Showing posts with label WikiLaw. Show all posts
Showing posts with label WikiLaw. Show all posts

Wednesday, November 25, 2015

মিথ্যার কাছে সত্য পরাজিত হচ্ছে? by তৈমূর আলম খন্দকার

বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে যখন বেশি বেশি প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে এবং যে সময়ে দেশে-বিদেশে মাননীয় প্রধান বিচারপতি বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করে বক্তব্যের পর বক্তব্য রাখছেন, এমনই সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ শিক্ষক অধ্যাপক এ কে এম ফজলুল হক ছেলে দীপনের লাশ কাঁধে নিয়েই বলেছেন, ‘আমি পুত্রহত্যার বিচার চাই না ...’। তার এ বক্তব্য কি সমগ্র জাতির বক্তব্য না দেশের বিচারব্যবস্থার ওপর একটি অনাস্থার বহিঃপ্রকাশ?
দীপনের বাবা তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো সান্ত্বনা তো পানইনি, বরং সরকারি মুখপাত্র তাকে নিয়ে উপহাস করেছেন, যা একজন মার্জিত মানুষ করতে পারেন না। ক্ষমতায় থাকলে মানুষ ধরাকে সরাজ্ঞান করে। ক্ষমতার কালো চশমা তাদের আড়াল করার পূর্বেই জনগণ থেকে নিজেরাই আড়াল হয়ে যান বলে জনতার বুকের আর্তনাদ বোঝা তো দূরের কথা বরং টিপ্পনী ও নোংরা উপহাস করতেও দ্বিধা বোধ করেন না। ক্ষমতাসীনদের এ উপহাস কি জাতির প্রাপ্য ছিল?
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি বলেছে, ‘বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে সরকার বিরোধী দলের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছে।’ সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি খোন্দকার মাহবুব হোসেন স্পষ্টই যে কথা বলেছেন- এ কথার প্রতিবাদ বা বিরূপ মন্তব্য সুশীল বা সরকার পক্ষের আইনজীবীদের পক্ষ থেকে তো আসেইনি; এমনকি প্রধান বিচারপতির দফতর থেকেও কোনো মন্তব্য করা হয়নি। ঠিক এমনই সময়ে ‘দেখেশুনে অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে জামিন দেয়ার জন্য’ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বগুড়ার জনসভায় আহ্বান জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এ আহ্বান কি আদেশ না নির্দেশ না হুমকি, তা মূল্যায়িত হওয়ার আগে এ কথাটি উঠে আসে যে- রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু হয়রানির উদ্দেশ্যে একের পর এক মিথ্যা মোকদ্দমায় না জড়ানোর জন্য তিনি (প্রধানমন্ত্রী) যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিতেন, তবে প্রধানমন্ত্রী বিচারক বা বিচারপতিদের প্রতি কী বার্তা দিতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট হতো। প্রধানমন্ত্রীর একতরফা (জামিনের প্রশ্নে) বক্তব্যে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কতটুকু রক্ষা পেয়েছে, তা অবশ্যই প্রধান বিচারপতি বিবেচনায় নিয়ে তার পরবর্তী বক্তব্য পেশ করবেন, যা শোনার অপেক্ষায় (রাজনৈতিক কারণে) দুর্দশাগ্রস্ত জনগণ।
বিচার বিভাগ বা এর নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা খুবই দুরূহ ব্যাপার। তবুও বলতে হয়, কারণ দেশে এখন গণতন্ত্র নেই। ফলে গণমানুষের শেষ আশ্রয় হিসেবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা সমুন্নত রাখতে না পারলে আমও গেল, ছালাও গেল। অর্থাৎ বাকস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমাবেশ করার স্বাধীনতার প্রশ্নে মহান স্বাধীনতার আগেও যা ছিল বর্তমানেও তা-ই আছে; বরং প্রতিহিংসার পরিমাণটা একটু বেশি।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, সুপ্রিম কোর্ট বার সভাপতি যে বক্তব্য দিয়েছেন, এর সত্যতা ও বাস্তবতা (মাননীয় প্রধান বিচারপতি) তার বিভাগের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতার বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে পারছেন নাকি আরো জোরগলায় ব্যর্থতাকে ঢাকা দেয়ার একটি প্রয়াস খুঁজবেন?
আন্দোলনের সময় বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যার দায় (দেশনেত্রেী) খালেদা জিয়া এড়িয়ে যেতে পারেন নাÑ এমন মন্তব্য প্রধান বিচারপতি প্রকাশ্যেই করেছেন, যার অনুরূপ বক্তব্য আগেই মাহবুবউল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া প্রমুখ সরকারদলীয় এমপি-মন্ত্রী ও নেতারা দিয়েছেন। আন্দোলনের জন্য বাস পুড়িয়ে মানুষ হত্যা একটি জঘন্যতম অপরাধ বলে আমি মনে করি। বিএনপি সরকার আমলে ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত শুধু বিআরটিসির ৫৩টি বাসে অগ্নি সংযোগ করা হয়েছে। এর দায়দায়িত্ব প্রধান বিচারপতি মহোদয় কার ওপরে বর্তাবেন? প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করাসহ মিথ্যা মামলায় জড়ানোর জন্য সরকারি লোকেরা বাস পুড়িয়েছে, এমন সংবাদও সংবাদপত্রে ও টিভিতে দেখা গেছে। একজন পুলিশ অফিসারের ভয়েস রেফারেন্স দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বাস পোড়ানো সরকারি দলের কারসাজি বলে দায়িত্ব নিয়েই মন্তব্য করেছেন। সোয়েম্যুটো রুল দিয়ে বিষয়টি কি দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট করা যায় না?
ন্যায়বিচার ও আইন যদি সাংঘর্ষিক হয়, তবে বিচারপতি মহোদয় বিবেচনা ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনটার অগ্রাধিকার দেবেন? যে আইন শুধু শাসকদলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখার জন্য প্রণীত হয়, সে আইনের রক্ষাকবচ হিসেবে বিচার বিভাগ ব্যবহৃত হতে পারে না। স্মরণ রাখতে হবে যে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা কার হাতে? অবশ্যই তা পার্লামেন্টের হাতে। পার্লামেন্ট কার নিয়ন্ত্রণে? অবশ্যই তা ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণে? ক্ষমতাসীনেরা কার নিয়ন্ত্রণে? অবশ্যই তা প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে। ফলে প্রধানমন্ত্রী ও তার বহরকে হেফাজত ও ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যেই প্রণীত হচ্ছে বিরোধী দলকে দমন-নিপীড়ন করার আইন।
বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী বলেছিলেন যে, আমাদের দেশের আইন জনপ্রতিনিধিগণ নয় বরং কেরানীগণ প্রণয়ন করেন; এমপিরা শুধু হাততালি দিয়ে তা পাস করে দেন। বিচারপতি চৌধুরীর বক্তব্যের প্রতিবাদে তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী পরে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম বিচারপতি চৌধুরীর বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে অভিযোগ আনার হুমকি দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে কেন মন্ত্রী চুপসে গেলেন, তা বোঝা না গেলেও থলের বিড়াল প্রকাশ হওয়ার আশঙ্কায় তাকে চুপ করানো হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।
যে আইন জনগণের অধিকার রক্ষার পরিবর্তে শুধু ক্ষমতাসীনদের রক্ষার জন্য প্রণীত হয়, ন্যায়বিচারের স্বার্থে সে আইন গ্রহণযোগ্য নয়। সে আইনের হেফাজত করার জন্য যদি বিচারপতিদের বাধ্য করা হয়; তবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা স্বাভাবিকভাবে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য এবং বর্তমানে তাই হচ্ছে। বিচার বিভাগকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিরোধী দলকে নিপীড়ন-নির্যাতনে সরকারের বিরুদ্ধে খোন্দকার মাহবুব হোসেন যে অভিযোগ এনেছেন, সময় একদিন আসবে যে দিন তাদেরকেও বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, যারা ব্যবহৃত হয়েছেন এবং হচ্ছেন।
প্রশ্ন আসে- গণতন্ত্র রক্ষায় বিচার বিভাগ কতটুকু সোচ্চার। প্রধান বিচারপতিকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, এ নজির বাংলাদেশেই আছে। সামরিক জান্তাদের প্রধান বিচারপতিই শপথবাক্য পাঠ করিয়ে বঙ্গভবনে বসিয়েছেন। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। ১৯৭১ সালের ৯ মার্চ বিচারপতি বি এ সিদ্দিকী জেনারেল টিক্কা খানকে শপথবাক্য পাঠ না করানোর জন্যই কিন্তু হানাদার পাকিস্তান সরকার নড়েচড়ে বসেছিল এবং স্বাধীনতা আন্দোলন ত্বরান্বিত হয়, যা থেকে জন্ম লাভ করে লাল-সবুজ পতাকা।
বিচারপতি এনায়েতুর রহিম তার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘বিচার অন্ধ হতে পারে, তবে বিচারপতি কিন্তু অন্ধ নন’; জাতি সেটাই চায়। সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরবিরোধী হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়; বিচারপতি কিন্তু নিরপেক্ষ দৃষ্টি নিয়েই গণতন্ত্রকে রক্ষার স্বার্থে বিরোধী দলের ওপর অযাচিত নির্যাতনের প্রশ্নে আইনের দোহাই দিয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন না। তাই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার বিচার বিভাগের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট বারের যে অভিযোগ, তা খণ্ডানোর ও জবাবদিহিতার দায়িত্বও বিচার বিভাগের অবশ্যই রয়েছে। কারণ তারাও জনগণের অর্থে লালিত-পালিত।
ছেলেহত্যার বিচার চাই না বলে একজন পণ্ডিত বাবার যে আর্তনাদ, এ আর্তনাদ সমগ্র জাতির আর্তনাদ। এ করুণ চিত্র শুধু বিচারব্যবস্থার প্রতি নয়, বরং গোটা সভ্যতার ওপর চপেটাঘাত। এ আর্তনাদ দায়িত্বশীলদের কর্ণকুহরে কতটুকু পৌঁছেছে, তা বোঝা না গেলেও এ আর্তনাদ আকাশে-বাতাসে ইথারে ভাসছে, যা থেকে আরো কোনো বেদনাদায়ক চিত্রের জন্ম নিতে পারে; বিগত ইতিহাস যা সাক্ষ্য দেয়। গণতন্ত্র নির্বাসিত হলে জঙ্গিবাদের উত্থান হবে- এ কথাও রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ বারবার বলে আসছেন।
রাষ্ট্র পরিচালনা করার দায়িত্ব যেমন সরকারের। অন্য দিকে রাষ্ট্র পরিচালনায় কোনো স্বেচ্ছাচারিতা হচ্ছে কি না এবং শাসকদল ভিন্ন পন্থায় নিগৃহীত হচ্ছে কি না, এটা দেখার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। শুধু দারোগার ফরোয়ার্ডিং ও চার্জশিটের ওপর ভিত্তি করে শাস্তি দেয়া বা জামিন না দেয়া বিচার বিভাগের দায়িত্ব নয়। এ বিভাগের যিনি প্রধান তিনি সুপ্রিম কোর্টের নন, বরং সংবিধানের ৯৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি সমগ্র বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি। তাই টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত সব নির্যাতন-নিপীড়নের প্রতিকারের এবং আইনের ছদ্মাবরণে রাষ্ট্রীয় জুলুমের প্রটেকশন দেয়ার দায়িত্ব প্রধান বিচারপতির।
বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ অভিযানে গত ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত গত ১৫ দিনে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া গোটা দেশে আট হাজার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং এখনো তা অব্যাহত আছে। প্রতিনিয়তই কোন জেলায় কতজন বিরোধীদলীয় নেতাকর্মী গ্রেফতার হচ্ছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া খুললেই নিয়মিত স্ক্রলে ভেসে আসে। গণগ্রেফতার আর তা নিয়ে বাণিজ্য এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। বিএনপি ও ২০ দলীয় ঐক্যজোটের কোনো নেতাকর্মী এখন বাড়িতে থাকতে পারেন না। কোনো অভিযোগ না থাকার পরও এ গণগ্রেফতার হওয়া নিরীহ মানুষগুলোর আইনগত অধিকার দেখা তথা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব কার? গণগ্রেফতার সম্পর্কে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গত ১৬ নভেম্বর পুলিশ প্রধান এ কে এম শহিদুল ইসলাম বলেছেন, রাজনৈতিক কারণে বা যাদের ক্রিমিনাল রেকর্ড নেই তাদের আটক করা হচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, ‘যারা বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত, যারা বিভিন্ন নাশকতার পরিকল্পনায় ষড়যন্ত্রকারী ও মদদদাতা ছিল এবং নাশকতার অভিযোগে আটক করা হয়েছিল, পরে জামিন নিয়ে আবারো একই ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তাদেরকেই আটক করা হচ্ছে।’ পুলিশ প্রধানের এ বক্তব্য কি সত্য? বাস্তবতা কী বলে?
পুলিশনির্ভর এ রাষ্ট্রে পুলিশ প্রধানের বক্তব্যই শেষ কথা; কিন্তু বিচার বিভাগ কি পুলিশের বক্তব্য যথার্থ মনে করছে? নতুবা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কপালে এত বড় দুর্দশা কেন? স্মরণ করা দরকার যে, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জব্বার, সালাম, বরকত, রফিক- তাদের বুকে গুলি, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে বসুনিয়ার বুকে গুলি, ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক, সৈরাচার নিপাত যাক’- এ স্লোগান বুকে ধারণকারী নূর হোসেনের বুকে গুলি পাকিস্তান বা চাঁদের দেশ থেকে এসে কেউ করেনি; বরং বাঙালি পুলিশই গুলি চালিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেখানে ভাড়াটিয়া খুনি (নারায়ণগঞ্জের ৭ খুন) হিসেবে ব্যবহৃত হয়, সেখানে তাদের ওপর বিচার বিভাগের এতটা নির্ভরশীল হওয়া কি নিরাপদ বা যুক্তিসঙ্গত? জাতি বিষয়টি কোন বিবেচনায় নেবে? মিথ্যার কাছে সত্য কি পরাজিত হয়ে যাচ্ছে? বিবেচনার দায় সমগ্র জাতির, কিন্তু জাতিকে শেল্টার দেয়ার দায়িত্ব কার?
লেখক : প্রাক্তন চেয়ারম্যান বিআরটিসি ও
সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com

Monday, November 9, 2015

ন্যায়বিচার ও রিমান্ড by খন্দকার মাহবুব হোসেন

একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত বিষয় ন্যায়বিচার। কেননা, ন্যায়বিচারবঞ্চিত সমাজের শান্তি, সভ্যতা ও প্রগতি এক কথায় মানবজীবনে কোনো উৎকর্ষতা থাকে না। তাই যেকোনো সভ্য সমাজের জন্য ন্যায়বিচার অপরিহার্য। আর এর জন্য প্রয়োজন আইনের শাসন। লর্ড চ্যাথাম বলেছেন, ‘আইন যেখানে শেষ, সেখানেই অত্যাচার শুরু।’
ন্যায়বিচার পাওয়ার পূর্বশর্ত যেমন ন্যায়পরায়ণ, সৎ ও দক্ষ বিচারক; তেমনি বিশেষ করে ফৌজদারি মামলায় সত্যিকার দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। একটি ফৌজদারি মামলায় যিনি তদন্তকারী কর্মকর্তা থাকেন, তাঁর সততা ও দক্ষতা দোষী ব্যক্তিকে উপযুক্ত সাক্ষ্য–প্রমাণ দ্বারা শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা থাকে। কিন্তু গণতন্ত্রবিহীন একটি দেশে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পেশাগত দায়িত্ব ও বিবেক বিসর্জন দিয়ে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবান্বিত হয়, তখন অনেক সত্যিকার দোষী ব্যক্তি আইনের আওতায় আসেন না এবং নির্দোষ ব্যক্তি সাজানো সাক্ষ্য–প্রমাণের কারণে আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন। ফলে একদিকে যেমন জনগণ বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা হারায়, অপর দিকে দোষী ব্যক্তিরা সমাজে নির্বিচারে তাঁদের জঘন্য কর্মকাণ্ড চালাতে সক্ষম হন। ফলে স্বাভাবিকভাবে দেশের আইনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে, জনগণের জানমাল বিপন্ন হয়।
এ কথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের অদক্ষতা এবং অসৎ পথে অর্থ উপার্জনের উৎস হিসেবে ফৌজদারি মামলায় তদন্তের ক্ষেত্রে তাদের সঠিক ভূমিকা রাখে না। শুধু তা-ই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সত্যিকার দোষী ব্যক্তিদের আড়াল করার জন্য অনেক নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে তাঁদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করে এবং নির্যাতনের ফলে তদন্তকারী কর্মকর্তার শেখানো মতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করে কথিত অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে—জনগণকে এই ধারণা দিয়ে তাদের ব্যর্থতা এবং অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করে।
ন্যায়বিচার পাওয়ার পূর্বশর্ত যেমন ন্যায়পরায়ণ, সৎ ও দক্ষ বিচারক; তেমনি বিশেষ করে ফৌজদারি মামলায় সত্যিকার দোষী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনার দায়িত্ব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এ ক্ষেত্রে তদন্তকালীন যখন কোনো মামলায় আসামিকে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করে পুলিশ রিমান্ড চায়, তখন ওই বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের একটি বিরাট আইনগত দায়িত্ব থাকে। এবং তাঁর ওপর নির্ভর করে একজন নিরীহ মানুষকে রিমান্ডে নিয়ে যাতে নির্যাতনের শিকার হতে না হয় এবং নির্যাতনের ফলে পুলিশের শেখানো মতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি প্রদানে বাধ্য না হয়। এ ব্যাপারে ফৌজদারি কার্যবিধিতে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে, তদুপরি আমাদের উচ্চ আদালতেরও রিমান্ড-সংক্রান্ত ব্যাপারে বিভিন্ন মামলায় নির্দেশনা রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শফিউজ্জামান বনাম রাষ্ট্র গং ৫৬ ডিএলআর পৃ. ৩২৪ মামলায় বিচারপতি এস কে সিনহা (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) ও বিচারপতি শরিফউদ্দিন চাকলাদার সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ রিমান্ড প্রদান–সংক্রান্ত ব্যাপারে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪, ৬০, ৬১ ও ১৬৭ ধারা এবং আমাদের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদের আলোকে নিরীহ নাগরিকেদের ফৌজদারি মামলায় আসামি হিসেবে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যখন হাজির করা হয়, সেই মামলার বিষয়বস্তুর ওপর নির্ভর করে পুলিশের চাহিদামতে রিমান্ডে দেওয়া হবে কি না, সে ব্যাপারে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের অবশ্য পালনীয় বিষয় ওই মামলার আলোকে ১১টি নির্দেশনা দিয়েছেন।
‘ক) যখন কোনো পুলিশ কর্মকর্তা কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করিবেন, তখন গ্রেপ্তারের কারণ উল্লেখপূর্বক একটি বিবরণ তৈরি করিয়া তাৎক্ষণিকভাবে উহাতে গ্রেপ্তারের তারিখ ও সময় উল্লেখপূর্বক গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির স্বাক্ষর নিবেন এবং তাঁর নিকটস্থ কোনো আত্মীয় অথবা বন্ধুকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে জ্ঞাত করিবেন।
‘খ) তাঁহার ডায়েরিতে গ্রেপ্তারের কারণ, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির নাম, ঠিকানা এবং গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি কাহার হেফাজতে আছেন উল্লেখ করিবেন।
‘গ) ওই সকল বৃত্তান্তসহ বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে পুলিশ হেফাজতে (রিমান্ডে) রাখার আবেদন করিতে হইবে। (ধারা-১৬৭ ফৌ. কার্যবিধি অনুযায়ী) এবং বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ ডায়েরি দেখিতে মামলার তদন্তের স্বার্থে সাক্ষ্য–প্রমাণ সংগ্রহের জন্য পুলিশকে সর্বোচ্চ ১৫ দিনের সময় দিতে পারিবেন এবং রিমান্ডের সময় অতিক্রমের পর অবশ্যই আসামিকে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির করিতে হইবে।
‘ঘ) গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে পুলিশ রিমান্ড অথবা জেলে প্রেরণের পূর্বে অবশ্যই তাঁহার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলা দায়ের করিতে হইবে। যদি কোনো গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে ওপরে বর্ণিত বিবরণসহ পুলিশ কর্মকর্তা তাঁহাকে পুলিশ হেফাজতে রাখার আবেদন করেন, কিন্তু পুলিশ ডায়েরিতে তাঁহার বিরুদ্ধে আনীত যথোপযুক্ত সাক্ষ্য–প্রমাণ উল্লেখ না থাকিলে সে ক্ষেত্রে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে যদি তাঁহার বিরুদ্ধে পরবর্তী সময়ে মামলা–সংক্রান্ত ব্যাপারে কোনো উপযুক্ত সাক্ষ্য–প্রমাণ আসার সম্ভাবনা থাকে, তখন তিনি পুলিশ রিপোর্ট অনুযায়ী মামলা আমলে নেওয়ার ক্ষমতাপ্রাপ্ত বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হাজির হইবেন মর্মে ফৌ. কার্যবিধি ১৬৯ ধারা মোতাবেক মুচলেকা নিয়া মুক্তি দিবেন।
‘ঙ) যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা কোনো মামলার আসামিকে যিনি ইতিমধ্যে জেলে আছেন, তাঁহাকে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখাতে চান, তাহলে তাঁহাকে অবশ্যই বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নতুন মামলাসংক্রান্ত ডায়েরিসহ উপস্থাপন না করিলে বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট উক্ত মামলায় গ্রেপ্তারের অনুমতি দিবেন না।
‘চ) একজন বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট যখন গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিকে উপস্থিত করিয়া পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করিবে, তখন অবশ্যই বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটকে উপরিউক্ত নির্দেশনাবলি পালিত হইয়াছে কি না, সেই মর্মে সন্তুষ্ট হইয়া প্রয়োজন বোধে রিমান্ডের আদেশ দিবেন। উপরিউক্ত নির্দেশনাবলির মূল লক্ষ্য যাহাতে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি অযথা হয়রানির শিকার না হন।’
ওই রায়ে মাননীয় বিচারপতি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করিয়াছেন যে উপরিউক্ত নির্দেশনাবলি যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তা অথবা বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট পালন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁরা আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তিযোগ্য হইবেন এবং সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি ওই ব্যাপারে মহামান্য হাইকোর্টে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য হাইকোর্ট বিভাগের শরণাপন্ন হতে পারবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, ওই নির্দেশনাসমূহ প্রায় ক্ষেত্রেই পালন করা হয় না; যা শুধু আইনের ব্যত্যয় নয়, উচ্চ আদালতের নির্দেশনার প্রতি অবজ্ঞার সমতুল্য, যাহা আদালত অবমাননারও শামিল।
রিমান্ডের নামে পুলিশের হেফাজতে কোনো আসামিকে যাতে অকথ্য শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন ভোগ করতে না হয়, সে কারণে আমাদের উচ্চ আদালতের নির্দেশনাগুলো পালন করা উচিত। তদুপরি আসামিকে রিমান্ডে নেওয়ার আগে এবং তাঁকে যখন রিমান্ড থেকে আদালতে আনা হয়, উভয় ক্ষেত্রে তার ওপর কোনো শারীরিক নির্যাতন হয়েছে কি না, তার জন্য বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশনা দেওয়া একান্ত আবশ্যক। তাহলে দেখা যাবে, অনেক নিরীহ ব্যক্তি একদিকে যেমন পুলিশ কর্তৃক শারীরিক নির্যাতনের শিকার হবেন না, অপর দিকে পুলিশের শেখানো মতে মিথ্যা স্বীকারোক্তি দিতে বাধ্য হবেন না।
বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেট যখন আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি লিপিবদ্ধ করেন, তখন স্বচ্ছ ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে তাঁদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, মিথ্যা স্বীকারোক্তি করার কারণে একজন নির্দোষ ব্যক্তির জীবনে নেমে আসতে পারে চরম দুর্ভোগ, এমনকি দীর্ঘ কারাবাস ও মৃত্যুদণ্ড। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে একজন বিজ্ঞ ম্যাজিস্ট্রেটের যে মানবিক ও আইনি দায়িত্ব রয়েছে, তা পালনে অবশ্যই সতর্কতার দাবি রাখে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন: সভাপতি, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি।

Friday, November 6, 2015

ভারতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগ বিতর্ক by মিজানুর রহমান খান

তোমার পতাকা যারে দাও তারে বহিবারে দাও শকতি—ভারতের সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশ্যে এ মুহূর্তে এর চেয়ে মোক্ষম কিছু বলার নেই। কারণ, কংগ্রেস ও বিজেপির এক অসাধারণ ঐক্যে বিচারপতি নিয়োগে যে কমিশন তৈরি করেছিল, সুপ্রিম কোর্ট ১৬ অক্টোবর তাকে অবৈধ বলে বাতিল করে দিয়েছেন।
গরু বিতর্ক ও বরেণ্য লেখকদের পুরস্কার ফেরতদানের ঘটনায় জেরবার বিজেপি রায় শুনে হতভম্ব। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ‘ব্যক্তিগতভাবে’ ব্লগে লিখেছেন, এটা টিরানি অব আনইলেকটেড বা ‘অনির্বাচিত ব্যক্তিদের স্বৈরশাসন’। তবে জেটলির মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় কংগ্রেস বলছে, ‘এই মন্তব্য দুর্ভাগ্যজনক। আদালত অবমাননার শামিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অনেক সময় নির্বাচিত ব্যক্তিদের স্বৈরশাসকে পরিণত করে।’ তবে এতে সন্দেহ সামান্য যে নির্বাচিত কিংবা অনির্বাচিত যেকোনো স্বৈরশাসন ন্যায়বিচারের জন্য হুমকি। কেবল বিচারকের দ্বারা বিচারক নিয়োগের নিরঙ্কুশ একটি ব্যবস্থা বিশ্বে বিরল বলে আমাকে নিশ্চিত করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক কেট মেলিসন। মিস কেটের কথায়, ‘আমি এটা সমর্থন করতে পারি যে ভারতের বিচার বিভাগ হয়তো বিচারক নিয়োগে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা করতে পারে। কিন্তু বিচারক নিয়োগে কেবল বিচারকদের থাকা প্রমাণ করে যে নিয়োগ–প্রক্রিয়ায় কোনো গণতান্ত্রিক জবাবদিহি নেই। এর ফলে বিচার বিভাগের পক্ষে তার সদস্য (বিচারক) নির্বাচনে যথোপযুক্তভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা অনেকটাই ম্লান হতে পারে। কারণ, এতে নিজেদেরই অনুকরণ করার প্রবণতা বাড়বে।’ এই মতের সঙ্গে একমত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
‘প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিচারপতি নিয়োগ দেবেন’ এই ব্রিটিশ উদ্ভাবন নিয়ে বহুকাল চলতে চলতে উপমহাদেশজুড়ে আজ ক্লান্তি চোখে পড়ে। বিশ্বের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা হলো কমিশন করা। বিচারপতি নিয়োগে পাকিস্তান কমিশন ও উন্মুক্ত শুনানি দুটোই করেছে। বাংলাদেশ ২০০৮ সালে কমিশন করল, আদালতে সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে তা উতরেও গেল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাকে বাঁচাল না।
ভারতের সুপ্রিম কোর্ট শুধু সংসদের তৈরি করে দেওয়া কমিশন বাতিল করেই ক্ষান্ত হননি, তাঁরা একই সঙ্গে সংসদ দ্বারা বিলুপ্ত হওয়া কলিজিয়াম, যেটি প্রধান বিচারপতি ও অপর পাঁচ জ্যেষ্ঠ বিচারপতি নিয়ে গঠিত, সেটিকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন এবং এই কলিজিয়াম যে ত্রুটিপূর্ণ সে বিষয়ে আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে আগামী ৩ নভেম্বর শুনানির তারিখ ধার্য করেছেন। প্রধান বিচারপতি এইচ এল দাত্তু বলেছেন, সবাই পরিপক্ব, তাই সরকার জানবে রায় কী করে মেনে নিতে হয়। কিন্তু প্রশ্নটি মোটেই এতটা আটপৌরে নয়। ভারতকে অবশ্যই একটি উন্মুক্ত, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থায় যেতে হবে।
নিরপেক্ষভাবে বিচারপতি নিয়োগ সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। কারণ, নিরপেক্ষভাবে বিচারক বাছাই ও নিয়োগ–প্রক্রিয়ার গতিশীল অস্তিত্ব ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অর্থপূর্ণ হতে পারে না, প্রকৃত স্বাধীনতা প্রবেশ করতেই পারে না।
বাংলাদেশের মতোই ভারতের সংবিধানে লেখা ছিল রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শক্রমে বিচারক নিয়োগ দেবেন। এই পরামর্শ রাষ্ট্রপতি মানে সরকার করতেন, কিন্তু মানতে বাধ্য ছিলেন না। ১৯৮১ সালে এস কে গুপ্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্ট সে কথা মানলেন। তবে বললেন, পরামর্শটা কার্যকরী হতে হবে। শেষ কথা রাষ্ট্রপতি, মানে, মন্ত্রিসভা বলবেন।
১২ বছর পরে ১৯৯৩ সালে সুপ্রিম কোর্ট আগের রায় উল্টে দেন। এবার বলেন, না, শেষ কথা বলবেন সুপ্রিম কোর্ট। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা মৌলিক কাঠামো। সরকারের কথা শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হলে ওই মৌলিক কাঠামো আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কারণ, বিচারক হতে কে যোগ্যতম তা সুপ্রিম কোর্টই ভালো বলতে পারবেন। তবে তাঁরা নিজেরাও বিচক্ষণতার পরিচয় দেন। রাষ্ট্রপতি নিজেই যখন রেফারেন্স পাঠিয়ে মতামত চাইলেন, তখন তাঁরা আর ব্যক্তি প্রধান বিচারপতির ওপরে থাকলেন না। তাঁরা একটি কলিজিয়াম করলেন। বললেন, প্রধান বিচারপতি মানে এক মাথার ব্যক্তি নন। আর তাই কলিজিয়ামে আরও পাঁচ বিচারপতি অন্তর্ভুক্ত হলেন। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই কলিজিয়ামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের তির নিক্ষেপ চলছিল। কলিজিয়ামের মূল লেখক প্রধান বিচারপতি ভার্মা নিজেই অবসরে গিয়ে বলেছেন, আমি মত পাল্টালাম। এতে সংশোধনী আনাই সমীচীন।
এটা অত্যন্ত বিরল ঘটনা যে মূল রায় প্রকাশের পরেও আকর্ষণ ফুরায়নি, কারণ যা নিয়ে বিরোধ, আদালতই মানছেন সে বিষয়ের ফয়সালা হয়নি। একই মামলা কিন্তু যমজ রায়, কোনটিকে মাইলফলক বলব, তা দ্বিতীয় রায় না জেনে বলা যাবে না। বাংলাদেশি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এম আই ফারুকী মনে করেন, ‘রায় দানের পরে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ সদস্যের ওই বেঞ্চ ফাংটাস অফিসিও (আর কোনো কার্যকারিতা নেই) হয়েছেন। তাঁর পক্ষে এখন আর শুনানি করা সমীচীন নয়।’
আইনি তর্কে যাব না। এই যমজ রায় এড়ানোই উচিত ছিল। আমরা এও দেখলাম, কমিশন বাতিলে পাঁচজন বিচারপতির বেঞ্চ একমত হতে পারেননি। তাঁরা ৪: ১ ভোটে বিভক্ত হয়েছেন। অথচ এই কমিশন গঠনে কংগ্রেস-বিজেপি বিভক্ত হয়নি। আর যদি সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে ন্যায়বিচার করা যায়, তাহলে বিচারক নিয়োগেও করা যাবে। রাজনীতিকেরা শ্রেণি হিসেবে অগ্রহণযোগ্য, বিচারকেরা শ্রেণি হিসেবে বেশি গ্রহণযোগ্য—যুক্তিটা ভঙ্গুর। রাজনীতিক বাদ দিয়েও বিভিন্ন পেশার লোক সমন্বয়ে কমিশন করা চলে।
ভারতকে এমন ব্যবস্থায় যেতে হবে, যাতে কোনো বিশেষ শ্রেণির শ্রেষ্ঠত্ব থাকা বা না থাকা জ্বলন্ত না হয়ে ওঠে। মিডিয়া সুপ্রিম কোর্টের পাশে দাঁড়িয়েছে। রাজনীতির সময়টা বিজেপির জন্য অনুকূল নয়। উপমহাদেশীয় রাজনীতি আজও হাওয়া বুঝে চলার প্রবণতা দেখিয়ে থাকে। ‘বর্তমান সরকারের ওপর আদালতের আস্থা নেই’ বলার মতো জনপ্রিয় অবস্থান নিতে কংগ্রেস কোনো বিলম্ব করেনি। কংগ্রেস কেন এর পক্ষে ভোট দিয়েছিল, সেটা তার উচিত ছিল আগে ব্যাখ্যা করা।
নভেম্বরের সম্ভাব্য রায়ে বিচারক নিয়োগ বিতর্কের চির অবসান ঘটাবে বলে মনে হয় না। রায়ের আলোকে সংবিধানে নতুন সংশোধনী আনার প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায় ১৭ অক্টোবরে হায়দরাবাদের নালসার আইন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফাইজান মুস্তাফা ‘সাংবিধানিকতাবাদের বিজয়’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ লিখেছেন। সেদিনই তাঁকে লিখলাম ও জানতে চাইলাম, ভারতের সংবিধান কঠিনভাবে ক্ষমতার পৃথক্করণের ভিত্তিতে গড়া। রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য এর সীমা কত দূর অতিক্রম করতে দেওয়া সমীচীন?’
কলিজিয়ামের পাঁচ সদস্যই বিচারক ছিলেন। আর ছয় সদস্যের কমিশনে বিচারক ছিলেন প্রধান বিচারপতিসহ তিনজন। বাইরের লোক বলতে আইনমন্ত্রী, আরও দুজন আইনবিদ। প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি ও বিরোধী দলের নেতা বসে ওই দুজন ঠিক করবেন। মামলা বিচারাধীন বলে মোদির ডাকা বৈঠকে প্রধান বিচারপতি হাজির হননি।
ফাইজানের মতে, এটাই উদ্বেগের যে ‘যেকোনো দুজন কারও মনোনয়ন আটকে দিতে পারে।’ তিনি যেন ধরে নিয়েছেন শ্রেণি হিসেবে তিন বিচারক সব সময় ঐকমত্যে থাকবেন। আর বাগড়া দেবেন আইনমন্ত্রী ও দুই আইনবিদের মধ্যে অন্তত একজন। অথচ সরকারের প্রস্তাবও যেকোনো দুই বিচারক আটকে দিতে পারেন। এই ক্ষমতা যখন দুই দিকে থাকবে, তখন গঠনমূলক আপস হওয়ার কথা। এও সত্য, বাগড়া দেওয়াটা সরকারই বেশি দেখাতে পারে। তা ছাড়া, দুই সংখ্যালঘুর স্বৈরশাসন মানা যায় না।
প্রধান বিচারপতির মতের প্রাধান্য মানেই বিচার বিভাগের স্বাধীনতার শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ, এটি একটি উপমহাদেশীয় ধারণা, যা দুর্বল হয়ে পড়ছে। ভারতের বাইরে একে আমরা ‘রূপকথা’ হিসেবে, গোত্রগত স্বার্থে ব্যবহৃত হতে দেখেছি।
২০০৮ সালে আট সদস্যের যে কমিশন বাংলাদেশে চালু (বর্তমানে বিলুপ্ত) হয়েছিল, তাতে বিচারকদের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা (৮: ৫) ছিল।
অধ্যাপক ফাইজান স্বীকার করেন ‘কলিজিয়াম সংবিধানের মূল পাঠ থেকে যথেষ্ট বিচ্যুত হওয়া একটি ব্যবস্থা। কিন্তু ক্ষমতার পৃথক্করণ সত্ত্বেও সংবিধান ব্যাখ্যা করার অধিকার সুপ্রিম কোর্টের আছে।’ এর আগে এই অবাক করা ‘সংবিধান-বিচ্যুতির’ বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতের সাবেক প্রধান বিচারপতি আলতামাশ কবীর ঢাকায় আমাকে বলেছিলেন, ‘কলিজিয়াম সংবিধানের বাইরে, তা আমি মানি না।’ আসলে ১৮ বছর ধরে বিচারকসর্বস্ব কলিজিয়াম যে কার্যকর থেকেছে, তার কৃতিত্ব নির্বাহী বিভাগের, তারা প্রশ্ন তোলেনি।
‘বর্তমান সময়ে এটাই সমর্থন করা দরকার যে কমিটেড বিচারক দিয়ে সরকার যাতে “কোর্ট প্যাকিং” (রুজভেল্ট দলীয় লোক এনে সুপ্রিম কোর্ট বোঝাই করেছিলেন, সেই থেকে কোর্ট প্যাকিং কথাটির প্রচলন) না করতে পারে’—ফাইজানের এই অবস্থানকে যথার্থ বলেই মনে হয়। গোপাল সুব্রামনিয়ামকে বিচারক হতে অন্যায্যভাবে আটকে দিয়ে মোদি সরকার তার বিতর্কিত যাত্রা শুরু করেছিল। এই কলামে তার প্রতিবাদ করেছিলাম।
বিচারক বাছাইয়ের প্রাথমিক প্রক্রিয়া সুপ্রিম কোর্টের থেকে সরকারের কাছে নেওয়ার বিধান অবশ্যই সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে আঘাত করেছে। এটা থাকতে পারে না। ভারতে প্রকাশ্য গণশুনানি চালুর ফল ‘নোংরা’ হবে বলে ফাইজান মনে করেন। কিন্তু এই নোংরা হওয়ার ঝুঁকি সত্ত্বেও আমি এর প্রচলন সমর্থন করি। ফাইজান ইঙ্গিত দেন যে রুদ্ধদ্বার কক্ষে সুপ্রিম কোর্টের ৩১ বিচারকের সামনেও শুনানি হতে পারে না। জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদেরও কলিজিয়ামে নেওয়া যাবে না। কারণ, তাতে রাজনীতি হবে। প্রশ্নের উত্তরে ফাইজান কেবল আইনের অধ্যাপকদের যুক্ত করতে রাজি হয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়ার ন্যাশনাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক ড. জন ব্রেইথওয়েট এবং ভারতের সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী কালিশ্বরণ রাজেরও অভিমত নিয়েছি, তাঁরাও এতে একমত। রাজের মতে, বিচার বিভাগ যেমন স্বাধীন, তেমনি বিচারক নিয়োগব্যবস্থাও স্বাধীন হতে হবে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের এই ত্রুটিপূর্ণ রায়ের অসামান্য প্রভাব পড়বে উপমহাদেশে। লাহোরে যোগাযোগ করা হলে পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ বেলাল ও আলী আসগর চিমা ওই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে স্বাগত জানান। ভারতের অ্যাটর্নি জেনারেল অন্য ১৪ দেশের সঙ্গে বাংলাদেশকে হাজির করেন এটা দেখাতে যে এখানে ‘বিচার বিভাগের সঙ্গে কোনো দালিলিক প্রমাণসাপেক্ষ কোনো পরামর্শ ছাড়াই নির্বাহী বিভাগ বিচারক নিয়োগ দিয়ে থাকে।’
কেমব্রিজের ওই অধ্যাপক কেট মেলিসন, যিনি ২০০৬ সালে বিশ্বের বিচারক নিয়োগের ওপরে একটি বই সম্পাদনা করেছেন, ভারতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ২২ অক্টোবর আমাকে লেখা তাঁর একটি মন্তব্য দিয়ে শেষ করি: ‘বিচারক নিয়োগ–প্রক্রিয়া শ্রেয়তর করতে হলে সেখানে বিভিন্ন গ্রুপের সম্মিলনী উত্তম। রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গের হাতেই এর ভার নিরঙ্কুশভাবে থাকা উচিত নয়।’
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

Friday, October 16, 2015

বিদ্যালয়ের ফটকে ছাত্রী হত্যা- শুধু শাস্তি নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়

কবিতা মনি দাস
বিদ্যালয়ের ফটকের কাছে রক্তমাখা একটি ছুরি। রক্ত ১৬ বছরের এক কিশোরীর, যে আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এখন সে হাসপাতালের মর্গে। আর কোনো দিন ওই বিদ্যালয়ের ফটকে তার পা পড়বে না। ঘাতক বিক্রম নামের ২২ বছরের এক তরুণ। লোকজন তাঁকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দিয়েছেন। তাঁকে একমাত্র আসামি করে একটা হত্যা মামলা করেছেন কিশোরীর বাবা। হত্যাকারী হত্যাকাণ্ডের সময়ই হাতেনাতে ধরা পড়ায় আইনানুগভাবে তাঁর শাস্তি নিশ্চিত করা পুলিশের পক্ষে কঠিন হওয়ার কথা নয়। তবে সে জন্য যেসব প্রত্যক্ষদর্শী তাঁকে হাতেনাতে ধরে পুলিশে দিয়েছেন, তাঁরা যেন আদালতে সাক্ষ্য দিতে যান, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গত মঙ্গলবার দুপুরের এই হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গে আমরা কিছু মৌলিক প্রশ্ন তুলতে চাই। ঘটনার বিবরণ থেকে ধারণা করা যায়, তরুণটি ওই কিশোরীর প্রতি আকৃষ্ট ছিলেন। কিন্তু আসলে তিনি কী চেয়েছিলেন? তিনি কি কিশোরীটিকে ভালোবাসতেন? ভালোবাসা কি জবরদস্তি করে পাওয়ার বিষয়? এবং ভালোবাসলে কি শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার মানুষটিকে খুন করা যায়?
আবার এটাও সত্য যে তরুণটি পেশাদার খুনি নন, এর আগে তিনি কোনো ফৌজদারি অপরাধ করেননি। তিনি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জীবনে তাঁর নিশ্চয়ই কিছু আশা ও স্বপ্ন ছিল। তাহলে এমন একটা গুরুতর, বিভীষিকাময় কাজ কীভাবে তিনি করতে পারলেন? কেন তিনি আর দশজন স্বাভাবিক শিক্ষিত তরুণের থেকে হঠাৎ রূপান্তরিত হলেন একজন নৃশংস খুনিতে?
এসব কথার উদ্দেশ্য এই তরুণের অপরাধকে লঘু করা নয়। তাঁর অবশ্যই আইন অনুযায়ী কঠোরতম শাস্তি হওয়া উচিত, যাতে অন্য কেউ এমন পথে যাওয়ার সাহস না পায়। তবে শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে এ রকম প্রবণতা পুরোপুরি বন্ধ হবে না। আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সংস্কৃতি, নৈতিকতাবোধ, নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি—এসব ক্ষেত্রে গলদ রয়ে গেছে কি না, থাকলে সেগুলো কীভাবে দূর করা যায়, সেসবও ভাবতে হবে।
বিদ্যালয়ের ফটকে ছাত্রী হত্যা
আপডেট: ১৪ অক্টোবর  ২০১৫
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিদ্যালয়ের ফটকে ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছে কবিতা মনি দাস (১৬) নামের এক ছাত্রী। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
নিহত কবিতা কালিয়াকৈর উপজেলার সূত্রাপুর এলাকার বোর্ডঘর বিজয় সরণি উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। সে ঢাকার ধামরাই উপজেলার সাটুরিয়া গ্রামের সাগর মনি দাসের মেয়ে। সূত্রাপুরে নানার বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করত কবিতা।
গ্রেপ্তার হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হলেন কালিয়াকৈরের উত্তর কাঞ্চনপুর পশ্চিমপাড়া এলাকার বিক্রম চন্দ্র সরকার (২২)। তিনি সাভারের গণবিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ প্রথম বর্ষের ছাত্র।
কবিতার পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দশম শ্রেণির ছাত্রী কবিতার নির্বাচনী পরীক্ষা চলছে। অন্যান্য দিনের মতো গতকাল দুপুরেও সে পরীক্ষা দিতে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়। বেলা দেড়টার দিকে বিদ্যালয়ের ফটকে পৌঁছানোর পর বিক্রম তার গতিরোধ করেন। এ সময় দুজনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে বিক্রম একটি ধারালো ছুরি দিয়ে কবিতার পেটে ও কাঁধে আঘাত করেন। কবিতার চিৎকার শুনে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্রছাত্রী ও আশপাশের লোকজন গিয়ে বিক্রমকে আটক করে পুলিশে দেন। কবিতাকে উদ্ধার করে কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠানো হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পুলিশ লাশ ময়নাতদন্তের জন্য গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক সাইফুল ইসলাম বলেন, স্কুলছাত্রী কবিতার পেটে, বুকে ও হাতে ছুরির তিনটি আঘাত রয়েছে। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তার মৃত্যু হয়েছে।
কবিতার নানা ননি গোপাল বলেন, বিক্রম অনেক দিন ধরে কবিতাকে নানাভাবে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন। চার-পাঁচ মাস আগে একদিন স্কুলে যাওয়ার সময় কবিতার হাত ধরে টানাটানি করেন তিনি। পরে বিষয়টি নিয়ে বিক্রমের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করা হয়। এরপর থেকে প্রতিদিন কবিতাকে স্কুলে দিয়ে ও নিয়ে আসতেন তাঁর নানি। কিন্তু নানি অসুস্থ থাকায় কয়েক দিন ধরে সে বান্ধবীদের সঙ্গে স্কুলে-যাওয়া আসা করছিল।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামরুজ্জামান জানান, হত্যার ঘটনার পর গতকালের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে।
এদিকে ঘটনার খবর পেয়ে কালিয়াকৈর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাইফুল কবীর ও কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওমর ফারুক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ওসি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে বিক্রমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

Monday, October 12, 2015

সাংসদ মনজুরুলের জামিন নাকচ, আত্মসমর্পণের নির্দেশ

আদালতে সাংসদ মনজুরুল ইসলাম ওরফে
লিটন। ছবি: সাহাদাত পারভেজ
শিশু শাহাদাত হোসেনকে হত্যাচেষ্টা মামলায় গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সাংসদ মনজুরুল ইসলাম ওরফে লিটনের আগাম জামিনের আবেদন নাকচ করেছেন হাইকোর্ট। সাংসদকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে গাইবান্ধার মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আজ সোমবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
ওই মামলায় আগাম জামিন চেয়ে গতকাল রোববার হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন সাংসদ মনজুরুল। এর ওপর আজ সকালে শুনানি শুরু হলে আদালত সাংসদের আইনজীবীকে বেলা একটায় তাঁর মক্কেলকে (সাংসদ) হাজির করতে নির্দেশ দেন। আদালতের নির্দেশে হাইকোর্টে হাজির হন সাংসদ মনজুরুল। এরপর শুনানি নিয়ে আদেশ দেন আদালত।
শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। সাংসদ মনজুরুলের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মোকছেদুল ইসলাম।
মোকছেদুল ইসলাম আদালতকে বলেন, আসামি একজন সাংসদ। তিনি পরিস্থিতির শিকার। তিনি নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তাই তাঁর আগাম জামিনের আবেদন মঞ্জুর করার আরজি জানান তিনি।
জামিনের বিরোধিতা করে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতকে বলেন, সাংসদ মনজুরুল ইসলামের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা গুরুতর অপরাধ। তাঁর আবেদন নাকচ করে তাঁকে পুলিশের হেফাজতে দেওয়ার আরজি জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
পরে এক সংবাদ সম্মেলনে মাহবুবে আলম বলেন, সাংসদ লিটনের জামিন আবেদন খারিজ করা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে ১৮ অক্টোবরের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। নির্দেশনা সংক্রান্ত হাইকোর্টের এ আদেশ আপিল বিভাগের রায়ের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তাই নির্দেশনার আদেশের বিরুদ্ধে কাল মঙ্গলবার আপিল করা হবে।
২ অক্টোবর সাংসদ মনজুরুলের ছোড়া গুলিতে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার গোপালচরণ গ্রামের শিশু শাহাদাত হোসেন (সৌরভ) আহত হয়। বর্তমানে সে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ ঘটনায় মনজুরুলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তিনি মামলার একমাত্র আসামি। মামলায় হত্যাচেষ্টা ও গুরুতর জখমের অভিযোগ আনা হয়েছে।

Sunday, October 11, 2015

মামলা করে সাক্ষ্য দিতে আসছে না পুলিশ by আসাদুজ্জামান

মামলার বাদী, তদন্তকারী কর্মকর্তাসহ অধিকাংশ পুলিশ সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসছেন না। এ কারণে ঢাকার ২৩টি আদালতে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বিচারাধীন ১৫৬ মামলার বিচারকাজ কার্যত আটকে আছে। এ ছাড়া সরকারি অনুমোদন না আসায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা ১৩৮টি মামলার বিচার শুরুই করতে পারছেন না আদালত। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ থাকায় আরও আটটি মামলার বিচারকাজ আপাতত বন্ধ রয়েছে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাক্ষী পর্যায়ে থাকা বিচারাধীন ১৫৬টির মধ্যে অধিকাংশ মামলায় সাক্ষীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন সংশ্লিষ্ট আদালত। তারপরও পুলিশসহ অধিকাংশ সাক্ষী হাজির হচ্ছেন না।
এ রকম ৬২টি মামলার নথিপত্রে দেখা যায়, এসব মামলায় আদালতে দিনের পর দিন সাক্ষ্য দিতে না আসায় ৩৩৩ জন পুলিশ সাক্ষীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
এ তথ্য জানিয়ে বিষয়টি নিয়ে মতামত জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান প্রথম আলোকে বলেন, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় পুলিশ বাহিনীর যেসব সদস্য আদালতে সাক্ষ্য দিতে যাচ্ছেন না, তাঁদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নথিপত্রে দেখা যায়, নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) ৩৫ জন সদস্যেরবিরুদ্ধে পাঁচটিমামলা করেছে গুলশান, খিলক্ষেত, সূত্রাপুর ও পল্টন থানার পুলিশ। এর মধ্যে দুটি ২০০৫ সালে এবং একটি ২০০৯ সালে দায়ের করা। পরে পুলিশ অভিযোগপত্র দিলে মামলাগুলোর বিচারকাজ শুরু করেন আদালত। এর কোনোটিতেই বাদী, তদন্ত কর্মকর্তাসহ কোনো সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিতে আসেননি।
এর মধ্যে পল্টন থানার মামলায় {নম্বর-৩১(৮)২০০৫, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল নং-১১১৯/২০০৫} প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা আদালত ২০০৯ সালের ১১ আগস্ট সাত জেএমবি সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। আসামিদের মধ্যে চারজন কারাগারে, একজন জামিনে ও দুজন পলাতক আছেন।
গত ছয় বছরে কারাগারে থাকা চার আসামিকে ৬৭ বার আদালতে তোলা হয়েছে, কিন্তু মামলার বাদী পল্টন থানার তৎকালীন সহকারী উপপরিদর্শক মজনু মিয়া ও তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির তৎকালীন পরিদর্শক আবদুর রাজ্জাক সাক্ষ্য দিতে আসেননি। এ দুজনসহ ২৫ জন সাক্ষীর বিরুদ্ধে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন।
২০০৫ সালে গুলশান থানায় জেএমবির পাঁচ জঙ্গির বিরুদ্ধে মামলা {নম্বর-৩২ (৮) ২০০৫ ও বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৩১৫/২০০৭} করেন ওই থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক মীর জাহেদুল হক। ২০০৯ সালের ১৪ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠিত হয়। মামলাটি ঢাকার দ্বিতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। গত ছয় বছরে এই মামলায় আসামিদের ৩৭ বার আদালতে তোলা হয়েছে। কিন্তু মামলার বাদী, চারজন তদন্ত কর্মকর্তাসহ ৩৭ জন সাক্ষীর কেউ আদালতে হাজির হননি। এঁদের সবার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা মহানগর ও জেলার ২৩টি আদালতে বিচারাধীন ১৫৬টি জঙ্গি মামলার বেশির ভাগের একই দশা। এর কারণ জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের প্রধান সরকারি কৌঁসুলি আবদুল্লাহ আবু প্রথম আলোকে বলেন, সাক্ষী আদালতে হাজির করার সম্পূর্ণ দায়িত্ব পুলিশের। কিন্তু জঙ্গিদের অধিকাংশ মামলায় পুলিশ সাক্ষীই সাক্ষ্য দিতে আসছে না। এমনকি সাধারণ সাক্ষীদেরও হাজির করানো হচ্ছে না। ফলে বছরের পর বছর এসব মামলা ঝুলে আছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ তথ্য ও প্রসিকিউশন বিভাগের উপকমিশনার এ এইচ এম কামারুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আদালতের যেসব সমন বা পরোয়ানা আমাদের কাছে পাঠানো হয়, তা সংশ্লিষ্ট অফিসে পাঠানো হয়।’ তিনি দাবি করেন, আদালতের সব সমন তামিল (বাস্তবায়ন) করা হয়।
অনুমোদনের অভাবে আটকে আছে ১৩৮টির: সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় অপরাধ আমলে নেওয়ার আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ আইনে নিষিদ্ধঘোষিত বিভিন্ন উগ্রপন্থী সংগঠনের সদস্যদের বিরুদ্ধে করা ১৩৮টি মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন আসেনি। ফলে এসব মামলার অপরাধ আমলে নিতে পারছেন না ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালত।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথম আলোকে বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলার অনুমোদন আমরা দিচ্ছি। মামলার ফাইলপত্র আসার পর যাচাই-বাছাই করে যত দ্রুত সম্ভব অনুমোদন দেওয়া হয়।’
হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ: এদিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না নিয়েই সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপরাধ আমলে নেওয়ার কারণে আটটি মামলার আসামিরা হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এসব মামলার বিচারকাজের ওপর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। এসব স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য রাষ্ট্রপক্ষের কোনো উদ্যোগও নেই বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্থগিতাদেশের কারণে জঙ্গিদের মামলার বিচারকাজ বন্ধ রয়েছে, তা ঢাকা মহানগরের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অফিস থেকে আমাকে জানানো হয়নি। আমার অফিসে এ-সংক্রান্ত মামলার কাগজপত্র পাঠানো হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, জঙ্গিদের মামলার বিচারের ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Thursday, October 1, 2015

সাকা–মুজাহিদের ফাঁসি: পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ, রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু

মুক্তিযুদ্ধকালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় গতকাল বুধবার প্রকাশিত হয়েছে। সন্ধ্যায় তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে পাঠানো হয়।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম রাতে প্রথম আলোকে বলেন, এর মধ্য দিয়ে এ দুজনের বিরুদ্ধে রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেল। তবে ১৫ দিনের মধ্যে আসামিরা রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করার সুযোগ পাবেন।
গতকাল দুপুরে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় দুটি প্রকাশিত হয়। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল সৈয়দ আমিনুল ইসলাম বিকেলে প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুটি রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি বের হয়েছে। এখন এটি ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হবে। রায়ের অনুলিপি সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।’
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ গত ১৬ জুন মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন। একই বেঞ্চ গত ২৯ জুলাই সাকা চৌধুরীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির আদেশ বহাল রাখেন। এই বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
মুজাহিদের আপিলের ১৯১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় লিখেছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা এ রায়ের সঙ্গে একমত হয়েছেন। আর সাকা চৌধুরীর আপিলের ২১৭ পৃষ্ঠার রায় লিখেছেন প্রধান বিচারপতি। বেঞ্চের অন্য সদস্যরা তাঁর সঙ্গে একমত প্রকাশ করেছেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার শহীদুল আলম গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পূর্ণাঙ্গ রায় দুটি ট্রাইব্যুনালে পৌঁছেছে। আজ বৃহস্পতিবার রায় দুটি ট্রাইব্যুনালের সামনে উপস্থাপন করা হবে।
সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদ দুজনেই কারাগারে রয়েছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে ২০১৩ সালের ১৭ জুলাই মুক্তিযুদ্ধকালে আলবদর বাহিনীর নেতা মুজাহিদকে ফাঁসির আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২। আর মুক্তিযুদ্ধকালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে একই বছরের ১ অক্টোবর সাকা চৌধুরীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-১। তাঁরা দুজনেই ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালতে আপিল করেছিলেন।
রায় যেভাবে কার্যকর হবে: পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর মুজাহিদ ও সাকা চৌধুরীর আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, রায়ের সত্যায়িত অনুলিপি পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তাঁরা পুনর্বিবেচনার আবেদন করবেন।
রায় কীভাবে কার্যকর হবে, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। গতকাল নিজ কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, প্রথমে পূর্ণাঙ্গ রায় বিচারিক আদালতে, অর্থাৎ ট্রাইব্যুনালে পাঠাবেন আপিল বিভাগ। ট্রাইব্যুনাল আসামিদের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করবেন। এর মধ্যে আপিল বিভাগের বেঁধে দেওয়া সময় অনুসারে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের দিন থেকে ১৫ দিনের মধ্যে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতে পারবেন আসামিরা। আর পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর থেকেই দণ্ড কার্যকরে উদ্যোগ নিতে পারবে রাষ্ট্র। তবে ১৫ দিনের মধ্যে আসামিরা পুনর্বিবেচনার আবেদন করলে তখন মৃত্যু পরোয়ানা ও দণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া স্থগিত হয়ে যাবে। আপিল বিভাগ যদি আসামিদের রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন, তাহলে সব শেষে আসামিরা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইতে পারবেন। তবে আসামি ক্ষমা না চাইলে তখন দণ্ড কার্যকর করতে কোনো বাধা থাকবে না।
অবকাশের মধ্যে আপিল বিভাগে পুনর্বিবেচনার আবেদনের শুনানি হতে পারে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মাহবুবে আলম বলেন, এটা পুরোপুরি আদালতের এখতিয়ার।
সুপ্রিম কোর্টে বর্তমানে অবকাশ চলছে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত এ অবকাশ চলবে। ১ নভেম্বর থেকে সুপ্রিম কোর্টের নিয়মিত কার্যক্রম শুরু হবে।
এর আগে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগেও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের প্রায় দেড় মাস পর তা কার্যকর হয়েছিল। জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের এক সপ্তাহের মধ্যে ফাঁসি কার্যকর হয়। এ দুজনের কেউ রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চাননি।
গত বছরের ৩ নভেম্বর কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে রায় দেন আপিল বিভাগ, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ওই রায় পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশিত হয়। পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫তম দিনে (৫ মার্চ) তা পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন কামারুজ্জামান। ওই সময় সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ সামনে থাকায় আসামিপক্ষ শুনানি মুলতবি চায়, আদালত তা মঞ্জুর করেন। পরে ৫ এপ্রিল পুনর্বিবেচনার আবেদনের ওপর শুনানি হয়, ৬ এপ্রিল তা খারিজ করেন আদালত। ১২ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে সরকার।
কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকরের সময় অবশ্য পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সময়সীমা নিয়ে কোনো নির্দেশনা ছিল না। ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর কাদের মোল্লার আপিল মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। ১০ ডিসেম্বর রাতে তাঁর ফাঁসি কার্যকরের পদক্ষেপ নেয় সরকার। সেদিন নির্ধারিত সময়ের মাত্র দুই ঘণ্টা আগে চেম্বার বিচারপতির কাছে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন কাদের মোল্লা। ১২ ডিসেম্বর তাঁর আবেদন খারিজ করেন আপিল বিভাগ। ওই রাতেই কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কাদের মোল্লার পুনর্বিবেচনার আবেদনের পূর্ণাঙ্গ রায়ে পুনর্বিবেচনার আবেদনের জন্য ১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দেন আদালত।
রায়ে যা বলেছেন আদালত: মুজাহিদের পূর্ণাঙ্গ রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে এটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে মুজাহিদ মুক্তিযুদ্ধের সময় আলবদর বাহিনীর নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের আগমুহূর্তে বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার নীলনকশা হাতে নিয়ে বুদ্ধিজীবী নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল পাকিস্তানি সেনা ও গুপ্তঘাতক আলবদর বাহিনী। আর এই হত্যাকাণ্ডে মুজাহিদ প্ররোচনা, উসকানি, পরামর্শ ও সহায়তা করেছেন। বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতা শুধু হিটলারের গ্যাস চেম্বার গণহত্যার সঙ্গে তুলনীয়। তিনি নিঃসন্দেহে একজন যুদ্ধাপরাধী এবং এ জন্য তাঁকে ট্রাইব্যুনাল যে সাজা দিয়েছেন, শুধু সে সাজাই দেওয়া যায়।
সাকা চৌধুরীর রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, আসামি সর্বোচ্চ নির্মমতা ও চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংঘটিত করেছেন। তিনি বেসামরিক ও নিরস্ত্র মানুষকে নিপীড়ন করেছেন, তাঁদের নির্যাতন করে হত্যা করেছেন, নিরীহ মানুষদের গুম করেছেন এবং মানুষের সম্পদে বাধাহীন লুটতরাজ চালিয়েছেন। সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক কারণে তিনি এসব অপরাধ করেছেন পরিকল্পিতভাবে তাঁর প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার জন্য। ট্রাইব্যুনাল যে এ জন্য তাঁকে সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন, এতে হস্তক্ষেপ করার কোনো কারণই থাকতে পারে না।
জামায়াতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলাটিরও আপিল নিষ্পত্তি হয়েছে। আপিল বিভাগ তাঁকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। এর পূর্ণাঙ্গ রায় এখনো প্রকাশিত হয়নি।

Friday, September 18, 2015

প্রেসিডেন্ট পোস্ট অফিস নন -সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত by উৎপল রায়

প্রধান বিচারপতিকে অভিশংসনের প্রস্তাব করে প্রেসিডেন্টকে এক বিচারপতির চিঠি দেয়ার কঠোর সমালোচনা করেছেন প্রবীণ রাজনীতিবিদ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি বলেছেন, এটি অনভিপ্রেত ও অনাকাঙ্ক্ষিত। আমাদের জুডিশিয়ারির ইতিহাসে এ রকম ঘটনা আর ঘটেনি। সুপ্রিম কোর্ট সর্বোচ্চ সাংবিধানিক আদালত। বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল। এখানে মানুষ সব সময় ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করে। সুপ্রিম কোর্টের উপরে আর কোন আদালত নেই। সুপ্রিম কোর্টের অনিবার্যতা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। এছাড়া, রাষ্ট্র অচল। অন্যদিকে প্রধান বিচারপতির উপরে বিচারের ক্ষেত্রে একমাত্র সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কেউ নেই। এই জায়গাগুলোকে সমস্ত বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। তাই এটা নিয়ে যত কম কথা বলা যায় ততই ভাল।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত মানবজমিনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনের নিজ কার্যালয়ে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে নানা ইস্যুতে খোলামেলা কথা বলেন তিনি। মন্ত্রিসভার বাইরে থাকা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রায়শই সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্তেরও সমালোচনা করেন। প্রধান বিচারপতির অভিসংশন চেয়ে প্রেসিডেন্টের কাছে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীর চিঠি দেয়া প্রসঙ্গে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বিষয়টি ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত চলে গেছে। কেউ বলছেন, এটি আইনে নেই। কিন্তু একটি কথা সবাইকে বুঝতে হবে প্রেসিডেন্ট কিন্তু পোস্ট অফিস নয়। পোস্ট অফিসে চিঠি পাঠালে তার কাজ হলো চিঠিটি পাঠিয়ে দেয়া। আর তো কোন কাজ নেই। তবে, প্রেসিডেন্ট অনেক কিছুই করতে পারেন। আমাদের বর্তমান প্রেসিডেন্ট একজন অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ। একজন অভিজ্ঞ আইনজীবীও। তাই আমরা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে কিছু কিছু ব্যাপারে সমাধান আশা করতেই পারি। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, এখানে একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিএনপির আইনজীবীরা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ক্ষমতায় আছে। কিন্তু এ বিষয়ে তারা কথা বলছে সরকারি দলের মতো। আবার সরকারি দল রহস্যজনক কারণে নীরব। তারা চুপ করে আছে। আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাপতি হিসেবে আমিও এ বিষয়টির একটি পার্ট। কিন্তু এটিতো কোন গৌরবের বিষয় নয়। তবে,  বার ও বেঞ্চে অনেক অভিজ্ঞ জুরিস্টরা রয়েছেন। তাদের মধ্যস্থতায় বিষয়টি একটি মীমাংসায় উপনীত হবে বলে আমি আশা করবো।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র ওপর ভ্যাট আরোপ এবং আন্দোলনের মুখে তা আবার প্রত্যাহারের বিষয়ে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী ভ্যাট বসিয়েছেন। বাজেট হইলো কবে, আর প্রতিক্রিয়া হইলো কবে? তারা (শিক্ষার্থী) জানে না যে ভ্যাট পাস হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়া হলো বহু পরে। এখানে যে গ্যাপটা সেটা রাজনৈতিক সচেতনতার অভাব। কিন্তু পরে হলেও প্রতিক্রিয়া হলো, হয়ে আকস্মিকভাবে একটি অরাজনৈতিক জায়গা থেকে আন্দোলন হলো। আমি প্রথমেই বলেছিলাম শিক্ষা ফি’র ওপর এই ভ্যাট আরোপ অনৈতিক এবং এটা তুলে নেয়া ভাল। কারণ শিক্ষা একটি অধিকার। আমি ছাত্ররাজনীতি করে এসেছি। যে কারণে আমি প্রথমেই বলতে পেরেছি। আর যারা মন্ত্রিসভায় আছে তাদের তো আর আমার মতো ফ্রিস্টাইলে কথা বলার সুযোগ নাই।’
তিনি বলেন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না-কি নন প্রফিটেবল। কিন্তু নন প্রফিটেবল হলে এতদিন যে তারা প্রফিট করলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কি ঘাস কাটছিল? এখানে ভালভাবে মনিটরিং দরকার ছিল। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলন প্রসঙ্গে  সুরঞ্জিত সেন বলেন, রাজনীতিকে রাজনীতি দিয়েই মোকাবিলা করতে হবে। গণতান্ত্রিক সরকারের ডায়নামিক বলে কিছু কথা আছে। শেখ হাসিনার যে পার্টি এটাতো গ্যারেজের পার্টি না। রাজপথের পার্টি। এরা আন্দোলন করতেও জানে, আন্দোলন মোকাবিলা করতেও জানে। দুটি বিষয়ই তাদের জানা আছে। কত সুন্দরভাবে বিষয়টি হ্যান্ডেল করা হয়েছে। এটাকেই বলে পলিটিক্যাল ডায়নামিজম। তিনি বলেন, ‘অনেকেই বলছে অর্থমন্ত্রীর ইমেজ ডাউন হয়েছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রীর ইমেজ ডাউন হলে কিছু আসে যায় না। প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ ডাউন হলে কিছু আসে যায়। তবে, এই ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর পরাজয় হয়নি। বরং প্রধানমন্ত্রীর বিজয় হয়েছে। তার ইমেজ বেড়েছে। তার লাভ হয়েছে।’
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার লন্ডন সফরের বিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রবীণ এই নেতা বলেন, এর আগে তিনি সৌদি আরব সৌদি আরব করেছেন। তারপরও ওটা হয়নি। এবার তিনি লন্ডনে গেলেন। সৌদি আরব কেন হয় নাই, আর লন্ডন কেন হলো এটা সবাই জানে। লন্ডন থেকে ওনার ছেলে যদি একবার বাইরে বের হন তবে আর লন্ডনে ঢুকতে পারবে না। এ কারণেই খালেদা জিয়া সৌদি আরব যাননি। এখন কথা হলো, তিনি (খালেদা জিয়া) লন্ডনই যাক আর সৌদি আরবই যাক, একজন রাজনীতিবিদ যখন যেখানে যান না কেন তার সব কথা, চিন্তা, চেতনা রাজনীতিকে কেন্দ্র করেই। রাজনীতির বাইরে তিনি আর কিছুই পাবেন না। হবেও না।
সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থেকে বিএনপির অনেক কিছুই শিক্ষণীয় আছে। শিক্ষার্থীরা তো পেট্রলবোমা ও ককটেল মারে নাই। পেট্রলবোমা, ককটেল ছাড়াও কিভাবে অহিংস আন্দোলন করা যায় তা তারা দেখিয়েছে। এই ডায়নামিজমটা খালেদা জিয়া বুঝতে পারেন না। কারণ এরা তো ব্যারাকের পার্টি। আর ব্যারাকের পার্টি দিয়ে আন্দোলন হবে না। তিনি বলেন, বিএনপি ইতিমধ্যে যে সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড করেছে এগুলোর জবাবদিহির প্রশ্ন তার রাজনৈতিক দলের মধ্যেই এসে গেছে। ৫ই জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন এবং তা প্রতিহত করতে যাওয়া দলকে কতটুকু লাভবান করেছে আর কতটুকু ক্ষতি করেছে সেটাই এখন তারা (বিএনপি) হিসাব করছে। এখন আবার তিনি (খালেদা জিয়া) গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরেছেন। এই যে স্ববিরোধী আচরণ এটা তাকে শুধু জনগণ থেকেই বিচ্ছিন্ন করেনি রাজনীতি থেকেও বিচ্ছিন্ন করেছে। একই সঙ্গে দলের নেতাকর্মীরাও হতাশাগ্রস্ত। তাই এ বিষয়ে অবশ্যই চিন্তা কেবল মায়ের পুত্রের কাছে যাওয়া না, এটা রাজনীতির রাজনীতির কাছে যাওয়া।

Monday, September 14, 2015

১০ বছর পর কিবরিয়া হত্যার বিচার শুরু by ওয়েছ খছরু

সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গতকাল দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মকবুল আহসানের আদালতে দুই ঘণ্টা শুনানির পর দেশজুড়ে আলোচিত এ হত্যা মামলার চার্জগঠনের মাধ্যমে বিচারকাজ শুরু হয়েছে। মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপির শীর্ষ নেতা হারিছ চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের বরখাস্ত হওয়া মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জের বরখাস্ত হওয়া পৌর মেয়র জি কে গউছসহ ৩২ জনকে অভিযুক্ত করে বিচারকাজ শুরু হলো। এ সময় আদালত সিলেট সিটি করপোরেশনের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া গ্রেপ্তারকৃত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ ৫ জনের অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। চার্জগঠনের আগে অব্যাহতি আবেদনের শুনানি হয় বলে জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তবে আদালত বরখাস্ত হওয়া কারান্তরীণ মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর অসুস্থতার আবেদনটি আমলে নিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার চিকিৎসা-সংক্রান্ত রিপোর্ট পাঠাতে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছেন। সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া নিহত হয়েছিলেন ১০ বছর আগে। আলোচিত এ মামলার তদন্ত শেষ করতে দীর্ঘদিন লেগেছে। এরই মধ্যে পুলিশ, ডিবি ও সিআইডি এ মামলার তদন্ত রিপোর্ট দাখিল করে। গেল বছর সিআইডির করা অধিকতর তদন্ত রিপোর্টে বিএনপি নেতা হারিছ চৌধুরী, সিলেট সিটি করপোরেশনের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীসহ কয়েকজনকে নতুন করে চার্জশিটভুক্ত করা হয়। গেল বছর চার্জশিট দেয়ার পর চলতি বছরের জুন মাসে মামলাটি সিলেটের বিচারিক আদালত দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। ২১শে জুন দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলাটির প্রথম শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে সব আসামি উপস্থিত না থাকায় ইতিমধ্যে ৯ দফা তারিখ পেছানো হয়। অবশেষে দশ দফা শুনানিকালে মামলার চার্জগঠন করা হয়। গতকাল ছিল মামলার চার্জগঠনের শুনানির দিন। এ কারণে ঢাকায় থাকা সব আসামিকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসা হয়। গত মঙ্গলবার সর্বশেষ সিলেটে নিয়ে আসা হয় বরখাস্ত হওয়া মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে। তার অনুপস্থিতির কারণেই বারবার এ মামলার চার্জগঠন প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছিল। তাকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে আসার পর গতকাল সকালে অ্যাম্বুলেন্সে করে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয়। এ সময় সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আসামিদেন আনা হয় প্রিজন ভ্যানের একটি গাড়িতে। তাদের আদালতে আনার আগে গোটা আদালতপাড়ায় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এরপর সকাল সাড়ে ১০টায় একে একে সব আসামিকে নিয়ে আদালত এলাকায় প্রবেশ করে গাড়ি। বেলা ১১টার আগেই তাদের সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে তোলা হয়। আদালতে শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই একে একে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বরখাস্ত হওয়া মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানসহ ৫ জনের অব্যাহতির আবেদন করেন আইনজীবীরা। এর ফলে আদালতে অব্যাহতি আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। প্রায় এক ঘণ্টা শুনানির পর আদালত অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর আরিফুল হক চৌধুরীর স্বাস্থ্য সম্পর্কিত আবেদনের শুনানি হয়। শুনানিকালে উন্নত চিকিৎসার জন্য আরিফুল হক চৌধুরীকে বিদেশে নেয়ার কথা জানান আইনজীবীরা। আদালত তাদের আবেদন আমলে নিয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার স্বাস্থ্যগত রিপোর্ট আদালতকে অবহিত করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন আলোচিত এ মামলার কারাবন্দি আসামি সিলেট সিটি করপোরেশনের সাময়িক বরখাস্তকৃত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, হবিগঞ্জ পৌরসভার সাময়িক বরখাস্তকৃত মেয়র জি কে গউছ, হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি আবদুল হান্নান, দেলওয়ার হোসেন রিপন, বদরুল আলম, মিজানুর রহমান, হাফেজ নাঈম, মুহিবুল্লাহ, শরীফ শাহেদুল আলম, মুফতি মঈন উদ্দিন, আবদুল মাজেদ ভাট, শেখ মাওলানা আবদুল সালাম, শেখ ফরিদসহ জামিনে থাকা ৮ আসামি। ২০০৫ সালের ২৭শে জানুয়ারি হবিগঞ্জ সদরের বৈদ্যের বাজারে এক জনসভায় গ্রেনেড হামলায় নিহত হন সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া। হামলায় নিহত হন কিবরিয়ার ভাতিজা শাহ মনজুরুল হুদা, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রহিম, আবুল হোসেন ও সিদ্দিক আলী। এ ঘটনায় হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক আবদুল মজিদ খান হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা করেন। এ হত্যা মামলার ৩২ আসামির মধ্যে ১৪ জন কারাগারে, ৮ জন জামিনে এবং ১০ জন পলাতক রয়েছেন। দীর্ঘ ১০ বছর পর সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জগঠন পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ ১৯শে সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। আদালত সূত্র জানিয়েছে, ২২ আসামির জামিনের প্রার্থনাও করা হয়। ট্রাইব্যুনালের বিচারক দীর্ঘ শুনানি শেষে এ আবেদনগুলোও খারিজ করে দেয়া হয়। মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী কিশোর কুমার কর জানিয়েছেন, মামলার আসামি আরিফুল হক চৌধুরী অসুস্থ থাকায় কয়েক দফা পিছিয়ে ছিল আলোচিত এ মামলার চার্জগঠন। মামলায় কারাবন্দি ও জামিনে থাকা ২২ আসামির উপস্থিতিতে মামলার চার্জগঠন হয়। এ ছাড়া পলাতক ১০ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত। আগামী তারিখের মধ্যে তাদের আদালতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আরিফুল হকের পক্ষে দাখিলকৃত চিকিৎসার জন্য আবেদন মঞ্জুর করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মেডিক্যাল রিপোর্ট দাখিল করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন আরিফুল হকের পক্ষে নিয়োজিত আইনজীবী মোহাম্মদ লালা। তিনি বলেন, আমরা আদালতের কাছে তার অব্যাহতির আবেদনের পাশাপাশি অসুস্থতার আবেদন করি। আদালত তার অব্যাহতির আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। তবে, তার স্বাস্থ্যগত সমস্যা প্রকট। বিষয়টি আদালতকে জানানোর পর আদালত কারা কর্তৃপক্ষকে রিপোর্ট দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। এদিকে, আরিফের কারণেই বারবার পিছিয়ে গিয়েছিল চার্জগঠন প্রক্রিয়া। গত ৬ই সেপ্টেম্বর ছিল কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জগঠনের সর্বশেষ তারিখ। তবে আসামি কারাবন্দি আরিফুল হক চৌধুরী অসুস্থ থাকায় এবং তাকে আদালতে হাজির না করায় ওই দিন চার্জগঠন হয়নি। এর আগে গত ২১শে জুন, ৬, ১৪ ও ২৩শে জুলাই এবং ৩, ১০, ১৮, ২৫ ও ৬ই সেপ্টেম্বর আলোচিত এ হত্যা মামলার চার্জগঠনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু সব আসামি আদালতে হাজির করতে না পারায় চার্জগঠনের তারিখ পিছিয়ে যায়। সিলেট জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ জানিয়েছেন, বারবার তারিখ পেছানোর পর সব আসামি উপস্থিত থাকায় চার্জগঠন করা হয়েছে। আদালত আসামিপক্ষের ও রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য শুনে চার্জগঠন করেন। এর ফলে আলোচিত এ হত্যা মামলার ন্যায়বিচার দ্রুততম সময়ে পাওয়া যাবে বলে মনে করেন তিনি। হবিগঞ্জ আদালতের পিপি অ্যাডভোকেট মকবুল হোসাইন জানিয়েছেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে ত্রুততম সময়ের মধ্যে এ মামলার বিচার শেষ হওয়ার কথা। ৩ মাসের মধ্যে বিচার শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিচারক ইচ্ছা করলে কিছুটা সময় বাড়াতে পারেন। তবে, তিনি আশা করেন, খুব দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাদীপক্ষ ন্যায়বিচার পাবে।
আদালত প্রাঙ্গণে ভিড়: সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জগঠন উপলক্ষে দীর্ঘ ৮ মাস পর সিলেটের আদালতে আসেন সাময়িক বরখাস্ত হওয়া গ্রেপ্তারকৃত মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে। এ কারণে আদালত এলাকায় ভিড় করেন লোকজন। এর মধ্যে অধিকসংখ্যক উপস্থিতির মধ্যে ছিলেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। সিলেট জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতা দিলদার হোসেন সেলিম, অ্যাডভোকেট নুরুল হক, অ্যাডভোকেট আবদুল গফ্‌ফার, বিএনপি নেতা নাসিম হোসাইন, জেলা বিএনপি নেতা আলী আহমদ, বিএনপি নেতা ও সিটি কাউন্সিলর ফরহাদ চৌধুরী শামীম, মহানগর বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক জিয়াউল গনি আরেফিন জিল্লুরসহ সিনিয়র নেতারা আদালত এলাকায় উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি সিলেট সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। আরিফুল হক চৌধুরীকে সকাল পৌনে ১১টায় অ্যাম্বুলেন্স করে যখন আদালতে নিয়ে আসা হয়, তখন তাকে একনজর দেখতে ভিড় করেন সবাই। এ সময় কারা সদস্যরা হুইল চেয়ারসহ আরিফুল হক চৌধুরীকে গাড়ি থেকে নামান। এ সময় তাকে দেখে স্লোগান দেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। তাদের স্লোগানের সময় হুইল চেয়ারে বসে থাকা আরিফুল হক চৌধুরী কান্নায় ভেঙে পড়েন। অস্রুভেজা চোখে তিনি হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের অভিবাদন জানান। পরে কারা সদস্যরা তাকে হুইল চেয়ারে করেই আদালতে নিয়ে যান। শুনানিকালে আরিফ হুইল চেয়ারেই বসে থাকেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা তারা আদালতে ছিলেন। এ সময়ও নেতাকর্মীদের উপস্থিতি কমেনি। আদালত থেকে বের করে নেয়ার সময়ও বিষণ্ন ছিলেন আরিফ। এ সময়ও নেতাকর্মীরা তার সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা চালান। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষ নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যে তাকে ফের কারাগারে নিয়ে যান।

প্রধান বিচারপতির অভিসংশন চেয়ে বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরীর চিঠি

প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে অভিশংসনের (ইমপিচমেন্ট) আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি দিয়েছেন আপিল বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী। আজ রোববার প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে সংবিধান লঙ্ঘন, শপথ ভঙ্গের অভিযোগ এনে তিনি এই চিঠি পাঠিয়েছেন। রাতে চিঠির বিষয়ে বঙ্গভবন এবং আইন মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করে সূত্র জানান, তারা এ ধরণের কোনো চিঠি পাননি। তবে এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী আজ অভিশংসন চেয়ে যে চিঠি পাঠিয়েছেন সে বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। চিঠির অনুলিপি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। চিঠিতে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী তাকে বিচারিক বেঞ্চ হতে সরিয়ে দেয়া, তার প্রতি প্রতিহিংসা ও বৈষম্যমূলক আচরণসহ সুনির্দ্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগ করেন। চিঠির অনুলিপি তিনি প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি, আইনমন্ত্রী এবং সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের বিচারপতিগণের কাছে পাঠিয়েছেন। নয়া দিগন্তের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কাছে জানতে চাওয়া হলে রাতে তিনি জানান, এ ধরণের কোনো চিঠি তিনি এখনো পাননি।
বিচারপতির সংবর্ধনা নিয়ে আইনজীবীদের পাল্টাপাল্টি সভা ও মিছিল
আপিল বিভাগের বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীকে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প থেকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেয়া হবে কি না তা নিয়ে পাল্টাপাল্টি মিছিল ও সংপ্তি সমাবেশ করেছেন বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা।
বিষয়টি নিয়ে গতকাল বেলা সোয়া ১টায় সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে সাধারণ সভার আয়োজন করা হয় সমিতির শামসুল হক চৌধুরী হলে। সভায় এই বিচারপতিকে সংবর্ধনা না দেয়ার জন্য রেজুলেশন পাস করার সময় আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা দ্বিমত পোষণ করেন। এ সময় উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে বাগি¦তণ্ডা ও উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সভার ব্যানার ছিনিয়ে নিয়ে যান।
সভায় সভাপতিত্ব করছিলেন বারের সিনিয়র সহসভাপতি এ এস এম মোক্তার কবির খান। উপস্থিত ছিলেন সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল খায়ের, সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, সমিতির নির্বাহী পরিষদের সদস্য অ্যাডভোকেট মির্জা আল মাহমুদসহ বিএনপি ও আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা।
সভা শেষ হতে না হতেই মিছিল বের করেন দুই পক্ষের আইনজীবীরা। বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা মিছিল শেষে সমিতির সভাপতির করে সামনে সংপ্তি সমাবেশ করেন। মিছিলে নেতৃত্ব দেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সহসম্পাদক অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম তালুকদার রাজা, অ্যাডভোকেট আবেদ রাজা প্রমুখ। মিছিলে অংশ নেন বিএনপিপন্থী আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী সদস্য আইয়ুব আলী আশরাফী, মির্জা আল-মাহমুদ, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট পারভীন ইয়াসমিন প্রমুখ।
মিছিল শেষে সংপ্তি সমাবেশে বক্তারা বলেন, এই বিচারপতিকে সুপ্রিম কোর্টে সংবর্ধনা দেয়া হবে না। তারা সাবেক অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিএনপিপন্থী আইনজীবী অ্যাডভোকেট এম ইউ আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী পরোভাবে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন। এই বিচারপতিকে যেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি সংবর্ধনা না দেয় এ জন্য প্রতিদিন বেলা ১টায় কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা দেন বিএনপিপন্থী আইনজীবীরা।
অন্য দিকে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরীকে সংবর্ধনা দেয়ার পক্ষে সংপ্তি মিছিল করেন আওয়ামী লীগপন্থী আইনজীবীরা। এতে নেতৃত্ব দেন সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সাবেক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোমতাজ উদ্দিন আহমেদ মেহেদীসহ কয়েকজন আইনজীবী।

Sunday, September 13, 2015

অপারেশন ক্লিনহার্টে দায়মুক্তি অবৈধ

‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে পরিচালিত অভিযানের কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দিয়ে করা আইনটিকে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক উল্লেখ করে অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। রোববার বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি আশরাফুল কামালের হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ এ রায় দেয়। একটি রিট আবেদনে জারি করা রুলের চূড়ান্ত শুনানি শেষে আদালত এ রায় দেয়।  আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় ২০০২ সালের ১৬ই অক্টোবর থেকে ২০০৩ সালের ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ নামে যৌথ বাহিনীর অভিযান চলে। ওই অভিযানের কার্যক্রমকে দায়মুক্তি দিয়ে ২০০৩ সালের ২৪শে ফেব্রুয়ারি ‘যৌথ অভিযান দায়মুক্তি আইন, ২০০৩’ জারি করা হয়। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম  কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না ২০১২ সালের ১৪ জুন হাইকোর্টে রিট আবেদনটি করেন।  ওই বছরের ২৯ জুলাই আইনটিকে কেন সংবিধানের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ও বাতিল  ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিল হাইকোর্ট।

Friday, September 11, 2015

জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা: সাক্ষ্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে বিশেষ আদালতে তুমুল হট্টগোল

পুরান ঢাকার বকশিবাজার বিশেষ আদালতে হাজিরা
দিতে যাওয়ার সময় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে শুভেচ্ছা
জানান বেগম খালেদা জিয়া : নয়া দিগন্ত
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় নিয়মবহির্ভূতভাবে সাক্ষ্যগ্রহণকে কেন্দ্র করে আদালতে দুই পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল ও বাগি¦তণ্ডার ঘটনা ঘটেছে। একপর্যায়ে উত্তেজিত আইনজীবীরা মুখোমুখি অবস্থান নেন। খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে এক সাক্ষীর সাক্ষ্য পুনর্লিখন (রি-রাইট) করেন বিচারক। এ সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। গতকাল বৃহস্পতিবার জিয়া চ্যারিটেবল মামলার তিনজন সাক্ষীকে জেরা করেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা। তারা হলেন পূবালী ব্যাংক কর্মকর্তা এইচ এম ইসমাঈল, জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তা মকবুল আহমেদ ও ফাহমিদা রহমান। এ ছাড়া এই মামলার অষ্টম সাক্ষী সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ হাফিজুর রহমানের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয় এ দিন। এরপর আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন বিচারক আবু আহমেদ জমাদার।
মামলাটির বিচারকাজ চলছে ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ আদালতে। রাজধানীর বকশিবাজারে কারা অধিদফতরের মাঠে স্থাপিত এই বিশেষ আদালতের অস্থায়ী এজলাসে মামলাটি পরিচালনা করছেন বিচারক আবু আহমেদ জমাদার। দুদকের দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাও চলছে একই আদালতে।
গতকাল সকাল সাড়ে ১০টায় বিচারকাজ শুরু হয়। সাক্ষী পূবালী ব্যাংকের কর্মকর্তা এইচ এম ইসমাঈলকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে জেরা করেন সিনিয়র আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক খান ও অ্যাডভোকেট আমিনুল ইসলাম। তার জেরা চলাকালে বেলা ১১টায় আদালতে আসেন বেগম খালেদা জিয়া। বিচার চলাকালে প্রায় তিন ঘণ্টা আদালতে উপস্থিত ছিলেন তিনি। তার উপস্থিতিতেই বাকি সাক্ষীদের জেরা ও জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়। ক্রিম কালারের প্রিন্টের একটি শাড়ি পরে আদালতে এসেছিলেন সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। বিচার চলাকালে তাকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছিল।
খালেদা জিয়া আদালতে যাওয়ায় কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আদালতের ভেতরে ও বাইরে পুলিশ ও র‌্যাবের কয়েক শ’ সদস্য এই দায়িত্বে ছিলেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনকে তথ্য প্রদানকারী ব্যাংক কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান জব্দ তালিকার একটি বিবরণ উপস্থাপন করতে শুরু করলে তা নিয়মবহির্ভূত বলে শুরুতে বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন খালেদা জিয়ার আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন। কিন্তু বিচারক তার বক্তব্য আমলে না নিয়ে জবানবন্দী গ্রহণ করে যাচ্ছিলেন। পরে তাতে আরেক দফা আপত্তি জানান, সিনিয়র আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক খান। কিন্তু তাতেও কোনো ফল আসেনি। উভয়পক্ষের আইনজীবীরা এ সময় তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হন। তাদের মধ্যে তুমুল হট্টগোল ও বাগি¦তণ্ডা শুরু হয়। এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন মাইক হাতে নিয়ে আদালতকে উদ্দেশ করে বলেন, ১/১১-র সময় ক্যাঙারু কোর্টে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবীরা যেভাবে আচরণ করেছেন, এখানেও তারা সেভাবে আচরণ করছেন। এটা কোনো ক্যাঙারু কোর্ট নয়, এটা সাংবিধানিক কোর্ট। আমরা আদালতকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না। আমি ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে দেশের বিচারপ্রক্রিয়ার সাথে জড়িত। আমি দুই ঘণ্টা ধরে বিচারকাজ দেখছি। এখানে নিয়মানুযায়ী কিছু হচ্ছে না। জব্দ তালিকার একজন সাক্ষী কী কী ডকুমেন্ট দিয়েছেন, কেবল তার তালিকাটুকুই তিনি বলবেন। তার অন্য কোনো কথা গ্রহণযোগ্য হবে না।
এরপর ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন আদালত ত্যাগ করে চলে যাওয়ার কথা বলে উল্লেখ করেন, এখানে আইন অনুযায়ী বিচার হচ্ছে না। যদি আইন অনুযায়ী বিচার না হয়, তাহলে আমরা আইনজীবীরা এবং বেগম খালেদা জিয়া এই বিচারপ্রক্রিয়া বর্জন করব, আদালত ছেড়ে চলে যাবো। তিনি সাক্ষী হাফিজুর রহমানের দেয়া বিভিন্ন তথ্য বাদ দিতে দাবি জানান। ডিফেন্স আইনজীবীদের প্রতিবাদের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারক সাক্ষী হাফিজুর রহমানের সাক্ষ্য পুনর্লিখন করেন।
পূবালী ব্যাংক কর্মকর্তা এইচ এম ইসমাঈলকে আইনজীবী আমিনুল ইসলামের করা জেরার অংশবিশেষ নিচে তুলে ধরা হলো :
প্রশ্ন : দুদককে কাগজপত্র দেয়ার নির্দেশ কত তারিখে পেয়েছেন?
উত্তর : ২৫-৯-২০১১ইং তারিখে।
প্রশ্ন : আপনি দুদকের কোনো চিঠি পেয়েছেন?
উত্তর : আমার কাছে কোনো চিঠি আসেনি, চিঠি এসেছে ব্যাংকের কাছে।
প্রশ্ন : ব্যাংকের কাছে আসা দুদকের চিঠি কি আপনি দেখেছেন কখনো?
উত্তর : ২৫-৯-২০১১ইং তারিখে দেখেছি।
প্রশ্ন : আপনার কাছে কি এই মুহূর্তে চিঠিটা আছে?
উত্তর : নাই।
প্রশ্ন : তার মানে দুদকের চিঠিটা আপনি এখন আদালতে দেখাতে পারবেন না।
উত্তর : না।
প্রশ্ন : ওই চিঠিতে কী লেখা তা-ও বলতে পারবেন না।
উত্তর : না।
প্রশ্ন : আপনি তখন সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার ছিলেন। আপনি তত দিনে ব্যাংক বিষয়ে বিভিন্ন ট্রেনিং নিয়েছেন। ব্যাংকের কোনো ডকুমেন্ট কাউকে দিতে হলে সার্টিফাইড কপি দেয়ার নিয়ম আছে, অরিজিনাল কপি দেয়ার নিয়ম নাই। জানেন কি?
উত্তর : জানি।
প্রশ্ন : মূল কাগজগুলো আপনি নিজেই নিয়ে গেছেন দুদক অফিসে?
উত্তর : জি, আমি নিজেই নিয়ে গেছি।
প্রশ্ন : এর আগে দুদকের কোনো কর্মকর্তা ইন্সপেকশনের জন্য ব্যাংকে এসেছিল?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : আপনি যখন ডকুমেন্ট নিয়ে গেলেন, তখন ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আপনাকে একটা অফিস আদেশ দিয়েছিল, সেটা বের করুন।
উত্তর : এই মুহূর্তে নেই। (পরে আইনজীবীদের সহায়তায় বের করা হয়।)
প্রশ্ন : এটা তো অফিস আদেশ?
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : অফিস আদেশ ‘পূবালী/নয়াপল্টন/বিবিধ/৬২৩৭/২০১১’, তারিখ : ২১-৯-১১ এই স্মারকবলে আপনি ডকুমেন্টগুলোর মূল কপি দুদক কার্যালয়ে নিয়ে যান?
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : আপনি যে চিঠি নিয়ে যান, এটা কি সেই চিঠি (চিঠির কপি দেখিয়ে)?
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : এই চিঠির নিচে প্রাপ্তি স্বীকারের জন্য অনুরোধ করা আছে এবং কার্য সম্পাদনের পর মূল কপি ফেরত দেয়ার জন্য বলা আছে?
উত্তর : জি।
প্রশ্ন : এই স্মারক নম্বরে দুদকের কোনো কর্মকর্তার প্রাপ্তি স্বীকার আছে?
উত্তর : নাই।
প্রশ্ন : ডকুমেন্টগুলোর মূল কপি রাখা হয়েছে বা ফেরত দেয়া হয়েছে, সেটাও লেখা নাই?
উত্তর : নাই।
প্রশ্ন : এই অফিস আদেশে আপনার (এইচ এম ইসমাঈল) কোনো নাম উল্লেখ আছে?
উত্তর : না, নাই।
প্রশ্ন : এই আদেশে ব্যাংক কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরের নিচে কোনো তারিখ বা সিলমোহর আছে?
উত্তর : না, নাই।
প্রশ্ন : এই চিঠিতে একটি সঞ্চয়ী ও একটি চলতি হিসাবের কথা আছে। দু’টিতেই হিসাবের পূর্ণ ডিজিটগুলো নাই।
উত্তর : না, নাই।
প্রশ্ন : এই আদেশে দুদকের একটি পত্রের কথা উল্লেখ আছে? পত্রে দুদক কী কী কাগজ চেয়েছে তার কোনো উল্লেখ আপনাকে দেয়া অফিস আদেশে নাই?
উত্তর : না, নাই।
প্রশ্ন : এই কাগজগুলো আপনি যখন দুদক অফিসে নিয়ে যান, তখন বা তার আগে আপনি কি সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টধারীদের জানিয়েছিলেন বা তাদের চিঠি দিয়েছিলেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : কাগজ সরবরাহের সময় সেশন জজের আদেশের কথা বলেছেন জবানবন্দীতে। সেই আদেশের সাথে দুদকের বিবরণ ছিল। সেই বিবরণের ‘ছ’ ক্রমিকে আছে যে, চেকের মূল কপি ও ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ‘রেকর্ডগুলো’ দিতে হবে। এই ‘রেকর্ডগুলো’ বলতে কী চেয়েছিল দুদক, তা পরিষ্কার করতে কোনো চিঠি পেয়েছিলেন?
উত্তর : না, পাইনি।
প্রশ্ন : চিঠিতে ইন্সপেকশন করা, কোনো ডকুমেন্ট উপস্থাপন করা বা কোনো রেকর্ডের সার্টিফাইড কপি দেয়ার কথা স্পষ্ট করে বলা নেই?
উত্তর : না, নাই।
প্রশ্ন : আদেশের শেষ লাইনে বলা আছে, বর্ণিত আলামত জব্দ করার অনুমতি দেয়া হলো।
উত্তর : আছে।
প্রশ্ন : এই অফিস আদেশ বেআইনি ছিল। আপনারা বেআইনি আদেশ বলে বেআইনি কাজ করেছেন এবং গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করেছেন।
উত্তর : সত্য নয়।
এ সময় আইনজীবী বলেন, শতভাগ সত্য।
প্রশ্ন : জব্দকৃত রেকর্ডের মধ্যে প্রদর্শনী ৫-এ সঞ্চয়ী হিসাব হলো- ২৪৩৮১০১০৪৪৭৪। কিন্তু আপনার অফিস আদেশে হিসাব নম্বর হলো- ৪৪০৭। অর্থাৎ জব্দতালিকার হিসাব নম্বর ও আপনার অফিস আদেশের হিসাব নম্বর এক নয়।
উত্তর : সত্য নয়।
এ সময় আইনজীবী বলেন, সত্য নয়তো কী? এটা তো রেকর্ডে আছে।
প্রশ্ন : আপনি দুদকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অবৈধ আদেশে ভীত হয়ে ব্যাংকের গ্রাহকের গচ্ছিত ডকুমেন্ট ও তথ্য গ্রাহকের সাথে বিশ্বাস ভঙ্গ করে দুদককে সরবরাহ করেছেন।
উত্তর : ইহা সত্য নহে।
প্রশ্ন : গ্রাহক সম্পর্কে মিথ্যা ও ভুল তথ্য সরবরাহ করেছেন।
উত্তর : ইহা সত্য নহে।
প্রশ্ন : এই হিসাব নম্বরের তথ্য সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের অনুমতি ছাড়া দেয়ার আইনগত অধিকার আপনার ছিল না।
উত্তর : ইহা সত্য নহে।
প্রশ্ন : আপনি কোনো কারণ ছাড়া সংশ্লিষ্ট হিসাবের তথ্য দুদককে সরবরাহ করেছেন।
উত্তর : ইহা সত্য নহে।
প্রশ্ন : আপনি যে অফিস আদেশের বলে দুদককে তথ্য দিয়েছেন সেই আদেশে ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন দু’জন কর্মকর্তার অনুমোদন ছিল। আজ যে আপনি সাক্ষী দিতে এসেছেন, এখন কি তাদের অনুমতি নিয়েছেন?
উত্তর : না।
প্রশ্ন : আপনি অসত্য স্যা দিয়েছেন।
উত্তর : ইহা সত্য নহে।
এ দিকে আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার অনুলিপি না পাওয়ার কথা বলে সময়ের আবেদন করলে বিচারক তা নথিভুক্ত করে রাখেন। এ ছাড়া বেগম খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাবেন বলে জানানো হলে বিচারক বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দেশের বাইরে যেতে পারেন। তবে তার পক্ষে আইনজীবীরা প্রতিনিধিত্ব করবেন।
জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে জমি কেনা প্রশ্নে অবৈধভাবে ৬ কোটি ৫২ লাখ ৭ হাজার টাকা লেনদেনের অভিযোগ এনে খালেদা জিয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের ৮ আগস্ট তেজগাঁও থানায় জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলাটি করে দুর্নীতি দমন কমিশন। এ ছাড়া জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০০৮ সালের ৩ জুলাই রমনা থানায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা করে প্রতিষ্ঠানটি। মামলায় ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়।

Thursday, September 10, 2015

দেশে দেওয়ানি মামলা ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫৭

আইন বিচার ও সংসদবিষয়কমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, দেশে সর্বমোট বিচারাধীন দেওয়ানী মামলার সংখ্যা ১৩ লাখ ৪৬ হাজার ৪৫৭টি। এর মধ্যে ৩০ জুন ২০১৫ পর্যন্ত সুপ্রিম কোটের আপিল বিভাগে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ১২ হাজার ৬৬৯টি, হাইকোট বিভাগে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার সংখ্যা ৮৬ হাজার ৪টি, জেলা জজ আদালত সমুহে বিচারাধীন দেওয়ানী মামলার সংখ্যা ১১ লাখ ১৯ হাজার ৮১২টি। এছাড়া অপির্ত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ মামলার সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজার ৯৮২টি।
সংসদে প্রশ্নোত্তরে আজ মঙ্গলবার এম আব্দুল লতিফ বিশ্বাসের (চট্টগ্রাম-১১) এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এই তথ্য জানান। বিকালে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
আইন মন্ত্রী জানান, ভূমি সংক্রান্ত মামলাগুলো দেশে বিদ্যমান দেওয়ানী আদালত সমুহে নিস্পত্তি হচ্ছে। জমি জরিপ সংক্রান্ত বিরোধী নিস্পত্তির জন্য ৪২টি জেলায় ল্যান্ড সার্ভে? ট্রাইব্যুনার রয়েছে। এছাড়া ল্যান্ড সার্ভে আপীলাত ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধী আছে। ভূমি সংক্রান্ত মামলা নিস্পত্তির জন্য পৃথক ভূমি ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা আপাতত; সরকারের নেই।
দেশে প্রচলিত আইন ১০৫৭টি
দিদারুল আলমের (চট্টগ্রাম-৪) এক প্রশ্নের জবাবে আইন মন্ত্রী আনিসুল হক জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ প্রচলিত আইনের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৫৭টি।
জন প্রশাসন ক্যাডারে নারী কর্মকর্তা ২৯৮ জন
বেগম পিনু খানে এক প্রশ্নের জবাবে জন প্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানান, জন প্রশাসন ক্যাডারে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা ২৯৮জন। জন প্রশাসনে সচিব হিসেবে ৪জন, যুগ্ম সচিব্ হিসেবে ১০৮ জন এবং উপসচিব হিসেবে ১৮৬জন নারী কর্মরত আছেন। জেলা প্রশাসকদের মধ্যে ৩জন নারী কর্মরত আছেন। নারী পুরুষ নির্বিশেষে পদোন্নতি ও পদায়ন একটি স্বাভাবিক রুটিন কাজ। এই সংখ্যা হ্রাস/বৃদ্ধি একটি চলমান প্রক্রিয়া। ১ সে্েপ্টম্বর ২০১৫ পর্যন্ত মাতৃকালীন ছুটি, লিয়েন ও প্রশিক্ষন ইত্যাদি কারণে ৪১ জন নারী কর্মকর্তা ওএসডি আছেন।
বিএনপির আমলে ৪২ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামুলক অবসর প্রদান
নুরজাহান বেগমের এক প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম জানান, বিগত বিএনপি সরকারের সময় ৪২ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে ৫ জন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়েছে।

Tuesday, September 8, 2015

রাষ্ট্রধর্মের বৈধতা প্রশ্নে করা রিট আবেদন খারিজ

ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার বৈধতা প্রশ্নে দায়ের করা একটি রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. এমদাদুল হক ও বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের বেঞ্চ আজ সোমবার এই আদেশ দেন।
আদালতে আবেদনের পক্ষে রিটকারী আইনজীবী সমেন্দ্র নাথ গোস্বামী নিজেই শুনানি করেন। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল খোরশেদুল আলম।
খোরশেদুল আলম পরে সাংবাদিকদের বলেন, আদালত আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দিয়েছেন।
১৯৮৮ সালে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা এবং ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ফিরিয়ে আনার পরও রাষ্ট্রধর্ম বহাল রাখার বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে গত আগস্টে এই রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সমেন্দ্র নাথ গোস্বামী। ওই বিধান কেন সংবিধানের সাথে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে রুল চেয়েছিলেন তিনি। তার আবেদনে আইন সচিবকে বিবাদি করা হয়েছিলো।
এ বিষয়ে ৩০ আগস্ট শুনানি শেষে আদালত আদেশের দিন ঠিক করে দিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় আজ সোমবার আদালত খারিজের আদেশ দেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৮ সালের ৫ জুন চতুর্থ জাতীয় সংসদে অষ্টম সংশোধনী অনুমোদন হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানে অনুচ্ছেদ ২-এর সাথে ২(ক) দফা যুক্ত হয়। এতে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম হবে ইসলাম, তবে অন্যান্য ধর্মও প্রজাতন্ত্রে শান্তিতে পালন করা যাইবে।’
২০১১ সালের ২৫ জুন আনা পঞ্চদশ সংশোধনীতে ওই অনুচ্ছেদ আবার সংশোধন করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, তবে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমমর্যাদা ও সমঅধিকার নিশ্চিত করবে।’
রিট আবেদনকারীর যুক্তি, একটি নির্দিষ্ট ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ২(ক) অনুচ্ছেদটি সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদের পরিপন্থি যেখানে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ তথা সংবিধানের প্রাধান্যের বিষয়ে বলা হয়েছে। আবেদনে বলা হয়, অনুচ্ছেদটি সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সংক্রান্ত অষ্টম অনুচ্ছেদেরও পরিপন্থি, যেখানে ‘জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা এবং এসব নীতি থেকে উদ্ভূত অন্য সব নীতিকে রাষ্ট্র পরিচালনার ‘মূলনীতি’ ঘোষণা করা হয়েছে।