Thursday, June 26, 2014

নূর হোসেনের যত বড় ভাই! by সোহরাব হাসান

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন নূর হোসেনই আলোচনায় ছিলেন৷ ১৯৮৭ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নায়ক৷ সেই নূর হোসেন বুকেপিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে এরশাদের স্বৈরশাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন৷ সব স্বৈরশাসকের মতো এরশাদও এ রকম একজন সাহসী ও দ্রোহী যুবককে সহ্য করতে পারেননি৷ প্রকাশ্য রাজপথে মিছিলরত এই অকুতোভয় যোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ সেই নূর হোসেন ছিলেন আমাদের লাখো লাখো ছাত্র ও তরুণের আদর্শ৷ গণতন্ত্রের আশা ও বিশ্বাস৷ তাঁর সাহস ও ত্যাগের পথ ধরে নব্বইয়ে এরশাদের পতন হয়েছে সত্য, গণতন্ত্র মুক্তি পায়নি; বরং আড়াই দশকের ব্যবধানে স্বৈরাচারের সব বদগুণ ও বদ–অভ্যাস আমাদের কথিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জেঁকে বসেছে৷ সেদিন নূর হোসেনকে গুলি করে যে স্বৈরাচারী হত্যা করেছিল, সেই স্বৈরাচারী এখন গণতান্ত্রিক সরকারের অংশীদার৷ পৃথিবীর সব স্বৈরাচারকেই হয় দেশত্যাগ করতে হয়, নয় বিচারের মুখোমুখি হতে হয়৷ পিনোচেট, মার্কোস, ইরানের শাহ—কেউ দেশে থাকতে পারেননি৷ কিন্তু বঙ্গদেশীয় স্বৈরাচার বহাল তবিয়তেই আছে৷ তিনি কেবল সরকারের অংশীদার নয়, ‘গণতন্ত্রী’ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত৷ আবার একই সঙ্গে জেনারেল মঞ্জুর হত্যার আসামিও৷

রাজনীতিতে যখন নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ নির্বাসিত হয়, যখন স্বপ্ন ও বিশ্বাস হারিয়ে যায় তখন শহীদ নূর হোসেনদের কথা কেউ মনে রাখেন না৷ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ পরিত্যক্ত হয়৷ আর তাদের শূন্য স্থান পূরণ করে নারায়ণগঞ্জের, লক্ষ্মীপুরের, ফেনীর সন্ত্রাসী ও খুনিরা। সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন এক ভয়ংকর সন্ত্রাসী৷ সাত খুনের আগ পর্যন্ত তাঁর সব অপকর্ম ও অপরাধ চাপা ছিল৷ এখন দিনের অােলার মেতা প্রকাশিত৷ আবার এ কথাও ঠিক যে নূর হোসেনরা একা দানব হতে পারেন না। এই সমাজেই তাঁর আশ্রয়দাতা, অস্ত্রদাতা ও মন্ত্রদাতা আছেন৷ আছেন তাঁর বড় ভাই, মেজো ভাই, ছোট ভাই৷ আছেন মাসোহারাভোগী, চাঁদা গ্রহণকারী ও চাঁদা প্রদানকারী৷ একটি সমাজ কতটা পচে গেলে, নষ্ট হলে রাজনীতি কতটা দূষিত হলে এ রকম একজন ব্যক্তিকে দুধকলা দিয়ে পোষা হয়। সমাজের অনেক ভদ্র লেবাসধারী ব্যক্তিরও নাকি তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতে বাধেনি। নূর হোসেন সবকিছু টাকা দিয়ে কিনতে চেয়েছিলেন— বাড়ি, গাড়ি, বিত্তবৈভব, রাজনীতি, পদপদবি৷ এমনকি টাকা দিয়ে সাতজন মানুষকে খুন করাতেও তাঁর বাধেনি৷ তিনি ভেবেছেন, আইনের ঊর্ধ্বেে থাকবেন৷ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন৷ তাঁর বড় ভাই, মেজো ভাই ও ছোট ভাইয়েরা বাঁচাবেন৷ কিন্তু শেষরক্ষা হলো বলে মনে হয় না৷
সম্প্রতি কলকাতার আদালতে নূর হোসেন বলেছেন, তিনি সাত খুনের ঘটনায় জড়িত নন৷ তিনি রাজনীতির শিকার৷ তিনি স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি৷ দেশ ছেড়েছেন তাঁর নেতা ও বড় ভাইদের পরামর্শে৷ আমরা জানি না নূর হোসেনের নেতা ও বড় ভাই কারা? তাঁরা কি নারায়ণগঞ্জেই সীমাবদ্ধ, নাকি রাজধানীর অভিজাতপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত? তবে আমরা অন্তত তাঁর একজন বড় ভাইয়ের নাম দেখেছি, যিনি টেলিফোনে তাঁকে পাসপোর্টে সিল আছে কি না জানতে চেয়েছেন, যিনি জনৈক গৌরদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন৷ উল্লেখ্য, এই বড় ভাইয়ের হাত ধরেই নূর হোসেন ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় পিজিপিতে (প্রেজেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি) যোগ দিয়েছিলেন৷ আবার ২০০১ সালে তাঁর সঙ্গেই পাালিয়ে গেছেন। কী অদ্ভুত আত্মিক বন্ধন৷ নূর হোসেন কেবল সুদিনের বন্ধু নন, দুর্দিনেরও সহযাত্রী।
তবে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এ রকম বহু ভাই ও নেতা অাছেন ফেনীতে, লক্ষ্মীপুরে, বরিশালে, পাবনায়, সিলেটে, যশোরে; যারা নূর হোসেনদের আশ্রয় ও অভয় দেওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া আছেন। তাঁরা একেকজন নূর হোসেন, একেকজন ইমদু (বিচারপতি সাত্তারের আমলে একজন প্রতিমন্ত্রীর বািড় থেকে যিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন), একেকজন আজম খান (যিনি আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিনকে হত্যা করেছিলেন) তৈরি করেন। এই তিন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী তিন আমলে তৈরি৷ এখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী কিংবা স্বৈরাচারী আমলের মধ্যে ফারাক নেই৷ অপরাধী যত ভয়ংকরই হোক না কেন, একা সে অপরাধ করতে পারে না৷ নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেনও পারেননি৷ আমাদের এই সমাজ ও রাষ্ট্র এতটাই নিষ্ঠুর ও নির্বিকার যে এত দিন নূর হোসেন এসব অপকর্ম নির্বিঘ্নে করে যেতে পেরেছেন৷ আমাদের রাজনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করেনি৷ একটি সমাজ ধ্বংসের কিনারে গেলেই এ রকম ঘটনা ঘটে থাকে৷
খুন, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই যে এই ব্যক্তি করেননি৷ আর আমাদের সমাজ, আমাদের সরকারি দল, আমাদের বিরোধী দল, আমাদের নাগরিক সমাজ, আমাদের সরকার ও প্রশাসন তা মুখ বুজে ‘অনুমোদন’ করে গেছে৷ এই সন্ত্রাসী নূর হোসেনই এখনকার বাংলাদেশের আদর্শ৷ আওয়ামী লীগ, বিএনপি জাতীয় পার্টি—একে একে তিনি তিন দলেই সুবিধা নিয়েছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হয়েছেন৷ প্যানেল মেয়র পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন৷ সাত খুনের ঘটনা এভাবে দেশব্যাপী তোলপাড় না করলে হয়তো তিনি ভবিষ্যতে সাংসদও হতেন৷ আমরাও তা মেনে নিতাম।
এই নূর হোসেনদের স্থায়ী কোনো দল নেই৷ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতা-সাংসদেরাই নূর হোসেনের ভাই হয়ে যান৷ নাসিম ওসমানের হাতে তৈরি নূর হোসেন বিএনপি নেতা গিয়াসউদ্দিনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন৷ এই ধারায় চলে আসছে আমাদের রাজনীতি। যেই সমাজে খুদে মাফিয়া ডন নূর হোসেন সমাদৃত, সেই সমাজে গণতন্ত্রের জন্য জীবন দেওয়া নূর হোসেনের কথা কেউ মনে রাখে না৷ নূর হোসেন এখন কলকাতায় জেলে আটক আছেন৷ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ফেরত আনার চেষ্টা করছে৷ কিন্তু সেই চেষ্টা কত দিনে সফল হবে, আদৌ সফল হবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে৷ গ্রেপ্তারের আগে নূর হোসেন কলকাতার উপকণ্ঠে ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতেন।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী নূর হোসেন ভারতে যাওয়ার সময় দুই কোটি টাকা সঙ্গে নিয়ে গেছেন৷ কীভাবে তিনি এত টাকা নিয়ে গেলেন? কারা তাঁকে সহযোগিতা করেছে, পার হতে সাহায্য করেছে, সেটা কি কখনোই জানা যাবে? কেবল নূর হোসেন নন, বাংলাদেশের টাকা ও অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়, দুবাইয়ে, যাচ্ছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে, জমা হচ্ছে সুইস ব্যাংকে৷
কলকাতার আদালতে নাকি নূর হোসেন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন৷ কী নিষ্কলুষ চরিত্র! নূর হোসেন বলেছেন, তিনি রাজনীতির শিকার৷ এক অর্থে তিনি ঠিকই বলেছেন৷ যে রাজনীতি খুনির চেহারা জনসমক্ষে উন্মোচন করে দেয়, হতে পারে তিনি সেই রাজনীতির শিকার৷ এর পর তাঁকে দেশে আনা হলে বলবেন, তিনি রাজনীতির শিকার। বিচার হলে বলবেন, রাজনীতির শিকার। কেননা এত দিন নূর হোসেনের পক্ষে আরও অনেক বড়, মেজো ও ছোট ভাই দাঁড়িয়ে যাবেন। সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও হয়তো তাঁদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না৷ এই প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনের উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে৷ কে জিতবেন—জনগণ যাকে ভোট দেবেন তিনি, নাকি যিনি ব্যালট বাক্স দখল করে নেবেন? নাকি ভোটের নামে সেখানে আরেকটি প্রহসন হবে?
প্রথম আলোর খবরে জানা যায়, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন—এমন ৩৬ জনের তালিকা তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি সংস্থা৷ ভোটারদের নিরাপত্তা এবং ভোটকেন্দ্রসহ এর আশপাশের এলাকায় শািন্তশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এসব ব্যক্তির ওপর কড়া নজরদারির সুপারিশ করেছে ওই সংস্থাটি৷ তালিকাভুক্ত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে মামলা রয়েছে৷ এঁদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ওসমান পরিবারের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত৷ এসব ব্যক্তির অনেকেই আবার র‌্যাব-পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, অতীতে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এর মধ্যে নির্বাচনী এলাকার বাইরের বাসিন্দাও আছেন৷ এসব ব্যক্তি অর্থ ও পেশিশক্তির জোরে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারেন৷
ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান তাঁর নির্বাচনী এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থেকে হাজার হাজার লোক নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন৷ প্রয়োজনে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখো মানুষ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ–৫ নির্বাচনী এলাকায় নিয়ে যেতে বলেছেন৷ এর উদ্দেশ্য কী? বাইরের লোকেরা তো ভোট িদতে পারবেন না, তাহলে কি ভোট ঠেকাতেই এই প্রস্তুতি? নির্বাচন কমিশন, নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই হুংকারকে কীভাবে নেয়, সেটাই দেখার বিষয়৷ নারায়ণগঞ্জের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকেরই দায়িত্ব তাঁদের ভোটের অধিকার রক্ষা করা এবং ভোট চোর ও ভোট ডাকাতদের রুখে দেওয়া৷
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

নারায়ণগঞ্জে কারেন্ট জালের রাজনীতি by মিজানুর রহমান খান

নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনযজ্ঞ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের সময় সামাজিক শক্তি যতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, রাজনৈতিক দল তা পারে না। কারণ, দলগুলো অনেক বেশি অগণতান্ত্রিক ও কোটারি শক্তির সঙ্গে আপস করে চলে। সেখানে ব্যক্তি ও তার দল চাইলেই সামাজিক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। তাকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আপস করতে হয়। সে কারণে বিএনপির মতো দল, যারা বর্তমান সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল, তারা আজকের উপনির্বাচনে দলগতভাবে কোনো পরোক্ষ বার্তা প্রকাশ করতে পারেনি। সে কারণে কেন্দ্র দখলের মতো কোনো ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে বিএনপি অপ্রস্তুত থাকবে৷ প্রতিরোধপর্ব যাতে কার্যকরভাবে জমে উঠতে না পারে, সে জন্য বহুধারায় বিভক্ত স্থানীয় বিএনপিকে অধিকতর দুর্বল করে রাখা হয়েছে।

জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর আলম খন্দকার সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে হলেও বলেছিলেন, মানুষ সন্ত্রাসী ও গডফাদারকে ভোট দেবে না। বিএনপির আমলে তাঁর নিহত ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি বিএনপির আরেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনকে (মি. উদ্দিন বর্তমানে দলের সঙ্গে আলগা সম্পর্ক রেখে চলেন, অনেকটা নিষ্ক্রিয়, বললেন, খন্দকাররা তাঁকে ভুল বুঝেছেন) দায়ী করেন৷ আবার পার্বত্য চুক্তিবিরোধী এক মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় একজন নিহত এবং নিজের গায়ে দুটি বুলেট আজও বহনের ঘটনায় তৈমুর ওসমানদের ওপর দায় চাপান৷ লন্ডনে পাড়ি জমানোর আগের রাতে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। এ নির্বাচনে আকরাম জয় পেলে বিএনপি কোনোভাবে লাভবান হতে পারে, সেই চিন্তা তাঁর নেই। তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎপ্রত্যাশী তৈমুর আলমের দেশত্যাগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর ভাই খোরশেদ আলম খন্দকার—যিনি একজন কাউন্সিলর ও বিএনপির নেতা, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর ছবি দহলিজে শোভিত, হোলস্টারে সারাক্ষণ পিস্তল রাখেন, তিনি হজব্রত পালন করতে শহর ছেড়ে যান৷ কিন্তু তৈমুরপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ টি এম কামাল, যিনি সর্বশেষ কাউন্সিলে গোপন ব্যালটে নির্বাচিত একমাত্র নেতা, ক্রমাগত বিবৃতি দিচ্ছেন যে বিএনপি ভোট বর্জন করেছে ঠিকই; কিন্তু বিএনপি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, যারা জিয়া পরিবারকে হেনস্তা করেছে, তাদেরকে ‘ভোট’ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। চাষাঢ়ার মোড়ে যেখানে জেনারেল জিয়াউর রহমান শহরের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল খেলার মাঠ নষ্ট করে জিয়া ক্লাব বানানোকে উৎসাহিত করেছিলেন, সেখানে রাখা জিয়ার ম্যুরালে ওসমানেরা কালি লাগিয়েছিলেন। কামালই তা মুছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন।
ভোট কথাটির উচ্চারণ যে সাংগঠনিক অবস্থানের পরিপন্থী, সেটা চিহ্নিত করে তাঁকে চাপে ফেলার মতো নেতা-কর্মীর আকাল পড়েনি। এমনকি তাঁকে বহিষ্কারের কথাও প্রচারিত হয়েছিল। অথচ তিনি তেমন মাপের নেতা নন৷ এই আসনের বিএনপির দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভাব্য প্রার্থী তফাতে রইলেন। তৈমুর লন্ডনে আর অপর বিএনপির নেতা আবুল কালাম, ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে অাকরামকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন, যথাসম্ভব কম সক্রিয়। তিনি যদিও সরাসরি ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ভোট না দিতে আহ্বান জানিয়েছেন।
মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ আলী, যিনি ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, বিএনপিপন্থীর তকমা তাঁর গায়ে এখনো লেপ্টে আছে, যঁাকে ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পরে সেলিম ওসমানের পোশাক কারখানা উইজডোম অ্যাটায়ার্সের ‘অবৈধ’ দখলদারত্ব থেকে নাটকীয়ভাবে উৎখাতের ঘটনায় ওসমান পরিবারের পক্ষে মধ্যস্থতা করতে দেখা গিয়েছিল, তিনি লাঙ্গলের পক্ষে সক্রিয় থেকেছেন।
১২ নম্বর ওয়ার্ডের সিটি কাউন্সিলর শওকত হোসেন ওরফে শকু বিএনপির স্থানীয় নেতা, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বেকসুর খালাস পাওয়া আসামি কিসমতের ভাই, বোমা হামলায় ২০ জনের নিহত হওয়ার ওসমানীয় মামলার অন্যতম আসামি৷ শামীম সুযোগ পেলেই কিসমতের ভাইকে ‘প্রশ্রয়’ দেওয়া নিয়ে আইভীকে ঠেস দেন৷ অথচ শকু লাঙ্গলের পক্ষে ভোট চাইছেন। তিনি অবশ্য এটা অস্বীকার করেন। প্রশ্নের জবাবে শামীম ওসমান আমাকে বলেছিলেন, বোমা হামলায় শকুর জড়িত থাকার বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দেন না। ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন দেওয়ান লাঙ্গলের পক্ষে ভোট চাইছেন। বন্দর উপজেলা থেকে বিএনপির সদ্য নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ওরফে মুকুলের ব্যবসা খুব পরিচ্ছন্ন নয় বলে অভিযোগ আছে। তিনি সতর্কতার সঙ্গে হলেও লাঙ্গলের পক্ষে নামেন। এ টি এম কামাল ছাড়া বিএনপির অন্য যিনি আনারসের পক্ষে জোরসে নেমেছেন, তিনি আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান। সেটাও সম্ভবত তিনি মূলধারার বা ঢাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আলগা বলেই। বিএনপি–বিদ্রোহী হিসেবে বারের সভাপতি হন।
খালেদা জিয়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওসমান পরিবারের দ্বারা ধারাবাহিকভাবে বিব্রত ও পীড়িত। ত্বকী এবং সেভেন মার্ডারের অসাধারণ সংবেদনশীল প্রেক্ষাপট বিএনপি নেত্রীকে গঞ্জের ভুক্তভোগী পরিবারের শরণাপন্ন করেছিল, কিন্তু তা অতটুকুই৷ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের পাশে মওদুদ আহমদরা দাঁড়ালে এর সুফল নাগরিক সমাজের প্রার্থী আকরাম পেতেন৷ কিন্তু ‘অবৈধ’ উপনির্বাচন বর্জনের যান্ত্রিক অবস্থানে তঁারা সম্ভবত অাঁচড়টুকুও কাটতে চাননি৷ দলের লাভ কী। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আকরাম সচিব থাকলেও তাঁদের মধ্যে বাতচিত তেমন হয়নি। ফুলের তোড়া হাতে আকরাম তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। তাই প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা একটি বিতর্কিত পরিবারের পাশে থাকার অভাবনীয় ঘোষণা এবং তাতে শান্তিকামী মানুষের আহত বোধের বিষয়টি বিএনপির নেত্রীকে কোনো কৌশল গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেনি। রুহুল কবির রিজভী ভোট না দেওয়ার ডাক দিয়েছেন৷ এর তাৎপর্য অস্পষ্ট নয়৷ স্থানীয় একজন সাংবাদিক মঙ্গলবার তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রিজভী তখন বলেন, ভোটাররা কেন্দ্রে যাবেন কি যাবেন না, তা তিনি বলেননি।
কাকতালীয় যে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক যেভাবে প্রকাশ্যে আকরামকে, তেমনি তাঁর শাসকদলীয় প্রতিপক্ষ খোকন সাহা ওসমানকে সমর্থন করছেন। গতকাল এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই রকম খবর পেলাম। একজন টিভিব্যক্তিত্ব বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। আকরামই জয় পাবেন। আরেকজন যিনি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সঙ্গী ছিলেন, তিনি আমাকে বলেন, কেন্দ্র দখলের প্রস্তুতি আছে৷ সেলিম ওসমান জানিয়েছিলেন, তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউ নির্বাচন করবেন না। পরে মত পাল্টান।
ওসমান পরিবারের সদস্যরা অতীতে অনেক দুঃসময় অতিক্রম করেছেন। বিদেশে তাঁদের পালিয়ে থাকতে হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এমন দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেননি। এবারে দিয়েছেন এমন একটি প্রেক্ষাপটে, যখন সাত খুনের সন্দেহের তিরে ওসমান পরিবার বিদ্ধ। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর প্রতিপক্ষের অবস্থান বা কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসেনি। গঞ্জবাসীর প্রতি খালেদা জিয়ার কোনো অঙ্গীকার আছে, তা বলা যাবে না; বরং একজন জনপ্রিয় রাজনীতিক আমাকে বলেছেন, বিএনপির উচ্চপর্যায়কে হাত করার খবর তাঁরা শুনেছেন। এটা ঠিক-বেঠিক যা-ই হোক, বিএনপির ঔদাসীন্য স্পষ্ট। অবশ্য বিএনপির বিপুল নেতা–কর্মী নাগরিক শক্তির পক্ষে খেটেছেন৷ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পনগর, যেটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম কেন্দ্র, যেখানে বছরে কয়েক ডজন গুম–খুন হয়, সেখানে একটি নির্বাচন হচ্ছে, যার সঙ্গে বর্তমান সরকারের টিকে থাকা, বর্তমান সরকারের বৈধতার প্রশ্ন সবচেয়ে ঠুনকো, সেখানেও কারচুপির আশঙ্কা প্রবল৷ সবকিছু ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সন্ত্রাস, না শান্তি, সেটা অনেকাংশে প্রতীকী হলেও তারও তো একটা পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে। অথচ সেখানে দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল কথিতমতে নিরপেক্ষ থাকার ধনুর্ভঙ্গপণ করেছে।
মঙ্গলবার মির্জা ফখরুল ইসলামকে বললাম, বর্জনের তকমা বজায় রেখেও একটি পরোক্ষ অবস্থান স্পষ্ট করতে পারতেন, কিন্তু করেননি৷ ভোট বর্জনের দিকেই বিএনপির ঝোঁক, যা ওসমান পরিবারকেই শক্তি জোগাবে। অপরাজনীতির কারেন্ট জালে বিএনপি এভাবেও বন্দী৷
সাধ্য কী যে আইভী ও আকরামও সহজে এর বাইরে বের হন। মেয়র পদে থেকে আইভীর তো একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না৷ তাই তাঁকে কৌশলী হতে হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের শেষ কমিটির আহ্বায়ক আকরাম পদত্যাগ করেছেন। সেটা গ্রহণ বা নাকচ হলো কি না জানা যায় না। যুগ্ম আহ্বায়ক মারা গেছেন। গঞ্জের আওয়ামী লীগ তাই মরূদ্যান হয়ে শূন্যে ভাসছে।
রাজনীতি ও সুশাসন কোনোটিই গঞ্জে নেই। শামীম ওসমান তিন ঘণ্টার বেশি গঞ্জের ঘটনাপ্রবাহ তাঁর মতো করে ব্যাখ্যা করেও গভীর হতাশা ব্যক্ত করেন। আমাকে বলেন, তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিতে পারেন!
জয়ী হলে আওয়ামী লীগে যোগ দেবেন? শেখ হাসিনা আমন্ত্রণ জানালে তাঁকে ফেরাবেন? এস এম আকরাম আমাকে এ সম্ভাবনা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নাকচ করে দেননি। কারণ, রাজনীতিটা কারেন্ট জালে আটকা। বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখন নয়৷
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

ভারতের মাটিতে আবারও রক্তের দাগ by কুলদীপ নায়ার

ভারতের সাবেক কৃষিমন্ত্রী ও মহারাষ্ট্রের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী শারদ পাওয়ার বলেছেন, বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর সাম্প্রদায়িকতা ফিরে এসেছে। কথাটা তিনি ঠিকই বলেছেন। আর সেটা ঘটেছে মোদির সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ১৫ দিনের মধ্যে। ক্ষমতার পাঁচ বছর পূর্ণ হতে ঢের বাকি। মহারাষ্ট্রের সবচেয়ে উদার শহর পুনেতে দেখা গেল, একদল লোক রণমূর্তি ধারণ করে শহরময় ছুটে বেড়াচ্ছে। একটি উগ্রপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী মোহসিন শেখ নামের ২৮ বছর বয়সী এক আইটি ম্যানেজারকে হত্যা করেছে। অভিযোগ হচ্ছে, এই ব্যক্তি নাকি শিবাজি ও ঠাকরের ব্যঙ্গাত্মক ছবি পোস্ট করেছিলেন। উগ্রপন্থী দল শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা হচ্ছেন এই বাল ঠাকরে। যে অভিযোগে মোহসিনকে হত্যা করা হয়েছে, তার সমর্থনে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই।

এটা ঠিক, ভারতীয় জনতা পার্টি এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছে এটা এক বড় সুযোগ। মুসলমানরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। মোদি তাদের এই বলে আশ্বস্ত করতে পারেন যে তাঁর সরকার ব্যাপারটি খতিয়ে দেখছে এবং হত্যাকারীদের শিগগিরই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে। কিন্তু মোদি এমনই একজন মানুষ, যাঁকে একবার কোনো ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত এক ব্যক্তিকে সমব্যথা জানানোর অনুরোধ করা হলেও তিনি সেই অনুরোধ রাখেননি৷
মোদির এই মনোভাবে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এমনকি ২০০২ সালে তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে প্রশাসন ও পুলিশের মদদে দুই শতাধিক মুসলমান নিহত হয়, সেই ঘটনার পর তিনি দুঃখ পর্যন্ত প্রকাশ করেননি। ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে তিনি নির্দোষ খেতাব লাভ করেন, এর বদৌলতে তিনি সব সমালোচনা থামিয়ে দেন। আজ পর্যন্ত তিনি এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেননি। পুনের এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করলে তা মুসলমানদের অন্তত সান্ত্বনাটুকু দেবে৷ আর বহুত্ববাদী ভারতের ভিত আরও পোক্ত হবে।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় মোদি যখন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী উত্তরীয়ের প্রশংসায় আপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন, ভারতমাতা তখন ভেবেছিল, এটা একরকম আবেগের বহিঃপ্রকাশ। আর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, ভারতের ১২৫ কোটি মানুষকেই তিনি তাঁর উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে চান, এতেও ভারতমাতা আশ্বস্ত হয়েছিল।
কিন্তু দলটি যতই তার কর্মসূচি দিচ্ছে, ততই দেখা যাচ্ছে যে মোদির এ কথা ধাপ্পা ছাড়া আর কিছু না। এর আড়ালে বিজেপি আসলে আরএসএসের বিভাজনমুখী নীতি বাস্তবায়ন করছে। মোদি নিজেকে একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করছেন, আর বিজেপি এবং আরএসএস ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি নস্যাৎ করার পথে এগোচ্ছে।
আরএসএস ইতিমধ্যে বিভিন্ন কমিশন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে তাদের বিশ্বস্ত মানুষদের বসানো শুরু করেছে। আর নিম্নস্তরের কাজগুলো করার জন্য প্রশাসনের ক্যাডারদের মধ্য থেকে তরুণদের বেছে নেওয়া হচ্ছে। হাওয়া যেদিকে বয়, আমলাতন্ত্রও সেদিকে ঝোঁকে। ফলে নিজেদের কর্মসূচি বাস্তবায়নে বিজেপি এবং আরএসএসের কোনোই ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে না।
আরএসএস নিজেকে সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করে। সে কারণে রাজনীতি করা তাদের সাজে না। আরএসএসের কর্মী নাথুরাম গডসে গান্ধীকে হত্যা করার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরু আরএসএসকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। তারপর ১৯৪৯ সালে আরএসএস এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য দেনদরবার শুরু করলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল আরএসএসের কাছ থেকে এই মর্মে মুচলেকা নেন যে ‘আরএসএস কোনো রাজনৈতিক তৎপরতায় অংশ নেবে না’। তারা ‘শুধু সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবে’।
কিন্তু প্যাটেল সাহেব এতেও সন্তুষ্ট হননি। তিনি দাবি করেছিলেন, আরএসএস এই প্রতিশ্রুতি তাদের গঠনতন্ত্রে সংযুক্ত করুক, যাতে চিরকালের জন্য আরএসএস রাজনীতি থেকে দূরে থাকে। এটা ১৯৪৯ সালের ঘটনা, তারপর সরকার আরএসএসের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। কিন্তু ২০১৩ সালে সংগঠনটির সরসংঘচালকের প্রধান মোহন ভাগওয়াতের নেতৃত্বে আরএসএস মারাত্মক বিশ্বাসঘাতকতা করে আগ্রাসী রাজনীতি শুরু করে বসে। লক্ষ্য ছিল আরএসএসের সাবেক প্রচারক নরেন্দ্র মোদিকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করা। তার ফলাফল আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি।
তার পরও ভারতের ১৫-১৬ কোটি মুসলমানের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। কারণ, ভারত রাষ্ট্রটি তার সংবিধান অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সংবিধান অনুযায়ী সে দেশের প্রত্যেক নাগরিক আইনের চোখে সমান। সেখানে আদালত আছে, সংবাদমাধ্যম আছে। উদারনৈতিক ব্যক্তিরা আছেন, যাঁরা মুসলিম সম্প্রদায়ের যেকোনো বিপদ-আপদে তাদের পাশে এসে দাঁড়ান। বাবরি মসজিদ ধ্বংস এবং গুজরাটে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা শুরু হওয়ার পর আমরা সেটা দেখেছি।
ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে মুসলিম-অধ্যুষিত জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই অনুচ্ছেদ ভারতীয় সংবিধানের সমবয়সী, এর বয়স এখন ৬৫ বছর। মোদির আমলে এ প্রদেশের বিশেষ মর্যাদা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে, সেখানকার মানুষ তেমনটা মনে করতেই পারে। যাঁরা এই অনুচ্ছেদের অমর্যাদা করতে চান, তাঁরা ইতিহাস জানেন না। এমনকি সত্য সন্ধানেও তাঁদের তেমন আগ্রহ নেই।
ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হয়। সে সময় ৫৬০টি রাজাশাসিত রাজ্যের সামনে দুটি সুযোগ খোলা ছিল। হয় তাদের ভারতের সঙ্গে যোগ দিতে হতো, অথবা নবগঠিত পাকিস্তানে যোগ দিতে হতো। সেই ফয়সালাটা অবশ্য ধর্মের ভিত্তিতেই হয়েছে। সেই সব রাজ্যের শাসকেরা অবশ্য চাইলে স্বাধীন থাকতে পারতেন। জম্মু ও কাশ্মীরের মহারাজা হরি সিং বেশ দেরিতে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন, যদিও সেই প্রদেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান। আমার পাঠ হচ্ছে, আরেকটু ধৈর্যশীল হলে প্রদেশটি হয়তো পাকিস্তানের সঙ্গেই যেতে পারত। কিন্তু পাকিস্তান প্রথমে আদিবাসী এবং পরে সেনা পাঠিয়ে প্রদেশটিকে নিজের ঘরে আনার চেষ্টা করে। মহারাজা ভারতে যোগদানের চুক্তি স্বাক্ষর করে এই খুনোখুনি বন্ধ করার চেষ্টা করেন। তবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তিনি মাত্র তিনটি বিষয় তুলে দেন: প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ।
অন্য বিষয়গুলো রাজ্যের হাতেই থাকে। ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে সে আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটেছে। ভারতীয় ইউনিয়ন আরও মন্ত্রণালয় দাবি করলে রাজ্যটির সিদ্ধান্তক্রমেই তা হতে হবে। রাজ্যটি এ শর্তেই ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিল। ফলে আরএসএস যে ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদটি বাতিল করার দাবি জানাচ্ছে, সেটা অবৈধ।
বাস্তবে ব্যাপারটা এমন জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে যে এর সমাধানে তিন পক্ষের সম্মতি লাগবে: ভারত, পাকিস্তান এবং জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ। আজ যদি গণভোট হয়, তাহলে জম্মু ও কাশ্মীরের জনগণ স্বাধীন রাষ্ট্রের পক্ষেই ভোট দেবে। জম্মুর অধিকাংশ মানুষ হিন্দু, তারা চাইবে ভারতের সঙ্গে যেতে। লাদাখের অধিকাংশ জনগণ বৌদ্ধ, তারা সরাসরি নতুন দিল্লির অধীনে ‘ইউনিয়ন টেরিটরি’র অধিকার দাবি করবে। এসব ভিন্ন ভিন্ন বিবেচনার কারণে সমস্যাটি আরও জট পাকিয়ে উঠেছে। এই প্রেক্ষাপটে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রের সীমানা তুলে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হবে, সেটাই এ সমস্যার একমাত্র সমাধান।

ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক৷

কোরীয় উপদ্বীপ- দুই কোরিয়া, এক হওয়ার স্বপ্ন by এ কে এম জাকারিয়া

শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দিনে দিনে এর অনেক ক্ষতই শুকিয়েছে। একমাত্র কোরীয় উপদ্বীপকেই এখনো বয়ে বেড়াতে হচ্ছে সেই যুদ্ধের দগদগে ঘা। যুক্তরাষ্ট্র ও একসময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের শক্তির প্রতিযোগিতায় কৌশলগত ভারসাম্যের বলি হিসেবে বিভক্ত হয়েছে কোরীয় উপদ্বীপ। প্রায় ৭০ বছর ধরে উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত দুই কোরিয়া দুই পথেই হাঁটছে।

বিশ্ববাসীর কাছে উত্তর কোরিয়া যেন এক অজানা দ্বীপের নাম। ‘কিম ডাইনেস্টির’ শাসনে দুনিয়াবিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়া টিকে থাকার বিস্ময়কর ক্ষমতার প্রকাশ দেখিয়ে যাচ্ছে। আর দক্ষিণ কোরিয়া অর্জন করেছে চমকে দেওয়ার মতো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। মাথাপিছু ৩০ হাজার ডলারের বেশি আয় নিয়ে বিশ্ব জিডিপির সূচকে দেশটির স্থান এখন ১৩ নম্বরে। পারমাণবিক সক্ষমতা বাদ দিলে সামরিক শক্তিতেও দেশটি এখন সামনের কাতারে, বিশ্বের মধ্যে নবম। ইসরায়েল ও জাপানের মতো দেশ থেকেও এগিয়ে। এই অর্থনৈতিক সামর্থ্য ও সামরিক শক্তি নিয়েও এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিতে দেশটির প্রভাব এই অঞ্চলের অপর দুই শক্তিশালী দেশের (চীন ও জাপান) তুলনায় কম। দক্ষিণ কোরিয়া সম্ভবত বর্তমানে এ দিকেই মনোযোগ দিতে শুরু করেছে।
২০১৩ সালে ক্ষমতায় এসে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট পার্ক গুয়েন-হে বিদেশনীতির ক্ষেত্রে ‘ট্রাস্টপলিটিক’ নামে এক নীতির ঘোষণা দিয়েছেন; যার ঘোষিত লক্ষ্য হচ্ছে সন্দেহ-অবিশ্বাস ও সংঘাতের পরিবেশকে আস্থা ও সহযোগিতায় রূপান্তরিত করা এবং ‘একটি নতুন কোরীয় উপদ্বীপ, নতুন উত্তর-পূর্ব এশিয়া ও একটি নতুন বিশ্ব গড়ে তোলা।’ সবকিছু মিলিয়ে তিনি এক কোরিয়ার স্বপ্ন দেখছেন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণ ও বিশ্ববাসীকে সেই স্বপ্নের সাথি করতে চাইছেন।
সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় হয়ে গেল বিশ্ব সাংবাদিক সম্মেলন৷ মূল িথম কোরীয় উপদ্বীপের শান্তি ও দুই কোরিয়ার একত্রীকরণ। দক্ষিণ কোরিয়ার সাংবাদিক সমিতির আয়োজনে এ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন ৫০টি দেশের শ খানেক সাংবাদিক। দক্ষিণ কোরিয়া, সামগ্রিকভাবে কোরীয় উপদ্বীপকে জানা-বোঝা, দুই কোরিয়ার এক হওয়ার সম্ভাবনা এবং এসব নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাংবাদিক ও কোরিয়া পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও মতবিনিময়ের এক সুযোগ করে দিয়েছিল এই সম্মেলন। দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান সরকার যে ‘এক কোরিয়া’ ইস্যুটিতে দুনিয়ার মনোযোগ চাইছে, সেটা সম্মেলনে যোগ দেওয়া সব সাংবাদিকের কাছেই স্পষ্ট হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এর সম্ভাবনা বা বাস্তবতা আসলে কতটকু?
শীতল যুদ্ধের শেষ হয়েছে সেই কবে। দুই ভিয়েতনাম এক হয়েছে, জার্মানি এক হয়েছে—তা–ও ২৩ বছর হয়ে গেছে। দুই কোরিয়ার এক হতে বাধা কোথায়? সম্মেলনে অংশ নেওয়া চীনের এক সাংবাদিকের মতে বাধাগুলো হচ্ছে, দুই কোরিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও উন্নয়নের মধ্যে বিশাল পার্থক্য এবং বড় দেশগুলোর হস্তক্ষেপ। রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও উন্নয়নের পার্থক্য জার্মািন, ভিয়েতনামসহ বিভক্ত অন্য দেশগুলোতেও ছিল। কোরীয় উপদ্বীপের সমস্যা নিয়ে ছয় দেশীয় যে উদ্যোগ ও আলোচনা অনিয়মিতভাবে হয়ে থাকে, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া বাদে বাকি চারটি দেশ হচ্ছে চীন, জাপান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র। দুই কোরিয়ার এক হওয়ার ক্ষেত্রে এই আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোই কি তবে সবচেয়ে বড় বাধা?
সাংবাদিকদের সঙ্গে এক নৈশভোজে এসেছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার মিনিস্ট্রি অব ফরেন অ্যাফেয়ার্সের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তাঁর কাছে বিদেশি সাংবাদিকদের জানার বিষয় ছিল, দুই কোরিয়ার এক হওয়ার ব্যাপারে চীনের অবস্থান কী? ‘চীনের অবস্থানগত পরিবর্তন হয়েছে, এখন অন্তত আমরা চীনের সঙ্গে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে পারছি।’ উত্তরটি কূটনৈতিক৷ কিন্তু চীনের অবস্থান কী হতে পারে, তা আমরা অনুমান করতে পারি৷ একীভূত কোরিয়া বড় এক শক্তি হিসেবে চীনের জন্য ভবিষ্যতে হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তাইওয়ান, ব্রুনাইয়ের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে আছে চীন। অন্যতম নৌ রুট ও প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ পুরো দক্ষিণ চীন সাগরকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চীনের মরিয়া অবস্থান কোনো লুকানো বিষয় নয়। দক্ষিণ চীন সাগরের বিতর্কিত পারসেল দ্বীপের কাছে গত মাসেই তেল অনুসন্ধানে বিশাল রিগ পাঠিয়েছে চীন, যে অঞ্চলটির ওপর দাবি রয়েছে ভিয়েতনামেরও। এ নিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কড়া কথার বিনিময় হয়েছে। চীনের এই উদ্যোগ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘উসকানিমূলক’। আর দক্ষিণ চীন সাগরের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান চীনের কাছে ‘অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ’। এ পরিস্থিতিতে বিভক্ত কোরিয়া, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘শত্রু’ উত্তর কোরিয়ার প্রয়োজনকে চীন অস্বীকার করবে কীভাবে?
মাত্র ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ হলেও উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার মধ্যে একটি সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত দিয়ে সংযুক্ত কোরীয় উপদ্বীপ ও এই অঞ্চলের ভূরাজনীতিতে রাশিয়া তার স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট ও প্রভাব বজায় রাখতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। উত্তর কোরিয়ার কীর্তিকলাপ নিয়ে রাশিয়ার উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা কম নয়। কিন্তু শীতল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইউক্রেন প্রশ্নে পশ্চিমের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক এখন সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে এসে ঠেকেছে। ইউক্রেন বিরোধের কারণে পশ্চিমের অবরোধের মুখে পড়লে রাশিয়া কোরীয় উপদ্বীপের রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে মার্কিন ও পশ্চিমাবিরোধী অবস্থান নিতে পারে, যার সহজ অর্থ হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক আরও জোরদার করা। এক কোরিয়া এবং এর নেতৃত্বে যদি থাকে দক্ষিণ, তবে সেখানে মার্কিন প্রাধান্যের বিষয়টিই নিশ্চিত হবে। রাশিয়া কি তা চাইবে?
কোরীয় উপদ্বীপকে একসময় উপনিবেশ বানিয়েছিল জাপান। আর এখন সামরিক শক্তিতে দক্ষিণ কোরিয়া জাপানকে ছাড়িয়ে গেছে। তবে সমৃদ্ধ অর্থনীতি হিসেবে এশিয়ার রাজনীতিতে জাপানের একটা শক্ত অবস্থান রয়েছে, যা দক্ষিণ কোরিয়ার নেই। দক্ষিণ কোরিয়া এখন তা অর্জনের চেষ্টায় মাঠে নেমেছে। এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘনিষ্ঠ দুই মিত্রের মধ্যে ঐতিহাসিক কারণেই সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন রয়ে গেছে। জাপান ও উত্তর কোরিয়া গত মাসে নতুন করে আলোচনা শুরুর ঘোষণা দিয়েছে। জাপানের এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া বিস্মিত। কোরিয়ান-আমেরিকান সাংবাদিক টনি নামকুং দীর্ঘদিন ধরে দুই কোরিয়ার রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করছেন৷ তিনি এক লেখায় লিখেছেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবের কাছে এই অঞ্চলে পুনরায় পা ফেলার উপায় হচ্ছে উত্তর কোরিয়া। কোরীয় উপদ্বীপে ‘পুনরায় পা ফেলা’ বা প্রভাব বজায় রাখা যদি জাপানের লক্ষ্য হয়ে থাকে, তবে এক ও শক্তিশালী কোরিয়া জাপানের জন্য খুব স্বস্তির কারণ হবে বলে মনে হয় না।
গত জানুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়ায় মোতায়েন মার্কিন সেনার সংখা ছিল ৩০ হাজার। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দেশটি সফরে এসে আরও ৮০০ সৈন্য বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। কারণ, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষায় তাঁরা ‘প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। নিরাপত্তা নিশ্চয়তা চুক্তি অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ার পক্ষে তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ওয়াশিংটন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। অথচ সমালোচকেরা বলেন, নিজেকে রক্ষার ক্ষমতা দক্ষিণ কোরিয়ার এককভাবেই রয়েছে। কোরীয় উপদ্বীপে উত্তর কোরিয়ার মতো একটি দেশ আছে বলেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এই অঞ্চলে চীন-রাশিয়ার খুব কাছাকাছি সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক কোরিয়া যুক্তরাষ্ট্রকে সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত করতে পারে।
এই যে এত আলোচনা, সেখানে উত্তর কোরিয়া কোথায়? একত্রীকরণ নিয়ে দেশটি বা এর জনগণ কী ভাবছে, তার পুরোটাই অজনা। যুক্তরাষ্ট্রের ফিন্যান্সিয়াল টাইমস পত্রিকার উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া প্রতিনিধি সিমন মান্ডি এক আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন সাংবাদিকদের এই সম্মেলনে। তাঁর মতে, বর্তমান উত্তর কোরিয়া সরকারের শান্তিপূর্ণ একত্রীকরণে সাড়া দেওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। এ ধরনের কিছু হলে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ অনুচরদের সবই হারাতে হবে, এমনকি তাঁরা শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখিও হতে পারেন। তাঁর মতে, একমাত্র উত্তর কোরিয়ার সরকারের উৎখাতই দুই কোরিয়ার এক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। আর তা হতে পারে দুই উপায়ে: প্রথমত, কিম উনের ঘনিষ্ঠ অনুচরদের কেউ এককভাবে যদি হত্যাকাণ্ড ঘটান অথবা উচ্চপর্যায়ে যদি কোনো ষড়যন্ত্র ঘটে; আর দ্বিতীয় পথটি হচ্ছে গণ-অভুত্থান। গণ-অভুত্থানের আপাতত কোনো সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করেন এই মার্কিন সাংবাদিক। তবে উত্তর কোরিয়া সরকারের উচ্চপর্যায়ে বিভক্তির আলামতের তথ্য তাঁর কাছে রয়েছে বলে জানিয়েছেন। দুই কোরিয়ার এক হওয়ার জন্য িক তবে উত্তর কোরিয়ার সরকার উৎখাত বা এ ধরনের কোনো ষড়যন্ত্রের জন্য অপেক্ষা করতে হবে!
কোরীয় উপদ্বীপ নিয়ে উল্লেখযোগ্য আন্তর্জাতিক উদ্যোগ হচ্ছে দুই কোরিয়া, চীন, জাপান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে ছয় দেশীয় আলোচনা। অনিয়মিত এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে হতাশা রয়েছে দক্ষিণ কোরীয় মহলে। দক্ষিণ কোরীয়দের মনোভাব অনেকটা এ রকম যে কোরীয় উপদ্বীপের শান্তির চেয়ে সবাই বরং এ নিয়ে খেলছে। কিন্তু এটাও তাদের মানতে হচ্ছে যে চীন, জাপান, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের আন্তরিক উদ্যোগ ছাড়া এই উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও এক হওয়ার কোনো উদ্যোগের সূচনা করাও অসম্ভব। কিন্তু এই অঞ্চলের বর্তমান জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সবগুলো দেশ একসঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপের শান্তি ও একত্রীকরণের ব্যাপারে ‘আন্তরিক’ হয়ে উঠবে, এমন আশা করা কঠিন। ‘কোরীয় উপদ্বীপের একত্রীকরণ’ আপাতত একটি স্বপ্নের নাম। দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট তাঁর এই স্বপ্নকে নিজের জনগণ ও বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করেছেন। কাউকে না কাউকে তো স্বপ্ন দেখতে হবেই, তার বাস্তবায়ন আপাতত যত কঠিন ও অসম্ভবই মনে হোক না কেন।

দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ফিরে
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com

নূর হোসেনের যত বড় ভাই!

নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের আগে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন নূর হোসেনই আলোচনায় ছিলেন৷ ১৯৮৭ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের নায়ক৷ সেই নূর হোসেন বুকেপিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লিখে এরশাদের স্বৈরশাসনকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন৷ সব স্বৈরশাসকের মতো এরশাদও এ রকম একজন সাহসী ও দ্রোহী যুবককে সহ্য করতে পারেননি৷ প্রকাশ্য রাজপথে মিছিলরত এই অকুতোভয় যোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করা হয়৷ সেই নূর হোসেন ছিলেন আমাদের লাখো লাখো ছাত্র ও তরুণের আদর্শ৷ গণতন্ত্রের আশা ও বিশ্বাস৷
তাঁর সাহস ও ত্যাগের পথ ধরে নব্বইয়ে এরশাদের পতন হয়েছে সত্য, গণতন্ত্র মুক্তি পায়নি; বরং আড়াই দশকের ব্যবধানে স্বৈরাচারের সব বদগুণ ও বদ–অভ্যাস আমাদের কথিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জেঁকে বসেছে৷ সেদিন নূর হোসেনকে গুলি করে যে স্বৈরাচারী হত্যা করেছিল, সেই স্বৈরাচারী এখন গণতান্ত্রিক সরকারের অংশীদার৷ পৃথিবীর সব স্বৈরাচারকেই হয় দেশত্যাগ করতে হয়, নয় বিচারের মুখোমুখি হতে হয়৷ পিনোচেট, মার্কোস, ইরানের শাহ—কেউ দেশে থাকতে পারেননি৷ কিন্তু বঙ্গদেশীয় স্বৈরাচার বহাল তবিয়তেই আছে৷ তিনি কেবল সরকারের অংশীদার নয়, ‘গণতন্ত্রী’ প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত৷ আবার একই সঙ্গে জেনারেল মঞ্জুর হত্যার আসামিও৷ রাজনীতিতে যখন নীতি, আদর্শ, মূল্যবোধ নির্বাসিত হয়, যখন স্বপ্ন ও বিশ্বাস হারিয়ে যায় তখন শহীদ নূর হোসেনদের কথা কেউ মনে রাখেন না৷ শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ পরিত্যক্ত হয়৷ আর তাদের শূন্য স্থান পূরণ করে নারায়ণগঞ্জের, লক্ষ্মীপুরের, ফেনীর সন্ত্রাসী ও খুনিরা। সাত খুনের প্রধান আসামি নূর হোসেন এক ভয়ংকর সন্ত্রাসী৷ সাত খুনের আগ পর্যন্ত তাঁর সব অপকর্ম ও অপরাধ চাপা ছিল৷ এখন দিনের অােলার মেতা প্রকাশিত৷ আবার এ কথাও ঠিক যে নূর হোসেনরা একা দানব হতে পারেন না। এই সমাজেই তাঁর আশ্রয়দাতা, অস্ত্রদাতা ও মন্ত্রদাতা আছেন৷ আছেন তাঁর বড় ভাই, মেজো ভাই, ছোট ভাই৷ আছেন মাসোহারাভোগী, চাঁদা গ্রহণকারী ও চাঁদা প্রদানকারী৷ একটি সমাজ কতটা পচে গেলে, নষ্ট হলে রাজনীতি কতটা দূষিত হলে এ রকম একজন ব্যক্তিকে দুধকলা দিয়ে পোষা হয়। সমাজের অনেক ভদ্র লেবাসধারী ব্যক্তিরও নাকি তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত মাসোহারা নিতে বাধেনি।
নূর হোসেন সবকিছু টাকা দিয়ে কিনতে চেয়েছিলেন— বাড়ি, গাড়ি, বিত্তবৈভব, রাজনীতি, পদপদবি৷ এমনকি টাকা দিয়ে সাতজন মানুষকে খুন করাতেও তাঁর বাধেনি৷ তিনি ভেবেছেন, আইনের ঊর্ধ্বেে থাকবেন৷ ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকবেন৷ তাঁর বড় ভাই, মেজো ভাই ও ছোট ভাইয়েরা বাঁচাবেন৷ কিন্তু শেষরক্ষা হলো বলে মনে হয় না৷ সম্প্রতি কলকাতার আদালতে নূর হোসেন বলেছেন, তিনি সাত খুনের ঘটনায় জড়িত নন৷ তিনি রাজনীতির শিকার৷ তিনি স্বেচ্ছায় দেশ ছাড়েননি৷ দেশ ছেড়েছেন তাঁর নেতা ও বড় ভাইদের পরামর্শে৷ আমরা জানি না নূর হোসেনের নেতা ও বড় ভাই কারা? তাঁরা কি নারায়ণগঞ্জেই সীমাবদ্ধ, নাকি রাজধানীর অভিজাতপাড়া পর্যন্ত বিস্তৃত? তবে আমরা অন্তত তাঁর একজন বড় ভাইয়ের নাম দেখেছি, যিনি টেলিফোনে তাঁকে পাসপোর্টে সিল আছে কি না জানতে চেয়েছেন, যিনি জনৈক গৌরদার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে বলেছেন৷ উল্লেখ্য, এই বড় ভাইয়ের হাত ধরেই নূর হোসেন ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষায় পিজিপিতে (প্রেজেন্ট গভর্নমেন্ট পার্টি) যোগ দিয়েছিলেন৷ আবার ২০০১ সালে তাঁর সঙ্গেই পাালিয়ে গেছেন। কী অদ্ভুত আত্মিক বন্ধন৷ নূর হোসেন কেবল সুদিনের বন্ধু নন, দুর্দিনেরও সহযাত্রী। তবে আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারি, এ রকম বহু ভাই ও নেতা অাছেন ফেনীতে, লক্ষ্মীপুরে, বরিশালে, পাবনায়, সিলেটে, যশোরে; যারা নূর হোসেনদের আশ্রয় ও অভয় দেওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া আছেন। তাঁরা একেকজন নূর হোসেন, একেকজন ইমদু (বিচারপতি সাত্তারের আমলে একজন প্রতিমন্ত্রীর বািড় থেকে যিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন), একেকজন আজম খান (যিনি আওয়ামী লীগ নেতা ময়েজউদ্দিনকে হত্যা করেছিলেন) তৈরি করেন। এই তিন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী তিন আমলে তৈরি৷
এখানে বাঙালি জাতীয়তাবাদী, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী কিংবা স্বৈরাচারী আমলের মধ্যে ফারাক নেই৷ অপরাধী যত ভয়ংকরই হোক না কেন, একা সে অপরাধ করতে পারে না৷ নারায়ণগঞ্জের নূর হোসেনও পারেননি৷ আমাদের এই সমাজ ও রাষ্ট্র এতটাই নিষ্ঠুর ও নির্বিকার যে এত দিন নূর হোসেন এসব অপকর্ম নির্বিঘ্নে করে যেতে পেরেছেন৷ আমাদের রাজনীতি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার বিরুদ্ধে টুঁ শব্দটি করেনি৷ একটি সমাজ ধ্বংসের কিনারে গেলেই এ রকম ঘটনা ঘটে থাকে৷ খুন, রাহাজানি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে এমন কোনো অপরাধ নেই যে এই ব্যক্তি করেননি৷ আর আমাদের সমাজ, আমাদের সরকারি দল, আমাদের বিরোধী দল, আমাদের নাগরিক সমাজ, আমাদের সরকার ও প্রশাসন তা মুখ বুজে ‘অনুমোদন’ করে গেছে৷ এই সন্ত্রাসী নূর হোসেনই এখনকার বাংলাদেশের আদর্শ৷ আওয়ামী লীগ, বিএনপি জাতীয় পার্টি—একে একে তিনি তিন দলেই সুবিধা নিয়েছেন। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর হয়েছেন৷ প্যানেল মেয়র পদেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন৷ সাত খুনের ঘটনা এভাবে দেশব্যাপী তোলপাড় না করলে হয়তো তিনি ভবিষ্যতে সাংসদও হতেন৷ আমরাও তা মেনে নিতাম। এই নূর হোসেনদের স্থায়ী কোনো দল নেই৷ যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, সেই দলের নেতা-সাংসদেরাই নূর হোসেনের ভাই হয়ে যান৷ নাসিম ওসমানের হাতে তৈরি নূর হোসেন বিএনপি নেতা গিয়াসউদ্দিনের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন৷ আবার আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শামীম ওসমানের হাত ধরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন৷ এই ধারায় চলে আসছে আমাদের রাজনীতি। যেই সমাজে খুদে মাফিয়া ডন নূর হোসেন সমাদৃত, সেই সমাজে গণতন্ত্রের জন্য জীবন দেওয়া নূর হোসেনের কথা কেউ মনে রাখে না৷ নূর হোসেন এখন কলকাতায় জেলে আটক আছেন৷ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ফেরত আনার চেষ্টা করছে৷ কিন্তু সেই চেষ্টা কত দিনে সফল হবে, আদৌ সফল হবে কি না, সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে৷ গ্রেপ্তারের আগে নূর হোসেন কলকাতার উপকণ্ঠে ফ্ল্যাট ভাড়া করে থাকতেন। গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী নূর হোসেন ভারতে যাওয়ার সময় দুই কোটি টাকা সঙ্গে নিয়ে গেছেন৷ কীভাবে তিনি এত টাকা নিয়ে গেলেন?
কারা তাঁকে সহযোগিতা করেছে, পার হতে সাহায্য করেছে, সেটা কি কখনোই জানা যাবে? কেবল নূর হোসেন নন, বাংলাদেশের টাকা ও অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে মালয়েশিয়ায়, দুবাইয়ে, যাচ্ছে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে, জমা হচ্ছে সুইস ব্যাংকে৷ কলকাতার আদালতে নাকি নূর হোসেন নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন৷ কী নিষ্কলুষ চরিত্র! নূর হোসেন বলেছেন, তিনি রাজনীতির শিকার৷ এক অর্থে তিনি ঠিকই বলেছেন৷ যে রাজনীতি খুনির চেহারা জনসমক্ষে উন্মোচন করে দেয়, হতে পারে তিনি সেই রাজনীতির শিকার৷ এর পর তাঁকে দেশে আনা হলে বলবেন, তিনি রাজনীতির শিকার। বিচার হলে বলবেন, রাজনীতির শিকার। কেননা এত দিন নূর হোসেনের পক্ষে আরও অনেক বড়, মেজো ও ছোট ভাই দাঁড়িয়ে যাবেন। সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও হয়তো তাঁদের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবে না৷ এই প্রেক্ষাপটে আজ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠেয় নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর-বন্দর) আসনের উপনির্বাচন হতে যাচ্ছে৷ কে জিতবেন—জনগণ যাকে ভোট দেবেন তিনি, নাকি যিনি ব্যালট বাক্স দখল করে নেবেন? নাকি ভোটের নামে সেখানে আরেকটি প্রহসন হবে? প্রথম আলোর খবরে জানা যায়, সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন—এমন ৩৬ জনের তালিকা তৈরি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী একটি সংস্থা৷ ভোটারদের নিরাপত্তা এবং ভোটকেন্দ্রসহ এর আশপাশের এলাকায় শািন্তশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য এসব ব্যক্তির ওপর কড়া নজরদারির সুপারিশ করেছে ওই সংস্থাটি৷ তালিকাভুক্ত এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে মামলা রয়েছে৷ এঁদের বেশির ভাগই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে ওসমান পরিবারের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত৷ এসব ব্যক্তির অনেকেই আবার র‌্যাব-পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, অতীতে বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। এর মধ্যে নির্বাচনী এলাকার বাইরের বাসিন্দাও আছেন৷ এসব ব্যক্তি অর্থ ও পেশিশক্তির জোরে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারেন৷ ইতিমধ্যে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমান তাঁর নির্বাচনী এলাকা সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লা থেকে হাজার হাজার লোক নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন৷ প্রয়োজনে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে লাখো মানুষ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ–৫ নির্বাচনী এলাকায় নিয়ে যেতে বলেছেন৷ এর উদ্দেশ্য কী? বাইরের লোকেরা তো ভোট িদতে পারবেন না, তাহলে কি ভোট ঠেকাতেই এই প্রস্তুতি? নির্বাচন কমিশন, নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এই হুংকারকে কীভাবে নেয়, সেটাই দেখার বিষয়৷ নারায়ণগঞ্জের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন প্রত্যেক নাগরিকেরই দায়িত্ব তাঁদের ভোটের অধিকার রক্ষা করা এবং ভোট চোর ও ভোট ডাকাতদের রুখে দেওয়া৷
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

নারায়ণগঞ্জে কারেন্ট জালের রাজনীতি

নারায়ণগঞ্জের উপনির্বাচনযজ্ঞ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের সময় সামাজিক শক্তি যতটা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, রাজনৈতিক দল তা পারে না। কারণ, দলগুলো অনেক বেশি অগণতান্ত্রিক ও কোটারি শক্তির সঙ্গে আপস করে চলে। সেখানে ব্যক্তি ও তার দল চাইলেই সামাজিক অপশক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে না। তাকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় আপস করতে হয়। সে কারণে বিএনপির মতো দল, যারা বর্তমান সরকারের অধীনে উপজেলা নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিল, তারা আজকের উপনির্বাচনে দলগতভাবে কোনো পরোক্ষ বার্তা প্রকাশ করতে পারেনি। সে কারণে কেন্দ্র দখলের মতো কোনো ঘটনা ঘটলেও তা প্রতিরোধে বিএনপি অপ্রস্তুত থাকবে৷ প্রতিরোধপর্ব যাতে কার্যকরভাবে জমে উঠতে না পারে, সে জন্য বহুধারায় বিভক্ত স্থানীয় বিএনপিকে অধিকতর দুর্বল করে রাখা হয়েছে। জেলা বিএনপির সভাপতি তৈমুর আলম খন্দকার সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নের জবাবে হলেও বলেছিলেন, মানুষ সন্ত্রাসী ও গডফাদারকে ভোট দেবে না। বিএনপির আমলে তাঁর নিহত ভাইয়ের হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি বিএনপির আরেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনকে (মি. উদ্দিন বর্তমানে দলের সঙ্গে আলগা সম্পর্ক রেখে চলেন, অনেকটা নিষ্ক্রিয়, বললেন, খন্দকাররা তাঁকে ভুল বুঝেছেন) দায়ী করেন৷ আবার পার্বত্য চুক্তিবিরোধী এক মিছিলে গুলিবর্ষণের ঘটনায় একজন নিহত এবং নিজের গায়ে দুটি বুলেট আজও বহনের ঘটনায় তৈমুর ওসমানদের ওপর দায় চাপান৷
লন্ডনে পাড়ি জমানোর আগের রাতে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। এ নির্বাচনে আকরাম জয় পেলে বিএনপি কোনোভাবে লাভবান হতে পারে, সেই চিন্তা তাঁর নেই। তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎপ্রত্যাশী তৈমুর আলমের দেশত্যাগের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর ভাই খোরশেদ আলম খন্দকার—যিনি একজন কাউন্সিলর ও বিএনপির নেতা, বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাঁর ছবি দহলিজে শোভিত, হোলস্টারে সারাক্ষণ পিস্তল রাখেন, তিনি হজব্রত পালন করতে শহর ছেড়ে যান৷ কিন্তু তৈমুরপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ টি এম কামাল, যিনি সর্বশেষ কাউন্সিলে গোপন ব্যালটে নির্বাচিত একমাত্র নেতা, ক্রমাগত বিবৃতি দিচ্ছেন যে বিএনপি ভোট বর্জন করেছে ঠিকই; কিন্তু বিএনপি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে, যারা জিয়া পরিবারকে হেনস্তা করেছে, তাদেরকে ‘ভোট’ না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। চাষাঢ়ার মোড়ে যেখানে জেনারেল জিয়াউর রহমান শহরের ঐতিহ্যবাহী ফুটবল খেলার মাঠ নষ্ট করে জিয়া ক্লাব বানানোকে উৎসাহিত করেছিলেন, সেখানে রাখা জিয়ার ম্যুরালে ওসমানেরা কালি লাগিয়েছিলেন। কামালই তা মুছে দিতে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলেন। ভোট কথাটির উচ্চারণ যে সাংগঠনিক অবস্থানের পরিপন্থী, সেটা চিহ্নিত করে তাঁকে চাপে ফেলার মতো নেতা-কর্মীর আকাল পড়েনি। এমনকি তাঁকে বহিষ্কারের কথাও প্রচারিত হয়েছিল। অথচ তিনি তেমন মাপের নেতা নন৷ এই আসনের বিএনপির দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সম্ভাব্য প্রার্থী তফাতে রইলেন।
তৈমুর লন্ডনে আর অপর বিএনপির নেতা আবুল কালাম, ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে অাকরামকে অল্প ব্যবধানে হারিয়ে জয়ী হয়েছিলেন, যথাসম্ভব কম সক্রিয়। তিনি যদিও সরাসরি ত্বকী হত্যাকাণ্ডের সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ভোট না দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মোহাম্মদ আলী, যিনি ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, বিএনপিপন্থীর তকমা তাঁর গায়ে এখনো লেপ্টে আছে, যঁাকে ২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনের পরে সেলিম ওসমানের পোশাক কারখানা উইজডোম অ্যাটায়ার্সের ‘অবৈধ’ দখলদারত্ব থেকে নাটকীয়ভাবে উৎখাতের ঘটনায় ওসমান পরিবারের পক্ষে মধ্যস্থতা করতে দেখা গিয়েছিল, তিনি লাঙ্গলের পক্ষে সক্রিয় থেকেছেন। ১২ নম্বর ওয়ার্ডের সিটি কাউন্সিলর শওকত হোসেন ওরফে শকু বিএনপির স্থানীয় নেতা, বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বেকসুর খালাস পাওয়া আসামি কিসমতের ভাই, বোমা হামলায় ২০ জনের নিহত হওয়ার ওসমানীয় মামলার অন্যতম আসামি৷ শামীম সুযোগ পেলেই কিসমতের ভাইকে ‘প্রশ্রয়’ দেওয়া নিয়ে আইভীকে ঠেস দেন৷ অথচ শকু লাঙ্গলের পক্ষে ভোট চাইছেন। তিনি অবশ্য এটা অস্বীকার করেন। প্রশ্নের জবাবে শামীম ওসমান আমাকে বলেছিলেন, বোমা হামলায় শকুর জড়িত থাকার বিষয়টি তিনি গুরুত্ব দেন না। ১৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন দেওয়ান লাঙ্গলের পক্ষে ভোট চাইছেন। বন্দর উপজেলা থেকে বিএনপির সদ্য নির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ওরফে মুকুলের ব্যবসা খুব পরিচ্ছন্ন নয় বলে অভিযোগ আছে। তিনি সতর্কতার সঙ্গে হলেও লাঙ্গলের পক্ষে নামেন।
এ টি এম কামাল ছাড়া বিএনপির অন্য যিনি আনারসের পক্ষে জোরসে নেমেছেন, তিনি আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খান। সেটাও সম্ভবত তিনি মূলধারার বা ঢাকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আলগা বলেই। বিএনপি–বিদ্রোহী হিসেবে বারের সভাপতি হন। খালেদা জিয়া এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা ওসমান পরিবারের দ্বারা ধারাবাহিকভাবে বিব্রত ও পীড়িত। ত্বকী এবং সেভেন মার্ডারের অসাধারণ সংবেদনশীল প্রেক্ষাপট বিএনপি নেত্রীকে গঞ্জের ভুক্তভোগী পরিবারের শরণাপন্ন করেছিল, কিন্তু তা অতটুকুই৷ আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারের পাশে মওদুদ আহমদরা দাঁড়ালে এর সুফল নাগরিক সমাজের প্রার্থী আকরাম পেতেন৷ কিন্তু ‘অবৈধ’ উপনির্বাচন বর্জনের যান্ত্রিক অবস্থানে তঁারা সম্ভবত অাঁচড়টুকুও কাটতে চাননি৷ দলের লাভ কী। খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে আকরাম সচিব থাকলেও তাঁদের মধ্যে বাতচিত তেমন হয়নি। ফুলের তোড়া হাতে আকরাম তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। তাই প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা একটি বিতর্কিত পরিবারের পাশে থাকার অভাবনীয় ঘোষণা এবং তাতে শান্তিকামী মানুষের আহত বোধের বিষয়টি বিএনপির নেত্রীকে কোনো কৌশল গ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করেনি। রুহুল কবির রিজভী ভোট না দেওয়ার ডাক দিয়েছেন৷ এর তাৎপর্য অস্পষ্ট নয়৷ স্থানীয় একজন সাংবাদিক মঙ্গলবার তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। রিজভী তখন বলেন, ভোটাররা কেন্দ্রে যাবেন কি যাবেন না, তা তিনি বলেননি। কাকতালীয় যে নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক যেভাবে প্রকাশ্যে আকরামকে, তেমনি তাঁর শাসকদলীয় প্রতিপক্ষ খোকন সাহা ওসমানকে সমর্থন করছেন।
গতকাল এক ঘণ্টার ব্যবধানে দুই রকম খবর পেলাম। একজন টিভিব্যক্তিত্ব বললেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। আকরামই জয় পাবেন। আরেকজন যিনি প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের সঙ্গী ছিলেন, তিনি আমাকে বলেন, কেন্দ্র দখলের প্রস্তুতি আছে৷ সেলিম ওসমান জানিয়েছিলেন, তিনি বা তাঁর পরিবারের কেউ নির্বাচন করবেন না। পরে মত পাল্টান। ওসমান পরিবারের সদস্যরা অতীতে অনেক দুঃসময় অতিক্রম করেছেন। বিদেশে তাঁদের পালিয়ে থাকতে হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের সভানেত্রী এমন দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দেননি। এবারে দিয়েছেন এমন একটি প্রেক্ষাপটে, যখন সাত খুনের সন্দেহের তিরে ওসমান পরিবার বিদ্ধ। কিন্তু তাই বলে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর প্রতিপক্ষের অবস্থান বা কৌশলে কোনো পরিবর্তন আসেনি। গঞ্জবাসীর প্রতি খালেদা জিয়ার কোনো অঙ্গীকার আছে, তা বলা যাবে না; বরং একজন জনপ্রিয় রাজনীতিক আমাকে বলেছেন, বিএনপির উচ্চপর্যায়কে হাত করার খবর তাঁরা শুনেছেন। এটা ঠিক-বেঠিক যা-ই হোক, বিএনপির ঔদাসীন্য স্পষ্ট। অবশ্য বিএনপির বিপুল নেতা–কর্মী নাগরিক শক্তির পক্ষে খেটেছেন৷ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শিল্পনগর, যেটি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম কেন্দ্র, যেখানে বছরে কয়েক ডজন গুম–খুন হয়, সেখানে একটি নির্বাচন হচ্ছে, যার সঙ্গে বর্তমান সরকারের টিকে থাকা, বর্তমান সরকারের বৈধতার প্রশ্ন সবচেয়ে ঠুনকো, সেখানেও কারচুপির আশঙ্কা প্রবল৷ সবকিছু ছাপিয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সন্ত্রাস, না শান্তি,
সেটা অনেকাংশে প্রতীকী হলেও তারও তো একটা পক্ষ-বিপক্ষ থাকবে। অথচ সেখানে দেশের বৃহত্তম বিরোধী দল কথিতমতে নিরপেক্ষ থাকার ধনুর্ভঙ্গপণ করেছে। মঙ্গলবার মির্জা ফখরুল ইসলামকে বললাম, বর্জনের তকমা বজায় রেখেও একটি পরোক্ষ অবস্থান স্পষ্ট করতে পারতেন, কিন্তু করেননি৷ ভোট বর্জনের দিকেই বিএনপির ঝোঁক, যা ওসমান পরিবারকেই শক্তি জোগাবে। অপরাজনীতির কারেন্ট জালে বিএনপি এভাবেও বন্দী৷ সাধ্য কী যে আইভী ও আকরামও সহজে এর বাইরে বের হন। মেয়র পদে থেকে আইভীর তো একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীকে প্রকাশ্যে সমর্থন দেওয়ার আইনগত সুযোগ ছিল না৷ তাই তাঁকে কৌশলী হতে হয়েছে। জেলা আওয়ামী লীগের শেষ কমিটির আহ্বায়ক আকরাম পদত্যাগ করেছেন। সেটা গ্রহণ বা নাকচ হলো কি না জানা যায় না। যুগ্ম আহ্বায়ক মারা গেছেন। গঞ্জের আওয়ামী লীগ তাই মরূদ্যান হয়ে শূন্যে ভাসছে। রাজনীতি ও সুশাসন কোনোটিই গঞ্জে নেই। শামীম ওসমান তিন ঘণ্টার বেশি গঞ্জের ঘটনাপ্রবাহ তাঁর মতো করে ব্যাখ্যা করেও গভীর হতাশা ব্যক্ত করেন। আমাকে বলেন, তিনি রাজনীতি ছেড়ে দিতে পারেন! জয়ী হলে আওয়ামী লীগে যোগ দেবেন? শেখ হাসিনা আমন্ত্রণ জানালে তাঁকে ফেরাবেন? এস এম আকরাম আমাকে এ সম্ভাবনা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নাকচ করে দেননি। কারণ, রাজনীতিটা কারেন্ট জালে আটকা। বলেন, এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সময় এখন নয়৷
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্বাস্থ্য দেখবে কে?

যে হাসপাতালগুলোতে সাধারণ মানুষ রোগমুক্তির স্বপ্ন দেখে, সেই হাসপাতালগুলো কি আদৌ সুস্থ আছে শুধু তার গঠনশৈলীর দিক থেকে? হাসপাতাল হচ্ছে এমন একটি স্থান, যেখানে একজন মৃত্যুপথযাত্রী নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে৷ তাই একে বলা হয় ‘স্পেস ফর হোপ’৷ অথচ আমাদের দেশের অলিগলিতে আর রাজপথের ধারে অপরিকল্পিতভাবে যেভাবে হাসপাতালগুলো গড়ে উঠছে, তাদের চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশেষ করে হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকটি এখানে মূল বিবেচ্য বিষয়৷ কারণ, আবাসিক বাড়ি, অফিস স্পেস আর হাসপাতালের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার সংজ্ঞায়ন ভিন্নতর হবে, এটিই স্বাভাবিক। অথচ হচ্ছে ঠিক তার উল্টো। ঢাকা শহরের বেশির ভাগ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান বহুতলবিশিষ্ট, পুরোটাই কাচ দিয়ে ঘেরা এবং সেই কাচের দেয়াল মোটেও খোলা যায় না। রাতের বেলায় হাসপাতালগুলোতে অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে আলোকসজ্জায় বোঝার কোনো উপায় নেই এগুলো হাসপাতাল, নাকি কোনো পাঁচতারা হোটেল৷ যদিও খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এগুলো করা হয়ে থাকে মূলত বাণিজ্যিক কারণে। আর স্থায়ীভাবে লাগানো কাচের কারণে কোনোভাবেই হাসপাতালের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক বাতাস চলাচল করতে পারে না, তাই মূলত পুরো স্থাপনাটিকেই শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মধ্যে নিয়ে আসা হয়। যদিও একটি হাসপাতালে অবশ্যই বিশেষ বিশেষ অংশে শীতলীকরণ প্রয়োজন, কিন্তু সমস্ত স্থাপনায় শীতলীকরণ ব্যবস্থা কি আমাদের দেশের জলবায়ুর জন্য সুখকর? শুধু তা–ই নয়, এই অতিরিক্ত যান্ত্রিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া বিদ্যুৎ ঘাটতির ওপরেও বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একজন অভিজ্ঞ ডাক্তার সব সময় তাঁর রোগীদের উপদেশ দিয়ে থাকেন প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সঙ্গে সহাবস্থান করার জন্য, অথচ আমাদের দেশের অপরিকল্পিত চাকচিক্যের কারণে বেশির ভাগ চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি মাথায় না রেখে ভবনটিকে মোটা রিফলেকটেন্স কাচ দিয়ে মুড়িয়ে দিচ্ছে৷ এতে তাপমাত্রার প্রতিফলন বেড়ে যাচ্ছে অভ্যন্তরীণভাবে।
শুধু তা-ই নয়, ইউরোপীয় আদলে গড়ে ওঠা এসব অবকাঠামো তার আশপাশের বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে ওঠার জন্য সব থেকে বেশি ভূমিকা পালন করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, কাচ দিয়ে মোড়া একটি সুউচ্চ ভবনের চারপাশের তাপমাত্রা বাতাসের স্বাভাবিক তাপমাত্রা থেকে চার-ছয় ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়, যার প্রভাব পড়ছে রাস্তায় খোলা বাতাসে দাঁড়িয়ে থাকা সাধারণ মানুষের ওপর; স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে ক্রমাগত। অন্যদিকে ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগা, অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পুরে মরা দেখে আমাদের গা শিউরে ওঠে, যা নিয়ে আমরা সবাই বর্তমানে কথা বলছি৷ কারণ প্রতিনিয়তই আমরা এই দুর্ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছি। কিন্তু আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি, অপরিকল্পিতভাবে আবাসিক ফ্ল্যাট অথবা অফিসের আদলে বেড়ে ওঠা হাসপাতালগুলো আদতেই স্বাস্থ্যসম্মত কি না? সেখানে অগ্নিনির্বাপণের পরিপূর্ণ ব্যবস্থা আছে কি না? গাড়ি পার্কিংয়ের সঠিক ব্যবস্থা আছে কি না? আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, একটি বিপণিকেন্দ্র আর একটি হাসপাতাল এক বিষয় নয়। একটি বিপণিকেন্দ্রে আগুন লাগলে হয়তো মানুষ দৌড়াতে সক্ষম, কিন্তু একজন মৃত্যুপথযাত্রী, যে কিনা অচেতন অবস্থায় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে, তার পক্ষে কীভাবে দৌড়ানো সম্ভব? বিষয়টি নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে, বিশেষ করে স্থপতিদের। বাংলাদেশের প্রতিটি ভবন পরিবেশবান্ধব কি না, তা যাচাই-বাছাই করে নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে দুঃখের বিষয় এই যে এগুলো পরিবেশবান্ধব করার সুস্পষ্ট নীতিমালা এখনো আমরা আমাদের দেশের জলবায়ু অনুযায়ী তৈরি করতে পারিনি৷ পাশের দেশ ভারত, মালয়েশিয়া এদিক থেকে অনেক এগিয়ে গিয়েছে। অন্যথায় চিকিৎসা নিতে আসা খোলা আলো-বাতাসে থাকা গ্রামের সাধারণ একজন মানুষকে এই কাচ দিয়ে মোড়ানো ‘হিট বক্স’ আসলেই কি পরিপূর্ণ চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম হবে?
নাকি তাদের অযথাই এসির মধ্যে রেখে এগুলো শুধু বাণিজ্যিকভাবে লাভবান হওয়ার পাঁয়তারা মাত্র। আর এ কথা অনস্বীকার্য যে আমাদের দেশেরই নামকরা স্থপতিদের ভবনবিষয়ক কর্তৃপক্ষ এগুলো সব সময় আমলে নিচ্ছে না৷ তারা শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নিয়েই সময় পার করছে৷ পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে না৷ বেশির ভাগ হাসপাতালে করিডরের প্রশস্ততা, লিফটের সামনের জায়গার পরিমাণ ও সংখ্যা, ভবনের সামনের খোলা জায়গার পরিমাণ, ময়লা-আবর্জনার যথাযথ ব্যবস্থাপনা, অগ্নিনির্বাপণ, বহির্গমনের রাস্তা খোলা স্থানে উন্মুক্ত কি না ইত্যাদি অবশ্যই খতিয়ে দেখতে হবে৷ নইলে একটি হাসপাতাল সব সময় তার নিজেরই স্বাস্থ্য-সংকটে ভুগবে এবং তার চারপাশের পরিবেশ দূষিত করবে। তখন এটি রোগ নিরাময়ের কেন্দ্র না হয়ে হয়ে উঠবে মৃত্যুকেন্দ্র। হাসপাতাল-ক্লিনিক ইত্যাদি নির্মাণে কী ধরনের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও খেয়াল রাখতে হবে৷ কারণ বিভিন্ন উপকরণ থেকে বিভিন্ন ধরনের অস্বাস্থ্যকর রশ্মি নিঃসরিত হয়ে যেন স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব না ফেলে৷ এমনকি কোন ধরনের রং ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও বিবেচ্য বিষয় হতে হবে। তাই দরকার একটি সুস্পষ্ট পরিবেশবান্ধব বিধিমালা, যা হবে সম্পূর্ণ আমাদের দেশের জলবায়ুর উপযোগী৷ এবং এ ব্যাপারে সরকারকে চুপ করে বসে থাকলে চলবে না; প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে, ব্যক্তিগত স্বার্থচিন্তা বাদ দিয়ে এগিয়ে আসতে হবে৷ সত্য হলেও অনস্বীকার্য যে প্রতিনিয়তই আমরা নিয়ম গড়ছি নিজেদের প্রয়োজনে, ভাঙছিও একই কারণে, যা দেখার কেউ নেই৷
সজল চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, স্থাপত্য বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়৷

অস্থিতিশীল ইরাকে বিমান হামলায় নিহত ২২, আহত ৩৬

ইরাকের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় দুটি প্রদেশে বিমান হামলায় কমপক্ষে ২২ জন নিহত ও ৩৬ জন আহত হয়েছেন। আহতদের স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে গতকাল প্রধানমন্ত্রী নূরি আল-মালিকি বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেই অনড় থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আইএএনএস। নিনেভেহ প্রদেশের রাজধানী মসুল থেকে ১২০ কিলোমিটার পশ্চিমে কয়েকটি যুদ্ধবিমান থেকে মিউনিসিপ্যালিটি ভবন ও এর কাছের দুটি বাড়িতে বোমা বর্ষণ করা হয়। এতে ৬ জন নিহত হয় ও ৬ জন আহত হয়। কট্টরপন্থীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাজ শহরতলিতে হামলা চালানো ওই যুদ্ধবিমানগুলোকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। ইরাক ও সিরিয়ার সীমান্তবর্তী শহরতলিটির বাসিন্দারা ধারণা করছেন, যুদ্ধবিমানগুলো সিরীয় বিমান বাহিনীর হতে পারে। তবে নিরপেক্ষ কোন সূত্র থেকে এর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এদিকে গত মঙ্গলবার রাতে উত্তরাঞ্চলীয় সালাহুদিন প্রদেশের বাইজি শহরে কয়েকটি ইরাকি হেলিকপ্টার থেকে হামলা চালানো হয়। এতে ১৬ জন নিহত ও ৩০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়। হতাহতদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। এর আগে গত মঙ্গলবার ইরাক-জর্ডান সীমান্তবর্তী রুতবা শহরে অশনাক্তকৃত কয়েকটি যুদ্ধবিমানের হামলায় ৬৯ জন নিহত ও ১৪৪ জন আহত হয়েছিলেন। স্থানীয় বাসিন্দারা ধারণা করছেন, সিরীয় যুদ্ধবিমান এ হামলাগুলো চালিয়েছে।

ব্রাজিলের কারাগারে ফুটবল তৈরি করে সাজা মাফ

হুগো আলভেস একসময় পেশাদার ফুটবল খেলে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখনও সম্পৃক্ত আছেন প্রিয় ফুটবলের সঙ্গে। কিন্তু ঠিক যেভাবে চেয়েছিলেন সেভাবে নয়। কারান্তরীণ হুগো বন্দিশালার কারখানায় ফুটবল তৈরি করার কাজ করেন। ব্রাজিলের কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারাগার নেলসন হুংরিয়া’র নির্দিষ্ট সংখ্যক বন্দিকে দিয়ে ফুটবল বানানোর কাজ করানো হয়। তাদের মধ্যে একজন হুগো। এ কাজের বদলে বন্দিদের সাজার মেয়াদ মওকুফ করে দেয়া হয়। প্রতি তিন দিন কাজের জন্য মওকুফ হয় একদিনের সাজা। মাদক মামলায় ৫ বছরের সাজা ভোগ করছেন ৩১ বছর বয়সী হুগো। ফুটবল বানানোর চেয়ে খেলার মাঠে থাকার আকাঙক্ষাটাই বেশি। তারপরও অন্তত পছন্দের কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত আছেন বলে সেটাকেই সান্ত্বনা মনে করছেন হুগো। দক্ষিণ-পূর্ব ব্রাজিলের বেলো হরাইজোন্তে শহরের নিকটবর্তী এ কারাগারে ফুটবল বানানোর কাজে হুগো সহ আছেন মোট ৮০ জন বন্দি। এদের মধ্যে ৪০ জন প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে বল বানানোর কাজ করেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন। বাকিরা বলের অংশগুলো সেলাইয়ের কাজ করে। এ দলের কর্মপ্রক্রিয়া অপরদের তুলনায় ভিন্ন। ২০১১ সালে ব্রাজিলজুড়ে কারাগারে থাকা বন্দিদের মনোবল উন্নীত করার জন্য এ পদক্ষেপ নেয়া হয়। এরই অংশ হিসেবে নেলসন হুংরিয়া’তে ফুটবল তৈরি করার কারখানা বানানো হয়। এর মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন কারাজীবনের পর বন্দিরা স্বাভাবিক জীবনের জন্য কর্মদক্ষতা অর্জন করছেন, অন্যদিকে কাজের বিনিময়ে সাজার মেয়াদ কমিয়ে দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়াও সাজার মেয়াদ কমিয়ে নিতে বন্দিদের জন্য রয়েছে শিক্ষা, সাহিত্য পাঠ ও পুস্তক প্রতিবেদন লেখার কার্যক্রম। কারাগারের এ কারখানার বন্দিরা দিনে ৪০০টি করে ফুটবল তৈরি করে। এতে করে তারা প্রতি মাসে আয় করে ৫৪৩ ব্রাজিলিয়ান রিয়াল। এর চার ভাগের এক ভাগ যায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারে। বন্দি পায় অর্ধেক। আর বাকি এক চতুর্থাংশ একটি একাউন্টে গচ্ছিত রাখা হয় যা ওই বন্দি মুক্তি পাওয়ার সময় নিতে পারবে। কারাগারের কারখানায় ট্রাইভেলা নামক এক প্রতিষ্ঠানের জন্য ফুটবলগুলো বানানো হয়। প্রতিষ্ঠানের খরচে নির্মিত হয়েছে কারখানাগুলো। প্রতি মাসে আনুষঙ্গিক খরচও তারা দিয়ে থাকে। তবে কর্মীদের মজুরি, ওভারটাইম, ট্যাক্সের দিক দিয়ে অনেক বেশি অর্থ বাঁচাতে সক্ষম হচ্ছে তারা। শ্রমিকদেরকে বোনাসও দিতে হচ্ছে না তাদেরকে। ব্রাজিলের প্রচলিত বোনাস বছরের ১৩তম মজুরি হিসেবে পরিচিত। কেননা, এর পরিমাণ প্রায় মাসিক বেতনের সমান হয়ে থাকে। বন্দিদের হাতে তৈরি বলগুলো বিক্রি করে ট্রাইভেলা প্রতি মাসে ১ লাখ ৯০ হাজার ডলার আয় করে। প্রতি মাসে বেতন বাবদ সার্বিক ব্যয় মাত্র ২০ হাজার ডলার। প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্ট আর ক্রুজ বলেন, বাইরের শ্রমিকদের তুলনায় কারাগারের শ্রমিকরা ১০ গুণ ভালো। তাদের চাকরি হারানোর ভয় রয়েছে। সেই সঙ্গে আছে কাজ করার উদ্যম। কখনও শ্রমিকদের নিয়ে কোন সমস্যা হয়নি বলে তিনি জানান। বন্দিদের তৈরি বলগুলো বিশ্বকাপে ব্যবহার হচ্ছে না ঠিকই তারপরও নিজেদের হাতে বানানো বল নিয়ে গর্বিত তারা। প্রদেশের পেশাদার প্রতিযোগিতায় ব্যবহার করা হচ্ছে তাদের বানানো বল। কর্মকর্তারা জানালেন, কারাগারের কাজগুলোর মধ্যে ফুটবল বানানোর কাজকে সব থেকে দামি কাজ বিবেচনা করা হয়। সহসা এ কাজের সুযোগ আসে না। প্রদেশের ৪টি কারাগার মিলে মাত্র ১২০ জন বন্দি এ কাজে নিয়োজিত আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। হুগোকে সুযোগ পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছিল একটি বছর। কখনও কখনও বন্দিদের আত্মীয় বা বন্ধু-বান্ধবের কাছে তৈরি ফুটবল পাঠানোর সুযোগ দেয়া হয়। গ্রাসিয়ানো অ্যান্টোনিও নামক এক বন্দি তার ১৪ বছরের ছেলের জন্য তার নাম লিখে একটি বল বানিয়ে পাঠিয়েছেন। হুগোর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে অনেকেই জানায়, এ কাজ তাদেরকে প্রতিদিনের একঘেয়ে কারাজীবন থেকে কিছুটা হলেও মুক্তি দেয়। কাজের মধ্যে সময়ও পার হয় দ্রুত। নেলসন হুংগারিয়াতে ফুটবল তৈরি কাজে নিয়োজিত বন্দিদের মধ্যে একজন খুবই সুপরিচিত। তিনি ২৯ বছর বয়সী ব্রুনো ফার্নান্দেজ। রিও ডি জেনিরোর খ্যাতিমান ক্লাব ফ্লামিঙ্গোর সাবেক ফুটবলার ও দলপতি ছিলেন তিনি। ব্রাজিল বিশ্বকাপ দলের অংশ হবার সম্ভাবনাও ছিল। গত বছর নিজের বান্ধবীকে হত্যা করার হুকুম দেয়ার অপরাধে তাকে ২২ বছরের কারাদ- দিয়েছে আদালত। ব্রাজিলের একটি আইনের আওতায় ব্রুনো মিনান গেরেইসের সেকেন্ড ডিভিশন একটি দলের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। কর্ম-মুক্তি কার্যক্রমের আওতায় তিনি খেলার সুযোগের প্রতীক্ষায় রয়েছেন। প্রাথমিক ভাবে বিচারক তার এ আবেদন নাকচ করে দেয়। তবে তাকে শিগগিরই ওই দলের নিকটবর্তী কোন কারাগারে স্থানান্তরিত করা হবে। নতুন করে আবার ক্যারিয়ার শুরু করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

নগ্ন ও সেক্সের ব্রাজিলে ভিন্ন এক ব্রাজিল

ব্রাজিলের পতাকায় দু’টি শব্দ লেখা। শৃঙ্খলা ও প্রগতি। ভিনদেশী কোন পর্যটক, যিনি রিও ডি জেনিরো’র সাম্বা মত্ত-নাইটক্লাব বা সাও পাওলো ঘুরে দেখেছেন তাদের মনে ঠিক শৃঙ্খলার প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠবে না। জরাজীর্ণ ফাভেলা (বস্তি)-র সমাহার আর যানজট বিভ্রাটের চিত্রই ব্রাজিলে অধিক সুপরিচিত। তবে সে ধারণা পাল্টে যাবে রাজধানী ব্রাসিলিয়াতে এলে। অন্য শহরগুলোর থেকে পার্থক্য আকাশ-পাতাল। এত গোছালো একটি শহর যে বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় এটা আসলেই ব্রাজিলে। ‘ফ্যান্টাসি আইল্যান্ড’ শিরোনামে ব্রাসিলিয়ার ইতিহাস আর সংস্কৃতি নিয়ে লিখেছেন হেনরিক ব্রান্ডাও জনসন। তিনি বলেন, এখানে সাম্বা চোখে পড়বে না। রাস্তার পাশে নেই কোন বিয়ারের দোকান। আর ফুটবল খেলার দৃশ্যও খুঁজে পাবেন না। এমনকি শহরের কেন্দ্রে কোন ফাভেলা নেই। ব্রাজিলের জন্য এটা সম্পূর্ণ অপরিচিত এক দৃশ্যপট, মন্তব্য করেন তিনি। অনেকের কাছে চিরাচরিত ব্রাজিলের দৃশ্য হলো রৌদ্রোজ্জ্বল আটলান্টিক ঘেঁষা সৈকতগুলোতে ফুটবল খেলার উন্মাদনা। ব্রাসিলিয়া কোন উপকূলবর্তী শহরও নয়। রিও থেকে আনুমানিক ৫৮০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে এর অবস্থান। তবে ফুটবল যে নেই সে কথা এখন আর বলা যাবে না। ব্রাসিলিয়ার এস্টাদিও ন্যাসিওনাল স্টেডিয়ামটি ব্রাজিল বিশ্বকাপের জন্য নির্মিত নতুন স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে একটি। আর এর পেছনে ব্যয়ও হয়েছে সব থেকে বেশি। ব্রাসিলিয়া শহরটি আধুনিক ব্রাজিলের অনন্য নিদর্শন। শহরটির বেশির ভাগ অংশের রূপকার অস্কার নিয়েমেয়ার। ব্রাজিলিয়ান স্থাপত্য শিল্পের পেলে হিসেবে তিনি খ্যাত। প্রশস্ত এভিনিউ আর যানজট মুক্ত গাড়ি যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্যও পরিচিত ব্রাসিলিয়া। পাশাপাশি শান্ত এক পরিবেশে স্থানীয়দের নিবাস।
১৯৫৬ সালে এক টুকরো ঘাসের জমির ওপর গোড়াপত্তন হয়েছিল শহরটির। আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ১৯৬০-এ। যে মালভূমিতে শহরটির জন্ম তার আয়তন ছিল মাত্র ৩৮০০ ফুট। ব্রাসিলিয়া এখন ব্রাজিলের ৪র্থ সর্ববৃহৎ শহর। রাজনীতিবিদ আর আমলাদের হাতে সৃষ্টি হয় ব্রাসিলিয়া। আর শহরটির নকশা করেছেন লুসিও কস্তা। রিও ডি জেনিরো থেকে রাজধানী সরিয়ে ব্রাসিলিয়াতে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট হুসেলিনো কুবিতশেক। আধুনিকতার প্রতি ব্রাজিলের তৃষ্ণা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে শহরটি। এছাড়াও, নজরে পড়ে সামাজিক সাম্য। সকল শ্রেণীর লোকদের এখানে পারস্পরিক সহাবস্থান। চমকপ্রদ নির্মাণ আর স্থাপত্যশৈলীর নমুনাই শুধু নয় ল্যাটিন আমেরিকার সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের শহরগুলোর মধ্যে একটি ব্রাসিলিয়া। সব থেকে আকর্ষণীয় ভবনগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়েমেয়ারের ‘মেট্রোপলিটন ক্যাথিড্রাল অব আওয়ার লেডি অ্যাপারেসিডা’ আর কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাসাদসদৃশ সব ভবন। বিশ্বকাপের আগমনে এসব ভবনগুলোকে হলুদ আর সবুজ আলোয় সজ্জিত করা হয়েছে। নিয়েমেয়ারের অনবদ্য স্থাপত্যশৈলী আর নকশার প্রশংসা করে রাইস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ফারেস আল দাহদাহ শহরটিকে যুক্তরাষ্ট্রের হিউস্টনের সঙ্গে তুলনা করেন। তার নকশায় ব্রাজিলের অনন্য সহজাত সৌন্দর্য ও দক্ষতা ফুটে উঠেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। ব্রাসিলিয়ার স্থানীয় ফুটবল ইতিহাস তত সমৃদ্ধ নয়। এখানের সব থেকে পুরানো ক্লাবের যাত্রা শুরু হয় ১৯৭৫ সালে। দলটি এখন আর টপ ডিভিশনে খেলছে না। তবে শহরের জন্মের পর ব্রাজিলের নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রথম বাসিন্দারা কিন্তু তাদের ফুটবলপ্রেম সঙ্গে নিয়েই এসেছিলেন। সমপ্রতি রিও’র ফ্লামেঙ্গো এখানে খেলে গেছে একটি ম্যাচ। স্টেডিয়ামে ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। আর ফুটবলের সব থেকে মর্যাদার আয়োজন ফিফা বিশ্বকাপের খেলাগুলোতেও যে তিল ধারণের ঠাঁই থাকবে না তা বলাই বাহুল্য।

দাঙ্গা নিয়ে এখনো নীরবতা!

নরেন্দ্র মোদি
ক্ষমতায় এসে বলেছিলেন, তাঁর হাতে সময় আছে মাত্র ৬০ মাস। সরকারের প্রথম মাস পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অন্তত এটুকু বোঝাতে পেরেছেন, নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে হাতের কাজগুলো শেষ করতে তিনি বদ্ধপরিকর৷ সমস্যাগুলো যদি মোটামুটি তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়, তা হলে দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক ও বৈদেশিক ক্ষেত্রে মোদি বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা যাকে ‘অত্যন্ত ইতিবাচক’ বলে মনে করছেন৷ তৃতীয় ভাগ অর্থাৎ সামাজিক ক্ষেত্র নিয়ে মোদির ভাবনাচিন্তায় অবশ্য তেমন বড়সড় কোনো পরিবর্তন এখনো নজর কাড়েনি৷ বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে মোদির দৃষ্টিভিঙ্গকে সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি ‘বৈপ্লবিক’ বলে মনে করেন৷ গতকাল মঙ্গলবার প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে প্রতিবেশীদের আমন্ত্রণ করে মোদি যে বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন, এই এক মাসে তা তিনি আরও খানিকটা এগিয়ে নিয়েছেন৷ ভুটান সফর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে প্রথমেই বাংলাদেশ সফরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত এবং ভারতীয় রাষ্ট্রদূতদের দিল্লিতে ডেকে সার্বিক পররাষ্ট্রনীতির আলোয় প্রতিবেশীনীতি নিয়ে দিনভর আলোচনার মধ্য দিয়ে আগামী দিনের নীতিমালা তৈরির যে কর্মসূচি মোদি সরকার নিয়েছে, তা সাম্প্রতিক অতীতে হয়নি।’ বীণা মনে করছেন, এই এক মাসে এত দ্রুত এতটা এগোনো নিঃসন্দেহে কৃতিত্ব। মোদি বোঝাতে পেরেছেন, তাঁর চাহিদা ও রূপায়ণের সদিচ্ছার মধ্যে ফারাক একেবারেই নেই। বীণার সঙ্গে একমত কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞ সি রাজামোহনও৷
গতকাল প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রতিবেশীদের নিয়েই প্রধানমন্ত্রী সময় দিয়েছেন বেশি। কারণ, এটা তাঁর অগ্রাধিকার৷ কিন্তু সেই সঙ্গে তিনি ভিসা বিতর্ককে পেছনে ফেলে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নিয়েছেন, জাপানেও যাবেন। উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি চীন যাচ্ছেন। প্রতিটি পদক্ষেপই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক৷’ মোদির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অবশ্যই দেশের অর্থনীতি। এমনিতেই দুবছর ধরে দেশের আর্থিক হাল বিভিন্ন কারণে আশাপ্রদ নয়। প্রবৃদ্ধির হার যতটা হবে মনে করা হয়েছে, ততটা হয়নি৷ আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন সংস্থাগুলোও ভারতের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ছবি মোটেই ভালো আঁকেনি। বিশ্বজোড়া মন্দা এর অন্যতম কারণ। মূল্যবৃদ্ধি এখনো লাগামছাড়া। রাশ টানতে না পারলে জনপ্রিয়তা হারানোর ঝুঁকি থাকবে। বিরোধী দল হিসেবে বিজেপি বারবার ইউপিএ সরকারের এই দুর্বলতার (পলিসি প্যারালিসিস) সমালোচনা করেছে৷ গত এক মাসে মোদি অন্তত এটুকু বোঝাতে পেরেছেন, স্থবিরতায় তাঁর বিশ্বাস নেই। শরিকদের ওপর নির্ভরতা না থাকায় অপ্রিয় সিদ্ধান্তগুলো নিতে মোদি দেরি করছেন না৷ যেমন ট্রেনের যাত্রী ভাড়া ও পণ্য মাশুল বাড়ানোর সিদ্ধান্ত৷ বণিকসভা ‘ফিকি’-র সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অঞ্জন রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভর্তুকি কমানোর মতো প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীকে কঠোরভাবে নিতে হবে৷ ট্রেনের ভাড়া বাড়িয়েও চাপে পড়ে পিছিয়ে গেলে তা সুলক্ষণ হবে না৷ পরিবেশের কারণে আটকে থাকা প্রকল্প ছাড় পেলে অর্থনীতির ছবিটা ঘুরতে পারবে৷ সীমান্তের উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বহুদিন ধরে আটকে আছে৷ মোদি সেগুলো শুরু করতে উদ্যোগী।’ অঞ্জন রায় অবশ্য বলেন, ‘কালোটাকা উদ্ধারে মোদির উদ্যোগ প্রধানত রাজনৈতিক, যদিও তা ভীতির সৃষ্টি করতে পারে।’ সামাজিক ক্ষেত্রে এই এক মাসে প্রধানমন্ত্রী অবশ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার ক্ষেত্রে তেমন সফল নন, বরং বিভিন্ন রাজ্যে অসম্প্রীতির ঘটনা ঘটছে৷ এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর নীরবতা সমালোচিতও হচ্ছে। প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মোদি বেশ কিছু সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন৷ আমলাশাহির ওপর ভরসা স্থাপনই শুধু নয়, প্রশাসনে তাঁদের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকারের প্রথম মাসপূর্তিতে নরেন্দ্র মোদি অন্তত এটুকু বুঝিয়েছেন, ৬০ মাসের মধ্যে হাতের কাজ শেষ করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পালন করতে হলে বিশ্রামের অবকাশ নেই।

রাজনীতিতে নামার কোনো ইচ্ছা নেই মিশেলের

মিশেল ওবামা
মার্কিন ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা রাজনীতিতে পা রাখতে চান না। পরিবারবান্ধব কর্মস্থল নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত সোমবার হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মিশেল এ কথা বলেন। খবর রয়টার্সের৷ স্বামী বারাক ওবামা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব ছেড়ে যাওয়ার পর হিলারি ক্লিনটনের মতো মিশেলও রাজনীতিতে পা রাখতে পারেন বলে গুঞ্জন চলছিল। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, তিনি সাবেক ফার্স্ট লেডি হিলারির পদাঙ্ক অনুসরণ করে রাজনীতি শুরু করবেন না৷ এর আগে কর্মজীবী পরিবার নিয়ে হোয়াইট হাউসে এক সম্মেলনে নিজেদের অতীত জীবনযাত্রার ধরন নিয়ে অজানা অনেক কথা বলেন মার্কিন ফার্স্ট লেডি ও প্রেসিডেন্ট৷ হোয়াইট হাউসে আসার আগে বারাক ও মিশেল চাকরি করতেন৷ একসঙ্গে সময় কাটানো ওবামা দম্পতির জন্য তখন সত্যিই বেশ কঠিন ছিল৷ কারণ স্বামী-স্ত্রীর কর্মস্থল ছিল আলাদা শহরে৷ ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর অবশ্য পাল্টেছে তাঁদের জীবনযাত্রা৷
মিশেল বলেন, ‘বারাক তখন স্প্রিংফিল্ডে কাজ করতেন, তারপর ওয়াশিংটনে৷ আমি ছিলাম শিকাগোয়৷ ফুটফুটে দুটি মেয়ের দেখাশোনার পাশাপাশি তখন একটি খণ্ডকালীন চাকরিও করতাম৷ আসলে খণ্ডকালীন কাজ নিয়ে ভুল করেছিলাম৷ কারণ আমার খণ্ডকালীন বেতন হলেও কাজ পূর্ণকালীনই করতাম৷’ স্ত্রীর বক্তব্যের আগে প্রেসিডেন্ট ওবামাও কিছু কথা বলেন নিজের অতীত জীবন সম্পর্কে, ‘হোয়াইট হাউসে আসার আগেও আমাকে প্রচুর সময় কাজ করতে হতো৷ আর কিছু সময় নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রমে কাটিয়েছি৷ সংসার ও মেয়েদের সামলানোসহ বাকি সব দায়িত্ব মিশেলের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলাম৷’ মিশেল বলেন, মেয়ে সারাহর জন্মের পর তাকে দেখাশোনার জন্য কেউ (বেবিসিটার) ছিল না৷ আর সেটাই ছিল সম্ভবত তাঁর মাতৃত্বের সবচেয়ে বাজে সময়৷ কিছুদিন পরই তিনি শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে একটি চাকরির ইন্টারভিউয়ের ডাক পান৷ চার মাস বয়সী মেয়ে সাশাকে নিয়েই তিনি সেখানে যান৷ চাকরিদাতা কর্তৃপক্ষ তাঁর অবস্থা বিবেচনায় নেয়। হাসপাতালের ভাইস প্রেসিডেন্টের চাকরিটা তিিন পেয়ে যান৷

জীবিত থাকতে ঋণী, মৃত্যুর পর ধনী

মাইকেল জ্যাকসন
যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের অদূরেই ফরেস্ট লনের সমাধিতে ঘুমিয়ে আছেন তিনি৷ পাঁচ বছর আগে এই দিনে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তিনি। তবে ভক্তদের কাছে আজও তিনি বেঁচে আছেন স্বমহিমায়। তিনি বিশ্বখ্যাত পপসম্রাট মাইকেল জ্যাকসন৷ আজ ২৫ জুন তাঁর পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী৷ গানে দুনিয়ার সংগীতপ্রেমীদের মাতিয়ে রাখলেও মৃত্যুর আগে জ্যাকসন আর্থিক দুরবস্থায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। অথচ মৃত্যুর পাঁচ বছর পরে আজ সেই মানুষটিরই সম্পদ ফুলে-ফেঁপে উঠেছে৷ খবর এএফপির৷ ব্যতিক্রমী গায়কি আর অসাধারণ নৃত্যশৈলীর মিশেলে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া মাইকেল জ্যাকসনের জীবনের শেষ দিনগুলো ভালো যাচ্ছিল না৷
এমনিতেই তাঁর মাথার ওপর বোঝা হয়ে চেপে ছিল বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ৷ তার ওপর ওই বছরের নভেম্বর থেকে লন্ডনে অনুষ্ঠেয় ৫০টি কনসার্টের মহড়া নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় ছিলেন তিনি৷ জ্যাকসনের সম্পদ নিয়ে প্রকাশিত নতুন একটি বইয়ে বলা হয়েছে, জ্যাকসনের রেখে যাওয়া ভূ-সম্পত্তির বর্তমান অর্থমূল্য ৭০ কোটি ডলারের বেশি৷ এসব সম্পত্তির দেখাশোনা করছেন তাঁর মা ও তাঁর তিন সন্তান৷ বইটির লেখক জ্যাক গ্রিনবার্গ বলেন, ‘মৃত্যুর পাঁচ বছর পর জ্যাকসন অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করছেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের সেরা সময়েও পারেননি৷’ শেষ এক বছরে বিলাসিতা আর অর্থ অপচয়ের চূড়ান্ত মাত্রায় পেঁৗছে গিয়েছিলেন জ্যাকসন৷ আর এই বিলাসিতার পেছনে অর্থের জোগান দিতে তিনি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েছিলেন৷ জ্যাক গ্রিনবার্গ বইয়ের শেষে লিখেছেন, ‘একটি কথা সত্যি: জ্যাকসন বেঁচে আছেন ও ভালো আছেন৷

সাদ্দামকে উৎখাত জঙ্গি উত্থানের জন্য কিছুটা দায়ী

টনি ব্লেয়ার
ইরাকের সাবেক স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেনের ক্ষমতাচ্যুতি বর্তমানে সুন্নি জঙ্গিদের উত্থানের পেছনে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে৷ যুক্তরাজ্যের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার গত সোমবার ফিনান্সিয়াল টাইমস-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ মন্তব্য করেন৷ খবর দ্য ইনডিপেনডেন্টর৷ নিবন্ধটিতে ব্লেয়ার বলেন, ইরাকে ১১ বছর আগে সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘটনার জের ধরে বর্তমানে জঙ্গিদের উত্থান ঘটেছে৷ ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর আগ্রাসনে সাদ্দামকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ২০০৩ সালে ইরাকে আগ্রাসন না চালালে এত দিনে হয়তো আরব বসন্তের জোয়ারে দেশটির জনগণ সাদ্দামের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করত৷
সাদ্দাম হয়তো সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মতো বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করতেন৷ কিংবা মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট হোসনি মোবারকের মতো তাঁর পরিণতি হতো৷ যুক্তরাজ্যের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘২০০৩ সালে যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়ে হোক না কেন, আজ আমরা বড় ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলা করছি৷ তবে আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, ইরাকে চলমান সংকট, ২০০৩ সালে নেওয়া সিদ্ধান্তের ফল নয়৷’