Tuesday, September 10, 2019

কেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করে না সিআইএ?

লিবিয়ায় জাতিসংঘ স্বীকৃত সরকারকে উৎখাতের অভিযানে নামা সামরিক কমান্ডারের অর্থ যোগানদাতা হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)। কাতারের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছে যে দেশগুলো, তাদের মধ্যে নেতৃত্বস্থানীয় পর্যায়ে আছে ইউএই। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাত নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা (এনএসএ)-এর সাবেক কর্মীদেরকে হ্যাকার হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে দেশটি। তাদেরই করা কম্পিউটার প্রোগ্রামের মাধ্যমে অনলাইন নজরদারি পরিচালনা করে ইউএই, যার আওতায় মার্কিন নাগরিকরাও পড়েছে।
কিন্তু এ ধরণের মার্কিন স্বার্থ পরিপন্থি কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত থাকা সত্ত্বেও, ইউএই’র বিরুদ্ধে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ নজরদারি চালায় না। সাবেক তিন সিআইএ কর্মকর্তার বরাতে এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। খবরে বলা হয়, সিআইএ গুপ্তচরবৃত্তি বন্ধ করে দিয়েছে এমন নয়। আগে থেকেই ইউএই’র ওপর গুপ্তচরবৃত্তি করে না সিআইএ।
কিন্তু কয়েক দশকে আমূল পাল্টে গেছে ইউএই’র প্রভাব ও চরিত্র। সম্পদশালী এই দেশটি মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা অঞ্চলে বহু যুদ্ধে অর্থায়ন করছে। গোপন অভিযান পরিচালনা করছে। আর্থিক প্রভাব ব্যবহার করে আঞ্চলিক রাজনীতির গতিধারাই দেশটি পাল্টে দিচ্ছে। যার ফলে অনেক সময় মার্কিন স্বার্থও বিঘ্নিত হচ্ছে।
একজন সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা বলেন, ইউএই’র ক্রমবর্ধমান সামরিক ও রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খার সঙ্গে তাল মিলিয়ে সিআইএ’র অবস্থান গ্রহণে ব্যর্থ হওয়াটা অনেকটা কর্তব্য অবহেলার শামিল।
অবশ্য, ইউএই পুরোপুরি এড়িয়ে চলে না মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। যেমন, এনএসএ দেশটির ভেতরে ইলেক্ট্রনিক নজরদারি চালিয়ে থাকে। কিন্তু এ ধরণের নজরদারিতে ঝুঁকি যেমন কম, তেমনি ভালো ফলও আসে কম। এনএসএ’র কর্মকান্ড সম্পর্কে সম্যক অবহিত আছেন এমন দু’জন ব্যক্তি রয়টার্সকে এ কথা জানিয়েছেন। কিন্তু সিআইএ কোনো গুপ্তচরবৃত্তি করে না। বরং, ইউএই’র গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ‘লিয়াজোঁ’ বজায় রেখে চলে সিআইএ। যার ফলে অভিন্ন শত্রু যেমন ইরান ও আল কায়েদা নিয়ে পরস্পরের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করে থাকে দুই সংস্থা। কিন্তু সিআইএ সেখানে ‘মনুষ্য গোয়েন্দা তথ্য’ (হিউম্যান ইন্টিলিজেন্স) সংগ্রহ করে না। অর্থাৎ, সেখানে সিআইএ’র কোনো কর্মী নেই। নেই সরকারের ভেতরে কোনো তথ্যদাতা বা গুপ্তচর। যদিও হিউম্যান ইন্টিলিজেন্সের মাধ্যমেই সবচেয়ে মূল্যবান তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
সিআইএ খুবই অল্প কিছু দেশের ক্ষেত্রেই এভাবে কাজ করে। কথিত ‘দ্য ফাইভ আইজ’ জোটভুক্ত দেশ অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, যুক্তরাজ্য ও কানাডার ক্ষেত্রেই সিআইএ সরাসরি গুপ্তচরবৃত্তি করে না। এই চার দেশ ছাড়া পৃথিবীর যে দেশেই গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন স্বার্থ রয়েছে, সেখানে সিআইএ গোয়েন্দাগিরি চালায়। অনেক ঘনিষ্ঠ মিত্রও এক্ষেত্রে বাদ যায় না।
মধ্যপ্রাচ্যে আরেক প্রভাবশালী মার্কিন মিত্র সৌদি আরব। এই দেশটি তেল যেমন উৎপাদন করে, তেমনি মার্কিন অস্ত্র কিনে থাকে। কিন্তু ইউএই’র ওপর গোয়েন্দাগিরি না চালালেও, সিআইএ প্রায়ই সৌদি আরবকে টার্গেট করে। কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, অতীতে বেশ কয়েকবার সৌদি গোয়েন্দারা সিআইএ এজেন্টদের ধরে ফেলতে সক্ষম হয়, যারা কিনা সৌদি সরকারের ভেতর থেকে তথ্যদাতা রিক্রুট করার চেষ্টা করছিল। সৌদি গোয়েন্দা সংস্থা প্রকাশ্যে এ ব্যাপারে কিছু করে না। তবে গোপনে ঠিকই সিআইএ’র রিয়াদ স্টেশন চীফের সঙ্গে দেখা করে ওই সিআইএ কর্মকর্তাদের নীরবে দেশ থেকে নিয়ে যেতে বলে।
সাবেক সিআইএ এজেন্ট ও লেখক রবার্ট বায়ের বলেন, ইউএইতে হিউম্যান ইন্টিলিজেন্স না থাকাটা সিআইএ’র একটি ব্যর্থতা। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের রাজপরিবারগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও পারবারিক দ্বন্দ্বের ব্যাপারে সবচেয়ে কার্যকর তথ্য থাকা উচিত সিআইএর কাছে।
‘বেপরোয়া রাষ্ট্র’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, ইউএই’র ভেতর সিআইএ’র গোয়েন্দা তৎপরতা না থাকাটা উদ্বেগজনক। কেননা, ইউএই এখন বেপরোয়া রাষ্ট্রের মতো আচরণ করছে। লিবিয়া, কাতারের মতো কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছাড়াও আফ্রিকাতেও দেশটি তৎপরতা চালাচ্ছে।
সুদানে ইউএই বছরের পর বছর ধরে শ’ শ’ কোটি ডলার দিয়ে প্রেসিডেন্ট ওমর হাসান আল বশিরকে টিকিয়ে রেখেছিল। পরে তাকে পরিত্যাগ করে তার বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটানো সামরিক নেতাদের সাহায্য দেয় ইউএই। ইউএই সমর্থিত নতুন সরকারের নিরাপত্তা বাহিনী জুনে কয়েক ডজন বেসামরিক বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে, যারা কিনা বেসামরিক শাসন ও নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ করছিল। ইউএই আফ্রিকার আরেক দেশ ইরিত্রিয়া ও স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্র সোমালিল্যান্ডেও সামরিক ঘাঁটি বানিয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাবেক ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আপনি হর্ন অব আফ্রিকায় যেখানেই পরখ করতে যাবেন, দেখবেন সেখানে ইউএই আছে।’
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের নির্বাহী পরিচালক সারা লি হোয়াইটসন বলেন, ‘নিকটবর্তী অঞ্চল ছাড়িয়ে বহুদূর অবদি নিজেকে অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি হিসেবে জানান দিয়েছে ইউএই। হোক সেটা সোমালিয়া, ইরিত্রিয়া বা জিবুতি বা ইয়েমেন, ইউএই কোথাও কারও তোয়াক্কা করছে না।’
ইয়েমেনে ইউএই ও সৌদি আরব মিলে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়াইরত জোটের নেতৃত্বে আছে। দেশটির বিমান হামলায় হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে। পাশাপাশি, লাখ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছে। ফলে এক মানবিক সংকটের সূচনা হয়েছে সেখানে। মার্কিন কংগ্রেস সম্প্রতি সৌদি আরব ও ইউএই’র কাছে সমরাস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে একটি প্রস্তাবনা পাস করেছে। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই প্রস্তাবনার ওপর ভেটো দিয়েছেন। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের পর থেকে ইউএই মার্কিন লবিস্টদের পেছনে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার খরচ করেছে।
সিআইএর সাবেক ওই তিন কর্মকর্তার একজন বলেন, শুধু আঞ্চলিক রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের কারণেই ইউএই’র ওপর গুপ্তচরবৃত্তি বাড়ানো প্রয়োজন, তা নয়। ইউএই এখন রাশিয়ার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করছে। গত বছর নিরাপত্তা, বাণিজ্য ও তেল বাজারে পারস্পরিক সহায়তার উদ্দেশ্যে রাশিয়ার সঙ্গে বিস্তৃত একটি কৌশলগত আংশিদারিত্ব চুক্তি সই করে ইউএই। চীনের সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াচ্ছে ইউএই। আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ মোহাম্মদ বিন যায়েদ কার্যত ইউএই’র শাসক। তিনি গত মাসে চীন সফর করেছেন।
তবে কিছু জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউএই’র স্বার্থ এখনও অনেকটাই অভিন্ন। এ কারণেই সেখানে গুপ্তচরবৃত্তির প্রয়োজন বোধ করছে না যুক্তরাষ্ট্র। অবসরপ্রাপ্ত সিআইএ কর্মকর্তা নরম্যান রুলে বলেন, ‘তাদের শত্রু আমাদেরও শত্রু। আবুধাবি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবদান রেখেছে, বিশেষ করে ইয়েমেনে আল কায়েদার বিরুদ্ধে।’
তবে কার্নেগি ফাউন্ডেশনের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বিশেষজ্ঞ জোয়ান ভিট্টোরি বলেন, ‘মার্কিন ও আমিরাতি সরকারের কিছু উদ্দেশ্য অভিন্ন হলেও, দুই দেশের স্বার্থ ক্রমেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। কারণ, ইউএই’র রাজপরিবারের মূল লক্ষ্য হলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা। যখন কোনো শাসকগোষ্ঠী যেকোনো মূল্যে অস্তিত্ব রক্ষা করতে চাইবে, তা যে আমেরিকার স্বার্থের সঙ্গে মিলে যাবে, তা নয়।’

যুদ্ধবাজ ট্রাম্প by ফজলুল কবির

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মানুষটাই হয়তো উসকানিমূলক। কী প্রেম, কী যুদ্ধ, ঘর কিংবা বাহির, সব ক্ষেত্রেই তিনি যা করেন, তা-ই কারও না কারও জন্য উসকানিমূলক হয়ে উঠছে। এর কোনটি তিনি ভেবে করেন, আর কোনটি করেন না তা অবশ্য বলা মুশকিল। কারণ ‘খেয়ালি রাজা’ হিসেবে তো তিনি এরই মধ্যে বেশ নাম কুড়িয়েছেন। হোয়াইট হাউসের ওই ওভাল অফিসে ঢোকার পর থেকে তিনি কত কী না করলেন, একে ধরলেন, তাকে ছাড়লেন, মন্ত্রিপরিষদের সভাকে রীতিমতো বিদূষক সভায় রূপান্তর করে ছাড়লেন। রাজা হয়ে হম্বিতম্বি করলেন এবং করেই যাচ্ছেন। আর তাঁর মন্ত্রী মশাইয়েরা নিজেরা ‘কম কী’ বোঝাতেই যেন আরও সরেস হয়ে মাঠে নামলেন।
এ চলতেই লাগল, কখনো অভিবাসন, কখনো স্বাস্থ্যসেবা, কখনোবা সীমান্ত নিরাপত্তার দোহাইয়ে। গত তিন বছরে আমেরিকা ও সারা বিশ্ব তাঁর এ অসীম ক্ষমতা বেশ মনোযোগের সঙ্গেই প্রত্যক্ষ করেছে। কিন্তু এতেও যেন মন ভরল না। ‘দা আলটিমেট অ্যাটেনশন সিকার’ অভিধা পাওয়া এই প্রেসিডেন্ট এবার বিশ্ব রাজনীতিতেও নিজেকে ‘বেস্ট এভার ডিলমেকার’ প্রমাণে মাঠে নামলেন। নিজের মেয়াদের তৃতীয় বছরে এসেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির সব দৃষ্টি নিজের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করলেন একটি ‘অতি সফল’ উত্তর কোরিয়া চুক্তির মাধ্যমে। এমনকি এই ‘সফল’ চুক্তির জন্য ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার ট্রাম্পেরই পাওয়া উচিত’ বলে প্রচার চালানো শুরু করল তাঁর ঘনিষ্ঠরা।
কিন্তু বিধি বাম। বাম যে, তা অবশ্য নিজ ঘরেই বেশ ভালোভাবে টের পাচ্ছেন তিনি ও তাঁর দল। সে যা হোক, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধুচন্দ্রিমার ঘোর কাটে কাটে করছে অনেক দিন। কিম ট্রাম্প সম্পর্কে অনেক মধু বাণী দিলেও বিনা শর্তে চুক্তিটি মানতে রাজি নন। তিনি তাঁর দেশের নিরাপত্তা চান। বিশেষত চান পরমাণু কর্মসূচি বন্ধের প্রথম ধাপেই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রত্যাহার। বিপরীতে ওয়াশিংটন চায় আগে কর্মসূচি বন্ধ হোক। এই যে ব্যবধান এই ব্যবধানই হচ্ছে সেই লোহার বাসরের ফুটো, যা দিয়ে এরই মধ্যে ঢুকে পড়েছে ভ্লাদিমির পুতিনের দেশ রাশিয়া। এটা এই তো কয়েক দিন আগের ঘটনা।
ডোনাল্ড ট্রাম্প কখনো বিকল্পহীন থাকেন না। ‘গ্রেট ডিলমেকার’ হিসেবে সব সময় ‘হাতের পাঁচ’ রেখে দেন তিনি। আর এই হাতের পাঁচ হিসেবেই কিনা কে জানে, একই সময়ে ট্রাম্প নামলেন চীনের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে। এবার তাঁর অস্ত্র শুল্কারোপ। অর্থনীতি বাঁচানোর কথা বলে চীনা পণ্য আমদানিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যে শুল্কারোপ করল, তা বুমেরাং হয়ে নিজের কোম্পানিগুলোকেই আঘাত করল। চীনের পাল্টা আঘাতে বিপর্যস্ত হলেন মার্কিন কৃষকেরাও। কিন্তু জগতের সব ‘ভদ্রলোকের’ মতো ট্রাম্পও এক কথার লোক। তিনি তাঁর কথা থেকে নড়লেন না। চীনের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা চলার মধ্যেই তিনি দ্বিতীয় ধাপে ২০ হাজার কোটি ডলার পণ্যে শুল্কের পরিমাণ বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করেন।
এই পদক্ষেপ যখন নেওয়া হচ্ছে, ঠিক একই সময়ে রণতরি পাঠিয়ে উসকানো হচ্ছে ইরানকে। আর দক্ষিণ আমেরিকার ভেনেজুয়েলার গণতন্ত্রায়ণ নিয়ে জলঘোলা করা হচ্ছে। অথচ তিনি বলেছিলেন, অন্য দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দায় আমেরিকা নেবে না আর। এসবই চলছে একসঙ্গে। কথা হচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প কি সত্যিকার অর্থেই এতগুলো ফ্রন্টে একসঙ্গে লড়তে প্রস্তুত? নাকি নির্বাচনের আগের বছর একটু জলঘোলা করে যেনতেনভাবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পাঁয়তারা করছেন তিনি।
অবশ্য যুদ্ধে উসকানি দেওয়া কিংবা নানাভাবে যুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরি করায় আমেরিকার সুদীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৮৬ সালে আজকের ইরানের মতোই লিবিয়াকে যুদ্ধে নামার উসকানি দিয়েছিল তৎকালীন রোনাল্ড রিগ্যান প্রশাসন। লিবিয়ার তৎকালীন নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে যুদ্ধে টেনে আনতে দেশটির সমুদ্রসীমায় রণতরির সমাবেশ ঘটিয়েছিল আমেরিকা। সেটি যে সুপরিকল্পিত উসকানি ছিল, তা একই বছর লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসের কাছে স্বীকারও করেছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর এক শীর্ষ কর্মকর্তা। বলার অপেক্ষা রাখে না, গাদ্দাফি ওই উসকানির ফাঁদে পা দিয়েছিলেন। লিবিয়ার সমুদ্রসীমায় টহল দেওয়া মার্কিন যুদ্ধবিমান লক্ষ্য করে অন্তত ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিলেন তিনি, যা তাঁর গায়ে একজন আগ্রাসী ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাহীন নেতার তকমা লাগিয়ে দেয়। ফলাফল, লিবিয়ার নৌবাহিনীর টহল জাহাজে মার্কিন হামলা, প্রাণহানি।
যুদ্ধ বাধানোর মার্কিন সক্ষমতা সবচেয়ে বড় উদাহরণ হয়ে আছে ইরাক যুদ্ধ। ২০০৩ সালে ভুয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে দেশটিতে হামলা চালায় তৎকালীন জর্জ বুশ প্রশাসন, যার ক্ষত এখনো বয়ে বেড়াচ্ছে ইরাক। গত ১৬ বছরেও ইরাক স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেনি। এই আগ্রাসনে ইরাক তো ছিন্নভিন্ন হয়েছেই, আমেরিকাও হারিয়েছে অন্তত ৪ হাজার সেনা। ভিয়েতনাম যুদ্ধও সংঘটিত হয়েছিল মার্কিন পক্ষের উসকানির জের ধরেই, যা ৫৭ হাজার মার্কিন সেনা ও ১০ লাখের বেশি ভিয়েতনামি সেনার মৃত্যু দেখিয়েছিল। এখন ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে যে আচরণ করছে, তা সুস্পষ্ট উসকানি হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশ্লেষকেরা। প্রশ্ন হচ্ছে এই উসকানির মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসন কি আরেকটি যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে আমেরিকাকে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেকে যতই ‘গ্রেট ডিলমেকার’ দাবি করুন না কেন শুরু থেকেই বিশ্ব তাঁকে একজন ‘যুদ্ধবাজ’ নেতা হিসেবেই দেখেছে। হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি উত্তর কোরিয়া, ইরান, কিউবাসহ বিভিন্ন দেশের বিরুদ্ধে নানা উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে আসছেন। ২০১৭ সালে ওভাল অফিসে প্রবেশের পরপরই তাঁর তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইকেল ফ্লিন ইরানকে হুমকি দিয়ে রেখেছিলেন। সরাসরি বলেছিলেন, ‘আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানকে সতর্ক করছি।’ ইরানের সঙ্গে হওয়া ছয় জাতি চুক্তি থেকে আমেরিকাকে প্রত্যাহার করে গত বছর এ সতর্কবার্তাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া হয়। আর কিছুদিন আগে পারস্য উপসাগরে রণতরি পাঠিয়ে চূড়ান্ত উসকানিটি দেওয়া হলো। মজার বিষয় হচ্ছে, এই রণতরি পাঠানোর খবরটি কিন্তু পেন্টাগন থেকে আসেনি; এসেছে বর্তমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের দপ্তর থেকে। এর কারণ হিসেবে ‘ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি থেকে হামলার হুমকি রয়েছে’ বলে উল্লেখ করা হলেও সুনির্দিষ্টভাবে কিছুই বলা হয়নি। এই বক্তব্য ও মার্কিন প্রশাসনের অবস্থান নিঃসন্দেহে ইরাক যুদ্ধের পূর্ববর্তী অবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।
ওয়াশিংটন কি তবে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি যুদ্ধ চায়? চাইলে তার কারণ কি? সাবেক বারাক ওবামা প্রশাসনের সবকিছুই পরিত্যাজ্য এমন ধারণা থেকে আর যা-ই হোক একটি যুদ্ধ অন্তত করা যায় না। তাহলে এমন উসকানির পেছনে ঠিক কী কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে উঠে আসছে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার দুই মিত্র সৌদি আরব ও ইসরায়েলের নাম। এ দুই মিত্রেরই প্রতিপক্ষ ইরান। ইসরায়েল ইরানকে শত্রু মনে করে হিজবুল্লাহ প্রশ্নে। আর সৌদি আরবের প্রশ্নটি আধিপত্যকেন্দ্রিক। এ দুটি দেশই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কর্তৃত্ব ধরে রাখতে আমেরিকাকে ব্যবহার করে আসছে। বিশ্ব মোড়ল আমেরিকার ভূমিকা এ অঞ্চলে অনেকটা ভাড়াটে যোদ্ধার মতো।
কথা হচ্ছে, এই সময়ে এসে আরেকটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সামর্থ্য আমেরিকার রয়েছে কিনা। না, সামরিক সামর্থ্যের কথা বলা হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, অর্থনৈতিক সামর্থ্যের কথা। বিশেষত যখন ট্রাম্প প্রশাসন চীনের মতো একটি বৃহৎ শক্তির সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধে নামে, তখন ইরানের সঙ্গে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার কতটা সামর্থ্য তার রয়েছে, সে প্রশ্নটি তোলাই যায়। কারণ, ওয়াশিংটন যতই বলুক বাণিজ্য ঘাটতির সমন্বয়ের জন্য চাপ দিতে চীনকে শায়েস্তা করার পন্থা হিসেবে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করা হয়েছে। কিন্তু সত্য হচ্ছে এই পদক্ষেপে আমেরিকাও কম শায়েস্তা হচ্ছে না। নিজেদের নেওয়া পদক্ষেপ ও চীনের নেওয়া পাল্টা পদক্ষেপে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মার্কিন অর্থনীতিই।
আর অভিবাসন, স্বাস্থ্য, সুরক্ষাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে ঘরের ভেতরেই দুর্বল হয়ে পড়ছে প্রশাসন। সঙ্গে রয়েছে রবার্ট ম্যুলারের প্রতিবেদন, যা সরাসরি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিযোগ না তুললেও এমন বহু তথ্যের সন্নিবেশ ঘটিয়েছে, যা দিয়ে অনায়াসে তাঁকে অভিযুক্ত করা যায়। বিষয়টি নিয়ে বিরোধী ডেমোক্র্যাট দলে বেশ আলোচনা চলছে। সিনেটে ডেমোক্র্যাট নেতা ন্যান্সি পেলোসি এখন পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব উত্থাপন না করার পক্ষে মত দিয়েছেন। এই অবস্থায় বাইরে বলপ্রয়োগকে নিজেদের শক্তি সংহত করার উপায় হিসেবে নিলে, তা বুমেরাং হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। আমেরিকার খেয়ালি রাজা ডোনাল্ড ট্রাম্প এই শঙ্কার সমীকরণটি বুঝবেন, তেমনটা আশা করা যাচ্ছে না। তবে তাঁর অমাত্যরা, নিদেনপক্ষে কংগ্রেস বুঝবে—এ আশা করাই যায়।
>>>ফজলুল কবির: সাংবাদিক

ইসরায়েলি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি হিজবুল্লাহর

গুলি চালিয়ে ইসরায়েলের একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করেছে লেবাননের শিয়া-অধ্যুষিত সংগ্রামী সংগঠন হিজবুল্লাহ গ্রুপ। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের শহর রামিয়াতে আজ সোমবার এই ড্রোনটি ভূপাতিত করা হয়েছে বলে দাবি করেছে হিজবুল্লাহ।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান সমর্থিত সংগঠন হিজবুল্লাহ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ভূপাতিত ড্রোনটি এখন তাদের জিম্মায় আছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, ড্রোনটি লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে এগোচ্ছিল। ‘যথাযথ অস্ত্র’ ব্যবহার করে ড্রোনটিকে ‘মোকাবিলা’ করা হয়েছে।

তবে ড্রোন ভূপাতিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও হিজবুল্লাহর আক্রমণে ভূপাতিত হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে ইসরায়েল। ঠিক কী কারণে ড্রোনটি ভূপাতিত হয়েছে, সে বিষয়েও সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি ইসরায়েল। এক বিবৃতিতে ইসরায়েল জানিয়েছে, ‘রুটিন কার্যক্রম চালানোর সময় লেবাননের অভ্যন্তরে ড্রোনটি ভূপাতিত হয়েছে। তবে ড্রোনটি থেকে কোনো তথ্য পাচার হয়নি।’

আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হিজবুল্লাহর দাবি সত্য হয়ে থাকলে ২০০৬ সালের পর এই প্রথমবারের মতো ইসরায়েলি কোনো ড্রোন ভূপাতিত করল হিজবুল্লাহ। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরায়েল-লেবানন সীমান্তে বেশ কয়েকবার গুলি বিনিময় করেছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। গত সপ্তাহেই ইসরায়েল অভিযোগ করেছিল, লেবাননের বেকা ভ্যালিতে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা তৈরি করছে হিজবুল্লাহ। তবে এমন দাবি পুরোপুরি অস্বীকার করেছে হিজবুল্লাহ।

হিজবুল্লাহকে নিজেদের সীমান্তে সবচেয়ে বড় সামরিক হুমকি মনে করে ইসরায়েল। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর দাবি, হিজবুল্লাহর কাছে ১ লাখ ৩০ হাজার রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্রের বিপুল সংগ্রহ আছে। ২০০৬ সালে সীমান্তে প্রায় মাসব্যাপী সশস্ত্র লড়াইয়ে জড়িয়েছিল ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ।
সাম্প্রতিক সময়ে লেবানন সীমান্তে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ। ছবি: রয়টার্স

কাশ্মীর পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের

মিশেল ব্যাচেলেট
জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান মিশেল ব্যাচেলেট কাশ্মীর পরিস্থিতিতে  গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সোমবার তিনি বলেন, গতমাসে জম্মু- কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদাকে বাতিল করে দেয়ার পরে কেন্দ্রীয় সরকার যেভাবে সে রাজ্যে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে সেসম্পর্কে তিনি 'গভীরভাবে উদ্বিগ্ন'।

মানবাধিকারের পক্ষে জাতিসঙ্ঘের হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেট মানবাধিকার কাউন্সিলের ৪২তম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণে ওই মন্তব্য করেন।

গত এক মাসেরও বেশি সময় ধরে কাশ্মীরে বিভিন্ন বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কঠোরতায় কার্যত রাজ্যটি অবরুদ্ধ হয়ে আছে। সেখানকার নাগরিকরাও ব্যাপক দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধানের উদ্বেগ প্রকাশে বিষয়টি অন্যমাত্রা পেয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

মিশেল ব্যাচেলেট বলেন, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বিধিনিষেধ আরোপ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের আটকে রাখাসহ কাশ্মীরিদের মানবাধিকার নিয়ে ভারত সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের প্রভাব সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।

ব্যাচেলেট বলেন, ‘যদিও আমি ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সরকারকেই  মানবাধিকারকে সম্মানিত ও সুরক্ষিত করার জন্য অনুরোধ করে চলেছি,  তবুও আমি বিশেষ করে ভারতের কাছে বর্তমান অবরুদ্ধ পরিস্থিতি বা কারফিউকে সহজ করার জন্য, মৌলিক পরিসেবাগুলোতে মানুষের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার জন্য আবেদন করেছি এবং যেসকল নেতারা আটক রয়েছেন তাঁদের মানবাধিকারের প্রতিও যাতে শ্রদ্ধা জানানো হয় সেই অনুরোধ করছি। এসব বিষয়ে কাশ্মীরের জনগণের সঙ্গে পরামর্শ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা ওই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে তাঁদের ভবিষ্যতের উপরে প্রভাব পড়বে।’

কাশ্মীরের পাশাপাশি অসমের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের প্রধান মিশেল ব্যাচেলেট। তিনি বলেন, অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জিকরণ বা এনআরসির মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে যে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে তা নিয়েও চিন্তিত তিনি।

এব্যাপারে তিনি ভারত সরকারের কাছে আবেদন প্রক্রিয়া চলাকালীন যথাযথ কার্যাবলী নিশ্চিত করতে এবং নির্বাসন বা আটকে রাখা রোধ করতে ও মানুষকে রাষ্ট্রহীন হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা নিশ্চিত করার জন্য আবেদন করেছেন।

যুদ্ধবাজদের এখন পোয়াবারো by ফজলুল কবির

মাস্টার্স অব ওয়ার’ গানে বব ডিলান সুস্পষ্টভাবে অস্ত্রের রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তার গোপন সম্বন্ধটি উন্মোচন করে দিয়েছেন। গানটি অস্ত্রের কারবারিদের কথিত নিরাপত্তার মুখোশটি খুলে দিয়েছে।
স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত গানটিতে তিনি পরাশক্তির দ্বন্দ্বের মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা কোটি মানুষের জীবনকে শঙ্কায় ফেলা বাণিজ্যের ভিতটি দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যা এখনো ভয়াবহভাবে প্রাসঙ্গিক।
অস্ত্রের ঝনঝনানি এ বিশ্বে কখনো থেমেছে কি না বলা মুশকিল। তবে এর শব্দের উচ্চতার তারতম্য নিশ্চয়ই ছিল। ছিল বিভিন্ন অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির তীব্রতার পার্থক্য। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার দোহাইয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সশস্ত্রীকরণ একটি অপরিবর্তনীয় বাস্তবতা।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় এমন অজুহাতে সুস্পষ্টভাবে বিভক্ত দুই শিবিরে এমন সশস্ত্রীকরণের উত্তুঙ্গ রূপ বিশ্ব দেখেছে, যা বিশ্বের মানুষকে নিরাপত্তার বদলে অনিরাপত্তার বোধেই আক্রান্ত করেছে বেশি। সেই সময়টিই যেন আবার ফিরে এসেছে। সারা বিশ্বে সশস্ত্রীকরণ এখন সর্বোচ্চ মাত্রায় চলছে, ভীষণভাবে বেড়েছে সামরিক ব্যয়।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (সিপ্রি) গত ২৯ এপ্রিল প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈশ্বিক সামরিক ব্যয় গত বছর বেড়ে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ১৯৮৮ সাল থেকে এ-সংক্রান্ত তথ্যের সন্নিবেশ শুরুর পর থেকে এটিই এ খাতে সর্বোচ্চ ব্যয়। আর স্নায়ুযুদ্ধ–পরবর্তী স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ বিশ্বের হিসাবকে গণনায় নিলে এ ব্যয় রীতিমতো চমকে দেয়। কারণ, এ ব্যয় ১৯৯৮ সালের বৈশ্বিক সামরিক ব্যয়ের তুলনায় ৭৬ শতাংশ বেশি।
বৈশ্বিক শক্তিগুলো অবশ্য এই তথ্যকে একটু ভিন্নভাবে দেখতে চায়। তাদের মতে, জিডিপির অংশ হিসেবে গত কয়েক বছরে সামরিক ব্যয় বরং কমেছে। অর্থাৎ আগে বৈশ্বিক জিডিপির যত অংশ সামরিক খাতে ব্যয় করা হতো, এখন তার চেয়ে কম ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু অর্থের অঙ্কে এটি আগের সব হিসাবকে ছাড়িয়ে গেছে, যা সারা বিশ্বে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে রীতিমতো চোখ রাঙাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বন্দ্বই মূলত এই সময়ে বৈশ্বিকভাবে সামরিক ব্যয় এত বিপুলভাবে বাড়ার কারণ। এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত, তা-ই এই সামরিক প্রতিযোগিতার সূচনা করেছে। শুরুটা হয়েছিল অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট এমনিতেই বিপুল ছিল, যা ২০১৮ সালে আরও বাড়ানো হয়। সামরিক ব্যয় একটি সীমার মধ্যে রাখার বিষয়ে কংগ্রেসের আরোপ করা বাধ্যবাধকতা ভেঙে সাত বছরে প্রথমবারের মতো এই ব্যয় বৃদ্ধি সারা বিশ্বকেই নতুন প্রতিযোগিতার বার্তা দেয়। এই বার্তার মূল লক্ষ্য চীন ও রাশিয়া খুব দ্রুত এর পাঠোদ্ধার করে ‘পরাশক্তির প্রতিযোগিতা’য় নেমে পড়ে। ফলাফল হলো ভয়াবহ।
সিপ্রির তথ্যমতে, গত বছর সারা বিশ্বের সামরিক খাতে ব্যয় ছিল ১ লাখ ৮২ হাজার কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। আর এই ব্যয়ের প্রায় অর্ধেকই করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মিলে। এ দুই দেশ মিলে গত বছর সামরিক খাতে ব্যয় করেছে ৮৯ হাজার ৯০০ কোটি ডলার।
অথচ ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব এখনো প্রতিশ্রুতির কাতারেই রয়ে গেছে, যার বাস্তবায়নের জন্য বছরে এর চেয়ে ঢের কম অর্থের প্রয়োজন। দারিদ্র্য বিমোচনের মাধ্যমে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়তে বছরে মাত্র ২৬ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের তহবিল প্রয়োজন বলে উঠে এসেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও, কৃষি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক তহবিল আইএফএডি ও ওয়ার্ল্ড ফুড প্রাইজের গবেষণায়। এই অর্থে সারা বিশ্বের শিশুদের অপুষ্টির সমস্যা মিটিয়ে ফেলা সম্ভব। একই সঙ্গে সব শিশুর শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। এসব তহবিলে অর্থের জোগান সামরিক ব্যয়ের মতো একমুখী কোনো বিষয় নয়। অপুষ্টি ও ক্ষুধামুক্ত জনগোষ্ঠী অনেক বেশি উৎপাদনশীল, যেখানে সামরিক খাত শুধু চোখ রাঙাতেই পারে। আন্তর্জাতিক খাদ্যনীতি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইফপ্রি) এক গবেষণার তথ্য বলছে, শুধু এশিয়াকে ক্ষুধামুক্ত করতে পারলেই এই অঞ্চলের মানুষের উৎপাদনশীলতা এক প্রজন্মের ব্যবধানে এতটাই বাড়বে যে তা বছরে দেড় লাখ কোটি ডলার অর্থনীতিতে যোগ করবে। তারপরও এসব খাতে তহবিল জোগানের প্রশ্নকে এড়িয়ে বিশ্বনেতারা নির্দ্বিধায় সামরিক ব্যয় বাড়িয়ে চলেন। নামেন প্রতিযোগিতায়।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট জানাচ্ছে, ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ছিল ৬৪ হাজার ৯০০ কোটি ডলার, যা ছিল শীর্ষ দশে থাকা আটটি দেশের মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় কাছাকাছি। কিন্তু এটিও সন্তুষ্ট করতে পারেনি পেন্টাগনকে। গত বছর মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পেন্টাগনকে বরাদ্দ করে ৭১ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। এতেও হচ্ছে না। আসছে বাজেটে সামরিক খাতে ৭৫ হাজার কোটি ডলার চাইছে সংস্থাটি। এরই মধ্যে এই চাহিদার অনুকূলে বাজেট বৃদ্ধির প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একমাত্র ইরাক যুদ্ধ ছাড়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট এত বেশি আর কখনো বাড়ানো হয়নি বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন পোস্ট।
এই দিক থেকে চীন কিছুটা পিছিয়েই আছে বলা যায়। সামরিক খাতে দেশটির ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশ থেকে দুই-পঞ্চমাংশের মাঝামাঝি। তাদের মোট সামরিক বাজেট সম্পর্কে সুস্পষ্ট জানার উপায় নেই। চীনের সামরিক ব্যয় কিংবা এর বছরওয়ারি বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের সমতুল্য না হলেও, তা এশিয়ার প্রেক্ষাপটে একধরনের সংকট তৈরি করছে। সিকি শতক ধরেই চীনের সামরিক ব্যয় বাড়ছে, যা এশিয়ায় ক্ষমতার ভারসাম্যে সুস্পষ্ট পরিবর্তন নিয়ে এনেছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রকৃত অর্থে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাজেট ১৭ শতাংশ কমেছিল। একই সময়ে চীনের সামরিক বাজেট বাড়ে ৮৩ শতাংশ। মূলত প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আমলেই চীনের সামরিক বাজেট ব্যাপকভাবে বেড়েছে।
চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক বাজেট নিয়ে ইউএস নেভাল ওয়ার কলেজের অধ্যাপক অ্যান্ড্রু এরিকসন দ্য ইকোনমিস্টকে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের আমলে চীন যে মাত্রায় সামরিক সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে, তা চীনের ইতিহাসেই বিরল। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি উন্নয়ন হয়েছে চীনের নৌবাহিনীর।’
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইআইএসএসের তথ্যমতে, শুধু ২০১৪ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে চীন তার নৌবাহিনীর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটিয়েছে, যা ভারত ও ফ্রান্সের নৌবাহিনীর মিলিত শক্তিকে ছাড়িয়ে গেছে। তারপরও দেশটির জিডিপির বিপরীতে সামরিক খাতে ব্যয় এখন অনেক কম। অন্তত সামরিক শক্তির বিচারে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের জিডিপির বিপরীতে ব্যয়কে বিবেচনায় নিলে, তা-ই বলতে হয়। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে জিডিপির ৩ দশমিক ২ শতাংশ সামরিক খাতে ব্যয় করে, চীন সেখানে করে মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ। এর অর্থ হচ্ছে চীনের সামরিক সম্প্রসারণের আরও বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে, বলার অপেক্ষা রাখে না যা সামষ্টিক শঙ্কাকেই বাড়িয়ে তুলবে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক সম্প্রসারণ বিশ্বের অন্য শক্তিগুলোকেও সামরিক ব্যয় বাড়াতে উদ্বুদ্ধ করছে। বিশেষত চীনের সামরিক সম্প্রসারণ বৃদ্ধিকে হুমকি হিসেবে নিচ্ছে তার এশীয় প্রতিবেশীরা। এমনকি জাপানও তার প্রতিরক্ষা নীতিতে পরিবর্তন এনে একে ঢেলে সাজাতে চাইছে। এ লক্ষ্যে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়েছে জাপান। কারণ হিসেবে তারা চীনকে হুমকি হিসেবে উল্লেখ করছে। চীনের আঞ্চলিক প্রতিযোগী ভারত এরই মধ্যে সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে, যা ইউরোপের দেশগুলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে কিছুদিন আগে হওয়া সীমান্ত বিরোধ এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলবে নিশ্চিতভাবেই। বর্তমান নরেন্দ্র মোদি সরকার পুনর্নির্বাচনের যৌক্তিকতা হিসেবে এই নিরাপত্তার সম্বন্ধটিই সামনে আনছে। নির্বাচনের ফল যেদিকেই যাক না কেন, ভারতের পরবর্তী নেতৃত্ব বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবেন বলা যায়। ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়াও সামরিক ব্যয় বাড়িয়েছে, যা ছিল ২০০৫ সালের পর সর্বোচ্চ। সব মিলিয়ে চীনের পদক্ষেপের কারণে অনেকটা নিভৃতেই এশিয়ায় শুরু হয়ে গেছে সশস্ত্রীকরণ প্রতিযোগিতা। ১৯৮৮ সালে যেখানে এশিয়ার দেশগুলোর বাজেটের ৮ শতাংশ ব্যয় হতো সামরিক খাতে, এখন তা বেড়ে ২৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে বলে জানিয়েছে সিপ্রি।
পিছিয়ে নেই ইউরোপীয় দেশগুলোও। ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলো ২০১৮ সালে সামরিক বাজেট আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ২ শতাংশ বাড়িয়েছে বলে জানিয়েছে আইআইএসএস। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির তথ্যমতে, রাশিয়াকে হুমকি মনে করা পোল্যান্ড গত বছর সামরিক বাজেট ৮ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়িয়েছে। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সামরিক দিক থেকে ইউরোপ সম্মিলিতভাবে বিশ্বের দ্বিতীয় শক্তিধর অঞ্চলে পরিণত হবে, যার শক্তির মাত্রা রাশিয়ার চেয়ে চার গুণ হবে। এই হিসাবটিও নিশ্চয়ই রাশিয়া করছে। ২০১৮ সালে সাড়ে ৩ শতাংশ সামরিক বাজেট কমলেও বিশ্বব্যাপী সামরিকীকরণের এই প্রতিযোগিতায় রাশিয়া চুপ করে বসে থাকার দেশ নয়। ভূরাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় ও সামরিকীকরণের প্রেক্ষাপটকে দেশটি যে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছে, তার একটি বড় প্রমাণ বহন করছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে কিম জং উনের মধ্যকার সাম্প্রতিক বৈঠক।
তবে বৈশ্বিক এই প্রবণতায় একটি বড় ব্যতিক্রম হচ্ছে আফ্রিকা। অঞ্চলটির সামরিক ব্যয় টানা চার বছর ধরে কমছে। সিপ্রির তথ্যমতে, গত চার বছরে আফ্রিকার দেশগুলোর সম্মিলিত সামরিক বাজেট কমেছে ৮ দশমিক ৪ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যও কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। অঞ্চলটির বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইরান সামরিক ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করছে। যদিও আঞ্চলিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে তা শেষ পর্যন্ত কোথায় দাঁড়াবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। বিশেষত ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচন ও তাঁর দেওয়া ‘নিরাপত্তা’ প্রতিশ্রুতির বিপরীতে মধ্যপ্রাচ্য শান্তিপ্রক্রিয়ার গতিমুখের ওপরই পুরোপুরি নির্ভর করছে। এ ক্ষেত্রে এমনকি কাতারের সঙ্গে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন চার আরব দেশের বিরাজমান দ্বন্দ্বের বিষয়টিও বিবেচ্য।
সব মিলিয়ে বিশ্ব আবারও এক ভীষণ অস্ত্র প্রতিযোগিতার কালে প্রবেশ করেছে বলা যায়। ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যযুদ্ধের আবরণে যার সূচনা করেছিলেন, তা এখন খোলাখুলি রণসজ্জার প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি অঞ্চল এই প্রতিযোগিতায় ইতিমধ্যে শামিল হয়েছে। বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যমান ও ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা বলছে, এই প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। এই পুরো প্রতিযোগিতা চলছে নিরাপত্তার মতো একটি অতি জরুরি শব্দের প্রয়োগ ও অজুহাতে। যদিও শাসক প্রযুক্ত এই নিরাপত্তার অজুহাত কখনো সাধারণ মানুষকে নিরাপদ বোধ দিতে পারেনি; দিতে পেরেছে শুধু আরও লাল, আরও প্রকট মৃত্যুর চোখরাঙানি। অস্ত্রের সওদার সঙ্গে মৃত্যুর সওদার কোনো তফাত নেই; একটি আরেকটিকে বাড়িয়ে তোলে, যা আদতে অস্ত্রের কারবারিদের সাম্রাজ্যই বাড়িয়ে তোলে।
ফজলুল কবির: সাংবাদিক

দলিল ও দুর্নীতি সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে: -টিআইবি’র গবেষণা

ভূমি নিবন্ধনে এ অনিয়ম  ও দুর্নীতির বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। দুর্নীতি বিরোধী সংস্থাটির এ প্রতিবেদনে ভুমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। টিআইবি বলছে, এ খাতে দুর্নীতি রোধের চেষ্টা করা হলেও দুর্নীতি কমেনি, বরং আগের চেয়ে বেড়েছে। টিআইবির নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দলিল নিবন্ধন অফিস দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এই সেবায় ক্রমাগত দুর্নীতি বেড়েই চলেছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, দেশব্যাপী কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া দেশের সব দলিল লিখন অফিসের ঘুষ লেনদেন বিষয়টি এখন স্বাভাবিক চিত্র।
অনুষ্ঠানের শুরুতে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন, নিহার রঞ্জন রায় ও শাম্মী লায়লা ইসলাম। এতে বলা হয়, একটি দলিলের নকল তুলতে সেবা গ্রহীতাদের গুনতে হয় ১ থেকে ৭ হাজার টাকা। আর দলিল নিবন্ধনের জন্য দলিল লেখক সমিতিকে চাঁদা দিতে হয় ৫শ’ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। এছাড়াও ভূমির আকার ও এলাকাভেদে এই টাকার পরিমাণ অনেক সময় বেশিও হয়ে থাকে। আর দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে নিয়ম বর্হিভূতভাবে গুণতে হয় ১ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত।
টিআইবি জানায়, দেশের ৮টি বিভাগের ১৬টি জেলার ৪১টি সাবরেজিস্ট্রার অফিস থেকে প্রাপ্ত তথ্য ও জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধন অধিদপ্তর ও অংশীজনদের কাছ থেকে গবেষণার জন্য তথ্য সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় উঠে আসে-২০১৭ সালের জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ৪২.৫ শতাংশ সাব-রেজিস্ট্রার অফিস থেকে সেবা গ্রহণের সময় দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ২৮.৩ শতাংশ গড়ে ১১ হাজার ৮৫২ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। এসব অবৈধ অর্থ ১০/১৫ শতাংশ সাবরেজিস্ট্রার ও বাকী অর্থ অফিসের সকলের মধ্যে পদ অনুযায়ী বাটোয়ারা হয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নিবন্ধন অধিদপ্তরের অধীনে ৩৬ লাখ ৭২ হাজার ৬২৮টি দলিল নিবন্ধন হয়েছে। এর মধ্যে ১২ হাজার ৪৩২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
গবেষণায় একটি উদাহরণ দিয়ে বলা হয়, একটি পৌঁনে ৬ শতক জমির প্রকৃত মূল্য ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। তিনি ৫ লাখ টাকা কমানোর জন্য দেন ৫ লাখ টাকা ঘুষ। আর ফি জমা দেন ৫ লাখ টাকা।
গবেষণায় আরো উঠে আসে, এই ৪১ অফিসের প্রায় অর্ধেক অফিসের কর্মচারীরা সময়মতো অফিসে আসেন না। নকলনবীশদের নিয়োগ এবং দলিল লেখকদের লাইসেন্স পাওয়ার ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ ছাড়া কাজ হয় না। আবার এই সুপারিশ অনেকসময় করে থাকেন মেয়র, সংসদ সদস্য এমনকি মন্ত্রীও। নকলনবীশ হিসেবে নাম তালিকাভুক্তকরণ ২০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। এছাড়াও নকলনবীশ থেকে মোহরার পদে যোগদানে ২ থেকে ৮ লাখ টাকা, মোহরার থেকে সহকারী পদে যোগদানে ৩ থেকে ১০ লাখ, দলিল লেখকের লাইসেন্স প্রাপ্তি ১ থেকে ৩ লাখ টাকা, দলিল লেখক সমিতিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করণে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা আর সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে বদলিতে ৩ থেকে ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়।
গবেষণায় ব্যবহৃত অফিসের ৪১টির মাঝে ২৭টি জরাজীর্ণ ভবনে কাজ চলছে। নকলনবীশদের কাজ করতে হয় ২০/২৫ জনকে এক রুমে। এছাড়া বারান্দা, সিঁড়ির নিচেও কাজ করতে হয় তাদের। আর ৪১ টির মধ্যে ৩২ টি অফিসেই দেখা যায় প্রয়োজনীয় আসবাবপত্রের ঘাটতি। ৩১টি অফিসে সরকার নির্ধারিত ফি’র চার্ট নেই কিংবা দৃষ্টিগোচর নয়।
এক প্রশ্নের জবাবে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এই দুর্নীতি বন্ধ করতে সদিচ্ছা জরুরি। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আর ভূমির ডিজিটালাইজেশন খুবই জরুরি। দিনে দিনে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। এমন ব্যক্তি কমই খুঁজে পাওয়া যায় যিনি দলিল সংক্রান্ত দুর্নীতির শিকার হননি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আইনি জটিলতার কারণেও কিছু অস্পষ্টতা ও বিরোধিতা হয়ে আসছে। হালনাগাদ খতিয়ান সাব-রেজিস্ট্রার অফিসগুলোতে নিয়মিত সরবরাহ হচ্ছে না। এছাড়াও জনবলের ঘাটতি, লজিস্টিকস ও আর্থিক বরাদ্দ এবং দুর্বল অবকাঠামো ও ডিজিটালাইজেশনের ঘাটতি। আর নিয়মবহির্ভুতভাবে সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এই আর্থিক দুর্নীতির সঙ্গে বিভিন্ন অংশে বিভিন্নজনের পারস্পরিক যোগসাজশ থাকায় অভ্যন্তরীন জবাবদিহিতা কাঠামো যৌথভাবে কাজ করছে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, টিআইবি’র ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান সুলতানা কামাল, উপদেষ্টা (নির্বাহী) অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, পরিচালক (রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি) মোহাম্মদ রফিকুল হাসান।

যে কারণে সড়কে মৃত্যু কমছে না by মরিয়ম চম্পা

সড়কে এতো মৃত্যু! প্রতিদিনই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে তালিকা। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হাজারো পরিবারের দীর্ঘশ্বাস কান্না। মিটিং, মিছিল, মানববন্ধন, আন্দোলন কোন কিছুই থামাতে পারছে না সড়কে মৃত্যুর মিছিল। সরকারের নানা উদ্যোগের পরও কেন কমছে না সড়কে এ মৃত্যু? পুলিশ বলছে, সড়ক মহাসড়কে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া দুর্ঘটনা বাড়ার অন্যতম কারণ। দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা কমাতে ছোট গাড়ি কমিয়ে বড় যানবাহনের দিকে নজর দেয়ার পরামর্শ দিচ্ছে তারা।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মতে, দুর্ঘটনা রোধে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না বলেই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে না। এদিকে পুলিশ, বিআরটিএ এবং বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এআরআই) গত চার বছরের পরিসংখ্যান বলছে, এ সময় সড়ক দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি দুটোই বেড়েছে। মহাসড়কে ২০১৫ সালে ১৭৭৩ জন, ২০১৬ সালে ১৭৬৯ জন, ২০১৭ সালে ১৬০১ জন এবং ২০১৮ সালে ১৪৩৯ জন দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন বলে তথ্য দিচ্ছে এআরআই।

ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু কমেনি।
গত এক বছরে ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৯৭ জন। নিহত ব্যক্তিদের প্রায় ৩৮ শতাংশই পথচারী। সড়কে মৃত্যুর এই হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সড়ক দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই)। ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে চলতি বছরের ১ জুলাই পর্যন্ত ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য পর্যালোচনা করে প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ এই হিসাব দিয়েছে। আর এসব মৃত্যুর ঘটনায় হওয়া মামলার তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এই সময়ে শুধু বিমানবন্দর সড়কে মারা গেছেন ৪৬ জন। গত বছর ২৯ জুলাই বিমানবন্দর সড়কে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর বাস তুলে দিয়েছিলেন বেপরোয়া চালক। এতে নিহত হয় কলেজের দুই শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজীব। এ ঘটনার পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামেন স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। তখন সড়কে নৈরাজ্য বন্ধে পুলিশ ও সরকারের অন্যান্য সংস্থা নানা উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেন। আন্দোলনের এক বছর পার হলেও সেগুলোর পুরোপুরি আলোর মুখ দেখেনি। ফেরেনি সড়কে শৃঙ্খলা।

শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চ আদালতের নির্দেশে তদন্ত কমিটি হয়। বুয়েটের এআরআইয়ের পরিচালক মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি উচ্চ আদালতে প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে বলা হয়, ঢাকার সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বিদ্যমান গণপরিবহন ব্যবস্থার বিশৃঙ্খলা দায়ী। গণপরিবহন কমলেও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বাসের একাধিক রুট বিদ্যমান, যা বিজ্ঞানসম্মত নয়। নিয়োগপত্র ছাড়াই দৈনিক চুক্তির ভিত্তিতে চালক নিয়োগ দেয়া হয়। দিন শেষে তেলসহ নানা আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে গিয়ে মারাত্মক চাপে পড়েন চালকরা।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, বছরে বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ লোকের মধ্যে ১৫ দশমিক ৩ জনের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়। এ হিসাবে প্রতিবছর বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যু হয় প্রায় ২৪ হাজার ৯৫৪ জনের। জাতিসংঘ ঘোষিত পঞ্চম বিশ্ব নিরাপদ সড়ক সপ্তাহ উপলক্ষে বাংলাদেশে জাতিসংঘ কার্যালয় তাদের ফেসবুক পেজে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি ‘ইন্টারেকটিভ রিপোর্ট’ প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ‘এক গুচ্ছ ধারাবাহিক জাতীয় সড়ক নিরাপত্তার কৌশলগত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং সমপ্রতি সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছে।’

ডাব্লিউএইচও বলেছে, মানসম্মত হেলমেট সঠিকভাবে পরলে মৃত্যুর ঝুঁকি ৪০ শতাংশ এবং গুরুতর আহত হওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ কমবে। বাংলাদেশে মোটরসাইকেলের সব আরোহীর জন্য মানসম্মত হেলমেট ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা যথাযথভাবে মানা হয় না বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুন নেওয়াজ মানবজমিনকে বলেন, রোড সেফটিতে সরকারের আলাদা করে সেফটি রিলেটেড কোনো ন্যাশনাল প্রোগ্রাম নেই। আমাদের টার্গেট আছে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে কমাতে হবে। কিন্তু সরকারের রোড সেফটি নিয়ে বড় কোনো আলাদা প্রোগ্রাম নেই। ছোট খাটো দু’একটি প্রোগ্রাম থাকলেও ওভাবে ডায়াগ্রাম আকারে নেই। এটার ওপর যে ফান্ড বা খরচ করার প্রক্রিয়া ট্রেনিং, গবেষণায়, যে বাজেট থাকার কথা সেটা কিন্তু নেই। কিছু কিছু এখন শুরু হচ্ছে। টুকটাক কিছু চলমান আছে এতোটুকুই। এক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী গবেষণায় বরাদ্দ নেই।

বুয়েটের এই শিক্ষক মনে করেণ, এক্ষেত্রে একটি কর্ম সফল করতে হলে একটি জাতীয় প্রোগ্রামের উদ্যেগ নিতে হবে। বাজেট দিতে হবে। গবেষণা শুরু করতে হবে। চালককে বেতন কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসতে হবে। চুক্তিভিক্তিক চালনা বন্ধ করতে হবে।

ঢাকা দক্ষিণের এডিসি ট্রাফিক সাউথ মেহেদী হাসান বলেন, এখানে বাস-ট্রাক চালকদের একধরনের দায়িত্ব থাকে। সাধারণ জনগনের, ট্রাফিক পুলিশের এক ধরনের দায়িত্ব থাকে। সকলের সম্মিলিত প্রোয়াসের মাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সবাই যদি আইন সম্পর্কে সচেতন হয় এবং যারা পথচারি তারা যদি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয় তাহলে একত্রে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাছাড়া শুধু ট্রাফিক পুলিশ বা বিআরটিএ-এর পক্ষে এককভাবে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না।

তিনি বলেন, চালকদের প্রোপার ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকতে হবে। তাদেরকে এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। আইন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। একইসঙ্গে আমরা যারা পথচারি তারা যদি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে ট্রাফিক আইন মেনে চলি তাহলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে আমরা পথচারিদের সচেতন করতে সাধারণ জনগনকে নিয়ে প্রচুর মিটিং করি। জেব্রা ক্রোসিং, রেড লাইট ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করি। আমরা এখন অনেক মামলা করি যে সকল গাড়ির কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স ঠিক নেই তাদের বিরুদ্ধে। আমরা আমাদের মতো সচেতন করার চেষ্টা করছি। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকেও এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলছেন, আমাদের সড়কের যে সার্বিক ব্যবস্থাপনা সেখানে দৃশ্যমান কোনো কাজ না করেই মনে করি রাতারাতি সড়ক দুর্ঘটনা কমবে। এই প্রত্যাশাটা পুরণ হওয়া সহজ নয়। আমরা যদি মোটাদাগে বলার চেষ্টা করি তাহলে বলতে হয়, সড়কে আইন প্রয়োগের সিথিলতা বা গাফলতি আছে। যে যার যার আইডেন্টি কার্ড বা পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চলছে। সাংবাদিক গাড়িতে তার স্টিকার লাগিয়ে চলছে। আইনজীবী তার স্টিকার লাগিয়ে চলছে। এ্যাটর্নি জেনারেল সে তার পরিচয়পত্র ব্যবহার করে চলছে। কিন্তু সড়কে চলার ক্ষেত্রে সবার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা থাকার কথা। এক্ষেত্রে নিজের পরিচয় সংক্রান্ত স্টিকার গাড়িতে লাগিয়ে কারো সুবিধা নেয়ার কথা নয়। অন্যদিকে যারা এনফোর্সমেন্টকারী প্রতিষ্ঠান তারা কাউকে অনেক সময় ছাড় দিচ্ছে।
আমরা দেখেছি যে হেলপার থেকে চালক তৈরি হচ্ছে। রাস্তার একপাশ তৈরি হলে অপরপাশ থেকে কার্পেট উঠে যাচ্ছে। যানবাহনের ক্ষেত্রে ফিটনেসবিহীন যানবাহন, নসিমন-করিমন ইজিবাইক যেগুলো মহাসড়কে চলার কথা নয় সেগুলো দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে একত্রে পাল্লা দিয়ে চলছে। কাজেই সড়ক দুর্ঘটনা সংগঠিত হওয়ার জন্য যে সমস্ত উপাদানগুলো প্রোয়োজন তার সবগুলো উপাদান মহাসড়কে নিশ্চিত রেখে আমরা যদি প্রত্যাশা করি রাতারাতি দুর্ঘটনা কমবে তাহলে যা হওয়ার তাই হবে। এটার জন্য প্রয়োজনীয় কার্যকর পদক্ষেপ, মনিটরিং, আইনের কঠোরতম প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরী। মহাসড়ক থেকে অবান্তর যানবাহনগুলো উচ্ছেদ করা জরুরী। এটার প্রধান অন্তরায় একবাক্যে যদি বলা হয় সেটা হচ্ছে, আইন প্রয়োগের সিথিলতা বা গাফলতি। আইনের সঠিক প্রয়োগ থাকলে এটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। উন্নত বিশ্বে এভাবেই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে।

চামড়ার জন্যে এশিয়ান হাতি নিধন বাড়ছে

চামড়ার জন্যে আস্ত হাতির শরীরে চেঁছে ফেলা হয়েছে।
সতর্কবার্তা: এই প্রতিবেদনের কিছু ছবি অনেকের জন্য পীড়াদায়ক হতে পারে।
"আমার এমন অনুভূতি হতে লাগলো যেন কেউ একজন কষে আমার পেটে একটা ঘুঁষি মেরেছে। আমি ছবিটার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। জীবনে এই প্রথমবারের মতো আমি অসহায় বোধ করছিলাম", বলছিলেন মিয়ানমারে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফান্ড ফর নেচার সংস্থাটির প্রধান, ক্রিস্টি উইলিয়ামস।
চামড়া পুরোপুরি চেঁছে ফেলা হয়েছে এরকম একটি মৃত হাতির ছবির কথা বলছিলেন তিনি।
ক্রিস্টি উইলিয়ামস বলছিলেন, "প্রাণীটার সারা শরীরে চামড়া তুলে ফেলা হয়েছে। শুধু দেখা যাচ্ছে পচন ধরা গোলাপি মাংস।"
ক্রিস্টি উইলিয়ামস বলছেন কুড়ি বছর ধরে হাতি সংরক্ষণের কাজ করতে গিয়ে তিনি অনেক কিছু দেখেছেন।
কিন্তু ওই ছবিতে যা দেখেছেন তা একেবারে ভিন্ন মাত্রায় ভয়াবহ।
কোথায় হাতির চামড়ার চাহিদা বেশি?
বিশ্বব্যাপী হাতির জন্য সবচাইতে বড় ঝুঁকির জায়গাগুলোর একটি হল তার আবাসস্থল ধ্বংস করা আর লম্বা সাদা দাঁতের জন্য চোরা শিকারির দ্বারা তাদের নিধন।
হাতির সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য এই দুটি বিষয়কেই মূলত দায়ী করা হয়।
কিন্তু ইদানিং নতুন বিপদ হয়ে এসেছে চামড়ার জন্যে এশিয়ান হাতি শিকার।
১৯৯০-এর দশকে হাতির চামড়ার তৈরি সামগ্রী পাওয়া গিয়েছিলো চীনে।
ইদানিং আরও অনেকগুলো দেশের নাম যুক্ত হয়েছে সেই তালিকায়, যেখানে হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি সামগ্রী জনপ্রিয় হচ্ছে।
বিপন্ন প্রাণী হাতির জন্য বেঁচে থাকা আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংস্থা এলিফ্যান্ট ফ্যামিলির কর্মকর্তা ডেভিড অগেরি বলছেন, "পুরো অঞ্চল জুড়ে হাতির চামড়া দিয়ে তৈরি সামগ্রীর ব্যবসা প্রসার লাভ করছে। বিশেষ করে চীন, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়াতে আমরা তার প্রমাণ পেয়েছি।"
যে কারণে এর চাহিদা বাড়ছে
চীনে হাতির চামড়া দিয়ে এক ধরনের গুড়া তৈরি করা হয়।
সেখানে অনেকেই মনে করেন হাতির চামড়ার ঔষধি গুণাবলী রয়েছে, যা দিয়ে আলসার, পাকস্থলীর প্রদাহ এমনকি ক্যান্সারও নিরাময় করা যায় বলে বিশ্বাস করেন চীনের অনেকে।
হাতির চামড়ার নিচে যে চর্বি রয়েছে তা দিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের ক্রিম যা ত্বকের প্রদাহ নিরাময়ে ঔষধ হিসেবে বিক্রি হয়।
হাতির দাঁত ও চামড়া দিয়ে গহনাও প্রস্তুত হচ্ছে। কিছু দেশে এসব পণ্যের চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে।
চাহিদা বাড়ছে তাই হাতি নিধন বাড়ছে
মিয়ানমারে হাতি নিধনের মাত্রা অনেকে বেড়ে গেছে।
ক্রিস্টি উইলিয়ামস বলছেন, "বিষ মেশানো ডার্ট (তীর) ছুঁড়ে মারা হচ্ছে হাতির দিকে। এই ক্ষেত্রে হাতিটি সাথে সাথে মারা যায় না। বিষের কারণে সৃষ্ট ভয়াবহ যন্ত্রণা নিয়ে হাতিটি কয়েকদিন বেঁচে থাকে।"
এই মৃত হাতিটি পাওয়া গেছে ভিয়েতনামে।
তিনি বলছেন, "এমনও হতে পারে যে হাতিটি পুরোপুরি মারা যাওয়ার আগেই তার শরীরের চামড়া ছাড়ানোর কাজ শুরু হয়ে গেছে। হাতির শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ব্যবসার সাথে জড়িত চোরাকারবারিরা হাতির চামড়ার গুঁড়োর সাথে প্যাঙ্গুলিন বা বনরুই নামের আরেকটি প্রাণীর আঁশ দিয়ে ভেষজ ঔষধ বানাচ্ছে।"
এলিফ্যান্ট ফ্যামিলি বলছে তাদের কাছে এর প্রমাণ রয়েছে।
বিপন্ন প্রাণী
বনরুই একটি বিপন্ন প্রাণী। এশিয়ার হাতিও বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। এশিয়ার ১৩ টি দেশে এশিয়ান হাতি পাওয়া যায়।
তার মধ্যে শুধু ভারতেই এই প্রাণীটির ৬০ শতাংশের আবাসস্থল। আফ্রিকার হাতির মতো এশিয়ার স্ত্রী হাতির লম্বা দাঁত নেই।
চীনে ও মিয়ানমারে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে হাতির চামড়া দিয়ে তৈরি সামগ্রী।
সেই কারণে হাতির দাঁতের জন্য তাদের মারা হয়নি। তাদের অপেক্ষাকৃত কম বিপদগ্রস্ত মনে করা হতো।
কিন্তু চামড়ার চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সেটি আর বলা যাচ্ছে না। এখন সব ধরনের হাতিই মারা পড়ছে।
মিয়ানমারে ২০১০ সাল থেকে ২০১৮ পর্যন্ত ২০৭টি হাতি শিকার করা হয়েছে।
এটিকে ভয়াবহ লক্ষণ বলে বর্ণনা করে এলিফ্যান্ট ফ্যামিলি বলছে, তাদের হিসেবে মিয়ানমারে মোট হাতির সংখ্যাই দুই হাজার।
১৯৪০ এর দশকে সেখানে ১০ হাজারের মতো হাতির বাস ছিল।
কিন্তু সেই সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। মিয়ানমারের বন অধিদপ্তরের প্রধান ড. নি নি ক্যাও বলছেন, ২০১০ সাল থেকে বিষয়টা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাতির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে তৈরি কিছু সামগ্রী।
তিনি বলছেন, "হাতির পুরো শরীরটাই বিক্রি হচ্ছে। চীনে হাতির শুঁড় বেশ জনপ্রিয়। চামড়া দিয়ে তৈরি হচ্ছে গহনা। হাতির মাংসও বিক্রি হচ্ছে।" মিয়ানমারের বিভিন্ন এলাকায় হাতির হাড়গোড় পাওয়া বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।
যেভাবে চলে ব্যবসা
ভিয়েতনামে এরকম হাতির সংখ্যা এখন মোটে ১০০টি।
সেখানে ২০১৩ সালে পুরো চামড়া চেঁছে ফেলা একটি মৃত হাতি পাওয়ার পর সেখানেও যে হাতি আরও বেশি বিপদগ্রস্ত সে সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া গেলো।
যদিও চীনে হাতির চামড়া বা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে তৈরি সামগ্রীর বড় ব্যবসা রয়েছে, কিন্তু চোরা শিকারিদের দ্বারা হাতি নিধন ঠেকাতে চীন তেমন কিছুই করছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে হাতির শরীরের কোন কিছু বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর হয়েছে দেশটি। এর ফলে দোকানে এখন আর এসব পণ্য বিক্রি হয় না।
বিক্রি এবং অর্থ আদানপ্রদান পুরোটাই অনলাইন ভিত্তিক হয়ে গেছে।
একজন বিক্রেতা হাতির লেজ দিয়ে তৈরি পণ্য প্রদর্শন করছেন।
ডেভিড অগেরি বলছেন, অনলাইন ভিত্তিক হয়ে ওঠার কারণে এসব পণ্য বিক্রি প্রতিহত করা মুশকিল হয়ে উঠেছে।
আইইউসিএনের কর্মকর্তা সন্দ্বীপ তুমার তিউয়ারি বলছেন, "হাতির চামড়া, হাতির দাঁত বা আইভরির মতো এতটা দামি নয়। কিন্তু হঠাৎ করে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে যদি হাতির চামড়ার চাহিদা বেড়ে যায় তাহলেই হাতিদের জন্য নতুন করে বিপদ নেমে আসবে।"
গবেষণায় দেখা গেছে এক কিলোগ্রাম হাতির চামড়া মিয়ানমারে ১০৮ ডলারে বিক্রি হচ্ছে। চীনে সেটি ২০০ ডলারে বিক্রি হয়।
হাতির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে তৈরি সামগ্রী যে দামে বিক্রি হয় তাতে শিকার আরও বেড়ে যেতে পারে।
মিয়ানমার সম্প্রতি এই পণ্যের বিক্রির উপরে আরও কড়াকড়ি আরোপ করেছে। চীনও তাকে অনুসরণ করছে। তবে ক্যাম্পেইনাররা বলছেন, এটা যথেষ্ট নয়।
এশিয়ার ১৩ টি দেশে এশিয়ান হাতি পাওয়া যায়।

ভুলের জালে বিএনপি

ক্ষমতার বাইরে থাকার এক যুগের বেশি সময় অতিক্রম করেছে বিএনপি। আগামী অক্টোবরে ক্ষমতা ছাড়ার ১৩ বছর পূর্ণ হবে। গত ১৩ বছরে দলটির নেতৃত্ব ধীরে ধীরে দুর্বলতর বা শূন্য হয়ে পড়ছে। যথাসময়ে যথাসিদ্ধান্ত না নিতে পারাই সব থেকে বেশি চোখে লাগছে। উল্টাপাল্টা সিদ্ধান্ত নেয়ার ফলে দলটির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা মাঝেমধ্যেই বিভ্রান্ত হচ্ছেন। তারা দেখছে, ভুলের নেশায় পেয়ে বসেছে বিএনপিকে। একটার পর একটা ভুল করছে তারা। অনেকে বলেন, ২০০৬ সালে ক্ষমতা ছাড়ার আগে তারা প্রচুর ভুল করেছিল।
কিন্তু সেই ভুলের পাকচক্র থেকে তারা আর বেরুতে পারেনি। বরং আরো বেশি ভুলের চোরাবালিতে আটকা পড়েছে। কেউ বলেন, রাজনীতি আর খেলার মাঠে তফাৎ নেই। মাঠে ভুল হলে তা আর সংশোধন করা যায় না। খেসারত দিতেই হবে। এটা ঠিক যে, তারা অভাবনীয় চাপের সম্মুখীন। বাংলাদেশের মাটিতে এরকমভাবে কোনো রাজনৈতিক দলকে চাপে রাখা সম্ভব, তা এর আগে ভাবা যায়নি। কিন্তু সেই দোহাই দিয়ে বিএনপির ভুল রাজনীতিকে যথার্থতা দেয়া যাবে না।

অনেকের মতে বিএনপি জন্মকালে ঠেকায় পড়ে শাহ আজিজুর রহমানকে প্রধানমন্ত্রী করেছিল। সেই যে, তাদের ট্যাগ লাগলো স্বাধীনতা বিরোধীদের মিত্র করার। এরপর আর কখনই দলটি এই ইমেজ ভাঙার চেষ্টা করলো না। আজ এতকিছুর পরও তারা ভুলের রাজনীতিতে খাবি খাচ্ছে। তারা জামায়াত সঙ্গ ত্যাগ করতে পারছে না। তারা বলেছে বটে- তারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়েছে। কিন্তু তা বিশ্বাসযোগ্যতার সংকটে ভুগছে। তারা বলেছে বটে, জামায়াতের সঙ্গে তাদের আদর্শগত সম্পর্ক নেই। কিন্তু তাও একই সংকটে ভুগছে। ১৯৯১ সালের সংসদে তারা ইনডেমনিটি বাতিলের প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরে এসেছে। জিয়াউর রহমান দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেননি। অথচ এই অপবাদ তাকে নিতে হয়েছে। বিএনপি নেতারা কখনো বিষয়টি পরিষ্কার করেননি। জিয়াউর রহমান কর্নেল ফারুক-রশীদকে রাজনীতি করতে দেননি। দিয়েছেন এরশাদ। জিয়া ফারুককে কোর্ট মার্শালে ৫ বছর জেল ও এক লাখ টাকা জরিমানা দিয়েছিলেন। কিন্তু বিএনপি এই তথ্য কোনোদিন প্রচার করেনি।

২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে বাংলাদেশ পরপর তিনবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। কিন্তু দুর্নীতির দায়ে দলে তারা শুদ্ধি অভিযান চালায়নি। এমনকি কোনো উদ্যোগও নেয়নি। এরপর নিজেরা ২০০৪ সালের ২১শে আগস্টের গ্রেনেড হামলার পরে যা যা করণীয় ছিল তা তারা করেনি। বরং জজ মিয়া নাটকের জন্ম দিয়েছে। এই গ্রেনেড হামলার বিষয়ে বিএনপি কোনো বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারেনি। যদিও বিএনপি বিশ্বাস করে যে, গ্রেনেড হামলায় সংগঠনগতভাবে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। কিন্তু মানুষের কাছে তাদের কোনো বক্তব্য নেই। অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিনের ওপর ভরসা করে তারা ভুল করেছিল। বরং তিনি এমন প্রক্রিয়ায় প্রধান উপদেষ্টা হলেন যা পরে কেয়ারটেকার সরকার বাতিলের অপরাজনীতিকে বৈধতা দেয়ার কাজে লেগেছে। সবশেষ তারা ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নিয়ে ভুল করেছিল বলেই অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ মনে করেন। কিন্তু সেই বয়কট ভুল ছিল কি ঠিক ছিল- সে বিষয়ে বিএনপি বিভক্ত থেকে গেছে। তারা এক সুর ধারণ করতে পারেনি। ২০১৩-২০১৪ সালে পেট্রলবোমার নাশকতায় বিএনপির ভূমিকা কি ছিল, সে বিষয়ে তারা নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করতে পারেনি। গ্রেনেড হামলার পরে পেট্রলবোমা হামলার বিষয়ে তারা তাদের অবস্থান পরিষ্কার করতে না পারার কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ল্যান্ডস্কেপ বর্তমান রূপে পাল্টে দেয়ার একটা যোগসূত্র অনেকেই স্বীকার করেন।

অনেকের মতে, সর্বশেষ গত নির্বাচনে যেতে শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নিতে পারা। ‘মিত্রদের’ সঙ্গে হঠাৎ জোট গঠন করা, গণভবনে সংলাপে যাওয়া, প্রধানমন্ত্রীর কাছে গ্রেপ্তার হওয়া নেতাকর্মীদের একটি তালিকা ধরিয়ে দেয়া। কিন্তু তা থেকে কৌশলগত কোনো জয় অর্জন করতে না পারা। আবার ২৯শে ডিসেম্বরের ঘটনা সম্পর্কে কোনো ধরনের আঁচটি পর্যন্ত করতে না পারা। আবার সংসদে যোগদান প্রশ্নে একবার না একবার হ্যাঁ, মির্জা ফখরুলের যোগদান না করা, ভোটের পরে ‘ঐক্যফ্রন্টের রাজনীতি’কে বিসর্জন দেয়া, এমন সবকিছু মিলিয়ে এটা খুব পরিষ্কার যে, সাধারণ মানুষ তাদের ওপর খুব একটা ভরসা রাখতে পারছে না। স্থায়ী কমিটির সদস্যদের পরস্পরের বিরুদ্ধে মুখ খোলা বা অনুরাগ-বীতরাগ প্রকাশ করার মধ্যেও দলটির দুর্বলতার লক্ষণ স্পষ্ট।

অনেক পর্যবেক্ষক আক্ষেপ করে বলছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় যেখানে প্রায় প্রত্যেকটি পদক্ষেপ হতে হবে সঠিক, সেখানে প্রায় প্রত্যেকটি পদক্ষেপ ভুল বা বিভ্রান্তিকর হচ্ছে। কেউ বলছেন, ব্যর্থতার জন্য কে দায়ী, সেটা বড় কথা নয়। বিএনপির নেয়া পদক্ষেপগুলো সঠিক, সাহসী, মোক্ষম ও তাৎক্ষণিক বা কৌশলগত হওয়া থেকে অনেক দূরে আছে, সেটাই বড় ব্যাপার। অবশ্য কেউ কেউ বলছেন, টানা এক যুগের বেশি ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপির এমনই হওয়ার কথা। এতে খুব বেশি আপসেট হওয়ার কারণ নেই। আওয়ামী লীগ ২১ বছর ক্ষমতার বাইরে ছিল। তারা ফিরে এসেছে। আবার বিদায় নিয়েছে। আবার ফিরে এসেছে।
অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন যে, একুশ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের একটি অংশ এডাল থেকে ওডালে দাপাদাপি যে করেননি তাতো নয়। বিএনপিও সেই উপসর্গ থেকে মুক্ত নয়। সুদিন এলে বিএনপির পক্ষেও আবার শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিচিত্র নয়। তবে নিরপেক্ষ বিশ্লেষকরা বলছেন, ওই ২১ বছরে প্রধান বিরোধী দল যেভাবে যেটুকু অধিকার ভোগ করেছে, সেটা তো গত ১২ বছর অনুপস্থিত। আগামী ৯ বছর কীভাবে কাটবে সেই চিত্র আরো ধূসর।

২১ বছরের (১৯৭৫-১৯৯৬) ব্যবধানে নেতৃত্বের হাল ধরেছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। বাংলাদেশ রাজনীতিতে উত্তরাধিকার রাজনীতির দ্বিতীয় রাউন্ড চলছে। প্রথম রাউন্ডে উভয় পরিবারের উত্তরাধিকারীরা সাফল্যের উদাহরণ তৈরি করেছেন। বঙ্গবন্ধুর পরে শেখ হাসিনা, জেনারেল জিয়ার পরে তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় ফিরেছেন। দ্বিতীয় রাউন্ডে আছে জিয়া পরিবার। মন্ত্রীরা ঘোষণা দিয়েছেন, একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার আপিলের শুনানি এ বছরে হবে। আর তারেকের সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হবে। বিশ্লেষকরা আদালতের সম্ভাব্য ফলাফল বিষয়ে অতীতে ক্ষমতাসীনদের অভিপ্রায় ও বাস্তবতা মিলিয়ে নিচ্ছেন। আর তাই অনেকেই বলছেন, তারেক রহমানের যাবজ্জীবন সাজা মৃত্যুদণ্ডে উন্নীত হলে তার একটা প্রভাব বিএনপির রাজনীতিতে দৃশ্যমান হতে পারে। এই মুহূর্তে এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ কম যে, জেনারেল জিয়ার সব থেকে দুই প্রভাবশালী উত্তরাধিকার বেগম খালেদা জিয়ার জামিন অনিশ্চিত। তারেক রহমানের দেশে ফেরা অনিশ্চিত।

প্রশ্ন উঠেছে, বর্তমানে যে অবস্থা চলছে, সেই অবস্থা ধরে রেখে তারা আগামী সাধারণ নির্বাচনে কি করবে। ২০১৪ ও ২০১৮ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, মওদুদ আহমেদ, ড. মোশাররফ হোসেন, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় কী ভূমিকা রাখছেন- দলটির নেতাকর্মীদের কাছেও সেটা স্পষ্ট নয়। ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে সময় ঠিকই খসে পড়ছে। বিএনপি নেতারা ভাব নেন, তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি, তারেকের প্রত্যাবর্তন এবং সাধারণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। বাস্তবতা তা বলে না। অবশ্য অনেকে বলেন, বিএনপির কোনো নেতৃত্বই এর উত্তর জানেন না বা খোঁজেন না।
২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেছিলেন, তাদের নেতা জেলে যাওয়ায় দলীয় নেতাকর্মীরা আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ। মামলাও বিএনপির বেশি ক্ষতি করতে পারবে না।’ কিন্তু এই ঐক্য থাকলেও তা কি ফল দিয়েছে, তার সদুত্তর মির্জার জানা নেই। মামলা বিএনপির ক্ষতি যা করার করেছে। এবং করে চলছে। কোনো প্রতিরোধ তারা গড়ে তুলতে পারেননি। এখন মামলা করে করে ক্লান্ত প্রশাসন কিছুটা জিরিয়ে নিচ্ছে। মির্জা ওই সময়ে বিবিসিকে বলেছিলেন, খালেদাকে কারাগারে বেশিদিন রাখতে পারবে না। দল অটুট আছে, অটুট থাকবে। তিনি ভদ্রলোক, সজ্জন, কিন্তু ভিতু। দায়িত্ব পাওয়ার পর ২০টি জেলাও সফর করেননি। মির্জা হয়তো বিশ্বাস করেন, বিএনপির কর্মীবাহিনী, জনগণ সরকারি ‘নিপীড়ন’ মোকাবিলা করেই রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারবে।’ কিন্তু কি সেই রাজনৈতিক লক্ষ্য তারা কারো কাছে খুব পরিষ্কার নয়। মুক্তি, প্রত্যাবর্তন বা নির্বাচন ছাড়া কোনো পরিবর্তন অর্থবহ মনে করতে পারেন না দলের নেতাকর্মীরা।

বেগম খালেদা জিয়া আপসহীন। বলা হচ্ছে, তিনি চাইলে মুক্তি নিতে পারতেন। কিন্তু তার এই ত্যাগের মহিমা ম্লান। কারণ এটা কমই মনে করা হয় যে, তিনি মুক্তি পেলে বিরাট আন্দোলন হবে। কিংবা চলমান রাজনৈতিক স্থিতাবস্থার কোনো ‘বেইল আউট’ ঘটবে। বরং দলটির বিদেশি মিত্ররা- যারা একদা বিএনপির কাছে পরীক্ষিত ছিল, তারা বদলে গেছে। ওই ভাবনায় নানা চিড় ধরেছে। চীন ও সৌদি আরবের সঙ্গে আওয়ামী লীগের বর্তমান সম্পর্কটা বিএনপির সাবেক সম্পর্কের সঙ্গে তুলনা করলেই বিষয়টি জলবৎ তরলং হয়ে ওঠে। সুতরাং বিএনপি নেতৃত্বের সামনে প্রশ্ন তারা স্বল্পমেয়াদে, মধ্যমেয়াদে বা দীর্ঘমেয়াদে কি করবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘দেশে সামন্ত ধাঁচের মানসিকতা প্রবল। তাই আমরা পরিবারগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। জিয়া পরিবার থেকে একটা বিকল্প কাউকে বের করতে হবে। কারণ পরিবারের বাইরে নেতৃত্ব তো যাবে না। স্ট্যান্ডিং কমিটির যে অবস্থা কেউ কাউকে মানে না।’
অথচ বেগম খালেদা জিয়া বা তারেক রহমানের বাইরে পরিবারের কাউকে সামনে আনার বিষয়টি একেবারেই আলোচনায় নেই। সংরক্ষিত মহিলা আসনে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার অভিষেক পর্বে পর্দার আড়ালে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রীর নাম জানা গিয়েছিল। কিন্তু সেটা পর্দার আড়ালেই থাকলো।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমদে বলেন, আমরা যদি উপমহাদেশীয় উত্তরাধিকারী রাজনীতির দিকে তাকাই তাহলে রাজার ছেলে রাজা হবে, সেটা কিন্তু ট্রেন্ড নয়। বরং ট্রেন্ড এটাই যে, ভয়ানক কোনো বিয়োগান্তক অধ্যায়ের অব্যবহিত পরেই কেবল পরিবারের কারো উত্থান ঘটে। খুব বেশি দেরি হলে মানুষ ভুলে যায়। অন্তত উল্লেখেেযাগ্য সহানুভূতি মেলে না। এটা হারিয়ে যায়। ইন্দিরা গান্ধী হত্যাকাণ্ডের পর তার ছেলে রাজীব কেবল একবারই চান্স পেয়েছেন। ভুট্টোর ফাঁসির পরে বেনজির এবং বেনজির হত্যাকাণ্ডের পরে তার স্বামী সুযোগ নিয়েছেন। রাহুল পারল না বলে প্রিয়াঙ্কা এলো, তা কাজ দিলো না। বিলওয়াল ভুট্টো মায়ের হত্যাকাণ্ডের সহানুভূতির ভোট পাবেন, কিন্তু সেটাই ক্ষমতায় নেবে না। অবশ্য অনেক বিশ্লেষক বলেন, বিএনপিকে টিকতে হলে পরিবারের দিকে তাকিয়ে লাভ নেই। বর্তমান পরিবেশে তারা কেউ এসে হাল ধরার অবস্থায় নেই। কেউ এলেও তিনি হয়তো একজন নারী হবেন। কিন্তু বাস্তবতা তাকে স্বাগত জানাবে না। সুতরাং বিএনপিকে টিকতে হলে তার কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হবে। রাজধানী ঢাকাই বিরোধী দলের প্রধান ঘাঁটি। কিন্তু ঢাকাকে ১৫টি ভাগে ভাগ করে শক্তিশালী সাংগঠনিক কমিটি গঠন বিষয়টি স্বপ্ন হয়েই থাকছে। স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্যই শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছেন। তারা নিয়মিত সভায় আসতে পারেন না। পারেন না কার্যকরভাবে আলোচনায় অংশ নিতে।

দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, পুলিশ হেফাজতে নির্যাতন, মানবাধিকার কমিশনে দুর্বল ভূমিকা পালন, মাদক যুদ্ধে কয়েক শত লোকের মৃত্যু, ৩০ লাখের বেশি মামলাজট, সড়কে প্রতিদিন ২০ জনের বেশি মানুষের লাশ হওয়া, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্যে ভেজাল, ব্যাংকে তারল্য সংকট, যানজট, ঘুষ-দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া, পুঁজিবাজার ধ্বংস করে লাখ লাখ বিনিয়োগকারীকে নিঃস্ব করা, লাখো শিক্ষিত বেকারের চাকরি না হওয়া, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিদেশে পাড়ি দেয়া ইত্যাদি বিষয়ে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব কি বলছে- এসব বিষয় জানতে দেশের মানুষের আগ্রহ ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে।

বিএনপির সংকট গভীরতর। তার সংকটের কারণ পরিষ্কার। কিন্তু তা দূর করার সামর্থ্য নেতাদের নেই। এই প্রেক্ষাপটে অনেকে শঙ্কিত হয়ে বলছেন, সরকারি দলেরই উচিত দেশের স্বার্থে, ক্ষমতাসীন দলের স্বার্থে প্রধান বিরোধী দলকে স্পেস করে দেয়া। রোহিঙ্গা সংকটের পর আসাম সংকট এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের সম্ভাব্য উত্থান- সবমিলিয়ে একটা নতুন সংকট। এই মুহূর্তে শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে বিএনপির নিজেকে তৈরি করা দেশের বৃহত্তর স্বার্থেও জরুরি।

পাকিস্তানের চোখ ধাঁধানো কূটনৈতিক অভ্যুত্থান by এম বিলাল লাখানি

ট্রাম্প-ইমরান খানের সম্মেলন কাভার করার জন্য ওয়াশিংটনে ল্যান্ড করার পর যখন উবারে করে যাচ্ছিলাম, তখন উবারের ইথিওপিয়ান ড্রাইভার বললেন, “জণগণ ভালো নেতাদের পছন্দ করে না, তারা চায় আগ্রাসী নেতা”। দুজন পরস্পরবিরোধী নেতার সমালোচক ও সমর্থকদের মধ্যে অভিন্ন মিল খুঁজে পাওয়াটা দুর্লভ কিন্তু কার্যত সবাই একমত যে দুজনেই তারা আগ্রাসী। ভারত, আফগানিস্তান এবং আমেরিকান ক্ষমতা কাঠামোর অনেকের আপত্তি সত্বেও যে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো, তার কারণ হলো নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের ব্যাপারে দুই নেতার আগ্রাসী নীতি: ট্রাম্প আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতে চান এবং ইমরান পাকিস্তানের কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা দূর করে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির নতুন যুগের সূচনা করতে চান, যেটার জন্য প্রয়োজন বিদেশী বিনিয়োগ।

পাকিস্তান কিভাবে এই কূটনৈতিক অভ্যুত্থান ঘটালো, সেটার পেছনের ঘটনা জানতে আমি কথা বলি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মেহমুদ কোরেশি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী প্রবাস বিষয়ক বিশেষ সহকারী জুলফি বুখারি, এবং উইলসন সেন্টারের এশিয়া প্রোগ্রামের ডেপুটি ডিরেক্টর মাইকেল কুগেলম্যান।

বর্তমান সরকার যখন ক্ষমতায় আসে, পাকিস্তানের সাথে সাক্ষাতের জন্য তখন প্রস্তুত ছিল না আমেরিকা, গঠনমূলক বিনিময়ের কথা দূরে থাক। বিশ্বের জন্য একটা মাথাব্যাথা হিসেবে আমাদের দমিয়ে রাখা হয়েছিল। এই সময়টাতে ২০১৮ সালে ইউএনজিএ বৈঠকের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে আমেরিকান সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান শাহ মেহমুদ কোরেশি। এই সফরকালেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ লিন্ডসে গ্রাহাম ইমরান খানের সাথে বৈঠক করেন এবং তালেবানদের সাথে আলোচনার গুরুত্বের ব্যাপারে তার অবস্থান দেখে প্রভাবিত হন। তিনি জানতেন এটা ট্রাম্পের কাছে মিউজিকের মতো কাজ করবে, যিনি তার সেনাদেরকে ঘরে ফিরিয়ে নিতে চান, কারণ নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি এই যুদ্ধের ইতি টানার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

রাজনৈতিকভাবে আগ্রাসী মানসিকতার এই দু্‌ই নেতা ট্রাম্প ও ইমরান খান উভয়েই ব্যক্তিগতভাবে সামরিক সঙ্ঘাতের ব্যাপারে অনীহা রয়েছে। তালেবানদের সাথে আলোচনার বিষয়টি যখন জনপ্রিয় হয়নি, তখনই এই আলোচনার পক্ষে কথা বলে তালেবান খান আখ্যা পেয়েছিলেন ইমরান খান। অন্যদিকে উত্তর কোরিয়ার সাথে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সখ্যতা এবং ইরান মার্কিন ড্রোন ভূপাতিত করার পর পাল্টা আঘাত হানার নির্দেশ দিয়েও সেখান থেকে ফিরে আসার সিদ্ধান্তের মধ্যে দিয়েও তার মানসিকতা ফুটে উঠেছে। তাদের সীমাবদ্ধতা থাকলেও এই সম্মেলন সফল হওয়ার পেছনে যে কারণটি ভূমিকা রেখেছে, সেটা হলো সামরিক সঙ্ঘাতের ব্যাপারে আদর্শগতভাবে উভয়ের বিরোধী অবস্থান।

হোয়াইট হাউজে যখন দুই নেতার বৈঠক চলছিল, তখন মাইকেল কুগেলম্যান কফি খেতে খেতে আমাকে বললেন, “ট্রাম্পের সাথে বৈঠক হওয়াটাই পাকিস্তানের জন্য একটা সাফল্য”। তবে বৈঠকের বাইরেও পাকিস্তান তিনটি বড় বিজয় পেয়েছে। প্রথমত, ট্রাম্প কাশ্মীর ইস্যুতে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। দ্বিতীয় বিজয় হলো, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, আমরা আফগান শান্তি আলোচনার ব্যাপারে নতুন করে কোন প্রতিশ্রুতি দেইনি। পাকিস্তান শুধু শান্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে আমাদের আগ্রহের আন্তরিকতার বিষয়টি আবারও উল্লেখ করেছে। পাকিস্তানের জন্য এটা একটা চোখ ধাঁধানো কূটনৈতিক ক্যু। বহু অর্জন হয়েছে, যেখানে বিনিময়ে দিতে হয়েছে সামান্য, যেটা নয়াদিল্লী ও কাবুলে মর্মবেদনার জন্ম দিয়েছে।

তৃতীয়ত, খানের বিশাল সমাবেশ যেটার মাধ্যমে তার বৈধতা নিয়ে প্রাথমিকভাবে যে কথা বলা হয়েছিল, সেটা নাকচ হয়ে গেছে এবং মাইক পম্পেও এমনকি তার এই বিপুল অভ্যর্থনা নিয়ে মন্তব্য করেছেন। পরদিন আমরা যখন হোয়াইট হাউজে গেছি, আগের দিনের সমাবেশটা তখন ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

এরপর যা ঘটলো। ২০২০ সালের নির্বাচনী প্রচারণা শুরুর আগেই সেনা প্রত্যাহার শুরু করতে চান ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভারত ও আফগানিস্তানকে বাদ দিয়ে এ জন্য তিনি পাকিস্তানের উপর ভরসা করতে চান। ইমরান খান যদি এই সব কিছুতে সফল হতে পারেন, তাহলে তাকে স্মরণ করা হবে আফগানিস্তানে শান্তি আনয়নকারী দূত হিসেবে, তাকে স্মরণ করা হবে সেই নেতা হিসেবে, যিনি ভারতকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করেছেন এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাসের দীর্ঘ গতিপথকে পাকিস্তানের অনুকূলে ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করছেন ইমরান খান। ১২ মাসের মধ্যেই আমরা জানতে পারবো, তিনি ইতিহাস সৃষ্টি করবেন, নাকি নিজেই ইতিহাস হয়ে যাবেন।

পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য by এসএম আব্বাস

বইয়ের প্রচ্ছদ
ভ্রমণ কাহিনীতে সাধারণত গৎবাঁধা তথ্যের গতানুগতিক রূপ পাওয়া যায়। কোথায় গেলাম, কী করলাম, কী খেলাম, থাকার জায়গাটা কেমন ইত্যাদি তথ্যের সন্নিবেশেই এ ধরনের লেখার ভিত রচিত হয়ে থাকে। কিন্তু ‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ গ্রন্থটি চিরচেনা সেই কাঠামো ভেঙে বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে।

গ্রন্থটির লেখক জাকারিয়া মণ্ডল পেশায় সংবাদকর্মী। তিনি যতটা না সংবাদ সংগঠক, তার চেয়েও বেশি রিপোর্টিং মানসিকতা ধারণ করেন। ‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ বইয়ে তাই রিপোর্টিং ও ফিচারের অভূতপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে।
পেশাগত প্রয়োজনে পারস্য উপসাগরের দ্বীপদেশ বাহরাইন, দক্ষিণ চীন সাগরের পশ্চিমপাড়ের মালয় উপদ্বীপ ও পূর্ব পাড়ের বোর্নিও দ্বীপ, হিমালয় কন্যা নেপাল এবং প্রতিবেশী ত্রিপুরার আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়িয়েছেন জাকারিয়া মণ্ডল। আয়েশি পর্যটকের আড়মোড়া ভেঙে হয়ে উঠেছেন পরিশ্রমী পরিব্রাজক। সরেজমিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে কিংবদন্তি, ঐতিহ্য, ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতার গল্প মিশিয়ে নিজস্ব ঢঙে বুনেছেন ভ্রমণ সাহিত্য। ফাঁকে ফাঁকে বেদ, উপনিষদ, রামায়ণ, মহাভারত, মহাপুরাণ, উপপুরাণের আখ্যান ও উদ্ধৃতি বইটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’তে মোট ১২টি ভ্রমণ গল্প স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি মালয় উপদ্বীপের, চারটি ত্রিপুরার ও অবশিষ্ট তিনটি বোর্নিও, বাহরাইন ও নেপালের প্রেক্ষাপটে রচিত। প্রতিটি গল্পেই জ্বলজ্বল করছে অগণিত এক্সক্লুসিভ রিপোর্টের সম্ভাবনা। যেমন বাহরাইনের গল্পে মেসোপটেমীয় ও অ্যাসেরিয় সভ্যতার মিশেলে গড়ে ওঠা দিলমুন সভ্যতার প্রেক্ষাপট ও বিবর্তন, মালয়েশিয়ায় ভারতীয়দের অভিবাসন, বোর্নিওতে আত্মার উপাসক মুসলিম বাজাউ সম্প্রদায়, নেপালের স্বয়ম্ভু মন্দিরের বিবর্তন ও সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশের ময়নামতি ও পাহাড়পুরের প্রতিচ্ছায়ায় ছাওয়া ত্রিপুরার পিলাক নগর নিয়ে নিঃসন্দেহে বড় বড় রিপোর্ট হতে পারে। রবীন্দ্রনাথের ভুবনেশ্বরী, মাতাবাড়ির ত্রিপুরেশ্বরী, কসবার কমলেশ্বরী নিয়েও দারুণ রিপোর্ট করা যায়।
চোখে দেখা বিবরণে কীভাবে তথ্যের সমাবেশ ঘটাতে হয় তার অনন্য নজির হয়ে উঠেছে ‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ গ্রন্থটি। তবে অনেক বিষয়ে গবেষণালব্ধ অজানা বিষয়ের সমাবেশ ঘটালেও কিছু কিছু প্রসঙ্গ ইচ্ছে করেই অসমাপ্ত রেখে দিয়েছেন লেখক। এতে পাঠক মনের তৃষ্ণা আরও বেড়েছে নিঃসন্দেহে।

‘পাহাড়ের ভাঁজে মহাকাব্য’ গ্রন্থে অনেক কঠিন বিষয়কে সহজ ছন্দে গেঁথেছেন লেখক। তার বিবরণ সাবলীলভাবে এগিয়ে চলে বাঁধ ভাঙা স্রোতস্বিনীর মতো। একবার পাঠের মধ্যে ঢুকে পড়লে মগ্ন হয়ে পড়তে হয়। বইয়ের পাতায় ফুটে উঠতে থাকে একের পর এক ভ্রমণ দৃশ্যের প্রাণবন্ত সব ছবি।

সব গল্পেই প্রাসঙ্গিক ও দুর্লভ আলোকচিত্রের উপস্থিতিতে বইটি আরও দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। সহায়িকা হিসেবে ব্যবহার করা বিভিন্ন গ্রন্থ ও সূত্রের উদ্ধৃতি গ্রন্থটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। গত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বইটি প্রথম প্রকাশিত হয়। প্রকাশক শুদ্ধপ্রকাশ। চার রঙে ছাপা বইটির দাম ২৫০ টাকা। বিভিন্ন অভিজাত বইয়ের দোকান ছাড়াও অনলাইনে রকমারি ও ইত্যাদি শপে বইটি পাওয়া যাচ্ছে।

টাইমের চোখে প্রভাবশালী ১০ মুসলিম by মনযূরুল হক

প্রতি বছরের মতো এ বছরও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত ম্যাগাজিন ‘টাইম’ বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করেছে। ১৯৯৯ সালে শুরু হওয়া ‘টাইম ওয়ান হানড্রেড’ ১৭ এপ্রিল সংখ্যায় রয়েছে চমকের বাহার। বিখ্যাত অনেকেই অবস্থান হারিয়েছেন এবং দেখা মিলেছে অনেক নতুন মুখের। পাইওনিয়ার, আর্টিস্ট, লিডার, আইকন ও টাইটান- এমন পাঁচ ক্যাটাগরির তালিকায় স্থান পেয়েছেন প্রভাবশালী ১০ মুসলিম ব্যক্তিত্ব।
২১ জনের পাইওনিয়ার তালিকায় রয়েছেন মার্কিন কমেডিয়ান হাসান মিনহাজ ও সামিন নুসরাত। শিল্পীদের ১৭ জনের তালিকায় রয়েছেন সম্প্রতি অস্কারজয়ী অভিনেতা মাহেরশাল আলী। বিশ্বের প্রভাবশালী নেতাদের তালিকায় থাকা ২৬ জনের মধ্যে স্থান পেয়েছেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ, মালয়েশিয়ার মাহাথির, পাকিস্তানের ইমরান খান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদ। প্রভাবশালী আইকনদের ১৪ জনের তালিকায় রয়েছেন দুজন মুসলিম নারী মানবাধিকার কর্মীÑ রাজিয়া আল-মুতাওয়াকিল ও লুজাইন আল-হাজলুল। আর সর্বশেষ টাইটান বা ‘দানব’দের নিয়ে তৈরি ১৬ জনের তালিকায় সবচেয়ে উজ্জ্বল অবস্থানে আছেন মিসরীয় ফুটবল তারকা মোহাম্মদ সালাহ, যিনি মার্ক জাকারবার্গ ও মুকেশ আম্বানিকেও পেছনে ফেলেছেন। আসুন টাইমের চোখে বিশ্বখ্যাত মুসলিম তারকাদের সম্পর্কে চেনাজানা হোক।
১. হাসান মিনহাজ
১৯৮৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেওয়া হাসান মিনহাজ একজন লেখক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও টেলিভিশন প্রযোজক। টাইম ম্যাগাজিনের পক্ষে তাকে নিয়ে লিখেছেন ডেইলি শোতে তার সহকর্মী ট্রেভার নোয়া। তিনি লেখেনÑ ২০১৪ সালে যখন হাসান মিনহাজের সঙ্গে প্রথমবারের মতো আমার দেখা, তখন আমরা এখানে কাজ করতে এসেছিলাম। এরপর পাঁচ বছর কেটে গেছে, আর হাসানের মুখ এখন বিশ্বব্যাপী টেলিভিশন পর্দায় দেখা যাচ্ছে। ২০১৭ সালে হোয়াইট হাউসের প্রতিনিধিদের ডিনারে কৌতুক পরিবেশনের পর তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে এবং লেটনাইট শোতে তার উপস্থিতি আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন মুসলমান ও অভিবাসীদের প্রতি খ—গহস্ত হয়ে পড়েন, তখন হাসান মিনহাজের কণ্ঠ প্রতিবাদে ছিল মুখর। হাসান একজন প্রথম প্রজন্মের ইন্ডিয়ান আমেরিকান মুসলিম। দীর্ঘ পরিশ্রম ও সাধনার মধ্য দিয়ে হাসান তার ধারালো ও স্মার্ট ভাষ্য, ক্যারিশম্যাটিক ব্যক্তিত্ব ও আন্তরিকতা দিয়ে আমেরিকা জয় করেছেন। এখন হাসানই আমেরিকা এবং আমেরিকাই হাসান।
কৌতুকই হাসানের শক্তি। তার কৌতুকের ধারালো আঘাতে বেশ কয়েকবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মিনহাজের মজলিস এড়িয়ে যান। মিনহাজের পৈতৃক বসতি ভারতের উত্তর প্রদেশের আলীগড়ে। তারা বাবা নাজমি রসায়নবিদ এবং মা সিমা ডাক্তার। তারা ক্যালিফোর্নিয়ার দাভোসে অভিবাসী হন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক করেন মিনহাজ। তিনি ইংরেজি ভাষা ছাড়াও অবিরত হিন্দি ও উর্দুতে কথা বলতে পারেন।
২. সামিন নুসরাত
সামিন নুসরাত হলেন শেফ ও রান্নাবিষয়ক জনপ্রিয় লেখক। নিউইয়র্ক টাইমস ম্যাগাজিনে তিনি নিয়মিত লেখেন। জন্ম ১৯৭৯ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সানদিয়েগো শহরে। কিন্তু তার বাবা-মা ইরানি, ১৯৭৬ সালে তারা অভিবাসী হয়ে আমেরিকায় আসেন। ১৯৯৭ সালে বার্কেলের ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি বিষয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হন। তখনই শেজ পেনিশ রেস্টুরেন্টে খেতে গিয়ে বিখ্যাত শেফ অ্যালিস ওয়াটার্সের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং দীর্ঘদিন তার সঙ্গে কাজ করার পর অ্যালিস মন্তব্য করেনÑ সামিন নুসরাত হবে আমেরিকার পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে খ্যাতিমান রন্ধন শিক্ষক। টাইমের পক্ষে অ্যালিস তাকে নিয়ে লেখেনÑ সততা, হৃদ্যতা, নিরলস প্রচেষ্টা আর একাগ্রতার বদৌলতে সামিন এখন পৃথিবী বিখ্যাত একজন শেফ। সামিন দেখিয়েছে যে, কে কোথা থেকে এসেছে, সেটা কোনো বিষয় নয়। বরং সে আপনার উপাদানগুলো বুঝতে পারছে। বিশ্বের যেখানেই আপনি থাকেন বা বেড়ে ওঠেন, সেখানকার পরিবেশে কীভাবে স্বাস্থ্যসম্মত ও সুস্বাদু খাবার তৈরি করে নিতে পারেন, তা আমাদের বলে সামিন।
‘সল্ট, ফ্যাট, এসিড, হিট’ (২০১৭) শিরোনামে লেখা তার বইকে লন্ডনের দ্য টাইমস বর্ষসেরা রান্নাবিষয়ক বই হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং নিউইয়র্ক টাইমসের জরিপে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত বইয়ের তালিকায় স্থান পায়। বইটি অবলম্বনে ‘সল্ট, ফ্যাট, এসিড, হিট’ নামে একটি ডকু সিরিজ নেটফ্লিক্সে প্রচারিত হচ্ছে।
৩. মাহেরশাল আলী
আলীর জন্ম ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে ১৯৭৪ সালে। তিনি সেন্ট মারিস কলেজ অব ক্যালিফোর্নিয়া থেকে ১৯৯৬ সালে গণযোগাযোগ বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অভিনয় প্রোগ্রামে মাস্টার্স করেন। ধর্মভীরু খ্রিষ্টান পরিবারে বেড়ে ওঠা আলী ১৯৯৯ সালে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তার আগের নাম মাহেরশাল আলহাশবাজ গিলমোর থেকে পরিবর্তন করে মাহেরশাল আলহাশবাজ আলী রাখেন। তিনি মুসলিম অভিনেত্রী আমাতুস সামি করিমকে বিয়ে করেন এবং তাদের শিশুকন্যার নাম রাখেন বারি নাজমা।
২০১৭ সালে ‘মুনলাইট’ ছবিতে অভিনয় করে অস্কারের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম অভিনেতা হিসেবে একাডেমিক পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৯ সালে ‘গ্রিনবুক’ ছবির জন্য দ্বিতীয়বার অস্কার পান তিনি। তিনি হাঙ্গার গেমস, হাউস অব কার্ডস ও কর্নেল স্টোকসের মতো জনপ্রিয় বেশ কিছু টিভি সিরিজে অভিনয় করেছেন। টাইম ম্যাগাজিনে তার পক্ষে আরেক অস্কারজয়ী অভিনেত্রী অক্টাভিয়া স্পেন্সর লেখেনÑ মাহেরশাল আলী বহু বছর ধরে দর্শকদের যা দিয়েছেন, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি সম্প্রতি তার মূল্যায়ন করেছে। তিনি আমাদের শিল্পকে সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে গেছেন। প্রতিটি চরিত্রে নিখুঁত অভিনয়ের খেলা খেলেন তিনি। একজন দক্ষ ও যোগ্য অভিনেতা হিসেবে আমি সবসময় তাকে শ্রদ্ধা করি।
৪. আবি আহমেদ
তার পুরো নাম আবি আহমেদ আলী। ২০১৮ সালের ২ এপ্রিল তিনি ইথিওপিয়ার চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। ১৯৭৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্ম নেওয়া এ নেতার বাবা ছিলেন একজন অরমো উপজাতীয় মুসলিম আর মা খ্রিষ্টান। আদ্দিস আবাবার মাইক্রো লিংক ইনফরমেশন টেকনোলজি কলেজ থেকে স্নাতক সম্মান লাভ করে তিন লন্ডনের গ্রিন উইচ ইউনিভার্সিটির অধীনে ইন্টারন্যাশনাল লিডারশিপ ইনস্টিটিউট থেকে মাস্টার্স করেন। সামরিক বাহিনীতে থাকাকালে তিনি লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদবি পেয়েছিলেন। এরপর রাজনীতিতে আসেন।
ইথিওপিয়ার অলিম্পিক ক্রীড়াবিদ ফেইসা লিলেসা তার সম্পর্কে টাইম ম্যাগাজিনে লেখেনÑ ২০১৬ সালে ইথিওপিয়া যে বাজে অবস্থায় উপনীত হয়েছিল এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিবাদে দেশটি যখন গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, আমি অলিম্পিকের ম্যারাথনে কাক্সিক্ষত রেখা পার হচ্ছিলাম, আর আমার দেশ ও মাকেও চিরতরে হারাতে বসেছিলাম। তখনই ত্রাতার ভূমিকায় ড. আবি আহমেদ আবির্ভূত হন। আফ্রিকা মহাদেশের সর্বকনিষ্ঠ এ সরকারপ্রধান স্বল্পতম সময়ের মধ্যেই এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, গত ২০ বছর ধরে চলা পূর্ব আফ্রিকার দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বন্ধ হয়ে শান্তি ফিরে এসেছে। আমি বলব, ইথিওপিয়ার ইতিহাসে তার মতো নেতা আর দেখিনি। তিনি হাজার হাজার রাজনৈতিক বন্দিকে মুক্তি দিয়েছেন। জনগণ এখনও প্রতিবাদ করে সত্য; কিন্তু প্রতিবাদ করলেই তারা জেলে যায় না। এটাই আশার আলো, এটাই গণতন্ত্র।
৫. ইমরান খান
ইমরান খান ১৯৫২ সালের ২৫ নভেম্বর পাঞ্জাবের শাহিওয়ালে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ইকরামুল্লাহ খান নিয়াজির একমাত্র ছেলে। ১৯৭৫ সালে তিনি অক্সফোর্ডের কিবল কলেজে রাজনীতি, দর্শন ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৯৯৬ সালে রাজনীতিতে আসেন এবং পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমবার নির্বাচনে হারলেও ২০০২ সালে জয়ী হন এবং ২০১৮ সালের আগস্টে পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
১৯৯২ সালে তার নেতৃত্বে ক্রিকেট বিশ্বকাপ জেতে পাকিস্তান। নিজ উদ্যোগে লাহোরে তিনি তার মায়ের নামে একটি বিশ্বমানের ক্যান্সার হাসপাতাল নির্মাণ করেছেন। পাকিস্তানের খ্যাতিমান সাংবাদিক ও ‘তালিবান’ গ্রন্থের লেখক আহমেদ রশিদ টাইম ম্যাগাজিনের পক্ষ থেকে তার সম্পর্কে লেখেনÑ কঠিন সময় পাড়ি দিচ্ছে পাকিস্তান, যখন দেশটি ঋণের ভারে জর্জরিত এবং চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। এমন সময় দেশটির হাল ধরেন ইমরান খান। তিনি যেমন বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন পাকিস্তানকে, তেমনি ২০ বছর আগে পাকিস্তানি কলুষিত রাজনীতিতে প্রবেশ করে একেবারে শূন্য অবস্থান থেকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছেন। সমালোচকরা বলেন, পাকিস্তানি আর্মি ও ইসলামি চরমপন্থি দলগুলোর সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। তবে তার নেতৃত্বে বলীয়ান হয়ে উঠছে পাকিস্তান। কেননা তিনি চালকের আসনে বসে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পনা করতে পারেন। দক্ষিণ এশিয়ার দ্বন্দ্ব-সংঘর্ষ ঘুচে তার নেতৃত্বে স্থায়ী শান্তি আসবে আশা করা যায়।
৬. যুবরাজ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান
১৯৬১ সালে জন্ম নেওয়া আরব আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স ‘এমবিজেড’ নামে পরিচিত। তিনি দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট ও আবুধাবির শাসক জায়েদ বিন সুলতান আল নাহিয়ানের তৃতীয় ছেলে, বর্তমান আমির খলিফা বিন জায়েদের ছোট ভাই এবং আবুধাবির সিংহাসনের উত্তরসূরি। একই সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রীয় ইউনিয়ন ডিফেন্স ফোর্সের প্রধান এবং আমির খলিফা বিন জায়েদের অবর্তমানে রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক রায়ান বোহল টাইমের পক্ষে তার সম্পর্কে লেখেনÑ উত্তরাধিকার সূত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট খলিফা বিন জায়েদ হলেও দেশটির ক্ষমতার মূল কেন্দ্র আসলে ক্রাউন প্রিন্স মোহম্মদ বিন জায়েদ। সম্প্রতি শত্রুভাবাপন্ন দেশ ইরান এবং কাতারের সঙ্গে যে উপসাগরীয় বিবাদের শুরু হয়, এতে মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন তিনি। ঝুঁঁকি গ্রহণে তিনি এমনই সিদ্ধহস্ত যে, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান তাকে অনেকাংশেই অনুকরণ করেন।
৭. মাহাথির মোহাম্মদ
ডা. মাহাথির মোহাম্মদ মালয়েশিয়ার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি। ১৯৮১ সালে প্রথমবার দায়িত্ব গ্রহণের পর তার দল পরপর পাঁচবার সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে এবং এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। ২০০৩ সালের ৩০ অক্টোবর তিনি স্বেচ্ছায় পদ ছেড়ে দেন। ১৫ বছর পর আবারও আসেন রাজনীতিতে। মাহাথিরের ভাষায়Ñ জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সংশোধনের জন্য তিনি আবার সক্রিয় হয়েছেন। ২০১৮ সালের ৯ মে সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হয়ে ৯২ বছর বয়সে পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।
১৯২৫ সালে তিনি মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর অ্যালোর সেটরে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক এবং মা ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত নারী; যিনি মাহাথিরকে বাড়িতে কোরআন শিক্ষা দিতেন। ১৯৪৭ সালে তিনি সিঙ্গাপুরের কিং অ্যাডওয়ার্ড মেডিসিন কলেজে ভর্তি হয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন।
টাইম ম্যাগাজিনে তার সম্পর্কে ব্রিটিশ অনুসন্ধানী সাংবাদিক ক্লারে রিক্যাসল ব্রাউন বলেনÑ ক্ষমতার লড়াইয়ে নামার জন্য তার যথেষ্ট তারুণ্য ছিল না। তদুপরি নিজের নৈতিক মনোবলের ওপর দাঁড়িয়ে ৯২ বছর বয়সে উত্তরসূরি নাজিব রাজাককে হারিয়ে প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। বোঝা যায়, বয়োজ্যেষ্ঠ এ নেতার ওপর এখনও আস্থা রাখেন মালয়েশিয়ার জনগণ। এখন তিনি ৯৩ বছরের বৃদ্ধ এবং প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, এরপর ৭১ বছর বয়সি আনোয়ার ইব্রাহিমের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন।
৮. রাজিয়া আল-মুতাওয়াকিল
টাইম ম্যাগাজিনের নির্বাচিত প্রভাবশালীদের মধ্যে সম্ভবত রাজিয়া আল-মুতওয়াকিল মিডিয়ায় সবচেয়ে কম পরিচিত। তিনি মূলত একজন ইয়েমেনি মানবাধিকার কর্মী, যিনি ‘মাওয়াতানা অর্গানাইজেশন’-এর মতো একটি মানবাধিকার সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ২০০৪ সাল থেকে ইয়েমেনের মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতো সংগঠনের সঙ্গে কাজ করছেন তিনি। এর আগে সানাআ ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যাস-কমিউনিকেশনের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। ২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো কোনো ইয়েমেনি নারী হিসেবে তিনি ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট ও জাতিসংঘের সিকিউরিটি কাউন্সিলে ইয়েমেনের পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করার জন্য আমন্ত্রণ পান।
আমেরিকার ভার্মন্ট অঙ্গরাজ্যের সিনেটর ও প্রবীণ মার্কিন রাজনীতিক বার্নি স্যান্ডার্স তাকে নিয়ে টাইম ম্যাগাজিনে লিখেছেনÑ রাজিয়া এমন নারী, যিনি প্রথম যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তুলছেন। ইয়েমেন পরিস্থিতি নিয়ে বড় পরিসরে গণমাধ্যমে লিখতে শুরু করেছেন। দুর্ভিক্ষপীড়িত ইয়েমেনের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে কাজ করতে গিয়ে রাজিয়া এবং তার দলকে প্রতিনিয়ত বিপদের ঝুঁঁকিতে থাকতে হয়। তার এ দুঃসাহসিক পদক্ষেপ আমাদের সবার জন্য অনুকরণীয়।
৯. লুজাইন আল-হাজলুল
১৯৮৯ সালের জুলাইতে জন্ম নেওয়া এ তরুণী সৌদি নারী অধিকারকর্মী ও সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে পরিচিত। তবে তিনি প্রথম খ্যাতি পান সৌদির রাস্তায় প্রকাশ্যে গাড়ি চালানোর কারণে। যার ফলে তাকে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করতে হয়। ব্রিটিশ কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়া লুজাইন সর্বশেষ ২০১৮ সালে বেশ কয়েকজন নারীবাদীর সঙ্গে গ্রেপ্তার হন। মুক্তি পান সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানো সংক্রান্ত আইনি বিধিনিষেধের বিলুপ্তি ঘটার মাধ্যমে। এর আগে ২০১৫ সালে তিনি প্রভাবশালী ১০০ আরব নারীর মধ্যে তৃতীয় বলে বিবেচিত হয়েছিলেন। ২০১৬ সালে তিনি ১৪ হাজার নারীর স্বাক্ষরসহ নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতার বিষয়ে বাদশা সালমান বরাবর রিট পিটিশন দাখিল করেন।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকাবিষয়ক নির্বাহী পরিচালক সারাহ লি উইটসন টাইম ম্যাগাজিনে তার সম্পর্কে লেখেন- লুজাইন যা করেছেন, তার জন্য সে একই সঙ্গে বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে এবং সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নিগৃহীত হয়েছে একজন নারী। আসলে সে হলো সৌদি নারিত্বের আদর্শ।
১০. মোহাম্মদ সালাহ
১৯৯২ সালের ১৫ জুন মিসরের নাজরিজে জন্ম নেওয়া সালাহ মাত্র ২০ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবলার হিসেবে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান। ২০১৭ সালে জনপ্রিয় ক্লাব লিভারপুলে যোগ দেওয়ার আগে তিনি ব্রিটিশ ক্লাব চেলসি, ইতালিয়ান ক্লাব ফিওরেন্তিনা ও রোমার হয়ে খেলেছেন। ২০১৩ সালে ম্যাগিকে বিয়ে করেন তিনি। পরের বছর জন্ম নেয় তার কন্যাসন্তানÑ মক্কা।
সালাহকে বলা হয় মিসরের মেসি। ফুটবলের পাশাপাশি তিনি মিসর ও মধ্যপ্রাচ্যে অবহেলিত নারীদের জন্য কাজ করেন। এ বছর টাইম ম্যাগাজিনের ছয়জন কভার তারকার একজন সালাহ এবং একই সঙ্গে ওয়েবসাইটে তাকে নিয়ে একটি দেড় মিনিটের ভিডিও ডকুমেন্টারি আপ করা হয়েছে। যেখানে তিনি বলেছেনÑ আমাদের সংস্কৃতিতে যেভাবে মেয়েদের দেখা হয়, সেটা পাল্টানো দরকার। এটা হতেই হবে, এর বিকল্প নেই। আমি আগের চেয়েও বেশি সমর্থন দিই মেয়েদের। কারণ আমি উপলব্ধি করি তারা আরও বেশি কিছু পাওয়ার দাবি রাখে।
এইচবিও’র কার্যনির্বাহী প্রজোযক জন অলিভার টাইম ম্যাগাজিনে তাকে নিয়ে লিখেছেনÑ একজন ফুটবল খেলোয়াড়ের চেয়েও বড় ব্যাপার হচ্ছে সালাহ একজন ভালো মানুষ। যদিও বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারও তিনি। সারা বিশ্বের মিসরীয়, লিভারপুল ও মুসলিমদের কাছে তিনি একজন আইকন। যদিও বিশ্বকাপে আশানুরূপ ফল দেখাতে ব্যর্থ হয় তার দেশ। কিন্তু তিনি প্রতিটি গোলের পরই সিজদার মাধ্যমে তা উদযাপন করেছেন। বিনয়ী, চিন্তাবিদ ও মজার মানুষ হিসেবে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত।

ইরানে ট্যাংকার আটক: জাহাজের পতাকা কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?

বাণিজ্যিক জাহাজে ব্রিটিশ পতাকা
পারস্য উপসাগরে মালবাহী জাহাজ স্টেনা ইমপেরো আটক করেছে ইরান, যেটি চলছিল ব্রিটিশ পতাকা নিয়ে। কিন্তু আসলে এই জাহাজটির মালিক একটি সুইডিশ কোম্পানি এবং পুরো জাহাজে কোন ব্রিটিশ নাগরিক ছিল না।
কিন্তু এটা অস্বাভাবিক নয়। বরং অনেক সময়েই দেখা যায় যে, জাহাজটি এমন একটি দেশের পতাকা নিয়ে চলাচল করছে, যার মালিক একেবারেই ভিন্ন দেশের লোক।
কিন্তু কেন এটা করা হয়? তাতে কি সুবিধা?
কেন লাইবেরিয়া, পানামা আর মার্শাল আইল্যান্ডের পতাকাবাহী জাহাজ বেশি দেখা যায়?
সাগরে চলাচলকারী প্রতিটি বাণিজ্যিক জাহাজকে কোন না কোন দেশে নিবন্ধন করতে হয় এবং সেই দেশের পতাকা ওই জাহাজটি বহন করবে। দেশটিকে বলা হয় ফ্ল্যাগড স্টেট।
ওপেন রেজিস্ট্রি পদ্ধতিতে, যাকে অনেক সময় 'সুবিধা অনুযায়ী পতাকা' বলেও বর্ণনা করা হয়, জাহাজ যেকোনো দেশে তালিকাভুক্ত হতে পারে, জাহাজের মালিক অন্য দেশের হলেও তাতে কোন সমস্যা নেই।
তবে অন্য পদ্ধতিগুলোয় পতাকার বিষয়ে বেশ কড়াকড়ি রয়েছে যে, এসব জাহাজের মালিক কে হতে পারবে এবং কিভাবে জাহাজ পরিচালনা করা হবে। যে দেশে নিবন্ধন করা হয়, সে দেশের আইনকানুন জাহাজটিকে মেনে চলতে হয়।
ব্রিটিশ পতাকাবাহী জাহাজ স্টেনা ইমপেরো - এই ট্যাংকারটিকেই আটক করেছে ইরান।
পানামা, মার্শাল আইল্যান্ড আর লাইবেরিয়া হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ফ্ল্যাগ স্টেট বা পছন্দের পতাকার দেশ।
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক জাহাজের তালিকায় প্রায় তেরশো জাহাজ তালিকাভুক্ত রয়েছে।
এই লাল পতাকার ব্যানারের দলে যুক্তরাজ্য, ক্রাউন ডিপেন্ডেনসিস (আইল অফ ম্যান, গার্নসে, এবং জার্সি) এবং যুক্তরাজ্যের ওভারসিজ টেরিটরি (অ্যানগুলিয়া,বারমুডা, দ্যা ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, দ্যা কেইম্যান আইল্যান্ড, দ্যা ফকল্যান্ড আইল্যান্ড, জিব্রাল্টার, মন্টসেরাত, সেন্ট হেলেনা এবং দ্যা টার্ক ও কাইকোস আইল্যান্ড) মিলে বিশ্বের নবম বৃহত্তম জাহাজ বহরে পরিণত হয়েছে।

নিজে দেশ ছেড়ে কেন অন্য দেশের পতাকা?

অনেকগুলো বাণিজ্যিক কারণ বিবেচনায় রেখে জাহাজ মালিকরা নিবন্ধন করার দেশটিকে বাছাই করেন।
এসবের মধ্যে রয়েছে সেখানকার আইনকানুন, করের হার, সেবার মান- বলছেন ম্যারিটাইম নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আয়োনিস চাপসোস।
তিনি বলছেন, গ্রীস হচ্ছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ মালিকের দেশ। কিন্তু সেখানকার বেশিরভাগ জাহাজই গ্রীসের পতাকা বহন করে না।
এর একটি বড় কারণ, সেখানে এজন্য অনেক বেশি অংকের ট্যাক্স দিতে হয়।
বরং 'ফ্ল্যাগ স্টেট, অনেক সময় দেখা যায় যেগুলো একটু গরীব দেশ, তারা জাহাজ নিবন্ধন করে অর্থ আয় করার সুযোগ পায়।
জিব্রাল্টারের কাছে এই ইরানি তেলবাহী জাহাজটি আটক করেছিল ব্রিটেন, তার পর থেকেই ইরান পাল্টা ব্যবস্থার হুমকি দিচ্ছিল
যেমন জাহাজ নিবন্ধন খাত থেকে পানামার অর্থনীতিতে প্রতিবছর কোটি কোটি ডলার যোগ হয়।
এখানকার নিবন্ধন পদ্ধতির কারণে বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে জাহাজের কর্মীদের নিয়োগ দেয়া যায়, যা কোম্পানির খরচও অনেক কমিয়ে আনে।
এই 'সুবিধা অনুযায়ী পতাকা' পদ্ধতির অনেক সমালোচনা রয়েছে, বিশেষ করে এর দুর্বল নিয়মাবলী আর তদারকির অভাব, যা এমনকি অনেক সময় আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের নিয়মের বিরুদ্ধে চলে যায়। যদিও গত তিন দশক ধরে জাহাজ চলাচলের রীতিনীতির বিশেষ উন্নতি ঘটতে দেখা গেছে।
তবে এখনো এই ব্যবস্থার অনেক সমালোচনা করা হয়।
ভিন্ন দেশের পতাকাবাহী হওয়ার কারণে অনেক সময় মজুরি বৈষম্য বা খারাপ কাজের পরিবেশর জন্য মালিকের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, বলছে আন্তর্জাতিক ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কাস ফেডারেশন।

কার দায় বেশি?

কোন দেশে নিবন্ধন করার পর পতাকা বহনের পাশাপাশি ওই জাহাজের ওপর ওই দেশের আইন কার্যকর হবে। পতাকাবাহী জাহাজের কোন অপরাধের জন্য দায়দায়িত্ব বহন করবে যে দেশে তালিকাভুক্ত হয়েছে, সেই দেশটি।
যার মানে হলো নিবন্ধন দেয়ার সময় প্রতিটা জাহাজকে জরিপ এবং যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে, বলছে আইএমও।
পারস্য উপসাগরে একটি বিস্ফোরণে ক্ষতিগ্রস্ত হয় নরওয়ের মালিকানাধীন কিন্তু মার্শাল আইল্যান্ডে নিবন্ধনকৃত জাহাজ ফ্রন্ট অলটেয়ার
যেসব দেশে জাহাজ তালিকাভুক্ত হয়, প্রতিটা দেশই আন্তর্জাতিক ম্যারিটাইম চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে এবং চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নের দায়িত্ব নিয়েছে। যেসব বিধিবিধানের মধ্যে রয়েছে জাহাজ কিভাবে তৈরি হবে, নকশা, সরঞ্জাম এবং কিভাবে জাহাজটি পরিচালিত হবে ইত্যাদি।
জাতিসংঘের কনভেনশন ফর দি ল' অফ দি সী অনুযায়ী, সমুদ্রে চলাচলের সময় জাহাজে যেন সবরকম নিরাপত্তার ব্যবস্থা থাকে, সেটা নিশ্চিত করবে নিবন্ধন করা দেশটি, যাদের পতাকা ওই জাহাজে রয়েছে।

নিবন্ধনের বিষয়গুলো কে দেখে?

এটা খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার নয় যে, কোন একটা দেশে জাহাজ নিবন্ধন এবং ওই দেশের পতাকা জাহাজটি বহন করলেও, এই নিবন্ধনের পুরো কাজটি হয়তো করা হচ্ছে আরেকটি দেশে।
লাইবেরিয়ার উদাহরণ দেখা যাক, যেখানে জাহাজ নিবন্ধনের কাজটি করে একটি আমেরিকান কোম্পানি, যাদের সদর দপ্তর ওয়াশিংটন ডিসিতে।
ভূমিবেষ্টিত মঙ্গোলিয়ার নিবন্ধন দপ্তর সিঙ্গাপুরে অবস্থিত।
কোমোরোসের নিবন্ধন হয় বুলগেরিয়া থেকে।
ভানুয়াটুর জাহাজ নিবন্ধন অফিস রয়েছে নিউইয়র্কে।
জাহাজ নিবন্ধনের এই অস্বাভাবিক পদ্ধতি অনেক সময় নিরাপত্তা ঝুঁকিরও তৈরি করে।
নিবন্ধনকারী কোন দেশের পক্ষে তালিকাভুক্ত হওয়া সব জাহাজকে নিরাপত্তা দেয়া সম্ভব নয়, বলছেন মি. চাপসোস, যদিও ওই জাহাজটি হয়তো ওই দেশেরই একটি বর্ধিত অংশ।
আর এটা সেসব দেশের জন্য আরো কঠিন যাদের হয়তো ছোট আকারের নৌবাহিনী রয়েছে, যেমন র‍য়্যাল নৌবাহিনী, কিন্তু বাণিজ্যিক জাহাজের বিশাল বহর রয়েছে।
ব্রিটিশ ইরানিয়ান নাগরিক নাজনিন যাগারি-র‍্যাটক্লিফকে ইরান আটক করে রাখায় ইরানের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক আগে থেকেই তিক্ত হয়ে উঠেছে। ছবিতে মেয়ের সঙ্গে নাজনিন