Monday, December 14, 2009

কুয়াশা ফুঁড়ে বড় জয় কলাবাগানের

প্রথম পর্বে ৯ ম্যাচ খেলে রান করেছিলেন মাত্র ১৬৯, ফিফটি ছিল না একটাও। সেই রকিবুল হাসান সুপার লিগের প্রথম ম্যাচেই দেখা পেলেন বড় ইনিংসের। কাল রকিবুলের ৮৩ আর অধিনায়ক জাভেদ ওমরের ৭০ রানের সৌজন্যেই সিসিএসের বিপক্ষে ৮৪ রানের বড় জয় পেয়েছে কলাবাগান। ১৩ ম্যাচে ১৮ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ স্থানে কলাবাগান।
কালই শুরু রেলিগেশন লিগের প্রথম ম্যাচে পারটেক্সকে ৭ উইকেটে হারিয়েছে সূর্যতরুণ। কুয়াশার কারণে দেরিতে খেলা শুরু হওয়ায় দৈর্ঘ্য কমে এসেছিল দুই ম্যাচেরই।
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে কলাবাগানের ওপেনিং জুটির ব্যাটিং মানেই ছিলেন নাজমুস সাদাত। রকিবুলের সঙ্গে এই জুটিতে আসা ৩৯ রানের মধ্যে তারই ছিল ৩৫! তবে নাজমুস সাদাতের মাত্র ১৮ বলের ইনিংসটিরই পর পুরোটাই হয়ে গেল রকিবুল-জাভেদ ‘শো’। ৭১ রানে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে জাহিদ বিদায় নেওয়ার পর তৃতীয় উইকেটে দুজনে মিলে যোগ করেন ১১৮ রান। প্রিমিয়ার লিগে নিজের প্রথম ফিফটির ইনিংসটা রকিবুল খেলেছেন ৭৪ বলে। জবাবে নির্ধারিত ৪০ ওভারে ৯ উইকেটে ১৭২ রান পর্যন্ত যেতে পারে সিসিএস।
রেলিগেশন লিগে বিকেএসপির ৩৪ ওভারের ম্যাচে ইমতিয়াজ (৬৪*)-জুনায়েদের (৪৮) ১০৪ রানের ওপেনিং জুটিতে সূর্যতরুণ পারটেক্সের ১৪৭ রান টপকে গেছে ৩ উইকেট হারিয়েই।
সংক্ষিপ্ত স্কোর
 কলাবাগান: ৪০ ওভারে ২৫৬/৬ (রকিবুল ৮৩, জাভেদ ৭০, নাজমুস ৩৫, আরিফুল ২৬; তাপস ৩/৪৯, সিরাজুল্লাহ ১/৮, আশরাফুল ১/৪১, রাসেল ১/৬৮)। সিসিএস: ৪০ ওভারে ১৭২/৯ (নাজমুল ৬১, তাপস ৪৫, উত্তম ২৬; জাহিদ ৩/৫, ফরিদ ২/৩০, শাফাক ২/৩২, এনামুল জুনিয়র ১/২০)। ফল: কলাবাগান ৮৪ রানে জয়ী। ম্যান অব দ্য ম্যাচ: রকিবুল।
 পারটেক্স: ৩৪ ওভারে ১৪৭/৮ (মেহরাব ৮০, রেজাউল ৩৯; মাহবুবুল ৪/৩৬, মঞ্জুরুল ২/২৯, সানজামুল ২/৩৩)। সূর্যতরুণ: ২৯.২ ওভারে ১৫১/৩ (ইমতিয়াজ ৬৪*, জুনায়েদ ৪৮; রেজাউল ২/২৬, ফারুক ১/১৩)। ফল: সূর্যতরুণ ৭ উইকেটে জয়ী।

‘মুম্বাই হামলা প্রমাণ করেছে লস্কর-ই-তাইয়েবা ভয়ংকর সন্ত্রাসী সংগঠন’

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, মুম্বাই হামলার মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণিত হয়েছে যে পাকিস্তানভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়েবা একটি ভয়ংকর সন্ত্রাসী সংগঠন। ওয়াশিংটন সংগঠনটির সন্ত্রাসী তত্পরতা বন্ধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছে। খবর পিটিআইয়ের।
মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইয়ান কেলি গত শুক্রবার নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘লস্কর-ই-তাইয়েবার ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। মুম্বাইয়ের হামলাই তা প্রমাণ করেছে।’ তিনি বলেন, ‘লস্কর-ই-তাইয়েবা সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে তত্পর। আর এভাবেই এটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী সংগঠনে পরিণত হয়েছে। বিশ্ববাসীর উচিত, লস্কর-ই-তাইয়েবার সব ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া।’

যানবাহনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনতে পরিকল্পনা অনুমোদন -আসিয়ান পরিবহনমন্ত্রীদের বৈঠক

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর আঞ্চলিক জোট আসিয়ানভুক্ত ১০টি দেশ ও জাপান যানবাহনের মাধ্যমে পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমিয়ে আনার ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা অনুমোদন করেছে। ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। দেশগুলোর পরিবহনমন্ত্রীরা ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ে দুই দিনের বৈঠক শেষে গত শুক্রবার এ পরিকল্পনা অনুমোদন করে।

উষ্ণতম বছর হবে ২০১০ সাল!

১৬০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে উষ্ণ বছরটি হতে পারে ২০১০ সাল। মানুষের কারণে সৃষ্ট জলবায়ুর পরিবর্তনই এ জন্য দায়ী। ব্রিটিশ আবহাওয়া দপ্তর এ কথা জানিয়েছে। খবর পিটিআইয়ের।
ব্রিটিশ আবহাওয়া দপ্তর আরও জানায়, ২০১০ সালের উষ্ণতা বৃদ্ধির পেছনে স্বাভাবিক আবহাওয়ার প্রকৃতির অবদান থাকবে সামান্যই। ১৯৯৮ সালে এল নিনোর প্রভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধির ঘটনা ঘটেছিল। কিন্তু প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় এল নিনোর প্রভাবে তখন যে উষ্ণতা বৃদ্ধি ঘটেছিল আগামী বছরের (২০১০ সাল) উষ্ণতা বৃদ্ধির মাত্রা হবে তার চেয়েও কম।
দ্য লন্ডন টাইমস এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যকার বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে আগামী বছর তাপমাত্রা প্রায় দশমিক ছয় ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হবে। আর বার্ষিক গড় তাপমাত্রা হবে ১৪ দশমিক ৫৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসের সমর্থনে পরিবেশবাদী গ্রিনপিস সংগঠনের বিশেষজ্ঞ বেন স্টুয়ার্ট বলেন, বাস্তবতা হলো এ বিশ্ব দিন দিন আরও উষ্ণ হয়ে উঠছে। আর মানুষই এটার জন্য দায়ী।

দুলালকে বাঁচান -সাহায্যের আবেদন

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার পোম্বাইশ গ্রামের দিনমজুর দুলাল মিয়ার হূদপিণ্ডের একটি ভাল্ব গত তিন বছর ধরে নষ্ট। মরহুম বাবা জব্বার আলীর দেওয়া শেষ সম্বলটুকুও ইতিমধ্যে তাঁর চিকিত্সায় ব্যয় হয়েছে। সহায়তা করেছে গ্রামের লোকজনও। ঢাকার জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিত্সকেরা জানিয়েছেন, শিগগিরই দুলালের অস্ত্রোপচার করে ভাল্ব প্রতিস্থাপন করতে হবে। এতে প্রায় চার লাখ টাকা প্রয়োজন। কিন্তু দুলালের স্ত্রী ও তিন সন্তানের পক্ষে এত টাকা জোগাড় করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এই অবস্থায় চাচা ছালামত উল্লাহ দুলালকে বাঁচাতে সমাজের হূদয়বান ও বিত্তবানদের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। সাহায্য পাঠানোর ঠিকানা: মো. ছালামত উল্লাহ, সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর: ১৭৭৩, সোনালী ব্যাংক, আড্ডা বাজার শাখা, বরুড়া, কুমিল্লা।

দুই ডাকাত গ্রেপ্তার

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার মর্দাসাদী এলাকার কুখ্যাত ডাকাত মতি ও নোয়াব আলীকে গত বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজরুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে মতি ও নোয়াব আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা আন্তজেলা ডাকাতদলের সদস্য। মতির বিরুদ্ধে আটটি ও নোয়াবের বিরুদ্ধে সাতটি ডাকাতির মামলা রয়েছে।

জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী বলেছেন, জামায়াত বাংলাদেশে একটি উদীয়মান শক্তি হওয়ার কারণেই ইসলামবিরোধীরা এই দলের নেতাদের নামে নানা মিথ্যাচার, অপবাদ ও তথ্যসন্ত্রাস চালাচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা ইসলামি আন্দোলনকে কোণঠাসা করে ফায়দা লুটতে চায়। এসব ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচার মোকাবিলা করতে আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে দলের নেতা-কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছেন জামায়াতের আমির।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ২০১০ ও ২০১১ সালের জন্য জামায়াতের ঢাকা মহানগর শাখার আমিরের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এই কথা বলেন নিজামী।

টাঙ্গাইলে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত

ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ডুবাইল এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় পিতা ও শিশুকন্যাসহ তিনজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন।
নিহত ব্যক্তিরা হলেন টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি উপজেলার হরিপুর গ্রামের নুরুল ইসলাম (৪০), তাঁর শিশুকন্যা ইকরা (৬) ও প্রাইভেট কারের চালক ঢাকার দক্ষিণ গেন্ডারিয়ার শরিফুল ইসলাম (৩৫)।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে মহাসড়কের ওই স্থানে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে টাঙ্গাইলের ধনবাড়িগামী একটি প্রাইভেট কারের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাইভেট কারটি দুুমড়ে-মুচড়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাইভেট কারের চালক মারা যান। প্রাইভেট কারের আরোহী চার যাত্রী আহত হন। তাঁদের মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিত্সক নুরুল ইসলাম ও ইকরাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শ্রীচিন্ময়ের গান -স্মরণ by নাসিমা খান

সাহিত্যিক-সাংবাদিক আনিসুল হক একবার প্রশ্ন করেছিলেন, ‘শ্রীচিন্ময়ের কাছ থেকে আপনি কী পেয়েছেন?’ প্রশ্নটি সর্বজনীন প্রাথমিক প্রশ্ন। এই হাইস্পিড অনলাইন যুগে ওম শান্তির ধ্যান শ্রীচিন্ময় আমাকে বিশেষ কী দিতে পারে? দিতে পারার সঙ্গে আরও একটি বিষয় জড়িত আছে—নিতে পারা। এই যে দুই—দেওয়া-নেওয়া, তোমার-আমার শ্রীচিন্ময় তাঁদের মধ্যে তৈরি করে দেন অনাদিকালের এক অটুট বন্ধুত্ব, যার নাম তিনি দিয়েছেন ‘ওয়াননেস’।
‘ওয়াননেস’-এর লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য শ্রীচিন্ময় অনুশীলিত কতগুলো চর্চা আছে, যা যেকোনো ব্যক্তিকে যেমন যুগোপযোগী হাইস্পিড করে তুলতে পারে, আবার একই সঙ্গে নিভৃতচারী শান্ত-ধীর করে রাখতে পারে। শ্রীচিন্ময়ের দর্শনে ধ্যানী হওয়ার অর্থ চক্ষু বন্ধ করে বাস্তবকে বর্জন করা নয়, বরং বাস্তবতাকে স্বীকার করে এর ওপর নিজের চর্চিত শিক্ষাকে কাজে লাগানো—সেই ‘ওয়াননেসের’ পক্ষে।
এই ওয়াননেস, এই একাত্মতা কার সঙ্গে? তোমার সঙ্গে আমার, হিন্দুর সঙ্গে বৌদ্ধের, ইহুদির সঙ্গে মুসলিমের, পূর্বের সঙ্গে পশ্চিমের, উঁচুর সঙ্গে নিচুর ঘুরে ঘুরে এলে বৃত্তের কেন্দ্র স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির, মানুষের সঙ্গে বিধাতার। তাই শ্রীচিন্ময়ের পথে চলতে হলে স্রষ্টাকে বিশ্বাস করে আসতে হবে, তিনি আছেন—তিনি এক, অদ্বিতীয়। তারপর শ্রীচিন্ময় বলেন বাকিটা। স্রষ্টা কেন ভালোবাসবেন না তাঁর সৃষ্টিকে, কেন বারবার ক্ষমা করে দেবেন, কেন ফিরে ফিরে আসেন সাত আসমানের নিচে মানুষের হূদয়ে হূদয়ে, কেন এই ক্ষণিকের আতিথ্য নিয়ে এত বাড়াবাড়ি? এত বিচ্ছিন্নতার দরকার নেই। কীভাবে খুঁজে পেতে হবে বৈচিত্র্যের সৌন্দর্য, কীভাবে শান্ত হয়ে শান্তি-প্রগতির জন্য কাজ করতে হবে। আরও কত কী!
পূর্ববঙ্গের চট্টগ্রামের ছেলে শ্রীচিন্ময়ের জন্ম হয়েছিল ১৯৩০ সালে। ১০ বছর বয়সে ভারতের পণ্ডিচেরীতে গিয়ে শ্রীঅরবিন্দের আশ্রমে বড় হন। ১৯৬৪ সালে প্রবাসী হন আমেরিকার নিউইয়র্কে। আশ্রমের শিক্ষা আর নিজের সৃজনশীলতা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে অকৃতদার এই পুরুষ প্রতিদিন বিকশিত হয়েছেন কেবলই মানুষের জন্য। তিনি একই সঙ্গে কবি, শিল্পী, আঁকিয়ে, সমাজসেবক। অসংখ্য কবিতা, গান লিখেছেন, সুর দিয়েছেন। ১৩ হাজার বাংলা গান আছে তাঁর রচনায় ও সুরে। আছে আট হাজার ইংরেজি গানও। বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, খেলতেন, ম্যারাথন দৌড়াতেন, ভারোত্তোলন করতেন, আর সবার ওপরে যা করতেন তা হলো, মেডিটেশনের মাধ্যমে মানুষকে সত্যান্বেষী করে তোলা, সহজ মানুষে পরিণত করা।
তিনি বলতেন, মানুষের জন্মগত অধিকার আছে ঈশ্বরকে কাছে পাওয়ার। পাপী-পুণ্যি—সবার জন্যই তাঁর দুয়ার খোলা সব সময়। আমরা তাঁর সঙ্গে আমাদের যোগসূত্র কোনো ভুলে কখনো ছিন্ন করে ফেলি। তিনি কিন্তু তা করেন না। তাঁর সঙ্গে আমার, আমাদের এই সম্পর্কের এক ঝলকের একটু আলো যে একবার চোখে দেখতে পায়, সে আর জেগে ঘুমাতে পারে না। তার পথ চলা শুরু হয় সীমার মধ্যে অসীমের দিকে। চিন্ময়ের ভাষায়, ‘সুপ্রিম’কে ভালোবাসতে পারার অপার আনন্দ চিন্ময়ের দর্শনে, সৃষ্টিতে প্রকাশিত হয়েছে বারবার। এ ভালোবাসার রং মনে ধরলে কে আর হিংসা করে কাকে? কোনো হিটলার হত্যা করবে কোনো ইহুদিকে? কোনো মার্কিন কোনো আফগানকে? কারণ সে তো জেগে উঠে দেখতে পেয়েছে—মোরা যাত্রী একই তরণীর।
পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শ্রীচিন্ময় সেন্টার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৬৪ সালের পর থেকেই। সেখানে চিন্ময়ের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী অগণিত মানুষকে বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষিত করেছেন তাঁর দর্শনে। নানা দেশের নানা শহরে চিন্ময় বহুবার গান করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন। এবার তাঁর গান হবে, তাঁর জন্মস্থান বাংলাদেশের ঢাকা শহরে। আজ ১৩ ডিসেম্বর, রোববার, তাঁর রচিত গান গাইবেন তাঁরই ছাত্রছাত্রীরা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র মিলনায়তনে। গান চিন্ময়ের প্রাণ। গানের জগতে, সুরের বাণীর জাদুতে তিনি ঈশ্বরকে খুঁজে পেতেন। মনের সহজ আনন্দে তাই লিখেছেন অজস্র গান। পরে তাঁর ছাত্রছাত্রীরা সেগুলো গেয়ে, প্রকাশ করে পরিচিত ও প্রিয় করেছেন অন্যদের কাছে। রবীন্দ্রনাথের পূজাপর্বের গানের বাণীর সঙ্গে শ্রীচিন্ময়ের গানের বাণীর মিল রয়েছে। ঈশ্বরকে রবীন্দ্রনাথ যতভাবে ভালোবেসেছেন, শ্রীচিন্ময় তার চেয়ে কম বাসেননি, এ যেন প্রিয়তমকে ভালোবেসে কে কত গান উত্সর্গ করতে পারেন!
ঈশ্বর বা স্রষ্টা, তাঁকে কাছে পাই, না পাই, আলো-অন্ধকারে যাই অথবা না যাই, যে যেই বোধ নিয়ে হাঁটি পৃথিবীর এই পথ—সবার জন্যই চিন্ময়ের গান দর্শন আর শিক্ষা অবারিত। ২০০৭ সালের ১১ অক্টোবর নিউইয়র্কের জ্যামাইকায় শ্রীচিন্ময় দেহ ত্যাগ করেন। তাঁর ছাত্রছাত্রীরা এখন জ্যামাইকা সেন্টারকে মূল কেন্দ্র ধরে তাঁর কাজ করে চলেছে। বলাই বাহুল্য, সব ধর্মের-শ্রেণীর মানুষের জন্য এই সেন্টারের দরজা রাত-দিন খোলা।

ধনীর বিলাসিতা ক্ষতি করবে আর দোষী হবে গরিব -জলবায়ু পরিবর্তন by ফরিদা আখতার

‘বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নির্গমন কমাতেই হবে’ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে মতৈক্যের একটি জায়গা তৈরি হয়েছে। ধনী-গরিব সব দেশের পক্ষ থেকে একটি কথাই উঠছে। বিশ্বের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২০৫০ সালের মধ্যে গড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে শতকরা ৮০ ভাগ কার্বন নির্গমন কমাতেই হবে। এ পর্যন্ত জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে যত আন্তর্জাতিক সভা হয়েছে, তার মধ্যে এই সিদ্ধান্তই বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু কে কমাবে? এবং কীভাবে কমাবে? সেই প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। তবে এ কথাও আমরা সবাই জানি, কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের জন্য শিল্পোন্নত দেশের তথাকথিত উন্নয়ন বা অতি-উন্নয়ন এবং পৃথিবীর সব দেশেরই ধনীদের বিলাসী জীবনযাত্রার ধরন দায়ী। এই জীবনযাপনের সব মাধ্যম জ্বালানিনির্ভর, যার মধ্যে এই কার্বন নির্গমনের সব উপকরণ রয়ে গেছে।
ডেনমার্কের কোপেনহেগেন শহরে বর্তমানে জাতিসংঘের যে জলবায়ু সন্মেলন চলছে, তার কারণেও বাতাসে কার্বন নির্গমনের পরিমাণ বাড়বে, কারণ ১৯২টি দেশের কয়েক হাজার প্রতিনিধি উড়োজাহাজে করে যাবেন, অনেক গাড়ি চলবে, বাতি জ্বলবে আর খরচ হবে কাগজ, হাজার পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট বের হবে প্রতিদিন। এসব কূটতর্ক মনে হতে পারে, তবে এ ধরনের সম্মেলনের এই দিকটা না বললেই নয়। তাই বলে সম্মেলনে অংশগ্রহণ না করলে ভালো কিছু হবে, তা বলছি না।
পৃথিবীর ধনী ও তথাকথিত শিল্পোন্নত দেশের ধনী মানুষের জীবনযাত্রা কী পরিমাণ ক্ষতিকর, তা এই জলবায়ু পরিবর্তনের ঘটনাতেই বোঝা যায়। আমরাও শিল্পোন্নত দেশের অনুকরণে শিক্ষিত হতে গিয়ে শিখেছি, লেখাপড়া করে যে, গাড়ি-ঘোড়া চড়ে সে’—এখন তার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ‘লেখাপড়া করে যে, কার্বন নির্গমন করে সে।’ কৃষকের জ্ঞাননির্ভর ও প্রাণবৈচিত্র্যনির্ভর কৃষি বাদ দিয়ে জ্বালানিনির্ভর কৃষির প্রবর্তন করা হয়েছে বিশ্বব্যাংক ও দাতা সংস্থার পরামর্শে। কৃষি মানে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচযন্ত্র দিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলা, ধান কাটার জন্য যন্ত্রের ব্যবহার, ধান ভানার জন্য রাইস মিল—সবই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ফলে ফ্যাক্টরি-ব্যবস্থায় খাদ্য উত্পাদনও হয়ে গেছে পরিবেশ ধ্বংসের কারণ। সভ্যতা আমাদের পরিবেশবান্ধব হতে শেখায়নি, শিখিয়েছে পরিবেশ ধ্বংস করতে। অনেকে বলবেন, আমরা প্রযুক্তির বিকাশ ও উন্নয়নের বিরোধিতা করছি। আসলে মানুষের কল্যাণ ও পরিবেশ রক্ষার জন্য প্রযুক্তি খুব কদর পায়নি, পেয়েছে মুনাফা অর্জনকারী ও পরিবেশ ধ্বংসকারী প্রযুক্তি। কাজেই আমাদের সমালোচনা সেই প্রযুক্তির বিরুদ্ধেই।
ধনীদের জীবনযাত্রার গরমে উত্তর মেরুর নিষ্পাপ হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার আর টিকে থাকতে পারছে না। সেগুলো গলে যাচ্ছে। আগে শীতকালে গ্লেসিয়ার ছড়িয়ে পড়ত, গরমকালে ছোট হয়ে আসত। এই গ্লেসিয়ারের অবস্থা দেখে বিশ্বের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না, তা ধারণা করা যায়। ১৯৮০ সাল থেকে গ্লেসিয়ারের সংকীর্ণ হয়ে যাওয়ার বিষয়টি নজরে আসতে শুরু করে। এতে উন্নত বিশ্ব একটু চিন্তিত হয়ে উঠেছে। গ্লেসিয়ার না গলে যদি শুধু সমুদ্রের পানি বেড়ে যেত, তাহলে এত বেশি হইচই হতো কি না সন্দেহ আছে। কারণ, সেটা মূলত বাংলাদেশের মতো সমুদ্রপারের গরিব দেশের ব্যাপার হয়ে দাঁড়াত।
এদিকে আমাদের দেশের কাছাকাছি বরফ গলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে হিমালয়ের চূড়ায়। সেখানে বরফ সময়ের আগেই গলে যাচ্ছে। ফলে আমাদের নদীতে পানি অস্বাভাবিকভাবে এবং অসময়ে বাড়ছে। শীত, গরম ও বর্ষাকাল ঠিকমতো আর বোঝা যাচ্ছে না। এটা বড়ই যন্ত্রণার।
বাংলাদেশকে বিশ্বের পরিবেশসচেতন মানুষ এখন খুব চেনে। তারা বলে, ওহ্, বাংলাদেশ, তোমরা তো সমুদ্রের পানিতে ডুবে মরবে। বিশ্বের তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে এবং এর ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের একটি বড় অংশ সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। কিন্তু অনেকে যেটা দেখছেন না তা হচ্ছে, সমুদ্র যেমন রাগে ফুঁসছে, তেমনি হিমালয়ের অভিমানও কম নয়। বাংলাদেশে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র মিশে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ে। জাতিসংঘের জলবায়ুসংক্রান্ত প্রতিবেদনে (Big melt threatens millions, says UN, People & the Planet. June 4, 2007) হিমালয়ের গ্লেসিয়ার গলে যাওয়ার ফলে এশিয়ার; বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার, নদীর উত্স ২০৩৫ সাল অর্থাত্ মাত্র ২০ থেকে ২১ বছরের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যাবে। ফলে বাংলাদেশসহ ভারত, তিব্বত, নেপাল, পাকিস্তান ও মিয়ানমারে আগামী কয়েক দশকে বন্যা ও খরার ঘটনা বেড়ে যাবে। এর অর্থ হচ্ছে, বঙ্গোপসাগরে পানির উচ্চতা এমনিতেই বাড়বে, তার ওপর যোগ হবে হিমালয়ের বরফগলা পানি। বাংলাদেশের মাথার ওপরে এবং পায়ের তলায় সব দিক থেকে আঘাত আসবে।
কোপেনহেগেনে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য একটি নতুন চুক্তি হওয়ার কথা। বর্তমানে যে চুক্তি চলছে, অর্থাত্ কিয়োটো প্রটোকলের মেয়াদ ২০১২ সালে শেষ হয়ে যাবে। কাজেই বিশ্বে তাপমাত্রা কমিয়ে আনার জন্য নতুনভাবে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে চুক্তি হওয়ার কথা। আর তখনই গোল বাধছে। যাদের কারণে তাপমাত্রা বাড়ছে, তারা নিজেদের জীবনযাত্রা পরিবর্তনের খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হয় না; বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব একটা সাড়া দিচ্ছে না। তাদের জীবাশ্মনির্ভর জীবনযাত্রা পরিবর্তন না করেই আলোচনার মোড় ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তারা ভোগ কমানোর কথা যত না বলছে, তার চেয়ে বেশি আঙুল তুলে দেখানোর চেষ্টা করছে যে আসলে গরিব মানুষের সংখ্যাই দায়ী। সে কারণে তড়িঘড়ি করে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বিশ্ব জনসংখ্যা প্রতিবেদন, ২০০৯ প্রকাশ করে বসেছে। কোনো প্রকার গণনা ছাড়াই অঙ্ক কষে বিশ্বের জনসংখ্যা সাত বিলিয়ন হয়ে যাবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তারা আরও বলছে, আসলে জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য জনসংখ্যাও একটি বিষয় হিসেবে আসা উচিত। যদিও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনসংখ্যার প্রভাব নিয়ে খুব বড় ধরনের যুক্তি তাদের পক্ষে নেই বলে তারা আভাসে-ইঙ্গিতে তা তুলছে। তারা ‘জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ’ কথাটি উচ্চারণ না করে হালকাভাবে ‘পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি’ করা উচিত বলে পরামর্শ দিচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে একটু চালাকি আছে। বলা বাহুল্য, এই সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কাজটি গরিবদের ওপরই ঘটবে, যেমন অতীতে ঘটেছে। ভোগই যদি কার্বন নির্গমনের প্রধান কারণ হয়, তাহলে গরিব দেশের গরিব মানুষ যা ভোগ করে, তা ধনীদের ভোগের ধারেকাছেও নেই। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন, হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ১৯৯৮ ওভারভিউ, ধনী-গরিবের ভোগের বিপুল ব্যবধান তুলে ধরেছে। সেখানে বলা হয়েছে, মাত্র ২০ শতাংশ ধনী মানুষ ৮৬ শতাংশ ভোগ করে আর সর্বনিম্ন ২০ শতাংশ গরিব মানুষ মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোগ করে। এই ২০ শতাংশ ধনীরা ৪৫ শতাংশ মাছ-মাংস, ৫৮ শতাংশ জ্বালানি, ৮৪ শতাংশ কাগজ এবং ৮৭ শতাংশ গাড়ির ব্যবহার করে। এর বিপরীতে মাত্র ৫ শতাংশ মাছ-মাংস, ৪ শতাংশ জ্বালানি, ১ দশমিক ১ শতাংশ কাগজ এবং ১ শতাংশ গাড়ি ব্যবহার করে। তাহলে এই গরিব মানুষগুলোকে দুনিয়া থেকে একেবারে সরিয়ে দিলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ১ শতাংশও উন্নতি করা যাবে না। অথচ ধনীরা একটু দয়া করে তাদের ভোগের মাত্রা কমিয়ে দিলে অনেক পার্থক্য বোঝা যাবে, এই কথা একটি শিশুও হিসাব করে বুঝবে। কিন্তু তবুও কেন তৃতীয় বিশ্বের জনসংখ্যার দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে? এর কারণ, বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই এখন ধনী দেশের জীবনযাত্রার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ধনী দেশের সরকার এ ব্যাপারে খুব একটা দায়িত্ব নিতে চায় না বলে ‘যত দোষ, নন্দ ঘোষ’কে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এবং এই নন্দ ঘোষ আর কেউ নয়, আমাদের গরিব মানুষ। দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরানোর এর চেয়ে ভালো পদ্ধতি আর কী হতে পারে? বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট, ২০০৯-এ আরও কারসাজি আছে। সেটা হচ্ছে, নারীদের সম্পৃক্ত করে প্রশ্নটি উত্থাপন করা হয়েছে। এ কথা সত্যি যে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়ে যাচ্ছে, এতে গরিব দেশের গরিব মানুষ নিত্য বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় প্রভৃতিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে এবং নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, গত দশকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিবছর ২১ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ৯৮ শতাংশ দুর্যোগই জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত। বিশ্বব্যাপী মানুষের ক্ষয়ক্ষতির সংখ্যা ১৯৯৮ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত ব্যাপকভাবে বেড়েছে। জনসংখ্যা প্রতিবেদনটি বাংলাদেশে প্রকাশ করতে গিয়ে স্থানীয় ইউএনএফপিএ প্রতিনিধি বলেছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগে নারীদেরই খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কথাটি মিথ্যে নয়। তিনি সাম্প্রতিক সময়ের বাংলাদেশে দুটি বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সিডর ২০০৭ এবং আইলার ২০০৯-এর কথা উল্লেখ করেন এবং মানুষের ক্ষয়ক্ষতির বর্ণনা দেন। কিন্তু এর সঙ্গে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বা পরিবার পরিকল্পনার সম্পর্কটা কোথায়? পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির মাধ্যমে সন্তান জন্মদান কমানো কিংবা বন্ধ করা যাবে। অর্থাত্ সিডর বা আইলা হলে যে সন্তান জন্মায়নি, তার তো কোনো ক্ষতি হবে না। কিন্তু যারা ইতিমধ্যে জন্মগ্রহণ করেছে তাদের বাঁচানোর জন্য পরিবার পরিকল্পনা কতটা সহায়ক হবে। স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে উন্নত না করে বিদেশ থেকে আমদানি করা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি নারীর শরীরে ঢুকিয়ে দিলে তার স্বাস্থ্যের যে ক্ষতি হবে, সে দায়িত্ব কে নেবে? জন্মনিয়ন্ত্রণ করা না-করা নারীর নিজের বিবেচনায়ই হওয়া উচিত, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে জটিলতা বাড়ানোর কোনো দরকার নেই।
বাংলাদেশে ধনীদের একটি বড় অংশ ঢাকা শহরে বাস করে। তাঁদের ভোগের অবস্থা দেখলেই আমরা আন্দাজ করতে পারি, বিশ্বের ধনীদের কী অবস্থা। ঢাকা শহরে গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধি যে যানজটের সৃষ্টি করছে, তার চেয়ে বেশি করছে বাতাসে কার্বন নির্গমন ও পরিবেশদূষণ। যানজটের সমস্যা ট্রাফিক সিগন্যালের নতুন নিয়মকানুন করে হয়তো ঠিক করা সম্ভব, কিন্তু একটি গাড়িতে মাত্র একজন কি-দুজন চড়বে বলে গাড়ির সংখ্যা বাড়ানোর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ আনা না হলে কার্বন-জট ঠেকানো যাবে না। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, সংসদে কিংবা উপজেলা পরিষদে যে জনপ্রতিনিধিরা যাচ্ছেন, তাঁদের জন্যও বিশেষ গাড়ি আমদানি করতে হচ্ছে। আমি অনেক আগে লিখেছিলাম (প্রথম আলোতেই), গাড়ির পরিবার পরিকল্পনা চাই, আজও বলছি, মানুষের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য যদি পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি করতে হয়, তাহলে গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে চাই বিশেষ পরিকল্পনা। কার্বন নির্গমন ঠেকানোর জন্য এটাই হবে সবচেয়ে কার্যকর পন্থা। বাংলাদেশে আমরা এখনো জলবায়ু মোকাবিলায় নিজস্ব পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারি। এর আগে আমাদের প্রতি দোষারোপ করার চেষ্টা ঠেকাতে হবে। যারা দায়ী, সেই ধনী দেশকেই কার্বন নির্গমন কমানোর বেশির ভাগ দায়িত্ব নিতে হবে। সমস্যা যেখান থেকে শুরু, সমাধান সেখান থেকেই হতে হবে।
ফরিদা আখতার: নারী আন্দোলনের নেত্রী।

বরুণ ফোটার অপেক্ষায় ভাটির ভাসান পানি -শ্রদ্ধাঞ্জলি by পাভেল পার্থ

বাংলাদেশে একেক অঞ্চলে একেক রকমের তৃণগুল্ম ও বৃক্ষরাজি। একেক ফুলের একেক রং, একেক ঘ্রাণ। হাওর-ভাটির নানা প্রান্তে জন্মে এমনই কত না বর্ণ-গন্ধের উদ্ভিদ। করচ, হিজল, কদম, তমাল, সিংড়া, বনতুলসীর মতো বরুণ এক বৈশিষ্ট্যময় জলাভূমি অঞ্চলের উদ্ভিদ। ভাটি অঞ্চলে ধানকাটার সময় টেপী বোরোর গরম গরম ভাতের সঙ্গে বরুণের কচি ডগা ভর্তা-ভাজি করে গৃহস্থ নারীরা কামলাদের খেতে দেন। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে হাওরের নারীরা সংগ্রহ করেন বরুণ ফুল। আসছে বছরটি যাতে পরিবার ও গ্রামসমাজের জন্য মঙ্গলময় হয়, সে জন্য বরুণের ফুল গ্রামময় গেঁথে দেওয়া হয় গোবরের দলায়। হাওরাঞ্চলে এ পর্ব আড়িবিষুসংক্রান্তি নামে পরিচিত। বসন্তের শুরুতে সাদা ফুলে ছেয়ে যায় বরুণের ডাল। বর্ষাকালে বরুণের ডালে থোকা থোকা ফল ধরে। ফলের ভেতরেই থাকে আগামী দিনের অনন্য সব বরুণের সম্ভাবনার বীজ। বর্ষাকালেই হাওরজুড়ে ভাসান পানির থইথই। বর্ষার ভাসান পানির সঙ্গী হয় ফলন্ত পোয়াতি বরুণের ঘাড় উঁচু সব ডাল। বরুণগাছ ছাড়াও আরেক বরুণ হাওর-ভাটির ভাসান পানির সঙ্গী হয়েছিলেন। নথিপত্রে প্রসূন কান্তি (বরুণ) রায় নাম থাকলেও ভাটিবাংলায় তিনি বরুণ রায় নামেই জয় করেছিলেন হাওরবাসীর বিশ্বাস।
বাংলাদেশে হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ড দেশে ৪১৪টি হাওর আছে বলে তাদের এক দলিলে উল্লেখ করে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪২৩টি হাওর রয়েছে। দেশের মোট আয়তনের ৬ ভাগের ১ ভাগজুড়ে এই হাওরাঞ্চলে প্রায় ২ কোটি মানুষের বসবাস। এককালে হাওরে জন্মাত অবিস্মরণীয় সব গভীর পানির ধানের জাত। উপমহাদেশের প্রথম গভীর পানির ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৪ সালে হাওরের হবিগঞ্জ জেলার নাগুড়াতে। সেই প্রতিষ্ঠানকে বদলে তৈরি করা হয়েছে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের আঞ্চলিক গবেষণাকেন্দ্র। গবেষণা ও উন্নয়নের নাম করে গভীর পানির ধানের জাতগুলো ডাকাতি করেছে ইরি ও সিজিআরআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠান। ষাটের দশকের পর তথাকথিত সবুজ বিপ্লবের নামে রাষ্ট্রের মাধ্যমে রাসায়নিক কৃষি চালু হওয়ায় বাংলাদেশের হাকালুকি, হাইল, শনির, দেখার, টাঙ্গুয়ার, পচাশোল, সজনার মতো বৈশিষ্ট্যময় হাওরগুলোতে জমেছে করপোরেট কোম্পানির বিষ। মেঘালয় পাহাড়ে অন্যায় ও অপরিকল্পিত করপোরেট কয়লা, পাথর ও ইউরেনিয়াম খনির ফলে ভাটিবাংলার হাওর-জলাভূমি প্রশ্নহীনভাবে জখম হচ্ছে দিনের পর দিন। হাওরের ধান-মাছ-বন-জলসহ প্রাণসম্পদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার হাওরবাসী এভাবেই দিন দিন হাওরের সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক করপোরেট বিশ্বায়িত দুনিয়ার পুতুল নাগরিকে পরিণত হতে বাধ্য হয়েছে।
রাষ্ট্রের রাজস্ব উন্নয়নের নাম করে জমিদারি প্রথার পর হাওরাঞ্চল দখল করে প্রশ্নহীন অন্যায় ইজারাদারি। হাওর ইজারাদারেরা কিছুদিনের মধ্যেই ‘ওয়াটার লর্ড’ নামে হাওর এলাকার দখলদার হয়ে ওঠে। অন্যায়ভাবে তারা হাওরনির্ভর কৃষক ও জেলের ভাসান পানিতে মাছ ধরার প্রথাগত অধিকারও কেড়ে নেয়। রাষ্ট্র সমানে রাজস্ব আদায়ের নাম করে দেশের সব হাওর-জলাভূমি ইজারা দিতে থাকে। বহিরাগত ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা মত্স্যজীবী সংগঠনের নামে কেবল হাওর নয়, নদী পর্যন্ত ইজারা নেওয়ার মতো বাহাদুরিও করেছে হাওর এলাকায়। যেমন, একটি ২০ একর বা তার ওপরের হাওর-জলাভূমি বিল (সরকারের ভাষায় যা জলমহাল) ইজারা দিয়েছে সরকার। ওই বিলের সীমানা হেমন্তকালে ২০ একর হলেও বর্ষাকালে প্লাবনে ভেসে যায় চারদিক। আর কোনো সীমানা থাকে না জলাভূমির। ২০ একরের ভেতরের মাছসহ সব জলজ প্রাণ ‘সীমানা লঙ্ঘন’ করে। ইজারাদার বাদে যদি গ্রামের কোনো দরিদ্র প্রান্তিক কৃষক বা জেলে বা যে কেউ এই ভাসান পানিতে মাছ ধরতে যায়, তবে তাকে ভয়াবহভাবে জখম হতে হয়। ইজারাদার তাকে বাধা দেয় এবং ভাসান পানিতেও তাকে মাছ ধরতে দেওয়া হয় না। তখন আর ইজারাদার তার সীমানাকে ২০ একর হিসাবে চিহ্নিত না করে ভাসান পানিতেও তার মাছ ভেসে গেছে বলে ওই মাছ না ধরার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করে। ধানের আবাদ না করলে যেমন হাওরবাসীর চলে না, তেমনি মাছ না ধরলেও হাওরবাসীর চলে না। বর্ষার ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকারের দাবিতে হাওরের প্রান্তিক জনগণ সংগঠিত হয়েছে নানা সময়ে। ভাটিবাংলার বরুণের ডালে ডালে ঝুলে থাকা বরুণ ফলের ভেতর সেই সব স্মৃতিচিহ্নের দ্রোহের ঝাঁজ এখনো বিরাজমান।
বরুণ রায় ভাটিবাংলার বরুণ ফলের ভেতরের সেই আহাজারি টের পেয়েছিলেন। তাই বরুণ ফলের মতো তিনিও সঙ্গী হয়েছিলেন ভাসান পানির। মূলত হাওরাঞ্চলে আশির দশকে গড়ে ওঠে ভাসান পানিতে মাছ ধরার অধিকার আন্দোলন। পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম ভাসান পানির অধিকারের দাবিতে সংগঠিত এই গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বরুণ রায়। মূলত বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, কৃষক ও ক্ষেতমজুর সমিতির সদস্য-কর্মীরা এই আন্দোলনের প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক চেহারা দাঁড় করান।
কমরেড বরুণ রায় ১৯২২ সালের ১০ নভেম্বর সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার বেহেলী গ্রামের এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৪২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন এবং ১৯৫০ সালে পার্টির সিলেট জেলা শাখার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের এক লড়াকু বীর বরুণ রায় ১৯৮৮ সালে সুনামগঞ্জ-১ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন। ৮ ডিসেম্বর ২০০৯ মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টায় সুনামগঞ্জ শহরের হাসননগরের নিজ বাসভবন থেকে ৮৮ বছর বয়সে বরুণ রায় হাওরের পাড়ে লড়াই করে টিকে থাকা বরুণগাছের শীর্ষে চলে যান। শীলা রায়, যিনি তাঁর সংসার-জীবনেরও সহযোদ্ধা হয়ে ছিলেন, তিনিই মঙ্গলবার রাতে তাঁর মুখাগ্নি করেন।
হাওরের ভাসান পানি বরুণের ছায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। বসন্তেই ফুটবে ফুল, তারবাদে বর্ষাতে ডালে ডালে থোকা থোকা ফল। আর ফলের ভেতরেই থাকবে আগামীর সব অপ্রতিরোধ্য সম্ভাবনা। আবারও ভাটিবাংলায় বরুণের ফল থেকে গজাবে চিরঅম্লান বরুণেরা। অসাম্যের ইজারাদারি বাতিল করে ভাসান পানিতে হাওরের প্রান্তিক জনগণের অধিকার একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই হবে। বরুণের বীজের ভেতর হাওর-ভাটির সেই দ্রোহের ব্যঞ্জনা নিরন্তর বিরাজমান। বরুণ রায় বীজের ভেতর সেই সম্ভাবনা ও আহাজারিকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন। ভাটিবাংলার জনগণও তার প্রয়োজনেই বরুণের বংশ শেষ হতে দেবে না কোনো দিন। ভাসান পানির সঙ্গী বরুণ বৃক্ষের দিকে হাত বাড়িয়ে আছে বঞ্চিত হাওর। আমরা কি বরুণ রায়ের মতো হাওর-ভাটির সেই ডাকে সাড়া দিতে আগ্রহী?
পাভেল পার্থ: প্রতিবেশবিষয়ক গবেষক।
animistbangla@yahoo.com

ঈশ্বরদীর সজল হত্যা মামলা -রাজনৈতিক চাপ বন্ধ করতে হবে

সরকার বদলালেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তথা পুলিশের চরিত্র যে বদল হয়নি, ঈশ্বরদী উপজেলার গোকুলনগর এলাকার সজল হত্যা মামলাই এর প্রমাণ। রাজনৈতিক বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার জেরে গত ১২ নভেম্বর নিহত হন সজল। এ ঘটনায় তাঁর বাবা আমজাদ খাঁ স্থানীয় রেলওয়ে থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি। পরে স্থানীয় যুবলীগের নেতা শফিকুল ইসলামকে প্রধান আসামি করে তিনি মামলা করেন পাবনার বিচারিক আদালতে। এ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত আসামিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেও থানার পুলিশ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বরং ৫ ডিসেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে মামলার প্রধান আসামির বৈঠক হয়েছে বলে দাবি করেছেন বাদী।
তদন্ত কর্মকর্তা সে দাবি অস্বীকার করেননি। পুলিশের দায়িত্ব দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন। এখানে দেখা গেছে, পুলিশ দুষ্টকেই আশকারা দিয়ে যাচ্ছে। তারা আদালতের নির্দেশ পালন না করে আসামিকে চা-বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করছে। আসামিদের সঙ্গে পুলিশের এ ধরনের সখ্য শুধু অনৈতিক নয়, আইনের শাসনেরও পরিপন্থী। তদন্ত কর্মকর্তা আত্মপক্ষ সমর্থন করতে গিয়ে বলেছেন, আসামিদের না ধরতে ওপর মহলের চাপ আছে। সে চাপ উপেক্ষা করে তিনি চাকরি হারাতে চান না। ওই ওপর মহলটি কে? আসামি যেহেতু ক্ষমতাসীন দলের যুব সংগঠনের স্থানীয় নেতা, সেহেতু রাজনৈতিক চাপ থাকাই স্বাভাবিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব সেই চাপ অগ্রাহ্য করে আসামির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশ বাহিনীকে নির্ভয়ে ও নিরপেক্ষভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালনের যে নির্দেশ দিয়েছেন, ঈশ্বরদীর ঘটনায় এর বিপরীত চিত্রই প্রতিফলিত হয়েছে।
এ ধরনের ঘটনা যে শুধু ঈশ্বরদীতেই ঘটছে, তা বিশ্বাস করার কারণ নেই। সব সরকারের আমলে একশ্রেণীর রাজনৈতিক টাউটকে থানায় ঘুরঘুর করতে দেখা যায়। জোট সরকারের আমলে এসব ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। এখনো যদি এর পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে দিনবদল হলো কোথায়? সজল হত্যা মামলার আসামিদের গ্রেপ্তার করে অবিলম্বে বিচারে সোপর্দ করতে হবে। আদালতই বিচার করবেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা দোষী না নির্দোষ।

ভারাক্রান্ত রাজধানী ঢাকা -বাড়ছে মানুষ, ভাঙছে স্বপ্ন

পঞ্চাশের দশকে ঢাকা ছিল অপূর্ব সুন্দর। এর আগে রমনায় বাঘ ডাকত। পুরানা পল্টন ছিল আকর্ষণীয়। আর ওয়ারী ছিল সেকালের সৌন্দর্যমণ্ডিত আধুনিক ঢাকার প্রতীক। মাত্র ৬০ বছরেই সেই সব ঐতিহ্য মরে গেছে। স্বপ্নের নগর ভেঙে পড়ছে। আজ ঢাকা এক জনবহুল ও জঞ্জালের নগর। প্রতিদিন এখানে স্রোতের মতো মানুষ ঢুকছে। রাস্তা না বাড়লেও প্রতিদিন বাড়ছে গাড়ির সংখ্যা। এ নগরের জনসংখ্যার কোনো সঠিক হিসাবও নেই কারও কাছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ নগরে এখন বাস করছে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ লোক। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৭ হাজার ৭০০ জন।
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ধারণের জন্য ঢাকা শুধু দিঘে-পাশেই বাড়ছে না, উচ্চতায়ও বাড়ছে। ঢাকা এখন বহুতল ভবনের কেন্দ্র, যেখানে জমছে নগরবাসীর বহুতল সুখ-দুঃখ। কারণ, নাগরিক পরিষেবা-ব্যবস্থা এতই অপ্রতুল যে সুপেয় পানি, বিদ্যুত্, যাতায়াতব্যবস্থা, চিকিত্সাসহ ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধা থেকে বেশির ভাগ মানুষ বঞ্চিত। এমন অপরিকল্পিতভাবে যে বিশ্বের কোনো আধুনিক নগর চলতে পারে, তা অবিশ্বাস্য।
সমস্যা যে তীব্র তাতে সন্দেহ নেই। প্রশ্ন হলো, সমাধান কী? মোটামুটি বসবাস-উপযোগী ঢাকা নগরের জন্য অন্তত তিনটি ক্ষেত্রে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, সারা দেশের জন্য সঠিক জনসংখ্যানীতি; দ্বিতীয়ত, সুব্যবস্থাপনা; আর তৃতীয়ত, এবং যেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, শক্তিশালী স্থানীয় শাসনব্যবস্থা। যাঁরা দেশ পরিচালনা ও নগর-ব্যবস্থাপনার মতো গুরুদায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের এ তিনটি ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা বাড়ছে এবং আশঙ্কা করা হয় যে বর্তমানের প্রায় ১৬ কোটি থেকে বেড়ে ২০৫০ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় সাড়ে ২৫ কোটি। স্পষ্টতই, এই বৃদ্ধির হারের সঙ্গে তাল রেখে ঢাকা মহানগরের জনসংখ্যাও বাড়বে। কিন্তু একটা লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমছে এবং ২০৫০ সালে মোট জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ৯০০ কোটিতে স্থিতি লাভ করবে, এমনকি এরপর ধীরে ধীরে কমে আসবে। বাংলাদেশ এই সাধারণ ধারার বাইরে থাকবে না। অবশ্য এ জন্য যথাযথ পরিকল্পনা ও তার সঠিক বাস্তবায়ন দরকার।
তবে রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তাতে কমবে না। সর্বপর্যায়ে দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বিশেষভাবে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের স্বশাসন ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। এর প্রমাণ আমাদের হাতের কাছেই রয়েছে। কলকাতার জনসংখ্যা যে এমন বেহিসাবির মতো বাড়ছে না, তার অন্যতম একটি কারণ হলো, সেখানে রয়েছে শক্তিশালী স্থানীয় সরকারব্যবস্থা। আমাদের দেশে এখনো সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে। ৪০ থেকে ৫০ শতাংশেরও বেশি চাকরি সৃষ্টি হয় ঢাকায়। সাধারণত নদীভাঙনে স্থানচ্যুত মানুষ আশ্রয়ের জন্য প্রথমে যায় পাশের উপজেলা বা জেলা শহরে। সেখানে চাকরির সংস্থান হলে তারা সহজে রাজধানীতে আসত না। যদি চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশালের মতো মহানগরগুলোতে উন্নয়ন প্রকল্প সমন্বিতভাবে বাস্তবায়িত হতো, চাকরির সংস্থান থাকত, শিক্ষা-চিকিত্সার উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেত, তাহলে সত্যিকার অর্থে এক-একটা ‘টেকসই’ নগর গড়ে উঠত এবং রাজধানী ঢাকা জনজটের অভিশাপ থেকে মুক্ত থাকত।
রাজধানী ঢাকাকে বাঁচাতে হবে, এর কোনো বিকল্প নেই। সরকার ও নগর পরিকল্পনাবিদেরা এদিকে নজর দিন।