Tuesday, March 1, 2016

ওয়ান ইলেভেন: জেনারেল মইন

(ওয়ান ইলেভেনের প্রধান রূপকার তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ। ‘শান্তির স্বপ্নে সময়ের স্মৃতিচারণ’ গ্রন্থে জেনারেল মইন বর্ণনা করেছেন ওয়ান ইলেভেনের বিস্তারিত। ওই বইয়ের কিছু অংশ প্রকাশিত হলো মানবজমিন অনলাইন-এ)
দিনে দিনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন চূড়ান্ত সংঘর্ষের দিকে মোড় নিচ্ছিলো। ৭-৯ জানুয়ারি সারা দেশে অবরোধ পালিত হলো। ভাঙচুর, বিক্ষোভ, মিছিল আর বিক্ষিপ্ত সংঘর্ষে পুরো দেশ অচল হয়ে পড়লো। মহাজোট ঘোষণা করলো, সরকার যদি নির্বাচনী কর্মকা- নিয়ে এগিয়ে যায় তাহলে ১৪ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে অবরোধ ও বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচি পালিত হবে। ২১ ও ২২ জানুয়ারি দেশব্যাপী সর্বাত্মক হরতাল। তাতেও কাজ না হলে এরপর থেকে শুরু হবে লাগাতার কর্মসূচি। মহাজোটের এরকম কঠোর হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও সরকার তার অবস্থানে অনড় থাকলো। সংবিধানে উল্লিখিত নব্বই দিনের মধ্যে নির্বাচনের বাধ্যবাধকতা অবলম্বন করে চারদলীয় জোটও নির্বাচনের পক্ষে অনড় থাকলো। ত্রিমুখী এই অনড় অবস্থানের মধ্যে সমাধান খুঁজে পেতে সাধারণ মানুষের অলৌকিক কিছু কামনা ব্যতিত আর কিছুই করার থাকলো না।
অস্থির এ সময় আমার মনের উপর প্রচ- চাপ সৃষ্টি করেছিলো। টেলিভিশনের পর্দায় বিক্ষোভ আর ভাংচুরের ছবি দেখে আমার মনে প্রশ্নের উদয় হয়েছিলো কার বিরুদ্ধে আমাদের এ ক্ষোভ? রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদ ধ্বংস করে কার লাভ? অবরোধের মধ্যে ভাংচুরের শিকার ট্যাক্সিক্যাবের ভেতর আতঙ্কিত যাত্রীর কোলে ছোট্ট শিশুর আর্তনাদ দেখে আমার মনে হয়েছিলো এ শিশুটির কী অপরাধ? এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর ছিলো না আমার কাছে। আর উত্তর ছিলো না বলেই গভীর রাত পর্যন্ত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে নির্ঘুম যন্ত্রণাময় সময় কাটিয়েছি, আর কায়মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি যথাযথ দিক-নির্দেশনার জন্য।
সেনাবাহিনীর নিষ্ক্রিয়তায় দিন দিন দেশের মানুষের হতাশা  আরো বাড়ছিলো। তাদের অসহায় আক্ষেপ, সেনাবাহিনী কেন চুপ করে আছে? দেশের প্রতি কি তাদের কোনো দায়িত্ব নেই? আমাদের এ দুঃসময়ে তারা কি আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবে না? পত্রিকার পাতা ও টেলিভিশনের টকশোগুলোতে সাধারণ মানুষের এরকম হাজারো আর্তি আমাকে স্পর্শ করলেও আমি ভেবেছি আমাদের কী করার আছে? রাষ্ট্রের নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কী করতে পারি? কিন্তু কিছু করার জন্য আমার উপর চাপ বাড়ছিলো। এমনকি আমি সেনাবাহিনীর ভেতরও একধরনের হতাশা লক্ষ্য করি। সেনাবাহিনী এ দেশের সাধারণ মানুষেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই সাধারণ মানুষের হতাশা, আশা-নিরাশা সেনাসদস্যদের ভেতরও সংক্রমিত হবে এটাই স্বাভাবিক। তবুও সর্বান্তকরণে আমি চেয়েছি রাজনীতিবিদরাই এ সমস্যার সমাধান করুক।
এক সময় ক্ষমতাধর কয়েকটি দেশের প্রতিনিধি আমার সাথে দেখা করে জানালো, সবদলের অংশগ্রহণ ব্যতিরেকে নির্বাচন অনুষ্ঠানে সেনাবাহিনী সহায়তা করলে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে প্রত্যাহারের জন্য তারা জাতিসংঘকে অনুরোধ করবেন। প্রচ্ছন্ন এ হুমকির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি অনুধাবন করতে আমার অসুবিধা হলো না। জাতিসংঘের কর্মকান্ডের নিয়ন্ত্রক এসব দেশের অনুরোধ ও মতামত যে জাতিসংঘ অগ্রাহ্য করতে পারবে না তা বলাই বাহুল্য। আমি এর পরিণাম চিন্তা করে শিউরে উঠলাম। আমার ১৯৭৫-এর ৬ ও ৭ নভেম্বরের কথা মনে পড়লো, যখন সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে সিপাহিরা অস্ত্রহাতে রাস্তায় নেমে এসেছিলো, সেদিন কোনো চেইন অব কমান্ড কাজ করেনি। সেনাবাহিনীর সীমিত আয়ের চাকরিতে সৈনিকদের একমাত্র অবলম্বন জাতিসংঘ মিশন। তাদের সামনে থেকে যদি সেই সুযোগ কেড়ে নেয়া হয় তাহলে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টকর হয়ে পড়বে। সেই সাথে শান্তিরক্ষা মিশনে আমাদের এতোদিনের সুনামও ভূলুণ্ঠিত হবে। তারপরেও আমার একমাত্র চেষ্টা ছিলো কী করে সেনাবাহিনীকে রাষ্ট্রযন্ত্রের কর্মকা- থেকে দূরে রাখা যায়।
এ সময়কার রাতগুলো ছিলো আমার জন্য খুবই কষ্টের। দিনগুলো কেটে যেতো কর্মব্যস্ততায়। কিন্তু রাত হলেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠতো ভাঙচুর, ধ্বংসলীলা আর অসহায় মানুষের আর্তনাদের দৃশ্য। সারারাত ভেবে ভেবে ক্লান্ত হতাম, কী করে দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়? কিন্তু দেশের প্রতি আমার প্রেম, গণতন্ত্রের প্রতি আমার শ্রদ্ধা এবং রাষ্ট্রের প্রতি আমার আনুগত্য আমার মনকে শান্ত করতো। একবার আমার মনে প্রশ্ন জাগলো, দেশকে বাঁচানোর জন্য যদি আমি কিছু করি তবে কি তা ম্যাডাম জিয়ার বিরুদ্ধে যাবে? তাহলে কি তা বিশ্বাস ভঙ্গের সামিল হবে না? তিনিই তো সেনাপ্রধান হিসেবে আমার উপর আস্থা রেখেছিলেন। সাথে সাথে আমি আবার নিজের মধ্যেই উত্তর পেলাম, দেশ যেখানে ধ্বংসের মুখোমুখি সেখানে অন্য সবকিছুই গৌণ। দেশ থেকে বড় আর কিছুই হতে পারে না। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি দেশের হয়ে সেনাবাহিনী প্রধানের উপর আস্থা রেখেছিলেন। সেই আস্থার অমর্যাদা আমি করছি না। বরং যদি কিছু করি তবে তা দেশের জন্যই করবো, সেখানে বিশ্বাস ভঙ্গের প্রশ্ন নেই। আমার কাছে প্রথমে দেশ তারপর অন্যকিছু। সেই সময় কিছু করার চেষ্টা করা মনে নিজের জীবনের ঝুঁকি নেয়া। তাই আমার মাঝে আরেকটি প্রশ্নের উদয় হলো, এই কারণে জীবনের ঝুঁকি নেয়া কি যুক্তিযুক্ত? আবার উত্তর পেলাম, জন্মেছি যখন তখন কোনো একদিন মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতেই হবে। তবে সে মৃত্যু যদি দেশের জন্য, দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য হয় তবে তারচেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না। নিজের মনের সাথে এরকম হাজারো প্রশ্ন আর উত্তরে নির্ঘুম রাত কাটিয়েছি। আমার অস্থিরতা আমার স্ত্রী টের পেলেও সে কখনো কিছু জিজ্ঞেস করতো না। আমিও নিজ থেকে তাকে কিছু বলতাম না। কারো সাথেই মনের এ কষ্ট ভাগ করে নেয়ার সুযোগ ছিলো না। তবে ডিভিশন কমান্ডারদের দেশের অবস্থা সম্পর্কে নিয়মিত অবগত করতাম এবং তাদের মতামত শুনতাম। তাদের মধ্যে কেউ কেউ দ্রুত কিছু করার তাগিদ দিতো। বিশেষ করে সাভার ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী দেশের অবস্থা এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খুবই উদ্বেগ প্রকাশ করতেন। আমি তাদের বুঝাতাম রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ নেই।

গ্রেপ্তার এড়াতে এরশাদ নিজেই সমাঝোতা করেছিলেন -আনিসুল ইসলাম মাহমুদ

জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেছেন, এক-এগারের সময় গ্রেপ্তার এড়াতে পার্টির চেয়ারম্যান নিজেই সমঝোতা করেছিলেন। তার নির্দেশ ও সুবিধার্থেই আমি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হয়েছিলাম। আমি এ দায়িত্ব নিয়েছিলাম বলেই মাইন থ্রি ফরমুলা থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন এরশাদ। আজ মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে শেরপুরে জাতীয় পার্টির এক সম্মেলনে জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ বলেছেন, এক-এগারের কুশিলব হিসেবে আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বিচার হওয়া উচিত। এরশাদের এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সংবাদ সম্মেলন ডাকেন আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। তিনি বলেন, সেসময় এরশাদ সাহেব ভয়ে দেশের বাহিরে চলে যেতে চেয়েছিলেন। পরে আমরা তাকে বলেছিলাম আপনার যাওয়ার দরকার নেই। তখন গ্রেপ্তার না হতে এরশাদ নিজেই এক-এগারোর সরকারের সঙ্গে সমঝোতা করেন। প্রথমে তিনি তাঁর ভাই জিএম কাদেরকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জিএম কাদের ওই পদ গ্রহণ করতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। কারণ, জেনারেল মইন ইউ আহমেদ এর সঙ্গে সেমিনারে যেতেন জিএম কাদের। কাদের সাহেব এক-এগারো সরকারের অংশ হতে চেয়েছিলেন। আনিসুল ইসলাম মাহমুদ আরও বলেন, জিএম কাদের এমন ব্যক্তি, যিনি এক আসন থেকে দুইবার নির্বাচন করতে পারেননি। যতবার এমপি হয়েছেন তার ভাইয়ের পরিচয়ে এমপি হয়েছেন। এরশাদ সাহেব তার এই ভাইয়ের জন্য পার্টি ধ্বংস করে দিচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, হয়তো আমি পার্টি থেকে বহিষ্কারও হয়ে যেতে পারি। এটা নিয়ে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। এরশাদের উদ্দেশ্যে এই জাপা নেতা বলেন, আপনি ব্যাক্তিগত উদ্দেশ্যে পার্টিকে ধ্বংস করে দিবেন না। পার্টির জন্য আপনি ছাড়াও অনেকের অবদান আছে। সরকারের এই মন্ত্রী আরও বলেন, আমরা যতটুকু সম্ভব বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করছি। এখন মন্ত্রীসভা থেকে বের হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। পার্টির ভালোর জন্য যদি মন্ত্রীত্ব ছাড়তে হয়, ছাড়বো। তবে আগে বুঝাতে এর পেছেনে যুক্তি কি।

কাদের সিদ্দিকীর আপিলের শুনানি ৩ মার্চ

স্থগিত থাকা টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের উপ-নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বৈধ নয় বলে হাইকোর্টের দেয়া রায় স্থগিত চেয়ে কৃষক-শ্রমিক-জনতা লীগের সভাপতি আবদুল কাদের সিদ্দিকীর করা লিভ টু আপিলের শুনানির জন্য আগামী ৩ মার্চ দিন ধার্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের চেম্বার জজ আদালত। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর চেম্বারজজ আদালত এই আদেশ দেন।
পরে ব্যারিস্টার ড. মুহাম্মদ ইয়াসীন খান জাগো নিউজকে বলেন, চেম্বার জজ আদালত কোনো আদেশ না দিয়ে আগামী ৩ মার্চ নিয়মিত ফুলকোর্টে শুনানির জন্য ঠিক করেন।
আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট এজে মোহাম্মদ আলী, সঙ্গে ছিলেন ব্যারিস্টার রাগিব রউফ চৌধুরী। অপরদিকে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। ইলেকশন কমিশনের আইনজীবী ব্যারিস্টার ড. মুহাম্মদ ইয়াসীন খান।
রাগিফ রউফ চৌধুরী বলেন, এর আগে হাইকোর্টের ঘোষণা করা রায় প্রকাশ করেন ২৩ তারিখ তার পরে ২৫ ফেব্রুয়ারি লিভ টু আপিল করেন কাদের সিদ্দিকী।
এর আগে গত ৪ ফেব্রুয়ারি কাদের সিদ্দিকীর করা রিট আবেদন বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি জাফর আহমেদ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ বিষয়ে জারি করা রুলের নিষ্পত্তি করে রিট খারিজ করে রায় দেয়। কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বৈধ নয় বলে নির্বাচন কমিশনের দেয়া সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছেন আদালত। এরপর আজ (মঙ্গলবার) হাইকোর্টের রায় স্থগিত চেয়ে চেম্বার বিচারপতির আদালতে আপিল (সিএমপি) আবেদন করেন কাদের সিদ্দিকী।
টাঙ্গাইল-৪ আসনে উপ-নির্বাচনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র গ্রহণের নির্দেশ দিয়ে ২০১৫ সালের ২১ অক্টোবর আদেশ দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক আকন্দ সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের অবকাশকালীন একটি ডিভিশন বেঞ্চ এ সংক্রান্ত এক রিট পিটিশনের শুনানি শেষে কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা দিয়ে তা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের আদেশ দেয়। এছাড়াও ঋণ খেলাপি দেখিয়ে কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণার সিদ্ধান্ত বাতিল প্রশ্নে আদালত সংশ্লিষ্টদের প্রতি রুল জারি করেন।
ওইদিনই আদেশ পরবর্তী এক প্রতিক্রিয়ায় অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বিষয়টি নিয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করা হবে বলে জানান।
কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে ইসির পক্ষে গত বছর ২৬ অক্টোবর আবেদন দায়ের করেন অ্যাডভোকেট-অন-রেকর্ড ব্যারিস্টার ড. মুহাম্মদ ইয়াসীন খান। ২৭ অক্টোবর টাঙ্গাইল-৪ আসনের উপ-নির্বাচন স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবকাশকালীন চেম্বার কোর্ট।
কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে ইসির আবেদন বিষয়ে ২ নভেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি হয়েছিল। ওইদিন টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতী) আসনের উপ-নির্বাচন ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত ঘোষণা করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
একই সঙ্গে বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টের জারি করা রুল এ সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেন আদালত। এ সময়ের মধ্যে টাঙ্গাইল-৪ আসনের উপ-নির্বাচনের সব কার্যক্রম বন্ধ থাকবে বলেও আদেশ দেয়া হয়। সে অনুয়ায়ী রুলের ওপর হাইকোর্টের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়।
টাঙ্গাইল-৪ (কালিহাতি) আসনে উপ-নির্বাচনে প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে কাদের সিদ্দিকী গত ২০ অক্টোবর হাইকোর্টে রিটটি দায়ের করেন। গত ১৩ অক্টোবর টাঙ্গাইল-৪ আসনের উপ-নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাছাইকালে ঋণ খেলাপির দায়ে কাদের সিদ্দিকী ও তার স্ত্রী নাসরিন সিদ্দিকীর মনোনয়নপত্র বাতিল করে।
এরপর এ দুই প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করেন। ইসি এ দুই প্রার্থীর উপস্থিতিতে শুনানি করে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।
আদালতে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। কাদের সিদ্দিকীর পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী এজে মোহাম্মদ আলী। তাকে সহায়তা করেন ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী।
গতবছর ২৮ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে স্থানীয় টাঙ্গাইল সমিতি আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সাবেক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তিমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী হজ, তাবলিগ জামাত বিষয়ে মন্তব্য করে বক্তব্য দেন। লতিফ সিদ্দিকীর ওই মন্তব্য ও বক্তব্য সম্বলিত ভিডিও ক্লিপ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও গণমাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচার হলে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। পরে বিষয়টি আমলে নিয়ে সরকার লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিপরিষদ থেকে অপসারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা হিসেবে তাকে  আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। দল থেকে বহিষ্কৃত হওয়ায় টাঙ্গাইল-৪ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে লতিফ সিদ্দিকী গত বছর ১ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করে। ফলে আসনটি শূন্য হয়। গত ৩ সেপ্টেম্বর শূন্য আসন বিষয়ে গেজেট প্রকাশ করে সংসদ সচিবালয়। এরপর নির্বাচন কমিশন (ইসি) এ আসনে উপ-নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে। সে মোতাবেক গত বছর ১০ নভেম্বর এখানে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

সাত খুনের মামলার বিচার গোপনে?

নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার বিচার কি গোপনে হচ্ছে? আদালতকক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়ার পর এ প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল সোমবার এই মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর আগে আসামিপক্ষের আইনজীবীর সঙ্গে একজোট হয়ে আদালতকক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেন সরকারি কৌঁসুলি (পিপি)।
সাংবাদিকদের বের করে দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলেছেন, একমাত্র ক্যামেরা ট্রায়াল (গোপনে বিচার) হলে আদালত সাংবাদিকদের বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেছেন, আদালত থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়ার ক্ষমতা পিপির নেই।
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় ২০১৪ সালে দুটি মামলা হয়েছিল। একটির বাদী নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে গতকাল বিজয় কুমার পালের জবানবন্দির মধ্য দিয়ে ওই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়।
গতকাল সকাল নয়টার দিকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে সাত খুন মামলার ২৩ জন আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করা হয়। সকাল সোয়া ১০টার দিকে আসামি সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন, র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মাদ, আরিফ হোসেন, এম এম রানাসহ সব আসামিকে আদালতকক্ষে আসামির কাঠগড়ায় নেওয়া হয়। এ সময় পর্যন্ত সাংবাদিকেরা আদালতকক্ষে ছিলেন। এ মামলার অপর ১২ আসামি পলাতক।
সাড়ে ১০টার দিকে মামলার কার্যক্রম শুরুর কিছুক্ষণ আগে আসামি নূর হোসেনের আইনজীবী ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা আদালতকক্ষে উপস্থিত সাংবাদিকদের বের হয়ে যেতে বলেন। কিন্তু তাঁর কথা শুনে কোনো সাংবাদিক বের হননি। পরে পিপি এস এম ওয়াজেদ আলী বলেন, সাক্ষ্য গ্রহণের কার্যক্রম চলাকালে বাদী, আসামি ও আইনজীবী ছাড়া আর কেউ থাকতে পারবেন না বলে আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। এর পরপরই সাংবাদিকদের বের করে দেয় পুলিশ। তাৎক্ষণিকভাবে সাংবাদিকেরা এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করলেও তাঁরা বের হয়ে যেতে বাধ্য হন।
এরপর বিচারক আসন গ্রহণ করেন। বেলা দেড়টা পর্যন্ত বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণের পুরোটা সময় সাংবাদিকেরা আদালতকক্ষের বাইরে ছিলেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, গতকাল সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হলেও মামলা-সংশ্লিষ্ট নন এমন আইনজীবীরা এবং নূর হোসেনের বড় ভাই নূর উদ্দিন আদালতকক্ষে উপস্থিত ছিলেন।
আদালতকক্ষ থেকে পিপি সাংবাদিকদের বের করে দিতে পারেন কি না, জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা পিপি বলতে পারেন না। পিপির এ ক্ষমতা নেই। এটা বলতে পারেন কোর্ট। কোর্ট যদি মনে করেন ক্যামেরা ট্রায়াল হবে, তাহলে বলতে পারেন।’ তিনি এ বিষয়ে খোঁজ নেবেন বলে জানান।
যোগাযোগ করা হলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘এটা খুব অদ্ভুত ঘটনা। সাংবাদিকদের বের করে দেওয়ার অধিকার পিপির নেই। সাক্ষ্য গ্রহণের সময় সাংবাদিকেরা থাকতে পারবেন কি না, সেটা ঠিক করতে পারেন একমাত্র বিচারক। সাধারণত সাক্ষীর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ক্যামেরা ট্রায়াল হয়। কিন্তু সে আদেশ বিচারককে দিতে হবে।’
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ এই আইনজীবী আরও বলেন, সর্বোচ্চ আদালতে প্রতিদিন প্রধান বিচারপতি কী কথা বলছেন না বলছেন, সেটা মুহূর্তের মধ্যে রিপোর্ট হয়ে যাচ্ছে। কই কেউ তো সাংবাদিকদের বাধা দিচ্ছে না।
ক্যামেরা ট্রায়াল হলো বিচারের একটি বিশেষ পদ্ধতি, যেখানে বিচারক, রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের সুনির্দিষ্ট আইনজীবী এবং আসামি ছাড়া আর কেউ আদালতকক্ষে উপস্থিত থাকতে পারেন না।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী শাহদীন মালিক পাল্টা প্রশ্ন তুলে বলেন, পিপি বলার কে? পিপি কেন এ ধরনের কথা বললেন, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এ ধরনের মামলায় সাংবাদিকদের দায়িত্বপালনে কোনো বাধা নেই। চাইলে বিচারক বিশেষ কোনো যুক্তি থেকে এটা বলতে পারেন।
রাতে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে পিপি ওয়াজেদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে ভুল-বোঝাবুঝি হচ্ছে। বিচারকের নির্দেশে আমি আদালতকক্ষে শৃঙ্খলা রাখার জন্য আইনজীবী বাদে বাকিদের কিছুক্ষণের জন্য বাইরে থাকতে বলেছিলাম।’ তিনি দাবি করেন, নূর হোসেনের বড় ভাইকে িতনি চেনেন না। তাই তিনি আদালতকক্ষে ছিলেন কি না, তা বলতে পারবেন না।
আদালতকক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া ‘ন্যক্কারজনক ঘটনা’ উল্লেখ করে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমরা প্রথম থেকে বলছি, এই মামলায় প্রভাবশালী একটি মহল প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।’ সাংবাদিকদের বের করে দেওয়ার ঘটনায় তিনি ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তিনি আশা করেন, আগামী দিনগুলোতে সাংবাদিকদের শুনানির সময় উপস্থিত থাকতে দেওয়া হবে।
আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, মামলার ১ নম্বর আসামি নূর হোসেনকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর থেকে তাঁর প্রভাব দৃশ্যমান হচ্ছে। গত ৮ ফেব্রুয়ারি সাত খুনের ঘটনায় করা মামলা দুটিতে অভিযোগ গঠন করা হয়। ওই দিন একটি মামলার বাদী নিহত ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম প্রথম আলোর কাছে অভিযোগ করেছিলেন, নূর হোসেনের লোকজন তাঁকে সব সময় অনুসরণ করে। মামলার ধার্য দিনে আদালতের চারপাশে পাহারা বসায়। ওই দিনও নূর হোসেনের ভাতিজা ও তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী শাহজালাল বাদলসহ চারজন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া নূর হোসেনের লোকজন আদালতের বাইরে জটলা করে দাঁড়িয়ে ছিলেন।
ওই দিন সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, নূর হোসেন ভারত থেকে দেশে আসার পরে পুরো পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো থেকে তিনি অব্যাহতি পেতে শুরু করেছেন।
গতকালের ঘটনা নিয়ে নারায়ণগঞ্জের বর্ষীয়ান আইনজীবী ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মহানগর কমিটির সভাপতি আহসানুল করিম চৌধুরী বলেন, আদালতের বিচারকাজ হবে উন্মুক্ত। সারা দেশের মানুষের আগ্রহ রয়েছে সাত খুনের বিচার নিয়ে। তাই এ মামলার সব কার্যক্রমে সাংবাদিকদের থাকতে দেওয়া উচিত।
জেলা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মজিবুল হক বলেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে মামলার শুনানিতে সাংবাদিকদের উপস্থিতি কাম্য। কিন্তু আজ যা হলো, তা নজিরবিহীন।
আইনজীবীরা বলেন, সাংবাদিকেরা আদালতকক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বেলা পৌনে ১১টার দিকে বিজয় কুমার পাল বাদী হিসেবে তাঁর জবানবন্দি দেওয়া শুরু করেন। এরপর তাঁকে জেরা করেন র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আরিফ হোসেনসহ ১০ আসামি এবং র্যাবের আট সদস্যসহ পলাতক ১২ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা। মামলার অন্য আসামি নূর হোসেন, তারেক সাঈদ মোহাম্মাদ ও এম এম রানার পক্ষের আইনজীবীরা বাদীকে জেরা করতে সময় চাইলে আদালত তা মঞ্জুর করে ৭ মার্চ দিন ধার্য করেন।
নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সহযোগীকে হত্যার ঘটনায় অন্য মামলাটি করেছিলেন সেলিনা ইসলাম। গতকাল আদালত তাঁর সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য ৩ মার্চ দিন ধার্য করেন।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে অপহরণের শিকার হন আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালক। পরে তাঁদের এবং কাউন্সিলর নজরুল ইসলামসহ পাঁচজনের লাশ শীতলক্ষ্যা নদীতে পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় করা দুই মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি নূর হোসেন, তারেক সাঈদসহ ৩৫ জনকে আসামি করে অভিযোগ গঠন করেন আদালত।

কাকে বলে রাষ্ট্রদ্রোহিতা! by মিজানুর রহমান খান

মহাত্মা গান্ধী ১৯২২ সালে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায় স্বীকার করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এই আদালতের কাছে আমার এটা লুকানোর কিছু নেই যে বিদ্যমান সরকারব্যবস্থার প্রতি আমার বিরাগ প্রকাশ করাটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।’ ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহ্ফুজ আনাম সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো মন্তব্য না করা সত্ত্বেও গতকাল রোববার খবর বেরিয়েছে যে, রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে মামলা করতে চট্টগ্রামের পুলিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে অনুমোদন চেয়েছে। এ বিষয়ে যে প্রাথমিক আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তাতে আমরা সংশয়গ্রস্ত যে আমাদের সমাজ আট শ বছর পেছনের ইঙ্গ-মার্কিন সমাজে ফিরছে কি না।
‘অসত্য খবর’ প্রকাশকে দণ্ডনীয় করে ইংল্যান্ডে ১২৭৫ সালে সেডিশাস লাইবেল বা রাষ্ট্রদ্রোহমূলক মানহানি আইন পাস হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র দুবার এই আইন করে আবার সেগুলো বাতিল করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অ্যাডামসের কর্তৃত্ববাদী ফেডারেলিস্ট সরকার ১৭৯৮ সালে রাষ্ট্রদ্রোহ আইন করেছিল। তিনি ও তাঁর সরকার আজকের আমেরিকার দুই প্রধান দল ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান এবং সংবাদপত্রের সমালোচনায় ভীত ছিলেন। বাক্স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণে কংগ্রেস কোনো আইন করতে পারবে না, এটা সংবিধানে লেখা ছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট অ্যাডামস তবু সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে ওই আইন পাস করেছিলেন এবং তাঁর সময় অন্তত ১০ জন সম্পাদক ও লেখক দণ্ডিত হয়েছিলেন। কেউ কেউ দেশান্তরিত হন। ১৯১৮ সালে দুই বছরের মেয়াদে শেষবারের মতো এ রকম আইন দেখেছেন মার্কিনরা। ব্রিটেনে এই আইনের আওতায় সবশেষ বিচার হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। ২০১০ সালে ব্রিটেন আইনটি বাতিলের অন্যতম মুখ্য কারণ হিসেবে যা উল্লেখ করেছিল, তা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য একটি শিক্ষণীয় হয়ে আছে। সেখানে বলা আছে, বিশ্বের বহু দেশ ব্রিটেনে এই আইন আছে—সেই যুক্তি দেখিয়ে নিজের দেশে তা টিকিয়ে রাখে। কিন্তু আসলে তারা এই আইনটি রাজনৈতিক ভিন্নমত দমিয়ে রাখতে ব্যবহার করে থাকে।
দণ্ডবিধির ৪৯৯ ধারায় মানহানির সংজ্ঞা এবং ৫০০ ধারায় অনধিক দুই বছরের দণ্ড ও অর্থদণ্ড এবং উভয়বিধ দণ্ড প্রদানের বিধান আছে। এটা সবার জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু ৫০১ ও ৫০২ ধারা নির্দিষ্টভাবে সাংবাদিক ও প্রকাশকদের জন্য প্রযোজ্য। এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বিচারপতি মোস্তাফা কামালের কাছে জানতে চেয়েছিল, এই দুটো বিধান রহিত করা যায় কি না। সাংবাদিকেরা এমন কিছু বহুকাল ধরে দাবি করে চলছিলেন। কিন্তু বিচারপতি মোস্তাফা কামাল তাঁর লিখিত প্রতিবেদনে বললেন, সাংবাদিকের জন্য এক আইন আর নাগরিকের জন্য আরেক আইন, এটা হতে পারে না। কারণ, তাতে ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনের সমতার নীতির লঙ্ঘন ঘটে। তবে তিনি এটা লিখেছিলেন যে, ‘সংশ্লিষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত’ ব্যক্তিকেই মানহানির প্রতিকার চাইতে হবে।
কোনো ক্ষতিকর বা অনিষ্টকর বা অশ্লীল বিষয়–সংবলিত কোনো রিপোর্ট বা কোনো পত্রিকা বা সাময়িকীতে লিখন, মুদ্রণ, প্রকাশ, বণ্টন বা বিক্রি ইত্যাদি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ১৬ ও ১৭ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ ছিল, কিন্তু সংবাদপত্রসেবীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯১ সালের ১৮ নম্বর আইন দ্বারা তা বাতিল করা হয়েছে। তাই মানহানির প্রতিকারের জন্য দণ্ডবিধি ছাড়া অন্য কোনো সংবিধিবদ্ধ আইন নেই। দেওয়ানি আইনে অবশ্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন।
প্রশ্ন হলো কোনো ব্যক্তি কি একই ঘটনায় একই সঙ্গে দুটি আইনের অধীনে মানহানির প্রতিকার চাইতে পারেন? একই অপরাধে কারও দুবার বিচার হবে না। কিন্তু কেউ মানহানির ঘটনায় সিভিল রং বা দেওয়ানি অপকারের প্রতিকার চেয়ে দেওয়ানি আদালতে মোকদ্দমা করতে পারেন। আবার দণ্ডবিধির আওতায় মামলা করতে পারেন। আমাদের আইন কমিশনের অভিমত অনুযায়ী কোনো প্রকৃত সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি তার মানহানির জন্য একসঙ্গে দণ্ডবিধি ও দেওয়ানি উভয় আইনে মামলা করতে পারেন। অ্যাডভেলোরিম ফি বিষয়ে একটি আলাদা আইন আছে। আর সেখানে দণ্ডবিধির আওতায় মানহানি মামলায় আর্থিক ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কিংবা তা উশুল করে দেওয়ার কোনো বিধান রাখা হয়নি।
দণ্ডবিধির ১২৪ক এর আওতায় ১৭টি রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হলো। ৫৩ জেলায় ৬২ মানহানিসহ মোট মামলা ৭৯। আর তাতে ফৌজদারি আইনে ১ লাখ ৩২ হাজার ৮১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকার ক্ষতিপূরণ চাওয়া হয়েছে, যেখানে উপমহাদেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলোতে এটা মীমাংসিত যে, কেবল সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি শুধু দেওয়ানি আইনে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারেন। সেখানে আইনের চোখে যারা সরাসরি ‘সংক্ষুব্ধ’ নন, তারা মানহানির জন্য টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়েছেন।
গত বছরের নভেম্বরে গুজরাটের হার্দিক প্যাটেলকে যখন রাষ্ট্রদ্রোহিতার দায়ে অভিযুক্ত করা হলো, তখন তাকে ভিন্নমতের প্রতি সরকারের ক্রমেই বৃদ্ধি পাওয়া অসহিষ্ণুতার নজির হিসেবে দেখা হলো। রাষ্ট্রদ্রোহের আইনের আধুনিক ব্যবহারের নীতি হলো, কোনো সরকারের টিকে থাকার জন্য কোনো প্রকাশনা বা মন্তব্য যদি কোনো ‘স্পষ্ট এবং আসন্ন বিপদ’ সৃষ্টি করে, তাহলে তাকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলা যাবে। অতীতের একটি ঘটনার জন্য মাহ্ফুজ আনামের দুঃখ প্রকাশের ঘটনায় বর্তমান রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থার প্রতি এ ধরনের কোনো উপাদান আছে মর্মে সমাজের প্রাজ্ঞ ও চিন্তাশীল ব্যক্তিরা মত দেননি। এটাও বিবেচ্য যে ওই সময় শেখ হাসিনা রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন না। পুলিশের বড়কর্তা নিয়োগ–সংক্রান্ত টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা বানানোর চেষ্টা ২০১২ সালে কোয়াশ বা খারিজ করেছেন গুজরাটের হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ১২৪ক ধারায় যদি প্রমাণ না করা যায় যে, কোনো রিপোর্ট বা বক্তব্য সরকারের বিরুদ্ধে নৈরাজ্যকর হয়েছে, তাহলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ বলে গণ্য হবে না। বিচারপতি হর্ষ দেবানি বলেছেন, রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে ‘সরকারের বিরুদ্ধে নাশকতার’ উপাদান থাকতেই হবে।
তাই মাহ্ফুজ আনাম যেভাবে দুঃখ প্রকাশ করে শান্তির সপক্ষে ভূমিকা রেখেছেন, তা কোনোভাবেই ‘সরকারের বিরুদ্ধে নাশকতা’ হতে পারে না। অভিযোগ উঠেছে, ডেইলি স্টার ২০০৭ সালে যাচাই না করে খবর ছেপে এবং ২০১৬ সালে তা স্বীকার করে রাষ্ট্রদ্রোহ করেছে। এই যুক্তি বিবেচনায় নিলেও আমরা দেখি, অপরাধের দায়যুক্ত কার্য সংঘটনকাল হলো ২০০৭ সাল। সংসদে দাবি উঠেছে ২০১১ সালের ১৫তম সংশোধনীতে যুক্ত করা সংবিধানের ৭ক অনুচ্ছেদমতে মাহ্ফুজ আনামকে রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে বিচার করতে হবে। অথচ সেখানেও নাশকতার শর্ত দেওয়া আছে। বলা হয়েছে, শক্তি প্রদর্শন বা তাতে উসকানি দিয়ে সংবিধান রদ বা বাতিলের কোনো চেষ্টা হবে অপরাধ। আবার সংবিধানের পরিষ্কার নির্দেশনা হচ্ছে, ২০০৭ সালে সংঘটিত অপরাধ শুধু নয়, ‘অপরাধের দায়যুক্ত যেকোনো কার্যের’ কারণে কারও বিচার ২০১১ সালের বা ভবিষ্যৎসাপেক্ষ কোনো আইনে করা যাবে না। কারণ, ভূতাপেক্ষভাবে এর প্রয়োগ সংবিধানের ৩৫(১) অনুচ্ছেদ নিষিদ্ধ করেছে। বঙ্গবন্ধু নিজেই এই বিধান ১৯৭২ সালে এনেছেন। আর এতে বলা আছে, ‘অপরাধের দায়যুক্ত কার্য সংঘটনকালে বলবৎ ছিল, এইরূপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যতীত কোনো ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না। এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ কোনো আইনে যেরুপ দণ্ড দেওয়া যেতে পারত তার থেকে ভিন্ন দণ্ড দেওয়া যাবে না।’ সুতরাং মাহ্ফুজ আনাম তার ২০০৭ সালের রিপোর্টের জন্য প্রচলিত কোন আইনের কোন ধারাটি লঙ্ঘন করেছেন, সেটা সবার আগে বিচার্য। রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়েরের অনুমোদন প্রদানের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এদিকটি বিবেচনায় নিতে হবে। এ বিষয়ে সরকারকেই দায়িত্ব নিতে হবে। কারণ, তার অনুমতি ছাড়া কোনো আদালত রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা আমলে নিতে পারবেন না। কারণ, আইন এটাও নিষিদ্ধ করে রেখেছে।
মাহ্ফুজ আনামের টিভি বক্তব্যের পক্ষে–বিপক্ষে আমরা নিশ্চয় আলোচনা চালিয়ে যাব। কিন্তু আমরা নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না এটা দাবি করে যে, তাঁর কথায়, ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিপন্ন বা জনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়া’ কিংবা ‘সংবিধান বাতিলের’ মতো কোনো অপরাধের উপাদান আছে। এতে যদি আমরা একমত হই তাহলে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কোনো প্রশ্নই আসে না। আমাদের ৩৯ অনুচ্ছেদে যে পাবলিক অর্ডার বা জনশৃঙ্খলা কথাটি আছে, সেটা মাহ্ফুজ আনামের কথায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে, অভিযোগকারীদের তার প্রমাণ দিতে হবে। এই যুক্তির সমর্থনে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকেই সাক্ষ্য হিসেবে হাজির করছি।
১৯৫১ সালে সংসদে একটি বিল এনে তিনি বলেছিলেন, ১২৪ক তে উল্লেখ করা ‘সিডিশন’ (আমাদের দণ্ডবিধির ১২৪কটিও হুবহু এক) কথাটি অত্যন্ত আপত্তিকর ও গর্হিত। আমি ১৯(২) অনুচ্ছেদে বাক্স্বাধীনতার বিধানে ‘জনশৃঙ্খলা’ এনে রাষ্ট্রদ্রোহের ধারণাকে বিস্তৃত করিনি।’
আমরা ১৯৭২ সালেই সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে ভারতের ওই সংশোধিত ১৯(২) অনুচ্ছেদটিকে অবিকল গ্রহণ করেছিলাম। অবশ্য পরিহাস হলো যদিও নেহরু বলেছিলেন, সিডিশন আইনের কোনো ঠাঁই ভারতে হবে না। কিন্তু তিনি কথা রাখতে পারেননি। রাম নন্দন নামের বিহারের এক লোক ‘জাতিকে বিভক্ত’ করার জন্য নেহরুকে বিশ্বাসঘাতক বলেছিলেন। হুমকি দিয়েছিলেন দিনমজুরদের চরম দারিদ্র্য নিরসনে ব্যর্থ সরকারের উৎখাতে দরকার হলে তিনি আর্মি গঠন করবেন। তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত হলেন। সুপ্রিম কোর্ট রাম নন্দনের দণ্ড মওকুফ করলেন। সেই ১৯৫৮ সালেই উচ্চ আদালতের রায়ে বাক্স্বাধীনতার জয় হয়েছিল।
রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা দায়েরে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সরকারকে সতর্ক করে বলেছিলেন, সিডিশন আইনকে কিছুতেই ব্যাপকতা নয়, অত্যন্ত সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহার করতে হবে, নইলে তা সাংবিধানিক বৈধতার পরীক্ষায় পাস করতে পারবে না। বিধানটা দণ্ডবিধির এমন একটি পরিচ্ছেদে রাখা, যেটির শিরোনাম ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ’। সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ বলেছে, ‘রাষ্ট্র বলতে সংসদ, সরকার ও সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ অন্তর্ভুক্ত।’ আমরা বিস্ময়ে বিমূঢ়, যা তাঁর ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার’ বহিঃপ্রকাশ, সেটা কীভাবে, কী করে (আনামের টক শোর আত্মসমালোচনামূলক মন্তব্য) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অপরাধ বলে গণ্য হতে পারে?
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

১/১১–র কুশীলবদের বিচার হয়নি কেন? by মশিউল আলম

১৬ জুলাই ২০০৭। গ্রেপ্তারের পর ঢাকার আদালতে
আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা -ফাইল ছবি
ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে মামলা করার যে নজিরবিহীন তৎপরতা দেখলাম, তা শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়াবে কে জানে। দুই সপ্তাহের কম সময়ের মধ্যে একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৭৮টির মতো মামলা দায়ের করার ঘটনা অস্বাভাবিক।
আজ থেকে আট-নয় বছর আগে, ২০০৭-০৮ সালে ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে মাহ্ফুজ আনামের ডেইলি স্টার কী প্রতিবেদন ছেপেছে, তার বিচার চেয়ে এতগুলো বছর পরে মামলা করার পাইকারি উৎসাহের তাৎপর্য কী, তা জানি না। জাতীয় সংসদের ভেতরে ও বাইরে যাঁরা মাহ্ফুজ আনাম ও ডেইলি স্টার-এর শাস্তির দাবি জানাচ্ছেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে যাঁরা মামলা দায়ের করছেন, যাঁরা টিভি টক শোতে নানা কথা বলছেন, তাঁদের একটা সাধারণ অভিযোগ হলো, মাহ্ফুজ আনাম ও ডেইলি স্টার সাংবাদিকতার মাধ্যমে শেখ হাসিনার গ্রেপ্তার ও কারাভোগের ‘পটভূমি’ তৈরি করেছিল। কিন্তু এ অভিযোগ কতটা বাস্তব তথ্যভিত্তিক? আওয়ামী লীগের প্রধান শেখ হাসিনা ও বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়াকে যাঁরা গ্রেপ্তার করেছিলেন ও দীর্ঘ সময় ধরে কারাগারে আটকে রেখেছিলেন, তাঁরা কি আসলেই ডেইলি স্টার ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের দ্বারা ‘পটভূমি’ তৈরির অপেক্ষায় ছিলেন?
স্মরণ করা যাক
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয় ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই ভোররাতে, ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ ও জরুরি অবস্থা জারির ছয় মাসের মধ্যে। ওই ছয় মাস ধরে আওয়ামী লীগ-বিএনপি এবং শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার ব্যাপারে নানা কিছু করার চেষ্টা চলেছে। অগণতান্ত্রিক পন্থায় গণতন্ত্র উদ্ধারের দায়িত্ব যাঁরা নিজেদের হাতে তুলে নিয়েছিলেন, তাঁদের প্রথম পরিকল্পনা (প্ল্যান এ) ছিল দেশের দুই প্রধান নেত্রীকে বিদেশে চলে যেতে বাধ্য করা। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে শেখ হাসিনা তাঁর সন্তানদের সঙ্গে দেখা করার জন্য আমেরিকা ও কানাডা যান; সে সময় গুঞ্জন ওঠে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার তাঁকে আর দেশে ফিরতে দেবে না। শেখ হাসিনা ১৩ মার্চ ভিসা নবায়ন করতে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে গেলে দূতাবাসের তৎকালীন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসি জিজ্ঞেস করেন, তাঁকে বাংলাদেশে ফিরে আসতে বাধা দেওয়া হবে—এটা নিয়ে তাঁর কোনো উদ্বেগ আছে কি না। শেখ হাসিনা তখন তাঁদের বলেন, তিনি অবশ্যই ফিরে আসবেন, এমনকি সে জন্য তাঁকে যদি ভারত হয়ে চোরাপথে সীমান্ত অতিক্রম করেও দেশে ঢুকতে হয়, তবু তিনি ফিরে আসবেন (তথ্যসূত্র: উইকিলিকস বার্তা ১৩ মার্চ, ২০০৭)। তিনি আমেরিকা যাওয়ার পর তাঁর ফিরে আসা ঠেকাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ন্যক্কারজনকভাবে নানা কারসাজি করেছিল। ঢাকায় তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রিসিয়া বিউটেনিস ২০০৭ সালের ৫ এপ্রিল এক গোপনীয় তারবার্তায় ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের সদর দপ্তরকে বলেন, ‘দুই “পরিবারতান্ত্রিক” রাজনৈতিক দল...তাদের ধ্বংস করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে “দুই ভদ্রমহিলাকে” স্থায়ীভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করার জন্য সামরিক বাহিনী তাঁদের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।’ কিন্তু কোনো চাপেই হাসিনা দেশে ফিরতে পিছপা হননি। তিনি ৫ মে স্বদেশে ফিরে আসেন।
তারপর শুরু হয় তত্ত্বাবধায়কদের ‘প্ল্যান বি’ বা দ্বিতীয় পরিকল্পনা। সেটা ছিল: ফৌজদারি দণ্ড দেওয়ার মাধ্যমে নির্বাচনে দাঁড়াতে অযোগ্য ঘোষণা করে দুই নেত্রীকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়া। শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করার আইনগত পটভূমি তৈরির কাজ শুরু করা হয় তারও আগে থেকে।
ওয়েস্টমন্ট পাওয়ার কোম্পানির চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম ফারুক, ইস্টকোস্ট ট্রেডিং প্রাইভেট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আজম জে চৌধুরী, ইউনিক গ্রুপের পরিচালক নূর আলী প্রমুখ ব্যবসায়ীকে দিয়ে শেখ হাসিনা ও তাঁর আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে জোরজবরদস্তি করে অনেক মামলা দায়ের করানো হয়। তাঁর বিরুদ্ধে খালেদা জিয়া সরকারের আমলে দায়ের করা মামলাগুলোও সক্রিয় করা হয়। তাঁকে গ্রেপ্তার করার প্রায় দুই মাস আগে ২০০৭ সালের ২৮ মে গ্রেপ্তার করা হয় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী শেখ ফজলুল করিম সেলিমকে। তাঁকে ভীতিকর পরিবেশে জিজ্ঞাসাবাদ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় করা হয়। ১৯ জুন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস ওয়াশিংটনে তাঁর সদর দপ্তরকে এক গোপনীয় তারবার্তায় লেখেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের সূত্রগুলো আমাদের বলছে, তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২৭টি মামলা নিয়ে কাজ করছে।’ ওই তারবার্তার শেষে রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস মন্তব্য করেছেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতির দুই শীর্ষ নারীকে (The two grande dames of Bangladeshi politics) রাজনীতি থেকে সরে যেতে বাধ্য করার লক্ষ্যে সরকার প্রায় নিশ্চিতভাবে এক ত্রিমুখী আক্রমণ সমন্বয় করছে: আদালতে মামলা, একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন ও দলীয় সংস্কারের উদ্যোগ।...আর রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের মামলাগুলোর অধিকাংশই দায়ের করছেন সেই সব ব্যক্তি, যাঁদের সদ্য ধরে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, জিজ্ঞাসাবাদ থেকে বেরিয়ে এসেই তাঁরা মামলাগুলো দায়ের করছেন।’
শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা, দীর্ঘ সময় ধরে কারারুদ্ধ করে রাখা, সর্বোপরি তাঁদের রাজনীতি থেকে ‘মাইনাস’ করার জবরদস্তিমূলক ও অপরিণামদর্শী তৎপরতার এসব ঘটনা বেশি পুরোনো নয়। আমাদের সবারই সেসব দিনের কথা মনে আছে। নতুন করে এগুলোর বিশদ বর্ণনা অপ্রয়োজনীয়। সংক্ষেপে আর একটা তথ্য জানাই। শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের দুই দিন পর, ২০০৭ সালের ১৯ জুলাই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের তৎকালীন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসি এক গোপন তারবার্তা ওয়াশিংটনে পাঠান। উইকিলিকসের মাধ্যমে পাওয়া সেই তারবার্তা থেকে জানা যাচ্ছে, শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করার পরপরই ডিজিএফআইয়ের কাউন্টার-টেররিজম বিভাগের তৎকালীন প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন ‘বাংলাদেশের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করার উদ্দেশ্যে’ দূতাবাসের প্রধানসহ অন্যান্য কর্মকর্তার সাক্ষাৎ চাইলে ১৭ জুলাই তাঁদের সাক্ষাৎ ঘটে। সেখানে ব্রিগেডিয়ার আমিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স গীতা পাসি ও অন্যদের বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা শেখ হাসিনা ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতা খালেদা জিয়া—উভয়কে সসম্মানে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার জন্য কয়েকটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁরা দুজনই সেসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে শেখ হাসিনাকে আগের দিন গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং খালেদা জিয়াকে অচিরেই গ্রেপ্তার করা হবে।’
অর্থাৎ, দুই নেত্রী যদি ‘সসম্মানে রাজনীতি থেকে বিদায় নেওয়ার প্রস্তাব’ গ্রহণ করতেন, তাহলে তাঁদের গ্রেপ্তার, কারাভোগ, ডজন ডজন মামলা ইত্যাদি কোনো কিছুরই মুখোমুখি হতে হতো না। ব্রিগেডিয়ার আমিন সেদিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের আরও বলেন, খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হবে ‘সমতা সৃষ্টি’র খাতিরে; অর্থাৎ যেহেতু শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, সেহেতু খালেদা জিয়াকেও গ্রেপ্তার করা হবে। স্মরণ করা যেতে পারে, খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারের আড়াই মাস পর, ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর।
সুতরাং, এটা খুব পরিষ্কার যে ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার গ্রেপ্তার, কারাভোগ ইত্যাদি ছিল ওই সরকারের সামরিক নেতাদের পূর্বসিদ্ধান্তের বিষয়। ডেইলি স্টার ও অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে কী প্রকাশিত হয়েছে, তার ওপরে সেই সিদ্ধান্ত মোটেও নির্ভরশীল ছিল না।
এখন, এতগুলো বছর পরে বিচার চেয়ে মামলা যদি করতেই হয়, তো সেটা মাহ্ফুজ আনাম ও ডেইলি স্টার-এর বিরুদ্ধে কেন? বিচার যদি চাইতেই হয়, তাহলে যাঁরা তাঁকে ভোররাতে গ্রেপ্তার করে বিরাট নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করেছিলেন, তারপর কারাগারে নিক্ষেপ করেছিলেন এবং সেখানে প্রায় একটা বছর বন্দী করে রেখেছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কেন মামলা করা হয়নি? এবং সেটা ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদায় নেওয়ার অব্যবহিত পরেই কেন করা হয়নি? ২০০৯ সাল থেকে তো আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় রয়েছে।
আমরা স্মরণ করতে পারি
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পরেও সেনাপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন জেনারেল মইন উ আহমেদ, যাঁকে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘আর্কিটেক্ট’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন ঢাকায় সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি। জেনারেল মইন ২০০৯ সালের ১৪ জুন অবসরে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় মাস সেনাপ্রধানের পদে চাকরি করেছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই।
জরুরি অবস্থাকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা ‘এক-এগারো’র আরেক ‘আর্কিটেক্ট’ ছিলেন একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল। সন্ত্রাস ও গুরুতর অপরাধ দমনসংক্রান্ত ‘জাতীয় সমন্বয় কমিটি’র প্রধান সমন্বয়কারী ছিলেন তিনি। যাঁর ভূমিকা শেখ হাসিনাসহ অন্য রাজনীতিকদের যথেষ্ট ভোগান্তির কারণ হয়েছিল। তিনি তখন ছিলেন নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি, এরপরই তিনি হন সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও)। ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বে মহাজোট সরকারের অধীনে তিনি পররাষ্ট্র বিভাগের চাকরিতে বহাল থেকেছেন অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার পদে। ২০১১ সালের জুনে তাঁর সেনাবাহিনীর চাকরি শেষ হয়ে গেলেও পররাষ্ট্র বিভাগের অধীনে তাঁর চাকরি অব্যাহত রাখা হয়। হাইকমিশনার হিসেবে তিনি বহাল থাকেন ২০১৪ সালের মে মাস পর্যন্ত, অর্থাৎ ২০০৮-এর নির্বাচনের পরের মহাজোট সরকারের পুরো মেয়াদেই। এ জন্য তাঁর চুক্তিভিত্তিক চাকরির মেয়াদ বাড়ানো হয় চারবার।
তত্ত্বাবধায়ক আমলের ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরও একাধিক সামরিক-বেসামরিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
ওই সময় ডিজিএফআইয়ের ক্ষমতাধর পরিচালক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ টি এম আমিন। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা সুবিদিত। তিনিও তত্ত্বাবধায়ক সরকার-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০০৯ সালের ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর চাকরিতে বহাল ছিলেন। ওই তারিখে তাঁকে সকল সুবিধাসহ বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। তিনি সর্বশেষ দায়িত্ব পালন করেন আনসার ও ভিডিপি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে।
ডিজিএফআইয়ের আরেক পরিচালক চৌধুরী ফজলুল বারী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে বিদেশি মিশনে চাকরি নিয়ে চলে যান। আওয়ামী লীগ সরকার এসে তাঁকে দেশে ফিরে আসতে বলে। কিন্তু তিনি ফিরে না আসায় সেনাবাহিনী তাঁকে ‘পলাতক’ ঘোষণা করে। এরপর সব সুবিধাসহ তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ডিজিএফআইয়ের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করতেন আরেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। সংবাদমাধ্যমগুলোতে রাজনীতিকদের সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থা করতেন মূলত তিনিই। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়।
ওই সময় ডিজিএফআইয়ের আরেক পরিচালক, যিনি মিডিয়া ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দায়িত্বে ছিলেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তিনি এই গোয়েন্দা সংস্থার মহাপরিচালক হন এবং পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। এখনো তিনি চাকরিতে বহাল আছেন।
শেখ হাসিনাকে দীর্ঘ ১১ মাস কারাগারে আটকে রেখে যে যন্ত্রণা দেওয়া হয়েছে, তার প্রতিকার চাইলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখনই উদ্যোগ নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বা তাঁর সরকার সে রকম কিছু করেননি। ‘সেনা-সমর্থিত’ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের কৃতকর্মের বিরুদ্ধে তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি; হয়তোবা নিতে চাননি, দৃশ্যত ক্ষমা করে দিয়েছেন। ঢাকায় সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই ওয়াশিংটনে পাঠানো এক গোপনীয় তারবার্তায় লেখেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে বলেছেন, তিনি মইনসহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ নেবেন না (would not seek retaliation), যদিও তা নেওয়ার জন্য তাঁর নিজের দলের ভেতর থেকে আহ্বান জানানো হয়েছে।’
বিষয়টি গতকালও সংসদে আলোচনায় আসে। সেখানে ওই সময়ের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠনের দাবি করেন কয়েকজন মন্ত্রী-সাংসদ। আলোচনায় অংশ নিয়ে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন এক-এগারো পরবর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের কথা উল্লেখ করে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে ওই ঘটনার তদন্ত করেছিলেন তিনি। এক-এগারোর কুশীলবদের এতে সম্পৃক্ততা পেয়েছিলেন। সুপারিশও জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই সুপারিশ প্রকাশিত হয়নি। হিমঘরে চলে গেছে। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ ছিল। সেটাও বাস্তবায়ন করা হয়নি।

জামাইয়ের আদর চলুক, শাস্তি হোক সাংবাদিকের by ফারুক ওয়াসিফ

হাসপাতাল থেকে পিকআপ ভ্যানে করে সাংসদপুত্র
বখতিয়ারকে নিয়ে ​যাওয়া হয় আদালতে।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের আসামি তারেক সাঈদ পথ দেখিয়েছেন। সেই পথে হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে পৌঁছে গেছেন ইস্কাটনের জোড়া খুনের আসামি সাংসদপুত্র রনি। ‘ঘোড়া দেখে খোঁড়া’ পুরোনো দিনের প্রবাদ। নতুন প্রবাদ হবে, ‘জেলে গেলে রোগী’। অথবা ঢাকাই সিনেমার ঢঙে বলা যায়, ভিআইপি কেন আসামি? মানুষের মুখ আছে, মানুষ নানান কথা বলবে। কিন্তু মানী লোকের মান রাখাও তো কর্তৃপক্ষের কর্তব্য। সম্মানী লোকের আরাম-আয়েশ দরকার। তাই রনি কারাগারের বদলে হাসপাতালে। যদ্দেশে যদাচার—যেখানে যেমন চলে আর কি।
গত বছরের ১৩ এপ্রিল নেশাগ্রস্ত রনির এলোপাতাড়ি গুলিতে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁরা মামুলি লোক। একজন চালান রিকশা, আরেকজন অটো। আর নারায়ণগঞ্জের যে সাত হতভাগ্যের মৃত্যুর জন্য তারেক সাঈদের বিচার হওয়ার কথা, তাঁরাও কেউকেটা কেউ নন। সবাইকে সমান চোখে দেখা ঠিক না। নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো ব্যক্তিকে বিনা বিচারে মাসের পর মাস আটকে রাখা যেতে পারে। মারাত্মক অসুস্থ বলে তাঁর পরিবার হা-হুতাশ করলেও কুছ পরোয়া নেহি। হাসপাতাল তাঁর জন্য নয়। হাতের পাঁচ আঙুল যদি এক সমান না হয়, তাহলে যে হাতে খুন করা হয় আর যে হাতে কলম ধরা হয়, তা কেমন করে সমান হবে? সব আসামিরই তো আর মেরুদণ্ডে সমস্যা নেই।
কী সুন্দর মিল তারেক আর রনি সাহেবের। দুজনেই মেরুদণ্ডের ব্যথার দোহাই দিয়ে হাসপাতালস্থ হয়েছেন। অবশ্য বাংলাদেশে এখন মেরুদণ্ড থাকাটাই এক বিরাট সমস্যা। ব্যথা না হলে কি করে আমরা জানতাম যে তারেক ও রনিরও মেরুদণ্ড আছে এবং সেখানে ব্যথা হয়।
কিন্তু চিন্তার কারণটা অন্য জায়গায়। আসামিদ্বয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। একজন ক্ষমতাশালী এক রাজনৈতিক নেতার জামাই, অন্যজন সাংসদের পুত্র। দফায় দফায় তাঁরা সরকারি হাসপাতালে এসে থাকছেন, ঘুমাচ্ছেন। তাহলেও তাঁদের আসল অসুখটাই এখনো শনাক্ত করতে পারছেন না ডাক্তাররা। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারাধ্যক্ষ মো. নেছার আলম প্রথম আলোকে বলেন, অর্থোপেডিক সমস্যার কারণে বখতিয়ার রনিকে গত ৩১ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অথচ তিনি কিনা ভর্তি আছেন মেডিসিন বিভাগের অধীনে। ওদিকে তাঁর তত্ত্বাবধানকারী মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এস এম হাফিজ বলছেন, বখতিয়ারের সমস্যা আসলে কিডনিতে। সেটাই সই, কিডনির চিকিৎসাই হোক! তা না, তাঁকে দেওয়া হচ্ছে সাইকোথেরাপি। মুনের সুখের জন্য সাইকোথেরাপি খারাপ না। তবে বিচার শুরু হওয়ার আগে আগেই তাঁকে মানসিক রোগী বানানোর কৌশলটা দারুণ। এখন ডাক্তাররা যদি সার্টিফিকেট দিয়ে দেন, রনি মানসিকভাবে অসুস্থ, তাহলেই তো কেল্লা ফতে। পাগলের গুলিতে জোড়া হত্যার মামলা তাহলে হালকা হয়ে যায়। রনির আইনজীবীরা ডাক্তারের সার্টিফিকেট দেখিয়ে বলতে পারবেন, রনি সুস্থ মস্তিষ্কে গুলি করেননি! এই বেলা রনির পথ ধরতে পারেন তারেক সাঈদের মতো অভিযুক্তরা। তাঁরও উচিত কোমর বা নাক-টাকের অসুখের কাহিনি না সাজিয়ে সরাসরি ‘পাগল’ সেজে থাকা। পাগল বলেই তো ‘ভিআইপি কেবিনের সামনে খোশগল্প করতে করতে রনি বলে ফেলেন, ‘আমার মা পিনু খান এমপি ও মহিলা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক। বাবাও এমপি ছিলেন। আমিও একজন সিআইপি। আমার নাম বখতিয়ার আলম রনি, আওয়ামী লীগের অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ও একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক। অথচ ডিবি পুলিশ আমাকে ইস্কাটনের জোড়া খুনের মামলায় ফাঁসিয়ে দিল। শিগগিরই আমার জামিন হবে।’ (প্রথম আলো , ২৭ ফেব্রুয়ারি) পাগল বটে, ক্ষমতার পাগল।
গত বছরের অক্টোবরে গুলশানের রাস্তায় বেপরোয়া রেসিং কারের ধাক্কায় রিকশাযাত্রী মায়ের কোলে থাকা এক কচি শিশু মরে যায়। ঘটনার আট দিন পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে পুলিশ একটা মামলা করে বটে। পরে জানা যায়, নিহত শিশুর পরিবার মামলাটি তুলে নেয়। কেন তুলে নেয়, কিসের বিনিময়ে তুলে নেয়, তা আর জানা যায় না। যা-হোক, আইনগতভাবে বিষয়টির মীমাংসা হয়ে যাওয়ার পর আমরা বলতে পারি, আসলে রেসিং কারটি কেউ চালাচ্ছিল না, আর ওটার আঘাতে সেদিন কেউই খুন হয়নি। আশা করি, অচিরেই আমরা জানতে পারব, তারেক ও রনিও পাগলামির বশে অপরাধ করে ফেলেছেন। তাঁরা কারও মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী নন। যাঁরা মরেছেন, তাঁদেরই আসলে কপাল খারাপ। আসলে ওই তিনটি ঘটনায় নিহত ব্যক্তিরা মৃত বটে, তবে হত্যার শিকার নন। কেউ তাঁদের হত্যা করেনি! পত্রিকাগুলো সব মিথ্যা লিখেছে! এ জন্য সাংবাদিকদের শাস্তি হোক আর আসামিদের রাখা হোক জামাই-আদরে।
সর্বশেষ, আদালতে তারেক সাঈদ, র‍্যাবের আরও দুই কর্মকর্তাসহ ২৩ আসামির উপস্থিতিতে সাক্ষ্যগ্রহণের সময় এজলাসকক্ষ থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেওয়া হয়। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি তাই যাহা আসে কই মুখে’। আমাদের মনে হয়, দেখে শুনে চুপিয়া যাওয়াই ভালো। তার পরও চলচ্চিত্রকার ঋতিক ঘটকের সুবর্ণরেখার সেই খ্যাপাটে চরিত্রের কথা মনে আসে, ঘুলঘুলি দিয়ে মুখ বাড়িয়ে যে বলেছিল, ‘আমি কিন্তু সব দ্যাখতাছি’।

ছি ছি এত্তা জঞ্জাল! by হাসান ফেরদৌস

যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে গণতন্ত্রের মহা পূজারি হিসেবে দাবি করলেও নির্বাচনের নামে এ দেশে যে কাণ্ড হচ্ছে, তা দেখে নাকে রুমাল চেপে ধরা ছাড়া অন্য পথ আছে বলে মনে হয় না। ২০১৬ সালে এ দেশের মানুষ তাঁদের নতুন প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার সদস্যদের নির্বাচন করবেন। এখন চলছে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচন বা প্রাইমারি।
পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই নির্বাচনে দলের প্রার্থী কে হবেন, সে সিদ্ধান্ত নেন সে দলের হর্তাকর্তারাই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রে সে সিদ্ধান্ত নেন দলের সাধারণ সমর্থক ও সদস্যরা। পুরোদস্তুর এক নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁরাই ঠিক করে দেন শেষ পর্যন্ত ব্যালটে কার নাম উঠবে।
উদ্দেশ্যের সাধুতা নিয়ে প্রশ্ন নেই, ব্যাপারটা যে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক, সে ব্যাপারেও তর্ক নেই। কিন্তু যে কায়দায় বিভিন্ন প্রার্থী এই প্রাক্-নির্বাচনী বাছাইপর্বের পুলসিরাত পার হতে গিয়ে একে অপরকে কুপোকাত করতে কোমর বেঁধে নেমেছেন, তা দেখে বলতে হয়, ছেড়ে দে ভাই, কেঁদে বাঁচি। এই কাজ করতে গিয়ে কী পরিমাণ অর্থের শ্রাদ্ধ হচ্ছে, সে আরেক কেলেঙ্কারি।
প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য রিপাবলিকান পার্টির যেসব প্রার্থী প্রাইমারি পর্যায়ে লড়ছেন, তাঁদের কথাটাই ধরি। এমনিতে রিপাবলিকানদের সুনাম আছে, কাদা-ছোড়াছুড়িতে তাঁরা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। একে অপরের সম্বন্ধে ডাহা মিথ্যা কথা বলতে তাঁদের কারোর চোখের পাতাটি পর্যন্ত কাঁপে না। এবার যাঁরা প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দলের মনোনয়ন চাইছেন, তাঁদের কথাই ধরা যাক। পালের গোদা ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে ছাড়া বাকি সবাইকে মিথ্যুক ও জোচ্চোর বলে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছেন। আরেক প্রার্থী টেড ক্রুজ অনবরত বাইবেল জপে যাচ্ছেন, কিন্তু বাড়তি দু-চারটে ভোটের আশায় জলজ্যান্ত মিথ্যা বলতে তাঁর বাধে না। এঁদের তুলনায় অপেক্ষাকৃত তরুণ মার্কো রুবিও নিজেকে সবার ত্রাতা প্রমাণ করতে নিজের জীবনবৃত্তান্তে সত্য-মিথ্যার এমন পলেস্তারা লাগিয়ে চলেছেন যে কোনটা সত্য আর কোনটা কল্পনা, ভোটারদের তা বোঝা অসম্ভব। উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানো যাক।
অভিযোগ উঠেছে, আইওয়া অঙ্গরাজ্যে প্রথম নির্বাচনে টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ যে জিতেছিলেন, তার অন্যতম কারণ তাঁর নির্বাচনী কমিটির পক্ষ থেকে ই-মেইল ও টেলিফোন করে জানানো হয়, শল্যচিকিৎসক বেন কারসন প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। যেহেতু তিনি আর নির্বাচনে থাকছেন না, তাহলে কারসনকে ভোট দিয়ে কী লাভ? তার চেয়ে বরং আপনার মূল্যবান ভোটটি টেড ক্রুজের বাক্সেই ফেলুন। অথচ কারসন কখনোই বলেননি তিনি নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর ক্রুজের এই গোপন চালাকিটি প্রকাশিত হয়। আর তাতে ট্রাম্প মহা হুলুস্থুল বাধিয়ে দেন। নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে তিনি প্রত্যাশিত প্রথম স্থানের বদলে দ্বিতীয় স্থান দখল করেন। সাংবাদিকদের ডেকে তিনি ঘোষণা দিলেন, টেডের নামে তিনি মামলা করবেন। কারণ, তিনি জালিয়াতি করে নির্বাচনে জিতেছেন। বেন কারসনও টেডের বিরুদ্ধে তাঁর উষ্মা প্রকাশ করতে বিলম্ব করলেন না। পরে অবস্থা বেগতিক দেখে নিজের অপরাধ স্বীকার করে মাফ চাইতে বাধ্য হন ক্রুজ।
নেভাডা অঙ্গরাজ্যে রিপাবলিকান ককাসের আগে টেড ক্রুজের নির্বাচনী কমিটি থেকে আরেক কাণ্ড করা হলো। তাঁর পক্ষ থেকে প্রচারিত এক ভিডিও বিজ্ঞাপনে দেখানো হলো, সিনেটর রুবিও মন্তব্য করছেন, বাইবেলে সব প্রশ্নের জবাব নেই। ইভানজেলিক্যালদের ভোটের জন্য এই দলের সব প্রার্থী বগলে বাইবেল নিয়ে ঘুরছেন। সেখানে সেই বাইবেল নিয়ে এমন মন্তব্য? দেখা গেল রুবিও সে কথা তো বলেননি, বরং বলেছেন ঠিক উল্টো কথা। ঘটনাটা এই রকম। হোটেলের লবিতে বাইবেল হাতে বসেছিলেন টেড ক্রুজের ধর্মযাজক পিতা ও তাঁর কমিটির এক কর্মী। সে সময় তাঁদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন সিনেটর রুবিও। তাঁদের দুজনের হাতে বাইবেল দেখে রুবিও বললেন, খুব ভালো বই, এই বইতেই সব প্রশ্নের জবাব রয়েছে। আসল ভিডিও দেখিয়ে যখন বলা হলো ক্রুজ ও তাঁর সমর্থকেরা মিথ্যাচার করছেন, তখন তিনি সব দোষ চাপালেন তাঁর নিজের প্রধান মুখপাত্র রিক টেইলরের ওপর—রীতিমতো লোকজন ডেকে তাঁকে বরখাস্ত করার কথা ঘোষণা করলেন। ততক্ষণে অবশ্য ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। রুবিও জানালেন, এই লোকটা আগাগোড়া নিজের ও অন্যের ব্যাপারে মিথ্যা বলে যাচ্ছে, সে জন্য বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। ট্রাম্প বললেন আরও শক্ত কথা, ‘এই লোককে মিথ্যা বলায় কেউ ঠকাতে পারবে না।’
নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা যে একে অপরের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলবেন, সে ব্যাপারটা এ দেশে এত পরিচিত যে সাউথ ক্যারোলাইনার একটি দৈনিক চার্লস্টন পোস্ট সেখানে প্রাইমারি ভোটের আগে ‘হুইস্পার ক্যাম্পেইন’ নামে এক বিশেষ ডিজিটাল সাইট চালু করে। যেকোনো ভোটার সেখানে গিয়ে দেখে নিতে পারেন কোন প্রার্থী কার বিরুদ্ধে কী মিথ্যাচার করছেন। মিথ্যাচারের জন্য সবচেয়ে পরিচিত ও পরীক্ষিত পদ্ধতি হলো ‘রোবোকল’ বা স্বয়ংক্রিয় টেলিফোন বার্তা। যাঁরা ভোটের ব্যাপারে এখনো তাঁদের সিদ্ধান্ত নেননি, তাঁদের আলাদা করে বাছাই করে প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো প্রার্থীর নামে টেলিফোনে ডাহা মিথ্যা কথা বলে তাঁর মনে সন্দেহ ঢুকিয়ে দেওয়া এই ‘রোবোকল’-এর উদ্দেশ্য।
এ রকম মিথ্যা প্রচারে যে কাজ হয়, তার সেরা প্রমাণ সিনেটর জন ম্যাককেইন। ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন জর্জ ডব্লিউ বুশ। নিউ হ্যাম্পশায়ারের প্রাইমারিতে জয়লাভ করায় সবাই ধরে নিয়েছিল সাউথ ক্যারোলাইনার প্রাইমারিতেও ম্যাককেইন জিতবেন। ঠিক শেষ মুহূর্তে এক মোক্ষম চাল দিলেন বুশের প্রধান পরামর্শদাতা কার্ল রোভ। তিনি গুজব ছড়ালেন যে ম্যাককেইনের একটি কৃষ্ণাঙ্গ অবৈধ কন্যাসন্তান রয়েছে। রাজ্যের লাখ লাখ মানুষের মধ্যে বেনামি টেলিফোন বার্তায় সে গুজব রটিয়ে দেওয়া হলো। গুজবটি খুব চালাকির সঙ্গে ছড়ানো হয়েছিল। টেলিফোন করে ভোটারদের অতি নিরীহভাবে জিজ্ঞেস করা হতো, ‘আপনি যদি জানতে পারেন যে জন ম্যাককেইনের একটি অবৈধ কন্যাসন্তান রয়েছে, তারপরেও কি আপনি তাঁকে ভোট দেবেন?’
যে অবৈধ কন্যাসন্তানের কথা বলা হচ্ছে, তাঁর নাম ব্রিজেট। ১৯৯১ সালে বাংলাদেশের এক অনাথ আশ্রম থেকে মেয়েটিকে দত্তক নিয়ে এসেছিলেন ম্যাককেইন দম্পতি। সম্পূর্ণ মিথ্যা সেই রটনার জোরে সাউথ ক্যারোলাইনার প্রাইমারি জিতে নেন জর্জ বুশ। সেবার এই পরাজয়ের ধাক্কা ম্যাককেইন আর সামলে উঠতে পারেননি। সেই থেকেই সাউথ ক্যারোলাইনার পরিচয় রিপাবলিকানদের ‘নোংরা প্রচারণার স্বর্গ’ হিসেবে।
এখন সমস্যা হবে প্রকৃত নির্বাচনের সময় ভোটের ফলাফল পাল্টে দেওয়ার জন্য যদি কোনো নোংরা চাল চালা হয়। রিপাবলিকানদের ঝুলিতে তেমন ‘সিক্স’-এর অভাব নেই। ২০০৮ ও ২০১২ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী বারাক ওবামাকে ঠেকানোর জন্য তাঁর ‘ভোট ব্যাংক’ নামে পরিচিত আফ্রিকান-আমেরিকান ও হিস্পানিক ভোটারদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র করা হয়। তিনি মুসলমান—সে মিথ্যা প্রচার ও ‘রোবোকল’ তো ছিলই। এ ছাড়া যা করা হয়, তার মধ্যে ছিল বাসায় বাসায় প্রচারপত্র বিলি করে ভোটের মিথ্যা তারিখ ও সময় জানানো। এমনকি কোথায় ভোট গ্রহণ হচ্ছে, মিথ্যা ঠিকানা দিয়ে মানুষের ঘরে ঘরে জানিয়ে আসা হয়। এ ঘটনা ঘটে মূলত গ্রামাঞ্চলে, অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকায় ও পরিণত বয়সের ভোটারদের বেলায়, যাঁদের পক্ষে সে সত্য যাচাই সব সময় সম্ভব হয় না।
ব্যাপারটা যে মোটেই হাসি-ঠাট্টার নয়, সে কথা বোঝাতে কমেডিয়ান টারাড্যাকটিল (টারা ডেভলিন) একটি ওয়েবসাইট চালু করেছেন, যার নাম ‘রিপাবলিকান ডার্টি ট্রিকস’। হাসিঠাট্টার মধ্য দিয়েই টারা এই ওয়েবসাইটে খুব ভালো করে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে নির্বাচনের সময় এ দেশের রক্ষণশীল রাজনীতিকেরা, যাঁরা ঈশ্বরের নাম ও পারিবারিক মূল্যবোধের কথা বলতে গিয়ে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন, তাঁরা কীভাবে সাধারণ ভোটারদের ঠকাতে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছেন।
মূল নির্বাচন হতে এখনো অনেক দেরি। আশার কথা হচ্ছে, রিপাবলিকান বা ডেমোক্র্যাট, যে পক্ষ থেকেই শঠতা বা মিথ্যাচারের আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে, তাদের খপ করে ধরে ফেলার জন্য এখন বিস্তর সচেতন মানুষ জেগে রয়েছেন—টারাড্যাকটিল তাঁদের একজন। গণতন্ত্রের জন্য সেটাই আশার কথা, কারণ গণতন্ত্র আর যা-ই হোক, গ্যালারিতে নিরাপদ দূরত্বে বসে উপভোগ করার মতো কোনো খেলা নয়।
হাসান ফেরদৌস: যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি।

কনডেম সেলে ১১৬৪ আসামি by মহিউদ্দিন অদুল

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত সাড়ে চার শতাধিক ব্যক্তির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৬ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কার্যকর হয়েছে ৪৩৩ জনের ফাঁসি। এ ছাড়া, গত জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশের সব কারাগারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামি রয়েছে ১১৬৪ জন। এর মধ্যে গত ২৮শে জানুয়ারি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বিডিআর বিদ্রোহ মামলার আসামিসহ মোট ১৬৮ জন ফাঁসির আসামি ছিল। বাকিরা অন্যান্য কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে রয়েছে। কারাগারের কনডেম সেলে নিঃসঙ্গ দিন কাটছে তাদের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে শীর্ষ সারিতে রয়েছে চীন, ইরান, সৌদি আরব, ইরাক, সুদান ইত্যাদি রাষ্ট্র। তবে এক এক দেশে এক একভাবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয় শিরশ্ছেদের মাধ্যমে। কোনো কোনো দেশে ফায়ারিং স্কোয়াডে বা বিষাক্ত ইনজেকশনের মাধ্যমেও তা কার্যকর হয়। বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে নির্ধারিত ফাঁসির মঞ্চে কারাবিধান অনুযায়ী কিছু নিয়মকানুন পালনের মধ্য দিয়ে জল্লাদের মাধ্যমে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দণ্ড কার্যকর করা হয়। বৃটিশ শাসনামলে সূর্যসেন ও ক্ষুদিরামসহ স্বাধীনতা আন্দোলনের মহানায়কদের ফাঁসিতে পুরো বৃটিশ ভারতে নিন্দার ঝড় উঠেছিল। পাকিস্তান আমলেও মৃত্যুদণ্ড হিসেবে ফাঁসি কার্যকর ছিলো। স্বাধীনতার পর থেকে এদেশের কারাগারগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে প্রায় সাড়ে চারশ’ ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৭৬ সাল থেকে চার দশকে মোট ৪৩৩ জনের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতির আসামি থেকে শুরু করে শীর্ষজঙ্গি। রাজনীতিবিদ থেকে মানবতা বিরোধী অপরাধী পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরের গুরুতর অপরাধী। ১৯৭৬ সালে ৩ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। বিশেষ সামরিক আদালতের রায়ে ওই বছরের ১৭ই জুলাই কর্নেল (অব.) তাহেরের ফাঁসির ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। আর স্বাধীনতার পর ১৯৭৭ সালে সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টার অভিযোগেই স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ২৪৭ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছিল। এর মধ্যে ১৮ই অক্টোবর ৩৭ জন, ২৬শে অক্টোবর ৫৬ জন, ১৮ই নভেম্বর ৩৭ জনের ফাঁসি হয়। এরপর ১৯৭৮ সালে ১৭ জন ও ১৯৭৯ সালে ১ জনের ফাঁসি হয়। পরের বছর ১৯৮০ সালের ৩রা জুন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কিশোরগঞ্জের চার জেলেকে হত্যার দায়ে একসঙ্গে ৪ জনের ফাঁসি চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। ওই বছর আরও ৯ জনসহ মোট ১৩ জনকে ফাঁসির রশিতে ঝোলানো হয়েছিল। চট্টগ্রামে সেনা বিদ্রোহ ও সাবেক  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার দায়ে ১৯৮১ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর ১২ জন সেনা কর্মকর্তার ফাঁসির আদেশ কার্যকর হয়। তাদের মধ্যে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহসেন উদ্দিন, কর্নেল রশিদ, কর্নেল নওয়াজেশ, লে. কর্নেল দেলোয়ার হোসেন, মেজর কাজী মোমিনুল হক, মেজর গিয়াস উদ্দিন, মেজর রওশন ইয়াজদানি, মেজর মুজিবুর রহমান, ক্যাপ্টেন জামিল হক ও লে. রফিকুল হাসান উল্লেখযোগ্য। এ ফাঁসির ঘটনাও বেশ আলোচিত ছিল। ওই বছর আরও একজনসহ মোট ১৩ জনের ফাঁসি হয়েছিল। ১৯৮২ সালে ৬ এবং ১৯৮৩ সালে ৭ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। পরের বছর কারও ফাঁসি হয়নি। তবে ১৯৮৫ সালে ১৩ জন ও ১৯৮৬ সালে ২৬ জনের ফাঁসি হয়। গৃহপরিচারিকার সঙ্গে পরকীয়ার জের ধরে স্ত্রী সালেহাকে হত্যার দায়ে ১৯৮৭ সালে ধনীর দুলাল ডা. ইকবালের ফাঁসিও কম আলোচিত ছিল না। এটি বছরের একমাত্র ফাঁসি ছিল। এরপর ১৯৮৮ সালে ২ ও ১৯৯০ সালে ১ জনকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ১৯৯১ সালে কারও ফাঁসি না হলেও ১৯৯২ সালে পাঁচজনের ফাঁসি হয়। পরের ১৯৯৩ সালের ২৭শে জুলাই সাংবাদিক কন্যা শারমিন রীমাকে হত্যার দায়ে তার স্বামী মনির হোসেনের ব্যাপক আলোচিত ফাঁসিসহ আরও চারটি ফাঁসি কার্যকর হয়। ১৯৯৪ সালে কার্যকর হয় ২ জনের ফাঁসি। এরপর ১৯৯৫ এবং ৯৬ সালে কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি। ১৯৯৭ সালে ডেইজি হত্যা মামলার আসামি হাসানসহ ২ জনকে ফাঁসি দেয়া হয়। পরের তিন বছরও কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি। এরপর ২০০১ সালে ৩ এবং ২০০২ ও ২০০৩ সালে ২ জন করে ৪ জনের ফাঁসি হয়। ভয়াবহ খুন, ধর্ষণ ও চাঁদাবাজির জন্য বাংলাদেশের অপরাধীদের মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত হিসেবে পরিচিত ছিলেন এরশাদ শিকদার। ২০০৪ সালের ১০ই মে খুলনা কারাগারে তার ফাঁসি কার্যকর হয়। ওই বছরের ১লা সেপ্টেম্বর রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে ইয়াসমিন হত্যা মামলার আসামি এএসআই মইনুল হক ও আব্দুস সাত্তার, ২৯শে সেপ্টেম্বর দিনাজপুর জেলা কারাগারে একই মামলার অপর আসামি পুলিশের গাড়িচালক অমৃত লাল বর্মণ এবং ২৯শে মার্চ কাশিমপুর কারাগারে জঙ্গি সদস্য আতাউর রহমান সানি ও খালেদ সাইফুল্লাহসহ ওই বছর মোট ১৩ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। ২০০৫ সালে ৫ জন ও ২০০৬ সালে ৪ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। এরপর ব্যাপক গোপনীয়তায় ২০০৭ সালের ৩০শে মার্চ একই রাতে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে শায়খ আবদুর রহমান, ময়মনসিংহ কারাগারে সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই ও আবদুল আওয়াল, পাবনা কারাগারে খালেদ সাইফুল্লাহ, কাশিমপুর হাইসিকিউরিটি কারাগারে আতাউর রহমান সানি ও ইফতেখার হাসান মামুনসহ ৬ শীর্ষ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়। ২০০৮ সালে ৮ ও ২০০৯ সালে ৪ জনের ফাঁসি হয়। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলার পাঁচ আসামি সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, বজলুল হুদা, মহিউদ্দিন আহমেদ,  সৈয়দ ফারুক রহমান, একেএম মহিউদ্দিনের ফাঁসি কার্যকর হয় ২০১০ সালের ২৮শে জানুয়ারি। ওই বছর আরও ৪ জনসহ মোট ৯ জনের ফাঁসি হয়। ২০১১ সালে ৫ ও ২০১২ সালে ১ জন ফাঁসির দড়িতে ঝুলে। ২০১৩ সালের ১২ই ডিসেম্বর জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়। ওই বছর আরও ১ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়। পরের বছর ২০১৪ সালে সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তথা বিডিআর বিদ্রোহ মামলায় ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ হলেও ওই বছর কোনো ফাঁসি কার্যকর হয়নি। ২০১৫ সালের ১১ই এপ্রিলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের ফাঁসি হয়। একই বছরের ২২শে নভেম্বরে বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ  মুজাহিদসহ ৩ জনের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সর্বশেষ ২০১৬ সালের প্রথম দু’মাসে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। 
কারা অধিদপ্তরের উপ- মহাপরিদর্শক একেএম ফজলুল হক মানবজমিনকে বলেন, গুরুতর অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ফাঁসি কারাবিধান অনুযায়ী কার্যকর হয়ে আসছে। এর মধ্যে খুনি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সেনা সদস্যসহ বিভিন্ন অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সমপ্রতি বেশ কয়েকজন মানবতাবিরোধী অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর হয়। এছাড়া, চাঞ্চল্যকর খুনের দায়ে মনির এবং ডা. ইকবালসহ বেশ কিছু ফাঁসিও দেশে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল। বর্তমানে ফাঁসির দণ্ড পাওয়া আসামিদের দেশের কারাগারগুলোর কনডেম সেলে রাখা হয়েছে। বিমর্ষ দিন কাটছে তাদের। তবে এর মধ্যে কারও ফাঁসি কার্যকরের আদেশ হয়েছে কিনা তা এই মুহূর্তে বলা যাবে না।

প্রথম দেখাতেই পিটার টার্গেট করে মেরিনাকে by নুরুজ্জামান লাবু

এটিএম জালিয়াতির পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকায় এসেছিল পোলিশ নাগরিক পিটার। লন্ডন প্রবাসী নাবির ছিল তার পথপ্রদর্শক। নাবিরের সঙ্গেই গুলশানের হোটেল হলিডে প্লানেটে উঠে পিটার। সেখানেই পিটারের সঙ্গে প্রথম দেখা হয় মেরিনার মেরিনা তখন হলিডে প্লানেট হোটেলের অভ্যর্থনাকারী হিসেবে কর্মরত। প্রতিদিন টুকটাক কথা বলতে বলতেই দু’জনেই একে অপরের প্রেমে পড়ে যায়। পিটারের উদ্দেশ্য ছিল মেরিনাকে বিয়ে করতে পারলে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব নিয়ে আপাতত এদেশেই স্থায়ী আবাস গড়া। আর মেরিনার উদ্দেশ্য ছিল ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও ইউরোপিয়ান নাগরিক পিটারকে প্রেমের জালে আটকাতে পারলে একদিকে যেমন অর্থকষ্ট দূর হবে, অন্যদিকে ইউরোপেও পাড়ি জমানো যাবে। ধীরে ধীরে দুজনেই জড়িয়ে পড়ে প্রেমে, তারপর একসঙ্গে থাকা।
সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের হোতা পিটারের স্ত্রী হিসেবে মেরিনা এখন আলোচনার তুঙ্গে। তবে মেরিনাই তার আসল নাম কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। রোজিনা ওরফে রোমানা নামেও অনেকেই চেনেন তাকে। গুলশানের হোটেল হলিডে প্লানেটে জমা থাকা পাসপোর্টে রোজিনার নাম উল্লেখ রয়েছে। কেরানীগঞ্জে মায়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা মেরিনা ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ-ইউডা থেকে পড়াশুনা করেছেন। পড়াশুনা শেষ না হতেই পার্টটাইম চাকরি করেছেন একটি ট্র্যাভেল এজেন্সিতে। পারিবারিকভাবে বিয়েও হয় এক যুবকের সঙ্গে। কিন্তু কিছুটা বেপরোয়া জীবনযাপন করতেন মেরিনা। এ কারণে এক কন্যা সন্তানের মা হলেও বিচ্ছেদ হয়ে যায় স্বামীর সঙ্গে। তারপর থেকে মায়ের সঙ্গেই থাকতেন তিনি। ট্রাভেল এজেন্সি ছেড়ে যোগ দেন হোটেল হলিডে প্লানেটের অভ্যর্থনাকারী হিসেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ১৩ই ডিসেম্বর ঢাকায় এসে হোটেল হলিডে প্লানেটে উঠে আন্তর্জাতিক ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি চক্রের অন্যতম হোতা পিটার। নিজেকে পরিচয় দেয় ব্যবসায়ী হিসেবে। সেখানেই অভ্যর্থনাকারী হিসেবে কর্মরত রোজিনা ওরফে রোমানা ওরফে মেরিনার সঙ্গে পরিচয় হয় তার। কয়েক মাসের মধ্যেই জড়িয়ে পড়ে প্রেমের সম্পর্কে। জালিয়াতির টাকায় পিটার দু’হাতে খরচ করতো। এসব দেখে সত্যি ব্যবসায়ী এবং অঢেল টাকার মালিক হিসেবে পিটারকে প্রেমের জালে আটকাতে চান মেরিনা। পিটারও ঢাকায় একজন ‘পার্টনার’ খুঁজছিলো। রোজিনা ওরফে মেরিনার সঙ্গে লং ড্রাইভে যেতো নিয়মিত। রোজিনা ওরফে মেরিনাও কাজ শেষে বিভিন্ন রেস্টুরেন্টে ও বারে পার্টিতে যেতো পিটারের সঙ্গে। ঢাকায় আসার চার মাসের মাথায় পিটারের সঙ্গে থাকা শুরু করেন রোজিনা ওরফে মেরিনা। মাস তিনেক হলিডে প্লানেটের পাঁচ তলার ৫০৫ নম্বর স্যুটে থাকতেন। ওই কক্ষের প্রতি দিনের ভাড়া ছিল ৪ হাজার টাকা করে। প্রায় মাস তিনেক তারা ওই কক্ষেই থেকেছেন। হলিডে প্লানেট হোটেলের এক কর্মকর্তা জানান, পিটার ও মেরিনা তাদের জানিয়েছিল তারা বিয়ে করেছে। তারপরও হোটেলে একসঙ্গে দিনের পর দিন থাকাটা অশোভনীয় মনে হওয়ায় তাদের হোটেল ছেড়ে কোনো বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে বলা হয়। গত অক্টোবর মাসে তারা হোটেল ছেড়ে গুলশানের ২ নম্বর এভিনিউর ১১২ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর প্লটের একটি বাসা ভাড়া নেয়। প্রায় দেড় লাখ টাকা ভাড়া দিয়ে আলিশান ওই বাসায় থাকতো পিটার ও রোজিনা ওরফে রোমানা। গতকাল ওই বাসায় গিয়ে পিটারের বাসাটি তালাবদ্ধ দেখা যায়। ওই ভবনের বাসিন্দারা কেউ এ বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি।
সূত্র জানায়, একসঙ্গে থাকার সময়ই গর্ভধারণ করেন রোজিনা ওরফে রোমানা। সন্তানের বিষয়টি প্রথমে জানতো না পিটার। পরে সন্তান সম্ভবা হওয়ার কারণে তারা নিজেরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ওই বাসায় ওঠে। চলতি মাসের প্রথমদিকেই সন্তান প্রসব করেন রোজিনা ওরফে মেরিনা। গুলশানের একটি হাসপাতালে সন্তান প্রসব হয় তার। ছেলে সন্তানের নাম রাখেন আলেকজান্ডার ওরফে অ্যালেক্স। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পিটার জানিয়েছে, তারা কেউ ধর্মান্তরিত হয়নি। পিটার শুধু স্ত্রীর নাম পরিবর্তন করে রোজিনার জায়গায় মেরিনা করে দিয়েছিলো। ডাকতো মেরি বলে। সূত্র জানায়, রোজিনা ওরফে মেরিনার লিভটুগেদার ও পিটারের সঙ্গে বিয়ের সবকিছুই জানতো তার পরিবার। কিন্তু বিপুল অর্থের মোহে তারা বিষয়টি মেনে নিয়েছিলো সহজেই। জালিয়াতি করে আয় করা পিটারের বিপুল পরিমাণ অর্থ রোজিনা ওরফে মেরিনা তার মায়ের বাসায় দিয়েছেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পিটার জানিয়েছে, কার্ড জালিয়াতির ঘটনা গণমাধ্যমে আসার পরপরই তার দুই বন্ধু বুলগেরিয়ান রোমিও ও ইউক্রেনিয়ান অ্যান্ডারসন ওরফে অ্যান্ডি দেশ ছেড়ে চলে যায়। পিটারও চলে যেতে চেয়েছিলো। কিন্তু নিজের নবজাতক সন্তানকে ফেলে যেতে মন চায়নি তার। আর তার পাসপোর্টের ভিসার মেয়াদও শেষ হয়ে গিয়েছিল। ভিসা বাড়ানোর আবেদন করেছিলো, কিন্তু সেই কাগজপত্র হাতে পায়নি বিধায়  সে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতেই গোয়েন্দাদের হাতে ধরা পড়তে হয়েছে তাকে। পিটার বলেছে, তার জালিয়াতির সঙ্গে তার স্ত্রীর কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সে জানতোও না এসব কথা। তবে গোয়েন্দারা রোজিনা ওরফে মেরিনাকে নজরদারির মধ্যে রেখেছে। সদ্য সন্তান প্রসব করায় তাকে গোয়েন্দা হেফাজতে নেয়া হয়নি। কিন্তু তাকে কয়েকদফা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে রোজিনা ওরফে মেরিনা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পিটারের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তারা খুঁজে পাননি। তার স্ত্রীর কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কিনা তা খোঁজ করে দেখা হচ্ছে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে রোজিনা ওরফে মেরিনা সাংবাদিক পরিচয় শুনেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে আরও কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে আর পাওয়া যায়নি।
এদিকে এটিএম বুথ থেকে টাকা জালিয়াতির ঘটনায় থমাস পিটারসহ তিন ব্যাংক কর্মকর্তার প্রথম দফার ছয় দিনের রিমান্ড শেষ হয়েছে গতকাল। আজ তাদের আদালতে সোপর্দ করে আবারও রিমান্ডের আবেদন করা হবে বলে জানিয়েছেন তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পিটারের সহযোগীদের নাম-ঠিকানা যাচাই বাছাই করার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পিটারের এই কাজে যারা সহযোগিতা করেছে তাদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারেরও চেষ্টা চলছে। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মোহাম্মদ শাহজাহান বলেন, পিটারের কাছ থেকে আরও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে পিটারের কাছ থেকে সংগৃহীত তথ্য যাচাই বাছাইয়ের কাজ চলছে।
উল্লেখ্য, গত ৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে ১২ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজধানীর বনানী ও মিরপুর এলাকার বিভিন্ন বুথ থেকে কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকের টাকা খোয়া যায়। গ্রাহকের কাছে ডেবিট কার্ড ও পাসওয়ার্ড গচ্ছিত থাকলেও তাদের মোবাইল ম্যাসেজে টাকা উত্তোলন হওয়ার নোটিফিকেশন আসে। বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী গ্রাহকরা নিজ নিজ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে জানালে বিষয়টি সবার নজরে আসে। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পায়। এর প্রেক্ষিতে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক লিমিটেড (ইউসিবিএল)-এর পক্ষ থেকে বনানী থানায় তথ্য-প্রযুক্তি আইন ও পেনালকোডের ধারায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। এছাড়া, সিটি ব্যাংকের পক্ষ থেকেও পল্লবী থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। দুটো মামলাই তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ- ডিবি। গত ২২শে ফেব্রুয়ারি পুলিশ গুলশান এলাকার বাসা থেকে থমাস পিটার ও সিটি ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা মকসেদ আলী ওরফে মাকসুদ, রেজাউল করিম ওরফে শাহীন ও রেফাজ আহমেদ ওরফে রনিকে গ্রেপ্তার করে।

দমনের যুগ শুরু হয়েছে by পার্থ চেট্টাপাধ্যায়

ভারতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের
সাবেক অধ্যাপক এস এ আর গিলানিকে গ্রেপ্তার
ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর এবারই প্রথম আঘাত করা হলো, ব্যাপারটা তা নয়। কিন্তু এবার যেভাবে আঘাতটা করা হলো, তার মধ্যে একটা নতুন ধরন আছে, যেটা বেশ মারাত্মক।
আমরা জানি, যারা উপনিবেশবিরোধী স্লোগান দিত বা জাতীয়তাবাদী মতামত প্রকাশ করত, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা তাদের বিরুদ্ধে গয়রহভাবে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ আনত। রাজনৈতিক নেতা ও প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে হাজার লেখক, শিল্পী, কবি ও শিক্ষককেও গ্রেপ্তার করেছিল তারা। কিন্তু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তারা তো নিজেরাও ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সেরা ছাত্র ছিলেন, যাঁরা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বেতনের সরকারি চাকরিতে যোগদানের জন্য তুমুল প্রতিযোগিতা করে এসেছিলেন। ফলে তাঁরা স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিটিশ নীতিকে শ্রদ্ধা করতেন।
স্বাধীন ভারতের শুরুর দিকে, যখন আমি কলেজে পড়তাম, তখন পুলিশ ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারবে না, সরকার এই নিয়মটি মেনে চলত। ছাত্ররা রাস্তায় প্রতিবাদ করার সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লে তারা ক্যাম্পাসে ঢুকে পড়ত, আর পুলিশও ব্যত্যয়হীনভাবে কলেজের ফটকে এসে দাঁড়িয়ে যেত, ভেতরে ঢুকত না। ১৯৭০-এর দশক থেকে এই নিয়ম ভাঙা শুরু হয়। যে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত লেগেই থাকে, সেখানে সরকার ও বিরোধীদের দ্বন্দ্বের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়কেও টেনে আনা হলো। সহিংস প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার জন্য ছাত্র ও শিক্ষকদের গ্রেপ্তার করা হলো। আর এটা বলাই বাহুল্য যে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্য কাশ্মীরে দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন চলছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়কেও ছাড় দেওয়া হয়নি।
কিন্তু ১৯৭৫-৭৭ সালের জরুরি অবস্থার সময়টা বাদ দিলে আর কখনোই এমন হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না, যখন বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রাজনৈতিক আলোচনা করা যাবে না। কিন্তু আমাদের কি এটা মেনে নিতে হবে যে জাতির প্রতি অনুগত হলে এসব বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলা যাবে না: আমাদের জাতির উদ্ভব ও বর্তমান মর্যাদা, সংবিধান ও আইনের প্রকৃতি, বিভিন্ন অঞ্চল ও সংস্কৃতির মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক ইত্যাদি। অন্য কথায়, জাতীয় আনুগত্য থাকার অর্থ কি এ রকম যে ছাত্র ও শিক্ষকেরা নিপীড়িত ও সংখ্যালঘু মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনাই করতে পারবে না? কেউ ভাবতে পারেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রাণ হচ্ছে এসব বিতর্ক।
ভারতে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তারে ১৮ বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন
যত গণপরিসর আছে তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে মূল্যবান এ কারণে যে এটা হচ্ছে জাতির প্রাণবন্ত বুদ্ধিবৃত্তিক জীবনের কেন্দ্র, যার ভিত্তি হচ্ছে চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কথাও বলা যায়, দুনিয়ায় বাজার নিয়ন্ত্রিত পুঁজিবাদের কেন্দ্র হলেও এ দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাকরির নিশ্চয়তা আছে, সেখানে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে, পড়ানো ও মত প্রকাশের কারণে তাদের ভোগান্তির শিকার হতে হবে না। ১৯৫০-এর দশকে কুখ্যাত ম্যাককার্থির হাতে কমিউনিস্টদের নির্যাতিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রে এই অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
আজ ভারতে যা হচ্ছে তা অনেকটা সেই ম্যাককার্থির যুগের মতোই। যাদের বিরুদ্ধে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় বা জেএনইউতে ‘জাতিবিরোধী’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তারা সত্যিই সেটা করেছিল কি না, তা এই ছাত্রদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। রোহিত ভেমুলার ব্যাপারটা খুবই বিয়োগান্ত, তাঁকে তো আর জীবিত ফিরিয়ে আনা যাবে না। এটা কোন ঘরানার আইন, যেখানে আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের আদেশ ও তার পরিপালন করার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করা যাবে না, তা-ও আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো গণপরিসরে?
কোন সাংবিধানিক আইন বলেছে, জাতি-রাষ্ট্রের বিদ্যমান সীমানা ও ভারতীয় ইউনিয়নের দুটি রাজ্যের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। আবার যেখানে সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ভারতীয় ইউনিয়নের রাজ্যের সংখ্যা ও তাদের মধ্যকার ফেডারেল সম্পর্কের ধরন প্রায় প্রায়ই বদলায়, সেখানে এমন কথা কীভাবে বলা যায়।
নাকি এমন দাবি করা হচ্ছে যে এসব স্পর্শকাতর বিষয় রাজনীতিকদের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া উচিত, কোমল মনের ছাত্রদের এমন বিপজ্জনক সন্দেহের দিকে ঠেলে দেওয়া যায় না? অথবা বিশ্ববিদ্যালয়কে যে জাতীয়তাবাদের আঁতুড়ঘর বানানোর পরিকল্পনা চলছে, যেখানে ছাত্রদের মগজ ধোলাই করে তাদের হাবাগোবা বানানো হবে? সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রতিটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ২০৭ ফুট লম্বা ইস্পাতের খুঁটিতে জাতীয় পতাকা ওড়ানো হবে। এমন মূল্যবান সিদ্ধান্ত নিয়ে হাসাহাসি করলেও আমরা রেহাই পেয়ে যেতে পারি, কিন্তু এর মাজেজা খুবই মারাত্মক, ব্যাপারটা প্রহসন।
দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ যে বন্দোবস্ত করেছে, তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা বাম-দলিত-সংখ্যালঘু ঘরানার যেকোনো ছাত্রের ওপর হামলে পড়তে পারবে। রাজনৈতিক প্রত্যয়ের ভিত্তিতে তাদের ‘জাতিবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। পুলিশ রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করতেই পারে, কিন্তু আদালতে না টিকলে তা একেবারেই কাজে আসবে না। এর লক্ষ্য হচ্ছে বিরোধীদের গায়ে কালি লাগানো, ভয় দেখানো। গত বছর এম এম কালবুর্গির হত্যার মধ্য দিয়ে যার চূড়ান্ত নজির দেখা গেছে। আজ আমরা যা দেখছি তা হয়তো এক দীর্ঘ ও রক্তাক্ত যাত্রার শুরু মাত্র: পাতিয়ালা হাউস আদালতে কানাইয়া কুমারের ওপর হামলা বা গোয়ালিয়রে অধ্যাপক বিবেক কুমারের ওপর হামলা।
কথা হচ্ছে, আমাদের অনেক কিছুই বিপন্ন হয়ে পড়েছে। আমাদের শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
স্ক্রল. ইন থেকে নেওয়া, অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
পার্থ চেট্টাপাধ্যায়: ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও চিন্তক।

বিএনপি জামায়াত দূরত্ব by কাজী সুমন

ক্রমেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। বিশেষ করে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের যোগাযোগ এখন নেই বললেই চলে। গত কয়েক মাসে জোটের কোনো বৈঠকেই যোগ দেয়নি জামায়াত। পৌরসভা নির্বাচনের পর ইউপি নির্বাচনেও জামায়াতের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হয়নি বিএনপির।
বিএনপি-জামায়াত সম্পর্কে গত দুই বছরের বেশি সময় ধরেই ভাটার টান চলছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি এক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা রেখেছে। তবে বিএনপি বা জামায়াত কোনো দলই আনুষ্ঠানিকভাবে জোট ভাঙার দায় নিতে রাজি নয়। যে কারণে ঘোষণা দিয়ে হয়তো জামায়াত জোট ত্যাগ করবে না। বিএনপিও এ ব্যাপারে কোনো ঘোষণা দেবে না। তবে অস্তিত্বের সংকটে থাকা জামায়াত এরই মধ্যে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও বিকল্প চিন্তা করছে। দলের অনূর্ধ্ব ৬০ বছর বয়সী নেতাদের নিয়ে নতুন দল গঠনের আলোচনাও রয়েছে।
গত ১৯শে ফেব্রুয়ারি ইউপি নির্বাচন নিয়ে ২০ দলের মহাসচিব পর্যায়ের বৈঠক আহ্বান করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বৈঠক শেষে মির্জা আলমগীর ইউপি নির্বাচনে ২০ দল ঐক্যবদ্ধভাবে অংশ নেয়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু ওই বৈঠকে অংশ নেননি জোটের অন্যতম শরিক দল জামায়াত ও এলডিপির কোনো প্রতিনিধি। ওই দিনের সংবাদ সম্মেলনে জোটের দুই শরিক দলের যোগ না দেয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যান মির্জা আলমগীর। এতে জামায়াতসহ কয়েকটি শরিক দলের সঙ্গে বিএনপির দূরত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরে ইউপি নির্বাচনে প্রার্থী নিয়ে বিএনপির সঙ্গে শরিক দলগুলোর এখনও কোনো সমঝোতা হয়নি। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মো. শাহজাহান শরিকদের জন্য ২০টি ইউপিতে ছাড় দেয়ার কথা বললেও বাস্তবে তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি। একাধিক শরিক দলের শীর্ষ নেতা জানান, জামায়াত, এলডিপি, কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ ন্যাপ নিজেদের মতো করে প্রার্থী দিয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি দল নিজেদের মতো করে প্রার্থী দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। এদিকে ইউপি নির্বাচনে সমঝোতার বিষয়ে জোটের শরিক দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, নির্বাচন নিয়ে জোটের সমন্বয় সভায় আমাদের নামেমাত্র ডাকা হয়েছিল। মাত্র ১৫-২০ মিনিটের একটি বৈঠকের নামে ফটোসেশন করা হয়। বিএনপির সিদ্ধান্তগুলো শুধু আমাদের জানিয়ে দেয়া হয়। নির্বাচনে শরিক দলগুলোর কোনো প্রার্থী আছে কিনা তা নিয়ে আলোচনা করা হয়নি। এর আগে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন সমন্বয় সভায়ও জামায়াতের কোনো প্রতিনিধি অংশ নেননি। এছাড়া উপজেলা ও পৌরসভায় ২০ দল জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছিল। তখন এলডিপি ও জাতীয় পার্টিকে (জাফর) দুটি পৌরসভায় ছাড় দিয়েছিল বিএনপি। কিন্তু জামায়াতের সঙ্গে প্রথমদিকে সমঝোতা না হওয়ায় একপর্যায়ে মির্জা আলমগীর বলেছিলেন, স্থানীয়ভাবে জামায়াতের প্রার্থীদের সঙ্গে সমঝোতা করা হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হয়নি জামায়াতের সঙ্গে। দুটি উপজেলায় তাদের প্রার্থী জয়ও পায়। ২০ দলীয় জোটের শরিক দলের এক শীর্ষ নেতা জানান, ২০ দলীয় জোট একরকম মৃত অবস্থায় আছে। তেমন কোনো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নেই। বিএনপির দরকার ‘২০’ সংখ্যাটিকে টিকিয়ে রাখা। তাই জোট থেকে ছোট কোনো দল বেরিয়ে গেলেও তাদের কিছু যায়-আসে না। বিএনপির কোনো কর্মীকে ওই দলের চেয়ারম্যান করে ২০ সংখ্যাটি তারা ঠিক রাখবে। কারণ, ২০ দলের মধ্যে কয়েকটি দল রয়েছে যাদের গুটি কয়েকজন নেতা ছাড়া আর কোনো কর্মী নেই।
দুটি বৈঠকে জামায়াতের অংশ না নেয়ার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মানবজমিনকে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন। জামায়াত নেতারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেন না। এজন্যই হয়তো দলটির কোনো নেতা বৈঠকে যোগ দিতে পারেনি। তার মানে এই নয় জামায়াত ২০ দলীয় জোটে নেই। পৌরসভা ও ইউপি নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়ার বিষয়ে অনেকটা একই যুক্তি তুলে ধরেন বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরামের এই নেতা।
এদিকে, জামায়াত নেতাদের নিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের আলোচনাও শোনা যাচ্ছে। দলটির নাম হতে পারে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি)। যুদ্ধাপরাধের অপবাদ ঘুচাতে অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাদের দলটির নেতৃত্বে নিয়ে আসা হবে। তবে জামায়াত এক্ষেত্রে বিলুপ্ত করা হবে না। একটি অংশ জামায়াতেই থেকে যাবেন।

সাংবাদিকদের আদালতে থাকতে দেয়া হয়নি

বাদীর সাক্ষ্য গ্রহণের মধ্য দিয়ে নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ৭ খুনের মামলার বিচারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা একটানা জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে চলে সাক্ষ্যগ্রহণ। ওই ঘটনায় করা দুটি মামলার একটির বাদী ডা. বিজয় কুমার পাল আদালতে সাক্ষ্য দেন। ডা. বিজয় কুমার পাল ৭ খুনের ঘটনায় নিহত আইনজীবী অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকারের বড় মেয়ের জামাতা। উভয় মামলায় অভিযুক্ত ৩৫ আসামির মধ্যে ২৩ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আসামিদের মধ্যে গতকাল ২২ জনের আইনজীবী বাদীকে জেরা করেন। ৩ জনের পক্ষে আদালতে সময় প্রার্থনা করলে বিচারক তা মঞ্জুর করেন। উপস্থিত বাকি ১০ আসামির আইনজীবীরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তারা বাদীকে জেরা করতে পারেননি। বিচারক এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করেন আগামী ৭ই মার্চ। এ ছাড়া আগামী ৩রা মার্চ ৭ খুনের ঘটনায় করা অপর মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্য নেয়ার তারিখ ধার্য করেন বিচারক। সেলিনা ইসলাম বিউটি গতকালও আদালতে উপস্থিত ছিলেন। এদিকে বিচারকাজ শুরুর আগে আদালতের এজলাস থেকে সাংবাদিকদের বের করে দেয়ায় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে এজলাসে প্রবেশে কড়াকড়ি শিথিল করা হয়। সকাল সাড়ে ১০টায় বিচারক বিচারকাজ শুরু হলেও ডা. বিজয় সাক্ষ্য দিতে কাঠগড়ায় দাঁড়ান সকাল পৌনে ১১টায়। এরপর তিনি আদালতের উদ্দেশে তার বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তার বক্তব্য উপস্থাপন শেষে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা তাকে জেরা শুরু করেন। দুপুর সোয়া ১টা পর্যন্ত একে একে ২২ আসামির আইনজীবী বাদীকে জেরা করেন। ২২ আসামির মধ্যে ১০ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। বাকি ১২ আসামি পলাতক। পলাতক আসামিদের পক্ষে রাষ্ট্র নিয়োজিত আইনজীবীরা জেরা করেন। এদিকে মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন, র‌্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদ এবং উপ-অধিনায়ক এম এম রানার পক্ষে তাদের আইনজীবীরা বাদীকে জেরা করার জন্য সময় প্রার্থনা করেন। বিচারক তা মঞ্জুর করে আগামী ৭ই মার্চ বাদীকে জেরার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেন। বাদীপক্ষের নিয়োজিত আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, আসামিপক্ষ গতকালও সাক্ষ্য গ্রহণ বানচাল করার চেষ্টা করেছিল। তাদের সেই চেষ্টা সফল হয়নি বিজ্ঞ বিচারকের কারণে। আদালতে একটি মামলার বাদী ডা. বিজয় কুমার পাল সাক্ষ্য দিয়েছেন। এর আগে আগামী ৩রা মার্চ অপর মামলার বাদী ডা. সেলিনা ইসলাম বিউটির সাক্ষ্য দেয়ার তারিখ ধার্য করা হয়েছে। আদালতে পিপি অ্যাডভোকেট ওয়াজেদ আলী খোকন বলেন, গতকাল ৭ খুনের ঘটনায় করা ২ মামলার একটির বাদী ডা. বিজয় কুমার পাল সাক্ষী দিয়েছেন। এ ছাড়া অপর মামলার বাদী সেলিনা ইসলাম বিউটি আদালতে উপস্থিত থাকলেও সময় সংকুলান না হওয়ায় তার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ৩রা মার্চ ধার্য করা হয়েছে। এর আগে গতকাল সকালে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকা ও গাজীপুর থেকে ৫ এবং নারায়ণগঞ্জ কারাগার থেকে ১৮ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। মামলার ৩৫ আসামির মধ্যে যারা উপস্থিত ছিল তারা হলে নূর হোসেন, লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন, লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানা, হাবিলদার এমদাদুল হক, আরজিও-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া ও বিল্লাল হোসেন, সিপাহি আবু তৈয়ব, কনসটেবল শিহাবউদ্দিন, এসআই পুণেন্দু বালা, ল্যান্স করপোরাল রহুল আমীন, এএসআই বজলুর রহমান, হাবিলদার নাসির উদ্দিন, এএসআই আবুল কালাম আজাদ, সৈনিক নুরুজ্জামান, কনসটেবল বাবুল হাসান, সৈনিক আসাদুজ্জামান নূর, মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের সহযোগী মোস্তফা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী ও আবুল বাশার। এখনও পলাতক যে ১২ জন : সাত খুনের ঘটনায় আদালতে যে ৩৫ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র গঠিত হয়েছে তার মধ্যে এখনও ১২ জন পলাতক রয়েছে। ওই ১২ জনের মধ্যে মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের ৪ সহযোগী রয়েছে। বাকিরা র‌্যাব-১১-এর সাবেক সদস্য। চাঞ্চল্যকর এ মামলায় ৩৫ আসামির মধ্যে মোট ২১ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ ছাড়া ঘটনার সাক্ষী হিসেবে ১৫ র‌্যাব সদস্যসহ ২০ জন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭শে এপ্রিল আদালত থেকে ফেরার পথে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার সহযোগী সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তার গাড়িচালক ইব্রাহীম ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংকরোড থেকে অপহৃত হন। অপহরণের ৩ দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও পরদিন ১লা মে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

বলিউডে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নারী পাচার

ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউডে নানা রকম কাজের সুযোগ রয়েছে। নায়ক-নায়িকাদের সহকারী হিসেবে কাজ করে আয় করা যায় অনেক টাকা। এ রকম হাজারো রঙিন স্বপ্ন দেখিয়ে নারী পাচার করতো ওরা। নারী পাচারে কাজ হতো তিন স্তরে। একটি চক্র জেলা-উপজেলার নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের সংগ্রহ করতো। তারা এনে দিতো ঢাকার পাচারকারী চক্রের কাছে। তারা ভারতীয় পাচারকারী চক্রের কাছে বিক্রি করে দিতো উচ্চমূল্যে । পাচারের শিকার তরুণীদের ফিল্ম সিটি হিসেবে খ্যাত মুম্বইতে নেয়া হতো ঠিকই, কিন্তু বলিউডের কোনো কাজে নয়, তাদের বাধ্য করা হতো বিভিন্ন পতিতা পল্লীতে কাজ করতে। শুধু তাই না, ভারতে আটকে রেখে মেয়েকে দিয়ে কথা বলানো হতো পরিবারের সঙ্গে। দেশে ফিরিয়ে দেয়ার বিনিময়ে দাবি করা হতো বিপুল টাকা। এরকম একটি নারী পাচারকারী চক্রকে আটক করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-র‌্যাব। গ্রেপ্তারকৃতরা হলো- রোকন (২১), আয়েশা আক্তার আশা (২৫), আমির (২২), হাসান খন্দকার (৩০), হাবিব (৩২), মিল্টন (২২) ও সামাদ (৩২)। এ সময় পাচারকারীদের হেফাজত থেকে চার তরুণীসহ ১২টি পাসপোর্ট, ১১টি জাল ভিসা, বিমানের ৫১টি জাল টিকিট ও ৫৩টি ভুয়া নিয়োগপত্র, একটি ভিডিও ক্যামেরা ও ১৪টি  মোবাইল উদ্ধার করা হয়েছে। এই চার তরুণীকে বেনাপোলের সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেয়ার প্রস্তুতি চলছিল।
গতকাল বিকালে কুর্মিটোলায় র‌্যাব সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, গত বছরের ২৫শে সেপ্টেম্বর র‌্যাব-১২ সিরাজগঞ্জ ক্যাম্পে রওশন আরা নামে এক নারী তার মেয়ে সাবিনাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করে। অভিযোগে বলা হয়,  সে গাজীপুরে গার্মেন্টে কাজ করতো। ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার পর ১৭ই আগস্ট কর্মস্থলে ফিরে যায় সাবিনা। কিন্তু এরপর থেকেই তাকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। ক’দিন পর ভারতীয় মোবাইল নম্বর থেকে তার মেয়ে ফোন করে জানায় তাকে  ভারতে পাচার করা হয়েছে। পাচারকারীরা তাকে ফেরত দেয়ার বিনিময়ে ৫ লাখ টাকা দাবি করে। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ওই অপহরণের ঘটনাটি নিবিড়ভাবে তদন্ত করতে গিয়ে তারা এই পাচারকারী চক্রের সন্ধান পান। পরে গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের বড়বাড়ি এলাকা থেকে এ চক্রের সদস্য রোকন ও আয়েশাকে গ্রেপ্তার করে। এসময় তাদের কাছ থেকে সোহাগী নামে অপর এক ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা রোকন, আয়েশা ও সাবিনাকে বলিউডে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতে পাচার করে দেয়ার কথা স্বীকার করে। একই কায়দায় সোহাগীকেও ভারতে পাচারের প্রক্রিয়া চলছিল বলে তারা জানায়। রোকন ও আয়েশাকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে র‌্যাব সূত্র জানায়, তারা সোহাগী নামের ওই তরুণীকে ভারতে পাচার করে দেয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছিল। চক্রের অপর দুই সদস্য আমির ও হাসানের সঙ্গে তাদের ৮০ হাজার টাকায় চুক্তি হয়। পরে র‌্যাব ফাঁদ পেতে সোহাগীকে হস্তান্তরের নাম করে যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে আমির ও হাসানকে আটক করে। এসময় র‌্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে তাহের নামে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা তাহের পালিয়ে যায়। র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে আমির ও হাসান জানায়, সোহাগীকে তারা ভারতের কলকাতায় এক দিদির কাছে বিক্রির জন্য সব বন্দোবস্ত করে রেখেছিল। সোহাগীর ‘দাম’ ধরা হয়েছিল দুই লাখ টাকা। কলকাতার ওই দিদি তাকে মুম্বইয়ের পতিতালয়ে কাজে লাগাতো। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, আমির ও হাসানকে কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে যাত্রাবাড়ী থানাধীন বউবাজারের একটি বাসার তৃতীয় তলায় আরেক তরুণীকে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা হয়েছে বলে জানায়। পরে র‌্যাব কর্মকর্তারা ওই বাসা থেকে শিরীন নামে এক তরুণীকে উদ্ধার করে। র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, পাচারকারী চক্রের অপর সদস্যদের ধরতে তারা সোহাগী ও শিরীনকে হস্তান্তরের ফাঁদ পাতে। এ জন্য তারা ছদ্মবেশে গত রোববার তাদের নিয়ে বেনাপোল সীমান্তের সূর্যখালী এলাকায় অভিযান চালায়। সেখান থেকে পাচারকারী চক্রের হাবিব, মিল্টন ও সামাদকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তারা কলকাতার সেই দিদির এদেশীয় প্রতিনিধি। তাদের কাজ হলো রাতে সীমান্ত পার করে দেয়া। এই তিন জনের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে রাজধানীর ফকিরাপুল পানির ট্যাংকি এলাকা থেকে মামুন মির্জাকে আটক করা হয়। এসময় সালমান নামে আরেক পাচারকারী পালিয়ে যায়। এসময় মামুনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার হেফাজতে পাচারের উদ্দেশে রাখা দুই কিশোরী রয়েছে বলে স্বীকার করে। পরে র‌্যাবের অপর একটি অভিযানিক দল দক্ষিণ কেরাণীগঞ্জ এলাকা থেকে শারমিন ও রিয়া নামে দুই কিশোরীকে উদ্ধার করে। জিজ্ঞাসাবাদে মামুন মির্জা জানায়, সে শারমিনকে ১৫ দিন ও রিয়াকে ৩ মাস ধরে তার হেফাজতে রেখেছে। তাদের দু’জনকে মামুন বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে। পরে ভারতীয় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি বলিউডে কাজের কথা বলে ভারতে পাচার করে দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সঙ্গে কেরানীগঞ্জের বাসায় দুই তরুণীর সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কের সময় ভিডিও করে তা প্রচারের হুমকি দিয়ে পতিতাবৃত্তি করাচ্ছিল। র‌্যাব কর্মকর্তা মুফতি মাহমুদ খান বলেন, এই চক্রটি গত ৪-৫ বছরে অন্তত পাঁচ শতাধিক তরুণীকে ভারতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে বলে স্বীকার করেছে। কখনো কাজের প্রলোভন, কখনো বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়েদের পাচার করতো ওরা। এই সিন্ডিকেটের প্রধান হোতা হলো তাহের ও সালমান। তাদের গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে বলে তিনি জানান।
সাবিনাকে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চলছে: র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, সিরাজগঞ্জ থেকে পাচার হওয়া সাবিনাকে ভারতের মুম্বই থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন তারা। এ জন্য তারা পুলিশ সদর দপ্তরের মাধ্যমে ইন্টারপোলের সঙ্গে কথা বলেছেন। সাবিনাকে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান র‌্যাবের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।