Monday, May 13, 2013

প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞ বন্ধ হোক

হেফাজতে ইসলামের অবরোধ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দুই দিনে ৪৯ ব্যক্তির প্রাণহানিসহ যে ব্যাপক নাশকতা ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা অনর্থক, অপ্রয়োজনীয় এবং সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। এসব অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। অকালে ঝরে যাওয়া প্রতিটি জীবনই মূল্যবান। আমরা প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করি।  হেফাজতের ১৩ দফা যদিও যুক্তিসংগত নয় কিন্তু তাদেরকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে না পারার ব্যর্থতা মূলত শাসনগত সংকটেরই প্রতিফলন। হেফাজতের তরফে যে ধরনের হিংসাশ্রয়ী তৎপরতা চলেছে, তা নজিরবিহীন। এতে ইসলামের অবমাননা ঘটেছে। রোববার দিনভর রাজধানীর মতিঝিল-পল্টন, গুলিস্তান-ফুলবাড়িয়া এলাকায় অবরোধকারীরা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও সহিংসতা চালান। অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগ করা হয়। মতিঝিল থেকে পল্টন পর্যন্ত ফুটপাতের সব দোকান পুড়িয়ে দেওয়ায় সেখানকার দরিদ্র ছোট ব্যবসায়ীরা আক্ষরিক অর্থেই সর্বস্বান্ত হয়েছেন। অবরোধকারীরা সড়কে অবরোধ সৃষ্টি করতে পল্টন-বিজয়নগরের সড়ক বিভাজকের অনেক গাছ কেটে ফেলেছেন। তাঁরা হামলা করেছেন সম্প্রচার ও মুদ্রণ সংবাদমাধ্যমের সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যানদের ওপর। হেফাজতে ইসলামের প্রতিশ্রুতি ছিল, তাদের অবরোধ কর্মসূচি হবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। কথা ছিল, কর্মসূচি শেষে সন্ধ্যা ছয়টায় তারা শাপলা চত্বর ত্যাগ করবে। কিন্তু সকাল থেকেই হেফাজতের কর্মীরা সহিংস আচরণ শুরু করেন। সন্ধ্যা ছয়টা পেরিয়ে গেলেও তাঁরা শাপলা চত্বরে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। সরকারের একজন মন্ত্রী সংবাদমাধ্যমে তাঁদের সন্ধ্যার মধ্যে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান। কিন্তু তাঁরা তা অগ্রাহ্য করে তাঁদের দাবি না মানা পর্যন্ত ফিরে যাবেন না বলে ঘোষণা দেন। হেফাজতের আমির শাহ আহমদ শফী শাপলা চত্বরে যাওয়ার মাঝপথ থেকে রহস্যজনকভাবে ফিরে যান। অবরোধ কর্মসূচির ব্যাপারে সরকারকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে তাঁরা শাপলা চত্বরে থেকে যাওয়ার পাশাপাশি অভিযোগ করেন, তাঁদের কর্মীদের হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা দাবি করেন, কোনো সহিংসতা ও নাশকতার সঙ্গে হেফাজতের কর্মীদের কোনো সম্পর্ক নেই। সরকার ও হেফাজতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সুরাহা হতে পারে সহিংস ঘটনাবলির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার মাধ্যমে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একটি গুরুতর অভিযোগ এ রকম যে হেফাজতের মধ্যে জামায়াত-শিবিরের কর্মীরা ঢুকে নাশকতা ও সহিংসতা করেছেন। এটিও তদন্তের বিষয়। ১৩ দফার মতো সংবেদনশীল দাবিদাওয়া দুই বড় দল, বিশেষ করে আওয়ামীলীগের পক্ষে কিছুতেই মানা সম্ভব নয়। অথচ সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে বিএনপি ঢাকাবাসীকে হেফাজতের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানায়। সার্বিকভাবে আমরা সমাজে দায়িত্বহীন আচরণের উদ্বাহু নৃত্য দেখছি। সাভারে মানবসৃষ্ট বিয়োগান্ত ঘটনায় সারা বিশ্ব যখন বাংলাদেশের দিকে নজর রাখছে, তখন একসঙ্গে অনেকগুলো দিকে ক্রমাগতভাবে মানবসৃষ্ট সহিংসতার খবর ছড়িয়ে পড়ছে। দৃশ্যত ন্যূনতম বলপ্রয়োগে হেফাজতকে সরাতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাই ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু তাতে ক্ষমতাসীন দলের আত্মতৃপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

রাজশাহীতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শিবির কর্মী নিহত

রাজশাহীতে গত শনিবার গভীর রাতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটা-লিয়নের (র‌্যাব) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজন নিহত হয়েছেন। র‌্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, পাঁচটি গুলি, ছয়টি ককটেল ও তিন বোতল পেট্রল উদ্ধার করেছে। নিহত ব্যক্তির নাম শাহাদত হোসেন (৩০)। তিনি শিবিরের কর্মী বলে জানা গেছে।
শাহাদতের ভাই হাসানুল বান্না দাবি করেন, তাঁর ভাই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ কারণে সরকারি বাহিনী তাঁর ভাইকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে।
র‌্যাব-৫-এর ভাষ্যমতে, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে রাজশাহী শহরের বিনোদপুরে বাংলাদেশ বেতারের রাজশাহী সম্প্রচার কেন্দ্রের মাঠে শিবিরের সাত-আটজন কর্মী বৈঠক করছিলেন। তাঁরা পরদিন (রোববার) হরতালে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছিলেন। খবর পেয়ে র‌্যাবের সদস্যরা সেখানে গেলে শিবিরের কর্মীরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। র‌্যাবের সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। একপর্যায়ে শিবিরের কর্মীরা পালিয়ে যান। পরে ঘটনাস্থলে র‌্যাবের সদস্যরা শাহাদতের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। সেখান থেকে শিবিরের কর্মীদের ফেলে যাওয়া একটি নাইন এমএম পিস্তল, পাঁচটি গুলিসহ একটি ম্যাগাজিন, ছয়টি ককটেল ও তিন বোতল পেট্রল উদ্ধার করা হয়।
 হাসানুল বান্না প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাইয়ের সাড়ে চার বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। তাঁর ভাই বালুঘাটে ‘সাব কন্ট্রাক্টে’ কাজ করতেন। ৩ মে ঢাকায় এক বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। পরদিন ৪ মে দুপুর থেকে তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকার মিরপুরের ওই বন্ধুর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে তাঁরা জেনেছেন, র‌্যাব পরিচয়ে শাহাদতকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে তাঁরা ঢাকায় র‌্যাব ও থানায় যোগাযোগ করেন। কিন্তু কেউ কিছু জানে না বলে জানায়।
বান্না দাবি করেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে র‌্যাব-৫-এর একজন কর্মকর্তা তাঁদের বলেন, ‘গত শুক্রবার রাত আটটার দিকে ঢাকা থেকে ধরে শিবিরের একজনকে রাজশাহীতে আনা হয়েছে।’ তার পর থেকেই তাঁরা উৎকণ্ঠায় ছিলেন। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে গোলাগুলির শব্দ পেয়ে তাঁরা জেগে ওঠেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তিনি বেতারের সম্প্রচার কেন্দ্রের মাঠে গিয়ে দেখেন, আমগাছের নিচে তাঁর ভাইয়ের রক্তমাখা লাশ পড়ে আছে। খানিকটা দূরে র‌্যাব অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের লোকও অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন।
নগরের মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অসিত কুমার ঘোষ বলেন, শাহাদতের নামে মতিহার থানায় পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য বহন ও পুলিশের ওপর হামলার মামলা রয়েছে। দুটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন মামলার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, শাহাদত শিবিরের বড় কোনো নেতা নন। তবে মতিহার এলাকায় কোথায় কখন ককটেল হামলা হবে, তার নেপথ্যে কাজ করতেন তিনি।
ওসি আরও জানান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শাহাদতের লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
জামায়াতের দাবি: শাহাদাত হোসেনকে র‌্যাব গুলি করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে শাহাদাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। সঙ্গে থাকা অন্যদের ‘মিথ্যা’ মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠালেও হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করার কথা শিকার করেনি। গতকাল ভোরে লাশ রাজশাহীর বিনোদপুর রেডিও কলোনি মাঠে ফেলে দিয়ে বলা হচ্ছে, র‌্যাবের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের সময় শাহাদাত নিহত হয়েছেন। র‌্যাবের এ বক্তব্য মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
শিবিরের নিখোঁজ আরেক নেতার সন্ধান মেলেনি: এর আগে গত ৪ এপ্রিল রাতে রাজশাহী মহানগর শিবিরের অফিস সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলামকে র‌্যাব পরিচয়ে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা এবং তাঁর মুক্তির দাবিতে রাজশাহীতে হরতালও ডেকেছে শিবির। আনোয়ারুল রাজশাহী কলেজের গণিত বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পড়েন।
ঘটনার কয়েক দিন পর সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আনোয়ারুলের বড় বোন মোর্শেদা পারভীন অভিযোগ করেন, ৪ এপ্রিল দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে র‌্যাব-৫-এর নাহিদ, বুলবুলসহ ৩০-৪০ জন সদস্য উপশহর বন্ধগেট এলাকায় তাঁদের বাড়ি থেকে আনোয়ারুলকে নিয়ে যান। এ সময় তাঁরা পরিবারের সদস্যদের একটি কক্ষে আটকে রাখেন। বাসায় আনোয়ারুলের ওপর এক ঘণ্টা নির্যাতনের পর বাড়িতে থাকা ল্যাপটপ, ডেক্সটপ, পাঁচ-ছয়টি মুঠোফোনসহ তাঁকে নিয়ে গিয়ে নগরের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে অভিযান চালানো হয়।

চিকিৎসকেরা চাইলে আজ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা হতে পারে

বিস্ময়কন্যা রেশমা সুস্থ আছেন। তবে শরীরের দুর্বলতার কারণে তিনি একা হাঁটাচলা করতে পারছেন না। আজ সোমবার মেডিকেল বোর্ড আরেকবার রেশমার অবস্থা পর্যালোচনা করবে। এরপরই গণমাধ্যমের কর্মীদের তাঁর সঙ্গে কথা বলতে দিতে পারে কর্তৃপক্ষ।
রেশমার মা জোবেদা খাতুন মেয়ের সঙ্গেই আছেন। তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তাঁকেও সিএমএইচে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রেশমাকে সাভার সিএমএইচের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।
সাভার সিএমএইচের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শরীফ আহমেদ গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেশমার শরীরে কোনো আঘাত নেই। তিনি এখন পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত। তাঁর মূল সমস্যা হচ্ছে, ১৭ দিন ধ্বংসস্তূপে থাকার কারণে সৃষ্ট মানসিক ও শারীরিক অবসাদ এবং ভয়। এগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
রেশমার চিকিৎসা সম্পর্কে শরীফ আহমেদ বলেন, লক্ষণ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রেশমার মুখের ত্বকে একটু সমস্যা দেখা গেছে। সে জন্য এক ধরনের ক্রিম ও অলিভওয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর কিডনিতে কিছুটা সমস্যা ছিল বলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। দুর্বলতার জন্য ভিটামিন খাওয়ানো হচ্ছে। সব ওষুধই মুখে খাওয়ানো হচ্ছে। তবে রেশমার শরীরের সব প্যারামিটারই এখন ভালো অবস্থায় আছে।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শনিবার রাত ও পরবর্তী সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়েছেন রেশমা। হাঁটাচলায় সমস্যা হচ্ছে বলে বিছানাতেই সময় কাটছে তাঁর। হাঁটতে গেলে মাথা চক্কর দেয়। শরীরের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না।
রেশমাকে গতকাল সকালে ব্রেড, জেলি, বাটার ও ডিম খেতে দেওয়া হয়। সকাল ১০টার দিকে দেওয়া হয় বিস্কুট ও দুধ। দুপুরের খাবারের তালিকায় ছিল ভাত, মুরগির মাংস, সবজি, ডাল। দুপুরের খাবারের পর ফল খেতে দেওয়া হয়। রাতেও স্বাভাবিক খাবার দেওয়া হয় রেশমাকে।
গতকাল বিকেলে শীরফ আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, আজ মেডিকেল বোর্ড আরেক দফা রেশমার সর্বশেষ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। মেডিকেল টিম চাইলে আজই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়ার হতে পারে তাকে।
রেশমার ভাই জাহিদুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গত সন্ধ্যায় আইসিইউতে রেশমাকে দেখতে যান। এ সময় তাঁকে খাবার দেওয়া হয়েছিল। রেশমা অল্প খাবার খেয়েছেন। শরীরে শক্তি নেই বলে রেশমা তাঁকে জানিয়েছেন। এ ছাড়া হাতেও ব্যথা আছে।

উদ্ধার অভিযান শেষের পথে, দিশেহারা স্বজনেরা

সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। আজ সোমবার উদ্ধারকাজ শেষ হয়ে যেতে পারে বলে উদ্ধারকারীদের পক্ষ থেকে আভাস দেওয়া হয়েছে। এরপর সেনাবাহিনীর কাছ থেকে রানা প্লাজার দায়দায়িত্ব ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
অভিযান শেষ হতে চললেও স্বজনহারাদের কান্না থামছে না। গতকালও অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শ দুয়েক স্বজনহারা ব্যক্তিকে প্রিয়জনের লাশের জন্য ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে। অনেকেই স্বজনের লাশের হদিস না পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে বেড়িয়েছেন। কয়েকজন স্বজনহারা ব্যক্তি বলেছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ করে সবাই বাড়ি চলে যাবে। আমরা কী নিয়ে বাড়ি যাব। লাশটা পেলে তো সান্ত্বনা পেতাম।
গত শনিবার রাত ১১টা থেকে গতকাল রোববার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চারটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার অভিযান শুরুর পর থেকে গতকালই সবচেয়ে কম মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই নিয়ে গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১২৭ জনে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। এখন নিচতলার মেঝে সরানোর কাজ চলছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, নিচতলার মেঝেটা খুব পুরো ও শক্ত। এর নিচেই গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান। সেখানে প্রচুর পানি জমে ছিল। গতকাল দিনভর সে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে নিচতলার মেঝে কেটে পার্কিং এলাকার ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। এ সময় ভবনের পেছনের দিকে পার্কিংয়ে থাকা কয়েকটি কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু টেবিল-চেয়ার, ক্যাবিনেট এবং দেয়ালের কিছু অংশ অক্ষতই দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ভবনের অন্যতম মালিক সোহেল রানার অফিস-কক্ষ। ভবনটির বেজমেন্টে সোহেল রানার ব্যক্তিগত কার্যালয় ছিল।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, শনিবার দিবাগত রাত ১২টার পর দীর্ঘক্ষণ কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। রাত তিনটা ২৫ মিনিটে একজন পুরুষের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ওই মৃতদেহের সঙ্গে একটি পরিচয়পত্র ছিল, যার নম্বর ১২ হাজার ৫১। নাম পিন্টু, ধসে পড়া ভবনের তৃতীয় তলায় কাজ করতেন। মৃতদেহের সঙ্গে একটি মুঠোফোন পাওয়া যায়। কিন্তু উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ফোনের সিমকার্ডটি অকেজো হওয়ায় তা থেকে সেভ করা নম্বর বের করে স্বজনদের খোঁজ করা যায়নি। সাধারণত মুঠোফোন পাওয়া গেলে সিমটা চালু করে সেভ করা নম্বরে ফোন করে স্বজনদের খুঁজে বের করা হয় এবং পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। এরপর সকাল নয়টার দিকে একটি মাথার খুলি পাওয়া যায়। বেলা ১১টার দিকে একজন পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু মৃতদেহের সঙ্গে কোনো পরিচয়পত্র কিংবা মুঠোফোন পাওয়া যায়নি। ফলে পরিচয় অজানা লিখে অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, পরিচয় পাওয়া গেলে এবং স্বজনদের সন্ধান পেলে মৃতদেহের সঙ্গে এসব তথ্য অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর পরিচয় না পেলে লাশবাহী পলিথিনের প্যাকেটে মার্কার দিয়ে শুধু মাথার দিকটা চিহ্নিত করে ‘অজানা’ লিখে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার আজমল কবীর গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, এখন কারও জীবিত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। উদ্ধারকর্মীরা এখন বেজমেন্টের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছেন। পার্কিংয়ে কিছু গাড়ি দেখা গেছে। তবে সেখানে পানি জমে রয়েছে। পানিনিষ্কাশন আর বেজমেন্টের ছাদ পুরোটা সরানোর কাজ চলছে। পার্কিংয়ে কোনো মৃতদেহ রয়েছ কি না, তা খুঁজে দেখার পর অভিযান শেষ করা হবে। আজ সোমবার সন্ধ্যা নাগাদ অভিযান শেষ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ভবনধসের ঘটনায় এক হাজার ১১৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই হাজার ৪৩৮ জনকে। তবে এর মধ্যে ১২ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ১২৭। স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ৮৩২টি মৃতদেহ। হস্তান্তরের অপেক্ষায় অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠ ও বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে রয়েছে ৬১টি মৃতদেহ। আর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে নাম-পরিচয়হীন ২৩৪টি মৃতদেহ।
স্বজনেরা এখনো অপেক্ষায়: গতকাল দুপুরে বগুড়ার সোনাতলার আরশেদা বেগম ও তাঁর ছেলের বউ কোহিনূর জড়াজড়ি করে কান্নাকাটি করছিলেন অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে। বিলাপের সুরে আরশেদা বলছিলেন, ‘আমার ছেলেরে আল্লাহ পছন্দ করে নিয়ে গেছে। লাশটা দিলে আল্লাহর কী ক্ষতি হবে। আল্লাহ তুমি লাশটা দাও।’ আরশেদার ছেলে আসাদুল ব্যাপারী রানা প্লাজার সপ্তম তলায় কাজ করতেন। কোহিনূর বলেন, ‘চার বছর আগে আমার বিয়ে হয়। একটা ছেলে হয়েছিল। সে-ও মারা গেছে। এখন আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই।’ সাভার ব্যাংক কলোনির ফজল ব্যাপারী ও ববিতার ছেলে মনির হোসেনের এখনো সন্ধান পাননি স্বজনেরা। ববিতা বলেন, ‘সবাই বলছে ঢাকায় গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করতে। ঢাকা গেলে এর ফাঁকে যদি আমার মনিরের লাশ অধরচন্দ্রের মাঠে চলে আসে তাহলে তো অন্যরা নিয়ে যেতে পারে। তাই যাচ্ছি না।’ ফজল ব্যাপারী বলেন, ‘শুনেছি উদ্ধারকাজ শেষ হয়ে যাবে। সবাই বাড়িতে চলে যাবে। আমি কী নিয়ে বাড়ি যাব। আমি তো আমার মনিরের লাশ এখনো পাইনি।’ গতকাল অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে নওগাঁর প্রভাত চন্দ্র বসু ও বিলকিস আক্তারের স্বজনেরা এই প্রতিবেদককে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অভিযান শেষ হয়ে গেলেও যদি স্বজনের লাশ পাওয়া না যায়, তাহলে কী হবে এই ভেবে অনেকে দিশেহারা বোধ করছেন।

‘রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা’ ইউসুফ গ্রেপ্তার, কারাগারে

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে ‘রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ কে এম ইউসুফকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গতকাল রোববার দুপুরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে কারাগারে পাঠান।
বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিকেলে ইউসুফকে হাজির করা হলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দুপুরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।
দুপুরে ট্রাইব্যুনাল ইউসুফের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আরজি জানান রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হূষিকেশ সাহা। শুনানিতে তিনি বলেন, এ কে এম ইউসুফ মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের ৯৬ জন সদস্য ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে খুলনায় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। একাত্তরে বাগেরহাটের (তৎকালীন খুলনা জেলার একটি মহকুমা) বিভিন্ন জায়গায় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি একজন প্রভাবশালী নেতা, তাঁর জন্য মামলার সাক্ষীরা হুমকির শিকার হচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হোক।
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফের (এ কে এম ইউসুফ) বিরুদ্ধে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ (প্রাইমা ফেসি) পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২), ৪(১) ও ৪(২) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হলো। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনও মঞ্জুর করা হলো। গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে হবে।
দুপুর ১২টার দিকে পরোয়ানা জারির পরপরই র‌্যাব-২-এর উপ-অধিনায়ক মেজর আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল ইউসুফের ধানমন্ডির বাসভবন ঘিরে ফেলে। বেলা পৌনে একটার দিকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় আগারগাঁওয়ে র‌্যাব-২-এর কার্যালয়ে। পরে তাঁকে ধানমন্ডি থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বিকেল চারটার পর ইউসুফকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাইফুর রহমান তাঁর পক্ষে জামিনের আবেদন দাখিল করেন। তবে এরপর এজলাস বসেনি। ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে আজ জামিনের আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেন। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, ইউসুফের বিরুদ্ধে আনা ১৫টি অভিযোগের মধ্যে গণহত্যার অভিযোগ সাতটি। এগুলো হলো: একাত্তরের ১৩ মে কচুয়া থানার রণজিতপুর গ্রামে গণহত্যা, ১৯ মে মোরেলগঞ্জ বাজারে গণহত্যা, ২১ মে রামপালের ডাকরা গ্রামে গণহত্যা, ১৪ অক্টোবর রামপালের চুলকাঠি গ্রামে গণহত্যা, ১৫ অক্টোবর কচুয়ার মঘিয়া গ্রামে গণহত্যা, জুলাই ও নভেম্বরে কচুয়ার শাঁখারীকাঠিতে গণহত্যা। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য ইউসুফ একাত্তরে মালেক মন্ত্রিসভার রাজস্ব, পূর্ত, বিদ্যুৎ ও সেচমন্ত্রী ছিলেন। ৮ মে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়।

কাদের মোল্লার দণ্ড, আপিল নিষ্পত্তির ৬০ দিন পার

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল নিষ্পত্তির ৬০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) আইনের ২১(৪) ধারা অনুসারে আপিল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সংশোধনী আনা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে—এই বিধানটি বাধ্যতামূলক নয়। কারণ, ৬০ দিনের মধ্যে শেষ না হলে কী হবে, তা বলা নেই। এটা নির্দেশনামূলক। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিষয়টি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা শুনতে ও রায় দিতে পারবেন।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। পরে ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরদিন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা বাতিল চেয়ে কাদের মোল্লাকে খালাসের আরজি জানিয়ে আপিল করে আসামিপক্ষ। ইতিমধ্যে আইনে উল্লেখ করা ৬০ দিন সময় পেরিয়ে গেছে।
কাদের মোল্লার দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের ওপর ১০ দিন শুনানি হয়েছে। আজ সোমবার আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় আপিল শুনানির জন্য ৬ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে।
এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায় ঘোষণার ২৯ দিনের মাথায় ২৮ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ আপিল করে। এরপর ১৮ এপ্রিল আপিল বিভাগ ২ মে দিন ধার্য করে এই সময়ের পূর্বে উভয়পক্ষকে আপিলের সার সংক্ষেপ জমা দিতে নির্দেশ দেন। সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মে আপিল বিভাগ আসামিপক্ষকে ১৬ মের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিধান অনুযায়ী আপিলের বিষয়ে আসামি সাঈদীকে নোটিশ দিতে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই আইনের উল্লেখ করা ৬০ দিন সময়ের ইতিমধ্যে ৪৫ দিন পেরিয়ে গেছে।
কাদের মোল্লার দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের প্রধান সমন্বয়কারী ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল শুনানি হয়নি। আমরা থাকি, তারা (আসামিপক্ষ) আসে না। তাদের আসা উচিত, অনেকেই আসেন। এটা আর কিছু না, বিলম্ব করার জন্য।’ তিনি বলেন, সাঈদীর আপিলের সারসংক্ষেপ দিতে বলা হয়েছে। ১৬ মে একটা তারিখ আছে। সাঈদীর ব্যাপারে কারাগারে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।
কাদের মোল্লার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘প্রথম থেকেই বলেছি, আইন দ্বারা সর্বোচ্চ আদালতকে মামলা নিষ্পত্তির জন্য সময় বেঁধে দেওয়া যায় না। এটা নির্দেশনামূলক। সর্বোচ্চ আদালত পূর্ণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলা নিষ্পত্তিতে ওই সময়সীমা মানতে বাধ্য নন। তিনি মনে করেন, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের ওপর একটা চাপ সৃষ্টির জন্যই এ বিধানটি করা হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ এবং তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেন। অন্যান্য অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন দণ্ডের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন।
এ অবস্থায় ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধিত আইনে রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও বাদীপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির বিধানও রাখা হয়। আইনে রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার বিধান রয়েছে।
অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। রায়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালিকে হত্যার দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি, ধর্মান্তরিত করার একটি এবং লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তবে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় অন্য অভিযোগগুলোতে আলাদা করে কোনো দণ্ড দেওয়া হয়নি।
ছয়টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও দণ্ড ঘোষণা না হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে খালাসের আরজি জানিয়ে আপিল করেন সাঈদী। আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় আজ বিষয়টি ১ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে।
৬০ দিনের বিধান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী এম জহির প্রথম আলোকে বলেন, এটা হচ্ছে নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক নয়। এ রকম হয়ে থাকে। যদি না হয় তাহলে কী করবে, খালাস পেয়ে যাবে? কী হবে বলা নেই, তাই এটা বাধ্যতামূলক নয়।

শেষ ম্যাচে সান্ত্বনার জয়

শেষ ভালো মানে নাকি সব ভালো। কিন্তু জিম্বাবুয়ে সিরিজের শেষটা ভালো করেও কি সব ভালোর দাবি করতে পারছে বাংলাদেশ দল! টেস্ট সিরিজ ড্র, ওয়ানডে সিরিজে তো হারই। টি-টোয়েন্টি সিরিজটা জিততে পারলেই কেবল আজ সকালে দেশে ফেরার বিমানে সামান্য সান্ত্বনা নিয়ে ওঠা যেত। কিন্তু কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠে পাওয়া কালকের ৩৪ রানের জয় যে সিরিজ জয়ের উৎসবে মাতার নয়, শুধুই সিরিজ ড্র করার!
মুশফিক পুরো সিরিজে দ্বিতীয়বারের মতো টসে জিতলেন। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে হারলেও কাল জয়ী দলের নাম বাংলাদেশ। এই দুই পার্থক্য ছাড়া প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সঙ্গে দ্বিতীয়টির অনেকই মিল। প্রথম ইনিংসের রানটাই দেখুন। আগের দিন বাংলাদেশের সামনে ১৬৯ রানের লক্ষ্য দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। কাল আগে ব্যাট করে বাংলাদেশও করল ঠিক ১৬৮। আরও মিল খুঁজে পাবেন যদি বাংলাদেশ দলের প্রথম ম্যাচের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে কালকের ব্যাটিংটাকে মেলান। অবশ্য মিল ধরে রাখতে পারেনি জিম্বাবুয়ে। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ মাত্র ৬ রানে হারলেও কাল ২০ ওভার ব্যাটিং করে ৯ উইকেটে ১৩৪ রানই করতে পারল জিম্বাবুয়ে।
সাকিব আল হাসানের জন্য জিম্বাবুয়ে সফরের শুরুটা ছিল শঙ্কার। শিনবোনের চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসন জিম্বাবুয়েতে এসেও চলছিল বলেই হয়তো পুরোপুরি মেলে ধরতে পারছিলেন না নিজেকে। তবে সফরের শেষটা সাকিব করলেন সাকিবের মতোই। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ফিফটির সঙ্গে পেয়েছেন ২ উইকেট। বাংলাদেশ জিতলে হয়তো হয়ে যেতেন ম্যান অব দ্য ম্যাচও। কাল আর এই ‘হয়তো’র প্রয়োজন পড়ল না। ব্যাট হাতে ৪০ রান, সঙ্গে টি-টোয়েন্টিতে ক্যারিয়ার-সেরা বোলিং। ম্যান অব দ্য ম্যাচ তো বটেই, টি-টোয়েন্টির ম্যান অব দ্য সিরিজও সাকিব আল হাসানই। আগের সেরা বোলিংটা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ৩৪ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন সেবার। আর কাল ২২ রানে ৪ উইকেট। জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানদের দাঁড়াতে দেননি এই বাঁহাতি স্পিনারই।
বাংলাদেশের ইনিংস মূলত প্রথম টি-টোয়েন্টিরই পুনরাবৃত্তি। প্রথম ম্যাচে ইনিংসের প্রথম ওভারেই আউট হয়ে গিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। বাংলাদেশ দল লড়াই যা করার করেছিল ওপেনার শামসুর রহমানের সঙ্গে সাকিব আল হাসানের দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে। শুরুর দৃশ্যে কাল শামসুরের জায়গায় তামিম, তামিমের জায়গায় শামসুর। শামসুরও এদিন উতসেয়ার করা ইনিংসের প্রথম ওভারে ডিপ মিড উইকেটে ওয়ালারের ক্যাচ। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে সাকিবের সঙ্গে শামসুরের জায়গায় তাই তাামিম। ৮২ রানের জুটি। তামিম ৩০ বলে ৪৩, সাকিব ২৮ বলে ৪০। আগের ম্যাচে যেমন সাকিবের পর পরই ফিরে যান শামসুর, কালও দুই সেট ব্যাটসম্যানই পর পর আউট। মুসাঙ্গির বলে ডিপ স্কোয়ার লেগে রাজার হাতে ক্যাচ দিয়ে সাকিব, দুই ওভার পর উতসেয়ার বলে লং অনে তামিম ধরা পড়লেন শিঙ্গি মাসাকাদজার হাতে।
দলের ৮৬ রানে সাকিব ও ১০১ রানে তামিমের বিদায়ের পর মনে হচ্ছিল ঘুরে যাচ্ছে ম্যাচের গতি। তামিম আউট হওয়ার পর আরও ৪ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে যোগ হয়েছে মাত্র ৬৭ রান। মিডল-অর্ডারে মুশফিকুর রহিম আশা জাগিয়েছিলেন প্রথম ম্যাচে। কাল সাকিব-তামিম ফিরে যাওয়ার পর সে জায়গায় হাল ধরেছিলেন নাসির হোসেন। কিন্তু দুই ম্যাচের মধ্যে যেখানে এত মিল সেখানে রানআউটটাই বা বাকি থাকবে কেন! প্রথম ম্যাচে রানআউট হয়েছিলেন নাসির ও মাহমুদউল্লাহ। কাল সেই দুর্ভাগ্যে পুড়লেন শুধু নাসির।
পুরো সিরিজে আম্পায়ারিংয়ের মান কোন পর্যায়ের ছিল, তার সর্বশেষ নমুনা দেখা গেল কাল শেষ ম্যাচে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এবার আম্পায়ার বল গুনতেও ভুল করলেন! জিম্বাবুয়ের বোলিংয়ের সময় উতসেয়ার করা ১৪তম ওভারটি তাই শেষ হয়ে গেল ৫ বলেই। বাজে আম্পায়ারিংয়ের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ দল। কোচ শেন জার্গেনসেন তো এ নিয়ে কয়েকবারই কথা বলেছেন ম্যাচ রেফারির সঙ্গে। কাল জিম্বাবুয়ের ইনিংস চলাকালে মাঠেই আম্পায়ারের ওপর ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা গেল সহ-অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহকে। ব্যাটসম্যান শন উইলিয়ামস অশালীন ভাষায় কিছু বলছিলেন মাহমুদউল্লাহকে। জবাব দিচ্ছিলেন মাহমুদউল্লাহও। কিন্তু আম্পায়ার এখানেও জিম্বাবুয়ের পক্ষ নিয়ে বারবার মাহমুদউল্লাহকেই থামতে বলছিলেন। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক, সহ-অধিনায়কের সঙ্গে এ নিয়ে ভালোই কথা-কাটাকাটি হয় আম্পায়ারের।
শেষ ম্যাচটা জিতলেও জিম্বাবুয়ে থেকে এ রকম অনেক রাগ-ক্ষোভ-হতাশা নিয়েই দেশে ফিরছে বাংলাদেশ দল। তবে প্রাপ্তির খাতাটা বেশি ভারী হয়ে গেল বোধ হয় লজ্জাতেই।
বাংলাদেশ ২০ ওভারে: ১৬৮/৭
জিম্বাবুয়ে ২০ ওভারে: ১৩৪/৯
ফল: বাংলাদেশ ৩৪ রানে জয়ী

পাকিস্তানে গণতন্ত্রের জয়

পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। দেশটিতে গত শনিবারের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হয়েছে তাঁর দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ বা পিএমএল (এন)। তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় মধ্য ডানপন্থী দলটিকে সরকার গঠনের জন্য জোট গড়তে হতে পারে।
পাকিস্তানের ৬৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হতে যাচ্ছে। একে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জয় হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা।
পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের আসনসংখ্যা ৩৪২। এর মধ্যে ২৭২টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়। বাকি ৭০টির মধ্যে ৬০টি নারীদের এবং ১০টি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত। কাজেই সরকার গঠনের জন্য সরাসরি ভোট হওয়া ২৭২টির মধ্যে ১৩৭টি আসন পেতে হবে।
গতকাল রাত দেড়টা পর্যন্ত বেসরকারিভাবে মোট ২৬৬টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে নওয়াজের পিএমএল (এন) পেয়েছে ১৩৩টি আসন। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়া পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। পিপিপি পেয়েছে ৩৩টি আসন। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পেয়েছে ২৭টি আসন। ৭৩টি আসনে জয়ী হয়েছে স্বতন্ত্র ও অন্য দলের প্রার্থীরা। আর ৬টি আসনে ফলাফল ঘোষণা বাকি আছে।
প্রধান বিরোধী দল পিপিপি না পিটিআই—কে হবে, তা নির্ভর করছে অবশিষ্ট আসনের ফলাফলের ওপর।
পাকিস্তানের সাড়ে ছয় দশকের ইতিহাসে যখনই সেনাবাহিনীর হাত থেকে ক্ষমতা কোনো রাজনৈতিক দলের হাতে এসেছে, তখন তা গেছে পিপিপি অথবা পিএমএলের (এন) কাছে। এ দুটি দলই নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে দেশটির রাজনীতি। এবার সেখানে পিটিআই নামের আরেকটি দলের আবির্ভাব ঘটল। দলটি শেষ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত দুবারের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো নির্বাচনে পিপিপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি দলের চেয়ারম্যান।
এদিকে, সরকার গঠনের লক্ষ্যে গতকালই অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন নওয়াজ শরিফ। দলের শীর্ষ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী শরতাজ আজিজ জানান, কয়েকজন স্বতন্ত্র সাংসদের সঙ্গে কথা বলেছেন নওয়াজ। এ ছাড়া, মন্ত্রিপরিষদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি।
জিয়ো টেলিভিশনের খবরে জানানো হয়, জমিয়ত উলামা-আল-ইসলামের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান ফোন করে নওয়াজ শরিফকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সরকার গঠন নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
টেলিভিশনটির খবরে আরও বলা হয়, নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নওয়াজ সরকার গঠন করলে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।
সর্বশেষ পিপিপি সরকারের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানে কোনো সরকারই ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। অর্থাৎ কখনোই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। সেদিক দিয়ে এবারের নির্বাচন ছিল ঐতিহাসিক। দেশটির ক্ষমতায় বারবার হস্তক্ষেপ করেছে সেনাবাহিনী। ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে তিনবার। দেশ শাসন করেছেন চারজন স্বৈরশাসক।
সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে ১৯৯৯ সালে। রক্তপাতহীন ওই অভ্যুত্থানে নওয়াজ শরিফের নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। নওয়াজকে নির্বাসনে পাঠানো হয় সৌদি আরবে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দুই মেয়াদে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি—১৯৯০ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের ১৮ জুলাই এবং ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। নির্বাসন থেকে ২০০৭ সালে দেশে ফিরে পরের বছর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেন নওয়াজ। ওই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে পিপিপি।
শনিবার মধ্যরাতেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন নওয়াজ শরিফ। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আসকারি বলেন, তাঁকে (শরিফ) সন্ত্রাসবাদ ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। দ্রুত যদি তা করতে পারেন, বেশ ভালো। আর না পারলে তাঁকে সংকট ও সমালোচনার মুখে পড়তে হবে।
ইমরানের বার্তা: নির্বাচনী প্রচারণার সময় পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পর থেকে হাসপাতালে আছেন ইমরান খান। গতকাল কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, এ নির্বাচন দেশের নবীন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। তবে তাঁর দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনে কারচুপির বিষয়ে তাঁরা তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছেন।
ভিডিও বার্তায় ইমরান বলেন, ‘আমরা এখন গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হচ্ছি। নির্বাচনে ব্যাপক হারে ভোট দেওয়ার জন্য আমি দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই। দেশের তরুণ সমাজ আমার পক্ষে ছিল। এটাই আমার বিজয়।’
জোট সরকার হচ্ছে: সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না নওয়াজের দল। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাদের জোট গঠন করতে হবে। তবে নওয়াজকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল পিপিপি বা পিটিআইয়ের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়বে না। বরং দু-চারটি করে আসন পাওয়া ছোটখাটো অন্য দলগুলোর কয়েকটি বা বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারলেই তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় যেতে পারবেন তিনি। তা খুব কঠিন হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। তবে পাকিস্তানের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জোট টিকিয়ে রাখা কঠিন এবং এতে সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে। কেননা, দেশটির সাড়ে ছয় দশকের বেশি সময়ের ইতিহাসে সর্বশেষ পিপিপি সরকার ছাড়া কোনো সরকারই ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি।
প্রাদেশিক নির্বাচন: জাতীয় পরিষদের পাশাপাশি শনিবার চারটি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনেও ভোট দিয়েছে সেখানকার জনগণ। এগুলো হলো খাইবার পাখতুনখাওয়া, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান।
এর মধ্যে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বিজয়ের পথে রয়েছে ইমরানের দল। রাজনৈতিকভাবে চরম অস্থিতিশীল এবং জঙ্গিবাদে জর্জরিত ওই অঞ্চল তালেবানের ঘাঁটি অভিযোগ তুলে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ড্রোন (চালকবিহীন বিমান) হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনী প্রচারণায় ইমরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে ড্রোন হামলা বন্ধের ব্যবস্থা করা হবে। আর সিন্ধু প্রদেশে বিজয়ের পথে রয়েছে পিপিপি। সিন্ধু ভুট্টো পরিবারের পৈতৃক স্থান। সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবে সরকার গঠন করতে পারে নওয়াজ শরিফের পিএমএল (এন)। পাঞ্জাব নওয়াজের নিজের প্রদেশ। বেলুচিস্তানের ফলাফল এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সেখানে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি। এএফপি, বিবিসি ও ডন।

শেষ ম্যাচে সান্ত্বনার জয়

শেষ ভালো মানে নাকি সব ভালো। কিন্তু জিম্বাবুয়ে সিরিজের শেষটা ভালো করেও কি সব ভালোর দাবি করতে পারছে বাংলাদেশ দল! টেস্ট সিরিজ ড্র, ওয়ানডে সিরিজে তো হারই। টি-টোয়েন্টি সিরিজটা জিততে পারলেই কেবল আজ সকালে দেশে ফেরার বিমানে সামান্য সান্ত্বনা নিয়ে ওঠা যেত। কিন্তু কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠে পাওয়া কালকের ৩৪ রানের জয় যে সিরিজ জয়ের উৎসবে মাতার নয়, শুধুই সিরিজ ড্র করার! মুশফিক পুরো সিরিজে দ্বিতীয়বারের মতো টসে জিতলেন। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে হারলেও কাল জয়ী দলের নাম বাংলাদেশ। এই দুই পার্থক্য ছাড়া প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচের সঙ্গে দ্বিতীয়টির অনেকই মিল। প্রথম ইনিংসের রানটাই দেখুন। আগের দিন বাংলাদেশের সামনে ১৬৯ রানের লক্ষ্য দিয়েছিল জিম্বাবুয়ে। কাল আগে ব্যাট করে বাংলাদেশও করল ঠিক ১৬৮। আরও মিল খুঁজে পাবেন যদি বাংলাদেশ দলের প্রথম ম্যাচের ব্যাটিংয়ের সঙ্গে কালকের ব্যাটিংটাকে মেলান। অবশ্য মিল ধরে রাখতে পারেনি জিম্বাবুয়ে। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ মাত্র ৬ রানে হারলেও কাল ২০ ওভার ব্যাটিং করে ৯ উইকেটে ১৩৪ রানই করতে পারল জিম্বাবুয়ে। সাকিব আল হাসানের জন্য জিম্বাবুয়ে সফরের শুরুটা ছিল শঙ্কার। শিনবোনের চিকিৎসা-পরবর্তী পুনর্বাসন জিম্বাবুয়েতে এসেও চলছিল বলেই হয়তো পুরোপুরি মেলে ধরতে পারছিলেন না নিজেকে। তবে সফরের শেষটা সাকিব করলেন সাকিবের মতোই। প্রথম টি-টোয়েন্টিতে ফিফটির সঙ্গে পেয়েছেন ২ উইকেট। বাংলাদেশ জিতলে হয়তো হয়ে যেতেন ম্যান অব দ্য ম্যাচও। কাল আর এই ‘হয়তো’র প্রয়োজন পড়ল না। ব্যাট হাতে ৪০ রান, সঙ্গে টি-টোয়েন্টিতে ক্যারিয়ার-সেরা বোলিং। ম্যান অব দ্য ম্যাচ তো বটেই, টি-টোয়েন্টির ম্যান অব দ্য সিরিজও সাকিব আল হাসানই। আগের সেরা বোলিংটা ছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। ৩৪ রানে ৪ উইকেট নিয়েছিলেন সেবার। আর কাল ২২ রানে ৪ উইকেট। জিম্বাবুয়ের ব্যাটসম্যানদের দাঁড়াতে দেননি এই বাঁহাতি স্পিনারই। বাংলাদেশের ইনিংস মূলত প্রথম টি-টোয়েন্টিরই পুনরাবৃত্তি। প্রথম ম্যাচে ইনিংসের প্রথম ওভারেই আউট হয়ে গিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। বাংলাদেশ দল লড়াই যা করার করেছিল ওপেনার শামসুর রহমানের সঙ্গে সাকিব আল হাসানের দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে। শুরুর দৃশ্যে কাল শামসুরের জায়গায় তামিম, তামিমের জায়গায় শামসুর। শামসুরও এদিন উতসেয়ার করা ইনিংসের প্রথম ওভারে ডিপ মিড উইকেটে ওয়ালারের ক্যাচ। দ্বিতীয় উইকেট জুটিতে সাকিবের সঙ্গে শামসুরের জায়গায় তাই তাামিম। ৮২ রানের জুটি। তামিম ৩০ বলে ৪৩, সাকিব ২৮ বলে ৪০। আগের ম্যাচে যেমন সাকিবের পর পরই ফিরে যান শামসুর, কালও দুই সেট ব্যাটসম্যানই পর পর আউট। মুসাঙ্গির বলে ডিপ স্কোয়ার লেগে রাজার হাতে ক্যাচ দিয়ে সাকিব, দুই ওভার পর উতসেয়ার বলে লং অনে তামিম ধরা পড়লেন শিঙ্গি মাসাকাদজার হাতে। দলের ৮৬ রানে সাকিব ও ১০১ রানে তামিমের বিদায়ের পর মনে হচ্ছিল ঘুরে যাচ্ছে ম্যাচের গতি। তামিম আউট হওয়ার পর আরও ৪ উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশের স্কোরবোর্ডে যোগ হয়েছে মাত্র ৬৭ রান। মিডল-অর্ডারে মুশফিকুর রহিম আশা জাগিয়েছিলেন প্রথম ম্যাচে। কাল সাকিব-তামিম ফিরে যাওয়ার পর সে জায়গায় হাল ধরেছিলেন নাসির হোসেন। কিন্তু দুই ম্যাচের মধ্যে যেখানে এত মিল সেখানে রানআউটটাই বা বাকি থাকবে কেন! প্রথম ম্যাচে রানআউট হয়েছিলেন নাসির ও মাহমুদউল্লাহ। কাল সেই দুর্ভাগ্যে পুড়লেন শুধু নাসির। পুরো সিরিজে আম্পায়ারিংয়ের মান কোন পর্যায়ের ছিল, তার সর্বশেষ নমুনা দেখা গেল কাল শেষ ম্যাচে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, এবার আম্পায়ার বল গুনতেও ভুল করলেন! জিম্বাবুয়ের বোলিংয়ের সময় উতসেয়ার করা ১৪তম ওভারটি তাই শেষ হয়ে গেল ৫ বলেই। বাজে আম্পায়ারিংয়ের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ দল। কোচ শেন জার্গেনসেন তো এ নিয়ে কয়েকবারই কথা বলেছেন ম্যাচ রেফারির সঙ্গে। কাল জিম্বাবুয়ের ইনিংস চলাকালে মাঠেই আম্পায়ারের ওপর ক্ষোভ ঝাড়তে দেখা গেল সহ-অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহকে। ব্যাটসম্যান শন উইলিয়ামস অশালীন ভাষায় কিছু বলছিলেন মাহমুদউল্লাহকে। জবাব দিচ্ছিলেন মাহমুদউল্লাহও। কিন্তু আম্পায়ার এখানেও জিম্বাবুয়ের পক্ষ নিয়ে বারবার মাহমুদউল্লাহকেই থামতে বলছিলেন। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক, সহ-অধিনায়কের সঙ্গে এ নিয়ে ভালোই কথা-কাটাকাটি হয় আম্পায়ারের। শেষ ম্যাচটা জিতলেও জিম্বাবুয়ে থেকে এ রকম অনেক রাগ-ক্ষোভ-হতাশা নিয়েই দেশে ফিরছে বাংলাদেশ দল। তবে প্রাপ্তির খাতাটা বেশি ভারী হয়ে গেল বোধ হয় লজ্জাতেই।
বাংলাদেশ ২০ ওভারে: ১৬৮/৭
জিম্বাবুয়ে ২০ ওভারে: ১৩৪/৯
ফল: বাংলাদেশ ৩৪ রানে জয়ী

রাজশাহীতে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ শিবির কর্মী নিহত

রাজশাহীতে গত শনিবার গভীর রাতে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটা-লিয়নের (র‌্যাব) সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ একজন নিহত হয়েছেন। র‌্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি পিস্তল, পাঁচটি গুলি, ছয়টি ককটেল ও তিন বোতল পেট্রল উদ্ধার করেছে। নিহত ব্যক্তির নাম শাহাদত হোসেন (৩০)। তিনি শিবিরের কর্মী বলে জানা গেছে। শাহাদতের ভাই হাসানুল বান্না দাবি করেন, তাঁর ভাই জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। এ কারণে সরকারি বাহিনী তাঁর ভাইকে ধরে নিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে। র‌্যাব-৫-এর ভাষ্যমতে, শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে রাজশাহী শহরের বিনোদপুরে বাংলাদেশ বেতারের রাজশাহী সম্প্রচার কেন্দ্রের মাঠে শিবিরের সাত-আটজন কর্মী বৈঠক করছিলেন। তাঁরা পরদিন (রোববার) হরতালে নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করছিলেন। খবর পেয়ে র‌্যাবের সদস্যরা সেখানে গেলে শিবিরের কর্মীরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। র‌্যাবের সদস্যরাও পাল্টা গুলি চালান। একপর্যায়ে শিবিরের কর্মীরা পালিয়ে যান। পরে ঘটনাস্থলে র‌্যাবের সদস্যরা শাহাদতের লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। সেখান থেকে শিবিরের কর্মীদের ফেলে যাওয়া একটি নাইন এমএম পিস্তল, পাঁচটি গুলিসহ একটি ম্যাগাজিন, ছয়টি ককটেল ও তিন বোতল পেট্রল উদ্ধার করা হয়।  হাসানুল বান্না প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর ভাইয়ের সাড়ে চার বছরের একটি মেয়ে রয়েছে। তাঁর ভাই বালুঘাটে ‘সাব কন্ট্রাক্টে’ কাজ করতেন। ৩ মে ঢাকায় এক বন্ধুর বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশে তিনি বাড়ি থেকে বের হন। পরদিন ৪ মে দুপুর থেকে তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ঢাকার মিরপুরের ওই বন্ধুর বাড়িতে খোঁজ নিয়ে তাঁরা জেনেছেন, র‌্যাব পরিচয়ে শাহাদতকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে তাঁরা ঢাকায় র‌্যাব ও থানায় যোগাযোগ করেন। কিন্তু কেউ কিছু জানে না বলে জানায়। বান্না দাবি করেন, নাম প্রকাশ না করার শর্তে র‌্যাব-৫-এর একজন কর্মকর্তা তাঁদের বলেন, ‘গত শুক্রবার রাত আটটার দিকে ঢাকা থেকে ধরে শিবিরের একজনকে রাজশাহীতে আনা হয়েছে।’ তার পর থেকেই তাঁরা উৎকণ্ঠায় ছিলেন। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে গোলাগুলির শব্দ পেয়ে তাঁরা জেগে ওঠেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে তিনি বেতারের সম্প্রচার কেন্দ্রের মাঠে গিয়ে দেখেন, আমগাছের নিচে তাঁর ভাইয়ের রক্তমাখা লাশ পড়ে আছে। খানিকটা দূরে র‌্যাব অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা পুলিশের লোকও অস্ত্র হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। নগরের মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অসিত কুমার ঘোষ বলেন, শাহাদতের নামে মতিহার থানায় পাঁচটি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে বিস্ফোরক দ্রব্য বহন ও পুলিশের ওপর হামলার মামলা রয়েছে। দুটি মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। বাকি তিন মামলার তদন্ত চলছে। তিনি বলেন, শাহাদত শিবিরের বড় কোনো নেতা নন। তবে মতিহার এলাকায় কোথায় কখন ককটেল হামলা হবে, তার নেপথ্যে কাজ করতেন তিনি। ওসি আরও জানান, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ময়নাতদন্ত শেষে শাহাদতের লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জামায়াতের দাবি: শাহাদাত হোসেনকে র‌্যাব গুলি করে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেন, প্রায় এক সপ্তাহ আগে শাহাদাত হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। সঙ্গে থাকা অন্যদের ‘মিথ্যা’ মামলা দিয়ে কারাগারে পাঠালেও হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁকে গ্রেপ্তার করার কথা শিকার করেনি। গতকাল ভোরে লাশ রাজশাহীর বিনোদপুর রেডিও কলোনি মাঠে ফেলে দিয়ে বলা হচ্ছে, র‌্যাবের সঙ্গে গুলিবিনিময়ের সময় শাহাদাত নিহত হয়েছেন। র‌্যাবের এ বক্তব্য মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শিবিরের নিখোঁজ আরেক নেতার সন্ধান মেলেনি: এর আগে গত ৪ এপ্রিল রাতে রাজশাহী মহানগর শিবিরের অফিস সম্পাদক আনোয়ারুল ইসলামকে র‌্যাব পরিচয়ে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁকে আদালতে সোপর্দ করা এবং তাঁর মুক্তির দাবিতে রাজশাহীতে হরতালও ডেকেছে শিবির। আনোয়ারুল রাজশাহী কলেজের গণিত বিভাগের স্নাতকোত্তর শ্রেণীতে পড়েন। ঘটনার কয়েক দিন পর সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আনোয়ারুলের বড় বোন মোর্শেদা পারভীন অভিযোগ করেন, ৪ এপ্রিল দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে র‌্যাব-৫-এর নাহিদ, বুলবুলসহ ৩০-৪০ জন সদস্য উপশহর বন্ধগেট এলাকায় তাঁদের বাড়ি থেকে আনোয়ারুলকে নিয়ে যান। এ সময় তাঁরা পরিবারের সদস্যদের একটি কক্ষে আটকে রাখেন। বাসায় আনোয়ারুলের ওপর এক ঘণ্টা নির্যাতনের পর বাড়িতে থাকা ল্যাপটপ, ডেক্সটপ, পাঁচ-ছয়টি মুঠোফোনসহ তাঁকে নিয়ে গিয়ে নগরের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে অভিযান চালানো হয়।

চিকিৎসকেরা চাইলে আজ গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা হতে পারে

বিস্ময়কন্যা রেশমা সুস্থ আছেন। তবে শরীরের দুর্বলতার কারণে তিনি একা হাঁটাচলা করতে পারছেন না। আজ সোমবার মেডিকেল বোর্ড আরেকবার রেশমার অবস্থা পর্যালোচনা করবে। এরপরই গণমাধ্যমের কর্মীদের তাঁর সঙ্গে কথা বলতে দিতে পারে কর্তৃপক্ষ। রেশমার মা জোবেদা খাতুন মেয়ের সঙ্গেই আছেন। তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী। তাঁকেও সিএমএইচে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। রেশমাকে সাভার সিএমএইচের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে। সাভার সিএমএইচের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শরীফ আহমেদ গতকাল রোববার প্রথম আলোকে বলেন, ‘রেশমার শরীরে কোনো আঘাত নেই। তিনি এখন পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত। তাঁর মূল সমস্যা হচ্ছে, ১৭ দিন ধ্বংসস্তূপে থাকার কারণে সৃষ্ট মানসিক ও শারীরিক অবসাদ এবং ভয়। এগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে।’ রেশমার চিকিৎসা সম্পর্কে শরীফ আহমেদ বলেন, লক্ষণ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রেশমার মুখের ত্বকে একটু সমস্যা দেখা গেছে। সে জন্য এক ধরনের ক্রিম ও অলিভওয়েল ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর কিডনিতে কিছুটা সমস্যা ছিল বলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। দুর্বলতার জন্য ভিটামিন খাওয়ানো হচ্ছে। সব ওষুধই মুখে খাওয়ানো হচ্ছে। তবে রেশমার শরীরের সব প্যারামিটারই এখন ভালো অবস্থায় আছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শনিবার রাত ও পরবর্তী সময় পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমিয়েছেন রেশমা। হাঁটাচলায় সমস্যা হচ্ছে বলে বিছানাতেই সময় কাটছে তাঁর। হাঁটতে গেলে মাথা চক্কর দেয়। শরীরের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠলে আর কোনো সমস্যা থাকবে না। রেশমাকে গতকাল সকালে ব্রেড, জেলি, বাটার ও ডিম খেতে দেওয়া হয়। সকাল ১০টার দিকে দেওয়া হয় বিস্কুট ও দুধ। দুপুরের খাবারের তালিকায় ছিল ভাত, মুরগির মাংস, সবজি, ডাল। দুপুরের খাবারের পর ফল খেতে দেওয়া হয়। রাতেও স্বাভাবিক খাবার দেওয়া হয় রেশমাকে। গতকাল বিকেলে শীরফ আহমেদ প্রথম আলোকে জানান, আজ মেডিকেল বোর্ড আরেক দফা রেশমার সর্বশেষ অবস্থা পর্যবেক্ষণ করবে। মেডিকেল টিম চাইলে আজই গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়ার হতে পারে তাকে।রেশমার ভাই জাহিদুল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, তিনি গত সন্ধ্যায় আইসিইউতে রেশমাকে দেখতে যান। এ সময় তাঁকে খাবার দেওয়া হয়েছিল। রেশমা অল্প খাবার খেয়েছেন। শরীরে শক্তি নেই বলে রেশমা তাঁকে জানিয়েছেন। এ ছাড়া হাতেও ব্যথা আছে।

উদ্ধার অভিযান শেষের পথে, দিশেহারা স্বজনেরা

সাভারের রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ এখন শেষ পর্যায়ে। আজ সোমবার উদ্ধারকাজ শেষ হয়ে যেতে পারে বলে উদ্ধারকারীদের পক্ষ থেকে আভাস দেওয়া হয়েছে। এরপর সেনাবাহিনীর কাছ থেকে রানা প্লাজার দায়দায়িত্ব ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। অভিযান শেষ হতে চললেও স্বজনহারাদের কান্না থামছে না। গতকালও অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় মাঠে শ দুয়েক স্বজনহারা ব্যক্তিকে প্রিয়জনের লাশের জন্য ছোটাছুটি করতে দেখা গেছে। অনেকেই স্বজনের লাশের হদিস না পেয়ে হাউমাউ করে কেঁদে বেড়িয়েছেন। কয়েকজন স্বজনহারা ব্যক্তি বলেছেন, উদ্ধার অভিযান শেষ করে সবাই বাড়ি চলে যাবে। আমরা কী নিয়ে বাড়ি যাব। লাশটা পেলে তো সান্ত্বনা পেতাম। গত শনিবার রাত ১১টা থেকে গতকাল রোববার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত চারটি মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার অভিযান শুরুর পর থেকে গতকালই সবচেয়ে কম মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই নিয়ে গতকাল সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক হাজার ১২৭ জনে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শেষ পর্যায়ে। এখন নিচতলার মেঝে সরানোর কাজ চলছে। উদ্ধারকর্মীরা বলছেন, নিচতলার মেঝেটা খুব পুরো ও শক্ত। এর নিচেই গাড়ি পার্কিংয়ের স্থান। সেখানে প্রচুর পানি জমে ছিল। গতকাল দিনভর সে পানি নিষ্কাশন করা হয়েছে। কয়েকটি স্থানে নিচতলার মেঝে কেটে পার্কিং এলাকার ধ্বংসস্তূপ সরানো হয়েছে। এ সময় ভবনের পেছনের দিকে পার্কিংয়ে থাকা কয়েকটি কক্ষের সন্ধান পাওয়া যায়। এর মধ্যে কিছু টেবিল-চেয়ার, ক্যাবিনেট এবং দেয়ালের কিছু অংশ অক্ষতই দেখা যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এটি ভবনের অন্যতম মালিক সোহেল রানার অফিস-কক্ষ। ভবনটির বেজমেন্টে সোহেল রানার ব্যক্তিগত কার্যালয় ছিল। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, শনিবার দিবাগত রাত ১২টার পর দীর্ঘক্ষণ কোনো মৃতদেহ পাওয়া যায়নি। রাত তিনটা ২৫ মিনিটে একজন পুরুষের মৃতদেহ পাওয়া যায়। ওই মৃতদেহের সঙ্গে একটি পরিচয়পত্র ছিল, যার নম্বর ১২ হাজার ৫১। নাম পিন্টু, ধসে পড়া ভবনের তৃতীয় তলায় কাজ করতেন। মৃতদেহের সঙ্গে একটি মুঠোফোন পাওয়া যায়। কিন্তু উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, ফোনের সিমকার্ডটি অকেজো হওয়ায় তা থেকে সেভ করা নম্বর বের করে স্বজনদের খোঁজ করা যায়নি। সাধারণত মুঠোফোন পাওয়া গেলে সিমটা চালু করে সেভ করা নম্বরে ফোন করে স্বজনদের খুঁজে বের করা হয় এবং পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। এরপর সকাল নয়টার দিকে একটি মাথার খুলি পাওয়া যায়। বেলা ১১টার দিকে একজন পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু মৃতদেহের সঙ্গে কোনো পরিচয়পত্র কিংবা মুঠোফোন পাওয়া যায়নি। ফলে পরিচয় অজানা লিখে অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, পরিচয় পাওয়া গেলে এবং স্বজনদের সন্ধান পেলে মৃতদেহের সঙ্গে এসব তথ্য অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আর পরিচয় না পেলে লাশবাহী পলিথিনের প্যাকেটে মার্কার দিয়ে শুধু মাথার দিকটা চিহ্নিত করে ‘অজানা’ লিখে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং ব্রিগেডের ব্রিগেডিয়ার আজমল কবীর গতকাল দুপুরে প্রথম আলোকে বলেন, এখন কারও জীবিত থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ। উদ্ধারকর্মীরা এখন বেজমেন্টের ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ করছেন। পার্কিংয়ে কিছু গাড়ি দেখা গেছে। তবে সেখানে পানি জমে রয়েছে। পানিনিষ্কাশন আর বেজমেন্টের ছাদ পুরোটা সরানোর কাজ চলছে। পার্কিংয়ে কোনো মৃতদেহ রয়েছ কি না, তা খুঁজে দেখার পর অভিযান শেষ করা হবে। আজ সোমবার সন্ধ্যা নাগাদ অভিযান শেষ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান। গতকাল সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত ভবনধসের ঘটনায় এক হাজার ১১৫টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে দুই হাজার ৪৩৮ জনকে। তবে এর মধ্যে ১২ জন চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতালে মারা যান। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ১২৭। স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ৮৩২টি মৃতদেহ। হস্তান্তরের অপেক্ষায় অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠ ও বিভিন্ন হাসপাতালের মর্গে রয়েছে ৬১টি মৃতদেহ। আর জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে নাম-পরিচয়হীন ২৩৪টি মৃতদেহ। স্বজনেরা এখনো অপেক্ষায়: গতকাল দুপুরে বগুড়ার সোনাতলার আরশেদা বেগম ও তাঁর ছেলের বউ কোহিনূর জড়াজড়ি করে কান্নাকাটি করছিলেন অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে। বিলাপের সুরে আরশেদা বলছিলেন, ‘আমার ছেলেরে আল্লাহ পছন্দ করে নিয়ে গেছে। লাশটা দিলে আল্লাহর কী ক্ষতি হবে। আল্লাহ তুমি লাশটা দাও।’ আরশেদার ছেলে আসাদুল ব্যাপারী রানা প্লাজার সপ্তম তলায় কাজ করতেন। কোহিনূর বলেন, ‘চার বছর আগে আমার বিয়ে হয়। একটা ছেলে হয়েছিল। সে-ও মারা গেছে। এখন আমার আর যাওয়ার জায়গা নেই।’ সাভার ব্যাংক কলোনির ফজল ব্যাপারী ও ববিতার ছেলে মনির হোসেনের এখনো সন্ধান পাননি স্বজনেরা। ববিতা বলেন, ‘সবাই বলছে ঢাকায় গিয়ে ডিএনএ পরীক্ষা করতে। ঢাকা গেলে এর ফাঁকে যদি আমার মনিরের লাশ অধরচন্দ্রের মাঠে চলে আসে তাহলে তো অন্যরা নিয়ে যেতে পারে। তাই যাচ্ছি না।’ ফজল ব্যাপারী বলেন, ‘শুনেছি উদ্ধারকাজ শেষ হয়ে যাবে। সবাই বাড়িতে চলে যাবে। আমি কী নিয়ে বাড়ি যাব। আমি তো আমার মনিরের লাশ এখনো পাইনি।’ গতকাল অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে নওগাঁর প্রভাত চন্দ্র বসু ও বিলকিস আক্তারের স্বজনেরা এই প্রতিবেদককে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অভিযান শেষ হয়ে গেলেও যদি স্বজনের লাশ পাওয়া না যায়, তাহলে কী হবে এই ভেবে অনেকে দিশেহারা বোধ করছেন।

‘রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা’ ইউসুফ গ্রেপ্তার, কারাগারে

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকালে ‘রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা’ হিসেবে পরিচিত জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির এ কে এম ইউসুফকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গতকাল রোববার দুপুরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিকেলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তাঁকে কারাগারে পাঠান। বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিকেলে ইউসুফকে হাজির করা হলে ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। দুপুরে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। দুপুরে ট্রাইব্যুনাল ইউসুফের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিলে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আরজি জানান রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি হূষিকেশ সাহা। শুনানিতে তিনি বলেন, এ কে এম ইউসুফ মুক্তিযুদ্ধকালে জামায়াতের ৯৬ জন সদস্য ও স্বাধীনতাবিরোধীদের নিয়ে খুলনায় প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। একাত্তরে বাগেরহাটের (তৎকালীন খুলনা জেলার একটি মহকুমা) বিভিন্ন জায়গায় গণহত্যা, হত্যা, অপহরণ, লুণ্ঠন, অগ্নিসংযোগ প্রভৃতি মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত ছিলেন। আনুষ্ঠানিক অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ১৫টি অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি একজন প্রভাবশালী নেতা, তাঁর জন্য মামলার সাক্ষীরা হুমকির শিকার হচ্ছেন। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হোক। শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল আদেশে বলেন, আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফের (এ কে এম ইউসুফ) বিরুদ্ধে দাখিল করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও সংশ্লিষ্ট নথি পর্যালোচনা করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রাথমিক অভিযোগ (প্রাইমা ফেসি) পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২), ৪(১) ও ৪(২) ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেওয়া হলো। তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদনও মঞ্জুর করা হলো। গ্রেপ্তারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে হবে। দুপুর ১২টার দিকে পরোয়ানা জারির পরপরই র‌্যাব-২-এর উপ-অধিনায়ক মেজর আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে র‌্যাবের একটি দল ইউসুফের ধানমন্ডির বাসভবন ঘিরে ফেলে। বেলা পৌনে একটার দিকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় আগারগাঁওয়ে র‌্যাব-২-এর কার্যালয়ে। পরে তাঁকে ধানমন্ডি থানার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বিকেল চারটার পর ইউসুফকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হলে আসামিপক্ষের আইনজীবী সাইফুর রহমান তাঁর পক্ষে জামিনের আবেদন দাখিল করেন। তবে এরপর এজলাস বসেনি। ট্রাইব্যুনাল তাঁকে কারাগারে পাঠিয়ে আজ জামিনের আবেদনের শুনানির দিন ধার্য করেন। বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে তাঁকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, ইউসুফের বিরুদ্ধে আনা ১৫টি অভিযোগের মধ্যে গণহত্যার অভিযোগ সাতটি। এগুলো হলো: একাত্তরের ১৩ মে কচুয়া থানার রণজিতপুর গ্রামে গণহত্যা, ১৯ মে মোরেলগঞ্জ বাজারে গণহত্যা, ২১ মে রামপালের ডাকরা গ্রামে গণহত্যা, ১৪ অক্টোবর রামপালের চুলকাঠি গ্রামে গণহত্যা, ১৫ অক্টোবর কচুয়ার মঘিয়া গ্রামে গণহত্যা, জুলাই ও নভেম্বরে কচুয়ার শাঁখারীকাঠিতে গণহত্যা। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য ইউসুফ একাত্তরে মালেক মন্ত্রিসভার রাজস্ব, পূর্ত, বিদ্যুৎ ও সেচমন্ত্রী ছিলেন। ৮ মে তাঁর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়।

কাদের মোল্লার দণ্ড, আপিল নিষ্পত্তির ৬০ দিন পার

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে করা আপিল নিষ্পত্তির ৬০ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালস (সংশোধন) আইনের ২১(৪) ধারা অনুসারে আপিল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান রয়েছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সংশোধনী আনা হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ৬০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে—এই বিধানটি বাধ্যতামূলক নয়। কারণ, ৬০ দিনের মধ্যে শেষ না হলে কী হবে, তা বলা নেই। এটা নির্দেশনামূলক। তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের অন্তর্নিহিত ক্ষমতা আছে, ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিষয়টি শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা শুনতে ও রায় দিতে পারবেন। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৫ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন। পরে ৩ মার্চ কাদের মোল্লার সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। পরদিন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সাজা বাতিল চেয়ে কাদের মোল্লাকে খালাসের আরজি জানিয়ে আপিল করে আসামিপক্ষ। ইতিমধ্যে আইনে উল্লেখ করা ৬০ দিন সময় পেরিয়ে গেছে।কাদের মোল্লার দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের ওপর ১০ দিন শুনানি হয়েছে। আজ সোমবার আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় আপিল শুনানির জন্য ৬ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে। এর আগে ২৮ ফেব্রুয়ারি মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায় ঘোষণার ২৯ দিনের মাথায় ২৮ মার্চ রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষ আপিল করে। এরপর ১৮ এপ্রিল আপিল বিভাগ ২ মে দিন ধার্য করে এই সময়ের পূর্বে উভয়পক্ষকে আপিলের সার সংক্ষেপ জমা দিতে নির্দেশ দেন। সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ৭ মে আপিল বিভাগ আসামিপক্ষকে ১৬ মের মধ্যে আপিলের সারসংক্ষেপ জমা দিতে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বিধান অনুযায়ী আপিলের বিষয়ে আসামি সাঈদীকে নোটিশ দিতে রাষ্ট্রপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই আইনের উল্লেখ করা ৬০ দিন সময়ের ইতিমধ্যে ৪৫ দিন পেরিয়ে গেছে। কাদের মোল্লার দণ্ডের বিরুদ্ধে আপিলের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ট্রাইব্যুনালে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের প্রধান সমন্বয়কারী ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এম কে রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গতকাল শুনানি হয়নি। আমরা থাকি, তারা (আসামিপক্ষ) আসে না। তাদের আসা উচিত, অনেকেই আসেন। এটা আর কিছু না, বিলম্ব করার জন্য।’ তিনি বলেন, সাঈদীর আপিলের সারসংক্ষেপ দিতে বলা হয়েছে। ১৬ মে একটা তারিখ আছে। সাঈদীর ব্যাপারে কারাগারে নোটিশ পাঠানো হয়েছে। কাদের মোল্লার আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘প্রথম থেকেই বলেছি, আইন দ্বারা সর্বোচ্চ আদালতকে মামলা নিষ্পত্তির জন্য সময় বেঁধে দেওয়া যায় না। এটা নির্দেশনামূলক। সর্বোচ্চ আদালত পূর্ণ ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলা নিষ্পত্তিতে ওই সময়সীমা মানতে বাধ্য নন। তিনি মনে করেন, দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের ওপর একটা চাপ সৃষ্টির জন্যই এ বিধানটি করা হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ৫ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল-২ কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনা ছয়টি অভিযোগের মধ্যে দুটিতে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ এবং তিনটিতে ১৫ বছর করে কারাদণ্ডাদেশ দেন। অন্যান্য অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেওয়া হয়। যাবজ্জীবন দণ্ডের আদেশ প্রত্যাখ্যান করে কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে ঢাকার শাহবাগে ব্যাপক বিক্ষোভ দেখা দেয়। গড়ে ওঠে গণজাগরণ মঞ্চ। এরপর মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। এ অবস্থায় ১৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) বিল, ২০১৩ জাতীয় সংসদে পাস হয়। সংশোধিত আইনে রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও বাদীপক্ষের আপিলের সমান সুযোগ রাখা হয়েছে। এতে ৬০ দিনের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তির বিধানও রাখা হয়। আইনে রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আপিল করার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়। রায়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে আনা ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। এর মধ্যে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালিকে হত্যার দায়ে তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি, ধর্মান্তরিত করার একটি এবং লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তবে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় অন্য অভিযোগগুলোতে আলাদা করে কোনো দণ্ড দেওয়া হয়নি। ছয়টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার পরও দণ্ড ঘোষণা না হওয়ায় এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সাজা চেয়ে আপিল করে রাষ্ট্রপক্ষ। আর সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে খালাসের আরজি জানিয়ে আপিল করেন সাঈদী। আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় আজ বিষয়টি ১ নম্বর ক্রমিকে রয়েছে। ৬০ দিনের বিধান সম্পর্কে জানতে চাইলে বিশিষ্ট আইনজীবী এম জহির প্রথম আলোকে বলেন, এটা হচ্ছে নির্দেশনামূলক, বাধ্যতামূলক নয়। এ রকম হয়ে থাকে। যদি না হয় তাহলে কী করবে, খালাস পেয়ে যাবে? কী হবে বলা নেই, তাই এটা বাধ্যতামূলক নয়।

পাকিস্তানে গণতন্ত্রের জয়

পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ আবার প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। দেশটিতে গত শনিবারের সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিজয়ী হয়েছে তাঁর দল পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ বা পিএমএল (এন)। তবে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় মধ্য ডানপন্থী দলটিকে সরকার গঠনের জন্য জোট গড়তে হতে পারে। পাকিস্তানের ৬৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হতে যাচ্ছে। একে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জয় হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশ্লেষকেরা। পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদের আসনসংখ্যা ৩৪২। এর মধ্যে ২৭২টি আসনে সরাসরি নির্বাচন হয়। বাকি ৭০টির মধ্যে ৬০টি নারীদের এবং ১০টি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষিত। কাজেই সরকার গঠনের জন্য সরাসরি ভোট হওয়া ২৭২টির মধ্যে ১৩৭টি আসন পেতে হবে। গতকাল রাত দেড়টা পর্যন্ত বেসরকারিভাবে মোট ২৬৬টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে নওয়াজের পিএমএল (এন) পেয়েছে ১৩৩টি আসন। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়া পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি)। পিপিপি পেয়েছে ৩৩টি আসন। ক্রিকেটার থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) পেয়েছে ২৭টি আসন। ৭৩টি আসনে জয়ী হয়েছে স্বতন্ত্র ও অন্য দলের প্রার্থীরা। আর ৬টি আসনে ফলাফল ঘোষণা বাকি আছে। প্রধান বিরোধী দল পিপিপি না পিটিআই—কে হবে, তা নির্ভর করছে অবশিষ্ট আসনের ফলাফলের ওপর। পাকিস্তানের সাড়ে ছয় দশকের ইতিহাসে যখনই সেনাবাহিনীর হাত থেকে ক্ষমতা কোনো রাজনৈতিক দলের হাতে এসেছে, তখন তা গেছে পিপিপি অথবা পিএমএলের (এন) কাছে। এ দুটি দলই নিয়ন্ত্রণ করে এসেছে দেশটির রাজনীতি। এবার সেখানে পিটিআই নামের আরেকটি দলের আবির্ভাব ঘটল। দলটি শেষ পর্যন্ত প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা পেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। আত্মঘাতী বোমা হামলায় নিহত দুবারের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টো ও সদ্য বিদায়ী প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারির ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো নির্বাচনে পিপিপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। তিনি দলের চেয়ারম্যান। এদিকে, সরকার গঠনের লক্ষ্যে গতকালই অন্যান্য দলের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন নওয়াজ শরিফ। দলের শীর্ষ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী শরতাজ আজিজ জানান, কয়েকজন স্বতন্ত্র সাংসদের সঙ্গে কথা বলেছেন নওয়াজ। এ ছাড়া, মন্ত্রিপরিষদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদ নিয়ে আলোচনা করেছেন তিনি। জিয়ো টেলিভিশনের খবরে জানানো হয়, জমিয়ত উলামা-আল-ইসলামের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমান ফোন করে নওয়াজ শরিফকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে সরকার গঠন নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। টেলিভিশনটির খবরে আরও বলা হয়, নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজকে ফোন করে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, নওয়াজ সরকার গঠন করলে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। সর্বশেষ পিপিপি সরকারের আগ পর্যন্ত পাকিস্তানে কোনো সরকারই ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেনি। অর্থাৎ কখনোই শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। সেদিক দিয়ে এবারের নির্বাচন ছিল ঐতিহাসিক। দেশটির ক্ষমতায় বারবার হস্তক্ষেপ করেছে সেনাবাহিনী। ১৯৪৭ সালে ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে তিনবার। দেশ শাসন করেছেন চারজন স্বৈরশাসক। সর্বশেষ সামরিক অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটে ১৯৯৯ সালে। রক্তপাতহীন ওই অভ্যুত্থানে নওয়াজ শরিফের নির্বাচিত সরকারকে সরিয়ে ক্ষমতায় বসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। নওয়াজকে নির্বাসনে পাঠানো হয় সৌদি আরবে। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে দুই মেয়াদে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি—১৯৯০ সালের ৬ নভেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের ১৮ জুলাই এবং ১৯৯৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর পর্যন্ত। নির্বাসন থেকে ২০০৭ সালে দেশে ফিরে পরের বছর অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেন নওয়াজ। ওই নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে পিপিপি। শনিবার মধ্যরাতেই নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেন নওয়াজ শরিফ। পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আসকারি বলেন, তাঁকে (শরিফ) সন্ত্রাসবাদ ও অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করতে হবে। দ্রুত যদি তা করতে পারেন, বেশ ভালো। আর না পারলে তাঁকে সংকট ও সমালোচনার মুখে পড়তে হবে। ইমরানের বার্তা: নির্বাচনী প্রচারণার সময় পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার পর থেকে হাসপাতালে আছেন ইমরান খান। গতকাল কর্মী-সমর্থকদের উদ্দেশে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেছেন, এ নির্বাচন দেশের নবীন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে। তবে তাঁর দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্বাচনে কারচুপির বিষয়ে তাঁরা তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। ভিডিও বার্তায় ইমরান বলেন, ‘আমরা এখন গণতন্ত্রের পথে অগ্রসর হচ্ছি। নির্বাচনে ব্যাপক হারে ভোট দেওয়ার জন্য আমি দেশবাসীকে অভিনন্দন জানাই। দেশের তরুণ সমাজ আমার পক্ষে ছিল। এটাই আমার বিজয়।’ জোট সরকার হচ্ছে: সরকার গঠনের জন্য নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না নওয়াজের দল। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তাদের জোট গঠন করতে হবে। তবে নওয়াজকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল পিপিপি বা পিটিআইয়ের ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন পড়বে না। বরং দু-চারটি করে আসন পাওয়া ছোটখাটো অন্য দলগুলোর কয়েকটি বা বিজয়ী স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারলেই তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় যেতে পারবেন তিনি। তা খুব কঠিন হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। তবে পাকিস্তানের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে জোট টিকিয়ে রাখা কঠিন এবং এতে সরকারের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশয় থেকেই যাবে। কেননা, দেশটির সাড়ে ছয় দশকের বেশি সময়ের ইতিহাসে সর্বশেষ পিপিপি সরকার ছাড়া কোনো সরকারই ক্ষমতার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি।প্রাদেশিক নির্বাচন: জাতীয় পরিষদের পাশাপাশি শনিবার চারটি প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনেও ভোট দিয়েছে সেখানকার জনগণ। এগুলো হলো খাইবার পাখতুনখাওয়া, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও বেলুচিস্তান। এর মধ্যে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখাওয়ায় বিজয়ের পথে রয়েছে ইমরানের দল। রাজনৈতিকভাবে চরম অস্থিতিশীল এবং জঙ্গিবাদে জর্জরিত ওই অঞ্চল তালেবানের ঘাঁটি অভিযোগ তুলে সেখানে দীর্ঘদিন ধরে ড্রোন (চালকবিহীন বিমান) হামলা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। নির্বাচনী প্রচারণায় ইমরান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাঁর দল ক্ষমতায় গেলে ড্রোন হামলা বন্ধের ব্যবস্থা করা হবে। আর সিন্ধু প্রদেশে বিজয়ের পথে রয়েছে পিপিপি। সিন্ধু ভুট্টো পরিবারের পৈতৃক স্থান। সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাবে সরকার গঠন করতে পারে নওয়াজ শরিফের পিএমএল (এন)। পাঞ্জাব নওয়াজের নিজের প্রদেশ। বেলুচিস্তানের ফলাফল এখনো স্পষ্ট নয়। বিশ্লেষকদের মতে, সেখানে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনা বেশি।