Tuesday, November 5, 2019

বেলা থর্ন: ডিজনি তারকা থেকে পর্ন পরিচালক যিনি নিজেই ভূয়া ভিডিওর শিকার

কারো সম্মানহানি করার লক্ষ্যে একান্ত ব্যক্তিগত যৌনসম্পর্কের ভিডিও ইন্টারনেটে ছেড়ে দেয়াটা বেশ কিছুকাল থেকেই পৃথিবীতে এক গুরুতর সমস্যায় পরিণত হয়েছে - যাকে বলে 'রিভেঞ্জ' বা প্রতিশোধমূলক পর্ন ।
এই রিভেঞ্জ পর্নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছেন এমন এক তারকা - যিনি একসময় ছিলেন ডিজনি তারকা, কিন্তু এখন নিজেই পর্ন ছবির একজন পরিচালক।
বেলা থর্ন নামের এই পর্ন ডিরেক্টর এ সপ্তাহের শুরুতে ঘোষণা দিয়েছেন যে তিনি পর্নগ্রাফি শেয়ারিং সাইট পর্নহাবের সাথে কাজ করবেন এটিকে 'রিভেঞ্জ পর্ন' থেকে মুক্ত করার জন্য।
বেলার মুখ অন্য নারীর দেহে জুড়ে দিয়ে এরকম হাজার হাজার পর্ন ছবি তৈরি করা হয়েছে। এসব কথা বলার সময় বেলা থর্ন কাঁদছিলেন এবং তার পোষা অস্ট্রেলিয়ান শেফার্ড কুকুরটি পায়ের কাছে ঘুরঘুর করে তার উদ্বেগ প্রকাশ করছিলো।
আমরা কথা বলেছি গণিকা বলে কাউকে লজ্জা দেবার বিষয়ে, তা ছাড়া অবসাদ বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে হেনস্থা করা নিয়েও কথা বলেছি। আর যে দেহ বেলার বলে চালিয়ে মিথ্যা ভিডিও তৈরি করা হয়েছে - সেটা নিয়েও আলোচনা করেছি।
আমরা অন্টারিওতে তার ভাড়া বাড়ির ডেকে বসেছিলাম। খুবই শান্ত এলাকা। থর্ন তিন মাস ধরে এখানে আছেন শুটিংয়ের কাজে। এখান তিনি তরুণীর ভূমিকায় অভিনয় করছেন যিনি নিপীড়ক বাবাকে হত্যার জন্য শহরে ফিরে এসেছেন।
এ বছরেই অর্থাৎ ২২ বছর বয়সে এসে নিজের প্রথম বই প্রকাশ করেছেন তিনি।
নয় বছর বয়সে বেলা এক মোটরবাইক দুর্ঘটনায় তার বাবাকে হারান। শিশু মডেল হিসেবে বেড়ে ওঠে তার ক্যারিয়ার। পরে জায়গা করে নেন ডিজনি চ্যানেলে।

১০০ নারী

বিবিসির প্রভাবশালী নারীর তালিকা নারী নেতৃত্বময় ভবিষ্যতের ভিশন দেখায়।
এই জুনে বেলা কিছু টেক্সট মেসেজ পান এমন কিছু নাম্বার থেকে- যেগুলো তার পরিচিত নয়।
"একটি সাক্ষাতকার দিয়ে এসে আমি কাঁদছিলাম। বই নিয়ে কথা বলছিলাম। এবং এর মধ্যে ফোনের দিকে তাকিয়ে আমি দেখি আমার নিজেরই নগ্ন চিত্র"।
নিজের সাবেক প্রেমিকের কাছে পাঠানো ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে বেলা অবাক হন।
ম্যানেজারকে ডাকেন ও এজেন্টের কাছে পরামর্শ চান। কিন্তু এর মধ্যেই আবারো শব্দ করে ওঠে ফোন।
আরও নগ্ন ছবি। এবার তার কিছু বিখ্যাত বন্ধুর।
সময়টা ছিলো খুব সকাল এবং তখনো তিনি বিছানায়। নিজের বইয়ে বেলা ছোটবেলায় যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার বর্ণনা দিয়েছেন। ছবিগুলো দেখে সেই একই অনুভূতি জেগে উঠলো তার মনে।
"এটি আবারো ঘটলো" - বলেন তিনি।
সুতরাং তিনি একটি সিদ্ধান্ত নিলেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে টুইটারে তার ৭০ লাখ ফলোয়ার এবং ২২ মিলিয়ন ইন্সটাগ্রামে ও ফেসবুকে প্রায় নব্বই লাখ।
নিজের টপলেস ছবি প্রকাশ করে তিনি সাথে হ্যাকাররা তাকে যে হুমকি দিয়েছে তার স্ক্রীনশট দিলেন, আর তার সাথে নিজের বার্তা।

বিতর্ক

আমেরিকান চ্যাট শো দা ভিউয়ের হুপি গোল্ডবার্গ অবশ্য থর্নের সাথে একমত নন।
"তুমি যদি বিখ্যাত হও তখন তোমার বয়স কতো সেটা আমি বিবেচনায় নেবো না। তাই নিজের নগ্ন ছবি তুলোনা কখনো। একবার নিলে এটা হ্যাকারদের জন্য সহজলভ্য হয়ে পড়ে। আর ২০১৯ সালে এসে এটা যদি না বোঝো তাহলে আমি দু;খিত"।
তবে বেলা থর্ন ইন্সটাগ্রামে গোল্ডবার্গের এই মন্তব্যকে 'সিক অ্যান্ড ডিসগাস্টিং' আখ্যায়িত করেন।
"আমি পছন্দ করি এমন কারও কাছ থেকে এমন মন্তব্য আমাকে আঘাত দেয়"।
তিনি বলেন আগে থেকেই ঝুঁকিতে থাকা কোন তরুণকে প্রকাশ্যে বিব্রত করলে সেটি তাকে আরও মানসিক সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
"একটি ছবি এভাবে প্রকাশ হলে এটি স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে। এবং তাদের আত্মঘাতী মনে হতে পারে"।

ইন্টারনেটে ভুয়া ছবি ও ভিডিও

এসব ছবি যা তিনি নিজে প্রকাশ করেছেন সেগুলো ছিলো বেলা থর্নের সত্যিকার টপলেস ছবি।
কিন্তু ভিডিওতে পরিষ্কার বেলাকে দেখা গেলেও সত্যিকার অর্থেই তিনি সেটি ছিলেন না। এগুলো কারসাজি করে বানানো হয়েছিলো সুপার-ইমপোজ করে।
একটি ভিডিওতে থর্নের কান্নার শব্দ জুড়ে দেয়া হয়েছিলো, যেটি থর্নেরই একটি রেকডিং থেকে নেয়া হয়েছে।
প্রাপ্তবয়স্কদের ছবি নির্মাণ করে পুরস্কার পেয়েছেন তিনি
আবার একটি ভিডিওতে যেখানে একজন নারী স্বমেহন করছে, সেখানে বেলা থর্নের মুখ বসিয়ে দেয়া হয়েছে।
"এসব ভিডিও সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং সবাই মনে করেছে এটি আসলেই আমি," বিবিসিকে বলছিলেন তিনি।
সফটওয়্যার ডেভেলপাররা বিবিসিকে বলছে, এক বছর ধরেই একটি সিঙ্গেল ফটোগ্রাফ থেকে এমন ভুয়া (ডিপ ফেক) ভিডিও বানানোর প্রযুক্তি বাজারে আছে। আর এটাই বেলাকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
"এটা শুধু সেলিব্রিটিদের জন্য উদ্বেগের নয় বরং এটা কমবয়সীদের পর্নগ্রাফির ভিত্তি তৈরি করছে"।
তিনি বলেন এসব ভিডিও প্রতিশোধ নেয়া, ব্লাকমেইল করা এমনকি চাঁদাবাজির জন্য তরুনী নারীদের বিরুদ্ধ ব্যবহৃত হতে পারে।

পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ

এই পর্যায়ে এসে অ্যাওয়ার্ড জেতা প্রাপ্তবয়স্কদের ছবি 'হিম অ্যান্ড হার' যেটিতে পরিচালক হিসেবে বেলা থর্নের অভিষেক হয়েছে - সেটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
তিনি বলেন তিনি ছবিটি বানিয়েছেন কারণ তিনি মনে করেন এই ইন্ডাস্ট্রিতে আরও নারী পরিচালক দরকার। এটি হওয়া দরকার নারীর যৌনতা নিয়ে থাকা গল্পগুলোর পরিবর্তনের জন্যই।
এক পর্যায়ে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় যে তিনি যেখানে ছবি মুক্তি দিয়েছেন - বিবিসির অনুসন্ধান দেখা গেছে সেই পর্নহাবই রিভেঞ্জ পর্ন ভিডিও থেকে মুনাফা করছে। জবাবে তিনি বলেন. এটা তার জানা ছিলোনা।
পর্ণহাবের মালিক কোম্পানি অবশ্য বিবিসিকে বলেছে, তারা চান ব্যবহারকারীরা নিরাপদে কনটেন্ট ব্যবহার করবে।
থর্নের এক বন্ধু পরে জানিয়েছেন, তিনি পর্নহাবের সাথে কথা বলেছেন্ ।
পরে তিনি তার প্রথম মুভির জন্য পর্নহাব অ্যাওয়ার্ড পান।
তিনি প্রাপ্তবয়স্কদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং প্রতিশোধমূলক পর্ন ভিডিওর বিরুদ্ধে বার্তাও দিয়েছেন তাতে।
"পর্নহাবের সাথে আমি কাজ করছি প্রত্যেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য"।

প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করছেন যারা

প্রসবজনিত ফিস্টুলা একটি জটিল সমস্যা হলেও প্রায় অনেকেই তা গোপন রাখেন। বিশ্বজুড়ে ২০ লাখের বেশি মাকে এই সমস্যায় আক্রান্ত করছে।
কিন্তু আফ্রিকার দেশ মাদাগাস্কারের একদল নারী এই সমস্যা মোকাবেলায় তৈরি করেছেন নতুন এক নজির।
একদল নারী যারা নিজেরাই ফিস্টুলায় আক্রান্ত, তারা নিজের ও নিজেদের জীবনের কষ্টকর অভিজ্ঞতা আর দুর্ভোগের গল্প ছড়িয়ে দিচ্ছেন অন্য আরও অনেক নারীদের মাঝে যাদের চিকিৎসা প্রয়োজন।
তাদেরকে মনে করা হচ্ছে 'পেশেন্ট অ্যাম্বাসেডর'। গতবছর এই প্রকল্পটি চালু হওয়ার পর থেকে অনেকেরই জীবনরক্ষাকারী অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।
ফেলিসিয়ার গল্প
১৪ বছর আগের কথা।
ফেলিসিয়া ভোনিয়ারিসোয়া মিয়াডানাহারিভেলোর প্রথম সন্তান প্রসবের সময় প্রচন্ড জটিলতার সৃষ্টি হয়।
"আমি একদিন বাড়িতে চেষ্টার পর কাছাকাছি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। আমি তিন দিন ব্যথা সহ্য করেছি এবং তখনো প্রসব হয়নি।"
তার সন্তান প্রসবের আগেই মারা যায়। এবং ফেলিসিয়ার প্রসব-জনিত ফিস্টুলার সমস্যা শুরু হয়।
বিলম্বিত ও বাধাগ্রস্ত প্রসব এবং যথাযথ চিকিৎসা সুবিধা না থাকার কারণে প্রসবজনিত ফিস্টুলার সমস্যার শুরু হয়।
যোনিপথ, মূত্রাশয় ও মলদ্বারের মাঝখানে কোনো অস্বাভাবিক ছিদ্র তৈরি হলে একে প্রসবজনিত ফিস্টুলা বলে।
এর ফলে কোনোরকম নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই প্রস্রাব-পায়খানা বের হয়ে যায়। বিব্রতকর গন্ধ এবং সার্বক্ষণিক ভেজা-ভাব স্বাভাবিক জীবন যাপনে বাধা হয়ে দাড়ায়।
এর ফলে আরও অনেক ফিস্টুলা সমস্যায় আক্রান্ত নারীর ভাগ্যে যা ঘটে থাকে, তাই ঘটেছিল ফেলিসিয়ার ভাগ্যেও। তার জীবনসঙ্গী তাকে ত্যাগ করে এবং এই নারীকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে বাধ্য করা হয়।
এমনকি তার পরিবারের অনেক লোকজনও তাকে মেনে নিতে চায়না। "লোকজন এমন আচরণ করতে লাগলো যেন আমি কোন মানুষই নই, এবং এই বিষয়টি আমাকে খুবই কষ্ট দিয়েছিল", বলেন ফেলিসিয়া।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুসারে মাদাগাস্কারে প্রতিবছর প্রায় ২০০০ নারী সন্তান জন্মদানের সময় প্রসব-জনিত ফিস্টুলার শিকার হয়।
কারণ তারা সময়মত সিজারিয়ান সি-সেকশন বা অস্ত্রোপচার কিংবা চিকিৎসা সহায়তা পাননা।
আর একবার তাদের ফিস্টুলা দেখা দিলে খুব সামান্য শতাংশ নারী তা সমাধানের জন্য সার্জারির সুযোগ পায়।
একদশকের বেশি সময় তাই ফিস্টুলা নিয়ে কাটাতে হয় ফেলিসিয়াকে। এরপর তার সুযোগ মেলে তামাতাভে শহরে ফ্রিডম ফ্রম ফিস্টুলার বিনা বেতনে পরিচালিত ক্লিনিকে চিকিৎসা নেয়ার।
সেখানেই তার চিন্তা আসে কিভাবে সে অন্যদের সহায়তা করতে পারে।
"আমি যখন সুস্থ হলাম তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম রোগীদের শুভেচ্ছা দূত হিসেবে কাজ করবো। কারণ আমি জানতাম যে, আমার এলাকায় বহু নারী আছে যারা আমার মত একই রোগে ভুগছে এবং সমাজ থেকে তাদের বিতাড়িত করা হয়েছে।"
চিকিৎসা শেষে নিজের গ্রামে ফিরে গেলেন ফেলিসিয়া এবং তার জীবন একটি সার্জারির পর কীভাবে বদলে গেছে সে-কথাই অন্য নারীদের কাছে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিলেন।
যেভাবে শুরু করলেন সেবা দেয়
ফেলিসিয়া ছোট্ট একটি দোকানে কফি এবং কেক বিক্রি করেন। যে রাস্তা ধরে বহু লোক এক গ্রাম থকে আরেক গ্রামে যাতায়াত করে। দোকানে আসা লোকজনের সাথে ফিস্টুলা নিয়ে কথাবার্তা বলে সে।
লোকজনের কাছে নিজের ফোন-নম্বর দিয়ে সে অনুরোধ করে নতুন কোনও ফিস্টুলা রোগীর কথা জানতে পারলে তাকে খবর দিতে।
মানুষের দরজায় দরজায় ঘুরে ঘুরেও ফিস্টুলার কথা জানায় সে। অনেকেই যে সমস্ত বিষয় নিয়ে খোলাখুলি কোনও প্রশ্ন তুলে ধরতে সংকোচ বোধ করে, সেসব প্রশ্ন তুলে ধরে; উত্তর দেয় সে নিজেই।
ফিস্টুলা রোগীদের নিয়ে এখনো সামাজিক অনেক কুসংস্কার প্রচলিত আছে। অনেক মানুষই ফিস্টুলা শব্দের সাথেও পরিচিত নয়।
তারা হয়তো বিষয়টি সম্পর্কে বলে থাকে "যে নারীর গায়ে দুর্গন্ধ" কিংবা "শিশুর জন্মদানের পর ফুটো।"
"তাদের সঙ্গে একত্রে বসবাস করা কঠিন কারণ তাদের গা থেকে সবসময় প্রস্রাবের গন্ধ। তাদের অনেককে সমাজ থেকে বিতাড়িত করো হয় এবং তাদের ওপর লোকজন ক্ষুব্ধ থাকে"-বলছিলেন একজন নারী।
তবে ফেলিসিয়া এখন সবার কাছে খুব ভালোভাবে পরিচিত। গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখে ও তাকে তারা বিশ্বাস করে। তবে কাজটি মোটেই সহজসাধ্য নয়। লোকজনকে চিকিৎসা সেবা নেবার ব্যাপারে উৎসাহিত করতে তাকে কখনো কখনো একাধিকবারও তাদের কাছে যেতে হয়।
"লোকজন যেতে চায়না তার মূল কারণ হচ্ছে তারা ভয় পায়। অস্ত্রোপচার নিয়ে তাদের ভীতি রয়েছে। অঙ্গ চুরি হয়ে যেতে পারে এমন গুজব প্রচলিত আছে । রোগীদের পরিবারগুলো মনে করে হাসপাতালে তারা মারা যাবে তাই সেখানে পাঠাতে চায়না তারা"।
এইসব এলাকায় যাতায়াতের একমাত্র উপায় হাঁটাপথ। কলাগাছ ও কফিগাছ দ্বারা ঘেরা খাড়া পাহাড় বেয়ে যেতে হল। কোনও রাস্তা না থাকয় জঙ্গলের ভেতর পথ বেছে নিতে হয়।
মারিয়ান্নের বয়স ২১ বছর। কিন্তু তাকে দেখতে মনে হয় আরও অনেক ছোট। প্রসবের সময় তার নবজাতক সন্তানটি দুই সপ্তাহ আগে মারা গেছে সময়মত সে হাসপাতালে যেতে পারেনি বলে। ফিস্টুলার শিকার হওয়ায় তার স্বামী তাকে ত্যাগ করেছে এবং বাবা ও সৎ মায়ের কাছে ফিরে আসতে সে বাধ্য হয়েছে।
"আমি খুব লজ্জা ও বিব্রতকর অবস্থার মধ্যে ছিলাম এবং সবসময় লুকিয়ে থাকতাম। শরীর থেকে বাজে গন্ধ বের হওয়ার কারণে গ্রামে বের হওয়ার মত বা কোনও মানুষের কাছে যাওয়ার সাহস ছিলনা।"
প্রতিদিন মারিয়ান্নেকে কাপড়চোপড় ধুতে হতো প্রস্রাবের গন্ধের কারণে। সে বলে "বাচ্চাকে হারানোর কারণে আমার খুব খারাপ লাগে। আমার জীবনটাই পুরো পাল্টে গেছে এ কারণে।"
মারিয়ান্নেকে শহরে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দেয়ার ব্যাপারে তার পরিবারের লোকজনের সাথে কথা বলেছে ফেলিসিয়া। নিজের জীবনের কথাও তাদের সামনে তুলে ধরেছে সে। তাদের নানা প্রশ্নের জবাব এবং মারিয়ান্নেকে যথাসময়ে তাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দিতে হয় তাকে। এরপর মারিয়ান্নে নিজেও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে।
সে বলে, "ফেলিসিয়া নিজে হাসপাতালে গিয়েছিল এবং অস্ত্রোপচার করেছিল। আমার মনে হয় এটা সে না হয়ে অন্য কেউ হলে আমি হয়তো তাকে বিশ্বাস করতাম না কারণ আমরা অনেক ধরনের গুজব শুনেছি এবং এর আগে কখনো এই এলাকা ছাড়িনি।"
"এখন আমি জানি যে প্রকৃতপক্ষে চিকিৎসা পেতে পারলে এবং সুস্থ হয়ে উঠতে পারবো। আমি আমার আগের জীবন ফিরে পেতে চাই।"
দাতব্য সংস্থা ফ্রিডম ফ্রম ফিস্টুলা এইসব নারীদের ভ্রমণের খরচ বহন করছে। যদিও ফেলিসিয়া যে সময় দিচ্ছে সেজন্য তারা তাকে অর্থ দিচ্ছেনা।
কিন্তু গতবছর নিজের সার্জারির পর থেকে সে অন্য মহিলাদের সহায়তা করার জন্য শক্তভাবে পাশে দাঁড়ায় ফেলিসিয়া। এই যাত্রায় বেশ কয়েকদিন লাগে এবং বেশিরভাগই পায়ে হেটে এবং গণ-পরিবহনে আসা-যাওয়া করতে হয়।
দ্য ফ্রিডম ফ্রম ফিস্টুলা ক্লিনিকে ৬টি ওয়ার্ড এবং ৪২টি শয্যা রয়েছে। সেখানে সার্জারির জন্য আসা একজন রোগী যাফেলিয়েনে, যার বয়স ৩৮। সে প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছে কিন্তু সে ভীত নয় বলে জানায়।
প্রসবকালীন ফিস্টুলা বিশেষজ্ঞ মিশেল ব্রিন তার অস্ত্রোপচার করবেন।
এই অস্ত্রোপচারের জন্য প্রথমে ব্লাডার এবং পরে যোনিপথ এর সার্জারি করা হবে। অস্ত্রোপচারের জন্য ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগে।
"এটা তাদেরকে সম্পূর্ণ নতুন এক জীবন এনে দেবে। অন্যতম প্রধান সমস্যা তাদের রাতের বেলা অনবরত প্রস্রাব বেরোনো । তো অস্ত্রোপচারের পর প্রথম যে জিনিসটি তারা উপলব্ধি করবে তা হলো, শেষপর্যন্ত তারা রাতের নির্বিঘ্ন ঘুম পেতে যাচ্ছে" বলছিলেন চিকিৎসক মি ব্রিন।
এই দাতব্য সংস্থার পরিচালক এলো ওটোবো বলেন, "নিজ সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছে ফেরত যাওয়ার আগে তাদের শারিরীক সুস্থতার পাশাপাশি এইসব নারীদের জন্য প্রচুর মানসিক যত্ন প্রয়োজন । সে কারণে তাদের কাউন্সিলর দিয়ে কাউন্সিলিং এর ব্যবস্থা রয়েছে।"
পরিচালক ওটেবো বেলন, "এইসব নারীরা শুধুমাত্র শুভেচ্ছা দূত হিসেবে নয়, তারা যেন প্রকৃত অর্থে নিজ কমিউনিটির মধ্যে নেতৃস্থানীয় হয়ে উঠতে পারে সেজন্য তাদের ক্ষমতায়নের কাজ করা হচ্ছে।"
এখানে যে শুধু সুস্থ করার কাজটিতেই গুরুত্ব দেয়া হয় তেমনটি নয়। বরং সুস্থতার পর একেকজন রোগী কি অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে দিন পার করেছে সে গল্প শেয়ার করার এবং তা নিয়ে কোন ধরনের সংকোচের বদলে গর্ব করার প্রেরণাও দেয়া হয় এই সংস্থাটি থেকে।
যেমনটা বলছেন ডিরেক্টর ওটোবো-"অনেক ফিস্টুলা রোগী ১৫, ২০ বছর ধরে এই দুর্ভোগ সহ্য করে আসছে এবং এখন তারা আমাদের ক্লিনিকে আসে আমরা তাদের সমাজে ফিরে গিয়ে নিজেদের গল্পগুলো তুলে ধরতে, এবং গর্বের সাথে কথা বলা শেখাই। এবং সামগ্রিক আরোগ্যলাভের প্রক্রিয়ায় এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি।"
এখানেই শেষ নয়। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হয় সর্বশেষ ধাপে একটি বিদায়ী পার্টির মধ্য দিয়ে। নিজেদের অভিজ্ঞার গল্প বলার অনুশীলনের সুযোগ এটি। নতুন পোশাক এবং উজ্জ্বল গোলাপি রং এর লিপস্টিক-এ সজ্জিত এই নারীরা সেদিন আত্মবিশ্বাসী এবং উচ্ছ্বসিত। চলে প্রত্যেকের নিজেদের গল্প বলা এবং বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেয়া। এমনকি তাদের দেয়া হয় সার্টিফিকেটও।
অনেক দেশ সি-সেকশন সার্জারি, মাতৃ-স্বাস্থ্য সেবা এবং প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফদের মাধ্যমে ফিস্টুলা সার্বিকভাবে নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে।
কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত সব জায়গায় সেই পর্যায়ের সেবা না পৌঁছচ্ছে মাদাগাস্কারের এসমস্ত নারীরা অন্তত নিজেরাই একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে সহায়তার হাত বাড়াচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য মানুষকে বোঝানো যে ফিস্টুলা রোগীরাও মানুষ এবং তাদের সমাজ থেকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়।
>>>মানবজমিন,

লেসভস দ্বীপের শরণার্থী শিবিরে by মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী

মরিয়া ক্যাম্প
এ বছরের এপ্রিল মাসে আমার গ্রিসের লেসভস (Lesbos) দ্বীপে শরণার্থী নিয়ে একটা গবেষণাকাজে যাওয়ার সুযোগ হয়। দ্বীপটার অবস্থান গ্রিসের অ্যাজিয়ান সাগরে। সমুদ্রপথে তুরস্ক থেকে এর দূরত্ব মাত্র ৬ কিলোমিটার। দ্বীপটা তুরস্কের এত কাছে যে, ম্যাপে দেখলে তুরস্কেরই একটা দ্বীপ বলে ভ্রম হয়। লেসভসসহ গ্রিসের অ্যাজিয়ান সাগরে অবস্থিত বেশ কয়েকটি দ্বীপে তুরস্কে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীরা ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রাবারের নৌকায় পাড়ি দিয়ে আসা শুরু করে। নৌকা ডুবে মৃত্যুবরণের ঘটনাও সে সময়ে বেশ কয়েকবার ঘটেছে। এর মধ্যে নৌকা ডুবে চার বছরের শিশু আয়লান কুর্দির মৃত্যুর ঘটনা সে সময়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল।
লেসভস দ্বীপ সে সময়ে ছিল তুরস্ক থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আসা শরণার্থীদের প্রধান গন্তব্য। লেসভস থেকে তারা গ্রিসের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে ইউরোপের অন্য দেশে পাড়ি জমানো শুরু করে। ২০১৫ সালের মতো না হলেও দ্বীপটাতে এখনো শরণার্থী আসা বন্ধ হয়নি। বর্তমানে সেখানে মরিয়া (Moria) ও কারা টেপে (Kara Tepe) নামে দুটো শরণার্থী ক্যাম্প আছে। আমার সুযোগ হয়েছিল ক্যাম্প দুটি দেখার এবং এ নিয়ে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে মতবিনিময়ের।
উল্লেখ্য, গবেষণার জন্য এর আগে আমার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে যাওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া সুযোগ হয়েছিল জার্মানিতে একজন শরণার্থী ক্যাম্প পরিচালকের কর্মস্থল পরিদর্শনের। মরিয়া ও কারা টেপে ক্যাম্প পরিদর্শন আমার শরণার্থী ক্যাম্পবিষয়ক অভিজ্ঞতাকে অনেক বাড়িয়েছে সন্দেহ নেই।
বলে রাখা ভালো, জনসংখ্যার দিক থেকে কুতুপালং ক্যাম্প পৃথিবীর বৃহত্তম ক্যাম্প, যেখানে এখন প্রায় আট লাখের মতো শরণার্থী বসবাস করছে। মরিয়া ও কারা টেপে সে তুলনায় অনেক ছোট। শরণার্থীর সংখ্যা সেখানে যথাক্রমে মাত্র ৫ হাজার ও ২ হাজার। এই দুটো ক্যাম্প হলো, যাকে বলা যায় ট্রানজিট ক্যাম্প। এই ক্যাম্পগুলো থেকে শরণার্থীদের যাচাই–বাছাইয়ের কাজ করা হয়। সন্তোষজনক হলে তাদের অনুমতি দেওয়া হয় গ্রিসে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের। না হলে তাদের মাসের পর মাস ক্যাম্পে পড়ে থাকতে হয় অথবা ফিরে যেতে হয় নিজ দেশে।
আকারে ছোট হলেও মরিয়া ক্যাম্পের দুর্নাম আছে ইউরোপের নিকৃষ্টতম শরণার্থী শিবির হিসেবে। এর কারণ ক্যাম্পে বসবাসরত শরণার্থীদের নিজেদের মধ্যে প্রায়ই মারামারির ঘটনা। এ ছাড়া অব্যবস্থাপনা তো আছেই। বর্তমানে ৫ হাজারের মতো শরণার্থী থাকলেও এর প্রকৃত ধারণক্ষমতা ৩ হাজারের মতো। ক্যাম্পের মূল অংশ উঁচু দেয়াল ও কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। তাই বাইরে থেকে অনেকখানি বন্দিশিবিরের মতো মনে হয়।
একসময় মরিয়ার জনসংখ্যা ১০ হাজারের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হওয়ার কারণে অনেকেই ক্যাম্পের বাউন্ডারির বাইরে তাঁবু টানিয়ে থাকা শুরু করেন। সে তাঁবুগুলো এখনো আছে এবং অনেকে সেখানেই থাকা পছন্দ করেন। ২০১৫ সালের দিকে আসা শরণার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগই ছিল সিরিয়ান। বর্তমানে বেশির ভাগ শরণার্থী আফগান। আফগান মানে এই না, তারা সবাই আফগানিস্তান থেকে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের কারণে আফগানরা আগে পাকিস্তান, ইরানসহ মধ্য এশিয়ার অন্য দেশে আশ্রয় নিয়েছিল। আমি ক্যাম্পে কর্মরত একজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, এই আফগানরা আসছে মূলত ইরান থেকে। আফগান ছাড়াও ক্যাম্পে আছে আফ্রিকা থেকে আসা শরণার্থীরা। ক্যাম্পে দু-একজন বাংলাদেশিও আছে শুনেছি, তবে তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়নি। শরণার্থীদের অনেকেই যুবক বয়সের। তবে আমি ক্যাম্পে অনেক শিশুকেও খেলা করতে দেখেছি।
মরিয়ার তুলনায় কারা টেপে বেশ চমৎকার ও পরিচ্ছন্ন। কারা টেপেকে শিশু ও পরিবার নিয়ে বসবাসের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। সেখানে আছে শিক্ষা, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ। আমার স্বচক্ষে সেখানে একটা বাদ্যযন্ত্র প্রশিক্ষণের ক্লাস দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল।
মরিয়া ও কারা টেপে থেকে শরণার্থীরা অনুমতি নিয়ে বাইরে যেতে পারে। তবে তাদের দ্বীপ ত্যাগের অনুমতি নেই। লেসভসের রাজধানী মিটিলিনি থেকে মরিয়ার দূরত্ব গাড়িতে করে প্রায় ৪০ মিনিটের মতো। কারা টেপের দূরত্ব প্রায় ২০ মিনিট। দুটো ক্যাম্প থেকেই বাসে করে শরণার্থীরা রাজধানীতে আসতে ও ফিরে যেতে পারে। এই দুটো ক্যাম্প ছাড়াও লেসভসে আরও কয়েকটা ছোট ছোট শিবির আছে। এ ছাড়া অনেক শরণার্থী মিটিলিনিতেই থাকে। আমি পুরো মিটিলিনি শহরজুড়েই শরণার্থীদের পরিবার ও শিশু নিয়ে ঘুরতে দেখেছি।
লেসভস মন কেড়ে নেওয়ার মতো সুন্দর একটা দ্বীপ। দ্বীপের অর্থনীতি মূলত নির্ভর করে জলপাই তেলের বাণিজ্যের ওপর। এ ছাড়া আছে পর্যটন ও মাছ ধরা। জলপাই বাগানের দেখা মেলে পুরো দ্বীপজুড়ে। এ ছাড়া আছে লেবু আর কমলাগাছের সমাহার। প্রত্যেক বাসার বাগানে ফলগুলোকে থোকায় থোকায় ঝুলতে দেখা যায়। লেসভসের মানুষ উদার ও অতিথিবৎসল। আপন মনে করে কাউকে কিছু দিতে তাদের আপত্তি নেই। প্রথম প্রথম যখন শরণার্থীদের আগমন শুরু হয়েছিল তখন তাদের অনেকেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। শরণার্থীদের আগমনের মূল স্থান দ্বীপের উত্তরে, যেখানে থেকে সমুদ্রপথে তুরস্কের দূরত্ব সবচেয়ে কম। সেখানে পৌঁছে মরিয়া ক্যাম্প পর্যন্ত পাহাড়ি রাস্তায় হাঁটতে প্রায় এক দিনের মতো লেগে যায়। সে যাত্রার সময় অনেক স্থানীয় লোকই খাবার ও পানি দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু এখন অনেকেই শরণার্থীদের নিয়ে শঙ্কিত। সম্প্রতি শরণার্থীদের বিপক্ষে মিটিলিনিতে বিক্ষোভ সমাবেশ হয়েছে। পাশাপাশি বাড়ছে অসন্তোষ পুরো গ্রিসজুড়েই।
এই পরিবর্তনের সঙ্গে মিল আছে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশিদের প্রতিক্রিয়ার সঙ্গেও। রোহিঙ্গা সংকটের শুরুর দিকে বাংলাদেশিদের অনেকেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বিশেষ করে অগ্রগণ্য ছিলেন কক্সবাজারের স্থানীয় লোকজন। কিন্তু এখন অনেকেই শঙ্কিত নিজেদের জীবন ও জীবিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে।
আসলে এ দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে শরণার্থী সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে। শরণার্থী শিবিরে থাকা মানুষদের কাজের কোনো সুযোগ নেই। কাজেই তাদের মধ্যে অপরাধমূলক কাজে জড়িয়ে পড়া অস্বাভাবিক নয়। লেসভসে বেশ কয়েকজন আমাকে শরণার্থীরা চুরিসহ অন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া শরণার্থীদের মধ্যে স্থানীয়দের চাওয়া–পাওয়া ও সংস্কৃতি বোধ উপেক্ষা করার অভিযোগ আছে।
শরণার্থী শিবিরে যাঁরা মানবিক সহায়তা দেওয়ার কাজ করেন তাঁরা প্রাধান্য দিয়ে থাকেন শরণার্থীদেরই। স্থানীয়দের মতামতকে উপেক্ষা করা হয়। মাঝেমধ্যে স্থানীয়দের ওপর বর্ণবাদী ও অহেতুক বিদেশি আতঙ্কে ভুগছে জাতীয় তকমা লাগিয়ে দেয়। এতে যাঁরা সত্যিকার অর্থেই উদার মনোভাবাপন্ন তাঁরা দূরে সরে যান। এ জন্য আমি মনে করি যে শরণার্থী শিবিরের কর্ম পরিচালনার কেন্দ্রে থাকতে হবে স্থানীয় লোকজনের মতামত প্রকাশ ও অংশগ্রহণের সুযোগ। শরণার্থীদের মধ্যে সৃষ্টি করা দরকার আশ্রয়দানকারী দেশের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রকাশের মনোবৃত্তি।
ইউরোপে সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রচলিত আছে, এই শরণার্থীরা মূলত অর্থনৈতিক অভিবাসী মানে তারা সত্যিকার অর্থে শরণার্থী নয়। এ কথা যারা বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার চেষ্টা করছে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে লেসভসে আমি যাদের দেখেছি তাদের বেশির ভাগকেই এই দলে ফেলব না, কারণ শরণার্থীদের মধ্যে অনেকেই যুবক বয়সের হলেও শিশুসহ পরিবারের সংখ্যাও কম নয়।
ভেবে দেখুন, আফগানিস্তান, ইরান, পাকিস্তান হয়ে লেসভসে আসতে তাদের কতটা দূরত্ব পাড়ি দিতে হয়েছে? বাধ্য না হলে কি কেউ পরিবার–পরিজন নিয়ে এ রকম ঝুঁকিপূর্ণ দূরত্ব পাড়ি দেয়? একই কথা প্রযোজ্য যারা যুবক বয়সী তাদের ক্ষেত্রেও। যুবকদের ক্ষেত্রে এই সিদ্ধান্ত বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পরিবার নিয়ে থাকে। পুরো পরিবার শরণার্থী হওয়ার আগে প্রথমে সবচেয়ে সমর্থ যুবকদের পাঠানো হয় আশ্রয়স্থল খুঁজে পাওয়ার জন্য। এরপর পাড়ি জমায় পরিবারের বাকিরা। রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে অবশ্য এর বিপরীত ঘটেছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে দলে দলে এসেছে নারী-শিশু মিলে, শুধু প্রাণটা বাঁচানোর তাগিদে। পরিকল্পনা করে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের শরণ গ্রহণ ঘটেনি।
লেসভসে আমার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা হয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্যও প্রযোজ্য হতে পারে। শরণার্থী সংকটের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য মিটিলিনিতে ইউনিভার্সিটি অব অ্যাজিয়ানের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রিফুজি অবজারভেটরি। এই অবজারভেটরি গবেষণার পাশাপাশি আজিয়ান সাগরে শরণার্থীদের গতিবিধি, গবেষণা ও সংবাদের তথ্যকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই অবজারভেটরি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত থাকায় একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে থাকে। গ্রিসসহ ইউরোপের অন্য দেশগুলো ও মানবিক সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলো প্রয়োজন মতো এদের কাছ থেকে পরামর্শ ও তথ্য নিতে পারে।
আমি যত দূর জানি রোহিঙ্গা সংকট পর্যবেক্ষণে এ রকম কোনো স্বাধীন প্রতিষ্ঠান নিয়োজিত নয়। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে পরামর্শ ও তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ থাকে না। তাই বঙ্গোপসাগরে শরণার্থী সংকট পর্যবেক্ষণে একটি প্রতিষ্ঠানকে নিয়োজিত করা প্রয়োজন, যার কাছ থেকে বাংলাদেশ সরকার প্রয়োজনে তথ্য ও পরামর্শ নিতে পারবে।
সব মিলিয়ে লেসভস দ্বীপের ক্যাম্প পরিদর্শন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটকে গ্রিসের শরণার্থী সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের যাঁরা রোহিঙ্গা সংকটের ওপরে কাজ করছেন তাঁদের বাংলাদেশের সংকটকে বৈশ্বিক শরণার্থী সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার প্রচেষ্টা করতে হবে। শরণার্থী সংকট বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রধান সংকট। এই সংকটকে জানা ও বোঝার চেষ্টা জরুরি। জরুরি শরণার্থীরা যেখানে আশ্রয় নিচ্ছে সেখানকার মানুষের চাহিদাকে জানার ও বোঝার চেষ্টার। এতে যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা নয়, কিন্তু কিছুটা হলেও শরণার্থী সংকটকে ঘিরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যে রাজনৈতিক সংকট দেখে দিচ্ছে আশা করি তার কিছুটা নিরসন ঘটবে।
>>>ড. মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী: যুক্তরাজ্যের বোর্নমাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যাপনা করেন।

শালবন বিহারে একদিন by শাহরিয়ার নোবেল

কুমিল্লা শালবন বৌদ্ধ বিহার
কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি প্রত্নস্থলে অসংখ্য প্রাচীন স্থাপনা। এর মধ্যে অন্যতম শালবন বৌদ্ধ বিহার। দ্বাদশ শতাব্দীর এই প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা বাংলাদেশের প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনগুলোর একটি।
ময়নামতিতে খনন করে এর অস্তিত্ব মেলে। কোটবাড়িতে বার্ডের কাছে লালমাই পাহাড়ের মাঝামাঝি এলাকায় এর অবস্থান। এখানকার আশপাশে একসময় শাল-গজারির ঘন বন ছিল। এজন্যই এর নামকরণ হয়েছে শালবন বৌদ্ধ বিহার
ধারণা করা হয়, সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। এর ছয়টি নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ পর্বের কথা জানা যায়। অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে তৃতীয় পর্যায়ে কেন্দ্রীয় মন্দিরটি নির্মাণ ও বিহারটির সার্বিক সংস্কার হয়েছিল বলে ধারণা রয়েছে। চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায়ের নির্মাণকাজ ও সংস্কার সম্পন্ন হয় নবম-দশম শতাব্দীতে।
শালবন বৌদ্ধ বিহারে মোট ১৫৫টি কক্ষ আছে। এর সামনে ৮ দশমিক ৫ ফুট চওড়া বারান্দা ও শেষ প্রান্তে অনুচ্চ দেয়াল। প্রতিটি কক্ষের দেয়ালে তিনটি করে কুলুঙ্গি রয়েছে। কুলুঙ্গিতে দেবদেবীর মূর্তি ও তেলের প্রদীপ রাখা হতো। কক্ষগুলোতে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা থাকতেন। সেখানে বিদ্যা ও ধর্মচর্চা হতো।
প্রবেশদ্বারের পাশে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে একটি হলঘর রয়েছে। চারদিকের দেয়াল ও সামনে চারটি বিশাল গোলাকার স্তম্ভের ওপর নির্মিত এটি। হলঘরটি ভিক্ষুদের খাবারঘর ছিল বলে ধারণা করা হয়। এর চারদিকে ইটের চওড়া রাস্তা রয়েছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক খননের মাধ্যমে শালবন বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ থেকে আটটি তাম্রলিপি, প্রায় ৪০০টি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, অসংখ্য পোড়ামাটির ফলক বা টেরাকোটা, সিলমোহর, ব্রোঞ্জ ও মাটির মূর্তি পাওয়া গেছে। এগুলো বাংলাদেশের প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করছে।
শালবন বৌদ্ধ বিহারের মূল মন্দিরকে ঘিরে চারপাশে ছোট ছোট ৯টি মন্দির ও ৬টি স্তূপ পাওয়া গেছে। এছাড়া মূল মন্দিরের বাইরে আরও দুটি মন্দির ও চারটি স্তূপ আবিষ্কৃত হয়।
গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে মূল বৌদ্ধ বিহারের (মন্দিরের) উত্তর-পূর্ব কোণে পাঁচ বর্গমিটার আয়তনের ২১টি বর্গাকৃতি স্থানে খননকাজ শুরু হয়। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ নভেম্বর একটি স্থানে ইট ও কাদামাটির তৈরি কূপের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন গোলাকার কূপটির ব্যাসার্ধ ১১ ফুট চার ইঞ্চি।
বৌদ্ধ বিহারে রয়েছে হরেক রকমের ফুল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কসমস, ডালিয়া, জিনিয়া, মৌচান্দা, সেলভিয়া, বোতাম, গোলাপ, সিলভিয়া, কেলানডোলা ইত্যাদি। বছরজুড়ে ঋতুভিত্তিক নানান প্রজাতির ফুল গাছের চারা রোপণ করা হয়।
ঐতিহাসিক নিদর্শন শালবন বৌদ্ধ বিহার দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মধ্যে আকর্ষণীয়। প্রতিদিনই তাদের সমাগম দেখা যায় এখানে। শিক্ষার্থী আর গবেষকদের কাছে এটি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

'থানার বাইরে থেকেই ভাইয়ের কান্না আর চিৎকার শুনতে পাইতেছিলাম। পুলিশ আমার ভাইরে মারতেছিলো।' by তাফসীর বাবু

বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ বিষয়ে গেলো সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কমিটির সভায় একটি পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো। সভায় বিভিন্ন বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবেদনের আলোকে বাংলাদেশের নির্যাতন পরিস্থিতি নিয়ে কমিটির সদস্যরা যেসব অভিযোগ তুলে ধরেছেন, তার বিপরীতে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী দাবি করেছেন, বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের তথ্য অনেকক্ষেত্রেই অসত্য। এছাড়া এ ধরণের নির্যাতন প্রতিরোধে আইনী কাঠামোর উন্নতির কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। কিন্তু বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র আসলে কী রকম?
দু'হাজার ষোল সালের এক মধ্যরাত।
আব্দুল আলীমের (ছদ্মনাম) বাসায় প্রবেশ করে সাদা পোষাকে পুলিশের বেশ কিছু সদস্য।
কোন ওয়ারেন্ট ছাড়াই আব্দুল আলীমকে নিয়ে আসা হয় থানায়। তখনো মি. আলীম জানেন না তার অপরাধ কী?
সকাল হতেই শুরু হয় তার ওপর নির্যাতন।
মি. আলীম বলছিলেন, "থানার ভেতরে একটি রুমে ওরা আমাকে প্রথমে রশিতে ঝুলায়। এরপর আমার শরীর ঘোরাতে থাকে আর কয়েকজন পুলিশ সদস্য লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটাতে থাকে। ঘণ্টা দুয়েক থেমে থেমে চলে এই নির্যাতন।"
মি. আলীম বলছিলেন, এভাবে টানা আট দিন তাকে মারধর করা হয়। প্রতিদিন অন্তত: দুই ঘণ্টা।
কিন্তু কোন মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়নি।
মারধরের আওয়াজ মোবাইল ফোনে তার বাড়ির সদস্যদের শুনিয়ে টাকা চাওয়া হয়েছিলো। বলা হয়েছিলো, টাকা দিলে ছেড়ে দেবে।
আব্দুল আলীম জানাচ্ছেন, তারা টাকা দিতে পারেননি। পরে ভাংচুরের একটি মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে চারদিনের রিমান্ডে নেয়া হয়। আবারো চলে নির্যাতন।
মি. আলীম প্রায় দশ মাস কারাভোগের পর জামিন পান।
তবে তিনি পরে থানা হেফাজতে নির্যাতন বিষয়ে টুঁ শব্দটিও করেন নি। কোন মামলাও করেন নি।
"আমি বা আমার পরিবার আসলে মামলা করার কথা ভাবিই নি। ছাড়া পেয়েছি এটাই ছিলো বড় কথা। পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করে কি নিজের জীবনকেই হুমকির মধ্যে ফেলবো?" মি. আলীমের পাল্টা প্রশ্ন।
থানা হেফাজতে থাকা অবস্থায় এবং রিমান্ডে মি. আলীম তার উপর নির্যাতনের যে অভিযোগ করছেন, বাংলাদেশে এমন অভিযোগ নতুন নয়।
এমনকি নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনাও আছে।
এরকমই একটি মৃত্যুর ঘটনা আমাকে বলছিলেন পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী। ধরা যাক, তার নাম মানুসরা খাতুন।
মানসুরা খাতুন জানাচ্ছিলেন, ২০১২ সালে পুলিশের হাতে তার বড় ভাই আটক হওয়ার একদিন পরই তার লাশ পাওয়া যায় হাসপাতালের মর্গে।
"পুলিশের সোর্স আমার ভাইয়ের কাছে টাকা চাইছিলো। সে দেয় নাই। পরে একদিন পুলিশের এক এসআই কয়েকজন পুলিশ নিয়া আইসা আমার ভাইরে এলাকা থেকে ধরে থানায় নিয়ে যায়। রাতে আমরা দেখা করতে যাই। প্রথমে দেখা করতে পারি নাই। কিছুক্ষণ পরে থানার বাইরে থেকেই ভাইয়ের কান্না আর চিৎকার শুনতে পাইতেছিলাম। ওরা আমার ভাইরে মারতেছিলো।"
মানসুরা বলছেন, সেই রাত্রেই পরে থানায় ভাইয়ের সঙ্গে তারা দেখা করতে পেরেছিলেন।
তখন তার ভাইয়ের শরীর ছিলো রক্তাক্ত। তার ভাই তখন জানিয়েছিলেন, ৫০,০০০ টাকা না দিলে তাকে মেরে ফেলবে।
"পরদিন দুপুরে আমি থানা থিক্যা ফোন পাই। বলে আমার ভাই অসুস্থ্য। হাসপাতালে আছে। আমি আর আমার বোন দৌড়ায়া হাসপাতালে যাই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভাইরে খুইজ্যা পাই মর্গে। ভাইয়ের দুই পা নীল হয়া আছিলো। এমন মারছে যে, আমার ভাই যদি বাঁইচাও থাকতো, ওর পা দুইটা মনে হয় কাইটা ফেলতে হইতো।"
মানসুরা বলছেন, তার ভাইয়ের একমাত্র কন্যাকে এখন তারাই দেখাশোনা করছেন।
এ ঘটনায় পরে তিনি পুলিশের কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে একটা মামলা করেছিলেন। সেই মামলায় পুলিশের এক এসআই জেলহাজতে আছেন।
বাংলাদেশে আইন-শৃংখলা বাহিনীর হাতে আটক অবস্থায় কিংবা রিমান্ডে নির্যাতনের এরকম ঘটনা আরো অনেক আছে।
কিন্তু এসব বিষয়ে অবশ্য ভূক্তভোগীরা প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। মামলাও করতে চান না।
এ ধরণের ঘটনার তথ্য অনেক সময় মানবাধিকার সংগঠনগুলোই জনসমক্ষে নিয়ে আসে।
মানবাধিকার সংগঠন অধিকার গত পাঁচ বছরে এরকম ১৩১টি নির্যাতনের সংখ্যা উল্লেখ করছে।
এছাড়া পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় গত পাঁচ বছরে ৩০৭ জন নির্যাতনে মৃত্যুর শিকার হয়েছে বলে তথ্য দিচ্ছে সংস্থাটি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর অনারারি নির্বাহী পরিচালক সারা হোসেন বলছেন, নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন অহরহই ঘটছে। অথচ এটা বেআইনী।
তিনি বলছেন, "আপনি কিন্তু কোন ক্ষেত্রেই কারো বিরুদ্ধে কোন মতেই নির্যাতন করতে পারবেন না। এখানে নির্যাতনের পক্ষে কোন অজুহাতের সুযোগ নেই। এমনকি দেশে যদি যুদ্ধাবস্থাও থাকে এবং আটক ব্যক্তি যদি সন্ত্রাসীও হয়, তাহলেও তাকে নির্যাতন করা যাবে না। আমাদের সংবিধানে কিন্তু এরকমটাই বলা আছে।"
বাংলাদেশে ২০১৩ সালে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন বন্ধে একটি আইন পাস করা হয়। যেখানে সব ধরণের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, শাস্তি দেয়া এমনকি ভয়-ভীতি দেখানোও অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়েছে।
কিন্তু মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এই আইনে যেমন কারো শাস্তি পাওয়ার নজীর নেই তেমনি আইন প্রতিপালনেও ঘাটতি আছে।
সারা হোসেন বলছিলেন, "এখানে জবাবদিহিতার ব্যাপারটা আসলে নেই। কারণ যে সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসছে, তারা নিজে কিন্তু জবাবদিহিতার ব্যবস্থা করছে না। যেই পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ বাহিনী তাদের কয় জনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে? নির্যাতন বিষয়ে কী করা হয়েছে সে বিষয়ে সংসদেই বা কয়বার কথা হয়েছে?"
বাংলাদেশে নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতন এবং এর যথাযথ আইনী প্রতিকার না পাওয়ার অভিযোগ অবশ্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোও করে থাকে।

কিন্তু এসব অভিযোগের বিষয়ে সরকার কী করছে?

গেলো সপ্তাহে জাতিসংঘের নির্যাতন বিরোধী কমিটির আয়োজনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যালোচনায় বাংলাদেশের আইন মন্ত্রী দাবি করেছেন, নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ পেলে সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয় সরকার।
এ বিষয়ে গেলো সপ্তাহে জেনেভা থেকে টেলিফোনে বিবিসি'র সঙ্গে কথা বলেন আইনমন্ত্রী।
তিনি অবশ্য নির্যাতনের অভিযোগগুলোকে অনেক ক্ষেত্রেই অসত্য বলছেন।
আনিসুল হক বিবিসিকে বলছিলেন, "দুই চারটা এরকম ইনসিডেন্ট যেগুলো হয়েছে, সেসবের দায়িত্বভার বর্তায় যাদের উপরে, তাদের বিরুদ্ধে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। শুধু ডিপার্টমেন্টাল পদক্ষেপ না, আমরা ফৌজদারি পদক্ষেপও নিয়েছি।"
"কিন্তু আমরা জাতিসংঘেও এটা বলেছি যে, অনেক ক্ষেত্রেই অনেক ব্যাপারে বাইরে থেকে যেসব তথ্য তারা (জাতিসংঘ) পান সেই তথ্যগুলো বস্তুনিষ্ঠও নয়, সত্যও নয়।"
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলো যে তথ্য দিচ্ছে, তাতে করে আইনমন্ত্রীর বক্তব্যের বিপরীত চিত্রই পাওয়া যায়।
কিন্তু এসব ঘটনায় বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভূক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় যেমন নেন না তেমনি আইন-শৃংখলা রক্ষা বাহিনী থেকেও নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে ঘটনা খতিয়ে দেখার প্রবণতা দেখা যায় না।
গত পাঁচ বছরে নিরাপত্তা হেফাজতে মারা গেছেন তিন শতাধিক ব্যক্তি।