Monday, December 9, 2013

আসল মোমেনা ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেননি: কাদের মোল্লার স্ত্রী

জামায়াতের সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার মামলায় সাক্ষী নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন কাদের মোল্লার স্ত্রী।
প্রকৃত মোমেনা বেগম ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেননি বলেও জানিয়েছেন তিনি। সোমবার সকালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি করেন কাদের মোল্লার স্ত্রী সানোয়ারা বেগম।

তিনি বলেন, একমাত্র সাক্ষী (মোমেনা বেগম) সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আমার স্বামীকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়েছে। সেই মোমেনা বেগম আদৌও আদালতে সাক্ষী দিতে আসেন নি। ক্যামেরা ট্রায়ালের নামে গোপন বিচারে ভূয়া একজন মহিলাকে মোমেনা বেগম সাজিয়ে আদালতে বক্তব্য দেওয়ানো হয়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে জল্লাদখানায় সংরক্ষিত প্রকৃত মোমেনা বেগমের ছবি দেখে আমাদের আইনজীবীরা নিশ্চিত করেছেন আদালতে সাক্ষ্য দেওয়া মোমেনা বেগম প্রকৃত মোমেনা বেগম ছিলেন না। অথচ এই রকম একজন ভুয়া সাক্ষীর তিন জায়গায় প্রদত্ত তিন রকমের বক্তব্যে পরে শুধুমাত্র তার সাক্ষ্যের ভিত্তিতেই আমার স্বামীকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। আমরা মনে করি তা নজিরবিহীন এবং এটি একটি ভুল রায়। আমরা মনে করি সংবিধান প্রদত্ত রিভিউ এর সুযোগ পেলে সুপ্রিম কোর্টে এই বিষয়গুলো তুলে ধরার মাধ্যমে আব্দুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডের রায় পাল্টে যাওয়া সম্ভব।
লিখিত বক্তব্যে সানোয়ারা বেগম আরও বলেন, এমতবস্থায় আমরা সরকার, সুপ্রিম কোর্ট, দেশের সকল আইনজীবী মানবাধিকার সংগঠন সমূহসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে অনুরোধ জনাচ্ছি যে, যে বিচার প্রক্রিয়া এবং সাক্ষী নিয়ে এতো বড় জালিয়াতির অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে একজন নির্দোষ মানুষের জীবন বাচানোর স্বার্থে একটি স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়ে তদন্ত করে মামলার সঠিক এবং পুর্নবিচার করা হোক।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন কাদের মোল্লার ছেলে হাসান জামিল, মেয়ে আমানাতুন পারভীন, আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন খান প্রমুখ।
কাদের মোল্লার স্ত্রী বলেন, উপমহাদেশের ইতিহাসে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ড না দেওয়া স্বত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্টের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এটাই একমাত্র ঘটনা। এখন সংবিধান অনুসারে তাঁর আপিল রিভিউ করার অধিকার রয়েছে। যেহেতু একজন বিচারপতি মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিরোধীতা করেছেন, তাই রিভিউ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমরা জানতে পেরেছি সরকার তড়িঘড়ি করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চেষ্টা করছে। রিভিউ করার অধিকার না দিয়ে এবং জেল কোডের বিধান অনুসরণ না করে দ্রুত ফাঁসি দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে তা সর্বজনীন মানবাধিকারের পরিপন্থী।

পাঠকের মন্তব্য: অনলাইন থেকে- স্যালুট আপনাকে কিংবদন্তি

অনলাইনে প্রথম আলো (prothom-alo.com) নিয়মিত পড়া হয় ১৯০টি দেশ থেকে। পড়ার পাশাপাশি পাঠকেরা প্রতিদিন রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজ, খেলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের মতামত দেন।
তাঁদের এ মতামত চিন্তার খোরাক জোগায় অন্যদের। গত কয়েক দিনে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠকদের কিছু মন্তব্য ঈষৎ সংক্ষেপিত আকারে প্রকাশ করা হলো।

বিদায় ম্যান্ডেলা
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুর খবরে আহসান হাবিব তাঁর অনুভূতি জানিয়েছেন: স্যালুট আপনাকে হে কিংবদন্তি। আপনার মতো নেতার কিছুটা ছিটেফোঁটা আমাদের নেতারা পেলে আমরা হয়তো খুন, ধ্বংস ও স্বৈরাচারী অবস্থা থেকে মুক্তি পেতাম।
সালাম: এসব নেতা যুগে যুগে একবারই আসেন। এঁরা নিজের জন্য আসেন না, নিজেকে বিলিয়ে দিতে আসেন। আমাদের নেতাদের মতো ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি করেন না। শুভ বিদায় নেলসন ম্যান্ডেলা।
হূদয়: স্যালুট অবিসংবাদিত নেতা। আপনার মতো নেতা আমাদের খুব প্রয়োজন। বিশ্ব এমন এক নেতাকে হারাল, যাঁর অভাব কখনো পূরণ হওয়ার নয়।
সাজেদ সোহেল: সব সময় বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা থাকবে এই মহান মানুষটির প্রতি। কালো মানুষদের কণ্ঠস্বর, নির্যাতিত মানুষের প্রতিচ্ছবি এই মাদিবা। বিশ্ব মুক্ত হোক বর্ণপ্রথা থেকে।
শান্তা: কিছু মানুষ আমাদের জন্য পথ তৈরি করে দেন, আর আমরা সে পথে চলি। ম্যান্ডেলা মানবমুক্তির পথের অন্যতম স্রষ্টা। বিনম্র শ্রদ্ধা থাকল এই মহান প্রাণের জন্য।
আবুল হাসনাত: এ পৃথিবী থেকে চলে গেলেন আরেক মহামানব। আমাদের এ দুর্ভাগা দেশে যদি তাঁর মতো একজন রাজনীতিবিদ থাকত, তবে দেশবাসীকে জ্বলেপুড়ে মরতে হতো না। কবে আমাদের দেশে এমন তর্কাতীত নেতারা আসবেন, যাঁকে নিয়ে আমরা গর্ব করব?

এবার তফসিল ১০ দিন পেছানোর শর্ত এরশাদের
কয়েক দিন ধরে নির্বাচন বর্জন ও ‘সর্বদলীয়’ সরকার থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়ার পর জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ অবশেষে নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নতুন শর্ত দিয়েছেন। এ খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাচ্চু লিখেছেন: সময়ের বিবর্তনে ও দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বৈরশাসক এরশাদের জাতীয় পার্টি এখন দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের কাছে ক্ষমতার লড়াইয়ে তুরুপের তাসে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই রাজনৈতিক দলই এরশাদকে নিয়ে ভোটের হিসাবনিকাশ কষে ব্যস্ত সময় পার করছে। দুই দলের আদর্শহীন রাজনীতির কারণে এরশাদ আজ এমন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসতে পেরেছেন। বিশ্বে আর কোনো স্বৈরশাসকের ক্ষেত্রে এমনটা হয়নি।
শফিক: এইচ এম এরশাদ যত কথা কম বলবেন, তত ভালো।
জামিউল হাসান: এরশাদ হলো বাংলাদেশে নষ্ট রাজনীতির জনক।
মোহসিন চৌধুরী: এরশাদের নাটক কখনো শেষ হবে না? তবে সে রাজনীতির রঙ্গমঞ্চের নায়ক থেকে অচিরে খলনায়কে পরিণত হবে।
রওনক: আওয়ামী লীগ এরশাদকে নির্বাচনে নেওয়ার জন্য যতখানি উদগ্রীব, ততটা যদি বিএনপির ক্ষেত্রে দেখাত, তবে সবাই স্বাগত জানাত এবং খুশি হতো।

এরশাদ ‘ছুটে গেলে’ জরুরি অবস্থা?
বিশেষ প্রতিবেদনে সাংবাদিক শরিফুজ্জামান দেশে জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেছেন। এতে মতামত জানিয়ে আকাশ ঘোষ লিখেছেন: নির্বিচারে মানুষ হত্যা বন্ধে জরুরি অবস্থা জারিই হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।
এফ রহমান: ক্ষমতা ধরে রাখতে আওয়ামী সরকারকে যদি সেনাবাহিনীর কাঁধে চাপতে হয়, তবে দলটি কীভাবে পাকিস্তানি সেনাশাসকদের ক্ষমতা দখলের নির্লজ্জ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করবে?
মীর মোহাম্মদ মোফাজ্জাল হোসেন: সেনা মোতায়েন করতে যত দেরি হবে, ভাঙচুর ও হত্যা তত বাড়বে। একবার ঠিকমতো পিটুনি দিতে পারলে বিএনপি-জামায়াত কোথায় পালাবে, খুঁজে পাওয়া যাবে না। সরকার কঠোর মনোভাব দেখাচ্ছে না বলে সবাই দেশটিকে মগের মুল্লুক বলে মনে করছে। জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। যারা জনগণের জানমাল নিয়ে ছিনিমিনি খেলে, তারা দুষ্কৃতকারী। তাদের কঠোর হাতে দমন করতে হবে।
মোহাম্মদ নূরুদ্দিন জাহাঙ্গীর: এরশাদ ছুটে না গেলেও লাভ হবে না। কারণ, সরকারের নির্বাচনী ফন্দি জনগণ বুঝে গেছে। ভারত থেকে লোক নিয়ে এসে তদবির করানোর কাজটিও জনগণ ভালোভাবে নেয়নি।

শনিবার থেকে আবার ৭২ ঘণ্টার অবরোধ
বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮-দলীয় জোটের নতুন দফা অবরোধের খবরে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে মোহাম্মদ শামিম হোসেন লিখেছেন: নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করাটাই একমাত্র দাবি হতে পারে না। পাঁচ বছর পর পর তথাকথিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা একদল দুর্বৃত্তের হাত থেকে আরেক দল দুর্বৃত্তের কাছে হস্তান্তরের একটা প্রক্রিয়া আছে। কিন্তু তা ছাড়াও নির্বাচনের মাধ্যমে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের বা সমস্যার মীমাংসা হওয়া দরকার। যদি তা না হয়, তবে মানুষের ক্রোধ চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেবে।
শাহেদ মাহবুব: দেশটা আপনাদের (খালেদা-হাসিনার) পৈতৃক সম্পত্তি নয় যে যা খুশি করবেন। আমাদের রুটিরুজি হরণের অধিকার আপনাদের কেউ দেয়নি।
মো. শিহাব উদ্দিন: যাদের প্রতি আপনাদের (১৮-দল) বিদ্বেষ, পারলে তাদের মারেন। আমাদের মারেন কেন?
সালোক: এত কথা না বাড়িয়ে সরাসরি বলুন, আপনাদের (১৮-দল) দাবি না মানলে আরও মানুষকে আপনারা মারবেন। সারা জীবন তো বলে গেলেন জনগণ অমুক চায়, তমুক চায়। আসলে জনগণ কী চায়, তা আপনাদের জানা নেই। সরকারকে ভয় দেখাতে সাধারণ মানুষ হত্যা না করে মানুষকে ভালোবাসুন।
মো. সাজির আলী: এভাবে অবরোধ-হরতাল দিতে থাকলে আমাদের জনগণের কী হবে, দেশটার কী হবে, কেউ ভেবেছেন একবার?

রাজনীতি ও মনস্তত্ত্ব- জেনারেলের মন by জাহিদ হায়দার

মানুষের মন ব্যাখ্যাতীত। পৃথিবীর সাত শ কোটি মানুষের মন সাত শ কাটি রকমের। ‘আমার মনের সঙ্গে তোমার মনের অনেক মিল’, এই কথা বলে যাঁরা যুগল হয়ে যান, দেখা গেছে, একদিন তাঁদের মনে অনেক বেশি অমিল। মন চড়ে বেড়ায় ঝোড়ো মেঘের পিঠে। মন কখন চরিত্রের আচরণ বদলে দেবে, মনের বাহক তার সময়-ক্ষণ সব সময় বলতে পারেন না।
অনেক বছর আগে ঢাকার এক দেয়ালে পড়েছিলাম: ‘এরশাদের চরিত্র ফুলের মতো পবিত্র’। আমরা দেখেছিলাম, ওই দেয়াললিখন পড়ে মানুষ মানুষের মুখের দিকে তাকিয়ে, চোখে সন্দেহবাচক প্রশ্ন তুলে হাসত। কী কারণে হাসত আমি জানি না। জেনারেলকে তাঁর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক যে ‘ক্যারেকটার সার্টিফিকেট’ দিয়েছিলেন, তাতে কি ‘ফুল’ শব্দটি ছিল? এই প্রয়োজনীয় তথ্যও আমার অজানা।
কেউ কর্নেলকে চিঠি লেখে না গার্সিয়া মার্কেজের একটি বই। জেনারেলেকে জানতে লিখেছিলেন গ্রাহাম গ্রিন। পরিসরের অভাবে এই লেখায় আমি বিখ্যাত বই দুটির বিষয়-কথা বলব না। এই লেখার শিরোনাম পড়ে পাঠক ভাবতে পারেন, একজন জেনারেলের মন বোঝা বা বিশ্লেষণ করা বেসামরিক নাগরিকের পক্ষে কি সম্ভব? কারও মন বুঝতে মনোবিজ্ঞানীরা ব্যক্তির সমগ্র জীবনপর্বের সব কথা শুনতে চান, বুঝতে চান।
এরশাদের শৈশব-কৈশোরের এবং সৈনিক জীবন শুরুর পর্ব-অধ্যায় আমি কতটুকু জানি? বেসামরিক জনগণ জেনারেলদের মনমানসিকতার সব ‘কুচকাওয়াজে’র গভীর অর্থও বোঝে না। রাস্তায় ট্যাঙ্ক নেমে এলে বুঝতে চেষ্টা করে, জেনারেল তাঁর কাঁধের উজ্জ্বল সোনালি তলোয়ার গণতন্ত্রের কথা বলে কত দিন ঘোরাবেন পাবলিকের মাথার ওপর। এরশাদ ক্যাপ্টেন, মেজর, কর্নেল ইত্যাদি পদ সাফল্যের সঙ্গে পার করে একদিন হয়েছিলেন জেনারেল এবং এই দেশের রাষ্ট্রপতি। একসময় কবিতা লিখতেন (কবি মোহাম্মদ রফিক জেনারেলের কবি হওয়া পছন্দ করেননি, লিখেছিলেন: সব শালা কবি হতে চায়)।
এরশাদের কার্যকলাপ ও মন এক পাল্লায় এবং এই দেশের অধিকাংশ বাঙালি মুসলমানের মন ও কার্যকলাপ আরেক পাল্লায় রাখলে দেখা যাবে, মাপ হবে সঠিক। (এই বাক্যে ‘কলাপ’ শব্দটি বড় ব্যঞ্জনা ধরে, ‘শতবরণের ভাব-উচ্ছ্বাস কলাপের মতো করেছ বিকাশ’—কবি রবীন্দ্রনাথ ময়ূরপুচ্ছ অর্থে লিখেছেন। আমাদের জেনারেলের মন কখন মেঘের উড়ালে, ডান-বাঁয়ে ছাতা ধরার স্বভাবে ভাব-উচ্ছ্বাসে নেচে ওঠে, ধরে শতবরণ, সে কথা তিনিও ভালোমতো জানেন না। বলেছেন: ‘সকালে বলি এক কথা, বিকেলে আর এক কথা।’ কী জেনুইন পোয়েট!)
লর্ড ক্লাইভ নামে একটি বই লিখেছিলেন লর্ড মেকলে। লেখক তাঁর বইয়ে বাঙালির চরিত্র ও আচার-আচরণ সম্পর্কে ভালো মন্তব্য করেননি। ‘মিথ্যাবাদী’, ‘ঠগ’, ‘প্রতারক’, ‘পরশ্রীকাতর’, ‘সুবিধাবাদী’, ‘ভণ্ড’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে বাঙালি কী জিনিস মেকলে বলেছিলেন। মেকলেরাও ভালো ছিলেন না। মেকলের বলা বাঙালির মধ্যে সনাতন ধর্মের বাঙালিও ছিল।
আমাদের জেনারেল স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন। কে না ভালোবাসে স্বপ্ন দেখতে! বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তিনি স্বপ্ন দেখতেন শুক্রবার কোন মসজিদে নামাজ পড়বেন (অনেক দিন তিনি স্বপ্ন দেখে আর নামাজ পড়তে যান না। তিনি দামি পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে এবং অনুমান করি সুগন্ধি আতর মেখে জুমা শুরু হওয়ার বেশ আগেই চলে যেতেন স্বপ্নে দেখা মসজিদে। কী ধর্মপ্রাণ মানুষ!
কেউ কেউ জেনারেলের স্বপ্ন-বয়ান বিশ্বাসও করতেন। এদের মধ্যে আনোয়ার জাহিদের থাকার কথা। তিনি বলেছিলেন, জেনারেল যদি তাঁকে রাস্তায় ঝাড়ু দিতে বলেন, তিনি দেবেন। তিনি বড় সাংবাদিক ছিলেন। জেনারেল একজন বাঙালি মুসলমান, তাঁর মনের মধ্যে আসলেই কি নির্দিষ্ট মসজিদে নামাজ পড়া নিয়ে লর্ড মেকলে বর্ণিত ‘ভণ্ডামি’ ছিল? কদিন আগে দেখলাম, ‘নারীরা তেঁতুল’—এই তত্ত্বের জনক শফী হুজুরের কাছে জেনারেল গেছেন। হেফাজতের সমাবেশকে তিনি সমর্থন করেন। ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করেছিলেন এই জেনারেল।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এরশাদকে দুর্নীতির কারণে জেলে পুরেছিলেন। বাংলাদেশ একসময় পাঁচবার দুর্নীতিতে ১ নম্বরও হয়েছিল; এখনো আমরা দুর্নীতি করতে বড় পারদর্শী।
বিভিন্ন দেশ লুণ্ঠন করে বিশ্ববীরের খ্যাতি পেয়েছিলেন আলেকজান্ডার। তিনি এই উপমহাদেশে এসে তাঁর লুণ্ঠনসঙ্গী সেলুকাসকে বলেছিলেন: ‘কী বিচিত্র এই দেশ, সেলুকাস!’ আমার ধারণা, আলেকজান্ডার উপমহাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বৈচিত্র্য দেখে ওই মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর কথাকে এখন ব্যবহার করা হয় আমাদের আচার-আচরণের বহুবিধ অসংগতির ধারা মিলিয়ে। জেনারেলকে কোন বিশেষণে রাখব?
আমার সঙ্গে অনেকে একমত হতে পারেন, না-ও পারেন; আমাদের জেনারেল শৈশবেই ভালো ডিগবাজি দেওয়া শিখেছিলেন। সেদিন আফ্রিকান এক ফুটবল খেলোয়াড়কে দেখলাম, গোল করে দু-তিনটি ডিগবাজি দিলেন। তাঁর সহখেলোয়াড়েরা তাঁকে জড়িয়ে ধরার জন্য করছিলেন ছোটাছুটি। আমাদের দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের সমর্থকেরা এরশাদের ডিগবাজি বড় ভালোবাসেন, কখন কোন দলের পক্ষে ও বিপক্ষে গোল করবেন এবং ডিগবাজি দেবেন সে বিষয়ে তিনি এবং তাঁকে দলে নেওয়া লোকজনও জানেন না। এরশাদকে নিজেদের অপসুবিধার জন্য প্রয়োজনীয় করে তুলেছে আমাদের দুই বড় রাজনৈতিক দল। দুই দলের নেতারা জেনারেলের সঙ্গ পেতে কত কিছু করেন!
জেনারেলের সৈনিক জীবন, রাজনৈতিক জীবন, কবিপ্রেমিক মন, ধর্মীয় মন, ডিগবাজির কসরত এবং বাঙালির মন ও কর্ম সম্পর্কে মেকলে বর্ণিত কথামালা—এ সবকিছু পাওয়া যাবে এই দেশের অনেক বাঙালির মধ্যে। এই জেনারেল আমাদের সব কর্ম-অপকর্মের সমষ্টি। জেনারেলকে যখনই দেখি, মনে হয় ভদ্রলোক আমাদের জাতির সার্থক প্রতিনিধি। তাঁকে অনুরোধ, তিনি যেন আত্মহত্যা না করেন। তাঁর কর্মকাণ্ড থেকে আমাদের যদি আরও কিছু শিক্ষা হয়, শিক্ষা মানুষকে সৎ করে, সুন্দর করে, তা হলে জেনারেলকে আগামী দিনের বাঙালিরা সূত্র (রেফারেন্স) হিসেবে ব্যবহার করবেন এবং বলবেন, জেনারেল এরশাদের জীবনকর্ম থেকে যা কিছু শিখেছ, তা করো না!
জাহিদ হায়দার: কবি, উন্নয়নকর্মী।

প্রতিবন্ধী রুমকির এগিয়ে চলা

লিখতে কষ্ট হচ্ছে? জবাবে বলে, ‘না’। ভবিষ্যতে কী হতে চাও? ‘লেখাপড়ার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করে ভালো শিক্ষক হতে চাই। সংসারের অভাবও ঘোচাতে চাই।’

এভাবেই দৃঢ়তার সঙ্গে প্রশ্নের জবাব দিয়েছে শারীরিক প্রতিবন্ধী রুমকি খানম। মেয়েটি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষা দিচ্ছে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর এসি মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে।
রুমকি ঈশানগাতী রেজিস্ট্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রী। বাড়ি কাশিপুর ইউনিয়নের ঈশানগাতী গ্রামে। গত শুক্রবার ইসলাম ও নৈতিক শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা ছিল। পরীক্ষাকেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, দুটি বেঞ্চ একত্র করে তার ওপর বসে মনোযোগ দিয়ে লিখছে রুমকি। কোনো হাত-পায়েই পুরো বল পায় না সে। তাই বাঁ হাত ও পায়ের সাহায্যে কলম ধরে লিখছে। ডান পায়ের ওপর খাতা ও প্রশ্ন। এক লাইন লেখা হলে বাঁ পা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে খাতা ওপরে তুলে নিচের লাইন লিখছে।
পরীক্ষাকেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক (হল সুপার) হোসনে আরা পারভীন বলেন, এ অবস্থাতেও তার লেখার গতি স্বাভাবিক। পরীক্ষায় প্রতিবন্ধীরা ২০ মিনিট অতিরিক্ত সময় পায়। তবে সে গণিত পরীক্ষায় অতিরিক্ত সময় নেয়নি। অন্য বিষয়েও অতিরিক্ত সময়ের পুরোটি লাগেনি। তার লেখাও খুব সুন্দর।
ঈশানগাতী রেজিস্ট্রি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. রমজান আলী বলেন, রুমকি খুব মেধাবী ও আত্মবিশ্বাসী। প্রথম শ্রেণী থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত প্রত্যেক ক্লাসেই সে প্রথম হয়েছে। সুন্দর ছবি আঁকতে পারে সে। তার বাবা আবদুর রউফ মোল্লা এ বিদ্যালয়েরই সহকারী শিক্ষক।
রুমকির মা আবেদা সুলতানা বলেন, তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে রুমকি মেজো। জন্মগতভাবেই সে প্রতিবন্ধী। তবে লেখাপড়ায় খুবই মনোযোগী। নিজের প্রচেষ্টায় লেখা শিখেছে। সব সময় লেখাপড়ার মধ্যে থাকতে চায় সে। পাঠ্যবই ছাড়াও অন্য বইও নিয়মিত পড়ে। বাম হাত দিয়ে নিজেই খায়। তবে কাপড় পরা ও গোসল করাসহ অন্য সব কাজে অন্যের ওপর নির্ভরশীল।
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থের অভাবে রুমকির চিকিৎসা করা সম্ভব হয়নি। আমাদের কোনো জমিজমা নেই। অন্য কোনো আয় নেই। ওর বাবার সামান্য বেতনে কোনো রকমে চলে পাঁচ সদস্যের সংসার।’

ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য ১৫ ডিসেম্বর- বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধরেরা যোগ দেবেন

দক্ষিণ আফ্রিকার অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নেতাদের এক করতে যাচ্ছে। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে, শত্রুতা ভুলে উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম প্রান্ত থেকে বিশ্ব নেতারা দক্ষিণ আফ্রিকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য ১৫ ডিসেম্বর রোববার অনুষ্ঠিত হবে। পূর্ব কেপটাউনের কুনু গ্রামে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হবে। ১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই ওই গ্রামে জন্মেছিলেন তিনি।
গতকাল শুক্রবার দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার প্রতিবেদনে জানানো হয়, এর আগে পোপ দ্বিতীয় জন পল, প্রিন্সেস ডায়ানা, প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি, উইন্সটন চার্চিলসহ অনেক খ্যাতিমান ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের শেষকৃত্যে বিশ্বনেতারা অংশ নিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের থেকে ম্যান্ডেলা ভিন্ন। তাঁর আবেদন সর্বত্র ও ব্যাপক। তাই আধুনিক সভ্যতার ইতিহাসে এই শেষকৃত্য হতে যাচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্বদের মহা সম্মিলন।
ম্যান্ডেলার শেষকৃত্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে যোগ দেবেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা ও কয়েকজন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাজ্য থেকে প্রিন্স চার্লস, প্রিন্স উইলিয়াম ও প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের যাওয়ার কথা।
এ ছাড়া চীন, ইরান, কিউবা, ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি নেতারা যাবেন।
শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে ওবামার সঙ্গে ইরানের প্রেসিডেন্ট রুহানির প্রথমবারের মতো সাক্ষাত্ হতে পারে।

রাজনৈতিক নেতৃত্বের বাইরে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র, সংগীত, ধর্মীয় অঙ্গনের প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও এই অনুষ্ঠানে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ম্যান্ডেলার মরদেহ প্রিটোরিয়ার একটি সেনা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

কাল রোববার জাতীয় প্রার্থনা দিবস পালন করবে দক্ষিণ আফ্রিকা। আগামী সোমবার জোহানেসবার্গের উপকণ্ঠে ৯৫ হাজার আসনের একটি স্টেডিয়ামে জাতীয় শোক অনুষ্ঠান পালন করা হবে। ১১ ডিসেম্বর থেকে প্রিটোরিয়ায় তিন দিনের জন্য ম্যান্ডেলার মরদেহ রাখা হবে। এরপর ১৫ ডিসেম্বর পূর্ব কেপটাউনের কুনু গ্রামে তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হবে।

গত বৃহস্পতিবার দক্ষিণ আফ্রিকার স্থানীয় সময় রাত আটটা ৫০ মিনিটে জোহানেসবার্গের নিজ বাড়িতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ম্যান্ডেলা। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর চার মাস ১৭ দিন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের এই মহান নেতার মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় অবিলম্বে স্থগিতের আহ্বান

১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতা কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত।
স্বচ্ছ ও ন্যায় বিচার প্রশ্নে তা করা উচিত বলে মনে করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। গতকাল সংস্থটির এক প্রতিবেদনে এ আহ্বান জানানো হয়। ‘বাংলাদেশ: হল্ট এক্সিকিউশন অব ওয়ার ক্রাইমস অ্যাকিউজড’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি এইচআরডব্লিউ’র নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়েছে। কাদের মোল্লাকে আপিলের সুযোগ দেয়া উচিত বলেও মন্তব্য করা হয় ওই প্রতিবেদনে। এইচআরডব্লিউ’র এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেছেন, যে কোন পরিস্থিতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরোধিতা ও একে অপরিবর্তনীয়, অবমাননাকর ও নিষ্ঠুর শাস্তি হিসেবে বিবেচনা করে। তিনি বলেন, অতীত পর্যালোচনায় যেখানে মৃত্যুদণ্ডের বিধান কার্যকর করতে আইন পাস করা হয় এবং চূড়ান্ত রায় ঘোষণার পর সে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অধিকার দেয়া হয় না, সেসব ক্ষেত্রে এটা বিশেষভাবে তিরস্কারযোগ্য। মানবাধিকার সংগঠনটির অভিযোগ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে রায় দিয়েছে, সেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশে যুদ্ধপরাধের বিচার চায় বলে মন্তব্য করেন ব্র্যাড অ্যাডামস। কিন্তু, সেটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ফখরুলসহ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে খালেদার বৈঠক

দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠক করেছেন বিরোধী নেতা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।
সোমবার রাতে তার গুলশানের বাসভবনে জাতিসংঘের সহকারী  মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠকের পরপরই এ বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক শেষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনা চলছে, আলোচনা এখনও শেষ হয়ে যায়নি। যিনি (তারানকো) এসেছেন আলোচনা শেষ হলে কি দাঁড়াবে তা তিনি জানাবেন। আলোচনা শেষ হলে আমরাও আমাদের বক্তব্য জানাবো। এসময় সাংবাদিকদের কোন প্রশ্নের উত্তর দেননি মির্জা আলমগীর। এর আগে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, আন্দোলন চলছে, আন্দোলন চলবে। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর সঙ্গে খালেদার জিয়ার বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা নিয়ে মন্তব্য করার মতো সময় এখনও হয়নি। বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. ওসমান ফারুক, সাবিহউদ্দিন আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। প্রথমে খালেদা জিয়ার বাসভবন থেকে  বেরিয়ে যান শমসের মবিন চৌধুরী। এরপর পর্যায়ক্রমে বের হন নজরুল ইসলাম খান, ওসমান ফারুক। এরপর সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে আবার বৈঠক করেন খালেদা জিয়া। রাত ৯টার দিকে খালেদার জিয়ার বাসভবন থেকে বের হন ড. মোশাররফ হোসেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীর বের হয়ে সাবিহউদ্দিনের গাড়িতে করে খালেদা জিয়ার বাসভবন ত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন পর নিরাপদ অবস্থানে থাকার পর বিরোধী নেতার সঙ্গে জাতিসংঘ দূতের বৈঠকের সূত্র ধরে প্রকাশ্যে আসেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা আলমগীর। এবং খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি সর্বশেষ ২৯শে নভেম্বর নয়াপল্টনে গায়েবানা জানাজায় অংশ নিয়েছিলেন।

সরল গরল- রাষ্ট্রপতি ও সুপ্রিম কোর্টই শেষ ভরসা by মিজানুর রহমান খান

রাষ্ট্রপতি যে মুহূর্তে মনে করবেন সংলাপ ও সমঝোতার পথ রুদ্ধ, সেই মুহূর্ত থেকে তিনি একটি অসাধারণ প্রতিকারের কথা ভাবতে পারেন।

উচ্চশিক্ষা- সুনাগরিকত্বের পুঁজি শক্তিশালী করো by মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান

আমার দাদার বাবা ছিলেন একজন কৃষক, আমার দাদা কৃষক-কাম-সিল্ক ব্যবসায়ী এবং আমার বাবা একজন আইনজীবী। শিক্ষাই ছিল আমার একমাত্র পুঁজি।

শিশু মতামত জরিপ ২০১৩- বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের কাছে শিশুদের প্রত্যাশা

তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি যৌথ প্রকল্পের আওতায় ইউনিসেফের পরিচালনায় ও সেভ দ্য চিলড্রেন, অ্যাকশন এইড,

দেশে কি মহাপ্রলয় আসন্ন? by অরবিন্দ রায়

লোকনাথ বা মোহাম্মদী পঞ্জিকায় মহাপ্রলয়ের দিন-তারিখ উল্লেখ নেই। সূর্য বা চন্দ্র গ্রহণের আগাম দিনক্ষণের কথা যেমন লেখা থাকে, মহাপ্রলয়ের দিনক্ষণ নিয়ে আগাম তথ্য এ যাবৎ কেউ দেয়নি। ভবিষ্যতে দেবে কি-না আমার জানা নেই। শুনেছি মহাপ্রলয়ের দিন সূর্য পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসবে। আর এর হলকায় ছারখার হবে সব কিছু। তবে বর্তমানে দেশের যা পরিস্থিতি তাতে ছারখার হওয়ার জন্য মহাপ্রলয়ের অপেক্ষায় থাকতে হবে না। জ্যান্ত মানুষ ঝলসানোর জন্য সূর্যকেও আর কষ্ট করে পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসার প্রয়োজন নেই। কেননা শরীর ঝলসানোর জন্য পেট্রল বোমাই যথেষ্ট, যার আঘাতে ইতিমধ্যে অনেকের শরীর ঝলসে গেছে। তাদের কেউ কেউ চলে গেছেন না ফেরার দেশে। অবশিষ্টরা ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে অসহনীয় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।
এ বুঝি শেখ ফজলুল করিমের স্বর্গ-নরক কবিতার চিত্রকল্প। কোথায় স্বর্গ? কোথায় নরক? কে বলে তা বহুদূর? মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক মানুষেতে সুরাসুর। কবিতায় বর্ণিত সেই স্বর্গ-নরকের মতো মহাপ্রলয়ও বোধকরি মানুষের ওপর আগাম নেমে আসার পাঁয়তারা করছে। আজকাল শিক্ষিত ও ভদ্র ঘরের অনেক ছেলেই মহাপ্রলয় ডেকে আনার কাজে সদা ব্যস্ত। পান থেকে চুন না খসতেই মানুষ মাপের রামদা ও ভোজালি নিয়ে প্রতিপক্ষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে তারা। এ যেন কারবালার ঘটনায় বর্ণিত এজিদ বাহিনীর মিনি সংস্করণ। জানি না এরা কোন এজিদের বংশধর, যারা প্রতিপক্ষকে মেরে ফেলার জন্য খঞ্জর উঁচিয়ে নিত্য প্রহর ধাওয়া করছে।
দেশের শিরায় শিরায় এখন সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা বহমান। তবে একে সংসদীয় গণতন্ত্র না বলে ‘সংঘাতীয় গণতন্ত্র’ বলা যেতে পারে। বাস্তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কেবল সংঘাতীয় গণতন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এর বাস্তব চিত্র আরও ভয়াবহ। মূলত দেশে এখন নামে গণতন্ত্র, কাজে রাজতন্ত্র, বাস্তবে নাইতন্ত্র চলছে। কেবল ক্ষমতা লাভের জন্যই উভয় দল পরস্পরের কাটা মুণ্ডের মালা গলায় ঝোলাতে চাইছেন। কাজেই এ তন্ত্রকে কোনোমতেই গণতন্ত্র বলা যায় না। রাজার উত্তরসূরিরাই রাজা হওয়ার বিষয়টি মোটামুটি রীতি ও নিয়তিতে পরিণত হয়েছে। কাজেই এ পদ্ধতিকে রাজতন্ত্র বলা যেতেই পারে। আবার ক্ষমতা হাত বদলের এ সময়ে অনেককেই আদর্শবর্জিত হতে দেখা যায়। আদর্শ কেনা-বেচার হাটটিও বেশ জমজমাট হয়ে ওঠে। অগ্নিপরীক্ষার এ মৌসুমটায় যেহেতু কাউকেই কোনো তন্ত্রের ফ্রেমে বাঁধা যায় না, কাজেই একে নাইতন্ত্র বলতে দোষের কিছু নেই।
মজার বিষয় হচ্ছে, এসব অপকর্ম করার লাইসেন্স জনগণই তাদের হাতে তুলে দেয়। আর প্রতি পাঁচ বছর পর পর লাইসেন্স নবায়নের যখন সময় আসে, তখন ঝগড়া-বিবাদের প্রদর্শনী বসে। এ বায়স্কোপ না দেখলে বিশ্বাস করার উপায় থাকে না যে বিবাদ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, এসব বিবাদের ফলাফল যাই হোক, তার ভাগিদার যারা কখনোই হয় না তাদেরই এসব ফ্যাসাদে প্রাণ হারাতে দেখা যায়। বিষয়টি বর ও কনে পক্ষের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার মতো। লাশও পড়ে কয়েক ডজন। কিন্তু তাতে বর-কনের ফুল শয্যায় এতটুকু ব্যাঘাত ঘটে না। ঠিক এ কথাটি অনেকেই সোজা-সাপ্টাভাবে বলেন- ‘মজা লোটে ফজা ভাই, পাড়া-পড়শীর ঘুম নাই’। এই ফজা ভাইদের হাতে ক্ষমতার সুধা তুলে দেয়ার জন্যই আমজনতা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু নির্মম হলেও সত্য যে, পথঘাটের আন্দোলনে জীবন হারানো কোনো পরিবারের সদস্যকে অদ্যাবধি মন্ত্রী-মিনিস্টার বানানো হয়নি। মন্ত্রী বানানো দূরে থাক; ঘুষ ছাড়া পিওনের চাকরিও কেউ পেয়েছে বলে আমার জানা নেই। অথচ এরাই আজ বুকের রক্তে রঞ্জিত করছে পিচঢালা পথ। নিজে পঙ্গু হওয়ার পাশাপাশি সমাজকেও পঙ্গু করছে। পরিবারগুলো পাওনা হিসেবে পাচ্ছে গগনবিদারী কারবালার মাতম।
কী হবে? কী হতে যাচ্ছে- এ নিয়ে আতংকের শেষ নেই। একাত্তরে নয় মাস পর তবু একটা ফয়সালা হয়েছিল। চলমান অশান্তির ফয়সালা আদৌ কখনও হবে কি-না তা বিধাতা ছাড়া কেউই বলতে পারবেন না। মাঝ শিঁথির মতো দুই ভাগে ভাগ হয়ে পরস্পর পরস্পরকে নিশ্চিহ্নের খেলায় মেতে উঠেছে তারা। শক্তি ও তেজে কেউই কোনো অংশে কম নয়। কাজেই নিশ্চিহ্ন মিশনের সামগ্রিক পরিণতি কী, তা সাধারণ অন্ধেরও জানা থাকার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক অন্ধরা ক্ষমতা ছাড়া কিছুই দেখতে পান না। নরহত্যার এ খেলায় নিরীহের পাশাপাশি নেতা, কর্মী, সমর্থক, পিকেটার কেউই বাদ যাচ্ছে না। আজ যদু তো কাল মধু। লাশ পতনের রেট ক্রমশ বাড়ছে। বর্ধনশীল এ রেট ছাপাখানার ছপাছপ গতিতে গিয়ে ঠেকলেও মনে হয় না কারও হুঁশ হবে। কাজেই এ পরিস্থিতিকে মহাপ্রলয় বলা যেতেই পারে। এখন চলছে সেমি প্রলয়। সামগ্রিক পরিস্থিতির সহসা কোনো পরিবর্তন আনা না হলে মহাপ্রলয়ের তারিখটি মনে হয় ৫ জানুয়ারি ২০১৪।
অরবিন্দ রায় : একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কারিগরি পরিচালক

ব্যারিস্টার নোরা শরীফ : বাংলাদেশের এক বোন, বন্ধু, ভক্ত এবং যোদ্ধা by মহিউদ্দিন আহমদ

ইউরোপীয় মহিলা, দীর্ঘাঙ্গি, শাড়ি পরিহিতা, হাতে কুলাজাতীয় কিছু একটা, ধীরে ধীরে হেঁটে আসছেন দূর থেকে। কাছে আসতে ঠিকই দেখা গেল, কুলায় ধূপ ধুনা দূর্বা, এবং মহিলাটি নোরা, ব্যারিস্টার নোরা শরীফ। গত শুক্রবার লন্ডন সময় রাত ১১টায় নোরা মারা গেছেন, লন্ডনে তাদের বাসায়। পরদিন দুপুরে খবরটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রথম জানালাম এজেডএম মোহাম্মদ হোসেন মঞ্জুকে। তারপর আমাদের সুপ্রিমকোর্টের বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সারকে। নোরাকে ঘিরে ’৭১-এর আগে-পরে লন্ডনে আরও হাজার হাজার বাংলাদেশীর মতো আমাদের প্রত্যেকেরই অনেক অনেক মধুর স্মৃতি আছে। টেলিফোনে নোরার মৃত্যুর খবরটি বলতেই মঞ্জু কয়েক মিনিট কাঁদল। তারপর বলল, উপরে, লেখার শুরুতেই, নোরাকে বর্ণনা করে দেয়া স্মৃতিটি।
এ জেড এম মোহাম্মদ হোসেন মঞ্জু একাত্তরে যুক্তরাজ্যে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ছাত্র সংগ্রাম কমিটির প্রধান ছিলেন। তার ডেপুটিদের একজন ছিলেন ড. খোন্দকার মোশাররফ হোসেন, এখন বিএনপির শীর্ষ নেতাদের একজন। প্রবাসে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান পুরুষ বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে যখন কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হতো, দেখেছি তিনি যে তিন-চারজন মানুষের সঙ্গে সমস্যা-সংকট নিরসনে পরামর্শ করছেন, তাদের একজন এই মঞ্জু। অন্য দু’জন শেখ আবদুল মান্নান এবং লুলু আপা, মানে ভিকারুন্নিসা নূন স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা হেডমিস্ট্রেস লুলু বিলকিস বানু। শেখ মান্নান ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ডান হাতের মতো।
মঞ্জু বলছিল, কুলা হাতে নোরা আসছিলেন, কারণ পাশের ‘অল্গেট’-এর একটি হলে বেগম সুফিয়া কামালকে একটি সংবর্ধনা দেয়া হবে ‘পিউর’ বাঙালি রীতিনীতিতে। তাই ধূপ ধুনা দূর্বার ব্যবস্থাও। এবং নোরা ছাড়া এমন একটি আয়োজনের বড় একটা দায়িত্ব নেয়ার মতো মানুষ প্রবাসে, বিদেশে কমই পাওয়া যায়। সেই প্রবাসটি বাংলাদেশী অধ্যুষিত হলেও। বছর তিনেক আগের আর একটি অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মঞ্জুর কথা বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল বারবার। ঢাকা থেকে জেট এয়ারওয়েজের একটি বিমানে উঠে মঞ্জু দেখে বিমানের প্রথম দিকে নোরাও উপবিষ্ট আছে। মঞ্জুর সিট পেছনের দিকে। মঞ্জু তখন কিছুটা অসুস্থ। নোরা তা লক্ষ্য করলেন। দিল্লিতে জেট এয়ারওয়েজের প্লেনটি কোনো এক কারণে ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় নামতে পারল না। লন্ডন যাওয়ার কানেকটিং ফ্লাইট মিস করলেন তারা। দিল্লি বিমানবন্দরে নানা রকমের ঝামেলায়ও পড়লেন এই দু’জন। এর মধ্যে মঞ্জুর অসুস্থতা বেশ বেড়ে গেল। অসুস্থ মঞ্জুকে আগেই লক্ষ্য করেছিলেন বলে নোরা মঞ্জুর জন্য অপেক্ষা করতে থাকলেন প্লেন থেকে নামার সময়। দু’জনে একত্রে নামলেন; তারপর বিমানবন্দরে মঞ্জুর জন্য ডাক্তার ডাকা, ডাক্তারের পরামর্শে মঞ্জুকে যখন পাশের ক্লিনিকে নিতে হল, তখন থেকে শুরু করে পরের প্রায় ২৪ ঘণ্টা মঞ্জুকে সঙ্গ দিয়েছেন নোরা, ওষুধ-পথ্য খাইয়েছেন। তারপর লন্ডনে নেমে তাকে বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করে তবেই নোরা এই দায়িত্ব থেকে অবসর নিলেন।
নোরাকে নিয়ে এবার আমার কিছু কথা।
লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে সেকেন্ড সেক্রেটারির চাকরিটি ছেড়ে দিলাম প্রকাশ্য এক ঘোষণায়, ১৯৭১-এর ১ আগস্ট, লন্ডনের জিরো পয়েন্ট- লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারে, বাংলাদেশীদের আজ অবধি বৃহত্তম সমাবেশে। তার তিন সপ্তাহ পর ২৩ আগস্ট আমাদের প্রথম সন্তান অরুর জন্ম। মেয়েটি ঠিকই, স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নিল বাসার পাশের ফুলহামের এক সরকারি হাসপাতালে। কিন্তু সদ্যোজাত শিশুর লালন-পালন সম্পর্কে অরুর মা বা আমার যে কোনো ধারণা নেই। বাংলাদেশ, ভারত এসব দেশে শিশুর নানি, দাদি, চাচি, ফুফি, বোন- কত জাতের কতসব আত্মীয় সাহায্য নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু লন্ডনে এসব পাব কোথায়। সুতরাং ভরসা নোরা, বন্ধু সুলতান শরীফের আইরিশ স্ত্রী। সুলতান তখন মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সারির নেতা, লন্ডন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক; এখন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি।
অরু তার জন্মের পর তিন-চার দিন হাসপাতালে থাকল। তারপর হাসপাতাল যখন তাকে আর রাখতে চাইল না, কয়েক ঘণ্টার জন্য তাকে বাসায় আনলাম। তারপর দিলাম দক্ষিণ লন্ডনের বাল্হামে নোরা এবং সুলতান শরীফদের বাসার উদ্দেশে ছুট। দু’তিন দিনের মাথায় যা আশংকা করেছিলাম তাই ঘটল। মেয়ে রাত ২টা-৩টার দিকে একদিন এমন চিৎকার করে কান্না জুড়ে দিল যে কোনোভাবেই শান্ত করতে পারছিলাম না। কয়েক মিনিট পর বাধ্য হয়ে তুললাম ঘুম থেকে নোরা-সুলতান শরীফ দম্পতিকে। নোরা অরুকে একাঁধ ওকাঁধ করল কয়েকবার, তারপর বসে কোলে নিয়ে উপুড় করে পিঠে ট্যাপও করল কয়েকবার, পানিজাতীয় কিছু একটা খাওয়ালোও বোধ হয়, তারপর মেয়ে শান্ত হল এবং পাড়া জুড়ালো।
অরুকে নিয়ে এখানে সেই পাঁচ-সাত দিন থাকাকালেই নোরা এক সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আমার চা খাওয়া দেখে বলেছিল, You Bengalees, you produce tea; but you do not know how to take tea. Half cup of milk and half cup of sugar; what of tea is left there? (তোমরা বাঙালিরা চা উৎপাদন কর ঠিকই, কিন্তু তোমরা চা খেতে জান না। কাপের অর্ধেক দুধ, বাকি অর্ধেক চিনি; তাহলে চায়ের কি থাকল?)
এবার আর একটি অভিজ্ঞতা-
মহিউদ্দিন আহমেদ জায়গীরদার এখন উত্তরায় পূর্ব পাশে আমার নিকটতম প্রতিবেশী, ভুটানে আমাদের রাষ্ট্রদূত ছিলেন; ৭১-এ তিনি নাইজেরিয়ার রাজধানী লাগোসে পাকিস্তান হাইকমিশনের একজন থার্ড সেক্রেটারি। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন পাকিস্তান হাইকমিশনের এই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করবেন। ৭১-এ মুজিবনগর সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল বাঙালি কূটনীতিবিদ এবং অন্যসব কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাকিস্তান দূতাবাস থেকে তাদের চাকরি ছেড়ে দেবেন এবং এই মর্মে তাদের নিদের্শও পাঠানো হয়। তাদের মধ্যে যারা পারবেন তারা কলকাতার মুজিবনগর সরকারে বা যারা পারবেন না তারা লন্ডনে আমাদের সদ্য প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ মিশনে রিপোর্ট করবেন। তো জায়গীরদার সাহেব ঠিক করলেন, তিনি লন্ডনেই আসবেন। তারা পাঁচজন, - স্বামী-স্ত্রী তারা দু’জন এবং তাদের এক ছেলে দুই মেয়ে। সময়টা বোধহয় সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি। বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী বোধহয় তখন ইউরোপ সফরে। সুতরাং লন্ডনের হিথরো বিমানবন্দরে তাদের সংবর্ধনা এবং থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করার দায়িত্বটা আমার উপরই পড়ল। কিন্তু আমার কোনো চিন্তা-দুশ্চিন্তা নেই। অরুকে সামাল দেয়ার ব্যাপারটা ইতিমধ্যে তার মা মোটামুটি শিখে ফেলেছেন। সোস্যাল ওয়েলফেয়ার ডিপার্টমেন্ট থেকেও এক মধ্যবয়সী মহিলাও সপ্তাহে দু-একবার শিশুর লালন-পালন বিষয় এক ঘণ্টা-দু’ঘণ্টার ট্রেনিং দিতে আসে।
সব ধরনের কাজে, আমার বড় ভরসা নোরা এবং সুলতান শরীফ। জায়গীরদারদের আসার ব্যাপারটিও তাদের জানালাম। এই দম্পতি এক কথাতেই জায়গীরদার পরিবারকে তাদের বাসায় তুলতে আগ্রহী হলেন। নির্ধারিত দিনে সুলতানকে নিয়ে আমি গেলাম আমার অস্টিন-১৩০০ গাড়ি চালিয়ে হিথরোতে। তারা বেরিয়ে আসলেন ঠিক সময়েই তাদের বাক্স-পেট্রা নিয়ে। আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে তাদের সংবর্ধনা জানালাম। জায়গীরদার সাহেবকে আমি আগে থেকেই চিনতাম। ইসলামাবাদে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আমরা কিছুদিন একত্রে ছিলাম। কিন্তু তাদের পাঁচজনের ব্যাগ-বাক্স নিয়ে বিপদে পড়লাম। আমি গাড়ি চালালেও গাড়িতে সাতজন তো যেতে পারব না। তারপর লাগেজ, ব্যাগেজের কি হবে?
ভাড়ায় একটি ট্যাক্সি নিলে সমস্যার সমাধান করা যায়। কিন্তু তাতে যে তিন পাউন্ড লাগবে! তিন পাউন্ড খরচ করার মতো অবস্থা আমার তখন নেই। এ ছাড়া যে কোনো খরচের সময়ে আমরা চিন্তা করি, ওই খরচের টাকা দিয়ে কয়টি বুলেট কেনা যাবে? বা রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কয় জোড়া জুতা বা জামা-সোয়েটার কেনা যাবে? সুতরাং ট্যাক্সি ভাড়া এবং তিন পাউন্ড খরচের বিবেচনা দু’তিন মিনিটের আলোচনার পর বাদ পড়ল। কিন্তু বিকল্প কি? কয়েক মিনিটে বিকল্পও বেরিয়ে এলো।
এই প্রান্ত থেকে আমি জায়গীরদারদের পাঁচজনকে নিয়ে আমার গাড়িতে সুলতানের বাসায় আসব। হিথরোতে সুলতান জায়গীরদার লাগেজ সামাল দেবে। আর ওই প্রান্ত থেকে নোরা তাদের মরিস মাইনর বা মিনি গাড়িটা নিয়ে হিথরোতে আসবে, সুলতান এবং লাগেজগুলো উঠিয়ে আবার বালহামের ২৫ বালবার্নি গ্রোভের বাসায় ফিরে যাবে। কিন্তু আমি বাসায় ঢুকব কিভাবে? সুলতানের কাছে তো বাসার চাবি নেই, নোরার কাছে চাবি, কিন্তু নোরাও তখন গাড়িতে হিথরোর উদ্দেশে। চাবি সংকটের সমাধান এভাবে হল : নোরা বাসার চাবি দরজার ফাঁকে, নিচে, ম্যাটের ভেতর লুকিয়ে রেখে আসবে। বাসায় পৌঁছে আমি চাবি খুঁজে বের করে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকব।
এ সবই করেছিলাম সেদিন শুধু তিন পাউন্ড বাঁচাতে। প্রতি পাউন্ডে তখন এগার-বারো টাকা। বিশ্বাস হয়?
তিন.
জন্মসূত্রে নোরা ছিলেন একজন আইরিশ, জন্ম আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে। সম্ভ্রান্ত পরিবারেই তার জন্ম হয়েছিল। বাবা শ্যন এফ মারে (Sean F. Murray) আইরিশ কারেন্সি বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ৬ বোন, ৩ ভাইয়ের মধ্যে নোরা দ্বিতীয় ছিলেন। নোরা লিংগুইস্টিক্স-এ গ্র্যাজুয়েশন করেন ডাবলিন, তারপর কৃষি বিষয়ে কিছু একটা পড়তে গেলেন ফ্রান্সে। সেখান থেকে আসেন লন্ডনে ব্যারিস্টারি পড়ত, এখানেই সুলতানের সঙ্গে পরিচয়, ছয় দফা আন্দোলনের সময়। ওই সময় নোরা, সুলতান, মঞ্জু, বিচারপতি মানিক, সবাই লন্ডনে ব্যারিস্টারির ছাত্র। সেই সূত্রে পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। সুলতানের সঙ্গে নোরার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। সংশ্লিষ্টতা বাড়তে থাকে বাঙালিদের সব রকমের আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গেও। তারপর ১৯৬৮-এর ৩০ সেপ্টেম্বর তাদের প্রণয় পরিণত হয় পরিণয়ে। তখন থেকে বাঙালিদের আন্দোলন সংগ্রামের যত প্লাকার্ড, ফেস্টুন একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় বহনের দায়িত্ব নোরার, তার গাড়িতে। ৭২-৭৪-এ, স্বাধীন বাংলাদেশে নোরা তিন বছর কাটিয়েছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের একজন শিক্ষক হিসেবে; একেবারে পুরোপুরি একজন বাঙালি নারী হিসেবে। ল্যাটিন ভাষা জানতেন নোরা। দক্ষ ছিলেন আইরিশ, ইংরেজি, বাংলা, ফ্রেঞ্চ ও ইটালিয়ান ভাষাতেও। বাঙালিদের সঙ্গে তিনি বাংলাতেই কথা বলতেন। বাসায় ও বাইরের প্রায় সব অনুষ্ঠানে শাড়ি পরতেন তিনি। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগকে নিয়ে সুলতান শরীফ তার পুরো জীবনটা কাটিয়েছেন, এখন তার আরও বড় দায়িত্ব। কিন্তু দিনে ৪ চারবার ইনসুলিন নিতে হয়। হার্টের অপারেশন একবার হয়ে গেছে, এখন কিডনিও আক্রান্ত। সুলতানকে তার সব ব্যস্ততা এবং দায়িত্ব পালনে এত বছর সামাল দিয়েছে নোরা। ঢাকায়, আমরা নোরা শরীফদের বন্ধুদের এখনকার দুশ্চিন্তা, সুলতান শরীফকে এখন দেখবে কে?
তাদের দুই মেয়ে রাজিয়া, ফওজিয়া- দুজনই ইংল্যান্ডেই আছে। তবে লন্ডন থেকে শ’খানেক মাইল দূরে। স্বামী-সংসার নিয়ে আছে। তাদের তিন সন্তান। তারাও ভালোই আছে।
’৭১-এর বিজয়ের কয়েক মাস পর ম্যারিয়েটার অস্বাভাবিক মৃত্যু আমাদের অনেককে সাংঘাতিক এক ধাক্কা দিয়েছিল। ’৭১-এ আমাদের মুক্তিযুদ্ধে এক ইংরেজ তরুণী এই ম্যারিয়েটার ভূমিকা এবং অবদানের ওপর আমার তিনটি লেখা আছে।
এবার আমাদের ’৭১-এর ‘লন্ডনের ফকির সমিতি’র সদস্যদের সর্বশেষ ধাক্কাটি দিলেন আইরিশ, বাংলাদেশ প্রেমিক নোরা। - মাঝখানে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, শেখ আবদুল মান্নান, লুলু বিলকিস বানু- একেকটি থোকা থোকা নাম।
লন্ডনে অসুস্থ আছেন যুক্তরাজ্য ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আরেক নেতা নজরুল ইসলাম আলো। ঢাকায় অসুস্থ এ জেড মোহাম্মদ হোসেন মঞ্জু। মঞ্জু এখন কালিয়াকৈরে চন্দ্রা স্পিনিং মিলস্রে ম্যানেজিং ডাইরেক্টর। কিন্তু নিয়মিত অফিসে বা ফ্যাক্টরিতে আসা-যাওয়া করতে পারে না। আমাদের সেই ’৭১-এর ফকির সমিতির সদস্যদের বয়সও তো কম হল না। প্রত্যেকেই এখন ’৭০-এর ওপর। ১৩ বছর ধরে আমার অবসর জীবন, ঢাকায় থাকি। আশংকা, দুশ্চিন্তা- কখন কী শুনি।
শেখ হাসিনার এই মহাজোট সরকারটি একটি অসাধারণ কাজ করেছে- ’৭১-এ আমাদের যেসব বিদেশী বন্ধু আমাদের বিপদের দিনে পাশে দাঁড়িয়ে আমাদের সাহস, উৎসাহ, প্রেরণা দিয়েছেন, সরাসরি মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছেন কেউ কেউ, তাদের প্রায় সবাইকে সম্মাননা দিয়েছেন, তাদের মধ্যে নোরাও ছিলেন। দুই বছর আগে, ২০১২-এর ২৭ মার্চ, ‘ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার অনার’ নিতে তিনি সুলতানকে নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। এই সম্মাননাপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশেষ ডিনারে আপ্যায়িত করেছেন। নোরাকে নিয়ে আমার সর্বশেষ স্মৃতিটা হচ্ছে- সোনারগাঁও হোটেলে এমন একটি ডিনার শেষে বিদায় নেয়ার সময় হোটেলের বলরুমের দরজায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা খুনসুটি করছেন নোরার সঙ্গে, পাশে সুলতান শরীফ দাঁড়িয়ে হাসছেন এবং তাদের এই খুনসুটি উপভোগ করছেন।

প্রত্যাশা বন্দি হয়ে আছে মাননীয়দের মগজে by মোকাম্মেল হোসেন

জ্ঞান ফিরতেই লোকটার মুখ দেখতে পেল সাবিকুন। পাশের বিছানায় চিত হয়ে পড়ে আছে। সারা শরীর সাদা কাপড়ের ব্যান্ডেজ দিয়ে মোড়ানো। দেখে মনে হচ্ছে, কাফনে আবৃত একটি লাশ। বাসের মহিলা আসনে সাবিকুন ছাড়া আর কেউ ছিল না। লোকটা পাঁচ-ছয় বছরের একটি ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে বাসে ওঠার পর সাবিকুনের পাশেই বসেছিল। বাস শাহবাগ পৌঁছার পর ছেলেটি হঠাৎ হাত নেড়ে বলে ওঠে-
: আব্বু- পতাকা।
-কই!
এক ফেরিওয়ালা ফুটপাতে লাল-সবুজের পতাকা ফেরি করছিল। ছোট্ট ছেলেটি সেদিকে লোকটার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে-
: ওই যে...
কৌতূহলী এক জোড়া নবীন চোখের সঙ্গে এক জোড়া বয়স্ক চোখ লাল-সবুজে নিমগ্ন হয়। ছেলেটি বায়না ধরে-
: আব্বু, আমারে একটা পতাকা কিইন্যা দিবা! অসীম মমতা নিয়ে লোকটিকে ছেলের মুখের দিকে তাকাতে দেখে সাবিকুন। ছেলের মাথায় বিলি কাটতে কাটতে লোকটা ফেরিওয়ালাকে ডাক দেয়। বাসের চাকা নড়তে শুরু করার ঠিক আগ মুহূর্তে সাবিকুনের মনে হল, জানালা দিয়ে একটা কালো বাদুড় উড়ে এসে বাসের মধ্যে আছড়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আগুনের লেলিহান শিখা বাসটাকে গ্রাস করে ফেলে। সাবিকুন বাসের দরজা লক্ষ্য করে লাফ দেয়। পোড়া শরীর নিয়ে বাস থেকে নিচে গড়িয়ে পড়ার পরপরই জ্ঞান হারায় সে। সে যে একটা হাসপাতালে আছে, এটা সাবিকুন বুঝতে পারে। হাসপাতালের পরিচয় উদ্ধারের জন্য চারপাশে নজর বুলায় সাবিকুন। সাবিকুনকে নড়াচড়া করতে দেখে একজন নার্স এগিয়ে আসে। নার্সের কাছে সাবিকুন জানতে চায়-
: এইটা কোন হাসপাতাল?
নার্স যান্ত্রিক গলায় উত্তর দেয়-
: এটা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। আপনি এ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে আছেন।
মোবাইল ফোনটা হাতব্যাগের মধ্যে রেখেছিল সাবিকুন। লাফ দেয়ার সময় কোলের ওপর রাখা হাতব্যাগটা সে হাতে নিয়েছিল কিনা মনে করতে পারল না। বাসায় খবর দেয়া দরকার। নার্সকে কথাটা জানাতেই সে বলল-
: ফোন নম্বর বলতে পারবেন?
-পারব।
: বলেন।
নার্স এপ্রোনের পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে সাবিকুনের দেয়া নম্বরে কল করে। ওপাশ থেকে হ্যালো শোনা যেতেই সাবিকুনের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেয় নার্স। সাবিকুন কানে ফোন ঠেকিয়ে শাশুড়ির গলা শুনতে পায়।
শাশুড়ির কণ্ঠ শুনে সাবিকুনের দুই চোখে প্লাবনের ধারা নামে। তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে-
: মা, মাগো- আমি বাঁইচ্যা আছি...
কথা বলতে গিয়ে সাবিকুন দেখল, সে কোনো শব্দ উচ্চারণ করতে পারছে না। গলা দিয়ে শুধু ফ্যাসফ্যাস আওয়াজ বের হচ্ছে। বুকের গভীর থেকে উৎসারিত অন্তহীন হাহাকার ও কান্নার স্রোত পাথরচাপা দিয়ে বেঁচে থাকার আনন্দ সংবাদটা শাশুড়িকে জানায় সে। ঘড় ঘড় আওয়াজ শুনে সকচিত হয় সাবিকুন। লোকটা হাঁ করে দম নেয়ার চেষ্টা করছে। কোরবানি দেয়া পশুর কণ্ঠনালী থেকে বের হওয়া আওয়াজের সঙ্গে এ আওয়াজের অনেকটা মিল রয়েছে। সাবিকুন নিজেকে প্রশ্ন করে, মানুষ পশু কোরবানি করে আল্লাহপাকের সন্তুষ্টি লাভের জন্য। এ মানুষটা কার সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি হয়েছে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেশের চলমান রাজনীতির কথা মনে হয় তার। সাবিকুন ভাবে, এ কেমন রাজনীতি- যা নাগরিকদের নিরাপত্তা দেয়ার বদলে জীবনসংহারী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়! বিপজ্জনক এ রাজনীতি তার মতো অসংখ্য মানুষের জীবন এমন একবৃত্তে বন্দি করে ফেলেছে-তারা ঘরে বসে থাকলেও বিপদ, বাইরে বের হলেও বিপদ। সাবিকুন কাজে না গেলে রাজনীতি তার খাবারের সংস্থান করবে না। তাকে না খেয়ে মরতে হবে। আবার খাবারের সংস্থানের জন্য কাজে যাওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তায় বের হলে জীবিত অবস্থায় ঘরে ফিরতে পারবে কিনা, তা তার জানা নেই। অবস্থাটার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে সাবিকুনের ছোটবেলার একটি ঘটনার কথা মনে পড়ল। সাবিকুন বান্ধবীদের সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছিল। হঠাৎ শোনে- পাশের বাড়ির হাতেম বেপারি খুব হৈচৈ করছে। সাবিকুন ও তার বন্ধুরা সেখানে গিয়ে দেখে, বেপারির বউ রান্নাঘরে বসে চাল বাছছে। বেপারি চিৎকার-চেঁচামেচি করে চাল বাছতে বউকে নিষেধ করছে। বেপারির কথায় তার বউ কর্ণপাত না করায় বেপারি লাফ দিয়ে তার সামনে গিয়ে বলল-
: তরে নিষেধ দিছি, হেরপরও তুই চাইল বাছতেছস কী জন্য?
বেপারির বউ নির্বিকার ভঙ্গিতে তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। বউয়ের নির্লিপ্ততা দেখে বেপারি আরও রেগে যায়। বলে-
: এই চাইল বাইছ্যা তুই ভাত রানবি- আর অই ভাত আমি খামু! তর ভাতের খ্যাতা পুড়ি। তুই আমার পাকঘর থেইক্যা অহনই বাইর হ।
বেপারির বউ এ কথা অগ্রাহ্য করে চুলার কাছে যেতেই বেপারি দাঁত কিড়মিড় করে বলে-
: আমার বাপ একটা- জবানও একটা। তুই অহন ভাত রানলেও মাইর খাবি- না রানলেও মাইর খাবি...
সাবিকুনের মনে হয়- দেশের রাজনীতি এখন হাতেম বেপারির সেই কথারই প্রতিধ্বনি করছে। সে সহিংস মূর্তি ধারণ করে দেশবাসীকে বলছে- তোরা ঘরে বইসা থাকলেও মরবি, বাইর হইলেও মরবি...
সাবিকুন সামনে চোখ রাখতেই দেখে, কেউ একজন উড়তে উড়তে তার দিকে এগিয়ে আসছে। কাছাকাছি আসতেই শাশুড়িকে চিনতে পারল সাবিকুন। রওশন আরা ছেলের বউয়ের পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শুরু করলেন। তাকে কাঁদতে দেখে একজন টিভি সাংবাদিক এগিয়ে আসে। ক্যামেরাম্যনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে রওশন আরার সামনে দাঁড়িয়ে সে বলতে শুরু করে-
: দর্শক, আপনারা জানেন, আজ শাহবাগ এলাকায় যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রলবোমা নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় অন্তত ১৭ জন যাত্রী দগ্ধ হয়, যাদের চিকিৎসা চলছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। আমরা এখন সেই ঘটনার শিকার হয়েছেন এমন একজনের আÍীয়ের সঙ্গে কথা বলছি।
টিভি সাংবাদিক রওশন আরার মুখের কাছে মাইক্রোফোন ধরে বলেন,
: কাইন্ডলি আপনার নামটা বলবেন?
-রওশন আরা।
: পেশেন্ট আপনার কী হয়?
-আমার ছেলের বউ।
: সহিংস রাজনীতির নৃশংসতার শিকার হয়ে আপনার ছেলের বউ এখন বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
টিভি সাংবাদিকের কথা শুনে রওশন আরা আঁচলে চোখ মুছে বললেন-
: বাবা রে! আমার প্রতিক্রিয়া জাইন্যা কী করবেন? বউমার এই অবস্থার জন্য যারা দায়ী- আপনি তাদের কাছে যান।
-রাজনীতিকরা তো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ঘটনার একটা ব্যাখ্যা দেবেন। আমরা আপনার প্রতিক্রিয়া জানতে চাচ্ছি।
: আমার কোনো প্রতিক্রিয়া নাই। প্রতিক্রিয়া জানাইয়া লাভ কী? প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ তাদের প্রতিক্রিয়া জানাইতেছে। কোনো কাজ কি হইতেছে? এইটা আমাদের নিয়তি হইয়া গেছে- এই দেশে যারা রাজনীতি করবেন, তাদের সন্তানরা ইউরোপ-আমেরিকায় সুন্দর জীবন কাটাবে। আর রাস্তাঘাটে অসহায়ভাবে মৃত্যুর শিকার হবে আমার মতো সাধারণ মানুষের ছেলেমেয়ে ও আত্মীয়-স্বজনরা। এটাই আমাদের রাজনীতির আসল চেহারা। এই রাজনীতি আমরা চাই না। আমরা এই রাজনীতিরে ঘেন্না করি...
পাশের বিছানা থেকে এবার গোঙানির আওয়াজ ভেসে আসে। ডাক্তার ও নার্সরা ব্যস্ত পায়ে লোকটার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ছেলেটা কোথায়? সাবিকুন ডানে-বাঁয়ে দৃষ্টি মেলে বার্ন ইউনিটের সারি সারি বেডে ছোট্ট কোনো শরীর পড়ে আছে কিনা- তার সন্ধান করে। কোথাও দেখতে না পেয়ে তার মনের কোণে আশংকার মেঘ ঘনীভূত হয়- তবে কি ছেলেটি অগ্নিদগ্ধ হয়ে বাসের মধ্যেই মারা গেল! এখন সে পড়ে আছে লাশকাটা ঘরে, নাম-পরিচয়হীন লাশ হয়ে? সাবিকুন ব্যাকুল হয়ে উত্তর খুঁজতে থাকে- আগুনে দগ্ধ হওয়ার সময়ও কি ছেলেটির হাতে বাবার কিনে দেয়া লাল-সবুজ পতাকাটা ছিল? কে আগে পুড়েছে? পতাকা, না সে?
সাবিকুন তলপেটে হাত রাখে। তার গর্ভে একটা ভ্রুণ আস্তে আস্তে মানবশিশুর আকার ধারণ করছে। অনাগত শিশুটিকে ঘিরে সাবিকুনের অনেক স্বপ্ন। অনেক আশা। অনেক প্রত্যাশা। সাবিকুন জানে না, তার স্বপ্ন, আশা ও প্রত্যাশাগুলো পূরণ হবে কিনা! কারণ-এগুলো বন্দি হয়ে আছে রাজনীতির কুশীলব মাননীয়দের মগজে।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক

এই ট্রাজিক রাজনৈতিক নাটকের পরবর্তী দৃশ্য কী হবে? by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বুড়িগঙ্গার স্রোত থমকে আছে। কোন্দিকে প্রবাহিত হবে তা কেউ জানে না। স্রোত অবরুদ্ধ হয়ে থাকলে তাতে ময়লা জমে, পানি দূষিত হয়। বাংলাদেশে রাজনীতির অবরুদ্ধ স্রোত মুক্ত না হলে, গতি না পেলে তা দূষিত হবে। জনজীবন বিপন্ন হবে। এই অবরুদ্ধ স্রোতকে গতি দেয়া, আবার চলমান করার জন্য অনেক রাজনৈতিক, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা হয়েছে, সফল হয়নি। শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা তারানকো সাহেব ঢাকায় এসেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক মহল সবার সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন ও করছেন। কিন্তু জটিলতার গিঁট খুলছে না। শেখ হাসিনার নির্বাচনকালীন সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। বেশ কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতও হয়ে গেছেন। এই অবস্থা থেকে ঘড়ির কাঁটা পেছানো মুশকিল। অন্যদিকে বিরোধী জোট নির্বাচনের তফসিল পেছানো এবং সরকারপ্রধানের পদ থেকে শেখ হাসিনাকে অপসারণ ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতে অনড় হয়ে আছেন।
বিশ্ববিপ্লবী নেতা দক্ষিণ আফ্রিকার নেলসন ম্যান্ডেলা মারা গেছেন। সারা বিশ্বে শোক ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি বাংলাদেশেরও বন্ধু ছিলেন। বাংলাদেশ একবার সফর করে গেছেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশে তিন দিনের জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, নেলসন ম্যান্ডেলার স্মৃতির প্রতি যথোচিত শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য তিন দিনের এই শোক দিবসে হরতাল-অবরোধ যেন স্থগিত রাখা হয়। বিএনপি সেই অনুরোধও রক্ষা করেনি। অর্থাৎ তারা কোনো কারণেই নমনীয় হতে রাজি নন। এই অচলাবস্থার মধ্যে চলছে হরতাল ও অবরোধের নামে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, নিরীহ মানুষ হত্যা। এতদিন রেললাইন উপড়ে ফেলা হয়েছে, ট্রেনে আগুন দেয়া হয়েছে। এখন যাত্রীবাহী লঞ্চেও আগুন দেয়া হচ্ছে। মনে হয় জামায়াত তার একাত্তরের পূর্ব চরিত্রে ফিরে গেছে। তাদের যুদ্ধ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যতটা নয়, তার চেয়ে অনেক বেশি জনগণের বিরুদ্ধে। একাত্তর সালে তাদের সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতির কভার ছিল পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী। এবার তাদের কভার বিএনপি বা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল।
সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি রাজনৈতিক আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে। তার ছাতার আড়ালে জামায়াত চালাচ্ছে দেশময় নৃশংস জ্বালাও-পোড়াও হত্যাকাণ্ড। বিএনপির আন্দোলনের লক্ষ্য শেখ হাসিনাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরিয়ে তাদের পছন্দসই সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান। জামায়াতের লক্ষ্য বিএনপির আন্দোলনের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা এবং দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষা করার জন্য দেশময় একাত্তরের মতো বর্বরতার অনুষ্ঠান। এখানে এসে বিএনপির আন্দোলন ও জামায়াতের নাশকতা একসূত্রে বাঁধা পড়ে গেছে। এই নাশকতার মৈত্রীর গিঁট ছাড়িয়ে বিএনপি মুক্ত ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারছে না। এখানেই রাজনৈতিক জটিলতার গিঁট সহজে খুলতে চাইছে না। তারানকো সাহেবের মধ্যস্থতাও এখানে কাজ করবে কিনা তা বলা মুশকিল।
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন যেন নাটকের একটি ঘূর্ণায়মান মঞ্চ। একই সঙ্গে বহু দৃশ্যের অভিনয় চলছে। এই ঘূর্ণায়মান মঞ্চে জনগণ একদিকে দেখছে আওয়ামী লীগ সরকার ও বিরোধী বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষের রাজনীতি। অন্যদিকে দেখছে বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর একটা বড় অংশের মধ্যে পরের আলুর গুদামে আগুন লাগায় পোড়া আলু খাওয়ার মহোৎসব। তার পাশে আবার নতুন দৃশ্য যোজিত হয়েছে, জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টির আকস্মিক নতুন অবস্থান গ্রহণের দরুন। এই দৃশ্য দেশময় দারুণ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। সাবেক রাষ্ট্রপতির ঢাকার বাড়ির সামনে কৌতূহলী জনতার ভিড় কমছে না।
এখন এই বয়োবৃদ্ধ জেনারেল এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি কি করবেন, তা কেউ জানেন না। তিনি নির্বাচনকালীন সরকারে যোগদানের দু’দিন পরই এই সরকার ও নির্বাচন দুই-ই বর্জনের ঘোষণা দেন এবং মন্ত্রিসভায় তার দলের যেসব মন্ত্রী ও উপদেষ্টা আছেন, তাদের অধিকাংশের পদত্যাগপত্র নিজের কাছে জমা রাখেন। কিন্তু এই পদত্যাগপত্রগুলো তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পেশ করেননি। তার নির্বাচন বর্জনও এখন পর্যন্ত সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। জাতীয় পার্টি কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও নেয়নি।
বর্তমানে কিছুদিনের জন্য হলেও দেশের রাজনৈতিক তাস খেলার তুরুপের তাসটি এরশাদ সাহেবের হাতে রয়েছে। তিনি যদি নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় না থাকেন এবং নির্বাচন বর্জন করেন, তাহলে বিএনপি-জামায়াতের আন্দোলনের শক্তি বাড়বে। কোনো কোনো দেশ যে বাংলাদেশে সর্বোচ্চসংখ্যক দলের (সর্বদলের নয়) অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা বলছেন, তা অনুষ্ঠান করাও বর্তমান সরকারের পক্ষে সহজ হবে না। সরকার কোনো রকমে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সক্ষম হলেও দেশে-বিদেশে তা কতটা ক্রেডিবিলিটি পাবে, তা এখন বলা মুশকিল। তবে এরশাদ সাহেব নির্বাচন বর্জন নীতিতে অটল থাকলে তার নির্দেশ মান্য না করে যদি তার দলের একাংশ সরকারের সঙ্গে থেকে যায় তাহলে অন্য কথা।
নির্বাচনকালীন সরকারে জাতীয় পার্টি থাকলে এবং নির্বাচনে অংশ নিলে অবশ্যই দেশে বিএনপিকে ছাড়াই একটি ক্রেডিবল নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হবে। ১৯৭০ সালে ভাসানী ন্যাপের মতো তখনকার একটি বড় এবং প্রভাবশালী দল নির্বাচন বর্জন করা সত্ত্বেও যেমন একটি ঐতিহাসিক নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছিল; নেপালে অন্যতম বৃহৎ দল মাওবাদী সংগঠন নির্বাচন বর্জন সত্ত্বেও যেমন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল; বাংলাদেশেও তেমন নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব। নির্বাচনের জোয়ার শুরু হলে পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ভোটার যে নির্বাচনে ভোট দিতে ছুটে আসবে তাতে সন্দেহ নেই।
বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে না এলে দলের হার্ডলাইনের নেতারা হয়তো আশা করতে পারেন, জামায়াতের সঙ্গে মিলে দেশময় সন্ত্রাস সৃষ্টি করে তারা ভোটদাতাদের মনে ভীতি সৃষ্টি করে তাদের ভোটদানে বিরত রাখতে পারবেন। যদি তারা তা পারেন তাহলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত তা পারবে বলে মনে হয় না। প্রথমত, সন্ত্রাস দ্বারা জনসমর্থন আদায় করা যায় না। পাকিস্তানে উগ্র মৌলবাদীরা নির্বাচন বানচাল করতে পারেনি। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে আগামী নির্বাচনের সময় সন্ত্রাস দমনে সরকারের গণতান্ত্রিক শিথিলতা থাকবে না, সঙ্গে থাকবে সেনাবাহিনীর তৎপরতা। সুতরাং ভীতি ছড়িয়ে বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন বানচাল করা যাবে না।
নির্বাচন যদি হয় তাহলে তার পরবর্তী দৃশ্যের কথা এখন ভেবে লাভ নেই। কী হবে তা সময়ই বলে দেবে। নির্বাচন বানচাল বা বন্ধ রাখতে না পারলে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান শুধু দুর্বল হওয়া নয়, অনেকটাই ভেঙে পড়তে পারে। আর বিএনপির কভার ছাড়া জামায়াতের পক্ষে দেশে সন্ত্রাস চালানো অসম্ভব হবে। তখন নতুন সরকার হয়তো জামায়াতকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে আরও শক্ত হাতে তাদের দমনের জন্য এগিয়ে যাবে। যদি তা হয়, তাহলে সমগ্র দক্ষিণ এশিয়াতেই (পাকিস্তানসহ) উগ্র মৌলবাদের চূড়ান্ত পরাজয় ও পতনের সূচনা হবে বাংলাদেশ থেকেই। ভারত যত বড় দেশ হোক, তার গণতন্ত্র যত পুরনো হোক, সেখানেও ফ্যাসিবাদী হিন্দুত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। বাংলাদেশ ছোট প্রতিবেশী হতে পারে কিন্তু দেশটিতে গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজম সুরক্ষা পেলে ভারতেও অনুকূল প্রভাব বিস্তার করবে।
বিএনপি কেন তুচ্ছ ছুঁতোনাতায় নির্বাচন বর্জন করতে চায় তা আমার হিসাবে আসে না। জামায়াত নামক সিন্দবাদের দৈত্যটিকে কাঁধ থেকে নামিয়ে বিএনপি নির্বাচনে এলে এখনও তাদের জয়লাভের সম্ভাবনাই বেশি বলে অনেকে মনে করেন। আওয়ামী লীগ দেশের উন্নয়নে সর্বাধিক কাজ করা সত্ত্বেও কেউ কেউ মনে করেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে এই সরকারের বিরুদ্ধে একটি ‘সাইকো’ তৈরি হয়েছে। তার সুযোগ নিয়ে বিএনপি পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের অধিকারী হয়েছে। এই একই সাইকোর সুযোগ নিয়ে হাসিনা সরকারের অধীনেই তাদের নির্বাচন জয়ের সম্ভাবনা ছিল বেশি। কেন, ১৯৭০ সালে ইয়াহিয়া-জান্তার এলএফও মেনে নিয়ে নির্বাচনে গিয়ে তখনকার আওয়ামী লীগ ভূমিধস বিজয়ের অধিকারী হয়নি?
আমার একান্ত আশা এবং প্রার্থনা, তারানকো সাহেবের মধ্যস্থতা সফল হোক। বিএনপির সুমতি ফিরুক। তারা নির্বাচনে আসুন। দেশে রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ হোক। জনজীবনে স্বস্তি ফিরে আসুক। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি এখন পর্যন্ত বড় নাজুক। তার ভিত্তি নির্বাচনে সবার অংশগ্রহণে শক্ত হোক। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মতো মধ্যযুগীয় মৌলবাদী অভ্যুত্থান প্রতিহত হোক। বাঙালির হাজার বছরের লোকায়ত সভ্যতা, সংস্কৃতি, ভাষা, ইতিহাস রক্ষা পাক।
বাংলাদেশে দ্রুত রাজনৈতিক দৃশ্যের পরিবর্তন ঘটবে তা আশা করা যায় না। বর্তমানে যা চলছে তা একটি ট্রাজিক নাটক। এর পরবর্তী দৃশ্য কি হবে তার জন্য নিষ্ক্রিয় দর্শক সেজে বসে না থেকে এবং সেমিনার ও টকশোতে আমাদের একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী যদি ‘নিরপেক্ষ বিদূষক’ না সেজে অতীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধের মতো সন্ত্রাস প্রতিরোধে সক্রিয় হতেন, বর্তমানের রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূরীকরণে প্রধান রাজনৈতিক দল দুটির ওপর চাপ সৃষ্টিতে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা নিতেন, তাহলে আজকের সমস্যা এতটা জটিল সংকটে পরিণত হতে পারত না। দেশ সংকটমুক্ত হোক তা আমরা সবাই চাই। কিন্তু সে জন্য প্রত্যেকের সাধ্যমতো নিজ নিজ দায়িত্ব পালনেও আমাদের এগিয়ে আসা উচিত। কেবল অন্যের সমালোচনা করে ও উপদেশ দিয়ে এবং বিদেশীদের ওপর নির্ভর করে সমস্যা দূর করা যাবে না।

যেখানে শৈশব সেখানেই শেষশয্যা

শোকগাথার জলোচ্ছ্বাসে ভাসছে গোটা দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথাগত রেওয়াজে কাঁধে কাঁধ, হাতে হাতে, কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গাইছে মহাপ্রয়াণের গীত। তালে তাল মিলিয়ে, পায়ে পা ঠুকে সমস্বরে বুক ভাসাচ্ছে সবাই। এমনই চলবে আগামী ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ‘তোমার মতো, এ পৃথিবীতে আর কেউ নেই।’ এমনিতে আনন্দের গান হলেও, সে সুরে উল্লাসের রেশটুকুও নেই- বেদনার মহাসাগরের পাশে সলিল সমাধি হয়েছে সে সোল্লাসে। গানের ফাঁকে ফাঁকে সবাই কাঁদছেন, ‘আমরা পিতৃহারা হলাম, মাতৃহারাও। তাকে ছাড়া আমাদের কী করে চলবে।’ বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় রাত ৮টা ৫০ মিনিটে মারা গেছেন নেলসন রোলিহলালা ম্যান্ডেলা। শুক্রবার ভোর রাতে সেই খবর জানাজানি হতেই ৯৫ বছর বয়সী রাষ্ট্রনায়কের বাড়ির সামনে অসংখ্য মানুষের ঢল। সবার মুখে একটাই কথা ‘আমরা অনাথ হলাম।’ নেলসন ম্যান্ডেলার মৃত্যুসংবাদ দিতে গিয়ে প্রেসিডেন্ট জ্যাবক জুমাও বলেন, ‘পিতৃহারা হল দ. আফ্রিকা। এ দেশের মানুষ তাদের পিতাকে হারাল।’ মহাকালের মহানায়ক সময়ের সেরা সন্তান সেই কালো মানুষটিকে সমাহিত করা হবে ১৫ ডিসেম্বর। পরম শ্রদ্ধাভরে জন্মস্থান কু কুনুগ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে তার শেষ শয্যা হবে। সেখানেই পাতা হচ্ছে তার শেষ বিছানা। এখানেই কেটেছিল তার উচ্ছল শৈশব। মমতাময়ী মায়ের কোলে চড়ে এপাড়া ওপাড়া করে বেরিয়েছিলেন একসময়। বাবা-দাদার কাঁধে হয়তো পাহাড়ি আকাশে ম্লান হয়ে যাওয়া অস্তাচলে স্বপ্ন রেখেছিলেন। সমবয়সীদের সঙ্গে ছেলেবেলামো করেছেন। কৈশোরে কালপুরুষ হওয়ার স্বপ্নে মজেছিলেন- সেও এই কুনুতেই। এবার সেই কুনুতেই চির ঘুমের দেশের রাজপুত্র হবেন মর্তের স্বপ্নপুরুষ ‘টাটা’- দ. আফ্রিকার বাবা। শতাব্দীর সেরা সূর্য! ম্যান্ডেলার জীবদ্দশাতেই পরিবারে ভাঙন দেখা দিয়েছিল, যা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় বছর কয়েক আগে, ম্যান্ডেলার শেষকৃত্য-বিতর্কে। মৃত্যুর পরে নেলসনকে কোথায় সমাহিত করা হবে, তা নিয়েও ম্যান্ডেলা পরিবারে ঘোর সংঘাত চলছিল। এক দিকে ম্যান্ডেলার প্রথম পক্ষের নাতি মান্ডলা। অন্য দিকে দুই স্ত্রী উইনি ও গ্রাচা। ইতিমধ্যেই ম্যান্ডেলার কয়েক জন ছেলেমেয়ে মারা গিয়েছেন।
তাদের শায়িত করা হয়েছিল কুনু গ্রামে। কিন্তু মান্ডলা চাইছিলেন, মৃত্যুর পরে তার দাদাকে সমাহিত করা হবে জন্মস্থান মাভেজোতে। অন্য আত্মীয়দের না জানিয়ে, বাবা-ফুফুর কবর কুনু গ্রাম থেকে রাতারাতি মাভেজোতে নিয়ে আসেন মান্ডলা। যাতে মৃত্যুর পরে মাভেজাতে সমাহিত করলে ছেলেমেয়েদের পাশেই ঠাঁই হয় ম্যান্ডেলার। কবর-বিতর্ক আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কোর্টের রায়ে অবশ্য ম্যান্ডেলার ছেলেমেয়ের কবর ফিরিয়ে আনা হয় কুনু গ্রামেই। ম্যান্ডেলার মৃত্যুর পরে অবশ্য সহমত হয়েছেন পরিবারের সবাই। ১৫ ডিসেম্বর, রোববার, পাহাড়ি গ্রাম কুনুতেই তার শেষকৃত্য হবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমা। ভুগছিলেন দীর্ঘদিন ধরেই। বৃহস্পতিবার ভোররাতে খবর এল নেলসন ম্যান্ডেলা আর নেই। বছর কুড়ি আগে, ১৯৯৪ সালের ১০ মে, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন ম্যান্ডেলা। বর্ণবিদ্বেষ জমানার শেষ শ্বেতাঙ্গ প্রেসিডেন্ট, এফ ডব্লিউ দ্য ক্লার্ককে পাশে নিয়ে ৭৫ বছর বয়সী ম্যান্ডেলা সে দিন বলেছিলেন, ‘এত দিন পরে, অবশেষে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছি আমরা। বর্ণবিদ্বেষের সন্ধ্যা আর এ দেশে কখনও আসবে না।’ কথা রেখেছিলেন তিনি। রাজনৈতিক দক্ষতায় সামলেছিলেন দেশের ক্ষমতাসীন শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীকে। বর্ণবিদ্বেষের বীজ যে দেশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, দেশের সব থেকে বিত্তবান সম্প্রদায় যেখানে শ্বেতাঙ্গ, সামরিক বাহিনীও যেখানে শ্বেতাঙ্গদের হাতে, সেখানে প্রশাসনকে ধীরে ধীরে, ধাপে ধাপে ‘কালো’ করে তুলেছিলেন নেলসন। রোবেন দ্বীপে ২৭ বছরের দীর্ঘ বন্দিজীবন, আর মুক্তির পরের রক্তহীন সংগ্রামের বিনিময়ে এ দেশে নতুন সূর্যের ভোর এনেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকা তাই তাকে ডাকত ‘টাটা’ বলে। ম্যান্ডেলার মাতৃভাষা ‘জোসা’তে ‘টাটা’ মানে বাবা। মাত্র পাঁচ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। কিন্তু জাতির জনক থেকে গিয়েছেন জীবনভর।