Saturday, January 26, 2019

ভেনিজুয়েলা সংকট: কোন ভূমিকায় সেনাবাহিনী?

নিকোলাস মাদুরোর সরকার ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনীর কাজের প্রশংসা করেছে এবং তাদের ক্ষমতা বিস্তৃত করেছে। কিন্তু বিরোধীদের দাবি সেনাবাহিনী যেন দেশটির সংবিধানের প্রতি অনুগত থাকে।
ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ দেশটির সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডের দ্বারা কতটা নিয়ন্ত্রিত হয়?
গত ২৫ বছরে ভেনিজুয়েলায় তিনবার অভ্যুত্থানের চেষ্টা হয়েছে - এবং সাম্প্রতিক ইতিহাসে দেশটি তার সবচেয়ে খারাপ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এ কারণে এখন সবার দৃষ্টি ভেনিজুয়েলার সেনাবাহিনী দিকে।
এই সেনাবাহিনী কি প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রশাসনের প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে, নাকি এটি পক্ষ পরিবর্তন করে বিরোধী দলের নেতা এবং স্ব-ঘোষিত অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট জুয়ান গুয়াইদোকে সমর্থন দেবে?
মাদুরো বলেছেন যে তিনি ভেনিজুয়েলার একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিরোধী দলীয় নেতা গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার পর মাদুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ প্রেসিডেন্ট মাদুরোর প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নে সব ধরণের সন্দেহকে উড়িয়ে দিলেও মাদুরোর ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
মিস্টার গুয়াইদোর সেনাবাহিনীকে পক্ষ বদলানোর যে আহ্বান জানিয়েছিলের কার তীব্র নিন্দা জানান প্রতিরক্ষামন্ত্রী লোপেজ।
এক টুইটার বার্তায় তিনি বলেন, "যিনি সন্দেহজনক স্বার্থ হাসিলের জন্য আইন বহির্ভূতভাবে নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাকে দেশের সেনারা কখনোই প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেনে নেবে না।
সরকারের শক্তিশালী বন্ধন
প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মন্ত্রীসভার প্রায় এক তৃতীয়াংশ জুড়েই রয়েছেন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তা।
যদিও ভেনিজুয়েলার সংবিধানে সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতির বাইরে রাখার কথা বলা আছে।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো লোপেজও সেনাবাহিনীর কর্নেল হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন।
২০০২ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় হুগো শ্যাভেজ সরকারের প্রতি অনুগত ছিলেন তিনি।
একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রচারের কারণে তিনি বেশ পরিচিতি পেয়েছেন।
সেখানে তিনি বলেছিলেন "শ্যাভেজ এখনও বেঁচে আছেন। তার মাতৃভূমি এগিয়ে চলছে। স্বাধীন ও সমাজতান্ত্রিক মাতৃভূমি।"
পাদ্রিনো লোপেজ যৌথ বাহিনীর প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে এবং পরে দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান।
এরপর ২০১৪ সালে মাদুরো তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন।
তার ক্যারিয়ারের অগ্রগতি অন্যান্য উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের মত ভিন্ন নয় - তার মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের আনুগত্য ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ নেতা নির্ধারণ করতে পারে।সরব উপস্থিতি
পক্ষ বদলানোর ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর জন্য কোন বিষয়টি প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে?
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজ ১৯৯৯ সালের সংবিধানে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা বাড়িয়েছেন এবং রাজনীতিতে তাদের পথ তৈরি করে গেছেন।
যেখানে তাদের ভূমিকা শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ থাকবেনা। এর চাইতে আরও বেশি কিছু হবে।
বর্তমানে ভেনিজুয়েলা উচ্চ মুদ্রাস্ফিতি ও ঘাটতিতে ভুগছে। এ অবস্থায় দেশটির সেনা সদস্যদের ওপর নানা দায়িত্ব আরোপ করা হয়েছে।
যেমন: সাধারণ মানুষের মধ্যে তেল, চাল, কফিসহ অন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী বিতরণ, সেইসঙ্গে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা সংশ্লিষ্ট পণ্য যেমন টয়লেট পেপার, স্যানিটারি টাওয়েল, ন্যাপি ইত্যাদি বিতরণেরও নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিক্ষোভ কর্মসূচি বা খাদ্য লুটপাটের অভিযোগে গ্রেফতারকৃতদের শাস্তি সামরিক ট্রাইব্যুনাল দ্বারা বিচার করা হয়। সরকারের এমন পদক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে নাগরিক অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত এনজিওগুলো।
কারাকাসের সিমন বলিভার ইউনিভার্সিটির পলিটিকাল সায়েন্সের অধ্যাপক এবং নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ হার্নান ক্যাস্তিলো বলেন, "দৈনন্দিন সমাজে সেনাবাহিনী, এর আগে এতোটা সরবভাবে উপস্থিত ছিল না।"
সামরিক শক্তি
প্রেসিডেন্ট মাদুরো পরবর্তীতে সামরিক শক্তি ও রাজনীতিকে একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে দেন।
আলকালা বলেছেন " দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে জাতীয় উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনী আগের চেয়ে বেশি সম্পৃক্ত হয়েছে।"
সাবেক সেনা কর্মকর্তা ক্লিভর আলকালা প্রয়াত নেতা শ্যাভেজের সমর্থক হলেও তিনি মাদুরো সরকারের সমালোচনা করেন।
তিনি বলেন, দেশের প্রশাসন ও অর্থনীতির বড় অংশ সামরিক প্রশাসনের দায়িত্বে চলার বিষয়টি কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
"মাদুরো সশস্ত্র বাহিনী ও সেনাবাহিনীর প্রধানের উপর অত্যধিক নির্ভর হয়ে পড়ায় তিনি রাজনীতিবিদ ও নাগরিক সমাজের সমর্থন হারিয়েছেন।
এ অবস্থায় তিনি ক্ষমতায় থাকার জন্য সমর্থন পেতে সামরিক বাহিনীর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন"। জানান আলকালা।সেনাবাহিনীর মধ্যেই অসঙ্গতি
শীর্ষ সামরিক নেতারা এখনো প্রেসিডেন্ট মাদুরোর কাছাকাছি থাকতে পারে। তবে সেনাবাহিনীর নিচু স্তরের সাথে তার সম্পৃক্ততা এতোটা নেই।
দেশের অন্য সকলের মতো সমস্ত সামরিক সদস্যদেরও ভেনিজুয়েলার অর্থনৈতিক সংকট সহ্য করে চলতে হয়েছে।
তবে সেনাবাহিনীর উচ্চ-পদের কর্মকর্তাদের চাইতে এই নিচু পদের কর্মকর্তারা জ্বালানি, খাদ্যের অভাব এবং তীব্র মুদ্রাস্ফীতি সংকটের শিকার হয়েছে বেশি।
এ কারণে তাদের মধ্যে অসন্তোষ বেড়েই চলছে।
চলতি সপ্তাহের বিক্ষোভের সময়ে, সৈন্যদের একটি অংশকে দেখা যায় বিক্ষোভকারীদের দমন করার পরিবর্তে তাদের সমর্থন দিতে।
সাম্প্রতিক মাস গুলোয়, সশস্ত্র বাহিনীর শতাধিক সদস্যকে বিশ্বাসঘাতকতা, বিদ্রোহ, লুটপাট আর পক্ষ-ত্যাগের অভিযোগে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
আলকালা বলছেন, সশস্ত্র বাহিনীর অভ্যন্তরে অনিশ্চয়তা আর অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা প্রতিনিয়ত বাড়ছে: গত বছর তিন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়। পরে তারা কলম্বিয়া পালিয়ে গিয়ে সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয় চান।
এতদূর পর্যন্ত, ভেনিজুয়েলার সশস্ত্র বাহিনী মাদুরোর পক্ষেই আছে। - তার প্রতি আনুগত্য দেখানোয় আনুমানিক ১৬ হাজার ৯শ সৈন্যকে পদন্নোতি দেয়া হয়েছে। যদিও তারা দেশটির বর্তমান সংকটের মূল হোতা।
সূত্রঃ বিবিসি

ভেনিজুয়েলা সংকট: বিভক্ত দুনিয়া স্নায়ুযুদ্ধের আভাস

ভেনিজুয়েলা সংকটকে কেন্দ্র করে সারা পৃথিবী দুই ভাগে বিভক্ত। পরাশক্তিধর, বিশেষ করে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী দেশগুলো একে অন্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। ভয়াবহ ও শিরদাঁড়া হিম করা এক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে দুনিয়াজুড়ে। তবে কি স্নায়ুযুদ্ধের সেই সময়গুলো ফিরে এসেছে! সাবেক সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত চলা স্নায়ুযুদ্ধে বিশ্ব দেখেছে অনেকগুলো যুদ্ধ। এখনকি ভেনিজুয়েলাকে ঘিরে আরেকটি বড় যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে পরাশক্তিগুলো!
ভেনিজুয়েলার শাসক কে হবে- তা নিয়ে এরই মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচনে বিজয়ী নিকোলাস মাদুরো নাকি নিজেই নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণাকারী বিরোধী নেতা হুয়ান গাইডো। দেশটির সোশ্যালিস্ট পার্টির প্রধান নিকোলাস মাদুরো শপথ নিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তবে যে নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পশ্চিমা কিছু দেশ।
অন্যদিকে নিজে নিজে শপথ নিয়ে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেছেন হুয়ান গাইডো। তাকে আবার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র রাষ্ট্রগুলো স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু এতে চটেছে চীন ও রাশিয়া। একইসঙ্গে কড়া প্রতিক্রিয়া দিয়েছে তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান ও কিউবা।
সংকট শুরু হলে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন মাদুরোকে টেলিফোন করেন। পুতিনের দাবি বাইরে থেকে ভেনিজুয়েলার এ সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। ইঙ্গিত সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বিরোধী শক্তির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং হুয়ান গাইডোকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনে ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের কথাও বলেছে দেশটি। এমন অবস্থার প্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে রাশিয়া। এর আগে দেশটিতে দুটি পরমাণু বোমাবাহী বোম্বারু যুদ্ধবিমানও পাঠায় রাশিয়া।
রাশিয়ার উপ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রিয়াবকভ সিএনএনকে এক সাক্ষাৎকারে বৃহস্পতিবার বলেছেন, আমরা শুধু যুক্তরাষ্ট্রকে নয়, প্রত্যেককে সতর্ক করে দিচ্ছি।  ভেনিজুয়েলায় কোনো রকম হস্তক্ষেপ থেকে কী ফলাফল বেরিয়ে আসতে পারে তা সবার জানা উচিত। হুয়ান গাইডোকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে আমি মনে করি এই অবস্থান থেকে ভয়াবহ কিছুর ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ হলো আগুনে আরো গ্যাস যোগ করা। যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তির ব্যবহার করলে বিপর্যয়ের সৃষ্টি হবে। এতে আন্তর্জাতিক বিপুল পরিমাণ সিস্টেমে আঘাত লাগবে, ভেনিজুয়েলাকে আরো রক্তপাতের দিকে ঠেলে দেবে।
এদিকে, রাশিয়ার মিত্র চীনও ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রতিবাদ জানিয়েছে। উল্লেখ্য, রাশিয়া ও চীন প্রয়োজনীয় ঋণ ও অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে ভেনিজুয়েলাকে। বিশেষ করে চীন সে দেশে বিশাল মাত্রায় বিনিয়োগ করে এসেছে। সে দেশের পেট্রোলিয়াম শিল্পেও চীনের বড় অবদান রয়েছে। এমন অবস্থায় ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে বিশ্ব স্পষ্টত দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একপক্ষ সমর্থন করছে নিকোলাস মাদুরোকে। অন্যপক্ষ সমর্থন করছে হুয়ান গাইডোকে। এ রাজনীতিতে রয়েছে স্থানীয় কৌশল। তার চেয়ে বড় হয়ে আছে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপ। তাতে সে যে দেশ যাকেই সমর্থন করুক না কেন।
অনলাইন সিএনএন লিখেছে, বিরোধী দলীয় নেতা হুয়ান গাইডোকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়ে রাশিয়া যে সমালোচনা করেছে তার সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে চীন, তুরস্ক ও সিরিয়া। এ ইস্যুতে তারা ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সমর্থন জানিয়ে কড়া ভাষায় বিবৃতি দিয়েছে। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত মাদুরোর বিরুদ্ধে এবং হুয়ান গাইডোকে স্বীকৃতি দেয়ার মার্কিন উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে যারা তার মধ্যে রয়েছে বৃটেন, কানাডা, ব্রাজিল, কোস্টারিকা, আর্জেন্টিনা, পেরু, কলোম্বিয়া, ইকুয়েডর, চিলি, স্পেন ও অর্গানাইজেশন অব আমেরিকান স্টেটস। কিন্তু ৩৫ বছর বয়সী গাইডোকে স্বীকৃতি দেয়াকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে রাশিয়া ও তার মিত্ররা।
গত বুধবার গাইডো নিজে শপথ নিয়ে নিজেকে ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন। আরো ঘোষণা দেন যে, মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। এর ফলে ভেনিজুয়েলার ভেতরে ও বাইরে দেশটির ভবিষ্যৎ নিয়ে এক লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। ওদিকে হুয়ান গাইডোকে স্বীকৃতি দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিকোলাস মাদুরো ৭২ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সব কূটনীতিককে তার দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। এর মধ্যদিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করেন তিনি। তবে তার এ নির্দেশকে যুক্তরাষ্ট্র অর্থহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। ভেনিজুয়েলা সংকট নিয়ে শনিবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উন্মুক্ত আলোচনার অনুরোধ জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিবৃতি দিয়েছে সিরিয়াও। বৃহস্পতিবার দেয়া ওই বিবৃতিতে বলা হয়, বিষয়টিতে যুক্তরাষ্ট্রের নগ্ন হস্তক্ষেপের নিন্দা জানায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ সরকার। এমন হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক সব নিয়ম কানুন, আইনের ভয়াবহ লঙ্ঘন। আর তা ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর ভয়াবহ এক আক্রমণ।
সেনাবাহিনী রয়েছে মাদুরোর পক্ষে
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গেই রয়েছে তার দেশের সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবার তারা এ কথা জানিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে অভিযোগ করেছে, তাদের দেশে একটি সমান্তরাল সরকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভেনিজুয়েলার গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে একে একটি অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে সেনাবাহিনী। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এসে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা মাদুরোর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাদুরোর মন্ত্রিসভার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়েই রয়েছেন সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তারা। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পাদ্রিনো লোপেজও সেনাবাহিনীর কর্নেল হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। ২০০২ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের সময় হুগো শ্যাভেজ সরকারের প্রতি অনুগত ছিলেন তিনি। একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রচারের কারণে তিনি বেশ পরিচিতি পেয়েছেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন, শ্যাভেজ এখনও বেঁচে আছেন। তার মাতৃভূমি এগিয়ে চলছে। স্বাধীন ও সমাজতান্ত্রিক মাতৃভূমি।
পাদ্রিনো লোপেজ যৌথ বাহিনীর প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে এবং পরে দেশটির সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিয়োগ পান। এরপর ২০১৪ সালে মাদুরো তাকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিযুক্ত করেন। তার মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের আনুগত্য ভেনিজুয়েলার ভবিষ্যৎ নেতা নির্ধারণ করে দিতে সক্ষম।
মাদুরোকে এরদোগানের ফোন, তুরস্ক আপনার পাশে আছে
ভেনিজুয়েলা সংকটের মধ্যে বুধবারই প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ফোন করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যিপ এরদোগান। তিনি তাকে দৃঢ়তা অবলম্বনের আহ্বান জানান। বলেন, আপনার পাশে আছে তুরস্ক। প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র ইব্রাহিম কালিনকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে রাষ্ট্র পরিচালিত বার্তা সংস্থা আনাডোলু। ইব্রাহিম কালিন বৃহস্পতিবার টুইটে লিখেছেন, এরদোগানের নেতৃত্ব সব রকম অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান বজায় রাখবে তুরস্ক।
ওদিকে মাদুরোকে সমর্থন দিয়েছে চীনও। তারা বলেছে, ভেনিজুয়েলা সরকার তার জাতীয় সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতা ধরে রাখার চেষ্টা করছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিইং বলেছেন, চীন আশা করে ভেনিজুয়েলার অন্য দলগুলো তাদের সাংবিধানিক ব্যবস্থার প্রতি সম্মান দেখাবে এবং রাজনৈতিক বিরোধ সহিংসতা এড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করবে। আমরা চাই যুক্তরাষ্ট্র ও ভেনিজুয়েলার মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক সমতা, পারস্পরিক সম্মান ও একে অন্যের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার মধ্য দিয়ে বজায় থাকুক। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ভেনিজুয়েলার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের হস্তক্ষেপের বিরোধী চীন। হুয়া চুনিইং বলেন, ভেনিজুয়েলায় সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে সব পক্ষই বিরোধিতা করবে। আমি বলতে চাই বাইরের দেশ থেকে অবরোধ এবং হস্তক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে। এতে সংকটের সমাধান হবে না।
অবস্থা যখন এই, তখন ভেনিজুয়েলার রাজপথ অস্থির। আর বিদেশি শক্তিগুলো পক্ষ নেয়া শুরু করেছে। পাশাপাশি, ভেনিজুয়েলায় রাজনৈতিক সংকট আরো গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁ পর্যন্ত ভয়াবহ এক  বিপর্যয় থামানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

ধ্বংসের কাছাকাছি পৃথিবী!

নতুন করে পারমাণবিক অস্ত্রের প্রতিযোগিতা, ক্রমবর্ধমান হারে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ ও রাষ্ট্র মদতপুষ্ট অসত্য প্রচারণার ফলে বিশ্ব এখন ধ্বংসের কাছাকাছি। এমনটাই নির্দেশ করছে ডুমস ডে ঘড়ি। শীতল যুদ্ধের উত্তাল সময়ে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল। এমনটা দাবি করেছেন পারমাণবিক বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোভিত্তিক বুলেটিন অব দ্য এটোমিক সায়েন্টিস্টস তৈরি করেছে এই ডুমস ডে ক্লক। বিশ্ব কতটা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে এতে তা ইঙ্গিত করা হয়। বৃহস্পতিবার তারা এই ঘড়িতে দেখিয়েছে দ্বিতীয় বছরের জন্য মধ্যরাত হতে বাকি আছে দুই মিনিট। বিজ্ঞানীরা এ অবস্থাকে ভয়াবহরকম এক অস্বাভাবিকতা বলে উল্লেখ করছেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
বুলেটিন অব দ্য এটোমিক সায়েন্টিস্টস এক বিবৃতিতে বলেছে, ২০১৮ সালে যে অবস্থায় ছিল ডুমস ডে ক্লক। এবারও সেখানেই আছে। একে স্থিতিশীলতা বলে ধরে নেয়া উচিত হবে না। একে বিশ্ব নেতা ও সারাবিশ্বের মানুষের জন্য একটি কড়া হুঁশিয়ারি হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্রকে খর্ব করার জন্য তথ্যযুক্তকে ক্রমাগত বেশিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে গত বছর। সেই ঝুঁকি এসে বিদ্যমান পারমাণবিক যুদ্ধ ও জলবায়ু পরিবর্তনের যে হুমকি তাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে আরো বলা হয়েছে, বিশেষ করে সামাজিক মিডিয়া সহ বহু ফোরামে জাতীয় পর্যায়ের নেতারা ও তাদের সহযোগীরা নির্লজ্জের মতো মিথ্যা বলেছেন। তারা বুঝিয়েছেন তারা যে মিথ্যা বলছেন সেটাই সত্য।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডনাল্ড ট্রাম্প। তারপর থেকে ২০১৭ ও ২০১৮ সালে এই ডুমস ডে ক্লক পর্যায়ক্রমে ৩০ সেকেন্ড এগিয়ে গেছে। এর কারণ, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনাকর পরিস্থিতি।

জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ: এখন আমাদের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য

বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এখন আমাদের প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। আমাদের ঐক্যের যোগসূত্র হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িকতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাম্য ও ন্যায়বিচার এবং উন্নয়ন ও অগ্রগতি। বিজয়ের পর আমরা সরকার গঠন করেছি। সরকারের দৃষ্টিতে দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিক সমান। আমরা সবার জন্য কাজ করব। টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৫ মিনিটের বক্তব্যে তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় ও বিএনপি জোটের বড় পরাজয়ের কারণ ব্যাখা করেন।
আওয়ামী লীগের জয়কে প্রত্যাশিত উল্লেখ করে জয়ের পেছনে ১৪টি কারণ তুলে ধরেন। অন্যদিকে বিএনপি জোটের পরাজয়ের সাতটি কারণ উল্ল্যেখ করেন। একইসঙ্গে তিনি বিপুল বিজয়ের জন্য আওয়ামী লীগের সকল নেতা-কর্মী, সমর্থক ও শুভানুধ্যায়ীদের ধন্যবাদ জানান। আর সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন শেষ করার জন্য জনগণ, নির্বাচন কমিশন, নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। ভাষণে শেখ হাসিনা যারা নৌকায় ভোট দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ আর যারা ভোট দেননি তাদের ধন্যবাদ জানান নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য। পাশাপাশি নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দল ও জোট এবং প্রার্থীকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বিএনপি দলীয় এমপিদের সংসদে যোগ দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন,একাদশ সংসদে বিরোধীদলের সদস্য সংখ্যা নিতান্তই কম। তবে, সংখ্যা দিয়ে আমরা তাদের বিবেচনা করব না। সংখ্যা যত কমই হোক, সংসদে যেকোন সদস্যের ন্যায্য ও যৌক্তিক প্রস্তাব/আলোচনা/সমালোচনার যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। আমি বিরোধীদলের নির্বাচিত সদস্যদের শপথ নিয়ে সংসদে যোগদানের আহ্বান জানাচ্ছি। দুর্নীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন,আমি জানি, দুর্নীতি নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে অস্বস্তি রয়েছে। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের নিজেদের শোধরানোর আহ্বান জানাচ্ছি। আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে দুর্নীতি উচ্ছেদ করা হবে। আমরা তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুর্নীতির নির্মুল করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। দুর্নীতি বন্ধে জনগণের অংশগ্রহণ জরুরি। তাই, গণমাধ্যমের সহায়তায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির কাজ অব্যাহত থাকবে।
আওয়ামী লীগের জয়ের কারণ
আওয়ামী লীগের ল্যান্ডস্লাইড বিজয়ের ১৪টি কারণ তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন,এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয় ছিল খুবই প্রত্যাশিত। নির্বাচনের আগে দেশি-বিদেশি জরিপগুলিও এ রকমই ফলাফলের ইঙ্গিত দিয়েছিল। লন্ডন-ভিত্তিক ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট এবং রিসার্স এন্ড ডেভলপমেন্ট সেন্টারের জরিপের ফল আপনারা লক্ষ্য করেছেন। আমাদের এই ল্যান্ড-স্লাইড বিজয়ের কয়েকটি কারণ আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই।
 
পদ্মাসেতু, ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহাসড়কগুলোকে চার-লেনে উন্নীতকরণসহ মেগা প্রকল্পগুলো দৃশ্যমান হওয়ায় সাধারণ মানুষের বর্তমান সরকারের উপর আস্থা জন্মেছে।
  •         কৃষিজীবীদের সার, বীজসহ বিভিন্ন উপকরণে ভর্তুকি প্রদানের মাধ্যমে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে।
  •         সরকারি চাকুরিজীবীগণের বেতনভাতা বিগত ১০ বছরে আড়াই থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
  •         গ্রাম বাংলার খুব কম পরিবারই আছে, যে পরিবার সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর উপকারভোগী নয়। কোন না কোনভাবে প্রতিটি পরিবার উপকৃত হচ্ছেন।
  •         দশ বছর আগে যে বালক/বালিকাটি হারিকেন বা কুপির আলোয় পড়া-লেখা করত, গ্রামে পাকা রাস্তা দেখেনি, তরুণ বয়সে সে এখন বৈদ্যুতিক বাতির আলোয় পড়াশোনা করছে, মোটরযানে যাতায়াত করছে।
  •        বিগত ১০ বছরে দেশে যে উন্নয়ন হয়েছে, সাধারণ মানুষ তার সুফল পেয়েছেন।
  •       যে বয়স্ক পুরুষ-নারী পরিবারে ছিল অবহেলিত-অপাংক্তেয়, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা তাঁকে সংসারে সম্মানের জায়গায় নিয়ে গেছে।
  •      কৃষি শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, ভ্যান বা রিক্সাচালকসহ নি¤œবিত্তের মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। ১০ বছর পূর্বে একজন কৃষি শ্রমিক তাঁর দৈনিক মজুরি দিয়ে বড় জোর ৩ কেজি চাল কিনতে পারতেন। এখন তিনি ১০ কেজি চাল কিনতে পারেন।
  •         সরকারি ও বেসরকারি খাতের শ্রমিক-কর্মচারিদের বেতন-ভাতাও সমহারে বেড়েছে। যেমন পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন ১৬০০ টাকা থেকে ৫ গুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৮ হাজার টাকা হয়েছে।
  •       ব্যবসায় এবং শিল্প-বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে একদিকে কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে অন্যদিকে রপ্তানি বাণিজ্য প্রসারিত হয়েছে। যার সুবিধা সাধারণ জনগণ পাচ্ছেন।
  •        মানুষ নিজের এবং দেশের মর্যাদা চায়। আমরা বাংলাদেশকে সেই মর্যাদা এনে দিতে পেরেছি। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর নিন্ম মধ্যম আয়ের দেশ এবং ৪৬ বছর পর উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা প্রাপ্তি জনগণকেও গর্বিত করেছে। ভিক্ষুকের দেশের দুর্নাম ঘুচেছে। যাঁরা মানুষকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছেন, তাঁদের মানুষ মর্যাদা দিবেন- এটাই স্বাভাবিক।
  •         বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালের পর থেকেই নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। প্রতিটি সম্ভাব্য প্রার্থী নিজ নিজ এলাকায় জনসংযোগ বাড়িয়েছেন এবং এলাকার উন্নয়নে অবদান রেখেছেন। এবারের নির্বাচনে দলের প্রতিটি নেতাকর্মী মনোনীত প্রার্থীর জন্য কাজ করেছেন।
  •         আমাদের নির্বাচনী প্রস্তুতি ছিল ব্যাপক। সরাসরি সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি আমরা ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালিয়েছি।
  •       নির্বাচনী প্রচারকালে সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। ব্যবসায়ী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, কৃষিবিদ, শিক্ষাবিদ, সাবেক আমলা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য, শিল্পী-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ধর্মীয় নেতা- সকলেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছেন। একটি সমাজের প্রায় সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ যখন কোন দলের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন, তখন তাকে কোনভাবেই আটকে রাখা যায় না।

বিএনপির পরাজয়ের কারণ
এদিকে ভাষণে বিএনপির পরাজয়ের সাতটি কারণ তুলে ধওে শেখ হাসিনা বলেন,পক্ষান্তরে আমাদের প্রতিপক্ষ জোটের নির্বাচনী কৌশল সম্পর্কে আপনারা ভালভাবেই জানেন। আমি এ নিয়ে কথা বলতে চাইনে। তাঁদের পরাজয়ের বহুবিধ কারণ রয়েছে: 
  •       তাছাড়া, ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাতের দেশব্যাপী অগ্নি-সন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মক কর্মকা- সাধারণ মানুষের মন থেকে মুছে যায়নি।
  •        নিজেরা জনগণের জন্য কী করবে,  সে কথা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে ক্ষমতায় গেলে আমাদের বিরুদ্ধে কী ধরনের প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নিবে- তাদের প্রচারণায় প্রাধান্য পেয়েছে।
  •       মনোনয়ন নিয়ে ব্যাপক বাণিজ্যের অভিযোগ এবং দুর্বল প্রার্থী মনোনয়ন;
  •         এক আসনে ৩-৪ জন বা তারও বেশি প্রার্থী মনোনয়ন;
  •       নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠাতা পেলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন - সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা;
  •      সোসাল মিডিয়ায় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিষোদগার করা ছাড়া নিজেদের সাফল্যগাঁথা তুলে ধরতে পারেনি।
  •        সর্বোপরি, বিএনপি’র ধানের শীষ মার্কায় যুদ্ধাপরাধী জামাত নেতাদের মনোনয়ন তরুণ ভোটাররা মেনে নিতে পারেনি। তরুণেরা আর যাই হোক স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তির পক্ষ নিতে পারে না। এ রকম আরও বহু উদাহরণ দেওয়া সম্ভব, যার মাধ্যমে প্রমাণ করা যাবে যে সাধারণ ভোটারগণ বিএনপি’র দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন এবং নৌকার অনুকূলে এবার গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল।

মাদকাসক্তি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের আহ্বান
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা দেখেছেন আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে ইতোমধ্যেই মাদক, জঙ্গি তৎপরতা এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে সফলতা অর্জন করেছি। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে। আমরা একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে হিংসা-বিদ্বেষ হানাহানি থাকবে না। সকল ধর্ম-বর্ণ এবং সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। সকলে নিজ নিজ ধর্ম যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে পালন করতে পারবেন।  তিনি বলেন,বৈশ্বিক প্রভাবে কিংবা স্থানীয় প্ররোচনায় আমরা কিছু কিছু তরুণকে বিভ্রান্তির শিকার হয়ে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হতে দেখেছি। ইসলাম শান্তির ধর্ম। ইসলামে সন্ত্রাসের কোন স্থান নেই। আমি সমাজের সকলকে মাদকাসক্তি ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারে আমরা কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছি। মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়নের মাধ্যমে উৎপাদনমুখী করা হচ্ছে। কওমী মাদ্রাসার দাওয়ারে হাদিস ডিগ্রিকে মাস্টার্স ডিগ্রির সমমানের করা হয়েছে। সারাদেশে ৫৬০টি মসজিদ-কাম-ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।

আওয়ামী লীগ কথামালার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা টানা তৃতীয়বার এবং ১৯৯৬ সাল থেকে চতুর্থবারের মত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সরকার পরিচালনার ম্যান্ডেট দিয়েছেন। আপনাদের এবারের এই নিরঙ্কুশ সমর্থন আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে আপনাদের এই রায়কে দেশবাসীর সেবা এবং জাতির পিতার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার ও সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ বলে মনে করি। তিনি বলেন,বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কথামালার রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আমরা যে প্রতিশ্রুতি দেই, তা বাস্তবায়ন করি। ২০০৮ এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে যেসব প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছিলাম তার অধিকাংশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন,একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আমরা ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ’ শ্লোগান সংবলিত নির্বাচন ইশতেহার ঘোষণা করেছি। ইশতেহার ঘোষণাকালে আমি এর সারাংশ আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম। আপনারা অনেকেই এই দলিলটি ইতোমধ্যে পড়েছেন। আমি আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই যে, আমাদের যেকোন নীতিমালা প্রণয়নে এবং উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে এই ইশতেহারটি পথ-নির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। তিনি বলেন,মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বিস্তার, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়নসহ আর্থ-সামাজিক নানা সূচকে বাংলাদেশ বিগত দশ বছরে ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। শুধু এশিয়ার দেশগুলোরই শীর্ষে নয়, কোন কোন ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন অনেক উন্নত দেশকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ তাই বাংলাদেশকে চেনেন ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ হিসেবে।

আমাদের এই পথচলা মসৃণ ছিল না
প্রধানমন্ত্রী বলেন,আমাদের এই পথচলা মসৃণ ছিল না। শত প্রতিকূল অবস্থা মোকাবিলা করে আমরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছি। যার সুফল আজ জনগণ পাচ্ছেন। এ অর্জন শুধু সরকারের নয়, এ অর্জন দেশের প্রতিটি পরিশ্রমী মানুষের। আজকে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১.৮ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে যা ২০০৫-৬ সালে বিএনপি সরকারের আমলে ছিল ৪১.৫ শতাংশ। মাথাপিছু আয় ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে ১ হাজার ৭৫১ ডলারে উন্নীত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩ বিলিয়ন থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনি বলেন,বিএনপি সরকারের ২০০৫-৬ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল মাত্র ৬১ হাজার কোটি টাকা। যা ৭.৬ গুণ বৃদ্ধি করে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আমরা ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকার বাজেট দিয়েছি। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণ ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা। যার নব্বই ভাগ বাস্তবায়ন হয় নিজস্ব অর্থায়নে। কারও কাছে আমাদের হাত পেতে চলতে হয় না। প্রধানমন্ত্রী জানান,গত অর্থবছরে আমাদের জিডিপি’র প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.৮৬ শতাংশ। মূল্যস্ফীতি ৫.৪ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ফলে নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার আওতায় রয়েছে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি এখন বাংলাদেশ। প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারস-এর প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৪০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের অর্থনীতি বিশ্বে ২৩তম স্থান দখল করবে। তিনি বলেন,এইচ.বি.এস.সির প্রক্ষেপণ অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হবে। আমরা মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছি। ভারতের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা হয়েছে।

আরও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে
প্রধানমন্ত্রী বলেন,দশ বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। মানুষের জীবনমান এখন অনেক উন্নত। এখন মানুষ সুন্দর করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। দেশকে আমরা আরও উন্নত করতে চাই। তাই সামনে অনেক কাজ আমাদের। আরও কঠিন পথ পাড়ি দিতে হবে। আপনাদের সঙ্গে নিয়ে সেই বন্ধুর পথ অতিক্রম করতে পারব, ইনশাআল্লাহ। জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপি-জামাতের সন্ত্রাসীদের হামলায় ২৪ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি। এসময় তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামাত জোটের অগ্নি সন্ত্রাস এবং পেট্রোল বোমা হামলায় যারা নিহত হয়েছেন আমি তাঁদের স্মরণ করেন। আহত ও স্বজনহারা পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। এছাড়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২-বারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রী, সদ্য সমাপ্ত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম-সহ দশম সংসদের যেসব সদস্য ইন্তেকাল করেছেন, তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন।

তরুণদের কর্মসংস্থানের বিশেষ পরিকল্পনা
ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারি সেবাখাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় জীবনের সর্বত্র আইনের শাসন সমুন্নত রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করব। জাতীয় সংসদ হবে সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রবিন্দু। তিনি বলেন,আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। তরুণদের কর্মসংস্থানের জন্য আমরা বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা প্রদানসহ বিভিন্ন সুবিধা নিশ্চিত করা, তরুণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও প্রণোদনা প্রদান, সরকারি উদ্যোগে কর্মসংস্থান পরিকল্পনা, তরুণ উদ্ভাবকদের উদ্ভাবনসমূহ আন্তর্জাতিকভাবে পেটেন্ট করার উদ্যোগ গ্রহণ, দেশ-বিদেশে কর্মে নিয়োগের জন্য কারিগরি বিষয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি এবং কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ জনবল গড়ে তোলার জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে কারিগরি কলেজ স্থাপন করা। ইতোমধ্যে কারিগরি কলেজ স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জানান,আগামি পাঁচ বছরে আমরা দেড় কোটি কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি। সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ এগিয়ে চলেছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীগণ বিনিয়োগের জন্য আসছেন। সারাদেশে ২ ডজনের বেশি হাইটেক পার্ক এবং আইটি ভিলেজ নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। কৃষি, মৎস্য, পশুপালন, পর্যটন, সেবাখাতসহ অন্যান্য খাতে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আত্ম-কর্মসংস্থানের ব্যাপক সুযোগ সৃষ্টি করা হবে। তিনি বলেন,আমরা চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যথাসময়ে শেষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। বিশেষ করে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, মহেষখালি-মাতারবাড়ি সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পসহ ফাস্ট ট্রাক মেগা প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন কাজে গতি আনা হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন,দেশের প্রতিটি গ্রামে শহরের সুবিধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। দেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে। ছেলেমেয়েদের উন্নত পরিবেশে লেখাপড়ার সুযোগ তৈরি করা হবে। সুপেয় পানি এবং উন্নতমানের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। সুস্থ বিনোদন এবং খেলাধুলার জন্য অবকাঠামো গড়ে তোলা হবে। ইন্টারনেট/তথ্য প্রযুক্তি সর্বত্র পৌঁছে যাবে।

সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়
প্রধানমন্ত্রী পরিকল্পনা তুলে ধরে বলেন,২০২০ সালে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে আমরা ২০২০-২০২১ সালে মুজিব বর্ষ এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব উদযাপন করব। বাঙালি জাতির এই দুই মাহেন্দ্রক্ষণে আমরা দেশকে আর্থ-সামাজিক খাতে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে চাই। আর এর কৌশল হিসেবে আমরা ভিশন ২০২১ এবং ভিশন ২০৪১ বাস্তবায়ন করছি। পাশাপাশি, জলবায়ুর ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অর্জনের জন্য আমরা ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০’ নামে শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন,আমরা ইতোমধ্যে সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়ন শুরু করেছি। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। তিনি বলেন,সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়- আমাদের এই পররাষ্ট্র নীতিই বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্কের মূল হাতিয়ার। এই নীতির সফল বাস্তবায়ন বাংলাদেশকে উন্নতি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক যে কোন সময়ের চাইতে সুদৃঢ় এবং গভীর। প্রধানমন্ত্রী বলেন,তরুণেরাই দেশের ভবিষ্যত কর্ণধার। তারুণ্যের সৃষ্টিশীলতা, উদ্যম এবং শক্তির উপর আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থা রয়েছে। তারুণ্য মানেই বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, আসাদ-মতিউর, নূর হোসেনদের রক্তদান। তারুণ্য মানেই লাল-সবুজের পতাকা- আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি, তারুণ্য মানেই বাঙালি এবং বাংলাদেশ। তিনি বলেন,১৯৭১ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিল। আর ২০১৮ সালে আরেক বিজয়ের মাসে এ দেশের ভোটারগণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করেছে, আমাদের দেশ সেবার সুযোগ করে দিয়েছে। আমি আগেও বলেছি, আবারও বলছি- আমার ব্যক্তিগত কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। বাবা-মা-ভাই, আত্মীয়-পরিজনকে হারিয়ে আমি রাজনীতি করছি শুধু জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তাবায়নের জন্য; এ দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য। এ দেশের সাধারণ মানুষেরা যাতে ভালভাবে বাঁচতে পারেন, উন্নত-সমৃদ্ধ জীবনের অধিকারী হতে পারেন- তা বাস্তবায়ন করাই আমার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন,জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বলেছিলেন: ‘মহৎ অর্জনের জন্য মহৎ ত্যাগের প্রয়োজন।’ আমরা ত্যাগের পথ অনুসরণ করেই এগিয়ে যাচ্ছি। আমার বর্তমানকে উৎসর্গ করেছি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। আমরা তরুণদের শক্তি, মেধা ও মননকে সোনার বাংলা গড়ার কাজে সম্পৃক্ত করব। আজকের তরুণেরাই পারবে দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি আনতে।

সকল নাগরিকের সমর্থন এবং সহযোগিতা চাই
বক্তব্যর শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নবীন-প্রবীণের সংমিশ্রণে আমি আমার মন্ত্রীসভা গঠন করেছি। প্রবীণদের অভিজ্ঞতা আর নবীনদের উদ্যম- এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমরা আমাদের লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। আপনারা আমার উপর আস্থা রেখে যে রায় দিয়েছেন, কথা দিচ্ছি আমি প্রাণপণ চেষ্টা করব সে আস্থার প্রতিদান দিতে। এজন্য দলমত নির্বিশেষে দেশের সকল নাগরিকের সমর্থন এবং সহযোগিতা চাই। আপনাদের সহযোগিতায় আমরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতামুক্ত অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করব, ইনশাআল্লাহ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাষায় বলতে চাই:

‘যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি-
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।’
সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সহায় হোন।