Friday, October 10, 2014

অ্যান্টিবায়োটিক কম দিতে চিকিৎসকদের পরামর্শ

গত কয়েক বছরে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে (প্রেসক্রিপশন) অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দেওয়ার হার বেড়েছে। অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় জটিল সংক্রমণের ক্ষেত্রে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে বলে গবেষকেরা সতর্ক করেছেন।

যুক্তরাজ্যের পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ড (পিএইচই) নামের একটি সংস্থা অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের ফলে কী কী সমস্যা হতে পারে, তা নিয়ে কাজ করেছে। আর সংস্থাটির গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে আজ শুক্রবার দ্য গার্ডিয়ান-এর এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
পিএইচইর গবেষকেরা বলছেন, চিকিৎসকদের অবশ্যই অধিক অ্যান্টিবায়োটিক বাদ দেওয়া উচিত। কারণ, অধিক অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণে গুরুতর সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়।
গবেষকেরা আরও জানান, অধিক অ্যান্টিবায়োটিক সেবনে এর কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি জানা সত্ত্বেও এ বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার হার বেড়েছে। ২০১০ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দেওয়ার হার গড়ে ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পিএইচইর তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে হাসপাতালের চিকিৎসকেদের অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দেওয়ার হার ১২ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে দাঁতের চিকিৎসকেদের ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দেওয়ার হার বেড়েছে ৩২ শতাংশ পর্যন্ত।
পিএইচইর গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের পরামর্শ দেওয়ার হার অবশ্যই কমাতে হবে। কারণ, এই হার বাড়তে থাকলে তা সরাসরি জীবনঘাতী সমস্যা তৈরি করবে, যা আদৌ নিরাময় করা সম্ভব হবে না।
পিএইচইর গবেষক অ্যান্থনি ক্যাসেল এ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ এই সময় একটি বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তাঁর যুক্তি হচ্ছে, চিকিৎসক ও চিকিৎসা সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার কমাতে হবে। অন্যথায় এই কার্যকর ওষুধটিও একসময় তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলবে।
যুক্তরাজ্যের রয়েল কলেজ অব জেনারেল প্র্যাকটিশনার্সের চেয়ার অব কাউন্সিল মরিন বেকার বলেছেন, ‘অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ক্ষেত্রে পারিবারিক চিকিৎসকেদেরও এগিয়ে আসতে হবে। কিন্তু চিকিৎসকেরা অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার জন্য খুব চাপে থাকেন। অনেক সময় সাধারণ উপসর্গের ক্ষেত্রেও তাঁদের ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের জন্য পরামর্শ দিতে হয়। অথচ অন্যান্য ওষুধেও তা নিরাময় সম্ভব।

‘হুদ হুদ’ প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত

ঘূর্ণিঝড় ‘হুদ হুদ’ উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর ও ঘণীভূত হয়ে অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। এটি অবস্থান করছে পশ্চিম মধ্যবঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন পূর্ব মধ্যবঙ্গোপসাগর এলাকায়।

ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সর্তকতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আবহাওয়া অধিদপ্তর শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার বুলেটিনে এ তথ্য দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ঘূর্ণিঝড়টি সন্ধ্যা ৬টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৯৭৫ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৯১০ কিমি দক্ষিণপশ্চিমে, মংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৮৮০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর থেকে ৮৭০ কিমি দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে অবস্থান করছে। এটি আরও ঘণীভূত হয়ে পশ্চিম-উত্তরপশ্চিম দিকে অগ্রসর হতে পারে। এ সময় ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১২০ কিমি থেকে ১৪০ কিমি পর্যন্ত লক্ষ্য করা গেছে।
অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর এবং সমুদ্র বন্দরসমূহের উপর দিয়ে ঝড়োহাওয়া বয়ে যেতে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। গভীর সাগরে অবস্থানরত মাছধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। ভারতের আবহাওয়া দপ্তর বলছে, ১২ অক্টোবর নাগাদ ঝড়টি বিশাখাপত্তম ও গোপালপুরের মধ্যবর্তী এলাকা দিয়ে অন্ধ্র উপকূল অতিক্রম করতে পারে। গত বছর অক্টোবর-নভেম্বরে পাইলিন, হেলেন ও লহর নামে তিনটি ঘূর্ণিঝড় অন্ধ্র উপকূলে আঘাত হানে। এর আগে ১৯৯৯ সালের অক্টোবরে উড়িষ্যায় তাণ্ডব চালিয়ে যায় একটি সুপার সাইক্লোন, যাতে অন্তত ১৫ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।
এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সাগর তীরের আট দেশের আবহাওয়া দপ্তর ও বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্যানেলে ‘হুদ হুদ’ নামটি প্রস্তাব করে ওমান। হুদহুদ আরবের একটি পাখি, যার মাধ্যমে নবী সুলাইমান (আ.) সেবার রানী বিলকিসকে পত্র পাঠাতেন।

১৬০০ রাজনীতিক ও আমলার দায়মুক্তি by নিয়াজ মাহমুদ

ঢাকঢোল পিটিয়ে সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী রাজনীতিক এবং আমলাদের দুর্নীতির বিষয়ে অনুসন্ধান শুরু করেছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ বিষয়ে গণমাধ্যমের জন্য নিয়মিত ব্রিফিংও করা হয় সময়ে সময়ে। কিন্তু তদন্তাধীন এসব ঘটনায় বেশির ভাগই দায়মুক্তি পেয়ে যাচ্ছেন। অনেকটা গোপনেই মামলা নথিভুক্ত করে দায়মুক্তির ‘সনদ’ দিচ্ছে কমিশন। তিন বছর আট মাসে কমিশন বিলুপ্ত ব্যুরোসহ ৫৩৪৯টি দুর্নীতির অনুসন্ধান নথিভুক্ত করে আসামিদের দায়মুক্তি দিয়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি বছর আগস্ট মাস পর্যন্ত প্রায় ১৬০০ রাজনৈতিক ব্যক্তি ও উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতির অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দেয়া হয়েছে। এই আট মাসে  ৯০৪টি দুর্নীতির অভিযোগের  মধ্যে ৮৭০ জনের বিরুদ্ধে কোন মামলা দায়ের হয়নি। এছাড়া, ৩০৭টি মামলায় ৭১৮ জন আসামির বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ না পাওয়ায় তাদেরকে দায়মুক্তি  দিয়ে  চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে আলোচিত পদ্মা সেতু দুর্নীতির অভিযোগ থেকে সাবেক  যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনসহ ১০ জনকে দায়মুক্তি দেয় দুদক। তাদেরকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি) দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে- মামলার যথার্থতা না থাকা, তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য, সাক্ষী না পাওয়ায় মামলাটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নথিভুক্ত করেছে কমিশন। সর্বশেষ সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হককেও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি দিয়েছে দুদক। এছাড়া, আট মাসে দুর্নীতির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পাওয়াদের মধ্যে আরও রয়েছেন-জাতীয় সংসদের উপনেতা ও সাবেক বনমন্ত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, সাবেক এমপি এইচবিএম ইকবাল, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী, মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, মোহাম্মদ নাসিম, ফিলিপাইনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাজেদা রফিকুন নেসা, পেট্রোবাংলার জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) আইয়ুব খান চৌধুরী, সিআইডি’র সাবেক পুলিশ সুপার এম রফিকুল ইসলাম, রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক এম আবু তাহের, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক কর কমিশনার এমদাদুল হক প্রমুখ। এমনকি  রেলের নিয়োগ দুর্নীতিতে যুক্ত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া পূর্বাঞ্চলীয় মহাব্যবস্থাপক (জিএম) ইউসুফ আলী মৃধাও দুদকের করা পাঁচটি মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
রুহুল হক ছাড়া আরও যেসব সাবেক মন্ত্রী-এমপিকে জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ নিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে দুদক অনুসন্ধান করে তাদের মধ্যে সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান, সাবেক পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান, সরকারি দলের এমপি আসলামুল হক, এনামুল হক ও আবদুর রহমান বদি, বিএনপির দুই সাবেক এমপি শহীদ উদ্দীন চৌধুরী ও মসিউর রহমান এবং জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি আবদুল জব্বার। তাদের মধ্যে আবদুল মান্নান খান, মাহবুবুর রহমান ও আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। শহীদ উদ্দীন চৌধুরী ও আবদুল জব্বারের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আর আসলামুল হককে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অনেকটা ঘোষণা দিয়ে দুদক এসব অনুসন্ধান শুরু করলেও দায়মুক্তি দিয়েছে অনেকটা নিভৃতে। এর আগে উচ্চ আদালতের আদেশে ২০৫টি রুল কমিশনের বিপক্ষে গেছে বলে দুদক জানিয়েছে। এতে শেখ হাসিনার ৯টি মামলা রয়েছে (২০০৯ থেকে ২০১২) সালের মধ্যে। তবে মহাজোট সরকারের আমলে কোন মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি বলে দাবি করেছে দুদক। অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে দুদকের মামলা দায়েরের সংখ্যা খুবই কম এমন প্রশ্নে দুদকের উপ-পরিচালক জনসংযোগ প্রণব কুমার মজুমদার মানবজমিনকে বলেন, মামলা দায়েরের সহায়ক নথিপত্রের অপ্রাপ্যতা, অভিযোগের সত্যতা ও অনেক সময় সাক্ষী খুঁজে না পাওয়া, অনুসন্ধান প্রক্রিয়ায় অভিযোগকারীর সহায়তা করতে না চাওয়া, মৃত্যু মূল কারণ।  এছাড়া, অনেক প্রশাসনিক কার্যালয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নথিপত্র ধ্বংস করা। মামলার অনুসন্ধান প্রমাণে এসব আবশ্যিক। কিন্তু নথি পাওয়া যাচ্ছে না। দুদকের মামলার বেশির ভাগ সাক্ষী সরকারি কর্মকর্তা। দীর্ঘসূত্রতার কারণে মামলায় সাক্ষী দিতে আসেন না তারা। আর নথিপত্র ধ্বংস তো রয়েছেই। এসব কারণে অনুসন্ধানের ওপর ভিত্তি করে  দুদকের মামলা দায়েরের সংখ্যা কম। তবে দুদকের মামলায় শাস্তির সংখ্যা নেহায়েত কম নয় বলে দাবি করেন জনসংযোগ কর্মকর্তা। তিনি বলেন- ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক  রফিকুল আমীন, হল-মার্কের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভিরসহ দুর্নীতির মামলায় অনেকেই কারাগারে। তবে একটি সূত্র জানায়, দুদকের মামলায় দুর্বল চার্জশিট ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের কারণে শাস্তির সংখ্যা কমে গেছে। এ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান বলেন, বর্তমান কমিশন কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করেনি। অনুসন্ধানে যা পাওয়া যায় তার ভিত্তিতেই মামলা হয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে দুদক কাজ করছে যারা এমন অভিযোগ করছেন তারা না জেনেই বলছেন। দুদক চেয়ারম্যান বলেন, কে সরকারি দল কে বিরোধী দল তা আমাদের কাছে মুখ্য নয়। আমরা যে দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা পাবো তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো। ওদিকে, দুদকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ১৬২৪টি অভিযোগের মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন  পেশের আগেই ১২১৫টি দুর্নীতির অভিযোগ বাতিল হয়ে যায়। ৪০৯টি অভিযোগ বাতিল করা হয়  প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করার পর। গত বছর ৩৫০টি অভিযোগ গ্রহণ করে দুদক এবং ১০৫ জনকে সম্পদের হিসাব দাখিলের নোটিশ দেয়া হয়। ২০১৩ সালে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কয়েকজন সিনিয়র নেতা ও দলটির সঙ্গে সংশিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে অভিযোগসমূহ আনা হয়েছিল,  সেগুলো খারিজ করে দিয়েছে কমিশন। এর মধ্যে এইচবিএম ইকবাল ছাড়াও আবুল হাসানাত আবদুল্লাহর দুর্নীতির দু’টি অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি  দেয় কমিশন। ২০০২ সালে অবৈধ সম্পদ অর্জন  করার অভিযোগ দু’টি আনা হয়েছিল। ২০১৩ সালের জুন মাসে মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে দুর্নীতির একটি অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দেয় দুদক। ২০০১ সালে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে জাতীয় আদমশুমারি প্রকল্পে ৯৪ কোটি টাকা অপব্যবহারের অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে। ২০০৭ সালে কমিশন অভিযোগটি দাখিল করেছিল। ২০১৩ সালে দুদক যাদের অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছিল, সে তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী এটিএম গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, সাবেক আইনপ্রণেতা আবদুল কাদের খান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী সচিব এম আবদুল মতিন ও চট্টগ্রামের সাবেক পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট ইফতেখার আহমেদ। অন্যদিকে কিছু রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলার আইনি  প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে  দুদক। এ তালিকায় রয়েছেন বিএনপির মওদুদ আহমদ, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা, সাবেক স্পিকার জমিরউদ্দিন সরকার, এম মোর্শেদ খান, আলী আসগর লবি ও তার পরিবারের সদস্য,  মোসাদ্দেক আলী ফালু, এহছানুল হক মিলন, একেএম  মোশাররফ  হোসেন, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও তার পরিবারের সদস্যরা।
টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান মানবজমিনকে এ বিষয়ে বলেন, হলফনামা অনুযায়ী সম্পদ বাড়ার অভিযোগে কারও বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে অব্যাহতি দিলে (কারও সম্পদ পাঁচ গুণ, ১০ গুণ) প্রশ্ন থেকেই যাবে। তিনি বলেন, দুর্নীতি বেড়েছে। এসব অনুসন্ধান করতে গিয়ে হাবুডুবু খাচ্ছে কমিশন। তাদের উচিত হবে একটি নীতিমালা করে যে সব বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ তা অগ্রাধিকার দিয়ে তদন্ত করা।
আলোচিত পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলার ফাইল ক্লোজড: পদ্মা সেতু দুর্নীতির মামলায় গত ৩রা সেপ্টেম্বর দশ আসামিকে অব্যাহতি দিয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (এফআরটি) দিয়েছে দুদক। মামলার যথার্থতা না থাকা, তদন্তে পর্যাপ্ত তথ্য, সাক্ষী না পাওয়ায় এ মামলাটি চূড়ান্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে নথিভুক্ত করেছে কমিশন। তবে কানাডা থেকে লাভালিন কর্মকর্তা রমেশের ডায়েরি অথবা কানাডা থেকে মামলা প্রমাণের মতো প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পেলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত কিংবা নতুন করে দায়ের করা হবে বলে দুদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ঢাকঢোল পিটিয়ে ২০১২ সালের ১৭ই ডিসেম্বর রাজধানীর বনানী থানায় এ মামলা দায়ের করে দুদক। এ মামলায় সেতু বিভাগের সাবেক সচিব মোশাররফ  হোসেইন ভূঁইয়া, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী কাজী মো.  ফেরদৌস, সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী  মো. রিয়াজ আহমেদ জাবের, ইপিসি’র উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম  মোস্তফা, কানাডীয় প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠান এসএনসি লাভালিনের ভাইস প্রেসিডেন্ট  কেভিন ওয়ালেস, আন্তর্জাতিক প্রকল্প বিভাগের প্রাক্তন ভাইস প্রেসিডেন্ট রমেশ শাহ ও সাবেক পরিচালক  মোহাম্মদ ইসমাইল এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন। এছাড়া, মামলার এজাহারে সন্দেহভাজনের তালিকায় ছিলেন সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল  হোসেন ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান  চৌধুরী।  পরে সংবাদ সম্মেলনে চেয়ারম্যান  মো. বদিউজ্জামান বলেন, প্রাথমিক সত্যতা আর চূড়ান্ত সত্যতা এক নয়। পদ্মা সেতু দুর্নীতির ষড়যন্ত্র মামলার প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তি ছিল পত্রিকার তথ্য ও বিশ্বব্যাংকের আশ্বাস। বিশ্বব্যাংকের আশ্বাসের ভিত্তিতে মামলা দায়ের করা হলেও মামলা প্রমাণের জন্য দাতা সংস্থা ও কানাডা থেকে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে হলো। এদিকে, দুদকের বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৩ ও  আগস্ট-২০১৪ পর্যন্ত প্রতিবেদন-এ বলা হয়েছে বিলুপ্ত ব্যুরোরসহ মোট ১২৩০০টি অনুসন্ধান হাতে নেয় সংস্থাটি। তিন বছরে বিশেষ জজ আদালতে  বিচারাধীন ৩৬৭২টি দুর্নীতির মামলায় শাস্তি হয়েছে মাত্র ৬৯০টিতে। এর মধ্যে দুদকের মামলা ২৩৮০টি। বিলুপ্ত ব্যুরোর ১২৯২টি। এছাড়া, ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দুদকের ১৫৯৮টি মামলা বিশেষ জজ আদালতে নিষ্পত্তি হয়। এরমধ্যে ৯০৮টি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছেন। সাজা হয়েছে  মাত্র ৬৯০টি মামলায়। একই সময়ে  স্থগিত হয়েছে ৭৫৪টি মামলা। এছাড়া, চলতি বছর  জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাসে যাচাই-বাছাই করে ৬৯১টি অভিযোগ অনুসন্ধানের জন্য গ্রহণ করে দুদক। এরমধ্যে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ১৪৬টি অভিযোগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হয়। আগস্ট মাসে কমিশন ১৮টি মামলা ও ১৭টি চার্জশিট দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি  জানুয়ারি  থেকে আগস্ট পর্যন্ত ১৯৩টি মামলা, ৩৩৮টি চার্জশিট দাখিল ও ৩০৪টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিলের অনুমোদন দিয়েছে কমিশন। এছাড়া, আগস্ট মাসে ১০টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে দু’টিতে সাজা ও আটটি মামলায় আসামিরা খালাস পেয়েছে।

টাঙ্গাইলে নৃশংসতা: ঘাতক জাহাঙ্গীর এখনও নিখোঁজ

স্ত্রী ও তিন মেয়েকে হারিয়ে পারিবারিকভাবে নিঃসঙ্গ মজিবর রহমান বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। নির্মম এ ঘটনায় তাকে সান্ত্বনা  দেয়ার কোন ভাষা নেই এলাকাবাসী ও স্বজনদের। কিন্তু তাদের চোখে ও মুখে ক্ষোভ, কেন এখনও প্রধান আসামি ও নৃশংস এ ঘটনার হোতা বখাটে জাহাঙ্গীরকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে পারছে না। এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে বখাটে জাহাঙ্গীর আলমের ছোট ভাই হানিফ মিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়েছে। ঘটনার পর পরই গ্রেপ্তারকৃত রিকশাচালক আলী হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারা জবানবন্দি দেবে বলে জানিয়েছেন টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর।  গ্রেফতারকৃত অপর আসামিরা হলো জাহাঙ্গীরের চাচী নাছিমা আক্তার, খালা রহিমা বেগম ও জাহাঙ্গীরের বন্ধু সুশান্ত। এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে ও জড়িতদের বিচার দাবিতে টাঙ্গাইল শহরের নিরালা মোড়ে গতকাল দুপুরে মানববন্ধন করেছে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন। মির্জাপুরের সোহাগপাড়া গ্রামে প্রবাসী মজিবর রহমানে বাড়িতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সান্ত্ব্তনা ও সমবেদনা জানাতে যান বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। মজিবর রহমানের স্ত্রী হাসনা বেগম, তিনি মেয়ে মনিরা আক্তার (১৪), বাক প্রতিবন্ধী মীম আক্তার (১১) ও চার বছরের শিশু কন্যা মিলি আক্তারের নির্মম হত্যার খবর শুনে তাদের বাড়িতে ছুটে যান কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী ও নেতৃবৃন্দ, বিএনপি নেতা ও মির্জাপুরের সাবেক এমপি আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সমবেদনা জানান। এ সময় বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী অবিলম্বে অপরাধীদের গ্রেপ্তার দাবি করে বলেন, দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির খারাপ হওয়ার কারণেই এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পুড়িয়ে মানুষ মারা হবে জানলে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করতাম না। বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, মির্জাপুরে এত নির্মম ঘটনা এর আগে কখনও ঘটেনি। অপরাধীরা পার পেয়ে গেলে ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনা বারবারই ঘটবে। টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব হোসেন বলেছেন, ঘটনাটি জঘন্য, চিন্তার বাইরে এবং অমানবিক। ক্ষমার অযোগ্য আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। জেলা প্রশাসক মঙ্গলবার রাতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিহতদের দাফনের জন্য ৫ হাজার টাকা করে অর্থ প্রদান করেন। মজিবর রহমানের পিতা ফকিরচাঁন আক্ষেপ করে বলেন, তার তিন নাতনি কে সচ্ছলভাবে মানুষ করার জন্যে পুত্র মজিবর রহমান আট বছর আগে মালয়েশিয়া গিয়েছিল। আর্থিক অবস্থা অনেকটা ভাল হওয়ায় একতলা বাড়ি নির্মাণ করে।  সেখানেই স্ত্রী ও কন্যারা বসবাস করতো। জাহাঙ্গীরের উত্ত্যক্তের কারণে মনিরাকে একই গ্রামের উত্তরপাড়ার নানা বাড়িতে রাখা হতো। সেখান থেকেই সে নিয়মিত স্কুলে যেতো। কিন্তু প্রতিদিনই স্কুলে যাওয়ার পথে জাহাঙ্গীর তাকে উত্ত্যক্ত করতো। মনিরার বান্ধবী মৌসুমী ও সেতু আক্তার বলেছে মনিরা খুবই ভাল ছাত্রী ছিল। ভালভাবে পড়াশোনা করে বড় হওয়ার ইচ্ছা ছিল তার। ঈদের দিন দাদীর ইচ্ছা পূরণ করতেই মনিরার মা হাসনা বেগম মেয়েকে এক রাতের জন্য বাড়িতে নিয়ে আসেন। ওই রাতে তিন মেয়েকে নিয়ে মা একই বিছানায় ঘুমিয়েছিলেন। কিন্তু তারা জানতেন না এটাই ছিল তাদের জীবনের শেষ রাত।

শেষ দেখতে চান সুলতান by কাজল ঘোষ

রাজনীতির বাইরে আট বছর। সময় কাটাতেন ব্যক্তিগত আলাপচারিতাতেই। কখনও সখনও ফেসবুক স্ট্যাটাস। এতটুকুই। হঠাৎ আলোর ঝলকানি। নড়েচড়ে বসেছেন। জানান দিয়েছেন। আর অপেক্ষা নয়। মাঠে নামবেন। ঘুণে ধরা রাজনীতির শেষ দেখবেন। কুলাউড়ার গোবিন্দপুরে নিজ বাড়িতে ঈদ ছুটি কাটিয়েছেন। সেখানেই কথা হলো নীরবতার নানা প্রসঙ্গ নিয়ে। এক সন্ধ্যায় হাজির হই গোবিন্দপুরের সেই বাড়িতে। বাড়ির বাইরে-ভেতরে সব মিলিয়ে শতাধিক নেতাকর্মীর ভিড়। এদের বেশির ভাগই স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের। সন্ধ্যা ঘিরে ছিল কোজাগরি পূর্ণিমা। চায়ের বাগানে জোনাকি পোকার মেলা। সেই পূর্ণিমার মিষ্টি আলোতে উঠোনে বসেই সুলতান মনসুর জানালেন, মৌলিক রাজনীতি থেকে সরবেন না। বঙ্গবন্ধু ও জয় বাংলার আদর্শ থেকে একচুলও নড়বেন না। দেশ ও জাতির সঙ্কটে যা যা প্রয়োজন তা-ই করবেন। দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্য গড়তে কাজ শুরু করেছেন। আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবেই নয়া ফ্রন্টে প্রতিনিধিত্ব করবেন।

সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ। সুলতান মনসুর নামেই রাজনীতির মাঠে আলোচিত। ছিলেন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি। স্বাধীনতাউত্তর ডাকসু’র ভিপি। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে তুখোড় ছাত্রনেতা। ছিলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকও। বাইরে আলোচনা অনেক, কিন্তু ভেতরের কারণ কি? বললেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন পাবো না এমনটা ভাবনাতেই ছিল না। তৃণমূল থেকে নেতাকর্মীরা আমাকে মনোনয়ন দিলেও কেন্দ্রীয়ভাবে বাদ দেয়া হয়। সেবার মহাজোটের মনোনীত প্রার্থী এখানে মাত্র ১০১৯ ভোট পায়। যা ছিল মৌলভীবাজার-২ আসনে আওয়ামী লীগের ভোটের ইতিহাসে সর্বনিম্ন রেকর্ড। এখানেই শেষ নয়। বাদ দেয়া হয় কেন্দ্রীয় কমিটি থেকেও। ভিন্ন ভিন্ন ভাবে দু’গ্রুপ থেকেই আমার নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় কমিটিতে। কিন্তু শেখ হাসিনা নিজ হাতে আমার নাম কেটে দিয়েছিলেন। তৃণমূলের মতামতকে তিনি আমলে নেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি। বলাবলি আছে, ওয়ান ইলেভেন পরবর্তীতে সংস্কারপন্থি মনে করেই আপনার ব্যাপারে দল এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে? সুলতান মনসুর খানিকটা থেমে উড়িয়ে দিলেন এমন অভিযোগকে। বললেন, যদি তাই হবে তাহলে এখন দলে অনেক সংস্কারপন্থিই কিভাবে জায়গা পেলেন? আসল বিষয় হচ্ছে, শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আক্রোশ। দ্বন্দ্বটা ওখানেই। যে কারণে আমাকে দলের পদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমি নীরবে অপেক্ষা করেছি। পর্যবেক্ষণ করেছি গণতন্ত্রহীনতার এই সংস্কৃতিকে। দলে নেই কিন্তু আবার আওয়ামী লীগের হয়েই নয়াফ্রন্টের সঙ্গে থাকছেন- বিষয়টি স্পষ্ট হলো না? এমন প্রশ্নে বলেন, আমি তো এখনও আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী হিসেবে আছি। আমাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়নি। আর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার এবং জয় বাংলার বাইরে রাজনীতি করবো না। এটা আমাকে দল থেকে বাদ দেয়া বা দলে রাখার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। ন্যূনতম ১১ দফার ভিত্তিতে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামছি শিগগিরই। প্রাথমিক পর্যায়ে ২৯শে অক্টোবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা রয়েছে। ফ্রন্টের কর্মপন্থা ও ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি চূড়ান্ত হবে ডিসেম্বরের মধ্যেই। বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে সকল দল-মতের অংশগ্রহণ ছিল না। একটি গ্রহণযোগ্য ও সকলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি ধীরে ধীরে দেশ ছাড়িয়ে দেশের বাইরেও জোরালো হচ্ছে। সকলের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে দেশে গণতন্ত্র পুনঃস্থাপিত হবে না। এখন দেশে চলছে মোসাহেবির রাজনীতি। চামচারাই যেন সবকিছু। এতটা গণতন্ত্রহীনতাই দেশ কখনও চলেনি। এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না।
আমাদের লক্ষ্য হবে, ১১ দফার ভিত্তিতে ব্যক্তিগত, দলগত ও ফ্রন্টগতভাবে নির্বাচনের প্রস্ততি নেয়া। যদি দলগত অবস্থান থেকে নির্বাচনে ফ্রন্ট অংশ না নেয় তবে এককভাবেই নির্বাচনে অংশ নেবো। সেই প্রস্ততিই নিতে শুরু করেছি। সেই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছি। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগসহ অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গেও যোগাযোগ শুরু করেছি। কারা থাকছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সময় হলেই তা দেখা যাবে। পরিস্থিতির সৃষ্টি হলেই অনেককেই দেখা যাবে। আগামীর রাজনীতিতে ভূমিকা কি হবে- এমন প্রশ্নে বলেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। মানুষের যে বিশ্বাস ও আকাঙ্ক্ষা তাই আমার রাজনীতির শক্তি। কোন চাপ বা হুমকির কাছে এই বিশ্বাস নষ্ট বা ধ্বংস করতে চাই না। মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় শেষ দিন পর্যন্ত কাজ করে যাবো- এটাই প্রতিজ্ঞা।

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেলেন না ভাষা মতিন

রাষ্ট্রীয় মর্যাদা জোটেনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সেনাপতি আবদুল মতিনের ভাগ্যে। নানা শ্রেণী-পেশার সর্বস্তরের মানুষ তাকে ফুলেল শ্রদ্ধায় শেষ বিদায় জানালেও রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানানো হয়নি তার প্রতি। ক্ষমতাসীন দল ও জোটের নেতারা তার প্রতি শ্রদ্ধা জানালেও ছিল না সরকারের তরফে কোন শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের আয়োজন। এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আবদুল মতিনের প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানাতে যাওয়া বিশিষ্টজনরা। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে এই ভাষা সেনাপতি একদিন মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছিলেন। তবে তার চিরবিদায়ে তিনি নিজে পেলেন না সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ সম্মান।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই নিহিত ছিল উল্লেখ করে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, তিনি যদি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না পান তবে আর কে পাবেন? রাষ্ট্র তাকে সম্মান জানাতে পারলো না এটা রাষ্ট্রেরই ব্যর্থতা। বাংলা ভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের এ অগ্রপথিককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গতকাল সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। বুধবার সকালে মারা যাওয়ার পর থেকে গতকাল বেলা ১২টায় শহীদ মিনারে আনা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানেই ছিল আবদুল মতিনের মরদেহ। শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানানোর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হস্তান্তরের আগ পর্যন্ত পরিবারের চাওয়া মোতাবেক সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনাটমি বিভাগের মর্গে পাঠানোর মাধ্যমে তাকে শেষ বিদায় জানানো হয়। বেলা ১২টার পর বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেতা কমরেড আবদুল মতিনের মরদেহ বঙ্গবন্ধু মেডিকেল থেকে নেয়া হয় ঢাকা মেডিকেলের সামনে আমতলায়, যেখানে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। সেখান থেকে তার কফিন নিয়ে আসা হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। ফুলে ফুলে মোড়ানো অ্যাম্বুলেন্সের পাশ দিয়ে হেঁটে শহীদ মিনারে পৌঁছান তার রাজনৈতিক সহকর্মীরা। তার আগেই বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হন আজীবন সংগ্রামী আবদুল মতিনকে শ্রদ্ধা জানাতে। প্রথমে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের পক্ষ থেকে এবং এরপর ব্যারিস্টার রফিক-উল হকসহ কয়েকজন আইনজীবী এই ভাষা সেনাপতির কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের পক্ষে ফুল দেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, প্রেসিডিয়াম সদস্য নূহ-উল আলম লেনিন ও দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক। এরপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নেতৃবৃন্দ। একে একে শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, বিএনপির পক্ষ থেকে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ব্রিগেডিয়ার অব. হান্নান শাহ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। শ্রদ্ধা জানান জাতীয় পার্টি, জাসদ, সম্মিলিত নারী পরিষদ, বাংলা একাডেমি, সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরামের পক্ষ থেকে কেএম সফিউল্লাহ, ভাষাসৈনিক আবদুল গফুর, অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাংবাদিক সমাজ, ছাত্রদল, জাসাস, ছাত্র ইউনিয়ন, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ), স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সম্মিলিত আইনজীবী পরিষদের ব্যারিস্টার আমিনুল ইসলাম, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সৈয়দ হাসান ইমাম, পীযূষ বান্দ্যোপাধ্যায়, স্বাধীনতা পরিষদ, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি, চীন-মৈত্রী সমিতি, সাম্যবাদী দল, তথ্যমন্ত্রীর পক্ষে শহিদুল হক স্বপন, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী পরিষদের পক্ষ থেকে এডভোকেট মাহবুব উদ্দিন খোকন, গণসংহতি আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ, ছাত্র ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন, স্বাধীনতা ফোরাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) শফিউল আলম প্রধান, গণজাগরণ মঞ্চ, ছাত্রমৈত্রী, খেলাঘর, এশিয়াটিক সোসাইটি, ন্যাপ, আবদুল মতিনের গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার চৌহালি উপজেলার মানুষ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় মিডিয়া সোসাইটি, ভাষা বিজ্ঞানী ড. মনসুর মুসা, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বৃহত্তর পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ, কৃষক-খেত মজুর সমিতি, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, বিএসএমএমইউ-এর চিকিৎসকগণ, সাংস্কৃতিক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, গণগ্রন্থাগার, ভাষা আন্দোলন স্কুলসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক সংগঠন। এছাড়া ব্যক্তিগতভাবে হাজারো মানুষ কমরেড আবদুল মতিনের কফিনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। আবদুল মতিনের উদ্দেশ্যে শোক বইও খোলা হয় শহীদ মিনারে।
মরদেহ হস্তান্তর:  বিএসএমএমইউ’র পক্ষ থেকে প্রো ভিসি প্রফেসর শহীদুল্লাহ শিকদার আবদুল মতিনের মরদেহ তার স্ত্রী গুলবদন্নেসা মনিকার কাছে হস্তান্তর করেন। এ সময় তিনি বলেন, মহান এ ভাষা সেনাপতির পরিবারের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্যন্ত তাদের ওপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। তারা এমন একজন ব্যক্তির এ দায়িত্ব পেয়ে গর্বিত। এরপর মিসেস মতিন আবদুল মতিনের শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী আনুষ্ঠানিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (ঢামেক) ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক শফিকুল আলম, ঢামেক এনাটমি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শামীম আরা ও চিকিৎসকদের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করেন। এ সময় বিপ্লবী এ নেতার সহধর্মিণী সকল প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানান। তিনি দেশবাসীকে অনুরোধ করেন তার অবদান যেন কেউ ভুলে না যান। তার আদর্শকে ধারণ করে তা বাস্তবায়নের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, আবদুল মতিন ২০০৬ সালে সজ্ঞানে ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহ দান করার ইচ্ছা পোষণ করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, আবদুল মতিনের মরদেহ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য উপকার হবে। এরপর আবদুল মতিনের উদ্দেশ্যে ১ মিনিট নিরবতা পালন করার পর দুপুর ২টার দিকে বিএসএমএমইউ’র অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে ঢামেকের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। এ সময় অ্যাম্বুলেন্সটি বিভিন্ন সংগঠনের মিছিল সহকারে ঢামেকের এনাটমি বিভাগের মর্গে পৌঁছায়। এনাটমি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক শামীম আরা বলেন, ভাষা মতিনের মরদেহ এনাটমি বিভাগে রাখা হয়েছে। তার পরিবারের সম্মতিতে তার মরদেহ সংরক্ষণ করা হবে। গতকাল থেকেই এই সংরক্ষণের কাজ শুরু হয়েছে এবং সাত থেকে আট দিন সময় লাগবে এ-কাজ শেষ হতে। অধ্যাপক শামীম আরা বলেন, পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে দুই মাস লেগে যাবে। এরপর মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য তা ব্যবহৃত হবে।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেয়ায় ক্ষোভ: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মাহসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তারা মতিনকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দিয়ে সরকার ভুল করেছে। সকালে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার কফিনে ফুল দিতে গিয়ে তিনি একথা বলেন। তিনি বলেন, মহান এ নেতাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া সরকারের দায়িত্ব ছিল। বিএনপিসহ গোটা দেশের মানুষ এটা আশা করেছিল। কিন্তু কেন দেয়নি এটা সরকার জানে। ফখরুল বলেন, আবদুল মতিন ছিলেন কিংবদন্তির নেতা। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি দেশ গড়ার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তার এ শূন্যতা পূরণ হওয়ার নয়। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে এ ধরনের ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান দেখানো হয়েছে। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এমকে আনোয়ার, মির্জা আব্বাস, বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা  ড. ওসমান ফারুকসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু মনে করেন, আবদুল মতিনের রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাওয়া উচিত ছিল। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, মতিন ভাই ছিলেন চেতনাসম্পন্ন প্রগতিশীল মানুষ। এটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক যে, তার মতো মানুষ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পাবে না। এটা রাষ্ট্রের জন্য সুখকর নয়। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, কেন রাষ্ট্র তাকে সম্মাননা জানায়নি তা এই মুহূর্তে বলতে পারব না। তবে তিনি ভাষা আন্দোলনের প্রতীক হয়ে আছেন। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা স্বীকৃতি আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক এমাজউদ্দীন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আবদুল মতিনকে যদি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা না দেয়া হয় তবে কাকে দেয়া হবে এটা আমার একটা প্রশ্ন। কলামনিস্ট ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, আজকে তার শ্রদ্ধা জানাতে যে লোক সমাগম ঘটেছে, তা প্রমাণ করে তার অবস্থান কোথায়। রাষ্ট্র তাকে সম্মান না জানালেও তার কিছু যাই-আসে না। তবে তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য। রাষ্ট্র তাকে সম্মান জানাতে পারেনি এটা রাষ্ট্রেরই ব্যর্থতা। তিনি বলেন ভাষা মতিন একটি অধ্যায়ের নায়ক। তার চলে যাওয়ার মাধ্যমে আজ সেই অধ্যায়ের অবসান ঘটলো। তিনি বলেন, তার সঙ্গে শহীদ মিনারকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। তার মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, তিনি চেয়েছিলেন একটি জাতীয়তাবাদী, অসামপ্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার। তিনি বলেন, ব্যক্তির মৃত্যু হলেও কখনও আদর্শের মৃত্যু হয় না। আদর্শের ভিতর দিয়েই তিনি বেঁচে থাকবেন। এছাড়া ক্ষোভ জানিয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তবে রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অভাবে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম। ভাষা সৈনিক হওয়া সত্ত্বেও কেন তিনি রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাননি সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে নাসিম বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের অভাব ছিল। রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেয়া না হলেও প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের পক্ষ থেকে সম্মান জানানো হয়েছে। নাসিম বলেন, ভাষা মতিন রাষ্ট্রের সম্পদ। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে সব আন্দোলনে তার অবদান রাষ্ট্র ও জনগণ ভুলবে না।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের টোপ, পাল্টা কৌশল বিএনপির by কাফি কামাল

মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে রাজনৈতিক মহলে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দাবি ও সরকারের কৌশল নিয়ে শুরু হয়েছে এ গুঞ্জন। সূত্র জানায়, বিরোধী রাজনৈতিক জোটের দাবি ও আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে ভাবছে সরকার। তবে সে নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটকে নিয়ে সম্ভাব্য একাধিক বিকল্প কৌশলে হাঁটছে সরকার। বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতাও ঘরোয়া আলাপে তাদের ঘনিষ্ঠজনদের তেমন ইঙ্গিত দিয়েছেন। সূত্র জানায়, ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠন করলেও আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর স্বীকৃতি ও সমর্থন পায়নি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। দৃশ্যত বাংলাদেশের প্রভাবশালী বন্ধু রাষ্ট্রগুলো সম্পর্ক রক্ষা করলেও তা নিয়ে স্বস্তিতে নেই সরকার। প্রতিনিয়ত দেশে-বিদেশে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ ও প্রতিবাদমুখর রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে সরকারকে। বন্ধু রাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে যে সম্পর্ক তা ‘রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র’ সম্পর্কের- বেশি কিছু নয়। কিন্তু কূটনৈতিক মহলের একটি চাপের মধ্য দিয়ে দিন পার করতে হচ্ছে সরকারকে। একদিকে সংলাপের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য পন্থা খুঁজে বের করে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজনের কথা বলছেন কূটনীতিকরা। অন্যদিকে দেশে প্রধান বিরোধী জোটের পাশাপাশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে আরেকটি জোট। এমন পরিস্থিতিতে মধ্যবর্তী নির্বাচনসহ সার্বিক বিষয়ে বিকল্প পথ নিয়ে ভাবছে সরকার। পাশাপাশি বিকল্প কৌশলগুলোর বাস্তবায়ন করতে প্রস্তুত করা হচ্ছে সে ক্ষেত্র। রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, আইনি প্রক্রিয়ায় বিএনপি ও ২০দলীয় জোটের শীর্ষস্থানীয় ও কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্বাচনের অযোগ্য করার কৌশলে অনেক দূর এগিয়েছে সরকার। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এ দুই মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ কয়েকজন সিনিয়র নেতার সাজার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক বক্তব্যে প্রয়োজনে বিএনপি চেয়ারপারসনকে গ্রেপ্তারের কথা প্রকাশ্যেই বলেছেন। একই ভাবে দলের দ্বিতীয় প্রধান প্রভাবশালী নেতা তারেক রহমান একাধিক মামলার আসামি। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যে যান তিনি। কিন্তু সেখান থেকে আর ফিরতে পারেননি। বর্তমানে একাধিক মামলায় তাকে ফেরারি ঘোষণা করেছে আদালত। সম্পূরক চার্জশিটে ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় আসামি করা হয়েছে তারেক রহমানকে। এ মামলায় তার বিরুদ্ধে বড় ধরনের সাজা ঘোষণা হতে পারে। এছাড়া দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্তত শতাধিক শীর্ষ ও কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। এভাবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিএনপির অন্তত দেড় শতাধিক নেতাকে নির্বাচনের অযোগ্য করা হতে পারে। সূত্র জানায়, দ্বিতীয় কৌশল হিসেবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে ভাঙন ধরানো এবং মহাজোটের বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে সরকার। সেটা মহাজোটে যোগদান কিংবা গৃহপালিত বিরোধী জোটে রাখার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হতে পারে। ইতিমধ্যে সে প্রক্রিয়ায়ও অনেক দূর এগিয়েছে সরকার। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে কয়েকজন নেতা সরে গিয়ে নাম কা ওয়াস্তে একটি জোট গঠন করেছেন। বিএনপি সূত্র জানায়, একদিকে দলের প্রভাবশালী ও গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নির্বাচনে অযোগ্য করে রাখা অন্যদিকে জোটকে দুর্বল করে একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন আয়োজন করতে পারে সরকার। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, মামলার ভয় ও সুযোগের লোভ দেখিয়ে সে নির্বাচনে অংশগ্রহণে বাধ্য করাতে পারে বিএনপির কিছু নেতাকে। ইতিমধ্যে তেমন লক্ষণও প্রকাশ পেয়েছে। নেতারা জানান, দলের স্থায়ী কমিটির একজন প্রবীণ সদস্যকে এ ব্যাপারে সন্দেহের চোখে দেখছে নেতাকর্মীরা। এছাড়া সে নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময় সংস্কারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত কিছু নেতাকে রাখা হচ্ছে সন্দেহের তালিকায়। তবে বিএনপি চেয়ারপারসন ও দল এবং জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বাদ দিয়ে নির্বাচনে যাবে না ২০দলীয় জোট। সে ক্ষেত্রে গৃহপালিত বিরোধী দলসহ একটি খণ্ডিত বিএনপিকে নির্বাচনে নেয়ার চেষ্টা করবে সরকার। এতে সফল হলে একদিকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বেশি সংখ্যক রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের বিষয়টি যেমন প্রমাণ করতে পারবে সরকার অন্যদিকে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে বিএনপির নির্বাচন বিমুখতা। সূত্র জানায়, সরকার কৌশল বাস্তবায়নে আরেকটি বিকল্প কৌশল নিতে পারে। সেক্ষেত্রে সাজা হলেও গ্রেপ্তার করা হবে না বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে। উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনার মাধ্যমে ঝুলিয়ে রাখা হবে সে রায়। তারপর চলবে দেনদরবার। তখন খালেদা জিয়া আপস এবং আপসহীনতার মাধ্যমে নির্ধারণ হবে পরবর্তী পরিস্থিতি। এদিকে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি আলোচনায় উঠে এলে এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান নয় তাদের পাল্টা কৌশল। তবে বিএনপির একাধিক সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় নেতাদের ঐক্য ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল ধরে রাখতে শিগগিরই ধারাবাহিক একটি মতবিনিময়ের উদ্যোগ নিতে পারেন খালেদা জিয়া। এদিকে কিছুদিন ধরে গুঞ্জন চলছে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিএনপির হাল ধরতে দেশে ফিরছেন দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। দলের একটি অংশ বিষয়টিকে ইতিবাচক দেখলেও বড় অংশটিই এমন গুঞ্জনের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছেন। তারা যুক্তি দেখিয়ে বলছেন, রাজনীতি হচ্ছে কৌশলের খেলা। সরকারের মামলা ও গ্রেপ্তার কৌশলের কারণে বিএনপি নেতাকর্মীরা অনেকটা বিপর্যস্ত। ফলে বিএনপির রাজনীতিও কিছুটা কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে। তবে এর মাধ্যমে প্রমাণ হয় না বিএনপি জনমতের রাজনীতিতে দুর্বল হয়ে গেছে। তারা বলেন, এখনই ডা. জুবাইদা রহমানের হাতে বিএনপির হাল তুলে দেয়ার অর্থ দাঁড়াবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান রাজনৈতিকভাবে শেষ হয়ে গেছেন।

মাদক সেবন আত্মঘাতী by কামাল আহমাদ

‘মাদক’ নেশা এমন এক নেশা, যা মানুষকে অতিদ্রুত মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। ‘মাদক’ সেবন আর আত্মঘাতী একই কথা। ‘মাদক’ মূলত নির্দিষ্ট কোনো কিছুর নাম নয়; যে বস্তু খেলে বা পান করলে মানুষের মস্তিষ্ক আগের মতো স্বাভাবিক থাকে না, চেতনা শক্তি হারিয়ে যায়, বিবেক-বুদ্ধি নষ্ট হয় Ñ এমন সব বস্তুকেই ‘মাদক’ বলে। রাসূল সা: বলেছেন, ‘প্রত্যেক ওই বস্তু যা বিবেকের তি করে সেসবই মাদক। আর সব ধরনের মাদকই হারাম’ (ইবনু মাজাহ হা/৩৩৯০)। অন্যত্র রাসূল সা: বলেছেন,‘যে বস্তু বেশি ভণ করলে বিবেকের তি হয়, কম হলেও তা হারাম’ (ইবনু মাজাহ হা/৩৩৯৩)। তিনি আরো বলেন,‘আমার কিছু উম্মত মদ পান করবে তার নাম রাখবে ভিন্ন’ অর্থাৎ তাকে ‘মদ’ না বলে অন্য নাম বলবে (ইবনু মাজাহ হা/৪০২০)। সুতরাং হাদিস থেকে স্পষ্ট, বিড়ি, সিগারেট, জর্দা, গুল, ফেনসিডিল, ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা ইত্যাদি সবই নেশাদ্রব্য, সবই মাদক। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায়, এই মাদকের সাথে জড়িত  বেশির ভাগ মানুষ। শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রী, শিতি-অশিতি প্রায় লোকেই অন্য কোনো নেশায় জড়িত না হলেও সিগারেটের সাথে জড়িত। শিতি লোকেরাও বর্তমানে ধূমপান করে। তারা কিন্তু জানে ‘ধূমপানে মৃত্যু ঘটায়’ তবু তারা ধূমপান করে।
একটি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে গড়ে প্রতি দিন সাত কোটি ৯৮ লাখ টাকার ধূমপান করা হয়। যে টাকা দিয়ে ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৫৩ লাখ শিশুকে দৈনিক একটি করে ডিম ও এক গ্লাস দুধ খেতে দেয়া সম্ভব। অথচ এ টাকা আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে দরিদ্র দেশের মানুষ। আরেকটি পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সিগারেটের তামাক শুকাতে নাকি বছরে তি হয় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আবার প্যাকেটের গায়ে লেখা হচ্ছে ‘ধূমপানে মৃত্যু ঘটায়’ এ কেমন শিা? নয়া দিগন্ত পত্রিকা রিপোর্ট করেছে Ñ ‘প্রতিমাসে বাংলাদেশে ইয়াবা ট্যাবলেট আসছে শত কোটি টাকার।’ কারা সেবন করছে এসব মাদক? নিশ্চয় বাংলার মানুষ। কে এই মরণ নেশার আমদানিকারক? নিশ্চয় বাংলার মানুষ। সুতরাং আমাদের সন্তান নষ্ট হবে না তো কাদের সন্তান নষ্ট হবে? রিপোর্টে আরো বলা হয় Ñ ‘এক সপ্তাহে র‌্যাব সদস্য ৩৬ হাজার ৫০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে’ (২৭/৮/১৩)। জানি না কত ইয়াবা ট্যাবলেট বাংলাদেশে আছে।
আমারা কি আমাদের দেশটাকে মাদকের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? নষ্ট করে দিচ্ছি কি আমাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ? কেন আজ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের হাতে এই মরণ নেশা? তারাই কি এর জন্য দায়ী? মানবজীবনের একটি সময় রয়েছে যাকে বলে বয়ঃসন্ধিকাল। এই সময় ছেলেমেয়েরা যখন নবযৌবনে পা রাখে, তখন তারা নতুন এক জগতে প্রবেশ করে। মন সব সময় নতুন কিছু পেতে চায়। শরীরের গঠন আকৃতির পরিবর্তন হয়। কণ্ঠসুরের পরিবর্তন ঘটে। শরীরে দেখা দেয় নতুন এক উজ্জ্বলতা। ছেলেমেয়ে তখন একে অন্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা যেন তখন অন্য জগতের মানুষ। এই সময় রাষ্ট্র্র, সমাজ ও প্রত্যেক বাবা-মায়ের উচিত তাদের আদরের
সন্তানকে সুশিায় শিতি করা, অন্য শিার পাশাপাশি দ্বীনি শিার প্রতি গুরুত্বারোপ করা। ‘মাদক’ যে হারাম বা মাদক ভণে যে নেশা হয় এ কথা পৃথিবীর প্রায় মানুষই জানে, তবু মানুষ মাদকের সাথে সম্পৃক্ত। এই মাদককে মানুষ কখনো কখনো বাবা-মা, সন্তানাদির চেয়েও বেশি আপন মনে করে। মাদক সেবনের পর সে ভুলে যায় কে তার বাবা, কে তার মা। সেই তখন নেশাগ্রস্ত হয়ে কাউকে খুন করতেও দ্বিধা করে না। যার স্পষ্ট প্রমাণ বাবা-মাকে হত্যাকারিণী ঢাকা চামেলীবাগের ‘ঐশী রহমান’। এ খুনের জন্য দায়ী কে? কেন সে খুন করলো? সে কি সুস্থ মস্তিষ্কে খুন করেছে? নাকি নেশাগ্রস্ত মস্তিষ্কে খুন করেছে?
ইসলামের দৃষ্টিতে মাদক : আনাস রা: বলেন, রাসূল সা: ১০ ব্যক্তির প্রতি অভিশাপ করেছেনÑ * যে ব্যক্তি মদের নির্যাস বের করে তার প্রতি * মাদক প্রস্তুতকারকের প্রতি * মাদক সেবনকারীর প্রতি * যে ব্যক্তি অন্যকে মদ পান করায় তার প্রতি * যে ব্যক্তি মাদক আমদানি করে তার প্রতি * যার জন্য আমদানি করা হয় তার প্রতি * যে ব্যক্তি মাদক বিক্রি করে তার প্রতি * যে ব্যক্তি মাদক ক্রয় করে তার প্রতি * যে ব্যক্তি মাদক সরবরাহ করে তার প্রতি * যে ব্যক্তি মাদকের লভ্যাংশ ভোগ করে কার প্রতি (তিরমিজি, মিশকাত হা/২৭৭৬ সনদ ছহি)।
অন্যত্র রাসূল সা: বলেছেন, ‘সর্বদা নেশাদার দ্রব্য সেবন করা মূর্তিপূজার মতো অপরাধ’ (ইবনু মাজাহ হা/৩৩৭৫)। ‘সর্বদা নেশাদার দ্রব্য সেবনকারী জান্নাতে যাবে না’ (ইবনু মাজাহ হা/৩৩৭৬)। ‘যে ব্যক্তি নেশাদার দ্রব্য সেবন করে ৪০ দিন তার সালাত কবুল হবে না, যদি এ অবস্থায় মারা যায় তাহলে সে জাহান্নামে যাবে’ (ইবনু মাজাহ হা/২৭৩৮)। ‘অন্যায় ও অশ্লীল কর্মের মূল হচ্ছে মাদক সেবন করা’ (নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, হা/৩৩৭১)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, পূজার আস্তানা ও ভাগ্য নির্ধারক শরসমূহ ঘৃণিত শয়তানের কাজ, অতএব তোমরা তা বর্জন করো; যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের মাঝে শত্র“তা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি করতে এবং তোমাদের আল্লাহর স্মরণ ও সালাত থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে, কাজেই তোমরা কি (এ কাজ থেকে) বিরত থাকবে? তোমরা (সর্ব বিষয়ে) আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূল সা:-এর আনুগত্য করো আর (মদ ও জুয়ার ধ্বংসকারিতা থেকে) সতর্ক থাকো, আর যদি তোমরা (রাসূলের আনুগত্য থেকে) মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে জেনে রেখো, আমার রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে সুস্পষ্টভাবে (আমার আদেশগুলো) পৌঁছে দেয়া’ (সূরা মায়িদা: ৯০-৯২)। ওই আয়াত থেকে বুঝা যায়, যারা মাদক সেবন করে তারা মূলত শয়তানেরই অনুসরণ করে। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বহু আয়াতে বলেছেন, ‘তোমরা শয়তানের অনুসরণ করো না, নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্র“’ (সূরা বাকারা : ২০৮)। আল্লাহ তায়ালা জিন শয়তানের পাশাপাশি মানুষ শয়তান থেকেও দূরে থাকতে বলেছেন। মানুষ শয়তানই মানুষের জন্য প্রকাশ্য শত্র“। যারা মানুষকে হত্যা করে, যারা এই ভয়ঙ্কর মাদকদ্রব্যকে আশ্রয় দেয়, যারা এই মাদক নেশাকে আমদানি করে অতঃপর বাংলার নব যুবক-যুবতী, স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের হাতে মাদক তুলে দিয়ে তাদের সুন্দর ভবিষ্যৎকে নষ্ট করে, ধ্বংস করে তারা কখনো সুস্থ মনের মানুষ নয়। তারা মানবরূপী শয়তান। তারাই মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।
লেখক : প্রবন্ধকার

শান্তিতে নোবেল পেলেন মালালা ও কৈলাশ

এ বছর শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন পাকিস্তানের নারী শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা ইউসুফজাই ও ভারতের শিশু অধিকার কর্মী কৈলাশ সত্যার্থী।

আজ শুক্রবার বিবিসির অনলাইন, রয়টার্স ও এনডিটিভির খবরে জানানো হয়, নরওয়ের নোবেল কমিটি আজ বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করে। নাম ঘোষণা শেষে নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে বলা হয়, শিশু-কিশোর ও তরুণদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সব শিশুর জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে সংগ্রামের স্বীকৃতিস্বরূপ এ দুজনকে শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
নরওয়ের নোবেল কমিটির প্রধান থরবিয়ার্ন জাগল্যান বলেন, ‘একজন হিন্দু, অন্যজন মুসলমান; একদিকে একজন ভারতীয়, অন্যদিকে একজন পাকিস্তানি; একই লক্ষ্য নিয়ে, শিক্ষার অধিকারের দাবিতে এবং উগ্রবাদের বিরুদ্ধে তাঁরা সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন, যা নোবেল কমিটির কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়েছে।’
নারী ও শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিতের দাবিতে কাজ করার কারণে পাকিস্তানের তালেবান জঙ্গিগোষ্ঠীর চক্ষুশূলে পরিণত হন মালালা। ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় তালেবানের এক জঙ্গি তাঁর মাথায় গুলি করে। তবে সৌভাগ্যক্রমে মৃত্যুর মুখ থেকে বেঁচে ফিরে আসেন মালালা।
এর মধ্য দিয়ে সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার রেকর্ড গড়লো ১৭ বছর বয়সী মালালা। এর আগে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্তদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন অস্ট্রেলীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ বিজ্ঞানী লরেন্স ব্র্যাগ। ১৯১৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে বাবার সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল পেয়েছিলেন তিনি। সে সময় তাঁর বয়স ছিল ২৫ বৎসর।
অন্যদিকে মহাত্মা গান্ধীর আদর্শের অনুসারী ভারতের কৈলাশ সত্যার্থী দীর্ঘদিন ধরে ‘বাচপান (শৈশব) বাঁচাও আন্দোলন’-নামে শিশু-অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
জয়ী হওয়ায় পর এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের এই নোবেলজয়ী বলেন, এর মধ্য দিয়ে কোটি শিশুর কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়েছে।
এদিকে, যখন পুরস্কার ঘোষণা করা হয় তখন মালালা যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম শহরের একটি স্কুলে ক্লাস করছিলেন বলে নোবেল কমিটির এক নারী মুখপাত্র জানান। আজ বিকেলে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলন করে মালালা নিজের প্রতিক্রিয়া জানাবেন বলে ওই নারী মুখপাত্র গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।
এ বছর নোবেলে শান্তি পুরস্কারের জন্য ২৭৮ জন মনোনীত হন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পোপ ফ্রান্সিস, অ্যাডওয়ার্ড স্নোডেনও।

তিন মেয়েসহ মাকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার ৭

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে তিন মেয়েসহ মাকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় পুলিশ আরও সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এঁদের মধ্যে ছয়জনকে আজ শুক্রবার সকালে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। বাকি একজনকে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে।

মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন মির্জাপুর মাছরাঙা ফিলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপক মীর আজাদুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ আবুল বাশার, সুপারভাইজার ওয়াসিম মিয়া, লাইনম্যান আবদুল মান্নান এবং এ ঘটনায় সন্দেহভাজন খুনি জাহাঙ্গীরের বন্ধু মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই নয়াপাড়া গ্রামের সুশান্ত কুমার রায়, তাঁর (জাহাঙ্গীরের) ফুপা পার্শ্ববর্তী কালিয়াকৈর উপজেলার চাঁনপুর গ্রামের নান্নু মিয়া ও খালাতো ভাই সখীপুর উপজেলার বড়চালা গ্রামের বাদশা মিয়া।

এঁদের মধ্যে সুশান্তকে ঘটনার দিন ও বাদশাকে ঘটনার পরদিন পুলিশ আটক করে। গতকাল তাঁদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সুশান্তকে জিজ্ঞাসাবাদে আজ সাত দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই হানিফকে আদালতের মাধ্যমে তিন দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ।

এ ঘটনায় পেট্রল সরবরাহকারী রিকশাচালক আলী হোসেন আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ২০০ টাকা ভাড়ায় স্থানীয় একটি ফিলিং স্টেশন থেকে দুটি কনটেইনারে করে জাহাঙ্গীরের জন্য পেট্রল বহন করে আনেন তিনি।

এ ঘটনায় দোষীদের শাস্তির দাবিতে আজ বিকেলে সোহাগপাড়া গ্রামবাসী মানববন্ধন করেছেন। বেলা সাড়ে ১১টায় প্রথম আলো মির্জাপুর বন্ধুসভা মির্জাপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মানববন্ধন পালন করে।

পবিত্র ঈদুল আজহার দিন গত সোমবার দিবাগত রাতে মির্জাপুর উপজেলার গোড়াই ইউনিয়নের সোহাগপাড়া গ্রামের মালয়েশিয়াপ্রবাসী মজিবর রহমানের স্ত্রী হাসনা বেগম এবং তাঁর তিন মেয়ে মনিরা আক্তার (১৪), মিম আক্তার (১০) ও মলি আক্তারকে (৭) ঘরের মধ্যে ঘুমন্ত অবস্থায় পেট্রলের আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়। পুলিশ ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, বখাটে জাহাঙ্গীর আলম বিয়ের প্রস্তাবে প্রত্যাখ্যাত হয়ে আক্রোশের বশে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।

ইন্দোনেশিয়ার রাজনীতিতে কায়েমি স্বার্থবাদীদের থাবা by সাজ্জাদুল ইসলাম

ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০ অক্টোবর একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অপর একজন নির্বাচিত জনপ্রিয় প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যাচ্ছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট সুশিলো বামবাং ইয়দোয়োনো নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জকো উইদোদোর কাছে এ দিন ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। বর্তমান সময় পর্যন্ত একটি ছোট্ট গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইন্দোনেশিয়ার উচ্চপর্যায়ের রাজনীতি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এদের রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তন ঘটলেও এরা প্রায় সব ক্ষেত্রে পারস্পারিক স্বার্থের বাঁধনে আবদ্ধ। অবশ্য নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট এ চক্রের বাইরে থেকে এসেছেন। এরই মধ্যে পুরনো নেতারা পরবর্তী প্রেসিডেন্টের উচ্চাভিলাষী সংস্কার পরিকল্পনায় বাধা সৃষ্টির পাঁয়তারা শুরু করেছেন।

>> বর্তমান প্রেসিডেন্ট সুশিলো বামবাং ইয়দোয়োনো এবং নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জকো উইদোদো
নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জকোভি নামে সুপরিচিত। তার বাবা ছিলেন একজন কাঠুরিয়া। জাভার মধ্যাঞ্চলের মাঝারি ধরনের শহর সোলোতে নদীর তীরের চালাঘরের বাড়িতে বড় হন তিনি। ব্যক্তিগত আলাপচারিতা ও বাইরে ভোটারদের সাথে দেখা করার সময় উইদোদোকে অত্যন্ত প্রাণবন্তু দেখায়। তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন, বক্তৃতা দেয়ার জন্য যাত্রাবিরতি করেন এবং এ ক্ষেত্রে জাঁকজমক প্রদর্শনকে ঘৃণা করেন। জকোভি ইন্দোনেশিয়ার নতুন ধরনের নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন: তিনি বয়সে তরুণ, বাস্তববাদী ও গতিশীল; তার কাছে সহজে যাওয়া যায় এবং কোনো ধরনের দুর্নীতি তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তরুণসমাজ, প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন ভোটারদের সমর্থনে তার রাজনৈতিক উত্থান ঘটেছে। দলীয় নেতৃত্বের সিঁড়ি বেয়ে নয়, বরং শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও সুশাসনের সুকীর্তির মাধ্যমে তার উত্থান ঘটেছে। সোলোর মেয়র ও পরে জাকার্তার গভর্নর হিসেবে তিনি সেখানকার যানজট,বন্যা ও পয়ঃনিষ্কাশনের মতো নিত্যনৈমিত্তিক সমস্যাসহ জনগণের সমস্যা নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জনগণ তার এসব কাজ প্রত্যক্ষ করেছে। অন্য রাজনীতিকেরা অবশ্য জনগণের এসব দুর্ভোগ নিরসনে তেমন একটা সময় দেন না।
ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক ক্রান্তিকালে জকোভি একজন মহান নেতা হিসেবে দেশটির ক্ষমতা গ্রহণ করতে যাচ্ছেন। ইয়দোয়োনোর এক দশকের শাসনামলে ইন্দোনেশিয়ায় ব্যাপক অর্থনৈতিক বিকাশ ঘটেছে। কয়লা, তেল, গ্যাস ও কাঠের চাহিদা পূরণের জন্য চীন ইন্দোনেশিয়ার ওপর নির্ভর করার কারণে অংশত এ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে। ২০১০-২০১২ অর্থবছরে যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৩ শতাংশ সেখানে চলতি বছরের প্রথমার্ধে তা নেমে এসেছে ৫.২ শতাংশে।
এ ছাড়া আগামী ছয় বছরে ইন্দোনেশিয়ার শ্রমশক্তির সাথে যোগ হবে আরো দেড় কোটি মানুষ। বিশ্বব্যাংক বলেছে, তারা মনে করেন, ইন্দোনেশিয়ার প্রবৃদ্ধির হার ৯ শতাংশ অর্জনের চেষ্টা করা উচিত। আর এ জন্য দেশটিকে তার শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও অবকাঠামোর উন্নয়ন করতে হবে। ইন্দোনেশিয়া ইতোমধ্যে তেল আমদানিকারকে পরিণত হয়েছে। দেশটির জ্বালানি ভর্তুকি কমানো অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এ জন্য সরকারের বাজেটের এক-পঞ্চমাংশ ব্যয় করতে হয়। জকোভি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ত্যাগের আগেই জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক সমালোচনার ঝুঁকি গ্রহণের জন্য ইয়দোয়োনোকে সম্মত করানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ও পিডিআইপি পার্টির নেতা মেঘবতী সুকর্নপুত্রীর সম্পর্ক ভালো নয়। জকোভি পিডিআইপি পার্টির সদস্য। আর সে কারণে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট তার কথায় সম্মত হননি।
জকোভি বুঝতে পারছেন, তার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের শুরুর দিকে জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ পদক্ষেপ গ্রহণ যেকোনো নেতার জন্যই বেশ বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু জকোভি আরো খারাপ কিছু হতে পারে বলে মনে করছেন। নির্বাচনে তিনি যাকে পরাজিত করেছেন, তিনি হলেন সাবেক বিশেষ বাহিনীর জেনারেল প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো। তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। তিনি হলেন পুরনো নেতাদের চক্রের সদস্য। সুহার্তো আমলের লোকদের সাথে তার সম্পর্ক ও যোগাযোগ রয়েছে। তিনি জকোভির বিরুদ্ধে লড়তে সঙ্কল্পবদ্ধ বলে মনে হচ্ছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে ৫০০টি প্রাদেশিক গভর্নর, রিজেন্সি প্রধান ও সিটি মেয়র পদে সরাসরি নির্বাচন বাতিল বিল অনুমোদনের ঘটনায় তাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের বিষয় প্রকাশ পায়। পার্লামেন্টের বেশির ভাগ সদস্য প্রাবোয়োর ‘রেড-হোয়াইট’ জোটের অন্তর্ভুক্ত। এর ফলে আঞ্চলিক পরিষদ এসব স্থানীয় সরকারপ্রধান নিয়োগ করবে। আঞ্চলিক পরিষদগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে রেড-হোয়াইট জোট। জকোভি ছিলেন সাবেক মেয়র ও গভর্নর এবং সরাসরি ভোটের ফসল হিসেবে তার উত্থান ঘটেছে, এ বিষয়টি কারোরই চোখ এড়ায়নি।

হংকংয়ে গণতন্ত্রের লড়াই by মুহাম্মদ খায়রুল বাশার

বিশ্ব ইতিহাসের দশটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতের মধ্যে দু’টি ছিল বিশ্বযুদ্ধ। অপর আটটির মধ্যে পাঁচটি চীনে সংঘটিত অথবা চীনে শুরু হয়েছিল। ওই সব যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতে বিপুলসংখ্যক  মানুষের প্রাণহানি ও রক্তবন্যা বয়ে গিয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসের দশটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতের মধ্যে দু’টি ছিল বিশ্বযুদ্ধ। অপর আটটির মধ্যে পাঁচটি চীনে সংঘটিত অথবা চীনে শুরু হয়েছিল। ওই সব যুদ্ধ ও সঙ্ঘাতে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ও রক্তবন্যা বয়ে গিয়েছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সংঘটিত তাইপিং বিপ্লবে ২০ মিলিয়ন তথা দুই কোটি লোক নিহত হয়। এক দশক পর হান চাইনিজ ও মুসলিমদের মধ্যকার সঙ্ঘাতে আরো আট থেকে ১২ মিলিয়ন, অর্থাৎ প্রায় এক কোটি ২০ লাখ লোক নিহত হয়। বিংশ শতাব্দীতে মাও সেতুংয়ের (মাও জেদং) শাসনামলে ২০ মিলিয়ন থেকে ৩০ মিলিয়ন, অর্থাৎ প্রায় ৩০ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। কিছু লোককে হত্যা করা হয়। বর্বরতা ও অদক্ষতার কারণে সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের ফলে বেশির ভাগ মানুষ মৃত্যুবরণ করে।

চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দ নিঃসন্দেহে নিজেদের স্বার্থে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকতে চান, কিন্তু দেশের ভয়ানক ইতিহাসের কথা স্মরণ করলে কেন তারা হংকংয়ের বিক্ষোভকারীদের কোনো সুযোগ না দেয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তার সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। হংকংয়ের বিক্ষোভকারীরা দেশটিতে সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। চীনা প্রেসিডেন্ট বিন জিন পিং এবং তার সহকর্মীরা মনে করে, দেশের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার একমাত্র পথ হচ্ছে গোটা দেশের ওপর পার্টির নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। তাদের আশঙ্কা, পার্টির নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলেই দেশ বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়ের পথে চলে যাবে। তাদের এই বক্তব্য সঠিক যে, স্বৈরতন্ত্র স্বল্প সময়ের জন্য দেশকে স্থিতিশীল করতে পারে। কিন্তু চীনাদের নিজস্ব ইতিহাস দেখানো সত্ত্বেও সেখানের স্বৈরশাসন দীর্ঘ দিন চলতে পারে না। একটি স্থিতিশীল সরকারের একমাত্র নিশ্চয়তা দিতে পারে জনগণ। জনগণকে তাদের সরকারের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হতে হবে। চীনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি জনগণের অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
১৯৯৮ সালে সাবেক ব্রিটিশ উপনিবেশ হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তারপর থেকে চীনের অধীন ‘এক দেশ দুই পদ্ধতি’ নীতিতে হংকংয়ের প্রশাসন পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু ২০১৭ সালের পরবর্তী নির্বাচনে যেকোনো নাগরিককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেয়ার দাবি করছে গণতন্ত্রপন্থীরা। হংকংয়ের নতুন প্রশাসক নির্বাচন প্রশ্নে গত মাসে চীনের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে হংকংয়ে বিক্ষোভ শুরু হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, হংকংয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পদের জন্য ২০১৭ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রার্থীদের আগে বেইজিং মনোনীত করবে। হংকংয়ের জনগণ চীনের এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। তারা যেকোনো নাগরিককে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দেয়ার দাবিতে সেপ্টেম্বরের প্রথম দিকে আন্দোলন শুরু করে। পরবর্তীকালে তাদের প্রতিবাদ-বিক্ষোভ গণবিক্ষোভে রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা হংকংয়ের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থান করে রাস্তা অবরোধ করে রাখে। ১ অক্টোবর ছিল চীনের ৬৫তম জাতীয় দিবস। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর কমিউনিস্ট চীনের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটে। চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চল হংকংয়ের বর্তমান প্রধান নির্বাহী লিউং চুন-ইং। আন্দোলনকারীদের দাবি মেনে না নেয়ায় গোটা হংকং এখন উত্তাল। হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থীরা প্রধান নির্বাহীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার সাথে আলোচনায় বসতে সম্মত হলেও আন্দোলনকারীদের ওপর পিপার ¯েপ্র, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ, হামলা ও পুলিশের শক্তি প্রয়োগের প্রতিবাদে আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে হংকংয়ের জনগণ প্রবলভাবে ফুঁসে উঠেছে। প্রতিবাদকারীরা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ১৯৯৭ সালে ব্রিটেন হংকংকে চীনের অধীনে হস্তান্তর করার সময় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

হংকংয়ে গণতন্ত্রের দাবিতে বিক্ষোভকারীরা তাদের আন্দোলনকে ‘ছাতা বিপ্লব’ নাম দিয়েছে। পুলিশের পিপার ¯েপ্র থেকে নিজেদের রক্ষায় আন্দোলনকারীরা ঢাল হিসেবে ছাতা ব্যবহার করেন। আর এই ছাতা বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেন সব ধরনের মানুষ। এতে ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, ব্যাংকার ও মিশনারিরা অংশগ্রহণ করেছেন। বৃষ্টি এবং কাঁদানে গ্যাস ও পিপার ¯েপ্র থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই তারা ছাতা বিপ্লবে অংশ নেন।
কিছু কিছু বিক্ষোভকারীর কাছে গণতন্ত্র হচ্ছে নীতির বিষয়। প্রধান ভূখণ্ড চীনের বাইরের মধ্যম শ্রেণীর তথা মধ্যবিত্ত জনগণ বাসস্থান, শিক্ষা এবং তাদের চাকরিসংক্রান্ত অন্যান্য বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তারা প্রতিনিধিত্ব চায়, কারণ এখন যেভাবে হংকংকে শাসন করা হচ্ছে তাতে তারা খুশি নয়। তাদের মোটিভেশন যে দিকেই থাকুক না কেন, প্রতিবাদকারীরা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে। তারা কেবল সাম্প্রতিক সময়ে গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরশাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করা যেমন কায়রো, কিয়েভের ঘটনাকেই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে নাÑ তাদেরকে ২৫ বছর আগে তিয়েন আনমেন স্কোয়ারে ছাত্রদের গণ-অভ্যুত্থানে গণহত্যা চালানোর বিষয়টির কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছে। ওই সব বিক্ষোভে চীনের গুলি বর্ষণের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছিল এবং শৃঙ্খলা ফিরে এসেছিল। কিন্তু চীনা শাসকদের ব্যাপারে বিশ্বব্যাপী অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বব্যাপী সনাতনী ব্যবসা-বাণিজ্য তথা সার্বিক ক্ষেত্রে একটি অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। এটা শুধু বর্হিবিশ্বে নয়Ñ চীনা জনগণের মধ্যেও শাসকদের ব্যাপারে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।
হংকংয়ে কমিউনিস্ট পার্টি কমিউনিস্টদের সমন্বয় এবং ঔপনিবেশিক কৌশল ব্যবহার করছে। প্রতিবাদকারীদের সরকারি মুখপাত্র ‘রাজনৈতিক চরমপন্থী’ এবং ‘কালো হাত’ আখ্যায়িত করে বলা হচ্ছে চীনাবিরোধী বিদেশীরা তাদেরকে বিভ্রান্তির পথে পরিচালিত করছে। তিয়েন আনমেন স্কোয়ারের প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। এতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি সরকারের দীর্ঘ দিনের অনিচ্ছার বিষয়টিই প্রতিফলিত হয়েছে। হংকং অথবা চীনের যেকোনো স্থানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তারা আগ্রহী নয়। পার্টির নেতৃবৃন্দ দেখেছেন, হংকং হচ্ছে একটি আন্তর্জাতিক নগরী সেখানকার মানুষ ব্রিটিশরা হংকংকে চীনের কাছে হস্তান্তর করার আগ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্যভাবে স্বাধীনতা ভোগ করত। চীনের অপর একটি অংশের শহরগুলোতে সমালোচকদেরকে বিদেশীদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার অভিযোগ এনে নাগরিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়। তারা মনে করে, পার্টির হংকং নীতির সাথে দীর্ঘ দিন ধরে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত মি. ঝি-ই হংকংয়ের ব্যাপারে বেশি জানেন। একই সময়ে পার্টিকে ছোটখাটো আঞ্চলিক সমস্যা কাটিয়ে ওঠার জন্য ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে দেখা গেছে। কমিউনিস্ট পার্টি ব্রিটিশদের তীব্র সমালোচনা করলেও টাইকনদের সমর্থন কিনে নিত। টাইকনদের মাধ্যমে তারা সেখানে আর কাউকে মাধা উঁচু করে দাঁড়াতে দিত না। মি. ঝি গণতন্ত্রের ব্যাপারে তার যে দৃষ্টিভঙ্গি সেটার ওপর তাদের সমর্থন নিশ্চিত করার জন্য হংকংয়ের ৭০ জন সুপার ধনাঢ্য ব্যক্তির সাথে বেইজিংয়ে বৈঠক করেন। হংকংয়ে পার্টির সমর্থকেরা যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, ব্যবসায়ীদের এক দিকে নিয়ে আসা স্থিতিশীলতার জন্য ভালো। সরকার নানাভাবে চেষ্টা করেও বিক্ষোভকারীদের রাস্তা থেকে সরাতে পারেনি। শক্তি প্রয়োগ ও হামলা চালানোর কারণে হংকংয়ের গণতন্ত্রপন্থীরা প্রধান নির্বাহীর আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। পরবর্তীকালে আবার আলোচনার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সরকার কি আলোচনার মাধ্যমে একটি সমাধানে আসবে, নাকি শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সঙ্কট সমাধান করবে। মি. ঝি মনে করেন, পার্টির জন্য স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার একমাত্র পথ হচ্ছে পার্টির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে আরো উচ্চকণ্ঠ হওয়া। এটা সম্ভব যে, তিনি আরো শক্তি প্রয়োগের কর্তৃত্ব দেবেন। ওই ধরনের পদক্ষেপ হবে হংকংয়ের জন্য একটি বিপর্যয়। এবং এতে মি. ঝি-এর সমস্যারও কোনো সমাধান হবে না। চীনের প্রধান ভূখণ্ডও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। পার্টি নেতৃবৃন্দ মূল ভূখণ্ডের জনগণকে হংকংয়ের ঘটনাবলি জানা থেকে বিরত রাখার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। হংকংয়ের ঘটনাবলি মূল ভূখণ্ডের জনগণকে প্রভাবিত করার ভয়ে নেতৃবৃন্দ শঙ্কিত। কমিউনিস্ট পার্টির জন্য সমস্যা হচ্ছে, মূল ভূখণ্ডের কিছু লোকের মধ্যে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আকাক্সার বিষয়টি যখন ফুটে উঠেছে এবং প্রায়ই সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, তখন অনেক লোক বর্তমানে যেভাবে দেশ শাসন করা হচ্ছে তার প্রতি তাদের অসন্তুষ্টির কথা জানিয়ে দিয়েছে। অত্যাচার, নির্যাতন, শক্তিপ্রয়োগ ইত্যাদিতে তো হংকংয়ে প্রতিবাদ বন্ধ করতে সক্ষম হবে; কিন্তু অন্য শহরগুলোতেও দ্রুত বিক্ষোভ শুরু হবে।
মি. ঝি-এর ক্ষমতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষমতা তিনি কুক্ষিগত করে রেখেছেন। তিনি এটা স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র সহ্য করবেন না। ভবিষ্যতে সেখানে কী ঘটবে তা অত্যন্ত অস্পষ্ট। চীনা প্রেসিডেন্ট ঝি জিনপিং এখন চাপের মুখে। হংকংয়ের বিশেষ মর্যাদাকে হয়তো আরো বাড়িয়ে দেয়া হবে। চীনে কোনো কোনো শহরে দেখা দিচ্ছে সরাসরি বিদ্রোহ। ইতোমধ্যে ঝিনজিয়াংয়ে ঝি-কে সঙ্কটে পড়তে হয়েছে। এরপর একটি গণতান্ত্রিক ও স্বৈরশাসিত দ্বীপ তাইওয়ান রয়েছে। তাইওয়ানকে চীন তার ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে মনে করে। হংকংয়ে কী হবে? সেখানে তিন ধরনের ফলাফল হতে পারে। প্রথমত, বিক্ষোভকারীরা সামান্য কিছু ছাড় দিয়ে গণতন্ত্রের ক্ষেত্র লাভ করতে পারে। দ্বিতীয়ত, হংকং একই অবস্থায় থেকে যেতে পারে। তৃতীয়ত, বেইজিং এক দেশ দুই নীতি ব্যবস্থাটি বন্ধ করে দিতে পারে। হংকংয়ের খোলানীতির কারণে আর্থিক ও রাজনৈতিকভাবে হংকং চীনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ইউক্রেনে রাশিয়া যা করেছে সে রকম হংকংয়ে চীনের দখলদার বাহিনী পাঠানোর প্রয়োজন নেই। ১৯৯৭ সাল থেকে শহরটিতে পিপলস লিবারেশন আর্মি মোতায়েন রয়েছে, আর গত ১৭ বছর ধরে হংকং চীনের একটি অভিন্ন অংশ হিসেবে রয়েছে। হংকং ঐতিহাসিকভাবে মুক্ত স্বাধীন থাকতে চায়। মূল ভূখণ্ডে সে ধরনের অভিজ্ঞতা শুরু করার জন্য হংকং হচ্ছে একটি আদর্শ স্থান। মি. ঝি এই সুযোগ পাওয়ায় বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলে তিনি অতীতের সব সম্রাট ও পার্টিপ্রধানদের চাইতেও দেশের জন্য বেশি কাজ করতে পারবেন।

নিখোঁজ মানুষ by পাত্রিক মোদিয়ানো

আমি কিছুই না। সেদিন সন্ধ্যায় ক্যাফের ছাদ-বারান্দার গায়ে ছায়া হয়ে থাকা সেই এক আবছা আকৃতি ছাড়া আর কিছুই না আমি। তখন আমি অপেক্ষা করছি যে বৃষ্টি কখন থামবে; বৃষ্টিটা শুরু হয়েছিল হুট্টে আমাকে ফেলে চলে যাওয়ার পরই।  এর কয়েক ঘণ্টা আগে আমরা আবার একবার শেষবারের মতো দেখা করেছিলাম এজেন্সির অফিসে। হুট্টে, বরাবরের মতো বসে ছিল তার বিশাল ডেস্কে, তবে কোট গায়ে চাপিয়েই। এর ফলে পুরো জিনিসটার মধ্যে সত্যি একটা বিদায়ের আবহ তৈরি হয়েছিল। আমি বসেছিলাম তার উল্টো দিকে, আমাদের ক্লায়েন্টদের জন্য রাখা হাতলওয়ালা এক লেদারের চেয়ারে। নানা রং ছড়ানো বাতিটা থেকে উজ্জ্বল আলো বের হয়ে আমার চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। ‘তো, গাই, তাহলে আজকের দিনটাই শেষমেশ এসে গেল...এখানেই তাহলে ইতি’, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল হুট্টে। ডেস্কে পড়ে আছে একটা দলছুট ফাইল। মনে হয় ওটা সেই কালোমতো ছোটখাটো লোকটার হবে, সেই যে ভয়-পাওয়া চেহারার, ফোলা ফোলা গালের লোক যে আমাদের ভাড়া করেছিল তার বউকে অনুসরণ করার কাজে। পরে বিকেলের দিকে ওই মহিলা পল-দুমার অ্যাভিনিউয়ের কাছে ভিতাল রোডের এক আবাসিক হোটেলে দেখা করল আরেক কালোমতো ছোটখাটো লোকের সঙ্গে,
তারও চেহারা ছিল ফোলা ফোলা ধরনের। চিন্তার মধ্যে ডুবে হুট্টে তার দাড়িতে হাত বোলাতে লাগল। খুব ঘন করে ছাঁটা ধূসরবর্ণ দাড়ি তার দুই গাল বেয়ে ছড়িয়ে গেছে। আর তার বড় স্বচ্ছ চোখ দুটো স্বপ্নালুভাবে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। ডেস্কের বাঁ পাশে একটা বেতের চেয়ার, কাজের সময় যেটাতে আমি বসি। হুট্টের পেছনে কাঠের কালো তাকগুলো দেয়ালের অর্ধেকটা দখল করে আছে। ওখানে সারি করে রাখা গত ৫০ বছরেরও বেশি সময়ের রাস্তাঘাট ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বহু ডাইরেক্টরি আর যত ধরনের সম্ভব ইয়ারবুক। হুট্টে আমাকে প্রায়ই বলত যে আমাদের কাজের জন্য অতি প্রয়োজনীয় জিনিস এগুলো, বলত যে সে কোনো দিন এদের থেকে বিদায় নেবে না। আর এই ডাইরেক্টরিগুলো, এই ইয়ারবুকগুলো আসলে আপনার পক্ষে কল্পনা সম্ভব এমন—সবচেয়ে দামি, সবচেয়ে আবেগ-জাগানো এক লাইব্রেরিই বটে—এদের পাতার পর পাতায় তালিকা করা আছে কত মানুষের, কত জিনিসের, কত হারিয়ে যাওয়া পৃথিবীর; সেসবের সাক্ষী হিসেবে টিকে আছে কেবল ওই তালিকাগুলোই। ‘এই এত এত ডাইরেক্টরি নিয়ে এখন কী করবে তুমি?’ আমি তাকগুলোর দিকে সাঁ করে একবার পুরো দেখে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তাকে। ‘ওগুলো আমি এখানেই রেখে যাচ্ছি, গাই। এই অ্যাপার্টমেন্টের লিজ আমি ছেড়ে দিচ্ছি না।’ সে এবার চারদিকে তাকাল একটা চকিত দৃষ্টি দিয়ে। পাশের ছোট ঘরটাতে যাওয়ার জোড়া দরজা খোলা ছিল; ওখান দিয়ে দেখা যাচ্ছিল বহু-ব্যবহৃত ভেলভেটে মোড়া সোফা, ফায়ারপ্লেস আর আয়নাটাকে—আয়নার ভেতরে ইয়ারবুক, ডাইরেক্টরির সারিগুলো আর হুট্টের মুখ। প্রায়ই আমাদের ক্লায়েন্টরা এই ঘরে বসে অপেক্ষা করে। ওখানে নকশাকাটা কাঠ দিয়ে তৈরি মেঝেটাকে সুরক্ষা দিচ্ছে একটা পারস্যের কার্পেট। দেয়ালে, জানালার কাছে ঝুলছে একটা মূর্তি।
‘গাই, কী ভাবছ তুমি?’
‘কিছু না। তো, তুমি তাহলে অ্যাপার্টমেন্টটা ছাড়ছ না?’
‘হ্যাঁ। মাঝেসাঝে আমি প্যারিস আসব, তখন এই এজেন্সির অফিস হবে আমার সাময়িক আবাস।’
সে তার সিগারেট কেসটা বাড়িয়ে দিল সামনের দিকে।
‘আমার মনে হয় এই অফিসটা যেমন আছে তেমনভাবে রেখে দিলেই বরং দুঃখ কম লাগবে।’
আমরা দুজন একসঙ্গে কাজ করছি আজ আট বছরেরও ওপরে হবে। হুট্টে নিজে এই প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেন্সি চালু করে ১৯৪৭ সালে; আর আমার আগে আরও বেশ কজন লোকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আছে তার। আমাদের ব্যবসাটা হচ্ছে, হুট্টের মতে, ক্লায়েন্টদের ‘সোসাইটি ইনফরমেশন’ সরবরাহ করা। এর সবই হলো—যেমনটা হুট্টে বারবার বলতে পছন্দ করত—সোসাইটির, মানে একটু ওপরতলার লোকজনের মধ্যেকার ব্যাপারস্যাপার নিয়ে নাড়াচাড়া করা।
‘তোমার কী মনে হয়, তুমি নিস-এ থাকতে পারবে?’
‘অবশ্যই পারব।’
‘বোর হয়ে যাবে না?’
সে ফুঁ দিয়ে খানিকটা ধোঁয়া ছাড়ল।
‘গাই, মানুষকে একদিন না-একদিন তো অবসরে যেতেই হবে।’
বিশাল দেহটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল হুট্টে। তার উচ্চতা নিশ্চিত ছয় ফুটের বেশি, আর ওজন অবশ্যই ২০০ পাউন্ডের ওপরে হবে।
‘আমার ট্রেন ১০টা ৫৫ মিনিটে। একটা ড্রিংক করার মতো সময় হাতে আছে আমাদের।’ সে আমার সামনে দিয়ে হেঁটে করিডরে গিয়ে ঢুকল। এই করিডরটা গেছে অফিসে ঢোকার মুখের হলঘরের দিকে, এক বেঢপ গোল-মতোন ঘর যার দেয়ালগুলো আবছা-ধূসর রঙের। একটা কালো ফোলিও ব্যাগ, ওটা কাগজপত্রে এত ঠাসা যে বন্ধ হচ্ছে না, পড়ে আছে মেঝেতে। হুট্টে ফোলিওটা হাতে তুলল, তারপর তার এক হাত ওটার নিচে দিয়ে সঙ্গে করে নিয়ে চলল।
‘তোমার লাগেজ নেই কোনো?’
‘সব আমি আগেই পাঠিয়ে দিয়েছি।’
হুট্টে এবার সামনের দরজা খুলল, আমি হলঘরের বাতি নিভিয়ে দিলাম। সিঁড়ির ল্যান্ডিংয়ে দরজা বন্ধ করার আগে সে থামল এক মুহূর্ত; তারপর দরজা আটকানোর ধাতব শব্দটা আমাকে ফেলে দিল এক গভীর বেদনার মাঝে। এই শব্দ ইতি ঘোষণা করল আমার জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়ের।
‘জীবনের এই ব্যাপারগুলো চরম কুৎসিত, তাই না গাই?’ বলল হুট্টে, আর তার কোটের পকেট থেকে বের করল বড় একটা রুমাল, ভুরু মুছল তা দিয়ে।
কালো মার্বেলের আয়তাকার ফলকটা, এর অক্ষরগুলো গিল্টি করা
আর চকচকে একটা জিনিস দিয়ে সেগুলোর ওপরভাগ মোড়ানো, তখনো লাগানো রয়েছে ওখানে: সি. এম. হুট্টে, প্রাইভেট এনকোয়ারিজ।
‘আমি এটা এখানেই রেখে যাচ্ছি,’ বলল হুট্টে, তারপর তালার মধ্যে চাবি ঘুরাল।
আমরা নিয়েল অ্যাভিনিউ ধরে একদম প্লেস পেরেইরে পর্যন্ত চলে গেলাম। বাইরে তখন অন্ধকার, আর শীতকাল যদিও আসতে খুব বেশি বাকি নেই, তবু আবহাওয়া বেশ সহনীয়ই ছিল বলতে হয়। প্লেস পেরেইরে পৌঁছে আমরা হোরটেনসিয়াস ক্যাফের ছাদের বারান্দায় গিয়ে বসলাম। এই ক্যাফেটা হুট্টে পছন্দ করে কারণ এর চেয়ারগুলো বেতের—‘ঠিক আগেকার দিনের মতো।’
‘তা এবার তোমার ব্যাপারে বলো গাই, তুমি কী করবে বলে ঠিক করেছ?’ ব্র্যান্ডি ও সোডার কয়েক ঢোক খেয়ে নিয়ে আমাকে জিজ্ঞেস করল সে।
‘আমি? আমি একটা জিনিসের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছি।’
‘খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছ মানে?’
‘হ্যাঁ। আমার অতীতের।’
কথাটা মনে হয় একটু অদ্ভুতভাবেই বলে ফেললাম আমি; শুনে মুখে একটু হাসি ফুটল হুট্টের।
‘আমি অবশ্য সব সময়ই ভাবতাম যে একদিন না-একদিন আবার তুমি তোমার অতীত খোঁজার চেষ্টা চালাবে।’
এবার হুট্টে সিরিয়াস হয়ে গেল, তার কথা নাড়া দিল আমাকে।
‘কিন্তু কথা শোনো, গাই। আমি জানি না ওই অতীত খোঁজার কোনো অর্থ হয় কি না।’
চুপ হয়ে গেল সে। কী ভাবছে সে? তার নিজের অতীতের কথা?
‘আমি তোমাকে এজেন্সি অফিসের একটা চাবি দিয়ে যাচ্ছি। তাহলে মাঝেমধ্যে তুমি ওখানে যেতে পারবে। আমার সেটাই ভালো লাগবে।’
সে তার হাতে একটা চাবি বাড়িয়ে ধরল, আমি ওটা রাখলাম আমার ট্রাউজারের পকেটে।
‘আর নিস-এ আমাকে কল কোরো। আমাকে খবরাখবর জানিয়ো, জানিয়ো যে তোমার দিনকাল কেমন যাচ্ছে...মানে তোমার অতীত খোঁজার বিষয়টা...।’
উঠে দাঁড়াল সে, আমার হাত জড়িয়ে ধরল।
‘আমি কি তোমার সঙ্গে স্টেশন পর্যন্ত যাব?’
‘না, না...দুঃখ বাড়বে তাতে...।’
একটা বড় পা ফেলে সে বেরিয়ে গেল ক্যাফে থেকে, একবারও পেছনের দিকে ঘুরল না। আমি হঠাৎ একধরনের শূন্যতা অনুভব করলাম। এই লোকটা আমার জীবনে অনেক তাৎপর্যবহ এক লোক। আমি ভাবি যে তাকে ছাড়া, তার সাহায্য ছাড়া ওই ১০ বছর আগে কী অবস্থা হতে পারত আমার, যখন আমি পুরোপুরি স্মৃতি হারিয়ে অন্ধের মতো হাতড়ে ফিরছিলাম এক কুয়াশার মধ্যে। আমার ঘটনা তার মনকে নাড়া দিয়েছিল এবং তার যে লোকজন অনেক চেনাজানা সে ব্যাপারটার সাহায্য নিয়ে সে এমনকি আমার জন্য বৈধ পরিচয়পত্র ইত্যাদি জোগাড় করে দিতেও সক্ষম হয়েছিল। ‘এই নাও’, সে আমার হাতে একটা বড় খাম তুলে দিতে দিতে বলেছিল সেই দিন, ওটার ভেতরে ছিল একটা পরিচয়পত্র আর একটা পাসপোর্ট। ‘তোমার নাম এখন থেকে গাই রোঁল্যা।’ আর এই প্রাইভেট ডিটেকটিভ ভদ্রলোক—যার পেশাদারি সেবার সহযোগিতা আমাকে বারবার নিতে হয়েছে, যখনই আমি আমার অতীতকালের কোনো সাক্ষী কিংবা কোনো নিশানার ঢাকনা উন্মোচন করতে চেয়েছি—সেদিন আরও যোগ করেছিল: ‘মাই ডিয়ার গাই রোঁল্যা, আজ থেকে আর পেছন দিকে তাকিয়ো না; শুধু বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েই ভেবো। আমার সঙ্গে কাজ করবে নাকি?...’ আমার জন্য যদি সে কোনো টান বোধ করে থাকে, তাহলে তা এ কারণেই যে (ব্যাপারটা আমি পরে জেনেছি) সেও তার নিজেকে নিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেছিল, তারও জীবনের একটা পুরো অধ্যায় ঢাকা পড়ে গিয়েছিল অন্ধকারে—অতীতের সঙ্গে তখনো তার নিজের যোগ ঘটানো যায় এমন সামান্য কোনো নিশানা, সামান্য কোনো সংযোগসূত্র না রেখে। কারণ, এই ক্লান্ত বুড়ো মানুষটা, যাকে আমি তখন দেখছি গায়ে জীর্ণ এক কোট চাপিয়ে আর কালো রঙের বড় এক ফোলিও হাতে নিয়ে রাতের অন্ধকারের মধ্যে হেঁটে চলে যাচ্ছে, সেই বৃদ্ধ আর অতীত দিনের সুদর্শন এক টেনিস খেলোয়াড়, হালকা-হলুদ চুলের বাল্টিক ব্যারন কনস্টান্টিন ফন হুট্টের মধ্যে কি মিল আছে কোনো?
পাত্রিক মোদিয়ানোর মিসিং পারসন উপন্যাসের প্রথম অধ্যায়ের অনুবাদ।

দখলের দৌড় by নাহার মনিকা

শুধু শীতকালটাই যা সমস্যা। কোনোমতে জ্যাকেট, সোয়েটারের সঙ্গে নিজের শরীরটা টেনেহিঁচড়ে চার চার মাস কাটিয়ে দিতে পারলে এ দেশে গরমকালের তুলনা হয় না। শনিবারের সকালে বাসার কাছের পার্কের বেঞ্চিতে বসে ফোনে শীতকালের গল্প বললেও ভেতরের চিনচিনে টেনশন এড়াতে পারে না ফয়সাল। মোজাম্মেল চাচা মানে রুকুর আব্বা এখনো বাসায় ফেরেনি। রুকুর হাবিজাবি প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে ফয়সাল সতর্ক হয়। হাজার হলেও প্রতিবেশী, ফোনে প্রায়ই কথা হলেও সম্পর্কটা কোনো মোড় নেয়নি। ফয়সাল আগে কাঁধ থেকে নিজের জোয়াল নামাতে চায়। আরেকটা কাজ খুঁজছে সে, একটা মাত্র চাকরি করে আর কুলানো যাচ্ছে না। পার্কের অদূরে কৃত্রিম ছোট জলার পাশে এত দিনে ফয়সালের প্রিয় হয়ে ওঠা একটা উইপিং উইলোগাছ, ডালপালা নুইয়ে ক্রন্দনরত। একটা পাখির দল ‘ভি’ শেপ বানিয়ে বেশ উঁচুতে উড়ে যাচ্ছে, মনটা ফুরফুরে হতে হতে আবার ভার হয়। জুলাই মাসের এমন সকালবেলাও সে উপভোগ করছে না! ‘বুঝলা, আজকে এইখানে কী যে সুন্দর একটা দিন, গরম কিন্তু হিউমিডিটি কম বলে ঘামটাম নেই।’ ‘ইশ্ কী ভাগ্য আপনাদের! আর আমরা গরমে কাঁঠাল পাকায়ে ফেলতেছি।’ টলটলে চোখ রুকুর, ফয়সাল চোখ বন্ধ করে ওর হাসি দেখতে পায়। অনলাইনে তাকে পাওয়া যায় না বলে রুকু অনুযোগ করে। কিন্তু বেশ কয়েক মাস হলো ইন্টারনেট সার্ভিস নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে ফয়সাল। রুকু এখানের শপিং মলের কথা জানতে চাইলে ফয়সালের কেবল সেইন্ট রক মলের ফুডকোর্টের রেস্টুরেন্টে কাজ করার কথা মনে আসে।
কারি হাউস, সাইনবোর্ডের নিচে ছোট্ট অক্ষরে লেখা ‘স্পাইসি চিকেন অ্যান্ড ভেজিটারিয়ান কুইজিন।’ তা-ও সে সব সময় ঢুকত পেছনের গেট দিয়ে, যেখানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর পার্কিং লট, সেখান দিয়ে। মালিকের সঙ্গে দুই হাতে পানি নয়তো সফট ড্রিংকসের ক্রেট, অথবা ডিস্পোজেবল প্লেট, ন্যাপকিন ইত্যাদি নানা রকম কাজ করত। কাজ যখন শেষ হতো, শরীরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ক্লান্তিতে দোকানপাটের দিকে তাকানোও হতো না তার। আর গত দুই বছর ধরে বিলাসিতা বলতে কলিং কার্ড দিয়ে দেশে ফোন করা। অথচ কেনাকাটার শখ তারও কি কম, বিশেষ করে পারফিউম? সেই জগন্নাথে পড়ার সময়ই সে ঢাকায় দোকান খুঁজে খুঁজে পারফিউম কিনেছে। আর এখানে সব ভালো ব্র্যান্ডের এন্তার ছড়াছড়ি! কিন্তু... একটা বিশালকার ‘কিন্তু’ গলায় আটকে থাকে তার। কেন যে জমিটা কিনতে গেল! প্রেয়সীর তিলের জন্য সমরখন্দ বোখারা বাজি ধরেছিলেন যে কবি, তাঁর কথা মনে হলে হাসি পায় ফয়সালের। তার তো রাজ্যপাট না, মাত্র ২২ কাঠা জমি, আর এ জন্য রুকুকেও সে কোনো রকম প্রতিশ্রুতির বাইরে রেখেছে। ‘ও হ্যাঁ’, হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে খবরটা দেয় রুকু। জমিটার ব্যাপারে তার আব্বাও উকিলের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে চেয়েছে। মাস দেড়েক আগে জরুরি ভিত্তিতে ইটের দেয়াল তোলা হলো। জবরদখলকারী গুন্ডা-মাস্তানদের বিশ্বাস আছে? সুতরাং আবার টাকা। বাড়তি লাখ দেড়েক টাকা পাঠাতে হলো। চিন্তিতভাবেই ফোনালাপ শেষ করে ফয়সাল। জমিতে তো একটা বড় সাইনবোর্ডও আছে, ‘এই জমির মালিক...’ ইত্যাদি। তার পরও ঝামেলা তাকে ছাড়ছে না। কানাডায় আসার পর প্রথমবার দেশে গেল আট বছর পর। ঢাকা শহরের ভিড়ভাট্টা ভালো লাগেনি। তার চেয়ে তারাগঞ্জ অনেক বেশি শান্তির জায়গা মনে হয়েছে। অথচ কী আশ্চর্য, আগে নিজের এলাকাকে কেমন গ্রাম্য মনে হতো!
এক সকালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফয়সালের মনে হচ্ছিল, বাকি জীবন এই তারাগঞ্জেই কাটিয়ে দিতে পারে সে। আর সেদিনই মোজাম্মেল চাচা জমিটার খোঁজ এনেছিল। একসঙ্গে ২২ কাঠা জমি আজকের দিনে পাওয়া মুশকিল; আর একটু ভেতরে সরকারি বাঁধের দিকে হলেও দাম চলতি বাজারের তুলনায় বেশ কম। তারাগঞ্জ থেকে রিকশায় ১০ মিনিট। কাশবনে ছাওয়া শান্ত খোলা জমি ফয়সালকে কেমন বিহ্বল করে তুলেছিল। নিচু হয়ে হাত দিয়ে সে ছুঁয়ে দেখেছিল ঘাস, আগাছা আর কাশবনের গোড়ায় শুকনা শাদাটে শরৎকালের মাটি। কিন্তু জমির সস্তা দামও তার কাছে আকাশচুম্বী ঠেকায় প্রথমে কিছু বলতে পারেনি। সন্ধ্যাবেলা আম্মা তাকে শোবার ঘরে ডেকেছিল। স্টিলের আলমারি খোলা, ব্যাংকের পাশবই আর কাগজপত্র বিছানার ওপর ছড়ানো। টাকা জমিয়েছে। স্কুলশিক্ষকের পেনশনের টাকায় কৃচ্ছ্রসাধন করে চলা অভ্যাসে ছেলের পাঠানো প্রায় সব টাকাই জমিয়ে রেখেছে মা। হ্যাঁ, এ দিয়ে বায়নার টাকাটা হয়ে যায়। এখন ফয়সাল যদি মাসে মাসে আরেকটু করে পাঠায়, তাহলে এই জমিটা হাতছাড়া হয় না। মেজো খালুদের মতো একটা কোল্ড স্টোরেজের ব্যবসা যদি করা যায়—ছেলেরও তাহলে বিদেশবিভুঁইয়ে পড়ে থাকার দরকার পড়ে না। জমিটা থাকলে সঙ্গে বাড়ি দেখিয়ে ব্যাংকলোনও পাওয়া যাবে। বিষয়টা নিয়ে আতিপাতি করে ভেবে ফয়সাল নিজেও লুব্ধ হয়েছে। হ্যাঁ, তাকে খাটতে হবে। হয়তো আরেকটা কাজ জোগাড় করতে হবে, নাইট শিফট বা শনি-রোববারে। এ আর এমন কি! জমিটা একতাল সোনার মতো! মোজাম্মেল চাচা যেমন বলছিল, খালি জমিতে কিছু গাছ লাগিয়ে দিলেও দুই-তিন বছরে লকলক করে বাড়বে, সেগুলো বেঁচেও কত টাকা! তা তিন-চার বছর তো লাগবেই, ফয়সাল কি চাইলেই ঝটপট ফিরতে পারবে? অন্তত বিয়ে করে বউ নিয়ে গিয়ে সিটিজেন হওয়ার মেয়াদ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত থাকতে হবে। তারপর একটা বা দুটো সন্তানের বিদেশে জন্মানোর নিরাপদ দিকটাও একদম ফেলে দেওয়া যায় না। এই স্বপ্নে রুকু প্রবেশ করলে ফয়সাল আপনমনে লাজুক হেসে আম্মাকে মাথা দুলিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলে দিয়েছিল।
বায়না দিয়ে ফয়সাল ফিরে যাবে আর মাস খানেকের মধ্যে পাঠাতে হবে বাকি টাকা জোগাড় করে। কিন্তু এক মাসের মধ্যে এত টাকা! মেজো খালু মাথা নেড়েছে, ‘পাগল নাকি? এমন জমি কেউ হাতছাড়া করে? কত্ত মানুষ লাইন িদয়া আছে।’ আম্মা মুখ মলিন করে বসে থাকলে মেজো খালু আর মোজাম্মেল চাচার সামনে নিজের অহমিকা আহত হতে দেয়নি ফয়সাল। মাস খানেকের মধ্যে টাকা একসঙ্গে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতে বড় ভালো লেগেছিল। পরের সপ্তাহে কানাডা ফিরেছিল সে। নিজে জমির মালিক আর মাথার ওপরে বিপুল ঋণের বোঝা—এই দুই অনুভব নিয়ে তার জেট ল্যাগ উধাও হয়ে গিয়েছিল। তিন-চারটা ক্রেডিট কার্ড ছিলই। ব্যাংক তাকে বড় অঙ্কের ধারের ক্রেডিট লাইন দিতে চেয়েছিল আগে একবার, খামোখা সুদ দিয়ে লাভ কী, এই ভাবনা থেকে তখন গা করেনি। ব্যাংকগুলো তো মুখিয়ে আছে ধারকর্জ দেওয়ার জন্য। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে, ব্যাংকের ফাইন্যান্স ম্যানেজার লেবানিজ লোকটা কি হেলাফেলায় ২৫ হাজার ডলার বরাদ্দ করে দিল! সুদের হারও কম, সে তুলনায় মাস্টার কার্ড বা ভিসা, অথবা আমেরিকান এক্সপ্রেসের কোনো কোনোটায় ২০, ২২ এমনকি ২৫ পার্সেন্ট সুদ। কিন্তু তখন আর ফেরার উপায় নেই। যুদ্ধে নাম লেখানো হয়ে গেছে ফয়সালের। সব মিলিয়ে হাজার পঞ্চাশেক ডলার আপাতত জোগাড় হোক। হুন্ডি, ব্যাংক—দুই রকমেই টাকা পাঠিয়েছে। আম্মা যেদিন দলিলের নকলটাও হাতে পেল, সেদিন নিজের জন্য একজোড়া স্নো বুট মূল্যহ্রাসে কিনেছিল। পাশের ফ্ল্যাটের রাজেশ প্যাটেল বারান্দায় বসে ফয়সালকে হাত তুলে ডেকে সেদিন নিজের পানাহারের সঙ্গী করেছিল। ক্যাসিনোতে কাজ করে রাজেশ। বউ-বাচ্চা গুজরাটে বেড়াতে যাওয়ায় একলা লাগলে ফয়সালকে ডাকে। ক্যাসিনোতে জুয়াড়ি আর সুন্দরী বারবনিতাদের গল্প শুনে ভালোই সময় কাটে। সেদিনও নির্ভার সন্ধ্যা কেটেছিল। তারপর দুই বছর ধরে ফয়সাল তার নয়-নয়টা ক্রেডিট কার্ড দিয়ে শাফল খেলছে। অল্প সুদের কার্ড থেকে টাকা তুলে বেশি সুদের ধার শোধ করছে। আসল শোধ করতে পেরেছে সামান্যই। মাঝেমধ্যে ঘুমানোর সময় কার্ডগুলোর পেছনে বসে থাকা সুদখোর কোম্পানির হর্তাকর্তাদের দেখে দুঃস্বপ্নে। রাজেশ তাকে শনি ও রোববারে মাস দুয়েকের একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছিল। সেই কাজ শেষ হলে ফয়সালের আবার তেলবিহীন প্রদীপের দশা।
ক্লান্তিতে নুয়ে গেলে নিজের ২২ কাঠা জমির কথা ভাবে ফয়সাল, ভেবে ভেবে চাঙা হয়ে উঠতে চায়। যতই সে পরবাসী হোক, দেশে তার নিজের কিছু আছে। দৈনন্দিন যে কোনো তাচ্ছিল্যের কাছে এই ২২ কাঠা জমি ফয়সালকে বুক টান করে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে এসব কী বলছে আম্মা? ‘হ্যাঁ, তোর খালু বলতেছিল জমিটার নাকি কী একটা ঝামেলা দেখা দিছে।’ ‘মানে?’, প্রায় চিৎকার করে উঠেছে ফয়সাল। ‘তুই তোর মেজো খালুকে একটা ফোন কর।’ আম্মার ক্লান্ত কণ্ঠস্বর বিপর্যস্ত শোনায়। মেজো খালু মোটরসাইকেল চালাতে চালাতে মোবাইলে কথা বলে, বাতাসে কথা কেটে কেটে যায়। আতঙ্ক লাগে ফয়সালের। হোন্ডা বাড়ির উঠানে থামার শব্দ পায় সে। ‘বাবা ফয়সাল, এত দিন তো সব ঠিক ছিল, এখন হঠাৎ এই নতুন উৎপাত শুরু হইয়া গেল।’ ফয়সাল চুপ থাকলে খালু নিজেই কথা শুরু করে, ‘জমিটা যখন তুমি নিলা, তখন তো নিষ্কলঙ্ক জমি ছিল।’ ‘এইটা কী বলতেছেন খালু! মোজাম্মেল চাচা আর আপনি দুজনই না বললেন ভালো সোর্স।’ ‘এই রকম চোখের সামনের জমিতে এমন ঘাপলা থাকতে পারে...’, মেজো খালু বরাবর ধীরস্থির, মুরব্বিয়ানা আয়ত্তে এনে কথা বলেন, ‘এই জমির অর্ধেক অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তফসিলভুক্ত হয়া গেছে সেই ১৯৮৬ সালে—এই কথা তো আমাদের জানার উপায় ছিল না। জমি যার কাছ থেকে আমরা কিনলাম, সেই সাইদুর রহমান আসলে জমিটা ইজারা নিছিল, বুঝলা বাবা?’ নাহ্, এসব নথিপত্রের কথাবার্তা ফয়সাল বুঝতে পারছে না। তার অধৈর্য লাগে, ‘খালু, এখন কী হবে সেইটা বলেন! আমাদের তো সাইনবোর্ড লাগানো আছে।’ ‘হ্যাঁ, সাইনবোর্ড আছে, আর নিজেদের এত দুর্বল ভাবার কোনো কারণ নেই। সাবকবলা দলিলটাও তো রেজিস্ট্রি করা হইছিল।’, মেজো খালু যথাসম্ভব আশ্বস্ত করে ফয়সালকে, ‘কেনা জমি হাতছাড়া হবে এত সহজ নাকি?’ রুকুদের বাসায় ফোন করে ফয়সাল এবার মোজাম্মেল চাচাকে চায় প্রথমেই। ‘আসলে ঘটনা এখন তোমাকে খুলে বলতেই হবে। তোমার কি দেশে আসতে পারার কোনো সম্ভাবনা আছে?’ মাথা নষ্ট! ফয়সালের এখন মরার সময় নেই। জমিটা নিয়ে একটা পুলিশ
কেস আছে। আদতে জমির মালিক নাকি আমপাড়ার সুখেন হালদার, ওর মায়ের দিককার প্রপার্টি। তাকে সাইদুর রহমান ভুয়া কেস দিয়ে জেলে পাঠিয়ে, তার অসাক্ষাতে কাগজপত্র বানিয়ে জমি বিক্রি করে দিয়েছে। সুখেন জেল থেকে এত দিন পরে ছাড়া পেয়ে সাইদুরের বিরুদ্ধে মামলা করেছে। তার কাছে আসল দলিল আছে। ‘তখনই সব গড়বড় টের পাওয়া গেল।’ রুকুর আব্বার মনে হচ্ছে ঘটনা রসিয়ে বলতে পেরে বেশ ভালো লাগছে। বলার মতো গল্প। ‘তাইলে এক কাজ করো, শাজাহান উকিলকে তুমিই একবার ফোন দেও, উনি দেওয়ানি মামলার উকিল, ভালো ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।’ মোজাম্মেল চাচা নামাজের ওয়াক্তের কথা বলে সংক্ষেপে শেষ করে। রোববার ভোররাতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখে ফয়সাল। ঘুম ভাঙামাত্রই ফোন টেপে। শাজাহান উকিল ফোন ধরে হ্যালো বলেই অন্য কার সঙ্গে যেন কথায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফয়সালের অধৈর্য সীমা ছাড়ালে উকিল সাহেবের মিহি গলা শোনা যায় আবার। ‘আপনে বাদী? কার বিরুদ্ধে মামলা করবেন?’ কার বিরুদ্ধে মামলা করবে! ফয়সাল গুছিয়ে অবস্থাটা বলার চেষ্টা করে। উকিল সাহেব পুরোটা শেষ করতে দেয় না। পক্ষ-বিপক্ষ, মামলার আরজি, সাবমিশন, অর্ডার শিট ইত্যাদি শব্দের তোড়ে ক্রমেই খেই হারিয়ে ফেলতে থাকে সে।
‘আপনে এক কাজ করেন, বুধবার বিকেলে আসেন।’ ‘আমি তো দেশের বাইরে থেকে বলছি, আসতে পারব না।’ ...।’ দীর্ঘ একটা ‘অ’ যেন সুতানলি সাপ, ফোনের এ প্রান্তে ভেসে আসে। আম্মাকে ফোন করে ফয়সাল। আম্মা কি তাকে ঘটনা আঁচ করতে দিতে চাইছে না! কেন যাচ্ছে না মেজো খালুকে সঙ্গে নিয়ে যেখানে যাওয়া প্রয়োজন—কোর্ট-কাছারি, যেখানে দরকার। নাহ্, মেজো খালুকে আবার ফোন করে ফয়সাল। ‘খালু, আমাদের দলিল কি জাল?’ না না, তা হবে কেন? তবে এখন মামলা-মোকদ্দমা এড়ানো যাচ্ছে না। আমরা সাইদুরের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করব। তোমাকে একবার দেশে আসতে হবে।’ সাইদুরের মামলা সুখেনের বিরুদ্ধে, সুখেনের মামলা সাইদুরের বিরুদ্ধে, ফয়সালের মামলা সাইদুরের বিরুদ্ধে—মামলার ত্রিভুজাকৃতির লাটিম বনবন ঘুরতে থাকে, ফয়সালের মাথায় ঢোকে না কিছুই। ঘুমভাঙা চোখে সে বের হয়ে আসে সামনের পার্কে। উইপিং উইলোগাছের পাতায় সকালের চকচকে আলো। কপালের শিরা দপদপ করে ফয়সালের। রাজেশ জগিং করতে বেরিয়েছে। দৌড় শেষে পাশে এসে বসে পড়ে হাঁপায়। ‘ম্যানগুচিয়ার আপ। কী হইছে তোমার?’ বিমর্ষ ফয়সাল বিড়বিড় করে, ‘আমি সর্বস্বান্ত হয়ে গেছি, ম্যান আই অ্যাম টোটালি ব্রোক...।’ ‘হোয়াট ডু ইউ মিন, ইউ নেভার গো টু ক্যাসিনো, ইউ ডোন্ট ডু গ্যাম্বলিং!’ ‘ইয়েস, আই ডিড গ্যাম্বলিং...আ হিউজ ওয়ান...।’ ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠতে গিয়ে থেমে যায় ফয়সাল, বিড়বিড় করে তোতলাতে থাকে।

২০২৪ সালে নভোমণ্ডলে আর জলের অতলে!

আগামী এক দশকেই নাকি পর্যটনশিল্প মানবজাতিকে ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যাবে। পর্যটন ভবিষ্যতে ডানা মেলে দেবে দূর নভোমণ্ডলে আর ডুব দেবে মহাসাগরের অতল জলের তলে। পৃথিবীর পর্যটনশিল্পের ভবিষ্যৎ গতি-প্রকৃতি নিয়ে গবেষণার পর এমনটাই জানিয়েছেন কয়েকজন ভবিষ্যৎ-তত্ত্ববিদ ও পর্যটনশিল্প বিশেষজ্ঞ। বার্তা সংস্থা এএফপির বরাত দিয়ে হিন্দুস্তান টাইমস এ কথা জানিয়েছে।
সাহসী পর্যটকদের যাঁরা ইতিমধ্যেই অ্যান্টার্কটিকার মেরু অঞ্চলে গিয়ে শীল মাছেদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন কিংবা পাপুয়া নিউগিনির দুর্গম বনাঞ্চলের আদিবাসীদের সঙ্গেও বন্ধুত্ব করে এসেছেন, তাঁরা আগামী দিনে কোথায় যাবেন! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতল জলের আহ্বানে মহাসাগরের তলায় ডুব দিতে পারেন তাঁরা। কিংবা সত্যি সত্যিই উড়ে যেতে পারেন মহাশূন্যে! যদিও এমন দুঃসাহসী যাত্রায় বিত্ত আর সক্ষমতার প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দেবে। কিন্তু এটা ঠিক যে, আগামী এক দশকেই পর্যটনশিল্পের এই দুই নতুন গন্তব্যে নিয়মিত ভ্রমণের সুযোগ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। ‘স্কাইস্ক্যানার রিপোর্ট ২০১৪’-তে এমনটাই জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

মহাশূন্যে যাত্রা
কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি কোম্পানিগুলো পর্যটকদের নিয়ে মহাশূন্যে নিয়মিত নভোযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। বিভিন্ন কোম্পানির মধ্যে এই প্রস্তুতি নিয়ে ইতিমধ্যেই তুমুল প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু ২০১৪ সালের মধ্যেই হয়তো ভার্জিন গ্যালাকটিক এবং ওয়ার্ল্ড ভিউ এন্টারপ্রাইজের মতো প্রকল্পগুলো আলোর মুখ দেখতে শুরু করবে। অন্ততপক্ষে পৃথিবীর কক্ষপথে নিয়মিত পর্যটক পরিবহনের সুযোগ পেয়ে যাবে তারা। স্কাইস্ক্যানারের প্রতিবেদনের অন্যতম ভাষ্যকার ভবিষ্যৎ-তত্ত্ববিদ ড্যানিয়েল বুররুস এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘১০ বছরের সীমারেখার মধ্যেই আমরা এমন মহাকাশযাত্রার বুকিং শুরু করতে পারব, যেখানে মহাকাশের উত্তেজনাময় পরিবেশে সময় কাটিয়ে হাসি-আনন্দে ফিরে আসতে পারব আমরা।’

সাগরতলে ভ্রমণ
জলের তলে ভ্রমণে আগ্রহ বাড়ছে অনেক দিন ধরেই। কিন্তু সাগরতলে ভ্রমণ নিয়ে আগামী ১০ বছরেই পর্যটনশিল্পের পুরোদস্তুর বাজার দাঁড়িয়ে যাবে বলে মন্তব্য করা হয়েছে স্কাইস্ক্যানার প্রতিবেদনে। উদাহরণ হিসেবে পোল্যান্ডের কোম্পানি ডিপ ওয়াটার টেকনোলজির কথা বলা যেতে পারে। এরা মহাকাশযানের মতো দেখতে গোলাকৃতির আংশিক জলে ডোবা হোটেল বানিয়েছেন। যেখানে গিয়ে সাগরতলের পরিবেশ উপভোগ করতে পারবেন অতিথিরা। দুবাই এবং মালদ্বীপে ভ্রমণের জন্য বিশেষভাবে বানানো এই ওয়াটার ডিসকাস হোটেলের তলার দিকে একটা আন্ডারওয়াটার ডেক থাকবে। প্রায় ৩০ ফুট উচ্চতার এই ডেকে বসে অ্যাকুরিয়ামে বসে থাকার মতো করে সাগরের তলদেশ দেখা যাবে।
পর্যটনশিল্পের এই দুই ভবিষ্যৎ গন্তব্যের মধ্যে তুলনা করতে গিয়ে অবশ্য স্কাইস্ক্যানারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গ্যারেথ উইলিয়ামস বলেছেন, তিনি বাজি ধরতে পারেন, মানুষ আগে সাগরের তলাতেই বেশি যাবে। কেননা, মহাকাশযাত্রার বিপুল খরচের কারণেই জলের তলের চেয়ে নভোমণ্ডলে মানুষের পদচারণ তুলনামূলকভাবে কম হবে।

সান্তা মারিয়ার খোঁজে

সান্তা মারিয়া ডুবল ৫০০ বছরের বেশি পেরিয়ে গেল। আর দুনিয়ার ইতিহাস পাল্টে দেওয়া সান্তা মারিয়ার খোঁজে অভিযান চলছে সে-ও তো অনেক দিনের কথা। এই মে মাসে তো প্রায় উৎসবই শুরু হয়ে গিয়েছিল সান্তা মারিয়াকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দে! প্রায় এক দশক ধরে চালানো এক অভিযান শেষে মার্কিন বিশেষজ্ঞ ব্যারি ক্লিফোর্ডের নেতৃত্বাধীন অনুসন্ধান দল দাবি করেছিল হাইতির উপকূলে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের সান্তা মারিয়াকে খুঁজে পেয়েছেন তাঁরা। কিন্তু এ নিয়ে সংশয় কাটছিল না অনেকেরই।

সান্তা মারিয়া, পিন্তা আর নিনা। এই তিন জাহাজের নৌবহর নিয়েই ভারত তথা এশিয়ায় আসার সংক্ষিপ্ত পথ খুঁজে বের করতে ১৪৯২ সালে স্পেন থেকে রওনা দিয়েছিলেন কলম্বাস। কিন্তু এশিয়ায় না পৌঁছে কলম্বাসের আমেরিকায় চলে যাওয়ার ইতিহাস তো সবারই জানা। তবে, আটলান্টিক পাড়ি দিয়েই দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল সান্তা মারিয়া। ধারণা করা হয় শীতকালে বড়দিনের দিনেই হাইতি উপকূলের কাছাকাছি সাগরতলের কোনো একটা পাথুরে বা প্রবাল প্রাচীরে ধাক্কা খায় সান্তা মারিয়া। দুর্ঘটনা কবলিত জাহাজটি সেখানেই পরিত্যক্ত হয়।
সেই থেকে সান্তা মারিয়া পড়ে রইল সাগরের তলে। কিন্তু আধুনিক দুনিয়ার নতুন মানচিত্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা জাহাজটিকে খুঁজে বের করতে বদ্ধ পরিকর হাইতি। মে মাসে হাইতির উপকূলে ব্যারি ক্লিফোর্ডের পাওয়া জাহাজটি সান্তা মারিয়া নয় বলে জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞদের প্রতিবেদনের পরও দমে যান নি হাইতির সংস্কৃতিমন্ত্রী মনিক রোকোর্ত। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন সান্তা মারিয়ার খোঁজ না পাওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য সব স্থানেই তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাবে হাইতি।
হাইতি সরকারের অনুরোধে ইউনেসকোর বিশেষজ্ঞ দল ব্যারি ক্লিফোর্ডের পাওয়া জাহাজের ধবংসাবশেষ পরীক্ষা করে দেখে। তাঁরা জানান, প্রাপ্ত জাহাজটির কাঠামোতে ব্রোঞ্জ বা তামার পাতের ব্যবহার দেখা গেছে; যা ১৭ ও ১৮ শতকের জাহাজ নির্মাণশৈলীতে চালু হয়। সান্তা মারিয়া তৈরির সময় এমন নির্মাণশৈলীর কথা জানা যায় না। স্পেনের সাগরতলের প্রত্নতত্ত্ব জাদুঘরের সাবেক পরিচালক এবং জাহাজ ধংসাবশেষ বিশেষজ্ঞ নিয়েতো প্রিয়েতো ইউনেসকোর এই বিশেষজ্ঞ দলের নেতৃত্ব দেন। সোমবার প্রকাশিত ইউনেসকোর প্রতিবেদন সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের কাছে সন্দেহাতীত প্রমাণ আছে যে, ওই জাহাজটি আরও অনেক পরে তৈরি।’
ইউনেসকো প্রতিবেদনে জাহাজের নির্মাণশৈলীতে কয়েক শতকের পার্থক্য থাকা ছাড়াও ধ্বংসাবশেষের স্থান নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। তাদের দাবি, ধ্বংসাবশেষের স্থানটি উপকূল থেকে অনেক দূরে। কিন্তু মার্কিন বিশেষজ্ঞ ব্যারি ক্লিফোর্ড ইউনেসকো প্রতিবেদনের সঙ্গে একমত নন। ক্লিফোর্ড বলছেন, তাঁর পাওয়া জাহাজের ধ্বংসাবশেষে লোমবার্ড নামে যে বিশেষ ধরনের কামান পাওয়া গেছে, তা নিশ্চিতভাবেই কলম্বাসের যুগের জিনিস। ইউনেসকো প্রতিবেদনের দুদিন পর এক বিবৃতিতে ক্লিফোর্ড বলেন, ‘এটা জরুরি যে ইউনেসকো ধ্বংসাবশেষের পুরো জায়গাটি পর্যবেক্ষণ করে দেখবে এবং আমাদের তোলা ছবি ও সেখানকার বাস্তবতা মিলিয়ে নেবে।’ এ বিষয়ে ইউনেসকো বিশেষজ্ঞদের সহায়তা করারও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি।
হাইতির সংস্কৃতিমন্ত্রী রোকোর্ত বলেছেন, ‘উপকূল ধরে সম্ভাব্য সব স্থানেই অনুসন্ধান চালিয়ে যাবে তাঁর দেশ। কেননা কোনো গবেষকই সংশয়ের ছায়া এড়িয়ে নিশ্চিতভাবে বলতে পারেন না কলম্বাসের ঐতিহাসিক জাহাজটি ঠিক কোথায় ডুবেছিল।’

কাশ্মীর সীমান্তে গোলাগুলিতে ১২ বেসামরিক নাগরিক নিহত

মর্টারের গোলায় ফুটো হওয়া বাড়ির ছাদের ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে
দুই পাকিস্তানি নারীকে। তাঁদের অভিযোগ, সীমান্তের ওপার থেকে
ভারতীয় বাহিনীর ছোড়া গোলাতেই এ অবস্থা। শিয়ালকোট
নগরের পাশের  সীমান্ত গ্রাম ধামালা থেকে গতকাল তোলা ছবি। এএফপি
বিরোধপূর্ণ কাশ্মীর সীমান্তে ভারত ও পাকিস্তানের সেনাদের অব্যাহত পাল্টাপাল্টি গোলাগুলিতে গত কয়েক দিনে অন্তত ১২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছে। দুই দেশের সরকারি কর্মকর্তারা গতকাল বুধবার এ কথা জানিয়েছেন। এদিকে ভারতের শীর্ষ সরকারি সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তানের তরফ থেকে হামলা একেবারে বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত ‘শক্তিশালী ও সমুচিত’ জবাব দিতে সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল এ বিষয়ে বলেছেন, শিগগিরই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। খবর এএফপি, রয়টার্স, ডন ও এনডিটিভির। গোলার আঘাত থেকে বাঁচার জন্য কাশ্মীর সীমান্তের দুই দিকেই হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে চলে গেছে। গোলাগুলির জন্য ভারত ও পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ পরস্পরকে দায়ী করছে। সীমান্তে সেনাদের গোলাগুলিতে গত সোমবার নয়জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। সেখানে মাত্র এক দিনে এত বেশি বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই প্রথম। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে গত মঙ্গলবার রাতব্যাপী লড়াইয়ে দুই বেসামরিক নাগরিক নিহত ও ১৮ জন আহত হয়। দেশটির পুলিশের মহাপরিচালক কে. রাজেন্দ্র এ তথ্য দিয়েছেন। আর পাকিস্তানি অংশে ১৯ বছর বয়সী এক নারী মর্টার গোলার আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন বলে জানান স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা শওকত আলী। এদিকে, পাকিস্তানি বাহিনীর বরাত দিয়ে ডন জানায়, পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর সীমান্তের কাছাকাছি শিয়ালকোটে মঙ্গলবার রাতে ভারতীয় বাহিনীর হামলায় অন্তত তিনজন নিহত ও চারজন আহত হয়েছে। ভারতের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এস ডি গোসওয়ানি বলেন, তাঁদের অবস্থান লক্ষ্য করে পাকিস্তানি বাহিনী মঙ্গলবার রাতে হামলা চালায়। এতে ভারতের পক্ষ থেকেও পাল্টা জবাব দেওয়া হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, ভারত বিনা উসকানিতে হামলা চালিয়েছে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, সীমান্ত লঙ্ঘন করে পাকিস্তান হামলা করলে ভারত সেটা বরদাশত করবে না। ভারতীয় বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, তাদের ৬০টি অবস্থান এবং আশপাশের ৩৬টি গ্রাম লক্ষ্য করে পাকিস্তানি সেনারা গোলাবর্ষণ করছে। আর পাকিস্তানিদের ৭৩টি অবস্থান লক্ষ্য করে ভারতীয়রা মর্টার ও গুলি ছুড়ে ‘উপযুক্ত জবাব’ দেয়। পতাকা বৈঠকের জন্য পাকিস্তানের তরফ থেকে মঙ্গলবার রাতে একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হলেও ভারত তাতে সাড়া দেয়নি। ভারতীয় সূত্রগুলো জানায়, পাকিস্তানকে বলে দেওয়া হয়েছে, অস্ত্রবিরতির লঙ্ঘন এবং সমঝোতার আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না। অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যমণ্ডিত হিমালয়ের কাশ্মীর অঞ্চলকে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই নিজেদের বলে দাবি করে। এর দুটি বড় অংশ দুই দেশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সীমান্তের নিয়ন্ত্রণরেখার (এলওসি) কাছাকাছি নিয়মিত দুই দেশের সেনাবাহিনীর লড়াই হয়। কাশ্মীরের ভারত-নিয়ন্ত্রিত অংশে বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ ভারতীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে। ‘সব ঠিক হয়ে যাবে’: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গতকাল সীমান্তে পাকিস্তানের অস্ত্রবিরতি লঙ্ঘনের বিষয়ে বলেছেন, শিগগিরই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। গতকাল মোদি সেনাবাহিনীর প্রধান দলবীর সিং সুহাগসহ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা করেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, সবকিছু শিগগিরই ঠিক হয়ে যাবে। এর আগে ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেন, সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতির ব্যাপারে যথাযথ ‘ব্যবস্থা নেওয়ার’ পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। ভারত পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়ে এ-ও বলেছে, তারা সংঘাতের মাত্রা চড়াতে ভীত নয়।

জয়ললিতার জামিন আবেদন নাকচ, আপিলের প্রস্তুতি

জয়রাম জয়ললিতা
ভারতের কর্ণাটকের হাইকোর্ট গত মঙ্গলবার তামিলনাড়ু রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী জয়রাম জয়ললিতার জামিন আবেদন নাকচ করেছেন। আদালতের এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করতে যাচ্ছেন জয়ললিতার আইনজীবী। দুর্নীতির দায়ে কারাদণ্ড পাওয়া জয়ললিতা গতকাল বুধবার কারাগারে তাঁর দশম দিন কাটালেন। খবর এনডিটিভির। জয়ললিতার আইনজীবী তাঁর কারাদণ্ড বাতিল ও জামিন আবেদন মঞ্জুরের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। দেওয়ালি উপলক্ষে ১৮ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টের কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এর আগেই যদি সর্বোচ্চ আদালত আপিল আবেদনের ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত না নেন, তবে জয়ললিতাকে বড় এ উৎসবটি কারাগারেই কাটাতে হতে পারে।
৬৬ বছর বয়সী জয়ললিতার বিরুদ্ধে গত মাসে দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় কর্ণাটকের একটি আদালত তাঁকে চার বছর কারাদণ্ড দেন। নিজের রাজ্যে বিচারকাজ প্রভাবিত হওয়ার আশঙ্কায় ২০০১ সালে ওই অভিযোগ কর্ণাটকের আদালতে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে প্রথম মেয়াদে অসাধু উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি অর্জন করেন জয়ললিতা।

আইসিসিতে কেনিয়াত্তা

উহুরু কেনিয়াত্তা
মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গতকাল বুধবার দ্য হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) হাজির হলেন কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু কেনিয়াত্তা। বিশ্বে এই প্রথম ক্ষমতায় থাকা অবস্থায়ই কোনো দেশের প্রেসিডেন্ট আইসিসিতে হাজিরা দিলেন। ২০০৭-০৮ সালে কেনিয়ায় নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার পরিকল্পনায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে সমন জারি করে আইসিসি।
দ্য হেগের আদালতে আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটর ফাতু বেনসুদা উপস্থিত ছিলেন। তিনি আগে অভিযোগ তুলেছিলেন যে কেনিয়ার সরকার সহিংসতায় অভিযুক্তদের বিচারের ক্ষেত্রে সাক্ষীদের ভীতি প্রদর্শন করছে। এ ছাড়া সহিংসতার চিহ্ন মুছে ফেলা হচ্ছে। এএফপি

বাবা আদম মসজিদ by তানভীর হাসান

সুদূর আরব দেশে জন্মগ্রহণ করেও ইসলাম ধর্ম প্রচারে ভারতবর্ষে এসেছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক বাবা আদম। উপমহাদেশে সেন শাসনামলে ১১৭৮ সালে ধলেশ্বরীর তীরে মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমে আসেন তিনি। তখন বিক্রমপুর তথা মুন্সিগঞ্জ ছিল বল্লাল সেনের রাজত্বে। ওই বছরই বল্লাল সেনের হাতে প্রাণ দিতে হয় তাঁকে।
শহীদ বাবা আদমকে মিরকাদিমের দরগাবাড়িতে দাফনের পর তাঁর মাজারের পাশে ১৪৮৩ সালে নির্মাণ করা হয় বাবা আদম মসজিদ। এটি ছিল তাঁর মৃত্যুর ৩১৯ বছর পরের ঘটনা। সেই থেকে ৫৩০ বছর ধরে ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে এই মসজিদটি। কিন্তু মুসলিম ঐতিহ্যের চোখজুড়ানো এই শৈল্পিক স্থাপনার গায়ে এখন শুধুই অযত্ন-অবহেলার ছাপ। তৎকালীন ভারতবর্ষে যে কটি প্রাচীন মসজিদ ছিল, সেগুলোর একটি বাবা আদম মসজিদ। বাংলার সুলতান জালাল উদ্দিন ফতেহ শাহর শাসনামলে তাঁর আগ্রহে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়।

সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরের অদূরে তায়েফে ১০৯৯ সালে জন্মগ্রহণ করেন ইসলাম ধর্ম প্রচারক বাবা আদম। পরবর্তী সময়ে আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধনায় বড় পীর হজরত আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর সাহচর্য পেতে বর্তমান ইরাকের বাগদাদে আসেন। সেখানে শিক্ষাগ্রহণ করেন তিনি।
মুন্সিগঞ্জ শহর থেকে উত্তর-পশ্চিমে চার কিলোমিটার পথ পেরোলেই বাবা আদম মসজিদ। আর ঢাকা থেকে সড়কপথে মসজিদের দূরত্ব মাত্র ২৮ কিলোমিটার। সদরঘাট থেকে নৌপথে মিরকাদিমের কাঠপট্টি ঘাটে নামার পর আধা কিলোমিটারের মধ্যেই মসজিদটি। সদরঘাট-কাঠপট্টি ঘাট এক ঘণ্টার পথ।
এলাকাবাসীর ভাষ্য, বাবা আদমের নামে নির্মিত এ মসজিদটি দেখতে বছরজুড়ে দরগাবাড়িতে আসেন দেশ-বিদেশের পর্যটক ও দর্শনার্থীরা। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনাও এ মসজিদ দেখতে এসেছিলেন। তবে পর্যটকদের আকর্ষণ ধরে রাখা কিংবা কয়েক শ বছরের ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে টিকে থাকা এ স্থাপনাটি সংরক্ষণে নেই তেমন কোনো উদ্যোগ।
বইপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ভারতবর্ষ প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগ ১৯০৯ সালে একবার এ মসজিদটি সংস্কার করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় সেভাবেই ফেলে রাখা হয়। ১৯৯১ সালের দিকে এর চারপাশে লোহার সীমানা বেড়া নির্মাণ করা হয়। সে বছরই বাংলাদেশ সরকারের ডাক বিভাগ মসজিদের ছবি দিয়ে ডাকটিকিট প্রকাশ করে। মসজিদটির ঐতিহ্য ধরে রাখতে এটাই ছিল সরকারের উল্লেখ করার মতো কোনো পদক্ষেপ। সম্প্রতি বাবা আদম মসজিদ পরিদর্শন করে দেখা যায়, দীর্ঘদিন পরিচর্যার অভাবে মসজিদের দেয়ালে শেওলা পড়েছে। মসজিদে আশপাশের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা নামাজ পড়ছেন।
মসজিদ ও মাজার কমিটির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মজিবর রহমান প্রথম আলোকে জানান, ছয়-সাত বছর আগে একবার প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ থেকে সংস্কার ও রং করা হয়েছিল। এরপর আর তাদের দেখা মেলেনি। তবে এখন তাঁরা নিজেরা মূল কাঠামো ঠিক রেখে মসজিদটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন।
শিগগিরই বাবা আদমের মসজিদ ও মাজার পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগের পরিচালক মো. আতাউর রহমান।
অপূর্ব নির্মাণশৈলী: ছয় গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদের নির্মাণশৈলী মনোমুগ্ধকর। এটি দৈর্ঘ্যে ৪৩ ফুট ও প্রস্থে ৩৬ ফুট। দেয়াল প্রায় চার ফুট চওড়া। ইট-সুরকি দিয়ে ভেতরে গাঁথা। নির্মাণ নকশা বা স্থাপত্যকলা অনুযায়ী মসজিদ ভবন উত্তর-দক্ষিণে লম্বা। সম্মুখের দিকে খিলান আকৃতির প্রবেশপথ। দুই পাশে সম আকারের দুটি জানালা। মসজিদের সামনে ওপরের দিকে রয়েছে ফারসি ভাষায় খোদাই করা কালো পাথরের ফলক।
মসজিদের ভেতরে ঢুকে সামনে এগোলে চার কোনায় চারটি ত্রিভুজাকৃতির স্তম্ভ চোখে পড়ে। মসজিদের খিলান, দরজা, স্তম্ভের পাদদেশ, মেঝে ও ছাদের কার্নিশের নিচে ইট কেটে মুসলিম স্থাপত্যকলার অপূর্ব নকশাও লক্ষ করা যায়।

চামড়ায় লবণ মাখা হচ্ছে সড়কে! by সুজন ঘোষ

চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক দখল করে খোলা অবস্থায় লবণজাত করা হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া। এ কারণে পুরো এলাকায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এ জন্য মানুষের বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ সেলিম মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর প্রথম আলোকে বলেন, ‘পশুর চামড়ার সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা না হলে সেখান থেকে জীবাণু সৃষ্টি হতে পারে। এসব জীবাণু মানুষের শরীরে সংক্রমণের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রদাহ সৃষ্টি করবে।’
উত্তর চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটির সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরের যোগাযোগের অন্যতম রাস্তা মুরাদপুর-অক্সিজেন সড়ক। কিন্তু রাস্তার ওপর খোলা জায়গায় চামড়া রাখায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে ব্যস্ততম সড়কটি। এতে যান চলাচল করছে ধীরগতিতে।
গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, মুরাদপুর রেলগেট, হামজারবাগ, আতুরার ডিপো ও আমিন জুট মিল এলাকায় সড়ক এবং ফুটপাতের ওপরই চলছে কোরবানির পশুর চামড়া লবণজাত করার কাজ। ফুটপাত ও সড়কের একাংশ দখল করে শামিয়ানা টাঙিয়েছেন আড়তদারেরা। শামিয়ানার নিচে খোলা অবস্থায় মজুত করা হয়েছে পশুর চামড়া। লবণ দিয়ে চামড়াগুলো রোদে শুকানো হচ্ছে। এরপর সেগুলো গুদামে নিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকেরা। চামড়ার দুর্গন্ধে পথচারীরা নাক-মুখ চেপে চলাচল করছে। প্রায় তিন কিলোমিটার দৈর্ঘের এ সড়কের দুই কিলোমিটারজুড়ে দেখা গেল এমন দৃশ্য।
মুরাদপুর রেলগেট এলাকার একটি ফার্মেসির মালিক বাবুল দাশ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সড়ক দখল করে খোলা অবস্থায় চামড়া রাখায় আমাদের অনেক সমস্যা হচ্ছে। লোকজন চলাফেরা করতে পারছে না। অনেকে দুর্গন্ধে রাস্তায় বমি করে দিচ্ছে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি লিমিটেড সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রামে প্রায় ১৬০টি আড়ত আছে। এর মধ্যে সমিতির সদস্যভুক্ত ১১২টি। এসব আড়তে প্রায় চার হাজার শ্রমিক কর্মরত।
বৃহত্তর চট্টগ্রামে এবার প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করেছে কাঁচা চামড়া আড়তদার ব্যবসায়ী সমিতি। এর মধ্যে প্রায় চার লাখ ৪০ হাজার গরুর এবং এক লাখ ছাগলের চামড়া রয়েছে। আর মহিষের চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে প্রায় ১০ হাজার। ৯০ শতাংশ চামড়া আড়তে পৌঁছে গেছে বলে চামড়া আড়ত ব্যবসায়ী সূত্রে জানা গেছে।
সমিতির সাধারণ সম্পাদক নূর আহম্মদ বলেন, ‘ঈদের সময় গুদামের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত চামড়া সংগ্রহ করা হয়। চামড়াগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লবণজাত করা না হলে নষ্ট হয়ে যায়। তাই বাধ্য হয়ে সড়ক দখল করে চামড়া লবণজাত করা হচ্ছে। তবে  শুক্রবারের মধ্যেই সড়ক থেকে চামড়া সরিয়ে নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শফিকুল মান্নান সিদ্দিকী প্রথম আলোকে গতকাল দুপুরে বলেন, ‘ব্যবসায়ীদের সড়ক থেকে চামড়া দ্রুত সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। তাঁরা সেটা না করলে করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে আমরা নিজেরাই তা সরিয়ে ফেলব। তখন অভিযুক্ত ব্যবসায়ীদের জরিমানা করা হবে।’

লতিফ সিদ্দিকীকে অপসারণে দল ও সরকারে প্রস্তুতি by শরিফুজ্জামান

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর বিষয়ে সরকার ও দল চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে কাল-পরশু। কাল শনিবার সরকারি ছুটির দিনে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ খোলা থাকছে। ওই দিনই মন্ত্রিসভা থেকে তাঁকে অপসারণের চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে।

পরদিন রোববার সরকারি দল আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠক ডাকা হয়েছে। ওই বৈঠকে লতিফ সিদ্দিকীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে বলে কার্যনির্বাহী সংসদের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ মোশাররাফ হোসাইন ভূইঞা হজ পালন শেষে আজ দেশে ফেরার কথা রয়েছে। মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর হলেও আনু্ষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিপরিষদ সচিবের উপস্থিতি প্রয়োজন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানায়, সংবিধানের ৫৮(১-ক) ধারা অনুযায়ী, লতিফ সিদ্দিকী রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিলেই তা গৃহীত হবে। কিন্তু তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সূত্র জানায়, গতকাল বৃহস্পতিবার অফিস চলা পর্যন্ত লতিফ সিদ্দিকীর পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা পাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মন্ত্রী জানান, সরকার ও দলের বিপক্ষে প্রকাশ্যে এমন অবস্থানের পর তাঁর সঙ্গে কেউ আর যোগাযোগ করে তাঁকে পদত্যাগের সুযোগ দিতে চান না। সে ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৮(২) ধারা প্রয়োগ করে তাঁকে অপসারণ করা হতে পারে।
ওই ধারা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী যেকোনো সময় তাঁকে পদত্যাগের অনুরোধ করতে পারেন এবং এই অনুরোধ পালনে অসমর্থ হলে তিনি রাষ্ট্রপতিকে ওই মন্ত্রীর নিয়োগের অবসান ঘটাতে পরামর্শ দেবেন।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্র জানায়, এ প্রক্রিয়ায় তাঁকে অপসারণের লক্ষ্যে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব আজ দেশে ফিরলে তাঁর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী বিষয়টি চূড়ান্ত হবে।
একাধিক মন্ত্রী জানান, আচার-ব্যবহারের কারণে মন্ত্রিসভার সদস্যদের প্রায় সবাই তাঁকে অপছন্দ করতেন। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও তটস্থ থাকতেন। তিনি যে কাউকে যেকোনো পরিবেশে অপমান করতেন, ধমক দিতেন। এ কারণে মন্ত্রিসভার সদস্য ও দলের নেতাদের কাছে তিনি অজনপ্রিয় ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। এ পরিস্থিতিতে এখন কেউই তাঁর পক্ষে কথা বলছেন না বা সহানুভূতিও দেখাচ্ছেন না।
এদিকে তাঁর পদত্যাগ বা অপসারণের আগেই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনানুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। এ ছাড়া বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থাকা অবস্থায় তিনি যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন, সেগুলো নিয়েও নড়াচড়া শুরু হয়েছে।
পবিত্র হজ ও মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)কে নিয়ে অযাচিত মন্তব্য এবং প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে নিয়ে কটূক্তি করায় লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে অপসারণ ও দল থেকে বহিষ্কারের দাবি ওঠে। নিউইয়র্ক সফর শেষে প্রথমে সিলেটে ও পরে ঢাকায় ফিরে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে অপসারণের কথা বলেন। এ ছাড়া দলের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথাও জানান।
৩ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, রাষ্ট্রপতি দেশে ফেরার পরই লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক মন্ত্রী ও নেতার সঙ্গে কথা বলে আভাস পাওয়া গেছে, এ মুহূর্তে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে নতুন কাউকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর হাতেই থাকছে এ দুটি মন্ত্রণালয়। সজীব ওয়াজেদ জয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন।
একই সঙ্গে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে গুঞ্জন আছে, মন্ত্রিসভায় কিছু রদবদল হতে পারে। কাকে, কোথায় দেওয়া হবে বা কার মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হবে, কেউ বাদ পড়বেন কি না, সেই সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর বাইরে তেমন কেউ জানেন না।