Monday, September 2, 2013

রাজনীতি- অরাজনৈতিক ব্যক্তিরাও রাজনীতিরই অংশ by আলী ইমাম মজুমদার

অরাজনৈতিক ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বক্তব্য প্রদান নিয়ে বিগত বেশ কিছুকাল বিতর্ক চলছে। বিশেষ করে যাঁরা যখন সরকারে থাকেন, তাঁরা এ ধরনের লোকদের অনেকের বক্তব্য পছন্দ করেন না।

কুষ্টিয়ার রাজনীতি- নির্বাচন হবেই! নির্বাচন ঠেকিয়ে দেব! by সোহরাব হাসান

২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে কুষ্টিয়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজগঞ্জ থেকে কর্মস্থলে আসছিলেন। হঠাৎ অজ্ঞাত নম্বর থেকে একটি ফোন এল।

রস+আলো প্রস্তাবিত টক শো নীতিমালা

কিছুদিন আগে শোনা গিয়েছিল, টিভির টক শোগুলোর জন্য নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হচ্ছে। কিন্তু এখনো তা আলোর মুখ দেখেনি।

জাতিসংঘ মহাসচিব, চীনা রাষ্ট্রদূত এবং দেশের রাজনীতি by মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন

পাহাড়সম অনিশ্চয়তার মধ্যে আকস্মিক এক ফোনালাপে রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। দেশের চলমান অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও আগামীতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে দুই শীর্ষ নেত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। বান কি মুনের এই উদ্যোগ আশান্বিত করেছে মানুষকে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম চলমান রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কথা বলেছে চীন। চীনের রাষ্ট্রদূত সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে তিনি দুই শীর্ষ নেত্রীকে সংলাপ শুরুর তাগিদ দিয়েছেন। ঈদের পর নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে বিরোধী দল চূড়ান্ত আন্দোলনে নামার কথা থাকলেও কৌশলগত কারণে কর্মসূচি দেয়ার ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। এর সুফলও তারা পেয়েছেন। নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে সরকার যে চাপের মধ্যে পড়েছে- বিএনপি জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে গেলে এর বিপরীতটা হতো। উল্টো বিএনপি চাপের মধ্যে পড়ত। এ মুহূর্তে কঠোর আন্দোলনে না গিয়ে বিরোধী জোট রাজনীতিতে একধাপ এগিয়ে গেছে। আগামীতে ভোটের রাজনীতিতে তারা এর ফল পাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন। বিরোধী দলের কৌশল যে কোনোভাবে দেশকে নির্বাচনমুখী করা। নির্বাচনী রাজনীতিতে তাদের নেতাকর্মীরা উদ্দীপ্ত ও উজ্জীবিত।
অন্যদিকে নির্বাচনের নাম শুনলেই যেন ক্ষমতাসীন দলের পরাজয়ের ভীতি পেয়ে বসে। তারা হয়তো মনে করছেন, নির্বাচন মানেই তাদের পরাজয় আর বিএনপির জয়। তাই ঈদের পর ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ কিছু জায়গায় পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা থাকলেও তা হবে না বলেই মনে হয়। পরাজয়ের ভীতি থেকেই তারা স্থানীয় নির্বাচন থেকে সরে এসেছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনও কৌশলে বানচাল করার চেষ্টা চলছে বলে অনেকে মনে করেন। আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমের কথায়ও নির্বাচন না হওয়ার ইঙ্গিত প্রকাশ পেয়েছে। তিনি অহরহ বলছেন, নির্বাচন না হলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই দেশ চালাবেন।
প্রশ্ন হল, নির্বাচন হবে না কেন? প্রধানমন্ত্রীও মেয়াদ শেষে আবার ক্ষমতায় থাকবেন কেন? উত্তর সহজ- ক্ষমতাসীন দল যে কোনো উপায়ে নির্বাচন বানচাল করে, পঞ্চদশ সংশোধনীর সুযোগ নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চায়। সে হিসেবে দেশে অস্থিরতা ও বিশৃংখলা সৃষ্টি হয় এমন কোনো কর্মসূচি না দিয়ে বিএনপি নিঃসন্দেহে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। আর কঠোর কর্মসূচি না দেয়ায় ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলছেন, আন্দোলন করার শক্তি নাকি বিএনপির নেই। বিএনপির আন্দোলনের শক্তি সরকার খোঁজে কেন? বিএনপি কখন আন্দোলন করবে, না করবে এটি তাদের রাজনৈতিক কৌশল। এ নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা কেন? ব্যথা এ জন্য যে, সরকার চায় দেশে জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন হোক। পানি ঘোলা হোক। নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতায় থাকার প্রেক্ষাপট তৈরি হোক।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে চীনের রাষ্ট্রদূতের সাম্প্রতিক মন্তব্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। চীন হয়তো মনে করছে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর আঞ্চলিক নিরাপত্তার সম্পর্ক জড়িত। আগামীতে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন না হলে বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে। ফলে বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ আমদানি-রফতানির গতি মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে। তাতে বাংলাদেশ যেমন ক্ষতির সম্মুখীন হবে, তেমনি ক্ষতির সম্মুখীন হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও। এমনটি হলে রফতানিমুখী দেশ হিসেবে চীনের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে; অনিবার্য ক্ষতির মুখে পড়তে পারে চীন। তাই চীন চাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শান্তি বজায় থাকুক। বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক।
চীনের পরই জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশের চলমান রাজনীতি নিয়ে সরাসরি কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে। উদ্দেশ্য বাংলাদেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের আগ্রহ সবার নজর কেড়েছে। বান কি মুন এদেশের মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বুঝতে পেরেছেন। তার এই উদ্যোগ বাংলাদেশের অনিশ্চিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তরণে সহায়ক ভূমিকা রাখবে- এতে সন্দেহ নেই। এরই মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের ভূমিকার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। রাজনৈতিক সমঝোতার একটা প্রেক্ষাপট তৈরি হচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে এর বাস্তব প্রতিফলন মানুষ দেখতে পাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন।
একজন এশিয়ান হিসেবে জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশকে দেখছেন ভবিষ্যতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে। তার দৃষ্টিতে বাংলাদেশ হয়তো বিশ্ব পরিসরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্তিরতার প্রভাব প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে গোটা বিশ্বকেই আচ্ছন্ন করতে পারে। তাই বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গুরুদায়িত্ব হিসেবে মনে করছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন এবং দুই নেত্রীকে ফোন করেছেন। শোনা যাচ্ছে, দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে তিনি আরও বাস্তবধর্মী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন। যাতে সব দলের অংশগ্রহণে একটি পক্ষপাতহীন ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।
বিরোধী দলের উচিত এ জন্য দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা এবং কঠোর কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে বিরত থাকা। কথা ছিল ঈদের পর বিরোধী জোট রাজপথ উত্তপ্ত করতে কঠোর কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামবে। যদি বাস্তবে এমনটি হতো, তাহলে এর বেনিফিশিয়ারি হতো নিঃসন্দেহে সরকারি দল। এখন তারা যে চাপের মধ্যে আছে, তখন এই চাপ সহ্য করতে হতো বিরোধী জোটকে। ফলে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ইস্যুতে চীনও এগিয়ে আসত না, জাতিসংঘও এগিয়ে আসত না। ফলে সরকার একটা ফুরফুরে মেজাজে থাকত; তারা কোনো চাপ অনুভব করত না। এসব বিষয় মাথায় রেখেই বিরোধী জোটকে কৌশলে এগুতে হবে। কোনো হটকারী কাজ করা মোটেও সমীচীন হবে না।
সংবিধান পাঁচ বছরের বেশি কোনো সংসদ বহাল থাকার নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হলে পরবর্তী সময়ে বহাল থাকা সংসদ যদি সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতিতে ফিরে যায়, তাহলে কী হবে? নির্বাচিত এমপিদের সংবিধান অনুযায়ী কি কোনো করণীয় থাকবে? এসব জটিল প্রশ্ন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ফলে সরকার পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়ে নৈতিকভাবে চাপের মধ্যে আছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর অসঙ্গতিগুলো ক্ষমতাসীন দলের এমপিদের মুখেও প্রকাশ পাচ্ছে। এতে সরকার উভয় সংকটে পড়েছে। এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে তারা এখন পথ খুঁজছে। এ পথ করে দিতে পারে বিরোধী জোটের জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন। তাই জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলনে সরকার উসকানি দিচ্ছে। বিএনপির আন্দোলনের শক্তি-সামর্থ্য নেই বলে মন্তব্য করছে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি রাজনৈতিক দলকে জনগণের ভোটে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসতে হলে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হয়- নির্দ্বিধায় বলা যায়, বর্তমান শাসকদল তা তৈরি করতে পারেনি। কাজেই জনগণের ভোটে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের আবার সরকারে আসার চিন্তা অবান্তর। বরং যেনতেনভাবে সরকারে আসার চিন্তা বাদ দিয়ে একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অবস্থান যদি শাসক দল আগামীতে নিশ্চিত করতে পারে; এটি তাদের জন্য হবে অনেক পাওয়া। জনগণ তাদের পাঁচ বছর পর হয়তো আবার ক্ষমতায় আনবে। সুতরাং এখনও যে সময়টুকু ক্ষমতাসীন দলের হাতে আছে, তার সর্বোত্তম ব্যবহার করতে হবে। রাজনৈতিক সংকট সমাধানে উদ্যোগী হতে হবে। সরকারকে অনুধাবন করতে হবে, জনগণ যদি জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ-আতংক ও দুশ্চিন্তায় ভোগেন, তাহলে মানুষের কাছে তারা আরও অজনপ্রিয় হয়ে উঠবে। তাদের সব সম্ভাবনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। মানুষ মনে করে, দেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখার বিষয়টি এখন সর্বতোভাবে বর্তমান সরকারের ওপরই নির্ভর করছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনে পক্ষপাতহীন নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে জনগণের ভোটের অধিকার রক্ষার পাশাপাশি দেশও এক অনিবার্য বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাবে। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে দেশে গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থা ব্যাহত হবে। আর এই সমঝোতার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারকেই।
বিএনপি উদার গণতান্ত্রিক পরিচয়ের ধারক একটি রাজনৈতিক দল। জিয়াউর রহমান উদার নীতিতে বিএনপির জন্ম দিয়ে খুব অল্প সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। উদার নীতির কারণেই বাংলাদেশের মানুষ বারবার ভোট দিয়ে বিএনপিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে বিএনপি পাঁচবার সরকার গঠন করেছে। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এটা একটা রেকর্ড বলা যায়। কাজেই উগ্র ও জ্বালাও-পোড়াও পথে নয়, উদার গণতান্ত্রিক পরিচয়েই বিএনপির পথচলা সমীচীন।
মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

তিস্তা চুক্তি- আশা ভঙ্গে মরুকরণের হাতছানি by তুহিন ওয়াদুদ

তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি নিয়ে মহাজোট সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশ এবং ভারত উভয় দেশ আশার বাণী শুনিয়ে আসছে।

ইয়াবার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া by মো.আরিফুর রহমান ফাহিম

ইয়াবা সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছুই নেই। এ সম্পর্কে আমরা সবাই কম বেশি জানি। তবে এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কি বা এটি শরীরের ওপর কি কি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে সে বিষয়ে অনেকেই আমরা তেমন কিছুই জানি না।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্র্তিযুদ্ধ ও শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ by ড. মিহির কুমার রায়

শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড- এ কথাটি এখন কারও মুখে শোনা যায় না, অথবা কোনো বিলবোর্ডেও দেখা যায় না। বরং এর পরিবর্তে রাজধানী শহর কিংবা বিভাগীয় শহর/জেলা শহরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ব্যাপারে অনেক রঙিন ব্যানার দেখা যায়। এছাড়াও বিশেষত রাজধানী শহরে ব্যক্তিমালিকানায় প্রতিষ্ঠিত অনেক স্কুল-কলেজের ছবিসহ রঙিন বিলবোর্ড দেখতে পাওয়া যায়। তাছাড়াও টেলিভিশনে দেশের ব্যক্তিমালিকানায় প্রতিষ্ঠিত আবাসিক/অনাবাসিক স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কারুকার্যমণ্ডিত অনেক বিজ্ঞাপন দেখতে পাওয়া যায়। এসবের মুখ্য উদ্দেশ্য হল শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা। ভর্তি প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বিভিন্ন ধরনের ছাড়ের ঘোষণাও দেয়া হয়। সম্প্রতি দেশের সব বোর্ডের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল একসঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে এবং তুলনামূলক বিচারে এ বছরের ফলাফল কিছুটা খারাপ হয়েছে সত্য, তবে এবারও জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫৫ হাজারের ওপরে রয়েছে- যারা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে। এর বাইরেও উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তির আশা পোষণ করে নিজেদের আর্থিক সঙ্গতির কথাটি বিবেচনায় রেখে। এর মাঝামাঝি সময়ে অর্থাৎ উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পর থেকে ভর্তির আগ পর্যন্ত শহরের কোচিং সেন্টারগুলো ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের ভর্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি স্বরূপ কোচিং বাণিজ্য করে যাচ্ছে অত্যন্ত লাভজনকভাবে।
আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০১৪ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিচ্ছু ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি পরীক্ষার ভিত্তিতে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলে প্রায় ১০৪টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং দেশের সার্বিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একই পরীক্ষার্থীকে একাধিক প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে হয়। এর জন্য ভর্তিচ্ছু পরীক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তি ফি প্রদান করে ফরম পূরণ করতে হয় এবং পরে তাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে যেতে হয়, যা অনেকাংশে ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য। তারপরও যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সীমিত আসনে ভর্তির সুযোগ পেয়ে যায় মেধার ভিত্তিতে, তারা তুলনামূলক কম খরচে পড়াশোনার বিরল সুযোগটি পেয়ে যায়। তবে কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞপ্তিতে প্রকাশিত যোগ্যতা অনুযায়ী আবেদন করার পরও আবেদনকৃত সবাই ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। এতে করে সাধারণ মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক, প্রশাসন ও পদ্ধতিগত ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।
দেশে বর্তমানে ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন ভিত্তিতে ভর্তির জন্য আবেদন করা হয় এবং এ ফরম পূরণ করতে যে ধরনের কম্পিউটার দক্ষতার প্রয়োজন হয় তা সিংহভাগ মফস্বল শিক্ষার্থীদের মধ্যে থাকে না। আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের কারণে এ সুযোগে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী অনলাইন সার্ভিস দিয়ে রমরমা ব্যবসা চালিয়ে যায়, যা শিক্ষার্থীদের জন্য একটা বাড়তি খরচ। বিষয়টি এখানেই শেষ নয়, যারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তারা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে ভর্তির জন্য প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় এবং সেখানেও অনলাইন পদ্ধতিতে ভর্তির আবেদন করতে হয় শুধু একটি মাত্র কলেজ থেকে। ফলে পদ্ধতিগত কারণে নির্দিষ্ট সংখ্যক ছাত্রছাত্রী ভর্তির সুযোগ পায়। এতে যারা সরকারি মাধ্যমে আর সুযোগ পায় না, তারা প্রায় ৭০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য ভিড় জমায় এবং সেখানেও দু-একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া ভর্তি পরীক্ষায় তেমন কোনো নিয়ম মানা হয় না। ফলে সাধারণভাবে জিপিএ ২.৫০ পেয়েই অনায়াসে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন অনুষদ যেমন- ব্যবসায় প্রশাসন, বস্ত্র প্রকৌশল, কম্পিউটার প্রকৌশল, ইংরেজি, আইন প্রভৃতি বিষয়ে ভর্তি হয়ে যায়। কিন্তু সমস্যাগুলো হল প্রথমত, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও ভর্তি ফি’র ব্যাপারে কোনো সমতা নেই, যে যার মতো ফি নির্ধারণ করে থাকে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগ আসে মফস্বল থেকে, যারা বাংলা মাধ্যমে পড়াশোনায় অভ্যস্ত অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মাধ্যম হল ইংরেজি। তৃতীয়ত, বেশির ভাগ শিক্ষার্থীর আর্থিক সচ্ছলতা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খরচের সঙ্গে অসঙ্গতি বিধায় তাদের এক জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হয়। চতুর্থত, বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসসহ কোনো ছাত্রাবাস/ছাত্রীবাস নেই বিধায় শিক্ষার্থীরা নিজ দায়িত্বে মেস, হোস্টেল কিংবা বাড়ির রুম উচ্চহারে ভাড়া করে লেখাপড়ার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা একাধারে ব্যয়বহুল, অস্বাস্থ্যকর ও মানসিক বিকাশের সহায়ক নয়। এর ফলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে জীবনের মধুর ক্ষণগুলো উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়। একই ঘটনাগুলো পরে ছাত্রছাত্রীদের জীবনদর্শন, আচরণ ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পঞ্চমত, মানসম্মত শিক্ষা যা ছাত্রের ভবিষ্যৎ জীবনের একমাত্র পাথেয় বিশেষত প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে, তা অনেক ক্ষেত্রে একটি পর্যায়ে ধরে রাখা যাচ্ছে না। যদিও পরীক্ষার ফলাফল দেখে এ ঘাটতিটুকু বোঝার কোনো উপায় নেই। এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একই বক্তব্য। শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্য হয় যেখানে, সেখানে শিক্ষা হল পণ্যের ভূমিকায় আর বেপারির ভূমিকায় শিক্ষক। এ সত্যটুকু এখন সরকার ও মালিকপক্ষ সবাই জানেন।
এ অবস্থার ভেতর থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে বের করে এনে ছাত্রদের কল্যাণে নিয়োজিত করতে হবে এবং অভিন্ন কাঠামোতে সার্বিক একাডেমিক ও প্রশাসনিক শিক্ষা কার্যক্রমকে নিয়ে আসতে হবে। এর মধ্যে প্রথম প্রয়োজন হবে সরকারের পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে মালিকদের একাগ্রতা ও ঐকান্তিক ইচ্ছা। দ্বিতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিন্ন নিয়মে ভর্তি পরীক্ষা পরিচালনা করা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি ফিসহ সেমিস্টার ফি বাবদ খরচ একটি অভিন্ন কাঠামোতে নিয়ে আসা। তৃতীয়ত, মানসম্মত শিক্ষাদানের জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান আইন করে বন্ধ করা এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে স্থায়ীভাবে বিষয়ভিত্তিক মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ করা। চতুর্থত, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেতন কাঠামো থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অভিন্ন বেতন কাঠামো নেই এবং একই বিশ্ববিদ্যালয়ের একই পদে দুই শিক্ষকের বেতন ভিন্নতর পরিলক্ষিত হয়, যা মানসম্মনত শিক্ষার পরিপন্থী। পঞ্চমত, গরিব মেধাবী ছাত্রদের জন্য বিশেষ সুবিধা থাকলেও অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তা মানতে চায় না। তাছাড়াও যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মেধার ভিত্তিতে ভর্তি পরিচালনা করে থাকে, সেখানে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত ছাত্ররা অর্থের অভাবে আর ভর্তির সুযোগ পায় না। সেক্ষেত্রে কোটাপদ্ধতি চালুর বিষয়টি সক্রিয় বিবেচনায় রাখা যায় কি-না, তা সরকার ও মালিকপক্ষসহ সুধীজন বিবেচনায় রাখতে পারে। শিক্ষার আলো সমাজকে আলোকিত করবে, এ ধারণাটি আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে সেই প্রত্যাশায় রইলাম।
ড. মিহির কুমার রায় : অর্থনীতিবিদ ও গবেষক, সিটি ইউনিভার্সিটি, ঢাকা

ওবামা কি অপেক্ষায় থাকবেন? by হুসাইন আজাদ

একক ক্ষমতাবলে সিরিয়ায় হামলার ইঙ্গিত দিয়েও শেষ পর্যন্ত কংগ্রেসের অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা।

দুর্নীতিবাজদের কারণে যোগ্যরা বঞ্চিত হচ্ছে by নির্মল চক্রবর্ত্তী

দুর্নীতি শব্দের অর্থ হচ্ছে নীতিহীনতা। নিয়ম-নীতি-নৈতিকতাকে বিসর্জন দিয়ে কোনো কাজ করাই মূলত দুর্নীতি। অবৈধভাবে, আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে স্বীয় কার্য উদ্ধারের লক্ষ্যে গ্রহণ করা কোনো খারাপ নীতিই দুর্নীতি। বিশেষ করে যে ক্ষেত্রে আর্থিক বা অন্য কোনো মূল্যবান সামগ্রী কিংবা সুযোগ-সুবিধা লেনদেনের সম্পর্ক থাকে। এতে করে নিয়ম-কানুনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, প্রতিযোগিতায় টিকে যাওয়া সৎ, যোগ্য ও মেধাবীরা তাদের ন্যায্য প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। জীবনের যে কোনো ক্ষেত্রে টিকে থাকতে বা প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে প্রতিযোগিতার প্রয়োজন। আর যে কোনো প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে প্রয়োজন যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আনুগত্য। আজকাল ভর্তি পরীক্ষা, নিয়োগ পরীক্ষা, এমনকি পদোন্নতি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে কাক্সিক্ষত ফলাফল অর্জন করতে হয়। স্বাভাবিকভাবে সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করে কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে যারা পৌঁছতে পারবে, সাফল্য তাদেরই আসার কথা। কিন্তু ইদানীং সেটা হয় না। এজন্য ধরতে হয় ভিন্ন পথ। প্রভাব-প্রতিপত্তি, রাজনৈতিক বিবেচনা, আর্থিক লেনদেন কিংবা অন্য বিশেষ কোনো সুযোগ-সুবিধার বিনিময় করতে হয়। বস্তুত সঠিক পথে ইদানীং কোনো কাজই করা যায় না। দেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরে চলছে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি। টাকা-পয়সার অবৈধ লেনদেন ছাড়া গাছের পাতাও নড়ানো যাচ্ছে না। এক টেবিল থেকে আরেক টেবিলে ফাইল সরাতে গেলেও ক্ষেত্রবিশেষে বড় অংকের অর্থ গুনতে হয়। ছোট অংকের ঘুষ-উৎকোচের ব্যাপার তো বলতে গেলে আমাদের কাছে সহনীয়ই হয়ে গেছে। আমরা ধরেই নিয়েছি যে, কাজ করতে গেলে সর্বত্র কিছু হাতখরচ, আপ্যায়ন, কিংবা পকেট মানি বাবদ কিছু ‘সম্মানি’ দিতে হয়। এভাবে চলতে চলতে বর্তমানে দেশজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে নৈরাজ্যের এক মহাযজ্ঞ। এটা শুধু দেশে নয়, বিশ্বজুড়েই সম্প্রসারিত হয়েছে। ছড়িয়েছে সংক্রামক ও দুরারোগ্য ব্যাধির মতো।
গত ১০ জুলাই প্রায় সব পত্রিকায় ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বৈশ্বিক দুর্নীতি সম্পর্কিত জরিপ প্রকাশিত হয়েছে। তাতে শিরোনাম হয়েছে- রাজনৈতিক দল ও পুলিশ সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত খাত। জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৯৩ শতাংশ মানুষের ধারণা, দেশে সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে রাজনৈতিক দল ও পুলিশ। গ্লোবাল করাপশনে ব্যারোমিটার ব্যবস্থা শীর্ষক এ জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। তবে উত্তরদাতাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা হচ্ছে, সরকারি সেবায় ঘুষ দেয়ার হার কমেছে। উত্তরদাতাদের ধারণা, পুলিশ, বিচারব্যবস্থা ও ভূমিসেবা শীর্ষ ঘুষ গ্রহীতা খাত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে বাংলাদেশে ৪৬ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণা ছিল দেশে দুর্নীতি বেড়েছে। এখন ৬০ শতাংশ উত্তরদাতা এই ধারণা পোষণ করেন। তবে উত্তরদাতারা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছেন পুলিশ, বিচারব্যবস্থা, ভূমিসেবা ও রেজিস্ট্রেশন, পারমিট সেবা, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিসেবা (গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি) এবং কর- এই আটটি সেবা খাতে ঘুষ বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেয়ার হার তুলনামূলকভাবে কমেছে। ৯০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকার বিশেষ মহলের (রাজনৈতিক দল, রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক, বিশেষ ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ইত্যাদি) স্বার্থ দ্বারা বিভিন্ন মাত্রায় প্রভাবিত হয়। জরিপ বলছে, রাজনৈতিক দল, পুলিশ ও বিচারব্যবস্থার পর দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের তালিকায় রয়েছে যথাক্রমে সংসদ, সরকারি প্রশাসন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা, শিক্ষা, এনজিও, সামরিক বাহিনী এবং ধর্মীয় সংগঠন।
দুর্নীতির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক ও প্রতিবেশী দেশগুলোর একটি তুলনা প্রতিবেদনে দেয়া হয়েছে। বৈশ্বিকভাবে ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৭০ শতাংশ এবং আফগানিস্তানের ৩৯ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণা দুর্নীতি বেড়েছে। অন্যদিকে বৈশ্বিকভাবে ৭২ শতাংশ, ভারতের ৮০ শতাংশ এবং আফগানিস্তানের ৭১ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, সরকারে দুর্নীতি গুরুতর সমস্যা। জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৩২ শতাংশ উত্তরদাতার ধারণা, দুর্নীতি প্রতিরোধ সরকারি পদক্ষেপ অকার্যকর।
টিআই’র এ প্রতিবেদন নিয়ে আমাদের দেশে রীতিমতো হইচই হড়ে গেছে। অনেকেই এ ব্যাপারে মন্তব্য করেছেন যে যার মতো করে। সরকারি দল তথা আওয়ামী লীগ এটাকে বানোয়াট, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দেখছে। তাদের ধারণা, মেয়াদের শেষ প্রান্তে এসব প্রোপাগান্ডা জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে পারে। তবে বিরোধী দলগুলো বিষয়টিকে লুফে নিয়েছে। দুর্নীতি-সংক্রান্ত এ প্রতিবেদন তাদের সরকারবিরোধী সমালোচনার গতিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর জনসাধারণ হচ্ছে একের পর এক দুর্নীতির শিকার। যার কোনো প্রতিকারই করা যাচ্ছে না। সরকার বদল হচ্ছে, কিন্তু দুর্নীতি দূর হচ্ছে না। বরং তা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত এ প্রতিবেদন মিথ্যা নয়, আবার পুরোপুরি সত্যও নয়। সত্য-মিথ্যার মাঝামাঝি হলেও এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কোনো কিছু স্বীকার বা অস্বীকার করলেই প্রকৃত চিত্র মুছে যায় না। ধুয়ে যায় না কলঙ্ক কালিমা। দেশে অবশ্যই দুর্নীতি হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে এবং তা বেশ কয়েকটি খাতে অতিমাত্রায়। তাই বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে নিতে হবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
চাটুকারদের কথা শুনে দেশের বাস্তব চিত্র উপলব্ধি করা যাবে না। কারণ এ চাটুকার শ্রেণীর মানুষেরা রাজনীতিকদের অতিরিক্ত প্রশংসার অন্ধকারে রাখে। প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করার অবকাশ দেয় না। শুধু তাই নয়, এরাই রাজনীতিকদের নাম ভাঙিয়ে নানা অপকর্ম ও দুর্নীতি করে থাকে, যা রাজনীতিকদের কাঁধে এসে পড়ে। তখন তারাও পরোক্ষভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েন। আর এভাবেই তাদের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার প্রভাব শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে ব্যালট বাক্সে।
এখনও সময় আছে নীতি-নৈতিকতাহীন সব ধরনের অবৈধ পন্থা পরিত্যাগ করার। ঘুষ বাণিজ্য দূর করার। আসুন, আমরা যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী প্রাপ্তির প্রত্যাশা করি এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে বিরাজমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই সম্মিলিতভাবে। তাতে নিজেদেরও শান্তি আসবে, বৈশ্বিক শান্তিও প্রতিষ্ঠিত হবে। মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হবে দেশ ও জাতি।
নির্মল চক্রবর্ত্তী : ভারতের দৈনিক উত্তরবঙ্গ সংবাদ পত্রিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি

কেমন পুরুষকে সঙ্গী হিসেবে চায় মেয়েরা?

সঙ্গী হিসেবে কেমন পুরুষকে কল্পনা করেন একজন নারী? সেটা হয়তো একজন নারীর কাছে জানতে চাওয়া হলেই বেরিয়ে আসবে।

গুজবের ঘুড়ি এবং রাজনীতির বাস্তবতা by আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাংলাদেশ এখন গুজবে গুজবে সয়লাব। আগস্ট মাসের গোটা দুই সপ্তাহ ঢাকায় কাটিয়ে এসেছি। তখনও নানা গুজব কানে এসেছে। কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক, তা নির্ণয় করা মুশকিল। বর্তমানে যেমন আমাদের রাজনীতিতে, তেমনি সাংবাদিকতায়ও হলুদের ছাপ বেশি। ব্রডশিট জাতীয় দৈনিক আর হলুদ ছুপানো ট্যাবলয়েড-মার্কা পত্রিকার মধ্যে অনেক সময় পার্থক্য খুব কম চোখে পড়ে। গুজবগুলোর মূল কেন্দ্র এখন জাতীয় পার্টি ও ঢাকার ইউনূস সেন্টার। আমি তখন ঢাকায়। খবর রটে গেল, ড. ইউনূসকে প্রধান করে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হবে। তাতে ড. কামাল হোসেন, ড. বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রমুখ থাকবেন। এরপর ১৮ আগস্ট রোববার ঢাকা থেকে লন্ডনে এসে পৌঁছতে না পৌঁছতে শুনলাম, ঢাকার বাজারে রটে গেছে, বিএনপি নেত্রী জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। প্রস্তাবটি হল, জে. এরশাদ বিএনপি জোটে যোগ দিলে এবং আগামী নির্বাচনে জোট জয়ী হলে তিনি রাষ্ট্রপতি হবেন। নির্বাচনে ৭০টি আসন তার দলকে ছেড়ে দেয়া হবে এবং মন্ত্রিসভায় তার দল ১০টি আসন পাবে।
একেবারে বিশ্বাস করার মতো খবর। সারাদিন টেলিফোনে খোঁজখবর নিলাম। ঢাকায় কাগজগুলো দেখলাম। কিন্তু এই খবর যে সঠিক তার কোনো প্রমাণ পেলাম না। বুঝলাম, দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলছে। সেই সুযোগে গুজবের ঘুড়ি ওড়ানো হচ্ছে। জেনারেল এরশাদের সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে যাওয়া নিয়েও গুজব ছড়ানো হয়েছে। বলা হয়েছে, সিঙ্গাপুরে যাওয়ার আগে অথবা পরে এরশাদ সাহেব টেলিফোনে বেগম জিয়ার সঙ্গে কুড়ি মিনিট কথা বলেছেন। কী বলেছেন তার কোনো হদিস নেই।
আমাদের নতুন রাষ্ট্রপতিও সিঙ্গাপুর গেছেন। তা নিয়েও নানা গুজব। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর আবদুল হামিদ সাহেব ঘনঘন সিঙ্গাপুরে যাচ্ছেন। অনেকে বলেন, ছোটখাটো রোগে চিকিৎসার জন্যও কি বাংলাদেশে ভালো চিকিৎসক নেই? জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন প্রয়াত ডা. নুরুল ইসলাম। তিনিই বঙ্গবন্ধুর চিকিৎসা করতেন। বড় ধরনের সার্জারি ছাড়া বঙ্গবন্ধুকে তো কখনও চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে হয়নি। এখন কথায় কথায় চিকিৎসার নামে সিঙ্গাপুর, ব্যাংককে যাওয়ার ধুম পড়ে গেছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতির চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে যাওয়া নিয়েও রাজনৈতিক গুজব কানে এসেছে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটা অস্থিরতা চলছে। এই অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে গুজবের একটা অবদান রয়েছে। রাজনীতিতে সুস্থতা ও স্থিরতা ফিরিয়ে আনতে হলে গুজবের ধূম্রজাল থেকে দেশকে মুক্ত করা প্রয়োজন। কিন্তু কে তা করবেন? আমাদের প্রিন্টিং অথবা ইলেকট্রনিক মিডিয়া? এই মিডিয়ার একটা বড় অংশ তো নিজেরাই গুজব ছড়ানোর কাজে ব্যস্ত। এটাই তাদের ব্যবসা। দেশে এখন একশ্রেণীর হলুদ সাংবাদিকের আবির্ভাব ঘটেছে। প্রকৃত সাংবাদিকদের মতো তাদের একই মর্যাদা। সংবাদপত্রের কলাম, টেলি টকশোতে তাদের প্রাধান্য বেশি। অর্থাৎ আমাদের সাংবাদিকতায় মুড়ি ও মুড়কির এখন এক দাম। এ অবস্থা থেকে দেশ মুক্ত না হলে সমাজ বা রাজনীতিতে নীতি-নৈতিকতা কখনও ফিরে আসবে না।
জেনারেল এরশাদ এবং ড. ইউনূসকে নিয়ে সত্য-মিথ্যা খবর রটানো হলুদ সাংবাদিকতায় যে লাভজনক ব্যবসা হয়ে উঠেছে, তার একটা বড় কারণ সম্ভবত দেশের বহমান রাজনীতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির ওপর অনেকেই আস্থা হারিয়েছেন। বহমান রাজনীতির এই গোলকধাঁধা থেকে বেরোনোর কোনো পথও তারা দেখছেন না। তখন তারা ভাবেন, জে. এরশাদ কিংবা ড. ইউনূসই সম্ভবত তাদের ত্রাতা হতে পারবেন। হতাশ মনের এই ক্ষোভকেই পুঁজি করে হলুদ সাংবাদিকরা তাদের গুজবের ব্যবসাকে জমজমাট করে তুলেছেন। জে. এরশাদ বা ড. ইউনূস কী করতে পারেন বা কী করতে পারবেন তা খতিয়ে দেখার কাজটি এই হলুদ সাংবাদিকরা এড়িয়ে চলেন।
জেনারেল এরশাদ ও ড. ইউনূসের মধ্যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে। জেনারেল এরশাদ সামরিক ডিক্টেটর থেকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এসেছেন। নেতা হয়েছেন। একজন সামরিক শাসক ক্ষমতা থেকে অপসারিত হওয়ার পর রাজনীতিতে ফিরে এসেছেন এবং প্রতিষ্ঠা লাভ করেছেন এমন ঘটনা বিশ্ব ইতিহাসেই বিরল। আমরা পছন্দ করি বা না করি জে. এরশাদ এবং তার জাতীয় পার্টি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন একটা ফ্যাক্টর। তাই তাকে নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি দু’দলেই এত টানাটানি।
ড. ইউনূস একজন ব্যাংকার এবং ব্যবসায়ী। রাজনীতিক নন। আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও তিনি রাজনীতিতে আসেননি। তবে রাজনৈতিক কথাবার্তা বলতে শুরু করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অতীতেও তার কোনো ভূমিকা ছিল না। এক-এগারোর সময় নোবেল পুরস্কারকে পুঁজি করে তিনি খালি মাঠে গোল দিতে চেয়েছিলেন। পারেননি। এখন যে তিনি রাজনীতিতে নামার পাঁয়তারা করছেন তা রাজনীতি বা জনগণের প্রতি ভালোবাসার জন্য নয়। গ্রামীণ ব্যাংকের একচ্ছত্র আধিপত্য হারানোর পর তিনি বর্তমান সরকারের প্রতি রুষ্ট হয়েছেন এবং এই সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামাতে চান।
ড. ইউনূসের লক্ষ্য আওয়ামী লীগ-বধ। তাই নীতি ও আদর্শগতভাবে বিএনপি-জামায়াতের সঙ্গে কোনো মিল না থাকা সত্ত্বেও তিনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপক্ষের শিবিরে গিয়ে ভিড়েছেন। তাদের গডফাদার হওয়ার চেষ্টা করছেন। দেশের রাজনীতিতে যেসব দল বা নেতার কোনো গুরুত্ব ও অবস্থান নেই তারা গিয়ে ঢাকার ইউনূস সেন্টারে ভিড় জমিয়েছেন। উদ্দেশ্য, তাকে তাল দিয়ে রাজনীতিতে নামাতে পারলে বা তাকে দিয়ে একটি নতুন রাজনৈতিক দল খাড়া করতে পারলে এই শাখামৃগের দল হয়তো একটি নতুন শাখায় ঝুলে ক্ষমতার বলয়ে যাওয়ার আশা করতে পারবে।
আমার ধারণা, ড. ইউনূস নতুন দল গঠন করতে যাবেন না। তিনি আওয়ামী সরকারের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য তার নেতৃত্বাধীন এলিট ক্লাস ও দুটি মিডিয়া নিয়ে যে রাজনৈতিক চেষ্টা চালাবেন, তাতে বিএনপি-জামায়াত-হেফাজতের লাভ হবে। তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। এ পথে না গিয়ে ড. ইউনূস যদি নতুন রাজনৈতিক দল গড়তে যান, তার পরিণতি হবে ড. কামাল হোসেনের গণফোরামের মতো।
ড. কামাল হোসেন তবু গণফোরাম গঠনের সময় কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাপের ভাঙনের যুগে কয়েকজন নীতিনিষ্ঠ পার্টি সদস্যকে পেয়েছিলেন তার দলে (তাদের অধিকাংশই এখন তার সঙ্গে নেই)। ড. ইউনূস এখন দল গঠন করতে গেলে কোনো নীতিনিষ্ঠ নেতাকর্মীই পাবেন না। পাবেন দলছুট, জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত কিছু নামসর্বস্ব নেতা। তাদের নিয়ে দল গঠনের পরিণাম হবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটে আরেকটি গুরুত্বহীন ছোট শরিক দল হওয়া। তার বেশি কিছু নয়। সুতরাং তাকে নিয়ে গুজব যারা ছড়াচ্ছেন তারা খতিয়ে দেখছেন না যে, ড. ইউনূস বিশ্ব চড়িয়ে বেড়ানো ব্যক্তি। তিনি এত বুদ্ধিহীন নন যে, গুজব রটনাকারী বা উস্কানিদাতাদের চাপে আবার লাফ দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাবেন। তবে আমার মতে, তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতিতে নামলে ভালো হতো। দেশের মানুষ তার আসল চেহারাটা দেখতে পেত।
জাতীয় পার্টির নেতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সহজে মহাজোট ছাড়বেন এমনটা আমার মনে হয় না। মহাজোটে অবস্থান করা সত্ত্বেও তার প্রতি যথেষ্ট অবিচার করা হয়েছে, তাদের জোটে গুরুত্ব দেয়া হয়নি একথা সত্য। সেই সঙ্গে এও সত্য, দলের ভেতর থেকেই তার ওপর মহাজোট ত্যাগের দারুণ চাপ আছে। তবু জে. এরশাদ এখনও মহাজোটে আছেন। তিনি যদি মহাজোটে থাকেন, তাহলে তার নীতিগত অবস্থান দৃঢ় হবে। বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থায় শেখ হাসিনা তাকে বা তার দলকে আর অবহেলা ও উপেক্ষা করতে পারবেন না। মহাজোটে জে. এরশাদ তার প্রভাব ও গুরুত্ব বাড়াতে পারেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে তার আস্থা সম্পর্কে জনগণের একাংশের মধ্যে যে সন্দেহ তা দূর করতে পারেন এবং দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষাতেও শেষ বয়সে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যেতে পারবেন।
দলের একাংশের চাপে তিনি যদি ১৮ দলীয় জোটে যান, সেটা হবে তার জন্য আত্মঘাতী নীতি। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য বিএনপি এখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা তাকে রাষ্ট্রপতি পদে বসাবে বলে টোপ দিতে পারে। কিন্তু যে খালেদা জিয়া এবং তার পুত্র তারেক রহমান নিজেদের দলের মনোনীত রাষ্ট্রপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে বঙ্গভবনে বসার কয়েক মাসের মধ্যে অবমাননাকরভাবে পদত্যাগে বাধ্য করে পুলিশ পাহারায় বঙ্গভবন ছাড়তে বাধ্য করতে পারেন। তারা সুযোগমতো জে. এরশাদের সঙ্গে কী আচরণ করবেন জেনারেল নিশ্চয়ই তা ভেবে দেখবেন। বিএনপি তাকে রাষ্ট্রপতি করলেও (গুজব অনুযায়ী) তিনি হবেন- ক্ষমতাহীন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপতি। মাতা-পুত্রের ক্ষমতাচক্রের বাইরে বঙ্গভবনে বসে তিনি কী করবেন? আর মন্ত্রিসভায় জাতীয় পার্টির দশজন মন্ত্রী গ্রহণের কথা তো ইলেকশন প্রমিস। নির্বাচনের পর এই প্রতিশ্র“তি রক্ষা করা হবে তার নিশ্চয়তা কোথায়? আর জাতীয় পার্টি থেকে নতুন সংসদে ক’জন প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারবে তা এখনই বা কে বলবে?
সবচেয়ে বড় কথা, আগামী নির্বাচনে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে তাহলে তারেক রহমান গোড়াতেই প্রধানমন্ত্রী না হোন, তিনিই হবেন কার্যত সরকারের হর্তাকর্তা। আর মাতার একান্ত বাসনায় যদি তারেক রহমানকে গোড়াতেই প্রধানমন্ত্রী করা হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির আসনটি মাতার জন্য নির্দিষ্ট থাকবে বলে জানা যায়। তাহলে বঙ্গভবনে জে. এরশাদের জন্য দরোজা খোলার সুযোগ কোথায়? আর সাময়িকভাবে জেনারেলকে যদি রাষ্ট্রপতি পদে বসার সুযোগ দেয়াও হয়, তাহলে তিনি রাষ্ট্রপতি আর তারেক রহমান সরকারের হর্তাকর্তা অথবা প্রধানমন্ত্রী এই কম্বিনেশনটা কেমন হবে? এই কম্বিনেশন রাষ্ট্রপতি হিসেবে জেনারেল এরশাদের মর্যাদা, ক্ষমতা ও গুরুত্ব কতটা রক্ষা করবে?
মহাজোট যদি কোনো কারণে ছাড়তেই হয়, তাহলে আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধির ধারণা, জে. এরশাদ তার জাতীয় পার্টি নিয়ে একা অথবা তার সমমনা কিছু গণতান্ত্রিক দল নিয়ে নতুন জোট করে নির্বাচনে নামলে ভালো করবেন। এমন হতে পারে, নির্বাচনে তার দল এত আসন পেতে পারে যে, তিনি তখন বড় দুটি দলের কাছেই কোয়ালিশন গঠনের জন্য নিজস্ব শর্ত আরোপ করতে পারবেন, চাই কি, আদায়ও করতে পারবেন। ব্রিটেনের লিবারেল পার্টির সুদীর্ঘকালের ইতিহাস থেকে তার শিক্ষা অর্জন করা উচিত। বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ড. ইউনূস নন, জে. এরশাদই অধিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন।

সিরিয়ায় হামলা হলে আল-কায়েদার লাভ!

সিরিয়ায় যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক অভিযান চালায় তবে সেটা আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা ও তার শাখা সংগঠনগুলোকেই লাভবান করবে বলে মন্তব্য করেছে দামেস্ক।

প্রাণ ফিরেছে রামুর বৌদ্ধপল্লীতে by দুলাল বড়ুয়া

নতুনের ছোঁয়ায় প্রাণ ফিরে পেয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের রামুর বৌদ্ধপল্লী। মন্দির আর বাড়িঘরের পোড়া দাগ মুছে গেছে।

আত্মহত্যার চেষ্টা ঐশীর by নূরুজ্জামান

গাজীপুরের কোনাবাড়ি কিশোরী উন্নয়ন কেন্দ্রে থাকার সময় গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল ঐশী রহমান।

মাওলানা সাঈদীর কনডেম সেল জীবন, লিখছেন জীবনের অভিজ্ঞতা by সাজেদুল হক

ছয় মাস ধরে কাশিমপুর কারাগারের কনডেম সেলে কঠিন সময় পার করছেন জামায়াতের বহুল আলোচিত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।

সোয়া দুই কোটিতেও পোষাবে না পুনম পান্ডের

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে শুরু হচ্ছে বিগ বস-৭। বিশ্বখ্যাত রিয়েলিটি শো বিগ ব্রাদারস এর আদলে নির্মিত বিগ বস অনুষ্ঠানটি ভারতের সবচেয়ে বড় রিয়েলিটি শো বলে বিবেচনা করা হয়।

পাইলট নিয়ে ব্যস্ত অহনা

মডেল ও অভিনেত্রী অহনা ‘পাইলট’ নামে নতুন একটি ধারাবাহিকে অভিনয় করছেন। ফেরারী ফরহাদের রচনায় এ নাটকটি পরিচালনা করছেন মোস্তাফিজুর রহমান সুমন।

সিরিয়া হামলায় ন্যাটো নেই

ন্যাটো জোটের মহাসচিব আন্দ্রেস ফগ রাসমুসেন বলেছেন, সিরিয়ায় সামরিক হামলা চালানোর কোনো পরিকল্পনা তার সংস্থার নেই। ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। খবর এপির। রাসমুসেন জানান, ‘সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আমি ন্যাটোর কোনো ভূমিকা দেখি না। ন্যাটোকে কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে এর সব সদস্য রাষ্ট্রের অনুমোদন লাগবে।’
যদিও বুধবার তিনি বলেছিলেন, রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার অগ্রহণযোগ্য। এর জন্য যারা দায়ী তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। এর আগে শুক্রবার খবর বেরিয়েছিল, ২৮ সদস্য বিশিষ্ট ন্যাটো জোটের অন্তত ১০টি দেশ সিরিয়ায় সামরিক হামলার বিরোধী। এদের মধ্যে ব্রিটেন, জার্মানি ও ইতালি অন্যতম। এদিকে, সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার ব্যাপারে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে আংশিক কোনো প্রতিবেদন মেনে নেবে না সিরিয়ার আসাদ সরকার। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়ালিদ আল-মুয়াল্লেমের বরাত দিয়ে একথা জানিযেছে দেশটির সরকারি টেলিভিশন। সিরিয়ায় সফররত জাতিসংঘের পরিদর্শকরা যখন তড়িঘড়ি করে তাদের তদন্ত কাজ শেষ করে দামেস্ক ত্যাগ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন মুয়াল্লেম এ ঘোষণা দিলেন। সিরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনকে ফোন করে বলেছেন, জাতিসংঘের তদন্তকারীরা তাদের কাজ শেষ না করলে এবং তাদের গৃহিত নমুনার পরীক্ষার ফলাফল বের না হওয়া পর্যন্ত জাতিসংঘের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না।
রাসায়নিক হামলা সিরিয়া ও জর্ডানের জন্য হুমকি : সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের হামলা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ ইসরাইল ও জর্ডানের জন্য হুমকি তৈরি করবে বলে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মন্তব্য করেছেন। এ পরিস্থিতিতে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের জন্য সিরিয়া সরকারকে যথাযথ জবাব দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এগিয়ে আসার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বলেও জানান ওবামা। শুক্রবার হোয়াইট হাউসে এক বৈঠক শেষে ওবামা সাংবাদিকদের বলেন, সিরিয়া সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনও পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র।অন্যদিকে, সিরিয়ার কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশটির ওপর আগ্রাসন চালানো হলে ইসরাইলের দিমুনা পরমাণু চুল্লীসহ ৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা চালাবে দামেস্ক। সিরিয়ার ওই গবেষণা কেন্দ্র এই ৫টি স্থাপনার ছবিও প্রকাশ করেছে। সিরিয়ার কৌশলগত গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক ইমাদ রাজ্জাক বলেছেন, বিদেশী শত্র“রা তার দেশের ওপর হামলা চালালে সিরিয়ার সশস্ত্র বাহিনী খুব সহজেই দখলদার ইসরাইলের ওই লক্ষ্যবস্তুগুলোর ওপর হামলা চালাতে সক্ষম হবে। ইসরাইল বলেছে, সিরিয়ার যে কোনো হামলার অত্যন্ত কঠোর জবাব দেয়া হবে। ওদিকে, ইরানি সংসদের একটি প্রতিনিধিদল সিরিয়া ও লেবানন সফরের উদ্দেশ্যে শনিবার রাজধানী তেহরান ছাড়েন। ওই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখা এবং সিরিয়ায় রাসায়নিক হামলার নিন্দা জানাতে ইরানি প্রতিনিধিদল এ সফরে গেছে। ইরানের এক কর্মকর্তা জানান, জাতীয় সংসদের শীর্ষ পর্যায়ের সদস্য আলাউদ্দিন বোরুজেরদি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তিনি সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
ফ্রান্স যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়াকে ‘কঠোর বার্তা’ দিতে বদ্ধপরিকর : ওলান্দ
ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ এবং বারাক ওবামা রাসায়নিক অস্ত্র হামলা ইস্যুতে সিরিয়াকে ‘কঠোর বার্তা’ প্রদান করছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট কার্যালয় এলিসি প্রাসাদের এক বিবৃতিতে এ কথা জানানো হয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয় উভয় দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা একমত হয়েছেন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বরদাশত করবে না। দু’দেশরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয় সিরিয়া ইস্যুতে তারা আলোচনা অব্যাহত রাখবে।
বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে : বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। সিরিয়া হামলার আশংকায় হঠাৎ তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়া হামলার ব্যাপারে ‘চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত’ নেয়নি এমন ঘেষণার পরে আবারও স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে তেলের দাম। যুক্তরাষ্ট্রে ব্যারেল প্রতি অপরিশোধিত তেলের মূল্য ১ দশমিক ১৫ ডলার কমেছে। লন্ডনে কমেছে ব্যারেল প্রতি ১ দশমিক ৭ ডলার। এএফপি, রয়টার্স, আলজাজিরা।

সিরিয়ায় কিছু একটা করা উচিত

সিরিয়ায় হামলা চালানোর সিদ্ধান্তে অনড় যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন যোগাচ্ছে ফ্রান্স। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্রিটেন পার্লামেন্টে লেবার পার্টির সদস্যদের তীব্র বিরোধিতার মুখে এক পর্যায়ে হামলা চালানোর পদক্ষেপ থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। এদিকে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দ হামলায় অংশীদারিত্ব করতে বুধবার বিশেষ অধিবেশন ডেকেছেন।
সিরিয়ার ভাগ্যে কি ঘটতে যাচ্ছে? সমসাময়িক এ মিলিয়ন ডলার প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গলদঘর্ম হচ্ছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। আদৌও কি সত্যাশ্রয়ী হামলা চালানো হবে নাকি ইরাকের হাতে মারণাস্ত্র আছে এমন ‘আষাঢ়ে গল্প’ ফেঁদে জাতীয় স্বার্থ চরিতার্থ করতে সুকৌশলে এগোনো হচ্ছে সেটা এখনও ঝাপসা দর্পণে দেখা প্রতিচ্ছবির মতোই অস্পষ্ট। বর্তমান নিরিখে ফ্রান্সের অবস্থান কি হবে সেটা উঠে এসেছে দেশটির সর্বাধিক প্রচারিত ‘লাঁ মদ’ সংবাদপত্রে। পত্রিকাটির সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলান্দের সাক্ষাৎকারের চৌম্বক অংশ তুলে ধরা হল :
প্রশ্ন : ২১ আগস্ট দামেস্কে ‘রাসায়নিক অস্ত্র’ হামলা হয়েছে এর স্পষ্ট প্রমাণ কি ফ্রান্সের হাতে আছে?
ওলান্দ : এটা একটা অমূলক প্রশ্ন। এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য। এমনকি সিরিয়া কর্তৃপক্ষও এ সত্য অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখায়নি। ফ্রান্সের হাতে প্রমাণ আছে বাশার সরকার এ ন্যক্কারজনক ঘটনার জন্য দায়ী। সিরিয়ায় এ পর্যন্ত অনেক রাসায়নিক হামলা হয়েছে। তবে, ২১ আগস্টের হামলা স্মরণকালের সবচেয়ে নিন্দনীয়, গর্হিত এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
প্রশ্ন : সামরিক হামলা কতটা আইনসিদ্ধ হবে?
ওলান্দ : ১৯২৫ সালের জেনেভা প্রটোকলে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, রাসায়নিক হামলা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ। এ কারণে আমরা (যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, ব্রিটেন) তদন্তের ভার জাতিসংঘের ওপর দিয়েছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না কারণ প্রমাণ পেলেও নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব অনুমোদন করাতে পারব না। চীন এবং রাশিয়া ভেটো দিয়ে সব উদ্যোগ ভেস্তে দেবে। গত দুই বছর ধরে তারা নিরাপত্তা পরিষদকে সিরিয়া ইস্যুতে অচল করে রেখেছে।
প্রশ্ন : যুদ্ধের লক্ষ্য কি হবে?
ওলান্দ : আমি এমন যুদ্ধের কথা বলছি না যেখানে দৈত্যকার মানবতাবিরোধী অপরাধীকে শাস্তি দেয়া হবে। যুদ্ধ হবে ‘নিবারক’ শক্তি। হাত গুটিয়ে বসে থাকার অর্থ হল সবকিছুকে চলতে দেয়া। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। গৃহযুদ্ধে ১ লাখ সিরীয় নাগরিকের প্রাণহানি ঘটেছে। এভাবে চলতে দেয়া যায় না। কিছু একটা করা উচিত।
প্রশ্ন : আক্রমণের ধরণ কেমন হবে?
ওলান্দ : আলোচনার টেবিলে যুদ্ধের সব ধরন রয়েছে। তবে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বলতে পারি বাশারের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করা উচিত।
প্রশ্ন : হামলার পর রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক কিভাবে বিবেচনা করবেন?
ওলান্দ : রাশিয়া আগাগোড়া বাশার আল আসাদের পক্ষ নিয়েছে। রাশিয়া মনে করে বাশারের পতনে মধ্যপ্রাচ্যে বিশৃংখলা ছড়িয়ে পড়বে। তবে আমি বরাবরই পুতিনকে বোঝানোর চেষ্টা করছি রাশিয়ার স্বার্থেই সিরিয়ার ইস্যুতে রাজনৈতিক সমাধান দরকার।
প্রশ্ন : পার্লামেন্টের সিদ্ধান্ত ছাড়া কি হামলার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছেন?
ওলান্দ : উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণাদি ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না। আমি বুধবার পার্লামেন্টে সিরিয়া ইস্যুতে বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করেছি। পার্লামেন্ট সদস্যদের সিরিয়া ইস্যুতে মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। সংবিধানের ৩৫নং ধারা অনুসারে সরকারের পক্ষ থেকে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন এবং লক্ষ্য সম্পর্কে সবাইকে অবগত করতে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সূত্র : ফরাসি দূতাবাস।

ইরাকের পুনরাবৃত্তি নয় : কেরি

সিরিয়া নিয়ে নতুন কৌশল প্রয়োগে তৎপরতা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র শক্তিরা। সেখানে যুদ্ধের ঘণ্টা বেজে উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল সেখান থেকে কিছুটা পিছু হটেছে তারা। ইরাক, লিবিয়া বা আফগানিস্তানের মতো যুদ্ধ হবে না এটি। এমনকি সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্যও এ যুদ্ধ নয়। ২০০৩ সালে ইরাক হামলার পটভূমির চেয়ে আলাদা হবে সিরিয়া হামলার পটভূমি। বার বার এমনটিই দাবি করছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। শুক্রবার এক বক্তব্যে জন কেরি আবারও দাবি করলেন, বাশার আল আসাদ বাহিনীই রাসায়নিক হামলা চালিয়েছে। এর যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে তাদের হাতে। তিনি আরও বলেন, প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বার বার তা খতিয়ে দেখছে মার্কিন গোয়েন্দা গোষ্ঠী, যাতে এ নিয়ে কোনো বিভ্রান্তি না থাকে। ইরাকের বেলায় যেভাবে প্রমাণাদি জোগাড় করা হয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশি মনোযোগ দেয়া হচ্ছে সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সত্যতা যাচাইয়ে। আমরা ইরাকের ঘটনার পুনরাবৃত্তি চাই না। কেরির এ বক্তব্যের অব্যবহিত পরেই হোয়াইট হাউসে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় ওবামা বলেন, আমরা এমন কোনো ধরনের সামরিক হামলায় যাব না যেখানে সেনাদের পা সিরিয়ার মাটিতে পড়ে এবং যার কারণে দীর্ঘ মেয়াদি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে হয়। আমরা সিরিয়া হামলার বিষয়ে খুবই সীমিত পরিসরের কথা ভাবছি। ওবামার মতো ব্রিটিশ পার্লামেন্টে একই ধরনের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। ওবামার পরিকল্পনার ব্যাপারে ব্রিটিশ সংসদ সদস্যদের ধারণা দিতে গিয়ে ক্যামেরন বলেন, ওবামা এমন একজন মানুষ যিনি ইরাক যুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন। এখন কেউ ওবামাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করতে পারেন না যে,
তিনি চান আমেরিকা আরও যুদ্ধে জড়িয়ে পড়–ক। ক্যামেরন আরও বলেন, সিরিয়ায় আমরা যে ধরনের পদক্ষেপের ব্যাপারে ভাবছি তা ইরাকের চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা। কিন্তু ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সিরিয়া হামলা থেকে বিরত থাকার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই যখন অবস্থা তখন সাবেক মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী লিওন পানেট্টা শুক্রবার বলেছেন, জাতিসংঘ বা তার মিত্ররা যৌথভাবে সিরিয়ায় হামলা করলে ‘খুবই ভালো হতো।’ কিন্তু তারা না এলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। এনসিসি নিউজে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন পানেট্টা। তিনি আরও যোগ করেন, বিশ্ব শান্তির জন্য সিরিয়ার হামলা করা উচিত যুক্তরাষ্ট্রের। এছাড়া সিরিয়া হামলার ছক সম্পর্কে কয়েক মাস আগে হোয়াইট হাউসকে অবহিত করেছিল মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়Ñ এমন দাবিও করেন পানেট্টা। নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু মার্কিন সামরিক বাহিনীর জানা আছে এবং অল্প সময়েই লক্ষ্যবস্তু গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম তারা। ফলে অযথা সময় নষ্টের পক্ষে নয় পানেট্টা। শুধু পানেট্টা নয় সিরিয়া হামলার ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া জানালেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াকার বুশ। তিনি দাবি করেন, আমি কখনই সিরিয় প্রেসিডেন্ট বাশারের নাচের পুতুল নই। ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বুশ একথা বলেন। বুশ নেতৃত্বাধীন ইরাক ও আফগানিস্তানে হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কতামূলক শিক্ষা নেয়ার আছেÑ এমন বক্তব্যের জেরে তিনি বলেন, সিরিয়ার হামলা ইস্যুতে তিনি ‘ফাঁদে জড়াতে’ চান না। প্রেসিডেন্ট (ওবামা) যদি হামলা চালাতে চান তাহলে তার জন্য পর্যাপ্ত সামরিক বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। তবে তিনি এও বলেন, এখনকার সিরিয়া ও তখনকার ইরাকের মধ্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সে যা হোক, সিরিয়া হামলা ঠিক হবে কি হবে না তা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে শেষ পর্যন্ত রাজি হননি ওয়াকার বুশ।
সিরিয়া হামলার নয় অজুহাত
সে যাই বলুক সিরিয়া হামলার ব্যাপারে এখন দৃঢ়চিত্তে জন কেরি। রাসায়নিক হামলা চালিয়ে বাশার যে বর্বরতার পরিচয় দিয়েছে তার বিরুদ্ধে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে কেরি তার অবস্থানে অনঢ়। মূলত নয়টি কারণে সিরিয়ায় হামলা চালানোর পক্ষে তিনি।
রাসায়নিক অস্ত্রের ব্যবহার : রাসায়নিক হামলা সম্পর্কে আমরা যা বলছি তা সত্যিই আমরা জানি। বাশারের শাসনামলে কিভাবে রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি বিস্তার লাভ করেছে তাও আমাদের জানা আছে। সম্প্রতি রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে গোয়েন্দা অনুসন্ধানে। সুতরাং সিরিয়া হামলার যথেষ্ট বৈধতা রয়েছে বলে কেরির অভিমত।
সামাজিক মাধ্যম : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখা গেছে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের প্রভাব। মাত্র ৯০ মিনিটে ইন্টারনেটে এ নরক তাণ্ডব ছড়িয়ে পড়েছে।
এ ধরনের হামলার ভয় : কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, কাটাছেড়া নেই বা গুরুতর জখমের নিদর্শনও নেই। শুধু পড়ে আছে লাশের সারি। এ দৃশ্য চিকিৎসকরা দেখেছেন। আবারও এ ধরনের হামলা হলে তার বর্বরতার শিকারও হবে মানুষÑ বলেন কেরি।
হামলার শিকার : রাসায়নিক হামলার শিকার হয়েছে শিশুসহ কমপক্ষে ১ হাজার ৪২৯ জন মানুষ। এটা জঘন্য অপরাধ।
বাশারের বর্বরতা : কেরির অভিযোগ, নিজের জনগণের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র প্রয়োগ করে তাদের হত্যা করেছে বর্বর বাশার।
ইতিহাসের দায় : মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ দমনে আমরা কি করছি তাই বিবেচনার বিষয়। না হলে ইতিহাসের কাছে দায়বদ্ধ থাকতে হবে আমাদের।
সিরীয় প্রেসিডেন্টকে শাস্তি দেয়া : শুক্রবার টুইটার বার্তায় কেরি বলেছেন, বাশার কুলাঙ্গার ও খুনি। তিনি তার শাস্তির জন্য লড়ছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের দায় : কেরির দাবি, বাশারের বিরুদ্ধে কিছু করা না হলে তা আবারও ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র তার দায়িত্ব থেকে তাই এর জবাব দেবে।
যুদ্ধভীতি : ইরাক ও আফগান যুদ্ধের ভীতি থেকে মার্কিনরা আর কোনো যুদ্ধে জড়াতে আগ্রহী নয়। কিন্তু ভীতির কারণে দায়িত্ব থেকে সড়ে দাঁড়াতে পারে না যুক্তরাষ্ট্র। তথ্যসূত্র : এনবিসি, রয়টার্স, আল জাজিরা।
 

সিরিয়া হামলার ৫ ঝুঁকি

সিরিয়ায় সীমিত পরিসরে সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। চলতি সপ্তাহেই হামলা চালানো হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী সংবাদপত্র ইউএসএ টুডের এক প্রতিবেদনে শনিবার বলা হয়, সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলায় অন্তত পাঁচটি ঝুঁকি রয়েছে।
১. ব্যর্থতা
সীমিত আকারে সামরিক হামলা হলে তা লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হতে পারে। ফলে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ জনগণের ওপর হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রাখতে পারেন। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ওপর হামলার আকার বৃদ্ধির জন্য চাপ বাড়তে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে।
২. সিরিয়ার পাল্টা জবাব
আক্রান্ত হলে সিরিয়া তার চিরশত্র“ ইসরাইলের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সমীকরণ হতে পারে। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র জর্ডান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বেঁকে বসতে পারে। তারা বাশারের যেমনি বিরোধী, তেমনি ইসরাইলের বাড়াবাড়িকে সমর্থন করবে না।
৩. ইরানের হস্তক্ষেপ
সিরিয়ায় পশ্চিমা হামলা হলে দেশটির অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র ইরান তার নৌ-শক্তিকে ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিতে পারে। পৃথিবীর ২০ ভাগ জ্বালানি তেল পারস্য উপসাগরের এই সংকীর্ণ পথ দিয়ে পারাপার হয়। এ ধরনের পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের নৌ-শক্তির ওপর সামরিক হামলা চালাতে পারে। এতে শিয়া প্রধান ইরানের সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে থাকা শিয়ারা জেগে উঠতে পারে। উল্লেখ্য; ইরান ইতিমধ্যেই হুশিয়ার করে দিয়েছে যে সিরিয়া আক্রান্ত হলে মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বলবে।
৪. রাশিয়ার লাভ
প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনের নেতৃত্বে রাশিয়া আবার অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাশিয়ার প্রভাবও বেড়েছে অনেকাংশে। রাশিয়া চাইবেÑ সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ব্যর্থ করে দিতে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়া, ইরান ও সিরিয়ার প্রভাব বৃদ্ধি পাবে এবং পশ্চিমা প্রভাব হ্রাস পাবে।
রাশিয়া ইতিমধ্যেই ভূমধ্যসাগরে দুটি রণতরী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
৫. ইসলামপন্থী সংগঠনের হামলা
সিরিয়ায় হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস ও হেজবুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাতে পারে। বিশেষ করে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহর হতে পারে হামলার লক্ষ্যবস্তু। এ দুটো সংগঠন সব সময়ই কট্টর ইসরাইল-বিরোধী।

১৭৫ নারী ও একজন সাদেকা by রহিদুল মিয়া

সুই দিয়ে শাড়িতে চুমকি, জরি, পুঁতি বসানোর কাজে ব্যস্ত
সাদেকা আক্তার (বাঁয়ে)। তাঁকে সহযোগিতা করছেন অন্যরা।
নারীদের নিয়ে তিনি ‘বেগম রোকেয়া মহীয়সী নারী মহিলা
উন্নয়ন সমিতি’ গড়ে তুলেছেন ছবি: প্রথম আলো
‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের নারীদের কল্যাণমুখী কাজের কথা শুনে কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতার কথাই মনে পড়ে। নারীরা গ্রামের জন্য, নিজেদের জন্য শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরা দরিদ্র শিশুদের বিনা মূল্যে শিক্ষাদান ও উপকরণ সরবরাহ, দুস্থ রোগীকে অর্থ, রক্তদান, ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের স্বাস্থ্যের খোঁজ নেন। গরিব ঘরের মেয়ের বিয়েতে সহযোগিতা, ধর্মীয় উৎসবে হতদরিদ্রদের কাপড়, টাকা, শীতে কম্বল দেন। পরামর্শ দেন সবাইকে স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ব্যবহারের।সমাজ বদলের এই কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাদেকা আক্তার (২৮)। গ্রামের নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথও দেখিয়েছেন তিনি। তাঁর দেখানো পথে ওই গ্রামের অন্তত দেড় শ গৃহবধূ দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। সংসারে এনেছেন সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য।
অনুপ্রেরণা রোকেয়া: তারাগঞ্জ উপজেলার বুড়িরহাট গ্রামের সহিদুল ইসলামের মেয়ে সাদেকা। অভাবের সংসারে নবম শ্রেণীতে উঠেই বন্ধ হয়ে যায় পড়াশোনা। ২০০০ সালে তাঁর বিয়ে হয় ডাঙ্গাপাড়া গ্রামের দিনমজুর আবদুল জলিলের সঙ্গে। কিছুটা লেখাপড়া জানা সাদেকা শ্বশুরবাড়িতে এসে দেখেন, যৌতুকের জন্য ওই গ্রামের নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। অল্প বয়সী মেয়েদের দেওয়া হচ্ছে বিয়ে। শিশুরা স্কুলে না গিয়ে খেতে কাজ করছে। গ্রামের এ চিত্র সাদেকাকে নাড়া দেয়। কিছু একটা করার কথা ভাবেন তিনি। স্বপ্ন দেখেন গ্রামের সব ছেলেমেয়ে স্কুলে যাবে, কোনো বাল্যবিবাহ, নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে না। নারীরাও আয় করে সমাজে মাথা উঁচু করে চলবেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ২০০৩ সালের মে মাসে গ্রামের ১০১ জন দরিদ্র নারীকে নিয়ে একটি সমিতি গঠন করেন। সমিতির নাম দেন ‘বেগম রোকেয়া মহীয়সী নারী মহিলা উন্নয়ন সমিতি’।
১০ টাকায় শুরু: সদস্যরা প্রত্যেকে সপ্তাহে ১০ টাকা করে সমিতিতে জমা দিতে থাকেন। দুই বছরে সমিতির সঞ্চয় আর তা বিনিয়োগ করে পাওয়া লাভে তহবিলে জমা হয় দুই লাখ ৯৫ হাজার টাকা। সদস্যরা তা ভাগ করে নেন। ওই টাকা দিয়ে হাঁস-মুরগি, ছাগল কিনে পালন শুরু করেন। সমিতির প্রাথমিক এই সাফল্য আত্মবিশ্বাসী করে সাদেকাকে। ২০০৬ সালে সাদেকা তারাগঞ্জ পল্লী উন্নয়ন অফিসের অধীনে ‘হতদরিদ্রদের কর্মসংস্থান নিশ্চিতকরণ প্রকল্প’-এর আওতায় প্রশিক্ষণ নিয়ে সমিতির সদস্যদের শাড়িতে নকশা তোলার হাতের কাজ শেখান। সমিতির তহবিল থেকে কাপড়, সুতা, চুমকি, জরি, পুঁতি কিনে শুরু করেন শাড়িতে নকশা করার কাজ।
সেই গ্রামে একদিন: সম্প্রতি এক সকালে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামটির নারীরা শাড়িতে নকশা তোলার কাজ করছেন। একটি সাধারণ জর্জেট শাড়ি নকশার কাজের পর কতটা অসাধারণ হয়ে ওঠে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সেখানকার বেশির ভাগ বাড়িতে চকচক করছে টিনের চালা। খড়ের কুঁড়েঘর নেই বললেই চলে। গ্রামের নারীরা শাড়িতে সুই দিয়ে চুমকি, জরি, পুঁতি বসানোর কাজে ব্যস্ত।
আক্তারা খাতুন নামের এক কারিগর জানান, উজ্জ্বল রঙের ওপর নকশাগুলো ফোটে ভালো। একটি জর্জেট কিংবা টিস্যু শাড়িকে নকশার কাজে সাজাতে একজন কারিগরের পাঁচ-ছয় দিন লাগে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলার পাইকারেরা অর্ডার দিয়ে শাড়িতে নকশার কাজ করে নেন। তাঁরাই এখন শাড়িতে কাজ করতে প্রয়োজনীয় সুই, সুতা, চুমকি, জরি ও পাথর দেন। সমিতির অধীনেও নকশার কাজ করা হয়। প্রতিটি শাড়ির মজুরি বাবদ কারিগরদের দেওয়া হয় ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। একজন নারী কারিগর মাসে চার-পাঁচটি শাড়িতে কাজ করতে পারেন। গড়ে মাসে তাঁদের তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা আয় হয়।
‘মা দল’, ‘নারী দল’: সমিতিতে গিয়ে দেখা যায়, সাদেকা সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করছেন। সাদেকা জানালেন, সমিতির অধীনে শাড়িতে নকশার কাজ ছাড়াও মাছ, সবজি, কলা, আদা চাষ করা হচ্ছে। এসব খাত থেকে আসা আয়ের ১০ শতাংশ গ্রামবাসীর কল্যাণে ব্যয় করা হয়। ১০১ জন সদস্য নিয়ে সমিতি শুরু হলেও এখন সদস্য ১৭৫ জন।
সমিতির ৪০ জন নারী নিয়ে আছে একটি ‘মা দল’। এ দলের সদস্যরা ঘরে ঘরে গিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে নারীদের ধারণা দেন। শিশুদের সময়মতো টিকা দেওয়া হয়েছে কি না খোঁজ নেন। বসতভিটায় সবজি চাষের পরামর্শ দেন।
এ ছাড়া গ্রামে বাল্যবিবাহ, বহু বিবাহ রোধের জন্য ৫০ সদস্যের একটি নারী দল আছে। এ দলের নারীরা গত তিন বছরে ডাঙ্গাপাড়া, দোলাপাড়া, চিলাপাক গ্রামের সাতজন শিশুকে বাল্যবিবাহের হাত থেকে রক্ষা করেছেন।
সমিতি থেকে একটি শিক্ষাকেন্দ্র খোলা হয়েছে। এটি পরিচালনা করেন গ্রামের গৃহবধূ রূপালী বেগম। মাসে দেড় হাজার টাকা তিনি ভাতা পান।
দিনবদল: সাহেবা বেওয়ার জমি ছিল না। ১২ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর ভিক্ষা করে কোনো রকমে চার সদস্যের সংসার চালাতেন। এখন তাঁর বাড়িতে হাঁস-মুরগি, গাভি আছে। শাড়িতে নকশার কাজ করে মাসে চার হাজার টাকা পান।
গৃহবধূ জেন্না বেগম জানান, তাঁর বিয়ে হয় ১৫ বছর বয়সে। বেকার স্বামীর সংসারে ঠিকমতো দুই বেলার খাবার জুটত না। সমিতি থেকে ভাগে পাওয়া লাভের টাকায় এখন তাঁর স্বামী চালের ব্যবসা করছেন। তিনি করেন শাড়িতে নকশার কাজ। স্বামী আর তাঁকে নির্যাতন করেন না। সাহেবা ও জেন্না বেগমের মতো অন্য নারীরাও বললেন, সাদেকা আপা আমাদের নতুন জীবন দিয়েছেন। সংসারে এখন তাঁরা সিদ্ধান্তও দিতে পারেন।
সাদেকার স্বপ্ন: অসহায় নারীদের স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়ায় সাদেকার ভূয়সী প্রশংসা করলেন উপজেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মাহমুদা বেগম ও উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান। উল্লাপাড়া গ্রামের নারীদের সমাজ বদলে অবদানের কথা জানেন স্থানীয় সাংসদ আনিছুল ইসলাম মণ্ডলও। তিনি বলেন, ‘আমি তাঁদের তৎপরতা দেখেছি। তাঁদের কাজ প্রশংসার দাবিদার।’
নারীদের জন্য আর কী করতে চান? এ প্রশ্নের জবাবে সাদেকা মিষ্টি হেসে বলেন, ‘এখন আমার একটাই স্বপ্ন, নারীদের জীবনের দুঃখ মোচন করা। এ জন্য ধীরে ধীরে শাড়িতে নকশার কাজে অন্য গ্রামের নারীদের যুক্ত করব। পুরো উপজেলার নারীদের সংগঠিত করে সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা দেব।