Sunday, September 22, 2019

দুর্নীতিবিরোধী 'শুদ্ধি অভিযান'কে কীভাবে দেখছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা?

আওয়ামী লীগের যে বৈঠকে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সেখানেই তিনি যুবলীগের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন।
এরপর থেকেই অঙ্গ সংগঠনগুলোয় চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা বড় নেতাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয়।
এর কয়েকদিন পরেই র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) বিশেষ একটি অভিযান শুরু করে। যুবলীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তাদের নিয়ন্ত্রিত অবৈধ ক্যাসিনোসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও অভিযান চালানো হয়েছে।
কিন্তু চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বা বহুদিন ধরে ক্যাসিনো চালিয়ে আসার অভিযোগ থাকার পরেও, এতদিন পরে কেন নড়েচড়ে বসেছে দলটি?
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলছেন, গত দশ বছর ধরে আওয়ামী লীগ যে টানা ক্ষমতায় রয়েছে, এ সময় কিন্তু অনৈতিকতার কারণে অনেক সাবেক মন্ত্রী, এমপির বিরুদ্ধে মামলা নেয়া হয়েছে, তাদের অনেকে কারাগারেও গেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখনি তথ্য পেয়েছেন, উনি তাক্ষণিকভাবে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন।
''আমরা যে এখন শুরু করলাম, আগে শুরু করি নাই, এরকম কোন কথার যৌক্তিকতা নেই। যখনি তথ্য এসেছে, সেই তথ্য সঠিক বলে জানা গেছে, তখনি সমূলে ধ্বংস করার জন্য অভিযান চালানো হয়েছে।''
এসব অভিযানের ফলে দলীয়ভাবে আওয়ামী লীগের জন্য আশঙ্কার কোন কারণ নেই বলে তিনি মনে করেন।
''এই গুটিকয়েক অনৈতিক বা দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি, এদের কার মন খারাপ হলো বা কার সমর্থন থাকলো কি থাকলো না, তাতে আওয়ামী লীগের কিছু আসে যায় না।'' বলছেন মি. হানিফ।
এর মধ্যেই ঢাকায় অভিযানের পাশাপাশি চাঁদাবাজির অভিযোগে কুষ্টিয়া যুবলীগের দুইজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠনগুলোর অনেক শীর্ষ নেতা গ্রেপ্তার আতঙ্কে ভুগছেন বলে খবর প্রকাশ করা হয়েছে বাংলাদেশের সংবাদপত্রগুলোতেও।
এই অভিযানকে কীভাবে দেখছেন আওয়ামী লীগের মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা?
শরীয়তপুর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সামিনা ইয়াসমিন বলছেন, দলের মধ্যে যদি দুর্নীতি থাকে, তাহলে তো সেটা ভ্যানিস করাই উচিত। দল পরিষ্কার থাকবে, এটাই দলের জন্য ভালো।
''দলে দুষ্ট লোক থাকলে, তারা যদি এভাবে ধরাও পড়ে, সেটার জন্য দলের অন্যদের উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রশ্ন আসে না। বরং এরা ধরা পড়লে দল খাটি হবে। মানুষের মধ্যেও একটা সচেতনতা আসবে, যে এরকম করা যাবে না।
এর আগে বিভিন্ন দুর্নীতি, চাঁদাবাজির ঘটনায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা জড়িত বলে অভিযোগের আঙ্গুল উঠেছে।
এবার এই অভিযানকে সরকারের দুর্নীতির প্রমাণ বলে দাবি করছে বিরোধী দল।
ফলে এভাবে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে বিরোধীদের হাতে দল ও সরকারকে সমালোচনার সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে বলে কোন কোন নেতা মনে করেন।
তবে শেষপর্যন্ত এই অভিযান দলের জন্য ভালো হবে বলে মনে করছেন ফরিদপুরের আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি মাসুদ।
তিনি বলছেন, 'আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যদি এই ধরণের অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে তো অবশ্যই ভাবমূর্তির ক্ষতি হচ্ছে। পাশাপাশি এটাও ঠিক, যদি এই শুদ্ধি অভিযান না চলে, যদি কোন কিছু না করা হয়, তাহলে তো পরিবর্তন আসবে না। এই অভিযানের প্রয়োজন আছে।''
''এটা এই নয় যে, আমি আওয়ামী লীগ করি, আমার সরকার ক্ষমতায়, তাই আমাকে অন্যভাবে দেখতে হবে। এটা ঠিক না।''
এই নেতারা আশা করছেন, এ ধরণের অভিযানের ফলে দুর্নীতিগ্রস্ত বা চাঁদাবাজরা একটা বার্তা পাবে যে, আওয়ামী লীগ তাদের প্রশ্রয় দেবে না।
কিন্তু শুধুমাত্র এরকম অভিযান চালিয়ে দলকে দুর্নীতিমুক্ত করা যাবে, সেই প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক সামিনা লুৎফা বলছেন, এ ধরণের অভিযানে সাময়িক সাফল্য পাওয়া গেলেও, দলকে সত্যিকারের দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে দশ বছরের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা দলটিকে আরো কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলছেন, ''এই অভিযান হচ্ছে একটা বার্তা দেয়া, যাতে মানুষ এসব ব্যাপারে সতর্ক হয়, যেন এরকম কাজ না করে। কিন্তু একজন যখন একটি দলের সবকিছুর সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন তার পক্ষে এত বড় একটা দলের সব কিছু নজরদারিতে রাখা সম্ভব না।''
''সুতরাং একজন দুইজনকে গ্রেপ্তার করে মানুষ বা নেতাকর্মীকে দুর্নীতি থেকে দূরে রাখার একটা চেষ্টা হিসাবে আমরা দেখতে পারি, বা শুরু হিসাবে দেখতে পারি। কিন্তু তারা অনেকদিন ধরে যেহেতু ক্ষমতায় রয়েছে, তাই দীর্ঘমেয়াদী যদি দুর্নীতি আসলেই বন্ধ করতে চান, তাহলে দলের ভেতরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সঙ্গে ক্ষমতার সুষম বণ্টন করতে হবে।''
এটা ছাড়া বিশ্বাস অর্জন করা বা দুর্নীতি সম্পূর্ণভাবে দূর করা সম্ভব হবে না বলে তিনি মনে করেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এই অভিযান আরো কিছুদিন চলবে এবং তালিকায় রয়েছেন আরো বেশ কয়েকজন বড় নেতা।
আওয়ামী লীগের নেতারা আশা করছেন, এসব অভিযান নিয়ে এখন সাময়িক সমালোচনা হলেও, শেষপর্যন্ত সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য সেটি ইতিবাচক হবে।
ঢাকায় অবৈধভাবে চালানো কয়েকটি ক্যাসিনো বন্ধ করে দিয়েছে র‍্যাব, যেসব ক্যাসিনো পরিচালনায় ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে

খালেদের সেই টর্চারসেল by মরিয়ম চম্পা

কমলাপুর রেলস্টেশনের উল্টো দিকে ইস্টার্ন কমলাপুর টাওয়ার। ১৮ তলা এই ভবনটির সামনে এখনো ঝুলছে যুবলীগ নেতা খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার পোস্টার। ৬৪/৬৮ ইস্টার্ন কমলাপুর কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের পঞ্চম তলার ৪০২ নম্বর কক্ষে খালেদ গড়ে তুলেছিলেন ‘নির্যাতন কেন্দ্র’। ভবনটির পাঁচতলা পর্যন্ত কমার্শিয়াল কমপ্লেক্স। বাকি ১৩ তলায় ফ্ল্যাট বাসা। ভবনে থমথমে পরিবেশ। বাসিন্দারা অপরিচিত কাউকে দেখলেই ভিন্ন দৃৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। পঞ্চম তলায় গিয়ে দেখা যায় সুনসান নীরবতা। ভবনের দেয়ালে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে রং-বেরংয়ের কাগজে শুভ জন্মদিন ভাই। মাঝখানে খালেদের ছবি। সিড়ির বাম পাশে রিসিপশনে ভূইয়া এন্ড ভূইয়া ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড। পাশেই ৪০২ নং কক্ষ। যেটা খালেদের ‘নির্যাতন কেন্দ্র’ নামে পরিচিত। কক্ষটিতে এখন তালা ঝুলছে।
ইস্টার্ন হাউজিং গ্রুপের এই ভবনের কেয়ারটেকার বলেন, ছয়মাস ধরে এই ভবনে চাকরি করছি। তারা বড় নেতা। তাদের বিষয় আলাদা। তারা যখন আসে তখন আমি বেরিয়ে যাই। বেরিয়ে যাওয়ার পরে প্রবেশ করি। নেতার সঙ্গে প্রায় শতাধিক লোকজন আসতো। মাসে সর্বোচ্চ এক থেকে দুইবার যাই সার্ভিস চার্জ ও বিদ্যুৎ বিল আনতে। তাদের অফিস কক্ষের ভেতরে কি হচ্ছে সেটা বলতে পারবো না। ওই কক্ষের সঙ্গে বাহিরের জগতের কোনো যোগাযোগ নেই বললেই চলে। কারণ নেতা আসলে তখন তার লোকজনদের ভয়ে অফিস বন্ধ করে বেরিয়ে যেতাম। তারা আমার অফিস কক্ষে এসে বিড়ি খায়। ঝামেলা করে। যুবলীগের এই নেতাকে সিসি ক্যামেরায় দেখা মাত্রই অফিস বন্ধ করে নিচে চলে যাই। তারা চলে গেলে আবার উপরে আসি। উনি এতো বড় মানুষ। তার কাছে কি আমরা যেতে পারি। এই ঘটনার পরে আমাদের ভবনের সুনাম নষ্ট হয়েছে। র‌্যাবের অভিযানের সময় আমি ভেতরে গিয়েছিলাম। যে সকল সরঞ্জামাদি কক্ষের ভেতরে দেখেছি সেগুলো আমি আগে কখনোই দেখিনি। এগুলো দেখে অনেকটা ভরকে গিয়েছিলাম।
ভবনের পরিচ্ছন্নতা কর্মী বলেন, স্যার যে এমন এইটা আমরা জানতাম না। তিনি যখন গাড়ি থেকে নামতেন তখন মাথা নিচু করে নামতেন। আবার লিফটে উঠতেন মাথা নিচু করে। কারো দিকে তাকাতেন না। কারো সঙ্গে কথাও বলতেন না। একদিন আমাকে ডেকে একদম কর্নারের অফিস কক্ষ ঝাড়া মোছা করতে বলেন। রুমটি ছিল সম্পূর্ণ খালি। একপাশে ছিল ছোট্ট একটি খাট। তবে পাশের কক্ষে আমরা কখনো প্রবেশ করিনি। ওই কক্ষগুলো আমাদের দিয়ে পরিষ্কার করাতো না। ওই রুমের ভেতর কি আছে সেটাও আমরা জানি না। উনারা যখন আসতেন তখন রুমটি খোলা হতো। তাছাড়া সবসময় রুমটি তালাবন্ধ থাকে।
ভবনের চতুর্থ তলার একটি ম্যানপাওয়ার অফিসের কর্মচারি বলেন, একমাস আগে আমি এখানে চাকরিতে যোগদান করি। ভবনের সামনে পোস্টারে আমি তাকে প্রথম দেখি। তিনি চেনাজানা লোক ছাড়া কারো সঙ্গে কথা বলেন না। আমি একদিন অনেক প্রত্যাশা নিয়ে দাড়িয়ে ছিলাম তাকে দেখবো। এসময় ভাইয়ের লোকেরা এসে আমাকে বলেন, আপনাকে কি খালেদ সাহেব চিনেন? তখন আমি ভয় পেয়ে যাই। রীতিমত কাঁপতে থাকি। এসময় আমি বলি, জ্বি না। তখন ভাইয়ের লোকেরা বলেন, ‘তাহলে আপনি দাড়িয়ে আছেন কেনো। বেরিয়ে যান’। একটি কঠিন অবস্থা ছিল। আমি বললাম ভাইকে একটু দেখার জন্য দাড়িয়েছি। উনি যখন ভবনে আসেন তখন নিচে তার বডিগার্ড ছাড়া আর কোনো লোক থাকে না। পুরো রাস্তা তাকে ছেড়ে দিতে হয়। উপরেও একই অবস্থা। আবার যাওয়ার সময়ও একই অবস্থা। ভয়ে কেউ সামনে আসতে চায় না। উনি না যাওয়া পর্যন্ত আমরা কেউ উঠা নামা করি না। তবে রুমের ভেতর কখন কি হতো আমরা জানি না।
ভূইয়া এন্ড ভূইয়া ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড এর সামনে হীরক রাজা নামে ই-কমার্সের এর কর্মচারী বলেন, গত ছয়মাস ধরে আমি এখানে কাজ করছি। এই অফিসটিকে যে টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করতো সেটা আমাদের জানা ছিল না। কখনো ওই অফিসে যাওয়া হয় নি। নেতা না আসলে অফিস সবসময় বন্ধ থাকে। খুব নিরিবিলি পরিবেশ। ঘটনার দিন বাসায় গিয়ে টেলিভিশনে খবর দেখে জানতে পারি এটা টর্চার সেল। সামনাসামনি অফিস হলেও ভেতরে কি হচ্ছে সেটা আমরা কিভাবে জানবো। ভেতরে তারা কি কাজ করতো সেটা আমরা জানি না।  
ভবনের সিকিউরিটি গার্ড বলেন, ছয় থেকে সাত বছর ধরে এখানে চাকরি করছি। এই ঘটনার আগে আমরা কিছু জানতাম না। স্যার আসলে আমরা চুপচাপ দাড়িয়ে থাকতাম। আমাদের সঙ্গে স্যার খুবই সুলভ আচরণ করতেন। ভবনের লিফটম্যান বলেন, পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে এখানে চাকরি করছি। আমার কাজ হচ্ছে লিফট অপারেট করা। স্যার আসলে আমি লিফটে পঞ্চমতলায় নামিয়ে দিয়ে আসতাম। ওনার অফিসের ভেতরে প্রবেশ করা নিষেধ। কাজেই অফিসের ভেতরে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেটা আমরা জানি না। ঘটনার দিন র‌্যাবের সদস্যরা এসে রেড দেয়ার পর আমাদের জানায় আপনাদের ভবনের একটি অফিসে অনেকগুলো লাঠি, ইলেকট্রিক শকসার্কিট যন্ত্র, তিনটি মোবাইল ফোনসহ আরো অনেক কিছু পাওয়া গেছে। স্যারের সঙ্গে আমাদের খুব কম কথা হতো। ঘটনার আগ পর্যন্ত আমরা এসব কিছুই জানতাম না। এটা জানার পরে একটু অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে। তার বেলায় এমন কিছু হতে পারে। বাহির থেকে দেখে মনেই হতো না। ভবনের সামনে এক চায়ের দোকানি বলেন, আমরা দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ। কি বলবো, কে শুনে ফেলবে। পরে আমাদের উপর বিপদ হবে। কিছু জানিনা তাই ভালো।

টেন্ডার মুঘল জি কে শামীমের ব্লু-প্রিন্ট by শুভ্র দেব

গোলাম কিবরিয়া শামীম। সবাই চেনে জি কে শামীম হিসেবে। কারও কারও কাছে পরিচিত টেন্ডার মুঘল শামীম হিসেবে। শুক্রবার প্রায় দুইশ’ কোটি টাকার এফডিআর নথি, নগদ কোটি টাকা আর সাত দেহরক্ষীসহ গ্রেপ্তারের পর বেরিয়ে আসছে শামীমের অপরাধ জগতের নানা চমকপ্রদ তথ্য। স্কুল শিক্ষক বাবার টানাপড়েনের সংসারে বেড়ে উঠা শামীম কিভাবে টাকার কুমির হয়েছেন তার ব্লু প্রিন্ট এখন আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে। তার উত্থান কাহিনী এখন মানুষের মুখে মুখে। যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে শামীম কোন সংগঠনেরই কেউ নন। তবে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেকের সঙ্গে শামীমের ছবি ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। এমনকি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর দায়িত্বশীলদের সঙ্গে রয়েছে শামীমের ঘনিষ্ট ছবি। তার বিলাসী জীবন, ‘ভিআইপি প্রটোকলে’ চলাফেরার বিষয় এতোদিন প্রকাশ্যেই ছিল। কিন্তু কেউ কোন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের থেকে নির্দেশের পর তাকে পাকড়াও করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর একে একে বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য।

শামীমের বাবা আফসার উদ্দিন ছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি সোনারগাঁও হাইস্কুল থেকে ১৯৮৭ সালে এসএসসি পাস করেন। একই এলাকার একটি কলেজ থেকে ১৯৮৯ সালে এইচএসসি পাস করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। যুবদলের রাজনীতিতে জড়িয়ে সান্নিধ্য পান বিএনপির একজন প্রভাবশালী নেতার। এরপর থেকেই চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজিতে হাতেখড়ি। শুরুতে শিক্ষাভবন কেন্দ্রিক টেন্ডারবাজি করতেন। একসময় শিক্ষা ভবন কেন্দ্রীক সিন্ডিকেট গড়ে তুলেন। টেন্ডার পাওয়ার জন্য পেশি শক্তির ব্যবহার শুরু করেন। ওই সময় টেন্ডার নিয়ে প্রায়ই সংঘর্ষ-গুলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। যার নেপথ্য ছিলেন এই শামীম। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর যুবলীগের রাজনীতিতে নাম লেখান শামীম। এরপর আর তার পেছনে তাকাতে হয়নি। যুবলীগের প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার শেল্টারে বেপরোয়া হয়ে উঠেন টেন্ডারবাজিতে। বিভিন্ন পর্যায়ের লোকদের ম্যানেজড করে বিভিন্ন দপ্তরের টেন্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিতে থাকেন। এখন ঢাকার টেন্ডারমোঘল হিসাবেই তিনি পরিচিত। টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজি করে শতশত কোটি টাকার সম্পত্তি করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শামীম গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী ঠিকাদার। এই মন্ত্রণালয়ে যত বড় বড় টেন্ডার হত তার পুরো নিয়ন্ত্রণই ছিল তার কাছে। ছোটখাটো টেন্ডারের দিকে তার কোনো নজর ছিল না। অন্তত একশো কোটির ওপরের টেন্ডারে তার নজর থাকত। পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সব ঠিকদারের নেতা ছিলেন তিনি। তবে প্রতিটি টেন্ডারে তার নিজের প্রতিষ্ঠান বা পছন্দের প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা ছিল। পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়াই শামীমের প্রতিষ্ঠান কাজ পাওয়ার জন্য তৈরি করা হত। মাঝেমধ্যে ২/১টি কাজ যদি অন্য প্রতিষ্ঠান পেত সেখান থেকেও নিজের ভাগ নিয়ে আসতেন। সূত্র বলছে, শুধুমাত্র গণপূর্ত মন্ত্রলালয় থেকে এক যুগে শামীম অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকার কাজ ভাগিয়ে নিয়েছেন। আর এসব কাজ পাওয়ার জন্য তিনি সখ্যতা গড়ে তুলেছিলেন মন্ত্রী থেকে শুরু করে সচিব, প্রকৌশলী, রাজনৈতিক প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে। তাদেরকে লাভের একটি ভাগ দিতেন। কারণ অনেক সময় তারা টেন্ডারের মূল্যও বাড়িয়ে দিতেন।

রুপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের পাশে গ্রিনসিটি আবাসিক এলাকা নির্মাণের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২১টি আবাসিক ভবন নির্মাণের ওয়ার্কঅর্ডার পাওয়ার পর টেন্ডার মূল্যের ৫ শতাংশ বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ দিতে হয়েছে। এরমধ্যে সাবেক এক মন্ত্রী, সচিব, সাবেক প্রকৌশলীসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন। কিন্তু বালিশ কাণ্ডের পর শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জি কে বিপিএল কালো তালিকাভূক্ত হয়। কারণ গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রূপপুরের ওই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে শামীমের প্রতিষ্ঠানই। একাধিক সূত্রে জানাগেছে, পূর্ত মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে শামীমের সখ্যতা ছিল। এ বিষয়টি সবাই খুব ভাল করে জানতো। মূলত এই প্রতিমন্ত্রীর কারণেই শামীম একের পর এক টেন্ডার নিয়ন্ত্রণে নিত। আর কামিয়ে নিয়েছে শত শত কোটি টাকা।

সূত্র বলছে, বর্তমানে ১৬টি বড় প্রতিষ্ঠানের কাজ শামীমের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেকেবি এন্ড কোম্পানি  (প্রাইভেট) লিমিটেডের কব্জায়। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাজ করছে জেকেবি।  প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আশকোনায় র?্যাবের সদর দপ্তর, গাজীপুরের পোড়াবাড়িতে র?্যাব ট্রেনিং সেন্টার, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবন, পঙ্গু হাসপাতালের ভবন, এনজিও ভবন, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ভবন, বিজ্ঞান জাদুঘর, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ভবন, সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবন, ক্যাবিনেট ভবন, বাসাবো  বৌদ্ধমন্দির, পার্বত্য ভবন, মিরপুর-৬ নম্বরের স্টাফ কোয়ার্টার, সেবা মহাবিদ্যালয় এবং মহাখালী ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ প্রতিষ্ঠানটি করছে। এর মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০০ কোটি টাকার কাজ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল  ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ৪০০ কোটি টাকার কাজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেস্টিভ, রিসার্চ এন্ড হসপিটালে (মহাখালী ডাইজেস্টিভ) ২০০ কোটি টাকার কাজ, এজমা সেন্টারে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ। এছাড়া জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, বাংলাদেশ সেবা মহাবিদ্যালয়ে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, গাজীপুর র‌্যাব ট্রেনিং স্কুলের ৫৫০ কোটি টাকার কাজ, বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের ৩০০ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ, সচিবালয়ের ক্যাবিনেট ভবণ নির্মাণে ১৫০ কোটি টাকার কাজ, এনবিআরের ৪০০ কোটি টাকার, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের ১০০ কোটি টাকার কাজ, পিএসসিতে ১২ কোটি টাকার কাজ ও এনজিও ফাউন্ডেশনে ৬৫ কোটি টাকার কাজ।

খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, শামীম সরকার দলীয়, বিরোধী দলীয় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব, দেশ পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। যে মন্ত্রণালয়ের যে কাজ আসত ওই মন্ত্রণালয় থেকে টেন্ডার নিতেন। তবে শামীমকে সব কাজেই শেল্টার দিতেন যুবলীগ দক্ষিণের এক শীর্ষ নেতা। তাদেরকে নিয়েই মূলত টেন্ডারবাজি করতেন। এছাড়া বিদেশ থেকে সহযোগিতা করতেন আন্ডারওয়ার্ল্ডের শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান। প্রতিটা টেন্ডার নিতে পেশি শক্তি প্রদর্শনে জিসানের ভুমিকা থাকত। এজন্য টাকার ভাগও বিদেশে জিসানের কাছে পাঠিয়ে দিতে হত। জিসান ছাড়াও পলাতক আরও কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সঙ্গে তার যোগাযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, শামীম তার অবস্থান তুলে ধরতে বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে বাঁধিয়ে রাখতেন। শুক্রবার তার অফিসে অভিযান চলার সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে, র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজির আহমেদ, যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি পাওয়া গেছে। যা এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

সূত্র বলছে, শামীমের মালিকাধীন জি কে বিপিএল প্রতিষ্ঠানের কাজই ছিল টেন্ডারবাজি করা। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), রেলভবন, শিক্ষাভবন, ক্রীড়া পরিষদ, পানি উন্নয়ণ বোর্ড, যুব ভবন, কৃষি ভবন, স্বাস্থ্য প্রকৌশলে টেন্ডার তার কব্জায় ছিল। এসব দপ্তরের কোনো টেন্ডার হলে শামীমের প্রতিষ্ঠানই অংশগ্রহণ করত। স্বচ্ছতা বুঝানোর জন্য তার নিয়ন্ত্রণাধীন কিছু প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণ করাত। তার সঙ্গে পরামর্শ না করে অন্য কেউ টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে পারত না। এসব কাজ তার অস্ত্রধারী সহযোগীরাই করত। এজন্য ভয়ে কেউ কথা বলত না। এমনকি ই-টেন্ডারেও শামীমের নিয়ন্ত্রণ ছিল। সূত্র বলছে, শামীমের একটি টর্চারসেলও আছে। টেন্ডার নিয়ে কোনো ঠিকাদার তার মতের বাইরে গেলে টর্চারসেলে এনে সেই ঠিকাদারের সঙ্গে বুঝাপড়া করেন। নিজে টেন্ডার ভাগিয়ে এনে যদি কাউকে দিতেন তবে সেখান থেকে টাকার ভাগ নিতেন।

সূত্র জানিয়েছে, শামীম পেশি শক্তি প্রদর্শন করেই টেন্ডারবাজি করতেন। এজন্য তিনি বিশাল সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী পুষতেন। তিনি যখন কাজের জন্য বিভিন্ন দপ্তরে প্রবেশ করতেন তখন তার প্রটোকল দেখেই সবাই তাকে সমীহ করত। দপ্তরের বড় বড় কর্মকর্তা, মন্ত্রীদের কক্ষে তার অবাধ যাতায়াত ছিল। কোথাও গিয়ে তাকে বাধার মুখে পড়তে হয়নি।
শামীমের ভাই গোলাম হাসিব নাসিম জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন ঢাকার বাসাবো ও বনশ্রী এলাকায়। চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি করে বাসাবোর কদমতলা, ডেমরা, দক্ষিণগাঁও এলাকায় বাড়ি করেছেন। গুলশান, নিকেতন ও বনানী পুরনো ডিওএইচএস এলাকায় তার ডজন খানেক ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া সোনারগাঁও, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। গুলশান, নিকেতন ও বনানী পুরনো ডিওএইচএস এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। গ্রামের বাড়ি সোনারগাঁও উপজেলা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় তার কোটি কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র জানিয়েছে, নিকেতন ও বাসাবো এলাকায় অন্তত ১০টি বহুতল ভবন আছে। বাসাবোতে ১টি বড় বানিজ্যিক প্লট, বান্দরবানে তিন তারকা মানের একটি হোটেল রয়েছে। অভিযানের সময় তার অফিস থেকে নগদ এক কোটি  ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া গেছে। তবে তার কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে আরও কয়েক শত কোটি টাকা পাওয়ার তথ্য বেরিয়ে এসেছে। সিঙ্গাপুরে তার একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ডে বিপুল অর্থের খবর পাওয়া গেছে। অভিযোগ আছে দেশের বাইরে বিভিন্ন স্থানে তার বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে। কয়েকটি দেশে তার বাড়ি ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি রয়েছে।

শামীম ১০ দিনের রিমান্ডে: অবৈধ অস্ত্র ও মাদক মামলায় আলোচিত যুবলীগ নেতা জি  কে শামীমের ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। এর মধ্যে অস্ত্র মামলায় ৫ দিন ও মাদক মামলায় ৫ দিন। এছাড়া সাত দেহরক্ষীকে অস্ত্র মামলায় ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। গতকাল সন্ধ্যায় গুলশান থানার পরিদর্শক আমিনুল ইসলাম তাদের ঢাকা মহানগর আদালতে হাজির করে ১৪ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। এসময় শামীমের আইনজীবী তার রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা আক্তার ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

হারিয়ে যাচ্ছে জিরাফও

জিরাফ এই মুহূর্তে বিলুপ্তির মুখে থাকা পৃথিবীর অন্যতম প্রাণী। পরিবেশবাদীদের চাপের মুখে অবশেষে প্রাণীটির বিলুপ্তি রোধে যুক্তরাষ্ট্র সরকার ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। গত ২৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের ফিশ অ্যান্ড ওয়াইল্ডলাইফ সার্ভিস (এফডব্লিউএস) এক ঘোষণায় বলেছে, তারা জিরাফকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপদাপন্ন প্রাণী আইনের আওতায় আনবে কি না, সে জন্য একটি পর্যালোচনা শুরু করতে যাচ্ছে।
পৃথিবীজুড়ে জিরাফের সংখ্যা যেভাবে হ্রাস পাচ্ছে, তা বন্ধে মার্কিন প্রশাসনের এগিয়ে আসাকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বলে অভিহিত করেছে পরিবেশবাদী ও প্রাণী সংরক্ষণ সংগঠনগুলো। যদিও তাদের আইনি চাপের মুখেই এই পদক্ষেপ নিতে কিছুটা বাধ্যই হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
বর্তমানে আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে বন্য পরিবেশে জিরাফের সংখ্যা মাত্র ৯৭ হাজারের কিছু বেশি। ২০১৬ সালের এক শুমারির তথ্য এটি। এই সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমছে। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন জিরাফকে ওই বছরই ‘বিপদাপন্ন’ প্রাণী ‘লাল’ তালিকাভুক্ত করেছে। গত ৩০ বছরে জিরাফের সংখ্যা ৩৬ থেকে ৪০ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে আইইউসিএন।
এফডব্লিউএস বিবৃতিতে বলেছে, জিরাফকে হয়তো বিপদাপন্ন প্রাণী আইনের আওতায় আনার সময় এসেছে। বিলুপ্তির হাত থেকে জিরাফ বাঁচাতে জিরাফ শিকার ও জিরাফের শরীরের অংশ আমদানি বন্ধে এটি প্রথম ধাপ। আইনের আওতায় আনাই হবে এর চূড়ান্ত ধাপ।

ক্যাসিনো ঘিরে অন্য সিন্ডিকেট by পিয়াস সরকার

মতিঝিল থানার পেছনের এলাকাটি ক্যাসিনোপাড়া নামেই পরিচিতি। সূর্য অস্ত যাবার পরই বদলে যেতো পাড়াটির চিত্র। আলোক ছটা ছড়িয়ে পড়তো এলাকায়। গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে দেখা মিলতো দামি গাড়ির বহর। আবার এই ক্যাসিনো ঘিরে কাজ করতো কয়েকটি গাড়ি কেনার সক্রিয় চক্র। ক্যাসিনোপাড়ায় গতকাল সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, তালা ঝুলছে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের সামনে। আর একে ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নুর আমিন জয় এই এলাকার একটি ছাত্রাবাসে থাকেন। তিনি বলেন, রাত   নামলেই এলাকাটি পরিণত হতো আলোর মেলায়। একদিন রাতে দেখি বাংলাদেশ জাতীয় দলের এক সাবেক ক্রিকেটারকে। এছাড়াও বেশ কয়েকদিন দেখা মিলেছে অভিনেতাদেরও। আরেকজন বাসিন্দা বলেন, রীতিমতো এখানে দামী গাড়ির ভিড়ে অবর্ণনীয় যানজটের সৃষ্টি হতো। এছাড়াও বিদেশিরাও আসতো এখানে। সড়ক থেকে বেরিয়েই অস্থায়ী এক চায়ের দোকান। দোকানটি খোলা থাকে সারারাত। রাতের বেলা দোকান সামলান ইসমাইল হোসেন। তিনি বলেন, রাতে প্রচুর পরিমাণে সিগারেট বিক্রি হয়। এছাড়াও বিক্রি হয় চা। বেশি বিক্রি হয় বেনসন সিগারেট। এক প্যাকেটের দাম ২৬০ টাকা হলেও অনেকইে ৫শ’ টাকার নোট দিয়ে চলে যেতো।

এই চা বিক্রেতা আরো জানান, প্রায়ই দেখতেন ক্যাসিনো থেকে হতাশ হয়ে বের হচ্ছেন অনেকে। তারা বিক্রি করে দিতেন তাদের মোটর সাইকেল, প্রাইভেট কার। আর মোবাইলফোন, হাতঘড়ি কারা কিনতো এসব পণ্য? তিনি বলেন, এখানে মোটর সাইকেল ও গাড়ি কেনার জন্য বেশ কয়েকজন লোক থাকে। তারা আশে পাশে অপেক্ষা করে। জুয়া খেলতে গিয়ে সব হারানো লোকেরা গাড়ি বিক্রি করে ফের জুয়া খেলতে যায়। আর ঘড়ি, চেইন বিক্রি করে তারা গাড়ি ভাড়া দিতো। মোটর সাইকেল বিক্রি প্রায় প্রতিদিনের ঘটনা। আরেকজন চায়ের দোকানদার ইবাদত মিয়া বলেন, এসব মোটর সাইকেল বিক্রি হয় খুবই কম দামে। সপ্তাহখানেক আগে একটি নতুন এফ জেড এস মোটর সাইকেল বিক্রি হয় মাত্র ৪০ হাজার টাকায়। আর সেদিনই একটি পালসার বিক্রি হয় ৫০ হাজার টাকায়।

অরিত্র সাহা নামে একজন বলেন, মোড়ে মোড়ে অপেক্ষা করতে থাকে এসব লোক। আর মোবাইল ফোনের দাম ছিলো আরো সস্তা। আইফোন বিক্রি হয় মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়।
এক ব্যক্তি বলেন, এই মোটর সাইকেল, গাড়িগুলো অল্প দামে কেনার সঙ্গে সঙ্গেই নিয়ে যাওয়া হয় মানিকনগরে। সেখানে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই চেচিস নম্বর পরিবর্তন করে ফেলা হয়। এরপর নম্বর প্লেট খুলে ফেলে বিক্রি করা হয় মাসখানেক পর। এটি একটি সক্রিয় চক্র। তিনি ধারণা করেন এসব পণ্য কেনাবেচার সঙ্গে হয়তো জড়িত রয়েছে ক্যাসিনো কর্তৃপক্ষ।

আহসানউল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সৌরভ মন্ডল। তার অভিজ্ঞতা হয়েছিলো ক্যাসিনোতে যাবার। তিনি লেখাপড়ার পাশাপাশি পার্ট টাইম চাকরী করেন একটি বায়িং হাউজের অনলাইনে। এই শিক্ষার্থী গিয়েছিলেন তার অফিসের এক উর্ধতন কর্মকর্তার সঙ্গে। সৌরভ বলেন, এসব মানুষ একসঙ্গে অনেক টাকা হারিয়ে বসেন। তারা একসঙ্গে খেলেন কয়েক লাখ থেকে কোটি টাকাও। সব হারিয়ে বেশ একটা ধাক্কার মুখে পড়েন। এই ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে শেষ চেষ্টা হিসেবে নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে হলেও শেষ একটা সুযোগ খোঁজেন।

কেমন ছিলো তার ক্যাসিনোর অভিজ্ঞতা? তিনি বলেন, আমি গিয়েছিলাম গত মে মাসে। বনানী গোল্ডেন ক্লাবে। কলিগের সঙ্গে যাবার কারণে ছিলাম বেশ অস্বস্তিতে। যেকেউ চাইলে সেখানে ঢুকতে পারেনা। পরিচিত এবং রেফারেন্স থাকলেই ঢোকা সম্ভব হয়। ঢুকেই চোখে পড়ে বিভিন্ন আলোর ছটা। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ব্রাণ্ডের মদ, বিয়ার, কোল্ড ড্রিংকস। আছে ইয়াবা ও সীসা। এছাড়াও মেলে বিচিত্র খাবার। থাই, চাইনিজ, বাঙ্গালী খাবার।

ভাই প্রথমে ১০ হাজার টাকার ২০টি চিপস কেনেন। চিপস বিক্রি করছিলেন বেশ স্মার্ট দু’জন তরুনী। ভাই ‘ইট রিচ’ ও ‘ত্রি কার্ড’ খেলেন। এই সময় লক্ষ্য করি সেখানে কোটি টাকার চিপস নিয়েও অনেকে খেলার আসরে বসেছেন। অধিকাংশ চিপস কেনেন এটিএম কার্ড দিয়ে। খেলার পাশাপাশি আড্ডাও দিচ্ছেলেন অনেকে। ছিলো অস্ত্রধারী নিরাপত্তাকর্মী। তিনটি বিশেষ স্থান আছে সেখানে। প্রথমটি বেশ বড়। এখানে সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকায় খেলা যায়। মধ্যমটিতে সর্বনিম্ন ১০ হাজার ও উচ্চ শ্রেণিরটা সম্ভবত ২৫ হাজার। তবে যেকেউ চাইলেই উচ্চ শ্রেণিরটিতে গিয়ে খেলতে পারেন না। আর খেলা চলাকালীন স্মার্ট কিছু তরুনী দিয়ে যেতেন কোল্ড ড্রিংকস।

ঘরহারা মানুষের শহরে রূপান্তরিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলস

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের লস অ্যাঞ্জেলস কাউন্টিতে (মেট্রো পলিট্রন অঞ্চল) ঘরহারা মানুষের সংখ্যা ৫৯ হাজারে পৌঁছেছে। এদের মধ্যে ৩৬ হাজারেরও বেশি মানুষ থাকেন শহরে। মঙ্গলবার প্রকাশিত লস এঞ্জেলেস কাউন্টির বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্যের বরাত দিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান বলছে, বিগত এক বছরে বাস্তুহারাদের সংখ্যা প্রায় ১৬ শতাংশ বেড়েছে। আয় বৈষম্য, আবাসন সংকট, অনিয়ন্ত্রিত ভাড়া ও এই খাতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দের অভাবকেই এর কারণ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবছর জানুয়ারিতে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক মিলে কাউন্টির বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে থাকে। রাস্তায়, তাবুতে কিংবা গাড়িতে বসবাস করা মানুষদের তালিকা করে থাকে তারা।  সেই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ৫৩ শতাংশ মানুষ এবারই প্রথমবারের মতো বাস্তুহারা হয়েছেন। মূলত তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশাই এজন্য দায়ী। প্রাপ্ত বয়স্কদের এক চতুর্থাংশ ঘর হারিয়েছেন ২০১৮ সালে। এছাড়া বাস্তুহারাদের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রে ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাস করছেন। 
প্রতিবেদনে বলা হয়, এক বছরে বাস্তুহারা পরিবার বেড়েছে ৮ হাজার ৮০০টি। এর মধ্যে ১৬০০ এরও বেশি পরিবার একদমই অরক্ষিত অবস্থায় আছে। তরুণদের মাঝে ঘরহারাদের সংখ্যা বেড়েছে ২৪ শতাংশ যা প্রায় ৪ হাজারের কাছাকাছি। এর অর্ধেকের বেশিই একেবারে অরক্ষিত অবস্থায় আছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান বলছে, এই পরিসংখ্যান ক্যালিফোর্নিয়ার আবাসন সংকট ও আয় বৈষম্যের প্রকটতাকেই সামনে এনেছে।
পরিসংখ্যানে উঠে আসা চিত্রকে হৃদয়বিদারক আখ্যা দিয়ে লস এঞ্জেলেসের মেয়র এরিক গারসেটি বলছেন, ‘এই চিত্র আমাদেরকে কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করে। আবাসন প্রকল্পে কেন্দ্রীয় বিনিয়োগের অভাব এবং বাসা ভাড়া বেড়ে যাওয়াই এমন পরিস্থিতির কারণ। এই পরিস্থিতিতে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন তারা। তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে ঘর ছেড়ে দিচ্ছেন। ’
ইউনিয়ন রেসকিউ মিশনের প্রধান নির্বাহী রেভ অ্যান্ডি বেলস বলেন, 'আমি অনেকদিন ধরেই এটা নিয়ে চিৎকার করে আসছি। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। যতদিন তারা মাথার ওপর ছাদ না পাবে ততদিন পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকবে।'
কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিনিরাই আবাসন সংকটের প্রধান বলি। অন্য যেকোনও গোষ্ঠীর চেয়ে তাদের মধ্যে ঘরহারার হার চারগুণ বেশি। কৃষ্ণাঙ্গরা সামগ্রিক যুক্তরাষ্ট্রের ৮ শতাংশ হলেও বাস্তুহারা গোষ্ঠীর ৩৩ শতাংশই ওই জনগোষ্ঠীর মানুষ। লস অ্যাঞ্জেলস হোমলেস সার্ভিসন অথরিটি জানিয়েছে, সেখানে এক বেডরুমের ফ্ল্যাটের ভাড়া বহন করতে হলে সপ্তাহে ৭৯ কর্মঘণ্টা ব্যয় করতে হয়। স্বল্প আয়ের মানুষের চাহিদা মেটাতে সেখানে ৫ লাখ নতুন বাড়ির প্রয়োজন।  সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক পিটার লিন জানিয়েছেন, তার নিজের কর্মীদের অনেকেই লস অ্যাঞ্জেলসে থাকার মতো ব্যয় বহন করতে পারে না। তিনি দাবি করেন,  সরকার চাইলে হাজার হাজার মানুষকে এই পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করতে পারে। 
এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিলো লস অ্যাঞ্জেলসের ডেভলপাররা সেখানে বিলাসবহুল বাড়ি তৈরি করছেন যেগুলোর দাম লাখ লাখ ডলার। সেখানকার টেনান্টস ইউনিয়ন এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেন রোজেনথাল বলেন, ‘এই শহরের ব্যয়ের কারণেই দিন দিন মানুষ পথে বসছে। এখানে বিলাসবহুল বাড়ি বেশি তৈরি হয়, ভাড়ার ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। যদি একবার কাউকে উচ্চ ভাড়ার কারণে পথে বসতে হয় তবে তার আর কোনও উপায় থাকে না। তাই যদি আপনি মাথার ওপর ছাদ চান,তবে এই শহর ছাড়তে হবে।’

আবার জ্বলে উঠেছে সেই তাহরির স্কয়ার

আবার জ্বলে উঠেছে সেই তাহরির স্কয়ার। এখান থেকেই জ্বলে উঠা ক্ষোভের আগুন উৎখাত করেছিল প্রায় ৩০ বছরের স্বৈরাচার হোসনি মুবারককে। আবার আরেক স্বৈরশাসক আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির পদত্যাগ দাবিতে জ্বলে উঠেছে পুরো মিশর। তার ছবিকে দু’পায়ে পিষ্ট করতে দেখা গেছে বিক্ষোভকারীদের। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। শুক্রবার প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির পদত্যাগ দাবিতে হাজার হাজার মিশরীয় রাজপথে নেমে আসেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ভিডিওতে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা স্লোগান দিচ্ছেন। তাতে তারা বলছেন- ‘জেগে উঠুন। কোনো ভয় করবেন না। সিসিকে যেতেই হবে’। আবার কেউ কেউ স্লোগান দিচ্ছেন ‘জনগণ সরকারের পতন চায়’।

শুক্রবার বড় বিক্ষোভ হয়েছে রাজধানী কায়রোতে। বিক্ষোভ হয়েছে দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেকজান্দ্রিয়া ও সুয়েজে। এসব বিক্ষোভে মুখোমুখি অবস্থানে দেখা যায় বিক্ষোভকারী ও সরকারি বাহিনীকে। আল জাজিরা বলছে, বেসামরিক পোশাকে থাকা নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে মুখোমুখি হয়েছে। রাজধানী কায়রোর তাহরির স্কোয়ারমুখী সব সড়ক বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ২০১১ সালে এখানকার বিক্ষোভেই পতন ঘটে হোসনি মুবারকের।

ওদিকে মিশরের ভিতর থেকে রিপোর্ট করার ক্ষেত্রে নিষিদ্ধ করা হয়েছে আল জাজিরাকে। তা সত্ত্বেও কায়রোতে বেশ কিছু মানুষকে গ্রেপ্তারের খবর দিয়েছে এই মাধ্যমটি। তারা বলছে, বিক্ষোভকারীদের প্রতি কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। মিশরীয় ব্যবসায়ী ও অভিনেতা মোহামেদ আলী বর্তমানে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন। তিনি প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এনেছেন এবং জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাজপথে নেমে আসতে। তিনি মঙ্গলবার এক ভিডিও বার্তায় বলেছেন, যদি বৃহস্পতিবারের মধ্যে পদত্যাগের ঘোষণা না দেন আল সিসি, তাহলে মিশরের জনগণ শুক্রবার তাহরির স্কয়ারের বিক্ষোভে নামবে। একই সঙ্গে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে উত্থাপিত অভিযোগকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সিসি।

গত ২রা সেপ্টেম্বর থেকে ভিডিও বার্তা পোস্ট করা শুরু করেন মোহামেদ আলী। তার সর্বশেষ ভিডিও ভিউ হয়েছে লাখ লাখ বার। এর মধ্য দিয়ে নিজদেশে তিনি একটি ‘পাবলিক ফিগারে’ পরিণত হয়েছেন। বিক্ষোভকারীরা যখন শুক্রবার প্রতিবাদের জন্য জমায়েত হচ্ছিলেন তখন তিনি একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। এতে তিনি জনগণকে তাদের অধিকারের দাবিতে শক্তিশালী অবস্থান নিতে ও দাবি অব্যাহতভাবে চালিয়ে নিতে উৎসাহিত করেন। তিনি বলেন, আল্লাহ মহান। আমি মিশরে ফিরতে চাই। মিশর ও আমার দেশবাসীকে খুব মিস করছি। আল্লাহ আপনাদের সমস্যা সমাধানে শক্তিশালী করুন।

আল জাজিরার মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ইয়াহিয়া ঘানেম বলেছেন, শুক্রবারের বিক্ষোভ মিশরীয়দের মধ্যে অবশ্যই একটি ভিন্ন গতি এনে দেবে। মিশরে এখন যা ঘটছে তা অনেক দিনের জমে থাকা আন্দোলনের অংশ। এটা হলো স্বৈরশাসকের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করা। শুক্রবারের এই বিক্ষোভ ছিল দেশের ভিন্ন মতাবলম্বীদের বিরল এক জনপ্রতিবাদ। প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ২০১৩ সালে দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকার সময় মিশরে সব রকম বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেন। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ওই বছরই তার নেতৃত্বে সামরিক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় মিশরে। 

ওদিকে সর্বশেষ অবস্থা নিয়ে মন্তব্যের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি আল জাজিরা। অন্যদিকে এ বিষয়টি নিয়ে কোনো রিপোর্ট প্রকাশ করেনি মিশরের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন। তবে সরকারপন্থি একটি টিভির উপস্থাপক বলেছেন, বিক্ষোভকারীদের ছোট্ট একটি গ্রুপ কায়রোর কেন্দ্রীয় অঞ্চলে সমবেত হয়েছিল ভিডিও ধারণ করতে এবং সেলফি তুলতে। সরকারপন্থি আরেকটি টেলিভিশন চ্যানেল বলেছে, তাহরির স্কয়ার শান্ত রয়েছে।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসেন আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। এরপরই সেখানে খরচ কমানোর অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করা হয়। এর উদ্দেশ্য, ২০১১ সালে আবর বসন্তের ফলে অর্থনৈতিক যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নেয়া। কিন্তু দেশটিতে দরিদ্রের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। জুলাইয়ে প্রকাশিত সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, মিশরে বসবাসকারীদের প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন বসবাস করেন দারিদ্র্যে। মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, ২০১৮ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রেসিডেন্ট সিসি ক্ষমতায় আসার পর তার নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ভীতিপ্রদর্শন, সহিংসতা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও নেতাকর্মীদের খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার চালিয়ে যাচ্ছে। এর আগে মিশরে মত প্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের জন্য গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা।

টেন্ডারমুঘল শামীমের যত কাহিনী

গোলাম কিবরিয়া (জিকে) শামীম। মধ্যবিত্ত এক স্কুল মাস্টারের ছেলে। ভাগ্য পরিবর্তনে আশায় নারায়ণগঞ্জ থেকে চলে আসেন ঢাকায়। কায়দা-কানুন করে পেয়ে যান যুবলীগের পদ-পদবি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তার। নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেকেবি এন্ড কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেডের নামে বড় বড় সব প্রতিষ্ঠানের কাজ একাই বাগিয়ে নেন তিনি। আর দু’একটি কাজ দয়া-দাক্ষিণ্য করে অন্য কাউকে ছেড়ে দিলেও নিজের হিস্যা ঠিকই বুঝে নিতেন। তাকে কমিশন দিয়েই অন্যরা কাজ করার সুযোগ পেতেন। সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও কার্যালয়ের সব টেন্ডারে তার ছিলো একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।
শামীমের রাজ্যে যেনো টাকার বিকল্প কিছু নেই। তার সব কাজকর্ম টাকাকেই কেন্দ্র করে। অফিসে টাকা, বাসায় টাকা, ব্যাংকে টাকা। টাকা তার নিজ নামে, স্বজনদের নামে।
বর্তমানে ১৬টি বড় প্রতিষ্ঠানের কাজ শামীমের ঠিকাদারি  প্রতিষ্ঠান জেকেবি এন্ড কোম্পানি  (প্রাইভেট) লিমিটেডের কব্জায়। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কাজ করছে জেকেবি। 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর আশকোনায় র‌্যাবের সদর দপ্তর, গাজীপুরের পোড়াবাড়িতে র‌্যাব ট্রেনিং সেন্টার, ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবন, পঙ্গু হাসপাতাল, এনজিও ভবন, নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল, পাবলিক সার্ভিস কমিশন ভবন, বিজ্ঞান জাদুঘর,  সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, সচিবালয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নতুন ভবন, ক্যাবিনেট ভবন, বাসাবো  বৌদ্ধমন্দির, পার্বত্য ভবন, মিরপুর-৬ নম্বরের স্টাফ কোয়ার্টার, সেবা মহাবিদ্যালয় এবং মহাখালী ক্যানসার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ প্রতিষ্ঠানটি করছে।
এর মধ্যে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪০০ কোটি টাকার কাজ, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল  ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ৪০০ কোটি টাকার কাজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডাইজেস্টিভ, রিসার্চ এন্ড হসপিটালে (মহাখালী ডাইজেস্টিভ) ২০০ কোটি টাকার কাজ, এজমা সেন্টারে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ। এছাড়া জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, বাংলাদেশ সেবা মহাবিদ্যালয়ে ২০-২৫ কোটি টাকার কাজ, গাজীপুর র‌্যাব ট্রেনিং স্কুলের ৫৫০ কোটি টাকার কাজ, বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের ৩০০ কোটি টাকার নির্মাণ কাজ, সচিবালয়ের ক্যাবিনেট ভবণ নির্মাণে ১৫০ কোটি টাকার কাজ, এনবিআরের ৪০০ কোটি টাকার, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সের ১০০ কোটি টাকার কাজ, পিএসসিতে ১২ কোটি টাকার কাজ ও এনজিও ফাউন্ডেশনে ৬৫ কোটি টাকার কাজ।
সরকারি এসব কাজে সাধারণত: ইউজিপির মাধ্যমে দরপত্র আহ্বান করা হলেও তাতে শামীমের কোন সমস্যা ছিলো না। বরং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের অর্থ দিয়ে ইউজিপিতেও প্রভাব খাটান।
অভিযোগ রয়েছে, যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায়বিষয়ক সম্পাদক পদ হাতিয়ে নেয়ার পর শামীমের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান জিকেবি এন্ড কোম্পানি (প্রাইভেট) লিমিটেড ঠিকাদারি কাজের নিয়ন্ত্রণ নেয়। গণপূর্তেও আধিপত্য বিস্তার করেন জিকে শামীম। অধিংকাংশ কাজ নিজ প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেয়ার পাশাপাশি অন্য ঠিকাদাররা যে কাজ পেতেন সেখান থেকেও মোটা অঙ্কের কমিশন নিতেন তিনি। এসব কিছুই করতেন যুবলীগের পরিচয় ব্যবহার করে। যদিও যুবলীগ সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী দাবি করেছেন, যুবলীগে তার কোন পদ-পদবি নেই।
এদিকে গতকাল নিকেতনের ৫ নম্বর রোডের ১১৩ নম্বর রোডে বাসায় র‌্যাবের সদস্যরা তল্লাশি শেষ করে শামীমের অফিস ১১৪ নম্বর বাড়িতে যান। ওই বাড়ির দ্বিতীয় তলা ও তৃতীয় তলায় শামীমের বিলাসবহুল অফিস। সেখানে অভিযান চালিয়ে নগদ ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার বিভিন্ন ব্যাংকের এফডিআর, ১টি রিভলবার, ৪ টি বিদেশি মদের বোতল ও বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই উদ্ধার করা হয়। এ সময় শামীমসহ তার ৭ দেহরক্ষীকে আটক করা হয়। র‌্যাব দেহরক্ষীর অস্ত্রগুলো জব্দ করে। আটককৃত দেহরক্ষীরা হলেন, শহিদুল ইসলাম, মুরাদ, দেলোয়ার, জাহেদ, সায়েম, আমিনুল ও কামাল।
অভিযান শেষে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম বিভাগের পরিচালক লে. কর্নেল সারোয়ার বিন কাশেম সাংবাদিকদের জানান, সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে সকাল থেকে আমরা শামীমের বাসা ও অফিসে অভিযান শুরু করি। এ সময় শামীম ও তার সাত জন দেহরক্ষীকে আটক করা হয়।
তিনি জানান, অভিযানে শামীমের অফিস থেকে তার একটি অত্যাধুনিক অস্ত্র ও  দেহরক্ষীদের সাতটি শটগান এবং নগদ এক কোটি আশি লাখ টাকা, মোট ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআরের (১৪০ কোটি টাকার এফডিআর মায়ের নামে, বাকি ২৫ কোটি টাকার এফডিআর শামীমের নামে) কাগজ ও বিদেশি মদের কয়েকটি বোতল উদ্ধার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেসব তদন্ত করছি। তবে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে আটক করা হয়েছে। যেসব টাকাগুলো উদ্ধার হয়েছে সেগুলো  বৈধ না অবৈধ এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, অবৈধভাবে টাকাগুলো আয় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্ত প্রক্রিয়াধীন। তদন্ত শেষে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হবে।
বিলাসী জীবন ছিল জি কে শামীমের। তার চারপাশে থাকত ছয় দেহরক্ষী। তাদের হাতে শটগান। গায়ে থাকত বিশেষ পোষাক। দূর থেকেই দেখলেই মনে হত বিশেষ কেউ

ভিআইপিদেরও হার মানিয়েছে ‘শামীম স্টাইল’ by মারুফ কিবরিয়া

সামনে পেছনে অস্ত্রধারী দেহরক্ষী। মোটরসাইকেলে চেপে সাইরেন বাজাতেন সেই দেহরক্ষীরা। একাধিক গাড়িতে থাকতো একদল ক্যাডার। পেছনে দামি গাড়িতে থাকতেন শামীম। একেক দিন ব্যবহার করতেন একেক গাড়ি। গাড়িবহর আসার আগেই ফাঁকা করা হতো সড়ক। এটি টেন্ডার মোঘল জি কে শামীমের চলাফেরার স্টাইল। তার এ স্টাইল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অনেকের প্রটোকলকে হার মানিয়েছে। রাজধানীর নিকেতনের কার্যালয়ে আসা যাওয়ার সময় ভবনের আশপাশ দিয়ে কাউকে চলাচল করতে দিতেন না তার দেহরক্ষীরা। জি কে শামীম স্থান ত্যাগ করার পর সবার জন্য রাস্তা উম্মুক্ত হতো। জি কে শামীমের এমন প্রটোকল দেখে বিস্মিত হতেন অনেকে। একই সঙ্গে বিরক্তির ব্যাপারও হয়ে উঠত অনেকের কাছে। তবে কেউ ভয়ে মুখ খুলেননি। শামীম উচ্চতায় ছোটখাটো। ৫ ফুটের সামান্য বেশি। মাথায় চুল নেই বললেই চলে। দেখতে সাদামাটা মনে হলেও জীবনযাত্রা ছিল বিলাসী। রাজধানীর সবুজবাগ, বাসাবো, মতিঝিলসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত যুবলীগের এই নেতাকে শুক্রবার আটক করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন। নিকেতনের যে কার্যালয় থেকে শামীম র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন সেটি পুরোটাই আবাসিক এলাকা। আবাসিক ভবনগুলো সবকটিই ৫ থেকে ৭ তলা। এবং প্রতিটিই একটির সঙ্গে আরেকটি ঘেঁষা।

শুধু জি কে শামীমের ব্যবসায়িক ভবনটি (জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড) চার তলা। এই ভবনের অফিসে কখনো সকালে, কখনও দুপুরে এমনকি গভীর রাতেও আসতেন জি কে শামীম। সকাল, দুপুর, বিকাল বা রাত যখনই শামীম নিকেতনে প্রবেশ করতেন তা টের পেয়ে যেতেন আশপাশের সবাই। তার পাহারায় সবসময় তিনটি মোটরসাইকেলে ৬ জন দেহরক্ষী থাকতেন। শামীমের গাড়ির সঙ্গে থাকতো আরও দুটি কালো রঙের জিপ গাড়ি। এ দুই গাড়িতে থাকতো তার ক্যাডাররা। সাইরেন বাজাতে বাজাতে রাস্তা দিয়ে গাড়িবহরসহ এগিয়ে যেতেন তিনি। এই সময়ের মধ্যে যতক্ষণ শামীম স্থান ত্যাগ না করতেন ততক্ষণ কারো গাড়ি নামতে পারতো না। যুবলীগের এই নেতার ব্যবসায়িক কার্যালয়ের পাশের এক ভবনের নিরাপত্তারক্ষী বলেন, শামীম সাহেবের চালাচল ছিল পুরো রাজকীয়। মন্ত্রীদের মতো। মন্ত্রীরা আসা যাওয়ার সময় যেমন চারপাশ খালি করে দেয়া হয় তেমনি তার অফিসে প্রবেশ ও বাইরে যাওয়ার সময় এমন হতো। তার সাথে সবসময় ছয়জন বডিগার্ড থাকতো। তাদের হাতে অস্ত্র থাকতো। এ ছাড়া তার আগে-পিছে কালো রঙের আরও দুটি দামি জিপ গাড়ি থাকতো।

এই নিরাপত্তাকর্মী আরো বলেন, আমি গত ছয়মাস হইছে এখানে এসেছি। শামীম সাহেবের আসা যাওয়া দেখে অনেকে অবাক হয়ে যেতেন। সবাই মনে করতেন কোনো মন্ত্রী আসতেছে। আশাপাশের অনেক মানুষ বিরক্ত হতো। কেউ জরুরি কাজে বের হবে। কিন্তু তার (শামীম) জন্য আটকে থাকতে হতো। অফিসের সামনে তার গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রসহ দেহরক্ষীরা তার চারদিকে ঘিরে রাখতো। আর মন্ত্রীদের স্টাইলে গাড়ি থেকে নামতেন শামীম সাহেব। আশপাশের বাড়ির কারো গাড়ি বের করা হলে তাদের ফিরিয়ে দেয়া হতো। জি কে শামীমের অফিসের পাশের সড়কের আরেকটি ভবনের নিরাপত্তা কর্র্মী ইউসুফ হোসেন বলেন, এই বাড়িতে আমি তিন বছর থেকে কাজ করছি। যতদূর জানি আগে ওই বাসাটা খান সাহেব নামের একজনের ছিল। বছর খানেক আগে খান সাহেবের কাছ থেকে শামীম বাড়িটা কিনছে। শামীম সাহেব বাড়িটা কেনার পর সবসময় এই জায়গাটা জমজমাট থাকে। প্রতিদিনই তিনি এখানে আসেন গাড়িতে সাইরেন বাজিয়ে। দেহরক্ষীদের পাশাপাশি পুলিশের গাড়িও থাকতো। তার চলাচল দেখে মনে হতো মন্ত্রী এমপিদের আসা যাওয়া চলছে। অনেক সময় গভীর রাতেও গাড়ির সাইরেন বাজতো। কিন্তু অফিসের ভেতরে কি কাজ চলতো আমি জানি না। সালাউদ্দিন নামের এক বাসিন্দা বলেন, আমি একটি বায়িং হাউজে চাকরি করি। অনেক সময় রাত হয় ফিরতে। রাতে অনেক সময় অফিস থেকে ফেরার সময় দেখি কয়েকটি বাইকার সাইরেন বাজাচ্ছেন। প্রথমে মনে করতাম পুলিশ সিভিল ড্রেসে কোনো কাজে আসে। পরে জানতে পারলাম যুবলীগের এক নেতা যার নাম জি কে শামীম। ওই ভবন  কিনে সেখানে অফিস দিয়েছে।

এদিকে বিপুল অংকের নগদ টাকা, চেক, অস্ত্র ও মদসহ র‌্যাবের কাছে গ্রেপ্তার হওয়া গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের অফিস ভবনে গিয়ে দেখা যায় পুরনো কোনো লোক নেই। গ্রেপ্তারের পর থেকে বাড়িটি সম্পূর্ণ ফাঁকা। এমনকি রাতারাতি নিরাপত্তাকর্মীও বদলে যায়। শুক্রবার গ্রেপ্তারের পর গতকাল দিনভর বাড়িটি ঘিরেও মানুষের কৌতুহলেরও শেষ ছিল না। ‘টাকার খনি’ আখ্যা পাওয়া রাজধানীর নিকেতনের শামীমের ওই ভবনটি দেখতে আসা যাওয়ার পথে ঢুঁ মারতে দেখা যায় অনেককে। ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে চাইলে দুই ব্যক্তি জানান, ভেতরে কেউ নেই। একজন বেরিয়ে এসে বলেন, আমরা নতুন আসছি। আজকে সকাল থেকেই কাজ করছি। এখানে আগে কে ছিল কারা ছিল কিছুই জানি না।

মালয়েশিয়ায় লোপেজের ছবি নিষিদ্ধ

মার্কিন অভিনেত্রী-গায়িকা জেনিফার লোপেজের নতুন ছবি ‘হাসলারস’ মালয়েশিয়ায় নিষিদ্ধ হয়েছে। দেশটির চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের মন্তব্য– নগ্নতা, অশ্লীল নাচ ও মাদক ব্যবহারের দৃশ্য আছে এতে। এ কারণে ছবিটি সিনেমা হলে প্রদর্শনের অনুপযোগী।
মালয়েশিয়ায় নিষেধাজ্ঞার খবরের সত্যতা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে ছবিটির পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান স্কয়ার বক্স পিকচার্স।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের বক্স অফিসে রমরমিয়ে চলছে ‘হাসলারস’। মদের বারে নেচে উপার্জন করা একদল নাচনেওয়ালীকে ঘিরে এর গল্প। নিজেদের ধনী খদ্দেরদের সম্পদ লুট করার ফন্দি আঁটে তারা।
২০১৫ সালে নিউ ইয়র্ক ম্যাগাজিনের একটি প্রতিবেদনে অনুপ্রাণিত ‘হাসলারস’ ছবির চিত্রনাট্য। এটি ২০০৮ সালের একটি সত্যি ঘটনা। তখন যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক মন্দা চলছিল।
কিছুদিন আগে টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় ‘হাসলারস’। ছবিটিতে জেনিফার লোপেজের চরিত্রের নাম রামোনা। নিউ ইয়র্কের একটি মদের বারের নর্তকী তিনি। এতে কাজ করার জন্য পোল ড্যান্স করতে হয়েছে তাকে।
৫০ বছর বয়সী লোপেজ ছাড়াও ছবিটিতে অভিনয় করেছেন কনস্ট্যান্স উ, জুলিয়া স্টাইলস, লিজ্জো ও কার্ডি বি। ছবিটি পরিচালনা করেছেন লরেন স্কাফারিয়া।
এদিকে ইতালির মিলানে শুক্রবার (২০ সেপ্টেম্বর) জঙ্গল থিমের একটি সবুজ গাউন পরে ক্যাটওয়াক করেছেন লোপেজ। প্রায় ২০ বছর আগে গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসে একই পোশাক পরে হাজির হয়েছিলেন তিনি। দুটিরই ডিজাইনার ডোনাতেলা ভারসেস। এজন্য পোশাকটির সঙ্গে লোপেজ এখন বেশ আলোচিত।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল: সেবার সঙ্গে ওষুধ ফ্রি by মতিউল আলম

চিকিৎসা সেবা দিয়ে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। প্রতিদিন আউটডোর, ইনডোর ও ওয়ান স্টপ সার্ভিস মিলে গড়ে ৯ হাজার রোগীকে বিনামূল্যে ১০০% ওষুধ, স্বল্প ফি’তে পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ চিকিৎসা সেবা দিয়ে এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছে হাসপাতালটি। রোগীদের কল্যাণে বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম ২০১৭ সালে ১৯ নভেম্বর ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করা হয় এই হাসপাতালে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস সারা দেশের একটি মডেল। সেবা পেয়ে রোগীরা শতভাগ সন্তুষ্ট। পাশাপশি সরকারের রাজস্ব আয়ও বেড়েছে বহুগুণ। অনেকগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপের ফলে মানুষ শতভাগ সুচিকিৎসা পাচ্ছে। যার নেতৃত্বে এত বড় সফলতা এসেছে তিনি হচ্ছেন হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহমেদ। বিগত ৪ বছরে তিনি দিনরাত শ্রম, ত্যাগ স্বীকারের ফলে হাসপাতালটি আজ এই পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। ভালো মানের চিকিৎসা প্রদানের ফলে কিছু বিড়ম্বনার শিকার হতে হচ্ছে কর্র্তৃপক্ষকে। ভালো চিকিৎসা পাওয়ায় মাত্রাতিরিক্ত রোগীর চাপ।  ফলে সেবা দিতে সীমিত ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান ও কর্মকর্তা কর্মচারীকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের ২ কোটি মানুষের একমাত্র শেষ ভরসাস্থল এই হাসপাতাল। এ ছাড়া গাজীপুর ও সুনামগঞ্জ জেলার মানুষও চিকিৎসা নিতে আসে এই হাসপাতালে। ২০১৫ সালে ১লা নভেম্বর বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাছির উদ্দিন আহমেদ যোগদান করেন। যোগদানের পর হাসপাতালের সেবার মান উন্নয়নে পরিকল্পনা শুরু করেন। তিনি বলেন, দেশের অন্যতম ৩টি হাসপাতালের মধ্যে একটি এই হাসপাতাল।

পরিকল্পিতভাবে পরিকল্পনা করা এটার পিছনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে লেগে থাকার সার্বক্ষণিক তদারকি সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সহযোগিতার ফলে এই মান অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। এটি দলগত প্রয়াস ছিল। একক কোনো ব্যক্তির কৃতিত্ব নেই। হাসপাতাল পরিচালক জানান, এক হাজার শয্যার হাসপাতালে গড়ে ৩ হাজারের অধিক রোগী ভর্তি থাকছে। এ ছাড়া হাসপাতালের আউডোরে প্রায় ৬ হাজার ও ওয়ানস্টপ সার্ভিসসহ জরুরি বিভাগে আরো প্রায় ৫০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসছে। এক হাজার শয্যার অনুমোদিত লোকবল দিয়ে বাড়তি এসব রোগীর চাপ সামাল দিতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছেন কর্তব্যরত ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীরা। তারপরও ডাক্তার, নার্স ও কর্মচারীদের আন্তরিকতার ফলে হাসপাতালের সেবাদান কার্যক্রম ও অগ্রযাত্রার জন্য দেশসেরা হাসপাতালের মর্যাদা লাভ করে ময়মনসিংহ মেডিকেল। সর্বশেষ গত ২০১৮ সালে প্রসূতি সেবায় বিদ্যমান কার্যক্রমের জন্যও পুরস্কার লাভ করে হাসপাতালটি। নামমাত্র ফিতে পরীক্ষাসহ বিনামূল্যের শতভাগ ওষুধ পেয়ে খুশি রোগীরা। এসবের পাশাপাশি আধুনিক মানের এমআরআই ও সিটি স্ক্যান মেশিন স্থাপন, হেমোডায়ালাইসিস মেশিনে কিডনি রোগীদের সেবা, থ্যালাসেমিয়া, চক্ষু রোগীদের আধুনিক পরীক্ষার মেশিন সংযোজন এবং হৃদ রোগীদের জন্য বহুল প্রত্যাশিত ক্যাথল্যাব স্থাপন প্রক্রিয়াধীন বলে জানান পরিচালক। নিউরো সার্জারি ও ইউরোলজিসহ বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি সংযোজন রোগীদের ভোগান্তির অবসান ঘটিয়েছে বলে জানান পরিচালক।

হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. লক্ষ্মী নারায়ণ মজুমদার বলেন, বর্তমান পরিচালকের নানামুখী ইতিবাচক উদ্যোগের ফলে হাসপাতালের রাজস্ব আয় বেড়েছে বহুগুণ। গত ২০০৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ভর্তি, টিকিট, এম্বুলেন্স, কেবিন ও পেয়িং বেড ভাড়াসহ অপারেশন চার্জ ও টেস্টের ফি নির্ধারণ করে দেয়। এসব খাত থেকে আদায় করা অর্থ ইউজার ফি হিসেবে জমা হয় সরকারি কোষাগারে। গত ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ইউজার ফি থেকে ময়মনসিংহ মেডিকেলের রাজস্ব আয় ছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৭৩ টাকা, গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে আয়  ৪ কোটি ৭২ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৬ টাকা, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রাজস্ব আয় ছিল ৬ কোটি ৭ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬৩ টাকা। গত ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৮ কোটি ৩১ লাখ ১৪ হাজার ৭৯১ টাকা, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এই আয় ছিল ৯ কোটি ৬০ লাখ ৯৮ হাজার ৬২৫ টাকা। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক লাফে এই রাজস্ব আয় দাঁড়ায় ১৩ কোটি ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৫৯২ টাকা।

মুক্তাগাছার চেচুয়ার রঘুনাথপুর গ্রামের আঃ মান্নান (৬৫) বলেন, হাতের আঙ্গুলের অপারেশন করতে হাসপাতালে এসেছেন। ভালো চিকিৎসা হচ্ছে। শহরের জেলাখানা রোড গলগণ্ডার মো. নজরুল ইসলাম (৫২) বলেন, ডায়বেটিকসহ নানা সমস্যা নিয়ে দেড় মাস ধরে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতালের ১০০% ওষুধ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা পেয়ে সে অনেক খুশি। গরিব লোকদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতাল অনেক উপকার করছে। হাসপাতালের ১নং গাইনি ওয়ার্ডে ভর্তি সদরের টান কাতলাসেন নুরজাহান বেগম (২৫)। সিজারে সন্তান হয়েছে। তার শ্বশুর আঃ গনি জানান, হাসপাতালে তার চিকিৎসা বাবদ কোন খরচ হয়নি। পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সব হাসাপাতাল থেকে দিচ্ছে। ভালো চিকিৎসা হচ্ছে। একই ওয়ার্ডে ভর্তি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলা আগত  কাকলী (২৫) তার সিজারে বাচ্চা হয়েছে। কোনো চিকিৎসা খরচ লাগেনি। অনেক ভালো চিকিৎসা পাচ্ছে। হাসপাতালের পরিচালক, ডাক্তার ও নার্সদের কাছে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। মাত্রাতিরিক্ত রোগীর জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রোগীদের। এক্সরে, অন্যান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার সিরিয়াল দিতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। এ ছাড়া ৪তলা বিশিষ্ট পুরাতন ২টি ভবনের ৮টি ওয়ার্ড সংস্কার কাজের জন্য ভর্তিকৃত রোগীদের স্থানাভাবে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এর জন্য হাসপতাল কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়। বহির্বিভাগে একজন ডাক্তারকে ১৫০-২০০ পর্যন্ত রোগী দেখতে হয়। ৬ ঘণ্টায় এত রোগী দেখা ডাক্তারদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। কর্তৃপক্ষ জানান, জনগণের দেয়া ১০%  সার্ভিস চার্জ থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ১৬ ডাক্তারসহ ১৩১ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছি। এতেও সামাল দেয়া কঠিন হচ্ছে।

আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির আলোচিত সেই জবানবন্দি

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় পুলিশের অভিযোগপত্র দাখিলের ১৮ দিন পর বৃহস্পতিবার তার কপি বাইরে প্রকাশিত হয়েছে। গেল ২৬শে জুন হত্যাকাণ্ডের ৬৬ দিন পর ১লা সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার ওসি (তদন্ত) মো. হুমায়ুন কবির। তবে আদালতে চার্জশিট দাখিল করলেও মামলার আসামিপক্ষ অথবা মিডিয়াকর্মীরা চার্জশিটের কপি এতদিন হাতে পায়নি। ১৮ই সেপ্টেম্বর চার্জশিট আদালত গ্রহণ করার পর বৃহস্পতিবার কপি বাইরে প্রকাশ হয়েছে। আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির আইনজীবী মো. মাহাবুবুল বারী আসলামের কাছ থেকে চার্জশিটের কপি পাওয়া গেছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নিহত রিফাত শরীফ বরগুনা থানা এলাকায় ডিস লাইনের ব্যবসা করতেন। রিফাত শরীফ ও মামলার এক নম্বর আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ড অনেক আগে বরগুনা জিলা স্কুলে একসঙ্গে লেখাপড়া করেছেন। সে সুবাদে তাদের উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল।

মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি তুলে ধরা হলো: ‘আমি বরগুনা সরকারি কলেজে ডিগ্রি প্রথম বর্ষে পড়াশোনা করি। ২০১৮ সালে বরগুনা আইডিয়াল কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে এইচএসসি পাস করি। আইডিয়াল কলেজে পড়াশোনা করাকালীন রিফাত শরীফের সঙ্গে ২০১৭ সালে আমার প্রেমের সম্পর্ক হয়। ওই সময় রিফাত শরীফ বামনা ডিগ্রি কলেজের ছাত্র ছিল। রিফাত শরীফ আমাকে তার কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। তার মধ্যে নয়ন বন্ড একজন। কলেজে যাওয়া আসার পথে নয়ন বন্ড আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে জ্বালাতন করত। আমি তার প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া না দেয়ায় সে আমার বাবা ও ছোটভাইকে ক্ষতি করার ভয় দেখাত। বিষয়টি আমি রিফাত শরীফকে জানাই নি।

আমি রিফাত শরীফকে ভালোবাসতাম। কিন্তু রিফাত শরীফ অন্য মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক করার কিছু বিষয় আমি লক্ষ্য করি। এ কারণে রিফাতের সঙ্গে আমার সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে। আমি ধীরে ধীরে নয়ন বন্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ি এবং নয়ন বন্ডের সঙ্গে আমার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আমি নয়নের মোবাইল ফোন নম্বরে আমার মায়ের মোবাইল ফোন এবং নয়নের দেয়া নম্বর শেষে ৬১১৩ ও একটি নম্বর শেষে ৪৫ দিয়ে নয়নকে কল, মেসেজ এবং ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারে কল দিতাম। বরগুনা সরকারি কলেজে পড়াকালীন ধীরে ধীরে রিফাত ফরাজী, রিফাত হাওলাদার ও রাব্বি আকনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। রিফাত ফরাজী ও নয়ন বন্ডের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। প্রেমের সম্পর্কের কারণে নয়ন বন্ডের বাসায় আমার যাতায়াত ছিল। নয়নের বাসায় দু’জনের শারীরিক সম্পর্কের কিছু ছবি ও ভিডিও নয়ন গোপনে ধারণ করে। যা আমি প্রথমে জানতাম না। নয়নের বাসায় আমি প্রায়ই যেতাম এবং আমাদের শারীরিক সম্পর্ক চলতে থাকে।

এরপর গত ১৫.১০.১৮ আমি রোজী আন্টির বাসায় যাওয়ার পথে বিকাল বেলা ব্যাংক কলোনি থেকে নয়ন বন্ড রিকশাযোগে আমাকে তার বাসায় নিয়ে যায়। নয়নের বাসায় গিয়ে আমি শাওন, রাজু, রিফাত ফরাজী এবং আরো ৭-৮ জনকে দেখি। শাওন বাইরে গিয়ে কাজী ডেকে আনে এবং নয়নের বাসায় আমার ও নয়নের বিয়ে হয়। তারপর আমি বাসায় চলে যাই। বাসায় গিয়ে নয়নকে ফোন করে বিয়ের বিষয়টি গোপন রাখতে বলি। তখন নয়ন বলে, ওইটা বালামে ওঠে নাই। বালামে না উঠলে বিয়ে হয় না। এরপরও আমি নয়নের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক বজায় রাখি। নয়নের সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি আমার পরিবারের কেউ জানে না। ২০১৯ সালের শুরুর দিকে কলেজ থেকে পিকনিকে কুয়াকাটা যাওয়ার বাস আমি মিস করি। তখন নয়নের মোটরসাইকেলে কুয়াকাটা যাই এবং নয়নের সঙ্গে একটি হোটেলে রাত্রিযাপন করি। আমি নয়নের বাসায় আসা যাওয়ার সময় জানতে পারি নয়ন মাদকসেবী, ছিনতাই করে এবং তার নামে থানায় অনেক মামলা আছে। এ কারণে নয়নের সঙ্গে আমার সম্পর্কের অবনতি হয় এবং রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার পূর্বের ভালোবাসার সম্পর্ক আবার শুরু হয়। গত ২৬শে এপ্রিল পারিবারিকভাবে রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়। রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ের পরও নয়নের সঙ্গে আমার দেখা-সাক্ষাৎ শারীরিক সম্পর্ক, মোবাইলে কথা-বার্তা,  মেসেজ এবং ফেসবুকের ম্যাসেঞ্জারে যোগাযোগ-সবই চলত।

বিয়ের পর জানতে পারি রিফাত শরীফও মাদকসেবী। সে মাদকসহ পুলিশের কাছে ধরা খায়। বিষয়টি জানতে পেরে আমি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ি। আমি রিফাতসহ আমার বাবার বাসায় থাকতাম। মাঝে মাঝে তাদের বাসায় যেতাম। নয়ন বন্ডের বিষয় নিয়ে রিফাত শরীফের সঙ্গে আমার মাঝে মাঝে কথাকাটাকাটি হতো এবং রিফাত শরীফ আমার গায়ে হাত তুলতো। গত ২৪শে এপ্রিল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে নয়ন বন্ড আমাকে ফোন দিয়ে বলে, তোর স্বামী, হেলালের ফোন ছিনাইয়া নিয়েছে। পরে রিফাত ফরাজীও আমাকে ফোন দিয়ে বলে, হেলালের মোবাইলটি রিফাতের কাছ থেকে নিয়ে হেলালকে ফেরত দিতে। আমি রিফাত শরীফকে হেলালের ফোন ফেরত দিতে বললে রিফাত শরীফ আমাকে চড়-থাপ্পড় মারে এবং তলপেটে লাথি মারে। রাতে মোবাইল ফোনে বিষয়টি নয়নকে জানাই এবং কান্না করি।

পরেরদিন ২৫শে এপ্রিল আমি কলেজে গিয়ে নয়নের বাসায় যাই। রিফাত শরীফকে একটা শিক্ষা দিতে হবে এ কথা নয়নকে বললে নয়ন বলে, হেলালের ফোন নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে রিফাত ফরাজী তাকে মারবে। তারপর আমি বাসায় চলে আসি এবং এ বিষয়ে কয়েক বার নয়ন বন্ডের সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়। নয়ন বন্ডের সঙ্গে আমার স্বামী রিফাত শরীফকে মাইর দিয়া শিক্ষা দিতে হবে, এ পরিকল্পনা করি। গত ২৬শে এপ্রিল আমি কলেজে যাই এবং সায়েন্স বিল্ডিংয়ের পাশের বেঞ্চের উপর রিফাত ফরাজী, রাব্বি, আকনকে বসা পাই। রিফাত হাওলাদার পাশে দাঁড়ানো ছিল। তখন আমি রিফাত ফরাজীর পাশে বসি এবং রিফাত ফরাজীকে বলি, ওকি ভাইটু খালি হাতে আসছ কেন? এ কথার জবাবে রিফাত হাওলাদার বলে, ওকে মারার জন্য খালি হাত যথেষ্ট। এরপর রিফাত ফরাজীকে জিজ্ঞাসা করি, নয়ন বন্ড ও রিফাত শরীফ কলেজে এসেছে কীনা? তখন নয়ন বন্ড আমাকে ফোন দেয়। সে কোথায় জানতে চাইলে নতুন ভবনের দিকে যেতে বলে এবং ওই সময় নয়ন নতুন ভবনের পাশের দেয়াল টপকিয়ে ভেতরে আসে। আমি হেঁটে নতুন ভবনের দিকে যাই এবং নয়নের সঙ্গে রিফাত শরীফকে মারপিটের বিষয়ে কথা বলি। এরপর রিফাত শরীফ কলেজের ভেতরে আসে এবং আমাকে নিয়ে চলে যাওয়ার জন্য কলেজ থেকে বের হয়ে মোটরসাইকেলের কাছে নিয়ে আসে। কিন্তু আমি মোটরসাইকেলে না উঠে সময় ক্ষেপণ করার জন্য পুনরায় কলেজ গেটে ফিরে আসি। রিফাত শরীফ আমার পেছন পেছন ফিরে আসে। তখন রিফাত ফরাজী কিছু পোলাপানসহ আসে। রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে জিজ্ঞাসা করে, তুমি আমার বাবা-মাকে গালি দিয়েছ কেন? রিফাত শরীফ বলে, আমি গালি দেই নাই। ওই সময় রিফাত ফরাজী রিফাতের জামার কলার ধরে এবং রিফাত শরীফকে জাপটে ধরে।

রিফাত ফরাজী, টিকটক হৃদয়, রিফাত হাওলাদার এবং আরো অনেকে রিফাত শরীফকে পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে মারধর করতে করতে এবং টেনে হেঁচড়ে ক্যালিক্সের দিকে নিয়ে যায়।
ক্যালিক্সের সামনে তারা রিফাত শরীফকে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। আমি তখন সবার পেছনে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। ওই সময় নয়ন বন্ড ক্যালিক্সের সামনে এসে রিফাত শরীফকে কিল ঘুষি মারতে থাকে। মারপিটের মধ্যেই রিফাত ফরাজী টিকটক হৃদয় ও রিফাত হাওলাদার দৌড়ে যায় এবং রিফাত ফরাজী দু’টি দা ও টিকটক হৃদয় এবং রিফাত হাওলাদার লাঠি নিয়ে আসে। একটি দা দিয়ে নয়ন বন্ড ও অন?্য দা দিয়ে রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে কোপাচ্ছিল। রিফাত ফরাজী রিফাত শরীফকে জাপটে ধরে রাখে যাতে রিফাত শরীফ পালাতে না পারে। রিফাত শরীফকে কোপাইতে দেখে আমি নয়ন বন্ডকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করি। দায়ের কোপের আঘাতে রিফাত শরীফ রক্তাক্ত হয়। সে রক্তাক্ত অবস্থায় পূর্ব দিকে হেঁটে যায় এবং আমি রাস্তায় পড়ে থাকা জুতা পরি। উপস্থিত একজন আমার হাতে ব্যাগ তুলে দিলে আমি রিকশা করে তাকে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসি। এরপর আমার বাবাকে ফোন করি। আমার বাবা ও চাচা হাসপাতালে আসে। এরপর রিফাত শরীফকে বরিশাল পাঠানো হয়। আমার কাপড়-চোপড়ে রক্ত লেগে থাকায় আমি বাসায় চলে যাই। পরে আমি জানতে পারি রিফাতের অবস্থা খারাপ। এরপর নয়নকে ফোনে বলি তোমরা ওকে যেভাবে কোপাইছো তাতে তো ও মারা যাবে এবং তুমি আসামি হবা। তারপর ওর অবস্থান জানতে চাই এবং পালাতে বলি। দুপুরের পর খবর পাই রিফাত শরীফ মারা গেছে।’

মিন্নির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি পাঠ করে শোনানোর পর এ প্রসঙ্গে তার বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোর বলেন, মিন্নিকে সাক্ষী থেকে আসামি করা এবং রিমান্ড ও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি আদায় সবকিছুই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের দায় চাপিয়ে দেয়ার একটি বিশেষ পরিকল্পনার অংশ মাত্র। একটি বিশেষ মহলের ফোনে পুলিশের যেমন দরকার তেমনটাই লিখে মিন্নির স্বাক্ষর নিয়েছে। আমরা বরগুনা জেল সুপারের মাধ্যমে আদালতের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছি। যা শুনানির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে।

এই হত্যার দায় আমার মেয়ের ওপর চাপিয়ে দেয়ার পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাকে বাসা থেকে ডেকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ড নেয়া হয়। পরবর্তীতে স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়।

আদালতের কাছে দেয়া মিন্নির জবানবন্দি প্রসঙ্গে মিন্নির পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহবুবুল বারি আসলাম বলেন, এ মামলার এজাহারের বিবরণ, চার্জশিট, মিন্নির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি এবং ঘটনার ভিডিও ফুটেজে যথেষ্ট গরমিল রয়েছে। মিন্নি জবানবন্দি প্রত্যাহারের আবেদন করেছে, যা এখনো নথি সামিলে রয়েছে। আমরা এসব অসঙ্গতিগুলো পর্যালোচনা করে আদালতে উপস্থাপন করব।

এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তদন্তের স্বার্থে তাকে আটক ও পরে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে জিজ্ঞাসবাদ করা হয়। সে সময় মিন্নি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বেচ্ছায় যে জবানবন্দি দিয়েছে, পুলিশ তাই এখানে উল্লেখ করেছে। আমরা রিফাত হত্যার মূল রহস্য উদঘাটনের চেষ্টায় আন্তরিক ছিলাম।

বেঁচে যাওয়া রোহিঙ্গাদের না শুকানো ক্ষত by ফেলিম কাইন

মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর গণহত্যা, নির্যাতন, গণধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের পোড়ামাটি অভিযান থেকে বেঁচে যাওয়া লোকদের দুর্ভোগ এখনো শেষ হয়নি। খুব শিগগিরই শেষ হবে, এমন ইঙ্গিতও দেখা যাচ্ছে না। কেবল জিজ্ঞাসা করে দেখুন রাবিয়া বসরি, আবদুল ওয়াহিদ ও আবু গফুরকে (তাদের প্রকৃত নাম নয়)।
রাবিয়া বসরির বয়স ২০১৭ সালের ২৭ আগস্ট ছিল ২১ বছর। ওই দিন সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রাখাইন রাজ্যের উত্তরপশ্চিমে চুট পিন গ্রামে প্রবেশ করলে তিনি পরিবারের সদস্যদের সাথে পাশের ধান ক্ষেতে পালিয়ে যান। তার স্বজনদের মধ্যে ৫ জন গুলিতে নিহত হন। রাবিয়া বসরি গুলি খেয়েও প্রাণে বেঁচে যান। গুলি তার বাম পায়ে ও ডান বাহুতে বিদ্ধ হয়। তখন চিকিৎসা করার সময় ছিল না। তার পরিবারের সদস্যরা তাকে বহন করে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। দু’দিন পর তার চিকিৎসার ব্যবস্থা হয়। তবে ওই ক্ষত এখনো সারেনি, তিনি এখনো ক্রাচে ভর না করে চলতে পারেন না।
২০১৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী যখন আবদুল ওয়াহিদের মাথা ও বাম পায়ে গুলি করে, তখন তার বয়স ছিল ৬ বছর। তিনি ও তার পরিবার রাখাইনের মরিকুরাম গ্রাম থেকে পালিয়ে এসেছেন। তার বিধ্বস্ত বাম পাটি তাকে সমস্যায় ফেলে গেছে, হাঁটতে তার খুবই কষ্ট হয়।
২০১৭ সালের আগস্টে আবু গফুরের বয়স ছিল ১৮ বছর। তিনি ছিলেন ছাত্র। থামবাজুর-কুন্দপারা গ্রামে সামরিক বাহিনীর ভারী অস্ত্রে সজ্জিত লোকজন তাকে ও তার কয়েকজন ক্লাসমেটের ওপর গুলি চালায়। তারা তখন স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। তার গুলি খাওয়ার দুঃস্বপ্নটি এখনো মনে আছে। প্রচণ্ড শব্দে তার কান স্তব্ধ হয়ে পড়ে। তার পরিবার নিরাপত্তার জন্য তাকে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। এখন সে বাম কানে কিছু শোনে না, বাম চোখে দেখে না।
তবুও বলতে হবে, রাবিয়া বসরি, আবদুল ওয়াহিদ ও আবু গফুর ভাগ্যবান। ২০১৭ সালের আগস্টে মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনী ও বৌদ্ধ রাখাইনরা যে ব্যাপক ও পরিকল্পিত সহিংসতা ছড়িয়ে দিয়েছিল, তা থেকে তারা প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন। ওই সহিংসতা অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়। এর জের ধরে সাত লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়। তারা এখনো কঠিন অবস্থায় সেখানে অবস্থান করছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ফিজিশিয়ান্স ফর হিউম্যান রাইটসের নতুন এক প্রতিবেদনে ওই সহিংসতার চাপা পড়া কিছু বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, অনেক রোহিঙ্গা গুলি, প্রহার, ছুরিকাঘাত থেকে রক্ষা পেলেও তারা এখন দীর্ঘ মেয়াদি শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন। এসব সমস্যা তাদের স্বাধীনভাবে চলাচল কঠিন করে তুলবে, তাদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস করবে, ব্যথামুক্ত জীবনকে শেষ করে দেবে।
এসব পঙ্গু লোক মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর নির্মম সহিংসতার প্রমাণ বহন করছে। তারা আরো অনেকে দিন এই যন্ত্রণা বয়ে বেড়াবে।
পিএইচআরের গবেষণায় সাক্ষাতকার দিতে ইচ্ছুক ১১৪ জনের কথা তুলে ধরেছে। এদের মধ্যে ৯০ জনই ওই সহিংসতায় আহত হয়েছিলেন। সংস্থার চিকিৎসকদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, এদের মধ্যে ৪৩ জনকে দীর্ঘ মেয়াদে পঙ্গুত্বকে বরণ করে নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের যারা পঙ্গু হয়ে গেছে, তাদের আসলে মিয়ানমার বাহিনী গুলি করে হত্যা করতে চেয়েছিল। তারা পালানোর সময় গুলির মুখে পড়েন। ওই আঘাতের ফলে অনেকে হাঁটতে পারছেন না, অনেকে এমনকি সামান্য কাপও হাতে নিতে পারেন না, অনেকে এক ব্যাগ চালও টানতে পারেন না।
পিএইচআরের চিসিৎসকেরা জানিয়েছেন, এসব লোকের চিকিৎসার দিকে তেমন নজর দেয়া হয়নি। আবার অনেকের চিকিৎসা অনেক দেরিতে শুরু হওয়ায় কোনো কোনো অঙ্গ কেটে ফেলতে হয়েছে। সময়মতো চিকিৎসা হলে এসব অঙ্গ হয়তো রক্ষা করা যেত।
যাদের নৃশংসতার কারণে তারা ভূমি হারিয়েছে, পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, তাদের অপরাধের দ্রুত বিচার হওয়া উচিত।
মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য মিয়ানমার নিরাপত্তা বাহিনীর বিচার হওয়া উচিত। আর এজন্য জাতিসঙ্ঘ তথ্যানুসন্ধান মিশন যেসব সুপারিশ করেছে, সে ব্যাপারে নতুন করে সোচ্চার হওয়া উচিত জাতিসঙ্ঘের। উল্লেখ্য, ওই মিশনের প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে কিংবা অস্থায়ী কোনো ফৌজদারি আদালতে দায়ীদের বিচারের সুপারিশ করা হয়েছে।
গণহত্যার অপরাধ প্রতিরোধ ও দায়ীদের শাস্তি দানের জন্য ১৯৪৮ সালের কনভেনশনের পক্ষ জাতিসঙ্ঘ সদস্য রাষ্ট্রগুলোর উচিত হবে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করার জন্য মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালতে মামলা করা।
আর পঙ্গুত্ব বরণ করা রাবিয়া বসরি, আবদুল ওয়াহিদ ও আবু গফুরদের মতো লোকজন যাতে নিয়মিত পরিচর্যা পায় তা নিশ্চিত করা উচিত পঙ্গুত্ববিষয়ক জাতিসঙ্ঘ বিশেষ প্রতিনিধির। যাদের আঘাত মারাত্মক, তাদের দীর্ঘ মেয়াদি পুনর্বাসনের উদ্যাগ গ্রহণ করা উচিত। তাছাড়া তারা যাতে অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল না থঅকে, সেজন্য তাদেরকে কারিগরি বিদ্যা শিক্ষা দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করা উচিত।
২০১৭ সালের সহিংসতার জন্য দায়ীদের প্রতি অর্থপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে এবং এর ফলে যারা পঙ্গু হয়ে পড়েছে তাদের প্রতি প্রত্যক্ষ সহায়তা না দিলে ওই রক্তক্ষরণের নিরাময় না হওয়া ক্ষত কেবল বাড়বেই।

ভুটানের সুখের মন্ত্র ও মূল্যবোধ-ভিত্তিক শিক্ষা by জুলফিকলি আব্দুল রাজাক

একটি রোড সাইনে লেখা “৫০ কিমি/ঘ. গতিসীমা মেনে চলুন”। আরেকটিতে লেখা “তাড়াহুড়া করলে উদ্বেগে পড়তে হবে।” পৃথিবীর বুকে শেষ সাং-গ্রিলা – ভুটানে স্বাগতম। বিশ্বের একমাত্র কার্বন নেগেটিভ দেশটি বলে দিচ্ছে তারা দেশের পরিবেশকে ধরে রাখতে আর “সুখী” থাকতে কতটা ব্যাকুল।

এই ধারণার ইতিহাস ঘাটতে হলে ১৬২৯ সালে ফিরে যেতে হবে, যখন এই “সুখ” ভাবনার উদ্ভব। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, জাবদ্রুং নাগাওয়াং নামগিয়াল নামে এক লোক বলেছিলেন: সরকার যদি প্রজাদের সুখ দিতে না পারে তাহলে সেই সরকার থাকার কোন মানে হয় না।

কি সত্যি কথাই না তিনি বলেছিলেন! আজকের প্রেক্ষাপটে এর প্রতিটি অক্ষর সত্যি।

এই ক্ষুদ্র ও লোক চক্ষুর আড়ালে থাকা রাষ্ট্র ভুটান ১৯৭০-এর দশকের গোড়ার দিকে এক সাহসী ঘোষণা দেয়: “গ্রোস ন্যাশনাল প্রডাক্ট (জিএনপি) থেকে গ্রোস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস (জিএনএইচ) অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” এটা অনেককে অবাক করেছে। ওই গভীর নীতিমালাটি অনেকে বিস্মৃত হলেও বাকি বিশ্ব পরবর্তীতে সেখানেই ফিরে গেছে।

সন্দেহ পোষণ না করলেও জিএনএইচ ধারণাকে ‘অবাস্তব’ আখ্যা দিয়ে বাতিল করে দেন অনেকে। কেউ কেউ বলেন হাস্যকর। কিন্তু ভুটান তার কথায় অটল ও দৃঢ় থাকে। যার ফলশ্রুতিতে ২০০৮ সালের সংবিধানে ৯ নং ধারায় গর্বের সঙ্গে ঘোষণা করা হয়: ন্যাশনাল গ্রোস হ্যাপিনেসের অভিষ্ঠ লক্ষ্য হাসিল করতে পারবে এমন পরিবেশ জোরদারের চেষ্টা করবে রাষ্ট্র।

২০০৮ সালেই ভুটানে প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন সরকার গঠিত হয় এবং তারা জিএনএইচ রক্ষার অঙ্গীকার করে। সেই সঙ্গে সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য ধ্বংসকারী বিশ্বায়নের কুফলগুলো থেকে দেশকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেয়।

দেশের রাজপরিবার থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ থেকে শুরু করে সবকিছুতে এর প্রমাণ মেলে। কাউকে হিমালয় পর্বতমালার কোন চূড়ায় উঠতে দেয়া হয় না। এগুলোকে প্রাকৃতিকভাবে পবিত্র বলে গণ্য করা হয়।

অনেকটা তরুণ ৩৯ বছর বয়সী রাজা জিগমে খেসার নামগিয়ার ওয়াংচুকের মতে: জিএনএইচ সার্বিকভাবে একটি দেশের মান পরিমাপ করে। এটা বিশ্বাস করে যে কোন দেশের বস্তুগত ও আধ্যাত্মিক উন্নয়ন পাশাপাশি ঘটলেই মানব সমাজের জন্য সেটা হবে উপকারী উন্নয়ন। এই উন্নয়ন হবে পরস্পরের জন্য সম্পূরক ও শক্তিবর্ধক।

অন্য কথায় এটা হলো মধ্যমপন্থা যা প্রতীচ্যের বিজয়ী দর্শন এবং জীবন ব্যবস্থা।

দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন যে জিএনএইচ মানে হলো – উন্নয়নের একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সার্বিক ধারণা। তার সেই বিবৃতি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। এ ব্যাপারে রাজা বলেন, জাতীয় সচেতনতা আমাদেরকে (ভুটানিদের) একটি উন্নততর ভবিষ্যতের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে চালিত করে।

আর সে কারণেই রয়্যাল ইউনিভার্সিটি অব ভুটানের পারো কলেজ অব এডুকেশনের গবেষণা হচ্ছে জিএনএইচ-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। এর লক্ষ্য হলো দয়া, সাম্য, সহানুভুতি ও মানবতার মতো নৈতিক মূল্যবোধের সঙ্গে বস্তুগত উন্নয়নের সেতুবন্ধন রচনা।

মানুষের সত্যিকারের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সত্যিকারের মানুষ তৈরি এর লক্ষ্য। কোন মানব পুঁজি তৈরি এর লক্ষ্য নয়।

দেশটির জাতীয় শিক্ষা দর্শনে এই আকাঙ্ক্ষাগুলোর প্রতিফলন ঘটেছে, যাতে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুসঙ্গত মানব লালনের কথা বলা হয়েছে। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, জিএনএইচ এমন মানুষ তৈরি করবে যারা বিশ্বকে বোঝার ক্ষেত্রে চিন্তাশীল ও বিশ্লেষণধর্মী মনন সম্পন্ন হবে, লোভ ও অত্যধিক কামনা থেকে মুক্ত হবে।

আসলে মনযোগ অনুশীলন করাই দেশটির মন্ত্র যা ভুটানকে জাগ্রত ও শালীন করে রেখেছে। তাই দেশটি এই গ্লোবালাইজড বিশ্বের কাছে অনুকরণীয়।

>>>লেখক ইউনিভার্সিটি সাইন্স মালয়েশিয়ার সেন্টার ফর পলিসি রিসার্স এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ফেলো।

নতুন করে হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যকার উত্তেজনা ও সংঘাতের কারণ

হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ইহুদিবাদী ইসরাইল ২০০৬ সালে লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘটিত ৩৩ দিনের যুদ্ধে পরাজয়ের তিক্ত স্মৃতি আজো ভুলতে পারেনি। সুযোগ পেলেই তারা লেবাননে হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নেয়ার চেষ্টা করে। সর্বশেষ গত ২৫ আগস্ট থেকে ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হিজবুল্লাহ ও ইসরাইলের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও হামলা পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।

হিজবুল্লাহ-ইসরাইল সর্বশেষ সংঘর্ষ থেকে ইসরাইলের আগ্রাসী ও সম্প্রসারণবাদী নীতির পরিচয় পাওয়া যায়। গত ২৫ আগস্ট ইসরাইল দুটি ড্রোন দিয়ে লেবাননে হামলা চালায়। প্রথম ড্রোনের হামলায় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হলেও দ্বিতীয় ড্রোনের হামলায় হিজবুল্লাহর প্রচার দফতরের একটি ভবনের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর আগেও ইসরাইল সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের দক্ষিণে অবস্থিত হিজবুল্লাহর একটি সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। ওই ঘটনায় দু'জন শহীদ হন। কয়েক দফা এসব হামলার পর হিজবুল্লাহ মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ ইসরাইলি হামলার শক্ত জবাব দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেন। এরপরই ১ সেপ্টেম্বর পাল্টা হামলা চালিয়ে তিনি প্রতিশোধ নেন। ২০০৬ সালের ৩৩ দিনের যুদ্ধের পর এটিই ছিল ভারি অস্ত্রের যুদ্ধ। গায়ে পড়ে নতুন করে হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার পেছনে ইসরাইলের অন্যতম একটি কারণ ছিল আসন্ন নির্বাচন। কেননা ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও যুদ্ধমন্ত্রীও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভাল অবস্থানে নেই।

এ অবস্থায় দেশের ভেতরে নিজের রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার জন্য নেতানিয়াহুর সামনে দুটি লক্ষ্য রয়েছে। প্রথমত, আমেরিকার প্রস্তাবিত 'ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি' পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ও এ থেকে ফায়দা হাসিল করা। ওই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপায় খুঁজে বের করার জন্য গত জুনে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও নেতানিয়াহুর অতি ঘনিষ্ঠ জারেড কুশনার 'ডিল অব দ্যা সেঞ্চুরি' পরিকল্পনার প্রতি আরব দেশগুলোর সমর্থন আদায়ের জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছেন। কিন্তু তার ওই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে। কারণ সবার সমর্থন না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবের বিস্তারিত আর প্রকাশ করা হয়নি। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, যে কোনো যুদ্ধ পরিস্থিতিকে নিজের স্বার্থে কাজে লাগানো। গত মে মাসে ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে। কিন্তু ফিলিস্তিনিরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলায় যুদ্ধ মাত্র দুই দিন স্থায়ী হয় এবং ইসরাইল যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে বাধ্য হয়।

এরপর ইসরাইল যুদ্ধ কৌশল পাল্টে ফেলে এবং ইরাকে অবস্থিত প্রতিরোধ সংগঠন হাশদ্‌ আশ্‌ শাবি এবং সিরিয়ার সেনা অবস্থানের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এ ছাড়া, লেবাননের হিজবুল্লাহর অবস্থানেও সীমিত পর্যায়ে হামলা চালায় ইসরাইল। লেবাননের দৈনিক আল আখবার এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে লিখেছে, "ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু লেবাননের বিরুদ্ধে ছোট বড় হামলা চালিয়ে আসলে ইসরাইলিদের সমর্থন লাভের চেষ্টা করছেন যাতে নির্বাচনে বিজয় লাভ করা যায়। অর্থাৎ তিনি অভ্যন্তরীণ ফায়দা হাসিল ও ব্যক্তিগত স্বার্থের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। আর এটাই লেবাননে হামলার প্রধান কারণ।"  লেবাননের হিজবুল্লাহ মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহও গত ২৫ আগস্ট এক ভাষণে বলেছেন, নেতানিয়াহু আসলে নির্বাচনে জেতার জন্যই সম্প্রতি লেবাননে হামলা চালিয়েছে।

ইসরাইলের সাম্প্রতিক আগ্রাসনের প্রতিশোধ হিসেবে লেবাননের হিজবুল্লাহও পাল্টা হামিলা চালিয়ে ইসরাইলকে সতর্ক করে দিয়েছে। ইসরাইলে হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র হামলার উদ্দেশ্য সেখানকার নির্বাচনকে প্রভাবিত করা নয় বরং প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ইসরাইলকে এটা দেখিয়ে দেয়া যে তাদের যেকোনো হামলা বিনা জবাবে পার পাবে না। হিজবুল্লাহ সংগঠন ইসরাইলি নেতৃবৃন্দ ও তাদের সমর্থকদের এটাও বুঝিয়ে দিয়েছে যে, হামলা করে পালিয়ে যাওয়ার দিন শেষ হয়ে গেছে। পাল্টা হামলা সম্পর্কে হিজবুল্লাহ মহাসচিব নাসরুল্লাহ বলেন, আগ্রাসন না চালাতে আমরা ইসরাইলকে বাধ্য করব।

যাইহোক, হিজবুল্লাহর এ নীতি আত্মরক্ষামূলক এবং তারা এটাও প্রমাণ করেছে যে, হিজবুল্লাহ কখনো যুদ্ধের সূচনাকারী নয়। কিন্তু যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর জবাব দিতে তারা কুণ্ঠাবোধ করবে না। হিজবুল্লাহর পাল্টা হামলার লক্ষ্য কেবল সংগঠনকে রক্ষা করা নয়। এ ব্যাপারে সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ যেমনটি বলেছেন, "গোটা লেবাননের নিরাপত্তা বিধান করা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হিজবুল্লাহ লেবাননের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বাইরের কিছু নয়।"

ইসরাইলে হিজবুল্লাহর পাল্টা আঘাতের তৃতীয় উদ্দেশ্য হচ্ছে, তারা যদি জবাব না দিত তাহলে ইসরাইল আবারো হামলার ধৃষ্টতা দেখাতো। হিজবুল্লাহর জবাবের কারণে দখলদার ইসরাইল হিজবুল্লাহর ক্ষেপণাস্ত্র  ও অন্যান্য সামরিক শক্তি সম্পর্কে অবহিত হতে পেরেছে এবং এই সংগঠনের নেতার বক্তব্যের দৃঢ়তার বিষয়টিও তারা উপলব্ধি করতে পেরেছে। সুতরাং তারা বুদ্ধিমান হলে লেবানন কিংবা হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে আর আগ্রাসনের সাহস পাবে না।

ইসরাইলে হিজবুল্লাহর পাল্টা আঘাতের চতুর্থ উদ্দেশ্য হচ্ছে, হিজবুল্লাহ এটা দেখিয়ে দিয়েছে, তারা ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধ চায় না কিন্তু যেকোনো মূল্যে লেবাননসহ গোটা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা রক্ষা করবে। অন্যদিকে ইসরাইলিরা খুব ভাল করেই জানে বৈরুতে ইসরাইলের ড্রোন হামলার জবাবেই হিজবুল্লাহ পাল্টা হামলা চালিয়েছে। তাই বৃহত্তর যুদ্ধ শুরুর কোনো কারণ নেই।

১৯৮৫ সালে লেবাননে ইসরাইল বিরোধী প্রতিরোধ সংগঠন হিজবুল্লাহ গড়ে ওঠে। এরপর গত ৩৪ বছরে হিজবুল্লাহ এ অঞ্চলে অত্যন্ত সুসংগঠিত সংগঠন ও বিরাট শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এটি বর্তমানে লেবাননের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগঠন যার প্রমাণ ২০১৮ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাদের অভাবনীয় বিজয়। ওই নির্বাচনে প্রতিরোধ জোট ১২৮টি আসনের মধ্যে ৬৮টি আসন পেয়ে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। শুধু লেবাননের ভেতরেই নয় একইসঙ্গে সমগ্র পশ্চিম এশিয়ায়ও হিজবুল্লাহ প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এ কারণে চিন্তিত হয়ে পড়েছে আমেরিকা, ইসরাইল ও সৌদি আরব। এই তিন অপশক্তি হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগেছে এবং এ সংগঠনকে সন্ত্রাসী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। আমেরিকা ও সৌদি আরবের ধারণা হিজবুল্লাহকে সন্ত্রাসী তালিকায় ফেলে নিষেধাজ্ঞা দিলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিশোধ শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। কিন্তু সিরিয়া সংকটে হিজবুল্লাহর গঠনমূলক ভূমিকা ও জনপ্রিয়তা এবং হিজবুল্লাহর প্রভাব বিস্তারে ইসরাইলের আতঙ্কিত হয়ে পড়া থেকে বোঝা যায়, এ সংগঠন অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বীরবিক্রমে এগিয়ে যাচ্ছে।

মোটকথা, মধ্যপ্রাচ্যে হিজবুল্লাহসহ অন্যান্য প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর প্রতি এ অঞ্চলের জনগণের সমর্থন দেয়া থেকে বোঝা যায়, প্রতিরোধ শক্তিগুলো ভালই প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। এ প্রসঙ্গে, লেবাননের হিজবুল্লাহ ছাড়াও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সংগঠনগুলো, ইরাকের হাশদ্‌ আশ্‌ শাবি জোট ও ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ সংগঠনের কথা উল্লেখ করা যায়। এ সংগঠনগুলোর যেমন জনভিত্তি রয়েছে তেমনি আদর্শিকভাবেও তারা সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ। এ কারণে তাদের দমনের জন্য শত্রুদের সব ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হয়েছে। আমেরিকা ও ইসরাইলের সমর্থন নিয়ে সৌদি আরব ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনের আনসারুল্লাহর বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে আসলেও আনসারুল্লাকে তারা দমন করতে তো পারেনি বরং এ সংগঠন আরো শক্তিশালী হয়েছে।
হিজবুল্লাহর হাতে ভূপাতি ইসরাইলি ড্রোন

ভয়ঙ্কর মাদক আইস ছড়িয়ে দিচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্র by রুদ্র মিজান

দেশব্যাপী মরণনেশা আইস ছড়াতে তৎপরতা চালাচ্ছে আন্তর্জাতিক চক্র। ইয়াবার চেয়ে শক্তিশালী এই মাদক ইতিমধ্যে দেশের বিভিন্নস্থানে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। দেশের বাইরে থাকা কিছু বাংলাদেশির মাধ্যমে এই মাদক ছড়িয়ে দিতে তৎপরতা চালানো হয়। বিশেষ করে আফ্রিকান কিছু নাগরিক ভ্রমণের নামে বিভিন্ন ভিসা নিয়ে ঢাকায় এসে আইস ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করে। এমনকি ঢাকায় গড়ে তোলা হয় আইস তৈরির কারখানাও। গোয়েন্দাদের ধারণা প্রায়ই বিভিন্ন ভিসা নিয়ে এই চক্রের সদস্যরা দেশে এসে মাদকের কারবার করার চেষ্টা করছে।

দক্ষিণ পূর্ব-ইউরোপের ভয়ঙ্কর মাদক আইস। গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, মাদকটি ছড়িয়ে দিতে কাজ করছে আফ্রিকান কিছু নাগরিক। বিত্তশালী পরিবারের ছেলে-মেয়ে, বিশেষ করে ব্যবসায়ী, শোবিজ জগতের লোক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের শিক্ষার্থীদের টার্গেট করে এই চক্র।
এক গ্রাম আইসের মূল্য ৭ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করছিলো তারা। 

এই চক্রের মধ্যে রয়েছে এক নাইজেরিয়ান। তার সম্পর্কে তথ্য পান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা। তারপরই মাঠে নামে তারা। আযা আনাইচুকা অনিনুসি নামক ওই নাইজেরিয়ানের সঙ্গে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করা হয় সোর্সের মাধ্যমে। সম্প্রতি আইস বিক্রি করতে হোটেল লা মেরিডিয়ান সংলগ্ন বিমানবন্দর রোডে ক্রেতাবেশী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা টিমের সঙ্গে সাক্ষাত করতে যায় আযা আনাইচুকা। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে আটক করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে ৫২২ গ্রাম আইস জব্দ করা হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে ওই নাইজেরিয়ান জানান, তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লেখাপড়া শেষ করে এখানেই গার্মেন্টের ব্যবসা করছিলেন। তবে অল্প সময়ে বিপুল অর্থের মালিক হতে বিভিন্ন দেশে ভয়ঙ্কর এই মাদক ছড়িয়ে দিতে কাজ করছিলেন তিনি। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ভ্রমণ করে এসব দেশে আইস ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করেছেন। উগান্ডা থেকে বিশেষ  কৌশলে তার কাছে এই মাদক পাঠানো হতো।

তবে ভয়ঙ্কর এই মাদকটির সন্ধান পাওয়া গেছে আরও আগেই। একজন ইয়াবা বিক্রেতাকে অনুসরণ করছিলো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের গোয়েন্দা টিম। মোহাম্মদপুর, আদাবর, শ্যামলী, মিরপুর এলাকায় রয়েছে ওই মাদক ব্যবসায়ীর বিশেষ নেটওয়ার্ক। গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ইয়াবা বিক্রেতা রাকিব উদ্দিনকে ইয়াবাসহ আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের টিম। ওই সময়ে রাকিবের বাসায় ১৬০ পিস ইয়াবার সঙ্গে পাওয়া যায় পাঁচ গ্রাম নতুন এক মাদক। যা দেখতে অনেকটা লবণের মতো। বিদেশে প্রশিক্ষিত মাদকদ্রব্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম তা দেখেই বুঝতে পারেন এটি দক্ষিণ পূর্ব-ইউরোপের ভয়ঙ্কর মাদক আইস। কোথাও কোথাও এটিকে ক্রিস্টিল ম্যাথ নামে চিনে অনেকে। শক্তি ও যৌন উত্তেজনা বাড়ানোর জন্য তাপ দিয়ে এর বাষ্প শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে মাদকসেবীরা। এটি মাদকসেবীদের রক্তে মিশে যায়। পর্যায়ক্রমে এটি নেশায় পরিণত হয়। নেশা করতে গিয়ে এক পর্যায়ে নিজের শরীর, যৌনশক্তি সবই হারাতে হয় সেবনকারীদের। নটরডেম কলেজের এক সময়ের মেধাবী এক শিক্ষার্থী  হতাশা থেকে মাদকে আসক্ত হন। তারপর নিজেই শুরু করেন মাদক বাণিজ্য।

আইস সম্পর্কে তার কাছ থেকে  জানা যায় চাঞ্চল্যকর তথ্য। এই আইস বাণিজ্যের মূল হোতা ঝিগাতলার ইঞ্জিনিয়ার রাশিদুজ্জামানের ছেলে হাসিব মোহাম্মদ রশিদ (৩২)। ওই শিক্ষার্থীর দেয়া তথ্যানুসারেই ঝিগাতলার ৭/এ সড়কের ৬২ নম্বর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। হাসিবদের নিজেদের ওই বাড়ির বেইজমেন্টে ছিলো আইস তৈরির কারখানা। সেখানে ছিলো আইস ও এমডিএমএ সহ সিউডোএফ্রিড্রিন এক্সটাকশন সুবিধা সম্বলিত ডিস্টিলেশন চেম্বার। ওই অভিযানেই আইস নামক মাদক বাংলাদেশে প্রথম সনাক্ত হয় বলে জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তবে হাসিব পলাতক থাকায় তখনও তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে গত ১৮ই মার্চ মিরপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় তাকে। জিজ্ঞাসাবাদে হাসিব জানান, মালয়েশিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেছেন তিনি। দেশে আসার পর অনলাইন ও বিদেশী বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমেই সময় কাটতো তার। ডার্ক নেটের মাধ্যমেই আইস তৈরি সম্পর্কে শিক্ষা নিয়ে নিজেই কারখানা তৈরি করে ইয়াবার চেয়ে ভয়ঙ্কর এই মাদক তৈরি করছিলেন হাসিব।

এসব বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম বলেন, আর্ন্তজাতিক মাদক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে টার্গেট করে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা সতর্ক রয়েছি। যে কারণে আইসের মতো ভয়ঙ্কর মাদক ছড়িয়ে দেয়ার আগেই জড়িতদের আটক করা সম্ভব হয়েছে।

লাদাখ নিয়ে ভারতের বিপুল আশা, তবে বাস্তবতা কঠিন by বার্তিল লিন্টনার

জম্মু ও কাশ্মীরকে ভেঙে দিয়ে কেন্দ্র-শাসিত দুটি ইউনিয়ন অঞ্চল হিসেবে গড়ার ভারতের সিদ্ধান্ত ওই অঞ্চলের মুসলিম প্রাধান্যপূর্ণ জনসাধারণের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে, প্রতিবেশী পাকিস্তানে ও আরো দূরের ইসলামি মহলগুলোতে ক্রোধের সঞ্চার হয়েছে।

কিন্তু ভারতীয় সংবিধানে থাকা রাজ্যটির বিশেষ মর্যাদা বাতিলসহ এই পদক্ষেপটি দৃশ্যত লাদাখকে খুশি করেছে। এখন লাদাখ নিজস্ব পরিচিতিতে ইউনিয়নভুক্ত অঞ্চলের মর্যাদা পাবে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি হবে হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে প্রথম প্রশাসনিক এলাকা, যেখানকার প্রায় অর্ধেক লোক বৌদ্ধ। এটি প্রতিবেশী চীনের মধ্যে সতর্কতা সৃষ্টি করবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলুপ্তির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত একমাত্র যে বিক্ষোভটি হয়েছে তা হলো কার্গিলে। জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্তের কাছে লাদাখের মুসলিম প্রাধান্যপূর্ণ জেলায় অবস্থিত এই কার্গিল।

লাদাখের সাবেক ভারতীয় কূটনীতিবিদ পুনচুক স্টবদান ৭ আগস্ট হিন্দুস্তান টাইমসকে বলেন, অবশেষে মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলো। তিনি বলেন, লাদাখিরা কখনো ব্যাপকভাবে মুসলিমসংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরে প্রাধান্য সৃষ্টি করতে পারেনি।

তবে লাদাখের নতুন ইউনিয়ন ভূখণ্ডের ভবিষ্যত নিয়ে অনিশ্চয়তাও রয়েছে। আর তা ঘরোয়া ও একইসাথে আন্তর্জাতিকও।

ইস্যুটি স্পর্শকাতর হওয়ায় পরিচয় প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় অধিবাসী বলেন, লোকজন এতে খুশি। কিন্তু জমি সুরক্ষা ও বহিরাগতদের ঢল নিয়ে তাদের ভয় এখনো রয়ে গেছে।

অনুচ্ছেদ ৩৭০-এর ফলে স্থানীয় অধিবাসীরা কিছু সুরক্ষা পেত। বিশেষ করে ভারতের অন্যান্য অংশের লোকজন এখানে জমি ও অন্যান্য সম্পত্তি ক্রয় করতে পারত না।

ওই বাধা দূর হওয়ায় স্থানীয়রা আশঙ্কা করছে, ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে উদ্যোক্ততারা এসে লাদাখের আকর্ষণীয় পর্যটন শিল্পে বিনিয়োগ করবে, এতে অনেক লাদাখির আয়ও বাড়বে।

লাদাখের নতুন ইউনিয়ন এলাকা কিভাবে শাসিত হবে তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অন্যান্য রাজ্য কিংবা নতুন জম্মু ও কাশ্মীরের মতো লাদাখের কোনো নির্বাচিত পরিষদ থাকবে না।

এর বদলে স্থানীয় সরকার পরিচালিত হবে জাতীয় রাষ্ট্রপতির নিয়োগ করা একজন লে. গভর্নরের মাধ্যমে। স্থানীয়ভাবে নির্বাচিত পরিষদ না রাখার কারণ হলো, নয়া দিল্লি চায় এই স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকাকে কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে।

জম্মু ও কাশ্মীরে ১৯৯০-এর দশক থেকে যে সহিংস বিদ্রোহ চলছে, তা স্পর্শ করেনি লাদাখকে। এর ফলে ভারতীয় ও বিদেশী পর্যটকদের জন্য জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।

এখানকার দর্শনীয় পর্বতগুলো, কোনো কোনোটি সমুদ্রস্তর থেকে সাত হাজার মিটার পর্যন্ত উঁচু, ট্রেকারদের আকর্ষণীয় বস্তু। বিশেষ করে যারা এখানকার তিব্বতি-বৌদ্ধ সংস্কৃতির অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান, তাদের কাছে এটি অনন্য সুযোগ।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ৪৯,৪৭৭ জন বিদেশীসহ মোট ৩২৭,৩৬৬ জন পর্যটক লাদাখি রাজধানী লেহ ও এর আশপাশের এলাকা সফর করেছেন। এর আগের বছর সংখ্যাটি ছিল ৫০ হাজারের মতো।

লাদাখের ৫৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকায় মাত্র ২৭৫,০০০ লোক বাস করে। অথচ ৫০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকার পাঞ্জাবে প্রায় তিন কোটি লোকের বাস।

তবে অঞ্চলটির জটিল ভূরাজনীতি সম্ভবত লাদাখের ভবিষ্যত শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য অনেক বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

ব্রিটিশ আমল পর্যন্ত রাজন্য শাসিত কাশ্মীরের মধ্যে কেবল ভারত-শাসিত কাশ্মীরই নয়, পাকিস্তান ও চীনের কাছে থাকা অংশও ছিল।

উপনিবেশ আমলের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৪৫ ভাগ এখন ভারতের নিয়ন্ত্রণে, পাকিস্তানের ৩৫ ভাগ ও চীনের নিয়ন্ত্রণে ২০ ভাগ।

পাকিস্তান ১৯৪৭ সালের যুদ্ধের পর জম্মু ও কাশ্মীরের পশ্চিম অংশের বড় অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্টা করে। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পর ১৯৬৩ সালে সই হওয়া সীমান্ত চুক্তি অনুযায়ী পাকিস্তান কারাকোরাম রেঞ্চের উত্তর দিকে প্রায় সাত হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় চীন সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়।

কারাকোরাম রেঞ্চটি আগে পাকিস্তানি ভূখণ্ড বিবেচিত হতো। ভারতও এই এলাকাটি দাবি করত। আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা আকসাই চিনকেও (তা আরো বড় এলাকা) ভারত তার লাদাখের অংশ মনে করে। লাদাখের নতুন ইউনিয়ন এলাকার মর্যাদার ফলে এসব দাবি নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি এখনো করেনি। তবে ভবিষ্যতে করতে পারে।

লাদাখ শুরুতে ছিল তিব্বতি উপজাতীয়দের শাসিত একটি স্বাধীন রাজ্য। ১৮৩৪ সালে শিখ সাম্রাজ্য এটি দখল করে। ১৮৪৬ সালে এটি জম্মু ও কাশ্মীরে একীভূত হয়ে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব মেনে নেয়।

তবে এর উত্তর সীমান্তটি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ১৮৬৫ সালে ব্রিটিশ সার্ভেয়ার উইলিয়াম এইচ জনসন আকসাই চিন দিয়ে সীমান্ত তৈরির প্রস্তাব করেন। পরে তা সংশোধন করে ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা স্যার জন্য আরদাঘ।

এরপরপরই এটি পরিচিত হয় আরদাঘ-জনসন লাইন নামে। ভারত এই সীমান্তকে এখনো স্বীকার করে। তবে চীন কখনো এই সীমানা স্বীকার করেনি।

এর বদলে চীন ১৮৯৩ সালে জিনজিয়াংয়ের প্রধান শহর কাশগরের ব্রিটিশ কনস্যাল জর্জ ম্যাকার্থি ও তখনকার চীনা কিং শাসকদের ব্রিটিশ মন্ত্রী স্যার ক্লাউড ম্যাকডোনাল্ড প্রণীত অপর সীমানাটি দাবি করছে।

দাবি-পাল্টা দাবি থাকলেও চীন ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত মোটামুটিভাবে শান্তই রয়েছে। তবে উত্তর-পশ্চিম লাদাখে যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সীমান্ত রয়েছে, সেখানে দুই দেশের মধ্যে সংঘর্ষ প্রায়ই দেখা যায়।

লাদাখের কার্গিল জেলায় এ আশপাশের এলাকায় ১৯৯৯ সালে দুই দেশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

পাকিস্তানের মিত্র চীন কিন্তু জম্মু ও কাশ্মীরের ব্যাপারে ভারতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। চীন মনে করে, এর ফলে সঙ্ঘাতের নতুন ধারার সূচনা করা হলো।

নয়া দিল্লির অনুচ্ছেদ ৩৭০ বাতিল করার পরপরই পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কোরেশি আলোচনার জন্য বেইজিং যান। তবে চীনা উদ্বেগ পাকিস্তানের চেয়ে ভিন্ন।

পাকিস্তান চাচ্ছে, ইসলামপন্থীসহ কাশ্মীরী বিদ্রোহীদের প্রতি আন্তঃসীমান্ত সমর্থন বাড়াতে।  কিন্তু চীন তার জিনজিয়াং সীমান্তের কাছে এমন বিদ্রোহীদের উপস্থিতি কামনা করে না। কারণ সে নিজেই সেখানকার মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ে চিন্তায় আছে।

তাছাড়া আরো বেশি অস্থিতিশীল কাশ্মীর চীনের ভূ-রাজনীতি ও অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে নয়, বিশেষ করে তথাকথিত চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠার দিকে চীন বেশ নজর দেয়ায়। কয়েক বিলিয়ন ডলারের এই অবকাঠামো প্রকল্পটি পাকিস্তানি বন্দর গোয়াদর দিয়ে চীনকে আরব সাগরে প্রবেশের সুযোগ দেবে।

তিব্বতি-বৌদ্ধ সংস্কৃতির লাদাখে নতুন প্রশাসনিক এলাকা সৃষ্টি করার ফলে চীনের সাথেও ঝামেলার সৃষ্টি হবে। উল্লেখ্য, চীন ১৯৫৯ সালে তিব্বতকে নিজের করে নেয়। এরপর থেকে দেশটি সেখানকার সংস্কৃতি, ধর্ম ও ঐতিহ্য মুছে ফেলার চেষ্টা করছে।

তিব্বতি বৌদ্ধদের নেতা দালাই লামা ১৯৫৯ সাল থেকে ভারতে প্রবাস জীবনযাপন করছেন। তিনি ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কাঁটা হিসেবে বিরাজ করছেন। প্রবাসী এই আধ্যাত্মিক নেতা কয়েকবারই লাদাখ সফর করেছেন। সর্বশেষ করেছেন ২০১৮ সালের জুলাই মাসে।  রাজধানী লেহ ও অন্যান্য এলাকা নতুন ইউনিয়নভুক্ত হওয়ার মর্যাদা প্রাপ্তিতে লাদাখিরা আনন্দপ্রকাশ করলেও উদ্বিগ্ন হওয়ার নতুন ও সম্ভাব্য অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী কারণ পারে চীন।
পূর্ব লদাখের রাজধানী লেহ’র থিকসে বৌদ্ধ মঠের পাদদেশে খেলছে একদল শিশু, ছবি: এএফপি

তিক্ত উত্তরাধিকার রেখে গেলেন মুগাবে

রবার্ট মুগাবের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত, তিনি একজন অসাধারণ দক্ষ নেতা ছিলেন। রোডেসিয়ার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইয়ান স্মিথের শাসনামলে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত, ১৯৮০ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত একজন বৈধ ও ত্রুটিপূর্ণ শাসক ছিলেন তিনি। ২০০০ সালে সাংবিধানিক গণভোটে লজ্জাজনক পরাজয় দেখেছিলেন জিম্বাবুয়ের সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি শাসক। তৃতীয়ত, মুগাবে ছিলেন একজন রক্তচোষা
একনায়ক। তিনি নির্বাচনে কারচুপি করেছেন। ২০১৭ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত নিজের বিরোধীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। এসব ছাড়া, পদচ্যুত, মৃতপ্রায় ও স্বৈরশাসক হিসেবেও কিছু সময় পার করেছেন মুগাবে।
ইয়ান স্মিথ ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত রোডেসিয়ার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তার শাসনামলে ১১ বছর কারাবন্দি ছিলেন মুগাবে। পরবর্তীতে প্রতিবেশী দেশ মোজাম্বিকে একাধিক গেরিলা শিবিরে নির্বাসিত অবস্থায় দিন পার করেন। ওই সময়গুলো তার সাহস, দৃঢ়তা, কৌশলগত দক্ষতা ও প্রতিভার সুসপষ্ট প্রমাণ। জেসুইত ধর্মযাজকদের অধীনে থেকে নিজের বুদ্ধিদীপ্ততা ও চারুত্ব ঝালিয়ে নেন মুগাবে। কিন্তু এসব গুণের পেছনেই লুকিয়ে ছিল নির্মমতা ও ধূর্ততা। কারাগারে থাকাকালীন সময়ে বেশ কয়েকজন কারাবন্দিকে নিজের অধীনস্থ করতে পেরেছিলেন তিনি। পরবর্তীতে তাদের মুগাবের রাজনৈতিক দল জানু-পিএফ পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে দেখা গেছে। কারাগারে থাকার সময় তার অনুসারীদের তৎকালীন সময়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নেতা নাবানিঙ্গি সিটহোলেকে ক্ষমতাচ্যুত করার কথা জানিয়েছিলেন মুগাবে। কারাগার থেকে ছাড়া পাবার পর তিনি নির্বাসনে যান। নির্বাসনে থাকার সময় গেরিলা বাহিনী ও আফ্রিকান নেতাদের বোঝাতে সক্ষম হন যে, সরকার-বিরোধী আন্দোলনের মূল ব্যক্তি তিনিই। তার জীবনে একক অর্জনের মধ্যে এটি অন্যতম। এই পর্যায়ে পশ্চিমা নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তার।  তারা তার প্রতি মুগ্ধ ছিলেন। তারা তার শিক্ষাবিদ হাবভাব দেখে মুগ্ধ হননি। তাদের মুগ্ধতার কারণ ছিল, মুগাবে সমালোচনাকারীদের দমাতে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। গেরিলা শিবিরগুলোয় এধরনের সমালোচনা দূরীকরণের কাজ চলতো- নির্যাতন করে, বন্দি রেখে। এই পর্যায়ে মুগাবে ছিলেন একজন উৎসর্গী মার্ক্সিস্ট।
মুগাবের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় স্বাধীন জিম্বাবুয়ের প্রথম বৈধ নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশাল জয় দিয়ে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সাল থেকে অবশ্য প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন তিনি। প্রায় এক দশকের মতো সময় ধরে তিনি জিম্বাবুইয়ানদের কাছে করা প্রতিশ্রুতি পূরণ করেন। স্থাপন করেন ৫ হাজারের কাছাকাছি খামার। তৎকালীন সময়ে আফ্রিকার মধ্যে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে বেড়ে ওঠা কৃষি খাতগুলোর একটি ছিল জিম্বাবুয়ের। ক্ষমতার প্রথম দিকে নিজের শাসনে তেমন একটা দাগ লাগতে দেননি মুগাবে। একমাত্র দাগ যেটি ছিল সেটি হচ্ছে, দক্ষিণাঞ্চলে ভিন্নমত দমনের চেষ্টা। নেবেলে সমপ্রদায় ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলো মুগাবের সমর্থনপ্রাপ্ত শোনা সমপ্রদায়ের প্রভাবের বিরোধিতা করতো। তাদের দমাতে নারী, শিশুসহ প্রায় ২০ হাজার মানুষ হত্যা করেন মুগাবে। কিন্তু দেশের অর্থনীতি বাড়ছিল। সঙ্গে উন্নত হচ্ছিল দেশের নাগরিকদের জীবনমানও। সব মিলিয়ে পশ্চিমা সরকারগুলো ও আন্তর্জাতিক দাতারা মুগাবের অপরাধ দেখেও না দেখার ভান করেন।
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন মুগাবে। জমি হারানো মানুষের সংখ্যা ধীরে ধীরে বাড়ছিল। বিশেষ করে ঝানু যোদ্ধাদের একটি দল অভিযোগ তোলে, মুগাবে শ্বেতাঙ্গদের খামার কিনে তাদের মধ্যে ভাগ করে দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এমনটি হচ্ছিল। ১৯৯৭ সালে বেপরোয়া সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ওইসব ঝানু যোদ্ধাদের ব্যাপক পরিমাণ খামার তাদের হাতে তুলে দেন। এতে বাজেটে বিরূপ প্রভাব পড়ে। বিশ্বব্যাংক জিম্বাবুয়ের তহবিল আটকে রাখতে বাধ্য হয়। একইসঙ্গে শুরু হয় অর্থনৈতিক ধস।
মুগাবের ক্যারিয়ারের তৃতীয় পর্যায়ের অন্যতম দৃষ্টান্ত ২০০০ সালের সাংবিধানিক গণভোট। ভোটে জিতলে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যাপক ক্ষমতা উপভোগ করতে পারতেন তিনি। কিন্তু তা হয়নি, তিনি হেরে যান। একইসঙ্গে শুরু হয় তীব্র বিরোধী আন্দোলন। প্রভাবশালী বাণিজ্য সংগঠন নেতা মরগান টিভানগিরাইয়ের নেতৃত্বে গঠিত মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেটিক চেঞ্জ (ডিএমসি) মুগাবে সরকারের মধ্যে দুর্নীতিসহ অন্যান্য বিষয়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। ৪৬ শতাংশ ভোট পেয়ে হেরে যান মুগাবে। এটা তার কাছে বড় ধরনের হতাশা ছিল।
হারের লজ্জায় রেগে ওঠেন মুগাবে। কিছু সংখ্যক শ্বেতাঙ্গ কৃষকরা বিরোধী দলকে সমর্থন দিচ্ছিল তখন। তৎক্ষণাত ওই কৃষকদের জমি দখল করে নেন তিনি। তাদের কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি। এমনকি জমি দখলে সহিংসতার চর্চাও করেছেন অনেক সময়। এতে তার দলের প্রধান সুবিধাভোগীরা বেশ খুশি হন। তার দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রেস মুগাবে, যিনি কিনা বয়সে মুগাবের চেয়ে ৪১ বছরের ছোট, প্রেসিডেন্টের চারপাশে একটি লুণ্ঠনমূলক অভিযান চালানো শুরু করেন। অচিরেই জিম্বাবুয়ের অর্থনীতিতে ধস নেমে আসে। ২০০৮ সালে মুদ্রাস্ফীতি এত বেড়ে যায় যে, তা প্রায় মূল্যহীন হয়ে দাঁড়ায়। এসবের মধ্যদিয়ে এমডিসির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। ২০০৮ সালে স্বল্প ব্যবধানে নির্বাচনে জয়ীও হয় দলটি। নির্বাচনের প্রথম দফায় মুগাবেকে পরাজিত করেন টিভানগিরাই। কিন্তু নির্বাচন কমিশন ছিল মুগাবের প্রতি অনুগত। তারা মুগাবের পক্ষে ফল প্রকাশ করে। তাদের ঘোষণা অনুসারে, অল্প কিছু ভোটের ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় এমডিসি। দ্বিতীয় দফায় কয়েকশ’ এমডিসি কর্মীকে হত্যা করা হয়। হার মানতে বাধ্য হন টিভানগিরাই।
মুগাবের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে ভয়াবহ পর্যায় ছিল লজ্জাজনক একটি শেষ। বৃদ্ধ বয়সের ক্ষমতা হারানোর দৃষ্টান্ত ও তার স্ত্রীর লালসায় এটা সপষ্ট হয়ে ওঠছিল যে, মুগাবের মৃত্যুর পর ক্ষমতা দখল করতে চাইছিলেন গ্রেস। এমতাবস্থায় সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা হারান একসময় বীর হিসেবে আখ্যায়িত মুগাবে। অবশেষে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পর সমপ্রতি প্রয়াত হয়েছেন তিনি।
মুগাবের মৃত্যুতে জিম্বাবুয়ের ভেতরে তেমন কোনো পরিবর্তন আসবে না। কেননা, তিনি দুই বছর ধরে দেশটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই নেই। তাছাড়া দেশেও নেই গত কয়েক মাস ধরে। হয়তো তার শেষকৃত্যে প্রচুর মানুষের সমাগম হবে। হয়তো তাদের অনেকে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করবে। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট একসময় মুগাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ক্ষমতায় এসে তিনি দলে তেমন কোনো পরিবর্তন আনেননি। মুগাবের আমলের সুবিধাভোগীরা এখনো নিজস্ব পদে বহাল আছেন। দেশের অর্থনীতির উন্নতি হয়নি। এমন কী যে নির্বাচনের মধ্যদিয়ে তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন, সে নির্বাচনে সহিংসতা, জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে।
(লন্ডনভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে)