Tuesday, August 20, 2013

বিজ্ঞানে নোবেলজয়ী নারী কম কেন?

বিজ্ঞানে প্রথম নোবেলজয়ী নারী ম্যারি কুরি।
সর্বশেষ ২০০৯ সালে আদা ইয়োনাথ
বিশ্বের নারীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের চেয়ে কিছুটা বেশি। তবু বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল আর গণিতের মতো বিষয়ভিত্তিক কর্মক্ষেত্রে শীর্ষ পদগুলোর অধিকাংশই রয়েছে পুরুষের দখলে। সবচেয়ে উন্নত দেশেও ব্যাপারটার ব্যতিক্রম চোখে পড়ে না। বিজ্ঞানের জগতে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জয়ের ক্ষেত্রেও নারী পিছিয়ে। বিজ্ঞানীদের কাঙ্ক্ষিত চূড়ান্ত পুরস্কার হিসেবে বিবেচিত নোবেল বিজয়ীদের তালিকায়ও দেখা যায় পুরুষের জয়জয়কার। এ পর্যন্ত বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় (পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, চিকিৎসাবিদ্যা ও অর্থনীতি) নোবেল বিজয়ী মোট ৩৫৭ জনের মধ্যে নারীর সংখ্যা মাত্র ১৬ জন। এতটা ব্যবধানের কারণ কী? বিষয়টি অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছেন যুক্তরাজ্যের শেফিল্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই গবেষক হানা ডগডেল ও জুলিয়া শ্রোয়েডার। তাঁদের মতে, ২০ শতকের প্রথমার্ধে বিজ্ঞান গবেষণায় নারীর অংশগ্রহণ ছিল খুবই কম। সম্ভবত এ কারণেই নোবেলজয়ী নারী বিজ্ঞানীদের সংখ্যা এত কম। সিগনিফিকেন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের পরিসংখ্যানবিদ স্টেফানি কোভালচিক লিখেছেন, ২০ শতকের প্রথমার্ধে বিজ্ঞানভিত্তিক পেশায় অংশগ্রহণে নারীদের যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। নোবেল মনোনয়নে নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণে উদ্যোগী সংগঠন রোসালিন্ড ফ্র্যাংকলিন সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ম্যারি অ্যান লিবার্ট অভিযোগ করেন, যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নারীরা নোবেল মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে উপেক্ষার শিকার হন। কারণ, তাঁদের মনোনয়ন দিতে কেউ উদ্যোগ নেয় না। সর্বশেষ ২০০৯ সালে নোবেলজয়ী নারী বিজ্ঞানী ইসরায়েলি আদা ইয়োনাথ। আর প্রথম এই কৃতিত্ব দেখিয়েছেন পোলিশ বংশোদ্ভূত ফরাসি নারী বিজ্ঞানী মেরি কুরি। পদার্থবিদ্যায় ১৯০৩ সালে নোবেল পান তিনি। হাফিংটন পোস্ট।

জিব্রাল্টারে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ

এইচএমএস ওয়েস্টমিনস্টার
ব্রিটিশ ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে স্পেনের জেলেদের মাছ ধরা নিয়ে উত্তেজনার মধ্যে গতকাল সোমবার ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ জিব্রাল্টারে পৌঁছেছে। সেখানে যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনী মহড়া দেওয়ার কথা রয়েছে। ব্রিটিশ, স্পেন ও জিব্রাল্টার কর্তৃপক্ষ বলেছে, যুক্তরাজ্যের নৌবাহিনীর ওই অঞ্চল দেখাশোনা করতে আসার কর্মসূচি অনেক আগে ঠিক করা ছিল। তবে স্পেনের কেউ কেউ যুদ্ধজাহাজের এই উপস্থিতিকে উসকানিমূলক বলে মন্তব্য করেছেন। গ্রিনিচ মান সময় সকাল সোয়া সাতটার দিকে এইচএমএস ওয়েস্টমিনস্টার যুদ্ধজাহাজটি জিব্রালটার বন্দরের দিকে যায়। এ সময় অন্য দুটি ছোট জাহাজ পাশে ছিল। জিব্রাল্টারে কংক্রিটের ব্লক ফেলে কৃত্রিম শৈলশ্রেণী তৈরি করেছে যুক্তরাজ্যের সরকার। স্পেনের জেলেদের অভিযোগ, এতে নির্দিষ্ট জলসীমায় যাওয়ার পথ বন্ধ করে তাঁদের মাছ ধরার অধিকার হরণ করা হয়েছে। এদিকে স্পেন নিরাপত্তা তল্লাশি কঠোর করেছে। এতে জিব্রাল্টারে যেতে শ্রমিকদের এমনকি পর্যটকদেরও নানা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। ৩০ হাজার জনসংখ্যার এই জিব্রাল্টার এলাকার মালিকানা দাবি করে আসছে স্পেন। যদিও ৩০০ বছর আগে একটি চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাজ্য ওই এলাকা নিজেদের দখলে নেয়। জিব্রাল্টারের মুখ্যমন্ত্রী ফেবিয়ান পিকারডো বলেন, স্পেনের ক্ষমতাসীন পিপলস পার্টির বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি ভিন্ন খাতে নিতে দেশটির সরকার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে সংঘাতে জড়ানোর চেষ্টা করছে। রয়টার্স।

সিনাইয়ে জঙ্গিদের রকেট হামলা, ২৫ পুলিশ নিহত

মিসরের সিনাই উপত্যকায় গতকাল সোমবার জঙ্গিদের রকেট হামলায় পুলিশের অন্তত ২৫ জন সদস্য নিহত হয়েছেন। এরপরই মিসর সরকার রাফা সীমান্ত বন্ধ করে দেয়। এরই মধ্যে সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারক মুক্তি পাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। দুর্নীতির মামলায় তিনি খালাস পাওয়ায় তাঁকে আদালত দ্রুত মুক্তির নির্দেশ দিয়েছেন বলে তাঁর আইনজীবী জানান। এদিকে মিসরের সংকট নিয়ে গতকাল জরুরি বৈঠক করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। কাল বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করে মিসরের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি পর্যালোচনা করবেন বলে বৈঠক শেষে জানানো হয়েছে। সিনাই উপত্যকায় গতকাল পুলিশের ২৫ সদস্যের প্রাণহানির ঘটনা বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড়। এতে করে ওই এলাকায় নব্বইয়ের দশকের মতো অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। রাজধানী কায়রো, আলেক্সান্দ্রিয়াসহ কয়েকটি এলাকায় চলতি সপ্তাহে ইসলামপন্থীদের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষে প্রায় ৮০০ লোক নিহত হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা সীমান্তের কাছ দিয়ে দুটি বাসে করে যাচ্ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। এ সময় অজ্ঞাত জঙ্গিরা বাস দুটি লক্ষ্য করে রকেটচালিত গ্রেনেড ছুড়লে হতাহতের ঘটনা ঘটে।২০১১ সাল স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পতনের সময় থেকেই গাজা ও ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী সিনাই উপত্যকায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়। তবে গত ৩ জুলাই সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে সেখানকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও শোচনীয় হয়। কার্যত কয়েক সপ্তাহ ধরে মিসরজুড়েই সহিংসতা চলছে। মুরসিকে ক্ষমতায় পুনর্বহালের দাবিতে মুসলিম ব্রাদারহুডসহ তাঁর সমর্থক ইসলামপন্থী সংগঠনগুলো প্রতিদিনই বিক্ষোভ করছে। সর্বশেষ ১৪ আগস্ট কায়রোর রাব্বা আল-আদাবিয়া মসজিদের বাইরে এবং নাহদা স্কয়ার থেকে মুরসিপন্থী বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের মাধ্যমে যে রক্তপাত শুরু হয়েছে, তা থামার ন্যূনতম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
১৪ আগস্ট থেকে সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৮০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন। সর্বশেষ গত রোববার কারাগারে ৩৬ জন ইসলামপন্থীকে নিরাপত্তা বাহিনী হত্যা করেছে বলে ব্রাদারহুড দাবি করেছে। কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, ওই বন্দীরা একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করেছিলেন। তাঁকে মুক্ত করতে সেখানে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ওই বন্দীদের মৃত্যু হয়। বিক্ষোভকারীদের যেকোনো ধরনের সহিংসতা নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিহত করবে বলে মিসরের সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সতর্ক করে দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় ৩৬ বন্দী নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটল। সিসি বলেন, ‘দেশ ধ্বংস হওয়ার মুখে আমরা কখনোই নীরব থাকব না। আমরা এ জন্য প্রস্তুত রয়েছি।’ ইইউর জরুরি বৈঠক: মিসর-সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য ইইউ গতকাল বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠক শেষে জানানো হয়েছে, কাল বুধবার জোটের ২৮টি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা বৈঠক করে মিসরের সঙ্গে ইইউর সম্পর্কের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। এর আগে ইইউর কর্মকর্তারা গত রোববার সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, শিগগিরই কায়রোর সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি ‘জরুরি ভিত্তিতে পর্যালোচনা’ করা হবে। গত রোববার সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকের পর ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেন, ‘মিসরের মতো দেশে যে মাত্রায় সহিংসতা চলছে, তা অগ্রহণযোগ্য।’ এএফপি ও রয়টার্স।

মিসরে আরব বসন্তের কবর?

আরব বসন্তের সূচনা হয় তিউনিসিয়ায়। এরপর তা ছড়িয়ে পড়ে মিসর, ইয়েমেন, লিবিয়া, বাহরাইন, সিরিয়াসহ কয়েকটি দেশে। কিন্তু এই দেশগুলোর সার্বিক পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আরব বসন্ত ছুঁয়ে যাওয়া দেশগুলো যেন টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। এদিকে মিসরে আরব বসন্তের পর গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসির ক্ষমতাচ্যুতি ও তাঁর সমর্থকদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানে প্রশ্ন উঠেছে, মিসরে কি আরব বসন্তের কবর হচ্ছে? নাকি ওই অঞ্চলের দেশগুলোতে ইসলামপন্থীদের ক্ষমতায় যাওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার কবর হচ্ছে?
মিসরে আরব বসন্তের সূচনা হয় প্রায় তিন দশকের শাসক হোসনি মোবারকের পতনের পর। দেশটির প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হন মুসলিম ব্রাদারহুড-সমর্থিত মোহাম্মদ মুরসি। কিন্তু মাত্র এক বছরের মাথায় ক্ষমতাচ্যুত হতে হয় তাঁকে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির ভঙ্গুর অর্থনীতি সচল করতে উদ্যোগ না নেওয়া এবং রাজনৈতিক বিভক্তি দূর করার পরিবর্তে ‘একলা চলো নীতি’ নিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অভিলাষের কারণেই এই পরিণতি হয় মুরসি তথা ইসলামি ব্র্রাদারহুডের। তিউনিসিয়াবিষয়ক বিশ্লেষক জামেল আরফাউয়ি বলেন, ‘মিসরে ইসলামপন্থীদের এত দ্রুত পতন দেখে আমি বিস্মিত। আমার ধারণা ছিল, তুরস্কের ইসলামপন্থীদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকবে।’ তিউনিসিয়ায় আরব বসন্তে জয়নুল আবেদিন বেন আলীর পতনের পর ইসলামপন্থী দল এন্নাহদা সরকার গঠন করলেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিভেদ আরও বেড়েছে। ইয়েমেনে আলী আবদুল্লাহ সালেহর পদত্যাগ এবং লিবিয়ায় কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর দেশ দুটিতে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই চলছে। লিবিয়ায় এই লড়াই ইয়েমেনের চেয়ে অনেক বেশি প্রবল। আর সিরিয়ায় তো দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদবিরোধী লড়াই চলছে। সেখানে বিরোধীদের কঠোরভাবে দমন করছেন তিনি। আর সাম্প্রতিক মিসরে বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হচ্ছে, দেশটিতে আরও রক্তপাত আসন্ন। এরই মধ্যে ব্রাদারহুডকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে আলোচনা শুরু হয়েছে। ব্রাদারহুড নিষিদ্ধ হোক বা না হোক, সংগঠনটির বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযান অব্যাহত থাকলে নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে যাবে। গোপন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি তারা দীর্ঘমেয়াদে সরকারবিরোধী লড়াই শুরু করবে; যা মোবারকের পতনের পরও দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার আভাস দিচ্ছে। সঙ্গে এটাও অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে যে আরব বসন্তের সুফল মিসরের জনগণ পাচ্ছে না। তাই কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন, মিসরেই কি রচিত হচ্ছে আরব বসন্তের কবর?

বিহারে ট্রেনে কাটা পড়ে ৩৫ তীর্থযাত্রী নিহত

ভারতের বিহার রাজ্যের খাগারিয়া জেলায় গতকাল সোমবার রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে অন্তত ৩৫ জন তীর্থযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে। পরে বিক্ষুব্ধ স্থানীয় লোকজন ও তীর্থযাত্রীরা হামলা চালিয়ে ট্রেনটির ছয়টি বগি পুড়িয়ে দেন। তাঁরা ট্রেনের চালককে বেধড়ক মারধর করেন ও ট্রেনের কয়েকজন কর্মীকে জিম্মি করে রাখেন। পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এস কে ভরদ্বাজ ৩৫ জন হিন্দু তীর্থযাত্রীর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ইস্ট সেন্ট্রাল রেলওয়ের (ইসিআর) সার্সা-মানসি রুটের ধামারা রেলওয়ে স্টেশনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। তীর্থযাত্রীরা রেললাইন পার হওয়ার সময় দ্রুতগামী ট্রেন রাজ্য রানি এক্সপ্রেস তাঁদের চাপা দেয়। এতে হতাহতের ঘটনা ঘটে। তিনি আরও জানান, আহত অনেকের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাজ্য রানি এক্সপ্রেস ট্রেনটি সার্সা থেকে পাটনা যাচ্ছিল। ধামারা স্টেশনে ট্রেনটির নির্ধারিত যাত্রাবিরতি ছিল না। সকাল সোয়া আটটার দিকে ট্রেনটি ধামারা স্টেশন পার হচ্ছিল। এর কিছুক্ষণ আগে ওই স্টেশনে একটি লোকাল ট্রেন যাত্রাবিরতি করে। সেই ট্রেন থেকে তীর্থযাত্রীরা নেমে রেললাইন পার হচ্ছিলেন। এমন সময় দ্রুতগামী রাজ্য রানি এক্সপ্রেস ট্রেনটি স্টেশনে ঢুকে পড়ে। এতে অনেক তীর্থযাত্রী ট্রেনের নিচে পড়লে হতাহতের ঘটনা ঘেটে। পরে ট্রেনটি থামানো হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্ষুব্ধ জনতা ও অন্য তীর্থযাত্রীরা ট্রেনটিতে হামলা চালান। বিভিন্ন বগিতে আগুন দেন তাঁরা। এতে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত একটি বগিসহ ছয়টি বগি পুড়ে যায়। একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বিক্ষুব্ধ লোকজন ট্রেনের চালককে বেধড়ক মারধর করেন ও রেলের কর্মীদের ওপর হামলা চালান। তাঁরা কয়েকজন রেলকর্মীকে জিম্মি করে রেখেছেন। আইএএনএস।

পোশাক শিল্পের উন্নয়নে বিদেশী ক্রেতাদের সহায়তা by ড. আনু মাহমুদ

বাংলাদেশের পোশাক কারখানার শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ উন্নত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যারা বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করে থাকে। মার্কিন ও কানাডিয়ান কোম্পানিগুলোর এ উদ্যোগের নাম দেয়া হয়েছে ‘বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স সেফটি ইনিশিয়েটিভ’। পাঁচ বছর মেয়াদি এ পরিকল্পনার অধীনে আগামী এক বছরের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলো প্রথমে তারা পরিদর্শন করবে। যেসব কারখানায় পর্যাপ্ত শ্রমিক নিরাপত্তা নেই বা কারখানা স্থানান্তরের প্রয়োজন রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সমস্যা নিরসনে মালিকপক্ষকে স্বল্প সুদে ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করবে। পাশাপাশি জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়ক সংস্থা জাইকাও পোশাক খাতের উন্নয়নে ১০০ কোটি টাকা ঋণ দেবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের পোশাক শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ধরে নেয়া যায়। দেশে ও বিদেশে আমাদের পোশাক শিল্পের অর্থনৈতিক গুরুত্ব কত ব্যাপক, তা বিদেশী এ পরিকল্পনা থেকেই সহজে অনুমান করা যায়। তাদের এ পরিকল্পনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে একটি সুখবর হলেও কিঞ্চিৎ বিব্রতকরও বটে। পোশাক শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা অর্জিত হলেও মালিকপক্ষ ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিরাপত্তা এবং শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হওয়ায় বিদেশী এ পরিকল্পনা আমাদের আন্তরিকতা ও সফলতার ক্ষেত্রে একটি প্রশ্নবোধক চিহ্নও এঁকে দেয় বটে।
দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় শ্রমিকদের নিরাপত্তা, শ্রম অধিকার ও শ্রমিক কল্যাণ পরিবেশ নিয়ে অনেক আগে থেকেই শ্রমিক, মানবাধিকার সংগঠনগুলো আন্দোলন করে আসছিল। সাভারে রানা প্লাজা ধসে হাজারের অধিক শ্রমিক নিহত হলে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকে। সেদিকে কেউ কর্ণপাত না করায় শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা জিএসপি হারায় বাংলাদেশ। খোদ ওবামা প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে নিুগামী তো হয়ই, পোশাক শিল্পের প্রতি দেখা দেয় হুমকি হিসেবেও। আশার কথা, জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশের জন্য স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হয়নি। এ সুবিধা স্থগিত করা হয়েছে। এ সুবিধা ফিরে পেতে মার্কিন প্রশাসন বেশকিছু শর্তারোপ করেছে। নভেম্বরের মধ্যে যেসব শর্ত পূরণ করলে জিএসপি সুবিধা বাংলাদেশ ফিরে পেতে পারে, সেসব শর্তের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- পোশাক কারখানায় শ্রমিকদের নিরাপত্তা, কর্মপরিবেশ উন্নয়ন ও দেশের শ্রম আইন সংশোধন।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও জাইকার উদ্যোগও পোশাক কারখানায় কর্মপরিবেশের উন্নয়নসহ নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশের প্রায় পাঁচ হাজার পোশাক কারখানায় ওই সংগঠন পরিদর্শন করবে এক বছর ধরে। এর জন্য প্রাথমিকভাবে তারা তহবিল গঠন করেছে চার কোটি ডলারের বেশি। কারখানাগুলোর সার্বিক মানোন্নয়নের জন্য তারা দশ কোটি ডলার ঋণের ব্যবস্থা করবে। জাইকাও ঋণের ব্যবস্থা করবে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে। এ ঋণ দেয়া হবে বিশেষ কোনো নির্দিষ্ট দিক নির্দেশ করে নয়, সার্বিক উন্নয়নে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ব্যাংক ও বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সহজশর্তে এ ঋণ প্রদান করা হবে। আশার কথা, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যে ঋণ সহায়তা প্রদান করবে, তাও সহজশর্তে। দেশের ব্যাংকগুলোর প্রচলিত প্রায় ১৬ শতাংশ উচ্চ সুদ হারে নয়, বরং ৫ থেকে ৬ শতাংশ সুদ হারে ঋণ দেবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশের পোশাক কারখানায় বারবার সংঘটিত দুর্ঘটনায় হাজার হাজার শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনা এবং শ্রমিকদের বেতন-ভাতাসহ অন্য ন্যায্য সুযোগ-সুবিধা প্রদানের জন্য শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ ও প্রচার মাধ্যম বারবার সোচ্চার ও সতর্ক করার পরও তা বাস্তবায়িত না হওয়া দুঃখজনক। শ্রমিক হত্যা ও বঞ্চনার ঘটনা ঘটেই চলেছে এত কিছুর পরও।

ইউরোপীয় ইউনিয়নও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে তিনটি বিষয়ে অগ্রগতির সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে কারখানা পরিদর্শকের সংখ্যা ২০০-তে উন্নীত করতে হবে এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে সব কারখানার কাঠামো ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিদর্শন সম্পন্ন করতে হবে। জেনেভায় ইইউ আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। ইইউ ছাড়াও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং যুক্তরাষ্ট্র এ বৈঠকে অংশ নেয়। এ বিষয়ে বৈঠক-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে ইইউ ট্রেড কমিশনার ক্যারল ডি গুশ বলেন, বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা স্থগিত করা হলে বড় ধরনের বিপর্যয় হবে। অনেক শ্রমিক চাকরি হারাবেন। তিনি আরও জানান, অগ্রগতি নিয়ে আলোচনার জন্য ২০১৪ সালে বাংলাদেশ নিয়ে আবার একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে বাংলাদেশের পোশাক কারখানাগুলোর নিরাপত্তার মানোন্নয়নে সহায়তা করবে বিদেশী ক্রেতারা। এ বিষয়ে একটি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে শীর্ষস্থানীয় ৭৩টি পশ্চিমা খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান। এর অংশ হিসেবে চলতি মাসের শেষের দিকে কারখানা পরিদর্শনে আসছেন তারা। এএফপি ও বিবিসির সংবাদ থেকে জানা যায়, ‘অ্যাকর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেফটি ইন বাংলাদেশ’ নামে এ চুক্তি বাধ্যতামূলক। এতে বিদেশী কোম্পানিগুলোর জন্য বাংলাদেশী যেসব কারখানা পোশাক প্রস্তুত করে, সেগুলোতে আগামী নয় মাসের মধ্যে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদের এ চুক্তির বাস্তবায়ন দেখভাল করতে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে একটি সদর দফতর প্রতিষ্ঠা করা হবে। এছাড়া বাংলাদেশে আরেকটি দফতর খোলা হবে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের মানোন্নয়নে বিদেশী ক্রেতাদের এ উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে এ দেশের পোশাক শিল্প খাতে শ্রমমান নিয়ে অনেক প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও একথা পরিষ্কার যে, জিএসপি বাতিল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তৈরি পোশাক শিল্প কোনো জিএসপি সুবিধা পায় না। অথচ জিএসপি সুবিধা পায় এমন শিল্প-কারখানাগুলোর শ্রমমান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়নি কোনো মহল থেকে। এর মানে এই নয় যে, জিএসপি সুবিধাপ্রাপ্ত শিল্প-কারখানাগুলো সবাই শ্রমমানের আইএলও স্ট্যান্ডার্ড বজায় রাখছে। বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের পক্ষ থেকে সব সময় দাবি ছিল, ক্রেতারা যেন ন্যায্য দাম দিয়ে পোশাক কেনে। কিন্তু উল্লিখিত কোনো আলোচনাতেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের গার্মেন্ট পণ্য পাশ্চাত্যের কাছে লোভনীয় এ খাতে সস্তা মজুরির কারণে। অধিক মুনাফার লোভে ইউরোপীয় ক্রেতারা ক্রমাগত দাম কমিয়ে বাংলাদেশ থেকে পণ্য সরবরাহের চাপ দেয়। এর বাইরে আবার বড় বড় বায়াররা বাংলাদেশে না এসে সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, দুবাই, দিল্লি, মুম্বাইয়ে বসে সেদেশের বায়িং হাউসগুলোকে অর্ডার দেয়। এ বায়িং হাউসগুলো আবার আরও সস্তা দাম ধরে বাংলাদেশ থেকে পোশাক তৈরির অর্ডার দেয়। কম দামের ওপর আবার মধ্যস্বত্বভোগীদের এই কমিশন বোঝা নিয়ে পোশাক তৈরি করতে গিয়ে দেশের পোশাক শিল্পের অবস্থা খুবই করুণ। এরই মধ্যে অনেক পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে ব্যবসায় লোকসান গুনে। কিন্তু তাদের এই দাম কমানোর প্রধান শিকার হয় গার্মেন্ট শ্রমিকরা। কাজেই সত্যিকারভাবে যদি পাশ্চাত্যের আমদানিকারকরা পোশাকের উৎপাদন মূল্য না বাড়ায়, তাহলে কমপ্লায়েন্সের নামে খরচ বাড়িয়ে দেশের পোশাক শিল্প তার উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে পারবে না। যেসব পশ্চিমা কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বা শ্রম সংস্থার প্রতিনিধি বাংলাদেশের পোশাক খাতের শ্রমমান নিয়ে দিন-রাত জ্ঞানগর্ভ তত্ত্ব, তথ্য ও উপদেশ দেন, তারা যদি সংকটের মূল কারণ অনুধাবন করে পাশ্চাত্যের বায়ারদের বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিতে রাজি করাতে সক্ষম হন, তাহলে এ সংকটের সমাধান খুব সহজেই সম্ভব হবে।
ড. আনু মাহমুদ : অর্থনীতি বিশ্লেষক

তত্ত্বাবধায়ক সরকার অগণতান্ত্রিক নয় by ড. শরীফ মজুমদার

কিছু পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী সরকার সমর্থকদেরই একটি বড় অংশ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের পক্ষে। তবুও তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অগণতান্ত্রিক বলে অবজ্ঞা করা হচ্ছে। স্বভাবতই প্রশ্ন এসে যায়, কেউ ইচ্ছা করলেই একটি দাবিকে ‘গণতান্ত্রিক’ বা ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে আখ্যায়িত করতে পারেন কি-না? সম্ভবত পারেন, কারণ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই ৪-৫ বছর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে গণতান্ত্রিক শক্তি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন এবং বলেছিলেন, দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা থেকে দেশকে রক্ষা করতে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিকল্প নেই। তাহলে গত ৪-৫ বছরে এমন কী পরিবর্তন হয়েছে যে, একটি ‘গণতান্ত্রিক’ দাবি ‘অগণতান্ত্রিক’ বলে আখ্যায়িত হচ্ছে?
মুখ্য পরিবর্তনটি হল, একটি বিতর্কিত বিষয়ে সমগ্র জাতি আজ বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীই কয়েক বছর আগে যখন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার জন্য আন্দোলনে নেমেছিলেন, তখন জাতি আজকের মতো এতটা বিভক্ত ছিল না। দ্বিধাবিভক্ত দেশে কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা লোপ পায়? একটি অবুঝ শিশুও বলবে ‘না’; বরং প্রয়োজনীয়তা আরও প্রকটভাবে অনুভূত হয়। অন্য আর কী পরিবর্তন হয়েছে, যাতে করে জনগণ ধরে নিতে পারে গণতান্ত্রিক পন্থায় জাতি অনেক এগিয়ে গেছে? কিছু স্থানীয় সরকার নির্বাচন হয়েছে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের ভরাডুবি হয়েছে। কিন্তু সেই নির্বাচন কমিশনের প্রধানই স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ছাড়া সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচন সম্ভব নয়। সুতরাং কিভাবে একটি গণতান্ত্রিক দাবি কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই অগণতান্ত্রিক হয়ে যাবে, তা বোধগম্য নয়।
গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তির ইচ্ছায় গণতান্ত্রিক দাবি অগণতান্ত্রিকে রূপান্তরিত হওয়ার সুযোগ খুবই সীমিত; এটি শুধু স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সম্ভব। যে দাবিগুলো বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পক্ষে উপস্থাপন করেছিলেন, তার অধিকাংশই আজও প্রযোজ্য। সুতরাং বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতার তত্ত্বাবধায়ক ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত পূর্ববর্তী বিরোধীদলীয় নেত্রীর দাবির প্রতিই অনুসমর্থন বৈকি। এটি তৃতীয় বিশ্বের শাসনব্যবস্থার একটি ধরন- যেখানে ক্ষমতাসীন দল সব সময় মনে করে, তাদের শাসনামলে গণতান্ত্রিক চর্চায় এতটাই পরিবর্তন হয়েছে যে আগের মতো অরাজনৈতিক সরকারের মাধ্যমে নির্বাচনের কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু বাস্তবতা হল, বিরোধী দল ও সাধারণ মানুষ সরকারের মনে করার সঙ্গে কখনোই একমত হতে পারে না। তত্ত্ব¡াবধায়ক সরকারের প্রয়োজন ফুরাবে তখনই, যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থা জন্ম নেবে এবং সেক্ষেত্রে দেশের বিচার বিভাগের করণীয় খুবই সীমিত। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমরা এখনও সেই আস্থার জায়গাটি থেকে অনেক দূরে। এ থেকে অবশ্যই আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তা একবারের প্রয়াসে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়।
তৃতীয় বিশ্বে বিদ্যমান শাসনব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব শুধু নির্বাচন পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর নির্বাচন-পূর্ব দায়িত্বগুলো অনেকাংশে নির্বাচনকালীন দায়িত্বের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। যখন একটি রাজনৈতিক দল ৫ বছর ধরে তাদের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ধরে নিয়ে দেশ পরিচালনা করে, তখন তাদের মধ্যে স্বভাবতই এ ধারণা জন্ময় যে সবকিছু প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী চলবে। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব হল এটি নিশ্চিত করা যে, সবকিছু গণতন্ত্রের ধারণা অনুযায়ী চলবে, ক্ষমতাসীনদের পছন্দ অনুযায়ী নয়। সে হিসেবে অবশ্যই আমাদের বাস্তবতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গণতান্ত্রিক। এটি গণতান্ত্রিক বলেই তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণায় আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এখন উন্নত বিশ্বের দেশগুলো হয়তো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয় না এবং এর কারণ গণতন্ত্রের মূলনীতির প্রতি তাদের অগাধ শ্রদ্ধাবোধ। এ শ্রদ্ধাবোধের কারণেই সেখানে ক্ষমতাসীন রাজনীতিকরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন না। মূলত রাজনীতিকদের এ অক্ষমতাই সেখানে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ টিকিয়ে রাখে। আর তৃতীয় বিশ্বের ক্ষেত্রে এ সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশটি ফিরিয়ে আনাই হল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম ও প্রধান কাজ। কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মধ্য দিয়ে জাতীয় নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে জনগণ ও বিরোধী দলের আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে, এমনটা বোধগম্য নয়। এ আস্থাহীনতাই নির্বাচন-পরবর্তী দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতার জন্ম দেবে এবং সে কারণেই আমাদের পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এমন অনেক ঘটনাই আমাদের জাতীয় জীবনে ঘটেছে যেগুলোর কোনো সাংবিধানিক স্বীকৃতি ছিল না, কিন্তু সেগুলো আমাদের পরিপ্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক বলে অনুভূত হয়েছিল। পরে আমরা সেগুলোকে অগণতান্ত্রিক বলে আখ্যায়িত করিনি বরং সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে গণতান্ত্রিক বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সংবিধান ধর্মগ্রন্থ নয় যে এতে কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না। সংবিধান গণতান্ত্রিক বিষয়গুলোকে আইনগত স্বীকৃতি দিয়ে থাকে মাত্র। সুতরাং সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকেও গণতান্ত্রিক আইনগত স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে, যতক্ষণ না সব রাজনৈতিক দল কোনো চাপ ছাড়াই তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ব্যতিরেকে নির্বাচনে অংশ নিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। উন্নত দেশের নির্বাচন পদ্ধতির উদাহরণ দেয়া তখনই মানাবে, যখন তাদের অন্য গণতান্ত্রিক চর্চাগুলোও উদাহরণ হিসেবে গণ্য হবে। যেমন উন্নত দেশগুলোতে নগ্ন রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা এবং রাজনৈতিক হানাহানি কোনো নির্বাচনকালীন ঘটনা নয়। ভোটের আগে নগদ টাকা লেনদেনের মতো বিষয় তারা চিন্তাও করতে পারে না; ফলে আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকা সরকারি দল ও নাজুক অবস্থানে থাকা বিরোধী দল নির্বাচনে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। কিন্তু দুঃখজনক হল, এ বিষয়গুলো তৃতীয় বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে নির্বাচনকালীন সময় সবসময়ই মুখ্য বিষয় হিসেবে গণ্য হয়। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হল, উন্নত দেশগুলোতে সরকারি দল নির্বাচন পরিচালনা করে থাকে এ কারণে যে, বিরোধী দল নির্বাচন নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলে না; যদি বিরোধী দল প্রশ্ন তুলত, তাহলে সরকারি দল নিজে থেকেই এ ধরনের বিতর্কিত কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখত। এটা তাদের একে অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরই বহিঃপ্রকাশ। এ সম্মান প্রদর্শন একের প্রতি অন্যের আস্থা থেকে আসে, যা সবকিছুরই নিয়ামক। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের আগে সেই আস্থার পরিবেশটি সৃষ্টি করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যখন উন্নত দেশের নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করেন, তিনি এ বিষয়গুলো আড়াল করে যান।
উন্নত দেশগুলোতে জাতীয় বিতর্কিত বিষয়গুলো বিচারবিভাগের মাধ্যমে সুরাহা না করে গণভোটের মাধ্যমে সুরাহার জন্য জনগণের ওপরই ছেড়ে দেয়া হয়। গণভোটের দিক থেকে চিন্তা করলে বলা যায়, সীমিতভাবে হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ওপর ‘গণভোট’ কিছুটা হয়েই গেছে। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল অনেকটা তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে অন্দোলনেরই ফলস্বরূপ। সুতরাং এটি সীমিতভাবে হলেও জাতীয় নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার পুনর্বহালের পক্ষে গণরায়। এখন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে আলোচনা করতে চাইলেও জনগণের ভোট ভিক্ষুক হিসেবে তা আর করতে পারছে না। কারণ তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপি সমর্থকরা এটিকে তাদের সঙ্গে প্রতারণা হিসেবে দেখবে। এটি স্বাভাবিক, কারণ গত ২-৩ বছরে যে দাবিটি বিরোধী দলকে কিছুটা হলেও চাঙ্গা রেখেছিল তা হল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি এবং প্রকারান্তরে এ দাবিই একটি মজবুত বিরোধী মোর্চার সৃষ্টি করেছিল, যা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ফলাফল তৈরি করেছে। এ মোর্চা বিএনপির একার মোর্চা নয়; সুতরাং বিএনপি একা ইচ্ছা করলেই আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে কোনো আলোচনায় অংশ নিতে পারে না। এ ধরনের পরিস্থিতিতে কোনো রাজনৈতিক দলই তা করতে পারে না; কারণ তাদের বিপুল সমর্থকের সেন্টিমেন্টের প্রতি সম্মান দেখাতে হয়। বর্তমান সরকারি দল আওয়ামী লীগও যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিল, তারাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি। সুতরাং পূর্ববর্তী বিরোধীদলীয় নেত্রী, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জন্য যেমন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক ছিল, তেমনি বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতার জন্যও তা গণতান্ত্রিকই রয়েছে। এ ব্যবস্থা গণতান্ত্রিক বলেই এটি জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। এটি গণতান্ত্রিক, তাই এটি রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারের প্রতি সম্মান রেখেছে, যে ইশতেহার দেখে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেছে। সে ইশতেহারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের কোনো অঙ্গীকার কোনো রাজনৈতিক দলই করেনি। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের দাবি করতে হলে সে দাবি এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে এনে তার পক্ষে জনগণের সমর্থন আদায় করে পরে দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে হবে।
পরিশেষে একটি প্রবাদের কথা মনে করিয়ে দেই- ‘মহানুভবতা নিজেকে দিয়েই শুরু করতে হয়’। যেহেতু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী অনুরূপ পরিস্থিতিতে নিজেই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেননি এবং নির্বাচন পরিচালনার জন্য তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার দাবি করছিলেন, সুতরাং তিনি বর্তমান বিরোধীদলীয় নেতার দাবির প্রতি সম্মান দেখাতে নৈতিকভাবে বাধ্য। আমাদের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় এ মুহূর্তে তত্ত্বাবধায়কহীন নির্বাচন দাবি করা কিছুটা অকালপক্বতারই শামিল। কেউ যদি জোরপূর্বক তা করতে চান, তাহলে হয়তো অবশেষে সামরিক ক্ষমতা দখলকেই গণতান্ত্রিক বলে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং দুঃখজনক সত্য হল, সে ধরনের কোনো অধ্যায়ের সূচনা হলে তা স্বাভাবিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার যে পদ্ধতি, সে পদ্ধতিটিকেই শ্লথ করে দেবে। সব শেষে যে মন্তব্যটি করব তা হল, উন্নত দেশের নির্বাচন পদ্ধতিকে উদাহরণ হিসেবে আনার আগে সে দেশগুলোতে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে বিরোধী দলের যে আস্থা থাকে সে উদাহরণটি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারণ এ আস্থার জায়গাটি তৈরি হলে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের এমনিতেই আর কোনো বাধা থাকবে না। নির্বাচন পদ্ধতি সম্পর্কে বিরোধী দলের সম্মতি আদায় করাটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কোন দেশ কিভাবে নির্বাচন করছে তা নয়।
ড. শরীফ মজুমদার : সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

টকশো by নুরুল ইসলাম বিএসসি

যুদ্ধাপরাধের বিচার কার্য বা বিচারের রায় নিয়ে কোনো কথা নেই। বিচার কাজ তার নিজস্ব গতিতে চলছে এবং জামায়াত ছাড়া সবাই তা মেনে নিচ্ছে। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ। বিএনপিও মৌনতা অবলম্বন করে বিচারে সমর্থন দিচ্ছে, যদিও অন্তর্জ্বালা। এ মুহূর্তে জামায়াত নিষিদ্ধ হলে বিএনপির লাভ। জামায়াতিরা বিএনপিতে নাম লেখাবে। আমার কথা জামায়াতকে নিয়ে। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা করেছে, ঘরবাড়ি জ্বালিয়েছে, ধর্ষণের মতো জঘন্য পাপ করেছে। বর্তমানে যারা শিবির করে, তারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি বা মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতের ক্রিয়াকাণ্ড দেখেনি। ইতিহাসও সঠিকভাবে লেখা হয়নি, যা থেকে তারা আসল ঘটনা জানতে পারে। তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই, বেতন পায়, কাজ করে। বেতন কোত্থেকে আসে, সবাই জানে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তাদের টাকার উৎস বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়নি।
প্রতিদিন টকশো হয়। টক কী মিষ্টি ওদিকে যাব না। শুধু একথা বলব, যাদের টকশোতে ডাকা হয় তারা কারা। হেফাজত নেতাদের যখন টকশোতে ডাকা হয়, স্বাভাবিক কারণে তারা নিজেদের পক্ষে অবস্থান নেবে এবং জনমত সৃষ্টিতে তাদের কথাগুলো সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তাদের যারা ডাকেন, তাদের দোষ নয়, যারা আসেন তাদের দোষ। যারাই টকশোতে অংশগ্রহণ করেন, সবাই সরকারবিরোধী, ব্যতিক্রম কিছু থাকে।
সমুদ্রে হাঙরসহ মানুষখেকো জন্তু থাকে। হাঙর বা মানুষখেকো জন্তু মানুষের খাদ্য নয়, ফলে আওয়ামী লীগেরও খাদ্য নয়। জামায়াত যতই ভালো হোক, কুমির কি কখনও নিজের স্বভাব বদলাতে পারে? সুতরাং জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সখ্য হওয়ার নয়। হাঙরের কোনো বন্ধু থাকে না। টকশোতে এক ভদ্রলোক যে আওয়ামী লীগাররা জামায়াতের মাংস খাওয়া মাছ ভক্ষণ করবেন বলে উক্তি করেছেন, একথার কোনো বিজ্ঞানসম্মত যুক্তি নেই।
ভদ্রলোক প্রকারান্তরে স্বীকার করেছেন, সামাজিক অবস্থানের বিচারে নেতার সৃষ্টি হয়। ওই নেতা সামাজিক অবস্থানে থেকেই নিজেকে গড়ে তোলেন। কিন্তু ব্যতিক্রমের কথা তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন। ব্যতিক্রমীরাই সমাজে পরিবর্তন আনতে পারেন, পরিশুদ্ধ নতুন সমাজ তথা রাষ্ট্র গঠনে সক্ষম হন। তবে টকশোতে অংশ নেয়ার সময় তারা কোন দলের সমর্থক পরিষ্কার বোঝা যায়। নিরপেক্ষতার ভান করলেও তারা আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী, ভালো কাজগুলো তাদের চোখে পড়ে না।
বিএনপি চেয়ারপারসন ১৫ আগস্ট শোক দিবসে কেক কেটে আনন্দ-ফুর্তি করেন। এটা তিনি না করলেও পারতেন। জন্মদিন আর ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন আলাদা। আবার খালেদা জিয়া যদি ১৫ তারিখ রাত ১২টার পর ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকেন, তিনি ১৬ তারিখ ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন হিসেবে পালন করতে পারতেন। অন্যদিকে ৯ মাস ১০ দিন মাইনাস করেও তিনি জন্মদিন পালন করতে পারতেন। খামাখা বঙ্গবন্ধুকে খাটো করার এই মানসিকতা জাতির জন্য বড়ই দুর্ভাগ্যজনক। একথাগুলো কি টকশোওয়ালারা অনুধাবন করবেন?
আওয়ামী লীগ সব ভালো করেছে বা করছে একথা আমি দাবি করছি না। একটু সচেতন হলে আরও ভালো করতে পারত। কিন্তু বিএনপি তো দীর্ঘকাল দেশ শাসন করেছে। তারা কেন সমাজ-রাষ্ট্রে পরিবর্তনের বদলে দুঃখ-কষ্ট বয়ে আনলেন? আওয়ামী লীগের বর্তমান কার্যক্রমের জন্য বিএনপি কি শতভাগ দায়ী নয়? খালেদা জিয়ার ছেলেরা যদি হাওয়া ভবন তৈরি না করতেন, দেশের সম্পদ পাচারে জড়িয়ে না পড়তেন, দেশের কি এ অবস্থা হতো? এক চোখে সব দোষ দেখলে তো কিছুই হবে না। দু’চোখে অবস্থা ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ করতে হবে। যারা আওয়ামী লীগ করেন, তারা নিশ্চয়ই অন্ধভাবে কেউ দল সমর্থন বা দল করেন না। নিজের চাওয়ার সঙ্গে দলের চাওয়ার যখন মিল হয়, তখনই ওই ব্যক্তি ওই দলের সমর্থক হন। আওয়ামী লীগের চাওয়ার মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আছে আর আমাদের হৃদয়ে আওয়ামী লীগের চাওয়ার বস্তুগুলো ধারণ করি বলেই আমরা আওয়ামী লীগ করি। যারা স্বাধীনতা মানে না, যারা সংবিধান মানে না, যারা ধর্মনিরপেক্ষতা মানে না, যারা বঙ্গবন্ধুকে জাতির জনক মানে না তারাই ভিন্ন ভিন্ন দল করে এবং তারাই এদেশটাকে পাকিস্তানের আদলে গড়ে তুলতে নানা অরাজক অবস্থার সৃষ্টি করছে এবং টকশো নামক অনুষ্ঠানে সে বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিভেদের জন্ম দিচ্ছে।
নুরুল ইসলাম বিএসসি : সংসদ সদস্য ও কলাম লেখক

বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর by ফারুক উদ্দিন আহমেদ

আজকাল লিখতে খুব কমই উৎসাহবোধ করি। কারণ দেশ ও জনগণের কথা মনে হয় অনেকেরই পছন্দ নয়। তারা টকশোতে কথা বলা ব্যক্তিদের নিশিকুটুম্ব বলেছেন- পত্রিকায় যারা লিখেন তাদের সম্বন্ধেও বিরূপ মন্তব্য করেন। দেশের সবচেয়ে বিজ্ঞ আইনজীবী, সাংবাদিক ও লেখকদের ‘মোটা’, ‘মুই কার খালু’, ‘সুদখোর’, ‘সুবিধাবাদী’ ইত্যাদি নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। অথচ এসব যাদের সম্বন্ধে বলা হয়েছে তারা শুধুই দেশের মঙ্গল চান, জনস্বার্থে কথা বলেন বা বক্তব্য দেন। যারা ক্ষমতায় আছেন তারা নিজেদের অধীনে নির্বাচন করে আবার অনেকদিনের জন্য ক্ষমতায় যেতে চান তাই ‘উন্নয়নের ধারাবাহিকতা’, ‘ভিশন ২০-২০’ ইত্যাদি ভালো ভালো কথা বলেন। অথচ বিগত প্রায় পাঁচ বছরে তারা তাদের বেশির ভাগ নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে পারেননি। কিন্তু তারা যে চেষ্টা করেছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাই শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন খাতে যে বেশকিছু অগ্রগতি হয়েছে- তা তাদের চরম বিরোধী বিএনপির নেতারাও মুখে না বললেও মনে মনে স্বীকার করবেন। বিএনপিকে এটাও স্বীকার করতে হবে যে, ‘মাগুরা’ টাইপের ঘাপলা করলে সরকারি দল বিগত সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে পাঁচটার মধ্যে অন্তত একটিতে জিতত। তবুও বিরোধী দল তাদের কেয়ারটেকার সরকার বা নিরপেক্ষ-নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি থেকে হটছে না। আর সরকারও সে দাবি কিছুতেই মানা হবে না বলে পরিষ্কার বলে দিচ্ছে। অর্থাৎ কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না।
এই বিশ্বাস বা আস্থার অভাবের পরিপ্রেক্ষিতেই কেয়ারটেকার সরকার পদ্ধতির ব্যবস্থা প্রচলিত হয়েছিল এবং মূলত আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থানের কারণে। অর্থাৎ যে অনড় দাবিতে আওয়ামী লীগ কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থা চালু করেছিল সে রকম দাবিই এখন বিএনপি করছে। ইত্যবসরে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছে। কিন্তু যে রায়ে এই সিদ্ধান্ত দেয়া হয়েছিল সেখানেই বলা হয়েছিল প্রয়োজনে আরও দুটি জাতীয় সংসদের নির্বাচন কেয়ারটেকার সরকার ব্যবস্থায় হতে পারে। ইত্যবসরে বর্তমান সরকার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ইত্যাদিতে হাজার হাজার নির্বাচন করে দেখিয়েছে তারা নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারে। কিন্তু সবাই বলছেন এই জিনিস সেই জিনিস না- জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় আর এগুলোতে তা হয় না। আসলেও উপজেলা, পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচিতদের কর্তৃত্ব প্রায় কিছুই নেই। তাছাড়া জেলা পরিষদ নির্বাচন না করে সেখানে সবগুলোতেই সরকারের দলীয় লোকদের কর্তা বানিয়ে রাখা হয়েছে। এসব কোনো দোষের হতো না যদি এরা যোগ্য ও জনদরদি ব্যক্তি হতেন। ঠিক তেমনি ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিভিন্ন পদধারীদের যদি যোগ্যতা ও অতীত রেকর্ড দেখে নিযুক্ত করা হতো তাহলে তাদের পক্ষে এত সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি সম্ভব হতো না। আসলে আওয়ামী লীগের প্রতি বর্তমানে মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার অন্যতম প্রধান কারণ ছাত্রলীগ-যুবলীগের অব্যাহত সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি, যা বন্ধ করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। আগে বিএনপির আমলে হাওয়া-ভবনকেন্দ্রিক যে দলীয়করণ ও দুর্নীতি, এখনও যদি সেরকম চলে মানুষ তাহলে যাবে কোথায়। মানুষ ওদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে আওয়ামী লীগের আশ্রয় নিয়েছিল। এখন সে আশ্রয়ই যদি অনিরাপদ হয় মানুষের যাওয়ার জায়গা কই? তাই সম্প্রতি সব সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে মানুষ বিএনপিকে নয় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে- ভোট দিয়েছে অহংকার, আত্মগরিমা, দুর্নীতি ও দলীয়করণের বিরুদ্ধে।
বর্তমান অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, বড় দুটি রাজনৈতিক দল কোনোটিই পরস্পরকে আস্থায় নিতে পারছে না। তারা এখন কেয়ারটেকার ব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে অনড় অবস্থান নিয়েছে; অথচ পরস্পরের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস থাকলে শুধু একটি ভালো ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠন করলেই সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারত। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও মোসাহেবি করে সম্প্রতি এমন সব পদক্ষেপ নিয়েছে, যাতে বিরোধী দলগুলোর তাদের প্রতি অনাস্থা আরও বেড়েছে। ইত্যবসরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার যা দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠী চায় তা নিয়েও অনেক তেলেসমাতি হয়েছে। বিশেষত প্রতিটি ব্যাপারে অহেতুক বিলম্ব। এ বিচার আরও এক বছর আগে শেষ হলে এখন হয়তো এর বাস্তবায়ন হতো। এসব কি অনেকটা ইচ্ছাকৃত নয়? আল্লাহই মালুম। যেসব বিচারের রায় হয়েছে তা সুপ্রিমকোর্ট হয়ে কবে বাস্তবায়িত হবে কে জানে। বিচার যখন বিলম্বিত হয় তখন ‘বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে’ কবিগুরুর একথাটা আজও চিরদিনের মতোই সত্য। এদিকে এসব বিচারের প্রতিবাদে জামায়াত-শিবির এ পর্যন্ত কতটা হরতাল ডেকেছে তারাও হয়তো ঠিকমতো বলতে পারবে না। পবিত্র রমজান মাসেও তারা লাগাতার চার-পাঁচ দিন হরতাল দিল যা এর আগে কেউ কোনোদিন চিন্তাও করেননি। সবচেয়ে বিপদে পড়েছেন সাধারণ মানুষ যারা ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়ি গিয়েছেন, কারণ জামায়াত-শিবির পবিত্র ঈদুল ফিতরের পরেই পরপর দু’দিন লাগাতার হরতাল ঘোষণা করেছে। ধর্মপ্রাণ মানুষদের অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার এ এক নতুন এবং অতি ধৃষ্ট কৌশল। যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় তাই সাধারণ মানুষ এসব ভোগান্তি থেকে তাদের কাছেই নিষ্কৃতি কামনা করে। যা হোক বিএনপি ও আওয়ামী লীগকে অবশ্যই সমঝোতায় আসতে হবে দেশের মানুষকে শান্তি ও স্বস্তি দেয়ার লক্ষ্যে। রাজনীতি মানেই তো মানুষের কল্যাণ বৃদ্ধি- মানুষের নিরাপত্তাহীনতা ও দুর্ভোগ বাড়ানো নয়- এটা সবাইকে মনে রাখতে হবে। খুন-খারাবি, চাঁদাবাজি ও প্রতিহিংসার রাজনীতি মানুষ চায় না, তাই এখন থামলে ভালো।
ফারুকউদ্দিন আহমেদ : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা

আগামী নির্বাচন কি হচ্ছে, হলে কিভাবে হচ্ছে এবং না হলে? by বদিউর রহমান

আমাদের সংবিধান অনুসারে সাধারণভাবে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। ব্যতিক্রম হিসেবে সামরিক সরকার এলে, জাতীয় দুর্যোগ হলে কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতায় এক-এগারো ধরনের কথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এলে এ নিয়মে ছেদ পড়ে। কখনোবা সাদেক আলী-মার্কা ফেব্র“য়ারি নির্বাচন হলেও আবার পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হয় না। আগাম নির্বাচনের ফায়দা নিতে চাইলেও হয়তো এর ব্যতিক্রম ঘটতে পারে। আমার প্রত্যাশা, প্রতিটি সরকার পাঁচ বছর পূর্ণ করুক এবং কোনো আন্দোলনেও যেন সরকারের মেয়াদ-পূর্ব অবসান না ঘটে। এ প্রত্যাশায় বলীয়ান হয়ে এবং বাজাদের (বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল) অপ্রয়োজনীয় হুমকির অসারতা বিবেচনায় আমরা এবারও যথারীতি আলী (আওয়ামী লীগ) সরকারের মেয়াদান্তে জাতীয় নির্বাচন হবে মর্মে আশাবাদী। কেউ কেউ অবশ্য এই ‘হবে’-কে ‘হতে পারে’ বলতে বেশি আগ্রহী। সভা-সেমিনার এবং ইফতারি-ঈদ মিলনী-প্রচারণার রাজনীতিতে অংশগ্রহণকারী অনেক নেতা-পাতিনেতা এবং সুশীল-কুশীল বা সুজন-কুজনরা হরহামেশা একটা আশংকা প্রকাশ করে আমাদের নির্বাচন সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত অথবা সন্দিহান করে তুলছেন। আমি যেহেতু সব সময় আশাবাদী মানুষ, সেহেতু আমি মনে করি এবং এখনও বিশ্বাস করি, যথারীতি ও যথাসময়ে আগামী নির্বাচন হবে এবং হতে হবে। অতএব আগামী নির্বাচন কি হচ্ছে- এমন প্রশ্নে আমার সোজা জবাব, আগামী নির্বাচন এখন পর্যন্ত বিদ্যমান রাজনৈতিক অবস্থায়ই হচ্ছে।
যারা আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে চলেছেন, তাদের মধ্যে হয়তো দুটি উদ্দেশ্য বিদ্যমান। এক. তারা নির্বাচন হোক তা-ই চান না। এতে তাদের কোনো লুকানো এজেন্ডা হয়তো বাস্তবায়িত হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতায় তারা ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে আনন্দ পেতে চান। তারা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে আগ্রহী নন। তারা অবশ্যই অগণতান্ত্রিক সরকারে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আমি নিজেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় অনেককে সামরিক শাসনে বা অগণতান্ত্রিক এমনকি সাময়িকভাবে স্বীকৃত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বেশ স্বস্তি অনুভব করতে দেখেছি। আমলাদের অনেকে তো ওই ধরনের সরকারের অংশীদার হতেও ভালোবাসেন, আপন-আপনভাবে কাজ করতে বেশ আরাম পান, রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেক অন্যায়-আবদার ও অযৌক্তিক গালাগাল থেকে মুক্তি পান। এটা অবশ্যই এক বড় গবেষণার বিষয়- আমলারা সামরিক শাসন বা অন্য ধরনের অগণতান্ত্রিক সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক ধরনের সরকারে আরাম পান কেন? আমি যতটুকু পর্যবেক্ষণ করেছি তাতে লক্ষ্য করেছি যে, এ ধরনের সরকারগুলোতে আমলাদের কর্তৃত্ব তুলনামূলকভাবে বাড়ে, লেখাপড়া জানা আমলাদের এসব সরকারে কদরও বাড়ে, অসহিষ্ণু প্রকৃতির, মূর্খ প্রকৃতির রাজনৈতিক ‘বেয়াদব’ মন্ত্রী-নেতাদের নির্যাতন-নিপীড়ন এবং অযথা তোষামোদ প্রত্যাশা থেকে আমলারা রক্ষা পান। সুযোগ-সুবিধা ভোগেও আমলারা একটু ভালো শেয়ারিংয়ে যেতে পারেন। মূলত রাজনৈতিক নেতাদের নেতৃত্বের অভাব, জ্ঞানের তুলনামূলক ঘাটতি, অসহিষ্ণু আচরণ, অতিমাত্রায় স্বজনপ্রীতি, দলকানা মনোভাব এবং ন্যায়ানুগ সিদ্ধান্তের কমতি তাদের প্রতি আমলাদের বিরূপ করে তোলে। অপরদিকে রাজনৈতিক সরকারের লাগামহীন দুর্নীতি থেকে রক্ষা পেতেও অন্য শ্রেণী-গোষ্ঠী যথা ব্যবসায়ী-শিল্পপতি, পেশাজীবী এবং আমজনতাও এ ধরনের সরকারকে সাময়িকভাবে পছন্দ করে।
বস্তুত রাজনৈতিক ব্যর্থতাই সামরিক বা অন্য সরকারকে সাময়িকভাবে প্রিয় করে তোলে, যেমনটি আমরা অন্তত তিন-তিনবার দেখেছি- প্রথমবার বঙ্গবন্ধু হত্যার পর জিয়ার সামরিক আমলে, দ্বিতীয়বার এরশাদের সামরিক আমলে এবং তৃতীয়বার ২০০৭-এ এক-এগারোর পর। এ সরকারগুলোর অর্থাৎ অনির্বাচিত বা অগণতান্ত্রিক এ সরকারগুলোর জনপ্রিয়তা প্রাথমিকভাবে, ছয় মাস থেকে এক বছরে, এমন তুঙ্গে থাকে যে তখন তাদের সমর্থনে গণভোট দিলেও তারা জনসমর্থন পেয়ে যাওয়ার অবস্থায় থাকে। রাজনৈতিক সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনে অতিষ্ঠ হওয়ার কারণে জনগণ তখন এসব সরকারের মাঝে ‘মুক্তি’ খোঁজে। কিন্তু এ সরকারগুলোই যখন আবার দুর্নীতিপরায়ণ এবং অযথা কর্তৃত্বপরায়ণ হওয়া শুরু করে, তখন জনগণ আবার সম্বিত ফিরে পায় এবং মুখ ফিরিয়ে নেয়। এ এক কঠিন বাস্তবতা এ দেশে। এত কিছুর পরও সময়ের পরীক্ষায় সেই পাকিস্তান আমল থেকে এ পর্যন্ত বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অজনপ্রিয় হলেও বা হয়ে গেলেও নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের কোনো বিকল্প নেই। সামরিক বা সেনাসমর্থিত যে কোনো অনির্বাচিত সরকারই দেশের জন্য কোনো মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। কারণ বেনাভোলেন্ট ডিক্টেটর পাওয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনি বেনাভোলেন্ট ডিক্টেটররাও পরে আর বেনাভোলেন্ট থাকে না। জনগণও পরিবর্তনে বিশ্বাসী, পরিবর্তনে আশাবাদী এবং পরিবর্তন প্রত্যাশী। এসব বিবেচনায় আমরা আশাবাদী যে আগামী নির্বাচন হচ্ছে।
আগামী নির্বাচন যে হচ্ছে, তার পেছনে আমার যুক্তি পর্যালোচনার দাবি রাখে। কারও কাছে পছন্দ না হওয়া ভিন্ন কথা। নির্বাচন না হওয়ার বা না করার অথবা না হতে দেয়ার অনুঘটক তো এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষত বড় দু’দল আলী ও বাজাদ। আলীর দিকটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে নির্বাচন না করলে তার কী লাভ-ক্ষতি আর করলে কী লাভ-ক্ষতি। নির্বাচন করলে আলী গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অঙ্গীকার বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের বিশ্বাস ধরে রাখতে সক্ষম হবে। তৃণমূল পর্যায়ের সুসংগঠিত ঐতিহ্যবাহী দল হিসেবে এ দলের প্রতি মানুষের আস্থা অন্তত অটুট থাকবে। জনগণের নিকট-অতীতের দুটি ঘটনা থেকে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত আছে, আলী সুযোগ বুঝে সামরিক বা অগণতান্ত্রিক শাসনকেও সমর্থন করে অথবা অন্তত এর বিরোধিতা করে না। আর বাজাদ সরকারের বিরুদ্ধে তেমন পরিবর্তন হলে তো কথাই নেই। যেমন এরশাদের সামরিক আইন জারির সময় আলী কোনো প্রতিবাদ করেনি, কারণ ক্ষমতাটা নেয়া হয়েছিল বাজাদ থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জিয়ার সম্পৃক্ততা নিয়ে এবং আলীকে সাইজ করার জন্য বাজাদ বিকল্প শক্তি হিসেবে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাওয়ায় বাজাদের সঙ্গে আলীর শত্র“তা এবং ভাইস-ভারসা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, এ থেকে পরিত্রাণের আশু সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। জয়-তারেকের প্রজন্ম তেমন কিছু ঘটলে অবশ্য ভিন্ন কথা। আবার বাজাদের পুতুল রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে হটিয়ে তিন ‘উদ্দিনে’র সরকার এলেও আলী খুশি হয় এবং ওই সরকারকে তাদের লগি-বৈঠার আন্দোলনের ফসল বলে দাবি করে। এমন আশা করা হয়তো এখনও অমূলক হবে না যে, ভবিষ্যতেও যদি বাজাদ থেকে অন্য কেউ ক্ষমতা অগণতান্ত্রিকভাবে কেড়ে নেয় তাহলেও আলী শত্র“র শত্র“ বন্ধু বিবেচনায় খুশিই হবে। আলী সব সময় অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও এ ক্ষেত্রে তাদের চরিত্র ভিন্ন। আলী নিজে নির্বাচন না দিয়ে এমন কোনো দায় হয়তো নিতে চাইবে না, কারণ আলী থেকে অন্য কেউ জোর করে ক্ষমতা নিয়ে নিলে বাজাদও একইভাবে হয়তো খুশি হবে। তবে এবারে আলীর ক্ষমতায় থাকাবস্থায় তেমন অবস্থা তার অনুকূলে না ভাবা পর্যন্ত আলী নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতা হস্তান্তরে আগ্রহী হবে। আলী অবশ্যই চাইবে পঞ্চদশ সংশোধনী অনুসারেই নির্বাচন হোক। বাজাদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা আলীর পক্ষে এখন এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। তত্ত্বাবধায়কের দাবিতে এত আন্দোলন আর প্রাণহানির পর আদালতের রায়ের অজুহাতে তড়িঘড়ি করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়ে এখন আবার তাতে ফিরে যাওয়া মানেই জাতীয় নির্বাচনে আলীর নিশ্চিত পরাজয় মেনে নেয়া। তখন আরও অনেকে রাগে-ক্ষোভেও আলীকে ভোট দেবে না। বলবে, এই যদি করবে তাহলে আগে এত নাটক কেন, হরতালে-আন্দোলনে মানুষকে কেন এত কষ্ট দেয়া?
আমি নিজে ফাও তত্ত্বাবধায়ক এখনও সমর্থন করি না। নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনই আমি সমর্থন করি। আলী হেরে গেলেও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচনের আদর্শ স্থাপন করতে পারে এবং তা আলীর জন্য পরবর্তী নির্বাচনেও ইতিবাচক হবে। অতএব আলী নির্বাচন দেবে। না দিলে আলীকে জনগণ বিশ্বাসঘাতকই শুধু বলবে না, ঘৃণাও করবে। সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল হিসেবে আলী নির্বাচন বন্ধ করবে না।
বাজাদের দিক বিবেচনা করলে এটা পরিষ্কার, বাজাদ এখন জয় প্রত্যাশী। বাজাদের জনপ্রিয়তায় নয়, আলীর প্রতি অসন্তোষে নেতিবাচক ভোটে বাজাদ এখন তৃপ্ত। সিটি নির্বাচন ছাড়িয়ে জাতীয় নির্বাচনে তেমন জয়ের হাওয়া বাজাদ দেখছে। তত্ত্বাবধায়ক না দিলেও অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই বাজাদ নির্বাচনে যাবে। না গেলে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় যে বাজাদের পক্ষে আর সম্ভব নয়, সেটা বাজাদও বোঝে। মুখে হুংকার ছাড়লেও বাজাদ বোঝে যে, এবার নির্বাচনে অংশ না নিয়ে আলীকে মাঠ ছেড়ে দিলে পরের মেয়াদেও বাজাদ আর আলীকে উৎখাত করতে পারবে না। বরং ক্রমাগতভাবে ১২ বছর অর্থাৎ একযুগ (২+৫+৫) ক্ষমতার বাইরে থেকে দল টিকিয়ে রাখাই হবে কার্যকর। রাজনীতি করলে ক্ষমতায় যেতে হয়, দলীয় কর্মীদেরও কলাটা-মুলাটা দিতে হয়। ক্ষমতায় না থাকলে এ দেয়া সম্ভব নয়। অতএব, বাজাদও নির্বাচনে যাবে। আমি আশাবাদী, নির্বাচন হচ্ছে। আলী আর বাজাদ নির্বাচনে অংশ নিলে সমস্যাই থাকে না।
এখন প্রশ্নটা হল, কীভাবে হচ্ছে? অবশ্যই আলাদীনের চেরাগের মাধ্যমে বাজাদ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরে পেতে পারে না। ওই দাবি মানা মানে আলীর পরাজয় মেনে নেয়া- তা আগেই বলেছি। অতএব শেখ হাসিনার অধীনে না হলে আপসের মাধ্যমে দু’দলের সমঝোতায় একটা নির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনেই শেষতক শেষরক্ষা হতে হবে। দু’দলই বোঝে যে, তা না হলে আবার রাজনৈতিক পিঠাভাগের জন্য একটা ‘অরাজনৈতিক বানর’ হলেও এসে যেতে পারে, যেমন এক ফখরুদ্দীন এসেছিলেন। এতে ক্ষতি বেশি হবে বাজাদের, কেননা বাজাদ অর্জিত নেতিবাচক জনপ্রিয়তাও হারাবে তখন। এখন বাজাদের রাশি যে অবস্থানে, তাতে হাসিনার অধীনে নির্বাচন হলেও বাজাদের যাওয়া উচিত এবং দেখিয়ে দেয়া দরকার যে, জনগণ এবার তাদের চায়। জনগণ এখন সচেতন ও সতর্ক, ভোট-চুরির সুযোগ এখন নেই। নির্বাচন কমিশন তাদের অফিসারকে রিটার্নিং অফিসার করলে, নির্বাচনে সেনাবাহিনী নিয়োজিত থাকলে এবং আগের নিয়মে ব্যালটে ভোট হলে অর্থাৎ ইভিএম ব্যবহার না হলে আর অসুবিধা কোথায়? ফলে মিডিয়া ক্যু এখন কি আর সম্ভব?
আর নির্বাচন না হলে? একটি সম্ভাবনা থাকে মাত্র তখন, যখন আলী পরিপূর্ণ নিশ্চিত হবে যে তারা হেরে যাবে এবং হারটা তারা মানতে চাইবে না, কেবল তখনই আলী নির্বাচন না চাইলে একটা অরাজক অবস্থা সৃষ্টির প্রয়াস নিতে পারে। তখন হয়তো জরুরি অবস্থা জারি বা ভিন্ন কোনো পন্থায় সরে যাওয়ার চিন্তা করতে পারে। তবে আমার বিশ্বাস, আলী তেমন কোনো অপচিন্তায় গিয়ে বিতর্কিত হতে চাইবে না। কেননা তাতে আপাতত বাজাদকে ঠেকানো গেলেও পরে আলীর নিজেকে পুনরুদ্ধার করা আরও কঠিন হবে। তখন ঐকিক নিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।
বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান