Tuesday, March 24, 2026
সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় ব্যর্থ হওয়ার সুযোগ নেই by এম এ আজিজ
অতীতে আমাদের দেশের অধিকাংশ বনাঞ্চলে বাঘ ছিল। আমরা আমাদের শালবনের বাঘ হারিয়েছি গত শতকের গোড়ার দিকে, পাহাড়ি বনের বাঘও নির্বংশ হলো আমাদের চোখের সামনে। আজ শুধু সুন্দরবনের কাদাপানিতে কোনোরকমে বাংলার সর্বশেষ বাঘের এক খণ্ডাংশ পপুলেশন টিকে আছে। সুন্দরবনের মতো জলার বনে টিকে থাকা বাঘ প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে চলেছে—মানুষের সঙ্গে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে।
মাত্র দুটি শিকার-প্রাণীর ওপর তাদের নির্ভরশীলতা এই বাঘের অস্তিত্বকে ঝুঁকির মুখে রেখেছে সারাক্ষণ। প্রধান শিকার-প্রাণী চিত্রা হরিণ বাঘের খাবারের ৭৯ শতাংশ জোগান দেয়। অন্যদিকে একশ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত সুন্দরবন থেকে চিত্রা হরিণ শিকার করে। সুন্দরবনের আশপাশের জেলার বাইরেও হরিণের মাংস পাচার হয়। সমাজে মুখোশধারী কিছু লোভী মানুষ এই মাংসের জন্য লালায়িত থাকে সব সময়। এরা সুন্দরবনের হরিণের নিয়মিত ভোক্তা।
সুন্দরবন বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। ২০১০-১৫ সময়েও সুন্দরবনের ওপর এমন সংকট নেমে এসেছিল। ওই সময় চোরা শিকারি ও বনদস্যুরা সুন্দরবনের ওপর জেঁকে বসে। হরিণের পাশাপাশি বাঘ শিকারের এক মহোৎসবে নেমে পড়ে বনদস্যু ও তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকা চোরা শিকারিরা। বনজীবীরাও চরম নিপীড়নের মধ্যে পড়ে। ওই সময় অনেক চোরাকারবারি বাঘের চামড়াসহ ধরা পড়ে। এসব বিপর্যয়ের প্রতিফলন পরবর্তী সময়ে আমরা বাঘ জরিপের ফলাফলে দেখতে পাই।
জুলাই বিপ্লবের পর সুন্দরবনের ওপর আবারও নেমে এসেছে তেমন এক বিপর্যয়। অতীতে আত্মসমর্পণকারী অনেক বনদস্যু আবার সুন্দরবনে ফিরে এসেছে, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বনদস্যু। নিরীহ বনজীবীদের জিম্মি করে অত্যাচার ও মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি নিজেরাও বাঘ-হরিণ শিকারে জড়িয়ে পড়েছে। আর তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ওত পেতে থাকা চোরা শিকারিরা হামলে পড়েছে সুন্দরবনে। ফলে আমরা প্রতিনিয়ত অসংখ্য হরিণের ফাঁদ উদ্ধার হতে দেখছি। সম্প্রতি সেই ফাঁদে আহত বাঘ উদ্ধারের ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করলাম। এমন নির্মম ঘটনা আমাদের অজান্তে নিশ্চয় আরও ঘটছে।
সুন্দরবন আমাদের জাতীয় সম্পদ। অন্যদিকে বাঘ আমাদের গৌরবের প্রতীক, আমাদের আবেগের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এ ছাড়া এই দুই বিরল প্রাকৃতিক সম্পদ বিশ্ব ঐতিহ্যের স্মারক। ফলে এদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব আমাদের সবার।
রাষ্ট্র বন বিভাগের ওপর এদের দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছে মাত্র। কিন্তু বন বিভাগের রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা, আছে জনবল ও দক্ষতার ঘাটতি। বিপরীতে সুন্দরবনের ওপর জীবিকার জন্য আছে স্থানীয় মানুষের তীব্র চাপ। ফলে সুন্দরবন রক্ষায় আমাদের সবাইকে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি প্রত্যেকের অবস্থান থেকে আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।
সুন্দরবন ও বাঘের এই সংকট মোকাবিলা করতে হলে আমাদের দ্রুত কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
প্রথমত, সুন্দরবনকে অতিসত্বর দস্যুমুক্ত করতে হবে। এটি করতে হলে বন বিভাগের পাশাপাশি সব আইনশৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থাকে এগিয়ে আসতে হবে। যত দ্রুত সম্ভব যৌথ অভিযান পরিচালনা করে সুন্দরবন থেকে বনদস্যুদের নির্মূল করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, হরিণশিকারিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সুন্দরবনে নিয়মিত টহল জোরদার করতে হবে। সুন্দরবনঘেঁষা গ্রামগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে চোরা শিকারি ও বিষ প্রয়োগকারী জেলেদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে। সেই সঙ্গে তাদের মুখোশ উন্মোচন করে সামাজিকভাবে বর্জন করতে হবে।
* এম এ আজিজ, অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
| ৪ জানুয়ারি ২০২৬ সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের মোংলা উপজেলার শরকির খালসংলগ্ন সুন্দরবনের অংশে হরিণ শিকারে পাতা ফাঁদে আটকে পড়ে বাঘটি। আহত অবস্থায় সেটিকে উদ্ধার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত |
Monday, January 19, 2026
সুন্দরবনে ১০০ কেজি হরিণের মাংস ও ৪ হাজার মিটার ফাঁদ জব্দ
কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন আজ মঙ্গলবার প্রথম আলোকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গতকাল বিকেল চারটার দিকে কোস্টগার্ডের একটি দল কয়রায় সুন্দরবনের কাগাদোবেকি টহল ফাঁড়ির ঘোলের খাল–সংলগ্ন এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় ওই এলাকা থেকে ১০০ কেজি হরিণের মাংস এবং প্রায় ৪ হাজার মিটার দৈর্ঘ্যের হরিণ শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়। কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে শিকারিরা বনের ভেতরে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
উদ্ধার করা হরিণের মাংস ও শিকারের ফাঁদ পরবর্তী আইনি ব্যবস্থার জন্য বন বিভাগের কাগাদোবেকি টহল ফাঁড়ির বনরক্ষীদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুনতাসীর ইবনে মহসিন বলেন, জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গত এক বছরে সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে ৮২৪ কেজি হরিণের মাংসসহ ২৯ জন শিকারিকে আটক করা হয়েছে। সর্বশেষ ২৭ ডিসেম্বর সুন্দরবনের মুচির দোয়ানি এলাকা থেকে ২১ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই শিকারিকে আটক করা হয়। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং বন্য প্রাণী হত্যা ও পাচার রোধে কোস্টগার্ডের এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
![]() |
| নদী তীরে হরিণের পাল। সুন্দরবনের নীলকমল এলাকায়। ফাইল ছবি |
Tuesday, April 1, 2025
বাঘের ইচ্ছে হলেই সম্ভব by শামীমুল হক
আল-আমিন স্পষ্ট করে না বললেও আন্দাজ করা যায়। সুন্দরবনের হরিণের কথাও বললেন তিনি। পাখ-পাখালির কথাও বাদ যায়নি। টিভি স্ক্রিনে ভেসে ওঠলো মানচিত্র। আমরা কোন কোন নদী দিয়ে কোথায় যাবো। এমন সময় আল-আমিন জানালেন আগামীকাল আমরা কটকায় যাবো। তবে আপনাদের জন্য সুখবর হলো কটকায় হেঁটে যেতে পারবেন। যেখানে জাহাজ থামবে সেখান থেকে সাড়ে ৯ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে হবে। আর যারা যাবেন না তারা জাহাজেই থাকবেন। জাহাজও একই সঙ্গে ছাড়বে। এই সাড়ে ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে জাহাজ গিয়ে থামবে। ওদিকে যারা হেঁটে যাবেন তারাও সেখানে গিয়ে একসঙ্গে মিলিত হবেন। হেঁটে যাওয়া পথের তিন কিলোমিটার জঙ্গল। তিন কিলোমিটার বিস্তীর্ণ চর। আর তিন কিলোমিটার সাগর। অন্যরকম এক ফিলিংস এই হেঁটে যাওয়ার। যারা গিয়েছেন তারা বলেছেন, এমন স্মৃতি মনের গহীনে গেঁথে থাকবে আজীবন। যারা যাননি তারা বড্ড মিস করেছেন। গাইড আল-আমিন বলেই যাচ্ছিলেন সুন্দরবনের ইতিহাস ঐতিহ্যের কথা। এই তিনদিন আমরা কোথায় কোথায় যাবো। কীভাবে যাবো। সবই বলা হলো। পরদিন ভোর ৬টায় পাখি দেখতে যারা যাবেন তাদের কীভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। কি করতে হবে সবই বললেন। কুমির প্রজনন কেন্দ্রে গিয়ে কি করতে হবে। কীভাবে চলতে হবে। আল-আমিনের সব মুখস্থ। সবশেষে বললেন, এরপরও যদি কারও কিছু জানার থাকে আমাকে বলবেন। আমি সর্বদা আপনাদের সেবায় নিয়োজিত। কথায় কথায় জাহাজ গিয়ে থামলো হাড়বাড়িয়া পয়েন্টে। এবার আল-আমিন বললেন, এবার আমরা হাড়বাড়িয়া পয়েন্টে যাবো। ঘুরে দেখবেন জীব বৈচিত্র্য। খুলনা চার নম্বর ঘাট থেকে যে ট্রলারে করে আমরা দূরে অপেক্ষারত জাহাজে গিয়ে উঠেছিলাম সেই ট্রলার আর জাহাজ ছাড়েনি। ট্রলার বেঁধে দেয়া হয় জাহাজের সঙ্গে। যেখানেই যাই জাহাজ মাঝ নদীতে থেমে যায়। তারপর ট্রলার নিয়ে যায় তীরে বা কোনো স্পটে। আমরাও এবার জাহাজ থেকে নেমে ট্রলারে গিয়ে বসলাম। উদ্দেশ্য হাড়বাড়িয়া পয়েন্ট দেখা। চার কিংবা পাঁচ মিনিট চলার পরেই হাড়বাড়িয়া পয়েন্ট। ট্রলার থেকে একে একে সবাই নামলাম। প্রবেশ পথেই বানরের দেখা। দলবদ্ধ বানরের দল। এত মানুষ দেখেও বানরগুলোর কোনো ভয় নেই। বরং আমাদের এক সহযাত্রীকে আক্রমণ করে বসে। গাইড আগে এগুচ্ছে আমরা পেছনে পেছনে। যতই এগুচ্ছি সামনে গহীন জঙ্গল। সবাই চোখ বড় বড় করে তাকাচ্ছে বাঘ দেখা যায় কিনা? ভয়ও কাজ করছে সবার মনে এই বুঝি বাঘ হামলে পড়ছে কারও না কারও ওপর। ভয় আর আতঙ্কে হিমশীতল হয়ে আসছিল শরীর। অন্যদিকে সুন্দরবন দেখার আনন্দও ছিল মনে। মাঝে মাঝে গাইড চিৎকার করে বলছিলেন সবাই একসঙ্গে থাকেন। কেউ একা হবেন না। তাহলে বিপদ হতে পারে। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টটি খুব সুন্দর করে সাজিয়েছে কর্তৃপক্ষ। দুই কিলোমিটার জঙ্গলের ভেতরে গিয়েও বাঘের দেখা পাওয়া যায়নি। যা দেখা গেছে তা হলো বাঘের পায়ের ছাপ। আর ছাপ কোথায়? যে পথে মানুষ চলাচলের জন্য সুন্দর করে ইটপাথরের সুড়কি দিয়ে বানানো হয়েছে তার পাশেই। মানুষ যেন চলাচল করতে পারে সেজন্য এ পথ বানানো হয়েছে উঁচু করে পিলারের উপর। দুই পাশে আবার রেলিং দেয়া।
হাঁটতে হাঁটতে কিছুক্ষণ পর পর দেখা যাচ্ছিল বাঘের পায়ের ছাপ। আসলেই কি এটা বাঘের পায়ের ছাপ? এখানেও রয়েছে রহস্য। কথিত রয়েছে, বন বিভাগ থেকে এক ধরনের অস্ত্রের মাধ্যমে এমন ছাপ দেয়া হয়। পর্যটকরা যাতে পায়ের ছাপ দেখে শিহরিত হন। বাঘ না দেখলেও পায়ের ছাপ দেখেছি-এটা ভেবে তৃপ্তি পান। এমন তৃপ্তি নিয়েই হাজার হাজার পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ শেষ করে ফিরে আসেন নিজ গন্তব্যে। বেশক’টি নদী ঘিরে রেখেছে সুন্দরবনকে। এর সবক’টিই জোয়ার- ভাটার নদী। তাই জোয়ারে সুন্দরবনে পানি জমে। আবার ভাটায় সেই পানি নেমে যায়। আশ্চর্যজনকভাবে জোয়ারের পানিতে যেন গাছ না মরে এ প্রতিটি গাছই তাকে রক্ষায় শ্বাসমূল ছড়িয়ে দেয়। ছোট থেকে বড় বহু শ্বাসমূল ঘিরে রাখে প্রতিটি গাছকে। গাইড আল-আমিন সবচেয়ে বড় শ্বাসমূলটি দেখিয়ে বলেন, এটি সবচেয়ে বড়। মানে হলো জোয়ারে পানি এ শ্বাসমূলের উপরে উঠে না। জোয়ারের সময় গাছ এ শ্বাসমূল থেকে শ্বাস নিয়ে বেঁচে থাকে। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টেই ছোট খালে এক প্রকার মাছ দেখা যায়। এ মাছগুলোর সামনে গিয়ে গাইড আল-আমিন এ মাছের বিশদ বর্ণনা দেন আমাদের। এ মাছ জলে ও স্থলে বসবাস করে। সামনেই একটি পুকুর। পুকুরে পানি থৈ থৈ। নিশ্চয় জোয়ার- ভাটায় এ পুকুরও ডুবে ও ভাসে।
সুন্দরবন নাম হয়েছে সুন্দরী গাছের কারণে। কিন্তু সুন্দরী গাছ কীভাবে সুন্দর তা বোঝা গেল না। তবে তার একটি বৈশিষ্ট্য আছে। সুন্দরী গাছের গোড়া এমনভাবে নিজ থেকে তৈরি যা দেখলে মন জুড়িয়ে যায়। গাছটিকে যেন চারদিক থেকে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে। যেন ভেঙে না যায়। কারণ সুন্দরী গাছ একেবারে লম্বা ও সোজা হয়। এর কোনো ডালপালা নেই। একেবারে লক-লকিয়ে এগিয়ে গেছে উপরে। প্রচণ্ড বাতাসেও এ গাছ ভেঙে পড়ে না। কারণ তার গোড়ায় নিজ থেকেই মোটা মোটা জড় ঠেস দিয়ে রেখেছে। আসলেই প্রকৃতির কী খেলা! প্রত্যেকেই নিজেকে বাঁচানোর উপায় নিজেই খুঁজে নেয়। সুন্দরী গাছও তেমন। আর এ সুন্দরী গাছ বেশি দেখা যায় আন্দারমানিক পয়েন্টে। হাড়বাড়িয়া ভ্রমণ শেষে আন্দারমানিকের উদ্দেশ্যে যাত্রা। শুরুতেই বাঘের ছবি দিয়ে বিরাট নিয়ন সাইনের পোস্টার সাঁটানো। এ বাঘ দেখেই আন্দারমানিক স্পটে প্রবেশ। শুরুতেই বিশাল এক উঁচু টাওয়ার। এর নাম ডলফিন টাওয়ার। এ টাওয়ার থেকে নদীতে ডলফিন দেখা যায় বলে এর নাম রাখা হয়েছে ডলফিন টাওয়ার। সহযাত্রীদের অনেকেই ডলফিন দেখতে এ টাওয়ারে উঠেন। তাদের দু’চোখ নদীর দিকে বড় বড় চোখ নিয়ে তাকানো। ডলফিন দেখার স্বপ্ন এ চোখে। কিছুক্ষণ পর একে একে সবাই নেমে এলেন। কি ভাই ডলফিন দেখেছেন। কেউ কোনো কথা বলছে না। অবশ্য গাইড আল-আমিন কথার মারপ্যাঁচ জানেন ভালো। আগেই বলে নিয়েছিলেন ডলফিন টাওয়ারে উঠলে ডলফিন দেখা যেতেও পারে। নাও পারে। যাদের ভাগ্য ভালো তারা ডলফিন দেখতে পায়। এই আন্দারমানিকে বেশক’টি হরিণ আটকে রাখা হয়েছে। বাউন্ডারির বাইরে থেকে ডাক দিলে হরিণগুলো ছুটে আসে। কেউ কেউ এসব হরিণকে আদর করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অবশ্য জাহাজ চলাকালীন সুন্দরবন থেকে অনেক হরিণ নদীতে পানি খেতে এসেছে তা দেখা গেছে। আন্দারমানিকের প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে দেখা গেছে সব সুন্দরী গাছের আখড়া।
এবার পশু-পাখি দেখার পালা। জাহাজ এক জায়গায় গিয়ে থামলো। সবাইকে জানিয়ে দেয়া হলো সকাল ৬টায় ট্রলার পশু-পাখি দেখার জন্য যাবে। যথাসময়ে সবাই ট্রলারে গিয়ে উঠলেন। ট্রলার ছাড়লো। একটু সামনে গিয়ে মূল নদীর শাখা দিয়ে প্রবেশ করলো ট্রলার। একটি খালের মতো। সবার নজর খালের দু’পাশের গাছের দিকে। পাখি দেখার জন্য। কিন্তু না! কোনো পাখিই দেখা যাচ্ছিল না। কিছু দূর যাওয়ার পর একজন এসে বললেন, ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ করে দাও। আস্তে আস্তে চলুক। ইঞ্জিনের শব্দে কিছুই বুঝা যাচ্ছে না। সত্যিই তাই। ইঞ্জিন বন্ধ করে ট্রলার এগুতে থাকে। এবার পাখির কিচিরমিচির শব্দ কানে আসছে। আসছে বন মোরগের ডাক। সত্যিই পাখ-পাখালির এমন ডাক মন ছুঁয়ে যায়। কিন্তু খালের পাশের কোনো গাছেই পাখির চিহ্নটি পর্যন্ত নেই। ফেরার পথে আবার একই দৃশ্য। চোখ বড় করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সবাই। কিন্তু না পাখির দেখা মিললো না। পাখির কিচিরমিচির শব্দ আর বন মোরগের ডাক পুঁজি করেই ফিরে আসা জাহাজে। সেখান থেকে করমজাল যাওয়া। যেখানে রয়েছে কুমির প্রজনন কেন্দ্র। সেখানে গিয়ে দেখা মিললো ছোট ছোট দোকানপাটের। দোকানিরা এসেছেন মোংলা থেকে। করমজালে আসা পর্যটকদের কাছে তাদের পণ্য বেচতে। পণ্য বলতে পানি, চা, রুটি, পেয়ারা, শসা, পানীয়। কিন্তু সবই ডাবল দাম। আবার সেখানে হরিণের খাবার বিক্রি হচ্ছে। মানুষ লাইন ধরে খাবার কিনছে। হরিণকে খাবার দিবে বলে। করমজালে হরিণ, বানর সবই আছে। তবে কুমির দেখতেই এখানে ভিড় বেশি। করমজালের নদীতেও কুমিরের আস্তানা। করমজালের ভেতরে একটি পুকুর আছে। এ পুকুরেই প্রথম আনা হয় রোমিও আর জুলিয়েট কুমির জুটিকে। কিন্তু রোমিও আর জুলিয়েট প্রজনন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে জুলিয়েটকে বন্দি করে রাখা হয় একটি খাঁচায়। আর রোমিওকে নদীতে ছেড়ে দেয়া হয়। রোমিও যেন তার আর কোনো সঙ্গীকে বেছে নিতে পারে। কিংবা সে তার পথ নিজেই বেছে নিবে। বেশক’টি খাঁচায় ছোট কুমির আর বড় কুমির। পুকুরের পাড়ে গিয়ে দেখা গেল বড় দুটি কুমির পানি থেকে পাড়ে উঠে ঘুমিয়ে আছে। একটি উল্টো হয়ে ঘুমিয়ে আছে। প্রথম দেখায় মনে হয়েছে মরে আছে। এত মানুষের হইচই তবু কুমিরের ঘুম ভাঙছে না। মনে মনে ভাবলাম এ জন্যই বুঝি বলা হয়, কুমিরের ঘুম ঘুমিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর একটি কুমির সজাগ হয়ে দ্রুত পুকুরে নেমে যায়। অন্যটি মরার মতো ঘুমিয়েই আছে। ফেরার পথে সেখানকার ডাব খেয়ে একে একে সবাই ট্রলারে উঠেন। এরপর ট্রলার নিয়ে যায় আমাদের জাহাজে।
সুন্দরবনের ৬০ শতাংশ বাংলাদেশে হলেও এ অংশে নাকি বাঘ আছে ১২৫ কি ১২৮টি। আর ভারতের অংশে ৪০ শতাংশ হলেও সেখানে বাঘ রয়েছে ৪০০-এর উপরে। আচ্ছা বাঘ কীভাবে গণনা করে। এ নিয়ে মনে প্রশ্ন। শুধু আমার নয়, অনেকের মনেই এ প্রশ্ন। আর বাঘের সংখ্যা যে বলা হয় এটা কতোটুকু সত্যি? এ নিয়ে অনেক কিছু লেখা যায়। তবে লিখলে বাঘ গণনায় যে বাজেট তাতে টান পড়বে। তারচেয়ে বরং যে হিসাব দেয়া হয় সেটা মেনেই সবার চলা উচিত। চলছেও। সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাস করে। কিন্তু এ বনে বাঘের দেখা মেলা অন্য যেকোনো বনের চেয়ে বেশ দুরূহ। সুন্দরবনে দিনে দু’বার জোয়ার-ভাটা হয়। এখানে মোটরবোটে চড়ে বন দেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই। তবে প্রায়ই রিপোর্ট হয় কোনো না কোনো সময়ে জেলে, কাঁকড়া শিকারী, মধু আহরণকারী ও গোলপাতা আহরণকারীরা বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন।
সুন্দরবনে কথা হয় এক গোলপাতা আহরণকারীর সঙ্গে। তাকে বাঘের কথা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ওই যে বাঘের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে একটা বাঘ এখান দিয়ে গেছে। কথায় কথায় তিনি বলেন, বাঘ দেখবেন কোথা থেকে? বাঘের নির্দিষ্ট একটি এলাকা আছে। সে এলাকায় আপনারা যেতে পারবেন না। তবে একটা কথা শুনে রাখুন সুন্দরবনে কেবল বাঘের ইচ্ছে হলেই মানুষ তাকে দেখতে পায়। করমজালে কথা হয় মামুনের সঙ্গে। তার বাড়ি মোংলায়। প্রতিদিন নদী পার হয়ে করমজালে আসে। পেয়ারা-শসা আর বড়ই বিক্রি করছে এখন। বেশির ভাগ সময় মৌসুমি ফলমূলই বিক্রি করে। মামুনের কথাÑ সুন্দরবনের আনাচকানাচ তার নখদর্পণে। তার মতো এখানকার বাসিন্দাদের কাছে বাঘ হচ্ছে ‘মামা’। সকালে বেরুনোর আগে বনবিবির কাছে প্রার্থনা করে বেরিয়েছে মামুন। সুন্দরবনের নরম মাটিতে বাঘের পায়ের চিহ্ন কয়েক ইঞ্চি ডুবে আছে। যেন কিছুক্ষণ আগে কেওড়ার শ্বাসমূল বাঁচিয়ে নেমে এসেছিল বাঘ। হাড়বাড়িয়া পয়েন্টের একজন কর্মচারী ফ্যাকাসে মুখে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো। ‘মানুষখেকো, বেজায় চালাক। গত সপ্তাহে এক জেলের ওপর হামলা চালিয়েছিল। বেচারা ছুরি দিয়ে আত্মরক্ষা করতে চেয়েছিল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যে বাঘটিই তার দফারফা করে ফেলে। তার কথা কানে আসতেই আমি ঢোক গিললাম। আগেই বলেছি দিনের মধ্যে দু’বার সুন্দরবন পানির নিচে ডুবে যায়। এখানকার বাঘদের তখন লবণাক্ত পানি পান ও আধা-জলজ জীবনযাপন করতে হয়। এ কারণে সুন্দরবনের বাঘ দক্ষ সাঁতারুও। এ বনের বাঘের লেজ শক্ত ও পেশিবহুল। সাঁতারের সময় পানিতে লেজ ঝাপটায় এটি। সুন্দরবনের বাঘ অন্য জায়গার বেঙ্গল টাইগারের মতো নয়। এর খাদ্যাভ্যাসও অন্যদের থেকে ভিন্ন। এ বনের বাঘেরা মাছ, কাঁকড়া, কচ্ছপ, বড় গুঁইসাপ ইত্যাদিও শিকার করে। সুন্দরবনের বাঘের সাপ শিকার করারও নজির আছে। তবে বাঘের প্রধান খাদ্য হরিণ। ক’দিন আগে একটি বাঘকে নদীর এপার থেকে ওপার যেতে দেখেছেন অনেকেই। কেউ কেউ এটি ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছেন।
সুন্দরবনের জেলে, কাঁকড়া শিকারী, মৌয়াল এদের বেশির ভাগই বিনা অনুমতিতে ও কোনো প্রকার আত্মরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া বনে প্রবেশ করে। আর এরা বাঘের জন্য বেশ সহজ শিকার। সহজে শিকার করা যায় বলেই মাঝেমধ্যে এ বাঘগুলো মানুষের ঘাড় মটকায়। কিন্তু গুজব আর মিথ ছাড়া সুন্দরবনকে চিন্তা করা যায় না। এসব চিন্তা করতে করতেই রাতে ভালো ঘুম হয়নি। সকালে জাহাজের তিন তলায় উঠতেই দেখা হলো জাহাজের এক কর্মকর্তার সঙ্গে। একগাল হেসে জিজ্ঞেস করলো, ‘ঘুম হয়নি মনে হচ্ছে। বাঘের স্বপ্ন দেখলেন নাকি রাতে? ভয় পাবেন না। ও আমি প্রতি রাতে দেখি। ছোটবেলায় বাঘ মামা আর শিয়াল পণ্ডিতের গল্প শোনেননি, এরকম মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। কিংবা, ‘বনের রাজা কে? বাঘ নাকি সিংহ?’, এই ধাঁধার মাঝে পড়েননি, এমন মানুষের সংখ্যাও হাতেগোনা। সিংহকে বনের রাজা বলা হলেও বাস্তবে সিংহ কিন্তু বনে বাস করে না। পৃথিবীর বেশির ভাগ সিংহের বসবাস আফ্রিকার সাহারা মরুভূমির সাভানা অঞ্চলে। অন্যদিকে, বাঘের বসবাস কিন্তু এশিয়ার মাত্র কয়েকটি দেশের বন-জঙ্গলে। বাংলাদেশ ও ভারতের কোল ঘেঁষা সুন্দরবন এই বাঘের অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। একসময় পৃথিবীতে বাঘের নয়টি উপ-প্রজাতি ছিল। কিন্তু আজ থেকে প্রায় দেড়শ’ বা দুইশ’ বছর আগে তিনটি প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে এবং পৃথিবীতে এখন টিকে রয়েছে মাত্র ছয়টি উপ-প্রজাতির বাঘ। তবে আকৃতি এবং সৌন্দর্য্যে যেসব বাঘ খ্যাতিমান, তার মধ্যে সুন্দরবনের বাঘ রয়েল বেঙ্গল টাইগার অন্যতম।
(সূত্র- মানবজমিন ঈদ আনন্দ ২০২৫)

Monday, January 6, 2025
‘বাঘের মুখ থেকি লাশ কাড়ি আনছি, এখন আর ভয়ে বনে যাই না’ by নাজনীন আখতার
গানটির প্রতিটি লাইনে সুন্দরবনের প্রতি ভালোবাসা, জীবিকার কথা। দেবেন মণ্ডল একসময় কাঠুরিয়া ছিলেন। সুন্দরবনের গভীরে ছিল তাঁর নিত্য আনাগোনা। তবে ১৩ বছর ধরে সুন্দরবনের ভেতরে আর যান না দেবেন মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘এখন গান-বাদ্য করি, কাজ করি, মাছ ধরি।’
২৫ বছরের বনজীবী জীবনে চারবার খুব কাছ থেকে বাঘ দেখেছেন বলে জানালেন দেবেন মণ্ডল। একবার বাঘের মুখ থেকে লাশ কেড়ে এনেছিলেন বলে দাবি তাঁর। দেবেন মণ্ডল বলেন, ‘বাঘের মুখ থেকি লাশ কাড়ি আনছি, এখন আর ভয়ে বনে যাই না।’
দেবেন মণ্ডলের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের দেখা হয় গত ২২ ডিসেম্বর খুলনার দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নের খেজুরিয়া গ্রামে।
সুন্দরবনের একদম কাছঘেঁষা গ্রাম খেজুরিয়া। গ্রামবাসীই খোঁজ দিলেন ৬৩ বছর বয়সী দেবেন মণ্ডলের।
সরু রাস্তা ধরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে যেতে যেতে এর-ওর সঙ্গে কথা বলার পর সন্ধ্যা নামার মুখে দেবেন মণ্ডলকে পাওয়া গেল।
গ্রামের বাজারে একটি বন্ধ দোকানের সামনের বেঞ্চে বসে ছিলেন দেবেন মণ্ডল। পরিচয় দেওয়ার পর তিনি কথা বলতে বেশ আগ্রহ দেখালেন।
অভিজ্ঞতার ঝাঁপি খুললেন দেবেন মণ্ডল। আলাপে সুন্দরবন, বাঘ, নিজের জীবন-জীবিকাসহ নানা প্রসঙ্গ উঠে এল। তবে বাঘের কথা এল একটু বেশিই।
সুন্দরবনকে ‘অন্নদাতা’ হিসেবে বারবার তুলে ধরেন দেবেন মণ্ডল। জীবিকার উৎস হিসেবে সুন্দরবনের মর্যাদা তাঁর কাছে ‘মাতৃতুল্য’। তিনি বলেন, এই জীবনে যা কিছু যতটুকু পেয়েছেন, তা সুন্দরবনই তাঁকে দিয়েছে।
পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের বিয়ে দিয়েছেন দেবেন মণ্ডল। স্ত্রী, ছেলে আর পুত্রবধূ নিয়ে এখন তাঁর সংসার। আলাপের শুরুতে একটি বাঘের মুখ থেকে এক অপরিচিত যুবকের লাশ কেড়ে আনার গল্প বললেন তিনি।
‘বাঘটি সরছিল না’
দেবেন মণ্ডলের বাবা গৃহস্থালির কাজ করতেন। আর তিনি নিজে কাঠুরে হিসেবে জীবিকা শুরু করেন ২৫ বছর বয়সে। তখন বিবাহিত ছিলেন। তিনি বললেন, ২৫-৩০ জনের দল নিয়ে কাঠ কাটতে যেতেন। দলের নেতা ছিলেন তিনি। ৩৫ বছর বয়সে একবার বনে কাঠ কাটতে যান তিনি। দলে ছিলেন ৭ জন। একই সময়ে দুটি নৌকায় করে আরও দুটি দল এসেছিল।
দেবেন মণ্ডল বলেন, বেলা তিনটার দিকে বন থেকে কাঠ নিয়ে নৌকার কাছে আসেন। দেখেন, অন্য একটি নৌকার কাঠুরেরা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছেন। দেবেন মণ্ডলের দলটির কাছে এসে তাঁরা বলেন, তাঁদের দলের এক কাঠুরেকে বাঘ টেনে নিয়ে গেছে। টেনে নেওয়া কাঠুরেকে বাঘ এতক্ষণে মেরে ফেলেছে, তা নিশ্চিত। কিন্তু তাঁর লাশ ফেলে তাঁরা কীভাবে চলে যাবেন! পরিবারটির জন্য শেষ চিহ্ন হিসেবে লাশ তো নেওয়া দরকার। লাশ উদ্ধারে দেবেন মণ্ডলরা কোনো সাহায্য করতে পারেন কি না?
তখন দেবেন মণ্ডল বলেছিলেন, বাঘ সামনে দেখার পর যদি দলের কেউ পিছু না হটেন, তাহলে তিনি চেষ্টা করতে রাজি আছেন। সবাই সম্মতি জানানোর পর তাঁরা অগ্রসর হন। সবাইকে বলা হলো, ‘হইহই’ শব্দ করে ‘জাকদ’ (চিৎকার) দিতে। তাঁরা সুন্দরীগাছের পাতায় বাড়ি দিয়ে শব্দ করতে করতে এগোচ্ছিলেন, যাতে বাঘ ভয় পেয়ে লাশ ছেড়ে পালায়। মাটিতে পায়ের ছাপ দেখে দেবেন নিশ্চিত হয়েছিলেন, বাঘ দক্ষিণ দিকে গেছে। কিছুটা এগোতে রক্ত, গাছের গোড়ায় আটকে থাকা গেঞ্জির অংশ দেখে নিশ্চিত হন, ঠিক পথেই এগোচ্ছেন। আরও কিছুটা এগোতে দেখতে পান, বাঘটি লাশ খাচ্ছে। শব্দ পেয়ে বাঘটি তাকায়। তিনি ‘মন্তর’ পড়া শুরু করেন।
কী মন্ত্র পড়েছিলেন, কেন পড়েছিলেন—এই প্রশ্নে দেবেন মণ্ডল বলেন, ‘চাখান, খিলান বহু মন্তর আছে। মন্তর না পড়লে তো বাঘ উঠবে না। আমি মন্তর পড়ি, বাঘ একবার উঠে, আবার বইসে যায়। আমার গা দিয়ে পানি পড়ছিল (ঘাম)। তিনবারের বার বাঘ লাশ ছেড়ে চলে গেল।’
লাশের কাছে যাওয়ার পর দলের অন্যদের সতর্ক করেছিলেন বলে জানান দেবেন মণ্ডল। বলেছিলেন, ‘বাঘ কিন্তু বেশি দূর যাবে না। লাশ বেঁধে (কাঠের তক্তার সঙ্গে) তোমরা সামনে যেতে থাকো (নদীর দিকে)। আমরা কয়েকজন পিছন ফিরি (বনের দিকে মুখ করে) হাঁটব।’
লাশ নিয়ে বারবার পেছন ফিরে ‘হইহই’ শব্দ করে হাঁটছিলেন বলে জানান দেবেন মণ্ডল। সেই সময়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে দেবেন বলেন, লাশ নৌকায় তোলা হয়েছে, এই সংকেত পেয়ে তাঁরা নৌকার দিকে ছুটতে ছুটতে দেখলেন, মুখের গ্রাস হারিয়ে ক্ষুধার্ত বাঘটি তাঁদের দিকেই আসছে। তাঁরা নৌকায় ওঠার পর বাঘটি পিছু পিছু নদীতে নেমে এসেছিল। কিন্তু গলাপানি অবধি এসে বাঘটি থেমে যেতে বাধ্য হয়। বাঘটি তাকিয়ে ছিল তাঁদের নৌকার দিকে।
‘বাঘের কবলে’
সুন্দরবনে কয়বার বাঘ দেখেছেন—এ প্রশ্নের উত্তরে দেবেন মণ্ডল বললেন, ‘চারবার।’
সরু রাস্তার ওপারে একটি গাছ দেখিয়ে দেবেন মণ্ডল বললেন, একবার এতটুকু দূরত্বে একটি বাঘ দেখেছিলেন তিনি। শেষবার তিনি নিজে বাঘের হামলার শিকার হয়েছিলেন। মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। সেই ভয় এখনো তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তার পর থেকে তিনি আর বনে যান না।
দেবেন মণ্ডল যখন তাঁর বাঘের কবলে পড়ার গল্প শুরু করলেন, তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে অন্ধকার নেমে এসেছে। দোকান ঘিরে বেশ জটলা। সবাই গল্প শুনতে আগ্রহী।
বাংলা-ইংরেজি সাল-তারিখের মিশেলে সময়কাল ধরে বাঘের কবলে পড়ার গল্প বলতে থাকেন দেবেন মণ্ডল: তখন তাঁর বয়স ৫০ বছর। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাস। দিনটি বাংলা ৬ পৌষ। মঙ্গলবার। বেলা ১১টা।
সকালে বাড়ি থেকে বের হন। উত্তুরে বাতাস। বেশ ঠান্ডা, কুয়াশা। এখন বনের যে প্রান্তগুলো ঘেঁষে ইকো রিসোর্ট তৈরি হয়েছে, সেই বরাবর কুলতলীর খালের ভেতরে নৌকায় দলবল নিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি। খালের ভেতর দুই দিকে দুটি বাঁক। এর মধ্যে ডানদিকের বাঁকে উঠলেন তাঁরা। অন্যদের কাজে লাগিয়ে তিনি একটু ভেতরের দিকে যান।
বেলা ১১টার দিকে ফিরে এসে দেবেন মণ্ডল দেখেন বেশ অনেকখানি কাঠ কাটা হয়ে গেছে। তিনি আরেকটি গাছের গোড়ায় কুড়াল দিয়ে কোপ দিতেই বাঘ তাঁর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
দেবেন মণ্ডলের ডান চোখে থাবা মারে বাঘ। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে পড়ে যান। তাঁর ঘাড়ে কামড় দিয়ে বাঘ তাঁকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। সে সময় তাঁর দলের একজন সর্বশক্তি দিয়ে বাঘের মাথায় কুড়াল দিয়ে আঘাত করেন।
ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় দেবেন মণ্ডলের চোখে-মুখে ভয়ের ছাপ ফুটে উঠেছিল। তিনি বলেন, ‘বাড়ি খেয়ে বাঘ আমাকে ছাড়ি দিল। আমাকে ওরা নৌকায় করে আনল। গ্রাম্য ডাক্তার অশোক বৈদ্য ট্রিটমেন্ট (চিকিৎসা) দিল। ঘাড়-গলা ভাগ হয়ে গেছিল। চোখ ঝুলে গেছিল। ৫১টা সেলাই লাগছিল। মুখ বাঁকা হয়ে গেছিল।’
তারপর প্রায় দুই মাস ভারতে চিকিৎসা নেন বলে জানান দেবেন মণ্ডল। বলেন, দেশে-বিদেশে চার মাসের চিকিৎসায় তাঁর প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকা খরচ হয়েছিল।
দেবেন মণ্ডল বলেন, বাঘের ঝপ করে লাফ দেওয়ার শব্দটা এখনো তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। একদিন একটা গুইসাপ গাছ থেকে লাফিয়ে পড়েছিল। তিনি আঁতকে উঠেছিলেন। নিজে বাঘের কবলে পড়ার পর থেকে তিনি আর বনে যান না।
দেবেন মণ্ডল বলেন, ‘ওই সাবজেক্ট (প্রসঙ্গ) বাদ। সেই থেকে জঙ্গলে যাই না। গান-বাদ্য করি।’
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ২৫ বছর ধরে কেন সুন্দরবনে গিয়েছিলেন, জানতে চাইলে দেবেন মণ্ডল বলেন, বনের কাজে দ্বিগুণ আয়। ভালো খাওয়া-পরার জন্যই বনে যেতেন তিনি।
২০০৭ সাল থেকে সুন্দরবনে সব ধরনের কাঠ সংগ্রহ নিষিদ্ধ। তবে এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গোপনে অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহের অভিযোগ আছে। এ বিষয়ে খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মিহির কুমার দো আজ প্রথম আলোকে বলেন, এখন সুন্দরবন থেকে অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহ বলতে গেলে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। কেউ এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে তাঁরা আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।
দেবেন মণ্ডল তাঁর ছেলেকে বনজীবী বানাননি। তিনি বলেন, ‘ছেলে রিসোর্টে কাজ করে। ওকে পড়াশোনা শিখাইছি। ওদিক (বনে) দিতাম না। জমি নাই, জমা নাই। জঙ্গলে খাটিয়া মানুষ করেছি।’
নিজের জীবনে যা ঘটেছে, তাকে ‘ভাগ্যের লিখন’ বলে বিশ্বাস করেন দেবেন মণ্ডল। তিনি বলেন, ২৫ বছর বয়সে তাঁকে এক জ্যোতিষী বলেছিলেন, ৫০ বছর বয়সে দন্তাঘাতে তাঁর মৃত্যু হবে। জ্যোতিষীর এই ভবিষ্যদ্বাণী তিনি বিশ্বাস করেছিলেন। সাপ বা বাঘের কামড়ে তাঁর মৃত্যু লেখা ভেবে ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপেছিলেন।
সুন্দরবনের ভেতরে যাওয়া ছাড়লেও বন নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই দেবেন মণ্ডলের। তাঁর ভাষায়, ‘আমার পরিবার জঙ্গলের পরেই বাঁচিয়াছি’ (জঙ্গলই তাঁর পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছে)। তাই সুন্দরবনের গুণকীর্তন করে কণ্ঠে গান তোলেন দেবেন মণ্ডল, ‘গাছে গাছে নানান পাখি দেখিতে যে পাই/বাঘ, হরিণ, জাতিসর্প রয়েছে সেথায়। হায় রে সুন্দরবন/সে যে মায়েরই মতন...।’
| ষাটোর্ধ্ব দেবেন মণ্ডল এখন গান গেয়ে দিন পার করেন। ছবি: প্রথম আলো |
Tuesday, November 11, 2014
সুন্দরবনে বাঘ গণনা শুরু হচ্ছে আজ

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2352)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...
