেন, কিন্তু ঠিক কী কারণে খাদেম বলতে পারল না। মধু নামের উত্তমের এক সঙ্গী বলল, ওসি কঠিন মানুষ, একটা মেরামতি চালাচ্ছিলেন বন্দরে, সেইটা শেষ করতে ফিরে এসেছেন। এক সপ্তা থাকবেন।

উত্তমের, খাদেমের ফোন বাজতেই থাকল। একজন কেউ জানালো বন্দুক সগিরকে নিয়ে পুলিশ বন্দরে এসেছে, আরেকজন বলল, ডন সাহেব নারায়ণগঞ্জ ফিরে গেছেন। খাদেম নিজেই একটা নাম্বারে ফোন করে শুনল, বসের এক ইস্পিশাল ক্যাডারকে পিটিয়ে হাড়গোড় ভেঙে হাসপাতালে পাঠিয়েছে এহসানের লোকজন। লোকটা বাঁচে কিনা সন্দেহ।

এহসানের লোকজনকে নিয়ে অবশ্য ভয় নেই তারা মিয়ার ক্যাডারদের। ঢাকা থেকে কঠিন কিছু লোক তিনি আনিয়েছেন, তারাই তাদের সামাল দেবে। তাদের ভয়টা ওসিকে নিয়ে। এ লোক তার মেরামতির কাজে কাউকে তোয়াক্কা করে না।

তারা মিয়া কাঁপা কাঁপা গলায় ফোন করলেন খাদেমকে, বললেন কিছু একটা করতে। পুলিশ তার গদি ঘিরে রেখেছে।

খাদেম বেরিয়ে গেল। মধুও গেল। উত্তমও একসময় উঠল। যাওয়ার আগে সে ফজলুকে বলল নিতাইবাবুর আড়তের পেছনের খালটা পার হয়ে ইনাম মার্কেটের গেটে কিসলুর চায়ের দোকানে চলে যেতে। সে মনুকে সঙ্গে নিয়ে যাবে।

ফোনটা খোলা রাখিস, সে বলল।

কিন্তু বাড়ির সামনের গলিটার মোড়েও হয়তো উত্তম পৌঁছাতে পারল না, পুলিশের বাঁশি বাজা শুরু হলো। একই সঙ্গে দ্রুতপায়ে দৌড়াদৌড়ি। দরজা খুলে ফজলু দেখল, গলিটায় সাত-আট পুলিশ। দুই পুলিশ তাদের মেসবাড়ির দিকেই আসছে। তাদের হাতে বন্দুক উঁচু করে ধরা। গলিতে আলো নেই, কিন্তু একটা ফাজিল চাঁদ উঠে আলোর অভাবটা অনেকটা ঘুচিয়ে দিয়েছে। ফজলু দাঁড়িয়ে পড়ল। তার ভেতর থেকে একটা তাড়া আসছে, পালা, পালা, ডাইনে দৌড়  দে। না-হয় ঘরে ঢুইকা পিছনে যা, পিছনের পাঁচিল বাইয়া পালা। কিন্তু তার পা গলির ইট আর খোয়ায় আটকে গেছে। পা নড়ে না। সে দেখল দুই পুলিশ দৌড়ে আসছে বন্দুক তাক করে। পুলিশ নিশ্চয় জানে তারা মিয়ার ক্যাডাররা কোথায় থাকে। ওসি তো জানতেন। এই দেড়তলা আধাপাকা দালানে, চার কামরার মেসবাড়িতে।

চাঁদের আলোটা স্থির, দুধ-ঘোলা সাদা। গলির রাস্তার দুই দিকে দুটা নিমগাছ, কে কবে লাগিয়েছিল কে জানে, কিন্তু কেউ কাটে না, গাছ দুটা নাকি গলিটার হাওয়া পরিষ্কার করে। নিমগাছের পাতায় চাঁদের আলো তিরতির করে। উলটো দিকের গাছটার নিচে দু-একটি ভাঙা চেয়ার, তক্তা, কেরোসিন কাঠের বাক্স। মোক্তার অ্যান্ড সন্সের পরিত্যক্ত তৈজসপত্র। দোকানটা মেরামত হয়েছে কদিন আগে, আবর্জনাগুলি সরানো হয়নি। সেই আবর্জনার ওপার থেকে হঠাৎ একটা ছায়া রাস্তাটা পার হয়ে তার সামনে এসে দাঁড়ালো। একটা গরু। কড়া বাদামি পিঠ আর গা, চাঁদের আলোয় কিছুটা অস্পষ্ট, কিন্তু সেই অস্পষ্টতার মধ্যেও সাদা সাদা কিছু অবিন্যস্ত টুকরো আভা জেগেছে, যা দেখলে হঠাৎ বুনোফুল বলে মনে হতে পারে।

ফুলি! ফজলু নিজেকেই বলল। ফুলি এখানে কী করে এলো? এও কি সম্ভব? নাকি চাঁদের আলো তার চোখে বিভ্রম ছড়িয়েছে?

সে চাঁদটার দিকে তাকাল। চাঁদের ওপর কিছু সাদা মেঘ হালকা চাদর বিছিয়েছিল। সেই চাদর এখন সরে গেছে। চাঁদটা তাজা। যেমন তাজা গরুটাও। গরুটার দিকে চোখ নামাতে হলো ফজলুর। এটি এখন মাথাটা শক্ত করে সামনে মেলে বেশ তেজে এগিয়ে যাচ্ছে দুই পুলিশের দিকে, যেন তার মাথাটা ঢাল, অথবা একটা কামানের নল।

পুলিশ দুজন ভড়কে গেল। তারা গরুটার দিকে তাকাল। তারা বুঝতে চেষ্টা করল, কেন তাদের দিকেই এটি ধেয়ে আসছে। তারা বন্দুক চালাতে পারত, বন্দুক তো তাক করাই ছিল। কিন্তু তারা গ্রামের ছেলে, একটা গাভীকে বন্দুকের গুলিতে মারার কথা ভাবতে পারে না। তারা বরং গাভীটা থেকে দূরে সরে যেতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিন্তু গাভীটা তেজি, তার চোখে পানি নেই, তার শরীরেও অবসাদ নেই। সে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়াল। গলিতে কয়েকজন পথচারী ছিল, মোক্তার অ্যান্ড সন্সের কর্মচারী ছিল। তারা অবাক হয়ে দেখল, গাভীটা এক পুলিশের সামনে গিয়ে মাথা তুলে তার বন্দুকে একটা হালকা টোকা দিলো। তারপর জিভ বের করে বন্দুক ধরা হাতটা চাটতে লাগল।

মোক্তার অ্যান্ড সন্সের এক কর্মচারী শব্দ করে হাসল। বলল, পুলিশভাই, গরুটা আপনারে পছন্দ করেছে।

পুলিশটার জন্য বিব্রতকর অবস্থা। অন্য পুলিশটাও এই অবাক দৃশ্যে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের চোখ এখন গাভীটার দিকে। সেটি এখন স্থির দাঁড়িয়ে লেজ নাড়ছে। অন্য পুলিশটার দিকে তাকিয়ে যেন জানতে চাইছে, তোমার হাতটাতে একটু আদর করে দিলে রাগ করবে?

চাঁদের আলোয় দুই পুলিশ, একটি গাভী, কিছু মানুষ যেন একটা শান্ত ছবির ফ্রেমে বন্দি হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্তের জন্য। তারপর চাঁদের সামনে ক্ষক্ষরের দেয়াল তুলে দিতে একটা মেঘ এগিয়ে এলো। হেলতে দুলতে।

এই দৃশ্য দেখার জন্য ফজলু অবশ্য আর দাঁড়িয়ে ছিল না। গাইটা তেজি ভাব নিতেই তার পায়ে চাঞ্চল্য এসেছে, সে ঘরে ঢুকে দুপুরে কাঁধে ঝুলিয়ে আনা ব্যাগটা তুলে নিয়েছে, যার ভেতরের একটা পকেটে এখনো কাল হাটে পাওয়া বাকি টাকাগুলি আছে। তারপর পেছনের পাঁচিল টপকে হাওয়া হয়ে গেছে।

বন্দর পার হতে হতে সে চাঁদটার দিকে আবার তাকিয়েছে। চাঁদটা ক্ষক্ষরের পাঁচিলের পেছনে বন্দি। আলোটা অস্পষ্ট। আকাশ জুড়ে সাদা মেঘের হুটোপুটি।

-----পাঁচ----

বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভোর হয়ে গেল ফজলুর। সে জানে দাদি ততক্ষণে উঠে যাবেন, নামাজ পড়বেন, কিছুক্ষণ উঠানে হাঁটবেন। হয়তো নিচুস্বরে বিলাপ করবেন – তার ছেলে আর ছেলের বউয়ের জন্য, হয়তো ফুলি এবং ফজলুর জন্য। অথবা চুপ করে মোড়াটাতে বসে থাকবেন।

গত সন্ধ্যার ঘটনা ফজলুকে বিমূঢ় করে রেখেছে। যে-গাইটা তাকে বাঁচিয়ে দিলো দুই পুলিশের হাত থেকে, সে কোত্থেকে এলো। সে কি ফুলি? যদি ফুলি হয়, দুনিয়ায় এর থেকে অসম্ভব কথা আর কে  কবে শুনেছে?

মেসবাড়ি থেকে পালিয়ে সে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করেছে, খবর নিয়েছে। তার মোবাইলে ফোন করেছে মনু, বলেছে খাদেম মারা পড়েছে, বস আটক হয়েছে। মনু বলেছে, তুই পালা। বন্দরে আর জীবনে না। মনু যাবে চাঁদপুর। তার এক মামার ইলিশের আড়ত আছে সেখানে।

বাড়ির কাছাকাছি এসে ফজলুর ইচ্ছা হয়েছে, একটা গাছে তার মাথাটা ঠুকবে। কিসের জন্য, সে বলতে পারবে না। ঠুকতে ইচ্ছা হয়েছে, কিন্তু ঠুকল না, কারণ কপালে রক্ত জমলে দাদি দেখলে ভয় পাবেন। এমনিতেই গতকালের রক্তের দাগটা কপালে আছে।

দাদি রক্ত ভয় পান। বাবা-মার লাশ যখন বাড়িতে আসে, তার পুলিশ মামা তাকে বলেছেন, তাদের গায়ে রক্ত ছিল। রক্ত দেখে দাদি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

বাড়িতে ঢুকতেই দাদিকে দেখা গেল। তিনি বেতের মোড়া পেতে বসে আছেন ফুলি যেখানে ঝিম মেরে থাকত সেখানে। ফজলুর বুকটা একটা মোচড় দিলো। হালকা পায়ে সে এগোল। কিন্তু সামনে তাকাতেই তার চোখটা কপালে উঠল। ফুলি! নাকি অন্য কোনো গাই? একটু এগিয়ে সে দেখল গাইয়ের চামড়াটা কড়া বাদামি, ভোরের হালকা আলোতেও যা বোঝা যাচ্ছে। এবং এখানে-সেখানে সাদা দাগ। যেন বুনোফুল। গাইটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনে একটা টুকরিতে ঘাস, বিচালি। কিন্তু সে খাচ্ছে না, শুধু তার চোয়াল নড়ছে।

ফজলুর পায়ের শব্দে দাদি তাকালেন। গত সন্ধ্যার চাঁদটার মতো একটা আলোময় হাসি দিয়ে বললেন, ফজলু, তুই আইলি? দ্যাখ। আমার ফুলিও ফিরা আইছে। যা, এখন পুকুরে গিয়া একটা ডুব দিয়া আয়। তোর পেটে ক্ষুধা, ফুলিটার মতো। তুই কাইল থাইক্ক্যা কিছু খাস নাই। তুই খাইলে ফুলিও খাইব।

পাঁচ দ্বীপরাষ্ট্রে বাড়ি কিনলেই পাবেন পাসপোর্ট, দেড় শতাধিক দেশে ভিসামুক্ত প্রবেশ সুবিধা

পূর্ব ক্যারিবীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশ এখন শুধু মনোমুগ্ধকর সৈকত আর নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দিয়ে সেসব দেশে বাড়ি বা সম্পদ কেনার জন্য ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে না; বরং ওই সব দেশে বাড়ি কিনলে বা বিনিয়োগ করলেই আপনি পেয়ে যাবেন পাসপোর্টও।

ওই অঞ্চলের পাঁচ দেশ অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডা, ডোমিনিকা, গ্রেনাডা, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস ও সেন্ট লুসিয়া এমন প্রস্তাব দিয়েছে। এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট (সিবিআই)।

সিবিআইয়ের অধীন কমপক্ষে দুই লাখ মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করে একটি বাড়ি কিনলেই আপনি পেয়ে যাবেন এ পাসপোর্ট। এতে ইউরোপের শেনজেন অঞ্চল, যুক্তরাজ্যসহ ১৫০টির বেশি দেশে পাবেন ভিসামুক্ত প্রবেশের সুবিধা।

ধনীদের জন্য এসব দ্বীপরাষ্ট্রগুলোতে রয়েছে করছাড়–সংক্রান্ত আরও বেশ কিছু সুযোগ-সুবিধা, যেমন মূলধনি মুনাফা পাওয়া এবং উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সম্পদের ওপর থেকে কর অব্যাহতি। কয়েকটি ক্ষেত্রে আয়করেও রয়েছে ছাড়। এ পাঁচ দেশেই সিবিআই প্রকল্পের বিনিয়োগকারীরা দেশগুলোর নাগরিকত্ব পাবেন।

প্রকল্পে দারুণ সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন অ্যান্টিগুয়ার লাক্সারি লোকেশনসের মালিক নাদিয়া ডাইসন। তিনি বলেন, ‘অ্যান্টিগুয়ায় সম্পত্তি বিক্রেতারা চাহিদা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ মুহূর্তে ক্রেতাদের প্রায় ৭০ শতাংশই নাগরিকত্ব চাইছেন। আর তাঁদের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা।’

প্রকল্পে সাড়া পাওয়ার কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে নাদিয়া আরও বলেন, ‘(যুক্তরাষ্ট্রের) অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি যে একটি বড় কারণ, তা স্পষ্ট। গত বছর এ সময়ে শুধু ভালো আবহাওয়া ও অবকাশ কাটানোর সুবিধা বিবেচনায় বাড়ি কিনতে চাওয়া কিছু ক্রেতা ছিলেন। সঙ্গে অল্প কয়েকজন ছিলেন সিবিআই প্রকল্পের ক্রেতা। এখন সবাই বলছে, ‘‘আমি নাগরিকত্বসহ একটি বাড়ি চাই।’’ আমরা আগে কখনো এত বাড়ি বিক্রি করিনি।’

অ্যান্টিগুয়া এ কর্মসূচিতে বসবাস করার বিষয়ে কোনো শর্ত রাখেনি। তা সত্ত্বেও কয়েকজন ক্রেতা সারা বছর সেখানে থেকে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে জানান নাদিয়া। তিনি বলেন, কয়েকজন ক্রেতা ইতিমধ্যে সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছেন।

গত এক বছরে ক্যারিবীয় অঞ্চলে সিবিআই কর্মসূচির আবেদনকারীদের সবচেয়ে বড় অংশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এমনটাই জানিয়েছে বিনিয়োগভিত্তিক অভিবাসনসংক্রান্ত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স। ইউক্রেন, তুরস্ক, নাইজেরিয়া ও চীনের নাগরিকেরাও উল্লেখযোগ্য হারে এ প্রকল্পে আবেদন করছেন বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক এই প্রতিষ্ঠান।

প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছে, ২০২৪ সালের চতুর্থ প্রান্তিক থেকে ক্যারিবীয় অঞ্চলের সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট কর্মসূচিতে মোট আবেদনপত্রের সংখ্যা ১২ শতাংশ বেড়েছে।

হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের পরামর্শক ডমিনিক ভোলেক বলেন, বন্দুক সহিংসতা থেকে শুরু করে ইহুদিবিদ্বেষ—সবকিছুই মার্কিনদের চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

ভোলেক আরও বলেন, (সিবিআই গ্রহণকারীদের) প্রায় ১০ থাকে ১৫ শতাংশ স্থানান্তরিত হন। অধিকাংশের কাছে এটি তাঁদের উদ্বেগ থেকে বাঁচার একটি বিমার মতো। দ্বিতীয় নাগরিকত্ব থাকা মানে একটা ভালো বিকল্প হাতে থাকা…।

ক্যারিবীয় পাসপোর্টের মাধ্যমে সহজ ভ্রমণের সুবিধাও ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করছে বলে মনে করেন ভোলেক। তিনি বলেন, অনেক মার্কিন ক্রেতা রাজনৈতিকভাবে অধিকতর নিরপেক্ষ পাসপোর্টে ভ্রমণ করতে বেশি পছন্দ করেন।

কোভিড মহামারির আগপর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্সের তালিকাতে ছিল না বলে জানান ভোলেক। সে সময়ে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে অবাধে ভ্রমণে অভ্যস্ত ধনীদের জন্য চলাচলে ওই বিধিনিষেধ ছিল এক ‘বড় ধাক্কা’। আর এটাই প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রে সিবিআই কর্মসূচিতে আগ্রহ বাড়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ২০২০ ও ২০২৪ সালের মার্কিন নির্বাচনের পর সেই আগ্রহ আবারও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।

ভোলেক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে দুই বছর আগেও তাঁদের কোনো কার্যালয় ছিল না। অথচ গত দুই বছরে দেশটির বড় বড় শহরে তাঁরা আটটি কার্যালয় খুলেছেন। কয়েক মাসের মধ্যে আরও দুই থেকে তিনটি কার্যালয় চালু হতে যাচ্ছে।

কানাডার হ্যালিফ্যাক্সের রবার্ট টেইলর অ্যান্টিগুয়ায় একটি সম্পত্তি কিনেছেন। অবসর কাটাতে এ বছরের শেষ দিকে তিনি সেখানে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

গত বছরের গ্রীষ্মে আবাসনে ন্যূনতম বিনিয়োগের শর্ত তিন লাখ ডলার করার ঠিক আগে দিয়ে টেইলর এ খাতে দুই লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। নাগরিকত্ব পাওয়া গেলে আরও বেশকিছু সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টেইলর বলেন, নাগরিক হলে অবস্থান করার সময়সীমার বিধি এড়িয়ে যাওয়া যায়। এর ওপর ব্যবসায়িক সুযোগগুলো কাজে লাগানোর স্বাধীনতাও থাকে। তিনি বলেন, ‘আমি অ্যান্টিগুয়া বেছে নিয়েছি, কারণ, এখানে চমৎকার জলরাশি আছে, মানুষ খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ এবং আমার বাকি জীবন কাটানোর জন্য এখানকার আবহাওয়া দারুণ উপযোগী।’

তবে এসব কর্মসূচি একেবারে বিতর্কহীন নয়। ২০১২ সালে তৎকালীন অ্যান্টিগুয়া সরকার দেশের অর্থনীতি সচল রাখার উপায় হিসেবে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে পাসপোর্ট বিক্রির ধারণা উত্থাপন করলে কেউ কেউ এর নৈতিকতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।

সিবিআই কর্মসূচি নেই, ক্যারিবীয় অঞ্চলের এমন কয়েকটি দেশের নেতারাও এর সমালোচনা করেছেন। তাঁদের একজন সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডাইনসের প্রধানমন্ত্রী রালফ গনসালভেস। তিনি বলেন, ‘নাগরিকত্ব বিক্রির পণ্য হওয়া উচিত নয়।’

এ নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, অপরাধীরা এসব শিথিল শর্তের সুযোগ নিতে পারেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ক্যারিবীয় অঞ্চলের যেসব দেশ সিবিআই কর্মসূচি চালু করেছে, তাদের জন্য ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার প্রত্যাহারের হুমকি দিয়েছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র এসব কর্মসূচি কর ফাঁকি ও আর্থিক অপরাধের জন্য ব্যবহার হতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

ইউরোপীয় কমিশনের একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, তাঁরা ক্যারিবীয় অঞ্চলের ওই পাঁচ দেশের সিবিআই কর্মসূচি ‘পর্যবেক্ষণ’ করছেন এবং ২০২২ সাল থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মুখপাত্র আরও বলেন, এ মূল্যায়নের মাধ্যমে এটা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে, ওই কর্মসূচির অধীন নাগরিকত্ব দেওয়ার বিনিময়ে যেন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ভিসামুক্ত প্রবেশাধিকার ব্যবস্থার অপব্যবহার না হয়। সেই সঙ্গে এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে কি না, তা-ও যাচাই করে দেখা হচ্ছে।

এ নিয়ে ডোমিনিকার প্রধানমন্ত্রী রুজভেল্ট স্কেরিট তাঁর দেশের সিটিজেনশিপ বাই ইনভেস্টমেন্ট কর্মসূচিকে ‘নির্ভরযোগ্য ও স্বচ্ছ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এর গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ কঠোর পরিশ্রম করেছে।

সেন্ট লুসিয়ায় প্রধানমন্ত্রী ফিলিপ জে পিয়েরে বলেন, তাঁদের দ্বীপপুঞ্জের এ কর্মসূচি যেন কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডের সহায়ক না হয়, তা নিশ্চিত করতে তাঁরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা মানদণ্ড মেনে চলেন।

অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার প্রধানমন্ত্রী গ্যাস্টন ব্রাউন বলেন, গত এক দশকে এ কর্মসূচি থেকে অর্জিত অর্থ তাঁর দেশকে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে এনেছে।

সম্পত্তি কেনা ছাড়াও বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্যারিবীয় দেশগুলোতে নাগরিকত্ব পাওয়ার অন্যান্য সাধারণ উপায়ের মধ্যে রয়েছে জাতীয় উন্নয়ন তহবিল বা অনুরূপ কোনো খাতে এককালীন অর্থ প্রদান।

ডোমিনিকায় একজন একক আবেদনকারীর জন্য এ অর্থের পরিমাণ শুরু হয় দুই লাখ ডলার থেকে। আর ডোমিনিকা ও সেন্ট কিটসে মূল আবেদনকারী এবং তাঁর সঙ্গে সর্বোচ্চ তিনজন নির্ভরশীল সদস্যের জন্য এটি বেড়ে দাঁড়ায় ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত।

অন্যদিকে, অ্যান্টিগুয়ায় বিনিয়োগকারীরা চাইলে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ লাখ ৬০ হাজার ডলার অনুদান দেওয়ার বিকল্প সুযোগও পান।

আন্তর্জাতিক চাপে ওই দ্বীপপুঞ্জগুলো নজরদারি শক্ত করার জন্য নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে মান নির্ধারণ, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মনীতি মেনে চলা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠন।

বর্তমানে পাসপোর্ট বিক্রি দ্বীপপুঞ্জগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখে।

সেন্ট কিটসের সাংবাদিক আন্দ্রে হুই বলেন, তাঁর দেশের সিবিআই কর্মসূচি ব্যাপক জনসমর্থিত। লোকজন অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব বোঝেন এবং তাঁরা সরকার যে কাজগুলো এ অর্থ দিয়ে সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন, তা কৃতজ্ঞচিত্তে গ্রহণ করেছেন।

অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার একটি সৈকত
অ্যান্টিগুয়া অ্যান্ড বারবুডার একটি সৈকত। ফাইল ছবি: এএফপি