Tuesday, June 30, 2015

মায়া ও কামরুলের পদত্যাগ করা উচিত: টিআইবি

রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ
সম্মেলনে আজ টিআইবির নির্বাহী পরিচালক
ইফতেখারুজ্জামান বক্তব্য রাখেন। ছবি: সাহাদাত পারভেজ
দুর্নীতির অভিযোগের কারণে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলামের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত বলে মনে করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পদত্যাগ করলে এটি একটি নজির হতো বলে মনে করে টিআইবি।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সততা সম্পর্কে যুবকদের ধারণা’ শীর্ষক জরিপের ফলাফলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ কথা বলেন। ত্রাণমন্ত্রী মায়ার দুর্নীতির বিষয়টি বিচারাধীন বলে উল্লেখ করে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, তাঁর দুর্নীতির বিষয়টি এখনো বিচারাধীন। তাই শুধু এটুকু বলা যায় যে এ ক্ষেত্রে তিনি যদি পদত্যাগ করতেন, তাহলে ভালো হতো। এটি একটি নজির হতো। ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একইভাবে গম নিয়ে খাদ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এখন পর্যন্ত এটা প্রমাণিত যে গমের মান ততটা ভালো ছিল না। তাই খাদ্যমন্ত্রীরও উচিত ছিল স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা। তিনি বলেন, এরপর যদি তদন্ত ও বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে প্রমাণ হতো যে এই ঘটনার সঙ্গে তাঁরা জড়িত নন, তাহলে তাঁরা অনেক বেশি জনপ্রিয় হতেন। মানুষ তাঁদের ফুলের মালা দিয়ে বরণ করত।
টিআইবির যুব সততার জরিপের ফলাফলে বলা হয়, দুর্নীতি সম্পর্কে যুবকদের স্বচ্ছ ধারণা আছে। কিন্তু অনেক সময় পরিস্থিতির কারণে বা বাধ্য হয়ে তাঁদের দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হচ্ছে। রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি যুবকদের ধারণা নেতিবাচক। তাঁরা মনে করেন, এসব খাতে দুর্নীতি বেশি হচ্ছে।
টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল বলেন, ‘আমাদের জন্য দুঃখজনক সব কিছু জেনেশুনে তরুণদের দুর্নীতি মেনে নিতে হচ্ছে। তারা চাইলেও তাদের মূল্যবোধ কাজে লাগাতে পারছে না।’ তিনি বাজেটে শিক্ষায় কম বরাদ্দ দেওয়ায় সরকারের সমালোচনা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে জরিপ উপস্থাপনা করেন টিআইবির গবেষক মঞ্জুর ই খোদা, শাম্মী লায়লা ইসলাম প্রমুখ।
বাংলাদেশ সংবিধান অনুযায়ী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার মন্ত্রিত্ব এবং সংসদ সদস্য পদ ১৪ জুন থেকে খারিজ হয়ে গেছে। আইন বিশেষজ্ঞরা সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে এই মতামত দিয়েছেন।
ওই ধারার ২ দফার ঘ উপদফায় বলা আছে, ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হবার এবং সংসদ সদস্য থাকবার যোগ্য হবেন না, যদি “তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দু বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বছর অতিবাহিত না হয়ে থাকে”।’ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া ২০০৮ সালে জ্ঞাত আয়ের বাইরে অবৈধভাবে ছয় কোটি টাকার বেশি সম্পদ অর্জনের মামলায় ১৩ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। ২০১০ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ কেবলই আইনি প্রশ্নে ওই রায় বাতিল করেন। দুদক এর বিরুদ্ধে আপিল করে। ১৪ জুন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বাতিল করে হাইকোর্টে আপিলের পুনঃশুনানির নির্দেশ দেন।
এদিকে ব্রাজিল থেকে নিম্নমানের গম আনার ঘটনায় সমালোচনার মুখে পড়েছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত রোববার দেওয়া সর্বশেষ চিঠিতে বলা হয়েছে, খাদ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ করা গমের আটা অত্যন্ত নিম্নমানের। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর এসব নিম্নমানের গম ও আটা খাচ্ছেন। এতে তাঁদের মনোবল দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে একই অভিযোগে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম গত রোববার প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে পুলিশের অভিযোগ নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে এমন কোনো চিঠি আমরা পাইনি।’

কর্ণফুলীতে তিন কিলোমিটার টানেল নির্মাণে চুক্তি

কর্ণফুলী নদীতে দীর্ঘ তিন কিলোমিটার টানেল নির্মাণের লক্ষ্যে চায়না কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানির (সিসিসিসি) সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন করেছে বাংলাদেশ সরকার। নয় হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে দেশে প্রথমবারের মতো নদীর তলদেশে এই 'টানেল' নির্মাণের কাজটি পেয়েছে চায়না কোম্পানিটি।
এই টানেল হবে এশিয়ান হাইওয়ে এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের অংশ। সরকার বলছে, এই টানেল চালু হলে চট্টগ্রাম হবে 'ওয়ান সিটি টু টাউন'। টানেল নির্মাণে মঙ্গলবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে চায়না কমিউনিকেশন্স কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চুক্তি হয়।
সড়ক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং চীনের পরিবহন মন্ত্রী চুক্তি সই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বলে সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা আবু নাসের গণমাধ্যমকে জানান। সেতু বিভাগের পক্ষে সচিব খোন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম এবং সিসিসিসি প্রতিনিধি এ চুক্তিতে সই করেন।
এ টানেল নির্মাণের জন্য গত বছরের ১০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বেইজিংয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। চীন ও হংকংয়ের দুটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১৪ কোটি টাকা ব্যয়ে টানেলের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ করে।
মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এর আগে জানিয়েছিলেন, সরকারি পর্যায়ে (জি টু জি) কর্ণফুলীর তলদেশে এই টানেল নির্মাণ করা হবে। সব ঠিক থাকলে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের পর দুই লেইনের এই টানেল দিয়ে যান চলাচল করতে পারবে বলে পাশা করছেন কাদের।

দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনের কারিগর by সালমা খান

পঁচাত্তরে পা রাখা বাংলাদেশের এক চিরতরুণ বিশ্বনাগরিক, পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব নিরসনের একজন কারিগর। এটা আমাদের সবার জন্য এক পরম গর্বের বিষয়। বিগত শতাব্দীর শেষার্ধে পুঁজিবাদ তত্ত্বভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক সোনালি সম্ভাবনার সময় পেরিয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভাবনীয় বিকাশ, মানুষের গড় আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, শিক্ষার প্রসার, প্রযুক্তিগত চমকপ্রদ উদ্ভাবন, বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ হওয়া ইত্যাদির সমন্বয়ে মানুষের জীবনে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়ার কথা থাকলেও জনপদনির্বিশেষে তা ঘটেনি; বরং মানুষে মানুষে নতুন বৈষম্যের সৃষ্টি হয়েছে। কারণ, পুঁজিবাদ তত্ত্বভিত্তিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধনী দেশগুলোকে আরও ধনসমৃদ্ধ করেছে। আর সমৃদ্ধির নিচের জনগণ দারিদ্র্য উত্তরণের সুযোগগুলোর প্রবেশগম্যতা থেকে বঞ্চিত হয়ে চলেছে। উন্নয়নের চাবিকাঠি কেন্দ্রীভূত হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক পুঁজিবাদীর হাতে। এমনকি ধনী ও দরিদ্র দেশের সরকারও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অভিগম্যতা সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়েছে।
পুঁজি আহরণে ব্যাংকঋণের জামানত দেওয়ার ক্ষমতা না থাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মোদ্যম ব্যবহার করে দারিদ্র্য চক্র থেকে উত্তরণের কোনো সুযোগ আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে ছিল না। পুঁজিবাদী অর্থনীতির এই সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে মুহাম্মদ ইউনূস ৩৯ বছর আগে জামানতবিহীন ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থা প্রচলনের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দেন।
ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য মোকাবিলার সুযোগ সৃষ্টির জন্য মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সৃষ্ট গ্রামীণ ব্যাংক ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করে। বর্তমানে এশিয়া, আমেরিকা, ইউরোপ, আফ্রিকাসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই গ্রামীণ ব্যাংকের মডেলে ক্ষুদ্রঋণব্যবস্থা প্রচলিত আছে। গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্যের প্রথম ধাপ উত্তরণের একটি জুতসই হাতিয়ার হলেও ইউনূস তাঁর দীর্ঘ কর্ম-অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পেরেছিলেন, বৃহত্তর পরিসরে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যক্তিগত লাভের আশা ছাড়াই উদ্যোক্তাকে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে হবে, যা পুঁজিবাদী তত্ত্বের সর্বোচ্চ মুনাফা প্রণোদনাভিত্তিক উৎপাদনব্যবস্থার মাধ্যমে সম্ভব নয়। ইউনূসের সামাজিক ব্যবসার ধারণা এই চিন্তারই ফসল।
মুহাম্মদ ইউনূসের মতে, পুঁজিবাদী কাঠামোকে সম্পূর্ণতা দিতে হলে ব্যবসার মাধ্যমে এমন সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে করে একজন উদ্যোক্তা শুধু ব্যক্তিগত মুনাফা অর্জনের তাগিদে সীমাবদ্ধ না থেকে মানুষ হিসেবে তাঁর সহজাত সমাজকল্যাণ-স্পৃহার বশবর্তী হয়ে সামাজিক ব্যবসায় বিনিয়োগ করতে পারেন এবং ব্যবসালব্ধ মুনাফা একই উদ্দেশ্যে পুনর্বিনিয়োগ করতে পারেন। সামাজিক ব্যবসা হবে, যেখানে উদ্যোক্তা মূলত একটি সামাজিক সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে বিনিয়োগ করবেন। ইউনূস উদ্ভাবিত সামাজিক ব্যবসার মূল চালিকা শক্তি হলো বহুমাত্রিক মানুষের মধ্যে অন্তর্নিহিত পরোপকারের স্পৃহা ও সামাজিক কল্যাণ সাধনে আত্মতৃপ্তি লাভের বাসনা এবং সেই কাজে উদ্যোক্তা হিসেবে জীবিকা নির্বাহ। একই ব্যক্তি একসঙ্গে সনাতন পুঁজিবাদী ব্যক্তি মুনাফাভিত্তিক ব্যবসা ও পৃথক সামাজিক ব্যবসা করতে পারেন। পার্থক্য এই যে সামাজিক ব্যবসায়ে বিনিয়োগকারী শুধু তাঁর বিনিয়োগকৃত অর্থই ফেরত পাবেন, অর্জিত মুনাফা কোম্পানির (সামাজিক ব্যবসা) সম্প্রসারণ, শ্রমিককল্যাণ, পরিবেশবান্ধব পরিস্থিতি ইত্যাদির উন্নয়নে ব্যয় হবে। যাঁরা সামাজিক ব্যবসার উদ্যোক্তা হবেন, তাঁদের জন্য সামাজিক ব্যবসার উদ্দেশ্যে সৃষ্ট ফান্ড থেকে ঋণের ব্যবস্থা থাকবে। বর্তমানে দেশে চারটি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নয়টি প্রতিষ্ঠান থেকে সামাজিক ব্যবসায় উদ্যোক্তারা ফান্ড পেতে পারেন।
গ্রামীণ ব্যাংক ক্ষুদ্রঋণের মতো ইউনূস উদ্ভাবিত সামাজিক ব্যবসা তত্ত্ব বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। পুঁজিবাদ ব্যবসার বিশ্বনেতারা তাঁদের চলতি ব্যবসার পাশাপাশি করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি হিসেবে সামাজিক ব্যবসার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বর্তমান বিশ্বে ক্রমবর্ধমান বৈষম্য হ্রাস করতে অনেকেই একমাত্র সামাজিক ব্যবসাকে টেকসই হাতিয়ার মনে করছেন। অক্সফামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী বছর নাগাদ বিশ্বের অর্ধেক সম্পদ চলে যাবে মাত্র ১ শতাংশ মানুষের হাতে। পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে শীর্ষ ৮৫ ধনীর সম্পদ। ৮০ শতাংশ মানুষের কাছে মাত্র ৫ দশমিক ৫ শতাংশ সম্পদ। বিশ্ব অর্থনীতিকে ন্যায় ও সমতাভিত্তিক এবং টেকসই করতে হলে তাই সামাজিক ব্যবসা প্রসারের বিকল্প নেই। বেকারত্ব, দারিদ্র্য ও স্থানীয় বিশেষ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন, নেপাল, ভারত, হাইতি, কলাম্বিয়া, উগান্ডা, ব্রাজিল, আলবেনিয়া প্রভৃতি দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে সামাজিক ব্যবসার প্রসার ঘটেছে এবং ইতিমধ্যেই ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশ্যে সামাজিক ব্যবসার স্লোগান হলো ‘আমরা চাকরিপ্রার্থী নই, আমরা চাকরিদাতা’। কারণ, সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে প্রতীকী উদ্যোক্তা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন। গ্রামীণ ব্যাংকের অনেক ঋণগ্রহীতার সন্তানেরা চাকরির জন্য দুয়ারে দুয়ারে না ঘুরে নবীন উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের জীবিকা ও অন্যের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। এ বছরের ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বছরে বাংলাদেশে প্রায় ২২ লাখ তরুণ চাকরির খোঁজে শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন, সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে তাঁদের উদ্যোক্তা সৃষ্টি করতে পারলেই কেবল এই বেকারত্ব মোচন সম্ভব। বৈশ্বিক টেকসই উন্নয়ন প্রসঙ্গে ইউনূসের তিন শূন্য ও চার করণীয় থিওরি ইতিমধ্যে সুধী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে: ১. শূন্য দারিদ্র্য ২. শূন্য বেকারত্ব এবং ৩. শূন্য কার্বন নিঃসরণ এবং এই তিন শূন্য অর্জন করতে চার করণীয় ১. তরুণ উদ্যম, শক্তি ও সৃজনশীলতাকে সঞ্চিত করা ২. প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা ৩. ব্যবসাকে সামাজিক ব্যবসায় পরিণত করা এবং ৪. সুশাসন নিশ্চিত করা।
দারিদ্র্য দূরীকরণে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণের সাফল্য এবং সামাজিক ব্যবসার মানবিক অর্থনৈতিক তত্ত্ব ইউনূসকে ভূষিত করেছে ১১২টি আন্তর্জাতিক পুরস্কারে। যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম, আমেরিকার কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল, র‍্যামন ম্যাগসাইসাই অ্যাওয়ার্ড, ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজ, আগা খান অ্যাওয়ার্ড, সিডনি পিস প্রাইজ, সিউল পিস প্রাইজ প্রভৃতি। বাংলাদেশও তাঁকে ভূষিত করেছে প্রেসিডেন্ট পুরস্কার, কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুরস্কার ও স্বাধীনতা পুরস্কারে। পৃথিবীর ২০টি দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি লাভ করেছেন ৫৫টি সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি। বিখ্যাত টাইমম্যাগাজিনইউনূসকে একজন এশিয়ান হিরো এবং ২০০৮ সালে বিশ্বের ১০০ জন পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালের মধ্যে অন্যতম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ইউনূস রচিত বইগুলোর মধ্যে তাঁর আত্মজীবনী ব্যাংকার টু দ্য পুওর, ক্রিয়েটিং আ ওয়ার্ল্ড উইদাউট পোভার্টি ও বিল্ডিং সোশ্যাল বিজনেস আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছে এবং ১৫ থেকে ২০টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে। ২০১২ সালে গ্লাসগোর ক্যালিডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর নিযুক্ত করেছে।
ইউনূসের কর্মের ব্যাপ্তি আজ সারা বিশ্ব হলেও বাংলাদেশ নিয়েই তাঁর সমগ্র জীবন ও স্বপ্ন। বিগত চার দশকে বাংলাদেশে মানব উন্নয়ন সূচকে যে অভাবনীয় ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে, তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাঠামোগত পরিবর্তন হয়নি। ইউনূসের সামাজিক ব্যবসা প্রসারের মাধ্যমে দেশের লাখ লাখ তরুণ চাকরি খোঁজার পরিবর্তে উদ্যোক্তা হয়ে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূর করতে অনুপ্রাণিত হবেন—এ আশায় ইউনূসের সুস্থ ও কর্মময় জীবন কামনা করছি। বাংলাদেশের স্বপ্নপূরণে ইউনূস দীর্ঘজীবী হোক। শুভ জন্মদিন।
তথ্যসূত্র: সামাজিক ব্যবসা, মুহাম্মদ ইউনূস ও ইউনূস সেন্টার।
সালমা খান: অর্থনীতিবিদ ও নারীনেত্রী।

‘বিতর্কিত মন্ত্রীদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত’

বিতর্কিত মন্ত্রীদের স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ- টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন মায়ার মন্ত্রীত্বের বৈধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আমি তার ব্যাপারে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অবস্থান নিতে চাই না। যেহেতু বিচারাধীন বিষয় এবং আমাদের দেশে এধরণের কোন দৃষ্টান্ত নেই। তাই মন্ত্রীর উচিত স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা। একইভাবে গম কেলেঙ্কারীর দায়ে খাদ্য মন্ত্রীরও পদত্যাগ করে আইনের মাধ্যমে  নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের সুযোগ গ্রহণ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। মঙ্গলবার টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে ‘জাতীয় যুব-সততা জরিপ ২০১৫’ প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। টিআইবি ওই জরিপে জানিয়েছে, যুবরা রাজনীতি ও আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসাবে চিহ্নিত করেছে। একই সঙ্গে সরকারি সেবাখাতগুলোকে বেসরকারি সেবা খাতগুলোর তুলনায় বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করছে। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এডভোকেট সুলতানা কামাল, উপ নির্বাহী পরিচালক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক মোহাম্মদ রফিকুল হাসান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আজ ১ সেকেন্ড বাড়তি সময় পাবে পৃথিবী

আজ দিনের দৈর্ঘ্য হবে এক সেকেন্ড বেশি। পৃথিবীর আবর্তন গতি কমতে থাকার সঙ্গে তাল মেলাতেই মঙ্গলবার এক সেকেন্ড যোগ করার সিদ্ধান্ত নেন ফ্রান্সের প্যারিস মানমন্দির কর্তৃপক্ষ। আজ রাট ১১:৫৯:৫৯ সেকেন্ড সময়ের পরই অতিরিক্ত এক সেকেন্ড যোগ করা হবে। লিপ ইয়ারের মতো একে বলা হয় লিপ সেকেন্ড। প্যারিসের মানমন্দিরে অবিস্থত ইন্টারন্যাশনাল আর্থ রোটেশন সার্ভিস, আইইআরএস-এর বিজ্ঞানীররা সারা বছরই পৃথিবীর আবর্তনের ওপর নজর রাখেন। প্রয়োজনে গণণার ক্ষেত্রে তারা সূক্ষè পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। তবে লিপ সেকেন্ড যোগ করার নজির এবারই প্রথম নয়। সর্বপ্রথম ১৯৭২ সালে লিপ সেকেন্ড যোগ করা হয়। সবমিলিয়ে এর আগে ২৫ বার এমনটা ঘটেছে। আজ ১১:৫৫:৫৯ সময়ে অতিরিক্ত একটি সেকেন্ড যোগ করা হবে। এদিকে এ নিয়ে চিন্তার ভাজ পড়েছে সফটওয়্যয় প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নেয় শুরু করেন। এর আগে ২০১২ সালে লিপ সেকেন্ড যোগ হকান পর সময়েরর ঘেরফেরের কারণে বহু সফটওয়ার বিশেষ করে জাভায় তৈরি প্রোগ্রামগুলি ক্রাশ করে।

ভোট নিয়ে ভুতুড়ে কাণ্ড by বদিউল আলম মজুমদার

ঢাকার দুটি এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনে কেন্দ্র দখল করে সিল মারাসহ কারচুপির বহু ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল পর্যালোচনার পর মনে হচ্ছে যে এসব নির্বাচনে ভোট নিয়ে বাস্তবেই ব্যাপক ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটে গিয়েছে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাম্প্রতিক নির্বাচনের সঙ্গে ২০১০ সালের নির্বাচনের ফলাফলের তুলনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে।
এবার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে চূড়ান্ত প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ১২ জন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী ছিলেন আ জ ম নাছির উিদ্দন, আর বিএনপির প্রার্থী ছিলেন বিদায়ী মেয়র মনজুর আলম। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফলের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রামের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ১৩ হাজার ৬০০। ভোট পড়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার ৬৬৩ (৪৭.৯০ শতাংশ), যার মধ্যে বৈধ ৮ লাখ ২১ হাজার ৩৭১ এবং অবৈধ ৪৭ হাজার ২৯২ ভোট। মোট বৈধ ভোটে নাছির পেয়েছেন ৪ লাখ ৭৫ হাজার ৩৬১ (৫৭.৮৭ শতাংশ) এবং মনজুর আলম ৩ লাখ ৪ হাজার ৮৩৭ (৩৭.১১ শতাংশ)। তবে একটি কেন্দ্রের (হালিশহর মেহের আফজল উচ্চবিদ্যালয়) ৩ হাজার ৬২৯টি ভোটের মধ্যে মনজুর আলম একটি ভোটও পাননি, যদিও ২০১০ সালের নির্বাচনে সেই কেন্দ্রে তিনি ৬১৬টি ভোট পেয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে, ২০১০ সালে চট্টগ্রামের মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৮৭ হাজার ৪৯৭। ভোট পড়েছিল ৯ লাখ ২১ হাজার ৩৮৯ (৫৪.৬০ শতাংশ), যার মধ্যে বৈধ ভোট ছিল ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৪৫, অবৈধ ৩৫ হাজার ৫৪৪। মোট বৈধ ভোটের আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্রার্থী বিদায়ী মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৭৬০ (৪৩.৩২ শতাংশ) এবং বিএনপি-সমর্থিত মনজুর আলম ৪ লাখ ৭৯ হাজার ৬৫৮ (৫৪.১৫ শতাংশ) ভোট পেয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এবারের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ৭১৯টি ভোটকেন্দ্রে সার্বিক ভোট প্রদানের হার ৪৭.৯০ শতাংশ হলেও, ৩৩টি কেন্দ্রে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে, যার মধ্যে ১০টি কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ছিল ৯০ শতাংশের বেশি। একটি (আগ্রাবাদ তালেবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ছিল ৯৯ শতাংশ আরেকটি কেন্দ্রে ৯৮ শতাংশ এবং অন্য একটি কেন্দ্রে ৯৭ শতাংশ। পক্ষান্তরে, ২০টি কেন্দ্রে ২০ শতাংশের নিচে ভোট পড়েছে, এর মধ্যে একটি (নৌবাহিনী আদর্শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়) কেন্দ্রে মাত্র ৮.৬৮ শতাংশ ভোট পড়েছে। যদিও ২০১০ সালের নির্বাচনে ৬৭৩টি কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার এবারের হার থেকে প্রায় ৭ শতাংশ বেশি ছিল, কিন্তু আগের নির্বাচনে কোনো কেন্দ্রেই এ হার ৯০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়নি।
সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট প্রদানের সঙ্গে অন্তত সাতটি পদক্ষেপ জড়িত: ১. ভোটার প্রথমে যান একজন কর্মকর্তার কাছে, যিনি ভোটার তালিকা দেখে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেন। ভোটারের কাছে তাঁর ভোটার নম্বর থাকলে এ কাজটি দ্রুত সম্পন্ন হয়। ২. এরপর আরেক ব্যক্তি ভোটারকে তিনটি ব্যালট পেপার দেন, ৩. ব্যালট বইয়ের মুড়িতে তাঁর স্বাক্ষর/টিপসই নেন, ৪. তাঁর আঙুলে কালির দাগ দেন, এবং ৫. তাঁকে ভোট দেওয়ার জন্য কালি লাগানো একটি সিল দেন। ৬. তারপর বুথে গিয়ে ব্যালট পেপারগুলোতে সিল মেরে ভোটার ভোট দেওয়ার কাজ সারেন এবং ৭. সেগুলো ভাঁজ করে বুথের বাইরে অবস্থিত ব্যালট বাক্সে ফেলেন। ভোটার কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন, তা আগে থেকেই নির্ধারিত থাকলে এ কাজটিও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট সবাই ক্ষিপ্রতার সঙ্গে তঁাদের করণীয় সম্পন্ন করতে পারলে একজন ভোটারের, সাবেক নির্বাচন কমিশনার সাখাওয়াত হোসেনের মতে, তিনটি ভোট প্রদানের জন্য সর্বনিম্ন তিন মিনিট সময় লাগবে। তাঁর মতে, নিরক্ষর, স্বল্প শিক্ষিত ও অনভিজ্ঞদের আরও বেশি সময় লাগবে।
গণমাধ্যমের সুবাদে সাম্প্রতিক সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের সম্পর্কে প্রায় সব ভোটারই জেনেছেন, তাই কাকে তাঁরা ভোট দেবেন, তা-ও আগে থেকেই নির্ধারণ করেছেন বলে ধরে নেওয়া যায়। কিন্তু কোন ওয়ার্ডে কারা কাউন্সিলর প্রার্থী, বিশেষ করে সংরক্ষিত আসনের প্রার্থীদের সম্পর্কে অনেক ভোটারই জানতেন না। তাই দলীয় প্রতীকের অনুপস্থিতিতে এবং প্রার্থীদের সম্পর্কে না জানার কারণে অনেক ভোটারকেই ব্যালট পেপারে অন্তর্ভুক্ত সবগুলো নাম বিচার-বিবেচনা করে ভোট প্রদান করতে হয়েছে, যার মাধ্যমে অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণ হয়েছে। তাই ভোটারদের বহুবিধ ব্যাকগ্রাউন্ড, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা বিবেচনা করে অনুমান করা যায় যে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনটি ভোট দেওয়ার জন্য গড়ে প্রত্যেক ভোটারের অন্তত পাঁচ মিনিট সময় লেগেছিল।
সর্বনিম্ন তিন মিনিট ধরলে সর্বোচ্চ (৯৯ শতাংশ) ভোট গ্রহণের দাবিদার আগ্রাবাদ তালেবিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছয়টি বুথে আট ঘণ্টায় সর্বাধিক ৯৬০টি ভোট প্রদান করা সম্ভব ছিল। আর গড়ে পাঁচ মিনিট ধরলে মোট ৫৭৬টি ভোট দেওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু ওই কেন্দ্রে ভোট পড়েছিল ২ হাজার ৪৩৩টি। তিন মিনিট সময় ধরলেও এমন বিরাট পরিমাণের ভোট গ্রহণের জন্য আট ঘণ্টার তিন শিফটে ভোট গ্রহণের প্রয়োজন ছিল! তাই এ ধরনের অস্বাভাবিক ভোট প্রদানের হার একমাত্র ভোটকেন্দ্র দখল এবং অবৈধ সিল মারার ক্ষেত্রেই সম্ভব।
এবারের চট্টগ্রামের ভোটের দিকে তাকালে একটি সুস্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ করা যায়, যা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। ভোট প্রদানের হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনজুর আলমের ভোট প্রাপ্তির হার ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ১০ শতাংশ ভোট প্রদানের হার যে কেন্দ্রে, সেখানে মনজুর আলমের প্রাপ্ত বৈধ ভোটের হার ছিল ৫৪.০১ শতাংশ; ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট প্রদানের হার যেসব কেন্দ্রে, সেখানে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৩৯.৮ শতাংশ; এবং ৯০ শতাংশের বেশি ভোট প্রদানের হারের ক্ষেত্রে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ১৫.০১ শতাংশ। অন্যদিকে ১০ শতাংশ ভোট প্রদানের হার যেসব কেন্দ্রে, সেখানে নাছিরের প্রাপ্ত বৈধ ভোটের হার ছিল ৩৬.৪২ শতাংশ; ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট প্রদানের হার যেসব কেন্দ্রে, সেখানে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৫৫.৩২ শতাংশ; এবং ৯০ শতাংশের বেশি ভোট প্রদানের হারের ক্ষেত্রে তাঁর ভোটের হার ছিল ৭৭.০৭ শতাংশ।
অন্যভাবে বলতে গেলে, ভোট প্রদানের হার যেসব কেন্দ্রে অপেক্ষাকৃত কম, সেসব কেন্দ্রে মনজুর আলম জিতেছেন এবং ভোট প্রদানের হার যেখানে অপেক্ষাকৃত বেশি, সেসব কেন্দ্রে নাছির জিতেছেন। এ প্রবণতার ফলে ভোট প্রদানের হার ৪৩ শতাংশ পার হওয়ার পর নাছিরের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ মনজুর আলমের প্রাপ্ত ভোটের পরিমাণ ছাড়িয়ে যায়। আরও খোলাসা করে বলতে গেলে, ভোট প্রদানের হার ৪৩ শতাংশের নিচের সব কেন্দ্রে মনজুর আলম মোট ৯৯ হাজার ৭৭২ ভোট পান এবং নাছির মোট ৯৯ হাজার ৩৮৫ ভোট পান, আর এসব কেন্দ্রের প্রায় সবগুলোতেই মনজুর আলম জিতেছেন এবং এর বেশি ভোট প্রদানের হার সম্পন্ন সব কেন্দ্রেই নাছির জিতেছেন।
তাই এটি সুস্পষ্ট যে নাছিরের জয়ের মূল উৎস হলো সেসব কেন্দ্র যেখানে ভোট প্রদানের হার ছিল উচ্চ এবং অস্বাভাবিক। আর আগের আলোচনা থেকে আমরা জানি যে যেসব কেন্দ্রে উচ্চ ও অস্বাভাবিক হারে ভোট পড়েছে, সেসব কেন্দ্রেই সিল মারার ঘটনা ঘটেছে। কোনো কোনো কেন্দ্রে জোর করে সিল মারার ঘটনা এমন বিশৃঙ্খল ছিল যে সেখানে বাতিল ভোটের পরিমাণ অস্বাভাবিক পরিমাণের ছিল। উদাহরণস্বরূপ, দক্ষিণ কট্রলি প্রাণহরি মডেল সরকারি প্রাইমারি সেন্টারে চার হাজার ৩২২ প্রদত্ত ভোটের মধ্যে বৈধ ভোটের সংখ্যা ছিল বাতিল ভোটের চেয়েও কম এবং যথাক্রমে ১ হাজার ৮৬২ এবং ২ হাজার ৪৬০। এ যেন ভোট নিয়ে এক ভুতুড়ে কাণ্ড!
আরও স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, এবারের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সরকারি দল-সমর্থিত নাছিরের জয়ের পেছনে ভোটকেন্দ্র দখল করে সিল মারার মতো কারচুপি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। গণমাধ্যমে এ ব্যাপারে ব্যাপক অভিযোগও প্রকাশিত হয়েছে। আর এই অভিযোগে মনজুর আলম দুপুরের মধ্যেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন।
পক্ষান্তরে, ২০১০ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে, যে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে বলে মনে করা হয়, এমন প্রবণতা লক্ষ করা যায় না। সে নির্বাচনে যে কেন্দ্রে ১০ শতাংশের কম ভোট পড়েছে, সেখানে মনজুর আলমের প্রাপ্ত বৈধ ভোটের হার ছিল ৬০.২৬ শতাংশ; ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট প্রদানের হার যেসব কেন্দ্রে, সেখানে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৫৪.১৬ শতাংশ; এবং ৮০ শতাংশের বেশি ভোট প্রদানের হার সম্পন্ন কেন্দ্রে তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল ৬১.৭৯ শতাংশ। অন্যদিকে পরাজিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীর প্রাপ্ত ভোটের হার ছিল সর্বনিম্ন ৩৪.৪৪ শতাংশ এবং সর্বোচ্চ ৪৯.৪৮ শতাংশ। তাই ২০১০ সালের চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ভোট প্রদানের হারের ওপর কোনো প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ভর ছিল না। অর্থাৎ সেই নির্বাচনে জোর করে ব্যালটে সিল মারার মতো কারচুপি ঘটেনি, সে ধরনের কোনো অভিযোগও ওঠেনি এবং যে নির্বাচনের ফলাফল পরাজিত প্রার্থী মহিউদ্দিন চৌধুরীও মেনে নিয়েছিলেন।
পরিশেষে, গত ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠিত তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। এ ব্যাপারে প্রার্থীদের পক্ষ থেকে বহু মৌখিক ও লিখিত অভিযোগ নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কমিশন এগুলোর কোনোটি আমলে না নিয়েই তড়িঘড়ি করে ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করে ফেলে। শুধু তা-ই নয়, কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, রিটার্নিং কর্মকর্তা ফলাফল ঘোষণার পর নির্বাচনী বিরোধ মীমাংসার দায়িত্ব নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালের, কমিশনের এ ব্যাপারে আর কিছুই করার থাকে না। এ দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, কারণ নূর হোসেন বনাম নজরুল ইসলাম মামলায় [৫বিএলসি(এডি)২০০০] বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ রায় দেন যে নির্বাচনের সময়ে কারচুপির খবর প্রকাশিত হলে কিংবা এ ব্যাপারে অভিযোগ করা হলে, তদন্ত সাপেক্ষে কমিশনের নির্বাচন বাতিলেরও ক্ষমতা রয়েছে।
বদিউল আলম মজুমদার: সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)।

লুক ইস্টর দিন শেষ, এখন সময় অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির

এশিয়ায় ছয় দিনের রাষ্ট্রীয় সফরের শেষ ধাপে সোমবার দু’দিনের সফরে দ. কোরিয়ায় পৌঁছেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং বিনিয়োগ বাড়ানো তার এ সফরের মূল লক্ষ্য। বাণিজ্যিক ও কৌশলগত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ৭টি চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে।
দেশটির প্রেসিডেন্ট পার্ক গিউন-হাইয়ের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অবস্থা নিয়ে কথা বলেন মোদি। বৈঠকে কূটনীতি থেকে অর্থনীতি এবং কোরীয় উপদ্বীপের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উভয়ে আলোচনা করেন। বৈঠক শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে মোদি বলেন, ‘লুক ইস্ট’ নয়, এখন সময় ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’র। প্রসঙ্গত ভারতের লুক ইস্ট পলিসি হচ্ছে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে নয়াদিল্লির অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বৈদেশিক সম্পর্ক বিস্তারের একটি কার্যকরী পরিকল্পনা নীতি। এ নীতির অন্যতম লক্ষ্য ভারতকে একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করা এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে চীনের কৌশলগত প্রভাব খর্ব করা। ভারত এবং চীন নিজেদের মধ্যে আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতায় এ সম্পর্ক গড়ে তুললেও এর সঙ্গে জাপানের সংযুক্তি ধারণাটিকে কিছুটা হলেও পূর্ণতা দিয়েছে। তার সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়েছে নেপাল, ভুটান, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশ। অন্যদিকে, ভবিষ্যৎ অর্থনীতির কেন্দ্রভূমি এশিয়া হওয়ার যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নীতি হচ্ছে ‘পিভট এশিয়া’। দক্ষিণ চীন সাগর, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অনাবিষ্কৃত বিপুল সম্পদকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী দেশগুলোর এসব নীতি আবর্তিত হচ্ছে। ভারতের কংগ্রেস সরকার প্রণীত লুক ইস্ট পলিসি মোদির কাছে পানসে ঠেকে। তাই তিনি আরও প্রো-অ্যাক্টিভ পলিসি নেন, যার নাম ‘অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি’। এ নীতি গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই ভারতের উদ্দেশে আমেরিকা থেকে বলা হয়, আমরা খুব ভালোভাবেই লুক ইস্ট নীতি সম্পর্কে অবহিত ছিলাম, কিন্তু আমরা অ্যাক্ট ইস্ট নীতির এ নতুন পরিবর্তনকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানাই’। লুক্ট ইস্ট নীতি থেকে অ্যাক্ট ইস্ট নীতির মধ্যে মূল পার্থক্য হচ্ছে, এখন ভারত আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ভূমিকা রাখতে চায় এবং জাপান, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া আর আসিয়ানের সঙ্গে ভারতের বাস্তব সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি প্রধান ট্রেডিং নেশন হিসেবে দ্রুততার সঙ্গে নিজের উত্থান চায়।
আর তারই অংশ হিসেবে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি ও নিবিড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপনের লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশ সফর করছেন মোদি। চীন মঙ্গোলিয়া সফরের পর এবার দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে কৌশলগত সম্পর্ক বাড়ানোর ও ভারতে সিউলের বিনিয়োগ টানার চেষ্টা করছেন। দুই দেশের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বৈত কর পরিহার সংক্রান্ত চুক্তি, বিভিন্ন দ্রব্য আমদানি-রফতানির ব্যাপারে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতাবিষয়ক চুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, বিদ্যুৎ ইত্যাদি বিষয়। ভারতের অবকাঠামো খাতে ১০০০ কোটি ডলার বিনিযোগ করতে যাচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া। উল্লেখ্য, ভারতে প্রায় ৩০০ কোরিয়ান সংস্থা রয়েছে। এদেশে তারা প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে। সেদেশের প্রায় ৪০ হাজার কর্মী ভারতে কর্মরত। ভারতও প্রায় ২ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে দক্ষিণ কোরিয়ায়। বহু ভারতীয় আইটি ও ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি কোরিয়ায় ব্যবসা করতে উৎসুক। এদিকে, মোদির হুন্দাই, স্যামসাং ও এলজি’র মতো বৃহত্তম কোম্পানির কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে। ভারতে এ তিন উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের ফার্ম রয়েছে। মোদি সফরকালে তার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিনিয়োগ আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

চীনের ২২শ কোটি ডলার ঘরে তুললেন মোদি

চীনের ২২০০ কোটি ডলার ঘরে তুললেন মোদি। ভারত ও চীনের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো শনিবার প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি ডলারের ২১টি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চীনের সাংহাইয়ে সফররত ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতিতে এসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ২শ’ চীনা ও ভারতীয় কোম্পানির নির্বাহীদের উদ্দেশে মোদি বলেন, ‘পারস্পরিক স্বার্থ সম্পর্কিত বিষয়ে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ভারত এখন ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। চীনে তিনদিনের সফরের শেষ দিন কাটাচ্ছেন মোদি। ভারতের বৃহত্তম ব্যবসায়ী অংশীদার চীন। দুই দেশের মধ্যে ২০১৪ সালে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৭ হাজার ১শ’ কোটি ডলার। তবে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ২০০১-০২ সালের ১শ’ কোটি ডলার থেকে বেড়ে গত বছর ৩ হাজার ৮শ’ কোটি ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, ভারতের দূতাবাসের বাণিজ্যবিষয়ক উপদেষ্টা নামগিয়া খানপা চুক্তি সইয়ের কথা নিশ্চিত করেছেন। ভারতের কর্মকর্তারা বলেন, এসব চুক্তি অনুসারে ভারতের বিভিন্ন ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে চীনের ব্যাংকগুলো আর্থিক সহায়তা দেবে। টেলিকম, ইস্পাত, সৌরশক্তি ও চলচ্চিত্র খাতেও দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে এক ব্যবসায়ী ফোরামে মোদি বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এই শতাব্দী এশিয়ার।’ তিনি গৃহায়ন, নবায়ণযোগ্য জ্বালানি, দ্রুতগতির রেল, মেট্রো, বন্দর, বিমানবন্দর খাতসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগে চীনকে আহ্বান জানান। এসব খাতের উন্নয়নে চীনের সহায়তা দরকার বলে তিনি মনে করেন। এএফপি। জীবনবৃত্তান্ত দেখে কেউ আমাকে প্রধানমন্ত্রী বানায়নি’ : ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন,
জীবনবৃত্তান্ত দেখে তাকে কেউ প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করেনি। তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীনে অবস্থানরত নরেন্দ্র মোদি শনিবার (১৬ মে) সাংহাইয়ে ভারতীয় জনগোষ্ঠীর এক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেয়ার সময় এ কথা বলেন। সাংহাইয়ে আইসিবিএস এক্সপো সেন্টারে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সেখানে অবস্থানরত অন্তত পাঁচ হাজার ভারতীয় উপস্থিত হয় বলে জানা গেছে। বক্তৃতার সময় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত করার জন্য ভারতীয়দের কুর্ণিশ করার কথা উল্লেখ করে মোদি বলেন, সময় খুব দ্রুত বদলে যেতে শুরু করেছে। চীনে ভারতীয়রা সুখে-শান্তিতে বসবাস করবে, তা হয়তো আগে কখনো ভাবা যায়নি। মোদি বলেন, আজ থেকে এক বছর আগেও আপনারা সবাই ভারতের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল জানতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। সে সময় সবাই বলত, ভারতের বাইরে মোদিকে ক’জন জানে? শুধুমাত্র গুজরাটের মানুষরাই তাকে চেনে। তিনি বলেন, এই সমালোচনা সঠিক ছিল। তবে সে দ্বিধা এখন ভুল প্রমাণিত হয়েছে। আপনাদের শুভকামনাই আমাকে এখানে আনতে পেরেছে এবং শুধুমাত্র আপনাদের আশীর্বাদ থাকলেই আমি এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাব না, যা আমাদের দেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

ব্রাজিলের গম পুলিশকে দুর্বল করছে!

খাদ্য অধিদপ্তরের সরবরাহ করা গমের আটা অত্যন্ত নিম্নমানের। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অক্লান্ত পরিশ্রম করার পর এসব নিম্নমানের গম ও আটা খাচ্ছে। এতে তাঁদের মনোবল দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত রোববার দেওয়া সর্বশেষ চিঠিতে এ কথা বলা হয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে একই অভিযোগে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। পুলিশের চিঠি পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়টি খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ২১ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, ব্রাজিল থেকে আনা গম সরকারের আমদানি শর্তের প্রান্তসীমায় ছিল। আর নিম্নমান হওয়ায় খাদ্য বিভাগ থেকে মে মাসে গমের একটি জাহাজ ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
তবে খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম গত রোববার প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপকালে পুলিশের অভিযোগ নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশের পক্ষ থেকে এমন কোনো চিঠি আমরা পাইনি।’
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গমের মান নিয়ে পুলিশের আপত্তির বিষয়টি তুলে খাদ্য মন্ত্রণালয়কে গত দুই মাসে একাধিক চিঠি দিয়েছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা গমের ব্যাপারে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের আপত্তির বিষয়টি জানতে পেরেছি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। আশা করি, তারা বিষয়টিকে আমলে নেবে।’
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য অধিদপ্তর পুলিশ বাহিনীকে ব্রাজিল থেকে আনা গম সরবরাহ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সরকারি পরীক্ষাতেই নিম্নমান হিসেবে চিহ্নিত ওই দেড় লাখ টন গমের মধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার টন গ্রামাঞ্চলে বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচি ও প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পুলিশ বাহিনীর ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, উন্নত চাল-গম বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে পুলিশ বাহিনীর মনোবল সুদৃঢ় হবে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে সহায়ক হবে। গুদাম থেকে উন্নত মানের চাল-গম সরবরাহের জন্য খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আদেশ থাকলেও তা সরবরাহ করা হচ্ছে না।
এর আগে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো আরেক চিঠিতে বলা হয়, খাদ্য অধিদপ্তর থেকে দেওয়া চাল ও গম মোটা, দুর্গন্ধযুক্ত, নোংরা ও কাচযুক্ত। পুলিশের পাশাপাশি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য, জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা অধিদপ্তর এবং বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিশেষ নিরাপত্তা ফোর্সের বেসামরিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে কর্মরত তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীসহ প্রায় ৩৩ হাজার কর্মকর্তা ও কর্মচারী ঢাকা মহানগর পুলিশের রেশন স্টোর থেকে এসব গম উত্তোলন করে থাকেন।
খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ফয়েজ আহমদ বলেন, ব্রাজিলের গমের মান নিয়ে পুলিশ প্রশ্ন তোলায় তাদের আর ওই গম দেওয়া হচ্ছে না। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প এবং কর্মসূচিতে বণ্টনের জন্য এগুলো দেওয়া হয়েছে।
তাহলে কি পুলিশ বাহিনী নিম্নমান বলে প্রত্যাখ্যান করায় এগুলো গরিব মানুষকে দেওয়া হচ্ছে? জবাবে ফয়েজ আহমদ বলেন, এই গম নিম্নমান বলা হলেও অখাদ্য বা পচা কেউ বলেনি। সরকারি কর্মসূচি থেকে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ আসেনি।
এর আগে গত ১৩ মে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পুলিশের জন্য উন্নত মানের গম সরবরাহ করতে একটি চিঠি দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নিরোদ চন্দ্র মণ্ডল স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, পুলিশের জেলা/ইউনিটের রেশনসামগ্রী হিসেবে জেলা খাদ্যগুদাম থেকে যে গম সংগ্রহ করা হয়, তা উন্নত নয়। পুলিশ বাহিনী থেকে পাঠানো নিম্নমানের গমের কিছু নমুনাও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়।
পুলিশের অভিযোগের পর ২১ জুন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রাজিল থেকে আনা গমের ব্যাপারে তাঁদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে চিঠি দেন। এতে তিনি বলেন, ‘আমি খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে চারটি প্যাকেজের আওতায় ব্রাজিল থেকে ২ লাখ ৫ হাজার ১২৮ মেট্রিক টন গম দুটি সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া হয়। এই গমের গুণগত মান সরকারি বিনির্দেশের গ্রহণযোগ্যতার প্রান্তসীমায় অবস্থিত ছিল।’
মহাপরিচালক ওই চিঠিতে লেখেন, ‘মহাপরিচালক হিসেবে আমি যোগদানের পর একটি জাহাজের গম গ্রহণের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু এগুলোর আকার, প্রকার ও বর্ণ চাক্ষুষ দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়নি। তাই তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। গমগুলোর আমদানিকারক গ্লেনকোর বিভির স্থানীয় প্রতিনিধি ওই গম ফেরত নেয়।

সরকারের অবস্থান কোন পক্ষে!

বাংলাদেশ পরিস্থিতি খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দিচ্ছে। বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন ব্লগার অভিজিত রায় হত্যাকাণ্ডে তার স্ত্রীর কাছে প্রকাশ্যে কোন নিন্দা জানান নি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি হয়তো ব্যক্তিগতভাবে নিন্দা জানিয়ে থাকতে পারেন। অন্যদিকে তার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় স্বীকার করেছেন যে, তার দল বা সরকারের জন্য এর পক্ষে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। কারণ, আওয়ামী লীগ নাস্তিক সংগঠনের তকমা গায়ে লাগাতে পারে না। তাই এর মাধ্যমে সজীব ওয়াজেদ জয় তার জাতিকে হতাশ করেছেন। তাই কেউ নিরাপদেই বলতে পারেন যে, দেশের পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণ কমই (স্যাকি)। এর ফলে আরেকটি প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। তাহলো- কোন যুক্তিতে যুদ্ধাপরাধের বিচার দেশে ধর্মীয় মৌলবাদের মূলোৎপাটনে সহায়ক হবে? এসব কথা ভারতের দ্য ইকোনমিক টাইমসে লিখেছেন সাংবাদিক ও বিশ্লেষক অমিতাভ মুখার্জী। ‘ক্যান শেখ হাসিনা অ্যাক্ট এগেইনস্ট বাংলাদেশী ফান্ডামেন্টালিস্ট?’ শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদনে তিনি এসব কথা লিখেছেন। লেখাটি গতকাল অনলাইনে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি লিখেছেন, ভারতের নিরাপত্তার সঙ্গে সংঘাতময় এমন ইঙ্গিত বেরিয়ে আসছে বাংলাদেশ থেকে। বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের ফাঁসির রায় নিশ্চিত করেছেন। এতে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়কার অপরাধীদের বিচারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফলতায় আরও একটি পালক যুক্ত হলো। কিন্তু পর্যায়ক্রমে যেসব ব্লগারকে হত্যা করা হয়েছে তাতে আওয়ামী লীগ পরিচয় সঙ্কটে পড়েছে। এতে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন প্রশাসনে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে। অমিতাভ মুখার্জী লিখেছেনÑ আমাদেরকে আরও গুরুত্বপূর্ণ একেটি বিষয় মনে রাখতে হবে। তাহলো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের আগে ও পরে ভারতীয় মিডিয়ায় ভুলভাবে বলা হয়েছে যে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমান্ত চুক্তিই মূল বিষয়। এক্ষেত্রে আলোচনার মূলে যেসব ইস্যু ছিল তার মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ইস্যু, বাংলাদেশে ক্রমে বেড়ে ওঠা কট্টরপন্থি সন্ত্রাসী সংগঠন এবং তা তাদের কর্মকাণ্ড ভারতে পাঠানো এবং অবশ্যই নদীর পানি বন্টনের বিষয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এসব বিষয় তুলে ধরেছেন কিনা তা জানা যায় নি। ওই প্রতিবেদনে অমিতাভ মুখার্জী আরও লিখেছেন, এটা সত্য যে, জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ দুই নেতা আবদুল কাদের মোল্লা ও মোহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। দলের আরও মহারথীদের বিরুদ্ধে একই রকম রায় দেয়া হয়েছে। কিন্তু এতে দেশের কট্টরপন্থিদের ওপর খুব কমই প্রভাব ফেলেছে। তাদের সংখ্যা প্রায় ৫৫০ লাখ। ভারত ও বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো ধর্মীয় জঙ্গিবাদ ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। গত এপ্রিলে আওয়ামী লীগ সমর্থিত আওয়ামী ওলামা লীগ ধর্মনিরপেক্ষ ও উদারপন্থি ব্লগারদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে। ইসলামের ক্ষতি করে এমন অভিযোগে তারা জাতীয় শিক্ষা নীতি বাতিল করতে বলে। ইসলামী সুন্নাহর বিরুদ্ধে যায় বলে তারা বাল্য বিয়ের নীতি থেকে সরে যেতে আহ্বান জানায় সরকারের প্রতি। তারপর থেকে আওয়ামী লীগের নেতারা এই সংগঠনের সঙ্গে যোগসূত্র না থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু তাতে কাজ হচ্ছে না। কারণ, ওলামা লীগের দুটি অংশই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের ঠিকানা ব্যবহার করছে এবং আওয়ামী লীগের কর্মসূচিগুলোতে যোগ দিচ্ছে। গত রমজানে ওলামা লীগকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে ইফতারি করানো হয়েছিল। এক্ষেত্রে আরও একটি মজার বিষয় আছে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের বড় মাপের নেতা ও শেখ হাসিনা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সরাসরি সমর্থনে প্রতিষ্ঠিত হয় এই ওলামা লীগ। সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিবৃতি একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে। তাহলো তার দল যুদ্ধাপরাধী ও অন্যান্য মৌলবাদী সংগঠন থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে। বাংলাদেশ সরকার শুধু ব্লগারদের রক্ষায়ই ব্যর্থ হয় নি, পাশাপাশি তাদের কণ্ঠরোধের জন্য দমনমুলক বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিছুটা পিছনে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ব্লগে তার দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের কারণে আসিফ মহিউদ্দিনকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। ব্লগিং প্লাটফরমকে সরকার চাপ দিচ্ছে যাতে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত হয় নাএমন ব্লক যেন তারা বন্ধ করে দেয়। মৌলবাদীরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে স্থান সৃষ্টি করে নিয়েছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। সম্ভবত বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছেন শেখ হাসিনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রফেসর আবুল বারাকাতের মতে, রাষ্ট্রের মধ্যে রাষ্ট্র, অর্থনীতির ভিতরে অর্থনীতি সৃষ্টি করেছে জামায়াতে ইসলামী। তারা যেসব ব্যবসায় পরিচালনা করে তা থেকে বছরে ২৭ কোটি ৮০ লাখ ডলার মুনাফা হয়। এর শতকরা ১০ ভাগ যায় হামায়াতে ইসলামীর কাছে এবং বাকিা ধর্মীয় অন্যান্য সংগঠনের কাছে। আবুল বারাকাতের মতে, দেশের জাতীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যখন শতকরা ৬ ভাগ তখন জামায়াত নিয়ন্ত্রিত ব্যবসায় প্রবৃদ্ধির হার শতকরা ৯ ভাগ। আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য হলো, জামায়াত পরিচালিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যে পরিমাণ অর্থ রয়েছে তা জাতীয় বাজেটের শতকরা ৮ দশমিক ৬২ ভাগ। ২০০৫ সালে জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের প্রয়াত নেতা শায়ক আবদুর রহমান প্রকাশ করেছেন যে, বাংলাদেশে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হতে ৪০ জন প্রার্থীকে তিনি সহায়তা করেছেন। জামায়াতের হাতে গোনা কয়েকজন এমপি আছেন। তাহলে জেএমবির সমর্থনে নির্বাচিত অন্যরা কারা? হাসিনাকে অবশ্যই তা বের করতে হবে।

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি- কিছু ভুলভ্রান্তির অভিযোগ, ভর্তির সুযোগ পাবে সবাই

একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিচ্ছু একজন শিক্ষার্থী আবেদনে বাণিজ্য শাখার নাম দিয়েছিল। কিন্তু বোর্ড থেকে প্রকাশিত মনোনীত তালিকায় এসেছে বিজ্ঞান শাখা। আবার আবেদন না করার পরও রাঙামাটির একটি কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়েছে একজন শিক্ষার্থী।
চার দফা সময় বাড়িয়ে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য মনোনীত শিক্ষার্থীদের তালিকা প্রকাশ করা হলেও এখনো এমন কিছু ভুলভ্রান্তি রয়েছে। এসব বিষয়ে গতকাল সোমবার বেশ কিছু শিক্ষার্থী ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে অভিযোগ করেছে। এ ছাড়া কিছু কারিগরি সমস্যার কারণে মনোনীতদের তালিকা পেতে দেরি হওয়া কিছু কলেজ গতকাল ভর্তির কার্যক্রম শুরু করতে পারেনি।
এ বিষয়ে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, এ রকম কিছু অভিযোগ আসছে। এগুলো সংশোধন করা হবে। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কিছু নেই। সবাই ভর্তির সুযোগ পাবে।
গত রোববার মধ্যরাতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য মনোনীত শিক্ষার্থীদের তালিকা করা হয়। এর ভিত্তিতে গতকাল থেকে ভর্তি শুরু হয়েছে। এবারই প্রথম শিক্ষার্থীদের পছন্দক্রম অনুযায়ী ভর্তিযোগ্য কলেজ নির্ধারণ করে দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড।
রাজধানীর আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষার্থীর অভিভাবক জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর সন্তানের ফল খুবই ভালো। সে আদমজীসহ একাধিক কলেজ পছন্দক্রম দিয়েও কোনোটিতেই ভর্তির জন্য মনোনীত হয়নি। এ জন্য এখন খুব দুশ্চিন্তায় আছেন।
এ রকম ৬২ হাজার ৮৫০ শিক্ষার্থী প্রথম দফায় কোনো কলেজে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়নি। ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, এদের অধিকাংশের এসএসসি ফল ভালো। কিন্তু পছন্দক্রমে সবাই শুধু ভালো কলেজগুলোর নাম দিয়েছে। এসএসসির ফল অনুযায়ী পছন্দক্রমের কলেজের আসনের সংখ্যা পূরণ হওয়ায় প্রথম মেধা তালিকায় তারা স্থান পায়নি।
শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই। এখন দ্বিতীয় মেধা তালিকা প্রকাশ করা হবে। এ ছাড়া ‘রিলিজ স্লিপের’ (ছাড়পত্রের মাধ্যমে অন্য কলেজে ভর্তির সুযোগ) মাধ্যমেও শূন্য আসন থাকা কলেজে ভর্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ভর্তির পর ‘মাইগ্রেশনের’ সুযোগ রাখা হয়েছে।
বোর্ড সূত্র জানায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর খালি আসনের ভিত্তিতে দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশ করা হবে ৬ জুলাই। প্রথম দফায় মনোনীত শিক্ষার্থীরা প্রথমে কলেজে ভর্তি হবে। এরপর তারা চাইলে পছন্দক্রম মেনে অন্য কলেজে ভর্তি (মাইগ্রেশন) হতে পারবে। এমন শিক্ষার্থীদের ৪ জুলাইয়ের মধ্যে অনলাইনে নিজ নিজ আবেদন আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিবর্তনের সম্মতি দিতে হবে।
প্রথম ও দ্বিতীয় মেধাতালিকার যেসব শিক্ষার্থী মনোনীত হয়েও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্ধারিত তারিখের মধ্যে ভর্তি হয়নি বা কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য মনোনীত হয়নি, তাদের রিলিজ স্লিপধারী হিসেবে গণ্য করা হবে। এসব শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খালি আসনের বিপরীতে অনলাইনে সর্বোচ্চ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের পছন্দ দিয়ে ৯ ও ১০ জুলাই আবেদন করতে হবে। রিলিজ স্লিপধারীদের আবেদনের ফল ১১ জুলাই প্রকাশ করা হবে।
আর যেসব শিক্ষার্থী এখনো কোনো আবেদন করেনি, তাদেরও শূন্য আসন থাকা কলেজগুলোতে ভর্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। তাদের ১৩ জুলাই থেকে ২১ জুলাই অনলাইনে বা খুদে বার্তায় আবেদন করতে হবে।
এদিকে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ সূত্র জানায়, মেধাতালিকায় মনোনীত হয়েও কিছুসংখ্যক ছাত্রী গতকাল কলেজে ভর্তি হতে গেলে তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কলেজ থেকে তাদের বলে দেওয়া হয় যে তাদের স্কুল শাখার ছাত্রীরা আগে ভর্তি হবে। এরপর বাইরের শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হবে।
এ বিষয়ে অধ্যক্ষ সুফিয়া খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবু বক্কর ছিদ্দিক প্রথম আলোকে বলেন, কলেজ অধ্যক্ষকে ফোন করে মঙ্গলবারের মধ্যে ওই সব ছাত্রীকে ভর্তি করানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতারই সংস্কার প্রয়োজন by শওকত হোসেন

ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ আরনেস্ট ফ্রেডারিক সুমাখার ১৯৭৩ সালে অর্থনীতি নিয়ে বিখ্যাত একটি বই লিখেছিলেন, স্মল ইজ বিউটিফুল: আ স্টাডি অব ইকোনমিকস এজ ইফ পিপল ম্যাটারড। তবে অর্থনীতিতে ‘ছোটই সুন্দর’—এই ধারণা নিয়ে অর্থনীতিবিদেরা যত কথাই বলুন, ইংরেজি সাহিত্যের একসময়ের ছাত্র বলেই হয়তো আমাদের অর্থমন্ত্রী শেক্সপিয়ারকেই বেশি মনে রেখেছেন। হ্যামলেট নাটকে রাজা ক্লডিয়াস সৎপুত্রের বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করতে পলোনিয়াসকে নিয়োগ দিয়েছিলেন। পলোনিয়াস হ্যামলেটের খবর দিতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘ব্রেভিটি ইজ দ্য সউল অব উইট’। কিন্তু আমাদের অর্থমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত বাজেট বক্তৃতায় মোটেই আগ্রহী নন।
৪ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে বাজেট উপস্থাপন করলেন, তার মূল বক্তৃতা ৯০ পৃষ্ঠার। তবে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা নয়; ২০১১-১২ অর্থবছরের মূল বাজেট বক্তৃতা ছিল ১৪৮ পৃষ্ঠার, ২০১২-১৩ অর্থবছরেরটি ১২৩ পৃষ্ঠার এবং ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বক্তৃতা ছিল ১১৯ পৃষ্ঠার।
ভারতের বর্তমান রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি একসময় অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনি প্রথম বাজেট দিয়েছিলেন ১৯৮২ সালে। ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিটের সেই বাজেট বক্তৃতা শুনে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, ‘দ্য শর্টেস্ট ফিন্যান্স মিনিস্টার হ্যাজ ডেলিভারড দ্য লংগেস্ট বাজেট স্পিচ।’ একটু বড় বাজেট বক্তৃতা হলে আজকাল অনেকেই এ কথাটি ব্যবহার করেন। অর্থমন্ত্রীদের এসব দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতা শুনেই হয়তো অক্সফোর্ডের অধ্যাপক রবার্ট সার্ভিস বলেছিলেন, আপনি তখনই দীর্ঘ বক্তৃতা দিতে পারবেন, যখন শ্রোতাদের পালিয়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। সংসদ অধিবেশন থেকে সরকারি দলের কারোরই পালানোর সুযোগ আসলেই নেই।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারতের বর্তমান অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির দেওয়া বাজেট বক্তৃতাটি ছিল দুই ঘণ্টা পাঁচ মিনিটের। আর বক্তৃতাটি ছিল ৪৪ পৃষ্ঠার। দীর্ঘ বক্তৃতার এর আগের রেকর্ডটি ছিল প্রণব মুখার্জির, তাঁর শেষ বাজেট ২০১২-১৩ অর্থবছরের, আর পৃষ্ঠাসংখ্যা ছিল ৩৬। বলা হয়ে থাকে, ইতিহাসের দীর্ঘতম বাজেট বক্তৃতাটি দিয়েছিলেন সাবেক ব্রিটিশ অর্থমন্ত্রী উইলিয়াম গোল্ডস্টোন, ১৮৫৩ সালের ১৮ এপ্রিল। ওই বক্তৃতাটি ছিল চার ঘণ্টা ৪৫ মিনিটব্যাপী। এর প্রায় পৌনে ২০০ বছর পর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতাদাতা হিসেবে ইতিহাসের পাতায় আমাদের অর্থমন্ত্রী স্থান পাবেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়।
সংবাদপত্রকর্মী হিসেবে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা পুরোটাই শুনতে হয়। বলতে দ্বিধা নেই, পুরো বক্তৃতা শোনাটা কষ্টকর। আকর্ষণীয় হলে দীর্ঘ বক্তৃতার শ্রোতা পাওয়া যায়। কিন্তু বাজেট বক্তৃতা আকর্ষণীয় করা সহজ নয়। এখন গুগল সব জানে। গুগলের সাহায্য নিয়ে বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রীদের বাজেট বক্তৃতা পাওয়া কঠিন নয়। বেশ কয়েকটি বাজেট বক্তৃতা পড়ে মনে হয়েছে, আমাদেরটাই কম আকর্ষণীয়। শুনতে খারাপ লাগলেও বলতে হয়, আমাদের বাজেট বক্তৃতার ধরনটি পাকিস্তানের মতোই।
এবারের বাজেট বক্তৃতায় অধ্যায় ১০টি, আর অনুচ্ছেদ আছে ২৩৩টি। এর মধ্যে ৩৩ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আছে ছয়টি অধ্যায়। এখানে মূলত অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বাজেট সংশোধনী ও নতুন বাজেট এবং সরকারের উন্নয়ন কৌশলের বর্ণনা রয়েছে।
এগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়, পড়াটাও কষ্টকর নয়। অষ্টম অধ্যায়টি মূলত মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সাফল্যের ফিরিস্তি। এ জন্য বরাদ্দ ১৪ পাতা। এরপরেই আছে সংস্কার ও সুশাসন নামে সাত পাতার একটি অধ্যায়। এ দুই অধ্যায় থেকে নতুন তথ্য পাওয়া গেল সামান্য কয়েকটি। এর মধ্যে ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা পাঁচ হাজার থেকে বাড়িয়ে দশ হাজার করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়া গেল না। অরুণ জেটলি যেমনটি করেছেন, আমাদের অর্থমন্ত্রী তা করলেই পারতেন। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক এসব ফিরিস্তি অরুণ জেটলি পরিশিষ্টে রেখে দিয়েছেন। কারও আগ্রহ থাকলে সেখান থেকেই পড়ে নিতে পারবেন।
অথচ বাজেট বক্তৃতা আগে এত দীর্ঘ ছিল না। আগে বক্তৃতা দেওয়া হতো দুই পর্বে। রাজস্ব কার্যক্রম ছিল দ্বিতীয় পর্বের বক্তৃতার অংশ। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ব্যতিক্রমী সময়টা বাদ দিলে বাজেট বক্তৃতা এক পর্বে শেষ করার কাজটি শুরু করেছেন বর্তমান অর্থমন্ত্রী। বক্তৃতায় আরও একটি বড় পরিবর্তন ঘটেছে। অতীতে অর্থমন্ত্রীরা বাজেটে কবিতার অংশ ব্যবহার করতেন। থাকত প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ বা সাবেক কোনো রাষ্ট্রনায়কের কথা। এ ধারার প্রথম পরিবর্তন আনেন এম সাইফুর রহমান। ২০০১ সালে দ্বিতীয় দফায় বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে প্রশংসার অংশবিশেষ বাজেটে স্থান পেতে শুরু করল। কবিতাকে ছুটি দিয়ে দাতাদের সার্টিফিকেটের কেন প্রয়োজন হয়েছিল, সেটি একটি প্রশ্ন।
বাজেটের আগের দিন প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, তাঁর বাজেট দীর্ঘ, কারণ এখানে সবকিছু বিস্তারিত বলা থাকে। এবার দেখা যাক বিস্তারিত বাজেটের নমুনা। অর্থমন্ত্রী ৬২ পৃষ্ঠায় বলেছেন, ১ জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আর গৃহীত পদক্ষেপগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। খবর নিয়ে যা জানা গেল, বেতন অংশ এবার কার্যকর হচ্ছে আর ভাতার অংশ কার্যকর হবে পরের অর্থবছর থেকে। এ কথাটা পরিষ্কার বললেই হতো।
১৯৭৫ থেকে শুরু করে ২০০৮ পর্যন্ত বাজেট বক্তৃতাগুলোতে প্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা নিয়ে বিস্তারিত বক্তব্য থাকত। কী কী পদ্ধতিতে কালোটাকা সাদা হবে, তার বিস্তারিত যেমন বলা হতো, তেমনি আগের দেওয়া সুযোগ কতজন নিয়েছেন এবং এই উদ্যোগ সফল হলো কি না, তারও বিবরণ থাকত। এখন হয় উল্টো। যেমন: ২০১০-১১ অর্থবছরে বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ না করেই অর্থমন্ত্রী কালোটাকা সাদা করার বিধানটি আয়কর আইনে স্থায়ী করে দিয়েছিলেন, যা বাতিল করেছিল সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকার। আর এবার ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কালোটাকার মালিকদের আরও বেশি সুবিধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর কিছুই উল্লেখ করেননি অর্থমন্ত্রী।
সবচেয়ে চমকপ্রদ কাজটি হয়েছে চিনি নিয়ে। বাজেটে অপরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক টনপ্রতি দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে চার হাজার টাকা এবং পরিশোধিত চিনির আমদানি শুল্ক সাড়ে চার হাজার থেকে বাড়িয়ে আট হাজার টাকা করা হয়েছে। অথচ বাজেট বক্তৃতায় এর উল্লেখ নেই।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন করা হলে অর্থমন্ত্রী বললেন, এ রকম কিছু তিনি বক্তৃতায় বলেননি। তাহলে কীভাবে এল? সে কথাটি ফাঁস করেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নজিবুর রহমান। সংবাদ সম্মেলনেই তিনি অর্থমন্ত্রীকে জানান, ‘স্যার, রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুযায়ী আপনার বক্তৃতায় এটা রাখা হয়নি, তবে ছকে রয়ে গেছে।’ এই হচ্ছে আমাদের বাজেট বক্তৃতা। বাজেটে অনেক বেশি কথা বলা হয়, জরুরি অনেক কথাই বলা হয় না। আবার অনেক সময় বেশি কথা বলা হয় বলেই হয়তো আসল কথাটি হারিয়ে যায়।
অনেক দেশেই এখন বাজেটের মৌলিক প্রস্তাবগুলো আগেই প্রকাশ করা হয়। এ নিয়ে আলোচনা হওয়ার পর গ্রহণযোগ্য হলে তবেই তা বাজেটে স্থান পায়। আমাদের পথটা উল্টো। কাজটি শুরু করেছিলেন শাহ এম এস কিবরিয়া। এর পেছেনে রাজনীতি আছে বলেই ধারণা করা যায়। সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। অর্থমন্ত্রী জুনের প্রথম বৃহস্পতিবার বাজেট উপস্থাপন করেন। আর বাজেট পাসের দিন প্রধানমন্ত্রী কিছু প্রস্তাব সংশোধনের জন্য অর্থমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন। আর অর্থমন্ত্রী তা মেনে নেন। এরপরেই পাস হয় বাজেট। এতে সরকার যে সাধারণ মানুষের কথা কতটা ভাবে, সেটি প্রমাণ করা যায়।
এই জনতুিষ্টমূলক কর্মকাণ্ডে সমস্যা হয় অন্যত্র। আজি হতে শতবর্ষ পরে না হলেও ১০ বছর পরও যদি কোনো গবেষক অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে বাজেট বক্তৃতাগুলো পড়েন, তাহলে অনেকগুলো ভুল তথ্য পাবেন। কারণ, বক্তৃতায় লেখা অনেক প্রস্তাবই পরে বদলে গেছে। সে তথ্যটি কিন্তু ওয়েবসাইটে নেই। একটি উদাহরণ দিই। ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বলা আছে—ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা ১ লাখ ৮০ হাজারই থাকবে, কোনো পরিবর্তন হবে না। অথচ ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বক্তৃতায় আছে, ওই করমুক্ত আয়ের সীমা এখন দুই লাখ টাকা। তাহলে সিদ্ধান্তটা বদলে গেল কবে? ২০১২ সালের ২৮ জুন জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আয়সীমা বাড়ানোসহ জনতুষ্টির এই কাজটি করেছিলেন অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে।
আমরা অনেক কিছুরই সংস্কার করতে বলি। এখন সময় এসেছে বাজেট বক্তৃতার সংস্কারের। কাজটি কি অর্থমন্ত্রী করবেন? তাহলে কি বাজেটে নতুন কিছুই নেই? আছে তো। এবারের বাজেট বক্তৃতার বইটির প্রচ্ছদ সবুজ, আগের সবগুলোই ছিল সাদা-কালো।
শওকত হোসেন: সাংবাদিক।
massum99@gmail.com

ক্রান্তিকালের কিছু কথা by এম আবদুল হাফিজ

যে কোনো একটি দেশের টিকে থাকা ও অগ্রগতির জন্য অনেক পূর্বশর্ত থাকে। সেগুলোর মধ্যে আমার দৃষ্টিতে অগ্রাধিকার পায় রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা, গ্রহণযোগ্য আইনশৃঙ্খলা ও অনুভবযোগ্য নৈতিক মান। জানি না স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশে আদৌ কি কোনো সময়ে এসবের সমাহার ঘটেছিল? অবশ্য স্বাধীনতাত্তোর প্রতিটি শাসকচক্রের অনুমানে অন্তত তার আমলে তা ঘটেছিল এবং শাসকচক্রটি যথেচ্ছাচারে লিপ্ত হয়েছিল। ট্রাজেডি যে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব স্বয়ং তার অভেদ্যতায় বিশ্বাস করেছিলেন তার শাসনের এক বিপজ্জনক চোরাবালিতে দাঁড়িয়ে যখনো পর্যন্ত এ দেশকে ঘিরে দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অবসান ঘটেনি। তাকে জীবন দিয়ে তার ভুল না হলেও অসতর্কতার মাশুল পরিশোধ করতে হয়েছিল। অভ্যুত্থান, পাল্টা অভ্যুত্থান, সেনা অসন্তোষ ও রক্তপাত পটভূমিকায় এক মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের দৃশ্যপট দখলের মধ্য দিয়ে নাটকের আপাতত পরিসমাপ্তি ঘটলেও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে একাধিক ডাইমেনশনযুক্ত হওয়া ছাড়াও তার বিস্তৃতি আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। সবাই ভাবতে শুরু করেন যে, বাংলাদেশের তিনিই দাতা ও ভাগ্য বিধাতা। ক্ষমতার লাগাম সৃষ্টিতে ধারণ অমুক বা তমুক ব্যক্তিরা গোষ্ঠীর কায়েমি অধিকার। এমন পরস্পরবিরোধী দাবির সহজ নিষ্পত্তি নেই বলে এ দেশে স্থান করে নেয় শক্তির এক প্রকার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তার সঙ্গে যুক্ত হয় ষড়যন্ত্র, অবিশ্বাস এবং পেশিশক্তির প্রয়োগ।
এমনই এক প্রতিযোগিতা ও বিতর্কের ধারাবাহিকতায় জেনারেল মনজুরও খামোকা একটি ব্যর্থ অভ্যুত্থান করেন। ক্ষমতা, বৈভব এবং পদমর্যাদা যদি উদ্দেশ্য হয় তার মতো যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তা দেশ কালের সীমানা পেরিয়ে যে কোথাও তা হাসিল করতে পারতেন এবং একটি ঈর্ষণীয় উচ্চতায় আরোহন করতে পারতেন। দূর এবং নিকটে থেকে আমি তাকে যেটুকু দেখেছি তা আমার মধ্যে এই বিশ্বাসের উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। একাত্তরের শুরুতে আশা-নিরাশার দোলাচলে শিয়ালকোটে আমরা এক গুচ্ছ বাঙালি কর্মকর্তা। যতই দিন গড়াচ্ছিল বাড়ছিল উত্তেজনা। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারেনি যে, একুশ পিএসএ’র আন্ডার অফিসার, বিদেশের স্টাফ কলেজ থেকে সদ্য ফেরত মনজুর সামরিক পেশাই যার প্যাশন, তিনি তাদের জন্য কোনো ক্ষতির কারণ হতে পারেন। স্ত্রী-পরিবারসহ গ্যারিশনের প্রেসটিজিয়াস চাবিন্দা কলোনিতে তার নিবাস। কেউ অবাক হয়নি মনজুর যখন সামরিকভাবে বিবেচিত শিয়ালকোটে অবস্থিত ১৪ (প্যারা) ব্রিগেডের সম্ভবত সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিএস পদে তাকে নিয়োগ দেয়া হয়। রাজনীতিবিমুখ, ছাপোষা এবং মধ্যবিত্ত মানসিকতার এই কর্মকর্তাকে ঝুঁকিপূর্ণ কোনো দুঃসাহসিক পদক্ষেপের নায়ক ভাবা কঠিন ছিল।
ক্রান্তিকালের কিছু কথাপাকিস্তানের টপ ক্লাশের চক্ষু ছানাবড়া যখন আগস্টের এক ভোরে চারদিক থেকে ম্যাসেজ আসতে থাকল যে বিএস সাহেব কো মিলনেহি রহ্যা হ্যায়। অফিসে পৌঁছেই দেখলাম গোটা কতক চপারের ওড়াউড়ি। ঊর্ধ্বতন এক অফিসারের সঙ্গে এক পর্যায়ে মনজুরের বাংলোয় গেলাম যেখানে পূর্বেও বহুবার গিয়েছি। আমার সঙ্গী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বুঝলেন কিনা জানি না আমি মুহূর্তেই আচ করতে পারলাম যে বিহঙ্গ উড়াল দিয়েছে। পূর্বের রাতে তারই কমান্ডারের বিদেশ গমন উপলক্ষে নৈশভোজ দিয়েছিল। প্রচুর হৈহুল্লোড়ের মধ্যে দেশের তৎকালীন নাজুক অবস্থার কথা কারো মনে আসেনি। পূর্ব রাতের অনুষ্ঠানে ব্যবহƒত কোনো কিছুই গোছানো হয়নি। শুধু সব বাড়ি জুড়ে সবকিছু ছিমছাম পড়ে আছে। গ্যারেজে বিদেশ থেকে আনা গাড়ি, ওয়ারড্রোবে থরে থরে সাজানো শাড়ি অলংকার, যত্রতত্র পড়ে আছে মনজুরের শখের ইলেকট্রনিক সব সামগ্রী। শুধু গৃহের বাসিন্দারাই নেই। দুর্গম পথে সীমান্ত পার হওয়ার পথে মনজুরের সঙ্গী পুরো পরিবার-আর্দালী এবং মাত্র ক’মাসের নবজাতক।
জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পূর্বে ইতোমধ্যেই সেনাপ্রধান ছিলেন। যেহেতু তিনি ফুলটাইম রাজনীতিক হয়েই দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করতে চেয়েছিলেন, তিনি তার সেনাপ্রধানের পদটি তার প্রেসিডেন্সির রক্ষাকবচ হিসেবে রাখতে চাননি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে যেটি একটি প্রবণতা হিসেবে দেখা যায়। সেনাবাহিনীর বেশ কিছু সেনাপ্রধান হওয়ার যোগ্য কর্মকর্তা থাকলেও জেনারেল জিয়ার নজরে পড়েন তার কোনো গুণের জন্য নয়। জিয়া সম্ভবত ভেবেছিলেন যে এরশাদের মতো একজন সেনাপ্রধান থাকলে তার ক্ষমতায় তিনি সম্ভবত ভাগ বসাবেন না। কিন্তু তার অনুমান ভুল ছিল। এরশাদ সাহেব ক্ষমতার লোভ সংবরণ করেনি।
মঞ্জুর অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার কারণ তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়ার গগনচুম্বী জনপ্রিয়তা। তবে সব অভ্যুত্থানই সফল হবে এমন কোনো কথা নেই। মনজুর এরশাদের পথ না আগলালেও মনজুরকে নিয়ে এরশাদের স্বস্তি ছিল না। জিয়া হত্যার তদন্ত কমিশনে আমি একজন জ্যেষ্ঠ সদস্য ছিলাম। সে জন্যই আঁচ করা সম্ভব হয়েছিল যে মনজুরের হত্যাটি কোনো স্বাভাবিক মৃত্যু ছিল না। এখনো যদি মনজুর হত্যার রহস্য উদ্ঘাটিত হয় এ দেশের এক ক্রান্তিকালের ক্ষমতাকে ঘিরে আবর্তিত অনেক বিষয়ই স্পষ্ট হওয়ার সুযোগ আছে। সুযোগ আছে দেশের রাজনীতিকে একটি সুস্থ ধারায় ফিরিয়ে আনার।
লেখক : সাবেক মহাপরিচালক, বিআইআইএসএস ও কলামিস্ট। সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক

‘নাকফুলটা বিক্রি করে আমার কাফনের কাপড় কিনে নিও’ -বৃদ্ধাশ্রমের দেয়ালে এক মায়ের চিঠি by ইকবাল আহমদ সরকার

একসময় তাদের সবই ছিল। নানান পেশার মানুষ। কেউ ছিলেন সরকারি চাকুরে, কেউ ব্যবসায়ী, কেউবা শিক্ষক। পরিবার নিয়ে সুখের জীবন ছিল তাদের। কিন্তু শেষবেলায় এসে জীবন তাদের সঙ্গে হয়তো নিষ্ঠুর রসিকতাই করেছে। সব থেকেও যেন তাদের কিছুই নেই। এখন তাদের ঠাঁই হয়েছে গাজীপুরের বিশিয়া কুড়িবাড়ির বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে তোলা এই পুনর্বাসন কেন্দ্রে এখন রয়েছেন ১৯৩ জন ষাটোর্ধ্ব নারী-পুরুষ। সেসব নিবাসীদের মনে স্বামী বা স্ত্রী, সন্তান, স্বজনদের নিয়ে কতইনা ব্যথা আর আবেগ গড়াগড়ি খাচ্ছে। যদিও অসুস্থদের চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল সার্ভিস, টিভি দেখার জন্য হলরুম, নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা ডাইনিং রুম এবং মসজিদে নামাজ পড়ার ব্যবস্থা রয়েছে। এরপরও তাদের মন শুধুই কাঁদে স্বজনদের জন্য। কেউ প্রকাশ করছেন আর কেউ করছেন না। জীবনের শেষ প্রান্তের অসহায় এসব মানুষের সঙ্গেই নিবাসের দেয়ালে ঝুলছে সুখের সংসারে ঠাঁই না পাওয়া অসহায় এক মমতাময়ী মায়ের বেদনায় ভরা ছেলের প্রতি আবেগের এক খোলা চিঠি।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন- ‘আমার আদর ও ভালোবাসা নিও। অনেক দিন তোমাকে দেখি না, আমার খুব কষ্ট হয়। কান্নায় আমার বুক ভেঙে যায়। আমার জন্য তোমার কী অনুভূতি আমি জানি না। তবে ছোটবেলায় তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতে না। আমি যদি কখনও তোমার চোখের আড়াল হতাম মা মা বলে চিৎকার করতে। মাকে ছাড়া কারও কোলে তুমি যেতে না। সাত বছর বয়সে তুমি আমগাছ থেকে পড়ে হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছিলে। তোমার বাবা হালের বলদ বিক্রি করে তোমার চিকিৎসা করিয়েছেন। তখন তিন দিন, তিন রাত তোমার পাশে না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, গোসল না করে কাটিয়েছিলাম। এগুলো তোমার মনে থাকার কথা নয়। তুমি একমুহূর্ত আমাকে না দেখে থাকতে পারতে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার বিয়ের গয়না বিক্রি করে তোমার পড়ার খরচ জুগিয়েছি। হাঁটুর ব্যথাটা তোমার মাঝে মধ্যেই হতো। বাবা... এখনও কি তোমার সেই ব্যথাটা আছে? রাতের বেলায় তোমার মাথায় হাত না বুলিয়ে দিলে তুমি ঘুমাতে না। এখন তোমার কেমন ঘুম হয়? আমার কথা কি তোমার একবারও মনে হয় না? তুমি দুধ না খেয়ে ঘুমাতে না। তোমার প্রতি আমার কোন অভিযোগ নেই। আমার কপালে যা লেখা আছে হবে। আমার জন্য তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি খুব ভালো আছি। কেবল তোমার চাঁদ মুখখানি দেখতে আমার খুব মন চায়। তুমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবে। তোমার বোন.... তার খবরা-খবর নিও। আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বলো আমি ভালো আছি। আমি দোয়া করি, তোমাকে যেন আমার মতো বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে না হয়। কোনো এক জ্যোস্নাভরা রাতে আকাশ পানে তাকিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু ভেবে নিও। বিবেকের কাছে উত্তর পেয়ে যাবে। তোমার কাছে আমার শেষ একটা ইচ্ছা আছে। আমি আশা করি তুমি আমার শেষ ইচ্ছাটা রাখবে। আমি মারা গেলে বৃদ্ধাশ্রম থেকে নিয়ে আমাকে তোমার বাবার কবরের পাশে কবর দিও। এজন্য তোমাকে কোনো টাকা খরচ করতে হবে না। তোমার বাবা বিয়ের সময় যে নাকফুলটা দিয়েছিল সেটা আমার কাপড়ের আঁচলে বেঁধে রেখেছি। নাকফুলটা বিক্রি করে আমার কাফনের কাপড় কিনে নিও। তোমার ছোটবেলার একটি ছবি আমার কাছে রেখে দিয়েছি। ছবিটা দেখে দেখে মনে মনে ভাবি এটাই কি আমার সেই খোকা!’ মায়ের প্রতি সন্তানের এই অবহেলার কারণ আর মমতায় ভরা ওই মায়ের ঠিকানা না জানা গেলেও হতভাগা অনেকের ঠিকানাই মিলেছে, যাদের ঠাঁই হয়েছে গিভেন্সি গ্রুপের কর্ণধার খতিব জাহিদ মুকুলের প্রতিষ্ঠিত বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
অনেক মা-বাবার জীবনের গল্প চাপা পড়েছে বৃদ্ধাশ্রমের গাছ-গাছালির ঝরা পাতার নিচে। শেষ জীবনের স্বপ্ন এখন চাপা দিয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রের দেয়ালের গাথুনির ভাঁজে ভাঁজে। তবে কেউ কেউ তুলে ধরছেন তাদের বুকের ভেতরে জমে থাকা ব্যথার কথাগুলো। আবার সবাই যে ছেলেমেয়ে বা স্বজনদের কাছে অবাঞ্ছিত হয়ে এখানে এসেছেন তেমনও নয়। সমাজের কারণে, পরিস্থিতির শিকার হয়েও এসেছেন কেউ কেউ। তাদেরই একজন ঝালকাঠির এম আলী। তিনি নিজের সহায় সম্পদ বিলিয়েছেন সমাজসেবার কাজে। তার মেয়ে ঢাকার একটি মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে নিজের উপার্জন দিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিচ্ছেন। আর ছেলে এমবিএ পাস করেছে। এম আলী ছেলেমেয়ে বা সংসারের লোকজনের জন্য নয়, ঘৃণ্য কিছু সমাজপতি নামধারী সমাজের লোকজনের জন্য বাড়ি ছেড়ে তিনি ঠাঁই নিয়েছেন বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে। পরিবারে অবাঞ্ছিত হয়ে অবহেলিত হয়ে অনেকে আছেন এই কেন্দ্রে। তাদেরই একজন ফরিদপুরের বাদশাহ মিয়া (৭০)। তিনি সৌদি আরব ছিলেন এক দশকেরও বেশি সময় ধরে। স্ত্রীর নামেই বিদেশ থেকে পাঠাতেন টাকা-পয়সা। ঢাকার রামপুরায় স্ত্রী লালবানুর নামের জমিতে বাড়ি তৈরি করে সেই বাড়িতে তিনি এখন অপাংক্তেয়। শরীরের কর্মক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গে নিজের অর্থে গড়া বাড়ি থেকে বাদশাহকে বের হয়ে তাকে চলে আসতে হয়েছে এই কেন্দ্রে। গাজীপুরের কারাগারে আটক ছিলেন জেমস ওয়াকার (৭০) নামের এক ভারতীয় নাগরিক। আইনি সহায়তার পর পুনর্বাসন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান প্রায় দুই বছর আগে জেমস ওয়াকারকে নিয়ে আসেন কেন্দ্রে। আরও একজন বিদেশি নাগরিক কয়েক বছর এখানে থেকে বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছেন। হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান ধর্মের লোকজন মিলেমিশেই আছেন এখানে। নারী-পুরুষদের আলাদা নিবাস। স্বজন-সংসার, পরিবার, পরিজন নিয়ে তাদের মনে নানা কষ্ট থাকলেও কেন্দ্রে অনেকটা ভালই আছেন তারা। নারায়ণগঞ্জের বৃদ্ধ আনন্দ ব্যবসা করতেন। এক ছেলে ভারতে আছেন। স্ত্রী আর অপর ছেলে মারা যাওয়ার পর বাড়িঘর ছেড়ে চলে এসেছেন পুনর্বাসন কেন্দ্রে। আবার পরিবারের লোকজনের সঙ্গে অভিমান করেও আছেন কেউ কেউ। তাদেরই একজন শিক্ষা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত চাকুরে কুমিল্লার হুমায়ুন কবির। তিনি জানালেন, স্ত্রী আর ছেলের সঙ্গে রাগ করে বাড়ি ছেড়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রে এসে ভালই আছেন। নামাজ রোজাও করছেন ঠিকমত। গিভেন্সি গ্রুপের কর্ণধার শিল্পপতি খতিব জাহিদ মুকুল আর্তমানবতার সেবায় নিবেদিত হয়ে অবহেলিত, অসহায়, আশ্রয়হীন প্রবীণদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে গড়ে তোলেন এই বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র। প্রাথমিকভাবে  উত্তরায় এর গোড়াপত্তন হলেও ১৯৯৪ সালে কেন্দ্রটি স্থানান্তর করা হয় গাজীপুরে। পরের বছরের এপ্রিলে কেন্দ্রটির সম্প্রসারিত অংশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন শান্তিতে নোবেল পুরস্কার জয়ী মাদার তেরেসা। এ কেন্দ্রের ধারণ ক্ষমতা ১২০০।
সরকারি-বেসরকারি, দেশি বা বিদেশি কোন ধরনের সহযোগিতা ছাড়াই কেবল মাত্র নিজেদের গিভেন্সি গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড নামক রপ্তানিমুখী পোশাক শিল্প গ্রুপের অর্থে পরিচালিত মানবসেবার বয়স্কদের এ প্রতিষ্ঠানকে অনেকদূর এগিয়ে নিতে চান তারা। এ বিষয়ে বয়স্ক কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান খতিব আব্দুল জাহিদ মুকুল বলেন, ছোটবেলায় আমার গ্রামে, বাড়ির আশপাশে প্রবীণদের প্রতি অবহেলা-অবজ্ঞার কিছু দৃশ্য আমাকে বড়ই পীড়া দিত। আর সেই বেদনাবোধ থেকে মনে মনে ভেবেছি, মহান সৃষ্টিকর্তা যদি আমাকে তৌফিক দেন তাহলে দেশের উপেক্ষিত-অবহেলিত বয়স্কদের জন্য কিছু করব। আর সৃষ্টিকর্তা আমাকে যখন তৌফিক দিলেন তখনই আমি শৈশবের স্বপ্ন ও প্রেরণার কথা ভুলে না গিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রটি গড়ে তুলি। এ কেন্দ্রকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করতে পরিকল্পিতভাবে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। এই কেন্দ্রের নামে এখন প্রায় শত বিঘা জমি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে তাদের আবাসন, চিকিৎসা ও বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে মাছের খামার, সবজি চাষ, ফলের বাগান, সামাজিক বনায়ন ইত্যাদি। এসবের আয় ছাড়াও বাকি ব্যয়ভার গিভেন্সি গ্রুপের আয় থেকে মেটানো হয়। তিনি আরও জানান, এই কেন্দ্রে শুধু যে অসহায়দের লালন পালন করা হয় তা কিন্তু নয়। অনেক সময় যেসব প্রবীণের ছেলেমেয়ে বা ঘনিষ্ঠজনরা রয়েছেন, তাদের আবারও পারিবারিক বন্ধনে ফিরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। স্বজনদের এবং বয়স্কদের বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ভেঙে যাওয়া পারিবারিক সম্পর্ক আবারও দৃঢ় করে অনেককেই তাদের নিজস্ব ঠিকানায় তুলে দেয়া হচ্ছে। এছাড়াও কারাগারের অসহায় বৃদ্ধদের জন্যও এ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কাজ করা হয়ে থাকে। ভবিষ্যতে দেশের প্রতিটি জেলায় বয়স্কদের জন্য অন্তত একটি করে প্রবীণ কল্যাণ ক্লাব করে দেয়ার ইচ্ছা রয়েছে তার।

নতুন মাত্রায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক by এম সাখাওয়াত হোসেন

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সমঝোতা ও
শুভেচ্ছা স্মারক নিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপির অবিশ্বাস্য জয়ের পেছনে ছিল হিন্দুত্ববাদী বলে পরিচিত গুজরাটের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও সফল মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত ক্যারিশমা ও চমক। বাল্যকাল থেকেই যাঁর ধ্যানধারণায় ছিল হিন্দুত্ব আর ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের উত্থান। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন ২০০২ সালের ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গায় জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও ২০১৪ সাল পর্যন্ত গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীই ছিলেন। গুজরাটকে অর্থনৈতিক অঙ্গনে এক উচ্চ জায়গায় নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তাঁর শক্ত অবস্থান টের পায় গোটা ভারত। বহু বছরের পরিবারতন্ত্র ছিঁড়ে বের হয়ে মোদি হন অধুনা ভারতের একক নেতা। সবই তাঁর ব্যক্তি ইমেজ ও ক্যারিশমা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথের সময়েই ভারতের বৈদেশিক নীতিতে এক পরিবর্তনের সূচনা করেন তিনি। ওই শপথ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়ে উপস্থিত হন দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশের সরকারপ্রধানেরা, এমনকি চিরবৈরী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও। শপথ অনুষ্ঠানেই তিনি তাঁর বিদেশনীতির ধারণা দিতে শুরু করেন। এর মধ্য দিয়ে অন্য এক মোদীর উত্থান হতে দেখা যায়। প্রায় এক বছরের শাসনকালে এ পর্যন্ত আঠারোটি দেশ যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানসহ দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশ সফর করে মোদি বিশ্বের দরবারে নিজের অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হন। পরিচিত হয় নরেন্দ্র মোদির রাষ্ট্রনায়ক রূপ।
মোদি বাংলাদেশে এলেন। ব্যস্ত সময় কাটালেন। দেখলেন, শুনলেন, জয় করলেন এবং ফেরত গেলেন অনেক প্রাপ্তি নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণের প্রধান চাহিদা উত্তরাঞ্চলের সমস্যা তিস্তা নদীর পানির হিস্যা সমাধানের আশার বাণী শুনিয়ে গেলেন। সরকারের রাজকীয় অভ্যর্থনা আর আপ্যায়নের পর প্রায় বিশটি চুক্তি, সমঝোতা স্মারক, বিদ্যুৎ খাতে কিছু বিনিয়োগের ভরসা আর একগাদা যোগাযোগ বা কানেক্টিভিটির উদ্যোগ ছাড়াও পাওয়া গেল ২০০ কোটি মার্কিন ডলার ঋণের ঘোষণা। এ ঋণের লক্ষ্য যোগাযোগ খাতের উন্নয়ন।
যোগাযোগ বলতে গেলে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে পূর্বে প্রায় অশান্ত সাত রাজ্যের সহজ পথে যোগসূত্র গাঁথার ব্যবস্থা। কিন্তু তিস্তার সুরাহা হলো না, বরং তিস্তার সঙ্গে জুড়ল ফেনী নদীর বিষয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিলেন যে তিনি এ সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন, তবে রাজ্য সরকারদের অনুমোদন পেলেই তিনি পানি বণ্টনের কাজ ত্বরান্বিত করতে পারবেন। কাজেই বল এখন পশ্চিমবঙ্গ আর ত্রিপুরা সরকারের হাতে। অবশ্য পরিষ্কার নয় যে এ দুই বিষয় একত্রে সমাধান হবে, না আলাদাভাবে সমাধান হবে। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এমন ঘোষণার ব্যাখ্যায় বলা যায় যে এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও ত্রিপুরার বামপন্থী সরকারপ্রধান মানিক সরকার। এক কথায় বাংলাদেশকে এ দুই রাজ্য ও নেতাদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে বহু দিন। ফেনী নদীর পানির ব্যবহার এবং মুহুরির চর নিয়ে বহু দিন ধরে ত্রিপুরা সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের ছোটখাটো সমস্যা লেগেই থাকে। সে বিষয়ের সঙ্গে তিস্তার পানির বিষয় জুড়ে দিলে এক আমলাতান্ত্রিক জটিলতা অবশ্যই সৃষ্টি হবে।
নরেন্দ্র মোদি বরাবরই সুবক্তা হিসেবে পরিচিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশে তিনি তাঁর বাগ্মিতার দক্ষতা রেখেছেন। তিনি পর্যটনের মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সমস্যা সহজীকরণের কথা উচ্চারণ করেননি। মোদির ভাষণ থেকে এ কথা প্রতীয়মান যে তিনি গত এক বছরে সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়নের পথ পরিষ্কার করা ছাড়াও বাংলাদেশের সরকার, মানুষ আর সমাজ সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা নিয়ে এ দেশ সফরে এসেছেন।
মোদি জানেন কোন সময় কোথায় কী ধরনের বক্তব্য দিতে হবে। তিনি একবারও নিজের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে কথা বলেননি। তাঁর ভাষণ শুধু বাংলাদেশিদের জন্য ছিল না, ছিল ভারতীয় এবং বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো তথা জাতিসংঘ ব্যবস্থাপনার জন্যও। তাঁর ভাষণ ছিল বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের জন্যও। তিনি তাঁর ও তাঁর দেশের মনোবাসনার কথা অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ করেছেন। আর তা হলো বিশ্বদরবারে ভারত তথা দক্ষিণ এশিয়ার মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতৃত্বে ভারতের দাবির ন্যায্যতা তুলে ধরা। দুই দশক ধরে ভারত সরকারগুলো এ লক্ষ্যে কাজ করছে। নরেন্দ্র মোদি তাঁর শাসনামলে এর চূড়ান্ত পরিণতি পর্যন্ত না যেতে পারলেও বহু দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইবেন। এখানেই ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতির মূল।
বিশ্বের বড় আসরে বসতে হলে ভারতকে অন্তত দক্ষিণ এশিয়ার দেশ তথা এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবং সহযোগীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে। তবে দক্ষিণের অন্যান্য দেশের সঙ্গে মোদি তাঁর বিদেশনীতিতে অনেক সফলতা অর্জন করলেও দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ প্রতিবেশী পাকিস্তানের সঙ্গে এখন পর্যন্ত তেমন অগ্রগতি করতে পারেননি, যেমন পেরেছিলেন তাঁর অন্যতম রাজনৈতিক পথ প্রদর্শক অটল বিহারি বাজপেয়ি। পাকিস্তানের অবস্থানের বিষয় তিনি অপ্রচ্ছন্নভাবে হলেও উল্লেখ করেছেন তাঁর ভাষণে। যদিও সম্প্রতি চীন সফরে গিয়ে মোদি ওই দেশের সঙ্গে ১৯৬২ সালের পর থেকে ভারতের সীমান্ত বিরোধের বিষয় উল্লেখ করেননি, তবে পাকিস্তান-চীন কৌশলগত সম্পর্ক সম্বন্ধে ভারতের মনোভাব জানিয়েছেন।
নতুন আঙ্গিকে ভারতের পরিবর্তিত নীতি, যাঁর সূচনা মোদি করেছেন, তাতে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ভারতের কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, তা পরিষ্কার করা হয়েছে। ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশ অনেকাংশে পাকিস্তানের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তা এই প্রথমবারের মতো স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়েছে, যা মোদির শেষ ভাষণেও উঠে এসেছে। বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে যে যোগাযোগ বা সংযোগ বা কানেক্টিভিটির সূচনা হয়েছে, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। বিগত ছয় দশকে ভারতে উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোর সঙ্গে পশ্চিমাংশের আত্তীকরণ তেমনভাবে হয়নি। অশান্ত রয়ে গেছে এসব রাজ্য। মাত্র কয়েক দিন আগেই মণিপুরে বিদ্রোহীদের আক্রমণে প্রায় ২০ জন ভারতীয় সেনাসদস্য নিহত হয়েছিলেন। এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে এই যোগাযোগ অত্যন্ত জরুরি, যেমন জরুরি সার্বিক নিরাপত্তার জন্য। অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়তো এনে দেবে স্থিতিশীলতা।
ভারত-বাংলাদেশ কানেক্টিভিটির বিষয়টি নতুন নয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বিষয়টি বহুভাবে চর্চিত হয়েছে। বাংলাদেশের কাছে ভারতের অন্যতম চাহিদা ছিল ভূখণ্ড ব্যবহারে যোগাযোগ। ১৯৭৪ সালের ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির অন্যতম বিষয় ছিল করিডর, যা আজকের কানেক্টিভিটি, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর তৎকালীন সরকার এ বিষয়ে তেমন উৎসাহ দেখায়নি বলে বিষয়টি এত দূর গড়িয়েছে। বঙ্গবন্ধু ওই সময়ে কেন উৎসাহী ছিলেন না, তার উল্লেখ ও বিশ্লেষণ প্রয়াত জে এন দীক্ষিত রচিত লিবারেশন অ্যান্ড বিয়ন্ড এবং জেনারেল জ্যাকবের রচিত সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা নামক পুস্তকে বিস্তারিত বিশ্লেষিত হয়েছে। এ কানেক্টিভিটি বাংলাদেশের চাইতে ভারতের প্রয়োজন ছিল বেশি, যে কারণে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এ সফরের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যোগাযোগব্যবস্থা। এ ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের কতখানি প্রাপ্তি, তা অবশ্য এখনো পরিষ্কার নয়। তবে সংসদে অথবা অন্যান্য ফোরামে এ বিষয়ে সরকার সম্যক ধারণা দেবে বলে আশা করা যায়।
ভারত মহাসাগর তথা ভারতের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি প্রদর্শন, বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক লগ্নি ইত্যাদির সঙ্গে একরকমের প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থানে ভারত প্রবেশ করছে। উদাহরণ, ভারতের দূরপ্রাচ্য নীতি। ভারত চীনের কথিত ‘সামুদ্রিক সিল্ক রুটের’ বিষয়ে সন্দিহান, যেখানে সমগ্র পথে পঞ্চাশটি বন্দর যোগ করার কথা। নরেন্দ্র মোদি এই সফরে তাঁর ভাষণে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে বন্দর যোগাযোগের কথাও উল্লেখ করেছেন। হয়তো এটাও ক্ষুদ্র আকারে চীনের সঙ্গে একধরনের প্রতিযোগিতার বিষয় হতে পারে।
বাংলাদেশে ভারতের বেশ কিছু লগ্নির সমঝোতা হয়েছে, হয়তো ভবিষ্যতে আরও হবে। ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের কথাও হয়েছে, তবে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কতখানি সুযোগ গ্রহণ করতে পারবে, তা দেখার বিষয় হবে। মোদীর এই সফর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের জন্য এক স্বস্তির বিষয় নিশ্চয়ই। মোদি প্রধানমন্ত্রীর উন্নয়নের ইচ্ছা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য টলারেন্সের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সরকার অবশ্যই যথেষ্ট সফল ভাবতেই পারেন। তবে এই প্রথম বাংলাদেশে এ সফরকে ঘিরে সব রাজনৈতিক দলের এক সুর হওয়া অবশ্যই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা, বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যতের জন্য সুখকর হতে পারে।
অবশ্যই ভারত চাইবে বড় শক্তি হিসেবে ইতিবাচক ইমেজ গড়ে তুলতে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই ভারতকে সব প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের স্বাভাবিকীকরণ দ্রুত যেমন প্রয়োজন, তেমনি এ অঞ্চলে গণতন্ত্র সুসংহত করার বিষয়েও যথেষ্ট যত্নবান হতে হবে। মোদি ভালো করেই জানেন, ভারতীয় গণতন্ত্র শক্ত ভীতে না থাকলে একজন সামান্য নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি নরেন্দ্র মোদি হয়ে উঠতে পারতেন না।
সংক্ষেপে নরেন্দ্র মোদির এ সফরকে সার্বিকভাবে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সম্পর্কের নতুন দুয়ার খুলতে পেরেছেন নরেন্দ্র মোদি। তিনি নিজেকে বিশ্বের দরবারে এবং এ অঞ্চলে পরিবর্তিত মোদি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন। এ সফরে মোদিও বাংলাদেশের জনগণের মনে দাগ কাটতে পেরেছেন। তবে বাস্তবিক পক্ষে বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে বিতর্ক হয়তো আরও অনেক দিন চলবে। মোদির সফরের মধ্য দিয়ে সমতার ভিত্তিতে আঞ্চলিক সহযোগিতা আরও অগ্রসর হোক, এমনই আমাদের কাম্য।
এম সাখাওয়াত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও কলাম লেখক৷
hhintlbd@yahoo.com

প্রেস ক্লাব কোন পথে

প্রেস ক্লাবে দলবাজি আগেও ছিল। এখনও আছে।  ভবিষ্যতেও থাকবে। আমি পছন্দ করি আর না করি। তবে এখন যা চলছে, তা এক ধরনের নোংরামি। সহসাই সংঘাত থেকে সংঘর্ষে রূপ নেবে এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে। পেশাদার সাংবাদিকদের একটি ক্লাব। কে দায়িত্বে থাকবেন কে থাকবেন না এটা নির্ধারণ করার মালিক সাংবাদিকরা। কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে এখানেও বিএনপি-আওয়ামী লীগ কিংবা জামায়াতের রাজনীতি। সিদ্ধান্ত হয় প্রকাশ্যে, নেপথ্যে। এ যেন চর দখলের লড়াই। এতদিন জোড়াতালি দিয়ে চলছিল। মন্দের ভাল বলা যায়। কিন্তু হঠাৎ করে ছন্দপতন। নির্বাচনের পথ পরিহার করে সোজা দখল। রাখঢাক ছাড়াই এ কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। কেন এই দখল? নানা কথা, নানা হিসাব। বিএনপিপন্থিরা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নিয়ন্ত্রণ করে আসছিলেন। নিয়মনীতি উপেক্ষিত ছিল। খেয়াল-খুশি মতো সদস্য বাড়িয়েছেন-কমিয়েছেন। আপত্তি করার কেউ ছিল না। এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা। পরিণতিতে আপসের পথ বের করেন কতিপয় সিনিয়র সাংবাদিক। যারা আওয়ামী লীগ-বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। বলা যায় এক ধরনের ভাগবাটোয়ারা। গত ডিসেম্বরে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এই তথাকথিত সমঝোতার কারণে নির্বাচন পেছানো হয়। গেল মাসে সমঝোতার একটি নীলনকশাও ফাঁস হয়ে যায়। পরিণতিতে গুঞ্জন শুরু হয়ে যায় সাংবাদিক মহলে। দুই শিবির থেকেই প্রতিবাদ আসতে থাকে। একপর্যায়ে ভেস্তে যায় সমঝোতা। দখল প্রক্রিয়া তখনই সম্পন্ন হয়। শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একদল সাংবাদিক (দুই শিবিরভুক্ত) নতুন কমিটি ঘোষণা করে দেন। নির্বাচন ছাড়া কিভাবে কমিটি হতে পারে তা ছিল এক বিস্ময়কর ঘটনা। প্রেস ক্লাব তো আলাদা কোন দ্বীপ নয়। দেশ যেভাবে চলছে তার কিছুটা হলেও তো আঁচড় লাগবেই। শফিকুর রহমান প্রবীণ সাংবাদিক। রাজনৈতিক আদর্শের প্রশ্নে তিনি বরাবরই আপসহীন। প্রেস ক্লাবের নেতৃত্বেও ছিলেন বেশ কিছুকাল। মাঝখানে দুবার আওয়ামী লীগের টিকিটে জাতীয় সংসদ নির্বাচন করে সফলকাম হননি। তিনি কেন যে এ পথে এগিয়ে এলেন তা এখনও অস্পষ্ট। ক্লাব দখল করে তিনি কি পেলেন? এতে করে কি তার মর্যাদা বাড়লো! ইকবাল সোবহান চৌধুরীইবা কেন এতে জড়ালেন। তার অবস্থান তো অনেক ওপরে। আপনি পছন্দ করেন আর না করেন। শওকত মাহমুদের ভূমিকাও এখানে রহস্যজনক। সমঝোতার অন্যতম রূপকার হয়েও কেন তিনি মনোনয়নপত্র জমা দিতে গেলেন তা নিয়ে বলাবলি আছে সংশ্লিষ্ট মহলে। প্রেস ক্লাবের পুরনো কমিটির কথাইবা কি বলবো? তারা ক্লাবটিকে রাজনৈতিক অফিসে পরিণত করেছিলেন। কোন অডিট ছাড়াই চলছিল সবকিছু। কি যে মধু আছে সেখানে! সদস্যপদ দেয়ার ক্ষেত্রে সব সময় উদ্দেশ্য ছিল কিভাবে নিয়ন্ত্রণ হাতে রাখা যায়। এর ফলে পেশাদার বহু সাংবাদিক সদস্য হতে পারেননি। সব মেনে নেয়া গেলেও এটা মেনে নেয়া যায় না। কারণ, প্রেস ক্লাব কাউকে লিজ দেয়া হয়নি। যাই হোক, প্রতিদিন যেভাবে পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে তাতে করে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যেই কয়েক দফা হাতাহাতি হয়ে গেছে। আমরা সাংবাদিকরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলবো, আর নিজেরা নির্বাচন থেকে দূরে থাকবো- এটা কি করে হয়। ভোটার তালিকা নিয়ে নানা অভিযোগ। এই অভিযোগের ভিত্তি যে নেই তা কিন্তু বলা যাবে না। এর সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার। অভিযোগগুলো নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হতে পারে। সিনিয়র সাংবাদিকরা এখন ক্লাবমুখী হচ্ছেন না। আগে দিনে তিন থেকে চারশ সাংবাদিক প্রেস ক্লাবে যেতেন। এখন একশতে নেমে এসেছে। সদস্য নন এমনদের আনাগোনা বেশি। আগে ছিল যারা ইউনিয়ন করতেন তারা প্রেস ক্লাব নিয়ে তেমন মাথা ঘামাতেন না। এখন দেখা যাচ্ছে যারা জাতীয় রাজনীতি করেন তারাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করছেন। সঙ্কট এখানেই। পেশাদারদের ক্লাব পেশাদারদের হাতেই ছেড়ে দিন। তাহলেই দেখবেন বিভক্তি সত্ত্বেও সঙ্কট কেটে গেছে।

যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে আওয়াজ

লাতিন আমেরিকায় মেয়েদের রাস্তাঘাটে হরহামেশাই উত্ত্যক্ত করা হয়। তা আবার বহু ধরনের। কেউ অশ্লীল শব্দ ছোড়ে, কেউ চোখ মারে, কেউবা করে অশালীন ইঙ্গিত। এসব ঘটনা যৌন নিপীড়নের মতো। কাহাতক আর এ যন্ত্রণা সওয়া যায়। দেয়ালে ঠেকেছে পিঠ, তাই তারা এবার প্রতিবাদে সোচ্চার। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সংগঠিত হচ্ছেন নারী অধিকার কর্মীরা। না, এ নিপীড়ন আর সহ্য করা হবে না।
কলম্বিয়ায় আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন সারা ভেলেজ। প্রতিদিন যখন তিনি ক্লাসে যান, তখন তাঁকে শুনতে হয় পুরুষদের অশ্লীল কটাক্ষ। লাতিন আমেরিকায় এটা নতুন নয়। রাস্তায় নারী দেখলেই কিছু পুরুষ শিস দেবে, নয়তো অশ্লীল কটাক্ষ করবে। এত দিন কেউ এসব বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায়নি। নারীরাও নীরবে সহ্য করে গেছেন। নতুন প্রজন্মের নারীরা এখন আড়ষ্টতার খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসতে তৎপর।
বোগোতার বাসিন্দা সারা ভেলেজ বলেন, তিনি শান্তিতে রাস্তায় হাঁটতে পারেন না। পুরুষেরা চিৎকার করে মেয়েদের অশ্লীল কথা বলে। বাসে উঠেও পড়তে হয় এমন দুর্ভোগে। কেউ কেউ এত বেয়াড়া, মুখে বলেই ক্ষান্ত নয়, গায়ে পর্যন্ত হাত দেয়। সারার মতো অভিজ্ঞতা প্রায় সব নারীরই কমবেশি রয়েছে।
মেক্সিকো সিটিতে নারী ও শিশুদের জন্য গাড়ি চালান লরা রেয়েস। কিন্তু লরার শান্তি নেই। তাঁর ভাষ্য, গাড়িটি কেবলমাত্র নারীদের জন্য হলেও অনেক বিকৃত মানসিকতার লোক উঠে পড়ে। সমাজের সব শ্রেণি, সব পেশার নারীরাই এ রকম যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন।
ব্রাজিলের সাংবাদিক ক্যারোলিন অ্যাপল সম্প্রতি তাঁকে উত্ত্যক্ত করা এক ব্যক্তির ছবি প্রকাশ করে হইচই ফেলে দেন। রাস্তায় চলার সময় ওই উত্ত্যক্তকারী ইচ্ছে করে তাঁর দিকে নোংরা ও অশ্লীল ইঙ্গিত করেন। ক্যারোলিনের দাবি, একজন গাড়িচালক তাঁর সঙ্গে এই অশ্লীল আচরণ করেন। এভাবে প্রতিনিয়ত পথেঘাটে নারীর ওপর যৌন নিপীড়ন চলছে। ব্রাজিলের জনবহুল জায়গাগুলোতেও এ ধরনের যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের ঘটনা প্রতিদিনই ঘটছে। অন্তঃসত্ত্বা নারীরও নিস্তার নেই। চিৎকার করে অশ্লীল ইঙ্গিত করে পুরুষেরা।
চিলিতে প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে নয়জনই জনবহুল জায়গাগুলোতে যৌন নিপীড়ন বা হয়রানির শিকার হয়ে থাকেন। ২০১৪ সালের অবজারভেটরি অ্যাগেইনস্ট স্ট্রিট হ্যারাসমেন্টের জরিপ অনুসারে, ৭০ শতাংশ নারী বলেছেন, তাঁরা এ ধরনের যৌন হয়রানির কারণে মানসিক চাপ, অবসাদ বা রোগে ভুগছেন।
আর্জেন্টিনায় পরিচালিত এক জরিপেও একই তথ্য পাওয়া গেছে। লাতিন আমেরিকায় পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বেড়েছে। আর্জেন্টিনায় দিনে একজন নারী, মেক্সিকোতে দিনে পাঁচজনের বেশি নারী ও ব্রাজিলে দিনে ১৫ জন নারী পারিবারিক সহিংসতার শিকার হন।
কোস্টারিকা, মেক্সিকো ও পেরুতে রাস্তায় নারীর প্রতি এমন যৌন নিপীড়ন ও হেনস্তার প্রতিবাদে আইন পাস করা হয়েছে। পেরুতে যৌন হয়রানি বা উত্ত্যক্তকারীর শাস্তি হতে পারে ১২ বছরের কারাদণ্ড। আর্জেন্টিনা ও চিলির আইনপ্রণেতারাও এ রকম বিল পাস করার কথা ভাবছেন।
চিলিতে নারী অধিকার আন্দোলনের প্রেসিডেন্ট মারিয়া ফ্রান্সিসকা ভেলেনজুয়েলা এ ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন। নারীর প্রতি এই অসদাচরণ বাড়তে থাকায় পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো তাদের কর্মকাণ্ড চিলি থেকে আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া, নিকারাগুয়া, পেরু, এল সালভাদর ও উরুগুয়েতে ছড়িয়ে দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও তাঁরা যথেষ্ট সরব।
ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ কলম্বিয়ার নৃতত্ত্ববিদ ফ্যাবিয়ান সানাব্রিয়া বলেন, নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে নারীরা এখন অনেক বেশি সংঘবদ্ধ। আজকের নারীরা নির্যাতক পুরুষের বিরুদ্ধে তাঁদের মায়েদের তুলনায় অনেক বেশি সরব। তাঁরা নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। নারীদের উত্ত্যক্ত করার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে জোরালো প্রচার চলছে। পেরুতে নারীদের যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে এক জোট হয়েছেন আন্দোলনকারীরা।
অলিম্পিকে মেডেলজয়ী ভলিবল খেলোয়াড় নাতালিয়া মালাগা বলেন, নারীর উত্ত্যক্তকারীদের তাঁদের মায়েদের মুখোমুখি করা উচিত। লাতিন আমেরিকায় এখন অনেক নারী কর্মজীবী। গত ২০ বছরে কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বেড়ে সাত কোটিতে পৌঁছেছে। তাঁরা রাস্তায় পুরুষের যৌন হয়রানি থেকে রেহাই পেতে চান। উত্ত্যক্তকারীদের বিরুদ্ধে তাঁরা আন্দোলন করে যাচ্ছেন।
আর্জেন্টিনার রাজনীতিবিদ মৌরিসিও ম্যাকরি বর্তমানে প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি বলেন, দেশটির রাস্তায় রাস্তায় এখনো নারীদের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভেনেজুয়েলার ক্যাথলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজের অধ্যাপক আলেজান্দ্রা ক্যাবেরা বলেন, আজকের নারীরা ভালো করেই জানেন যে তাঁদের প্রশংসা করে উত্ত্যক্তকারীরা যেসব স্তুতি ছোড়ে, এতে খুশি হওয়ার কিছু নেই। এভাবে তাঁদের একধরনের বস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল উইমেন্স ইনস্টিটিউটের আইনবিষয়ক সমন্বয়ক পাবলো নাভারেতে বলেন, রাস্তায় নারীরা রোজই যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। এর প্রতিকার দরকার। এএফপি অবলম্বনে

এক জাহিদের অনেক ‘কীর্তি’ by তানভীর হাসান

মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, জমি দখল, সন্ত্রাস—সবই চলছে তাঁর নেতৃত্বে। ধলেশ্বরীর তীর ও রাস্তা দখল করে চলছে তাঁর ইট ও বালুর ব্যবসা। মালবাহী জাহাজের খোঁচায় ব্লক সরে গিয়ে হুমকির মুখে পড়েছে মুন্সিগঞ্জ শহররক্ষা বাঁধও।
তিনি জাহিদ হাসান। মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার পঞ্চসার ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি। পুলিশ ও প্রশাসনের নাকের ডগায় বছরের পর বছর এসব ঘটলেও তিনি আছেন বহাল তবিয়তে। এতে আতঙ্কিত সাধারণ মানুষ।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, জাহিদের বিরুদ্ধে মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় যুবদল নেতা মুক্তার হোসেন হত্যাসহ চারটি মামলা রয়েছে। ২০০১ সালে মুক্তারকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। জাহিদের বিরুদ্ধে মামলা আরও বেশি হবে বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি।
মুন্সিগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোহাম্মদ ইমদাদ হোসাইন জানান, বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে, এমন মামলার মধ্যে সদর থানায় ২০০৫ সালের একটি অস্ত্র মামলা ও ২০১৩ সালের একটি মাদক মামলা রয়েছে জাহিদের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া ২০১৫ সালে হাটলক্ষ্মীগঞ্জে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায়ও তাঁর জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে।
প্রায় চার মাস আগের ঘটনা। নদীর তীরের নৌযান থেকে চাঁদাবাজি ও বালুর ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জাহিদের লোকজনের সঙ্গে হাটলক্ষ্মীগঞ্জ এলাকায় পৌর কাউন্সিলর মকবুল হোসেনের লোকজনের গোলাগুলি হয়। এ সময় এক পথচারী, এক রিকশাচালকসহ তিনজন গুলিবিদ্ধ হন। ভয়ে তাঁরা কেউ মামলা করেননি। পরে পুলিশ মামলা করে।
পঞ্চসার ইউনিয়নের নয়াগাঁও গ্রামে জাহিদের বাড়ি। রাজনীতিতে আসার আগে ১৯৯৬ সালেও তিনি দরজির কাজ করতেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাঁর ভাগ্য বদলায়। আগে তাঁদের দোচালা টিনের ঘর ছিল। এখন সেখানে তিনতলা বাড়ি। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে তাঁর একাধিক বাড়ি রয়েছে বলে এলাকাবাসীর কয়েকজন জানান।
নয়াগাঁওয়ে চাঁদতারা মসজিদসংলগ্ন এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ ঘেঁষে একটি টং দোকান বসিয়েছেন জাহিদ। সেখানে থেকে তিনি ইট ও বালুর ব্যবসা করছেন। বাঁধের পূর্ব পাশ দিয়ে গেছে ঢাকা-মুক্তারপুর-নয়াগাঁও-মুন্সিগঞ্জ সড়ক। সড়ক ও বাঁধের মধ্যবর্তী অংশে নয়াগাঁও অংশে বিশাল জায়গা দখল করে চলছে এ ব্যবসা। সেখানে সড়কের জমি দখল করে পঞ্চসার ইউনিয়ন যুবলীগের কার্যালয়ও নির্মাণ করেছেন জাহিদ।
জাহিদের ইট ও বালুর ব্যবসার কারণে এখানে নিয়মিত নৌযান আসায় শহররক্ষা বাঁধের ব্লক ধসে পড়ছে। বালুর কারণে আশপাশের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, কিন্তু এলাকাবাসী এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ইউনিয়নের বণিক্যপাড়ায় ব্যক্তিমালিকানাধীন বিশাল একটি পুকুর ভরাট করে সেখানে নিজের নামে সাইনবোর্ড টাঙিয়েছেন জাহিদ। তাতে লেখা, ‘এই জমির মালিক জাহিদ গং’। চার-পাঁচ মাস আগে পুকুরটি ভরাট করা হয় বলে জানা গেছে।
এলাকাবাসী জানান, স্বাধীনতার আগেও এই সম্পত্তির মালিক ছিল হিন্দুরা। স্বাধীনতার পর তারা ভারতে চলে যায়। তখন তাদের কাছ থেকে স্থানীয় আবু তাহেরের বাবা আলী মিয়াসহ ওয়ারিশরা ওই জমি কিনে নেন। পুকুরটিও তাঁদের ছিল। কিন্তু এখন জাহিদ গংরা সেই পুকুর জোর করে ভরাট করে নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করছেন।
জমির মালিক আবু তাহের বলেন, জাহিদের জমি দখলের প্রতিবাদ করায় তাঁদের হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে থানা-পুলিশ করার পরও কিছু হচ্ছে না। পরে তাঁরা আদালতে মামলা করেন।
এসব বিষয়ে কথা বলতে যুবলীগের নেতা জাহিদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘বণিক্যপাড়ার ওই সম্পত্তি আমি এক মালিকের কাছে থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়েছি। ওই মালিক আর আমি অংশীদার। আমার জমি আমি ভরাট করমু, এটা আপনে দেখার কে?’ তিনি একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে বলেন, ‘আপনে লেইখ্যা কিছু করতে পারবেন না। এমন অনেক সাংবাদিক দেখছি। লেইখ্যা পত্রিকার পাতা ভইরালান, কিছুই হইব না। বরং আমি নিজেই কইয়া দেই, আমার বিরুদ্ধে আপনি কী লিখবেন।’
জাহিদকে ইউনিয়ন যুবলীগের স্বঘোষিত সভাপতি আখ্যায়িত করে সদর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি বাদল রহমান বলেন, ‘জাহিদরা মিলে যে কমিটি গঠন করে আমাদের কাছে জমা দিয়েছে, সেটাকে আমরা এখনো অনুমোদন করিনি।’ জাহিদের দলীয় কার্যালয় স্থাপন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘দলীয় কার্যালয় তৈরিতে তো কোনো বাধা নেই। এটা দলের যে কেউ নির্মাণ করতে পারেন। যারা এই জেলার আলো-বাতাস গ্রহণ করে বড় হয়েছে, তাদেরকে জাহিদ সম্পর্কে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই।’