Friday, January 23, 2015

প্রতিহিংসার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ!

প্রতিদিনের মতো গত শনিবারও অটোরিকশা নিয়ে বেরিয়ে ছিলেন সিদ্দিকুর রহমান। বাড়িতে অসুস্থ মা, স্ত্রী ও দুই সন্তান আছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী তিনি। ময়মনসিংহ শহরে সিএনজি চালিয়ে যে কয়টি টাকা আয় হয় তা দিয়েই পরিবারের খরচ মেটান ত্রিশোর্ধ্ব সিদ্দিকুর। কিন্তু তিনি কি জানতেন দুর্বৃত্তদের ছোঁড়া পেট্রলবোমায় ঝলসে যাবে দেহ? জানতেন কি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সাদা বিছানায় শুয়ে দগ্ধ ঘায়ের তীব্র যন্ত্রণায় কাতরাতে হবে তাকে? জানলে হয়ত বের হতেন না। আবার হয়ত শঙ্কা নিয়েই দুরু দুরু বুকে উপার্জনে নেমেছিলেন। বিরোধীদল বিএনপির ডাকা টানা অবরোধ কর্মসূচিতে সিদ্দিকুরের মতো ভাগ্যবরণ করতে হয়েছে কয়েক শ নিরীহ মানুষকে। প্রাণ দিয়েছেন অন্তত ২৩ জন। যাদের বেশির ভাগই খেটে খাওয়া কম আয়ের মানুষ। তারা হয়ত কল্পনাও করেননি কাজের তাগিদে রাস্তায় নামলে এভাবে বর্বরতার শিকার হতে হবে। রাজনৈতিক সহিংসতায় এমন প্রাণহানির ঘটনা নতুন নয়। অতীতেও হয়েছে। এখনও হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি হয়েছে বরাবর জনগণই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জনগণের কল্যাণে রাজনীতির কথা বললেও রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন জনগণই। রাজনৈতিক সহিংসতায় যারা স্বজন হারান তারাই বোঝেন স্বজন হারানোর বেদনা কেমন হতে পারে। যে পরিবারে নিহত ব্যক্তিটিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি থাকেন তাদের ভোগান্তি কোথায় গিয়ে পৌঁছতে পারে, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই ভালো বলতে পারবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক গোবিন্দ চক্রবর্তী বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন হঠাৎ করেই অশান্ত হয়ে ওঠায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পোহাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বা দামি গাড়ি হাঁকিয়ে কর্মস্থলে যান তাদের জন্য যতটা না ভোগান্তি হয়েছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে নগরীর মধ্য ও স্বল্প আয়ের মানুষদের।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতিকরা জনগণের কল্যাণের কথা বলেন। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে পুরোপুরি উল্টো। হামলার যত আঘাত সবই আসে জনগণের ওপর। ভাঙচুর করা হয়, আগুন দেওয়া হয় গণপরিবহনে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। এ ধরনের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে জনগণের কল্যাণ মুখে মুখেই থাকবে, বাস্তবে মিলবে না কিছুই।
গত ৫ জানুয়ারি বিএনপিকে রাজধানীতে জনসভা করতে দেওয়া হয়নি। পাশাপাশি গুলশানের কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনকে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে ৬ জানুয়ারি থেকে টানা অবরোধ করে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। তবে ৪ জানুয়ারি থেকেই শুরু সংঘাতের। এই দিনটি থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১২ দিনে সংঘর্ষ-সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২৩ জন। আহত অন্তত ৩৫০ জন। এই কয়দিনে আগুন দেওয়া হয় ১৭৮টি যানবাহনে। ভাঙচুর করা হয় অন্তত ২৫১টি যানবাহন। ঢাকা মহানগরে আগুন দেওয়া হয়েছে ৩৪টি গাড়িতে। অবরোধ কর্মসূচির মধ্যেই বৃহ¯পতিবার সকাল-সন্ধ্যা হরতালও করেছে বিএনপি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী রিয়াজ রহমানের ওপর হামলার প্রতিবাদে এই হরতাল ডাকা হয়।
ঢাকাসহ ১৬ জেলায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে রংপুরের মিঠাপুকুরে। গত ১৪ জানুয়ারি মিঠাপুকুরের ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে যাত্রীবাহী একটি বাসে পেট্রলবোমা হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। পুলিশের ভাষ্য, ১৪ জানুয়ারি রাত সোয়া ১২টার দিকে রংপুর শহরের মডার্ন মোড় এলাকা থেকে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ৩০টি বাস পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল পুলিশ ও বিজিবি। ওই বাস বহরের সামনে ছিল পুলিশের গাড়ি, পেছনে বিজিবির গাড়ি। বহরের ২৩ নম্বরে ছিল পেট্রলবোমা হামলার শিকার হওয়া খলিল এন্টারপ্রাইজ নামের যাত্রীবাহী বাসটি। পুলিশ-বিজিবির প্রহরায় বাসের বহর মিঠাপুকুর উপজেলার বাতাসন এলাকায় এলে মহাসড়কের পাশের বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে বাস লক্ষ্য করে পেট্রলবোমা ছুঁড়ে মারে দুর্বৃত্তরা। খলিল এন্টারপ্রাইজ নামের বাসটিতে পেট্রলবোমা এসে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাসে আগুন ধরে যায়। বাসের ভেতরে পুড়ে মারা যায় চারজন। গুরুতর দগ্ধ হয় ১০ জন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থান আরও একজন মারা যান। রংপুরের পুলিশ সুপার আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘আমরা কোন দেশে বাস করছি? এ কেমন বীভৎসতা! কোনো মানুষ কী করে এমনভাবে মানুষ হত্যা করতে পারে?’
এ ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের শতাধিক নেতা-কর্মীকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। এ পর্যন্ত জামায়াত-শিবিরের বেশ কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি নতুন নয়
রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রাণহানি নতুন নয়। অতীতেও দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি সহিংসতায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। অথচ এতকিছুর পরও বন্ধ হচ্ছে না সংঘাতের রাজনীতি।
আওয়ামী লীগের সময়ে
২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মারা গেছেন ৫৬৪ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের দলীয় কোন্দলেই মারা গেছেন ১৩০ জন। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে গত বছরের ২৭ থেকে ২৯ অক্টোবর বিএনপি-জামায়াতের ডাকা ৬০ ঘণ্টার হরতালেই ১৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এর আগে গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসের সহিংসতায় ২৮৯ জন প্রাণ হারান।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ৫৫ জন মারা গেছেন হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে। আর ১৮ জন মারা গেছেন জামায়াত-পুলিশ সংঘর্ষে। হরতালের মধ্যে রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন ১৩৮ জন। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষে ১৩ জন এবং আওয়ামী লীগ ও জামায়াত-শিবিরের সংঘর্ষে আরও পাঁচজন মারা গেছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দলে ১৫ জন এবং বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে  ৬ জন মারা গেছেন।
এর আগে ১৯৯৬ সালের জুনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। সে সময় থেকে ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮৯৮ জনের প্রাণহানি ঘটে। এর মধ্যে ২০০১ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে লতিফুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। ওই দুই মাসে ১৩১ জনের প্রাণহানি ঘটে।
বিএনপির সময়ে
২০০১ সালের অক্টোবরে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসে। সে সময় থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় ৮৭২ জন প্রাণ হারান। এর মধ্যে সন্ত্রাসী হামলায় আওয়ামী লীগের ২০০ নেতা-কর্মী মারা যান। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় মারা যান ২৪ জন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ-বিএনপি সংঘর্ষে ৭৫ জন, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৭৫ জন, বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ১০ জন ও আওয়ামী লীগের কোন্দলে ১৪ জন মারা যান। বাকিরা হরতাল ও অবরোধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনে মারা গেছেন। সেবার ক্ষমতার শেষ সময়ে ২০০৬ সালে ১২০ জন প্রাণ হারান। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সংঘর্ষে প্রাণ হারান ৩৬ জন। হরতাল ও অবরোধে প্রাণ হারান ৩৫ জন। এ ছাড়া ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সালের মে পর্যন্ত বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে রাজনৈতিক সংঘর্ষে ১৭৪ জন প্রাণ হারান।
কম সহিংসতার নজিরও আছে
বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট প্রকাশিত সংবাদপত্রে হরতালচিত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ১৯৯৮ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সে সময় হরতাল, অবরোধ ও অসহযোগের মতো আন্দোলন হলেও রাজনৈতিক সহিংসতায় খুনোখুনি তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ১৯৯৫ সালের ১৬ থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে ৯৬ ঘণ্টার হরতালে দুজনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর একাধিকবার হরতাল দিলে সে সময় মারা যান আরও ছয়জন। ১৯৯৬ সালের ৯ মার্চ থেকে টানা ১৭ দিন অসহযোগ আন্দোলন হয়েছে দেশে। সে সময়ও খুব বেশি মানুষ মারা যাননি।
সহিংসতা থামার আলামত নেই
হঠাৎ অশান্ত হয়ে ওঠা রাজনৈতিক অঙ্গন কবে শান্ত হবে তার কোনো ঠিক নেই। সরকার ও বিরোধী পক্ষের ‘অনড়’ অবস্থানের কারণে সহসাই সংঘাতময় পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার কোনো সম্ভাবনাই দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। দুই দলের নেতাদের মুখেও নেই স্বস্তির বাণী। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার শর্ত মেনে বিএনপি যে সংলাপের দাবি জানাচ্ছে তাতে আওয়ামী লীগের থোরাই কেয়ার। বরং বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনে জ্বালাও-পোড়াও ঠেকাতে মরিয়া হয়ে উঠেছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যারাই সহিংসতায় জড়াচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি তো আছেই।
সরকারের কঠোর এই অবস্থানেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। যে করেই হোক সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করার কর্মসূচি নিয়ে নেমেছে দলটি। তবে গ্রেপ্তার ও হামলা আতঙ্ক পিছু ছাড়ছে না বিএনপি নেতাদের। কেউ গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে বাঁচছেন। আর কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারা অন্তরীণ আছেন।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘দেশ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সরকারকে নমনীয় হতে হবে। এভাবে পুলিশ-বিজিবি দিয়ে অতীতেও কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, আওয়ামী লীগও পারবে না।’
অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতারাও অনড় নিজেদের অবস্থানে। দলটির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেন, ‘বিএনপি মনে করছে সন্ত্রাসী কায়দায় সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নেওয়া যাবে। কিন্তু তাদের মনে রাখতে হবে বর্তমান সরকার সংবিধান রক্ষায় গণতান্ত্রিকভাবেই ক্ষমতায় এসেছে। সরকার তার মেয়াদপূর্ণ করেই ক্ষমতা ছাড়বে। এর আগে কোনো নির্বাচনের প্রশ্নই আসে না।’ তিনি বলেন, বিএনপি দেশের উন্নয়ন দেখে ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছে। তারা আবারও দেশকে এক শ বছর পেছনে ঠেলে দিয়ে দুর্নীতি ও জঙ্গিবাদকে ফিরিয়ে আনতে চাইছে। কিন্তু তাদের এই নীলনকশা কখনই বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না। এ জন্য যা করার তাই করা হবে।’ সাপ্তাহিক এই সময়-এর সৌজন্যে।

অফিসারদের বেতন বাড়িয়ে ক্ষমতায় থাকতে চান হাসিনা: সেলিম

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম অভিযোগ করেছেন, সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বাড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা পাকাপোক্ত করছেন। শুক্রবার বিকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে ‘সবার জন্য বাসযোগ্য ঢাকা চাই’  দাবিতে সিপিবির এক সমাবেশে এ কথা বলেন তিনি। একই দাবিতে পুরানা পল্টন থেকে মিছিল করে তারা। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেলিম বলেন, “শেখ হাসিনা সরকারি বড় অফিসারদের বেতন বাড়িয়ে দিয়েছেন, যাদের পরিমাণ দেশের জনগণের মাত্র ৪ শতাংশ। বড় অফিসারদের মাথায় তেল দিয়ে ক্ষমতা পোক্ত করতে গিয়ে সরকার বাকি ৯৬ শতাংশ লোকের কথা ভাবছেন না।” ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে সরকার সমস্যার সমাধান না করে প্রতিনিয়তই সমস্যার সৃষ্টি করছেন বলে দাবি করেন সিপিবির সভাপতি বলেন, ঢাকা শহরে শুধু রাজনৈতিক সমস্যাই নয়, বাসাভাড়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষ। সাধারণ মানুষের বেতন বাড়বে না, অথচ সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে।” সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে সেলিম বলেন, “জনগণের স্বার্থে আঘাত হানলে দেশের মানুষকে সাথে নিয়ে প্রয়োজনে সারা দেশ অচল করে দেয়া হবে।” ‘বিএনপি-আওয়ামী লীগের লড়াই দেশের জন্য নয়, ক্ষমতার জন্য। দেশের মানুষকে শোষণ করতেই তারা আজ কামড়া-কামড়ি করে দেশকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে’ বলেও মন্তব্য করেন সিলিম। দেশের বর্তমান পরিস্থিতির দায় খালেদা জিয়া এড়াতে পারেন না মন্তব্য করে সিপিবির এ নেতা বলেন, “সাংবিধানিকভাবে আপনার আন্দোলন করার অধিকার থাকলেও মানুষ মারার কোনো অধিকার নেই।” সমাবেশে আরো বক্তব্য দেন সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু জাফর আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য আহসান হাবীব, ঢাকা কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আশরাফ হোসেন আশু প্রমুখ।

‘মানুষ হত্যার দায় দুই দলকে নিতে হবে’

রাজনীতির নামে দেশে সাধারণ মানুষ হত্যার মহোৎসব চলছে বলে মন্তব্য করেছেন গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার। তিনি বলেছেন, এসব হত্যাকান্ডের জন্য সরকার ও ২০ দলীয় জোটকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। শুক্রবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘরের সামনে সন্ত্রাস বিরোধী আলোক মিছিল ও কামরুজ্জামানের রায় কার্যকরের দাবিতে গণজাগরণ মঞ্চের একাংশের গণঅবস্থান কর্মসূচি পালনকালে এসব কথা বলেন তিনি। পরে ওই অংশের কর্মীরা হরতাল-অবরোধের নামে চলমান সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাস বিরোধী আলোক মিছিল বের করেন। মিছিলটি শাহবাগ থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে শহীদ মিনার ঘুরে পুনরায় শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। এদিকে, হরতাল-অবরোধের নামে দেশব্যাপী সন্ত্রাসের প্রতিবাদে জাদুঘরের সামনে সমাবেশ ও মিছিল করেছে গণজাগরণ মঞ্চের আরেকটি অংশ। মঞ্চের অন্যতম সংগঠক কামাল পাশা চৌধুরীর নেতৃত্বে সমাবেশ শেষে একটি সাদা পতাকা মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ঘুরে পুনরায় শাহবাগ গিয়ে শেষ হয়। ইমরান বলেন, ৫ই জানুয়ারির পর দেশে নতুন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। রাজনীতির নামে দেশে মানুষ হত্যার মহোৎসব চলছে। বাসে আগুন দিয়ে, পেট্রোল বোমা মেরে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। মানুষ ঘর থেকে বের হলে আর ফিরতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কার মধ্যে থাকে। আমরা এক ভয়ানক পরিস্থিতি অতিবাহিত করছি। তিনি বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তা দিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তাদের বেষ্টনীর মধ্যে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। যারা হত্যা করছে তাদের গ্রেফতার করাও সম্ভব হচ্ছে না। নিরীহ মানুষকে হত্যা করার পর দুই বড় রাজনৈতিক দল নতুন নাটক সাজাচ্ছে, বিবৃতি দিয়ে একে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। এসময় তিনি চলমান সন্ত্রাস রুখতে আগামী মঙ্গলবার দেশব্যাপী সন্ত্রাস বিরোধী গণঅবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ঐদিন বিকাল তিনটায় শাহবাগে গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।

বার্ন ইউনিটের রাজনীতি

তানজিমুল হক (অয়ন)
লেখক ও বিবিসিতে কর্মরত সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান। দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ১৬ই জানুয়ারি তিনি ফেসবুকে লিখেছেন- গত ১০ দিনের সহিংসতায় মারা গেছেন ২৩ জন। তার মধ্যে ১৭ জনই নিরীহ মানুষ যারা আমার ও আপনার মতো মানুষেরই স্বজন কিম্বা আত্মীয়। এই পরিস্থিতিতে পুলিশ র্যাব বিজিবি সবাই নানা রকমের হুমকি (গুলি) দিচ্ছে। যদিও এসব বাহিনীর হুমকি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, এরা এমনিতেই গুলি করে, চোখ বেধে অজ্ঞাত (ওরা জানে, আমরা জানি না) স্থানে নিয়ে যায়, ওষুধ দিয়ে চেতনা নাশ করে, তারপর হত্যার পর পেট কেটে নদীতে ডুবিয়ে দেয়। আমাদের ভাগ্য ভালো হলে তাদের লাশ নদীর ওপরে কচুরিপানার নিচে খুজে পাই। না হলে অপেক্ষায় (ভুয়া আশা নিয়ে) থাকতে হয় সারা জীবন। আজ সকালে ভাবছিলাম দেশে যে সমস্যার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি বাহিনীগুলো এধরনের হুমকি দিচ্ছে সেটা কি আইন শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা? এটাতো সবাই জানে যে এই সমস্যা হচ্ছে রাজনৈতিক। তাহলে ওষুধ দিতে হবে রাজনীতির যে স্থানে জীবাণুর সংক্রমণ হয়েছে সেখানে। গুলি করে ভয় দেখিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে কিছুটা শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে কিন্তু সেই শান্তি কি স্থায়ী হবে? ধরা যাক এখন যে অবরোধ চলছে সেটা কদিন পর এমনিতেই নিস্তেজ (কদিন আর দম থাকবে বিরোধীদের) হয়ে আসবে, কিন্তু এই হানাহানির কি অবসান ঘটবে? আজ যদি ওরা ঘরে ফিরে যায় আবার কয়েকদিন পর কি তারা শক্তি সঞ্চয় করে ফিরে আসবে না? গত বছরের ৫ই জানুয়ারি কি হয়েছে আমরা জানি। এবছরের ৫ই জানুয়ারি কি হয়েছে সেটাও আমরা জানি। তাহলে আগামী বছরের ৫ই জানুয়ারি কি আবার এতোগুলো নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটবে? আমরা জানি ঘটবে। এটা জানার জন্যে জ্যেতিষি হওয়ার দরকার হয় না। আমরা জানি এই সঙ্টকের কারণও রাজনৈতিক। এটা জানার জন্যে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বা টকশোবিদ হতে হয় না। তাই আপনারা এর গোড়ার দিকে তাকান। ওখান থেকে জীবাণুটা দূর করেন। মন্ত্রীরা, সরকারি দলের রাজনীতিকরা বার্ন ইউনিটে যাচ্ছেন। পোড়া মানুষের ছবি প্রচার করছেন আর বলছেন দেখুন ওরা কতো খারাপ। ওরা যে খারাপ সেটা নিয়ে কারো সন্দেহ নেই। খারাপ না হলে ওরা নিজেদের বাপ মা ভাই বোনকে পেট্রোলের আগুনে এভাবে পোড়াতে পারে না। কিন্তু আপনারা কি ভালো? একবার ভেবে দেখুনতো ওই বার্ন ইউনিটের পেছনে কি কারণ? আজ পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া এই মানুষগুলো কি কারণে মৃত্যুর মুখোমুখি?

‘বিএনপির সফলতা বার্ন ইউনিটের আহাজারি’

দেশব্যাপী চলমান নাশকতা, নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস বন্ধের জন্য বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সংগঠনের নেতারা বলেছেন, বিএনপি বলছে তাদের আন্দোলন সফল। এই সফলতা মানে বার্ন ইউনিটে মানুষের আহাজারি। অচিরেই এই নৈরাজ্য বন্ধ না হলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ার আহ্বান জানিয়েছেন সংগঠনটির নেতারা। আজ শুক্রবার বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ কর্মসূচি থেকে এ আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ। তিনি বলেন, ‘বিএনপি–জামায়াত জোট গণতন্ত্রের নামে আজ মানুষ হত্যার উৎসবে নেমেছে। তারা আজ মানুষ পুড়িয়ে, বাসে আগুন দিয়ে নাশকতা শুরু করেছে। আমরা এই নাশকতার তীব্র নিন্দা জানাই।’
গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘৭১–এ জামায়াত তাণ্ডব চালিয়েছে পিডিপি-মুসলিম লীগকে সঙ্গে নিয়ে। আর আজকে তারা একই কাজ করছে বিএনপিসহ ২০-দলকে নিয়ে। স্বাধীনতার ৪৪ বছর পর নামগুলো খালি বদল হয়েছে কিন্তু তাদের সেই সহিংসতা বন্ধ হয়নি।’ দেশের সব জেলায় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ কর্মসূচি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ২৭ জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাসে নিহত লোকজনের স্মরণে দেশের সব জেলা-উপজেলার শহীদ মিনারে মোমবাতি প্রজ্বালন করা হবে জানিয়ে গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘ওই দিন আমরা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শপথ নেব।’
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘কোনো একটি রাজনৈতিক দলের একার পক্ষে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের সবাইকে এই সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।’
নাট্যকার রামেন্দু মজুমদার বলেন, ‘আজকে যারা অবরোধ করছেন তারা বার্ন ইউনিটে যান, দেখেন আপনাদের আন্দোলনের সফলতা। এভাবে দেশে সন্ত্রাসের রাজত্ব চলতে পারে না। এটি বন্ধ করতে হবে। তবে কেবল সরকারের পক্ষে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়, এ জন্য জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে।’
শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক লিয়াকত আলী বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি, যারা চিন্তা চেতনায় এ দেশের নয়, তারাই আজকে সন্ত্রাস করছে। তারাই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে লাখ লাখ মানুষকে জিম্মি করেছে। ঐক্যবদ্ধভাবে এই অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতে হবে ।
অভিনেতা ইনামুল হক বলেন, ‘একাত্তরের যারা পরাজিত শক্তি তারাই আজকে মানবতা লুণ্ঠন করছে। আমাদের সেই মানবতা রক্ষা করতে হবে।’
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাবেক সভাপতি নাট্যকার নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘পেট্রলবোমায় মায়ের বুক খালি হয়ে যাবে, এমন দেশ তো আমরা চাইনি। সরকারের কাছে অনুরোধ, কঠোর হাতে পরিস্থিতি দমন করুন।’ জোটের সাধারণ সম্পাদক হাসান আরিফ বলেন, ‘২০১৩ সালেও আমরা প্রতিরোধ গড়েছিলাম। এই বাংলাদেশ পিছু হটতে জানে না। যারা আজকে সন্ত্রাস করছে, তাদের সমূলে নির্মূল করা হবে। এ জন্য মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব শক্তিকে এক হতে হবে।’
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন নাট্যকার আতাউর রহমান, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি সারওয়ার আলী, পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব কামরুল হাসান, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ঝুনা চৌধুরী, পথনাটক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান খান, গণসংগীত শিল্পী সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ফকির আলমগীর, নাট্যশিল্পী সংসদের যুগ্ম সম্পাদক নাদের চৌধুরী, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সহসভাপতি বেলায়েত হোসেন প্রমুখ।
বেলা তিনটা থেকে শুরু হওয়া এ অনুষ্ঠান সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অবধি চলে। আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে দেশের গান ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন উদীচি, ক্রান্তি শিল্পগোষ্ঠী, সংহতিসহ আরো কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীরা। অনুষ্ঠানে গত কয়েক দিনের সহিংসতায় নিহত লোকজনের স্মরণে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়।

আমার ইউরোপনামা by সোহেল পারভেজ

আমি যখন নেদারল্যান্ডসে স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি পাই, তখন আমার প্রবাসজীবন সাড়ে তিন বছরের। খুব বেশি দিন নয়, কিন্তু আমার কাছে মনে হতো অনন্তকাল ধরে আমি দেশছাড়া! চক্ষুলজ্জার অনেক কিছুই তখনো আমার চরিত্রে বিদ্যমান ছিল। তখনো কোনো বাঙালির বাসায় গেলে যদি খেতে বলত, আমি খিদে নিয়েও বলতাম, খিদে নেই, খাব না! কেউ আমাকে দ্বিতীয়বার খেতে বলেছে বলে মনে পড়ে না! সাধাসাধি তো পরের কথা। শুধু মনোয়ার ভাইয়ের স্ত্রী শাম্মী আপা জিজ্ঞেস না করে টেবিলে খাবার দিয়ে সরাসরি এসে বলেছেন, ভাই, খেতে আসেন! তাঁর বলার মধ্যে আন্তরিকতা এত বেশি মাত্রায় ছিল যে, না বলার কথা মনেই আসেনি। জানি না তিনি এখনো সে রকম আছেন কি না? তাঁরা আরও ভালো জীবন যাপন করতে ইংল্যান্ড চলে গেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। আমার স্ত্রী দেখি বাসায় কেউ এলে এরকম করে বলে! ভালো লাগে তখন আমার খুব। যদিও চক্ষুলজ্জা কোনো কাজের কিছু নয়। তবুও আমার মধ্যে বেশ ভালোভাবেই তা ছিল অনেক দিন। আজ আর নেই! নিজেকে বরং অনেক ক্ষেত্রে বেশি চাঁছাছোলা মনে হয় এখন। কিন্তু মজার কথা হলো, আমি আমার সেই চক্ষুলজ্জাওয়ালা সোহেলকে মাঝে মাঝে মিস করি। খারাপও লাগে! অকপটে সবকিছু বলতে পারাই যে কারও জন্য মঙ্গলজনক। তাই উচিত হয়তো। কিন্তু নিজের ক্ষেত্রে সত্যি আমার মনে হয় ওরকম খানিকটা লাজুক লাজুক থাকতে পারলেই ভালো হতো, এর পক্ষে ভালো কোনো যুক্তি আমি দিতে পারছি না, শুধু নিজে অনুভব করি অনুভূতিটা জানি না বোঝাতে পারলাম কি না৷ বোঝাতে পারতেই হবে এমন তো না৷ এগুলো তো একান্তই নিজস্ব অনুভূতি! জীবনের কঠিন বাস্তবতা আমার থেকে কেড়ে নিয়েছে মনের সৌন্দর্যটুকু পর্যন্ত! প্রবাসজীবন কী করে মানুষের সুকুমার বৃত্তিগুলো নষ্ট করে দেয়, আমার থেকে ভালো কেউ জানে না। হয়তো হেঁটে যাচ্ছি, কোনো কারণে আকাশের দিকে চোখ গেছে, দেখি মেঘমুক্ত ঝকঝকে নীল আকাশ! সুন্দর আকাশ থমকে দাঁড়িয়ে দেখার চোখ আজ আর আমার মধ্যে নেই! কোনো এক সময় ছিল, যে অনুভূতি আমি মনে করতে পারি না, কষ্ট লাগে খুব মাঝে মাঝে৷ এই কষ্ট শেয়ার করা যায় না৷ রেসিডেন্স হওয়ার আগে প্রতিদিন মনে হতো এই বুঝি আজই স্থায়ী হওয়ার চিঠি পাব মিনিস্ট্রি থেকে৷ লেটার বক্স খুলতাম দুরু দুরু বুকে৷ এমনি করে চলে গেছে সাড়ে তিনটি বছর। কাজেই এখন যাঁরা ওরকম চিঠি পাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন, আমি তাঁদের কষ্টটা বুঝি। রেসিডেন্স হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাথায় এল কখন দেশে যাব ৷ কিন্তু অফিশিয়াল ফরমালিটি শেষ করে টাকাপয়সা জোগাড় করতেও চলে যায় আরও বছর খানেক। ইউরোপের যে দেশগুলোতে সোশ্যাল সিকিউরিটি আছে অর্থাৎ আপনার কাজ না থাকলেও বেতনভাতা পাওয়ার বন্দোবস্ত আছে, নেদারল্যান্ডস এর মধ্যে অন্যতম। একটা দেশকে মানুষ যত সুন্দর করে গড়তে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ নেদারল্যান্ডস। ফুলের দেশ হিসেবে সবাই জানলেও সেই ফুল এখানে কী রকমভাবে আছে তা যিনি দেখেননি, তিনি বুঝবেন না। বেশির ভাগ লোক টিউলিপ গার্ডেনের ফটো বা ভিডিও দেখে মুগ্ধ হন। আসলে গোটা দেশটাই যেন ফুলে ফুলে মোড়ানো! মানুষ, ঘরবাড়িগুলো পর্যন্ত ফুলেল৷ যদিও বছরের প্রায় অর্ধেক শীতকাল থাকায় ওই সময়টাতে পথে-ঘাটের ফুলগুলো থাকে না। ফুল থাকবে কীভাবে? চারদিকে শুধু বরফ আর বরফ৷ এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে টিউলিপ গার্ডেন দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয় মে মাসের ২১ তারিখ পর্যন্ত। সেটা দেখার মতোই জিনিস একটা৷ সাধারণত যেকোনো সুন্দর দৃশ্যের ছবি তুললে, ছবিতে জায়গাটাকে বাস্তবের চেয়ে সুন্দর দেখায় বা লাগে৷ কিন্তু আমার জীবনে দেখা এইটিই একমাত্র জায়গা, যা ছবির চেয়ে বাস্তবে অনেক বেশি সুন্দর৷ যে জায়গাটাতে টিউলিপ গার্ডেন অবস্থিত তার নাম লিস, ওই এলাকার মানুষ অনেক আগে থেকে ফুলচাষি এবং ওখানকার মাটি হলো টিউলিপের জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী, দেশের অন্য জায়গার চেয়ে।
আমি রেসিডেন্স কার্ড পাওয়ার কয়েকদিন পর বাল্যবন্ধু টিপু তার ইতালির মাস তিনেকের সংসার গুটিয়ে আমার কাছে চলে আসে৷ যেদিন সে আসে, সেদিনের কথা কোনোদিন ভুলব না৷ প্রায় চার বছর দেশছাড়া৷ ইউরোপের অন্য দেশে আত্মীয়স্বজন থাকলেও তাদের সঙ্গে আমার তখনো দেখা হয়নি। সেই হিসেবে টিপু প্রথম প্রিয়জন, যাকে এত দিন পর কাছে থেকে দেখব৷ দেশে ফেলে আসা প্রিয়জনদের কাউকে গায়ে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখতে পারব, এরকম ভাবনাতেই আমি আগের রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পর্যন্ত পারিনি! দুপুর বেলা হল্যান্ড স্পুর নামে হেগ শহরের একটা স্টেশনে টিপুর এসে নামার কথা। তালিস, ফ্রান্সের একটা অত্যাধুনিক ট্রেনে করে তার আসার কথা৷ খানিকটা টেনশনেও ছিলাম৷ কারণ টিপুর সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার মতো বৈধ কাগজপত্র ছিল না। ভাগ্যের সহায়তা ছাড়া কোনো গতি নেই! একসময় তালিস এসে থামল এবং আমাকে অবাক করে দিয়ে আমাদের সবার প্রিয় টিপু হেলেদুলে নেমে এল৷ আহা! প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে এত দিন পর দেখা, আবেগতাড়িত না হওয়া বরং অস্বাভাবিক! মাঝে কিছুদিন বাদ দিয়ে সেই থেকে টিপু আমার সঙ্গেই থেকেছে স্ত্রী আসা পর্যন্ত। রেসিডেন্স হওয়ার পরপরই হেগ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরের ছোট একটা গ্রাম ওয়ের্ডেনে আমাকে বাসা দেওয়া হয়৷ যেদিন প্রথম বাসাটা দেখতে যাই, তখন শীতকাল৷ বরফ পড়ে চারদিক সাদা হয়ে আছে৷ আমার জন্য বরাদ্দ একতলা ছোট ধরনের বাসাটি বরফের নিচে একরকম চাপা পড়েছিল বলা যায়! এমনিতেই স্নো পড়ছে তো পড়ছেই, তার মধ্যে ওটা একটা খালি বাসা৷ বেশ কিছুদিন ওই বাসার হিটিং সিস্টেম কাজ করেনি৷ ছাদে বিশাল বরফের চাঁই হয়েছিল। তখন দুপুর ১২টা একটা হবে কিন্তু ওই বাসার আশপাশের ঘরবাড়ি, রাস্তা একেবারে জনশূন্য! আমি আর ওখানকার পৌরসভার, যিনি আমাকে বাসা বুঝিয়ে দিতে এসেছিলেন, তিনি ছাড়া কেউ নেই! হঠাৎ আমার মন ভীষণ খারাপ হলো, এরকম জনমনুষ্যহীন জায়গায় থাকব কী করে? যত দিন এ দেশে আছি, বড় শহরে দুনিয়ার মানুষের মাঝে থাকতাম আমি৷ হঠাৎ নির্জনতা তো ভালো লাগার কথাও নয়! পৌরসভার ভদ্রলোক চলে যাওয়ার পর আমি হতভম্ব হয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম৷ পরে হেগে ফিরে গিয়ে যেখানে ছিলাম, সেখানেই থাকি৷ ভাবটা এমন যেন ওয়ের্ডেনে আমি বাসা নিইনি! এক মাস চলে যাওয়ার পর হঠাৎ মনে হলো আরে, ওই বাসার ভাড়া তো দিতে হবে, চিঠিপত্র যা আসার তা ওই ঠিকানায় আসবে৷ কারণ ওটা তখন আমার অফিশিয়াল ঠিকানা। পরে টিপুকে নিয়ে চলে গেলাম থাকতে ওয়ের্ডেন। সে এক স্বপ্নের গ্রাম যেন! ছবির মতো সুন্দর! ওখানকার প্রায় প্রতিটি বাড়ির সামনে-পেছনে ফুলের বাগান আছে। তবে আমার ধারণা, সারা দুনিয়াতেই গ্রামের মানুষগুলো শহরের মানুষদের চেয়ে বেশি সহজ-সরল ও প্রাণবন্ত! ওয়ের্ডেন গ্রামটিতে ওই সময় মানে ২০০১ সালে ১৫ হাজার মানুষ বাস করত৷ অনেকেই আমাদের চিনত৷ কারণ হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র বিদেশি থাকত ওখানে। আর যে এরিয়াতে আমাদের বাসা, ওখানকার সব লোক দেখা হলে হাই, হ্যালো ছাড়াও বাড়তি সৌজন্যতা দেখাত। একটাই সমস্যা, তা হলো সন্ধ্যা ছয়টার পর ওখানে মনে হয় একটা ভূত দেখা যায় না! মানুষ দেখব কি? আমার স্ত্রী ২০০৩ সালে প্রথম দেশ থেকে এসে এই বাসাতেই উঠেছিল৷ আমি সকালে কাজে চলে যেতাম৷ সন্ধ্যায় ফিরতাম। স্ত্রীর সময় কাটানোই ছিল তখন প্রধান সমস্যা! তার মধ্যে সে কেবল বাংলাদেশ থেকে এসেছে৷ ভাষা জানে না, কালচার জানে না—ভয়ে সে বাসার ভেতর বসে থাকত, বুঝতাম মাঝে মাঝে কান্নাকাটিও করত৷ স্থায়ী হওয়ার আগে একটা কাপড় ঝোলানো হ্যাঙ্গার ফ্যাক্টরিতে কাজ করতাম, রেসিডেন্স কার্ড না হলে নেদারল্যান্ডসে বৈধভাবে কাজ করা যায় না৷ আগের সাড়ে তিনটি বছর এভাবেই লুকিয়ে লুকিয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে হয়েছে। কন্ট্রোলের ভয়ে কেউ অবৈধভাবে কাজ দিতে চায় না। সরকার জানতে পারলে যিনি কাজ দিয়েছেন, তাঁকে অনেক জরিমানা করে৷ ওই সময়টাতে কত অদ্ভুত কাজ যে করেছি তার ইয়ত্তা নেই৷ বেশির ভাগ সময় রাতে ম্যাকডোনাল্ডস বা বার্গার কিং ক্লিনিং করতে হয়েছে। একটা নির্দিষ্ট লেভেল পর্যন্ত ক্লিন না থাকলে পরের দিন সকালে ওই সব ফাস্ট ফুড ওপেন করতে পারবে না। কখনো দুজন, কখনো তিন-চারজন মিলে রাতে ক্লিনিং করতাম৷ রাত ১২টায় শুরু করে ভোর চার-পাঁচটা পর্যন্ত কাজ করতে হতো। কিন্তু কাজ শেষ হলেও বাসায় যাওয়ার উপায় ছিল না৷ সকাল আটটায় ম্যানেজার এসে সব ঠিকমতো ক্লিন আছে কি না দেখে ওকে করলেই বাসায় যাওয়া যেত। একজন চালক ছিল, যার কাজ ছিল আমাদের ওই সব রেস্টুরেন্টে রাতে নামিয়ে দিয়ে যাওয়া৷ সকাল সাড়ে আটটার দিকে আবার এসে সবাইকে তুলে যার যার বাসার সামনে ড্রপ করে দেওয়া। বেশ কয়েকটা ক্লিনিং কোম্পানির অধীনে কাজ করেছি। একবার মাস তিনেক কাজ করেছিলাম হেগ থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার দূরের ছোট একটা শহরে। ওই সময়টা কষ্ট গেছে খুব! রাত ১২টায় কাজ শুরু করার জন্য আমাকে ১০টার ট্রেন ধরতে হতো। কাজ খুব কঠিন ছিল না৷ ওখানে আবার ম্যানেজারের জন্য অপেক্ষা করতে হতো না৷ আমার সঙ্গে আর একজন ছিলেন ইন্ডিয়ান, নাম বলবীর৷ তিনি ওই ছোট শহর ব্রেডাতেই থাকতেন। রাত ১০টায় ওই রেস্টুরেন্ট বন্ধ হতো এবং বলবীর ভাই তখনই কাজ শুরু করে দিতেন আগেভাগে বাসায় চলে যাওয়ার জন্য। রাত তিনটা সাড়ে তিনটার মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যেত। বলবীরের কাছে চাবি থাকত৷ কাজ শেষে এক মিনিটও দেরি না করে উনি অ্যালার্ম সেট করে বাড়ি চলে যেতেন। আমি হেঁটে হেঁটে স্টেশনে যেতাম। নেদারল্যান্ডসে প্রতি রাতে শহরভেদে রাত ১২টা-একটার মধ্যে সব ট্রেন স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়৷ কোনো কারণে কোনো ট্রেন লেট থাকলে ওটা পরে এলে যাত্রীরা নেমে বের হয়ে যেতে পারেন৷ স্টেশনে ঢোকা যায় না সকাল ছয়টা পর্যন্ত। ছয়টার পর স্টেশনের গেট অটোমেটিক খুলে যায়। আমাদের দেশের যাঁরা জানেন না বা দেখেননি, তাঁরা সিস্টেমটা চিন্তাও করতে পারেন না৷ কারণ দেশে গেলে অনেকেই এরকম প্রশ্ন করে যে এসব দেশে পার্ক বা ফুটপাতে রাত কাটিয়ে দিনে লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করা যায় কি না? এখানে পার্ক, ফুটপাত বা ট্রেন স্টেশনে রাত কাটানোর কোনো উপায় নেই। ওসব জায়গায় লুকিয়ে থাকতে গেলেও আপনাকে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ ধরে ফেলবে। অনেক সময় উইকএন্ডে লোকজন যদি বেশি মাতাল হয়ে রাস্তায় মাতলামি করে বা কোথাও অযাচিত বসে থাকে, তবে পুলিশ ধরে তাকে বাসায় দিয়ে আসবে এবং অতি অবশ্যই ওই মাতালের পকেটে জরিমানার টিকিট ঢুকিয়ে দেবে। তবে ভবঘুরেদের জন্য বড় শহরগুলোর স্টেশনগুলোতে খুবই অল্প পয়সায় রাত কাটানোর বন্দোবস্ত আছে৷ আড়াই ইউরো দিয়ে ওখানে রাতে ঘুমানো যায়, যেখানে বিছানা-বালিশ কিছুই নেই৷ শুধু ফ্লোরে ঘুমাতে হবে আপনাকে৷ রুমটা শীতাতপনিয়ন্ত্রিত এই যা৷ যিনি দেখেননি তাঁর জন্য বিষয়টা কল্পনা করাও খানিকটা মুশকিল।
যা-ই হোক ওই তিন মাস ছিল আমার সবচেয়ে কষ্টের সময়৷ প্রতিদিন আমি কাজ থেকে রাত চারটার দিকে স্টেশনের সামনে এসে দাঁড়াতাম, প্রচণ্ড তুষারপাতে জীবন শেষপ্রায়। স্টেশনের সামনে তখন টেলিফোন বুথ ছিল৷ এখন নেই বললেই চলে৷ কোনোমতে জ্যাকেট জড়িয়ে ফোন বুথে ঢুকে শীতের হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করতাম৷ আর কাঁদতাম! ভাবতাম, জীবনে পাপ ছিল তাই এই জীবন পেয়েছি৷ পুরা তিনটি মাস এভাবে কেটেছে৷ আর ওটা এমন একটা সময়, যখন ইউরোপে পরিচিত সবাই ঘুমে৷ দেশে ফোন করে কথা বলব? মোবাইল ফোন দিয়ে কথা বলতে গেলে দুই মিনিটেই সব টাকা শেষ হয়ে যাবে! তা ছাড়া ওই কষ্টের কথা মা-বাবাকে বললে কিছুই হবে না শুধু ওনারা কষ্ট পাবেন৷ এই কষ্ট তো আমি আমার মা-বাবাকে দিতে পারি না। আমার প্রিয় মুন্নি খালাম্মা থাকেন আমেরিকার সিয়াটলে৷ তাঁকে প্রতিদিন ওই সময় মিসড কল দিতাম৷ তিনি ফোন করে আমার সঙ্গে দেড় দুই ঘণ্টা কথা বলতেন৷ যেকোনো কষ্ট দূর করতেই সময়টা খুব বড় বিষয়৷ সময়তে কেউ আপনাকে পাঁচ টাকা দিয়ে সাহায্য করলে যে উপকৃত হবেন, অসময়ে পাঁচ লাখ দিলেও দেখা যাবে কাজে লাগছে না। আমি মুন্নি খালার কথা আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে মনে রাখব৷ স্টেশন খোলার আগের ওই দেড়-দুই ঘণ্টা ছিল আমার জন্য নরক! শুধু খালাম্মা ফোন করে আমাকে সাহস দিয়েছেন৷ আমি কষ্টের কথা বলতে বলতে প্রায় দিন কেঁদে ফেলতাম৷ উনিও কাঁদতেন আমার সঙ্গে৷ সহমর্মিতার কান্না৷ তাঁকে বলে রেখেছি, যদি কোনোদিন তাঁর দুঃসময় আসে, তবে যেন আমাকে স্মরণ করেন৷ আমি তাঁর জন্য জীবন লড়িয়ে দেব। কথার কথা না এটা, বাস্তবেই করব।

ইন্টারনেট থাকবে না!

গুগলের নির্বাহী চেয়ারম্যান এরিক স্মিড
ফেসবুকের শেরিল স্যান্ডবার্গ
মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা
ইন্টারনেট বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না এক সময়। ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সম্প্রতি এমনই মন্তব্য করলেন গুগলের নির্বাহী চেয়ারম্যান এরিক স্মিড। সুইজারল্যান্ডের দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক প্যানেলে তাঁকে ওয়েব নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করতে বললে তিনি বলেন, ‘আমি খুব সাধারণভাবে বলব, ইন্টারনেট হারিয়ে যাবে।’ এএফপির খবরে জানানো হয়, এরিক স্মিড বলেন, ‘এত বেশি আইপি (ইন্টারনেট প্রোটোকল) ঠিকানা থাকবে...এত বেশি যন্ত্র, সেন্সর ও পরিধেয় পণ্য থাকবে যার সঙ্গে মানুষ যোগাযোগ করবে যে ইন্টারনেটের প্রয়োজনবোধই হবে না।’
স্মিড ব্যাখ্যা করেন, ‘সব সময় মানুষের উপস্থিতির বিষয়টিকেই অনুষঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ধরা যাক, একটি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করা হলো যে ঘরটিই হলো বুদ্ধিমান। আমার অনুমতি সাপেক্ষে ঘরে ঢোকামাত্রই আমার ঘরের সব যন্ত্রপাতি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে যার যা কাজ তা শুরু করে দিল।’
স্মিড বলেন, ‘অত্যন্ত ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, অত্যন্ত যুগোপযোগী যোগাযোগে সক্ষম ও দারুণ মজাদার বিশ্ব আমাদের সামনে উঠে আসবে।’
এই প্যানেলে আলোচনার সময় এরিক স্মিড সার্চের বাজারে গুগলের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ক নিয়েও কথা বলেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন গুগলের এই বাজার আধিপত্যকে খর্ব করতে মামলা লড়ছে। গত বছরে গুগলের অন্যান্য ব্যবসাকে সার্চ ইঞ্জিন ব্যবসা থেকে পৃথক করার জন্য ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টে আলোচনা হয়।
‘দ্য ফিউচার অব দ্য ডিজিটাল ইকোনমি’ নামের এই প্যানেলে উপস্থিত ছিলেন ফেসবুকের প্রধান পরিচালনা কর্মকর্তা শেরিল স্যান্ডবার্গ। শেরিল স্যান্ডবার্গ বলেন, ‘প্রযুক্তি বিশ্ব এখন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে সবাই চাকরি নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু প্রযুক্তি শুধু এই শিল্পেই চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করছে না; বরং এর বাইরেও কর্মক্ষেত্র বাড়াচ্ছে।’
প্রযুক্তির কারণে চাকরির সুযোগ নষ্ট হচ্ছে কি না—সে বিষয়টি নিয়ে স্মিড বলেন, ‘এই বিতর্ক শত শত বছর ধরেই চলছে। যখন ট্রাক্টর এল তখন অনেকেই হালচাষ ছেড়ে দিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান এনে দিতে পেরেছিল। বৈশ্বিক সমস্যার সমাধান মানেই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হওয়া। ’
সবার ব্যক্তিগত মত আছে
এ বছর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের অন্যতম একটি আলোচনার বিষয় ছিল বৈশ্বিক সমৃদ্ধির ফল কীভাবে বণ্টন করা হবে সে বিষয়টি। বৈশ্বিক সমতা বিধানে বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলোর সংযোগ-সুবিধা কাজ লাগতে পারে বলে মত দেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।
মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা বলেন, ‘প্রযুক্তির সব রকম সুবিধা কী সবার মধ্যে ছড়ানো গেছে? সবার কাছে প্রযুক্তি সুবিধার বিষয়টি আগে আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।’
সত্য নাদেলা আরও বলেন, ‘আমি অবশ্য এ বিষয়ে আশাবাদী, কারণ এতে কোনো সন্দেহ নেই। যদি প্রযুক্তি ব্যবসা করতে হয়, তবে আশাবাদী হতেই হবে। আমার মনে হয়, আগে মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি মানুষকে দারুণ কিছু করার যথেষ্ট ক্ষমতাশালী করে তোলে।’
শেরিল স্যান্ডবার্গ বলেন, ‘ইন্টারনেটের আদি যুগে ইন্টারনেট ছিল লুকিয়ে-চুরিয়ে ব্যবহারের জিনিস। কিন্তু এখন প্রত্যেকেই সবকিছু নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিচ্ছেন, সবার জন্য দৃশ্যমান করে দিচ্ছেন। এখন সবার নিজস্ব একটি মত রয়েছে। সবাই এখন পোস্ট করতে পারে। শেয়ার করতে এবং কোনো বিষয়ের ওপর তাঁদের মন্তব্যের মাধ্যমে মতামত জানাতে পারে, যা আগে কখনো সম্ভব হয়নি।’
স্মিড বলেন, ‘এখন কোনো দেশের পক্ষেই ব্যাংকিং, যোগাযোগ, নৈতিকতা ও মানুষের যোগাযোগের বিষয় চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এখন আর কাউকে এই সংযোগ-সুবিধার বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা সম্ভব নয়। এটা কোনোভাবেই কাজ করবে না।
শেরিল স্যান্ডবার্গ বলেন, ‘এখন মাত্র ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে যাওয়াতে এই অবস্থা। আমরা ৪০ শতাংশের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে যদি এ অবস্থায় আসতে পারি বাকি ৫০, ৬০ বা ৭০ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া কঠিন কিছু নয়। মাত্র দুই দশকের ইন্টারনেট অগ্রসরতায় যদি এই যুগান্তকারী পরিবর্তন আসে, তবে ইন্টারনেটের সম্ভাব্যতা ও প্রবৃদ্ধি আরও চমৎকার হবে—এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়।’

কেমন হবেন নতুন সৌদি বাদশাহ?

(নতুন সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ। ছবি: এএফপি) সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহর মৃত্যুর পর তাঁর সৎভাই সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ (৭৯) দেশটির নতুন বাদশাহ হয়েছেন। নতুন বাদশাহ কেমন হবেন, তা নিয়ে এর মধ্যে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। তাঁর ব্যক্তিজীবন, কর্মজীবন ও ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে অনেকেরই বেশ কৌতূহল।  এএফপির খবরে জানানো হয়, প্রায় ৫০ বছর রিয়াদের গভর্নর ছিলেন সালমান। এই সময়ের মধ্যে রিয়াদে ব্যাপক সংস্কারসাধনের কৃতিত্ব রয়েছে তাঁর। আবদুল্লাহর মতো সালমানও নম্র স্বভাবের। কঠোর নিয়ম অনুসরণ, পরিশ্রমী ও নিয়মানুবর্তিতার জন্য তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে। রাজ পরিবারের কয়েক শ যুবরাজের দেখভালে তিনি দক্ষতা দেখিয়েছেন। পিঠে অস্ত্রোপচারের পর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাঁকে নিয়ে কিছুটা উদ্বেগ ছিল। আবদুল্লাহর মতো তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। কিন্তু আবদুল্লাহর শারীরিক অসুস্থতার কারণে তাঁর কর্মকাণ্ড ততটা প্রচার পায়নি।
১৯৩৫ সালর ৩১ ডিসেম্বর জন্ম নেওয়া সালমান সৌদি আরবে রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল আজিজ বিন সৌদের ২৫তম সন্তান। তাঁর মা হাসসা বিন আহমেদ আল সৌদারির সাত সন্তানের অন্যতম সালমান। তেলসমৃদ্ধ সৌদি আরবের বাদশাহ হওয়ার পর আবদুল আজিজের ষষ্ঠ সন্তান তিনি। মাত্র ২০ বছর বয়সে সালমান রিয়াদ প্রদেশের গভর্নর হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তাঁকে রিয়াদের উন্নয়নের স্থপতি হিসেবে মনে করা হয়। জেদ্দার সঙ্গে ঐতিহাসিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে তিনি মরুময় রিয়াদকে একটি আধুনিক নগরে পরিণত করেন। তিনি আল সৌদ পরিবারের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর অন্যতম মধ্যস্থতাকারী। একই সঙ্গে নাগরিক চাহিদার দিকে নজর রাখেন। সততা ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির জন্য তাঁর সুখ্যাতি রয়েছে।
২০১১ সালে ভাই প্রিন্স সুলতানের মৃত্যুর পর সালমান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১২ সালে রাজ প্রাসাদে তাঁর পূর্বের উত্তরসূরি প্রিন্স নাইফের মৃত্যুর পর তাঁকে পরবর্তী বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর তিনি পাশ্চাত্য ও এশিয়ার অনেক দেশ সফর করেছেন। বিদেশি সহযোগীদের সঙ্গে তিনি ইতিমধ্যে শক্ত বন্ধন গড়ে তুলেছেন। এতে বাদশাহ হওয়ার পর তিনি পাশ্চাত্যের নীতি নির্ধারকদের কাছে প্রিয়ভাজন হতে পারেন।
বাদশাহ সালমান আলোচনার ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাধ্যমে তিনি সমস্যা সমাধানে পছন্দ করেন বলে জানান জেদ্দাভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্য কৌশলগত অধ্যয়ন ইনস্টিটিউটের পরিচালক আনোয়ার এশকি। তিনি জানান, সালমান সংস্কারের পক্ষপাতী। তিনি অভ্যন্তরীণ আইনের আধুনিকায়ন করতে চান। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তিনি বাদশাহ আবদুল্লাহর পথই অনুসরণ করবেন। রাজপরিবারের অনেক তরুণ প্রিন্সকে সালমান শাস্তি দিয়েছেন, এ কারণে সবাই তাঁকে ‘শ্রদ্ধা ও ভয়’ করেন। ব্যক্তিজীবনে প্রিন্স সালমান তিনটি বিয়ে করেছেন। তাঁর ১০ ছেলের দুজন মারা গেছেন। এ ছাড়া তাঁর এক মেয়ে রয়েছে।

‘হাত পুড়াইছে, মাইয়্যারে কোলে নিতে পারি না’ by কমল জোহা খান

‘বোমা মাইর‌্যা ওরা আমার হাত পুড়াইছে। মাইয়্যারে কোলে নিতে পারি না।’ সাড়ে তিন বছরের মার্জানকে কাছে না পাওয়ার আকুতি এভাবেই জানান ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন মা রেশমা বেগম (৩০)। ফুটফুটে শিশুকন্যা ও স্বামী মাহবুব আলমের সঙ্গে ২০ জানুয়ারি রাতে ঢাকা থেকে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাড়ি বরিশালের কলাপাড়ায়। রাজধানীর গোড়ানে রয়েছে তাঁদের সাজানো সংসার। মাহবুব প্রাইভেট কার চালান। রেশমা সামাল দেন সংসার। ১৪ বছরের ছেলে আবদুর রহমানকে বোনের বাসায় রেখে রওনা দেন তাঁরা গ্রামের বাড়ির দিকে। পারিবারিক কাজে যাচ্ছিলেন।
হরতাল-অবরোধের আতঙ্ক নিয়েই সায়েদাবাদ থেকে আবদুল্লাহ পরিবহনের বাসে চড়েন রেশমা-মাহবুব। তবে বরিশাল পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি তাঁদের। কিন্তু রাত সাড়ে ১২টার দিকে বরিশাল শহর পার হওয়ার পরই নেমে আসে দুর্ভোগ। এ সময় বাসের বাঁ পাশে পড়তে থাকে একের পর এক পেট্রলবোমা। জানালার পাশে বসে থাকা রেশমার বাঁ হাতে আঘাত করে বোমা। তাঁর গায়ে জড়ানো চাদরে আগুন ধরে যায়। পাশে মাহবুব নিজের প্রাণের মায়া না করে জড়িয়ে ধরেন মেয়ে মার্জানকে। হুড়মুড় করে বেরিয়ে আসেন বাইরে। জীবন বাঁচানোর সেই সংগ্রামের কথা বলার সময় আতঙ্ক ফুটে ওঠে রেশমার চেহারায়।
রেশমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটার পর একটা বোমা আইস্যা পড়ছিল। তাই বাসের জানালার কাচ ভাঙা ছিল। ভাঙা জানালা দিয়াই লাফ দেই।’
স্বামী মাহবুবেরও বাঁ হাতের পুরো কবজি ঝলসে গেছে। কিন্তু যন্ত্রণায় কাতর রেশমা-মাহবুব আগলে রাখেন মেয়ে মার্জানকে। আহত এই দুজনকে পুলিশ বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে দুদিন তাঁদের চিকিৎসা চলে। হাতে ব্যান্ডজ নিয়ে মেয়ে মার্জানকে নিয়ে কনকনে শীতের মধ্যে লঞ্চে করে আজ ভোরে তাঁরা ঢাকায় চলে আসেন। সকালে তাঁরা ভর্তি হন ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটে। প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় নিজেদের ভাগ্যবান মনে করছেন মাহবুব ও রেশমা। বার্ন ইউনিটে বোনের স্বামী মোজাম্মেলের কোলে ঘুমিয়ে থাকা মার্জানকে দেখছিলেন আর রেশমার দুই চোখ ভিজে যাচ্ছিল।
মেয়ের দিকে তাকিয়ে রেশমা বলেন, ‘ছেলেরে আমাদের লগে লই নাই। থাকলে আল্লাই জানে কী হইত! দুই দিন মাইয়্যারে কোলে নিতে পারি নাই। বরিশালে ওরে দেখমু, না আমাগো চিকিৎসা করামু—বুঝতে পারছিলাম না।’
অবশ্য মাহবুবের কণ্ঠে ছিল ক্ষোভ। তিনি বলেন, ‘এই অবস্থার কি সমাধান হইব, জানি না। তবে আমাদের চিকিৎসা যেন ভালো হয়।’ ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা পার্থ শংকর পাল জানান, রেশমা-মাহবুব এখন শঙ্কামুক্ত। রেশমার বাঁ হাতের ৩ শতাংশ এবং মাহবুবের ১ শতাংশ পুড়ে গেছে। তবে ক্ষত সারতে সময় লাগবে।

সেন্সরশিপ নয়, নৈতিক দায়িত্ববোধ

গণমাধ্যমের ওপর নতুন করে সেন্সরশিপ আরোপ করা হচ্ছে খালেদা জিয়ার এমন মন্তব্য নাকচ করে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ বলেছেন, এটা কোন সেন্সরশিপ নয়। পৃথিবীর কোন সভ্য দেশে নেতিবাচক খবর প্রচার করা হয় না। এটা চাপিয়ে দেয়া নয়, এটা সমাজের প্রতি নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকে করা। নেতিবাচক সংবাদ সম্প্রচার করলে সন্ত্রাসীরা উৎসাহ পায়। সন্ত্রাসীরা যাতে উৎসাহিত না হয় সেজন্য নেতিবাচক খবর প্রচার করবে না বলে কথা দিয়েছে টেলিভিশন মালিকরা। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টায় নিজ বাসভবনে দলীয় কর্মীদের সাথে মতবিনিময় শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, এটার মধ্যে সেন্সরশীপ হলো কিভাবে? কোন সেন্সরশীপ আরোপ করা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। বেগম খালেদা জিয়ার এসবের (সেন্সরশীপ) ব্যাপারে জ্ঞানের ঘাটতি আছে। উনাকে কেউ মিথ্যা বুঝিয়ে এসব কথাবার্তা বলাচ্ছেন। নেতিবাচক সংবাদ প্রচার কোন সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের দ্বায়িত্বের মধ্যে পড়ে না। তারেক জিয়াকে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য দেশে ফেরত পাঠাবেনা এ নিয়ে হানিফ বলেন, বাংলাদেশের কোন নাগরিক যদি অপরাধ করে বিদেশে পালিয়ে থাকে, সে ফেরারি আসামী হিসেবে বিবেচিত হবে। তাকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আছে। এব্যাপারে আর্ন্তজাতিক মহল বা বিভিন্ন দেশ সরকারকে সাহায্য করবে এটাই জাতির আশা। হরতাল অবরোধ নিরসনে বিএনপির সঙ্গে কোন আলোচনা হবে কিনা এমন প্রশ্নে হানিফ বলেন, যারা পেট্রল মেরে, বাসে আগুন দিয়ে, মানুষ হত্যা করে তারা সন্ত্রাসী। সন্ত্রাসী কর্মকা- বন্ধ করার জন্য কোন সন্ত্রাসীর সঙ্গে আলোচনার সুযোগ নেই। নাশকতা বন্ধ করে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা দুর করলেই, সরকার দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের দাবী দাওয়া নিয়ে আলোচনা করার জন্য চিন্তা করতে পারে বলে তিনি জানান। এসময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, কেন্দ্রীয় সহ সম্পাদক শেখ হাসান মেহেদী, কুষ্টিয়া সদর অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আব্দুল খালেকসহ দলীয় নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গভীর সঙ্কটে ইয়েমেন: পদত্যাগ করলেন প্রেসিডেন্টও

ইয়েমেনের প্রধানমন্ত্রী খালিদ বাহা ও মন্ত্রিসভার পর এবার দেশটির প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদি পদত্যাগ করলেন। হাউদি শিয়া সম্প্রদায়ের যোদ্ধারা রাজধানী সানায় দখল প্রতিষ্ঠার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন তিনি। ফলে, রাজনৈতিকভাবে দেশটিতে মারাত্মক এক শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। এক বিবৃতিতে মনসুর হাদি বলেছেন, শান্তি চুক্তির প্রতি হাউদি যোদ্ধারা শ্রদ্ধা প্রদর্শনে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। এদিকে হাউদি বিদ্রোহীরা প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি ও বার্তা সংস্থা রয়টার্স। রাজনৈতিক দলগুলো একটি ‘অচলাবস্থা’য় পৌঁছেছে বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন হাদি। তবে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের সিদ্ধান্তে অসম্মতি জানিয়েছে পার্লামেন্ট। এদিকে ইয়েমেনের গোয়েন্দা প্রধান আলি হাসান আল-আহমেদিও তার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। হাউদি নেতা আবু আল-মালেক ইউসেফ আল-ফিশি প্রস্তাব করেছেন হাউদি নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলো নিয়ে একটি প্রেসিডেন্ট কাউন্সিল গঠনের। এদিকে বন্দরনগরী আদেনে বোমা বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। সেখানে প্রেসিডেন্টের সমর্থকরা বিক্ষোভ করছেন বলে জানা গেছে। আল-কায়েদার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইয়েমেন সরকারকে সহযোগিতা করছিল যুক্তরাষ্ট্র। জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদা বিরোধী অভিযানে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী থেকে বঞ্চিত হলো ওয়াশিংটন, এমনটা মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট হাদির পদত্যাগের সিদ্ধান্তের নানা দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

খালেদাকে গ্রেপ্তার হবে সরকারের রাজনৈতিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করলে বর্তমান সরকারের ‘রাজনৈতিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া’ সম্পন্ন হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। আজ শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক আবদুল লতিফ স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে রুহুল কবির রিজভী এমন মন্তব্য করেন।
রুহুল কবির রিজভী বিবৃতিতে বলেন, ‘ভোটারবিহীন সরকার মনে করছে বেগম জিয়াকে গ্রেপ্তার করলেই বোধ হয় ২০ দলের আন্দোলনে ভাটা পড়বে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে কথিত বন্দুকযুদ্ধ ও ক্রসফায়ারের পরও আন্দোলনকারীরা যখন হরতাল-অবরোধে অগ্রগামী, তখন বেগম জিয়াকে গ্রেপ্তারের পরিণতি হবে বর্তমান অবৈধ সরকারের জন্য রাজনৈতিক অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া।’
রিজভী বলেন, বর্তমান অবৈধ সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে অন্য সদস্য ও শাসকদলের উচ্চপর্যায়ের নেতৃবৃন্দের বক্তব্য বিবৃতি শুনলে মনে হয়, কে কত নিম্ন রুচির ভাষা প্রয়োগ করতে পারে, সেটারই প্রতিযোগিতা করছে। মহান জাতীয় সংসদকে যেন আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় কার্যালয় কিংবা আওয়ামী মহাজোট সরকারের ক্লাব ঘরে পরিণত করা হয়েছে। সেখানে গান-বাজনা থেকে শুরু করে জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে গালিগালাজ এবং বর্তমান চলমান আন্দোলন দমানোর হুমকিধমকির প্রতিযোগিতা চলছে।
খালেদা জিয়াকে গ্রেপ্তার করতে আইনি প্রক্রিয়া দেখা হচ্ছে বলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের জবাবে রিজভী বলেন, এখন একদলীয় রাষ্ট্র, একদলীয় জাতীয় সংসদ, একদলীয় নির্বাচন, একদলীয় জনপ্রশাসন এবং একদলীয় বিচারব্যবস্থা বিরাজমান। সুতরাং সমগ্র রাষ্ট্রকেই আওয়ামীকরণ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় আইনি প্রক্রিয়ার অর্থ হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর জারিকৃত ফরমানের ধারাবাহিক বাস্তবায়ন। অর্থাৎ গ্রেপ্তার থেকে শুরু করে বিচারের রায় পর্যন্ত। কিন্তু জনগণও যে বিচারক, আওয়ামী লীগ যেন সেটা ভুলে না যায়। আওয়ামী নেতারা ভুলে গেছে, দেশের মালিক জনগণ। কোনো ভোটারবিহীন সরকার বা সংসদ নয়। অসভ্য আস্ফালনকারীরা নিশ্চয় জনগণের স্মৃতি থেকে মুছে যাবে না।
রিজভী দাবি করেন, ছয় বছর ধরে বিএনপিকে ধ্বংস করতে এমন কোনো বেপরোয়া নিষ্ঠুরতা নেই, যা এই অবৈধ সরকার করেনি। আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য কর্মসূচি ছিল বিএনপিসহ আন্দোলনরত বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গুম করা কিংবা বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুলি করে লাশ অজ্ঞাত স্থানে ফেলে দেওয়া। আওয়ামী শাসন আর মরণের বার্তা যেন সমার্থক। তিনি বলেন, জনগণের কণ্ঠনালি কেটে গণতন্ত্রকে কবরস্থ করার ঐতিহ্য এ দেশে একমাত্র আওয়ামী লীগেরই। সে জন্য নতুন রূপে নয়, আসল রূপেই বাকশালকে চূড়ান্তরূপে দাঁড় করানো হয়েছে। আর এ জন্যই খালেদা জিয়াকে বন্দী করার নানা ফন্দি আঁটা থেকে শুরু করে গণমাধ্যমকে শুধু সরকারের বার্তা প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর বাগ স্বাধীনতার আইনগত অধিকারকে তো আগেই শূলে চড়ানো হয়েছে।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারকেরা আন্দোলনরত নেতা-কর্মীদের বুকে গুলি করতে বলেছেন। গোয়েন্দা পুলিশ বন্দুকযুদ্ধের গল্প বানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মীদের হত্যার পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বাহবা পাচ্ছেন। আন্দোলন ঠেকাতে প্রতিরোধ কমিটির নামে বেসামাল সশস্ত্র ক্যাডারদের লেলিয়ে দিয়ে আন্দোলনকারীদের লাশের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এত কিছুর পরও মৃত্যু তোরণ দুয়ারে দুয়ারে গণতন্ত্র ও স্বাধীন জীবনের জয়গান গাইতে গাইতে আন্দোলনরত নেতা-কর্মীরা অবরোধ-হরতালে নির্ভীক অগ্রবাহিনী হিসেবে অংশগ্রহণ করছে বলে দাবি করেন তিনি।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে বন্ধু কবি গোবিন্দ হালদার by কামাল লোহানী

‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি,
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’
পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রবল প্রাণের উচ্ছ্বাসে গর্জে ওঠা প্রতিরোধ সংগ্রমের চূড়ান্ত পর্যায়ে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিজয় রচনার একটি অমোঘ অস্ত্র- এ গানটির রচয়িতা গোবিন্দ হালদার। জন্মেছিলেন পশ্চিম পরগনার বনগাঁর পূর্বপাড়ায়। চাকরি করতেন ভারত সরকারের জীবনবীমা দফতরে, ছোট্ট একটি পদে। অথচ ছোটখাটো সরলপ্রাণ মানুষটির জীবনে কী অসাধারণ দোলা লাগল পূর্ববাংলার অকুতোভয় জনগণের বিপুল বিপ্লবে। একটি মানুষ আরেকটি মানুষের বিপন্নতা আর নৃশংসতায় কী অসাধারণ মানবিক প্রেমে নিজের প্রতিবাদের ভাষাকে কলমে কালিতে সৃষ্টি করেছেন। কোমল প্রাণ মানুষ ফুলকে সে ভালোবাসেন প্রাণের বৈভবে তাই বুঝি কবি আবেগের অসীম সাহসকিতায় জনগোষ্ঠীর প্রতীক এ ফুলকে বাঁচানোর যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। গণমানুষের মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধারণের অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।... এই যোদ্ধা কবির সাহসী কলমে তাই কালি হয়ে রক্ত ঝরলেও বিজয়ের পূর্বগগনে রক্তলাল সূর্যের উদয়কে ইঙ্গি করেছেন।
এমনি এক সহযোদ্ধা কবি-গীতিকার গোবিন্দ হালদারকে আমরা হারিয়েছি দীর্ঘ অসুস্থতা আর বার্ধক্যের কারণে। গোবিন্দ ভুগছিলেন কয়েক বছর ধরে। নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। প্রয়োজন ছিল নিবীড় পরিচর্যা আর চিকিৎসার। সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ তিনি সামান্য বেতন পেতেন। অবসরে যে অর্থ জোগান হয় তাতে দিনগুজরান ছিল অসম্ভব। কিন্তু আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদান সত্ত্বেও আমরা, সরকার, রাষ্ট্র- কেউই তার প্রতি কোনো নজর দেইনি। তিনি আমাদের কাছে যতটা পরিচিত ছিলেন তেমনি কলকাতা কিংবা পশ্চিবঙ্গে ছিল না। সে কারণে আমাদের দায়িত্বটা অনেক বেশি ছিল। মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলায় গোবিন্দ হালদার বিস্মরণেই চলে গিয়েছিলেন। বোধহয়, নব্বই দশকেও যদি তাকে দেখতে গিয়ে তার হতদরিদ্র অবস্থা না দেখতাম, তাহলে আমাদেরও চৈতন্যেদয় ঘটত কিনা সন্দেহ আছে।
সেবার গোবিন্দদাকে দেখতে গিয়েছিলাম বন্ধু কবি-সাংবাদিক জিয়াদ আলীকে নিয়ে। ওঁর স্বামী বিবেকানন্দ সরণির সরকারি ঘরখানা থেকে বেরিয়ে স্থানীয় সিপিএম বন্ধুদেরও বলেছিলাম খোঁজখবর রাখার জন্য। কিন্তু তা হয়নি। যা হোক ওর একমাত্র সন্তান গোপাকে খুঁজেছিলাম দেখভাল কীভাবে হচ্ছে জানার জন্য। বাসায় পাইনি, কারণ ও অন্যত্র থাকে। পরে জানতে পেরে আমায় টেলিফোন করল এবং কথা বলতে বলতে জানাতে চাইল বাবার যদি মন্দ কোনো একটা ঘটনা ঘটে যায় তাহলে কি করবো, কাকু?’ কথাটা শুনে আমি একটু চিন্তিত হলাম। কি হবে আবার? বুঝলাম কথায়, যদি মৃত্যু হয় তাহলে কি করে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে? ওকে বললাম, যা হবে তার জন্যে কোনো চিন্তা করো না, আমরা এখন থেকে চিকিৎসার সব ব্যয়ভার গ্রহণ করলাম। মাসে যে খরচ হয় আমরাই পাঠিয়ে দেব। ঠিকমতো চিকিৎসা করো। আমি ফিরে এসে গোবিন্দকে নিয়ে একটা লেখা লিখলাম খবরের কাগজে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র সিদ্ধান্ত নিয়ে টাকা সংগ্রহ করল। ওদিকে নিউইয়র্কে বাঙালিরা একত্রিত হয়ে গোবিন্দ হালদারকে অবহেলার জন্য ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করলেন। তারা আমার লেখাটি পড়ে সিদ্ধান্ত নিলেন যতটা সম্ভব সাহায্য-সহযোগিতা করার। অর্থ সংগ্রহ করলেন আমার কাছ থেকে গোবিন্দ হালদারের ভারতীয় ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বরটা নিলেন। সেখানেই ওরা চার হাজার ডলার পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মীদের মধ্য থেকেও কিছু টাকা পাঠান হল বটে কিন্তু তার চিকিৎসাসেবা দেখাশোনার জন্য কাউকে দায়িত্ব নেয়া উচিত ছিল। সেটা কলকাতার ডেপুটি হাইকমিশন নিতে পারত। কিন্তু তারা ধারে কাছেও ছিল না।
এর মধ্যে মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গোবিন্দ হালদারের বিপন্নতার কথা জানতে পেরে ১৫ লাখ টাকা অনুদান হিসেবে দেন। এতে গোবিন্দ হালদার ওই ছোট কুঠুরি থেকে মুক্তি পান এবং কাকুরগাছি এলাকায় একটি ফ্ল্যাট কিনে সেখানে ওঠেন। এরপর তার অসুস্থতার কারণে বারবার হাসপাতাল আর বাসা করতে থাকেন। সবশেষে ১৩ ডিসেম্বর তাকে মানিকতলায় জিতেন্দ্রনাথ রায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কিডনির জটিলতায়। অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। খবর পান হাসিনা এবং তিনি নিজে তার সঙ্গে কলকাতায় কথা বলেন। আশ্বাস দেন তার চিকিৎসার দায়িত্ব তিনি বহন করছেন। সেদিন ছিল ২০ ডিসেম্বর। আর ২২ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতা পৌঁছেই হাসপাতালে গোবিন্দদাকে দেখতে যান। তিনিও আশ্বস্ত করেন।
শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেসব রাষ্ট্র, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান সহায়তা প্রদান ও সহযোগিতা দিয়েছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সম্মাননা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। এ পর্যায়ে গোবিন্দ হালদারকেও তার অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য সম্মাননা প্রদান করা হয় এবং তার কন্যা গোপা ও জামাই চিন্ময় এ সম্মাননা গ্রহণের জন্য ঢাকা আসে। ওরা আমার বাসায়ও এসেছিল দেখা করতে। সঙ্গে ছিলেন ওদের পরিবারের সুহৃদ নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাবেদ আলী। তখন গোবিন্দ আসতে পারেননি, তার অসুস্থতার কারণে।
আমাদের এ অকৃত্রিম বন্ধু গোবিন্দ হালদার ১৭ জানুয়ারি ২০১৫ জিএন রায় হাসপাতালে পরলোকগমন করেছেন। এর পরপরই মেয়ে গোপার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। বেলা ১১টায় মারা গেছেন এবং হাসপাতাল থেকে বেরুতে প্রায় ৩টা বেজে যাবে। বৌদি পারুল হালদার সেখানে ছিলেন না। তিনি ছিলেন বাসায়। গোপা বলল, মাকে আনিনি। বাবাকে তো হাসপাতাল থেকে বাসায় নিয়ে যাব। নিমতলা শ্মশানঘাটে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। এতদিনেও বৌদির ফোন নম্বরটা পাইনি। তাই রাত সাড়ে ১১টায় ফোন করে কথা বললাম। তিনি কাঁদছিলেন অঝোরে। কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন, ‘সবশেষ হয়ে গেল। দাদা আমারতো কিছু রইল না।’
এরই মধ্যে পারুল বৌদি বললেন, বাংলাদেশ দূতবাসের উপপ্রধান এবং প্রথম সেক্রেটারি (প্রেস) খবর পেয়েই হাসপাতালে গিয়েছিলেন। তখন থেকে শ্মশানঘাটে শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। ওরা কী ভালো মানুষ। ওরা আমাকে মা বলে ডেকেছেন, সম্বোধন করেছেন। কথাগুলোর মধ্যে দারুণ আবেগ ছিল। দুঃখ একটাই রয়ে গেল আমাদের জন্য গোবিন্দ হালদারের সচেতন ভালোবাসা, মুক্তি সংগ্রামের প্রতি তার যে শ্রদ্ধাবোধ, যা থেকে তিনি এদেশের মানুষ না হয়েও মুক্তিযুদ্ধের ওপর এতগুলো গান লিখে দিয়েছিলেন, তাকে যথার্থ সম্মান দেখানো অথবা তার উপযুক্ত মূল্যায়ন বহুদিন পর্যন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সরকার তো করবে না জানি, তো আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ত ছিলাম তারা কেন করতে পারলাম না। বেতার-টিভির রয়ালটি কেন পাননি এত বছরেও? তবুও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বর্তমান সরকার তার জীবনাবসানের আরও কয়েকটা বছর যা করেছেন, তার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। স্বাধীন বাংলা বেতার কর্মীরাও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
গোবিন্দ হালদারের কালজয়ী গানগুলো মানুষের হৃদয় পটে যেমন সাহস সঞ্চার করেছিল তেমনি রণাঙ্গনে মুক্তিযোদ্ধারা প্রেরণা পেয়েছিলেন পাকিস্তানি হায়েনা শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে।
কবি লিখছেন, পদ্মা মেঘনা যমুনা
তোমার আমার ঠিকানা।
এক বাংলার কোটি প্রাণ আজ
একই পথের নিশানা।
যুদ্ধ চলছে হায়েনাদের বিরুদ্ধে। কৃষক শ্রমিক ছাত্র যুবক-সাধারণ মানুষ পর্যন্ত একজোট হয়ে ছুটেছিল মুক্তিযুদ্ধে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে। বন্ধু তুমি কমরেড, অনুপ্রেরণার সঙ্গে নির্দেশ দিয়ে লিখেছিলে?
লেফট রাইট লেফট রাইট লেফট
নওজোয়ান সব এগিয়ে চলো
এগিয়ে চলো।
পথে পথে বাধার পাহাড়
বিদ্যুৎগতিতে পায়ে দলো।
গোবিন্দ হালদার লিখেছিলেন যেসব গান তার মধ্য থেকে প্রথম সেটির সুরারোপিত হয়েছিল, সেটি হলো;
‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।’
জীবনসংগ্রামে শত্রু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে আবেগে উল্লিখিত এই গানটি যেদিন প্রথম সন্ধ্যা অধিবেশনে স্বাধীন বাংলা বেতারে বেজে উঠল, মানুষের প্রাণে প্রাণে সে কী শক্তির প্রাবল্য লক্ষ্য করেছিলাম, আজ তা বোঝাতে পারব না! কবি বন্ধু তোমার কলম থেকে ঝরেছে কী মর্মস্পর্শী অন্তরঙ্গবাণী :
যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা
যার নদীজল ফুলে ফলে মোর স্বপ্ন আঁকা।
সে নদীর নীল অম্বর মোর মেলছে পাখা
সারাটা জীবন সে মাটির গানে অস্ত্র ধরি।
সীমাহীন মাতৃপ্রেম তোমার লেখায় উচ্ছল ছন্দে প্রকাশিত হয়েছে।
নারকীয় হত্যাযজ্ঞের পিশাচদের ছেড়ে দেয়ার পরও মনকে কঠিন করে তুমি বন্ধু গোবিন্দ হালদার লিখেছিলে:
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।
দুঃসহ এ বেদনার কণ্টক পথ বেয়ে
শোষণের নাগপাশ ছিঁড়লে যারা
আমরা তোমাদের ভুলব না।
কবি-সহযোদ্ধা বন্ধু, তোমার পথনির্দেশ, আমরা বোধহয় মানতে পারিনি বলে মুক্তিযুদ্ধে পরাজিত শক্তি আন্দোলন-সন্ত্রাস-জনহিংসতা, নৃশংস নরহত্যা আবার গণহত্যায় রুপ নিয়েছে। একে রুখতে আবার একাট্টা হতে হবে জনতার আকাক্সিক্ষত রাজনৈতিক অঙ্গীকারে। বন্ধু গোবিন্দ, তুমি অমর- চিরভাস্মর বাঙালির মনে প্রাণে।

নির্জনতার মডার্নিটি

কবিতা ভাষা নির্মাণে নিজেকে নগ্ন করে, লাল হলুদ সবুজবাতি জ্বালিয়ে অনেক ভেতরে, অনেক দূরপথে যাত্রা করে সে সৃজন-উল্লাসে। তারিক সুজাতের কবিতায় এ হল স্বাভাবিক উৎরাইয়ের দূরযাত্রা। চেতনের পথ ধরে অজানায় বয়ে যাওয়া, তবে পথের দুধারে চেনা-সব মুখ আর উপাদান, চেনা প্রকৃতি ও বাস্তবতা। কখনও জাগতিক চৈতন্যের অনুপুঙ্খ যাপনের প্রাত্যহিক ঘটনাই তার প্রধান উপজীব্য। সমকালীন রাজনৈতিক উপাদান কিংবা ভিন্ন চোখে সময়কে দেখার মাধ্যমে কবিতার শরীর ও মন-নির্মাণে তার যে ভাষাদর্শন, তাও ব্যক্তি তারিক সুজাতের নিজস্ব। ফলে সাবজেক্টিভ ও অবজেক্টিভের মধ্যে দিয়ে যে কাব্য-সুরধারা, তা সরল বাক্যগঠন, শব্দচয়নের এক যুক্তিক্রম-পথের নির্দেশ দেয়- যা তারিক সুজাতের স্বকীয় বৈশিষ্ট্যের পরিচয় বহন করে। কবিতার শৈলী, দৃশ্যগত ও বোধগত আমাদের প্রায়শ আলোচ্য হয়, তার চেয়ে বেশি অন্তর্গত চেতনের ইঙ্গিত কত দূর পাঠককে টেনে নিয়ে যায়।
এই প্রচল মূল্যায়নের বাইরে গিয়ে কাঠামোবাদি দৃষ্টির নিরিখে নয় কেবল, ডাইলেক উপস্থাপনের নিরিখেও তারিক সুজাত অ্যান্টিডাইলেক কিংবা পলিটিকেল হেজিমনি-অ্যান্টিহেজিমনির সমন্বয় সাধন করতে পেরেছেন। ক্ষয়িষ্ণু নাগরিক মধ্যবিত্ত শ্রেণীর যাপনের টানাপোড়েন চমৎকারভাবে উপস্থিত তার কবিতায়।
আশির দশকের অগ্রজ কবি তারিক সুজাতের কাব্যপ্রতিমা পড়ুয়া-মনোবিদের পঠনে-মননে এমনই এক আশ্চর্য নবনির্মিতি তৈরি করে দেয়; অক্ষরের রেখায় রেখায় মডার্ন ফর্ম ও এক্সেপ্রেশনে ক্ল্যাসিকাল মানুষের আভিযাত্রিক সাহসকে উসকে দিয়ে, তার পর অব্যর্থ অন্বয়ে গড়া বৈশ্বিক-বিস্তারকে সুসহ-সুষমায় কিংবা চারু-নন্দময়তায় ভরিয়ে তোলে। প্রান্তরের সহজিয়া অভিপ্রায় সব নিস্পৃহ নিরক্তিম সাধুতায়, কখনও বা দৃপ্তবিপ্লবী রক্তিমতায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। তিনি প্রজানীতি কিংবা রাষ্ট্রনীতির যথা সুন্দরের সিম্পনিটি মগ্নগহন কবিতাকলার আলতো ছোঁয়ায় এমন এক অনিন্দ্যসুরের তানপুরায় গেয়ে তোলেন যে, মৃদুকণ্ঠ নমনীয়তার আশ্লেষে সিদ্ধ সবচেয়ে বজ -উচ্চারণটিও তখন তার তুলিতে স্বতঃই মানিয়ে যায়। তার ‘বাংলাদেশ’ কবিতাটি এক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল উপমাই শুধু নয়, বিরলপ্রয়োগ সৌন্দর্যে এক মহা-উচ্চারী ইতিহাস হতে পারে।
পথের চোখেও আজ পথচলার ক্লান্তি/পথের পা স্থির হয়ে দাঁড়াতে পারছে না কোথাও/পথ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পথিকের পায়ে।/পথের মোড়ে রক্তচোখে সিগন্যালগুলো/রাগী গলায় বলছে : এদিকে এসো না/পথের পাশের যাত্রীছাউনিটিও/ সূর্যের দিকে মুখ তুলে ভাবছে :/ কোথাও শান্তির মতো শীতল ছায়া নেই।/একটি বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতো/জেব্রাক্রসিংয়ে দাঁড়িয়ে আছে তের কোটি মানুষ।/পথের মাঝখানে গোল আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে/ট্রাফিকের ভূমিকায় একঘেয়ে অভিনয় করে যাচ্ছে/প্রতিদ্বন্দ্বী ছায়া।/মত ও পথের পার্থক্য নিয়েও যে/যাত্রা হয়-/সেই কথাটি কেউ বলছে না/পথ এসে থমকে দাঁড়িয়েছে পথিকের পায়ে।
স্বপ্ন এবং সত্য। মত ও পথ। প্রকৃতি ও মানুষ। গতি ও গান। দুঃখ ও ক্লান্তি। নিন্দা ও ঘৃণা, স্মৃতি ও বিষাদ- এসব উপাচার ব্রহ্মারে পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। কবি কিন্তু এগুলোকে বাজাতে চান জরাহীন এক ভাষাভঙ্গিমায়। নির্জন লাবণ্যে জ্বালাতে চান অন্তর্লোকের প্রদীপ শিখা। কবিতা তখন আর স্বয়ং কবির নাগালে থাকে না, ঐন্দ্রজালিক স্পর্শসত্যে কিংবা পাঠসত্যে সে অনায়াসে পৌঁছে যায় পড়–য়ার মর্মমূলে। তখন বাদ-বিবাদ কিংবা প্রতিবাদ ডিঙিয়ে সে কবিতা পেয়ে যায় এক অবিসংবাদিতের রূপ।
‘কবিতা’ কবিতাটি একবার পড়া যাক :
মৌন, হে ব্যবধান/নির্লিপ্ত দহনে তবু কী করে পোড়াও!/আলোতে উত্তীর্ণ মুখ, আলোকিত অমা;/ ঐ আলোর দিকে, ঐ উত্থিত অলৌকিক/ সিঁড়িটির দিকে হেঁটে যায়, কে সে?/কতটা পথের শেষ দিগন্তকে ছোঁয়/ কত ধাপ নামা হলে পতনের শুরু/পথিক জানে না তবু দ্বিধাহীন যায়!/ যে যায় সে যায়। পথ-সিঁড়ি চিনে/যাওয়াটাই মৌলিক;/ না হলে পরাস্ত হতে হয়, বিনাশে ফুরায় নীড়/অযথা ক্লান্তিতে পরিণামহীন হেঁটে/জীবন জয়ের নামে যৌবন খরচ।/মৌন, হে প্রজ্ঞাপারমিতা,/হে সুন্দর সর্বনাশ!/তুমুল তোমার দিকে মন্দ্র আলোড়ন/অনন্তের ঘরে অমরতা নিলয় নিখিল/মৌন, হে ব্যবধান!
বাঙালি জাতির অস্তিত্বের গৌরব ‘একাত্তর বা স্বাধীনতা’ যে মহান প্রাতিস্বিক-মানবের হাত দিয়ে এসেছে, আলোকস্তম্ভ তথা উচ্চমান মিনারের মতো যিনি এ জাতিকে অনন্তকাল ধরে আশা, সাহস ও প্রেরণা জুগিয়ে যাবেন, সেই চিরভাস্বর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথা কি তিনি বিস্মৃত হতে পারেন? না, তিনি কখনোই জাতির এ মহান নায়ককে বিস্মৃত হতে পারেন না। স্মরণ-মাধুর্যে তাই তিনি প্রভাতের প্রার্থনা সঙ্গীতের মতো অকপটে গেয়ে ওঠেন :
মুখর মিনার/যেন সে ভোরের পাখি/অমল আঘাতে/দ্রুত ছিঁড়ে গেলে ঘুম/পার হয়ে রাত/আঁধার অতনু তিথি/প্রিয়তম রোদ/প্রতীক আলোতে দেখা/ সে তো বাঙালির পিতা মুজিবেরই মুখ।
এভাবে মহামানব বঙ্গবন্ধু কিংবা মৃত্যুঞ্জয়ী একাত্তরের চেতনাসঞ্জাত উচ্চারণ তার কবিতায় ফিরে ফিরে আসে। যেমন ফিরে ফিরে আসে যাযাবরী শৈশবের সাহসিকতা কিংবা যুদ্ধপথের দগ্ধস্মৃতি। আমাদের এ প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারি প্রেতাত্মারা বারবার ছোবল মেরে বিকৃত করার স্পর্ধা দেখায়, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তাক্ত স্মৃতিকে যারা নিমিষেই মুছে ফেলতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের এই দেশে এও কি সম্ভব? ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বারবার বেপথু হওয়াকে কবি তাই কিছুতেই মেনে নিতে পারেন না। তার মানবিক সত্তা প্রতিবাদের বহুবিধ প্রতীকে ফুঁসে ওঠে উচ্চকণ্ঠে উচ্চারণ করে :
আমার সময়কে আমি/উল্টো পায়ে হেঁটে যেতে দেখেছি!/ ভূতগ্রস্ত সময়ের পদচ্ছাপ অনুসরণ করে/জরাগ্রস্ত জাতি কখন পৌঁছে গেছে/গভীর খাদের কিনারায়/ জানলে না, তুমি জানলে না।/হে আমার তিরিশ-বয়সী যুবা/রক্তাক্ত স্বদেশ/ তোমাকে টেনেহিঁচড়ে মর্গের দিকে/নিয়ে যাচ্ছে কারা?...
...প্রিয় নেতৃবৃন্দ!/ ইতিহাসের কালো কফিনে / শেষ পেরেকটি ঠোকার আগে/ মুক্তবাতাসে আমাদের একটু / নিঃশ্বাস নিতে দিন
নিজেরই ভেঙে যাওয়ার শব্দে/ জেগে ওঠো বাংলাদেশ/ জাগো শেষবার
আততায়ী হন্তারক সময়ের প্রতিধ্বনি তুলে/আসে দুঃস্বপ্নের রাত/ বারবার...
কবিতা তো মানুষের আশ্রয়-নিদান। বিপুল এই মহাবিশ্বে মানুষ খুঁজে-ফেরে তার স্বস্তিকা-পুরাণ। মাটি ফুঁড়ে আকাশছোঁয়া বৃক্ষপাখালির মতো কবিতাও তাই পল্লবিত হয় কবির কল্পচেতনার রঙ ছুঁয়ে ছুঁয়ে। এই রঙ কখনও গাঢ়, কখনও আর্দ্র, কখনও কোমল, কখনও রুদ্র, কখনও রুক্ষ, কখনও নিরস, কখনও বা তীক্ষè, সহজ ও স্বতঃস্ফূর্ত। স্বপ্নে-জাগরণে অতিচেতন মানুষের মন এভাবে উড়ে উড়ে যায়, দিগন্ত থেকে দিগন্তরেখায়... নীল আকাশের তারায় তারায়। কবি তারিক সুজাতের বর্ণিল কাব্যচ্ছটা এভাবে পাঠককে মুহূর্তেই পৌঁছে দেয় আবিলতাহীন এক স্বপ্নাদ্য জগতের চির-সবুজের প্রান্তরে। মাসুদ পথিক

দর্শনের দারিদ্র্যে বই by খান মাহবুব

কয়েক মাসের ব্যবধানে চলে গেলেন বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, কবি আবুল হোসেন, ইতিহাসবিদ প্রফেসর সালাহ্উদ্দীন আহ্মদ, দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম, প্রফেসর জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, নজরুল-সঙ্গীতশিল্পী ফিরোজা বেগম, ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন, সাংবাদিক এবিএম মূসা, স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন ও চিত্রশিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দিন আহমেদ, কবি অরুণাভ সরকার। প্রতিটি মৃত্যুই চারপাশের মানুষগুলোকে সংকুচিত করে। তারপর যদি হয় বরেণ্য ব্যক্তিত্ব, তাহলে সমাজযন্ত্র মানিক-রতন হারানোর যন্ত্রণায় কাতর হয়। মানুষের দেহনাশ হবে, এটা চিরন্তন। কর্মগুণ নির্ধারণ করে প্রাণ গেলে বায়বীয় মানুষটি কতটা প্রাসঙ্গিক থাকবে। তবে আমাদের চারপাশের নক্ষত্রগুলোর একটা একটা করে খসে পড়ায় আমি কাতর হচ্ছি এই ভেবে যে, আমাদের শিল্পসংস্কৃতির জগতে নতুন নক্ষত্র সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না। একটু আগে যাঁদের নাম বললাম- ভবিষ্যতে কি এ রকম কৃতী মানুষ তৈরি হবে? স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে- উত্তর অনেক রকম হতে পারে তবে আমার কাছে মনে হয় আগামী প্রজন্ম এ রকম কৃতী মানুষ আর আসবে না। চলমান সময়ে সর্বক্ষেত্রে নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও প্রত্যয়ের বড় অভাব। আর একটি বড় কারণ হচ্ছে- যে ধরনের চর্চার ভেতর দিয়ে আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্ম শক্ত ভিতের জমিনে দাঁড়িয়েছে- সে ধরনের নিবেদন বা চর্চার মধ্য দিয়ে আমরা স্ব-স্ব ক্ষেত্রে এগুতে পারছি কি?
ইন্দ্রিয়জাত চাওয়া-পাওয়ার হিসেব-নিকেশ, নাকি প্রযুক্তি-নির্ভর জীবন, নাকি অন্য কিছু সব এলোমেলো করে দিচ্ছে! জানি না। তবে একটা সংকীর্ণতা আমাদের সবাইকে কুড়ে-কুড়ে খাচ্ছে। সেটা হচ্ছে আমাদের পাঠ-বিমুখতা। আজকাল সামগ্রিকভাবে আমরা পাঠ-বিমুখ। ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী, বিজ্ঞাপনের এমন ভাষা শত ভাগ সত্য হিসেবে ঘড়ির কাঁটার মতো ঠিক ঠিক করছে। মিনি শ্যাম্পু, মিনি স্ক্যাটের মতো মোবাইলের মিনিবার্তা কিংবা ফেসবুকে লেখা ৩/৪ শত শব্দের কোনো গল্পে বা অন্য কিছুতে আমরা অভ্যস্ত। এক রাতে দুই মলাটের পুরো বই পড়ার গল্প আজকাল গর্ব করে খুব একটা কারও কাছে শুনি না। পাঠ-বিমুখতা আমাদের দুর্বল মানসিক ভিতের একটা বড় কারণ। দেশীয় শিল্প-সংস্কৃতির ভুবনে বুঁদ হয়ে থেকে আগে নিজের দেশকে জানার অপার আগ্রহ নতুন প্রজন্মের নেই। পড়ার অভ্যাসের সুযোগ-সুবিধাও নেই। ষাটের দশকের মতো মধ্যবিত্তের বাড়ির বুক-সেলফ, পাড়ার ক্লাবের বইয়ের সেলফ কিংবা শহরের পাঠাগার- সব দিন দিন উধাও হয়ে যাচ্ছে।
দিন দিন বিবর্ণ ও উৎসাহহীন হচ্ছে বইয়ের ভুবন। উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি-
(১) ১৩৩৫ বঙ্গাব্দে বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলায় ৬০/৭০টি লাইব্রেরি ছিল [সূত্র সৌরভ ১৩৩৫ ১৬বর্ষ ৭ম সংখ্যা ১৩৩৫ বঙ্গাব্দ]। এ ধরনের সমৃদ্ধ পাঠাগার কেন এখন গড়ে উঠছে না। ময়মনসিংহ জেলায় এখন মানসম্মত ৫০টি পাঠাগারও নেই। তাহলে কি বইয়ের প্রয়োজন কমেছে, নাকি আমরা মননের দারিদ্র্যে বইয়ের থেকে দূরে চলে গেছি।
(২) কুমিল্লার রামমালা (স্থাপিত ১৯১২) লাইব্রেরিতে জার্মান দার্শনিক জারমুরালের ৫০টি বইসহ অনেক দুষ্প্রাপ্য বইসহ ৮ হাজার পুঁথি আছে। এই পাঠাগার রবীন্দ্রনাথেকে সংবর্ধনা দিয়েছিল। এ ধরনের পাঠাগার এখন তৈরি হচ্ছে না কেন?
(৩) টাঙ্গাইলের সাদত কলেজে (স্থাপিত ১৯২৬) করটিয়ার জমিদাররা গরুর গাড়ির বহরে করে কলেজ লাইব্রেরিতে বই দিয়েছিলেন। সে কারণে বঙ্গের আলিগড়খ্যাত এ কলেজ পূর্ববঙ্গের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের লাইব্রেরি সংগ্রহশালার মধ্যে অনন্য ছিল। আজও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ির জমিদারদের দান করা বই আলমারিতে তালাবদ্ধ করে ঢাকার কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি গৌরাবান্বিত বোধ করে। অথচ এত ডিজিটালাইজেশন, এত অটোমেশিনের পরও আমাদের পাঠাগারগুলো ধুলায় ঢাকা জীর্ণ। পাঠকের হাত কম স্পর্শ করে বইয়ের পাতার জমিনকে।
সরকার ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত সময়ে ৯১৭টি লাইব্রেরিকে ৪৫৪ দশমিক ৫০ কোটি টাকার আর্থিক ও গ্রন্থ সহায়তা দেয়। বর্তমান সরকার ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৭২০টি লাইব্রেরিকে ২ কোটি ২৫ লাখ টাকা দেয়। ২০১৪ সালে ২৩৮৭টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও ২২৬২টি পাঠাগারকে সরকার অনুদান প্রদান করেছে। সহায়তা বৃদ্ধি হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় কম।
অনেক নিরাশার মধ্যেও একটু একটু আলো আছে। সম্প্রতি দেশের জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত একটি খবরে আছে-
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বুড়াবুড়ি ইউনিয়নের প্রত্যন্ত গ্রাম মোল্লারহাট। গ্রামের কয়েকজন তরুণ গড়ে তুলেছেন সচেতন শিক্ষার্থী সংঘ (সশিচ) তারা একটি পাঠশালাও প্রতিষ্ঠা করেছেন। গ্রামের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বই কিনে দেন। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির পরামর্শ, ভর্তির জন্য যাতায়াতের অর্থের ব্যবস্থা করেন।
৬০-এর দশকে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা যে ধরনের গান শুনত, যে ধরনের সিনেমা দেখত, যে ধরনের বই পড়ত এবং তার মাধ্যমে যে ধরনের রুচি তৈরি হতো, এখন তা হচ্ছে না। কারণ রুচিবোধ ও মানসিকতা সৃজনে যে ধরনের ইনপুট চারপাশ থেকে বেড়ে ওঠার সময় যোগ হতো আজকাল তেমন হয় না। ফলে আজকের ছেলেমেয়েদের জীবনযাপন, ভাব-ভাবনা রবীন্দ্র-নজরুল বলয়ের বাইরে। কিন্তু আবহমান বাঙালির তো গর্ব- রবীন্দ্র-নজরুল বলয়ের আকাশ।
আমরা কথায় কথায় উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার কথা বলি। কিন্তু উন্নত দেশের মানুষের ব্যস্ততার মধ্যেও যে পাঠ্যাভ্যাস আছে, তা আমাদের নেই। এই দৈন্য, আমাদের মানসিকতার। তা সমাজের সর্বক্ষেত্রে বিরাজমান। যে দেশের আইনপ্রণেতাদের ব্যবহারের জন্য ৮৫ হাজার বইয়ের সংগ্রহের জাতীয় সংসদের পাঠাগার মাত্র ২২ দশমিক ৮৫ শতাংশ ব্যবহার করে। তাও বেশির ভাগ সদস্য যায় কেবল সংবাদপত্র পড়ার জন্য- এ ধরনের সংবাদ পীড়াদায়ক।
সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকের ১৬ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখের খবরে প্রকাশ- রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘরের নিবন্ধিত প্রকাশনার সংখ্যা ১৩ হাজার ৫৭৬টি। সম্প্রতি তিন হাজার ৫২টি প্রকাশনার হদিস নেই। এ অবস্থা আমাদের জন্য কোনো সুখবর বয়ে আনে না।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি তিন হাজার মানুষের জন্য একটি লাইব্রেরি প্রয়োজন। সেই হিসেবে বাংলাদেশে ১৭৯৪৭টি পাঠাগার থাকা প্রয়োজন। কিন্তু দেশে সচল গ্রন্থাগারের সংখ্যা হাজারের বেশি নয়।
বাংলাদেশের মানুষের দর্শনের মন্দাদশায় বইকে একটু নেড়েচেড়ে দেখার সুযোগ করে দেয় অমর একুশে গ্রন্থমেলা। বাঙালি জাতীয়তাবাদের জাগরণের ভ্রুণ প্রোথিত আছে একুশের মধ্যে। তবে একুশে মেলার বাইরেও বড় পরিসরের বইমেলা প্রয়োজন। কারণ একুশের বইমেলা বাঙালিদের জন্য এক বিশেষ আয়োজন। এ কথা বললেই আবার পশ্চিম বাংলার বাঙালিরা তাদের অংশগ্রহণের দাবির ঝাণ্ডা তুলে ধরে। সম্প্রতি পশ্চিম বাংলার পাবলিশার্স অ্যান্ড বুক সেলার্স গিল্ডের সম্পাদক ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন- অবশ্যই একুশে বইমেলায় বাংলা ভাষায় লেখা সব বইকেই স্থান দিতে হবে। যেমন কলকাতা বইমেলায় শিলচর, ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের প্রকাশনা স্থান পায় তেমনি বাংলাদেশের প্রকাশনা স্থান পায়। তিনি আরও বলেন, একুশে বইমেলা বলে এই আবেগকে সামনে এনে একটি স্বার্থান্বেষী মহল বাংলা ভাষার এই দ্বিতীয় রাজধানীর লেখক-প্রকাশকদের ওই মেলায় ঢুকতে দিচ্ছে না।
ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় যাই বলুন না কেন- বাংলাদেশ একটা ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র। অন্য ভাষাভাষীদের স্বীকৃতি থাকলেও এ দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ বাংলায় কথা বলে। তাছাড়া বাংলা ভাষাকে রক্ষা করতে ৫২তে রক্ত দিয়েছিল এ জাতি। তাই আমাদের বর্ণমালা শহীদের রক্তে ভেজা বারুদের গন্ধমাখা। তবে একুশে বইমেলায় নয়, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি বিবেচনায় আমাদের কলকাতা বইমেলার মতো বড় পরিসরে বহুভাষিক বইমেলার আয়োজন প্রয়োজন। আর একুশে বইমেলা গত বছর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যে সম্প্রসারিত রূপ পেয়েছে সেই বর্ধিত জায়গায় সুযোগ-সুবিধার সুযোগ নিয়ে মেলা হতে হবে আরও নান্দনিক, হৃদয়গ্রাহী ও পাঠকবান্ধব।

পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ ইংলাক

থাইল্যান্ডের আইনপ্রণেতারা দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রাকে অভিশংসনের জন্য ভোট দিয়েছেন এবং তাঁকে পাঁচ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আজ শুক্রবার বিবিসি অনলাইনের খবরে জানানো হয়, বিতর্কিত চালের ভর্তুকি প্রকল্পের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হলো। এর আগে সকালে ওই প্রকল্পের জন্য ইংলাকের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করার কথা জানিয়েছিলেন দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল।
সেনাবাহিনী তাঁর সরকারের ক্ষমতা দখলের কয়েক দিন আগে ২০১৪ সালের মে মাসে দেশটির একটি আদালত তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে অপসরণ করেন। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত জাতীয় আইনসভার আজকের অধিবেশনে ২১৯ সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ১৯০ জন ইংলাককে অভিশংসন করার পক্ষে ভোট দেন। ১৮ জন সদস্য অভিশংসনের বিপক্ষে ভোট দেন, অন্যরা ভোটদানে বিরত থাকেন। আর একজন আইনপ্রণেতা এ অধিবেশনে অনুপস্থিত ছিলেন।

সৌদি আরবের নতুন বাদশাহ সালমান কে?

সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের মৃত্যুর পর নতুন বাদশাহ হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার সৎ ভাই ৭৯ বছর বয়সী সালমান বিন আবদুল আজিজ। ২০১২ সালের জুন মাসে ‘ক্রাউন প্রিন্স’ উপাধিতে ভূষিত হন তিনি। বাদশাহ আবদুল্লাহর সিংহাসনের তৃতীয় উত্তরাধিকারী সালমান। ২০১১ সালের শেষদিকে ও ২০১২ সালের মাঝামাঝি বড় দুই ভাইয়ের মৃত্যুর পর সালমানই ছিলেন সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী। এদিকে ২ কোটি ৮০ লাখ জনসংখ্যার দেশ সৌদি আরবের নতুন বাদশাহ হিসেবে সালমান বিন আবদুল আজিজ একই সঙ্গে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করবেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা টাইম ম্যাগাজিনের অনলাইন সংস্করণের একটি প্রতিবেদনে ‘হু ইজ সাউদি অ্যারাবিয়া’জ নিউ কিং?’- শিরোনামে একটি প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, দীর্ঘ সময় রাজধানী রিয়াদের গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। প্রগতিশীল ও বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন যুবরাজ হিসেবে সুনাম রয়েছে সালমানের। এদিকে সৌদি আরবে ক্ষমতার এ পালাবদলটা বাধাহীনভাবে ও স্বচ্ছন্দেই হবে এবং কিছুটা অস্থিতিশীলতা বিরাজ করলেও, দীর্ঘমেয়াদী নীতিতে কোন পরিবর্তন আসবে না, এমনটা আশা করা হচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সালমানের স্বাস্থ্য খুব একটা ভালো যাচ্ছে না। সে কারণে বড় ভাই আবদুল্লাহর মতো দীর্ঘ সময় তিনি সৌদি বাদশাহের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এদিকে বাদশাহ আবদুল্লাহর সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী হবেন যুবরাজ মুকরিন। তিনি বাদশাহ আবদুল আজিজের সর্বকনিষ্ঠ পুত্র। গত বছর তাকে ‘ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স’-এর খেতাব দেয়া হয়। বাদশাহ সালমানের মতো প্রজ্ঞার সঙ্গে তিনিও পুনর্গঠন ও সংস্কারের ব্যাপারে সতর্ক দৃষ্টি রাখেন বলে সুনাম রয়েছে।

হলিউড ছবিতে বিপাশার চমক

ক’দিন আগেই মুক্তি পেয়েছে বিপাশা বসু অভিনীত ছবি ‘এলোন’। ভৌতিক এ ছবিতে বরাবরের মতো অসাধারণ অভিনয় করেছেন তিনি। পাশাপাশি ব্যাপক রগরগে দৃশ্যে ক্যামেরাবন্দি হয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন। ছবিটি বেশ ভাল ব্যবসা সফলতাও পেয়েছে। সব মিলিয়ে এ ছবিটির দর্শক সাড়ায় ব্যাপক আনন্দিত বিপাশা। সম্প্রতি নিজের বাসায় ‘এলোন’-এর সফলতায় একটি পার্টিও দিয়েছেন তিনি। সেই পার্টিতে ছবির কলাকুশলীরা ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বলিউডের অনেক পরিচিত মুখ। তবে ফুরফুরে মেজাজে থাকা বিপাশা বর্তমানে একাধিক বলিউড ছবির কাজ ফিরিয়ে দিয়েছেন। মূলত গল্প তেমন একটা পছন্দ না হওয়াতেই এসব ছবিতে অভিনয়ে রাজি হননি তিনি। তবে আরেকটি কারণও আছে। আর সেটি হলো সম্প্রতি দ্বিতীয়বারের মতো হলিউড ছবিতে অভিনয়ের জন্য কাজ করছেন তিনি। ২০১৩ সালে ‘দ্য লাভারস’ ছবির মাধ্যমে হলিউডে অভিষেক হয়েছিল তার। এবার সেই ছবির সিক্যুয়ালেই অভিনয় করছেন তিনি। গত এক সপ্তাহ ধরেই ‘দ্য লাভারস-২’ ছবির শুটিংয়ে অংশ নিচ্ছেন বিপাশা। এ ছবিটি শেষ না করা পর্যন্ত অন্য ছবি তেমন হাতে নিতে চাচ্ছেন না তিনি। এদিকে বিপাশা ভক্তদের জন্য চমকও থাকছে এ ছবিতে। বলিউড অনেক ছবিতে খোলামেলা ও রগরগে দৃশ্যে কাজ করছেন এ অভিনেত্রী। এবার হলিউডের এ ছবিতে প্রথমবারের মতো নগ্ন হয়ে ক্যামেরাবন্দি হয়েছেন বিপাশা। ছবিতে একটি বিছানাদৃশ্যে পুরোপুরি নগ্ন অবস্থায় দেখা যাবে তাকে। অবশ্য সেটা কেবলই চরিত্রের প্রয়োজনে- এমনটাই জানিয়েছেন বিপাশা। সম্প্রতি এ ছবির মহরত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘দ্য লাভারস-২’ ছবিতে আমার চরিত্রটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এখানে একজন পরিপূর্ণ অভিনেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রমাণের সুযোগও থাকছে। তবে একটি দৃশ্যে কাপড় ছাড়া বিপাশাকে দর্শক দেখতে পাবেন। এটা আমার পক্ষ থেকে দর্শকদের জন্য চমক। আশা করছি সবাই উপভোগ করবেন। তাহলে এবার অপেক্ষায় থাকুন।

সব অভিযোগ থেকে মুক্ত ফনসেকা

শ্রীলংকার সাবেক সেনাপ্রধান শরৎ ফনসেকাকে ক্ষমা করে দিয়েছেন দেশটির নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আনেন। বৃহস্পতিবার বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, ফনসেকাকে যাবতীয় অভিযোগ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্তি দেয়া হয়েছে। রাজাপাকসে সরকার ২০১০ সালে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অন্যান্য অভিযোগ এনে তাকে কারাদণ্ড দেয়। অথচ এই ফনসেকা দেশটির তামিল বিদ্রোহীদের দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। শুধু কারাদণ্ড নয়, ভোটাধিকারসহ তার যাবতীয় নাগরিক অধিকার হরণ করা হয়। এরপর ২০১২ সালে ২ বছরের বেশি কারাভোগ করে বের হন তিনি। কিন্তু তারপরও তার নাগরিক অধিকার ফেরত দেয়া হয়নি। ফনসেকার সমর্থকদের অভিযোগ, ২০১০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই ছিল তার অপরাধ।ফনসেকার সেনা জেনারেলের পদমর্যাদা ফিরিয়ে দিয়ে তার ভোট দেয়ার অধিকার ও নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার নাগরিক অধিকারও পুনর্বহাল করা হয়েছে।
তামিল বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযানের তত্ত্বাবধান করেছিলেন ফনসেকা ও রাজাপাকসে। বিদ্রোহ দমন করা ওই অভিযানে হাজার হাজার বেসামরিক তামিলকে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। বিদ্রোহ দমনের পর প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসের সঙ্গে ফনসেকার বিরোধ তৈরি হয় এবং ২০১০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাজাপাকসের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হন ফনসেকা। এর কিছুদিনের মধ্যেই ফনসেকার কারাবাসের শাস্তি হলে তার রাজনৈতিক অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় রাজাপাকসে সাবেক এই সেনাপ্রধানকে ক্ষমা করে তাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেন। কিন্তু নতুন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা ফনসেকার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোও বাতিল করে দিয়েছেন। ফনসেকার বিরুদ্ধে করা দুর্নীতির মামলাটিও তুলে নেয়া হয়েছে। ফলে মামলাটি নিয়ে আপিল করার সিদ্ধান্ত বাদ দিয়েছেন তিনি। শীলংকার রাজনীতির প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মধ্যে ফনসেকা অন্যতম। সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তিনি সিরিসেনার পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন। নির্বাচিত হওয়ার পরই ফনসেকাকে পুনর্বাসিত করার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন সিরিসেনা। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর অভিযোগ, ফনসেকা ও রাজাপাকসে উভয়েই তামিল যোদ্ধারা আত্মসমর্পণ করতে চাইলেও তাদের গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু উভয়েই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ২০০৬ সালে তামিল টাইগারদের এক আÍঘাতী বোমা হামলা থেকে অল্পের জন্য বেঁচে গিয়েছিলেন ফনসেকা। বিবিসি।

মেসিই ত্রাতা বার্সার

স্পেনের কোপা দেল রে’র শেষ আটের প্রথম পর্বের ম্যাচ কষ্টেসৃষ্টে জিতেছে বার্সেলোনা। আর্জেন্টিনার ফরোয়ার্ড লিওনেল মেসির শেষ সময়ের পেনাল্টি থেকে পাওয়া গোলে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদকে ১-০ ব্যবধানে হারায় লুইস এনরিকের দল। ন্যুক্যাম্পে বুধবার রাতে বার্সেলোনা সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটানো গোলটি ৮৫ মিনিটে করেন মেসি। বক্সের মধ্যে বল দখলের লড়াইয়ের একপর্যায়ে অ্যাটলেটিকোর হুয়ানফ্রান বার্সেলোনার সার্গিও ?বুসকেটসকে ফাউল করলে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। মেসির পেনাল্টি শট প্রথম দফায় রুখে দিলেও শেষরক্ষা করতে পারেননি ইয়ান ওব্লাক। ফিরতি শটে স্লোভেনিয়ার এ গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন আর্জেন্টিনা ফরোয়ার্ড। মেসি, নেইমার ও লুইস সুয়ারেজ প্রথম একাদশে থাকায় প্রথমার্ধে গোলের সুযোগ বেশি তৈরি করে বার্সেলোনা, কিন্তু কোনোটাই কাজে লাগাতে পারেননি তারা। অন্যদিকে প্রথমার্ধে নিজেদের পোস্ট আগলে রেখে গুটিকয়েক আক্রমণ করলেও সাফল্য পায়নি অ্যাটলেটিকো। ন্যুক্যাম্পে পঞ্চম মিনিটে এগিয়ে যেতে পারত এনরিকের দল। মেসি, দানি আলভেস ও সুয়ারেজের বোঝাপাড়ায় বল পেয়ে যান নেইমার।
কিন্তু ব্রাজিলের ফরোয়ার্ডের শট রুখে দেন অ্যাটলেটিকো গোলরক্ষক। এরপর ৬০ মিনিটে মেসির শটও ঠিকানা খুঁজে পায়নি। বার্সেলোনাকেও প্রথমার্ধে বেশ চাপে রাখে প্রতি-আক্রমণনির্ভর ফুটবল খেলা অ্যাটলেটিকো। শেষদিকে গোলের সুযোগ তৈরি করেছিলেন সিমিওনের শিষ্যরাও। কিন্তু আন্তোনিও গ্রিজম্যান, ফার্নান্ডো টরেস, আরদা তুরান অ্যাটলেটিকোকে গোল এনে দিতে ব্যর্থ হন। প্রথমার্ধে গোলের সেরা সুযোগটি নষ্ট করেন বার্সেলোনার সুয়ারেজ। ৪০ মিনিটে রাকিটিচের ভলি ঠিকই পোস্টের খুব কাছাকাছি থাকা সুয়ারেজকে খুঁজে নিয়েছিল। কিন্তু একটু লাফিয়ে ওঠা বলে ছয় গজ দূর থেকে উরুগুয়ে ফরোয়ার্ডের নেয়া শট পোস্টের উপর দিয়ে চলে যায়। দ্বিতীয়ার্ধেও বল দখলে এগিয়ে থাকলেও মেসি-সুয়ারেজরা প্রতিপক্ষের বক্সে গিয়ে তালগোল পাকিয়ে সুযোগ হারাতে থাকেন। ৭৫ মিনিটে অ্যাটলেটিকোর জালে প্রথম বলার মতো শট নেয় তারা। কিন্তু আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার শট রুখে দিতে কোনো সমস্যাই হয়নি অতিথি দলের গোলরক্ষকের। ৮৫ মিনিটে মেসিকে আর গোলবঞ্চিত করতে পারেননি অ্যাটলেটিকোর শেষ প্রহরী। ইনজুরি টাইমে মেসির ফ্রিকিক ক্রসবারের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ায় জয়ের ব্যবধান আর বাড়েনি। বুধবার রাতে দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচে মুখোমুখি হবে দুই দল। ম্যাচটি ভিসেন্তে ক্যালডর্নে হবে বলে বার্সেলোনাকে টপকে কোপা দেল রে’র শেষ চারে ওঠার আশা করতেই পারে অ্যাটলেটিকো। ওয়েবসাইট।

এক ফ্রেমে সজল ও মম

ফের এক নাটকে অভিনয় করেছেন সজল ও মম। নুজহাত আলভী আহমেদের রচনায় ও পরিচালনায় নাটকের নাম ‘বোঝে না সে বোঝে না’। ত্রিভুজ প্রেমের গল্প নিয়ে নাটকটি তৈরি হয়েছে। এ নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে জাকিয়া বারী মম বলেন, ‘নাটকটির গল্প এককথায় অসাধারণ। ভালো গল্প না হলে এখন চলচ্চিত্রের বাইরে অন্যকিছু নিয়ে চিন্তা করছি না আমি। গল্প ভালো হওয়ার কারণেই এ নাটকে অভিনয় করেছি। এ ধরনের গল্প হলে মাঝে মধ্যে কাজ করতে আপত্তি নেই।
নাটকে সজল দূর্দান্ত পারফর্মেন্স করেছে। আমাদের দুজনেরই অভিনয় দর্শকদের ভালো বলে আমার বিশ্বাস।’ সজল বলেন, ‘মম নিঃসন্দেহে একজন ভালো অভিনেত্রী। সূক্ষ্ম বিষয়গুলো খুব সহজেই তিনি ধরতে পারেন। এ নাটকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আশা করছি দর্শকদের পছন্দ হবে।’ নাটকটি আগামী ঈদুল ফিতরে একটি স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচার হবে বলে নির্মাতা জানান।

বার্ন ইউনিটে দর্শনার্থীদের ভিড় কমানোর পরামর্শ

বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, তাঁদের সঙ্গে আসা লোকজন এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের ভিড়ে আগুনে পোড়া মানুষের সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সংক্রমণসহ মৃত্যুঝুঁকির আশঙ্কা বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে ভিড় এড়িয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে দর্শনার্থীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের চিকিৎসকেরা।

বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট সূত্র বলছে, গতকাল বৃহস্পতিবারও ১০০ শয্যার বার্ন ইউনিটে পাঁচ শতাধিক রোগী ভর্তি ছিলেন। ওয়ার্ড, হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিট (তুলনামূলক গুরুতর অবস্থা এমন রোগীদের এখানে রাখা হয়), নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র—সব জায়গাতেই গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে রোগীদের। সঙ্গে আছে দর্শনার্থীদের ভিড়। এরই মধ্যে চলমান হরতাল-অবরোধের সহিংসতায় দগ্ধদের জন্য আলাদা একটি ওয়ার্ড করা হয়েছে। গতকাল পর্যন্ত ভর্তি ছিলেন ২৩ জন। তাঁদের মধ্যে চারজন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে আছেন। গত পরশু রাতে ভর্তি ৩৫ বছর বয়সী অটোরিকশাচালক আবদুর রশীদের অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক। শ্বাসনালিসহ তাঁর ৩৯ শতাংশ পুড়ে গেছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান আবুল কালাম প্রথম আলোকে বলেন, অনেকে মনে করেন, পরিষ্কার জামাকাপড় বা চকচকে জুতা পরে ঢুকলে সংক্রমণ ঘটবে না। কিন্তু এ ধারণা ঠিক নয়। চামড়া মানুষকে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করে। চামড়া পুড়ে যাওয়ায় দগ্ধ রোগীরা সংক্রমণের ঝুঁকিতে ভোগেন বেশি। চিকিৎসকেরাও অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় বিশেষ সতর্কতা অনুসরণ করে থাকেন।
ভিড় এড়িয়ে দগ্ধ রোগীদের পুনর্বাসনের বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের অবৈতনিক উপদেষ্টা সামন্ত লাল সেন।
চিকিৎসকেরা জানান, সম্প্রতি সংক্রমণের কারণে ১৭ বছরের এক তরুণ মারা গেছে। ৫৭ শতাংশ পোড়া নিয়ে ভর্তি হওয়া ওই রোগীটি ৮০ ভাগ সুস্থ হয়ে উঠেছিল। ১৮ দিন পর সে মারা যায়। এ ছাড়া হরতাল-অবরোধের সহিংসতায় দগ্ধ একজন যুবকের দুই হাতেও সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। সংক্রমণের কারণে তার সেরে উঠতে অনেকটা সময় লাগতে পারে। জানতে চাইলে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক প্রথম আলোকে বলেন, অগ্নিদগ্ধদের দেখতে যাওয়া একটি দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তবে এখন থেকে যেন ভিড় না হয়, সে বিষয়ে বার্ন ইউনিটের সঙ্গে আলোচনা করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।
খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, হরতাল-অবরোধের পেট্রলবোমায় দগ্ধদের দেখতে এ পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গেছেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত, জাতীয় পার্টির প্রেসিডেন্ট ও সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী মহসিন আলী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ, প্রতিমন্ত্রী জাহিদ মালেক, আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক হাছান মাহমুদ, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী রুহুল হক ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা। একমাত্র কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ছাড়া রাজনৈতিক নেতাদের প্রত্যেকেই দলবল নিয়ে আসেন। এমনকি ১০০ জন পর্যন্ত সঙ্গী নিয়েও ইউনিটে ঢুকে পড়ার ঘটনা ঘটেছে। অনেকে বার্ন ইউনিটে যাওয়ার আগে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় খবর দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁরাও প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ইউনিটে হাজির হচ্ছেন।
ইউনিটের একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে একত্রে অসংখ্য মানুষ কোনো রকম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা না নিয়েই হুড়মুড় করে রোগীদের কাছে চলে যাচ্ছেন। এমনকি তাঁরা নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্র ও হাই ডিপেনডেন্সি ইউনিটেও ঢুকে পড়ছেন। সাধারণত বিভাগীয় প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অভ্যর্থনা জানান। এমন ঘটনাও ঘটছে, দর্শনার্থীদের চাপে তিনিই এই ব্যক্তিদের রোগীদের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারছেন না। সংবাদকর্মীরাও মাঝে মাঝে যথেষ্ট বিবেচনাবোধের পরিচয় দিচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন কমপক্ষে ছয়জন চিকিৎসক। তাঁরা বলছেন, রোগী আসার পরপরই চিকিৎসার প্রয়োজন, কিন্তু আক্রান্ত ব্যক্তিরা হাসপাতালে ঢোকার পরপরই সংবাদকর্মীদের মধ্যে ছবি নেওয়া এবং কথা বলার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। চিকিৎসকেরা বলেছেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ঠিক যতজনকে অনুমতি দেবেন, শুধু ততজনই যথাযথ ব্যবস্থা অনুসরণ করে ঢুকলে রোগীরা সংক্রমণের ঝুঁকি এড়াতে পারেন। বার্ন ইউনিটে ঢোকার আগে দর্শনার্থীদের একবারই ব্যবহার করা যায় এমন গাউন, শু-কভার ও মাস্ক ব্যবহারের অনুরোধ করেছেন তাঁরা। এ ছাড়া সংগৃহীত খবর ও ছবি সংবাদকর্মীরা নিজেদের মধ্যে আদান-প্রদান করলে কিছুটা ভিড় কমবে।
জানতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশন অব প্রাইভেট টিভি চ্যানেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক শাইখ সিরাজ বলেন, ‘চিকিৎসকদের উদ্বেগ যুক্তিসংগত। কিন্তু আমাদের মধ্যে ধৈর্য একেবারেই নেই। এ নিয়ে আমরা আলোচনা করব। সিদ্ধান্তে পৌঁছানো খুব জরুরি হয়ে পড়েছে।’
গতকাল হরতাল-অবরোধে দগ্ধদের দেখতে বার্ন ইউনিটে যান স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সংসদের হুইপ আ স ম ফিরোজসহ সাংসদ, কর্মকর্তারা।
রাজনৈতিক সহিংসতার মূল কারণ অবৈধ সরকার ও সংসদ বলে বিএনপি যে দাবি করছে, সে বিষয়ে স্পিকারের মন্তব্য জানতে চাইলে স্পিকার সাংবাদিকদের বলেন, ‘নিরীহ ব্যক্তিদের দগ্ধ করা ছাড়া কি এর সমাধানে আর কোনো পথ নেই’? সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধে জাতীয় সংসদের ভূমিকা কী—এমন প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, ‘এ মুহূর্তে যে ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছে, তা বন্ধে আমরা সুদৃঢ় অবস্থান নিয়েছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘যে ধরনের দৃশ্য ভেতরে দেখতে হলো, তা কলঙ্কজনক। খুবই নৃশংস ও নারকীয়। এ ধরনের সন্ত্রাস, সহিংসতা রাজনীতি হতে পারে না। এ ধরনের সন্ত্রাস বন্ধে প্রত্যেক সচেতন বিবেকবান মানুষকে উদ্যোগ নিতে হবে। আমাদেরও একই দাবি, এ ধরনের আক্রমণ বন্ধ করেন।’ স্পিকার জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে অগ্নিদগ্ধ প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা দেন।

অবরোধের ১৮ দিন: সিলেটে নিহত ১, চলে গেলেন কলেজছাত্র সানজিদ- বিজিবির পাহারার মধ্যেই ট্রাকবহরে বোমা হামলা

(রাজশাহী নগরের কাদিরগঞ্জ এলাকায় গতকাল দুপুরে পণ্যবাহী ট্রাকে হামলার সময় জনতা ও বিজিবির ধাওয়া খেয়ে পালিয়ে যায় হামলাকারীরা। এ সময় তাদের কাছেই বিজিবির এক সদস্যকে (ডানে) দেখা যায় l ছবি: প্রথম আলো) রাজশাহীতে বিজিবির পাহারার মধ্যেই ট্রাকবহরে বোমা হামলা করেছে দুর্বৃত্তরা। এ সময় স্থানীয় জনতা প্রতিরোধে এগিয়ে গেলে বোমায় দুজন আহত হন। বগুড়ায় ট্রাকে হামলায় তিনজন গুরুতর দগ্ধ হয়েছেন। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধের ১৭তম দিনে গতকাল আরও কয়েকটি জেলায় বোমা নিক্ষেপ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এদিকে রাজধানীতে ককটেল হামলায় আহত হয়ে এক সপ্তাহের বেশি সময় দুর্বিষহ যন্ত্রণা ভোগ করে গতকাল মারা গেছেন একজন কলেজছাত্র। এ ছাড়া লালবাগে বোমা বিস্ফোরণে আহত ছাত্রদল নেতা মাহবুবুর রহমান ওরফে বাপ্পী গতকাল ভোরে মারা গেছেন। সিলেটে পেট্রলবোমা হামলার পর ট্রাক চাপায় নিহত হয়েছেন একজন। ৪ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া রাজনৈতিক সহিংসতায় গতকাল ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩১। নারায়ণগঞ্জে একটি মাইক্রোবাস ও একটি ট্রাক, সিলেটে দুটি যাত্রীবাহী বাস, গাজীপুরে যাত্রীবাহী লেগুনা ও চাঁদপুরে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। দিনাজপুরে ধানবোঝাই ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছেন একজন। টানা অবরোধের মধ্যে কাল কয়েকটি জেলায় হরতালও পালন করা হয়। আগামী রোববার টাঙ্গাইলে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জেলা বিএনপি। কাল ১৩টি জেলায় সহিংসতার ঘটনা ঘটে। গত রাত ১২টা পর্যন্ত অগ্নিসংযোগ করা হয় ১৬টি ও ভাঙচুর করা হয় ১৩টি যানবাহনে। আটক করা হয় ১৮৩ জনকে।
গত বছরের ৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে চলতি মাসের ৬ তারিখ থেকে চলছে টানা অবরোধ। তবে ৪ তারিখ থেকে শুরু সংঘাতের। এই ১৯ দিনে আগুন দেওয়া হয় ২৯০টি যানবাহনে, ভাঙচুর করা হয় আরও অন্তত ৩৮২টি।
রাজধানীর পরিস্থিতি: হরতাল ও অবরোধ চলাকালে গতকাল রাজধানীতে চারটি যানবাহনে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তবে কেউ হতাহত হননি। নগরে বেশ কিছু ককটেলেরও বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে।
পুলিশ জানায়, রাত নয়টায় মালিবাগ চৌধুরীপাড়ায় বন্ধু পরিবহনের একটি মিনিবাস, রাত আটটায় গাবতলী বালুর মাঠের বাস ডিপোতে রূপকথা পরিবহনের একটি বাস, সন্ধ্যা সাতটায় কমলাপুরের টিটিপাড়া বস্তির সামনে একুশে পরিবহনের একটি বাস ও সন্ধ্যা ছয়টায় রামপুরা টিভি ভবনের সামনে একটি কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়া হয়। ঘটনাস্থলগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা গিয়ে আগুন নিভিয়ে ফেলেন।
এদিকে রাত সোয়া নয়টার দিকে দুর্বৃত্তরা ঢাকা উদ্যানসংলগ্ন মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে চ্যাম্পিয়ন নামের একটি চলন্ত হিউম্যান হলারে ককটেল ছুড়ে মারে। এতে চালকের সহকারী জালাল হাওলাদার আহত হন। তাঁর মাথায় স্প্লিন্টারের আঘাত লাগে। একই সময় নিউমার্কেট থানার সামনের রাস্তায় একটি ককটেলের বিস্ফোরণ হয়। সন্ধ্যায় শেরেবাংলা নগরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে দুটি ককটেলের বিস্ফোরণ ঘটে।
চলেন গেলেন সানজিদ: শেখা হলো না কম্পিউটার, স্বপ্ন পূরণ হলো না আইনজীবী হওয়ার। রাজনীতির নৃশংসতার শিকার হয়ে কলেজছাত্র সানজিদ হাসান ওরফে অভিকে (১৯) চলে যেতে হয়েছে চিরতরে।
১৪ জানুয়ারি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের অবরোধ চলাকালে বঙ্গবাজার এনেক্স টাওয়ারের সামনে দুর্বৃত্তদের নিক্ষেপ করা ককটেল সানজিদের মুখে লাগে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির পর গত মঙ্গলবার রাত একটার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। সানজিদ পুরান ঢাকার কবি নজরুল সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষে পড়তেন।
ছেলেকে হারিয়ে গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে সানজিদের মা-বাবা কান্নায় ভেঙে পড়েন। সানজিদের মা নুরজাহান বেগম বিলাপ করে বলেন, সানজিদের ইচ্ছা ছিল আইনজীবী হওয়ার। কিছুদিন আগে একটি কম্পিউটার কিনে দেওয়ারও বায়না ধরেছিল তাঁর কাছে। তিনি সানজিদকে বলেছিলেন কম্পিউটার চালানো শিখতে। সেদিন কম্পিউটার শিখতেই সানজিদ তার বন্ধু সবুজকে নিয়ে বঙ্গবাজারে এনেক্স টাওয়ারে এসেছিল। সেখান থেকে বেরিয়ে বাসায় ফেরার পথে দুর্বৃত্তদের নিক্ষেপ করা ককটেলে সানজিদ ক্ষতবিক্ষত হয়। সানজিদের বাবা দেলোয়ার হোসেন পুরান ঢাকার রায়সাহেব বাজারে ডিম বিক্রি করেন। মা-বাবার সঙ্গে তিনি ধোলাইখাল এলাকায় থাকতেন। দুই ছেলের মধ্যে সানজিদ বড়।
ঢাকার বাইরের চিত্র: গতকাল দুপুরে রাজশাহী শহরের কাদিরগঞ্জ মোড়ে বিজিবির পাহারার মধ্যে ঢাকাগামী ট্রাকবহরে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। পেট্রলবোমা ও ঢিলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় অন্তত পাঁচটি গাড়ি। হামলা ঠেকাতে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে গেলে দুজন আহত হন। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি বিজিবির সদস্যরা থাকলেও দুর্বৃত্তদের নাগাল পাননি।
এত কাছে থেকেও বিজিবির সদস্যরা দুর্বৃত্তদের ধরতে পারলেন না কেন জানতে চাইলে ৩৭ বিজিবির পরিচালক আনোয়ারুল আলম বলেন, ‘বিজিবির গাড়িগুলো ট্রাকবহরের অনেক পেছনে ছিল। বিজিবি যখন ঘটনাস্থলের কাছাকাছি আসে, তখন হামলাকারীরা দৌড়ে পালাচ্ছিল। কারা হামলাকারী আর কারা সাধারণ মানুষ, তখন পেছন থেকে বোঝা যাচ্ছিল না। তাই গুলি চালানো বা অ্যাকশনে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নগর ভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল একটি ট্রাকবহর। বিজিবি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে এটি পাহারা দিয়ে আনছিল। রাস্তাটির সঙ্গে সমান্তরালভাবে রেললাইন চলে গেছে পূর্ব-পশ্চিম। চলার সময় ট্রাকগুলোর কয়েকটি বহর থেকে একটু পেছনে পড়ে যায়। ঠিক তখনই রেললাইনের উত্তর দিক থেকে মুখোশধারী ১৫-২০ জনের একটি দল বহরে হাতবোমা ছুড়তে থাকে। একটি ট্রাকে খানিকটা আগুন জ্বলে ওঠে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আরও কয়েকটি। এই অবস্থার মধ্যেই ঘটনাস্থল পার হয়ে চলে যায় ট্রাকগুলো। হামলার সময় দুর্বৃত্তরা কাউকে রাস্তার ওপর দাঁড়াতে দিচ্ছিল না। সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলেও তারা নিষেধ করে।
হামলার ঠিক আগমুহূর্তে কাদিরগঞ্জ মোড়ে দোকানে বসে ছিলেন পান দোকানি মাশেম শেখ। তাঁর ছোট ভাই কাজেম শেখ তখন রাস্তার অপর পারে একটি ছাপাখানায় যন্ত্র চালাচ্ছিলেন। এমন সময় হঠাৎই ট্রাকবহর লক্ষ্য করে শুরু হয় বোমা হামলা। তখন একটি রড নিয়ে হামলাকারীদের দিকে তেড়ে যান মাশেম শেখ। তাঁর ডাকে কাজেম শেখও এগিয়ে যান। একপর্যায়ে হামলাকারীদের ছোড়া হাতবোমায় দুই ভাই রাস্তায় পড়ে যান। স্থানীয় লোকজন উদ্ধার করে তাঁদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। বিজিবির সদস্যরা ঘটনাস্থলের কাছে এগিয়ে গিয়ে ধাওয়া করলে হামলাকারীরা বোমা ফাটাতে ফাটাতে পালিয়ে যায়। মাশেম শেখের শরীরে অস্ত্রোপচার করা হয়। তাঁর বাঁ হাত, মুখ ও বাঁ কানের পাশে বোমার স্প্লিন্টার ঢুকেছে। হামলায় এক ট্রাকচালক আহত হয়েছেন। নগরের বোয়ালিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহমুদুর রহমান বলেন, বহরে সেনাবাহিনীর পণ্যবাহী কিছু ট্রাকও ছিল। হামলাকারীদের কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। এ হামলার আগে ভোরে চারঘাট উপজেলার কুঠিপাড়া এলাকায় খড়বোঝাই একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা ছুড়ে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।
বগুড়া-জয়পুরহাট মহাসড়কের (পুরাতন দিনাজপুর সড়ক) নুনগোলা এলাকায় গত রাত আটটার দিকে আসবাববাহী একটি ট্রাকে পেট্রলবোমা হামলা চালানো হয়েছে। এতে চালকসহ তিনজন গুরুতর দগ্ধ হন। তাঁদের শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। দগ্ধ ব্যক্তিরা হলেন চালক সাজু মিয়া (৩৫), আরোহী টিটন মিয়া (৩০) ও আবদুর রহিম (৩২)। ট্রাকটি নামুজা বাজার থেকে ঢাকা যাচ্ছিল।
সিলেট-জকিগঞ্জ সড়কের হিলালপুর ও শ্রীরামপুর এলাকায় সকালে যাত্রীবাহী দুটি বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে সেগুলোতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে শ্রীরামপুরে একটি বাসে যাত্রীবেশী কয়েকজন দুর্বৃত্ত চালকের মাথায় অস্ত্র ঠেকিয়ে গাড়ি থামায়। পরে যাত্রীদের নামিয়ে গানপাউডার ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুন দেওয়ার পর ওই স্থানে অপেক্ষমাণ সহযোগীদের মোটরসাইকেলে চড়ে পালিয়ে যায় তারা। হিলালপুরেও প্রায় একই কায়দায় গানপাউডার ছিটিয়ে বাসে আগুন দেওয়া হয়।
গাজীপুরের তিন সড়ক এলাকায় দুপুরে যাত্রীবাহী লেগুনায় পেট্রলবোমা ছুড়েছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে তারা ইটপাটকেল ছোড়া শুরু করলে যাত্রীরা দ্রুত নেমে পড়ে। এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করা হয়েছে চারজনকে। নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ভোলাইল এলাকায় দুপুরে ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ সড়কে একটি মাইক্রোবাস ও একটি ট্রাক পুড়িয়ে দিয়েছে ১০-১২ জন দুর্বৃত্ত। চাঁদপুর-কুমিল্লা সড়কের জেলা জজের বাসভবনের সামনে চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভোরে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।
মৌলভীবাজারের বড়লেখার কুমারপাড়া এলাকায় বুধবার রাতে একটি অটোরিকশা পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার কেরানীহাটে সকাল নয়টার দিকে ককটেল বিস্ফোরণে মো. হানিফ ও মো. জাহেদ নামের দুই যুবক আহত হয়েছেন। হানিফ একটি পরিবহন কোম্পানির বাস কাউন্টারের সুপারভাইজার ও জাহেদ কর্মচারী।
টাঙ্গাইলে রোববার সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে জেলা বিএনপি। এদিকে হরতালের সমর্থনে মিছিলের প্রস্তুতিকালে গতকাল জেলা যুবদল, ছাত্রদল ও শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদকসহ ১০ নেতা-কর্মীকে আটক করেছে পুলিশ। নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বগাদিয়া এলাকায় বুধবার রাতে পাঁচটি অটোরিকশা ভাঙচুর করা হয়েছে। এ সময় ইটের আঘাতে চালকসহ তিনজন আহত হন।
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে বুধবার রাতে ধানবোঝাই একটি ট্রাকে দুর্বৃত্তদের পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়েছেন চালক আনিছুর রহমান (৩০)। এতে জড়িত থাকার অভিযোগে পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। জামালপুরে হরতালের দ্বিতীয় দিন গতকাল সকালে চারটি যানবাহন ভাঙচুর করেন হরতাল-সমর্থকেরা। এ সময় এক অটোরিকশার চালকসহ তিনজন আহত হন।
{প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন প্রথম আলোর সংশ্লিষ্ট এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা}