Sunday, October 26, 2014

ঘুরপাকে ইউরোপীয় রাজনীতি by সরাফ আহমেদ

ইউরোপীয় রাজনীতি কিছুদিন থেকেই একটা ঘুরপাকের মধ্যে পড়েছে, ইউরোপীয় ঐক্যের প্রবক্তারা দীর্ঘদিন থেকেই চেষ্টা চালিয়ে আসছেন বিশ্ব ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গাঁটছড়া না বেঁধে একটি নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় গড়ে তুলতে। কিন্তু নিজেদের কিছু দুর্বলতা, অর্থনৈতিক ও কিছু অনৈতিক স্বার্থ এবং যুক্তরাষ্ট্রের মারপ্যাঁচে বারবারই সেই উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে।
এক.
ইউক্রেনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে সৃষ্ট সংকটে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ, শেষে অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ক্রিমিয়া উপদ্বীপ হাতছাড়াসহ দেশটির উত্তরের কিছু অংশ রুশ বংশোদ্ভূত বিদ্রোহীদের হাতে চলে যাওয়া আর পরে ইউরোপপন্থীরা ক্ষমতায় এলেও দেশটিতে এখনো যুদ্ধ-সংকট কাটেনি। ইউরোপের ভুল রাজনীতির কারণে রাশিয়া তাদের আঞ্চলিক রাজনীতিতে আপাতবিজয়ী বলেই মনে করছে। ইউক্রেন রাজনীতিতে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের দোহাই দিয়ে পশ্চিম ইউরোপীয় দেশগুলো বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়ার সঙ্গে নানা বিনিময় বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও রাশিয়া তা আমলে নেয়নি। হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড, বুলগেরিয়া, স্লোভাকিয়া, গ্রিস, জার্মানির মতো দেশগুলো রাশিয়ান গ্যাসের প্রতি ভালো রকমের নির্ভরশীল রয়েছে, আর তা রাশিয়ার রাজনীতিকেরা ভালো করেই জানেন। পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়া গ্যাস রাজনীতি শুরু করলে ইউরোপের বহু দেশেই প্রচণ্ড ঠান্ডায় গ্যাসচালিত হিটার বেশি দিন চলবে না।
দুই.
গত জুলাই মাসে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী যখন ফিলিস্তিনের গাজার পশ্চিম তীরে জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ও জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়ন অনূদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আকাশ থেকে বেপরোয়া বোমা নিক্ষেপ করে ধ্বংস আর ঘরে ঘরে প্রবেশ করে দুই হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করল, তখন ইউরোপীয় রাজনীতি অস্বস্তিতে ছিল বটে৷ তবে কোনো জোরালো সমালোচনা, প্রস্তাব গ্রহণ বা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হলো না। ৮ জুলাই থেকে গাজা উপত্যকায় এই আক্রমণ শুরু হলেও ২২ জুলায় জার্মানি, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যৌথ উদ্যোগে জাতিসংঘে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবসহ গাজায় জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল, শেষ পর্যন্ত সেই প্রস্তাব আর আলোর মুখ দেখেনি আর বলার অপেক্ষা রাখে না—ইসরায়েলের জন্মলগ্ন থেকে গত ৬১ বছরে জাতিসংঘে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো প্রস্তাব গৃহীত হলেও তা থোড়াই তারা আমলে নিয়েছে।
অথচ গত ২৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস তাঁর দেশের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি এই আক্রমণকে যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা বলে আখ্যায়িত করলে, যুক্তরাষ্ট্র সঙ্গে সঙ্গে তা প্রতিবাদ করে একে অপমানজনক বক্তব্য বলে সমালোচনা করে। আর এখন যুদ্ধের প্রায় তিন মাস পর এই ১২ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রধান ক্যাথি অ্যাশটন ঘোষণা দিয়েছেন, যুদ্ধ-উপদ্রুত গাজায় পুনর্নির্মাণ খাতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ৪৫০ মিলিয়ন ইউরো সাহায্য দেবে। যে যুদ্ধে দুই হাজার ১০০ লোকের প্রাণহানি হলো, অসংখ্য মানুষ হতাহত হলো আর ১৮ হাজার বসতি ধ্বংস হলো, সেই যুদ্ধ আক্রমণের কারণ নিয়ে কোনো আলোচনা বা জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইসরায়েল কর্তৃক দখলকৃত ফিলিস্তিনি এলাকায় বসতি নির্মাণ বন্ধ হলো না, তা নিয়ে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো নিষেধাজ্ঞাও জারি হলো না, কিন্তু পুনর্নির্মাণ খাতে আর্থিক সাহায্য দিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানবিকতা কেনার চেষ্টা করছে।
তবে সময় পাল্টাচ্ছে, জুলাই মাসে গাজায় যুদ্ধের সময় ইউরোপজুড়ে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে। ইউরোপের সংবাদপত্রগুলোয় ইসরায়েলের কড়া সমালোচনা হয়েছে। সম্প্রতি সুইডেন সরকার ইসরায়েলের পাশে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে আর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব কমন্সের সদস্যরাও ১৩ অক্টোবর ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছেন, স্কটল্যান্ডও সত্বর স্বীকৃতির ঘোষণা দেবে বলে শোনা যাচ্ছে।
তিন.
মধ্যপ্রাচ্যে সিরিয়া, ইরাকসহ লিবিয়ায় ইসলামিক স্টেটের (আইএস) প্রতিপত্তি যত বাড়ছে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনাও বাড়ছে, আর পশ্চিমাদেরও বিরাট মাথাব্যথার কারণ হচ্ছে ইসলামিক স্টেটের কার্যকলাপ। দুই দশক আগে ছিল তালেবানরা, তা শুধু আফগানিস্তান আর পরে পাকিস্তানে৷ পরে হলো আল-কায়েদা, তারা দেশজুড়ে দখল না নিয়ে বিশ্বজুড়ে নানা জায়গায় সন্ত্রাসী হামলা করেছে আর এখনকার ইসলামিক স্টেটের গেরিলারা বাগদাদ দখল করতে উদ্যত হচ্ছে, তারা ইরাক ও সিরিয়ার বহু এলাকা দখল করে নিজ নিজ দেশের মানুষকে হত্যা-জুলুম, নারীদের প্রতি অত্যাচার, ইসলামের নানা পবিত্র স্থান ধ্বংসসহ চারজন পশ্চিমা সাধারণ মানুষকে গলা কেটে হত্যা করেছে। আর এই স্বঘোষিত ইসলামিক স্টেটের জিহাদে যোগ দিতে ইউরোপের নানা দেশ থেকে তিন হাজার তরুণ ইরাক বা সিরিয়ায় চলে গেছেন, জিহাদি রোমান্টিকতা বা অতি উৎসাহে কিছু তরুণীও সিরিয়ায় গিয়েছেন।
লন্ডনের মেয়র বরিস জনসন ১০ অক্টোবর দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, যুক্তরাজ্য থেকে পাঁচ থেকে ছয় শ যুবক আল-কায়েদ বা ইসলামিক স্টেটের জিহাদি যুদ্ধে যোগ দিতে ইতিমধ্যেই সিরিয়া বা ইরাকে গিয়েছেন আর তাঁদের অর্ধেকের বসবাস লন্ডনে। তিনি আরও বলেছেন, এসব যুবক ফিরে এলে তাঁদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়াটি বেশ কঠিন হবে। জার্মানিতেও সালাফিস্ট নামের ইসলামিক আন্দোলন ইদানীং বেশ পরিচিতি পেয়েছে, জার্মানিতে তাঁদের প্রায় পাঁচ হাজার অনুসারী রয়েছেন, যাঁদের ইসলামিক স্টেটের জিহাদি আন্দোলনের সমর্থক বলে মনে করা হয়, এই জাতীয় আন্দোলন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সে বেশ আগে থেকেই জেঁকে বসেছে। জার্মানি ও ফ্রান্স থেকেও ইসলামিক স্টেটের জিহাদি আন্দোলনে যোগ দিতে বহু যুবক ইরাক, সিরিয়া বা তুরস্কে গিয়েছেন, সেখান থেকে নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউরোপে অন্য সাথিদেরও তঁাদের সঙ্গে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
ইদানীং একটা নতুন বিতর্ক ইউরোপে দানা বেঁধেছে, আর তা হলো ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার মুয়াম্মার গাদ্দাফি বা সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ আদতে অগণতান্ত্রিক বা স্বৈরশাসক হলেও তা পশ্চিমাদের জন্য বোধ হয় নিরাপদ ছিল। একসময় সাদ্দাম হোসেন, গাদ্দাফি বা বাশারকে সরাতে যাদের অর্থকড়ি আর অস্ত্র দেওয়া হয়েছিল, তারাই আজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমাদের চক্ষুশূল।
সেই স্বৈরশাসকদের আমলে নিদেনপক্ষে দেশগুলোয় এতটা হানাহানি আর রক্তক্ষয় ঘটেনি, যা এখন ঘটছে। একটি দেশে বোমাবর্ষণ নানা ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়ে স্বৈরশাসককে অপসারণ করলে আর সেখানে কিছু পুনর্বাসন কর্মসূচি দিয়ে সেখানে গণতন্ত্র ফিরে আসবে—এই পশ্চিমা নীতি অসাড় বলে প্রমাণিত হয়েছে। পশ্চিমারা দেশগুলোয় গণতন্ত্রায়ণের চেষ্টা না করে যুদ্ধ আর বলপ্রয়োগের চেষ্টায় লিপ্ত হয়েছিল আর তার ফলে ইসলামিক স্টেটের জিহাদি অভিযান দিনকে দিন বেড়েই চলেছে।
কানাডায় জন্ম নেওয়া অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মিশাইল চোসুডভস্কি আগামী ডিসেম্বরে তাঁর প্রকাশিতব্য যুদ্ধের বিশ্বায়ন, মানবতার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ যুদ্ধ শিরোনামের বইয়ে লিখেছেন, নিজ দেশের সীমানা রক্ষা সব দেশেরই দায়িত্ব, কিন্তু নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে পৃথিবীর নানা স্থানে যুদ্ধাবস্থা পরিবেশ তৈরি ও যুদ্ধে অংশগ্রহণ বিশ্ব মানবিকতার পরিপন্থী। একই কথা বলছে ইউরোপের বুদ্ধিজীবী মহল।
বর্তমানে ইউরোপ-আমেরিকার অর্থনৈতিক স্বার্থ অভিন্ন না হলেও, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ও পরবর্তী সময়ে পশ্চিম ইউরোপের পুঁজিবাদী দর্শনের অভিন্ন অনুসারীরা চাইলেও নানা কৌশলগত কারণে, বিশ্বজুড়ে আমেরিকার যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার ফাঁদ থেকে বের হতে পারছে না। তবে ইউরোপজুড়ে এই ঘুরপাক খাওয়া রাজনীতি বা মানবিকতার বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ খেলা ও হত্যাযজ্ঞে সমর্থন বা অংশগ্রহণের বিরুদ্ধ-নিন্দা ও লেখালেখি ক্রমেই জোরদার হচ্ছে।
সরাফ আহমেদ: প্রথম আলোর জার্মানি প্রতিনিধি।
Sharaf.ahmed@gmx.net

রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়- বিদ্যাশৃঙ্খলা নিয়ে ভাবুন by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে, অবশেষে দেশে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে কী কী বিদ্যাশৃঙ্খলা বা বিভাগ থাকবে, পত্রিকায় তা-ও ছাপা হয়েছে। এই সংবাদ পড়ে বিস্মিত হয়েছেন রবীন্দ্রগবেষক, রবীন্দ্রভক্ত ও দেশের বিশিষ্টজনেরা। রবীন্দ্রনাথের নামে প্রতিষ্ঠিত হলেও এটি হচ্ছে একেবারেই দেশের আর দশটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়। প্রস্তাবিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া অধ্যাদেশ থেকে জানা গেছে, কিছু মানবিক বিভাগ থাকলেও সর্বাধিক গুরুত্ব পাচ্ছে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ব্যবসায় প্রশাসন, আইন, জীব এবং সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ। এতে করে আদতে এটি হবে গতানুগতিক ধারারই একটি বিশ্ববিদ্যালয়।
দেশের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল, রবীন্দ্রনাথের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার। যে বিশ্ববিদ্যালয় হবে রবীন্দ্রনাথের সমাজভাবনা ও শিক্ষাভাবনার আলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক চরিত্রের বিশ্ববিদ্যালয়। রবীন্দ্রানুরাগী ও বিশিষ্টজনেরা মনে করেন, পূর্ববঙ্গে জমিদারি তদারকির উদ্দেশ্যে বসবাসকালে সমাজ ও শিক্ষা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে এক নতুন ধারার চিন্তা-চেতনার জন্ম হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ শিক্ষা নিয়ে গভীরভাবে ভাবনা-চিন্তা করেছেন, বহু লিখেছেন। শুধু তা–ই নয়, তিনি নিজে শিক্ষকতাও করেছেন। রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় এসেছিল শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হলো—মনুষ্যত্বের পূর্ণ উন্মোচন; ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সংযোগ; ব্যক্তির সঙ্গে প্রকৃতির সংযোগ; শিক্ষিত ও অশিক্ষিতের বৈষম্য তিরোহিতকরণ; জ্ঞানবোধ-কল্পনা ও সৌন্দর্য চেতনার কর্ষণ ও তার বিকাশ সাধন।
তিনি মনে করতেন, কর্মে জ্ঞান প্রয়োগের দ্বারা জীবনে পূর্ণতা আসে, সমৃদ্ধি অর্জিত হয়, সৃজনশীলতার সাহায্যে মনুষ্যত্বের পরিচর্যা বিকাশ এবং ব্যক্তির সব শুভ সম্ভাবনার স্ফুরণ ঘটে। শিক্ষা বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের আরও চিন্তা ছিল শিক্ষাকে বিশ্বমুখীন করতে হবে, যাতে করে তার মাধ্যমে দেশে দেশে, সভ্যতায় সভ্যতায় যোগাযোগ স্থাপন এবং জ্ঞানের সঙ্গে সভ্যতার মেলবন্ধন সৃষ্টি করা সম্ভব হয়। তিনি লিখেছেন, পশ্চিমের লোকে যে বিদ্যার জোরে বিশ্বজয় করেছে, সেই বিদ্যাকে গাল পাড়তে থাকলে দুঃখ কমবে না, কেবল অপরাধ বাড়বে। কেননা বিদ্যা যে সত্য।
বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে তাঁর অভিমত, পশ্চিমা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা থেকে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থায় অনেক ফারাক রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেখানে চিত্ত মন্থনের যোগ বিচ্ছিন্ন নয়, পক্ষান্তরে আমাদের দেশের ক্ষেত্রে তার উল্টোটা রয়েছে। বলা বাহুল্য, যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর শিক্ষা বিষয়ে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিক্ষার যে আদর্শ গড়ে তুলেছিলেন, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছিলেন। সেই চিন্তার তিনি প্রথম বাস্তবায়ন ঘটান, নিজস্ব জমিদারি পূর্ববঙ্গের কালিগ্রাম পরগনায়, যার সদর ছিল পতিসর। জমিদারি পরিচালনাকালেই শিক্ষার বিষয় নিয়ে ভাবতে ভাবতে তিনি একবার এখানেই ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘শিক্ষার অভিসেচন ক্রিয়া সমাজের উপরের স্তরকেই দুই-এক ইঞ্চি মাত্র ভিজিয়ে দেবে আর নিচের স্তর পরস্পরায় নীরস কাঠিন্যে মরুময়তা বিরাজ করবে, এ এক “চিত্তঘাতী মূর্খতা” যা মানা যায় না।’
এই উদ্দেশ্য সামনে রেখেই তিনি কালিগ্রামে প্রজাদের কল্যাণার্থে ‘কালিগ্রাম হিতৈষী সভা’ গঠন করে রাস্তাঘাট সংস্কার, জলকষ্ট নিবারণের জন্য মজাপুকুর, কূপ খনন, দাতব্য চিকিৎসালয় প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রজাদের সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। পরগনায় তিনটি মধ্য ইংরেজি স্কুলসহ ২০০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন বলে একজন খ্যাতিমান রবীন্দ্রগবেষক তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, এর একটি মধ্য ইংরেজি স্কুলকে রবীন্দ্রনাথ ১৯৩৭ সালে শেষ যাত্রায় পূর্ববঙ্গে এসে ছেলের নামে ‘রথীন্দ্রনাথ ইনস্টিটিউশন’ রূপে হাইস্কুলে উন্নীত করেন।
রবীন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত দিবা-নৈশ উভয় বিদ্যালয়ে শিশু ও বয়োবৃদ্ধদের পড়ালেখার ব্যবস্থা ছিল। রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রজাদের কল্যাণের কথা চিন্তা করেই ছেলে রথীন্দ্রনাথকে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে স্নাতক করে নিয়ে এসেছিলেন। কালিগ্রামে ফিরে এসে রথীন্দ্রনাথ নিজে ট্রাক্টর চালিয়ে জমি চাষ করে সহায়তা করেছেন প্রজা-চাষিদের। এই প্রজাদের কথা ভেবেই নোবেল পুরস্কার হিসেবে পাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ জমিদারিতে ‘পতিসর গ্রামীণ ব্যাংক’ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
যে কারণেই হোক, পূর্ববঙ্গের কালিগ্রামের সব প্রকল্প স্থানান্তরিত হয় ১৯২৯ সালে বোলপুরের শান্তিনিকেতনে। এই শান্তিনিকেতনে পরিপূরক হিসেবে যে শ্রীনিকেতন গড়ে তোলা হয়, তাঁর সব প্রকল্পই ছিল কালিগ্রাম পরগনার। রবীন্দ্রনাথ তাঁর অকৃপণ অবদান দিয়ে বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখাকে সমৃদ্ধ করেছেন। বলা হয়, তিনি বাংলা সাহিত্যকে এক শতাব্দী বা তারও বেশি এগিয়ে দিয়ে গেছেন। রবীন্দ্রসাহিত্যের এই অগ্রযাত্রায় সবচেয়ে বড় ভূমিকা যে পূর্ববঙ্গের, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এসব বিষয় বিবেচনা করেই দাবি উঠেছে, প্রস্তাবিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে পূর্ববঙ্গে কবির গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগের অনুষঙ্গ অর্থাৎ সমাজ-শিক্ষা প্রভৃতি দর্শনের প্রসঙ্গ যেন অঙ্গীভূত করা হয়। মানববিদ্যার অন্য বিষয়গুলোও যেন বিদ্যাশৃঙ্খলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশিষ্টজনদের অভিমত হলো, রবীন্দ্র অধ্যয়ন, তুলনামূলক ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, ফোকলোর, ইতিহাস, পুরাতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, জাতিতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, নন্দনতত্ত্ব, সংগীত, নাটক, চারুকলা, ভূগোল ও পরিবেশ, পল্লি উন্নয়ন প্রভৃতি বিভাগের সংযোজন করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ একটি সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের খসড়া আইন চূড়ান্ত হওয়ার আগে এসব বিষয় কর্তৃপক্ষ অবশ্যই বিবেচনায় আনবেন, সেটাই আমাদের প্রত্যাশা।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক, অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

ঘরে ১০ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকার কাজ করেন নারী -সিপিডির গবেষণা

নারী ঘরে করেন এমন কাজের আর্থিক মূল্য গত অর্থবছরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশের সমান। চলতি মূল্যে টাকার অঙ্কে তা ১০ লাখ ৩৭ হাজার ৫০৬ কোটি টাকা। স্থায়ী মূল্যে এটা পাঁচ লাখ ৯৪ হাজার ৮৪৫ কোটি টাকা।  বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) প্রাথমিক হিসাবে, ওই বছর চলতি মূল্যে জিডিপির আকার ছিল ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৯২০ কোটি টাকার।
মজুরি দেওয়া হয় না বা স্বীকৃতি নেই গৃহস্থালির এমন কাজের অন্যতম হলো রান্না, বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যা ও সহায়তা করা। এসব কাজ অন্য কাউকে দিয়ে করাতে যত ব্যয় হতো, সেই হিসাবে এর আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ পদ্ধতিকে বলা হয় প্রতিস্থাপন পদ্ধতি। তবে মজুরি না পাওয়ায় জাতীয় আয়ে নারীর এ ধরনের কাজের আর্থিক প্রতিফলন ঘটে না।
গ্রহণযোগ্য মূল্যপদ্ধতি ব্যবহার করে নারীর এ ধরনের কাজের আর্থিক মূল্য নির্ধারণের আরেকটি হিসাবে দেখা গেছে, জাতীয় আয়ের বাইরে রয়ে গেছে, এমন কাজের আর্থিক মূল্য জিডিপির ৮৭ দশমিক ২ শতাংশের সমান। গত অর্থবছরে নারীর এমন কাজের আর্থিক মূল্য প্রায় ১১ লাখ ৭৮ হাজার দুই কোটি টাকা। স্থায়ী মূল্যে এটা ছয় লাখ ৭৫ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা। নারীরা যে কাজ করে কোনো মজুরি পান না, এমন কাজ করাতে চাইলে একজন লোক যে মজুরি দিতেন, সেই পদ্ধতি ব্যবহার করে এ হিসাব করা হয়েছে। এ পদ্ধতিতে পরিবারের সদস্যদের পরিচর্যা ও সহায়তামতো বিষয়গুলোকে যুক্ত করা হয়।

>>রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল সিপিডি আয়োজিত ‘অর্থনীতিতে নারীদের অবদান নিরূপণ: বাংলাদেশ পরিপ্রেক্ষিত’ সংলাপে (বাঁ থেকে) সিপিডির গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল, সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য ও নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান l প্রথম আলো
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণায় এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। গতকাল শনিবার ‘অর্থনীতিতে নারীদের অবদান নিরূপণ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত’ শীর্ষক এ গবেষণার ওপর সংলাপের আয়োজন করে প্রতিষ্ঠানটি।
সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে রাজধানীর এক হোটেলে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালসহ অর্থনীতিবিদ, নারীনেত্রী, এনজিও ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এ সংলাপের আয়োজন করা হয়। ‘মর্যাদায় গড়ি সমতা’ প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এ গবেষণায় সহায়তা দিয়েছে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক ফাহমিদা আখতার, রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান ও রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট শাহিদা পারভীন এ গবেষণা করেন।
ফলাফল: গবেষণায় বলা হয়েছে, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময় এমন কাজ করেন, যা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না। একজন নারী এমন কাজ করেন প্রতিদিন গড়ে ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা। আর পুরুষ করেন মাত্র আড়াই ঘণ্টা। একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজ করেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ কাজের গড় সংখ্যা ২ দশমিক ৭। জাতীয় আয়ে নারীর যে পরিমাণ কাজের স্বীকৃতি আছে, তার চেয়ে ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৯ গুণ কাজের স্বীকৃতি নেই।
গবেষণার ফলাফলে আরও বলা হয়েছে, মজুরিহীন কাজে সম্পৃক্ত নারীদের তিন-চতুর্থাংশই মজুরি পাওয়া যাবে এমন কাজ করতে চান না। শহরে এমন নারীর হার ৮০ দশমিক ১৭ শতাংশ, গ্রামে ৭১ দশমিক ১১ শতাংশ। মজুরি নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী নন এমন নারীদের ৬০ শতাংশই বলেছেন, তাঁদের পরিবার চায় না তাঁরা বাইরে কাজ করুক। ওই নারীদের কাজ করতে না চাওয়ার অন্য কারণগুলো হলো পরিবারকে অধিক সময় দিতে চান, পরিবারের সদস্যদের যত্ন নেওয়ার কেউ নেই, উপযুক্ত কাজ পাচ্ছেন না, অসুস্থতা, অর্থের প্রয়োজন নেই এবং পারিবারিক ব্যবসায় সম্পৃক্ততা।
গবেষণায় দেখা গেছে, মজুরির টাকা খরচ করতে ৪০ শতাংশ নারীকে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করতে হয়। আর ৫১ দশমিক ৭ শতাংশ নারী নিজের ইচ্ছামতো খরচ করতে পারেন। গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রায় সাড়ে ৮৯ শতাংশ নারী অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত রয়েছেন, যাঁরা কোনো মজুরি পান না।
নারীর অবদানকে স্বীকৃতি দিতে গবেষণায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, জিডিপিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য জাতীয় হিসাবব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা, গৃহস্থালির কাজের ভার কমানোর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ, নারীর মজুরি বৃদ্ধি।
সারা দেশের ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সের মোট ১৩ হাজার ৬৪০ জন ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে নারী আট হাজার ৩২০ জন এবং পুরুষ পাঁচ হাজার ৩২০ জন। গত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে জরিপকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
আলোচনা: সংলাপ অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ‘আমার মা অনেক কষ্ট করে আমাকে হিসাববিদ বানিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতি তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দেয়নি, মায়ের অবদান জিডিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।’ তিনি মনে করেন, নারীকে বাইরে রেখে কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা সফল হবে না। তাই সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এ বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থনীতিতে নারীর অবদান যথেষ্ট মাত্রায় অবমূল্যায়িত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মক্ষেত্রে নারীদের কীভাবে আরও বেশি মাত্রায় সম্পৃক্ত করা যায়, সেদিকে বেশি নজর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।
দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, যেসব নারী আয় করেন, কিন্তু তাঁদের ইচ্ছামতো খরচ করার অধিকার নেই। পরিবার বা স্বামীর সঙ্গে আলাপ করে খরচ করতে হয়। এ ছাড়া মজুরি বা বাজারভিত্তিক সমস্যাও রয়েছে। অনেক নারী বলেছেন, ঘরে-বাইরে কাজ করার পর তাঁরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পান না। এ বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, নারীর অবদানের স্বীকৃতি নেই, এটা সব সময় বলা হয়। কিন্তু কীভাবে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি দেওয়া যায়, নীতিকাঠামোতে তা থাকা উচিত।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম মনে করেন, সমাজে নারীদের প্রকৃত মর্যাদা দেওয়া হয় না। বিনা মজুরিতে করা কাজের হিসাব না করায় সমাজে তাঁদের অবদান বোঝা যায় না। তাঁদের অবদান নীতিনির্ধারকদের জানা দরকার।
মানবাধিকারকর্মী হামিদা হোসেনের মতে, নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সন্তানদের স্কুল থেকে আনা-নেওয়া করেন মায়েরা। মায়েদের এ কাজের স্বীকৃতি না দেওয়ার বিষয়টি পুরুষদের কৃষ্টিগত সমস্যা। আর নিরাপত্তাহীনতা রাজনৈতিক সমস্যা। পুরো বিষয়টি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও দেখতে হবে।
সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মালেকা বেগম বলেন, মেয়েদের কাজটা নির্দিষ্ট করা হয় নিম্নতম মজুরি দিয়ে। তাঁদের অফিসের টেলিফোন অপারেটর, অভ্যর্থনাকেন্দ্রের কর্মীর মতো কাজ দেওয়া হয়। সেখানে তো কম মজুরিই দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, ‘আমরা নারী নির্যাতনের কথা নীতিনির্ধারকদের অনেক বলেছি, কাজ হয়নি। কিন্তু বিবিএস যখন এ নিয়ে গবেষণা ফলাফল প্রকাশ করল, তখন নীতিনির্ধারকেরা নড়েচড়ে ওঠেন।’
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান, জাতিসংঘের সিডও কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমা খান, বেসরকারি সংস্থা নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রোকেয়া কবির, ব্র্যাকের পরিচালক ফস্টিনা পেরেইরা, বিল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফেরদৌস আরা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সায়েমা এইচ বিদিশা, বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের অর্থনীতিবিদ সালমান জাইদী প্রমুখ।

হুন্ডির পাচারকৃত কালো টাকা কি হালাল? by আলী ইদ্‌রিস

গত ২২শে অক্টোবর ইস্টার্ন ব্যাংকের আয়কর পকেট গাইড প্রকাশনা অনুষ্ঠানে এনবিআরএর চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘মালয়েশিয়া ও কানাডার মতো দেশে যারা বাড়ি কিনেছেন, তারা ঠিকমতো আয়কর দিয়েছেন কিনা সেটি খুঁজে দেখবে এনবিআর।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘বিদেশে বাড়ি কেনা দোষের কিছু না। কারও টাকা থাকলে তিনি অবশ্যই বাড়ি কিনতে পারেন। তবে দেশ থেকে টাকা নিয়ে সেখানে বাড়ি কিনলে তার আয়কর সরকারকে দিতে হবে।’ (প্র: আ: ২৩/১০/১৪)। এনবিআর চেয়ারম্যানের ভাষ্য মতে, বিদেশে বাড়ি কেনার জন্য বৈধভাবে বৈদেশিক মুদ্রা নেয়া যায়, অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদন দিয়ে থাকে। কিন্তু আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান অনুসারে মূলধন ফেরত, আমদানি, লভ্যাংশ, শিক্ষা, চিকিৎসা, ভ্রমণ ও আরও কিছু খাত ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক বাড়ি কেনার জন্য দেশের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা নেয়ার অনুমোদন দেয় না। যদি দিয়ে থাকে তাহলে অনুমোদন দেয়ার সময় আয়কর সার্টিফিকেট চায়নি কেন। এনবিআর চেয়ারম্যান আরও বলেছেন, ‘বৈধ-অবৈধ দু’ভাবেই দেশের টাকা বিদেশে চলে যাচ্ছে, এটি হলো বাস্তবতা। সেটা আমরা ঠেকাতে না পারলেও এসব টাকার কর আদায় করে রাজস্ব বাড়াতে পারি।’ তার মতে, মনে হচ্ছে কর আদায় করেই পাচারকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে ছেড়ে দেয়া যায়। এটা অবিচার এবং এ জাতীয় কার্যক্রম পুরান ও নতুন উভয় পাচারকারীদের আরও উৎসাহিত করবে। অবৈধভাবে দেশের অর্থপাচার করা মানি লন্ডারিং আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। আগে পাচারকৃত অর্থ কৌশলে দেশে ফেরত আনতে হবে। এর পরই কর দেয়ার প্রশ্ন ওঠে। বাংলাদেশের অর্থপাচারকারীরা এখন কালো টাকা নিয়ে অভিজাত শ্রেণীর কাতারে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড ভিয়েতনামের পর পৃথিবীর বড় বড় ধনীর সঙ্গে এ দেশের কালো টাকা সুইস ব্যাংকের ভল্টে জমা পড়েছে। মিডিয়ার রিপোর্ট অনুসারে ২০১২ সাল পর্যন্ত সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশীদের আমানত ১,৯০৮ কোটি টাকা ছিল। ২০১৩ সালে সে অর্থ ৩,১৬২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এ অর্থপাচারকৃত মোট অর্থের ১.৫ শতাংশ। স্বাধীনতার পর গত ৪ দশকে ২ লাখ কোটিরও অধিক অর্থ পাচার হয়েছে। এসব অর্থ পৃথিবীর বিভিন্ন ব্যাংকে গচ্চিত এবং বাকিটা বিদেশে বাড়ি, গাড়ি শিল্প-কারখানা ইত্যাদিতে বিনিয়োগ হয়েছে। ইউএনডিপি’র এক প্রতিবেদন মতে, বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থপাচার হওয়া দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান দ্বিতীয়। প্রথম স্থানে রয়েছে আইভরিকোস্ট। অর্থপাচার একটি অবৈধ বা অনৈতিক কাজ হলেও কোন দেশে পাচারকারী নেই এমন গ্যারান্টি দেয়া অসম্ভব। বিনা কারণে, উৎসুক্যবশত বা হবি হিসাবেও কেউ কেউ সুইস ব্যাংকে টাকা রাখে। কিন্তু বদনাম সুইস ব্যাংকের হলেও অন্যান্য দেশে যেমন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, এসব দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকল্পে বিভিন্ন আকর্ষণীয় স্ক্রিমের আওতায় বৈদেশিক বিনিয়োগ আহ্বান করা হয়। ওইসব দেশে প্রবাসী ও অভিবাসী ছাড়াও অসংখ্য বাংলাদেশীদের বাড়ি, গাড়ি, শেয়ার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়ে গেছে। শুধু মালয়েশিয়াই ২,৯২৩ জন বাংলাদেশী সেকেন্ড হোম কিনে অনুমানিক ৫,০০০ কোটি টাকা পাচার করেছেন। বাংলাদেশের নাগরিক হয়ে তারা এই লাখ লাখ ডলার কিভাবে বিদেশে বিনিয়োগ করলেন বা ব্যাংকে জমা করলেন সেটা অনুসন্ধানের বিষয়। ব্যাংকের মাধ্যমে আইন অনুযায়ী বিদেশে বিনিয়োগ করার সুযোগ সীমিত, তাই হুন্ডি বা অন্য চ্যানেলে এসব অর্থপাচার হয়েছে, যা মানি লন্ডারিং আইনে অপরাধ। বড় বড় দেশে অর্থপাচার চল্লিশ বছর ধরে চলছে। একইভাবে স্বাধীনতার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও অন্যান্য দেশে অভিবাসন ও ব্যবসা স্কিমে হাজার হাজার বাংলাদেশী কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে সুবিধাগুলো গ্রহণ করেছেন। ওই টাকা আইন অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়ে গেল, না পাচার হলো মানি লন্ডারিং আইন, এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কিনা, সবই খতিয়ে দেখার বিষয়। ইউএনডিপি’র প্রতিবেদন অনুযায়ী গত চার দশকে ২ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে, অঙ্কটি ক্ষুদ্র বলে মনে হয়। পাচারকৃত অর্থ আরও অনেক বেশি হওয়া উচিত। নৈতিকতার ব্যাপারটা বাদ দিলে অর্থপাচারের কারণ হলো : দুর্নীতি, আত্মসাৎ, ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক অর্থ বিদেশে রেখে দেয়ার প্রবণতা, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, লাভজনক বিনিয়োগের ক্ষেত্রের অভাব, সুশাসনের অভাব বা আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি ইত্যাদি। উপরিউক্ত যে কোন কারণেই হোক, পাচারকারীদের এ অর্থ এক সময়ে দেশে ফেরত আনা উচিত। কিন্তু এখানেই সমস্যা। পাচারকৃত অর্থ খুব কম ক্ষেত্রেই দেশে ফেরত আসে। কারণ পাচার করতে যেমন ঝুঁকি নিতে হয়, ফেরত আনাও তেমনি ঝুঁকিপূর্ণ। তাই পাচারকারীরা দু’বার ঝুঁকি নিতে চায় না। তা ছাড়া দেশপ্রেমের অভাব বা দেশের আয়কর আইন, মানি লন্ডারিং আইনের জরিমানা বা শাস্তির ভয়ে কেউ ওই টাকা ফেরত আনতে চায় না। অন্যদিকে এ টাকা উদ্ধার করাও সহজ নয়। সুইস ব্যাংক বাংলাদেশকে তথ্য দিতে চায় না। বাংলাদেশ বর্তমানে অর্থপাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক জোট ‘এগমন্ট’ গ্রুপের সদস্য হওয়ায় তথ্য পেতে সহায়ক হবে। তথাপি পুরোপুরি তথ্য কখনও পাওয়া যাবে না। তবে আইনিযুদ্ধ চালিয়ে কৃতকার্য হওয়া দীর্ঘ সময়ের ব্যাপার। তাই পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা হবে, ওই টাকা যাতে সহজে দেশে ফেরত আসতে পারে সে উদ্দেশ্যে অন্যান্য দেশের মতো কিছু স্কিম বা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া উচিত। কালো টাকা সাদা করার মতো পাচারকৃত টাকা জরিমানা দিয়ে নির্দিষ্ট শিল্পে বা অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করার সুযোগ দেয়া যেতে পারে। পাচার যাতে না হয় তার প্রতিকার করা যেমন সরকারের দায়িত্ব, তেমনি কালো টাকার মতো পাচারকৃত টাকারও সৎকার করা সরকারের কর্তব্য। আমাদের হৃদয়ে নৈতিক উন্নতি ও দেশপ্রেম জাগ্রত না হওয়া পর্যন্ত অর্থপাচার হবেই, কিন্তু কৌশলে সে অর্থ ফিরিয়ে আনাই কৃতিত্ব। তাই শুধু আয়কর আদায় করার উদ্দেশ্যে নয়, পাচারকৃত অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন স্কিম চালু করা উচিত।

কেন এত আকুলিবিকুলি by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচন সূত্রে আসা সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ইতালি সফর শেষে দেশে ফিরে গত বৃহস্পতিবার গণভবনে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। তাতে তিনি তার স্বভাবসুলভ হাস্য কৌতুক করে বাছাই করা আওয়ামী ঘরানার সাংবাদিকদের আনন্দ দিয়েছেন। আমরা টেলিভিশনের পর্দায় সে সম্মেলন দেখে কৃতার্থ বোধ করেছি। প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের সংবাদ সম্মেলনে অনেক টেলিভিশন চ্যানেল নিষিদ্ধ। সংবাদপত্রের যেসব সাংবাদিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়, তাদের সাংবাদিক পরিচয়ের চেয়ে দলীয় পরিচয়ে চেনেন সমাজের লোকজন। ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন, প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে দিতে পারেন, তথাকথিত সংবাদ সম্মেলনে এমন সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষেধ। এটা সুকুমার রায়ের ‘বাবুরাম সাপুড়ে’ ছড়ার মতো। করে নাকো ফুঁসফাঁস, মারে নাকো ঢুসঢাস, সে রকম গোটা দুই সাপ নিয়ে আসার নির্দেশ। সেই সাপ জ্যান্ত, গোটা দুই আনতো, তেড়েমেড়ে ডাণ্ডা করে দেবো ঠাণ্ডা। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন এখন ফুঁসফাঁস ঢুসঢাস না করাদের এক আমোদ বৈঠক।
এমন একটি পপিচুস (পরস্পর পিঠ চুলকানো সমিতি) আয়োজিত হলে হাস্যরসের জন্ম হওয়া তো অনিবার্য হয়ে ওঠে। হয়ও। আর আমরা দু’নয়ন ভরে তা উপভোগ করি। এসব এমবেডেড সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্ন ও জবাবের ধারা একই। প্রকৃত সাংবাদিকদের মতো প্রশ্ন করতে পারেন না বা করতে চান না। সম্ভবত বিধানও নেই। সেখানে একই লোক সাবধানী তৈলমর্দনমূলক প্রশ্ন করেন। শেখ হাসিনা যেমন খুশি জবাব দেন। প্রধানমন্ত্রীও তৃপ্ত, এমবেডেড সাংবাদিকরাও তৃপ্ত। এভাবেই অনেক দিন যাবৎ চলছে। ২৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবারও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি।
আওয়ামী ঘরানার একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন, বিএনপির সাথে সরকার কোনো আলোচনায় বসছে কি না। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, প্রশ্নটি ছিল খুব স্বাভাবিক ও সঙ্গত। আসলে তা ছিল শেখ হাসিনাকে তার শ্লেষাত্মক বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে দেয়া এবং সে জবাবের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছেন তিনি। সুযোগটি লুফে নিয়ে তিনি বলেছেন, ‘বারবার ওই খুনিদের সাথে বসার জন্য এত আকুলিবিকুলি কেন? বিএনপি কী দিয়েছে? প্রতিদিন বোমার আওয়াজ আর অস্ত্রের ঝনঝনানি না শুনলে আপনাদের ভালো লাগে না, নাকি শান্তিতে থাকতে ভালো লাগে না? যারা রাজনীতির আঁস্তাকুড়ে চলে গেছে, তাদের জন্য আপনাদের এত দরদ কেন? সংলাপ প্রশ্নে তিনি সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, কাউকে যদি কেউ খুন করার চেষ্টা করে, এবং হাতেনাতে ধরা পড়ে এবং বিচার চাইবার পরিবর্তে যদি বলা হয় আপস করতে, তখন কেউ আপস করবে? করবে না। তাহলে বারবার আসে কেন?
কেন যে ‘দরদ’, সে বিষয়ে উপস্থিত ‘সাংবাদিকেরা’ আর কোনো কথা বলেননি। সেটাই স্বাভাবিক।
এরপর তিনি ২০ দলীয় জোটের সম্ভাব্য আন্দোলনের ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলেন, নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ছিলাম, তাই অনেক কিছু করতে পারিনি। এখন নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আছে। এবার দেশের মানুষের গায়ে হাত দিয়ে দেখুক, দেশের একটি মানুষের ক্ষতি করলে খবর আছে। যে যেখানে পারেন, সেখানেই তাদের প্রতিরোধ করবেন। আমরা আপনাদের সাথে আছি। আবার একই অনুষ্ঠানে তিনি হজ, তাবলিগ ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের বিরুদ্ধে কটূক্তি করায় সম্প্রতি অপসারিত আওয়ামী মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকীর গ্রেফতার দাবিতে সম্মিলিত ইসলামি দলগুলোর হরতাল আহ্বানের সমালোচনা করে বলেন, যখনই মামলার (খালেদা জিয়ার) তারিখ পড়ে, তখনই হুমকি ধমকি আর হরতালের ঘোষণা আসে। তিনি যেহেতু দুর্নীতি করেছেন, এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন, তাই মামলার হাজিরা থেকে বাঁচার জন্য হরতাল ডাকা হয়। চোরের মন পুলিশ পুলিশ। না হলে মামলার মোকাবেলা করতে ভয় কিসের?
তিনি বলেন, দেশী বিদেশী যারাই এই সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তাদের দূরদর্শিতার অভাব ছিল। যেসব রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা এ দেশে অবস্থান করে সরকারের বৈধতা নিয়ে কথা বলেছেন তাদের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা একটি প্রশ্নও তোলেননি। বরং সরকারকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। এখনো যারা সরকারের বৈধতা নিয়ে কথা বলছেন, তারা হয় কূপমণ্ডূপতায় ভুগছেন আর না হয় বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বলছেন। বিদেশী কোনো রাষ্ট্রের তরফ থেকে সংলাপের তাগিদ দেয়া হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, বর্তমান বিরোধী দল তো সংসদের সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রেখেছে। তারা তো ফাইল ছোড়াছুড়ি করছে না। আর যে দল নির্বাচনই করেনি, তাদের নিয়ে তো কারো মাথাব্যথা নেই।
পরে রেল মন্ত্রণালয়ে গিয়ে কর্মকর্তাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, রেলের জন্য খরচটাও বেড়ে গিয়েছিল। খরচ বাড়ার কারণে বিশ্বব্যাংক যখন এগিয়ে এলো, তাদের সহযোগিতা নিতে গেলাম। পরে একটা সময় দুর্নীতি-টুর্নীতি, হাবিজাবি বলেটলে চেষ্টা করল এটাকে ঠেকাতে। দুর্নীতি ষড়যন্ত্রের কথা বলে বিশ্বব্যাংক প্রথমে পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থায়ন স্থগিত করে। অনেক নাটকীয়তার পর গত বছর জানুয়ারিতে ওই প্রকল্পে তাদের অর্থ না নেয়ার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। তিনি বলেন, এটা অন্য কারণে, প্রকৃত দুর্নীতি কোনো কিছুই হয়নি। কেউ বের করতে পারেনি; কিন্তু বিষয়টা ছিল একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে। ঠিক যে উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপি গাড়ি পোড়াল বা রেল পোড়াল, ঠিক সেই রকম উদ্দেশ্যে কোনো কোনো মহল থেকে এ ধরনের অভিযোগ আনা হয়েছিল। আমরা সেটা চ্যালেঞ্জ দিয়েছি। নিজের অর্থেই পদ্মা সেতু করব।
প্রধানমন্ত্রী আরো অনেক কথাই বলেছেন। ধারাবাহিকভাবে সেসব বিষয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। দেশের কোনো সেক্টরেই যে স্বাভাবিক অবস্থা নেই চোখ কান খোলা রাখলে যে কেউ সে সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন। রাজনীতিতে যে দলন-পীড়ন এখন চলছে, তা অনেকাংশে ১৯৭২-৭৫ সালের দমন-পীড়নকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিরোধী দল বলতে তিনি জাতীয় পার্টিকে মিন্ করতে অনেক স্বস্তিবোধ করছেন। ৫ জানুয়ারি প্রহসনের আগে বানরের পিঠা ভাগাভাগির মতো সংসদের আসনগুলো এরশাদ-হাসিনা ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বিরোধী দল সদস্যরা সরকারের মন্ত্রী উপদেষ্টা। জাতীয় পার্টির প্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত।
এরশাদ নির্বাচনে অংশ নিতে চাননি। তাকে সিএমএইচে বন্দী রেখে রওশনকে দিয়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেখিয়ে এক হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়। জাতীয় পার্টির যারা সংসদ সদস্য ঘোষিত হয়েছেন তাদের অনেকে জানতেনই না যে তারা এমপি হয়েছেন। সে রকম একটি বিরোধী দলকে প্রকৃত বিরোধী দল বলতে শেখ হাসিনা অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন। যেমন অনুগত সাংবাদিকদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করায় তিনি অনেক বেশি স্বচ্ছন্দ। এ বিরোধী দলের প্রধান গুণ তারা প্রশ্ন করে না ও ফাইল ছোড়াছুড়ি করে না। যার যার নিজের নিজের ধান্ধায় তারা ব্যস্ত আছেন। অর্থাৎ শেখ হাসিনা এমন এক বিরোধী দল চান যারা কোনো বিষয়েই প্রশ্ন করবে না। দুর্নীতিতে দেশ সয়লাব হয়ে গেলেও না। অন্যায়, জোরজবরদস্তি, জুলুম, নির্যাতন হলেও প্রশ্ন করবে না। যেমন করে না জাতীয় পার্টি। ফলে তার দরকার জাতীয় পার্টি মার্কা বিরোধী দলই। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা স্মরণ করতে পারেন যে, বিরোধী দলে থাকা অবস্থায় তিনি কী করেছেন।
এবার আশা যায় প্রধানমন্ত্রীর আকুলিবিকুলি নিয়ে। বিএনপির সাথে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে তিনি সাংবাদিকদের পাল্টা প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, খুনিদের সাথে বসার জন্য সাংবাদিকদের এত আকুলিবিকুলি কেন? তিনি বলতে চেয়েছেন যে, বিএনপি আমলে প্রতিদিন বোমা আর অস্ত্রের ঝনঝনানি হতো। এখন শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাংবাদিকদের কি সেটা ভালো লাগছে না? শান্তি যে কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটি খুঁজে বের করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। এখন প্রতিদিন ১৫-২০ জন করে দেশে মানুষ খুন হচ্ছে। সে খুন হচ্ছে টেন্ডারবাজি, দখলবাজি, আধিপত্য বিস্তার, পারিবারিক কলহ প্রভৃতি নিয়ে। মুক্তিপণের জন্য প্রতিদিন অপহৃত হচ্ছে শিশুসহ বহু সংখ্যক মানুষ। সে মুক্তিপণ আদায়কারীর তালিকায় যোগ দিয়েছে দলীয়কৃত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও। এসব বাহিনীর লোকদের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জীবন দিচ্ছে বা পঙ্গুত্ব বরণ করছে প্রতিদিনই কেউ-না-কেউ। তারপরও তিনি বলতে চাইছেন, শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী যখন এমন দাবি তুললেন, প্রকৃত সাংবাদিক কেউ হাজির থাকলে তাকে এই চিত্র স্মরণ করিয়ে দিতে পারতেন।
প্রসঙ্গত, সংলাপ প্রশ্নে সাংবাদিকদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, কাউকে যদি কেউ খুন করার চেষ্টা করে এবং হাতেনাতে ধরা পড়ে এবং বিচার চাওয়ার পরিবর্তে যদি বলা হয় আপস করতে তখন কি কেউ আপস করবে? করবে না। তাহলে বারবার এ কথা আসে কেন? তারপর বরাবরের মতোই শেখ মুজিবের হত্যাকাণ্ড, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা প্রভৃতি ঘটনা উত্থাপন করে বলেন, খালেদা জিয়া সহযোগী। তার ছেলে আসামি। কেউ প্রশ্ন করল না এ মামলায় তো তারেক রহমান আসামি ছিলেন না। পরে কেন জবরদস্তিমূলকভাবে তাকে আসামি করা হলো? প্রশ্নকর্তা বিবিসির সাংবাদিকদের উদ্দেশ করে তিনি বলেন, এখন দেশে যে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রয়েছে, তা যারা চাইবে না, যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, ইয়াহিয়ার প্রেতাত্মা যারাÑ তারাই খুনিদের সাথে বসার কথা বলে। তার এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব থেকে বিবিসির ওই সাংবাদিক পর্যন্ত ইয়াহিয়ার প্রেতাত্মায় পরিণত হলো। সাবাস শেখ হাসিনা।
শেখ হাসিনা বলেছেন, মামলায় হাজিরা দিতে খালেদা জিয়ার ভয়। এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন এই জন্য কোর্টে যেতে ভয়। মামলায় হাজিরা দিয়ে প্রমাণ করুন চুরি করেননি। আমাদের প্রশ্ন মামলায় হাজিরা দিতে তিনি কি খুব স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন? তার ডেকে আনা সামরিক সরকার তার এবং খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একই অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিল। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত আঁতাতের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমেই তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলাগুলো তুলে নিয়েছিলেন; কিন্তু বহাল রেখে দিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা। শেষ পর্যন্ত তিনি নিজেও আরো কিছু মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন। একইভাবে বিএনপি নেতাদের এক একজনের বিরুদ্ধে শত শত মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। যার কোনোটা যুক্তির বিচারে টেকে না। উপরন্তু বিচার বিভাগ দলীয়করণের ফলে এখন মানুষ ন্যায়বিচার নিয়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছে না। মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত। ন্যায়বিচার তিরোহিত। জানমালের নিরাপত্তা শূন্যের কোঠায়। অর্থনীতি ধ্বংসোন্মুখ। জনশক্তি ও গার্মেন্ট রফতানিতে ধস। এর সমাধান জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, গণতন্ত্র। আর এখন সেটা নেই বলেই সাংবাদিকদের এমন আকুলিবিকুলি।
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

ইলিশ মাছের আবাসস্থল রক্ষা জরুরি by কাজী শফিকুর রহমান

ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ। আমিষজাতীয় খাদ্য সরবরাহ ও জাতীয় অর্থনীতিতে ইলিশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দেশে মোট মাছ উৎপাদনে ইলিশের পরিমাণ প্রায় ১১ শতাংশ। প্রতি বছর দেশে প্রায় ৩.৫১ লাখ মেট্রিক টন ইলিশ উৎপাদিত হয়। কয়েক দশকে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণে নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস, পরিবেশ বিপর্যয়, নির্বিচারে জাটকা ধরা এবং প্রচুর পরিমাণে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরায় ইলিশের উৎপাদন দ্রুত হ্রাস পেয়েছে। এই মাছের উৎপাদন ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়া শুরু হয়েছে; যেমনÑ জাটকা সংরক্ষণ, সর্বোচ্চ প্রজনন মওসুমে ইলিশ ধরা নিষিদ্ধকরণ আর অভয়াশ্রমগুলোকে রক্ষা।
ইলিশের প্রজনন সারা বছরই হয়, তবে সবচেয়ে বেশি হয় অক্টোবর মাসে; অর্থাৎ আশ্বিন-কার্তিক মাসে, বড় পূর্ণিমার সময়। তখন শতকরা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ ইলিশই সাধারণত পরিপক্ব এবং ডিম ছাড়ার উপযোগী থাকে। দুর্ভাগ্যবশত এ সময়েই সবচেয়ে বেশি, অর্থাৎ সারা বছর যত ইলিশ ধরা হয় তার ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ধরা পড়ে। তা ছাড়া সারা বছরই নির্বিচারে জাটকা ইলিশ ধরা হয়।
এই প্রতিকূল অবস্থায় ইলিশের প্রাকৃতিক প্রজনন এবং জাটকা ইলিশ বড় হওয়া ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়। ইলিশ ধরার কাজে চার থেকে পাঁচ লাখ জেলে এবং ২০ থেকে ২৫ লাখ লোক ইলিশের বিপণন ও অন্যান্য কাজে নিয়োজিত আছে। নানাবিধ কারণে দেশের বিভিন্ন জলাশয়ে ইলিশের উৎপাদন মারাত্মকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এর বড় কারণ, আমরা ইলিশের আবাসস্থল রক্ষা করতে পারিনি। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র এবং এদের প্রায় সব শাখা, প্রশাখা ও উপনদীতে আগে প্রচুর ইলিশ পাওয়া যেত। তা ছাড়া ফেনী, কর্ণফুলী, মাতামুহুরীÑ এসব নদ-নদীতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে ইলিশ পাওয়া যেত।
শতকরা ৯৫ থেকে প্রায় ৯৮ ভাগ ইলিশই দেশের অভ্যন্তরীণ নদ-নদীতে ধরা পড়ত। পঞ্চাশের দশকে এসব জলাশয়ে ইলিশের উৎপাদন ছিল প্রায় দেড় লাখ টন। গত ৪০-৪৫ বছরে দেশের ৩৫টি নদ-নদী থেকে ইলিশ প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এসব নদ-নদীতে একসময় বছরে ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার নৌকা দিয়ে ২১ হাজার থেকে ২৫ হাজার টন ইলিশ ধরা হতো। বন্যানিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পের বাঁধ এবং আড়াআড়িভাবে নদ-নদীতে বাঁধ তৈরির কারণে ইলিশের আবাসস্থল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফারাক্কা বাঁধের জন্য পদ্মা নদীতে পানিপ্রবাহ অনেক কমে গেছে। পদ্মা ও এর সব শাখা-প্রশাখায় ইলিশ উৎপাদন অনেক হ্রাস পেয়েছে। হাতিয়া, সন্দ্বীপ, ভোলা, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পাড় ভাঙার ফলে ওই সব অঞ্চলে নদীর গতিপথ ও তলদেশ ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে। অনেক চর ও ডুবোচর সৃষ্টি হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া ইলিশের আবাসস্থল ও পরিবেশ নষ্ট করছে।
তিন বছর গবেষণার পর ২০১৩ সালে মৎস্যবিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে ইলিশের চাষ সম্ভব নয়। পুকুরে ইলিশকে বাঁচিয়ে রাখতে পারলেও এর স্বাদ, বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার নদী কিংবা সাগরের মতো হওয়া সম্ভব নয়। পুকুরে ইলিশ চাষ খুবই ব্যয়বহুল। ছোট একটি ইলিশের জন্য ব্যয় হবে তিন থেকে চার হাজার টাকা। পুকুরে ইলিশের ডিম এলেও তা পরিপক্ব হয় না।
ইলিশ সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে জরুরিভিত্তিতে কতকগুলো ব্যবস্থা নেয়া অপরিহার্য; যেমনÑ ক. নদ-নদীতে বাঁধ নির্মাণের আগে ইলিশের ওপর এর সম্ভ^াব্য নেতিবাচক প্রভাবের আলোকে ব্যবস্থা নিতে হবে। খ. ইলিশ ও অন্যান্য মাছের বিচরণ ও নৌচলাচলের জন্য পদ্মা, ধলেশ্বরী, মধুমতি, গড়াইÑ এসব নদীর পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি এবং তলদেশ খনন করতে হবে। গ. ইলিশের আবাসস্থল সংরক্ষণ, পুনরুদ্ধার, নদীশাসন ও পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। ঘ. ইলিশের বিচরণস্থলে উপযুক্ত খাবার সরবরাহের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ আবশ্যক। ঙ. মাছের আবাসস্থল রক্ষার লক্ষ্যে আইন প্রণয়ন এবং বিদ্যমান আইনগুলোকে সময়োপযোগী করতে হবে।
মাছের নিরাপদ ডিম ছাড়ার সুবিধার্থে এবং মা ইলিশ রক্ষার উদ্দেশ্যে এ বছরও সারা দেশে ইলিশ ধরা, বিক্রি, বাজারজাতকরণ ও পরিবহনের ওপর ৫ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ১১ দিনের জন্য ১৪টি জেলার নদ-নদীতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের অনেকের মতে, এই সময় আরো বেশি, কমপক্ষে ১৫দিন হওয়া আবশ্যক।
বছরের মোট দুই মাস ১১ দিন ইলিশ জেলেদের জীবিকা নির্বাহে সহায়তা দেয়া হয়। কারণ, এই সময় তারা ইলিশ আহরণ থেকে বিরত থাকে। ইলিশ জেলেদের পরিচয়পত্র সরবরাহের কাজ শুরু হয়েছে। সেটা সঠিকভাবে করতে পারলে তাদের জীবন-জীবিকার উন্নতি হবে। তাদের জন্য ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং সঞ্চয়ের সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার।
লেখক : আইনজীবী

মিলানে আসেম, পশ্চিমবঙ্গে বর্ধমানকাণ্ড ও বাংলাদেশ by সাদেক খান

যুদ্ধ যুদ্ধ রব এখন চার দিকে। তবে গণবিধ্বংসী যুদ্ধ এখনো বৈশ্বিক মাত্রায় কিংবা ব্যাপক আকারে শুরু হয়নি। কেবল খণ্ড খণ্ড বিধ্বংসী যুদ্ধ ও অনিয়মিত নাশকতা সমান্তরালভাবে তিন মহাদেশে তথা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে সরাসরি উত্তর আটলান্টিক জোটের প নিয়ে যোগ দিয়েছে দণি গোলার্ধের চতুর্থ মহাদেশ অস্ট্রেলেশিয়া। চার মহাদেশব্যাপী যুদ্ধলিপ্ততার এই ভয়ঙ্কর বাস্তবতার উপলব্ধি তাড়া করে ফিরেছে ইতালির মিলান নগরীতে দুই দিনের এশিয়া-ইউরোপ মিটিং বা আসেম অধিবেশনে সমবেত বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও যোগ দিয়েছেন আসেমের ওই দশম অধিবেশনে। তার সাথে একান্ত সাাৎ হয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনের। একান্ত সাাৎ হয়েছে জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেলের সাথেও। ভাববিনিময়, সৌজন্যের আদান-প্রদান ঘটেছে। ওই আসেম অধিবেশনের পুরো সময়জুড়ে কিন্তু একটা উদ্বেগ ইউরোপ ও ইউরোপীয় রাশিয়া কিংবা এশিয়ার মধ্যপ্রাচ্যে তেলসমৃদ্ধ আরব রাষ্ট্রগুলোকে বিচলিত করে রেখেছে। তার প্রতিফলন ঘটেছে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেলের দীর্ঘ বৈঠক এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য নেতার সাথে রুশ নেতৃবৃন্দের সংলাপে। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের চিন্তা-চেতনায় তার কোনো সংক্রমণ হয়নি। তাদের নজরে পড়েনি মিলানে সমাগত ইউরোপীয় নেতৃবৃন্দের কাতরতা। রাশিয়ার বিরুদ্ধে, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে এক নয়া লৌহবলয় রচনায় শামিল হয়েছে ইউরোপ। তার জেরে জ্বালানি-অনিশ্চয়তা, বাজার সঙ্কোচন ইত্যাদির কারণে অস্থির ইউরোপীয় জনপরিবেশ। আইএসআইএল বা ইরাক ও লেভান্তের ইসলামি রাষ্ট্রের জিহাদে যোগদানকারী ইউরোপীয় মুসলিম স্বেচ্ছাসেবকেরা দেশে ফিরে নাশকতায় লিপ্ত হবে কি না, বহিরাগমনের সবগুলো পথে কঠোর পাহারার নিরাপত্তাবলয় বহাল করে তাদের দেশে ফেরা কিভাবে বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে রয়েছে ইউরোপীয় নেতাদের দুশ্চিন্তা। গৃহযুদ্ধে বিরতি সত্ত্বেও অদ্যাবধি পূর্ব ইউক্রেনে বন্ধ হয়নি স্থানে স্থানে রকেট আক্রমণ, কিয়েভ সরকারের দখলে থাকা একটি বিমানঘাঁটি থেকে কামানের গোলা ছোড়া। ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রেহাই পাচ্ছে না জনবসতিগুলো। ইরাকের বাগদাদের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে আইএসআইএল বা ইসলামি রাষ্ট্রের ঘোষিত খেলাফত। সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তে কুর্দি পেশমেরগা যোদ্ধারা ন্যাটো-মার্কিন বিমান হামলার ছত্রছায়ায় খেলাফতের অভিযান কিছুটা ঠেকিয়ে দিতে সম হলেও ইরাক ও সিরিয়ায় ক্রমে বেড়েই চলেছে ইসলামি রাষ্ট্রের পরিধি। এসব নিয়ে সেসব দেশের মানুষের আওয়াজ নেতাদের আলোচনা শুনেও যেন শুনতে পাননি আসেমে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল। শুধু বলে গেছেন, এ দেশের বাক্যবাগীশ মতাসীনদের কেতাবি মূল্যবোধ ও স্বপ্নের ভবিষ্যতের কথা, যে কথার সাথে তাদের কাজের কোনো মিল নেই, আর স্বদেশে তাদের জুলুম-দুরাচারও ক্রমবর্ধমান।
তবে ইরাক ও লেভান্তের ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘প্রজন্মব্যাপী’ যুদ্ধের জন্য যে জোট বা কোয়ালিশন মার্কিন নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে তাতে বাংলাদেশ যোগ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সঠিক পথেই চলেছে। বাংলাদেশ বলেছে, জাতিসঙ্ঘ সনদের আওতায় পরিচালিত শান্তিরা বা শান্তিপ্রতিষ্ঠা কিংবা আগ্রাসন প্রতিরোধের যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো ধরনের যুদ্ধে বাংলাদেশ লিপ্ত হবে না।
বস্তুত চীনের ‘শান্তিপূর্ণ জাগৃতি’-এর নীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে চীনের সাথে ‘সহযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা’-এর নীতির প্রভাবে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিসহায়ক যে স্থিতিস্থাপকতা এখনো বজায় রয়েছে, তার সুবিধাভোগী হয়েই এ দেশ অনগ্রসরতা ও দারিদ্র্যের ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, ক্রমে একটা প্রতিযোগিতাম অর্থনীতির দেশে পরিণত হয়েছে। শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতি-দুরাচার জুলুমবাজি সত্ত্বেও জনশক্তি, শ্রম ও উদ্যোগবলে অর্থনৈতিক বিকাশের একটা অভ্যন্তরীণ গতিবেগ ও বৈদেশিক বাণিজ্য-সম্পর্ক তৈরি করতে সম হয়েছে বাংলাদেশ। তার ধারাবাহিকতা রার জন্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সঙ্ঘাতমুক্ত অবস্থান এ দেশের একান্ত প্রয়োজন। একইভাবে প্রয়োজন দেশাভ্যন্তরে সুশাসন, জননিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ। অশান্তি সৃষ্টিকারী বৈদেশিক হুমকি বা কারসাজি আর অভ্যন্তরীণ দুরাচার বা নৈরাজ্য উভয়ের বিরুদ্ধেই এদেশবাসীকে সতর্ক থাকতে হবে।
তবে আঞ্চলিক যুদ্ধাবস্থা এড়াতে পারলেও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ধ্বংসাত্মক আঘাত কি এড়াতে পারছি আমরা?
২ অক্টোবর এ দেশের সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গ-বিহার-উড়িষ্যার মাওবাদী করিডোরের কাছে বর্ধমানে খাগড়াগড়ের একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে দু’জনের মৃত্যু ও একজন জখম হওয়ার ফলে সেখানে আর বীরভূমে গুপ্তসন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সন্ধান পায় ভারতীয় পুলিশ। ওই গোষ্ঠী বাংলাদেশের ‘অবদমিত নাশক দল’ জেএমবির (জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ) সম্পৃক্ততাপুষ্ট বলে দাবি করেছে ভারতীয় গোয়েন্দারা। ভারতীয় পত্রপত্রিকার খবর : সেখানে বাংলাদেশ থেকে কিছু জঙ্গি মুসলিম মৌলবাদী গিয়ে একটি দালানবাড়িতে বোমা বানাচ্ছিলেন। বোমা বানানোর সময় সেখানে বোমা বিস্ফোরণ ঘটে। ফলে মারা যান দু’জন বোমা নির্মাণকারী ও আহত হন আরো কয়েকজন। যে দালানবাড়িটিতে বোমা বানানো হচ্ছিল, বোমা বিস্ফোরণের ফলে তার কোনো অংশ ভেঙে যায়নি। (উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে নকশালপন্থীরা অনেক শক্তিশালী বোমা বানাতে জানে। সেসব বোমা বিস্ফোরণে দালানকোঠা ভেঙে পড়ে, সাঁকো, রেললাইন উড়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ‘জঙ্গি মুসলিম মৌলবাদীদের’ তৈরি পটকার সাথে তার তুলনা হয় না। যেমনÑ ভারতে ছত্তিশগড় রাজ্যে নকশালপন্থীরা স্থলমাইন ব্যবহার করছে, যা কেবল সেনাবাহিনীর লোকেরাই ব্যবহার করতে পারে।)
পূজার ছুটি (বাংলাদেশ বকরি ঈদ ও দুর্গাপূজা মিলিয়ে লম্বা ছুটি) থাকায় ঘটনাটি নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের উপাদান পাকিয়ে তুলতে একটু সময় লেগেছে। তা ছাড়া এক ঢিলে দুই পাখি মারার সুযোগ হাতে পেয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টির র কারিগরেরা প্রথমে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও রাজ্য সরকারকে তদন্তের বাহাদুরিতে ভুল করার সময় দিয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের টাস্কফোর্স, অ্যান্টিটেরোরিস্ট স্কোয়াড ও সিআইডি নিহত শাকিল ও আহত হাসানের দুই স্ত্রীকে অকুস্থল থেকে গ্রেফতার করে। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী তারা নিকটবর্তী বাদশাহি রোডের একটি পোড়োবাড়িতে ৮ অক্টোবর তল্লাশি চালিয়ে কিছু আলামত পেয়ে বাড়িটি সিলগালা করে। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গের সরকারবিরোধী দলগুলোর তরফে আওয়াজ ওঠে জাতীয় গোয়েন্দা এজেন্সির হাতে তদন্তভার দেয়ার জন্য। সন্দেহ ব্যক্ত করা হয়, তৃণমূল কর্মীদের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, রাজ্য পুলিশ আলামত নষ্ট করতে পারে।
তার আগে ৭ অক্টোবর পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির দেয়া খবর : রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে জঙ্গি তালিমের জন্য প্রায় ৬৫টি শিবির গড়েছে (ভারতের) নিষিদ্ধ সংগঠন সিমি। বাংলাদেশের মৌলবাদীরা এবং (পাকিস্তানের) আইএসআই ওই জঙ্গিশিবিরগুলোকে প্রত্যভাবে মদদ জোগাচ্ছে বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। এ সম্পর্কে গোয়েন্দা রিপোর্ট পাওয়ার পর ভারতের জাতীয় তদন্ত এজেন্সি (এনআইএ) কেন্দ্রের নির্দেশে খোঁজখবর শুরু করেছে। শুধু এই রাজ্য নয়, ত্রিপুরা ও অসম সীমান্তেও সিমি এ ধরনের জঙ্গি তালিমশিবির তৈরি করেছে। বর্ধমান বিস্ফোরণ-কাণ্ডের তদন্তে নেমে সিআইডি সিমির যোগসাজশের হদিস পেয়েছে। সিআইডি এবং রাজ্য পুলিশের অফিসাররা মনে করছেন, সিমি বর্ধমানের ওই বাড়িতে বসে যেমন অত্যাধুনিক বিস্ফোরক তৈরি করেছে, তেমনি সীমান্তবর্তী নদিয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও দণি দিনাজপুর জেলায় বড় ধরনের জাল বিস্তার করেছে। এই চার জেলার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশী জঙ্গিরা ভারতে ঢুকে পড়ছে। রাজ্যের কয়েকজন লিংকম্যান অস্ত্র ও বিস্ফোরক বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কয়েকজন বাংলাদেশী আবার ভুয়া তথ্য দিয়ে এই দেশের ভোটার তালিকায় নাম তুলেছে ও সচিত্র পরিচয়পত্রও তৈরি করেছে। শুধু নদিয়া জেলায় এ রকম ২৭টি জঙ্গি ঘাঁটি তৈরি হয়েছে। এ ছাড়াও মালদহ, মুর্শিদাবাদ ও দণি দিনাজপুর জেলায় এ রকম গোপন ক্যাম্পসহ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বাংলাদেশ সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় মোট ৬৫টি জঙ্গি ঘাঁটির খবর পাওয়া গেছে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দফতরের নির্দেশ মোতাবেক উত্তর চব্বিশপরগনা, নদিয়া ও মুর্শিদাবাদের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশ তল্লাশি চালানো শুরু করেছে। কেন্দ্রের নির্দেশে এনআইএ-ও পৃথকভাবে তদন্ত শুরু করেছে।
৭ অক্টোবর কলকাতা থেকে আরো খবর : বর্ধমানে বিস্ফোরণ-কাণ্ডের সাথে বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদিনের (জুম) সংস্রবের আরো সুস্পষ্ট প্রমাণ
তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। গোয়েন্দারা নিশ্চিত, চলতি বছরে ফেব্র“য়ারি মাসের ২৩ তারিখ বাংলাদেশের ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকায় পুলিশ খুন করে দুই জুম নেতাকে ছিনিয়ে নিয়েছিল যে দলটি, তারাই ঘাঁটি গেড়েছিল বর্ধমানে। তার আগে এ দলটিই মুর্শিদাবাদের লালবাগ এলাকায় সাময়িক আস্তানা গেড়ে ‘জিহাদি’ নিয়োগের কাজ চালাচ্ছিল। বিস্ফোরক জোগাড় করা, বোমা বানানো এবং সেই ‘কনসাইনমেন্ট’ বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য ক্যারিয়ার নিয়োগের কাজও শুরু করেছে তারা। নিয়োগের এই কাজ পরিচালিত হয়েছে বর্ধমান-কাণ্ডে নাম জড়ানো কৌসরের মাধ্যমে। খাগড়াগড়ের ওই বাড়িতে বহিরাগতদের নিয়মিত আনাগোনা ছিল। তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনই বিশেষ করে কৌসর, রসিক ও ফারুক নামে তিনজন বাংলাদেশে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’।
১১ অক্টোবর ভারতে অফিস-আদালত খোলার পরপরই অনলাইনে খবর : পশ্চিমবঙ্গ সরকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ১০ অক্টোবর কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থার (এনআইএ) হাতে বর্ধমান-কাণ্ডের তদন্তভার তুলে দিলো। জামা’আতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) প্রতিনিধিরা মুর্শিদাবাদ, নদিয়া ও বর্ধমানসহ নানা এলাকায় ধর্মীয় শিাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঘুরে এপার বাংলায় ঘাঁটি গাড়তে শুরু করেছিল। সিবিআইয়ের নজরে এখন ১৯ নম্বর দরগা রোডের বাড়ি, যেখানে নিষিদ্ধ সিমির মূল ঠিকানা ছিল, এখন একটি প্রকাশনা সংস্থার অফিস।
বর্ধমানের খাগড়াগড়ে ওই বিস্ফোরণে বাংলাদেশী বোমা কারিগর শামিম শাকিল আহমেদ ও স্বপন মণ্ডল নামে দু’জন নিহত হন। নিহত দু’জনসহ পুরো দলটি বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী সংগঠন জেএমবির সদস্য। বিস্ফোরণে আহত আবদুল হাকিম এর বেশি তথ্য দিতে রাজি হননি। শাকিলের স্ত্রী রুমি বিবি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, দলটি লেদ মেশিনের সাহায্যে অস্ত্র বানানোর চেষ্টা করছিল। বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়ে যাওয়া মোবাইল ফোনের আইএমআই রেকর্ডে রকেট লঞ্চারের ডিজাইনের ছবি ও পেণাস্ত্রের ডিজাইন পাওয়া গেছে।
তারপর ১৬ অক্টোবর বিশেষ খবর : বর্ধমানের বাদশাহি রোডে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সিলগালা করা বাড়িটি থেকেই পায়খানায় লুকানো ৩০টি গ্রেনেড-জাতীয় হাতেগড়া তাজা বোমা উদ্ধার করেছে এনএইএ, এনএসজির যৌথ বিশেষজ্ঞ দল ও তাদের বিস্ফোরক ঘ্রাণ সন্ধানী কুকুরবাহিনী। পশ্চিমবঙ্গের গোয়েন্দারা সেসব খুঁজে পায়নি বা ভালো করে খুঁজে দেখেনি। নজরদারিতে রাখা আরেকটি মাদরাসায় অভিযান চালায়নি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, যদিও জব্দ করা একটি পেনড্রাইভে সেখানে জঙ্গি প্রশিণের ভিডিও চিত্রের তথ্য তাদের হাতে এসেছিল।
এর পর ১৭ অক্টোবর থেকে শুরু হলো ভারতের, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের মিডিয়ায় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সূত্রে ফাঁস করা
তদন্তের খবর দিয়ে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধাস্ত্রের নানা বোমাবার্তার প্রস্রবণ। যেমন অনলাইনে এলো : বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের পর একের পর এক তল্লাশি অভিযান চালিয়ে পাওয়া যাচ্ছে প্রচুর পরিমাণে গ্রেনেড ও বিস্ফোরক। এসব গ্রেনেড ও বিস্ফোরক বাংলাদেশ ও আসামের জঙ্গিদের কাছেও পাঠানোর জন্য তৈরি করা হয়েছিল বিস্ফোরণে নিহত শাকিল গাজীর তত্ত্বাবধানে। এসব গ্রেনেড ও বিস্ফোরক মজুদ করে রাখা হয়েছিল বিভিন্ন জঙ্গিডেরায়। বর্ধমানে বিস্ফোরণের ঘটনাস্থল থেকে ৫০০ মিটার দূরে বাদশাহি রোডে একটি বাড়ি থেকে এনআইএ গোয়েন্দা ও এনএসজির কমান্ডোরা উদ্ধার করেছিল ৪০টি গ্রেনেড এবং ২৫ বস্তা বিস্ফোরক। এ বাড়িটিতে থাকত মন্টু শেখ ও তার ছেলে রেজাউল শেখ। বিস্ফোরকগুলো লুকানো ছিল বাথরুমের একটি গোপন স্থানে। গোয়েন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, এ বিপুল বিস্ফোরক কি সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ চালানোর জন্য রাখা হয়েছিল, নাকি সেনাদের ওপর আক্রমণের জন্য। যৌথবাহিনীর সদস্যরা কুকুর ও বোম স্কোয়াডকে সাথে নিয়ে তল্লাশিতে নেমে যেভাবে বিস্ফোরক পাচ্ছে তাতে তাদের ধারণা, বর্ধমান ও সংলগ্ন এলাকায় আরো গ্রেনেড ও বিস্ফোরক মজুদ রাখা হয়েছে। রেজাউল শেখ ও তার পরিবার বিস্ফোরণের দিন থেকেই লাপাত্তা।
পত্রিকার খবর : মাওবাদী নারীবাহিনীর কথা এত দিন জানা ছিল। এবার ধরা পড়ল পশ্চিমবঙ্গে একটি জিহাদি প্রমীলা বাহিনীর অস্তিত্ব। ঘটনায় নিহত শাকিল আহমেদের স্ত্রী রাজিয়া বিবি এবং জখম আব্দুল হাকিমের স্ত্রী আলিমা বিবি দু’জনই ওই নারী বাহিনীর সদস্য। বাকিরা এখনো অধরা।
এনআইএর দাবি : বাহিনী গঠন ও যাবতীয় প্রশিণের প্রধান দায়িত্বে ছিল আয়েশা বিবি, যে কিনা বর্ধমানের মঙ্গলকোটের কৃষ্ণবাটী গ্রামের বাসিন্দা মৌলানা ইউসুফ শেখের স্ত্রী। খাগড়াগড়-কাণ্ড যে আন্তর্জাতিক জঙ্গিজালকে প্রকাশ্যে এনেছে, পশ্চিমবঙ্গে তার চাঁই হলো ইউসুফ। জিহাদিদের অন্যতম আঁতুড় হিসেবে চিহ্নিত শিমুলিয়া মাদরাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ইউসুফ আপাতত ফেরার। আয়েশাও পালিয়েছে।
বাংলাদেশের জেএমবি ও ভারতের জমিয়তুল মুজাহিদিনকে মেলাতে সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছে ওসামা বিন লাদেনের আলকায়েদা। আলকায়েদার বর্তমান প্রধান আয়মান আল জাওয়াহিরির লেখা সাত পাতার যে চিঠিটি ২০০৯-এ ফাঁস হয়, তাতে জিহাদে মহিলাদের শামিল হওয়ার আহ্বান রয়েছে।
আফগানিস্তানের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত হানার ল্েয আলকায়েদাই গড়েছিল প্রমীলা জঙ্গিবাহিনী ‘বোরখা ব্রিগেড’। আত্মঘাতী নারীজঙ্গির মারণ হানার দৃষ্টান্তও রয়েছে ভারতে। এলটিটিইর এমন এক হামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধীকে প্রাণ দিতে হয়।
রাজিয়া, আলিমা ছাড়াও জিন্নাতুর বিবি, জরিনা বিবি, রুম্পা খাতুন ও খালেদা বিবি বীরভূমের এই চার তরুণী শিমুলিয়া ও মকিমনগর মাদরাসায় জঙ্গি তালিম নিয়েছিল বলে
তদন্তকারীদের সন্দেহ। চারজনই অবশ্য ফেরার। তাদের খোঁজ করতে রাজ্যে আরো মহিলা অফিসার ও কনস্টেবল আনছে এনআইএ। ‘মাওবাদী নেত্রী জাগরি বাস্কে, সুচিত্রা মাহাতো, শোভা মান্ডিরা দু-তিন বছর আগে মূল স্রোতে ফিরেছে ঠিকই; কিন্তু এখন ঘুম কেড়েছে আয়েশারা।’ মন্তব্য এক আইবি-কর্তার।
পত্রিকায় আরো খবর মালদহ থেকে : কালিয়াচকের বাঁশবাগানে মিলল ১৬টি বলবোমা। শক্তপোক্ত প্লাস্টিকের বলের কিছুটা কেটে কমলা রঙের বিস্ফোরক ঠাসা। রয়েছে ছোট পেরেক, পাথরকুচি, বল বিয়ারিং, ধারাল লোহার টুকরোও। সেসব পুরে আঠা দিয়ে ফের বলটি জোড়া হয়েছে। সব মিলিয়ে আনুমানিক ওজন প্রায় ৫০০ গ্রাম। এমনই ১৬টি ‘বলবোমা’ শুক্রবার উদ্ধার হলো মালদহে। তার জেরে ফের তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছে মালদহ জেলা পুলিশের বিরুদ্ধে। কারণ, যে শিকের বাড়ির বাগানে বড় মাপের প্লাস্টিকের জেরিকেনে বোমাগুলো রাখা ছিল, পুলিশ তাকে রাত পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদ করেনি।
১৮ অক্টোবরের ভারতীয় পত্রপত্রিকায় জবর খবর : যে ধরনের রাসায়নিক বিস্ফোরক বর্ধমানে উদ্ধার হয়েছে, তার সাথে শ্রীলঙ্কায় মুছে যাওয়া তামিল জঙ্গি সংগঠন এলটিটিইর (লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম) ব্যবহার করা বিস্ফোরকের মিল খুঁজে পেয়ে কপালে ভাঁজ পড়েছে ন্যাশনাল সিকিউরিটি গার্ডের (এনএসজি) বোমা বিশেষজ্ঞদের; কিন্তু এখন তো আর এলটিটিইর অস্তিত্বই নেই। কোথা থেকে উঠে এলো এদের নাম? এনএসজির সাবেক কর্তা এবং বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘ভুলে যাবেন না, সম্প্রতি ছত্তিশগড়ে মাওবাদীদের বিস্ফোরণের ঘটনাতেও এলটিটিইর ছাপ পেয়েছে স্বরাষ্ট্র দফতর। সংগঠন হিসেবে এলটিটিইর এখন আর অস্তিত্ব না থাকলেও যে পাকা মাথার যুবকেরা এলটিটিইর জন্য বিস্ফোরক বানাত, তারা রয়েই গেছে।’
ভারতীয় গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, একসময় এলটিটিইর হয়ে কাজ করা এই যুবকেরাই এখন মোটা টাকার বিনিময়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন, মাওবাদী বা (পাকিস্তানের) লস্করের মতো জঙ্গিদের বিস্ফোরক তৈরির প্রশিণ দিচ্ছে। বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বিস্ফোরণে নিহত শাকিল বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠন জেএমবির সদস্য ছিল (নিহত দ্বিতীয় ব্যক্তির নাম শোভন মণ্ডল, নাগরিকত্ব ভারতীয়, অমুসলিম)। গোয়েন্দাদের আশঙ্কা, সম্প্রতি এই সংগঠনও হয়তো মোটা টাকা দিয়ে এলটিটিইর বিস্ফোরক বানানোর কারিগরি আয়ত্ত করেছে। কয়েক দিনের তল্লাশিতে বর্ধমানের খাগড়াগড় ও শিমুলিয়া থেকে পাওয়া গেছে বেশ কিছু রাসায়নিক। এগুলোর সবই উচ্চমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক বানাতে কাজে লাগে। এই রাসায়নিক দেখেই বিস্মিত ভারতের গোয়েন্দারা। ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা এজেন্সি এনআইএর বক্তব্য, সামান্য নড়াচড়াতেই ফেটে যেতে পারে এই বিস্ফোরক। যে কারণে, মঙ্গলবার খাগড়াগড়ের দোতলায় উঠে রাজ্য পুলিশ ও সিআইডির কাছ থেকে সব জিনিস বুঝে নিলেও ওই বিস্ফোরক সরিয়ে নেয়ার ঝুঁকি নেয়নি তারা। এর পরই বর্ধমানে ডেকে আনা হয়েছে এনএসজির বোমা বিশেষজ্ঞদের। রাসায়নিকগুলো দেখে তারা বলছেন, এ ধরনের রাসায়নিক দিয়ে একসময় বিস্ফোরক তৈরি করত এলটিটিই। গোয়েন্দাদের একাংশের মতে, সম্প্রতি বিস্ফোরক বানানোর কিছু কৌশল ইন্টারনেট মারফত শেখার চেষ্টা করছিল শাকিলরা। খাগড়াগড়-শিমুলিয়ায় তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া তথ্যপ্রমাণ সে রকমই ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে ই-মেইল মারফত সেগুলো তাদের কাছে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে বলেও মনে করা হচ্ছে। পিকরিক এসিডের মতো বিস্ফোরক যে ইন্টারনেট দেখে বানানো সম্ভব নয়, সে কথাও মানছেন বিশেষজ্ঞরা।
একসময়ে সার থেকে আইইডি তৈরি হতো। সেই আইইডির ব্যবহার শুরু করে আইরিশ রিপাবলিকান আর্মি। তারাই বিস্ফোরক হিসেবে নাইট্রিক এসিড ব্যবহার শুরু করে। এখন বিস্ফোরক বানানোর জন্য অত্যাধুনিক রাসায়নিক লেড অ্যাজাইড বা পিকরিক এসিড ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারতীয় গোয়েন্দারাই বলছেন, ‘ভয়ঙ্কর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। এক দিকে বিস্ফোরক বানানোয় এলটিটিইর এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সাথে আইএসআই-হুজি জঙ্গিদের টাকা ও নেটওয়ার্ক, জামা’আতদের আত্মবিসর্জনের সঙ্কল্প এবং সর্বশেষে রাজনৈতিক নেতাদের মদদ।’
এখানে ‘রাজনৈতিক নেতাদের মদদ’ বলতে অবশ্য ইঙ্গিত করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে মতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের দিকে। তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুসলিম ভোটে আর নকশাল জঙ্গিদের মদদ দিয়ে মতায় এসেছেন, এমনই ধুয়া তুলেছে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি ও বামফ্রন্ট। তথা সম্ভাব্য নাশকতার জন্য বোমা তৈরিতে হতাহতের ঘটনা নিয়ে মতার লড়াইয়ের জাল ফাঁদা আর দোষারোপের রাজনীতি শুরু হয়েছে। সেই জালের ফাঁদে বাংলাদেশকেও জড়িয়ে ফেলার বাকায়দা সুযোগ রেখেছে ভারতীয় গোয়েন্দারা। বাংলাদেশবিদ্বেষী নানা ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধাস্ত্র বহু দিন ধরেই মিডিয়ার মাধ্যমে শানিয়ে চলেছে ভারতশক্তির র সংস্থা। বর্ধমান-কাণ্ডের যুদ্ধাস্ত্রটি এই পর্যায়ে পশ্চিমবঙ্গের মমতা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কাজে কম-বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে বলেই মনে হয়। তবে তার কামানের নল দণি এশিয়ায় আল জাওয়াহিরি ঘোষিত আলকায়েদা চক্রান্তের দোহাই দিয়ে ভূরাজনৈতিক স্বার্থে বাংলাদেশের দিকে যেকোনো সময় যে ঘোরানো হতে পারে, সে কথা বলার অপো রাখে না।
লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক

আজকের প্রজন্মের নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ by শাহ আবদুল হান্নান

আমি গত শতাব্দীর ষাটের দশকের ছাত্র। সময়ের পরিবর্তনে নিশ্চয়ই সমস্যা বা পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়; কিন্তু গত ২০ বছরে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে, যা আগের কোনো প্রজন্ম মোকাবেলা করেছে বলে মনে হয় না। এখন যারা ১৮ বা তার কম বয়সের, তারা মোবাইল ও ইন্টারনেট প্রযুক্তির ভয়াবহ নৈতিকতা বিধ্বংসী উপাদানের শিকার। মোবাইলে নানা গোপন ছবি ধারণ এবং কথাবার্তা রেকর্ড করার সুযোগ রয়েছে, যা অনেক সময় অন্য ব্যক্তি জানতে পারে না। তা ছাড়া কিছু কোম্পানি এমন সময়ে কল চার্জ কমিয়ে দেয়, যার ফলে এ বয়সের ছেলেমেয়েরা প্রায় সারা রাত মোবাইলে কথা বলে তাদের বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে। ফলে তাদের কান নষ্ট হয়, ঘুম নষ্ট হয়, লেখাপড়া নষ্ট হয়, ভালো করে পরের দিন কাস করা হয় না। এ ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনা, যার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
তেমনিভাবে আগের প্রজন্ম ইন্টারনেট প্রযুক্তির ভালো বা মন্দের সম্মুখীন হয়নি। এ প্রযুক্তির কল্যাণের শেষ নেই। সেগুলো বর্ণনার স্থান এটা নয়; কিন্তু এর অন্য দিকটি হচ্ছে, এ প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্নোগ্রাফি এবং নগ্ন যৌনতার অস্বাভাবিক এবং সীমাহীন বিস্তার হচ্ছে। ঘরে ঘরে বিশেষ করে সাইবার ক্যাফের মাধ্যমে।
বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত এ প্রযুক্তি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো এই ভয়াবহ বিকৃতি প্রতিরোধের কোনো কার্যকর প্রচেষ্টা করছে বলে আমার জানা নেই। আমার অভিজ্ঞতা হচ্ছে এই যে, যখন ইন্টারনেটে কাজ করি তখন সময়ে সময়ে বিকৃত যৌন দৃশ্যাবলি স্ক্রিনে চলে আসে। এসব বন্ধ করা কঠিন নয়। এসব ক্ষেত্রে যেভাবেই হোক বিভিন্ন দেশের সরকারকে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে ভাবতে হবে এবং বসতে হবে যেন এটা বন্ধ করা যায়। আমরা এটুকু জানি যে, কোনো কোনো দেশ এ ক্ষেত্রে সফল হয়েছে।
আজকের প্রজন্ম আরো বিভিন্ন ধরনের নতুন মাত্রার অস্বাভাবিকতার সম্মুখীন। যেমনÑ আজকাল কিছু ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠান সুপারস্টার বা এ ধরনের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে হাজার হাজার কিশোরীকে বিভিন্ন ধরনের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত করছে। যদিও তারা এগুলোকে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা বলছে না। এসবের আসল উদ্দেশ্য পুঁজিবাদের মূলনীতি অনুযায়ী এসব কোম্পানির মুনাফা বৃদ্ধি করা। তাতে নৈতিকতার কী হলো সেটা কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। এসব প্রতিযোগিতার উপস্থাপিকা এবং অংশগ্রহণকারীরা অনেক সময় এমন পোশাক পরেন, যা আমাদের কালচারে মোটেই সঙ্গত বলা চলে না। তাদের উগ্র সাজসজ্জা থাকে, অনেক সময় পোশাক টাইট হয়, ওড়না থাকে না, কামিজ ছোট হয় এবং উগ্র রঙচঙের হয়। এগুলো প্রকৃতপক্ষে আমাদের উঠতি বংশধরদের শিক্ষা বা রুচি বা যোগ্যতা কোনোভাবেই বৃদ্ধি করছে না।
বর্তমান বস্তুবাদী সভ্যতার প্রভাবেই বলব যে, এ বয়সের ছেলেমেয়েরা নৈতিকতার ক্ষেত্রে তাদের যা কর্তব্য তা তারা ধরে রাখতে পারছে না। তারাও ভোগবাদী হয়ে যাচ্ছে। একটি উদাহরণ দিইÑ আমারই এক ভাগ্নি, যে হলে থাকে, তার সাথে আলাপ করতে গিয়ে জানতে পারলাম যে, ছুটির দিনগুলোতে এ বয়সের মেয়েরা বিশেষ করে সাজসজ্জা, ঘুরে বেড়ানো এবং পার্লারে গিয়ে বেশি সময় ব্যয় করে। সে বলল, কোনো ভালো অনুষ্ঠানের দাওয়াত দিলে তারা বলে, এতে কী হবে। এ ক’দিনের দুনিয়াতে ভোগ করাইতো উচিত। এ সুযোগতো আর আসবে না। তার এ কথা বিশ্বব্যাপী সেকুলার চিন্তা এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতাই প্রমাণ করে।
আমার নিবেদন যে, এই প্রজন্মই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভবিষ্যৎ মানবতা তাদেরই সন্তানসন্ততি হবে। এটা অভিভাবকদের জন্য একান্ত জরুরি যে, তারা এই প্রজন্মকে রক্ষায় যথাযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন। অমুসলিমদের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ হওয়া উচিত তা তাদেরই ধর্মীয় বা আদর্শিক নেতারা ঠিক করবেন; কিন্তু মুসলিম উম্মাহর ক্ষেত্রে আমি বলতে চাই যে, অভিভাবকদের দায়িত্ব হচ্ছেÑ
১. ৮-১০ বছর বয়সের মধ্যে রাসূল সা:-এর জীবনী অন্তত জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত ছেলে এবং মেয়েকে পড়িয়ে দেয়া। রাসূল সা:-এর জীবনী হচ্ছে সর্বোত্তম আদর্শ। এটা ভালো করে না পড়ে কখনোই উত্তম নৈতিকতা অর্জন করা সম্ভব নয়।
২. তেমনিভাবে অন্তত আবু বকর রা:, ওমর রা:, উসমান রা:, আলী রা:, খাদিজা রা:, ফাতেমা রা: ও আয়েশা রা:-এর জীবনী ১১-১২ বছর বয়সের মধ্যে পড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এদের সমকক্ষ মানুষ পৃথিবীতে হয়নি।
৩. অন্তত খেলাফতে রাশেদার ইতিহাস পড়ানোর ব্যবস্থা করা, যাতে তারা আদর্শ শাসনের নমুনা বুঝতে পারে এবং তাদের অতীত ঐতিহ্য জানতে পারে।
৪. তেমনিভাবে এ বয়সের ছেলেমেয়েকে তাদের দেশে ইসলামের আগমন ও বিস্তার এবং মুসলিম শাসনের ইতিহাস পড়িয়ে দেয়া, যাতে তারা তাদের স্থানীয় ঐতিহ্য জানতে পারে।
৫. তাদের অল্প বয়সে অন্তত কুরআন পাকের কিছু অংশের অতি সুন্দর শুদ্ধ তিলাওয়াত শেখানো, যাতে কুরআনের সুরের যে সৌন্দর্য, যে মাধুর্য তা তাদের অন্তরকে প্রভাবিত করে। একই সাথে কুরআনের যতটুকু সম্ভব অর্থ পড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা।
৬. সর্বশেষ হচ্ছে তাদেরকে শুরু থেকেই শালীন পোশাকের দিকে উদ্বুদ্ধ করা। পৃথিবীতে যত নোংরামি হচ্ছে তার একটি কারণ অশালীন পোশাক।
আমি মুসলিম উম্মাহর সরকার, নেতা, আলেম, চিন্তাবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক নেতা, রাজনৈতিক ব্যক্তি, ইমাম ও খতিব সবার কাছে আবেদন করি, এ বিষয়টি আপনারা গভীরভাবে বিবেচনা করুন এবং এ ব্যাপারে কার্যকর স্থানীয়, সামাজিক ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিন।
লেখক : সাবেক সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

গিয়াস কামাল চৌধুরী by মীযানুল করীম

আজ ২৬ অক্টোবর। প্রখ্যাত সাংবাদিক গিয়াস কামাল চৌধুরীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। গত বছর এ দিনে তিনি ৭৪ বছর বয়সে ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। এর আগে কয়েক বছর ধরে ছিলেন গুরুতর অসুস্থ। তার জন্ম ১৯৩৯ সালের ২১ জুলাই ফেনী জেলার সদর উপজেলার শর্শাদির চৌধুরী পরিবারে। গিয়াস কামাল চৌধুরী বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অঙ্গনে শুধু একজন সিনিয়র সাংবাদিকই ছিলেন না, সংবাদপত্রসেবীদের সংগ্রামী ট্রেড ইউনিয়ন নেতা হিসেবেও ছিলেন সুপরিচিত। ছাত্রজীবন থেকেই গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, সেই সাথে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা এবং বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের প্রশ্নে গিয়াস কামাল ছিলেন বরাবর আপসহীন। আমাদের জাতীয় রাজনীতির অঙ্গনে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও ইসলামি মূল্যবোধে উজ্জীবিত যে ধারা, এর সপক্ষে এবং সর্বপ্রকার আগ্রাসন ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে তার অবস্থান ছিল সামনের সারিতে।
গিয়াস কামালের বাবা রফিক উদ্দীন চৌধুরী একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। মা মুনীর আখতার খাতুন চৌধুরাণী ছিলেন কাব্যপ্রতিভার অধিকারী। পিতার কর্মস্থল, চট্টগ্রাম শহরে জন্ম হলেও গিয়াস কামাল চৌধুরীর স্কুলজীবন কেটেছে ফেনী (বর্তমানে সরকারি পাইলট) হাইস্কুলে। এরপর কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি উত্তীর্ণ হন। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ে রাজনীতি ও ছাত্র আন্দোলনে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হয়ে যান। তিনি মাস্টার্স ও আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি ছাড়াও সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা অর্জন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তখনো এ দেশে সাংবাদিকতায় ডিগ্রি বা অনার্স কোর্স চালু হয়নি।
গিয়াস কামাল চৌধুরী রাজনৈতিক জীবনে ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর আদর্শে উদ্বুদ্ধ। ছাত্রজীবন থেকেই স্বপ্ন দেখতেন বৈষম্য ও শোষণমুক্ত সমাজের, যেখানে কৃষক শ্রমিক মেহনতি মানুষের অধিকার হবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ঢাকায় ১৯৬২ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম নেতা হিসেবে তিনি কারারুদ্ধও হয়েছিলেন।
গিয়াস কামাল সাংবাদিকতার মাধ্যমে দেশ ও জাতির সেবা করে গেছেন একনাগাড়ে চার দশকেরও বেশি সময়। কর্মজীবনের সূচনা করেন ১৯৬৪ সালে ‘ঢাকা টাইমস’ পত্রিকায় যোগ দিয়ে। এটি ছিল ইত্তেফাক গ্রুপের সাপ্তাহিক প্রকাশনা। পরে তিনি ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজের সাথে জড়িত হন। বাংলাদেশ হওয়ার পরে যোগ দেন জাতীয় বার্তা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায়। এখানে কাটিয়েছেন প্রায় তিন দশক। শেষ জীবনে দৈনিক খবরপত্র সম্পাদনা করেছেন। তিনি বেশ কয়েক বছর ছিলেন ভয়েস অব আমেরিকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি।
আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী গণ-আন্দোলনকালে ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা সংবাদ শোনার জন্য দেশের মানুষ সাগ্রহে প্রতীক্ষা করত। এর কারণ, গিয়াস কামালের স্বকণ্ঠে দেশের প্রকৃত পরিস্থিতি ফুটে উঠত এই সংবাদে। তিনি সরকার নিয়ন্ত্রিত বাসসের সাংবাদিক হয়েও তখন পেশাগত কাজে সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
গিয়াস কামাল আজীবন সোচ্চার ছিলেন গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতাসহ ন্যায্য দাবিদাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন ও ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে গেছেন। তিনি জাতীয় প্রেস কাবের সভাপতিও ছিলেন। যদিও লিখেছেন কম, তবুও সাপ্তাহিক বিক্রমসহ কয়েকটি পত্রিকায় তার কলামগুলো জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতার প্রতিফলন। সাংবাদিকতার অঙ্গনে অবদান রাখার জন্য তিনি একুশে পদকে ভূষিত হয়েছিলেন।
ব্যক্তিজীবনে কুমিল্লা শহরের ঐতিহ্যবাহী দারোগাবাড়ির সাথে তার ছিল ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা। সাহিত্যিক মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও প্রখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন খসরু সম্পর্কের দিক দিয়ে তার চাচা। কবি বেলাল চৌধুরী তার আপন ভাই।
নব্বই দশকের প্রথম দিকে গিয়াস কামাল চৌধুরী ব্রেইন হেমারেজে আক্রান্ত হয়ে অনেক দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠলেও বিশেষ করে ২০১১ সালে আক্রান্ত হন দুরারোগ্য ব্যাধিতে। ফলে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং চলৎশক্তিরহিত অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন বহু দিন। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি সরব সংগ্রামী জীবনের অবসান হলেও গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার কায়েমের আন্দোলনে তার বিরাট অবদান স্মরণীয় হয়ে থকাবে।

করোনেশন বালিকা বিদ্যালয় সম্পর্কিত সংবাদ প্রসঙ্গে by ফারহানা নাজ

গত ০৬-০৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের ৩০-৮-২০১৪ সংঘটিত একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্রী স্নেহার ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে কর্তৃপক্ষ মনে করে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনা অবহিত হওয়ার পরপরই স্নেহাকে শুশ্রƒষা করা, বাবা-মাকে তাৎক্ষণিকভাবে খবর দেয়া, প্রধান শিক্ষিকা সাতজন শিক্ষকসহ ঘটনার দিনই স্নেহাদের বাসায় যাওয়া, স্নেহার চিকিৎসার জন্য আর্থিক সহযোগিতা বাবদ ২৫ হাজার টাকা প্রদান, তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের খুঁজে বের করার আশ্বাস, ঘটনার দিনই তদন্ত কমিটি গঠন, ভিজিলেন্স টিম গঠন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা, বিদ্যালয়ের উভয় শিফটে দৈনিক সমাবেশে, প্রতিটি কাসে সতর্কতা ও উপদেশমূলক বক্তব্য প্রদান, নোটিশ প্রদান, ওই পরিবারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষাকরাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিশেষ মহল  বা ব্যক্তিরা স্নেহার ঘটনাকে পুঁজি করে বিষয়টি ভিন্নখাতে প্রবাহিত করে শত বছরের ঐতিহ্যবাহী ও দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এ বিদ্যাপীঠ এবং এর কর্তৃপক্ষের সুনাম ও ভাবমর্যাদা ুণœœ করতে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচারে লিপ্ত। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ওই ঘটনার পর কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় সাত দিনের মধ্যে এর সাথে জড়িত তিন ছাত্রীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়। জেলা প্রশাসক মহোদয়ের সভাপতিত্বে গত ০৮-০৯-২০১৪ অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত মোতাবেক দোষী তিন ছাত্রীকে ছাড়পত্র প্রদান এবং থানায় জিডি করার মতো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বার্থান্বেষী মহল যাতে অপপ্রচারের মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও ভাবমর্যাদা ুণœকরতে না পারে, সে ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ সহায়তা প্রত্যাশা করে।
ফারহানা নাজ, প্রধান শিক্ষিকা, সরকারি করোনেশন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়, খুলনা

লাশ নিয়ে শোকার্তদের মিছিল by খালিদ সাইফুল্লাহ

অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশবাহী গাড়ি বাসা থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ এবং বায়তুল মোকাররম থেকে বাসায় নেয়ার সময় জনতার ঢল বিশাল শোকমিছিলে পরিণত হয়। দুপুরে লাশের গাড়ির সাথে হাজার হাজার মানুষ হেঁটে মগবাজারের কাজী অফিস লেনের বাসা থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদে আসেন। আবার একইভাবে বিশাল মিছিল নিয়ে বায়তুল মোকাররম থেকে মগবাজার পর্যন্ত পৌঁছেন। এ সময় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। গতকাল শনিবার সকাল থেকেই মগবাজার কাজী অফিস লেনে অধ্যাপক গোলাম আযমের বাসার সামনে ভিড় জমান হাজার হাজার মানুষ। প্রিয় নেতাকে দেখার সুযোগ করে দিতে সকাল ৭টার পর তার লাশবাহী গাড়িটি বাসার নিচে রাখা হয়। এরপর রাজধানী ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে আসা মানুষ সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে তাকে শেষবারের মতো দেখেন। এ সময় মাইকে অনবরত কালেমা শাহাদত ও দোয়া চলতে থাকে। আগত দর্শনার্থীরাও দোয়া-দুরুদ পড়েন। সময় যত বাড়তে থাকে কাজী অফিস লেনে নেতাকর্মী ও জনসাধারণের আগমন তত বাড়তে থাকে। তাকে দেখতে আসেন দৈনিক সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনীম আলম, প্রচার বিভাগের সহকারী সেক্রেটারি ব্যারিস্টার মতিউর রহমান আকন্দ, নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি ডা: আবদুল্লাহ মো: তাহের, বরিশাল মহানগরী আমির মোয়াজ্জেম হোসেন, ঢাকা মহানগর সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিন ও মঞ্জুরুল ইসলাম ভুঁইয়া, বিশিষ্ট আলেম অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদিন, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম সাঈদী প্রমুখ। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, সিলেট, যশোর, নোয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীরা তাকে দেখতে ভিড় জমান। ফলে তার বাড়ির সামনে দীর্ঘ লাইন পড়ে যায়। ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা শৃঙ্খলার সাথে নেতাকর্মী ও জনসাধারণকে দেখার সুযোগ করে দেন। দুপুর ১২টা বাজতেই কাজী অফিস লেনসহ আশপাশের সড়ক লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। সকাল থেকেই কাজী অফিস লেনসহ আশপাশের বিভিন্ন মোড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য অবস্থান নেন। কিন্তু নেতাকর্মীরা সুশৃঙ্খল থাকায় তাদের তেমন বেগ পেতে হয়নি। দুপুর ১২টা ২৫ মিনিটে অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশবাহী গাড়ি নিয়ে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের উদ্দেশে রওনা দেন নেতাকর্মীরা। এ সময় তাকে বহনকারী গাড়ির সাথে বিপুল মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কারে নেতারা অংশ নেন। এ ছাড়া গাড়ির আগে-পিছে হাজার হাজার নেতাকর্মী হেঁটেই বায়তুল মোকাররমের উদ্দেশে রওনা দেন। উচ্চৈঃস্বরে কালিমা শাহাদত ও দোয়া-দুরুদ পড়তে পড়তে তারা ভিকারুননিসা স্কুলের সামনের রাস্তা দিয়ে বেইলি রোড হয়ে শান্তিনগর মোড় ঘুরে কাকরাইল আসেন। সেখান থেকে বিজয়নগর হয়ে পল্টন মোড় ঘুরে বায়তুল মোকাররম মসজিদে গিয়ে পৌঁছেন। লাশবাহী গাড়ির সাথে হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে এটি যেন একটি শোকমিছিলে পরিণত হয়। মিছিলকালে রাস্তার পাশেও শত শত মানুষ দাঁড়িয়ে মিছিলের সাথে একাত্মতা প্রকাশ এবং গোলাম আযমের রূহের মাগফিরাত কামনায় উচ্চৈঃস্বরে দোয়া করতে থাকেন। নামাজে জানাজা শেষে বায়তুল মোকাররম থেকে আবারো তার লাশবাহী গাড়িটি মগবাজার কাজী অফিস লেনের বাসায় নেয়া হয়। এ সময় নামাজে জানাজার আগে আসা মানুষের সাথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা আরো হাজার হাজার মানুষ যোগ দেন। উচ্চৈঃস্বরে কালিমা শাহাদত, অন্যান্য দোয়া-দুরুদ এবং কখনো নারায়ে তাকবির সেøাগানসহ পথ চলতে থাকেন তারা। এ সময় পল্টন মোড়, বিজয়নগর, কাকরাইল, শান্তিনগর, মালিবাগ, মৌচাক ও মগবাজারসহ আশপাশের এলাকার সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ শোকমিছিলে একাত্ম হয়ে যান। শুধু কালিমা শাহাদত ও দোয়া-দুরুদের আওয়াজ শোনা যায় চারদিকে। ফিরে যাওয়ার সময় শোক মিছিলটি শান্তিনগর থেকে মালিবাগ হয়ে মৌচাক ঘুরে ওয়্যারলেস মোড় হয়ে তার বাসায় যায়। এ সময় শান্তিনগর থেকে শোকমিছিলে অংশ নেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায়। বেলা ২টা ৫০ মিনিটে তার লাশবাহী গাড়িটি কাজী অফিস লেনের বাসায় পৌঁছায়। এ সময় কাজী অফিস লেন ছাড়াও মগবাজার ওয়্যারলেস মোড় থেকে ভিকারুননিসা স্কুল মোড় পর্যন্ত সাধারণ মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা যায়। সেখানে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না। অধ্যাপক গোলাম আযমের লাশ বাসায় নেয়ার পর পরিবারের সদস্য ও নেতাকর্মীদের শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেয়া হয়। তারপর বেলা ৩টা ১৫ মিনিটে পারিবারিক কবরস্থানে পিতার কবরের পাশে তার দাফনকাজ শুরু হয়। ছেলে আবদুল্লাহিল আমান আযমী ও তার পরিবারের দুইজন সদস্য গোলাম আযমের লাশ কবরে রাখেন। বেলা সাড়ে ৩টায় তার দাফন সম্পন্ন হয়। দাফন শেষে কবর জিয়ারত করা হয়। এ সময় জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান এবং কেন্দ্রীয় প্রচার সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনীম আলম, সহকারী প্রচার সেক্রেটারি মতিউর রহমান আকন্দ, ঢাকা মহানগরী জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর জামায়াতের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। দাফন শেষে দীর্ঘ লাইন দিয়ে নেতাকর্মীরা অধ্যাপক গোলাম আযমের কবরে মাটি ছিটিয়ে দেন। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত কাজী অফিস লেনে সাধারণ মানুষের ভিড় দেখা যায়।

দরপত্র ছাড়াই ইউক্রেন থেকে আড়াই লাখ টন গম আমদানি by আশরাফ আলী

ইউক্রেন থেকে জরুরিভিত্তিতে আড়াই লাখ টন গম আমদানি করতে যাচ্ছে সরকার। অপর্যাপ্ত মজুদের কারণ দেখিয়ে দরপত্র ছাড়া অনেকটা তড়িঘড়ি করে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) পর্যায়ে এ আমদানি করা হচ্ছে। প্রতি টন গমের আমদানি মূল্য ধরা হয়েছে ২৯৭ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার, যা টাকার অঙ্কে দাঁড়ায় ২৩ হাজার ২০৫ টাকা। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব আজ অর্থনৈতিক ও ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য ওঠার কথা রয়েছে। বর্তমানে দেশে গমের মজুদ দুই লাখ ৭০ হাজার টন, যা পর্যাপ্ত নয় বলে খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে। তাই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরিভিত্তিতে গমের আপদকালীন মজুদ বাাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। আর মজুদ বাড়াতেই আন্তর্জাতিক দরপত্রের পাশাপাশি সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে ইউক্রেন থেকে এ গম আমদানির কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ইউক্রেনের সাথে চলমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) আওতায় গম আমদানি ও অন্যান্য দ্বিপীয় আলোচনার জন্য ইউক্রেনের খাদ্যমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম গত ৩১ আগস্ট থেকে ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইউক্রেন সফর করেন। এ সময় একটি ‘মিনিটস অব দ্য মিটিং’ স্বারিত হয়। এ আলোচনার পরিপ্রেেিত গত ১৫ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফরে আসে। প্রতিনিধিদলটি খাদ্যমন্ত্রীসহ সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠক করে। বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রতিনিধিদলটি আড়াই লাখ টন গম রফতানির বিষয়ে সম্মত হয়।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সারসংেেপ বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে গণখাতে ক্রয় আইন-২০০৬ (পিপিএ) ও গণখাতে ক্রয় বিধি, ২০০৮ (পিপিআর) অনুযায়ী এ আমদানি করা হচ্ছে। ক্রয় আইন পিপিএর ৬৮(১) ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন, ইত্যাদি েেত্র সরকারি ক্রয় সম্পর্কিত বিশেষ বিধান-সরকার, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজনে বা বিপর্যয়কর কোনো ঘটনা মোকাবেলার জন্য জনস্বার্থে, সরকার কর্তৃক গঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সুপারিশক্রমে, ধারা ৩২-এ বর্ণিত সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি বা অন্য কোনো ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করে ক্রয়কার্য সম্পন্ন করতে পারবে।
খাদ্য সচিব মুশফেকা ইকফাৎ স্বারিত সারসংপে বলা হয়েছে, বিগত অর্থবছরের আমদানিসংক্রান্ত বিভিন্ন রেকর্ডে দেখা যায় আন্তর্জাতিক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনি¤œ দরদাতার সাথে চুক্তি করা হলেও অনেক েেত্র এসব প্রতিষ্ঠান গম সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গেলেও এরা আইনের আশ্রয় নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করে। এতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গম পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে না। ফলে জরুরি প্রয়োজনে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। তিনি বলেছেন, গত অর্থবছরে ১০টি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হলেও নির্ধারিত সময়ে গম সরবরাহ করতে না পারার কারণে কার্যাদেশ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের চারটি চুক্তি বাতিল এবং পারফরম্যান্স গ্যারান্টি (পিজি) বাতিল করা হয়। তাই জি-টু-জি পর্যায়ে গম আমদানি ল্যমাত্রার একটি অংশ আমদানি করা হলে গমের সন্তোষজনক মজুদ গড়ে তোলা ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে বলে তিনি ওই সারসংেেপ উল্লেখ করেছেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো সারসংেেপ বলা হয়েছে, গমের মজুদ বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার আন্তর্জাতিক দরপত্রের পাশাপাশি সরকার-টু-সরকার পর্যায়ে ইউক্রেন থেকে এ গম আমদানির কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ইতোমধ্যে গমের মজুদ আশঙ্কাজনকহারে কমে গেছে। গত ১৯ অক্টোবর দেশে গমের মজুদের পরিমাণ ছিল দুই লাখ ৭০ হাজার টন, যা আপদকালীন মজুদ হিসেবে পর্যাপ্ত নয়।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম ও মংলাবন্দরের মাধ্যমে এ গম আমদানি করা হবে। প্রতি টন গমের আমদানি মূল্য ধরা হয়েছে ২৯৭ দশমিক ৫০ মার্কিন ডলার। এ সংক্রান্ত প্রস্তাব অর্থনৈতিকবিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি ও ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদনের জন্য উঠানো হবে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সভাপতিত্বে আজ রোববার সচিবালয়ে বিকেল ৩টা ও ৪টায় সভা দু’টি হওয়ার কথা রয়েছে।

মিয়ানমার থেকে গণহারে পালাচ্ছে রোহিঙ্গারা

ক্রমবর্ধমান হতাশা ও ভীতির কারণে মিয়ানমার পশ্চিমাঞ্চল থেকে রোহিঙ্গা মুসলমানরা গণহারে অন্যত্র পালিয়ে যাচ্ছে। দুই বছর আগে দেশটিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর রোহিঙ্গাদের নৌকা করে মিয়ানমার ত্যাগের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গতকাল শনিবার একজন শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞ পশ্চিমা মায়ানসারের স্থানীয় অধিবাসী এবং ‘রোহিঙ্গা অ্যাডভোকেসি গ্রুপ’ নামক অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ক্রিস লেওয়া গতকাল এ কথা নিশ্চিত করেন।

তিনি বলেন, শুধু গত দুই সপ্তাহে আট হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী পশ্চিম মিয়ানমার ছেড়ে মালবাহী জাহাজে চড়ে থাইল্যান্ডের পথ ধরেছে। প্রতিদিন পলাতকদের দলে ভিড়ছে গড়ে ৯০০ করে মানুষ। মূলত ১৫ অক্টোবর থেকে এ যাত্রা শুরু হয়েছে। গত দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা দেশ ছেড়েছে। এটি এ যাবতকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেশ ত্যাগের ঘটনা। থাইল্যান্ডে পৌঁছার পর থাই প্রশাসনের কাছ থেকে তাদের পেতে হচ্ছে বৈরী আচরণ। অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গাদের দলগুলোকে সীমান্তে ভিড়তে দেয়া হচ্ছে না। পুনরায় ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে। যারা কোনোভাবে থাইল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতে সমর্থ হচ্ছেন, তারা আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর হাতে পড়ছেন খুব সহজেই। তাদের থাইল্যান্ডের জঙ্গলে শিবিরে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং বড় অঙ্কের চাঁদা না দেয়া পর্যন্ত এ নির্যাতন চলছে । পলায়নপর রোহিঙ্গাদের বর্তমান আবাস রাখাইনভূমির উত্তরাংশে। কয়েক প্রজন্ম ধরে তারা এ স্থানে বসবাস করে আসছে স্বীকৃতিবিহীন। তাদের ‘বাঙালি’ বলে অভিহিত করা হয় এবং সংখ্যাগুরু বৌদ্ধদের মধ্য থেকে আক্রমণাত্মক ভিুরা নিয়মিতভাবে তাদের ওপর বর্বর হামলা চালাচ্ছে।
বার্তা সংস্থা এপির সাথে যোগাযোগের সময় অনেক রোহিঙ্গা জানায়, তারা ‘পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ায়’ অংশ নিতে অস্বীকার করায় তাদের কয়েক সপ্তাহ ধরে নিজ নিজ গ্রামে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। অন্যদের মারধর ও গ্রেফতার করা হয়। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শত শত বছর ধরে বসবাসকারী রোহিঙ্গা মুসলমানদের মিয়ানমার সরকার ‘বাঙালি’ হিসেবে শনাক্ত করার চেষ্টা করছে। মিয়ানমার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ অধ্যুষিত বিস্তীর্ণ জনপদ যেখানে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার বাস। সামাজিকভাবে এরা অত্যন্ত হীন জীবনমান যাপন করছে। গত দুই বছরে পরিসংখ্যানবিহীন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছে এবং এক লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরে মানবেতর অবস্থায় বসবাস করছে। রাষ্ট্রহীন নির্যাতনের শিকার মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা মালয়েশিয়া ও অন্যান্য দেশে চলে যেতে চায়, কারণ তারা চরম সাম্প্রদায়িক বৌদ্ধ দেশ মিয়ানমারে তাদের কোনো ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে না। লেওয়া বলেন, রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার লক্ষ্যে সরকার সুপরিকল্পিতভাবে তাদেরকে ব্যাপকহারে ধরপাকড় করছে বলে আমাদের কাছে সুস্পষ্ট  প্রমাণ রয়েছে। দেশত্যাগী রোহিঙ্গাদের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে তিনি জানান। রাখাইন রাজ্যের ক্রমশ উত্তেজিত অবস্থা রোহিঙ্গা দেশত্যাগে বাধ্য করছে এমন সংবাদের সূত্র ধরে স্টেট প্রধান উইন মায়াইংকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের ওপর নিষ্পেষণ বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।
সেনাবাহিনীর গুলিতে সাংবাদিক নিহত
মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর গুলিতে এক সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। দেশটির সেনাবাহিনী শুক্রবার এক বিবৃতিতে এ কথা জানিয়েছে। সেনবাহিনীর একটি কারাগার থেকে পালানোর সময় তাকে গুলি করা হয় বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহত সাংবাদিকের নাম অং নাইং। গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাকে মন রাজ্য থেকে আটক করা হয়। ওই রাজ্যে সেনাবাহিনীর সাথে কারেন বিদ্রোহীদের সংঘর্ষের খবর সংগ্রহ করার কারণে তাকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছে সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনী অভিযোগ করেছে, অং কারেন বিদ্রোহীদের ইনফরমেশন অফিসার হিসেবে কাজ করছিলেন। গত ৪ অক্টোবর তিনি এক সেনাসদস্যের অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করলে গুলি চালানো হয়। এরপর তাকে পার্শ্ববর্তী একটি গ্রামে কবর দেয়া হয়। নিহত সাংবাদিকের স্ত্রীর অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতিতে সেনাবাহিনী এ বিবৃতি দিয়েছে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সত্য নয় বলে জানিয়েছেন তার সহকর্মীরা। এ ছাড়া মানবাধিকার কর্মীরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একটি মানবাধিকার সংগঠনের মুখপাত্র জ থেট হয়ে বলেছেন, তিনি সাংবাদিক কিংবা ইনফর্মার যাই হোন না কেন এটি মানবাধিকারের লঙ্ঘন। তার মৃত্যুর সত্য ঘটনা প্রকাশ হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

মিসরের জনগণের উদ্দেশে কারাগার থেকে মুরসির চিঠি

মিসরের মহান জনতা!
যেই মুহূর্তে দেশ বিপ্লব রক্ষার্থে চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণরাও তাদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ; ঠিক সেই মুহূর্তে আপনাদের প্রতি হিজরি নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। অবৈধ সামরিক ক্যু ও এর কুশীলবদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখায় আমি আনন্দিত। সেজন্য আপনাদেরকে অভিনন্দন জানাই। আমাদের মহান জাতির বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের নায়কেরা যেসব কুকর্ম করেছে, তার প্রতিফলের কথা চিন্তা করে ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে তারা।

আমার পতন হয়েছে-এই ঘোষণা দেয়ার সুযোগ আমি বন্ধ করে দিয়েছি। এছাড়া বিপ্লব ও শহীদদের রক্তের সাথে আপোস করে সব ধরনের সমঝোতার চেষ্টা অব্যাহতভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছি। কারণ, সমঝোতার এসব প্রচেষ্টার লক্ষ্য হচ্ছে জনগণকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের দাসত্বে আবদ্ধ রাখা। জনগণ এটা কখনোই চায় না।
আমি আবারো নেতৃবৃন্দ, পরিষদ, জোট, বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষার্থীসহ সকল বিপ্লবীদের কাছে আমার নির্দেশনা পুনর্ব্যক্ত করছি। সামরিক ক্যু-এর প্রতি কোনো ধরনের স্বীকৃতি দিবেন না। বিপ্লব থেকে পিঁছিয়ে আসা যাবে না। শহীদদের রক্তের সাথে আপস করে কোনো ধরনের সমঝোতা করা উচিত হবে না।
শুভ নববর্ষ। জীবনে আগামী বছরটি আসুক আপনাদের মুক্তাবস্থায়।
আমার ব্যাপারে আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। আমি মনে করি, আল্লাহ আমাদের বিপ্লবকে অবশ্যই সফল করবেন। আপনাদের ইচ্ছাশক্তি ও বিরাট শক্তির প্রতি আমার আস্থা আছে। আল্লাহর ইচ্ছায় আমার কারারুদ্ধ ছেলেরা জেল থেকে বের হওয়া এবং মেয়েরা ঘরে ফিরে যাওয়ার আগে আমি কারাগার ত্যাগ করব না।
আমার জীবন বিপ্লবের শহীদদের চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। বিপ্লবের সব স্কয়ার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন যুবকদের থেকে আমি ইচ্ছাশক্তি অর্জন করছি। আমি আমার সন্তানতুল্য শহীদদের ভুলব না, যারা ক্যু-এর পর বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়েছিলেন। ক্ষতের সমুদ্রে পরিণত হয়েছিল দেশ। আমি জানি বিপ্লবের মাধ্যমেই সেই ক্ষত দূর হতে পারে এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
সুতরাং সুসংবাদ নিন এবং বিপ্লব সফলে প্রচেষ্টা চালিয়ে যান। নিশ্চয়ই আল্লাহ সত্যকে সমর্থন করবেন এবং আপনাদেরকে নিরাশ করবেন না। আল্লাহ’র ইচ্ছায় শিগরিই আমরা বিপ্লবের বিজয় উদযাপন করতে একত্রিত হব।
মোহাম্মাদ মুরসি
প্রেসিডেন্ট, দ্য আরব রিপাবলিক অব ইজিপ্ট
সূত্র: মিডলইস্ট মনিটর

‘নারীরা অর্থনৈতিকভাবেও বৈষম্যের শিকার’

শুধু সামাজিক নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও নারীরা বৈষম্যের শিকার। বর্তমানে নারী যে কাজ করে, তার মাত্র চার ভাগের এক ভাগ জাতীয় আয়ে যোগ হয়। একজন গড়ে প্রতিদিন ১২ দশমিক ১টি কাজ করে, যা জাতীয় আয়ে যোগ হয় না। এসব কাজের বার্ষিক মূল্য মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮৭ দশমিক ১ শতাংশের সমান। গতকাল রাজধানীর স্থানীয় একটি হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আয়োজিত জরিপ রিপোর্ট প্রকাশের অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, বিয়ের ক্ষেত্রে নারীদের বয়সসীমা কমছে না। সিপিডির সম্মানিত ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মীর্জ্জা আজিজুল ইসলাম, বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. মুস্তফা কে মুজেরী, সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান, গবেষণা পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনসহ দেশের বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ, নারীনেত্রী এবং সমাজবিজ্ঞানীরা।  অনুষ্ঠানে জানানো হয়, পুরুষের তুলনায় নারীর ৩ গুণ সময় জাতীয় আয়ে যোগ হয় না। একজন প্রতিদিন হিসাবের বাইরে ৭ দশমিক ৭ ঘণ্টা কাজ করে। সংখ্যার বিবেচনায় এ ধরনের কাজ ১২ দশমিক ১টি।  গ্রাম শহর দুই জায়গাতেই এ ব্যবধান রয়েছে।
সিপিডির জরিপ অনুসারে নারীদের যে সব কাজ জাতীয় আয়ে যোগ হয় না, তার বার্ষিক মূল্য জিডিপির ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে সাধারণ মূল্য পদ্ধতি অনুসারে যা জিডিপির ৮৭ দশমিক ২ শতাংশ।  পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষ নারী। তাই এদের বাদ দিয়ে সরকার বা অর্থনীতি কোন কিছুই সফল হতে পারে না। তিনি বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের বৈষম্য রয়েছে। একদিনে তা সমাধান হবে না। এ জন্য সময় লাগবে। তিনি আরও বলেন, সরকার নারীর বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পর্যায়ে ক্রমে এগুলোর কাজ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে সরকারের পাশাপাশি সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।  এ সময় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নারীদের বিয়ের বয়সসীমা কমিয়ে আনার বিষয়টি বাজারে শোনা যাচ্ছে। তবে সরকার এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেবে না। অর্থাৎ বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর বয়সসীমা আগের মতো থাকবে।  মীর্জ্জা আজিজ বলেন, দেশের সবাই স্বীকার করবে, নারীর সব কাজের স্বীকৃতি নেই। জাতীয় আয়ে অবদানের স্বীকৃতি দিতে প্রাতিষ্ঠানিক খাতে নারীর মজুরিভিত্তিক  অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে যে সব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, তা সবার আগে দূর করা জরুরি। তিনি বলেন, সরকার নারীকে মাতৃত্বকালীন ৬ মাস ছুটি দেয়। কিন্তু অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এখনও তা কার্যকর করেনি। ফলে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করার জন্য সরকারের উদ্যোগ নেয়া উচিত। এছাড়া নারীর ক্ষেত্রে সহিংসতা বন্ধে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। অন্য বক্তারা বলেন, সমাজে বিভিন্ন সময়ে নারীরা চাকরিতে বাধার সম্মুখীন হয়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা আসে পরিবার থেকে। এছাড়াও কুসংস্কারের কারণে নারীরা কাজ করতে পারে না। আর চাকরিতে বেতন পেলেও তা নিজের ইচ্ছায় খরচ করতে পারে না। এক্ষেত্রে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।
সুপারিশ: নারীকে যথাযথ মূল্যায়নে সিপিডির পক্ষ থেকে এ সময়ে বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় আয়ের হিসাব ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে নারীর অবৈতনিক কাজের মূল্য অন্তর্ভুক্ত করা। এ ক্ষেত্রে মূল্যায়নের পদ্ধতি ঠিক করতে সরকার অর্থনীতিবিদ, পরিসংখ্যানবিদ, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ, অ্যাডভোকেসি গ্রুপসহ সব পক্ষের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করতে হবে। শ্রম বাজারে নারীর পারিশ্রামিক তুলনামূলকভাবে কম। তাই এ বৈষম্য কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে আইন করা উচিত।
যেভাবে জরিপ পরিচালনা করা হয়: সিপিডির গবেষণায় দেশের ১৫ বছরের উপরে ১৩ হাজার ৬৪০ জন ব্যক্তির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ৩২০ জন নারী এবং ৫ হাজার ৩২০ জন পুরুষ। জরিপ হয় ৫ হাজার ৬৭০টি। ২০১৪ সালের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে এ জরিপ সম্পন্ন করা হয়। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের নির্ধারিত বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। পরবর্তীকালে তা জাতিসংঘের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে কাজের মূল্য বের করা হয়।

স্বপ্নের সিঁড়ি অতিক্রমে পিতা পুত্রের সংগ্রাম

কার স্বপ্ন বড়? পিতা না পুত্রের। ভ্যানচালক পিতা রশিদুল ইসলামের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাচ্ছেন মামুন। কখনও কখনও মানুষ তার স্বপ্নকে ছাড়িয়ে যায়। বাপ-বেটার গল্প যেন তেমনি। এক ভ্যানচালকের ছেলে চিকিৎসক হওয়ার পথে ফেলেছেন প্রথম পদক্ষেপ। ভর্তি হয়েছেন রংপুর মেডিকেল কলেজে। ছেলে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করায় শুরুতে আনন্দে আত্মহারা ছিলেন রশিদুল। যদিও ছেলের পড়ার খরচ যোগানোর চিন্তায় ছিলেন বেসামাল। ঠিক ওই মুহূর্তেই মামুনের স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য তার পাশে এসে দাঁড়ায় দি অপটিমিস্টস। গত জানুয়ারি মাসে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় মানবকল্যাণের ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলা এ সংস্থার এসএসপিতে। অপটিমিস্টের সহায়তা পেয়ে কৃতজ্ঞ মামুন। বলেন, সংস্থাটির সহযোগিতার কারণে আমার পথচলা সহজ হচ্ছে। চিকিৎসক হয়ে গ্রামের চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের জন্য কাজ করতে চান মামুন।
নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার কাঁঠালী ইউনিয়নের দক্ষিণ দেশীবাই গ্রামের বাসিন্দা রশিদুল। স্ত্রী ছফিয়া বেগম আর দুই ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে তার টানাপড়নের সংসার। ভাই-বোনের মধ্যে মামুন তৃতীয়। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায় মামুন উত্তীর্ণ হয়। তার ভর্তি হওয়ার সুযোগ মেলে রংপুর মেডিকেল কলেজে। সে সময় চিন্তাগ্রস্ত মামুন বলেছিলেন, মেডিকেল কলেজে পড়ার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু পড়ার খরচ চালাবো কিভাবে। বাবা বলেছেন, তুই চিন্তা করিস না। আমি ভ্যান চালিয়েই তোর খরচ যোগান দেবো। কিন্তু আমি জানি ভ্যান চালিয়ে এত টাকা যোগান দেয়া সম্ভব নয়। সে সময় তার সহযোগী হয় দি অপটিমিস্টস। মামুনের বাবার সম্পত্তি বলতে ৩ দশমিক ৫ শতক ভিটেমাটিটুকু। ভ্যান চালিয়ে কোন দিন ২০০, কোন দিন ১০০ টাকা আয় হয়। তা দিয়েই সংসারটা টেনে নিচ্ছেন। যে কোন মূল্যে ছেলের পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন মামুন। শিক্ষাজীবনে বরাবরই কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে মামুন। অষ্টম শ্রেণীতে সে সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি এবং এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিল। মানবতাকল্যাণের ব্রত নিয়ে ২০০০ সালের ৬ই অক্টোবর যাত্রা শুরু করে বেসরকারি দাতব্য প্রতিষ্ঠান দি অপটিমিস্টস। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ সংস্থাটির প্রধান কার্যালয় নিউ ইয়র্কে। ঢাকায় সংস্থাটির শাখা কার্যালয় রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশে দি অপটিমিস্টস-এর নিবন্ধন রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, মুন্সীগঞ্জ, রংপুর, ফেনী, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ৬২৮ শিক্ষার্থীর স্পন্সর করছে সংস্থাটি। সাভারের রানা প্লাজায় ভবনধসে ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্ট শ্রমিকদের ৮১ স্কুলগামী শিশুর সহযোগিতায়ও এগিয়ে এসেছে দি অপটিমিস্টস। আশাহত শিশুদের আশা যোগানোর লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সংস্থটি। দারিদ্র্য অথবা পিতা-মাতা হারিয়ে দুর্যোগে পড়া শিশুদের পাশে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে দি অপটিমিস্টস। শিক্ষা উপকরণ থেকে শুরু করে খাদ্যসামগ্রী দিয়ে অসহায় মানুষের সহযোগিতা করে যাচ্ছে এ দাতব্য সংস্থা।

পদ্মার কারণে বন্ধ হলো গ্যাস প্রজেক্ট কাজ by শাহ্‌ জামাল

হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’র কাছে পদ্মা নদীর কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে ভেড়ামারা-খুলনা গ্যাস প্রজেক্ট’র কাজ। পদ্মা নদীর তলদেশের ৭০ ফিট গভীর দিয়ে কোন মতেই পাইপলাইন স্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে না। দু’বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়ার পর মালামাল গুটিয়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানির গ্রিলকেট কোম্পানি। কবে নাগাদ প্রকল্পের কাজ আবার শুরু হবে তাও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা। ২০০৬ সালে টাঙ্গাইল থেকে খুলনা পর্যন্ত ২৬৬ কিলোমিটার গ্যাস পাইপলাইন স্থাপনের জন্য সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর মধ্যে ভেড়ামারা থেকে খুলনা পর্যন্ত ১৬৫ কিলোমিটার। সরকার, এডিবি এবং জিটিসিএল’র অর্থায়নে গ্যাস সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট ফেজ ২-এর আওতায় ভেড়ামারা-খুলনা পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস প্রকল্পের ব্যয় ধরা ৯০ হাজার ৩৮১ দশমিক ৪০ লাখ টাকা। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে কাজটি শুরু হয়। সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয় ২০১৪ সালের জুন। কিন্তু নানা জটিলতা আর পদ্মা নদীর কারণে পিছিয়ে গেছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্প। সূত্র জানিয়েছে, খুলনার সঙ্গে এ প্রকল্পের সংযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার কাছে হার্ডিঞ্জ ব্রিজসংলগ্ন পদ্মা নদী। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের সেতুবন্ধ তৈরি করেছে পদ্মা নদীর ওপর লালন শাহ ব্রিজ। কিন্তু ব্রিজটিতে গ্যাসলাইন স্থাপনের জন্য কোন প্রভিশন রাখা হয়নি। সে কারণে চরম বিপাকে পড়ে ভেড়ামারা-খুলনা গ্যাস প্রজেক্ট বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টরা। তাই বাধ্য হয়ে পদ্মা নদীর তলদেশের ৭০ থেকে ১৬০ ফিট গভীর দিয়ে পাইপলাইন বসানোর সিদ্ধান্ত নেয়। এ দুরূহ কাজটি পায় জার্মানির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান গ্রিলকেট নামের একটি কোম্পানি। প্রায় সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলারে চুক্তিবদ্ধ হয়ে কাজটি শুরু করে অখ্যাত এ কোম্পানি। কিন্তু তারা পদ্মা নদীর তলদেশ দিয়ে মাত্র ২ কিলোমিটার খনন করে ৩০ ইঞ্জি ডায়া পাইপ স্থাপন করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ’র ১০০ মিটার উজানে গ্রিলকেট কোম্পানি পাইপলাইন বসানোর কাজটি শুরু করেছিল অনেক আগে। পদ্মার তলদেশের নিচে ২ কিলোমিটার ৩০ ইঞ্জি ডায়া পাইপ স্থাপনের চুক্তি করে তারা। প্রযুক্তির সাহায্যে নিয়ে নদীর তলদেশ দিয়ে তারা প্রথমে ৬ ইঞ্জি ডায়া পাইপ দিয়ে নদী খনন শুরু করে। প্রথমে সফল হলেও মোটা পাইপ’র ক্ষেত্রে দেখা দেয় চরম বিড়ম্বনা। মূল বাধা হয়ে দাঁড়ায় পদ্মা নদীর প্রচুর পরিমাণের পাথর। পাথরেই আটকে যায় গোটা প্রকল্প। ৩০ ইঞ্জি ডায়াচের পাইপ স্থাপন তো দূরের কথা এর ধারে-কাছেও যেতে পারেনি কোম্পানিটি। পরপর দু’বার চেষ্টা করেও তারা সফল না হওয়ায় মালামাল নিয়ে ছিটকে পড়ে। বাংলাদেশ গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির চেয়ারম্যান ইসাহাক আলী জানিয়েছেন, ১৯১২ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ নির্মাণের সময় পদ্মা নদী নিয়ন্ত্রণ নিতে প্রচুর পরিমাণ পাথর ফেলা হয়। পদ্মার দু’ধারে গাইড ব্যাংকও নির্মাণ করা হয় পাথর দিয়েই। পাথর ভেদ করে পাইপলাইন স্থাপন করা খুবই দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। পদ্মা নদীর তলদেশ থেকে ৭০ থেকে ১৬০ ফিট গভীর দিয়ে ৩০ ইঞ্চি ডায়া পাইপ স্থাপন করা হবে। দু’বার চেষ্টা করেও চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জার্মানির গ্রিলকেট। এ জন্য তাদের বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল সাড়ে ৭ মিলিয়ন ডলার।
 তিনি জানান, নতুন কোন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও উন্নত প্রযুক্তির কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে আবার নদীর তলদেশে পাইপ স্থাপনের কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর জন্য এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে অনুমতিপত্র দেয়া হয়েছে। তবে কবে কাজটি আবার শুরু হবে তা বলা যাচ্ছে না, তবে শিগগিরই শুরু হবে। এ দিকে ভেড়ামারা থেকে ১৬৫ কিলোমিটার কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, খুলনা পর্যন্ত ২০ ইঞ্চি ডায়া পাইপ বসানোর কাজ ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। সানিক্স লিমিটেড কোম্পানির সিভিল ইঞ্জিনিয়ার রবিউল ইসলাম জানিয়েছেন, পাইপলাইন স্থাপনের কাজ শেষ হওয়ার পর এখন ভেড়ামারা থেকে খুলনা পর্যন্ত ৫টি গ্যাস ট্রান্সমিশন সাব-স্টেশন বসানো হবে। ইতিমধ্যে ভেড়ামারার কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে, কুষ্টিয়া, যশোর, ঝিনাইদহ, খুলনার কাজও শেষের দিকে। অন্যদিকে, গ্যাস প্রজেক্টর কাজ বাস্তবায়নের জন্য ভেড়ামারা থেকে খুলনা পর্যন্ত কোটি কোটি টাকার সম্পদ, পাইপলাইন, গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ, মালামাল এবং সাব-স্টেশনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য কাজ করছে আল আরাফাত সার্ভিসেস নামক একটি কোম্পানি। কোম্পানির এতদাঞ্চলের সুপারভাইজার আখতারুজামান জানিয়েছেন, ভেড়ামারা থেকে খুলনা পর্যন্ত পাইপলাইন এবং সাব-স্টেশনগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ কর্মীবাহিনী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়মতান্ত্রিকভাবে এর কার্যক্রম চলছে।

বাংলাদেশকে শাস্তি দেয়ায় বিপরীত ফল বয়ে আনবে -ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয়

বাংলাদেশের রানা প্লাজায় ধসের ফলে অনিরাপদ ভবনটিতে আটকা পড়ে ১১৩৮ জন গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনার এক বছরেরও বেশি সময় পার হয়েছে। মার্কিন ও ইউরোপিয়ান খুচরা বিক্রেতারা তাদের আওতাধীন কারখানাগুলোর পরিস্থিতি আরও উন্নত করার জন্য দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেছিল। কিন্তু তাদের এখনও অনেক দূর যাওয়া বাকি। শুক্রবার এ কথা বলা হয়েছে ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয়তে। এতে আরও বলা হয়, ইউরোপিয়ান কোম্পানিগুলোর একটি পরিদর্শক দল গত সপ্তাহে ঘোষণা দিয়েছে যে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর এ পর্যন্ত তারা প্রায় ১১০৬টি বাংলাদেশী কারখানা পরিদর্শন করেছে। এগুলোতে তারা ৮০ হাজারেরও বেশি নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে পেয়েছে। এগুলোর প্রায়  এক-দশমাংশেরও বেশি কারখানার অবকাঠামোগত পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে, এগুলোতে যদি উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে নিয়ে যেতে হয়, তাহলে অবিলম্বে সংস্কার করতে হবে, অন্যথায় পরিত্যক্ত করতে হবে। বিশাল ঘন বসতিপূর্ণ বাংলাদেশে পোশাক শিল্প হচ্ছে আশীর্বাদস্বরূপ। ১৯৯৭ সালের পর দেশটির মাথাপিছু মোট জাতীয় উৎপাদন ও আয় দ্বিগুণ হয়েছে। কেননা বাংলাদেশ নিজেকে তৈরী পোশাক উৎপাদনের একটি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। বাংলাদেশের মোট প্রবৃদ্ধির অর্ধেকেরও বেশি এসেছে এ শিল্প থেকে, যা আগের একই সময়ের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশ বেশি। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হচ্ছে এ দেশ। তবুও ২২০০ কোটি ডলারের গার্মেন্ট ব্যবসা বৈশ্বিক উৎপাদনের ক্ষেত্রে এখনও একটি গুরুত্বপূর্ন কেন্দ্র এ দেশ। তাই বাংলাদেশের গার্মেন্ট কারখানার সঙ্গে যে সব কোম্পানি ব্যবসা করে, তাদের বর্জন করা এবং বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশকে শাস্তি দেয়ায় বিপরীতমুখী ফল বয়ে আনবে। তাই শ্রমিক নিরাপত্তার দাবিটি শুধু তাদের রক্ষা করার অজুহাত হওয়া উচিত নয়। এর ফলে চাকরি হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বহু গরিব মানুষ। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ও ভাল কর্মপরিবেশ বিপরীতমুখী কিছু নয়। গার্মেন্ট শ্রমিকদের আগুনের ফাঁদে যেতে বাধ্য করা কিংবা রানা প্লাজার মতো ভবন ধসের ঘটনা নিয়ে অবহেলা দেখানো নিয়ে কোন প্রশ্রয় নয়। প্রাথমিক দায়ভার বাংলাদেশী নেতাদের ওপরই পড়ে। তাদের উচিত বিদ্যমান মানদণ্ডের উন্নতি ঘটানো, রাতে কাজ করানো হয় যেসব গার্মেন্টে সে সবের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা এবং বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা। একই সঙ্গে দায়িত্ব রয়েছে পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতাদের। তাদের উচিত তাদের ব্যাপক বাজার শক্তি ব্যবহার করে সরবরাহকারীদের কাছ থেকে ভাল কিছু দাবি করা। শ্রমিকদের কথা মাথায় রেখে বা নিজেদের করপোরেট ইমেজ ধরে রাখতে বা যে কোন কারণেই হোক, তবে কিছু কোম্পানি এটি করতে বেশ ভাল অবস্থান নিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ইউরোপীয় ও মার্কিন কোম্পানিদের দু’টি গ্রুপ নিরাপত্তা পরিদর্শন শুরু করেছে। ইতিমধ্যে স্বাধীন নিরাপত্তা নীতিমালা তৈরি করেছে এবং প্রাথমিক পরিদর্শন সম্পন্ন করেছে গ্রুপ দু’টি। গত সপ্তাহে ইউরোপিয়ান কোম্পানিদের গ্রুপটি তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। পরীক্ষা হচ্ছে, এর মাধ্যমে নতুন কোন দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে কিনা। পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতাদের উচিত ছিল ধসের আগেই রানা প্লাজার নিরাপত্তা ত্রুটি খুঁজে বের করা। বড় কোম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকদের আরও ভাল পরিস্থিতির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গ্রাহকদের অধিকার ও দায়িত্ববোধ রয়েছে এ ধরনের দাবি ওঠানোর।

আওয়ামী লীগ-বিএনপি ডিসেম্বর টার্গেট ধরেই এগোচ্ছে...

ডিসেম্বর টার্গেট ধরেই এগোচ্ছে আওয়ামী লীগ-বিএনপি। সরকারি দল ঝিমিয়ে পড়া সংগঠনকে চাঙা করতে ডিসেম্বরের মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, জেলা ও উপজেলায় সম্মেলন করার নির্দেশনা দিয়েছে। তৃণমূলে কোন্দল মেটাতে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফর শুরু করেছেন। অন্যদিকে ২০ দল নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে জনমত  গঠনে জেলায় জেলায় জনসভার মাধ্যম জোরালো কর্মসূচি দিতে মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের তরফে সব দলের অংশগ্রহণে নির্বাচন আয়োজন ইস্যুতে আলোচনার প্রস্তাব না এলে আবারও রাজপথের আন্দোলনে নামবে। ইতিমধ্যে ২০দলীয় জোট নেত্রী জেলা সফর শুরু করেছেন।
ডিসেম্বরের মধ্যেই দল গোছানোর প্রস্তুতি আওয়ামী লীগের চলতি বছরের মধ্যেই দল গোছানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করেছে আওয়ামী লীগ। ডিসেম্বরের মধ্যেই মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি পুনর্গঠন, জেলা ও উপজেলা সম্মেলন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ঝিমিয়ে পড়া সংগঠনকে প্রাণবন্ত করতে ইতিমধ্যে তৃণমূল পর্যায়ে নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে কেন্দ্র থেকে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর পর দলের সবপর্যায়ে সম্মেলনের বিধান রয়েছে। কিন্তু দুই দশক ধরে সম্মেলন হয় না এমন জেলা যেমন রয়েছে আবার ১০ থেকে ১২ বছর ধরে সম্মেলন হয় না এমন জেলার সংখ্যাও ১০টির বেশি।  ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের পর দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ বিগত প্রায় সাড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে সারা দেশের ৭৩টি সাংগঠনিক জেলার মধ্যে মাত্র ১৫টি সাংগঠনিক জেলার সম্মেলন শেষ করতে পেরেছে। একই সঙ্গে আরও ৫শ’ উপজেলা ও থানা কমিটির সম্মেলন এই সময়ের মধ্যে হতে পারেনি। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর সাংগঠনিক দিক থেকে অনেকটাই গতিহীন হয়ে পড়েছিল দলটি। ঝিমিয়ে পড়ে দলীয় কার্যক্রম। জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে সময়মতো দলের কেন্দ্রীয় কমিটি করা হলেও জেলা, উপজেলা ও থানা কমিটিগুলো সম্মেলন করা যায়নি দফায় দফায় সময় বেঁধে দেয়ার পরও। এতে জেলায় জলায় বেড়েছে কোন্দল ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব। তাই ঝিমিয়ে পড়া দলীয় কার্যক্রমকে সক্রিয় করা ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব  ও কোন্দল মেটাতে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফর শুরু করেছেন। সূত্র জানায়, বিরোধী দলের সম্ভাব্য আন্দোলন-কর্মসূচিকে মাথায় রেখেই দল পুনর্গঠনের কাজে হাত দেয়া হয়েছে। বছরের শেষ অথবা আগামী বছরের শুরুতে বিরোধী দল আন্দোলনে যেতে পারে এ চিন্তা থেকেই এই সময়ের আগে দল গোছানোর কাজ শেষ করে আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি নিতে চায় ক্ষমতাসীন দল। এবিষয়ে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. নূহ-উল-আলম লেনিন মানবজমিনকে বলেন, দীর্ঘ দিন পরে হলেও আমরা মেয়াদোত্তীর্ন বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার সম্মেলন করছি। এটা খুবই স্বাভাবিক যে এতে করে দলে গতিশীলতা আসবে। দল সাংগঠনিকভাবে আরও শক্তিশালী হবে। তবে এ সম্মেলনের সঙ্গে বিএনপির রাজনৈতিক আন্দোলনের হুঙ্কারের কোন সম্পর্ক নেই দাবি করে তিনি বলেন, বিএনপি কখন আন্দোলন করবে কখন তারা আন্দোলনের ঘোষণা দেবে এনিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন নই।
তৃণমূলের সম্মেলনের বিষয়ে বিগত ঈদুল আজহার আগে দলের সাংগঠনিক সম্পাদকসহ শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। বৈঠকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ সাংগঠনিক জেলাগুলোর সম্মেলন শেষ করার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। এ সময় তিনি সম্মেলনে শেষ করার পাশাপাশি সম্মেলনকে ঘিরে যাতে কোনরকম অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সে জন্য সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে দলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও শীর্ষ নেতাদের নির্দেশ দেন। গত ২০শে সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে দেশের সকল মেয়াদোত্তীর্ণ  জেলা, মহানগর, উপজেলা ও থানা সম্মেলন শেষ করার বিষয়ে দলের উপদেষ্টাদের মতামত ও পরামর্শ চান শেখ হাসিনা। বৈঠকে অংশ নেয়া নেতারা জানিয়েছেন, দলকে চাঙ্গা করতে ডিসেম্বরের মধ্যেই সব জেলা ও উপজেলা সম্মেলন শেষ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তারা বলেন, ইতিমধ্যে রাজশাহী বিভাগের সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে মেয়াদোত্তীর্ণ  অন্যান্য জেলার সম্মেলনের তারিখও ঘোষণা করা হবে। ইতিমধ্যে রাজশাহী  বিভাগের আওতাধীন মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সম্মেলনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, সিলেট, রংপুর ও খুলনা বিভাগের মহানগর, জেলা ও  উপজেলা শাখার সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা করা হবে। দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, সম্মেলন কর্মসূিচর অংশ হিসেবে ২৫শে অক্টোবর রাজশাহী মহানগর, ৯ই নভেম্বর জয়পুরহাট, ১৫ই নভেম্বর সিরাজগঞ্জ, ২০শে নভেম্বর চাঁপাই নবাবগঞ্জ ২৭শে নভেম্বর রাজশাহী জেলা, ২৯শে নভেম্বর পাবনা, ৩০শে নভেম্বর নাটোর, ৯ই ডিসেম্বর নওগাঁ জেলার সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া নির্দিষ্ট তারিখে এই সময়ের মধ্যে এসব জেলার বিভিন্ন উপজেলার সম্মেলনে অনুষ্ঠিত হবে। দলের দপ্তর কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, রাজশাহী বিভাগের এসব সম্মেলনের সমন্বয় করবেন দলের এই বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। টিম প্রধান হিসেবে কাজ করবেন প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন- জাহাঙ্গীর কবির নানক, কর্নেল (অব.) ফারুখ খান, আবু সাইদ আল মাহমুদ স্বপন, খায়রুজ্জামান লিটন, আবদুর রহমান, আখতারুজ্জামান, মির্জা আজম ও এডভোকেট জুনাইদ আহমেদ পলক। রংপুর জেলার দায়িপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর, লালমনিরহাট জেলার সম্মেলন  ইতিমধ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঠাকুরগাঁও জেলার সম্মেলনও ১৬ই অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছে। কেন্দ্রের নির্দেশনা পেয়েছি। নভেম্বর ও ডিসেম্বরের মধ্যে রংপুর, গাইবান্ধাসহ অন্য জেলার সম্মেলন হবে। সে অনুযায়ী প্রস্তুতিও চলছে। সিলেট জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ বলেন, হবিগঞ্জের জেলা সম্মেলন গত বছরই শেষ হয়েছে। সিলেট জেলা ও মহানগর কমিটির মেয়াদ শেষ হবে চলতি বছরের নভেম্বরে। মেয়াদ শেষে মহানগর ও জেলা সম্মেলন শেষ করতে চেষ্টা করব। এ ছাড়া কেন্দ্রের নির্দেশনা রয়েছে তাই ডিসেম্বরের মধ্যে  সুনামগঞ্জের জেলা সম্মেলনও শেষ হবে। খুলনা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক বলেন, নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে খুলনা মহানগর ও দ্বিতীয় সপ্তাহে কুষ্টিয়া জেলার সম্মেলন হবে। এ ছাড়া বাকি জেলার সম্মেলন পর্যায়ক্রমে ডিসেম্বরের মধ্যেই শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। তিনি বলেন, নভেম্বরের মধ্যেই খুলনার সকল উপজেলার সম্মেলন শেষ হবে। 
সফর জনসংযোগের পর মাঠের কর্মসূচি দেবে বিএনপি
নির্দলীয় সরকারের অধীনে দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে ফের মাঠে নামতে যাচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দল। সাংগঠনিক পুনর্গঠন, জেলা পর্যায়ে জনসভা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও পেশাজীবীদের সঙ্গে ধারাবাহিক মতবিনিময়ের মাধ্যমে চাঙ্গা করা হচ্ছে জনসমর্থন। কঠোর সমালোচনার পাশাপাশি সময় দেয়া হচ্ছে সরকারকেও। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে সরকারের তরফে সব দলের অংশগ্রহণে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন ইস্যুতে আলোচনার প্রস্তাব না এলে আবারও রাজপথের আন্দোলনে নামবে বিরোধী জোট। জেলা পর্যায়ে খালেদা জিয়ার সফর জনসংযোগের পর আসবে মাঠের কর্মসূচি। নির্দলীয় সরকারের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের বিষয়টিও ইস্যু হিসেবে সামনে আনতে পারে বিএনপি। নীলফামারীর জনসভায় বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে অথর্ব আখ্যায়িত করে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবি জানিয়েছেন খালেদা জিয়া। তবে বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিসহ জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুতে তাৎক্ষণিক কর্মসূচি ঘোষণার ব্যাপারে জোটের তরফে নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিএনপি ও জোটের শরিক দলের একাধিক নেতা এমন তথ্য জানিয়েছেন। ২০শে অক্টোবর রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপি সমর্থিত মেয়র, পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের মতবিনিময় সভায় খোদ বিরোধী জোট নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন, ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর আমরা আন্দোলন করিনি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের জন্য অপেক্ষা করেছি। সরকারকে ১০ মাস সময় দিয়েছি। কিন্তু আর নয়। নীলফামারীর জনসভায় আন্দোলনের প্রস্তুতি নেয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেছেন, আসুন সবাই ঐক্যবদ্ধ হই। সময়মতো আন্দোলনের ডাক দেবো। এ সরকারকে বিদায় করে আমরা ঘরে ফিরবো। সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল বাঁকা করতে হবে। যারা দেশের পক্ষে থেকে, মানুষের পক্ষে থেকে আন্দোলন করে তারা পরাজিত হতে পারে না। অনেক মার খেয়েছি, এবার রক্ত দেয়ার জন্য আমরা প্রস্তুত। জয় আমাদের হবেই।
বিএনপি নীতিনির্ধারক ফোরামের দুই সদস্য জানান, জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারাঙ্কোসহ আন্তর্জাতিক মহলের কাছে ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনের প্রধান যুক্তি ছিল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। তখন তারা সে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্বল্পসময়ের সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেছিল। বিএনপি আন্দোলনের পাশাপাশি সরকারের সে অঙ্গীকারের বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছিল। তাই ৫ই জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর ফের আন্দোলনে নামতে সময় নিয়েছে বিরোধী জোট। তারা বলেন, সরকার তাদের অঙ্গীকার থেকে সরে গিয়ে এখন পুরো বিষয়টিই অস্বীকার করছে। দমন-পীড়নের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকতে চায় সরকার। ফলে এখন আন্দোলনের বিকল্প নেই। নেতারা জানান, হঠাৎ করে যেমন আন্দোলন জমিয়ে তোলা যায় না তেমনি আগে-ভাগে দিনক্ষণ নির্ধারণ করেও আন্দোলন সফল করা যায় না। পরিবেশ-পরিস্থিতি, জনগণে ফলে হুট করে নয়, নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিবৃদ্ধি ও জনমত চাঙ্গা করেই বৃহত্তর আন্দোলনে যাবে বিরোধী জোট। আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানালেও আন্দোলনের সময় নির্ঘণ্ট না জানিয়ে নীলফামারীর জনসভায় খালেদা জিয়া বলেছেন, কবে আন্দোলন শুরু করবো তা আমি সময়মতো জানাবো। আগে মানুষের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করে নিই। তারপর আন্দোলনের ডাক দেবো। আন্দোলন সম্পর্কে মির্জা আলমগীর বলেন, আমরা  সহিংসতা চাই না। আমরা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন চাই। আমাদের আন্দোলন চলছে। আন্দোলনের বিভিন্ন স্তর আছে। জনসভা করে আমরা গণসম্পৃক্ততার কাজটি করছি। নির্বাচন না দিলে আন্দোলনে আমরা এ সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করবো। এদিকে যুবদলের একজন শীর্ষ নেতা বলেন, আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরে একাধিক পাবলিক পরীক্ষার শিডিউল রয়েছে। আন্দোলনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় কোন বিঘ্ন ঘটাতে চায় না বিএনপি। তাই আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সারাদেশে সফর ও রাজধানীতে ধারাবাহিক জনসভা ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে জনসমর্থন ফের তুঙ্গে নেয়া হবে। দলীয় সূত্র জানায়, জনসমর্থন ও আন্দোলনের ব্যাঘাত ঘটাতে নানা ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু সরকারের ফাঁদে পা দিয়ে হুট করে অগোছালো কোন কর্মসূচি দেবে না ২০দল। দলীয় ইস্যুর চেয়ে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতেই বেশি গুরুত্ব দেবে ২০দল। তাই অযথা রাজনৈতিক বিতর্ক এড়িয়ে যেতে নেতাদের নির্দেশনাও দেয়া হয়েছে। আন্দোলন নিয়ে সরকারের অপপ্রচারের জবাবে খালেদা জিয়া বলেছেন, মানুষের জন্যই আমাদের আন্দোলন। আমরা আন্দোলন করবো- দেশের উন্নয়নে, মানুষের ভোটাধিকার আদায়ে, খুন-গুম থেকে মানুষকে রক্ষার জন্য এবং ন্যায়বিচার ও সুশাসন নিশ্চিত করার জন্যই। আমাদের আন্দোলনে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়। দেশবাসীর আস্থা অর্জনে তিনি বলেন, দেশে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা পেলে বিদেশী বিনিয়োগ আসবে, দেশের উন্নয়ন হবে। আমরা দেখিয়ে দেবো- আমরা পেরেছিলাম, আমরাই পারবো।
এদিকে দ্রুত নির্বাচনের দাবির পক্ষে জনসমর্থন গড়তে জেলায় জেলায় সফর জনসংযোগ শুরু করেছে বিএনপি। ইতিমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, জামালপুর ও নীলফামারী তিনটি জেলায় জনসভা করেছে ২০দল। তিনটি জনসভাতেই প্রধান অতিথি হিসেবে অংশ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০দলীয় জোটের শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া। সফর জনসংযোগের ধারাবাহিকতায় আরও তিনটি জেলায় জনসভার দিনক্ষণ ঘোষণা করা হয়েছে জোটের তরফে। আগামী ৩০শে অক্টোবর নাটোর ও ১২ই নভেম্বর কিশোরগঞ্জে জনসভা হবে। এছাড়া জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আগামী ৬ কিংবা ৭ই নভেম্বর কুমিল্লায় জনসভা হবে। সফর জনসংযোগের ধারাবাহিকতায় নভেম্বর-ডিসেম্বরে আরও কয়েকটি জেলায় জনসভা করতে পারে ২০দলীয় জোট। ওদিকে জনমত গঠনের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম ও রাজশাহী বিভাগীয় বিএনপি সমর্থিত মেয়র, পৌর মেয়র ও উপজেলা চেয়ারম্যানদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। অন্যান্য বিভাগীয় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গেও তিনি মতবিনিময় করবেন। রাজশাহীর জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা জনগণের প্রতিনিধি তাই জনগণের কাছে যাবেন। জনগণকে সরকারের অনিয়মের কথা বোঝাবেন। যে সময়ে আমি আন্দোলনের আহ্বান জানাবো, আপনারা হাজির হবেন। আন্দোলনের মাধ্যমেই এদের বিদায় করবো।
এদিকে নীলফামারী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আনিসুল আরেফিন চৌধুরী জানান, খালেদা জিয়ার জনসভার মাধ্যমে জনসমর্থনই কেবল সৃষ্টি হবে না সাংগঠনিক ভিত্তিও মজবুত হবে। জনসভা শেষে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে।  ওদিকে নাটোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক বলেন, ৩০শে অক্টোবর খালেদা জিয়ার জনসভাকে কেন্দ্র করে নানামুখী প্রস্তুতি চলছে। জেলা ও উপজেলা বিএনপিসহ অঙ্গদলের নেতাকর্মীরাও নিজেদের মধ্যে দফায় দফায় প্রস্তুতি বৈঠক করছেন। প্রশাসনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। জনসভার সার্বিক প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল ঢাকায় রাজশাহী বিভাগীয় ৯টি সাংগঠনিক জেলা বিএনপির নেতারা দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি বলেন, জনসভাটি হবে শহরের নবাব সিরাজউদ-দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে। এ বিশাল মাঠে আওয়ামী লীগ কখনও জনসভার সাহস পায়নি। বারবার বিএনপিই এ মাঠে সমাবেশ করেছে এবং বিপুল লোকসমাগমের মাধ্যমে সফল করেছে। আশা করছি, জনসভায় নাটোরের স্মরণকালের বিপুল লোকের সমাগম ঘটবে। এদিকে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম আকবর খোন্দকার জানান, আগামী ৬-৭ই নভেম্বর সমাবেশের সম্ভাব্য দিন ঘোষণা করা হলেও ২৭শে অক্টোবর নয়া পল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কুমিল্লা উত্তর-দক্ষিণ জেলা নেতাদের নিয়ে একটি বৈঠক হবে। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের নেতৃত্বে সে বৈঠকে কুমিল্লা সমাবেশের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হবে। কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আখতারুজ্জামান সরকার বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জনসভাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে কুমিল্লা উত্তর-দক্ষিণে প্রস্তুতি শুরু করেছেন ২০ দলীয় জোটের নেতাকর্মীরা। গতকালও কুমিল্লার হোমনায় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ারের নেতৃত্বে প্রস্তুতি সভা হয়েছে। কুমিল্লা দক্ষিণের সাধারণ সম্পাদক হাজী আমিনুর রশিদ ইয়াসিন বলেন, আন্দোলন করতে গিয়ে কুমিল্লায় আমাদের দু’জন সিনিয়র নেতা গুমসহ বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। মামলায় জর্জরিত জেলার নেতাকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে কুমিল্লায় খালেদা জিয়ার সমাবেশ আয়োজনে তৃণমূল নেতাকর্মীদের চাপ রয়েছে। তাই আমরা আশা করছি, কুমিল্লার সমাবেশ হবে স্মরণকালের বিশাল।