Thursday, February 5, 2026
আমলারা প্রকৃতিগতভাবে সংস্কারবিরোধী: আসিফ নজরুল
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আয়োজিত একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন আসিফ নজরুল। ‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ নামক বইটির লেখক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান।
আমলাদের কাজে হতাশ হয়ে যান উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমাদের এখানে যারা ইয়াং অফিসার (তরুণ কর্মকর্তা) আছে যাদের স্নেহ করি, আমি তাদের বুঝাই, বাবা, তুমি কিন্তু কেরানি না…ইউ আর আ অফিসার। অফিসারের স্বাধীন বিচার-বুদ্ধি-ক্ষমতা থাকতে হবে।’
উপদেষ্টা হওয়ার আগে শেখ হাসিনার সমালোচনা করার ফলে মানুষ তাঁকে মাথায় তুলে নাচত উল্লেখ করে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমি প্রচণ্ড পপুলার একটা মানুষ ছিলাম। আর এখন সারা দিন কাজ করি। কালকে রাতে দুবাই থেকে মিটিং করে এসে রাত আড়াইটা পর্যন্ত কাজ করেছি। সকালে উঠে সাড়ে সাতটা থেকে কাজ করেছি, আমার চোখ জ্বলতেছে, মাথা ব্যথা হয়ে গেছে, সারা দিন কাজ করি আর সারা দিন গালি শুনি।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দুর্নীতির গল্প অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন। উদাহরণ হিসেবে তিনি একটি ইউটিউব ভিডিওর কথা উল্লেখ করেন, যেখানে এক জনপ্রিয় ইউটিউবার দাবি করেছিলেন, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান নাকি কাউকে শত কোটি টাকা দিয়েছেন। বক্তার ভাষায়, এসব গল্প শেষ পর্যন্ত বিনোদনের উপকরণে পরিণত হয়।
‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ বইয়ের প্রসঙ্গ তুলে আসিফ নজরুল বলেন, এ ধরনের বই ও লেখা কেবল স্মৃতিকথা নয়, এগুলো রাষ্ট্র, মানবিকতা ও নাগরিক দায়িত্ব নিয়ে গভীর অন্তর্দৃষ্টি দেয়। এসব লেখা আরও বেশি পাঠকের কাছে পৌঁছানো জরুরি।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, তথ্য ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদ মাহবুবউল্লাহ, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
![]() |
| ‘বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতি’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে। ছবি: মীর হোসেন |
Friday, October 3, 2025
পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরে সরকার থাকে -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: আসিফ নজরুল
প্রথম আলো: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। আপনি কি আগেই বুঝতে পেরেছিলেন, সরকারের পতন আসন্ন?
আসিফ নজরুল: ধারণা করতে পেরেছিলাম। মিছিলে, সমাবেশে এমন পরিচিত মানুষদের দেখতে পারছিলাম, যাঁরা আগে কখনো আসেননি। তারপর শত নির্যাতনের পরও ছাত্রনেতাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় মানুষের ঢল, দ্রোহযাত্রা, সেনাসদরে সেনাপ্রধানের বক্তব্য শুনে মনে হচ্ছিল, শেখ হাসিনা এবার আর টিকতে পারবেন না। ৩ আগস্ট শহীদ মিনারে ছাত্র–জনতার বিশাল সমাবেশে বলেছিলাম, জয় তোমাদের সুনিশ্চিত।
প্রথম আলো: সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে কি আপনার সঙ্গে ৫ আগস্টের আগেই যোগাযোগ করা হয়েছিল? তারা কী বলেছিল?
আসিফ নজরুল: জুলাইয়ের একদম শেষ দিকে রাতের বেলায় সেনাবাহিনীর পরিচয় দিয়ে সিভিল ড্রেসে একজন এসেছিলেন আমাদের পাড়ায়।
আমাকে খুব সাবধানে থাকতে এবং রাতে বাসায় না ঘুমাতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি আদৌ সেনাবাহিনীর কি না, তা নিয়ে তখন সংশয় ছিল। ভয়ে অবশ্য তাঁর পরিচয় ভেরিফাই করার চেষ্টা করিনি। এরপর ৫ আগস্ট দুপুর ১২টার দিকে সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার ফোন করে তাঁর পরিচয় জানিয়ে আমাকে ক্যান্টনমেন্টে আসার আমন্ত্রণ জানান। আমি রিজওয়ানা হাসান আর মির্জা ফখরুল ভাইয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমার স্ত্রী খুবই ভয় পেয়েছিল। সে দোয়া পড়ছিল, সেনাবাহিনী যে গাড়ি পাঠিয়েছিল, সে সেটার ছবি তুলে রেখেছিল। তারা তাকে বারবার অভয় দিচ্ছিল। এরপর ৫ তারিখ সারা দিন যে অভিজ্ঞতা হলো, তা অকল্পনীয় ও অবিশ্বাস্য।
প্রথম আলো: অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্তিতে আমি আপনার সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তখন বলেছিলেন, মানুষের নিয়ত যদি সৎ হয়, দেশপ্রেম ও ইচ্ছাশক্তি থাকে, তাহলে যেকোনো কাজ করা সম্ভব। এখন এক বছর পূর্তিতে আমি জানতে চাই, সরকার আসলে কী করতে পারল, আপনার মন্ত্রণালয় কী করতে পারল?
আসিফ নজরুল: আপনাকে যেটা বলেছিলাম, তা অনেকাংশে সত্যি। যেকোনো কাজ করা সম্ভব না হলেও অনেক কিছু করা যায়। আমার মন্ত্রণালয় কী করেছে, তার একটা হিসাব দিয়েছি ৩১ জুলাই। আমরা ১৬-১৭টি আইন (নতুন ও সংশোধন) করেছি। দেওয়ানি ও ফৌজদারি দণ্ডবিধিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা, লিগ্যাল এইড সার্ভিসকে সম্প্রসারিত করা, অনলাইন বেল (জামিন) বন্ড দেওয়ার আইন করা, ডিজিটালাইজেশনের পদক্ষেপ—এমন অনেক কিছু আছে। কিছু কাজ আমরা করেছি, যেটা আগের কোনো সরকারের আইন মন্ত্রণালয়কে করতে হয়নি। আমরা ১৬ হাজারের বেশি হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছি। এটা শুধু বৈঠক করে হয় না, মামলার নথি ধরে ধরে পর্যালোচনা করতে হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে এ রকম নেই যে একটা মন্ত্রণালয় এক বছরে প্রায় পাঁচ হাজার সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছে, সেটি করেছি।
আমি মনে করি, সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য অর্থনৈতিক খাতের শৃঙ্খলা আনা। আমরা শেখ হাসিনার আমলে শুনতাম, তিনি নিজেও বলেছিলেন, দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে। অর্থনীতিতে ধস নামার লক্ষণ ছিল। সেটা ঠেকানো গেছে। আমি সব সময় শুনতাম যে এ রকম একটা পরিস্থিতিতে বিনিময় হার (ডলারের দাম) অত্যন্ত বেড়ে যায়। সেটা বাড়েনি, বরং এখন কমতির দিকে। আমাদের রিজার্ভ (বৈদেশিক মুদ্রার মজুত) বেড়েছে, ব্যবস্থাপনা ভালো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে, ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা আসছে, মানুষের আস্থা ফিরছে। রোজার মাসে দ্রব্যমূল্য কিছু কিছু কম রাখা গেছে। হজ ব্যবস্থাপনার উন্নতি হয়েছে। অপচয় কমানো গেছে। ফাওজুল কবির ভাইয়ের (বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান) হাতে যেসব মন্ত্রণালয় আছে, সেখান থেকে তিনি ৪৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় করেছেন। এটা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কাটছাঁট ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বাদ দিয়ে করা হয়েছে।
বিপ্লব-উত্তর পরিস্থিতিতে যে বিশৃঙ্খল একটা অবস্থা থাকে, সেটা যদি না থাকত, আরও বেশি কিছু করা যেত।
প্রথম আলো: নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে আপনি ৩০ বছর বিভিন্ন সরকারের অন্যায় কাজের সমালোচনা করেছেন। এখন সরকারে আছেন। আসলে কী করতে পারেননি?
আসিফ নজরুল: আমাদের দুটি বড় ব্যর্থতা হচ্ছে ‘মব–সন্ত্রাস’ ও ঢালাও মামলা। মব–সন্ত্রাস দমন করার ক্ষেত্রে সমস্যা হলো, পুলিশ মোরাল (নৈতিক অবস্থান) ছিল না। যে পুলিশ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিপক্ষ ছিল, সেই পুলিশ যখন দেখে গণ-অভ্যুত্থানের দাবিদার বলে কিছু মহল মব করছে, তখন সেটা দমন করতে পারেনি। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অসহায় হয়ে মাঝেমধ্যে বলেন, ‘আপনারা আমাকে ক্লিয়ারলি (পরিষ্কারভাবে) বলেন কী করব, বল প্রয়োগ করব, নাকি করব না।’ আমরা পুলিশের ভয়াবহ বলপ্রয়োগের স্মৃতির পর সেটা করতে বলতে পারি না। দেখবেন, অনেক ক্ষেত্রে পুলিশ উল্টো মার খেয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান বা বিপ্লব-পরবর্তী পরিস্থিতিতে সমাজের বিভিন্ন অংশের মধ্যে শৃঙ্খলা একটু কমে যায়। কারণ, তারা একটা অন্য রকম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ফ্যাসিস্ট রেজিমের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। হঠাৎ করে সবাই সুশৃঙ্খল হয়ে যায় না। আপনি মহান মুক্তিযুদ্ধের পরের অবস্থা দেখেন, সেখানে তো একটা দলের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল। তারপরও তো শৃঙ্খলা আনতে পারেনি। তবে আমরা বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি।
প্রথম আলো: আপনি মুক্তিযুদ্ধের পরের কথা বললেন। সেটার মাশুল তো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দিতে হয়েছে। তাঁর সরকার খুব দ্রুত অজনপ্রিয় হয়ে পড়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি নৃশংস হত্যাকাণ্ডেরও শিকার হন।
আসিফ নজরুল: সেই সময় তো অনেক সন্ত্রাস হয়েছে সরকারের স্বার্থ পূরণের জন্য। যেমন রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ড বা সিরাজ শিকদারের মতো নেতাদের হত্যা। এখনকার সময়ে আপনি কী দেখেছেন, আসিফ নজরুল বা অন্য কোনো উপদেষ্টা মব–সন্ত্রাস করাচ্ছেন? কিংবা ক্ষমতায় থাকার জন্য আমরা বাহিনী লেলিয়ে দিচ্ছি। তখন এক দলের দুঃশাসন ছিল। এখন তো পার্সপেকটিভটা ডিফারেন্ট (পটভূমি ভিন্ন)।
প্রথম আলো: আসিফ নজরুলকে মব করাতে দেখিনি, তবে আমরা দেখেছি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ কর্মকর্তারা মব দমন করতে চেয়েছেন। পরে তাঁদের প্রত্যাহার করা হয়েছে।
আসিফ নজরুল: দু-একটা ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। আপনি তো জানেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন কী রকম বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে কোনো কোনো কর্মকর্তাকে আরও ভালো জায়গায় (প্রত্যাহার করে) নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা শাস্তি হিসেবে নয়।
প্রথম আলো:
ঢালাও মামলার কথা আপনি বলছিলেন।
আসিফ নজরুল: দেখেন, মামলা সরকার করেনি, করেছেন ভুক্তভোগীরা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে মামলা–বাণিজ্যের প্রত্যাশী একশ্রেণির আইনজীবী জুটে গেছেন।
প্রথম আলো: কিছু দলের কিছু নেতাও জড়িত।
আসিফ নজরুল: প্রশ্ন হলো, পুলিশ ফিল্টার (যাচাই করে আসামি করা) করতে পারে না কেন? প্রথম দিকে পুলিশকে আমরা বলেছিলাম। পুলিশ যখন ফিল্টার করতে গেছে, তখন তাদের বলা হয়েছে যে তারা সারা জীবন ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে। এখন সমস্যা কী? পুলিশের ওই নৈতিক মনোবলটাই নেই। সারা হোসেন (সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী) বললেন, ‘আপনারা পারছেন না কেন?’ আমি বললাম, আপনি আমাকে সলিউশন (সমাধান) দেন। আজকে তিন মাস হয়ে গেছে। তারপর আমরা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধন করেছি।
প্রথম আলো: দুঃখিত স্যার। আপনাকে থামিয়ে একটা প্রশ্ন করি। সেটা হলো, আপনি বলছেন সরকার একটা মামলাও করেনি। কিন্তু সরকারের পাবলিক প্রসিকিউটর, সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল মামলাগুলোয় জামিনের বিরোধিতা করছেন। কেউ হাইকোর্টে জামিন পেলে আপিল করে আটকে দেওয়া হচ্ছে। এক মামলায় জামিন পেলে অন্য মামলায় গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।
আসিফ নজরুল: মামলাগুলো হত্যার ঘটনার। এসব মামলায় আওয়ামী লীগের লোকেদের সংশ্লিষ্টতা বা মদদ নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ কম। কিন্তু এর বাইরে যাঁরা নিরীহ সাধারণ মানুষ আছেন, তাঁদের অনেকে জামিন পাচ্ছেন। কয়েকজন নেতাও পেয়েছেন। আমি কয়েকটা নাম চট করে বলি, প্রফেসর আবদুল মান্নান জামিন পেয়েছেন, সাবের হোসেন চৌধুরী জামিন পেয়েছেন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে গ্রেপ্তারই করা হয়নি। এ রকম কিছু উদাহরণ কিন্তু আছে।
প্রথম আলো: আমিও যোগ করি, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও জামিন পেয়েছেন। এ রকম কয়েকটি ঘটনা আছে। কিন্তু সেটা সমালোচনা হওয়ার পর। এটাও বলা হয় যে বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের তো হত্যা মামলায় আটকে রাখার কারণ নেই। তাঁদের দুর্নীতি বা অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি খতিয়ে দেখাই সমীচীন।
আসিফ নজরুল: বোধ হয় শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আমার জানামতে, সাত-আটজন গ্রেপ্তার হয়েছেন। আপনাকে গ্যারান্টি দিয়ে বলছি, মামলাগুলোর পেছনে সরকারের কোনো পক্ষের মদদ নেই। এখন আপনাকে বলি, ধরেন, যারা সাধারণ ভুক্তভোগী, তারা যখন দেখেছে মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে, তখন কোনো সাংবাদিক যদি রক্তপিপাসু প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপনি যা করছেন ঠিক আছে। আমরা আপনার সঙ্গে আছি,’ সেটা কি মদদ নয়?
প্রথম আলো: সেটার বিচার তো ট্রাইব্যুনালে হতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্ট হত্যা মামলায় তাঁদের আসামি করা কি যৌক্তিক?
আসিফ নজরুল: যাঁরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনে অভিযুক্ত, তাঁদের ক্ষেত্রে তো কমান্ড রেসপনসিবিলিটির ব্যাপার আসবে। কিন্তু তার বাইরে যেটা আছে, এই ইনস্টিগেশন করা (উসকানি দেওয়া), এটা কেউ কেউ করেছে। এটা তো গুরুতর অপরাধ।
প্রথম আলো: তাহলে আপনি কি বলছেন, বিচার যত দিন চলবে, তাঁরা কারাগারে থাকবেন?
আসিফ নজরুল: সেটা তো আমি বলতে পারব না। বিচার চলাকালে যদি বিচারক মনে করেন...এটা বিচারকের বিবেচনার বিষয়।
প্রথম আলো: বিচারক কি স্বাধীনভাবে রায় দিতে পারেন? বলা হচ্ছে, বিচারালয়ে ভয়ের পরিবেশ আছে। ধরুন, আজকে বিচারক সাংবাদিক শ্যামল দত্তকে জামিন দিলেন। পরের দিন বিচারক মবের শিকার হবেন না, সেটা নিশ্চিত?
আসিফ নজরুল: আমি তো বিচারকের মানসিক অবস্থা বলতে পারব না। তবে আপনাকে একটা জিনিস বলি, ১৫ বছর বিচারকদের ভয়ের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা হয়েছে। বলে দেওয়া হয়েছে, কাকে জামিন দেবেন, কাকে দেবেন না। সেই বিচারকেরও নিজের অতীতের কথা মনে পড়ে যে অতীতে আমি কী করেছি বা কীভাবে ইউজড (ব্যবহৃত) হয়েছি। ১৫ বছর ভয়ের পরিবেশে অভ্যস্ত হয়ে এবং ওই রাজনৈতিক বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত দিয়ে এখন হঠাৎ করে তাঁর মানসজগতে নিজের অতীত বিবেচনা বা বর্তমান পরিস্থিতির বিবেচনা উঠে যাবে, এটা সবার ক্ষেত্রে না–ও হতে পারে।
প্রথম আলো: কিন্তু স্যার, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের তো একটা বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল ন্যায়বিচার।
আসিফ নজরুল: ন্যায়বিচারের সংজ্ঞা কার কাছে কী? কমপক্ষে হাজার লোক মারা গেছেন, কমপক্ষে এক লাখ কোনো না কোনোভাবে আহত হয়েছেন, ১৫ বছরে লাখ লাখ মানুষ জীবিকা থেকে বঞ্চিত হওয়া, গুমসহ বিভিন্ন ধরনের নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তাঁরা যদি মনে করেন, এটাই (মামলায় আসামি করা) তো আমার এখন ন্যায়বিচার। আমাকে একটা আইন দেখান যে আমরা কাউকে মামলা করা থেকে বিরত করতে পারি। আপনাকে আবার বলি, পুলিশ কেন স্ক্রুটিনি (যাচাই-বাছাই) করে না। আগের আমলে পুলিশ এক পক্ষের মামলা নিত, আরেক পক্ষের নিত না। এখন পুলিশ মামলা নিচ্ছে। ১৫ বছরের যে অপরাধবোধ, যে সংস্কৃতি, সেই একই পুলিশ, একই বিচারালয়, রাতারাতি মুক্ত হয়ে যাবে, এটা এত সহজ না। আরেকটা কথা আপনাকে বলি, মামলা তো ভুয়া না। আপনি অভিযোগ করতে পারেন যে মামলায় অনেক লোককে জড়ানো হয়েছে, যাঁরা এই মামলায় জড়িত হওয়ার কথা নয় এবং এর মাধ্যমে বাণিজ্য করা হচ্ছে।
প্রথম আলো: মামলা ভুয়া, সেটা বলছি না। আগের সরকারের আমলে ছিল ‘গায়েবি মামলা’। এখন ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি।
আসিফ নজরুল: হ্যাঁ, বলতে পারেন। তবে পার্থক্য হলো, আগের সরকারের সময় সরকার মামলা করত। এখন ভুক্তভোগী মানুষ মামলা করছেন। আগের আমলে পুরো মামলাই ছিল গায়েবি, পুরোপুরি কল্পিত। এখন মামলার অভিযোগটা সত্যি, অনেক লোককে যে জড়ানো হচ্ছে, এটা হয়তো সত্যি নয় অনেক ক্ষেত্রে।
প্রথম আলো: কিন্তু স্যার, বিগত সরকারের আমলে মামলা দিয়ে দিনের পর দিন জেলে আটকে রাখা হতো, জামিন দেওয়া হতো না, এখনো আমরা সেটাই দেখি।
আসিফ নজরুল: পার্থক্য আছে। আগের সরকারের আমলে গায়েবি মামলা দিয়ে অনেক আসামি করা এবং প্রচুর আসামিকে ধরা হতো। আমরা পুলিশকে কড়াভাবে বলে দিয়েছি, প্রমাণ পেলেই কেবল আসামি ধরা যাবে। আমার ধারণা, আমাদের সরকারের সময় মোট আসামির বড়জোর ১০ শতাংশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
প্রথম আলো: সর্বশেষ উদাহরণটি দেখি। একজন সাবেক প্রধান বিচারপতি (খায়রুল হক), যাঁর বিরুদ্ধে চরম বিতর্কিত রায় দেওয়া, রায় পরিবর্তনের অভিযোগ আছে। কিন্তু হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা কি যৌক্তিক মনে হচ্ছে?
আসিফ নজরুল: ওনার বিরুদ্ধে তিনটা মামলা রয়েছে। পুলিশ তাঁকে আদালতে তুলেছে হত্যা মামলায়। পরে তাঁকে রায় পরিবর্তন–সংশ্লিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং রিমান্ডও এই মামলায় শুধু চাওয়া হয়েছে। আপনাকে একটা কথা বলি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে চূড়ান্ত রায় যাঁরা লিখেছেন, তাঁদের মধ্যে দুজন বিচারপতি লিখেছেন, বিচারপতি খায়রুল হক সংক্ষিপ্ত রায়ের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ রায়ের ব্যত্যয় করেছেন। এটা তো আইনসিদ্ধ নয়। তাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা, রিমান্ডে নেওয়া নিয়ে আপনি প্রশ্ন তুলতে পারেন না।
প্রথম আলো: না স্যার, তাঁকে গ্রেপ্তার-রিমান্ড নিয়ে আমার প্রশ্ন নেই। আমার প্রশ্ন, কেন রায় জালিয়াতির বদলে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার?
আসিফ নজরুল: ১৫ বছর পুলিশ নিয়োগ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিবেচনা ছিল আওয়ামী লীগ করে কি না, অনেক ক্ষেত্রে গোপালগঞ্জ বাড়ি কি না। সেই পুলিশের সবাই আমাদের জন্য শতভাগ আন্তরিকতা দিয়ে কাজ করবে—এটা বোধ হয় একটু বেশি চাওয়া। পুলিশে দক্ষতার ঘাটতিও আছে। পুলিশে আবার অনেকেই আছেন, যাঁরা দায়িত্বশীল ও আন্তরিক।
প্রথম আলো: জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। বিচার কতটা এগোল?
আসিফ নজরুল: দুই জায়গায় বিচার হচ্ছে। একটা হলো সাধারণ আদালতে। অন্যটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। আমি মনে করি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলা যথেষ্ট ভালোভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। আমাদের তদন্ত ও প্রসিকিউশন দলের কাছে প্রথম থেকে প্রত্যাশা ছিল, মামলা যেন যেনতেনভাবে পরিচালিত না করা হয়। শক্ত প্রমাণ যাতে থাকে এবং তা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে। আপিলের আদালতে রায় যেন টিকে থাকে। শেখ হাসিনার আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে যে বিচার হয়েছিল, সেখানে টেলিফোনে-স্কাইপে রায় লিখে নিয়ে আসত। এখানে এ রকম কিছু হবে না। আমরা গত নভেম্বরে কাজ শুরু করেছি। আট মাসের মাথায় মামলার বিচার শুনানি পর্যায়ে চলে গেছে। আমি মনে করি, এটা যথেষ্ট অগ্রগতি।
আমি জানি, আপনি প্রশ্ন করবেন যে আমি বলছি বিচার এত দিনে হয়ে যাবে। দেখেন, এ বিষয়ে আমি আমার ধারণা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে কথা বলি। যখন শহীদ পরিবারগুলো কাঁদতে থাকে, তখন খুব ইচ্ছা করে যে আমি নিজের ধারণার কথা বলি। প্রসিকিউশন টিমের সঙ্গে আমি যোগাযোগ রাখি। আমি জানি, মামলা কোন জায়গায় রয়েছে। সেটার ভিত্তিতে অ্যানালাইজ করে (বিশ্লেষণ) বলেছি। প্রথমবার বিচারে যথেষ্ট অগ্রগতি ছাড়াই বলেছি, অক্টোবরের মধ্যে হয়তো রায় হবে। এখন বিচারের গতি দেখে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি, অক্টোবরে না হলেও ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে হবে। আমি যখন অক্টোবরের মধ্যে বলেছিলাম, তখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারপতিরা আমাকে সতর্ক করেছিলেন। এটাই তো প্রমাণ যে আমাদের আদালত কতটা নিরপেক্ষ।
প্রথম আলো: বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়ের অগ্রগতি কতটা?
আসিফ নজরুল: পৃথক সচিবালয় মানে শুধু চেয়ার-টেবিল দেওয়া নয়। কয়েক দিন আগে একটা রুলস (বিধি) পাস হয়েছে, যেখানে বিচার বিভাগের পদ সৃজন প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে হওয়ার কথা বলা হয়েছে। পদায়ন বিধিমালা হয়েছে। আরও কিছু বিধিমালা করতে হবে। আমি মনে করি, আমাদের যে গতিপথ ও কর্মপরিকল্পনা রয়েছে, এটা (পৃথক সচিবালয়) ডিসেম্বরের আগে হয়ে যাবে।
প্রথম আলো: বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পরে গণ-অভ্যুত্থান হলো। সমাজে যে আয়বৈষম্য ও বৈষম্য, সেটা কমাতে কী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে? প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস সারা জীবন দরিদ্র মানুষের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে সরকারের কি আরও ভূমিকা রাখা উচিত ছিল? এই সরকার এক বছরে দরিদ্র মানুষের জন্য বাড়তি কী করেছে?
আসিফ নজরুল: আমি আসলে অর্থনৈতিক বিষয়টা খুব কম বুঝি। কিন্তু আমি সব সময় দেখতাম, বলা হতো যাতে কোনোভাবেই দ্রব্যমূল্য না বাড়ে। আর কর্মসংস্থান যেন বৃদ্ধি পায়। দুটি জিনিস উনি (অধ্যাপক ইউনূস) সব সময় বলতেন। এখন ধরেন দ্রব্যমূল্য তো অনেক ক্ষেত্রে সহনীয় রাখা গেছে।
প্রথম আলো: মূল্যবৃদ্ধি আগে হতো ১১-১২ শতাংশ, এখন সেটা ৮ শতাংশে নেমেছে।
আসিফ নজরুল: এটা সাকসেস (সফলতা) নয়?
প্রথম আলো: সফলতা নয়, সেটা বলছি না। বলছি, দরিদ্রদের জন্য এই মূল্যস্ফীতিও সহনীয় নয়।
আসিফ নজরুল: কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যেটা হয়েছে, আমাদের পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগপদ্ধতিতে দীর্ঘসূত্রতা রয়েছে। এখানে হয়তো আমাদের আরও কিছু করার ছিল।
প্রথম আলো: বাজেটে আমরা দেখলাম, দরিদ্র মানুষের ভাতা বেড়েছে ৫০ টাকা, কোনো ক্ষেত্রে ১০০ টাকা; যে হারে শেখ হাসিনাও বাড়াতেন। শ্রম কমিশনের প্রতিবেদন হিমাগারে পড়ে আছে।
আসিফ নজরুল: অনেকেই প্রশ্নটা তোলেন যে এই পাঁচটা কমিশন করা হলো কেন (জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় না থাকা পাঁচ কমিশন—নারী, স্বাস্থ্য, গণমাধ্যম, শ্রম ও স্থানীয় সরকার)। এসব কমিশনের আশু বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ আমি নিজে স্যারের (অধ্যাপক ইউনূস) নির্দেশে দু-এক মাস আগে মন্ত্রণালয়গুলোয় পাঠিয়ে দিয়েছি। কিন্তু কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে, এটা ফলোআপ করার এখতিয়ার আমার নেই। তবে স্যার উপদেষ্টাদের সঙ্গে কিছুদিন পরপর বসছেন এবং জিজ্ঞাসা করছেন যে তাঁদের ক্ষেত্রে সংস্কারকাজের অগ্রগতি কী।
প্রথম আলো: জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সবচেয়ে বেশি প্রাণ দিয়েছেন শ্রমজীবী মানুষ ও শিক্ষার্থীরা। সরকারি চাকরিজীবীরা বিগত সরকারকে শেষ সময়েও অসহযোগিতা করেননি। আমলাদের হাতে রাখতে শেখ হাসিনা গাড়ি কেনা, ফ্ল্যাট কেনায় ঋণসুবিধা দিয়েছিলেন। আপনারা সেটা বাতিল করেননি। আপনারা এসে সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়তি ইনক্রিমেন্ট (বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি) দিলেন, এখন আবার বেতন কমিশন গঠন করা হলো। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হোক, কিন্তু শ্রমজীবীদের জন্য কী করেছেন?
আসিফ নজরুল: বেতন কমিশনের বিষয়ে আমি আপনাকে ঠিক বলতে পারব না। কারণ, এটা জনপ্রশাসনের ব্যাপার। আর এই সরকারের প্রতি সবার (আমলাদের মধ্যে) লয়ালিটি (আনুগত্য) নিয়ে প্রশ্ন আছে, দক্ষতা ও আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এখন হঠাৎ করে বলব, আপনার ব্যবহৃত গাড়ি-বাড়ি সব ফেরত দেন, এটা কি বাংলাদেশের বাস্তবতায় সম্ভব?
প্রথম আলো: প্রকল্পের যে গাড়ি সরকারের পরিবহন পুলে জমা না দিয়ে আমলারা ব্যবহার করেন, সেগুলো তো ফেরত নিতে পারতেন।
আসিফ নজরুল: এটার ডিটেইল (বিস্তারিত) তথ্য আপনাকে দিতে পারব না। কিন্তু প্রকল্পের গাড়ির ক্ষেত্রে খুবই কড়া মনোভাব আমাদের রয়েছে।
প্রথম আলো: সরকারের ভেতরে কি কোনো সরকার আছে?
আসিফ নজরুল: আচ্ছা, পৃথিবীতে কোন দেশে সরকারের ভেতর সরকার থাকে না? পৃথিবীর সব সরকারের ভেতরে সরকার থাকে, যাকে ‘কিচেন কেবিনেট’ (যাঁদের প্রভাব বেশি) বলা হয়। তবে সরকারের বাইরের কেউ সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করে না।
প্রথম আলো: সরকারের এক বছর পূর্তি হচ্ছে ৮ আগস্ট। এখন কি পারদর্শিতা মূল্যায়ন করে কোনো রদবদলের সম্ভাবনা আছে? আপনি হয়তো স্বীকার করবেন যে কোনো কোনো উপদেষ্টা ভালো করেছেন, কেউ কেউ সেটা পারেননি।
আসিফ নজরুল: আমাদের অনেক সমালোচনা হয়, যেটা খুব নির্দয়। তো আমি যখন ইনডিভিজুয়ালি (ব্যক্তি ধরে) দেখি, আমাদের অনেকেই খুব ভালো করছেন। আমাদের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ভাই, জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির ভাই, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন ভাই ভালো করছেন। আমাদের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেন ভাই হজ ব্যবস্থাপনায় সেরা কাজ করেছেন। এ রকম আরও কারও কথা বলতে পারি। ব্যর্থতার কথা আমার বলা শোভনীয় নয়, এটা আপনাদের ব্যাপার।
স্যারের (অধ্যাপক ইউনূস) যে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ (শরীরী ভাষা) থাকে, তাঁর যে কার্যপদ্ধতি, এটার মধ্যে কিন্তু আমরা প্রত্যেকে জানি, কার কাজের ব্যাপারে স্যারের মূল্যায়ন কতটুকু আছে।
প্রথম আলো: একটা সম্পূরক প্রশ্ন করে নিই। বিগত সরকারের আমলে আমরা দেখতাম, যত সমালোচনাই হোক, শেখ হাসিনা কাউকে বদলাননি। কোনো সমালোচনাকে তিনি পাত্তা দেননি। এই সরকারের আমলেও কি সেটাই হবে?
আসিফ নজরুল: না, কিছু সমালোচনা তো খুবই নির্দয়। এ রকম সমালোচনার কারণে যদি কাউকে বাদ দিতে হয়, তাহলে তো সবার বিরুদ্ধে সমালোচনা শুরু হবে।
প্রথম আলো: যৌক্তিক সমালোচনা কি নেই?
আসিফ নজরুল: সে ক্ষেত্রে সামগ্রিক বিবেচনা করতে হয়। ধরেন, যৌক্তিক সমালোচনা মনে হচ্ছে, কিন্তু ইন্টেলিজেন্সের রিপোর্টের (গোয়েন্দা প্রতিবেদন) ভিত্তিতে বা অন্য কোনো তথ্যের ভিত্তিতে স্যার (অধ্যাপক ইউনূস) যদি কনভিন্স (সামগ্রিক বিষয় অনুধাবন করে সম্মত হওয়া) না হন, তাহলে তো ব্যবস্থা নেওয়াটা তাঁকে ডিসকারেজ (নিরুৎসাহিত) করবে। আমাদের কারও কারও ক্ষেত্রে হয়তো অদক্ষতা, অনভিজ্ঞতার অভিযোগ থাকতে পারে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগ শোনেন? একজন-দুজন সম্পর্কে হয়তো ক্যাম্পেইন (প্রচার) আছে, সেটা তো প্রমাণিত তথ্য নয়। আমরা অফিস করি না, এটা তো শোনেন না, স্বজনপ্রীতি করি, এটা শোনেন না।
প্রথম আলো: আমরা তো শুনি, কেউ কেউ বেলা দুইটার পরে অফিসে যান। আমরা তো দু-একজনের কথাই বলব। কেউ তো বলছে না, পুরো উপদেষ্টা পরিষদ চলে যাক।
আসিফ নজরুল: আমি এ বিষয়ে নিশ্চিতভাবে অবগত নই।
প্রথম আলো: উপদেষ্টা পরিষদে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে, আলোচনার ক্ষেত্রে বাইরের কেউ জেনে যাবে, এই ভয়ে থাকেন কি না।
আসিফ নজরুল: আমার মনে হয় না।
প্রথম আলো: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও নির্বাচনে বাধা আসার আশঙ্কা—এ দুই পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় নিয়ে জানতে চাই, আপনারা কি সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন তুলে আনতে পারবেন।
আসিফ নজরুল: অবশ্যই পারব।
প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, সেনাবাহিনীর আরও সক্রিয় ভূমিকা ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হবে না। সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব আছে বলে একটা কথা প্রচলিত রয়েছে।
আসিফ নজরুল: মোটেও দূরত্ব নেই, এটা নিশ্চিত থাকেন। এগুলো সম্পূর্ণ বাইরের স্পেকুলেশন (অনুমান); বরং বাইরের শক্তিগুলো কেউ কেউ সেনাবাহিনীকে অন্যায়ভাবে কিছু ক্ষেত্রে দোষারোপ করার চেষ্টা করে। আমি গণ-অভ্যুত্থানের মাঠে থাকা একজন কর্মী হিসেবে বলি, সেনাবাহিনী সরকারের একটি বাহিনী হয়েও সামগ্রিকভাবে গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষে যে ভূমিকা রেখেছে, সেটা সম্পর্কে সমাজের কিছু কিছু স্তরের শ্রদ্ধাবোধের অভাব আছে। ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্নভাবে সেনাবাহিনীর কেউ কেউ জঘন্য কাজে লিপ্ত হতে পারে, তবে সামগ্রিকভাবে তাদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত প্রশংসনীয়। আমার কথা হলো, সেনাবাহিনীর সঙ্গে সরকারের দূরত্ব নেই। তবে নির্বাচনের সময় আরও বেশি দায়িত্ব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করলে সেটা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়।
প্রথম আলো: নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি কি আপনাদের কোনো পক্ষপাত আছে? সরকারের দুজন উপদেষ্টা তাদের লোক বলে অনেকে বলে থাকেন।
আসিফ নজরুল: গণ-অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত মুহূর্তে তো অবশ্যই ছাত্রদের নেতৃত্ব ছিল, এটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। যখন আমাদের সরকার গঠিত হয়, তখন তো আমি সমালোচনা শুনেছি যে এত কম ছাত্র উপদেষ্টা কেন। ছাত্র উপদেষ্টাদের বন্ধুরা যখন দল গঠন করলেন, তখন কিছু ক্ষেত্রে মনে হতে পারে, সরকার এনসিপিকে প্রিভিলেজ (বিশেষাধিকার) দিচ্ছে। আসলে প্রিভিলেজ দিচ্ছে না। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃস্থানীয় ভূমিকার কারণে এনসিপি খুব বেশি ‘ভালনারেবল’ (নাজুক)। সে জন্য গোপালগঞ্জ বা কোনো কোনো জায়গায় তাদের বাড়তি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে। বিএনপি বা জামায়াত অনেক পুরোনো দল, অনেক সুসংগঠিত। এনসিপি সেটা নয়। তাদের ওপর যদি কোথাও হামলা হয়, কোনো ঘটনা ঘটে, কেউ কি আমাদের ক্ষমা করতে পারবে?
প্রথম আলো: এনসিপির নেতাদের কথায় কিন্তু মনে হয় না তাঁরা ‘ভালনারেবল’।
আসিফ নজরুল: আমার বিচারে একটা সদ্য ভূমিষ্ঠ দলের অনেক সমর্থক থাকতে পারে, কিন্তু তাদের তো বেশি কর্মী নেই, অভিজ্ঞতা নেই। আরেকটা কারণে তাদের সুরক্ষা দেওয়া দরকার; সেটা হলো, পতিত আওয়ামী লীগের প্রথম টার্গেট (নিশানা) হওয়ার কথা এনসিপির নেতারা।
প্রথম আলো: বিএনপির সঙ্গে আপনাদের দূরত্ব আছে, সখ্য ধর্মভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে—এ বক্তব্যের জবাবে কী বলবেন? বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি কথা বলেছেন। সেটি হলো, দক্ষিণপন্থীদের উত্থানে তিনি উদ্বিগ্ন।
আসিফ নজরুল: আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে ধর্মভিত্তিক দলগুলো প্রচণ্ড অন্যায়-অবিচারের শিকার হয়েছে।
প্রথম আলো: অন্যায়-অবিচারের শিকার বিএনপিও হয়েছে।
আসিফ নজরুল: মধ্যপন্থী দলের মধ্যে বিএনপি, আর সংখ্যায় বেশি ধর্মভিত্তিক দল। তারা অসীম নির্যাতন, গ্রেপ্তার, গুমের শিকার হয়েছে এবং তারা এই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। তাদের সঙ্গে তো আমাদের বসতে হয়।
প্রথম আলো: বৈঠক তো হবেই। বলছি, বিএনপির চেয়ে তাদের সঙ্গে সখ্য বেশি কি না।
আসিফ নজরুল: কেউ বলেন এনসিপির সঙ্গে আমাদের সখ্য, কেউ বলেন ধর্মীয় দলের সঙ্গে। লন্ডনে অধ্যাপক ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠকের পর কেউ কেউ বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে সরকারের সখ্য। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে বা জ্ঞাতসারে কোনো দলের পক্ষ অবলম্বন করা হয় না।
প্রথম আলো: কোনো কোনো সমাবেশে নাগরিক সমাজের কারও কারও ‘কল্লা ফেলে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হলো। কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। কেন?
আসিফ নজরুল: আমার মনে হয় যাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, সেই পুলিশ হয়তো ভাবছে, এটা জাস্ট ‘পলিটিক্যাল রেটরিক’ (রাজনৈতিক বক্তব্য)। ব্যবস্থা নেওয়া হলে উগ্রবাদকে উসকে দেওয়া হবে এবং ওনাদের নিরাপত্তার জন্য জিনিসটা ভালো হবে না। আমি তো হুমকির পরও কারও কর্মকাণ্ড কম দেখছি না। অনেক সময় রাষ্ট্র পরিচালনার সময় বিবেচনায় রাখতে হয়, ব্যবস্থা নিলে আরও উসকে দেওয়া হয় কি না।
প্রথম আলো: আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। বিচার শেষ হওয়ার আগে তাদের কার্যক্রম চালাতে না দেওয়ার পক্ষে অনেক মানুষ রয়েছেন। কিন্তু কারও কারও প্রশ্ন, নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম স্থগিত রেখে যদি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হয়, সেই নির্বাচন নিয়ে বিদেশে প্রশ্ন উঠবে কি না?
আসিফ নজরুল: প্রশ্ন যারা তোলার, তারা তুলবে। কিন্তু দেখেন, আওয়ামী লীগের কারও মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই; বরং আওয়ামী লীগের নেত্রী ও অন্য নেতারা বলছেন, এই গণহত্যা নাকি আমরা করেছি এবং তাঁরা ফিরে এলে প্রতিশোধ নেবেন, আমাদের ফাঁসিতে ঝোলাবেন। এ ধরনের কথাবার্তা যে দল বলে এবং যে দল সুযোগ পেলেই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা চালাতে দিলে আপনি দেশ চালাতে পারবেন? তাদের বিচার করতে পারবেন? অসম্ভব একটা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে এবং মারামারি-খুনোখুনি করে বাংলাদেশকে বিপর্যস্ত করা হবে। বাংলাদেশে অন্যান্য যে অপশক্তি আছে, তাদের হস্তক্ষেপ করার সুযোগ তৈরি করা হবে। এই আশঙ্কা সত্যি, যৌক্তিকভাবেই আমাদের মধ্যে আছে।
প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ না করে জনগণকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দেওয়াই কার্যকর পন্থা হবে।
আসিফ নজরুল: এটা ঠিক, জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হওয়া আরও বেশি ইমপ্যাক্টফুল (কার্যকর)। কিন্তু আমাদের তো সত্যি সত্যি আশঙ্কা আছে যে আওয়ামী লীগ নির্বাচন তো দূরের কথা, রাজনৈতিক মাঠে সক্রিয় থাকলে দেশে কোনো দিন নির্বাচন করা যাবে না, দেশ পরিচালনা করাই যাবে না। আমাদের ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট (গোয়েন্দা প্রতিবেদন) আছে যে সরকারের বিরুদ্ধে আনসারের বিক্ষোভসহ বিভিন্ন বিক্ষোভে আওয়ামী লীগের ইন্ধন ছিল। ক্রেডিবল এভিডেন্স (বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ) আছে সেখানে।
প্রথম আলো: সরকার ভারতে আম পাঠাল। ভারত যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের পর চিকিৎসক পাঠাল। উপদেষ্টাদের মধ্যে ভারতবিরোধী বক্তব্য ইদানীং কম দেখছি। দেশটির সঙ্গে সম্পর্কের কী অবস্থা?
আসিফ নজরুল: আমরা ভারতের শত্রু হতে চাই না, কিন্তু ভৃত্যও হতে চাই না। আমরা সমমর্যাদাভিত্তিক একটা সম্পর্ক চাই।
প্রথম আলো: তিস্তা প্রকল্প চীনা ঋণে করার জন্য দেশটিকে চিঠি দিয়েছে সরকার। এটা কি উপদেষ্টা পরিষদে আলোচনা হয়েছে?
আসিফ নজরুল: মাঝে মাঝে উপদেষ্টা পরিষদে, মাঝে মাঝে কিচেন কেবিনেটে (কয়েকজন উপদেষ্টা) আলোচনা হয়, মাঝে মাঝে স্যার ডেকে নিয়ে কথা বলেন। এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কোনো উপদেষ্টা এককভাবে নেন না।
প্রথম আলো: আপনি বা আপনার সরকার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কি ফেসবুকার বা ইউটিউবারদের দ্বারা প্রভাবিত হন, চাপে থাকেন? আপনি নিজেই বলেছিলেন, তদবির না শুনলেই অপপ্রচার চালানো হয়।
আসিফ নজরুল: সোশ্যাল মিডিয়ার চাপ সারা পৃথিবীতেই কমবেশি আছে। এখন তো যা ইচ্ছা লিখে দেওয়া যায়। ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের প্রয়োগ নেই, গ্রেপ্তারের ভয় নেই, হুমকির ভয় নেই। তবে আমি নিজে ফেসবুক-ইউটিউব দেখে সিদ্ধান্ত নিই না। হতে পারে দু-একজন ফেসবুকে কোনো একটা নির্দিষ্ট প্রচারণা দ্বারা পীড়িত হন। সেটা দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়া বা সিদ্ধান্ত না নেওয়ার চেষ্টা করেন।
প্রথম আলো: ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের মিশন খোলা হচ্ছে। কিন্তু আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনে আট মাস ধরে কোনো চেয়ারম্যান নেই।
আসিফ নজরুল: আপনি একটা ভালো সমালোচনা করেছেন। এখনকার যে মানবাধিকার কমিশন, তা প্রায় নখদন্তহীন বলতে পারেন। আইনের মধ্যে অনেক সমস্যা রয়েছে। অন্য অনেক সংস্কারকাজ করতে গিয়ে মানবাধিকার কমিশনের সংস্কার করা যায়নি। এই কমিশনের আইনে ব্যাপক সংস্কার করা দরকার, তারপর নিয়োগ। খালি খালি কাউকে চাকরি দিয়ে তো লাভ নেই। তবে এটা আমরা খুব দ্রুত দেব।
প্রথম আলো: কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশে আসলে রিকনসিলিয়েশন বা পুনর্মিলন দরকার। আপনি রিকনসিলিয়েশন কমিশনের কথা বলেছেন। প্রধান বিচারপতি ও আপনি দক্ষিণ আফ্রিকা ঘুরে এসেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকায় বিচার হয়েছে, পরস্পর পরস্পরের কাছে ক্ষমা চেয়েছে। আমরা কি রিকনসিলিয়েশনে যাব, নাকি অনন্ত বিভাজন ও সংঘাতের মধ্যে থাকব?
আসিফ নজরুল: দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী সত্যি সত্যি অনুতপ্ত ছিল। অনুতপ্ত থেকে তারা রিকনসিলিয়েশন করতে চেয়েছিল। আমাদের যারা হত্যাকারী, তাদের মধ্যে আপনি কোনো অনুতাপ দেখেন? আপনি তাদের সঙ্গে কীভাবে রিকনসিলিয়েশন করবেন?
প্রথম আলো:
আপনি যাঁদের কথা বলছেন, তাঁরা তো বিচারের আওতায় চলে আসবেন। এর বাইরে আওয়ামী লীগের বিপুল নেতা-কর্মী রয়েছেন, সমর্থক রয়েছেন।
আসিফ নজরুল: সারা দেশের মানুষের বিরুদ্ধে তো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। রিকনসিলিয়েশনের অনেকগুলো কনসেপ্ট আছে। একটা হচ্ছে ট্রুথ সিকিং (সত্য সন্ধান), সেটা আমরা করছি। দ্বিতীয়, মেমোরিয়ালাইজেশন (স্মরণ রাখার ব্যবস্থা)। সে জন্য জুলাই জাদুঘর করছি। তৃতীয়, ক্ষতিপূরণ। সেটা দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ, জাস্টিস (ন্যায়বিচার)। এই চারটা প্রক্রিয়ার পর রিকনসিলিয়েশন হয়। জাস্টিসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এটার পরে রিকনসিলিয়েশন করার পরিবেশ-পরিস্থিতি এলে আমাদের সরকার না হোক, পরবর্তী সরকার বিবেচনা করবে।
প্রথম আলো: রিকনসিলিয়েশন ছাড়া কি আমরা বিভাজন ও প্রতিশোধের চক্রে পড়ে থাকব?
আসিফ নজরুল: যেকোনো ক্ষেত্রে খুব ভালো কনসেপ্ট রিকনসিলিয়েশন। মুক্তিযুদ্ধের পরেই রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল। নব্বইয়ের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের পর রিকনসিলিয়েশন দরকার ছিল। কিন্তু রিকনসিলিয়েশন করার একটা পরিবেশ-পরিস্থিতি লাগে। আপনার যারা ক্ষতি করেছে, তাদের সঙ্গে আপনি সদ্ভাব কীভাবে রাখবেন, যদি তারা অনুতপ্ত না হয়।
প্রথম আলো: আমাদের তো একজন নেলসন ম্যান্ডেলা দরকার। অধ্যাপক ইউনূস ছাড়া এই নেতা কে হবেন?
আসিফ নজরুল: নেলসন ম্যান্ডেলাদের অপর দিকে তো ডি ক্লার্কের মতো নেতাও ছিলেন। আপনি ডি ক্লার্কের (এফ ডব্লিউ ডি ক্লার্ক শ্বেতাঙ্গদের নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট) ভূমিকা দেখেন, নেলসন ম্যান্ডেলা তো একা একা সেটা (বর্ণবাদ বিলোপ ও রিকনসিলিয়েশন) করতে পারেননি। আমরা দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলঙ্কাসহ বিভিন্ন দেশের উদ্যোগের কথা জানছি। পরে একটা উদ্যোগ সম্ভবত প্রধান বিচারপতির পক্ষ থেকে নেওয়া হবে। আলোচনাটা থাক সমাজে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আসিফ নজরুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।
| সাক্ষাৎকারে সমসাময়িক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দেন আসিফ নজরুল। ছবি: জাহিদুল করিম |
Thursday, September 18, 2025
অনেক কাজ করেছি, যা দেশের ইতিহাসে হয়নি: আসিফ নজরুল
বুধবার বিকেলে সিলেটের একটি হোটেলের হলরুমে ‘জারিকৃত আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫: মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক বিধান’ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘সবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে, যার যা ইচ্ছা, লিখে দেওয়া যায়। আমি প্রায়ই শুনি, “আপনি কী করেছেন? শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে বসেছেন, আমরা আপনাকে বসিয়েছি, আপনি কী করেছেন?” আমি বুঝতে পারি না, আনসারটা কী হবে। আমি ফুটবল প্লেয়ার নই, কিংবা মঞ্চনাটকের অভিনেতাও নই, আমি যেটা করব, আপনি দেখতে পারবেন।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আজকে লিগ্যাল এইডের কথা বললাম। এর আগে অনেক কাজ করেছি, যা কোনো দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়নি। আমরা সিভিল আদালত, ক্রিমিনাল আদালত পৃথক করেছি, যাতে সিভিল আদালতের নিষ্পত্তি বাড়ে, যাতে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুতগামী হয়। আগে কোনো দিন বাংলাদেশে এটা করা হয়নি। আমরা বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষমতা সেটা আগে পলিটিক্যাল মন্ত্রীদের হাতে ছিল, এটা চিফ জাস্টিসের কাছে নিয়ে গেছি। যে ফাইল নিজের হাতে নিয়ে চিফ অ্যাডভাইজারের কাছে সাইন করিয়েছি। পিয়নের মতো করে গিয়ে ওনার হাত থেকে সাইন করে নিয়েছি। সে রকম প্রায় সোয়া দুই শ বিচারকের পদ এক দিনে সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এমন একটা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট করেছি, যার জন্য বাংলাদেশে সমালোচনা হয়নি। দেওয়ানি কার্যবিধি আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে, যেটা আগে হয় নাই।’
আসিফ নজরুল দাবি করেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ে সারা বাংলাদেশ থেকে খুঁজে সবচেয়ে সৎ, সবচেয়ে যোগ্য অফিসারদের নিয়ে এসেছেন। তাঁরা দিনে–রাতে কাজ করছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তাঁরা যে পরিবর্তনগুলো করে দিয়েছেন, যে সংস্কার এনেছেন, তা রাজনৈতিক সরকার ধরে রাখলে ন্যায়বিচার বৃদ্ধি পাবে। দরিদ্র, অসহায় মানুষের আইনগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ অবারিত হবে। বিনা খরচে দ্রুততম সময়ে আইনগত সহায়তা পাবেন তাঁরা।
জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার আয়োজনে আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যক্রমকে সম্প্রসারণ এবং অধিকতর গতিশীল, জনবাবন্ধব ও সহজলভ্য করতে গত ১ জুলাই আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এই অধ্যাদেশের তফসিলভুক্ত বিষয়গুলোতে (পারিবারিক বিরোধ, পিতা-মাতার ভরণপোষণ, বাড়িভাড়া, যৌতুক ইত্যাদি) সিলেটসহ ১২টি জেলায় মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক বিধান বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে আসিফ নজরুল বলেন, ‘লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে যে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, সেটা প্রচলিত আদালতের বিরোধ নিষ্পত্তির চেয়ে ১০ ভাগের ১ ভাগ কম সময় লাগে। প্রচলিত আদালতে যদি পাঁচ বছর লাগে, লিগ্যাল এইডে সেটি নিষ্পত্তি করতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে, এত পার্থক্য। লিগ্যাল এইড অফিসে যে নিষ্পত্তিগুলো হয়, সেখানে ৯০ শতাংশ মানুষ সেটিসফায়েড থাকে। অর্থাৎ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে যে সলিউশনটা পায়, পরে তারা কোর্টে যায় না। ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন্যই আর কোর্টে যায় না। অথচ প্রচলিত আদালতে যে মামলা হয়, দেখবেন বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পরও কেউ উচ্চতর আদালতে যায় আপিল করার জন্য। কাজেই দেখলাম যে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সন্তুষ্ট লোকের সংখ্যাও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সন্তুষ্ট লোকের চাইতে অনেক বেশি। এটা এমন একটা বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা যেখানে কম সময় লাগে, অনেক কম টাকা লাগে, অনেক কম ভোগান্তি হয়, অনেক বেশি মানুষ সন্তুষ্ট থাকে।’
লিগ্যাল এইড আগে বাধ্যতামূলক ছিল না মন্তব্য করে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এবার আমরা মামলার জট কমাতে বাধ্যতামূলক করেছি। আপনাকে প্রথমে লিগ্যাল এইডে যেতে হবে। সেখানে যাওয়ার পর অসন্তুষ্টি থাকলে আদালতে যেতে পারবেন। কিন্তু প্রথমে লিগ্যাল এইডে যেতে হবে। এটা আমরা করেছি ১ নম্বর পরিবর্তন। আমাদের একটা ইচ্ছা ও বিশ্বাস আছে, এটা ঠিকমতো করতে পারলে মামলার জট কমে যাবে। মানুষের হয়রানি কমে যাবে, বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য অপূর্ব অভাবনীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য।’
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শেখ আশফাকুর রহমান, সিলেট জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হালিম উল্লাহ চৌধুরী এবং বন্ধুরাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষে দুজন প্রতিনিধি বক্তব্য দেন। এর আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা বিষয়ে নাটক প্রদর্শন করা হয়।
এদিকে সকালে সিলেটে পৌঁছে আইন উপদেষ্টা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র রাতারগুল পরিদর্শনে যান তিনি।
| জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার উদ্যোগে এবং সিলেট জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সহযোগিতায় জেলা পর্যায়ে আইনগত সহায়তা সম্পর্কিত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বুধবার বিকেলে গ্র্যান্ড সিলেট হোটেলের মিলনায়তনে। ছবি: প্রথম আলো |
Thursday, June 12, 2025
আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের নিন্দা ও ক্ষোভ
বুধবার (১১ জুন) ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে এক পোস্টে তিনি এসব কথা বলেন। নিচে তা তুলে ধরা হলো౼
পোস্টে আইন উপদেষ্টা লেখেন, কয়েক দিন আগে মুক্তিযোদ্ধাদের সংজ্ঞায়ন বিষয়ক ভুল সংবাদের জেরে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। এই ঝড়ের অন্যতম শিকার হয় আমার পরিবারের সদস্যরা। দু-একজন তাদের ধিক্কার দিতে থাকে, কীভাবে এই আইন করলাম আমি! তারা বলে, এটা তো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় করেছে! কিন্তু সমালোচকরা নাছোড়বান্দা! না, আইনটিতে তো লেখা আছে আইন মন্ত্রণালয়ের নাম।
নিজের মন্ত্রণালয়ের কাজের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, আমি জানি, এ রকম বহু শিক্ষিত মানুষ আছে সমাজে। তাদের কাছে সবিনয়ে বলি, অন্য যেকোনো মন্ত্রণালয় যে অধ্যাদেশই করুক না কেন, তা জারি করতে হয় আইন মন্ত্রণালয়কে। আমাদের রুলস্ অব বিজনেস অনুসারে এটাই বিধান। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশে এটাই হয়। বাংলাদেশে এনবিআর নিয়ে যে আইনটা (অধ্যাদেশ) হয়েছে, তা করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়। উপদেষ্টা পরিষদে অনুমোদিত হওয়ার পর এটা জারি করতে হয়েছে আইন মন্ত্রণালয়কে। সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা নিয়ে যে আইন, তাও করেছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। কিন্তু এটা জারি করতে হয়েছে আইন মন্ত্রণালয়কে।
অধ্যাদেশ আকারে যত আইন অতীতে হয়েছে, সেগুলো আইন মন্ত্রণালয় জারি করেছে। ভবিষ্যতে যেসব অধ্যাদেশ হবে, সেগুলোও আইন মন্ত্রণালয়কে জারি করতে হবে। এ জন্য গেজেটের প্রথম পাতায় আইন মন্ত্রণালয়ের নামই থাকবে। কিন্তু তার মানে এটি নয় যে আইন মন্ত্রণালয় আইনগুলো করেছে বা এটি আইনগুলোর প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়।
আইন মন্ত্রণালয় নিজস্ব উদ্যোগে আইন করেছে কেবল এ মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধিভুক্ত বিষয়ে। যেমন, দেওয়ানি কার্যবিধির সংশোধনী আইন বা উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগ সংক্রান্ত আইনটি করেছে আইন মন্ত্রণালয়। কিন্তু অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের কার্যপরিধিভুক্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের কোনো ক্ষমতা আইন মন্ত্রণালয়ের নেই। আছে শুধু জারি করার দায়িত্ব। এটি স্রেফ আনুষ্ঠানিকতা।
আইন তো তবু কিছুটা খটমটে বিষয়। কিন্তু সাদামাটা, সহজবোধ্য যে কোনো বিষয়েও আমাকে নিন্দা করার প্রবণতা আছে সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারের যে কোনো কাজের সমালোচনা যদি আমাকে করা হয়, তাহলে যে কোনো ভালো কাজের প্রশংসাও আমাকে কেন করা হয় না?
সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দেশত্যাগের বিষয়ে আইন উপদেষ্টা বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি কীভাবে বিদেশে গেলেন এই দায় যদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে না দিয়ে আমাকে দেওয়া হয়, তাহলে দ্রব্যমূল্য যে স্থির রয়েছে, এই প্রশংসাও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে না দিয়ে আমাকে দিতে হবে। কিন্তু এর কোনটিই আসলে করা ঠিক নয়।
আমার কাজের জন্য নিন্দা/প্রশংসা আমাকে করবেন, অন্যর কাজের জন্য অন্যকে। যেকোনো কাজের সামগ্রিক দায়দায়িত্ব আমাদের গোটা সরকারের। কিন্তু যদি নির্দিষ্টভাবে একজন উপদেষ্টাকে দায়ী করা হয়, তাহলে সেটি শুধু তার মন্ত্রণালয়ের অধিভুক্ত বিষয়ে করা উচিত।
যারা নিন্দা করেন, কুৎসা রটান, এর মধ্যে হয়তো কোনো আনন্দ খুঁজে পান। কিন্তু এটা অন্য কাউকে এমন কষ্ট দিতে পারে, যা আপনি নিজে কখনও বহন করতে চাইবেন না। এটি মনে রাখা ভালো।
আসিফ নজরুল বলেন, আমি জানি ‘অপরের মুখ ম্লান ক’রে দেওয়া ছাড়া প্রিয় সাধ নেই’౼এমন মানুষ আছে সমাজে। যারা এমন না, তাদের কাছে অনুরোধ, কারও নিন্দা করার আগে একটু জেনে নিন। আল্লাহ আছেন, আমাদের সবাইকে একদিন জবাব দিতে হবে।
![]() |
| আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। ছবি : সংগৃহীত |
Saturday, March 29, 2025
সত্যের মুখোমুখি আসিফ নজরুল
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে আসিফ নজরুলের নাম উঠেছিল কিনা-এমন এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা বলেন, ‘৫ই আগস্ট রাত ১টার দিকে বঙ্গভবন থেকে এসে কার্জন হলের ওখানে নাহিদ, আফিস ও মাহফুজদের সঙ্গে দেখা হয়। আমিতো ভেবেছিলাম স্যার (ড. মুহাম্মদ ইউনূস) প্রধান উপদেষ্টা হবেন না। তখন আমি সালেহউদ্দিন, ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ স্যারের কথা বলেছিলাম। ৬ই আগস্ট সকাল বেলা অন্য একটা পক্ষ থেকে আলোচনা করা হয়। তারা বলেছিল-ইউনূস স্যার না হলে কে হতে পারেন। সেই তালিকাতেও আমার নাম ছিল না।’
তিনি বলেন, ‘উপদেষ্টাদের নাম নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। আমি উপদেষ্টাদের যে কয়টা নাম বলেছিলাম তারা সেখানে কয়েকটা রেখেছে, কয়েকটা রাখে নাই। ২০ জন উপদেষ্টা যদি থাকে এরমধ্যে ১০ জনের নাম আমি বলিই নাই। আমার সঙ্গে কিংবা সালেহউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গে ছাড়া ইউনূস স্যারের তেমন কারো সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। স্যারের সঙ্গে আমার ২০ বছরের ঘনিষ্ঠতা।’
‘আপনি কতটা ভারতপন্থি, কতটা ভারত বিদ্বেষী’ আসিফ নজরুলের কাছে এমন প্রশ্ন রাখেন উপস্থাপক। উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমাকে পাকিস্তানপ্রেমী বলে আমার রুমে আগুন দেয়া হয়েছিল। আমার রুমে তালা দেয়া হয়েছে। হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। রাতারাতি আমি হয়ে গেলাম ভারতের ‘দালাল’। জামিল সাহেব যখন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেলেন তখন ২৪ ঘণ্টা প্রচারণা চলল- আমি ভারতের দালাল। তাজুল যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেলো তখন ২৪ ঘণ্টা প্রচারণা চলল-আমি পাকিস্তানের দালাল। আমি ক্লিয়ারলি বলি আমি বাংলাদেশের ‘দালাল’। আগে আমাকে কেউ অ্যাটাক করার আগে ৫০ বার ভাবতো। এখন দেখেন আপনার প্রোগ্রামে আমি আট মাস পর এসেছি। কিন্তু আগে প্রতি মাসে একবার করে আসতাম। এখন গুজব ছড়ানো হচ্ছে। কেউ যদি আমাকে বলে, ভাই আপনি নাকি আমেরিকা চলে গেছেন? আমি কী বলব, আমি ফোনটা কেটে দেবো। কিন্তু জবাবদিহিতা অন্য জিনিস। গালাগালি, মিথ্যাচারের উত্তর দেয়া যায় না।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘আগে মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে আক্রমণকারী ছিল সরকার ও সরকার দলের ক্যাডাররা। এখন মত প্রকাশের শত্রু হচ্ছে জনগণ। এখন জনগণের একটা অংশ আরেকটা অংশকে কথা বলতে দেয় না। আমাদের সরকারের সমালোচনাও হচ্ছে। আমার বিরুদ্ধে ৪ মাসে ১৭ টা ভিডিও করা হয়েছে। ধর্যের সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে। আমি আওয়ামী লীগের ১৫ বছরে যতো বাজে কথা শুনেছি তার থেকে বেশি কথা গত সাত মাসে শুনেছি। কারো বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয় নাই। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে মানুষের মধ্যে নানা অস্থিরতা থাকে, অনিশ্চয়তা থাকে। অতিরিক্ত স্বাধীনতা, অতিরিক্ত চাহিদার কারণে এসব হচ্ছে। জনগণের একটা অংশ যখন আরেকটা অংশকে অ্যাটাক করছে। মব শুরু হয়েছে। এটাকে দমন করার জন্য সরকারের ব্যর্থতা থাকতে পারে, কিন্তু প্রণোদনা নেই। আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর একেকটা কার্ভ আছে। কখনো মনে হয় কমেছে, কখনো মনে হয় বেড়েছে। যদি পরিসংখ্যান দেখেন অপরাধ প্রবণতা কিন্তু বাড়ে নাই। অনেকক্ষেত্রে কমেছে। কিন্তু মানুষের স্বাভাবিক যন্ত্রণা এতো রক্ত দেয়ার পর কেনো এটা হবে? এখন এই রোগটা বেশি অনুভূত হয়। বাংলাদেশে সবথেকে বেশি রাজনীতিকরণ করা হয়েছে পুলিশে। ঘোষণা দিয়ে গোপালগঞ্জের পুলিশ, ছাত্রলীগের পুলিশ নেয়া হয়েছে না! এই লোকগুলো কি রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে যাবে? এটা সম্ভব না। পুলিশের আপার টায়ারের সবাই আওয়ামী লীগের।’
৫ আগস্ট ছাত্রজনতার আন্দোলন বিপ্লব নাকি অভ্যুত্থান-এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি বলব দুটোর মাঝামাঝি। এটা অভ্যুত্থান না, গণঅভ্যুত্থান অবশ্যই কিন্তু এরমধ্যে বিপ্লবের এলিমেন্ট ছিল। কিন্তু বিপ্লব হয়নাই। হয়ত এটা আরো লিঙ্গার করলে, মানুষের মধ্যে রেজিস্টেন্স আসলে মানুষের মধ্যে একটা প্রতিরোধ আসলে তাহলে বিপ্লব হতো। এরশাদ ৯ বছরে মেরেছে ৪০ জন মানুষ। আর শেখ হাসিনা সরকার ২ সপ্তাহে মেরেছে কমপক্ষে এক হাজার মানুষ। নির্মম হত্যাকারী।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সভানেত্রী লেথাল ওয়েপন ব্যবহার করতে বলছেন। আওয়ামী লীগের সব থেকে যে ভালো নেতা সেটার পেছনেও একটা কুৎসিত নির্বাচনে নির্বাচিত। ভুলে যান আমি উপদেষ্টা। আমি মানুষ হিসেবে বলছি আওয়ামী লীগকে যদি নির্বাচনের সুযোগ দেয়া হয়, আওয়ামী লীগ আবার দেশটাকে দোযখ বানানোর চেষ্টা করবে। তার কাছে এতো টাকা আছে। সবথেকে বড় কথা তাদের মধ্যে কোনো রিমোর্টস নাই। তাদের দেশে ১৫ থেকে ২০ শতাংশ অন্ধ সাপোর্টার রয়েছে। জাতিসংঘের রিপোর্টে ইনক্লুসিভ ইলেকশনের কথা বলে নাই। তারা বলেছে দলকে যাতে নিষিদ্ধ করা না হয়। একটা দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত কি উচিত না তা নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে দেয়ার বিষয়ে মানুষের ব্যাপক আপত্তি আছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি সেনাপ্রধান যদি এই বিষয়টি নিয়ে কথা না বলেন ভালো হয়। এসব নিয়ে কথা বললে সমালোচনা আসবে। বাহিনী চিফ যদি এসব বলে সমালোচকদের ইনভাইট করেন তাহলে এটা দেশের জন্য ভালো না।’
এই সরকারে কার শেয়ার কতখানি-এমন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্রদের কাছে যেটা শুনেছি, তারা বিএনপির মতামত চেয়েছে। একজনকে তারা চেয়েছিল, কিন্তু বিএনপি থেকে অবজেকশন আসার কারণে তাকে বাদ দেয়া হয়েছে। আবার একজন বিএনপির কথায় আসছেও। জামায়াতের কথাতেও আসছে। বাংলাদেশে কেয়ারটেকার সরকার এতো দ্রুত গঠন হয় নাই। ৫ই আগস্টই শেখ হাসিনা পালিয়ে যাবে এটাইবা কতজন জানতো?’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিরপেক্ষতার প্রশ্নে ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘সরকারের নানা কম্পোনেন্ট থাকে। যদি ইউনূস স্যারের কথা বলেন, তাহলে ১০০ ভাগ নিরপেক্ষ। ওনার ডেপথ অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং অসাধারণ। আবার আমার পরিবারের উদাহরণ দিয়ে বলি-আমার এক ভাই আওয়ামীপন্থি। আবার আমি অ্যান্টি আওয়ামী লীগ। আবার আমার আরেক ভাই ইসলামিক লাইনে ঝোঁক রয়েছে। সরকারের মধ্যেও সেটা থাকা স্বাভাবিক। কেউ আওয়ামীপন্থি নাই, কিন্তু কারও বিএনপি, জামায়াতের মধ্যে মায়া থাকতে পারে। কারো বামদের প্রতি মায়া থাকতে পারে।’
বৈষম্যবিরোধী ছাত্রদের নিয়ে গঠিত নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রতি সরকারের আশীর্বাদ রয়েছে কিনা-এমন এক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি আমাদের উপদেষ্টা পরিষদের কেউ ছাত্রদের রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হবে না। যদি হয় তাহলে আমি মনে করব আমার সারা জীবনের জাজমেন্ট ভুল। আমার সাথে মির্জা ফখরুল ভাইয়ের একটা ভালো সম্পর্ক রয়েছে। আমাকে ফোন দিয়ে রাগারাগি করারও অধিকার আছে তার। এই ছাত্ররা নিজের জীবন বিপন্ন করে মুক্তির স্বাদ আমাদের দিয়েছে। তাদের প্রতি আমাদের একটা ভালোবাসা থাকবে না! ছাত্ররা পরমর্শের জন্য এলে আমি অবশ্যই দেবো। যেকোনো দল এলেও আমি দেবো। আমি অন্তর থেকে চাই তারা একটা পরিশুদ্ধ বিকল্প রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলুক। ফান্ডিংয়ের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে একটা রেকর্ড গড়ে তুলুক। প্রকাশ্যে চাঁদা নাও। ভাই আমি এই দলের... বৃটেনে আমেরিকায় যেরকম হয়। আমার বুদ্ধিবৃত্তিক হেল্প লাগলে এটার সঙ্গে সরকারের কাজের কোনো সম্পর্ক নাই। আমরা শেখ হাসিনার আমলে মালিকানার রাজনীতি। তারা মুক্তিযুদ্ধকে পৈত্রিক সম্পত্তি মনে করতো। যদিও শেখ পরিবারের কেউ যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল কিনা সন্দেহ আছে। আরেকটা হলো ট্যাগ দেয়ার রাজনীতি। এই প্রবণতা ছাত্রদের বা বিএনপি/জামায়াতেরও হয়তো কিছুটা আছে। আমরা ২৫/২৬ বছর বয়সে কতো ভুল করতাম। ওরাতো একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসছে। সারজিস ১০০ গাড়ি নিয়ে প্রোগ্রাম করেছে, ডা. তাসনিম জারা প্রশ্ন তুলেছে এটার ব্যাখ্যা করো। এটাওতো প্রচলিত রাজনীতিতে ছিল না। তাদের প্রতি ভালোবাসা আছে বলেই আমরা বেশি কষ্ট পাই। হাসনাত যে পোস্টটা করেছে, তাদের দলের তিনটা মানুষ প্রতিবাদ করেছে। এটাও নতুন চর্চা। দেখি তারা ভুল করতে করতে শেখে নাকি!’
ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘মাহফুজ মবের বিরুদ্ধে যেভাবে অবস্থান নিয়েছে, যার কারণে নিন্দিতও হয়েছে। মাত্রাছাড়া অবস্থায় যাওয়ার পর সরকার ব্যবস্থাও নিয়েছে। বলতে পারেন প্রতিরোধের ব্যবস্থা আরও আগে হওয়া উচিত ছিল। ১৯৮৫ সাল থেকে সরকারকে আমি কাছ থেকে দেখছি। ১৯৮৫ সাল থেকে কোনো সরকার এতো ডিফিকাল্ট সময় পার করেনি। ফলে আমাদের ভুল হবেই। আমরা দুর্গম সমুদ্র পাড়ি দিচ্ছি একটা দুর্বল জাহাজ নিয়ে। জাহাজটাকে ঠিক রাখার জন্য ড. ইউনূস সজাগ আছেন। মৌলবাদের তকমা লাগলে ওনার নিজেরও ক্ষতি হবে। দেশেরও ক্ষতি হবে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ নিয়ে করা ‘কতদিন ক্ষমতায় থাকবেন’ এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, সামনের বছর রোজা, বন্যার আগে নির্বাচন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ধারণা ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময় নির্বাচন হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এটা ক্ষমতা না, এটা দায়িত্ব। জুলাই আগস্টের আগে খালি সমালোচনা করতাম, দোষ ধরতাম মানুষ পাগলের মতো ভালোবাসতো। আর এখন সারাদিন কাজ করি আর সারা দিন মানুষের কাছে বকা খাই। শেখ হাসিনার আমলে মনের শান্তি ছিল না কিন্তু এই জীবনটা দীর্ঘায়িত করার ইচ্ছা নাই। শেষ পর্যন্ত আমাদের সময়ের বিচারে মানুষ আমাদের ভালোবাসবে। গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের আকাশচুম্বী আকাঙ্ক্ষা থাকে। আমার ধারণা শেষ পর্যন্ত মানুষ আমাদের প্রতি এতো অখুশি থাকবে না।’

ধর্ষণ মামলার জট কমাতে ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’ আলাদা ধারা করা হয়েছে: সাক্ষাৎকার আসিফ নজরুল
প্রথম আলো: ২০২০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধন আনে তৎকালীন সরকার। ধর্ষণের সাজা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের সঙ্গে মৃত্যুদণ্ড যোগ করা হয়। ধর্ষণের মামলায় ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। এবার মাগুরার শিশুটির ঘটনায় ওই আইনে সংশোধন এনেছে অন্তর্বর্তী সরকার। জনতুষ্টির বিষয়টি মাথায় রেখে সরকার তড়িঘড়ি করে আইন সংশোধন করল কি?
আসিফ নজরুল: মাগুরার শিশুটির ঘটনা ছিল হৃদয়বিদারক। আইন দ্রুত সংশোধন করার ক্ষেত্রে এ ঘটনাটি ভূমিকা রেখেছে সত্য; তবে ওই ঘটনা না ঘটলেও আইনটি সংস্কারে উদ্যোগ নিতাম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সীমাবদ্ধতা ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে আমরা আগে থেকে অবগত ছিলাম। আইনটি সংশোধনের আগে তড়িঘড়ি নয়, ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। অনেক মহলের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সংশোধন আনা হয়েছে।
প্রথম আলো: যৌন নির্যাতনের নানা ধরন তুলে ধরে ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’ সাত বছর ধরে ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত করার দাবি করে আসছে। জোট বলছে, সরকার আলোচনায় তাদের ডাকেনি।
আসিফ নজরুল: ‘ধর্ষণ আইন সংস্কার জোট’কে ডাকলে ভালো হতো। তবে তাদের দাবিগুলো অন্যদের দাবির মধ্যেও এসেছিল। আইনের খসড়া বিষয়ে নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশনের লিখিত মতামত পেয়েছি। হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মতামত নেওয়া হয়েছে। এসব মতামতের ৬০ শতাংশ গ্রহণ করা হয়েছে। অ্যাটর্নি জেনারেল, নারী ও শিশু মন্ত্রণালয়, তিনজন উপদেষ্টা এবং আইন ও ফরেনসিক–বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া হয়েছে। রাজপথে আন্দোলনে শিশু ধর্ষণ মামলার বিচার আলাদা ট্রাইব্যুনালে করার দাবি ছিল। আইনে সংশোধন এনে ২৬ক ধারায় শিশু অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। আসলে এটা এমন একটি আইন, তা সংশোধনে যত আলোচনাই করা হোক না কেন, মনে হবে আলোচনা যথেষ্ট হয়নি।
প্রথম আলো: নতুন অধ্যাদেশে ধর্ষণের সংজ্ঞা দণ্ডবিধির ধারা অনুসারেই রয়েছে। সেখানে ধর্ষণকে নারীর বিরুদ্ধে পুরুষের অপরাধ হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। অধ্যাদেশে ধর্ষণের সংজ্ঞায় ভুক্তভোগীকে ‘ব্যক্তি’ উল্লেখ করা হলে নারী ও শিশুর বাইরে অন্য লিঙ্গের মানুষেরা ধর্ষণের শিকার হলে বিচার পেতে পারতেন। এ সমস্যার তো সমাধান হলো না।
আসিফ নজরুল: ধর্ষণের সংজ্ঞায় আলাদা করে পরিবর্তন না আনা হলেও ‘যৌনকর্ম’ দফা যুক্ত করে ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ধর্ষণের সংজ্ঞা বিস্তৃত করার যে দাবি ছিল, তা যৌনকর্মের ব্যাখ্যায় তুলে আনা হয়েছে। অন্য লিঙ্গের বিষয়ে আমাদের এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই। তবে ছেলেশিশুদের বিরুদ্ধে যৌনকর্মকে ‘বলাৎকার’ হিসেবে আইনের ২ ধারায় যুক্ত করা হয়েছে। ধর্ষণ বলতে ‘বলাৎকার’কেও বোঝাবে। ১৬ বছরের কম বয়সী ছেলেশিশুরা এই ধারায় বিচার পাবে।
প্রথম আলো: ছেলেশিশুদের ধর্ষণের বিষয়টি আগে আইনে শনাক্ত করা ছিল না। বিচারকেরা অন্য বিচারকাজের উদাহরণ টেনে ১৬ বছরের কম বয়সী ছেলেশিশুদের ধর্ষণের বিচার করতেন এই আইনে। শিশু আইন ২০১৩ ও বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুসারে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত শিশু ধরা হয়। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মেয়ে ও ছেলেশিশুর বয়স ১৮ করার একটা দাবি ছিল।
আসিফ নজরুল: বয়স আগের আইনে যা ছিল, তা–ই রাখা হয়েছে। আপাতত ১৮ করার সিদ্ধান্ত নেই।
প্রথম আলো: অধ্যাদেশে ৯খ ধারা সংযোজন করে ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড’ রাখা হয়েছে। কী উদ্দেশ্যে তা করা হয়েছে? আইনে ধর্ষণের ধারায় ‘প্রতারণামূলকভাবে সম্মতি আদায়ের’ বিষয়টি এখনো আছে। দুটি বিষয় এক হয়ে গেল কি না, স্পষ্ট করবেন কি?
আসিফ নজরুল: ধর্ষণের অভিযোগে যেসব মামলা হয়েছে, সেসব মামলা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এখানে দুই ধরনের মামলা হয়। একটি হচ্ছে প্রতারণামূলক সম্মতি আদায় বা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ। অপরটি কোনো ধরনের সম্পর্ক ব্যতীত ধর্ষণ; যেমন মাগুরার শিশুটির ঘটনা। বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে মামলার আধিক্য রয়েছে। এসব মামলার কারণে সম্পর্ক ব্যতিরেকে ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনার বিচার বিলম্বিত হতো। সম্পর্ক ব্যতিরেকে নৃশংস ধর্ষণের মামলার দ্রুত বিচার করতে ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড’ ধারা যুক্ত করে একে আলাদা করা হয়েছে। প্রথমোক্ত অপরাধগুলোর তদন্ত ও বিচারের সময়সীমা কমানো হয়েছে; কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের অপরাধের (‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’) ক্ষেত্রে এই সময়সীমা কমানো হয়নি, এসব অপরাধের শাস্তিরও আলাদা সাজার বিধান (সর্বোচ্চ সাত বছর কারাদণ্ড) রাখা হয়েছে।
‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম’–সংক্রান্ত ধারার মাধ্যমে নতুন কোনো অপরাধকেও সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। এটি ধর্ষণের প্রচলিত সংজ্ঞার মধ্যেই সুপ্ত ছিল, এমন অভিযোগে বহু মামলাও হতো আগের আইনে। পার্থক্য হচ্ছে, এখন এগুলোর বিচার নতুন বিধান অনুসারে হবে। অন্যদিকে বিয়ের প্রলোভন ছাড়াও অন্যরকমভাবে প্রতারণা করে যৌন সম্পর্কের সম্মতি আদায়ের চেষ্টা হতে পারে, সেসব অপরাধকে ধর্ষণের প্রচলিত সংজ্ঞা অনুসারে বিচার করা হবে।
প্রথম আলো: ‘বিয়ের প্রলোভনের মাধ্যমে যৌনকর্ম করিবার দণ্ড’ ধারায় হয়রানিমূলক মামলা করার ঝুঁকি থাকে কি?
আসিফ নজরুল: মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা হলে সেটিও প্রতিহত করার বিধান রয়েছে। আইনের ১৭ ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে। বিচারকের যদি মনে হয়, এটা মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, সে ক্ষেত্রে বিচারক সাজা (ক্ষতিপূরণ, সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড) দিতে পারবেন।
প্রথম আলো: আইনটি সংস্কারের ফলে ধর্ষণের বিচার দ্রুত হওয়া কি নিশ্চিত হবে?
আসিফ নজরুল: সংশোধনের ফলে কিছু গুরুত্বপূর্ণ লাভ হয়েছে। সম্পর্ক ব্যতিরেকে ভয়াবহ ধর্ষণের ঘটনার তদন্তের সময় ১৫ কার্যদিবস এবং বিচারের সময় ৯০ কার্যদিবস করা হয়েছে। সময় অর্ধেক কমিয়ে আনায় এই মামলাগুলো গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত বিচার করা যাবে। অপর দিকে প্রতারণামূলক বা বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ধর্ষণের মামলাকে ভিন্ন ধারায় নিয়ে যাওয়ার কারণে ধর্ষণের মামলার জট কমবে। ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক থাকার কারণেও বিচার বিলম্বিত হতো। ডিএনএ পরীক্ষার সনদ পাওয়ার অপেক্ষায় অনেক মামলা বছরের পর বছর আটকে থাকত। অধ্যাদেশের বিধান অনুসারে, ডিএনএ পরীক্ষার সনদ ছাড়াই আদালত যদি মনে করেন, চিকিৎসা সনদ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচার সম্ভব, তাহলে আদালত ডিএনএ সনদ ছাড়াই দ্রুত বিচার করতে পারবেন।
প্রথম আলো: কিন্তু তদন্ত ও বিচারের সময় বাড়ানোর জন্য বিকল্প ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। সময় নেওয়ার অজুহাতে বিচার দীর্ঘায়িত কি হতে পারে না?
আসিফ নজরুল: আইনে বিকল্প ব্যবস্থা রাখতেই হবে। যদি তদন্ত কর্মকর্তা বা ভুক্তভোগী গুরুতর অসুস্থ থাকেন? এমন কোনো গুরুতর ঘটনা হতে পারে যে তদন্ত কর্মকর্তা ওই সময়ের মধ্যে কাজ করতে পারলেন না। তাই বিকল্প ব্যবস্থা থাকতে হবে। বিচারক পরিস্থিতি বিচার করে সময় বাড়াতে পারবেন।
প্রথম আলো: ডিএনএ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক না থাকায় প্রকৃত আসামি শনাক্তকরণে সমস্যা হতে পারে কি?
আসিফ নজরুল: ডিএনএ পরীক্ষার বাধ্যবাধকতা তুলে দেওয়ায় মামলা গতি পাবে। আদালত যদি মনে করেন, চিকিৎসা সনদ ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বিচার সম্ভব, শুধু তখন আদালত ডিএনএ সনদ ছাড়া দ্রুত বিচার করতে পারবেন।
প্রথম আলো: বিচারের দীর্ঘসূত্রতার জন্য তো রাষ্ট্রপক্ষের ব্যর্থতাকেও দায়ী করা হয়। তদন্ত, অভিযোগপত্র গঠন থেকে শুরু করে সাক্ষী হাজির করতে না পারা, বারবার শুনানি পেছানো—বিভিন্ন ধাপে বিচার দীর্ঘায়িত হয়। এ বিষয়ে সরকার কি কিছু করবে?
আসিফ নজরুল: এসব দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। বিচারের দীর্ঘসূত্রতা কমাতে প্রতিটি ধাপে কাজ করতে হবে। তবে আইনে যেসব সংশোধন আনা হয়েছে, সেটির সুফল শিগগিরই দৃশ্যমান হবে।
প্রথম আলো: এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বেশ নাজুক অবস্থায় এবং এ কারণে নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আপনি কী মনে করেন।
আসিফ নজরুল: আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর ধ্বংসপ্রাপ্ত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিয়ে কাজ শুরু করি। শেখ হাসিনার শাসনামলে বিশেষভাবে যে দুটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করা হয়, তা হচ্ছে পুলিশ ও বিচার বিভাগ। পুলিশের ক্ষেত্রে ক্ষতি ছিল বেশি। একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত পুলিশ বাহিনীকে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ করতে হয়েছে। এখন সমাজে মতপ্রকাশ করার ইচ্ছা, স্বাধীনতাচর্চা অনেক বেড়েছে। ভিন্নমত প্রকাশের জন্য মামলা করা হচ্ছে না। মানুষের প্রত্যাশা কিছু কিছু ক্ষেত্রে আকাশচুম্বী হয়ে গেছে। বিপ্লবোত্তর পরিস্থিতি যেমন হয়, অনেক মানুষ অসহিষ্ণু হয়ে গেছে। ১৫ বছরের চাপা ক্ষোভ, যন্ত্রণা, অবরুদ্ধ থাকার কষ্ট মানুষ একসঙ্গে প্রকাশ করছে। এসব কিছুর প্রতিফলন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর পড়েছে। কখনো কখনো পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়, কখনো কখনো আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে ফেলি। নারীর প্রতি যে সহিংসতা, আক্রমণাত্মক ও অসহিষ্ণু পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে সরকার পদক্ষেপ নিয়েছিল। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আরও উন্নত করার অবকাশ রয়েছে। নারীর প্রতি সহিংসতা, হয়রানি ও অবমাননাকর ব্যবহার বৈষম্যমূলক, শোষণমূলক ও নিপীড়নমূলক। এটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ওই সময়ে নেতৃত্ব দেওয়া নারীদের প্রতি চরম বিশ্বাসঘাতকতা। সরকার এ বিষয়ে সজাগ রয়েছে।
প্রথম আলো: এখন নারীবিদ্বেষী একটি চক্রকেও সক্রিয় হতে দেখা গেছে। এ ধরনের চক্র সক্রিয় থাকলে নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ে বলা হয়। আপনার মত কী?
আসিফ নজরুল: নারীবিদ্বেষী প্রচার যেটা আছে, সেটি সমাজের অজ্ঞানতা ও অশিক্ষার ফসল। এ ধরনের বিদ্বেষমূলক কাজে কখনো কখনো নারীদেরও অংশ নিতে দেখা যায়। এ ধরনের মানুষদের ‘মোরাল পুলিশিং’ করার আগে তাঁদের প্রতি আমার একটাই আবেদন, আগে নিজের ক্ষেত্রে ‘মোরাল পুলিশিং’ করুন। নারী কী পোশাক পরলেন, তা না বলে আপনি সত্য কথা বলেন কি না, আপনার উপার্জন সৎ কি না, আপনি ধর্মের ফরজ পালন করেন কি না, ধর্মের অপব্যাখ্যা করেন কি না, মানুষের উপকার করেন কি না, এসব বিষয়ে আগে নিজের ওপর ‘মোরাল পুলিশিং’ করুন, তারপর ঠিক করুন অন্যকে নৈতিক উপদেশ দেওয়ার যোগ্যতা আপনার আছে কি না। বাংলাদেশে ‘মোরাল পুলিশিং’–এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই, এটা ফৌজদারি অপরাধ।
প্রথম আলো: অপরাধ কমাতে সব নাগরিকের ডিএনএ প্রোফাইলিং করার বিষয়ে সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত আছে কি?
আসিফ নজরুল: এটা খুবই ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। এই সরকার কম সময়ের জন্য এসেছে। এই সময়ে এটা কার্যকর করা সম্ভব না। তবে কাজটি শুরু করা যায় কি না, তা প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় তুলব।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আসিফ নজরুল: আপনাকেও ধন্যবাদ।
| আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল। ছবি: সাজিদ হোসেন |
Friday, February 28, 2025
আখতাররা কয়েক মাসের মধ্যেই অসম্ভবকে সম্ভব করলো: ড. আসিফ নজরুল
তিনি লিখেন, ‘২০২৪ সালে ভুয়া নির্বাচনের পর খুব মন খারাপ করে থাকতাম। এমন সময় আখতার একদিন আইন বিভাগে এলো। বলে-কয়ে আমি তাকে বাড়ি থেকে ঢাকায় আনিয়ে মাস্টার্স শেষ করতে রাজি করিয়েছিলাম। কিন্তু এরপরও ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার কোনো লক্ষণ নাই তারমধ্যে। আমার গাড়ি থামিয়ে সে সালাম দিলো। তারপর বেশ কিছুক্ষণ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি বিরক্ত হলাম। আরো বিরক্ত হলাম যখন সে বলল, নুর-রাশেদদের দল ত্যাগ করে নতুন সংগঠন করবে! আমি বললাম-আবার নতুন দল! আর কতবার মার খেতে চাও তুমি! সে মাথা নিচু করে মৃদু হাসতে থাকে। এই অদ্ভুত হাসির কোনো মানে খুঁজে পেলাম না। বেশি কথা না বলে বাসায় চলে এলাম। কয়েকদিন পর ছাত্রলীগের হাতে তার মার খাওয়ার রক্তাক্ত ছবি দেখে দুঃখ আর হতাশায় বুক বিদীর্ণ হলো। সে কি বুঝতে পারছে না কিছু হবে না আর এসব করে! বুঝতে আমি-ই পারিনি। নতুন সংগঠন করার কয়েক মাসের মাথায় তারা এক অসম্ভবকে সম্ভব করলো। প্রবল প্রতাপশালী আর নির্মম ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ঘটালো।’
জুলাই আন্দোলনের কথা তুলে ধরে ড. আসিফ নজরুল আরো লিখেন, ‘আখতারের সংগঠনের নাহিদ হয়ে উঠলো এই গণঅভূত্থানের প্রধান নেতা। উত্তাল জুলাই-এ আমার এবং আমার মতো লক্ষ মানুষের নেতা! তারপর নাহিদের সঙ্গে কাজ করলাম নতুন সরকারে। কতবার যে সে আমাকে বিস্মিত করলো তার যোগ্যতা, বাকসংযম, ব্যক্তিত্ব আর অকল্পনীয় ম্যাচিউরিটি দিয়ে! নাহিদ থাকে আমার পাশের বাসায়। সে সরকার থেকে পদত্যাগ করার দিন গভীর রাতে তার সবুজ লনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম অনেকক্ষণ। মায়া বড় বিচিত্র বিষয়!’
নতুন দলের প্রতি শুভ কামনা জানিয়ে এই উপদেষ্টা লিখেন, ‘আজ নাহিদ আর আখতার শুরু করছে নতুন যাত্রা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-তারুণ্যের প্রত্যাশা পূরণে শুরু হলো তাদের নতুন দলের অভিযাত্রা। জাতীয় নাগরিক পার্টির সবার জন্য অনেক দোয়া, শুভকামনা।’

Thursday, January 16, 2025
জুলাই হত্যার বিচার করতে না পারলে আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার নাই- আসিফ নজরুল

Sunday, December 29, 2024
’২৫ সালের মধ্যেই জুলাই হত্যার বিচার
ড. আসিফ নজরুল বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ড ও হেফাজতের হত্যাকাণ্ডসহ ধারাবাহিকভাবে গুম-খুনের সঙ্গে জড়িতদেরও বিচার করা হবে। এসব বিচার করবে আইন বিভাগ। কোনো গাফিলতি হবে না। সারা দেশে দায়ের হওয়া গায়েবি মামলার আনুমানিক সংখ্যা নির্ধারণের কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কতোগুলো ‘গায়েবি’ মামলা হয়েছে তার হিসাব বের করতে সব জেলার পাবলিক প্রসিকিউটরদের তদন্ত করতে বলা হয়েছে। তিনি বলেন, আইন মন্ত্রণালয় এখন পর্যন্ত ৫১টি জেলা থেকে গায়েবি মামলার আনুমানিক হিসাব পেয়েছে। আরও ১৩টি জেলা থেকে তথ্যের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর চার হাজারের বেশি পাবলিক প্রসিকিউটর নিয়োগ করা হয়েছে। এই কাজ তারা করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারক ছিল না, তদন্ত কর্মকর্তা ছিল না জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে প্রসিকিউশন টিম করা হয়েছে। তড়িঘড়ি করে বিচার করে বিচারকে প্রশ্নের মুখে ফেলা যাবে না। বিচার নিয়ে কোনো গাফিলতি হবে না, নিশ্চিত করে বলতে চাই। বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো দেরি হচ্ছে না। এ সময় আসামিদের হাতকড়া পরানো নিয়ে উপদেষ্টা আরও বলেন, মামলার শুনানির সময় ও আসামিদের হাতকড়া না পরানো নিয়ে এখন সমালোচনা হচ্ছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের সময় আসামিদের আইনজীবী যিনি ছিলেন, তিনি বলেছেন, শুনানির জন্য সে সময় তিন মাস দেয়া হয়েছিল। এখন শুধু এক মাস দেয়া হয়েছে। তখন আসামিদের কাউকে হাতকড়া পরানো হয়নি, এখনো আসামিদের হাতকড়া পরানো হচ্ছে না।
উল্লেখ্য, জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ হয়েছেন ৮৫৮ জন, আহতের সংখ্যা ১১ হাজার ৫৩৬ জন। অভ্যুত্থানে হতাহতদের প্রথম ধাপের খসড়া তালিকা প্রকাশ করেছে গণঅভ্যুত্থান বিষয়ক বিশেষ সেল। সম্প্রতি সেলের প্রধান, অতিরিক্ত সচিব খন্দকার জহিরুল ইসলামের সই করা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে হতাহতের এ তালিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়। পরে জুলাই-আগস্টে নিহত এবং আহতদের তালিকা তৈরি করতে ১৫ই আগস্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে।
এ কমিটি গত ২৯শে সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ৭১৭ জনের নিহতের তালিকা প্রকাশ করেছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম-এমআইএস। তবে ২৮শে সেপ্টেম্বর বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি আন্দোলনে নিহত ও আহতদের সংখ্যা আর বেশি বলে দাবি করে। সেদিন বলা হয়, আন্দোলনে ১৫৮১ জন নিহত হয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের অডিটোরিয়ামে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক কেন্দ্রীয় উপ-কমিটি, জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেদিন বলা হয়, আন্দোলনকালে ৩১ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতা আহত হয়েছেন। তবে এটি আরও যাচাই-বাছাই করা হবে।
ট্রাইব্যুনালে ‘টপ কমান্ডার’সহ সবার বিচার আগামী বছরের মধ্যে শেষ হবে: চিফ প্রসিকিউটর
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাধারণত ‘টপ কমান্ডার’ বা শীর্ষ অপরাধীদের বিচার করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সবার বিচারই প্রায় আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা হবে। চিফ প্রসিকিউটরকে এই অধিবেশনে সঞ্চালক মনির হায়দার প্রশ্ন করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে সক্ষমতা আছে, তা গণহত্যা, গুম-খুনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের এত বড় পরিধির বিচারের জন্য কি যথেষ্ট? জবাবে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, এই ট্রাইব্যুনালের ১০ জন প্রসিকিউটর ও ১৭ জন তদন্তকারী কর্মকর্তা আছেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে গুম, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ বাংলাদেশের মাটিতে হয়েছে, সেই অপরাধের যারা মাস্টারমাইন্ড (হোতা), যারা একদম সর্বোচ্চ জায়গায় বসে থেকে অপরাধগুলো সংঘটিত করেছিলেন প্রাধান্য দিয়ে, তাদের বিচার করা। সেক্ষেত্রে এই ট্রাইব্যুনাল হাজার হাজার মানুষের বিচার করতে পারবে না এবং সেই লক্ষ্যে অগ্রসরও হচ্ছেন না তারা।
সারা দেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং এর সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠন রাজনৈতিকভাবে সম্পৃক্ত ছিল। এর সঙ্গে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অধিকাংশ কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা ছিল। দেশব্যাপী সবকিছুর বিচার করতে গেলে এই ট্রাইব্যুনালের পক্ষে তা সম্ভব নয় বলেও জানান চিফ প্রসিকিউটর। তাজুল ইসলাম বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধে সাধারণত টপ কমান্ডারদের বিচার করা হয়। জুলাই-আগস্টের গণহত্যার প্রধান নিউক্লিয়াস ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তার নিচের দিকে কয়েকজন ছিলেন, তাদের বিচারকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তারা তাদের বিচার শেষ করতে চান। সেই সক্ষমতা তাদের আছে বলে জানান তিনি। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রধান অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মামলা ও সবার বিচারই প্রায় আগামী এক বছরের মধ্যে শেষ করা যাবে। দেশব্যাপী যত অপরাধ হয়েছে, সে জন্য বিভিন্ন থানায় মামলা হয়েছে এবং সাধারণ আদালতে বিচার চলছে, সেটা চলবে বলেও জানান তাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, সেই বিচার করতে কতো সময় লাগবে, সেটা সংশ্লিষ্ট আদালত বলতে পারবেন। দুইদিন আগে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কথা বলেছেন জানিয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, তাদের অনেক প্রাধান্য আছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রাধান্য হচ্ছে যারা দেশটাকে খুন ও গুমের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছিল, যারা ছাত্র-জনতার রক্তে এই বাংলার মাটি রঞ্জিত করেছে, তাদের বিচার এক নম্বর প্রাধান্য। এই জায়গায় ব্যর্থ হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে বঙ্গোপসাগর: রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর
দক্ষিণ এশিয়ার কেন্দ্রবিন্দু আর হিমালয় নয়, কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে বঙ্গোপসাগর বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি বলেন, সরকার এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সরকার দক্ষিণ এশিয়ার নেতৃত্ব দিতে পারে। সেই নেতৃত্ব দেয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি পরিবর্তন হচ্ছে মন্তব্য করে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ২০২৫ সালে সবচেয়ে বড় রকমের পরিবর্তন হবে। হিমালয় থেকে বঙ্গোপসাগরে পরিবর্তন হবে। এ অঞ্চলে কোনো নেতা নেই, যিনি বঙ্গোপসাগরে বর্তমান পরিস্থিতিতে জাতীয়ভাবে নেতৃত্ব দান করতে পারবেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন প্রতিবেশী আসতে পারে, নতুন রাষ্ট্রের উত্থান হতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উচিত যে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে, ভূরাজনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দেবে।’
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, সংস্কার ও নির্বাচনকে পাল্টাপাল্টি না বলে ন্যূনতম ঐক্যের দিকে যেতে হবে। অর্থনীতি মন্দা অবস্থায় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অর্থনীতির উৎপাদন সম্পর্কে কোনো কথাবার্তা নেই। সেটা আসলে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কায়দায় চলবে না, অন্য কোনো কায়দাও চলবে না। দেশজ কায়দা চলতে হলে দৃষ্টান্ত তৈরি করা যাবে। কিন্তু সামগ্রিক সংস্কার করা যাবে না। সরকারের একটাই লক্ষ্য থাকতে হবে, দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে। চারটা থেকে পাঁচটা দৃষ্টান্ত তৈরি করতে হবে।
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক অনুমোদন দেয়া ১২ ব্যাংকের স্পন্সর কোথা থেকে পেয়েছে, তা বের করা এনবিআরের দায়িত্ব বলে মন্তব্য করেন রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
প্রতিশোধ নয়, বিচার করতে চায়: অ্যাটর্নি জেনারেল
অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, ‘জুলাই গণহত্যার বিচারে আমরা কি প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি এমন অনেক প্রশ্ন আসছে। আমরা বলতে চাই, আমরা প্রতিশোধ নিতে চাচ্ছি না। আমরা বিচার করতে চাচ্ছি। কেন বিচার করতে চাচ্ছি? আমরা আগামী প্রজন্মকে ইতিহাসের একটি দায় থেকে মুক্ত করতে চাচ্ছি।’
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, বর্তমান সময়ে এসে কেউ জমি দখলে ব্যস্ত, কেউ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যস্ত, কেউ পদ-পদবি দখলে ব্যস্ত, কেউ নিজস্ব লোক পুনর্বাসনে ব্যস্ত, কিন্তু খুনিদের ধরিয়ে দেয়ার জন্য, খুনিদের বিচারের জন্য আমাদের ওপর যে পরিমাণ চাপ প্রয়োজন ছিল সেদিকে আপনারা ফোকাস করেননি। তিনি বলেন, আপনারা যত বেশি চাপে রাখবেন, আমরা তত বেশি এই বিষয়টাকে (বিচার) সামনের দিকে এগিয়ে নিতে দৃঢ় চেষ্টা থাকবে। আপনারা যত বেশি অতন্দ্র প্রহরীর মতো দায়িত্ব পালন করবেন আমরা রাষ্ট্রকে এবং জনগণের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ততবেশি এজেন্ডা ভিত্তিক সাহসিকতা নিয়ে এগিয়ে যাবো।
দেশে ঐক্যের প্রয়োজন উল্লেখ করে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঐক্য ছাড়া সংস্কার সম্ভব নয়। সংস্কার ছাড়া যৌক্তিক কোনো বাংলাদেশ আপনাদের উপহার দেয়া সম্ভব নয়। ঐক্য ছাড়া, সংস্কার ছাড়া এই বিচার প্রক্রিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে করাটা কঠিন এবং দুরূহ।’
বিচারের চ্যালেঞ্জ বিষয়ে আলোচনা কম হওয়ায় কিছুটা হতাশা প্রকাশ করে রাষ্ট্রের প্রধান এ আইন কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল চ্যালেঞ্জের জায়গাটা কি সেটা আমাদের বলবেন। আমরা সেটায় যেন যৌক্তিক সমাধানের জায়গায় যেতে পারি, সেটা সুনির্দিষ্টভাবে আমরা পাইনি। তিনি বলেন, আমার কাছে চ্যালেঞ্জের প্রধান জায়গাটা হলো, জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তের বিনিময়ে যে চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা রাস্তায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিলাম, সেই লক্ষ্য, সেই ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা, সেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, হাতে হাত মিলিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করার যে ঐক্য, সেই ঐক্যটাতে যে ফাটল ধরেছে সেই ফাটলটাই প্রধান চ্যালেঞ্জ। ’
বিভিন্ন মিথ্যা মামলা প্রসঙ্গে মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পার্সোনাল গ্রাস এক্সপোজ করার জন্য মামলা দিয়েছেন, আসামির খাতায় নাম দিয়েছেন, এই মামলাগুলোর পরিণতি কি হবে এবং এটার সঙ্গে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের যে মামলা তার কোনো কনফ্লিক্ট হবে কিনা প্রশ্ন এসেছে। আপনাদের আইনিভাবে, স্পষ্টভাবে বলতে চাই, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে যে ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়েছে, সেই ট্রাইব্যুনাল ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ বিশেষ ট্রাইব্যুনাল-১৯৭৩ এর ১৯ নাম্বার আইন। সে আইনে মানবতাবিরোধী আইনের যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে হত্যা, নির্যাতন, গুমসহ অনেকগুলো অপরাধের কথা বলা হয়েছে, যে অপরাধগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সিভিলিয়ান পপুলেশনের ওপর ঘটনা ঘটানো হয়েছে তার বিচার হবে। সেটি একটা দুইটা স্পেসিফিক ঘটনার দরকার নেই। ইন জেনারেল সেটার বিচার হবে। ঐ আইনেই বলা আছে ডমেস্টিক অন্যান্য আইনে যাই বলা থাকুক না কেন, ঐটার বিচার ওখানে হবে। অর্ডিনারি গুমের বিচার, খুনের বিচার, নির্যাতনের বিচার, নিপীড়নের বিচার, এইগুলো অর্ডিনারি কোর্টে হতে কোনো বাধা নেই এবং সেটাও চলবে।
সংস্কারের বিষয়ে সরকার একা সিদ্ধান্ত নেবে না: উপদেষ্টা মাহফুজ
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, রাজনৈতিক দল ও স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনা করে সংস্কারের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সিদ্ধান্ত নেবে। মাহফুজ বলেন, ‘কমিশন থেকে রিপোর্ট পাওয়ার পর সব রাজনৈতিক দল এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বৃহত্তর পরিসরে আলোচনার পরিকল্পনা করছে সরকার। যা জানুয়ারিতে হবে বলে আশা করা হচ্ছে। সংস্কারের বিষয়ে সরকার একা কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।’
তিনি বলেন, ‘কতোটা সংস্কার সম্ভব এবং কোনটা স্বল্পমেয়াদি আর কোনটা দীর্ঘ সময়ের জন্য সব কিছুই রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। এরপর জনগণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে পরিষ্কার হবে যে আমাদের অগ্রাধিকারমূলক সংস্কারগুলো কী এবং আমরা কী করতে সক্ষম হবো।’
মাহফুজ বলেন, ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ঐক্য দিয়ে কী করবেন। রাষ্ট্র প্রধানত তার প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল। আমরা ৭২’র সংবিধানের সমালোচনা করছি কারণ এর দ্বারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানগুলোকে যদি রাষ্ট্র ও জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা না যায়, তাহলে এ সংস্কার ক্ষমতার পরিবর্তন ছাড়া আর কিছুই দিতে পারবে না।’
ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিমূলক একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উপদেষ্টা মাহফুজ বলেন, ‘১৯৭১ সালের পর আমরা দেশকে সংস্কার ও প্রতিষ্ঠা করতে বড় একটা সুযোগ পেয়েছি। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আমরা যদি রাষ্ট্রের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হই, তাহলে সবকিছু ভেস্তে যাবে।’ গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারকে জবাবদিহি করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাহফুজ আলম বলেন, ‘আমরা চাই জনগণ সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করুক। কেননা এটি সরকারের কাজের গতি ত্বরান্বিত করে। জনগণের ব্যাপক সমালোচনা সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
সংলাপে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নেতা মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাখা যায় কিনা, তা সংবিধান সংস্কার কমিটিকে ভাবতে হবে। বাহাত্তরের সংবিধান রচনার সময় শেখ মুজিবও কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেননি। সংবিধান নতুন করে রচনার সময় এ অঞ্চলের ধর্মীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে প্রাধান্য দিতে হবে। আতাউর রহমান দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট ও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের পরামর্শ দেন।
জাতীয় নাগরিক কমিটির সরোয়ার তুষার বলেন, ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পরে বাংলাদেশের যে সংবিধান তা বাতিল হয়ে গেছে। বলা যায়, এ সংবিধান এখন কোমায় চলে গেছে। সংবিধান পরিবর্তন করার লক্ষ্যে একটি লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে, গঠন করতে হবে একটি গণপরিষদ। এ গণপরিষদ সংবিধান রচনা করবে নতুন করে। এই গণপরিষদ পরে আইনসভা বা জাতীয় সংসদে পরিণত হতে পারে। প্রয়োজনে গণভোট করা যেতে পারে।
তবে তুষারের কথার বিরোধিতা করেন ছাত্রদলের গবেষণা সেলের সদস্য হাবিবুর রহমান হাবীব। তিনি বলেন, ‘যে সংবিধানের ১০৪ ধারা মতে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতাসীন হয়েছে, আপনারা শপথ নিয়েছেন, তা এত সহজে বাতিল করে দেবেন? সংবিধান সংস্কার করতে গেলে প্রয়োজন গণভোট। থাকতে হবে জনগণের ভাষ্য। জনগণের কথা বলবেন, তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা। জনগণের প্রতিনিধিদের বাদ দিয়ে কেবল ১০-১২ জনের পাঠচক্রে সংবিধান সংস্কার করে ফেলবেন?’ জবাবে সারোয়ার তুষার বলেন, রাজনৈতিক দলই জনগণের প্রতিনিধি এটা ভুল ধারণা। তাহলে জুলাই বিপ্লবে ছাত্রদের ডাকে সাধারণ মানুষ নেমে আসতো না।
দৈনিক ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সালেহ উদ্দিনের সঞ্চালনায় সংলাপে অংশ নেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, গণফোরামের কো-চেয়ারম্যান সুব্রত চৌধুরী, গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরাজী, গণসংগীত আন্দোলনের আবুল হাসান রুবেল প্রমুখ।
সৈয়দ আবদুল্লাহর সঞ্চালনায় অধিবেশনে আরও বক্তব্য দেন- নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি’র সাবেক প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. মাহাদী আমিন, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু, মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটির চেয়ারপারসন রোকসানা খন্দকার, মানবাধিকার কর্মী ইলিরা দেওয়ান, এডভোকেট দিলরুবা শারমিন, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখ।

Sunday, December 15, 2024
আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে ভালো দেশ গড়তে না পারলে গণ-অভ্যুত্থান ব্যর্থ হবে: আসিফ নজরুল
শনিবার বিকেলে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে এক আলোচনা সভায় আসিফ নজরুল এ কথাগুলো বলেন। ‘গণ–অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আমি আবু বকর’ শিরোনামে এ আলোচনা সভার আয়োজন করে বঙ্গীয় সাহিত্য সভা। ‘আমি আবু বকর’ চলতি বছরের শুরুতে প্রথমা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত আসিফ নজরুলের একটি উপন্যাস।
আলোচনায় অংশ নিয়ে ‘আমি আবু বকর’ উপন্যাসটি প্রকাশের জন্য প্রথমা প্রকাশন ও প্রথম আলোকে ধন্যবাদ জানান আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর কক্ষে তালা, আগুন, গুলি করে হত্যার হুমকি, ধাওয়া দিয়ে বিতাড়িত করা, মামলা, বিভিন্ন কনসালট্যান্সির কাজ বাতিল করে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির সন্দেহে পেটানোর বিরুদ্ধে বলার জন্য অনেক বন্ধু দূরে চলে গেছেন উল্লেখ করে আসিফ নজরুল বলেন, ‘জেনেবুঝে শিক্ষার্থীদের ট্যাগ দেওয়া হতো। তারা জানত, ছাত্রটা শিবির বা ছাত্রদল না। তাঁর ল্যাপটপটা নেওয়ার জন্য বা বিনোদন হিসেবে এটা করা হতো।...১৫ বছরের এসব ব্যাধি থেকে আমরা এখনো মুক্ত হইনি।’ সেই ‘ট্যাগের রাজনীতি’ থেকে বের হওয়া গেছে কি না—প্রশ্ন রেখে অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগকে ঘৃণা করতাম ট্যাগের রাজনীতি দিয়ে মানুষকে ভিকটিমাইজ (ক্ষতিগ্রস্ত) করার কারণে। সেটা কি আমরা এখনো করে চলছি না?’
১৫ বছর ধরে যে ‘নারকীয় শাসন’ সহ্য করতে হয়েছে, তার পেছনে সামষ্টিক কাপুরুষতাও ছিল বলে মন্তব্য করেন আসিফ নজরুল। তিনি বলেন, ‘তারা সব সামাজিক সম্পর্ক শেষ করে দিয়েছিল। এত নিষ্ঠুর, নারকীয়! জানি না আমরা কী পাপ করেছিলাম যে আমরা শেখ হাসিনার মতো একটা শাসক পেয়েছিলাম বাংলাদেশে। ...আমরা যদি আওয়ামী লীগ আমলের চেয়ে অনেক বেটার (আরও ভালো) একটা বাংলাদেশ না গড়তে পারি, তাহলে জুলাই গণ–অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়ে যাবে।’
অধ্যাপক আসিফ নজরুল আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে কবিতার মাধ্যমে অনেক প্রতিবাদ হয়েছে। কিন্তু গল্প-উপন্যাসের মধ্য দিয়ে প্রতিবাদটা কম হয়েছে বলে আমার মনে হয়। সাহিত্যচর্চা, গল্প-উপন্যাসের মধ্য দিয়ে আমাদের প্রতিবাদটা জারি রাখা উচিত। ...আমি জীবনে অনেক বিচিত্র জিনিস করেছি। অ্যাকটিভিজম করেছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলাম, সাংবাদিক ছিলাম। এখন আবার সরকারের একটা দায়িত্ব পালন করছি। কিন্তু লেখালেখির মধ্যে যে আনন্দ, পৃথিবীতে এই আনন্দের কোনো তুলনা হয় না।’
‘আমি আবু বকর’ উপন্যাসের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান আবদুল মোমেন (লেখক নাম আন্দালিব রাশদী) বলেন, এই গল্পটি আবু বকরের আত্মজীবনী। আবু বকর একটি বিকৃত সমাজের সৃষ্টি। যে সমাজের প্রধানমন্ত্রী ও বায়তুল মোকাররমের খতিব একসঙ্গে পালিয়ে যান। ...গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান অস্ত্র হচ্ছে বিচার। যথাযথ বিচার সরকারি দলেরও হতে হবে, সেটা যে সরকারই হোক, এমনকি এই অন্তর্বর্তী সরকারও যদি হয়। সেটা যদি হয়, বৈষম্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসবে এবং সেই সমাজে আবু বকর সৃষ্টি হবে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ছাত্রলীগের গণরুম–গেস্টরুম নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন গণ অধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মো. রাশেদ খান। তিনি বলেন, ‘আমি আবু বকর’ উপন্যাসে আসিফ নজরুল যা লিখেছেন, তা মফস্সল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসা প্রত্যেকটি শিক্ষার্থীর গল্প। আসিফ নজরুল সব সময় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু উপদেষ্টা হওয়ার পর থেকে অধ্যাপক আসিফ নজরুলকে নিয়ে আবু বকরের মতোই নিপীড়ন ও ব্লেম-গেমের (দোষারোপ) চক্রান্ত করছে একটি মহল। তিনিও আবু বকরের মতোই নিপীড়ন ও সাইবার বুলিংয়ের (হয়রানি) শিকার।
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক সালাহ উদ্দিন শুভ্র বলেন, ছাত্রলীগ নিপীড়নের যে পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল, সেই বাস্তব ঘটনাগুলো ‘আমি আবু বকর’ উপন্যাসে আছে। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের নিপীড়নব্যবস্থায় বেশি নিপীড়িত হয়েছেন নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা।
লেখক ও প্রকাশক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন ওটিটি নির্মাতাদের ‘আমি আবু বকর’ উপন্যাসটি নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আসিফ নজরুলের অসম্ভব শক্তিশালী লেখক হওয়ার ক্ষমতা আছে। তিনি যেন নিয়মিত বেশি বেশি লেখেন।
গণ–অভ্যুত্থানের বুদ্ধিবৃত্তিক পাটাতন নির্মাণে ‘আমি আবু বকর’ উপন্যাসটি বড় ভূমিকা পালন করেছে বলে মন্তব্য করেন বাসসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ। লেখক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদের সঞ্চালনায় সভায় অন্যদের মধ্যে কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান ও লেখক আমিনুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
-প্রথম আলো
Saturday, November 16, 2024
সক্ষমতার ঘাটতি থাকতে পারে, আমাদের আন্তরিকতার অভাব নেই -ড. আসিফ নজরুল
ড. আসিফ নজরুল বলেন, গত ১৫ বছরের শাসনকে কয়েক সপ্তাহে মোকাবিলা করা খুব কঠিন। গুম-বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের এক প্রশ্নের জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, এই সরকার সব সরকারের মতো না। আমরা কোনো পলিটিক্যাল ফিগার না। আল্লাহর রহমতে আমরা প্রত্যেকে আমাদের প্রফেশনে প্রতিষ্ঠিত। তাই আগের সরকারের পুনরাবৃত্তির প্রশ্নই আসে না। কোনো সরকার কিন্তু গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের জন্য কমিশন গঠন করেনি। আমাদের সরকার পরিচালনায় যদি কোনো ভুল হয়ে থাকে তাহলে আপনারা নিশ্চয়ই সমালোচনা করবেন।
স্বজনদের উদ্দেশ্যে আসিফ নজরুল বলেন, আমরা আপনাদের সঙ্গে থাকবো। আমাদের আন্তরিকতা নিয়ে কোনো সন্দেহ রাখবেন না, শুধু এটুকু দাবি করবো। আমাদের সক্ষমতার ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু আমাদের আন্তরিকতা আর সাহসের কোনো অভাব নাই। আমরা এটার শেষ দেখে ছাড়বো। খুন করার চেয়েও কাউকে গুম করাকে আরও জঘন্য অপরাধ আখ্যায়িত করে আসিফ নজরুল বলেন, একটা মানুষ যখন মারা যায়, আপনি জানেন তার ডেডবডি আছে। আর এটা কী দুঃসহ ব্যথা! আপনি জানেন না বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে। তিনি বলেন, আপনারা ছবি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন, আমিও তো মানুষ। আমারও তো সন্তান আছে। আমার বাচ্চাটা যদি গুম থাকে, আমার কী হবে? আমি যদি গুম হই, আমার স্ত্রীর কী হবে? আমি যদি গুম হই, আমার মায়ের কী অবস্থা হবে? এগুলো চিন্তা করলে মনে হয় যে, যারা এসব গুমের নির্দেশ দেয়, যারা গুম করে, আমার মনে হয় যে, তাদের পরিবারগুলোতে আমরা এসব পরিবারের সামনে নিয়ে আসি।
অনুষ্ঠানে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান বলেন, ন্যায়বিচার সবার অগ্রাধিকার। শুধু গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার ব্যক্তির পরিবারের জন্য নয়, গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের নির্যাতনের শিকার প্রত্যেকের জন্য। গুমের শিকার ব্যক্তির পরিবারের এক সদস্য কান্না বিজড়িত কণ্ঠে বলেন, এই সরকারের কাছে আমাদের অনুরোধ, অন্তত একটা সন্ধান দিন আমাদের। আমাদের সাহায্য করুন। দশ বছর ধরে সন্তানকে খোঁজার বর্ণনা দিয়ে রওশন আরা বলেন, আমার ছেলেকে রাতের অন্ধকারে গুম করা হয়েছে। কতো জায়গায় খুঁজছি, কোথাও পাইনি। ফিরে পাওয়ার আশায় দ্বারে দ্বারে এখনো খুঁজছি। পাঁচ বছর আগে স্বামীকে হারিয়ে ফেলা নাসরিন জাহান জানান, অন্ততপক্ষে আমাদের একটা সন্ধান দিন যে আছে বা নাই। নামাজের বিছানায় বসে যাতে অন্তত কিছু বলতে পারি। আমরা নানাভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছি।

Friday, November 8, 2024
আসিফ নজরুলের সঙ্গে আওয়ামী দুস্কৃতিকারীদের আচরণ অনভিপ্রেত: তারেক রহমান
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় ফ্রান্সে যাওয়ার পথে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা এয়ারপোর্টের সামনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে কতিপয় আওয়ামী দুস্কৃতিকারীর উদ্ধত আচারণ করে। বিদেশের মাটিতে নিজ দেশের সরকারের একজন উপদেষ্টার সঙ্গে এহেন শিষ্টাচারবর্হিভূত আচরণ শুধু অনভিপ্রেতই নয় বরং দেশ ও জনগণের আত্মমর্যাদার ওপর প্রচণ্ড আঘাত।
তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদের হিংস্র রুপের প্রকাশ এখনো দেশে-বিদেশে অনেক স্থানে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। প্রবাসে আওয়ামী নেতাকর্মীরাও শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের অবয়ব ধারণ করে সুযোগ পেলেই গণতান্ত্রিক শক্তির ওপর আক্রমণ চালাচ্ছে। আইন উপদেষ্টার সঙ্গে তাদের উশৃঙ্খল আচরণে আবারও প্রমাণিত হলো এরা বিশৃঙ্খলা, হানাহানি, বিভাজন, সংকীর্ণতা, অনৈক্য, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির হরিলুট এবং বিপুল অঙ্কের টাকা পাচারসহ অসৎ অনাচারের মাধ্যমে কর্তৃত্ববাদী শেখ হাসিনার হত্যা ও গুমের রাজনীতির বিশ্বাস থেকে সরে আসেনি। এরা গণতন্ত্র স্বীকৃত মানবাধিকার, আইনের শাসন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও জনগণের নাগরিক স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়।
তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্রের সঙ্গে শত্রুতা আওয়ামী লীগের চিরদিনের বৈশিষ্ট্য। রক্তাক্ত পন্থায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে পরাজিত করতে না পেরে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ায় শেখ হাসিনার ক্রোধ যেমন থামছে না তেমনি দেশে-বিদেশে তার সমর্থকরাও প্রচণ্ড হাতাশা নিয়ে সুযোগ পেলেই গণতন্ত্রকামী মানুষদের হত্যা করছে বা শারিরীকভাবে আঘাতসহ নানাভাবে হয়রানীর কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ড জেনেভা এয়ারপোর্টের সামনে ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে অশোভন আচরণ শেখ হাসিনার তৈরি করা সেই দু:শাসনেরই অভিব্যক্তি।
তিনি বলেন, পতিত শেখ হাসিনা দেশের রাজনীতিকে জটিল করে তুলতে বাইরে থেকে সব ধরনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লুটপাটের সুবিধাভোগীরা বিদেশে গভীর চক্রান্তে মেতে উঠেছে। গণতন্ত্রের স্বপক্ষের ব্যক্তিবর্গকে হেনস্থা করাসহ বাংলাদেশের ভেতরেও অন্তর্ঘাত সৃষ্টির গভীর চক্রান্তজাল বুনে যাচ্ছে। লুটপাটের স্বর্গরাজ্য পুনরুদ্ধারের জন্য উদগ্রীব ফ্যাসিবাদের দোসররা দেশে-বিদেশে নানা এজেন্ডা নিয়ে কাজ করছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, আওয়ামী লীগ বরাবরই ক্ষমতার নেশায় আচ্ছন্ন অপরাধ প্রবণ রাজনৈতিক দল। ক্ষমতা হারানোর মনোবেদনায় এরা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। এরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিশ্বাস করে না বলেই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেছে নেয়। আত্মপ্রত্যয়হীন, যুক্তিবিমুখ, মানবতাবিরোধী আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসী দোসরদের চিহ্নিত করে রাখতে হবে। এদেরকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
তিনি বলেন, বিদেশে গণতন্ত্রকামী প্রবাসী বাংলাদেশিরা ফ্যাসিবাদী দোসরদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন ও বিচার বিভাগকে অবহিত করতে হবে। বাংলাদেশে আওয়ামী দৈত্যকে জনগণই বোতল বন্দি করেছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে এই সমস্ত আওয়ামী কুচক্রীদের বিচারের আওতার মধ্যে আনতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। আমি আসিফ নজরুলের ওপর ফ্যাসিস্ট দোসরদের অসৌজন্যমূলক আচরণের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
কী ঘটেছিল জেনেভা বিমানবন্দরে
প্রায় দুই মিনিটের একটি ভিডিও। যেটি বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাল ওই ভিডিও নিয়েই চলছে নানান আলোচনা। কী ছিল সেই ভিডিওতে, কী-ই বা ঘটেছিল?
ওই ভিডিওতে দেখা গেছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলকে ঘিরে রেখেছেন একদল লোক। তারা উপদেষ্টার সঙ্গে উত্তেজিত ভাষায় কথা বলছেন। তর্ক করছেন। বারবার তার দিকে তেড়ে আসছেন। ঘিরে ধরছেন। সামনে এগুতে দিচ্ছেন না তাকে। বলছেন, আপনি মিথ্যা বলছেন।
জানা যায়, জেনেভায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) গভর্নিং বডি এবং সংস্থাটির গুরত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরছিলেন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। দূতাবাসের প্রটোকলে তিনি গাড়িতে করে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা বিমানবন্দরে পৌঁছান।
গাড়ি থেকে বিমানবন্দরে নামার পর হঠাৎ একদল লোক এসে আইন উপদেষ্টাকে ঘিরে ধরেন। তাকে বিরক্ত করতে থাকেন। উচ্চশব্দে কথা বলতে থাকেন।
ভিডিওতে দেখা যায় এ সময় আসিফ নজরুল বলছেন, ‘আপনি গায়ে হাত দিচ্ছেন কেন? এভাবে কথা বলতে পারেন না। আপনি অনেক খারাপভাবে কথা বলছেন, খারাপ ব্যবহার করছেন। আপনাদের ল্যাঙ্গুয়েজ এমন কেন? আপনারা আসেন, কথা বলবো। তখন হেনস্তাকারীরা বারবার তর্ক করতে থাকেন। তাদের একজন বলেন, আমরা বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। স্বাধীনতার পক্ষের লোক, আপনারা বিপক্ষের লোক। এরপর আসিফ নজরুল বিমানবন্দরের ভেতরে ঢুকে যান। হেনস্তাকারীরা তখনও তার পিছু নেন। ‘পাকিস্তানি রাজাকার, বাংলাদেশ সরকার’, ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’বলে স্লোগান দিতে থাকেন।
ওদিকে গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, সুইজারল্যান্ডের বেশ কয়েকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, বিমানবন্দরে আইন উপদেষ্টাকে হেনস্তাকারীরা আওয়ামী লীগের সমর্থক। সেখানে সুইজারল্যান্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নজরুল ইসলাম জমাদার ও সাধারণ সম্পাদক শ্যামল খান উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে জেনেভা থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা যায়, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের প্রোটকলে প্রচণ্ড ঘাটতি ছিল। মিশন সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেনি।

Wednesday, October 30, 2024
নির্বাচনমুখী যাত্রা শুরু হয়ে গেছে

Friday, October 25, 2024
আওয়ামী লীগের ডিএনএতে ফ্যাসিজম আছে: আসিফ নজরুল
বৃহস্পতিবার বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ মিলনায়তনে আদর্শ প্রকাশনী আয়োজিত ‘গণতন্ত্রের অভিযাত্রা : আসন্ন চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। এতে সংবিধান সংস্কার কমিটির প্রধান অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান, সাংবাদিক মনির হায়দার, সাহেদ আলম, সাইয়েদ আবদুল্লাহ, বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহবায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ, অন্যতম সমন্বয়ক সারজিস আলম ও উমামা ফাতেমা অংশ নেন।
আলোচনায় ড. আসিফ নজরুল বলেন, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে ঠিক কত লোক মারা গিয়েছে তা আমরা জানি না। যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে যে নৃশংসতা ও হত্যার খবর আমরা প্রতিনিয়ত জানতে পারছি তা ভাষায় বর্ণনা কঠিন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা আমাদের নতুন পথ দেখিয়েছে, সাহস জুগিয়েছে। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে আমরাও আগস্ট মাসে মৃত্যুভয় ভুলে গিয়েছিলাম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, শেখ হাসিনা দেশের প্রতিটি সিস্টেমকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের সমস্ত ভেঙে পড়া কাঠামোর পুনর্গঠন প্রক্রিয়া সহজ না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এগুলো সংস্কারের সময় দিতে হবে। আমরা ১৫ বছর ধৈর্য ধারণ করেছিলাম, এখন যেন অল্পতেই অধৈর্য হয়ে না পড়ি।
নিজের এবং সরকারের সমালোচনাকে সাধুবাদ জানিয়ে আসিফ নজরুল বলেন,সমালোচনা অবশ্যই করবেন, তবে একটু ভালোবাসা দিয়ে করবেন আমরা তো আর আওয়ামী লীগ না। তিনি এ সময় আক্ষেপ করে বলেন, পত্রপত্রিকা, সমাবেশ ও ফেসবুকে এখন সবাই কেবল সরকার ও সমন্বয়কদের সমালোচনা নিয়ে ব্যস্ত। কেউ ১৬ বছর ধরে আওয়ামী লীগের অপকর্ম সম্পর্কে বলছে না। আমরা কি তাদের সব অপরাধ ভুলে গিয়েছি,তাদের এত দ্রুত ক্ষমা করে দিয়েছি?
আলোচনা সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী সাইয়েদ আব্দুল্লাহ বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষ এখন নিজেকে প্রজা না ভেবে দেশের নাগরিক ভাবতে শুরু করেছে। এটাই অনেক বড় পরিবর্তন। তিনি বলেন,অন্তর্বর্তী সরকারের এখন এক নাম্বার চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অপকর্মকারীদের বিচার করা। আমি মনে করি যে প্রক্রিয়ায় তা করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। সুতরাং সবার আগে বিচার বিভাগের সংস্কার প্রয়োজন। পুলিশ বিভাগের আমূল সংস্কার প্রয়োজন।
আলোচনা সভায় গত ৩টি নির্বাচনকে অবৈধ ঘোষণা করে গণতন্ত্র হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে ৩টি নির্বাচন এই সংবিধানের ধারাবাহিকতার দোহায় দিয়েই করা হয়েছে। এখন ৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারীদের সে সংবিধান বহন করা কি দায়িত্ব?
হাসনাত বলেন, আমরা গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী একটি ভুল করেছি। আমরা বিপ্লবটিকে সংবিধানের মধ্যে ঢুকিয়ে ফেলেছি। এর কারণে আমাদের নানা জটিলতায় পড়তে হয়েছে। ৫ই আগস্ট ছাত্রজনতা এই মুজিববাদী সংবিধানের বিপক্ষে রায় দিয়েছিল,ফলে ৭২-এর সংবিধান এখন একেবারে অপ্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, দ্রুত ফ্যাসিবাদকে কায়েম রাখার অন্যতম মূল নিয়ামক এই শক্তিকে দ্রুত বাতিল ঘোষণা করতে হবে। কেন্দ্রীয় এই সমন্বয়ক বলেন, শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতা দরকার নেই, দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা দরকার। মত আগেও প্রকাশ করা যেতো, তবে সেটা ছিলো সহমত। তাই আমরা শুধু মত নয়, দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা চাই।
আলোচনা সভায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক কমিটির মুখপাত্র উমামা ফাতেমা বলেন, অভ্যুত্থানের স্পিরিটকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার এবং এর একক ন্যারেটিভ দাঁড় করানোর সমালোচনা করেন। এত দ্রুত আন্দোলনের শহীদদের আত্মত্যাগ ভুলে গিয়ে ও রাষ্ট্র সংস্কারের কথা পাশ কাটিয়ে শুধু দ্রুত নির্বাচন চাইলে সেটি জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সাথে বেঈমানি করা হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

Tuesday, October 22, 2024
প্রেসিডেন্টের বক্তব্য মিথ্যাচার, শপথ লঙ্ঘনের শামিল
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি যে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র পাননি। এটা হচ্ছে মিথ্যাচার এবং উনার শপথ লঙ্ঘনের শামিল। কারণ, উনি নিজেই ৫ই আগস্ট রাত ১১টা ২০ মিনিটে পেছনে তিন বাহিনীর প্রধানকে নিয়ে জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে বলেছেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী উনার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং উনি তা গ্রহণ করেছেন।’
আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এরপর সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উপদেশমূলক এখতিয়ার প্রয়োগ করে উনার (রাষ্ট্রপতি) কাছ থেকে আপিল বিভাগের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়- এই পরিস্থিতিতে করণীয় কি আছে? এটার পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন সুপ্রিম কোর্টের যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন এবং অন্য সব বিচারপতিরা মিলে ১০৬-এর অধীনে একটা মতামত প্রদান করেন রাষ্ট্রপতির রেফারেন্সের ভিত্তিতে। সেটার প্রথম লাইনটি হচ্ছে, দেশের বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যেহেতু প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন...। তারপর অন্যান্য কথা।’
‘এই রেফারেন্সটিতে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ আপিল বিভাগের সব বিচারপতির স্বাক্ষর আছে’ বলেন আসিফ নজরুল।
‘এই যে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দিয়েছেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে যে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা যায়, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের এই মতামতের ভিত্তিতে একটা নোট আমরা মন্ত্রণালয় থেকে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে প্রেরণ করি। ?রাষ্ট্রপতি এই অভিমতটা দেখেছেন এবং গ্রহণ করেছেন। এরপর তিনি নিজেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করেছেন।’
আসিফ নজরুল বলেন, একের পর এক কার্যাবলীর মধ্যদিয়ে এটা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত উনি পুরো জাতির কাছে বিভিন্নভাবে এটা নিশ্চিত এবং পুনর্বার নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। এখন প্রায় আড়াই মাস পরে যদি উনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগপত্র দেননি, এটা এক ধরনের স্ববিরোধিতা হয়, ওনার শপথ লঙ্ঘন হয়। এ পদে থাকার আর ওনার যোগ্যতা আছে কিনা, সে সম্পর্কে প্রশ্ন আসে।
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে বলা হয়েছে- আপনার যদি শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতা না থাকে বা আপনি গুরুতর অসদাচরণ করেন, তখন রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপনি থাকতে পারেন কিনা সেটা নিয়ে ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ আমাদের সংবিধানে রয়েছে।’
তিনি বলেন, একজন সর্বোচ্চ পদে থাকা মানুষ পুরো জাতির সামনে ভাষণ দিয়ে বলেছেন-প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। এবং উনি পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। এটা বলার পর, এর আলোকে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে অভিমত চাওয়ার পর, সেই অভিমতে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারের নিয়োজিত প্রধান বিচারপতি এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অন্য বিচারকরা মিলে যে চিঠির প্রথম লাইলে লিখেছেন যে, দেশের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। যেটা উনি গ্রহণ করেছেন। উনি সিন করেছেন।
তিনি আরও বলেন, ‘এত কিছুর পর উনি (রাষ্ট্রপতি) এটা কীভাবে বলতে পারেন, সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। আমাদের বক্তব্যে অত্যন্ত পরিষ্কার। উনি স্পষ্টভাবে বলেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ জমা দিয়েছেন, এটা উনি গ্রহণ করেছেন। এখন তার স্ববিরোধী কথা বলার সুযোগ নেই। উনি যদি ওনার বক্তব্যে অটল থাকেন, তাহলে তার রাষ্ট্রপতি পদে থাকার যোগ্যতা আছে কিনা সেটা, আমাদের উপদেষ্টামণ্ডলীর সভায় ভেবে দেখতে হবে।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে আইন উপদেষ্টা বলেন, পদত্যাগ করলে উনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগ করেন। পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির দপ্তরে থাকার কথা। এবং বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী এটা নিয়ে কোনো আদালতের প্রশ্ন করার সুযোগ নেই। এটা উনার কাছে। উনি নিজে বলেছেন- এটা উনার কাছে জমা দেয়া হয়েছে। উনি এটা গ্রহণ করেছেন। এখন উনি যদি বলেন নাই। তাহলে উনি কী করেছেন পদত্যাগপত্র। তাহলে আপনারা উনাকে জিজ্ঞাসা করবেন। উনি যদি বক্তব্যে অটল থাকেন বিষয়টি নিয়ে উপদেষ্টামণ্ডলীতে আলোচনা হতে পারে। তবে উপদেষ্টামণ্ডলীতে কি সিদ্ধান্ত নেয়, আমি এখন বলতে পারি না। জাতির সামনে বলা কথা নিয়ে যদি বিতর্ক সৃষ্টি করেন, সেটা তো অসদাচরণের পর্যায়ে পড়ে। তখন এই প্রশ্ন আসে আপনার মানসিক সক্ষমতা আছে কিনা রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে। এ প্রশ্নগুলো আসার সুযোগ তিনি তৈরি করে দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বলেছেন, তিনি শুনেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু তার কাছে এ-সংক্রান্ত কোনো দালিলিক প্রমাণ বা নথিপত্র নেই। মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকারটি রোববার পত্রিকার রাজনৈতিক ম্যাগাজিন সংস্করণ ‘জনতার চোখ’-এ প্রকাশিত হয়।

BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...

