Wednesday, November 13, 2013

ইদানীং রাজনীতি- মন্ত্রিত্ব এখন চাকরি! by শাহদীন মালিক

আজ সকালে মন্ত্রীরা যথাসময়ে অর্থাৎ সকাল নয়টায় তাঁদের নিজ নিজ চাকরিস্থলে নিশ্চয় হাজির হয়েছেন।

ব্যাংক জালিয়াতি- অর্থমন্ত্রী, সবগুলোই আপনার বিষয় by শওকত হোসেন

একটি সহযোগী দৈনিকে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে। ৩ নভেম্বর প্রকাশিত সেই সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রীকে সাম্প্রতিক কেলেঙ্কারি নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল।

নারীস্বার্থ- রাষ্ট্র, সরকার ও বিরোধী দলের কাছে কী চাই by মালেকা বেগম

দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সবাই অতীতের সূত্র ধরে বর্তমান আর আগামীর কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলের নেতা দুজনেই অতীতের প্রসঙ্গে পরস্পরের প্রতি দোষারোপের বারুদ ছিটিয়ে দিয়েছেন ফোনালাপে।

অস্বস্তিতে ভুগছেন পুলিশ কর্মকর্তারা

অস্বস্তিতে ভুগছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে পারছেন না রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের কারণে। সন্দেহ ও অবিশ্বাসের দোলাচলে সময় পার করছেন তারা।

মন্ত্রীবিহীন প্রধানমন্ত্রী by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

বর্তমান বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া মন্ত্রিসভায় আর কোন সদস্য নেই। কারণ রাষ্ট্রীয় অতীব ও জরুরি প্রয়োজনেই প্রধানমন্ত্রী ৫৮(২) অনুচ্ছেদ

জাতীয় মশকরা by সাজেদুল হক

বেইলী রোডেও এমন নাটক কখনও মঞ্চস্থ হয়েছে কিনা- তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। নাটকপ্রবণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে সোমবার যা ঘটে গেল তা একেবারেই অভিনব।

টেলিভিশনে শিষ্টাশিষ্ট বিশিষ্ট কথন by হানিফ সংকেত

বৃক্ষ তোমার নাম কী, ফলেই পরিচয়। অর্থাৎ আমগাছে আমই ধরে, জাম না। আর জামগাছে জামই ধরে, জামরুল নয়।

ঈশ্বর কণায় হকিংস কেনো নাখোশ?

পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস জানিয়েছেন, ঈশ্বর কণার খোঁজ পাওয়ায় তিনি নাখোশ হয়েছেন। কিন্তু কেনো? সম্প্রতি তার ব্যাখাও দিয়েছেন তিনি।

রাম লীলার ওপর নিষেধাজ্ঞার খড়গ!

সঞ্জয় লীলা বানশালী পরিচালিত ‘রাম লীলা’ ছবিটি মুক্তি পাওয়ার কথা ছিল ১৫ নভেম্বর। কিন্তু গতকাল মঙ্গলবার ছবিটির মুক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন দিল্লির একটি আদালত।

১৬ কোটি মানুষের কী অপরাধ? by মোস্তফা কামাল মজুমদার

আসন্ন সাধারণ নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে রাজনৈতিক মতানৈক্য সারা দেশকে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। দৃশ্যত পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক জোট ও দলগুলো তাদের অবস্থান থেকে এক ইঞ্চিও সরতে চাচ্ছে না। এ নিয়ে সর্বশেষ বিরোধী দলের নেতাকে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে আমন্ত্রণ নিয়ে দুই নেত্রীর মধ্যে টেলিফোনে যে কথা কাটাকাটি হয়েছে, তাকে অনেকে নিরর্থক মনে করেছেন। রাজনৈতিক অচলবস্থা নিরসনে নেতৃত্বের অপারগতার কারণে সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যেও হতাশা বেড়েছে। ঢাকায় কর্মরত বেশ কিছু বাংলাদেশের শুভাকাক্সক্ষী দেশের রাষ্ট্রদূতদের কর্মচঞ্চলতা এখনও ফলপ্রসূ না হওয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তাগিদ দিয়েছেন।
অচলাবস্থার মূল কারণ নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে বিরোধ। নির্বাচন বর্তমান সরকারের তত্ত্বাবধানে নাকি নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে হবে- যে ব্যবস্থা ১৯৯৬ সাল থেকে চালু ছিল। ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮ সালে তিনটি নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থার অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। সব বিরোধী দল, এমনকি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের কয়েকটি শরিক দল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ও তার মিত্র দলগুলো এ দাবির পক্ষে সারা দেশে শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তুলেছে।
আওয়ামী লীগ ও তার অন্ধ সমর্থক দলগুলো ক্ষমতাসীনদের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন অনুষ্ঠানে বদ্ধপরিকর। তারা শুধু বিরোধী দলের কিছু সংসদ সদস্যকে নির্বাচনকালীন সরকারে অন্তর্ভুক্ত করতে রাজি আছেন। এর পক্ষে প্রধান যুক্তি- দুই বছরের সর্বশেষ কেয়ারটেকার সরকারের সময়কার দুরবস্থা, জরুরি অবস্থা এবং তার অধীনে রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসা নিষ্পেষণ এবং মাইনাস টু ফর্মুলা ইত্যাদি। কিন্তু এখানে একটা বিষয় দৃষ্টির আড়ালে থেকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা না থাকার কারণেই অচলাবস্থার সূত্র ধরে জরুরি অবস্থা এসেছিল। বিরোধী দলের একটা দাবি উপেক্ষা করা যায় না। তারা বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির পরিবর্তন আওয়ামী লীগ তথা তার নেতৃত্বাধীন জোটের কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল না। এ রকম কোনো কর্মসূচি ২০০৮ সালের নির্বাচন মেনিফেস্টোতেও বলা হয়নি। যারা পঞ্চদশ সংশোধনী প্রণয়ন ও পাসের সঙ্গে জড়িত তাদের বিভিন্ন সময়ের কথাবার্তা থেকেও এটা পরিষ্কার যে, শুরুর দিকে কেউ এই মীমাংসিত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে চাননি। আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের তরফে বলা হয়েছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে দুটি শর্ত জুড়ে দেয়া যেতে পারে : ১. নির্বাচনকালীন এই সরকারের মেয়াদ ৯০ দিনে সীমাবদ্ধ থাকবে এবং ২. এ সরকার বিদেশের সঙ্গে কোনো চুক্তি সই করতে পারবে না। সরকারি দলের এ মনোভাবের পরিপ্রেক্ষিতে বিরোধী দলের নেতারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংরক্ষণের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখে তাদের অবস্থান আরও পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এর পরেও পারস্পরিক আস্থাহীনতার যে বিরাট ফারাক পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে, তা টেকসই গণতন্ত্রের স্বার্থে দূর করা দরকার। এই মূল ইস্যু বাদ দিয়ে মামুলি বিষয়- ২৭-২৯ অক্টোবরের হরতাল বিরোধী দল প্রত্যাহার করেছে কিনা- নিয়ে টানাটানি করলে ফলপ্রসূ কিছু হবে বলে মনে হয় না। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের ভাষায় অবাধ, নিরপেক্ষ ও সবার অংশগ্রহণভিত্তিক নির্বাচন করার পরিবেশ তৈরি করা এখনকার জরুরি কাজ।
এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে, একটা নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের তত্ত্বাবধানে অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান অসম্ভব। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন একটা মার্জিত পর্যায়ে এখনো আসেনি যে, ক্ষমতায় আসীন ব্যক্তিরা তাদের নির্ধারিত ক্ষমতা বা ম্যান্ডেটের বাইরে যাবেন না- এতটুকু বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন। বা বিরোধী দলের মধ্যে আস্থা এমন পর্যায়ে আসেনি যে, তারা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে নিয়োজিতের নিরপেক্ষতা ও সত্যনিষ্ঠার ব্যাপারে সন্দিহান নন। এখানে এ কথা বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতারা মানুষের স্বভাবজাত পক্ষপাত বা লোভকে তাদের বিচার-বুদ্ধির কাছে ছেড়ে না দিয়ে রাষ্ট্রের তিন অঙ্গ নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টি করেছিলেন। যার ফলে মাত্র কদিন আগেও বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সরকারেরও কিছু কর্মকাণ্ড অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ তার প্রবর্তিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য চাহিদা মতো রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষমতা কংগ্রেস তাকে দেয়নি। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় নিযুক্ত আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকেও তার দূতাবাস ও বাসস্থানের বাইরে ভ্রমণ এ কারণে অনেকটা সীমিত রাখতে হয়েছিল।
এটা পরিষ্কার যে, আমাদের দেশে রাষ্ট্র বা সরকারের কোনো অঙ্গ বিরোধী দলের নিয়ন্ত্রণে নেই যে, মার্কিন কংগ্রেসের মতো নির্বাহী বিভাগের ওপর চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে। আমাদের দেশের মতো সংসদীয় শাসন ব্যবস্থায় এরকম নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রায় অসম্ভব, যদি না সংসদে কারও নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকে বা দেশে কোয়ালিশন সরকার থাকে। এখানে শুধু উচ্চ আদালতের ক্ষমতা আছে নির্বাহী বা আইন বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করার। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে উচ্চ আদালত আগে থেকেই তার অবস্থান নিয়ে নিয়েছে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সংসদীয় ব্যবস্থায় সরকারের ছত্রছায়ায়ই আইন বিভাগ পরিচালিত হয়। আবার পার্লামেন্ট সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে এমনকি বিচার বিভাগের ক্ষমতা হ্রাস করারও ক্ষমতা রাখে। বর্তমান সংসদের ওপর নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ কতটা শক্তিশালী তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। কারণ সংসদের নয়-দশমাংশ সদস্য সরকারি দলের বা জোটের। এরূপ অবস্থায় ক্ষমতাসীনরা চাইলে একদিনের মধ্যে একটা সংবিধান সংশোধনী বিল পাস করে শাসন ব্যবস্থা তথা সাংবিধানিক বিষয়ে ঐকমত্য ফিরিয়ে এনে শান্তিপূর্ণ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে এবং তা করলে তারা এদেশের গণতন্ত্রকামী ও শান্তিপ্রিয় মানুষের মনে স্থায়ী শ্রদ্ধার আসন দখল করতে সক্ষম হবে।
ঐকমত্য সৃষ্টিতে সমর্থ না হলে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর বর্তমান জটিলতা আরও প্রকট হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় নির্বাচনী প্রচারণা সমান অধিকারভোগী প্রতিযোগীদের মধ্যে হবে না, হবে অসম প্রতিযোগিতার নির্বাচন। একদল প্রতিযোগী সরকারি সুযোগ-সুবিধা এবং মর্যাদা পাবে, অন্যদল সাধারণের কাতার থেকে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। মন্ত্রীরা সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি ভোগ করবেন। কারণ আইন প্রয়োগকারীরাসহ প্রশাসন প্রটোকল ও মর্যাদা রক্ষাসহ তাদের সন্তুষ্ট রাখার কাজে ব্যস্ত থাকতে বাধ্য হবে। রাশেদ খান মেননসহ সরকারি রাজনৈতিক জোটের প্রভাবশালী কিছু সদস্য অল্প কদিন আগে পর্যন্ত এমপিদের সংসদ সদস্য পদে আসীন রেখে অসম নির্বাচনী প্রতিযোগিতার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বক্তব্য রেখেছেন। সরকারি মহল নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে এবং আসন্ন নির্বাচন কীভাবে অনুষ্ঠিত হবে এ নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে। কারণ এ ধরনের নির্বাচনের কোনো নজির এদেশে কখনও ছিল না। নির্বাচনী আচরণবিধি চূড়ান্ত করতে নির্বাচন কমিশন হিমশিম খাচ্ছে, কারণ এই বিধিতে নির্বাচনে সাধারণ প্রতিদ্বন্দ্বী ও এমপি-মন্ত্রী প্রতিদ্বন্দ্বীদের নির্বাচনকালীন সুযোগ ও মর্যাদা একরকম হবে না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সর্বশেষ বক্তব্য হল, তারা রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য অপেক্ষা করছেন। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অতি সম্প্রতি সংসদে সংশোধিত হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের ওপর থেকে এ বিষয়ে চাপ কিছুটা কমবে। কিন্তু এদেশের মানুষ একই নির্বাচনে মর্যাদার পার্থক্য নিয়ে প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখতে অভ্যস্ত নয়।
যদিও প্রবাদে আছে- একটা জনগোষ্ঠী যে ধরনের সরকারের জন্য উপযোগী সে ধরনের সরকারই পায়, তবুও বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষ সম্ভবত বর্তমান অবস্থায় নিপতিত হওয়ার মতো কোনো অপরাধ করেনি। শত বিপত্তি অতিক্রম করে এদেশের মানুষ এখনও উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার সামর্থ্যরে পরিচয় দিয়ে চলেছে। বিদেশের মাটিতে গরিব মানুষের শরীরে ঘামের বিনিময়ে ডলার উপার্জনের কারণেই তিন দশক ধরে বাংলাদেশ বাণিজ্যিক লেনদেনে একটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পেরেছে।
বাংলাদেশের চাষীরা শুধু চাল, গম ও ভুট্টার উৎপাদনই বাড়ায়নি, কৃষি বহুমুখী করে তারা সবজি এবং ফলের সরবরাহও বাড়িয়েছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হলে এখন এসব কৃষিপণ্যের সরবরাহ বাজারে প্রচুর থাকে। কোনো কোনো পণ্যের দাম আগের তুলনায় কমে গেছে। নিবেদিত গার্মেন্ট কর্মীরা কঠোর পরিশ্রম, এমনকি কখনও জীবন বাজি রেখে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন বাড়িয়ে চলেছে। ক্রিকেটাররা দেশের মর্যাদা বাড়িয়েছে। এখন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা সারা বিশ্বের ঘরে ঘরে মিনি পর্দায় পত্পত্ করে ওড়ে। এ সাফল্য তাদের। এখনকার যুবকরা ইন্টানেটের মাধ্যমে সারা বিশ্বে ঘুরে বেড়ায় এবং আকাশছোঁয়া উন্নতির স্বপ্ন দেখে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত তাদের নিরাশ না করে ক্ষমতায়নের পরিবেশ আরও পরিচ্ছন্ন রাখা।
মোস্তফা কামাল মজুমদার : সাংবাদিক

প্রশাসন দলীয়করণের পরিণাম! by আবদুল লতিফ মণ্ডল

গত ৩ নভেম্বর ‘ওরা যেন পালাতে না পারেন’ শিরোনামে যুগান্তরের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘প্রশাসনে ক্ষমতার চরম অপব্যবহারকারী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের অনেকে মহাজোট সরকারের মেয়াদের শেষ সময়টায় লিয়েন, শিক্ষা ছুটি ও বিদেশ সফরের নামে দেশ থেকে সটকে পড়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। ইতিমধ্যে কয়েকজন সন্তর্পণে চলেও গেছেন। বাকিরা পাততাড়ি গোটানোর তালে আছেন। এ নিয়ে জনপ্রশাসনে কর্মরত সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ বিরাজ করছে। এই ক্ষোভ শুধু সরকারবিরোধী সমর্থক কর্মকর্তাদের মধ্যেই নয়, সাধারণ কর্মকর্তা ও কর্মচারী, এমনকি সরকার সমর্থক কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এ নিয়ে বেজায় নাখোশ। এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারী বলছেন, আওয়ামী ঘরানার কর্মকর্তা সেজে গত পৌনে পাঁচ বছরে যারা প্রশাসনের ওপর নানাভাবে নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়েছেন এবং দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ সহায়-সম্পদের মালিক হয়েছেন, তাদের এখন কোনো অবস্থাতেই দেশ ছাড়তে দেয়া উচিত হবে না।’ প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ সচিবালয়ের কয়েকজন সিনিয়র সহকারী সচিব, উপসচিব ও যুগ্ম সচিব প্রতিবেদককে বলেছেন, ‘ক্ষমতার অপব্যবহারকারী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের ক্ষমা নেই। তাই ওদের পালাতে দেয়া যাবে না।’
প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলবাজি প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, প্রজাতন্ত্রের কর্মের সব ক্ষেত্রেই যেমন- সংযুক্ত দফতর, অধস্তন দফতর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা- স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, এন্টারপ্রাইজ ইত্যাদিতে এর বিস্তার ঘটেছে। নিজের স্বার্থ রক্ষার্থে প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে সর্বনিু পর্যায়ের কর্মচারী দলবাজিতে লিপ্ত। পেশাজীবীরা যেমন- চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, কৃষিবিদরাও দলবাজিতে পিছিয়ে নেই। প্রজাতন্ত্রের নিরপেক্ষ ও নিরীহ কর্মচারীরা উপেক্ষিত। যুগান্তরের আলোচ্য প্রতিবেদনে এ অবস্থারই প্রতিফলন ঘটেছে।
তবে এটাও সত্য যে, প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলবাজি বর্তমান সরকারের আমলেই শুরু হয়নি। গত ২০ বছরে দুটি বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাদের পালাক্রমিক শাসনামলে প্রশাসনকে দলীয়করণের কোনো চেষ্টাই বাকি রাখেনি। প্রশাসনে দলীয়করণে ব্যবহৃত দুটি মোক্ষম অস্ত্র হল পদোন্নতি ও প্রাইজ পোস্টিং। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাদের শাসনামলে প্রশাসন দলীয়করণে এ দুটি অস্ত্রের পূর্ণ ব্যবহার করেছে। প্রশাসনকে দলীয়করণে রাজনীতিকদের উদ্যোগ কর্মকর্তাদের দলবাজ হতে উৎসাহ দিয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে আশির দশকের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সচিবালয়ের উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদগুলোতে নিয়োগ ও পদোন্নতির ব্যাপারে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো হলেও বিএনপির শাসনামলে ১৯৯২ সালে এসব পদে পদোন্নতিতে বড় ধরনের বিশৃংখলার শুরু হয়। অনেকের মতে, প্রশাসনকে দলীয়করণেরও এটি ছিল প্রথম সুপরিকল্পিত বড় পদক্ষেপ। তবে কেউ কেউ মনে করেন, স্বাধীনতার পর পরই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক পাবলিক সার্ভিস কমিশনের (পিএসসি) প্রতিষ্ঠিত পদ্ধতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিপুলসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধাকে ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যান্য পদে চাকরি প্রদান ছিল প্রশাসনকে দলীয়করণের প্রথম পদক্ষেপ। এদের অধিকাংশ কর্মকর্তা প্রশাসনে ‘আওয়ামীপন্থী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই এসব কর্মকর্তা প্রশাসনে নানা ধরনের সুবিধা পেয়েছেন।
অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের দাবি গণআন্দোলনে রূপ নিলে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি সরকারের পতন হয়। ১৯৯১ সালের ফেব্র“য়ারিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। সরকার গঠনের এক বছর পার না হতেই বাংলাদেশ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিএনপির প্রতি সহানুভূতি সৃষ্টি করতে এবং পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের সময় তা কাজে লাগাতে ১৯৯২ সালের ফেব্র“য়ারিতে প্রয়োজনীয় শূন্যপদ ছাড়াই বিএনপি সরকার বাংলাদেশ সচিবালয়ের উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে সাতশ’র বেশি কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়।
১৯৯২ সালে বিএনপি প্রয়োজনীয় শূন্যপদ ছাড়াই অনেকটা ‘গণপদোন্নতির’ যে নজির সৃষ্টি করে, ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ তা যত্নসহকারে অনুসরণ করে।
২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার শূন্যপদ ছাড়া পদোন্নতি ও প্রশাসনে দলীয়করণের গতিকে জোরদার করে। এ ছাড়া স্বাধীনতার পর চাকরিতে নিয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে যারা ‘আওয়ামীপন্থী’ হিসেবে বহুল পরিচিত, তাদের চাকরি হতে অবসর প্রদান করে। এখানেই শেষ নয়। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে নিজেদের বিজয় সুনিশ্চিত করতে বিএনপি সরকার প্রশাসন সাজানোর উদ্যোগ নেয়। নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে পারে প্রশাসনের এমন গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজেদের পছন্দসই লোক রাখতে প্রতিটি পদের বিপরীতে একাধিক বিকল্প কর্মকর্তার তালিকা প্রণয়ন করা হয়, যাতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদল হলেও তাদের নিজেদের লোক এসব পদে থাকে। বহুল আলোচিত ১/১১-এর কারণে তাদের সে আশা পূরণ হয়নি।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার প্রয়োজনীয় সংখ্যক শূন্যপদ ছাড়াই বাংলাদেশ সচিবালয়ে উপসচিব ও তদূর্ধ্ব পদে পদোন্নতি প্রদান এবং দলীয়করণের ধারা অব্যাহত রাখে। ক্ষমতা গ্রহণের মেয়াদ এক বছর পূর্ণ না হতেই ২০০৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শূন্যপদ ছাড়াই সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে ৪৯৪ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। প্রয়োজনীয় সংখ্যক শূন্যপদ না থাকা সত্ত্বেও ২০১২ সালের ফেব্র“য়ারিতে উপসচিব, যুগ্ম সচিব ও উপসচিব পদে প্রায় সাতশ’ কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হয়। শূন্যপদের অভাবে তাদের অধিকাংশকে পদোন্নতি পূর্বপদে পদায়ন করা হয়। শূন্যপদ ছাড়াই পদোন্নতি প্রদানের সর্বশেষ উদাহরণ গত ১৮ জুলাই তিনশ’র অধিক উপসচিবকে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি প্রদান।
তাছাড়া এবার ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ প্রশাসনে দলীয়করণকে জোরদার করতে ‘আওয়ামীপন্থী’ হিসেবে পরিচিত যেসব মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে বিএনপি অবসর প্রদান করেছিল বা যারা আওয়ামী লীগের ভাবাদর্শে বিশ্বাসী, যারা স্বাভাবিক নিয়মে অবসর গ্রহণ করেছিলেন তাদের অনেককে স্বায়ত্তশাসিত, আধা-স্বায়ত্তশাসিত সংস্থায় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের অনেককে নিয়োগ দেয়া হয় বিভিন্ন কমিশনে। অনেকে মনে করেন, বর্তমান সরকারের আমলে প্রশাসনকে দলীয়করণ ও কর্মচারীদের দলবাজি অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ করেছে।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, প্রশাসনে দলীয়করণের অন্য মোক্ষম অস্ত্রটি হল ভালো পোস্টিং। গত দু’দশকে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে যে বিষয়টি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে তা হল, ক্ষমতাসীন দলের ভাবধারা ও আদর্শে বিশ্বাসী না হলে কোনো কর্মকর্তার পক্ষে মন্ত্রণালয়/বিভাগের সচিব; সংযুক্ত দফতর, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, আধা- স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার প্রধান এবং দ্বিতীয় স্তরের পদে পোস্টিং পাওয়া সম্ভব নয়। জনপ্রশাসনের মাঠ পর্যায়ে ডিসি, এসপি প্রভৃতি পদে পদায়নে এটা সমভাবে প্রযোজ্য। উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোতে রাজনীতিকরা প্রশাসনে তথা আমলাতন্ত্রে বিভেদ সৃষ্টি করতে না পারলেও বাংলাদেশে রাজনীতিকরা, বিশেষ করে বড় দুটি দল বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরা সফলভাবে এ কাজটি সমাধা করতে পেরেছেন। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মূলত ‘আওয়ামীপন্থী’ ও ‘বিএনপিপন্থী’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। দুই শিবিরে বিভক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সুসম্পর্কের অভাব রয়েছে। একই ব্যাচের কর্মকর্তা হয়ে তারা একজন আরেকজনকে বিশ্বাস করতে পারেন না। এতে সরকারের কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে। কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও সততা এখন প্রশ্নের সম্মুখীন। এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলবাজি ও ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিকদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় কারণে মাঠ পর্যায়ে সরকারি সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও লাভবান হচ্ছেন বড় দুটি দলের রাজনীতিকরা।
প্রশাসন দলীয়করণের যে সর্বনাশা খেলায় রাজনৈতিক দলগুলো মেতে উঠেছে, তা থেকে তাদের সরে আসতে হবে। সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের নির্দেশনা থাকলেও স্বাধীনতার চার দশকেও তা করা হয়নি। স্বাধীনতার পর চার দশকের তিন দশক দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। প্রজাতন্ত্রের কর্মে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও কর্মের শর্তাবলী নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণীত হলে তারা খেয়ালখুশি মোতাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যবহার করতে পারবেন না ভেবে তারা আইনটি প্রণয়ন করেননি। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার এবার ক্ষমতায় এসে আইনটি প্রণয়নের উদ্যোগ নিলেও এখন তারা তা থেকে সরে এসেছে। প্রশাসনে গতিশীলতা, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার জন্য আইনটি দরকার। আগামীতে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের উচিত হবে আইনটি প্রণয়ন করা এবং প্রশাসনে দলীয়করণ বন্ধের মাধ্যমে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দলবাজির অবসান ঘটানো। তাদের প্রস্তুত করতে হবে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য।
আবদুল লতিফ মণ্ডল : সাবেক সচিব, কলাম লেখক

প্রধানমন্ত্রীর এই অতি উৎসাহের উদ্দেশ্য কী by সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতী

ইংরেজি ৪টি শব্দের আদ্যাক্ষর- এ, বি, সি ও ডি- দিয়ে লেখাটি শুরু করছি। ‘এ’ দিয়ে হয় অ্যাভয়েড, যার বাংলা অর্থ পরিহার করা। ‘বি’ দিয়ে হয় বাইপাস, যার বাংলা অর্থ পাশ কাটিয়ে যাওয়া বা এড়িয়ে যাওয়া। ‘সি’ দিয়ে হয় কনফিউশন, যার বাংলা অর্থ বিভ্রান্তি বা ধোঁয়াশা। ‘ডি’ দিয়ে হয় ডেঞ্জার, যার বাংলা অর্থ বিপদ। এই চারটি ইংরেজি শব্দকে উপলক্ষ করে, বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গনকে সম্পৃক্ত করে দু-চারটি কথা বলতে চাই। ২০১১ সালের প্রথম ৬ মাস বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করার নিমিত্তে সংবিধান সংশোধনী কমিটি চিন্তাভাবনা করেছিল। ওই সময়কার সংবিধানে লিপিবদ্ধ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সংক্রান্ত বিধানগুলো নিয়ে এবং তার বাস্তবায়ন কেমন হয়েছে বা হয়নি এ বিষয়গুলো নিয়ে সেই সংবিধান সংশোধন কমিটি ব্যস্ত ছিল, আগ্রহী ছিল, পরিশ্রম করেছে- এ কথা অনেকেই বলেন। সেই কমিটি তাদের কাজের চূড়ান্ত পর্যায়ে কী সুপারিশ দিয়েছিল বা দেয়নি, সেটি চাক্ষুষ দেখার সুযোগ আমার হয়নি। তবে গত ৩১ অক্টোবর ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত ড. বদিউল আলম মজুমদারের কলাম থেকে আমি এর সারমর্ম পড়েছি। তিনি হুবহু উদ্ধৃত করে পাঠকদের জানিয়েছেন, ওই সংবিধান সংশোধনী কমিটির কোন কোন সদস্য কোন কোন প্রসঙ্গে কী বলেছেন। ড. বদিউল আলম মজুমদারের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপচারিতার মাধ্যমে জানতে পারলাম, তিনি যে কথাগুলো পত্রিকায় লিখেছেন, সেগুলোর উপযুক্ত দালিলিক প্রমাণ তার কাছে রয়েছে। অর্থাৎ তিনি কান-কথার ওপর ভিত্তি করে ওই কলামটি লেখেননি। বাংলাদেশে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী জনস্বার্থে অনেক তথ্যই নাগরিকরা পেতে পারেন। এই মর্মে তথ্য অধিকার আইন দেশে চালু আছে।
কথাগুলো বললাম এজন্য যে, সংবিধান সংশোধনী কমিটি কী সুপারিশ নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিল এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী নির্দেশনা দিয়ে ওই কমিটিকে ফেরত পাঠিয়েছিলেন, সেটি ড. বদিউল আলম মজুমদারের লেখায় রয়েছে। ওই কলাম পড়ার পর আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আগ্রহ বা জেদ বা যে কোনো গোপন রাজনৈতিক পরিকল্পনার কারণেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। ড. বদিউল আলম মজুমদারকে ধন্যবাদ।
৮ নভেম্বর আরেকটি দৈনিকে প্রকাশিত এক কলাম পড়ে বিষয়টি আরেকটু পরিষ্কার হয়েছে। ওই কলামের শিরোনাম ছিল ‘আওয়ামী লীগ অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করে তৃপ্তি পায়’। এ কলামের লেখক ছয়বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ড. কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম (অব.) এমপি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে যাদের মানা যায়, তাদের অন্যতম কর্নেল অলি আহমদ বীরবিক্রম। তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ থানার সন্তান। নিজের এলাকায় অত্যন্ত সুপরিচিত শিক্ষানুরাগী একজন ব্যক্তি হিসেবে তিনি সাফল্যের যথেষ্ট স্বাক্ষর রেখেছেন। দীর্ঘ সংসদীয় জীবনে তিনি বিভিন্ন দায়িত্ব সাফল্যের সঙ্গে পালন করেছেন। ২০০৬ সালের অক্টোবরে তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি নিয়ে নবযাত্রা শুরু করেন এবং এ দলের কার্যরত প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান তিনি। কর্নেল অলি আহমদের নাম এবং তার কলামের রেফারেন্স এজন্য নিলাম যে, তার লেখাটিতে সংবিধান সংশোধনী প্রসঙ্গে বক্তব্য এসেছে। আমরা উভয়েই উভয়ের কলামগুলো পড়ি, ত্র“টি-বিচ্যুতি নিয়ে কথা বলি। যেহেতু রাজনীতিতে আমি তুলনামূলক নবীন এবং তিনি ৩৩ বছরের অধিককাল রাজনীতিতে সক্রিয়, তাই আমি মাঝেমধ্যে তার কাছে রাজনৈতিক ইতিহাস, প্রেক্ষাপট এবং বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চাই বা সেসব নিয়ে আলোচনা করি। তার কলামে সংবিধান সংশোধনী প্রসঙ্গ যতটুকু উঠে এসেছে. তার থেকে বেশি তথ্য তিনি মৌখিকভাবে আমাকে বলেছেন।
যা হোক, সংবিধান সংশোধনী প্রসঙ্গে কমিটি যাই করুক বা না করুক, বাস্তবতা হল সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনী এসেছে এবং এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত হওয়ার পর থেকে বিরোধী দল যতবারই এর পক্ষে কথা বলতে চেয়েছে, ততবারই সরকার বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। আমি ইংরেজি অক্ষর ‘এ’ অ্যাভয়েড দিয়ে এটাই বোঝাতে চাচ্ছি যে, এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একজন রাজনীতিক হিসেবে একটি কৌশল বেছে নিয়েছেন এবং সেই কৌশলটি হল, তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুটিকে তিনি অ্যাভয়েড করতে থাকবেন যতক্ষণ পর্যন্ত সম্ভব হয়। এ নিয়ে আলোচনা, ফয়সালা সবকিছুকেই তিনি অ্যাভয়েড বা পরিহার করে যাবেন। ইংরেজি অক্ষর ‘বি’ বা বাইপাস শব্দটি দিয়ে বোঝাতে চাচ্ছি যে, যখনই বিরোধী দল এ বিষয়টিকে সামনে আনতে চায়, তখনই সরকার তথা প্রধানমন্ত্রী এটিকে বাইপাস করে চলেন। কোনোভাবেই মূল প্রশ্নের উত্তরটি তিনি দেন না। তিনি কোনো সময়ই উত্তর দেন না ১৯৯৫-৯৬ সালে কেন ১৭৩ দিন হরতাল দিয়েছিলেন, কেন তিনি সংসদীয় কমিটির সুপারিশের বিরুদ্ধে গেলেন, কেন তিনি এরশাদ সাহেবের মার্শাল ল’ (২৪ মার্চ ১৯৮২) আসায় খুশি হয়েছিলেন অথবা কেন তিনি ওয়ান-ইলেভেন সরকার তার ও তার দলের আন্দোলনের ফসল বলে ওই সরকারকে জনসমক্ষে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। বিরোধী দলের এই মুহূর্তের মূল প্রশ্ন বা বক্তব্য হচ্ছে, ‘সংবিধান সংশোধনী করেছেন আপনাদের (সরকারি দলের) প্রয়োজনে, আপনাদেরই স্বার্থকে সামনে রেখে। জাতির স্বার্থকে সামনে রেখে নয়। শুধু তাই নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি নিয়ে যদি আপনাদের এতই অনীহা থাকে, তাহলে আপনারা কেন বিরোধী দলে থাকাবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৭৩ দিন হরতাল দিয়েছেন? ওই সময় আপনারা কেন সর্বদলীয় সরকার ব্যবস্থাকে পরিহার করেছিলেন?’ ইত্যাদি প্রশ্নের উত্তর কোনো মঞ্চে বা টেলিভিশন ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেন না। তিনি বিষয়টিকে বাইপাস করেন বা এড়িয়ে যান। আর এসব কারণেই জাতি আজ কনফিউজ বা বিভ্রান্তিতে রয়েছে। এটি দেশ ও জাতির জন্য কোনোভাবেই কাম্য নয়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি কেন বাতিল করা হয়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে কখনও বলা হচ্ছে, আদালত বলেছে দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক থাকবে, বাকি সময় থাকবে না বলে বাতিল করা হয়েছে। কখনও বলা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক চেতনা রক্ষায় বাতিল করা হয়েছে। কখনও বলা হচ্ছে, নির্বাচিত ব্যক্তিদের জড়িত রাখার জন্য বাতিল করা হয়েছে। কখনও বলা হচ্ছে, সবাইকে নিয়ে দেশ পরিচালনার জন্যই বাতিল করা হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে জাতি বিভ্রান্তি বা ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছে। বিভ্রান্তি ও ধোঁয়াশা মানে কনফিউশন। বাংলা ব্যাকরণে ধোঁয়ার সঙ্গে কুয়াশা সন্ধি করলে ধোঁয়াশা শব্দটি আসে। ধোঁয়ার মধ্যে মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হয় এবং কুয়াশার মধ্যে মানুষ একটি নির্দিষ্ট দূরত্বের পর আর কিছুই দেখতে পায় না। সুতরাং এই ধোঁয়াশা সৃষ্টির মাধ্যমে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকদের এমন একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্মে নিয়ে গেছেন, যেখানে সবারই শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে এবং সেখান থেকে কোন দিকে যাবে সে পথও কেউ দেখতে পাচ্ছে না। সুতরাং এমন পরিস্থিতির কারণে একটি কঠিন অনিশ্চয়তা আর দিকভ্রান্তিতে পুরো জাতিই রাজনৈতিকভাবে অবরুদ্ধ হয়ে আছে। এই অবরুদ্ধ বা বন্দিদশা থেকে জাতি মুক্তি চায়। আর এই মুক্তির চাবিটি একমাত্র প্রধানমন্ত্রীর হাতেই রয়েছে। তিনি ইচ্ছে করলেই পুরো জাতিকে দিকভ্রান্তি, অনিশ্চয়তার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অ্যাভয়েড ও বাইপাস করার ফলে জাতি কনফিউশনে আছে। এই তিনটির সম্মিলিত প্রভাবে আজকে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিরাজ করছে, ইংরেজি ভাষায় তাকে ডেঞ্জারাস বলতে পারি। বর্তমানে জাতি বিপদের মধ্যে রয়েছে। পত্রিকার কলামে, টিভির টকশোতে অনেকেই বলেছেন, রাজনৈতিক এ বিপদ বা সংকট মোকাবেলায় দুই নেত্রীর আলোচনায় আসা উচিত। আমি অবশ্যই একে সাধুবাদ জানাই। তবে এখানে আমার একটি প্রশ্ন : আজকের এ পরিস্থিতির জন্য দুই নেত্রীই কি সমানভাবে দায়ী? যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল করা না হতো, তাহলে কি বিএনপি আন্দোলনে নামত? আমি বলতে চাচ্ছি, আজকের এই রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টির জন্য শতকরা ৯০ ভাগই দায়ী বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। বাকি দশভাগ- দশজনের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমি বলব- বিরোধী দল হয়তোবা দায়ী তাদের কৌশলগত ভুল-ভ্রান্তির জন্য। তবে বিরোধী শিবির সব সময়ই একটি শান্তিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান প্রত্যাশা করে যাচ্ছে।
প্রফেসর ড. ইউনূসের একটি কথার উদ্ধৃতি দিয়ে বলতে চাই, জাতি শুধু শান্তিপূর্ণ নির্বাচনই চায় না, জাতি নির্বাচন-পরবর্তী সময়েও শান্তি চায়। কারণ এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে বেঁচে থাকতে হলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে টিকিয়ে রাখতে হবে। বিচক্ষণতা আর বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিয়ে আমাদের এগুতে হবে।
এই কলাম যখন পাঠকের কাছে পৌঁছুবে, সে সময়ের মধ্যে যে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। কারণ পরিবেশ-পরিস্থিতি অতি দ্রুত বদলাচ্ছে। তাই আগামী ২৪ ঘণ্টা বা ৪৮ ঘণ্টা বা ৯৬ ঘণ্টা পর কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে, তা বলা মুশকিল। তবে প্রতিটি ঘটনার পেছনেই বক্তব্য থাকে, সমালোচনা থাকে।
যা হোক, আমরা যদি আগামীর বাংলাদেশকে ভালো একটি অবস্থানে নিয়ে যেতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের একটি যুগোপযোগী বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা কি ‘এক্সক্লুসিভ’ রাজনীতি করব নাকি ‘ইনক্লুসিভ’? ইনক্লুসিভ রাজনীতি বলতে বোঝাতে চাচ্ছি সবাইকে নিয়ে দেশের জন্য কাজ করা, সব দল ও মতকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে যথাস্থানে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ করে দেয়া। আর এক্সক্লুসিভ রাজনীতি বলতে বোঝাতে চাচ্ছি, কোনো কোনো ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিকে নিয়ে দেশের জন্য কাজ করা। সুতরাং যে কোনো একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত আমাদের নিতেই হবে। সিদ্ধান্তটি নিতে হবে ভেবেচিন্তেই। কারণ সিদ্ধান্তটি এমন হতে হবে যাতে করে বিশ্বে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে। বিশেষত আমাদের পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রগুলোর কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। আমরা এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেব না, যার জন্য বিশ্বে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
আমার এই কলামের শেষ অনুচ্ছেদে আমি সরাসরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গে লিখব। আমার অনুভূতি হচ্ছে, বিতর্কিত পরিবেশ ও পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী দুটি কাজ করছেন। প্রথম কাজ হচ্ছে, বিরোধী শিবিরের ওপর মামলা-হামলাসহ তীব্র আক্রমণ চালানো এবং দ্বিতীয় কাজ, তার নির্বাচনমুখী কার্যক্রম দুর্বার গতিতে চালিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে টেলিভিশনের পর্দায় হরতালের দৃশ্য, পুলিশের গোলাগুলির দৃশ্য, আগুন লাগার দৃশ্য ইত্যাদি দেখছি, অপরদিকে সরকারি দলের লোকেরা আনন্দ-উল্লাসের মধ্য দিয়ে মনোনয়নপত্র কিনছেন- সেই দৃশ্য দেখছি। ইংরেজি প্রবাদ ‘হোয়েন রোম ইজ বার্নিং, নিরো ইজ প্লেইং দি ফ্লুট’, মানে প্রায় ২০০০ বছর আগে রোম শহর আক্রমণ করে শহরে আগুন লাগিয়ে দেয়ার পর সম্রাট নিরো বাঁশি বাজিয়ে তৃপ্তি পাচ্ছিলেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি এ মুহূর্তে তা-ই। যুগপৎ যে দুটি কাজ প্রধানমন্ত্রী চালিয়ে যাচ্ছেন, সেই দুটি কাজ করার পেছনে বা চালিয়ে যাওয়ার পেছনে যে চারটি শক্তি কাজ করছে, সেগুলো হল : এক. ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অন্তরে লালিত দুর্দমনীয় ইচ্ছা, দুই. ক্রমান্বয়ে দুই-তিন বছর ধরে দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা সাজানো প্রশাসনিক শক্তি, তিন. প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে প্রায় বিনা শর্তে দেয়া আকাশচুম্বী সুযোগ-সুবিধাগুলোর বিনিময়ে অধিকতর পাওয়া এবং তাদের পক্ষ থেকে তার প্রতি সীমাহীন শুভেচ্ছা ও সমর্থন, চার. বিগত পাঁচ বছরে বিভিন্ন প্রশ্নবিদ্ধ উপায়ে ও নিয়মে উপার্জিত হাজার হাজার হাজার কোটি টাকার নির্বাচনী তহবিল।
মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক : কলাম লেখক; চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি

মন্ত্রিত্ব এখন চাকরি!

আজ সকালে মন্ত্রীরা যথাসময়ে অর্থাৎ সকাল নয়টায় তাঁদের নিজ নিজ চাকরিস্থলে নিশ্চয় হাজির হয়েছেন। সচিবালয়ে যেসব সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি করেন, তাঁদের হাজির হওয়ার কথা সকাল নয়টায়। এখন মন্ত্রিত্ব যেহেতু অন্য সবার মতো একটা চাকরি, সেহেতু যাঁরা এই চাকরি করেন, তাঁদেরও চাকরির বিধিবিধান মেনে সকাল নয়টাই চাকরিস্থলে হাজির হওয়ার কথা। সময়মতো হাজির না হলে অনিয়মিত হাজিরাজনিত যে শাস্তি পেতে হয় মন্ত্রীদের, এখন থেকে সেটাও মাথা পেতে নিতে হবে। সব চাকরিতেই, বিশেষত চাকরির নিয়মকানুন বা চাকরির বিধিবিধান যেখানে আছে, সেখানে চাকরিতে যোগদানপত্র দিতে হয় এবং সেই যোগদানপত্র গৃহীত হতে হয়। একইভাবে চাকরি থেকে পদত্যাগ করতে হলে পদত্যাগপত্র দিতে হয় এবং পদত্যাগপত্র গৃহীত হতে হবে। পদত্যাগপত্র গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত পদত্যাগ কার্যকর হবে না। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক—সব ধরনের সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, মন্ত্রীরা তাঁদের পদত্যাগপত্র প্রধানমন্ত্রীকে প্রদান করেছেন। খবর অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী এখনো পদত্যাগপত্রগুলো গ্রহণ করেননি, অতএব সরকারিভাবে বলা হচ্ছে, মন্ত্রীরা এখনো নিজ নিজ পদে বহাল আছেন। অর্থাৎ মন্ত্রিত্বও অন্য হাজারো চাকরির মতো একটা চাকরি। এই চাকরিতেও পদত্যাগপত্র শুধু দিলেই তা কার্যকর হবে না। পদত্যাগপত্র কার্যকর হতে হলে তা গৃহীত হতে হবে। অন্যভাবে বলতে গেলে বলতে হচ্ছে, যেহেতু পদত্যাগ গৃহীত হবার প্রয়োজনীয়তার উদ্ভব হয়েছে, সেহেতু মন্ত্রিত্ব একটা চাকরি। দুনিয়ার অন্যান্য দেশের মতো, আমাদের সংবিধানের ভাষাও সহজ-সরল। ১৪৭ অনুচ্ছেদের ৩ উপ-অনুচ্ছেদটাই একমাত্র জটিল অংশ।
এই ১৪৭(৩)টাও কিন্তু মন্ত্রীদের বেলায় প্রযোজ্য। ১৪৭(৩) বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে যদি তালগোল পাকিয়ে যেত, তাহলে না বুঝতাম যে তালগোল পাকানোর পেছনে কারণ আছে। কিন্তু মন্ত্রীর পদত্যাগের ব্যাপারে ৫৮ অনুচ্ছেদের ১ উপ-অনুচ্ছেদ যে বিধান, সেটা মোটেও জটিল কোনো ব্যাপার নয়। পাঠক, নিচে ৫৮(১) অনুচ্ছেদটি পড়ে নিজেই বিবেচনা করুন: ‘৫৮(১)...মন্ত্রীর পদ শূন্য হইবে, যদি— (ক) তিনি রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করিবার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট পদত্যাগপত্র প্রদান করেন।’ এখানে জটিলতাটা কোথায়। প্রথম আলোর পাঠকদের জন্য নিশ্চয় কোনো ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই। বুঝতে কারও তকলিফ হওয়ার কথা নয়। তবে উচ্চ এবং মহা-উচ্চ সরকারি সব পদে বা সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সুবিধার্থে একটু ব্যাখ্যা করার প্রয়াস গ্রহণ করি! ৫৮ অনুচ্ছেদের শুরুটা হলো এই বলে যে মন্ত্রীর পদ কীভাবে শূন্য হবে। প্রথম উপদফায় অর্থাৎ (ক) উপদফায় বলা হলো—প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগপত্র ‘প্রদান করিলে’। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী মন্ত্রীরা সবাই প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগপত্র ‘প্রদান করেছেন’। এই ‘প্রদানে’র মাধ্যমে সংবিধান অনুযায়ী পদত্যাগ কার্যকর হয়ে গেছে। গ্রহণ করা বা না করার কোনো সুযোগ সংবিধান রাখেনি। সংবিধান অনুযায়ী মন্ত্রীরা পদত্যাগপত্র প্রদান না করেও পদত্যাগী হতে পারেন। এই ৫৮ অনুচ্ছেদের ৪ উপ-অনুচ্ছেদে বলা আছে— ‘প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিলে...মন্ত্রীদের প্রত্যেকে পদত্যাগ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে...।’ অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে মন্ত্রীদের আলাদা করে পদত্যাগপত্র লিখতে হবে না। প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ পদত্যাগপত্র না পেশ করেও পদত্যাগ করা যায়। আর এ ক্ষেত্রে যেহেতু পদত্যাগপত্র পেশই করতে হয় না, সেহেতু গ্রহণ করা বা না করার প্রশ্ন অবান্তর।
দুই মন্ত্রীরা যোগদানপত্র বা জয়েনিং লেটার কীভাবে দেন? মন্ত্রীদের কি যোগদানপত্র দিতে হয়? ‘আমি অদ্য অমুক তারিখে পূর্বাহে কাজে যোগদান করেছি। আমার এই যোগদানপত্র গ্রহণ করে বাধিত করবেন’— এই গোছের কোনো যোগদানপত্র মন্ত্রীদের দিতে হয় না বা যোগদানপত্র ‘গৃহীত’ হওয়ার কোনো দরকার বা বিধান নেই। তাহলে কী আছে? ‘১৪৮(৩): ...শপথ গ্রহণের অব্যবহিত পর তিনি কার্যভার গ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’ অর্থাৎ শপথ নেওয়াটাই হলো এক অর্থে যোগদানপত্র। এ জন্যই আমরা টেলিভিশনে দেখি যে শপথ নেওয়ার আগে পতাকাবিহীন গাড়ি আর বঙ্গভবন থেকে শপথ নিয়ে বেরিয়ে আসার সময় গাড়িতে পতপত করে পতাকা উড়ছে। নিজামী-মুজাহিদ হলেও। সংবিধানের ভাষায় ‘কার্যভার গ্রহণ’ করতে যোগদানপত্র লাগে না এবং তা গ্রহণ হওয়ারও প্রয়োজন নেই। একইভাবে পদত্যাগপত্র গ্রহণ বা গ্রহণ না করার কোনো সুযোগ নেই।
তিন পদত্যাগপত্র যেহেতু এখনো গৃহীত হয়নি আর সে কারণে মন্ত্রীরা মন্ত্রিত্ব করে যাচ্ছেন, সেহেতু মন্ত্রিত্ব এখন চাকরি। সমস্যা হলো, এই চাকরির বিধিমালা বা নিয়মকানুন কী। সরকারের প্রায় ধরনের চাকরির বিধিমালা আছে। অর্থাৎ চাকরিতে নিয়োগ কীভাবে হবে। পদোন্নতি, বদলি, ছুটি, অবসর ইত্যাদির শর্ত কী, সেগুলো চাকরি বিধিমালায় বিস্তারিত উল্লেখ থাকে। চাকরির নিয়মকানুন না মানলে, কাজে গাফিলতি হলে কীভাবে কী কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সেসব ব্যাপারও চাকরি বিধিমালার অংশ। বিভিন্ন ধরনের সরকারি চাকুরেদের বেলায় বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা আছে। আবার অনেক ক্ষেত্রে একই চাকরির বিভিন্ন বিষয়ে বহুবিধ আইন-বিধিমালা থাকতে পারে। অধমের জানামতে, মন্ত্রীদের চাকরিসংক্রান্ত কোনো আইন বা বিধিমালা নেই। শুধু তাঁদের বেতন-ভাতা সুযোগ-সুবিধাসংক্রান্ত আইন আছে। কোনো চাকরির ব্যাপারে যদি বিধিমালা বা আইন না থাকে, তাহলে সেই চাকরির শর্তাবলি কীভাবে নির্ধারিত হয়? এ ক্ষেত্রে, অর্থাৎ চাকরির শর্তাবলি-সংক্রান্ত যখন কোনো নির্দিষ্ট আইন বা বিধিমালা না থাকে, তখন আমরা বলি ওই চাকরির শর্তাবলি ‘মাস্টার সার্ভেন্ট রুলস’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। অর্থাৎ রুক্ষ বাংলায় ‘মনিব-চাকর নিয়ম দ্বারা’। বেশ কয়েকটি পত্রিকায় পড়লাম, পদত্যাগপত্র প্রদানের সময় পাঁচজন প্রতিমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেছেন।
চার প্রায় সবকিছুতেই সরকার প্রতিনিয়ত এখন গুবলেট পাকিয়ে ফেলছে। সংকট ঘনীভূত হচ্ছে। অতীতের অন্য বিভিন্ন সরকারের মতো এই সরকারও অনেক হিসাব-নিকাশ করছে, প্ল্যান-পাঁয়তারা করছে। কিন্তু আমাদের ইতিহাস বলে, ভালো কাজ না করলে কোনো প্ল্যান-পাঁয়তারাই কাজে লাগে না। বেশি পেছনে যাওয়ার দরকার নেই। গত বিএনপি সরকার তাদের হিসাব আর প্ল্যান অনুযায়ী চতুর্দশ সংশোধনী পাস করিয়েছিল ২০০৪ সালের মে মাসে। অর্থাৎ মেয়াদ শেষ হওয়ার কমবেশি আড়াই বছর আগে। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে বিচারপতিদের চাকরির বয়স বাড়িয়েছিল ৬৭ বছরে। ধরে নেওয়া হয়, একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন, সে জন্যই এই সংশোধনী। আরও অনেক হিসাব-নিকাশ ছিল। কোনো কিছুই কাজে দেয়নি। এই সরকারও পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করিয়েছিল প্রায় আড়াই বছর আগে। আর এখন মন্ত্রীর পদকে পর্যন্ত মামুলি চাকরির পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। কোনো কিছুতেই সম্ভবত শেষরক্ষা হবে না। তাই কূটকৌশল, হিসাব-পাঁয়তারা বাদ দিয়ে সরল বিশ্বাসে জনসেবা করুন। তাতেও ভরাডুবি ঠেকানো যাবে না, তবে আমাদের, অর্থাৎ জনগণের ভোগান্তি কিছুটা হলেও কমবে, আর আমরা তাতেই কৃতজ্ঞ থাকব। আর মন্ত্রীদের দোহাই—আপনারা কারও চাকরি করেন না। মনিব-চাকরের আইন আপনাদের জন্য নয়।
ড. শাহদীন মালিক: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট, অধ্যাপক স্কুল অব ল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়।

আরাফাতের খুনি ইসরায়েল

ইয়াসির আরাফাত
প্যারিসের হাসপাতালে আরাফাত মারা যান ২০০৪-এর ১১ নভেম্বর। তাঁর রোগটা চিহ্নিত করা যায়নি। তাঁর মৃত্যু দুর্ঘটনাও ছিল না, স্বাভাবিকও ছিল না। নির্ভরযোগ্য প্রমাণ বলছে, তিনি গুপ্তহত্যার শিকার। আরাফাত নিজেই বলেছেন, কমপক্ষে ৪০টি হত্যাচেষ্টা তিনি উতরিয়েছেন। ১৯৮৫ সালে অল্পের জন্য তিউনিসিয়ায় ইসরায়েলি বোমা হামলা থেকে রক্ষা পান। ওই হামলায় মারা যায় ৭৩ জন।
২০০১-এর ডিসেম্বরে ইসরায়েলি মিসাইল রামাল্লায় তাঁর দপ্তরে আঘাত হানে। এর খানিক আগেই তিনি সেখান থেকে বেরিয়ে যান। ইসরায়েল বুঝিয়ে দিয়েছিল আরাফাত হত্যার নিশানায়। সে সময় তিনি আক্ষরিকভাবেই নিজের দপ্তরে বন্দী ছিলেন। তাঁর স্বাস্থ্য ছিল ভালো। কিন্তু সে সময়ের ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন চেয়েছিলেন আরাফাতের মৃত্যু। ১৯৮২ সালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকাকালে শ্যারন বৈরুতে আরাফাতকে হত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। পাইকারি হারে ফিলিস্তিনিদের হত্যার জন্য শ্যারন লেলিয়ে দিয়েছিলেন ফ্যাসিস্ট ফ্যালাঞ্জিস্ট বাহিনীকে। শ্যারন ঘোষণা করেছিলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ চালাচ্ছেন একজন মাত্র ব্যক্তি, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ইয়াসির আরাফাত।’ তাঁকে হত্যার জন্য শ্যারনের দরকার ছিল ওয়াশিংটনের সবুজসংকেত। ইসরায়েলি এম হেইম র‌্যামন বলেন, ‘শ্যারন চেয়েছিলেন আরাফাতকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় নরমপন্থী কাউকে বসাতে। এখন সেটাই হয়েছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ কার্যত ধ্বংস এবং পশ্চিম তীর ও গাজা ইসরায়েলের প্রায় পূর্ণ দখলে।’ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সে সময় ছিলেন শ্যারনের প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি দাবি করেছিলেন, ‘সম্পূর্ণ সামরিক বিজয়।’ তাঁরা চেয়েছিলেন ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সম্পূর্ণ বিনাশ। ওয়াশিংটনের সম্মতি নিয়েই ইসরায়েল আরাফাতকে হত্যার সময় ও পদ্ধতি বেছে নিল। তারা ভেবেছিল, কোনো প্রমাণ থাকবে না। কিন্তু তারা ভুল ভেবেছিল। ইসরায়েলি সাংবাদিক, শ্যারনের একসময়ের বিশ্বস্ত মুখপাত্র ইউরি দান মনে করেন, শ্যারনই আরাফাতকে হত্যা করেছেন এবং জর্জ বুশ এর অনুমোদন দিয়েছিলেন। তিনিই বলেন, আরাফাতকে বিষ প্রয়োগ করা হয়। আরাফাতের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. আশরাফ আল-কুর্দি ২০০৭ সালে বলেন, আরাফাতের রক্তে এইচআইভি পাওয়া গেছে, কিন্তু তিনি নিহত হয়েছেন বিষের কারণে। মৃত্যুর অল্প কিছু আগে তাঁর শরীরে এইচআইভির ভাইরাস প্রবেশ করানো হয়। ২০০৫-এর সেপ্টেম্বরে কুর্দি বলেছিলেন, যেকোনো চিকিৎসকও আরাফাতের রোগলক্ষণ দেখে বলবেন, তিনি বিষের শিকার। প্যারিসে নেওয়ার আগে তাঁর শরীরের ওজন অর্ধেক হয়ে গিয়েছিল, মুখ লালচে আর গায়ের রং হয়ে পড়েছিল ধাতব হলুদ।
বিষটা ধীরে ধীরে কাজ করছিল। অক্টোবরের ১২ তারিখে খাওয়ার পরই আরাফাতের বমি হয় এবং তলপেটে ব্যথা হয়। ঘণ্টা খানেক আগেই তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ সুস্থ। তিউনিসিয়া থেকে ডাক্তাররা এলেন, তাঁরাও রোগটা ধরতে পারলেন না। ২৯ তারিখে হেলিকপ্টারে করে তাঁকে জর্ডানে নেওয়া হলে অপেক্ষারত ফরাসি বিমান তাঁকে প্যারিসে নিয়ে যায়। ফরাসি ডাক্তাররাও রোগ ধরতে ব্যর্থ হন। ৩ নভেম্বর কোমা এবং ৪ নভেম্বর মৃত্যু। অথচ কোনো ময়নাতদন্ত করা হলো না। মৃত্যুর কারণ ঘোষিত হলো না। চিকিৎসার কাগজপত্রও থাকল অপ্রকাশিত। ২০১২ সালে স্ত্রী সুহা আরাফাতের লাশ তোলার আদেশ দেন। সুইস, ফরাসি ও রাশিয়ার বিজ্ঞানীদের তাঁর দেহের উপাদান পরীক্ষার জন্য দেওয়া হয়। আল-জাজিরা টেলিভিশন প্রচার করে: ‘নয় মাসের অনুসন্ধান বলছে, আরাফাত হয়তো পোলোনিয়াম বিষে মারা গেছেন।’ তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সবকিছু পরীক্ষা করে পোলোনিয়াম বিষ মেলে। পোলোনিয়াম উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থ। এটা হাইড্রোজেন সায়ানাইডের থেকে ১০৯ গুণ বিষাক্ত। এটা শরীরে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে মেরে ফেলে। কিন্তু হাসপাতালের যন্ত্রে তা ধরা পড়ে না। তবে সুইজারল্যান্ডের রেডিওফিজিক (এসআ৬র) সংস্থা আরাফাতের জিনিসপত্র, রক্ত, মূত্র,
লালা ও ঘামের নমুনা পরীক্ষা করে সেসবে অস্বাভাবিক মাত্রার পোলোনিয়াম পায়। এবং তা আরাফাতের শরীরে প্রাকৃতিক উৎস থেকে আসেনি। ফরাসি চিকিৎসক ড. ফ্রাঁসোয়া বকুদ বলেন, ‘আমি নিশ্চিত করে বলছি, আমরা আরাফাতের শরীরে পোলোনিয়ামের ব্যাখ্যাতীত আধিক্য পেয়েছি।’ এ বছরের ৬ নভেম্বর আল-জাজিরায় ব্রিটেনের শীর্ষ ফরেনসিক বিজ্ঞানী ও সাবেক গোয়েন্দা ডেভ বার্কলে বলেন, ‘আরাফাত পোলোনিয়ামের বিষক্রিয়ায় মারা গেছেন। আমরা তাঁকে হত্যার বন্দুকটা পেয়েছি, কিন্তু তা কার হাতে ধরা, তা এখনো পাইনি।’ মৃত্যুর পর মাহমুদ আব্বাসকে দিয়ে ইসরায়েল তাঁর মৃত্যুর কার্যকারণ ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়। অন্যদিকে ফরাসি চিকিৎসকদের বলা হয়েছিল চুপ থাকতে। ইসরায়েল বারবার প্রকাশ্যে আরাফাতকে হত্যার ঘোষণা দিয়েছে। তাঁকে হত্যার কারণ ও সক্ষমতাও তাদের আছে। আর আরাফাতই প্রথম নেতা নন, যাকে ইসরায়েল হত্যা করেছে।
ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ গুপ্তহত্যায় বিশ্বের সেরা। দু-একটি ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা সফল। ১৯৯৭ সালে আম্মানে হামাসের রাজনৈতিক নেতা খালেদ মিশালের কানে তারা বিষ স্প্রে করে। কিন্তু তিনি বেঁচে যান। ২০০৫-এর ফেব্রুয়ারিতে রেকর্ড করা ভিডিও ও অডিও সাক্ষ্যপ্রমাণ দেখায় যে লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রফিক হারিরিকেও তারা হত্যা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র এর জন্য সিরিয়াকে দোষী করে। পরে হিজবুল্লাহকেও দোষারোপ করা হয়। কিন্তু দেখা গেল, হারিরিকে হত্যার সম্পূর্ণ দায়দায়িত্ব ইসরায়েলের। অথচ কেউ তাদের জবাবদিহি চাইছে না। দশকের পর দশক ধরে তারা রাজনৈতিক গুপ্তহত্যা চালিয়ে আসছে, করে যাচ্ছে যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর চালাচ্ছে স্লোমোশন জেনোসাইড। গত ৫ নভেম্বর সুহা আরাফাত এসআরের রিপোর্ট হাতে পান: ‘আমি ইয়াসিরের শোকে নতুন করে পড়লাম, যেন এইমাত্র শুনলাম তিনি মারা গেছেন।’
ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ। কাউন্টারপাঞ্চ থেকে নেওয়া।
স্টিফেন লেন্ডম্যান: মার্কিন সাংবাদিক।

হাইয়ান এবার সোমালিয়ায়

আমি আমার পরিবারের ১০ সদস্যকে নিজ হাতে কবর দিয়েছে
সৃষ্টিকর্তা আমার সব কেড়ে নিলেন
গণমাধ্যমকে আবদুল্লাহি
যুগান্তর ডেস্ক
ফিলিপিন্সের পর এবার ঝড়ের তাণ্ডবলীলা দেখেছে সোমালিয়া। দেশটির উত্তর পূর্বাঞ্চলের পুন্টল্যান্ড রাজ্যে মৌসুমি ঝড়ে অন্তত ১০০ জন নিহত হয়েছে, নিখোঁজ রয়েছে আরও কয়েকশ’ মানুষ। সোমবার রাতে দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের দেয়া বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সাপ্তাহিক ছুটির দিনে দেশটির আধা-স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল পুটল্যান্ডে এই ঝড় আঘাত হানে। ঝড়ের আঘাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পর লুটপাট ও বিশৃংখলা প্রতিরোধে জরুরি অবস্থা জারি করেছে প্রশাসন। এছাড়া, এ অঞ্চলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য ?কামনা করেছে দেশটির সরকার। সরকারি কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, ঝড়ের আঘাতে ?
ভূমি ধসের পর কয়েকশ’ মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছে। পুটল্যান্ড প্রদেশের প্রশাসনিক প্রধান আবদিরাহমান মোহামুদ ফারুলে রাজধানী গারুবিতে এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, ঝড়ের আঘাতে অনেক বাড়ি ঘর ও গবাদি পশু সমুদ্রে ভেসে গেছে। মানুষ এখন খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছে। জাতিসংঘের সহযোগিতা সংস্থাসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। সরকারি কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিক তথ্য মতে ১০ হাজার গবাদি পশু, মাছ ধরার নৌকা সাগরে ভেসে গেছে। বাড়ি-ঘরের ছাউনি কয়েক কিলোমিটার দূরে উপড়ে গেছে। মনে হচ্ছে, মহাপ্রলয় বয়ে গেছে এই অঞ্চলে।

রাষ্ট্র, সরকার ও বিরোধী দলের কাছে কী চাই

দেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সবাই অতীতের সূত্র ধরে বর্তমান আর আগামীর কথা বলছেন। প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলের নেতা দুজনেই অতীতের প্রসঙ্গে পরস্পরের প্রতি দোষারোপের বারুদ ছিটিয়ে দিয়েছেন ফোনালাপে। সভায়, সংবাদ সম্মেলনে এবং ক্বচিৎ হলেও জাতীয় সংসদে। সেই বারুদের আগুনে দেশ-জনগণ পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। কত স্বপ্ন, কত আশা, কত ভবিষ্যৎ পুড়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত স্বজন হারানোর শোক এবং আমাদের, দেশ ও জাতির নেতা বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার জাতীয় অপূরণীয় শোক, জাতীয় চার নেতাকে জেলে হত্যা করার অপরাধ জনগণ ভুলবে না, ক্ষমা করবে না হত্যাকারীদের। গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভি রহমানসহ সব রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধেও জনগণ ক্রুদ্ধ ও সোচ্চার। বিরোধী দলের বিরুদ্ধে এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযোগ জানাতে আইনি পদক্ষেপই প্রগতির পথ দেখাবে। সুযোগ পেলেই বিরোধী দলের নেতাকে ফোনে বা মাইকে অপ্রীতিকর শব্দে,
অভিযোগে ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতবিক্ষত করে ও অপমান করে প্রধানমন্ত্রী নিজের রক্তাক্ত হূদয়ের রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে চাইছেন। পাল্টাপাল্টি বিরোধীদলীয় নেতাও কটু কথা উত্তপ্ত স্বরে বলছেন। বাংলাদেশের জনগণের প্রায় শতকরা ৫০ ভাগ নারীসমাজের চাহিদা পূরণে অক্ষম এই দুই রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের ব্যর্থতার কারণে যত্রতত্র পুরুষপ্রধান উপস্থিতিতে রাজনৈতিক আলোচনায় রাজনৈতিক নারী নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা হচ্ছে। পরিশীলিত রাজনৈতিক পরিপক্বতার অভাবে দুই প্রধান নারীনেত্রীর আচরণে, বক্তৃতায়, ভাষণে, দলের কর্মসূচি গ্রহণে এতটাই ব্যক্তিগত আক্রোশ ও প্রতি-উত্তরে আক্রোশ, পরস্পরকে ঘায়েল করার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে (১৯৯১ থেকে বর্তমানে ২০১৩ পর্যন্ত) যে রাজনীতিতে নারীর প্রবেশপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। শতকরা ৫০ ভাগ নারীসমাজের প্রতিনিধিত্বকারী নারী আন্দোলনের নেতৃত্ব রাজনীতিতে নারীর সম-অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ১৯৪৭ সাল থেকে এই ভূখণ্ডে ব্রিটিশবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলনের ধারা অক্ষুণ্ন রেখেছেন। ইতিহাসে সেই নারীরা উপেক্ষিত। পুরুষ-অধ্যুষিত রাজনৈতিক দলের প্রান্তে রাজনৈতিক নারীদের কোণঠাসা করে ঠেলে রাখা হয়েছে; আগেও এবং এখনো। বর্তমানে সেই ধারা ভেতরে ভেতরে অক্ষুণ্ন রয়েছে। যদিও বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী পদে এবং মাননীয় স্পিকার পদে আওয়ামী লীগের সরকার নারীনেত্রীদের নির্বাচিত করেছে। কিন্তু তাঁদের স্বাধীন কাজের মননশীলতা লক্ষণীয় নয়। আওয়ামী লীগের নারী-পুরুষ সব সদস্যই; মন্ত্রী এবং নেতারাও প্রধানমন্ত্রী-মুখাপেক্ষী এবং তাঁর অঙ্গুলি হেলনে চলেন। ফলে শুধু নারী-মন্ত্রী-নেত্রীদের (দলীয়)
স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার অভাবের কথা বলে নারী নেতৃত্বকে দোষ দিয়ে লাভ নেই। যারা নারী নেতৃত্বের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁরা সেই হেফাজতি বা আল্লামা শফীসহ যাঁরা ‘নারী নেতৃত্ব হারাম’ বলে নতুন যুগের, নতুন সময়ের ও নারী নেতৃত্বের সুযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে নাকচ করে দিতে চাইছেন, তাঁদের কণ্ঠেই কণ্ঠ মেলাচ্ছেন। শুধু রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের ক্ষমতায়িত নারীদের বিরুদ্ধে নয়, বাড়িতে-বাড়িতে, সমাজের অগ্রসরমাণ-ক্ষমতায়িত, কর্ম-দক্ষ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষ, নারীদের (মা, স্ত্রী, বোন, মেয়ে, ছেলের বউ, নাতনিসহ সব নারী) এগিয়ে যাওয়া থমকে দিতে চান সেই ধরনের চিন্তাধারার মানুষ। নারী শুধু বাবার, স্বামীর, ছেলের মুখাপেক্ষী থাকবে; যেকোনো স্বাধীনতা নারীকে দেবে তারই প্রভু পুরুষ। নিজে স্বাধীন হতে পারবে না নারী। ঠিক হেফাজতি নির্দেশনামা, আল্লামা শফীর নির্দেশনামা এবং একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলের প্রধান নেতার দলীয় নির্দেশ। হেফাজতিদের নারীবিদ্বেষ এত বিস্তার লাভের সুযোগ পাচ্ছে পারিবারিক আইন, ১৯৬১ ও পুরুষের বহু বিবাহ আইন, সম্পত্তিতে নারীর জন্য অসম-অধিকারের আইন, বিবাহবিচ্ছেদের পরে মায়ের কাছে মেয়ে ১৮ বছর ও ছেলে আট বছর থাকতে পারার আইন, বংশধারায় পুত্রের প্রাধান্য,
‘হিন্দু আইন’ রাষ্ট্রীয়ভাবে আইনি স্বীকৃতি না পাওয়া, হিন্দু বিয়ে ও বিচ্ছেদ রেজিস্ট্রি করার আইন না হওয়ার কারণে। সামাজিক-পারিবারিক নারী লাঞ্ছনার যত ঘটনা, সেগুলোতে হেফাজতিদের উসকানি থাকতে পারে, তবে পারিবারিক নারী নির্যাতনকারী পুরুষদের নৃশংসতাও হেফাজতিদের উসকানি দিচ্ছে বৈকি! বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, প্রগতিবিদ পুরুষদের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, সকল পারিবারিক আইনের সঙ্গে যুক্ত সব নারী-বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিন। প্রথম আলোর প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রথম আলোর সম্পাদকসহ সব পুরুষ কর্মী, অন্যান্য লেখক-প্রতিবেদক এই উদ্যোগ নিতে পারেন প্রথম আলোয় লক্ষাধিক স্বাক্ষর ছাপিয়ে। জেলায় জেলায় বন্ধুসভা এই উদ্যোগ নিতে পারে। চীনের বেইজিংয়ে ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘ আয়োজিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মেলনে গৃহীত নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১২ দফা কর্মসূচির দলিলে স্বাক্ষর করেছিলেন। বাংলাদেশের বেসরকারি নারী প্রতিনিধিদলের নেত্রী অধ্যাপক ড. নাজমা চৌধুরীর নেতৃত্বে আমরা বাংলাদেশের ৫২ জন প্রতিনিধি সেই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলাম। মুক্ত আকাশে ২০ হাজার পাখি উড়িয়ে ৩০ আগস্ট ’৯৫ নারী সম্মেলন শুরু হয়েছিল। ১৫ সেপ্টেম্বর সর্বসম্মতিতে শিক্ষা, দারিদ্র্য, পরিবেশ, অর্থনৈতিক, সহিংসতা, মিডিয়া, সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্ষমতা, মানবাধিকার, স্বাস্থ্য ইত্যাদি ১২টি ইস্যুতে দলিল গৃহীত হয়েছে। ২০১৩ পর্যন্ত ১৮ বছর ধরে সরকারি এই দলিল বিষয়ে বর্তমান বিরোধীদলীয় নেত্রী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদেয় অঙ্গীকার সম্পর্কে একটি বাক্যও উচ্চারণ করেননি।
মূলত নারীর সমান অধিকার বিষয়ে তাঁর দলীয় অবস্থান ‘হেফাজতি’ ‘জামায়াতি’ নীতিমালার সঙ্গে জোটের অচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। অন্যদিকে বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা; তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার স্বাক্ষরিত বেইজিং সম্মেলনের দলিলের ১২টি ইস্যু বিষয়ে কোনো বাক্য উচ্চারণ করেননি কখনো। নারীর প্রগতিতে প্রধানমন্ত্রী নিজেই তো কতগুলো ইস্যু বানিয়ে নারীর অবস্থানের জন্য উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছেন যে নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ১১ ধাপ এগিয়েছে। এই সমতার মৌলিক ভিত্তিটাই বাংলাদেশের পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, প্রতিষ্ঠানে, কর্মস্থলে অত্যন্ত নড়বড়ে। যেকোনো সময় প্রাপ্ত ১১ ধাপ সমতা শিকড় উপড়ে ধূলিসাৎ হতে পারে। আমরা তাই চাই, সরকার বেইজিং সম্মেলনে জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত ১২টি ইস্যুর বিষয়ে কর্মসূচির ঘোষণা দেবে। আগামী নির্বাচনের ঘোষণাপত্রে এই ১২টি ইস্যু বিষয়ে নীতিমালা গ্রহণ করে নারীর পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতায়নের জন্য সব রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি ঘোষিত হোক, সেই কর্মসূচি রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে গ্রহণের অঙ্গীকার করা হোক। সব রাজনৈতিক দলের কাছে আমাদের নারী আন্দোলনের প্রস্তাব থাকছে,
নারীর সামগ্রিক অগ্রগতি ও প্রগতির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ও বিশ্ব নারী সমাজের গৃহীত (১৯৯৫) ১২টি ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে সেই অনুসারে রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের বিষয়ে অঙ্গীকার করা হোক। সরকারের ভেতরে, রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে, বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলের ভেতরে, পরিবারে, সমাজে, সংস্কৃতিতে, অর্থনীতিতে ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে ‘হেফাজতি’ নারীনীতির মূলোৎপাটন করতে নারী সমাজ বদ্ধপরিকর। এবারের নির্বাচনে নারী ভোটাররা রুখে দাঁড়াবেন জামায়াতি রাজনীতিকে, রুখে দাঁড়াবেন জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ দলের বিরুদ্ধে, প্রার্থীদের বিরুদ্ধে; আওয়ামী লীগের জামায়াতি মনোভাবের, দুর্নীতিবাজ, ত্বকী ও অন্যান্য হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের, পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন প্রজেক্টে লিপ্ত দুর্নীতিবাজদের, অসৎ অর্থলোভীদের, নারীর সম্মান ও সম-অধিকারের বিরুদ্ধ মতের প্রার্থীকে নারী ভোটাররা ভোট দেবেন না। আমরা চাই পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, আইনে, কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতিতে নারী-পুরুষ কেউ কারও অসম্মান করবেন না, নারী তাঁর নিজস্ব পরিচয়ে অবস্থান করবেন, নারীর চলাফেরায় কেউ বাধা দেবেন না, হেফাজতি দৃষ্টিভঙ্গির উচ্ছেদ করতে হবে প্রত্যেকের মন থেকে, বিশ্বাস ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। আমরা চাই নির্বিঘ্নে, সুষ্ঠুভাবে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে আগামী নির্বাচন সময়মতো হোক।
মালেকা বেগম: নারীনেত্রী, অধ্যাপক, সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, ঢাকা।