Saturday, August 18, 2018

আসছে ইরানি মডেলের এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা

ইরানি প্রযুক্তিতে তৈরি এস-৩০০
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান শিগগিরি নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি এস-৩০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মোড়ক উন্মোচন করবে। ইরান এ ব্যবস্থার নাম দিয়েছে বাবর-৩৭৩।
ইরানের উপ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মাদ আহাদি গতকাল (শুক্রবার) তাবরিজ শহরে এক অনুষ্ঠানে একথা বলেছেন। তিনি জানান, চলতি ফারসি বছরের শেষ নাগাদ এ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা উন্মোচন করা হবে। আগামী ২০ মার্চ ফারসি বছর শেষ হবে।
জেনারেল আহাদি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলে ইরান প্রতিরক্ষা খাতে খুবই কম বিনিয়োগ করে যা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের সঙ্গেও তুলনার যোগ্য নয়। সৌদি আরব বিশ্বের তৃতীয় অস্ত্র আমদানিকারক দেশ অথচ ইরান এ খাতে কম বিনিয়োগ করেই মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা দিচ্ছে। জেনারেল আহাদি জোর দিয়ে বলেন, স্বাধীন নীতি অনুসরণ করার কারণে ইরানের পক্ষে প্রতিরক্ষা খাতে আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে।

বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য ও আন্দোলনের খসড়ার রূপরেখা তৈরি by কাফি কামাল

নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী সংসদ নির্বাচনের দাবিতে প্রস্তুত হয়েছে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের খসড়া রূপরেখা। জাতীয় ঐক্যের রূপরেখায় রয়েছে কারাবন্দি খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তি, নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেয়া, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনের সময়ে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন, নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনী তফশিল ঘোষণার পর বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে নতুন মামলা ও গ্রেপ্তার অভিযান বন্ধসহ চলমান সব রাজনৈতিক ইস্যুর সমন্বয়। ইস্যুভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের কৌশল ও গতি-প্রকৃতির বিষয়টিও রয়েছে রূপরেখায়। দলের তৃণমূল নেতাদের মতামত পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে শনি ও সোমবার দুই দফায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ খসড়া তৈরি করেছে বিএনপির নীতিনির্ধারক ফোরাম। প্রস্তুতকৃত খসড়াটি লন্ডনে অবস্থানরত দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পাঠানো হবে।
পাশাপাশি দলের চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়াকেও বিষয়গুলো অবহিত করা হবে। তাদের মতামত ও নির্দেশনার ভিত্তিতে ঈদের পর দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির বৈঠক ডাকা হবে। সেই বৈঠকের পরই প্রকাশ্যে আসবে জাতীয় ঐক্যের প্লাটফর্ম। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন আহূত সমাবেশে এ রূপরেখা জাতির সামনে তুলে ধরা হবে। ২২শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে সমাবেশের প্রস্তুতি হিসেবে ড. কামাল হোসেনের বাসায় বুধবার একটি বৈঠক হয়। বৈঠকে সমাবেশ থেকে কী ঘোষণা দেয়া হবে, সমাবেশে কাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে- এ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আহূত সমাবেশেই এক মঞ্চে উঠতে পারেন দেশের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা। তবে এই ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে থাকতে পারে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াত ইসলামী।
জাতীয় ঐক্যের রূপরেখার বিষয়ে বিএনপি স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, রূপরেখা তৈরির আগে তারা কয়েক দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকগুলোতে নেতারা যেসব ইস্যুতে একমত পোষণ করেছেন সেসব বিষয়ই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে রূপরেখায়। এরমধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সব রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মুুক্তির বিষয়টি অন্যতম প্রধান ইস্যু হিসেবে গুরুত্ব পেয়েছে। এছাড়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তারকৃত শিক্ষার্থীদের মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির দাবিটিও যুক্ত করা হয়েছে সেখানে।
রূপরেখা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিএনপির এক নেতা জানান, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার জন্য তারা কয়েক ভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক ও মতবিনিময় করেছেন। ওইসব দলের নেতাদের মতামত নিয়েছেন। যুক্তফ্রন্টভুক্ত দলগুলোর পাশাপাশি বাম ও ডান দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন বিএনপি নেতারা। কেবল বিএনপি নয়, যুক্তফ্রন্টের নেতারা এ ক্ষেত্রে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। বিএনপির দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি নিয়ে প্রথমদিকে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের। কিন্তু জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রবের একটি মতামতের মধ্যদিয়ে সে দ্বিধার সমাপ্তি ঘটেছে। তিনি পরিষ্কার বলেছেন, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী নয়, তিনি দেশের সিংহভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। গণতন্ত্রের জন্য আজ তিনি কারাগারে রয়েছেন।
তাই সুষ্ঠু নির্বাচনে তিনিসহ দেশের সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জাতীয় নির্বাচনের আগে মুক্তি দেয়ার দাবিকে প্রাধান্য দিতে হবে। জাসদ সভাপতির এ মতামতের প্রেক্ষিতে অন্যান্য দলের নেতারাও এই ইস্যুতে একমত পোষণ করেছেন। বিএনপির অন্য এক নেতা বলেন, বর্তমান সরকারের অধীনে বিগত কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রকৃত অবস্থা দেখে সব রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছেন, এই সরকারের অধীনে কখনো সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়। তাই নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার দাবি এখন আর শুধু বিএনপির একার নয়। এটা সবার। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া আর রাজনৈতিকভাবে আত্মহত্যা করা এখন একই বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই বিষয়টি বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা উপলব্ধি করতে পারছেন। আর সে কারণেই জোরালো হয়েছে বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি। যুক্তফ্রন্টের দায়িত্বশীল এক নেতা জানান, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়টি এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবেই পুরো প্রক্রিয়াটি এগোচ্ছে। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী মাসের প্রথমপক্ষে অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের জন্য আমরা যাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে এসেছি- তাদের অনেকেই তো এখন কথা বলছেন। ফলে বিষয়টি যে ইতিবাচকভাবে এগোচ্ছে তা পরিষ্কার।
এটি একটি প্রক্রিয়া, সংশ্লিষ্টরা এ নিয়ে কাজ করছেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, দেশের বামপন্থি ও মধ্যপন্থি দলগুলোর নতুন নতুন গ্রুপ হচ্ছে। তারা জাতীয় নির্বাচনসহ সার্বিক ইস্যুতে সোচ্চার হচ্ছে। যেসব রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, লুটপাট ও নৈরাজ্যমুক্ত একটি সুষ্ঠু পরিবেশ এবং সরকার চায় তারা এ নিয়ে কাজ করছে। সার্বিকভাবে বিষয়টির প্রগ্রেস হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট নেতারা জানান, ক্ষমতার বাইরে থাকা বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল নিয়ে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গঠন এবং নির্দলীয় নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে রাজপথে নামার পরিকল্পনারও অগ্রগতি হয়েছে বেশ। বিকল্প হিসেবে রয়েছে প্লাটফর্মের বদলে ইস্যুভিত্তিক যুগপৎ আন্দোলনের কৌশল। বিএনপি স্থায়ী কমিটির শনি ও সোমবার অনুষ্ঠিত বৈঠক সূত্র জানায়, আগামী দিনে যুগপৎ আন্দোলনের জন্য বৈঠকে জাতীয় ঐক্য গড়ার বিষয় নিয়ে নানাবিধ পরামর্শ নেয়া হয়। এর মধ্যে আগামী মাসে জাতীয় ঐক্যের ফর্মুলা প্রকাশ্যে নিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া সংকট নিরসনে সরকার সংলাপের উদ্যোগ নিলে ইতিবাচকভাবে সাড়া দেবে বিএনপি। তবে সে সংলাপ হতে হবে অবশ্যই এজেন্ডা নির্ভর। সময়ক্ষেপণের জন্য এজেন্ডাবিহীন কোনো সংলাপে যাবে না তারা।
এদিকে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের আত্মপ্রকাশের আগে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে সমাবেশের মাধ্যমে বড় ধরনের শো-ডাউন করতে চায় বিএনপি। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সমাবেশে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষের উপস্থিতির মাধ্যমে সরকারকে একটি বার্তা দিতে চায় বিএনপি। এর আগে বিভিন্ন দলের চাওয়া-পাওয়া নিয়ে আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ নেয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছেন নেতারা। এছাড়া আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার মাধ্যমে নিরসন করা হবে দলের অভ্যন্তরে বিরাজমান ছোটখাটো বিরোধ, কোন্দলগুলো।
এদিকে বিএনপির তৃণমূল থেকে পাওয়া মতামতের ভিত্তিতে রাজপথে জোরালো আন্দোলনের রোডম্যাপের যে খসড়াটি প্রস্তুত করা হয়েছে সেটা চূড়ান্ত হবে ঈদের পর দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায়। তবে ঈদের আগে দলের নীতিনির্ধারক ফোরামের কয়েকজন সদস্য বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। সে সাক্ষাতের অনুমতি চেয়ে ইতিমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। বিএনপি স্থায়ী কমিটির বৈঠক সূত্র জানায়, জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়া ও আন্দোলনের পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচনের কৌশল প্রণয়ন ও প্রস্তুতির জন্যও কাজ করবে দলের একটি দায়িত্বশীল টিম। তারা জোট ও বৃহত্তর ঐক্যের শরিকদের চাহিদা ও সেখানকার বাস্তবতা নিয়ে কাজ করবেন। এছাড়া দলের সাবেক ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের ভোটারদের মধ্যে জনপ্রিয়তা এবং নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও সার্বিক তথ্য-উপাত্ত ও নেতাকর্মীদের মতামত এবং স্থানীয় জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যুর ভিত্তিতে একটি সারসংক্ষেপও তৈরি করবেন, যা দলের ইশতেহার প্রণয়ন ও প্রার্থী বাছাই এবং জোট এবং জাতীয় ঐক্যের শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনায় সুবিধা হয়।
বৈঠক সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আগামী আন্দোলনে ঢাকা মহানগর বিএনপির ভূমিকাকে অগ্রগণ্য হিসেবে দেখতে চায় দলের নীতিনির্ধারক ফোরাম। আর সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ দুই সাংগঠনিক ইউনিট ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণের কমিটিতে বঞ্চিত নেতাদের অন্তর্ভুক্ত ও কিছু থানা কমিটি পুনর্গঠনের যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর রাজধানীর সমাবেশে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দলের ঢাকা মহানগর দুই ইউনিটের নেতাদের তাগিদ দেয়া হয়।

নিষিদ্ধ রিকশা চলে টোকেনে by হাফিজ মুহাম্মদ

ব্যাটারিচালিত রিকশা বা অটোরিকশা রাজধানীর একাধিক এলাকায় নিষিদ্ধ। তবুও এগুলো চলছে। ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে নিষিদ্ধ এলাকায়। আর এজন্য তারা নির্দিষ্ট থানা ম্যানেজ করে। পুলিশ থানা থেকে তাদের টোকেন দেয়। প্রতিমাসেই এ টোকেন পরিবর্তন হয়। এগুলোর লেনদেন আবার চালকরা সরাসরি নিজেরা করেন না। নিয়ন্ত্রণ করেন সরকার দলীয় স্থানীয় নেতাকর্মীরা। আবার কিছু কিছু এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশাগুলো চলে গ্যারেজ মালিকানায়। তারাই থানাকে ম্যানেজ করে চলেন। তারা দৈনিক ভিত্তিতে চালকদের কাছে রিকশা ভাড়ায় দেন। চালকরা জানান, মাস প্রতি তাদের থানায় চাঁদা দিতে হয় ১০০০ টাকা। তবে যারা গ্যারেজ থেকে রিকশা ভাড়ায় চালান তাদের সরাসরি থানায় টাকা দিতে হয় না। সবকিছু গ্যারেজ মালিকরাই ম্যানেজ করেন। তারা শুধু দৈনিক ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ভাড়া পরিশোধ করেন। গত ২৯শে জুলাই রাজধানীর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর হত্যাকাণ্ড ঘটে। এরপরে দেশব্যাপী নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা। তারা অবৈধ যানবাহন কিভাবে বন্ধ করতে হয় তা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেন কর্তৃপক্ষকে। আন্দোলনের মধ্যেই ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ট্রাফিক সপ্তাহ পালন শুরু করেন। তারাও অবৈধ যানবাহন বন্ধে অভিযানে নামেন। তবে সাধারণ মানুষ মনে করেন, সরষের মধ্যে ভূত থাকলে কোনোভাবেই এসব বিশৃঙ্খলা বন্ধ হবে না। যেভাবে পুলিশ গাড়ি থেকে চাঁদা তুলে তারা কিভাবে যানবাহন বন্ধ করবে। তার মধ্যে যা রাজধানীতে একেবারেই নিষিদ্ধ তাও চলছে। গতকাল সরজমিন রাজধানীর একাধিক এলাকা ঘুরে এসব ব্যাটারিচালিত রিকশা চলতে দেখা যায়। রাজধানীর পল্লবী থানাধীন মিরপুর ১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকা। মাঝখান থেকে চলে গেছে বেগম রোকেয়া সরণি। এই প্রধান সড়কের দুই পাশের ভিতরের এলাকাতেই চলে এসব রিকশা। কথা হয় একাধিক রিকশা চালক ও মালিকের সঙ্গে। তারা জানান, রিকশার পিছনে লাগানো কার্ডটিই থানা থেকে দেয়া মাসিক টোকেন। এজন্য থানা তাদের কাছ থেকে এক হাজার টাকা নেয়। তারা সড়কের এক পাশে মিরপুর ১১ ও ১২ থেকে বাউনিয়াবাঁধ, কালশী ও মিরপুর ১৪ নম্বর পর্যন্ত এলকাগুলোতে চালাতে পারেন। অন্যপাশে পূরবী সিনেমা হল থেকে আবাসিক, দুয়ারীপাড়া, শিয়ালবাড়ী মোড় ও রূপনগরের কিছু এলাকায় এগুলো চালান। তবে কোনোক্রমে প্রধান সড়কে যেতে পারেন না। কখনো গেলে পুলিশ আটকে দেয়। পরে টাকা দিয়ে ছাড়াতে হয়। ব্যাটারিচালিত রিকশা চালক আফজাল। তিনি বলেন, আমি যে রিকশাটি চালাই এটা আমার নিজের। পূরবী সিনেমা থেকে ভিতরের এলাকায় শুধু চালাতে পারেন। এজন্য প্রতি মাসে থানায় এক হাজার টাকা দেন। বিনিময় থানা থেকে একটি মাসিক টোকেন দেন। তিনি রিকশার পিছনে লাগানো ৪ম লেখা একটি কার্ড দেখিয়ে বলেন, এটিই ওই কার্ড। আরেক চালক মো. শাহীন। তার রিকশাটি চলে মিরপুর ইনডোর স্টেডিয়ামের উল্টোপাশে। মিরপুর-১১, লালমাটি, বাউনিয়াবাঁধ, কালশী থেকে মিরপুর ১৪ নম্বর পর্যন্ত এলাকায়। তিনি গ্যারেজ থেকে দৈনিক ভিত্তিতে ভাড়ায় নেন। সব খরচ গ্যারেজের এজন্য তাকে দিনে দিতে হয় ৩৫০ টাকা। আর দুই চার্জের গাড়ি নিলে ৩০০ টাকা। শাহীন বলেন, আমি দুই মাস ধরে এ রিকশাটি চালাই। এজন্য রিকশায় থানা থেকে নেয়া একটি পাশ কার্ড দিয়ে দিয়েছেন গ্যারেজ মালিক। অনেকজন মালিক এক হয়ে এই রিকশাগুলো চালান। যারা প্রত্যেকেই সরকার দলের নেতাকর্মী। শাহীনের রিকশায় সটকানো কার্ডে লেখা দেখা যায় ‘অটোরিকশা মাসিক কার্ড’। সেখানে তিনটি ফোন নম্বর দেয়া রয়েছে। এগুলোতে কল দিয়ে এ রিকশা কিভাবে চলে জানতে চাইলে একটি নম্বর থেকে আসাদ পরিচয়ে বলেন এর সঙ্গে আমি জড়িত নাই। কেন আমার ফোন নম্বর তারা ব্যবহার করছে জানি না। অন্য আরেকটি নম্বরে কল দেয়া হলে তিনি নাম না বললেও জানান আমি সিকিউরিটি ফোর্সের লোক। এরা গরিব চালক। তারা গ্যারেজ থেকে ভাড়ায় নিয়ে রিকশা চালান। তার দুইটি রিকশা রয়েছে জানিয়ে বলেন, এটা অবৈধ নয়। মালিকদের মাধ্যমেই ভিতরের এলাকায় চলে।
তবে চালক শাহীনের কাছ ঠিকানা নিয়ে বাউনিয়াবাঁধ ঈদগাহ মাঠ সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় ব্যাটারিচালিত রিকশার একাধিক গ্যারেজ। যেখানে একজন কেয়ারটেকার দায়িত্ব পালন করছেন। কিছুক্ষণ পর পর চালকরা রিকশা নিয়ে আসছেন আর চার্জ দিচ্ছেন। এসব কেয়ারটেকার জানান, ওইসব গ্যারেজের মালিক স্থানীয় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্যারেজ কেয়ারটেকার বলেন, আমার মালিক প্রতিমাস শেষে থানা থেকে একটি কার্ড দিয়ে যান। সেটা রিকাশায় লাগিয়ে দেই। আমি আর কিছু জানি না।
ধানমন্ডির ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক মো. আবদুল আজিজ মিয়া। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে রাজধানীর রায়েরবাজার একালায় বসবাস তার। সড়ক দুর্ঘটনায় পায়ে আঘাত পাওয়ার পর থেকে ঠিকমতো হাঁটা-চলা করতে পারেন না তিনি। তিনি ছাড়া সংসারে আর কর্মক্ষম কোনো মানুষ নেই। তিনি তার স্ত্রীর জমানো কিছু টাকা ও লোন করে একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা কিনেছেন। ৪৬ হাজার টাকা দিয়ে গত জুন মাসে রিকশাটি কিনেছেন। একবার ফুল চার্জ দিলে, ৯৫ ভোল্টের ৪টি ব্যাটারিতে ২০ ঘণ্টা মতো চলে তার রিকশা। পা দিয়ে প্যাডেল করা লাগে না বলে, বেশ সহজেই এক এলাকা থেকে যাত্রী নিয়ে খুব সহজেই ছুটে বেড়াতে পারে সে। তার রিকশাটি চালাতে পুশিকে টোকেনের জন্য প্রতি মাসে দিতে হয় এক হাজার টাকা। তবুও মেইন রোডে উঠলেই হাইকোর্টের নিষিদ্ধ এই অটোরিকশা নিয়ে পড়তে হয় বিপাকে। ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা দেখলেই আটক করেন। তাদের আবার টাকা না দিলে রিকশা নিয়ে যায় ডাম্পিংয়ে। রিকশার পিছনে লাগানো টোকেন দেখিয়ে আজিজ বলেন, আমরা কেউই এই কাগজ সম্পর্কে তেমন কিছু বুঝি না। তবে এই কাগজ সিটি করপোরেশনের কাগজ। আর এর জন্য প্রতি মাসে আমাদের ১০০০ টাকা করে দিতে হয়। কার কাছে টাকা জমা দিয়েছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সিটি কর্পোরেশনে যাওয়া খুব ঝামেলা। তবে আমাদের মহাজনরা এইসব কাজ ভালো পারেন। তাদের সব লাইন-ঘাট চেনা। তাই আমরা প্রতি মাসে মাহজনের কাছে শুধু টাকাটা দিয়ে দিই। সেই আমাদের কার্ড এনে দেয়। আমরা শুধু পুরনোটা খুলে নতুন কার্ডটা লাগাই। মাহাজন এক হাজার থেকে ৮০০ টাকা জমা দেয় আর খরচ হিসাবে বাকি ২০০ টাকা নিজে কমিশন রাখেন। আজিজের রিকশার পিছনে লাগানো রয়েছে। এগুলো তিনজন মহাজনের মোবাইল নম্বর।
তাদের একজন মো. রাজ্জাক মির্জা। তবে তিনি এইভাবে রিকশা চলার কথা অস্বীকার করেন। কার্ডে তার মোবাইল নম্বর ভুলে দেয়া হয়েছে বলে জানান। তবে তার অধীনে ১০টা ব্যাটারিচালিত রিকশা রয়েছে। কিন্তু তার একটির জন্যও তাকে টাকা পয়সা দিতে হয় না।
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার প্রত্যেককেই বিভিন্ন ‘ব্যাটারিচালিত রিকশামালিক-শ্রমিক কল্যাণ সমিতির কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে প্রতি মাসে বৈধতা নিতে হয়। তবুও সরকারি খাতায় এরা অবৈধ। নাম জানাতে অনিচ্ছুক এক মহাজন জানান, এটা আসলে একটা চলমান প্রক্রিয়া। সিটি করপোরেশনের কথা বললেও ব্যাটারিচালিত রিকশার বিষয়ে তেমন কিছুই খোঁজ রাখেন না। আমাদের মহাজনদের কিছু সমিতি আছে। চালকদের বিপদের দিনে যাতে তাদের কারোর কাছে হাত না পাতা লাগে এই উদ্দেশে আমরা প্রতিমাসে তাদের কাছ থেকে একটা নির্দিষ্ট অনুপাতে টাকা নেই। এর সামান্য কিছু আমরা রাখি আর পুরোটা তুলে দিই সমিতির হাতে।
তবে যে থানার অধীনে এসব রিকশা চলছে সেই থানাই নাকি এসব নিষিদ্ধ রিকশা সম্পর্কে জানেন না। এ বিষয়ে পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, আমার থানায় টাকা দিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলে সেটা আমার জানা নেই। আমি এ থানায় নতুন জয়েন করেছি। একমাসও হয়নি। তবে এসব নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল এবং থানায় টাকা নেয়ার বিষয়টি খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেবেন।

রোহিঙ্গা প্রশ্নে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান পাল্টায়নি এখনো

সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নিপীড়ন বিরোধী প্রস্তাবে চীন ও রাশিয়ার সমর্থন না পাওয়ায় গভীর হতাশা ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি। তার মতে, এ নিয়ে জাতিসংঘে দফায় দফায় প্রস্তাব উত্থাপিত হয়েছে কিন্তু তাতে ধারাবাহিকভাবে ভেটো প্রদান করে আসা চীন ও রাশিয়ার অবস্থান এখনও পাল্টায়নি। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিকীকরণের পরিবর্তে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে আলোচনা এবং দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার পক্ষেই অবস্থান চীন ও রাশিয়ার। তবে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রশ্নে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হলেও বাংলাদেশ বারবার বলে আসছে, আন্তর্জাতিক চাপ সরে গেলে মিয়ানমার তা বাস্তবায়নে গড়িমসি করবে। এ কারণে বাংলাদেশ জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সব ফোরামেই মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রাখার নীতি নিয়েছে। গত ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।
সেই বৈঠকে রোহিঙ্গা নিপীড়নের দায়ে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রদক্ষেপ গ্রহণের প্রস্তাব আসে পশ্চিমা দুনিয়া থেকে। কিন্তু তাতে অত্যন্ত সক্রিয়ভাবে বিরোধিতা করে চীন ও রাশিয়া। দেশ দুটি মিয়ানমারের পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করে। সেই বিতর্কে জাতিগত নিধনযজ্ঞের জন্য মিয়ানমারের তীব্র সমালোচনা করে পরিষদের স্থায়ী ৩ সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সসহ অস্থায়ী প্রায় সব সদস্য। সেই সমালোচনার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে (ভোটো প্রদান করে) চীন ও রাশিয়া প্রস্তাবটি আটকে দেয়। ফেব্রুয়ারির আগেও একাধিকবার নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে আলোচনা হয় এবং সেখানে নিন্দা প্রস্তাব পাসের চেষ্টা ছিল মানবাধিকার সংবেদনশীল রাষ্ট্রগুলোর। কিন্তু চীন ও রাশিয়া তাতে আপত্তি দিয়েছে, ভেটো প্রদান করেছে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের কাছে আল-জাজিরা জানতে চায় রাশিয়া ও চীনের ভেটো বন্ধে ঢাকার তরফে কোনো চাপ দেয়া হচ্ছে কি না?
জবাবে এ নিয়ে হতাশাসূচক জবাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। তিনি বলেন, ‘তাদের মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা বোঝাতে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি। তারপরও এ প্রশ্নে যদি আগামীকালও ভোট হয় তারা তাদের একই অবস্থান বজায় রাখবে।’ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫টি সদস্য দেশের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করেছে। সে প্রসঙ্গ টেনে শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘১৫ সদস্য দেশের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে আসার মধ্যদিয়ে দারুণ একটি কাজ করেছে নিরাপত্তা পরিষদ। তারা সবাই মিডিয়ায় কথা বলেছে, তাদের মতামত জানিয়েছে এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে। একইসময়ে তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্ভোগ ও তাদের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝতে পেরেছেন। নিরাপত্তা পরিষদের ১৩টি দেশের সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার পার্থক্য হলো এ দুই দেশ মনে করে আমাদের ঠাণ্ডা মাথায় থাকতে হবে, ধীর গতিতে চলতে হবে।’ উল্লেখ্য, গত বছরের ২৫শে আগস্ট রাখাইনে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো হয়।
হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭ লাখ মানুষ। আর তার আগে কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে তিন লাখ রোহিঙ্গা। সব মিলে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখে দাঁড়িয়েছে। জানুয়ারিতে সম্পাদিত ঢাকা-নেপিডো প্রত্যাবাসন চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরিয়ে নেয়া শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তা এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তাছাড়া, জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন সংস্থা ধারাবাহিকভাবে বলে আসছে, রাখাইন এখনও রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ নয়।

৪০ লাখ বাংলাভাষী হবে বৃহত্তম রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী! -ভারতের রিসার্চ ফাউন্ডেশন রিপোর্ট

দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছে, আসামে পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথা পদক্ষেপ নিতে সরকার ব্যর্থ হলে তা বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রবিহিন জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করতে পারে। তারা সুপারিশ করছে, এই প্রক্রিয়ার বিকল্প  হলো বর্তমানে নেপালি ও ভুটানি নাগরিকরা যেভাবে ভারতে উন্মুক্ত যাতায়াত করতে পারছে, তেমন একটি ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশ আলোচনা শুরু করতে পারে। জনসংখ্যাতাত্ত্বিক বিষয় ও নিরাপত্তাকে একত্রে নয়, দুটিকে আলাদা বিষয় ধরে ভারত ও বাংলাদেশ আলোচনা চালাতে পারে। তবে এভাবে চলতে থাকলে ভারতে ‘বাংলাভাষীরা’ আমেরিকার মেক্সিকান সংকটে রূপ নিতে পারে।   
১৬ই আগস্ট প্রকাশিত সংস্থাটির রিপোর্ট মতে, সমপ্রতি প্রকাশিত প্রাথমিক খসড়ায় ৪০ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে এবং তাদের সন্দেহভাজন বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবেই দেখা হচ্ছে। এখন যদিও ওই তালিকা যাচাইয়ের কাজ চলছে। কিন্তু কোনো কারণে যদি খসড়া তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় যারা জড়িত ছিল, এখন যাচাইয়ের কাজ যদি তাদের দ্বারাই করা হয় তাহলে ভুল থাকার আশংকাই সত্য হতে পারে। সংস্থাটির ভাষায়, আগের তালিকাই ‘নিয়ার রিপিট’ বা প্রায় পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
সংস্থাটির রিপোর্টে বলা হয়, অ-নাগরিক হিসেবে ৪০ লাখ মানুষকে চিহ্নিত করার ফলে এখন যাচাইয়ের কাজটি অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। কারণ এত বিপুল সংখ্যক মানুষকে দৈহিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া কঠিন বিষয়। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যখনই তাদের নাগরিক নন বলে ঘোষণা করা হবে, তখন তারা বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যেতে পারবে। পশ্চিমা দেশগুলো এ ধরনের ব্যক্তিদের দেশের সর্বোচ্চ আদালত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগ পর্যন্ত বিশেষ শিবিরে রেখে থাকে। ভারতও তামিল ও রোহিঙ্গাদের উদ্বাস্তু শিবিরে রেখেছে। কিন্তু সেসব অভিজ্ঞতা থেকে এবারের এই অভিজ্ঞতা হবে ভিন্ন।
লক্ষণীয় যে, অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন রিপোর্ট দাবি করেছে, অসাম প্রক্রিয়ায় যেভাবে ৪০ লাখ মানুষকে প্রাথমিকভাবে অনাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেছে তা দেশের সকল মিডিয়া সমর্থন করেছে। মিডিয়া এটাও ইঙ্গিত করেছে, এই ৪০ লাখ মানুষই বাংলাদেশি। ভারত বেশি হলে এটা প্রমাণ করতে পারে, তাদের সবাই ভারতীয় নয়। ভারত এর আগে এমনটা বার্মা থেকে আসা ‘উদ্বাস্তু’ এবং তামিলদের বিষয়ে করেছে। ভারত আশা করতে পারে না যে, যখনই এই ব্যক্তিদের ফেরত নিতে অনুরোধ জানাবে, তখন বাংলাদেশ সরকার তা পালন করবে। বাংলাদেশ এমনতিই রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের নিয়ে বিপদে আছে। এবং ভারত নিজেও রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে গণ্য করে ফেরত নিতে অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু মিয়ানমারের উদারনৈতিক নেত্রী অংসান সুচি নীরবতা পালন করছেন। ভারত সরকার যদিও বারংবার আশ্বস্ত করছে, যে খসড়া তালিকা ঘোষণা করা হয়েছে তা কেবলই খসড়া, এনিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু গোটা ভারত জুড়ে এটাই এখন চলছে, যেখানেই প্রধানমন্ত্রী মোদিও নেতৃত্বাধীন বিজিপি সরকার রয়েছে সেখানেই একই রকম বিদেশি খেদাও দাবি উঠেছে। এখন যদি তা মানা শুরু হয় তাহলে বাস্তবে কোনো সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে তা আরো জটিল হতে পারে।
রিপোর্টে আরো দাবি করা হয়, বর্তমানে লাখ লাখ না হলেও হাজার হাজার বাংলাদেশি ভারত জুড়ে বিভিন্ন পেশায় কর্মরত রয়েছে। এখন তাদের বিতাড়নের ব্যাপারে যদি সামাজিক প্রতিবাদ গড়ে ওঠে তাহলে তা আমেরিকার মেক্সিকান সমস্যার মতো একটি ইস্যুতে পরিণত হতে পারে। আমেরিকার নির্বাচনগুলোতে অবৈধ মেক্সকান বিতাড়ন একটি অব্যাহত স্লোগানে পরিণত হয়েছে। যেটা ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকানরা বেশি করেছেন। কিন্তু আপিল কোর্টকে হতাশ করা ছাড়া তারা এ পর্যন্ত এর কিছুই করতে পারেনি।
ওই রিপোর্টে হুঁশিয়ার করে দেওয়া হয়, সারা ভারতে যদি এখন ধর্ম ও ভাষার ভিত্তিতে ‘বিদেশি’ খেদাও অভিযান শুরু হয় তাহলে পার্শ্ববর্তী পশ্চিমবঙ্গ এবং তার আশেপাশের বিহার, আসাম, ওড়িশা ও ত্রিপুরার বাংলাভাষী এবং সম্ভবত যারা ধর্মে মুসলিম তারা ভিকটিম হতে পারেন।

যেভাবে ঢাকার মেরামত সম্ভব

আইনের সঠিক প্রয়োগ, নীতি ও বিশ্বাসযোগ্যতার মাধ্যমে ঢাকাকে বাঁচানো সম্ভব বলে মনে করেন নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন। শুধু তাই নয়, এভাবে সবচেয়ে কম সময়ে ঢাকাকে পৃথিবীর সেরা শহরগুলোর একটিতে পরিণত করা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি। মোবাশ্বের আহমেদ বলেছেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামা স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আমাদের শিখিয়েছে যে চাইলে তিন দিনেই ঢাকাকে বাসযোগ্য করা যায়। ঢাকার বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন, এর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান এবং একজন মানুষ দরকার যাকে ছাতা হিসেবে ধরে তার নির্দেশে কাজ করা যাবে। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপাকালে এসব কথা বলেন তিনি।
লন্ডনভিত্তিক ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইইইউ)’র বার্ষিক জরিপে বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর তালিকায় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছে ঢাকা। বিষয়টি কিভাবে দেখছেন এবং ঢাকাকে বাসযোগ্য করার উপায়ই বা কি- এমন প্রশ্নে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘যে মাপকাঠিতে ঢাকা শহরকে বসবাসের অযোগ্য বলা হয়, সেই মাপকাঠি হলো উন্নত শহরের মাপকাঠি। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ যে কত ভালো এবং কত অল্প সময়ের ভিতর আইন মানতে জানে সেটি পৃথিবীর কম দেশেই আছে।’ উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘মাত্র তিনদিনে ঢাকার মানুষ আইন মানা শুরু করলো। শিক্ষার্থীরা পুলিশও না, এ বিষয়ে তাদের কোনো ক্ষমতাও নেই। কিন্তু তাদের কথামতো মানুষ আইন মানলো কেন? পৃথিবীর কেউ দেখাতে পারবে যে তিনদিনে মানুষ আইন মানা শুরু করতে শিখেছে! এর মানে আইনের সঠিক  প্রয়োগ, নীতি এবং বিশ্বাসযোগ্যতা হলো বড় বিষয়। এই জিনিসগুলো অর্জন করতে পারলে ঢাকাকে শুধু রক্ষা করাই নয়, পৃথিবীর সেরা শহরগুলোর একটি বানানো সম্ভব এবং পৃথিবীর ভিতরে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যেই তা বানানো সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘দেশে প্রতি বছর বন্যা হয়। বন্যা প্লাবিত এলাকায় ডাকাতি হওয়ার কথা শোনা যায় না। মানুষ রিলিফ নিয়ে বন্যা প্লাবিত এলাকায় যায়। কিন্তু আমেরিকাতে বন্যায় বাঁধ ভেঙে যাওয়াতে সেনাবাহিনী নামাতে হয়েছে যাতে লুটপাট না হয় সেজন্য। কিন্তু এই পার্থক্যগুলো কেউ বিবেচনা করে না। আমরা বলি, নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলাম, সেখানে সবাই আইন মানে। কিন্তু সেখানে পাঁচ মিনিট আইনের দৃষ্টি বন্ধ করুক তারপর দেখা যাবে পরিস্থিতি কি হয়।’
ঢাকার বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার ঘাটতি রয়েছে উল্লেখ করে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তার মনের মতো কাজ করে। ঢাকা শহরের দুইজন মেয়রের একজন মশা তাড়ালেন, আরেকজন মশা তাড়ালেন না। তাহলে মশা মারার যে সুবিধা, সেটি কি পাওয়া যাবে? এই যে সমন্বয়হীনতা এর জন্য একটি প্রতিষ্ঠান এবং একজন মানুষ দরকার যাকে আমরা বলি আমব্রেলা অর্থাৎ ছাতা। এই ছাতার নির্দেশে সকলেই কাজ করবে।’ ঢাকাকে বাঁচাতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন উল্লেখ করে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘কেউ যখন অসুস্থ হয় তখন তার সব ট্রিটমেন্ট একসঙ্গে করতে হয়। বাদ দিয়ে করা যায় না। ভেঙ্গে ভেঙ্গে করা যাবে না। এইখানেই আমাদের ব্যত্যয়। একটি দেশ, রাষ্ট্র ও শহর একটি মানুষের শরীরের মতো। এখানেও সমন্বিতভাবে সমস্যা সমাধানে কাজ করতে হবে।’
ঢাকার সিটি করপোরেশনের মেয়রদের ক্ষমতা আরো বাড়ানো প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একজন বাস ড্রাইভার ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে মেয়র কি তাকে কিছু করতে পারে? পারে না। একজন পুলিশ যদি ঘুষ খায় তাহলে মেয়র তাকে বরখাস্ত করতে পারে না বা ব্যবস্থা নিতে পারে না। তাই এসব বিষয়ে আগে অর্জন থাকতে হবে। তাহলেই বিদেশের সঙ্গে তুলনা করা ঠিক হবে।’
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা নিয়ে মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘মানুষ ট্রাফিক আইন মানে না। যখন মন্ত্রী, এমপিরা ট্রাফিক আইন মানে না তখন কেউ তা মানে না। কিন্তু এই দেশের গ্রামের মানুষগুলো যখন সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে যায় তারা তো কেউ গাড়িচাপা পড়ে না, ট্রাফিক আইন ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে না। কারণ, সেখানে তারা আইন মানে। ঢাকা শহরের কিছু শিক্ষিত লোক অন্য দেশের বিমানবন্দরে পৌঁছে নিয়ম মানা শুরু করে। কিন্তু আমাদের বিমানবন্দরে এসেই তারা মারামারি শুরু করে দেন। এটি হয় আইনের সঠিক ও সর্বক্ষেত্রে প্রয়োগ না থাকার কারণে।’ তিনি বলেন, ‘মাত্র তিনদিনে বাচ্চারা বাংলাদেশে এমন কোনো উচ্চপর্যায়ের লোক নেই যে যাকে তারা আটকায়নি। এমনকি একজন পুলিশ কনস্টেবলকে লাইসেন্স না থাকার কারণে ওই পুলিশকে দিয়েই নিজের নামে মামলা করিয়েছে। এরকম নজির বিগত ৪৭ বছরের ইতিহাসে নেই। মানুষ যখন দেখেছে যে ছেলে মেয়েগুলো প্রত্যেককে সমানভাবে দেখছে এবং তাদের বাবার গাড়িকেও চার্জ করেছে তাই চাইলেই এই সমস্যা তিনদিনে সমাধান করা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যারা এসব নিয়ে কাজ করি তারা বলি ৬/৭ মাস লাগবে। কিন্তু তারা তো তিনদিনেই এটি করে দেখিয়েছে। তাই এটি দ্রুতই সম্ভব বলে আমি মনে করি।’
তিনি বলেন, ‘বেশিদূর যাওয়ার দরকার নেই, পাশেই কলকাতা। সেখানে সবাই আইন মানছে। কলকাতায় মাত্র ৪/৫ বছরে পরিবর্তন হলো কিভাবে? অথচ আমাদের চেয়ে তাদের অবস্থা খারাপ ছিল। সেখানে একটি গাড়ি জেব্রা ক্রসের লাইনের ওপরে দাড়ানোর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মোবাইলে এসএমএস চলে আসে যে এত টাকা জরিমানা করা হয়েছে। জরিমানার বিষয়টি পুলিশও জানে না। আমাদের দেশের গাড়িতে কোটি কোটি টাকা খরচ করে ইলেকট্রনিক ডিভাইসের নম্বর প্লেট লাগানো হয়েছে। কিন্তু ওই পর্যন্তই শেষ। এটি ব্যবহারের জন্য বাকি যে কাজ সেটি আর ব্যবহার করা হয়নি।’ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘দেশে আইনের প্রয়োগ হয়। কিন্তু রহিমের বেলায় হয়, করিমের বেলায় হয় না। আমাদের এ মানসিকতা পরিহার করতে হবে। যে মুহূর্তে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না তখনি রাতারাতি সবকিছু এমনিতেই বদলে যাবে।’

ঈদের আগে ছাত্রদের মুক্তি দিন: ড. কামাল

গণফোরাম সভাপতি ও জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাতের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, আমরা তার সঙ্গে দেখা করার আগ্রহ  প্রকাশ করছি। তিনি ব্যস্ত মানুষ। এতবড় দায়িত্ব নিয়ে আমাদের সময় দিবেন সেটা আমি দাবি করতে পারি না।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি যদি ১০ মিনিট সময়ও দেন, তাহলে এখানে যারা আছেন তাদের থেকে যাকে সময় দিবেন তিনি গিয়ে দেখা করবেন। একটা লিখিত সারসংক্ষেপ আপনার কাছে পাঠাবো।
গতকাল বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির দাবিতে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে আয়োজিত এই সভায় সিরাজগঞ্জ থেকে গত বুধবার গ্রেপ্তার হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক লুৎফুর নাহার লুমার মা রাশেদা বেগমের আহাজারি কাঁদিয়েছে দর্শক-স্রোতাদের।
সভায় সভাপতির বক্তব্যে ড. কামাল হোসেন বলেন, দেশের মালিক জনগণ। তা বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষরিত সংবিধানে স্বীকৃত। তা মুছে ফেলা সম্ভব নয়। দেশের মালিক হিসেবেই এখন জনগণকে দাঁড়াতে হবে। গতমাসে ছাত্ররা যা করেছে তা আমাদের জন্য গর্বের। তারা উচিত কথা বলেছে, উচিত কাজ করেছে। এজন্য তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। দিন দিন তা বাড়ছে। নির্যাতন করা হচ্ছে। ছাত্রদের মারধর করা যাবে না। ছাত্রদেরকে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হচ্ছে। স্বাধীন দেশে এমন বর্বরতা চলতে পারে না।
তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ঈদুল আজহার আগে গ্রেপ্তার করা ছাত্রদের মুক্তি দিন। এজন্য ৮১ বছর বয়সে আমি আপনার পা ধরে আবেদন করতে পারি। তারা যেন বাড়ি গিয়ে ঈদ করতে পারে।
তিনি বলেন, এদেশের জন্য বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে উপর-নিচ সবাই রক্ত দিয়েছেন, জীবন দিয়েছেন। এদেশে শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। যে লক্ষ্য বা সমাজ-রাষ্ট্রকে সামনে রেখে এত মানুষ জীবন দিয়েছে তা বৃথা যেতে পারে না। এদেশে অন্যায়, অবিচার, অনুচিত কাজ চলতে পারে না। তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে সবাই একমত। তা রাজনৈতিক বা দলীয় বক্তব্য নয়। সবার অন্তরের কথা। রাজনৈতিক নেতা বা সরকারি কর্মকর্তারা দেশের মালিক জনগণের সেবক। পুলিশকে দিয়ে কেউ অন্যায় কাজ করাতে চাইলে সাংবিধানিক বা আইনগতভাবে পুলিশ তা মানতে বাধ্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সভায় গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, দেশ আজ ভয়ানক অসুস্থ। এতটাই অসুস্থ যে, সরকার তা বুঝতেও পারছে না। অসুস্থতা বাড়ছে। চবি ভিসি সাবেক প্রধান বিচারপতিকে জুতা মারতে চান। তা অসুস্থতা। রাষ্ট্রপতি অসুস্থ। দুই-তিন মাস পর পর চিকিৎসা করতে দেশের বাইরে যান। বিচারকরা অসুস্থ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদ ও আওয়াজ সত্ত্বেও ফটোগ্রাফার শহীদুল আলমকে জামিন দেন না। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি যে কথা বলছেন তাতে মনে হচ্ছে তিনি নিয়মিত ঔষুধ খাচ্ছেন না। তিনি বলেছেন, খালেদা জিয়া নাকি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত। তখন তো খালেদা স্রেফ গৃহবধূ ছিলেন। গুছিয়ে কথাও বলতে পারতেন না। প্রধানমন্ত্রী এসব কী বলেন? ছাত্র আওয়াজ উঠিয়েছিল এই রাষ্ট্রের মেরামত প্রয়োজন। রাষ্ট্রযন্ত্রের চিকিৎসা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, কোটা বা নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনের চেয়ে যৌক্তিক দাবি আর কী হতে পারে? গণতান্ত্রিক দেশে সে আন্দোলনে রাস্তায় যাওয়া কী অপরাধ? পৃথিবীর কোন দেশে রাষ্ট্রপ্রধানদের নিয়ে হাসি-তামাশা হয় না? গণতন্ত্র মানে সহনশীল হওয়া।
তার আগে বক্তব্য রাখা লুমার মা রাশেদার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, লুমার মায়ের বিলাপে আমার লজ্জা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তার পা ধরে ক্ষমা চেয়ে নিই। কেন আমরা এই দেশ স্বাধীন করতে যুদ্ধ করেছিলাম। তিনিও আগামী ঈদুল আজহা উপলক্ষে গ্রেপ্তারকৃত ছাত্রদের মুক্তির দাবি জানান।
ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর হৃদয় পাষাণ। ১৫ই আগস্টের আগে অনুরোধ জানিয়েছিলাম গ্রেপ্তার হওয়া ছাত্রদের মুক্তি দিতে। কিন্তু তা হয়নি। নিরাপদ সড়কের মতো এমন ছাত্র আন্দোলন উপমহাদেশে আর হয়নি। কোটা ও নিরাপদ সড়কের এই আন্দোলন মারা যাবে না। তিনি আরো বলেন, এরশাদের আমলে দেশ চালাতো ডিসি, এসপিরা। এখন দেশ চালায় কনস্টেবলরা। সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধীসহ বিভিন্ন ইস্যু কাজে লাগানোর পর এখন টিকে থাকতে দেশ ও সমাজকে বিভক্ত করতে আবার মুক্তিযোদ্ধা ইস্যু ব্যবহার করা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধারা এখন চুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেছে। আমার সঙ্গে চুক্তি করো। আমার দল করো। তাহলে তুমি মুক্তিযোদ্ধা। তারা তো আসলে চুক্তিযোদ্ধা।
অনুষ্ঠানের শেষ দিকে সবাইকে কাঁদিয়ে গেল গ্রেপ্তার হওয়া লুমার মা রাশেদা বেগম। মাইক্রো ফোন হাতে নিয়েই তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। বিলাপে হারিয়ে যায় তার অনেক কথা। এ সময় অনুষ্ঠানে পিনপতন নিস্তব্ধতা চলে আসে। লুমার মা রাশেদা বলেন, আমার স্বামী মারা গেছে ৫ বছর আগে। আমি কষ্ট করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াচ্ছি তিন মেয়েকে। লুমা পড়াশোনা করে চাকরি করতে চেয়েছিল। ছোট মানুষ লুমা হয়তো বুঝে নি। যেদিন আন্দোলনে গেছে সেদিন মামলা হয়েছে। তারপর সে পরীক্ষা না দিয়ে বাড়িতে চলে গেছে। ভয়ে পরীক্ষা দিতে আসেনি। তাকে রাতে এ ঘরে, ও ঘরে লুকিয়ে রেখেছি। ভয়ে সে টেলিভিশনও দেখতো না। এরপর সিরাজগঞ্জে তার দাদার বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। সেখান থেকে আমার মেয়েকে ধরে নিয়ে এসেছে।
বর্তমান সরকারকে প্রতারক সরকার আখ্যা দিয়ে সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার দিয়ে যে প্রতারণার শুরু হয়েছে তা এখন কোটা ও সড়ক আন্দোলনেও চলছে। প্রধানমন্ত্রী কোটা তুলে দিবেন বলেছিলেন এবং নিরাপদ সড়কের আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করার পর ছাত্রদের এখন চৌদ্দ শিকের ভিতর ঢুকিয়েছেন। দেশকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোটেক সুব্রত চৌধুরী বলেন, এক সড়কেই যদি এত সমস্যা থাকে। তাহলে দেশে কত সমস্যা আছে। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি গত দু’দিন আগেও কেঁদেছেন। আপনার কান্নায় আমরা কাঁদি। কিন্তু আপনি এত উপরে উঠে গেছেন যে লুমার মায়ের কান্নায় আপনি কাঁদেন না। এখানেই আপনার সঙ্গে পার্থক্য।
জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টার সদস্য-সচিব মোস্তফা আমিন বলেন, মানুষের মধ্যে ঐক্য হলে সব সমস্যার সমাধান হবে। দেশকে সংবিধান বিধৃত পথে সাংবিধানিক ধারায় নিয়ে যেতে হবে।
আগামী ২২শে সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সমাবেশের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধান এখনও বাতিল হয়নি। চলমান আছে। সেই সংবিধানের আওতায় এমন কোনো কারণ নেই যে, অনুমতি পাওয়া যাবে না।
গণফোরামের যুগ্ম সহসভাপতি শফিউল্লাহ বলেন, বর্তমান সরকার গণতন্ত্রের কোনো সৌজন্যতাই রক্ষা করছে না। আমরা এখন টার্নিং পয়েন্টে এসে গেছি।
ছাত্র আন্দোলনে সমর্থন দেয়ায় চাকরিচ্যুত নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জিয়াউর রহমান বলেন, ছাত্ররা যৌক্তিক আন্দোলনে মূলত সরকারকে সহযোগিতা করছিল। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল। তাদের যৌক্তিক আন্দোলনে সমর্থন দেয়ার অধিকার তো আমার আছে। তারা যোগ্যদের মেধাভিত্তিক সমাজ-রাষ্ট্র চেয়েছিল। কিন্তু এখন এই ভয়ের আবহ থেকে নিজেদেরকে যদি মুক্ত না করি, তাহলে সেই ভয় আমাদেরকে আরো খারাপ জায়গায় নিয়ে যাবে।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মাহবুব হোসেন বলেন, সরকার কথায় কথায় বলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু কী দেখলাম। পুলিশ আইনের পোশাক পরে অনবরত বেআইনি কাজ করছে। শহীদের রক্তে ভেজা এই মাটি দুর্র্র্নীতি সহ্য করবে না।
জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া ঢাকা মহানগরীর সদস্য-সচিব মোস্তাক আহমেদের পরিচালনায় সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, সংগঠনটির ঢাকা মহানগরীর আহ্বায়ক কর্নেল (অব.) লতিফ মল্লিক, যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হুদা চৌধুরী, মোহাম্মদ হানিফ, মো. হাবিবুর রহমান ও ছাত্র আন্দোলনের সংগঠক মোহাম্মদ উল্লাহ মধু প্রমুখ।

একটি অন্যরকম প্রতিবাদ by মারুফ কিবরিয়া

এটা হয়তো অন্যরকম এক প্রতিবাদ। বর্তমান শাসনব্যবস্থা, বাকস্বাধীনতা হরণ ও প্রশ্নবিদ্ধ গণতন্ত্রের প্রতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুশফিক মাহবুব ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখে গেছেন কষ্টের কথা। ক্ষোভের কথা। গত ১৫ই আগস্ট নিজ বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যার পর তার এ ফেসবুক স্ট্যাটাসকে অনেকেই দেখছেন সুইসাইড নোট হিসাবে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেমুশফিকের সেই স্ট্যাটাস এখন ‘ভাইরাল’। সর্বত্র এ নিয়ে চলছে আলোচনা।
ঢাবির সংগীত বিষয়ের এই শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করার প্রায় দশ ঘণ্টা আগে ফেসবুকে লেখেন, ‘দুর্নীতিগ্রস্ত  শাসন ব্যবস্থায় কিছু বলার ন্যূনতম অধিকার থাকে না। এখন এটা বোঝার সময় হয়েছে যে, তোমার কণ্ঠস্বরের কোনো মূল্য নেই। তাই কথা বলা বন্ধ করুন ও সরকারের ভৃত্য হিসেবে তাদের প্রশংসা করা শুরু করুন। কি করতে হবে এবং কি করা যাবে না, শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদেরকে তা বলে দেয়। যেন সমাজ আমাদেরকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। যে সমাজ আমাদেরকে জেলে পাঠানো বা হত্যা করার ক্ষমতা রাখে। এমনকি আমাদের মৃতদেহ এমন জায়গায় ছুড়ে ফেলার ক্ষমতা তাদের আছে, যেখান থেকে কেউ তা খুঁজে পাবে না। এ বিষয়ে আপনাদের অনুভূতি কি? কে তাদেরকে এই ক্ষমতা দিয়েছে? গণতন্ত্র? নাকি এটা গণতন্ত্রের নামে নিয়ন্ত্রণের সুযোগ, যেখানে আমাদেরকে ক্ষমতাসীনদের প্রশংসা করতে হবে, তাদেরকে মেনে চলতে হবে। এটা কি শুধু আপনাদের হাতে বন্দুক আছে বলে? এটাই বিশ্বের সব ক্ষমতা না। বাংলাদেশি হিসেবে আমি স্বাধীনতা চাই। এমনকি এই চাওয়ার জন্য তারা যদি আমাকে হত্যা করে, তাও আমি এটা চাই’। আত্মহত্যার পর নিহত মুশফিকের বন্ধুমহলও বলেছে, মৃত্যুর আগে প্রায়ই দেশ নিয়ে, দেশের সার্বিক অবস্থা নিয়ে নানা আড্ডায় কথা বলতো। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অনেকটাই অসন্তুষ্ট ছিল ২৪ বছর বয়সী এ শিক্ষার্থী। কিছুতেই অন্যায় দুঃশাসনকে সমর্থন করতেন না মুশফিক।  তবে এসবই যে তার আত্মহত্যার মূল কারণ হতে পারে তা ভাবতে নারাজ বন্ধুরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বন্ধু বলেন, আমি মুশফিকের সঙ্গে পড়াশোনা করেছি। ওর এমন চলে যাওয়াটা মোটেও মেনে নিতে পারছি না। মুশফিক আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী ছিল। যেকোনো বিষয় নিয়ে খুব গভীরভাবে ভাবতো। আমাদের অন্য বন্ধুদের চেয়ে ওকে দেখেছি খুব ভিন্ন ধাঁচের। ক্যাম্পাসে আসতো যেতো। পড়াশোনায় বেশ মনোনিবেশ করতো সে। আড্ডায় খুব কমই বসতো। হ্যাঁ এটা ঠিক যে আড্ডার মাঝে দেশ নিয়ে, দেশের নানাদিক নিয়ে খুব গভীরভাবে আলোচনা করতো। তবে এটা নিয়ে খুব বেশি যে হতাশায় ভুগতো তা বলা যাবে না। মুশফিক সংগীতের শিক্ষার্থী হলেও ব্যবসার দিকে তার খুব মনোযোগ ছিল। যতদূর জানি, স্বেচ্ছায় সংগীতে পড়তে আসেনি। তার ইচ্ছা ছিল ব্যবসা নিয়ে পড়াশোনা করার। এ নিয়ে অনেক পরিকল্পনাও ছিল। কিন্তু সেসব কখনো খোলাসা করে বলেনি মুশফিক। মুশফিকের এ বন্ধু আরো বলেন, আমি ওর কাছের বন্ধু হলেও জীবনের অনেক ব্যক্তিগত কথা আড়ালেই রাখতো। যতটা জানি ওর পার্সোনাল কোনো কথা স্কুল কিংবা কলেজের বন্ধুরাও জানতো না। শিক্ষাজীবনে অনেকেরই প্রেমঘটিত কোনো ঝামেলা থাকে। এসব মুশফিকের ছিল না। তাই সব দিক চিন্তা করে আমরা মুশফিকের আত্মহত্যার বিশেষ কোনো কারণ বলতে পারছি না। এটা ধারণা করছি, হয়তো পারিবারিক কোনো কারণে হতাশা থেকে আত্মহত্যা করেছে মুশফিক। কিন্তু তারা বন্ধুর আত্মহত্যা নিয়ে অনেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মুশফিকের আরেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহপাঠী চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সে অনেক হাসিখুশিতে থাকতো। তার কোনো আর্থিক সমস্যা ছিল না। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, সে তার বাবার সঙ্গে কথা বলে রুম থেকে বের হয়েছিল। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তার মধ্যে ক্ষোভ ছিল। সেটা আমরা আড্ডার মাধ্যমে জানতে পেরেছি। তবে কী কারণে সে আত্মহত্যা করেছে তা সম্পর্কে আমি নিশ্চিত নই।
এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যান্টনমেন্ট থানার এক কর্মকর্তা জানান, এটি আত্মহত্যা। তাছাড়া পরিবারের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে আর কোনো অভিযোগ আসেনি। আর এ বিষয়ে থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। এ ব্যাপারে আইএসপিআর-এর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে একজন কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে মন্তব্য করার মতো এখনও কোনো অবস্থা হয়নি।
আত্মহত্যার আগে দেয়া স্ট্যাটাসটি মুশফিকের প্রথম স্ট্যাটাস নয়। এর আগেও অনেকবার দেশের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন পরিস্থিতি নিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সদ্য শেষ হওয়া নিরাপদ সড়কের দাবিতে নামা শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে তার ভিন্ন ধরনের একটি পোস্ট ছিল। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘অভিনন্দন, আন্দোলন মানেই যে শুধু সরকারের দোষ তা না। আন্দোলন আত্মসমালোচনার একটি উপায়। প্রায় ১০ বছর আগে আমরাই ২২৩ আসন দিয়ে এই সরকারকে এনেছিলাম, এখন ক্ষমতা রক্ষা করার জন্য যদি পদক্ষেপ নেয়া হয় সেটার দায় কোনো না কোনভাবে আপনার আমার সবার। আজ আওয়ামী লীগ যা করছে বিএনপি হলে তার থেকে কম করতো না এটুকু আমি নিশ্চিত। বর্তমান পরিস্থিতি অনুসারে যেকোনো আন্দোলনে বিএনপি তাদের বাম হাত দিবে যাতে ক্ষমতার কিছুটা ক্ষতি তারা করতে পারে। আর আওয়ামী লীগ এই কারণটাকে পুঁজি করে আন্দোলন বন্ধ করবে। যা দেখছি তা সত্য না, যা শুনছি তাও বিশ্বাসযোগ্য না। সব গুজব। অভিনন্দন বাংলাদেশের রাজনীতিকে, গণতন্ত্রের পোস্টমর্টেম রিপোর্টও গুম করে দিয়েছে।’

সড়কে নৈরাজ্য চলছেই মামলায় ভরসা ট্রাফিকের by আল-আমিন

অনেকটা ঘটা করে দেশব্যাপী পুলিশ ‘ট্রাফিক সপ্তাহ’ পালন করা হয়েছে। কিন্তু, সড়কে আগের মতো নৈরাজ্য চলছেই। রাজধানীর সড়কে উল্টোপথে চলা, যত্রতত্র পার্কিং, গাড়িতে রেশারেশি, যেখানে সেখানে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ হয়নি। পুরনো গাড়ি রং করে সড়কে নামাচ্ছে মালিকরা। লাইসেন্সবিহীন অবস্থায় চালক তাদের গাড়ি চালানোর কারণে অনেককেই জরিমানা করেছে ট্রাফিক পুলিশ। মামলাও দেয়া হয়েছে।
ফার্মগেট এবং বাংলামোটর, শাহবাগ এলাকায় দেখা যায়, বাস স্টপেজ না থাকার পরও যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করা হচ্ছে। অনেক মোটরসাইকেলের চালক হেলমেটবিহীন মোটরসাইকেল চালাচ্ছে। পথচারী সেতু থাকলেও মধ্য রাস্তা দিয়ে পার হচ্ছে। হাত উঁচিয়ে পথচারীরা চলন্ত গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। চালকেরা যানবাহন চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। আগের মতোই চলছে সড়কে বিশৃঙ্খলা।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি, গত ১০ দিনের এই ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করার কারণে ঢাকাসহ দেশের সকল সড়কে আগের তুলনায় অনেক শৃঙ্খলা ফিরে এসেছে। বিভিন্ন পরিবহন তথা গাড়ির ড্রাইভার ও জনগণের মাঝে ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেসসহ অন্যান্য কাগজপত্র সম্পর্কে অধিক সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বোপরি এই ট্রাফিক সপ্তাহের কার্যক্রমে আপামর জনসাধারণের মনে সড়কের নিরাপত্তা সম্পর্কে একটি ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ঈদের পর আবারও শুধু মাত্র ঢাকা মহানগর এলাকায় অভিযান চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
ঢাকায় ৫ই আগস্ট থেকে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত মোট ১০ দিনে মামলা হয়েছে ৮৮,২৯৩টি। আর জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৫ কোটি ১০ লাখ ৯৬ হাজার ২৭৭ টাকা। এ মামলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৪৩ হাজার ৮৬৩টি মামলা হয়েছে মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে। এ সময় ১ হাজার ৭৪২টি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়। ৭ হাজার ৯১৫টি মামলা হয়েছে উল্টো পথে চলাচল করায়। ফিটনেস সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩ হাজার ৩৩১টি। আর ঢাকাসহ সারা দেশে যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৪৯ টি। সর্বমোট জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৭ কোটি ১৪ হাজার ৩৭৫ টাকা। পর্যালোচনায় দেখা গেছে ঢাকায় মামলা হয়েছে প্রায় ৪৯ শতাংশ।
এ ব্যাপারে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড প্লানিং) মো. সোহেল রানা জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে ট্রাফিক সপ্তাহ পালন করায় সারা দেশে সাধারণ মানুষ পুলিশকে সমর্থন যুগিয়েছেন। গত ১০ দিনে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার গাড়ি জব্দ ও ৭ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বিআরটিএ এবং পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, একেকটি বাণিজ্যিক যানবাহনে তিন চালকের প্রয়োজনে। ব্যক্তিগত গাড়িতেও একাধিক চালক দরকার। কারণ মোটরযান আইন অনুসারে পেশাদার চালক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা যানবাহন চালাতে পারবেন। টানা ৫ ঘণ্টার বেশি চালানো যাবে না। অর্থাৎ সব মিলিয়ে যানবাহন যত আছে, এর চেয়ে বৈধ লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা বেশি হওয়ার কথা। এটি না থাকায় অদক্ষ ও ভুয়া চালকরাও যানবাহন চালাচ্ছেন।
বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে ৩৫ লাখ ৪৪ হাজার ৯টি গাড়ির রেজিস্ট্রেশন রয়েছে। এর বিপরীতে পেশাদার চালকের সংখ্যা ১২ লাখ ১৫ হাজার ৪৭০। অপেশাদার চালক আছেন ১৪ লাখ ২৪ হাজার ১৮৮ জন। সব মিলিয়ে ২৬ লাখ ৩৯ হাজার ৬৫৮টি। তবে একই চালকের একাধিক লাইসেন্সের হিসাব বাদ দিলে মোট ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৯ লাখ ৪০ হাজার ৩৮১টি। পেশাদার চালকের ভারি লাইসেন্স রয়েছে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৯৭টি, মাঝারি লাইসেন্স ৬০ হাজার ২৩৮টি, হালকা ৮ লাখ ৫৭ হাজার ৯৮৯টি ও থ্রি-হুইলারের ৫৪ হাজার ৪৮৪টি। অপেশাদার লাইসেন্সের মধ্যে মোটরসাইকেলের জন্য ৮ লাখ ২৩ হাজার ১৩৫ ও হালকা যানের লাইসেন্স রয়েছে ৬ লাখ ১ হাজার ৫৩টি। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ৫ই আগস্ট থেকে ১৪ই আগস্ট পর্যন্ত ঢাকাসহ সারা দেশে মামলা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৪৯টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। চালকের লাইসেন্স না থাকা বা নতুন করে নবায়ন না করার কারণে মামলা হয়েছে ৭৪ হাজার ২২৪ জনের বিরুদ্ধে। গাড়ির ফিননেস না থাকার কারণে পুলিশ ৫ হাজার ৪১৮টি যানবাহন জব্দ করে ডাম্পিং স্টেশনে পাঠিয়েছে। সর্বমোট জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৭ কোটি ১৪ হাজার ৩৭৫ টাকা। এই মামলার মধ্যে প্রায় ৪৯ শতাংশ মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর এলাকায়। ডিএমপিতে মোট মামলা হয়েছে ৮৮ হাজার ২৯৩টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১০ লাখ ৯৬ হাজার ২৭৭ টাকা।
গত ৫ই আগস্ট যানবাহনের লাইসেন্স এর ত্রুটি থাকার কারণে মামলা হয়েছে ৭ হাজার ৮১টি। গাড়ির ফিটনেস না থাকার কারণে ৫৭৭টি গাড়ি জব্দ করা হয়েছে। চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৫৬টি। আর জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪২ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৬ই আগস্ট মামলা হয়েছে ৭৩১৯টি। ফিটনেস না থাকার কারণে গাড়ি জব্দ করা হয়েছে ৮৩৭টি। চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৪৯৬টি। আর মামলায় জরিমানা হয়েছে ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৭২ টাকা। ৭ই আগস্ট মোট মামলা হয়েছে ৯৪৭০টি। এ সময় ৯৯৯টি গাড়ি জব্দ করা হয়। ১৮৭৫ জন চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আর জরিমানা করা হয়েছে ৫৪ লাখ ২৫ হাজার ৭৫০ টাকা। ৮ই আগস্ট মোট মামলা হয়েছে ৯৯৭৪টি। চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২১৫৩টি। আর গাড়ি জব্দ করা হয়েছে ১০৫৭টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ২০টাকা।
গত ৯ই আগস্ট ঢাকায় মোট মামলা হয়েছে ১০০২৬টি। এ সময় চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ২০৯৯টি। জরিমানা আদায় হয়েছে ৫৪ লাখ ৩ হাজার ৯২০ টাকা। ১০ই আগস্ট মোট মামলা হয়েছে ৮৫৪৭টি। চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১০৩৬টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪৯ লাখ ৩৫ হাজার ২০০টি। ১১ই আগস্ট মামলা হয়েছে ৯৭২৬টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৪৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৭৫টি। ১২ই আগস্ট মামলা হয়েছে ৯১৪৭টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৬০ লাখ ১৭ হাজার ৩৯০ টাকা। ১৩ই আগস্ট মামলা হয়েছে ৮৩৩৬টি। জরিমানা করা হয়েছে ৫৩ লাখ ৭৩ হাজার ১৫০ টাকা। ১৪ই আগস্ট মামলা হয়েছে ৮৬২৭টি। জরিমানা আদায় করা হয়েছে ৬০ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ টাকা।
সূত্র জানায়, ট্রাফিক সপ্তাহের ১০ দিনে ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের মোট মামলার মধ্যে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে বাসের বিরুদ্ধে ১৩০৯৩টি, ট্রাকের বিরুদ্ধে ১৮৪৮টি, কাভার্ড ভ্যানের বিরুদ্ধে ২৯২৫টি, পিকআপের বিরুদ্ধে ৬৬৩০টি, সিএনজি’র বিরুদ্ধে ৬৪২৩টি, মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে ৪৩৮৬৩টি, প্রাইভেটকারের বিরুদ্ধে ৮৪৯৭টি, মাইক্রোবাসের বিরুদ্ধে ২৭২৮টি, লেগুনার বিরুদ্ধে ৯৬১টি এবং অন্যান্য ১৩২৫টি মামলা করা হয়।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, এই কয়দিনে পুলিশ ঢাকাসহ সারা দেশের সড়কের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে। যদি সড়কের শৃঙ্খলা ফিরে আসে তাহলে পুলিশ আর অভিযান চালাবে না। আর যদি না হয় তাহলে পুলিশ আবার ঢাকাসহ সারা দেশে অভিযান চালাবে। আইনের ব্যত্যয় যে ঘটাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।