Thursday, June 2, 2016

বিশ্বের দীর্ঘতম রেল সুড়ঙ্গের উদ্বোধন

সুইজারল্যান্ডে নির্মিত বিশ্বের দীর্ঘ ও গভীরতম টানেল ফুঁড়ে
বেরিয়ে আসছে ট্রেন (উপরে)। গোথার্ড বেজ টানেল নামের
এ সুড়ঙ্গটি বুধবার উদ্বোধন করা হয়। ৫৩ দশমিক ৯
কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ টানেলটি উদ্বোধনের সময় মুখোমুখি
কথা বলছেন জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও সুইস
প্রেসিডেন্ট জোহান শ্নাইডার আম্মান (ডানে)। ১৭ বছরের
দীর্ঘ পরিশ্রমে ১২ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে তৈরি হয়েছে এটি।
বুধবারের ছবি -রয়টার্স
বিশ্বের দীর্ঘতম ও গভীরতম রেলওয়ে সুড়ঙ্গ উদ্বোধন করল সুইজারল্যান্ড। টানা ১৭ বছর ধরে আল্পস পর্বতমালার মধ্যদিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে রেল চলাচলের এ সুড়ঙ্গ। বিবিসি অনলাইনের এক খবরে বুধবার এ তথ্য জানানো হয়েছে। গথার্ড বেস টানেল নামের এ সুড়ঙ্গের মাধ্যমে উত্তর ও দক্ষিণ ইউরোপের মধ্যে দ্রুত গতির রেলযোগাযোগের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হল। এ টানেলের কারণে ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পণ্য পরিবহন এবং মানুষের ভ্রমণ ব্যয় ও সময় অনেক কমে এল। সুইজারল্যান্ডের এরস্টফেল্ড থেকে বোইডো পর্যন্ত বিস্তৃত এ টানেল।
উদ্বোধন উপলক্ষে টানেলে বিভিন্ন ধর্মের পণ্ডিতদের মাধ্যমে প্রার্থনাসভার আয়োজন করা হয়। সুইজারল্যান্ড জানিয়েছে, এর মাধ্যমে পণ্য পরিবহনে ইউরোপে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হল। এতদিন ভূপৃষ্ঠের রেলওয়ে ব্যবহার করে বছরে লাখ লাখ লরি পণ্য পরিবহন করে আসছিল। এখন তার পরিবর্তে ট্রেনের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন করা হবে। এটি সুইসদের অন্যতম অর্জন বলে আখ্যা দিয়েছেন পরিবহনমন্ত্রী পিটার ফুয়েগলিস্টলার। রয়টার্সকে তিনি জানান, এটি তাদের জন্য পর্বত জয় করার মতো। যেমনভাবে সাগরকে জয় করেছিল ডাচরা।
আগে বিশ্বের দীর্ঘতম রেল টানেল ছিল জাপানের সেইকান রেল টানেল। এর দৈর্ঘ ছিল ৫৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার। কিন্তু সুইজারল্যান্ডের গথার্ড বেস টানেলের দৈর্ঘ ৫৭ দশমিক ১ কিলোমিটার। যে কারণে এটিই এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেল টানেল। আর ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে সংযোগকারী ইউরোটানেল এখন তৃতীয় দীর্ঘতম রেলটানেল। এর দৈর্ঘ ৫০ দশমিক ৫ কিলোমিটার। উদ্বোধনী যাত্রায় বিপরীত দিক থেকে দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন ছাড়া হচ্ছে। উদ্বোধনী যাত্রীরা র‌্যাফেল ড্রয়ের মাধ্যমে টিকিট পেয়েছেন। সুড়ঙ্গের বাইরে দীর্ঘতম রেল টানেলের উদ্বোধন করেন সুইজারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট স্নেইডার আম্মান। এ অনুষ্ঠানে ইউরোপের কয়েকজন শীর্ষ নেতা অংশ নেন।
* গণভোটের মাধ্যমে সুইজারল্যান্ডের জনগণ ১৯৯২ সালে টানেল নির্মাণের অনুমতি দেন।
* টানেল নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৯৬ সালে। নির্মাণকাল ১৭ বছর।
* ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ডলার।
* টানেল নির্মাণে ৪ কোটি ঘন মিটার কনক্রিট ব্যবহার করা হয়েছে।
* ভূপৃষ্ঠ থেকে ২ দশমিক ৩ কিলোমিটার গভীর দিয়ে টানেলটি নির্মিত।
* আল্পস পর্বতমালার ৭৩ ধরনের কঠিন ও নরম পাথর কেটে এটি নির্মাণ করা হয়েছে।
* প্রতিদিন ২৬০টি মালবাহী ট্রেন এবং ৬৫টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করবে।
* একবার ভ্রমণে সময় লাগবে ১৭ মিনিট।
* এ খাতে ২ হাজার ৬০০ লোকের কর্মস্থান হয়েছে।

টিসিবির পণ্য কেনার হিড়িক

ঢাকায় টিসিবির বিক্রয় স্পটে
ক্রেতাদের দীর্ঘলাইন -যুগান্তর
সরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান টিসিবির ভর্তুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি কর্মসূচির শুরুতেই ব্যাপক সাড়া পড়েছে। দুর্মূল্যের বাজারে কম দামের পণ্য পেতে মরিয়া খোদ রাজধানীর ক্রেতারাই। বাজার পরিস্থিতি এতটাই চড়েছে যেখানে টিসিবি পণ্য কিনতে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন অনেক সক্ষম ক্রেতাও। উদ্দেশ্য দুটো পয়সা বাঁচানো। সহজেই বলে দেয়া যায়- নিম্নবিত্ত, দরিদ্র, দিনমজুর কিংবা ভাসমান ক্রেতারা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠছেন কম দামে সরবরাহ করা টিসিবির এ পণ্য কিনতে। সরেজমিন রাজধানীর প্রেস ক্লাব, সচিবালয় গেট, কাপ্তানবাজার, মতিঝিল শাপলা চত্বর, দৈনিক বাংলা মোড়, শান্তিনগর বাজার, ছাপড়া মসজিদ ও পলাশী বাজার ঘুরে এ চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে। হঠাৎ রোদ, থেমে থেমে বৃষ্টি ও ভ্যাপসা গরম উপেক্ষা করে বুধবার এসব স্থানে স্বল্পমূল্যের পণ্য নিতে এসেছেন স্থানীয়দের পাশাপাশি দূর-দূরান্তের নিুআয়ের মানুষও। তবে চাইলেই তো আর স্বল্পমূল্যের পণ্য পাওয়া যায় না। এ জন্য অনেক ঘাম ঝরাতে হয়। দাঁড়াতে হয় দীর্ঘ লাইনে। একসময় নিজের সিরিয়াল এলেও দেখা গেছে, ডাল আছে, তেল নেই। আবার লম্বা লাইনের সারি শেষ হওয়ার আগেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে টিসিবির দৈনিক সরবরাহকৃত পণ্য। একই খবর পাওয়া গেছে, শাহজাহানপুর, বাসাবো, রামপুরা, আগারগাঁও শেওড়াপাড়া বাজার, মিরপুর-১-এর মুক্তিযোদ্ধা মার্কেট,
মোহাম্মদপুর টাউন হল ও ঝিগাতলা কাঁচাবাজারসহ রাজধানীতে টিসিবির কার্যক্রম পরিচালনা করা ৩২টি স্থানেও। জানা গেছে, রমজান উপলক্ষে সারা দেশে ১৭৪টি ট্রাকের মাধ্যমে স্বল্পমূল্যে পণ্য বিক্রি করছে সরকারি সংস্থা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। এর মধ্যে ঢাকায় ৩২টি, চট্টগ্রামে ১০টি, অন্যান্য বিভাগীয় শহরে ৫টি করে এবং জেলা শহরে ২টি করে ট্রাকে পণ্য বিক্রি করছে টিসিবি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মুখে টিসিবির খোলা ট্রাক থেকে পণ্য নিতে আসা জনৈক ভোক্তা কামাল উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য পাওয়া যায়। এ জন্য সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। শেষ পর্যন্ত ভাগ্য সহায় হয়েছে। সিরিয়ালে আমার পালা এলে বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে ২ কেজি ছোলা, ২ কেজি চিনি ও ১ কেজি খেজুর কিনতে পেরেছি। তবে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মসুর ডাল কিনতে পারিনি। আমার পালা আসার আগেই তা শেষ হয়ে গেছে। আজিমপুর ছাপড়া মসজিদসংলগ্ন টিসিবির খোলা ট্রাক থেকে পণ্য নিতে আসা মরিয়ম বেগম বলেন, ‘ভাই শুধু আমি নই, আমার মতো অনেকেই লাইনে দাঁড়াইছিল। তারাও মাল পায় নাই। শুনতাছি কালকেও আইবো। তাই কাল আগেভাগেই আইস্যা লাইনে দাঁড়ামু। কারণ এখান থেকে মাল নিলে বাজার থাইক্যা অনেক কম দামে পাওয়া যায়।’ অভিন্ন সুরেই মন্তব্য করলেন, পুরান ঢাকার নিমতলি থেকে আসা দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘চিনি ও তেল নিতে এখানে আসছিলাম। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও এখন পর্যন্ত তা কিনতে পারিনি। শুনছি আজকের স্টকে আর বেশি মাল নাই।
নিতে হইলে কাল আবার আসতে হবে।’ টিসিবি পণ্য বিক্রেতা জিয়া উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, টিসিবি থেকে ৩০০ লিটার সয়াবিন তেল, ২০০ কেজি ডাল, ৮০০ কেজি ছোলা, ৪০০ কেজি চিনি ও ৫০ কেজি খেজুর সরবরাহ করা হয়। তিনি দাবি করেন, এ পরিমাণ পণ্য ভোক্তার চাহিদার তুলনায় খুবই কম। দুই ঘণ্টা থাকলেই বিক্রি শেষ হয়ে যায় এ কারণে অনেককে খালি হাতে ফিরতে হয়। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে শান্তিনগরের একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘ভাই, টিসিবির পণ্যে মনে হচ্ছে আগের তুলনায় মান ভালো হয়েছে। বিশেষ করে তেল ও ডাল খুবই মানসম্মত। আবার দামও কম। তাই সুযোগ পেয়ে স্বল্পমূল্যের সুযোগ নিলাম এখানে এসে। আমার মতো অনেকেই টিসিবি পণ্য কিনে নিচ্ছে।’ টিসিবি চিনি (দেশী) প্রতি কেজি ৪৮ টাকা, মসুর ডাল ৮৯ দশমিক ৯৫ টাকা, সয়াবিন তেল বোতল (৫ লিটার) প্রতি লিটার ৮০ টাকা, ছোলা প্রতি কেজি ৭০ টাকা ও খেজুর প্রতি কেজি ৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। যা ঢাকার বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি ছোলা ৯০-১০০ টাকা, চিনি ৫৮-৬২, বড় দানার মসুর ডাল ১০০-১১০, বোতলজাত সয়াবিন তেল ৯০-৯৫ টাকা দরে বিক্রি করতে দেখা গেছে। টিসিবির ভ্রাম্যমাণ দোকান থেকে একজন ক্রেতা ৪ কেজি ছোলা, ৫ লিটার তেল, ২ কেজি ডাল , ৩ কেজি চিনি ও ১ কেজি খেজুর কিনতে পারবেন।

অতীত ভোলার ম্যাচ

ফুটবলে বেশ এগিয়েছে মধ্য এশিয়ার দেশ তাজিকিস্তান। বাংলাদেশের তুলনায় তো বটেই। অতীত ইতিহাস তাই বলে। শক্তিশালী এই দলটির বিপক্ষে একবার জিতেছে লাল-সবুজরা। আবার ড্রও করেছে দু’বার। সেই তুলনায় হারের সংখ্যা একটু বেশিই (পাঁচবার)। তবে অতীত ভুলে এবার ভালো কিছু করে দেখানোর স্বপ্ন দেখছেন মামুনুলরা। গুরু যখন ডাচ ডি ক্রুইফ, আর শিষ্যদের নেতৃত্বে মামুনুল- তখন স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বদ্ধপরিকর বাংলাদেশের ফুটবলাররা। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের পর আরও একবার তাজিকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামছে বাংলাদেশ। এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের প্লে-অফ ম্যাচে আজ দুশানবেতে স্বাগতিকদের বিপক্ষে মাঠে নামবে লাল-সবুজের দল। বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় ম্যাচটি শুরু হবে। তাজিকিস্তান নামটা শুনলেই হয়তো মনের পর্দায় দুঃসহ স্মৃতি আর কনকনে ঠাণ্ডা আবহাওয়া ভেসে ওঠে। গত নভেম্বরে অ্যাওয়ে ম্যাচে ০-৫ গোলে বিধ্বস্ত হওয়াটা তো দুঃসহ স্মৃতিই। সেবার লড়তে হয়েছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডার সঙ্গেও।
এবার এর কোনোটিই নেই মামুনুলদের চিন্তায়। কারণ দুশানবেতে এখনকার আবহাওয়া অনেকটাই স্বাভাবিক। আর এবারের লাল-সবুজের দলটিও বেশ উজ্জীবিত। শুনুন বাংলাদেশ দলের ডাচ কোচ ডি ক্রুইফের মুখ থেকেই, ‘ম্যাচটি সামনে রেখে আমরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছি। ফুটবলাররা বেশ উজ্জীবিত এই আবহাওয়ায়। কিছু দিনের জন্য আমি দলের সঙ্গে ছিলাম না। তবে আবার ফিরে এসেছি। বাংলাদেশের ফুটবলে কিছু পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। এবার তাজিকিস্তানে ভালোমানের ফুটবলার সঙ্গে নিয়ে এসেছি। ফল কী হল তা দেখার বিষয় নয়। আমরা ইতিবাচক ফুটবল খেলতে চাই। আমি আশাবাদী, ছেলেরা ভালো কিছু করে দেখাবে।’ এই তাজিকিস্তানের সঙ্গে জুনে ডি ক্রুইফের অধীনে ড্র করলেও লোপেজের তত্ত্বাবধানে নভেম্বরে দুশানবেতে ০-৫ গোলে হেরেছিল বাংলাদেশ। সেটি মনে করিয়ে দিয়ে ডি ক্রুইফ বলেন, ‘ফিফা বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের হোম ম্যাচে ১-১ গোলে ড্র করেছিল বাংলাদেশ, তখন আমি ছিলাম। যেখানে অতিরিক্ত সময়ে গোল হজম করে ড্র করেছিল মামুনুলরা। নইলে জয় নিয়েই মাঠ ছাড়ত তারা। আমি জানি, ১০ বছর ধরে তোমাদের (তাজিকিস্তান) দেশ ফুটবল উন্নয়নে কাজ করছে। আমি জানি, তাজিকিস্তান অনেক শক্তিশালী তাদের ফুটবলারদের দক্ষতার জন্য। কারণ এ ফুটবলাররা রাশিয়ান লীগে খেলে। তবে আমরাও কম যাই না। ম্যাচের শেষ পর্যন্ত দেখতে চাই। লড়াই করতে প্রস্তুত আমার ফুটবলাররা।’ এবার কিছুটা পেশাদারিত্বের সুরেই বলেন এ ডাচম্যান,
‘মনে রাখতে হবে, এটা ফুটবল। যে কোনো কিছুই ঘটতে পারে এখানে। যেমন একটি লাল কার্ডেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যেতে পারে।’ গুরুর এমন কথায় যেন কিছুটা সাহস পেলেন অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম। একই সুর তার কণ্ঠেও, ‘আমাদের দল একটি ভালো অবস্থানে এসেছে। দীর্ঘদিন আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি এবং লড়াই করতে প্রস্তুত। অ্যাওয়ে ম্যাচ সব সময়েই কঠিন সফরকারীদের জন্য। যার প্রমাণ গত দু’বারের দেখায়। প্রথমবার ঢাকায় তাজিকিস্তান হারতে হারতে ড্র করেছিল আমাদের সঙ্গে। দ্বিতীয়বার আমরা তাজিকিস্তানে এসে ০-৫ গোলে হেরেছিলাম।’ তিনি যোগ করেন, ‘তাজিকিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামতে আমরা শংকিত নই। কারণ তাদের আগের সেই মান এখন আর নেই। আমার জানা মতে, তাজিকিস্তানের নুরুদ্দিন অনেক ভালোমানের ফুটবলার। এটা নিশ্চিত যে, আমরা নিজেদের সবটুকু দিয়ে লড়াই করব এ ম্যাচে। আমি বলতে চাই, আমরাও পারি ভালো কিছু করে দেখাতে।’ তাজিকিস্তানের বিপক্ষে কঠিন এক লড়াইয়ে নামার আগে বুধবারও ক্রুইফের তত্ত্বাবধানে অনুশীলন করেছেন মামুনুলরা।
হেড টু হেড
সাল বাংলাদেশ তাজিকিস্তান
২০০৩ ০ ২
০ ২
২০০৬ ১ ৬
২০০৭ ১ ১
০ ৫
২০১০ ২ ১
২০১৫ ১ ১
০ ৫

দুই ভুবনের দুই বাসিন্দা

পূর্ণিমাতে মুগ্ধ হয়েছেন হৃদয় খান। এসএ হক অলিক রচিত ও পরিচালিত ‘ফিরে যাওয়া হলো না’ টেলিফিল্মে তারা দু’জন প্রথম একসঙ্গে অভিনয় করেছেন। ১ জুন এর শুটিং শেষ হয়েছে। এতে রোদেলা চরিত্রে অভিনয় করেছেন পূর্ণিমা এবং ফাহিম চরিত্রে অভিনয় করেছেন হৃদয় খান। আসছে ঈদে বাংলাভিশনের পর্দায় দেখা যাবে এই জুটিকে। গত বছর ঈদে পূর্ণিমা সর্বশেষ অভিনয় করেছিলেন। বলা যায় প্রায় এক বছর বিরতির পর তিনি অভিনয়ে ফিরেছেন। হৃদয় ও পূর্ণিমার সঙ্গে কথা হচ্ছিল এ নাটকের সেটে বসে। শুটিংয়ের ফাঁকে আড্ডায় মেতে উঠেছেন দু তারকাই। দীর্ঘদিনের কাজের অভিজ্ঞতার বাহারি কথার ফুলঝুরি যেন বেজেই চলছে। এর অনেকটা শুটিং কেন্দ্রিক, আবার কিছুটা পুরনো স্মৃতিচারণ। এমনিতেই চুপচাপ স্বভাবের হৃদয় খান। গান নিয়ে স্টুডিওর চার দেয়ালের ভেতরেই কেটেছে ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সময়। এবার যেন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিলেন। যদিও অনেকটা অনুরোধের ঢেঁকি গেলার মতো অবস্থা ছিল তার। বলেছেন, ‘অলিক ভাই এমনভাবে অনুরোধ করলেন যে, না করতে পারিনি। তাছাড়া ভেবে দেখেছি, নিজেকে নিয়ে কিছুটা এক্সপেরিমেন্টও করা দরকার। সেটাই ঝালিয়ে নিলাম।’ কেমন লাগছে নতুন জীবনে এসে? এমন প্রশ্নের উত্তরে হৃদয় বলেন, ‘ভালো লাগাটা তৈরি করেই এসেছি। না হলে কাজ করতে এসে দুঃশ্চিন্তায় থাকতে হতো। এখন অনেকটা ভালো লাগছে।’ অভিনয়ে নিয়মিত থাকবেন কী না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সেটা নির্ভর করছে আমার কতদিন ভালো লাগে তার উপর। এখনই বলতে পারছি না।’
মাসুদ সেজানের নির্দেশনায় ঈদের নাটক ‘লাভ এ্যান্ড কোং’ নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে পূর্ণিমার অভিনয়ে ফেরা। এতে তার বিপরীতে আছেন মাহফুজ আহমেদ। দীর্ঘ বিরতির পর অভিনয়ে ফেরা প্রসঙ্গে পূর্ণিমা বলেন, ‘সংসার সন্তান নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই নিজের জন্য কিংবা অভিনয়ের জন্য বছরজুড়ে সময় বের করা কঠিনই বৈকি। তবে যেহেতু ঈদ এলে ভালো ভালো স্ক্রিপ্টের সমন্বয় ঘটে, তখন ইচ্ছে করে কাজ করার। সেটারও অনুপাত কিন্তু কম। টানা কাজ করার পক্ষপাতি আমি কখনও ছিলাম না, এখনও নই। ভালো কাজ কম করাই ভালো। এবারের ঈদে যে কয়টি কাজ করছি প্রত্যেকটি কাজই খুব ভালো। আমি আমার কাজগুলো নিয়ে আশাবাদী।’ এরই মধ্যে পূর্ণিমা আনিসুর রহমান মিলনের বিপরীতে তপু পরিচালিত ‘গোপনে’ নাটকের শুটিংয়ের কাজ শেষ করেছেন। এটিও আসছে ঈদে প্রচার হবে। আড্ডা বেশ জমে উঠছিল। নিজেদের অভিনয়ের ফিরিস্তি দিতে ব্যস্ত দুজনা। অভিনয় প্রসঙ্গে হৃদয় খান বলেন, ‘এর আগে অলিক ভাইয়ের দুটো চলচ্চিত্রে গান করেছি। মজা করে তিনি প্রায়ই বলতেন অভিনয় করার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে তার নির্দেশনায় অভিনয় করব এটা ভাবিনি। যাই হোক শেষ পর্যন্ত অভিনয় করছি, এটা আমার জন্য যেমন নতুন অভিজ্ঞতা। ঠিক তেমনি পূর্ণিমা আপুুর সঙ্গে প্রথম কাজ আমার, অনেক ভালো লেগেছে কাজটি করে।’ হৃদয় খান প্রথম অভিনয় করেন মোস্তফা কামাল রাজের নির্দেশনায় ‘রূপকথা’ নাটকে। এতে তার বিপরীতে ছিলেন নুসরাত ইমরোজ তিশা। অভিনয়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে হৃদয় খান বলেন, ‘অভিনয়ের জন্য যখন ক্যামেরার সামনে দাঁড়াই তখন আমার ভেতরে কোনো ভয় কাজ করেনি। কাজের ব্যাপারে আগে থেকেই কিছুটা অভিজ্ঞতা ছিলই। মিউজিক ভিডিও করার সময় কাছ থেকে কাজগুলো দেখা হয়েছে। নাটকে যেমন ডায়ালগের সঙ্গে অ্যাক্টিং করতে হয়। আমার ডায়ালগ দেয়া, কেমন হল এসব নিয়ে তো একটু দুশ্চিন্তা থাকেই। সবকিছু সহজ হয়েছে পরিচালকদের সহযোগিতার কারণেই। দেখি দর্শক কীভাবে তা গ্রহণ করেন।

ফালুজার আংশিক দখল নিল ইরাকি বাহিনী

ইরাকের ফালুজায় সরকারি বাহিনীর হামলায় নড়ে গেছে ইসলামিক
স্টেটের খুঁটি। তিনদিক থেকে সাঁজোয়াযান দিয়ে ঘিরে শহরের
অধিকাংশ জায়গাই নিজেদের দখলে নিয়েছে তারা। দূরদর্শণে
জঙ্গিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েই সাঁড়াশি হামলা
চালায় সরকারি বাহিনী (বামে)। অভিযানে ইরাকী
বাহিনীর সমর্থনে বরাবরের মতোই পাশে ছিল মার্কিন
নেতৃত্বাধীন যৌথবাহিনীর সেনারা (ডানে)। এএফপি
ইসলামিক স্টেটের (আইএস) কব্জায় থাকা ফালুজা শহরের কয়েকটি জেলা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে ইরাকি বাহিনী। শহরটি পুরোপুরি দখল নিতে অভিযান চলছে বলে জানা গেছে। শহরের ভেতরে অবরুদ্ধ প্রায় ৫০ হাজার বেসামরিক মানুষের জন্য ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে সরকারি বাহিনীকে। সোমবার সকাল থেকে শহরটির তিন দিক থেকে হামলা শুরু করে সরকারি বাহিনী। শহরটিতে আইএস-ইরাক বাহিনীর পাল্টাপাল্টি ভয়াবহ সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। ইতিমধ্যে ফালুজার কয়েকটি জেলা ইরাকি বাহিনীর দখলে চলে এসেছে বলে খবর প্রকাশ করেছে দি ইনডিপেনডেন্ট।
আইএস যোদ্ধারা আত্মঘাতী ও গাড়িবোমার সাহায্যে ইরাকি বাহিনীকে প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে নাইমিয়া জেলা পুরোপুরি ইরাকি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ইরাকি বাহিনী। সোমবার দুপুর নাগাদ নাইমিয়ার পুলিশ স্টেশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ইরাকি বাহিনীর দখলে আসে। ইরাকি বাহিনীকে নেতৃত্ব দেয়া লেফটেন্যান্ট জেনারেল আবদেলওয়াহাব আল সাদি বলেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের সহায়তায় ইরাকি বাহিনী ফালুজায় প্রবেশ করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ফালুজায় প্রায় ৫০ হাজার বেসামরিক মানুষ আটকা পড়েছে। তারা ইরাকি সেনাবাহিনী, শিয়া মিলিশিয়া, বিভিন্ন গোষ্ঠীগত সশস্ত্র বাহিনী এবং আইএসের মধ্যে ক্রসফায়ারে পড়তে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আবার আইএস তাদের ‘মানব ঢাল’ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে বলেও আশংকা করা হচ্ছে। ইরাকি বাহিনী আটকা পড়া মানুষকে উদ্ধারে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে বলে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরাকি বাহিনী ফালুজা পুনরুদ্ধার করতে পারলে আইএসের দখলে থাকা আরেক শহর মসুলেও তীব্র হামলা চালাতে পারে ইরাকি বাহিনী। এদিকে আইএস সামরিক এবং অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়ে এখন আত্মঘাতী বোমা হামলার তীব্রতা বৃদ্ধি করেছে।
ফালুজা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরবর্তী রামাদিতে এবং বাগদাদের উত্তরে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছে আইএস। ফালুজার বিস্ফোরণে অন্তত ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছেন। বাগদাদের হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। বাগদাদের শিয়া অধ্যুষিত শাব জেলায় গাড়িবোমা হামলায় ৮ বেসামরিক ও ৪ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। বাগদাদ থেকে ৩১ মাইল দূরবর্তী তারমিয়াহ শহরের বাজারে বোমা হামলায় ৭ বেসামরিক ও ৩ পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আইএসের তৃতীয় মোটরসাইকেল-বোমা বিস্ফোরণ হয় সাদর শহরে। এতে ৩ জন বেসামরিক লোক নিহত হয়েছেন। গত সপ্তাহের সোমবার থেকে বাগদাদের ৪০ মাইল দূরবর্তী আইএসের দখলে থাকা ফালুজা পুনরুদ্ধারে ইরাকের সেনাবাহিনী সামনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে। সেদিনই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের মাধ্যমে ফালুজার অধিবাসীদের শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার অনুরোধ করে ইরাকি সেনাবাহিনী। আর যারা শহর ছাড়তে পারবেন না, তাদের বাড়ির ওপর সাদা পতাকা লাগিয়ে রাখার আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি ইরাকের বিমানবাহিনী ফালুজায় বিমান থেকে লিফলেটও বিতরণ করে। তাতে শহরের বাসিন্দাদের সেনাবাহিনীর তৈরি করা ‘নিরাপদ গলি’ দিয়ে শহরের বাইরে চলে আসার আহ্বান জানানো হয়।

হিলারির মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন প্রক্রিয়াটি হওয়ার কথা ছিল আকর্ষণহীন, সংক্ষিপ্ত এবং আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। বারাক ওবামার মেয়াদ শেষ হলে হিলারি ক্লিনটন দলের মনোনয়ন চাইবেন—এমন অনুমান করা হয়েছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনের সময়ই। সেই মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মাধ্যমে হিলারিকে পরাজিত করে ওবামা বিজয়ী হন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে এক মেয়াদের পর হিলারি ক্লিনটন যে আর প্রশাসনে থাকলেন না, তাকেও বিশ্লেষকেরা তাঁর প্রার্থী হওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বলেই ধরে নিয়েছিলেন। দলের নেতাদের মধ্যে তাঁর প্রতি সমর্থন, ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রার্থী না হওয়ার ইঙ্গিত, দলে অন্য কারও মনোনয়নের ব্যাপারে উৎসাহ না থাকা—এ সবই ছিল তাঁর অনুকূলে; ফলে মনে হচ্ছিল খুব সাদামাটা একটা আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে হিলারি ক্লিনটন মনোনীত হবেন। কিন্তু তাঁকে যে ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স, যিনি কার্যত ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্যও নন, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি ফেলে দেবেন—সেটা অনেকেই ভাবেননি, হিলারি তো ননই। অঙ্কের হিসাবে অবশ্য এখনো বলা যায় যে হিলারির মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত। কেননা, মনোনয়ন পেতে দরকার ২ হাজার ৩৮৩ জন ডেলিগেট আর হিলারির সংগ্রহে নির্বাচিত ডেলিগেট ১ হাজার ৭৬৯ জন রয়েছেন। দলের সুপার ডেলিগেটের ৫৪১ জন তাঁকে সমর্থন দেবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে তাঁর পক্ষে আছেন মোট ২ হাজার ৩১০ জন।
বিপরীত দিকে বার্নি স্যান্ডার্সের পক্ষে আছেন ১ হাজার ৪৯৯ জন ডেলিগেট। সুপার ডেলিগেটদের মধ্যে মাত্র ৪৩ জন তাঁকে সমর্থন দেবেন বলে হয় প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বা অনুমান করা হচ্ছে; ফলে মোট দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৪২ জন। জুন মাসে যে সাতটি অঙ্গরাজ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের ভোট হবে, তাতে যে ৯১৩ জন ডেলিগেট রয়েছেন তার যৎকিঞ্চিৎ হিলারির পক্ষে এলেই তিনি দলের মনোনয়ন পাবেন। তা সত্ত্বেও এখন এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে ২৫ থেকে ২৮ জুলাই ফিলাডেলফিয়ায় অনুষ্ঠেয় সম্মেলনের মাধ্যমেই দলের প্রার্থী চূড়ান্ত হতে হবে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বলা হচ্ছিল যে রিপাবলিকান পার্টির সম্মেলন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক এবং দলের বিভক্তির একটি চিত্র ফুটে উঠবে; এখন কেউ কেউ আশঙ্কা করছেন যে ডেমোক্রেটিক পার্টিকেই হয়তো একটি বিভক্তিসূচক সম্মেলনের মুখোমুখি হতে হবে। বার্নি স্যান্ডার্স যখন প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হন, তখন অনেকেই তাঁকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কেবল এ কারণে নয় যে এতে করে ডেমোক্র্যাটদের প্রাথমিক নির্বাচনের মিডিয়া কাভারেজ দলের জন্য ইতিবাচক হবে, এ কারণেও যে স্বঘোষিত সমাজতন্ত্রী স্যান্ডার্স দলের এজেন্ডায় কিছু উদারনৈতিক বিষয় যুক্ত করতে পারবেন। হিলারি ক্লিনটনের অতীত রেকর্ড থেকে এটা স্পষ্ট ছিল যে তিনি দলের লিবারেলদের চেয়ে মধ্যপন্থী ও ডান-ঘেঁষাদের কাছাকাছি। ফলে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে স্যান্ডার্সের প্রচারণা তাঁকে বাধ্য করবে অন্তত কিছু বিষয়ে লিবারেল অবস্থান নিতে।
এমনকি হিলারির সমর্থকদের একাংশও এই প্রত্যাশা থেকে স্যান্ডার্সের উপস্থিতিকে ইতিবাচক ভেবেছেন। কিন্তু প্রচারণায় নামার পর স্যান্ডার্স আশাতীত সাফল্য লাভ করেন। বার্নি স্যান্ডার্সের এই উত্থানের পেছনে অন্যতম কারণ হচ্ছে সমাজে বিরাজমান অর্থনৈতিক বৈষম্য, বড় আকারের করপোরেশনগুলোর প্রতি রাজনীতিবিদদের পক্ষপাত, রাজনীতিতে লবিস্ট ও বিশেষ স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারীদের প্রভাব এবং পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তনের তাগিদ। এসব বিষয়ই ২০১১ সালে ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’ আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিল। সেই আন্দোলনের শক্তি ছিলেন তরুণেরা। স্যান্ডার্স সহজেই তাঁদের মনোযোগ ও সমর্থন লাভ করতে পেরেছেন। তাঁদের মধ্যে একধরনের উৎসাহ ও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে সক্ষম হওয়ায় তিনি খুব কম সময়ের ভেতরেই হিলারির জন্য বড় রকমের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি মনোনয়নের ব্যাপারেও আশাবাদী হয়ে ওঠেন। যদিও গোড়াতে হিলারি বার্নি স্যান্ডার্সকে ভেবেছিলেন স্বল্প সময়ের প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু কিছু সময়ের মধ্যে তিনি বুঝতে পারেন যে তাঁকে অনেক বিষয়েই স্যান্ডার্সের ভাষায় কথা বলতে হবে। হিলারি স্যান্ডার্সের চেয়ে বেশি ভোট পেলেও তিনি তাঁর সমর্থকদের আগ্রহ তৈরি করার ক্ষেত্রে স্যান্ডার্সের চেয়ে পিছিয়ে আছেন সেটা স্পষ্ট। হিলারির জন্য সমস্যা কেবল সেটাই নয়, সমস্যা হিসেবে হাজির হয়েছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে তাঁর ব্যক্তিগত সার্ভারের মাধ্যমে সরকারি ই-মেইল প্রেরণ বিষয়ে বিচার বিভাগ ও এফবিআইয়ের তদন্ত।
যদিও তাঁর আগেও পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একই ধরনের কাজ করেছেন এবং তিনি সম্ভবত কোনো রকম আইন ভঙ্গ করেননি; তথাপি এ বিষয়টি ক্রমাগতভাবে গলার কাঁটায় রূপ নিচ্ছে। এর কারণ হচ্ছে এ বিষয়ে দেওয়া তাঁর বক্তব্যের মধ্যে অসংগতি ও অস্পষ্টতা। তাঁর দেওয়া উত্তরের ধরনের কারণে হিলারি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, সে বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। আর বাস্তবতা হলো, অতীতে যেসব পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই কাজ করেছেন, তাঁরা কেউই তো আর প্রেসিডেন্ট হতে চাননি। হিলারির নির্বাচনী প্রচারাভিযানে তাঁর সমর্থকদের মধ্যে একধরনের উৎসাহের অভাব লক্ষ করা যায় বলে গণমাধ্যমের যে খবর, সে বিষয়ে সন্দেহের কারণ নেই। কিন্তু তার কারণ বোঝা দরকার। হিলারি কয়েক দশক ধরে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থেকেছেন—ফার্স্ট লেডি হিসেবে, সিনেটর হিসেবে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে। ফলে তাঁকে অনেক কাজে যুক্ত থাকতে হয়েছে এবং এখন সেগুলো থেকে একেবারে ভিন্ন ধরনের কথা তিনি বলতে পারছেন না, তিনি প্রতিশ্রুতি দিলে এই প্রশ্ন করাই সংগত যে কেন তিনি ক্ষমতায় থাকার সময়ে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেননি। বাস্তববাদিতার বিচারে মাপলে হয়তো তাঁর অনেক বক্তব্যই গ্রহণযোগ্য হবে, কিন্তু নির্বাচনী প্রচারাভিযানে সমর্থকেরা চান এমন কথা, যা তাঁদের শিহরিত করবে। ২০০৮ সালে হিলারি ক্লিনটন যত সহজেই পররাষ্ট্রনীতির পরিবর্তনের কথা বলতে পারতেন, ২০১৬ সালে তা বলা তাঁর পক্ষে অসম্ভবপ্রায়। তাহলে কি হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে বার্নি স্যান্ডার্সই শক্তিশালী প্রার্থী হবেন?
এই প্রশ্নের উত্তরে অনেকে সহজেই কিছু জনমত জরিপের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করবেন; যেখানে দেখা যায় যে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে হিলারির চেয়ে স্যান্ডার্স ভালো করছেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, নির্বাচনী যোগ্যতা বা ইলেকটেবিলিটির বিষয়টি ভোটাররা এখন যেভাবে দেখছেন, পাঁচ মাস পর সেভাবেই দেখবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই। অতীতে এ ধরনের পরিস্থিতি সহজেই বদলে গেছে। তদুপরি, এখন পর্যন্ত দেখা গেছে যে ডেমোক্রেটিক পার্টির শক্ত সমর্থক জনগোষ্ঠী কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে হিলারির সমর্থন স্যান্ডার্সের চেয়ে অনেক বেশি। মনে রাখা দরকার, যুক্তরাষ্ট্রের এক বড় এলাকাতেই রক্ষণশীলরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেসব জায়গায় একজন সমাজতন্ত্রী নির্বাচিত হতে পারবেন কি না, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আমরা ধরে নিতে পারি যে এসব দিক বিবেচনায় নিয়েই ডেমোক্র্যাটদের তৃণমূল ভোট দিয়েছে এবং তাদের পছন্দ হিসেবে এগিয়ে আছেন হিলারি ক্লিনটন। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে বার্নি স্যান্ডার্স দলের প্রাথমিক পর্যায়ে তরুণদের আগ্রহী করে তুলেছেন। তাঁদের বাদ দিয়ে, তাঁদের অবজ্ঞা করে ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনীত প্রার্থী এগোতে পারবেন না। ফলে ২০০৮ সালের প্রাথমিকের পরে সাধারণ নির্বাচনে ওবামা ও হিলারি যেভাবে একত্রে কাজ করেছেন, সেভাবেই এবারও এ দুই প্রার্থীকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে; এর অন্যথা হলে তার ফল হবে দলের জন্য নেতিবাচক। কিন্তু গত কয়েক দিনে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে ৭ জুন ছয়টি অঙ্গরাজ্যের ফলাফলে নাটকীয় কিছু না ঘটলেও স্যান্ডার্স তাঁর প্রার্থিতা অব্যাহত রাখবেন এবং সম্মেলনে তাঁর নিষ্পত্তি করতে চাইবেন এই যুক্তিতে যে সুপার ডেলিগেটদের উচিত হবে তাঁর পক্ষে দাঁড়ানো। শুধু তা-ই নয়, তিনি মনে করেন, এই মনোনয়ন প্রক্রিয়া গোড়া থেকেই তাঁর পক্ষে ছিল না। এসব ইঙ্গিতের কারণেই প্রশ্ন, ডেমোক্রেটিক পার্টিকে শেষ পর্যন্ত কি একটি বিভক্তিসূচক সম্মেলন দেখতে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর আমরা পাব ৭ জুনের পরে; আর সেই উত্তর কী হবে তার বেশির ভাগ জানেন বার্নি স্যান্ডার্স। হিলারি ক্লিনটনের দায়িত্ব হচ্ছে এ অবস্থা যাতে না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে ৭ জুনের পরপরই স্যান্ডার্স এবং তাঁর সমর্থকদের দিকে তাঁর হাত প্রসারিত করা।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।

মানুষের হৃদয় জয় করতে হবে

ইরাকের সরকারি বাহিনী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) দখল থেকে ফালুজা শহরটিকে আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার উদ্দেশ্যে মরণপণ লড়াইয়ে নেমেছে। ফালুজা আইএসের দখলে থাকা দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এক দশক ধরে জঙ্গি ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই ফালুজা। এর আগে রামাদিসহ কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শহর আইএসের হাতছাড়া হয়ে গেছে। ২০১৫ সালের মে মাস থেকে আইএস একটিও সফল অভিযান চালাতে পারেনি। এটা প্রায় নিশ্চিত যে এই লড়াইয়ে ইরাকি সরকার ফালুজা শহরের নিয়ন্ত্রণ আবার নিজের হাতে নিতে পারবে। কিন্তু কথা হচ্ছে, এর জন্য কত মূল্য চুকাতে হবে বা তার উদ্দেশ্যই বা কী? ইরাকি সমাজের অনেক গোষ্ঠীর কাছে ফালুজা শহরটি মার্কিন দখলদারির বিরুদ্ধে বিদ্রোহের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিশেষ করে সুন্নি আরবদের কাছে। মহাশক্তিশালী মার্কিন সেনাবাহিনীও তার উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ও গোয়েন্দাসক্ষমতা নিয়েও এই শহর নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খেয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহীদের একরকম সামাল দিতে পারলেও বিদ্রোহ ও বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর মূলোৎপাটন করতে পারেনি। আইএসের জন্ম এই ফালুজা শহরেই। অনেকেই এ কথা জানেন না যে আল-কায়েদা ইন ইরাক বা ইরাকি আল-কায়েদার নতুন রূপ আইএসের আজ বিশ্বব্যাপী যে পরিচিতি, তা সে অর্জন করার বহু আগেই, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসেই ফালুজা শহরটি জিহাদি নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। তার আগে সেখানে মাসের পর মাস রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে।
শহরটির প্রতীকী তাৎপর্যের পরিপ্রেক্ষিতে আইএস যদি ফালুজার ওপর থেকে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারায়, তাহলে সেটা তার জন্য মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক ধাক্কা হবে। সেটা হলে ইরাকি বাহিনী মসুল দখলের জন্য আরও বড় সামরিক অভিযানের আত্মবিশ্বাস পাবে। মসুল হচ্ছে ইরাকে আইএসের প্রধান ঘাঁটি, যেখানে তারা ২০১৪ সালের জুন মাসে ‘খিলাফত’ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু আইএস ও তার যোদ্ধারা, যারা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে ব্যাপকভাবে মিশে আছে, যাদের প্রতি স্থানীয় জনগণের বেশ সমর্থনও আছে, তারা ফালুজার এই যুদ্ধে ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণে কতটা উদ্যোগী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ফালুজার যুদ্ধে আইএস হয়তো সেই পুরোনো স্টাইলের গেরিলা যুদ্ধের কৌশল নিতে পারে, নতুন কোনো বিস্ফোরক অস্ত্র বানাতে পারে এবং ফাঁদ পাততে পারে, যে কৌশলের দ্বারা তারা এই শহরের ওপর বাইরের যেকোনো শক্তির নিয়ন্ত্রণ প্রতিহত করতে পারবে। ফলে ইরাকি সরকার বিজয়ের ঘোষণা দিলেও তা অর্থহীন হয়ে যেতে পারে। ইরাকি সরকার যদি ফালুজা পুনর্দখল করতে পারে, তাহলে বোঝা যাবে, যুদ্ধের পর নতুন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ফালুজা কখন ও কীভাবে আইএস থেকে মুক্ত হবে, সেটা তেমন কোনো বিষয় নয়, কে তাকে মুক্ত করবে, সেটাই আসল কথা। আইএসের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো ও তাকে পরাজিত করার দুটি দিক আছে; একটি সামরিক, অন্যটি রাজনৈতিক। ফালুজার মতো জনপদগুলোর স্থানীয় সুন্নি আরব অধিবাসীরা বাগদাদের শিয়ানিয়ন্ত্রিত সরকারকে বিশ্বাস করে না। কারণ, তাদের বিরুদ্ধে যে পক্ষপাত ও কর্তৃত্বমূলক আচরণের অভিযোগ রয়েছে, সেটা দূর করতে তারা তেমন কিছু করেনি (বিশেষ করে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী নুরি আল-মালিকির জমানায়)। তা ছাড়া শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপগুলোর তৎপরতায় সেখানকার উত্তেজনা বেড়েছে। অভিযোগ আছে, তারা সুন্নি আরবদের ওপর গোষ্ঠীগত নিপীড়ন চালিয়েছে।
ইরাকে সুন্নি আরবদের সংখ্যা নেহাত কম নয়, তাদের অর্থবিত্ত ও প্রভাব-প্রতিপত্তিও উপেক্ষণীয় নয়, আবার তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে একরকম স্বায়ত্তশাসনও ভোগ করে। জানা যায়, ফালুজায় তাদের কার্যক্রমের পরিসর খুবই সীমিত, যদিও মাঠের বাস্তবতা ও জঙ্গিদের ধারণা কিছুটা ভিন্ন। আইএসকে পরাজিত করতে হলে কিছু মৌলিক কাজ করতে হবে, যার মধ্যে রয়েছে প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, সুশাসন নিশ্চিতকরণ ও বিভক্ত সমাজকে এক সূত্রে গাঁথা। অর্থাৎ মাঠে আইএসের সঙ্গে লড়াই করার পাশাপাশি ইরাকি সরকারকে সুন্নি আরবদের হৃদয় ও মন জয় করতে হবে, তাদের দুঃখ-দুর্দশা ঘোচাতে হবে, যেগুলোর মূল অনেক গভীরে প্রোথিত (অনেকেই মনে করে, সরকারের তুলনায় আইএস মন্দের ভালো। সরকার তাদের অবজ্ঞা করে প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে)। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ইরাকের ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়া সরকার ও তার অকার্যকর, দুর্নীতিবাজ ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থায় সেই কাজে সফল হবে, তার সম্ভাবনা খুবই কম। দৃশ্যপটে আইএসের আবির্ভাবের পর থেকে গোষ্ঠীগত উত্তেজনা যেমন বেড়েছে, তেমনি শাসনব্যবস্থা অকার্যকর হতে বসেছে ও আঞ্চলিক মেরুকরণ ঘটেছে। এসব কারণে আইএসের দ্রুত উত্থান ঘটেছে। এটা হলফ করে বলা যায়, এই বিশৃঙ্খল যুদ্ধে ‘খিলাফত’ ও আইএস-শাসিত অঞ্চলের পতন ঘটবে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আইএস শেষ হয়ে যাবে। ইরাকের যেকোনো জায়গায় তাদের সন্ত্রাসী হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে।
অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া।
রাঞ্জ আলালদিন: লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ।

ট্রাম্পের উত্থানের পেছনে

দুই বছর আগে যা মনে হতো অকল্পনীয়, দেড় বছর আগে যা মনে হয়েছিল অসম্ভব, এক বছর আগে যাকে বলা হয়েছিল অচিরেই মিলিয়ে যাওয়ার মতো সাময়িক আলোচনার বিষয়, এখন সেটি হচ্ছে বাস্তবতা। এই বছরের নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হিসেবে কার্যত মনোনীত হয়েছেন দলের বাইরে থেকে আসা কোটিপতি আবাসন ব্যবসায়ী ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৮ থেকে ২১ জুলাই অনুষ্ঠেয় দলের সম্মেলনে তিনিই যে আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত হবেন তা নিয়ে সংশয়ের কারণ নেই। কেননা, দলের মনোনয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ১ হাজার ২৩৭ জন ডেলিগেটের চেয়েও বেশি ডেলিগেটের সমর্থন তাঁর পক্ষে আছে; জুন মাসে পাঁচটি অঙ্গরাজ্যে বাকি যে ৩৩৪ জন ডেলিগেট নির্বাচিত হবেন, তাঁদের সমর্থনের সবটা না হলেও সিংহভাগ তাঁর পক্ষেই যাবে। কেননা, তাঁর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই।
এত দিন যাঁরা ‘ঠেকাও ট্রাম্প’ বলে হুংকার দিয়ে প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন, তাঁরা এখন রণে ভঙ্গ দিয়েছেন। ট্রাম্পের এককালীন প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখন তাঁর প্রতি মৌন বা সরব সমর্থন দিতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। একপর্যায়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে তাঁর মনোনয়নকে কেন্দ্র করে দলে বড় ধরনের বিভক্তি আসবে, সেই আশঙ্কাও কার্যত তিরোহিত হয়েছে বলে অনুমান করা যায়। তার অর্থ অবশ্য এটা নয় যে প্রার্থী হিসেবে তিনি দলের সবার পছন্দের ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন; এ-ও নয় যে তিনি তাঁর কট্টর অবস্থান থেকে সরে এসেছেন।
অভিবাসী, হিস্পানিক ও মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং নারীদের ব্যাপারে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্য ও তাঁর মনোভঙ্গি যে অবমাননাকর এবং তাঁর সঙ্গে যে দেশের এক বড় অংশের নাগরিকেরা একমত নন, সেই বিষয়ে রিপাবলিকান দলের নেতারা অবহিত। এসব বিষয় যে নির্বাচনে তাঁদের দলের জন্য বোঝা হয়ে উঠতে পারে, সেই বিষয়েও তঁাদের একাংশের উপলব্ধি আছে। যে কারণে দলের শীর্ষ নেতাদের একটা বড় অংশ চাইছিলেন না ট্রাম্প মনোনয়ন পান। কিন্তু দলের তৃণমূলে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন এবং সব ধরনের বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও তিনি এখন যেখানে এসে দাঁড়িয়েছেন তাঁকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার আর কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ট্রাম্পের এই নাটকীয় উত্থানের কারণ কী? দায়িত্বশীল আচরণে অনীহ এবং উপর্যুপরি ব্যত্যয় ঘটানো একজন ব্যক্তি যে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী হলেন, সেটা কী করে সম্ভব হলো? তার কারণ অংশত নিহিত আছে দেশের বিরাজমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে, আর অংশত আছে রিপাবলিকান দলের নেতাদের অপরিণামদর্শী আশু সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কৌশলের মধ্যে। প্রথমটিকে আমি বহিঃস্থ কারণ বলে মনে করি, আর দ্বিতীয়টিকে আমার মনে হয় আগুন নিয়ে খেলার পরিণতি। ২০০৮ সালে যে মন্দা দেখা দিয়েছিল তা কাটিয়ে গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হয়েছে এবং ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি বেশি। বেকারত্বের হার কমেছে, কর্মসংস্থানের হারও সন্তোষজনক। কিন্তু অতীতের বিভিন্ন প্রশাসনের অনুসৃত নীতিমালা ও বিশ্বজুড়ে নিও-লিবারেল অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ফল হিসেবে গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্রে অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে।
নিও-লিবারেল অর্থনৈতিক আদর্শ গুটিকয় মানুষ এবং করপোরেশনের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনলেও দেশে দেশে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়ার শিকার হয়েছে সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠী। যুক্তরাষ্ট্রের গরিব মানুষের জন্যও তা সমানভাবে সত্য। অনেকের হয়তো মনে থাকবে যে সেই বৈষম্যের প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই ২০১১ সালে তৈরি হয়েছিল ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট’ বা ‘৯৯ শতাংশ’ আন্দোলন। যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি ইতিবাচক প্রবণতা সত্ত্বেও দেশের গরিব মানুষের একাংশ এখনো এর সুবিধা পায়নি। তাদের অনেকেই এই মন্দার আগে থেকেই ছিল ‘ভালনারেবল’। পরে এই মন্দা এবং তা থেকে বেরিয়ে আসার শ্লথ প্রক্রিয়া তাদের ঠেলে দিয়েছে একেবারে প্রান্তসীমায়। এ অবস্থা মোকাবিলায় ওবামা প্রশাসনের অনেক পদক্ষেপ কার্যকর করা যায়নি ২০১০ সাল থেকে আইনসভা বা কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে। তারা আশু রাজনৈতিক সুবিধা লাভের আশায় ওবামার কার্যক্রমকে ঠেকাতে গিয়ে কংগ্রেসকে এক নিষ্ক্রিয় প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। গত কয়েক দশকে যুক্তরাষ্ট্র যেসব বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে, তাতে অনেক কাজ, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতের অনেক কাজ দেশের বাইরে চলে গেছে। বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনও এর কারণ। এই শ্রেণির মানুষের মধ্যে একধরনের আপাতদৃষ্টে ‘বিদেশিভীতি’ রয়েছে বলেই মনে হয়।
তাদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের সমাজে যে জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন হচ্ছে তাতে শ্বেতাঙ্গরা একসময় সংখ্যালঘুতে পরিণত হবে এবং সেই বহুত্ববাদী সমাজে ‘তাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি’ হারিয়ে যাবে। গত কয়েক দশকে বিশ্বরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমেছে। বর্তমান বিশ্ববাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রের একসময়ের পররাষ্ট্রনীতির আগ্রাসী বৈশিষ্ট্য যেমন পরিবর্তিত হয়েছে, তেমনি ওবামা প্রশাসন তা করতে ততটা আগ্রহী ছিল না। পরিবর্তিত বাস্তবতা বুঝতে অপারগ বা অনীহ মার্কিন নাগরিকদের একাংশ মনে করে যে প্রশাসন স্বেচ্ছায় দেশের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতিকে দুর্বল করে ফেলেছে। রিপাবলিকান দলের সদস্য ও সমর্থকদের বড় অংশ এ জন্য একাধারে ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রশাসন এবং রিপাবলিকান দলের নেতাদের দায়ী করে। আর এই অংশের প্রত্যাশা ছিল এমন এক প্রার্থী, যিনি তাদের এই মনোভঙ্গিকে কোনো রকম রাখঢাক না করে তুলে ধরবেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প দলের এই অংশের কাছেই তাঁর আবেদন তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন এবং তাতে তিনি সফলও হয়েছেন। এখানে মনে রাখা দরকার, রিপাবলিকান দলের সবাই এমন মনে করেন বিষয়টি তা নয়। রিপাবলিকান দলের যে সদস্যরা ট্রাম্পকে তাঁদের পছন্দ বলে বেছে নিয়েছেন, তাঁরা শুধু ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর বিরুদ্ধে লড়তে পারেন—এমন একজন প্রার্থী বেছে নিয়েছেন তা-ই নয়, তাঁরা একই সঙ্গে রিপাবলিকান দলের নেতাদের বিরুদ্ধে তাঁদের বিদ্রোহের জানান দিয়েছেন।
তাঁরা জানিয়ে দিয়েছেন যে রিপাবলিকান দলের এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে তাঁরা একমত নন এবং যতই দলের নেতারা ট্রাম্পকে ঠেকাতে চেয়েছেন তৃণমূলের সমর্থকেরা ততই ট্রাম্পের পক্ষেই ঝুঁকেছেন। গত কয়েক মাসে রিপাবলিকান দলের নেতারা যদিও ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মনোনয়নের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরির চেষ্টা করেছেন, কিন্তু নিকট অতীতে তাঁদের বক্তব্য এবং কার্যক্রমই যে ট্রাম্পের উত্থানের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে, সেটা বোঝা দরকার। ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের একাংশের ধারণা হয়েছিল যে তাদের প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জন ম্যাককেইন যথেষ্ট রক্ষণশীল নন, ফলে তাঁরা বিস্ময়করভাবে রক্ষণশীলদের প্রতিনিধি হিসেবে আলাস্কার গভর্নর এবং প্রায় অপরিচিত সারাহ পেলিনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেছে নেন। ওবামা জন্মসূত্রে মার্কিন নন, তিনি ধর্মবিশ্বাসে মুসলিম—এজাতীয় ভিত্তিহীন অপপ্রচারের ব্যাপারে দলের নেতাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থন দলে অতিমাত্রার রক্ষণশীল ও কট্টর দক্ষিণপন্থী ব্যক্তিদের শক্তি জুগিয়েছে। এই ধারার অংশীদারেরাই ২০০৯ সালের গ্রীষ্মকালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রস্তাবিত স্বাস্থ্যবিমা সংস্কারের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান দলের ভেতরে সবচেয়ে সরব এবং সক্রিয় ছিলেন। তাঁরা সেই সময়েই ‘টি-পার্টি’ বলে নিজেদের সংগঠিত করেন এবং দলের প্রবণতাকে আরও দক্ষিণে ঠেলে দেন। এই গোষ্ঠীটি দলের প্রতিষ্ঠিত নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ২০১০ সালে প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটের নির্বাচনে তাদের পছন্দের অনেক ব্যক্তির মনোনয়ন দেওয়াতে সক্ষম হয়। সেই নির্বাচনে রিপাবলিকান দল আশাতীত সাফল্য লাভ করে—আইনসভার দুই কক্ষই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। দলের নেতারা বিজয়ের আনন্দে সম্ভবত এটা বিস্মৃত হন যে এতে করে দলের ওপরে তাঁদের নিয়ন্ত্রণই কেবল দুর্বল হচ্ছে তা নয়, দল আদর্শিকভাবেও কট্টর দক্ষিণপন্থী পথে চলতে শুরু করেছে। ২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় দলের পছন্দের প্রার্থী মিট রমনি অনেক কষ্টে মনোনয়ন পেলেন বটে; কিন্তু বড় আকারের পরাজয় বরণ করলেন। সেই সময়ে দলের প্রতিষ্ঠিত নেতাদের কাছে শিক্ষণীয় বিষয় হলো এবং বারবার তাঁরা বললেনও যে তাঁদের দরকার দলের ভেতরে বৈচিত্র্য আনা, সংখ্যালঘুদের কাছে আবেদন তৈরি করা,
কিছু সামাজিক বিষয়ে অন্ততপক্ষে মধ্যপন্থী অবস্থান নেওয়া। কিন্তু রক্ষণশীলদের জন্য শিক্ষা হলো তাঁদের প্রার্থীর উচিত আরও রক্ষণশীল হওয়া, প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবিত বিষয়গুলো আরও কঠোরভাবে মোকাবিলা করা। দলের নেতারা হয় স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে এ পথেই এগোলেন। ২০১৪ সালের আইনসভার নির্বাচনের ফলাফলের সাফল্য থেকেও এটা স্পষ্ট হলো যে দলের ভেতরে কট্টরপন্থীরা অনেক শক্তিশালী। তারা যখন দলের প্রাথমিক নির্বাচনে প্রতিনিধি সভায় দলের নেতা এরিক ক্যান্টরকে সহজেই হারিয়ে দিল, তখন নেতাদের টনক নড়লেও এবং নির্বাচনের পর এটা বুঝলেও যে এই কট্টর অবস্থান দলের জন্য আদর্শিকভাবে ক্ষতির কারণ হচ্ছে দল ক্রমাগতভাবে অধিবাসী, কৃষ্ণাঙ্গ ও নারীদের সমর্থন হারাচ্ছে তাঁরা এ বিষয়ে খুব বেশি ব্যবস্থা নেননি; বরং তাঁরা ভেবেছেন যে একসময় রাশ টেনে ধরা যাবে। ইতিমধ্যে দলের তুলনামূলক উদার ও মধ্যপন্থীরা দল থেকে ছিটকে পড়েছেন। এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে দলের এস্টাবলিশমেন্ট তাঁদের নিজেদের ক্ষমতাকেই কেবল হারিয়েছেন তা নয়, কট্টরপন্থী ব্যক্তিদের বক্তব্যকেই দলের অবস্থানে পরিণত করেছেন, দলের কর্মীদের একাংশের মধ্যে প্রত্যাশা সৃষ্টি হয়েছে যে তাঁদের প্রার্থীকে হতে হবে কঠোর এবং প্রচলিত রাজনীতিবিদদের মতো হিসেবি নয়। ট্রাম্প এসব প্রত্যাশা পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েই প্রার্থিতা পেয়েছেন। যে আগুন নিয়ে রিপাবলিকান দলের নেতারা খেলেছেন, একার্থে তার ফল হচ্ছে ট্রাম্পের উত্থান। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্তি দেখাতে গিয়ে কট্টরপন্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার ফলে দলের ভেতরে চিড় ধরেছে, দল তার ঐতিহ্য থেকে সরে গিয়ে কট্টর দক্ষিণপন্থী দলে পরিণত হতে চলেছে। এর প্রভাবে মার্কিন সমাজে বিরাজমান বিভক্তি বেড়েছে, সমঝোতা-বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে আরও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যেসব আদর্শ, নীতি এবং প্রবণতাকে প্রতিনিধিত্ব করেন, সেগুলোকে মার্কিন নাগরিকদের অধিকাংশ সমর্থন করেন কি না, তার উত্তরের জন্য আমাদের নভেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
আগামীকাল: হিলারির মনোনয়ন প্রায় নিশ্চিত
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।